May 31, 2013

ভূতের সঙ্গে রেস



কাল অফিস থেকে ফিরে বইয়ের বাক্সদুটো নিয়ে বসেছিলাম। একজন বাক্স থেকে বই তুলে ন্যাকড়া দিয়ে ঝেড়ে আরেকজনের হাতে দিচ্ছিল, আরেকজন সেটা বুককেসে গুছিয়ে রাখছিল। সোজা কাজ, কিন্তু অসম্ভব সময় লাগে। ঝাড়তে গেলেই পড়তে হয়, পড়তে গেলেই পড়ে শোনাতে হয়। একটা বই হাতে নিয়ে সবে ন্যাকড়া শূন্যে তুলেছি, সপাটে সেটা বইয়ের ওপর নামিয়ে আনব বলে, এমন সময় বসার ঘরের দরজাটা খুব ধীরে খুলে গেল।

ক্যাঁচ না কোঁচ না, জাস্ট খুলে গেল। পুরো ভেজানো অবস্থা থেকে একেবারে হাট। আমরা দুজনে দুটো মোড়ায় কাঠ হয়ে বসে রইলাম। কয়েক সেকেন্ড পরে ঢোঁক গিলে একজন জিজ্ঞাসা করল,  

-দরজা বন্ধ করনি?

-প্রথম কথা, ঘরে ঢোকার সময় তুমি আমার পেছনে ছিলে, কাজেই দরজা তোমার বন্ধ করার কথা। আমার নয়। আর দ্বিতীয় এবং সবথেকে ইম্পরট্যান্ট কথাটা হল, দরজা বন্ধ করে কি ওঁদের আটকানো যায়?

এই না বলে হাতে ধরা বইটার দিকে তাকিয়ে দেখি সেটা লীলা মজুমদারের ভূতের গল্পসমগ্র। মলাট উল্টে দেখি ভূমিকায় লীলা দুঃখ করেছেন, আজকাল লোকে ভগবানকেই মানে না, ভূত বেচারার কথা তো ছেড়েই দাও

মানতে পারলাম না। ভগবানে আমার বিশেষ ভরসা নেই, কিন্তু তাই বলে ভূত? ভূতের থেকে সত্যি ব্যাপার পৃথিবীতে আর হয় নাকি? যখন সত্যভারতী শিশুতীর্থে টিনের সুটকেস হাতে নিয়ে পড়তে যেতাম সেই সময় থেকেই আমি জানি যে ভূত বলে আসলে সত্যিই কিছু আছে। আমার সমস্ত ক্লাসমেটই জানত। আমাদের স্কুলে সেই আমলেও মিড-ডে মিলের চল ছিল। ভাত রুটি তরকারি নয়, তার থেকে ঢের ভালো জিনিস। মুড়ি চানাচুর, চিঁড়ের পোলাও, কোনওদিন দুধ মিল্কবিকিসসেই সব খেয়েদেয়ে বারান্দার কড়িকাঠ থেকে ঝোলানো কাঠের দোলনায় বসে পা দোলাতে দোলাতে আমরা পৃথিবীর যত জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। বাস বেশি জোরে যায় না ট্যাক্সি। মা বেশি ভালো না অঞ্জলি দিদিমণি। কিন্তু ভূতের থাকা না-থাকা নিয়ে কারোরই কোনও সন্দেহ ছিল না।

-ছুটির দিন দুপুরবেলা একটা হাওয়া দেয় দেখিস নি? চারদিক চুপচাপ হয়ে যায়, গাছের পাতাগুলো কীরকম খস্‌খস্‌ করে ওড়ে, পাজি শালিখগুলো কোথায় হাওয়া হয়ে যায় আর টিকিটি দেখা যায় না। আমাদের টফি পর্যন্ত বারান্দার এককোণে ভয় পেয়ে ল্যাজ গুটিয়ে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে।

আরও প্রমাণ চাই?

যে যাই দাবি করুক না কেন, একেবারে ভূতের ভয় নেই এমন লোক আমি দেখিনি। বান্টি পর্যন্ত ‘লেট দ্য রাইট ওয়ান ইন’ দেখতে বসে একটা সিনে আমার জামার হাতা খিমচে ধরেছিল। ওই যে ওই সিনটা, যেখানে বাচ্চা মেয়েটা আর কোনওভাবে বিল্ডিং-এ ঢোকার রাস্তা না পেয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ বাড়ির গায়ে লাগানো পাইপ বেয়ে উঠতে শুরু করে দিল? গভীর রাত, সাপের মতো এলিয়ে থাকা পিচরাস্তায় শুধু একখানা ল্যাম্পপোস্টের আলো পড়ে আছে। আর সেই আধো আলো আধো ছায়ায় একটা শরীর পাইপ বেয়ে উঠছে। ধীরে, কিন্তু অনায়াসে। মনে পড়লে ভরদুপুরেও ঘাড়ের রোঁয়া খাড়া হয়ে যায়।

বান্টি শুনলে লাফাবে, কিন্তু আমি সত্যি বিশ্বাস করি ভূতের সিনেমা দেখে ভয় পাওয়ায় লজ্জার কিছু নেই। ভূতকে ভয় পাই না, বিষাক্ত সাপের সঙ্গে একবাক্সে বাস করতে পারি, পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাল লংকা বাতাসার মতো চিবিয়ে খেতে পারি, গায়ে দাউদাউ আগুন লাগিয়ে এদিকসেদিক এলোপাথাড়ি ছুটোছুটি করতে পারি---এসব পারায় গর্ব করার মতো কী আছে কে জানে। সুস্থ মানুষ হলে অন্তত নেই। এম টিভি রোডিস্‌ হলে অবশ্য আলাদা কথা।

আমার মত হচ্ছে, ভূতে ভয় কমবেশি সবাই পায়। কেউ সেটা বুদ্ধিমানের মতো লুকিয়ে রাখতে পারে, যেমন আমি। আর কেউ সেটা বোকার মতো প্রকাশ করে ফেলে, যেমন বান্টি। ব্যস্‌, এইটুকুই যা তফাৎ।

এই কথাটা বললাম যখন, দিদিমণি আমাকে হাইফাইভ দিলেন। দিদিমণি হচ্ছেন বিবাহসূত্রে প্রাপ্ত আমার এক তুতো দিদা। খোলসা করে বললে, আমার শাশুড়িমায়ের পিসি। 

