April 30, 2013

Things I am Not Loving



১. বিয়ের কোল্যাটারাল ড্যামেজ। আমার বাবার গর্মিতে গলা বসে গেছে, মা কোমরের ব্যথায় শয্যা নিয়েছেন। কাকুকাকিমাও জেরবার। ডেডলাইন যত এগোচ্ছে, টু ডু লিস্টের সাইজ ততই সম্ভবের সীমা ছাড়াচ্ছে। আমপাকানো গরমে একএকদিনে পাঁচ থেকে ছ’টা বাড়ি ঘুরে নেমন্তন্ন। একএক ট্রিপে শ্যামনগর থেকে পাটুলি। তার ওপর ক্যাটারার, ডেকোরেটর এদের প্যাঁচপয়জারের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া তো আছেই। সকলেই আমাদের থেকে বেশি বোঝে। “কাকু, লুচি আজকাল কোলেস্টেরলের ভয়ে কেউ খেতে চায় না, ফ্যাটফ্রি বেবি নান প্রেফার করে।” সকলেই আমাদের ভালো চায়। “কাকিমা, চারদিকে একগাদা ফ্যাটফেটে আলো দিয়ে কী হবে। স্রেফ ফালতু খরচ। ধুস্‌। বরং গাছের পাতার ফাঁকেফাঁকে টুকটাক টুনি গুঁজে দেব, আধো আলো আধো ছায়ায় বেশ রোম্যান্টিক আবহাওয়ার সৃষ্টি হবে। তারপর দেখতে না পেয়ে চিকেনবল্‌সের ওপরে বসা মশামাছিও টুথপিকে গুঁজে মুখে পুরে দেবেন, ক্ষতি কী, ওগুলোও তো প্রোটিন...”

একখানা বিয়ে করে ভালোবাসার লোকজনেদের এই হাঙ্গামার মধ্যে ফেলেছি ভাবতেই অপরাধবোধ হচ্ছে। ওদিকে টাকা, শরীর সব জলের মত ক্ষয় হচ্ছে আর এদিকে আমি রোজ ব্যাগ দুলিয়ে অফিসে এসেযেয়েই কূল পাচ্ছি না। কুলাঙ্গার আর কাকে বলে।

২. আমি ভেবেছিলাম শুধু মফস্বলের ট্রেনলাইনেই এই স্টেশনগুলো থাকে। যেখানে কেউ নামে না, কেউ ওঠে না, তবু ট্রেনগুলো রোজ নিয়ম করে থামে। শুধু থামেই না, অন্য ভিড়ভার্তিক স্টেশনগুলোয় যদি তিরিশ সেকেন্ড থামে তবে এগুলোয় কোনও কোনও দিন তিরিশ মিনিটও হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘোর অফিসটাইমে। ট্রেনশুদ্ধু লোকের যে ওদিকে উপস্থিতির খাতায় ঢ্যাঁড়া পড়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করেই। আমাদের লাইনে এই স্টেশনটার নাম হালুয়া। সাউথইস্টার্ন সাইডেও একখানা আছে শুনেছি। টিকিয়াপাড়ার ঠিক পরেই, একটু দাঁড়া

এখন দেখছি কেবল মফস্বলের ট্রেনলাইনেই নয়, খোদ রাজধানীর মেট্রোলাইনেও এই জাতীয় স্টেশনের আবির্ভাব হয়েছে। খান মার্কেট আর কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মাঝখানে, রোজ সূর্য ওঠার মতো নিয়মানুবর্তিতায় মেট্রো পাঁচ মিনিট থেমে দম নিচ্ছে। ব্যাপারটা আমার মোটে পছন্দ হচ্ছে না, কারণ আমার আগে একজন অফিসে ঢুকে পড়ছেন। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়টা আরও পাঁচ মিনিট এগোতে হবে দেখছি। জঘন্য।

৩. পি ভি আর। সেদিন গয়নার বাক্স দেখতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটা ছোট কুরুক্ষেত্র বেধেছিল। আমার দোষ নেই। কী হয়েছিল শুনুন। আমি অনলাইনে শুক্রবারের বিকেলের শো-এর টিকিট কেটেছিলাম। শুক্রবার দুপুরবেলা একজন ফোন করে অত্যন্ত বিরক্ত স্বরে বললেন, “আপনে কোই বাংগালি মুভি কা টিকিট লিয়া হ্যায় কেয়া?” জানা গেল যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সে সিনেমা আজ দেখাবে না, তাই আমার টিকিট শনিবারে ট্রান্সফার করা হচ্ছে।

শনিবার হলে উপস্থিত হয়ে দেখি থিকথিক করছে ভিড়। সবাই আয়রনম্যান দেখতে এসেছে। গগল্‌স্‌ আঁটা, পেশীবহুল, স্টিলেটো-চড়া সে ভিড়ের কাছে ঘেঁষতে ভয় লাগে, পাছে কেউ ধমক দেয়। অতি কষ্টে ভয় জয় করে ভিড়ের ফাঁকফোকর গলে কাউন্টারের সামনে গিয়ে আশেপাশে দুচারজন নিরীহ বাঙালিকে দেখে বুকে বল এল। আমার সামনেই একজন মাসিমা গয়নার বাক্সের দুখানা টিকিট কিনলেন। আমি গিয়ে যেই না আমার ফোন এগিয়ে এস এম এস দেখিয়ে ব্যাপারটা খুলে বলতে গেছি, ওপাশের অসম্ভব চালিয়াৎ দেখতে ভদ্রলোক মোটা গলায় বললেন, “মুভি আজ ভি নেহি চল্‌ রহা হ্যায়। টেকনিক্যাল ডিফিকাল্টিজ। কাউন্টার ছোড় দিজিয়ে, নে-এ-এ-ক্সট্‌।”

তারপর ঠিক কী কী হয়েছিল আমার মনে নেই, কারণ রাগে আমার মাথা ভোঁভোঁ করছিল, হাত পা ঠকঠক করে কাঁপছিল, আর আমি গলা সপ্তমে তুলে “ইয়ার্কি পায়া হ্যায়” মর্মে কিছু একটা চিলচিৎকার করে বলে চলেছিলাম। আমার মূর্তি দেখে শেষে একজন ম্যানেজার ভেতর থেকে এসে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে পুরো ব্যাপারটা আবার গোড়া থেকে বুঝিয়ে বলতে হল, তাতে তিনি ভয়ানক কৃপার হাসি হেসে বললেন, “আরে আরে রাগবেন না, বুঝতে পেরেছি আপনার সিনেমাটা খুবই দেখার ইচ্ছে, ভালো ডিরেকটরের বুঝি? ঘাবড়াবেন না, আমি টিকিট এনে দিচ্ছি। আপনি আমাকে শুধু টাকাটা দিয়ে দিন।”

বলে ভদ্রলোক হাসিহাসি মুখে হাত বাড়িয়ে তাকিয়ে রইলেন।

আমি জাস্ট তাকিয়ে রইলাম। ব্যাপারটা সত্যিসত্যি ঘটছে কি না বিশ্বাস হচ্ছিল না। ভাবলাম একবার বলি, ঘিলুর জায়গায় গোবর না থাকলে আজকাল বুঝি পি ভি আরে চাকরি দিচ্ছে না? কিন্তু নিজেকে সংবরণ করলাম। আবার সাতকাণ্ড রামায়ণ খুলে বসতে হল, বুকিং আই ডি দেখাতে হল, তারপর একটা আধাখ্যাঁচড়া সরি-র পর আমি অবশেষে হলে ঢোকার অনুমতি মিলল। কিন্তু ততক্ষণে আশেপাশের সবাই আমাকে চিনে ফেলেছেন। চেনাই স্বাভাবিক। আমাদের দেশে চেঁচানোর কারণ কেউ মনে রাখে না, যে চেঁচায় তাকে সবাই দেখে রাখে। হলের সামনে সকলেই আমার থেকে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে রইলেন, কেউ কেউ আবার আঙুল দেখিয়ে ফিসফিসিয়ে কী সব বললেনও। আমি ভুরু কুঁচকে, যথাসম্ভব রাগী মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। এমন একটা ভাব করে, যেন কে কী বলল তাতে আমার কিস্যু এসে যায় না।

দুঃখের কথা হচ্ছে এর পরেও আমি পি ভি আরে সিনেমা দেখতে যাব। আরও দুঃখের কথা হচ্ছে যে অনলাইনে টিকিট কেটেই যাব। নিজের ওপর এত ঘেন্না হয়। মাকে সেটা বলতে মা খুব হোহো করে হাসলেন। বললেন, “ও মা, যাবি না তো কী? এইজন্য কেউ সিনেমা দেখা বন্ধ করে? আবার যাবি, আবার ওরা ভুল করবে, আবার তুই চেঁচাবি, আবার ওরা সরি বলবে না। তুই আবার যাবি। চোরের ওপর রাগ করে কেউ মাটিতে ভাত খায়, বোকা?”

