July 31, 2013

ওপেন কিচেন




মার্লিন গ্রুপ উত্তরপাড়ায় ফ্ল্যাটবাড়ি বানাচ্ছে। গঙ্গার ভিউ, জি টি রোডের সান্নিধ্য, শনিমঙ্গলবার তিন নম্বর বাসে চেপে পনেরো মিনিটের মধ্যে টুক করে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে পুজো দিয়ে আসার সুবিধে---সব মিলিয়ে দুর্দান্ত ব্যাপার। পাড়ার যত অল্পবয়সী দম্পতি ছুটেছে ফ্ল্যাট বুক করতে। তাদেরই একজোড়ার সঙ্গে বাজারে দেখা হয়ে গিয়েছিল। এ কথা সে কথা ঘুরে আলোচনা ফ্ল্যাটের দিকে ঘুরল। বিয়ে, বাচ্চা আর বাড়ি, এই তিন ব-এর একটিও যদি কারও জীবনে নতুন আসে বা আসার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তার সঙ্গে অন্য কোনও বিষয়ে পাঁচমিনিটের বেশি আলোচনা চালানো কঠিন। ইন ফ্যাক্ট, অসম্ভব।

আমি আর মা খুব উৎসাহ দেখিয়ে ফ্ল্যাটের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। রিষড়া প্ল্যাটফর্মে যে প্রকাণ্ড বিজ্ঞাপনগুলো পড়েছে ব্যাপারটা সত্যিই সে রকম সুইৎজারল্যান্ডের মতো দেখতে হল কি না। সুইমিং পুলের কাজ কদ্দুর এগোল। দম্পতি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বললেন, আরে কাকিমা রাখো তোমার সুইমিং পুল। ওপেন কিচেনটা যা বানিয়েছে না, দেখার মতো।

মিনিট দশেক ধরে ওপেন কিচেনের অষ্টোত্তরশতনাম শুনে তারপর ছুটি মিলল। মামেয়ে চার হাতে পলিথিনের ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে রিকশায় উঠে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। শনিমন্দিরের সামনে ভক্তদের ভিড় পেরিয়ে রিকশা যেই রেললাইনের পাশের টানা নির্জন রাস্তাটায় পড়ল, দোকান আর সাইনবোর্ডের চোখধাঁধানো লালনীল চিৎকার মিলিয়ে গিয়ে যেই না মাথার ওপর আকাশভরা তারার নরম আলো জ্বলে উঠল, মা জিজ্ঞাসা করলেন,

ওপেন কিচেন কী রে সোনা?

প্রশ্নটার জন্য আমি তৈরিই ছিলাম। ওপেন কিচেন মুভমেন্ট নিয়ে মা’কে একটা ছোটখাটো লেকচার দিলাম। বললাম, আমাদের বাড়িতে যেমন হয়, অতিথিরা সামনের ঘরে বাড়ির বাকিদের সঙ্গে গুলতানি মারেন আর তুমি রান্নাঘরে মীরামাসির সঙ্গে লুচিতরকারির ব্যবস্থা করতে করতে মাঝে মাঝে ছুটে ছুটে এসে হাসিঠাট্টায় অংশগ্রহণ কর, করেই আবার রান্নাঘরের দিকে হাঁটা লাগাও, সেজকাকু চেঁচায় “আঃ বৌদি অত রাঁধতে হবে না, এস তো গল্প করি” আর তুমি “এই তো এক্ষুনি আসছি...” বলে আবার দৌড়ে এসে একটুখানি মুখ দেখিয়ে যাও---সে জমানা আর নেই। এখন সবাই রান্নাঘরে বসেই গল্প করে। ঘরের মাঝখানে বিস্তৃত গ্র্যানাইটের আইল্যান্ড আর আইল্যান্ডের ওপর চিজডিপ আর ক্র্যাকারের ডিজাইনার বাটি। দেদার খাও আর আড্ডা মারো।  

মা শুনে খুব খুশি হলেন। অতিথিসৎকারের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য এতদিনে ঘুচল তবে।

কিন্তু যাই বলিস সোনা, একটা বিপদ আছে।

কী বিপদ?

মানে রান্নাঘরটা তো ঠিক দেখানোর মতো জিনিস নয়। হলুদের দাগ লাগা মশলার কৌটো, দেওয়ালে তেলের ছিটে, একজস্টের কালি---এইসবের মধ্যে অতিথিদের বসিয়ে রাখাটা কি ভালো দেখাবে?

আহা, গোড়াতেই ভুল করছ। তেলকালি থাকবে কেন রান্নাঘরে? এমন রান্নাই করবে যাতে তেলঝোল বেরোবে না। ডিপ ফ্রাইং প্রাণপণে অ্যাভয়েড করবে। এক গামলা তেলে ছ্যাঁকছোঁক করে বকফুল ভাজবে না। ডিস্‌গাস্টিং। নিতান্ত দরকার পড়লে আভেন-বেক্‌ড্‌ বকফুল সার্ভ করবে। রান্নাঘর দেখে যদি বোঝা যায় যে এখানে দু’বেলা রান্না হয়, তাহলে হোমমেকিং-এর পরীক্ষায় তুমি ডাহা ফেল।

আমার মা বরাবরের ভালো ছাত্রী, চট্‌ করে ব্যাপারটা বুঝে ফেললেন। তারপর একটু থেমে যোগ করলেন, তোদের বাড়িতে একটা ওপেন কিচেন রাখতে পারিস কিন্তু সোনা।

আচ্ছা আচ্ছা রাখব, বলে আমি চোখ ঘোরালাম। অন্ধকারে মা দেখতে পেলেন না। কিচেনে থাকব কতক্ষণ যে ওপেন ক্লোস্‌ড্‌ নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে? তাছাড়া নিজের কথা বলতে পারি, লোকের চোখের সামনে রান্না করতে আমার ভীষণ খারাপ লাগে। আমি রান্না করছি আর সবাই এদিকওদিক থেকে ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, রাঁধতে রাঁধতে কড়াই থেকে আলুভাজা চুরি করে খাচ্ছি কি না সে সব পর্যবেক্ষণ করছে---এর থেকে বিশ্রী ব্যাপার পৃথিবীতে কমই আছে।

তা বলে কি আমার ওপেন কিচেন ভালো লাগে না? ভীষণ ভালো লাগে। আমি ওপেন কিচেনের রীতিমতো ফ্যান। কিন্তু সে আরেক রকমের ওপেন কিচেন। ফ্ল্যাটবাড়ির চারদেওয়ালের ভেতরের সুসজ্জিত ওপেন কিচেনের সঙ্গে সে সব কিচেনের কোনও সম্পর্ক নেই।

