June 27, 2014

সাপ্তাহিকী ও ক'টি অবান্তর কথা






আমি না নিলেও, আমার বাবামা আমার সংগীতশিক্ষাকে যারপরনাই সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন। গান শেখার জন্য শুধু মাস্টারমশাই খুঁজেই তাঁরা ক্ষান্ত দেননি, তাললয়ের দিকটাতেও যাতে খামতি না পড়ে সে জন্য একজন তবলার মাস্টারমশাইকেও ধরেবেঁধে নিয়ে এসেছিলেন।

মাস্টারমশাই আসতেন রবিবার সকাল দশটা নাগাদ। তারপর ঘণ্টাদুয়েক ধরে তিনতাল, ঝাঁপতাল, দাদরা, ধামার, তেওড়াতে কসরত চলত। আমি গাইতাম, মাস্টারমশাই বাজাতেন, বাবা তালে তালে মাথা নাড়তেন। একই স্থান, কাল ও পরিস্থিতিতে অবস্থান করা সত্ত্বেও আমাদের তিনজনের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। মাস্টারমশাইয়ের উদ্দেশ্য থাকত যেনতেনপ্রকারেণ আমাকে তালচ্যুত করা, আমার উদ্দেশ্য হত প্রাণপণে তালের ল্যাজ ধরে ঝুলে থাকা, বাবার কী উদ্দেশ্য ছিল সেটা বাবাই ভালো বলতে পারবেন।

বলাই বাহুল্য, মাস্টারমশাই তাঁর উদ্দেশ্যে সফল ও আমি আমার উদ্দেশ্যে চরম ব্যর্থ হতাম। মাস্টারমশাইয়ের আকারটি ছিল নিতান্ত ভালোমানুষ গোছের, কিন্তু প্রকারে তিনি ছিলেন নির্মম। আমি তাল থেকে সম্পূর্ণ ছিটকে গেছি দেখেও তিনি বাজনা থামাতেন না। আমি সমে ফেরার জন্য হাঁচোড়পাচোড় করতাম, আর মাস্টারমশাই ঠিক সময়ে একটা অদরকারি লয়কারি দিয়ে আমাকে ফের ছিটকে দিতেন। ঠিক যেমন লাস্ট সিনে ভিলেন খাড়া পাহাড়ের গায়ে গজানো মিহি ঘাসের গোছা আঁকড়ে প্রাণরক্ষার চেষ্টা করে, আর ওপর থেকে হিরো একটা লম্বা বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে বেচারার সে চেষ্টাকে ক্রমাগত ব্যর্থ করে দেয়। সে এক করুণ দৃশ্য।

ইদানীং দৃশ্যটা বার বার ঘুরেফিরে মনে আসছে। আমি আনতে চাইছি না, তবু। তার কারণ আছে অবশ্য একটা। অবান্তরে এখন সেই তালকাটা দশা চলছে। সমে ফেরার সেই চেনা হাঁচোড়পাঁচোড়, সেই পরিচিত ছিটকে যাওয়া। আমি এম এস ওয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে আছি, এম এস ওয়ার্ড আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ঘড়ি ঘুরে যাচ্ছে, দিন বয়ে যাচ্ছে, সপ্তাহ ঘুরে একটা সাপ্তাহিকীর জায়গায় আরেকটা সাপ্তাহিকীর পালা চলে আসছে, আমার আঙুলনিঃসৃত প্রলাপের প্রস্রবণটিই যা শুধু রুদ্ধ।

সত্যি বলছি ভেবেছিলাম, সাপ্তাহিকী বার করব না। লেখার বেলায় ঢুঁ ঢুঁ, এদিকে ফাঁকি মেরে চুরি করা লিংক ছাপার বেলায় একেবারে লাফ দিয়ে রেডি। লজ্জাই হচ্ছিল। কী ভাববেন আপনারা সবাই।

কিন্তু তারপর সিদ্ধান্ত পাল্টালাম। সাপ্তাহিকী ছাপছি, কারণ এটা ওই সমে ফেরার হাঁচোড়পাঁচোড়ের প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে। যে প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেলে সমে ফিরবই এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু না গেলে যে কোনওদিনও ফিরব না, সে গ্যারান্টি অবধারিত। কাজেই, যত ফাঁকিবাজিই দেখতে লাগুক না কেন, আমি সাপ্তাহিকী ছাপার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমি তো চাইছিই, আপনারাও প্লিজ মনে মনে চান – অবান্তর যেন শিগগিরি নিজের তাল খুঁজে পায়।


*****


বোদ্ধার মহামারী লেগেছে চতুর্দিকে, এ আমি অনেকদিন ধরেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

মাত্র উনিশ বছরে কতকিছু বদলে যায়, হ্যাঁ?

এই ক্যানসেলড ভেকেশনের ক্যান্ডেললাইট আমাকেও জ্বালাতে হবে দেখছি। জ্বালাতন।


বাকিগুলোর কথা জানি না, তবে অ্যাভয়েড হিউম্যানস ডট কম-এর নাম শুনেই তো বেশ কাজের সাইট বলে মনে হচ্ছে।

মায়ের  অপত্যস্নেহের যে জাত হয় না, সে কথা আবারও প্রমাণ হল। ছবিগুলো পাঠিয়েছে তিন্নি।


এতে অ্যান্টিসোশ্যালের কী আছে কে জানে বাবা। আমরা সবাই-ই কি পরিস্থিতিবিশেষে এইরকম নই?

দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, মেজাজ, বদভ্যেস তো বটেই, এরা বলছে স্মৃতিও নাকি ডি এন এ-র প্যাঁচে প্যাঁচে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পরিবাহিত হয়।




June 25, 2014

একটি জরুরি শনাক্তকরণিকা



অ্যানিম্যাল ক্র্যাকার আমার প্রিয়তম বিস্কুট। ব্রিটানিয়া ক্রিম ক্র্যাকারের থেকেও আমি অ্যানিম্যাল ক্র্যাকার খেতে বেশি ভালোবাসি। কিন্তু খুব অস্বস্তি হয় যখন যে জন্তুটাকে খাই সেটাকে চিনতে পারি না। সে সমস্যা এবার ঘুচল। ছবি দেখে এটাও বুঝলাম যে সমগ্র বিস্কুটরূপী-জানোয়ারকুলে আমার প্রিয়তম হচ্ছে হিপো। 




June 24, 2014

Things I am Loving



১। স্মার্টফোন 

বান্টি ঘরে ঢুকে বলল, ‘দেবদীপের জন্য বড্ড চিন্তা হচ্ছে গো।’

আমি ল্যাপটপ থেকে মুখ না তুলেই বললাম, ‘কেন?’

‘আরে, ওর ক্যাব আসতে দেরি করছে, এদিকে ম্যানেজার আগের সপ্তাহেই ই-মেলে করেছে, লেট হলেই মার্ক করা হবে, নেক্সট ইয়ার অ্যাপ্রাইজালের সময় নাকি সব লেটমার্ক গুনেগুনে দেখা হবে এবং সেই বুঝে হুড়ো দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।   

‘দেবদীপটা কে?’

‘দেবদীপ? আমার সঙ্গে নার্সারিতে পড়ত। বেহালার ছেলে।’

এবার আমাকে মুখ তুলতে হল। আমি তো একবছর আগে যাদের সঙ্গে খেতামশুতাম সিনেমা যেতাম, তাদের সঙ্গেই যোগাযোগ রক্ষা করতে পারি না, বান্টি নার্সারির বন্ধুর অ্যাপ্রাইজাল নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে দেখে চমৎকৃত হলাম

‘খুব বন্ধু ছিল বুঝি?’

‘নাঃ।’

বলে বান্টি রহস্য করে চুপ করে রইল। তিরিশ সেকেন্ড পর বলল,

‘আহা, তখন বন্ধুত্ব ছিল না বলে কি এখন ফ্রেন্ডশিপ থাকতে নেই? আমি দেবদীপের সব খবর রাখি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় জানতে পারি ওর ক্যাব লেট করছে কি না, ম্যানেজার বকছে কি না, এ সপ্তাহে কোন কফিশপে যাচ্ছে, সামনের সপ্তাহে কোন রেস্টোর‍্যান্টে যাবে যাবে ভাবছে, গত সপ্তাহে কী খেল . . .’

আমার একটু ক্ষিদেক্ষিদে পাচ্ছিল, জিজ্ঞাসা করলাম,

‘কী খেল রে?’

'খুব কঠিন খাবার। তুমি নামই উচ্চারণ করতে পারবে না। আমাকেই গুগল করে দেখতে হয়েছে। স্টেক-ও-পোয়াভ উইথ বালসামিক রিডাকশন।' মুখচোখে যথোপযুক্ত সম্ভ্রম ফুটিয়ে বলল বান্টি। 

এককালে যখন সবকিছু দেখেই হাসার বদঅভ্যেস ছিল, তখন হলে হাসতাম, এখন আর হাসি না। তার কারণটা এই নয় যে মানুষ হিসেবে দারুণ ভালো হয়ে গেছি, কারণটা হচ্ছে যে তাহলে নিজেকে দেখেই সবথেকে বেশি হাসতে হয়। বিয়ে থেকে বাঘদর্শনের মতো লাইফ-চেঞ্জিং ইভেন্টস যেমন ডেকেডেকে আপনাদের সবার সঙ্গে শেয়ার করেছি, সকালবেলার মাথাব্যথা কিংবা সন্ধ্যেবেলার মনখারাপও বাদ দিইনি। আমার দোষ নেই, যুগটাই পড়েছে শেয়ারিং-এর। কাজেই এই খবরটাই বা শেয়ার করব না কেন?

আমি একটি স্মার্ট ফোনের মালিক হয়েছি।

এবং হয়ে ইস্তক হাত কামড়াচ্ছি অ্যাদ্দিন কেন হইনি। কত সুবিধে ভাবা যায় না। সেমিনার চলাকালীন টেবিলের তলায় হাত লুকিয়ে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে পারা যায়, রাতে শুতে যাওয়ার আগে মুখের সামনে ফোন ধরে ‘ওক্কে গুগল্‌, সেট দ্য অ্যালার্ম অ্যাট ফাইভ এ এম টুমরো’ চেঁচিয়ে বেশ বিনাপয়সার বিনোদন সৃষ্টি করা যায়, তাছাড়া ম্যাপট্যাপ দেখার ব্যবস্থাও আছে নাকি। এখনও সেটা অ্যাপ্লাই করার সুযোগ হয়নি, কিন্তু হজ খাসের অন্ধগলিতে শনিবার রাতে কখনও অটোভাইসাব পথ হারিয়ে ফেললে, তাঁকে ম্যাপ দেখিয়ে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারব, এই সম্ভাবনায় অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করছি।

তবে সবথেকে বেশি সুবিধে হয়েছে ঘুমোতে। বুকের ওপর আড়াই কেজির ল্যাপটপের বদলে দেড়শো গ্রামের ফোন থাকলে ঘুমের কোয়ালিটি যে কী পরিমাণে বাড়ে, নিজে চোখে না দেখলে আমি বিশ্বাস করতাম না।

