November 29, 2014

সাপ্তাহিকী




শিল্পীঃ Brock Davis


Brag is a good dog, but holdfast is better.
                                 ---পুরোনো প্রবাদ।

মির‍্যাকিউরল বড়ি খাওয়া তো দূর অস্ত, চোখে দেখেছেন কি? কিংবা কার্বোথিনের জামা? অবান্তরের একজন প্রিয় বন্ধুর পাঠানো লিংকে ক্লিক করে দেখে নিন।

ডিজনির জল মেশানো সংস্করণের ক্ষীণকটি যুবতীর কথা ভুলে যান। আসল গল্পে স্নো হোয়াইটের বয়স কত ছিল জানেন? সাত। সেই সাত বছরের মেয়ের রূপের জ্বালায় জ্বলেপুড়ে তাকে প্রাণে মারতে কে চেয়েছিল জানেন? উঁহু, সৎ নয়, স্নো হোয়াইটের নিজের মা।


My dear michael,
Jim Watson and I have probably made a most important discovery.

বলছে দোষ নাকি চিকেন জংলি স্যান্ডউইচের নয়, দোষ নাকি আমাদের টেস্ট বাডের। যারা প্লেনে উঠলেই অসাড় হয়ে যায়। প্লেনে উঠলে আরও কী কী ভয়ংকর ব্যাপার ঘটে জানতে হলে ক্লিক করুন।


Most people’s marriages were fine until they started using Facebook and WhatsApp.


বাস্তবে যদি না-ই হয়, তবে ভার্চুয়াল-ই সই।


November 27, 2014

Things I am Thankful for



ভদ্রতাবোধসম্পন্ন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

নিজের সমস্ত দুশ্চিন্তা, উদ্বেগের ভার সম্পূর্ণ ন্যস্ত করার মতো শক্তপোক্ত কাঁধওয়ালা দু’জোড়া বাবামা।

ঠাকুমা। কুয়োর পাড়ে উঠে পেয়ারা পাড়া ঠাকুমা, ক্যাথিটার পরে বিছানায় শুয়ে থাকা ঠাকুমা।

অফিসফেরতা অসামান্য ক্ষিদের মুখে সামান্য ঝালমুড়ি।

ফ্রিজ ভর্তি স্বাস্থ্যকর খাবার ফেলে রেখে ম্যাগি দিয়ে ডিনার সারার চরম অস্বাস্থ্যকর তাল।

সে তালে সোৎসাহে তাল মেলানোর মতো সঙ্গী। চব্বিশ ঘন্টার।

ফ্রেন্ডদের উপস্থিতি। ফ্রেন্ডলিস্টের অনুপস্থিতি।

শুক্রবার বিকেল। শনিবার সকাল।

ক্যান্ডি ক্রাশ। একাকীত্বে সঙ্গ দেওয়ার জন্য। আমার মতো জন্মনিড়বিড়ের ভেতরের সুপ্ত কিলার ইনস্টিংক্টের ঘুম ভাঙানোর জন্য।

সাইলেন্ট মোড।

স্প্যাম ফোল্ডার।  

মুখপোড়ানো বেগুনি।

বুকজোড়ানো ঠাণ্ডা জল।

বারান্দাওয়ালা বাড়ি।

মেট্রোওয়ালা শহর।

অবান্তর।

আপনারা। 

   

November 26, 2014

বাতিক



এবারের পুরোনো অবান্তর লিখতে গিয়ে যে পোস্টটা মনে ধরল সেটার নাম OCD। অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার। সেটাকে নতুন করে লিখতে গিয়ে একটা কথা মনের ভেতর খচখচ করছিল। আমি যে উদাহরণগুলো নিয়ে লিখছিলাম সেগুলোকে OCD বলে কি না সেটাই তো আমি জানি না। ফস্‌ করে এইসব বৈজ্ঞানিক নাম নিয়ে টানাটানি করা উচিত নয় বলেই মনে হল আমার। তাছাড়া ডিসঅর্ডার বললে আমার পচা গল্পগুলোকে দরকারের বেশি সম্মান দেওয়া হয়, কাজেই তাদের বাতিক বলে ডাকাই সব দিক থেকে সুবিধেজনক।

ছোটবেলায় আমার নানারকম বাতিক ছিল, বড় হতে হতে বেশিরভাগই কেটে গেছে। অন্তত চোখে পড়ার মতো কিছু বাকি নেই বলেই আমার আশা। তখন আমরা সর্বত্র ট্রেনে করে বেড়াতে যেতাম। স্লিপার ক্লাসের কাঠের সিটে বসে, খোলা জানালা দিয়ে হুহু করে ঢুকে পড়া আকাশবাতাস হাঁ করে গিলতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শেষে নামার আগে মা মাথায় চিরুনি ছোঁয়াতেই প্রাণ বেরোবার যোগাড়। তার পর বাবামায়ের পদোন্নতি হল, আমরাও স্লিপার ছেড়ে এসি থ্রি টায়ারে এসে পড়লাম।

আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতার একটা বিরাট অংশ জুড়ে আছে তিন বার্থওয়ালা ট্রেনের কামরা। প্লেনের থেকে ঢের ভালো। পা তুলে আরাম করে বসা যায়, টিফিনবাক্স খুলে লুচি আলুভাজা খাওয়া যায়। ক্যাটারারের পুঁচকে প্লাস্টিকের ট্রে-তে করে আসা ন্যাতানো কাটলেট আর আলুনি অমলেটও, সত্যি বলছি, আমার ভালো লাগে। অন্তত চিকেন জংলি স্যান্ডউইচের থেকে তো ভালো তো লাগেই।

কিন্তু সবথেকে ভালো লাগত বার্থে শুতে। কেন ভালো লাগত সেটা একটা রহস্য অবশ্য। ওইটুকু জায়গা, এদিক ফিরলে দেওয়াল, ওদিক ফিরলে ‘এই বুঝি পড়ে গেলাম’ ভাব, পিঠের নিচে পাতলা সাদা চাদর, বুকের ওপর রামকুটকুটে কম্বল – তবু বাড়ির কিং সাইজ বিছানার থেকে চিরকাল সেটাকে একশো গুণ ভালো আর রোমহর্ষক মনে হত। বাড়ির বিছানা যতই হোক, আমার না, বড়দের। তারা দয়া করে আমাকে শুতে দিয়েছে, যে কোনও ‘সরুন দিদি’ বলে যে কেউ এসে শুয়ে পড়তে পারে। বার্থে সে দুর্ঘটনা ঘটার জো নেই। গোটাটাই আমার জগৎ। এবার আমি ওপরের ট্রেনের সিলিংটাকে তারাভরা আকাশ বানিয়ে নিই, কিংবা ম্যাকিনটোশ মোড়া বার্থটাকে সাহারা মরুভূমি, কার কী বলার আছে?

