January 30, 2013

মিনি কুইজঃ জায়গাটা কী?



 
শিল্পীঃ রথীন মিত্র 
উৎসঃ গুগল ইমেজেস

আজ থেকে অনেক বছর আগে, জোব চার্নক আসারও আগে, পশ্চিমবঙ্গের এখানেসেখানে ইউরোপিয়ানরা এসে ঘাঁটি গেড়েছিল। পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসিরা। সাদা চামড়ার লোক দেখলেই কালো চামড়ার লোকেদের হাত পাততে ইচ্ছে করে, বা ভাইসি ভার্সা, কালো চামড়ার লোক দেখলেই সাদা চামড়ার লোকেদের দাতাকর্ণ সিনড্রোম দেখা দেয়। এখনও দেয়, তখনও দিত। তাই আমাদের স্বদেশী ভাইয়েরা সেই সব ইউরোপিয়ান সাহেবদের, বিশেষ করে বললে ডাচ সাহেবদের দরজায় দরজায় ঘুরে ভিক্ষা চাইত। ব্যাপারটাকে আরও করুণ করার জন্য কেঁদেকেঁদে বলত, “সার, আই অ্যাম পুওর। সার, আই অ্যাম পুওর...”

ভাবছেন কুইজটা কোথায়? ওপরের প্যারাগ্রাফটার মধ্যেই আছে। আজকের মিনি কুইজের প্রশ্নটা হচ্ছে যে ওপরের কথাক’টার মধ্যে আমার আপনার সবার চেনা একটার জায়গার নাম লুকিয়ে আছে।

জায়গাটা কী বলতে পারেন?

কুইজ মিনি, কাজেই কুইজের জন্য বরাদ্দ সময়ও কম। চব্বিশ ঘণ্টার বদলে ষোল ঘণ্টা সময় রইল। দেশে উত্তর বেরোবে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছ’টায় আর অ্যামেরিকায় উত্তর বেরোবে বুধবার রাত আটটায়। আশা করা যায় আপনারা তার মধ্যে উত্তরটা বার করে ফেলতে পারবেন। ততক্ষণের জন্য কমেন্ট বন্ধ করে রাখছি।

অল দ্য বেস্ট।

উত্তর

সার আই অ্যাম পুওর = সারাইঅ্যামপুওর = সেরামপুর = শ্রীরামপুর 

January 29, 2013

হ্যাদ্দেহোয়া



বান্টির ইদানিং কিছু ইন্টারন্যাশনাল বন্ধু জুটেছে শুনতে পাচ্ছি। অনেকদিন ধরেই ওর ইচ্ছে ছিল মনে, কিন্তু হচ্ছিল না। বেহালার লোকেরা, পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাক না কেন, গড়িয়ার লোকেদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করবে। এ সত্যিটা নিউটনের তিনটি সূত্রের মতোই অমোঘ। কিন্তু সত্যি অমোঘ হলেই যে লোকে মানবে এমন তো নয়। কোনও না কোনও কে. সি. পাল থাকবেই যে সারা শহর চুনকাম করে বলবে পৃথিবী আছে পৃথিবীর জায়গাতেই, সূর্যটাই আসলে তার চারপাশে ছুটে ছুটে মরছে। কেউ না কেউ থাকবেই যে বুক ঠুকে দাবি করবে বাঙালরা দলে দলে ট্রাঙ্ক হাতে মসিহার মতো শেয়ালদা স্টেশনে এসে না নামলেও কলকাতা একদিন নাকি ঠিকই সভ্য শহরে পরিণত হত।

হেঃ।

যাই হোক। মোদ্দা কথা হচ্ছে আমাদের বান্টি এই অবিশ্বাসীদের মধ্যে পড়ে। আমাদের সঙ্গে দিবারাত্র ওঠাবসা নাওয়াখাওয়া করে বটে, কিন্তু মনে মনে গুমরে মরে যে বাঙালিঘেটো থেকে ওর আর এ জীবনে বেরোনো হল না। কিন্তু সে আফসোস অ্যাদ্দিনে ঘুচেছে, নাস্তিক বান্টির দিকে ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন, ওর ঝোলায় রংবেরঙের বন্ধুবান্ধবের আমদানি হয়েছে।

সেদিন চা শিঙাড়া খেতে খেতে তাদের কথাই হচ্ছিল, এমন সময় বান্টি বলল ওর কোনও একজন ফরাসি বান্ধবী নাকি ওকে একরকম স্বর্গীয় খাবারের কথা বলেছেন। যেটা না খেলে নাকি বেঁচে থাকা আর কোমাটোজে থাকার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।

আমি শিঙাড়ায় সিংহের মতো একটা কামড় বসিয়ে বললাম, “বটে? শুনি কী খাবার?”

বান্টি মুখটা কাঁচুমাচু করে বলল, “হ্যাদ্দেহোয়া।”

“অ্যাঁ!!” আমার মুখ থেকে একটা আধখানা বাদাম ছিটকে বেরিয়ে এল। সেটাকে খুঁজেপেতে মেঝে থেকে কুড়িয়ে আবার মুখের ভেতর চালান করে আমি বললাম, “সে আবার কী রকম খাবার?”

বান্টি বলল, ও-ও নাকি খাবারের নামটা শুনে “অ্যাঁ!” করেছিল, কিন্তু মেয়েটি বারপাঁচেক নামটা রিপিট করার পরও যখন ব্যাপারটা বান্টির কানে “হ্যাদ্দেহোয়া”ই থেকে গেল তখন ও ছাড়ান দেওয়াই সাব্যস্ত করল। কে জানে হয়তো মেয়েটা ভাববে যে বান্টি ওর উচ্চারণ নিয়ে রসিকতা করছে। হয়তো ভাববে বান্টি ইনসেনসিটিভ।

হয়তো ভাববে বান্টি যথেষ্ট প্রোগ্রেসিভ নয়।

কথাটা মাথায় আসতেই আমরা দুজন একসঙ্গে শিউরে উঠলাম। কী ভয়ানক। আমি বান্টির পিঠে হাত বুলিয়ে বললাম, “ভালোই করেছিস ভাই, বাঙালির নাম ডোবাসনি।”

বান্টি খুব খুশি হয়ে আমার হাত থেকে শিঙাড়ার বাকিটুকু নিয়ে নিজের মুখে পুরে বলল, “তবে?

কিন্তু সমস্যাটা থেকেই গেল, খাবারের নামটা জানা গেল না।

অতএব আমরা হ্যাদ্দেহোয়ার রহস্যভেদে নামলাম। বান্টি আমাকে তাতিয়ে দেওয়ার জন্যই বলল বোধহয়, “কে বলতে পারে কুন্তলাদি, হ্যাদ্দেহোয়ার রহস্যভেদ করতে গিয়েই হয়ত তোমার মাথায় একটা ঝিংচ্যাক প্লট এসে যাবে, আর সেটাই হবে তোমার বাংলার আগাথা ক্রিস্টি হওয়ার পথের প্রথম পদক্ষেপ।”

বান্টি যতই বিরক্তিকর হোক না কেন, একটা কথা ওর সম্পর্কে বলতেই হবে, রক্ত গরম করে দেওয়ায় ওর জুড়ি নেই। আমি ওর সামনে “বাজে না বকে ফোনটা খুঁজে নিয়ে আয়” বলে হাত নেড়ে দিলাম বটে, কিন্তু মনের ভেতর আশার শিখা দপদপ করে উঠল। বলা তো যায় না। হতেও তো পারে? পারে না? বলুন?

যে কোনও রহস্যভেদের শুরুতেই চাই একটা প্ল্যান। আর প্ল্যান করতে গেলে চাই একটা সবুজ ডাইরি আর পেন। সবুজ ডাইরি হাতের কাছে পাওয়া গেল না কাজেই আমার নীল ডাইরি দিয়েই কাজ চালাতে হল। ডাইরির একটা ফ্রেশ পাতা বার করে তার ওপর সেলো গ্রিপার বাগিয়ে ধরে আমি বান্টিকে বললাম, “বল দেখি, হ্যাদ্দেহোয়া কেসের কি-ওয়ার্ডসগুলো কী কী?”

