March 05, 2015

সুমিতের স্বপ্ন



মূল গল্পঃ Harvey’s Dream
লেখকঃ Stephen King


কল বন্ধ করে, সিংকের ওপর হাত ঝেড়ে পেছন ফিরতেই বুক ধড়াস করে উঠল জয়ন্তীর। ডাইনিং টেবিলে সুমিত বসে আছে। জয়ন্তীর তিরিশ বছরের স্বামী। পরনে সাদা টি শার্ট, চেককাটা বারমুডা। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে জয়ন্তীর দিকে।

ইদানীং এই ব্যাপারটা শুরু হয়েছে। শনিবার সকাল হলেই ডাইনিং টেবিলে এসে এই উদাস মুখে বসে থাকাটা। এই এক পোশাকে, এই এক চেয়ারে। ন্যুব্জ শিরদাঁড়া, গালে খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি, টি শার্টের ভেতর থেকে উঁচু হয়ে ওঠা স্তনের সামান্য আভাস, মাথার চুল এলোমেলো। দৃষ্টি শূন্য। সুস্থ মানুষের দৃষ্টিতে কি এতখানি শূন্যতা থাকে? সুমিতের কি অ্যালজাইমার হচ্ছে? অ্যালজাইমারের কথা আজকাল প্রায়ই বেরোয় খবরেআক্রান্ত স্বামী স্ত্রীকে চিনতে পারে না, আক্রান্ত স্ত্রী স্বামীকে চিনতে পারে না। আক্রান্ত বাবামা ছেলেমেয়েদের নাম মনে করতে পারে না।

জয়ন্তী অবশ্য মনে মনে জানে যে সুমিতের এই দৃষ্টির সঙ্গে অ্যালজাইমারের কোনও সম্পর্ক নেই। কারণ সপ্তাহের বাকি পাঁচদিনের কর্পোরেটের টপ বস সুমিতের চাহনিতে শূন্যতার লেশমাত্র থাকে না। সকাল আটটার মধ্যে রেডি হয়ে এক হাতে ব্রিফকেস, অন্য হাতে গাড়ির চাবি নিয়ে যখন দরজার বাইরে বেরোয় সুমিত, তখন সুমিতের চোখমুখের প্রখর দীপ্তি দেখলে বোঝা যায় কেন এই লোকটা এত ওপরে উঠেছে। তিরিশ বছরে শেয়ালদার মেসের এক তলার ঘর থেকে সাউথ সিটির টপ ফ্লোর। সুমিত নিজেও সে কথা জানে। পেটে দুপাত্র পড়লে নিজের জীবনটাকে নিজেরই রূপকথার মতো লাগে তার। তখন মাঝে মাঝে সেই রূপকথার রহস্য ফাঁস করতে বসে সে। “প্রিপারেশন ইজ কী, মাই ডিয়ার”জীবনের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি প্রোমোশন, প্রতিটি উন্নতির জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রস্তুতি নিয়েছে সুমিত। জীবন থেকে চমক, তা সে ভালোই হোক বা মন্দ, এবং তা সংক্রান্ত সমস্ত অনিশ্চয়তা ঘুচিয়ে ফেলতে দিনরাত এক করে খেটেছে।  

এই শনিবারের সকালগুলোও আসলে সুমিতের প্রস্তুতির অঙ্গঅবসরের প্রস্তুতি নিচ্ছে সুমিতআর সাত মাস বাদে হঠা একদিন ঘুম থেকে উঠে যখন মনে পড়বে আজ কোথাও যাওয়ার নেই, আগামীকালও কোথাও যাওয়ার নেই, পরশুতরশুনরশু যতদূর চোখ যায় কোনওদিনই কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনা নেই কোথাও, তখন যাতে বুকে ধাক্কা না লাগে, নিজের অস্তিত্বটাকে অদরকারি একখণ্ড রক্তমাংসঅস্থির তাল মনে না হয়, তার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিজের ইউনিফর্ম বাছছে, ডাইনিং টেবিলের একটা বিশেষ চেয়ারে নিজের অধিকার কায়েম করছেআর সাত মাস বাদে যে চেয়ারটায় শুধু শনিবার সকালে নয়, সপ্তাহের সাতটা দিনই এসে বসবে সুমিত। সপ্তাহের সাতটা দিনই সিংকে হাত ঝেড়ে পেছন ফিরে যে চেয়ারটায় সুমিতকে আবিষ্কার করবে জয়ন্তী।

জয়ন্তী শিউরে উঠল। প্রতিদিন! জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আসা রোদ্দুরে বুড়ো হুলোর মতো থাবা গেড়ে প্রতিদিন বসে থাকবে সুমিত। টি শার্টের নিচ থেকে আলগা মাংসপিণ্ডরা মাথা তুলবে, বারমুডার আড়ালে ফুটে উঠবে ব্যবহার ফুরিয়ে যাওয়া যৌনাঙ্গের আভাস, আর সে দিকে তাকিয়ে বুকপেট ঘুলিয়ে উঠে আসা প্রকাণ্ড ওয়াকটাকে চাপা দিয়ে, মুখচোখ কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে জয়ন্তীকে জিজ্ঞাসা করতে হবে, “ব্রেকফাস্টে কী খাবে?”

