January 31, 2015

সাপ্তাহিকী





মিল্কমেড দিয়ে বানানো ভিয়েতনামি কফি তো খেতে ভালো হবেই, মিল্কমেড আর চা (!) দিয়ে বানানো হংকং-এর কফিও ভালো হতে পারে, কিন্তু কাঁচা ডিম দেওয়া অস্ট্রিয়ান কফিটা কেমন হবে সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

There is an element of boredom which is inseparable from the avoidance of too much excitement, and too much excitement not only undermines the health, but dulls the palate for every kind of pleasure, substituting titillations for profound organic satisfactions, cleverness for wisdom, and jagged surprises for beauty… A certain power of enduring boredom is therefore essential to a happy life, and is one of the things that ought to be taught to the young.

                                        ---Bertrand Russell, The Conquest of Happiness

When the internet stops working, actually tries rebooting the router before calling a family member for help.
আমার এর থেকে ভালো বর্ণনা আর কেউ দিয়েছে বলে মনে পড়ে না।

দিল্লি মেট্রোতে ছবি তুললে অন্তত নব্বই শতাংশ ছবি চেতন ভগতের বইয়ের উঠবে।

আরাম করে সিনেমা দেখা বুঝি, তা বলে একেবারে শুয়ে? তাও প্রকাশ্যে?

সুপারমার্কেটের আইল ছাড়াও আরও কতরকম করে মানুষ খাদ্যসংগ্রহ করে, এবং সে সব খাদ্যাভ্যাস মানুষের সভ্যতার আকৃতিপ্রকৃতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে জানতে হলে ক্লিক করুন।


ইউনিকর্ন যে লুপ্ত প্রাণী সেটা যে আপনি জানেন আমি জানি, কিন্তু কেন লুপ্ত সেটা জানেন কি? আমি জানি। এই লিংকটায় ক্লিক করলে আপনিও জেনে যাবেন।


রক পেপার সিজারস খেলায় হেরে হেরে হদ্দ হয়ে গেছেন? এই লিংকে ক্লিক করুন এবং নিজের ভাগ্য বদলান।


এই মুহূর্তে বাইরের রোদ্দুরটা ঠিক এই গানটায় বর্ণনা করা রোদ্দুরের মতো।


January 30, 2015

কারি গাছের পাতা



“আমার রেডিওয় আমার যা ইসসা, তাই শুনুম। লারেলাপ্পা গান শোননের ইসসা হইলে নিজের রেডিও কিইন্যা শোন গে যাও।”

রেডিওয় যে খবর আর কীর্তন ছাড়াও অন্যান্য অনুষ্ঠান হয় এবং সেগুলোও যে স্বাদবদলের জন্য মাঝেমধ্যে শোনা যেতে পারে এই পরামর্শের উত্তরে ঠাকুরদার ওই প্রত্যুত্তর।

আমি নিজের কানে শুনিনি অবশ্য। কারণ আমার তখন শোনার মতো কান ছিল না। কান কেন, আমিই তখন ছিলাম না। আমি ছিলাম না, কম্পিউটার ছিল না, ভি এস এন এল ব্রডব্যান্ড ছিল না, এমনকি দরজা টানা সাদাকালো অস্কার টিভিটাও তখন আমাদের বাড়িতে ছিল না। তখন আমাদের বাড়িতে বিনোদনের একমাত্র উৎস ছিল ঠাকুরদার এইচ এম ভি রেডিও। ঢাউস এবং গম্ভীর।

প্রত্যুত্তরটা শোনার পর একদিন সেজকাকু গটমটিয়ে গিয়ে বাজার থেকে একটা লাল রঙের ছোট রেডিও কিনে আনলেন। বাবাকে বললেন, “তুই-ই বা বসে আছিস কেন, কিনে ফেল একখানা রেডিও। এই বাড়িতে . . .”

আমার ঠাকুরদার সঙ্গে সেজকাকুর সর্বক্ষণ খটরমটর লেগে থাকত, কিন্তু এঁরা দুজনেই ছিলেন একে অপরের যাকে বলে কার্বন কপি। দুজনেই রগচটা, দুজনেই ডাকাবুকো, দুজনেই সারাজীবন নিজের নিজের বাবার একটি কথাও গ্রাহ্য করেননি। দুজনেরই মনেপ্রাণে বিশ্বাস ছিল “এই বাড়িতে” কিস্যু হবার নয়। অথচ সাতদিন হাসপাতালে থেকে যে রাতে দাদু মারা গেলেন এই সেজকাকুই শিশুর মতো কেঁদেছিলেন। সে সময়ের ফ্যাশনমাফিক আমাদের বাগানে দাদুর শায়িত দেহের সঙ্গে বাড়ির সবাইকে নিয়ে তোলা একটা ছবি আছে। ঠাকুমা, ঠাকুমার চার ছেলে, দুই ছেলের বউ, এক মেয়ে, দুই নাতনি আর রজনীগন্ধাশোভিত খাটে শোয়া ঠাকুরদা। সকলেই শান্ত, গম্ভীর, শোকতপ্ত। কিন্তু সেজকাকুর মুখটা দেখে বোঝা যাচ্ছে কাকু একেবারে ধসে গেছেন। আলোকচিত্রীর নির্দেশ মতো সকলেই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে, খালি ঠাকুমা আর কাকুর দৃষ্টি ঠাকুরদার নিষ্প্রাণ মুথ থেকে একচুলও সরেনি।