April 29, 2013

জুয়েল্‌রি বক্স




উৎস গুগল ইমেজেস

(নিচের লেখাটা টুং-এর ডায়েরির একটা পাতা থেকে নেওয়া। টুং-এর নাম টুং, কারণ ওর যমজ বোনের নাম টাং। টুং-এর ডায়েরি লেখার অভ্যেস আছে। গতকাল ওরা সবাই মিলে গয়নার বাক্স দেখতে গিয়েছিল। ফিরে এসে টুং তার মনে হওয়াগুলো ডায়েরিতে লিখে রেখেছে। আমি যখন বললাম এটা অবান্তরে ছাপালে কেমন হয়, টুং শ্রাগ করে চুইয়িংগাম চিবোতে চিবোতে চলে গেল। কাজেই ছাপানোতে টুং-এর আপত্তি নেই ধরে নিচ্ছি।

একটা কথা, টুং-এর লেখাটা থেকে সিনেমাটার গপ্প, দৃশ্য, ক্লাইম্যাক্স ইত্যাদি ফাঁস হয়ে যেতে পারে। যাঁরা স্পয়লারের ভয়ে সর্বক্ষণ কাঁটা হয়ে থাকেন, তাঁদের আগে থেকে সাবধান করে রাখলাম।)

28th April, 2013

ইয়েস্টারডে আমরা সবাই মিলে জুয়েল্‌রি বক্স দেখতে গেছিলাম। আমার কাল কোনও প্ল্যান্‌স্‌ ছিল না, তার ওপর মুভিটা অপর্ণা সেনের। তো বাবা যখন বলল কি মুভিটা দেখতে যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছে, আমি এগ্রি করে গেলাম।


স্টোরিটা একটা জুয়েল্‌রি বক্সকে নিয়ে। রাসমণি নামের এক চাইল্ড-উইডোকে বিয়ের সময় একগাদা হরিব্‌ল্‌ লুকিং জুয়েল্‌রি দেওয়া হয়েছিল, বুড়ি এখনও সেই নিয়ে অবসেস্‌ড্‌। তারপর সোমলতা ((((((((কঙ্কণা) বউ হয়ে ওদের ফ্যামিলিতে এল। শি ওয়জ ভেরি টিমিড অ্যান্ড এভরিথিং। তো ওই বুড়িটা মরার আগে বক্সটা সবাইকে লুকিয়ে কঙ্কণাকে দিয়ে গেল।


দ্য রেস্ট অফ দ্য স্টোরি হচ্ছে সোমলতা কী করে ওই বক্সের জুয়েল্‌রিগুলো ক্যাপিটল হিসেবে ইউজ্‌ করে মিত্রফ্যামিলির ফিন্যানশিয়াল সিচুয়েশনকে ইমপ্রুভ করল এট্‌সেট্‌রা এট্‌সেট্‌রা।


এমনিতে দেখলে মুভিটা জাস্ট একটা ভূতের গল্প বাট ইট অলসো হ্যাজ এ ভেরি স্ট্রং ফেমিনিস্ট অ্যাংগল। সোসাইটিতে উইমেনদের পজিশন, জুয়েল্‌রির সঙ্গে তাদের রিলেশনশিপ---কী করে ওভার দ্য টাইম চেঞ্জ করে যাচ্ছে সেটা খুব ক্লিয়ারলি দেখিয়েছে মুভিটাতে। কয়েকটা খুব স্ট্রং ফিমেল ক্যারেকটার আছে। ফার্স্ট অফ অল, পিসিমা। ছোট্টবেলা থেকে শি ওয়জ ডিপ্রাইভড অফ এভরিথিং যেটা ওকে খুব বিটার করে দিয়েছিল। আদারওয়াইজ শি ইজ কুল। সেক্সকে সিন মনে করে না, পাপপুণ্যে বিলিভ করে না, এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ারকে অ্যাকটিভলি সাপোর্ট করে। সোমলতা অন দ্য আদার হ্যান্ড ইজ ভেরি গুডি গুডি। তবে স্মার্ট আছে। কারোর এগেনস্টে যায় না, কিন্তু নিজের কাজটা ঠিক করে নেয়। শি অলসো হ্যাজ আ ভেরি শার্প বিজনেস মাইন্ড। সোমলতার মেয়ে (শ্রাবন্তী) হিপস্টার রেভলিউশনারি। সিগারেট খায় আর মোপেড চড়ে।


মুভিটা আমার কেমন লেগেছে? ফার্স্ট হাফটা ভীষণ ভালো, সেকেন্ড হাফের ফার্স্ট হাফটা চল্‌তা হ্যায়, আর লাস্ট ফরটিফাইভ মিনিট্‌স্‌, অনেস্টলি? আই, লাইক, টোট্যালি স্টার্টেড টেক্সটিং। যতক্ষণ ভূতের গল্প হচ্ছিল ইট ওয়জ প্রিটি ডিসেন্ট, শেষটায় হঠাৎ প্রেম, রেভলিউশন-ফেভলিউশন এনে দে জাস্ট রুইন্‌ড্‌ ইট।


ফর এক্স্যামপ্‌ল্‌, সোমলতার ফ্লিং-টা। ফ্র্যাংকলি? ঘুটঘুটে জঙ্গলের মধ্যে একটা লোক যদি রোজ আমার পেছনপেছন আসত আই উড হ্যাভ ফ্রিক্‌ড্‌ আউট। আর সোমলতার মতো একটা লেভেলহেডেড মেয়ে, একখানা লালগোলাপ দেখে সাডেনলি বারান্দা দিয়ে পাল্লুটাল্লু লুটিয়েমুটিয়ে দৌড় লাগাল, জাস্ট আনবিলিভেবল্‌ ম্যান। বাট মা সেড কি লভ মানুষকে দিয়ে অনেক উইয়ার্ড কাজকর্ম করিয়ে নেয়। সো, মে বি, আই ডোন্ট নো।


বাট সোমলতার মেয়ের প্রেমটা? হোয়াট ওয়জ দ্যাট? ফার্স্ট অফ অল, ওরা দেখাল কি মেয়েটা ওদের বাড়ির পুরোনো চাকর রামখিলাওনের নাতির সঙ্গে প্রেম করে। নো প্রবলেম, করতেই পারে, গুড ফর দেম। কিন্তু রামখিলাওনের নাতির ওই চেহারা? ছেলেটাকে, ট্রাস্ট মি, আমাদের কলেজের বাংলা অনার্সের ফার্স্টবয়ের মতো দেখতে। উশকোখুশকো চুল, গ্লোয়িং স্কিন, টুকটুকে লাল পাতলা ঠোঁট। ফাইভ মাইল্‌স্‌ দূর থেকে দেখলে যে কেউ বলে দেবে যে লিট্‌ল্‌ ম্যাগাজিনে কবিতা লেখে। তারপর ওদের কিসিং সিনটা...ও মাই গড...দুজনে অলটারনেট করে পোয়েমের লাইন বলতে বলতে...অফুল। হু ডাজ দ্যাট?! আমি মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ডিড ইউ গাইজ রিয়্যালি বিহেভ লাইক দ্যাট? তাতে মা আমাকে ডেঁপো মেয়ে বলেটলে বকে দিল।


পারফরম্যানস্‌ ওয়াইজ, মৌসুমী চ্যাটার্জি...আই ডোন্ট নো...স্লাইটলি ওভার দ্য টপ? ওই শ্বশুরের রোলটা যে করেছিল, পরাণ অ্যান্ড বরের রোলে শাশ্বত---দে ওয়্যার অস্‌সাম্‌। শাশ্বত ইজ সাচ আ কিউটি।


