July 31, 2014

রামগড় ২




রামগড়ের জল ভালো বলতে হবে। রাত ন’টার সময় ওইরকম গরগরে চিকেনের ঝোল আর রুটি খেয়ে ঘুমোতে গেলাম, সকালে উঠে দেখি চোঁ চোঁ খিদে পেয়ে গেছে। আটটার সময় বেড টি খেয়ে, স্নানটান করে ন’টার সময় ডাইনিং রুমে গিয়ে মাখনপাঁউরুটি আর ডবল ডিমের অমলেট খেয়ে তবে পেট খানিকটা ঠাণ্ডা হল।

রামগড়ে পৌঁছনোর আগে আমাদের কিছুই প্ল্যান করা ছিল না। কী করব, কী দেখব, কোথায় যাব। গাড়িতে যেতে যেতে পবন সিং জানতে চেয়েছিল শনিবার আমাদের প্ল্যান কী। কিছুই না শুনে পরামর্শ দিল মুক্তেশ্বর ঘুরে আসার।

ভেবে দেখলে পরামর্শটা খুব একটা খারাপ নয়। মুক্তেশ্বর রামগড়ের থেকে মোটে পঁচিশ কিলোমিটার আর মুক্তেশ্বর যাওয়ার ইচ্ছে আমাদের অনেকদিনের। অবশ্য শুধু যাওয়ার নয়, ইচ্ছেটা গিয়ে থাকার। কে এম ভি এন গেস্টহাউসের বারান্দায় বসে নন্দাদেবী অবলোকন করতে করতে পকোড়া খাওয়ার। এখন সে হওয়ার জো নেই। কিন্তু নেই বলেই মনের দুঃখে এতদূর এসে ফিরে যাওয়াটা খুব একটা বুদ্ধির কাজ হবে না।

শুক্রবার সন্ধ্যেতেই রিসেপশনে বলে রেখেছিলাম গাড়ির কথা। শনিবার সকালে এসে আমাদের মুক্তেশ্বর ঘুরতে নিয়ে যাবে। মুক্তেশ্বরে কী কী দেখার আছে সেটা অবশ্য আর চেক করার উপায় নেই। নো ইন্টারনেট। পুরোনো পদ্ধতির সাহায্য নিতে হল। তাক করে থেকে যেই মুহূর্তে ফোনের টাওয়ার একটা ভদ্রস্থ অবস্থায় পৌঁছল ফোন লাগালাম।

বাবা, কেমন আছ?

দারুণ, দারুণ। তোরা কেমন ঘুরছিস?

খুব ভালো বাবা। আমরা ভাবছি কাল মুক্তেশ্বর যাব। গাড়ি বলে দিয়েছি। কী কী দেখার আছে গো?

বাঃ বাঃ, মুক্তেশ্বর দারুণ জায়গা। মেঘ না থাকলে পুরো রেঞ্জ দেখতে পাবি।

আর?

আর ওই তো মন্দির দেখবি, চউলি কি জালি বলে একটা জায়গা আছে মন্দিরের গায়েই, সেটা দেখবি। ওখান থেকেই নন্দাদেবী দেখা যাবে। অবশ্য যদি মেঘ না থাকে।

গুড গুড।

আর একটা অ্যানিম্যাল রিসার্চ সেন্টার আছে অনেকদিনের পুরোনো। সেটা দেখতে পারিস।

থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ বাবা।

অর্চিষ্মান আছে নাকি হাতের কাছে?

বাবা জামাইয়ের সঙ্গে আলাপ করতে লাগলেন। আমি পকোড়ার খোঁজে বেরোলাম।

গাড়ি আসার কথা ছিল শনিবার সকাল দশটায়, এল এগারোটা বাজতে দশে। আমরা ততক্ষণ গেস্টহাউসের সামনের রাস্তা দিয়ে এদিকে এক কিলোমিটার ওদিকে এক কিলোমিটার মতো হেঁটে ফেললাম, ছাদে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ ফোটো সেশন করলাম। এই করে প’নে এগারোটা বাজল। তখন ‘ধুত্তেরি’ বলে ঘরে ঢুকে বই নিয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়েছি এমন সময় শুনি বাইরে প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁ।

গাড়ি চলল। আকাশ কালকের থেকে পরিষ্কার কিন্তু ঝকঝকে রোদ এখনও বেরোয়নি। মুক্তেশ্বরে ভিউর সম্ভাবনা এখনও আশান্বিত হওয়ার মতো কিছু নয়। পথের রক্ষণাবেক্ষণ যথারীতি ভালো। চকচকে পথ, ঝকঝকে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হু হু করে গাড়ি ছুটল। খাদের ধারে ধারে মোটা স্ল্যাবের পাঁচিলের গায়ে শ্যাওলা জমে রয়েছে। বেশ কয়েকটা রোগা কিন্তু তেজী ঝর্ণাও পেরোলাম। চলতে চলতে কুয়াশা ক্রমে বাড়তে লাগল। বোঝা গেল নন্দাদেবী কপালে নেই। আমি দুঃখিত হওয়ার চেষ্টা করেও পারলাম না। ভিউর মহিমা আমি ঠিক বুঝি না। দূরে বরফঢাকা পাহাড় ঝলমল করতে দেখলে ভালো লাগে ঠিকই, কিন্তু না দেখতে পেলেও আফসোস হয় না। হাতের কাছের সবুজ পাহাড়, উইন্ডস্ক্রিনের ওপাশে গাছের চাঁদোয়াঢাকা মোলায়েম রাস্তা, রাস্তার ধারে ধারে আপেলবাগান – এও তো ভিউ। সি. আর. পার্কের নোংরা বাজারে এ ভিউই বা কে দু’বেলা দেখতে সাধছে?