বান্টি হতাশ করল না। টকাটক বলে গেল আর আমিও ফটাফট এক দুই করে লিখে ফেললাম।

১. ফ্রেঞ্চ

২. ফুড     

ফার্স্ট স্টেপ শেষ। এর পরের স্টেপ হচ্ছে একবার চট করে সিধুজ্যাঠার বাড়িতে ঢুঁ মেরে আসা। আমরাও তাই করলাম। গুগলে ‘ফ্রেঞ্চ ফুড ইন নিউ দিল্লি’ টাইপ করতেই একঝাঁক নাম বেরিয়ে পড়ল। বেশিরভাগই খাবারের দোকানের নাম---পাঁচতারা হোটেল, ক্যাফে, বেকারি ইত্যাদি। সেগুলোর মধ্যে থেকে ফোন নম্বরওয়ালা জায়গাগুলোকে শর্টলিস্ট করা হল। পাঁচতারা হোটেলগুলোকেও বাদ দেওয়া হল। কারণ আমার বা বান্টি কারোরই পাঁচতারা হোটেলের রিসেপশনিস্টের সঙ্গে কথা বলার সাহস নেই। ফোনের আড়াল থেকেও না।

বাকি দোকানগুলোতে একে একে ফোন করে খোঁজ নেওয়া শুরু করলাম। কয়েকটায় বলল “নাম্বার নট ইন ইউজ”, কয়েকটায় নো রিপ্লাই হয়ে গেল, কতগুলো নম্বরে ওদিক থেকে ফোন তুলে কেউ চুপ করে রইল, আমি এদিক থেকে “হ্যালো হ্যালো” করে গেলাম। কোনও কাজই হল না, খামোকা আমার উনিশ পয়সা বিল উঠে গেল।  

জঘন্য।

অ-অ-ব-ও-ও-শে-এ-এ-ষে-এ একটা দোকানে ফোন তুলে একজন বললেন, “হ্যালো?”

আমি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বললাম, “হাই, আই অ্যাম অমুক কলিং ফ্রম তমুক।” তারপর একটু থেমে বান্টির দিকে তাকিয়ে একবুক দম নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “ডু ইউ হ্যাভ হ্যাদ্দেহোয়া?”

কোনও উত্তর নেই। বান্টির চোখের মণি ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। আমি আমার হৃৎপিণ্ডের ধুকপুক শুনতে পাচ্ছি।

“নো, ফিনিশড।”

“ফিনিশড?”

“ইয়েস, ফিনিশড।”

ফোনটা কেটে দিয়ে আমি দুই হাত মাথার ওপর তুলে উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলাম।

“আছে আছে, হ্যাদ্দেহোয়া আছে!”

বান্টিও হইহই করে লাফিয়ে উঠল। মিনিট দুয়েক পরে উত্তেজনা একটু কমে এলে আমরা মাথাঠাণ্ডা করে আলোচনায় বসলাম। বান্টি বলল, “ওকে, তাহলে কী দাঁড়ালো? হ্যাদ্দেহোয়া বলে সত্যিই একরকম ফ্রেঞ্চ খাবার আছে?”

“থাকতেই হবে। না থাকলে সেটা ফিনিশড হবে কী করে?”

“তাও বটে। তাহলে এবার আমাদের কী কর্তব্য?”

কর্তব্য ঝটিতি ঠিক হয়ে গেল। যে দোকানে ফোন করা হয়েছিল, সেখানে সশরীরে একদিন যাওয়া হবে এবং হ্যাদ্দেহোয়া কিনে আনা হবে। এত কান্ড করতে গিয়ে আমারও কী রকম হ্যাদ্দেহোয়া খাওয়ার জেদ চেপে গিয়েছিল। দোকানটা আমাদের দুজনের অফিসের ঠিক মাঝখানে, কাজেই আমরা ঠিক করলাম সোমবার, অর্থাৎ কিনা গতকাল, বিকেলবেলা অফিসফেরত বান্টি আর আমি দোকানটায় যাব।

যেমন কথা তেমন কাজ। সিধুজ্যাঠার কাছ থেকে ঠিকানাটাও জেনে নিয়েছিলাম, কাজেই খুঁজে বার করতে অসুবিধে হল না। ছোট্ট দোকান। দামি দামি ফরেনারে ঠাসা। সাধারণত এসব দোকান দেখলে আমরা রাস্তা বদলাই, কিন্তু কাল “জয় হ্যাদ্দেহোয়া” বলে ঢুকে পড়লাম।

দোকানের ঝকঝকে শোকেসের ভেতর লোভনীয় দেখতে নানানরকম ফ্রেঞ্চ পেস্ট্রি, কেক, বিস্কুট সারিসারি রাখা। দেওয়ালের গায়ে পালিশ করা চকচকে কাঠের শেলফে লম্বা গোল চৌকো পাউরুটি, চকলেটের ফিতে বাঁধা বাক্স, ইমপোর্টেড কফির প্যাকেট। কাউন্টারের ওপারে পুতুলের মতো দেখতে একটি ঝকঝকে সুন্দরী মেয়ে, ইস্তিরি করা ইউনিফর্ম পরে মাপা হাসি হেসে খদ্দের সামলাচ্ছে। বাংলা তো ছেড়েই দিলাম, এ সব দোকানে শেষ কবে হিন্দিতে কথা বলা হয়েছে কেউ মনে করতে পারবে না। বান্টি নার্ভাস হয়ে হড়বড়িয়ে মেয়েটাকে “হ্যাদ্দেহোয়া হ্যায়?” জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, আমি ওকে আস্তে করে টিপুনি দিয়ে থামালাম।

কারণ আমি ততক্ষণে দেখে ফেলেছি কেকপেস্ট্রির গায়ে গায়ে হেলান দিয়ে শোয়ানো কাগজের গায়ে ক্যালিগ্রাফি করে তাদের নামধাম লেখা রয়েছে। আমার মতলবটা ছিল, যেন কোনটা কিনব পছন্দ করতে পারছি না এমন ভাব করে সবগুলোর নাম পড়ে পড়ে দেখব, নির্ঘাত হ্যাদ্দেহোয়া-র আশেপাশে উচ্চারণের কিছু একটা বেরোবে, তখন আমরা ‘সেই ছোটবেলা থেকেই তো এ জিনিস খেয়ে আসছি’ মুখ করে, স্মার্টলি সেইটা অর্ডার করব।

দ্রুত একের পর এক নাম পড়তে থাকলাম। একে দোকানের কায়দার মিটমিটে আলো, তার ওপর ক্যালিগ্রাফির প্যাঁচ। একটা নাম পড়তে একঘণ্টা লাগছিল। এদিকে একে একে বিদেশীরা তাঁদের অর্ডার নিয়ে বেরোতে শুরু করেছেন, দোকান ক্রমশ ফাঁকা হয়ে আসছে, আর মিনিটখানেকের মধ্যে সুন্দরী মহিলা আমাদের দিকে এগিয়ে এসে, “এক্সকিউজ মি?” বলে হাসবেন। বান্টি মরিয়া হয়ে আমার পিঠে খোঁচা মারতে শুরু করল।   

“কুন্তলাদি, হারি আপ!”

ঠিক তক্ষুনি আমার চোখ পড়ল কেকটার দিকে। বাকি সব কেকপেস্ট্রির মাথা ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা উঁচু হয়ে ওঠা একটা কেকস্ট্যান্ডের ওপর রাখা। রাস্টিক, কিন্তু গ্র্যান্ড দেখতে। বড় গোল কেকটার চারধার ঘিরে ছোট সাইজের ওই কেকেরই স্যাম্পল গোল করে সাজানো।

টুং করে একটা শব্দ হল। স্প্রিং লাগানো কাঁচের দরজাটা খুলে দোকানের শেষ মেমসাহেব বেরিয়ে গেলেন। এখন দোকানে খালি মহিলা, বান্টি আর আমি। চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি মহিলার ঘাড় ধীরে ধীরে আমার দিকে ঘুরছে। বান্টি ছিটকে দেওয়ালের অন্যদিকে গিয়ে অ্যাবস্ট্রাক্ট পোস্টার দেখতে লেগেছে।

একটা অদৃশ্য শক্তি যেন আমার ওপর ভর করল। আমি দৃঢ় পদক্ষেপে রাজার মতো দেখতে কেকটার দিকে এগিয়ে গেলাম। চোখ সরু করে কাত করে রাখা কার্ডের দিকে তাকালাম।

Galette des rois.

গ্যা...লে...ত্তে দে...স র...ই....স...

গ্যালেত্ দে রোঁয়া!!!

“ইয়েস ম্যাম?”

“ওহ, হাই, ক্যান আই গেট ওয়ান অফ দিজ গ্যালেত্‌ দে রোঁয়াস প্লিজ?”

“টেক অ্যাওয়ে ম্যাম?”

