September 30, 2014

পুজোর ছুটি



ইউ ক্যান টেক আ পার্সন আউট অফ মফস্বল, বাট ইউ ক্যান নেভার টেক মফস্বল আউট অফ আ পার্সন। চতুর্থীর রাতে যখন অর্চিষ্মান একটু হেঁটে আসার প্রস্তাব দিল আমি ভাবলাম এই অন্ধকারে কেই বা আর দেখছে, চেয়ারের কাঁধে রাখা ধুধ্‌ধুড়ি টি শার্ট আর ল্যাতপেতে জিনস গলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

ভাবলাম রাস্তায় শ্মশানের নিস্তব্ধতা বিরাজ করবে। চতুর্থীর রাতে আমার পৈতৃক বাড়ির সামনের রাস্তায় যেমন করে। সাইকেল টুংটুঙিয়ে কোচিং ক্লাস থেকে ফিরবে ছেলেমেয়ের দল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাদের আমগাছের ঘন ছায়ার তলায় থামবে খানিকক্ষণ। গুনগুন গুনগুন। যখন ঊঠে বসার শক্তি ছিল ঠাকুমা খাটে বসে মাথা নাড়বেন। সব উচ্ছন্নে গেল। ত্রিপলের প্যান্ডেলে টিমটিমে টিউবলাইটের নিচে ঘুরে বেড়াবে উদাসী গরু, ঝগড়ুটে কুকুর। ঘরের ভেতর মা শিশুকে ষষ্ঠী পড়ার আগে যতখানি পারা যায় পড়িয়ে নেবেন। ভুজুং দেবেন, পুজোর আগে পড়াশুনো করলে মা সরস্বতীর কাছ থেকে বকেয়ার বেশি আশীর্বাদ পাওয়া যায়।

বাড়ি থেকে বেরিয়েই ভুল ভেঙে গেল। মনে পড়ে গেল এ তো আমার ছোটবেলার ঘুমন্ত মফস্বল নয়, এ আমার বুড়োবেলার জলজ্যান্ত শহর। চারদিকে হইহই করে অলরেডি পুজো শুরু হয়ে গেছে। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে নহবৎ, গত একমাস ধরে চলে আসা রবীন্দ্র-নজরুল-অতুলপ্রসাদী সংগীত প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড ফিনালে, স্থানীয় ব্যান্ডের গান। মাদুর্গার সামনে কোথাও কোথাও কাপড়ের আড়াল, কোথাও কোথাও তিনি চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছেন। ডি ব্লকের ঠাকুর দারুণ হয়েছে। মেলা গ্রাউন্ডের ঠাকুর আভা গার্দ। মা দুর্গা ভগবান বলেই কোমর অতখানি বেঁকিয়ে দাঁড়াতে পেরেছেন, নশ্বর মানুষ হলে পারতেন না।

দু’নম্বর মার্কেটের মোড়ের মাথায় গ্যাঁট হয়ে বসে থাকা দিল্লি পুলিশের এস ইউ ভি-র জায়গাটা পেরোলেই রাস্তার ধার বরাবর বাঁশের কর্ডন, দেখলেই টপকানোর জন্য মন উশখুশ করে। আমরা মেলা গ্রাউন্ড, কালীবাড়ি, কে ব্লক দেখে মার্কেট ওয়ানে আমাদের ফেভারিট ফুচকা খাওয়ার প্ল্যান করছিলাম, ভিড়ের নমুনা দেখে সে প্ল্যান বানচাল করতে হল। ফুচকাওয়ালা ভদ্রলোককে অন্তত একশো লোক ছেঁকে ধরেছে। অষ্টমীনবমীতে কী হবে ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।

আমরা ফুচকার স্বাদ ঘুগনি দিয়ে মেটালাম। মাটন ঘুগনি। বছরের বাকি সময় কুড়ি টাকা, এখন পঁচিশ। এখন দশটাকার ঝালমুড়ি পনেরো, পাঁচটাকার বেগুনি সাত। আর বিরিয়ানি। যে যেখানে পেরেছে একখানা হাঁড়ি নিয়ে বসে পড়েছে। লোকাল গুণ্ডা থেকে সবজিওয়ালা – সকলেই এই সিজনে বিরিয়ানি অন্ত্রেঁপ্রেনার। সকলের বিরিয়ানিই কলকাতার অথেনটিক বিরিয়ানি।

এ বছর সে অথেনটিক বিরিয়ানি খাওয়া হবে না আমার। আমি বাড়ি চললাম। আমার কপালে এ বছর বিরিয়ানি নেই, স্রেফ মায়ের হাতের ডাল ভাত আলুভাজা। কিন্তু আপনারা যাঁরা সি. আর. পার্কে পুজো দেখতে আসবেন, তাঁরা প্রাণ ভরে বিরিয়ানি খাবেন। ধৈর্য থাকলে দেড়শো লোকের পেছনে লাইন দিয়ে ফুচকাও ট্রাই করে দেখতে পারেন। সাতদিন বাদে আমি যখন ফিরব তখন আমাকে সেই ফুচকা খাওয়ার গল্প বলে জেলাস করবেন। আমি কিচ্ছু মনে করব না।

আপনাদের সবার পুজো খুব খুব ভালো কাটুক, সবাই ভীষণ আনন্দে থাকুন এই কামনা নিয়ে অবান্তরে সাতদিনের পুজোর ছুটি শুরু হল। টা টা বাই বাই, আবার যেন দেখা পাই।


September 29, 2014

পুরোনো অবান্তরঃ মাধ্যমিক! মাধ্যমিক!



ইংরিজি হরফে লেখা পুরোনো পোস্টগুলো সারাই করতে গিয়ে যে ব্যাপারটা বিশেষ করে চোখে পড়ছে সেটা হচ্ছে পোস্টগুলোর দৈর্ঘ্য। এখনকার পোস্টগুলো হেসেখেলে বারোশো তেরোশো শব্দের হয়। দু’হাজার নয় দশ এগারোর পোস্টগুলো হত মেরেকেটে পাঁচশো কি ছ’শো।

এর দুটো কারণ থাকতে পারে। এক, আমার ‘রাইটিং মাসল’ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আগে পাঁচশো শব্দ লিখে দম বেরোত, এখন বারোশো শব্দ পেরিয়ে বেরোয়। দু’নম্বর কারণটা এক নম্বরের কারণের মতো ভালো নয় আর সেই জন্যই আমার সন্দেহ হচ্ছে সেটাই সত্যি। আমার চরিত্র/ভাবনা থেকে ব্রেভিটি লোপ পাচ্ছে। দু’হাজার দশ সালের সাতই জানুয়ারি এই গল্পটা বলতে আমার খরচ হয়েছিল পাঁচশো বিরাশি শব্দ, আর আজ লাগল একহাজার দশ (তাও এই গৌরচন্দ্রিকা বাদ দিয়ে)। বয়স বাড়লে কি লোকে সত্যিই বেশি কথা বলে?

*****


‘চার্মিং’ বলতে যে ঠিক কী বোঝায় সেটা আমি অনেকদিন বসে বসে ভেবেছি। ভেবে বার করার চেষ্টা করেছি। কী থাকলে একটা মানুষ ‘চার্মিং’ হয়? সুন্দর চোখ? সুন্দর হাসি? সুন্দর ব্যবহার? কিন্তু এর একটাও নেই এমন অনেক লোকের চার্মের শিকার হতে দেখেছি আমি চারপাশের লোকদের। কাউকে দেখলেই তার সঙ্গে গিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করে কেন? কেন তার বন্ধু হতে ইচ্ছে করে?

