August 31, 2013

সাপ্তাহিকী





There are two motives for reading a book; one, that you enjoy it; the other, that you can boast about it.
                                                                                              ---Bertrand Russell

 বই পড়ার তৃতীয় কারণ।

“. . . so I guess this is a story of how it changed our lives. May be it’ll [change] yours’ too.  

এই তালিকায় আর. কে. নারায়ণের নামও জুড়ে নিতে পারেন। শুনেছি ‘গাইড’ দেখার পর দেব আনন্দের মুণ্ডপাত করেছিলেন তিনি।




সেতারটা একটু ডিস্‌ট্র্যাকটিং, সেটা বাদ দিলে এ সপ্তাহের গানের জবাব নেই।

  

August 29, 2013

দ্য ইয়ং ফ্রিৎজ




“হালো, উই হাইসেন সি?”

সামনের সিটের পিঠের ওপর জেগে থাকা মাথাটা মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। মাথার মালিক বসে পড়েছেন। বন থেকে ট্রেন ছাড়ার দশ মিনিটের মধ্যে বাকি সব স্বাভাবিক মানুষের মতো সিটে চুপ করে বসে থাকতে নিতান্ত অপারগ হয়ে তিনি সিটের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। দাঁড়িয়ে কামরাভর্তি লোকের ওপর নজরের সার্চলাইট ঘুরিয়ে এনে অবশেষে আমার সহকর্মী আনার মুখের ওপর ফেলেছেন এবং সাব্যস্ত করেছেন যে যাত্রার বাকি ছ’ঘণ্টা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার জন্য আনা যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট।

দু’হাতের মধ্যে থেকে একজোড়া অচেনা চোখ নিষ্পলকে তাকিয়ে থাকলে আর কিছুতে মনোনিবেশ করা শক্ত, কিন্তু তাও আমরা করার চেষ্টা করছিলাম। আমি আর আনা। বাকি ক্লাসের সঙ্গে ঝাঁক বেঁধে বন থেকে বার্লিন যাচ্ছি। আনা আইপ্যাড বার করে কী সব টাইপ করছে, আমি জানালার ধারে বসে দ্য কুকু’স কলিং শেষ করছি। বা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছি, কারণ ওই দু’জোড়া চোখ।

লো-কনটেক্সট্‌ কালচারের বাচ্চা বলে ভয়ে ভয়ে এড়িয়ে চলছিলাম, কিন্তু শেষটা আর থাকা গেল না। লো-কনটেক্সট্‌ কালচার হচ্ছে, এই যেমন ধরুন জার্মানরা। “হাউ আর ইউ” জিজ্ঞাসা করলে “সেয়ার গুট্‌” বলে প্রস্তরকঠিন মুখে চুপ করে থাকে। অপ্রাসঙ্গিক বা উইদাউট কনটেক্সট একগাদা কথা হাঁউমাঁউ করে উগরে দেয় না। আর আমরা হচ্ছি হাই-কনটেক্সট কালচারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। “কী, কেমন চলছে?” জানতে চাইলে বাজারের ব্যাগ হাতে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে বাতের ব্যথা থেকে শুরু করে কাজের লোকের কামাই---প্রতিটি পয়েন্ট টাচ না করে দম নিই না। বস্‌, “গতকাল অফিসে আসেননি কেন?” জিজ্ঞাসা করলে “অসুস্থ ছিলাম” বলে খেলখতম করার বদলে, “আরে আমি কী করব, অর্চিষ্মানের গরম লাগছিল বলে সারারাত জানালা হাট করে খুলে ঘুমিয়েছি, সকালবেলা উঠে দেখি টনসিল ফুলে ঢোল, ঢোঁক গিলতে পারছি না। তারপর তো ডাক্তার, বদ্যি, রাজ মেডিকো, সেট্‌জিন...”

ট্রেনিং-এর প্রথম সপ্তাহে লিডারশিপ নিয়ে বক্তৃতা দিতে এসে দু’রকম কালচারের পার্থক্য বানান করে বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন এক বক্তা। তার সঙ্গে অবশ্য পইপই করে এও বলেছিলেন যে কোনও কালচারই একে অপরের থেকে ভালোখারাপ নয়, ইট’স্‌ অল অ্যাবাউট ডাইভার্সিটি---কিন্তু তাতে আমি ভুলিনি। আজন্ম শুনে আসা বাবার কথাটাও মনে ছিল। “প্রয়োজনের অতিরিক্ত এত কথা বলে বলেই বাঙালির কিছু হল না।” আমার মা আবার এতটা নৈরাশ্যবাদী নন। মা বলেন, “চেষ্টা করলে মানুষে সব পারে। আমি চিরদিন মায়ের কোলঘেঁষা, তাই মায়ের মতটা আমার বেশি পছন্দ। হাই-কনটেক্সট কালচারে জন্মেছি বটে, কিন্তু প্রাণপণ পরিশ্রম করে লো-কনটেক্সট কালচারের রকমসকম আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি।

কিন্তু শেষটা আর পারা গেল না। পাশে আনার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, ওরও একই অবস্থা। আইপ্যাড আর বই মুড়ে রেখে অগত্যা আমরা সৌজন্যমূলক আলাপচারিতার পথ ধরলাম। যদিও সে পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, ভাষার ব্যাপারটা ভুললে চলবে না। যে তিনটে জার্মান বাক্য ফ্রাউ শ্‌প্রিংগার মাথায় গজাল মেরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তারই প্রথমটা ঝুলি বার করে জিজ্ঞাসা করলাম, “হালো, উই হাইসেন সি?”

হাই, হোয়াট’স ইয়োর নেম?

