March 31, 2014

একত্রিশে



টাকার কি অভাব আছে তোমার? মায় বাবায় সারা জীবন রোজগার করল কার লিগ্যা? আর তো ভাগিদার নাই কেউ। আধামাধা না, পুরা রাজত্বই তো তোমার।

আমাদের সেকেলে বাড়ির মধ্যে ঠাকুমার ঘরটা আরও সেকেলে। ঘরের সঙ্গে ঘরের লোকের বোঝাপড়া থাকে বোধহয়, সময়ের দৌড়ে কেউই কাউকে ফেলে এগিয়ে যেতে চায় না। বাকিরা এগোচ্ছে এগোক, আমরা হাত ধরে থাকি। ওদের ঘরে কাঁচের বাহারি শোকেস আসছে আসুক, আমাদের এই কাঠের পাল্লা টানা বেঁটে আলমারিই ভালো। ওদের ঘরে কাজের জিনিস সব কাবার্ডে তোলা। আধুনিক সিস্টেমই হল সব কাজের জিনিসপত্র লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা। বাড়িতে যে মানুষ থাকে, তারা যে চলাফেরা করে, ঘুমোয়, খায়দায়, দাঁত খোঁচায় --- সেটা বোঝা গেলেই কেলেংকারি। আমরা খোলামেলা যুগের মানুষ, আমাদের দেওয়ালে তক্তার খোলামেলা তাকের ওপর কেলেকুষ্টি ফ্রেমের ছোট আয়না, আয়নার পাশে শালিমার তেলের শিশি, নর্তকীর ডিজাইনওয়ালা হলুদ রঙের পাউডারকেস। কেসের ঢাকনা তুললে এখনও পিসির গায়ের আবছা গন্ধ আসে।

আড়াই দিনের ছুটি নিয়ে এসেছি। ভাগাভাগি হয়ে এ বাড়ির ভাগে পড়েছে প’নে এক দিন। খাওয়া ঘুম পাড়াপড়শি সামলে ঠাকুমার পাশে বসার ভাগে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। এই পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মুখ চেয়ে ঠাকুমা শুয়ে আছেন গত পাঁচ মাস।

এখন তো দায়িত্ব নেওয়ার লোকও আছে। তবে এত কষ্ট কর ক্যান? কীসের লিগ্যা?

প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে আমি ঠাকুমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ঠাকুমার চোখ আমার চিরকালের বিস্ময়ের বস্তু। অসংখ্য বলিরেখার জঙ্গল, ঝুলে পড়া চোখের পাতা ঘন বাদামি রঙের মণি ঢেকেই ফেলেছে প্রায়। যখন বয়স ছিল, কোলে বসে আঙুল দিয়ে ঠাকুমার চোখের পাতা টেনে ধরতাম আমি।

তুমি এইটুকু চোখ দিয়ে দেখতে পাও ঠাকুমা? আমরা যা যা দেখি সব?

আমার বিশ্বাসই হত না ওই চোখ দিয়ে ঠাকুমা আমাদের সমান সমান দেখতে পাচ্ছেন। নিশ্চয়ই কিছু না কিছু মিস হয়ে যাচ্ছে। তক্তপোশের একটা পায়া, নারকেল গাছের মাথা, বাবার গোঁফের আধখানা --- নির্ঘাত ফ্রেমের বাইরে রয়ে যাচ্ছে।

ঠাকুমার চোখ এখন আরও খুদি হয়েছে। কিন্তু আমি ধেড়ে হয়েছি কিনা তাই বুঝতে পারি ওই খুদিখুদি চোখ দিয়েই ঠাকুমা আমার থেকে ঢের বেশি দেখতে পাচ্ছেন। আমি কখনও মস্ত বাঁকানো দাঁত দেখছি, কখনও ল্যাজ দেখছি, কখনও থামের মতো পা দেখছি, ঠাকুমা গোটা হাতিটাকেই দেখতে পাচ্ছেন। আমার চোখের তলার কালি, কপালের ঠিক ওপরের চুলে ফুটে ওঠা সাদা টেনশন, সব ওই চল্লিশ পাওয়ারের টিউবের আলোতেই তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। আর জানতে চাইছেন,

ক্যান? কীসের লিগ্যা?

জানলে তবে তো বলব। কেন, কী, কতটা, সে সব কি নিজেই পরিষ্কার জানি আমি? তাই কথা ঘোরাই। বিজলীদির নাতনিকে দেখাতে এনেছিল তোমাকে ঠাকুমা? জাহাজবাড়ির ছোট ছেলেটা শুধরোলো? ঠাকুমা কোনও প্রশ্নের উত্তরে ঘাড় নাড়েন, কোনও প্রশ্নের উত্তরে ঠোঁট উল্টোন। কে জানে। শুয়ে শুয়ে আজকাল আর চারদিকের খবর মনের মতো করে রাখা হয় না তাঁর। সাঙ্গোপাঙ্গদের চোখকানই ভরসা এখন। তারা সকালবিকেল কুড়িয়েবাড়িয়ে ঝড়তিপড়তি এঁটোবাসি যা খবর এনে দেয়, সেই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

ঠাকুমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করেন। এবার ঘুমোতে দেওয়া উচিত, একটানা এত কথা বলে অভ্যেস নেই তো। আমি আরেকবার ঠাকুমার তুলোর মতো চুলে হাত বুলিয়ে উঠে আসি।

প্রশ্নটা যদিও মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। ক্যান? কীসের লিগ্যা? কতখানি না হলে পোষাবে না আমার আমার? কতখানি হলে চলে যাবে? প্রথম ক’দিন ভীষণ ভয় করবে। গরিব হয়ে যাওয়ার ভয়। সময়ে ভয় কেটেও যাবে। সবটাই তো অভ্যেস। বেশি টাকা, কম টাকা। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাপমতো নিজেকে কেটেছেঁটে নেবে সংসার। সাপ্তাহিক মেনুতে বাটার চিকেন কমে গিয়ে ভাত ডাল মাছের ঝোলের পরিমাণ বাড়বে।

সেটা কি ভালো হবে না খারাপ?

বিছানায় শুয়ে শুয়ে কুণ্ডুবাড়ির ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবি। ভাবি আর অপরাধবোধে ভাজা ভাজা হই। ছেলে হলে কি এই ভাবনাটা ভাবার সাহস হত আমার? এই দশটা-পাঁচটার দৌড়োদৌড়ি ছেড়ে বাড়িতে থাকার ভাবনাটা? নাতনির জায়গায় নাতি হলে ঠাকুমাও চাকরি ছাড়ার প্রস্তাবটা দিতেন না অবশ্য। কিন্তু ঠাকুমা তো আশি বছর আগেকার লোক। আমি কেন ভাবছি? অর্চিষ্মানেরও তো অফিস যেতে ক্লান্ত লাগতে পারে, তা বলে কি ও চাকরি ছাড়ার কথা ঘুণাক্ষরেও মগজে ঠাঁই দিতে পারবে?

. . . বাড়িতে থাকলে হয়তো তানপুরাটার ধুলো ঝাড়া হবে, টেবিলের জঞ্জাল সাফ হবে। সাফসুতরো টেবিলের ওপর একটা ডায়রি আর একটা নিব পেন শুয়ে থাকবে আমার অপেক্ষায়, কখন আমি এসে চেয়ার টেনে বসব . . .

চোখ প্রাণপণে টিপে বন্ধ করে ফেলি আমি। তওবা তওবা, রাম রাম। এক থেকে একশো গুনব নাকি একশো থেকে এক? ডিপ ব্রেথ নিই গুনে গুনে পাঁচবার। একদল ভেড়াশাবকের কান ধরে কুণ্ডুবাড়ির ছাদের রেলিং টপকানোর হুকুম দি

তারপর রাত বাকি থাকতে উঠে মায়ের হাতের চায়ে বেশ অনেকদিনের মতো শেষ চুমুক দিয়ে, ঝুপঝুপ প্রণাম সেরে, মশারির ভেতর মাথা গলিয়ে ঠাকুমার গলা জড়িয়ে ‘টা টা বাই বাই/আবার যেন দেখা পাই’ বলে দৌড় শুরু করে দিল্লিতে পৌঁছে সারাদিন অফিস সেরে সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে সুটকেসমুটকেস ছুঁড়ে ফেলে দম নিই যখন তখন ঠাকুমার প্রস্তাবের ছায়াটুকুও আমার মাথার ভেতর থেকে উধাও হয়ে গেছে।  

আবার সেই থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। আটটা-সাতটা। কোনও কোনও দিন সাতটা-আটটা। অটো। মেট্রো। ডিরেক্টর। রিপোর্ট। পিপিটি। কনফারেনস। পাবলিকেশন। পাবলিকেশনের অভাব। কাপের পর কাপ বিস্বাদ চা।

ক্যান? কীসের লিগ্যা?

বেলা, বেলা গড়িয়ে দিন, দিন গড়িয়ে মাস ফুরোয়। ডেস্কটপের কোণার ক্যালেন্ডার গড়িয়ে একত্রিশে এসে থামে। ই-মেল খুলে দেখি একটা না-পড়া মেল অপেক্ষা করছে। সাবজেক্ট লাইনে লেখা ‘পে স্লিপ’।

নিমেষে আলোয় আলো চরাচর। আনন্দসংগীত। শঙ্খধ্বনি। কলরোল। অবান্তরপ্রলাপ ডট ব্লগস্পট ডট ইনের বদলে ব্রাউসারে স্টেটব্যাংকের ঠিকানা টাইপ করি। কি-বোর্ডের ওপর ঝড়ের মতো আঙুল চলে। লাস্ট টেন ট্র্যানস্যাকশন। ওই তো! সারি সারি ডেবিটের মাথার ওপর গ্যাঁট হয়ে বসে আছে একখানা ক্রেডিট। জ্বলজ্বল করছে। ঝকঝক করছে।