সুজাতা যখন ক্লাস সিক্সে আমাদের স্কুলে ভর্তি হল তখন ওকে দেখে আমাদের ক্লাসশুদ্ধু মেয়ের সেই ইচ্ছে হল। ব্যাপারটা খুব সোজা ছিল না। যে ক’টা বদগুণের প্রকাশ মানুষের মধ্যে খুব কচি বয়সেই ঘটে তার একটা প্রধান হচ্ছে দলবাজি। আমরা ওই স্কুলে পড়ছি ক্লাস ওয়ান, কেউ কেউ নার্সারি থেকে। বেশ একটা দলবদ্ধতার ভাব জেগেছে মনে। সিক্সে যারা ভর্তি হত, ‘নতুন মেয়ে’ ছাপ ঘোচাতে তাদের যারপরনাই কাঠখড় পোড়াতে হত। অনেক সময় ঘুচতও না। ক্লাস টেনের দিদির পায়ের কাছে বসে ক্লাস সিক্সের ‘ফ্যান’কে আমি গুণমুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলতে শুনেছি, ‘তুমি নতুন মেয়ে দিদি! বোঝাই যায় না কিন্তু।’

সুজাতা আমাদের ক্লাসে ভর্তি হওয়ার সাত দিন যেতে না যেতেই আর বোঝার কোনও উপায় ছিল না যে ও নতুন মেয়ে। যেমন চোখ, তেমন হাসি, তেমন ব্যবহার। পড়াশোনা, দৌড়ঝাঁপ, রবীন্দ্রসংগীত – সবেতে ভালো। টিফিন পিরিয়ড হলেই সুজাতাকে নিজেদের গোলে বসানোর জন্য, নিজেদের টিমে খেলানোর জন্য টানাটানি শুরু হত। আমি হাঁ করে তাকিয়ে ভাবতাম, কী থাকলে লোকে এত জনপ্রিয় হয়? এত চার্ম আসে কোত্থেকে লোকের?

উত্তর পেতে দেরি হল না। একদিন স্কুলবাস না আসায় সুজাতা মায়ের সঙ্গে স্কুলে এল। ছোট্টখাট্টো কাকিমা, মেয়ের জলের বোতল কাঁধে ঝুলিয়ে হেঁটে হেঁটে সবুজ মাঠ পেরিয়ে এলেন, মেয়ের শয়েশয়ে সহপাঠী, জুনিয়র, সিনিয়র অনুরাগীরা কাকিমাকে ছেঁকে ধরল, কাকিমা হেসে তাদের সবার সঙ্গে আলাপ করলেন।

আর সেই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি বুঝে গেলাম চার্ম কোত্থেকে আসে। বংশপরম্পরায়।

অদ্ভুত ভাবে, সুজাতার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গভীর হল স্কুল ছাড়ার পর। ছোটবেলার স্কুলে ক্লাস টেন পর্যন্ত গিয়ে ফুরিয়ে গেল, আমরা দুজনেই ইলেভেন টুয়েলভে একটা নতুন স্কুলে গিয়ে ভর্তি হলাম। সে স্কুলে আমরা সবাই নতুন মেয়ে, তাই পুরোনো স্কুল থেকে আসা বন্ধুরা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকতাম। তার ওপর ইংরিজি টিউশন নেব বলে দুজনে ভর্তি হলাম। সাইকেল করে স্যারের বাড়ি থেকে সুজাতার বাড়ি যেতে লাগত ঠিক সাড়ে চার মিনিট। কোচিং-এ ভর্তি হওয়ার পর সুজাতার বাড়ি যাওয়া আর কাকিমার আদর খাওয়ার পরিমাণ দুটোই আমার বলার মতো বৃদ্ধি পেল।

ইংরিজি পড়তে পড়তে, স্যারের বকুনি খেতে খেতে, খাতায় মুখ চেপে অবিরাম হাহাহিহি করতে করতে সুজাতার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল। বন্ধুত্বের সঙ্গে ফাউ হিসেবে পেলাম কাকিমার স্নেহ। কাকিমা ঠিক মায়ের মতোই ছিলেন। দারুণ রান্না করতেন, ‘আর খেলে পেট ফেটে যাবে কাকিমা’ বলার পর আরও চারটে লুচি ফেলে দিতেন প্লেটের ওপর, ফেব্রুয়ারির ভোরে সুজাতাকে ডেকে নিয়ে স্যারের বাড়ি যাওয়ার সময় আমার মায়ের চাপিয়ে দেওয়া মাফলার আর একবার ভালো করে মুখের চারপাশে জড়িয়ে দিতেন। স্কুলের ছুটি চলাকালীন যখন কোচিং শেষে নিজের বাড়ি ফেরার আগে সুজাতার বাড়িতে স্টপেজ দিতাম তখন আমাদের সাইকেলের পথ চেয়ে হাসিমুখে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতেন।

কাকিমাকে ভালোলাগার কারণের আমার অভাব ছিল না। কিন্তু কাকিমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম এই গল্পটা শোনার পর।

আমাদের মাধ্যমিকের সিট পড়েছিল হিন্দমোটরের একটা স্কুলে। আমি রিষড়া থেকে ট্রেনে উঠতাম, সুজাতা উঠত তার পরের স্টেশন কোন্নগর থেকে, তারপরেই চলে আসত হিন্দমোটর। আমরা সাধারণত একই ট্রেনে চেপে পরীক্ষা দিতে যেতাম। সেই ট্রেনে গেলে পরীক্ষার হলে পৌঁছে, সিট বেছে, পরীক্ষার প্রিপারেশন নিয়ে উত্তেজিত আলোচনা করে, একে অপরকে টেনশন দিয়ে ও নিয়েও হাতে যথেষ্ট সময় থাকত। কাজেই সেই ট্রেনটাতে চেপেই আমরা পরীক্ষা দিতে যেতাম। আমরা, অন্যান্য যে সব স্কুলের ছেলেমেয়েদের ওই তল্লাটে সিট পড়েছে তারা। সবাই।

মা হিসেবে কাকিমা ছিলেন ফার্স্টক্লাস। মেয়ের ব্যাপারে কাকিমা কোনও ফাঁকিবাজি, কোনও আপোস কোনওদিন করেননি। মেয়ে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা দিচ্ছে, কাকিমাও কি দিচ্ছেন না? সেদিন সকালে উঠে কাকিমা অন্য পরীক্ষার দিনগুলোর মতোই নিজে তৈরি হলেন, মেয়েকে তৈরি করলেন, পেনপেনসিল অ্যাডমিট কার্ড ইত্যাদি ব্যাগে গুছিয়ে নিলেন। তারপর ঠাকুর প্রণাম করে স্টেশনের দিকে হাঁটা দিলেন।

গোটা ঘটনাটা অন্য দিনের থেকে একটু আগেই হয়ে গেল। বিফোর টাইম। কাকিমা খুশি হলেন। কিন্তু একটা সমস্যাও দেখা দিল। স্টেশনে পৌঁছে কাকিমা দেখলেন প্ল্যাটফর্মে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। যে ট্রেনটায় তাঁদের যাওয়ার কথা তার আগের ট্রেনটা।

রিকশাকে ভাড়া দিতে দিতে কাকিমার মাথা দ্রুত চলতে লাগল। দৌড়বেন? হাতে যথেষ্ট সময় আছে। পরের ট্রেনটাতে ধীরেসুস্থে গেলেও হয়। অবশ্য যদি পরের ট্রেন আসে। কী হবে যদি এই ট্রেনটা ছেড়ে চলার পরই ওভারহেড তারের বিদ্যুৎসংযোগ ছিন্ন হয়? ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়? লরি উল্টে গিয়ে জি. টি. রোড জ্যাম হয়ে যায়?