দিদিমণির অসাধারণ সাহস। ভরদুপুরে সল্টলেকের খাঁখাঁ রাস্তায় তিনি এক ব্যাটা হারচোরের কলার এমনি চেপে ধরেছিলেন যে সে পালাতে পথ পায়নি। সেই দিদিমণিও যখন জোরগলায় স্বীকার করলেন যে তিনি ভূতকে ভয় পান তখন আমরা সবাই হেসে বললাম,

-হ্যাঃ।

-আরে সত্যি। ওই মাথায় গোবরপোরা ছিনতাইবাজকে কাবু করাটা কোনও ব্যাপারই না, পাঁচবছরের শিশুও পারবে। সত্যি বলছি, আমি চোরদের বস্‌ হলে ও অপোগণ্ডের চাকরি থাকত না। ফাঁকা রাস্তায় একটা বেতো বুড়ির হার ছিনতাই করতে পারে না, আবার গেছে গুণ্ডা হতে। ছোঃ।

এত বছর বাদেও চোরের অপদার্থতার কথা মনে পড়ে দিদিমণি উত্তেজিত হয়ে পড়লেন।

-কিন্তু ভূতের সঙ্গে কোনও চালাকি চলবে না। ওদের অসম্ভব বুদ্ধি। বাস থেকে নেমে আলোঝলমল রাস্তাটা ধরে দিব্যি বুক ফুলিয়ে আসবে যখন তখন কেউ তোমাকে কিচ্ছুটি বলবে না, যেই না গলির ভেতর ঢুকবে, অমনি এদিকওদিক অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে তোমার ঘাড়ে ফুঁ দেবে।

-ঠিক বলেছেন দিদিমণি। আবার রসবোধও প্রখর। ফুঁ দেবে আর বলবে, এই আমি ঠিক তোর পেছনেই আছি, তাকা, তাকা না। আঃ তাকাই না একবার। আপনি বাধ্য মেয়ের মতো যেই না পেছনে তাকাবেন, অমনি দেখবেন কোত্থাও কিচ্ছু নেই, শুধু তালতাল অন্ধকার জমাট বেঁধে পড়ে আছে।

-এক্স্যাক্টলি। তখন আর তোমার কিছু করার আছে বল? গলা ফাটিয়ে রামনাম করতে করতে বাড়ি পর্যন্ত বাকি রাস্তাটা বেদম ছুটে পার হওয়া ছাড়া?

সত্যিই নেই। ঘরশুদ্ধু সকলে একমত হল। দিদিমণির গল্পের মুড এসে গেছে। তিনি বললেন,

-আরেকটা ডেঞ্জারাস জায়গা হচ্ছে খাটের তলা।

আমি একেবারে ছাদের সমান লাফ দিয়ে পড়লাম।

-ডেঞ্জারাস বলে ডেঞ্জারাস? আমি তো ছোটবেলায় হেমেন্দ্র রায়ের ভৌতিক গল্প নিয়ে খাটের ওপর উঠতাম, কিন্তু বই শেষ হলে আর নামতে পারতাম না। নামতে যাব, অমনি খাটের তলা থেকে একখানা লিকলিকে কালো হাত বেরিয়ে এসে পা টেনে ধরবে। ধরবেই। গ্যারান্টি। আমি খাটে বসেই “মা মা” বলে চিৎকার করতাম। মা গ্যাসে বসানো দুধ ফেলে এসে আমাকে কোলে করে নামিয়ে নিয়ে যেতেন।

দিদিমণি গম্ভীর হয়ে থাকেন।

-সে বাছা তোমাদের মাবাবার তোমরা একটি করে সন্তান, যখনতখন তোমাদের খাট থেকে কোলে করে নামানোর সময় ছিল তাঁদেরআমরা দশ-বারোখানা করে ছিলাম, নিজেদের প্রোটেকশনের ব্যবস্থা নিজেদেরকেই করে নিতে হত আমাদের।

প্রোটেকশনটা কী রকম? থিওরিটা সোজা, কিন্তু বাস্তবে পরিণত করতে গেলে রীতিমতো ফিট্‌নেস দরকার। দিদিমণি সন্তর্পণে খাটের থেকে হাতখানেক দূরে এসে পা জোড়া করে দাঁড়াতেন। তারপর ঝুঁকে পড়ে দুই হাত বিছানার ওপর রেখে, তাদের ওপর শরীরের সমস্ত ভার ন্যস্ত করে “হুপ্‌” বলে দুই পা একসঙ্গে মাটি থেকে তুলে এনে ধপ্‌ করে খাটের ওপর চড়ে বসতেন। নে হতচ্ছাড়া ভূত, ঠ্যাং ধরে কত টানবি টান।

দিদিমণির যে সব ছোটছোট অবোধ ভাইবোন ছিল তারা তো আসল কারণটা জানত না। দিদিকে দেখে তাঁরা ভাবল এটা বোধহয় কোনও মজার খেলাটেলা হবে। ব্যস্‌ আর যায় কোথায়। সবাই পালেপালে এসে হুপ্‌হাপ্‌ ধুপ্‌ধাপ্‌ শুরু করে দিল। শেষে গোলযোগটা এত বেশি হল যে দিদিমণির মা রান্নাঘর থেকে হাতাখুন্তি ফেলে দৌড়ে এলেন। খেলার শুরু কে করেছে এই প্রশ্নের উত্তরে সকলে দিদিমণির দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, “দিদি।”

দিদিমণির মা দিদিমণির দিকে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে বললেন,

-আজ বাদে কাল শ্বশুরবাড়ি যাবে, এখনও বাঁদরামো গেল না তোমার? শান্ত হয়ে পা টিপেটিপে চলা অভ্যেস কর, না হলে লোকে বলবে কী?

দিদিমণি গোঁজ হয়ে ভাইবোনের সামনে মায়ের বকুনি এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বার করে দিলেন। বললেই হল? তিনি পা টিপে টিপে চলুন আর ভূতে এসে তাঁর ঘাড় মটকাক আরকি। তখন যে কোনও শ্বশুরবাড়ির লোক তাঁকে বাঁচাতে আসবে না, বুদ্ধিমান দিদিমণি সেটা হাড়েহাড়ে জানতেন।

দিদিমণি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

-তাই বলে ভেব না, এতদিন যে ভূতের হাত বাঁচিয়ে বেঁচেবর্তে আছি তাতে আমার কোনও কৃতিত্ব আছে। আমার হাতে কোনওদিনও কিছু ছিল না। সবই ওদের দয়া। আমার ঘাড়টা মনে ধরেনি, মটকায়নি। ব্যস্‌। মনে ধরলে, হাজার লাফালাফিতেও কাজে দিত না।

আমরা দিদিমণিকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

-না না, এমন কেন বলছেন। আপনি কত বুদ্ধি খাটিয়েছেন, কত দৌড়োদৌড়ি ঝাঁপাঝাপি পরিশ্রম করেছেন, সেগুলো কি একটুও কাজে লাগেনি? এটা কি হতে পারে?