যেন না হয়, যেন না হয়, প্রাণপণে প্রার্থনা করে জয়ন্তী। এর জন্য সারাজীবন ধরে এত লড়াই করল জয়ন্তী? এত জোর করে হাসল, স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এত সাঁতরালো, তিন তিনটে মেয়েকে মানুষ করে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে বিদেশে সেট্‌ল্‌ করাল? আত্মীয়স্বজনদের ফোন করে করে মুখে রক্ত তুলে হীরের টুকরো জামাইদের প্রোমোশনের খবর দিল? এই জন্য সাতচল্লিশ বছরের সুমিতের মোবাইলে রাত দুটোর সময় আসা এস এম এসের বিপ বিপ শব্দ শুনল? সুমিতের টাইপ করার শব্দ শুনতে শুনতে উল্টোদিক ফিরে ঘুমিয়ে থাকার ভান করল? দাঁতে দাঁত চিপে নিজেকে সান্ত্বনা দিল, এ নিছক মিডলাইফ ক্রাইসিস, মাঝবয়সী পুরুষের বাধ্যতামূলক ব্যভিচারিতা, সময়ে কেটে যাবে? এর জন্য? এই দাঁতে দাঁত চেপে থাকা, এই দুঃখ ভুলে থাকা, এই সুখের অভিনয়, সব পেরিয়ে নাকি হাতে পড়ে রইল এই শনিবারের সকালগুলো?

আগে জানলে জয়ন্তী অভিনয় করত না। বাকি সবার মতো জয়ন্তীও ওই মিথ্যেটায় বিশ্বাস করেছিল। বিশ্বাস করেছিল যে এই প্রহসনটার একটা গভীর কোনও মানে আছেসেই মানেটার মুখ চেয়ে তুমি রাত জেগে স্বামীর জন্য সোয়েটার বুনবে, যে সোয়েটার সে জীবনে দু’বারের বেশি গায়ে দেবে কি না সন্দেহ, মেয়েদের ছোট ছোট হাতে আঁকা প্যাস্টেল রঙের নীল রঙের সূর্য আর হলুদ রঙের নদীর ছবি বাঁধিয়ে দেওয়ালে টাঙাবে।  দেওয়ালের দিকে তাকাল জয়ন্তীঅনেক যত্নে, তার নিজের হাতে সাজানো মিথ্যের গ্যালারি। বাঁদিক থেকে ডানদিক, ওপর থেকে নিচ। গড়িয়ার ভাড়াবাড়ির ছাদে এক ছিটের জামা পরে রোদে চোখ কুঁচকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ঝিনিমিনিটিনি। সুমিত-জয়ন্তীর ট্রিপলেট। নার্সিংহোম ভেঙে পড়েছিল দেখতে। পাশের বেডে একটা বাচ্চা মেয়ে (জয়ন্তীও বাচ্চাই তখন অবশ্য) ভর্তি ছিল, আগের দিন তার ছেলে হয়েছে। সে বেচারা জানতই না যে দুটোর বেশি বাচ্চা মানুষের একসঙ্গে হতে পারে। সে নিজের ছেলে ছেড়ে হাঁ করে জয়ন্তীর তিন মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। ক’বছর বাদে পাটুলিতে নতুন ফ্ল্যাট, নতুন কুকুরছানা। সেই কুকুরছানার মাথায় রঙিন টুপি পরিয়ে, গলায় রঙিন ফিতে বেঁধে দু’দিক থেকে জাপটে ধরে আছে তিন বোন। সিমলার চিড়িয়াখানার বাঘের খাঁচার সামনে, শিমূলতলার হলদিঝর্নার পাশে পাথরের ওপর ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে তিন বোন। তিনটে হাসিখুশি, সতেজ, নিষ্পাপ, সতেজ মুখ। দেখলে বিশ্বাসই হবে না আর ক’বছর পর এই মুখ দিয়ে হড়হড় করে মিথ্যে কথা বেরোবে, কলেজের পার্টি থেকে বাড়ি ফিরতে মাঝরাত পেরোবে। কেউ কিছু বললে ভাঙা, দুর্বিনীত গলা জান্তব চিকার করে বলবে, “আমার এই বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করে নাআআআআ।”

তারপর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবে চিকার, কান্নাকাটি সব শেষ, বাড়ি ফাঁকা করে তিন মেয়ে চলে গেছে, আর তোমার তিরিশ বছরের সফল, ব্যভিচারী স্বামী বসে আছে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে। বারমুডার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে ঊরুর ফ্যাকাশে থলথলে মাংস। চোখে শূন্য দৃষ্টি।

হাঁচি আসছে বুঝতে পেরে আঁচলটা মুখের কাছে তুলে আনল জয়ন্তী। পরপর তিনটে হল।

“কেমন আছে?”

জয়ন্তীর ফ্লুয়ের কথা জানতে চাইছে সুমিত। প্রতি বছর এই সিজন চেঞ্জের সময়টায় নিয়ম করে জয়ন্তীর ঠাণ্ডা লাগে। খুব কষ্ট। কাশতে গেলে বুক ভেঙে যায়, ঢোঁক গিলতে কোটি কোটি সূচ বেঁধে গলার ভেতর। তবে কষ্টের সঙ্গে সুবিধেও আছে। ছোঁয়াচে অসুখের ছুতোয় এ’কদিন একসঙ্গে শুতে হয় না। মাঝরাতে উঠে নিজের ভাগের লেপের জন্য কাড়াকাড়ি করতে হয় না। সুমিতের ক্বচিকদাচি মৃদু বাতকর্মের দুর্গন্ধ থেকেও মুক্তি। এ’কদিন একলা বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোয় জয়ন্তী। কোনও কোনও রাতে ছ’সাত ঘণ্টা। দুঃখের বিষয় কিছুদিন বাদেই জ্বর সেরে যাবে। পাশের ঘর থেকে সুমিত বালিশ বগলে আবার এ ঘরে ফিরবে, আর জয়ন্তীর কপালে আবার সেই ঘণ্টাচারেকের ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম।