‘পিউ! ট্রেন!’ আর্তনাদ করে কাকিমা ছুটতে শুরু করলেন।

সুজাতা ছুটতে শুরু করল। ছোটার ইচ্ছে না থাকলেও। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো ট্রেন ভোঁ দিল।

এইবার কাকিমা সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গেলেন। ভয় পাওয়ার কারণও ছিল। কাকিমারা ছুটে আসছিলেন ট্রেনের ল্যাজের প্রান্ত থেকে। অর্থাৎ ড্রাইভারকাকু তাঁদের দেখতে পাচ্ছেন না। হাওড়া স্টেশনের মেন লাইনের ড্রাইভারকাকুরা অত্যন্ত ভদ্রলোক হন। কেউ ছুটে আসছে দেখলে, বিশেষ করে শিশু মহিলা বৃদ্ধ ছুটে আসছে দেখলে তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকেন। আমার সঙ্গে বহুবার ঘটেছে এ ঘটনা। একবার উত্তরপাড়া প্ল্যাটফর্মে ছুটন্ত আমার ব্যাগের মুখ খুলে পেনসিলবক্স ছিটকে পড়ে পেনপেনসিল ইরেজার পেনসিল কাটার কল সব ছত্রাকার হয়েছিল। আমি ছুটে ছুটে সব এদিকওদিক থেকে কুড়িয়ে আনছিলাম আর ড্রাইভার কাকু জালি দেওয়া কাঁচের জানালার ভেতর হাত দেখিয়ে আশ্বাস দিচ্ছিলেন যে তিনি আমাকে ফেলে যাবেন না। যানওনি।

কাকিমা স্পিড বাড়ালেন। ভোঁ থামিয়ে ট্রেন ঝাঁকুনি দিল। কাকিমার গলা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল, ‘বেঁধে বেঁধে! রোককে!’

চিলতে কামরার দরজায় ঝুলন্ত গার্ডকাকু ফিরে তাকালেন। কাকিমার প্রাণে বল এল। ‘বেঁধে বেঁধে! রোককে!’

গার্ডকাকু হাতের ইশারায় বোঝালেন এক্ষুনি আর একটা ট্রেন আছে, তাঁরা যেন সেটায় আসেন। সুজাতা ছুটতে ছুটতে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘মা পরেরটায় গেলেই তো হয়।’

ট্রেন গড়াতে শুরু করল।

কাকিমার স্পিড কমল না। হাত ছিটকে আকাশের দিকে উঠে গেল। শরীরে যত জোর ছিল সবটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে কাকিমা চিৎকার করে উঠলেন, ‘মাধ্যমিক! মাধ্যমিক!’

একটা শব্দ। অথচ তার মধ্যে পোরা কত কিছু। বাঙালির হৃতগৌরব উদ্ধারের আশা, ভবিষ্যতের সোনালি স্বপ্ন। আকাশ থেকে যেন বজ্রনির্ঘোষ নেমে এল। সে নির্ঘোষ উপেক্ষা করেন এমন সাধ্য কি গার্ডকাকুর? ঘ্যাঁচ করে ট্রেন থেমে গেল। লোকজন সব কামরা থেকে নেমে এসে এদিকওদিক তাকিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে লাগল, সিগন্যালটিগন্যাল তো সব ঠিকই আছে, তবে? কাকিমা বুলেটের মতো ছুটে এসে লাস্ট কামরায় উঠে পড়লেন। ধরণী দ্বিধা হও জপতে জপতে সুজাতাও মায়ের পেছন পেছন ছুটে এসে ট্রেনে উঠে পড়ল। গার্ডকাকুর সিগন্যাল ক্লিয়ার হয়ে গেল, ট্রেন চলতে শুরু করল।

কাকিমার সঙ্গে বহু, বহুদিন দেখা হয় না। সুজাতার সঙ্গেও না। সুজাতা কেমন আছে আমি জানি না। তবে আমার এক চিৎকারে ট্রেন থামিয়ে দেওয়া সাহসী কাকিমা যে ভালোই থাকবেন সে নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই।



September 28, 2014

পুজোর বাজার



ঠেলতে ঠেলতে পুজোর আগের শেষ উইকএন্ড। এইবার মার্কেটিং-এ না বেরোলে আর রক্ষা নেই। অগত্যা ক্যান্ডি ক্রাশ ছেড়ে উঠতে হল।


ব্রেকফাস্টের মেনু চা, চিঁড়ের পোলাও আর সংগীত বাংলা। যোদ্ধা সিনেমার একটি গানে দেভ আর মিমির ধুনুচি নাচ দেখতে দেখতে খেলাম। চিঁড়ের পোলাওয়ের বাদামগুলো একটু বেশি পুড়ে গিয়েছিল, আর ঝালও সামান্য বেশি হয়েছিল। পোলাওটা পরিমাণেও বেশ বেশি হয়েছিল, কিন্তু আমরা কষ্টমষ্ট করে সবটাই খেয়ে নিলাম।


মলে ঘুরতে ঘুরতে আবার খিদে পেয়ে গেল। আমরা সবসময় এই খাব সেই খাব প্ল্যান করে মলে যাই, গিয়ে সেই একই কফি শপে ঢুকি। আমি খেলাম চা আর অমলেট, অর্চিষ্মান খেল স্যান্ডউইচ আর ক্যাপুচিনো।


লাস্টে বস্টন ব্রাউনি।


ফেরার পথে দেখলাম গাছের পাতায় পাতায় শরতের রোদ নাচছে, হু হু হাওয়ায় পথের ধুলো উড়ে যাচ্ছে এদিকসেদিক। চাকা বসানো হলুদ রঙের ব্যারিকেড ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্যান্ডেলের সামনে বসানোর জন্য। প্যান্ডেল প্রায় শেষের মুখে। আমরা যখন কলকাতা থেকে ফিরব তখন সব শেষ, প্যান্ডেল হাওয়া, মেলা গ্রাউন্ড আবার খাঁখাঁ খালি। একটু দুঃখদুঃখই হচ্ছিল। ঢুকে পড়লাম। ঠাকুর দেখা হবে না, প্যান্ডেলটা অন্তত দেখা হল।




September 27, 2014

সাপ্তাহিকী




দ্রুত ইংরিজি বলতে পারাটাকে যখন বেসিক লাইফ স্কিলের মধ্যে গণ্য করতাম তখন এক বন্ধুর মুখে ‘আই গিভ আ ড্যাম!’ শুনে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যখনতখন যত্রতত্র সুযোগ পেলেই ঠোঁট উল্টে বলতাম ‘আই গিভ আ ড্যাম!’ সেই শুনে একদিন আমার রুমমেট সুরায়া বলল, ‘বাট হোয়াই? ইউ শুড নট গিভ এনি ড্যামস অ্যাট অল।’ (গ্রাফের উৎস)

Creativity is knowing how to hide your sources.
                                                               ---Albert Einstein

সেপ্টেম্বর ২১ থেকে সেপ্টেম্বর ২৭ নিষিদ্ধ বই সপ্তাহ। কোনও বই নিষিদ্ধ করার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণই থাকতে পারে না কিন্তু এই লিংকে কিছু কিছু এমন কারণ দর্শানো হয়েছে যা সব রকম যুক্তিবুদ্ধিকে ছাপিয়ে যায়। যেমন ধরুন, শেল সিলভারস্টাইনের লেখা ছোটদের বই ‘আ লাইট ইন দ্য অ্যাটিক’ ফ্লোরিডার একটি স্কুলে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এই অভিযোগে যে it “encourag[ed] messiness and disobedience,” among other things.


