June 30, 2012

সাপ্তাহিকী




The Neverending Commute by Jamie Beck


Above all, be the heroine of your life, not the victim. 
                                                                Nora Ephron (1941-2012)


আপনি কাউকে পোস্টে সবথেকে অদ্ভুত কী পাঠিয়েছেন?

মেলের আমি মেলের তুমি, মেল দিয়ে যায় চেনা।

অবিকল আমার বর্ণনা।

পিন গোঁজাও হল, প্রতিশোধ নেওয়াও হল।

সিমেট্রি। আমার প্রিয় জিনিস।

যারা বোস হেডফোন কিনবেন বলে পণ করেছেন তাঁদের জন্য আমার সাবধানবাণী।

অবশেষে সত্যিটা মুখের ওপর বলার সৎসাহস হল কারো।

সবশেষে এ সপ্তাহের গান। শোনার পর যদি অন্তত একঘণ্টা মাথার ভেতর না গুনগুন করেছেন তো আমার নাম নেই। 


June 29, 2012

সিরিয়াল মোনোগ্যামিস্ট#৩ - প্রেম না নারীস্বাধীনতা?



টাইমস স্কোয়্যারে লভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট হওয়ার একই গল্প একশো পঞ্চান্ন বার শোনা কিংবা বিচের ধারে একশো পঞ্চান্ন রকম ভঙ্গিতে তোলা আলিঙ্গনাবদ্ধ ছবি দেখার থেকেও অস্বস্তিকর যদি কিছু থেকে থাকে সেটা হল বন্ধুদের প্রেম ভেঙে যাওয়ার সাক্ষী থাকা।

অস্বস্তিকর এবং বেদনার। সামনে থেকে একজন পছন্দের মানুষকে যন্ত্রণা পেতে দেখা সবসময়েই কষ্টকর। তাও আবার অকারণে। ডাক্তারের চেম্বারে ব্যথার চার্ট টাঙানো থাকে দেখেছেন? এক থেকে দশ পর্যন্ত ব্যথা অ্যাসেন্ডিং অর্ডারে সাজানো? পেটব্যথা মাথাব্যথা হাঁটুকনকন যতরকম সমস্যার জন্য আমাকে যখনই ডাক্তারখানায় যেতে হয়, ডাক্তারবাবু যতবারই আমাকে চার্ট দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করেন কতখানি ব্যথা করছে, আমি সর্বদা দশ নম্বর ব্যথার স্মাইলিটা দেখিয়ে দিই। ডাক্তারবাবু প্রতিবারই অবিশ্বাসী মুখ করে আমার দিকে তাকান কিন্তু আমার খালি মনে হয় এর থেকে কম ব্যথা করছে বললে যদি সিরিয়াসলি না নেয়?

প্রেম ভেঙে যাওয়ার ব্যথাটা হচ্ছে চার্টের এক নম্বর ব্যথা। বিশ্বাস করুন আমি একটুও কমিয়ে বলছি না। যতদিনেরই পুরনো প্রেম হোক না কেন, যত মেড ইন হেভেন প্রেমই হোক না কেন, জীবনের বেশির ভাগ ট্র্যাজেডিই প্রেমে ব্রেক আপ হওয়ার থেকে বেশি করুণ। বেশি ব্যথার। ভেঙে গেছে মানে ভাঙারই ছিল। জোড়াতালি দিয়ে আর বেশিদিন চলত না। কাজেই কান্নাকাটি না করে পরের প্রেমটার চেষ্টায় লেগে পড়ুন। আর যদি প্রেমকে কাঁচকলা দেখিয়ে একা একাই বাঁচতে পারেন তাহলে আমার তরফ থেকে হাই ফাইভ রইল। ওয়ে টু গো।

কিন্তু এটা প্রেমিকপ্রেমিকাদের বোঝায় কার সাধ্য। তাঁদের দোষ নেই। কেউই বোঝেনা, আমিও বুঝিনি। সারাদিন মুখে কুটোটি না কেটে, কেঁদে চোখমুখ ফুলিয়ে বাসস্ট্যান্ডে বসে থেকে একটার পর একটা বাস ছেড়ে দিয়েছি। মনে হয়েছে, বাস? বাড়ি যাওয়া? টিফিন খাওয়া? আমি বলে কিনা মরেই যাচ্ছি আর এখন এসব তুচ্ছ জাগতিক ব্যাপার নিয়ে মাথাঘামানো?

কাজেই সেদিন দরজা খুলে দেওয়ার পর যখন ম গোমড়া মুখে ভেতরে ঢুকে সোফার ওপর বসে পড়ে বলল, “ইট’স ফিনিশড” তখন আমি ওর পাশে এসে চুপ করে বসে রইলাম।

একটু পরে কান্নার বাঁধ ভাঙল। একেবারে ভেঙে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। কেন এরকম হল কুন্তলাদি? কী বলব বলুন দেখি। ম আর ওর প্রেমিকের মধ্যে নানারকম সমস্যা চলছিল অনেকদিন থেকেই। ঘটনাটার অনিবার্যতা নিয়ে চেনামহলে কারোরই সন্দেহ ছিল না কিন্তু ওরা সম্পর্কটাকে টেকানোর চেষ্টা করছিল দুজনেই।

শেষে কান্না থামল। ম খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে, আবেগে ভেসে যাওয়ার সমস্যা আছে সামান্য, কিন্তু সেটা বয়সের দোষ। ও নিজেও বুঝতে পারছে যে যা হয়েছে হওয়ারই ছিল। কিন্তু তাও মন মানছে না। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে নিজেকে নিজেই বোঝানোর মতো করে পুরনো ঘটনা মনে করে করে আমাকে বলতে লাগল ম। কেন সম্পর্কটা টেকার ছিল না। কোথায় কোথায় কমপ্যাটিবিলিটির অভাব ছিল। ম অসম্ভব স্বাধীনচেতা মেয়ে। সমাজের প্রচলিত বেশিরভাগ কায়দাকানুনের সাথেই ওর চলনবলন মেলেনা, আর সেটা যে মেলেনা সেই নিয়ে ম-এর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। আমি ম-এর এই ব্যাপারটাকে শ্রদ্ধা করি। ম-এর প্রাক্তন প্রেমিক ওর থেকে অনেক বেশি ছাঁচে ঢালা। সেই ছেলেটিকেও আমি মন থেকেই পছন্দ করি।

ম-এর সেদিনের স্মৃতিচারণার মধ্যে একটা ঘটনা আমার মনে বিঁধে আছে। এই সমস্যাটাই অন্য অন্য চেহারায়, অন্য অন্য নারীপুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দেখেছি। দেখুন তো আপনাদের কী মনে হয়।

সমস্যাঃ

ম একবার একটা অর্থনৈতিক গোলমালে ফেঁসেছিল। সম্পূর্ণ নিজের দোষে। অতিরিক্ত বেপরোয়া হলে যা হয়। তবে গোলমালটা গুরুতর ছিল এই কারণে যে পরিণতি খারাপ হলে ম-এর টাকাপয়সা সংক্রান্ত ক্ষতি তো হতই, কেরিয়ারও মাটি হতে পারত। বাঁচা গেছে সেসব কিছু হয়নি। কর্তৃপক্ষ স্রেফ সতর্ক করে ছেড়ে দিয়েছেন।

“মনে আছে তোমার কুন্তলাদি?”

নেই আবার? ঘটনাটা শুনে আমরা কে কতবড় হাঁ করেছিলাম সেটা পর্যন্ত মনে আছে।

তখন ম স্বাভাবিকভাবেই প্রেমিকের কাছে ঝামেলাটার কথা বলেছিল। প্রেমিকও শুনে প্রথমেই হাঁ করেছিল। তারপর হাঁ বুজিয়ে বলেছিল, “ভেবনা সব ঠিক হয়ে যাবে। এইমুহূর্তে তোমার টাকার দরকার থাকলে আমি দিই? কত লাগবে লজ্জা না করে আমাকে বল সোনা।”

সেই শুনে সোনা একেবারে রেগে কেঁপে অস্থির। “আমি কি ওর কাছে টাকা চেয়েছি? কী করে ও ভাবতে পারল আমার নিজের ক্রিয়েট করা সমস্যা আমি ওর টাকা নিয়ে সলভ করতে চাইব? আমাকে দেখে কি সেরকম মেয়ে মনে হয়, সত্যি করে বল তো কুন্তলাদি? কী ভয়ানক শভিনিস্ট ছেলে ভাবতে পারো!”

