September 30, 2013

কবির কণ্ঠে কবিতা







THE NAMING OF CATS 
by  T. S. Eliot

The Naming of Cats is a difficult matter,
It isn’t just one of your holiday games;
You may think at first I’m as mad as a hatter
When I tell you, a cat must have THREE DIFFERENT NAMES.
First of all, there’s the name that the family use daily,
Such as Peter, Augustus, Alonzo or James,
Such as Victor or Jonathan, George or Bill Bailey –
All of them sensible everyday names.
There are fancier names if you think they sound sweeter,
Some for the gentlemen, some for the dames:
Such as Plato, Admetus, Electra, Demeter –
But all of them sensible everyday names.
But I tell you, a cat needs a name that’s particular,
A name that’s peculiar, and more dignified,
Else how can he keep up his tail perpendicular,
Or spread out his whiskers, or cherish his pride?
Of names of this kind, I can give you a quorum,
Such as Munkustrap, Quaxo, or Coricopat,
Such as Bombalurina, or else Jellylorum-
Names that never belong to more than one cat.
But above and beyond there’s still one name left over,
And that is the name that you never will guess;
The name that no human research can discover –
But THE CAT HIMSELF KNOWS, and will never confess.
When you notice a cat in profound meditation,
The reason, I tell you, is always the same:
His mind is engaged in a rapt contemplation
Of the thought, of the thought, of the thought of his name:
His ineffable effable
Effanineffable
Deep and inscrutable singular Name.


September 29, 2013

ক্যাথরিন



ভদ্রমহিলাকে আগেই দেখেছি। চেহারা দেখে বুঝেছি ককেশিয়ান, ইংরিজি শুনে বুঝেছি এদিককার লোক। হাবভাব অবশ্য এদিককার লোকের মতো নয় খুব একটা। জার্মান বলতেই যে ছবিটা মনের মধ্যে জাগে---ঘড়ির কাঁটার তালে তালে প্যারেড করে হাঁটছে একদল লোক---এই মহিলা কোনওভাবেই সেই দলে পড়েন না। সকালে যখন কোনওমতে নাকেমুখে কর্নফ্লেক্স গুঁজে ছুটে বেরোই তখন দেখি কিচেন আর টেরাসের মাঝখানের দেওয়ালজোড়া জানালাটার সামনে বসে উদাসমুখে তিনি দূরের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে আছেন। সামনের টেবিলে পাঁউরুটি, মিনিমাম দু’রকমের জ্যামের শিশি, এককাঁদি কলা ইত্যাদি থরে থরে সাজানো। সন্ধ্যেবেলা ফিরে দেখি তিনি স্টোভের সামনে ধ্যানস্থ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনখানা বার্নারে তিনরকমের পাত্র চাপানো। কোনওটায় টগবগ করে কিছু ফুটছে, কোনওটার চাপা দেওয়া মুখের ভেতরে না জানি কি রহস্য গুমেগুমে সেদ্ধ হচ্ছে, আর কোনওটায় তেলের মধ্যে চড়বড়িয়ে ভাজা হচ্ছে সসেজ কিংবা মাংসের প্যাটি। সব মিলিয়ে সুগন্ধ যা বেরিয়েছে, অবাক লাগে অফিসে বসেই সেটা নাকে আসেনি কেন।

খাওয়াদাওয়ার বহর দেখে হিংসেতেই হোক বা আর যে কারণেই হোক, মহিলাকে দেখে আমি বিশেষ ইমপ্রেসড হইনি। ব্যস্ততাকে আমি ভয়ানক গুরুত্ব দিই, সারাশরীরে ঊর্ধ্বশ্বাস তাড়াহুড়োর ছাপ না থাকলে সন্দেহ হয়, কী জানি, এত দামি মনুষ্যজন্মের যথার্থ ইউটিলাইজেশন হচ্ছে না নির্ঘাৎ। চারদিকে ফেলে ছড়িয়ে নষ্ট হচ্ছে। করিডরে মুখোমুখি পড়ে গেলে মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে “হালো” বলেছেন, ভাব দেখে মনে হয়েছে কথা বলার সময় দেদার আছে হাতে, আমি একমিনিট দাঁড়ালেই বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলবেন। কিন্তু আমি হাঁটার গতি একবিন্দু না কমিয়ে মাপা হেসে বিড়বিড়িয়ে “হ্যালো” বলে পিঠটান দিয়েছি। অ্যালিসিয়া, টেরেসা আর থিয়াগোও থাকে আমার বাড়িতে। তিনজনের মুখেই শুনেছি, “হ্যাভ ইউ মেট ক্যাথরিন? শি ইজ সো নাইস।”

মিটিং সেই হল, কিন্তু যারপরনাই বেকায়দায়। পৃথিবীতে সবথেকে খারাপ লাগার কাজের লিস্টে আমার প্রথম তিনে পড়ে সুটকেস গোছানো। অখাদ্য, জঘন্য, যমের অরুচি। তাই প্রতিবার সে কাজটাকে ঠেলতে ঠেলতে শেষমুহূর্তে পাঠাই। শনিবার সকাল দশটায় বাড়ি ছাড়ার কথা, আমি ব্যাগ গোছাতে শুরু করলাম শুক্রবার রাত আটটায়। পরিণতি যথারীতি মাথাগরম, টেনশন, প্যানিক। ঘরের সমস্ত জিনিস যখন মাটিতে ছত্রাকার, হাঁ করা পাতালের গহ্বরের মতো সুটকেসটা আমার দিকে তাকিয়ে ছেতরে পড়ে আছে, আর ঘড়ি ছুটছে ঘোড়ার মতো---তখন হঠাৎ আমার মনে হল এক্ষুনি ডিনার খেতে না পারলে স্রেফ মরে যাব। বাইরে যাওয়ার টাইম নেই, অগত্যা রন্ধনই ভরসা। তাছাড়া ফ্রিজ খালি করার ব্যাপারও আছে।

গোছানো ফেলে পাস্তা, টমেটো, ক্যাপসিকাম, কুচোচিংড়ির প্যাকেট হাতে নিয়ে আমি রওনা দিলাম ক্যাথরিনের সাম্রাজ্যের রান্নাঘরের দিকে। একটা পাত্রে জল গরম বসালাম...অন্য পাত্রে তেল ঢেলে একটা রসুন থেঁতলে ফেলে দিলাম তার মধ্যে...টাইম নেই...আঁচ বাড়িয়ে গনগনে হাই...লাল রঙের কাটিংবোর্ড পেতে পেঁয়াজ কাটছি...ক্যাপসিকাম কুচোচ্ছি...ওদিকে জল গবগবিয়ে ফুটছে...পাস্তার প্যাকেটটা আবার কোথায় গেল...ভগবান, কেন আমার সঙ্গেই এ’সব হয় ভগবান...ফোন বাজছে কি?...দৌড়ে ঘরে যাচ্ছি...হ্যালো ক্যামিলা...নো আই হ্যাভ নট স্টার্টেড...আই ডোন্ট নো হাউ আই উইল ফিনিশ এভরিথিং...আনাকে ফোন করে দেখি তো ওর কী অবস্থা...হ্যালো আনা?...ও মাই গড...আই হেট প্যাকিং...