স্ট্রেস? দুশ্চিন্তা? অম্বল? অজীর্ণ? সব রোগের একটাই সমাধান। স্লো রিডিং। প্রাগৈতিহাসিক যুগের লোকেরা যাকে ‘বই পড়া’ বলত।


আমার ফিংগারপ্রিন্ট শব্দ ‘বস্‌স্‌স্‌স্‌’, আমার মায়ের ফিংগারপ্রিন্ট শব্দ ‘সাবধানে সোনামা’, আমার বাবার ফিংগারপ্রিন্ট শব্দ ‘দেখছি’। আপনার ফিংগারপ্রিন্ট শব্দ কী?



ভারতে ব্যালে নাচের বাজার নেই শুনে মাথিয়াস চোখ কপালে তুলে বলেছিল, ‘ইউ গাইস আর সাচ আ ক্লোজড শপ!’ শুনলাম আমিই প্রথম নই, ও আরও একজন ভারতীয়কে দেখেছে যে জনি ক্যাশের নাম শোনেনি। দেশের লজ্জা ঘোচাব বলে সেই থেকে আমি ব্যালেসংক্রান্ত কিছু পেলেই হামলে পড়ে দেখি। আপনারাও দেখুন।


আমি যাকে বলে এখন অন আ সঞ্জীব অভয়ংকর ডায়েট। দেখুন তো আপনাদের ভালো লাগে কি না।


September 25, 2014

September 24, 2014

Dis or Dat: পুজোসংখ্যা




উৎসঃ গুগল ইমেজেস


সাবেকি না আভা গার্দঃ সাবেকি

প্রবাসী না পাড়ারঃ পাড়ার

সপ্তমীর সকাল না অষ্টমীর রাতঃ সপ্তমীর সকাল

অষ্টমীর লুচি না নবমীর পাঁঠাঃ অষ্টমীর লুচি

ইঁদুর না কলাবউঃ কলাবউ

কার্ত্তিক না গণেশঃ গণেশ

লক্ষ্মী না সরস্বতীঃ সরস্বতী

সিংহ না মহিষাসুরঃ মহিষাসুর, মহিষাসুর, মহিষাসুর।

বাগবাজার না বোসপুকুরঃ বাগবাজার

কলেজস্ট্রিট না কুমারটুলিঃ কুমারটুলি

গাড়ি চেপে না পদব্রজেঃ পদব্রজে

ফুচকা না এগরোলঃ ফুচকা প্লাস এগরোল

অঞ্জলি না সন্ধিপুজোঃ অঞ্জলি

জিনস না ধুতি/শাড়িঃ ধুতি/শাড়ি

দেবীবরণ না ধুনুচি নাচঃ ধুনুচি নাচ

কাটাফল না লুচিসুজিঃ লুচিসুজি

দূর্বা না বেলপাতাঃ দূর্বা। উঁহু, বেলপাতা। বেলপাতা, ফাইন্যাল।

শিউলি না কাশফুলঃ ক্লোজ আপে শিউলি, লং শটে কাশফুল

লিমকা না থামস আপঃ লিমকা

কর্নেটো না চকোবার না কর্নেটোঃ কর্নেটো। (চকোবারের থেকে খাওয়া শক্ত এমন কোনও খাদ্যবস্তুর সঙ্গে আমার এখনও মোলাকাত হয়নি।)

সানগ্লাস না ক্যাপবন্দুকঃ ক্যাপবন্দুক

কুইজ কমপিটিশন না প্রদীপ জ্বালানো প্রতিযোগিতাঃ প্রদীপ জ্বালানো প্রতিযোগিতা। যদিও আমি কোনওবার চারটের বেশি জ্বালাতে পারিনি। হোপলেস।

ঢাক না কাঁসিঃ কাঁসি

প্রদীপ না চামরঃ প্রদীপ

পুজোর গান না পূজাবার্ষিকীঃ পূজাবার্ষিকী। আমাদের আমলে অবশ্য পুজোর গান সেভাবে হয়নি, যেমন আমার মায়েদের সময়ে হত। তবে হলেও মনে হয় পূজাবার্ষিকীই বাছতাম।

(পুজোর সিন) কাহানি না উৎসবঃ উৎসব

রবীন্দ্রসংগীত না আশা/কিশোরঃ আশা/কিশোর

দুপুরে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমিয়ে হোলনাইট ঠাকুর দেখা না দুপুরবেলা বালিশ জাপটে শুয়ে টিভিতে সোনার কেল্লা জয় বাবা ফেলুনাথ দেখে রাতে অকাতরে ঘুমঃ দুপুরবেলা বালিশ জাপটে শুয়ে টিভিতে সোনার কেল্লা জয় বাবা ফেলুনাথ দেখে রাতে অকাতরে ঘুম

নাড়ু না নিমকিঃ নাড়ু

গুড়ের নাড়ু না চিনির নাড়ুঃ গুড়ের নাড়ু


September 23, 2014

নিয়ম মতো



সেদিন অফিস থেকে ফিরে এঘরওঘর করছি, এমন সময় দরজায় টোকা। খুলে দেখি এক বয়স্ক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। এক হাতে বাজারের ব্যাগ, অন্য হাতে পাকানো আনন্দবাজার। আমার বাড়িতে সাধারণত এ চেহারার অতিথি আসেন না। বিশেষ করে এই সময়। এই সময় যাঁরা আসেন তাঁদের বেশিরভাগেরই পরনে থাকে ইউনিফর্ম, কারও কারও মাথায় টুপি, আর সবারই কাঁধে ঢাউস ব্যাগ। সেই ব্যাগ থেকে নাতিশীতোষ্ণ প্যাকেট বার করে হাতে দিতে দিতে তাঁরা বলেন, ‘কেয়ারফুল ম্যাম, ইট’স হট।’

আমি একটুও না ভেবে করিডরের উলটোদিকে বাড়িওয়ালার দরজা দেখিয়ে দিলাম।

আপনি যে বাড়ি খুঁজছেন সেটা এটা নয়, ওটা।

ভদ্রলোক নড়লেন না।

উঁহু। এই বাড়িটাই। আগেও একবার এসেছি, কেউ ছিল না।

আনন্দবাজার ধরা হাতের দুটো আঙুল ব্যাগের মুখের ভেতর ঢুকে গেল। বেরিয়ে এল একটা মোটা আয়তাকার খাতা। খাতার মলাটে নীল সাদা রুইতন ডিজাইন। খাতার অর্ধেক পাতার অর্ধেক ছেঁড়া।

