November 30, 2013

সাপ্তাহিকী



শিল্পীঃ Toni Demuro


আর্টবোদ্ধা হিসেবে নাম কিনতে চান? এই নিন চিট-শিট।


পাশবালিশ আমার ভালো লাগে না, তবে এই রকম দেখতে পাশবালিশ হলে ভেবে দেখতে পারি।


হগওয়ার্টস্‌ স্কুল কোথায় বলতে পারেন? মিডল আর্থ? না পারলে এই ম্যাপটা দেখে নিন।

লোকে কতরকম করে পয়সা রোজগার করে। এই ওয়েবসাইটে রেজিস্টার করলে এরা আপনারা রোজ একটু একটু করে গল্পের বই পড়তে পাঠাবে। যাতে বেশি সময় নষ্ট না হয়, আবার সাহিত্যচর্চাও ঘটে। 


আপনি কি এখনও আনস্মার্ট অ্যালার্ম ক্লক ব্যবহার করেন নাকি? ছো ছো। আইফোন আছে কী করতে? বালিশের তলায় রেখে ঘুমোতে যাবেন, বুদ্ধিমান আইফোন আপনার এপাশওপাশ করার ফ্রিকোয়েনসি ইত্যাদি দেখে বুঝে ফেলবে যে আপনার ঘুম থেকে ওঠার সময় হয়েছে না হয়নি।     

ব্যালে ভালো লাগে? নিউ ইয়র্ক সিটি ব্যালে স্কুল নিয়ে এই ডকুমেন্টারিটা দেখতে পারেন। একটু লম্বা, কিন্তু উইকএন্ড তো, একটু সময় না হয় খরচ হলই।


এই সপ্তাহে এই গানটা লুপে চলেছে আমার কম্পিউটারে। আমি নিশ্চিত আপনাদেরও গানটা অলরেডি ভালো লাগে।

November 29, 2013

Canal St. Martin





২০০১ সালের ব্লকবাস্টার সিনেমার নায়িকা আমেলি-র কী কী করতে ভালো লাগত মনে আছে? সব মনে না থাকলেও হবে, শুধু সেন্ট মার্টিন ক্যানালের জলে পাথর ছোঁড়ার খেলা খেলতে যে ভালো লাগত সেইটা মনে থাকলেই হব। কারণ আজ আমরা সেই সেন্ট মার্টিন ক্যানালের ছবি দেখব।


গত না তার আগের রবিবার ভুলে গেছি, সেন্ট মার্টিন ক্যানাল দেখতে বেরিয়েছিলাম। দেখা মানে ক্যানালের তীর ধরে হাঁটা। ক্যানালের গা বেয়ে বয়ে চলা বাঁদিকের রাস্তাটার নাম Quai de Valmy আর ডানদিকের রাস্তাটার নাম Quai de Jemmapes। দেখেশুনে আমার Quai de Valmy-কেই বেশি পছন্দ হল আর আমি ওইটা ধরেই হাঁটতে শুরু করলাম।


সেন্ট মার্টিন ক্যানাল আজকের ব্যাপার নয়। ১৮০২ সালে খোদ নেপোলিয়ন এই খাল খননের আদেশ দিয়েছিলেন। পারির জনসংখ্যা তখন বাড়তে শুরু করেছে। তাদের চাহিদা মেটানোর জন্য, আর হাইজিনঘটিত কারণেও শহরের ভেতর একটা টাটকা জলের উৎসের দরকার ছিল।  
  

Quai de Valmy রবিবার এই রাস্তায় খালি পথচারী আর সাইকেল-চড়িয়ে ছাড়া আর কারও ঢোকা নিষেধ। যাতে লোকে শান্তি করে প্রকৃতির শোভা উপভোগ করতে পারে। এই-বুঝি-গাড়ি-চাপা-পড়ে-মরলাম ইত্যাদি অকারণ টেনশনে যাতে ভুগতে না হয়।


সেন্ট মার্টিন ক্যানালের লাগোয়া পাড়া, প্যারিসের দশম arrondissement, এক কথায় বলতে গেলে ইন্টারেস্টিং। পথের পাশে আর্ট গ্যালারি, আর্ট এবং শুধুমাত্র আর্টের বইয়ের দোকান, লালনীল ক্যাফে ইত্যাদি ছড়ানোছেটানো। স্প্রিং আর সামারে নাকি খালের তীর জুড়ে পিকনিক দলের ভিড় লেগে যায় আর প্রচুর গিটারবাজিয়েরা গানবাজনা করে। এখন কি না অটাম, তাই তাদের দেখা নেই। প্রথমে একটু “হায় কী লস্‌” ভাব হয়েছিল মনে, তারপর গাছেদের লালকমলা হাইলাইট করা মাথা দেখে মন শান্ত হল। গিটার দেখতে পেলে তো ফল্‌ কালারস্‌ দেখা হত না।



November 28, 2013

Thanksgiving



১. আমি থ্যাংকফুল যে আমি অ্যামেরিকান নই বা অ্যামেরিকায় থাকি না বা আমার কোনও অ্যামেরিকান বন্ধু নেই। থাকলে আজকের দিনে বছরের মোস্ট ওয়ান্ডারফুল ডিনারের নামে আলুনি টার্কি, বিনের মশলাহীন তরকারি, দুধে গোলা আলুসেদ্ধর লেই আর কুমড়োর পিঠে খেতে হতে পারত

