May 31, 2014

সাপ্তাহিকী




পূর্ব জার্মানি, ১৯৭৩। আলোকচিত্রীঃ Gordon Gahan

Forgive everybody. 
                                                                                       ---Maya Angelou


হেড শটস।

আমার এই অ্যাপ-টি বেশ অ্যাপ্রোপ্রিয়েট লেগেছে।

এই ভিডিওটা আপনারা কেউ কেউ দেখেছেন হয়তো। আরেকবার স্লো মোশনে দেখুন।


জয় যেখানে অবিসংবাদিত।

আমার মোস্ট ডিফিকাল্ট মুভ হচ্ছে শীতের সকালে লেপের ভেতর থেকে বেরোনো।


ছোটদের বোকা বানাতে লোকে কী না বলে?

Don’t worry about travelling alone (it’s better).

নিজের এম আর আই স্ক্যান তো অনেকেই দেখেছেন। আনারসের এম আর আই স্ক্যান দেখতে হলে ক্লিক করুন।


আপনার গোপন প্রতিভা কী? এরা বলছে আমার যত সুপ্ত কেরামতি মিউজিকে।

প্রতিভার কথাই যখন হচ্ছে, তখন এমন প্রতিভাবান শিল্পীকে উপেক্ষা করে থাকি কী করে?

সবশেষে এ সপ্তাহের গান। দেখুন দেখি ভালো লাগে কি না।

    

May 29, 2014

কুমারডুবির সূর্যাস্ত



ট্রেনটা ভোঁ বাজিয়ে চলে গেল আর দেখলাম একটা খাঁ খাঁ প্ল্যাটফর্মে আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে আছি। আমি বাবা আর মা।

মাথা নিচু করে দেখলাম প্ল্যাটফর্মের ধুলোর নিচে প্রায় চাপাই পড়ে গেছে গোলাপি রঙের স্ট্র্যাপওয়ালা পুজোয় পাওয়া আমার নতুন জুতো। হঠাৎ বাবা বলে উঠল, ‘ওই তো!’ মুখ তুলে দেখলাম একটা লম্বা লোক হেঁটে আসছে আমাদের দিকে। লোকটা আমাদের দেখে হাসছে। বাবামাও লোকটাকে দেখে হাসছে, মাথার ওপর হাত তুলে টা টা করার ভঙ্গি করছে। এই লোকটার নামই নিশ্চয় মুখার্জিদা।

মুখার্জিদা প্রায় বাবার মতোই লম্বা আর রোগা। বাবার মতো কালো ফ্রেমের চশমাও পরেছে। কিন্তু বাবার সঙ্গে আর বেশি মিল নেই। বাবার থেকে বেশি বড় নয়, কিন্তু বুড়োদের মতো ধুতি পাঞ্জাবি পরেছে। আমার বাবাকে আমি কখনও ধুতি পরতে দেখিনি। না না দেখেছি। সেই যখন দাদু মারা গিয়েছিল তখন। তারপর আর কখনও দেখিনি।

এই রবিবারের ছুটিটা বাকি রবিবারের ছুটির মতো হবে না গোড়াতেই বুঝেছিলাম। বেড়াতে কেউ কুমারডুবি যায়? যাওয়ার জন্য এত ভালো ভালো জায়গা থাকতে? নিকো পার্কে যদি নাও নিয়ে যায়, জেঠুর বাড়িতে তো যাওয়া যায়? খাটের ওপর বাবু হয়ে বসে স্টিলের প্লেটে করে জেঠির হাতের ধোঁয়া ওঠা ডবল ডিমের অমলেট খাওয়া যায় তবে কেমন সুন্দর। জেঠির বানানো অমলেট আমাদের বাড়ির অমলেটের থেকে অনেক ভালো। বায়না করলে মা অফিস যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে ডিমসেদ্ধর বদলে আমাকে অমলেট করে দেয়, কিন্তু সেটা খেলেই বোঝা যায় অফিসটাইমে বানানো হয়েছে। একদিন তো নুন দিতেই ভুলে গিয়েছিল। আমি অবশ্য ভুল ধরিয়ে দিইনি। জেঠির অমলেটে নুনঝাল সব ঠিকঠিক হয় সবসময়। ঝাল কখনও কখনও একটু বেশি হয়ে যায় অবশ্য, আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে যায়। আমি জল মুছতে মুছতেই হুশহাশ করে খাই।

সেই সব ফেলে নাকি কুমারডুবির ধুলোর সমুদ্রে?

কারও বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার আগে আর বেড়িয়ে ফেরার পর তাদের নিয়ে আলোচনা করা বড়দের স্বভাব। মুখার্জিদা রোজ কুমারডুবি থেকে কলকাতা ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে। যেতে আসতে ঝাড়া চার চার আট ঘণ্টা। পয়সার অভাব নেই, কলকাতায় ভাড়া কেন, একটা বাড়ি কিনেই নিতে পারে। তবু নেয় না। বলে নাকি কুমারডুবি ছেড়ে থাকতে পারবে না। বাবা হাসছিল। বলছিল ‘মুখার্জিদা পুরো ক্ষেপচুরিয়াস।’

কতগুলো ভ্যানগাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল স্টেশনের গায়ে। আমাদের স্টেশনের গায়ে যেমন রিকশা দাঁড়িয়ে থাকে। কতগুলো লোক ভ্যানে পা ঝুলিয়ে বসেছিল। আমি কখনও পা ঝোলানো ভ্যানগাড়িতে চাপিনি। আমার খুব ইচ্ছে করছিল ওই ভ্যানগাড়িতে চাপি, কিন্তু মুখার্জিদা যেই বলল, ‘দশ মিনিট হাঁটতে পারবে তো?’ অমনি মাবাবা ভীষণ ভদ্রতা করে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, কোনও ব্যাপারই না।’ আমার মতামতটা কেউ জানতে চাইল না। মুখার্জিদা খুব খুশি হয়ে বলল, ‘হেঁটে না দেখলে কোনও জায়গা সত্যি করে দেখা হয় না।’ মাবাবা আবার ভীষণ ঘাড় নেড়ে বলল, ‘ঠিকই তো ঠিকই তো।’

রোদের মধ্যে হেঁটে হেঁটে যখন আমার পা ব্যথা হয়ে গেছে আর আমি মা’কে ফিসফিসিয়ে দু’বার জিজ্ঞাসা করে ফেলেছি, ‘আর কতক্ষণ হাঁটব মা?’ আর মা খালি চুপিচুপি বলছে, ‘এই তো এক্ষুনি এসে যাবে, কী সুন্দর ফুল ফুটেছে দেখেছ ঝোপটায়?’ তখন হঠাৎ মুখার্জিদা বলল, ‘এসে গেছি।’