রামগড়ের খ্যাতি আছে ফ্রুট বোল অফ কুমাউন বলে। আপেল, পিচ, ন্যাসপাতি গাছে পাহাড় একেবারে ছয়লাপ। আমাদের গেস্টহাউসের পেছনেই আছে একখানা অরচার্ড, সেটায় কাল সকালে ইচ্ছে হলে যেতে পারি। বাগানে আপেল আর বেশি নেই, সব চলে গেছে দিল্লিবম্বের বাজারে, এখন যে ক’টা আছে মালিকরা তাদের ওপর নীল মশারি বিছিয়ে রেখেছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম পাখির ভয়ে কি না। জানা গেল পাখির ভয় তো আছেই, তার থেকেও বেশি আছে বৃষ্টির ভয়। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে আপেলের গায়ে কালো কালো দাগ হয়ে যাবে আর অমনি শহুরে বাবুরা সে আপেল দেখে নাক কুঁচকোবেন।

মুক্তেশ্বরের অল্প আগে ভাটেলিয়া বলে একটা ছোট বাজার মতো জায়গা এল। বেশ কয়েকটা দোকান, জুতোর, মিষ্টির, ফলের। দোকানের মাথায় করিনা কাপুর খুব কায়দা করে মাথা হেলিয়ে লিমকা খাচ্ছেন। আমি জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখতে দেখতে চললাম। বব্বু বর্মা কা জেনারাল স্টোর্স, বব্বু বর্মা কা মোবাইল কি দুকান, বব্বু বর্মা কা সোনে কি গহনে কি দুকান। বব্বু বর্মার বংশধর হয়ে জন্মালে বেশ পায়ের ওপর পা তুলে জীবন কাটানো যেত। মিসটেক মিসটেক।

একটু বাদে রাস্তার পাশে দাঁড় করানো অনেকগুলো গাড়ির পাশে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে ড্রাইভারজী বললেন, ‘মুক্তেশ্বর আ গয়া।’



পাহাড়ের ভিউ বাদ দিলে মুক্তেশ্বরের মুখ্য আকর্ষণ হচ্ছে সাড়ে তিনশো বছরের পুরোনো একটা শিবের মন্দির। মন্দির যেমন হয় তেমনই। উঁচু উঁচু সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাও, জুতো খোল, ঘণ্টা বাজাতে ইচ্ছে হলে বাজাও, পুজো দিতে ইচ্ছে হলে দাও, না হলে ভেজা মেঝেতে পা টিপে টিপে মন্দিরের আশেপাশে ঘোরো। মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি গায়ে মানসিকের সুতো পেঁচিয়ে আরও মোটা হয়ে গেছে, দেখ। তারপর আবার পা টিপে টিপে এসে জুতো পরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এস।   

মুক্তেশ্বরের মন্দির থেকে নেমে এসে একটা প্যাঁচালো রাস্তা দিয়ে পেছন দিকে খানিকটা হেঁটে গেলে যে জায়গাটা আসে সেটা দেখেই আমার প্রথমে জে এন ইউ ক্যাম্পাসের পার্থসারথি রকসের কথা মনে পড়েছিল। এই জায়গাটার নাম অবশ্য পার্থসারথি রকস নয়, এই জায়গাটার নাম হচ্ছে চউলি কি জালি। অনেকদিন আগে, আমিও যখন জন্মাইনি, তখন নাকি এখানে এক দেবীর সঙ্গে এক দৈত্যের মারকাটারি যুদ্ধ হয়েছিল। এখানে দাঁড়ালেই চোখের সামনে নন্দাদেবী ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গকে দেখতে পাওয়ার কথা, কিন্তু মেঘের চোটে আমরা কিছু দেখতে পাইনি।
   

আনা কারেনিনা বলে গেছেন, সব সুখী সংসারই অবিকল এক, বৈচিত্র্য দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে অসুখী সংসারে। এক একটার এক এক রকম অসুখ। আনা কারেনিনা সুখঅসুখের বিষয় আমার থেকে অনেক বেশি বোঝেন, তাঁর কথার ওপর কথা আমি বলতে চাই না। খালি সামান্য একটি পর্যবেক্ষণ জুড়তে চাই। আমার পর্যবেক্ষণ অবশ্য অসুখের মতো ভারি ব্যাপার সংক্রান্তও নয়, বরং সমস্যাজনিত বলা উচিত। সব সংসারের সমস্যা আলাদা আলাদা হয় কিন্তু প্রতিটি সংসারের একটি নিজস্ব সমস্যা থাকে। যেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খুব বেশি বদলায় না। অর্থাৎ কি না থিম সমস্যা। ছোটবেলায় দেখেছি আমার বাবামায়ের সংসারের থিম ছিল লেট হয়ে যাওয়া। সব জায়গাতেই আমরা শেষমুহূর্তে হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছতাম। এটার জন্য যে বাড়ির কোনও একজন নির্দিষ্ট সদস্যকে দায়ী করা যায় তেমন নয় কিন্তু। দোষী চিহ্নিত করতে পারলে তো সে দোষ শুধরে নেওয়াই যায়, যায় না বলেই দোষ ক্রমে দীর্ঘস্থায়ী থিমে পরিণত হয়। কিছুতেই আমরা ভদ্রস্থ সময়ে বাড়ি থেকে বেরোতে পারতাম না। বাবা বলতেন, আমি তো রেডি। মা বলতেন, আমিও তো রেডি। আর আমি তো সেই কখন থেকে রেডি। বারান্দার উঁচু চেয়ারে বসে বাটা কোম্পানির গুড বয় শু পরা পা দুলিয়ে দুলিয়ে আকাশবাতাস দেখছি। সকলেই রেডি অথচ বাড়ি থেকে বেরোনো যাচ্ছে না। আশ্চর্য ব্যাপার।

এক বছর দু’মাস অতিবাহিত হওয়ার পর দেখছি আমার আর অর্চিষ্মানের সংসারেও একটা সমস্যার থিম ফুটে বেরোচ্ছে। আমাদের কেবলই ক্যাশ ফুরিয়ে যায়। আর ঠিক সেই সব জায়গাতেই ফুরোয় যেখানে কার্ড চলে না। গোয়া নিবাস, কুমায়ুন মণ্ডল গেস্টহাউস। ঠিক সেই সব জায়গাতেই ফুরোয় যেখানে হাতের কাছে এ টি এম-এর টিকিটিও নেই। দোষ আমাদের কারও নয়, দোষ পরিস্থিতির। এই যেমন রামগড়ের পরিস্থিতিটার কথাই ধরা যাক। মানিব্যাগে ক্যাশ ছিল যথেষ্টই। কিন্তু দুম করে গাড়িভাড়া করে মুক্তেশ্বর চলে যাওয়ায় সে টাকা খরচ হয়ে গেল, এবং যা হাতে রইল, হিসেব করে দেখা গেল সে টাকা দিয়ে লাঞ্চ ডিনার চা পকোড়ার দাম মিটিয়ে চেক আউট করে বেরোনো যাবে না।