তার উত্তরেই আমাদের নজরদারের সবেগে অন্তর্ধান। বুঝলান তিনি কথা বলতে চান না, শুধু তাকিয়ে দেখতে চান। উঁচু পিঠওয়ালা সিটের ব্যারিকেডের ওপার থেকে চাপা মহিলাকণ্ঠে জার্মান কথাবার্তা শোনা যেতে লাগল। সে কথার মানে বোঝার বিদ্যে আমার আনার কারওরই নেই, কিন্তু আমরা দু’জনেই নিশ্চিত ছিলাম যে কী বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। হাই, লো---সবরকম কনটেক্সটের কালচারেই কিছু কিছু কথোপকথন হুবহু এক।

“এ মা, এ রকম করতে হয় নাকি? নাম বল। না হলে কী ভাববেন বল দেখি ওঁরা? ভাববেন সোনা নিজের নামটাই জানে না। উঠে দাঁড়িয়ে হ্যালো বলে নিজের নাম বল। আর জিজ্ঞাসা কর আপনাদের নাম কী।”

অতি ধীরে প্রথমে চাইনিজ কাট চুলে ভরা মাথা, আর তার নিচে নীল কাঁচের গুলির মতো একজোড়া চোখ, সিটের ওপার থেকে আবার ভেসে উঠল। এতক্ষণ চাউনিতে যে সপাট আত্মবিশ্বাসের ভাবটা ছিল সেটা আর নেই। তার জায়গায় এখন অবিশ্বাস, ভয়, আর খানিকটা লজ্জা মিশে আছে।

নাম জানতে পেলাম না, কিন্তু চোখ এই প্রথমবার আমাদের মুখের ওপর থেকে সরলো। এখন তারা আনার আইপ্যাডের দিকে নিবদ্ধ। আছে আছে, আলাপের আশা আছে! দ্বিরুক্তি না করে আনা আইপ্যাড তুলে ধরেছে, “ইউ ওয়ান্ট টু সি ইট?”

উত্তেজনায় জার্মানের জায়গায় ইংরিজি বেরিয়ে পড়েছে। তাতে অসুবিধে কিছু নেই, কারণ বন্ধুত্বের বডি ল্যাংগোয়েজ সকলেই বোঝে। ভাষা দিয়ে তাকে প্রকাশ করতে হয় না।

সেই শুরু হল। আমাদের সিটের কথাবার্তা শুনে ততক্ষণে বাকি ক্লাসমেটরাও ঘাড় উঁচিয়ে দেখতে লেগেছেন ব্যাপারটা কী। কার মনজয়ের জন্য আমার আর আনার এত কাঠখড় পোড়ানো। তাদের মধ্যে দু’একজন গুটিগুটি আমাদের তিনজনের নির্বাক কথোপকথনের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করতে লাগলেন। আমি আর আনা কাজটা যতখানি সূক্ষ্মভাবে করার চেষ্টা করছিলাম, কেউ কেউ তার ধার ধারলেন না। সোজা গামি বিয়ার্‌সের প্যাকেট তুলে ধরে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “ইউ লাইক ক্যান্ডি?”

ডেসপ্যারেশনের মাত্রাটা বুঝে দেখুন।

আমাদের অনামা বন্ধু ততক্ষণে সিট থেকে নেমে এসেছে। তারপরের ঘন্টাখানেক ধরে সে আইলে ছুটেছুটে সকলের সঙ্গে আলাপ করে, তাদের সম্পত্তির হিসেবনিকেশ নিতে লাগল। মৌনব্রতও ভেঙে গেছে তার ততক্ষণে। তার একটা প্রধান কারণ হতে পারে যে সে বুঝে ফেলেছিল যে আকারেআয়তনে আর পাঁচটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো দেখতে হলে কী হবে, ভাষাগত বিকাশের দিক থেকে লোকগুলো তারই সমবয়সী। কিংবা হয়তো তারও কম। আলাপচারিতা মূলত চলছিল Wh-Questions-এর পথ ধরে। আমাদের “ওয়াস্‌ ইস্‌ট্‌ দাস্‌?” প্রশ্নের উত্তরে সে মহোৎসাহে আমাদের “দাস্‌ ইস্‌ট্‌ ফেনস্টাহ্‌, দাস্‌ ইস্‌ট্‌ শুহ্‌, দাস্‌ ইস্‌ট্‌ টাশে...” ইত্যাদি দেখিয়ে যেতে লাগল।

বার্লিনে নেমে যে যার ব্যাগপত্র সামলাচ্ছি, স্টেফানি আর শার্লটে নার্ভাস মুখে সকলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে হাতে ধরা নামের লিস্টে টিক মারছে, এমন সময় দরজা দিয়ে দুই ভদ্রমহিলা নেমে এলেন। একজনের মাথায় শরতের মেঘের মতো ধপধপে সাদা চুলের মুকুট আর আরেকজনের মাথা এখনও কুচকুচে কালো। কালোচুলের মহিলা একটা ডাবল্‌-স্ট্রোলার ঠেলছেন। তার একদিকের সিটে একটি একেবারেই দুধের শিশু, মুখে প্যাসিফায়ার গুঁজে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে। আর পাশের সিটে অঘোরে ঘুমোচ্ছে আমাদের বন্ধু। অবিন্যস্ত চুল কপালে এলোমেলো ছড়ানো, নীল কাঁচের গুলির মতো চোখ বড়বড় পাতার নিচে ঢাকা।

দল স্টেশনের বাইরে অপেক্ষায় থাকা বাসের উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করেছিল, আমি আর আনা ভদ্রমহিলাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। স্ট্রোলারের সামনে পৌঁছে হাসিমুখে হাত এগিয়ে দিয়ে আনা বলল, “ইয়োর চাইল্ড ইস রিয়েলি সুইট্‌। হোয়াট’স্‌ হিস নেম?”

কালোচুলের মা আনার হাত ধরে ঝাঁকিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, “ওহ্‌, হি ইস ফ্রিৎজ্‌।”


*****

ফ্রিৎজের ছবি তুলেছে আমার ব্রাজিলের বন্ধু আনা। আনা জানাইনা সোওজা। আলাপ হওয়ার পর থেকে অবশ্য আমরা ভারতীয়রা ওকে ‘আনাজানা’ বলেই ডাকছি।


August 27, 2013

দ্য ওল্ড ফ্রিৎজ




প্রাশিয়ার রাজা প্রথম ফ্রেডেরিকের ছেলে প্রথম ফ্রেডেরিক উইলিয়ামের ঘরে, সতেরশো বারো সালের চব্বিশে জানুয়ারি যখন ছেলে জন্মাল তখন সবাই আন্দাজ করেছিল এ ছেলে মহাবীর না হয়ে যায় না। দাদু প্রথম ফ্রেডেরিক নিজ উদ্যোগে ডিউক থেকে প্রাশিয়ার প্রথম রাজা হয়েছিলেন, আর তাঁর ছেলে প্রথম ফ্রেডেরিক উইলিয়াম ছিলেন এককথায় যুদ্ধবাজ। তাঁর প্রধান কীর্তির একটা ছিল সারা ইউরোপ ঢুঁড়ে লম্বা লোক খুঁজে বার করে এনে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা। এই লম্বা সেনাদের বাহিনী ইতিহাসে পট্‌স্‌ডাম জায়ান্টস্‌ নামে বিখ্যাত হয়ে আছে। পট্‌স্‌ডাম ছিল বংশানুক্রমিকভাবে ফ্রেডেরিকদের প্রিয় শিকারের জায়গা।