শিরদাঁড়াতে কেউ যেন একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে দেয়। আত্মবিশ্বাসের কুলকুণ্ডলিনী মুহূর্তে জাগ্রতশিরা উপশিরা গ্রন্থি বেয়ে সে আত্মবিশ্বাস সবেগে ওপরদিকে ছুটেছে। তোড়ে খুলে দিচ্ছে ঘাড়ের জট, ব্রহ্মতালু ফুঁড়ে লাফ মেরেছে আকাশপানে। নড়বড়ে মুণ্ডু নিমেষে ছিলার মত টানটান। ভীষণ উদার হয়ে যাই হঠা। নিজেকে খুব শক্তিশালী মনে হয়। এদিক ওদিক দু’চারটে অ্যাকাউন্টে ক্লিক ক্লিক করে টাকা ট্রান্সফার করি। মা’কে একটা শাড়ি উপহার দিলে কেমন হয়? বাবার জন্য ড্যান ব্রাউনের লেটেস্ট বইটা অর্ডার দিলে? অর্চিষ্মানের ব্যাগের হ্যান্ডেলটা ল্যাগব্যাগ করছে দেখেছিলাম না? রিভলভিং চেয়ার ঘোরাতে ঘোরাতে ফ্লিপকার্টের উইশলিস্ট পরীক্ষা করি। অর্চিষ্মানকে ফোন করে সুখবর দিই। নেক্সট কবে কোথায় বেড়াতে যাওয়া যেতে পারে সেই চর্চায় দশ মিনিট নষ্ট করি

একত্রিশ একটা ম্যাজিক তারিখ। একত্রিশ ঠাকুমার ভীষণ শক্ত প্রশ্নের উত্তরও বটে। ক্যান, কীসের লিগ্যা? টাকা? হা হা হা। ও টাকায় অনিল আম্বানির চায়ের জলও গরম হয় না। টাকার লিগ্যা নয় গো ঠাকুমা, টাকার লিগ্যা নয়। এই ম্যাজিকটার লিগ্যা। অন্যদিনের থেকে একটু বেশি খুশি, একটু বেশি উদার, একটু বেশি ভালোমানুষ হওয়ার ম্যাজিকটা। মূলচন্দের জ্যামে ভিখিরি বাচ্চাগুলো এসে অটোর গায়ে হামলে পড়বে, একটা তিন বছরের কোলে একটা দেড় বছর। বাকি তিরিশ দিন বিরক্তিতে ওদের চোখ থেকে চোখ ফিরিয়ে থাকি, একত্রিশ সে বিরক্তির মধ্যে খানিকটা লজ্জা ছিটিয়ে দেবে।

একত্রিশে আমি আর শুধু তোমার সোনার পুত্তলি নই ঠাকুমা, একত্রিশে আমি এই বদখত পৃথিবীটার বিতিকিচ্ছিরি ভিড়ের লক্ষ মুখের ভেতর একটা মুখ। বাকি তিরিশদিন যে ভিড়টার নাগাল এড়ানোর জন্য আমার অক্লান্ত আকুলিবিকুলি, একত্রিশে দেখ আমি সেই ঘেমো ভিড়টার মধ্যেই একচুল জায়গা পাওয়ার জন্য ধাক্কাধাক্কি করে মরছি। ই-মেলে আসা পে স্লিপটা জোরে জোরে মাথার ওপর নাড়ছি। চেঁচিয়ে বলছি, এই দেখো, এই আমার দাম। 

পড়ে পাওয়া রাজত্বের সঙ্গে এই হল্লাহাটির বাজারটার উত্তেজনা, থ্রিল, ম্যাজিকের কোনও তুলনাই হয় না।

অনেক অনেক দূরের একটা সেকেলে বাড়ির সেকেলে ঘরে নিভন্ত চোখ নিয়ে শুয়ে থাকা আমার সেকেলে ঠাকুমা --- পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে --- সে জন্মে তুমি যেন এই ম্যাজিকটা আপ্রাণ চেটেপুটে নিতে পার, এই তোমার জন্য আমার প্রার্থনা রইল।


      

March 29, 2014

সাপ্তাহিকী





Every man I meet wants to protect me. I can't figure out what from.
                                                                  ---Mae West

পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, আজ আমাকে রাত জাগতেই হবে। 

প্রথম মানুষ? সে আবার কী জিনিস?



দেখুন। যদি পারেন ফুলস্ক্রিন ও ফুল রেসলিউশনে দেখুন।


জানার কোনও শেষ নাই, জানার ইচ্ছা বৃথা তাই।

আজ থেকে আশি বছর আগেও লোকে সেক্সটিং করত।


ও সে মশলা দিয়ে তৈরি সে দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা।


ডলারের সিক্রেট জানতে চান? ক্লিক করুন।


সারা দিল্লি জুড়ে মেট্রো লাইনের কাজ চলছে, মেট্রোর বদলে এ জিনিসটা হলেও মন্দ হয় না কিন্তু।