আনার সঙ্গে কথোপকথনের ঠিক মাঝখানে কানফাটানো আওয়াজটা শুরু হল। পিঁ পিঁ পিঁ---মনে হচ্ছিল নরকের সবকটা প্রেশার কুকারে একসঙ্গে সিটি পড়তে শুরু করেছে। আমি ফোন হাতে মেঝের ওপর জমে গেলাম। পাশের একটা ঘর থেকে দড়াম করে দরজা খোলার শব্দ হল, কেউ একজন কাঠের বারান্দার ওপর দিয়ে দৌড়চ্ছে।

ক্যাথরিন আর আমি একই সঙ্গে পৌঁছলাম রান্নাঘরে। আমার তখনও হতভম্ব ভাব কাটেনি, ক্যাথরিন ছুটে গিয়ে চিমনি অন করল, গ্যাস নেভাল, ফটাফট্‌ জানালা খুলে দিল, একটা কিচেন টাওয়েল নিয়ে জোরে জোরে হাওয়া দিতে লাগল স্মোক ডিটেকটরটার নাকের ডগায়।

আওয়াজ থেমে গেল। ম্যাজিকের মতো।

ক্যাথরিন এতক্ষণে আমার দিকে তাকিয়েছে। আমি কান ধরে সোজা ওর পায়ে ডাইভ দেব বলে তৈরি হচ্ছিলাম, এমন সময় ক্যাথরিনের মুখে হাসি ফুটল।

দ্যাট ওয়াজ ফানি, নো?

তারপর দাঁড়িয়ে কত গল্প করল। জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি ফুড ব্লগার? বুঝলাম, কোনও একদিন ছাদে দাঁড়িয়ে পাগলের মতো অমলেটের ছবি তুলছি দেখে এই গুজবটা রাষ্ট্র হয়েছে। ভুল ভাঙাতে হল। বললাম যে আমি ফুড ব্লগার নই, কিন্তু ব্লগার বটে। ক্যাথরিনের সম্পর্কেও অনেক কথা জানা হল। অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি করার সময় অনেক ভারতীয় সহকর্মী ছিল নাকি ওর। তাদের বেশিরভাগই অ্যারেঞ্জড্‌ ম্যারেজ করেছে। ইজ ইট স্টিল আ বিগ থিং ইন ইন্ডিয়া? ঘাড় নাড়লাম আমি, ভেরি ভেরি বিগ।

পরদিন সকালে রওনা দেওয়ার সময় ক্যাথরিন বেরিয়ে এল। অ্যালিসিয়া আর আমার, দুজনের সুটকেসই সিঁড়ি দিয়ে নামাতে সাহায্য করল। কিছুতেই মানা শুনল না। অ্যালিসিয়া আর থিয়াগো দেখল নিজেদের প্রচুর বেঁচে যাওয়া খাবারদাবার ক্যাথরিনের দায়িত্বে দিয়ে যাচ্ছে। আমি শেষটায় লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই ফেললাম। একটা প্রায় নতুন অ্যাপ্রিকট জ্যামের শিশি আমার ফ্রিজের ভেতর রাখা আছে। যদি ও চায়...ক্যাথরিন শুনে এত খুশি হল যেন ক্লাস ফাইভের সোনাকে ক্যাডবেরি কিনে দিয়েছে সেজকাকু।

ফ্রাউ বার্শের বাড়ির মেনগেট থেকে বেরিয়ে আসার আগের মুহূর্তে ক্যাথরিন আমাকে বলল, আই উইশ উই হ্যাড মেট আরলিয়ার।

মি টু ক্যাথরিন, মি টু।


*****

কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, ব্যাগ গোছাচ্ছিলাম কেন? তার সোজা উত্তরটা হচ্ছে বন ছাড়ব বলে। আর শক্ত উত্তরটা দিতে গেলে একটু আগে থেকে বলতে হবে। খুব বেশি কাজের কথায় না গিয়ে এটুকু বলি, আমরা এখানে যে ট্রেনিংটায় এসেছি সেটার দুটো অংশ। এক অংশে শোনার কাজ প্রবল, অন্য অংশে লেখার ব্যাপার মুখ্য। অ্যাদ্দিন চলছিল শোনাশুনির পালা। সে পালা অবশেষে সাঙ্গ হয়েছে। এখন আমাকে মাথা চুলকে একখানা মিনি পেপার লিখতে হবে। সে পেপার লেখার আবার অনেক হাঙ্গামা। লেখার বিষয় বুঝে আমাদের ইউরোপের বিভিন্ন সংগঠনে পাঠানো হবে, যাতে লেখার সঙ্গে সঙ্গে সে সব সংগঠনের ভেতরের প্যাঁচপয়জারের সঙ্গে খানিকটা পরিচিতি ঘটে। তাছাড়া ছ’ অক্ষরের সেই সর্বশক্তিমান শব্দটি তো আছেই---নেটওয়ার্কিং।

এখানে আসার পরপরই সবাই যে যার পছন্দমতো ইন্‌স্‌টিটিউশনে নিজেদের নমুনা পেপার পাঠিয়ে হত্যে দিয়ে বসে ছিল। কবে ডাক আসে। ডাক আসতে শুরু করল মাসখানেক পর থেকে। একএক জনের ডাক আসে, সে খবর শুনে ক্লাসশুদ্ধু সকলে হাততালি দেয়, আন্তরিকভাবে খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরে “কনগ্র্যাচুলেশনস ডুড!” বলে, আর মনে মনে ভাবে আমার ডাক কবে আসবে। কাল সকালে আসবে কি?