পর পর দুটি রাজপুত্র কচি বয়সে মারা যাওয়ার পর ঘর আলো করে যখন তিন নম্বর ছেলে জন্মাল তখন সবাই অনেক শলাপরামর্শ করে, ভেবেচিন্তে, পেনসিল চিবিয়ে সে ছেলের নাম রাখল ফ্রেডেরিক। দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক। পরে রাজ্যের লোকেরা ভালোবেসে এঁকেই “বুড়ো ফ্রিৎজ” নাম দিয়েছিল। দাদু প্রথম ফ্রেডেরিকের চোখের মণি ছিল ফ্রিৎজ। বাবা প্রথম ফ্রেডেরিক উইলিয়াম ছিলেন কড়া ধাতের লোক, তিনি গোড়াতেই ঠিক করে ফেলেছিলেন ফ্রিৎজ বড় হয়ে তাঁর থেকেও নামজাদা যুদ্ধবাজ হবে। ঠুনকো পিতৃস্নেহ যাতে তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা সৃষ্টি না করতে পারে সেদিকে তাঁর কড়া নজর ছিল। ছ’বছর বয়স হতে না হতে ছোট ছেলেদের সেনাবাহিনী বানিয়ে তিনি ফ্রিৎজকে সে সেনাবাহিনীর কম্যান্ডার জেনারেলের পদে অভিষিক্ত করেছিলেন। শুধু ছেলেখেলা নয়, মিনিয়েচার অস্ত্রাগার পর্যন্ত ছিল সে সেনাবাহিনীর।


কিন্তু বাবা চাইলেই তো হবে না, নিয়তি কী চায় সেটাও তো দেখতে হবে। ফ্রেডেরিক উইলিয়াম ছেলেকে ধর্মশিক্ষা আর অস্ত্রশিক্ষায় পারঙ্গম করে তুলতে যত উঠে পড়ে লাগলেন, তত সব গোলমাল হয়ে যেতে লাগল। ইতিহাসের অনেক বড় বড় গোলমালের মূলে প্রাইভেট টিউটরদের হাত দেখা গেছে, ফ্রিৎজের জীবনেও সে রকম একজন টিউটরের আবির্ভাব ঘটল, তাঁর নাম জাক ডুহান। বারো বছর ধরে সযত্নে ছাত্র পড়িয়েছিলেন জাক। আর এই বারো বছরে মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে ষড় করে প্রায় তিন হাজার কবিতার বইয়ের এক গোপন লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিল ফ্রিৎজ। বাবার ছক কেটে দেওয়া সিলেবাসের বাইরে গ্রীক আর রোমান ক্ল্যাসিক সাহিত্য গুলে খেয়েছিল। ফরাসি দর্শনশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিল।

জাকের পর নিয়তির রূপ ধরে ফ্রিৎজের জীবনে এলেন হানস্‌। হানস্‌ ছিলেন অভিজাত সৈনিক পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা ফ্রিৎজের বাবার সেনাবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করে হানস্‌, ফ্রেঞ্চ এবং আইনপাঠ শেষ করে ফ্রেডরিখ উইলিয়ামের সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন।


আর শুরু হল এক অসাধারণ বন্ধুত্বের। ফ্রিৎজ আর হানস একসঙ্গে অংক শিখতেন, কবিতা পড়তেন, বাঁশি বাজাতেন। আট বছরের বড় বন্ধুর প্রতি অসম্ভব গুণমুগ্ধতা ছিল ফ্রিৎজের। আর সেই জন্যই বোধহয় তিনি হানস্‌কে মনের কথা খুলে বলেছিলেন, যে তিনি পালাতে চান। রাজত্ব, যুদ্ধ, প্রথম ফ্রেডেরিক উইলিয়ামের নাগাল থেকে অনেক দূরে। হানস্‌ প্রথমটা মত দেননি। কিন্তু কোতোয়ালপুত্রের কথা কবেই বা কোন রাজপুত্র শুনেছে? সতেরশো তিরিশ সালের পাঁচই অগস্ট, ফ্রেডেরিক উইলিয়ামের সেনাবাহিনী যখন রাইনউপত্যকায় যুদ্ধজয়ের ফিকিরে ঘুরছে, ফ্রিৎজ পালালেন। পালিয়ে বেশিদূর যেতে পারলেন না, চিঠি দেখে ফ্রিৎজ আর হানস্‌ দুজনকেই ধরে ফেললেন ফ্রেডেরিক উইলিয়াম। যুদ্ধপলাতক হিসেবে দুজনেরই কোর্টমার্শাল হল। হানস্‌ আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন। ফ্রেডেরিক উইলিয়াম যত রগচটাই হোন বোকা ছিলেন না। ছেলের রোগের আসল উৎসটা চিহ্নিত করতে ভুল হয়নি তাঁর। কোর্টের আদেশ ডিঙিয়ে হানসের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন তিনি। ফ্রিৎজও একেবারে পার পেলেন না। তার শাস্তি হল ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে হানসের শিরচ্ছেদ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা।


মানুষের জীবনকে স্পষ্ট বিফোর আফটার কম্পার্টমেন্টে ভাগ করা যায় কি না সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। বীজ চিরদিনই বুকের ভেতর গোপন থাকে, নাকি হঠাৎ একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আপাদমস্তক নিরীহ, শান্তিপ্রিয়, রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো ফইজল খান, বাপ কা দাদা কা সবকা বদলা নিতে খোলা তলোয়ার হাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে?