২. আমি থ্যাংকফুল যে আমার ঠাকুমা আমার নাম কুন্তলা রেখেছিলেন। মৌমিতা বা সুদেষ্ণা রাখেননি। মৌমিতা বা সুদেষ্ণাদের বিরুদ্ধে আমার কিছুই বলার নেই, আমি যে ক’কোটি মৌমিতা এবং সুদেষ্ণাকে চিনি তারা প্রত্যেকেই ভীষণ ভালো, ভীষণ বুদ্ধিমান আর ভীষণ ভালো দেখতে। কিন্তু তাদের মধ্যে সবথেকে বড় মিল হচ্ছে যে তাদের কেউই নাম ধরে ডাকে না। ডাকা সম্ভবও নয়। আমাদের ছত্রিশটি মেয়েওয়ালা পুঁচকে সেকশনেই মৌমিতা বলে হাঁক পাড়লে চারজন সাড়া দিত, সুদেষ্ণা বলে হাঁকলে দু’জন। কাজেই হাঁকতে হলে সবাই হাঁকত, “অ্যাই লম্বু, অ্যাই চাটুজ্জে, অ্যাই ব্যাটাচ্ছেলে গাঙ্গুরাম”। এই গাঙ্গুরামের সঙ্গে মণ্ডামিঠাইয়ের কোনও সম্পর্ক নেই বলাই বাহুল্য, এই গাঙ্গুরাম হচ্ছে গিয়ে গাঙ্গুলির অপভ্রংশ। আমাদের ক্লাসে একজন (মৌমিতা) ব্যানার্জিও ছিল। কাজেই আমিও যদি মৌমিতা হতাম তাহলে নেহাত বাধ্য হয়েই লোককে আমাকে “হাই-পাওয়ার মৌমিতা” কিংবা “গালে-ব্রণ মৌমিতা” বলের রেফার করতে হত। কী বাঁচানটাই না বাঁচিয়েছেন ঠাকুমা ভাবুন একবারথ্যাংক ইউ ঠাকুমা।

তাই বলে কি স্কুলে আমার কোনও ডাকনাম ছিল না? এমন হতভাগ্য যদি কেউ কোথাও থেকে থাকে পৃথিবীতে, স্কুলে যাকে কেউ কোনও ডাকনাম দেয়নি কখনও, তবে সে বেচারার প্রতি আমার অন্তরের সমবেদনা রইল। আমার ডাকনামটা আন্দাজ করা খুবই সোজাঃ “কুন্তী” ভালোবাসা উথলে উঠলে কেউ কেউ “ওরে কুন্তু রে” বলেও গলা জড়াত মনে পড়ে

৩. আমি থ্যাংকফুল আমার জীবনের সবক’টি সেকেন্ড চান্সের জন্য। সেকেন্ড, থার্ড, ফোর্থ চান্সগুলোর জন্যও। আমার ভুলেরও শেষ নেই, আমার ভুলের প্রতি জীবনের ক্ষমারও না। যতবার মনে হয়েছে আর বুঝি হল না, ততবার আবার নতুন নতুন সম্ভাবনারা এসে হাজির হয়েছে। কে জানে কোথা থেকে। ব্যক্তিগত জীবনে, কাজের ক্ষেত্রে, সর্বত্র। দেখেশুনে আমার কনফিডেন্স বেড়ে গেছে। এখন আমি নিশ্চিত, সব শেষ বলে আসলে কিছু হয় না। একটা না হলে অন্যটা হবে। যেটা হবে সেটাও ভালোই হবে, যেটা হল না, সেটা হলেও হাতিঘোড়া কিছু হত না।

৪. আমি থ্যাংকফুল কবীর সুমনের জন্য সেই ক্লাস ফাইভ থেকে তাঁর গানে আমাকে ডুবিয়ে রাখার জন্য। আমি থ্যাংকফুল গল্পের বইয়ের জন্য। ভালো, চলনসই, অখাদ্য---দুই মলাটের মাঝখানে পাতায় সারি সারি কালো পিঁপড়ের মতো শব্দের সারির জন্য আমি থ্যাংকফুল। আমি থ্যাংকফুল বর্ষার বিকেল, সন্ধ্যে, রাত্তির, ভোরের জন্য দিনের প্রথম আর্ল গ্রে-র জন্য সন্ধ্যের ভিড়ে ঠাসা মেট্রোয় একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো জায়গা পাওয়ার জন্য লংডিসট্যানস্‌ ফোনকলের দাম দিনদিন এই রেটে কমার জন্যশনিরবিছুটি, সপ্তাহের মাঝখানে পড়ে পাওয়া ছুটি, জাতীয় ছুটি, জ্বর হলে ছুটি, জাস্ট-ইচ্ছে-করছে-না-বলে ছুটি---ছুটির জন্য আমি থ্যাংকফুল।

৫. আর অফ কোর্স, আমি থ্যাংকফুল অবান্তরের পড়ুয়াদের জন্যআগেও বলেছি, এখনও বলছি, পরেও বলব---আপনারা আমার কী উপকার করেছেন সেটা যদি জানতেন। দিনের পর দিন ধৈর্য ধরে না পড়লে, কমেন্ট না করলে, সত্যিসত্যি বা মিছিমিছি পিঠ চাপড়ে “বাঃ বেশ হচ্ছে, চালিয়ে যাও” না বললে অবান্তর চলত না। আর অবান্তর না চললে আমিও কি চলতাম? হেঁটেচলেঅটোচড়ে বেড়াতাম ঠিকই, প্রাণের দায়ে প্রতিদিন সাড়ে আটটা টু সাড়ে ছ’টা হন্যে হয়ে দৌড়েও যেতাম, প্রাণ বেঁচেও যেত। কিন্তু প্রাণ বাঁচানোই কি সব? মনের কী হল সে খবর কে নিত? যেটুকু না হলেও দিন চলে যায়, সেইটুকু কোথায় পেতাম? গত সোয়া চার বছরে আপনারা আমার জীবনের সেইটুকু হয়ে উঠেছেন। আপনারা আমার আসলের সুদ, আমার সিনেমাহলের পপকর্ন, আমার মহার্ঘ কোটের তলায় মায়ের হাতে বোনা হাফ সোয়েটার, আপনারা আমার বিয়েবাড়ির পুঁচকে মেনুকার্ড। কার্ডের মলাটে লালরঙের হৃদয়ের ওপর ভুল বানানে বরবউয়ের নাম লেখা। নেমন্তন্ন হজম হয়ে গেছে কবেই, কার্ডটা এখনও যত্ন করে গোঁজা আছে বুককেসের শেলফ-ঢাকা খবরের কাগজের নিচে। সারাজীবন থাকবে।

থ্যাংক ইউ।


November 27, 2013

আপনার ব্রেনঃ ডানপন্থী না বামপন্থী?




উৎস গুগল ইমেজেস

একবার দেখলে সে মুখ আর ভোলেন না? মনের কথা পড়তে পারেন? কেম্ব্রিজ-ব্লু আর অক্সফোর্ড-ব্লু রঙের ফারাক খালি চোখে ধরতে পারেন? কবিতা লিখতে পারেন? কবিতা বুঝতে পারেন?