একে একে ক্লাসের প্রায় অর্ধেক লোককে কনগ্র্যাচুলেট করার পর আমার সাহসে টান পড়তে শুরু করল। তাতিয়ানা আর জোহানেসের সঙ্গে যুক্তি করে আমি মোটে এক জায়গায় প্রোপোজাল পাঠিয়েছিলাম। উত্তরে এসেছে জমাটবাঁধা নিস্তব্ধতা। কফিরুমে, করিডরে---জোহানেসের সঙ্গে দেখা হলে আমার মুখটা আপনা থেকেই কাঁদোকাঁদো হয়ে যায়। জোহানেস আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে, ঘাবড়াও মৎ কুন্তলা, এখনও অনেএএএক সময় আছে। আর তাছাড়া এখন ভরা সামার, সকলে ভেকেশন কাটাতে ব্যস্ত। ফিরে এসেই তোমাকে ডাক পাঠাবে।

শুনে আমার গাপিত্তি রিরি করে জ্বলে। ইয়ার্কি হচ্ছে? এদিকে আমার ভয়ে রাতের ঘুম উড়ে যাচ্ছে, আর ওদিকে লোকজন সানস্ক্রিনের গামলায় ডুব দিয়ে উঠে রংবেরঙের ছাতার তলায় শুয়ে শুয়ে ভূমধ্যসাগরের ঢেউ গুনছে? নেহাৎ ক্ষমতা নেই তাই, না হলে আমি আইন করে দেশ থেকে সামার ভেকেশন তুলে দিতাম।

বার্লিন থেকে ফেরার পথে বাসে বসে টের পেলাম টেনশন, রাগ, গা-জ্বলুনি সব চলে গিয়ে বুকের মধ্যে পড়ে আছে স্রেফ বিশুদ্ধ ভয়। আর একটুখানি হতাশা। বাড়ি ঢুকে ব্যাগপত্তর এদিকওদিক ছুঁড়ে ফেলে ফোন আর ল্যাপটপ নিয়ে চিৎ হয়ে পড়লাম। কানের ভেতর রিং হচ্ছে, চোখের সামনে ইনবকস্‌ লোড হচ্ছে। ওদিক থেকে অর্চিষ্মান হাসিহাসি গলায় হ্যালো বলল, আর চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠল জোহানেসের নামের পাশে কালো বোল্ড অক্ষরে লেখা সাবজেক্ট লাইন---কন্‌গ্র্যাচুলেশনস কুন্তলা! হিয়ার ইউ গো!

অর্চিষ্মান যে আমার জন্য কতখানি পয়া, সেটা আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল।


প্রোজেক্ট স্টাডির বরাদ্দ সোয়া দু’মাস (ফোর উইক্‌স্‌ টেন ডেজ) কাটানোর জন্য আপাতত আমি প্যারিসে। ট্রেনে বসেই বুদ্ধি খাটিয়ে প্যাডের সাদা পাতায় বড় বড় করে বাড়ির ঠিকানা লিখে রেখেছিলাম, ট্যাক্সিওয়ালার চোখের সামনে ধরতেই সোজা নিয়ে এল। মাঝখানে বারান্দা, চারদিকে বাড়ি। আমার বাড়িওয়ালির প্রতিনিধি আমার থেকে বয়সে ছোট, নাম ওয়াফা। ফোনে বুঝেছিলাম গলা মিষ্টি, আলাপ করে বুঝলাম মেয়েটিও ভয়ানক মিষ্টি। ঘরবাড়ি বুঝিয়ে, তালাচাবি শিখিয়েপড়িয়ে, আমাকে নিয়ে গিয়ে সুপারমার্কেট আর ফোনের দোকান দেখিয়ে দিল। সুপারমার্কেটে অভিজ্ঞতা ভালোই, কেবল একবার একজন দয়ালু দেখতে মহিলাকে জিজ্ঞাসা করতে হয়েছিল, রিডিউস্‌ড্‌ ফ্যাট দুধের বোতলের গায়ে কী লেখা থাকবে। আর কাউন্টারে এসে “Sac, S’il vous plait” একটানা বলতে গিয়ে সামান্য হোঁচট খেয়েছিলাম। ব্যস।


শহর নিয়ে লাফালাফি করাটা চরম ছেলেমানুষি জানি, তা সত্ত্বেও প্যারিসে আসা নিয়ে উত্তেজিত ছিলাম সেটা স্বীকার না করে উপায় নেই। ইউটিউবে অ্যান্থনি বোর্ডেনের প্যারিস সংক্রান্ত এপিসোডগুলো একধারসে দেখে ফেলেছি, 'থিংস টু ডু ইন প্যারিস' সার্চ করে করে আঙুলে কড়া পড়ে গেছে। এত সার্চ করে লাভ যে খুব কিছু হয়েছে তা নয়। কখনওই হয় না। শেষ পর্যন্ত মানুষের মুখের কথার থেকে ভালো আর কি কিছু হয়, না হতে পারে?

তাই আপনাদের দ্বারস্থ হচ্ছি। কী কী করার, দেখার, ঘোরার, খাওয়ার জিনিস আছে এ শহরে, সে সম্পর্কে যত পারেন সাজেস্‌শন দিন। আমি ভালো ছাত্রীর মতো সব টুকে রাখব। তারপর টিক মেরে মেরে সিলেবাস কমপ্লিট করব। অন্তত কমপ্লিট করার চেষ্টা করব কথা দিচ্ছি।

   
              

September 28, 2013

সাপ্তাহিকী



আলোকচিত্রী Valeria Schettino

The best fighter is never angry.
                                                                                                            ---Lao Tzu

মুখস্থবিদ্যা কি সত্যিই মহাবিদ্যা?

কেউ যদি বেশি খাও, খাওয়ার হিসেব নাও।





সেদিন আমিও ভাবছিলাম, আর ইচ্ছাডানাও কমেন্টে এসে পুজোর গানের কথা বললেন। তাই এ সপ্তাহে আরও একটা কালজয়ী পুজো/পুজো প্যান্ডেলের গান।


September 27, 2013

আবার যদি তেইশ হতাম



১. নিজের কেরিয়ারের প্রতি অনেক বেশি মনোযোগী হতাম। অন্তত একশো শতাংশ বেশি।

২. প্রেমে পড়তাম না।  

৩. একা একা পাহাড়ে বেড়াতে যেতাম। কবে থেকে ভেবে ভেবে আর যাওয়াই হল না। এখন একা যাওয়ার ইচ্ছেটাই চলে গেছে।

৪. মাথায় ঝুঁটি আর হাতে গিটার দেখলেই গলে জল হয়ে যেতাম না।

৫. বাবাকে আরও ঘন ঘন ফোন করতাম।

৬. বাজে আড্ডা মারা বন্ধ করতাম।

৭. যে সময় বাঁচত, তাতে লেখা শুরু করতাম। সিরিয়াসলি।  

৮. শরীরের যত্ন নিতাম। যোগব্যায়াম, সাঁতার, দৌড়---যা হোক কিছু একটা শুরু করতাম।

৯. সংস্কারজনিত খাওয়াদাওয়ার বিধিনিষেধ তখনই ভাঙতাম।

১০. লোকের ভ্যালিডেশনের জন্য অত হন্যে হয়ে থাকতাম না। নিজের মূল্য সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন হতাম।



September 26, 2013

The Basic Laws of Human Stupidity


by Carlo M. Cipolla, Professor of Economics, UC Berkeley
in Whole Earth Review, Spring 1987


1. Always and inevitably everyone underestimates the number of stupid individuals in circulation.

2. The probability that a certain person be stupid is independent of any other characteristic of that person.

3. A stupid person is a person who caused losses to another person or to a group of persons while himself deriving no gain and even possibly incurring losses.