আমরা মানিব্যাগ হাতড়ে একে অপরের দিকে তাকাতাকি করছি দেখে রিসেপশনিস্ট আশ্বাস দিলেন। মুক্তেশ্বরে নাকি একটা এ টি এম খুলেছে স্টেট ব্যাংকের। বেড়াতে গিয়ে টাকা তুলে নিলেই হবে। ফাঁড়া জোর কাটানো গেছে ভেবে আমরা নাচতে নাচতে মুক্তেশ্বরের দিকে রওনা দিলাম। এ সব জায়গার একটা বড় সুবিধে হচ্ছে যে পাহাড়ের টঙে বেশি জায়গা পাওয়া যায় না বলে সব জিনিস কাছাকাছি বানাতে হয়। মন্দির, এ টি এম, গেস্টহাউস, সবই একটা আরেকটার ঘাড়ের ওপর। মন্দির যাওয়ার পথে আমরা এ টি এম দেখতে পেলাম আর ঠিক করলাম ফেরার পথে টাকা তুলে নিয়ে যাব।

ফেরার পথে কী হল নিশ্চয় আঁচ করতে পারছেনঝকঝকে নতুন এ টি এম-এ ঢুকে বোতাম টেপাটিপি করতেই স্ক্রিনে সেই সাংঘাতিক ক’টি কথা ভেসে উঠল। আউট অফ অর্ডার। বাইরে বেরিয়ে দেখি ব্যাংকের দরজার বাইরে একজন দ্বাররক্ষী উদাস মুখে বসে বসে খইনি টিপছেন। আমাকে দেখে বললেন, 'সার্ভার ডাউন হ্যায়।' আমি বললাম, ‘আসপাস অর কোই. . .?’ তাতে উনি খইনিতে ফাইন্যাল চাঁটি মেরে, ফুঁ দিয়ে ভুষিটুষি উড়িয়ে যে জায়গাটার নাম বললেন, সেটা বেসিক্যালি আরেকটা হিলস্টেশন। পরের বছর গরমে আসার প্ল্যান করছি।

হোটেলে ফেরার পথে আবার বব্বু বর্মার সাম্রাজ্য, মশারিমোড়া গোলাপি আপেলের বাগান ইত্যাদি এল আর গেল, কিন্তু এবার আর অত মন দিতে পারছিলাম না। ক্যাশ জোগাড়ের চিন্তায় তখন মাথা ভার। একটা সম্ভাবনার কথা দুজনের মাথাতেই এসেছিল, হোটেলে ফিরে দৌড়ে রিসেপশনিস্টকে জিজ্ঞাসা করতে যেতে তিনিও সেই কথাটাই বললেন।

ভওয়ালি।

সেই যে নোংরা টাউনশিপ পেরিয়ে এসেছিলাম রামগড় মনে আছে? খুব নাক কুঁচকেছিলাম? আমাদের এখন বাঁচালে বাঁচাতে পারে ভওয়ালি। আর কেউ নয়। হ্যাঁ, রামগড় থেকে বাস যায় বৈকি। এই তো এখন বাজে দুটো দশ, টল্লা রামগড় থেকে আড়াইটের সময় মল্লা বাজারে বাস আসবে, সেটায় করে ভওয়ালি গিয়ে এ টি এম থেকে টাকা তুলে সাড়ে তিনটের বাসে চেপে আবার ফিরে আসলেই হবে।

আড়াইটে? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবার পেছন ফিরে ছুটতে যাব, দয়ালু রিসেপশনিস্ট ডেকে বললেন, আরে খেয়ে যান, রান্না হয়ে গেছে। ডাইনিং রুমে হইচই পড়ে গেল। আমাদের বাঁধা চেয়ারদুটোতে বসে আবার ভাত, চাপাটি, ডাল আর মিক্সড ভেজ কোনওমতে নাকে মুখে গুঁজে আমরা ছুটে রাস্তায় বেরোলাম। রিসেপশনিস্ট গেস্টহাউসের উঁচু বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখের ওপর হাতের ছাউনি দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, আমাদের আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘আরে ধীরে যাইয়ে, আভিভি দো কিলোমিটার দূর হ্যায়।’

আমরা একশো মিটার খাড়াই রাস্তা ভরা পেটে জিভ বার করে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠতেই বাস প্রবল বিক্রমে এসে আমাদের পেছন থেকে ধরে ফেলল। কী ভিড়, বাপরে। সিট পাওয়ার প্রশ্নই নেই। আমি সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পর মাথার ওপর আর ইঞ্চিদুয়েক জায়গা বাকি ছিল, অর্চিষ্মান বেচারাকে প্রায় কোমর থেকে হাফ ভাঁজ করে দাঁড়াতে হল। বাস গোঁ গোঁ আওয়াজ তুলে হেলেদুলে চলল। ভিড়, অষ্টাবক্র ভঙ্গি আর মাথার ভেতর ভয় (ভওয়ালির এ টি এমেরও যদি সার্ভার ডাউন থাকে?), সে এক চমৎকার ত্র্যহস্পর্শ। অবশেষে অনন্তকাল পরে দূর থেকে ভওয়ালির বাজার দেখা গেল, আমরা লাফ মেরে নেমে দৌড়লাম।

এ টি এম কাঁহা ভাইসাব?

আগে, আগে।

আগে আগে করতে করতে যখন শহর প্রায় ফুরোয় ফুরোয়, তখন চেনা নীলসাদা বোর্ড দেখে মন নেচে উঠল। গোটা গোটা করে লেখা ভারতীয় স্টেট ব্যাংক, তার নিচে জাম্বো সাইজের একখানা তীরচিহ্ন আঁকা। ব্লিচিং পাউডার ছেটানো একটা ছোট গলি আর খান দশেক সিঁড়ি পেরিয়ে অবশেষে এ টি এম। মহিমায় আমাদের কাছে তখন মুক্তেশ্বরবাবার মন্দিরের থেকে কোনও অংশে কম নয়। কার্ড ঢুকিয়ে বোতাম টিপে যখন দাঁড়িয়ে আছি তখন নাড়ির স্পিড নির্ঘাত মিনিটে মিনিমাম দেড়শো।

কা লে ক্ট  ই য়ো র  ক্যা শ।

আমি আগেও বলেছি, এখনও বলি, পরেও বলব। দীপিকা পাডুকোনকে কোন ব্যাংক বিশ্বমানের পরিষেবা দেয় তা জেনে আমার লাভ নেই। আমাকে ঘাটে মাঠে জলে জঙ্গলে পাহাড়ের টঙে যে উদ্ধার করে আমার আনুগত্য শুধু তার প্রতি। সে-ই আমার দিক থেকে মুক্তেশ্বরে মুখ ফেরাবে, আবার সে-ই ভওয়ালিতে আমাকে বিপদ থেকে হাত ধরে টেনে তুলবে। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নেক্সট ফিক্সড ডিপোজিটটাও এস বি আই-তেই খুলব ঠিক করে ফেলেছি।

