March 30, 2013

সাপ্তাহিকী




If you tell the truth, you don't have to remember anything.
                                                                                              ---Mark Twain

Ayn Rand really, really hated C. S. Lewis.

গুপ্ত দরজাওয়ালা বুককেস। আমার বড় সাধ একটা বানাই।

ভয়ের ছবি।

Your Subject Line Must Match Your Subject.

সাড়ে তিনখানা বিগ ম্যাক খেলেই একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সারাদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালোরির সংস্থান হয়ে যায়, জানতেন?

এটা নিশ্চয় আমি ছাড়া সবাই এতদিনে দেখে ফেলেছেন, তবু এসপ্তাহে গানের বদলে এটাই রইল। 

ছুটি এবার শেষ হলে বাঁচি, আর ভালো লাগছে না। সোমবার দেখা হবে, বাঁচা যাবে। টা টা।

March 28, 2013

March 27, 2013

দোল ২০১৩


বাড়িতে ঘুম থেকে উঠতে যে কী ভালো লাগে। চোখ খুলেই মনে হয়, মাথার ভেতরটা এত শান্ত কী করে? আর ঘাড়ের কাছে শিরদাঁড়াটায় দিবারাত্র যে গিঁটগুলো বেঁধে থাকে সেগুলোই বা কোথায় গেল? তারপর এক সেকেন্ড পরেই যখন বাঁদিকে জানালার শিকের ওপারের পেঁপেগাছটা আর আমার মুখের ঠিক ওপরে সিলিংফ্যানের আলতো হাওয়ায় দুলতে থাকা নীল রঙের মশারির ছাদ চোখে পড়ে তখন সব পরিষ্কার হয়ে যায়।  

ও হরি, আমি তো বাড়িতে।

আজ সকাল থেকে আমি কিচ্ছু করিনি। কিচ্ছু না মানে কিচ্ছু না। খালি এই বিছানা থেকে উঠে গিয়ে ওই বিছানায় গা ঢেলেছি, কিশোর ভারতী মুড়ে রেখে টিভি খুলেছি, টিভি বন্ধ করে বয়াম খুলে মুঠো ভরে নিমকি নিয়েছি, একটা একটা করে নিমকি মুখে ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে “সেকি এই অবেলায় ভোঁসভোঁস করে ঘুমোচ্ছো কেন গো?” বলে ঠাকুমার কাঁচাঘুম ভাঙিয়ে আবোলতাবোল বকেছি। এরই মাঝে একবার বুচিদিদিদের বাড়িতে পাড়াবেড়াতে গিয়েছিলাম। গিয়ে জেঠুজেঠির পায়ে আর বুচিদিদির গালে আবীর দিয়ে, একটা জলভরা সন্দেশ খেয়ে, জেঠির গাছে ফোটা একটা ধপধপে গন্ধরাজ তুলে নিয়ে এসেছি। ফুলটা এখন আমার পাশেই রাখা আছে। নেতিয়ে গেছে, কিন্তু এখনও সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে ফুলটা থেকে।

আমাদের বাড়িটাকে আমার খুব ভালো লাগে। কারণ আমার বাবা মা আর ঠাকুমা ছাড়া পৃথিবীতে একমাত্র এই বাড়িটাই আমাকে সবথেকে ভালো করে চেনে। বাড়ির পাঁচিল দেওয়াল রান্নাঘর কুয়োতলা ছাদ। আমিও বাড়িটাকে ভীষণ ভালো করে চিনি। এই বাড়ির বাগানে যে গাছগুলো আছে সেগুলোর প্রত্যেকটার বয়স আমি হাতে গুনে বলে দিতে পারি। কোনও কোনওটা আমার থেকেও বুড়ো আবার কোনওটা একেবারে পুঁচকে, সেদিনের। যেমন বেলফুলের গাছটা। মা আগের বছর নিজের জন্মদিনে পুঁতেছিলেন। পুরো একটি বছর মটকা মেরে পড়ে থাকার পর অবশেষে এই বসন্তে তার মাথায় দুটি সাদা কুঁড়ি উঁকি মেরেছে।

দোল খেলা হয় না অনেকদিন। একটা বয়সের পর খেলার ইচ্ছেটা চলে যায় বোধহয়। শেষে এমন হয় যে অন্যকে হুটোপাটি করে খেলতে দেখলেও বিরক্ত লাগে। ক’বছর হল দেখছি আমাদের পাড়ায় একটা বাচ্চাদের দল গজিয়েছে। তারা গরমের ছুটিতে ফাংশান করে, ডিসেম্বরের ছুটিতে ব্যাডমিন্টন খেলে আর আই পি এলের সময় পেছনের জমিটায় বল পেটায়। সে বল অবশ্য জমিতে কম, আমাদের ছাদেই বেশি থাকে। ক্ষণেক্ষণে মিহিগলায়, “জেঠি আমাদের বলটা নেব গো?” শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে মা এখন ছাদের দরজা খুলেই রাখেন, যার যখন পেছনের পাঁচিল টপকে ঘরের ভেতর দিয়ে কাদাপায়ে দৌড়ে ছাদে গিয়ে বল নামিয়ে আনে।

সেই দলের লোকজন আজ দশটা বাজতে না বাজতেই এমন হা রে রে রে করে রঙের বালতি আর পিচকিরি আর বেলুন নিয়ে মাঠে নামল যেন দেশে সদ্য স্বরাজ ঘোষণা হয়েছে। যত না খেলা, চিৎকার তার থেকে বেশি। কানের পর্দা ফাটার উপক্রম। আমি সবে গজগজ করে বলেছি, “দেখো না এই রং তুলতে কী হাল হয়” মা অমনি দয়ার অবতার হয়ে বলে উঠলেন, “আহা, বেরসিকের মতো কথা বলিস না তো সোনা। ওদেরই তো এখন চেঁচাবার বয়স। ওরা চেঁচাবে না তো কারা চেঁচাবে? তুই?”