4. Non-stupid people always underestimate the damaging power of stupid individuals. In particular non-stupid people constantly forget that at all times and places and under any circumstances to deal and/or associate with stupid people always turns out to be costly mistake. 

5. A stupid person is the most dangerous type of person.

বিস্তারিত বিবরণের জন্য এখানে দেখুন। 

September 25, 2013

মেজমামি



প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব সিগনেচার ইমোশন থাকে। কাউকে দেখলেই বিষণ্ণতার কথা মনে পড়ে, কারও সঙ্গে পাঁচ মিনিটের বেশি না হেসে কাটানো যায় না। আমার মেজমামির ছিল আনন্দ।

ছিল বলছি কারণ গত সপ্তাহে মেজমামি মারা গেছেন। খুচখাচ অসুখ ছিল, ষাটের আশপাশে ঘোরাঘুরি করা বাঙালি ভদ্রমহিলাদের যা যা থাকে। হাঁটুব্যথা, সুগার, রাতে ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম। বুধবার বেলা এগারোটা নাগাদ বাথরুমে ঢুকেছিলেন, সোয়া এগারোটা নাগাদ বাথরুমের পাশ দিয়ে যেতে যেতে দোলন আবিষ্কার করল বাথরুমের দরজা খোলা, মেঝের ওপর মামি অচেতন। চিৎকার চেঁচামেচি, একতলা থেকে ছোটমামা-ছোটমামির ছুটে আসা, অ্যাম্বুলেন্সে ফোন, হাসপাতাল যাওয়া, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, আটচল্লিশ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ, ডাক্তারের মাথা নাড়া, কয়েকঘণ্টা পরে মৃত্যু ঘোষণা।

নির্ঝঞ্ঝাট, ঝটপট। নির্ভুল মেজমামি স্টাইল। রেলগাড়ির স্পিডে কথা বলতেন মামি। অনেক কথা বলার ছিল তাঁর, এদিকে একটা দিনে সময় মোটে চব্বিশ ঘণ্টা। অগত্যা স্পিড না বাড়িয়ে উপায় নেই। কসবার ডাইনিং টেবিল ঘিরে কনফারেন্স বসত। আমার দাদুদিদিমার নয় ছেলেমেয়ে, বারো নাতিনাতনি আর সেই নাতিনাতনিদের গোটা চারেক ছানাপোনা। সকলেই বেশি কথা বলে, সকলেই চেঁচিয়ে কথা বলে। কথা বলার কম্পিটিশনে সবাইকে হারিয়ে প্রত্যেকবার জিততেন মেজমামি।

কথা ছাড়াও লোকের মুখ বন্ধ করানোর আরেকটা ব্রহ্মাস্ত্র ছিল মামির। রান্না। সব পরিবারেই একএকজন সেলিব্রিটি রাঁধিয়ে থাকে, আমাদের ছিলেন মেজমামি। সানন্দা পড়ে শেখা টোফু-পাতুরি মার্কা রান্না নয়, রিয়েল রান্না। আমাদের বাড়ির কত বাচ্চার খাওয়ার প্যাকনা যে সারিয়েছেন মামি তার ইয়ত্তা নেই। বেগুন খায় না? পথ্য মেজমামির হিং-বেগুন। পটল দেখলে ওয়াক তোলে? নেক্সট বার মামাবাড়ির নেমন্তন্নের মেনুতে মেজমামির চিংড়ি পটলের দোরমা মাস্ট।

বিয়ে, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন---যে কোনও অনুষ্ঠানবাড়িতে দরজা দিয়ে মামিকে ঢুকতে দেখলে হইহই রব উঠত। সবাই জানতে চাইত, এত দেরি কীসের? আমাদের কত মজা মিস্‌ হয়ে গেল। মামি কপট দুঃখের ভান করে বলতেন, ইস্‌ এতগুলো টাকা মিছিমিছি গচ্চা দিলাম, দেখে বুঝতে পারছিস না, দেরি কেন হল?

বিউটি পার্লার! মামি তুমি পার্লারে গিয়েছিলে? সকলে চেঁচিয়ে উঠত। বড়মামা মাথা নাড়তেন। এমনিতেই তো কত সুন্দর দেখতে লাগে তোমাকে পূরবী। ওই লোকঠকানো বিজনেসে মিছিমিছি টাকা ঢালছ। সেজমাসি বলতেন, আহা দাদা, কী যে বল। ছেলেমানুষরাই তো যাবে পার্লারে, আমি তুমি যাব নাকি। পঞ্চাশ পেরোনো ছেলেমানুষ মামি পার্লারের গল্পের ঝুলি খুলে বসতেন। পার্লারে কে কেমন সাজছিল, ফেসপ্যাক মেখে কাকে কেমন ভূতের মতো দেখাচ্ছিল, কে কার শাশুড়ির নিন্দে করছিল। মামি হাতপামুখচোখ নেড়ে সব ব্যাখ্যান করে বলতেন, আর মামির চারপাশে ভিড় করে বসে সবাই সে গল্পের প্রতিটি শব্দ হাঁ করে গিলত। বড়মামা থেকে শুরু করে ওয়াটারবটল গলায় ঝুলিয়ে কিন্ডারগার্টেনে যাওয়া ছোটনদি’র ছেলে।

তিনপ্রজন্ম জুড়ে নিজের জনপ্রিয়তা মেন্টেন করা সোজা নয়। মামি সে কাজটা অনায়াসে করতেন। আর পাঁচটা কাজের মতোই। ওই অনায়াসতাটাই ছিল মামির ব্যক্তিত্বের মূল সুর।

মায়ের ফোন পাওয়ার পর অনেকক্ষণ ধরে ভাবলাম। গত তিরিশবছরের স্মৃতি, চিরুনি চালিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। একমুহূর্তের জন্যও মামির হাসিহীন মুখ মনে করতে পারলাম না। সারপ্রাইজ দেব বলে না বলে বেলা তিনটের সময় গিয়ে বেল টিপেছি, মেজমামি দরজা খুলছেন। মামির চোখ কাঁচাঘুমে তখনও প্রায় বন্ধ, মুখে হাসি। কী পাজি মেয়ে! আমরা ফ্রিজ খালি করে সব খেয়ে ফেলেছি, কিচ্ছু খেতে পাবে না এখন, বেশ হবে। ভেতরের ঘর থেকে মামা বেরিয়ে আসছেন। মামা ঘুমোন না, মামার হাতে ধরা শরদিন্দুর মোটা রচনাবলী। সোনা তুমি এই গল্পটা পড়েছ? মামা পাতা উল্টে গল্প খুঁজছেন। মামি মাথা চাপড়ানোর ভঙ্গি করে মামার হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। সুইচ টিপে ফ্যান চালিয়ে দিচ্ছেন। চুপ করে বস। আমি আসছি। মামি পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকছেন। এক হাতে গ্লাসে টলটলে ঠাণ্ডা জল, আরেক হাতে ধরা প্লেটের ওপর আমার দেখা বিশ্বের বৃহত্তম পাটিসাপটা। মুখে কেল্লা ফতে হাসি। আমি হাঁ। তোমার ফ্রিজে র‍্যান্ডম বুধবার দুপুরে পাটিসাপটা রাখা থাকে মামি? মামি আমার হাতে প্লেট চালান করে খাটের ধারে পা ঝুলিয়ে বসছেন, না তা থাকে না। কিন্তু আমি জানতাম আজ তুই আসবি। সিরিয়াসলি, তুমি কি ম্যাজিক জানো? মামি উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরাচ্ছেন। পড়ন্ত দুপুরের আলো গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঢুকে ঘর ছেয়ে ফেলছে। মামি বলছেন, হুঁ হুঁ বাবা, এ হচ্ছে মেজমামির ম্যাজিক।