“ইয়েস প্লিজ।”

মহিলা গ্লাভস পরা কমলকলির মতো হাত দিয়ে একখানা গ্যালেত্‌ দে রোঁয়া প্যাকেটে পুরে ওদিক থেকে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন, আমি এদিক থেকে আমার কার্ড বার করে ওনার দিকে বাড়িয়ে দিলাম, দেওয়ানেওয়া শেষ হল, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ-এর পালা সাঙ্গ হল, আমি আর বান্টি দোকানের বাইরে বেরিয়ে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

বাড়ি এসে জানতে পারলাম এ অতি রাজসিক কেক। আর প্যাকেট খুলে লিফলেট পড়ে দেখলাম, সারা বছরের মধ্যে একমাত্র জানুয়ারি মাসেই এই কেক উক্ত দোকানে পাওয়া যায়। ভাবুন একবার। আর দুটো দিন বাড়িতে বসে নষ্ট করলেই আমাদের আর এবছরে হ্যাদ্দেহোয়া খাওয়া হত না। গালে হাত দিয়ে ২০১৪র জন্য বসে থাকতে হত।

এই দেখুন সেই হ্যাদ্দেহোয়ার ছবি। স্বমহিমায় আমার খাটের ওপর বিরাজমান।




কী বলছেন? হ্যাদ্দেহোয়া খেতে কেমন? সেটা বলব না। জানতে চাইলে আপনাদেরই হন্যে হয়ে হ্যাদ্দেহোয়া খুঁজে বার করে জানতে হবে। ঠিক যেমন করে আমরা জেনেছি।

January 28, 2013

শিবরাম উবাচ




"...যে কোনও দৈনিক মাসিক কি সাপ্তাহিক পত্রের যে-কোনও একটা পাতা বেছে নিতে হয়। এমনকী মশলাবাঁধা কাগজ বাংলা ভাষাভাষী হলে তার দ্বারাও বানানো যায়। প্রথমে সেই কাগজটিকে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে টুকরোগুলিকে শূন্যের দিকে ছুঁড়তে হবে। রচনাকে শূন্যগর্ভ করার জন্যও বটে এবং কিছুটা রচনার নৈপুণ্যের খাতিরেও বই কী। তারপর সেই ছেঁড়া টুকরোগুলিকে ইতস্তত থেকে কুড়িয়ে এনে পরের পর সাজিয়ে যাও---পছন্দমতো ছোট-বড় লাইনে। কবিতা মাপসই হওয়া দরকার। কমা সেমিকোলন দাঁড়ি প্রভৃতি ইচ্ছামতো দেবে। ড্যাস ও ফুটকি প্রয়োজন-মাফিক। তারপর নিজের রুচির আন্দাজে 'কাস্তে বাদুড় কাকের বীর্য' ইত্যাদি একটু ছিটিয়ে নিলেই মুখরোচক একটি আধুনিক কবিতা প্রস্তুত হল। কাকস্য পরিবেদনা সেই রচনা নিয়ে সম্পাদককে তাড়া করুন তারপর। এ-জাতীয় কবিতা লিখতে বেগ পাবার কিছু নেই, তেমন জোর থাকলে একটানে এক টনও লেখা যায়। কেবল যে গদ্য-সাহিত্য ভেঙেই রচনা করতে হবে, তারও কোনও মানে নেই---শেয়ারমার্কেট রিপোর্ট, সমরাঙ্গনের খবর, সম্পাদকীয় স্তম্ভ, নিজস্ব সংবাদদাতার বার্তা এসবের থেকেও বানানো যায়---এমনকী এক গদ্য-কবিতা ছিঁড়েও এইভাবে আরেক গদ্য-কবিতা নিয়ে আসা চলে। একটাই যে আসবে তার কোনও স্থিরতা নেই, বীজাণুর ন্যায় নিজগুণে দ্বিগুণভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই তুলোকে বারংবার পিঁজে ধুনে, সাজানোর হেরফেরে অতুলনীয় নতুন নতুন কবিতা আমদানি করা যায়। এসব কবিতার মাথামুণ্ডু থাকে না বটে, কিন্তু কবিতায় সে-বালাই না-থাকাই ভাল নয় কি? বাণীর এ এক ছিন্নমস্তা রূপ---নিজের কণ্ঠসুধা পানে নিজেই বিভোর, কেবল অঙ্গভঙ্গির একটুখানি ধড়ফড়ানি আছে এই যা।"

('এক মেয়ে ব্যোমকেশের কাহিনী' থেকে উদ্ধৃত)

January 26, 2013

প্রজাতন্ত্র দিবস








সাপ্তাহিকী




Awesomeness.

People don't multitask because they're good at it. They do it because they are more distracted. 
মাল্টিটাস্কিং-এর আসল কথা।

পারফেক্ট হাফ বয়েল্ড ডিম বানাতে চান? এরা বলছে, বয়েলিং নয়, স্টিমিং-ই পন্থা।

প্রোক্র্যাস্টিনেশন? কে বলল? এ হচ্ছে গিয়ে প্রি-ক্র্যাস্টিনেশন।

তাকা তাকা ধুম ধুম।

আজকের মিনি সাপ্তাহিকী এই পর্যন্তই। প্রজাতন্ত্র দিবসের শুভেচ্ছা জানবেন। সোমবার আবার দেখা হবে। টা টা।

January 25, 2013

গানে গানে কুইজের উত্তর


বেরিয়ে গেছে! 

বৃথা আশা


অনেকদিন ধরে অনেক কথা (আর ছবি) জমতে জমতে এই পোস্টটার জন্ম। তাতে অবশ্য সুবিধের থেকে অসুবিধেই বেশি। আমার গানের মাস্টারমশাই, যিনি আমার সারাজীবনে দেখা প্রথম তিনজন বুদ্ধিমান মানুষের তালিকায় সর্বদা থাকেন আর যার মুখ থেকে বেরোনো প্রায় প্রত্যেকটি কথাই কোটেশন বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, তিনি বলেছিলেন, “প্রিপারেশনের সময় যত বেশি, গোলমালের চান্সও তত বেশি।” কাজেই এই পোস্টটা কয়েকটা হাবিজাবি চিন্তার এলোপাথাড়ি বাক্যে প্রকাশ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আগেই সাবধান করে রাখলাম।

পোস্টের বীজ প্রথম বপন হয়েছিল মাসখানেক আগে, এই অবান্তরেই একটা কুইজ লেখার সময়। সেই মনে আছে, কয়েকজন মানুষের সম্পর্কে কয়েকটা কি-ওয়ার্ডস দিয়ে আপনাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম এঁরা কে? সেই পোস্টটা। প্রশ্নপত্র সেট করতে গিয়ে ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে নতুন করে আবার একটু পড়াও হয়ে গিয়েছিল।

আর তখনই তথ্যটা চোখে পড়ল।

অন্নদাশংকর রায় যে আই. সি. এস. পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন সেটা আগে জানা ছিল। যেটা জানা ছিল না সেটা হচ্ছে সে বারের পরীক্ষাটা ছিল অন্নদাশংকরের সেকেন্ড অ্যাটেম্পট। তার আগেও একবার তিনি আই. সি. এস. পরীক্ষায় বসেন এবং অকৃতকার্য হন। ভীষণ মন খারাপ হয়। হতাশা, রাগ, দুঃখ। তখন অন্নদাশংকর বাড়ির লোকজনদের বলেন যে তিনি সামনের বছর আবার পরীক্ষায় বসবেন। আর সামনের বছর যদি সারা ভারতে মাত্র একজনও পরীক্ষায় পাশ করে, তবে সেটা হবেন তিনি।

পরের বছর পরীক্ষায় কী হয়েছিল সেটা তো আর নতুন করে বলার দরকার নেই।   

ঘটনাটা পড়ে বেশ খানিকক্ষণ হাঁ করে থেকেছিলাম মনে আছে। কোথা থেকে পায় মানুষ এই মনের জোর, নিজের ওপর এই বিশ্বাস, কিছু করে দেখানোর এই দুর্দান্ত সংকল্প? কারা ব্যর্থতার দমবন্ধ গুহা থেকে বেরিয়ে নতুন উদ্যম আর দৃঢ়তায় সাফল্যের দিকে ছুটে যেতে পারে? আর তাকে বাগ না মানিয়ে দম নেয় না?

যারাই পারুক, আমি কেন পারি না?

