April 30, 2014

একটি বিলম্বিত অভিনন্দন



সৌমেশ লিংকটা পাঠিয়েছিলেন বেশ ক’দিন আগে। সাপ্তাহিকীর এ সপ্তাহের গানের ক্যান্ডিডেট হিসেবে। আমি ক্লিক করেওছিলাম। চেনা গায়ক, চেনা গান, কিন্তু গাওয়াটি অচেনা। কণ্ঠে ক্লান্তি, দমের ঝুলিতে টান। ডানদিকের ওপরের লাল ক্রসে ক্লিক করে বেরিয়ে সৌমেশকে রিপ্লাই দিয়েছিলাম, ‘সরি সরি, কিছু মনে করবেন না। গানটা আসলে আমার ভালো লাগে না।’ সৌমেশ আপাদমস্তক ভদ্রলোক, হাসিমুখে উত্তর পাঠিয়েছিলেন, ‘আরে না না, কোনও ব্যাপার না।’

কথোপকথন আর্কাইভ করে বসে রইলাম। মাথার ভেতর বাজতে লাগল,

‘সন্ধ্যের গলা সাধা, কী কঠিন ছায়ানট রাগ
কী করে রাখব তাল সম ফাঁকে কেবল হারায় . . .’

অফিসে বসে বসেই চোখের বাইরের আলো নিভে এল। জ্বলে উঠল মাথার ওপরের সিলিং জুড়ে ছোট ছোট সারি সারি হলুদ ফুল। দৃষ্টির সামনে ঢালু হয়ে নেমে গেল মানুষের মাথা। রোজ যে সব হরেদরে মাথারা ঘুরে বেড়ায় আমাদের হাটে বাজারে, শাকপাতামাছমুলো বেছেবুছে টিপেটুপে কেনে, তারা নয়। একটু অন্যরকম মাথারা আজ এসে জড়ো হয়েছে এখানে। মাথাদের বেশির ভাগই কলেজে যায়, হাতেগোনা ক’জন অফিসে বা স্কুলে। বিকেলবেলায় শুধু রকে বসে থাকার বদলে লাইব্রেরিতে ঢুঁ মারে। মণ্ডপের দালানে র-সু-ন জয়ন্তীর নাচগানের শেষে জোর করে একটা কুইজ গুঁজে দেয়। কুণ্ঠিত প্রতিবেশীদের টেনেটুনে টেবিলে এনে বসায়। আরে কাকিমা, হেবি সোজা প্রশ্ন, সব পারবে দেখবে। সে সব মাথার ভিড়ের ঢাল মিশেছে গিয়ে যে মঞ্চের পায়ের কাছে, সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন একজন। রিষড়ার বৃহত্তম মঞ্চে, পাড়াশুদ্ধু মেয়ে গ্রামবাসী সেজে নাচতে নাচতে ঢুকে পড়লেও যে মঞ্চে এদিকওদিক জায়গা বাকি থাকে, সেই স্টেজে একা দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। অথচ স্টেজটা একটুও খালি লাগছে না। ফ্যাকাশে নীল শার্টের গোটানো হাতা থেকে বেরিয়ে আসা শক্তপোক্ত হাত গিটারের তারে টোকা মারছে। সুরে নিখুঁত বাঁধা কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসছে নিটোল এক একটি শব্দ, এক একটা গান আর গাইতে গাইতে লোকটার সাইজ ক্রমশ বড় হয়ে যাচ্ছে। বিরাট হতে হতে ছেয়ে ফেলছে চারপাশ। আমাদের গ্রাম্য রবীন্দ্রভবনের জখম অ্যাকিউস্টিক ছাপিয়ে বন্যার জলের মতো উপচে পড়ছে লোকটার গলা। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সামনে বসা মাথাগুলোকে। দাসখৎ লিখিয়ে নিচ্ছে সারাজীবনের মতো। প্রকাণ্ড ছায়াটা ঘাড় ধরে ঘুরিয়ে দিচ্ছে একটা গোটা ইন্ডাস্ট্রির গতিপথ। একা।

তখন আমি বয়ঃসন্ধির বিপজ্জনক মুখটায় দাঁড়িয়ে আছি। সামনের ভিড়ে বসে থাকা কোনও কোনও কুইজমাস্টারের মুখ মনে পড়লেই কথা নেই বার্তা নেই ভ্যাঁ করে কান্না পেয়ে যাচ্ছে। ওই মারাত্মক সময়েও সুমনের প্রেমে পড়িনি আমি। মোহ, অনুরাগ, কাম, প্রেম, ভালোবাসা ইত্যাদি আরও নানারকম যা যা অনুভূতি বোধ করি আমি মর্ত্যের মানুষদের প্রতি, তার একটিও দিয়ে আলোর নিচে গিটার গলায় ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই অমর্ত্য সত্তাটিকে ছুঁয়ে দেওয়ার সাহস হয়নি আমার।

অমিতাভ একবার বলেছিল, পৃথিবীর তিনটে সবথেকে শক্ত কাজের মধ্যে একটা হচ্ছে সুমনের আনুগত্যে অবিচল থাকা। লোকটা এমন কাণ্ড বাধায় মাঝে মাঝে। দুমদাম সব কথাবার্তা। অপোগণ্ড সব সাঙ্গোপাঙ্গ। যখন যাকে ভালোলাগছে তখন তার প্রেমে পাগল, ছ’মাস বাদে তার গুষ্টির তুষ্টি না করে জল খাচ্ছে না। ওই যমের অরুচি নেতাগুলো সুমনকে নিয়ে কথা বলার সাহস পায় কোত্থেকে? সুমনই বা তাদের কথায় রাগে কেন? ওরা তো নশ্বর, সুমন তো নয়। নর্দমার ধারে পড়ে থেকে দু’টাকা পিসে বিকোনো খবরের কাগজ সুমনের সম্পর্কে যা-তা লেখে কোন সাহসে? যে কথা শুধুই কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন বা স্তুতি নয়? মোবাইল বেজে ওঠার অপরাধে বাবার বয়সী একটা লোককে ঘাড় ধরে হল থেকে বার করে দেওয়ার স্পর্ধা হয় কী করে স্বঘোষিত ইন্টেলেকচুয়াল গুণ্ডাদের? সুমনের চোখের সামনে?

গান শোনা যদিও বন্ধ করিনি। লোকটার ওপর থেকে বিশ্বাস টলেছে, লোকটার গান থেকে তো নয়। এখনও দিনে অন্তত ঘণ্টাখানেক কাটে জাতিস্মর আর চেনা দুঃখ চেনা সুখের ফেরে ঘুরে ঘুরে।

সেদিন জাতীয় পুরস্কারের খবরটা কানে এল। রূপঙ্কর, আপনাকে অজস্র অভিনন্দন জাতীয় পুরস্কার জয়ের জন্য। আপনি আমার প্রিয় একজন শিল্পী। যে গানটার জন্য ওরা আপনাকে প্রাইজ দিয়েছে, আমার মতে তার থেকে অনেক ভালো গান আপনি গেয়েছেন। ওই যে ‘তোমার টানে সারা বেলার গানে’ গানটা। কী ভালো, যতবার শুনি আবার শুনতে ইচ্ছে করে। এই প্রাইজ পাওয়া গানটাতেও আপনি প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন। কিন্তু আমাকে ক্ষমা করবেন, এটা আপনার গান নয়। আপনি যত চেষ্টা করেছেন, যত দরদ দিয়ে উচ্চারণ করেছেন গানের প্রতিটি শব্দ, তত বেশি করে আমার মনে পড়েছে আর একজনের কথা। তত ইচ্ছে করেছে জমজমাট অর্কেস্ট্রা আর মহার্ঘ অ্যারেঞ্জমেন্টের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে গানটাকে বার করে এনে একজনের একলা গিটারের কোলে রেখে আসতে। আপনার গানটা বারবার লুপে শুনতে শুনতে আমার চোখে ভেসে উঠেছে অনেক, অনেক দিন আগে দেখা একটা অতিকায় ছায়া। যে ছায়া একসময় আমার সারাটা জীবন গ্রাস করে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। পারেনি। কেন কে জানে। আমি বড় হয়ে গেছি বলে, নাকি ছায়ার মালিক তিলে তিলে মনুষ্যত্বে নেমে এসেছেন বলে?

রূপঙ্করের গানটা থামিয়ে লিস্টের প্রথম গানটায় ক্লিক করি। সৌমেশ এই গানটাই পাঠিয়েছিলেন আমাকে। এই গানটাই দু’লাইন শুনে বেরিয়ে এসেছিলাম আমি।

প্রথম আলোয় ফেরা, আঁধার পেরিয়ে এসে আমি
অচেনা নদীর স্রোতে চেনা চেনা ঘাট দেখে নামি
চেনা তবু চেনা নয়, এভাবেই স্রোত বয়ে যায় . . .

কণ্ঠে ক্লান্তি, দমের ঝুলিতে টান। একসময় অবহেলে রবীন্দ্রভবনের ছাদ ছুঁয়ে ফেলা সদর্প ‘ডি’, ‘এ’ স্কেলে হাঁটু গেড়ে বসেছে।

ফড়িং-এর উড়ে যাওয়া, ডানায় রংধনুর নীল
জন্মে জন্মে দেখা দুপুর আকাশে একা চিল
তারই মতো ভেসে যাওয়া চুপিসাড়ে দুখানি ডানায়
খোদার কসম জান, আমি ভালোবেসেছি তোমায়।

আমার গাল বেয়ে দু ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে নামে। আমার পাশে বসে একমনে কাজ করে চলা ঈশা, ঘাড় ঘোরালেই দেখতে পাবে জেনেও আমি নিজেকে সামলাতে পারি না।

গির্জার ঘণ্টায় মিলে যাওয়া ভোরের আজান
প্রতি আহ্বানে খোঁজা তোমার যোগ্য কোনও গান
যে গানে শ্যামের সুর রাধিকার বিরহে মানায়
খোদার কসম জান, আমি ভালোবেসেছি তোমায়।

আমার চোখের বাইরের আলো আবার নিভে আসে। আবার মাথার ওপর সারি সারি হলদে পলকাটা হলদে ফুল। কালো মাথার আঁধার পেরিয়ে আবার আমার চোখ গিয়ে থামে মঞ্চের একলা শিল্পীর পায়ের কাছে। এখন আর তিনি দাঁড়িয়ে নেই। বয়সের ভার ন্যস্ত করতে হয়েছে চেয়ারে। গিটারের তারে শ্লথ হয়েছে আঙুল। মুণ্ডিত মস্তক দুলিয়ে, বন্ধ চোখে কবি গেয়ে চলেছেন,

তোমাকেই বাজি ধরা বোকা প্রেমে যে অহংকার
গানে গানে কেঁদে মরা ব্যর্থ হয়েছে অভিসার
তোমায় খুঁজেছি শুধু কী আদিম বাঁচার নেশায়,
খোদার কসম জান, আমি ভালোবেসেছি তোমায়।

চরম এমব্যারাসমেন্টের ঝুঁকি অগ্রাহ্য করে আমার গাল দিয়ে জল গড়িয়েই চলে। প্রথম কৈশোরের সেই ছায়াটা ঘিরে আসছে আবার। গ্রাস করছে আমায় চারদিক থেকে। কুড়ি বছর আগে যেমন করেছিল। বুকের ভেতরটা আবার আনুগত্যে আর্দ্র হয়ে যাচ্ছে।

এখন আবার দেখা, আবার তোমার চোখে জল
কত জন্মের চেনা, তুমি আছ একই অবিকল . . .