এ সপ্তাহের গান। আমার বড় প্রিয় গান।


March 26, 2014

একটি জটিল প্রেমের গল্প



আগরতলা ভ্রমণের আমার বেশি কিছু মনে নেই, যদিও ওটাই আমার জীবনের প্রথম এরোপ্লেন চড়া। আবছা আবছা তিনচারটে দৃশ্য মনে পড়ে। হোটেলের একতলায় কোল্যাপসিবল গেটের ওপারে সারাদিন শুয়ে আছে একটা বিরাট ঝুপসো কুকুর, কেশে কেশে ক্লান্ত আমাকে কোলে করে করিডরে সারারাত পায়চারি করছে রোগা পিসি, ডাক্তারখানায় ওজনযন্ত্রের ওপর অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি আমি, ভালোমানুষ দেখতে একজন বুড়ো ডাক্তার খসখস করে সাদা কাগজে কী সব লিখছেন। পরে জেনেছিলাম ওঁর নাম ডঃ গোবিন্দ চক্রবর্তী আর কাগজে উনি যেগুলো লিখছেন সেগুলো সব হামের ওষুধ। ওঁর পরামর্শেই বেড়ানো সংক্ষেপ করে আমাদের ফিরে আসতে হয়েছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনাটাও আমার মাথা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু এতদিন পরেও একেবারে স্পষ্ট যেটা মনে আছে সেটা হচ্ছে একটা ধুলোয় ধূসরিত পথ, পথের দুপাশ দিয়ে শনশন করে পেছনদিকে ছুটে যাচ্ছে গাছপালা-বাড়িঘর-বাড়ির গায়ে আল্পনাওয়ালা কঞ্চির বেড়া। সামনের সিটে বসেছেন ড্রাইভার আর বাবা, পেছনের সিটে মা আর পিসির মাঝখানে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে বসে আছি আমি। মা ধুলো থেকে বাঁচার জন্য আঁচল দিয়ে নিজের মুখমাথা সব ঢেকে বসেছেন, আমাকেও প্রাণপণে সে আড়ালের ভেতর ঢোকানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু আমি অবাধ্য হয়ে বারবার মুণ্ডু বার করে আকাশবাতাস দেখছি। চারদিকে একটা কানফাটানো ভটভট আওয়াজ, আর সঙ্গে মানানসই ঝাঁকুনি।

সেই সোয়া পাঁচ বছর বয়সের ওই ধূলিধূসরিত মধ্যাহ্নটিতে আমি বুঝতে পেরে গিয়েছিলাম, আমার সারাজীবনের প্রিয়তম বাহনটির সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গিয়েছে। ওই গতি, ওই তেজ, সমাজসংসারসভ্যতার ওপর ওই ধুলো উড়িয়ে কান ফাটিয়ে মগজের ঘিলু ঝাঁকিয়ে ছুটে চলা --- চলতেই যদি হয় তবে জীবনের পথ ধরে এভাবেই ছুটে চলব আমি।

জীবনের পথে আমি ছুটেছি না হামাগুড়ি দিয়েছি সেটা কথা নয়। কথাটা হচ্ছে অটোর প্রতি আমার নিষ্ঠায় এখনও ফাটল ধরেনি। অটো এখনও আমার ফেভারিট বাহন। গায়ে হাওয়া লাগে, জ্যামে গোবদা গাড়িঘোড়ার ফাঁকফোকর গলে বেরোতে পারে, গোটা সিটে একলা বসে খোদাতালার আকাশবাতাস জনমনিষ্যি গরুছাগল বাসট্রাক দেখতে দেখতে পথ চলা যায়। সবের মধ্যে আছি, আবার নেইও। ভিড়ের মধ্য দিয়ে চলেছি, অথচ ভিড়ের চ্যাটচেটে ঘামটুকু গায়ে লাগছে না। এর ওপর যদি সে গাড়িতে এফ এম থাকে, তাহলে তো একেবারে সপ্তম স্বর্গ।

এক কথায় অটোকে আমি ভালোবাসি, অটোও আমাকে ভালোবাসে। অন্তত খারাপ বাসে বলে তো মনে হয় না।

এইটুকু বললে একটা ভালোবাসার গল্প হয় বটে কিন্তু ভালো গল্প হয় না। যতক্ষণ না গল্পে শর্ত, স্বার্থ, অধিকারবোধ, ঈর্ষা, সন্দেহ, হারাই-হারাই, পালাই-পালাই ইত্যাদি ভালো ভালো ভাব এসে জোটে ততক্ষণ ভালোবাসার গল্প আধাখ্যাঁচড়া। অসত্য। আর অসত্য গল্প কি কখনও ভালো হতে পারে?