ও, আরও একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হয়েছে। এতদিন যখন আমার বোতামটেপা নোকিয়া ফোন ছিল, তখন আশেপাশে যত লোক চোখে পড়ত সবাই দেখতাম স্মার্টফোন নিয়ে ঘুরছে। সবাই মানে সব্বাই। সোয়া আটটায় দরজায় চাবি ঘুরিয়ে বাড়ি থেকে বেরোনো থেকে আবার সাড়ে সাতটায় চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে বাড়ি ঢোকা পর্যন্ত যতজনের সঙ্গে দেখা হত। আর আমার স্মার্টফোন আসার পর থেকে শুধু অফিসেই অন্তত কুড়িজনকে দেখলাম যারা এখনও দিব্যি আনস্মার্টফোন নিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘোরাঘুরি করছে, কারওরই কোনওরকম অসুবিধে হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

২। বিছানা-ডেস্ক

আমার প্রাপ্তিযোগ এখন নির্ঘাত তুঙ্গে। রবিবার সকালবেলা কড়া নেড়ে কয়েকজন ভালো বন্ধু এসে উপস্থিত। ভালো মানে ভীষণ ভালো। যাদের সঙ্গে আমার বেশিরভাগ পছন্দই মেলে, আর তার থেকেও বেশি মেলে অপছন্দ। অপছন্দের বই, অপছন্দের সিনেমা, অপছন্দের মানুষ। তাদের নিয়ে চর্চা করে আড্ডা মারাত্মক জমে।

বন্ধুরা এলেই আমরা বর্তে যেতাম, কিন্তু দরজা খুলে দেখি তারা তিন দু’গুনে ছ’ছ’খানা হাত বোঝাই করে উপহার নিয়ে এসেছে আমাদের জন্য। রানা দাশগুপ্তের লেখা ‘ক্যাপিটাল’ (যেটা আমি আপাতত পড়ছি কিন্তু ভাবছি না) আর টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একশো পঁচাত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত ভারতীয় কার্টুনশিল্পীদের শিল্পের সংকলন।


বইদুটো দেখেই আমি আনন্দে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় একটা প্রকাণ্ড বাবলর‍্যাপের ভেতর থেকে বেরোলো এই জিনিসটা। আমি আর বর্ণনার কষ্টে যাচ্ছি না, আপনারা নিজেরাই দেখে নিন।


সেই থেকে এই ছোট্ট ডেস্কটি আমার ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠেছে। এর ওপর চায়ের কাপ রেখে চা খাচ্ছি, ল্যাপটপ রেখে টাইপ করছি, টাইপ করা থামিয়ে হাঁ করে টিভির দিকে তাকিয়ে আছি, শুধু ডেস্কটি কোলছাড়া করছি না। ডেস্কটাও বেশ আমার পোষ মেনেছে, চুপটি করে বসে আছে গা ঘেঁষে। একটুও ত্যান্ডাইম্যান্ডাই করছে না।

৩। বেডটাইম স্টোরি

আজকালকার বাচ্চাদের কথা জানি না, আমাদের ছোটবেলায় বেডটাইম স্টোরির চল ছিল না। সাহেবমেমদের বাচ্চারা ঘুমোতে যাওয়ার সময় যে বাবামা পালা করে বসে তাদের গল্পের বই রিডিং পড়ে শোনান, এই ব্যাপারটা প্রথম জেনে আমি যারপরনাই চমৎকৃত হয়েছিলাম।

একটু সন্দেহও যে হয়নি তা নয়। একদম গুঁড়ি বাচ্চা হলে তাও বুঝি, অনেকসময় দেখেছি বাচ্চার নিজে পড়তে পারার বয়স হয়ে গেছে তখনও বেডটাইম রিডিং চলছে। আমার নিজের কথা যদি বলতে বলেন, তবে আমাকে কেউ কিছু রিডিং পড়ে শোনালে, তাও যদি আবার গল্পের বই হয়, আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়। মনে হয় বইখানা কেড়ে নিয়ে নিজেই পড়ে নিই। কে জানে খাটুনি বাঁচাতে কিছু বাদটাদ দিয়ে দিচ্ছে কি না। আমার মনে হত বাচ্চাগুলোরও নিশ্চয় অস্বস্তি হচ্ছে, ভয়ে বাবামাকে থামতে বলতে পারছে না।

গোড়াতে আমার এও ধারণা ছিল যে গোটা হাঙ্গামাটা বুঝি সন্তানসন্ততির মধ্যে সাহিত্যপাঠের ভালোবাসা সঞ্চারের সাধু উদ্দেশ্যে করা হয়। তারপর একজন বললেন সে উদ্দেশ্য থাকলে থাকতে পারে, তবে মুখ্য উদ্দেশ্যটি অসাধু। গপ্প শুনতে শুনতে বাচ্চা ঘুমিয়ে পড়বে, আর বাবামা সেদিনের মতো মুক্তি পেয়ে লাফ মেরে টিভির সামনে গিয়ে বসবেন। আমি শুনে ভাবলাম, হ্যাঃ, তা আবার হয় নাকি? কানের কাছে ঘ্যানরঘ্যানর করে কথা বলে চললে ঘুম আসার বদলে আরও তো চটকে যাবে, কিন্তু তৎক্ষণাৎ আমার ছোটকাকিমার কথা মনে পড়ে গেল।

খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছে, বড়রা সবাই যে যার বিছানায় গড়িয়ে পড়েছেন, আমি আর আমার জেঠতুতো দিদি গুজগুজ করে গল্প করছি এমন সময় কাকিমা ‘সোনাআআ, মনাআআ’ করে মারাত্মক ডাকাডাকি লাগালেন। আমরা দৌড়ে যেতে বললেন, ‘আমার কানের কাছে বসে একটু গল্প কর না রে, একটু আরাম করে ঘুমোই।’ আমরা তো আকাশ থেকে পড়লাম। কিন্তু গুরুজনের আদেশ তো অমান্য করা যায় না, গল্প শুরু করতে না করতেই দেখি ছোটকাকিমার অল্প হাঁ করা মুখের ভেতর থেকে লম্বা লম্বা, ভারি ভারি নিঃশ্বাস বেরোতে শুরু করেছে।

আমারও আজকাল ছোটকাকিমার দশা হয়েছে। তবে আমার তো কানের কাছে বসিয়ে গল্প করানোর মতো সোনামনা নেই, তাই ইন্টারনেটই ভরসা। বিবিসি-র গোয়েন্দা নাটক, সানডে সাসপেনসে ফেলুদা-শঙ্কু-তারিণীখুড়ো-ব্যোমকেশ, ইউটিউবে শার্লক হোমস, মিস মার্পল, এরক্যুল পোয়াহো---যা পাচ্ছি কিছু একটা চালিয়ে ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ছি। কী বলব আপনাদের, প্রথম খুনটা হওয়ার আগেই জমাট, গভীর ঘুম এসে চোখের পাতায় সেই যে চেপে বসছে, একেবারে রাত কাবার করে ‘ওক্কে গুগল’ অ্যালার্ম বাজার আগে আর যাওয়ার নামটি করছে না।

৪। সুকুমার রায়-পড়া-বাঙালি

আমার এক বন্ধু ছিল, সে বলত, ‘বাঙালিকে যদি বাঙালি বলে চিনতেই না পারা গেল, তাহলে বস্‌ আমার তাকে পছন্দ হয় না।’ মানে পদবী বাঙালি হলে সে লোকটা বেশ কথায় কথায় কলকাতার কথা বলবে, ফুচকা খেতে ভালোবাসবে, পুজোর সময় ম্যাডক্স স্কোয়্যার মিস করবে, তবে না?

পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে আমার সে রকম কোনও বাছবিচার নেই। বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে সকলকেই অপছন্দ করার রাস্তা আমি খোলা রেখেছি। বাঙালি দেখলে একসময় উত্তেজিত হতাম না সেটা বললে ভুল হবে, লাফ মেরে বাংলায় কথা বলতে যেতাম। তার উত্তরে বারকয়েক হিমশীতল ইংরিজি শুনে তবে আমার শিক্ষা হয়েছে। বাংলাদেশের (এবং সি আর পার্কের) বাইরে, বিশেষ করে কাজকর্মের ক্ষেত্রে আমি আজকাল আগ বাড়িয়ে বাঙালিপনা একেবারেই দেখাতে যাই না। অপেক্ষা করি, উলটোদিকের বাঙালির ভাবভঙ্গি দেখে তবেই পা বাড়াই।

আমার অফিসে লাখ লাখ বাঙালি কাজ করে। বাঙালিদের পক্ষপাতিত্ব দেখানোর প্রশ্নই নেই, কারণ নীতিগতভাবে আমি অফিসের কাউকেই পছন্দ বা অপছন্দ করি না, করলে নানারকম সমস্যার উৎপত্তি হয় দেখেছি।  

কাল নিয়মের একটা ব্যত্যয় ঘটে গেল।

নিজের মনে কাজ করছিলাম। এমন সময়ে বাংলায় একটি কথোপকথন শোনা গেল। গলা শুনেই চিনতে পেরেছি। বক্তারা দুজনেই উচ্চপদস্থ ও বর্ষীয়ান। কান পাতছিলাম না একেবারেই, কিন্তু তাঁরা এমন খোলা গলায় গল্প করছিলেন যে শোনা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।

কথা হচ্ছিল সিনিয়রিটি নিয়ে।

কে কত সিনিয়র, কে সিনিয়রিটি ধুয়ে জল খেতে চায়, কে চায় না ইত্যাদি প্রভৃতি। কথা হতে হতে একজন হঠাৎ নিজের বয়সটি ঘোষণা করে বসলেন। বললেন, 'আমার তো এই সবে পঁয়তাল্লিশ হল।'

ঠিক দু’সেকেন্ড বাদে হাসিহাসি গলায় অন্যদিক থেকে প্রশ্ন ভেসে এল, ‘বাড়তির দিকে পঁয়তাল্লিশ না কমতির দিকে পঁয়তাল্লিশ?’

তারপর স্বাভাবিকভাবেই ওদিকের কথোপকথন বেশি এগোল না আর এদিকে আমার এতদিনের 'কর্মস্থলে নন-পার্শিয়ালিটি'র নীতি হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ল। বুঝে গেলাম বাঙালিদের আমি অবাঙালিদের তুলনায় বেশি পছন্দ করি না ঠিকই, কিন্তু সুকুমার রায় পড়া বাঙালিদের আমি এখনও পৃথিবীর বাকি সব মানুষের থেকে অন্যায় রকমের বেশি পছন্দ করি।    

  

June 22, 2014

মন্টু মিস্তিরির জানালা



উনিশশো সাতাশি সাল নাগাদ আমাদের বাড়ির চেহারায় অনেকগুলো পরিবর্তন আসে। যোগ হয় বারান্দাসহ একটি নতুন ঘর আর বিয়োগ হয়ে যায় বাগানের প্রায় অর্ধেক। যে ক’টা গাছ কাটা পড়ে তার মধ্যে বলার মতো ছিল একখানা কাঁটাভরা কুল আর একখানা পেয়ারা। কুলগাছ নিয়ে আমার আফসোস নেই, বেঁচে থাকলেও ও গাছ আমার কোনও কাজে লাগত না, কিন্তু পেয়ারাগাছ নিয়ে বিলক্ষণ আছে। আমাদের বাড়িতে আরও একখানা পেয়ারা গাছ আছে, বছর বছর তাতে দিব্যি ফলও ধরে, কিন্তু ঠাকুমা বলেন যেখানা গেছে সেখানার জাতই নাকি আলাদা ছিল।