হানসের মৃত্যুদণ্ডটাই আঠেরো বছরের ফ্রিৎজকে রাতারাতি বদলে দিয়েছিল কি না, সেটা জানার এখন আর কোনও উপায় নেই। কিন্তু বদল যে ঘটেছিল সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। হানসের মৃত্যুর দশ বছর পর, সতেরশো চল্লিশ সালে ফ্রেডেরিক উইলিয়াম পরলোকগত হলে প্রাশিয়ার রাজার সিংহাসনে আঠাশ বছরের তরুণ রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিখের রাজ্যাভিষেক হল।

কিন্তু রাজত্ব নামেই রাজত্ব, প্রাশিয়া তখন পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা খণ্ডখণ্ড জমিজায়গির ছাড়া আর কিছু নয়। দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল তাঁর এই ছত্রাকার রাজত্বকে সংগঠিত করা।


শুরু হল যুদ্ধ। অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, ফ্রান্স, স্যাক্সনি, সুইডেন---সকলের বিরুদ্ধে হইহই করে যুদ্ধযাত্রা করল পুঁচকে প্রাশিয়া। একমাত্র গ্রেট ব্রিটেন আর হ্যানোভার ছিল দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের মিত্রপক্ষ। আগত পঁচিশ বছর ধরে একের পর এক যুদ্ধে মগ্ন হয়ে রইলেন দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক।অগুন্তি লোক মরল, রাজ্যের পর রাজ্য ছারখার হল, অর্থনীতি ধসে পড়ল। দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক রাজত্ব শুরু করেছিলেন দুই মিলিয়ন প্রজা আর ১২০,০০০ বর্গ কিলোমিটারের ছিন্নভিন্ন স্বভূমি দিয়ে, চোখ বুজেছিলেন যখন তখন প্রাশিয়া ১৯৫,০০০ বর্গ কিলোমিটার আর ছয় মিলিয়ন প্রজা সম্বলিত ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দেশ।

দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের বীরত্ব নিয়ে অনেকরকম লিজেন্ড প্রচলিত আছে। শত অনিচ্ছেতেই হোক আর বাবার চাপে পড়েই হোক, যুদ্ধটা করতে তিনি শিখেছিলেন। ফ্রেডেরিক সর্বদা নিজে সামনে থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন। কথিত আছে যুদ্ধ চলাকালীন ফ্রেডেরিককে পিঠে নেওয়া অবস্থায় ছ’ছটি ঘোড়া গুলি খেয়ে মরেছিল। আবার অন্য রকম সাক্ষ্যও আছে। ইতিহাস বলে যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর একাধিকবার সেনাদল ছেড়ে চলে গেছেন ফ্রেডেরিক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মৌন হয়ে বসে কঞ্চি দিয়ে মাটিতে আঁক কেটেছেন। এখন আমরা একে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস বলে বাবাবাছা করি, তখন একজন রাজার পক্ষে এর থেকে বড় কাপুরুষতার পরিচয় আর কিছু হত না।


ইউরোপের ক্ষমতার লড়াইয়ে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া প্রাশিয়াকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে প্রধান শক্তির ভূমিকায় এনে দাঁড় করানোর পেছনে দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের অবদান অবিশ্বাস্য। চল্লিশ বছরের রাজত্বের গোড়ার দিকটা যুদ্ধবিগ্রহে কাটিয়ে শেষাংশ প্রাশিয়ার পুনর্গঠনে ব্যয় করেছিলেন তিনি। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, আইনব্যবস্থা---সবেতে দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের সুদক্ষ পরিচালনার ছাপ পড়েছিল। ট্যাক্সব্যবস্থা সংশোধন করেছিলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার কথা দিয়েছিলেন এবং সে কথা রেখেছিলেন, দেশ জুড়ে খাল কেটেছিলেন, শস্যের দাম কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, শস্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে ফসল খারাপ হলে চাষিদের অন্নসংস্থানের অভাব না হয়।

  
একা হাতে প্রাশিয়ার ভোল পালটে দিয়েছিলেন দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক---ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট। রাজ্যশাসনকে প্রজা এবং রাজার মধ্যে একটা চুক্তি হিসেবে দেখতেন তিনি। নিজেকে বলতেন, ফার্স্ট সারভেন্ট অফ দ্য স্টেট। ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটের হাত ধরে প্রাশিয়ার এই উত্থানের মধ্যেই বিংশ শতাব্দীর জার্মান ইতিহাসের বীজ লুকোনো ছিল বলে অনেকের ধারণা। ফাদারল্যান্ডের প্রতি ফ্রেডেরিকের একনিষ্ঠতা, প্রাশিয়াকে ইউরোপের সেরা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার তাঁর এই অদম্য বাসনার প্রতিফলন পড়েছিল হিটলার, বিসমার্ক জাতীয় নেতাদের ভাবনাচিন্তায়। হিটলারের ব্যক্তিগত হিরো ছিলেন ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট। তাঁর ঘরের দেওয়ালে ফ্রেডেরিকের ছবি সসম্মানে টাঙানো থাকত। তবে একলব্যের ছিরি দেখে দ্রোণাচার্যের বিচার করতে যাওয়াটা আমার মতে অন্যায় হবে। হিটলার শুধু ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটের জাত্যাভিমানটাই দেখেছিলেন, রাজ্যশাসনে তাঁর সহনশীলতা, প্রজামনস্কতার দিকটা অন্ধের মতো এড়িয়ে গিয়েছিলেন। ভুলে গিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত বিশ্বাসে নাস্তিক হলেও ধর্মের প্রতি সহনশীলতা ছিল ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটের মূল নীতি। ইহুদিদের প্রতি ফ্রেডেরিক যে খুব সদয় ছিলেন তা নয়, কিন্তু সমকালীন শিক্ষায়, বিজ্ঞানে, বাণিজ্যে ইহুদিদের অবদানটাও তাঁর স্মরণে ছিল। পোল্যান্ড ইত্যাদি দেশের সীমানায় বসবাসকারী বণিক ইহুদিরা ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটের উৎসাহ এবং সুরক্ষা দুই-ই পেয়েছিল। একদিক থেকে দেখতে গেলে “জার্মান শ্রেষ্ঠত্বের” বোধ হিটলারের থেকে কোটিগুণ বেশি ছিল ফ্রেডেরিকের মধ্যে। জার্মানিকে (তৎকালীন প্রাশিয়া) বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যা যা করার দরকার, যাদের যাদের সঙ্গে হাত মেলানো দরকার---সব করতে রাজি ছিলেন ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট। তাদের ধর্ম, জাতি, গায়ের রং ইত্যাদি নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় ছিল না তাঁর।


পৃথিবীতে মিলিটারি জিনিয়াসদের নিয়ে যে কটা টপ টেন লিস্ট তৈরি হবে, তাতে ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটের নাম জ্বলজ্বল করবে আরও অনেকদিন। ফ্রেডেরিকের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে আরও অনেকদিন ইতিহাস লড়ে যাবে। ফ্রেডরিকের চরিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে ফরেনসিক কাটাছেঁড়া চলবে, আসলে তিনি কী? জার্মান সুপ্রিমেসির প্রবক্তা, যুদ্ধবাজ সম্রাট, নাকি প্রজাবৎসল দক্ষ শাসক?