বোনাস কুইজঃ ‘ট্রেনে ঊঠলে আপনার ঘুম হয়, না হয় না?’ হঠাৎ ফেলুদা প্রশ্ন করল জটায়ুকে। জটায়ু একটা জলহস্তীর মতো বিশাল হাই তুলতে গিয়ে মাঝপথে থেমে হেসে বলল, ‘ঝাঁকুনিটা মন্দ লাগে না।’

ফেলুদা বলল, ‘জানি। কিন্তু সকলের পক্ষেই এই ঝাঁকুনিটা ঘুমপাড়ানির কাজ করে না। আমার এক মেসোমশাই সারারাত জেগে বসে থাকতেন ট্রেনে। অথচ বাড়িতে খেয়েদেয়ে বালিশে মাথা দিলেই অঘোর নিদ্রা।’

কোন গল্প?

অবশ্য সব বার্থের আকর্ষণ আমার কাছে সমান ছিল না। একেবারে গুঁড়ি অবস্থায় মা আমাকে কোঁচড়ে নিয়ে লোয়ার বার্থে শুতেন, হাত পা চলতে শুরু করতেই আমি সিঁড়ি বেয়ে সবথেকে উঁচু বার্থটা অধিকার করতাম। যেটায় আমাকে কেউ কখনও চড়াতে পারেনি কখনও সেটা হচ্ছে মিডল বার্থ। আমার নাকের ঠিক তিন ইঞ্চি ওপরে একটা লোক শুয়ে আছে, এবং অ্যাকসিডেন্ট হলে সে যে বার্থশুদ্ধু আমার ঘাড়ে পড়বে, এই কল্পনাটাই আমার কাছে ভয়াবহ ছিল।

অ্যাকসিডেন্ট যে একদিন না একদিন হবেই সে নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ ছিল না। কোনও ছোটরই থাকে না বোধহয়। আমরা বড়রা নিজেদের জীবনকে যেমন টেকেন ফর গ্র্যান্টেড করে নিই, ছোটরা তেমন নেয় না। তারা মনে মনে জানে যে একটি অসম্ভব বিপদসংকুল ও দুর্ঘটনাপ্রবণ পৃথিবীতে তারা বাস করছে। আমাদের কাছে যে জীবনের মানে পারসুইট অফ হ্যাপিনেস আর ফ্রাইডে নাইটের বোলিং অ্যালির আরাম, ছোটদের কাছে সেই জীবনই খাটের তলার অন্ধকারের অনিশ্চয়তা। সে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকে যারা, খাট থেকে নামতে গেলেই যে গোড়ালি টেনে ধরতে পারে তাদের বিশ্রী কালো হাত, সেটা ছোটরা কক্ষনও ভুলতে পারে না। ঠাকুরদার ঝুলি, গ্রিমস ভাইদের রূপকথা পড়ে বড়দের গায়ে কাঁটা দেয়। সুয়োরানীকে রাজা মাথায় কাঁটা হেঁটোয় কাঁটা দিয়ে মরতে পাঠাচ্ছেন, খাঁচার ভেতর বন্দী ছেলের আঙুল টিপে ডাইনিবুড়ি দেখছে সে ছেলে খাওয়ার যোগ্য নধর হয়েছে কি না – এ সব পড়ে আমরা বড়রা শিউরে উঠি, ছোটদের গায়ের একটি রোমও খাড়া হয় না। ট্রেনে চড়ার সময় বড়রা খালি লুচি আলুরদমের কথাই ভাবে, ছোটরা অ্যাকসিডেন্টটাও স্পষ্ট দেখতে পায়।

এই মিডল বার্থের বাতিক আমার কী করে কাটল সেটা বলি।

ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় আমাদের রাজস্থান বেড়াতে যাওয়া হয়েছিল। ট্রেনে আমাদের কুপে এক ডাক্তারবাবুর পরিবার উঠেছিলেন। তাঁরাও রাজস্থান যাচ্ছেন। এদিকে বাবা মা আমি, ওদিকে ডাক্তারবাবু ডাক্তারবাবুর স্ত্রী ও ক্লাস ফাইভে পড়া কন্যা। আমাদের আড়াইখানা লাগেজ, ডাক্তারবাবুদের তিনটে। হাফ যে বাড়তি লাগেজটি সেটি ডাক্তারবাবু কাছছাড়া করছেন না। কিছু পরেই বোঝা গেল সেটায় ভর্তি হয়ে চলেছে গুচ্ছের শারদীয়া। আনন্দমেলা, শুকতারা, কিশোর ভারতী, দেশ, পত্রিকা, আনন্দলোক।

ডাক্তারবাবুর স্ত্রী বললেন, “পুজোর সময় বেড়াতে যাওয়ার এই এক হ্যাপা। বাসে যেতে যেতে বই পড়বে, হোটেলে রাত জেগে বই পড়বে। পারলে আমাদের সাইট সিইং-এ পাঠিয়ে নিজে হোটেলে শুয়ে শুয়ে বই পড়বে। যেন টুম্পার মতো ছুটির পর স্কুল খুলে পরীক্ষা। আমার মাথায় ঢোকে না। আরামই যদি না করবে তা হলে আর বেড়াতে যাওয়া কেন বাবা, বাড়িতে বই মুখে করে বসে থাকলেই তো হয়।”

খাওয়াদাওয়া সেরে শোওয়ার সময় বার্থ ভাগাভাগির কথা উঠল, আর সেই সঙ্গে আমার বাতিকের কথাও। বাবামা হেসে হেসে আমার চিঁড়েচ্যাপ্টা হওয়ার আতংকের কথা বললেন, যেন দারুণ রসিকতার ব্যাপার। আমি মুখ বাঁচাতে তাড়াতাড়ি বললাম, “আমি জানি এগুলোর কোনও মানে নেই, তবু কিছুতেই নিজেকে বোঝাতে পারছি না।” ডাক্তারবাবু আনন্দমেলার একটা জায়গায় আঙুল গুঁজে রাখা অবস্থায় অন্য হাতে ঝুলে ঝুলে তৃতীয় বার্থে ওঠার কঠিন কসরত করছিলেন, তিনি বললেন, “আজকেই একবার শুয়ে দেখ না কী হয়। দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হয়ে যাবে।”