আমি সব সইতে পারি, কিন্তু আমার রসবোধ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে মনে বড় ব্যথা পাই।

তাই একটু পরে যখন মা নিজেই ছাদ ফাটিয়ে, “এ কী এ কী?” বলে চিৎকার করে উঠলেন আর আমি দৌড়ে গিয়ে মায়ের চিৎকারের কারণটা আবিষ্কার করলাম, তখন আমার হাসতে হাসতে পেট চেপে মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় রইল না।

মা বাজ পড়া গাছের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন আর তাঁর প্রিয় বাচ্চার দল আমাদের সদ্য রং করা নীল বর্ডার দেওয়া সাদা ধপধপে পাঁচিল তাক করে একের পর একে হলুদ সবুজ গোলাপি রঙের বেলুন ছুঁড়ে টিপ প্র্যাকটিস করে চলেছে।

তারপর ঝাড়া একঘণ্টা ধরে মায়ের গজগজানি চলল। ল্যাজকাটা বাঁদর, বদমাশের ধাড়ি, ভবিষ্যতের লেবুগুন্ডা্‌, এইসব বাছাবাছা বিশেষণ ধরে মা দুষ্কৃতীদের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে লাগলেন।

আমি বললাম, “আহা মা, দোলই তো খেলেছে, আর তো কোনও দোষ করেনি। আর এটাই তো দোল খেলার বয়স। ওরা খেলবে না তো কারা খেলবে? তুমি?”

তারপরেও যে মা আমাকে পাত পেড়ে বসিয়ে এঁচোড়ের তরকারি আর বাটামাছের ঝাল দিয়ে একগাদা ভাত ঠেসেঠুসে খাওয়ালেন, সেটা তাঁরই মহত্ত্ব।

সময় সব ভুলিয়ে দেয়। পাঁচিলের রঙের দুঃখটুঃখ সব। একটু পরে যখন সবার দোল খেলা ফুরিয়ে গেল, পিচের খালি রাস্তাগুলো আর কয়েকটা গরু গায়ে রং মেখে কাত হয়ে পড়ে রইল, তখন আমি আর মা জানালা দরজা বন্ধ করে, ফ্যান তিনে চালিয়ে, পরিষ্কার ঠাণ্ডা সিমেন্টের মেঝেতে বালিশ পেতে শুয়ে পাড়াপড়শি আত্মীয়স্বজনের নিন্দেমন্দ করতে লাগলাম।

আর আমাদের কথাগুলো ফ্যানের হাওয়ায় পাক খেয়ে খেয়ে আমাদের ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আলনার কাপড়ের ভাঁজে, কম্পিউটার টেবিলের নিচে, দরজার কোণে, টুলের তলায়, যেখানে ভগবতীর মায়ের ঝাঁটা পৌঁছোয় না কে জানে কতদিন, সেসব জায়গায় মা-মেয়ের মনের কথাগুলো গিয়ে গিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসতে লাগল।  

জন্মের পর থেকে যত কথা আমি বলেছি, যত অকাজের ভাবনা ভেবেছি, যত বিরহের কবিতা ভেঁজেছি, সে সবকিছু এই বাড়িটার কোথাও না কোথাও জমা হয়ে আছে। বাড়িটা যত্ন করে জমিয়ে রেখেছে। আমি যখন মাঝে মাঝে বাড়িটায় ফিরে আসি, বাড়িটার দিকে ভালো করে তাকাই, আনমনে একটা কিছু হাতে তুলে নাড়িচাড়ি, সেই কথা আর ভাবনা আর দৃশ্যগুলো একলহমায় চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। কাঠের আলনাটার গা থেকে ঝুলছে আঙ্কল চিপসের ফ্যাকাশে ম্যাসকটওয়ালা কি-চেন? অমনি মনে পড়ে যায় সিমলা ট্রিপ। হোটেলের ঘরে বড়দের সঙ্গে বসে ত্রিদেব দেখতে দেখতে চিপস খাচ্ছি আর বুঁদ হয়ে নাসিরুদ্দিন আর সঙ্গীতা বিজলানির নাচ দেখছি। ঠাকুমার ঘরে ঢোকার মুখের চৌকাঠটা? পুজোর নতুন জামা পরে ছুটে ঠাকুমাকে দেখাতে যাচ্ছি, হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছি, চিবুক বেয়ে লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ঠাকুমা “আহা আহা” করে খাট থেকে খচমচিয়ে নামছেন, মা পেছন থেকে হায় হায় করে ছুটে আসছেন।

“গেল গেল, আমার মেয়ের দাঁতের সেটিং জন্মের মতো গেল...”

মা আলতো করে আমার গায়ে চাঁটি মারেন। “ভ্যাট, আমি মোটেই এই সব বলিনি, বাজে কথা বললেই হল?”

আমরা দুজনেই হাসি। মার মুখটা হঠাৎ দুঃখীদুঃখী হয়ে যায়।

-সব ফেলে পর হয়ে যাবি সোনা?