বাট দ্য বেস্ট পার্ট অফ দ্য মুভি, ডেফিনিটলি কঙ্কণা। ভিতু, তোতলা নিউলিওয়েড লতা থেকে শুরু করে কুল অ্যান্ড কমপোজড মিসেস মিত্র পর্যন্ত---ফাটাফাটি। শুধু কঙ্কণাকে দেখার জন্যই মুভিটা দেখতে যাওয়া উচিত। শি ইজ সিম্পলি দ্য বেস্ট।


সব মিলিয়ে জুয়েল্‌রি বক্স মোটামুটি। ডিপেন্ড করছে মুভিটার কোন্‌ হাফটা কার বেশি মনে আছে। আমার মায়ের ফার্স্ট হাফটা মনে আছে তাই মায়ের কাছে মুভিটা অ্যাবাভ অ্যাভারেজ মনে হচ্ছে। আমি আবার অনেক ট্রাই করেও সেকেন্ড হাফটা মাথা থেকে বার করতে পারছি না, তাই আমার কাছে গোটা মুভিটাই স্টুপিড লাগছে।


তবে মা বলছিল, শীর্ষেন্দু মুখার্জির লেখা অরিজিন্যাল স্টোরিটা নাকি অনেক বেটার। আমাদের বাড়িতে নাকি আছেও পুজোসংখ্যাটা, যেটাতে স্টোরিটা ফার্স্ট পাবলিশড হয়েছিল। মায়ের খুব ইচ্ছে আমি স্টোরিটা পড়ি। মা বলছে সিনেমাটা খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু স্টোরিটা পড়লে নাকি মন ভালো হবেই। দেখি, টাইম হলে পড়ে দেখব’খন।

April 27, 2013

সাপ্তাহিকী



শিল্পীঃ Lisa Adams

If you want to make God laugh, tell him about your plans.
                                                                                                      ― Woody Allen



সকলেই যখন সুন্দরী।



আমার প্রিয় লেখকের প্রিয় গল্পের প্রিয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন আমার প্রিয় অভিনেতা। সিনেমাটা দেখার জন্য মুখিয়ে আছি। যদ্দিন রিলিজ না করছে, তদ্দিন এই গানটাই ভরসা।

আজকের মিনি সাপ্তাহিকী এই পর্যন্তই। সপ্তাহান্ত খোশমেজাজে কাটাবেন, সোমবার আবার দেখা হবে। টা টা।

April 26, 2013

ঠাকুমার যুগ



বিয়েটিয়ের ঝঞ্ঝাটের মধ্যে একটা ভালো খবর হচ্ছে, ঠাকুমা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। এর পেছনে কতখানি ওষুধের জোর আর কতখানি মনের, সে নিয়ে বাড়ির সবারই সন্দেহ আছে। মেজ (এবং ঠাকুমার ফেভারিট, যদি নিজের মুখেই বলি) নাতনির বিয়েতে যাতে তাঁকে বিছানায় শুইয়ে রেখে সবাই বেশিবেশি আনন্দ না করে ফেলতে পারে সেজন্য ঠাকুমা আদানুন খেয়ে লেগেছেন। এমনিতে ফিজিওথেরাপি তাঁর দু’চক্ষের বিষ। রোজ সকালে ঠাকুমাকে পাঁচ পা হাঁটাতে গৌতমের ঘাম ছুটে যায়। ঠাকুমা দার্শনিক মানুষ, নশ্বর শরীরটাকে এত মনোযোগ দিতে ভাল্লাগে না তাঁর। আমাদের পাড়ার আরও বেশ ক’বাড়ির বুড়োবুড়ি গৌতমের ক্লায়েন্ট। রোজ সকাল ছ’টা বাজতে না বাজতে ভটভটি চেপে গৌতম আমাদের পাড়ায় ঢোকে, তারপর ঘণ্টাদুয়েক ধরে এপাশওপাশের বাড়ি থেকে “ওরে বাবারে, মরে গেলাম রে” জাতীয় চিৎকার শোনা যায়। আমার ঠাকুমা বেশি চেঁচান না, নাতনির মতোই তাঁরও রাগ হলে শাটডাউন করে যাওয়ার বদভ্যেস আছে, তিনি গোঁজ হয়ে মুখ বুজে সব যাতনা সহ্য করে নেন।

সেই ঠাকুমা এখন শুধু গৌতম আসার আগে লক্ষ্মীমেয়ের মতো দাঁত মেজে চুল বেঁধে রেডি হয়ে বসেই থাকেন না, গৌতম চলে যাওয়ার পরেও বিছানায় শুয়ে শুয়ে ওর দেখিয়ে দিয়ে যাওয়া এক্সারসাইজগুলো একাএকাই যতখানি সম্ভব প্র্যাকটিস করতে থাকেন।

আর কোনও কাজ নেই বলেই বোধহয় ঠাকুমার মাথায় সর্বক্ষণ বিয়ের কথা ঘুরতে থাকে। এই পয়লা বৈশাখের আগেপিছে যখন বাংলা টিভি চ্যানেল আর কাগজপত্রিকাগুলো লালপাড়া সাদা শাড়ি পরা, কপালে লেপে সিঁদুর আর হাতে কুলো আর ঠোঁটে শাঁখ ধরা মহিলার ছবিতে ছেয়ে গিয়েছিল, তখন একদিন হঠাৎ হাত থেকে কাগজ ফেলে ঠাকুমা ঘরে আগুন লাগার ভাব করে “অর্চনা! অর্চনা!” চেঁচাতে শুরু করলেন।

মা তাড়াতাড়ি চৌকাঠ-মৌকাঠ সামলে দৌড়ে এলেন।

“কী হয়েছে মা?”

“কুলা সাজাইতে হইব না? খালি কলকাতা গেলেই হইব?”

ঠাকুমার আরেকটা দু’চক্ষের বিষ বাড়ির লোকের সকালবিকেল ব্যাগ দুলিয়ে কলকাতা যাওয়া। ঠাকুমা নিজে এককালে ছেলেমেয়েকে স্কুল আর স্বামীকে অফিসে পাঠিয়ে সারাদিন কলকাতা চষে বেড়াতেন। একাএকাই হলে গিয়ে সিনেমা দেখতেন, নিউ মার্কেটে বাজার করতেন। সেসব সুখ তাঁর ঘুচেছে অনেকদিন হল। তাই এখন অন্য কাউকে কলকাতা যেতে দেখলেই ঠাকুমার গাজ্বালা করে।

মা করুণ মুখ করে বললেন, “আর কুলো। ওসব হবে না মা, আপনার নাতনি ভেটো দিয়ে দিয়েছে।”

ঠাকুমা দু’সেকেন্ড ভেবে বললেন, “আচ্ছা। তাহলে প্রদীপ? আমার খাটের তলায় যে বড় পিতলের প্রদীপখান আছে, ওইটা ভালো কইর‍্যা মাইজ্যাটাইজ্যা রাখ, সারারাত জ্বালাইতে হইব কিন্তু।”

মা আমাকে ফোনে জিজ্ঞাসা করলেন, “কীরে, প্রদীপ জ্বালাব? নাকি তাতেও তোর লজ্জা করবে?”

আমি খানিকটা ঠাকুমার মুখ চেয়েই বললাম, “সে জ্বালাওগে। কিন্তু খাটের তলায় জ্বালাবে বলে দিচ্ছি, কেউ যেন না দেখে। যত্তসব।”

সত্যি বলছি, এই বিয়েতে আমার ঠাকুমার পারফরম্যান্স দেখে আমি মুগ্ধ। আমি ভেবেছিলাম আমার বিয়ের রকমসকম শুনে ঠাকুমা হয় চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলবেন নয় কেঁদে বিছানাবালিশ ভাসাবেন। ঠাকুমা এর একটাও করেননি। ইনফ্যাক্ট ওসব তুচ্ছ ব্যাপারে ঠাকুমার ইন্টারেস্টেডই নন। বিয়ের আগে তাঁর কড়িয়াল বেনারসীর ব্লাউজপিস বানানো হয়ে আসবে কিনা, একমাত্র সেই চিন্তা তাঁকে এখন কুরে কুরে খাচ্ছে। অনেক ঘাটের জল খেয়ে ঠাকুমা চুরাশি বছরেরটি হয়েছেন, তিনি জানেন দরজিব্যাটাগুলোকে বিশ্বাস নেই। রোজ বিকেলে মাকে একবার করে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে হয় যে দেবশ্রীতে ফোন করা হয়েছে, ব্লাউজ এই হয়ে এল বলে। এর মধ্যে আবার একবার খাট থেকে গড়িয়ে পড়ে গিয়ে কপালে কালশিটে পড়ে গেছে, তাতে দুবেলা নিয়ম করে বোরোলিন লাগানো চলছে যাতে ১১ তারিখের আগে দাগটাগ সব মিলিয়ে যায়। এসবের ওপর মাথার কাজ তো আছেই। অবসর সময়ে ঠাকুমা ভেবেভেবে তাঁর মগজের তূণে বাছাই করা ধারালো রসিকতার তীর পুরে রাখছেন, যাতে তার ঘায়ে নাতজামাইকে চিৎপাত করতে পারেন।