বাইরেটা বদলায়, ভেতরটা থেকে যায় ঠিক আগের মতো। কুড়ি বছরের ওপারএপারে গলার জোর ক্ষীণ হয়ে আসে, মনের জোর নড়বড়ে হয়, জিনিয়াসের জোর শুধু টসকায় না। থেকে যায় একই, অবিকল।

আমার জীবনে কাছ থেকে দেখা একটিমাত্র জ্যান্ত জিনিয়াস, আমার অন্তরের সবটুকু অভিনন্দন জানবেন।

  

April 28, 2014

20 Random Facts About Me



১. কুন্তলা না হলে আমার নাম রাখা হত অদিতি কিংবা শ্রীনীতা। অদিতির জন্য আমার বিশেষ দুঃখ নেই, শ্রীনীতার জন্য একসময় ছিল। এখন আর নেই। এখন আমার কুন্তলা নামটা বেশ পছন্দই হয়। যতক্ষণ না কেউ মানে জিজ্ঞাসা করছেন। তখন বলতে হয়, ‘উওম্যান উইথ হেয়ার অন হার হেড’। নিমেষে প্রশ্নকর্তার চোখ আমার হেডের দিকে যায় এবং আমি আবার নতুন করে শ্রীনীতার জন্য হাহাকার করি।

২. স্কুলে পড়াকালীন আমার প্রিয় বিষয় ছিল বাংলা, ইংরিজি।

৩. আমি গাড়ি চালাতে পারি না।

৪. আমি সাইকেল এবং স্কুটার, দুটোই খুব ভালো চালাতে পারি।

৫. আমার প্রথম মঞ্চে নামার অভিজ্ঞতা তিন বছর বয়সে। পাড়ার ফাংশানে ন্যাড়া মাথায় ফুলের মালা জড়িয়ে ‘সাঁওতালি দল, দলে দলে নাচে রে’ গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে। সেই নাচে আমার প্রতিভার প্রকাশ দেখেই আমার মা আমাকে কত্থক নাচ শেখার স্কুলে ভর্তি করে দেন। চার বছর বয়স থেকে ন’বছর বয়স পর্যন্ত আমি প্রতি রবিবার বিকেলে সেই স্কুলে গিয়ে পায়ে ঘুঙুর বেঁধে কোমরে হাত দিয়ে ‘ধা ধিন ধিন ধা’ করতাম। আট বছর বয়সে আমাকে গানের স্কুলে ভর্তি করা হয়। আট থেকে ন’বছর বয়স পর্যন্ত রবিবার বিকেলে আমার রুটিনটা ছিল এই রকম: বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোন্নগরে নাচের স্কুল, কোন্নগরে নাচের স্কুল শেষ করে শ্রীরামপুরে গানের স্কুল, শ্রীরামপুরে গানের স্কুল শেষ করে রিষড়ায় বাড়ি ফেরা। শুনে অর্চিষ্মান চোখ কপালে তুলে বলেছিল, ‘বুঝেছি, তুমি সেই মারাত্মক বাচ্চাদের একজন ছিলে যারা সবকিছু শেখে।’ সর্বৈব মিথ্যে। আমি নাচ আর গান ছাড়া কিছু শিখিনি কোনওদিন। নাচের পাট তো গান শুরু করার পরপরই চুকে গিয়েছিল।

৬. আমি কড়া গন্ধ সহ্য করতে পারি না। সে গন্ধ ভালো মন্দ যা-ই হোক না কেন। ধূপকাঠি, পারফিউম, কাঁঠাল, ইলিশ কিংবা কুল --- তাই আমার সিলেবাসের বাইরে।

৭. আমার জীবনের এক এবং একমাত্র সেলিব্রিটি ক্রাশের নাম চন্দ্রিল ভট্টাচার্য।

৮. আমার সঙ্গে যাদের আলাপ নেই তাদের ধারণা আমি বিদঘুটে রকমের গম্ভীর। গুড ফ্রাইডের ছুটিতে আমাদের অফিস থেকে আরেকদল বাঙালিও রণথম্ভোর বেড়াতে গিয়েছিল। তাদের একজনের সঙ্গে আমার ভালো আলাপ আছে, বাকিদের সঙ্গে নেই। জঙ্গলে দেখা হয়ে যেতে আমি আমার চেনা সহকর্মীর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়ে কথা বলেছি। সেই দেখে নাকি বাকিরা পরে তাকে বলেছে, ‘কী সাংঘাতিক! এই মহিলা হাসেন?’

৯. মাংস কিংবা ভাত, কোনওটাই আমার প্রিয় খাবার নয় বলেই বোধহয় বিরিয়ানির মহিমা আমার এ জীবনে বোঝা হল না।

১০. অবশ্য তাতে বিরিয়ানির কোনও দোষ নেই। বান্টি বলে আমি বাঙালির কলঙ্ক কারণ আমি বাঁচার জন্য খাই। আমি সারাজীবন (তিন বেলা) স্যান্ডউইচ বা দোসা বা পাপড়ি চাট বা ভাত মাছের ঝোল খেয়ে কাটাতে পারি। পেট ভরলেই হল।

১১. আমার ডানচোখের চশমার পাওয়ার মাইনাস বারো, বাঁ চোখের মাইনাস দশ।

১২. আমি সারাদিনে অন্তত তিনবার আমার চশমা হারাই। আর খালি চোখে চশমা খুঁজে বার করা আমার সাধ্য নয়। কাজেই অর্চিষ্মানকে সারাদিনে তিনবার করে আমার চশমা খুঁজে দিতে হয়।

১৩. সব ব্যাপারে না হলেও কিছু কিছু ব্যাপারে আমার OCD দেখার মতো। চিপসের প্যাকেট একটি নির্দিষ্টভাবে (প্যাকেট অক্ষত রেখে, প্যাকেটের শিরদাঁড়া ধরে সাবধানে টেনে মুখের আঠা খোলা) ছেঁড়া না হলে আমি সে প্যাকেটের চিপস খেতে পারি না। বলি, ‘না রে বান্টি, তুই খা, আমার পেটব্যথা করছে।’

১৪. আমি জীবনে কখনও মুদ্রাদোষ-মুক্ত থাকিনি। অবশ্য মুদ্রাদোষ বললে ব্যাপারটা ঠিক বোঝায় না, মায়ের মতে ‘পাগলামি’ বললেই ঠিক। হয় নিজের মাথার চুল ধরে টানি (টানতে টানতে টাক পড়ে গিয়েছিল একসময়), নয় আঙুল মটকাই (ছোটবেলায় পার্কে সবাই দৌড়োদৌড়ি করে খেলত, আমি দু-মিনিটের টাইম আউট নিয়ে গাছের তলায় বসে আঙুল মটকে নিতাম), নয় আংটি খুলে ঘোরাই, নয় নখ দিয়ে খুঁটে (বা কামড়ে) নিজেরই গায়ে ক্ষত করে ফেলি। আপাতত আংটি ঘোরানোর দশা চলছে। গত সপ্তাহে য-ভাইয়াকে ডেকে এনে তিনতলা লোহার ডেস্ক সরিয়ে তার পেছন থেকে গড়িয়ে যাওয়া আংটি উদ্ধার করাতে হয়েছিল।

১৫. আমার প্রিয় রং লাল, সাদা, কালো ও নীল। কিছু কিছু হলুদও ভালো লাগে।

১৬. আমার ধারণা সারাদিনে আমার বলা গড় মিথ্যের সংখ্যা অন্যদের থেকে বেশি। খুব তুচ্ছ এবং অকারণ ব্যাপারে আমি দুমদাম মিথ্যে বলে দিই। ধরুন কফিরুমে কেউ পাকড়াও করে জিজ্ঞাসা করল, ‘লাঞ্চ হয়ে গেছে?’ আমি ‘হ্যাঁ’ বলে দিলাম, যদিও আমার লাঞ্চ তখনও হয়নি। বা মা ফোনে জিজ্ঞাসা করলেন ‘অটোর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, সিনেমা যাচ্ছ বুঝি সোনামা?’ আমি বললাম, ‘না না সিনেমা নয়, শপিং মল।’ যদিও আমি তখন যাচ্ছি রিভলবার রানি দেখতে। অর্চিষ্মান বুঝতে পারে না। বলে, ‘কেন?’ কেন কি ছাই আমিই জানি? এই সব মিথ্যেগুলোর ওপর আমার কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। নিশ্বাসপ্রশ্বাস যেমন আমাদের অনৈচ্ছিক ক্রিয়া, আমার মিথ্যেগুলোও তেমনি অনৈচ্ছিক মিথ্যে। রাত জেগে নিজেই নিজের প্রচুর সাইকোঅ্যানালিসিস করেছি, কিন্তু কোনও কারণ খুঁজে পাইনি। শেষে একদিন আমার প্রিয় লেখকের বলা একটি কথা দেখে আসল কারণটা স্পষ্ট হয়ে গেল। আমি হিসেবি কি না, তাই আমি সত্যের বাজে খরচ করি না।

১৭. আমি জীবনের একটা লজ্জাজনক রকমের দীর্ঘ অধ্যায় ‘ক্লাস মনিটর’ বা ‘শ্রেণীমন্ত্রী’ হিসেবে কাটিয়েছি। লজ্জা আরও বেশি কারণ আমি শ্রেণীর কাউকে কোনওদিনও আমার একটি কথাও শোনাতে পারিনি। সব মনিটরের মতো আমারও একটা নাম টোকার খাতা ছিল। কেউ কথা বললে বা খামোকা পাশের মেয়ের ঝুঁটির ফিতে টেনে খুলে দিলে সেই খাতায় নাম লিখতে হত। পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাচ্ছে দেখলে আমি সেই ধুধধুড়ে খাতাটা বার করে প্রবল বেগে মাথার ওপর ঘোরাতাম এবং ক্লাসশুদ্ধু সবার নাম সে খাতায় লিখে ফেলার হুমকি দিতাম। তাতে কতখানি কাজ দিত, আপনারা আন্দাজ করতে পারছেন।

১৮. মেয়েদের প্রতি আমার সহজাত পক্ষপাতিত্ব আছে।

১৯. আমার রান্না করতে ভালো লাগে না, কিন্তু শনিরবিবার সকালের জলখাবার বানাতে আমি খুব ভালোবাসি। নিজের বানানো অমলেট খেয়ে নিজেই এমন মুগ্ধ হয়ে যাই যে বাধ্য হয়ে অর্চিষ্মানকেও তাল দিতে হয়। হ্যাঁ হ্যাঁ, সত্যিই ভালো হয়েছে।

২০. হিংসে আমার জীবনের অন্যতম চালিকাশক্তি।


April 26, 2014

বাংলা বাঁচাও / শেষ পর্ব



চিন্তামণি একটি সোফা পুরোটা দখল করে চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছেন। বিনীত সোফার হ্যান্ডেলে বসে খবরের কাগজ নেড়ে নেড়ে তাঁর মাথায় হাওয়া করছে।

প্রকাশঃ বন্ধুগণ, শ্রদ্ধেয় চিন্তামণিদা অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্য আমাদের সভা খানিকক্ষণ স্থগিত ছিল। আপাতত উনি খানিকটা সুস্থ বোধ করছেন। তাই তো দাদা?

চিন্তামণি শুয়ে শুয়েই ডান হাত আশীর্বাদের ভঙ্গিতে তুলে সম্মতি জানালেন। দেখে বোঝা যাচ্ছে কথা বলার অবস্থা তাঁর এখনও আসেনি।

প্রকাশঃ কাজেই আমাদের সভা আবার শুরু হচ্ছে। আমরা সিনিয়রিটি অনুযায়ী বক্তার ক্রম সাজানোর চেষ্টা করেছি। যাতে কেউ পার্শিয়ালিটির অভিযোগ আনতে না পারে, হে হে। আমাদের লিস্ট অনুযায়ী চিন্তামণিদা’র পর বাংলাভাষা বাঁচানো নিয়ে সভায় বক্তব্য রাখবেন আমাদের সবার প্রিয় মায়াবীদি।

বেচারামঃ জিয়ো মায়াবীদি, হয়ে যাক হয়ে যাক।

মায়াবীঃ সেকী, আমার থেকে সিনিয়র কেউ নেই নাকি এখানে? আমাকে কিন্তু দেখে বোঝা যায় না, আমার খুব ছোট বয়সে বিয়ে হয়েছিল তো। আমার এই গত অক্টোবরে সাঁইত্রিশ হল।

বেচারামঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ...ইয়ে মানে, আমার হঠাৎ একটা ভীষণ মজার চুটকি মনে পড়ে গেল... কিন্তু সিরিয়াসলি মায়াবীদি, আপনাকে দেখে কিন্তু বোঝাই যায় না, হেব্বি মেন্টেন করেছেন কিন্তু। আমি মাইরি টেনেটুনে তেত্রিশ ভেবেছিলাম।

মায়াবীঃ ধ্যাত, কী যে বল।

বেচারামঃ আরে বাই গড। পরিমলদা ইস আ রিয়েলি লাকি চ্যাপ। আপনার সিক্রেটটা কী বলুন দেখি? আমার বউকেও একটু টিপস-ফিপস দিন।

মায়াবী (লজ্জিত হেসে): তুমি পারও বটে।

বেচারামঃ উফ, মায়াবীদি, ফিদা ফিদা। আপনাকে হাসলে যা লাগে না। মাধুরী ফাধুরি কোথায় লাগে। আপনি সবসময় চোখের ক্লোজ আপ ছবি সাঁটেন কেন দিদি, মাঝে মাঝে হাসির ক্লোজ আপ সাঁটবেন, আপনার ফ্রেন্ডরা পাগল হয়ে যাবে।

চিন্তামণিঃ বলি, এবার একটু সভার কাজ শুরু করলে হয় না?

বিনীতঃ এই তো দাদা কথা বলেছেন, দাদা? এখন একটু ভালো বোধ করছেন দাদা?