এরপর আর কথা চলে না। আমি দুরুদুরু বুকে মিডল বার্থে শুয়ে পড়লাম। শুরুর চূড়ান্ত অস্বস্তি সত্ত্বেও একসময় ঘুম এসে গেল। লোকজনের কথাবার্তায় ঘুম ভাঙল যখন দেখলাম সকাল হয়ে গেছে, উর্দিপরা এক ভদ্রলোক চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে আমাদের খোপে ঢুকে পড়েছেন, আর মা বার্থের পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন, “হল তো? দুধ কা দুধ, পানি কা পানি?”

পরে ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার সময় যখন ঠিকানা দেওয়ানেওয়া হল, আমার বাবা মুখেমুখে আমাদের নামঠিকানা বললেন আর ডাক্তারবাবু মানিব্যাগ থেকে বার করে কার্ড দিলেন, আমি ঝুঁকে পড়ে দেখলাম লেখা আছে ডঃ অমুক চক্রবর্তী, সাইকায়াট্রিস্ট।

এই চাপা পড়ার টেনশনটা কিছু নতুন নয়। এই ভয়টাই বেড়েচেড়ে কদাকার রূপ ধারণ করলে যেটা হয় সেটার নাম ক্লস্ট্রোফোবিয়া। এটা যাদের থাকে তারা লিফটে উঠতে পারে না, আরাকু ভ্যালি বেড়াতে গিয়েও বোরাগুহায় ঢুকতে পারে না, সারাক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে বাঁদরদের বাদাম খাওয়াতে হয়। লম্বা টানেলে ঢুকলে কষ্ট হয়, এমনকি হাইওয়েতে চলার সময় পাশে কোনও প্রকাণ্ড ট্রেলার পাশে এসে আকাশবাতাস ঢেকে দিলেও তাদের হৃৎকম্প ওঠে।

ক্লস্ট্রোফোবিয়া যাদের থাকে তারা সাধারণত নিজেরা চাপা পড়ার ভয় পায়। আমি একটা রিভার্স ক্লস্ট্রোফোবিয়ার গল্প শুনেছিলাম যেখানে রোগী সর্বক্ষণ অন্য কাউকে চাপা দিয়ে ফেলার ভয় পাচ্ছেন। রোগী একজন প্রৌঢ় ভদ্রমহিলা, চাকরিবাকরি শেষ, ছেলেমেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, সকালে ছাদে বাগান করেন, দুপুরবেলা বাড়ির গোপালকে নকুলদানা জল দিয়ে খেয়ে উঠে সিরিয়াল দেখেন, রাত পড়লে সন্ধ্যে দিয়ে আবার সিরিয়াল দেখতে বসেন, সোজা কথায় দিব্যি ঝাড়া হাত পা জীবন, এমন সময়ে তাঁর জীবনে এক বিপদের আবির্ভাব হল। বিপদও বলা যায়, বাতিকও বলা যায়। ভদ্রমহিলা দেখতে লাগলেন যে তিনি যত্রতত্র গোপাল চাপা দিয়ে ফেলছেন। টেবিলে বইয়ের তলায়, ছাদে টবের তলায়, বাথরুমে বালতির তলায়।

এই ঘটনাটা যদি পঞ্চাশ বছর আগে ঘটত, “রাঙাদিদার ভীমরতি হয়েছে” বলে সবাই নাকে তেল দিয়ে বসে থাকত, দুষ্টু নাতিনাতনিরা “ও ঠাকুমা, তোমার গোপাল যে রান্নাঘরে সবজির ঝুড়ির তলায় চাপা পড়ে আছে দেখে এলাম গো” বলে জ্বালাতন করত, ব্যাপারটা ওইখানেই ধামাচাপা পড়ে যেত। কিন্তু আমাদের ভদ্রমহিলার ঘটনাটা যখন ঘটল তখন ফোবিয়া, ডিসঅর্ডার এ সব কথা লোকের কানে জলভাত হয়ে গেছে, সাইকায়াট্রিস্টকে আর কেউ পাগলের ডাক্তার বলে ডাকছে না। ভদ্রমহিলার ছেলেমেয়েরা তাঁকে ধরে সে রকম একজন সাইকায়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেল। সাইকায়াট্রিস্ট চিকিৎসা করলেন, ভদ্রমহিলার অতীতভবিষ্যৎ আশানিরাশা স্বপ্নদুঃস্বপ্ন ছেনে আতংকের মূল কারণ উদ্ধারের চেষ্টা হল, ওষুধ পড়ল, ওষুধ ভদ্রমহিলার ব্রেনের ভেতর ঢুকে হ্যাপিনেস সিরাম ক্ষরণ করাতে গেল।

অনেকদিন পর ডাক্তারবাবুর সঙ্গে রাস্তায় ভদ্রমহিলার দেখা হয়েছিল। ডাক্তারবাবু দেখে খুশি হলেন যে ভদ্রমহিলার মুখে সেই আতংকের ছায়া আর নেই, বরং গর্ব, তৃপ্তি, সন্ত্রাস মেশানো বেশ একটা আভা ফুটে বেরোচ্ছে। প্রাক্তন রোগীর গর্ব ও সন্ত্রাসের কারণ বুঝতেও ডাক্তারবাবুর দেরি হল না। অতি তৎপর একটি ক্ষুদ্র বালক, দু’পায়ে চলে কিন্তু হাবভাবে চারপায়ের সঙ্গেই তার মিল বেশি। ভদ্রমহিলা উৎফুল্ল হয়ে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আলাপ করলেন। ডাক্তারবাবুর কথা শোনার থেকে নিজের কথাই বললেন বেশি। ছেলের কথা, মেয়ের কথা, মেয়ের ঘরের এই নতুন সদস্যটির কথা – যার জ্বালায় ভদ্রমহিলার এক মুহূর্ত নিঃশ্বাস ফেলার জো নেই – খুব খুশি হয়ে জানালেন তিনি।