জয়ন্তী জানে কোনও একটা সিজন আসবে যখন সুমিত আর ফিরবে না। যতক্ষণ চায় ততক্ষণ গাঢ় ঘুম ঘুমোতে পারবে জয়ন্তী। মাঝে মাঝে নিজের এই সুখের প্রত্যাশাটুকু সুমিতের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছে হয়েছে ওর, কিন্তু নিজেকে সংযত করেছে। সুমিত হয়তো আঘাত পাবে। জয়ন্তী সুমিতকে আঘাত দিতে চায় না। এখনও না।

“ভালো।” সুমিত আর কতক্ষণ এখানে বসে থাকবে? ডিমসেদ্ধগুলো এই বেলা ফ্রিজ থেকে বার করে চপগুলো গড়ে ফেলা যেত।

সুমিত বলল, “কালকে আমার সঙ্গে শোওনি যে ভালোই হয়েছে জিতু। একটা জঘন্য স্বপ্ন দেখছিলাম। নিজের চিকারে নিজেরই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল।”

ক’বছর বাদে সুমিত ওকে জিতু বলে ডাকল? নামটা বিশ্রী লাগে জয়ন্তীর। জয়ন্তী সুমিতের দিকে ফিরে তাকাল। দুঃস্বপ্ন? সুমিত? সুমিত যে আদৌ স্বপ্ন দেখে এই কথাটাই তো জয়ন্তী জানে না। দেখলেও সে স্বপ্নের কথা পরদিন সকালে উঠে জয়ন্তীকে গল্প করে বলেনি কখনওঝট করে তিরিশ বছরের স্মৃতি একবার ঘেঁটে দেখল জয়ন্তীউঁহু, একবারও না। না না, একবার সেই কলেজ কেটে গঙ্গার ধারে বসে থাকার সময়, “জিতু, আমি রোজ তোমার স্বপ্ন দেখি জান?” গোছের হাস্যকর কিছু একটা বলেছিল বোধহয়জয়ন্তী আবার বেজায় খুশিও হয়েছিল শুনে।

“স্বপ্ন?”

“আরে, দুঃস্বপ্ন। ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। তুমি শুনতে পাওনি?”

জয়ন্তী সুমিতের দিকে তাকিয়ে রইল। রসিকতা করা প্র্যাকটিস করছে নাকি সুমিত? কিন্তু সুমিতের রসিকতা তো এ ধরণের নয়। সুমিতের রসিকতার ধরণ হচ্ছে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বসে বসের নিন্দে করা। ক্লায়েন্ট মিটিঙে বস কী কী বোকামি করেছে সেই সব গল্পের চর্বিতচর্বণ। বিশেষ করে যে বসের চাকরিটা সুমিত নিজে চায়। সে সব গল্পের প্রত্যেকটা অন্তত একশোবার করে শুনেছে জয়ন্তী।

“আমি চেঁচাচ্ছিলাম, কিন্তু আবার ঠিক চেঁচাচ্ছিলামও না। মানে, চেঁচাতে চাইছিলাম খুব, কিন্তু পারছিলাম না। কী রকম একটা দমবন্ধ হয়ে আসছিল। একবার তো মনে হল, স্ট্রোকফোক হচ্ছে নাকি? তারপর নিজের গলাটা নিজের কানে পৌঁছল। ঘুম ভেঙে গেল। আলো জ্বালালাম। সারা গা কাঁপছিল, ঘেমে চান। বাথরুমে গেলাম, পেচ্ছাপ করতে, হল না। আজকাল তো সর্বক্ষণই একটু একটু পেচ্ছাপ পায়, কিন্তু কাল রাতে হল না।”

থামল সুমিত। রোদ্দুরটা সামান্য সরে টেবিল থেকে এখন সুমিতের মাথার পাতলা হয়ে আসা চুলে পড়েছে। ধুলোকণারা সুমিতের মাথা ঘিরে ভাসছে। মনে হচ্ছে জ্যোতির্বলয়। ছোটবেলায় ক্যালেন্ডারে রামকৃষ্ণ সারদা বিবেকানন্দের মাথার পেছনে যেমন থাকত।

“কী স্বপ্ন?”

নিজের প্রশ্নে নিজেই চমকে গেল জয়ন্তী। পাঁচ বছর আগে তিন মেয়ের একসঙ্গে বিয়ে দেওয়ার সময় রিলায়েন্সের শেয়ারগুলো ছাড়া হবে কি না রাত জেগে বসে সেই আলোচনার পর, এই আবার সুমিতের কোনও কথা শোনার আগ্রহ বোধ করল জয়ন্তী।

“বলব?” সুমিতের মুখটা অল্প লাজুক দেখাচ্ছে এই মুহূর্তে। টেবিল থেকে পেপারমিলটা তুলে নিয়ে দু’হাতে লোফালুফি করতে শুরু করল সুমিত।

“বলে তো স্বপ্ন বলে দিলে আর নাকি সেটা সত্যি হয় না।”

সুমিতের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এই শনিবারের সকালের আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার টের পেল জয়ন্তী। সুমিতকে ঠিক সুমিতের মতো দেখতে লাগছে না। নাকি সুমিত এ রকমই দেখতে? জয়ন্তীর চোখে অন্যরকম লাগে? সুমিতকে এখন এমন একটা মানুষের মতো দেখতে লাগছে যার মানে আছে। মাংস চামড়া ঢিলে হয়ে যাওয়া সুমিতের শরীরটার মানে আছে, রোদমাখা ধুলোর বৃত্তের মাঝখানে সুমিতের ভারি হয়ে আসা মুখটার মানে আছে, এমনকি রান্নাঘরের দেওয়ালে যে ছায়া পড়েছে সুমিতের, সে ছায়ারও যেন একটা মানে করতে পারছে জয়ন্তী। জয়ন্তীর ধাঁধা লেগে গেল। এই কিছুক্ষণ আগেও তো গোটা জীবনটার অর্থহীনতা নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না তার। হঠা হল কী?