প্রকাশঃ হ্যাঁ হ্যাঁ, এবার সভার কাজ শুরু করা যাক। তাহলে সিনিয়রিটির দিক থেকে এখন কে বলতে উঠবেন? কবি? কবি?

কবি একমনে ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে আছেন।

বেচারামঃ দাদা, আরে ও দাদা, আরে ও দাদাআআআ, আপনার টার্ন, যান গিয়ে বাংলা বাঁচান।

কবিঃ ওহ্‌ আমাকে এখন বলতে হবে বুঝি? কিন্তু আমি তো কিছু তৈরি করে আনিনি।

বেচারামঃ আরে তৈরি আবার কীসের? যুদ্ধে যাচ্ছেন নাকি। ইস্কুলে এক্সটেম্পোর করেননি?

কবিঃ আসলে আমি তো খুব নির্জন লোক, আমি মোটে লোকের সামনে কথা বলতে পারি না।

বিনীতঃ আহা, একেই বলে কবি, কেমন সুন্দর বললেন, নির্জন লোক, নি-র-জ-ন, শুনলেই বুকের ভেতরটা কেমন সন্ধ্যেবেলার খাঁ খাঁ রেলস্টেশন হয়ে যায় . . .

প্রকাশঃ আরে কেয়া বাত কেয়া বাত বিনীত, তুমিও তো ফাটিয়ে দিচ্ছ। ‘সন্ধ্যেবেলার রেলস্টেশন’, তোফা, উমদা।

বিনীতঃ ভালো হয়েছে? এই সকলের পায়ের কাছে বসে কিছু কিছু শেখার চেষ্টা করেছি আরকি।

বেচারামঃ অলরাইট, তার মানে কবি বলতে চান না। নেক্সট?

কবিঃ আমার খাতাখানা তো সঙ্গে আছে, যদি সময় থাকে তবে আমি সেখান থেকেই না হয় দু’খানা কবিতা...

বেচারামঃ কত বড় কবিতা? দশ লাইনের বেশি হলে একটা বললেও অসুবিধে নেই।

প্রকাশঃ এবার আমাদের সামনে কবিতা পড়ে শোনাবেন আমাদের নির্জন কবি।

কবিঃ আসলে আমি খুব সাধারণ মানুষ জানেন . . . নিঝুম মানুষ . . .  বেশি কথা বলতে পারি না . . . আমার যত যাপন সব গাঁগঞ্জের মেঠো সখাদের সঙ্গে . . . তাদের সাথেই আমার সারাবেলা হইহই টইটই . . . তাদের সাথেই আমার গালভরা পান্তাভাত . . . তাদেরই দখিনা আঙিনায় এলোমেলো ঘুরে মরি আমি . . . আদাড়বাদাড় থেকে খুঁটে খুঁটেএএএএ . . . খুঁড়ে খুঁড়েএএএএ . . . কবিতার বীজ তুলে আনি . . . এনে টেবিলের ফুলদানিতে বুনে দিই . . . বীজগুলি রাতভর ফুল হয়ে ফোটে . . . সে ফুলের নিঃশ্বাসে সারারাত জমজমাট হই . . . সকালে উঠে দেখি আমি আর আমি নেই . . . আরশির ভেতর থেকে অন্য কেউ চেয়ে আছে . . .

বিনীতঃ উঃ, মাগোদেখুন দেখুন আমার গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে উঠেছে, দেখুন দেখুন, চিন্তামণিদা? দেখতে পাচ্ছেন?

বেচারাম (হাততালি দিতে দিতে) আরে মামা, কেয়া বাত কেয়া বাত। ফাটিয়ে দিয়েছেন গুরু। নেক্সট কবিতা।

কবিঃ সেকী এটি তো কবিতা ছিল না, এটি তো মুখড়া।

বিনীতঃ মুখড়াতেই এই, অন্তরায় পৌঁছে কী হবে ভাবতে পারছেন, অ্যাঁ চিন্তামণিদা?

চিন্তামণিঃ জ্বালালে দেখছি। তুমি পারলেই হবে। আমার পারার দরকার নেই। যত্তসব।

প্রকাশঃ আঃ বেচারামদা, কবিকে এত তাড়া দেবেন না। আপনারা কবিতা লেখেন না তাই বোঝেন না। কবিতা হল নদীর মতো, তাকে নিজের গতিবেগে বইতে দিতে হবে, না হলে যে কী হবে তা অকবিরা কল্পনাও করতে পারবে না। আপনি বলুন কবি। আমাদের সমৃদ্ধ করুন।

কবিঃ আমার কবিতাটির নাম হল, ‘মশার প্রশ্ন’।

কাল মাঝরাতে

রোজকার মতো

নিজের মুখোমুখি শুয়ে আছি –

মায়াবী নীল মশারির গায়ে গায়ে, পায়ে পায়ে ঘুরছে

মশার দল,

ঘুরছে

ফিরছে

আর

জানতে চাইছে

কেন? কেন? কেন?

কেন এই প্রতিরোধ?

কীসের ভয় আমার?

শুধু কি

ম্যালেরিয়া?

নাকি আরও গভীর কোনও ভয় কুরে কুরে খাচ্ছে আমাকে?

আমি

পালাতে চাইছি

প্রাণপণ

দৌড়চ্ছি

হাঁপাচ্ছি

পাঁজরের খাঁচার আগল ভেঙে হৃৎপিণ্ড ফেটে বেরোতে চাইছে

বুকপকেটের সেলাই কেটে পালাতে চাইছে

ওয়ালেট

কিন্তু আমি পালাতে দিচ্ছি না

দেব না কিছুতেই

ঘামছি

জানছি

চিনে নিচ্ছি সব শালাকে

ক্রুদ্ধ

বিক্ষুব্ধ

সন্তপ্ত


চড়াইপাখির মতো প্রকাণ্ড

মশারা –

এখনও প্রতিরাতে

আমাকে

অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।


সূচীভেদ্য নীরবতা।

বিনীত (ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে) কবি,  কবি, কী করে এমন লেখেন কবি? আমি নাড়া বাঁধব আপনার কাছে, কবি। আমাকে ফেরাবেন না, না না না . . . ফেরাবেন না। সবাই আমাকে ফিরিয়ে দেয় জানেন কবি, অন্তত আপনি আমাকে ফেরাবেন না . . .

কবি বিব্রত হয়ে বিনীতকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। মায়াবী আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ খোঁচাতে লাগলেন। একমাত্র বেচারাম মুখ অল্প হাঁ করে প্রস্তরমূর্তির মতো বসে রইলেন। দেখে মনে হচ্ছিল ভদ্রলোকের মাথায় বজ্রাঘাত হয়েছে।

প্রকাশ (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) এর পরেও যারা বলে যে আধুনিক কবিতার মানে বোঝা যায় না, তাদের আর কিছু বলার নেই আমাদের।

চিন্তামণিঃ আরে পড়াশোনা না করা পাবলিক কে কী বলল তাতে কিছু এসে যায় না। আমরা কী বললাম, বলছি, এবং বলব---তা সে কেউ শুনতে চাক আর না চাক---সেটাই হচ্ছে জরুরি।

প্রকাশঃ সেই। যাই হোক, সভার কাজ অগ্রসর করা যাক। মায়াবীদি, কিছু বলুন।

মায়াবীঃ আমি আর কী বলব, মানে . . . চিন্তামণিদার মতো প্রাজ্ঞ লোক, প্রকাশের মতো প্রতিশ্রুতিমান লেখক, কবির মতো কবি যেখানে উপস্থিত আছে, সেখানে আমার কিছু বলতে যাওয়াই বালখিল্যতা। আমি বাংলা মায়ের তুচ্ছ সেবিকা, সেবিকার মতোই মায়ের পায়ের কাছে বসে থাকতে চাই। বাংলা আমাকে এত কিছু দিয়েছে, এত প্রশংসা, এত লাইক . . . আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে আমার মতো একজন সাধারণ মেয়ে এতগুলো লাইক পাবে, জানেন। অবশ্য আমি জানি, লাইকটা সব নয়। আসল প্রাপ্তি হচ্ছে ফ্রেন্ডস। ফ্রেন্ডসদের ভালোবাসা। ফ্রেন্ডসদের শেয়ার করা নতুন নতুন রেসিপি। এই তো সেদিন বাবলিদি . . . বাবলিদিকে চেনেন তো চিন্তাদা? আমাদের সুকুমার রায় গ্রুপের? সেই বাবলিদি সেদিন পাঁচফোড়ন দিয়ে টোফুর একটা রেসিপি দিয়েছে, এত ভালো হয়েছিল। বাবাইয়ের বাবা তো খেতে বসে কথাই বলতে পারছিল না, খালি চোখ বুজে মাথা নাড়ছিল।

চিন্তামণিঃ বাবলি, বাবলি . . . ও হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই যে পিকনিকে ফুলকপির বড়া ভেজেছিল, হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। বড় ভালো মেয়ে। আজকাল আর ওইরকম মেয়ে দেখা যায় না। ওই গরম, আমরা ভদ্রলোকেরা তো সব চিলড বিয়ার নিয়ে ছায়ায় বসে বসে হাঁসফাঁস হয়ে যাচ্ছি, ওর মধ্যে একা হাতে একশো লোকের জন্য ফুলকপির বড়া ভেজে ফেলল আর সবথেকে ভালো লাগল কী জান? সর্বাঙ্গ দিয়ে ঘাম গড়াচ্ছে, কিন্তু মুখের হাসিটি মেলায়নি। ফুলকপির থালা হাতে যখন আমার সামনে এসে মিষ্টি হেসে বলল, ‘এই নিন চিন্তামণিদা, সবাইকে দেওয়ার আগে আপনার জন্য এনেছি . . .’ কী বলব ভায়া, এই বুড়ো বয়সেও বুকের ভেতরটা . . . চমকে গেছি বুঝলে, এমন মেয়েও আছে এখন জগতে?

কবিঃ নারীদের দেখে আজকাল বড় যন্ত্রণা হয় জানেন। মনে হয় শুধোই, কেন? কীসের আশায় ছুটছিস, পাগলি? কেন মরছিস ধুলো ঘেঁটে? কথা তো ছিল আমার হৃদয়ের কুঠুরিতে তুই রাজরানীর মতো বন্দিনী হয়ে থাকবি, আমি রোজ আগুনপাহাড় ডিঙিয়ে এসে তোর চোখে ঠোঁট ছুঁইয়ে তোর ঘুম ভাঙাব। সে কথা কেন রাখলি না রাক্ষুসি ডাইনি? কেন নিজেকে এভাবে বিকিয়ে দিলি সবার মাঝে?

বিনীত (দ্বিগুণ জোরে ফুঁপিয়ে উঠে) কেন কেন সুরঞ্জনা, কেন?

প্রকাশঃ না সে মেয়েরা চাকরি করছে ভালো, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের যা মাইনে হয়েছে, বাড়িতে দুটো সোর্স অফ ইনকাম না থাকলে চাপ। কিন্তু আমি মানছি যে সেটা করতে গিয়ে মেয়েদের লাবণ্যের খানিক হানি ঘটেছে।

কবিঃ সেটা কি তোমার কম বড় হানি বলে মনে হয় ভাই? নারীর লাবণ্যই যদি ফুরিয়ে গেল, তবে কবির আর বেঁচে থেকে লাভ রইল কোথায়?