-বস্‌স্‌স্‌...... পর তো সেই কবে থেকে। বাড়ি থেকে দূর করে দিয়েছ তো প্রায় এগারো বছর হতে চলল, মনে নেই? এখন নতুন করে শোক উথলে উঠছে বুঝি?

-সেই। তুই তো আমার সোনাই থাকবি, বল?

-হোল লাইফ। না থাকার অপশন আছে নাকি? তুমি চাইলেই তো হবে না।

মায়ের মুখে আবার হাসি ফোটে।  

-অলরাইট, ভেরি গুড।

-মেম খায় চা বিস্কুট। এবার নিজে ঘুমোও, আমাকেও ঘুমোতে দাও। যত্তসব।

এই ছিল আমার এবছরের দোল। আপনারা কে কেমন করে দোলযাত্রা উদযাপন করলেন? আমার মতো বেরসিক হয়ে বাড়িতে বসে রইলেন, নাকি হোলি হ্যায় চিৎকারে পাড়া কাঁপালেন? আমাকে বলুন। আমি শুনব বলে বসে আছি। 

March 26, 2013

বিয়ের সাজ


আমার এক পরিচিত মহিলা সবাইকে তাঁর বিয়ের ছবি দেখাতে দেখাতে খুব গর্বিত মুখে বলেছিলেন, “আমাকে দেখে আমার দিদির পাঁচবছরের মেয়ে তো বলছিল, ‘মা মা দেখো, ছোটমাসিকে ঠিক জগদ্ধাত্তি ঠাকুরের মতো দেখতে লাগছে।’”

খুঁত ধরতে চাইলে ওপরের কথাটার অনেকরকম খুঁত ধরা যায়। এক, নিজের মুখেই নিজের চেহারার প্রশংসা করাফিল্মস্টারেরা করলে তাও বুঝি, কিন্তু আমার আপনার মতো দুপায়ে হেঁটে বেড়ানো সাধারণ লোক? স্রেফ পাগলামি।

কিন্তু নিজের ঢাক নিজে পেটানোর থেকেও অদ্ভুত কথা হচ্ছে এইটা ভাবা, যে একজন জলজ্যান্ত মানুষকে জগদ্ধাত্রী ঠাকুরের মতো দেখতে লাগাটা একটা ভয়ানক ভালো ব্যাপার। 

কেনই বা কেউ সুস্থ মস্তিষ্কে নিজেকে এরকম সাজাতে চাইবে?

আমাদের দলে ‘সাজা’ ব্যাপারটা একটা বেশ উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়লোকে কতটা নিজের জন্য সাজে কতটা পরের জন্য, সাজার পেছনে কতখানি নিজেকে সুন্দর দেখানোর নিষ্পাপ ইচ্ছে কাজ করে আর কতটাই বা নিজেকে নিয়ে অতৃপ্তি, এই নিয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেঁচামেচি চালাতে পারি।

কিন্তু আজ অত গভীরে যাওয়ার দরকার নেই। আজ শুধু দেখতে ভালোলাগা খারাপলাগা নিয়েই কথা হোক।

আমার বাবা চরমপন্থী মানুষ। জীবনের বাকি ক্ষেত্রেও, সাজের ক্ষেত্রেও। বাবার মতে পরিচ্ছন্নতার বেশি সাজা মানেই নিজেকে খারাপ দেখতে লাগানোর রাস্তা পরিষ্কার করা। না সাজলে সবথেকে বেশি সুন্দর দেখতে লাগে, একটু সাজলে একটু খারাপ দেখতে লাগে, আর খুব বেশি সাজলে খুব বেশি খারাপ দেখতে লাগে। অনেকটা এই রকম।

 

আমি আবার অতটা নিষ্ঠুর হতে পারি না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লোকে সাজে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে রং মাখে, চুল ফাঁপায়, অতখানি পরিশ্রম একেবারে জলে যাবে এমনটা কি হতে পারে? মনে হয় না। বিশেষত সবাই যখন জানেই সৌন্দর্যের সংজ্ঞাগুলো ঠিক কী কী। ফর্সা রং, টুকটুকে ঠোঁট, আপেলরঙা গাল, ঢেউ তোলা পেশি, উথালপাথাল চুল। এইবার লিস্টে টিক দিয়ে দিয়ে টপাটপ সেজে নিলেই হয়ে গেল। শক্ত কাজ তো কিছু নয়।

কিন্তু তাই বলে গলায় ফুলের মালা আর গালে চন্দনের কলকা? মাথায় চোঙা টোপর আর সি-থ্রু ধুতি? গলা থেকে পেট পর্যন্ত থাকেথাকে নেমে আসা সোনার হার আর শুঁড়তোলা নাগরা চটি? বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ হাঁটু পর্যন্ত লম্বা জরিচুমকি বসানো একখানা ঘোমটা আর ধাক্কাপাড়ের বাবু ধুতি?

এই সাজে কাউকে কি ভালো দেখতে লেগেছে কোনওদিন? লাগা কি সম্ভব? যদি লাগতই তাহলে কি সবাই পুজোর সময় কিংবা মুখেভাতের নেমন্তন্নে এইরকম সেজেগুজেই যেত না?