ম্যাজিকের মতো মামি চলে গেছেন। শোকের সময় যদিও, তবু শোক বিশেষ টের পাচ্ছি না। অকুস্থল থেকে দূরে আছি বলে নয়, কলকাতায় যারা আছে, যারা হাসপাতালের দরজার ওপাশ থেকে অসংখ্য নল গোঁজা মেজমামির নিশ্চল অবয়বের দিকে তাকিয়ে থেকেছে, “বডি” নিয়ে কসবায় ফিরেছে, কেওড়াতলায় গেছে---তারাও খুব যে শোক করেছে তা নয়। বরং শকের ভাগটাই বেশি। এ’রকম একটা ঘটনা যে ঘটতে পারে সেটা মেনে নেওয়ার ধাক্কাটা, এই মুহূর্তে মামির চলে যাওয়ার কষ্টের থেকে অনেকগুণ বেশি।

কিন্তু এই মুহূর্তটা কেটে যাবে। আবার কারও একটা বিয়ে হবে, কিংবা কারও বাচ্চার অন্নপ্রাশন। আবার সকলে এধারওধার থেকে এসে জুটবে। আবার টেবিল ঘিরে আড্ডা বসবে, খবর দেওয়ানেওয়া হবে। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে সকলেরই মনে পড়বে, আরও যেন কার আসার কথা ছিল। কার যেন এসে টেবিলের মধ্যমণি হয়ে বসার কথা ছিল, গল্পের ঝুলি উজাড় করে ঢালার ছিল।

সেই সব না শোনা গল্পের দুঃখে তখন আমরা সবাই মিলে কাঁদব তোমার জন্য মামি। এখন নয়।    

   

September 23, 2013

খুড়োর বচন



ক্রাইসিস, তা সে যে ধরণেরই হোক না কেন, লক্ষ লক্ষ লোকের রুজিরুটি যেমন কাড়ে, তেমন লক্ষলক্ষ লোকের রুজিরুটির জোগানও দেয়। একএকটা ক্রাইসিস ঘিরে শতশত সেমিনার বসে, হাজারহাজার পেপার লেখা হয়, লাখলাখ ইন্টারভিউ দেওয়া-নেওয়া হয়। অবশ্য ক্রাইসিসই যে হতে হবে তা নয়, যে কোনও স্ট্রাকচারাল পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়াতেই এ জিনিস ঘটে। যেমন ধরা যাক উনিশশো একানব্বইয়ের ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কার। এখন ব্যাপারটা জলভাত হয়ে গেছে বলে মুক্ত বাণিজ্য নিয়ে আর কাগজে কাগজে সম্পাদকীয় লেখা হচ্ছে না, কিন্তু আজ থেকে বছর দশেক আগেও ইকনমিক লিব্যারালাইজেশনের সুফলকুফল নিয়ে ইউনিভার্সিটির ধাবায় ধাবায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গলাবাজি চলত। রংবেরঙের বিলিতি গাড়ি চড়তে পারার বেনিফিট, আর সস্তা আমদানির মুখে পড়ে দেশী ব্যবসাদারের নাভিশ্বাসের কস্টের অ্যানালিসিস। লাভক্ষতির মাপজোক নিয়ে প্রায় হাতাহাতি। নীলগিরি ধাবায় এক স্বর্গীয় বিকেলে এমনই এক বন্ধুত্বপূর্ণ হাতাহাতির আড্ডায় বসে শিঙাড়ায় কামড় দিয়ে তীর্থদা বলেছিল, “ভালোমন্দ কী হয়েছে জানি না বস্‌, কিছু ইকনমিস্টের সারাজীবনের খাওয়াপরার চিন্তা ঘুচেছে।”

এর থেকে বেশি সত্যি কথা আমি জীবনে কমই শুনেছি।

এখানে পায়ের তলায় সর্ষে বেঁধে এই যে সেমিনার শুনে বেড়াচ্ছি, তাদের সবারই মূল কথা ক্রাইসিস। অর্থনৈতিক, সামাজিক, ক্লাইম্যাটিক। গায়ের চামড়া নেহাৎ গণ্ডারের থেকেও মোটা, তাই সে সব সেমিনার শোনার পরেও রোজ রাতে বাড়ি ফিরে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে পারি। ভয়াবহ সব স্ট্যাটিসটিকস, বীভৎস সব ধ্বংসের ছবি দেওয়ালজোড়া স্ক্রিন থেকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। রিফিউজি বাড়ছে, রেনফরেস্ট কমছে, মাইনে চড়ছে, গ্রোথ ফোরকাস্ট পড়ছে। দেখতে দেখতে একএকজনের একএকরকম প্রতিক্রিয়া হয়। কেউ ফেসবুক স্ট্যাটাস চেক করে, কেউ ভয়ে সিঁটোয়, কেউ রুমাল বার করে চোখের জল মোছে। ওয়াটার ক্রাইসিস এবং সে ক্রাইসিস নিয়ে বিশ্বজোড়া পলিটিক্‌স্‌ নিয়ে দিনভর চর্চার পর আমার এক অতিসংবেদনশীল বন্ধু সেদিন বলেই ফেলল, “মে বি ইট্‌স্‌ নট রাইট টু ব্রিং আ চাইল্ড ইন দিস মেস্‌।”

এই সর্বগ্রাসী প্যানিকের আবহাওয়ায় তাই যখন এঁদের দেখা পাই, সেটা জ্বোরো কপালে জলপট্টির মতো কাজ দেয়। এঁরা সকলেই আমাদের ক্লাসে বক্তৃতা দিয়েছেন, সে ছাড়া এঁদের আর কোনও ক্যাটেগরিভুক্ত করার উপায় নেই। যদি না ধরা হয় যে এঁদের সকলেরই বয়স আশির ওপর, এঁরা কেউই বক্তৃতা দেওয়ার সময় পাওয়ার পয়েন্ট (বা লেটেক, বা প্রেজি) ব্যবহার করেন না, এঁরা সকলেই পলিসির থেকে মানুষের ওপর বেশি আস্থা রাখেন, আর এঁরা সকলেই ক্রাইসিসের কথা উঠলে মুচকি মুচকি হাসেন।