দিদিমণি বললেন ওঁরও সেইটাই আশা ছিল। কঠোর পরিশ্রম করে ভূতকে হারাবেন। কিন্তু একদিন ওঁর এক দাদু সে ভুল ভেঙে দিলেন।

রাতে খাওয়ার পর হ্যারিকেন নিয়ে কলতলায় সবাই মিলে হাত ধুতে যাওয়া হয়েছিল। সবাই মানে ভাইবোনেরা সবাই। সকলেই ঠ্যালাঠেলি করে কোনওমতে হাত ধুয়ে না ধুয়ে লাফ মেরে ঘরে ঢুকে গেল। পেছনে পড়ে রইল কেবল হ্যারিকেন আর আমাদের দিদিমণি। মেঘের ফাঁক দিয়ে ছেঁড়াছেঁড়া চাঁদের আলো এসে কলতলার বাঁধানো চাতালে পড়েছিল। কলতলার ঠিক গায়েই ছিল এক মস্ত ঝাঁকড়া আশশ্যাওড়া গাছ। জ্যোৎস্না যেই না সেই শ্যাওড়া গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ফিল্টার হয়ে এসে চাতালে পড়ল অমনি দিদিমণি খালি চোখে স্পষ্ট দেখলেন চাতালের ওপর একটা জলজ্যান্ত ভূতের মুখ।

হ্যারিকেনের মায়া ভুলে দিদিমণি ছুটলেন। কী ছোটাটাই না ছুটলেন। প্রাণের ভয় জীবনে দু-একবারই পায় মানুষ, দিদিমণির ছিল সেটাই প্রথমবার। মুখে ফেনা উঠে গেল, হৃৎপিণ্ড প্রায় বুক ফেটে বেরিয়ে এল এল। শেষে যখন চাতাল পেরিয়ে রান্নাঘরের দরজায় উপস্থিত হলে দিদিমণি, দাদুর সঙ্গে লাগল এক রামধাক্কা।

দাদু গম্ভীর গলায় বললেন,

-এত ছোটার কী হল?

দিদিমণি মুখ নিচু করে রইলেন। জানতেন আসল কারণটা বলে লাভ নেই। বড়রা ভূত ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নেয়নি কখনও, নেবেও না।

দাদু একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

-ভূতে তাড়া করেছিল বুঝি?

দিদিমণি চমকে মুখ তুললেন। দাদু বুঝতে পেরে গেছে! তাড়াতাড়ি ওপর নিচে ঘাড় নেড়ে বললেন,

-করেছিল তো।

-কিন্তু তুমি ছুটলে কেন? কীসে তোমার মনে হল যে ভূত তোমার থেকে আস্তে দৌড়য়?

দিদিমণির কাছে নিমেষে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। তাই তো! ভূতকে তিনি দৌড়ে হারাননি, কেউই ভূতকে দৌড়ে হারাতে পারে না। সেটা সম্ভবই নয়। “যাহ্‌ এবারের মতো ছেড়ে দিলাম” বলে ভূতই আসলে তাঁকে জিতিয়ে দিয়েছে।

সেই থেকে দিদিমণি ভূতকে শ্রদ্ধাভক্তি করে আসছেন, যাতে ভূতের নেকনজর চিরদিন তাঁর ওপর বর্তমান থাকে, আর চিরদিন তিনি দৌড়ে ভূতকে হারিয়ে দিতে পারেন।

May 30, 2013

ঋতুপর্ণ




উৎস গুগল ইমেজেস

জীবনে কোন্‌ সিনেমাটা আমি সবথেকে বেশিবার দেখেছি, আন্দাজ করে বলতে পারেন? পথের পাঁচালী নয়। উঁহু, গুপীবাঘাও নয়। চিলড্রেন অফ হেভেন কিংবা শশাংক রিডেম্পশনও নয়।

জীবনে আমি সবথেকে বেশিবার দেখেছি ‘উৎসব’।

লক্ষবার দেখেছি, অযুতবার দেখেছি, নিযুতবার দেখেছি। শুরু থেকে দেখেছি, মাঝখান থেকে দেখেছি। ইউটিউবে লাস্ট পার্ট থেকে শুরু করে পিছু হেঁটেহেঁটে শুরুর দিকে গেছি, কে জানে কত বার।

অথচ এমনটাও নয় যে উৎসব আমার ঋতুপর্ণর বানানো সবথেকে প্রিয় ছবি। সেটার জায়গা নিঃসন্দেহে নেবে উনিশে এপ্রিল। কিংবা হীরের আংটিও নিতে পারে। ইন ফ্যাক্ট অসুখও পারে।

উনিশে এপ্রিল প্রথম দেখেছিলাম টিভিতে। নতুন একটা বাঙালি ছেলের সিনেমা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে, সেই উৎসাহে দুপুরবেলা টিভির সামনে বসেছিলাম সকলে। আমি সত্যি বলছি, অত মুগ্ধ হইনি। তখন সবে টিন-এজে পা পড়েছে আমার, নিজেই নিজেকে নিয়ে মত্ত হয়ে আছি। নতুন সিনেমা মন দিয়ে দেখার মতো ধৈর্য, চেতনা কিছুই আমার ছিল না তখন।

কিন্তু আমি আমার মা’কে দেখছিলাম। সিনেমার শেষে যখন রাত কেটে গেছে, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মা-মেয়ে নতুন আলোয় দেখছে একে অপরকে, আমার মা মুখে আঁচল চেপে নিঃশব্দে কাঁদছিলেন। সিনেমাটা শেষ হওয়ার পর অনেকক্ষণ কোনও কথা বলেননি মা। আরও অনেকক্ষণ তাঁর চোখ লাল হয়ে ছিল। শেষে বিকেলের চা নিয়ে বসে সিনেমাটা নিয়ে একটাই কথা বলেছিলেন মা। “এইটুকু ছেলে, কী বই-ই না বানিয়েছে।” বলতে গিয়ে আবার মায়ের গলা ধরে এসেছিল।