সব প্রশ্নের উত্তর যদি “হ্যাঁ” কিংবা “অফ কোর্স” হয়, তাহলে বলতে হবে আপনার “রাইট ব্রেন” দারুণ শক্তিশালী। আর যদি আপনি টপাটপ ভাষা শিখে নিতে পারেন, ফ্রাইডে নাইটের তর্কে বাকি সবার কান কেটে নিজের পকেটে পুরতে পারেন, মাসকাবারি বাজার করতে গিয়ে দোকানির থেকে তাড়াতাড়ি মুখে মুখে যোগ করে টোটাল দাম বার করে ফেলতে পারেন (তাও আবার উল্টোদিক থেকে দোকানির বিতিকিচ্ছিরি হাতের লেখায় লেখা ফর্দ পড়ে) তাহলে ধরে নিতে হবে আপনার “লেফট্‌ ব্রেন” ধুন্ধুমার।

আপনার কোনদিকের ব্রেন ডমিন্যান্ট সেটা জানতে হলে নিচের খেলাটা খেলুন। মোটে তিরিশ সেকেন্ড লাগবে খেলতে, কাজেই সময়নষ্টের দুশ্চিন্তা করবেন না। আর বলাই বাহুল্য, খেলার রেজাল্ট আমাকে এবং অবান্তরের অন্যান্য পাঠকদের জানাতে ভুলবেন না। এদের রেজাল্ট বলছে, আমি দু’দিকের ব্রেন একেবারে নিক্তি মেপে একেবারে ফিফটি-ফিফটি ব্যবহার করি। অর্থাৎ আমার লেফট্‌ এবং রাইট, কেউই কাউকে জমি ছাড়তে রাজি নয়।

আপনার রেজাল্ট কী বলছে?  
Which side of your brain is more dominant?
The 30-Second Brain Test


November 26, 2013

রেসলিউশন্‌স্‌ ২০১৪



আমার ২০১৩-র রেসলিউশনের রেজাল্ট দেখে বান্টি বলল, “কিচ্ছু হয়নি।”

আমি চোখেমুখে আহত ভাব ফুটিয়ে বললাম, “কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বলতে নেই, শেখায়নি তোদের স্কুলে?”

“না বললেই কি কানা কানা থাকবে না, নাকি খোঁড়া হঠাৎ টগবগিয়ে ছুটতে শুরু করবে? তাছাড়া কানাখোঁড়া শব্দদুটোয় নেগেটিভ কনোটেশন জুড়ছ তুমি, আমি না। যাই হোক, আমি তোমার পারফরমেন্‌স্‌ নিয়ে কিছু বলিনি, আমি বলেছি যে তোমার রেসলিউশন সেট করাতেই সিরিয়াস গোলমাল রয়ে গেছে।”

“কী রকম?”

“তোমার রেসলিউশন সব প্রোসেস-ভিত্তিক, কাজেই তাদের ইভ্যালুয়েট করা অলমোস্ট ইমপসিব্‌ল্‌। ‘আমি কাল থেকে আর ফাঁকি দেব না’ বলা, ‘কাল সকাল থেকে আমি জীবে প্রেম প্র্যাকটিস করব’ বলার মতোই ভেগ। তার বদলে যদি তুমি বলতে এ বছরে আমি তিনটে পাবলিকেশন নামাব বা চারটে বাঁদরছানা অ্যাডপ্ট করব তাহলে প্রতিজ্ঞাটা আউটকাম-ভিত্তিক হত, এবং একই সঙ্গে অনেক জোরালোও হত।”

বান্টির কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে আমি লোকটা একেবারেই আউটকাম-ভিত্তিক নই। আদ্যোপান্ত প্রোসেস-ভিত্তিক। ‘কী হল’-র থেকেও ‘কীভাবে হল’---সেই প্রশ্নের উত্তর জানতেই আমার যত কৌতূহল। তিনটে পেপার নামানো খুবই ভালো কথা, কিন্তু সেগুলো কীভাবে নামানো হল সেটা আমার মতে জানা বেশি জরুরিপ্রথম ছ’মাস কোনও কাজ না করে, শেষ ছ’মাস পাগলের মতো নাওয়াখাওয়া ভুলে, আটের বদলে আঠেরো ঘণ্টা অফিসে থেকে, শরীরের প্রত্যেকটি শিরাউপশিরাকে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নার্ভাস ব্রেকডাউনের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করিয়ে যদি হয়, তাহলে সত্যি বলছি ওই রকম নামানোয় আমার কাজ নেই।

এর মানে কিন্তু এই নয় যে আমি ওই ভাবে করা কাজের গুণগত মান নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুলছি। আমার চেনা অনেক বুদ্ধিমান লোক এই পদ্ধতি ছাড়া কাজ করতে পারেন না বা নীতিগতভাবে এই পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনও পদ্ধতিতে কাজ করেন না। বান্টি এই দ্বিতীয় দলের পার্মানেন্ট মেম্বার। “কাজ করার জন্য মাইনে পাই, কাজটা কখন করলাম---সারা মাস ধরে নাকি ডেডলাইনের আগের রাত্তিরে---সে জন্য তো পাই না।”

অকাট্য যুক্তি। কিন্তু অকাট্য হলেই যে পছন্দের হবে তেমন কোনও কথা নেই। আমার পছন্দ হচ্ছে তেমন জীবন, যে জীবনের তিনশো পঁয়ষট্টি দিন বারো মাস চব্বিশ ঘণ্টা একই ছন্দে কাটে। একই তালে, একই লয়ে। আর আমি বিশ্বাস করি অমন জীবন আউটকামের মুখ চেয়ে তৈরি হয় না, ওর জন্য লাগে প্রোসেস। দীর্ঘ, অবিরাম, অক্লান্ত প্রোসেস।

২০১৪-র রেসলিউশনের ফাইনাল তালিকা ছাপানোর আগে আমার স্বীকারোক্তি এটাই। আমি কোনও বিশেষ আউটকামের জন্য হন্যে হয়ে এই কাজগুলো করতে চাইছি না। আমি চাইছি সামনের তিনশো পঁয়ষট্টিটা দিনে আমার রোজকার অভ্যেস, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি বদলাতে। এই সব বদলের ঘাড়ে চেপে যদি আউটকামের মোক্ষে পৌঁছনো যায় যাবে, না গেলেও ক্ষতি নেই। তখন এই ভেবে সান্ত্বনা পাব যে নিজের চোখে নিজে আরেকটু আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পেরেছি।

