December 31, 2013

ছবিতে বারোমাস্যা



জানুয়ারিঃ লুচি গোল হতে তখনও অনেক দেরি (এখনও অবশ্য), কিন্তু তাই বলে খেতে খারাপ হয়নি। তাছাড়া প্রত্যেকটা ফুটবলের মতো ফুলেছিল দেখে কী আনন্দ যে পেয়েছিলাম---এই বারোমাস বাদেও স্পষ্ট মনে পড়ছে।

ফেব্রুয়ারিঃ বন্ধুরা ক’জন মিলে ব্যাডমিন্টন ডেট হয়েছিল। আমাকে পাঁচমিনিট খেলতে দেখে একমিনিট চুপ করে থেকে সবাই মিষ্টি করে বলল, ‘কুন্তলাদি, তুমি বরং ছবি তোল, আমরা খেলি।’ কী ভাগ্যিস বলল। ওরাও বাঁচল, আমিও।

মার্চঃ এ বছরের মত শীত টা টা বাই বাই। ইজি-ধৌত হয়ে গরমজামারা সব সুটকেসে ঢোকার অপেক্ষা করছে।

এপ্রিলঃ পয়লা বৈশাখের ভোজ।

মেঃ মধুচন্দ্রিমা। শিলং-এ হোটেলের বারান্দায় কেষ্টঠাকুরের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আমি।

জুনঃ সারাদিন ঘ্যানাপাড়া বৃষ্টি, মেঘ আর কুয়াশা। ডয়েশ সামারের নমুনা দেখে সত্যি বলছি গোড়ায় চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হয়েছিল। এই ছবিটা ফ্রাউ বার্শের বাড়ির বারান্দা থেকে তোলা। ওই দূরে আবছায়া দেখা যাচ্ছে বনের সবথেকে উঁচু বাড়ি পোস্ট টাওয়ারের চুড়ো আর চার্চ।

জুলাইঃ কাল থেকে শুরু করে টানা একমাস দিনের আলো থাকা পর্যন্ত খেতে পারবে না ফাউজি আর মহম্মদ, আদর করে আমরা সবাই যাকে ‘মো’ বলে ডাকতাম। রামাদান শুরু হওয়ার আগের সন্ধ্যেয় তাই সবাই মিলে ডিনারে যাওয়া হয়েছিল। মেঘবৃষ্টি কেটে গিয়ে ডয়েশ সামার তখন পূর্ণমহিমায় আবির্ভূত হয়েছে।

অগস্টঃ একটি প্রাণ, একটি জানালা। বার্লিনের দেওয়াল পেরিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম জার্মানিতে ঢুকতে গিয়ে নিহত শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লোকে এখনও জানালায় ফুল রেখে যায়।

সেপ্টেম্বরঃ রবিবারে যেদিন কোথাও যাওয়ার না থাকত, বাড়িতে বসে খুব রান্নার ঝোঁক চাপত। আর রান্নার পর সে রান্নার ছবি তোলা। ভালো টাইমপাস হয় কিন্তু।

অক্টোবরঃ প্যারিস। শরতের দুপুর। পুজো-পুজো রোদ। আর ছবির বাঁদিকের কোণায় ভিক্টর হিউগোর বাড়ি।

নভেম্বরঃ সামার গতপ্রায়। কুয়াশা আর নাগরদোলার নোংরা কাঁচের ভেতর দিয়ে প্যারিস তবুও সুন্দরী।

ডিসেম্বরঃ ট্রেনিং শেষ। কে জানে আবার কতদিনের মনে শেষ ব্রাটউয়র্স্ট খাওয়া আর পথচলতি ‘ডাংকে শোন’ বলা। বুকের ভেতর বাড়ি ফেরার দিনগোনা শুরু। সে দিনগোনার উত্তেজনাটা দেখতে অনেকটা এই ছবিটার মতোই ছিল।


Best of 2013


বেস্ট বইঃ লোকলজ্জা আর নিজের ইমেজ বাঁচানোর দায় যদি না থাকত তা হলে আমি ড্যানিয়েল স্টিলের লেখা যে কোনও বইয়ের নাম বলতাম। টক্সিক ব্যাচেলরস্ কিংবা ডেটিং গেম। কামিং আউট কিংবা আ গুড উওম্যান। যেমন নাম, তেমন গল্প। সোজাসাপটা। ভালো লোকেরা সব সাক্ষাৎ দেবশিশু, খারাপ লোকেরা সবাই টপ টু বটম বদের বাসা। প্রেম, এক্সট্রা ম্যারিট্যাল, হলিউড, ওয়াল স্ট্রিটে ছয়লাপ সব গল্পের লাস্ট সিনে ভালো লোকেদের সুন্দর দেখতে লোকজনের সঙ্গে বিয়ে হবে আর খারাপ লোকেরা নরকের চৌরাশিটা কুণ্ডে জ্বলেপুড়ে মরবে।

দুঃখের বিষয় লোকলজ্জা আমার অসুবিধেজনক রকমের বেশি, আর তার থেকেও বেশি হচ্ছে নিজের ইমেজকে ধুয়ে মুছে চকচকে করে রাখার বাসনা। কাজেই আমি অনেক ভেবেচিন্তে দ্য লুমিনারিস্‌-কে আমার ২০১৩য় পড়া বেস্ট বইয়ের শিরোপা দিলাম। দেওয়ালজোড়া ক্যানভাসে নিখুঁত ঝকঝকে ছবির মতো এলেনর কাটনের ঐতিহাসিক মহাগ্রন্থ আমার এ বছরে পড়া সেরা বই।


বেস্ট (মিস্‌ হয়ে যাওয়া) সিনেমাঃ বছরের শেষে এসে অতিদুঃখের সঙ্গে আবিষ্কার করছি, ২০১৩য় রিলিজ হওয়া বাংলা, হিন্দি, ইংরিজি সিনেমার মধ্যে আমি দেখেছি মাত্র দুটো। গো গোয়া গন আর সত্যান্বেষী। এদের দুজনের মধ্যে কম্পিটিশন করানোর থেকে ঢের ন্যায্য হবে এ বছরে আমার সেরা মিস্‌ হয়ে যাওয়া সিনেমাদের মধ্যে বেস্ট বাছা।