কোথায় এসে গেছি? এ তো জঙ্গল। মাবাবার মুখ দেখেও বুঝলাম ঘাবড়ে গেছে। একটু পর নজরে পড়ল জঙ্গলের ভেতর অনেকটা দূরে ইঁট ইঁট দেখা যাচ্ছে। বুঝলাম ওটা একটা বাড়ি। আমাদের বাড়ির পেছনের জঙ্গলটার ভেতর একটা বাড়ি আছে এইরকম। বাড়িটায় তিনটে ভাইবোন থাকে। একটা বোনকে আমি কখনও দেখিনি, সে বাড়ির ভেতর থেকে বেরোয় না, খালি মাঝে মাঝে চিৎকার করে কাঁদে। আরেকটা বোন সর্বক্ষণ ম্যাক্সি পরে থাকে আর অন্য বোনটাকে বকে। বকা খেয়ে বোনটা আরও জোরে কাঁদে, তখন মাঝে মাঝে গুম গুম করে মারেও। ভাইটার নাম শংকর, ওর চোখে ভীষণ হাই পাওয়ারের চশমা। গাজরসেদ্ধ না খেতে চাইলে ঠাকুমা আমাকে ভয় দেখায়, একদিন আমার চশমার পাওয়ার বেড়ে শেষে নাকি ওই শংকরের মতো হয়ে যাবে। শংকরের নাকি খুব অসুখ, তাই ও কিছু কাজকর্ম করতে পারে না। তবে শংকর মাটি দিয়ে খুব ভালো ঠাকুর বানায়। আমাদের বাড়িতে লক্ষ্মীসরস্বতীপুজোর সময় বাবা শংকরের বানানো ঠাকুর কিনে নিয়ে আসে। বাজারের ঠাকুরগুলো অনেক বেশি চকচকে আর উঁচু উঁচু হয়, আমি একবার বলেছিলাম বাজার থেকে ঠাকুর কিনে আনতে, তাতে বাড়ির সবাই বলেছিল, বাজারের ঠাকুরগুলো সব খেলনা পুতুল, শংকরের ঠাকুরই আসল ঠাকুর। অমিতকাকু আর বুচিদিদিরাও শংকরের ঠাকুর কেনে। তবে তাতে শংকরদের বেশি রোজগার হয় না বোধহয়, কারণ শংকরের চশমার ডাঁটি সারানোর পয়সা নেই। সুতো পাকিয়ে পাকিয়ে বেঁধে রাখা আছে।

জঙ্গলের একটু ভেতরে ঢুকে বোঝা গেল মুখার্জিদার বাড়িটা শংকরদের বাড়ির থেকে অনেক বড়। অনেক মানে অনেক অনেক। শংকরদের বাড়ির মতো অন্তত দশটা বাড়ি ঢুকে যাবে মুখার্জিদার বাড়ির ভেতর। মুখার্জিদার বাড়িটা উঁচুও অনেক বেশি। বাবামা যে বলেছিল একটা সত্যিকারের জমিদারবাড়ি বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে সেটা তাহলে ঠিকই। কিন্তু এত গরিব জমিদার সেটা বলেনি।

মুখার্জিদা বলল, ‘কল্যাণ, মাথা নিচু কর। অর্চনা, ভয় পেয়ো না, একটু ক্লসটিক লাগতে পারে।’ (আমি পরে মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ইংরিজি কথাটা কী ছিল। মা বলল ক্ল-স-ট্রো-ফো-বি-ক। বাংলায় যাকে দমবন্ধ লাগা বলে। চারদিক বন্ধ ছোট জায়গার মধ্যে গেলে সবারই দমবন্ধ লাগে, কারও কারও সহ্যের অতিরিক্ত লাগে। তারা সে সব জায়গায় যেতেই পারে না। আগের বছর পুরী গিয়ে আমরা মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকেছিলাম মনে আছে? যাদের ক্ল-স-ট্রো-ফো-বি-য়া আছে তারা ওখানে ঢুকতেই পারবে না।)

ভাগ্যিস আমাদের তিনজনের কারওরই ওই অসুখটা নেই, থাকলে আমরা কেউই মুখার্জিদার বাড়িতে ঢুকতে পারতাম না। একটা ভীষণ নিচু, এই আমার মাথার থেকে হাতখানেক উঁচু দরজা দিয়ে ঢুকে সিঁড়ি। সিঁড়িটা এতই সরু যে পাশাপাশি দু’জন দাঁড়াতে পারবে না। মুখার্জিদা দেওয়ালে হাত দিয়ে খুটুস করে সুইচ জ্বালাতে একটা হলুদ বাল্বের টিমটিমে আলো ছড়িয়ে পড়ল, না হলে দিনের বেলাতেও ওই সিঁড়িতে একটুও আলো ঢুকত না। সিঁড়িটা বেশ ঘোরানো আর ধাপগুলো ইয়া উঁচুউঁচু। ওঠার সময় মা শক্ত করে আমার হাত ধরে রেখেছিল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আমরা লম্বা একটা বারান্দায় পড়লাম, আর আমার মনের কথাটা ম্যাজিকের মতো বুঝে নিয়ে মুখার্জিদা বলে উঠল,

জমিদারবাড়িতে ঢোকার উপযুক্ত সিংদরজা একটা ছিল, বুঝলে কল্যাণ। ওই ওদিকে।

আঙুল দিয়ে জঙ্গলের দিকে দেখাল মুখার্জিদা।

ওদিকটা একেবারে ভেঙেভুঙে গেছে। সিংদরজা দিয়ে এখন সাপখোপেরা যাতায়াত করে, আমি এই খিড়কিদরজা নিয়েই সন্তুষ্ট।

এই যে দরজা দিয়ে ঢুকলে অর্চনা, এটা ছিল গুপ্ত দরজা। ডাকাতটাকাত পড়লে এখান দিয়ে মহিলা আর বাচ্চাদের গয়নাটয়নাসহ বার করে দেওয়া হত। বাবুরা গাদাবন্দুক বাগিয়ে ডাকাতদের মোকাবিলা করার জন্য থেকে যেতেন।

বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল মুখার্জিদা।

এদিকেরও বেশি কিছু আর নেই। খানতিনেক ঘর সারিয়ে নিয়েছি। তাও কখনও ছাদ ভেঙে পড়ছে, দেওয়াল দিয়ে জল চুঁয়োচ্ছে। শনিরবি বাড়ি সামলাতে সামলাতেই কেটে যায়। নিজের জন্য সময়ই পাই না।

মুখার্জিদা হাসল। হাসিটা ঠিক ঠাকুমার হাসির মতো। ঠাকুমাও সারাদিন উবু হয়ে খুরপি নিয়ে আগাছা খোঁচায় আর হাসে। বলে, কোমরব্যথা সারার কী উপায় আছে, এই বাগানের ঠ্যালায়?