“বলে বুঝি?”

সুমিত স্বপ্ন সত্যি হওয়া না-হওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে। পেপারমিলটা নিয়ে লোফালুফি খেলতে খেলতে। জয়ন্তী ভাবল ওকে থামতে বলবে। জয়ন্তীর নার্ভাস লাগছে হঠা। বুক ধড়াস ধড়াস করছে। কিন্তু এই মুহূর্তে পেপারমিল নিয়ে খেলা করার মতো তুচ্ছ ব্যাপারে সুমিতকে নিষেধ করতে চায় না জয়ন্তী। একটু বাদে সুমিত নিজেই পেপারমিলটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। পেপারমিলটার ছায়া পড়ল টেবিলে। দীর্ঘ, কালো ছায়া। যেন দাবার বোর্ডে একটা প্রকাণ্ড গজ। সে ছায়ার দিকে তাকিয়ে ভয় লেগে উঠল জয়ন্তীর। সবকিছু এত ছায়া ফেলছে কেন আজ? সুমিত, পেপারমিল, টেবিলে পড়ে থাকা পাউরুটির গুঁড়োগুলোরও যেন আজ ছায়া দেখতে পাচ্ছে জয়ন্তী। স্পষ্ট, অতিকায়, অর্থপূর্ণ ছায়া। জয়ন্তী কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? ওর আর সুমিতের স্বপ্নের কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। গরম লাগছে, ঘাম হচ্ছে। সেই মেনোপজ শুরু হওয়ার সময় যেমন হয়েছিল। হঠা কিছুক্ষণ আগেকার অর্থহীন, ফাঁপা জীবনটার জন্য ভীষণ মন কেমন করতে লাগল জয়ন্তীর। মানে চায় না জয়ন্তী। গভীরতা চায় না। তাকে কয়েক মুহূর্ত আগের ফাঁপা, নিঃস্ব জীবনটা ফিরিয়ে দেওয়া হোক। এক্ষুনি। একবার মনে হল সুমিতকে বলে যে ও ভুল বলেছে। কাউকে না বললেই আসলে দুঃস্বপ্ন বিফল হয়। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে, সুমিত বলতে শুরু করেছে। অনুশোচনায় মন ভরে গেল জয়ন্তীর। এ সব জীবনকে অর্থহীন ভেবে নস্যা করে দেওয়ার শাস্তি ছাড়া আর কিছু নয়। কী করে এমন ভুল করতে পারল সে? কী করে এই প্রকাণ্ড, ভয়াল জীবনকে সে অর্থহীন ভেবে নিতে পারল?

“স্বপ্নে দেখলাম সকাল হয়ে গেছে, আর আমি রান্নাঘরে এসেছি। ইন ফ্যাক্ট, এই আজকের মতোই, শনিবারের সকাল। তবে তুমি তখনও ঘুম থেকে ওঠনি

“আমি তো সবসময়ই তোমার আগে উঠি

“আহা, এ তো স্বপ্ন

সুমিতের ঊরুর দিকে চোখ গেল জয়ন্তীর। ফর্সা চামড়ার ওপর ইতস্তত সাদা লোম। একসময় ভালো টেনিস খেলত সুমিত, তখন এই ঊরুর বাঁধুনি ছিল দেখার মতো।

“কিন্তু স্বপ্নের সকালটা এক্স্যাক্টলি এ রকম ছিল। এই রকম রোদ্দুরটোদ্দুর . . .” এক হাত তুলে হাওয়ায় ঘোরাল সুমিত। জ্যোতির্বলয়ের ধুলোগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। জয়ন্তীর মনে হল চিকার করে সুমিতকে বারণ করে। ঘাঁটিও না, সুমিত, জীবনের ছন্দকে এভাবে নিজে হাতে এলোমেলো করে দিও না।

“মেঝেতে আমার ছায়া দেখতে পাচ্ছিলাম। কী স্পষ্ট! কোনওদিন নিজের ছায়াটাকে অত স্পষ্ট মনে হয়নি, জান জিতু।” হাসল সুমিত। ওর ঠোঁটের গভীর ফাটলগুলো এই প্রথম খেয়াল করল জয়ন্তী।

“এত স্পষ্ট, অলমোস্ট জ্যান্ত মানুষের মতো।”

“সুমিত . . .”

“আমি বারান্দা থেকে খবরের কাগজটা আনতে গেলাম। কাগজের প্রথম পাতাতেই একটা বিশ্রী খবর . . .”

জয়ন্তীর মাথাটা ঘুরে উঠল সুমিত কোন খবরটার কথা বলতে চাইছে ও জানে! খবরটা ও দেখেছে একটু আগেই। মুম্বই এয়ারপোর্টে কাল গভীর রাতে দুটি শাটল বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন চালক সহ তিন যাত্রীর মৃত্যু। এয়ারপোর্টে খোঁড়াখুঁড়ি চলছিল, যথেষ্ট আলো ছিল না। অন্ধকারে ডোমেস্টিক আর ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের মধ্যে চলাচলকারী দুটি শাটল বাস ফুল স্পিডে এসে একে অপরকে সামনাসামনি ধাক্কা মারে। ঘটনাস্থলেই এক ড্রাইভার ও একজন যাত্রী মারা যান, বাকি দুই যাত্রী হাসপাতালে।

সুমিতও নির্ঘাত আজ সকালেই খবরটা কাগজে দেখেছে। স্বপ্নটপ্ন সব বাজে কথা। কিন্তু খবরের কাগজ সুমিত পেল কোথায়? কাগজ তো বারান্দা থেকে তুলে জয়ন্তী নিয়ে গেছে নিজের ঘরে। সুমিত কি জয়ন্তীর ঘরে ঢুকে খবরের কাগজ পড়ে এসেছে? এসে স্বপ্ন বলে চালিয়ে জয়ন্তীকে ঘাবড়ে দিতে চাইছে? প্র্যাকটিকাল জোক প্র্যাকটিস করছে সুমিত? তিরিশ বছর পর?