অফ কোর্স, না-দেখা-সিনেমার ভালোমন্দ বিচার করার প্রতিভা আমার নেই। কাজেই আমার বাছাবাছির মাপকাঠি হল কোন সিনেমাটা মিস্‌ করে গিয়ে আমার বেস্ট মন-খারাপ হয়েছে সেটা। মিশর রহস্য। আড়াইঘণ্টা ধরে প্রসেনজিতের খোঁড়া পায়ের হিরোইজম্‌ আর সন্তুর পাকামি, হলে গিয়ে না দেখতে পারার আফসোস আমাকে এখনও কুরে কুরে খাচ্ছে। 


বেস্ট খাওয়াঃ সিনেমা দেখিনি, কিন্তু খেয়েছি প্রচুর। গত বারো মাস, বাহান্ন সপ্তাহ, তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের সকালবিকেলদুপুরসন্ধ্যে ননস্টপ। যেমনতেমন দিন-আনি-দিন-খাই স্যান্ডউইচ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সেরা আইসক্রিম। কাজেই ফস্‌ করে সেরা খাওয়া বাছতে বললে পারব না।

কিন্তু সেরা খাওয়া কি শুধু খাবারের ওপর নির্ভর করে? অর্গ্যানিক, লোকাল, হিউমেনলি রেইজড্ ইনগ্রেডিয়েন্টস্‌ আর অথেনটিক রেসিপিই কি মেমোরেবল্‌ মিলের জন্ম দেয়? আমি তা মনে করি না। খাবারটা খাওয়ার সময় মাথার ভেতর টেনশন আর পেটের ভেতর ক্ষিদের মাত্রা---আমার মতে এই দুটো ব্যাপারই সবথেকে জরুরি। তাছাড়া কম্প্যানির ব্যাপারও আছে। প্যারিস ছাড়ার আগে অফিসের একগণ্ডা ফুডির সঙ্গে বসে প্রাইজ পাওয়া বিফ কারপাচিও খেয়েছিলাম, খেয়ে ম্যান্ডেটরি আহা-বাহাও করেছিলাম। কিন্তু দু’নম্বরের নোংরা বাজারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অর্চিষ্মানের সঙ্গে অফিসফেরতা ‘ঝালমুড়ি উইথ এক্সট্রা কাঁচালংকা অ্যান্ড নো নারকেল প্লিজ’? পৃথিবীর সব কারপাচিওর কান কেটে পকেটে পুরে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

সব দিক ভেবেচিন্তে আমি এ বছরের সেরা খাওয়া হিসেবে যেটাকে বাছলাম, সেই খাওয়াটা আমি খেয়েছিলাম এ বছরের জুন মাসের শেষ নাগাদ। কোলোন সেন্ট্রাল স্টেশনের গায়ে সাড়ে সাতশো বছরের পুরনো কেলেকুষ্টি ক্যাথিড্র্যাল, ক্যাথিড্র্যালের কোলে রাইখার্ড ক্যাফে। প্রিয় মানুষের সঙ্গ ছিল না ঠিকই কিন্তু পিঠের ওপর ভরা সামারের রোদ্দুর ছিল, মনের ভেতর হারানো-ফোন-সদ্য-ফিরে-পাওয়ার শান্তি ছিল, আর হাতের সামনে ছিল মুচমুচে খোঁয়াসঁ আর নোনতা হ্যামের জন্মজন্মান্তরের রাজযোটক জুটি।


বেস্ট ওয়র্স্ট ক্ষতিঃ ঋতুপর্ণ ঘোষ। মান্না দে-ও বলতে পারতাম। ইন ফ্যাক্ট, গান আর সিনেমার প্রতি নিজের বোধগম্যতা দিয়ে যদি দু’জনের মধ্যে বাছতে বলা হত তাহলে মান্না দে-র নামটাই আমার বলা উচিত ছিল। হেমন্ত না মান্না, বাঙালির এই চিরন্তন ঝগড়ায় আমি আজীবন ‘মান্না মান্না’ করে গলা ফাটিয়েছি, একলা ঘরে বসে ‘পুছো না ক্যায়সে’র মেদুরতায় বার বার আচ্ছন্ন হয়েছি। আহির ভৈরবের প্রতি এর থেকে বেশি সুবিচার পৃথিবীতে আর কোনও গাইয়ের পক্ষে করা সম্ভব কি না, সে নিয়ে প্রত্যেকবার সন্দেহ জেগেছে।

তবু আমি ঋতুপর্ণের নামটাই বলব। কারণ আমার জীবনে উৎসব আর উনিশে এপ্রিলের ভূমিকা অস্বীকার করলে তার থেকে বড় পাপ আর কিছু হবে না। আর তিতলি। আর হীরের আংটি। আর অসুখ। আর রেনকোট-এর সেই গানটার লাইনক’টা। ‘তুমহারি রাধা অব পুরি ঘরওয়ালি/ দুধ নওয়ন ঘিউ দিনরাত খালি/ বিরহকে আঁসু কবকে পোঁছ ডালি/ ফির কাহে দরদ জাগাও...’

ঋতুপর্ণের চলে যাওয়া আরও অনেকদিন দরদ জাগাবে। রুচি আর বুদ্ধির এমন মিশেল, চাইলেই আরও একটা জোগাড় করতে পারবে না বাঙালি।


বেস্ট শিক্ষাঃ প্রফেশন্যাল, পার্সোন্যাল যেদিক থেকেই দেখি না কেন, ২০১৩ আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বছর। ২০১৩ আমাকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ দিয়েছে। জীবনের প্রতিটি বছরই কিছু না কিছু শেখায় অবশ্য, কিন্তু অনেক সময় সেই শেখানোর থেকেও ‘শিক্ষা দেওয়া’র ভাবটা বেশি থাকে। গায়ে হাত বুলিয়ে শেখানোর থেকে বেত মেরে শেখানোতেই তাদের বেশি উৎসাহ। ২০১৩-র ভেতর সেই ভাবটা একেবারেই ছিল না। আমাকে সে শিখিয়েছে ভালোবেসে, যত্ন করে। অনেক আনন্দ, হইচই, ছোটছোট সুখের অভিজ্ঞতার ঝুলি উপুড় করে দিয়েছে সে আমার জীবনে। কিন্তু সবার থেকে ভালো আর দামি উপহার যেটি সে দিয়েছে তা হচ্ছে মানুষের সঙ্গ। নানান দেশের, নানান ভাষার, নানান রঙের, নানান মতের মানুষের সঙ্গ। আর এই সঙ্গ থেকেই আমি শিখেছি যে বাইরে থেকে দেখতে যত ভিন্ন আমরা সবাই, ভেতরটা আসলে ঠিক ততখানিই এক। স্নেহে, বাৎসল্যে, ক্ষুদ্রতায়, কৃতজ্ঞতাবোধে, ভয়ে, নিরাপত্তাহীনতায়, ব্যর্থতায় এবং সাফল্যে---আমরা প্রত্যেকে একে অপরের অবিকল সংস্করণ। কী শান্তির কথা বলুন দেখি।




