June 30, 2013

আবার কোলোন



সক্কালসক্কাল একগাদা গোলমাল দিয়ে দিন শুরু হল। চা ফুরিয়ে গেছে।

শনিবার ইউটিউব দেখতে গিয়ে বাজারে যাওয়ার সময় হয়নি। রবিবার এখানের সব দোকানপাট বন্ধ। তার মানে আমাকে রবিবার সকাল, রবিবার বিকেল, সোমবার সকাল চা-হীন কাটাতে হবে।

এতেও যদি মেজাজ গরম না হয় তবে কীসে হবে?

দ্বিতীয় ঝামেলাটা হল টিকিট কাটতে গিয়ে। সারি সারি খাঁ খাঁ টিকিট কাউন্টারের একটার সামনে গিয়ে যেই না বলেছি, আমাকে অনুগ্রহ করে কোলোন শহরের একটা টিকিট দেওয়া হোক, মহিলা পাথরের মত মুখ করে বললেন, টিকিট কাটার লাইন দেওয়ার জন্য যে টিকিটটা কেটেছ সেটা কোথায়?

হোয়াআআআআট?

আমাদের দেশে লোককে হাতে পায়ে ধরে লাইন দিতে রাজি করানো যায় না, আর এ দেশে লোকে সেধে লাইন দিতে চাইলে বলে, আগে টিকিট দেখাও না হলে লাইন দিতে দেব না। আমি ভদ্রমহিলার উঁচোনো তর্জনী লক্ষ্য করে ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা একটা মেশিনের কাছে গিয়ে একটা লাল রঙের বোতাম টিপলাম। খচাৎ করে একটা কাগজ বেরোল। তাতে দেখি লেখা ৩১৯২, কাউন্টার ৪। বোর্ডের দিকে তাকিয়ে দেখি সেটা ওই মহিলারই কাউন্টার। তারপর মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, আমি ওঁর দিকে। ত্রিসীমানায় কাকপক্ষীটিও নেই। ঝাড়া তিন মিনিট পর পিঁপ পিঁপ আওয়াজ করে বোর্ডের ওপর আমার নম্বর ফুটে উঠল। মহিলা তর্জনী বেঁকিয়ে আমাকে ডাকলেন। আমি গিয়ে টাকা দিলাম, উনি আমাকে টিকিট দিলেন।

পাগল না পায়জামা?

যাই হোক, ঝামেলার ওইখানেই সমাপ্তি। ঠিক টাইমে প্ল্যাটফর্মে শোঁশোঁ করে ট্রেন ঢুকে গেল। রবিবারের বাজারে জানালার ধারে সিট পেতে কোনও অসুবিধেই হল না।

এখানে শহরের ঠিক মাথার ওপরেই এত বড় আকাশ কী করে দেখা যায় সেটা একটা রহস্য। যেদিকে তাকাও হয় নীল আকাশ, নয় সবুজ জঙ্গল। জার্মান প্র্যাকটিস করব বলে একটা ন্যাশনাল জিওগ্র্যাফিক নিয়ে বেরিয়েছিলাম, প্ল্যাটফর্মে বসে পনেরো মিনিটে অতিকষ্টে আড়াই লাইন পড়েওছিলাম। আমুন্ডসেন আর স্কটের দক্ষিণমেরু অভিযানের কমপ্যারেটিভ অ্যানালিসিস করে একখানা লেখা। কিন্তু জানালার বাইরে এ রকম দৃশ্য ফেলে রেখে বানান করে করে জার্মান পড়াটা জাস্ট ক্রাইম। তাই বই ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে গালে হাত দিয়ে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আমার ট্রেনটা ছিল লোকাল ট্রেন। বন থেকে কোলোন যেতে লাগে আধঘন্টা কিন্তু তার মাঝে গোটা পাঁচেক স্টেশনে দাঁড়ায়। সে সব স্টেশনে নানারকম লোকজন ট্রেনে উঠছিল নামছিল। আমার সোজাসুজি ট্রেনের ওধারের জানালায় তিন ঠাকুমার একটা গ্রুপ বসেছিল। এত ফিটফাট ঠাকুমা আমি জীবনে দেখিনি। সাদা ধবধবে ববছাঁট চুল নিখুঁত করে সেট করা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে কালবৈশাখী চলে গেলেও একটি চুলও এদিক থেকে ওদিক হবে না। ঠাকুমাদের পরনে ইস্তিরি করা স্কার্ট টপ, ফিটিং বলে দিচ্ছে মহার্ঘ জিনিস। পায়ে বো-আঁটা পাম্পশু, গলায় মুক্তোর মালা।

ট্রেন কোলোন পৌঁছল। স্টেশনের ঠিক গায়ের বাস টার্মিনাস থেকেই আমার ফোন কালেক্ট করার কথা ছিল, সেসব নির্বিঘ্নে হয়ে গেলে আমি গুটি গুটি রাইখার্ডের দিকে চললাম।

রাইখার্ডের কথা মনে নেই? কোলোন ক্যাথিড্র্যালের কোলের কাছে সেই অনবদ্য ক্যাফেটি? ওয়েবসাইট বলছে ক্যাফের পত্তন হয়েছিল আঠেরোশো পঞ্চান্ন সালে। তারপর নানা মালিকের হাতবদল হতে হতে উনিশশো ছেষট্টি সালে প্রফেসর ফ্রেডরিখ উইলহেল্‌ম্‌ ক্রেমার নামের এক স্থপতির হাতে রাইখার্ড তার বর্তমান রূপ পেয়েছে।

রাইখার্ডে বসার জায়গার অভাব নেই। ক্যাফের ভেতরে চারশো লোক বসতে পারে, বাইরে টেরাসে আরও চারশো। বিরাট ‘ডম’ (ক্যাথিড্র্যাল) সেই টেরাসের ওপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার রাজকীয় ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। নেহাত বেরসিক না হলে এই সুন্দর সামার-প্রভাতে কেউ যেচে চার দেওয়ালের ভেতরে বসে না। তাই আমি বাইরের একটা রৌদ্রস্নাত টেবিল পছন্দ করে বসলাম।



বসে প্রথমেই আমার হারিয়ে পাওয়া মোবাইলের কয়েকটা ছবি তুললাম। মা’কে ফোন করলাম। অর্চিষ্মানকে ফোন করলাম। দুজনেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

কী খাব সেটা মোটামুটি ঠিক করাই ছিল। গোলাপি শার্ট আর কালো স্কার্টের ওপর ধবধবে সাদা লেসের ফিতে বাঁধা পরিবেশিকা এসে ছোট্ট নোটপ্যাডে আমার অর্ডার টুকে নিয়ে চলে গেলেন। 