তারপর ঝড়ের মতো এল দহন, বাড়িওয়ালি, অসুখ, উৎসব, শুভ মহরৎ, তিতলি। তিতলি! কী সিনেমা, কী সংলাপ। “তুমি বললে বাবা হাসবে আর আমি বললে কাঁদবে। কান্নার চেয়ে হাসিটাই ভালো না?” ঠিক এইভাবেই তো আমরা কথা বলি। আমরা, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালিরা। সেই আশির দশকের রঞ্জিত মল্লিক মার্কা সিনেমার মতো করেও বলি না, আবার এই দুহাজার দশ দশকের পরিশীলিত সিনেমাগুলোর মতো লাইনে লাইনে আধুনিক কবিতার লাইনও গুঁজে দিই না।

আর সেখানেই ঋতুপর্ণ, ঋতুপর্ণ। মধ্যবিত্ত শহুরে বাঙালির নাড়ি ওঁর থেকে ভালো করে এ কালের আর কোন বাঙালি শিল্পী বুঝেছেন আমি জানি না। ঋতুপর্ণকে একবার একটা ইন্টারভিউতে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি গ্রাম নিয়ে সিনেমা বানান না কেন? উনি বলেছিলেন, আমি যেটা জানি না, সেটা নিয়ে সিনেমা বানানোর সাহসও আমার নেই।

হক্‌ কথা।

অসুখ দেখার পর ডাই-হার্ড ঋতুপর্ণ ফ্যানে পরিণত হতে আমার বেশিদিন লাগেনি। সত্যি বলতে আমি খানিকটা ভদ্রলোকের প্রেমেই পড়ে গিয়েছিলাম। বুদ্ধিমান, পরিশীলিত, সৃষ্টিশীল। পারফেক্ট হওয়ার জন্য আর কী লাগে একটা মানুষের?

ঋতুপর্ণের লাগত। অসুখ, তিতলি, দোসর বানানোর পরও। আড্ডায় ঋতুপর্ণ নিয়ে কথা উঠলে একজন না একজন কেউ থাকতই যে মেয়েলি ঢঙে হাত পা নেড়ে কথা বলে উঠত। সে যত ইনটেলেকচুয়্যাল আড্ডাই হোক না কেন। ঋতুপর্ণ যখন মিরকে নিজের টক শো-তে ডেকে বেশ করে ঝেড়ে কাপড় পরিয়েছিলেন, তখন আমার আচ্ছা আচ্ছা আঁতেল বন্ধু নিন্দেয় ফেটে পড়েছিল। “রামো রামো, ইন্‌ডিভিজুয়াল মতপ্রকাশের অধিকারে এ কী হস্তক্ষেপ!” এদিকে মিরের টক শো-তে যখন একটা লোককে নিয়ে দিবারাত্র ছ্যাবলামো চলছিল---তার কাজ নিয়ে না, কথা নিয়ে না, লেখা নিয়ে না, স্রেফ তার চলাবলা হাতনাড়া যৌনজীবনযাত্রার পছন্দঅপছন্দ নিয়ে, তখন সবার হাসি ছাড়া আর কিচ্ছু পাচ্ছিল না।

তাই বলে কি ঋতুপর্ণের সবই আমার ভালো লাগে। মোটেও না। ইদানীং তো ঋতুপর্ণর সিনেমা দেখাও হয়ে উঠত না। ‘সব চরিত্রই কাল্পনিক’ দেখে হাঁ হয়ে রয়েছিলাম, ‘খেলা’ দেখে মাথা নেড়েছিলাম, ‘চিত্রাঙ্গদা’ দেখতেই যাইনি। আমার কিশোর বয়সের প্রেমের এ কী হল ভেবে দুঃখ যত না হয়েছিল, রাগ ধরেছিল তার থেকে বেশি।

এই যদি হবে তবে আমাদের হীরের আংটি দেখিয়ে আশা দিয়েছিলে কেন? কেন উনিশে এপ্রিলের মতো একখানা বোমা ফাটিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করেছিলে?

আজ মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস এই সিনেমাগুলো বানিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। ওঁর নিশ্চয় এই কথাগুলোও বলার ছিল। একজন শিল্পী শুধু আমাদের পছন্দের কথাগুলোই সারাজীবন ধরে বলে যাবেন আর নিজের কথা “পাছে কারও খারাপ লাগে” ভেবে বুকের ভেতর পুরে নিয়েই চলে যাবেন, সেটাই বা কী ধরণের ন্যায়বিচার?

আমরা সবাই ঋতুপর্ণকে সেকেন্ড সত্যজিৎ রায় হতে দেখতে চেয়েছিলাম। তিনি কী চেয়েছিলেন কে জানে। এখন চারদিকে শুনি, টালিগঞ্জের তারকা নিজের পোষা উঠতি তারকাকে সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় বলেন, “ওর ওপর নজর রাখুন, ও কিন্তু সেকেন্ড ঋতুপর্ণ হতে পারে।”

ফুঃ। তাহলেই হয়েছে আর কি। 
   

প্যাকিং আনপ্যাকিং আর চিত্তরঞ্জন পার্কের ইতিকথা



বাঙালির টাইমজ্ঞান নেই এই কথাটা যদি অপ্রমাণ করতে হয়, ভট্‌চাজ্‌বাবুকে ডাকতে হবে। সাড়ে ন’টা বলেছিলেন, সাড়ে ন’টায় এসে গেলেন। পরনে আদ্দির ফতুয়া, ট্রাউজার। কাঁধের ছোট্ট ঝোলা ব্যাগে হিন্দু আর জলের বোতল।

আমরাও স্নান করে চুল আঁচড়ে জামাকাপড় পরে গ্যাস্ট্রোজাইম খেয়ে রেডি হয়ে ছিলাম। গ্যাস্ট্রোজাইম কেন খেতে হয়েছিল? পরশু রাতে খেয়াল হল যে ফ্রিজ প্যাক হবে, এবং ফ্রিজের ভেতর পাউরুটি, হ্যাম, টমেটো কেচাপ, লাখখানেক মাদার ডেয়ারির দইয়ের চামচ ছাড়াও খানচারেক কাঁচা ডিম, একখাবলা ভাত আর পাঁচশো গ্রাম মুরগির স্টু পড়ে আছে।

প্রাণে ধরে ফেলতে পারলাম না। ঠুসে ঠুসে সেই রাত্রেই ভাত মুরগি শেষ করা হল। কাকভোরে উঠে দু’খানা করে ডিম সেদ্ধও সাঁটালাম। এর পরেও গ্যাস্ট্রোজাইম না খেয়ে, "দেখিই না কী হয়" বলে বসে থাকব, অত অ্যাড্‌ভেঞ্চারাস্‌ আমরা নই।