গোপাল চাপা পড়ার কথাটাই উঠল না। ডাক্তারবাবু বুঝলেন জ্যান্ত গোপালের উৎপাতে পেতলের গোপালের কথা মাথা থেকে উবে গেছে মহিলার।

কলেজে পড়ার সময় থেকে আরেকটি ইন্টারেস্টিং বাতিক হয়েছিল আমার। বেশ কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছি, আমাদের পাশে একজন শান্তিপ্রিয়, দীর্ঘদেহী উন্মাদ চুপ করে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, আমাদের ব্যাচ শেষ হলে উনি ফুচকা খাবেন। প্রথম দিন ওঁকে দেখে আমরা খুব ভয় পেয়ে চিৎকার করে এদিকওদিক ছুটে পালিয়েছিলাম (যদিও শালপাতা হাত থেকে ফেলে দিইনি), শেষে ফুচকাওয়ালার “কুছ নেহি করেগা, ম্যাডাম” আশ্বাস পেয়ে আবার গুটি গুটি ফেরত গিয়ে বকেয়া ফুচকা শেষ করেছিলাম। তারপর থেকে অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। আমরা ফুচকা খেতাম, ফুচকাওয়ালার পোষা পাগল পাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকত, আমাদের হয়ে গেলে সে খাবে।

দৃশ্যটা মনে মনে কল্পনা করতে পেরেছেন তো? এইবার মনে করুন কলেজের গেট থেকে আরেকদল মেয়ে কলকল করতে করতে বেরিয়ে এল, তাদের সঙ্গে একটু আগেই পাস ক্লাসে দেখা হয়েছে, অথচ ভঙ্গি দেখলে মনে হবে যেন গত পাঁচবছর অদর্শনের পর এই দেখা হল। ডি শার্পের কোমল নিষাদে আর্তনাদ করতে করতে এসে তারা আমাদের জাপটে ধরল, আমাদের শালপাতা থেকে তুলে ফুচকা মুখে পুরে দিল আর এই সব কলকাকলিতে আমি তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরে গেলাম।

আর অমনি আমার অস্বস্তি শুরু হল। মনে হল আমার শরীরটা যেন পেঁচিয়ে গেছে। যতক্ষণ না উল্টো ঘুরে প্যাঁচ খুলছি ততক্ষণ শান্তি নেই। অস্বস্তি বাড়তে বাড়তে শেষে যখন মাথা ঝিমঝিম, পেট খালিখালি, তখন লোকলজ্জার মাথা খেয়ে আমি কলকাতার ভরদুপুরের রাজপথে দাঁড়িয়ে এমনি এমনিই উল্টোদিকে একবার পাক দিয়ে নিলাম। প্যাঁচট্যাচ খুলে আবার সব ঠিক হয়ে গেল।

এই প্যাঁচ ঠিক করে দেওয়ার বাতিক আমার এক বন্ধুরও ছিল। তবে নিজের নয়, টয়লেট পেপার রোলের প্যাঁচ ঠিক করে দেওয়া বাতিক। নিজের বাড়ির তো বটেই, লোকের বাড়ির বাথরুমের টয়লেট পেপারের রোলের দিক ঠিক করে দিয়ে আসত সে।

কলেজের মতো না থাকলেও পেঁচিয়ে যাওয়ার অনুভূতি আমার এখনও যখনতখন হয়। রাস্তায় চলতে চলতে, অফিসে বসে বসে, খাটের ওপর বালিশের ঢিবির ওপর হেলান দিয়ে বসে টাইপ করতে করতে। মনে হয় মারাত্মক প্যাঁচ লেগে গেছে আমার। শরীরে, মনে, মাথায়, চিন্তায়। ঘর একা পেলে মাঝে মাঝে এদিকওদিক ঘুরে সে প্যাঁচ খোলার চেষ্টাও করেছি। খোলেনি। মা’কে ফোন করে নালিশ করলে মা হাহা করে হেসে বলেন, ওটাই নাকি জীবন। আগাপাশতলা প্যাঁচ নিয়ে দিনযাপন। পারসুইট অফ হ্যাপিনেস নয়।


November 23, 2014

কুইজঃ কার লেখা কে লেখে? (উত্তর প্রকাশিত)



উৎস গুগল ইমেজেস


নিচের তালিকাটা দেখলেই গোলমালটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। যিনি ক তিনি এক নম্বর লেখা লেখেননি, (ইন ফ্যাক্ট, তিনি দু’নম্বর লেখাটিও লেখেননি, তিন নম্বরটিও . . . নাঃ, আর হিন্ট দেওয়াটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে), যিনি খ তিনি দু’নম্বরটি লেখেননি, ইত্যাদি প্রভৃতি। ক খ-র সঙ্গে এক দুই ঠিকঠাক ম্যাচিং করে তালিকার গোলমাল সারানোই আপনাদের আজকের খেলা।

খেলা শুরু হল এখন থেকে, শেষ হবে ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা পর। দেশে সোমবার রাত আটটায়। ততক্ষণ আমি কমেন্ট পাহারা দেব। অল দ্য বেস্ট।


*****


ক) প্রেমেন্দ্র মিত্র
১। বোবা কাহিনী
খ) রমাপদ চৌধুরী
২। বারো ঘর এক উঠান
গ) বিমল মিত্র
৩। বালিকা বধূ
ঘ) বিমল কর
৪। সাহেব বিবি গোলাম
ঙ) জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
৫। শিবুর ডায়রি
চ) জসিমুদ্দিন
৬। হুগলীর ইমাম বাড়ি
ছ) লীলা মজুমদার
৭। বাঙালি জীবনে রমণী
জ) সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
৮। খারিজ
ঝ) নীরদ সি চৌধুরী
৯। পাঁক
ঞ) স্বর্ণকুমারী দেবী
১০। ডাবল বেডে একা
ট) সতীনাথ ভাদুড়ী
১১। অরণ্যের অধিকার
ঠ) শিবরাম্ চক্রবর্তী
১২। মোৎজার্টের স্বরলিপি
ড) নবনীতা দেবসেন
১৩। চার ইয়ারি কথা
ঢ) উৎপল দত্ত
১৪। আমি রাসবিহারীকে দেখেছি
ণ) বুদ্ধদেব বসু
১৫। ডোডো তাতাই পালাকাহিনী
ত) নারায়ণ সান্যাল
১৬। বিজলীবালার মুক্তি
থ) তারাপদ রায়
১৭। বাড়ি থেকে পালিয়ে
দ) মহাশ্বেতা দেবী
১৮। গোলাপ কেন কালো
ধ) প্রমথ চৌধুরী
১৯। ঢোঁড়াই চরিত মানস
ন) মতি নন্দী
২০। মঁসিয়র হুলোর হলিডে