কুন্তলাদি তখন চুপ করে ছিল বলাই বাহুল্য। মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, আরে পাস্ট ইস পাস্ট। যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। ভাবিসনা। কিন্তু মাথার ভেতরে ঘটনাটা সেই থেকে যে ঘুরঘুর করতে লাগল, ছাড়া পেল এই আজকের সিরিয়াল মোনোগ্যামিস্ট পোস্টে।

কুন্তলার মতে

প্রাক্তন প্রেমিকের আরও লক্ষ লক্ষ দোষ থাকতে পারে, কিন্তু প্রেমিকা বিপদে পড়লে টাকা দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টাটাকে যদি ম তার দোষ/শভিনিজম বলে চালাতে চায়, আমি সেটার ঘোর বিপক্ষে।

শভিনিজম দেখলে আমি চিনতে পারি, যে কোন মেয়েই পারে, ছেলেদেরও না পারার কোন কারণ নেই। ও দেখলেই চেনা যায়। এটা সেটা নয়।

যদিও ম-এর অযৌক্তিক প্রতিক্রিয়াটার উৎসটা আমি চিনি। “মেয়েরা প্রেমিকের পয়সায় খায় তাই গার্লস হোস্টেলে মেস বিল কম আসে” গোছের বহুলপ্রচলিত রসিকতা (অবশ্য আমার ধারণা ওটা রসিকতা নয়, রসিকতার মোড়কে গায়ের ঝাল)। বলাই বাহুল্য রসিকতাটা মেয়েদের সম্পর্কে কোন গভীর সত্য উন্মোচন করে না। ঠিক যেমন সান্টা সিং বান্টা সিং জোকস সারা বিশ্বের পাঞ্জাবিদের সম্পর্কে কিচ্ছু প্রমাণ করেনা। পরের ঘাড়ে কাঁঠাল ভেঙে খাওয়াটা একটা রোগ। যেটা ছেলে মেয়ে বাচ্চা বুড়ো সবার হতে পারে। হয়ও। লিঙ্গ বর্ণ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে।

ম-কে যেটা মনে রাখতে হবে “মেয়েরা প্রেমিকদের পয়সায় খায়” এই সর্বজনীন সত্য দিয়ে যেমন মেয়েদের বিচার করা যায়না, ঠিক তেমনি “সব ছেলেই বিশ্বাস করে মেয়েরা অর্থনৈতিক সাপোর্টের জন্য তাদের সাথে সম্পর্ক রাখছে/ কিংবা কোন ছেলে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে চাইছে মানেই প্যাট্রনাইজ করছে” গোছের মনোভাব পোষণ করাটাও একইরকমের ভুল। ছেলেদের ওপর একইরকমের অবিচার করা। তোমার প্রেমিক যেটা করেছে সেটা যে কোন স্বাভাবিক প্রেমিকই করত। করাই উচিত। যদি আমি তোমার জায়গায় থাকতাম, যদি আমার টাকাপয়সার সমস্যা হত আর সেটা জানার পরেও আমার প্রেমিক টাকা নিয়ে টুঁ শব্দটি না করত, তাহলেই বরং আমি সম্পর্কটা নিয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়তাম।

ঠিক যেমন সে যদি সমস্যায় পড়ত আর আমি যদি তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করার কথা না তুলতাম, তাহলে তার দুশ্চিন্তা করার ষোলোআনা অধিকার থাকত। 

জেন্ডার স্টিরিওটাইপিং খুবই হয় ম। ছেলেদের সাথেও, মেয়েদের সাথেও। মেয়েদের সাথে হয়ত একটু বেশি হয়ে এসেছে ঐতিহাসিক ভাবে। কিন্তু তাই বলে আমাদের প্রত্যেকটা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে সেই কষ্টিপাথরে সর্বক্ষণ ঘষে ঘষে পরখ করতে গেলে ঠিকের চাইতে ভুল বেশি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। যেখানে দাঁড়ানো দরকার সেখানে সবসময় রুখে দাঁড়াবে, তোমার পাশে আমিও দাঁড়াব কথা দিচ্ছি, কিন্তু সর্বক্ষণ প্যারানয়েড হয়ে থেকে রজ্জুতে সর্পভ্রম করোনা। 

এবার আপনাদের মতামতটা শোনা যাক। 

A Word on Statistics


by Wislawa Szymborska
Translated from Polish by Joanna Trzeciak

Out of every hundred people,

Those who always know better:
fifty-two.

Unsure of every step:
almost all the rest.

Ready to help,
if it doesn't take long:
forty-nine.

Always good,
because they cannot be otherwise:
four -- well, maybe five.

Able to admire without envy:
eighteen.

Led to error
by youth (which passes):
sixty, plus or minus.

Those not to be messed with:
four-and-forty.

Living in constant fear
of someone or something:
seventy-seven.

Capable of happiness:
twenty-some-odd at most.


Harmless alone,
turning savage in crowds:
more than half, for sure.

Cruel
when forced by circumstances:
it's better not to know,
not even approximately.

Wise in hindsight:
not many more
than wise in foresight.

Getting nothing out of life except things:
thirty
(though I would like to be wrong).

Balled up in pain
and without a flashlight in the dark:
eighty-three, sooner or later.

Those who are just:
quite a few, thirty-five.

But if it takes effort to understand:
three.

Worthy of empathy:
ninety-nine.

Mortal:
one hundred out of one hundred --
a figure that has never varied yet.

June 28, 2012

চেনেন নাকি?





টিফিন খেতে খেতে



পৃথিবীর সমস্ত লোককে দুটো পরিষ্কার শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। একদল দল বেঁধে টিফিন খায়, আরেকদল খায় একা একা।

আজকের অবান্তরের পোস্ট টিফিন নিয়ে। ঠিক টিফিন নিয়ে নয়, টিফিন খাওয়ার সময়টুকু নিয়ে। ছোটবেলায় যেটাকে টিফিন পিরিয়ড বলত।

আমাদের স্কুলের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পিরিয়ড ছিল টিফিন পিরিয়ড। বাংলা ইংরিজি অঙ্কও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাছাড়াও স্বাতীর কাছে ভূগোলের ক্লাস জরুরি ছিল ধরে নিচ্ছি কারণ স্বাতী এখন ইস্কুলের বাচ্চাদের ভূগোল পড়ায়। দেবাঞ্জলির কাছে জীবনবিজ্ঞান দরকারি ছিল নিশ্চয় কারণ দেবাঞ্জলি এখন বাচ্চা বুড়ো সবার জিভ টেনে, নাড়ি টিপে, পেটে টোকা মেরে পরীক্ষা করে দেখে কার শরীরে কী গোলমাল ঘটেছে, সেই বুঝে তাদের ধরে ধরে বিষতেতো ওষুধ গেলায়। অদিতির বাংলা কাজে লেগেছে, তনুর ইংরিজি কাজে লেগেছে, সোমদত্তার ইতিহাস, শতরূপার ভৌতবিজ্ঞান আর আমার কিছুই কাজে লাগেনি বোঝাই যাচ্ছে।

কিন্তু যে ক্লাসটা সব্বার কাজে লেগেছে সেটা হচ্ছে টিফিনের ক্লাস।

আমি কিন্তু শুধু পুষ্টিগত দিক থেকে কাজে লাগার কথা বলছি না। মায়েরা ভাবেন টিফিন খাইয়ে শিশুর শরীরে শতসিংহের জোর আনবেন, কিন্তু ভস্মে ঘি ঢালার এর থেকে ভালো উদাহরণ আর হয় না। টিফিনের গল্প আগেও করেছি অবান্তরে। মা বাক্স ঠেসে পালং শাক আর সিঙ্গাপুরি কলা দিয়ে দিতেন, মেয়ে সেগুলো ফেলে রেখে মহানন্দে বন্ধুর মায়ের হাতের সয়াসস আর আজিনামোটো দিয়ে বানানো চাউমিন খেত। আজিনামোটো অর্থাৎ মোনোসোডিয়াম গ্লুটামেট। যে জিনিসটাকে অ্যামেরিকানরা যমের মতো ভয় পায়। সে ভয় এমনই যে আমার ছোটবেলাতেই সে অ্যাটল্যান্টিক পেরিয়ে রিষড়ার মতো গণ্ডগ্রামে পৌঁছে গিয়েছিল। আমার মা বাড়িতে আজিনামোটো দিয়ে চাউমিন বানান শুনে এক ক্লাসমেট, যার বাবা আবার ডাক্তার ছিলেন, চোখ কপালে তুলে বলেছিল, “সেকি কাকিমা জানেন না?” আমি খুব ঘাবড়ে গিয়ে “কেন কী জানবেন?” জিজ্ঞাসা করায় বন্ধু সবজান্তার মতো মুখ করে বলেছিল, “আজিনামোটো খেলে লোকে বেঁটে হয়ে যায় তো। ওইসব খেয়ে খেয়েই তো চাইনিজরা জীবনে লম্বা হতে পারল না, দেখিসনি?”
  