পরে কোনওদিন আরও ভাল খাব কি না জানি না, কিন্তু ক্যাফে রাইখার্ডে আজ সকালের ব্রেকফাস্ট/ব্রাঞ্চ আমার জীবনের সেরা খাওয়া। প্রতি কামড়ে নরম অথচ মুচমুচে Croissant-এর সঙ্গে অল্প নোনতা হ্যাম আর রসালো টমেটো ত্র্যহস্পর্শ। মোটে তিনটে উপকরণ দিয়ে মুখের ভেতর এমন স্বর্গসুখের সৃষ্টি হতে পারে, কে জানত? এ জিনিস হুড়োহুড়ি করে খাওয়া চলে না, যেমন তেমন করে একে মুখের ভেতর ঠুসে প্লেট ঠেলে উঠে যাওয়া যায় না। এ খাওয়া ফাস্টফুডের অ্যান্টিথেসিস। কাঁটা প্রতিবার মুখ থেকে নামিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝতে পারছিলাম আমার মাথার ভেতরটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। টেনশন আউট, নিশ্চিন্তি ইন্‌। নিজের প্রতি মনোযোগ কমিয়ে পারিপার্শ্বিকের ওপর মনোযোগ বাড়ালাম। রোদ্দুরের ওম যেন আরও ভালোবেসে আমার কাঁধ জড়িয়ে ধরছিল। ততক্ষণে অল্প অল্প করে চারপাশের টেবিলগুলো ভর্তি হতে শুরু করেছে। খাওয়ার মাঝে মাঝে ব্রেক নিয়ে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশের লোক দেখতে লাগলাম। কেউ উত্তেজিত হয়ে হাত নেড়ে কথা বলছে, কেউ ভাবলেশহীন মুখে শুনছে। বেশির ভাগ লোকই ব্রেকফাস্ট খাচ্ছে। ঝুড়ি ভর্তি গোল লম্বা তেকোণা চৌকোণা পাঁউরুটির ঢিবি। ছুরি দিয়ে মোটা করে হলদে মাখনের ঘন পরত মাখাও আর মুখে পোর। চিবোও আর ভাব। এখনও কি সারা পৃথিবীর ওপর রাগে গা জ্বলছে তোমার? জ্বলছে না তো? জানতাম। আম-পচে-বেল। এক বুড়ো দাদু হট চকলেটের একটা আকাশছোঁয়া গ্লাস নিয়ে বসেছেন, কাঁপাকাঁপা হাতে চামচে করে একটু একটু করে চকলেটের ওপরের শরৎকালের মেঘের মত ক্রিম তুলে মুখে পুরছেন। দাদুর টেবিলের বাকি চেয়ারগুলো আমার টেবিলের মতই ফাঁকা। হয়ত দাদুর সঙ্গে আসার মত কেউ নেই। যারা ছিল হয়ত এতদিনে সব মরেঝরে গেছে।

ঠিক প'নে এগারোটার সময় ডমের ঘণ্টা বেজে উঠল। একসঙ্গে অনেক ঘণ্টা। সরু মোটা গং গং ঢং ঢং টুং টাং-এর ঐকতান। চলল টানা পনেরো মিনিট ধরে। গম্ভীর, অপূর্ব। শুনলে ভালোর থেকেও ভয় লাগে বেশি। কিংবা হয়তো আমার ভয় লাগছিল, ঘণ্টা শুনতে শুনতে ডরোথি সেয়ার্সের ‘দ্য নাইন টেলার্স’ গল্পটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল বলে। ফেনচার্চ সেন্ট পল নামের এক নামগোত্রহীন গ্রামের চার্চের ঘণ্টাঘরে পয়লা জানুয়ারি নাগাদ হঠাৎ একটি মৃতদেহ আবিষ্কার হল। অনেক ঘোরপ্যাঁচ, অলিগলি পেরিয়ে গোয়েন্দা লর্ড পিটার উইমসি অবশেষে রহস্য উন্মোচন করতে পারলেন। নববর্ষ উদযাপন করতে টানা ন’ঘণ্টা ধরে ম্যারাথন ঘণ্টা বাজানোর ঐতিহ্য চলে এসেছে প্রায় সেই মধ্যযুগ থেকে। সেই রাতেই একটা লোক সকলের অলক্ষ্যে ঘণ্টাঘরে হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে ছিল। টানা ন’ঘণ্টা ধরে ওই অমানুষিক শব্দ সহ্য না করতে পেরে অবশেষে লোকটার হার্টফেল হয়।

যাই হোক এসব ভয়ের কথা থাক, আইসক্রিমের কথা হোক। খাওয়া শেষ হলে আমি তিনমাইল লম্বা আইসক্রিমের মেনু বেছে একটা ক্রিম ভ্যানিলা আর একটা কফি উইথ হ্যাজেলনাট আইসক্রিমের অর্ডার দিলাম। অবিলম্বে পরিবেশিকার হাতে চেপে তার আবির্ভাব হল। 

আইসক্রিমটা দেখতে বেশি ভালো না খেতে, সেটা আমি এখনও স্থির করে উঠতে পারিনি। আরও কয়েকবার খেয়ে দেখতে হবে মনে হচ্ছে।

ব্যস্‌, গল্প প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। একটুখানি বাকি আছে সেটা চট করে বলে নিই। আমার পরিবেশিকা মন্দ ছিলেন না, তবে সামান্য ঢিলে। আমার দশটা আটত্রিশের ট্রেন ধরার ইচ্ছে ছিল, বিল মিটিয়ে লাঠিছাতাক্যামেরা সামলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসক্যালেটরের তিনটে করে সিঁড়ি টপকে প্ল্যাটফর্মে উঠে দেখি ঘড়িতে দশটা ঊনচল্লিশ বাজে, প্ল্যাটফর্ম ঝাঁট দিয়ে লোক তুলে নিয়ে আমার ট্রেন চলে গেছে।

পরের ট্রেন ঠিক একঘণ্টা বাদে, এগারোটা আটত্রিশে।

প্ল্যাটফর্মের ওপর ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছিল আর আমি যথারীতি পাকামো করে সোয়েটার নিয়ে বেরোইনি। অগত্যা আবার নিচে নেমে এলাম। কোলোন সেন্ট্রাল স্টেশনে বেশ রংচঙে আলোজ্বালা দোকানপাট আছে, ভাবলাম একঘণ্টা ধরে ঘুরে ঘুরে সেগুলোই দেখি। ঘুরতে ঘুরতে একটা জায়গায় এসে ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়েই দেখি আমার পাড়ার সুপারমার্কেটের নাম ঝকঝকে লাল আলো দিয়ে লেখা। স্টেশনের ব্রাঞ্চ কি না, রবিবারেও দিব্যি খোলা।

ভাগ্যিস ট্রেনটা মিস্‌ করলাম। ভাগ্যিস মহিলা ঢিলেমো করলেন। লাফ মেরে দোকানে ঢুকে গিয়ে একবাক্স দার্জিলিং টি-ব্যাগস্‌, একবাক্স পেনে পাস্তা, সবুজ ডাঁটিওয়ালা লাল টুকটুকে টমেটো, মোটা মোটা সসেজ কিনে ফেললাম। ডিনারের কথা ভেবে এখনই মন ভালো হয়ে যাচ্ছে।

June 29, 2013

সাপ্তাহিকী





In the long run, the sharpest weapon of all is a kind and gentle spirit.
                                                                                                      ---Anne Frank



আমিও তো তাই বলি।

কেউ বলেছিল লিংকন খুন হয়েছিল বলে, কেউ বলেছিল ঘড়ির আবিষ্কর্তা ওই সময়ে জন্মেছিল বলে। আসল কারণটা এ’দুটোর একটাও নয়। নতুন ঘড়ির কাঁটা দশটা দশে রাখার আসল কারণটা জানতে হলে ক্লিক করুন।





চোখকে বোকা বানানো এত সোজা ভাবিনি।


এ সপ্তাহের গান। শচীনকত্তা, সাহির লুধিয়ানভি, রফি, গীতা দত্ত। স্বর্গ কি বেশি দূরে হতে পারে?

