May 31, 2012

চেনেন নাকি?


























বারাক থেকে ইন্দিরা





ছবিটা দেখে ফেলেছেন নিশ্চয় সবাই এতদিনে? না দেখে থাকলে এখন দেখুন, দেখে থাকলেও আরেকবার দেখুন। ভালো জিনিস বেশি বার দেখলে ক্ষতি নেই।

ছবিটা দেখে আর ছবির আড়ালের গল্পটা জেনে আমার ছোটবেলার একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেল। ছোটবেলা নয় ঠিক, ছোটবেলা আর বড়বেলার সঙ্গম বলাই ভালো। শরীর মন জুড়ে তখন বদল আসছে স্রোতের মতো। সেরকম একটা সময়ে, একদিন সন্ধ্যেবেলা আমি আবিষ্কার করলাম যে আমি আর আগের মতো নেই। আগে বলতে এই গতকাল সন্ধ্যেবেলায় যেমন ছিলাম তেমনটাও নেই।

মা সব শিখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। আমি ব্যাপারটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, কাজেই বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। আমার মুখ দেখে মা সেটা আঁচ করতে পেরেছিলেন নিশ্চয়। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, দূর বোকা ভয়ের কী আছে, সব্বার হয় এরকম। আমি একটু ভরসা পেয়ে আমার চেনা যত মহিলা আছেন সবার নাম ধরে ধরে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম। অমুক জেঠির হয়? তমুক দিদিভাইয়ের? আচ্ছা ও বাড়ির কাকিমার? কাকিমার মেয়ের?

মা সবকটা নামের পরে ঘাড় হেলিয়ে বলতে লাগলেন, হয় হয় হয়।

আমার প্রাণে একটু বল এল। কিন্তু সন্দেহের শেষ বিন্দুটুকু তখনও মনের কোণায় মাটি কামড়ে পড়ে আছে। সেটার হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে আমি জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম, “ইন্দিরা গান্ধীরও হত?”

মা আগের মতই সিরিয়াস মুখ করে বললেন, “হত তো।”

ব্যস। আমার সমস্ত ভয় দুশ্চিন্তা নিমেষে উধাও হয়ে গেল। ইন্দিরা গান্ধী! আমার জানা সমগ্র নারীজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, একটা গোটা দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন যিনি, তাঁরও যখন হত তখন আমার হওয়াটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কিচ্ছু নেই।

গল্পটা মনে পড়ার পর ছবির ছোট্ট জ্যাকবের ওই মুহূর্তের অনুভূতিটা কল্পনা করতে আমার আর একটুও অসুবিধে হল না।

May 30, 2012

সব বড়দের ছোটবেলার ছড়া



রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে বেশিরভাগ দিনই ল্যাপটপ নেভানোর কথা মনে থাকেনা। তবে কালেভদ্রে এক একটা রাত আসে যেদিন আমি ল্যাপটপ তুলে, দাঁত মেজে, চুলে বেশ করে টেনে একটা বিনুনি বেঁধে, বড় দেখে ঠাণ্ডা একগ্লাস জল খেয়ে শুতে যাই। শুতে গিয়ে গায়ে চাদর টানার আগে হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিল থেকে একটা বইও টেনে নিই। দুপাতা পড়তে না পড়তেই চোখ জুড়ে ঘুম আসে। আর সে যে কী ভালোজাতের ঘুম সে কথা আর কী বলব।

আজ সেরকম একটা রাত। আজ আমি একটা ছোটদের ছড়ার বই পড়তে পড়তে ঘুমবো ভেবেছিলাম। কিন্তু পড়তে গিয়ে এত ভালো লাগল যে একটা ছড়া আপনাদের না শুনিয়ে থাকতে পারলাম না। সামনে থাকলে বেশ হাত পা নেড়ে অভিব্যক্তি দিয়ে শোনানো যেত কিন্তু তা যখন যাচ্ছেনা তখন আপনারা নিজেরাই কষ্ট করে পড়ে নিন।

Binker

Binker-what I call him-is a secret of my own,
And Binker is the reason why I never feel alone.
Playing in the nursery, sitting on the stair,
Whatever I am busy at, Binker will be there.
Oh, Daddy is clever, he’s a clever sort of man,
And Mummy is the best since the world began,
And Nanny is Nanny, and I call her Nan-
But they can’t See Binker.
Binker’s always talking, ‘cos I’m teaching him to speak
He sometimes likes to do it in a funny sort of squeak,
And he sometimes likes to do it in a hoodling sort of roar…
And I have to do it for him 'cos his throat is rather sore.
Oh, Daddy is clever, he’s a clever sort of man,
And Mummy knows all that anybody can,
And Nanny is Nanny, and I call her Nan-
But they don’t Know Binker.
Binker’s brave as lions when we’re running in the park;
Binker’s brave as tigers when we’re lying in the dark;
Binker’s brave as elephants. He never, never cries…
Except (like other people) when the soap gets in his eyes.
Oh, Daddy is Daddy, he’s a Daddy sort of man,
And Mummy is as Mummy as anybody can,
And Nanny is Nanny,and I call her Nan…
But they’re not Like Binker.
Binker isn’t greedy, but he does like things to eat,
So I have to say to people when they’re giving me a sweet,
“Oh, Binker wants a chocolate, so could you give me two?”
And then I eat it for him, 'cos his teeth are rather new.
Well, I’m very fond of Daddy, but he hasn’t time to play,
And I’m very fond of Mummy, but she sometimes goes away,
And I’m often cross with Nanny when she wants to brush my hair…
But Binker’s always Binker, and is certain to be there.
-A.A. Milne, Now We Are Six



নিজের বাড়ি



খুশবন্ত সিং-এর বাতলানো হ্যাপিনেসের কয়েকটা টোটকা ফরওয়ার্ডের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে আমার ইনবক্সে এসে পৌঁছেছিল। সে সময়টায় আমি কোনো কারণে আনহ্যাপি ছিলাম নিশ্চয় কারণ ডিলিট করার বদলে ফরওয়ার্ডটা খুলে পড়েছিলাম। তার আর কিছুই মনে নেই, কেবল বুদ্ধদেবের অষ্টাঙ্গমার্গের মত খুশবন্তজিও হ্যাপিনেসের আটখানা টোটকা দিয়েছিলেন মনে আছে। সে আটখানার মধ্যেও গোটা ছয়েক বেমালুম ভুলে গেছি, দুখানা কীকরে যেন মনে থেকে গেছে। ওই দুটোই বিশেষ করে মনে ধরেছিল বলে বোধহয়।

ছবি গুগল ইমেজেস থেকে

প্রথম টোটকাটা হচ্ছে, সিংজি বলছেন---আনন্দে যদি থাকতে হয় তবে কাউকে বাড়ি বয়ে এসে আড্ডা মারতে অ্যালাউ করবে না। কথাটা যে কতখানি সত্যি সেটা বলে বোঝানো মুশকিল। তবে ব্যাপারটা শুনে শেখা অসম্ভব, শিখতে হলে ঠেকেই শিখতে হবে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে, অতিথি ওঠবার নাম করছেন না, আইপিএল থেকে তৃণমূল...জেনারেল নলেজের ডালে ডালে হুপহাপ লাফালাফি করে বেড়াচ্ছেন। এদিকে আপনার রোজগেরে গিন্নি প্রায় মিস হয় হয়। প্রাণঘাতী পরিস্থিতি। তার থেকে একাবোকা বাড়িতে বসে থাকা অনেক ভালো। দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল। আর যদি একা থাকতে আপনার একেবারে কান্না পেয়ে যায়, দুটো লোকের মুখ দেখতে না পেলে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় তাহলে আমি যেটা করি সেটা করতে পারেন। লোকের বাড়ি গিয়ে আড্ডা মারা।

খুশবন্তের দ্বিতীয় টোটকা ছিল---নিজের বাড়ি। হোস্টেল, গ্র্যাজুয়েট ডর্ম, ভাড়া, ইজারা, সাব-ইজারা এসব সিঁড়ি কেবল ভাঙতে হয় বলে ভাঙা। মোক্ষ হচ্ছে সেই আদিঅকৃত্রিম অ্যামেরিকান ড্রিম, নিজস্ব একখানা মাথা গোঁজার ঠিকানা। সে ঠিকানায় হার্ডউডের বদলে কার্পেট পাতা থাকুক ক্ষতি নেই, বাগানভরা আম জাম কাঁঠালের বদলে রান্নাঘরের খুপচি জানালায় না হয় মানিপ্ল্যান্টই দোলাব, মাসে মাসে বাড়িভাড়ার বদলে মর্টগেজ গুনতেও রাজি আছি, যদি মালিকানার খোপে বজ্জাত বাড়িওয়ালার বদলে নিজের নামটা দেখতে পাই।

আমার নিজের বাড়ির শোক হঠাৎ উথলে উঠেছে কারণ লিজ রিনিউ করার সময় এসে গেল প্রায়। সেদিন মেলবক্সের তলা থেকে বাড়িভাড়া বাড়ানোর নোটিশও কুড়িয়ে এনেছি। অপ্রত্যাশিত কিছু নয়, তবু জানি এমাসের বাড়িভাড়ার চেকটা লিখতে গিয়ে গা করকর করবে।

ব্যাপারটা আরও খারাপ হয়েছে মা থাকার জন্য। নিজের বাড়িতে থেকে থেকে স্বভাব এমন খারাপ হয়েছে এঁদের যে কী বলব। নোটিশটা আসা থেকে মাঝে মাঝেই চলতে ফিরতে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠছেন মা, “ভাড়াবাড়ির পেছনে এতগুলো টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে, কবে নিজের কিছু একটা হবে...” আমি শেষে আর না থাকতে পেরে ঝাঁঝিয়ে উঠতে হেসে জিভ কেটে বললেন, “কী করব বল, রিফিউজি বাবার মেয়ে তো। নিজস্ব একখান বাসার জন্যে বিলাপটা রক্তের মধ্যে ঢুকে গেছে।”

