September 29, 2009

পুজো











ইনি হচ্ছেন কলম্বাস, ওহায়োর বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের মা দুর্গা। এঁরই ছুতো করে গত শনিবার আমরা সুটকেস ঘেঁটে তাঁতের শাড়ি, ফ্যাবইন্ডিয়ার পাঞ্জাবি, বাটিকের ডিজাইনার হ্যান্ডব্যাগ আর কোলাপুরি চটি ধুলো ঝেড়ে পরে বেরিয়েছিলাম। আকাশে ঘন কালো মেঘ আর দিনভর ঘ্যানঘেনে বৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও।

প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর যে পর্বটা থাকে, আমদের বেলায় পুজো দেখতে যাওয়ার আগের সেই পর্বটা হচ্ছে চাঁদা নিয়ে দরাদরি। এই অনাদিঅনন্তকাল ধরে চলতে থাকা ছাত্রাবস্থা, বছরের এই সময়টুকুতেই যা একটুখানি মাইলেজ দেয়। গরিব গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের জন্য দয়ালু কর্তৃপক্ষ চাঁদা কম ধার্য করেন। যাতে আমরা দোল বেঁধে গিয়ে মাসরস্বতীর পায়ে বই ঠেকিয়ে আসতে পারি।



চুল বাঁধতে বাঁধতে, শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে করতে, রং মিলিয়ে লিপস্টিক পরতে পরতে আর একখানা পাঞ্জাবি গলিয়েই যাদের সাজ কমপ্লিট সেই ছেলেছোকরাদের গালি খেতে খেতেই বেলা এগারোটা। ঊর্ধ্বশ্বাসে পুজোর ভেনুতে পৌঁছে দেখি তক্ষুনি সেকেন্ড ইন্সটলমেন্টের অঞ্জলি জাস্ট শুরু হয়েছে। মাদুর্গাকে মনে মনে মনে থ্যাংকস দিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ি।

কলকাতা বা কলম্বাস, পুজো যেখানকারি হোক না কেন, কোনওখানেই মাদুর্গা ও তাঁর পরিবার লাইমলাইটে থাকেন না। দেশে ঝাড়লণ্ঠন আর ঘুঁটের প্যান্ডেল আমাদের মনোযোগ দখল করে রাখে আর এখানে লোক দেখা আর নিন্দে করা। হার্মলেস নিন্দে, অফ কোর্স। কোন কাকুর পাঞ্জাবিটা নির্ঘাত কাকিমার বেনারসী কেটে বানানো হয়েছে গোছের।


আর খাওয়া তো আছেই। বিকেলের স্ন্যাক্সে ঝালমুড়ি (যেটায় চানাচুর আর মুড়ির অনুপাত হেসেখেলে ১ঃ১০) আর দুটো ক্ষীণকায় তেলেভাজা (ঠাণ্ডা এবং ন্যাতানো) খাওয়ার জন্য যে রকম উত্তেজনা আমার তার সিকিভাগও থাকলে ডিসার্টেশন এতদিনে নেমে যেত।




মাদুর্গাকে পাত্তা না দেওয়ার ব্যাপারটা বাদ দিলে এখানকার আর পাড়ার পুজোর অনেক তফাৎ। ওটা যদি লস্যি হয় এটা তবে পিটুলিগোলা। তাই এই পুজোতে আসার আগে একশোবার ‘যাব কি না যাব কি না’ ভাবি। শেষ মুহূর্তে সংশয়দীর্ণ চিত্তে ‘অ্যাটেন্ডিস্‌’-এর তালিকায় নিজের নামটা ঢোকাই।  কী হবে গিয়ে? ‘সেই ব্যাপারটা’ তো থাকবে না। তবু পুজোর দিন সকালে উঠে মন আপনা থেকেই ভালো হতে শুরু করে। পৌঁছে, অঞ্জলি দিয়ে, প্রসাদ খেতে খেতে আর মনেও পড়ে না যে না আসার ইচ্ছেটাও কখনও মনে উঁকি দিয়েছিল।

কারণ হয়তো, পুজোর সঙ্গে যে সব ভালোলাগাগুলো (সোজা কথায় নস্ট্যালজিয়া) জড়িয়ে আছে আমার সে গুলো অতটাও স্থানকালপাত্রনির্ভর নয়। পুজো মানে যদি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া হয় তবে সেটা ম্যাডক্স স্কোয়্যারে বসে দিলাম নাকি কোনও বিজাতীয় স্কুলের বাস্কেটবল কোর্টে বসে সেটা ইমমেটেরিয়াল। মনের মতো বন্ধু থাকলেই হল। অথবা যদি ওখানের পুজোয় অঞ্জলি দিতে দিতে কারও সঙ্গে চোখাচোখি হওয়াটাই পুজোর আসল কথা হয়, তা হলে এখানে আপনি যে টেবিলে বসে প্রসাদ খাচ্ছেন ঠিক তাঁর কোণাকুণি টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখুন, দেখবেন একজন অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নেবে।