তবু লোকে বছরের পর বছর ধরে বিয়ে করার সময় ওই সাজটা সেজে আসছে। শুধু সাজছে না, সেজে হাসিহাসি মুখে ছবিও তুলছে। একসেট ছবি বন্ধুবান্ধব, আরেকসেট কাকিপিসি, আরেক সেট অফিসকোলিগদের সঙ্গে। শুধু তুলেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, দিকেদিগন্তরে সে সব ছবি মেল করছে, বারোয়ারি দেওয়াল পেলেই টাঙিয়ে দিচ্ছে। নিজের ওই চেহারাটা স্থিরচিত্রে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখে তার মন ভরছে না, যত্ন করে ভিডিওতে তুলে রাখছে। তারপর শিকারি বেড়ালের মতো ফাঁদ পেতে বসে থাকছে, রাস্তা দিয়ে চেনা লোক গেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের দেখাবে বলে।

রেগেমেগে এত কথা হুড়মুড়িয়ে বলে হাঁপিয়ে গিয়ে দম নিচ্ছি, বান্টি পা নাচাতেনাচাতে বলল, “ধুস, তুমি কিসুই বোঝনি। বিয়ের সময় কেউ সুন্দর দেখবে বলে সাজে না।”

আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, “বলিস কী? খারাপ দেখাবে বলে কেউ সাজে নাকি?”

বান্টি বলল, “বিয়ের সময় ওইরকম সাজার নিয়ম চোখে পড়ার জন্য। বরবউকে ওইরকম পাগলের মতো সাজিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে রাখে যাতে দূর থেকেই দেখে লোকে টপ করে চিনে ফেলতে পারে। গরমের মধ্যে ভারিভারি প্রেজেন্ট হাতে ঘেমেনেয়ে বেশি হাঁটাহাঁটি করতে না হয়।”

“তোমাদেরও রাখবে, দেখো না।” বলে বান্টি দাঁত বার করে পা নাচায়।

আমি একেবারে মুষড়ে পড়ি। ব্যাপারটা ক্রমেই হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে বোধ হয়। অলরেডি আমাকে মা সতর্ক করে রেখেছেন, যেন বিয়ের দিন আমি একটু শান্তশিষ্ট মিতভাষী হয়ে থাকি। অন্যসময়ের মতো ক্ষণেক্ষণে নিজের পচা রসিকতায় নিজেই মুগ্ধ হয়ে অর্চিষ্মানের পিঠ চাপড়ে অট্টহাস্য করে না উঠি।

“তাহলে লোকে ভাববে বিয়ের আনন্দে অর্চনাদির মেয়ে পাগল হয়ে গেছে। সেটা কি ভালো হবে?” মা গম্ভীর গলায় জানতে চান।

চুপ করে থাকা ছাড়া আর কীই বা বলার আছে আমার এর উত্তরে? তাই চুপ করে থাকি। যেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকলেও আমাকে কিছু কম পাগলের মতো দেখতে লাগবে। তার মধ্যে যদি কেউ এসে জগদ্ধাত্রী-ফাত্রি বলে তা হলে তো আর কথাই নেই। বান্টির চোখ বাঁচিয়ে আমি মনেমনে একটা ছোট্ট প্রার্থনা সেরে নিই। আমাকে জগদ্ধাত্রী বললে যেন পাশে বসে থাকা অর্চিষ্মানকেও ‘কাত্তিকঠাকুর’ বলে কমপ্লিমেন্ট দেয় ঠাকুর।

হোমরাচোমরা মাসি গোছের কেউ এসে চিবুক ধরে “তোমাকে ঠিক কার্তিকের মতো দেখাচ্ছে” বললে অর্চিষ্মানের মুখটা ঠিক কীরকম হবে ভেবে আমি নিজেনিজেই টানা দুমিনিট হেসে নিই। বান্টি আছে দেখেও কন্ট্রোল করতে পারি না। আমাকে একাএকা হাসতে দেখে বান্টি চোখ ঘোরায়। বলে, “কাকিমা ঠিকই ভয় পেয়েছিলেন, তুমি অলরেডি পাগল হয়ে গেছ।”

*****

সে বান্টি যা খুশি বলুকগে, ওর কথায় অত পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু যে কথাটা বলার দরকার আছে সেটা হচ্ছে, কালকের দোল আর নরশুর গুডফ্রাইডে মিলিয়ে বেশ একটা লম্বা ছুটির ব্যবস্থা করা গেছে। আমি সেই ছুটিতে কলকাতা যাচ্ছি। প্রাক্‌বিবাহ প্রিপারেশনের জন্য। মা হাতে লিস্ট নিয়ে হাঁ করে পথ চেয়ে বসে আছেন, এয়ারপোর্ট থেকেই পাকড়াও করে এদিকওদিক ছোটাছুটি শুরু করে দেবেন। আমাকে পাগল সাজানোর সমস্ত ব্যবস্থা পাকা না করতে পারলে মায়ের আর তর সইছে না।

বুঝতেই পারছেন, এই ছোটাছুটির মধ্যে আমি অবান্তরে আসতেও পারি আবার নাও পারি। আসলে তো কথা হবেই, না আসতে পারলেও আপনারা অবান্তরকে ভুলে যাবেন না। মাঝেমাঝে এসে দেখেশুনে রাখবেন।

আর আপনারা সবাই খুব আনন্দ করে দোল খেলবেন। নিজে ভালো করে বাঁদুরে রং মাখবেন, চেনাশোনা কারও ওপর গায়ের ঝাল থাকলে বাঁদুরে রং দিয়ে আচ্ছা করে সে ব্যাটার দাঁত মেজে দেবেন। আমি ফিরে এসে সে গল্প শুনব।

টা টা।  

শব্দ নিয়ে কুইজের উত্তর

March 25, 2013

বিজ্ঞাপন

marc_johns
উৎস

কার যেন একটা গল্প শুনেছিলাম, ঘড়ি কিনে এনে যা লেখা আছে সত্যি কি না পরীক্ষা করার জন্য আধঘণ্টা জলের বালতিতে ঘড়িকে চুবিয়ে রেখেছিলেন। পরিণতি কী হয়েছিল সেটা আর বলে দেওয়ার দরকার নেই নিশ্চয়।