মুখার্জিদার ঘরে ঢুকে বসলাম আমরা। ঘরের সাইজ অনেক বড়, কিন্তু তাও কেমন ঘুপচি স্যাঁতসেঁতে ভাব। ঘরের মাঝখানে একটা ভীষণ উঁচু খাট। খাটের পায়াগুলোর নিচটা বাঘসিংহের থাবার মতো। বাবা আমাকে খাটের ওপর তুলে দিল, না হলে আমাকে খুব কষ্ট করে উঠতে হত। ঘরের দেওয়ালে কেমন মন্দিরের মতো খোপ খোপ কাটা, মা পরে বলেছিল ওগুলোকে কুলুঙ্গি বলে। এই ঘরেও বেশি আলো নেই। তবে সিঁড়ির থেকে বেশি আছে। ফ্যানটা কত ওপরে বাপরে। অত উঁচু থেকে হাওয়া লাগে গায়ে? ছাদের গায়ে আবার কালো কালো লাইনটানা। মুখার্জিদা আমাদের বসিয়ে পাশের একটা ঘরে গেল, পাঁচ মিনিট পরে তিনটে গ্লাস বসানো একটা থালা হাতে নিয়ে ঢুকে বলল, চা কফি তো খাওই, একটা নতুন জিনিস খেয়ে দেখ এবার।

দেখি কাঁচের গ্লাসের ভেতর টলটল করছে টুকটুকে লাল রঙের শরবত।

আমি একটুও লজ্জা না পেয়ে সবার আগে একটা গ্লাস তুলে নিয়ে ঢকঢক করে পুরো শরবতটা খেয়ে ফেললাম। ভীষণ ঠাণ্ডা, ভীষণ মিষ্টি। মুখার্জিদা হাহা করে হেসে বলল, এই তো তোমার মেয়ের পছন্দ হয়েছে শরবত। আমার কাছে একটা সবুজ রঙেরও আছে, খাবে?

আমি বুঝতে পারছিলাম মা আমার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আমি মায়ের দিকে তাকালাম না। ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলে দিলাম।

মুখার্জিদা লোকটা ক্ষেপচুরিয়াস হতে পারে, কিন্তু ভালো।

তারপর তো খাওয়াদাওয়া হল, খাওয়াদাওয়ার পর মুখার্জিদা পাড়া বেড়াতে নিয়ে গেলেন। কচুরিপানাছাওয়া পুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমরা ঘুরে বেড়ালাম। আমার আর পায়ে ব্যথা করছিল না। কত গাছ। কী সুন্দর হাওয়া দিচ্ছিল। হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা সাদারঙের বাড়ির কাছে এলাম। বাড়িটার সামনের মাঠে আমাদের মাঠের মতো ব্যাডমিন্টনের কোর্ট কাটা আছে। কাছে গিয়ে দেখলাম বাড়ির মাথার ওপর দেওয়ালে বড় বড় করে ডিজাইন করে লেখা আছে ধূর্জটিশংকর মুখোপাধ্যায় স্মৃতি পাঠাগার। বাবা, ইনি বুঝি . . . বলে মুখার্জিদার দিকে তাকাতেই মুখার্জিদা বলল, আমার ঠাকুরদা। এর নামে কুমারডুবিতে আরও অনেককিছু আছে। হাসপাতাল, অনাথাশ্রম। ধুর্জটিবাবু ছিলেন যাকে বলে দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ। বলে মুখার্জিদা হাসল। বাবামাও হাসল। আমি প্রহ্লাদ নামটা ছাড়া আর কিছু বুঝতে পারলাম না বলে হাসলাম না। মনে করে রাখলাম, বাড়ি গিয়ে ঠাকুমার কাছে বুঝে নিতে হবে।

বাড়ি ফিরে আমরা আরাম করে বসলাম। মুখার্জিদা নিচু হয়ে বুককেস থেকে একটা চৌকো মতো বই বার করে বলল, তোমাদের কয়েকটা ছবি দেখাই। আমাদের বাড়িতেও অ্যালবাম আছে। কিন্তু আমাদের অ্যালবামে বেশিরভাগ ছবিই মানুষের। মুখার্জিদার অ্যালবামে একটাও মানুষের ছবি নেই, খালি আকাশবাতাসগাছপুকুর। মুখার্জিদা বলছিল, এইটা হচ্ছে আমাদের পেছনের পুকুরটা। আর এইটা আগের বছর পুজোর সময় তুলেছিলাম। কেমন ঝেঁপে শিউলি ফুটেছে দেখেছ?

বাবামা খুব চমকে যাওয়া গলায় বলল, আপনি এগুলো তুলেছেন মুখার্জিদা! এ তো এক্সিবিশনে দেওয়ার মতো ছবি!

ছবিগুলো সত্যিই ভালো দেখতে। আমাদের অ্যালবামেও কয়েকটা পাহাড়ের ছবিটবি আছে, দার্জিলিং গিয়ে তোলা হয়েছিল, তার থেকে অনেক বেশি সুন্দর আর ঝকঝকে।

মুখার্জিদা হেসে বলল, আরে আমার আবার ছবি। একটা হটশট ক্যামেরা কিনেছিলাম শখ করে, সেই নিয়ে বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াই।

বাবা একেবারে আকাশ থেকে পড়ল। বলল, হটশট দিয়ে এই ছবি?! করেছেন কি মুখার্জিদা, আপনি ফোটোগ্রাফিটা সিরিয়াসলি নিন এক্ষুনি।

তার একটু পরেই বাবামা একবার নিজেদের মধ্যে চোখেচোখে তাকিয়ে নিয়ে বলল, এবার উঠি মুখার্জিদা, নয়তো ট্রেন মিস করে যাব।

মুখার্জিদা বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, কিন্তু যাওয়ার আগে একবার ছাদে চল। দেখবে, ভালো লাগবে।

সবাই উঠে দাঁড়াল। বাবা আবার আমাকে খাট থেকে নামিয়ে দিল। আমরা সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। মুখার্জিদা কুলুঙ্গিতে রাখা একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে নিল। বলল ওটাই হটশট ক্যামেরার ব্যাগ। আমাদের স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে যদি ভালো কিছু চোখে পড়ে তাহলে ছবি তুলে নেবে।