December 29, 2013

সুখদুঃখ সেট্‌ল্‌মেন্ট



একেকটা লোক একেকসময় এমন একেকটা কথা বলে বসে, কথাগুলোর জন্যই লোকগুলোকে সারাজীবন মনে রেখে দিতে হয়। আমার এক সিনিয়র দাদা যেমন। দাদা ভয়ানক ধার্মিক ছিলেন, কাঁঠাল দেখলে আনন্দে অজ্ঞান হয়ে যেতেন, খেয়ে ওঠার পর জোয়ানের বদলে মুঠো মুঠো মৌরি চিবোতেন। সোজা কথায় আমার আর দাদার মধ্যে একতিল মিলও ছিল না। তবু যে দাদার কথা কোনওদিন ভুলতে পারিনি তার কারণ দাদার একটি বাণী।

‘দুঃখ ভাগ করার লোক অনেক পাবে কুন্তলা, আনন্দ শেয়ার করার লোক পাওয়াই শক্ত।’

আমি হাঁহাঁ করে উঠে দাদার ভুল ঠিক করে দিতে যেতেই দাদা মাথা নেড়ে গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, ‘উঁহু, আমি ঠিকই বলেছি। পরে সময় পেলে ভেবে দেখো।’

পরে ভেবে দেখার অনেক সময় পেয়েছি এবং টের পেয়েছি দাদা কী সত্যি কথাটাই না বলেছিলেন।

কাজেই অবান্তর বই হয়ে বেরনোর ভালো খবরটা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। অবান্তরে এসে, ই-মেল করে, যাঁরা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। 

*****

লোকে বলে নতুন জায়গার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াতেই আসল কেরামতি, নিজের বাড়িতে গুছিয়ে বসতে যে এত সময় লাগে কে জানত। খালি এই সাড়ে তিন হাত শরীর আর শরীরের পেছন পেছন বাইশ কেজি নশো নিরানব্বই গ্রাম ওজনের বেঢপ ভি. আই. পি. টানতে টানতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া তো নয়, আগেপিছের লটবহর সৈন্যসামন্ত সামলাতে সামলাতেই জান কয়লা। রওনা হওয়ার পাক্কা পাঁচদিন আগে ডয়েচপোস্টের বৃহত্তম বাক্স ভর্তি করে বইপত্র পোস্ট করেছিলাম বাড়ির ঠিকানায়, বাড়ি পৌঁছনোর পাঁচদিন বাদেও সে বাক্সের দেখা নেই। ওদিকে লা পোস্টের বাক্স বাড়ি এসে গিয়েছিল কাঁটায় কাঁটায় পাঁচদিনের মাথায়। আসতেই হবে। সে বাক্সে ছিল শাড়ি, জামা, দু’তিনটে রোগারোগা আধা-দরকারি খাতাবই। আর এ বাক্স কানায় কানায় ভর্তি করে আছে গত ছ’মাসে কেনা খান ষোল বই, তার মধ্যে অনেকগুলোর প্রথম পাতায় শেকস্‌পিয়ার অ্যান্ড কোম্পানির মহার্ঘ ছাপ মারা। জিনসের পেছনপকেট থেকে ভাঁজে ভাঁজে আবছা হয়ে যাওয়া ডয়েচপোস্টের রিসিট বার করে আমরা স্বর্গমর্ত্যপাতাল এক করে ফেললাম, বাক্সের টিকির দেখা নেই। শেষে ‘কপালের নাম গোপাল’ বলে আশা ছেড়ে হাত-পা এলিয়ে বসেছি, এমন সময় গতকাল ভরদুপুরে খ্যানখেনে বেল বাজতে দরজা খুলে দেখি প্রকাণ্ড লালহলুদ বাক্সের ওপার থেকে জেগে থাকা একজোড়া চোখ পিটপিটিয়ে বলছে, ‘চায়পানি কে লিয়ে কুছ নহি মিলেগা?’

চায়পানি? চাইলে আমি কোর্মাকালিয়ার ব্যবস্থাও করতে পারতাম। লাফালাফি থামিয়ে বাক্স খুলে দেখি বই ছাড়াও জেনেভায় বেঁচে যাওয়া সুইস ফ্রাংকের ছোট্ট বটুয়াটাও এই বাক্সের ভেতর কী করে যেন ঢুকে পড়েছিল। ইউ. এন.-এর সুভেনির শপ থেকে অনেক শখ করে কেনা চাবির রিং-খানাও। দেখেশুনে, বাক্স হারালে কী হত সেই ভেবে আমার শোক নতুন করে উথলে উঠল।

বাক্স মিলল, কিন্তু তাই বলে বিপদ কমল না। দিল্লির ওয়েদারটাই এখন যেমন রীতিমত বিপদসংকুল। ভোরবেলা তাপমাত্রা থাকে সাত-আট, কিন্তু সকাল আটটার সময় জানালার বাইরের গোধূলির আলো, কুয়াশা, পায়ের তলায় ভাড়াবাড়ির প্রাণঘাতী ঠাণ্ডা মার্বেলের মেঝে, সব মিলিয়ে ফিল্‌স্‌ লাইক যেন সাইবেরিয়া। ট্রেনিং শেষে ‘কী শিখলে?’ প্রশ্নের উত্তরে খুব বড় মুখ করে ‘জার্মান পাংচুয়্যালিটি অ্যান্ড অরগ্যানাইজেশন’ বলেছিলাম, সে পাংচুয়্যালিটির শপথ রক্ষা করতে গিয়ে এখন প্রাণ বেরনোর জোগাড়।

তবে গুছিয়ে বসার পালা মোটামুটি শেষ। ভি. আই. পি. র ভেতরের জিনিসপত্র সব একেএকে যেথাকার সেখানে ফেরৎ গেছে, ভি. আই. পি. ঢুকে গেছে বক্সখাটের গুহায়, টি-ব্যাগের জায়গায় আবার সসম্মানে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে টাটা গোল্ডের। দুই মায়ের পাঠানো আচার, জয়নগরের মোয়া, কাজু-কিশমিশ-মোরব্বা-চেরি গাঁথা নরম বালিশের মতো কেক, বেগনি রঙের বাঁধনি প্রিন্টের শাড়ি, কাঁচ বসানো রাজস্থানি হাতব্যাগ---সব নিয়ে আমরা এখন যাকে বলে ‘সেটল্‌ড্‌’।