সবকিছুর মধ্যে একটা আধুনিকতাই ঠাকুমাকে কাবু করেছে সবথেকে বেশি। বিয়ের আগে ছেলেমেয়ের ভাবভালোবাসার ব্যাপার অনেকদিন জলভাত হয়ে গেছে, আজকাল বরং অন্যরকম বিয়ে হলেই সবাই টেনশনে থাকে। কিন্তু বিয়ের আগে যে শাশুড়ি-বউ একসঙ্গে বেনারসী পছন্দ করতে বেরোয়, আর বেরিয়ে দুপুরবেলা দোকানে বসে চাউমিন খায় আর লাইমসোডায় চুমুক দিতে দিতে গল্প করে, এইটা বিশ্বাস করতেই ঠাকুমার হাঁ হয়ে যাচ্ছেন।

সেদিন বৌভাতের শাড়িটাড়ি কিনে বাড়ি ফিরে ঠাকুমার পাশে বসে নিয়মমতো সারাদিন কী কী হল, কী কী কেনা হল, কী কী খাওয়া হল এসবের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছিলাম। ঠাকুমা অবাক হয়ে শুনছিলেন, আর মাঝে মাঝে বিজলিদির দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে বলছিলেন, “কী দিন আইল, অ্যাঁ?”

বিজলিদি বলছিল, “সে তো আসবেই। আপনি কী ভাবছিলেন, সবাই আপনার যুগে পড়ে আছে?”

ঠাকুমার বুক থেকে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস বেরোলো শুধু।

তারপর হঠাৎ কী ভেবে জিজ্ঞাসা করলেন, “আর শ্বশুরমশাই?”

আমি বললাম, “ছিলেন তো। ইনফ্যাক্ট কাকুই তো জুতোটা পছন্দ করে দিলেন...”

ঠাকুমার মুখটা তখন সত্যি সত্যি বিঘতখানেক হাঁ হয়ে গেল।

আর আমি ভাবার চেষ্টা করলাম, ঠাকুমা যখন বিয়ে হয়ে প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি এসেছিলেন তখন তাঁর কেমন লেগেছিল। চোদ্দ বছরের একটা পুঁটলিপাকানো মেয়ে, মাঠঘাটনদীপুকুর ছেড়ে হঠাৎ কলকাতা শহরের মধ্যিখানে, পাশে ট্রাঙ্ক হাতে একটা বয়সে বড় অচেনা লোক। বাড়িতে দাপুটে শাশুড়ি, পালপাল দেওর ননদ, যাদের অধিকাংশের বয়সই ঠাকুমার থেকে বেশি। খিদিরপুরের কোয়ার্টারসের সিঁড়িতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন ঠাকুমা। শাশুড়ি এসে চিবুক তুলে মুখ দেখছেন, প্রতিবেশীরা ভিড় করে উঁকিঝুঁকি মারছে, ননদদেওররা “বৌদি, বৌদি” করে ছেঁকে ধরেছে, আর চোখভরা টলটলে জল নিয়ে ঠাকুমা কেবল একটা কথা মনের ভেতর জপে চলেছেন, আর মাত্র তিনমাস। তারপরেই বড়দা আসবে দেখা করতে। কথা দিয়েছে।

আমি নিচু হয়ে ঠাকুমার গলা জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, “ভাগ্যিস তোমাদের যুগ আর নেই। থাকলে কী বিপদটাই না হত, বাবারে।”

April 24, 2013

ফুচকা



অটো থেকে নেমে ব্যাগ থেকে পার্স বার করে বেছে বেছে ন্যাতানো নোটগুলো অটোওয়ালাকে চালান করছি, পেছন থেকে একজন হর্ন দিয়ে দিয়ে কানের পোকা নড়িয়ে ফেলল।

“সরছি রে বাবা, সরছি” মনে মনে বলে আমি কাঁধ থেকে খসে পড়া ব্যাগ পিঠের দিকে ঠেলে দিয়ে তাড়াতাড়ি মাঝরাস্তা থেকে বাজারের দিকে আসার চেষ্টা করলাম।

আমার দোষ নেই। অটোওয়ালারও নেই। দিল্লিতে সবাই মাঝরাস্তায় থামে। শত হলেও নবাবদের শহর, নবাবিয়ানাটা এ শহরের মানুষের রন্ধ্রেরন্ধ্রে ঢুকে গেছে। আমি এই এইখানে আপনাকে নামিয়ে দিলাম, এইবার অগ্রপশ্চাৎএপাশওপাশ থেকে রে রে করে ছুটে আসা গাড়ির চাকার তলায় থেঁতলে না গিয়ে রাস্তা পেরোনোর দায়িত্ব আপনার। অটো, বাস, প্রাইভেট কার, ফটাফট্‌ সার্ভিস, সকলেরই একই ভঙ্গি।

ফটাফট্‌ কী? ওহ্‌, ওটা হচ্ছে একটা শাটল সার্ভিস, মেনলি মেট্রোস্টেশনগুলোর মধ্যে দৌড়োদৌড়ি করে। সার্থকনামা। চেহারায় না বাস, না অটো। দিল্লির রাস্তায় ফটাফটের দাপট দেখলে আপনি হাঁ হয়ে যাবেন। বাস লরি থেকে শুরু করে স্কোডা মার্সিডিস বি এম ডবলিউ সবাই ফটাফট্‌কে সাইড দেয়। আমার খুব শখ গাড়িটায় একবার চড়ি, কিন্তু আমাদের রুটে আবার ফটাফট্‌ চলে না। লোকাল অটো ইউনিয়ন শাসিয়ে রেখেছে বোধহয়। এদিকে নাক গলিয়েছ কি আরেকখানা হস্তিনাপুর নামিয়ে দেব।

জিপ খোলা ব্যাগ, পার্স, গাড়িঘোড়া সামলে রাস্তা পেরোচ্ছি, লোকটা তখনও হর্ন দিয়ে চলেছে। কে বস্‌। আমি আর ঘাড় না ঘুরিয়ে পারলাম না। আর ঘুরিয়েই চক্ষু চমৎকার। গাড়ির ভেতরে মাথায় টুপি আর চোখে গগল্‌স্‌ পরে, সারা মুখে একখানা তিরিক্ষে ভাব মেখে আমাদের ফুচকাওয়ালা বসে আছেন। আর মিনিটপাঁচেক পরেই আমি যাঁর সামনে শালপাতার বাটি ভিক্ষার ভঙ্গিতে পেতে দাঁড়ানোর প্ল্যান করছি।

এইবেলা একটা কথা পরিষ্কার করে রাখা দরকার। আমি অটো ঠেঙাচ্ছি আর আমার ফুচকাওয়ালা গাড়ি চাপছেন, এইটা কিন্তু কোনওভাবেই আমার মনে কোনও বিদ্বেষের জন্ম দেয়নি। আমি সেফ খেলে বাবামায়ের ঘাড়ে চেপে খানকয়েক পাশ দিয়ে চাকরি জুটিয়েছি, আর উনি গায়ের রক্ত জল করে শূন্য থেকে শুরু করে একটা রমরমা ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। কোনওরকম ব্যাকিং ছাড়া। আমাদের দুজনের মধ্যে গাড়ি চাপার যোগ্যতা যদি কারও থাকে, তাহলে সেটা যে ওঁরই আছে এ নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। আর আমার যে সন্দেহ নেই, সেটা নিয়ে আপনাদেরও কোনও রকম সন্দেহ থাকুক আমি তা চাই না।