আমরা যেদিকের সিঁড়ি দিয়ে উঠেছিলাম, ছাদে যাওয়ার সিঁড়িটা তার উল্টোদিকে। বারান্দা দিয়ে সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে আরেকটা ঘর পার হলাম। শিক দেওয়া জানালার ওপারে একটা ভীষণ টানটান বিছানা, বিছানার ঠিক মাঝখানে বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে রয়েছে একটা ডলপুতুল। মুখার্জিদা বলল, এটা টুকটুকির ঘর। মাসির কাছে থেকে আসলে এই ঘরেই থাকে। ওটা ওর এবাড়ির প্রিয় পুতুল, তাই সাজিয়ে রেখেছি। দেখলে খুশি হয়। আর ওই যে, ওটা রান্নাঘর। ব্যস, এই হচ্ছে আমার বাড়ি।

রান্নাঘর কেউ দেখতে চাইল না। তার একটা কারণ হতে পারে, রান্নাঘর আবার দেখার কী আছে, তবে আরেকটা কারণও হতে পারে। যেটা বাবামা ভাবে আমি জানি না, কিন্তু আমি জানি। আমি হোমওয়ার্ক করছিলাম, বাবা বলছিল। মা যতক্ষণে বাবার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপেছে ততক্ষণে আমি শুনে ফেলেছি। ওই রান্নাঘরেই জ্বলন্ত স্টোভ ফেটে মুখার্জিদার বউ মরে গেছে।

মুখার্জিদার ছাদে উঠে বাবামার মুখ সত্যি সত্যি হাঁ হয়ে গেল। বুচিদিদিদের তিনতলার ছাদও অনেক বড়, মাঠে কাদা থাকলে ওই ছাদেই অনেকসময় ব্যাডমিন্টন খেলা হয়, কিন্তু সে ছাদের সঙ্গে মুখার্জিদার ছাদের কোনও তুলনাই হয় না। আমাদের স্কুলের মাঠের অর্ধেক ঢুকে যাবে এই ছাদে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা ছাদের ধারে এলাম। ছাদের ধারের পাঁচিলটা মায়েরই প্রায় গলার কাছে পৌঁছে গেছে, আমি তো কিছু দেখতেই পাচ্ছিলাম না। ভাগ্যিস পাঁচিলের গায়ে ডিজাইন করার জন্য ফুটো করা আছে, আমি সেখান দিয়ে দেখলাম। বাড়ির পরে জঙ্গল, জঙ্গলের ওপারে বালিবালি একটা মাঠের মতো, তারও ওপারে চকচক করছে জল। ওটাই নাকি গঙ্গানদী।

মুখার্জিদা বলল, গঙ্গার পশ্চিমকূল বারাণসী সমতুল ভেবে বাড়ি বানানো হয়েছিল, এখন গঙ্গা কতদূরে চলে গেছে দেখ।

আমরা গঙ্গার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকালাম। মাঠের মতো ছাদের ওপারে আকাশের দিকে। এত বড় আকাশ আমি আগে কোথাও দেখিনি। আকাশের রংটা টকটকে লাল হয়ে গেছে। সূর্য ডুববে আর একটু পরেই। খুব সুন্দর একটা হাওয়া বইছে। আমাদের বাড়ির কাছের গঙ্গার ঘাটেও এরকম হাওয়া দেয়। আমরা সবাই চুপ করে আকাশের আলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মুখার্জিদা হঠাৎ বলল, সবাই এত খরচ করে এত পাহাড়সমুদ্রমরুভূমির সূর্যোদয় সূর্যাস্ত দেখতে যায়, আমি বিশ্বাস করি না, আমার কুমারডুবির থেকে সুন্দর সূর্যাস্ত পৃথিবীর আর কোথাও হয়। হতে পারে।

আমি ঘাড় উঁচিয়ে মুখার্জিদার মুখের দিকে তাকালাম। মুখার্জিদা আমার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল আসলে অনেক দূরে কোথাও আছে। যেন হাত বাড়িয়েও আমি মুখার্জিদাকে ছুঁতে পারব না। মুখার্জিদা যেন ভুলেই গেছে আমরা ওখানে আছি। সেই লালেকমলায় মেশানো আলোটা মুখার্জিদার মুখের ওপর পড়েছে। সেই আলোয় আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম মুখার্জিদার সারামুখ জুড়ে ফুটে উঠেছে দুঃখের অগুন্তি আবছা লাইন। মুখার্জিদাকে হঠাৎ ভীষণ বুড়ো দেখাচ্ছে। বাবার থেকে অনেক অনেক বেশি বুড়ো। 

বাবা বলল, দাদা এবার এগোই।

মুখার্জিদা চমকে উঠে আমাদের দিকে ফিরে তাকাল। বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদের আবার ট্রেন . . . কিন্তু যাওয়ার আগে তোমাদের একটা ছবি তুলে দিই, দাঁড়াও। এক মিনিট লাগবে।

আমরা কাছাকাছি ঘেঁষে দাঁড়ালাম। বাবামা দুদিক থেকে আমার কাঁধ জড়িয়ে ধরল। মুখার্জিদা গলায় ঝোলানো হটশট ক্যামেরা চোখের কাছে তুলে অল্প ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ‘রেডি’ বলছে, মুখার্জিদার ঝুঁকে থাকা ছায়াছায়া শরীরের পেছনে সূর্যাস্তের রঙে রাঙা হয়ে গেছে কুমারডুবির অনন্ত আকাশ, এই ছবিটা আমার চোখে সারাজীবনের মতো আঁকা হয়ে রইল।

*****     

ছবিটা এখনও আছে আমাদের অ্যালবামে। মুখার্জিদা প্রিন্ট করে পাঠিয়েছিলেন। অন্য ছবিদের থেকে মাপে বড়, তাই অ্যালবামের একটা পাতায় একাই সাঁটা আছে ছবিটা। এত ঝকঝকে সুন্দর ছবি, দেখলে সত্যি বিশ্বাস করা শক্ত হটশট ক্যামেরায় তোলা। উঁচু পাঁচিলটার গায়ে আমরা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছি, বাবামা আমাকে জড়িয়ে আছেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সূর্যাস্তের আলো আমাদের মুখে ঠিকরোচ্ছে আর আমরা তিনজনেই খুব হাসছি।


May 27, 2014

দৃষ্টিশুদ্ধি



সাড়ে তেত্রিশ বছর বয়স পার করেও যে এত কিছু দেখা বাকি থেকে যায় কে জানত। রোজই নতুন নতুন কিছু একটা দেখছি। দেখছি আর শিখছি। যেই না ভাবছি এইবার ব্যাপারটা আগাগোড়া বেশ হাতে এসে গেছে, মানবচরিত্রের গলিঘুঁজির জলছাপ নিখুঁত তুলে ফেলেছি মাথার ভেতর, অমনি সে ছাপ মাটি করে আরেকটা রাস্তা ফুটে উঠছে।