আর অফ কোর্স সবাই জানে, আমিও জানি, এই বদলের প্রক্রিয়াটা শুরু করার জন্য একত্রিশে ডিসেম্বরের মাঝরাত পর্যন্ত জেগে বসে থাকার কোনও দরকার নেই। ভালো হওয়ার জন্য পয়লা জানুয়ারির থেকে সাতই জুলাই কোনও অংশে কম পয়া নয়। তবু হাজার হোক, নতুন বছর বলে কথা। আর পাঁচটা লোকের মতো এই সিজনেই আমার ভালো হওয়ার ইচ্ছে লকলকিয়ে ওঠে। কেন ওঠে সে প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারব না।

গৌরচন্দ্রিকা শেষ, এইবার ২০১৪-র শপথ লিপিবদ্ধ করার পালা।

আমার প্রথম রেসলিউশনটা এক সপ্তাহ আগে লিস্টের প্রথমে তো দূর অস্ত, ত্রিসীমানাতেই ছিল না। কবে এটা ত্রিসীমানায় এল এবং বাকি সব রেসলিউশনকে ল্যাং মেরে চিৎপাত করে একেবারে লিস্টের টঙে চড়ে বসল, সেই দিনটা, ইন ফ্যাক্ট সেই মুহূর্তটাও আমার স্পষ্ট মনে আছে।

গত বুধবার ঠিক পাঁচটার সময় অ্যালার্ম বাজল, আর আমি বন্দুকের গুলির মতো ছিটকে বিছানায় উঠে বসলাম। মা সামনে থাকলে নির্ঘাত আঁতকে উঠতেন। “সোনা! কতবার বলেছি ওভাবে উঠতে নেই, কখন হ্যাঁচকা লেগে যাবে . . .” সে হ্যাঁচকা লাগলে লাগবে, আমার এভাবে না উঠে ছাড়া গতি নেই। নিজেকে যদি আরাম করতে অ্যালাউ করি, ভাব দেখাই যে ঘুম ভাঙার পর দশ মিনিট লেপের ভেতর এপাশওপাশ করার মধ্যে দোষের কিছু নেই, তাহলে আর রক্ষে নেই। মন সাপের পাঁচ পা দেখবে। দশ মিনিট বেড়ে পনেরো মিনিট হবে, পনেরো বেড়ে আধঘণ্টা, আধঘণ্টা বেড়ে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। খাল কেটে পঁয়তাল্লিশটা কুমীর যদি না ডাকতে চাই তাহলে অ্যালার্ম শোনা মাত্র ছিটকে উঠে পড়তে হবে। তাতে হ্যাঁচকাই লাগুক কি প্রাণই বেরোক।

খাট থেকে দু’পা মাটিতে নামিয়ে, কোনওমতে ডান পায়ের চটি বাঁ পায়ে আর বাঁ পায়ের চটি ডান পায়ে গলিয়ে বেডসাইড টেবিলের দিকে হাত বাড়িয়ে চশমাটা নিতে যাব, নিয়েও ফেলেছি প্রায় . . . এমন সময় হঠাৎ হাতের ধাক্কা লেগে চশমা ভূপতিত হলঅ্যালার্ম বাজিয়ে ঘুম থেকে ওঠার এই একটা মুশকিল। সারাশরীরের ঘুম একসঙ্গে ভাঙে না। ইনস্টলমেন্টে প্রথমে মগজের ঘুম ভাঙে, তারপর চটি পরতে গিয়ে পায়ের পাতার, চশমা নিতে গিয়ে হাতের পাঞ্জার। সেদিন হাত তখনও ঘুমোচ্ছিল নিশ্চয়, ঘুমচোখে চশমার বদলে চশমার পাশের বাতাসে খাবলা মেরেছে।

পিত্তিটা জাস্ট জ্বলে গেল। জ্বলুনিতে একটা উপকার হল অবশ্য, সারাশরীরের ঘুম ঝটকা দিয়ে একবারে  ছেড়ে গেল। চশমার চোদ্দপুরুষের পিণ্ডি চটকাতে চটকাতে আমি মেঝের ওপর নতজানু হলাম। “কোথায় আছিস, হাতের কাছে আয় মা” হাত বুলোতে বুলোতে খাটের তলায় ভেসে বেড়ানো চুলের গোল্লা, বিস্কুটের গুঁড়ো, আরও না জানি কী সব ইন্টারেস্টিং জিনিসপত্র হাতে ঠেকল, কেবল চশমার পাত্তা নেই। খানিক বাদে চশমার আমার ওপর করুণা হল বোধহয়, তিনি আমার আঙুলের খাঁচায় ধরা দিলেন

‘ইউরেকা!” বলে চশমা বাজেয়াপ্ত করে উঠে বসতে যাব অমনি ঘটনাটা ঘটল। আমার থার্টি টু-সামথিং কোমর ফ্রিজ করে গেল। খাটের পাশে অন্ধকারে আমি মেঝের ওপর গড় হয়ে শুয়ে রইলাম, মাথা তুলতে গেলেই কোমরের কাছে যেখানটায় শিরদাঁড়া শেষ হয়েছে, সেখান থেকে কড়কড় মচ্‌মচ্‌ নানারকম ভয়ানক শব্দ বের হতে লাগল। ওইখানটাতেই কুলকুণ্ডলিনী থাকে শুনেছি, এই ব্রাহ্মমুহূর্তে তিনিই জাগ্রত হলেন কি না কে জানে। নোংরা মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে শুয়ে আমি এইসব ভাবতে লাগলাম। আরও মনে হল, ভাগ্যিস অর্চিষ্মান নেই, হঠাৎ ঘুম ভেঙে আমাকে এই অবস্থায় আবিষ্কার করলে বেচারার হার্ট অ্যাটাক হত নির্ঘাত।

কতক্ষণ পর জানি না, (অ্যাকচুয়ালি জানি। অ্যাট লিস্ট এক ঘণ্টা। কিন্তু ঘড়িকে জিজ্ঞাসা করলেই সে অম্লানবদনে বলবে, এই তো মোটে পাঁচ সেকেন্ড হল। তাই আমি আজকাল ঘড়ি দেখা ছেড়ে দিয়েছি।) কোমরের খিল অবশেষে খুলে গেল, আমি চশমাসহ নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ালাম। অবশ্য ওঠা ব্যাপারটা এতটাও অবলীলায় হল না, শুনতে যতটা লাগছে। এক হাত দিয়ে বিছানার চাদর খিমচে টাইট্যানিকের মতো টলমল করতে করতে কোনওরকমে উঠে দাঁড়ালাম, তারই মধ্যে ডান হাঁটু একবার ব্রেক কষল, দাঁড়ানোর পর বাঁ গোড়ালি একবার মট্‌ করল।