তাছাড়া এই ওপেন কিচেন এমন কিছু আধুনিক ব্যাপারও নয়। আমার ছোটবেলাতে, এবং আমার ধারণা আমার ছোটবেলার অনেক অনেক আগে থেকেই এই কিচেনের প্রচলন ছিল। আমার জীবনের প্রথম যে ওপেন কিচেনটা আমি দেখেছিলাম আর দেখামাত্র প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম, সেটা ছিল উত্তরপাড়া আপ প্ল্যাটফর্মে। দোকানের মেনু খুবই সামান্য। ঝালমুড়ি। কিন্তু তাই বলে কিচেন সামান্য নয়। ছেলেটার চেহারাটা আমার এখনও আবছা মনে আছে। ঝালমুড়িওয়ালাদের যেমন হয়। রোগাপ্যাংলা চেহারা। যত না ওয়ার্কআউটের কল্যাণে, প্রোটিন-বেস্‌ড্‌ ডায়েটের অভাবে তার থেকে বেশি। শেডের তলায় একটা ছোট টেবিলের ওপর কিচেন। পরিষ্কার ঝকঝক করছে। মার্লিন গ্রুপের মডিউলার কিচেনের কান মুলে দেওয়ার মতো পরিষ্কার। টেবিলের একদিকে সারি দেওয়া স্টিলের কৌটো। সেদ্ধ করা আলুর বাইট-সাইজ্‌ড্‌ টুকরোর পাশে বেগুনি রঙের আভামেশানো পেঁয়াজ কুচির পাশে অফ-হোয়াইট বীজের ছিটে দেওয়া কাঁচালংকার সবুজ উজ্জ্বলতা। ফুড ফোটোগ্র্যাফারের স্বপ্নরাজ্য। মনুপিসি আমাকে অবশ্য বেশি ঝালমুড়ি কিনে দিত না, কিন্তু তা বলে দেখতে তো বাধা নেই। আমি লালরঙের ওয়াটার বটল্‌ গলায় ঝুলিয়ে টেবিলের পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। যতক্ষণ ট্রেন না আসে। কাস্টমার না থাকলে ছেলেটা কাটাকুটির কাজ এগিয়ে রাখত। সবুজ লংকার ওপর অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ছেলেটার ছুরি চলত। ছুরির হ্যান্ডেল নেই, ব্লেডে জং ধরে গেছে। ছেলেটা লংকা কুচোত, পেঁয়াজ কুচোত, খদ্দের এসে গেলে ছুরি সরিয়ে রেখে একটা হ্যান্ডেলহীন স্টিলের ক্যানের ভেতর মুঠো মেপে মুড়ি, আর চামচে করে আলু, পেঁয়াজ, কাঁচালংকা, ভেজা ছোলা, চানাচুর, ঝুরিভাজা, নুনমশলা ইত্যাদি দিয়ে, কৌটোর সারির পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সর্ষের তেলের শিশিটার ঘাড় ধরে মুড়ির ওপর উপুড় করে দিত। সবশেষে একটা বড় চামচ দিয়ে পুরো ব্যাপারটা ঘাঁটা। দুমদাম ঘাঁটা নয়, তারও টেকনিক আছে। বাঁ হাতে স্টিলের ক্যান ঘুরছে, আর ডানহাতে চামচ। নির্দিষ্ট ছন্দে। কোনও হাত বেশি জোরে ঘুরছে না, কোনও হাত থেমে যাচ্ছে না।

সেই আমার ওপেন কিচেনের প্রতি মুগ্ধতার শুরু। দিন যত কেটেছে, মুগ্ধতা বেড়েছে বই কমেনি। মা যতক্ষণ ঘোষ মেডিক্যালে দাঁড়িয়ে ঠাকুমার ওষুধ কিনেছেন, আমি গুটি গুটি এসে বাপির এগরোলের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। গনগনে স্টোভের মাথায় বসানো মসৃণ কাস্ট আয়রন তাওয়ার ওপর বাপির হাতে ধরা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল প্যাঁচানো হ্যান্ডেলওয়ালা খুন্তির নাচের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকেছি। বাড়ির মায়ের হাতের অত যত্নের চাউমিন কী রকম দলা পাকিয়ে যায়, আর এখানে এই খোলা ড্রেনের ওপর বাপির কাছে তারা কেমন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছে, ভাবা যায়? মৌলালির মোড়ে কচুরির দোকানে কোনওমতে দু’কামড় কচুরি খেয়ে মায়ের বকুনি অগ্রাহ্য করে দৌড়ে দোকানের পেছন দিকে এসে দাঁড়িয়েছি। ওখানে একজন দাদু বসে বসে শালপাতার ঠোঙা বানাচ্ছেন। কী গতি, কী ছন্দ, কী অনায়াস দক্ষতা। দেখতে দেখতে ঘোর লেগে যেত। একদিন মনে আছে মাবাবা কচুরির দাম মিটিয়ে এসে আমাকে ডাকছেন, এমন সময় দাদু মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে অল্প একটু মুচকি হেসে হাতের সদ্য বানানো ঠোঙাটা আমাকে দিয়ে দিলেন। এত আনন্দের মুহূর্ত কি এ অর্থহীন জীবনে বার বার আসে?

আগরওয়াল সুইটসের সামনে জিলিপির কড়াইয়ের কথা ভাবুন, নামহীন সাউথইন্ডিয়ান-চাইনিজ-মোগলাই মাল্টিকুইজিনের দোকানের দোসার তাওয়ার কথা ভাবুন। ঘর্মাক্ত গায়ে একজন বসে একটা তেল মাখানো বাটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দোসা বানাচ্ছে। কম্পাসকে লজ্জা দেওয়ার মতো গোল দোসা। কাটোয়ারিয়া সরাইয়ে গাছের তলায় তিওয়ারির গাড়ির ডিমপাঁউরুটির কথা মনে পড়ে? অমন শরতের মেঘের মতো হালকা অমলেট যদি পৃথিবীর কোনও মহার্ঘ ওপেন কিচেনে কেউ রিক্রিয়েট করতে পারেন, তাহলে...

এখানে আমি শুরুতে কিছুদিন বাড়ি থেকে লাঞ্চ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু অচিরেই সদিচ্ছায় টান পড়ল। আমার বন্ধুরা কেউ কেউ পোস্টটাওয়ারের ক্যান্টিনে যায়, কেউ ডয়েশ ভেলের ক্যান্টিনে। সেগুলোও কাছেই, কিন্তু সবথেকে কাছে হল ওয়ার্ল্ড কাফে বলে একটা দোকান। আমি সেখান থেকে স্যান্ডউইচ প্যাক করে অফিসে ফিরে এসে আরাম করে ইউটিউব দেখতে দেখতে খাই। সপ্তাহে দু-তিন বার দোকানের বাইরে গ্রিল-স্ট্যান্ড বসে। সেদিন কেউ দোকানের ভেতরে বসে খায় না। কোনওমতে কাউন্টার থেকে কুপন জোগাড় করে তড়িঘড়ি গ্রিল-স্ট্যান্ডের সামনে ভিড় জমায়। সেখানে একজন ভীষণ মোটা, ভীষণ গম্ভীর ভদ্রলোক একা হাতে গোটা দোকান সামলান। ভদ্রলোকের পরনে সাদা অ্যাপ্রন, মাথায় হাতখানেক লম্বা সাদা কুঁচি দেওয়া টুপি। গ্লাভস্‌ পরা হাতে লম্বা হিট-প্রুফ টংস্‌ দিয়ে কালো কুচকুচে গ্রিলের ওপর তিনি মাংস উল্টেপাল্টে সেঁকতে থাকেন। নরম, তুলতুলে, মশলায় জারানো মাংস। মাঝে মাঝে টুপটাপ করে মশলা গ্রিলের ওপর পড়লে সেখান দিয়ে আগুনের ফুলকি ফোঁস করে ওঠে। নিঃশব্দ ভিড় সম্মোহিতের মতো সে আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। গোটা পাড়াটা পোড়ামাংসের সুঘ্রাণে ম’ ম’ করে। গ্রিলের ওপর অর্ডার মতো মাংস সাজিয়ে উল্টোদিকে ফিরে ভদ্রলোক সাদা প্লেটে স্যালাড সাজান, রান্নাঘরের আভেন থেকে সদ্য বেরোনো, উষ্ণ পাঁউরুটি রাখেন। এবার গ্রিল থেকে রান্না হওয়া মাংস তুলে এনে জুড়ে দিলেই অর্ডার কমপ্লিট।