ভালো হয়ে থাকবেন। মা’র কথা শুনে চলবেন। দেখা হবে, টা টা।

June 28, 2013

প্রথম এগারো



আমি ভাবলাম কুইজ দেখে দেখে সবাই হেজেমজে গেছে, তাই প্রশ্ন বানানো ছেড়ে দিয়ে মহানন্দে ছিলাম। কিন্তু কিছুদিন ধরে ই-মেলে, এবং গতকাল কমেন্টেও, গুটিগুটি একজন-দুজন কুইজ সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। পরীক্ষা দিতে লোকজন এত ভালোবাসে কে জানত।

মাস্টারমশাই/দিদিমণি মাত্রেই জানেন উত্তর লেখার থেকে ঢের শক্ত প্রশ্নপত্র তৈরি করা। বেথুনে মাইক্রো পড়াতেন এম ডি। একদিন লাস্ট পিরিয়ডে মোনোপ্‌সনিস্টিক মার্কেটের ক্লাস চলছিল। আমরা সবাই ব্ল্যাকবোর্ডের থেকে ঘড়ির দিকে বেশি তাকাচ্ছি দেখে এম ডি খুব দুঃখ পেয়ে বলেছিলেন, তোমাদের তো না পড়লেও চলবে, কিন্তু আমাকে রোজ পড়া তৈরি করে আসতেই হবে, সে আমি চাই না চাই।

মোদ্দা কথা হল এতদিনের অনভ্যেসে আমার প্রশ্নপত্র বানানোর প্র্যাকটিস আর উদ্যম দুটোতেই জং ধরে গেছে, কাজেই কুইজের এখন চট করে দেখা পাওয়া মুশকিল। তবে অন্যরকম একটা খেলা করা যেতে পারে। তাতে পৃথিবী সম্পর্কে জেনারেল নলেজ হয়তো বাড়বে না, কিন্তু অবান্তরের লেখক পাঠক সকলেই একে অপরের হাঁড়ির খবর আরও একটু বেশি জানতে পারবেন। সেটাই বা কম কীসে?

প্রথমে আমি লিখছি, এরপর লিখবেন আপনারা।

১. প্রথম স্কুলঃ সত্যভারতী শিশুতীর্থ। কমলা টিউনিক, সাদা বেল্ট। হাতে টিনের সুটকেস, ন্যাড়া মাথার ওপরে গ্রীষ্ম বর্ষা শীত বসন্ত বারোমাস রামধনু রং ছাতা। পিসির হাত ধরে সোনা বীরদর্পে স্কুলে চলেছে।  

২. প্রথম বইঃ আমার মনে নেই, মা বলেন ‘পশুর ছড়া’। সেজমাসি বইমেলা থেকে কিনে রেখেছিলেন। সে বইয়ের সাইজ প্রায় আমারই মত ছিল। আমি সকালে উঠেই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বই ঘাড়ে বেরোতাম। এক এক ঘরে গিয়ে মেঝেতে থেবড়ে বসে পড়ে পড়াশোনা শুরু হত। তখনও পড়তে শিখিনি কিন্তু মা’র মুখে দিবারাত্র শুনে শুনে ছড়াগুলো মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। পাতা উল্টে উল্টে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে ছড়া বলে গোটা বই শেষ হলে আবার বই নিয়ে অন্য ঘরে যাত্রা। মানে অন্য যে ঘরে লোক আছে। আমি কক্ষনও ফাঁকা ঘরে বসে কবিতা পড়ে এনার্জি অপচয় করিনি।

৩. প্রথম ক্রাশঃ ক্রাশের বাংলা কী হবে? আমি জানি না, আপনি জানলে আমাকে জানিয়ে দেবেন প্লিজ। আমার প্রথম ক্রাশের নাম প্রদোষ মিত্র। এবং কী আশ্চর্যের ব্যাপার, আমার অসংখ্য চেনা মহিলার প্রথম ক্রাশের নামও এক্স্যাক্টলি ওটাই। এ রকম একটা আনকমন নামের লোক পশ্চিমবাংলার পাড়ায় পাড়ায় এত আছে কে জানত।  

৪. প্রথম প্রেমঃ এটাও প্রদোষ মিত্র লিখে দিলেই ঠিক হত, কিন্তু পুনরাবৃত্তি হয়ে যাবে। তার থেকে বরং বলি প্রথম যে একতরফা প্রেমে পড়েছিলাম সেই ছেলেটির নামের আদ্যক্ষর ছিল ‘স’। সাতবছর ধরে আমি রাতে ঘুমোতে গিয়ে তার কথা মনে করে চুপিচুপি কাঁদতাম, সাতবছর পরে হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি প্রেমট্রেম সব ফর্সা। আর প্রথম দু’তরফা প্রেমিকের আদ্যক্ষর? ‘অ’। এর থেকে বেশি লেখা গেল না কারণ এই ফেসবুকের দুনিয়ায় সকলেই সকলকে চেনে। পুরো নাম লিখি আর আপনারা কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ে বলুন, “হরি হরি, অমুকে তো আমার মাসতুতো ভাই হয়...” সে রিস্কে আমি নেই।

৫. প্রথম (হলে গিয়ে) সিনেমাঃ ক্লাস ফাইভে পড়াকালীন স্কুল থেকে চার্লি চ্যাপলিনের সিনেমা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। সিনেমার নাম মনে নেই, খুব সম্ভবত ‘মডার্ন টাইম্‌স্‌’। সিনেমাহলের নাম দীপক। আমি স্কুলে থাকতে থাকতেই দীপকের ব্যবসায় টান পড়তে শুরু করেছিল। দুপুরের শো-তে সন্দেহজনক নামের সিনেমা দেখানো হত। এখন গেলে নির্ঘাত দেখব দীপক ভেঙে হাইরাইজ উঠেছে।

প্রথম সিনেমা দেখা সংক্রান্ত আরও একটা ব্যাপার মনে আছে। হলের চেয়ার থেকে ইউনিফর্মের ভাঁজে করে ছারপোকা বাড়িতে বয়ে এনেছিলাম, মা টের পেতে পেতে তারা বাড়ি জুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করে ফেলেছিল। সারা বাড়ির বিছানা রোদ্দুরে দেবেন বলে টেনে টেনে মা ছাদে তুলছেন আর দিদিভাইদের মুণ্ডুপাত করছেন, “সিনেমা দেখাতে হলে ভদ্রস্থ হলে নিয়ে গেলেই পারে”, এই দৃশ্যটা স্পষ্ট মনে আছে।

৬. প্রথম বেড়াতে যাওয়াঃ এক বছর দশ মাস বয়সে দক্ষিণ ভারত বেড়াতে গিয়েছিলাম, তার কিছুই আমার মনে নেই। একটা দৃশ্য মনে পড়ে আবছা আবছা। একটা মন্দিরের চাতালে বসে আছি, দূরে শেকলে বাঁধা একটা হাতি। মাহুত গোছের একটা লোক একদলা ভাত গোল্লা পাকিয়ে হাতির মুখের কাছে ধরছে, আর হাতি শুঁড় আকাশের দিকে তুলে, হাঁ করে সে গোল্লা গপ করে গিলছে। সে গোল্লার সাইজ দেখার মত। অবশ্য এমনও হতে পারে যে পুরো দৃশ্যটাই কল্পনা। বড় হয়ে নির্ঘাত কোথাও পড়েছিলাম যে দক্ষিণ ভারতের বড়লোক মন্দিরে হাতি পোষা হয়। সেই তথ্যটাকে দক্ষিণ ভারত বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে পুরো দৃশ্যটা নিজেই নিজের স্মৃতিতে পুঁতে দিইনি, সে গ্যারান্টি নেই।