“হোয়েন ইউ রিচ মাই এজ, ইউ লার্ন টু লিভ উইথ ক্রাইসিস।”

বলেছিলেন যিনি, তাঁর চেহারাটা সান্টাক্লজের গোঁফদাড়িছাঁটা যমজ ভাইয়ের মতো। হাসিখুশি লাল আপেলের মতো মুখ, দশাসই শরীর কোটপেন্টেলুনটাই দিয়ে ঢাকা। মিটিং বুঝে আমাদের ড্রেসকোড বদলায়---এঁরা লোকসমক্ষে ফর্ম্যাল ছাড়া আর কিছু পরেননি কখনও, বেঁচে থাকতে পরার কল্পনাও করেন না। স্মার্ট ক্যাজুয়াল বস্তুটা যে কী এঁরা তা জানেনই না। (আমরাও জানি না স্মার্ট ক্যাজুয়াল খায় না মাথায় দেয়, তবু পরি।)

নিজের বয়সের গাছপাথরের হিসেব দিতে গিয়ে খুড়ো বললেন, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন। তাঁর বাবামা দু’খানা বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন, তাঁর ঠাকুরদাঠাকুমা দু’খানা বিশ্বযুদ্ধ + বাল্‌কান যুদ্ধ + তুর্ক-ইতালি যুদ্ধ সঅঅব দেখেছেন। কাজেই ক্রাইসিস কাকে বলে সে তাঁর বিলক্ষণ জানা আছে। আরও জানা আছে, ক্রাইসিস থাকা মানেই তার সমাধানও থাকা। অনেক ক্ষতি হবে, অনেক প্রাণ যাবে, আমিআপনি মরে ভূত হয়ে যাব---কিন্তু ক্রাইসিসও থাকবে না।

এক জীবনে অনেক দেখেছেন খুড়ো। যা দেখেছেন, আমার মতে তার কাছে একটা বিশ্বযুদ্ধ কিছুই না। জন্মেছিলেন ফ্রান্স-জার্মানির সীমান্তে একটা ছোট্ট গ্রামে। পড়তে গিয়েছিলেন সীমান্ত ডিঙিয়ে ফ্রান্সে। এখন ই.উ. বলতে লোকে যা বোঝে, ব্যাগ থেকে একটিবারও পাসপোর্ট না বার করে যত অনায়াসে টপকে যায় একের পর এক ঘুমন্ত বর্ডার চেকপোস্ট, তখন সে রকমটা ছিল না। যুদ্ধের স্মৃতি তখনও অসুবিধেজনক রকম দগদগে। খুড়োর ক্লাসের অনেক ছেলেই তখন ফ্রান্সের এমন সব গ্রাম থেকে এসেছিল যেখানে কয়েক বছর আগে জার্মান সেনারা গ্রামশুদ্ধু লোককে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরেছে।

খুড়োর গলায় এই এত বছর পরেও অপরাধবোধ স্পষ্ট ধরা পড়ে। তখন যদি কেউ তাঁকে বলত, আর মোটে ষাট বছরের মধ্যে ফ্রান্স-জার্মানি একই পার্লামেন্টে এগ্রিকালচারাল সাবসিডি নিয়ে গলা ফাটাবে, একই বিদেশনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবে, দু’দেশের লোক একই টাকা নিয়ে ক্রিসমাসের বাজার করতে যাবে---আর এই সমস্ত কাণ্ডকারখানা সত্যি হওয়ানোর দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হবেন...তিনি...

“ইট ওয়াজ আ ড্রিম।”

হেসে ওঠেন খুড়ো। একমুহূর্তের জন্য মুখের ওপর থেকে ধুরন্ধর কূটনীতিজ্ঞের মুখোশটা সরে গিয়ে কৈশোর-পেরোনো মুখচোরা ছাত্রটা বেরিয়ে পড়ে। বিদেশবিভূঁইয়ে পূর্বপুরুষের পাপের ভার মাথায় করে মুখ লুকিয়ে ঘুরছে। টেবিলের অন্যপ্রান্ত থেকেও বেশ বোঝা যায়, সেই মুহূর্তে নিজের জীবন রিওয়াইন্ডে চালিয়ে নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকছে তাঁর। যা ঘটেছে, তা সত্যিই কি ঘটেছে?

এইখানেই বাকিদের থেকে খুড়োদের অ্যাডভান্টেজ। মানতেই হবে অ্যাডভান্টেজটা নিতান্তই সময়জনিত এবং খুড়োর তাতে কোনওই কেরামতি নেই, কিন্তু তাই বলে তো সেটাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। খুড়ো ক্রাইসিস দেখেছেন, মানুষের অমানুষিকতার নিকৃষ্টতম উদাহরণ দেখেছেন, স্বপ্ন সত্যি হতে দেখেছেন। উপন্যাসের পাতায় নয়, নিজের জীবনে। ফ্রেঞ্চের গরিমা ভুলে ইংরিজি শিখেছেন, সোয়াজিল্যান্ডের রাজার সঙ্গে ক্যারাওকে গেয়েছেন, অভিজ্ঞতা দিয়ে হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন হাজার পুরুষকার আর লক্ষ উদ্যমের পরেও শেষ চাল চেলে যেতে পারে অদৃষ্ট।

“ইয়োর কেরিয়ার মেনলি ডিপেন্ডস্‌ অন নট বিয়িং অ্যাট দ্য রং প্লেস অ্যাট দ্য রং টাইম।” বক্তৃতার শেষদিকে একগাল হেসে বলেছিলেন খুড়ো। যাঁর কেরিয়ারের ছিটেফোঁটার স্বাদ পেলে ঘরের বাকি লোকেরা আনন্দে পাগল হয়ে যাবে, অন্তত আমি তো যাব।

দুঃখের বিষয় সেমিনার দেওয়ার মতো খুড়ো পাওয়াই মুশকিল। প্রতি পঞ্চাশটা সেমিনারে মেরেকেটে এক কি দু’জন খুড়ো জোগাড় করা যায়। বাকি সব লাইন দিয়ে স্ট্যাটস্‌, চার্ট, হিস্টোগ্র্যাম, বুলেটস্‌, অ্যানিমেশন, প্যানিক। এত খেটেখুটে সবাই পিপিটি বানায় (বা লেটেক, বা প্রেজি), সেমিনাররুমের দরজা ঠেলে বেরোনোর তিনমিনিটের মধ্যে মাথা থেকে সব হাওয়া। ম্যাজিকের মতো।

শুধু খুড়োদের বলা গল্পগুলো মনে থেকে যায়। ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজের খুঁটিনাটি---গল্পের পুরিয়ার মধ্যে করে সোজা চালান হয়ে যায় মগজের ভেতর। আর গিয়ে সারাজীবনের মতো সেখানেই আরাম করে গ্যাঁট হয়ে বসে। সেমিনার, ওয়ার্কশপ, ট্রেনিং, গ্রুপ ডিসকাশন আর ফিডব্যাক সেশনের কোলাহলের সমুদ্রে শুধু একটিই কাজের কথা ভেলার মতো ভেসে থাকে, “ইউ হ্যাভ টু লার্ন টু লিভ উইথ ক্রাইসিস।”

কিন্তু শেখাবে কে? মোস্ট প্রব্যাবলি সময়। সাধে কি আমার বুড়ো হতে তর সয় না?
      