এই দোকানটা আপাতত আমার প্রিয়তম ওপেন কিচেন। আপনার ফেভারিট ওপেন কিচেনের গল্প আমাকে বলুন, শুনি।

July 30, 2013

পপাত চ



পায়ের নিচে ঠক্‌ করে একটা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম শরীরের ভরকেন্দ্র ডিস্‌লোকেটেড হয়ে গেছে। বিপজ্জনক ভাবে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছি। পড়ছি বলা চলে। সিটি সেন্টারের পাথর বাঁধানো রাস্তার সঙ্গে সাধারণত আমার চোখের দূরত্ব থাকে ফুট পাঁচেক, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সে দূরত্ব কমে আসছে। চারফুট, তিনফুট, দু’ফুট। আত্মরক্ষার নির্ভুল প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় আমার হাতের মুঠো খুলে গেছে। আগে বাঁচলে তবে তো ব্যাগেটের নাম। দোলের দিন কেউ রং দিতে এলে যে ভঙ্গিতে না বলতে হয়, সেই ভঙ্গিতে আমার দুই হাতই এখন শরীরের সামনে। কিন্তু না বললেই বা শুনছে কে।

সেকেন্ডের মধ্যে পারপেন্ডিকুলার অবস্থা থেকে যখন শরীরটা রাস্তার সঙ্গে মিশে গেল, চশমাটা নাক থেকে ছিটকে গেল, পার্সের খোলা জিপের ভেতর থেকে খুচরো পয়সা এদিকসেদিক ঠুংঠাং গড়িয়ে গেল, তখন যুক্তি মানলে আমার ব্যথাবেদনার কথাটাই প্রথমে মাথায় উদয় হওয়ার কথা। কিন্তু মানুষের মন, কবেই বা আর যুক্তি মেনে চলেছে। সব ব্যথা ছাপিয়ে প্রথমেই আমার যেটা মনে এল সেটা হচ্ছে, হে ভগবান, সবাই আমাকে দেখছে। দেখছে আর হেসে খুন হচ্ছে।

মনে হওয়ার কারণ আছে। কাউকে পড়ে যেতে দেখলে আমি নিজে একসময় হাসি চাপতে পারতাম না। এখনও পুরোটা পারি না, তবে আগের থেকে অনেক বেশি পারি। অট্টহাসির জায়গায় মুচকি হেসে ক্ষান্ত দিই। নাক মোলার ছুতোয় হাসি আড়াল করি। অফ কোর্স, পড়ে গিয়ে কারও মাথা ফেটে গেছে, ফিন্‌কি দিয়ে রক্ত ছুটেছে, চারদিক থেকে ধর্‌ ধর্‌ তোল্‌ তোল্‌ জল আন্‌ ডাক্তার ডাক---এইসব পরিস্থিতিতে আমার মোটেই হাসি পায় না। কিন্তু একজন সুস্থসবল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ চলতে চলতে বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ শুকনো ডাঙায় ধপাস্‌ করে ভূমিশয্যা নিলে, হাসির আমি কোনও দোষ দেখি না। যারা হাসে না তারাই পাগল।

কিন্তু লোকে দেখে। বিশেষ করে যিনি পড়েছেন, তিনি। ক্লাস ফাইভ নাগাদ হবে, স্কুল থেকে ফিরছিলাম। ট্রেনে মাঝারি ভিড় ছিল। তার মধ্যে গেটের ঠিক মধ্যিখানে এক লেবুওয়ালা তার প্রকাণ্ড লেবুর ঝুড়ি রেখে এদিকসেদিক “দিদি লেবু নিয়ে যান, দশ টাকায় পাঁচটা, চিনির মতো মিষ্টি, না নিলে পস্তাবেন...” এই সব করে বেড়াচ্ছিল। ঝুড়িভর্তি এই বড় বড় নাগপুরী লেবু। আমরা সবাই ঝুড়ি বাঁচিয়ে কোনওমতে একপায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ট্রেন কোন্নগরে ঢুকব ঢুকব করছিল। এমন সময় লাইনের ওপর গরুটরু এসে পড়েছিল নির্ঘাত, ড্রাইভার মোক্ষম ব্রেক কষলেন। জাড্যের তাড়নায় কামরাশুদ্ধু লোক পাঁচহাত করে এগিয়ে গিয়ে হ্যান্ডেল, এরওর শাড়ির আঁচল, বিনুনির গোছা ইত্যাদি ধরে কোনওমতে সামলাল। একজন মোটামতো ভদ্রমহিলা সামলাতে পারলেন না। টাল খেয়ে বসে পড়লেন, ঠিক কমলালেবুর ঝুড়ির মধ্যিখানে।

আমি এতেও হাসতাম না কিন্তু গোলমাল বাধাল লেবুওয়ালা। কামরার ওই প্রান্ত থেকে পুরো ঘটনাটা দেখে তার মুখের ভাব যে রকম হল, তাতে আর হাসি চেপে রাখা গেল না। লেবুর ঝুড়ির ভেতর থেকে ভদ্রমহিলা দু’হাত আকাশে তুলে হ্যাঁচকা দিয়ে দিয়ে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছেন, আশেপাশের কিছু লোক ফাঁকা সমবেদনা দেখিয়ে “আহা আহা কী হল, লাগল নাকি” ইত্যাদি বলছে, আর দূর থেকে লেবুওয়ালা “গেল গেল” চিৎকার করে দৌড়ে আসছে, এই সব দেখে সোমা দাসের গলা জড়িয়ে হাসতে হাসতে আমার পেট ফাটার জোগাড় হল। ভদ্রমহিলা অবশেষে ঝুড়ির ফাঁদ থেকে মুক্তি পেলেন। লেবুওয়ালা হায় কী হল বলে ঝুড়িভর্তি লেবুর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল, আর ভদ্রমহিলা ভাঁটার মতো চোখ করে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।

তারপর ঝাড়া তিন মিনিট ধরে আমাকে তিনি যে বক্তৃতাটা দিলেন সেটার মর্মার্থ হল যে এসব ছেলেপুলে বড় হলে একএকটা চেঙ্গিজ খানে পরিণত হবে। একটু মায়ামমতা নেই, ভদ্রতাসভ্যতার কথা তো ছেড়েই দিলাম, মানুষকে পড়ে যেতে দেখে কোথায় টেনে তুলবে তা না হ্যাহ্যা করে হাসছে।

আমি এখনও মনে করি ভদ্রমহিলা আমার প্রতি অন্যায্য রাগ করেছিলেন। আমি যদি ওঁর জায়গায় থাকতাম আর উনি আমার জায়গায়, তাহলে কেমন না হেসে থাকতে পারেন দেখতাম।