এই কথাটা অবশ্য কিছু ভুল বলেননি মা। একহাতে একটা ট্রাঙ্ক আর অন্যহাতে একখানা বউ আর আটখানা ছেলেমেয়ে নিয়ে শেয়ালদা স্টেশনে এসে নামার পর থেকে আমার মাতামহ সিনেমার মতো একটা জীবন কাটিয়েছিলেন। আপনাদের অনেকের দাদুদিদার জীবনের মতোই। নতুন রোজগারের ব্যবস্থা করে, ছেলেমেয়েদের সব্বাইকে পর্যাপ্ত পড়িয়ে, নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছিলেন। আমার মামারা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে থাকতেন, কিন্তু দাদুর লক্ষ্য অর্জুনের মতো অবিচল ছিল চিরদিন। চাকরি সবাই পায়, কিন্তু সবার নিজের বাড়ি হয়না। জীবন দিয়ে সে কথা বুঝেছিলেন দাদু।

দাদুর গল্পের শেষটা আন্দাজ করার জন্য কোন প্রাইজ নেই। দাদু ভাড়াবাড়িতে মারা গেছিলেন। তার চার বছর পর ধুমধাম করে গৃহপ্রবেশ করে কসবার এখনকার বাড়িতে ঢুকেছিলেন মামারা।

যাই হোক। দাদুর গল্পটা লেজুড় হিসেবে এল, কিন্তু আজকের মূল প্রসঙ্গটা হল যে আমার বাড়িভাড়া বাড়ছে। আর সেই দুঃখে আমি আধমরা হয়ে আছি। দিনকয়েক পর এই দুঃখটা অন্য দুঃখ দিয়ে চাপা পড়ে যাবে জানি, কিন্তু যতক্ষণ না পড়ে ততক্ষণ আমি ঘ্যানঘ্যান করলে বিরক্ত হবেন না প্লিজ। 

Child's Drawing house
ছবি গুগল ইমেজেস থেকে

May 29, 2012

নারীহৃদয়ের রহস্য অবশেষে উদ্ঘাটিত





A Map of The Open Country of a Woman's Heart, D.W.Kellogg, c. 1833-1842

According to this map, Love is at the center of a woman's heart, and Sentimentality and Sentiment (including Good Sense, Discrimination, Hope, Enthusiasm, and Platonic Affection) take up a sizeable portion of the entire territory. This region of Sentiment and Sentimentality is separated from the larger, treacherous areas of a woman's heart: Selfishness and Coquetry pose dangers, especially to gentleman travelers, and these attributes suggest that all women are basically untrustworthy. The largest regions, Love of Admiration, Love of Dress, and Love of Display, all suggest that women are also essentially shallow and frivolous. 

May 28, 2012

পারা না পারার খেলা যদি চলে সারাবেলা



সবাই ‘না পারা’ নিয়ে মাথা ঘামায়, অ্যান্ডি সেলসবার্গ ‘পারা’ নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। এমন মাথা ঘামিয়েছেন যে সেই নিয়ে একখানা আস্ত বই লিখে ফেলেছেন তিনি। বইয়ের নাম You Are Good At Things: A Checklist.

বইটা আমি পড়িনি, পড়বার ইচ্ছেও যে বিশেষ আছে তা নয়, কিন্তু বইটার মোদ্দা কথাটা আমার ভালো লেগেছে। আমি বেশিরভাগ কাজের জিনিসই পারি না, যেমন ধরুন রাতের আকাশ দেখে তারা চেনা, ভরদুপুরের সূর্যের দিকে তাকিয়ে দিকনির্ণয়, রিয়েল অ্যানালিসিস। এদিকে আমার চেনা সব লোকেই ভালোভালো অনেক কিছু পারেন।

আমার বাবা পিং পং খেলতে পারেন, আমার মা সোয়েটার থেকে শুরু করে মাঙ্কি ক্যাপ থেকে হাতের দস্তানা...দেখার মতো বুনতে পারেন, আমার ঠাকুমা একবারও না থেমে কড়াকিয়া গণ্ডাকিয়ার নামতা মুখস্থ বলতে পারেন। এমনকি বান্টি যে বান্টি, সেও অনু মালিকের গলা হুবহু নকল করে গান গাইতে পারে। সে গান শুনে ঘরভর্তি জুনিয়র মেয়েরা এ ওর গায়ে পড়ে গিয়ে হাসতে হাসতে বলে, দোহাই বান্টিদা আর হাসিও না, এবার মরেই যাবো নির্ঘাত।

বলাই বাহুল্য বান্টি তাতে দ্বিগুণ উৎসাহে গান ধরে।

আমি এসব কিছু পারিনা। বান্টি যখন নেচেগেয়ে বেবাক পার্টি একাই নিজের পকেটে পুরে রাখে তখন আমি ঘরের এককোণে বসে ভগবানের প্রতি রাগে ফুঁসতে থাকি। কী ক্ষতিটা হত আমি কিছু ‘পারলে’?

আমার সেই রাগেই ব্যথার মলম বুলিয়েছেন অ্যান্ডি। বলেছেন, হতেই পারেনা। প্রতিভা প্রত্যেকের থাকে। কেউ এক চাকার সাইকেল চালাতে পারে, কেউ হুড়হুড়িয়ে উল্টো স্ক্রিপ্ট লিখে যেতে পারে, কেউ মুখের মাংসপেশি বিন্দুমাত্র না নড়িয়ে কান নাচাতে পারে, কেউ অসাধারণ অযাচিত জ্ঞান দিতে পারে, কেউ বসের সামনে এমন ভালোমানুষের মতো মুখ করে থাকতে পারে যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানেনা।

ওহ, এগুলোও পারা হলে আমিও তো পারি অনেক কিছুই। সোৎসাহে গুনতে শুরু করি আমি। গুনতে গুনতে বেশ একঝুড়ি প্রতিভা জোগাড় করে ফেলি নিজের। কী কী শুনবেন?

-আমি ভালো শাড়ি পরাতে পারি। এটা প্রতিভা হিসেবে তেমন কিছু শুনতে লাগছে না বটে, কিন্তু সরস্বতী পুজো আর অষ্টমীর সকালে আমার ডিম্যান্ড দেখলে আপনার মাথা ঘুরে যাবে। রীতিমত অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে মহিলারা আসেন। ক্লায়েন্ট যতই খুঁতখুঁতে হোন না কেন, আমার শাড়ি পরানোয় খুশি হননি এরকম একজনও নেই।

-আগেরটায় ইম্প্রেসড হননি? এটায় হতেই হবে। অ্যাসেম্বল করায় আমার জুড়ি মেলা ভার। মানে ওয়ালমার্ট আর আইকিয়া থেকে যে ভাঙাচোরা খাটবিছানাগুলো ডেলিভারি দেয়, সেগুলো জুড়ে জুড়ে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে আমার মতো প্রতিভা, আমার বন্ধুদের অন্তত কারও নেই। এই প্রতিভাটা সাংঘাতিক জরুরি কারণ ম্যানুয়াল নিয়ে ঝাড়া ২ ঘণ্টা লড়বার পর বান্টি যখন রাগে, হতাশায় ওর নতুন কেনা খাটটার ধ্বংসস্তুপের ওপর জুতোটুতো সুদ্ধ ধাঁই ধাঁই করে লাথি কষাতে শুরু করেছিল, তখন এই বান্দাকেই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। শুধু গান গেয়ে পাড়া মাতালেই যে হয়না, কাজের কাজও যে কিছু জানতে লাগে, সে কথা বুঝলে তো। যত্তসব।

-আমার সামনে কেউ একটানা কথা বলে গেলে আমি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ভাবে ঠিকঠিক জায়গায় “সেই তো”, “তবেই বুঝুন”, “সত্যি দিনকাল যে কী পড়েছে” এসব যোগান দিয়ে যেতে পারি। আমি যে একটি বর্ণও শুনছি না এটা ধরতে পারলে আপনাকে আমার একমাসের মাইনে দিয়ে দেব। বাজি রাখলাম।

-আমি আমার ওপরের ঠোঁট আর নিচের ঠোঁট, দুটোকে দুদিকে একইসাথে বেঁকাতে পারি। এটা লিখে বোঝানো একটু শক্ত হচ্ছে, সামনে করে দেখালে আপনারা ভালো করে অ্যাপ্রিশিয়েট করতে পারতেন। এটাও কাজের। এর ভরসাতেই আমার বন্ধুরা তাঁদের গেঁড়িগুগলিকে আমার ভরসায় রেখে নিশ্চিন্তে সিনেমা যেতে পারেন।

-ওহ আর হাতের কড়ে আঙুলকে অনামিকার ওপর, অনামিকাকে মধ্যমার ওপর, মধ্যমাকে তর্জনীর ওপর চাপিয়ে বিছে বানানো? ওটা ছোটবেলায় সবাই পারতেন জানি, আমি এখনো পারি। দু হাতেই। একসাথে। এটা অবশ্য অন্য কারও কাজে লাগে না, শুধু আমার লাগে। বান্টি যখন জোকস বলে পার্টি জমায়, তখন আমি খামোকা বোরড না হয়ে, একলা বসে দুহাতের দুই বিছের মধ্যে যুদ্ধযুদ্ধ খেলি। দিব্যি টাইমপাস হয়ে যায়।

আপনি কী ভালো পারেন?