যাই হোক, কুইজ চলছে মনে আছে তো? আমাদের সবার ছোটবেলার খেলা। খেলে জিততে চাইলে দেরি করবেন না। 

কুইজঃ শব্দ নিয়ে খেলা



উৎস গুগল ইমেজেস

চলুন, আজ একটা নেহাতই ছোটবেলার খেলা করা যাক। নিচে পনেরোটা শব্দ দেওয়া আছে। মানে একেবারে সাজিয়েগুছিয়ে দেওয়া নেই, একটু ওলটপালট করে দেওয়া আছে। আর যেহেতু এই ছোটবেলার খেলাটা আমরা বড়বেলায় খেলছি, তাই সম্মানরক্ষার খাতিরে শব্দগুলোর একটা করে অক্ষর উধাও করা হয়েছে। সেই উধাও হওয়া অক্ষরটিকে ধরে এনে সম্পূর্ণ শব্দটি সোজাভাবে লিখলেই আপনাদের কাজ শেষ।

বাকি কথাগুলো সবার জানা, তাও আরেকবার বলে দিচ্ছি। খেলা চলবে এখন থেকে শুরু করে চব্বিশঘণ্টা। দেশে মঙ্গলবার সকাল আটটা আর অ্যামেরিকার ইস্ট কোস্টে সোমবার রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত। ততক্ষণ আপনাদের কমেন্টস্‌ দেখতে পাব খালি আমি, আর কেউ নয়।

ওকে, লেগে পড়ুন তবে। অল দ্য বেস্ট।

*****

১. ন্ন প বা ভা শ

২.  নু তা ক তি গ

৩. ড় র ও য়া স

৪. ণা র গা বে গ

৫. য় বা তী তা জা

৬. য় প চ জ্ঞা অ রি

৭. ব্যা ম স র হা

৮. ল ন্ন য় ন শী

৯. রী দা ন গ বি

১০. ক তি র দা   

১১. খা ল উ রে   

১২. তি ক গ জা ম

১৩. র্ণা ক্র ব নু মি

১৪. ক রা হি ধা বা

১৫. মূ তু ল ল না

*****

খেলা শেষ। যাঁরা খেলেছেন, তাঁদের সবাইকে আমার অনেক ধন্যবাদ। এবার দেখা যাক উত্তরগুলো কী।

১. শত্রুভাবাপন্ন
২. গতানুগতিক
৩. ঘোড়সওয়ার
৪. গবেষণাগার
৫. জাতীয়তাবাদী
৬. অজ্ঞাতপরিচয়
৭. সমভিব্যাহার
৮. উন্নয়নশীল
৯. গগনবিদারী
১০. উদারনৈতিক
১১. উপকূলরেখা
১২. মহাজাগতিক
১৩. বর্ণানুক্রমিক
১৪. ধারাবাহিকতা। এই প্রশ্নটা ভালো হয়নি। ধারাবাহিক তো নিজেই একটা শব্দ। 
১৫. তুলনামূলক

March 23, 2013

সাপ্তাহিকী




Take your pleasure seriously. 
                                                                                   ---Charles Eames

দেশে যুদ্ধ বাধলে কেউ পাসপোর্ট নিয়ে পালিয়ে আসে, কেউ বা সাধের ম্যান্ডোলিন, কেউ বা কাঁচের চুড়ি। এই সিরিয়ান রিফিউজিরা কে কী নিয়ে ঘরছাড়া হয়েছেন দেখুন।

 আপনি কত জোরে টাইপ করতে পারেন? 

OSM. Oreo Separator Machine. 

একই অঙ্গে এত রূপ?


গলফ খেলাটা আমি অনেক চেষ্টা করেও বুঝতে পারিনি। এটা দেখে তাই গায়ের ঝাল মেটালাম।

আমার প্রিয় শহরের জানালা। 

অ্যালার্মঘড়ি কেন লাভের থেকে ক্ষতি করে বেশি।

মোরা সঁইয়া বুলায়ে আধি রাত কো।

আর কী। ভালো হয়ে থাকবেন সবাই। গরম পড়ছে, বেশি করে লেবুর জল বা নিম্বু পানি বা লেমনেড খেয়ে শরীর এবং মাথা দুটোই ঠাণ্ডা রাখবেন। সোমবার আবার দেখা হবে। ঠিক এইখানেই।


March 22, 2013

একটা জরুরি প্রশ্ন



স্কেটবোর্ডিংরত জোডি ফস্টার
উৎস গুগল ইমেজেস

গুগল রিডার গত হতে চলেছে শুনেছেন নিশ্চয়? পৃথিবীতে কোনও ভালো জিনিসের আয়ুই যে দীর্ঘ নয়, সেটার আরও একটা প্রমাণ পাওয়া গেল।

যাই হোক, আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এখন রাস্তা কী। এতদিন গুগল রিডারের মাধ্যমে আমি অন্তত গোটা চল্লিশেক ব্লগের খোঁজখবর রাখতাম। সেগুলোকে বানের জলে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কি কোনও উপায় আছে? আপনারা যাঁরা এতদিন রিডার ব্যবহার করতেন, তাঁরা কী করছেন?

