February 28, 2014

কসৌলি/ শেষ পর্ব




কসৌলির আবহাওয়ার সঙ্গে দেখলাম আমার মাথার ভেতরের আবহাওয়ার মিল আছে। ক্ষণেক্ষণে রোদ, ক্ষণেক্ষণে বৃষ্টি, ক্ষণেক্ষণে ঝঞ্ঝাবাত। রবিবার দিন সকালে উঠে দেখি চারদিক বিলকুল ফর্সা, গতকাল রাতের তাণ্ডবের কোনও চিহ্নই নেই। খালি একগাদা ভেজা ডাল, পাতা---বারান্দা আর দোলনা জুড়ে রাশিকৃত হয়ে পড়ে আছে, এক ভদ্রলোক ঝাঁটা মেরে সেগুলো সরাচ্ছেন। আমরা দরজা খুলে বেরোতেই তিনি আমাদের হাসিমুখে ‘গুড মর্নিং’ জানালেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপলোগ আজই নিকল রহে হো?’

আমরা দুঃখী মুখে মাথা নাড়লাম। বেড়ানো শেষ। আবার দিল্লি, আবার অফিস, আবার সেই আটটা ছটা ছোটাছুটি। ভাবতেই কান্না পাচ্ছিল। আবার কবে বাড়ি থেকে বেরোনোর সুযোগ হবে কে জানে।

বেশিক্ষণ দুঃখ পেয়ে থাকা গেল না অবশ্য, কারণ আজকে হাতে সময় বেশি নেই। দুপুর বারোটায় চেক আউট করব, আর বাসস্ট্যান্ড থেকে কালকার বাস ছাড়বে দুটো নাগাদ। আরাম করে তৈরি হয়ে ব্রেকফাস্ট খেতে খেতেই দশটা-সাড়ে দশটা বেজে যাবে নির্ঘাত। যদি কিছু দেখতে হয়, তার মধ্যেই দেখা সেরে ফেলতে হবে। অগত্যা কিঞ্চিৎ টাইম ম্যানেজমেন্টের প্রয়োজন আছে।

চা খেতে খেতে ব্রেনস্টর্মিং করে আমরা ঠিক করলাম বারোটার একটু আগেই চেকআউট করে বেরিয়ে যাব। আমাদের দুটো ব্যাকপ্যাক অফিসঘরের এককোণে রেখে দিতে নিশ্চয় হোটেল-কর্তৃপক্ষ অরাজি হবেন না। আমরা ঘুরেটুরে, বাজারেই লাঞ্চ করে, হোটেল থেকে ব্যাগ নিয়ে একেবারে বাসে গিয়ে উঠব।

লাঞ্চ করার জায়গাটার কথা একটু বলি আপনাদের। যাওয়ার আগে যখন তেড়ে রিসার্চ চলছিল, তখন একটা ভিডিওর সন্ধান পেয়েছিলাম। টিভিতে ‘হাইওয়ে অন মাই প্লেট’ বলে একটা নাকি অনুষ্ঠান হয়, তার জকি হচ্ছেন রকি অ্যান্ড ময়ূর নামের এক খাদ্যরসিক জুটি। ভিডিওটা হচ্ছে তাঁদের কসৌলিযাত্রার এপিসোডের। সেখানেই দ্য ডেইলি নিডস্‌ বলে একটি দোকানের উল্লেখ পেয়েছিলাম। মনে মনে ঠিক করেছিলাম, সময় পেলে যাব।  

কসৌলি পৌঁছে দেখলাম সময়ের আমাদের অভাব নেই, আর দ্য ডেইলি নিডস্‌ পড়বি তো পড়, বাসস্ট্যান্ড থেকে আমাদের হোটেল যাওয়ার রাস্তাতেই পড়ে। আমরা তাই হোটেলে যাতায়াতের পথে সর্বদাই দোকানে থেমে টুকটাক স্যান্ডউইচ নয়তো সুপ খেতাম।


দোকানটা এত চকচকে হলে কী হবে, বয়সের গাছপাথর নেই এর। উনিশশো কুড়ি সালে দোকান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যিনি, দুহাজার চোদ্দয় কাউন্টারে বসছেন তাঁর প্রপৌত্র। প্রপৌত্রর পাশেই চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসে আছে তাঁর শিশুপুত্র। মনোযোগ সহকারে বাবার কাছ থেকে ব্যবসার প্যাঁচঘোঁচ শিখে নিচ্ছে।