আপনাদের কারও যদি সি. আর. পার্কে বাড়ি বদল করতে হয় তবে চোখ বুজে ভট্‌চাজ্‌বাবুর শরণ নেবেন। ভদ্রলোক দিল্লিতে আছেন কে জানে কত বছর, মুভিং-প্যাকিং-এর কাজ করছেন বিশ বছর ধরে। ফলে যেটা হয়েছে, ভদ্রলোক একটা বন্ধ কাবার্ডের দিকে তাকিয়ে বলে দিতে পারেন সেটা প্যাক করতে ক’টা খালি কার্টন লাগবে। ভট্‌চাজ্‌বাবুর সঙ্গীসাথীরাও সব একেকজন হীরের টুকরো। ভদ্র, পরিশ্রমী, আলাপী। আমরা দুজন সত্যিসত্যিই ল্যাপটপ আর সার্টিফিকেটের বান্ডিল ঘাড়ে করে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে রইলাম। ওঁরা ম্যাজিকের মতো দশমিনিটে আমার কাবার্ড, পাঁচমিনিটে আমার তিনটে ড্রয়ার, সাতমিনিটে আমার রান্নাঘর আর তিনমিনিটে আমার বাথরুম প্যাক করে ফেললেন। বাকি তিন মিনিট গেল টুকটাক ঝাঁটা, ফোলডিং আলনা গোছাতে। সবকিছু আরও আগেই সারা হত যদি না আমি মাঝেমাঝেই ঝাঁপিয়ে পড়ে, “এই তো আমার ঘড়ি! এই তো আমার রেন্ট এগ্রিমেন্ট! এই তো আমার ম্যারেজ সার্টিফিকেট!” বলে ওঁদের কাজে ডিস্টার্ব না করতাম।

সব গোছানো হয়ে গেল। ভট্‌চাজ্‌বাবু পাংচুয়াল বলেই তো সব বাঙালি পাংচুয়াল নয়, ট্রাকওয়ালার অপেক্ষায় বসে থাকতে হল। সে ছোঁড়ার আসার কথা ছিল নাকি এগারোটায়, বারোটা অবধি তার দেখা মিলল না।

তাতে একদিক থেকে সুবিধেই হল অবশ্য। ভট্‌চাজ্‌বাবু সোনুকে পাঠিয়ে আমাদের সবার জন্য চা আর প্লাস্টিকের কাপ আর নিজের জন্য খানচারেক পান আনালেন। তারপর চায়ের কাপ হাতে কার্টন আর ন্যাড়া বক্সখাটের ওপর বসে জমিয়ে গল্প শুরু হল।

ভট্‌চাজ্‌বাবু বলতে লাগলেন, সে অনেক দিনের কথা। তখন সি. আর. পার্কে শেয়াল ডাকত আর সূর্যের আলো ঢলতে না ঢলতে একনম্বর দু’নম্বর বাজারের গুটিপাঁচেক দোকানদার ঝাঁপ বন্ধ করে পালাত। বাঙালি ভদ্রলোকরা তখন সব থাকতেন লোদি কলোনি, বিনয়নগর এই সব জায়গায়। তারপর একটা কথা উঠল, যে দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির কাছ থেকে ক্যাশ টাকা ধার নিয়ে পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুরা নাকি চিত্তরঞ্জন পার্কে সস্তায় জমি কিনে বাড়ি বানাতে পারে।

ব্যস্‌। স্রোতের মতো লোক ঢুকতে শুরু করল। ক’জন তাদের মধ্যে সত্যিসত্যি রিফিউজি তার হিসেব রাখা সম্ভবও ছিল না, রাখলও না কেউ। শুধু একটা জঙ্গুলে জায়গা ঘোষ, চাকলাদার, মুখার্জি, দত্ত, চৌধুরীদের বাংলা কথায়, আড্ডা, পি এন পি সি-তে মুখরিত হয়ে উঠল।

হঠাৎ প্যাঁ প্যাঁ আওয়াজ শুনে সোনু দৌড়ে গিয়ে দেখল গাড়ি এসে গেছে। সে গাড়ির ডাকনাম ‘দিলীপের গাড়ি’ আর ভালোনাম ‘সুরভি টেম্পু সারবিস’। বড়বড় যা জিনিস ছিল সেগুলোকে গাড়িতে তুলে, ছোট পোঁটলাপুঁটলিগুলো কে একটা দোমড়ানো ভ্যানগাড়িতে বেশ করে বেঁধে দেওয়া হল। সব হয়ে যাওয়ার পর সোনু আমাদের দিকে দেখিয়ে বলল, “আর এ মালদুটো কীসে করে যাবে দাদা?”

ভট্‌চাজ্‌বাবু আমাদের দিলীপের পাশে বসিয়ে দিলেন। অর্চিষ্মান সারারাস্তা, “আচ্ছা, যদি টেম্পো উল্টে যায়? যেতেও তো পারে? বলা তো যায় না?” এইসব আকাশকুসুম কল্পনা করতে করতে চলল। কিন্তু অত মজার কিছুই ঘটল না, আমরা দিব্যি অক্ষত অবস্থায় আমাদের নতুন বাড়ির দোরগোড়ায় এসে নামলাম।

তারপর আবার শুরু হল ওঁদের অমানুষিক পরিশ্রম। সব জিনিস দোতলায় তুলে দিয়ে, দেয়ানেয়া মিটিয়ে, “আচ্ছা তবে আসি? যোগাযোগ রাখবেন, নমস্কার।” বলে ওঁরা চলে গেলেন।

আর বাড়িভর্তি সুটকেস আর প্যাঁটরা আর পলিথিনের ঝোলার সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা প্রথমবার টের পেলাম, ঠিক কতখানি বিপদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে।

বিপদে পড়লে বাকিরা কী করে জানি না, হয়তো সে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা করে। আমরা অত বোরিং নই, আমরা বিপদে পড়লে দৌড়ে সিনেমা দেখতে যাই। বাক্সপ্যাঁটরা যে যেখানে আছে তেমন থাক, সপ্তাহের মাঝে একটা পড়ে পাওয়া ছুটি পেয়েছি, চল সেটার সদ্ব্যবহার করে আসি বলে আমরা ম্যাটিনি শো-তে ‘গো গোয়া গন’ দেখতে চলে গেলাম। তারপর ঘণ্টাদুয়েক কড়া এ. সি. তে বসে, দু’গামলা পপকর্ন আর দু’বালতি পেপসি দিয়ে লাঞ্চ সারতেসারতে টাইমপাস হয়ে গেল।