আমার মুখ দিয়ে আরেকটু হলেই বেরিয়ে যাচ্ছিল, ‘বাবামা বাড়ি নেই, পরে আসুন,’ সামলে নিলাম। ভদ্রলোক চাঁদা কেটে বিল দিয়ে চলে গেলেন। রেখে গেলেন তিনটে কুপন। সপ্তমী অষ্টমী নবমী ভোগ ভোজনের। নট ট্রান্সফারেবল। অ্যাডমিট টু। পরে দেখলাম কুপনের সঙ্গে একটা নির্ঘণ্টও রেখে গেছেন ভদ্রলোক।

অবশ্য এমন নয় যে নির্ঘণ্ট দেখে বুঝতে হবে এটা শরৎকাল। ভোরবেলা উঠে দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়ালে যে ঠাণ্ডা হাওয়াটা সারা গায়ে ঝাপটা মারে সেটাই যথেষ্ট। হাওয়াটা থাকে বেশ খানিকক্ষণ। আমরা চা খাই, হেডলাইন শুনি, জানালার ভারি পর্দা উড়ে উড়ে আমাদের গায়ে পড়ে। অফিসে আসার সময় অটোর ফাঁক দিয়ে গলা বাড়িয়ে থাকতে কী যে আরাম। ফেরার পথেও সেই আরামটা টের পাই। মূলচন্দের জ্যামে দাঁড়ানো সাতশো গাড়ির ফাঁক গলে এসে হাওয়া আমাদের গালে হাত বুলোয়।

পাড়ায় ঢুকে পড়লে তো আর সন্দেহ থাকার জো নেই। সি. আর. পার্কের গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে যত্রতত্র দেখা যাচ্ছে বাঁশের খাঁচা। বেশিরভাগ খাঁচাতেই ত্রিপলের ঢাকনি পড়তে শুরু করেছে, কেউ কেউ এখনও খালি মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। আমার মতো স্টেজে মারার তাল এদের। মোড়ের মাথায় উঁচু উচু হোর্ডিং-এ চেনা চেনা নাম। বেশি চেনা নামেদের সিনসিন্যাটির প্যান্ডেল ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে। পকেট ফর্টির কপালে নাচছে মাঝারি সেলিব্রিটি।

এই পকেট ফর্টির প্যান্ডেলেই আসতাম দল বেঁধে। সুমনের গান শুনতে। ক্যাকটাসের নাচ দেখতে। কিছু একটা হলেই হল। দেখাশোনাটা তো কথা নয়, সবাই মিলে হল্লা করতে করতে যাওয়াটাই বড় কথা। অথেনটিক ফুচকা, এগরোল খাওয়া। সময়টা ছিল ফার্স্ট সেমেস্টার। বাঁধা বাছুর ছাড়া পেয়েছে তখন সবে কয়েকমাস। এখনকার তুলনায় তখন আমার মাথায় অন্তত নব্বই শতাংশ চুল কম পাকা ছিল, রাতজাগার ক্ষমতা অন্তত একশো শতাংশ বেশি ছিল, মানুষের প্রতি বিশ্বাস অসীম ছিল আর নিজের প্রতি বিশ্বাস প্রায় ছিলই না।

আর ছিল হল্লা করার ক্ষমতা। সে হল্লার কথা মনে করলেও এখন আমার ক্লান্ত লাগে। পাঁচটা দিন নাগাড়ে বাঁই বাঁই করে ঘুরছি। সি. আর. পার্ক থেকে সফদরজং, সফদরজং ত্থেকে মন্দির মার্গ, মন্দির মার্গ থেকে দুর্গাবাড়ি, প্যান্ডেলের বদলে কালীবাড়ি হপিং। ঘুরছি আর ননস্টপ মুখ চলছে। ফুচকার পর বিরিয়ানি, বিরিয়ানির পর আলুর চপ, আলুর চপের পর লিমকা, লিমকার পর এগরোল। এত খাচ্ছি অথচ একটাও চোঁয়াঢেঁকুর উঠছে না, বুক একটুও জ্বলছে না, গায়ে একটুও গত্তি লাগছে না।    

বছর ঘুরে থার্ড সেমেস্টার আসতে আসতেই স্বাধীনতা পুরোনো হয়ে গেল, আর হল্লা থেকেও মন উঠে গেল। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরার প্রশ্নই নেই। তবু সি. আর. পার্কের পুজো দেখতে আসার একটা পাট থেকেই যেত। ভিড়ের সঙ্গে নয়, খালি আমি আর স। টিভিতে মহিলা সেলিব্রিটিদের মাঝে মাঝেই বলতে শুনি, তাঁরা নাকি চিরকালই মেয়েদের থেকে ছেলেদের সঙ্গে বেশি রিলেট করতে পেরেছেন, চিরদিন মেয়েদের থেকে ছেলেদের সঙ্গেই তাঁদের মেন্টালিটি বেশি ম্যাচ করেছে। আমার আবার উল্টো। এ যাবত যে ক’টি মানুষের সঙ্গে আমি আদৌ রিলেট করতে পেরেছি তাদের অধিকাংশই মেয়ে।

বাইরে থেকে দেখলে স-এর সঙ্গে আমার কোথাও কোনও মিল ছিল না। না চেহারায়, না বুদ্ধিতে, না যেটাকে ব্যাকগ্রাউন্ড বলে সেটায়। তবু স-এর সঙ্গে আমার মেন্টালিটি খাপেখাপে ম্যাচ করেছিল। প্রশংসা করার মতো স-এর অনেক জিনিস ছিল, কিন্তু আমাকে যেটা সবথেকে অবাক করত সেটা 'রাস্তার খাবার' সম্পর্কে স-এর বুৎপত্তি। খালি ফুচকা, এগরোল খেয়েই আমি নিজেকে বিশাল হনু মনে করতাম, স-এর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর একটা জগৎ আমার সামনে খুলে গেল। পৃথিবীতে যে এত রকমের চুরন থাকতে পারে, সেটা স না থাকলে আমি জানতে পারতাম না। আর এত রকম ফ্লেভারের চুসকি। তেইশ বছরের জীবনে আমি কোনওদিন বুড়ির চুল খাইনি শুনে মেলা গ্রাউন্ডর প্যান্ডলের সামনে দাঁড়িয়ে স-এর হাঁ-টা আমার এখনও চোখে ভাসে।

মাত্র দশবারো বছর কেটেছে, অথচ সেই আমিকে এই আমি আর চিনতেই পারি না। এখন প্যান্ডেল প্যান্ডেল ঘুরে সেলিব্রিটি দেখতে যাওয়ার কথা কল্পনা করলেও কান্না পায়, তেলেভাজা খাওয়ার কথা ছেড়েই দিলাম। এখন পুজোটা আরেকটা নিয়ম। টিকিট কেটে বাড়ি যাওয়াটা একটা নিয়ম, ঠাকুর দেখতে বেরোনোটা একটা নিয়ম, মার্কেটিং করতে যাওয়াটা একটা নিয়ম। আমি তোমার জন্য জামাকাপড় কিনব, তুমি আমার জন্য জামাকাপড় কিনবে। আমার তোমার কারও আলমারিতেই আর একটা রুমাল রাখারও জায়গা নেই, তবুও নিয়ম ভাঙা চলবে না। বিজয়ার ফোন, সেও নিয়ম করে।