May 27, 2012

শনাক্তকরণের জন্য


কেমন আছেন সবাই? কেমন কাটল আপনাদের উইকএন্ড? আমার আর মায়ের ঝটিকাসফর নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে। আমি যখন বক্তৃতা শুনতে শুনতে হাই তুলেছি, মা তখন হোটেলের দুধসাদা বিছানায় দুধসাদা কম্বল মুড়ি দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়েছেন। একদিন বিকেলে জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শহর দেখতে বেরিয়েছিলাম। কফি খেয়ে বেরনোর সময় কফির দোকান থেকে মা আমাকে একটা খুব পছন্দসই কফিমাগ কিনে দিলেন। আমি হাজারবার বারণ করলাম কিছুতেই শুনলেন না। বললেন, “আমাকে ওরা রিটায়ারমেন্টের সময় কত কিছু দিল, আমি তোকে কিছু দেব না এটা হয় নাকি?” আমি যখন বললাম যে এটা কোন যুক্তিই হলনা, তখন মা মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়িয়ে বললেন, মা হওয়া ব্যাপারটাই নাকি আগাগোড়া অযৌক্তিক।




মা থাকার সুবিধেও যেমন আছে, অসুবিধেও বিস্তর। যেমন ধরুন, বাড়ি ফেরার পর আমার প্ল্যান ছিল ল্যাপটপটা নিয়ে বিছানার ওপর চিৎপাত হয়ে পড়া। স্বাভাবিক লোকে যেমন পড়ে। কিন্তু মা যথারীতি বাগড়া দিলেন। হাত পা ধুতে হল, জামাকাপড় ছাড়তে হল, এমনকি ব্যাগটা পর্যন্ত পুরো আনপ্যাক করে যেখানকার জিনিস সব সেখানে রাখতে হল। এত পরিশ্রম করে যখন অবশেষে বিছানায় গা ঠেকিয়েছি, ল্যাপটপ ছাড়াই, তখন মা হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে বললেন, “যাই এইবেলা পায়েসটা রেঁধে ফেলি বরং।”

বাড়ি থেকে খবরের কাগজে মুড়ে সুগন্ধী গুড় বয়ে এনেছেন মা, মেয়েকে পায়েস রেঁধে খাওয়াবেন বলে। এই মাদার’স ডে আর ঘোরাঘুরির চক্করে সে সদিচ্ছা রূপায়ণে ক্রমাগত বাধা পড়ছে।

কাজেই আমাকে বিশ্রামের আশা ত্যাগ দিয়ে উঠে পড়তে হল। আমার জন্যই পায়েস যখন তখন মায়ের সাথে সাথে আমারও একটু হাত পা না নাড়লে ভালো দেখায় না। মা দুধ ঘন করতে বসালেন, আমি খবরের কাগজমোড়া গুড়ের চাক আর নতুন কফিমাগটা নিয়ে রান্নাঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে বসলাম। ঠুকে ঠুকে গুড়ের চাক ভাঙব। সেই ভাঙা গুড় মা পায়েসে দেবেন।

কিন্তু সৎ কাজে শত বাধা। মুড়বি তো মোড় মা গুড় মুড়েছেন আনন্দবাজারের একখানা আস্ত পাতা দিয়ে, কাজেই বাধ্য হয়েই আমাকে গুড় ছেড়ে কাগজে মনোযোগ দিতে হল। দিয়ে দেখি ওরেব্বাস এ যে আমার পুরো কাগজের মধ্যে ফেভারিট পাতা! না না সম্পাদকীয় পাতা না, আপনারা দেখছি আমাকে কিছুই চেনেননি অ্যাদ্দিনে। এটা হচ্ছে ওই পাতাটা যেখানে সবাই জন্মদিন, মৃত্যুদিন, অন্নপ্রাশন, নিরুদ্দেশ, আর এফিডেভিট করে নাম বদলের ঘোষণা ছাপে। জন্মদিনের ঘোষণায় কপালজোড়া কাজলের টিপওয়ালা বাচ্চাদের ছবি দেখে, ছবির তলায় ছোদ্দিদা, ছোদ্দাদু, মাম্মাম, ভালোপিসে, কালোমেসো ইত্যাদি স্বাক্ষর দেখে, “আজ হইতে আমি নিবারণ সাঁতরা হইতে শ্রী পৃথ্বীরাজ চৌহান নামে ভুবনে খ্যাত হইলাম” এইসব পড়েটড়ে আমি অবশেষে নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত ঘোষণায় এসে উপস্থিত হলাম।

ততক্ষণে মা বুঝে গেছেন আমার ভরসায় থাকলে সেদিন আর তাঁর পায়েস রাঁধা হচ্ছেনা, তাই তিনি নিজেই এসে গুড় ভাঙতে শুরু করেছেন। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে আমি মাকে নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত ঘোষণাগুলো জোরে জোরে রিডিং পড়ে শোনাতে লাগলাম।

-“আমার কাকা, উচ্চতা ৫ ফুট, রোগা, কালো, ডান চোখ ট্যারা, অমুক দিন হইতে নিখোঁজ...” এদের নির্ঘাত শরিকি ঝগড়া ছিল মা, গায়ের ঝাল ঝেড়ে লিখে দিয়েছে।

মা উত্তর না দিয়ে গুড় ভাঙতে থাকেন।

-ওরে বাবা মা এইটা শোনো। “অমুক গ্রামের শ্রী তমুক, তোতলা, টাকমাথা, গালে কাটা দাগ...” কী সাঙ্ঘাতিক!

ব্যাপারস্যাপার দেখে আমি রীতিমত উত্তেজিত হয়ে পড়ি। সেই সঙ্গে একটা সন্দেহ মনে প্রবল হয়ে উঠতে থাকে।

-আচ্ছা মা, আমি হারিয়ে গেলে তোমরা কী লিখে কাগজে বিজ্ঞাপন দেবে?

-আহ সোনা, সর্বক্ষণ তোমার এই বোকা বোকা রসিকতাগুলো অসহ্য।

-আরে হাইপোথেটিক্যালি বলছি তো। বলনা মা? নির্ঘাত লিখবে বেঁটে, নাকথ্যাবড়া, গালভর্তি ব্রণর দাগ, কেলেকুষ্টি...

-আহা কেলেকুষ্টি কেন, লিখব উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ।

-ওই একই হল, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ মানেই সবাই জানে কেলেকুষ্টি।

আমার সম্ভাব্য নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত ঘোষণার দুর্দশা কল্পনা করে আমি মুহ্যমান হয়ে বসে থাকি। সেই দুঃখেই হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে আমার। কীসের দুঃখে লোকে নিরুদ্দেশে যায় সে রহস্যটা এতদিনে আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।

আমার অবস্থা দেখে মা আমাকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। বলেন, শনাক্তকরণের জন্য নাকি ওইরকমই লিখতে হয়। সুডৌল চিবুক, পটলচেরা চোখ, বাঁশির মতো নাক এসব লিখে বিজ্ঞাপন দিলে আর নাকি কাউকে খুঁজে পেতে হত না কখনো। সৌন্দর্য ব্যাপারটা বিরল হতে পারে, কিন্তু ভিড়ের মাঝে আলাদা হয়ে থাকে মানুষের যত খুঁত আর খামতি। আমাদের যার যেখানটা টোলখাওয়া, বাঁকাচোরা, ছাতাপড়া---সেইসব জায়গাগুলোই নাকি আমাদের সবথেকে বড় পরিচয়। যে জায়গাগুলো মসৃণ, নিয়মিত ধুয়েমুছে পালিশ করে চকচকে করে রাখা, সেগুলো নয়।

কোনো যুক্তি আছে? তাহলে আর বিউটিপার্লারে গিয়ে একগাদা টাকা গচ্চা দিয়ে লাভ কী? দরকারের সময় যদি চকচকে ত্বক কোনো কাজেই না লাগল? আপনারাই বলুন?

এত শক্ত শক্ত কথা ভাবতে গিয়ে আমার কীরকম ঘুম এসে গেল। ঘুম থেকে উঠে দেখি সারাবাড়ি পায়েসের সুগন্ধে ম ম করছে। টেবিলে বসে পা দোলাতে দোলাতে বাটিভর্তি পায়েস খেতে খেতে আপনাদের কথা, বিশেষ করে যারা মায়ের হাতের পায়েস খেতে পাচ্ছেন না, তাঁদের কথা খুব মনে পড়ছিল জানেন। সত্যি বলছি। অন গড ফাদার মাদার।

May 26, 2012

সাপ্তাহিকী





একশো বছরেরও বেশি আগে ছোটদের স্কুল কেমন ছিল? ঠিক এইরকম।

ভাবছি এই টেবিলটা অর্ডার করি। আপনারা আমার বাড়িতে এলে আদর করে বসিয়ে পাত পেড়ে খাওয়ান যাবে।

এই ভদ্রলোক না থাকলে এখনো আপনাকে প্রত্যেকবার উঠে উঠে টিভির চ্যানেল বদলাতে হত, সাউন্ড বাড়াতে কমাতে হত। ভদ্রলোক মারা গেলেন সদ্য।

নমনীয়। এবং হৃদপিণ্ডের গতিবর্ধক।

ফস করে নিরামিষাশী হয়ে যাওয়ার আগে জেনে নিন

সময়ের স্রোতে কোন সাহিত্য ভেসে যাবে না কেউ কী বলতে পারে?
The first issue is what you might call the high-school-popularity problem. We are all aware of the radiant prom king, adorned with varsity letters, an alpha commanding a legion of adherents, who settles down into a life of quiet non-consequence. Meanwhile, there is the terminally shy type, prone to be picked on (or perhaps even viewed as beneath that particular form of contempt), a seemingly unaccomplished sort who goes on to change the world.
Best recipe for happiness. Jane Austen-এর মতে। আমার মতেও।

আর যথারীতি সবশেষে এসপ্তাহের গান। গানটা তো শুনবেনই, গানটা শুরু হওয়ার আগে গুলজারের গলায় ক'টা কথা আছে, সেগুলোও বাদ দেবেন না।

একদম ওপরের চোখধাঁধানো বসন্তের ছবিটা তুলেছেন Tim Robison.


May 25, 2012

না চাহিলে যারে পাওয়া যায়



সেদিন চাবি ঘুরিয়ে তালা খুলতে খুলতেই কীরকম একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। কেমন একটা খালি খালি ভাব। কী যেন নেই কী যেন নেই।  ডান কবজির একটা মসৃণ মোচড়ে তালাটা খুলে ঘরে পা দিয়েই মনে হল, “ওহ ব্যাপারটা এত সোজা? তাহলে রোজ এত ধস্তাধস্তি লাগে কেন?”