চিন্তামণিঃ মেয়েদের কোয়ালিটি যে কী পরিমাণে পড়েছে সেটা জাস্ট অভাবনীয়। চোখের সামনে দেখলাম, গোটা মায়ের জাতটাকে ধসে যেতে। আমাদের মায়েরা কেমন দশ হাতে সংসার সামলাতেন। কোনওদিন বাবার মুখে মুখে একটা কথা বলতে শুনিনি। কী নম্রতা, কী লাবণ্য। এখনকার মেয়েরা তার ধারেকাছে আসতে পারবে? হ্যাঁ মাসের শেষে হাত পেতে টাকা নিতে হত। তা নিতিস। কী মহাভারত অশুদ্ধটা হত? টাকাটাই কি সব? টাকার বিনিময়ে কোমলতাফোমলতা সব শিকেয় তুলে দিল। ছ্যা ছ্যা ছ্যা।

(প্রকাশের দিকে চোখ টিপে মুচকি হেসে) কিছু বলি না, বললে এই মায়াবীর মতো ফেমিনিস্টরা আবার ফোঁস করে উঠবে।

মায়াবীঃ ওরে বাবা, আমি ফেমিনিস্ট নই! মাগো, কী কাণ্ড! আমাকে আপনি এতদিনে এই চিনলেন চিন্তামণিদা? ও’রকম মেয়েদের সামনে এলেই আমি কেঁদে ফেলব।

বেচারামঃ আমিওপরিস্থিতি হেব্বি খারাপ। একটা নতুন বই বেরিয়েছে, দেখেছেন? গুলাব গ্যাং না কি যেন নামসেখানে মাধুরী যা লাঠি ঘুরিয়েছে . . . মারাত্মক ব্যাপার। এইসব দেখে দেখে শিখবে আর তারপর রিয়েল লাইফে অ্যাপ্লাই করবে। এক্ষুনি নারীঅত্যাচারনিবারণী সমিতি খুলে জোটবদ্ধ না হলে সবাই মিলে স্রেফ ঠ্যাঙানি খেয়ে মরতে হবে।

প্রকাশঃ এত ভালো লাগছে, মন খুলে সবাই কথা বলছেন, সমমনস্ক মানুষদের মধ্যে বৌদ্ধিক আদানপ্রদান ঘটছে, সত্যিকারের কথোপকথন এত বিরল হয়ে এসেছে আজকাল . . . কিন্তু আমাকে বাধা দিতেই হবে, কারণ সময় বড় নির্দয়। আমাদের আরও একজন বক্তা বাকি আছেন। বেচারামদা এবার আপনি কিছু বলুন।

বেচারামঃ এই কেলো করেছে, আমাকেও বক্তৃতা দিতে হবে নাকি? যাই হোক, বলতে যখন হবেই তখন ভ্যানতাড়া করে লাভ নেই। কথাটা হচ্ছে যে আমি একখান বই লিখেছি। এই যে, এই বইটা। নিরানব্বই পাতার বই, আটাত্তর টাকা দাম, নাম ‘বিন্দাস বাওয়ালি’। নাম দেখেই বইয়ের বিষয়বস্তু আঁচ করতে পারছেন। বাওয়ালি। প্রেম নয়, রাজনীতি নয়, দর্শন নয়, বাংলা সিরিয়াল নয়---বাওয়ালি। প্রেম, রাজনীতি, দর্শনও যে একেবারে নেই তা নয়, কিন্তু যা আছে, সবই বাওয়ালির মোড়কে। আশেপাশে যা-ই দেখেছি, যা-ই শুনেছি, যা-ই দেখেছি, আমার তীব্র রসবোধ ও তীক্ষ্ণ উইটের ছিপে গেঁথে তাকে তুলে এনে পরিবেশন করেছি। গরমাগরম। আসলে ওটাই আমার ইউ এস পি। ক্লাস নাইনটাইনে পড়ার সময় থেকেই পাড়ার সব বাসরে আমাকে ডেকে নিয়ে যেত। হাসানোর জন্য। এখন অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে, মুখ খুলতেও হয় না, আমাকে দূর থেকে আসতে দেখলেই মহিলারা হাসতে শুরু করেন। পেট চেপে ধরে বলেন, ‘উফ, বেচুদাটা যা হাসায় না।’

তাই আমি হাসিয়েছি। ‘বিন্দাস বাওয়ালি’র পাতায় পাতায়, লাইনে লাইনে হাসির খোরাক ঠুসে দিয়েছি। আপনারা যদি হাসতে চান, বিশেষ করে এই যে বিনীত ভাই তুমি, তোমার জীবনে হাস্যরসের ইমিডিয়েট দরকার হয়ে পড়েছে বলেই আমার ধারণা, তুমি তো ডেফিনিটলি পাঁচ কপি আজ নিয়ে যাবে . . . আপনারা সবাই ‘বিন্দাস বাওয়ালি’ কিনুন। বাংলাকে বাঁচান। আজ বাংলামায়ের প্রাণরক্ষার খাতিরে আমি একটা স্পেশাল অফার দিচ্ছি। ফ্রি-তে ‘বিন্দাস বাওয়ালি’ বাড়ি নিয়ে যান, পড়ুন, পড়ান, হাসুন, হাসান। তারপর ধীরেসুস্থে আমি আপনার বাড়ি বয়ে গিয়ে দাম আদায় করে নিয়ে আসব’খন।

আসলে আমি বইটা কেনানোর জন্য এত ঠ্যালাঠেলি করছি কেন বলুন তো, কারণ বইটা ভালো। আমি নিজে বলছি না, আমার পিসতুতো ভাই, মাকড়াপাড়া সাপ্তাহিক সংবাদে চিফ জার্নালিস্টের পোস্টে আছে, অপ-এড ছাড়া কিছুতে কলম ছোঁয়ায় না, সে নিজে ‘বি-বা’র রিভিউ লিখেছে নিজের কাগজে। কী লিখেছে শুনুন।

(পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজের টুকরো বার করে)

‘শ্রীযুক্ত বেচারাম বসাকের প্রথম বই ‘বিন্দাস বাওয়ালি’ গত বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। অবশ্য ‘প্রকাশিত’ শব্দটি এই বইটির পক্ষে নিতান্ত অপ্রতুল। বরং গত বইমেলায় শ্রী বেচারামের বইটি বাংলা সাহিত্যের ভাগ্যাকাশে ‘আবির্ভূত’ হয়েছে বললে বাস্তবের অনেকটা কাছাকাছি হয়। স্বর্গীয় হুতোম প্যাঁচার পর বাংলা সমাজ ও সময়ের বহুরৈখিক যাপনকে এমন স্বচ্ছতার সঙ্গে কেউ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বলে জানা যায় না। বইখানির সম্পদের তুলনায় আটাত্তর টাকা দাম কিছুই না। এক প্যাকেট সিগারেটের দামও ওর থেকে বেশি। বাঙালি যদি এই বই না কিনে সিগারেট কিনে আটাত্তর টাকা উড়িয়ে দেয়, তাহলে আমার মতো অভিজ্ঞ সাহিত্যবোদ্ধার মতে সেই সিগারেটের ছাই নিজের সারা গায়ে ছিটিয়ে বাঙালির গঙ্গায় ঝাঁপ দেওয়া উচিত।

হে হে হে, ওই গঙ্গায় ঝাঁপের জায়গাটা নিজগুণে ইগনোর করুন। গুপের সব ভালো, কেবল একটু মাথাগরম। কিছু করার নেই, হেরিডিটি। আমার পিসিকে দেখেছি, সারাজীবন মাথায় ঘৃতকুমারীর রস থাবড়ে ঘুমোতে যেতেন। পিসেমশাই বলতেন নাহলে নাকি পিসির মাথা এমন গরম হয়ে যাবে যে গ্যাস লাগবে না, পিসির মাথাতেই সারা বাড়ির রুটি সেঁকা হয়ে যাবে। হা হা হা। আমাদের বাড়ির জামাইগুলোরও হেব্বি সেন্স অফ হিউমার।

তবে ‘বি-বা’ কিছু নেগেটিভ রিভিউ-ও পেয়েছে। আমি মশাই অনেস্ট লোক। খানিক বলব, খানিক ঢাকব, ওসব হিপোক্রিসি আমার মধ্যে পাবেন না। আমাকে প্রচুর লোক বলেছেন যে ‘বি-বা’ প্রাইসিং-এ গোলমাল আছে। আটাত্তর টাকা খুচরো দিতে গিয়ে অনেকেই নাকানিচোবানি খেয়েছেন। সবথেকে মুশকিল হয়েছে যারা রাজিন্দরের থেকে ‘বি-বা’ জোগাড় করেছেন। একশো টাকার খুচরো দেওয়ার সময় ব্যাটা রেগুলার কুড়ি টাকা আর দু’খানা করে সেন্টার ফ্রেশ গছিয়েছে।

আমি সবার ফিডব্যাক মন দিয়ে শুনেছি। না শুনলে নিজেকে উন্নত করব কী করে। আমার আবার অত ইগোটিগো নেই। নেক্সট বইয়ের দাম আর আটাত্তর রাখা হবে না। ঝামেলাটা হচ্ছে পঁচাত্তর রাখব না আশি, সে বিষয়ে মনস্থির করতে পারছি না। এ বিষয়ে আপনাদের ফিডব্যাক আমার খুব দরকার।

(এই মুহূর্তে হাতে এক মস্ত ট্রে নিয়ে প্রায় টলতে টলতে টুনির প্রবেশ। ট্রে-র ওপর প্লেটে কেক, পেস্ট্রি, প্যাটিস থরে থরে সাজানো। প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সারাঘরে লক্ষণীয় রকমের চাঞ্চল্য সৃষ্টি হল। বিনীত এতক্ষণ দুহাতের ওপর মাথা রেখে ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলছিল, সে মাথা তুলে তাকাল, প্রকাশ ঘোষণার তাড়া কাগজ দ্রুত সরিয়ে রেখে হাতে হাত ঘষতে লাগল, সোফায় পড়ে থাকা চিন্তামণি হাত দিয়ে হাওয়া খামচে ধরে উঠে বসার অক্ষম চেষ্টা করতে লাগলেন। বেচারামের মুখ দেখে যদিও মনে হচ্ছিল তাঁর আরও অনেককিছু বলার আছে, তিনি তাড়াতাড়ি বক্তৃতা গোটাতে লেগে গেলেন।)

ব্যস্‌। আর তো কোনও কথা নেই। আপনারা সবাই ‘বিন্দাস বাওয়ালি’ কিনুন কেনান হাসুন হাসান, নিজে বাঁচুন ও বাংলাকে বাঁচান। মনে রাখবেন, বাংলার অনারে আজ বি-বা টোটাল ফ্রি পাওয়া যাচ্ছে। ফ্রি ফ্রি ফ্রি।

এই না বলে বেচারাম ট্রে-র ওপর লাফ দিয়ে পড়লেন। বাকিরা ভদ্রতা করে গুটি গুটি এগোচ্ছিল, বেচারামের লাফ দেখে তারাও ঝাঁপিয়ে পড়ল। টুনি ঠিক সময়ে সড়াৎ করে ট্রে-র কাছ থেকে সরে গিয়েছিল, না হলে বেচারার দু’চারটে হাড়গোড় মটকে যাওয়া কিছু অস্বাভাবিক ছিল না। ভিড় যখন সরল দেখা গেল ট্রে প্রায় খালি, কয়েকটা প্যাটিসের গুঁড়ো আর একখানা পেস্ট্রির হাফ থেঁতলানো মৃতদেহ পড়ে আছে।

ঘণ্টাখানেক পর এই প্রথম মায়াবীদেবীর ঘোড়াময় ঘরে নীরবতা বিরাজ করতে লাগল। মাঝে মাঝে শুধু তৃপ্ত চিবোনোর শব্দ। পরের দশ মিনিট আর বাংলা সম্পর্কে কারও দুশ্চিন্তা রইল না।
   
চিন্তামণি (গলা ঝেড়ে): বাঃ মায়াবী। ভালো ব্যবস্থাপত্র করেছ। এখন দেহে বেশ বল পাচ্ছি। একেবারে কাহিল হয়ে পড়ছিলাম। যাক, আমি যেটা বলছিলাম . . . আমাদের সময় থেকে অবশ্য এখন সবই বদলেটদলে গেছে, তবু . . . আমি বলছিলাম যে, নিজের মুখে নিজের এত প্রশংসা করা কি ভালো দেখায়? মানে ভালো জিনিস হলে তো লোকে কিনবেই, যেমন আমার বইটি, তিন মাসে তিনবার মুদ্রণ , কিন্তু তা বলে কি আমি সবাইকে কিনুন কিনুন বলেছি?

মায়াবীঃ ঠিক, বাবাইয়ের বাবাও তো গত মাসে প্রোমোশন পেয়েছে, সেলিব্রেট করতে এবার গরমে আমরা পাটায়া যাচ্ছি, আমি কি নিজে থেকে সেটা সবাইকে বলতে গেছি? নেহাত যারা ফ্রেন্ড, তাদের না বললে দুঃখ পাবে, পরে, ‘আমরা কি আপনার পর? আমাদের সঙ্গে কি সুখদুঃখের কথা শেয়ার করতে নেই’ বলে কথা শোনাবে, তাই ফ্রেন্ডদের জানিয়েছি।

বেচারামঃ হাহাহাহা, আপনিও সেই বস্তাপচা শামুকেই পা কাটালেন চিন্তামণিদা? আরে মশাই জাগুন। চোখ মেলে চেয়ে দেখুন আপনি কোথায় আর দুনিয়াটা কোথায়। একটা গোটা জাত স্রেফ জয়েন্ট দিয়ে দিয়ে ভোগে চলে গেল। এদিকে গুজরাতিরা দেখুনগে এম বি এ পড়ে কোথায় পৌঁছে গেছে। লেখালেখির পাঁপড় অনেক বেলেছেন মামা, সেই চণ্ডীদাসবিদ্যাপতিফতি, আরও কী সব নাম পড়েছিলাম অসিত বাঁড়ুজ্যের বইতে, সেই তবে থেকে বাঙালি লিখে আসছে। পরিণতি কী হয়েছে? কোন মুখোজ্জ্বলটা হয়েছে? না আরও তিনটে বাঁড়ুজ্যে নোবেল পেতে পারত, কে জানে কে কাঠি করেছে বলে সে সব ফসকে গেছে, সেই গর্বে এখনও গাল ফুলিয়ে বসে আছে বাংলাকে বাঁচাতে গেলে আর লিখে হবে না মামা, এবার লেখা বেচতে হবে। 

বিনীতঃ না সে আপনি যতই বলুন দাদা, এখনও নিজের কথা নিজের মুখে বলতে গেলে কেমন কেমন লাগে . . .

এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির প্রবেশ। লম্বা ছ’ফুট, ওজন কম করে একশো কেজি, গায়ের রং আবলুশকে লজ্জা দেবে, চিবুকে গোটি মাথায় ঝুঁটি, ভয়েস ব্যারিটোন।

ওঁকে জিজ্ঞাসা করুন তো, রবীন্দ্রনাথ যখন সুইডিশ নোবেল অথরিটির কাছে নিজের কবিতা নিজেই অনুবাদ করে সেধে সেধে পাঠিয়েছিলেন, তখন ওঁর কেমন কেমন লাগছিল কি না?

চিন্তামণিঃ ইকি এ এখানে কী করছে?

প্রকাশ (উত্তেজিত গলায়) আরে এ তো ‘ভাঙো চোরো নতুন করে গড়ো’ সমিতির ফাউন্ডার, রুদ্র ‘কালাপাহাড়’ বটব্যাল।

কালাপাহাড়ঃ কেন অসুবিধে আছে? বাংলার পিণ্ডি খালি একা তোমরাই চটকাবে, আমরা বসে বসে আঙুল চুষব, এমন কোথাও লেখা আছে নাকি?

বেচারামঃ না না, তা কেন, বাঙালি হয়ে জন্মেছেন যখন বাংলার পিণ্ডি চটকানোয় আপনারও সমানাধিকার। আসুন আসুন, বসুন বসুন। মায়াবীদি, কেক পেস্ট্রি আর আছে নাকি?

কালাপাহাড়ঃ আমি এখানে পেস্ট্রি গিলতে আসিনি। আমার অত ফালতু সময় নেই। ওয়ালে দেখলাম এখানে আজ বাংলার পিণ্ডি চটকানো হবে, তাই ভাবলাম একটু বাওয়াল দিয়ে আসি।

কবিঃ এ সব কী হচ্ছে, আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।

কালাপাহাড় (কবির মিহি গলা নকল করে): আপনি বোঝার চেষ্টাও করবেন না, ও রকম কিশমিশের মতো শুঁটকো ইন্টেলেক্ট দিয়ে বোঝার আশা করাই অন্যায়। (স্বাভাবিক গলায়) প্রকাশ? তুমিই তো পালের গোদা মনে হচ্ছে, তো কী সিদ্ধান্ত হল বাংলা বাঁচানো নিয়ে? আর কত জঞ্জাল লিখে ভ্যাট উপচোবে?

বেচারামঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ . . .

কালাপাহাড়ঃ বেচুবাবুর হঠাৎ এত হাসি পাচ্ছে কেন? অনেক বিক্কিরি হয়েছে বুঝি?

বেচারামঃ সে আপনাদের কৃপায় হচ্ছে মন্দ না। কিন্তু আমি হাসছি আপনার গোদা আইডেন্টিফিকেশনের গলদ দেখে। (চিন্তামণির দিকে ভুরু নাচিয়ে ইঙ্গিত করে) উনি যেখানে আছেন সেখানে আর কারও সাধ্য কি পালের গোদা হয়?

কালাপাহাড়ঃ বা বা বা, আমাদের চিন্তাদাও আছেন দেখছি এখানে। এই তোমরা সবাই ওঁকে বক্তৃতা দিতে দিয়েছ তো? না হলে কিন্তু ওঁর আবার গোঁসা হবে। দল ছেড়ে দুমদুমিয়ে চলে যাবেন। তাতে অবশ্য সবার মিটিং-এর খাবার কম পড়া বন্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনও ক্ষতি হবে না।

চিন্তামণিঃ দেখ রুদ্র, আমার মুখ খুলিয়ো না বলছি। তোমাদের ভাঙো চোরো গ্রুপের সব কেচ্ছা আমার জানা আছে, নেহাত আমি তোমাদের মতো অশিক্ষিত অভদ্র নই, আমার শরীরে ডিগনিটি বলে একটা পদার্থ এখনও বাকি আছে, তাই . . .

কালাপাহাড়ঃ ডি গ নি টি ? চি ন্তা ম ণি র? হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ হোঃ হোঃ হোঃ। প্রকাশ, তোমাদের মিটিং-এ এত রগড় হবে আগে জানাওনি কেন বাবা, তাহলে আরও আগেই আসা যেত? কীসের ডিগনিটি বে? যে তিনমাস ছিলে কী গুল খিলিয়েছিলে মনে আছে? কী সব উড়ো চিঠি এসেছিল মনে আছে? চিন্তামণির মাথার ফণী হয়ে কে যেন বিরাজ করছিলেন? কোন কচি কবিনী?

চিন্তামণিঃ কী, এত বড় সাহস? আমার চরিত্রহনন? আমার . . . (হঠাৎ বুক চেপে ধরে পতন)

মায়াবীঃ খুন! খুন! মাগো, তোমরা কেউ পুলিশ ডাকছ না কেন? টুনি, টুনি, আমার ফোনটা নিয়ে আয় শিগগিরি, বাবাইয়ের বাবাকে এক্ষুনি ফোন করতে হবে . . .

প্রকাশ ঘর থেকে ছুটে পালায়।

বিনীতঃ দাদা! দাদা! কী হল দাদা? আপনারা কি মানুষ, এই অভদ্র অসভ্য বর্বর লোকটাকে ঘরে ঢুকতে অ্যালাউ করেছেন? ঘাড় ধরে বার করে দিন।

কালাপাহাড়ঃ আরে এই পাপোষটা এখানে কী করছে? ঘাড় ধরবি তুই আমার? তোর হাইট কত বে? কবিতা পরে লিখবি, আগে ডনবৈঠক দে। (বিনীতের ঘাড় ধরে ঝাঁকানি। বিনীত এলিয়ে পড়ে যায়, সোফায় যেখানে চিন্তামণি পড়ে আছেন, তার কাছাকাছিই) এই এম সি বি সি গুলো ঢুকে বাংলা সাহিত্যটাকে একেবারে শেষ করে দিল।

বেচারামঃ আরে রাম রাম, ছি ছি ছি ছি, মায়াবীদি শিগগিরি কানে আঙুল দিন।

মায়াবীঃ এম সি বি সি মানে কী?

কালাপাহাড়ঃ কচি খুকি? ন্যাকা? আবার সাহিত্য করতে বসেছে। এই দুগ্ধপোষ্যগুলোর হাতে পড়েই বাংলার এই অবস্থা।

কবিঃ এই, ভদ্রমহিলাদের সামনে কোনও অশালীনতা আমরা সহ্য করব না।

কালাপাহাড়ঃ সহ্য করবি না মানে কী র‍্যা? সাহিত্য ফলাচ্ছিস, জানিস না শ্লীল অশ্লীল বলে কিছু হয় না? (গদার মতো হাত উত্তোলন, বেচারাম ঠিক সময়ে কবিকে টেনে না নিলে রদ্দাটা সোজা এসে কবির ঘাড়ে পড়ত।)

বেচারামঃ রুদ্রবাবু, রুদ্রবাবু, ডিপ ব্রেথ নিন। গুনে গুনে পাঁচবার। এত মেজাজ গরম করবেন না। আপনি যদি একাই সবাইকে মেরে ফেলেন, বাংলা বাঁচানোর জন্য কে থাকবে বলুন?

কালাপাহাড়ঃ চাই না, চাই না, এই গাধাগরুগুলোকে লাগবে না আমার বাংলা বাঁচাতে। এরা কিস্যু বোঝে না, কিস্যু জানে না, কিস্যু পড়েনি, এরা বাঁচাবে বাংলা? এরা মরলে তবে যদি বাংলা বাঁচে। যত্ত সব বুড়ো হাবড়ার দল বসেছে শখের সাহিত্য করতে। এতদিনকার একটা ঐতিহ্যশালী সাহিত্য, কারা সব লিখে গেছেন এখানে, তাদের উত্তরসূরী কি না হবে এরা? এরা ভাষাটার গলা টিপে মারবে। যেটুকু বাকি আছে সেটুকুও শেষ না করে ছাড়বে না এরা। এদের দেখে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়, মনে হয় শালা সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিই . . . শালা অশিক্ষিত নির্বোধের দল . . .

হাতের এক ঝাপটে কাছের বিষ্ণুপুরী ঘোড়ার কান উড়ে যায়। কালাপাহাড় কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ে। মা, মা গো, তোমাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না মা। আমাদের তুমি ক্ষমা করে দিয়ো।
  
মায়াবীঃ ও মা গো, আমার ঘোড়ার কান ভেঙে দিলে। এটা কি মানুষ, না জানোয়ার? এ নাকি কবিতা লেখে? টুনিইই, টুনিইইই, শিগগিরি আমার মোবাইল নিয়ে আয়, এক্ষুনি বাবাইয়ের বাবাকে খবর দিতে হবে।

কালাপাহাড় (কান্না থামিয়ে) আরে এ সব মালকে কোথা থেকে জোগাড় করে এনেছে? মেটাফোর বোzএ না? মাসিমা, আপনার ভাটের বাড়ি ভাঙার আমার টাইম বা প্রবৃত্তি কোনওটাই নেই। অবশ্য ভাঙলে আপনার উপকারই হত, রুচির যা নমুনা দেখছি।

মায়াবী কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যান। মুখ দু’বার খোলেন ও বন্ধ করেন। চোখ বিস্ফারিত। মনে হয় এক্ষুনি কেঁদে ফেলবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জলের বদলে চোখে আগুন ঝলসে ওঠে।

মাসিমা?! মাসিমা কাকে বললি হতভাগা?! তোর বয়স কত? ঝুঁটি বেঁধে থাকিস বসে কি ভেবেছিস বয়স বোঝা যায় না? ধেড়ে খোকা, উনি সবাইকে সাহিত্য বোঝাতে এসেছেন। (কোমরে আঁচল গুঁজে) টুনি, ফোন কাটা, রান্নাঘর থেকে সাঁড়াশিটা নিয়ে আয় বরং, ‘মাসিমা’ ডাকার শখ জন্মের মতো ঘুচিয়ে দিই। টুনিইইইই . . . .

দূর থেকে ধুপধাপ পায়ের শব্দ। তিন সেকেন্ড পরে ঘরের দরজায় টুনির আবির্ভাব। আসন্ন অ্যাকশনের আশায় ছোট্ট মুখ জ্বলজ্বল করছে। টুনির এক হাতে মোবাইল, অন্য হাতে সাঁড়াশি। হ্যালফ্যাশানের নয়, কুচকুচে কালো লোহার সাঁড়াশি। মায়াবীদির দিদিশাশুড়ি মরার আগে নিজে হাতে নাতবউয়ের হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যত্ন করে রাখিস। সাঁড়াশি বলে হেলাফেলা করিস না। স্বামীপুত্র নয়, দরকারে এ-ই তোর সবথেকে বড় সহায় হবে।

কবিঃ আহা আহা, নারী, উত্তেজিত হবেন না . . .

বেচারামঃ খাইসে, গুলাব গ্যাং জেগে গেছে মাইরি, আজ একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বে না। (কবির হাত ধরে টেনে) প্রাণ বাঁচাতে চান তো শিগগিরি সোফার তলায় লুকোন, আপনার যা বডি মাস, আপনি এ ঝড় আটকাতে পারবেন না।

বেচারাম ও কবি সোফার পেছনে বসে পড়লেন। কালাপাহাড় অবশ্য সে সুযোগ পেল না, তার আগেই সাঁড়াশির ঠোঁট এসে তার নাক টিপে ধরল। 

আঁ আঁ আঁ আঁ আঁ. . . . 