আপনার আছাড় খাওয়ার প্রবণতা কী রকম? আমার অত্যন্ত বাড়াবাড়ি রকমের বেশি। আমি শুধু পথ চলতে গিয়ে ধুপধাপ পড়িই না, ভুলভাল জায়গায় পড়ে যাওয়ার অলৌকিক ক্ষমতা আছে আমার। রাজধানীর তিনতলার বার্থ থেকে পড়ে যাওয়ার গল্পটা তো আগেই বলেছি। তাছাড়াও বিস্তর উদাহরণ আছে। টিউশন থেকে ফেরার পথে সাইকেলের হ্যান্ডেল হঠাৎ রহস্যজনকভাবে ঘুরে গিয়ে ঘাড় মটকে পড়বি তো পড় ঠিক সেই মোড়ের মাথাতেই পড়ত, যেখানে চারটি ফাজিল ছোকরা বসে গুলতানি মারছে। সাইকেলের ওপরে আমি বসে থাকতাম, কাজেই আমারও রাস্তায় গড়াগড়ি না খেয়ে উপায় থাকত না। সবথেকে খারাপ ব্যাপার যেটা হত, কাকুর বয়সী ছেলেগুলো দৌড়ে এসে ভয়ানক বিনয়ী গলায়, “দিদি, খুব বেশি লেগেছে কী?” ইত্যাদি পিত্তি-জ্বালানো প্রশ্ন করত।

কাজেই সিটি সেন্টারের বেকারির দোকানের পাপোশে হোঁচট খেয়ে যখন ভূপতিত হলাম তখন আমার ব্যথার থেকেও লজ্জা হল একশোগুণ বেশি। দোকানের এক কর্মচারী বেরিয়ে এসে গড়িয়ে যাওয়া কয়েনগুলো কুড়িয়ে এনে দিলেন, আর একজন সহৃদয় ভদ্রমহিলা লাইনে আমার ঠিক আগে দাঁড়িয়েই পাঁউরুটি কিনছিলেন, আহা আহা করে ছুটে এসে আমাকে ধরে তুললেন। ধন্যবাদ-টন্যবাদ দিয়ে কোনওমতে অকুস্থল থেকে পালালাম। বাড়ির কাছে এসে সুপারমার্কেটে ঢুকে বাঁধাকপি কিনছি, দেখি এক ভদ্রলোক একবার আমার দিকে তাকিয়েই দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলেন। ইস্‌, নির্ঘাত সিটি সেন্টারে ছিল। আমাকে পড়ে যেতে দেখেছে। জঘন্য।

বাড়িতে এসে পত্রপাঠ কলকাতা দিল্লি বম্বেতে ফোন করে জানিয়ে দিলাম যে আমি পড়ে গেছি। না না, চিন্তার কিছু নেই। ওই যেমন হয়---সামান্য ব্যথা, হাঁটুতে একটি আধুলি সাইজের বেগুনিরঙের কালশিটে, আর দুই হাতের তেলোর ডিফেন্সিভ উন্ডস্‌। এঁরা যতই হোক বাড়ির লোক। পড়ে গেছি শুনে হাসলে আমার থেকে এঁদের কপালেই দুঃখ বেশি। সকলেই যৎপরোনাস্তি সমবেদনা জানালেন। আমার আহত ইগো অবশেষে শান্তি পেল।    

  

July 29, 2013

রাইন




জার্মানির অন্যান্য শহরের কথা জানি না, বন্-এ ছ’মাস থাকতে হলে শুরুতেই নামধাম নথিভুক্ত করানোর একটা ব্যাপার থাকে। অ্যালফন্‌সের পিছু পিছু প্যারেড করে আমরাও স্টাডহাউসে গিয়েছিলাম রেজিস্ট্রেশন করাতে। কুপন হাতে অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে মাথার ওপরের বোর্ডে আমার নম্বর ফুটে উঠল। নির্ধারিত টেবিলের দিদিমণি আমার নাম আমার বরের নাম, আমার বয়স আমার বরের বয়স, আমার পাসপোর্টের ডিটেলস আমার বরের পাসপোর্টের ডিটেল্‌স্‌ ইত্যাদি টুকে নিয়ে একগাল হেসে আমার দিকে রেজিস্ট্রেশনের রসিদ আর একগোছা কাডবোর্ডের টিকিট এগিয়ে দিলেন।

টিকিটগুলো আর কিছুই না, ভাউচার। শহরের বিভিন্ন থিয়েটার, মিউজিয়াম, বোট্যানিকাল গার্ডেন, বিখ্যাত লোকেদের বাড়ি, গানের অনুষ্ঠান, নাচের ফাংশান ইত্যাদি ফ্রি-তে দেখে বেড়ানোর নেমন্তন্নপত্র। আদ্যোপান্ত ডয়েশে লেখা। পরের শনিবার সকালে গুগল ট্রান্সলেটর খুলে ঝাড়া দু’ঘণ্টা খরচ করে প্রতিটি ভাউচারের মর্মার্থ উদ্ধার করলাম। যেগুলো কাজে লাগবে---এই যেমন অপেরাহাউস, বিঠোভেনের বাড়ি, বোটানিক্যাল গার্ডেন, লাখখানেক মিউজিয়াম ইত্যাদির ভাউচার আলাদা করে রাখলাম। যেগুলো লাগবে না---যেমন জিমন্যাশিয়াম কিংবা সাপ্তাহিক কবিতাক্লাবের মেম্বারশিপ---সেগুলোও প্রাণে ধরে ফেলতে পারলাম না। যতই হোক, ভালোবেসে দিয়েছে।

আর একটা ভাউচার, যত্ন করে ব্যাগে পুরে নিলাম। অবিলম্বে ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টারে গিয়ে খোঁজখবর করব বলে। রাইনবক্ষে বোটভ্রমণের ভাউচার।

শম্পা বলার পর থেকেই বুকের ভেতর রাইনভ্যালিতে বোটভ্রমণের ইচ্ছে চাঁদের কলার মতো বাড়ছিল। রাইন ইউরোপের নামকরা লম্বা নদী। সুইজারল্যান্ড থেকে শুরু হয়ে অস্ট্রিয়া, লিখেনস্টাইন, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস্‌ ইত্যাদি দেশ ও দেশের সীমানা ছুঁয়ে নর্থ সি পর্যন্ত তার বিস্তার। রাইনভ্যালি অথবা মিড্‌ল্‌ রাইন হল এই দীর্ঘ যাত্রাপথের একটা অংশ। যেমনতেমন অংশ নয়, সবথেকে সুন্দর অংশ। এতটাই সুন্দর যে জার্মানির কোব্‌লেনজ্‌ আর মাইন্‌জ্‌ নামের দুই শহরের মাঝের রাইনভ্যালি ইউনেস্‌কোর বিশ্ব হেরিটেজ সাইট। অনেকে একে রোম্যান্‌টিক রাইন বলেও ডাকে।

যাচ্ছিযাব করে গড়িমসি করছিলাম, একের পর এক উইকএন্ড নাকের সামনে দিয়ে হুশহুশ করে আসছিলযাচ্ছিল, এমন সময় ইনবক্সে অ্যালফন্‌সের মেল এসে জানাল যে আগামী আঠাশে জুলাই রাইনভ্যালি বোটট্রিপের দিন ধার্য হয়েছে। যারা যেতে ইচ্ছুক তারা যেন কাঁটায় কাঁটায় সকাল ন’টা পঁয়তাল্লিশে ইউনিভার্সিটির পেছনের মাঠে জড়ো হয়। যারা অনিচ্ছুক তারাও যেন আসে, কারণ এমন সুযোগ পায়ে ঠেলার থেকে গাধামো আর কিছু হয় না।