লাগে কারণ রোজ আমার ডানকাঁধে একটা ব্যাগ, বাঁ কাঁধে একটা সাত পাউন্ডের ল্যাপটপ ব্যাগ, বাঁ হাত থেকে ঝুলন্ত পলিথিনের প্যাকেটে হয় দুধ, নয় পাউরুটি, নয় কোক জিরোর বোতল আর ডান বগলে একটা কাগজ ঠাসা ফাটোফাটো ফোল্ডার থাকে। সেই ফোল্ডার যথাস্থানে রেখে, কনুই দিয়ে খসে পড়া ব্যাগ ক্রমাগত পেছনদিকে ঠেলতে ঠেলতে, বিশ্বসংসারের গুষ্টির তুষ্টি করতে করতে আমি ঘটরঘটর করে তালার ভেতর চাবি ঘোরাতে থাকি। বার সাতেক লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার পর আট বারের বার অবশেষে তালা খোলে। প্রত্যেকদিনের ব্যর্থপ্রয়াসের সাক্ষ্য হিসেবে চকচকে তালার গায়ে অজস্র আঁচড়ের দাগ জমেছে। বাড়ি ছাড়ার সময় অর্ধেক ডিপোজিট আমার ওখানে বেরিয়ে যাবে নির্ঘাত।

সেদিন ব্যাপারটা অত সহজে মিটে যাওয়ায় সন্দেহ হল। অল্পবয়সি পাঠকরা চোখ ঘোরাবেন জানি, এতে সন্দেহের কী আছে? আছে আছে। একটা বয়সের পর বিনা ঝঞ্ঝাটে কিছু হওয়ার মানে অতি পরিষ্কার। হয় ব্যাপারটা হয়নি, নয় কিছু একটা গোলমাল হয়েছে।

অফ কোর্স। ফোল্ডারটা বগলে নেই।

বয়স হওয়ার আরও একটা ব্যাপার হচ্ছে কিছুতেই না ঘাবড়ানো। চোখের চালশে যত বাড়ে, মেঘভর্তি আকাশে রূপোলী রেখা খুঁজে বার করার প্রতিভাও পাল্লা দিয়ে তত বাড়ে। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে হাতের বাকি বোঝা নামিয়ে জুতো খুলতে লাগলাম। হতাশ ভাবে মনে করার চেষ্টা করলাম কোথায় ফেলেছি ফোল্ডারটা। ট্রেনে? নাকি দোকানে চেক আউট করার সময় কাউন্টারে নামিয়ে রেখেছিলাম? মনে পড়ল না। যাকগে মরুকগে। ভারি তো একগাদা অং বং চং পেপার। ল্যাপটপটাও তো যেতে পারত? সব সেভ করা আছে। আবার প্রিন্ট আউট নিয়ে নেবখ’ন। আরও কয়েকটা রেনফরেস্ট ধ্বংস হবে এই যা। আর ফোল্ডারটা। সেমিনার থেকে বিনাপয়সায় জোগাড় করে এনেছিলাম বেশ। সেটা গেল।

অনেক চেষ্টা করেও রেনফরেস্টের জন্য অপরাধবোধ জন্মাতে পারলাম না আমি মনের ভেতর। বরং ফোল্ডারটার জন্য একটু একটু মনকেমন করতে লাগল।

যাই হোক। মনকেমন ঝেড়ে ফেলে অবান্তরে আপনাদের সাথে গল্পটল্প করে, মায়ের হাতের রান্নাটান্না খেয়ে, ঘুমিয়েটুমিয়ে ফ্রেশ হয়ে পরের দিন অফিস গেলাম। ঝাড়া হাত পায়ে। একটা বোঝা কমে যেতে বেশ ভালো লাগছিল জানেন। মনে হচ্ছিল এরকম করে সব জিনিস নিজে থেকেই দুমদাম হারিয়ে গেলে তখন আর আমার কিছু করারই থাকবে না। বাধ্য হয়েই হিমালয়ে গিয়ে ধ্যানে বসতে হবে। বাঁচা যাবে।

অফিসে গিয়ে মনের আনন্দে কাজে ফাঁকি দিচ্ছি এমন সময় ফোনটা এল। অচেনা নম্বর। এমনিতে আমি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে তুলি না। অম্লানবদনে কেটে দিই। কিন্তু ইদানিং আমার বস নতুন ফোন কিনেছেন যার নম্বরটা আমার সেভ করা নেই। ঝুঁকি নেওয়াটা বোকামো হয়ে যাবে।

হ্যালো বলার পর ওদিকের গলাটা কানে আসা মাত্র আফসোস হল। বস নন। অনভ্যস্ত ইংরিজিতে কেউ আমার বিদঘুটে নামটা উচ্চারণ করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। গলায় যথাসম্ভব বিরক্তি ঢেলে বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ বলছি বলছি। আমার নতুন ক্রেডিট কার্ড চাই না, ইন্টারনেটের প্ল্যান আপগ্রেডিং চাই না, আপাতত ধর্মান্তরিত হওয়ারও প্রয়োজন বোধ করছি না, এছাড়া যদি কিছু বলার থাকে ঝটপট বলে কাটুন তো মশাই। আমার বলে কিনা গলা পর্যন্ত কাজ...

বোঝা গেল ভদ্রমহিলা আমার ফোল্ডারটা ট্রেনের কামরায় খুঁজে পেয়েছেন। ফেরত দিতে চান।

কোন মানে হয়? অচেনা লোকে যদি এভাবে দায়িত্ব নিয়ে আমার হিমালয়ে যাওয়া মাটি করে, আমার কিছু করার আছে?

ভাবছিলাম একবার বলি যে ও ফোল্ডার আমার লাগবে না। আপনি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বাচ্চাকে খেলতে দিয়ে দেবেন। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে বললাম না। উল্টে ভয়ানক উৎসাহ দেখিয়ে বলতে হল, হ্যাঁ হ্যাঁ ভাগ্যিস। কোথায় কবে দেখা করতে চান বলুন, না না আপনার যেখানে সুবিধে...

ফোনটা রাখা মাত্র মনে হল, নম্বরটা পেল কোথায়? নির্ঘাত ফোল্ডারটা খুলে হাঁটকেছে। মনটা তেতো হয়ে গেল।

তারপর বার তিনেক দেখা করার দিন, বার পাঁচেক দেখা করার জায়গা, বার সাতেক দেখা করার সময় বদলে, শহরের অন্য প্রান্তে উজিয়ে গিয়ে কী করে ফোল্ডারটা ফেরত নিয়ে এলাম সেকথা মনে পড়লেও আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ছি, লিখতে বলবেন না দয়া করে।

তবে ভদ্রমহিলার সাথে আলাপ হয়ে ভারি ভালো লাগল। টিপিক্যাল মা মা চেহারা। চোখ বন্ধ করা হাসি হেসে ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে বললেন, ওঁর মেয়েও ঠিক এরকম একটা ফোল্ডার নিয়ে অফিস যায় কিনা তাই উনি দেখেই বুঝেছেন দরকারি জিনিস। হ্যান্ডশেক করে বললেন, ভালো করে খাওয়াদাওয়া করতে। এত রোগা বলেই নাকি কিছু মনে থাকে না, যেখানে সেখানে জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলি। বাড়িতে এসে মাকে সেকথা বলতে মা গম্ভীর মুখে বললেন, “নিজের মায়ের কথা তো কানে ঢোকে না, পরের মায়ের কথায় যদি কাজ দেয় দেখ।”

ফোল্ডারটা খুলে দেখলাম একেবারে ওপরে টিকিটের প্রিন্টআউটটা রাখা আছে, আর তাতে জ্বলজ্বল করছে আমার কনট্যাক্ট ডিটেলস।

ব্যস গল্প শেষ। এখন সেই ফোল্ডারটা আমার ঠিক সামনে রাখা আছে। জিনিসটা ফেরত পেয়ে বেশ ভালো লাগছে জানেন। পেপারগুলো ফেরত পেয়েও। নতুন প্রিন্টআউট নিতে হল না, রেনফরেস্ট বেঁচে গেল।

*****

আচ্ছা এবার একটা ঘোষণা। আমি একটা ছোট্ট ছুটিতে যাচ্ছি। ওই যে টিকিটের ক্লুটা দিলাম? সামান্য ঘোরাঘুরির ব্যাপার আছে। মাকেও ট্যাঁকে করে নিয়ে যাচ্ছি। কাজেই সোমের বদলে ধীরেসুস্থে মঙ্গলবার ফিরব। বুধও হয়ে যেতে পারে বলা যায় না। এর মধ্যে অবান্তরে সাপ্তাহিকীর ডোজ যেমন পড়ে পড়বে।

আপনারা ভালো হয়ে থাকবেন। খুব করে টিভি দেখবেন আর ঘুমোবেন। দেখা হবে। টা টা।

May 23, 2012

Things I'm Afraid To Tell You



Cross stitch pattern, PDF- I lied about being the outdoor type
উৎস


কখনো কোনো ব্লগ পড়ে আপনার হিংসে হয়েছে? মনে হয়েছে ইস এর বাড়িটা কী বড়, এর কেরিয়ারটা কী ফাটাফাটি, এর বউকে কী ফোটোজেনিক দেখতে, এর বরের কত টাকা, এর বাচ্চারা কী ভালো একটুও কাঁদে না বায়না করে না, খালি কিউট মুখ করে ক্যামেরার সামনে পোজ দেয়?

মনে হয়েছে, বস এই জঞ্জাল লিখে এত কমেন্ট পাচ্ছে কী করে? নিজেই একগাদা বেনামে অ্যাকাউন্ট খুলে কমেন্ট লিখছে নাকি? বলা তো যায় না, যা দিনকাল পড়েছে...