উনিশশো সাতাশি সাল নাগাদ আমার জীবনেও একটি পরিবর্তন আসে। আমি একখানি ডায়রি প্রাপ্ত হই। ডায়রি আমাদের বাড়িতে এমন কিছু অমিল ছিল না, জানুয়ারি মাস পড়লেই গাদাগাদা ডায়রিতে ছেয়ে যেত বইয়ের টেবিল, কিন্তু তারা সবই মান্ধাতার আমলের লাল কিংবা মেরুন নকল চামড়াবাঁধাই গামবাট ডায়রি। আমার সৃষ্টিশীলতার গোড়ায় ধোঁয়া দেওয়ার মতো সূক্ষ্মতা সেগুলোর একটারও ছিল না। ও ডায়রিতে মাসমাইনের খুঁটিনাটি আর কিষাণ বিকাশ পত্রের হিসাব রাখাই চলত শুধু

এই যখন পরিস্থিতি, তখন একদিন সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে মা ব্যাগ থেকে একখানা ডায়রি বার করে আমার হাতে দিলেন। প্রথমটা আমি সেটাকে ডায়রি বলে চিনতেই পারিনি। রোগা, লম্বাটে, ধবধবে সাদা গায়ে বাদামি পোলকা ডট। আমার ছ’বছরের হাতের পাঞ্জার ভেতর সেটা দিব্যি এঁটে গেল। আর খুলে গেল আমার লেখকসত্তার মুখে টাইট করে এঁটে বসানো ছিপি।

কালক্ষয় না করে আমি ডায়রি লিখতে শুরু করলাম। পিসির ক্ষেপানি, ঠাকুমার বকুনি, বুচিদিদির আমাকে ফেলে খেলতে চলে যাওয়া---আরও যা যা অন্যায়অবিচারের মুখোমুখি হতে হত আমাকে রাত্রিদিন, তাদের রক্তাক্ত বর্ণনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লিখে রাখতে শুরু করলাম আমি আমার পোলকা ডট ডায়রিতে। অচিরেই যা ঘটবার তাই ঘটল। একদিন সকালে উঠে আমি আবিষ্কার করলাম অবিচারের ভাঁড়ার ঢনঢন, এদিকে ডায়রি তখনও চারের পাঁচ ভাগ খালি।

শুনেছি ‘সংকট’ শব্দটা লিখবার সময় চাইনিজরা তুলির দিয়ে পাতার ওপর দুটো আঁচড় কাটেএকটা আঁচড়ের মানে বিপদ, অন্যটার মানে সুযোগ। এই তথ্যটা জানা ছিল না বলেই বোধহয়, ওই চরম সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুধু বিপদটাই আমার চোখে পড়েছিল, সুযোগের বিন্দুবিসর্গ আঁচ পাইনি। অথচ আজ যখন এতদূর থেকে দেখছি, তখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বিপদের মধ্যে হাঙরের মতো হাঁ করে রয়েছে একখানা সুবর্ণসুযোগ যে মুহূর্তে আমি বুঝলাম নিজেকে নিয়ে লেখার আর কিছু নেই, তৎক্ষণাৎ আমার উচিত ছিল অন্যদের নিয়ে পড়া। কল্পনার চরিত্র খাড়া করে, তাদের জীবনে নানাবিধ সংকটের আমদানি করে তার সমাধানের জন্য প্রাণপাত করা। কল্পনার ভয়, কল্পনার ভালোবাসা, কল্পনার রাগ, কল্পনার দুঃখ। সত্যিকারের দুঃখের থেকে কাল্পনিক দুঃখের বিলাস যেমন অনেক বেশি, তেমনি বাস্তবের অনুভূতির থেকে কাল্পনিক অনুভূতি অনেক অনেক বেশি মহান ও অর্থপূর্ণ।

আমার মোটা মাথায় সেটা ঢুকল নাওই সংকটমুহূর্তে দাঁড়িয়েও আমি বাহাদুরি দেখিয়ে কল্পনার আশ্রয় নিলাম না, ঘোর বাস্তবের মায়ায় আটকে পড়ে রইলাম। আর সেই মুহূর্তেই লেখক হওয়ার স্বপ্নের কপালে কালি পড়ে গেল। তার বদলে হয়ে গেলাম ব্লগার।

হাতের কাছে লেখার জিনিস না পেয়ে আমি টুকতে শুরু করলামনাকে সদ্য চাপা চশমার কাঁচের ভেতর দিয়ে যা যা দেখা যায়, শোনা যায়, ছোঁয়া যায়মায়ের অফিসে প্রোমোশনের পরীক্ষার রেজাল্ট, ঠাকুমার ব্লাডপ্রেশার, বড়মাসির বাড়িতে যাওয়ার বাসের নম্বর ও স্টপেজের নাম। পয়লা বৈশাখের পাড়ার ফিস্টের মেনু। সামনের ঘরের দেওয়ালের গজালে বিঁধে রাখা সরস্বতী পুজোর চাঁদার লিস্টের গোছা দেখে দেখে কোন ক্লাবের ভাগ্যে কত জুটেছে তার তালিকা