রকি-ময়ূর দোকানের হ্যান্ডমেড হ্যামের খুব প্রশংসা করেছিলেন তাই আমরা গিয়েই হ্যাম-স্যান্ডউইচ খুঁজেছিলাম, কিন্তু বিধি বাম। শুনলাম অফসিজনে নাকি হ্যাম বানান না ওঁরা, খেতে হলে আমাদের চিকেন স্যান্ডউইচ খেতে হবে। তাই সই।


ছবিতে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু এত ভালো চিকেন স্যান্ডউইচ আমি সত্যি বলছি আগে কবে খেয়েছি মনে করতে পারছি না। নরম তুলতুলে বানরুটি, পুরু মাংসের প্যাটি, টকমিষ্টি স্যালাড আর প্রয়োজনের থেকে অনেক অনেক বেশি ট্যাংগি টোমাটো সস। স্যান্ডউইচের এদিকে কামড় দিলে ওদিক দিয়ে গড়িয়ে পড়ে কড়ে আঙুলে লেগে যায় আহ্, কী ভালো, কী ভালো খেতে। এই দেখুন, এই এক্ষুনি একবাটি কর্নফ্লেক্স খেয়ে উঠেছি, কিন্তু স্যান্ডউইচের কথা মনে পড়ে আবার হইহই করে খিদে পেয়ে যাচ্ছে।

খাওয়াদাওয়ার কথাই যখন হচ্ছে, তখন কসৌলির আরেকটি বিখ্যাত জিনিসের কথা বলে নেওয়া যাকভুইরা ফ্রুট জ্যাম। ভুইরা হচ্ছে কসৌলি থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরের একটি গ্রাম। সেই গ্রামে এক বিদেশিনী মহিলা এসে স্থানীয় মহিলাদের নিয়ে জ্যাম কোম্পানি খুলেছেন। এ জ্যামের বিশেষত্ব হচ্ছে, ফ্রুটের জায়গায় সত্যিকারের ফ্রুট ব্যবহার করা হয়েছে। রাজধানী এক্সপ্রেসের ব্রেকফাস্টের ম্যাংগো জুসের মতো নয়, প্যাকেটের গায়ে লেখাই আছে, ‘মেড উইথ ম্যাংগো, লাভ অ্যান্ড হ্যাপিনেস’মুখে দিলেই বুঝবেন লাভ অ্যান্ড হ্যাপিনেসের ভাগই বেশি, ম্যাংগোই কিঞ্চিৎ কম পড়িয়াছে। এই ভুইরা জ্যামে ওসব লাভ-টাভ নেই, আছে খাঁটি ফল। চিনি যতটুকু না দিলে নয় ততটুকুই দেওয়া হয়। নকল প্রিজার্ভেটিভও দেওয়া হয় না। লেবুর রস জাতীয় আসল জিনিস দিয়ে কাজ চালানো হয়। তাতে অসুবিধে একটাই, বেশিদিন রাখা যায় না। চটপট খেয়ে নিতে হয়।


সেটা আমাদের পক্ষে অসুবিধে হবে না বলেই মনে হয়। ওখানে বসেই আমরা চাখাচাখি শুরু করে দিয়েছি, দেখতেই পাচ্ছেনআসল ফল দিয়ে তৈরি যে সে নিয়ে যাতে কোনও সন্দেহই না থাকে, সে জন্যই বোধহয় জ্যামে ফলের বিচি মেশানো আছে।

যাই হোক। আমরা তো চেকআউট করে বেরিয়ে এলাম। হোটেলের লোকজন অতীব ভদ্রলোক বলেইছিলাম, আমরা না বলতেই তাঁরা উপযাচক হয়ে উপদেশ দিলেন, 'বাস ছোড়নে মে তো দের হ্যায়, আপলোগ ইঁহা ব্যাগ রাখকে ঘুমঘামকে আইয়ে।’

বেরিয়ে পড়া গেল।

আজ আমরা ধরব আপার মল রোড। কসৌলি বাসস্ট্যান্ডটা যদি একটা অক্টোপাস হয়, তবে তার একটা  শুঁড় হচ্ছে আপার মল রোড। আমাদের হোটেল লোয়ার মল রোডে, অর্থাৎ বাসস্ট্যান্ড থেকে আমাদের হোটেলে পৌঁছতে গেলে বেশ খানিকটা নামতে হয়, আর একই যুক্তি মেনে আপার মল রোড ধরতে গেলে উঠতে হয়। বেশ খাড়া পথ। এখন ভাঙা গোড়ালি নিয়ে সে পথের কথা কল্পনা করলেই আমার হৃৎকম্প হচ্ছে, কিন্তু তখন তো আমার পা সুস্থ ছিল, আমরা টগবগিয়ে উঠে গিয়েছিলাম।