মনে হলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, আমার চিন্তা ভাবনা সর্বক্ষণ এই লাইনেই চলতে থাকে।

আমার আপনার মতো হিংসুটিদের জন্য কয়েকজন ব্লগার Things I’m Afraid To Tell You নামে একটি ইন্টারনেট মুভমেন্ট শুরু করেছেন। যেখানে তাঁরা নিজেদের গভীর গোপন খুঁত আর নিরাপত্তাহীনতার কথা অসঙ্কোচে মেলে ধরছেন। ঈর্ষা, আলস্য, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদি রিপু যা মেকআপের তলায় চেপেচুপে রোজ সকালে হাসিমুখে দুনিয়ার দরবারে হাজিরা দিতে হয় সেগুলো মন খুলে স্বীকার করছেন। তাঁদের জীবনটা “আমার নয় কেন” এই কাঁদুনির বদলে, “কী ভাগ্যিস নয়” বলে হাঁপ ছাড়াটাই যে বেশি উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন।

আমি দেখলাম এই সুযোগ। এই আইডিয়াটা চুরি করে একটা ব্লগপোস্ট নামানোর। তাছাড়া অবান্তর পড়ে যদি আপনাদের কারো মনে আমার ছবির মতো জীবন আর ফুলের মতো স্বভাব নিয়ে কোনরকম কমপ্লেক্সের সৃষ্টি হয়, সেটাও দূর করা যাবে। আর সবথেকে যেটা ভালো ব্যাপার, সেটা হচ্ছে নিজেকে নিয়ে খানিকক্ষণ আরাম করে কথা বলা যাবে। এমনিতে তো কেউ শুনতেই চায়না। জঘন্য।

এক ঢিলে দুই...না...তিন তিনটে পাখি। ভাবা যায়?







  • আমি নিজেকে ইন্টেলেকচুয়াল প্রমাণ করার জন্য সর্বক্ষণ মুখিয়ে থাকি বটে, কিন্তু আসলে আমি একটি গেঁয়ো ভূত। আমার জ্যাজসঙ্গীত অখাদ্য লাগে। ওহ আর ‘সিটিজেন কেন’ সিনেমাটাও। নেহাত আগে পড়া ছিল ওটা সত্যজিৎ রায়ের প্রিয় সিনেমা, নাহলে আমি পুরোটা বসে দেখতে পারতাম না বিশ্বাস করুন।

  • আমার একা থাকতে বিশ্রী লাগে। কান্না পায়। মনে হয় মায়ের একটাও কথা শুনলাম না, সত্যি সত্যি যদি আমার কোনদিন বিয়ে না হয়? ভেবে ভেবে আমার বুকের ভেতরটা ভয়ে জমে যায়।

  • বিশ্বস্ত বলতে যা বোঝায় আমি ঠিক সেটা নই। লয়্যালটি আমার সহজে আসেনা। সেজন্য যাঁদের সেটা আসে তাঁদের আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি।

  • আমি অন্যের এঁটো খাইনা। এর সাথে ঘনিষ্ঠতার মাত্রার কোন সম্পর্ক নেই। কারোরটাই খাইনা।

  • আমি আমার বন্ধুদের সবথেকে বেশি হিংসে করি।

  • আর যারা ব্যঙ্গ করে কথা বলেন, তাঁদের সবথেকে বেশি ভয় পাই।

  • ‘দ্য পায়োনিয়ার উওম্যান’, যার একটা পোস্টে ৩৫০০০ কমেন্ট পড়ে তাঁর ব্যাপারটা নাহয় বুঝলাম, কিন্তু তাছাড়া কেন কেউ নিজেদের ব্লগে কমেন্টের উত্তর দেবেন না, দিতে চাইবেন না, এটা আমার কাছে সত্যি সত্যি একটা প্রশ্ন। কমেন্ট ভালো লাগে না? নাকি “বলেছে বলুক, আমার লেখা কাজ লিখেছি এরপর কে কী বলল তার উত্তর দেওয়া আমার দায়িত্ব নয়” মনে হয়?

  • আমার ভয়ঙ্কর ইগো। এবং অকারণ, বলাই বাহুল্য। কেউ আমার থেকে কোন বিষয় বেশি জানে (মানে আমার চেনা বৃত্তের লোকজন, নোয়াম চমস্কি আমার থেকে বেশি জানলে আমার কিছু এসে যায় না।) এটা মেনে নিতে আমার বুক ফেটে যায়।

ব্যস। মানে আরও আছে, কিন্তু সেগুলো বললে আপনারা আমাকে একঘরে করবেন, জীবনে আর অবান্তরে উঁকি দেবেন না, তাই চেপে যাচ্ছি।

দাঁড়ান, কোথায় যাচ্ছেন? আমার হাঁড়ির খবরগুলো শুনলেই হবে শুধু? আপনাদের জীবন বুঝি সব ধনধান্যে পুষ্পে ভরা? নিজেদের বুকের ভেতর যে কালো গহ্বরগুলোকে দুধকলা খাইয়ে পুষে রেখেছেন সেগুলো শেয়ার করতে হবে না?  আচ্ছা বেশি বলতে হবে না। একটা অন্তত বলুন? আচ্ছা আচ্ছা, আধখানা? প্লিজ? প্লিইইইইইইইজ?

May 22, 2012

কবিতার কথা



অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?

কোন প্রসঙ্গ নেই, এমনিই ওপরের লাইনটা লিখতে ইচ্ছে করল। শঙ্খ ঘোষের ‘শব্দ নিয়ে খেলা’, যে বইটা পড়ে রাকা আমাদের সব্বার মৌনতার ‘তা’ ছেঁটে থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দিয়েছে, সেই বইটা পড়ছি। আপনারাও পেলে পড়ে ফেলুন। আমি তো বলি পাওয়ার জন্য হাত পা গুটিয়ে বসে অপেক্ষা করবেন না, বনবাদাড় ভেঙে পিছু ধাওয়া করে পড়ে নিন। ঠকবেন না।

সেই বইটার দুই না তিন নম্বর পাতাতেই ওপরের লাইনটা লেখা আছে। পড়ে থেকে মাথার ভেতর ঘুরঘুর করছে। কিছুতেই বার করতে পারছি না। মাত্র ছ’শব্দের একটা বাক্য, অথচ কী নিটোল আর গভীর। কবিরাই এমন বাক্য লিখতে পারেন বোধহয়।

কবিতার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কীরকম? মানে কবিতা লেখার কথা বলছিনা। বাঙালি হয়ে জন্মেছেন যখন বিরহ কিংবা বর্ষা নিয়ে একটা দুটো পদ্য না নামিয়ে কি আর থেকেছেন? আমার চেনা মোটে দুজন বাঙালি হাত পা ছুঁড়ে দাবি করেছেন যে তাঁরা নাকি জন্মে এ-ক-টি-ই-ই-ও কবিতা লেখেননি। যদিও তাঁদের মধ্যে একজনকে আমি বিশ্বাস করিনা। লোকটা ডাইনে বাঁয়ে মিথ্যে বলে। অন্যজন হয়তো সত্যিই কবিতা লেখেনি কোনদিন কিন্তু সে কোনদিন পুরীও বেড়াতে যায়নি। কাজেই তাকে বাঙালি বলে গণ্য করারই দরকার নেই।

আমার কবিতার সাথে সম্পর্ক...প্রায় নেই বললেই চলে। পাঠ্যবইয়ের কবিতা আর রবীন্দ্র রচনাবলীর কবিতা, ব্যস। ও হ্যাঁ আর ওই দু’চারখানা কবিতা যেগুলো সবাই পড়েছে---বেণীমাধব, যেতে পারি কিন্তু কেন যাব, অবনী বাড়ি আছ, বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি---বাদ দিলে বাংলা কবিতায় আমার জ্ঞান ক-অক্ষর গোমাংস বললেও কিছু ভুল হয়না।

কি জানি, সেইজন্যই হয়তো বাইশে শ্রাবণ সিনেমাটা আমি কিচ্ছু বুঝতে পারিনি, পুরো ট্যান হয়ে গেছে।

কেন এরকম হল আমি সত্যি জানিনা। মেয়েদের সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতার সামগ্রিক বিকাশ ঘটানোর জন্য আমাদের স্কুলে নিয়মিত কবিতার সেমিনার বসত। পড়াশোনা নাচগান দৌড়ঝাঁপের প্রাইজ হিসেবে ঢালাও কবিতার বই বিতরণ করা হত। দিদিভাইরা কবিতা পড়তে, বলতে, এমনকি লিখতে পর্যন্ত উৎসাহ দিতেন। স্কুলসুদ্ধু উঠতি কবির কবিতা পড়ে মতামত দেওয়ার প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও।

এত করেও আমাকে কবিতা ধরানো যায়নি। খুবই খারাপ হয়েছে ব্যাপারটা। অ্যান ল্যামটের “বার্ড বাই বার্ড” বইতে পড়েছি, ভালো গদ্য লিখতে হলে পদ্য পড়া আবশ্যিক। তাছাড়া চোখের সামনে তো দেখছিই। যত উঁচুদরের লেখক, সবাই প্রায় সাহিত্যিক জীবন শুরু করেছিলেন কবিতা লেখা দিয়ে। সুনীল, নবনীতা, তারাপদ রায়। ব্যতিক্রম দু’চারজন থাকবেন নিশ্চয়, কিন্তু সেই থাকাটা প্রতিপাদ্যটা বরং আরও বেশি করে প্রমাণই করবে।

আমার বাবা বলেন, ধুস আধুনিক কবিতা আবার কবিতা নাকি? প্রত্যেকবার চোখ বন্ধ করে ডিকশনারি খুলেই যে পাতাগুলো আসবে তাদের তিন নম্বর শব্দগুলো সাজিয়ে সাজিয়ে লেখা তো? ওরকম কবিতা আমি দিনে ৫০০টা করে লিখতে পারি। এইটা পড়ে আধুনিক কবিরা রেগে যাবেননা প্লিজ। আমার বাবা ব্যাকডেটেড মানুষ। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছন্দমেলানো কবিতা ছাড়া তাঁর মন ওঠে না। কিন্তু আমি জানি দুর্বোধ্যতাটা সমস্যা নয়। আধুনিক কবিতা যদি দুর্বোধ্য হয় তাহলে

