February 28, 2013

শরীরের ভাষা


জে এন ইউ তে গিয়ে যে কত কিছু নতুন শিখেছিলাম, এখনও ভাবতে গেলে মাথা ঘুরে যায়। একুশ বছর ধরে মা যেসব জিনিস বকেঝকে, আদর করে শিখিয়েছিলেন, সেগুলো আনলার্ন করে আবার নতুন করে শিখতে ঘাম ছুটে গিয়েছিল।

মা শিখিয়েছিলেন, যখন হাঁটবে তখন খেয়াল রাখবে প্রতিবার পা তোলা আর ফেলার মাঝে যেন চটিটা রাস্তা থেকে পুরোটা উঠে আসে। তুমি চলেছ আর তোমার চটির গোড়ালি রাস্তা ঘষটাতে ঘষটাতে বীভৎস খ্যাস্‌খ্যাস্‌ আওয়াজ করে চলেছে, ও রকম হাঁটার থেকে না-হাঁটা ভালো।

আরও শিখিয়েছিলেন, দাঁড়ানোর সময় সোজা হয়ে দাঁড়াবে, হাতের কাছে গাছ কিংবা দেওয়াল পেলেই কেষ্টঠাকুরের মতো এলিয়ে পড়বে না। বসার সময়ও নিজের মেরুদণ্ডের ওপর ভরসা করবে, পাশের লোকের গায়ের ওপর গা ঢেলে দেবে না। কথা বলা নিয়েও আমার মায়ের ছুঁৎমার্গ তুঙ্গে ছিল। ‘প্রতিবেশী’র ‘প্র’, ‘কর্তৃপক্ষ’র ‘র্তৃ’ স্পষ্ট শোনা না গেলে কিংবা ‘অনুস্বর’কে ‘উনস্বর’ বলে চালাতে গেলে আমার মা প্রায় মূর্ছিত হয়ে পড়তেন।

শুনেটুনে তীর্থদা আমার ছোটবেলাটার ওপর ভীষণ করুণা দেখিয়ে বলল, “তোর মা তো মা কম, মুসোলিনি বেশি মনে হচ্ছে।” আমি “তবেই বোঝো” মুখ করে কাঁচুমাচু হয়ে বসে রইলাম আর তীর্থদা হাতে ধরে দেখিয়ে দিল ‘ইন্টারেস্টিং’ হতে গেলে আসলে আমার মা যা যা বলেছেন, আসলে অক্ষরেঅক্ষরে তার উল্টো করতে হবে। যেখানে সেখানে চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়তে হবে, সমান কিংবা বেশি ইন্টেলেক্টের লোক দেখলেই “কুর্নিশ কমরেড” বলে তাঁদের কাঁধ জড়িয়ে ধরতে হবে, আর হাঁটার সময় অল্প কুঁজো হয়ে, সামান্য ছেঁড়া চটি টেনেটেনে চলতে হবে।

“মনে রাখবি, প্রত্যেক ছেঁড়া চটির নিজস্ব একটা আওয়াজ আছে। তোর কাজ হচ্ছে নিজের সিগনেচার আওয়াজ তৈরি করা, যাতে সেই আওয়াজ শুনেই ধাবাশুদ্ধু লোক বুঝতে পারে ওঠে যে এইবার কুন্তলা এন্ট্রি নিচ্ছে।’

আমি ভয়ানক নিষ্ঠাভরে গোটা সেমেস্টার ধরে প্রবল খেটেখুটে নিজের চটির সিগনেচার সাউন্ড তৈরি করলাম। কিন্তু বিধি বাম। ডিসেম্বরের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে প্রথমদিন যেদিন বিকেলবেলা মায়ের সঙ্গে স্টেশনরোডে বেড়াতে বেরোলাম, সেদিনই সে সাউন্ডের সলিলসমাধি হয়ে গেল।

মা বললেন, “ওটা আবার কী রকম হাঁটা হচ্ছে সোনা?”

আমি বললাম, “লোড নিও না মা, এই নাও চুয়িংগাম খাও।” বলে পার্স থেকে ফস করে দুটো চুয়িংগাম বার করে একটা মায়ের দিকে এগিয়ে দিলাম, অন্যটা নিজে মুখে পুরে চ্যাকরচ্যাকর করে চিবোতে লাগলাম।

পরের অংশটুকু আর বলছি না।

যাই হোক। আজকের পোস্টের বিষয়, বডি ল্যাংগোয়েজ। এ বিষয়টাও আমার জে এন ইউ-তেই শেখা। হোস্টেলের অর্ধেক মেয়ে আই এ এস-এ বসছিল, কাজেই আশেপাশে কমপিটিশন সাকসেসের অভাব ছিল না। আমি পূর্ণার থেকে কসমোপলিট্যান আর রীতুদির কাছ থেকে কম্পিটিশন সাকসেস ধার করে পড়তাম। কসমোপলিট্যানের এ মলাট থেকে ও মলাট পর্যন্ত জীবনের নানা জরুরি বিষয়ে টিপ্‌স্‌ ঠাসা থাকত, আর কম্পিটিশন সাকসেসের একমাত্র পড়ার মতো জিনিস ছিল এই বডি ল্যাংগোয়েজ। গোড়ালির অ্যাংগেল কিংবা ভুরুর অবস্থান দেখে মানুষবিচার করার অব্যর্থ টোটকা।

ঠাট্টা করে লিখছি বলে ভাববেন না বডি ল্যাংগোয়েজ শাস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই। খুবই আছে। আমি বিশ্বাস করি একটা লোকের হাঁটাচলাতাকানো, হ্যান্ডশেক করা কিংবা বকদেখানো দেখে তার সম্পর্কে অনেককিছু বলা যায়। জেনোটাইপ-ফেনোটাইপ থেকে শুরু করে সমাজের পাওয়ার স্ট্রাকচারে লোকটার অবস্থান, সবকিছু।

ব্যাপারটা আমার কাছে ভয়ানক ইন্টারেস্টিং। ম্যান-সিটিং বলে একটা ব্যাপার আছে জানেন? কলকাতা শহরের শেয়ার-অটোতে চেপে থাকলে নির্ঘাত জানেন। পাশাপাশি দুটো লোক বসে আছে, একজনের দুই হাঁটু জায়গার অভাবে ঠোকাঠুকি, আরেকজন ঠিক ওই পরিস্থিতিতেই দুই হাঁটু দুদিকে যতখানি ছড়ানো যায় ততখানি ছড়িয়ে বসে আছে। যেন অটোটা ওনার পৈতৃক সম্পত্তি।

আপনারা নিশ্চয় সবাই মানবেন যে ম্যান-সিটিং-এর প্রবণতা, উয়োম্যানদের থেকে ম্যানেদের অনেক বেশি। কিন্তু কেন? এটা কি শুধু এই কারণেই যে ছোটবেলা থেকে সচ্চরিত্র মেয়েদের মাঠাকুমারা পইপই করে দুই পা জোড়া করে বসতে শিখিয়েছেন আর ছেলেদের সেটা শেখানো হয়নি, কারণ কে না জানে, চরিত্র ধুয়ে ছেলেদের জল খেতে হয় না?