জয়ন্তীর কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গালে নেমে এল। জয়ন্তীর হৃৎপিণ্ড পাগলের মতো জোরে দৌড়চ্ছেকিছু একটা ঘটতে চলেছে শিগগিরই। কিন্তু কেন? যখন জয়ন্তীর জীবনের আশানিরাশা দুইই ফুরিয়েছে, যখন জয়ন্তী হাড়েহাড়ে বূঝে গেছে এ জীবন থেকে ওর আর কিছু পাওয়ার নেই, কিছু দেওয়ারও না? কিছু চাই না জয়ন্তীর এখন। ফিরিয়ে নাও ফিরিয়ে নাও

“আমি ফ্রিজ খুললাম” সুমিত স্বপ্নের কথা বলে চলেছে। “খুলেই দেখি প্লাস্টিক র‍্যাপ ঢাকা দেওয়া একটা প্লেটে দুটো ডিমের চপ বানিয়ে রাখা। মাঝে মাঝে বিকেলে লোক আসার কথা থাকলে জলখাবারে দেওয়ার জন্য তুমি যেমন বানিয়ে রাখ। আমার দেখেই এত লোভ লাগল, জানো জিতু।” 

কাউন্টারে রাখা দুটো থালার দিকে তাকাল জয়ন্তী। একটায় পাউরুটির গুঁড়ো, একটা খালি। সেটায় একটা ডিম ভেঙে সামান্য নুনমরিচ দিয়ে ফেটানো হবে। কবিতা ফোন করেছিল কাল। আজ বিকেলে ওরা স্বামীস্ত্রী আসবে। জয়ন্তীর হাতের ডিমের চপ খেতে খুব ভালোবাসে ওরা।

“থাক, আমি আর শুনতে চাই না” নিজের গলা নিজেই শুনতে পেল না জয়ন্তী। এককালে কলেজে ড্রামা ক্লাবের সেক্রেটারি ছিল জয়ন্তী, আর আজ কি না রান্নাঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে গলা পৌঁছচ্ছে না তার। গলার মাসলগুলো সব ঢিলে হয়ে গেছে জয়ন্তীর, সুমিতের ঊরুর মাসলের মতো।

“আমি প্লেটের দিকে তাকিয়ে ভাবছি এক্ষুনি একটা চপ তুলে ভেজে খেয়ে নিলে তুমি ঠিক কতখানি রাগ করবে, এমন সময় ল্যান্ডলাইনটা বাজল। আমি দৌড়ে গেলাম পাছে আওয়াজে তোমার ঘুম ভেঙে যায়। আর তখনই ভয়ের পার্টটা শুরু হল। শুনতে চাও?”

না। ভাবল জয়ন্তী। আমি ভয়ের পার্টটা শুনতে চাই না। কিন্তু আবার চাইও। কারণ সকলেই ভয়ের পার্টটা শুনতে চায়। কারণ সকলেই আসলে পাগল। সকলেই যেচে নিজের জীবনে দুঃখ ডাকতে চায়। মা ঠিক কী বলত? স্বপ্ন বলে ফেললে আর সত্যি হয় না। তার মানে তো এই দাঁড়ায় যে দুঃস্বপ্নদের মিথ্যে করতে হলে সেগুলোকে বলে ফেলাই ভালো। ভালো স্বপ্নগুলোকে শুধু যত্ন করে নিজের কাছে রেখে দিতে হয়, যাতে কারও নজর সেগুলোয় না লাগে। ঝিনিমিনিটিনির কৈশোরের ডাইরিতে জমিয়ে রাখা প্রেমপত্রের মতো। গোছা গোছা প্রেমপত্র। ঝিনিমিনির তুলনায় টিনির সেক্সুয়্যাল অ্যাপিল চিরকালই বেশি ছিল তাই টিনির ডায়েরির পেটও ছিল বাকি দুজনের ডায়রির থেকে মোটা। সে জন্য ঝিনিমিনির কি বিদ্বেষ ছিল টিনির প্রতি? বিয়ের পর দু’বছরের মাথায় ঝিনিমিনির একটা করে প্ল্যানড ইস্যু হয়ে গেল, টিনির নানারকম কমপ্লিকেশনস ধরা পড়ায় কনসিভ করতে দেরি হচ্ছে, সেটা কি সান্ত্বনা হিসেবে কাজ করছে কোথাও? কৈশোরের ঈর্ষার ক্ষতে প্রলেপ লাগাচ্ছে?