এই রাস্তা ফুটে ওঠার ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং। যখন ঢুকেছিলাম তখন ইউনিভার্সিটিতে সবুজ কংক্রিটের অনুপাত ছিল হিংসে করার মতো। সবুজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আন্দাজ করার জন্য সেফোলজিস্টদের বোরিং প্যানেল বসানোর দরকার ছিল না। লোকের বাড়িঘরের ফাঁকে ফাঁকে গাছপালা থাকে, গাছপালার ফাঁকফোকরে বানানো বাড়িঘরদোরে আমরা থাকতাম। খেতাম শুতাম ফাঁকি মারতাম। ওয়ার্ডেন কড়া ধাতের না হলে হোস্টেলের বারান্দা দিয়ে গাছের ডালপালারা উঁকি মারতে চলে আসত যখনতখন। জঙ্গলের মধ্যে স্কুলবাড়িগুলো ঘাপটি মেরে থাকত। অভিজ্ঞ চোখ ছাড়া চট করে খুঁজে পাওয়া সোজা ছিল না। গাছের সমুদ্রের মধ্যে লাইব্রেরির মাথাটা শুধু জেগে থাকত, সেই দেখে দেখে একটা আন্দাজ করে নিতে হত। তবে অত আন্দাজটান্দাজের খাটুনিতে যেত না কেউই, তার থেকে অনেক বেশি সোজা ছিল মাটিতে ফুটে ওঠা পথ ধরে হেঁটে চলা। জীবনবিজ্ঞান বইয়ের রক্তসঞ্চালন সিস্টেমের জটিল ছবির মতো ছড়িয়ে থাকত মেঠো পথগুলো। ক্যাম্পাসের যেখানে যেখানে যাওয়ার দরকার পড়ত, সর্বত্র। ইন ফ্যাক্ট, কোথায় যাওয়া যাবে আর কোথায় যাওয়া উচিত হবে না, সেটা বোঝার জন্যও ওই মেঠো রাস্তার নির্দেশিকা ভালো কাজে দিত। যুগ যুগ ধরে কতশত কলম্বাসের হাওয়াই চটির ঘষায় তৈরি রাস্তা বলে কথা, তার মানচিত্র ছিল নিখুঁত। প্রতিটি রাস্তাই কোথাও না কোথাও পৌঁছত। আমি আদৌ সেখানে যেতে চাই কি না সেটার তোয়াক্কা না করেই। গোড়াতে পথ ধরে চলতে চলতে কতবার যে সোশ্যালের বদলে বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়েছি তার গুনতি নেই। অবশ্য তাতে অসুবিধে কিছু হয়নি। আমার আগেও লক্ষ লক্ষ আনকোরা ছেলেমেয়ে এই ভুল করেছে। ভুল শুধরে দিয়েছে দাদাদিদিদের কেউ, ‘নো প্রবলেম, বস্‌’ বলে সঙ্গে করে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। বায়োলজিক্যাল থেকে সোশ্যাল সায়েন্সের দিকে তৈরি হয়েছে আরেকটি পথ। সেই পথ ধরে নাকবরাবর গেলেই সমস্যার সমাধান।

সমস্যা হল যখন কর্তৃপক্ষ আবার নতুন করে সে সমস্যার সমাধান করতে বসলেন। সেটা করতে গিয়ে তাঁদেরও অনেক সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল নিশ্চয়। কোটি কোটি চিঠি চালাচালি করতে হয়েছিল, হাজারখানেক মিটিং ডাকতে হয়েছিল, শ’পাঁচেক টেণ্ডার পরীক্ষা করতে হয়েছিল। দুঃখের বিষয় তাতে তাঁদের উৎসাহে ঘাটতি পড়েনি। একদিন সকালবেলা ইস্কুল যাওয়ার সময় আমরা দেখলাম জঙ্গল জুড়ে মজুর লেগেছে, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন কনট্রাকটর। যত্ন করে সবাই মিলে আমাদের পায়ে চলা পথ বাঁধিয়ে দিচ্ছেন।

বলা হল এ যত না ছাত্রছাত্রীদের সুবিধের জন্য, তার থেকে বেশি ঘাসেদের মুখ চেয়ে। এই কেমন সুন্দর করে রাস্তা বাঁধিয়ে দেওয়া হল, এবার সবাই সে বাঁধানো রাস্তা ধরে লাইন করে স্কুলে যাবে আর আসবে। জঙ্গলের ঘাসেরা যত্রতত্র স্নিকার্স আর হাওয়াই চপ্পল চাপা পড়বে না।

কর্তৃপক্ষেরা তো সকলেই একসময় ছাত্র ছিলেন, তবু তাঁরা ছাত্রদের মতিগতি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না কেন সেইটা আমার চিরদিন জানতে ইচ্ছে করে। বাঁধানো রাস্তা ধরে চললে তো গন্তব্যে পৌছনোই যায় কিন্তু এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় পৌঁছতে হলে? চলাটা শুধু যে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি হয় তাই নয়, ইন্টারেস্টিংও হয় অন্তত একশো গুণ। এই সোজা ব্যাপারটা কর্তৃপক্ষ বোঝেননি, কিন্তু ছাত্র-কলম্বাসের দল বুঝে ফেলল নিমেষেই আর দেখতে না দেখতে কংক্রিটের রাস্তার ফাঁকে ফাঁকে মেঠো পথের নেটওয়ার্ক তৈরি হল। জালের মতো তারা ছেয়ে ফেলল ক্যাম্পাস। ঘাসেদের দুর্দশা বাড়ল বই কমল না।

মনুষ্যমনের মানচিত্রের ছাপ তুলতে বসে আমার হয়েছে সেই দশা। যত ভাবছি এইবার ছবি সম্পূর্ণ হল বোধহয় ততবার নতুন নতুন রাস্তা গজাচ্ছে এদিক ওদিক। সেই রাস্তা ধরে এগোতে গিয়ে কখনও কানাগলি বেরোচ্ছে, কখনও বেরিয়ে পড়ছে একটা আস্ত নতুন পাড়া। সে পাড়ায় নতুন নতুন সব পড়শি। নতুন নতুন দুঃখ, নতুন নতুন হিংসে, নতুন নতুন নিরাপত্তাহীনতা।

তেত্রিশ বছরের পুরোনো চোখের অসুবিধেটা প্রধানত এখানেই। ভালো কিছু আর নজরে পড়ছে না। দয়ামায়া, শৌর্যবীর্য, বুদ্ধির ধার, ভালোমানুষি দেখে মুগ্ধ হওয়ার দিন গেছে, অবাক করে দেওয়ার জন্য এখন পড়ে আছে শুধু হামবড়াই আর অসভ্যতা।