*****


উত্তর


ক) প্রেমেন্দ্র মিত্র
৯। পাঁক
খ) রমাপদ চৌধুরী
৮। খারিজ
গ) বিমল মিত্র
৪। সাহেব বিবি গোলাম
ঘ) বিমল কর
৩। বালিকা বধূ
ঙ) জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
২। বারো ঘর এক উঠান
চ) জসিমুদ্দিন
১। বোবা কাহিনী
ছ) লীলা মজুমদার
৫। শিবুর ডায়রি
জ) সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
১০। ডাবল বেডে একা
ঝ) নীরদ সি চৌধুরী
৭। বাঙালি জীবনে রমণী
ঞ) স্বর্ণকুমারী দেবী
৬। হুগলীর ইমাম বাড়ি
ট) সতীনাথ ভাদুড়ী
১৯। ঢোঁড়াই চরিত মানস
ঠ) শিবরাম্ চক্রবর্তী
১৭। বাড়ি থেকে পালিয়ে
ড) নবনীতা দেবসেন
২০। মঁসিয়র হুলোর হলিডে
ঢ) উৎপল দত্ত
১২। মোৎজার্টের স্বরলিপি
ণ) বুদ্ধদেব বসু
১৮। গোলাপ কেন কালো
ত) নারায়ণ সান্যাল
১৪। আমি রাসবিহারীকে দেখেছি
থ) তারাপদ রায়
১৫। ডোডো তাতাই পালাকাহিনী
দ) মহাশ্বেতা দেবী
১১। অরণ্যের অধিকার
ধ) প্রমথ চৌধুরী
১৩। চার ইয়ারি কথা
ন) মতি নন্দী
১৬। বিজলীবালার মুক্তি



November 20, 2014

খারাপ লাগা ভালো বই



ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় ঘটনাটা ঘটে গেল। লাইব্রেরি থেকে একটা গল্পের বই এনে পড়তে শুরু করে আমি দেখলাম ভালো লাগছে না। বই ভালো না লাগার ঘটনাটা নতুন নয় অবশ্য। তার আগেও আমার বিস্তর বই ভালো লাগেনি। “তাতে অসুবিধে কিছু নেই”, বলতেন আমাদের লাইব্রেরিয়ান আশুকাকু। কাকুর মত ছিল, নিয়ম করে ভালোলাগা বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে পথ্য করার মতো করে বাজেলাগা বই পড়া উচিত। বিশেষ করে যারা এখনও বীজগণিত শিখতে শুরু করেনি তাদের তো উচিতই। “বলা যায় না, পড়তে পড়তে একদিন দেখবি হয়তো বাজেগুলোকেই ভালো লাগবে, আর ভালোগুলোকেই আর পাতে তুলতে পারবি না।”

কাজেই আমি হাতের কাছে যা পেতাম তাই পড়তাম, ফেলুদা ভালো লাগত তাও পড়তাম, পাণ্ডব গোয়েন্দা ভালো লাগত না, তাও পড়তাম। ফেলুদা একবইঠায় শেষ করতাম, কাকাবাবু দু’তিন বইঠা লাগত, পাণ্ডব গোয়েন্দা চার-পাঁচ, কিন্তু যত বইঠাই লাগুক না কেন শেষ না করে ছাড়িনি কখনও।

সেই প্রথমবার লাইব্রেরি থেকে আনা বইটা আমি শেষ করতে পারলাম না। বইখানা খুললাম, একপাতা পড়লাম, বন্ধ করলাম। আবার খুললাম, এবার দু’পাতা পড়েই মন উঠে গেল। তিন নম্বর বার বকেঝকে কাল্পনিক চড়চাপড় মেরে মনকে দশ পাতা পর্যন্ত নিয়ে গেলাম, কিন্তু তার বেশি আর যাওয়া গেল না।

সাতদিন বইটা কোলে করে বসে থাকার পর অবশেষে লাইব্রেরিতে গিয়ে বইটা ফেরৎ দিয়ে অন্য বই নিয়ে আসলাম। মনের ভেতরটা মরমে মরে রইল। সেই দশ বছর বয়সেই আমার অপরাধবোধ হিংসে করার মতো ছিল। বইটা যে খারাপ হতে পারে এ কথা কিছুতেই মনে ঠাঁই দিতে পারছিলাম না। খালি মনে হচ্ছিল দোষ নিশ্চয় আমার। বইটা পড়া ও পড়ে মর্মোদ্ধার করার যোগ্যতাই নিশ্চয় আমার নেই।

বিশেষ করে বইটার লেখকের নাম যখন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সেই সবে শুরু। এর পরেও অনেকবার ঠিক এই অনুভূতিটা হয়েছে। বিভূতিভূষণের ‘অনুবর্তন’ শেষ করে, তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ শেষ না করে, ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’ খারাপ লেগে আমি মরমে মরে থেকেছি। নিজের বুদ্ধিহীনতায়, রুচিহীনতায় শিউরে উঠেছি বার বার। গুণীসমাজে জলচল হওয়ার আতংকে আমার রাতের ঘুম উড়ে গেছে।

আমাদের ভালোলাগা মন্দলাগার ব্যাপারটা কতখানি আমাদের নিজেদের স্থির করা আর কতখানি অন্যের ঠিক করে দেওয়া সেটা কেউ জানে না। যা যা আমাদের ভালো লাগে তার সবখানিই কি আমাদের সত্যি ভালো লাগে, নাকি আমরা জানি যে এই জিনিসগুলো ভালো, এগুলো আমাদের ভালো লাগা উচিত, সেই জন্য ভালো লাগে? অনেকদিন আগে একটা গল্প পড়েছিলাম। লেখক একটি ছোট ছেলেকে নিয়ে ট্রেনে চেপে যাচ্ছিলেন। একটি বিস্তীর্ণ জলখণ্ডের ওপর একটি ব্রিজ দিয়ে দিয়ে ট্রেনটি যাচ্ছিল। ব্রিজের গুমগুম শব্দ হচ্ছিল। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। তার আলো শান্ত জলে মাখামাখি হয়েছিল। ভদ্রলোক মুগ্ধ দৃষ্টিতে সে দৃশ্য দেখছিলেন। এমন সময় তাঁর চোখ পড়ল তাঁর সঙ্গের বালকটির দিকে।