ব্যাপারটা এত সাদাকালো নাও হতে পারে, জানেন। বরং এইটা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি, যে আমরা সবাই পরিস্থিতি বিশেষে ‘ম্যান’ কিংবা ‘উয়োম্যান’। অর্থাৎ যে লোকটা অটোতে মরে গেলেও চেপে বসবে না, সেই হয়তো আর তিরিশ মিনিট বাদে বসের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁটুতেহাঁটুতে ঠোকাঠুকি খাবে। আমি হয়তো বালিগঞ্জ ফাঁড়ি টু যাদবপুর থানা রুটের অটোতে (এরকম কোনও রুট আছে কি না আমি জানি না, আন্দাজে লিখছি, ভুল হলে রাগ করবেন না) সুবিধে করতে পারছি না, কিন্তু এই আমাকেই লালগোলা প্যাসেঞ্জারে গরিব চাষির পাশে বসিয়ে দিলে আমি কী মূর্তি ধরব, কে বলতে পারে?

সবটাই পাওয়ারের খেলা, তাই না?

কিন্তু সে কথা আমরা সবাই অলরেডি জানি, ওতে ইন্টারেস্টিং কিছু নেই। আসল ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হচ্ছে যে যদি আমরা সবাই ম্যান-সিটিং প্র্যাকটিস করি, তাহলে কী হবে সেইটা দেখা।

এ জিনিস আদৌ প্র্যাকটিস করা যায় কি না, করেও মোক্ষলাভ কিছু হয় কি না সে সব নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা ঘামান। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের শিক্ষিকা Amy Cuddy অন্তত বিস্তর ঘামিয়েছেন। নিচের টেড টক ভিডিওটাই তার সাক্ষী।

পারলে পুরোটা শুনবেন, প্লিজ।  




February 27, 2013

লিংকন না কাই পো চে?




উৎস গুগল ইমেজেস

গত সপ্তাহে আমি একটা অত্যাধুনিক গান শোনার যন্ত্র উপহার পেয়েছি। ওই যে যেসব যন্ত্রগুলো কানে গুঁজে চললে পৃথিবীর বাকি লোকের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা যায়, চেনাঅচেনা কারও চোখের দিকে তাকাতে হয় না, চোখেমুখে বেশ একটা কঠিন কুলনেস ফুটিয়ে চলাফেরা করা যায়, এবং আনমনা হয়ে বড়রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়িচাপা পড়ে মরবার সমস্ত রাস্তা পরিষ্কার হয়, সেই রকম একটা যন্ত্র।

খুশিতে ডগমগ হয়ে হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা যেই নিয়েছি, দোকানদার বললেন, “ওহো দাঁড়ান দাঁড়ান, এর সঙ্গে একটা ফ্রি জিনিসও তো আছে।”

আমি রুদ্ধশ্বাসে ফ্রি জিনিসটার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। আসলের থেকে সুদের আদর সবসময়েই বেশি। দোকানি ড্রয়ার খুলে ক্রেডিট কার্ডের মতো দেখতে কী একটা জিনিস বার করে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। খুলে দেখি সেটা পি ভি আর সিনেমার একটা পাঁচশো টাকার কুপন।

আনন্দে আমার শুধু নাচতে বাকি ছিল।

সিনেমা দেখতে আমার ভীষণ ভালোলাগেআর তার থেকেও বেশি ভালোলাগে হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে। শেরাটনে খাওয়া নয়, ব্যাংকক পাটায়া ঘোরা নয়, ফেসবুক খুঁজেখুঁজে সৃজিত-চন্দ্রিল-সুমন-রূপমকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোও নয়---ছায়াছায়া হলে বসে পপকর্ন আর ডায়েট সোডা খেতে খেতে বড়পর্দায় সুন্দরসুন্দর হিরোহিরোইনদের হাসিকান্নানাচনকোঁদন দেখা আমার ফেভারিট টাইমপাস।

আপনারা কেউ কেউ নির্ঘাত ভাবছেন, ভালো লাগে তো গেলেই পারো।

কিন্তু যাওয়াটা অত সোজা নয়। প্রথমত, অটো ধরতে হবে। অটো ধরাও যা, অটোওয়ালার পায়ে ধরাও তাই। যদিও পায়ে ধরলেই যে কার্যসিদ্ধি হবে তা নয়। অটোওয়ালার মেজাজ খুশ থাকতে হবে, আমাদের কপাল ভালো থাকতে হবে, এবং মিটারের থেকে অন্তত কুড়ি টাকা বেশি দিতে রাজি হতে হবে। এই ত্র্যহস্পর্শ যোগ হলে তবেই সিনেমাহলে পৌঁছনো যাবে। 

কিন্তু শুধু পৌঁছলেই তো হবে না, ঠেলাঠেলি করে টিকিটও কাটতে হবে। মাইলখানেক লম্বা লাইন দিয়ে কাউন্টারের সামনে পৌঁছে, টিকিটের দাম শুনে অজ্ঞান হয়ে গেলে চলবে না। পরের লোক সেই সুযোগে লাইন ভেঙে সামনে চলে আসবে। টিকিট হাতে নিয়ে, সারা অঙ্গে সিকিউরিটির থাবড়ানি সয়ে, পপকর্ন আর ডায়েট সোডা কিনতে গিয়ে আরেকপ্রস্থ নাকানিচোবানি খেতে হবে। যতই অবিশ্বাস্য হোক না কেন, মেনে নিতে হবে যে পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কারও কাছেই খুচরো নেই। কখনওই থাকে না। এতসব করে যদিও বা হলে ঢোকা গেল, সিনেমা চলার পুরো সময়টা ধরে কারও না কারও ফোন বাজতে থাকবে, এবং তাঁরা সেই ফোনগুলো রিসিভ করে কথা বলবেন। বলবেন, “রাইট নাউ আই অ্যাম ইন আ সিনেমা, আই উইল কল ইউ লেটার।”

আমি সত্যি একদিন একজনকে সিট ছেড়ে উঠে গিয়ে জিজ্ঞাসা করব যে এঁরা ঠিক কতখানি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকেন, যে দু’ঘণ্টা ফোন না ধরলে চলে না?

যাক গে, যা বলছিলাম। একসময় লোকের কথা বলা শেষ হবে, সিনেমাও। হল থেকে বেরিয়ে হয় আমার ব্রেনে ঘোর লেগে থাকবে, বেশ কিছুক্ষণ বাস্তবের মাটিতে পা পড়বে না, নয় মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত রাগে জ্বলে যাবে। দুটো প্রতিক্রিয়ারই পরিণতি একটাই, পেট চোঁ চোঁ করা খিদে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় যতই শপথ করে বেরোই না কেন যে ফিরে এসে ফ্রিজে রাখা পালংশাকের ঘণ্ট আর মুগডাল দিয়ে ভাত খাব, সিনেমা দেখে বেরোনো মাত্র সে শপথ খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে।

মনে হবে, এইটুকু তো মোটে জীবন, পালংশাক খেয়ে টাকা জমিয়ে সে জীবন মাটি করার কোনও মানে আছে?