যাই হোক, আজিনামোটোর প্রসঙ্গ এখন থাক। টিফিন পিরিয়ডের কথায় ফিরে আসি। টিফিনের আগের চারটে আর পরের তিনটে পিরিয়ডে আমাদের চালকলাবাঁধা শিক্ষা দিতেন দিদিভাইরা, আর টিফিন পিরিয়ডে হত আমাদের জীবনের শিক্ষা। কানে শোনা নয়, চোখে দেখা নয়, প্রতিপদে হোঁচট খেয়ে শেখা শিক্ষা। সারাজীবন ধরে সাধনা করলেও যে শিক্ষা ভোলা যায়না। কে কার সাথে বসে ভাগাভাগি করে টিফিন খাবে, কার সাথে খাবেনা, টিফিন খাওয়া শেষ হলে কার সাথে কুমীরডাঙা খেলবে, কার সাথে মরে গেলেও খেলবে না---এই সব শিক্ষা।

সোজা কোথায় দলবাজির শিক্ষা।

‘দলবাজি’ কথাটার ভাগ্য খারাপ, শুনলেই মনে হয় খারাপ কথা। ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ কথাটার মতো। কিন্তু আমি সত্যি সত্যি মনে করি কথাটা আসলে কিচ্ছু খারাপ নয়। নিজের আর কাছের লোকেদের জীবন পরীক্ষা করে দেখেছি, সবার অর্ধেক সমস্যা এড়ানো যেত বুদ্ধি করে দল ঠিক করতে পারলে। ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে অত্যধিক বর্ণময় দলটার সাথে না মিশে যদি পড়ুয়া দলটার সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষি করতাম তাহলে হয়ত গ্রেডটা আরেকটু ভালো হত। বেড়াতে গিয়ে ভীতুর ডিম দলটার সাথে ঘরে বসে না থেকে যদি সাহসী দলটার সাথে কায়াকিং করতে চলে যেতাম তাহলে একটা ছবি তুলে রাখা যেত। আপনাদের এখন দেখাতাম বেশ বুক ফুলিয়ে।

কাজেই দলবাজি শেখার জিনিস। আর দলবাজি শেখার আর শিখে হাতেকলমে প্রয়োগ করার সেরা জায়গা হচ্ছে টিফিন পিরিয়ড। টিফিনপিরিয়ডের আরও একটা ভালো ব্যাপার হচ্ছে অন্য পিরিয়ডগুলোর মতো স্কুল শেষ হলেই সেটা শেষ হয়ে যায়না। কী করেই বা যাবে? জীবন ফুরোয়না, দলবাজি ফুরোয় না, টিফিনপিরিয়ড ফুরিয়ে গেলে চলবে?

বড়দেরও যে টিফিন পিরিয়ড আর টিফিন পিরিয়ডের ডায়ন্যামিকস থাকে সেই সন্দেহটা মিলিয়ে নিতে মাকে ফোন করলাম। শোনা মাত্র মা শিউরে উঠলেন। বললেন তাঁদের অফিসেও নাকি টিফিন পিরিয়ডটাই সবথেকে মারাত্মক ছিল। কত স্ক্যামের সূত্রপাত হল, কত স্ক্যামের পর্দাফাঁস হল, কত হরতাল ডাকা হল,  কত GM বদলি হয়ে গেল, কত লোকের প্রোমোশন আটকে গেল---আর এ সঅঅঅবকিছুর বীজ বপন হল টিফিন পিরিয়ডে বসে বসে স্টিলের গোল বাক্স খুলে রুটি আলুপোস্ত খেতে খেতে।

শুধু যে খারাপ জিনিসই হল তা নয়। টেলিফোন অপারেটর হয়ে জীবন শুরু করার সময় মা যাঁদের সাথে বসে টিফিন খেতেন, যেমন যোগমায়ামাসি, তাঁদের সাথে মায়ের সারাজীবনের বন্ধুত্বও পাওনা হল। দুজনের কেরিয়ার দুই পথে বেঁকে গেল, অফিসবাড়ি আলাদা হয়ে গেল। তবু মাঝে মাঝে দেখা করার ইচ্ছে হলে দুজনে টিফিন পিরিয়ডে একসাথে দেখা করতেন। একে অপরের টিফিন ভাগ করে খেতে খেতে সুখদুঃখের গল্প করতেন।

ভেবে দেখছি আমিও টিফিনের ক্লাসে যে দলটা পাকিয়েছিলাম, স্বাতী অদিতি আর দেবাঞ্জলির সাথে, বাকি সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেলেও সেই দলটাই এখনও টিমটিম করে টিকে আছে। মাসের পর মাস যোগাযোগ না হলেও বুকের গভীরে ভরসাটুকু রয়ে গেছে যে দেখা হলেই আবার গোল হয়ে বসে তুমুল আড্ডা শুরু করা যাবে।

কিন্তু এখন আর দল পাকানোর রাস্তায় যাইনা। পাকাতে চাইলে পাকানোই যায়। অফিসে টিফিন পিরিয়ডে ক্যাফেটেরিয়ায় ছোটবড় জটলা হয়। সুনির্দিষ্ট জটলা। একটাকে আরেকটার সাথে গুলিয়ে ফেলার কোন চান্সই নেই। জটলা চলাকালীন মাঝে মাঝে কফি নিতে গিয়ে দেখেছি, খেতে খেতে মাথাগুলো ঘন হয়ে এসেছে, গলা উচ্চগ্রাম ছেড়ে প্রায় ফিসফিসানিতে নেমে এসেছে। দেখেই বোঝা যায় অফিসের কাউকে নিয়েই চর্চা চলছে খুব জোর। কে জানে আমাকে নিয়েই কিনা। টিফিনের গ্রুপে যোগ দেওয়ার নেমন্তন্নও এসেছিল গোড়ার দিকে। বেশ ক’দিন হেসে এড়িয়ে যাওয়ার পর এখন আর আসেনা। মাঝে মাঝে একা একা খেতে খেতে ভাবি অতিরিক্ত সাবধানী হতে গিয়ে ভুলই করলাম হয়ত।

আপনারা কোন দলে পড়েন? চারদিকে সাড়া ফেলে নরক গুলজার করে টিফিন খাইয়েদের দলে নাকি আমার মতো একাবোকাদের দলে? বলুন আমায় প্লিজ। 

June 27, 2012

আশ্চর্য ব্যাপার


দিগন্তজোড়া ন্যাড়া মাঠের ওপর নীল আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে সারি সারি মূর্তি দাঁড়িয়ে। তাদের খুদে খুদে শরীর, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মাথা, মাথায় আকর্ণ ড্যাবড্যাবে চোখ, প্রায় অদৃশ্য নাক আর কুলোর মতো থ্যাবড়া থ্যাবড়া কান। তার ওপর মুখে দুনিয়ার দুশ্চিন্তা মাখামাখি। কয়েকটা মুণ্ডুর ওপর আবার উল্টোনো হাঁড়ির মতো লাল পাথরের টুপি পরানো। আজ থেকে নয়, কাল থেকে নয়, সেই ১২৫০ থেকে ১৫০০ সালের মাঝামাঝি কোনো এক অনির্দেশ্য সময় থেকে মূর্তিগুলো দাঁড়িয়ে আছে। ঠায়। নট নড়নচড়ন। এক একটার দৈর্ঘ্য প্রায় চার মিটার, আর ওজন তেরো টন।


মূর্তিগুলো এমনি তো দেখতে চমকপ্রদ বটেই, কিন্তু তাদের নিয়ে উত্তেজনা চরমে উঠেছিল যখন জানা গেল যে মূর্তিগুলো যেখানে পাওয়া গেছে সেখানে আদৌ তাদের বানানো হয়নি। বানানো হয়েছিল দ্বীপের অন্য প্রান্তে। তারপর সেগুলোকে কী করে মাঠের ওপর এনে দাঁড় করানো হল সেই ভেবে ভেবে বৈজ্ঞানিকদের মাথার সব চুল উঠে গেল, UFO-বাদীরা বললেন “এ তো ইজি ব্যাপার, চাকতিতে চাপিয়ে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে”, কেউ বলল পাহাড়ের মাথায় একটা পাগলিবুড়ি থাকত নাকি---সে ইচ্ছে মতো আঙুল নাড়িয়ে কুচ্ছিত মূর্তিগুলোকে এদিক ওদিক হাঁটাত।

এসব ব্যাখ্যায় তুষ্ট না হয়ে বৈজ্ঞানিকরা মূর্তির স্যাম্পল বানিয়ে কাজে লেগে গেলেন। দড়ি বেঁধে, স্লেজগাড়ি চাপিয়ে নানারকম করে টেনেটুনে তাদের চলানোর চেষ্টা করা হল। কোনোবার তারা নড়লই না, কোনোবার কয়েক পা এগোল, কোনোবার কয়েক পা এগিয়েই দড়াম করে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। সেসব পরীক্ষানিরিীক্ষার ভিডিও YouTube-e আপলোড-ও করা হয়েছে। আর আপলোড করেছে স্বয়ং ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক। কাজেই চিটিংবাজি নয় এই ভরসায় আপনাদের সেটা দেখাচ্ছি।



ওহ, মূর্তিগুলো সম্পর্কে যা লিখলাম সব উইকি থেকে টোকা। তবে উইকির গাদাগাদা তথ্যের মধ্যে যেটা আমার সবথেকে নজর কেড়েছে সেটা হল, ২০০৮ সালে নাকি এক ফিনদেশীয় ট্যুরিস্ট এক বেচারা মূর্তির একটা কান কেটে নিয়েছিল। কী অন্যায় কথা ভাবুন। অবোলা মূর্তি বলে কি মানুষ না? কর্তৃপক্ষও ছাড়েননি অবশ্য। দুষ্কৃতকারী ট্যুরিস্টের কান মুলে ১৭০০০ ডলার আদায় করেছেন আর তিনবছর পর্যন্ত তার ইস্টার আইল্যান্ডে ফেরত যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।

আমার মতে শাস্তিটা যথেষ্ট কমের ওপর দিয়েই গেছে। পাজি লোকটার একটা কান কেটে নিলেও কিছু দোষের হতনা। 

ঘড়ি দেখা খরগোশের পিছু নিয়ে



যদি গর্তের ভেতর পড়েই যান, এটা হাতের কাছে রাখুন। চলাফেরায় বিস্তর সুবিধে হবে।



June 26, 2012

Dis or Dat: রাস্তাঘাটের খাওয়াদাওয়া



আলোকচিত্রীঃ অ্যালিস গাও (Lingered upon)

এই এপিসোডের আইডিয়াটা বেরিয়েছে রু-এর মাথা থেকে। রু, এই নাও তোমার এক্সক্লুসিভলি খাওয়াদাওয়া নিয়ে Dis or Dat.