এরপরেও যদি আমার রেসলিউশনের লিস্টে “দৈনিক আধঘণ্টা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ” না জায়গা পায়, তাহলে আর কীসে পাবে আমি জানি না।

২। আমার ২০১৪-র দ্বিতীয় রেসলিউশনটিও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত। স্বাস্থ্যের ওপর এত মনোযোগ দেখে নিজেরই ভয় লাগছে, হেলদি হয়ে শেষটায় না ২০১৫-র দিল্লি ম্যারাথনে নাম দিয়ে বসি। যাই হোক, ম্যারাথনের কথা এখন থাক, রেসলিউশনের কথা হোক। আমার সামনের বছরের দ্বিতীয় রেসলিউশন হল,

“খাওয়ার সময় খাব, বাকি সময় খাব না।”

এই প্রসঙ্গে চিবোনো আখের মতো হয়ে যাওয়া সেই গল্পটা আরেকবার আপনাদের মনে করিয়ে দিই। ভগবান যখন আমাদের নাইয়েখাইয়ে, ভালো জামা পরিয়ে, গাল টিপে ধরে চুল আঁচড়ে পৃথিবীর দিকে রওনা করাচ্ছিলেন তখন তাড়াহুড়োয় একটা ভীষণ জরুরি উপদেশের কথা তাঁর মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল টা টা করে পেছন ফিরতেই উপদেশটা তাঁর মনে এসে গেল, আর ভগবান দৌড়ে গেটের কাছে এসে চেঁচিয়ে বললেন, “মনে রেখ, দিনে একবার খাবে আর তিনবার স্নান করবেএএএ...”

স্বর্গের নিরবিচ্ছিন্ন সুখের জেলখানা থেকে ছুটি পেয়ে মানুষ তখন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগিয়েছে, তার কানে উপদেশের অর্ধেক ঢুকল অর্ধেক ঢুকল না সে ছুটতে ছুটতেই চেঁচিয়ে “ঠিক আছেএএএএ...” বলে একবারে মর্ত্যে পৌঁছে তবে দম নিল।

তারপর তো কী হল আমরা সবাই জানি। নরক গুলজার। কিন্তু অত্যাশ্চর্যভাবে ভগবানের বাকি একটাও উপদেশ মানুষের মনে না থাকলেও, শেষ উপদেশটা মনে থেকে গেল। মানুষ এখনও ভালো ছাত্রের মতো রোজ তিনবেলা খায় আর একবেলা স্নান করে।

সত্যি বলছি দৈনিক তিনবার খেলে আমার কোনও সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমি দিনে তিরিশবার খাই। ছ’টার সময় চা, সাড়ে ছ’টার সময় বিস্কুট, আটটার সময় টোস্ট, প’নে দশটার সময় চা, এগারোটার সময় চা, বারোটার সময় কিটক্যাট, দুটোর সময় স্যান্ডউইচ, তিনটের সময় চা, চারটের সময় চিপস্‌, সাড়ে চারটের সময় চা, সাতটার সময় স্যান্ডউইচ, সাড়ে আটটার সময় বিস্কুট . . . আশা করি আর বলার দরকার নেই, চিত্রটা আপনাদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে।

ফলে যেটা ঘটেছে, আমি দিনকে-দিন অম্লজীন চুর্ণের সচল বিজ্ঞাপনে পরিণত হয়েছি। অম্বল গলাজ্বালা চোঁয়াঢেঁকুর ইত্যাদি ব্যাপার নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসের মতোই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এ রথের গতি রোধ করতে না পারলে বিপদ আছে। সামনের বছর সেটা করব। খাওয়ার জন্য নির্ধারিত নির্ঘণ্টে পেট পুরে তৃপ্তি করে খাব, সারাদিন খুচুরমুচুর করে মুখ চালিয়ে বেড়াব না।

৩। তিন এবং শেষ প্রতিজ্ঞাটির জন্ম প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছে থেকে। জানি প্রতিশোধ খুব খারাপ ইমোশন, কিন্তু খারাপ ইমোশন থেকে অনেক সময় ভালো জিনিসের সৃষ্টি হতে পারে। মায়ের বকুনি শুনে আমি ছোটবেলায় অনেকসময় রাগ করে বেশি পড়াশুনো করে ফেলতাম। তখন মা মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বলতেন রাগ নাকি লক্ষ্মী।

অবশ্য প্রতিশোধের স্পৃহা লক্ষ্মী এমন কথা শুনিনি কখনও, কিন্তু এক্সপেরিমেন্ট করে দেখাই যাক না।

আমাদের আড্ডায় একজন আছেন, যাঁকে বাইরে থেকে দেখতে আমার আপনার মতোই স্বাভাবিক, কিন্তু অন্তরে তিনি সাক্ষাৎ দেবশিশু। আপনাদের আড্ডাতেও এই রকম দেবশিশু আছেন আমি নিশ্চিত, সব আড্ডাতেই থাকে। এঁদের বিশেষত্বটা হচ্ছে, এঁরা কখনও কাউকে খারাপ দেখতে বা বলতে পারেন না। এঁদের কাছে মন খুলে কারও নিন্দে করার উপায় নেই। ইরিটেটিংস্য ইরিটেটিং লোকজনের নামেও কিছু বললে এঁরা বলবেন, “এই যাঃ, ও ভীষণ সুইট।” সকলেই এঁদের কাছে সুইট, হার্মলেস, ‘মনটা-ভালো’ চেনা লোকজনের কথা তো ছেড়েই দিলাম, সেলিব্রিটিরা, যাঁদের নিয়ে পিএনপিসি করা সংবিধানেই অ্যালাউ করা আছে, তাঁরাও এঁদের কাছে আউট অফ বাউন্ডস্‌। শোভা দে? “ইস্‌, মহিলার কী সুন্দর শাড়ির কালেকশন”, নরেন্দ্র মোদী? “কাগজে তো দেখলাম লিখেছে খুব নাকি ভালো ফ্যামিলি ম্যান”, দেভ? “বাঙালিদের মধ্যে ও’রকম হাইট দেখা যায়, তুইই বল?”