September 21, 2013

সাপ্তাহিকী




Well," said Pooh, "what I like best--"and then he had to stop and think. Because although Eating Honey was a very good thing to do, there was a moment just before you began to eat it which was better than you were, but he didn't know what it was called. 
                                                                  --- A. A. Milne, Winnie the Pooh


তুতেনখামেন যখন রাজা হয়েছিলেন তখন তাঁর বয়স কত ছিল বলুন দেখি?

নিউ ইয়র্ক শহরের ক্রাইম সিন। নতুন চোখে দেখা।



বাজে খরচ করার মতো সত্তর টাকা থাকলে আমি এটা কিনে ফেলতাম। সত্যি বলছি।



Things That Are Better With Pockets---
কেবল, আমাদের বাড়ির দরজি নেয়ামত খলিফা অবহেলা করিয়া আমাদের জামায় পকেট-যোজনা অনাবশ্যক মনে করিলে দুঃখ বোধ করিতামএমন বালক কোনো অকিঞ্চনের ঘরেও জন্মগ্রহণ করে নাই, পকেটে রাখিবার মতো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি যাহার কিছুমাত্র নাই; বিধাতার কৃপায় শিশুর ঐশ্বর্য সম্বন্ধে ধনী ও নির্ধনের ঘরে বেশি কিছু তারতম্য দেখা যায় না।

আমার এ সপ্তাহের লুপে-চলা-গান। দেখুন তো আপনাদের ভালো লাগে কি না।


September 18, 2013

A Field Guide




আমি একজন ওস্তাদ

১. লিস্ট মেকার
২. সাইডট্র্যাকার
৩. দ্য ইন্টারনেট রিসার্চার
৪. দ্য গেমার (স্পাইডার সলিটেয়ারের চক্রব্যূহে আমার মৃত্যু লেখা আছে, আমি নিশ্চিত।)
৫. দ্য ওয়াচার (আপাতত চলছে ‘আ টাচ অফ ফ্রস্ট’)
৬. দ্য পারপেচুয়েটর
৭. দ্য ডেলিগেটর (নেহাৎ ডেলিগেট করার লোক নেই বলে)

এবার আপনাদের স্বীকারোক্তির পালা।


আলোকচিত্রী চোখ






ঘটনাটা ঘটল নদী পেরোতে গিয়ে। এই যে ওপরের নদীটার ছবি দেখছেন, এই নদীটা। নদীটার নাম মোসেল, এরই পাশে প্রাচীন শহর Trier-এর অবস্থান। আমার বাঁধা সিট ড্রাইভারের ঠিক পেছনেই, তাই বাসের বাকিদের সবার আগে আমিই দেখেছিলাম সবুজ গাছের ফাঁকে ফাঁকে ঘন নীলের আভাস। দেখতে না দেখতেই বাস হুড়মুড়িয়ে ব্রিজের ওপর উঠে পড়ল, ওপাশের জানালা থেকে অ্যালফন্‌স্‌ বলল, “লুক লুক”, আশপাশপেছনের সিট থেকে বিস্ময়মিশ্রিত “ওয়াও” ধ্বনি উঠল, আর আমি কোনওমতে কোলের ওপর রাখা ক্যামেরাটা চোখের কাছে তুলে নিয়ে খচাৎ খচাৎ শাটার টিপে গেলাম, সেকেন্ডে তিনবার।


বাস ব্রিজ থেকে নেমে পড়ল, সবাই জানালার পাশে হুমড়ি খেয়ে পড়া অবস্থা থেকে যে যার সিটে ফিরে গেল, আমি ক্যামেরা চোখ থেকে নামিয়ে ছোট্ট তিনকোণা প্লে বাটন টিপে আমার শিল্পকর্ম মুগ্ধনয়নে নিরীক্ষণ করতে লাগলাম, আর তক্ষুনি ঘটনাটা ঘটল।

আমার মনে পড়ে গেল যে নদীটা আসলে আমি চোখে দেখিনি। দেখিনি মানে, এই তো এল সি ডি মনিটরের তিন ইঞ্চি পরিসরে জুম ইন জুম আউট করে নদীর ছবি দেখছি, চাইলে বাকি জীবনটা ধরে প্রতিদিন সকালবিকেল ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখতে পারি, কিন্তু নিজের চোখে দেখার যে চান্সটা পাওয়া গিয়েছিল জীবনে মাত্র একবার, সেটা চলে গেছে, আমার দেখা না হতেই। এই যে নদীর ধারে জঙ্গল, জঙ্গলের মধ্যে পুতুলের গ্রামের মতো বসতি, বসতির বেড়া ডিঙিয়ে জলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়া পাহাড়ের ছায়া---এই ছবিটা আমার রেটিনার মধ্যে দিয়ে, লক্ষ লক্ষ স্নায়ুতন্ত্রের ঘাড়ে চাপিয়ে ব্রেনের পেছনে গুপ্তকুঠুরিতে জমা করে রাখার যে সুযোগ এসেছিল, সেটা আমি হেলায় হারিয়েছি। ব্রেনের বদলে এ ছবি এবার জমা হবে আমার পিকচার ফোল্ডারে, আরও হাজারদশেক ছবির সঙ্গে। কোনও এক বর্ষার বিকেলে নস্ট্যালজিক হয়ে সে ফোল্ডার খুলে নদীর ছবি দেখতে বসার সম্ভাবনা, আমার আবার এ পথে বেড়াতে এসে সশরীরে নদী দেখার সম্ভাবনার এককোটি ভাগের এক ভাগ।