এতক্ষণ পঞ্চেন্দ্রিয় নিজেদের নিয়ে বিভোর হয়ে ছিল, নিজেদের ভয়, নিজেদের নিরাপত্তা, নিজেদের সমস্যা। সে সমস্যা মিটে যেতে আবার নাককানচোখ খুলে গেল। ভওয়ালির চৌরাহার মোড়ে ফিরতি বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে চারদিক দেখতে লাগলাম। ছোট জুতোর দোকানের বাইরের রাখা বেঞ্চিতে ধৈর্য ধরে খদ্দেরের আশায় বসে রয়েছেন ব্যবসায়ী। পাশের সবজির দোকানের সামনের ঝুড়িতে দাদুর ছাতার কাঠের হ্যান্ডেলের মতো বেঁকানো একরকম জিনিস গাঁট করে বেঁধে রাখা আছে, এই বিঘৎখানেক লম্বা হবে, ট্র্যাফিক পুলিশ থেকে শুরু করে অফিসফেরৎ বাবু সকলেই সেটা কিনে বাড়ি যাচ্ছেন। খুব ভালো খেতে বোধহয়। একের পর এক জিপ, টাটা সুমো, সরকারি বেসরকারি বাস আসছে, লোক নামাচ্ছে, তুলছে, আবার ভোঁ বাজিয়ে চলে যাচ্ছে। দূরে কয়েকটা পুলিশ দাঁড়িয়ে গজল্লা করছে, কোনও টাটা সুমো অন্যায় রকম বেশি সময় দাঁড়িয়ে রাস্তা জ্যাম করলে মোটা তেলমাখানো বাঁশের লাঠি উঁচিয়ে ‘হ্যাট্‌ হ্যাট্‌’ বলছে, অমনি সুমো সুড়সুড়িয়ে সরে পড়ছে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যখন পায়ে ব্যথা হয়ে গেছে, আমি মাঝে মাঝে এক পায়ে দাঁড়িয়ে অন্য পা-টাকে একটু বিশ্রাম দিচ্ছি, এমন সময় একজন দয়ালু দেখতে ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপলোগ কাঁহা যাইয়েগা?’ বললাম, ‘রামগড়।’ ‘মল্লা ইয়া টল্লা?’ এ প্রশ্নটার উত্তর এখন জানি! যুগ্মকণ্ঠে চেঁচিয়ে বললাম, ‘মল্লা মল্লা!’ ভদ্রলোক আশা দিলেন, মল্লার বাস এই এল বলে। একটু পরে দেখি দূরে ময়ূরকণ্ঠী রঙের একখানা রাজকীয় বাস হেলেদুলে আসছে। আমি হ্যাংলার মতো জুলজুল করে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ওই তো এসে গেছে মল্লার বাস। আমি খুব করুণ গলায় বলার চেষ্টা করলাম, কই মল্লার বাস তো ধুলোমাখা আর বেঁটেমতো, সে বাসে তো ঘাড় সোজা করে দাঁড়ানো যায় না, এমন সময় কনুইয়ে টান পড়ল। দেখি অর্চিষ্মান অলরেডি বাসের দিকে ছুটবে বলে রেডি হয়েছে।

শিগগিরি চল, সিট খালি আছে এখনও কয়েকটা।

আমার রূপান্তরটা যদি আপনাদের দেখাতে পারতাম। কোথায় গেল সেই কাঁদোকাঁদো ভাব, কোথায় গেল পায়ের ব্যথা। ছুটে অর্চিষ্মানকে ওভারটেক করে, পাহাড়ি বাসের পাহাড়ের মতো উঁচু সিঁড়ি ‘হেঁইও’ বলে চড়ে, মেঝেয় রাখা বস্তার হার্ডল লাফিয়েঝাঁপিয়ে পেরিয়ে, এক রোগা ভদ্রলোককে এক ধাক্কায় জানালার দিকে চেপ্টে দিয়ে সিটের ধার দখল করা দেখে অর্চিষ্মানের চোখ কপালে।

তারপর আরও অন্তত লাখখানেক লোক বাসটায় উঠল। ছেলেবুড়ো, নারীপুরুষ, রোগামোটা, ফর্সাকালো। সবশেষে যখন ভাবছি এবার বাসটা চলতে পারলে হয়, তখন খিলখিল করতে করতে একদল কিশোরী উঠে, তাদের বিরাটবপু স্কুলব্যাগের গুঁতো দিয়ে ভিড় ফাঁক করে আমার আর অর্চিষ্মানের মধ্যবর্তী প্যাসেজটায় এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়েই কথা নেই বার্তা নেই, শুরু হল হাসি। খিলখিল খিলখিল। এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ে তো ও এর। আধমিনিট কথা, তিন মিনিট হাসি। সেই খিলখিলানি শুনতে শুনতে যখন আবার ভিড় ঠেলে মল্লা বাজারে নামলাম অর্চিষ্মান প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমিও ওই বয়সে অত হাসতে নাকি? বাপ রে বাপ।’

আমি মুখে একটা খুব স্মাগ লুক ফুটিয়ে বললাম, ‘আমি? ফুঃ। এদের সবার হাসি যোগ করে সেটাকে পঁচিশ দিয়ে গুণ করলে যেটা হবে সেটা আমার হাসির কাছাকাছি আসলেও আসতে পারে, তাও খানিকটা কম পড়বে।’

দিন ফুরিয়ে এল। আমরা হা-ক্লান্ত, কিন্তু সফল। এখন একবার বিছানায় এলিয়ে পড়লে আর উঠতে পারব না, তাই ঘরে যাওয়ার পথেই চা পকোড়ার কথা বলে যাওয়া হল। জানালার কাঁচের বাইরে অন্ধকার জমতে শুরু করেছে। ঝাপসা হয়ে আসছে দৃষ্টি। অদ্যই আমাদের রামগড়ে শেষ রজনী। আর চব্বিশ ঘণ্টা পর এই সময় শতাব্দী দিল্লির দিকে হাফ রাস্তা পেরিয়ে গেছে। পরশু অফিস। ডেডলাইন। টিভিতে খবরের চ্যানেলের চিৎকার। ফ্রিজে জমে যাওয়া মাছের ঝোল। মাগো।

তোমার মন খারাপ হচ্ছে না?