পুজোয় সবাই নিজের খোলস থেকে বেরিয়ে অন্যরকম। ভালো ছেলেরা বিসর্জনের লরির সামনে নাচবে, ভালো মেয়েরা চোখেমুখে আলো মেখে চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে দেখবে, কাকুরা শিং ভেঙে আবারও একবার ধুনুচি হাতে নামবেন, কাকিমারা সারা গালে সিঁদুর মেখে নৃত্যরত কাকুর দিকে তাকিয়ে বিশ বছর আগের কোনও বিসর্জনের সন্ধ্যের কথা ভাববেন। দাদুরা পাটভাঙা ধুতি পাঞ্জাবি পরে দূরে দাঁড়িয়ে আলোচনা করবেন। তবু তো ছেলেপুলেরা ট্র্যাডিশনটা ধরে রেখেছে।



নাচে, কোলাহলে, ঢাকের শব্দে, ধুনুচির ধোঁয়ায় কাছাকাছি আসবে সবাই। চেনা অচেনা আধচেনা সবাই গায়ে গায়ে ঠেকাঠেকি করে ঠাকুরের পা ছুঁতে যাবে, একে অপরের গালে লাল ছুঁইয়ে দেবে, জড়িয়ে ধরবে। সামনের তিনশো পঁয়ষট্টি দিন আবার একা একা বাঁচতে চাওয়ার অভিনয়ের রসদ পুরে নেবে নিজেদের মধ্যে।



এই নৈকট্য, স্পর্শ, গন্ধ, দৃশ্য সব বুকের ভেতর তুলে রাখবে যত্ন করে। আসছে বছর আবার হবে।




September 10, 2009

সত্যিমিথ্যে



আজ সকালে মাকে আবার একটা মিথ্যে কথা বললাম। অকারণেই। একটা কাজ করব বলে অনেকদিন আগে ঠিক করে রেখেছিলাম, সেই খবরটা এমন ভাবে দিলাম যেন এই এক্ষুনি মাথায় এল। কথাটা অতি সামান্য কিন্ত ভয় হয়েছিল শুনলেই বুঝি না করে দেবে। আমার ভয় মিথ্যে প্রমাণিত করে বাবামা অত্যন্ত স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করলেন এবং আপত্তির ধারপাশ দিয়ে গেলেন না। মিথ্যে বলার মানসিক চাপটা আমি অকারণই নিলাম।

চাপ বইকি। মনের জোর কম বলেই হোক, অথবা স্মার্টনেসের অভাব – মিথ্যে বলতে গেলে এখনও কথা জড়িয়ে যায়, ফোন কানে পায়চারির গতিবেগ বাড়ে, গলা মুদারা ছেড়ে উদারায় নেমে যায়। অথচ আমি মোটামুটি নিয়মিত মিথ্যে কথা বলে থাকি। সবথেকে বিরক্তিকর ব্যাপারটা হচ্ছে, যে বিষয়গুলো নিয়ে আমি মিথ্যে বলি সেগুলো এতই হাস্যকর রকমের ছেঁদো যে পরে ভেবে দেখলে নিজেরই হাসি পায়।

এমপিরিক্যাল কাজকর্ম করে থাকি, ডেটা আমার শালগ্রাম শিলা। সার্ভে করে দেখেছি, আশেপাশের সবাই মিথ্যে বলার ব্যাপারটা স্বীকার করেছে। কিন্তু স্ট্রিক্টলি মহৎ উদ্দেশ্যে। মৃত্যুপথযাত্রী বাবাকে কারগিল যুদ্ধে সন্তানের মৃত্যুর খবর দেওয়ার সময় অথবা দাঙ্গা চলাকালীন সংখ্যালঘুকে বাড়ির ভেতর লুকিয়ে রাখার সময় ছাড়া নো মিথ্যে।

দেখেশুনে আমি খুবই দুঃখিত হয়ে পড়েছি। বাকিদের যুদ্ধ দাঙ্গা ইত্যাদির তুলনায় আমার মিথ্যে বলার পরিস্থিতিগুলো, একশো কোটি বলিউডি সিনেমার তুলনায় টাইগার হিলের সামনে দাঁড়িয়ে ওয়েবক্যামে তোলা ফ্যামিলি ভিডিও।