মা বলেন, এই যে সবসময় অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকা (তা সে অন্নদাশংকর রায় হলেও), এটাই আসল গোলমালের। পৃথিবীর প্রত্যেকটা লোক নিজস্ব কিছু দোষগুণ নিয়ে জন্মেছে। অন্যের গুণগুলোই দেখতে পাচ্ছি শুধু, দোষগুলোর কথা তো ভুলে গেলে চলবে না।

“তুই কি জানিস অন্নদাশংকর কেমন লোক ছিলেন? দেখ গিয়ে হয়ত গোঁয়ার, জেদি, স্বার্থপর। সেগুলোও চাই তোর?”

অফ কোর্স চাই না। নিজের দোষের ভারে অলরেডি কোমর ভাঙোভাঙো, যেচে পরের দোষ ঘাড়ে নিলে আর দেখতে হচ্ছে না।

“তবে?”

আমার মন মানে না। দোষগুণের যে জন্মাবধি প্যাকেজের কথা মা বলছে, কী হবে যদি কারো প্যাকেজে সবথেকে জরুরি গুণগুলোই না থাকে? ডিটারমিনেশন, ডেডিকেশন, টেনাসিটি? যেগুলো না থাকলে বেঁচে থাকার মানেই হয় না? সেগুলো কি আলাদা করে বাজারে কিনতে পাওয়া যাবে না?

মা উত্তর দিতে পারেন না। দিতে চান না বলাই ভালো।

“সোনা, এত বাজে কথা বলার সময় নেই আমার। খেয়োদেয়ো, ভালো হয়ে থেকো, ঠাণ্ডা লাগিয়ো না।” মন্ত্রের মতো আউড়ে খটাস্‌ করে ফোন নামিয়ে রাখেন।

কিন্তু আমি এত সহজে ভাবনাটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারি না। টিভিতে, খবরের কাগজে্‌ এত যে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শুনতে পাই, একটা লেফট ক্লিক করলেই র‍্যাগস টু রিচেস রূপকথারা ইন্টারনেট থেকে বেরিয়ে এসে চোখের সামনে প্যারেড করতে থাকে, সাক্ষাৎকার দিতে বসে সেলিব্রিটিরা বলেন কেমন ভাবে একটা দিন, একটা রাত, কারও মুখের একটা ছোট্ট কথা, একটা ছোট্ট চাহনি, ঘাড় ধরে তাঁদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে---সে সব কি কখনও আমার জীবনে ঘটবে না?

ভাবাই সার হয়। ঘটে আর না। বছরের পর বছর, মাসের পর মাস, দিনের পর দিন, সকালের পর সকাল, আমি ঘুম থেকে উঠে সেইইইই পুরোনো কুন্তলাকে আয়নার সামনে আবিষ্কার করি। টুথব্রাশ গালে পুরে ওপার থেকে আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাচ্ছে। সেই খুঁতো, দাগধরা, ছাতাপড়া কুন্তলা।

জঘন্য।

আপনাদের কখনও হয় এ রকম? নিজেকে বদলে ফেলতে ইচ্ছে করে? নাকি আপনারা সবাই আমার মায়ের মতো পরিণতমনস্ক; নিজের অস্তিত্বের পুরোটাকে দোষগুণসহ ভালোবেসে ফেলেছেন? আর শান্তিতে বাঁচছেন?

*****

আপনারা শান্তিতে বাঁচুন সেই কামনাই করি। আর সেই সঙ্গে চলন্ত কুইজের কথাটাও মনে করিয়ে দিই। অনেক উত্তর পড়ে গেছে কিন্তু, দারুণ ইন্টারেস্টিং সব উত্তর। আপনি অপেক্ষা করছেন কীসের জন্য? যা মাথায় আসছে লিখে দিন। ভয়ের তো কিছু নেই। 

January 24, 2013

কুইজঃ গানে গানে




উৎস গুগল ইমেজেস


আজকের কুইজ সবার জন্যই, কিন্তু যারা গান শুনতে ভালোবাসেন, নতুন পুরোনো বাংলা গান, তাঁদের জন্য একটু বেশি করে। দেখুন তো, শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেন কি না? আপনাদের হাতে সময় আছে চব্বিশ ঘণ্টা। আগামীকাল, অর্থাৎ শুক্রবার রাত ন'টায়  কলকাতায় খেলা শেষ হবে, আর ক্লিভল্যান্ডে শেষ হবে ওই দিনই বেলা সাড়ে দশটায়। ততক্ষণ কমেন্টস অফ করা থাকবে।

নিন, লেগে পড়ুন। অল দ্য বেস্ট।

*****

১.   ___ হয়ে ছিলাম তখনও এখনও যেমন আছি,
      ___ হও ___ স্বপ্নের কাছাকাছি।

২.   কত ___ কত ___ যায় সরে সরে,
      শহরে ___ যাবেই পৌঁছে ভোরে।

৩.  গাং পার হইতে ___ আনা,
      ফিরা আইতে ___ আনা,
      আইতে যাইতে ___ আনা উশুল হইল না।

৪.  ___ দুয়ার থেকে ___ আঙিনা, বল কত দূর?
     যে যায় সে যায় ফিরিবার পথ নাই, সে কি দূর বহুদূর?

৫.  ___ দিলাম ___ দিলাম ___ ভরি সোনা,
     ___ ননদী গো ___ দিয়ো না।

৬.  ___ যেমন ___ বুকে তেমনি আমাতে তুমি,
      আমার পরানে প্রেমের বিন্দু ___ শুধু ___।

৭.  ___ বলছে দুধটা একদম মুখেই তুলছে না,
     ___ বলছে এমনি এমনি খাও,
     ___ বলছে আগে এত কেয়ারলেস ছিল না,
     ___ বলছে জাহান্নমে যাও।

৮.  তবু খুশির হাসির রেশ মুখে হয় না যে তার শেষ,
      কী তার ___ সে করেনি যাচাই।

৯.  ___ এসে পায়ে ওলটায়,
     ___ তুমি ছাড়া আছে আর কে?
     তাই নামলুম চ্যালেঞ্জিং রোলটায়,
     আমি ___ ___ পার্কে।

১০. ___ ___ মিছে সব, মিছে এ জীবনের ___
       কেবলি আঁখি দিয়ে আঁখির ___ পিয়ে, ___ দিয়ে হৃদি ___,
       আঁধারে মিশে গেছে আর সব।

*****

সময় শেষ! মিলিয়ে নিন উত্তর ঠিক হয়েছে কি না

উত্তর

১. নতজানু, মাধুকরী, নয়নমোহিনী
২. গ্রাম, পথ, রানার
৩. ছ', ছ', বারো
৪. চোখের, মনের
৫. খাট, পালং, সাত, রায়বাঘিনী, খোঁটা
৬. মুক্তা, শুক্তির, তুমি, তুমি
৭. মা, হরলিক্স, আন্টি, বাবা
৮. দাম
৯. স্পিলবার্গ, গুরু, ডাইনোসর, জুরাসিক
১০. সমাজ, সংসার, কলরব, সুধা, হৃদয়, অনুভব

Rules of Writing




শিল্পীঃ Jessica Hagy

Write.---Neil Gaiman

Quantity produces quality.---Ray Bradbury

A writer who waits for ideal conditions under which to work will die without putting a word on paper.---E.B.White

When you can't create you can work.---Henry Miller

Talent is cheaper than table salt. What separates the talented individual from the successful one is a lot of hard work.---Stephen King

Substitute "damn" every time you're inclined to write 'very;' your editor will delete it and the writing will be just as it should be. ---Mark Twain

The best time for planning a book is when you're doing the dishes.---Agatha Christie

Do back exercises. Pain is distracting.---Margaret Atwood

Do not use semicolons. They are transvestite hermaphrodites representing absolutely nothing. All they do is show you've been to college.---Kurt Vonnegut

Keep your day job.---John Grisham

January 23, 2013

Benjamin Franklin's Thirteen Virtues




এর মধ্যে আমার বিশেষ করে যেগুলোর অভাব সেগুলো হল, ইন্ডাস্ট্রি, মডারেশন আর ট্র্যাঙ্কুইলিটি। আপনার? নাকি আপনার সবগুলো গুণই আছে? 