“টিনির ফোনও শুধু একবার ‘বাবা’ বলল, কিন্তু তাতেই আমি বুঝে গেলাম যে ও টিনি, ঝিনি বা মিনি নয়। বোঝা যায় না?” সম্মতির আশায় জয়ন্তীর দিকে তাকাল সুমিত।

যায়। ঘাড় নাড়ল জয়ন্তী। প্রথম ডাকটা শোনা মাত্র বোঝা যায়। অনেক সময় সেটুকুও শুনতে লাগে না।

“আমি বললাম, আরে টিনি, এত ভোরে ফোন করলি? মা তো এখনও ওঠেনি। প্রথমটা কোনও উত্তর এল না। তারপর কেমন একটা ফ্যাঁস ফ্যাঁস আওয়াজ, টিনি কাঁদছে, জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে আর বলছে, বাবা বাবা, আমি বলছি কী হয়েছে টিনি, কী হয়েছে টিনিমণি, কিন্তু টিনি খালি কেঁদে যাচ্ছে, কান্নার মধ্যে মধ্যে খালি একটা দুটো অবোধ্য শব্দ কী বলছে কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না, ঠিক তখনই আমার ভয় লাগতে শুরু করল।”

এতক্ষণে? এতক্ষণে ভয় পাচ্ছে সুমিত? জয়ন্তী তো সেই কখন থেকে ভয় পেতে শুরু করেছে। সেই যখন ও পেছন ফিরে সুমিতকে ভূতের মতো বসে থাকতে দেখল। তারপর সেই ছায়াগুলো, যাদের কোনও একটা মানে আছে। ভীষণ খারাপ, ভয়ংকর একটা মানে। নাকি তারও আগে যখন সকালবেলা উঠে খবরের কাগজের কোণার খবরটায় চোখ পড়ল? কেন পড়ল? কতদিন তো দেশেরদশের কত জরুরি হেডলাইন চোখ এড়িয়ে যায় জয়ন্তীর। আর আজ প্রথমেই পাতার নিচের দিকে একটা তিন আঙুল বাই চার আঙুল খবর, মুম্বই এয়ারপোর্টে শাটল বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন চালক সহ তিনজনের মৃত্যু। ড্রাইভার ও একজন দুর্ঘটনাস্থলেই মৃত, বাকি দু’জন হাসপাতালে। নাকি ভয় পাওয়া শুরু হয়েছিল এক সপ্তাহ আগে থেকেই? যেদিন মিনির সঙ্গে ফোনে কথা হল আর একথা সেকথার পর মিনি বলল, ‘বাই দ্য ওয়ে, সামনের উইকে থাকছ তো?” জয়ন্তী বলল, “হ্যাঁ, কেন?” মিনি বলল, “না না, এমনি, জাস্ট আসকিং।” মনে হওয়ার কোনও কারণ নেই, কিন্তু জয়ন্তীর হঠা করে মনে হল, আসবে নাকি? গত বছর পুজোয় মিনি আর টিনি এসেছিল, ঝিনিটা আসতে পারেনি, সেই থেকে তিন বোন শলাপরামর্শ করছে একসঙ্গে কলকাতা আসার। যদি সবাই মিলে আসে? বাবা মা’কে চমকে দিতে? মিনিটার চিরকাল পেটপাতলা, একটু চাপ দিলেই বার করে ফেলা যেত, কিন্তু জয়ন্তী চাপ দেয়নি। সারপ্রাইজড হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছে। সুমিতকেও বলেনি কিছুই। পরদিন ঝিনিও ফোন করেও যখন বলল, “তারপর, কোথাও যাওয়ার প্ল্যানট্যান করছ নাকি?” তখনও জয়ন্তী জিজ্ঞাসা করেনি, “কেন রে? তোরা আসবি?” নিজেকে সংযত করেছে। একবার মনে হয়েছিল সুমিতকে বলে, কিন্তু বলেনি।

“টিনি কী বলছিল আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না। খালি হাঁপাচ্ছে আর বাবা বাবা বলে কাঁদছে, তার পর কী একবার বলল আমি প্রথমবার শুনলাম ম্যাক্সি পেন্টস, তারপর বুঝলাম টিনি বলছে, অ্যাক্সিডেন্ট, বাবা, অ্যাকসিডেন্ট . . . আমি বার বার জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম, কী অ্যাকসিডেন্ট? কার অ্যাকসডেন্ট, টিনি? টিনি? কোনও উত্তর নেই, খালি ফোঁপানি আর কান্না। আমার কেমন রাগ হয়ে যাচ্ছিল, আমি ওকে ধমকে উঠলাম, ছোটবেলায় যেমন ধমকাতাম, কী বলছ স্পষ্ট করে বল টিনি। টিনি!” 

জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো জয়ন্তী। এই টপ ফ্লোর থেকে শহরটাকে কত দূরের মনে হয়। এখানের বাস্তবটা যেন নিচের ওই ধুলোময়লা ট্র্যাফিকজ্যাম হর্নের চিকারময় বাস্তবটার থেকে অন্যরকম। এই বাস্তবটার আকাশ কত নীল, কত প্রশস্ত, এখানের বাতাস কী শান্ত আর শব্দঘাতহীন। তবু এই মুহূর্তে এই মহার্ঘ বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়েও জয়ন্তীর বুক ধড়ফড় করছে, কপালে গলায় স্বেদবিন্দু ফুটছে।

“ওই হাঁপানি আর কান্নার মধ্যে অবশেষে একটা কথা আমার কানে এল্। বাবা . . . নেই . . . নেই . . . আর তক্ষুনি, জান জিতু, তক্ষুনি আমি বুঝতে পেরে গেলাম আমাদের তিনটে মেয়ের মধ্যে একটা মেয়ে আর নেই। জাস্ট বুঝে গেলাম। টিনি আছে, কারণ টিনি ফোন করেছে, তার মানে ঝিনি আর মিনির মধ্যে একজন আর নেই। সবথেকে বীভৎস কী জান, ওই মুহূর্তে স্বপ্নে আমি অ্যাকচুয়ালি ভাবলাম, ঝিনি না মিনি, কে না থাকলে আমার কষ্ট কম হবে। আমার গলা খটখটে শুকনো হয়ে গিয়েছিল ভয়ে। আমি পাগলের মতো চিকার করতে লাগলাম, কে? কে নেই টিনি? ঝিনি না মিনি? মিনি না ঝিনি? ঠিক তক্ষুনি স্বপ্নটা হালকা হয়ে যেতে লাগল, বাস্তব জগটা স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়তে শুরু করল। অবশ্য বাস্তব বলে যদি আদৌ কিছু থেকে থাকে।”