আপার মল রোডটা, দেখে যা বুঝলাম, কসৌলির বড়লোক পাড়া। ওই পথেই যত মিলিটারিম্যানদের বাড়িঘরদোর, কোয়ার্টারস, হলিডে হোম, দূরদর্শন কেন্দ্র, ওই পথেই কুলীন কসৌলি ক্লাব। সাদারঙের খেলানো বাড়ির ওপর লালমাটিরঙের ছাদ, কুয়াশার ভেতর দিয়ে অপরূপ দেখায় ক্লাবের ঠিক সামনাসামনি, রাস্তার উল্টোদিকেই টেনিসকোর্ট অফসিজন বলেই হয়তো, লোকজনের দেখা প্রায় নেই  ইতিউতি যে কজন ঘোরাঘুরি করছেন, তারা সবাই স্থানীয় চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে কেউ ক্লাবের মেম্বার নন, সকলেই ভৃত্য পুরো জায়গাটার গা থেকে একটা এলিট-এলিট গন্ধ ছাড়ছে দেখতেশুনতে যতই ভালো হোক না কেন, এই গন্ধটা আমার একটুও ভালো লাগে না, তাই তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে এগিয়ে গেলাম

খাড়া পাহাড়, চড়তে দম বেরিয়ে যাচ্ছে, তাও থামতে ইচ্ছে করছিল না মনে হচ্ছিল, আর একদিন পরে তো চাইলেও এমন রূপসী রাস্তায় পা রাখতে পারব না, মাসমাইনেটা পুরো ধরে দিয়েও দশমিনিটের জন্য এমন নিস্তব্ধতা বাজার থেকে কিনে আনতে পারব না, যেদিকেই চোখ ফেরাই, কুয়াশার ভেতর ঘুমন্ত পাহাড়দের দেখতে পাব না আমরা ঘনঘন ঘড়ির দিকে তাকাতে লাগলাম আর নিজেরাই নিজেদের বোঝাতে লাগলাম, 'আর একটু যাই? আর একটু? ফেরার সময় তো ঢালু রাস্তা, একবার দৌড়তে শুরু করলে দশ মিনিটে হুড়মুড়িযে নেমে আসব, দেখবে'খন'

চললাম, চললাম, চললাম  পথ পাহাড়ের গা বেয়ে উঠল, নামল, বাঁকল পথের বাঁকে ঘাপটি মেরে বসে থাকা একদল কুয়াশা এই আমাদের গিলে নিল, তো দু'মিনিট বাদেই উগরে দিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল শেষটায় পাকাপথ ফুরিয়ে কাঁচা হয়ে গেল, তবু আমরা থামলাম না  তীরচিহ্ন দিয়ে দেখি বোর্ডের গায়ে লেখা আছে, 'গিলবার্র্ট ট্রেল' ঘড়ি দেখে বললাম, 'পা চালিযে গেলে, ট্রেলটার শেষ দেখতে না পারি, শুরুটা অন্তত দেখতে পারব, কী বল?' প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে সভায় পাশ হয়ে গেল, আমরা ট্রেল ধরে ছুটে চললাম ছুটতে ছুটতে গিলবার্ট সাহেব কে হতে পারেন সে নিয়ে একটু ব্রেনস্টর্মিংও হল নিশ্চয় মিলিটারিরই বড়বাবু গোছের কেউ হবে, না গো? তোমার কী মত?