একেবারে ফাঁকি দিইনি তা বলে। বাড়ি ফিরে রান্নাঘরটা গুছিয়ে ফেলেছিলাম। যাতে আজ সকালের চা-টা অন্ততঃ জোটে। সকালে উঠে দুমদাম করে এই অবান্তর পোস্ট লিখে, চা খেয়ে, ঘরময় ছিটিয়ে থাকা সুটকেস আর কার্টনের মৃতদেহ টপকে পালিয়ে এসেছি। সে ছবি আপনাদের দেখাতে পারতাম, কিন্তু ক্যামেরা হতভাগা এখন কোথায় কীসের নিচে চাপা পড়ে আছে কে জানে।


May 28, 2013

ঠাঁইবদল



আমার এই বাড়িটার বাস ওঠানোর দিন এসে গেল।

বান্টি বলল, “দেখো যেন আবার ফ্যাঁচফেঁচিয়ে কাঁদতে বোসো না।”

বয়েই গেছে আমার কাঁদতে। কান্নাকাটির কী আছে? তাছাড়া এগুলো তো সব বাসা, বাসা তো মাঝেমাঝে বদল করতেই হয়। বাড়ি তো যেখানে থাকার কথা সেইখানেই আছে। রিষড়ায়। কাঁদব আমি যেদিন ওই বাড়িটা প্রোমোটারের হাতে যাবে। গাছবাগান মুড়িয়ে, নীলসাদা একতলা বাড়িটা গুঁড়িয়ে, কুয়োতলা আর তুলসীমঞ্চ উড়িয়ে হইহই করে যেদিন একটা কুৎসিত বহুতল উঠবে আর ঘটা করে তার নাম রাখা হবে ‘ঠিকানা’ কিংবা ‘শান্তির নীড়”---সেদিন কান্না কাকে বলে দেখিয়ে দেব।

তবে এই বাসাটার কথা ভোলা সহজ হবে না, সেটাও সত্যি। হাজার হোক এটা আমার দিল্লির দ্বিতীয় খেপের প্রথম বাসা। আর সবথেকে বড় কথা হচ্ছে, এই বাড়িটা অবান্তরের সিংহভাগ পাঠকের সঙ্গে, আপনাদের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপের ঠিকানা। একে কি ভুলব মনে করলেই ভুলে যেতে পারি আমি?

অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাড়ি বদলের সময়টা আর পাঁচটা সময়ের থেকে আলাদা। এই সময়টায় পণ্যবাদী জীবনের অসারতা আমার কাছে একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। কত দুঃখে যে লোকে মিনিম্যালিস্ট হয়, সেটা হাড়েহাড়ে টের পাই। কেন মরতে গুচ্ছের পয়সা খরচ করে ওই কায়দার টেবিলল্যাম্প কিনেছিলাম, কাজে তো লাগেনি একটুও, অথচ এখন টান মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিতেও বিবেকে বাধছে। মা’র নীরব অসম্মতি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে একখানা সাদাগোলাপি ফুলফুল টি-সেট কিনেছিলাম। টি-পটটা ব্যবহার করেছি গুনে গুনে সাতদিন। কাপগুলোর কপালেও পটের থেকে বেশি আদর জোটেনি। বুঝেছি, ডেইন্টি কাপ ধরে কনিষ্ঠা হাওয়ায় ভাসিয়ে চা খাওয়া দেখতে যত ভালোলাগে, খেতে ততটাই খারাপ। দুয়ের পরে তিননম্বর চুমুক দিতে গিয়েই চা শেষ। নিকুচি করেছে অমন কাপের। তার থেকে আমার পাঁচশো এম এল সাইজের গাবদা কফিমাগ ঢের ভালো। 

বাড়ি বদলের দিনক্ষণ ঠিক হতে আমরা দু’চারটে ফোন করলাম।

“হ্যালো, রাহুল? তুমি কোন মুভার্‌স্‌ অ্যান্ড প্যাকার্‌স্‌কে নিয়েছিলে গো?”

“ওই তো, ভট্‌চাজ্‌। দাঁড়াও আমি তোমাকে ওঁর নম্বর এস এম এস করে দিচ্ছি।”

শুনলাম সি. আর. পার্কের ভেতর যাঁরাই বাড়ি চালাচালি করেন তাঁদের সবারই ভরসা ভট্‌চাজ্‌বাবু। ফোনে কথা হয়ে গেল। ভদ্রলোক রাত আটটায় দেখা করতে আসবেন বললেন। কাঁটায় কাঁটায় আটটা তিনে বেল বাজল।

কিছু কিছু লোক থাকে না, যাঁদের মঙ্গলগ্রহের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রথম দেখলেও আপনি একসেকেন্ডে বাঙালি বলে ধরে ফেলবেন? ভট্‌চাজ্‌বাবু হলেন সেই গোত্রের লোক। পাঁচ ফুট সাত, না মোটা না রোগা চেহারা, কাঁচাপাকা চুল, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, একহাতে বাজারের থলি, আরেকহাতে পাকানো নিউজপেপার। হিন্দু, অফ কোর্স। ভট্‌চাজ্‌বাবু দরজা দিয়ে ঢুকে এলেন। কোনও কথা না বলে চারদিক, রান্নাঘর, ব্যালকনি ইত্যাদি ঘুরে দেখে এসে ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে বললেন,

“ব্যস্‌?”

“ব্যস্‌।”

“মিনিম্যালিস্ট না কী যেন বলে, তোমরা কি সে রকম নাকি?”

হাসব না কাঁদব ভেবে পেলাম না। একবার ভাবলাম বলি, “সে রকম যে নই সেটা ওই কাবার্ডটা খুললেই টের পাবেন” কিন্তু বললাম না। হেঁহেঁ করে হাসলাম শুধু।

ভট্‌চাজ্‌বাবু চেয়ারে বসে পকেট থেকে একটা পেন বার করে হিন্দুর ওপরের বাঁদিকের সাদা অংশটায় কীসব হিজিবিজি কাটলেন, বিড়বিড় করলেন, মাথাটাথা নাড়লেন। তারপর খরচের এস্টিমেট দিলেন। রফা হয়ে গেল। “ভেরি গুড” বলে খবরের কাগজ ফের গুটিয়ে, পেন পকেটে চালান করে তিনি জানতে চাইলেন, “আচ্ছা এবার বল, তোমাদের প্রেফারড্‌ মোড অফ বাঁধাছাঁদা কী?”

আমরা বোকার মতো তাকিয়ে আছি দেখে ভট্‌চাজ্‌বাবু আরেকটু ভেঙে প্রশ্নটা করলেন।

“মানে প্যাকিং, র‍্যাপিং না স্যাকিং?”

“অ্যাঁ?”