মণির ছোটবেলার গল্প


কাল বং মম মর্নিং স্কুলের কথা বললেন আর আমার হুড়মুড়িয়ে একগাদা কথা মনে পড়ে গেল। আর তারপরেই মনে পড়ল, কী আশ্চর্য, আজকেই তো একটা মর্নিং স্কুল ডে! তেইশে জানুয়ারি, পনেরোই আগস্ট, সরস্বতী পুজো আর গরমের ছুটি পড়ার দিন, এই ছিল আমাদের মর্নিং স্কুলের দিন। সকাল সাতটার সময় ইউনিফর্ম পরে, লাল ফিতে বেঁধে, স্কুলে যেতে কী রকম উৎসব উৎসব লাগত। স্কুলে যাচ্ছি মনেই হত না।

মনে পড়া ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত। একটা স্মৃতির সঙ্গে যে লতায়পাতায় আরও কত কত স্মৃতি জড়িয়ে থাকে, একটা টানলে মাথার সঙ্গে চোখ নাক ঠোঁট কানের মতো সবাই মিলে একসঙ্গে এসে প্রেজেন্ট প্লিজ দেয়। অনেক সময় তারা প্রজন্মের পাঁচিলটাঁচিলও অনায়াসে টপকে চলে আসে। বিশেষ করে সে স্মৃতি যদি ছোটবেলার হয়। অনেক দেখেশুনে আমি বুঝেছি যে ছোটবেলার কোনও দেশকালসমাজ হয় না। আমার আর আমার ঠাকুমার কৈশোরযৌবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে আকাশপাতালের ফারাক থাকতে পারে, কিন্তু শৈশব অবিকল এক। চিলেকোঠার দেওয়ালে নিজের নাম লিখে হাতের লেখা প্র্যাকটিস আর ইটপাটকেল ঘষে রান্নাবাটির মশলা তৈরি। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো শ্বেতাঙ্গ টডলার আর লাজপতনগরের ভিখিরির ছেলের বাকি জীবনটুকু যতই আলাদা হোক না কেন, বৃষ্টির জমা জল দেখলেই লাফ দিয়ে গিয়ে তার মধ্যে গিয়ে ঝাঁপানোর ইচ্ছেটা হুবহু এক।

যাই হোক, এত কথা বলার মুখ্য উদ্দেশ্যটা হল যে আজকে যে গল্পটা আমি বলব সেটা আমার গল্প নয়, আমার মায়ের গল্প। একদিক থেকে দেখতে গেলে আমার মায়ের ছোটবেলাটা আমার ছোটবেলার থেকে অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং, তার কারণ, এক, বাড়ির ভেতর টোয়েন্টিফোর সেভেন মজুদ খেলার সঙ্গী আর দুই, দাদুদিদিমার টোয়েন্টিফোর সেভেন খড়গহস্তে পাহারা না দেওয়া। মাইক্রোওয়েভ ছিল না, ওয়াশিং মেশিনও না, কাজেই সারাসকাল রান্না করে উঠে, সারাদুপুর কাপড় কাচতে কাচতেই দিদিমার ফের রান্নাঘরে ঢোকার সময় হয়ে যেত, আট ছেলেমেয়ের পেছনে হেলিকপ্টার পেরেন্টিং-এর বিলাসিতার তাঁর সময় ছিল না। আর তখনকার বাবারা অনেক অন্যরকম ছিলেন, অফিস থেকে ফিরে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করলে সমাজে তাঁদের ধোপানাপিত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হত।

কাজেই মায়েরা দেদার খেলতেন। ঘুম থেকে উঠে খেলা শুরু হত, চলত সেই রাত্তিরবেলা ভাতের থালার সামনে বসে ঘুমে ঢুলে পড়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত। মাঝে মাঝে সেজমাসি এসে দুই কানে দুই প্যাঁচ দিলে খেলা থামিয়ে বই খুলে বসতে হত, কিন্তু ওই পর্যন্তই। বই খুলেও খেলার নিত্যনতুন পদ্ধতি বার করা হত। কারও পড়া থামিয়ে বাথরুম যাওয়ার দরকার হলে নানারকম সংকেতের মাধ্যমে সেটা জানাতে হত। ছোটবাথরুম হলে মেঝেতে একবার টোকা, বড়বাথরুম হলে দু’বার। জল খেতে ওঠবার সময় তিনবার টোকা দিতে হত।

আমি এ সব শুনি আর চোখ গোল গোল করে মায়ের দিকে তাকাই।

“আমি এসব করলে তুমি আমাকে কী করতে মা? আস্ত রাখতে?”

মা লজ্জা পেয়ে হাসেন। স্বীকার করেন, ছোটবেলাটা তাঁর আমার থেকে আরামে কেটেছে।

“আর কী কী খেলতে মা তোমরা?”

আমি গালে হাত দিয়ে গুছিয়ে বসি। এই স্বপ্নের মতো ছোটবেলাটা থেকে বেরোতে ইচ্ছে করে না আমার।

“আরও কত খেলা, খেলার কী শেষ আছে? খেলনা যত কম, খেলা তত বেশি। বাড়ির চেয়ার টেবিল, খাট বিছানা, জানালার খড়খড়ি, বারান্দার রেলিং, সবই খেলার জিনিস।”

একটা নাকি গোলটেবিল ছিল মায়েদের কইপুকুরের ভাড়াবাড়িতে। সেটাকে এক পায়ার ওপর কাত করে টেবিলটপটাকে স্টিয়ারিং-এর মতো করে ঘোরানো হত। সঙ্গে মুখে গোঁ গোঁ করে ইঞ্জিনের আওয়াজ। খানিকক্ষণ পরে আরেকজন খেলোয়াড় এসে টেবিলের পায়ার তলায় শুয়ে পড়ে, “বাঁচাও বাঁচাও, আআআআআআ” বলে চিৎকার করত। ব্যস হয়ে গেল বাস অ্যাক্সিডেন্ট। আর হত স্কুল থেকে ফিরে এসে ফুটবল। এগারো জনের টিম বানানোর মতো লোকবল ছিল না সত্যিই, কিন্তু তার থেকে খুব কমও ছিল না। মা আর ছোটমাসিকে দু-দলের গোলকিপার হয়েই তুষ্ট থাকতে হত। সেটাকে আবার কায়দা করে বলা হত “গোলকি”। মা বলেন, ছোড়দা পায়ে বল নিয়ে তীরের মতো ছুটে আসছে আর মেজদা চেঁচিয়ে মা’কে নির্দেশ দিচ্ছে, “মণিইইই, শুইয়া পড়্‌, শুইয়া পড়্‌...” এ স্মৃতি এখনও মায়ের কানে বাজে।

সবই যে সুখস্মৃতি, তা নয় অবশ্য। তৃতীয় বিশ্বের যা চিরকালীন সমস্যা, সীমিত রিসোর্সের সমবন্টন, সে সমস্যা মায়েদের নিয়মিত ভোগাত। বড়রা অবশ্য সেগুলোকে সম্পদ বলে চিনতে পারবে না, কিন্তু জং ধরা পেরেক, আলো ঝলসানো সবুজনীল কাঁচের গুলি, মিষ্টির দোকানে পাওয়া কাঠের চামচ---অমূল্য সব ধনসম্পদ, বাকি লুটেরাদের নজর থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হত। বেশিরভাগ সময়েই বাঁচানো যেত না, তখন শুরু হত মরণপণ সংগ্রাম। মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে, চুল টেনে, খামচে, চেঁচিয়ে কেঁদে, সারা পাড়া জানিয়ে যুদ্ধ চলত যতক্ষণ না পড়ার ঘর থেকে সেজমাসি কিংবা রান্নাঘর থেকে দিদিমা ছুটে এসে টেনে আলাদা করছেন। সেজমাসি হলে যুযুধান দু’পক্ষের কপালে দুঃখ ছিল, দিদিমা বকতেন না। আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, “তাই তো কই, প্যাটে কিসু নাই, রাগ তো হইবেই...” বলে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে চোখের জল মুছিয়ে বাটি করে মুড়ি খেতে দিতেন। চোখের জল আর দুঃখ, দুইই নিমেষে শুকিয়ে যেত।

আরও লক্ষ লক্ষ গল্প আছে মায়েদের ছোটবেলার। কিন্তু আমার আর লেখার সময় নেই। অন্তত আজ নয়। আপনারা যদি শুনতে চান, পরের কোনও পোস্টে আবার লিখবখ’ন।

January 22, 2013

হঠাৎ একদিন অসময়ে


অনেকদিন আগে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের একটা লেখা পড়েছিলাম। কোন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়? গল্পটা শুনলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

গল্পটা এক দম্পতির। স্বামী রোজ সকাল ন’টা নাগাদ খেয়ে দেয়ে অফিসে বেরিয়ে যান। স্ত্রী বাড়িতে থাকেন, রান্নাবান্না করেন, ঘরদোরের খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে মানুষ করেন। একদিন স্বামী নির্দিষ্ট সময়ে রেলস্টেশনে পৌঁছে দেখেন ভিড়ে ভিড়াক্কার। মুরগির মাংসের মূল্যবৃদ্ধি বা ওই গোছেরই কিছু কারণে রেল-অবরোধ হয়েছে, ঘণ্টাতিনেকের মধ্যে ওঠার লক্ষণ নেই। ভদ্রলোক মহানন্দে শিস দিতে দিতে বাড়ি ফিরে এলেন। বাড়ির লোককে কী রকম সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে ভাবতে ভাবতে কলিং বেল টিপলেন। ভেতর থেকে স্ত্রীর তিতিবিরক্ত বাজখাঁই গলা ভেসে এল, “আবার কে জ্বালাতে এল রে বাবা এখন, ভাল্লাগে না...”