একটা আলতো শব্দ করে হাসল সুমিত। ও-ও বিশ্বাস করে না! ও-ও ভাবে জীবন বলে আসলে কিছু নেই, গোটাটাই একটা প্রকাণ্ড, ফাঁপা মায়ার খেলা। সেই মায়াটা একটা একটা নিরীহ খবরের কাগজের চেহারা নিয়ে ছেতরে পড়ে আছে জয়ন্তীর বিছানায়, সেই খবরের কাগজের প্রথম পাতার নিচে তিন আঙুল চওড়া, চার আঙুল লম্বা একটা বাক্সের মধ্যে শুয়ে আছে ক’টা লাইন। ওই লাইনগুলোও কি মায়া? নাকি বাস্তব? ওগুলোকে কি বিশ্বাস করা যায়?

“ততক্ষণে ঘুম ভেঙে গেছে আমার। আমার স্বপ্নের চিকারটা তখন অনেক দূর থেকে আসছে মনে হচ্ছে, সেটাকে আর আমার গলা বলে মনেই হচ্ছে না, মনে হচ্ছে অন্য কারও গলা, এবং সেটা যে কী বলছে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।”

ঝিনি না মিনি? মিনি না ঝিনি?

সুমিত চুপ করে গেল। সুমিতের মাথার চারধারে আবার নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া রৌদ্রোজ্জ্বল ধূলিকণারা। রোদ্দুরে এখন ভেসে যাচ্ছে সুমিত-জয়ন্তীর রান্নাঘর।

“আমি অনেকক্ষণ শুয়ে রইলাম। ভাবলাম তুমি নির্ঘাত আমার চেঁচানি শুনতে পেয়েছ, তুমি হয়তো আসবে দেখতে। আমার সারা গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। আমি নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, যে এটা জাস্ট একটা স্বপ্ন, তুমি এলেও তাই-ই বলতে নিশ্চয়। কিন্তু আবার এও ভাবছিলাম, স্বপ্ন কি এত স্পষ্ট হয়? এত জ্যান্ত?”

আবার থামল সুমিত। সুমিতের আর খেয়াল নেই যে জয়ন্তী আর ওর কথা শুনছে না। জয়ন্তী এখন সর্বশক্তি দিয়ে প্রথমপাতার ডানদিকের নিচের ওই ছোট্ট বাক্সটার কথাটা ভেবে চলেছে। যারা মারা গেল, ড্রাইভার বাদে আর একজন স্পটেই, আর দু’জন পরে হাসপাতালে, তারা কি পুরুষ? সে ব্যাপারে কি কিছু লিখেছিল খবরে?

রান্নাঘরে আর কোনও শব্দ নেই। ঘরের দুই প্রান্তে অপেক্ষা করে থাকা দুই অবিশ্বাসীর মাঝখানে এসে জাঁকিয়ে বসেছে বাস্তব জগ, সে জগতের হাওয়া, রোদ, ধুলোর বিন্দু, নৈঃশব্দ্য, দূরত্ব। ফোনটা যখন বেজে উঠল, জয়ন্তী তখনও নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জানালার বাইরে তাকিয়ে। সুস্থ মানুষের চোখে কি অতখানি শূন্যতা থাকে? জয়ন্তীর হাতে আর একবিন্দু সাড় নেই যে হাতদুটো তুলে ও নিজের দু’কান চাপা দেবে, জয়ন্তীর ফুসফুসে আর এককুচি বাতাস নেই যে ও চিকার করে উঠবে। আবার বাজল ফোনটা। মেঝেতে চেয়ারের পায়ার ঘষটানির শব্দ হল। সুমিত ফোনটা ধরবে বলে উঠেছে। রান্নাঘরের বাইরে একটা কনসোল টেবিলে, পার্ক স্ট্রিটের একটা পুরোনো আসবাবের দোকান থেকে অনেক শখ করে কিনেছিল জয়ন্তী, রাখা ফোনটার দিকে এগোচ্ছে সুমিত। ফোনটা বাজল আবার।

যদি রং নাম্বার হয়? ভাবল জয়ন্তী। নির্ঘাত রং নাম্বার। হতেই হবে রং নাম্বার। স্বপ্ন বলে দিলে তা আর সত্যি হয় না।

সুমিত ফোন তুলে বলল, “হ্যালো?”


34 comments:

  1. আহা এই উইকেন্ডের জন্য একটা ভাল রসদ পাওয়া গেল! গল্পটা পড়ে ফেলার আগে একটা কথা ছিল - ওটা Harvey হবে তো?

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ পিয়াস, ঠিক করে দিলাম।

      Delete
  2. Kal ek niswashe porechi.darun legeche..

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, তিন্নি।

      Delete
  3. darun bolle kom bola hobe. aro galper ashai roilam.

    sanghatik galpo.. seshta marattok...