৭. প্রথম বেস্ট ফ্রেন্ডঃ স্বাতী। স্বাতীর সঙ্গে আমি সারাদিন স্কুলে গল্প করতাম, বাড়ি ফেরার পথে গল্প করতাম, বাড়ি ফিরে এসে ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম। এত কথা গজাত কোত্থেকে কে জানে।

৮. প্রথম রুমমেটঃ পূর্ণিমা ওরফে পূর্ণা। পূর্ণার গল্প আগেও করেছি, পরেও আরও অনেক করব। আজ থাক।

৯. প্রথম কম্পিউটারঃ হোস্টেলে থাকতে একটা অ্যাসেম্বল্‌ড্‌ ডেস্কটপ কিনেছিলাম। সেটা এখনও রিষড়ার বাড়িতে রাখা আছে। ওটাতে মূলত জি আর ই প্র্যাকটিস আর গান শোনা হত। এ আর রহমানের সংকলিত গানের একটা সিডি কার কাছে থেকে যেন ধার করে এনেছিলাম, সারাদিন সেটা তারস্বরে চলত।

প্রথম ল্যাপটপ সোনি ভায়ো। দ্বিতীয় ল্যাপটপও সোনি ভায়ো। তৃতীয়টাও তাই হলে আশ্চর্য হব না।

১০. প্রথম মোবাইলঃ নোকিয়া। ২০০৫ সালের ৫ই অক্টোবর, সাউথ এক্স ওয়ান মার্কেট থেকে কিনেছিলাম। এই মডেলটা।

 Nokia 3310  Mobile Price in India
উৎস গুগল ইমেজেস্‌

১১. প্রথম হবিঃ ট্রেন বাসের টিকিট জমানো। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনাদের অনেকের সঙ্গে আমার হবিটা মিলে যাবে। আমাদের সময়েও হলুদ রঙের পিচবোর্ডের ট্রেনের টিকিট চালু ছিল। একবার মা বাবার সঙ্গে কলকাতা থেকে ফিরছিলাম। ফিরছিলাম মানে বাবার কোলে চেপে ঘুমোচ্ছিলাম। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। হাওড়া স্টেশনে বাসটা ঢুকল যখন কন্ডাকটর আমার আধাঘুমন্ত হাতের মুঠোয় একগোছা টিকিটের বাণ্ডিল গুঁজে দিয়েছিলেন। নিমেষে ঘুম ছুটে গিয়েছিল। কন্ডাকটরের মুখটা মনে নেই, কিন্তু এখন মনে হয়, নিশ্চয় বাচ্চা ছেলেই হবে।


June 27, 2013

সকালের শপথ



গ্র্যাজুয়েট স্কুলে পড়ার সময় হঠাৎ আমার যোগা ক্লাসে ভর্তি হওয়ার মতি হয়েছিল। একগাদা সময় ফেলে ছড়িয়ে নষ্ট করছিলাম, কোনও কাজে মন বসছিল না। শরীরের দিকে নজর দিলে যদি মনের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় সেই আশায় গুটি গুটি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট যোগা ক্লাসে গিয়ে নাম লিখেছিলাম।

সে ক্লাসে রকমারি আসন শেখা ছাড়াও সাপ্তাহিক অ্যাসাইনমেন্ট লিখতে হত, শ্রীমদ্ভগবদগীতার দার্শনিক ব্যাখ্যা লিখে টার্মপেপার জমা দিতে হত।

এই যোগা ক্লাসে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারটা আমি সাধারণত চেনা কাউকে বলতাম না। দেশে থাকতে ফিরে চাইনি, বিদেশে গিয়ে যোগা শিখছি, এটা লোকে যে সিম্পলি আদিখ্যেতা বলে উড়িয়ে দেবে সে নিয়ে আমার কোনও সন্দেহই ছিল না। কিন্তু আমি সত্যিই চেয়েছিলাম আমার অখণ্ড অনন্ত সময় নিয়ে একটা কিছু করতে। যে কাজের শেষে অন্তত কিছু আউটপুট চর্মচক্ষে দেখতে পাওয়া যাবে।

সে ক্লাসের কিছু কিছু আসন এখনও মনে আছে। এখনও ন’মাসেছ’মাসে ভোরবেলা উঠে ইন্টারনেট ছেড়ে মেঝেতে মাদুর পেতে হাতপা টানাটানি করি, এবং মাত্র পাঁচ মিনিটে সারা শরীরে এবং মনে কি অদ্ভুত জোর আর ভালোলাগা আসে সেটা দেখে নতুন করে আপ্লুত হই। শপথ নিই, এবার থেকে রোজ করব। সে শপথের পরিণতি আর আপনাদের বানান করে বলার দরকার নেই নিশ্চয়।

ক্লাসে শেখা বেশিরভাগ আসনই ভুলে গিয়েছি, কিছু কিছু কথা এখনও মনে আছে। ক্লাসের শেষে পদ্মাসনে বসে প্রণাম করার একটা ব্যাপার ছিল। আমার এক নাস্তিক সিনিয়র প্রথমদিন ক্লাসে গিয়ে সে প্রণাম দেখে আঁতকে উঠে পরদিন থেকে ও পথ আর পাড়াননি। আমিও আস্তিক নই কিন্তু তাই বলে আমার প্রণামে অরুচি নেই। কারও যদি প্রণাম পেতে ভালোলাগে আমি তাকে প্রণাম করতে রাজি আছি।

আমার যোগা ক্লাসের দিদিমণি ভয়ানক বুদ্ধিমতী ছিলেন। শিরদাঁড়া সোজা করে, বাবু হয়ে বসে, চোখ বুজে মনে মনে ভগবানের নাম কর বললে যে চিঁড়ে ভিজবে না সেটা তিনি হাড়ে হাড়ে জানতেন। সকলেই বিকেলের কেটে রাখা সিনেমার টিকিটের কথা ভাববে। তাই আমরা যখন লাইন দিয়ে চোখ বুজে বসে থাকতাম তিনি শুধু দুটো কথা বলতেন।

এই মুহূর্তে তোমার ভেতরে আর চারপাশে যে শান্তি আর নীরবতা টের পাচ্ছ, মনে মনে চাও যেন সারাদিন সেই শান্তি আর নীরবতা তোমাকে ঘিরে থাকে।

সেই যোগা ক্লাসের থেকে এত দীর্ঘ সময়ের দূরত্বে দাঁড়িয়েও আমি এখনও রোজ ভোরে এই দুটো বাক্য মনে মনে উচ্চারণ করি। শান্ত ভোরের ছায়ায় বসে, কখনও কখনও নিস্তব্ধতায় কখনও কখনও সুরের সাগরে ডুবে থেকে চাওয়াটাকে নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর মনে হয়। মনে হয় এইটুকু তো কাজ, সামনের চব্বিশঘণ্টায় এটুকু করতে পারব না?

পারি না। বাকি সমস্ত চাওয়ার মত এই চাওয়াটাকেও পাওয়ায় পরিণত করতে আমি গলদঘর্ম হয়ে পড়ি। রোদ যত চড়ে, আমার মেজাজের চারদিকের শান্ত পাঁচিলে তত বড় বড় ছিদ্র দেখা দেয়। যত বেশি লোকের সঙ্গে কথা বলি, তত তাদের যাবতীয় খুঁত প্রকাণ্ড হয়ে আমার চোখে পড়তে থাকে। এত বোকা কেন? এত অভদ্র কেন? এত লম্বা কেন?

এক্স্যাক্টলি আমার মতই নয় কেন?