খটাস্‌ করে ছিটকিনি খুলে গেল। স্ত্রী স্বামীর হাসিহাসি মুখের দিকে তাকিয়ে দু’সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে রইলেন, তারপর চেঁচিয়ে উঠলেন, “তুমি? এখন?? কেন???”

গল্পের ভদ্রলোক ভয়ানক মুষড়ে পড়েছিলেন যদিও, কিন্তু আমি মনে করি ভদ্রমহিলার কোনও দোষ নেই। আমাদের সকলেরই প্রতিটি দিনের নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট লোক বা কাজের জন্য ধার্য করা আছে। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, কেউ সেই ভাগের বেশি দাবি করতে এলে রাগ ধরারই কথা। হয়ত তখন স্ত্রী সবে আরাম করে চায়ের চাপ নিয়ে সারাদিনে প্রথমবার খবরের কাগজটা মেলে বসেছেন, বা কাজের লোকের মুখে আয়েস করে পাশের বাড়ির নিন্দে শুনছেন, বা সাপ্তাহিক বর্তমান দেখে দেখে নিমপাতা আর দুধের সর মিশিয়ে ফেসপ্যাক বানিয়ে মুখে মাখবেন ভাবছেন। হয়ত সারাদিনে ওটাই ওনার একমাত্র অ্যালোন-টাইম, কে বলতে পারে?

সেদিন অফিস থেকে হঠাৎ ভরদুপুরে বাড়ি ফিরে এসে গল্পটার কথা মনে পড়ে গেল। আগে আসব ঠিকই করে রেখেছিলাম, তাই সকাল সকাল অফিস পৌঁছে কোনওদিকে না তাকিয়ে, টি-ব্রেক না নিয়ে, একটিবারের জন্যও এদিকওদিক না তাকিয়ে একটা পড়ে থাকা কাজ শেষ করেছি। শেষ করে, অ্যাটাচ করে, সেন্ড ক্লিক করেই ছুট। কী আনন্দ যে হচ্ছিল কী বলব। দুপুরের খাঁ খাঁ মেট্রো, যাত্রী বলতে শুধু কলেজ কেটে প্রেম করতে বেরোনো জোড়া-জোড়া ছেলেমেয়ের দল। সদ্য কৈশোর-পেরোনো ঝকঝকে খুশি খুশি মুখ, দেখলেও ভালো লাগে। দুপুরের ঝকঝকে রোদটাকেও অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। রোজরোজ এমন সুন্দর রোদ ওঠে, আর আমি ব্লাইন্ডঘেরা ঘরে বসে মনিটরের দিকে তাকিয়ে বেলা বওয়াই, জানতেও পারিনা---ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। মেট্রো থেকে নেমেই থরে থরে অটো। সকালসন্ধ্যে সে সব অটোওয়ালার পা ধরে আমি সাধি, তারাই দুপুরবেলা ছুটে ছুটে এসে আমাকে “ম্যাডাম ম্যাডাম” করছে, অবিশ্বাস্য। অটো চেপে একটার পর একটা ফাঁকা সিগন্যাল হুশ হুশ করে বাড়ির দিকে আসতে আসতে নিজের সুখ নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

কিন্তু চমক আরও বাকি ছিল। আমার পাড়াটার বাইরে একটা লোহার গেট আছে। অন্যান্য দিন যখন আমি বেরোই আর ফিরি, তখন সেটা হাট করে খোলা থাকে। যাতে পাড়ার মোটা মোটা বড়োলোকেদের, মোটা মোটা গাড়ি নিয়ে যেতেআসতে কোনও অসুবিধে না হয়। সেদিন দেখি পাল্লাদুটো টেনে বন্ধ করা, মধ্যে খালি ফুটখানেক ফাঁক। গাড়ি কেন, গাড়ির বেশিরভাগ মালিকই ওই ফাঁক দিয়ে গলবেন না।

গেটের ফাঁক গলে এদিকে এসেই আমার চক্ষু চড়কগাছ। বাড়িঘর, গাছপালা সব যে যার জায়গাতেই আছে, না থাকলে ভীষণই চিন্তার কথা, কিন্তু যেটা বিলকুল বদলে গেছে সেটা হচ্ছে গোটা পাড়ার মেজাজ। শালিখ, চড়াই এত ছিল নাকি এ পাড়ায়, আগে কোনওদিন দেখিনি তো? দোতলার বারান্দা থেকে শাড়ি, লেপ, বেডকভার ঝুলছে, একতলার চিলতে দালানে ফালি রোদে চেয়ার পেতে দু-একজন প্রৌঢ়া ঢুলছেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে দুপুরের মাছের ঝোলটা এত ভালো হয়েছিল যে বেশি খাওয়া হয়ে গেছে। গেটের সামনে সামনে কাজের লোকদের জটলা, পরচর্চার অমলিন আনন্দ মাখা মুখ, পিঠময় খোলা ভেজা চুল। জটলার ভেতর থেকে দু-একটা সন্দিগ্ধ দৃষ্টি আমার দিকে উড়ে এল। আর একটু এগিয়ে, বাড়ির একদম কাছে এসে দেখি, উল্টোদিকের যে পার্কটার ছবি মাঝে মাঝেই ছাপাই অবান্তরে, সেটায় কিছু লোক ইতিউতি ঘাসের ওপর শুয়ে ঘুমোচ্ছে। আর গুলমোহর গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এসে পড়া রোদ্দুর দুলে দুলে তাদের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে কী যে ভালো লেগেছিল আমার সেদিন দুপুরটা। হঠাৎ একদিন দেখেছি বলেই হয়ত ঘোর লেগে গেছে, রোজ দেখলে আর ভালো লাগত না। কিন্তু ভালোলাগার জিনিস আজকাল ভয়ানক বিরল হয়ে গেছে কিনা, তাই আমি সেদিনের দুপুরটার গল্প আপনাদের বিস্তারে শুনিয়ে রাখলাম। ভুলে যাওয়ার আগেই।

January 21, 2013

Hidden Roots


শিল্পীঃ David Byrne (উৎস)


Things I am Loving



কায়িক পরিশ্রমঃ উঁহু, ভুল ব্লগে এসে পড়েননি। আর আপনার চোখও নতুন করে খারাপ হয়নি। আমার মাথা খারাপ হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে যদি সন্দেহ হয় তাহলে আমি আশ্বস্ত করতে পারি যে সেটাও নয়। ব্যাপারটা হচ্ছে, কিছুদিন ধরে আমি সত্যি সত্যি কায়িক পরিশ্রমের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে পারছি। সময় কাটাতে, ক্যালরি ঝরাতে, ডিপ্রেশন ভোলাতে, সবকিছুর থেকে বেশি কাজ দেয় সাবেকি গায়ের খাটুনি। বিশ্বাস না হলে হাতে কলমে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। তামাদি প্রেম ভোগাচ্ছে? এক শিশি ‘ইজি’, আধ বালতি জল আর খানতিনেক চিটচিটে নোংরা সোয়েটার নিয়ে কলতলায় চলে যান, প্রেম বাপ বাপ বলে পালাবার পথ পাবে না। পড়াশোনা মাথায় উঠেছে? খাতা খুললেই থিওরেমের বদলে হাত থেকে ভসভসিয়ে বস্তাপচা বিরহের কবিতা বেরোচ্ছে? ঘাবড়াবেন না, বইখাতা বন্ধ করে উঠে পড়ুন। আশেপাশে তাকান, যে জামাকাপড়গুলো গোল্লা পাকিয়ে টিপ প্র্যাকটিস করার মতো ঘরের এদিসকওদিক ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছেন, সেগুলো ভাঁজ করে ফেলুন। নয়তো মা’কে গিয়ে জিজ্ঞাসা করুন, বাজার থেকে কিছু এনে দিতে হবে কি? নাকি ঘরটা ঝাঁট দিলে ভালো হয়? মা ভীষণ ভয় পেয়ে যেতে পারেন, তাঁকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে ঝাঁটা হাতে নেমে পড়ুন। দেরি করবেন না। ঘরের জঞ্জাল তো পরিষ্কার হবেই, সঙ্গে সঙ্গে মাথার ভেতরের আবর্জনাও দূরীভূত হবে।