জানালার পাশে বসা ছেলেটি এক মনে তার হাতে ধরা গুলতি নিয়ে খেলা করছে। বাইরের স্বর্গের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে। ভদ্রলোক অবাক হলেন। কিছুক্ষণ পর থাকতে পেরে তিনি বললেন, “জানালার বাইরেটা দেখেছ?” ছেলেটি মাথা তুলে দেখল, আবার মাথা নামিয়ে গুলতির দিকে মনঃসংযোগ করল। ট্রেন ছুটতে লাগল। ব্রিজ গুমগুম শব্দ করতে লাগল। আর একটু পরেই জল শেষ হয়ে আসবে, সূর্য ডুবে যাবে, জলের ওপর তৈরি হওয়া এই অবিশ্বাস্য মায়া উধাও হয়ে যাবে। ভদ্রলোক অধৈর্য হয়ে উঠলেন। ভদ্রলোক এইবার আর হিন্ট দিলেন না, সোজা লিডিং কোশ্চেনের পথ ধরলেন। “বাইরেটা কেমন সুন্দর দেখেছ?” বাধ্য ছেলেটি আরও একবার মাথা তুলে তাকাল। এইবার একটু বেশি সময় তাকিয়ে থাকল। আবার মাথা নামিয়ে গুলতিতে মনোনিবেশ করল। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, “এই যে এত বিস্তীর্ণ জল, জলের ওপর রঙের খেলা, আকাশ জুড়ে মেঘ আর সূর্যের মাখামাখি – তোমার ভালো লাগছে না?”

ছেলেটি এবার জানালার বদলে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল, বলল, “ভালো, কিন্তু বোরিং।” তার মাথা ঘুরে গেল গুলতির দিকে।

স্তম্ভিত ভদ্রলোক মুখ তুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। মুগ্ধতা কেটে গিয়ে তাঁর মনের ভেতর তখন শুধু অবিশ্বাস। বাইরেটা একই রকম রইল ট্রেন ছুটতে থাকল, ব্রিজ গুমগুম শব্দ করতে লাগল, জলের ঢেউয়ে খানখান হয়ে যেতে লাগল সূর্যের অস্তরশ্মি – এই প্রথম ভদ্রলোকের মনের কোণে উঁকি দিয়ে গেল, সত্যিই কি ব্যাপারটা একঘেয়ে? প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা কি আমাদের জন্মগত? নাকি ট্রেনিং-এর ফল?

আমরা মানতে চাই বা না চাই, আমাদের ভালোলাগা মন্দলাগার একটা বিরাট অংশ পরের মুখে ঝাল খাওয়া। যাঁদেরকে আমাদের ভালোলাগে, আমরা যাঁদের মতো হতে চাই, তাঁদের ভালোলাগামন্দলাগা বিশ্বাসঅবিশ্বাস আমাদের প্রভাবিত করে। পরের মুখে ঝাল খাওয়া কথাটার মধ্যে একটা নেগেটিভ দ্যোতনা আছে, কিন্তু সেটা সবক্ষেত্রে খারাপ নাও হতে পারে। পরের মুখে ঝাল না খেলে আমার জীবনেও ইঞ্জিরি গান শোনা হত না। চোখ কান বুজে “এই পর্যন্ত যা শুনেছি যা শিখেছি সেই যথেষ্ট, আর কিছু শুনব না শিখব না লালালালালালা” করলে বব ডিলানকে আমার কোনওদিন চেনা হত না। সেটা একটা খারাপ ব্যাপার তো হতই। মানছি, ইঞ্জিরি গান শোনার প্রথম প্রেরণাটা এসেছিল যত না গানের তাড়নায় তার থেকে অনেক বেশি ত-দাদার ও ত-দাদার গিটারের প্রতি অব্যক্ত অনুরাগের রাস্তা ধরে, কিন্তু যার যে ভাবে হয়। এলভিসের ঝুলপির প্রেমে পড়ে কেউ যদি রক অ্যান্ড রোল আবিষ্কার করে ফেলে তা হলে মন্দ কী?

মুশকিল হচ্ছে ভালোলাগা মন্দলাগা দিয়ে আমরা নিজেদের এবং অন্যদের বিচার করি। মার্গসংগীত শোনা লোকটার রুচি সংগীত বাংলা দেখা লোকটার রুচির থেকে উচ্চমানের ধরে নিই। ধরে নিই চেতন ভগত পড়া লোকটার বুদ্ধি অমিতাভ ঘোষ পড়া লোকটার বুদ্ধির থেকে কম।

বুদ্ধিরুচি পরিমাপের এই প্রচলিত ব্যবস্থাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি না সে নিয়েও আমি অবশ্য  নিশ্চিত নই। হতেই পারে জ্যাজসংগীতের মর্ম বুঝতে সত্যিই একটা ন্যূনতম শিক্ষা ও পালিশের দরকার হয়, সিমোন দ্য বুভোয়াঁ পড়ে বুঝতে গেলে একটা মানুষকে আর পাঁচটা এলিতেলি হরিদাসপালের থেকে বেশি কিছু হতে লাগে।

কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে আমার কোনও সন্দেহই নেই যে একটা মানুষকে মাপর জন্য সেই মানুষটার বুদ্ধি, রুচি, শিক্ষা, সংস্কৃতিচর্চা, আস্তিকনাস্তিক স্ট্যাটাস – খুব একটা সুবিধেজনক মাপকাঠি নয়। কারণ, সেই পরের মুখে ঝাল খাওয়া। এগুলো বেসিক্যালি খোলস। চান্স ফ্যাক্টর। আজ যে ঘোর মাওবাদী, উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর কমবেশি হয়ে অন্য কলেজে ভর্তি হলে সে-ই হয়তো বিকেলবেলা পাড়ার ছেলেদের জুটিয়ে হাফপ্যান্ট পরে ভারতমাতার জয় স্লোগান দিয়ে প্যারেড করে বেড়াত। এই আমি এখন চেতন ভগতের নাম শুনলে রেগে দু’গ্রাস ভাত বেশি খেয়ে ফেলছি, আর তিনটে বাড়ি এগিয়ে গিয়ে জন্মালে আমি হয়তো চেতন ভগতের অটোগ্রাফ নিয়ে বসার ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখতাম। সোফাসেটির সজ্জা এমন মাথা খাটিয়ে করতাম যে ঘরে ঢুকে বসলে অতিথিদের প্রথম সেই ফ্রেমটাই চোখে পড়ত।