জানা গেল প্যাকিং মানে তো শুধু প্যাকিং নয়, তারও রকমভেদ আছে। যেমন ধরা যাক টিভি। একে প্যাক করা ছাড়া গতি নেই। বাব্‌ল্ র‍্যাপে মুড়তে হবে, কার্ডবোর্ডের বাক্সে পুরতে হবে। তার কমে চলবে না। আবার ধরা যাক ফ্রিজ। এর জন্য শুধু বাব্‌ল্‌ র‍্যাপিংই যথেষ্ট। আর বাকি সব ফালতু জিনিস, জামাকাপড় থালাবাসন চিরুনিপাউডার চটিজুতো---এগুলো সব ধপাধপ চটের স্যাকে পুরে ভ্যানে তুলে দিলেই হবে। ওটাকে বলা হবে স্যাকিং।

“আর তোমরা ভ্যানের পেছনে ওয়াকিং করতে করতে চলে আসবে। এইটুকু তো পথ, পারবে না?”

খুব পারব। ভট্‌চাজ্‌বাবু খুশি হয়ে চলে গেলেন। কথা দিয়ে গেলেন বুধবার সকাল ঠিক সাড়ে ন’টায় উনি লোকলস্কর লাঠিসোটা নিয়ে হাজির হবেন। আমাদের কিচ্ছুটি করতে হবে না, আমরা শুধু ইম্পরট্যান্ট ডকুমেন্টস্‌, অর্থাৎ কি না আমাদের মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক গ্র্যাজুয়েশন ইত্যাদির অ্যাডমিট কার্ড, মার্কশিট, সার্টিফিকেট ইত্যাদি বুকে জড়িয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকব।

কবেকার ওই অর্থহীন নম্বরগুলোর থেকে বেশি জরুরি জিনিস আমাদের জীবনে এখনও কিছু নেই, কোনওদিন হওয়ার সম্ভাবনাও প্রায় শূন্য---এই সত্যি কথাটা আবারও নতুন করে মনে পড়িয়ে, কাটা ঘায়ে বেশ করে নুনের ছিটে দিয়ে, ব্যাগ দোলাতে দোলাতে ভট্‌চাজ্‌বাবু বিদায় নিলেন।

বলেছিলাম না, বাসাবদলের সময়টা সত্যিই খুব চোখ খুলে দেওয়া? 

  

May 27, 2013

চেনা ডাক্তার অচেনা ডাক্তার



ছেলেপুলেকে যদি কিছু বানাতেই হয়, তবে ডাক্তার বানানোই উচিত। বৃহত্তর সমাজের স্বার্থে, পাড়াপড়শির স্বার্থে, তাছাড়া লোককে ঢাক পিটিয়ে বলার স্বার্থটিও বেশ। কিন্তু এই কথাটা বললেই আমার ডাক্তার বন্ধুরা চটে চতুর্ভুজ হয়ে যান।

দাবি করেন ডাক্তার তাঁরা কেবল সেবার মুখ চেয়ে হয়েছেন, গাড়িবাড়িগ্ল্যামারপসার, একমানুষ উঁচুউঁচু অক্ষরে ‘সিপলা’ নয়তো ‘জনসন অ্যান্ড জনসন’ লেখা বিনেপয়সার বালিশের ওয়াড়---এসব নাকি তাঁদের বিন্দুমাত্র মোটিভেট করতে পারেনি।

মেনে নেওয়া ছাড়া যেহেতু গতি নেই তাই মেনেই নিই। তাছাড়া পাগল না হলে কেউ চেনা ডাক্তারকে চটায় না। রাতেবিরেতে বিপদে পড়লে দেখবে কে?

সব বাড়িতেই এইরকম একজন করে ডাক্তারবাবু থাকেন। যেমন আমার ছোটমামা। নামের পাশে গালভরা স্কিন স্পেশালিস্ট লেখা থাকলে কী হবে, আমাদের বাড়ির মাথাধরা থেকে পেটের রোগ সবের দাওয়াই মামা দেন। আমাদের পাড়ায় এমনিতে ডাক্তারের অভাব নেই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেদিকেই হাঁটো না কেন, পাঁচমিনিটের মধ্যে একটা না একটা ডিসপেনসারিতে পৌঁছে যাওয়া যায়, কিন্তু তাও আমরা মামাকে ফোন করি। মামা আমাদের কর্ডলেসের স্পিডডায়ালে বাঁধা হয়ে আছেন। সেই ছোট থেকে দেখে আসছি। ঠাকুমার মুখে কিছু রুচছে না? মায়ের কোমরে ব্যথা হয়েছে? সোনার কী যেন একটা কমপ্লিকেটেড অসুখ করেছে--- পড়ার বই খুলে বসলেই অকথ্য পেট কামড়াচ্ছে কিন্তু গল্পের বই পড়লে কিংবা টিভি দেখলে কিচ্ছু হচ্ছে না? মামাকে ফোন লাগাও।

এ তো গেল শুধু আমাদের বাড়ির কথা, এইবার এই একই চিত্র আমার জেঠিমা কাকিমাদের বাপের বাড়ি, আমার দুই মামা চার মাসি প্রত্যেকের বাড়ি, মামি এবং মেসোদের বাপের বাড়ির ক্ষেত্রেও কল্পনা করে নিন। তাহলে ব্যাপারটা খানিকটা আঁচ করতে পারবেন।

আমাদের সবার সবরকম রোগের চিকিৎসা করেও যে মামার হাতে অন্য রোগী দেখার সময় বা এনার্জি থাকে, সেইটাই একটা আশ্চর্যের ব্যাপার।

এছাড়াও বাঙালি সমাজে আরেকরকম ডাক্তার থাকেন যাঁদের আমাদের ফোন করতে হয় না। তাঁরা নিজেরাই যেচে ফোন করে আমাদের চিকিৎসা করেন। ঠাকুমার অরুচি হয়েছে, একটু গন্ধলেবুর পাতা কচলে ডালের জল খাইয়ে দেখেছ? মায়ের কোমরের ব্যথাটা বেড়েছে, পূর্ণিমাআমাবস্যায় ভাতরুটি ছেড়ে দেখেছ? সোনার পড়ার বই খুললেই পেট কামড়াচ্ছে, আচ্ছা করে কানদুটো মুলে দেখেছ?