আলুকাবলি না ঘুগনিঃ আলুকাবলি।

বাপুজি কেক না প্রজাপতি বিস্কুটঃ প্রজাপতি বিস্কুট

চাউমিন না রোলঃ রোল

চুসকি না বুড়ির চুলঃ চুসকি। কালাখাট্টা হ্যায় ভাইয়া?

ঝালমুড়ি না ভেলপুরিঃ ঝালমুড়ি

বার্গার না হটডগঃ বার্গার

টাকো না জিয়োরো (Gyro): জিয়োরো

চুরোস না ফ্রেঞ্চ ফ্রাইঃ ফ্রেঞ্চ ফ্রাই

পাপড়ি চাট না আলুটিক্কিঃ পাপড়ি চাট

বড়া পাও না বান অমলেটঃ বান অমলেট             

পাওভাজি না কচুরি আলুর তরকারিঃ কচুরি আলুর তরকারি। মৌলালির মোড়ে একটা ভাঙাচোরা দোকান আছে সেইটার হলে সবথেকে ভালো।

ফুচকা না চুরমুরঃ ফুচকা

কুলফি না কাঠি আইসক্রিমঃ কাঠি আইসক্রিম

মিক্সড ফ্রুট চাট না শশা চারফালি করে বিটনুন দিয়ে খবরের কাগজের টুকরোয় মুড়েঃ শশা চারফালি করে বিটনুন দিয়ে খবরের কাগজের টুকরোয় মুড়ে।

ফুলুরি না বেগুনিঃ বেগুনি

পেঁয়াজি না আলুর চপঃ পেঁয়াজি

আদা লজেন্স না কমলা লজেন্সঃ আদা লজেন্স

বাদামচাক না কাঠিভাজাঃ বাদামচাক

চিকেন কাটলেট না ফিশ ফ্রাইঃ ফিশ ফ্রাই

ভেজিটেবিল চপ না শিঙাড়াঃ শিঙাড়া

ব্রেড পকোড়া না ছোলে ভাটুরেঃ ছোলে ভাটুরে

মোমো না চিকেন মাঞ্চুরিয়ানঃ মোমো

কয়লার ধিকিধিকি আগুনের ওপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেঁকা ভুট্টা নুনলেবু ঘষে না পপকর্নঃ কয়লার ধিকিধিকি আগুনের ওপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেঁকা ভুট্টা নুনলেবু ঘষে।

জিলিপি না বোঁদেঃ সেরেছে। ওকে, জিলিপি।

কোক জিরো না বান্টাঃ বান্টা

লস্যি না বাদামমিল্কঃ লস্যি। সল্টেড প্লিজ।

ডাবের জল না আখের রসঃ ডাবের জল

নিম্বু পানি না জল জিরাঃ নিম্বু পানি

ফিল্টার কাপি না এসপ্রেসো শটঃ ফিল্টার কাপি

ক্যামোমাইল রোজ ফ্লেভারড লুজ হার্বাল ডিপ টি না মাটির ভাঁড়ে করে কেলেকুষ্টি সসপ্যানে সারাদিন ধরে ফুটতে থাকা চাঃ এটাও বলে দিতে হলে আর আপনাদের সাথে খেলে লাভ নেই। থাক।

June 25, 2012

ব্লগিং-এর ভেতরের কথা



বাকি সবরকম পেশার মানুষদের মতো ব্লগারদেরও নানারকম তুকতাক থাকে। মঙ্গলবারে পোস্ট করলে পেজভিউস বেশি হয়, ডানদিকে তাকিয়ে তোলা ছবির পোস্টে বাঁদিকে তাকিয়ে তোলা ছবির পোস্টের থেকে বেশি কমেন্ট পড়ে, সোমবার সোমবার মাংস খাওয়া বাদ দিলে বছর পাঁচেকের মধ্যে বুক ডিল ঠেকায় কার সাধ্যি, এই রকম সব গোঁড়া বিশ্বাস আছে ব্লগারদের। তাঁরা নিজেরা অবশ্য এগুলোকে তুকতাক বলে মানেন না। অনেকদিনের অভিজ্ঞতায় তাঁরা বারবার মিলিয়ে নিয়েছেন, এগুলো সত্যি সত্যি কাজে দেয়। আমি যদিও পেশাদার ব্লগার নই, নিতান্তই নেশাখোর ব্লগার, তবু এই আড়াই বছরে আমিও কয়েকটা জিনিস লক্ষ্য করেছি। যেগুলোকে তুকতাক না বলে পর্যবেক্ষণ বলাই ভালো। তার একটা দুটো আপনাদের বলি দাঁড়ান।

এক, লোকে শনিরবিবারে ব্লগ পড়েনা। এটা অ্যাকচুয়ালি উল্টো হওয়া উচিত, তাই না? সপ্তাহের বাকি পাঁচদিন নাক ডুবিয়ে কাজ করে শনিরবি ফ্যানের তলায় আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে বসে কে কার ব্লগে নতুন কী বোকামো করেছে ঘুরে ঘুরে সেসব দেখে বেড়ানো উচিত। কিন্তু সেটা হয়না। আমি পেজভিউসের গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য করে দেখেছি, লোকে অফিসে গিয়েই ব্লগ পড়তে বসে। কাজ শুরু করার আগে ওয়ার্ম আপ করে বোধহয়। ব্লগ দেখার আরেকটা ঝোঁক আসে ঠিক টিফিনটাইমের পর। ভালো মন্দ খেয়ে যখন সামান্য ঢুলুনিমতো আসে, তখন সবাই ঘুম তাড়াতে ব্লগ-হপিং-এ বেরোয়। কেউ কেউ অফিস থেকে বেরোনোর সময় আরেকবার উঁকি মেরে যান, তবে তাঁদের সংখ্যাটা অল্প। বেশিরভাগই তখন অফিস থেকে পালাতে পারার আনন্দে মাতোয়ারা। তখন আর ব্লগ পড়ে বোরডম কাটানোর দরকার নেই তাঁদের। আসন্ন ছুটির মুহূর্তটাই শরীরে নতুন এনার্জি এনে দিয়েছে।

দু’নম্বর পর্যবেক্ষণটা পড়ুয়াদের নিয়ে নয়। নিজেকে নিয়ে। আরও স্পষ্ট করে বললে অবান্তরের জন্য আমার সোমবারের পোস্ট লেখা নিয়ে। শুক্রবার যখন সাপ্তাহিকী পাবলিশ করে অবান্তরের ঝাঁপ ফেলি তখন সামনের সপ্তাহের পোস্টের আইডিয়া মাথার ভেতরে ঝাঁকঝাঁক বোলতার মতো ভনভন করে ঘুরে বেড়ায়। ভয়ানক সিরিয়াস মুখ করে আমি গুচ্ছ গুচ্ছ ড্রাফ্‌ট পোস্টে সেসব আইডিয়া লিপিবদ্ধও করে রাখি। কিন্তু রবিবার রাতে সে ড্রাফ্‌টগুলো নিয়ে বসলে, সেগুলো বাংলায় লেখা না হায়রোগ্লিফিকে--- নিজেই উদ্ধার করতে পারিনা।

এই যেমন ধরুন একটা ড্রাফ্‌টে লেখা আছে দেখছি “কী হতে হতে হল না”। বুঝুন। কত কিছুই তো হতে হতে হল না। কী কী হলনা, কী কী হওয়ার কথা ছিল সেসব সত্যি বলছি আমার মনেও নেই। ভাগ্যিস। যা হয়েছে বেস্ট হয়েছে। কেন আমি সুস্থ মস্তিষ্কে হওয়া-না হওয়ার কাদা আবার ঘাঁটতে যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম পরশু রাত্তিরে, এখন তা কিছুতেই মনে পড়ছে না। আরেকটা ড্রাফটে দেখছি লেখা আছে, “Stigma of being the only child”---বোঝাই যাচ্ছে একসময় এটাকে পোস্ট লেখার জন্য ভালো আইডিয়া বলে মনে হয়েছিল কিন্তু এখন ওই এক লাইন পড়েই নিজেই ঘুমিয়ে পড়ছি। শিগগিরি ডিলিট মারি দাঁড়ান।