কাজেই সদিচ্ছায় জল ঢেলে, খিদের মাপ বুঝে হয় কফি নয় কাবাবের দোকানে ঢুকে আরও একগাদা সময় আর টাকা গচ্চা দিতে হবে। খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে, অটোওয়ালার সঙ্গে আবার আরেকপ্রস্থ যুদ্ধ সেরে যখন বাড়ি ফিরব, তখন আমার মাথার আরও গোটাদশেক চুল পেকে গেছে। আর আমি আরও খানিকটা গরিব হয়ে গেছি।

তবু আমার শিক্ষা হয় না। তবু পরের সপ্তাহান্ত এলেই বুকের ভেতরটা “সিনেমা যাব, সিনেমা যাব” করে লাফাতে থাকে।

এ সপ্তাহে আরও বেশি করে নাচছে, কারণ ওই কুপন। কর্তৃপক্ষের ঘাড় ভেঙে সিনেমা দেখার উত্তেজনায় মাটিতে পা পড়ছে না। কাউন্টারে পৌঁছে যখন টিকিট কাটব, ওপারের স্যুটপরা কর্মচারী টাকার অংকটা বলবেন, আর আমি ফস্‌ করে কুপনটা বার করে কাঁচের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দেব, তখন তাঁর মুখটা কেমন চুপসে যাবে, সে কল্পনা করেই ক্ষণেক্ষণে শিহরণ হচ্ছে।  

বুঝতেই পারছেন, এত স্বপ্নের কুপন আমি যেমনতেমন করে নষ্ট করতে চাই না। সেটা যাতে না হয়, সে জন্য আমার একমাত্র ভরসা আপনারা।

আমার অপশন আছে দুটো, এক লিংকন, দুই কাই পো চে। দুটো সিনেমাই আমি দেখব, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কুপন দিয়ে কোন সিনেমাটা দেখব। আর এই সিদ্ধান্তটা নিতে আমাকে সাহায্য করবেন আপনারা---যাঁরা দুটো সিনেমাই দেখেছেন, যাঁরা একটা দেখেছেন, যাঁরা কোনওটাই দেখেননি কিন্তু সিনেমাদুটোর সম্পর্কে ধারণা আছে---সবাই।

আপনি আমার জায়গায় থাকলে কোনটা দেখতেন?

এই আমি আপনাদের পরামর্শের পথ চেয়ে বসে রইলাম, মনে থাকে যেন।
     

February 26, 2013

সমত্বদর্শন

জোলার গল্প


-মা, একটা গল্প বল না।

-এক দেশে মালতী নামের এক মেয়ে ছিল।

-না না, মালতীর গল্প বিচ্ছিরি, অন্য গল্প বল।

-আচ্ছা, এক দেশে দুই বন্ধু ছিল। তাদের একজনের নাম সেরিবা আর আরেকজনের নাম সেরিবান।

-তারা মাথায় ঝুড়ি চাপিয়ে বাসনকোসন ফেরি করে বেড়াত, আর সেরিবা যেমন বদমাশ ছিল, সেরিবান তেমন ভালো লোক ছিল। ও গল্পটাও আমার মুখস্থ আছে। নতুন গল্প বল।

-উম্‌ম্‌ম্‌, আচ্ছা শোন্‌। অনেককাল আগে এক দেশে এক বোকা জোলা ছিল।

-জোলা কী?

-মুসলমান তাঁতিকে জোলা বলে। এটাও জানিস না? রামোঃ।

-আচ্ছা আচ্ছা, তারপর সেই জোলার কী হল বল।

-জোলা একদিন বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে...

-কোথায়?

-সে আমি কী জানি, যাচ্ছে কোথাও একটা। হয়তো মহাজনের থেকে টাকা ধার নিয়েছিল, শোধ দিতে যাচ্ছে। কিংবা রাজবাড়িতে রানিমার মসলিন শাড়ির অর্ডার সাপ্লাই দিতে যাচ্ছে।

-তারপর?

-বন বেশি বড়ও নয়, আবার বেশি ছোটও নয়। এই ধর্‌ মাঝারি সাইজের। হেঁটে পেরোতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। জোলা সেদিন সকালে উঠে বউকে বলল, “বউ, আমাকে কয়েকটা পিঠে বানিয়ে দিয়ো তো, যদি পথে যেতে যেতে খিদে পায় তো গাছের তলায় আরাম করে বসে খাব।” বউ আকাশ থেকে পড়ে বলল, “ওমা, এইটুকু তো পথ, যাবে আর আসবে। এর মধ্যে আবার টিফিন লাগবে নাকি?” জোলা কিছু না বলে গম্ভীর মুখে ব্যাগ গোছাতে লাগল। জোলার বউও আর কথা না বাড়িয়ে গজরাতে গজরাতে যেমনতেমন করে চারটে গোলারুটি বানিয়ে পুঁটলি বেঁধে জোলার ব্যাগে পুরে দিল।

-গোলারুটি কী মা?

-সেকি রে? গোলারুটি খাসনি কখনও? আচ্ছা সামনের শনিবার তোকে টিফিনে দিয়ে দেব। দারুণ খেতে। গোল গোল, মিষ্টি মিষ্টি।

-আচ্ছা, তারপর কী হল?

-হ্যাঁ। জোলা তো স্নানটান করে, ভাতটাত খেয়ে, টিফিনবাক্স ব্যাগে মনে করে ঢুকিয়েছে কিনা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখে, খুশি হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বনের পথ ধরল।

-জোলাটার ভয় করল না?

-আরে ধুর, বন নামেই বন, বাঘভালুকও নেই, চোরডাকাতও না। দিব্যি গাছেগাছে পাখি ডাকছে, ডালেডালে ফুল ফুটেছে, চারদিক আলোয় ভেসে যাচ্ছে। জোলা মহাফুর্তিতে হাঁটছে হাঁটছে, হঠাৎ সিকিভাগ পথ পেরোনোর পর......সিকি মানে কী বল্‌ দেখি?

-পঁচিশ পয়সা, মা?

-গুড। তবে সিকির আসল মানে একের চার ভাগ। এক টাকায় একশো পয়সা, আর একশোকে চার দিয়ে ভাগ করলে হয় পঁচিশ। তাই পঁচিশ পয়সাকে সিকি বলে। হ্যাঁ, যা বলছিলাম। গোটা বনটাকে চারভাগ করলে যতটা হয়, তার একভাগ পথ পেরিয়ে এসে জোলার হঠাৎ কেমন কেমন মনে হতে লাগল।

-মাআআআ, ভূতের গল্প কেন বলছওওওও?