এই লেখাটা যত না ওঁকে নিয়ে তার থেকে অনেক বেশি ফুচকাকে নিয়ে।

আর সেজন্যই আমার বাবার কথাটা মাথার ভেতর তখন থেকে ঘুরে চলেছে।

আমার বাবা বিশ্বাস করেন পয়সা হওয়া আর উচ্ছন্নে যাওয়া আসলে একই কয়েনের এপিঠ আর ওপিঠ। আরও পরিষ্কার করে বললে, বাবামার পয়সা হওয়া আর ছেলেমেয়ের উচ্ছন্নে যাওয়া। আমার বাবা মনে করেন বাচ্চার বড় হওয়ার রেসিপিতে কৃচ্ছসাধনা একটা অপরিহার্য উপকরণ। বাবামা ভালোবাসা দেখিয়ে তাকে ডিজাইনার জামা ব্র্যান্ডেড জুতো কিনে দিতে পারেন, সপ্তাহে তিনদিন ক্যান্ডেললাইট ডিনারে নিয়ে যেতে পারেন, মাধ্যমিক পাশ করলে পাড়াকাঁপানো পালসার কিনে দিতে পারেন, কিন্তু এগুলো চরিত্রগঠনের কফিনে একের পর এক পেরেক ছাড়া আর কিছু না।

আমি বাবার মনোভাবটা বুঝতে পারি, কিন্তু পুরোটা যে সমর্থন করি এমন নয়। পয়সা হওয়াটা তো পাপ হতে পারে না, আর পয়সা হলে জীবনযাত্রার মান একই জায়গায় থেমে থাকবে সেটাও অসম্ভব। ইকনমিক্সের থিওরির মতে থাকা উচিতও নয়। আর আমার পয়সা হয়েছে, আমি হোন্ডা সিটি থেকে সিভিকে আপগ্রেড করে গেলাম, আর আমার সন্তান সেই লজঝড়ে হিরো সাইকেলে আটকা পড়ে রইল, এটাও খুব একটা এথিক্যাল বলে আমার মনে হয় না।

আমার খুব দুঃখ হলেও বলতে হচ্ছে আমাদের ফুচকাওয়ালার ক্ষেত্রে বাবার কথাটা একেবারে অক্ষরেঅক্ষরে ফলেছে। তিনি ফুলেফেঁপে উঠেছেন, তাঁর ফুচকা গোল্লায় গেছে।

ফুচকা নিয়ে আমার খুঁতখুঁতুনির কথা স্বীকার করতে আমার কোনও লজ্জা নেই। ফুচকার আকার আয়তন, তেঁতুলজলের তাপমাত্রা, আলুমাখার টেক্সচার থেকে শুরু করে প্রত্যেক ব্যাচে অপটিমাম কত জন খাইয়ে থাকা উচিত, সব নিয়ে আমার অত্যন্ত কড়া মতামত রয়েছে। যদিও শেষের ব্যাপারটা ফুচকাওয়ালার স্পিডের ওপর নির্ভরশীল, তবু বিগত প্রায় কুড়ি বছরের নিরলস রিসার্চের পর আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে একটা ফুচকার ব্যাচে চার থেকে ছয় জন খাইয়ে থাকলেই সবথেকে ভালো। চারের কম থাকলে ফুচকা মুখে পুরে, চিবিয়ে, গিলে, শালপাতার জলটুকু শান্তি করে খাওয়ার সময় পাওয়া যায় না। আর ছয়ের বেশি হলে একখানা ফুচকা খেয়ে হাঁ করে চাতকপাখির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। দুটো পরিস্থিতিই সমান বিরক্তিকর।

কিন্তু আমাদের মতো ফুচকা-শুদ্ধতাবাদীদের পক্ষে সময় দ্রুত খারাপ হয়ে আসছে। এই ঘোর বাঙালি ঘেটোতে পর্যন্ত, তেঁতুলজলের চকচকে স্টিলের পিপেটার পাশে সামান্য ছোট আরেকটা পিপে জাঁকিয়ে বসেছে। ওতে নাকি “মিষ্টি জল” থাকে। কিছু লোক দেখি নিয়মিত তেঁতুলজলের বদলে ওই মিষ্টি জল দিয়ে ফুচকা খায়। খেয়ে আবার “আআআহ্‌” বলে তৃপ্তিসূচক আওয়াজও করে। আমি নিশ্চিত সেদিনের আর বেশি দেরি নেই যেদিন কেউ এসে ফুচকায় কাবলিছোলার টপিং দাবি করবে।

যাকগে মরুকগে। করলে করবে। আটকাতে যখন পারব না, তখন ভেবে লাভ নেই।

গত কয়েক মাস ধরে আমাদের এই ফুচকাওয়ালা ভদ্রলোকের ব্যবসা দেখার মতো বেড়েছে। বাড়াই উচিত, কারণ সত্যিই এত ভালো ফুচকা আমি কলকাতাতেও দু-এক জায়গা ছাড়া খাইনি। তাই রোজ যখন ছয়ের জায়গায় বারোজনের সঙ্গে কনুইয়ের ধাক্কাধাক্কি করে ফুচকা খেতে হচ্ছিল তখন আমি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম যে, ফুচকার নাম বিশ্বে যত প্রচার হবে বাঙালি হিসেবে আমার গর্ব তো বাড়বে বই কমবে না। তার জন্য এটুকু কষ্ট না হয় সইলামই।

কিন্তু কষ্টের ধাতটাও ওই পয়সার মতো। বাড়তে শুরু করলে আর কমার জো নেই। খাইয়েদের ভিড় সামাল দেওয়ার জন্য ভদ্রলোক কিছু অল্পবয়সী অ্যাসিস্টান্ট আমদানি করলেন। যাদের একজনও বাঙালি নয়।

আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি জানি কলকাতায় যাঁদের হাতের ফুচকা খেয়ে আমরা সম্মোহিত হয়ে থাকি, তাঁদের নব্বই শতাংশের নাম হয় পাপ্পু নয় রাজিন্দর। কিন্তু তাঁরা রোজ বাংলাদেশের ধুলো খান, গড়ের মাঠের হাওয়া খান, দক্ষিণাপনের গেটে দাঁড়িয়ে ফুচকা বিলি করতে করতে পাঞ্জাবি কিংবা বুটিক শাড়ির আঁচলে ছাপা জীবনানন্দের কবিতার ছত্রে তাঁদের নিয়মিত চোখ পড়ে, মাথায় ফুচকাভর্তি কাঁচের বাক্স আর বগলে বিরাট মোড়া নিয়ে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকার সময় দেবব্রত বিশ্বাসের রবীন্দ্রসংগীত না শুনে তাঁদের পালাবার জো নেই। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি সুস্মিতা সেন কিংবা সৌরভ গাঙ্গুলির থেকে ওঁরা ঢের বেশি বাঙালি।

এই অ্যাসিস্ট্যান্ট বেচারারা জীবনানন্দ তো দূরে থাক, ফুচকা ব্যাপারটাই আগে কখনও চোখে দেখেনি। গোলগাপ্পা হয়তো খেয়েছে এদিকসেদিক, কিন্তু সেটাকে ফুচকার সিভিতে অভিজ্ঞতা হিসেবে ঢোকাতে গেলে আমাকেও পাশ্চাত্য মার্গসংগীতের একজন দিক্‌পাল বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

হয়তো একদিন শিখে যাবে, কিন্তু এখন সে ছেলের হাতে ফুচকা খাওয়া যে কী কঠিন ব্যাপার সে ভুক্তভোগীই জানে। ধরুন প্রথম ফুচকাটা খেয়ে আমি তাকে বললাম, ভাই আমাকে আরেকটু ঝাল দিয়ো তো প্লিজ। আলুতে ঝাল বেশি থাকুক বা কম, আমি এই অনুরোধটা করি। কেন করি কে জানে। আমার বিশ্বাস এর পেছনেও মায়ের হাত আছে। ছোটবেলায় যখন মা খেতে বসিয়ে বাকি সবার দিকে চোখ টিপে “বাব্বা, আমাদের সোনা কত বড় হয়ে গেছে, বড়দের ঝাল তরকারিও খেয়ে ফেলতে পারে” মার্কা ভুজুং দিতেন, আমার বুকটা গর্বে তিনহাত ফুলে উঠত। সেই আবেগটাই এখনও কাজ করে নিশ্চয়। আমি বেশি ঝালওয়ালা ফুচকা খাচ্ছি, আর আমার আশেপাশের লোকজন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে, এইটা আমার একটা চরম দুর্বলতার জায়গা।