এই আমিই ‘সমত্বদর্শন’ নিয়ে কুড়ি পাতার টার্মপেপার লিখে এ প্লাস পেয়েছিলাম। সে এ প্লাস, পেপারের সঙ্গে সঙ্গে কবেই কোন রিসাইকেল বিনে দেহ রেখেছে, আমি আমার অসম, অসহনশীল, মায়োপিক দৃষ্টি নিয়ে ঠিক যেখানে ছিলাম সেইখানেই পড়ে আছি।

এর থেকে বেশি জঘন্য ব্যাপার আর কি কিছু হয়? না হতে পারে?

মা বলেন, বান্টিও বলে, “হবে হবে। কালে হবে। হাল ছেড়ে না দিলেই হবে। যতবার লোককে দেখে রাগ ধরবে, নিজেকে মনে করাবে ওই লোকটারও তোমাকে দেখে তোমার মতই গা জ্বলছে। হয়ত তোমার থেকে কিছু বেশিই জ্বলছে। কাজেই ফাইটটা ছাড়লে হবে না।”

অগত্যা ফাইট দিয়ে চলেছি। আজ সকালেও কুয়াশা ঘেরা শহরের দিকে তাকিয়ে ভেবেছি, এই দৃশ্যটা আজ সারাদিন যেন বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরতে পারি। ক্লাসে বসতে পারি, মিটিং করতে পারি, গ্রসারি যেতে পারি।


এখন শুধু দেখার সত্যি সত্যি পারি কি না।


June 26, 2013

আজ ভোরে



এই মুহূর্তে এখানে পাখির ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। চতুর্দিকে ভয়ানক ব্যস্ত কিচিরমিচির। পাখির বাচ্চাদের আবার সারাবছরই মর্নিং স্কুল। এখন খুব হুড়োহুড়ি চলছে নিশ্চয় বাসায়। মা পাখির মেজাজ টং হয়ে আছে। ট্যাঁফো করলেই কানমলা।

কান খাড়া করলে ভীষণ আস্তে তবলার টুং টাং শোনা যাচ্ছে। ঘরের দরজাটা ভালো করে টেনে বন্ধ করা হয়নি বোধহয়। আমার ফ্লোরে আপাতত টেরেসা ছাড়া আর কেউ নেই। আশা করি এই আওয়াজে ওর ঘুম ভাঙবে না।

এক্ষুনি আরেকটা শব্দ শুরু হল। ইলেকট্রিক কেটলের জল ফুটতে শুরু করেছে। প্রথমে ধীরে, তারপর প্রবল তেজে। জলের গবগবানিতে তবলার মিহি টুংটাং ডুবে মরেছে। আমি কেটল তুলে সাবধানে লাল কাপের ওপর কাত করি। কাপের লাল গায়ে লিপ্টনের টি ব্যাগের হলুদ রঙের টিকি এলিয়ে পড়ে আছে। বেশ ইস্টবেংগল ইস্টবেংগল একটা ব্যাপার হয়েছে কিন্তু।

রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে একটু অপেক্ষা করি। যাতে ব্যবহৃত টি ব্যাগটা রান্নাঘরের বিনেই ফেলে রেখে যাওয়া যায়। নিজের ঘরটা যত আবর্জনামুক্ত রাখা যায় ততই ভালো। ঘরের ময়লা ঝাঁট দিয়ে রাস্তায় ফেলার আজীবনের শিক্ষা এত সহজে কি যায়?

মিনিমাম তিন মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। না হলে সকালের চা মাটি। বোর হয়ে গিয়ে আমি আস্তে করে টেরাসের দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসি। ঠাণ্ডা আছে কিন্তু বেশ। তার মধ্যে পরশু রাতে জানালা খুলে শুয়ে একটু একটু কাশি হয়েছে। কাশির সঙ্গে বুকের ভেতর ঘংঘং আওয়াজ ফ্রি। ভাগ্যিস বুদ্ধি করে সবুজ তুলোটে চাদরটা গায়ে দিয়ে এসেছিলাম। ভালো করে সেটা গলার কাছে জড়িয়ে নিই।

এত কিচিরমিচির, অথচ দেখা যায় না একটাকেও। আগেও দেখেছি, যে পাখির সাইজ যত ছোট, তার গলার আওয়াজ তত বেশি। পাখি দেখার আশায় ক্ষান্ত দিয়ে আমি অন্যদিকে চোখ ফেরালাম।

শহরের ওপর খুব ধীরে ভোর নামছে। পা টিপে টিপে। যাতে কারও ঘুম না ভেঙে যায়। পোস্টটাওয়ারের মাথাটা আবিরের মত লাল হয়ে গেছে শুধু। সব জায়গাতেই সকাল হওয়ার কায়দাটা এক, শুধু আধারটা আলাদা। বড়মাসি যেমন বলেন। বাড়িতে সকাল প্রথমে নামে নারকেলগাছের মাথায়, দিল্লিতে সারি সারি ডিশ অ্যাণ্টেনার চক্রব্যূহে, আর এখানে পোস্টটাওয়ারের টপ ফ্লোরে।

টাওয়ারের গা বেয়ে একসারি আলো সারারাত জ্বলে। বাতাসের স্বচ্ছ দেওয়ালের ওপারে সেগুলো থরথর করে কাঁপছে। সে কাঁপুনি দেখতে দেখতে হঠাৎ খেয়াল হয় তিনমিনিট হয়ে গেছে কখন। রান্নাঘরে এসে ন্যাতানো টি ব্যাগ ফেলে দিয়ে কাপে ঠোঁট ডুবিয়েই মুখ ছ্যাতরাই। ইস্‌, বেশি কড়া হয়ে গেছে। এককাপ চা-ও কেন ঠিক করে করতে পারি না ভগবান।

এনিওয়ে, মাইন্ড ওভার ম্যাটার করা ছাড়া গতি নেই। চা উনিশবিশ কড়া হয়ে গেলে যদি সকালসকাল মেজাজ চটকে যায় তাহলে অমন মেজাজের মুখে আগুন। চা থেকে মন তুলে নিয়ে আকাশের প্রতি নিবদ্ধ করি। এই ক’সেকেন্ডের মধ্যেই আলো কত বেড়ে গেছে। পৃথিবীটা আসলে কত জোরে ঘুরছে সেটা এই সময় বোঝা যায়। সন্ধ্যে নামার সময়েও। ভরদুপুরে, বিশেষ করে সেটা যদি দিল্লির মে মাসের দুপুর হয়, সূর্য ঠিক চাঁদির ওপর অনন্তকাল থেমে থাকার অনুভূতিটা যে আসলে ইলিউশন সেটা পরিষ্কার হয়ে যায়।

আমি ঘরে ফিরে এসে জানালার সামনে টেবিলে ল্যাপটপ খুলে বসি। জানালার বাইরে অর্ধেকটা ঘন সবুজ আর বাকি অর্ধেকটা ঝকঝকে নীল। এই ঘরটার আর যদি সবকিছু ভুলেও যাই, জানালাটা আজীবন মনে থাকবে। আর একটু পরেই একটা জেট প্লেন যাবে আকাশ চিরে। রোজই যায়। নীলের ওপর সার্জেনের দক্ষতায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা ক্ষত এঁকে দিয়ে।