-আঃ সোনা, ঘোর সকালে ভূত আসবে কোত্থেকে। আসলে জোলাটা ছিল ভীষণ পেটুক। একথালা ভাত খেয়েছে এই মিনিটকুড়ি আগেই, কিন্তু মনেমনে যেহেতু জানে যে ব্যাগের ভেতর গোলারুটি আছে, তাই তার কেবলি মনে হতে লাগল, উফ্‌ কতটা পথ রোদ্দুরে হেঁটে ফেললাম, এখন একটু কিছু পেটে না পড়লে আর চলছে না।

-হি হি।

-যেই না ভাবা, অমনি জোলা একটা গাছের তলায়, ফর্সা একটুখানি মাটি দেখে বাবু হয়ে বসে কাঁধের ব্যাগ থেকে টিফিনবাক্স বার করল। তারপর সেই টিফিনবাক্স খুলে একখানা নরম দেখে গোলারুটি হাতে তুলে, চক্ষু মুদে, ইয়াব্বড় দুই কামড়ে রুটিখানা পেটে পুরে ফেলল।

-হি হি হি।

-একটা রুটি খেয়েও তার শখ মিটল না। টপ করে আরেকটা রুটি তুলে গপগপ করে খেয়ে ফেলল। খেয়ে ফেলেই তার ভয়ানক আফসোস হল। ইস, এখনও কতটা পথ যেতে হবে, দুটো রুটি অলরেডি ফুরিয়ে গেল। যাওয়ার বাকি পথটুকু আর ফেরার পুরো পথটুকু মাত্র দুটো রুটি দিয়ে তাকে চালাতে হবে। ভাবতেই বউয়ের ওপর জোলার ভয়ানক রাগ ধরে গেল। কিপটে বউ, হাত খুলে একটু গোলারুটি পর্যন্ত টিফিনে দিতে পারে না।

-তারপর কী হল?

-জোলা বিরসবদনে টিফিনবাক্স ব্যাগে পুরে, ব্যাগ কাঁধে ফেলে হাঁটতে শুরু করল। যত হাঁটে, রোদ যত বাড়ে, জোলার রাগ তত চড়ে। আর রাগ হলেই খিদে পায় জানিস তো?

-কই আমার তো পায় না?

-বড় হলে পাবে, দেখবি। শেষে খিদের চোটে জোলা আর এক পাও চলতে পারল না, রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে টিফিনবাক্স খুলে আরও একটা রুটি বার করে হাঁউমাঁউ করে খেয়ে ফেলল। কিন্তু...

-আমি জানি আমি জানি তারপর কী হল...

-কী হল বল্‌ তো?

-এই তিননম্বর রুটিটা খেয়েও জোলার রাগ পড়ল না, তখন ও বাকি রুটিটাও হালুমহুলুম করে খেয়ে ফেলল।

-ভেরি গুড। উফ্‌ আমার সোনার কী বুদ্ধি। কিন্তু যেই না খাওয়া অমনি জোলার পেট এমন ভরে গেল যে জোলা আর একটি পাও চলতে পারল না। তখন সে ওই বনের মধ্যেই ধপাস্‌ করে বসে পড়ে হাত পা ছড়িয়ে, জলহস্তীর মতো হাঁ করে, ভ্যাঁ কান্না জুড়ল।

-কাঁদল কেন মা?

-কেন বুঝতে পারছিস না তো?

-উঁহু।

-জোলাটা হাপুসনয়নে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, ইস্‌স্‌ আমি কী বোকা, আগের রুটিগুলো খেয়ে আমার একটুও পেট ভরল না, যেই এটা খেলাম অমনি ভরে গেল। আমি যদি বুদ্ধি খাটিয়ে এই রুটিটা আগে খেতাম তাহলে আমার পেটও ভরে যেত, আর বাকি রুটিগুলোও বাজে খরচ হত না, ভ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ......ব্যস গল্প শেষ। এবার ঘুমোও সোনা, অনেক রাত হয়েছে।

*****

আজ যখন মার্কেটের মুখে অটো থেকে এসে নামলাম, তখন আমার অবস্থা প্রায় জোলারই মতো। খিদে পাওয়ার কোনও কারণ নেই, বেলা চারটের সময়ই পার্লে জি দিয়ে চিকুর বানানো কফি খেয়েছি, অথচ খিদের চোটে মাথা ঘুরছে। মা থাকলে বলতেন, এ হল দুষ্টুখিদে। এ খিদে জব্দ করার উপায় হচ্ছে, এক বড় গ্লাস দুধে কমপ্ল্যান গুলে মুখের সামনে এনে ধরা। খিদের ঠাকুরদারও টিকিটি ত্রিসীমানায় দেখা যাবে না আর।

আমার কপাল খারাপ, আর দুষ্টুখিদের কপাল ভালো যে দুধের গ্লাস হাতে মা সামনে দাঁড়িয়ে নেই। উল্টে মার্কেটের এদিকেওদিকে ঝালমুড়ি, ফুচকা, ঘুগনি, রোল নিয়ে সবাই উদগ্রীব হয়ে যেন আমার অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছে।

অটোতে বসেই আলুকাবলির কথা মনে পড়ে জিভে জল এসে যাচ্ছিল, কাজেই আমি প্রথমে সেদিকেই পা বাড়ালাম। দেখি ফুচকাওয়ালা এক ব্যাচ ফুচকা দেওয়া সবে শুরু করেছেন, সে সবের পাট চুকিয়ে আলুকাবলি বানিয়ে আমাকে দিতে দিতে তাঁর ঢের দেরি আছে। আমি আর তর সইতে না পেরে ফুচকার লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম।

ফুচকা খাওয়া হল। আলুকাবলিও বাদ পড়ল না। কিন্তু দুষ্টুখিদে তখনও ভুরু কুঁচকে, বুকের ওপর দুইহাত কাটাকুটি করে দাঁড়িয়ে পায়ে তাল ঠুকছে। আমি আমতাআমতা করছি দেখে সে আমার কান ধরে গোপালের রোল কর্নারের সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল।

আর যেই না আমি এগরোলটা শেষ করে টিস্যু দিয়ে মুখটুখ মুছে সেটাকে মুড়িয়ে তাক করে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলেছি, অমনি দেখতে দেখতে আমার পেট ভরে প্রায় জয়ঢাক হয়ে উঠল। আমি আর ওইটুকু পথ হেঁটে বাড়ি ফিরতে পারি না। কোনওমতে নিজেকে টেনেহিঁচড়ে, সিগন্যালমিগন্যাল ভেঙে, গাড়ি চাপা পড়তেপড়তেও বেঁচে গিয়ে বাড়ির গলিটায় ঢুকে আমার লক্ষকোটি বছর আগে শোনা জোলার গল্পটা মনে পড়ে গেল। এগরোলটা আগে খেলেই হত, ফুচকা আর আলুকাবলিটা মিছিমিছি খেয়ে পেটের বারোটা বাজাতে হত না।

ভেবে আমার অত কষ্ট আর হাঁসফাঁসের মধ্যেও ভীষণ জোরে হাসি পেয়ে গেল। হাসিহাসি মুখে দরজার তালা খুলে ঢুকতে গিয়ে একটাই আফসোস হচ্ছিল। মা আমাকে সেদিন অমন সুন্দর জোলার গল্পটা শুনিয়েছিলেন, আর আজ সেই গল্পটার এমন সুন্দর, লাগসই উদাহরণ পেয়েও আমি গল্পটা তাঁকে শোনাতে পারব না।
  