তটিনীর কলরব, লক্ষ নির্ঝরের ঝর ঝর,
সিন্ধুর গম্ভীর গীত, মেঘের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
ঝটিকা করিছে হা হা আশ্রয়-আলয় তার ছাড়ি
বাজায়ে অরণ্যবীণা ভীমবল শত বাহু নাড়ি,

কিছু কম দুর্বোধ্য নয়। আধুনিক কবিতা বুঝিনা তাই বিশ্রী, রবি ঠাকুরের কবিতা বুঝি তাই দুর্দান্ত, এই যুক্তি কাজেই ধোপে টেঁকে না। ভালো কবিতা দুর্বোধ্য হলেও ভালো, খারাপ কবিতা জলবৎ তরলং হলেও সে খারাপ।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে সোজা খারাপ কবিতা শুনলেই ধরে ফেলা যায় সে খারাপ। যেমন ধরুন,

"পোতোমাদ্দে পোবোল বিস্টি, ধইযযো ধরে বোসুন
ইসবেঙ্গলের পোসান্ত, মোহনবাগানের পোসুন।"

এ কবিতার প্রাণঘাতিতা (সেরেছে, এরকম শব্দ হয় তো?) নিয়ে কারো কোন সন্দেহ থাকতেই পারে না। কিন্তু যদি এমন একটা কবিতার সাথে মোলাকাত হয় যার আগা মুড়ো শেষ কিসসু বুঝতেই পারলাম না, তাহলে তাকে ফস করে ভালো বলে দিতে আমার কিরকম বাধোবাধো ঠেকে। সন্দেহ হয়, টুপি পরাচ্ছে না তো? আমি ‘ভয়ানক কবিতা বুঝি’ হাবভাব দেখিয়ে খুব আহাবাহা করলাম, এদিকে কবি হয়তো “কেমন কেসটা খাওয়ালুম” বলে হাতে তালি দিয়ে গড়াগড়ি খেয়ে হাসলেন।

দোষটা কবির নয়, দোষটা আমার নির্বুদ্ধিতার। কিন্তু নির্বোধ বলেই তো বেশি সাবধানে থাকতে হয় বলুন? কাজেই আমি কবিতার থেকে দূরে দূরে থাকি।

আর মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি, এ জন্মে এরকম একটা বাক্যের ব-ও আমার আঙুল দিয়ে বেরোবেনা জেনে।

অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?

আহা।

May 21, 2012

অভ্যেস



নাওয়াখাওয়া ঘুম ইত্যাদি শারীরবৃত্তীয় কাজকর্ম বাদ দিলে সারাদিনের মধ্যে আপনার আর কোন কাজটা সবথেকে সহজাত বলে মনে হয়? সহজাত বলতে আমি বোঝাতে চাইছি, যে কাজ আপসে আসে। বিন্দুমাত্র মাথা খাটাতে হয় না, হাত পা শরীর নিজেরাই মেশিনের মত নড়েচড়ে কাজ গুছিয়ে নেয়, সেটা করতে আপনার ভালো লাগছে না খারাপ লাগছে এসব আজেবাজে প্রশ্ন উত্থাপিতই হয় না। আমার যেমন স্নান করতে গেলে কান্না পায়, খেতে গেলে ফ্রিজের খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোতে হয়, এমনকি YouTube দেখতে গেলে পর্যন্ত একটা বাছাবাছির ব্যাপার থাকে---ইনস্পেক্টর বার্নাবি দেখবো নাকি ইনস্পেক্টর লিনলি---টস করে ঠিক করতে হয়, সেরকম নয় আরকি।

অনেক ভেবেচিন্তে আমি বার করেছি, সারাদিনের মধ্যে একমাত্র দাঁত মাজতে গেলেই আমাকে কিচ্ছু ভাবতে হয়না। আক্ষরিক অর্থেই আমি চোখ বুজে দাঁত মেজে ফেলতে পারি।

কাজেই যখন পড়লাম, বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ায় পেপসোডেন্ট বাজারে আসার আগে মোটে ৭% অ্যামেরিকান বাড়িতে টুথপেস্ট ছিল আর পেপসোডেন্ট বাজারে আসার দশ বছরের মধ্যে সংখ্যাটা বেড়ে ৬৫% হয়ে গিয়েছিল, আমার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। শেষপর্যন্ত দাঁতমাজাও কিনা পুঁজিবাদি কর্পোরেট চক্রান্ত!

এইসব ইন্টারেস্টিং তথ্য লেখা আছে চার্লস ডুহিগের ‘দ্য পাওয়ার অফ হ্যাবিটস’ বইতে। ওই যে অবান্তরের নিচে ডানদিকে যে বইটার মলাটের ছবি দেখতে পাচ্ছেন সেটায়। বইটা নিয়ে হইচই হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই, আমারও অভ্যেস ব্যাপারটা নিয়ে মাথাব্যথা একেবারে নেই সেরকম নয়, তাও আমি এতদিন বইটা জোগাড় করে পড়ার সাহস পাচ্ছিলাম না। কারণ বইটার নাম শুনলেই ভয় লাগে, এই রে এইবার জ্ঞান দিল বুঝি। পয়সা খরচ করে (বা লাইব্রেরিতে লাইন দিয়ে, এসব বইয়ের যা ডিম্যান্ড বাসরে) উপদেশ শোনার মতো মাথাখারাপ হয়নি এখনও আমার।

তারপর হঠাৎ একদিন ঘুরতে ঘুরতে একখানা অনলাইন ফ্রি সংস্করণ শিকে ছেঁড়ার মত হাতে এসে পড়লো। আমিও সময় নষ্ট না করে পড়তে শুরু করে দিলাম। ফ্রি-তে দিলে আমি বাইবেল পর্যন্ত পড়তে রাজি আছি, ‘পাওয়ার অফ হ্যাবিটস’ তো কোন ছার।

চার্লস লিখেছেন সেই আদি অকৃত্রিম সত্যের কথা, মানুষ অভ্যাসের দাস। এবং সেই অভ্যাস যতই তুচ্ছ অকিঞ্চিৎকর হোক না কেন, এই যেমন ধরুন দাঁতমাজা, তৈরি করতে হয়। কারা পারে? শিশুদের অভ্যেস তৈরি করে দিতে পারেন বাবামা, মাস্টারমশাই দিদিমণিরা, আর বুড়োধাড়িদের শেখাতে লাগে কর্পোরেট। তবে যাদেরই শেখানো হোক না কেন, যারাই শেখাননা কেন, চার্লস ডুহিগের মতে শিক্ষণপদ্ধতিটা কাজ করে নিচের ডায়াগ্রাম অনুসারে।


The Power of Habit

উৎসঃ দ্য পাওয়ার অফ হ্যাবিটস


এতেও নতুন কিছু নেই। সেই চিরাচরিত খুড়োর কলের সামনে মূলো ঝোলানোর কারসাজি। অবস্থা বুঝে মূলোটা বদলাতে হবে অবশ্য, বাচ্চাদের জন্য মায়ের চুমু বা দিদিমণির কানমলা, বড়দের জন্য চকচকে দাঁতের ফোটোশপ করা ফাঁপা প্রতিশ্রুতি।

কিন্তু আসল কথাটা সেটা নয়। চার্লসের বইয়ের আসল কথাটা হচ্ছে, দাঁতমাজা যদি কাউকে শেখানো যায়, মন মাথা শরীর চেতনার ভেতর গজাল মেরে এমনভাবে গুঁজে দেওয়া যায় যে দাঁত মাজতে শুরু করার আগে বিশ্বসংসার কেমন ছিল তার স্মৃতিটুকু পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে আরও অনেককিছু এভাবে শেখানো যেতে পারে। এইটা শুনেই চারদিকে হইহই রব উঠে গেছে। লোকে উৎসাহিত হয়ে ভাবছে এইবেলা সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেবো, রোজ বিকেলে একটা করে অনাবশ্যক কুকি আর খাবোনা এবং পত্রপাঠ ১০ পাউন্ড ওজন কমাবো, খাটের পাশে ‘ট্রিগার’ হিসেবে রানিং শু রেখে ঘুমোতে যাবো যাতে সকালে উঠে সেটা দেখেই দৌড়তে যাওয়ার কথা মনে পড়ে।

একটা কথা কিন্তু মানতে হবে, আমরা যতই হাত পা ছুঁড়ে কান্নাকাটি করিনা কেন, মানুষের জীবনে সমস্যা বিশেষ নেই। মানে সারাজীবনের মত অভ্যাস গঠনের সোনারকাঠি হাতে এসে যাওয়ার পর সেটা নিয়ে আমরা কিনা শুধুমাত্র জগিং করতে যেতে চাইছি? কোমরের চারপাশে খানিকটা বাড়তি মেদ ঝরানো ছাড়া আমাদের জীবনে উন্নতি করার মত আর কোন জায়গাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? সবাই মনের আনন্দে আছেন, প্রাণ ঢেলে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন, আত্মীয় বন্ধু পরিজনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সদ্ভাব বজায় রেখেছেন, রাস্তাঘাটে অচেনা লোকজনের সাথে খামোকা খারাপ ব্যবহার করে নিজের ফ্রাস্টেশন জাহির করছেন না---এর থেকে ভালো খবর মানবসভ্যতার জন্য আর কী হতে পারে আমি জানিনা।

অবশ্য এর আরেকটা ব্যাখ্যা হতে পারে। চার্লস যাই দাবি করুন না কেন, কিছু কিছু জিনিস শেখা, বা শেখানো যায় না। আমাদের এক ক্লাস ওপরে পড়তো এমিলিও হারনান্ডেজ, চার বছর না ফুরোতে পি এইচ ডি জমা করেছিল, গোটা পাঁচেক অতি উচ্চমানের পাবলিকেশন হেলায় নামিয়েছিল, প্রত্যেক সপ্তাহে ডিপার্টমেন্টের ছেলেপুলের সাথে জুটে বাস্কেটবল খেলতে যেত, এমনকি একবছর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস পার্টিতে সেজেগুজে নিকারাগুয়ান নাচ পর্যন্ত দেখিয়েছিল। 