এ ছেলে ওসবে কর্ণপাতই করে না। আমি “ঝাল দাও ঝাল দাও” বলে গলা ভেঙে ফেলি, সে পাথরের মতো মুখ করে ফুচকা দিয়ে যেতে থাকে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ঠ্যাঁটা, কিছুদিন পর একটা সন্দেহ হওয়ায় ঝালের বদলে যেই না বলেছি, “থোড়া মিরচি ডালনা প্লিজ”, অমনি দেখি সে ব্যাজার মুখে একখাবলা লংকা আলুতে মিশিয়ে দিল।

কাল ফুচকা খেতে গিয়ে দেখি পরিস্থিতি একটু বেশি খারাপ। বারোর বদলে বাইশজন লোক ফুচকার টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছেলেটা একজনকে বিনা মিরচি, তার পাশের জনকে মিঠা পানি, তার পাশের জনকে “ও মাই গড, নো ডার্টি ওয়াটার প্লিজ” ফুচকা দিতে গিয়ে গলদঘর্ম। এদিকওদিক তাকিয়ে দেখি মালিক ততক্ষণে গাড়ি পার্ক করে ভিড়ের থেকে খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে আরাম করে বিড়িতে টান দিচ্ছেন। চলে আসাই উচিত ছিল, কিন্তু কাল অফিসেও একটা বিশেষ খারাপ মিটিং-এ ঝাড়া দুঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছিল, কাজেই মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবে আমি দুর্গা বলে ভিড়ের ভেতর ঢুকে পড়লাম।

তারপর শুরু হল ঘণ্টায় একটা করে আলুনি, আঝাল ফুচকার দীর্ঘ বোরিং মিছিল। একবার তো পাশের ভদ্রলোকের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে ছেলেটা আরেকটু হলেই একটা মিঠাপানির ফুচকা আমার শালপাতার ওপর ধপ্‌ করে ফেলছিল, আমি প্রাণের দায়ে চিৎকার করে ওঠায় কোনওমতে শেষরক্ষা হল। কিন্তু চেঁচানির চোটে ওর হাত চলকে ফুচকার অর্ধেক জল ছিটকে আমার কুর্তার হাতা ভিজিয়ে দিল।  

মনটা একদম তেতো হয়ে গিয়েছিল জানেন। ভিড় থেকে বেরিয়ে এলাম। ডাস্টবিনে শালপাতা ফেলে হাতের আঙুলগুলো জিনসে ঘষে মুছলাম। ব্যাগ খুলে পার্স থেকে একটা দশ টাকার নোট বার করতে যাব এমন সময় পেছন থেকে কাঁধে একটা টোকা পড়ল। ঘুরে দেখি মালিক ভদ্রলোক। একটা শেষ টান দিয়ে বিড়িটা ছুঁড়ে ফেলে ভদ্রলোক বললেন, “একটু দাঁড়ান দিদি।”

ব্যাপারটা কী হচ্ছে বোঝার আগেই দেখি বাইশের ব্যাচ ভেঙেছে। ব্যাচের লোকজন ধীরে ধীরে ছত্রাকার হয়ে যাওয়ার পর ভদ্রলোক টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। ছেলেটাকে বললেন, “তু অব থোড়া আলুকাবলি দেখ, ম্যায় ইধার দেখ রহা হুঁ।” বলে স্টিলের লম্বা চকচকে হাতাটা দিয়ে তেঁতুলজলের পিপেটা দুবার ঘুলিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আসুন দিদি।”

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো গুটিগুটি এগিয়ে গেলাম। দেখি এদিকসেদিক থেকে আরও জনাচারেক লোক এসে আমার আশেপাশে দাঁড়ালেন। একজন মাঝবয়সী মা-মা দেখতে মহিলা, একজন কাঁচাপাকাচুলো প্রৌঢ় ভদ্রলোক, একটা বছর ষোলোর চশমা পরা লিকপিকে ছেলে, আর একটা ওই বয়সেরই মিষ্টিমতো মেয়ে। বোঝাই যাচ্ছে ছেলেটার সঙ্গী।

আমি কিছুতেই চিহ্নিত করতে পারছিলাম না জিনিসটা কী, কিন্তু চেহারা বয়সের সব অমিল ছাপিয়ে আমাদের পাঁচজনের মধ্যে একটা কিছু কমন ছিল। ওঁরা পাশে এসে দাঁড়ানো মাত্র আমি সেটা টের পেয়েছিলাম। ওঁরাও পেয়েছিলেন নিশ্চয়। ফুচকাওয়ালা ভদ্রলোকের হাত থেকে শালপাতার প্লেট নিতে নিতে আমরা সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে অল্প হাসলাম।

তারপর ভদ্রলোক শার্টের আস্তিন গুটিয়ে আচ্ছা করে আলুভাতে চটকে চটকে মাখলেন। চিমটি করে নানারকম মশলা মেশালেন, ছ্যাত করে বেশ খানিকটা তেঁতুলের জল ছেটালেন। আমি অনেক দ্বিধা কাটিয়ে সবে মুখ খুলতে যাব, অমনি দেখি উনি একটুখানি আলু আলাদা করে নিয়ে বেশ বড় একখাবলা ঘন সবুজ কুচো লংকা মিশিয়ে দিলেন।

তারপর শুরু হল ফুচকার পালা। ফুচকা তো নয়, ওয়ার্ক অফ আর্ট। নিটোল, নিখুঁত, একবারে মুখে পোরার জন্য একেবারে মাপমতো সাইজের। পারফেক্ট ঝাল, পারফেক্ট নুন, পারফেক্ট মশলা। আলু, ফুচকা আর জলের অনুপাতের পারফেক্ট মিশ্রণ।

ভদ্রলোক কোনওদিকে না তাকিয়ে একমনে ফুচকা দিয়ে যেতে লাগলেন। আমরা ঘোরের মতো খেয়ে যেতে লাগলাম। আর খেতেখেতেই আমার মাথায় বিদ্যুতের মতো খেলে গেল যে আমার চারপাশে এঁরা কারা দাঁড়িয়ে আছেন।

ফুচকাকে যাঁরা সত্যিসত্যি ভালোবাসেন, এঁরা সেই লক্ষলক্ষ বাঙালির প্রতিনিধি। সময় সমাজ পরিস্থিতি যতই বদলাক না কেন, কোনও মিঠাপানির সাধ্য নেই এঁদের গলা টিপে মারে, কোনও কলেরার বাবার সাধ্য নেই এঁদের শরীরে ছুঁচ হয়ে ঢোকে।

একসময় ভদ্রলোকের বিনীত কণ্ঠস্বরে আমার ঘোর ভেঙে গেল।

“চার প্লেট হয়েছে, আর দেব কি?”

আমরা সবাই মাথা নেড়ে না বললাম। যে যার পকেট থেকে পয়সা বার করতে লাগলাম। ভদ্রলোক আমাকে একটা জলছাড়া শুকনো ফুচকা বিটনুন ছড়িয়ে দিলেন, ছেলেমেয়ে দুটোর শালপাতায় একএক হাতা করে তেঁতুল জল ঢেলে দিলেন, বয়স্ক ভদ্রলোকের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে তিনি বললেন, “না না আমাকে আর কিছু দিয়ো না, বাড়িতে একগাদা রান্না হয়েছে, সেগুলোও তো খেতে হবে নাকি?” আর গোলগাল মায়ের মতো মহিলা দু-সেকেন্ড ভেবে ‘ধুস্‌ যা হয় হবে’ টাইপের মুখ করে একখানা শুকনো ফুচকা চেয়ে মুখে পুরে দিলেন।  

আমার আশীর্বাদের যদি জোর থাকে, তাহলে ফুচকাওয়ালা ভদ্রলোক অচিরেই অল্টো ছেড়ে মার্র্সিডিসের মালিক হবেন। কেউ আটকাতে পারবে না।   

April 23, 2013

The Eye Camera by Carrie Liao





ব্যাপক তো!!!


ক্যামেরাটা গেল কই


যাত্তারা...


...কী খাজা উঠেছে বস্‌



জঘন্য


ইস্‌ যদি এমন হত যে...


...চোখটাই ক্যামেরা হত?