February 25, 2013

The Oscars 2013: Best Picture Nominees as Pie Charts

Dis or Dat




অজর না অমরঃ অজর

কিনলে না বিসলেরিঃ বিসলেরি

দুরন্ত না রাজধানীঃ রাজধানী

টাইগার না পার্লে জিঃ পার্লে জি

পিং না ফোন কলঃ ফোন কল

পাখির খাঁচা না অ্যাকোয়ারিয়ামঃ হুম্‌ম্‌, অ্যাকোয়ারিয়াম

আত্মবিশ্বাসী+অ্যারোগ্যান্ট না ভীতু+ভদ্রঃ ভীতু+ভদ্র

বোকা বন্ধু না বুদ্ধিমান শত্রুঃ বুদ্ধিমান শত্রু

সাইক্লিং না সাঁতারঃ সাইক্লিং

সালসা না গুয়াকামোলেঃ সালসা

পাণ্ডা না পেঙ্গুইনঃ কুং ফু পাণ্ডা!

স্নেক না সলিটেয়ারঃ স্নেক

হট না রিচঃ রিচ

রিচ না ফেমাসঃ ফেমাস

ঝলমলে রিসর্ট না ছমছমে ডাকবাংলোঃ ছমছমে ডাকবাংলো

ফিক্সড ডিপোজিট না মিউচুয়্যাল ফান্ডঃ ফিক্সড ডিপোজিট। এস বি আই-এ হলেই সবথেকে ভালো।

রিওয়াইন্ড না পজঃ পজ

না-ভেবে-বলা না না-বলে-ভাবাঃ না-বলে-ভাবা

ভালোবাসার-কাজে-অন্যদের-থেকে-খারাপ-হওয়া না খারাপলাগার-কাজে-অন্যদের-থেকে-ভালো-হওয়াঃ খারাপলাগার-কাজে-অন্যদের-থেকে-ভালো-হওয়া

ডিপ্রেশন না ডায়েরিয়াঃ ডায়েরিয়া

গেঁটেবাত না অ্যালজাইমারঃ গেঁটেবাত

মহাকাশচারী না ভূ-পর্যটকঃ ভূ-পর্যটক

আইটেম সং না ভক্তিগীতিঃ ভক্তিগীতি

রোম না প্যারিসঃ রোম

পিয়ার্স ব্রসন্যান না ড্যানিয়েল ক্রেগঃ পিয়ার্স ব্রসন্যান

বার্ধক্য না বয়ঃসন্ধিঃ বার্ধক্য

কোক না ক্যাপুচিনোঃ কোক। জিরো হলে বেস্ট, না হলে ডায়েটেই কাজ চালিয়ে নেব।

ক্যাশ না ক্রেডিটঃ ক্যাশ

পাগল না মাতালঃ পাগল

প্লাস না মাইনাসঃ মাইনাস

February 23, 2013

সাপ্তাহিকী




কালাহারির পাখির বাসা।



সারা বিশ্বের আমলারা। 

শুধু সার্ফ করলেই চলবে? নিয়মকানুন জানতে হবে না?


এ সপ্তাহের গান এই রইল।  কেমন লাগল জানাবেন। সোমবার আবার দেখা হবে। ততদিন ভালো হয়ে থাকবেন। 

February 21, 2013

জিনের খেলা


জিনের খেলা, যতবারই দেখি না কেন, নতুন করে চমকে যাই। ওই লিকপিকে ডি এন এ-র প্যাঁচেপ্যাঁচে যে অতখানি শয়তানি আঁটা থাকতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস হয় না।

কিন্তু আজ সকালে অফিসের গেটের মুখে এসে যখন ট্যাক্সিটা ঘ্যাঁচ করে থামল, আর আমি ব্যাগের ভেতর এদিকওদিক হাতড়ে বুঝলাম যে মানিব্যাগটা চুপটি করে বাড়িতে টেবিলের ওপরেই শুয়ে আছে, আমি তাড়াহুড়ো করে ওকে ফেলে রেখে বেরিয়ে যাচ্ছি দেখেও স্রেফ শত্রুতা করেই আমার পিছু ডাকেনি, তখন বিশ্বাস করতেই হল।

বিশ্বাস করতে হল যে সময় তিরিশ বছর এগোলেও, রিকশার জায়গায় ট্যাক্সি, রিষড়ার জায়গায় দিল্লি এমনকি শাড়ির জায়গায় স্কিনি জিন্‌স এসে ঘাড়ে চাপলেও---আমি হুবহু আমার মায়ের মেয়ে রয়ে গেছি।

আমার মা, নিয়মিত পার্স ভুলে বাড়ি থেকে বেরোতেন, তারপর স্টেশনের পাশে কেষ্টদা’র দোকান থেকে বাসভাড়া ধার নিয়ে অফিস যেতেন। অফিস থেকে ফেরার সময় আবার যোগমায়ামাসির থেকে ফিরতি বাসভাড়া ধার নিতে হত।

আমি তো মরমে ট্যাক্সির সিটের সঙ্গে মিশে গেলাম। ট্যাক্সিওয়ালা একে ভীষণ ভদ্র, তার ওপর মুখচেনা। তিনি আমার থেকেও বেশি লজ্জা পেয়ে বললেন, “আরে কোই বাত নেহি ম্যাডাম, শামকো লে লেঙ্গে।”

কেষ্টদাও মা’কে ঠিক এভাবেই বলতেন। কাঠের ড্রয়ার টেনে টাকা বার করে মায়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বলতেন, “তাড়াতাড়ি যান গিয়া, তারকেশ্বর অ্যানাউন্স কইর‍্যা দিসে।”

আশ্চর্য কি না বলুন?

যত বুড়ো হচ্ছি, আশ্চর্য হওয়ার পরিমাণও তত বাড়ছে। এই সেদিন বান্টির সঙ্গে তর্ক করতে গিয়ে একটা চরম পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট মন্তব্য করে ফেলেই থতমত খেয়ে চুপ করে গিয়েছিলাম। বান্টি ভীষণ খুশি হয়ে মাথা নেড়ে বলল, “ছি ছি কুন্তলাদি, এত করে শেষে কি না এই? অ্যাঁ?” আমি বান্টির কথায় যত না লজ্জা পেলাম, অবাক হলাম তার থেকে একশোগুণ বেশি। মনে পড়ে গেল, আজ থেকে বছর পনেরো আগে যখন আমার রক্তে আইডিয়ালিজমের ঢেউ খেলত, তখন ঠিক এই গোত্রের একটা আলটপকা মন্তব্য করার জন্য আমি আমার বাবার সঙ্গে তিনদিন কথা বলিনি।