তবু কেন যে মিথ্যে বলি কে জানে। ছোটবেলা থেকে চরিত্রগঠনের যে পাঠগুলো পাখিপড়া পড়ানো হয়েছে তার মধ্যে একনম্বর নিঃসন্দেহে ‘সদা সত্য কথা বলিবে’। গুরুজনকে শ্রদ্ধা করা, কানাকে কানা খোঁড়াকে খোঁড়া না বলা, নিজের থেকে সাইজে বড় সবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা ইত্যাদিও সত্যি কথা বলার সঙ্গেই মুখস্থ করানো হয়েছিল। আজীবন প্র্যাকটিসও করেছি, খালি সত্যবচনটাই যে কেন বাদ পড়ে গেল জানি না।

কোথায় যেন পড়েছিলাম, টানা বারো বছর মিথ্যে না বললে মানুষের ভেতর এমন ক্ষমতা জন্মায় যে সে যা বলে তাই ফলে। কী সাংঘাতিক ক্ষমতা! এর লোভে কি মিথ্যে কথা বলা ছাড়া যায়? অবশ্য সে ক্ষেত্রে মিথ্যে না বলার মধ্যে সত্য গোপন, ইতি গজ গোছের সংলাপ ইত্যাদিও ধরা হবে। মাঝে কিছুদিন চেষ্টা করেছিলাম মিথ্যে না বলে থাকার। মারাত্মক ভাবে ফেল করেছি। সদা সত্যি কথা বলাও আমার এ জীবনে হল না, আরও অনেক কাজের মতো।

মিথ্যে কথা যখন বলতেই হবে তখন কী করে মিথ্যে বলেও ধরা না পড়া যায়, এবার থেকে সেটাই প্র্যাকটিস করব বরং, আজ থেকে।

    

  

গৌরচন্দ্রিকা



নতুন করে বলার কিছু নেই। খুব চেনা একটা পরিস্থিতি। অনেক কিছু করার আছে, কিন্তু করার ইচ্ছে নেই। পুরোনো খেলনাগুলোতে ধুলো পড়েছে, ভেঙেচুরে গেছে, অথবা তাদের থেকে আমার মন উঠে গেছে অকারনেই। তাই এই নবতম খেলনার আমদানি, ব্লগিং।

ঋতুপর্ণ ঘোষ কোথাও একটা ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, তিরিশ বছর বয়স পর্যন্ত মানুষের নামের প্রতি একটা মোহ থাকে। আমি অবশ্য মনে করি ব্যাপারটা যত না মোহের, তার থেকে বেশি টেনশনের। নাম নিয়ে এই টেনশনটা দুভাবে থাকতে পারে। হয় সে নিজের নাম সবাইকে জানাতে চায়, নয় সর্বক্ষণ সেটা আড়াল করতে চায়। একটা সময় পর্যন্ত যেমন আমি নিজের জন্য হন্যে হয়ে নিজের জন্য একটা পছন্দসই ছদ্মনাম খুঁজতাম। খ্যাতনামা হওয়ার স্বপ্নটা তখনও ছিল, তা বলে স্বনামে খ্যাত হওয়াটা ছিল দুঃস্বপ্ন।

ঋতুপর্ণের কথা সত্যি করে, নামের টেনশন আমার ঘুচে গেছে, অথবা যাচ্ছে বলা ভালো। স্বনামে খ্যাত হতে আমার আর কোনও আপত্তি নেই, বরং বেশ উৎসাহ আছে।

তিরিশ ঘনিয়ে আসছে, পনেরোও যেগুলো হবে না বিশ্বাস করতে পারতাম না, এখন তার দশ শতাংশও সত্যি হলে নিজেকে চিমটি কেটে দেখতে হবে। তাতে অসুবিধে কিছু নেই, কারণ আমার সুবিধেবাদী মন নিয়ত পুরোনো অ্যাম্বিশনগুলোকে সরিয়ে তার জায়গায় নতুন অ্যাম্বিশন এনে বসাচ্ছে। অস্কার, নোবেল দুটোই ফসকে গেছে, তবে জ্ঞানপীঠ এখনও মাঝে মাঝে স্বপ্নে ধরা দেয়।


মাধ্যমিকের বাংলা নম্বরটার মধ্যে সত্যি কোনও পূর্বাভাস লুকিয়ে ছিল কি না, সেটা আরেকবার পরখ করে দেখতে এই বৈদ্যুতিন খেরোর খাতা খোলা। আশায় আছি এই খাতা আমাকে বুদ্ধিজীবীতার আকাশে তারার জায়গা দেবে।

    
 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.