ক'দিন ধরে ভাবছিলাম ফোটো তোলাটা আরও ভালো করে শিখব। এত সুন্দর সুন্দর জায়গা, মানুষজন, বাড়িঘরদোর দেখার সুযোগ পাচ্ছি, সে সবের প্রমাণ রাখার দরকার যেমন আছে, তাদের প্রতি সুবিচারের দায়ও আছে। বাস থেকে নেমে দূর পাহাড়ের কোলে রোদঝলমল উপত্যকার দিকে তাকিয়ে আনন্দে দম বন্ধ হয়ে আসে, অথচ ছবিতে সে আনন্দের ছিটেফোঁটাও ধরা পড়ে না। অতখানি আকাশ যে দেখলাম চোখের সামনে, ফ্রেমের ভেতর সে এতটুকু হয়ে ধরা দেয়। কালার টেম্পারেচার নির্লজ্জের মতো বাড়িয়েও নীলসবুজের সেই কন্ট্রাস্টটা ধরতে পারি না, বাস থেকে নেমেই যেটা চোখ প্রায় অন্ধ করে দিয়েছিল।

নির্ঘাৎ লেন্সের দোষ। যতই হোক, কিট লেন্স। রিভিউতে পই পই করে লিখেছিল, কিট লেন্সের বদলে এমন কোনও একটা লেন্স কিনতে যাতে ওয়াইড অ্যাংগল আর টেলিফোটো জুম দুটোই অফার করে। শুনিনি। “এতেই হাত পাকিয়ে নিই” মনে করে কিট লেন্স ঘাড়ে করে বাড়ি চলে এসেছি, এখন চলছে তার শাস্তিভোগের পালা।

ছবি তুলতে পারি আর না পারি, পদস্থ লেন্স থাক আর না থাক, সেই দু’হাজার ছয়ের ডিসেম্বর থেকে ছবি তুলে আসছি আমি। একটা পয়েন্ট অ্যান্ড শুট ক্যামেরা কিনে মাঠে নেমেছিলাম। খাচ্ছিদাচ্ছি ঘুরছিফিরছি, আড্ডা মারছি, কোক জিরো খাচ্ছি আর পকেট থেকে ক্যামেরা বার করে ছবি তুলে রাখছি। গুনেগেঁথে সুখের মুহূর্ত জমা করে রাখছি, পাছে ভুলে যাই। সে ছবি দেখা হয়নি বহুদিন। হয়নি বললে মনে হয় যেন সময়ের অভাব, আসলে ঘটনাটা তা নয়। ইচ্ছে করেই দেখি না। একলা ঘরে বসে ফোল্ডারের হাসি, আড্ডা, বাঁধভাঙা উল্লাসের ছবি যখনই নেড়েচেড়ে দেখি, মুখ আপনা থেকে হাসিহাসি হয়ে উঠব উঠব করে অমনি মাথার ভেতর আরেকটা ছবির অ্যালবাম খুলে যায়।

এই দ্বিতীয় অ্যালবামের ছবিগুলো আমি তুলিনি, আমার চোখ তুলেছে। ব্রেনের সঙ্গে যোগসাজশ করে। কে জানে কখন। আমি যখন নিজের মনে খাচ্ছিলামদাচ্ছিলাম উঠছিলামবসছিলাম, ঘর অন্ধকার করে বিছানায় শুয়েছিলাম, তখন। ভিডিও রেকর্ডিং-ও আছে। ভীষণ ঠাণ্ডা একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, বাসস্টপে ফোন কানে নিয়ে বসে আছি। সে কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ এই মুহূর্তের থেকেও স্পষ্ট।

গত সপ্তাহের স্টাডি ট্রিপে একদিন দুপুরে হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিল। অ্যালিসিয়ার সঙ্গে একটাই ছাতা শেয়ার করে, দুজনেই ভিজতে ভিজতে রাস্তার ধারের একটা ঘুপচি পিৎজার দোকানে দৌড়ে ঢুকেছিলাম। অভিজ্ঞ ফুডিদের দেওয়া নানারকম বিখ্যাত দোকানের সাজেসশন ছিল পকেটে চিরকুটে লেখা, কিন্তু খিদে আর বৃষ্টির যুগ্ম অ্যাটাকে সে চিরকুটের দিকে তাকানোর সুযোগ ছিল না। পাঁচ ফুট বাই সাত ফুট দোকানের কাঠের বেঞ্চিতে বসে, আপাদমস্তক অচেনা ভাষায় লেখা মেনুকার্ড অতিকষ্টে উদ্ধার করে অ্যালিসিয়া অর্ডার দিল পিৎজা নেপোলি, আমি নিলাম Croque Monsieur (খক্‌ মঁসিয়)। বেসিক্যালি ফ্রেঞ্চ গ্রিল্‌ড্‌ হ্যাম অ্যান্ড চিজ স্যান্ডউইচ। সাদা প্লেটের ওপর শুয়ে থাকা বাদামি মুচমুচে পাঁউরুটির ভেতর নরম গোলাপি হ্যাম, আর গলন্ত লাভার মতো চিজ আর বেশেমেল সস্‌---। খাব কি, প্রাণ ভরে ছবিই তুলেছিলাম প্রথম দশ মিনিট ধরে।

এখন যতবার সে ছবির দিকে তাকাচ্ছি, খালি চোখে ভেসে উঠছে মাথার ওপর নামকাওয়াস্তে ছাতা, ছাতার শিক থেকে কনকনে ঠাণ্ডা বৃষ্টির জল শার্টের বাঁদিকের হাতা বেয়ে গড়িয়ে নামছে, পাথরপাতা পথের ওপর দিয়ে আমি আর অ্যালিসিয়া হাসতে হাসতে হাফ ছুটছি হাফ হাঁটছি।

মানতেই হবে, আমার চোখের ছবি তোলার উৎসাহ আমার থেকেও বেশি। সবথেকে অন্যায় কথাটা হচ্ছে, ওয়াইড অ্যাংগল লেন্স ছাড়াই সে আমার থেকে ভালো ছবি তুলছে। পোস্টপ্রসেসিং ছাড়াই সে ছবির কালার টেম্পারেচার নিখুঁত, এক্সপোজার পারফেক্ট, ডেপথ্‌ অফ ফিল্ড লা-জবাব। সবথেকে বড় সুবিধে হচ্ছে, ও ছবি সঞ্চয় করতে গেলে ল্যাপটপের মহার্ঘ স্পেস নষ্ট করতে হয় না। বাকি আর পাঁচটা স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়েমড়িয়ে ওরা থেকে যেতে পারে আমরণ। ও ছবি দেখতে গেলে কম্পিউটারে চার্জ থাকার দরকার নেই, যখনতখন যেখানেসেখানে একটুখানি একলা সময় বার করে, “কই দেখাও তোমার ছবি” হুকুম করলেই চোখ মহানন্দে পা ছড়িয়ে তার অ্যালবাম খুলে বসে।

ওর উৎসাহ দেখে ভাবছি, নিজে না শিখে ওকেই বরং ছবি তোলাটা ভালো করে শেখাই। মনে মনে যতই কিট লেন্সের ঘাড়ে দোষ চাপাই না কেন, নিজের দৌড় আমার জানা হয়ে গেছে।

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.