বাকিদের কী হয় জানি না, আমার ব্লাডপ্রেশার চড়চড় করে বাড়তে থাকে। মুখ দেখে সেটা বোঝা যায় নিশ্চয়, কারণ সঙ্গে সঙ্গে উল্টোদিকের লোকটার মুখেও একটা হালকা হাসি ফুটে ওঠে। হাসিটা এতই সূক্ষ্ম যে বাকিরা দেখতে পায় কি না জানি না, আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। আমি কী মহৎ, কত পজিটিভ, আর তুই কী ছোটমন, কেবল লোকের খুঁত ধরে বেড়াস---মহত্বের কমপিটিশনে আমাকে গোহারান হারিয়ে তাঁর মুখচোখ বিদীর্ণ করে যে অনির্বচনীয় গ্লো বিচ্ছুরিত হয়, ল্যাকমে লো’রিয়লের মডেলের এয়ারব্রাশ করা মুখেও সে ছটার দেখা মেলা ভার।

হারতে হারতে আমার এবার জেদ চেপে গেছে। আমি ঠিক করেছি এবার থেকে প্রকাশ্যে কারও নামে খারাপ কথা বলব না। মাথার ভেতর জাজমেন্টের জলপ্রপাত চালাতে পারি, কিন্তু মুখে সকলের প্রতি প্রশংসা আর ভালো কথার বান ডাকাব। যে সব ক্ষেত্রে প্রশংসা করা শারীরিকভাবে অসম্ভব হয়ে উঠবে, জিভে প্যারালিসিস দেখা দেবে, সেখানেও অ্যাট লিস্ট নিন্দের রাস্তা ধরব না। ধরি মাছ না ছুঁই পানি করে বেরিয়ে আসব। নরেন্দ্র মোদী ভালো ফ্যামিলি ম্যান শুনে চোখ কপালে তুলে বলব, “তাই নাকি? সত্যি, একটা মানুষকে বাইরে থেকে দেখে আমরা কত ভুল বুঝি।”     

বিশেষ করে আমার সেই বন্ধুটির সামনে এই নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করব আমি ২০১৪-য়। গরমকাল আসছে, দিল্লিতে মশার সিজ্‌ন্‌-ও এসে পড়ল বলে। সবার প্রশংসা করতে করতে দেবশিশু যখন দুই হাতে চটাপট মশা মারবেন, আমি বলব, “আহা রে মেরো না, বেচারারা কি টাইনি আর সুইট তো . . .”
দৃশ্যটা ভাবতেই আমার এত ভালো লাগছে যে অ্যাট লিস্ট এই প্রতিজ্ঞাটা আমাকে রাখতেই হবে
 

November 25, 2013

রেজাল্ট



আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, ২০১২-র নভেম্বর মাস নাগাদ আমি ২০১৪ সালের জন্য রেসলিউশনের লিস্ট বানাতে শুরু করেছিলাম। ভেবেছিলাম, সবার সামনে নাককানমুলে প্রতিজ্ঞা করলে প্রতিজ্ঞাপালনে সুবিধে হবে। অনেকটা ফেসবুকে স্ট্যাটাস মেসেজে “কমিটেড” ঘোষণা করার মতো। ঘোষণা করা হয়ে গেছে, ঘোষণার নিচে হাজারখানেক ‘লাইক’-ও পড়ে গেছে---তখন আবার ‘কমিটেড’ কেটে নামের পাশে ‘সিংগল’ লেখে এমন মাথা বেশি লোকের ঘাড়ে নেই। তখন যাই ঘটুক না কেন, “প্রেম যার সঙ্গেই করি না কেন কম্প্রোমাইজ তো সেই সবার সঙ্গেই করতে হবে” নিজেকে এইসব ভুজুংভাজুং দিয়ে প্রেম টিকিয়ে রাখতে হবে।

আমারও মতলবটা সেইরকমই ছিল। ঢাকঢোল পিটিয়ে কমিট করে ফেললাম, এবার চক্ষুলজ্জার তরী বেয়ে সে কমিটমেন্টের বৈতরণী পেরোবো, এমনই উচ্চাশা ছিল মনে।

শপথের লিস্টের আয়তনের ব্যাপারেও আমি অ্যাম্বিশন লাগামছাড়া হতে দিইনি। আইটেম রেখেছিলাম মোটে পাঁচখানা। ২০১৩-র রেসলিউশন আমি কতখানি রক্ষা করতে পারলাম, এখন তার হিসেব নেওয়ার আদর্শ সময় এসেছে। আসুন দেখা যাক রেজাল্ট কী হল।

শপথ #১---বলেছিলাম রান্না শিখব। বাঙালি রান্না। উঁহু, চিতল মাছের মুইঠ্যা বা কই মাছের গঙ্গাযমুনা নয়, আমার ভারি ইচ্ছে আলুবেগুনকপিরডাঁটা দিয়ে যে ধুন্ধুমার চচ্চড়িটা মা বানান সেইটা শিখি। বা একটু বেশি তেলে হিং ফোড়ন আর বড়িভাজা দিয়ে মেজমামির বেগুনের তরকারিটা শিখলেও মন্দ হয় না। তবে শেখবার লিস্টে আমার বড়জেঠির হাতের সব রান্নাই থাকবে। তেতোশুক্তুনি থেকে শুরু করে, পাঁচরকম শীতের তরকারি দিয়ে মাখামাখা মুগের ডাল, ঝাঁঝালো সর্ষের তেল দিয়ে মাখা পোস্তবাটা . . .”