চোখ বুজলেই...



Photobucket
খচাৎ! 



Photobucket


Photobucket


Photobucket

যখনই কেউ বলত, "দিদি একটা ছবি যদি..." আমি বলতাম, "শিওর, মাই প্লেজার।"

আর তারপর...




Photobucket



এঁরা কারা কুইজের উত্তর

April 22, 2013

কুইজঃ এঁরা কারা?





১. জন্মদিন ৬ই জানুয়ারি ১৮৫৪, ড্রাগ-অ্যাডিক্ট, ওয়েল মার্কড Supra-orbital development ওয়ালা Dolichocephalic খুলির মালিক। দিনের পর দিন কিছু না খেয়ে থাকতে পারেন। খবরের কাগজ পড়েন না, কারণ অদরকারি তথ্য দিয়ে মস্তিষ্কের RAM জ্যাম করায় বিশ্বাস করেন না।

২. ইনি আবার দিনে দুটো করে খবরের কাগজ পড়েন, নিয়ম করে চার্চে যান, বাগান করতে ভালোবাসেন, তার থেকেও বেশি ভালোবাসেন লোকের কেচ্ছা ঘাঁটতে। মানুষকে মোটে বিশ্বাস করেন না। অবিবাহিত।

৩. বিধবা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, মনে সিংহের মতো তেজ আর জিলিপির মতো প্যাঁচ। ঘাসের চচ্চড়ি রেঁধে বড়লাটকে তাক লাগাতে পারেন, রেগে গিয়ে তাকালে গরু তিনদিন দুধের বদলে দই দেয়।

৪. ডোরাকাটা, হাসিখুশি, এদিকে নাম রাখা হয়েছে এক গোমড়ামুখো দার্শনিকের নামে। প্রিয়বন্ধু এবং মালিকের বয়স ছয়।

৫. ঠিকানা, সর্দার শংকর রোড, লেক মার্কেট। বইয়ের পোকা, তথ্যের শিকারি। বলতে গেলে মাথার ভেতর জেরক্স মেশিন বসানো আছে। মনের জানালা সর্বদা খোলা রাখেন। আর পাঁচটা বুদ্ধিমান লোকের মতো এঁর পৈতৃক নিবাসও পূর্ববঙ্গ।   

৬. কুচকুচে কালো নধর দেহ, দেহে বোঁটকা গন্ধ, আধহাত দাড়ি। কচি পটলের মতো দুটো শিং, মনিবপত্নী আদর করে কেমিক্যাল সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছেন। গলায় লাল টুকটুকে ফিতে, মনিবের সাত বছরের মেয়ে টেঁপি ভালোবেসে পেঁচিয়ে দিয়েছে।

৭. পেশা ব্যারিস্টারি, নেশা স্টাইল। অক্সফোর্ডে সাত বছর কাটিয়ে দেশে ফিরে কথার কারখানা খুলে বসেছেন। লেখালিখি, প্রেম, সাজপোশাক---সব নিয়েই জোরগলায় মতামত দিয়ে থাকেন। ট্যাঁশ মহিলামহলে ভয়ানক জনপ্রিয়।

৮. হাইজাম্পে মহকুমা এক্সিবিশনে ফার্স্ট, দুর্ধর্ষ সেন্টার ফরওয়ার্ড, সাঁতারে অদ্বিতীয়। গাছে উঠতে পারে, ঘোড়ায় চড়তে পারে, বক্সিং করতে পারে। এসব করতে গিয়ে অবশ্য এফ.. পরীক্ষার রেজাল্টটা একটু খারাপ হয়ে গেছে। সেকেন্ড ক্লাস।

৯. সহাস্য সঙ্গীতজ্ঞ, মুন্ডিতমস্তক। পয়সা পাওয়ার আশায় ফাঁসি যেতেও রাজি।

*****

নিয়মাবলীর চর্বিতচর্বণঃ ওপরের লোকগুলোকে চেনার জন্য আপনারা সময় পাবেন চব্বিশ ঘণ্টা। দেশে মঙ্গলবার সকাল দশটা আর নিউইয়র্কে সোমবার রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত। ততক্ষণ কমেন্ট অফ করা থাকবে। 

অল দ্য বেস্ট। 


*****

খেলা শেষ, এবার উত্তরের পালা।

১. শার্লক হোমস

২. মিস মার্পল। অবিবাহিত শব্দটা দেখে অনেকে হারক্যুল পোয়্যারো আন্দাজ করেছেন। তবে চার্চ আর কেচ্ছার ক্লুদুটোর কথাও মাথায় রাখতে হবে। পোয়্যারোও আস্তিক ছিলেন, কিন্তু মার্পলের সঙ্গে চার্চের সম্পর্ক অনেক নিবিড় ছিল। তাছাড়া পোয়্যারো  সারাদিন বাইনোকুলার চোখে এঁটে লোকের কেচ্ছা খুঁজে বেড়াতেন না। ও হ্যাঁ, বাগান। পোয়্যারো একবার গ্রামে গিয়ে কুমড়ো ফলানোর চেষ্টা করেছিলেন, তাঁর বাগানের দৌড় ওর বেশি আর এগোয়নি।

আর আমার নিজের বিশ্বাস পোয়্যারো মিস মার্পলের মতো অত সিনিকও ছিলেন না।

৩. পদিপিসি

৪. হব্‌স্‌

৫. সিদ্ধেশ্বর বোস, ওরফে সিধু জ্যাঠা।

৬. লম্বকর্ণ

৭. অমিত রে

৮. শঙ্কর। এখানে যারা টেনিদা বলেছে আমি তাদের যুক্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু বিভূতিভূষণ দাবি করেছেন যে শঙ্কর সত্যি সত্যিই ওই সব কিছু পারত। আর স্রষ্টার কথা মেনে নেওয়া ছাড়া আমরা নিরুপায়। কাজেই।

৯. নেড়া


April 20, 2013

সাপ্তাহিকী



আলোকচিত্রীঃ Julien Coquentin


A lie gets halfway around the world before the truth has a chance to get its pants on. 
                                                                                       ― Winston Churchill


একটা ভালো খবর দিয়ে সপ্তাহান্ত শুরু করা যাক। কী বলেন?


লোকে লাইব্রেরিতে কী করে। আমি অবশ্য এগুলোর একটাও করি না। আমি সামনে বইখাতা খুলে রেখে হাঁ করে লোক দেখতে থাকি। 

অবশ্য এরকম একখানা লাইব্রেরি পেলে লোক না দেখে স্লিপ খেতে পারি।

সেই এগারোশো শতাব্দী থেকে এখন পর্যন্ত পাশ্চাত্য সঙ্গীতের অভিযোজন। বোরিং থিওরি নয়, অসাধারণ ডেমো।


বাৎস্যায়ন বর্ণমালা। অফিসে বসে খুলবেন না, আর বাড়িতে বসে খুললে আশেপাশে গুরুজন কিংবা ছানাপোনা নেই সেটা ভেরিফাই করে নেবেন দয়া করে।


এসপ্তাহে আমার প্রিয় গান।

সবাই ভালো হয়ে থাকবেন। দিল্লিতে গরম ক্রমেই স্বমূর্তি ধারণ করছে। গরম লাগলে কোল্ডড্রিংকস না খেয়ে ঘোল খেয়ে দেখুন। শরীর, পয়সা দুটোই বাঁচবে। সোমবার আবার দেখা হবে ঠিক এইখানেই। টা টা।   


April 19, 2013

পড়ে পাওয়া রামনবমী





রোটেশনের বাইরে চলে যাওয়া জিন্‌স্‌ পরে পকেটে হাত দিয়ে পাঁচশো টাকার নোট বেরোলে যতখানি আনন্দ হয়, আমার তার থেকেও বেশি আনন্দ হল যখন গতকাল অফিস গিয়ে শুনলাম আজ রামনবমীর ছুটি।

আমার টেবিলের ওপর একটা ছুটির লিস্ট আছে বটে, কিন্তু মনখারাপের ভয়ে আমি সেটার দিকে পারতপক্ষে তাকাই না। বোঝাই যাচ্ছে তাতে লাভ বই ক্ষতি হয় না। সবার কাছে যখন এমন খুশির খবরটা বাসি হয়ে গিয়েছিল, তখন আমি দিব্যি গোমড়ামুখে ট্রেড রিপোর্ট টাইপ করছিলাম। স্বপ্নেও কল্পনা করছিলাম না যে আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে সাক্ষাৎ দেবদূতের মতো চিকু আমার টেবিলে খটাস করে লেমন টি-র কাপ নামিয়ে রেখে বলবে,

“সো ম্যাডাম, হোয়াট ইস ইয়োর প্ল্যান ফর দ্য লং উইকএন্ড?”