অ্যালফন্‌সের অনেক গুণের পরিচয় পেয়েছি এই ক’দিনে, কিন্তু সে যে অন্তর্যামী, এইটা জানা ছিল না।


নীলসাদা ইউনিফর্ম পরা গার্ডবাবুর হাতে টিকিট ধরিয়ে আমরা ছোট্ট একটা জেটি পেরিয়ে ধবধবে সাদা রঙের দোতলা লঞ্চে গিয়ে উঠলাম। লঞ্চের একতলা দোতলা জুড়ে সুসজ্জিত বসার জায়গা, রেস্টোর‍্যান্ট, বাথরুম ইত্যাদি। সারা গায়ে কাঁচের দেওয়াল, যাতে বসে ব্রাটউর্স্ট আর সাওয়ারক্রাউট খেতে খেতে নদীর ধারের শোভা অবলোকন করা যায়। তবে শোভার আনন্দ একশো শতাংশ লুটেপুটে নিতে হলে, ছাদের থেকে ভালো আর কিচ্ছু নেই।

আমরা সোজা ছাদে চলে এলাম। রেলিং-এর ধারে কাঠের বেঞ্চি পেতে সেখানেও দিব্যি সুন্দর বসার ব্যবস্থা করা আছে। সবাই মিলে বসে ঠাট্টাতামাশা লেগপুলিং করছি, এমন সময় মৃদু  একখানা ভোঁ দিয়ে হেলেদুলে লঞ্চ চলতে শুরু করল। 



চিৎকার চেঁচামেচি ক্রমে নিভে এল, ফোটো তোলার উৎসাহে ক্রমে ভাঁটা পড়ল। ছাদের মাঝে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গজল্লা করছিল যারা, তারা গুটিগুটি রেলিং-এর পাশে এসে চুপটি করে দাঁড়াল। আমিও বক্‌বকানি বন্ধ করে বেঞ্চিতে এসে বসলাম। নদীর ধার ঘেঁষে সরু রাস্তা। লোকে হন্‌হনিয়ে সে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, শন্‌শনিয়ে সাইকেল চালাচ্ছে। এই তো কাল বিকেলে আমিই চালাচ্ছিলাম। একটু পরে মাথিয়াস্‌ আঙুল তুলে জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে একটা সাদা থামওয়ালা সাদারঙের বাড়ি দেখিয়ে বলল, “বল তো ওটা কী?”

হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখে শেষে বেচারা নিজেই উত্তরটা দিয়ে দিল। জার্মানির প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভবন, অর্থাৎ চ্যান্সেলরি। বার্লিন দেওয়াল ভাঙার সময় কাগজে কাগজে খুব হেলমুট কোলের নাম বেরোচ্ছিল মনে আছে? হেলমুট কোল তখন এই বাড়িতেই থাকতেন, অফিস করতেন। শুক্রবার বিকেলে আমরা সে অফিস দেখতেও গিয়েছিলাম। বাগানের রেলিং-এর কনুইয়ের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়েছিলাম। আর আজ লঞ্চের রেলিং-এর পাশে বসে চ্যান্সেলরির দিকে তাকিয়ে আছি। বাড়িটা যে বাইরে থেকে আসলে এ’রকম দেখতে সেটা সেদিন বুঝতেই পারিনি।

পার্সপেক্‌টিভ ব্যাপারটাই আসলে গোলমেলে।  

পার্সপেকটিভের কথা উঠলেই আমার একটা গল্প মনে পড়ে যায়। আগেও অবান্তরে গল্পটা বলেছি, কিন্তু আবার বলতে ইচ্ছে করছে। আমাদের পাড়ার এক দিদির বিয়ে হয়েছিল পাড়ারই এক দাদার সঙ্গে। দিদির বাপেরবাড়ি ছিল রাস্তার এ ধারে, আর শ্বশুরবাড়ি ওধারে। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি কোণাকুণি হেঁটে যেতে সময় লাগত গুনে গুনে ঠিক সাড়ে তিন মিনিট। কিন্তু সে তো ঘড়ির মাপ, মনের মাপে হয়তো ওই দূরত্বটাই দিদির কাছে সাত সমুদ্র তেরো নদীর সমান মনে হত। কে জানে। বিয়ে হওয়ার পরপর আমরা দেখতাম বিকেলবেলা দিদি গা ধুয়ে চুল বেঁধে ইয়াব্বড় একখানা সিঁদুরের টিপ পরে শ্বশুরবাড়ির গ্রিলগেট ধরে দাঁড়িয়ে লোক দেখছেন। আমরা হয়তো তখন দল বেঁধে শিঙাড়ার দোকানে যাচ্ছি। দিদির দিকে তাকিয়ে খুব হেসে হেসে হাত নাড়তাম কিন্তু দিদি ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থাকতেন। খানিকক্ষণ পরে চেঁচিয়ে উঠে বলতেন, “ও হরি, তোরা? উল্টোদিক থেকে দেখছি তো, চিনতেই পারিনি।”

দিদি আমাদের আজন্ম দেখে এসেছিলেন, আর আমি চ্যান্সেলরি দেখেছি মোটে একবার, তাও ওপর ওপর, বুড়ি ছুঁয়ে। কাজেই আমি যে সেটা উল্টোদিক থেকে দেখে চিনতে পারব না তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে।


কিছুক্ষণ পর আমাদের লঞ্চ শহরকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল। নদীর দু’তীরের চেহারাও নিমেষে বদলে গেল। সবুজের ওপর সবুজ, তার ওপর আকাশের নীল, নীলের ওপর থরে থরে জমতে থাকা ধূসর মেঘ। বৃষ্টি আসতে পারে। ঘন জঙ্গলের মাঝে একটা দু’টো দুর্গগোছের বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। বেশ কয়েকটা রোয়িং বোট চোখে পড়ল। ছুটির দিন, তাই মাছও ধরতে বেরিয়েছিলেন কেউ কেউ। মাঝে মাঝে লাল টুকটুকে ট্রেন ছুটে যাচ্ছিল লাগোয়া রেললাইনের ওপর দিয়ে। 



এইসব দেখছি, ছবি তুলছি, এমন সময় দেখি বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নেমেছে। ছাতালাঠি নিয়ে নিচে নেমে আসা ছাড়া গতি রইল না। আমার বন্ধুরা দোতলায় গিয়ে বসল, আর আমি সোজা নেমে এলাম একতলায়। 

চা তেষ্টা পাচ্ছিল অনেকক্ষণ থেকে। তেষ্টা না লোভ কে জানে। এমন সুন্দর জানালার পাশে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকার লোভ। কাউন্টারের সামনে গিয়ে অবশ্য মিনিটখানেক ধরে তন্নতন্ন করে মেনুবই খুঁজেও Tee বলে কোনও বস্তুর দেখা না পাওয়ায় শেষে কফি অর্ডার করতে হল। কাপপ্লেট হাতে নিয়ে ভালো দেখে একটা জানালার পাশে এসে বসলাম।


জানালার বাইরে বৃষ্টি তখনও অবিরাম চলছে। লঞ্চের ধাক্কায় রাইনের কালো জল ফুলে উঠে ছিটকে যাচ্ছে। কতরকম সাইজের ঢেউ। বিরাট থেকে মাথায় দু-তিনটে বিন্দুবিন্দু ফেনার মুকুটওয়ালা পুঁচকে ঢেউ। একের পর এক গড়ছে আর ভাঙছে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে নেশা ধরে যায়। বেথুন থেকে ফেরার সময় মাঝেমাঝে দু’শো উনিশের যমযন্ত্রণা এড়াতে আহিরিটোলা দিয়ে লঞ্চে করে হাওড়া ফিরতাম। তখনও লঞ্চের রেলিং-থেকে ঝুঁকে পড়ে ফেনার ভাঙাগড়া দেখতে একই রকম নেশা লাগত। কলেজটলেজ কবেকার স্মৃতি হয়ে গেল, ভাবা যায়?