বলাই বাহুল্য, আমি এমিলিও হতে চাইতাম। অনেকেই চাইতো। একবার ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “তুমি দিনে কতক্ষণ পড়াশুনো করো?” এমিলিও মিষ্টি হেসে বলেছিল, “সোম থেকে শুক্র আটঘণ্টা পড়ি, শনিরবি চারঘণ্টার বেশি ইচ্ছে করেনা।”

আমি যেভাবে দাঁত মাজি, এমিলিও সেভাবে পড়তে বসতো।

দুঃখের বিষয়, দাঁতমাজার থেকে পড়তে বসার রিটার্ন বেশি। অন্তত আমরা যে দুনিয়ায় বাঁচি সেই দুনিয়ায়। আর তার থেকেও বেশি দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে চাইলে আমি দুবেলার জায়গায় চারবেলা দাঁতমাজার অভ্যেস তৈরি করতে পারি, কিংবা রোজ সকালে দৌড়তে যাওয়ার, কিন্তু এমিলিওর মতো দৈনিক আটঘণ্টা নিরবিচ্ছিন্ন পড়া/কাজ করার অভ্যেস? অসম্ভব।

কারণ ওটা অভ্যেস নয়, ওটা চরিত্র।

মানুষ আদতে আশাবাদী কিনা, তাই নিজেকে নিয়ে আশা তার ফুরোয় না। চাইলে আমি সব করতে পারি, এ কথা সে নিজে প্রাণপণ বিশ্বাস করতে চায়। অন্য কারো মুখে শুনলে তো আর কথাই নেই। চার্লস বুদ্ধিমান লোক, তিনি সেটাই শুনিয়েছেন। হয়তো তিনি নিজেও এটা বিশ্বাস করেন।
*****

দেখেছেন, রবিবার রাতে পোস্ট লিখতে বসার এই মুশকিল। মনের যত দুঃখ, হতাশা, আসন্ন পাঁচদিনের যমযন্ত্রণার আশঙ্কা---সব ফুটে বেরোয়। আপনারা ঘাবড়াবেন না। হয়তো সত্যিই সবকিছু বদলানো সম্ভব। সবাই যখন বলছে, হয়তো কেন, নিশ্চয় সম্ভব।

আপনারা নিজেদের কোন অভ্যেসটা বদলাতে চান? বা নতুন করে তৈরি করতে চান? নাকি কিছুই বদলাতে চান না, যা আছে যেমন আছে তাই নিয়েই সন্তুষ্ট? তাহলে আপনাকে আমি সত্যি সত্যি হিংসে করি।

May 20, 2012

সাপ্তাহিকী





তবে? আজকালকার মহিলারা লিবারেটেড হয়ে সাপের পাঁচ পা দেখবেন, ঘরের কুটোটি ভেঙে দুখানা করবেন না, এদিকে  ঘ্যানা পাড়বেন মোটা হয়ে যাচ্ছি, মোটা হয়ে যাচ্ছি। কলি কলি, ঘোর কলি।

একটু বেটাইম হয়ে গেল, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না। ভালো জিনিস সবসময়ই ভালো।  মাদার'স ডে-র মর্ম যথার্থ হৃদয়ঙ্গম করতে হলে এই ভিডিওটা অতি অবশ্য দেখুন।

সকাল থেকে সন্ধ্যে, একটা গোটা দিন ভালো কাটানোর টিপস

প্রথম বিশ্বের শয়তানির দৌড়টা দেখেছেন! দুপেয়ে ছেড়ে এবার চারপেয়েদের টার্গেট করেছে।

এই সাধারণ কমন সেন্সটা যে কত লোকের নেই, বিশ্বাস করা শক্ত।

যেতে যেতে আপনাদের জন্য একটা ভালো গান রেখে যাই। ঘরের আলো নিভিয়ে, চোখ বুজে শুনতে পারলে বেশি উপকার পাবেন। ভিড় বাসে ঘেমো সহযাত্রীর সাথে সেঁটে দাঁড়িয়ে শুনলেও ভালো লাগবে অবশ্য। ওই যে বললাম, ভালো সবসময়েই ভালো।

আপনারাও ভালো হয়ে থাকবেন। কার্টুন কিংবা কিং খান, কিছু নিয়েই বেশি উত্তেজিত হবেন না। "যা হচ্ছে হোক বস আমার কী" বলে রিল্যাক্স করবেন। সোমবার আবার দেখা হবে। টা টা।


May 18, 2012

দুঃখের পোস্ট


আচ্ছা বলুন দেখি, কথাটা সখ্য না সখ্যতা?

আমি বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত, মর্মাহত। ইন ফ্যাক্ট মরেই গেছি ধরে নিন।

আমি কুম্ভীপাক জানি, রথারূঢ় জানি, দন্তরুচিকৌমুদী, অক্ষৌহিণী, স্পন্দচ্ছন্দা, গজভুক্তকপিত্থবৎ এমনকি ডিটি-রিও-রে-শন পর্যন্ত জানি, আর এই বহুব্যবহারে জীর্ণ, যুক্তাক্ষরবর্জিত একটা পুঁচকে বাংলা শব্দ কিনা আমাকে শুইয়ে দিল? মাথা হাফ ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে, উল্টো গাধার পিঠে চড়িয়ে দেশ থেকে রীতিমত গলাধাক্কা দিল?

তাও এই তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকার পর?

আমার পক্ষে অপমানটা হজম করা আরও বেশি শক্ত কারণ আমি নিজে চব্বিশ ঘণ্টা পরের ভুল ধরে বেড়াই। শখে নয়। যেচে কেউই অন্যের কাছে অপ্রিয় হতে চায় না। কমরেডরা জানেন ভুল ধরি, কারণ না ধরে পারি না। বিশেষ করে বাংলার ভুল। চোখের সামনে কেউ হ্রস্বর জায়গায় দীর্ঘ বসিয়ে দিছে, ণত্বষত্বের পিণ্ডি চটকে দিচ্ছে দেখলে ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যায়, মাথা বনবন করে ঘোরে, বুক ধড়ফড় করে।

ভুলটা ধরিয়ে দিলেই আবার সব স্বাভাবিক।

সেই আমি কিনা...

যাই হোক, যা হওয়ার হয়ে গেছে। পাস্ট ইজ পাস্ট। অতীত নিয়ে বুক না চাপড়ে বরং এই দুঃখ নিংড়ে একটা ব্লগপোস্ট নামান যায় কিনা দেখি।

কোন কিছু না জানা নিয়ে লজ্জা পাওয়ার মতো বোকা কিন্তু আমি নই জানেন। ছিলাম এককালে। সেকেন্ড সেমেস্টারে আমাদের যিনি ম্যাক্রো পড়াতেন তিনি প্রায় মোল্লা নাসিরুদ্দিনের মতই চালাক ছিলেন। প্রত্যেকদিন ক্লাসে এসে বলতেন, আজ আমি যে মডেলটা পড়াব সেটা নিশ্চয় তোমরা অলরেডি জান? বলে হাসি হাসি মুখে চেয়ে থাকতেন। আমিও বুরবকের মতো ঘাড় যথাসম্ভব হেলিয়ে, "হ্যাঁ স্যার, জানি তো" বলে দিতাম। বিষবৃক্ষের ফল ফলল মিডটার্মের নম্বর বেরনোর পর। সেই যে আমার CGPA টা কাত হয়ে পড়ল, পরের দুই সেমেস্টার ধরে প্রাণপণ সেবা করেও আমি তাকে আর আগের অবস্থায় ফেরত আনতে পারলাম না।

শিক্ষা হয়ে গেছে। এখন জানলেও বলি জানিনা স্যার, প্লিজ ইল্যাবরেট। বুঝলেও বলি, কিচ্ছু বুঝিনি আবার বোঝান।

তাহলে সখ্য-সখ্যতা না জানা নিয়ে এত বিচলিত হচ্ছি কেন জিজ্ঞাসা করছেন? হচ্ছি কারণ এই জায়গাটা আমার অ্যাকিলিস' হিল। দুর্যোধনের বিখ্যাত ঊরু। আমি যেখানে যাই পত্রপাঠ বাংলা বাঁচাও লোকাল কমিটির প্রেসিডেন্ট পদে নিজেকে স্বনির্বাচিত করি, আচার্য-র পরে কেউ য-ফলা দিলে তার সাথে জন্মের মত আড়ি করে দিই। আমার দ্বিতীয় বয়ফ্রেন্ড প্রেমপত্রে "মুহূর্ত" বানানে হ্রস্ব উ দীর্ঘ ঊ গুলিয়ে ফেলেছিল বলে আমি আরেকটু হলেই তাকে ছেড়ে দিচ্ছিলাম। (এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, মলাট দেখে বই বিচার করুন আর না করুন, বানান দেখে লোক অতি অবশ্য বিচার করবেন। নইলে শেষে নিজেই পস্তাবেন, আমার মত।)

মা যে বলেন, "সোনা, যে যা নিয়ে গর্ব করে, ঠিক সেই জায়গায় চরম হেনস্থা না সয়ে তার এ পৃথিবী থেকে মুক্তি নেই", ঠিকই বলেন।

তখন শুনিনি, আজ বড় দাম দিয়ে শিখতে হল।

যাই হোক, এখন আপনারা বলুন সখ্য আর সখ্যতার মধ্যে এতদিন আপনারা কোনটা ঠিক বলে জানতেন। সত্যি সত্যি বলবেন কিন্তু। ডিকশনারি দেখবেন না, আন্দাজে ঠিকটা ধরে ফেলে, "আমি তো সেই জন্মে থেকে এটাই জানি" দাবি করবেন না। আরও স্পষ্ট করে বললে, বাংলা রচনায় 'বন্ধুত্ব'-এর বদলে ভাষাজ্ঞান ফলিয়ে সখ্য আর সখ্যতার মধ্যে যেটা লিখে আসতেন, সেটাই বলবেন। দেখছেন তো অলরেডি আধমরা হয়ে আছি, আপনারা ধোঁকা দিলে আর বেঁচে ফেরা শক্ত হবে।