অতএব বুঝতে পারছেন, সোমবার সকালের জন্য আমার হাতে এখন সেই প্রবাদপ্রতিম পেনসিল ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। কোন সপ্তাহেই থাকে না। সপ্তাহটা কোনমতে ঠেলেঠুলে শুরু হয়, আপনাদের সাথে দু’চারটে বাক্যবিনিময় হয়, তারপর গিয়ে আমার ব্লগিং-এর জোশ ফেরত আসে। বাজে কথার স্রোত ফুরফুরিয়ে মগজ থেকে আঙুল বেয়ে ওয়ার্ড ফাইলে টাইপ হতে থাকে। তখন আবার তাদের থামায় কার সাধ্যি। কী বলতে কী বলে ফেলি সেই নিয়ে সর্বক্ষণ তটস্থ থাকতে হয়।

“অথেনটিক ব্লগিং”-এর মুখ চেয়ে আমি তাই আমার কথার অভাব নিয়েই এতগুলো কথা বললাম আপনাদের। হতাশ হবেন না যেন। সোমের ফাঁড়া কেটে মঙ্গলে পা পড়লেই ব্লগিং-দেবী আবার প্রসন্ন হাসি হেসে আমার পানে চাইবেন। আমি অন্তত সেই আশাতেই আছি। আপনারাও আমার সাথে থাকুন প্লিজ।


Cartoon: First person: I have nothing to say. Second person: You should blog about it.
ছবি গুগল ইমেজেস থেকে


June 23, 2012

সাপ্তাহিকী






মানুষ কতরকমের হয়। 

Full circle.

ফোটোসেশন। মডেলঃ ম্যাকবার্গার।

প্রাচীনকালের মালিশ।

ছোট্ট হিপোর গপ্প।

মশা আর বৃষ্টির লড়াই।

রঙ বদলের রূপকথা।

আজকের মিনি সাপ্তাহিকী এই পর্যন্তই। যাওয়ার আগে একটা গান শুনিয়ে যাই। ভয়ানক হাই থটের। কিন্তু শুনতে ভালো।

দেখা হবে। টা টা।


June 22, 2012

চেনেন নাকি? (বোনাস)


এটা না পারলে সবার একবেলা খাওয়া বন্ধ।




সিরিয়াল মোনোগ্যামিস্ট #২-গ্রুপচ্যাটের গেরো



ই আর উ-এর প্রেমটা শুরু হয়েছিল ফেসবুকে। ইন্ডিয়ার দারিদ্র্যসীমা সংক্রান্ত একটা মারকাটারি বিতর্ক চলছিল আরেক বন্ধুর ওয়ালে, তার কমেন্ট থ্রেডে। একে অপরের সাথে নখদাঁত বার করে লড়ছিল ই আর উ। একে অপরকে স্টুপিড রাস্কেল বলে গালি দিচ্ছিল। আমার মতো প্রেম বিশেষজ্ঞ কেউ কাছাকাছি থাকলে তক্ষুনি ধরে ফেলতে পারত, কিন্তু ই আর উ-এর বন্ধুরা ওদের প্রেমের খবর শুনে আকাশ থেকে পড়ে বলেছিল, “সেকী তোরা তো একে অপরকে সহ্য করতে পারিস না!”

পোলাপান।

ই আর উ প্রেমের ঘোষণাও করেছিল অনলাইনে। স্কাইপের গ্রুপ চ্যাটে। দুজনেই ভীষণ মিশুকে স্বভাবের। মোটে একা (বা দোকাও) থাকতে পারে না। চ্যাট করতে বসলে একেকবারে ৯-১০ জনকে জুটিয়ে নিয়ে বসে। বন্ধুরা অবাক হয়েছিল, কিন্তু খুশিও হয়েছিল সবাই মন থেকে। ভার্চুয়াল কেক কেটে, কাল্পনিক শ্যাম্পেন ঝাঁকিয়ে ওদের দীর্ঘ এবং হ্যাপি প্রেমজীবনের কামনা করেছিল সবাই।

প্রথম ঝগড়া যেদিন হল, খুনসুটি নয়, শক্ত শক্ত কথা দিয়ে একে অন্যকে সত্যি সত্যি আহত করতে চাওয়া সিরিয়াস ঝগড়া, সেদিনও চ্যাটে দুজন বন্ধু সাক্ষী ছিল। ভাগ্যিস ছিল, তাই বেশিদূর গড়ায়নি ব্যাপারটা। চট করে মিটে গেছে। ই আর উ পরে হাসাহাসি করেছে একে অপরের সঙ্গে, বন্ধুরা কী ভালো বাফারের কাজ করে সেটা নিয়ে।

ই আর উ আপাতত বন্ধুমহলে সবথেকে জনপ্রিয় ‘কাপল’। ন্যাকা নয়, বোকা নয়, প্রেম করে বলে বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেনি—ওদের বাকি অনেক ‘কমিটেড’ বন্ধুবান্ধবই যেটা করেছে। কুলেস্ট কাপল যাকে বলে। ওদের নিজেদের মধ্যেও বোঝাপড়া দারুণ। একে অপরকে ছেড়ে থাকার কথা মরে গেলেও ভাবতে পারেনা।

সমস্যাঃ বন্ধুত্ব না প্রেম?

ই আর উ নিজেরাও ভাবতে পারছেনা যে এটা একটা সমস্যা হতে পারে। অনেকদিন নিজেদের নিজেরাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে, ও কিছু নয়, ও মনের ভুল। কিন্তু ভুলটা এত বার ঘুরেফিরে দু’জনের মাথাতেই এসেছে যে সন্দেহ হচ্ছে এটাই ঠিক নয় তো?

ওদের আর বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে আগের মতো ভালো লাগছেনা।

এইটুকু বলার পরেই দুজনেই হাঁ হাঁ করে কথাটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টায় নামল। আমি যাতে ভুল না বুঝি সেটা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

“মানে বন্ধুরা খুব ভালো। কিন্তু কেউ কেউ এখনও নিজেরা প্রেম করে না তো, সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো বোঝে না।“ ই বলল। উ ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বলল, “এই যেমন ধর সেদিন আমি ই কে বললাম যে আর চিপস খাস না, পেটব্যথা করবে, সেই শুনে র-এর কী হাসি। বলল, ‘তোরা কি একে অপরের পেটব্যথার দায়িত্বও নিয়েছিস আজকাল? ভাগ্যিস প্রেম করি না...’”

ই আর উ নিজেরাও জানেনা কেন, কিন্তু র-এর হাসি আর কথাটা ওদের কানে বিঁধে আছে এখনও।

যারা প্রেম করে, যেমন ক, তারাও কিছু কম যাচ্ছে না। একদিন চ্যাটে নাদাল আর ফেডেরার নিয়ে সবাই মিলে খুব চেঁচামেচি হচ্ছিল, ই যথারীতি নাদালের পক্ষ নিয়েছে আর উ ফেডেরারের। সারাজীবন যেমন নিয়ে এসেছে। ক দুম করে বলল, “বেসিক জায়গাগুলোয় কমপ্যাটিবিলিটি না থাকলে প্রেম করা হেব্বি চাপ কিন্তু গুরু।”

কীই বা করার আছে ই আর উ-এর এসব জায়গাগুলোয় চুপ করে থাকা ছাড়া?

নাকি চ্যাট করা বন্ধ করে দেবে? বাকি সব প্রেম করা বন্ধুদের মতো? তবে কী অন্য বন্ধুরা যারা প্রেম করার পর পুরনো বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেছে তারাও বাধ্য হয়েই করেছে? প্রেম করার পর কি তবে সত্যিই লোকে এত বদলে যায় যে পুরনো বন্ধুদের ঠাট্টাইয়ার্কিও আর সহ্য করতে পারে না? ই আর উ-ও কী তবে বদলে গেল?

কুন্তলার মতেঃ

আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি খুব নরম করে ই আর উ-এর সমস্যাটা নিয়ে আলোচনা করতে, কিন্তু ভয় হচ্ছে সব চেষ্টা বিফলে যাবে। কারণ আমি এক্ষুনি যে কথাটা লিখব সেটা ই আর উ-র একটুও পছন্দ হবে না।

আমার ধারণা ই আর উ-এর সব সমস্যার মূল ওরা নয়, বন্ধুরা নয়, প্রেম তো নয়ই---সমস্যাটার মূল হচ্ছে ‘কুল কাপল’ হওয়ার ওদের অদম্য বাসনা।

তাই না কি? ই আর উ? বুকে হাত দিয়ে বল তো?