আবার আসব তো। শীতকালে আসব, মুক্তেশ্বরে থাকব। ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে বসে দেখব জানালার বাইরে নন্দাদেবী ঝলমল করছেন। জাস্ট ভাবো।

বুকের ভেতর দ্রুত ঘিরে আসা কুয়াশার ভেতর সেই ঝলমলে দৃশ্য প্রাণপণে কল্পনা করতে করতে আমি কচমচ করে পকোড়া খেতে লাগলাম।


                                                                                                                      (চলবে)


July 29, 2014

রামগড় ১




ডাক্তারবাবুর পেন প্রেসক্রিপশনের ওপর খসখসিয়ে চলতে চলতে থেমে গেল।

এখন? পাহাড়? পাগল নাকি? মোরাদাবাদ পর্যন্ত তো ফ্লাড। তাছাড়া শরীরের এই ছিরিতে?

পেনটা কাগজ থেকে উঠে এসে বন্দুকের নলের মতো ওপরনিচে আমাকে জরিপ করল খানিকক্ষণ।

আমরা দু’জনেই মুখ মাপমতো কাঁচুমাচু করলাম। যতটুকু করলে ভুলস্বীকার হয়, অপরাধবোধ ঠিক ঠিক ফোটে। আবার যতই ভুল হোক না কেন, আপনি যতই হেলথ-শেমিং করুন না কেন, ভুলটার শেষ দেখেই যে ছাড়ব, সেই প্রত্যয়টাও বুঝিয়ে দেওয়া যায়। ডাক্তারবাবু যা বোঝার বুঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাকি প্রেসক্রিপশনটুকু শেষ করলেন। বললেন, ‘ওষুধ নিয়ে যেও, ডোজ মিস কোর না, সোমবার আবার এস।’

আমরা একেবারে টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে ‘নিশ্চয় নিশ্চয়’ বললাম। ঠেলাঠেলি করে ঘর থেকে বেরোনোর আগের মুহূর্তে ভদ্রতা করে জুড়ে দিলাম, ‘আসলে অনেএএএকদিন থেকে আশা করে রয়েছি তো . . .’

ডাহা মিথ্যে কথা। বাহাত্তর ঘন্টা আগেও জানতাম না যে রামগড় যাব। কোথাও একটা যাওয়ার ইচ্ছে তো হচ্ছে সেই রণথম্ভোরের বাঘের মুখ থেকে বেঁচে ফেরা ইস্তক। সকাল বিকেল দুপুর মাঝরাত্তির ভাবছি মান্ডু? (ট্রেনের টিকিট ওয়েটিং লিস্ট একশো চুয়াল্লিশ) মুসৌরি? (দুজনেরই দেখা) মাউন্ট আবু? (যার দেখা নেই সে নাম শুনলেই ঠোঁট ছ্যাতরাচ্ছে) তারপর গত পরশু এসপার কি ওসপার ভঙ্গিতে জায়গা স্থির করে (সাড়ে চার মিনিট), দিল্লি কাঠগোদাম শতাব্দীর সিট অ্যাভেলিবিলিটি চেক করে টিকিট কেটে (সাড়ে তিন মিনিট), কুমায়ুন মণ্ডল বিকাশ নিগমের রুম অ্যাভেলিবিলিটির চার্ট পরীক্ষা করে অনলাইন ঘর বুক করে (আরও সাড়ে তিন) চ্যাটবক্সে হাই হায়ার হায়েস্ট ফাইভ।

দিল্লি থেকে রামগড় যাওয়া প্রায় তিব্বত যাওয়ার মতোই সহজ। শতাব্দী চেপে পাঁচ ঘণ্টায় কাঠগোদাম, কাঠগোদাম থেকে প্রাইভেট কারে চেপে দেড়ঘণ্টায় রামগড়। শতাব্দীযাত্রা নিয়ে কিছু বলার নেই। আমাদের পাড়ায় রায়ঠাকুমা বলে একজন ছিলেন, তাঁর সঙ্গে আমার ঠাকুমার ভাব আর ঝগড়া দুটোই সমান ছিল। একবার মনে আছে বারান্দায় থেবড়ে বসে হাতপাখা নাড়তে নাড়তে ঠাকুমা গর্ব করছিলেন যে এই তো এবার নাতনির স্কুলে গরমের ছুটি পড়লেই সবাই মিলে মথুরা বৃন্দাবন গয়া কাশী যাওয়া হবে। শুনে রায়ঠাকুমা মুখ বেঁকিয়ে বলেছিলেন, কী জানি বাবা, গরমকালে আবার তীর্থ কীসের। ‘আমরা তো যেত্তবার গেসি, শীতেই গেসি।’ আমরাও যেত্তবার শতাব্দীতে চেপেছি ট্রেন টাইমে ছেড়েছে, টাইমে পৌঁছেছে, রাস্তায় যথেষ্ট খাবারদাবার দিয়ে আমাদের মনোরঞ্জন করেছে। লোকে কতরকম লাইফ প্রোজেক্ট করে, সাইকেলে চেপে দুনিয়া ঘুরতে বেরোয়, কুকবুকের গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত সব রান্না রাঁধে, আমরা ভাবছি দিল্লি থেকে শতাব্দী চেপে যেখানে যেখানে যাওয়া যায়, সব জায়গা যাওয়ার একটা প্রোজেক্ট নেব। তা সে জায়গা যাওয়ার মতো হোক আর নাই হোক। কেমন হবে?