গুগল রিডারের কোনও সহজ বিকল্প জানা থাকলে দয়া করে আমাকে বলবেন। খুব উপকার হবে।

March 21, 2013

রাজধানী


সারা পৃথিবীর মধ্যে আমার প্রিয়তম পরিবহন ব্যবস্থা হল গিয়ে অটো। সাইজে ছোট, চটপটে, ট্র্যাফিক জ্যামে বাসলরির ফাঁক গলে প্রত্যেকবার বিজয়ীর মতো বেরিয়ে আসতে পারে। তাছাড়া অটোর যেখানেই বসো না কেন, গায়ে হাওয়া লাগবেই। কিন্তু এত সুবিধে হলে হবে কী, ভগবানের রসবোধ প্রখর। আমি অটো এত পছন্দ করি, এদিকে অটোওয়ালারা আমাকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। খালি দেখ না দেখ পায়ে পা বাধিয়ে ঝগড়া করার মতলবে থাকেন।

অটোর পরেই আমার চড়তে ভালো লাগে দু’চাকার সাইকেল। অটোর থেকে সাইকেলের সুবিধের জায়গাগুলো হলঃ সাইকেল ইকো ফ্রেন্ডলি, সাইকেলে চাপলে গায়ে হাওয়া বেশি লাগে, আর সাইকেলের আমাকে পছন্দ হল কি না সে নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। একমাত্র অসুবিধের দিকটা হচ্ছে, খাটুনির দিকটা।

আর অটো আর সাইকেলের পরেই আমার যেটা চড়তে সবথেকে বেশি ভালো লাগে সেটা হচ্ছে ট্রেন। লোকে বলে, প্রক্সিমিটি ব্রিডস কনটেম্পট, সে যুক্তি মানলে এতদিনে আমার ট্রেন দেখলে গা গুলিয়ে বমি আসার কথা, কিন্তু যত দিন যাচ্ছে ট্রেনের প্রতি আমার টান, ভালোবাসা বেড়েই চলেছে, বেড়েই চলেছে।

“চলেছে, চলেছে, চলেছে...”

সিনেমার নাম বলতে পারলে হাততালি।

আমি জীবনে অগুন্তিবার ট্রেনে চড়েছি। ছ’বছর বয়স থেকে একুশ বছর বয়স পর্যন্ত, রবিবার আর ছুটির দিন আর পুজোপার্বণ আর সর্দিগর্মি বাদ দিলে, রোজ। ডেলিপ্যাসেঞ্জার যাদের বলে, জীবনের একটা সময়ে আমি ছিলাম তাঁদেরই একজন। আমি ট্রেনে রানিং-এ উঠেছি, দরজায় ঝুলেছি, অবরোধের সময় সারাদিন কলেজ ঠ্যাঙানোর পর তৃষ্ণার্ত অভুক্ত অবস্থায় হাওড়া স্টেশনে রাত দশটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকেছি, কলেরার হুমকি অগ্রাহ্য করে ছালছাড়ানো নুনমাখানো শশা হাপুসহুপুস করে খেয়েছি, ভিড়ের ফাঁকে ছুঁয়ে দিতে চাওয়া অসভ্য হাতের মালিকের গাল চড়িয়ে লাল করে দিয়েছি, পকেটমারের হাতে সর্বস্ব খুইয়েছি, সারা জীবনের মতো কিছু সম্পর্কের খোঁজ পেয়েছি।

লোকাল ট্রেন আমাকে হাতে ধরে মানুষ করেছে বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না।

কিন্তু আজকে আমি আপনাদের যে গল্পগুলো বলব বলে বসেছি সেগুলো একটাও লোকাল ট্রেনের নয়। সব দূরপাল্লার।    

একদিক থেকে দেখতে গেলে আমার দূরপাল্লার ট্রেনে চড়ার গল্পের মধ্যে দিয়ে ভারতের মধ্যবিত্ত সমাজের অর্থনৈতিক ক্রমোন্নতির গতিপথের একটা খোঁজ পাওয়া যায়। সমাজ বলছি এই কারণেই যে আমার বন্ধুদের অনেকেরই অভিজ্ঞতা আমার সঙ্গে মিলে গেছে। আমরা সেকেন্ড ক্লাসে চড়েছি, চেয়ার কারে চড়েছি, তারপর একদিন হঠাৎ নিজেদের রাজধানীর এসি থ্রি টায়ার কামরায় আবিষ্কার করেছি। ইদানীং স্পাইসজেট আর ইন্ডিগো আসার পর সেটাও আমাদের অনেকের কাছেই ইতিহাস হয়ে গেছে।

সেকেন্ডক্লাসে চড়ার অভিজ্ঞতা আমার খুব বেশি মনে নেই। প্রথম যে জিনিসটা মনে আছে, সেটা হচ্ছে, আমি জানালার গরাদ দিয়ে যতখানি পারা যায় মুখ বার করে বসে আছি, হুহু করে হাওয়া লাগছে, মা বারবার ঝামেলা করছেন, সোনা ঠাণ্ডা লেগে যাবে ঠাণ্ডা লেগে যাবে বলে, আর আমি যতক্ষণ পারা যায় মায়ের কথা এককান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বার করে দিচ্ছি। শেষে অবশ্য মায়েরই জয় হত আর আমাকে হয় মুখ ভেতরে ঢোকাতে হত, নয় একগাদা গরমের মধ্যে মাথায় টুপি চাপাতে হত। জানালার হাওয়া খাওয়ার একটাই খারাপ দিক ছিল, ট্রেন থেকে নামার আগে চুল আঁচড়ানোর ব্যাপারটা। এতক্ষণ ধুলো খেয়ে মাথার চুল ততক্ষণে জটা পাকিয়ে গেছে। মা ক্রমাগত বকছেন আর চুলের দুর্ভেদ্য জটা ভেদ করে চিরুনি চালানোর চেষ্টা করছেন, আর আমার চোখ থেকে ব্যথার চোটে টপটপ করে জল পড়ছে, এ দৃশ্য আমার স্পষ্ট মনে আছে।