লঞ্চের ভেতরটাও দেখার মতো। জানালার পাশের টেবিলগুলো মোটামুটি ভর্তি করে লোকজন বসে গল্প করছে। বেশিরভাগই বুড়োবুড়ি। অবশ্য বেশ কয়েকটা ফ্যামিলিও এসেছে। দাদু ঠাকুমা, মা বাবা, ছেলেমেয়ে। বোর্‌ড্‌ মুখের সদ্য টিনএজার। লিখে দেওয়া যায় এটাই শেষবার। এর পর থেকে হাতে পায়ে ধরেও তাকে রবিবার দুপুরে হোলফ্যামিলির সঙ্গে বোটিং ট্রিপে আসতে রাজি করানো যাবে না। সোনালি চুলের গুটি গুটি হাঁটা টড্‌লার। প্র্যামে হাতপা ছড়িয়ে এলিয়ে আধশোয়া হয়ে থাকা শিশু। মাথায় চুল প্রায় নেই বললেই চলে, মোটা মোটা গাল, গোল গোল চোখ। গাম্ভীর্য দেখলে মনে হয় বিসমার্কের বাবা। দেখলেই ইচ্ছে করে জিভ বার করে ভেংচে দিই।


বোট হেলেদুলে চলল। লঞ্চ মাঝে মাঝে থামছে, লোক উঠছে নামছে। মাথার ওপর থেকে আমার কোলিগদের হাহাহিহি কানে আসছে। একটু পরে হোয়্যার ইস্‌ কুন্তলা কথাটা দু-চারবার কানে আসতে ওপরে এসে বসলাম। মাথিয়াস্‌ খুব হাতপা নেড়ে কাকে যেন একটা জার্মান হিস্ট্রি বোঝাচ্ছে। 

অবশেষে আমাদের স্টপ এসে গেল। লিন্‌জ্‌ আম রাইন। এখানকার শহরের নামের এই কায়দাটা আমার খুব ভালো লাগে। লিমবুর্গ আন্‌ ডের লান, লিন্‌জ্‌ আম রাইন। কতশত বছর ধরে নদীই তো শহরগুলোকে লালনপালন করে এসেছে। তাই এরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নদীর নামটা শহরের নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। ঠিকই করেছে। দেওয়াই উচিত।

অ্যালফন্‌স্‌ আমাদের প্ল্যান বুঝিয়ে দিল। এখানে আমরা লাঞ্চ করব, ঘণ্টাখানেক ঘুরবফিরব, তারপর ট্রেন ধরে বনে ফিরব। লিন্‌জ্‌ একেবারেই ট্যুরিস্ট শহর। বা শহরতলিও বলা যেতে পারে। এই রাইনভ্যালি বোটট্রিপের যাত্রীরাই শহরের অর্থনীতির শিরদাঁড়া। আমরা সবাই মিলে অ্যালফন্‌সের চেনা রেস্টোর‍্যান্টে গিয়ে আরাম করে ছাতার তলায় বসলাম। বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গিয়েছিল। বানান করে করে মেনু পড়ে যে যার খাবার অর্ডার করে দিল। আমি একটা টার্কি স্যালাড আর লাইট কোক নিলাম।


খাওয়ার পর প্ল্যানমতোই হাঁটাহুঁটি শুরু হল। পুরোনো লিন্‌জ্‌ নেহাতই ছোট শহর। মাঝারি স্পিডে মিনিট পনেরো হাঁটলেই শহরের এই সিংহদ্বার থেকে ওই সিংহদ্বারে পৌঁছে যাওয়া যায়। এখানেও বেশ কয়েকটা বাড়িতে লিমবুর্গের মতো হাফ-টিম্বার্‌ড্‌ স্থাপত্য নজরে পড়ল। হাঁটতে হাঁটতে আর ছবি তুলতে তুলতেই দেখি আবার খিদে খিদে পেয়ে গেছে। তখন রাস্তার পাশের একটা দোকানে ঢুকে আইসক্রিম কিনে খেতে হল।


আর কী। ঘোরা শেষ। এবার ঘরে ফেরা। তবে নৌকোর বদলে ট্রেনে চেপে। অ্যালফন্‌সের পিছু পিছু আবার লাইন দিয়ে মনখারাপ করা খাঁ খাঁ লিন্‌জ্‌ স্টেশনে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। একটু পরে বনে যাওয়ার ট্রেন এসে গেল।

   

July 27, 2013

সাপ্তাহিকী




বিগ বেনের ভেতরে। উৎস

When two people are under the influence of the most violent, most insane, most delusive, and most transient of passions, they are required to swear that they will remain in that excited, abnormal, and exhausting condition until death do them part. 
                                                                                     ---George Bernard Shaw




ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি, নোয়ার বানডাকা ইত্যাদির সালতামামি জানতে হলে এই লিংকটায় ক্লিক করতেই হবে।



নরওয়ের নকল সূর্য।

গুগল অটোকমপ্লিট। কমপ্লিট ননসেন্স।

অতই যদি প্যাকনা, নিজে বানালেই পারে।

হরর স্টোরি। মাত্র দু’লাইনেই ঘাড়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

এ সপ্তাহের গান। পাহাড়ি সান্যালের গলাটা কিন্তু পাহাড়ি সান্যালের নিজেরই। ভদ্রলোক রীতিমত ভালো ক্লাসিক্যাল গাইয়ে ছিলেন। জনশ্রুতি আছে সদ্যকিশোর ভীমসেন যোশী যখন সার্থক গুরুর খোঁজে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন, তখন অনেক ঘাটের জল খেতে খেতে পাহাড়ি সান্যালের বাড়িতেও তাঁর ঠাঁই হয়েছিল। মন টেঁকেনি।

July 26, 2013

একটি আদ্যোপান্ত বাস্তব কথোপকথন



চায়ের কাপ হাতে ই-কে হাসিমুখে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে আমি বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারিনি ঘটনা কোনদিকে ঘুরতে চলেছে। পারলে উল্টোদিকে টেনে দৌড় লাগাতে আমাকে দু’বার ভাবতে হত না।

ই হাত পাঁচেকের মধ্যে এসে পড়ায় খাতা মুড়ে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বোঝালাম যে আমি পোলাইট কথোপকথনের জন্য তৈরি। করমর্দন, হাই হ্যালো ইত্যাদি সম্ভাষণের পালা ফুরোল। এরপর যা যা ঘটেছিল সেটা ইংরিজিতেই লিখছি। অনুবাদ করতে গেলে রসভঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা।

ইঃ হাই কুন্তলা! আই অ্যাম গোয়িং টু ইন্ডিয়া উইথ মাই হাসব্যান্ড। ফর দ্য ফার্স্ট টাইম।

কঃ রিয়েলি? হাউ নাইস!