    ReplyDelete
    Replies
    1. গল্পটা মারাত্মক সেটা সত্যি, ইচ্ছাডানা। আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম। থ্যাংক ইউ।

      Delete
  4. একঘর একঘর! গল্পের ছায়া নিয়ে লেখা এরকম-ই হলে আমার খুব ভালো লাগে । হুবহু অনুবাদ না। খুব ভালো লাগলো ।
    বাই-দ্যা-ওয়ে, বইমেলায় বই বেরোলো না কেন?
    --
    সব্যসাচী

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, আরে বই বেরোনোর মালিক কি আমি, সব্যসাচী? আমি আক্ষরিক অনুবাদই করছিলাম, তারপর অবান্তরের কয়েকজন ভাবানুবাদের পরামর্শ দেওয়াতে সে রকম একটা চেষ্টা করা গেল। তোমার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম। অনেক ধন্যবাদ।

      Delete
    2. ইয়েস - আমি-ও ওই দলেই ছিলাম । মানে ফনিমনসা'র সাপোর্টার ... তবে নিরুচ্চারে । আজ লেখাটা পড়তে পড়তে হচ্ছিল অনলাইন পিটিশনে কাজ হয় তাহলে !
      এবার নেক্সট বইমেলা বই-এর জন্যে আর একটা পিটিশন খুলতে হবে মনে হচ্ছে :)

      Delete
    3. তন্ময়ের লেখাটা পড়ে পুরী ঘুরে এলাম । তোমার লেখা পরে লখনৌ এর বুকিং-ফুকিং ও করে ফেলেছিলাম | টুন্ডে-দস্তরখোয়ান-হজরতগঞ্জ সব ছক কষে ফেলাও শেষ । ছেলেবেলার পাঁচবন্ধু-বন্ধুপত্নী আর আন্ডাবাচ্চা নিয়ে । শেষে ছানাদের সোয়াইন ফ্লু-র ভয়ে ট্রিপ ক্যানসেল । মনে মনে আধমরা হয়ে আছি । :-(

      Delete
    4. এ বাবা, এটা বাজে হল। ঠিক আছে, সোয়াইন ফ্লু তো থাকবে না, কিন্তু লখনৌ থাকবে। আর "ফণিমনসার সাপোর্টার" শুনে বেশ মজা পেলাম।

      Delete
  5. অসাধারণ! টান টান গল্প - অনুবাদ গল্পেই তোমার সেরা দিক টা যেন বেরয়। গল্পের শুরুটা তে অন্যরকম ভাবে এগোচ্ছিল, হঠাত মোড় ঘুরে গিয়ে চমকে গেলাম।

    ReplyDelete
    Replies
    1. মোড় ঘোরানোটা অবশ্য স্টিফেন কিং-এর কৃতিত্ব। তবে তোমার যে আমার অনুবাদ ভালো লেগেছে সে জন্য অনেক ধন্যবাদ জানাই, কাকলি।

      Delete
  6. Kalkei porechhi comment ta deoya hoyni.. Sotyi bolchhi pore bhabanubad ta mul golper theke better laglo... Tumi please etai continue koro ebar theke.. :)

    Ar haan ajkal roj sokal bikel tomar blog e dhnu mari notun lekha khujte...tai roj ontoto ekta lekha na thakle besh mon kharap kore...

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ, চুপকথা। চন্দ্রচূড়ের সঙ্গে আপনিও তো ভাবানুবাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। অবান্তরের প্রতি আপনার ভালোবাসা বেড়েছে জেনে দারুণ খুশি হলাম।

      Delete
    2. are ki bolchho jedin prothom khonj peyechhi sedin e ek nisshashe boshe tomar somosto kota lekha porechhi...r eksonge oto peye ekhon lobh bere gechhey :)

      Delete
  7. durdanto !! tumi lekha ta seriously nao r aro publish koro, tabe tai bole amader ke bhule jeo na abar.. ekhaneo likhbe tabe you are just wired to be a writer, setai bolte chaichhi... Bratati.

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ, ব্রততী।

      Delete
  8. Abar rohsyo! Abar rohsyo! Amake tahole original te porte hochhey! Bhabanubad porei ja darun lagchey!

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, রুণা।

      Delete
  9. উফ! উফ! দারুণ... গল্প তো অসাধারণ... কিন্তু লেখার হাত আর মারাত্মক...

    ReplyDelete
    Replies
    1. খুশি হয়ে গেলাম, প্রত্যুষা। থ্যাংক ইউ।

      Delete
  10. বারমুডার আড়ালে ফুটে উঠবে ব্যবহার ফুরিয়ে যাওয়া যৌনাঙ্গের আভাস -- ei line ta ki onubad na apnar nijer udhbhavon ? Eti osadharon hoyeche. Apnar lekha sadharonoto khub ekta 'hard - hitting' noi, kintu ei onubad ti byatikrom. Khub bhalo hoyeche, aro onek likhun.

    ReplyDelete
    Replies
    1. Harvey in the morning, Harvey in his T-shirt and his boxer shorts, legs spread apart so she can view the meagre bulge of his basket (should she care to) . . .ওটা এই লাইনের অনুবাদ, ঘনাদা। উৎসাহের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

      Delete
  11. Replies
    1. সিরিয়াসলি, হীরক।

      Delete
  12. "ফণিমনসার সাপোর্টার" :).... Daarun hoyecche!!... Thik jamonti asha korechhilam...

    ReplyDelete
    Replies
    1. তবেই বুঝুন, চন্দ্রচূড়, অনেকেই মনে মনে ভাবছিলেন, কিন্তু আপনি যে মুখ ফুটে পরামর্শটা দিলেন সে জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এ রকম করে লিখতেও বেশি মজা। ভাবানুবাদটা আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুব, খুব খুশি হলাম।

      Delete
  13. ami ekta short film er kotha bhabchi eta porar por theke..1 week dhore bhebei jachchi...jani na banano hobe kina sesh obdi tobe hole bepar ta mondo hoy na...ki bolen didi?

    ReplyDelete
    Replies
    1. একদম ঋতম। দারুণ আইডিয়া। বানিয়ে ফেলো, তারপর আমরা সবাই মিলে দেখব।

      Delete
  14. Replies
    1. থ্যাংক ইউ, সুহানি।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.