May 17, 2012

হাতে নাতে





তথ্যসূত্রঃ এক্সপ্লোরনিউ ইয়র্ক টাইমস

শুক্রবারের আড্ডার সমাধান না হওয়া বহু বিতর্কের মধ্যে একটা বিতর্ক হল, মানুষের প্রজনন ঋতু, অর্থাৎ মেটিং সিজন আছে না নেই। বুঝতেই পারছেন, আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণাদি নিয়ে মাথা ঘামাই না,  স্রেফ পর্যবেক্ষণ দিয়ে কাজ চালাই। বান্টির, আমার আর সুদীপ্তর বিশ্বাস, কুকুর, বেড়াল, প্রজাপতির মতো মানুষেরও মেটিং সিজন আছে, না থাকার কোন কারণই নেই। ওদিকে সীবলি, সোমা, চিরু, যারা একটু ভালোমানুষ গোছের, তারা বলে, "ধ্যাত তোদের যত বেশি বেশি। মানুষের মোটেই ওসব নেই।"

এবার হাতে নাতে প্রমাণ হয়ে গেল তো? ওপরের চার্টটা যদিও ইউনাইটেড স্টেটসের ডেটা নিয়ে বানানো, কিন্তু আমি নিশ্চিত ভারতবর্ষের তথ্য কিছু অন্য কথা বলবে না। হ্যাঁ সিজনটা আলাদা হবে, হওয়াই স্বাভাবিক।

আমার আন্দাজের কথা যদি জানতে চান, তাহলে বলবো আমাদের দেশের (অন্তত পশ্চিমবঙ্গের) সিংহভাগ লোকের জন্মদিন ডিসেম্বরে পড়বে। তাই কিনা শম্পা? পড়াই স্বাভাবিক অবশ্য। যতই হোক, বসন্তের হাওয়ায় এখনো একটা ব্যাপার আছে।

May 16, 2012

পরজন্মে যদি কিছু হতেই হয়, ফ্রেঞ্চ হব



আমাদের শুক্রবারের আড্ডার প্রশ্ন প্রশ্ন খেলার একটা অন্যতম জনপ্রিয় প্রশ্ন হচ্ছে, পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে, তাহলে কী হয়ে জন্মাতে চাও?

আমি এতদিন মুহূর্ত না ভেবে জবাব দিতাম, “হোয়াইট মেল, রিচ অ্যান্ড থিন কিন্তু এখন উত্তরটা একটু বদলাতে হবে মনে হচ্ছে। পরজন্ম বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে পায়ে পড়ি ভগবান, আর কিচ্ছু চাই না, আমাকে খালি একটুখানি ফ্রেঞ্চ হয়ে জন্মাতে দিও।

সে ধুমসো মোটা, হাভাতে গরিব, ফিমেল ফ্রেঞ্চ হয়েও যদি জন্মাতে হয়, নো পবলেম।

এইবেলা বলে রাখি, ভূতের ভবিষ্যৎ দেখে ইস্তক ভাবছি জীবন থেকে র-ফলাটা কাটিয়েই দিই। পপার পোনানসিয়েসন নিয়ে অত বলপোয়োগ করে হবেটা কী?

যাকগে, যে কথা হচ্ছিল। এতদিন ধরে জেনে এসেছি, ফ্রেঞ্চ সব ভালো। ফ্যাশন, খাওয়াদাওয়া, সিনেমা, পারি শহর, পাউরুটি, মহিলাদের ফিগার, চুমু, চিজ, পুরুষদের দাড়ির ছাঁট। তাছাড়াও যেগুলো একেবারেই ফ্রেঞ্চ নয়, কিন্তু ভালো জিনিস, যেমন ধরুন আলুভাজা, তাকেও জাতে ওঠার জন্য নিজেকে ফ্রেঞ্চ বলে চালাতে দেখেছি। কিছুদিন আগে শুনলাম ফ্রেঞ্চ মায়েরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা। মাতৃত্বের পোতিযোগিতায় (কী করবো, পোলোভন সামলাতে পারছি না) তাঁরা চাইনিজ মায়েদেরও নাকি বলে বলে হারান। আর এখন শুনছি, ফ্রেঞ্চ বাচ্চারা পর্যন্ত ননফ্রেঞ্চ বাচ্চাদের থেকে ভালো। ফ্রেঞ্চ বাবামায়েরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, যা জোগাড় করে এনে মুখের সামনে ধরে দেন, তারা নাকি সোনামুখ করে সব খেয়ে নেয়। আদরে বাঁদর অ্যামেরিকান বাচ্চাদের মতো “আমার ফ্রেঞ্চ আলুভাজা চাআআআআআই” বলে থালাবাটি বাজায় না।


উৎস গুগল ইমেজেস
তাই বলছি, ফ্রেঞ্চ না হয়ে জন্মালে আর চলছে না। এই দেখুন বাঙালি বাচ্চারাও কিন্তু সব খায়, অন্তত আমি যখন বাচ্চা ছিলাম তখন খেত, কিন্তু তাদের নিয়ে কেউ কখনও আদিখ্যেতা করে নিউ ইয়র্ক টাইমসে আর্টিকেল লিখেছে?

নাকি বাঙালি বাচ্চারা এখন আর সব খায় না? এখন তাদের কচি পেটে দুর্গাপূজোর স্পাইসি খিচুড়ি সয় না?  গোটা মাছের ‘বোনস’ বাছতে কোমল হাতে কড়া পড়ে যায়?

আমি বলছি না যে আমি ছোটবেলায় মা যা দিতেন সব একেবারে বিনা প্রতিবাদে খেয়ে ফেলতাম। আমার মা রোজ আমাকে গাজরসেদ্ধ চটকে ভাতের সাথে মেখে খাইয়ে স্কুলে পাঠাতেন, চোখ ভালো রাখার আশায়। আমি রোজ চেঁচাতাম এবং রোজ থালার গাজর শেষ করে স্কুলে যেতাম। না শেষ করে গেলে পরিণতি কী হবে জানতাম না, কিন্তু খুব সাঙ্ঘাতিক যে কিছু একটা হবে এইটা আন্দাজ ছিল।

আমি নিশ্চিত কোন না কোন মা এই পর্যন্ত পড়ে বলছেন, হ্যাঁ হ্যাঁ তোমার তো সব ভালো ছিল, বোঝা গেছে। পরকে দেখে হাসা? নিজের হলে বুঝবে। হয়তো সত্যি। দশচক্রে ভগবান ভূত হন, কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায় তো কোন ছার। আমার বাচ্চা হলে আমিও হয়তো তাকে খিচুড়ি লাবড়ার বদলে পিৎজা খাওয়ার আলাদা পংক্তিতে বসাব। কিন্তু এইটা কথা দিচ্ছি, তখন আপনারা আমাকে দেখে যত খুশি হাসুন, অবান্তরের আর্কাইভ হাঁটকে এই পোস্টটা আমাকে ফরওয়ার্ড করুন, আমি কিচ্ছু মাইন্ড করবো না। পমিস।

কারণ আমি তখনও নিজের মনে জানব যে ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত হচ্ছে।

বাচ্চা আর বড়দের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই দূরত্বটা আমাকে ঘেঁটে দেয়। আলাদা খাবার, আলাদা ভাষা, আলাদা আইনকানুন। মা বাবারা দিব্যি লাল নীল সবুজ হলুদ চিনতে পারেন, কিন্তু বাচ্চাদের চেনানোর সময় টিয়াপাখি গ্রিন, পাম্পকিন ইয়েলো, খেলার বল রেড রঙের। আমার চেনা অনেক বাড়িতেই বাচ্চা আর কুকুরের সাথে এক ভাষায় কথা বলা হতে দেখেছি। গো, সিট, ইয়েস, নো, ফেচ। পোষা কুকুরের সাথে লোকে ইংরিজিতে কথা বলে কেন, সেটা অবশ্য আমার জীবনের অন্যতম জ্বলন্ত একটা প্রশ্ন। যদি কারো জানা থাকে তো বলবেন, দয়া করে।

তাও না হয় বুঝতে পারি, গ্রিন, ইয়েলো, রেড বলার সাথে ভাষা শেখানর একটা সম্পর্ক আছে। হয়তো বাচ্চা লাল নীল সবুজ আপসে শিখে নেবে, যতই হোক মাতৃভাষা। কিন্তু খাবারের ভেদাভেদটা আমি সত্যি বুঝি না।

বাচ্চারাও কী বোঝে? কে জানে। এখনকার বাচ্চারা যদি একটুও আমাদের আমলের বাচ্চাদের মতো হয়, তাহলে তারাও তো অধীর আগ্রহে বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে। মায়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে অফিস অফিস খেলছে, বাবার শার্ট পরে ডাক্তার সাজছে। চোখে জল চলে এলেও “আমি তো ঝাল খেতে পারি” বলে বড়দের তরকারি খাচ্ছে, যদি এই করে বড় হওয়ার ঘটনাটাকে একটু তাড়াতাড়ি ঘটানো যায়। ঝাল তো ছেড়েই দিন, আমি তো দুধের গ্লাসে একটা দুটো মরা পিঁপড়ে ভাসতে দেখলে এক্সট্রা খুশি হয়ে যেতাম। কে যেন বুঝিয়েছিল, পিঁপড়ে ভাসা দুধ খেলে পিঁপড়েদের মতো সাঁতার শেখা যায়।

কী টুপিটাই যে পরিয়েছিল, সেটা অবশ্য পরে সাঁতার শিখতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি।

কে জানে। হয়তো বাচ্চারা এখন বুদ্ধিমান হয়ে গেছে। বড় হলে যে লাভের চাইতে ক্ষতির অংশটাই বেশি, সেটা বুঝে গেছে। তাই যদ্দিন পারা যায়, আলাদা টেবিলে বসে পিৎজা খেয়ে ছোটবেলাকে জিইয়ে রাখতে একটুও আপত্তি করছে না।

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.