কিন্তু সব কাটাছেঁড়া পেরিয়েও যে প্রশ্নটা জ্বলজ্বল করবে তা হল, ফ্রিৎজ নামের সেই ছেলেটার কী হল। সেই কবিতা পড়া, বাঁশি বাজানো ছেলেটা? রাজার ঘরে জন্মেও যে নিজে একটাও যুদ্ধ করতে চায়নি, সমস্ত রাজনীতি, কূটনীতির ঘোলাজল এড়িয়ে যে হানসের সঙ্গে অনেক দূরে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল, সেই ছেলেটার কানাকড়িও কি বেঁচে ছিল পরমপ্রতাপশালী সম্রাট ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটের মধ্যে?


ছিল। এত যুদ্ধের পরেও দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক বাঁশি বাজাতে ভোলেননি। প্রায় একশোখানা সোনাটা রচনা করেছিলেন তিনি আর চারখানা সিম্ফনি। বাখ ছিলেন ফ্রেডেরিকের সভাকবিদের অন্যতম। রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের মতো দার্শনিক-সম্রাট হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। এনলাইটেন্‌ড্‌ অ্যাবসলিউটিজম্‌ মার্কা জলদগম্ভীর বিষয় নিয়ে ভলতেয়ারের সঙ্গে দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের চিঠিপত্রে নিয়মিত আলোচনা, ঝগড়াঝাঁটি চলত। জার্মান ছাড়াও ইংরিজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ইত্যালিয়ান ইত্যাদি ভাষা বলতে পারতেন তিনি।

কবিতা, সংগীত, দর্শন এসব ছাড়াও রাজা আরেকটি জিনিসকে মন দিয়ে ভালোবাসতেন---নিজের জন্মের শহর বার্লিনকে। দাদু প্রথম ফ্রেডেরিকের প্রতিষ্ঠা করা প্রাশিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস (বার্লিন অ্যাকাডেমি) তখন লন্ডন, প্যারিসের নতুন নতুন গজিয়ে ওঠা অ্যাকাডেমির ছটায় ম্লান হয়ে গেছে। দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক কোমর বেঁধে নামলেন বার্লিন অ্যাকাডেমির হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য। ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে আজীবন যুদ্ধ করলে কী হবে, ফ্রেঞ্চ ভাষা না শিখলে যে সমসাময়িক দর্শন-বিজ্ঞান-ধর্ম ইত্যাদি অধরা রয়ে যাবে সে বুদ্ধি তাঁর মাথায় খেলেছিল। ফ্রেঞ্চকে অ্যাকাডেমির অফিশিয়াল ভাষা ঘোষণা করা হল, আর দর্শন হয়ে উঠল অ্যাকাডেমির গবেষণার প্রধান থিম। ইম্যানুয়েল কান্টের মতো দার্শনিক অ্যাকাডেমির সদস্য ছিলেন।

রাজত্বকালে বার্লিনের সৌন্দর্যবৃদ্ধির খাতিরে অনেকগুলো প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট। তাদের মধ্যে কিছু কিছু, যেমন বার্লিন স্টেট অপেরা, রয়্যাল লাইব্রেরি, সেন্ট হেজউইগ’স ক্যাথিড্র্যাল ইত্যাদি এখনও স্বমহিমায় বর্তমান। কিন্তু নিজের মনের মতো প্রাসাদটা রাজা বানিয়েছিলেন শহরের বাইরে, পট্‌স্‌ডামে।


পট্‌স্‌ডামের কথা মনে আছে, সেই যেখানে ফ্রিৎজের পূর্বপুরুষরা শিকারশিকার খেলতে যেতেন? ফ্রিৎজের বাজখাঁই বাবা ফ্রেডেরিক উইলিয়াম সেখানে নিজের থাকার জন্য ছোট একটা বাড়িও বানিয়েছিলেন। ফ্রিৎজ রাজা হয়ে সেখানে নিজের সামার প্যালেস বানাল। ফ্রান্সের ভার্সাই প্যালেস আছে, জার্মানিরই বা কেন থাকবে না? সতেরশো চুয়াল্লিশ সালে, বাল্‌ড্‌ মাউন্টেন নামের স্থানীয় এক ছোট পাহাড়ের গায়ে এক ভাইনইয়ার্ড বপনের আদেশ দিলেন ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট। সেই ভাইনইয়ার্ডের বিস্তৃত নির্জনতার মধ্যে তৈরি হল সাঁ-সুসি (Sans-souci: Sans অর্থ ‘শূন্য’ বা ‘হীন’ আর Souci অর্থ দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা। দুইয়ে মিলিয়ে দুশ্চিন্তাহীন, দুর্ভাবনাহীন) প্রাসাদ। সামারের ক’টা দিন রাজকার্যের সমস্ত ভাবনাচিন্তামুক্ত হয়ে এই প্রাসাদে এসে কাটাবেন, এই স্বপ্ন ছিল ফ্রেডেরিকের।