      

December 25, 2013

এবার বইমেলায়



অনেকদিন আগে পড়েছিলাম তাই কোথায় পড়েছিলাম মনে নেই। বাঙালির বইপ্রীতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে চন্দ্রিল বলেছিলেন তাঁর ধন্দের কথা। বছর বছর পালে পালে বাঙালি বইমেলা যাচ্ছে, লাইন দিয়ে ফিশফ্রাই খাচ্ছে, ব্র্যান্ডেড জিনসের মায়া ত্যাগ করে ধুলো মাঠে থেবড়ে বসে পড়ে টুংটাং গিটার বাজিয়ে বেসুরো ব্যান্ডগান গাইছে। কেন? বই ভালোবাসে বলে? তাহলে তো কলেজ স্ট্রিট গেলেই হয়। সারাবছর খোলা থাকে, প্রবেশমূল্য লাগে না, সবথেকে বড় কথা বইয়ের দামে কমিশনও অনেক বেশি। বাঙালির বই ভালোবাসার সঙ্গে বাঙালির বইমেলা ভালোবাসার যদি সমানুপাতিক কোনও সম্পর্ক থাকত তাহলে সারাবছর কলেজ স্ট্রিটে আর “গাড়িঘোড়া চলতে হত না।”

আমি অবশ্য এক্ষুনি হাতে গুনে বলে দিতে পারি আমি কেন যাই। মানে, কেন যেতাম। আমি যেতাম দেবসাহিত্য কুটীরের স্টলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের বই আবার আগাগোড়া পড়ব বলে, আজকাল স্টলের দেওয়ালজোড়া সাদাকালো ভিন্টেজ ছবি দেখব বলে, আর ছবি দেখে বেরিয়ে হঠাৎ চিমা ওকোরিকে দেখে ফেলব বলেও। (এখনও কি বইমেলায় গেলে চিমাকে ঘিরে “গুরু গুরু” চেঁচিয়ে ওঠা ভিড় জমে যায়? নাকি চিমা নিশ্চিন্তে হেঁটেচলে মেলা দেখতে পারেন, কেউ তাঁকে চিনতেই পারে না যে বিরক্ত করবে?)

এ বছর আমি যে কারণে বইমেলা যাব, তার জন্য অবশ্য ওপরের একটাও কারণ দায়ী নয়। আমার এ বছরের বইমেলা যাওয়ার কারণটি খুবই ক্ষুদ্র। তার দৈর্ঘ্য সাড়ে আট ইঞ্চি, প্রস্থ সাড়ে পাঁচ, কবজি . . . আই মিন উচ্চতা, কমবেশি একশো কুড়ি পাতা। তার গায়ের রং আকাশি আর গোলাপি মেশানো। নাহ্, একগাদা বর্ণনা না দিয়ে আপনাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ করিয়েই দিই।


এই হচ্ছে অবান্তর। ভার্চুয়াল নয়, রিয়েল অবান্তর। ইন্টারনেটের আকারআয়তনঅবয়বহীন ফ্রি ব্লগস্পট অ্যাকাউন্টের অবান্তর নয়, রীতিমত হাতে ধরতে পারা, নাকে শুঁকতে পারা রক্তমাংসের অবান্তর।
অবান্তরকে ভার্চুয়াল থেকে রিয়েল করার কৃতিত্ব সৃষ্টিসুখ-এর। সোজা করে বললে রোহণ কুদ্দুসের। অবান্তরের প্রচ্ছদটি রোহণের নিজের হাতে তৈরি। বইরূপী অবান্তরের পেছনে রোহণের অবদানের এটি শুধু টিপ অফ দ্য আইসবার্গ, তাঁর হারকিউলিসোচিত পরিশ্রমের বাকিটুকু নেপথ্যে। রোহণ সৃষ্টিশীল, রোহণ পরিশ্রমী, রোহণ উচ্চাশাবাদী, রোহণ সপ্রতিভ এবং সুশীল, রোহণের মাথা বরফের মতো ঠাণ্ডা।

বেসিক্যালি, রোহণ আর আমি পরস্পরের পারফেক্ট পরিপূরক। কাজেই গত কয়েকমাসে আমাদের একসঙ্গে কাজ করাটা আনকোরা দিল্লি টু আগ্রা হাইওয়েতে ড্রাইভ করার মতোই মোলায়েম ও ঝাঁকুনিহীন হয়েছে।

ঝাঁকুনি যত লাগার লেগেছে বই-অবান্তরের জন্য আর্কাইভ থেকে পুরোনো লেখা ঝাড়াইবাছাই করতে গিয়ে। মাত্র দুই-আড়াই-তিন-চার বছর আগের ব্যাপার, তখনকার নিজের লেখা পড়ে এখন ভুরু ছেঁটে নিরুদ্দেশে যেতে ইচ্ছে করছে। কী খারাপ, কী ছেলেমানুষি, কী ভুলভাল। ডিপ্রেশন প্রায় সেট ইন করে করে। রীতিমত ফেশিয়াল, ম্যানিকিওর, পেডিকিওর করে তবে সে সব লেখাকে মনুষ্যসমাজের উপযোগী করে তুলতে হয়েছে। তাতে অবশ্য ডিপ্রেশন কাটেনি। কারণ বুঝেছি, আজ যে লেখাগুলো লিখে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে সাবাস বলছি, কয়েকবছর বাদে সেগুলো পড়লে মনের দুঃখে বনবাসে যেতে ইচ্ছে করবে। কী জঘন্য ব্যাপার বলুন দেখি।

পরিশ্রম যেখানে কিছুই হয়নি, সেটা হচ্ছে ‘উৎসর্গ’ বাছতে গিয়ে। রোহণ যখন ই-মেল করলেন, “কাজ প্রায় শেষ ম্যাডাম, এবার বলুন বইটা উৎসর্গ কাকে করতে চান” আমার মাথা থেকে একটা ভার যেন নেমে গেল। জবাফুলের ল্যাটিন নাম জানতে চেয়ে লাফিয়ে ওঠা উদগ্রীব একঘর হাতের মধ্য থেকে ইরাদিদিভাই যেন আমার হাতটাকেই বেছে নিলেন। আমিও একসেকেন্ড সময় নষ্ট না করে আমার উত্তরটা (সঠিক উত্তর) বলে দিলাম।