এই বার্ধক্যে পৌঁছে বুঝতে পারছি, ছোট থেকে সবাই যে কানের কাছে পাখিপড়া পড়েছে আর ঠারেঠোরে বুঝিয়েছে যে ভাবুক মানেই ভালো, সেটা কী পরিমাণে ভুল আর ক্ষতিকারক। আমি আর সে ভুল করছি না, নিজের ছেলেমেয়ে দাঁড়াতে শিখলেই হাতে ন্যাতাবালতি ধরিয়ে দেব। ফুড ফর ওয়ার্ক। খবরের কাগজ রিডিং পড়ে পাড়ার লোকের কাছে যতখুশি হাততালি পাও কিংবা অংকে ঝুড়িঝুড়ি নম্বর আনো; ভাত ডাল ফুচকা আইসক্রিম পেতে হলে ঘরের কাজ করতে হবে। ব্যস।

মেমোরি গেমঃ গতকাল একটা জন্মদিনের পার্টিতে গিয়েছিলাম। কলকাতা স্টাইল ফিশফ্রাই, মুসুরডাল, আলুপোস্ত, পাবদা মাছের কালোজিরে দিয়ে ঝাল, পাঁঠার স্বর্গীয় ঝোল, নলেন গুড়ের কামরাঙা সন্দেশ আর বিগ চিল ক্যাফে থেকে আনা চকোলেট ডবল ডেকাডেন্স কেকের ইয়াবড় একটা টুকরো শেষ করে সবে গদির ওপর এলিয়ে পড়ে হাঁফ ছাড়ছি, এমন সময় কে যেন সত্যজিৎ রায়ের নাম বলে উঠল। এই হয়, যতক্ষণ রান্না হচ্ছিল, ততক্ষণ আর্টের কথা ভুলেও কারও মাথায় আসছিল না। ততক্ষণ খালি ছুতোয়নাতায় ঘুরে ঘুরে রান্নাঘরে যাওয়া আর ফুটন্ত ডেকচির ঢাকনা তুলে তুলে দেখা, ভাত হতে আরও কত দেরি। যাই হোক, সত্যজিতের কথা উঠতে অরণ্যের দিনরাত্রির কথা উঠল, অরণ্যের দিনরাত্রির কথা উঠতে দুলির আবলুশ রঙ খোলা পিঠের কথা উঠল। কেউ একজন বলল, কোথায় নাকি সেই পিঠের একটা পোস্টার দেখেছে। দাম জিজ্ঞাসা করতে গিয়েছিল, ছ্যাঁকা খেয়ে পালিয়ে এসেছে। তখন কেউ একজন বলল, দূর দূর, অরণ্যের দিনরাত্রির পোস্টারই যদি লাগাতে হয় তবে দুলির পিঠ না লাগিয়ে জঙ্গলের মধ্যে শতরঞ্জি পেতে গোল হয়ে বসে মেমোরি গেম খেলার দৃশ্যটার লাগানো উচিত।

যেই না বলা, খেলার কথা সবার মাথায় এসে গেল আর আমরাও দেরি না করে একেকজন মূর্তিমান সৌমিত্র, শমিত ভঞ্জ, রবি ঘোষ, শুভেন্দু, শর্মিলা আর কাবেরী বসু হয়ে মাঠে নেমে পড়লাম। খেলা যা জমেছিল সে আর কী বলব। সবার ভুরু দেখতে দেখতে কুঁচকে গেল, নাকের পাটা ফুলে উঠল, বাইরে সূর্যের মরা আলো বারান্দা ছেড়ে পালালো তবু কারও চায়ের কথা মনেই পড়ল না। ঝাড়া দুঘণ্টার মরণপণ লড়াই। ধন্য বটে লোকজনের স্মৃতিশক্তি। খেলা থামার পর অটো ধরে বাড়ি ফিরতে ফিরতেও সবাই খেলার কথাই বলতে লাগল। আমার তো এমন অবস্থা হয়েছিল যে কাল মাঝরাতে “পাওলো রসি, হন্ডা সিভিক, ইদি আমিন...” বলে চেঁচিয়ে ঘুম ভেঙে ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছিলাম।

আপনারা শেষ কবে মেমোরি গেম খেলেছেন? না খেলে থাকলে সামনের উইকএন্ডে বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে খেলে দেখতে পারেন। দারুণ মজা হবে।

উৎস গুগল ইমেজেস

বিঃ দ্রঃ- একটা ছোট্ট ঘোষণা, আমার ইন্টারনেট কানেকশন একটু গোলমাল করছে। আমার হয়ত আপনাদের কমেন্টের উত্তর দিতে একটু সময় লাগতে পারে, আবার নাও পারে। দয়া করে মাইন্ড করবেন না।

January 19, 2013

সাপ্তাহিকী



আলোকচিত্রীঃ অ্যালিস গাও 

There is no fun doing nothing when you have nothing to do. Wasting time is merely an occupation then, and a most exhausting one. 
                                                                                     ---Jerome K. Jerome

জিনিয়াস।

টাকা দিয়ে কি আনন্দ কেনা যায়? কেন যাবে না, ঠিক মতো খরচ করতে জানলেই কেনা যাবে।

(স্বর্গের?) সিঁড়ি।

সাধারণ মানুষের সাধারণ ঘর। অসাধারণ পার্সপেক্টিভ থেকে।

"উফ্‌ আমি যা বিজি না..."/ " আমি সিরিয়াসলি উইয়ার্ড, তাই আমাকে কেউ বোঝে না..."/ "বাবা, ছেলের জ্বালায় একটু ঘুমোনোর জো আছে, একমাসও হয়নি, নিজে নিজে উল্টোতে শিখে গেছে..." দেখতেশুনতে নালিশের মতোই মনে হচ্ছে কিন্তু কোথাও একটা গোলমাল ঠেকছে তো? ঠেকবেই, কারণ এগুলোকেই বলে হাম্বলব্র্যাগিং। আমার মত যদি জিজ্ঞাসা করেন, ব্র্যাগিং-এর মতোই হাস্যকর।

লিপ রিডিং ভুল হলে কী ভয়ানক ব্যাপার হতে পারে।

মহাকাশে যেতে চান? মনের সুখে পা ছড়িয়ে কাঁদতে পারবেন না কিন্তু, আগে থেকেই সাবধান করে রাখলাম।

এ সপ্তাহের গান। আমার প্রাণের গান। আশা করি আপনাদেরও ভালো লাগবে।

আর কী? দিল্লিতে শীত এখন লাস্ট ল্যাপ দিচ্ছে, আমার ব্যাপারটা মোটে ভালো ঠেকছে না। আমি শেষ শীতের মজা লুটেপুটে নিতে চললাম, সোমবার আবার দেখা হবে। ততক্ষণ ভালো হয়ে থাকবেন।

January 18, 2013

রেজাল্ট


কোনটা কী কুইজের রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। অংশগ্রহণকারীদের আমার অসংখ্য ধন্যবাদ আর অভিনন্দন। সবাই খুব ভালো খেলেছেন।

January 17, 2013

আপনি কী ভালো পারেন?