এত কথা যখন বুঝে ফেললাম তখন আমার সেই ক্লাস সিক্সের বিকেলটার কথা মনে পড়ল। না পড়া অবনীন্দ্রনাথ বুকে জড়িয়ে ধরে গুটি গুটি যাচ্ছি লাইব্রেরির দিকে। মনে হচ্ছে, হে ভগবান, কেন আমি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছি না। মনে হচ্ছে চারদিক থেকে সবাই আমাকে দেখছে আমার নিজেদের মাথার মধ্যে চিৎকার করে বলছে, “ওই, ওই মেয়েটা অবনীন্দ্রনাথ বোঝে না, ওই মেয়েটা! হাহাহাহাহা! ওই যে, ওই মেয়েটা!”

এতদিন পর আমি সেই বিকেলটাকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলাম।  সেই প্রথম মনে হল হয়তো দোষটা আমার রুচিপছন্দের নয়, হয়তো দোষটা অবনীন্দ্রনাথের। হয়তো তিনি ওই গল্পটা অত ভালো লিখতে পারেননি। হতেই তো পারে। অবনীন্দ্রনাথও তো মানুষ।

তারপর মনে হল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই বা দোষ হতে হবে কেন? দোষ আমারও না, তাঁরও না। পৃথিবীর সব ‘ভালো’ জিনিস যেআমার ভালো লাগতে হবে এমন মাথার দিব্যি কে-ই বা দিয়েছে? ভাবতেই আমার ঝুঁকে পড়া কাঁধ সোজা হয়ে গেল, মাথা উঁচু হয়ে গেল, মাথার ভেতরটা এমন আলোবাতাস খেলতে লাগল যেমনটা আগে কখনও খেলেনি।

সেই নবলব্ধ সাহসের ওপর ভর দিয়ে আজ আমি এমন কয়েকটা বিশ্ববিখ্যাত বইয়ের নাম আপনাদের কাছে বলছি যেগুলো আমার মোটে ভালো লাগেনি। কাউকে বলিনি এতদিন, এই আজ আপনাদের বলছি।  এতদিন পর মনের কথা খুলে বলতে পেরে কী আরাম যে লাগছে, সে আমি বলে বোঝাতে পারব না।

*****

দ্য লর্ড অফ দ্য রিংসঃ আমি শেষ করতে পারিনি। সিনেমাগুলোই পারিনি, বই তো দূর অস্ত। মোটা বই দেখলে এমনিতেই আমার কম্প দিয়ে জ্বর আসে, কিন্তু দ্য হবিট পড়ে এত ভালো লেগেছিল যে LOTR-এ হাত দিয়েছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আমার মাথা ঘুরতে লাগল। কারা যে ফোর্সেস অফ লাইট, কারা যে ফোর্সেস অফ ডার্কনেস, কারা যে এলভ্‌স্‌, কারা যে হাফ-এল্ভেন, কারা যে ট্রোলস, কারা যে উরুক-হাই, কারা যে হবিট, কারা যে মানুষ – সব আমার মগজের মধ্যে ঘণ্ট পাকিয়ে যেতে লাগল। 

গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো চেপে বসল গান। আধপাতা যেতে না যেতেই সবাই মিলে তিনপাতা লম্বা লম্বা কোরাস গান ধরেছে, সে সব গানের ভাষাও আমার যে পুরো বোধগম্য হচ্ছে তেমন নয়। শেষটা আমি গানের জায়গাগুলো পাতা উল্টে উল্টে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হল না। আমি মেনে নিলাম LOTR-এর মহিমা আমার আর এ জীবনে বোঝা হল না।   


গুড ওমেনসঃ “টপ টেন কম্যান্ডমেন্টস ফর রাইটারস” গোছের যত লিস্ট পৃথিবীতে আছে, তার প্রতিটির প্রথম পাঁচে না থাকলেও ছ’নম্বরে যে নির্দেশটি থাকেই সেটা হল “কিল ইয়োর ডার্লিংস”অর্থাৎ কি না, কোনও একটি শব্দ/ লাইন/ অনুচ্ছেদ লেখার পর যদি লেখকের মনে হয়, “উঃ! কী দিয়েছি!” তাহলে পত্রপাঠ সেটাকে বাতিল করাএই দুর্মূল্য উপদেশটি কার বলা শক্ত, কারণ যুগে যুগে উইলিয়াম ফকনার, জি কে চেস্টারটন, চেকভ, স্টিফেন কিং – সকলের ঘাড়েই এই উপদেশটির দায় চাপানো হয়েছে।

উপদেশটা আমার খুব মনে ধরেছিল। এই গোছেরই একটা কথা বহুযুগ আগে মাস্টারমশাই বলেছিলেন। “যেদিন নিজের গান নিজের কানে ভালো লাগবে, সেদিন বুঝবি সব শেষ।”

নিল গেমন (আমি অ্যাদ্দিন গাইম্যান বলতাম কিন্তু এটা শোনার পর আর বলি না) আবার একেবারে উল্টো কথাটা বললেন। তিনি বললেন, “লাফ অ্যাট ইয়োর ওন জোকস” ভেবে দেখলে এই কথাটিও মিথ্যে নয়, নিজের লেখা জোকস পড়ে যদি নিজেরই হাসি না পায় তাহলে অন্যের পাবে কেমন করে? আমার তো মনে হয় একজন লেখক মনের মধ্যে যতখানি যা আবেগ টের পান তার কণামাত্র অক্ষরের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। দেবদাস-এর শেষ প্যারা লিখতে গিয়ে শরৎচন্দ্র নিজে নির্ঘাৎ কেঁদেকেটে একশা হয়েছিলেন, তবেই পাঠকদের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল জমেছিল।