নিজেকে ‘প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ’ যদি দিতেই হয় তবে গতি এখন শুধু খোদাতালার আকাশবাতাস।

দিল্লিতে একটা অদ্ভুত গ্রীষ্মকাল চলছে এবার। প্রথমত তো সে এলই দেরিতে। লেটমার্ক খেয়েও নির্লজ্জের মতো হাসতে হাসতে অফিসে ঢুকল। যদিও বা এল, মনখানা ফেলে রেখে এল কোথায় কে জানে। এতদিন ধরে এ শহরে আছি, এমন অন্যমনস্ক গরম আমি দেখিনি আগে আর কখনও। দুপুরটুকুই শুধু তার কাজে মন বসে। শুধু তখনই তার পথচলতি লোকের মুখ থেকে ‘ক্ষ্যামা দে’ টেনে বার করার মুরোদ হয়। সকালবেলা এলোমেলো হাওয়া দেয়, বিকেলবেলা মনের ভুলে রোদের বদলে মেঘে আকাশ ছেয়ে ফেলে। আর সবাই যখন ঘুমিয়ে কাদা, তখন আকাশ থেকে গরম বাতাসের হলকার বদলে ঝুপ ঝুপ জল ঢালে। ঠাণ্ডা জল। সঙ্গে পর্দা ওড়ানো হু হু হাওয়া। তাতেও যদি কারও কুম্ভকর্ণের ঘুম না ভাঙে, গুড়ুম গুড়ুম বাজ ডাকায় আর বিদ্যুতের টর্চ ফেলে সোজা চোখের ওপর। তখন ঘুম চোখে উঠে ‘কী হচ্ছে বস্‌, মে মাসে বৃষ্টি হচ্ছে কেন? যত্তসব’ বলে ফ্যান কমিয়ে বিছানার চাদরের ভাঁজ খুলে গায়ে ঢাকা দিতে হয়।

সেদিন ঘুম থেকে উঠে জানালার বাইরে বৃষ্টিধোয়া ভোরটা দেখে এমন ভালো লাগল যে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় বেশি লোক নেই, আমি আর পাশের বাড়ির পাগ। পাগের লজ্জাঘেন্না নেই, সে আমার সামনেই প্রাতঃকৃত্য সারতে লেগেছে। লজ্জা পেলাম শুধু আমি, আর পাগের দু’পেয়ে সঙ্গী। তাঁর অবশ্য লজ্জা পাওয়াই উচিত, লোকের বাড়ির গেটের সামনে এই কুকর্মটি সারাকালীন ধরা পড়ে গিয়েও যদি তিনি লজ্জা না পান, তাহলেই আশ্চর্য।

কিন্তু আমি সতর্ক ছিলাম। এসব তুচ্ছ ব্যাপারে মাথা গরম হতে দিয়ে অমন সুন্দর ভোরটি মাটি করার কোনও ইচ্ছেই আমার ছিলাম না। কাজেই পাগকে প্রাইভেসি দিয়ে আমি হাঁটা লাগালাম। বাড়ির সামনের ছোট রাস্তাটা পার হয়ে এসে বড় রাস্তায় যেই না সবে পা দিয়েছি . . .

. . . আলোয় আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল।

এত আলো এল কোথা থেকে? এখনও তো ভালো করে ভোর হয়নি, এখনও তো মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ, এখনও তো রাস্তার পাশের সারিসারি শ্রমিক তাঁবুতে প্রাণের সাড়া জাগেনি, এখনও তো উঁচু উঁচু বাড়ির বন্ধ জানালার গায়ে গোঁগোঁ আওয়াজ তুলে ওভারটাইম খাটছে ইকোফ্রেন্ডলি এসি-র দল। তবু আমার চোখে এত আলো ঝলসাচ্ছে কোথা থেকে?

এত কাণ্ড করে, সংসার ফেলে, এত ডেডলাইন পেরিয়ে, হাজার হাজার মাইল দূরের শহরে হর্স-চেস্টনাট গাছের বেড়া দেওয়া একটি রাজকীয় রাস্তা দেখে মুগ্ধ হতে গিয়েছিলাম, অথচ আমার গেট থেকে ঠিক পাঁচ পা দূরের রাস্তার দু’পাশে অমলতাসের বনে ঝেঁপে এসেছে চোখ অন্ধ করা হলুদ ফুলের বান, তার দিকে তাকিয়ে দেখার আমার ফুরসত হয়নি?

কালো মেঘের গায়ে ফুটে থাকা সেই অনির্বচনীয় আলোর সামনে দাঁড়িয়ে আমি অনেক অনেক দিন পর সত্যি সত্যি চমকে গেলাম। ওই অবিশ্বাস্য উজ্জ্বলতা আমাকে বিস্মিত, মুগ্ধ ও রোমাঞ্চিত করল। আলোয় আলো করে দিল আমার চোখ, আমার দেখা।

মানুষের মনের কানাগলির তল পেতে যত আকুলিবিকুলি আমার, তার সহস্রাংশও যদি অমলতাসের আলোর প্রতি খরচ করতাম তাহলে আমার নিজের মনের চেহারাটা এতদিনে অন্যরকম হতে পারত।


May 25, 2014

জানাশোনার আগেই



অফিসে বসে কাজের ভান করতে করতে এমন বোর হয়ে গেলাম যে মাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মা তুমি কখনও বোর হও?’

মা খুব উদাস হয়ে বললেন, ‘কই আর হই। ওই একটা জিনিস আর হওয়া হল না। তোরা কেমন চাইলেই ঝটপট বোর হয়ে যাস, দেখেশুনে আমার এত ইচ্ছে করে হই, কিন্তু কিছুতেই আর হতে পারি না। আসলে আমাদের ছোটবেলায় ‘বোর হওয়া’ ছিল না বলেই বোধহয়। যে নয়ে বোর হয় না, সে কি চাইলেও নব্বইয়ে বোর হতে পারে, তুইই বল?’

বলে মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চুপ করে রইলেন, আমার খোঁচাখুঁচির উত্তরে আনমনা হুঁহাঁ করে দায় সারতে লাগলেন। বুঝলাম কথোপকথন আর বেশি এগোবে না।

ফোন ছেড়ে দিলাম, কিন্তু মায়ের কথাটা মাথায় ঘুরতে লাগল। বোর হওয়া কাকে বলে সেটা না জেনেই খানিকটা বড় হয়ে যেতে পারলে কি বোরডমের হাত থেকে আজীবনের মতো নিস্তার পাওয়া যায়? ইগনোরেন্স কি তবে সত্যি সত্যি ব্লিস?