বাবামায়ের আরও কত ছায়া যে নিজের মধ্যে দেখতে পাই আজকাল। সত্যজিৎ রায় বা মাদাম কুরির সন্তান হয়ে না জন্মালে তো কারওরই নিজের পিতামাতা রোল মডেল হয় না, আমারও হয়নি। বরং ওই ছাঁচটা থেকে বেরোনোর একটা সক্রিয় চেষ্টা সবসময় ছিল। আমার বাবামা কিন্তু নিজেদের নিয়ে মোটেই দুঃখী ছিলেন না। তাঁরা খোশমেজাজে লোকাল ট্রেনেবাসে ধাক্কাধাক্কি করে অফিস যেতেন, অফিস থেকে এসে দূরদর্শনে নিউজ শুনতেন, শনিরবিবার আমাকে ট্যাঁকে গুঁজে সোদপুর কিংবা বেলঘরিয়ায় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে লৌকিকতা সারতে যেতেন।

কিন্তু আমি ওই জীবনটাকে দেখে মনে মনে নাক কোঁচকাতাম। নিজের কাছে শপথ নিতাম, ওঁরা দশটা-পাঁচটা টেবিলে বসে কলম পিষছেন, আমি মরে গেলেও পিষব না। আমি হাতির পিঠে চেপে রেনফরেস্টে ঘুরব। ওঁরা রুটি বাঁধাকপি খেতে খেতে খবর শোনেন, আমাকে নিয়ে খবর তৈরি হবে। ওঁরা বোরিং, নন-ইন্টেলেকচুয়াল স্বজনবন্ধুর সঙ্গে সপ্তাহের পর সপ্তাহ নিম্নচাপ আর মুদ্রাস্ফীতির লেবু কচলে চলেছেন, আমার আশেপাশে কেবল সেসব লোকই থাকবে যারা পোস্টমডার্নিজমটা জাস্ট বোঝে।

এখন পোস্টমডার্ন লোকজনের নাম শুনলেই আমার হৃৎকম্প হয়। তাদের সঙ্গে আড্ডা মারা তো দূরের কথা।

পার্স ভুলে যাওয়ার ঘটনাটা ঘটার পর মা’কে ফোন করে এই কথাগুলো বলছিলাম। ভয়ভয় করছিল, শুনে হয়তো মায়ের মনখারাপ হবে, ওঁর মধ্যবিত্ত ছাপোষা জীবনটাকে আমি একসময় হেলাছেদ্দা করতাম জেনে হয়তো আঘাত পাবেন।

মা সেসবের ধার দিয়ে গেলেন না। প্রথমেই মানিব্যাগ ফেলে অফিস চলে যাওয়ার জন্য একচোট বকলেন। বললেন, “ধীরস্থির হও সোনা। না হলে কিছুই হবে না।”

আমি বললাম, “সে না হয় হব। কিন্তু বিশ্বাস কর মা, আমি এখন তোমাদের জীবনটাকে আর একটুও করুণা করি না। কারণ ছোটখাট ডিটেল্‌স্‌ বাদ দিলে, আমার জীবনটাও ধীরেধীরে অবিকল তোমাদের মতোই হয়ে যাচ্ছে। আর তাতে আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না। বরং একটা অদ্ভুত স্বস্তি পাচ্ছি।”

মা হেসেই উড়িয়ে দিলেন। বললেন, এটাই নাকি জগতের নিয়ম। ষোল বছর বয়সে প্রথমবার ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ পড়ে নাকি মায়েরও দিদিমার কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস পড়েছিল। দিদিমা যে কলেজে পড়েননি, তাঁর মাথায় যে নারীবাদের এমন কঠিন কথা কস্মিনকালেও ঢুকবে না। দিদিমার যে বেঁচে থাকা ষোলআনাই ফাঁকি।

শুনে আমার একটু শান্তি হল। মা-ও দিদিমাকে মানুষ মনে করতেন না, আমিও আমার মা’কে করি না। অথচ আমাদের জীবনগুলো কি অদ্ভুতভাবে হাঁসের ছানার মতো একে অপরের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে লাইন বেঁধে দুলে দুলে এগিয়ে চলেছে।

ভেবে হঠাৎ আমার খুব মজা লাগল, আর একটুও অপরাধবোধ রইল না।


উৎস গুগল ইমেজেস

শহুরে কুইজের উত্তর


এইখানে। 


February 20, 2013

শহুরে কুইজ




সিনেমাগ্রাফঃ Jamie Beck

শোনো বন্ধু শোনো...প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা...

ইতিকথা আমি বলব, শহরের নাম আপনারা বলবেন। রাজি?

লেগে পড়ুন। আপনার হাতে সময় আছে মোটে একটা গোটা দিন। এই এখন থেকে শুরু করে কলকাতায় বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টা, আর ক্লিভল্যান্ডে বুধবার রাত তিনটে পর্যন্ত। কমেন্টস্‌ ততক্ষণের জন্য আমি পাহারা দেব।

অল দ্য বেস্ট।

*****

১. একটি নদী, একটি সবুজ পার্ক, আগুন হাতে একটি সবুজ নারী, পাহারারত দুটি সিংহ—যাদের একটির নাম ধৈর্য, অন্যটির তিতিক্ষা, পাঁচটি বরো, কিং কং।

২. ২০,০০০,০০০ লোক। প্রায় ততগুলোই সাইকেল। এককালে এই শহরের নাম ছিল দাদু। সত্যি বলছি। সিনেমার নামও বলতে হবে? ওকে। বিদায়, পরিচিতা।  

৩. গনগনে আগুন, প্যানপেনে বেহালা।

৪. আকাশভরা মেঘ, মিনারভরা ডানাছাঁটা দাঁড়কাক, কালো ভালুকের চামড়ার টুপি পরা প্রহরী, খুনে নাপিত।

৫. বিপ্লবের জন্মভূমি, দশহাজার ডুবো গাছের গুঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সৌধ, ইতিহাসের দীর্ঘতম অবরোধের সাক্ষী, গভীর রাতের গোধূলি, ক্যাথরিন।

৬. আইনস্টাইনের কোলে বসে ছবি তোলার শখ হয়েছে? তাহলে এই শহরে আসা ছাড়া গতি নেই।

*****

সময় শেষ। এই রইল কুইজের উত্তর। সকল অংশগ্রহণকারীকে আমার অনেক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন।

১. নিউ ইয়র্ক সিটি
২. বেজিং
৩. রোম
৪. লন্ডন
৫. সেন্ট পিটার্সবার্গ। এটা অনেকেই ভুল করেছেন। তবে যাঁরা মস্কো লিখেছেন, তাঁরা এতই কাছাকাছি গেছেন যে সেটাকে আর ভুল বলে না ভাবলেও চলবে।
৬. ওয়াশিংটন ডি সি
   