অটোর সঙ্গে আমার ভালোবাসাটি ভালো আর তাই সে ভালোবাসা জটিলতাশূন্য নয়। সে এমন জটিলতা যার কথা প্রাণের বন্ধুর কাছেও খুলে বলা যায় না। রক্তের সম্পর্কের কাছেও না। নিজের কাছেই যায় না অনেকসময়। মনের ভার যদি হালকা করতেই হয় তবে যেতে হয় কোটরওয়ালা বুড়ো গাছের কাছে। গাছ না পাওয়া গেলে ইন্টারনেটের অচেনা অদেখা বন্ধুরাও চলতে পারেন।

অনেকদিন আগে এক বিদগ্ধ দাদা বলেছিলেন, পৃথিবীর কোনও দুটো লোকের মধ্যে মাত্র দুটো জিনিসে কক্ষনও মিল হয় না। এক, বুড়ো আঙুলের আঁকিবুঁকিতে, দুই, প্রেম করার স্টাইলে। এমনকি একটাই লোকের প্রেম করার স্টাইল স্থানকালপাত্রভেদে বদলে বদলে যায়। কোনও প্রেমের প্রতি সে নিঃশর্ত আনুগত্যে হাঁটু গেড়ে বসে, কারও ওপর দিবারাত্র সর্দারি ফলায়, কারও ওপর সর্দারি ফলাতে চেয়েও পারে না, উল্টে নিজেই নাকের জলে চোখের জলে হয়।

অটোর সঙ্গে আমার প্রেমটা এই তৃতীয় গোত্রের।

অথচ এ রকমটি ছিল না জানেন। প্রথম যখন আমি নিয়মিত অটো চড়তে শুরু করি সেটা ক্লাস ইলেভেন হবে। শ্রীরামপুর স্টেশনে নেমে স্কুল পর্যন্ত যেতে অটো বা তিন নম্বর বাস ধরতে হত। বাসের ভাড়া অটোর থেকে কম ছিল আর আমি তখন বেকার ছিলাম, কাজেই সেদিক থেকে দেখলে আমার বাসে চাপাই যুক্তিসঙ্গত ছিল। তাও অযৌক্তিক অটো আমি কেন চড়তাম, সেটা আপনাদের বলছি। মোটে ছ’টি চড়নদার জোগাড় হলেই অটো ছেড়ে দিত, কিন্তু তিন নম্বর বাস ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত যতক্ষণ না গোটা দেড়শো লোক উঠে বাসের পেট ফাটোফাটো হয়। বাসের অপেক্ষায় থাকলে রোজই আমার ফার্স্ট পিরিয়ড পেরিয়ে স্কুলে ঢুকতে হত, কাজেই বাবামা দয়া করে আমাকে দেড় টাকার জায়গায় তিন টাকা খরচ করার অনুমতি দিয়েছিলেন।

প্রেমের গোড়ার দিকের একটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে অদূরদর্শিতা। তখন প্রেম বলতে শুধু প্রেমের উৎসটির কথাই মনে পড়ে। সে উৎসেরও যে উৎস আছে, তারও যে মাথা বাঁধা আছে অন্য কোনও খুঁটি বা গাছে, তারও যে বাড়িতে আছেন বদমেজাজি গুঁফো বাবা, ছিদ্রান্বেষী মা, স্বরচিত কবিতার বই গছানো মেসোমশাই --- সেটা কী জানি কেন কল্পনাতেই আসে না।

আমারও আসেনি। অটো নিয়ে তখনও আমার মোহাঞ্জন অটুট। আমার কাছে তখনও অটো মানে গতি, উত্তেজনা, রোমাঞ্চ। সকালবিকেল লালপাড় সাদাশাড়ি ইউনিফর্মের মাড় দেওয়া কড়কড়ে আঁচল বিজয়পতাকার মতো ওড়াতে ওড়াতে বটতলার জ্যাম ছিঁড়ে সদর্পে আওনযাওন। আমি তখন শুধু দেখেছি তার হলুদকালো ডোরাকাটা নির্ভীক শরীর, শুনেছি তার কর্ণপটহবিদারী চাঁচাছোলা স্বর, খেয়েছি তার বিস্তৃত বাতায়নের হাওয়া। সে স্বর-শরীরের কিছুই যে তার নিজের নয়, তার ললাটের ঝলমলে ঝালর থেকে শুরু করে পশ্চাদ্দেশের টা টা বাই বাই, ফির মিলেঙ্গে, বুরি নজরওয়ালে তেরা মুহ্‌ কালা যাবতীয় শুভেচ্ছা, আশীর্বাদ, অভিসম্পাতের মালিকানা যে অন্য কারও, স্টিয়ারিং যে শক্ত করে ধরে আছে অন্য একটা লোক --- সেটা আমার মাথাতেই আসেনি।

নেপথ্যের সেই সর্বশক্তিমান স্টিয়ারিং-ধারকটির পরিচয় আমি প্রথম পেলাম দিল্লিতে এসে। আর ঠিক তখন থেকেই আমার অটোপ্রেমে জটিলতার সূত্রপাত হল।

আগে অটোতে গটমটিয়ে চড়ে বসলেই হত, এখন আর ব্যাপারটা অত সোজা রইল না। প্রেমের বাবা কিছু একটা গোলমাল আঁচ করে টেলিফোন তুলে এনে নিজের ঘরে বসালেন। এতদিন রাতবিরেতসকালদুপুরে ফোন করলেই ওদিক থেকে কাম্য কণ্ঠের মধুর সম্ভাষণ শুনতে পেতাম, এখন তার নাগাল পাওয়ার আগে এক বস্তা কৈফিয়ত দিতে হয়। কাঁহা যাইয়েগা? কিতনা দিজিয়েগা? মিটার চলেগি, লেকিন আপকো দুগনা দেনা পড়েগা।

ধৈর্য ধরে প্রতিটি উত্তর দেওয়ার পরও সেগুলো তাঁর মনোমতো না হলে তিনি ফোন নামিয়ে রাখতে পারেন। কারণের মতো কারণ না দর্শিয়েই। খুব চাপাচাপি করলে হয়তো বলবেন, আমার তোমার বাংলা উচ্চারণ পছন্দ হয়নি, ব্যস্‌। আর কিছু জানার আছে?