আমি যখন প্রথম ইন্টারনেটে ব্লগ পড়তে শুরু করি, লেখা যখন অনেক দূরের ব্যাপার, তখন আমাকে ব্লগের কোন জিনিসটা সবথেকে বেশি আকৃষ্ট করেছিল বলুন তো? মেমে। সেভেন র‍্যান্ডম ফ্যাক্টস্‌ নোবডি নোজ অ্যাবাউট মি, ফাইভ প্লেসেস আই ওয়ান্ট টু গো বিফোর আই ডাই, হান্ড্রেড পিপল আই ক্যান্ট স্ট্যান্ড---এই সব। নিজে লেখ, আর তারপর ছোঁয়াছুঁয়ি খেলার মতো যতজনকে পার ট্যাগ করে দাও। যাতে তারাও নিজেদের নিয়ে কথা বলার সুযোগ পায়।

আমারও নিজেকে নিয়ে কথা বলতে ভীষণ ভীষণ ভালো লাগে কিন্তু বিধি বাম। এতদিন হয়ে গেল ব্লগিং করছি, কেউ আমাকে একটাও মেমে লেখার নেমন্তন্ন পাঠায়নি। তাতে দমে না গিয়ে আমি নিজেই নিজেকে নানারকম মেমের বরাত দেব ঠিক করেছি।

আজকের মেমেটা তারই একটা নমুনা। যে কোনও আদর্শ মেমের মতোই, এটিও টোকা। কিন্তু কোথা থেকে টোকা, সত্যি বলছি মনে নেই। তিন সত্যি।

ওপরওপর দেখলে মেমেটি অতি সুবোধ, ঘোরপ্যাঁচহীন। “আপনি কী ভালো পারেন?”---এই নিরীহ প্রশ্নটির উত্তর দিতে হবে শুধু। উৎসাহিত হয়ে সবে কর গুনতে শুরু করেছি কী কী ভালো পারি, গুনতে গুনতে ডান হাত শেষ হয়ে সবে বাঁ হাত শুরু হয়েছে, অমনি নজরে পড়ল মেমের নিচে খুদি খুচি ফাইন প্রিন্টে কী সব লেখা। দেখেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।

ফাইন প্রিন্ট মানেই খারাপ খবর।

যা ভেবেছি ঠিক তাই। ভালো পারার মধ্যে---গরিবদের দুঃখ প্রাণ দিয়ে অনুভব করতে পারি, শাশুড়িকে সুখী করতে পারি, জোকস বলে বাসরঘর জমিয়ে দিতে পারি, একবার পড়েই মাধ্যমিকের সিলেবাসের “গাছ” কবিতার মর্মার্থ উদ্ধার করে ফেলতে পারি---এ সব বললে চলবে না। এমন পারার কথা বলতে হবে যা চোখে দেখা যায়, হাতে ধরা যায়, স্কেল দিয়ে মাপা যায়, দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা যায়।

অর্থাৎ কিনা রক্তমাংসের পারা। হাওয়ায় প্রাসাদ গড়া নয়।

সে রকম কী ভালো পারি গুনতে গিয়ে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়। কী সর্বনাশ, কিছুই তো পারি না! অতি কষ্টে, কেঁদেকঁকিয়ে, ঝুলি ঝেড়ে, খানপাঁচেক কাজ খুঁজে বার করেছি যেগুলোতে আমাকে মোটের ওপর ভালো বলা যেতে পারে। এই রইল সেসবের লিস্ট।

১. টাইপ করা। এটা আমি সত্যি ভালো পারি। মানে পাশের লোক নিজের কাজ থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাবে, এমন ভালো। ইংরিজি, বাংলাও। দ্রুত এবং নির্ভুল। তবে এই ভালো পারাটার কৃতিত্ব গোটাটাই আমার বাবার। কলকাতা শহরের মোড়ে মোড়ে তখন জর্জ টেলিগ্রাফ টাইপিং অ্যান্ড স্টেনোগ্রাফি স্কুল ছিল। আর ঘরে ঘরে উদ্বাস্তু পরিবার। সে সব পরিবারের মেয়েরা দলে দলে টাইপিং শিখে অফিসকাছারি ভরিয়ে ফেলল। ছোটখাট আর্থ-সামাজিক বিপ্লব যাকে বলে। আমার যদিও চাকরির দরকার ছিল না, কিন্তু বাবা দাবি করেছিলেন যে টাইপ করতে হলে QWERTY শিখেই করতে হবে, নচেৎ নয়। কাজেই মাধ্যমিকের পরের দুপুরগুলো বসে বসে, ওয়ার্ড ফাইলের পর ওয়ার্ড ফাইল the quick brown fox jumps over the lazy dog লিখে লিখে ভরিয়ে ফেললাম, আর জন্মের মতো একটা বিদ্যেও শেখা হয়ে গেল। যতই অকাজের হোক, শেখা তো?

২. আমি ভালো চা করতে পারি। আমি বলছি না, যারা খেয়েছে তারা বলেছে। একবার নয়, বারংবার। মকাইবাড়ি ফার্স্ট ফ্লাশও পারি, টাটা গোল্ডও পারি, আবার নাম-না-জানা বাদামি কাগজের ঠোঙায় মোড়া চা-ও পারি। টি ব্যাগ তো পারিই। অবশ্য আগাথা ক্রিস্টির বই যারা পড়েছে তারা সবাই পারবে। যে রকমের চা-ই হোক না কেন, ফার্স্ট, ব্রিং দ্য ওয়াটার টু আ রোলিং বয়েল। এই রোলিং বয়েল ব্যাপারটা খুব জরুরি। তারপর চায়ের রকম বুঝে সময়, আঁচ, দুধ না লেবু না লিকার, সে সব ঠিক করতে হবে।

৩. আমি সাদা কাগজে খালি হাতে নাকবরাবর সোজা সরলরেখা টানতে পারি। মাঝে মাঝে তো দেখে বোঝাই যায় না লাইন খালি হাতে টানা হয়েছে না স্কেল বসিয়ে। এটার পেছনেও আমার ধারণা বাবার অবদান আছে। আমার বাবাও ভালো সরলরেখা টানতে পারেন। এমনকি চোখ বাঁধা অবস্থায় বাবা যে রকম সোজা তীরের মতো হেঁটে হাঁড়ির কাছে পৌঁছতে পারেন, বিশ্বাস করতে হলে নিজের চোখে দেখতে হবে।

৪. আমি ভালো টাকাপয়সার হিসেব রাখতে পারি। অন্তত এককালে পারতাম। যখনই বন্ধুরা একসাথে মিলে বেড়াতে যাওয়া হত বা পিকনিক বা চাঁদা তুলে খাওয়াদাওয়া, ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব অবশ্যম্ভাবী আমার কাঁধেই এসে পড়ত। আমিও উৎসাহের সঙ্গে একখানা খাতা বানিয়ে, তীরের মতো সোজা লাইন টেনে, জমাখরচের হিসেব রাখতে বসে যেতাম। কখনও একটি পয়সা বা সেন্টও এদিকওদিক হয়নি।

ইস্‌, এক্ষুনি পিকনিক করতে যেতে ইচ্ছে করছে।

৫. আমি ভালো মশারি ভাঁজ করতে পারি। সিরিয়াসলি ভালো। যত ল্যাগবেগে, অ্যাঁকাবেঁকা মশারিই হোক, আমার হাতে পড়লে বাছাধনকে বাগ মানতেই হবে। একটুও নেট এদিকওদিক থেকে বেরিয়ে থাকবে না। ভাঁজ শেষ হলে শুধু পড়ে থাকবে একটি নিখুঁত বর্গ বা আয়তক্ষেত্র।

আপনি কী ভালো পারেন? বলতে লজ্জা পাবেন না, নিজের প্রশংসা নিজের মুখে না করার জমানা নেই আর এখন। কাজেই নিচের কমেন্টে এসে বলে ফেলুন।

*****

ও, আর কুইজ চলছে মনে আছে তো? দেখতে দেখতে বেলা বয়ে যাবে, উত্তর দিতে দেরি করবেন না।

   

কুইজঃ কোনটা কী?


আজকের কুইজ চেনা কুইজ। আপনাদের নিচের জিনিসগুলোর খণ্ডাংশ দেখে চিনতে হবে পুরো জিনিসগুলো কী। কুইজ সোজা কি না জানিনা, তবে জিনিসগুলো সোজা সে কথা দিতে পারি।

উত্তর দেওয়ার সময় রইল চব্বিশ ঘণ্টা। খেলা শুরু হচ্ছে এখন, শেষ হবে বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে শুক্রবার সকাল আটটায় আর বাল্টিমোরে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ন'টায়। ততক্ষণের জন্য আমি কমেন্ট পাহারা দেব।

অল দ্য বেস্ট।

*****


১.


২.

৩.

৪.

৫.

৬.

৭.

৮.

৯.

*****

খেলা শেষ। উত্তর। 

১. বাল্ব
২. হ্যাংগার
৩. সেফটি পিন
৪. স্ক্রু
৫. বাঁশি
৬. টেবিল ফ্যান
৭. অ্যাশট্রে
৮. কাঁচি
৯. টুথব্রাশ

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.