কানফাটানো সেই আর্তনাদ ছাপিয়ে শোনা গেল মায়াবী গোধূলির রণহুঙ্কার। আর টুনির কচি গলার উল্লাস। আরও জোরে টানো পিসি, তোমার ঘোড়ার কানের মতো ওর নাকটাও টেনে ছিঁড়ে নাও। ঝাপটাঝাপটিতে আরও কতগুলো ঘোড়ার কান উড়ে গেল, ঘরময় ভাঙা কাঁচের প্লেটের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল। তবু মায়াবীর রোষ কমার লক্ষণ দেখা গেল না। হুঙ্কার, কান্না, কচি গলার খিলখিল হাসির আওয়াজ সন্ধ্যের আকাশবাতাস ছেয়ে ফেলল।

খুব কান পাতলে শোনা যেত হয়তো, অতি প্রাচীন ও ক্ষীণস্বরে কোথাও যেন কেউ কেঁদে কেঁদে বলছে, ‘ওরে তোদের দুটি পায়ে পড়ি, আমায় ছেড়ে দে।’ কিন্তু এত কোলাহলে সে কাকুতি চাপা পড়ে গেল, কারও কানে পৌঁছল না।
  
                                                                                                    (সমাপ্ত)

April 24, 2014

বাংলা বাঁচাও/ ১



সময়, আন্দাজ সন্ধ্যে ছ'টা। স্থান, 'মায়াবী গোধূলি' দেবীর অতি সুসজ্জিত বৈঠকখানা। ঘরের চার দেওয়াল যামিনী রায়ের কপি থেকে শুরু করে গুরুদেবের হিজিবিজি থেকে শুরু করে শান্তিনিকেতন থেকে কিনে আনা কাঁথা স্টিচের রাধাকৃষ্ণের রাসলীলায় ছয়লাপ। আসবাবপত্রের ফাঁকে ফাঁকে ঘরময় গোটাদশেক বিষ্ণুপুরী ঘোড়া ছেটানো। তিন ইঞ্চি থেকে তিন হাত, সবরকমের ঘোড়া আছে 'মায়াবী গোধূলি' দেবীর কালেকশনে। ঘোড়া সংগ্রহ ওঁর নেশা। থেরাপিস্ট বলেছেন ছোটবেলায় টাট্টুর বায়না করে বাবার কাছে কানমলা খেয়েছিলেন, সেই অবদমিত ট্রমারই প্রকাশ ঘটেছে বুড়ো বয়সে। দার্জিলিং ও কেদারনাথ ভ্রমণে গিয়ে জ্যান্ত ঘোড়ার কাছাকাছি আসার সৌভাগ্য হয়েছিল, সুবিধে করতে পারেননি। অগত্যা বিষ্ণুপুরীই সই।

‘মায়াবী গোধূলি’ নামটা ভদ্রমহিলার বাপমাপ্রদত্ত নয়। ওঁর আসল নাম মালা দে। নাম বদলানোর আইডিয়াটা ভদ্রমহিলার মাথায় আসে প্রবাসে বিয়ে হওয়ার পর। স্বামী অফিসে চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ দুপুরগুলোয় শপিং মলে ঘুরে ঘুরে যখন হাঁটুব্যথা হয়ে গেল, রকমারি রান্নার এক্সপেরিমেন্ট সয়ে সয়ে স্বামী পায়ে ধরে কেঁদে পড়লেন, স্বরচিত পেন্টিঙে বাড়ির কোণাঘুঁজি ছেয়ে গেল, এমন সময় মালাদেবী পদ্যের ফেরে পড়লেন। সেই যে পড়লেন, আর উঠতে পারলেন না। সর্বাঙ্গ থেকে ভুসভুসিয়ে পদ্য বার হতে লাগল। সে পদ্যের তোড়ে কোথায় ভেসে গেল তাঁর বোরডম। সঙ্গে নিয়ে গেল পিতৃমাতৃদত্ত চরম অকাব্যিক নামটিকে। একদিন ভেবে ভেবে নির্ঘুম রাত্রিযাপনের পর মালাদেবী জগতের কাছে ‘মায়াবী গোধূলি’ নামে আবির্ভূত হলেন। 'মালা দে' ট্রাংকের ভেতরে বিএ-র হলুদ সার্টিফিকেটের সঙ্গে বিস্মৃতিতে তলিয়ে গেল।

ফোন কানে প্রকাশ পালের প্রবেশ।

হ্যাঁ হ্যাঁ, চিন্তামণিদা, হ্যাঁ . . . হ্যালো . . . হ্যাঁ হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি . . . হ্যাঁ হ্যাঁ এই তো আমি মায়াবীদির বাড়ি পৌঁছে গেছি। বাকিরাও এসে পড়বে এক্ষুনি। আপনি কোথায়, সেকী এখনও অতদূর? শিগগিরি চলে আসুন দাদা। আমরা অপেক্ষা করছি। আরে না না, আপনি না আসা পর্যন্ত আমরা কিছু শুরু করব না, চিন্তা করবেন না। আচ্ছা চিন্তামণিদা এখন ছাড়ি, আরেকটা কল আসছে, আপনি চলে আসুন। হ্যাঁ হ্যাঁ, ওকে ওকে, এক্ষুনি দেখা হচ্ছে, টা টা বাই বাই, সঙ্গে থাকুন।

হ্যালো, হ্যাঁ বিনীত, হ্যাঁ হ্যাঁ এই তো চলে এস এবার। এই আমরা শুরু করছি। আরে সবাই এসে পড়ল বলে। এই তো আমি এসেছি মায়াবীদির ঘোড়ারাও এসে গেছে হে হে, এবার তুমি এলেই আমরা শুরু করতে পারি। হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি না এলে কিছু শুরু হচ্ছে না, তুমি চলে এস, আর দেরি কোরো না। ওকে, ছাড়ি তাহলে? টা টা বাই বাই, সঙ্গে থেকো।

ফোন ছেড়ে প্রকাশ পাল সবে সোফায় বসে হাঁফ ছাড়ছেন এমন সময় বাইরে থেকে একটি বছর বারোর বালিকার প্রবেশ ঘটল। বালিকার হাতে ঝোলানো প্যাকেটের গায়ে বিখ্যাত কেকপেস্ট্রির দোকানের নাম লেখা। প্যাকেটের সাইজ প্রায় মেয়েটিরই সমান। দেখে বোঝা যাচ্ছে ওজনও বিশেষ কম নয়।

প্রকাশঃ অ্যাই তো টুনি। যা তো, মায়াবীদিকে গিয়ে বল আমি এসে গেছি, বাকিরাও এসে পড়লেন বলে। যা যা, দেরি করিস না, শিগগিরি যা। আমরা ঠিক সোয়া ছ’টায় শুরু করব।

টুনিঃ আজ আবার তোমাদের মিটিং হবে বুঝি?

প্রকাশঃ হবে হবে। মিটিং হবে, তোর মালকিন যদি সদয় হন ইটিং-ও হবে। হে হে হে। ওগুলো কী আনলি রে বাজার থেকে, আমাদের জন্য বুঝি?

টুনি জবাব না দিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেল, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দুজন লোক ঘরে ঢুকলেন। যিনি অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ও মেদবহুল, তাঁর পরনে হাওয়াইয়ান চকরাবকরা শার্ট, মাখন জিনসের প্যান্ট, সারা মুখে একটা সবজান্তা ভাব মাখামাখি। সঙ্গের ছোকরাটির পরনে চোঙা পাজামা পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবির ওপর খদ্দরের আঁতেল হাতকাটা কোট। এর মুখের ভাবের সঙ্গে পাপোষের অনেকটা মিল আছে।

চিন্তামণিঃ না না বিনীত, প্রশ্নটা তো শুধু বাংলাভাষার নয়। বাংলা, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সিনেমা--- বেশিরভাগ লোকেই কিস্যু বোঝে না। সেই জন্যই আমরা যারা বুঝি, আর তোমরা, যারা অল্পস্বল্প বোঝার চেষ্টা করছ, তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সবাইকে সবকিছু পরিষ্কার করে বোঝাতে হবে। না হলে বাংলা কেন, গোটা বাংলাদেশই আর বাঁচবে না। আর এ কাজের জন্য প্রথম ধাপ কী বল দেখি?

বিনীতঃ ছি ছি চিন্তামণিদা, আমাকে আবার কেন, আমি কি কিছু জানি, এই আপনাদের পায়ের কাছে বসে কিছু শেখবার চেষ্টা করছি।

চিন্তামণিঃ কই হে প্রকাশ, তুমি বলতে পারবে, প্রথম ধাপ?

প্রকাশ (কান ধরে ও জিভ কেটে): অ্যাল্‌, কী যে বলেন দাদা।

চিন্তামণিঃ এই তো সমস্যা, গাদা গাদা ডিগ্রিই পেয়েছ শুধু, জ্ঞান কিছুই অর্জন করতে পারোনি। বাংলাকে বাঁচাতে গেলে প্রথম দরকার . . .

মাথার ওপর একটি চটি বই নাড়াতে নাড়াতে বেচারামের প্রবেশ।

বেচারামঃ পেয়ে যাবেন পেয়ে যাবেন। দরকারি অদরকারি যা চাই সব আমার এই বইটিতে পেয়ে যাবেন। নাম রেখেছি ‘বিন্দাস বাওয়ালি’, দাম করেছি মোটে আটাত্তর টাকা। ফাটিয়ে বিক্কিরি হচ্ছে মামা, সাড়ে তিনশো কপি অলরেডি ফিনিশ। আজ চারশোর বেঞ্চমার্ক হিট না করে যাচ্ছি না। অ্যাই তো চিন্তামণিদা, আপনি পাঁচ কপি নেবেন, বিনীত তুমি পাঁচ কপি, প্রকাশ তুমি . . .

প্রকাশকঃ আরে না না আমার বাড়িতে আপনার পাঠানো দশ কপি অলরেডি পড়ে পড়ে পচছে, আর দেবেন না দাদা।

বেচারামঃ সেকী পচছে কেন! তোমার অফিসে দাওনি? শ্বশুরবাড়ি? পাড়া? ছি ছি ছি। বাংলা সাহিত্যের এমন একখানা স্যাম্পল এক্সপেরিয়েন্স করা থেকে তুমি তাদের বঞ্চিত করছ ভাবতেই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তুমি আজ পাঁচের বদলে দশ কপি নিয়ে যাবে। কটা হল? পাঁচ প্লাস পাঁচ প্লাস দশ, কুড়ি। আরও মিনিমাম তিরিশ কপি চালাতে হবে আজ, আর কেউ আসবে না মিটিং-এ?

চিন্তামণিঃ এসেই বা কী হবে, আসল উদ্দেশ্যই যদি সাধিত না হয়?

বেচারামঃ সেরেছে, আবার উদ্দেশ্য-ফুদ্দেশ্য আছে নাকি? আমি তো ভাবলাম মায়াবীদির বাড়িতে সান্ধ্য খ্যাঁটন। সেই সেবারের মতো। কিমার চপ হয়েছিল না? উফফ্‌, এখনও মুখে লেগে আছে। আমার চল্লিশ পিস বই বিক্কিরি হয়েছিল সেদিন।

প্রকাশঃ সেজন্যই দাদা খেয়াল করতে পারেননি হয়তো, সেদিন আমরা বাংলা সাহিত্যে ‘লাইক’-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চর্চা করছিলাম।

বিনীতঃ হ্যাঁ হ্যাঁ, কী যেন টাইটেল ছিল সভার? ‘সাহিত্যের মাননির্ধারণে ‘লাইক’-এর তাৎপর্য'। উঃ, কিছু ঋদ্ধ হয়েছিলাম সেদিন।

বেচারামঃ আরিত্তারা, ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে, শুনি শুনি?

প্রকাশঃ ব্যাপার অতি সরল। সেই জন্যই তো আমাদের অবাক লাগে যে এটা আগে কারও মাথায় আসেনি কেন। সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার যে প্রক্রিয়া চলে আসছে আবহমান কাল থেকে, তার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোরই ক্ষুদ্র প্রয়াস আমাদের এটি। এই যে আমরা এতদিন ধরে সাহিত্যের শাখায় শাখায় বিচরণ করছি, তার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি কি জুটেছে? এই যে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ব্যাঙের ছাতার মতো মিডিয়া হাউস, পাবলিশিং সংস্থা, গুটখা কোম্পানি গজাচ্ছে আর তারা মিনিটে মিনিটে সাহিত্য সংস্কৃতি সিনেমা নাটক যাত্রা ইত্যাদিতে পুরস্কার বিতরণ করে চলেছে, তার একটাও কি আমরা পেয়েছি?

চিন্তামণিঃ সব বিক্রি হয়ে গেছে কর্পোরেটের হাতে। এই গ্লোবালাইজেশনই ডোবাবে, আমি সেই কবে থেকে বলে আসছি।

বিনীতঃ পুরস্কার তো ছেড়েই দাও, লেখা ছাপে পর্যন্ত না। সেই কবে থেকে আমি ‘সত্তর শব্দে গল্প লিখুন’ প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে আসছি, মিনিমাম সত্তরটা গল্প লিখে ফেলেছি এতদিনে, আমার বউ তো প্রতিটি গল্প পড়ে মুগ্ধ। অথচ একটাও সিলেক্টেড হয় না? এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?