বন্ধুদের দোষ নেই, কারণ ভেবে দেখ ওরা যা বলেছে সেরকম কথা তোমরাও একসময় বলেছ। সবাই এরকমই বলে। বউয়ের পাল্লায় পড়ে সিগারেট ছেড়ে দিয়েছে, বরের ভয়ে মিনিস্কার্ট পরছে না---এটাই আমাদের কথা বলার ধরণ। লোকে আড়ালে বলে, বন্ধুরা তোমাদের সামনে বলেছে কারণ ওরা ভেবেছে তোমরা একটুও বদলাওনি।

যেটা তোমরা অসম্ভব পরিশ্রম করে বন্ধুদের বিশ্বাস করিয়েছ, নিজেরাও বিশ্বাস করতে শিখেছ।

কিন্তু তোমরা তো বদলেছ। আর বদলেছ তাতে তো কোন দোষ করনি। স্বাভাবিক, সুস্থ আর পাঁচটা লোকে যা করে, তাই করেছ। বন্ধুত্ব আর প্রেম দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। দুটোই অপরিহার্য, দুটোই অসম্ভব সুন্দর, কিন্তু দুটোকে একেবারে এক দাঁড়িপাল্লায় চাপিয়ে নিক্তি মেপে মনোযোগ দিতে হবে সেরকম নয়। বন্ধুত্ব আর প্রেম কোনোটাই এত বিরক্তিকর বা ঠুনকো নয় যে একজনের দিকে তাকালে আরেকজন মূর্ছা যাবে।

আমি বলি কি, গ্রুপচ্যাট যেমন চলছে চলুক কিন্তু তোমরা দুজন একটা আলাদা চ্যাট করার জন্য সময় বার কর। সেটা কিন্তু পড়াশোনার সময় কেটে বার কোর না বাছা, গ্রুপচ্যাটের সময় কেটেই বার কোর। কেউ কিচ্ছু মনে করবে না। করলেও পাত্তা দিও না। সেই চ্যাটে কেবল দুজনে নিভৃতে কথা বল। কী বলবে? বলার কথা আপনি বেরবে, চিন্তা করতে হবে না। না হয় নাদাল ফেডেরার নিয়ে ঝগড়াই করবে, প্রেম তাতে বাড়বে বই কমবে না।

আর একটা কথা মনে রেখ, বন্ধুদের বাফার রেখে ঝগড়া মেটানোর ট্রিকটা বেশিদিন কাজে দেবেনা। আরও অনেক ঝগড়া হবে, এখন যা হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশি কদর্য, নগ্ন ঝগড়া। সেগুলো তোমরা বন্ধুদের সামনে তো করতে পারবেই না, করতে চাইলেও বন্ধুরা নিজেরাই কান চাপা দিয়ে দৌড়ে পালাবে। তার থেকে নিজেদের প্রেমটা শক্তিশালী কর যাতে সেসব ঝাপটা নিজেই সামলাতে পারে, বন্ধুদের মধ্যস্থতা ছাড়াই। সেই কাজটা কিন্তু গ্রুপচ্যাটে বসে করা মুশকিল। অন্তত আমি হলে পারতাম না।

বন্ধুরা বুদ্ধিমান, বুঝে নেবে। তারপর তোমাদের প্রেমিকপ্রেমিকা হিসেবে যতটুকু স্পেস দেওয়ার সেটা নিজে থেকেই দিয়ে দেবে। অর্থাৎ কিনা তোমাদের কমপ্যাটিবিলিটি আছে কিনা নেই সেই নিয়ে সেধে মতামত জ্ঞাপন করবে না।

আরে প্রেম করলে বন্ধুত্ব রাখা যায় কিনা সেসব ভাবার দরকার নেই। বন্ধুত্বের হাঁড়িকাঠে প্রেম যখন বলি হয়ে যায়নি তখন উল্টোটাই বা হবে কেন? আমার মত এই, এখন দেখা যাক অবান্তরের বিচক্ষণ বন্ধুদের মত কী।

কই বিচক্ষণ বন্ধুরা, কোথায় গেলেন?

June 20, 2012

অবান্তরের দীর্ঘতম পোস্টঃ বিষয় ফোটোগ্রাফি



আমাদের স্কুলে বছরে একবার করে ছোট ছোট দিদিমণিরা, যারা এখনও পুরো দিদিমণি হননি হওয়ার চেষ্টাচরিত্র করছেন, তাঁরা পড়াতে আসতেন। প্র্যাকটিস টিচিং করতে। নতুন দিদিভাইদের আমরা খুব ভালোবাসতাম। ক্লাসে আমরা গোলমাল করলে তাঁরা খুব ভয় পেয়ে গিয়ে বলতেন, এই চেঁচিও না চেঁচিও না প্লিজ, আমার নম্বর কাটা যাবে। আর কতরকম যন্ত্রপাতি থাকত তাঁদের বাপরে। আমাদের সুব্রতাদি’ভাই তো ঘামতে ঘামতে ক্লাসে ঢুকে খালি হাত বোঁ করে ঘুরিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে কমলালেবুর মতো পৃথিবী আর তার গায়ে ওপর নিচ আর আড়াআড়ি দাগ কেটে ৫ মিনিটে অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ বুঝিয়ে দিতেন---এই নতুন দিদিভাইরা গ্লোব, মানচিত্র, পাঁচরকম রঙের চক, পয়েন্টার, হ্যানা ত্যানা আরও কতকিছু যে ঘাড়ে করে ক্লাসে আসতেন ভাবা যায়না। একজন বেঁটে মতো নতুন দিদিভাই একবার ইতিহাস ক্লাসে চোল সাম্রাজ্যের দেওয়ালজোড়া ছবি এঁকে এনেছিলেন, সাম্রাজ্যের উত্তর সীমানা চিহ্নিত করতে গিয়ে শেষে আর হাত পাননা। আমরা দয়াপরবশ হয়ে বললাম, আমরা সবাই বুঝতে পেরেছি চোল সাম্রাজ্য কোথা থেকে কোথা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, আপনাকে অত লাফালাফি করতে হবেনা। শুনে সেই দিদিভাই খুব করুণ মুখ করে বলেছিলেন, লাফাতে নাকি তাঁকে হবেই নাহলে নম্বর কাটা যাবে।

বেচারা।                                              

যাই হোক, এনার ইতিহাস ক্লাসেই কিনা মনে নেই, কিন্তু কোনো এক ইতিহাস ক্লাসে নতুন এক দিদিভাই পড়াতে এসেছিলেন। নতুন দিদিভাইদের পড়ানোর আরেকটা বৈশিষ্ট্য ছিল যে তাঁরা বইয়ের যেখান সেখান থেকে যা খুশি চ্যাপ্টার বেছে পড়াতে শুরু করে দিতেন। মানে ধরুন বইয়ে পরের চ্যাপ্টার হয়ত আছে প্রস্তরযুগ, কিন্তু যেহেতু তাম্রযুগে চার্ট এঁকে আনার সুযোগ বেশি আর বেশি চার্ট মানেই দিদিভাইয়ের কপালে বেশি নম্বর, সেহেতু তিনি প্রস্তরযুগ পেরিয়ে সোজা তাম্রযুগ শুরু করতেন। কাজেই আমাদের আগে থেকে ক্লাসে পড়াটড়া তৈরি করে যাওয়ার বালাইও ছিল না। পরমানন্দ।

দিদিভাই তো নিয়ম মেনে পড়াতে শুরু করলেন। আদর্শ শিক্ষণপদ্ধতি বইতে নির্ঘাত লেখা ছিল যে কথোপকথনের মাধ্যমে বিষয়ে অবতরণ করতে হবে। নাহলেই নম্বর কাটা যাবে। দিদিভাই খুব গুছিয়ে শুরু করলেন, তোমরা নিশ্চয় জানো যে ইতিহাসকে আমরা বিভিন্ন যুগে ভাগ করি? একঘর মেয়ে মাথা হেলিয়ে ডেস্কে প্রায় শুয়ে পড়ে বলল, হ্যাঁআআআআ জানি। দিদিভাই বললেন, বাঃ বাঃ (শিক্ষার্থীদের উৎসাহদানেও নম্বর আছে)। আচ্ছা বলতো কটা যুগ? এর উত্তরে কেউ তিন বলল, কেউ বলল চার, একটা ভয়ানক গোলমালের উপক্রম হল। দিদিভাই তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ বদলে বললেন, আচ্ছা আচ্ছা বুঝেছি। বল দেখি এটা কোন যুগ চলছে?