আমার রিয়েল অবান্তর আমি উৎসর্গ করলাম আমার ভার্চুয়াল বন্ধুদের। অর্থাৎ আপনাদের।

কেন করলাম সে কথা আবার বললে পুনরাবৃত্তি দোষ ঘটবে, কাজেই সে পথে আর যাচ্ছি না। আপনাদের কাউকে কাউকে আমি রক্তমাংসে জানি, কাউকে শুধু ছবি দেখে চিনি, যাঁদের সেটুকুও চিনি না, তাঁদেরও চেহারা হাবভাব আচারআচরণের একটা স্পষ্ট ছবি আছে আমার মাথার ভেতর। আপনাদের সঙ্গে কথোপকথন করে, আপনাদের কথা ভেবে, আপনাদের জন্য লিখে, আপনাদের জন্য সাপ্তাহিকীর লিংক আর এ সপ্তাহের গান খুঁজে আমার সারাদিনের যে পরিমাণ সময় ব্যয় হয়, খুব কম রিয়েল লাইফ সম্পর্কের পেছনেই আমি সে সময় খরচ করেছি। করেছি, কারণ আমার খুব কম রিয়েল-লাইফ সম্পর্কই আমাকে এতখানি স্বার্থহীন ভালোবেসেছে, আমার দৈনন্দিন ভালো থাকার, সুস্থ থাকার, কারণ হয়ে উঠতে পেরেছে, মাত্র কয়েকটা কথায় আমার সারাদিন রোদঝলমল করে তুলতে পেরেছে।

আপনারা যদি ভার্চুয়াল হন, তাহলে আমার জীবনে রিয়েল বলে কিছু নেই।

আপনাদের বন্ধুত্বের প্রতিদানে এই পুঁচকে বই নিতান্ত অপ্রতুল, কিন্তু আপাতত এটুকুই রইল। আশা করি এতেই আমার দেওয়ার ঝুলি ফুরোবে না।

              

December 22, 2013

দিল্লি চলো



ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়ে গেছে, অফিসের ল্যাপটপ, লকারের চাবি প্রত্যর্পণ হয়ে গেছে, একে একে সবার গলা জড়িয়ে “ডোন্ট ফরগেট টু কিপ ইন টাচ” বলা হয়ে গেছে, ট্যাক্সি বুক করা হয়ে গেছে। সকাল সাড়ে আটটায় এসে আমাকে হোটেল থেকে তুলে হপ্টবানহফ পৌঁছে দেবে। টুথপেস্ট, হাওয়াই চটি, রাতের পাজামা---যেগুলো শেষমুহূর্তে ব্যাগে পোরা ছাড়া গতি নেই, এমন কয়েকটি আইটেম ছাড়া সুটকেস গোছানও একরকম শেষ।

এই যাব যাব যাব, যাচ্ছি যাচ্ছি যাচ্ছি, এলাম এলাম এলাম করতে করতেই ফেরার পালা চলে এল। মিথ্যে বলব না, মাঝামাঝি নাগাদ বেশ একটু অধৈর্য লাগছিল, মনে হচ্ছিল এত দীর্ঘ ছ’মাস বোধহয় আগে কখনও কাটাইনি। এখন মনে হচ্ছে সময়টা হুশ্‌ করে ফুরিয়ে গেল। এই তো সেদিন, অর্চিষ্মানের সঙ্গে অটোয় চড়ে ঘুরে ঘুরে মেডিক্যাল চেক-আপ করাচ্ছিলাম---নাকের পরীক্ষা, কানের পরীক্ষা, দাঁতের পরীক্ষা, ফুসফুসের পরীক্ষা---বাস্‌রে বাস্‌, পরীক্ষার আর শেষ নেই। মেডিক্যাল চেকলিস্টের বহর দেখে মনে হচ্ছিল ইউরোপ নয়, ইউরেনাস সফরে যাচ্ছি বোধহয়।

সব পরীক্ষা শেষ, এবার আমি গটগটিয়ে নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছি। আমি কানাই হই কি আমার দাঁতে পোকাই থাক (নেই, অন গড ফাদার মাদার) সে দেশে ঢোকা থেকে আমাকে কেউ রুখতে পারবে না।

বৃহস্পতিবারই অফিশিয়াল ট্রেনিং শেষ হয়ে গিয়েছিল। বিকেলে ছিল সার্টিফিকেট বিতরণ, সন্ধ্যেয় ডিনার। রাইনের ওপর ঝুঁকে পড়া Zur Lese” রেস্টোর‍্যান্টের কাঁচঘেরা বারান্দায় বসে দীর্ঘ ফেয়ারওয়েল ডিনার সারলাম আমরা। সম্মিলিত ভোজে আগেও অনেকবার গিয়েছি সকলে, কিন্তু সেদিনের ডিনারের সুর স্বাভাবিকভাবেই, সামান্য অন্য তারে বাঁধা ছিল। অনেকখানি রিলিফ, একটুখানি মনখারাপ। ছ’মাস বাদে বাড়ির লোকের সঙ্গে দেখা হওয়ার উত্তেজনা, আর যাদের সঙ্গে গত ছ’মাস সকালবিকেল ওঠাবসা করলাম---তাদের সঙ্গে খুব সম্ভবত জীবনে আর কোনওদিনও দেখা হবে না---এই সত্যিটা জানার বিষাদ।

কাজেই সন্ধ্যেটুকু নিংড়ে নেওয়ার এজেন্ডা ছিল সবার মনেই। খুব হুল্লোড় হল, শিক্ষক-ছাত্র, মডারেটর-পার্টিসিপেন্টের সীমারেখা ঘুচিয়ে সবাই মিলে গলা জড়িয়ে লাখোলাখো ছবি তোলা হল। ন’টা ভাষায় একে অপরকে “আই লাভ ইউ”, “আই উইল মিস ইউ” বলা হল। ছোট ছোট উপহার, কোনওদিন না ভোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়ানেওয়া হল। আশেপাশের টেবিল থেকে বিরক্ত জনতা খাওয়া শেষ করে উঠে চলে গেল, টেবিলের মোমবাতি জ্বলে জ্বলে নিভে গেল, রাইনের জলে চাঁদের ছায়া ঘনিয়ে এল, আমাদের গল্প তবু ফুরোয় না।

আমি আর কোসি যখন হপ্টবানহফে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি, তখন ক্রিসমাস মার্কেটের আলো অবশেষে নিভে গেছে।