আজ ভোরবেলা অ্যালার্ম থামিয়ে মটকা মেরে আছি, এমন সময় একটা আওয়াজ কানে এল। দু’সেকেন্ড শুনেই চিনতে পারলাম। মহিষাসুরমর্দিনী চালিয়েছে কেউ রেডিওয়। নিয়ম করে নিজে শুনছে, পাড়ার লোককে শোনাচ্ছে। আমি উঠে দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম। ঘরের ভেতর থেকে বাইরের তাপমাত্রা অন্তত তিন ডিগ্রি কম। চিলতে বারান্দায় ফোল্ডিং আলনার গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম। রেডিওয় শাঁখ বাজছে। আর কোনও শব্দ নেই কোথাও। আকাশের কালচে নীল গায়ে জ্বলজ্বল করছে কালপুরুষের কোমরের বেল্ট। আলতো হাওয়ায় আলনায় মেলা জামা দুলছে। এটা যেন কার গলা? দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়? নাকি তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়? আমার সবসময় গুলিয়ে যায়।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি রেডিও শুনতে লাগলাম। এত ঘটা করে সকালে উঠি কাজ করব বলে। কিন্তু ঠাণ্ডা হাওয়াটাকে ছেড়ে, (গানগুলোকে ছেড়েও) ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছিল না। ‘ওগো আমার আগমনী’ শুরু হল। আমার ফেভারিট। এই সাতসকালে মালকোষ, কানে লাগে না কিন্তু। এক্ষুনি শেষ হয়ে যাবে মহালয়া। তিথিনির্ঘণ্ট মানলে হয়তো থাকবে আরও কিছুক্ষণ, কিন্তু আমি মহালয়া বলতে যা বুঝি, যা বুঝে এসেছি জ্ঞান হওয়া ইস্তক, সেটা শেষ হয়ে যাবে। শুরু হয়ে যাবে অটো, অফিস, বাজার, দোকান, ডাক্তারখানা সম্বলিত আর একটা দিন। বছরের বাকি তিনশো চৌষট্টি দিনের সঙ্গে যার কোনও ফারাক নেই। আকাশের কালো ছাপিয়ে নীলের তেজ বাড়ছে, ফিকে হয়ে আসছে কালপুরুষের বেল্ট। চারপাশে আলো ফুটছে। রেডিও বন্ধ হয়ে গেল। আমি ঘরে ঢুকে এলাম। বিছানায় রাখা ফোনটা তুলে নিয়ে নিয়ম মতো স্পিড ডায়ালের খোপটায় আঙুল ছোঁয়ালাম, একবার বাজতে না বাজতেই নিয়ম মতো ওদিক থেকে হাসিহাসি ‘হ্যালো’ ভেসে এল।

বললাম, ‘শুভ মহালয়া, মা। আর ক’দিন বাদেই তোমার সঙ্গে দেখা হবে। কী মজা।’ 


September 21, 2014

পুরোনো অবান্তরঃ মাবাবার রবিবার



অবান্তরের শুরুর দিকের একটা বিরাট অংশ লেখা হয়েছিল বাংলা ভাষায়, ইংরিজি হরফে। সেগুলোকে এক এক করে বাংলা হরফ করার প্ল্যান করেছি আমি। করতে গিয়ে লেখাগুলোর চেহারাও বিস্তর বদলাচ্ছে। এ সপ্তাহের পোস্টটি অবান্তরে প্রথম বেরিয়েছিল দু’হাজার দশ সালের একুশে জুন। নাম ছিল শৈশব ভ্রমণ, আয়তন ছিল মাত্র পাঁচশো ষাট শব্দ। ঝাড়তেমুছতে গিয়ে সে লেখা হয়ে গেল চোদ্দশো একাত্তর শব্দের। আশা করি তার এই বর্ধিত বপু আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবে না।

*****   


বছরখানেক আগে এক রবিবার সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আমার মাবাবা ঠিক করলেন তাঁরা কিছু একটা ‘ইন্টারেস্টিং’ কাজ করবেন। জলখাবারে রবিবাসরীয় পড়া, পরোটা আলুভাজা খাওয়া, মাংস রান্না করে, খেয়ে, দুপুরবেলা খবরের কাগজ মুখে করে গড়াগড়ি খাওয়ার থেকে বেশি ইন্টারেস্টিং কিছু।

আমার মাবাবার সঙ্গে বেশিরভাগ বিষয়েই আমার চমকপ্রদ অমিল। নেহাত চেহারার মিল না থাকলে কেউ বিশ্বাস করত না আমি এঁদেরই যুগ্ম উদ্যোগ। সবথেকে বড় অমিলটা হল এঁরা দুজন যা করবেন বলে ঠিক করেন সেটা করেই ছাড়েন, না করা পর্যন্ত দম ফেলেন না। আমার আবার একবারে কিছু না হলে দেড়বার সেটা নিয়ে পড়ে থাকার বদভ্যেস নেই। যাই হোক, বাবামা ঠিক করলেন ইন্টারেস্টিং কাজ করবেন এবং ঠিক করা মাত্র ইন্টারেস্টিং কাজ খোঁজা শুরু হল।

ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। চা খেতে খেতে দুজনের মাথায় একই সঙ্গে ব্রেনওয়েভ খেলে গেল।

বাবা লাফিয়ে উঠলেন, ‘খিদিরপুর গেলে কেমন হয়?’

মা ঝাঁপিয়ে পড়লেন, ‘শিবপুর গেলে কেমন হয়?’

আমার মাবাবার ইন্টারেস্টিং কাজের দৌড় দেখে আপনি মুখ ব্যাঁকানোর আগেই বলি, খিদিরপুর শিবপুর আমার আপনার কাছে হেলাচ্ছেদ্দার হতে পারে, আমার মাবাবার কাছে ওই দুটোর থেকে ভালো জায়গা পৃথিবীতে আর তৃতীয়টি নেই।

মায়ের ছোটবেলা কেটেছে শিবপুরের এক ভাড়াবাড়ি থেকে আরেক ভাড়াবাড়িতে ঘুরে ঘুরে আর বাবা বড় হয়েছেন খিদিরপুরের সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়েজের সরকারি কোয়ার্টারসে। সত্তর সালের গোড়ার দিকে, আরও অনেক বাবামার মতো আমার দাদুদিদিমাও যখন এক রাতে সিদ্ধান্ত নিলেন, বাস ওঠানো ছাড়া ছেলেমেয়েদের সুরক্ষিত রাখার আর কোনও উপায় নেই, সেদিন থেকে শিবপুরের সঙ্গে মায়েদের সমস্ত সম্পর্ক ঘুচল। আর রেলওয়ে কোয়ার্টারস, কারই বা শেকড় কবে বসেছে সেখানে। কাজেই প্রায় পঞ্চাশ বছর বাদে, ফেলে আসা শৈশবকৈশোরের সঙ্গে দেখা করে আসার আইডিয়াটা একেবারে ফেলে দেওয়ারও নয়।

টসে মা জিতলেন তাই সকালবেলা যাওয়া হল শিবপুর। মোড়ের মাথার চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে মা যখন ‘জীবনদা’র পাঠশালা’র খোঁজ করলেন, দোকানদার আর দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা খদ্দেরদের চোখ কপালে উঠল। সাইকেল থেকে এক পা মাটিতে ছুঁইয়ে কিছু ছোকরা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা কেবল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘পাঠশালা এখানে কোথায় পাবেন মাসিমা?’