আবার সোজা প্রশ্ন। আবার জনতা নিঃসংশয়। আবার ৪০ টা লাল ফিতে বাঁধা মাথা প্রবল আন্দোলিত হয়ে সমস্বরে চেঁচিয়ে বলল, কলিযুউউউউউগ।

দিদিভাইয়ের মুখটা আমার মনে নেই, কিন্তু হুবহু কল্পনা করে নিতে পারছি।

যাই হোক, এটা আমার আজকের অবান্তরের বিষয় নয়। এতক্ষণ বিষয়ের অবতারণা হচ্ছিল। ঘড়ি দেখে লাভ নেই। কালকে আমার মতে মত না মেলানোর শাস্তি হিসেবে আজ আপনাদের একটা ১৩০০ শব্দের পোস্ট পড়তে হবে। ট্যাঁ ফো না করে কাজে লেগে যান।

আজ যদি আমাকে কেউ জিজ্ঞাসা করে মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটা কোন যুগ চলছে, আমি সেদিনের থেকেও বেশি নিঃসংশয় হয়ে বলব, ফোটোগ্রাফির যুগ। যেদিকে তাকান কেউ না কেউ, কারো না কারোর, কিছু না কিছুর ফোটো তুলছে। লোকের গলায় ক্যামেরা, পকেটে ক্যামেরা, ফোনে ক্যামেরা। দেশের অর্ধেক জনতা বর্তমান প্রেসিডেন্টের নাম জানেনা কিন্তু মেগাপিক্সেল কাকে বলে জিজ্ঞাসা করুন, জলের মতো পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেবে কেন মেগাপিক্সেল দেখে ক্যামেরা কিনতে যাওয়া মানে আসলে নিজের পায়ে কুড়ুল মারা। ইউরোপের রাজধানীর নাম জিজ্ঞাসা করুন, অম্লানবদনে বলবে জানেনা। জানতে চায়ও না নাকি। তারথেকে বরং ক্যানন বনাম নাইকন ডিবেটটার সুরাহা হওয়া আরও অনেক বেশি জরুরী।

ছবি তুলিয়েরা আমার ওপর রাগ করবেন না প্লিজ। আমি আপনাদের ছবি তোলা নিয়ে একটুও কটাক্ষ করছি না, কেবল পর্যবেক্ষণ করছি যে ছবি তোলাটা হবি হিসেবে হঠাৎই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সেটা যে করেছে, এটা আপনাদেরও স্বীকার করতে হবে। একই সঙ্গে বদলেছে ছবি তোলার বিষয়। ছোটবেলায় যখন গরমের ছুটিতে সিমলা কুলু মানালি বেড়াতে যেতাম তখন আমার বাবা তাঁর হটশট ক্যামেরায় লক্ষ লক্ষ পাহাড় পর্বত আর পাইন গাছের ছবি তুলতেন। মা বলতেন আহা পাহাড়ের সামনে মেয়েটার ছবিও তোল একটা। বাবা আমার ছবি তুলে দিতেন কিন্তু মাকে বলতেন, আরে প্রকৃতিকেই তো বন্দী করে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। এমন সূর্য কি তোমার রিষড়ায় উঠবে কোনোদিন, কিংবা ডালহাউসির মিনিবাস স্ট্যান্ডে?

এখন দু’বছর বাদে যদি একবার ভুলেও অ্যালবামে হাত পড়ে, তবে সূর্যোদয় চিহ্নিত করার একমাত্র উপায় ফোটোর সামনে ক্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে থাকা আমি, আমার দৈর্ঘ্য আর আমার জামার ছাঁট। ওহ সোনা এখানে প্রায় ম্যালের রেলিং-এর মাথায় মাথায়, এটা নির্ঘাত দার্জিলিং। ওহ মনে আছে ওই বছর পুজোয় বড়দি সোনাকে এই কুচ্ছিত স্কার্টটা দিয়েছিল, এটা নির্ঘাত সিমলা।

বলে না দিলে আরাকু ভ্যালি না আরকানসাস বোঝে কার সাধ্যি

আজকাল লোকে আমার বাবার মতো ভুল করেনা। মানুষের ছবি তোলে। আমি সারাদিন ব্লগে ব্লগে ঘুরি, ছবিতে ছবিতে ঠাসা সেসব ব্লগ। নিজেদের ছবি, সন্তানের ছবি, পোষা প্রাণীর ছবি। ক্যামেরায় বন্দী রোজকার দিনের ছোট ছোট ফোটোজেনিক টুকরো। জীবনের মতো ছবি তোলার দর্শনটাও বদলে গেছে আসলে। মানুষ এখন নিজেদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকাটাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে শিখেছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার একশোটা বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে নেওয়া শটের চেয়ে কানেক্টিকাটের ম্যাকডি-তে বন্ধুদের সাথে তোলা একটা গ্রুপ ছবির মর্ম যে অনেক বেশি সেটা বুঝতে শিখেছে। সন্তানের প্রথম পদক্ষেপ, নিজের হাতে বেক করা প্রথম কুমড়োর পাই, প্রথমবার ম্যারাথন দৌড়তে গিয়ে প্রতিবেশী ডাহা ফেল---সমস্ত আনন্দমুহূর্তের সাক্ষ্য জড়ো করে রাখছে। পরে যাতে ফুরসত পেলে আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে বসে দেখা যায়।

আর এত ছবি তুলে দেওয়ার জন্য লোক চাই। আজকাল লোকে বাকি সবকিছুর মতো সঞ্চিত স্মৃতির গুণগত মান নিয়েও অসম্ভব খুঁতখুঁতে। প্রতিটি স্মৃতির কম্পোজিশন, ফিনিশিং, এডিটিং, ফোটোশপিং---একেবারে পেশাদারি হওয়া চাই। তাই আলোকচিত্রীদের চাহিদাও আকাশ ছুঁয়েছে। সেটা ভালোই হয়েছে অবশ্য। জোগান আর চাহিদা এদুটো একসাথে না চললে যে কী অনাসৃষ্টি ঘটে সে তো আপনারা জানেননা, ইকনমিস্টরা হাড়ে হাড়ে জানেন।

যে কোনো শিল্প/বিদ্যা যখন পেশা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তখন তাতে বিভিন্ন রকম স্পেশালাইজেশনের আবির্ভাব হয়। ডাক্তারিতে এই ব্যাপারটা অলরেডি ঘটে গেছে। এখন লোকে ওপরের আর নিচের পাটির দাঁত তুলতে আলাদা আলাদা ডাক্তারের কাছে যায় শুনেছি। ফোটোগ্রাফিও ডাক্তারিকে ধরে ফেলল বলে। এতদিন নেচার ফোটোগ্রাফি, ওয়েডিং ফোটোগ্রাফি, অ্যাডভেঞ্চার ফোটোগ্রাফি শুনেছিলাম---গতকাল ডেলিভারি ফোটোগ্রাফির কথা জানলাম

সব ফোটোগ্রাফারই ডেলিভারি দেন মানে? আরে ধুর, এ ডেলিভারি সে ডেলিভারি নয়। এ হচ্ছে মায়েরা যে স্বর্গ থেকে নিজের শরীরের মধ্যে বয়ে নিয়ে এসে মর্ত্যে বাচ্চা ডেলিভারি দেন, সেই ডেলিভারি। এই ফোটোগ্রাফাররা হাসপাতালে, নার্সিংহোমে, অপারেশন থিয়েটারে, ডেলিভারি রুমে, গলায় বাজখাঁই DSLR ঝুলিয়ে অবলীলায় ঢুকে পড়ছেন। বাচ্চা বেরোনোর মুহূর্তে লাফিয়ে উঠে ঠেলেঠুলে ডাক্তার, নার্স, আসন্ন শিশুর পিতাকে সরিয়ে দিয়ে পারফেক্ট অ্যাঙ্গেলে ক্যামেরা বাগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছেন, যাতে জন্মপ্রক্রিয়ার প্রতিটি অলৌকিক মুহূর্ত তাদের সমস্ত সংগ্রাম, যন্ত্রণা, রক্ত, আর্তনাদ সমেত বন্দী করে রাখা যায়।

বার্থ ডেলিভারির ফোটো তোলায় স্পেশালিস্ট ফোটোগ্রাফারের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, আর তার থেকেও লম্বা লম্বা লাফ দিয়ে বাড়ছে তাঁদের চাহিদা। নাওয়াখাওয়ার সময় কমছে দ্রুত। এ তো আর মুখেভাতের ছবি তোলা নয় যে বাচ্চা কেঁদে কাজল ধেবড়ে ফেললে ফের কাজল টেনে নতুন করে ছবি তোলা যাবে। মা লেবারে গেছেন খবর পাওয়া মাত্র ক্যামেরা নিয়ে রেডি থাকতে হবে। যখনতখন ডাক আসতে পারে।

কোনো কোনো বেরসিক অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাপারটার আদৌ দরকার আছে কিনা। মানে ছবি তুলে না রাখলেও তো এ মুহূর্ত সারাজীবনে ভোলা মুশকিল, এমনিতে যতটুকু মনে থাকে সেটুকু থাকলে ক্ষতি কী? তাতে বার্থ ফোটোগ্রাফির বরাত দেওয়া বাবামায়েরা (এবং ফোটোগ্রাফাররা) বলেছেন অবশ্যই ক্ষতি আছে। একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনার মির‍্যাকল ঘটাচ্ছেন তাঁরা। সেই মুহূর্তে তাঁদের মুখটা ঠিক কতটা উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল, উজ্জ্বলতার সাথে মিশে ছিল কতটুকু যন্ত্রণা আর কতটুকু আশা, আর যখন প্রথম শুনলেন যে মেয়ে হয়েছে না ছেলে!!---এসমস্ত মুহূর্তকে ছবির মতো স্পষ্ট মনে রাখার পূর্ণ অধিকার আছে তাঁদের। একটুও ঝাপসা হয়ে গেলে চলবে না।