ঠাকুমাকে ফোন করে ‘কেমন আছ কী করছ কী খাচ্ছ’ সারার পর জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা ঠাকুমা, তুমি কখনও ডিপ্রেশন ফিল করেছ?’

‘অ্যাঁ? কী? ডিরেশন?’

‘আরে ডিপ্রেশন, ডিপ্রেশন, বিষণ্ণতা। যেটা হলে কাজ করতে ইচ্ছে করে না . . .’

ঠাকুমা আঁতকে উঠলেন। ‘কী সাঙ্ঘাতিক! কাজের সঙ্গে ইচ্ছের কী সম্পর্ক? কাজ করতে ইচ্ছে করছে না বলে যদি বসে থাকতাম, সংসারটা চলত? আর আমাদের আমলের শাশুড়িরা তোমাদের শাশুড়িদের মতো ছিলেন না, ওসব অনিচ্ছেটনিচ্ছের কথা তুললে আর রক্ষা রাখতেন না।’ আমি বললাম, ‘হুম্‌, বুঝলাম। কাজের অনিচ্ছের না হয় অপশন ছিল না, কিন্তু আরও সিনড্রোম আছে। এই যেমন ধর সারা গায়ে ব্যথা . . .’

ঠাকুমা বললেন, ‘সে তো সর্বক্ষণ হত। আমাদের বড় ভাতের হাঁড়িটা দেখিসনি বোধহয় তুই, যেটা তোর মা ধুয়েমুছে বাংকে তুলে রেখেছে? একএকবারে পনেরো জনের ভাত রান্না হত ওই হাঁড়িতে। বারে বারে উবু হয়ে ওই হাঁড়ি উনুন থেকে নামাও ওঠাও, গায়ে ব্যথা না হলেই আশ্চর্যের কথা।’ আমি মরিয়া হয়ে বললাম, ‘যখন তখন কান্না পাওয়া, লোকের মুখদর্শন করতে ইচ্ছে না করা, অকারণ মাথায় রক্ত উঠে যাওয়া . . .’ ঠাকুমা লজ্জিত গলায় বলতেন, ‘যেত তো। শ্বশুরবাড়িতে তো আমার নামই পড়ে গিয়েছিল রগচটা বলে। আমার কাকাশ্বশুর বলতেন আমাদের জগার বউয়ের সব ভালো, খালি মাথাটা একটু গরম। তবে তারও দাওয়াই ছিল। রাগ হলে চারটের মধ্যে যেটাকে হাতের কাছে পেতাম, আচ্ছা করে সেটার কান মুলে দিতাম। তাতেও রাগ না পড়লে এগালে ওগালে খান দুই থাপ্পড়। ব্যস। রাগের ‘র’ও বাকি থাকত না। কিন্তু তুই যে কী বললি ডিরিকন না কী, সে সবে কখনও ভুগিনি।’

ফোন রেখে গরম চায়ের খোঁজে বেরোলাম ঠাকুমার কানটা এতদিনে পুরো গেছে। পুরোটা সময় গলা ডি-শার্পে রেখে চেঁচাতে চেঁচাতে গলার ভেতরটা চিরে গেছে একেবারে।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে বান্টিকে পিং করলাম। হতভাগা আমার স্ট্র্যাটেজি ফলো করে আজকাল হরবখত ইনভিসিবল হয়ে থাকে, কারণ জানতে চাইলে বলে ‘শঠে শাঠ্যং’। পাঁচবার ‘আছিস আছিস’ করার পর প্রভুর দেখা মিলল। সব খুলে বললাম। মায়ের হাইপোথেসিস, ঠাকুমার এভিডেন্স। শব্দের প্রচলনের আগে জন্মে গেলে সেই শব্দের প্রকোপের হাত থেকেও কি বাঁচা যায়?

বান্টি বলল, ‘এইসব আজেবাজে বিষয় বাদ দিয়ে কাকিমার মতো শার্প লোকের তোমার মতো হাবুলচন্দর মেয়ে কী করে হল সেটা নিয়ে রিসার্চ করলেই তো পারতে। অফ কোর্স, কাকিমার হাইপোথেসিস ঠিক। এই আমার কেসটাই দেখ না। ঠিকসময় ‘ডুড’ শব্দটা না জেনে কী ঝামেলায় পড়েছি, এখন এত চেষ্টা করেও আর ডুডহুড প্রাপ্ত হতে পারছি না। দূর দূর, এক একসময় মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে হিমালয়ে চলে যাই।’

আমি ‘ষাট ষাট’ বলে ফোন রেখে দিলাম। তারপর বেশ কয়েকদিন ধরে ইন্টারভিউ নিয়ে ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে জানতে পারলাম যে আমাদের খবরের কাগজওয়ালার ‘সময়ানুবর্তিতা’ এবং আমার সহকর্মীর ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচয় ঘটার আগেই ব্যক্তিত্বের বিকাশ মোটামুটি সম্পূর্ণ হয়েছে।

সেই সেদিন থেকে বসে বসে ভাবছি, ‘প্রোক্র্যাস্টিনেশন’ শব্দটা জানার আগেই যদি বড় হয়ে যেতে পারতাম।


May 24, 2014

সাপ্তাহিকী





I'm sick of not having the courage to be an absolute nobody.
               ---J. D. Salinger, Franny and Zooey


আমার অন্যতম প্রিয় খাবার। বানাতেও যেমন খেতেও তেমন সহজ। এই রেসিপিগুলো দেখে থেকে আমি ভেবে যাচ্ছি আমার হাতের কাছের জিনিসপত্র দিয়ে কী ধরণের টু-ইনগ্রেডিয়েন্ট স্যান্ডউইচ বানানো যেতে পারে। কাসুন্দি + ডিমসেদ্ধ? পেস্তো + শশা?