অবশ্য বেশি জোরে ছোটা যাচ্ছিল না, কারণ কাল রাতের বৃষ্টিতে রাস্তা পিছল হয়ে গেছে, তার ওপর পাতামাতা পড়ে একেবারে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা আমাদের শহুরে কনভার্স থেকে থেকে হড়কাতে লাগল আমরা দুজনেই অবিরাম একে অপরকে 'সাবধান! সাবধান!' বলতে লাগলাম ভাবটা যেন, পড়লে অন্য লোকটাই পড়বে, আমার পড়ার কোনও চানসই নেই তারপর একটা বাঁক ঘুরেই দেখি...দেখা বলাটা ভুল হবে অবশ্য, কারণ কিছুই দেখা যাচ্ছিল না 


এর পরেও কি পৃথিবী আছে? সভ্যতা আছে? দিনরাত আছে? দিনরাতের অবসাদ? ছোটছোট দুঃখশোক, নালিশ, ঘ্যানঘ্যানানি? অফিস আছে? পলিটিক্স? নাকি একবার সাহস করে এই কুয়াশার দেওয়ালে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে পারলেই সবকিছুর নাগাল থেকে এক্কেবারে পগারপার? ছুটি, ছুটি, ছুটি?

দুটো পাথরের ওপর একটা পাথর বসিয়ে বেঞ্চি বানানো ছিল, তার ওপর বসলাম দুজনে ঘড়ি দেখার কথা মনেই ছিল না  কীসের ঘড়ি, কীসের সময়, কীসের তাড়া? দুটোর বাসের বদলে তিনটের বাস ধরলেই বা কার ক্ষতি, কীসের ক্ষতি? একটাদুটো পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল মাঝে মাঝেআর অনেক দূর থেকে ক্ষীণ হর্নের আওয়াজ কোন জগতের কে জানে যে জগতটায় কুয়াশাবৃত হয়ে আমরা বসে আছি, সে জগতটার তো নয়


কুয়াশার মধ্যে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা আশ্চর্য ব্যাপার টের পেলাম জানেন সামনে কুয়াশার অলঙ্ঘ্য দেওয়াল ফুঁড়ে চোখ চলছে না, অথচ মাথার ভেতরটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে চাওয়াপাওয়া, কাজঅকাজের টানাপোড়েন কোথায় উধাও, ঘাড়ের পেছনে টেনশনের জট খুলে যাচ্ছে কাল কী করেছি ভুলে গেছি, কাল কী করার আছে জানি না  এখন শুধু আমি সত্যি, আর আমার চারদিকের ঠাণ্ডা, ভেজা কুয়াশা সত্যি, এই ভুবনজোড়া নীরবতা সত্যি

তারপর যে ঘটনাটা ঘটল, তার জন্য আমি সত্যি তৈরি ছিলাম না বলা নেই, কওয়া নেই, গলাখাঁকারি নেই, আমার গলা দিয়ে হঠাৎ গান বেরিয়ে এল গান! কতদিন আগেই তো সে পাট চুকেছে অনেক কষ্টে নিজেকে বুঝিয়েছি গান আমাকে ছেড়ে সত্যিসত্যি চলে গেছে, আর ফিরবে না পায়ে ধরে সাধলেও শনিরবি সময় করে, অফিস যাওয়ার আগে, অফিস থেকে ফিরে, বাড়ির আনাচেকানাচে তাকে কত খুঁজেছি, লাঠিসোঁটাতানপুরা সহযোগে তাকে ধরতে লোক পাঠিয়েছি দিকেদিগন্তরে, সে ধরা দেয়নি আর এই পৃথিবীর প্রান্তে বসে সে কিনা বিনা নেমন্তন্নে এসে আমার গলায় জুড়ে বসল? আমিই বরং তাকে আগের মতো আদর করতে পারলাম না, গলার পলি সরিয়ে ভালো করে তার বসার জায়গা করে দিতে পারলাম না  তবু যে সে এল, দু'দণ্ড থাকল আমার সঙ্গে, আমাকে আগের মতো জড়ালো তার সবটুকু দিয়ে, এ আমার জন্মজন্মান্তরের ভাগ্য

কসৌলি আমার ভীষণ ভালো লেগেছে কসৌলি থেকে প্রিজারভেটিভহীন সুস্বাদু জ্যাম, ক্যামেরাভর্তি শতশত ছবি আর বুকের ভেতর পৃথিবীতে আমার সবথেকে প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো ক'টি দিনের অমূল্য স্মৃতি বোঝাই করে আমি বাড়ি ফিরেছি কিন্তু এ সব কিছুই যদি আমি না পেতাম, শুধু যদি কুয়াশা আর গান দিয়ে ছাওয়া ওই ক'টা মুহূর্ত দিয়ে কসৌলি আমাকে ফিরিয়ে দিত, তবু আমার কসৌলি যাওয়া সার্থক হত তবু আমি কসৌলিকে ভুলতে পারতাম না আজীবন  

                                                                                               (শেষ)
  
 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.