*****

ছুটি ছুটি ছুটি! এবার আর মাস নয়, সপ্তাহ নয়, এমনকি দিনও নয়। এবার গুনতি শুধু ঘণ্টায়। প্লেন যদি লেট না করে, তাহলে আর ঠিক আঠেরো ঘণ্টা পর আমাদের ট্যাক্সি আই. আই. টি. ফ্লাইওভার বেয়ে হুহু করে ছুটছে। প্রথমটা নিজের টিকিটের টাইমিং দেখে নিজের গালেই চড় বসাতে ইচ্ছে করছিল, এখন মনে হচ্ছে ভালোই হয়েছে। এতদিন পর দিল্লির সঙ্গে দেখা বলে কথা---ভিড়, জ্যাম, হর্নের চিৎকারের বদলে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা সে দেখা হওয়ার পক্ষে কোটিগুণ ভালো প্রেক্ষাপট। চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি---ওই দূরে ইউ. এফ. ও.-র চাকতির মতো জ্বলছে নেহরু স্টেডিয়াম, ফ্লাইওভারের নিচে চিরাগ দিল্লির জনপ্রাণীহীন মোড় ঘুমন্ত অক্টোপাসের মতো হাত পা মেলে পড়ে আছে। কাল সকাল ন’টার সময় ওই মোড়ের চেহারা কল্পনা করে মনে মনে শিউরে উঠছি। আবার কে জানে কেন, মনের গভীরে কোথাও একটা পরম স্বস্তিও বোধ হচ্ছে। ট্যাক্সির মাথার ওপর দিয়ে হামদর্দ ইউনিভার্সিটি লেখা বোর্ডটা হুশ্‌ করে বেরিয়ে গেল।

আর দেরি নেই, এবার সত্যি সত্যি বাড়ি চলে এসেছি।

*****

সবটাই যে আনন্দ আর হাঁফ-ছাড়া তেমন ভাবার কোনও কারণ নেই। কাল শেষমুহূর্তের খুচরো কেনাকাটি সেরে বাসে চেপে ফিরছি, হঠাৎ মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল যে আমার মনে নেই আমার চেকবইটা দিল্লির বাড়ির ঠিক কোথায় আছে। নো আইডিয়া। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই আইডিয়া থাকে না, আর এটা তো আনকোরা নতুন একটা বাড়ি। যদ্দুর মনে পড়ে, বাড়িবদলের সময় দরকারি কাগজপত্র (আশা করা যায়, তখন চেকবইটাকে দরকারি কাগজপত্রের দলেই ধরেছিলাম) একটা লাল রঙের হাতব্যাগে পোরা হয়েছিল, কিন্তু এ বাড়িতে পৌঁছে সে লাল ব্যাগ আর দেখেছিলাম কিনা, সিরিয়াসলি, মনে নেই।

লাল ব্যাগ কোথায় মনে নেই, নীল ফোল্ডার কোথায় ভগবানই জানেন, মা শেষবার এসে একটা জয়পুরি লেপ কিনে দিয়ে গিয়েছিলেন---সেটাই বা কোন চুলোয় ঘাপটি মেরে বসে আসে কে জানে। এখন তো আবার খোঁজার জায়গাও ডবল হয়ে গেছে, দু’খানা কাবার্ড, দু’খানা খাটের দু’খানা গর্ভগৃহ, দু’খানা টেবিলের দু’খানা ড্রয়ার। ওরে বাবারে। সব হাঁটকানোর কথা কল্পনা করতেই আমার বাড়ি যাওয়ার আনন্দ অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে। জঘন্য।

*****

নাহ্‌, মিথ্যে বলে লাভ নেই। আনন্দ মোটেই অর্ধেক হচ্ছে না। ব্যাংকে গিয়ে পায়ে ধরলে চেকবই আবার পাওয়া যাবে, নীল ফোল্ডারে কী ছিল সেটাই যখন মনে নেই তখন সেগুলো এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হতে পারে না। জয়পুরি লেপও পাখা মেলে যে উড়ে যায়নি সে বিষয়ে আমি একরকম নিশ্চিত, কাজেই টেনশন নিষ্প্রয়োজন। এখন শুধু ট্যাক্সির অপেক্ষায় বসে পা দোলানো, আর টি-থ্রির গেট দিয়ে বেরোতে বেরোতে ভিড়ের মাথা ছাড়িয়ে জেগে থাকা চেনা হাসিমুখ প্রথম দেখার মুহূর্তটা, বার বার মাথার ভেতর রিওয়াইন্ড করে দেখা।

ব্যস্‌।  

  

December 21, 2013

সাপ্তাহিকী








Never allow someone to be your priority while allowing yourself to be their option.
                                                                                                         ---Mark Twain 


বড়দিনের সকাল। স্পিলবার্গ, কিউব্রিক, লার্স ভন ট্রায়ার, উডি অ্যালেন ও আরও মহারথী পরিচালকদের পার্সপেকটিভ থেকে।

Irony-র এর থেকে মোক্ষম নমুনা জগতে আমি কমই দেখেছি। দোকান কর্তৃপক্ষ আমাকে ধমকালে টাকা ফেরৎ পাওয়ার কোনও ব্যবস্থা আছে নাকি---সেটাই আমার জিজ্ঞাস্য।


Why are apostrophes terrible to date? (সৌজন্যঃ সুগত)

আপনি দাঁড়ি না কমা না সেমিকোলন না জিজ্ঞাসাচিহ্ন? অসম্ভব লজ্জা পেয়ে স্বীকার করছি, আমি মাঝে মাঝে হাইফেন হতে পারি।

মনের বয়স মাপার খেলা পাঠিয়েছে অপরাজিতা। আমি খেলে খুবই হতাশ, কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম আমার মনের বয়স বাহাত্তর বেরবে, বেরিয়েছে ঠিক তার অর্ধেক, অর্থাৎ কিনা ছত্রিশ। জঘন্য। আপনার মনের বয়স কত?