আমি যথাসাধ্য উৎসাহ দেখিয়ে ভালো গৃহস্থ হওয়ার চেষ্টা করলাম। পুরোটা যে অভিনয় তাও নয়। যখনই শুনি কেউ প্রথমবার ইন্ডিয়া যাচ্ছে আমার ভীষণ আনন্দ হয়। আমি রোজ যে রাস্তা দিয়ে হাঁটি এরা সেই রাস্তা দিয়ে পায়ে ফোস্‌কা ফেলে হাঁটবে, প্রথমবার তাজমহলের সামনে দাঁড়াবে, রাতের এরোপ্লেনের জানালা থেকে প্রথমবার আলোজ্বলা ভারতবর্ষকে দেখবে---ভাবলেই আমার মন খুশি হয়ে ওঠে।

ই-র মুখে আমার উত্তেজনার প্রতিফলন না দেখে খানিকটা দমেই গিয়েছিলাম আমি। হয়তো বেড়াতে ভালোবাসে না। হয়তো হাসব্যান্ডের অফিসের কাজের ছুতোয় সাতসমুদ্দুর পেরোতে হচ্ছে। কী ঝামেলা।

ই কাজের কথা পাড়ে।

ইঃ কুন্তলা, আই হ্যাভ রেড ইন নিউজপেপার দ্যাট গার্ল্‌স্‌ গেট রেপ্‌ড্‌ ইন ইন্ডিয়া? ইভ্‌ন্‌ ট্যুরিস্টস্‌? ইস ইট ট্রু?

কঃ অ্যাঁ?

ইঃ ডাস্‌ দ্যাট হ্যাপেন ভেরি অফ্‌ন্‌?

কঃ মানে...আই মিন্‌ ...সামটাইমস্‌। বাট...

ইঃ ক্যান ইউ গিভ মি সাম সাজেস্‌শন্‌স্‌? হাউ ক্যান আই টেক প্রিকশনস্‌?

কঃ মে বি...ডু নট গো আউট অ্যালোন ইন নাইট।

ইঃ ইভ্‌ন্‌ উইথ মাই হাসব্যান্ড?

কঃ ইয়েস। ইট ইস বেটার টু রিটার্ন টু ইয়োর হোটেল বিফোর এইট ও ক্লক। বাট ইফ ইউ আর উইথ আ বিগ গ্রুপ, আই গেস্‌ ইউ আর সেফ।  

ইঃ থ্যাংকস। অ্যানাদার কুইক থিং...আই হ্যাভ হার্ড উইমেন গেট গ্রোপ্‌ড্‌ ইন ক্রাউডেড প্লেস?

কঃ ইয়ে...সামটাইম্‌স্‌...।

ইঃ ডাস্‌ দ্যাট হ্যাপেন আ লট্‌?

কঃ নো। নট হোয়্যার আই লিভ।

ইঃ ইফ আই টেল দেম টু স্টপ, উইল দে লিস্‌ন্‌?

কঃ ইউ মাস্ট টেল দেম টু স্টপ। বাট আই অ্যাম শিওর নাথিং উইল হ্যাপেন টু ইউ।

ইঃ থ্যাংকস্‌ কুন্তলা। থ্যাংকস ফর ইয়োর টাইম্‌। 

কঃ ডোন্ট ওয়রি...আই অ্যাম শিওর ইউ উইল হ্যাভ আ ভেরি নাইস্‌ ট্রিপ।

ইঃ আই উইল। থ্যাংকস্‌। বাআআই...

কঃ বাআআই।

ই চায়ের কাপ হাতে ভেসে ভেসে আবার যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে প্রস্থান করল। আমি চেয়ার টেনে বসে খাতা খুললাম। কিন্তু খাতার দিকে তাকিয়ে থাকাই সার হল, মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। কী বললাম, কী বলা উচিত ছিল। নানারকম অনুভূতি মিশে মাথার ভেতর মোক্ষম জট পাকিয়ে গেল। জট খানিকটা ছাড়তেই পোস্টটা লিখে ফেললাম, যাতে ব্যাপারটা মনে থেকে যায়। অবশ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ না রাখলেও কথোপকথনটা ভুলতে পারতাম কি না সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

এখন একটাই প্রার্থনা, যেন ই-র ইন্ডিয়া ট্রিপ নির্বিঘ্নে কাটে।


July 25, 2013

বেডসাইড ল্যাম্প



আমার স্বপ্নের বাড়ির সামনে একটা ছোট বাগান থাকবে, একটা বারান্দা থাকবে, আর থাকবে একটা ছাদ। আমার একান্ত নিজস্ব ছাদ। প্রতিবেশীদের নিয়ে আমি সেই ছাদে পনেরোই অগস্ট বা পয়লা জানুয়ারি মাংসভাতের ফিস্ট জমাতে পারি, কিন্তু তাছাড়া সে ছাদে আমার অধিকার অবিসংবাদিত। সে ছাদের দড়িতে কেবল আমারই ভেজা জিন্‌স্‌ শুকোবে। রাতে তারাভরা আকাশের তলায় কেবল আমিই মাদুর পেতে শোব।

বাড়ির ভেতরটা কেমন হবে সেই নিয়ে আমার বেশি মাথাব্যথা নেই। বসারঘর, শোবারঘর, রান্নাঘর, বাথরুম। সব বাড়িরই যেমন হয়। আমি আর অর্চিষ্মান মাঝে মাঝে ঘরের দেওয়ালে কী ঝোলানো হবে সেই নিয়ে তর্কবিতর্ক করি। আদিবাসী মুখোশ না গণেশ পাইনের কপি। তর্কের সময় আমি এমন ভাব দেখাই যেন আমার জীবনমরণ দেওয়ালের আর্টের ওপর নির্ভর করছে, কিন্তু আপনাদের চুপিচুপি বলে রাখছি, ওতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না। অর্চিষ্মানের যা প্রাণে চায় তাই ঝোলাতে পারে।

আমার শুধু একটি তুচ্ছ জিনিসের লোভ আছে। বেডসাইড ল্যাম্প। এ যাবৎ আমি যে ক’টা বাড়িতে থেকেছি, কোনওটাতেই বেডসাইড ল্যাম্প ছিল না। কেন কে জানে। এমন কিছু মহার্ঘ জিনিস নয়। খাটের পাশে একটা মাপমতো টুল আর একটা টেবিলল্যাম্প হলেই হয়ে যায়। এমনও নয় যে টাকায় কুলোচ্ছে না। কতশত বড়বড় খরচ করে ফেলি। একটা কম্পিউটার খারাপ হতে না হতে দৌড়ে আরেকটা কম্পিউটার কিনে আনি। টুল আর টেবিলল্যাম্প কিনতেও হবে না। দুটো জিনিসই বাড়িতে অলরেডি পড়ে পড়ে পচছে। তবু আমার আর সময় করে বেডসাইড ল্যাম্পের ব্যবস্থা করে ওঠা হয় না।

কিন্তু যখনই কোনও হোটেলে চেক ইন করি, আর ঘরে ঢুকেই উদাসীন সাদা বিছানার পাশে বেডসাইড ল্যাম্পের ওপর চোখ পড়ে যায়, আমার মনে একইসঙ্গে উল্লাস আর দুঃখ উথলে ওঠে। সামনের ক’টাদিনের বেডসাইড ল্যাম্পের বিলাসের জন্য উল্লাস, আর নিজের বাড়িতে এ জিনিস না থাকার দুঃখ।