প্রকাশঃ বিশ্বাস করছি না আমরা। তাই নিজেদের মূল্যায়নের ভার নিজেদের হাতেই নিয়েছি। প্রাইজ কারও বাপ, আই মিন, পিতৃপুরুষের সম্পত্তি নয়। সাহিত্যকে গজদন্তমিনার থেকে টেনে নামানোর সময় এসেছে। আর সাহিত্যের সবথেকে গণতান্ত্রিক মূল্যায়ন কী-ই বা হতে পারে? ‘লাইক’ ছাড়া? আমরা, বাংলা-বিপ্লবীরা, সর্বসম্মতিক্রমে স্থির করেছি যে পুরস্কারের বদলা লাইক। একশো লাইকে বঙ্কিম, পাঁচশো লাইকে রবীন্দ্র, হাজারে আনন্দ, পাঁচ হাজারে সাহিত্য অ্যাকাডেমি, দশ হাজারে বুকার, বিশ হাজারে অস্কার। এই হিসেব অনুযায়ী, গত সপ্তাহেই চিন্তামণিদা তিনটে বঙ্কিম আর পাঁচটা রবীন্দ্র পেয়েছেন। তাই না দাদা?

চিন্তামণিঃ রবীন্দ্র চারটে, বঙ্কিম পাঁচটা। আনন্দটা কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু আজ কি সেদিনের কথা নিয়েই আলোচনা চলবে? নাকি আমরা আশু সংকটের দিকে মনোযোগ দেব?

বিনীতঃ হ্যাঁ হ্যাঁ আশু সংকট, আশু সংকট। বাংলাভাষাকে বাঁচাতে হবে। জানেন, ছোটবেলা থেকে বাংলাকে আমি প্রেমিকা হিসেবে ভেবে এসেছি। যখন আমার একটাও প্রেম হচ্ছিল না, তখন আমি রোজ রাতে বাংলার সঙ্গে গল্প করতে করতে ঘুমোতে যেতাম। বাবার অফিস থেকে পাওয়া ডায়রিতে কম প্রেমের কবিতা লিখেছি তখন, উঃ! দিনে মিনিমাম দুটো। তারপর সুরঞ্জনা নামের সেই মেয়েটা যখন লেঙ্গি মারল, মাগো কী কষ্ট কী কষ্ট, তখন এই বাংলাতেই তো বিরহের কবিতা লিখেছিলাম, তার দুটো পাড়ার পুজো সুভেনিরে ছেপেওছিল। বাংলা আমাকে সুখেদুখে আশ্রয় দিয়েছে, বাংলা আমাকে কখনও লেঙ্গি মারেনি জানেন . . . (ক্রন্দনোদ্যত)

বেচারামঃ মরেছে, এ কাঁদবে নাকি এখন?

প্রকাশঃ আরে বিনীত, কেঁদো না কেঁদো না। বাংলাকে আমরা মরতে দেব না। এই আমি তোমার গা ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি। এই নাও চোখ মুছে ফেল। আমার রুমালটা আবার কোথায় গেল . . . চিন্তামণিদা আপনারটা একটু দেবেন নাকি?

চিন্তামণিঃ আরে এ তো মেলা ঝামেলা হল। বলি কাঁদুনিই হবে নাকি কাজের কথা হবে? আমি কিন্তু আটটার পর আর থাকতে পারব না। রাত ন'টার সিরিয়ালটা না দেখলে আমার রাতে ঘুম আসে না। প্রেশার হাই হয়ে যায়।

বেচারামঃ হ্যাঁ হ্যাঁ ভালো মনে করিয়েছেন। আমারও ওদিকে আবার বিগ বস শুরু হয়ে যাবে। শুরু হোক শুরু হোক।

প্রকাশঃ কিন্তু এখনও তো সবাই আসেনি . . .

বেচারামঃ আরে মামা, সবাই মিটিং শুরু হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা শুরু করলেই সুড়সুড়িয়ে এসে পড়বে।

প্রকাশঃ তবে মায়াবীদিকে ছাড়া শুরু করাটা বোধহয় ভালো দেখাবে না।

বেচারাম (চিৎকার করে): মায়াবীদিইইইই, মায়াবীদিইইইই, তাড়াতাড়ি আসুন। বাংলা মরে যাচ্ছে। শিগগিরি এসে বাংলাকে বাঁচান। আর আমাদের বাঁচানোর জন্য কিছু খাবারদাবারও সঙ্গে করে নিয়ে আসুন।

কবিঃ এত কলরব কেন?

প্রকাশঃ আরে কবি যে, একেবারে ঠিক সময়ে এসে পড়েছেন। কবি ছাড়া কি ভাষার কথা সম্পূর্ণ হতে পারে। পুরোটাই ভাসাভাসা থেকে যায়। আসুন আসুন, বসুন বসুন।

বেচারামঃ হ্যাঁ হ্যাঁ বসুন বসুন। জলটল খান, ঠাণ্ডা হোন। হয়ে একবার আমার এই বইটা নেড়েচেড়ে দেখতে পারেন। বাঁধাইটা বেশ ভালো করেছে। দেব নাকি পাঁচ কপি? (স্বগতোক্তিঃ পাঁচ প্লাস পাঁচ প্লাস দশ প্লাস . . .)

বিনীতঃ ইস্‌ কেমন চাঁদের হাট বসে গেছে। চিন্তাদা, প্রকাশদা, কবি . . . আজ কতকিছু শিখব, ভেবেই রোমহর্ষণ হচ্ছে, উঃ।

কবিঃ আমিও তো শিখতেই এসেছি ভাই। আজকাল বড় যন্ত্রণা পাই যখন দেখি সবাই শেখাতেই ব্যস্ত। কেউই কিছু শিখতে চায় না।

চিন্তামণিঃ হ্যাঃ, শিখবে না আরও কিছু। সেই কখন থেকে এসে শেখানোর চেষ্টা করছি, একটা কথা কানে নিয়েছে কেউ? খালি ভ্যাজরভ্যাজর চলছে।

কবিঃ এইটা একেবারে খাঁটি কথা বলেছেন দাদা। অদ্ভুত আঁধার এক নেমেছে পৃথিবীতে আজ, কেউ শিখতে চায় না। সকলেই শেখাতে চায়।

চিন্তামণিঃ সে আর বলতে। সেদিন ক্লাবে বসে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের আসল কারণটা নিয়ে একঘণ্টা বললাম, তা লোকে শুনবে কি, নিজের মতটা জাহির করতেই ব্যস্ত। আরে জানিস কিছু? পড়েছিস কিছু যে মত জাহির করবি?

বিনীতঃ ছি ছি ছি। শেখার এমন সুযোগ পেয়ে ছেড়ে দেওয়া? ছি ছি ছি। হ্যাঁ চিন্তাদা, মোগল সাম্রাজ্যের পতনের আসল কারণটা কী? একটু বলুন না প্লিজ, ঋদ্ধ হই।

বেচারামঃ সেকী ওই বারোটা না ক’টা কারণ পড়েছিলাম যে তার বাইরেও কারণ আছে নাকি?

চিন্তামণিঃ আরে ভাই আসল কারণটাই তো চেপে দিয়েছে বইয়ে। ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘেঁটে সব বার করে ফেলেছি। রিটায়ারমেন্টের পর সারাদিন বসে বসে এই তো করছি। ইন্টারনেট রিসার্চ। ডাবলু ডাবলু ডাবলু কনসপিরেশনথিওরিসইউনেভারনিউঅ্যাবাউট ডট কম বলে একটা ঘ্যামা ওয়েবসাইট পেয়েছি, সেখানে পরিষ্কার লিখে দিয়েছে। মোগল সাম্রাজ্য কীভাবে ধসে গিয়েছিল, নেতাজীকে নেহরু কেমন ষড়যন্ত্র করে চিনে পাঠিয়ে দিয়েছিল, হিটলার আসলে মরেনি, লুক অ্যালাইকের মাথায় গুলি মেরে ইভাকে নিয়ে অ্যামেরিকা পালিয়ে গিয়েছিল, বারমুডা ট্র্যাংগেল . . . সবের হাঁড়ি একেবারে হাটে ভেঙে দিয়েছে।

বিনীতঃ উঃ, ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।

চিন্তামণিঃ গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতোই ব্যাপার। কিন্তু অগারা সেটা বুঝলে তো। অর্ধেক লোক নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করতে ব্যস্ত, আর বাকি অর্ধেকের মুখ দেখলেই বুঝবে, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই আছে শুধু, কিস্যু শুনছে না। ভাবছে বউ বাজার থেকে কী নিয়ে যেতে বলে দিয়েছিল।

বেচারামঃ মনে পড়েছে, বিস্কুট। এইবেলা লিখে রাখি।

বিনীতঃ ছি ছি ছি ছি, ঋদ্ধ হওয়ার এমন সুযোগ, ছি ছি ছি ছি . . .

কবিঃ বচন ও শ্রবণের মধ্যেকার যে মধুর মেলামেশা, সেটি ম্রিয়মাণ হয়েছে বলেই আজকাল আর কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। তবে না বলতে পারার যন্ত্রণা আরও তুমুল হয় কখন জানেন? যখন দেখি আশেপাশে এমন একটিও মানবী নেই যার সঙ্গে বসে খানিকক্ষণ আত্মিক আদানপ্রদান চালাতে পারি।

বেচারামঃ আরিত্তারা, এ তো ডিটো আমার প্রবলেম। আমাদের অফিসে একটা নতুন রিসেপশনিস্ট এসেছে, বেশ ফর্সাটর্সা, তাকে জিজ্ঞাসা করতে গেলাম আই পি এল-এ কাকে সাপোর্ট করে, দেখি কটমটিয়ে তাকাচ্ছে। হাই হ্যালোই করতে চায় না, আত্মিকফাত্মিক তো ছেড়েই দিন।

মায়াবী গোধূলিঃ আমার সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন, মনে হয় হতাশ হবেন না। আমি মানুষটা খুব আনইন্টারেস্টিং নই।

সকলেঃ আরে আরে মায়াবীদি, আসুন আসুন।

প্রকাশঃ আমরা এতক্ষণ আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

বেচারামঃ হ্যাঁ হ্যাঁ মায়াবীদি, আসুন আসুন বসুন বসুন। (বিনীতকে উদ্দেশ্য করে) ভাই তোমার সিটটা ছাড়ো না, দেখছ লেডিসের বসার জায়গা নেই, আচ্ছা অভদ্র তো, তুমি যাও ওই ঘোড়াটার পিঠে বস গে যাও। হ্যাঁ মায়াবীদি, আপনি এখানটায় বসুন। আমার বইটা পেয়েছেন? সে কী এখনও পাননি? পাঁচ কপি রেখে যাই?

প্রকাশঃ আচ্ছা আমি বলি কি, এবার সভার কাজটা শুরু করলে হয় না?

সকলেঃ হ্যাঁ হ্যাঁ শুরু হোক শুরু হোক।

বিনীতঃ উদ্বোধনী সংগীত হবে না?

মায়াবীঃ আমার হারমোনিয়ামটা তেতলা থেকে যদি কেউ এনে দিতে পারেন। যদিও আমার গলাটা আজকে ঠিক . . .

বেচারামঃ এই কেলো করেছে। এই তুমি একটু মুখ বন্ধ করে বস তো ভাই, আমার বিগ বসটা মাটি করবে দেখছি। না না মায়াবীদি, আপনি একদম গলার ওপর চাপ দেবেন না। আমরা কষ্ট করে গানের বদলে উদ্বোধনী বক্তৃতা দিয়েই চালিয়ে নেব এখন। হ্যাঁ প্রকাশ, তুমিই উদ্বোধনটা করে দাও নাকি?

প্রকাশঃ আরে ছি ছি, চিন্তামণিদা থাকতে আমি?