আর এই ক্ষুধার্ত টোকাটুকির মধ্যে শিকে ছেঁড়া রসগোল্লার ভাঁড়ের মতো এসে পড়ল আমাদের হাউস এক্সটেনশন প্রোজেক্ট। প্রোজেক্টের প্রযোজক আমার মাবাবা, হর্তাকর্তাবিধাতা মন্টু মিস্তিরি।

মন্টু মিস্তিরির নামটা লেখার আগে খানিকক্ষণ বসে ভাবতে হল দৈনন্দিন জীবনে পেশাদার যে সব মানুষজনের সঙ্গে দেখা হয় তাদের সকলকেই একটি না একটি সম্পর্কের নাম ধরে উল্লেখ করতে শেখানো হয়েছিল ছোটবেলায়তিনবেলা ঘর ঝাড় দিতে আসেন যিনি তিনি মাসি, মা ও আমাকে সকালে স্টেশন পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে নিয়ে যান যিনি তিনি কাকু, ভীষণ আস্তে সাইকেল চালিয়ে নারকেল গাছে ওষুধ দিতে আসেন যিনি তিনি দাদু, এমনকি তিন বছর পরপর বাড়ি রং করতে আসত যে নাড়ু তাকেও আমার দাদা বলে ডাকতে হত, কিন্তু মন্টু মিস্তিরির সঙ্গে নাড়ুদার থেকে ঢের বেশি ঘন ঘন দেখা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে কোনওদিন কিছু বলে ডাকিনি কেন ভগবানই জানেন।

আমি নয়, বাড়ির কেউই ডাকত না। পাড়ারও কেউ ডাকত না। এই তথ্যটা জানা এমন কিছু শক্ত ছিল না। আশেপাশের কারও না কারও বাড়িতে কিছু না কিছু কাজ লেগেই থাকতসকালবেলা প্রায়শই চিৎকার শোনা যেত, ‘ওরেএএ মন্টু মিস্তিরি এসে গেছে রে, এতক্ষণ ধরে বলছি চানে যা, চানে যা, একটা কথা যদি কানে ঢোকে।’ দেখেশুনে আমাদের বাড়ির কড়া নড়লে আমিও জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে দৌড়ে গিয়ে বাবাকে বলতাম, ‘বাবা বাবা, মন্টু মিস্তিরি এসে গেছে।’ বাবা খবরের কাগজ ভাঁজ করে উঠে পড়ার সময় রান্নাঘরে উঁকি মেরে মা’কে বলে যেতেন, ‘শোনো, মন্টু মিস্তিরি এসে গেছে, সামনে দুটো চা পাঠিয়ে দিতে বোলো তো।’  

কিন্তু মনটা খচখচ করত। খচখচানিটা কীসে কাটল সেটা বলি। মাঘপঞ্চমীর আগে আগে তিনশো সতেরো নম্বর দল যখন কড়া নেড়ে চাঁদা নিতে এল তখন আমার ঠাকুমা চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোরা কারা রে?’ আমি খুব ভালো করেই জানতাম এরা কারা, এদের সঙ্গে রোজই আমার পার্কে দেখা হয়, ঢেঁকির মালিকানার লড়াইয়ে এদের কারও কারও কাছে আমি রোজই হারি, কিন্তু ঠাকুমা কিনা ঢেঁকি চড়ায় ইন্টারেস্টেড নন, তাই তিনি কাউকে চিনতে পারেননি। ঠাকুমার জেরার উত্তরে একটুও না ঘাবড়ে দলের মধ্যে হাইটে সবথেকে খাটো কিন্তু সাহসে সবথেকে লম্বা, ঝাঁকড়াচুলো, কালোকোলো উদয় সিং বুক ফুলিয়ে বলল, ‘আমি মন্টু মিস্তিরির ছেলে।’

এর পর মন্টুবাবুকে মন্টু মিস্তিরি বলে ডাকতে আমার আর কোনও সংশয় হয়নি।

যাই হোক, মন্টু মিস্তিরি দলবল নিয়ে এসে পড়ার পর আমার ডায়রি দেখতে দেখতে ভরে উঠল। ক’বস্তা সিমেন্ট, ক’বস্তা বালি, ক’লরি ইঁট মন্টু মিস্তিরি বাবার সঙ্গে গম্ভীরমুখে আলোচনা করত আর আমি শুনে শুনে পোলকা ডট ডায়রিতে টুকে রাখতাম। এই টোকাটুকির উদ্দেশ্য যে শুধু ডায়রির পাতা ভরানো ছিল তা নয় কিন্তুবাবা যদি দরকারি কিছু ভুলে যান তাহলে আমি আমার ডায়রি দেখে তাঁকে সে কথা মনে করিয়ে দিতে পারব এইরকম উচ্চাশা ছিল মনে। দুঃখের বিষয় বাবা কখনওই কিছু ভোলেননি, আর আমারও ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ হয়নি

সেই ডায়রিটা এখনও আছে আমাদের বাড়িতেমা রেখে দিয়েছেন। প্রায় আঠাশ বছর হতে চলল, পুঁচকে ডায়রি এখনও টসকায়নি। বাঁধাইটাধাই সব যেমনকে তেমন আছে, গায়ের রংটা শুধু সাদার বদলে ঘিয়ে মতন হয়ে গেছে। প্লাস্টিক মলাটে এখনও গোঁজা রয়েছে ম্যাগির সঙ্গে ফাউ পাওয়া চিতাবাঘের চৌকো স্টিকার।