May 21, 2014

সময়ের দোষ



গত ক’দিন ধরে ভেবে ভেবে আমি সময় ও কাজের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে একটা সিন্যারিও বিল্ডিং এক্সারসাইজ করেছি। এই দেখুন।


সময়
কাজ
কাজ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা
১.
আছে
আছে
শূন্য
২.
আছে
নেই
নট অ্যাপ্লিকেবল।
৩.
নেই
আছে
সামান্য। যদিও কাজের গুণগত মান নিয়ে কিছু না বলাই ভালো।
৪.
নেই
নেই
নট অ্যাপ্লিকেবল।

(ফুটনোটঃ বান্টি বলছে দুই আর চার নম্বর সিন্যারিওটা রিয়্যালিস্টিক নয়। বলছে, এ ধরণের আবোলতাবোল এবং অ্যাকাডেমিক্যালি নন-রিগোরাস কাজকর্মের জন্যই ইকনমিস্টদের নাকি কেউ সিরিয়াসলি নেয় না।)

ইকনমিস্টদের নিক আর না নিক, বান্টিকে সিরিয়াসলি নেওয়ার কোনও কারণ নেই কাজেই আমরা আমাদের বক্তব্যে ফিরে আসি। না বোঝার কিছু নেই, তবু ওপরের চার্টটা একবার ছোট করে ব্যাখ্যা করে দিই। অপ্রয়োজনীয় কথা বলব না এমন মুচলেকা যখন লিখে দিইনি তখন আমাকে ঠেকায় কে।

দেখতেই পাচ্ছেন, ওপরের চার্টটায় সময় ও কাজের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। আমাদের সম্ভাব্য সিন্যারিওটি হচ্ছে কাজের হওয়া না হওয়া, আর সে সিন্যারিওটির নেপথ্য চালক হচ্ছে সময় আর কাজের থাকা না থাকা।    

একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার লক্ষ্য করছেন? চারটি পরিস্থিতির ভেতর কাজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে একমাত্র তিন নম্বরে। যখন সময় নেই। ডেডলাইন ঘাড়ের ওপর কিংবা পেরিয়ে গেছে। বস্‌ হাতে খাঁড়া তুলে নিয়েছেন। ফিউচার হাঁড়িকাঠে মাথা দিয়ে থরথর করে কাঁপছে। ঠিক তখনই কাজ হলে হবে। না হলে আর হল না।

বান্টির মতো, সব পরিস্থিতিকেই যদি কমন সেন্স দিয়ে পর্যালোচনা করার বদঅভ্যেস যদি আপনার থাকে তাহলে আপনি এতক্ষণে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন। বলছেন, বাজে বকলেই হল, কাজ সারার জন্য বেস্ট সিন্যারিও হচ্ছে প্রথমটা। কাজ আছে, সময়েরও অভাব নেই, অতএব চালাও পানসি বেলঘরিয়া। তেড়ে টু ডু লিস্ট লেখো আর জমে থাকা কাজের বংশ নির্বংশ করো।

তাহলে আপনার ভুল আমাকে ধরিয়ে দিতেই হবে। বলতে হবে, কমন সেন্স দিয়ে দুনিয়া চলে না, চলে অভিজ্ঞতা দিয়ে। যদি না চলত তাহলে পরীক্ষার মাঝের ছুটিগুলোতে সবাই পড়ে ফাটিয়ে দিত আর কেউই জেমসের রং বেছে খেত না (কী লাভ, সবই একই জায়গায় যাবে যখন)।

কিন্তু তবু সকলেই জেমসের রং বেছে খায়। বান্টির মতো কিছু পাষণ্ড বাদ দিয়ে। ভাগ্যিস খায়। মানবজাতির প্রতি আমার বিশ্বাসের তলানিটুকুও না হলে এতদিনে উধাও হয়ে যেত।

এই যেমন আমার অভিজ্ঞতার কথাই ধরা যাক। আমার ইদানীংকার দৈনিক রুটিনের (বা রুটিনের আদ্যোপান্ত অভাবের) দিকে যদি আপনি নজর দেন তাহলে দেখতে পাবেন আমার হাতে এখন সময় কম নেই। অন্তত কম পড়ার কোনও কারণ ঘটেনি। অর্চিষ্মান বাড়িতে না থাকার আড়াইখানা সুবিধের মধ্যে এইটা অন্যতম। সকালসন্ধ্যের ফালতু আড্ডা থেকে আধ প্লাস তিন, মিনিমাম সাড়ে তিন ঘন্টা বেঁচে যাওয়া।

সাড়ে তিন ঘণ্টা! ভাবা যায়! সাড়ে তিন ঘণ্টায় কী না করতে পারে একটা মানুষ। উচ্চমাধ্যমিকের একটা হাফের পরীক্ষা শেষ করে ফেলতে পারে, অফিসটাইমে রিষড়া থেকে গড়িয়া পৌঁছে যেতে পারে, মহব্বতেঁ সিনেমাটাও প্রায় গোটাটাই দেখে ফেলতে পারে (শেষেরটার জন্য অবশ্য শুধু সময় নয়, কলজের জোরও থাকতে হবে।)

আর আমি কি না জীবনধারণের বেসিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারছি না। স্নানখাওয়ার টাইম নিয়ে সেই আগের মতোই টানাটানি পড়ছে, অবান্তরের ভাগে সেই ছাঁট-সময় ছাড়া কিছু জুটছে না।

শুরুটায় ভয়ানক অবাক হয়েছিলাম। যাচ্ছে কোথায় সময়গুলো? টিভি, ইন্টারনেট, গল্পের বইয়ে বেশি খরচ করছি বলে তো মনে হচ্ছে না, পড়ার বইখাতাও তাকে বসে ধুলো খাচ্ছে যেমন কে তেমন, তবে হচ্ছেটা কী? সময়গুলো কি পাখা মেলে উড়ে যাচ্ছে, নাকি আমি যখন অন্যদিকে তাকিয়ে আছি তখন ষড়যন্ত্র করে ঘড়ির কাঁটার কান মূলে এগিয়ে দিচ্ছে?

অনেক তক্কে তক্কে থেকে অবশেষে বার করে ফেলেছি। এগুলোর কিছুই নয়। বেঁচে যাওয়া সময়টায় আমি বসে বসে ভাবছি, ‘আরে অনেক তো সময় আছে, এই আর দশ মিনিট পর থেকে কাজে লাগলেই হবে এখন।’

আর সমস্ত কমন সেন্সের মাথায় চাঁটি মেরে সেই দশ মিনিট মিনিট থেকে ঘণ্টায়, ঘণ্টা থেকে দিনে, দিন থেকে মাসে, মাস থেকে বছরে, বছর থেকে . . . প্যাটার্নটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

সেই দশ মিনিটের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে সকালের ব্রেকফাস্ট মিস হয়ে গেছে, তার জায়গায় কোনওমতে এই পোস্টটা গুঁজে দিয়েছি। যদিও এর ভাগে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের বেশি একটি সেকেন্ডও বেশি খরচ করা যাবে না। টাইম নেই। 'নাই মামার থেকে কানা মামা ভালো' মনে করে এই হুড়ুমদুড়ুম পোস্টই পাবলিশ করে দৌড়ে অফিস যাব। পড়ে যদি বিচ্ছিরি লাগে তাহলে আমাকে দোষ দেবেন না যেন। মনে রাখবেন দোষ আমার নয়, আমার হাতে থাকা অফুরন্ত সময়ের।

      
 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.