এ সপ্তাহের গানের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ এই গানটার কথা মনে পড়ল। আপনাদেরও ভালো লাগবে আশা করি।

December 18, 2013

ব্ল্যাংকেনহাইম




টর্চ শুনে আমি সিরিয়াসলি ভেবেছি আমাদের বাড়িতে যে রকম ছিল, সে রকম। দু’ব্যাটারির, লালরঙের গায়ে কালো রঙের সুইচ। বুড়ো আঙুল দিয়ে সুইচ ঠেললে আলো জ্বলে, টানলে নিভে যায়। হাত দিয়ে আলোর মুখ চেপে ধরলে চার আঙুলের ফাঁক দিয়ে লাল আভা বেরিয়ে আসে, ঠিক যেন ঠাণ্ডা আগ্নেয়গিরি। লোডশেডিং-এ চিবুকের তলায় সে আলো জ্বালিয়ে হাসিমুখে সামনে গিয়ে দাঁড়ালে অতি সাহসী জ্যাঠতুতো দিদিরও হার্ট অ্যাটাক হওয়ার উপক্রম হয়।


ব্ল্যাংকেনহাইমে পৌঁছে দেখলাম এ টর্চ অন্য টর্চ। অ্যালফন্‌সের ই-মেলে লেখাই ছিল বন থেকে বাসে চেপে ব্ল্যাংকেনহাইম পৌঁছতে বিকেল চারটে বেজে যাবে, আর এ তল্লাটে আজকাল বিকেল চারটে মানে আসন্ন সন্ধ্যে। তাছাড়াও আইফেল পাহাড়র গায়ে গোঁজা ব্ল্যাংকেনহাইম দেখতে গেলে ছোটখাটো একটা হিল স্টেশনই বলা চলে, কাজেই ঠাণ্ডাও নাকি পড়বে বেশ। ই-মেলে স্পষ্ট বলা ছিল, ঠাণ্ডার মোকাবিলার দায়িত্ব যার যার নিজের, অন্ধকার মোকাবিলার জন্য কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে টর্চ সরবরাহ করা হইবেক।


ড্রাইভারের আনাড়িপনার জন্য চারটের বদলে আমাদের পৌঁছতে বেজে গেল চারটে পনেরো, আর সেই পনেরো মিনিটের দুশ্চিন্তায় অ্যালফন্‌সের মাথার আরও অন্তত পনেরোখানা চুল সাদা হয়ে গেল। “আই ডোন্ট লাইক দিস। আই ডোন্ট লাইক দিস্‌ অ্যাট অল। এভরিথিং শুড বি পারফেক্ট। এভরিবডি শুড বি অন টাইম।” অ্যালফনসের অবিশ্রান্ত মাথা নাড়া আর বিড়বিড়ানির মধ্যেই বাস হঠাৎ ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল জনপ্রাণীহীন একটা রাস্তার মধ্যিখানে। জানালার কুয়াশালাগা ঝাপসা কাঁচের ভেতর দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখি ফাঁকা রাস্তার পাশে খাঁ খাঁ একখানা বাসস্ট্যান্ড, অর্থাৎ কিনা “এইখানে বাস থামবে” লেখা একখানা ব্যানার আর সেই ব্যানারের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের বাস লক্ষ্য করে হাত নাড়ছে একটা লোক, লোকটার হাতে একটা প্লাস্টিকের থলে।

বাস থেকে নেমে অ্যালফনস্‌ আলাপ করিয়ে দিল। ইনি হচ্ছেন হের শ্‌মিড্‌। গাইড বললে গাইড, কর্তৃপক্ষ বললে কর্তৃপক্ষ। হের শ্‌মিডের হাতের থলে থেকে বেরোল আমাদের টর্চ। হাত তিনেক লম্বা ডাণ্ডার গায়ে মোম আর কাপড় জড়ানো। নিচের ছ’ইঞ্চি হাত দিয়ে ধরার জন্য খালি রাখা, কাপড় জড়ানো অংশের সঙ্গে তফাৎ বোঝানোর জন্য ডাণ্ডা ঘিরে একটা গোল কাগজ। আগুনের ফুলকি উড়ে এসে হাতের ওপর জুড়ে বসা ঠেকাতে সে কাগজ কাজে দেবে।


ততক্ষণে সন্ধ্যে নেমে এসেছিল। স্ট্রিটলাইটের গল্প নেই ব্ল্যাংকেনহাইমে, দু'চারটে বাড়ির জানালার ভেতর থেকে যে আলো দেখা যাচ্ছে, তাতে পথ চলা যায় না। আমরা যে যার টর্চ জ্বালিয়ে নিয়ে হের শ্‌মিডের পিছু নিলাম। হের শ্‌মিড্‌ ব্ল্যাংকেনহাইমে ইতিহাস বলতে লাগলেন। শতশত বছর আগে ব্ল্যাংকেনহাইম ছিল স্থানীয় কাউন্টির রাজধানী। রাজধানীতে রাজা ছিলেন, রাজার থাকার জন্য রাজপ্রাসাদও ছিল। সে প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ এখনও দেখা যায়। প্রাসাদের ভালো অংশটুকু সারিয়ে ইউথ হোস্টেল বানানো হয়েছে।

ফরাসি বিপ্লবের সময় পর্যন্ত ব্ল্যাংকেনহাইমের রাজারা বেশ শান্তিতেই ছিলেন। প্রজাদেরও যে তাঁরা খুব অশান্তিতে রেখেছিলেন তেমন সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। বাচ্চাদের পড়তে পাঠানোর জন্য স্কুল খোলা হয়েছিল, পাহাড় কেটে জল আনানেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। ব্ল্যাংকেনহাইমের পাহাড়ের মাথায় যে জলব্যবস্থার ভাঙাচোরা প্রমাণ এখনও দেখতে পাওয়া যায়।


কিন্তু বিপ্লবীদের সে কথা কে বোঝাবে। সাম্য, স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্বের প্রকাণ্ড সব আইডিওলজির ঝড়ে ছোট্ট ব্ল্যাংকেনহাইমের তুচ্ছ প্রগতি আর ভালো-থাকা শুকনো পাতার মতো উড়ে গেল। তবে ব্ল্যাংকেনহাইমের রাজারা দুর্বল হলেও বোকা ছিলেন না, হাওয়া কোনদিকে ঘুরতে চলেছে সেটা আঁচ করতে তাঁদের কষ্ট হয়নি। গিলোটিন ঘাড়ে করে বিপ্লবীরা হইহই করে এসে পড়ার আগেই তাঁরা পালালেন বাভারিয়ায়।

আর সেই শুরু হল ব্ল্যাংকেনহাইমের বাসিন্দাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার ট্র্যাডিশন। ব্ল্যাংকেনহাইম শব্দের মানেই হল ব্ল্যাংক হোম, খালি বাড়ি। এমন সার্থকনামা জায়গা আমি কমই দেখেছি। পাথর বাঁধানো রাস্তার পাশে সারি সারি হাফ-টিম্বারড বাড়ির বেশিরভাগই খালি। আশেপাশের দু-চারটে পাহাড় মিলিয়ে গোটা মিউনিসিপ্যালিটিতে এখন পড়ে আছে আটহাজারের মতো লোক, যাদের বেশিরভাগই বুড়োবুড়ি। নতুনেরা বাড়ি খালি করে চলে গেছে অন্য কোথাও, যেখানে শহর বাড়ছে, কাজ বাড়ছে, ভিড় বাড়ছে। যেখানে সন্ধ্যে ছ’টা বাজতে না বাজতে সবাই ঘরের দরজা টেনে ঘুমিয়ে পড়ছে না।