February 19, 2013

IQ



-heizusan

Things I am Loving


১. তালাশ সিনেমায় রাম সম্পথের সংগীত। সিনেমাটা হলে গিয়ে দেখেছি, রানি মুখার্জিকে দেখে মুগ্ধ হয়েছি, লাস্ট সিনে করিনা কাপুরের ভূত মৎস্যকন্যা হয়ে এসে আমির খানের প্রাণদান করছে দেখে হোহো করে হেসেওছি, কিন্তু এতসব করতে গিয়ে গানগুলোর দিকে আর ঠিক করে নজর দেওয়া হয়নি। তারই প্রায়শ্চিত্ত করতে এখন সারাদিনরাত সে গান কানের ভেতর লুপে বাজছে। চেনা লোকেরা আমার আদিখ্যেতা দেখে ঠোঁট বেঁকাচ্ছে। বলছে এর থেকে ভালো কত গান তো হয়েছে হিন্দি সিনেমায়, আরও কত হবে। হয়তো ঠিকই বলছে, কিন্তু আমার এতেই মন মজেছে। রাম সম্পথের নিজের গলায় “লাখ দুনিয়া কহে” আর সোনা মহাপাত্র এবং রবীন্দ্র উপাধ্যায়ের দ্বৈতকণ্ঠে “জিয়া লাগে না” বিশেষ করে ছুঁয়ে গেছে। আপনারা নিশ্চয় গানগুলো শুনে ফেলেছেন, তবুও একটা গানের লিংক নিচে দিলাম।



২. আমাদের পাড়ার দোকানে চায়ের সঙ্গে যে বিস্কুটটা দেয় সেটা। কোনওদিন গোল হয়, কোনওদিনও আয়তাকার কিংবা বর্গক্ষেত্র, কিন্তু প্রত্যেকদিনই সমান ভালো খেতে লাগে। কালোজিরে দেওয়া, ফুসকো মতো। বাড়িতে আরাম করে বসে মহার্ঘ লপচু চায়ের সঙ্গে মহার্ঘতর ব্র্যান্ডেড বিস্কুট খেয়ে যে আরাম হয় না, ওপচানো ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত বেশি মিষ্টি, আদার গন্ধে ভুরভুরানো চায়ের সঙ্গে ওই নামনাজানা বিস্কুটে কামড় বসিয়ে সে আরাম কোত্থেকে হয় আমার মাথায় ঢোকে না। ভাবছি ব্রিটানিয়া, ম্যাকভিটিসমিটিস ছেড়ে এবার থেকে চাওয়ালার থেকেই পাইকারি দরে বিস্কুট কিনতে শুরু করব।

৩. আলাপি, উপকারী প্রতিবেশী। আমার পাড়ায় কমবেশি সবাই আলাপি। তার মধ্যে একজন আমাকে রাস্তায় দেখলেই কোথায় কী ক্ষতিকারক খাবার পাওয়া যায় তার তত্ত্বতালাশ দেন। “অমুক দোকানের মোগলাইটা খেয়েছ? আর ওর ঠিক পাশের দোকানটার চিলি চিকেন? সেকি! শিগগিরি খাও। যেমন ভালো খেতে, তেমন পয়সা সাশ্রয়কারী। সন্ধ্যের মুখে খেয়ে ঢকঢক করে বড় এক গ্লাস জল খেয়ে নেবে, ব্যস, অম্বলের চোটে পরেরদিন ডিনারের আগে পর্যন্ত আর কিচ্ছুটি খেতে হবে না।”   
   
৪. বিচ্ছু বাচ্চা। মেট্রোয় যেতে আসতে এই প্রজাতিটির সঙ্গে আমার দু’বেলা দেখা হয়। কেউ কামরা ফাঁকা পেয়ে ধাঁইধাঁই ছোটে, কেউ স্টিলের রড ধরে বাঁইবাঁই ঘোরে, কেউ বোমা আছে নাকি পরীক্ষা করার জন্য মস্ত অ্যালসেশিয়ান নিয়ে জওয়ান ট্রেনে উঠলে ছুটে সে কুকুরের গলা জড়াতে যায়। কুকুরগুলোরও বলিহারি ট্রেনিং, চুপটি করে থাকে, ঘ্যাঁক পর্যন্ত করে না। সেদিন এক শিশুকে দেখলাম, বাবার কোলে চড়ে সিলিঙের দুই হ্যান্ডেলে দুই হাত পাওয়া মাত্র কোল থেকে লাফ মেরে বেরিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় দুই পা সাইকেল চালানোর মতো বনবন করে ঘোরাচ্ছে। আমি বসে বসে দেখি আর টাইমপাস করি। আর বাবামায়ের গলদঘর্ম অবস্থা দেখে মনে মনে হাঁফ ছাড়ি।

৫. পুলিৎজার বিজয়ী অ্যামেরিকান লেখক Herman Wouk-এর নিম্নলিখিত টোটকাটি।
When in danger or in doubt, run in circles, scream and shout.

February 18, 2013

ধ্রুবসত্য

দিল্লি, দার্জিলিং আর উটি



আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম দিল্লি হঠাৎ দার্জিলিং হয়ে গেছে।

শুধু আজই নয়, কালও দেখেছিলাম, পরশুও। লেপ ঠেলে বেরিয়ে, হাওয়াই চটির বদলে বরফঠাণ্ডা পাথরের মেঝেতে পা দিয়ে আঁতকে উঠে, জানালার পর্দা সরিয়ে, কাঁচভর্তি কুয়াশায় তর্জনী দিয়ে আঁক কেটে ওপারে কাঞ্চনজঙ্ঘার বদলে কেবল পার্কের বটগাছ চোখে পড়ছে। আর কোনও তফাৎ নেই।

দিল্লিতে খেপেখেপে বেশ ক’বছর কাটিয়ে অবশেষে আমি শহরটার আবহাওয়ার একটা আন্দাজ করতে পেরেছি। ছ’মাস পাগলের মতো গরম, তিনমাস পাগলের মতো ঠাণ্ডা, আর বাকি তিনমাস বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, বসন্তের একটা জগাখিচুড়ি। ভয়ানক কনফিউসিং, কিন্তু আবার ভীষণ ভালোও। সারাদিন ধরে আমার সব প্রিয় ব্যাপারগুলো ঘটে চলেছে। সকালবেলা মুখ খুললেই গ্যালগেলিয়ে সাদা ধোঁয়া, দুপুরবেলায় কুয়াশাটুয়াশা কেটে গিয়ে মিষ্টি ঝলমলে পুজোপুজো রোদ্দুর---সেই রোদে গা সেঁকতে সেঁকতে কুড়কুড়ে খেতে যে কী মজা---সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফেরার পথে কার্তিক মাসের মানানসই মনখারাপ আর জানালার ওপারে পার্কের কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ আর অমলতাসের শাখায় সারাদিনভর নির্ভেজাল বসন্ত।