আর ঠিক তার পরেই ভোরটা ফুরিয়ে গিয়ে হইহই করে সকাল হয়ে যাবে। নরম আলোর বদলে দিকবিদিক ভাসানো চোখ ঝলসানো রোদ্দুর। টাওয়ারের সারি দেওয়া কাঁপাকাঁপা আলোগুলো নিভে যাবে, পাখিরা চুপ করে যাবে। সবথেকে খারাপ যেটা হবে সেটা হচ্ছে আমার ঘড়িটা হঠাৎ পিক-আপ নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করবে। আকাশ জুড়ে কাটাকুটি খেলে আরও শতশত জেট প্লেন যাবে হয়তো, কিন্তু আমার তাদের দিকে তাকিয়ে দেখারও সময় থাকবে না।

   

June 25, 2013

মণির ই-মেল



আমার ফোন আবার হারিয়ে গেছে।

আমি প্রথমটা টের পাইনি। ঘণ্টা ছয়েক পরে মনে হল, অনেকক্ষণ ফোনটা বাজেনি তো। আমার মা তো এতক্ষণ তাঁর একমাত্র সন্তানের সঙ্গে কথা না বলে থাকার লোক নন। তখন ব্যাগ ঝাড়লাম, ড্রয়ার হাঁটকালাম, বিছানা উল্টোলাম। কোত্থাও নেই।

তখন স্কাইপ খুলে কাঁদতে বসলাম।

অর্চিষ্মান বলল, আবার গেছে? বাঃ। দাঁড়াও আমি ফোন করে দেখি।

এই না বলে স্পিড ডায়াল টিপে ফোন কানে ধরে গম্ভীরমুখে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

আমি চোখ মুছে নাক টেনে বললাম, তুমিও যেমন।। আমার ফোন কি আর এতক্ষণে বাজার অবস্থায় আছে? এতক্ষণে তার দোমড়ানো মোচড়ানো সিমকার্ড কোন জার্মান ট্র্যাশবিনে মুখ গুঁজড়ে পড়ে আছে দেখ গে যাও।

আর তক্ষুনি অর্চিষ্মান শাম্মি কাপুরের মত একখানা লাফ দিয়ে বলে উঠল, ইট্‌স্‌ রিংগিং! (সিনেমার নাম বলতে পারলে ফ্যান্টাস্টিশ্‌, না পারলেও ক্ষতি নেই।)

অ্যাঁ! সিরিয়াসলি? আমি বললাম, শিগগিরি স্পিকারে দাও, একটু শুনি!

তারপর স্কাইপের এপারে বসে বসে আমি ওপারে স্পিকার ফোনে আমার হারানো ফোনের রিংটোন শুনতে লাগলাম। ইস্‌, বেচারা ফোনটা না জানি কোথায় অবহেলায় অনাদরে একা একা পড়ে আছে। খুব ছোটবেলার একটা কথা মনে পড়ে গেল। অনেক দিনই এমন হত, মা অফিস থেকে ফিরে দেখতেন সকালে স্নানের পর তিনি যে শাড়িব্লাউজ কেচে ছাদে শুকোতে দিয়ে গিয়েছিলেন সেগুলো ছাদেই পড়ে আছে। নামিয়ে আনার কথা কারও মনে নেই। তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে চোখ গোল গোল করে গালে হাত দিয়ে বলতেন, ইস্‌ আমার কাপড়গুলো অন্ধকার ছাদে একা একা না জানি কত ভয়ই পাচ্ছে। চল্‌ তো সোনা, শিগগিরি ওদের নামিয়ে আনি। অমনি আমি বুক ফুলিয়ে মা’র পেছন পেছন ছাদ থেকে ভয়ার্ত শাড়ি উদ্ধার করতে যেতাম।

ঠিক তেমন করে যদি আমার ফোনটাকেও উদ্ধার করে আনতে পারতাম। সে বেচারাও নির্ঘাত বিদেশবিভুঁয়ে একা পড়ে ভয়ে কেঁপে সারা হচ্ছে।  

রিংটোন বেজে বেজে একসময় থেমে গেল। অর্চিষ্মানের ফোনের ভেতরের সেই অসহ্য মহিলা খ্যানখ্যানে গলায় জানালেন যে যার ফোন ডায়াল করা হয়েছে সে ফোন তুলছে না কাজেই যেন কিছুক্ষণ বাদে আবার ট্রাই করা হয় ইত্যাদি প্রভৃতি।

যেন এই সোজা কথাটা আমাদের না বলে দিলে আমরা বুঝতে পারতাম না। জঘন্য।

অর্চিষ্মান আমার বাড়িতে ফোন করে সব বৃত্তান্ত জানিয়ে দিল আর মা’কে বলে দিল জরুরি কথা থাকলে যেন উনি আমাকে ই-মেল করে দেন। মা’র একটা ই-মেল অ্যাকাউন্ট আছে, মাঝেসাঝে আমার পাঠানো ফোটো দেখতে আর প্রতিবছর আমার জন্মদিনে একটা করে ই-কার্ড পাঠাতে সেটা কাজে লাগে। আমিও মা’কে একটা লম্বা ই-মেল করে দিলাম। মা আমি ভালো আছি, ঠাণ্ডা লাগলে সোয়েটার পরছি, বৃষ্টি হলে ছাতা নিচ্ছি, রোজ সকালে দুধ ডিমসেদ্ধ খাচ্ছি, রোজ বিকেলে ফল খাচ্ছি, রোজ রাতে ভালো করে ঘুমোচ্ছি। তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোর না। ইতি, তোমার সোনা।

দু'ঘণ্টা পরই মা'র উত্তর এসে গেল। স্নেহের সোনা, ফোন হারানোর সংবাদ পেয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লাম। তুমি সময়সুযোগ মত একটা নতুন ফোন নিয়ে নিয়ো। আর অফিসে জিজ্ঞাসা কোর আমাদের দেশের মতো পুলিশে ডায়েরি করতে হবে কি না। মঙ্গলময় ঈশ্বর তোমাকে রক্ষা করুন। ইতি, আশীর্বাদিকা মা।

দেখেছ, ডায়েরি-মায়েরি করার ব্যাপারটা খেয়ালই ছিল না। মা’র এত কথা খেয়াল থাকে কী করে মঙ্গলময় ঈশ্বরই জানেন। পরদিন অফিসে গিয়ে অ্যালফন্‌স্‌কে সব ঘটনা খুলে বলতে অ্যালফন্‌স্‌ বলল এ দেশে ও সব পুলিশি ঝামেলায় যাওয়ার ব্যাপার নেই। ফোন হারিয়েছে তো কী হয়েছে। দোকানে রাশি রাশি ফোন সাজানো রয়েছে। দেখেশুনে বেছে নিলেই হল।

দেখেশুনে বেছে নিলে-এ-এ-ই হল।
(এই সিনেমাটা না বলতে পারলে কিন্তু ক্ষমা নেই।)

লাঞ্চব্রেকে বসে বসে নেটে ফোনের মডেল পছন্দ করছি, এমন সময় অ্যালফন্‌স্‌ এসে দুই হাতে তালি দিয়ে বলল, কুন্তলা, আই হ্যাভ আ ওয়ান্ডারফুল নিউজ ফর ইউ।

আমার ফোন কোলোনের বাসে পড়ে ছিল। বাস কোম্পানির লোক সেটা খুঁজে পেয়ে মাথাটাথা চুলকে শেষে অ্যালফন্‌স্‌কে ফোন করেছে। পরের ঘটনা খুবই সরল। আমার ফোন কোম্পানির জিম্মায় রাখা আছে, রবিবার আমাকে কোলোন গিয়ে সেটা উদ্ধার করে আনতে হবে।