আগের বার বাড়ি গিয়েছিলাম যখন মা ডায়রিটা বার করেছিলেন। পাতায় পাতায় ছত্রে ছত্রে বোকামি ঠাসাঠাসি, মা একটা একটা করে পাতা উল্টোচ্ছেন আর হেসে খুন হচ্ছেন, কিন্তু নিজের বোকামি কিনা, আমি অত জোরে হাসতে পারছিলাম না। তাছাড়াও বোকামি যখন পঁচিশ বছরের বেশি পুরোনো হয়ে যায় তখন তাকে দেখলে লজ্জার থেকে মজার ভাবটাই বেশি জাগেপাতা উল্টোতে উল্টোতে সিমেন্টবালির হিসেব বেরিয়ে পড়ল। হিসেবের তলায় দেখি ‘লিন্‌টন্‌’ ঢালাইয়ের (আমি জানি না, এ’রকম কোনও ঢালাই আদৌ হয় কি না, শব্দটা লিন্‌টন্‌ কি না তাও জোর দিয়ে বলতে পারছি না) মাপজোক দিনক্ষণ লেখা আছে আর তার তলায় ইনভার্টেড কমা-টমা দিয়ে, যাতে ব্যাপারটার গুরুত্ব নিয়ে কারও কোনও সন্দেহ না থাকে, লেখা আছে ‘প্যারালাল জানালা’।

লেখাটা দেখা মাত্র একটা ছবি আমার চোখে ভেসে উঠল। এই যে এখন পাঁচ হাত দূরে আর্জেন্টিনা ইরানের খেলা দেখছি, তার থেকে ঢের স্পষ্ট করে। কোমর পর্যন্ত উঁচু ইঁটের দেওয়ালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মন্টু মিস্তিরি  বাবাকে বলছেন, ‘মেজদা, প্যারালাল জানালা না রাখলে জানালা রাখার কোনও মানেই হয় না। হাওয়া শুধু ঢুকলেই তো হবে না, তাকে বেরোনোরও তো জায়গা দিতে হবে। এই জানালা দিয়ে ঢুকবে, ওই জানালা দিয়ে বেরোবে, তবে না আপনার গায়ে লাগবে?’

শেষ বাক্যটা বলার সময় মন্টু মিস্তিরি হাত দিয়ে শূন্যে একটা হাইওয়ে এঁকে দিল। যে হাইওয়ে ধরে হইহই করে হাওয়া ছুটে বেড়াবে আমাদের ঘরের ভেতর।  

মন্টু মিস্তিরিকে মিস্তিরি বলে ডাকলে কী হবে, তার কথা অমান্য করার সাহস কারও ছিল না। আমাদের নতুন ঘরেও প্যারালাল জানালা কাটা হল। কাটতে কাটতে ঘরের চার দেওয়ালে মোট পাঁচটি জানালা আর দুটি দরজা ফুটে বেরোল। মাবাবা মাথা চুলকে ভাবলেন একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল নাকি, কিন্তু মন্টু মিস্তিরি  অভয় দিয়ে বলল, কিচ্ছু ভাববেন না, সারা বাড়ির মধ্যে এই ঘরটাই সেরা হবে।’

হয়েওছিল তাই। ঘোর গরমের দুপুরে ব্যানার্জিজেঠি ঠাকুমার সঙ্গে চাইনিজ চেকার খেলতে এসে বলতেন, ‘মাসিমা, চলুন না নতুন ঘরে বসে খেলি, বেশ হাওয়া লাগবে গায়ে।’ রাত্রিবাস করতে আসা অতিথিরা ভীষণ কনসিডারেট হয়ে বলতেন, ‘আরে আমাদের নিয়ে একটুও ভেবো না অর্চনা, আমরা ওই কোণার ঘরটায় শুয়ে পড়ব’খন। কিচ্ছু অসুবিধে হবে না।’

অসুবিধে যা হয়েছিল সে শুধু আমার। রাতে শুয়ে দেখতাম দু’পাশের জানালা দিয়ে ছায়াছায়া হাত বাড়িয়ে আসছে যেন কারা, (সেগুলো নিম কিংবা জবাগাছের ডালও হতে পারে, আবার অন্য কিছুও হতে পারে- কিচ্ছু বলা যায় না।) ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক তীব্র হচ্ছে, মাথার কাছের জানালাটার বাইরে কী হচ্ছে ভগবানই জানেন। চোখ টিপে শুয়ে থাকতাম, ঝিঁঝিঁর ডাক ছাপিয়ে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠত হৃৎপিণ্ডের ধুপধাপ। কানে তালা ধরানো সে ধুপধাপ শুনতে শুনতে মন্টু মিস্তিরিকে অভিশাপ দিতাম। জানালায় জানালায় ঘর ছয়লাপ করে দেওয়ার জন্য। আমার রাতের ঘুম দুঃস্বপ্নে দুঃস্বপ্নে ছেয়ে দেওয়ার জন্য।  

অথচ সকালে উঠে যখন দেখতাম সেই একই জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে এসেছে রোদ্দুর, আমাদের সেকেলে বাড়ির বাকি অংশের সঙ্গে মানানসই করার জন্য জানালায় বসানো শিকের সমান্তরাল ছায়া ফুটে উঠেছে বিছানার এলোমেলো চাদরের ওপর, তখন ভয়টয় কোথায় হাওয়া হয়ে যেত। ভূতের বদলে জানালা দিয়ে এগিয়ে এসে হাত মেলাতে চাইত জবাগাছের কচি নরম ডাল, ডালের ডগায় সদ্য ফোটা লালরঙের নরম কুঁড়ি।