কিন্তু নিজের লেখা জোকস পড়ে খুব জোর হাসি পেলে তার পরিণতি কী হতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ গুড ওমেনস। বইটি পড়তে পড়তে অনেক সময়ই আমার মনে হচ্ছে টেরি প্র্যাচেট আর নিল গেমন একে অপরের সঙ্গে রসিকতা করছেন, একে অপরকে নিজের লেখা দিয়ে ইমপ্রেস করতে চাইছেন। আমি বেচারা পাঠক যে বইয়ের এদিকে বসে গল্পের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করছি, সে দিকে তাঁদের বিন্দুমাত্র খেয়াল রয়েছে বলে মনে হচ্ছিল না। অবশেষে তাঁদের (এবং প্রকাশকদেরও) চেষ্টা সফল হল, আমি শেষটা গল্প ছেড়ে গল্পের লেখকদের নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে লাগলাম। এই জায়গাটা মোটামুটি লাগছে, এটা নিশ্চয় প্র্যাচেটের লেখা, এই জায়গাটা জাস্ট পাতে দেওয়া যাচ্ছে না, এটা নিশ্চয় গেমন।


ও হেনরি-র গল্পঃ ও হেনরির লেখা প্রথম গল্প পড়েছিলাম দ্য গিফট অফ ম্যাজাই। অভূতপূর্ব লেগেছিল। বই মুড়ে খানিকক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছিল। মনে হয়েছিল এমনও গল্প হয়? এমন হৃদয়দোমড়ানো শেষ, এমন বুকমোচড়ানো আত্মবলিদান?

দ্বিতীয় গল্প, দ্য লাস্ট লিফ। গল্পের শেষে আবার খানিকক্ষণের নিস্তব্ধতা। আবার জানালার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবা, এমন হৃদয়দোমড়ানো শেষ, বুকমোচড়ানো আত্মবলিদান?

তিন নম্বর থেকে শুরু করে আর একটাও গল্প আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে প্রতিটি গল্পের শেষে সেই অনুভূতি, সেই একই প্রশ্ন। এমন হৃদয়দোমড়ানো শেষ, এমন বুকমোচড়ানো আত্মবলিদান?

গল্পের শেষের অপ্রত্যাশিত টুইস্টকে কী করে চরম প্রত্যাশিত ও নিতান্ত একঘেয়ে করে তোলা যায় সেটা ও হেনরি না পড়লে আমি বুঝতে পারতাম না।


শেষের কবিতাঃ শেষের কবিতা আমার কেন ভালো লাগেনি সেটা নিয়ে ভেবে ভেবে আমি যত সময় ব্যয় করেছি তার সিকিভাগও ওপরের আর কোনও বই/লেখককে নিয়ে করিনি। কারণ বোঝা শক্ত নয়। পাড়ার লোকের চালচলন অপছন্দ হওয়া যতটাই স্বাভাবিক, বাড়ির লোকের চালচলন অপছন্দ হওয়া তেমনই আশ্চর্য। তার ওপর সেই লোকটার বাকি সব কিছু যখন আমার দারুণ পছন্দের। তারও ওপর লোকটার ঠিক সেই জিনিসটাকেই অপছন্দ করা যা দেখে বাকি সবাই ধন্য ধন্য করছে। এ যেন বোমা ছুঁড়তে ছুঁড়তে পালানো ডাকাত দলের পেছনে সদরদরজার খিল হাতে নিয়ে ছুটে যাওয়া আমার সেজকাকুকে দেখে বলা, “এই, তপনের এক্স্যাক্টলি এই ডাকাবুকোপনাটাই পোষায় না আমার।’

মেটাফর একটু বাড়াবাড়ি রকম হয়ে গেল কিন্তু আমি কী বলতে চেয়েছি আপনারা বুঝতে পেরেছেন আশা করি। একে তো রবিঠাকুরের কিছু খারাপ লাগা, তাও আবার যে সে কিছু নয়, খোদ শেষের কবিতা!

এমন নয় যে শেষের কবিতার মূল বক্তব্য নিয়ে আমার কিছু বলার আছে। “বিয়েই প্রেমের একমাত্র পরিণতি নয়” এ সারসত্য নিয়ে কারওরই কিছু বলার থাকতে পারে বলে আমি মনে করি না। আমার সমস্যা হয় কথাটা যে বলছে তাকে নিয়ে।

“দাড়িগোঁফ-কামানো চাঁচা মাজা চিকন শ্যামবর্ণ পরিপুষ্ট মুখ, স্ফূর্তিভরা ভাবটা, চোখ চঞ্চল, হাসি চঞ্চল, নড়াচড়া চলাফেরা চঞ্চল, কথার জবাব দিতে একটুও দেরি হয় না; মনটা এমন এক রকমের চকমকি যে, ঠুন করে একটু ঠুকলেই স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ে” যার সেই অমিত রে-কে আমার কোনওদিন মনে ধরেনি। অমিত রে-র চটকদার সাজপোশাক, তুড়ুকদার জবাব চিরকাল আমাকে ইমপ্রেস করার থেকে বিরক্ত করেছে বেশি। অমিত রে আমার পছন্দের পক্ষে বড় বেশি চটপটে, বড় বেশি ঠুনকো। এমনতর অমিত রে-র মুখে “বিয়ে ছাড়াও প্রেম করা যায়” কথাটা বড়ই সুবিধেবাদী শুনতে লেগেছে আমার। এই কথাটাই যদি রবিঠাকুর বিহারীকে দিয়ে বলাতেন, নিদেনপক্ষে নিখিলকে দিয়েও, তাহলেই আর কোনও সমস্যা থাকত না। আমি তাদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলতাম, “যা বলেছ ভায়া, এই নাও হাই হায়ার হায়েস্ট ফাইভ।”

*****

আমার স্বীকারোক্তি শেষ, এবার আপনাদের পালা। এমন বিখ্যাত বইয়ের নাম করতে হবে যেটা পড়ে আপনি হাঁ করে ভেবেছেন, “এও ভালো লাগে লোকের? লোকেরা কি ছাগল? নাকি আমিই গাধা?” যদি বলেন সে রকম বই আপনার একটাও নেই, তা হলে আমি বিশ্বাস করব না।



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.