কাঁহা যাইয়েগা? ___ রোড? আরে ম্যাডাম, ইস টাইম উস রোড পে বহোত জাম হোতা হ্যায়। ___ মার্গ খালি রহেগা, যানা হ্যায় তো বতাইয়ে।

এই না বলে গাড়ি নিয়ে তিনি পাড়ি দেবেন। আপনার হাঁ হয়ে থাকা মুখের ওপর শুধু সি এন জি-র একগাদা কালো ধোঁয়া উড়বে। কানের ভেতর লাইন কেটে দেওয়ার পর প্যাঁ প্যাঁ আওয়াজটা মশকরার হাসি হাসবে।

এত বাধা পেলে যা হয়, প্রেম অবশেষে দরকচা মেরে যেতে শুরু করে। পরিস্থিতির ঘষা খেয়ে এদিকওদিকের পালিশ চটে যায়। বুকের ভেতর ক্ষোভের পলি পড়ে, সে উর্বর পলিতে নালিশের গাছ বাড়তে বাড়তে শেষে আস্ত একখানা বিষবৃক্ষ। কোথায় গোলমাল কেউই আঙুল দিয়ে দেখাতে পারছে না, কিন্তু প্রেমে বড় বড় ফাঁক পড়তে শুরু করেছে। দেখাসাক্ষাৎ আগের মতোই হচ্ছে, কিন্তু গোটা সময়টুকু জুড়ে প্রেমালাপের বদলে শুধু খিটিমিটি। এই করতে করতে শেষটায় অভিসার আর অভিসার থাকে না, যুদ্ধযাত্রায় পরিণত হয়। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে, জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে, দরজায় চাবি দিতে দিতে মাথার ভেতর আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতি চলে অনর্গল। ও যদি আমাকে এইটা বলে, আমি এইটা বলব। থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দেব। কিছুতেই আমাকে ঠকাতে দেব না। চিৎকার করে নিজের মতটা জানিয়ে দেব। অনেক সয়েছি, আর সইব না।

বান্টি একটা কথা বলে, সেলফ্‌-ফুলফিলিং প্রফেসি। প্রেমের ক্ষেত্রে ভীষণ খাটে দেখেছি। রিহার্সাল দেব যুদ্ধের অথচ দেখা হলে প্রেম করব, এ জিনিস হয় না। মাঝরাস্তায় হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক যেন শ্রীগুরু বস্ত্রালয়ের ক্যালেন্ডারের নিমাই-নিতাই, এমন সময় দূর থেকে তাকে দেখতে পেলাম। হলুদ-কালোর বদলে এখন তার শরীর হলুদ-সবুজ। একমুহূর্তের জন্য যুদ্ধটুদ্ধ সব হাওয়া, বুকের ভেতর আবার অনেকদিনের বিস্মৃত একটা ঝর্ণা কুলকুল করে বইতে শুরু করেছে। এত সুন্দর কারও ওপর কী করে রাগ করে থাকে কেউ? তারও কি এমনটাই মনে হয়? আমার সামনে এসে থামে সে। অনেকদিন আগে যেমন দাঁড়াত, আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে। আমি তার খোলা জানালায় উঁকি মারি।

ভেতরে বাবা বসে আছেন।

কাঁহা যানা হ্যায়?

মিটার খারাব হ্যায়, নহি চলেগি।

বুকের ভেতরের ঝর্ণার ফাটল ‘চিচিং বন্ধ’ বলে যেন বন্ধ করে দেয় কেউ। নিমেষে সব খটখটে শুকনো। সারা সকালের মুখস্থ করা লাইনগুলো হুড়মুড় করে মনে পড়ে যাচ্ছে।

আমার মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে . . . শব্দ তো নয়, বুলেট।

কিঁউ নহি চলেগি? আপকা মর্জি হ্যায় কেয়া?