সেকেন্ডক্লাসের দ্বিতীয় ভালো স্মৃতিটা হচ্ছে লুচি আর আলুরদমের স্মৃতি। ট্রেনে আর কিছু করার থাকে না বলেই হয়তো, অত্যন্ত ঘন ঘন অত্যন্ত বেশি রকম খিদে পায়। মা গোল টিফিনবাক্স ব্যাগ থেকে বার করলেই অস্পষ্ট হলুদ আলোজ্বলা কামরাটা নিমেষে জানুয়ারি মাসের রোদঝলমলে গড়ের মাঠের চেহারা নিত। দুপুরের ভাজা লুচি ততক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে নেতিয়ে গেছে, আলুর তরকারিও ঠাণ্ডা, তবুও অসুবিধেজনক ছোটছোট প্লেট আঁকড়ে ধরে, ট্রেনের দুলুনি সামলে, লুচি দিয়ে তরকারি মুড়ে মুখে পুরতে কী যে মজা লাগত, যে জানেনা সে জানেনা। আনন্দে সবাই খুব উদার হয়ে যেত মনে আছে। একে অপরের প্লেটে বেশি করে তরকারি তুলে দিতে চাইত। আর একটা লুচি খাও, প্লিজ? লুচির শেষে ব্যাগ থেকে মিষ্টির প্যাকেট বেরোত। অন্যান্য জিনিসের ভারে চেপটে যাওয়া সন্দেশ আলতো করে বার করে চেটেপুটে খেতাম সবাই।

এই এতযুগ বাদে লিখতে গিয়েই সে আনন্দের ছোঁয়া পাচ্ছি, তার মানে আসল আনন্দটা কতখানি হত ভাবুন একবার।

বড় হয়েও ট্রেনে চেপে আনন্দ পেয়েছি অবশ্য। তবে সে আনন্দ অন্যরকমের আনন্দ। জে এন ইউ থেকে প্রথম শীতের ছুটিতে পূর্বা এক্সপ্রেসে করে ফিরেছিলাম মনে আছে। ছ’জন বার্থ বুক করেছে, আর তাদের সঙ্গে ‘পাইল অন’ করেছে আরও পাঁচজন। ‘পাইল অন’ করা মানে হচ্ছে, শোয়ার জায়গা নেই, কিন্তু টিকিট আছে। অর্থাৎ কি না, একটা কামরায় মোট এগারো জন, সাইডের বার্থ দুটো ছেড়ে দিয়ে। সারারাত গল্প গান খেলা হয়েছিল। জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে কানপুর না কোথা থেকে শালপাতায় করে পুরিভাজি ডিনার কেনা হয়েছিল। অনবদ্য কিছু ইনডোর গেম্‌স্‌ও শিখেছিলাম মনে আছে।

তারপর অবশ্য সবসময় একাই যাতায়াত করেছি। মানে ভারতবর্ষের রেলগাড়ির কামরায় যতখানি একা হওয়া সম্ভব ততখানি একা।

সেরকম এক যাত্রায় কী হয়েছিল শুনুন। ঘটনাটা ঘটেছিল প্রায় বছর আটেক আগে, অথচ জনাদুয়েক ভয়ানক কাছের লোক ছাড়া এই প্রথম আমি ঘটনাটা কাউকে বলছি। কাজেই ঘটনার গুরুত্বটা বুঝতে পারছেন আশা করি।

রাজধানী চেপে দিল্লি ফিরছি। রাতের খাওয়া হয়ে গেছে, আমার সিট পড়েছে আপার বার্থে। আপার বার্থ আমার চিরকালের পছন্দের সিট। নির্জনতা বেশি, দুলুনি বেশি, বাড়ির/হোস্টেলের খাটের তুলনায় অ্যাডভেঞ্চার কোশেন্ট বলেবলে অন্তত একশো পয়েন্ট বেশি। যতবার ট্রেনে চেপে যত জায়গায় গেছি, আপার বার্থের কোনও সিট আমাদের ভাগে পড়লে আমিই সবসময় সেটাতে শুয়েছি। শুরুর দিকে বাবা কোলে করে তুলে দিতেন, তারপর নিজেই রেলিং ধরে তরতরিয়ে ওঠা রপ্ত করে নিয়েছিলাম।

সেজন্যই বোধহয় আত্মবিশ্বাসটা একটু বেশি রকমের বেশি হয়ে গিয়েছিল।

খেয়েদেয়ে, মুখ মুছে, আইসক্রিম “নেহি চাহিয়ে ভাইসাব” বলে আশেপাশের সকলের গোলগোল দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমি তো টঙে চড়ব বলে রেডি হলাম। এখনও মনে আছে, সবুজ রঙের সিন্থেটিক একটা সালোয়ার কামিজ পরে ছিলাম। সুতির পরে থাকলে হয়তো দুর্ঘটনাটা এড়ানো যেত বলেই মনে আছে।