ভার্সাইয়ের অনুকরণে সাঁ-সুসি বানানোর কথা মুখে বলেছিলেন বটে ফ্রেডেরিক, কিন্তু হাড়েমজ্জায় সাঁ-সুসি ভার্সাইয়ের থেকে যতখানি আলাদা হওয়া সম্ভব ততখানিই আলাদা। ভার্সাই বিলাসের প্রতীক, সাঁ-সুসি নির্জনতার; ভার্সাইয়ে ঘরের সংখ্যা দু’হাজার একশো তিপ্পান্ন, সাঁ-সুসির ঝাড়াঝাপটা একতলা কাঠামোর দুদিকে পাঁচ-পাঁচ করে মোটে দশটা ঘর; ভার্সাইয়ের চোখধাঁধানো বারক স্টাইল স্থাপত্যের বদলে সাঁ-সুসির শান্ত, ভাবুক রোকোকো। যদিও প্রাসাদ বানানোর সময় নামজাদা স্থপতিদের কাজে লাগিয়েছিলেন ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট, কিন্তু প্রাসাদের বিন্যাস আর সজ্জায় সম্রাটের ব্যক্তিগত পছন্দঅপছন্দ এতখানিই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে সাঁ-সুসি প্রাসাদের স্থাপত্যকে ‘রোকোকো’ না বলে ‘ফ্রেডেরিকিয়ান রোকোকো’ বলেই ডাকে সবাই।


সাঁ-সুসি ছিল ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটের আত্মার মুক্তি, প্রাণের আরাম। রাজকার্য থেকে ছুটি পেলেই ফ্রেডেরিক সেখানে গিয়ে দর্শনচর্চা করতেন আর বাঁশি বাজাতেন। রাজার সামার প্যালেস হিসেবে সাঁ-সুসি যে খুব একটা প্র্যাকটিক্যাল হয়নি সেটা অচিরেই বোঝা যেতে লাগল। সকলেই বলল এবার প্রাসাদের কিছু পরিমার্জন করা হোক, ঘরের সংখ্যা বাড়ানো হোক, বাইরের দেওয়ালের পলেস্তারা চটে যাচ্ছে—সেগুলো সারানো হোক, ফ্রেডেরিক কোনও কথায় কান দিলেন না। বললেন, কোনও দরকার নেই। সাঁ-সুসি আমি আমার জন্য বানিয়েছি, আমার সঙ্গে সঙ্গেই ও-ও মরবে।


রাজা ফ্রেডেরিক কবেই মরে ভূত হয়ে গেছেন, সাঁ-সুসি এখনও বহাল তবিয়তে বর্তমান আছে। তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে রাজপরিবারের বংশধরেরা সাঁ-সুসিকে সাজিয়েছে গুছিয়েছে, যত্ন করেছে। তারই ফলে আজ সাঁ-সুসি ইউনেসকোর বিশ্ব হেরিটেজ সাইটের অন্যতম। বছরের একটা দিন সাঁ-সুসির গেট খুলে দেওয়া হয় সাধারণের জন্য, প্রাসাদকে আলোয় আলোয় সাজিয়ে তোলা হয়, ছেলেবুড়োনারীপুরুষ সবাই বারক আমলের মত ধড়াচূড়া পরে পার্কে ঘোরাঘুরি করে। এ’বছরের সাঁ-সুসি নাইটের সময় কপালগুণে আমরা বার্লিনে ছিলাম, তাই আমাদেরও সাঁ-সুসি দর্শনের সৌভাগ্য হয়েছিল। ঘণ্টা চারেক ধরে বিরাট বাগানের নুড়ি বেছানো পথে হেঁটে হেঁটে, আপাদমস্তক অচেনা লোকেদের ছবি তুলে (তাঁরা একটুও আপত্তি করছিলেন না, বরং থেমে পোজ দিচ্ছিলেন), ব্রাটউয়র্স্ট, নিউটেলা ক্রেপ (আসল কথাটা অবশ্য ক্রেপ নয়, “খেপ”) আর কাগজের তিনকোণা ঠোঙায় করে আলুভাজা খেয়ে বেড়ালাম।


রাজা বেঁচে থাকতেই তার যত কেরামতি, মরে গেলে সে আমার আপনার মতোই নিড়বিড়ে, অসহায়। সতেরশো ছিয়াশি সালের সতেরই অগস্ট, সাঁ-সুসি প্রাসাদের স্টাডির আরামকেদারায় বসে, চুয়াত্তর বছর বয়সে নিঃসঙ্গ, নিঃসন্তান সম্রাট ফ্রেডরিক দ্য গ্রেট শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সমস্ত দাপট হাওয়ার মত উবে গেল। সারাজীবন কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজের মৃত্যু নিয়ে অনেক ভেবেছিলেন ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট। স্পষ্ট কথায় নিজের ইচ্ছে প্রকাশ করে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে সাঁ-সুসির মাটিতে কবর দেওয়া হয়, তাঁর প্রিয় গ্রেহাউন্ডের কবরের ঠিক পাশে। উইদআউট পম্প, উইদআউট স্প্লেন্‌ড্‌র, অ্যাট নাইটফল। সম্রাটের সে ইচ্ছেকে কাঁচকলা দেখিয়ে তাঁর ভাইপো, নতুন রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক উইলিয়াম আদেশ দিলেন রাজকীয় মর্যাদায় সম্রাটকে পট্‌স্‌ডামের গ্যারিসন চার্চের মাটিতে কবর দেওয়া হোক, প্রথম ফ্রেডেরিক উইলিয়ামের কবরের ঠিক পাশে।

প্রথম ফ্রেডেরিক উইলিয়াম, অর্থাৎ ফ্রিৎজের বাবা। যে বাবার হাত থেকে আজীবন পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছে ফ্রিৎজ, আর বারবার ব্যর্থ হয়েছে। মৃত্যুর পরে সেই বাবার কাছে এসেই কি না আত্মসমর্পণ করতে হল?


গল্প এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত, কিন্তু নিয়তির কথা ভুলে গেলে চলবে না। যখন মনে হচ্ছে এইবার অভিনয় শেষ, দর্শকেরা উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে, স্টেজের দু’দিক থেকে পর্দা এগোতে শুরু করেছে, ঠিক তক্ষুনি নিয়তি উইং-এর পাশ থেকে, “আবার সে এসেছে ফিরিয়া” বলে একগাল হেসে বেরিয়ে আসবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মিত্রপক্ষের বোমার হাত থেকে গৌরবময় জার্মান ইতিহাসকে বাঁচাতে হিটলার আদেশ দিলেন বাবা ছেলে দু’জনের কফিনকেই গ্যারিসন চার্চ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বার্লিনের কাছের এক আন্ডারগ্রাউন্ড বাংকারে রাখতে। উনিশশো পঁয়তাল্লিশের সাতাশে এপ্রিল অ্যামেরিকান আর্মি সে কফিন খুঁজে পেল। আরও পাঁচটা নাৎসি ট্রেজারের সঙ্গে তারা সেটা সযত্নে তুলে এনে রাখল মারবুর্গ প্রাসাদের বেসমেন্টে। সেখান থেকে দুই রাজার কফিনই ফের স্থানান্তরিত হল স্টুটগার্টের কাছে বুর্গ হোহেনজোলেন নামের দুর্গে। এই হোহেনজোলেনই হচ্ছে ফ্রেডেরিকদের আদি বংশ। যেখান থেকে ফ্রিৎজের দাদু প্রথম ফ্রেডেরিকের উত্থান শুরু হয়েছিল। পিতৃপুরুষের ভিটেয় বাবা আর ছেলের কংকাল পাশাপাশি চুপ করে শুয়ে রইল।