একদিক থেকে ভেবে দেখলে ঠিকই। কতশত মুহূর্ত অসতর্ক চলে যায় দিনের ভেতর, মনে রাখা হয়না। যখন পথে চলতে চলতে চিৎ হয়ে থাকা টুপির ভেতর টিপ করে পয়সা ছুঁড়ে দিই, তখন হয়ত আমার মুখটা দয়া আর করুণায় মাখামাখি হয়ে একটা স্বর্গীয় রূপ ধারণ করে, কে জানে। যখন সাবটাইটেল ছাড়া আভা-গার্দ কোরিয়ান সিনেমা দেখি কিংবা জেমস জয়েসের পাতা উল্টোই তখন আমার চেহারায় যে একটা সন্দীপ্ত বুদ্ধির ছায়া পড়ে সেটারও তো কোনো প্রমাণ রাখা হয়না। জঘন্য।
অবিলম্বে একটা ক্যামেরা জোগাড় না করলে চলছে না।

যাই হোক, যতদিন না সেটা করা হচ্ছে ততদিন আপনার জীবনের স্পেশাল মুহূর্তের ছবি আমাকে দেখতে বাধ্য করবেন না প্লিজ। আমার ভয়ানক হিংসে হবে। কী বললেন, এত পয়সা খরচ করে তুলেছেন, না দেখলে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেবেন? ওহ। তাহলে প্রসবকালীন ছবিগুলো থাক, আপনাদের পুরীর বিচে তোলা হানিমুনের ৭০০ ছবির অ্যালবামটাই আনুন বরং। সে তবুও মন্দের ভালো।

June 19, 2012

Dis or Dat




হরলিকস না কমপ্ল্যানঃ কমপ্ল্যান



গামছা না তোয়ালেঃ গামছা

হাইব্রিড SUV না অটোঃ অটো

সাদা টিউবলাইট না হলুদ বাল্বঃ হলুদ বাল্ব

শুকতারা না কিশোর ভারতীঃ শুকতারা

স্লিপ না ঢেঁকিঃ স্লিপ

সদন্ত শ্বাপদ না মেরুদণ্ডহীন বুকে হাঁটাঃ সদন্ত শ্বাপদ 

রাজমা না ছোলেঃ ছোলে

লুচি না পরোটাঃ লুচি

ক্যাবলা না অতিচালাকঃ ক্যাবলা

মশা না মাছিঃ মশা

গেরিলাযুদ্ধ না অসহযোগ আন্দোলনঃ অসহযোগ আন্দোলন

ফুলকপি না বাঁধাকপিঃ বাঁধাকপি

বম্বে না দিল্লিঃ দিল্লি

সপ্তমী না অষ্টমীঃ সপ্তমী

নাইকি না বাটাঃ হাঁটা মানে বাটা

পাটিসাপটা না ডেথ বাই চকলেটঃ পাটিসাপটা

হীরের আংটি না হোম অ্যালোনঃ হীরের আংটি

স্নেপ না ডাম্বলডোরঃ ডাম্বলডোর

হাসির না ভূতেরঃ ভূতের ভূতের প্লিইইইইইইইজ

লিমকা না থামস আপঃ লিমকা

ডনবৈঠক না শবাসনঃ শবাসন

পঞ্চমদা না শচীনকত্তাঃ শচীনকত্তা

দই চিঁড়ে না দুধ সিরিয়ালঃ দই চিঁড়ে

SMS না ই মেলঃ ই মেল

সানন্দা না উনিশকুড়িঃ সানন্দা

সোনা না রুপোঃ সোনা

স্কুল না কোচিং ক্লাসঃ স্কুল

প্রাইভেট না সরকারিঃ সরকারি

তোপসে না ওয়াটসনঃ তোপসে



পুনশ্চঃ আমি এই পোস্টটার প্রতিক্রিয়া দেখে সত্যি সত্যি ঘেঁটে গেছি। সবারই অনেক অনেক কিছু মেলেনি? মশার থেকে মাছি বেশি ভালো লাগে আপনাদের? ডনবৈঠক না দিলে মনখারাপ হয়ে যায়? অতিচালাক লোক দেখলেই দৌড়ে গিয়ে বন্ধুত্ব পাতাতে ইচ্ছে করে?  উনিশকুড়ি পড়তে ভালো লাগে??? 

তাহলে কী মিলল না আমার সাথে? 


Pros and Cons



আর সাত দিন বাদে কেউ ভোরবেলা চায়ের জল বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে ঘুম থেকে ডাকবে না। আর সাত দিন বাদে কেউ আমার বাড়িওয়ালার গলা হু-ব-হু নকল করে হাসিয়ে পেটে খিল ধরাবেনা। ধরিয়ে বাড়িভাড়া বাড়ার দুঃখ নিমেষে অর্ধেক করে দেবেনা।  আর সাত দিন বাদে সর্বশক্তি আর হাফ বোতল ব্লিচ দিয়ে ঘষলেও রান্নাঘরের কাউন্টার আর ক্যাবিনেটগুলো এত ঝকঝকে হবেনা, এই মুহূর্তে যেমন আছে। আর সাত দিন বাদে কেউ ফ্রিজে পাঁচ রকমের শাক ঝেড়ে বেছে ধুয়ে থরে থরে সাজিয়ে রাখবেনা। আর সাত দিন বাদে কেউ আমাকে তেতো থেকে চাটনি পর্যন্ত ফাইভ কোর্স মিল, ফ্রম স্ক্র্যাচ রেঁধে খাওয়াবেনা। আর সাত দিন বাদে পথ ভুলে মাঝে মাঝে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে বাটির ঢাকা তুললেই গুপ্তধনের মতো গরম গরম মাছের ডিমভাজা বেরিয়ে পড়বেনা। কিংবা ডালের জন্য ভেজে সরিয়ে রাখা মুগডাল। আর সাত দিন বাদে শনিরবির দুপুরগুলোয় কার্বোহাইড্রেট কোমায় আচ্ছন্ন হয়ে সুখনিদ্রায় ডুবে মরা যাবেনা। আর সাত দিন বাদে আকাশে রুপোর থালার মতো চাঁদ উঠলে আমার পাশে বসে কেউ এখনও কিশোরীর মতো মিষ্টি গলায় “চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে” গেয়ে উঠবেনা। আর সাতদিন বাদে যত বৃষ্টিই নামুক না কেন সে বৃষ্টি আমার বুকের ভেতরটা এমন করে ভেজাতে পারবেনা কিছুতেই।

আর সাত দিন বাদে আমাকে স্মোক অ্যালার্মের নিচে রবিবারের নিউজপেপার মুঠো পাকিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না যাতে ফোড়নের সাথে ডালের সংযোগ ঘটা মাত্র প্রবল বেগে সে পেপার নাড়িয়ে অ্যালার্মকে শান্ত রাখার একটা চেষ্টা অন্তত করা যায়। আর সাত দিন বাদে শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে উল্টোদিক থেকে ন্যাড়ামাথায় অর্ধেক বেগুনি আর অর্ধেক হলুদ রঙ করা কাউকে আসতে দেখলে দাঁতের ফাঁক দিয়ে চাপা গলায় হুমকি দিতে হবে না, “উফফ ওভাবে হাঁ করে তাকিও না বলছি। জঘন্য।” আর সাত দিন বাদে রোজ প্রায় বিয়েবাড়ির জামাকাপড় পরে অফিস যেতে হবেনা। আর সাত দিন বাদে ফ্রিজের গা, আয়নার কাঁচ, ল্যাপটপের ঢাকনা, আরও নানারকম বিশ্বাস্য অবিশ্বাস্য জায়গায় সেঁটে রাখা খয়েরি টিপ আবিষ্কার করতে হবেনা। আর সাত দিন বাদে আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে অবান্তর লিখতে হবেনা, কারণ দেখতে পেলে কেউ বলবেনা, "লিখতে হলে দুঃখের গল্প লেখা প্র্যাকটিস কর সোনা, এসব চুটকি লিখে বালিতে দাগ টেনে লাভ কী?" আর সাত দিন বাদে কেউ মিনিটে মিনিটে আগাথা ক্রিস্টি থেকে মুখ তুলে সদর্পে ঘোষণা করবেনা, "এইবার এক্কেবারে বুঝে গেছি, নির্ঘাত এ-ই খুনী, ঠিক কিনা?" আর সাত দিন বাদে রোজ সকালে দুধ চিঁড়ে গোছের কালাআদমি ব্রেকফাস্টের বদলে সাহেবদের মতো ব্ল্যাক কফি গিলে অফিস চলে যাওয়া যাবে।

আর সাতদিন পর থেকেই ফের দিন গোনা শুরু করা যাবে, মা কবে আসবেন। কী মজা হবে বলুন তো?      



    
 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.