এই কর্কশ, দুর্বিনীত, ঝগড়ুটে গলাটা আমার? নিজেই চমকে যাই।

এই পরিস্থিতিতে একমাত্র রাস্তা হচ্ছে প্রেম থেকে বেরিয়ে আসা। তুমিও বাঁচো, আমিও বাঁচি। যত ক্লিশেই শোনাক না কেন, প্রেম আর আয়না, ভাঙলে জোড়া লাগে না। যত সেলোটেপই সাঁটা হোক না কেন। ফাটল ঢাকবে হয়তো, কিন্তু সেলোটেপে সেলোটেপে আয়নার চেহারা আরও কদাকার হবে বই কিছু নয়।

তবু লোকে সেলোটেপ সেঁটে থেকে যায়। কেন কে জানে। গোটা প্রেমপ্রক্রিয়ার মধ্যে এই জায়গাটাতেই আমার সবথেকে খটকা লাগে। এই শেষ হয়েও শেষ না হওয়ার সময়টায়। চোখের সামনে খোলা রাস্তা দেখেও সাধ করে এই ধ্বংসস্তুপের ভেতর পড়ে থাকাটায়। কেন? শুধু কি বিগত প্রেমের মুখ চেয়ে? নাকি অভ্যেসে? নাকি শঙ্কায়? আর যদি কেউ ভালো না বাসে? আর যদি কারও মন ভোলাতে না পারি? আর যদি নতুন করে কবিতার লাইন, আর্টফিল্মের ডায়লগ মুখস্থ না হয়?

তার থেকে হয়তো এই ধংসস্তুপই ভালো।

আমার আর অটোরও সে রকমটাই হয়েছে। প্রেম আর নেই, তার ছেড়ে যাওয়া ফোকরে বাসা বেঁধেছে বিপন্নতা।

তবু এখনও কোনও কোনও শুক্রবার সন্ধ্যেয় অন্যরকম একটা হাওয়া দেয়। সপ্তাহের ক্লান্তি আর আসন্ন ছুটির স্বস্তি মিলেমিশে বুকের মধ্যে কেমন একটা শান্তির আকাঙ্ক্ষা টের পাই। অনুক্ত সন্ধিপ্রস্তাবে সই করি দুজনেই। আজ ঝগড়া করব না, কেমন? সিটে আলতো করে গা ছেড়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি। লাখ লাখ মানুষ, গাড়ি, লালসবুজ আলোর দপদপানির নিচ দিয়ে স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ঢেউয়ের মাথায় ফসফরাসের মতো ঝিকিয়ে উঠছে প্রেম। আশপাশের জগৎ থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া দুটো মানুষ, একে অপরে ডুব দিয়েছে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। বুঝতে পারি, অটোও দেখছে।

এমন সময় হঠাৎ চারদিকে চাঞ্চল্য। প্রেমিকযুগলের চটকা ভেঙে গেছে, আকাশের দিকে ঘাড় তুলে তাকিয়ে কী যেন দেখার চেষ্টা করছে। চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে গাড়িগুলো অস্থির হয়ে চেঁচামেচি লাগিয়েছে। হঠাৎ কীসের তাড়া লাগল সবার? সিগন্যালের দিকে তাকিয়ে দেখি তার রক্তচক্ষুর লাল গলতে শুরু করেছে। গলে গলে টুপটুপ করে পড়ছে জলের ফোঁটার মতো।

বৃষ্টি! দেখতে দেখতে জলের ফোঁটায় ঢেকে যায় চারদিক। ফুটপাথের কংক্রিট, গাড়ির ছাদ, প্রেমিকের হেলমেটহীন মাথা, আমার চেককাটা শার্টের হাতা। ভিখিরি বাচ্চাগুলো উল্লাসে চিৎকার করে জ্যামের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে ছুটছে। আমার মাথার ভেতরের ক্লান্তিটা কেটে যাচ্ছে বুঝতে পারি। বাড়ির জানালাটার কথা মনে পড়ছে। ঘরের আলো নিভিয়ে জানালার পাশে বসতে ইচ্ছে করছে এক্ষুনি। ভীষণ, ভীষণ ইচ্ছে।

একটা গান বাজতে শুরু করেছে কোথাও। হরিহরণের গলায়। ‘দেখো ক্যায়সে বেকরার ইস ভরে বাজার মে, ইয়ার এক ইয়ার কে ইন্তেজার মে।’

কোথাও নয়, গানটা বাজছে আমার খুব কাছে। অটোর ভেতর। আমার পিঠের কাছে রাখা স্পিকার জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘এক হাসিনা ইধর দেখো ক্যায়সি বেচয়ন হ্যায়...’ ভেজা হাওয়ার ছাঁটে সারা গা শিরশির করে ওঠে। আমার প্রিয় গানটার কথা ওর মনে আছে! এতদিন পরেও? এত ঝগড়া পেরিয়েও? বাইরের বৃষ্টি আমার নাগাল পায় না, কিন্তু অটোর ভেতরে বসেই গানের বৃষ্টিতে আমি ভিজে চুবড়ি হয়ে যেতে থাকি।

খন্ডহরে বতাতি হ্যায়, ইমারত বুলন্দ থি।

        

March 24, 2014

কুইজের উত্তর ভাবতে ভাবতে ...



... ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন কি? তাহলে এই গানটা শুনুন এবং দেখুন। দেখবেন নিমেষে মাথা খুলে গিয়ে হুড়হুড়িযে সব ঠিক উত্তর বেরিয়ে পড়ছে।






কুইজঃ কবিতা থেকে গান



উঁহু, আপনাদের কবিতা বলতে হবে না, গান তো গাইতে হবেই না। শুধু কবিতা থেকে গান হয়ে ওঠা নিচের গানগুলোর শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে।

‘কবিতা/গান’-এর কবির নামটাও যদি চিনে ফেলে উত্তরের সঙ্গে জুড়ে দেন, তাহলে এক্সট্রা হাততালি।

সময় চব্বিশ ঘণ্টা। উত্তর প্রকাশিত হবে দেশে মঙ্গলবার সকাল আটটায় আর নিউ ইয়র্ক সিটিতে সোমবার রাত সাড়ে দশটায়। আপনারা যাতে টোকাটুকি না করতে পারেন, সে জন্য ততক্ষণ কমেন্ট মডারেশন চালু থাকবে।

শুরু করে দিন তবে? অল দ্য বেস্ট।


*****

১. আমি তখন ____ শ্রেণী, আমি তখন ____
আলাপ হল ____, ____দের বাড়ি।

২. ____ বাতাস এল হঠাৎ ধেয়ে, ____ ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ
____ ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম একা, ____ মাঝে আর ছিল না কেউ।

৩. ____ তলে, ____ পারে
____ ডাকে, ____ ঝাড়ে
____ গন্ধে ____ আসে না, তাই তো ____ রই।

৪. ভাঙছ ____ ভাঙছ ____
____ জমা ____ বাড়ি
____ আড়ত, ____ গোলা
কারখানা আর রেলগাড়ি।

৫. ____ স্নেহধারা! ____ বিন্দু!
ডাকে তোরে চিত-লোল উতরোল ____।
____ হানে জুঁইফুলী বৃষ্টি ও অঙ্গে,
চুমা-চুমকীর হারে ____ ঘেরে রঙ্গে,
ধূলাভরা দ্যায় ধরা তোর লাগি ____!

৬. উঠছে ____
নামছে ____,-
____ দোলে
____ নাড়ায়!
____ দোলে
____ দোলে!
মেঠো ____
সামনে বাড়ে,-
ছয় ____
চরণ ____!

৭. ____ রৌদ্রের ____ উল্লাসে
____ নেই ____ নেই ____ নেই ____ নেই
____ শুধু একঝাঁক ____।

৮.  প্রবাসে ____ বশে
____ যদি খসে
এ ____ আকাশ হতে নাহি ____ তাহে।
____ মরিতে হবে, ____ কে কোথা কবে
চিরস্থির কবে ____ হায় রে ____।

৯. ____ নির্জন ____ কত ভয় তবুও ____ ছোটে
____ ভয় তারও চেয়ে ভয় কখন ____ ওঠে।

১০. ____ সরস্বতী কাল ____ বিয়ে
যমুনা তার ____ রচে বারুদ বুকে নিয়ে
____ টোপর নিয়ে!



*****

উত্তরঃ

১. আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি
আলাপ হল বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়ি।
              ---মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়, জয় গোস্বামী

২. পুবে বাতাস এল হঠাৎ ধেয়ে, ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ
আলের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম একা, মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।
                     ---রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৩. লেবুর তলে, পুকুর পারে
ঝিঁঝিঁ ডাকে, ঝোপে ঝাড়ে
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, তাই তো জেগে রই।
     ---কাজলাদিদি, যতীন্দ্রমোহন বাগচী

৪. ভাঙছ প্রদেশ ভাঙছ জেলা
জমি জমা ঘর বাড়ি
পাটের আড়ত, ধানের গোলা
কারখানা আর রেলগাড়ি।
      ---তেলের শিশি, অন্নদাশংকর রায়

৫. পাষাণের স্নেহধারা! তুষারের বিন্দু!
ডাকে তোরে চিত-লোল উতরোল সিন্ধু।
মেঘ হানে জুঁইফুলী বৃষ্টি ও অঙ্গে,
চুমা-চুমকীর হারে চাঁদ ঘেরে রঙ্গে,
ধূলাভরা দ্যায় ধরা তোর লাগি ধর্ণা!
     ---ঝর্ণা, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।

৬. উঠছে আলে
নামছে গাড়ায়,-
পালকী দোলে
ঢেউয়ের নাড়ায়!
ঢেউয়ের দোলে
অঙ্গ দোলে!
মেঠো জাহাজ
সামনে বাড়ে,-
ছয় বেহারার
চরণ-দাঁড়ে!
      --- পালকীর গান, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

৭. চৈত্রের রৌদ্রের উদ্দাম উল্লাসে
তুমি নেই আমি নেই কেউ নেই কেউ নেই
ওড়ে শুধু একঝাঁক পায়রা।
        ---বিমল চন্দ্র ঘোষ

৮. প্রবাসে দৈবের বশে
জীবতারা যদি খসে
দেহ আকাশ হতে নাহি খেদ তাহে।
জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে
চিরস্থির কবে নীর হায় রে জীবননদে।
          ---বঙ্গভূমির প্রতি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত

৯. রাত নির্জন পথে কত ভয় তবুও রানার ছোটে
দস্যুর ভয় তারও চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে।
          ---রানার, সুকান্ত ভট্টাচার্য

১০. যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে
যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে নিয়ে
বিষের টোপর নিয়ে!

          ---শঙ্খ ঘোষ


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.