এখন আমরা যেসব বাড়িতে থাকি সেসব বাড়ি হয়তো অনেক দামি মিস্তিরিরা বানিয়েছে, কিন্তু তারা মন্টু মিস্তিরির মতো প্যারালাল জানালার গুরুত্ব বোঝেনি। এই যেমন এখন বাইরে হু হু করে হাওয়া বইছে, বাড়িওয়ালার সজনেগাছের দুলন্ত মাথায় তার স্পষ্ট প্রমাণ দেখছি, কিন্তু হাট করে খোলা জানালার গা ঘেঁষটে বসেও সে হাওয়ার ছিটেফোঁটা পাচ্ছি না আমি। জানালার বাইরে এসে উঁকি মেরে হাওয়া ফিরে যাচ্ছে। বেরোনোর পথ নেই দেখে ঢুকছে না। বয়ে গেছে তার আমার মতো বদ্ধ ঘরে বসে পচে মরতে। সে মনের সুখে খেলে বেড়াচ্ছে খোলা আকাশের নিচে, দেদার দোল খাচ্ছে জানালার পাল্লা ধরে। আর আমি তার এত কাছে থেকেও তাকে ছুঁতে পারছি না, গুমোট হয়ে বসে বসে মন্টু মিস্তিরির কথা ভাবছি।       


June 21, 2014

সাপ্তাহিকী



কুপিত কিউব্রিক। (বিম্ববতীর দৌলতে।)

Football is a simple game; 22 men chase a ball for 90 minutes and at the end, the Germans win.
      ---Gary Linekar, উনিশশো নব্বইয়ের বিশ্বকাপে ফাইনালে জার্মানির কাছে হারার পর।



মানুষকে যখন জোর করে পুতুলের মতো বানিয়ে রাখার চেষ্টা।

আমার চেনা অনেককেই বলতে শুনেছি হলে সিনেমা দেখতে যাওয়ার প্রধান আকর্ষণ সিনেমাটা নয়, সিনেমা শুরু আগে যে ট্রেলর দেখানো হয় সেইগুলো। সেই ট্রেলর কী করে এল, কোথা থেকে এল, জানতে হলে ক্লিক করুন।

কিছু কিছু লোক জন্মায়ই ভাগ্যবান হয়ে। তারা না পড়েও নম্বর পায়, টিকিট কিনলেই লটারি জেতে, প্লেনে উঠলেই এয়ারহোস্টেস হাসি হাসি মুখে তাদের এসে বলে, দাদা আপনার টিকিট আপগ্রেড হয়ে বিজনেস হয়ে গেছে। বলাই বাহুল্য, আমি এদের মধ্যে পড়ি না। নম্বর আর লটারির মোহ আমার আর নেই, কিন্তু ইকনমির পয়সায় বিজনেস ট্র্যাভেলের সুপ্ত ইচ্ছেটা এখনও আছে। এখনও কারও টিকিট আপগ্রেডেড হয়েছে শুনলে হিংসের আলতো খোঁচা টের পাই। এই ছবিগুলো দেখে সে খোঁচা একটু কমল। যতই কপাল ভালো হোক, এমন বিজনেস ক্লাসে তো আর চড়তে পাবে না।

আজ দুপুরেই 3-D চশমা পরে How To Train Your Dragon 2 দেখে এলাম। এসে দেখি এরা খবরের কাগজে 3-D বিজ্ঞাপন বানিয়ে ফেলেছে। 

সর্বনাশ করেছে। মোটে এইক'টা সপ্তাহ বাকি?

নাঃ, সময় বাঁচাতে এক্ষুনি সকালে আরও একঘণ্টা আগে ওঠা প্র্যাকটিস করতে হবে। আর সে জন্য আমার চাই হিউম্যান অ্যালার্ম ক্লক।


আনন্দমেলার প্রথম সংখ্যা দেখতে কেমন ছিল কারও জানা আছে?

লিস্টের বাকি আবিষ্কারদের কথা জানি না, গুটেনবার্গের আবিষ্কারটার ব্যাপারে বলতে পারি, ওটা পঞ্চাশ কেন, পৃথিবীর সর্বকালের সেরা তিনটে আবিষ্কারের মধ্যেও হেসেখেলে জায়গা পাবে।



ফোটোগ্রাফি-উৎসাহীদের উদ্দেশ্যেঃ এর মধ্যে কোনও রোগ আপনার আছে নাকি?

It is rather anonymous as a typeface . . . it isn’t showy and making you look  at it . . . it is a typeface that is easy to read . . . it speaks clearly and pronounces itself with intent.
It is Times New Roman. আমার প্রিয়তম টাইপফেস/ফন্ট।

আমার চেনা একজনের Nomophobia আছে। আর আমার আছে Hippopotomonstrosesquipedaliophobia.

আপনি কি আমার মতো অচিরেই পলিথিন ব্যাগের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়তে চলেছেন, কিন্তু আমারই মতো ‘পাছে কাজে লাগে’ ভয়ে সেগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারছেন না? তাহলে এই ট্রিকটা আপনার কাজে লাগলেও লাগতে পারে।

পৃথিবীর দ্বিতীয় সুস্বাদুতম আইসক্রিম যিনি বানিয়েছেন, সেই Jenni Britton Bauer-এর একটি দিন।

এবার বিশ্বকাপ নিয়ে কিছু কথা হয়ে যাক। বিশ্বকাপ নিয়ে বেশি জানেন না বলে কমপ্লেক্সে ভুগছেন কি? তাহলে এই লিংকটা আপনার কাজে লাগবে। (স্পেনসংক্রান্ত টোটকাটা ইগনোর করবেন) (আবার সুগতর দৌলতে)

চিলি আর মেক্সিকোর খেলোয়াড়দের জন্য আমার সহানুভূতি রইল।

সবশেষে এ সপ্তাহের জন্য রইল একটি সময়োপযোগী সংগীত।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.