মা পাঠশালায় পড়তে যেতেন শুনে প্রথমটা আমি একেবারে আকাশ থেকে পড়েছিলাম।

তোমাকে দেখে এত আদ্যিকালের লোক বলে তো মনে হয় না মা?

নই তো মনে হবে কী করে। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলেন মা।

তোমরা সবাই পাঠশালায় যেতে নাকি?

কেউ যেত না, খালি আমি যেতাম।

রহস্যটা খুলে বলেছিলেন মা। আমার দাদুদিদিমার ন’টি সন্তান ছিল। প্রথম চারপাঁচটির খেয়াল তারা রাখতে পেরেছিলেন, শেষ চারপাঁচটির পারেননি। কোনও সুস্থ মানুষের পক্ষেই পারা সম্ভব না। আমার মা ছিলেন নয়ের মধ্যে আট নম্বর। গোড়ার দিকে নাকি কেউ খেয়ালই করেনি যে ইস্কুলে যাওয়ার বয়স হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও মা ইস্কুলে যাচ্ছেন না। দাদাদিদিরা যখন ভাত খেয়ে চুল আঁচড়ে স্কুলকলেজে চলে যাচ্ছে, মা বাগানে গাছের ছায়ায় ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছেন। হঠাৎ দিদিমা একদিন খুন্তি নাড়তে নাড়তে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে বাগানের দিকে তাকিয়ে মেয়েকে সেখানে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মণিমা, তুমি ইস্কুলে যাও নাই?’

ইস্কুল? মণিমা হাঁ করে বাগান থেকে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। দিদিমা আঁতকে উঠে রান্না যেমন কে তেমন ফেলে রেখে আলনা থেকে ভালো শাড়ি টেনে নামালেন, হাত ঘুরিয়ে একখানা খোঁপা বাঁধলেন, তারপর মণির হাত ধরে সোজা এসে হাজির হলেন জীবনদার পাঠশালায়।

পাঠশালায় মায়ের শিক্ষাদীক্ষা শুরু হল। এইবার দিদিমা তক্কেতক্কে ছিলেন। পরের বছর স্কুলের সেশন শুরু হওয়ার সময় আসতেই মেয়েকে পাঠশালা থেকে ছাড়িয়ে সোজা নিয়ে গেলেন প্রসন্নকুমারী বালিকা বিদ্যালয়ে।

জীবনদা'র পাঠশালা নিয়ে মায়ের বেশি স্মৃতি নেই। যেটা আছে সেটা দুঃখের।

মায়ের ইস্কুলে ভর্তি হওয়া সংক্রান্ত দুর্ঘটনাটার পর বাড়িতে একটা আতঙ্কের ঢেউ বয়ে গেল। বড়মাসি মেজমাসি ততদিনে পরের বাড়ি বিদেয় হয়েছেন, বড়মামা চাকরিতে ঢুকে পড়েছেন। বাবামায়ের ওপর আর ভরসা করা যাবে না বুঝে ভাইবোনদের ভবিষ্যতের ভার সেজমাসি তুলে নিলেন নিজের হাতে।

খুব কম মানুষই জীবনে নিজের ‘ভোকেশন’ খুঁজে পায়, আমার সেজমাসি সেই বিরল প্রজাতির একজন। দিদিমণি ছাড়া আর কিছু মাসি হতেই পারতেন না। ছোটবেলা থেকেই মাসির মধ্যে শাসকভাব প্রবল ছিল। সেজমাসি কড়া হাতে ভাইবোনের পড়াশোনা সামলাতে লাগলেন। রাতারাতি বাড়ির পরিবেশ মারাত্মক গম্ভীর হয়ে উঠল। হাফইয়ার্লি, অ্যানুয়াল, মান্থলি টেস্ট সব পরীক্ষায় কে কোন বিষয়ে কত নম্বর পাচ্ছে (এবং যা পাওয়া উচিত তার থেকে কত কম পাচ্ছে) সে সব মাসির নখাগ্রে বিরাজ করতে লাগল।

শুধু আমার মায়ের বেলায় মাসি একটু ফাঁপরে পড়ে গেলেন।

বাকিদের স্কুলে খাতা-সিস্টেম অংক ঠিক হচ্ছে কি না, বানান ভুল হচ্ছে কি না, বাক্যরচনা ভালো হচ্ছে কি না – সে সব প্রমাণ লোপাটের কোনও উপায় নেই। জীবনদার পাঠশালায় খাতাপেনসিলের পাট নেই। স্লেট পেনসিল। সে স্লেটে কী হচ্ছে না হচ্ছে ভগবানেরও জানার উপায় নেই। একবার ন্যাতা বুলোলেই হিস্ট্রি ডিলিট।

সেজমাসি হার মেনেও মানলেন না। নিয়ম জারি করলেন, আগের গুলো যায় যাক,  অন্তত লাস্ট পিরিয়ডে যা যা লেখা হবে সেটা না মুছে বাড়ি নিয়ে আসতে হবে।

সেদিন লাস্ট পিরিয়ডে বিয়োগের পরীক্ষা নিচ্ছিলেন জীবনদা। তেরো থেকে ছয় বাদ দিতে হবে। এত সোজা অংক দেখে মা উৎফুল্ল হয়ে পড়লেন। দ্রুত কর গুনে উত্তরের জায়গায় আট বসিয়ে সবার আগে স্লেট নিয়ে হাজির হলে জীবনদার সামনে।

যেমন মেয়ে তার তেমনি মা-ই তো হবে?

জীবনদা মায়ের খড়িপেনসিল কেড়ে নিয়ে আটের ওপর একটা গোল্লা পাকিয়ে দিলেন। তাতেও তাঁর প্রতিহিংসা মিটল না। গোল্লার ওপর আবার একখানা পেল্লায় ঢ্যাঁড়াও কেটে দিলেন।

বোনকে বাড়ি নিয়ে যেতে এসে পাঠশালার বাইরে দাঁড়িয়ে গোটা ঘটনাটা দেখলেন ছোটমামা। ছোটমামা বয়েজ স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়তেন এবং পাঠশালায় পড়া বোনের প্রতি সর্বক্ষণ অপরিসীম তাচ্ছিল্য বোধ করতেন।

ভাইবোন হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরে এল। সারা রাস্তা কেউই কারও সঙ্গে কথা বলল না। ছোটমামার মনে কী ভাব হচ্ছিল জানি না, বাড়ি যত ঘনিয়ে আসতে লাগল আমার মায়ের বুকের মধ্যে সেজমাসির রক্তবর্ণ দৃষ্টি তত প্রখর হয়ে জ্বলতে লাগল।

ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়লে মাথা গুলিয়ে গিয়ে লোকে নানারকম ভুল ডিসিশন নিয়ে ফেলে, আমার মা-ও ফেললেন। ডানহাতে স্লেট ধরা ছিল। (‘স্কুলব্যাগ ছিল না?’ জিজ্ঞেস করায় মা এমন জোরে হেসেছিলেন যে হাসতে হাসতে মায়ের চোখে জল এসে গিয়েছিল। আমার মুখটা কান্নাকান্না হয়ে যাচ্ছে দেখে মা তাড়াতাড়ি বলেছিলেন যে ব্যাগ না-থাকার সঙ্গে গরিব হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। শিবপুরের আচ্ছা আচ্ছা বড়লোকের ছেলেমেয়েরাও তখন বইখাতা হাতে নিয়ে হাওয়াই চটি পরে দৌড়ে দৌড়ে স্কুলে যেত, মায়েরা তো রিফিউজি। মিনিমাম সেভেন এইটে না উঠলে তখন ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়ার চল ছিল না। গেলেই বরং একটা হাসির ব্যাপার হত।)

স্লেটের অংক কষা দিকটা ফ্রকের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন মা। যাতে হাঁটার সময় ফ্রকে ঘষা লেগে ভুল অংকের চিহ্ন লোপাট হয়ে যায়।

বাড়ি এসে চটি খোলার ধৈর্যটুকুও দেখাতে পারলেন না আমার ছোটমামা।

দিদি, মণি না অংকে গোল্লা পাইসে।

মাথায় বাজ পড়লেও বোধহয় সেজমাসি এত স্তম্ভিত হতেন না।

কই দেখি?

আশেপাশে যারা খেলাধুলো, মারামারি ইত্যাদিতে ব্যস্ত ছিল, তারা সব ফেলে ছুটে এল। অন্যের হেনস্থা দেখার থেকে বেশি মজা আর কোনও খেলায় নেই। সেজমাসি চোখ পাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন, ছোটমামা অসম্ভব তৎপরতার সঙ্গে বোনের হাত থেকে স্লেট কেড়ে নিয়ে মাসির হাতে ধরিয়ে দিলেন, সবাই স্লেটের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

অংকের চিহ্ন নেই, চকখড়ি ঘষটানো স্লেটে একটা গোল্লার ছায়া দেখা যাচ্ছে।

মুইস্যা আনসে!

আমার ছোট্ট মায়ের কপালে তারপর যা জুটল সে গল্প রসিয়ে রসিয়ে বলার কলজে আমার নেই। ওই ট্রমা নিয়ে নিজে বড় হয়ে মা যে আবার আমাকে বড় করেছেন সেটাই আশ্চর্যের। একে অংকে গোল্লা, তার ওপর এমন অসততা! সবাই একবাক্যে ঘাড় নেড়ে বলল, চাকরিবাকরি পাওয়ার আশা তো ছেড়েই দাও, পেলেও নির্ঘাত তহবিল তছরুপ করে জেলে যাবে।

সাইকেল হেলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছোকরারা কাঁধ ঝাঁকাল, কিন্তু দোকানে বসা কোনও কোনও প্রৌঢ়ের ভুরু কুঁচকে গেল।

‘জীবনদা’র পাঠশালা! ওরে বাপরে! সে কী আজকের কথা? সে কী আর থাকে দিদি?’

তাঁদের কাছ থেকে রাস্তা জেনে নিয়ে মাবাবা এক বহুতলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। এরই তলায় চাপা পড়েছে মায়ের প্রথম স্কুল। জীবনদা’র পাঠশালা।

বিকেলবেলা খিদিরপুর গিয়েও অসম্ভব মজা হল। বাবাদের কোয়ার্টার দেখা হল, শান্তিকাকুদের কোয়ার্টার দেখা হল, যে বটগাছের তলায় মাদ্রাজিদের কালীপুজো হত সে বটগাছ দেখা হল, যে পুকুরে বাবার সঙ্গে কে কতক্ষণ জলের তলায় ডুবে থাকতে পারে কমপিটিশন দিতে গিয়ে সেজকাকু আরেকটু হলেই মরে যাচ্ছিলেন সে পুকুর দেখা হল, যে ইনস্টিটিউট বিল্ডিং-এ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এসেছেন শুনে ঠাকুমা উনুনে বসানো ভাত ফেলে রেখে দৌড়েছিলেন, সেই বিল্ডিংও দেখা হল।

দেখাটেখা সাঙ্গ করে বাবামা ফিরে আসছেন এমন সময় পেছন থেকে কে যেন চেঁচিয়ে ডাকল,

‘চন্দন?’

বহুদিন বাদে নিজের ডাকনামটা শুনে বাবা চমকে ফিরে তাকালেন। খানিক দূর থেকে এক ভদ্রলোক হেঁটে আসছেন। ছোট্টখাট্ট ভদ্রলোক, মাথা বাবার বুকের কাছে আসতে না আসতেই ফুরিয়ে গেছে। মুখে অনিশ্চিত হাসি।

‘চন্দন না?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু . . .’

ততক্ষণে ভদ্রলোকের মুখ জুড়ে হাসি ছড়িয়ে পড়েছে।

‘সর্বনাশ, গুন্ডাপ্পা!’

গল্পটা এই পর্যন্ত বলে আলমারি থেকে লুচিভাজা অ্যালবামটা বার করে এনেছিলেন বাবা। পাতায় পাতায় সাঁটা হলদে মেরে যাওয়া সাদাকালো ছবি। চেয়ারে বসা আমার অবিশ্বাস্য রকম কমবয়সী ঠাকুমাকে ঘিরে দাঁড়ানো হাফপ্যান্ট-পরা জেঠু, বাবা, কাকু। ঠাকুমার কোলে পুঁটলির মতো পিসি। ছোটকাকু তখনও সিনেই নেই। অ্যালবামের খসখসে মোটা কালো পাতাগুলোকে সাবধানে উলটে উলটে এক জায়গায় এসে থামলেন বাবা। দুটো ছেলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুজনেই টিংটিঙে রোগা, দুজনের পরনেই স্কুলের ইউনিফর্ম। সাদা শার্ট, নীল হাফপ্যান্ট। নীল অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না। ধূসর হয়ে গেছে। একজনের মাথা আরেকজনের বুকে কাছে এসে থেমে গেছে।

‘এই হচ্ছে গুন্ডাপ্পা। কত ইডলি খেয়েছি ওর মায়ের হাতে।’

দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরলেন। মাঝখান থেকে পঞ্চাশটা বছর হুস করে মিলিয়ে গেল। গুন্ডাপ্পা মায়ের সঙ্গে আলাপ করলেন। দু’হাত বুকের কাছে জড়ো করে অনেক বাঙালির থেকে স্পষ্ট বাংলায় বললেন, ‘নমস্কার বৌদি। খুব ভালো লাগল আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে।’

রাস্তায় দাঁড়িয়েই অনেক গল্প হল। আরও কত কত লোক, কোথায় কোথায় চলে গেছে। গল্প ফুরোলে গুণ্ডাপ্পার পিঠ আরেকবার জড়িয়ে ধরে বাবা বললেন, ‘ভাগ্যিস ডাকলি। তুই আমাকে চিনলি কী করে বলতো?’

গুন্ডাপ্পা মুচকি হাসলেন।

‘হাইট দেখে।’

বাবামা যা চেয়েছিলেন তাই হল। দারুণ ইন্টারেস্টিং কাটল তাঁদের রবিবার। আমি খালি উদাস হয়ে বসে বসে ভাবতে লাগলাম, মায়ের হাসি আর বাবার হাইট, কোনওটাই আমার ভাগ্যে জুটল না কেন কে জানে।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.