রাইন দিয়ে কত জল বয়ে গেল, দেওয়াল উঠল, দেওয়াল ভাঙল। উনিশশো নব্বই সালে জার্মানি এক হল। যুদ্ধের ক্ষত তখন মিলিয়ে এসেছে, অবিভক্ত জার্মানি আবার বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য তৈরি। এমন সময় আর কে জার্মানির রোলমডেল হতে পারেন, ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট ছাড়া? উনিশশো একানব্বই সালের সতেরোই অগস্ট, মৃত্যুর দু’শো পাঁচ বছর পরে ফ্রেডরিক দ্য গ্রেটের কফিনকে হোহেনজোলেনের বিস্মৃত কবর থেকে তুলে এনে, ডানামেলা ঈগলের ছবি আঁকা প্রাশিয়ান পতাকায় মুড়ে, সসম্মানে শায়িত করা হল সাঁ-সুসির মাটিতে।

ফ্রিৎজ বলেছিল, “Quand je serai là, je serai sans souci”, Once I am here, I shall be carefree. ওর একটা ইচ্ছে অন্তত পূর্ণ হয়েছে।


*****

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ গুগ্‌ল্‌
  

August 26, 2013

দু'সপ্তাহে



যদি জিজ্ঞাসা করেন গত দু’সপ্তাহ কী এমন রাজকার্যে কেটেছে যে অবান্তরে নিয়মিত পোস্ট লিখে উঠতে পারিনি, তাহলে তার উত্তর দেওয়া শক্ত হবে। মানছি কাজ ছিল, কিন্তু কাজের ফাঁকে সময়ও ছিল। সে সময়ের খানিকটা রাস্তায় ঘুরে, বইয়ের দোকান ঘেঁটে, হামবুর্গে এয়ারবাসের কারখানায় ইন্ডিগোর এরোপ্লেন তৈরি হতে দেখে, চলন্ত বাসে পাকিস্তানি সহকর্মীর সঙ্গে “যব কোই বাত বিগড় যায়ে” ডুয়েট গেয়ে, ট্রেনভর্তি সামান্য মাতাল ফুটবল ফ্যানেদের মাঝে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে বসে কেটে গেল। এত রকম ভালো জিনিসের মধ্যে আরও ভালো বাছা শক্ত, তবু তিনটে অভিজ্ঞতার প্রতি পার্শিয়ালিটি না দেখিয়ে পারলাম না।

১. অনেকদিন আগে একদিন বিকেলে কী খাই কী খাই করছিলাম, ঠাকুমা এক বাটি মুড়িবাতাসা এনে দিয়ে বলেছিলেন, “খা।” হাক্কা চাউমিন থেকে শুরু করে মোগলাই---নানারকম মাল্টিকুইজিন টিফিন খাওয়ার অভিজ্ঞতাই আমার হয়েছে তখন, কিন্তু সেদিনের সেই মুড়িবাতাসার চমকটা আজও ভুলতে পারিনি। এত সরল একটা ব্যাপার যে এত ভালো হতে পারে, সেটা কেন যেন আন্দাজই করতে পারিনি।

বছর কুড়ি আগে মুড়িবাতাসার বাটির প্রতি যে প্রতিক্রিয়াটা দেখিয়েছিলাম, গত দু’সপ্তাহে অফিসের হপ অন হপ অফ লিফট দেখে অবিকল সেই প্রতিক্রিয়াটা বেরিয়ে এল। আজকাল এই বহুতলের বাজারে অগুন্তি লিফটে চড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। বড়মাসির বেহালার ধুধ্‌ধুড়ে সরকারি ফ্ল্যাটের “হেঁইয়ো” বলে টেনে বন্ধ করা জং ধরা কোলাপ্‌সিব্‌ল্‌ গেটওয়ালা লিফট থেকে শুরু করে মহার্ঘ মলের কাঁচের লিফট---সারা শহরের ধুলো, ঘাম, মধ্যবিত্তপনাকে কাঁচকলা দেখিয়ে শন্‌শন্‌ করে স্বর্গের দিকে উড়ে চলেছে।

হপ অন হপ অফ লিফ্‌টের নখের যোগ্য নয় এদের একটাও।



হপ অন হপ অফ লিফটের প্রক্রিয়াটা এতই সরল যে প্রথমটা দেখলে বিশ্বাস হয় না। মনে হয় ম্যাজিক। হপ অন হপ অফের দ্বিতীয় এবং মুখ্য আকর্ষণটা রয়েছে এর উদাসীনতায়। আমি আমার মতো উঠছিনামছি, কারও ইচ্ছে হলে আমার সঙ্গে আসবে, নয়তো আসবে না। বয়েই গেল। দরজা নেই, বোতাম নেই। অফিসে লেট হয়ে গেলেও দূর থেকে গজেন্দ্রগমনে হেঁটে আসা সহকর্মীকে দেখে বিনীত হেসে লিফটের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকার পিত্তি-জ্বালানো ভদ্রতার দায় নেই। টপ ফ্লোরে অফিস হলে লিফটে ঢুকে আমার আগের প্রতিটি ফ্লোরের বোতাম জ্বলতে দেখার হতাশা নেই। হপ অন হপ অফ কারও জন্য অপেক্ষা করে না, কারও জন্য ছোটে না।