আমাদের হের শ্‌মিড্‌ অবশ্য ব্যতিক্রম। পঞ্চাশ বছরের জীবনের বেশিরভাগটাই ব্ল্যাংকেনহাইমের পাহাড়ের খাঁজেভাঁজে কেটেছে তাঁর। বাবা স্কুলমাস্টার ছিলেন, হের শ্‌মিডও স্কুলে পড়ান। ইতিহাস আর ইংরিজি। পড়িয়েশিখিয়ে ব্ল্যাংকেনহাইমের ছেলেপুলেদের ডানা শক্ত করেন, যাতে সময় হলেই তারা আইফেল পাহাড়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে উড়ে যেতে পারে।


হের শ্‌মিড্‌ পথ দেখিয়ে আমাদের নিয়ে গেলেন পাহাড়ের চুড়োর প্রাসাদে। মনের ভেতর বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চারের অনুভূতি হচ্ছিল। ওই কাদামাখা চড়াই রাস্তায় হের শ্‌মিড্‌ অত হনহনিয়ে হাঁটছিলেন কী করে কে জানে। এক হাতে মশাল নিয়ে তাঁর সঙ্গে তাল রাখতে আমাদের ওই ঠাণ্ডাতেও ঘাম ছুটে যাচ্ছিল। চলতে চলতেই পেছন থেকে হঠাৎ দেখি একজোড়া হেডলাইট এসে আমাদের গায়ের ওপর পড়েছে। মশালের জটলা সুসংবদ্ধ দু’সারিতে ভাগ হয়ে গিয়ে রাস্তা করে দিল, আর মাঝখান দিয়ে একটা পুরোন লজঝড়ে গাড়ি চেপে চলে গেলেন ব্ল্যাংকেনহাইমের চার্চের সিস্টার। চলে গেলেন বলাটা অবশ্য ঠিক হল না, যেতে যেতে গাড়ির জানালা নামিয়ে আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করলেন, হের শ্‌মিড্‌কে দেখে গাড়ি থামিয়ে আলাপ করলেন---আলাপচারিতার মধ্যে খালি “ইংলিশ গ্রুপ” কথাটা আমার মগজে ঢুকল।


পাহাড়ের মাথায় যখন পৌঁছলাম তখন মশালের আলো ছাড়া একে অপরের মুখও দেখতে পাচ্ছি না আমরা কেউ। আকাশে একটাও তারা নেই, হলুদ টিপের মতো চাঁদ খালি ভেসে আছে। আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে চাঁদটাকে কত কাছে দেখতে লাগে, পাহাড়ের চুড়োয় উঠে সেটাকে অত দূরের মনে হচ্ছিল কেন কে জানে। দলের কেউই বেশি কথা বলছিল না। অ্যালফন্‌সের সঙ্গে এটাই আমাদের শেষ ট্রিপ। আর এক সপ্তাহ বাদে এই সময় ক্যামিলার প্লেন অলরেডি ব্রাসিলিয়ার দিকে রওনা দিয়েছে, ফাউজির প্লেন উড়ে চলেছে জাকার্তার দিকে। সবাই কি সেই কথাই ভাবছিল? কে জানে। ঠিক এমন সময় চার্চের ঘণ্টা বেজে উঠল। ঢং ঢং ঢং। আকাশ, জঙ্গল, পাহাড়, আর পাহাড়ের কোলে বিস্মৃত ব্ল্যাংকেনহাইমের খালি বাড়ির দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফেরা সে শব্দের সাগরে ডুবে গিয়ে, চারদিক থেকে ঘিরে আসা উঁচু উঁচু গাছের ছায়াবয়ব আর দূর পাহাড়ের গায়ে আলোর টিমটিমানির দিকে তাকিয়ে, ঠাণ্ডায় গুটিসুটি মেরে আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম।


  

December 16, 2013

দ্য লাস্ট সাপার




কমনসেন্সকে বেশি চাপাচাপি করলে সে বলবে, “সত্যি কথাটা হচ্ছে, এই খাওয়াই শেষ খাওয়া জানলে আমি ভয়ের চোটে দাঁতে কুটোটি কেটে দুটো করতে পারব না। কাজেই আমার লাস্ট মিল জানতে চাওয়ার কোনও মানেই হয় না।”

বলাই বাহুল্য, কমনসেন্স কিস্যু জানে না। কাজেই তাকে বেশি পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই। ওপরের চার্টটায় বিশ্বের তাবড় তাবড় সেলিব্রিটির কল্পনার লাস্ট মিলের কথা লেখা আছে। সিম্পল থেকে ফ্যান্সি, লো ক্যালরি থেকে হাই ক্যালরি। অত ক্ষমতা আর অমন নাক থাকা সত্ত্বেও ক্লিওপেট্রা শেষ খাওয়া হিসেবে সামান্য ফল খেতে চেয়েছিলেন, আবার সারাজীবন অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেও অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনের শেষ খাওয়ার লিস্ট দেখলে মাথা ঘুরে যাবে। রাজকুমারী ডায়ানা মরণকালে খেতে চেয়েছিলেন অমলেট, কার্ট কোবেনের বাসনা ছিল শুধু এক ক্যান রুট বিয়ার।

আমার ব্যক্তিগত পছন্দ মিলেছে বেশি প্রেসিডেন্ট কেনেডির সঙ্গে। কেনেডি ব্রেকফাস্ট খেতে চেয়েছিলেন বলেই হয়তো। ভেবেচিন্তে দেখলাম, আমিও শেষ মিল হিসেবে ব্রেকফাস্টই খেতে চাই। আমার ফেভারিট ব্রেকফাস্ট। এক কাপ চা আর টোস্ট। মাখন মার্মালেড কিচ্ছু না, জাস্ট শুকনো মুচমুচে একপিস টোস্ট। আর হ্যাঁ, চা পাতা দেওয়ার আগে জলটা যেন রোলিং বয়েল হয় সেটা খেয়াল রাখলে যারপরনাই বাধিত হব।

আপনার শেষ খাওয়ার বাসনা কী?

     
 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.