কিন্তু এ রকম আবহাওয়ার খারাপ দিকটা হচ্ছে যে অফিসে যাওয়ার বদলে বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে। বেশ একটা ছোট্ট হিলস্টেশন। এই ধরুন শিলং কিংবা কোডাইকানাল। প্যাঁচানো রাস্তা, রাস্তার পাশে পাইনের রেলিং। আকাশেবাতাসে সারাক্ষণই একটা বৃষ্টিবৃষ্টি ভাব। আবার মাঝেমাঝে হুড়মুড়িয়ে প্রবল বৃষ্টি। তখন দৌড়ে গিয়ে রাস্তার পাশের অখ্যাত চার্চের বারান্দায় আত্মগোপন। কোডাইকানালে হয়েছিল আমাদের এ রকম। ওই চার্চটা কোনও সাইটসিয়িং-এর পয়েন্ট লিস্টে ছিল না। সেই যে থাকে, সেভেন পয়েন্ট, নাইন পয়েন্ট? তার মধ্যে একটা সানরাইজ পয়েন্ট থাকে, যেটাই সন্ধ্যেবেলা গেলে সানসেট পয়েন্ট হয়ে যায়? বেচারা চার্চটা সে রকম একটাও পয়েন্টের গরিমা অর্জন করতে পারেনি। ভাগ্যিস। কারণ বাকি সব পয়েন্ট মিলেমিশে ধোঁয়া হয়ে গেলেও ওই চার্চটা এখনও মাথার ভেতর জ্বলজ্বল করছে।

আজ সকালে মেট্রোর লাইনের ওপর ঠাসবুনোট কুয়াশা দেখে অবশ্য যে জায়গাটার কথা সবার আগে মনে পড়েছিল সেটা শিলং-ও নয়, কোডাইকানালও নয়। সেটা হচ্ছে উটি। মাবাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম ছোটবেলায়। বিশেষ কিছু মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে যে জায়গাটা আমার একটুও ভালো লাগেনি। চারদিকে পয়েন্টে পয়েন্টে ছয়লাপ। শানবাঁধানো লেক, লেকে লালনীল বোটের ট্র্যাফিক জ্যাম লেগে গেছে, কাতারেকাতারে লোক কোল্ডড্রিংকস খাচ্ছে, পালেপালে বেয়াদব বাচ্চারা দৌড়োদৌড়ি করছে। নরক গুলজার যাকে বলে।

জঘন্য।

কিন্তু আমি যে এ জীবনে আর কোনওদিন উটি যাব না তার কারণ বোটিং-ও নয়, বদমাশ বাচ্চাও নয়। তার কারণটা আমি এক্ষুনি আপনাদের বলব। বললেই আপনারা বুঝতে পারবেন, আমার এই উটি-ফোবিয়া কতখানি যুক্তিসংগত।

আর পাঁচটা হিলস্টেশনের মতোই উটি পৌঁছতে হলেও দীর্ঘ পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। সে রাস্তার একপাশে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে আর উল্টোপাশে সোজা নেমে গেছে খাদ। আর সেদিন এ সবের ওপর শাকের আঁটির মতো ছিল কুয়াশা। সামনে, পেছনে, অতলান্ত খাদের ভেতর থিকথিক করছে ঘন কুয়াশা। জানালার বাইরে তাকিয়ে জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে খাদ দেখা গেলে কী হত জানি না, দেখা যে যাচ্ছিল না তাতেই আমার গলা শুকোচ্ছিল বেশি। জানার ঠেকে অজানার আতংক সবসময়েই বেশি। পড়লে কতখানি পড়ব, শুধু হাতপা ভেঙেই রক্ষা হবে নাকি সোজা পঞ্চত্বপ্রাপ্তি, সেটা আন্দাজ করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম, আর মায়ের পাশে ফ্যাকাশে মুখে বসে মনে মনে ভাবছিলাম, এ যাত্রা রক্ষা কর ঠাকুর। আর সবথেকে বেশি ভয় লাগছিল এটা ভেবে যে ড্রাইভারও কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, স্রেফ অভ্যেসে ওই বিরাট বাস চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এমন সময় হঠাৎ বাসের সামনের সিট থেকে একটা গলা শোনা গেল। দেখি গাইড ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে গলা ঝেড়ে কী সব বলতে শুরু করেছেন আর আঙুল দিয়ে বাইরে কুয়াশার দিকে নির্দেশ করছেন। কানখাড়া করে বুঝলাম, যদিও এখন দেখা যাচ্ছে না, তবুও ওই আদিগন্ত কুয়াশার মধ্যেই, ঠিক যেদিকে ওঁর তর্জনী তাক করা আছে, সেখানেই নাকি ম্যায়নে পেয়ার কিয়া-র শুটিং হয়েছিল। আরও ভালো করে বললে, “দিল দিওয়ানা” গানটার, যে গানটায় ভাগ্যশ্রী হলদে শাড়ি পড়ে লজ্জায় তরুণ সলমানের ঘাড়ে ক্ষণেক্ষণে এলিয়ে পড়ছিলেন, সেই গানটার।

তারপর যেটা হল, সেটা বর্ণনা করতে আমার, এই এত বছর পরেও বুক কাঁপছে। গাড়িশুদ্ধু লোক, “কই কই দেখি দেখি?” করে খাদের ধারের জানালার সারির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল, গাইড অনুনয় করে বলতে লাগলেন, “আহা নিজের সিটে বসুন, বাস ঝাঁকাবেন না”, কেউ পাত্তাই দিল না, দুয়েকজন উল্লাসে চিৎকার করে বললেন, “দেখেছি দেখেছি, ওই তো ঠিক ওইখানটায়, আঃ মনে নেই সিনটা?” বাকিরা দ্বিগুণ উৎসাহে “কোথায় কোথায়” বলে আরও বেশি করে জানালার ওপর ঝুঁকে পড়লেন, আর তাঁদের শরীরের ভারে স্পষ্টতই খাদের দিকে কাত হয়ে যাওয়া বাসের ভেতর বসে ঠকঠকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমি অনিবার্য মৃত্যুর অপেক্ষা করতে লাগলাম।

উটি পৌঁছনো পর্যন্ত এ জিনিস চলতে লাগল। শুটিঙেরও অন্ত নেই, গাইডের জ্ঞানেরও অন্ত নেই, লোকের উত্তেজনারও না। বাস একএকটা করে মোড় ঘোরে, গাইড কুয়াশার মধ্যে কে জানে কীসের দিকে আঙুল তুলে চেঁচিয়ে ওঠেন, “এইবার সঙ্গম/এইবার পুকার/এইবার হ্যানা/এইবার ত্যানা” আর লোকেরা বুভুক্ষুর মতো হামলে পড়ে খাদের দিকে বাস কাত করে দেয়, আর আমার কলজে লাফ মেরে প্রায় শরীরের বাইরে চলে আসে।  

কী করে সেদিন অক্ষত দেহে বাস থেকে নেমেছিলাম জানি না। নেহাত মরা কপালে ছিল না, তাই। তবে ক্ষতি যা হওয়ার হয়েই গিয়েছিল। স্পষ্ট মনে আছে উটি ট্রিপ থেকে ফেরার পরেই একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় বিনুনি বাঁধতে গিয়ে মা আমার মাথার প্রথম পাকাচুলটি আবিষ্কার করে স্যাড হয়ে গিয়েছিলেন।

যে গোটাকয়েক চুল এখনও কাঁচা আছে মাথায়, সেগুলোকে আমি প্রাণে ধরে রক্ষা করতে চাই। আর সে জন্যই প্রাণ থাকতে আর উটিমুখো হচ্ছিনা। 

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.