ট্রেনে উঠলেই এত খিদে পায় কেন কে জানে। বিশেষ করে যদি জানা থাকে যে খেতে দেবে তবে তো আর রক্ষা নেই। ক্ষণে ক্ষণে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখ, পাশের লোককে বলে রাখ। যদি ঘুমিয়ে পড়ি ডেকে দিও কিন্তু। ন্যাতানো কাটলেট মিস হয়ে গেলে বলা যায় না, মনের দুঃখে হয়তো মরেই গেলাম। ট্রেনে আরও একটা জিনিস ফ্রিতে পাওয়া যায়, সেটা হচ্ছে লোক পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ। ঘণ্টাপাঁচেকের নিষ্ক্রিয়তার বিনিময়ে জীবনের সারসত্য সঞ্চয়ন। এবারের ট্রিপ থেকে যে সত্যটি আহরণ করেছি সেটি হচ্ছে যে দূঊঊঊরে যে বাচ্চাগুলো বসে থাকে, মাঝে মাঝে মাবাবার কোলে চেপে পাড়া বেড়াতে বেরোয়, গোল চোখ আরও গোল করে আমাদের দিকে হাঁ করে তাকায়, যেন আমাদের ধড়ের ওপর মুণ্ডুর জায়গায় ইউ এফ ও বসানো আছে - সে বাচ্চাগুলো এত্ত মিষ্টি, এত্ত মজার, ভাবা যায় না। আর যে বাচ্চাগুলো আমাদের আশেপাশে বসে সেগুলো সব একএকখানা যন্ত্র। নৃসিংহঅবতারের ডিরেক্ট বংশধর। চেঁচাচ্ছে, কাঁদছে, ঘ্যানঘ্যান করছে, গুরুজনের কথা এককান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বার করে দিচ্ছে, বুট পরা পা দিয়ে ক্রমাগত সিটের পেছনে লাথাচ্ছে - সে এক ভয়াবহ ব্যাপার।

টানা পাঁচঘণ্টা লাথি খেতে খেতে কাঠগোদামে পৌঁছলাম। নেমে অবশ্য নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর সোনালি রোদ্দুর দেখে মন ভালো হয়ে গেল। পরবর্তী কর্মপদ্ধতি না বুঝতে পেরে ন যযৌ ন তস্থৌ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় পবন সিং এসে স্যালুট ঠুকে বলল, ‘চলিয়ে সারজী, কাঁহা চলনা হ্যায়।’
আমরা অবশ্য তখনও জানি না যে আমার থেকেও হাইটে দু’ইঞ্চি ছোট এই হাসিমুখো লোকটার নাম পবন সিং। আমরা বললাম রামগড় যাব, পবন সিং একটা দাম বলল। দু’পক্ষেরই দু’পক্ষের প্রস্তাব মনে ধরল। পবন সিং অ্যাবাউট টার্ন করে সুদর্শন চক্রের মতো গাড়ির চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে চলল, আমরা পেছন পেছন দৌড়লাম। একটু দূরে রাখা একটি দুধসাদা অল্টোর ট্রাঙ্কের দরজা খুলে ওষুধের কোম্পানির নাম লেখা আমাদের লালকালো ব্যাগ ঢোকাতে যাবে, এমন সময় পবন সিং থমকে গেল।

‘রামগড় তো সমঝা, লেকিন কওনসা রামগড়? মল্লা ইয়া টল্লা?’

অ্যাঁ? এসব আবার কী?

ততক্ষণে চারপাশে গাড়িওয়ালাদের ভিড় জমে গেছে। ভারতবর্ষে এই একটা দেখার মতো জিনিস। যত না লোক, লোকের হাতে সময় তার থেকে বেশি। আমাদের গাড়ি ঠিক হয়ে গেছে, দরাদরির আর সুযোগ নেই, তবু লোকজন সঙ্গে সঙ্গে এসেছে কী হয় দেখার জন্য। বলা যায় না, ইন্টারেস্টিং কিছু এখনও ঘটতে পারে। চশমাপরা মহিলার হঠাৎ মৃগী অ্যাটাক হতে পারে, লম্বা লোকটার হঠাৎ পবন সিং-এর সঙ্গে মারামারি লাগতে পারে।

পবন সিং-এর দ্বিধা দেখে ভিড় উৎসাহিত হয়ে উঠল। তেড়েফুঁড়ে জানতে চাইল, ‘হাঁ হাঁ, মল্লা ইয়া টল্লা? টল্লা ইয়া মল্লা?’

বোঝা গেল দুইখান রামগড় আছে। এক মল্লা, আরেক টল্লা। মল্লা খানিক ওপরে, টল্লা খানিক নিচে। জটলার মধ্যে থেকে দুয়েকজন আমাদের আগাপাশতলা দেখে নিয়ে রায় দিলেন, ‘মল্লা, মল্লা। কুমায়ুন মণ্ডল রেস্ট হাউস।’ জহুরির জাত, দেখেই বুঝেছেন আমরা সরকারি গেস্ট হাউসের পাবলিক, ক্লাব মহিন্দ্রার বাংলো বুকিং নেই আমাদের।

টল্লা না মল্লা, মল্লা না টল্লা – চরম সাসপেন্স আর গুনগুনানির মধ্যে এক কান আঙুল দিয়ে চেপে কে এম ভি এন গেস্টহাউসে ফোন করে জানা গেল জহুরি নির্ভুল। আমাদের যেতে হবে মল্লা রামগড়েই। সম্মিলিত হাঁফ ছেড়ে ভিড় অবশেষে পাতলা হয়ে গেল। পবন সিং খুব খুশি হয়ে দড়াম করে ট্রাংকের ঢাকনা বন্ধ করে দরজা হাট করে খুলে ধরল, উঠে পড়লাম। একটা প্রশ্ন বুকের ভেতর খোঁচাচ্ছিল, না জিজ্ঞাসা করে পারলাম না। বললাম, ‘টল্লা হোতা তো প্রবলেম হোতা?’ কে জানে বাবা হয়তো বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। পবন সিং আয়না দিয়ে আমাদের চোখে চোখ রেখে হেসে বলল, ‘কেয়া প্রবলেম ম্যাডাম। মল্লা বোলে তো মল্লা চলে যায়েঙ্গে, টল্লা বোলে তো টল্লা। সাত আট কিলোমিটার কি তো বাত হ্যায়।’

গিয়ার চেঞ্জ করল পবন সিং।

‘লেকিন যানা শুরু করনে সে পহেলে কাঁহা যানা হ্যায় ইয়ে ক্লিয়ারলি পাতা হোনা চাহিয়ে, হ্যায় না?