বেচারামঃ চিন্তামণিদাই শুরু করুন তবে।

চিন্তামণিঃ আরে শুরু করুন বললেই করা যায় নাকি। বক্তা পরিচয়টরিচয় বলে একটা ব্যাপার নেই? প্রকাশ আমার সম্পর্কে একটু বলে দাও তো।

প্রকাশঃ বন্ধুগণ, আজ এই যে আমরা সকলে সমবেত হয়েছি, তা কিন্তু কোনও উদযাপনের জন্য নয়। আমাদের মা, আমাদের বাংলা আজ মৃত্যুশয্যায়। নাকেমুখে অক্সিজেনের নল গুঁজে শুয়ে আছেন। মায়ের প্রাণের দায়িত্ব আজ এসে পড়েছে আমাদের ক'জনের কাঁধে, যারা মাকে ভালোবেসে মায়ের সেবায় জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়েছি। এ সংগ্রামে আমাদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন চিন্তামণিদা। বাংলাকে বাঁচানোর লড়াইয়ে তিনি আমাদের পথ দেখাবেন। এ লড়াইয়ে সেনাপতি হিসেবে তাঁকে আমাদের সঙ্গে পেয়ে আমরা কৃতজ্ঞ।

চিন্তামণিঃ আমার বইয়ের কথাটা বল।

প্রকাশঃ ও হ্যাঁ, চিন্তামণিদা ‘বাংলাকে বাঁচানোর দশটি সহজ উপায়’ নামে একটি বই লিখেছেন। অতি প্রাঞ্জল ভাষায় স্টেপ বাই স্টেপ ব্যাখ্যা করে দেওয়া আছে কীভাবে বাংলামাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাকে ভালোবাসলে এই বইটি আপনাদের কিনতেই হবে।

চিন্তামণিঃ তৃতীয় মুদ্রণ হয়েছে মাত্র তিন মাসেই।

প্রকাশঃ হ্যাঁ হ্যাঁ মাত্র তিন মাসেই।

চিন্তামণিঃ আরে কত দামটাম, কোথায় পাওয়াটাওয়া যাবে একটু বলে দাও, নাহলে উৎসাহীরা সংগ্রহ করবেন কী করে? এ কী ধরণের ‘ধর ছাগলা পাতা খা’ বিজ্ঞাপন হচ্ছে? নিজের মুখেই নিজের কথা বলাবে দেখছি। সর দেখি . . .

বন্ধুগণ, ফড়েয়াপটির মোড় থেকে তিরিশ মিটার পূর্বদিকে হেঁটে গেলেই ডানদিকে একটা গলি আসবে, সেই গলি ধরে নাকবরাবর দশ মিনিট হাঁটবেন, তারপর বাঁয়ে ঘুরে আরও গুনে গুনে পনেরো মিনিট। গেলেই দেখবেন সাদাকালো বোর্ডে লেখা আছে ‘নতুন সূর্য প্রকাশনী’, ভেতরে গিয়ে আমার বই চাইলেই দিয়ে দেবে। আর এত দূর যদি যেতে না চান, ফড়েয়াপটির বাসস্টপের গায়েই ‘রাজিন্দর পান শপ’-এর রাজিন্দরের সঙ্গে আমার বহুদিনের খাতির, আমাকে খুব মানেটানে, ওর দোকানেও কিছু বই রাখার ব্যবস্থা করেছি।

বেচারামঃ আরিত্তারা, ওই রাজিন্দর তো আমার বইও রেখেছে। আটাত্তর টাকা পিস। কিনুন, কেনান, পড়ুন, পড়ান। বাংলা সাহিত্যকে বাঁচান।

চিন্তামণিঃ আচ্ছা আচ্ছা। এবার আমার বক্তৃতাটা হোক। প্রকাশ, অ্যানাউন্স করো।

প্রকাশঃ এবার আমাদের সামনে ‘বাংলা বাঁচাও’ বিপ্লব, তার উৎস, গতিপ্রকৃতি ও লক্ষ্য নিয়ে কিছু কথা বলবেন আমাদের সকলের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শ্রী চিন্তামণি লাহিড়ী।

চিন্তামণিঃ উপস্থিত ভদ্রমহোদয় মহোদয়াগণ, বাংলাকে বাঁচিয়ে রাখার এমন গুরুদায়িত্ব বহন করতে পেরে আমি সম্মানিত ও অভিভূত। আমি বেশি কথা বলব না, দু’চারটি কথায় নিজের মনের ভাব প্রকাশ করেই ছেড়ে দেব। আমি অনেকদিন ধরে যে কথাটা সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করছি সেটা হচ্ছে মরণোন্মুখ বাংলাকে বাঁচাতে গেলে সর্বপ্রথম দরকার হচ্ছে দ্রুত ইন্টারনেট কানেকশন। আমার বাড়িতে অ্যাদ্দিন ডায়াল আপ কানেকশন ছিল, ব্রডব্যান্ড করে নিয়েছি। হ্যাঁ খরচ একটু বেশি পড়েছে, কিন্তু মাতৃভাষার মুখ চেয়ে এটুকু আত্মবলিদান দিতে আমাদের প্রস্তুত থাকতেই হবে। আমি উপস্থিত সকলকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি, অবিলম্বে বাড়িতে হাই স্পিড ইন্টারনেট লাগানোর ব্যবস্থা করুন। (খক খক কাশি)

পরের ধাপ, ইন্টারনেটে নানারকম সাহিত্যচর্চার ব্যবস্থা আছে, নানারকম সমাজ, সমিতি, সার্কেল, মঞ্চ, দল, গ্রুপ---তার যে কোনও একটাতে নাম লেখান। তবে সাধু সাবধান! ভণ্ড ঠগ জোচ্চোরদের হাতে পড়বেন না। আমি কারও নাম করতে চাই না, কিন্তু আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা সাহিত্যের কিস্যু বোঝেন না, খালি বাতেলা মারেন। আমাকেও ডেকেছিল ওদের গ্রুপে। বলল কী সব ওয়েবজিন না কী সব বার করবে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম সম্পাদক হতে ডাকছে বুঝি, তারপর দেখি ও হরি, সম্পাদকটক সব নিজের মাসতুতো পিসতুতো দাদাদিদিরা হয়ে গেছে, আমাকে বলে এই তো উপদেষ্টার পোস্ট খালি আছে, আপনি উপদেষ্টা হোন। উপদেশ তো আপনি ভালোই দেন। আমি আর আপত্তি করিনি। সত্যি বলতে উপদেষ্টা, সম্পাদক এগুলো তো জরুরি নয়, আসল কথা হচ্ছে সাহিত্যের সেবা করা।

বিনীতঃ আহা, এমন নির্লোভ চরিত্র যদি সবার হত।

চিন্তামণিঃ আরে তা আমার উপদেশ শুনলে তো। একটাও ভালো কথা কানে নেয় না। বলি ডান যায় বাঁয়ে। তারপর যখন ত্রৈমাসিক সাহিত্যসভায় বাইরে থেকে বক্তৃতা দেওয়ার লোক ধরে আনল, আমি থাকা সত্ত্বেও, জাস্ট ভাবুন একবার . . . আমি রাগ করে চলে এসেছি। দেখুক না কী হয় ওই ওয়েবজিনের। বামুনকে চটালে কী হয় জানে না তো। (খক খক খক)

বিনীতঃ আহা, দাদার গলা শুকিয়ে গেছে। জল খাবেন নাকি দাদা?

বেচারামঃ এই কেউ হ্যায়, পানি লাও।

মায়াবীঃ অ্যাই টুনি একটু জল নিয়ে আয় না।

(টুনির আনা এক গ্লাস জল খেয়ে)

যাকগে মরুকগে, আমি নিজেই এখন একটা গ্রুপ খুলেছি। সেখানে ফাটিয়ে সাহিত্যচর্চা হচ্ছে, ব্যাপক লাইক পড়ছে। এখানে যারা উপস্থিত আছেন তারা যদিও অলরেডি সদস্য হয়েছেন, কিন্তু তাই বলে তাঁদের কর্তব্য সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। সহকর্মী, বাপেরবাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, অফিস, কাজের লোক . . . সবাইকে বলে বলে সদস্য করান। মিষ্টি কথায় শুনলে ভালো, না হলে গলা টিপে করান। মনে রাখবেন মাও সে তুং বলে গেছেন, ঘি যদি সোজা আঙুলে না ওঠে, তাহলে আঙুল বাঁকানোয় কোনও অপরাধ নেই। এটা আমার আপনার ক্ষুদ্র স্বার্থের ব্যাপার না, বাংলার বাঁচামরার প্রশ্ন।

(জলের গ্লাসে আরেকবার চুমুক দিয়ে)

এই গ্রুপে আমরা উঠতি লেখক, পড়তি লেখক, রিটায়ার-করা-সদ্য-লেখক সবাইকেই উৎসাহ দিচ্ছি। লেখালিখি ছাড়াও আমাদের গ্রুপের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলা ভাষার যে সব লেখকদের যথার্থ মুল্যায়ন হয়নি, যেমন সুকুমার রায়, তাঁদের মূল্যায়নের জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালানো। সুকুমার রায় বলে গিয়েছিলেন, ‘অল ওয়ার্ক অ্যান্ড নো প্লে মেকস জ্যাক আ ডাল বয়’, আমরা তাঁর সে বাণী অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার চেষ্টা করছি। এই যেমন গত শনিবার ‘সুকুমার রায় মূল্যায়ন সমিতি’র উদ্যোগে পাটুলিতে পিকনিকে যাওয়া হয়েছিল। আপনারা সবাই গিয়েছিলেন, কাজেই কেমন মজা হয়েছিল সে আর আমার নতুন করে বলার দরকার নেই। আমাদের মহিলা মেম্বাররা মাছ, মাছের ডিমের বড়া ইত্যাদি ভেজেছিলেন।

প্রকাশঃ ইয়ে চিন্তামণিদা, মানে আরও বক্তারা আছেন . . .

চিন্তামণিঃ না না আমি আর বেশি বলব না, খালি কাজের কথাগুলো শেষ করে নিই। আমাদের দেখাদিখি বাকিরাও চেষ্টা করছে টুকটাক, কিন্তু পড়াশোনা না থাকলে যা হয় আরকি। আমি খবর পেয়েছি ‘মানিকদা মূল্যায়ন সমিতি’র পক্ষ থেকে আমরা পাটুলিতে যে স্পটে গিয়েছিলাম, সেই স্পটটাই ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে নেক্সট উইকএন্ডের জন্য। কিন্তু ব্যাটারা পাবে না। কেয়ারটেকারকে টিপে দিয়েছি। (খক খক কাশি ও বিষম)

সকলে মিলেঃ আরে, কী হল কী হল?

(প্রবল খক খক।)

বিনীতঃ নিশ্চয় মানিকদা মূল্যায়ন সমিতির কেউ গালি দিচ্ছে। ছি ছি, এত ক্ষুদ্র মন। পিকনিক স্পট পাসনি বলে একটা বয়স্ক মানুষকে গলায় রক্ত তুলে মারবি? এরা কি মানুষ?

কবিঃ অদ্ভুত আঁধার এক নেমেছে পৃথিবীতে আজ . . . কিছু স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না . . . কে যে মানব, কে যে দানব সব আলুথালু হয়ে যাচ্ছে . . .

(আরও জোরে কাশি।)

সকলেঃ আরে কী হল কী হল?

বিনীতঃ দাদা, জল খাবেন নাকি একটু? মায়াবীদি আপনার কাজের মেয়েটাকে একটু জল আনতে বলুন না?

(খক খক খক।)

মায়াবীঃ টুনি টুনি, অ্যাই হতচ্ছাড়া টুনি, মরলি নাকি? শিগগিরি এক গ্লাস জল নিয়ে আয়।

চিন্তামণি (কোনওমতে কাশির বেগ থামিয়ে): রুম টেম্পারেচার . . .

বেচারামঃ হ্যাঁ হ্যাঁ রুম টেম্পারেচার জলই আনবে। তখনই জানতাম, এই বয়সে একটানা এত কথা পোষায় নাকি?

টুনি কর্তৃক জল আনয়ন ও চিন্তামণি কর্তৃক জলপান। পান করতে গিয়ে আবার কাশি ও বিষম।

মায়াবীঃ মাগো, তোমরা কেউ অ্যাম্বুলেন্স ডাকো না। এখন ভালোমন্দ কিছু একটা হয়ে গেলে বাবাইয়ের বাবা আমাকে আর আস্ত রাখবে না, বারবার বলেছিল পদ্য লিখছ লেখ, এইসব উটকো ঝামেলা বাড়িতে ঢুকিয়ো না।।

(মারাত্মক বেগে খক খক খক)

বিনীতঃ ইস, দাদা ভীষণ কষ্ট হচ্ছে? ইসসস।

বেচারামঃ আরে ইসআস পরে করবে, এখন একটু স্পেস দাও। কিস্যু হয়নি, জাস্ট শ্বাসনালীতে জল ঢুকে গেছে, মাথায় থাবড়া মারলেই বেরিয়ে আসবে।

অন্যের অপেক্ষা না করে নিজেই জোরে জোরে থাবড়া মারন।

চিন্তামণিঃ উ হু হু হু, মা গো।

বিনীতঃ আরে আরে এ কী করছেন। আস্তে মারুন। বুড়ো মানুষ, ব্যথা পাবেন।

কবিঃ এ কী অদ্ভুত আঁধার . . .

প্রকাশ (সব গোলমালের ওপর গলা চড়িয়ে) বন্ধুগণ, অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনাবশত আমাদের সভা খানিকক্ষণের জন্য মুলতুবি রাখতে হচ্ছে, আপনারা কেউ ফস্‌ করে চলে যাবেন না, আমরা আর কিছুক্ষণ বাদেই ফেরৎ আসছি। সঙ্গে থাকুন। বাংলা বাঁচাআআআন।

                                                                                                   (চলবে)


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.