বোঝাই যাচ্ছে এই ধরণের ডাক্তাররা আমার গুডবুকে নেই। কিন্তু আমি এঁদের ভয়ানক গুডবুকে আছি। ভগবানই জানে কেন। সেই ছোটবেলা থেকে এঁরা আমার পিছু ধাওয়া করে আসছেন। রিষড়া ডাউন প্ল্যাটফর্মে আমি আর মা দাঁড়িয়ে আছি। আমার পরনে খয়েরি টিউনিক, মাথার ঝুঁটিতে লালফিতের ফুল, পায়ে গুডবয় শু, চোখে মাইনাস সিক্স পয়েন্ট ফাইভ পাওয়ারের চশমা আর গালে পুরোনো ব্রণর পোলকা ডট।

আপ প্ল্যাটফর্ম থেকে একজন চেঁচাচ্ছেন, “অর্চনাদি! অর্চনাদি!”

মা এদিকওদিক তাকাচ্ছেন। আমি কনুই ধরে টেনে মাকে দেখাচ্ছি, “ওই যে ওই প্ল্যাটফর্মে, মা।” আমার মন অলরেডি কু-ডাক ডাকছে। আমার অলরেডি ভদ্রমহিলাকে একটুও ভালো লাগছে না।

“ও মা, এই আপনার মেয়ে বুঝি? কত্ত বড় হয়ে গেছে!!”

বান্টি বলে ওর নাকি খুউউউব ইচ্ছে, একবার এইধরণের পরিস্থিতিতে বক্তাকে জিজ্ঞাসা করা, “আপনি অন্য কী আশা করেছিলেন?”

মা অনিশ্চিত হাসিমুখে ঘাড় নেড়ে আস্তে গলায় হ্যাঁ বলছেন। দেখেই বুঝতে পারছি মা চিনতে পারেননি, মাথার ভেতর আকাশপাতাল হাতড়াচ্ছেন। বাড়ি? নোপ্‌। ট্রেন? উঁহু, এ তো আপে যাচ্ছে দেখাই যাচ্ছে। তবে কি অফিস? হতে পারে হতে পারে...কোন এক্সচেঞ্জ কোন এক্সচেঞ্জ...

শেষপর্যন্ত মা হাল ছেড়ে দিলেন।

উল্টোদিকের মহিলা হাল ছাড়ার পাত্রী নন। “ইস্‌ অর্চনাদি, আপনি আগের থেকেও রোগা হয়ে গেছেন। কী খারাপ দেখাচ্ছে। মেয়ে খুব দুষ্টুমি করে বুঝি। কী গো, মাকে খুব জ্বালাও নাকি?”

আমি ভুরুটা আগের থেকেও বেশি কোঁচকাই। ডাউন প্ল্যাটফর্মের লেডিস কম্পার্টমেন্টের জায়গায় দাঁড়ানো বাকি যাত্রীরা নিজেদের গুলতানির ভলিউম কমিয়ে মহিলার কথা কান পেতে শুনছেন।

মাকে ছেড়ে এবার মহিলা আমাকে নিয়ে পড়লেন। “এই বয়সেই এত হাই পাওয়ার! বাপরে! অবশ্য আপনার আর আপনার হাসব্যান্ড দুজনেরই বোধহয় চশমা তাই না? সেখান থেকেই পেয়েছে নিশ্চয়। গাজরসেদ্ধ খাইয়ে দেখবেন তো।”

“দেখব।” মায়ের এতক্ষণে গলা বেরিয়েছে। নিজের ঘাড়ের ওপর থেকে খাঁড়া সরে গেছে কি না, তাই।

“হ্যাঁ গো অর্চনাদি, মেয়ের এত ব্রণ হয়েছে কেন গো?”

কী চোখ! অতদূর থেকেও ঠিক দেখে ফেলেছে। আমি বেপরোয়া হয়ে মায়ের হাত ছাড়িয়ে প্ল্যাটফর্মের ধারে ঝুঁকে ট্রেন আসছে কি না দেখি। হে বাবা তারকনাথ, তারকেশ্বর লোকালটা পাঠাও বাবা তাড়াতাড়ি। বড় হয়ে চাকরি পেয়ে তোমার পুজো দেব।

মা হাঁহাঁ করে তাড়াতাড়ি আমাকে টেনে নিরাপদ জায়গায় ফেরত আনেন।

“পেট পরিষ্কার হয় না বোধহয়? তাই না?”

“হয় না তো।” মা স্পষ্ট গলায়, কেটে কেটে বলেন। যাতে প্রতিটি শব্দ মহিলার কানে পৌঁছোয়। আর সঙ্গে সঙ্গে আপ ডাউন প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আরও শ’খানেক লোকের।

আমি স্তব্ধ হয়ে মায়ের মুখে দিকে তাকিয়ে থাকি। এটা কী করলে গো মা? আমি কি তোমার এতবড় শত্তুর যে এই কথাটা তোমার অফিসটাইমে রিষড়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে হল? কী করে পারলে?

মা-ও বলেই বুঝেছেন যে কাজটা ঠিক হয়নি। আমার রক্তশূন্য মুখের দিকে তাকিয়ে মা তাড়াতাড়ি জিভ কেটে ঠোঁট নাড়িয়ে “সরি” বলার চেষ্টা করেন, কিন্তু ততক্ষণে মাইকে চুয়াত্তর নম্বর তারকেশ্বর লোকালের অ্যানাউন্সমেন্ট শুরু হয়ে গেছে।

মা মহিলার দিকে তাকিয়ে, “আচ্ছা তাহলে আসি” বলে পর্বটা শেষ করার চেষ্টা করলেন।

“হ্যাঁ হ্যাঁ। ইস্‌ কী ভালো লাগল আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে...”

ঝম্‌ঝম্‌ করে চুয়াত্তর প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ল। মা খুব লজ্জিত মুখে আমার হাত ধরে ট্রেনে উঠলেন। পাশাপাশি দুটো সিট খালি দেখে আমি আর মা বসে পড়লাম। কেউই কোনও কথা বলছিলাম না। আমি রাগে, আর মা কী জানি কেন। বোধহয় অনুতাপে।

কোন্নগরে সামনের একটা সিট খালি হল। ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একজন বসলেন। চেনামুখ, রিষড়া থেকেই উঠেছেন। মায়ের সঙ্গে হালকা হাসি বিনিময় হল।

ঠিক দশ সেকেন্ড পর সামনের জন ঝুঁকে পড়লেন।

“আপনি তখন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কী যেন বলছিলেন দিদি, মেয়ের পেট পরিষ্কারের ব্যাপারে? কৎবেল খাইয়ে দেখুন না। আমার চেনা দোকান আছে বাজারে। বলে রাখব, আপনাকে ফাসক্লাস বেল দেবে। সেটা গরমজলে ভালো করে চটকে...”

মাকে আমি আজ পর্যন্ত ক্ষমা করিনি। কোনওদিন করবও না।

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.