গত দু’সপ্তাহে প্রাণ ভরে হপ অন হপ অফ চড়ে নিয়েছি। পাঁচতলা সাততলা উঠতে নামতে তো বটেই, মাঝে মাঝে কফি ব্রেকে এসে এমনি এমনিও চড়েছি। আমাদের জার্মান সহকর্মীরা প্রথমটা এ ব্যাপারে আমাদের উৎসাহ দেখে থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন। এমন জিনিস হাতের সামনে থাকতে তাঁরা দু’বেলা মুখব্যাজার করে পাশের আধুনিক লিফট ব্যবহার করছেন। আমাদের পাল্লায় পড়ে বহুদিন বাদে ক্রিশ্চিয়ান হপ অন হপ অফে চড়ল। আর স্বীকার করল যদিও ও তলিয়ে ভেবে দেখেনি অনেকদিন, তবে ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে ফান্‌। গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না বোধহয় একেই বলে।  

২. হামবুর্গের পোর্ট দেখতে বেরিয়ে লঞ্চের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে নদীর হাওয়া খাচ্ছি, এমন সময় ইন্দোনেশিয়ার কুসুমওয়র্ধনে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “কুন্তলা, সিং উইথ মি।”

মিষ্টি হেসে, “আমার তো কোনও ইন্দোনেশিয়ান সং জানা নেই ভাই” বলতে যাব, অমনি দেখি দুই হাত শরীরের দু’পাশে ছড়িয়ে দিয়ে চোখ বুজে সে গান ধরেছে।

“তুম পাস আয়ে, ইয়ুঁ মুসকুরায়ে/ তুম নে না জানে কেয়া সপনে দিখায়ে/ অব তো মেরা দিল, লা লা লা লা লা, কেয়া করুঁ হায়-এ-এ/ কুছ কুছ হোতা হ্যায়।”

ফেলুময়রার দশটাকা পিস রসগোল্লা একবারে মুখে পোরার উপযুক্ত হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না। শকের অবশ্য সেই সবে শুরু। ততক্ষণে গানের আওয়াজ পেয়ে কুসুমওয়র্ধনের দেশোয়ালি ভাইবোনেরা ডেকের এদিকওদিক থেকে ছুটে এসেছে। “তুম পাস আয়ে” শেষ করে সদলবলে তারা “কোই মিল গয়া” গেয়ে এবং নেচে দেখাল। ততক্ষণে ডেক উপচে পড়ছে দর্শকের ভিড়ে। নাচ শেষ হতে কানফাটানো হাততালি, মুখের কাছে দুই হাত জড়ো করে কেউ কেউ চেঁচাল, “বলিউড...বলিউড...শাহরুখ খান...”

আর কোনওদিন শাহরুখ খানকে নিয়ে হাসব না। আমি তো শুধু হেসেই খালাস, এদিকে ভদ্রলোক যে বিশ্বের দরবারে দেশের নাম কী পরিমাণ রোশন করেছেন সে খবর কে রাখে।

নাচাগানাহল্লাহাটি শেষ হতে আবার নদীর দিকে মুখ ফিরিয়ে ঢেউ গুনছি, এমন সময় শুনি একটু দূরে গুণমুগ্ধ জটলার মধ্যে দাঁড়িয়ে কুসুমওয়র্ধনে ভয়ানক সিরিয়াস মুখ করে বলছে, “ইন্ডিয়ান পিপ্‌ল্‌ লা-আ-আ-আ-আ-ভ সিংগিং অ্যান্ড ড্যান্‌সিং।”


উৎস গুগল ইমেজেস

৩. দেশের বাইরে মজার অর্ধেক গল্পই দেশসংক্রান্ত। তিননম্বর গল্পটাও দেশ নিয়ে, আর এই গল্পটাই আমার ফেভারিট। সারাদিনের পাড়াবেড়ানো শেষ করে হা-ক্লান্ত পায়ে হেঁটে হেঁটে হোটেলে ফিরছি, এমন সময় চিনের গং পেছন থেকে ছুটে এসে আমার কাঁধ টেনে ধরে রাস্তার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “ও মাই গড, আই নো দেম।”

ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি গং-এর তর্জনী আমার পায়ের দিকে তাক করা।

“আই হ্যাভ দোজ্‌ এক্স্যাক্ট শুস্‌!!!...”

এবার আমার লাফিয়ে ওঠার পালা।

“বাটা শুস্‌? হাউ?!”

শুনি মহিলা সাড়ে তিনবছর নতুনদিল্লির চিনা এমব্যাসিতে কাটিয়েছেন, অজন্তাইলোরা ভ্রমণ করে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছেন, পনেরোই আগস্টে শাড়ি পরে সকলের হাততালি কুড়িয়েছেন এবং কনট প্লেস থেকে নিয়মিত বাটার জুতো কিনে পরেছেন।

আমি আর গং মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বাটা বন্দনা করতে লাগলাম।

“ইজ ইট অ্যান ইন্ডিয়ান কোম্পানি?”

“উঁহু, বাটা আসলে এম এন সি। ইন ফ্যাক্ট বাটা এ তল্লাটেরই জিনিস। কিন্তু ইন্ডিয়ার লোকেরা ভুলেই গেছে যে এটা আসলে বিলিতি ব্র্যান্ড।”

আমার সব ক্লান্তি নিমেষে ধুয়েমুছে গেল। সিংগিং অ্যান্ড ড্যানসিং-এর কথা জানি না, কিন্তু ইন্ডিয়ান পিপ্‌ল্‌ রিয়েলি লাভ বাটা। অন্তত আমি তো বটেই। হাঁটা মানে বাটা।


August 24, 2013

সাপ্তাহিকী



উৎস গুগল ইমেজেস

I asked the Zebra,
are you black with white stripes?
Or white with black stripes?
And the zebra asked me,
Are you good with bad habits?
Or are you bad with good habits?
Are you noisy with quiet times?
Or are you quiet with noisy times?
Are you happy with some sad days?
Or are you sad with some happy days?
Are you neat with some sloppy ways?
Or are you sloppy with some neat ways?
And on and on and on and on and on and on he went.
I’ll never ask a zebra about stripes...again.

                                                                                                        ---Shel Silverstein

একদা ইকনমি ক্লাস।






ইয়ো ইয়ো হানি সিংগ

এ সপ্তাহের গান। অরুণা ইরানি এত সুন্দরী ছিলেন?

বার্লিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবান্তর এ’কদিন গোহারা হেরেছে। কিন্তু বার্লিন শেষ, এবার আবার বন-বাসে যাওয়ার পালা। আশা করি আবার নিয়মিত পোস্ট লেখার দিন ফিরবে। টা টা।
   
 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.