অর্চিষ্মান সব শুনে বলল, কপাল বটে তোমার। তা বটে। আগের দিন রাইখার্ড ক্যাফের মেনুতে একটা আইসক্রিম দেখে মন আনচান করছিল, কিন্তু ততক্ষণে কেক অর্ডার করে দিয়েছি। রবিবার গিয়ে ফোন নিয়ে একেবারে আইসক্রিম খেয়ে ফিরব।

কিন্তু একটা জিনিসের জন্য একটু মনখারাপ লাগছে। মা’র ই-মেল। এই দুদিনেই ই-মেল লেখায় মা অসম্ভব উন্নতি করেছেন। স্নেহাস্পদ, আশীর্বাদক ইত্যাদি উধাও হয়েছে, ঈশ্বরও তাঁর মঙ্গলময় খেতাব ঘুচিয়েছেন। আমি মানসচক্ষে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কম্পিউটারের সামনে বসে মা’র টানটান কাঁধ ক্রমশ নরম হচ্ছে, কোঁচকান ভুরু ধীরে ধীরে মসৃণ হচ্ছে, ঠোঁটে মৃদু মৃদু হাসি ফুটছে। গতকাল আমার একটা পচা রসিকতা পড়ে হাসি পাওয়া বোঝাতে মা "হাহাহাহা" টাইপ করেছেন পর্যন্ত।

আমার ফোন ফেরৎ এলে মা আবার পুনর্মূষিক ভব হবেন, ই-মেলমুখো হবেন না। তাই ভাবছি আর ক’দিন ফোন ফেরৎ পাওয়ার খবরটা চেপে থাকি। অন্তত যদ্দিন না মা স্মাইলি দিতে শিখে যাচ্ছেন। আপনাদের কী মত?

June 23, 2013

কোলোন



আমাদের দ্বিতীয় সাপ্তাহিক এক্সকার্শনের গন্তব্য ছিল কোলোন। জার্মানির চতুর্থ বৃহত্তম শহর। বন থেকে মোটে আধঘণ্টার ট্রেনের রাস্তা। শুক্রবার অ্যালফন্‌স্‌ সবাইকে টিকিট দিয়ে দিয়েছিল। দুপুর দেড়টার ট্রেন। আমরা ঠিক করলাম একটা নাগাদ সবাই ইনফো পয়েন্টের সামনে জড়ো হব।


সকলে এসে যাওয়ার পর কমলা রঙের বাক্সে টিকিট পাঞ্চ করে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। কাঁটায় কাঁটায় দেড়টার সময় ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। উঠে দেখি বেশ ভিড়। আমি আমার লোকালট্রেনের বিদ্যে কাজে লাগিয়ে গোড়াতেই একটা সিট বাগিয়ে আরাম করে বসে পড়লাম। তবে জানালার ধার পেলাম না এই যা দুঃখ। জানালার পাশে বসে একটা ছেলে সারারাস্তা ম্যাকনাগেট্‌স্‌ খেতে খেতে চলল।

কোলোনেই অ্যালফন্‌সের বাড়ি। কথাই ছিল অ্যালফন্‌স্‌ কোলোন সেন্ট্রাল স্টেশনে দুপুর দুটো নাগাদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। সেন্ট্রাল স্টেশনের কোথায়? ঠিক ধরেছেন, ইনফো পয়েন্টের সামনে।

আপনাদের মনে নেই হয়ত, কিন্তু এই কোলোনেই আমি দিন চোদ্দ আগে প্রথম এসে নেমেছিলাম। নিয়ম মেনে যাত্রার শুরুতেই আমি নিজের একটা ফোটো তুলিয়ে নিলাম। দেখুন তো কেমন দেখাচ্ছে।


তারপর একটা বাসে চেপে শুরু হল আমাদের কোলোন ভ্রমণ। দেখা গেল যাত্রীর তুলনায় বাস বেঢপ রকমের বড়, কাজেই জানালার ধার পাওয়া নিয়ে কোনও চিন্তা রইল না।


কোলোন শহরেরও যাত্রা শুরু প্রায় বনের সঙ্গে সঙ্গেই। যিশুখ্রিস্টের জন্মের সামান্য আগে, রোমানদেরই হাতে। রাইন নদের বাঁধারে ছোট্ট সেনাছাউনি ঘিরে। শুনলাম কোলোন শুরু থেকেই তীর্থস্থান হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিল। বহুদিন পর্যন্ত কোলোন ক্যাথিড্র্যাল ছিল ইউরোপের বৃহত্তম চার্চ। এখনও এখানে প্রায় আড়াইশোটি চার্চের এক মস্ত সংঘ আছে।


আমাদের বাস এঁকেবেঁকে চলল শহরের রাস্তা ধরে। ছবির মত সাজানো শহর। শান্ত, ফাঁকা, রাস্তার দুপাশে গাছের ছায়াঢাকা। মাঝে মাঝে খেলার মাঠে বাচ্চাদের ছোটাছুটি। গাছপালার আড়ালে টুকটাক স্থাপত্যও চোখে পড়ল। গোটা রাস্তা জুড়েই বাসের ভেতর পুরোদমে জার্মান প্র্যাকটিস চলছিল। ওয়াস ইস্‌ট্‌ ডাস্‌? ডাস্‌ ইস্‌ট্‌ আইন্‌ হাউস্‌। ওহহহহ, ডাংকে শোন্‌, ডাংকে শোন্‌।


আদিতে কোলোন ছিল রাইনের ধারে এক কিলোমিটার বাই এক কিলোমিটারের একটা বিন্দু। লোক যত বাড়ল, শহরও ছড়াল। কিন্তু জার্মান শহর কি না, ছড়ালও একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। জলের এধারে একটা অর্ধবৃত্ত তৈরি হল, ওধারে আরেকটা। সে রকম একটা অর্ধবৃত্তের পরিধি বরাবর চলতে চলতে ব্রিজ পেরিয়ে আমরা নদীর ধারের একটা জায়গায় এসে নামলাম।


জায়গাটা অনেকটা চন্দননগরের স্ট্র্যান্ডের মত। লোকজন চওড়া পাঁচিলের ওপর শুয়ে বসে আছে, প্রেমিকপ্রেমিকারা একে অপরে মগ্ন হয়ে আছে, বাচ্চারা এর মধ্যেই সিঁড়ির রেলিং-এর একটা অংশকে টেম্পোর‍্যারি স্লিপ বানিয়ে গড়গড়িয়ে সেটা দিয়ে নামছে, আছাড় খাচ্ছে, খেয়ে হাঁটু ঝেড়ে উঠে পড়ে আবার স্লিপ খেতে দৌড়চ্ছে। 

আধঘণ্টা মত নদীর ধারে ঘোরাঘুরি করার পর আমরা আবার বাসে চেপে চললাম। আবার ব্রিজ পেরিয়ে অর্ধবৃত্ত ধরে চলা। যেদিকেই যতদূরেই চল না কেন, ক্যাথিড্র্যালের পাথুরে চূড়ার দৃষ্টির বাইরে যেতে পারবে না।


ভালো কথা, অনেকদিন আপনাদের কুইজ ধরা হয়নি। বলুন তো এই ছবিটা কীসের?