রাইনব্রাইটবাখে যে হোটেলটায় আমরা গত তিনদিন ছিলাম সেটা সম্পর্কে শুরুতে আমার মনে মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল। হোটেলের পেছনে সবুজ বাগান, করিডোরের কোণে কোণে সাদা কুরুশের টেবিলক্লথ ঢাকা কলকাকাটা কাঠের টেবিল, তার ওপর কারুকার্য করা প্লেটে তাজা ফলের সম্ভার। ঘরের ভেতরেও দিব্যি বসার সোফা, ছোট্ট রাইটিং ডেস্ক, ধবধবে সাদা বিছানা, ঝকঝকে বাথরুম। খুশিমনে বিছানায় চিৎপাত হয়ে পড়ে, করিডর থেকে তুলে আনা টুকটুকে আপেলে কামড় দিয়ে যেই না ল্যাপটপ খুলেছি, সব ভালোলাগা নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল। ইন্টারনেট ভয়ানক স্লো।

ইউটিউবে ভিডিও দেখার আশা তো ছেড়েই দিলাম, সে স্পিডে জি-মেলের পাতাটুকুও ভালো করে আপলোড হয় না। মেজাজ টং হয়ে গেল। অমন মিষ্টি রসালো আপেলখানা, মনে হল থু থু করে ফেলে দিই। বিশ্বের সঙ্গে যদি যোগাযোগই না করতে পারি, আপেল ধুয়ে কি জল খাব?

সারাদিন ক্লাস করে কেটে গেল। মিটাগ আর কাফে-পাউস গুলোও দাঁত কামড়ে এর-ওর সঙ্গে স্মলটক করে কাটিয়ে দিলাম। ক্লাসের শেষে প্রাণবন্ত সহকর্মীদের পাল্লায় পড়ে টেবিল-সকার চ্যাম্পিয়নশিপ খেলা হল। আমি বুদ্ধি খাটিয়ে ভীষণ খারাপ খেলে প্রথম রাউন্ডেই ধরাশায়ী হয়ে গেলাম, যাতে সারা চ্যাম্পিয়নশিপ ধরে খেলার পরিশ্রম না করতে হয়। কিন্তু খেলায় ভয়ানক মজা হয়েছিল। দেখা গেল ব্রাজিলের লোকেরা টেবিলেও ফুটবলটা বাকিদের থেকে ভালো খেলে। ঘণ্টা তিনেক ধরে লাফিয়েঝাঁপিয়ে, চেঁচিয়ে গলা ভেঙে যখন ঘরে ফিরলাম তখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি মোটে দশটা বাজে।

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ঘুম আসতে দেরি আছে অন্তত ঘণ্টা দেড়েক। এতখানি সময় আমি কী করে কাটাব? কম্পিউটারটাই যে ঠুঁটো হয়ে রয়েছে। একবার সত্যি সত্যি ভাবলাম সেটা ঘাড়ে করে বেরিয়ে পড়ি। একতলা, দোতলা, তিনতলা, ছাদ---ঘুরে ঘুরে দেখি কোথাও সিগন্যাল বেটার পাওয়া যাচ্ছে কি না। তাহলে না হয় সেখানেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে রাত কাটিয়ে দেওয়া যাবে।

হতাশ হয়ে বিছানার ওপর যেই না হাতপা ছড়িয়ে যেই না ধপাস্‌ করে বডি ফেলেছি, ডানহাতের ধাক্কা লেগে খটাস্‌ করে বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বলে উঠল। শান্ত হলুদ আলোর বৃত্ত ছড়িয়ে পড়ল সারা ঘরে। পুকুরে ঢিল পড়া ঢেউয়ের মতো। কী সুন্দর। আলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ইন্টারনেট-হীনতার দুঃখ মুহূর্তের জন্য ভুলে গেলাম। ইস্‌, এমন ভালো একটা জিনিস আমার বাড়িতে নেই কেন। নিজেকেই নিজে প্রতিশ্রুতি দিলাম, এবার বাড়ি ফিরে গিয়ে আর কিছু করি না করি, একটা বেডসাইড ল্যাম্পের ব্যবস্থা করবই।

আলোর দিকে মুগ্ধনয়নে চেয়ে থাকতে থাকতেই মাথায় এল। ইন্টারনেট নেই তো কী হয়েছে, অন্য আরেকভাবেও তো টাইমপাস করা যায়। গল্পের বই সঙ্গে আনিনি, কিন্তু আরেকরকম বই তো রয়েছে আমার ব্যাগে।

খাট থেকে উঠে ব্যাগ থেকে ফোল্ডারটা বার করলাম। বৃহস্পতিবার থেকে যে লেকচারগুলো হবে, অতি যত্ন করে তাতিয়ানা সেগুলোর প্রিন্টআউট নিয়ে ফোল্ডার বানিয়ে দিয়েছে। অন্যমনস্কভাবে গল্পের বইয়ের বদলে যখন সেগুলো ব্যাগে পুরে নিয়েছিলাম তখনই জানতাম নেওয়াই সার হচ্ছে। যেটুকু সময় পাব, সেটুকু ইউটিউব দেখেই কেটে যাবে। ফোল্ডারের দিকে তাকানোর সময় হবে না আমার।

বালিশটা আরেকবার ফাঁপিয়ে নিয়ে, লেপটা বুক পর্যন্ত টেনে নিয়ে বিছানার ওপর চিৎ হয়ে পড়লাম। আর্টিক্‌ল্‌টা দিব্যি। মাথার মধ্যে পয়েন্ট নোট করে নিচ্ছিলাম। কোথায় কোথায় আমি লেখকের সঙ্গে একমত নই। অল্প খুলে রাখা জানালাটা দিয়ে অল্প অল্প মিষ্টি ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছিল। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটাদু’টো রাতজাগা পাখি হঠাৎ হঠাৎ ডেকে উঠছিল। কখন যে চোখ ঘুমে জড়িয়ে এসেছে টেরই পাইনি।

খোলা জানালা দিয়ে এসে পড়া ভোরের আলোয় চোখ মেললাম। কী ভালো ঘুমিয়েছি। অন্যান্য রাতে যেমন হয়, বুকের ওপর চলন্ত ল্যাপটপের ছ্যাঁকায় ঘুম ছিঁড়েখুঁড়ে যায়, দুঃস্বপ্ন দেখি অবান্তরের কোডিং গোলমাল হয়ে গেছে, যাই লিখছি সব মুছে গিয়ে কেবল AbCdEfGh, সে সব কিচ্ছু হয়নি। 

হাত বাড়িয়ে বেডসাইড ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিলাম। জানালার আলো বেচারাকে অলরেডি গোহারা হারিয়ে দিতে শুরু করেছে। ওর জন্যই তো পড়া হল, ঘুম হল। ইন্টারনেট ছাড়াও যে এতখানি সময় বেঁচেবর্তে থাকা যায়, সে অবিশ্বাস্য সত্যটা প্রমাণ হল। শরীরে মনে একটা অদ্ভুত তাজা ভাব টের পাচ্ছিলাম। একটা রাতের টানা গভীর ঘুম এতখানি তফাৎ করে দিয়ে পারে, ভাবা যায় না। খুব আফসোস হচ্ছিল জানেন। আজ যদি ফুটবল খেলা হত তাহলে আর কাউকে আমার সামনে দাঁড়াতে হচ্ছিল না।   
   
 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.