আমি লোয়ার বার্থের ভদ্রলোকের গা বাঁচিয়ে বাঁপায়ের আঙুল রেখে, বাঁ হাত দিয়ে রেলিংটা ধরে একঝটকায় শরীরটা শূন্যে তুলে এনে ডানপায়ের আঙুলটা রেলিঙের একটা ধাপে রাখলাম। নেক্সট স্টেপ হচ্ছে সিট থেকে বাঁপাটা তুলে এনে রেলিং-এর ওপরের ধাপে রাখা আর সঙ্গে সঙ্গে বাঁ হাতটা তুলে নিয়ে গিয়ে বার্থের সঙ্গে লাগানো রডটা ধরা। সেটা নির্বিঘ্নে হয়ে গেল। এবার আর মাত্র একটা ধাপ বাকি। বাঁহাঁটুটা ভাঁজ করে বার্থের ওপর এনে রাখা আর তার ভরসায় বাকি শরীরটাকেও পুরোটা বার্থের ওপর তুলে নিয়ে আসা। এর পর কুঁজো হয়ে বসে ব্রাউন প্যাকেটের ভেতর থেকে বিছানা বার করে পেতে, কম্বলের তলায় ঢুকে গেলেই নিশ্চিন্ত।

কোথাও যে একটা গোলমাল হয়েছে সেটা আমি প্রথম টের পেলাম বাঁহাঁটু বার্থের ওপর তুলে আনার পর। গোলমালটা আর কিছুই না, দেবশ্রী টেলার্স পাকামো করে পাতিয়ালা কাটিং পায়জামা বানাতে গিয়ে মাইলখানেক কাপড় খরচ করেছে আর তারই কিয়দংশ আমার ডানপায়ের তলায় আটকা পড়ে গিয়ে একটি অপ্রত্যাশিত বাধার সৃষ্টি করেছে। যার ফলে বাঁহাঁটু অলরেডি বার্থে পৌঁছে যাওয়ার পরেও শরীরের বাকি অংশটুকু আটকে আছে সেই রেলিং-এই।

কবি বলে গেছেন, যারে তুমি পিছে ফেল সে তোমারে টানিছে পশ্চাতে। গুরুদেব বলে কথা, কাজেই তাঁর বাণী সত্যি করে আমার ডানপা সহ বাকি শরীরটা বার্থের ওপর থেকে বাঁপা আর বাঁহাতকে টেনে নামিয়ে আনল। সিনথেটিক কাপড়, বার্থের মসৃণ নীল আবরণের ওপর দিয়ে সড়াৎ করে বিনাবাধায় নেমে এল, আর আমি তিনতলা বার্থ থেকে ভাদ্রমাসের পাকা তালের মতো রাজধানীর থ্রি টায়ার কামরার নোংরা মেঝের ওপর এসে পড়লাম।

একেবারে চিৎপাত হয়ে।

তারপর দেড় সেকেন্ড যে কী হল আমার ঠিক মনে নেই। ঘোর ভাঙল সহযাত্রী মহিলাদের চিৎকারে। “মাগো কী হল গোওওওও...”

বিশ্বাস করুন, আমি তাঁদের দোষ দিই না। তাঁরা খেয়েদেয়ে দাঁত খুচিয়ে হেলেদুলে বিছানা পেতে আলো কমিয়ে আরাম করে শুতে যাচ্ছেন, হঠাৎ করে বাইশ বছরের একজন ধেড়ে মহিলা ওপর থেকে বলা নেই কওয়া নেই ঘাড়ের ওপর নেমে এলে, ভয় লাগারই কথা।

আমি বিদ্যুৎবেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া হাতপা গুটিয়ে উঠে পড়ে রেকর্ড স্পিডে তিনতলায় উঠে এলাম। এবার আর কোথাও কিচ্ছুটি গোলমাল হল না, রেলিং-পায়জামা-পায়ের ত্র্যহস্পর্শ একেবারে ঠিকঠিক ঘটল, কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়েই গেছে। পুরো কামরার লোক সচকিত হয়ে উঠল। যাঁরা শুতে যাব যাব করছিলেন তাঁরা ছুটে এলেন, যাঁরা অলরেডি শুয়ে পড়েছিলেন তাঁরাও কেউকেউ খচমচ করে বার্থ থেকে উঠে/নেমে পড়ে, পরনের আলুথালু কাপড় সামলাতে সামলাতে “কী হল কী হল” বলে ছুটে এলেন।

তারপর অন্তত মিনিট পাঁচেক ধরে প্রত্যক্ষদর্শীরা বাকিদের ঘটনাটা হাত পা নেড়ে অভিনয় করে দেখাতে লাগলেন, আশেপাশে থেকে “দিদি একটু দেখে চলবেন তো, কোথায় কী লেগে কী হয়ে যাবে বলা যায়? যা দিনকাল পড়েছে” ইত্যাদি ভালোভালো উপদেশ ভেসে আসতে লাগল, আর আমি কম্বলের তলায় শুয়ে শুয়ে প্রাণপণে ভগবানের কাছে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার প্রার্থনা করতে লাগলাম।

তারপর? তারপর আর কী। পরদিন সকালে আমাকে নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিচে নেমে আসতে হল, আগের দিন রাতে যিনি চেঁচিয়ে কামরা মাত করেছিলেন, সেই বৌদির “গায়ে ব্যথাট্যথা হয়নি তো?” প্রশ্নের উত্তরে মিষ্টি হেসে ঘাড় নেড়ে না-ও বলতে হল। কিছুক্ষণ বাদে শুকনো যমুনার ওপর দিয়ে ঘটাং ঘটাং করে ট্রেন এসে দিল্লি স্টেশনে ঢুকে গেল, আর আমিও লটবহর নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.