রেজাল্টঃ ডাহা ফেল। বাঙালি রান্না শেখার শপথরক্ষা হয়নি আমার। তবে কেন হয়নি সে বাবদে আমার তূণে অজস্র অজুহাত আছে। রাঁধার টাইম পেলাম কখন যে শিখব? বছরের প্রথমটা ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয় আর বিউটি পার্লারের দরজায় মাথা কুটে কেটে গেল, শেষটুকু কেটে গেল “খেপ” আর “খোয়াসঁ”র দেশে ঘুরে ঘুরে। বাংলায় (বা সি. আর. পার্ক---ওই একই হল) থাকলে তবে না বাঙালি রান্না? রান্না করার সদিচ্ছার অভাব যে আমার ছিল না তার প্রমাণ শনিরবির ছবি খুলে দেখিয়ে দিতে পারি। লক্ষকোটি পাস্তা আর স্যুপ, ‘ফ্রম-স্ক্র্যাচ’ রেঁধে খেয়েছি আমি দু’বেলা। কাজেই রান্নার শপথভঙ্গের পেছনে দোষ আমার নয়, দোষ আমার পরিস্থিতির।


শপথ #২---বলেছিলাম ঘুমোব। ঘুমের মতো ঘুম। কে কতক্ষণ একে অপরের দিকে চোখের পাতা না ফেলে তাকিয়ে থাকতে পারে, নীল মনিটরের সঙ্গে সে কম্পিটিশন দিতে দিতে রণক্লান্ত হয়ে চোখ বুজব না, দিনের কাজ সাঙ্গ করে কাচাকাপড়ে শুদ্ধমনে নিদ্রাদেবীর সাধনা করতে করতে ঘুমোতে যাব“নিশ্ছিদ্র নিটোল নিবিড়” ঘুম ঘুমোতে শিখব আমি। আবার নতুন করে

রেজাল্টঃ ওয়েল, ফেল আর পাশের মাঝামাঝি যদি কিছু থেকে থাকে, আমার এই শপথরক্ষার স্ট্যাটাস হবে সেইটা। ঘুমের বড়ির বিজ্ঞাপনে যেমন দেখায়---জিরো সাইজ মডেল, মাছি পিছলোনো ত্বক আর স্মিতহাসি নিয়ে, শরতের মেঘের মতো ফুরফুরে বিছানায় ঢুকে বেডসুইচ নিভিয়ে দিলেন আর অমনি জানালার বাইরে থেকে জোছনা এসে তাঁর চোখবন্ধ কিন্তু হাসিহাসি মুখের ওপর পড়ল---সেরকম ঘুমোনোর স্টেজে এখনও পৌঁছইনি ঠিকই, কিন্তু অন্তত অফলাইন হওয়া গেছে। একবছর আগের আমাকে চিনলে এ ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে আপনাদের সুবিধে হবে। বেশ অনেকদিন হল হেডমাস্টারের মতো বেত হাতে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে দিয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করাই। ফোন, আইপড ইত্যাদি আধুনিক সভ্যতার যতরকম উপদ্রব সব নাগালের বাইরে বিদায় করি। তারপর একখানি বই হাতে বিছানার ভেতর সেঁধোই। মিথ্যে বলব না, এ ঘটনা সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছ’রাত ঘটে। বাকি একটা রাত এখনও এঁকেবেঁকে হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে পালায়। সে ব্যাটাকে বাগ মানাতে পারলেই আমার জয় সম্পূর্ণ। অতএব এই শপথটাকে ওয়ার্ক অফ প্রোগ্রেস বললেই সবদিক থেকে ন্যায্য হবে।

শপথ #৩---বলেছিলাম ফাঁকিবাজির ভূতকে গলা টিপে মারব। সময় নষ্ট করার খোক্কসকে কুলোর বাতাস দিয়ে তাড়াব। এক্সপেকটেশনের ল্যাজামুড়ো ছেঁটে আমার সাইজে নামাব না, নিয়মিত ব্যায়াম করে মগজের গুলি ফুলিয়ে নিজেকে এক্সপেক্টেশনের মাপে তুলে নিয়ে যাব।

রেজাল্ট---আমি জানি পাঠক জানেন আদালতের রায় কী হতে চলেছে। কিন্তু অত তাড়াহুড়ো করলে চলবে না। সাতপাঁচ ভেবে তবে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে।

কম কথায় সারতে গেলে এই শপথরক্ষায় আমি আগাপাশতলা ফেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাড্ডু। ফাঁকি আমি এখনও মারি, সময় নষ্ট আমি এখনও করি। এই মুহূর্তেও করছি। আগের প্যারাগ্রাফটা শেষ করে “জল খেতে” উঠে ফিরে এসে ফের লেখা শুরু করতে গিয়ে দেখি মাঝখানের পাক্কা চল্লিশ মিনিটের টিকিটিও আর দেখা যাচ্ছে না। আমার বেশিরভাগ উচ্চাশাই এখনও আকাশের গায়ে আঁকা প্রাসাদসৌধ হয়ে ঝুলে আছে, হাত বাড়িয়ে তাদের ছোঁয়ার চেষ্টাটাই করে উঠতে পারিনি আমি এখনও পর্যন্ত।

কিন্তু দয়া করে আমাকে যদি একটু বেশি কথা বলার সুযোগ দেন তাহলে আমি অন্য একটা ছবি আপনাদের দেখাতে পারি। গত পাঁচ মাসে একটিও ডেডলাইন মিস না করার ছবি। কাজ জমা দেওয়ার দিন “আমার আরও চব্বিশ ঘণ্টা সময় দেওয়া হোক” বলে কান্নাকাটির অনুপস্থিতির ছবি। হ্যাঁ, ডেডলাইন রক্ষার কাজটা আমি “গ্রেসফুলি” করতে পারিনি ঠিকই---রাতে ঘুম বাদ পড়েছে, রৌদ্রকরোজ্জ্বল উইকএন্ডে সবাই যখন নিজের কাজ সময়মতো শেষ করে হল্লা করতে করতে পিকনিকে গেছে, তখন আমাকে বন্ধ ঘরে বসে নিজের ফাঁকিবাজির গুষ্টির পিণ্ডি চটকাতে চটকাতে ঝড়ের বেগে টাইপ করতে হয়েছে। কিন্তু জিভ বার করে ধুঁকতে ধুঁকতে হলেও, বাঁশি বেজে ওঠার আগে ফোটোফিনিশে আমি চকের দাগ ছুঁয়েছি।

আর ছুঁয়ে একচিমটে গর্বও যে বুকের ভেতর অনুভব করিনি তেমন নয়। গর্বের থেকেও বেশি হয়েছে স্বস্তি। আবার সেই এক গোষ্পদে ডুবে না মরার স্বস্তি। জানি মহাকালের নিরিখে পাঁচ মাস তুশ্চু। তার ওপর সেই পাঁচ মাস যদি একেবারে অচেনা পরিবেশে, অপরিচিত মানুষদের মাঝখানে কাটে। নিজের রাজত্বে ফিরে গিয়ে আবার সব যেমনটি তেমন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি যে ষোলোআনা বর্তমান, সে কথাটা আমার মাথায় আছে। কিন্তু তার সঙ্গে এটাও মাথায় আছে যে চাইলে পরিস্থিতি বদলানোর ক্ষমতাও আছে আমার। সে প্রমাণ আমি স্বচক্ষে দেখেছি।