এমন অনির্বচনীয় দর্শন শুনে সারাশরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। টের পেলাম বাতাসের তাপমাত্রা বেশ খানিকটা কমেছে অলরেডি। লালকালো নাগা শাল রেডি ছিল হাতের কাছেই, বার করে মুড়িসুড়ি দিয়ে বসলাম। জানালার কাঁচ তুলে দিলাম। আয়না থেকে ঝুলন্ত লালরঙের প্লাস্টিকের হনুমানঠাকুর এক হাতে গদা আরেক হাতে গন্ধমাদন নিয়ে দুলতে দুলতে অভয় দিতে দিতে চললেন।

রামগড় হচ্ছে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের একটি ছোট্ট পাহাড়ি শহর। রামগড়ের অসুবিধে (বা সুবিধে) হচ্ছে বেচারা পড়ে গেছে বাঘা বাঘা টুরিস্টপ্লেসের মাঝখানে। এ দিকে নৈনিতাল, ও দিকে মুক্তেশ্বর – এর মধ্যে রামগড় আর বেশি পাত্তা পাচ্ছে না। রামগড়ে কী দেখার আছে জিজ্ঞাসা করলে সবাই মাথা চুলকে বলছে, ইয়ে . . . মানে . . . এই তো চারটি আপেল বাগান আর পাহাড়। প্রশ্নকর্তা বাঙালি বুঝতে পারলে জুড়ে দিচ্ছে, আর হাঁ হাঁ, রভিন্দরনাথ টেগোর এখানেই বসে গীতাঞ্জলীর অর্ধেক লিখ্‌খা থা।

রামগড়ে যেতে গেলেও ব্যাপারটা বোঝা যায়। এক একটা মোড় পেরোয় আর পবন সিং বলতে থাকে, এই গেল আলমোড়ার রাস্তা, এই গেল চারধামের, এই গেল অমুকের, এই গেল তমুকের। চলতে চলতে আমরা ভীমতাল পেরোলাম। অজ্ঞাতবাস চলাকালীন ঘুরতে ঘুরতে দ্বিতীয়পাণ্ডব এ দিকে এসে পড়েছিলেন, এমন সময় তাঁর ভয়ানক তেষ্টা পেল। আমরা হলে জলের খোঁজে এদিকওদিক যেতাম, একেতাকে জিজ্ঞাসা করতাম, ভীম ওসব হাঙ্গামায় গেলেন না। কাঁধের গদা দিয়ে মাটির ওপর ধাঁই করে মারলেন এক বাড়ি, অমনি মাটি ফুটো করে মস্ত এক দিঘি বেরোল। দিঘির নাম হল ভীমতাল। ভীমের তেষ্টা বহুদিন মিটে গেছে, ভীমতাল এখন আশেপাশের লোকালয়ের তেষ্টা মেটায়। পবন বলল, হলদোয়ানি পর্যন্ত নাকি ভীমতালের জল সাপ্লাই হয়। ব্যাপারস্যাপার দেখে হাঁ হয়ে আছি, এমন সময় পবন বলল, ‘কোই মিল গয়া দেখা থা?’ আমি দেখিনি, কিন্তু গল্পটা ওপরওপর জানি আর কে কে অ্যাকটিং করেছিল তাও জানি। কাজেই মাথা নেড়ে দিলাম। পবন বলল, ওই যে একটা সিন ছিল না যেখানে ‘প্রীতি জিন্টা হাথ মে ফুল লেকে খিড়কি কি বাহার ভাগাদৌড়ি কর রহে থে?’ প্রীতি জিন্টাকে দেখিনি, কিন্তু নায়িকাদের হাতে ফুল নিয়ে ভাগাদৌড়ি করতে ঢের দেখেছি, কাজেই বিনা সংকোচে আবারও মাথা নেড়ে হাঁ হাঁ বলে দিলাম। ওই যে ওই বাংলোর সামনে, পবন আঙুল দিয়ে দেখাল। আমরা ‘রোককে রোককে’ বলে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলে নিলাম।


পবন নির্ঘাত আমাকে বলিউড বাফ ঠাউরেছে, জিজ্ঞাসা করল, 'বিবাহ্‌ ফিলিম দেখা হ্যায়? উসকা ভি শুটিং লেক কে আসপাস হি হুয়া থা।’

‘বিবাহ্‌’ আমি দেখেছি। মারাত্মক সিনেমা। সটাং অস্বীকার করলাম। ও সিনেমার সঙ্গে দূরদূরান্তের পরিচয়ও আমি স্বীকার করতে চাই না।


একপাশে পাহাড়, অন্যপাশে খাদের মধ্য দিয়ে আমরা এঁকেবেঁকে চললাম। এই সময় পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে সবুজ। সবুজ কাকে বলে দেখতে হলে বর্ষাকালে পাহাড়ে যেতে হবে। কাছেদূরের যত পাহাড় একেবারে ঘন বনে ছেয়ে গেছে। সেই বনের ফাঁক দিয়ে দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠেছে চকচকে কালো পিচরাস্তা। রাস্তার দু’পাশে জ্বলজ্বলে হলুদ রঙের বর্ডার। কাঠগোদাম থেকে রামগড়ের রাস্তা অবিশ্বাস্য রকমের ভালো। পবন সিং-এর অল্টো বাতাসের মতো উড়ে চলল। রাস্তার দু’পাশে কচুপাতার মতো বড় পাতাওয়ালা বড় বড় গাছের জঙ্গল ক্রমে পাইনের বন হয়ে গেল। শহর ক্রমশ ক্ষুদে থেকে ক্ষুদেতর হতে হতে শেষটায় ঘন কুয়াশার নিচে চাপা পড়ে গেল।

আর অমনি চোখের সামনে ফুটে উঠল অন্য একটা জগৎ। হেয়ারপিন বাঁকের মুখে পাঁচ বছরের শিশুর ছবি আঁকার খাতা থেকে উঠে আসা লাল টুকটুকে ছোট মন্দির, গায়ে অতি যত্নে ডিজাইন করে ওম্‌ লেখা। ছাগলের দল নিয়ে হাঁটছে অন্যমনস্ক কিশোরী। তেরপলের ছোট্ট ছাউনির নিচে উবু হয়ে বসে ভুট্টা সেঁকছে বুড়ো। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল নেমে গিয়ে কিনি, নিজেকে বকেঝকে সামলালাম। পাহাড়ি পথে বমি করার ট্র্যাক রেকর্ড দুজনেরই চমৎকার, যথাসম্ভব খালি পেটে মানে মানে গন্তব্যে পৌঁছতে পারলে বাঁচি।

তারপর এল ভওয়ালি। আর পাঁচটা নোংরা, ঘিঞ্জি পাহাড়ি টাউনের সঙ্গে কোনও ফারাক নেই। ভওয়ালির চৌরাহা আপনার শেষ সুযোগ, মাইন্ড চেঞ্জ করে রামগড়ের বদলে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার। কিন্তু আমরা গেলাম না। রামগড়েই যাব জেদ ধরে পড়ে রইলাম। জানালার পাশ দিয়ে হুসহুস করে ভওয়ালি পেরিয়ে গেল। যেই না পেরোল, পবন সিং আঙুল তুলে সামনের পাহাড়টার চুড়োর দিকে দেখাল। ও রহা রামগড়।