লং উইকএন্ড? বলে কী ছোকরা?

“লং উইকএন্ড কাঁহাসে মিলা তুমকো?” অনেক চেষ্টা করেও আমি গলা থেকে বিদ্রূপের ঝাঁজটা সরিয়ে রাখতে পারি না।

চিকু আকাশ থেকে পড়ে বলে, “ও মাই গড, ইউ ডোন্ট নো? কাল রামনবমী হ্যায় না?”

আমি আর একসেকেন্ড নষ্ট না করে ছুটির লিস্টের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। চিকু ইস রাইট। শুক্রবার, উনিশে এপ্রিল, ২০১৩, রামনবমীর ছুটি।

চিকু সিরিয়াস মুখে উপদেশ দেয়, “শাদি কা শপিং করনে চলে যাইয়ে।”

আমার বিয়ের খবরটা অফিসে রাষ্ট্র হল কী করে ভগবানই জানেন। আমি নিজে কাউকে বলিনি, আমি নিশ্চিত আমার অফিসের কেউ অবান্তর পড়ে না। একমাত্র যে সম্ভাবনাটা বাকি থাকে সেটা হল, আমার ছুটির দরখাস্ত পাওয়ার পর আমার বস ফোন তুলে তুলে সবাইকে বলেছেন। এই দৃশ্যটা কল্পনা করতে আমার যারপরনাই অসুবিধে হচ্ছে, কাজেই আমার কাছে এই ব্যাপারটা রহস্যই রয়ে গেছে।

রাষ্ট্র হওয়াতে খুব যে অসুবিধে হয়েছে তেমন নয়। আজকাল সবাই জেনে গেছে যে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে নেই, তাই সকলেই মিষ্টি হেসে কনগ্র্যাচুলেশন্‌স্‌ বলে ক্ষান্ত দিয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম স। স আমাদের অফিসের সাফাইকর্মী। হিমাচলপ্রদেশের মেয়ে, দিল্লিতে শ্বশুরবাড়ি। সে আমার বিয়ে নিয়ে আমার থেকেও বেশি উত্তেজিত। রোজ সকালে ঝাঁট দিতে দিতে সে আমার বিয়ের আপডেট নেয়।

“ম্যাডামজি, আপ অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ কর রহে হো ইয়া লাভ ম্যারেজ?”

লজ্জার মাথা খেয়ে বলতে হল যে লাভ ম্যারেজই করছি।

শুনে স একটু চুপ করে থেকে জানতে চাইল, “ম্যাডামজিকি মাম্মিপাপা নেহি হ্যায় কেয়া?”

স-এর দোষ নেই। ওদের গ্রামে বোধহয় একমাত্র অনাথ না হলে কোনও মেয়েকে লাভ ম্যারেজ করতে হয় না। বাবামা সৎপাত্র খুঁজে, ব্যান্ড বাজিয়ে, পটাখা ফাটিয়ে, বুক চাপড়ে কাঁদতেকাঁদতে মহাসমারোহে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে।

আমি বললাম যে আমার বাবামা দিব্যি বহাল তবিয়তে বেঁচেবর্তে আছেন, কিন্তু তাঁরা আমাকে ততটাও ভালোবাসেন না কিনা, তাই আমাকে উপায় না দেখে নিজের বর নিজেই বাছতে হয়েছে। আমাকে করুণা করেই বোধহয় স এই লাইনে আর কথাবার্তা এগোয়নি। ভাগ্যিস।

যাই হোক। কাল চিকু যখন আমাকে ছুটি খামোকা বাজে খরচ না করে শাদির শপিং-এ যাওয়ার পরামর্শ দিল আমি মনে মনে মুখ বেঁকিয়ে বললাম, ইস তাহলেই হয়েছে আরকি। বয়েই গেছে আমার এই আটত্রিশ ডিগ্রি গরমে ভাজাভাজা হয়ে শপিং করতে। বাড়ি গিয়ে এই যে বিছানায় চিৎপাত হয়ে পড়ব, সেই রবিবার সন্ধ্যের আগে আর উঠছি না।

যা হয়। অফিস থাকলে অ্যালার্ম বাজিয়ে ঘুম থেকে উঠতে হয়, আর ছুটির দিনে অন্ধকার থাকতে ঘুম ভেঙে গিয়ে দাঁত মেজে চা খেয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বসে পা দোলাতে হয়। কখন একটু ভদ্রস্থ সময় হবে, আর মাকে ফোন করে বলা যাবে, ওঠ ওঠ অনেক ঘুমিয়েছ। এবার উঠে আমাকে একটু অ্যাটেনশন দাও দেখি।

অপেক্ষা করতে করতে একটা ভালো জিনিস হল, অনেক দিন বাদে ভোর হতে দেখলাম। অন্যদিন তো ভোর ভোরের মতো আসে যায়, আমি আমার মতো ঘাড় গুঁজে গুনেগুনে টিফিনবাক্স ব্যাগে পুরতে থাকি। পাছে না খেয়ে মারা যাই। আজ সেটা করতে হয়নি। আজ আরাম করে চা খেতে খেতে পুবদিক আলো করে সূর্য উঠতে দেখতে পেরেছি। এমন সুন্দর দৃশ্য একাএকা দেখতে অপরাধবোধ হচ্ছিল বলে আপনাদের জন্য ওপরের ছবিটা তুলেছিলাম। কিন্তু ছবিতে আসল জিনিসগুলোই ওঠেনি। পাখির ডাক, হাওয়ায় দুলন্ত কৃষ্ণচূড়ার ডাল, আর পার্কটার শান্ত নিঃস্তব্ধতা। ওগুলো দয়া করে কল্পনা করে নেবেন।

তারপর তো এঘরওঘর রান্নাঘর ঘোরাঘুরি। সময় আর কাটে না দেখে অবশেষে ঘর ঝাঁট দেওয়া সাব্যস্ত করলাম। রোজ যেমন দিই, এদিকে একটা আর ওদিকে আরেকটা টান, তেমন নয়। সত্যিকারের ঝাঁট দেওয়া। মা থাকলে যেমন করে দেন। খাটের তলা থেকে কত কিছু যে বেরোলো। পেন, পেনড্রাইভ, কার্ডবোর্ডের মতো শক্ত চৌকো দেখতে একটা জিনিস। সেটা কার্ডবোর্ডও হতে পারে, পাউরুটিও হতে পারে। আপনারা যে যেটা ভাবতে চান ভেবে নিতে পারেন। আমি আর খোলসা করছি না।

এতদিন পর ঘরঝাঁট দিয়ে এত খিদে পেয়ে গেল যে দুটো লাঞ্চ করতে হল। তাদেরও ছবি তুলে রেখেছি, দাঁড়ান দেখাই আপনাদের।


লাঞ্চ নাম্বার ওয়ান

লাঞ্চ নাম্বার টু

দিন এখন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। আজকের দিনটা বড় ভালো কাটল আমার। অন্য ছুটির দিনগুলো, প্রত্যাশিত থাকে বলেই কিনা কে জানে, কেমন যেন গুবলেট হয়ে যায়। সেগুলোরও একটা করে নিজস্ব টু-ডু লিস্ট, সে লিস্টও শেষ না করতে পারার বিরক্তি, শেষপর্যন্ত দিনগুলোকে ছুটি বলে আর চেনাই যায় না।

আজকের দিনটা সেরকম ছিল না একটুও। এই দিনটার যেন থাকার কথাই ছিল না, হঠাৎ করে উড়ে এসে ক্যালেন্ডারে জুড়ে বসেছে। আজ আমি যে কাজগুলো করেছি সেগুলো সবটাই বাড়তি, যে কাজগুলো করিনি, সেগুলো করার কথাই ছিল না কখনও। কাজেই নো অপরাধবোধ, নো হতাশা।

এরকম আরও লক্ষ লক্ষ সত্যিকারের ছুটি আমার আপনার সবার জীবনে আসুক, এই কামনা করি।

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.