শপথ #৪---গতবছরটা মিনিম্যালিজম্‌ প্র্যাকটিস করার ব্রত নিয়েছিলাম আমি। বলেছিলাম বাড়িতে রাখার জায়গা নেই বলে ক্যামেরা কেনা আটকে রয়েছে। বলেছিলাম, "২০১৩র রেসলিউশনের লিস্টে আমার চার নম্বর আইটেম হচ্ছে, বাড়িতে কাজের জিনিসের জন্য জায়গা বার করা। আর এই রেসলিউশনের করোলারি হচ্ছে বাড়ি থেকে অকাজের জিনিস টান মেরে বিদায় করা।

রেজাল্টঃ এক্ষেত্রেও সেই অজুহাতটা ঝুলি থেকে বের করার সুবিধে আছে---বাড়িতেই যদি না থাকি তাহলে বাড়ি থেকে জিনিসপত্র টান মেরে বিদায় আর করি কী করে। যদিও আমি সেটা করছি না। কারণ অন্য যে বাড়িগুলোয় ঘুরে ঘুরে থাকলাম এই ক’টা দিন, সেগুলোতে আমার আচরণ মোটেই বুক ফুলিয়ে বলার মতো নয়। আমার টেবিলের ওপর এই মুহূর্তে আমি একটা ইউস্‌ অ্যান্ড থ্রো পেন এবং পাঁচটা প্রিন্ট আউট দেখতে পাচ্ছি যাদের সবকটারই ইউস্‌ বহুদিন হল ফুরিয়েছে। রোজ ভাবি ফেলব, রোজ যত্ন করে গুছিয়ে রাখি। অফিসের টেবিলের ওপরেও বেকারির পলিথিন আর অব্যবহৃত ন্যাপকিনের পাহাড় জমিয়েছি। আগামীকাল থেকে পৃথিবীর সব ন্যাপকিন কারখানায় লক-আপ হয়ে গেলে যাতে দু-মাস অন্তত কোনও অসুবিধেয় পড়তে না হয়।

ফেল। জঘন্য।

শপথ #৫---শপথ করেছিলাম মনের কথা মুখ ফুটে বলার। “. . . আমি ঠিক করেছি এবার থেকে মনের কথা খুলে বলব। কোন জিনিসটা আমার ভালো লাগছে, কোনটা ভালো লাগছে না, সেটা সময় থাকতে থাকতে ঠাণ্ডা মাথায় প্রকাশ করব।

রেজাল্টঃ সুখের কথা, এ শপথ আমি রক্ষা করেছি। এই মুহূর্তে অন্তত তিনটে পরিস্থিতি আমার মনে পড়ছে, যেখানে প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়ে, ঘরের কোণে বসে কল্পনায় গোটা ঝগড়াটা না করে আমি ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা মাথায় একটা সভ্য কথোপকথন চালানোর কনফিডেন্স দেখাতে পেরেছি। (সঙ্গে সঙ্গেই আর একটা পরিস্থিতি মনে পড়ছে যেখানে আবার সেই ল্যাজ গুটোনোর পুনরাবৃত্তি হয়েছে, কিন্তু আমরা সেই সংখ্যালঘু পরিস্থিতিটাকে ইগনোর করব।)

ফাইন্যাল স্কোর
শপথ #১ = ০
শপথ #২ = ১/২
শপথ #৩ = ১/৩
শপথ #৪ = ০
শপথ #৫ = ১

অর্থাৎ পাঁচটি শপথের জন্য এগ্রিগেট পাঁচ নম্বরের  মধ্যে আমি পেয়েছি মোটে ১+(৫/৬)। দুই-ও ছুঁতে পারিনি। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। জঘন্য।

রেসলিউশনের ব্যাপারে আপনাদের পারফরম্যানস্‌ কী রকম ২০১৩-য়? পাশ করুন ফেল করুন, বলতে লজ্জা পাবেন না। সারদা-মা’র কথাটা মনে রাখবেন, “লজ্জা ঘৃণা ভয়, তিন থাকতে নয়”। আর তাছাড়া শেকস্‌পিয়রও বলেছেন “ফেলিওর ইস দ্য মাদার অফ সাকসেস”। ২০১৩-র ফেলিওরের ওপর আমরা মহাসমারোহে ২০১৪-র সাকসেসের ভিতপুজো করব, কিচ্ছু ভাববেন না। (আর যদি অলরেডি না করে থাকেন, এ বছরের সাকসেস-ফেলিওরের কথা ভাবতে ভাবতে আগামী বছরের রেসলিউশনগুলোও এইবেলা ঠিক করে ফেলুন কারণ আগামীকাল সেই নিয়েই কথা হবে।)



November 23, 2013

সাপ্তাহিকী



 দ্য লিটল মেরিলিন। আলোকচিত্রীঃ  Edouard Boubat, 1975

When marrying, ask yourself this question: Do you believe that you will be able to converse well with this person into your old age? Everything else in marriage is transitory.
                                                                                     ---Friedrich Nietzsche


অ্যান্ড দ্য অ্যাওয়ার্ড গোস্‌ টু . . . SELFIE!


ছবিতে নিজেকে “হট্‌” দেখাতে চান? তাহলে এই কায়দাটা শিখতেই হবে। আমি শিখছি এবং দিবারাত্র প্র্যাকটিস করছি। এর পর আমার ছবি দেখে আপনারা কেউ আমাকে চিনতেই পারবেন না, দেখবেন।

ওপরের কেরামতিটা ম্যানেজ করে ফেলেছেন? গুড। এবার এটা শিখে ফেলুন। হোমরাচোমরা কাউকে কখনও যদি বাড়িতে নেমন্তন্ন করেন কাজে লেগে যাবে।


"Youth is the gift of nature, but age is a work of art." সেই কথাটাই হাতেনাতে প্রমাণ করে দিয়েছেন Steve McCurry। (সুগত-র সৌজন্যে)

এ সপ্তাহের গান। শুনতে ভালো, দেখতেও মন্দ না।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.