আপনি যদি ভাবেন পবন সিং-এর আঙুল বরাবর তাকিয়ে আমরা দেখলাম পাহাড়ের গায়ে সবুজ বনের ভেতর জেগে থাকা পুতুলের বাড়ির মতো ছোট ছোট রংচঙে বাড়ি, তাদের সারি সারি টিনের চালের ওপর খেলা করা রোদ্দুর তাহলে ভুল ভাববেন। রামগড়ে, অন্তত মল্লা রামগড়ে, ও সব কিচ্ছু নেই। পবন সিং যেটাকে বাজার বলে দেখাল, সেটা আসলে গুনে গুনে চারটে দোকানের একটা জটলা। বাজার থেকে খাদের দিকে নেমে যাওয়া একটা রাস্তা ধরে শ’খানেক মিটার ধরে নেমে গেলেই কুমায়ুন মণ্ডল বিকাশ নিগমের গেস্টহাউস। গেস্টহাউসে না থেমে সোজা আরও সাত কিলোমিটার নেমে গেলে টল্লা রামগড়।


আমরা থামলাম। পবন সিং-কে টা টা করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলাম। শুক্রবার দুপুরে পৌছনোর সুবিধে হচ্ছে তখনও গেস্টহাউস খালি। আপকো যো কামরা পসন্দ হো লে লিজিয়ে। কামরার শর্টলিস্ট ওঁরাই করে দিলেন। একশো এক আর একশো দু’নম্বর কামরাই বেস্ট। আমরা দুটো ঘরই ঘুরে দেখলাম, প্রায় অবিকল। টস করে একশো দুই উঠল। আমাদের আপত্তি সত্বেও লালকালো ব্য্যগ বয়ে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেলেন একজন। লাঞ্চমে কেয়া খাইয়েগা? তখন লাঞ্চের পক্ষে বেশ দেরি হয়ে গেছে। ভদ্রলোক নিজেই আগ বাড়িয়ে পরামর্শ দিলেন। এ বেলা ভেজ খেয়ে নিন, এক ঘণ্টার মধ্যে রান্না হয়ে যাবে, রাতে ননভেজ খাবেন’খন। তাই সই। ভাত, চাপাটি, ডাল, সবজির বায়না নিয়ে টুপি ছুঁয়ে ভদ্রলোক চলে গেলেন। আমরা মেন দরজার ছিটকিনি তুলে দিয়ে বারান্দার দিকের দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম।

আর বেরোনো মাত্র দুজনেরই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে গেল।


খাবারের ডাক এল। পেতলের বাটি করে ধোঁয়া ওঠা ভাত, জিরে ফোড়ন দেওয়া ডাল, আলু বিন ক্যাপসিকামের মাখোমাখো মশলাদার মিক্সড ভেজ। ফয়েল মোড়া বাহারি কঞ্চির ঝুড়ি করে হাওয়ার মতো হালকা, গরম গরম ফুলকো রুটি। একেকবারে দুটো করে। শেষ হলে পরের দুটো। মিক্সড ভেজ যে অত ভালো রান্না হতে পারে আমি না খেলে বিশ্বাস করতাম না। কৃতিত্বটা আমাদের খিদের নাকি গেস্টহাউসের রাঁধুনির হাতের তারের কে জানে।

ঘরে ফিরে কখন চোখ লেগে এসেছিল টেরই পাইনি। ঘুম যখন ভাঙল তখন ঘরের মধ্যে প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। জানালার বাইরে একটা আবছা নীল আলো লেগে আছে তখনও। সুইচ টিপে দেখি আলো নেই। চিন্তাও নেই। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রাখা মোমবাতি আর দেশলাই আগেই নজরে পড়েছে। মোমবাতি জ্বালিয়ে চটি গলিয়ে রান্নাঘরের দিকে হাঁটলাম। চা আর পকোড়ার তেষ্টায় গলা শুকোচ্ছে মারাত্মক। ঘরের ভেতর অত বুঝিনি, দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই ঠাণ্ডায় শিরদাঁড়া কেঁপে উঠল। অর্চিষ্মান যখন হাফ সোয়েটার ব্যাগে পুরছিল খুব ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসেছিলাম, নেক্সট আড়াইদিন ও-ই হাসবে মনে হচ্ছে।

চা আর পকোড়া এসে গেল। আমরা জানালার দিকে তাকিয়ে বসে বসে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করলাম। চোখের সামনে কুয়াশা পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছিল। যেন খাদের নিচে কেউ লাখ লাখ উনুন একসঙ্গে জ্বালিয়ে দিয়েছে। ধোঁয়ায় পোড়া কাঠের বদলে খালি কে জানে কত শতাব্দীর শ্যাওলাজমা পাইনবনের ভেজা গন্ধ। ধোঁয়ার ঢেউ ক্রমে নীল আলোটার শেষ চিহ্নটুকু গিলে ফেলল। টিভির নিচের লাল আলোটা জ্বলে উঠেছিল বেশ কিছুক্ষণ আগেই। তবু আমরা আলো জ্বালালাম না। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। অনেক দূরে টল্লা রামগড়ের রাস্তায় দুয়েকটা গাড়ির হলুদ হেডলাইটের আলো মাঝে মাঝে জোনাকির মতো টিমটিম করতে লাগল।


                                            (চলবে)


July 27, 2014

সাপ্তাহিকী




বার্লিন শহরের রাজমিস্ত্রি। উৎস

প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি অবান্তরকে এতদিন ফাঁকা ফেলে রাখার জন্য। এ অবহেলার কারণ ছিল, আশা রাখি যথাসময়ে সে কারণ আপনাদের দর্শাতে পারব। কিন্তু এখনও সে সময় হয়নি। আপাতত এই বিলম্বিত সাপ্তাহিকী দিয়ে মন ভোলানোর অক্ষম চেষ্টা করলাম। কাল থেকে সত্যিকারের পোস্ট শুরু হবে। হবেই।






ফ্লোরেন্স বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করছে এক্ষুনি।



ব্যান্ডের গলায় গানটি শুনে মুগ্ধ হয়েছিলাম। মানুষের গলায় শুনে যেন আরও ভালো লাগছে।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.