পারছেন না? হিন্ট চাই? সেকি, এত সোজা প্রশ্নেরও? ছো ছো। আচ্ছা দাঁড়ান হিন্ট দিচ্ছি।

উৎস গুগল  ইমেজেস

ইয়েস সার, ওপরের বাড়িটা হচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত সেন্টের কারখানা। ও-ডা-কোহ্‌লোন। আমরা বাঙালিরা যাকে ওডিকোলন বলি। আর ফোর সেভেন ওয়ান ওয়ান হল সব ওডিকোলনের সেরা ওডিকোলন। কিন্তু এর নাম ফোর সেভেন ওয়ান ওয়ান কী করে হল সেটা জানতে গেলে আমাদের একটু ঝট্‌ করে ইতিহাসে ঘুরে আসতে হবে। বেশি দূর না, এই নেপোলিয়ানের আমল পর্যন্ত গেলেই হবে। নেপোলিয়নের আগে পর্যন্ত এ তল্লাটে নাকি বাড়িঘরদোরের নম্বর ছিল না। নেপোলিয়ন সিস্টেম্যাটিক মানুষ ছিলেন, এমন অরাজকতা তাঁর সহ্য হল না। তাই তিনি নির্দেশ দিয়ে সেনা পাঠালেন যেন অবিলম্বে সব বিল্ডিং-এর নম্বর বসানোর ব্যবস্থা হয়।

নেপোলিয়নের নির্দেশ, কাজেই কেউ ট্যাঁফোটি না করে ঝট্‌পট্‌ নম্বর বসাতে লেগে গেল। বসাতে বসাতে আমাদের এই বাড়িটির ভাগে নম্বর উঠল ফিয়ের্‌ সিবেন্‌ আইন্‌ আইন্‌ অর্থাৎ কি না ফোর সেভেন ওয়ান ওয়ান। তারপর নেপোলিয়ন সব হারিয়ে সেন্ট হেলেনায় নির্বাসিত হলেন, রাইন দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেল, কোলোনের ওপর কত বোমা পড়ল, কত বাড়ি গুঁড়োল, নতুন করে কত বাড়ি গজাল, সে সব বাড়ির কতবার নতুন নতুন নম্বরীকরণ হল---কিন্তু এই জায়গার এই বাড়িটার নম্বর রয়ে গেল সেই ফোর সেভেন ওয়ান ওয়ান। আর এই বাড়িটা থেকে তৈরি হওয়া যে সুগন্ধী বিশ্বজয় করল তার নামও।


ওডিকোলন কথার অর্থ হল ওয়াটার অফ কোলোন। এককালে নাকি এই জল ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হত। লোকে গায়ে মাখতটাখত। গাইড বললেন তিনি শুনেছেন “সাম্‌ পিপ্‌ল্‌ ড্র্যাংক ইট অ্যান্ড সারভাইভ্‌ড্‌।” কিন্তু দোহাই আপনাদের, পরীক্ষা করে দেখার জন্য এক্ষুনি ছুটে গিয়ে যে যার ওডিকোলনের বোতলের ছিপি খুলে গলায় ঢালবেন না।

এরপর এল আমাদের শেষ স্টপ, ক্যাথিড্র্যাল। বানানো শুরু হয়েছিল বারোশো আটচল্লিশে, শেষ হয়েছে এই সেদিন, আঠেরোশো আশিতে। আমার জন্মের মোটে একশো বছর আগে। হাঁটতে হাঁটতে অ্যালফন্‌সের মুখে ক্যাথিড্র্যালের নানারকম মহিমার কথা শুনলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমা পড়ে যখন গোটা শহরটা ধুলো হয়ে গেছে তখনও নাকি ক্যাথিড্র্যালের গায়ে টুকটাক ফুটো হওয়া ছাড়া আর কোনও বড় ক্ষতি হয়নি।


আগেই শুনেছিলাম কোলোনে সেদিন কী সব বিক্ষোভটিক্ষোভ হবে। ব্রাজিল, তুর্কি আর ইজিপ্টের লোকজন তাদের নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ দুরবস্থার প্রতিবাদে কোলোন সেন্ট্রাল স্টেশনে জড়ো হয়েছিল। আমরা বিক্ষোভে নামিনি কিন্তু ছবি তুলে এনেছি। এই দেখুন।


ব্যস্‌ কোলোন ঘোরা শেষ। আপনারা নিশ্চয় ভাবছেন সারাদিন উপোস দিয়ে এ কেমন ঘোরাঘুরি। ভাববেন না, ক্যাথিড্র্যালের কোলে ছবির মত ক্যাফে রাইখার্ডে বসে আমরা কফি আর কেক দিয়ে পেটপুজো করে এসেছি। আমি নিয়েছিলাম সিটোহ্‌হ্‌নে (Zitrone = lemon)  টি আর চিজকেক উইথ ক্রিম। বড় ভালো খেতে। চামচে করে কেটে মুখে পুরলে আপনা থেকে চোখ বুজে আসে।


কিন্তু রাইখার্ডের বেস্ট ব্যাপারটা কেক নয়। কেকটেক খাওয়া হচ্ছে, এমন সময় মেক্সিকোর টেরেসা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, “ইউ মাস্‌ত্‌ গো তু দা বাথরুম, মাস্‌ত্‌ মাস্‌ত্‌ মাস্‌ত্‌।” আমি বলার চেষ্টা করলাম যে আমার তখন বাথরুম যাওয়ার দরকার নেই, মেয়ে কোনও কথা শুনবেই না। অগত্যা চিজকেক ফেলে রেখে বাথরুম যেতে হল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখি বেসমেন্টে ঝাড়লণ্ঠন ঝোলানো ঝিংচ্যাক বাথরুম। ভীষণ সুন্দরী মেমসাহেবেরা পাথরের মত মুখ করে হাঁটাহুটি করছেন। আমি ভয়ে ভয়ে তাঁদের পাশ কাটিয়ে একেবারে কোণের স্টলটায় ঢুকতে গিয়ে একেবারে থ।

ইকি, এ তো একেবারে স্বচ্ছ কাঁচের দরজা! ভেতরে সবকিছু একেবারে হাই রেসলিউশন ছবির মত পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

ইউরোপ লিব্যারাল শুনেছিলাম, তাই বলে এতটা লিব্যারাল সিরিয়াসলি ভাবিনি। টেরেসা এই বাথরুম ব্যবহার করে গেল নাকি? কী সাহসী মহিলা বাস্‌ রে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব ভাবছি আর দেখছি এপাশে ওপাশে মেমসাহেবরা গট্‌গট্‌ করে বাথরুমে ঢুকছেন বেরোচ্ছেন। আমার কী রকম একটা সন্দেহ হল। দেখাই যাক না ভাব করে স্টলের ভেতরে ঢুকে কালো রঙের নব ঘুরিয়ে দরজা লক করতেই, ভু-উ-উ-শ্‌!, দরজা নিমেশে ঝাপসা। কেবল আমার ছায়া ছাড়া আর কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।

বাড়ি ফিরে স্কাইপে অর্চিষ্মানকে পাকড়াও করে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বাথরুমের দরজার গল্প শোনালাম। তারপর ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কেমন বুঝলে?”

অর্চিষ্মান মুখ ভেচকে বলল, “বিতিকিচ্ছিরি। যত্তসব গিমিক। খারাপ হয়ে গেলে বুঝবে মজা। বাথরুম যাওয়াই বন্ধ।”

উৎসাহে এই ভাবে ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিলে কেমন রাগটা ধরে বলুন? আমি হার না মেনে বললাম, “এ সব জার্মান টেকনোলজি বুঝলে, অত সহজে খারাপ হয় না।”

বললাম বটে, কিন্তু কথাটা অর্চিষ্মান ভুল কিছু বলেনি। আমার বাড়িতে বাথরুম বানানোর সময় আমি দরজা দেওয়া বাথরুমই বানাবো। যেটার ভেতর ঢুকে পরিষ্কার ছিটকিনি তুলে দেওয়া যাবে।

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.