বাবা ভাইয়ের পরামর্শ নিলেন না। খুব ইচ্ছে হলে ভাইয়ের লাল রেডিও ধার নিয়ে শুনতেন, ব্যস। তলে তলে বাবার ফন্দি ছিল অন্য। যেই না সরকারি চাকরিখানা হস্তগত হল অমনি দাদুর ভ্রূকুটির সামনে দিয়ে বাবা বুক ফুলিয়ে কিনে আনলেন, উঁহু, রেডিও না, একেবারে প্যানাসোনিক কোম্পানির স্টেট অফ দ্য আর্ট টেপরেকর্ডার। ঠাকুরদার বোকা রেডিওর মতো সেটার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁটা ঘোরাতে হয় না, একবার বোতাম টিপে দিলেই খাটুনি শেষ। ঠাকুরদার ব্যাকডেটেড রেডিওর মতো সেটায় অধিবেশন ফুরোনোর আতংক নেই, যতক্ষণ না মন ভরে ততক্ষণ গান শুনিয়ে যাবে টেপরেকর্ডার, শুধু কারেন্টটা থাকতে হবে।

টেপরেকর্ডারের চেহারাটাও ছিল দেখার মতো। তন্বী, শ্যামাঙ্গী। সামনে কালো বোতাম সারি সারি সাজানো, ঠিক যেন মিশিমাখা হাসি। একটা টিপলে গান চলে, একটা টিপলে থামে, একটা টিপলে ফরফর করে এগোয়, একটা টিপলে করকর করে পেছোয়, একটা টিপলে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাবা ততক্ষণে চট করে সাইকেলে চেপে জহরের দোকান থেকে চিনি এনে দিতে পারেন ঠাকুমাকে। এসে বোতামখানা আবার টিপে দেন, ‘মেরা হাম’ বলে থেমেছিলেন, ‘দম না রহা’ বলে কিশোরকুমার আবার গাইতে শুরু করেন।

কিন্তু সবথেকে ভালো যে বোতামটা ছিল সেটার ওপর ছিল সিঁদুরের টিপের মতো একখানা ফুটকি আর ওপরে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ছিল ‘রেকর্ডিং’। একটা ফাঁকা ক্যাসেট পুরে এই বোতামটা টিপে দিলেই টেপরেকর্ডার আশেপাশের আওয়াজ কণ্ঠস্থ করতে শুরু করে দিত।

বাবা রেকর্ড করতে শুরু করলেন। নিজের গান, ঠাকুমার হাসি, দাদুর গর্জন, চড়াইশালিকের কিচিরমিচির, কুকুরের ঝগড়া, গরুর হাম্বা। শেষটা অবস্থা এমন হল যে বাবাকে যন্ত্র হাতে আসতে দেখলেই সবাই “ওরে বাবারে কত বেলা হয়ে গেল এখনও চান হল না” বলে গামছাটামছা না নিয়েই বাথরুমে ঢুকে পড়ত।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন আমি বোকার মতো দৃশ্যে আবির্ভূত হলাম। টাইমিং জ্ঞান আমার এখন যা, তখনও তেমনই ছিল বোঝা যাচ্ছে। বাড়ির লোকের অসহযোগে বাবার রেকর্ডিং-এর উৎসাহের আঁচ যাও বা নিবুনিবু হয়েছিল, এই ঘটনায় তাতে আবার নতুন করে ঘি পড়ল। আমার অযৌক্তিক কান্না, অকারণ হাসি, অবোধ্য চিৎকার সব বাবা রেকর্ড করে রাখতে শুরু করলেন।

তারপর যেই না বুলি একটুখানি ফুটল আমার অধৈর্য মা অমনি আমাকে পড়াতে শুরু করলেন। পড়া অতি সামান্য। এক থেকে দশ, ওয়ান থেকে টেন, এ থেকে জেড, অ থেকে ঔ আর ক থেকে চন্দ্রবিন্দু। ব্যস। সেটা আমাকে রোজ সকালসন্ধ্যে, দুপুরবিকেল, রোদ উঠলে বা মেঘ করলে, বাড়িতে অতিথি এলে বা না এলে তোতাপাখির মতো আবৃত্তি করতে হত।

বান্টি মুখে আতংকের ভাব ফুটিয়ে বলল, “উফ, কী অ্যাবিউস! সাইজে ছোট বলে কি মানুষ না? চাইল্ড রিয়ারিং বিষয়ে আমাদের দেশ যে কতখানি ব্যাকওয়ার্ড ছিল সেটা এই সব শুনলে বোঝা যায়। অবশ্য ছিল কেন বলছি, এখনও আছে। এই তো সেদিন আমার ভাইপোকে . . .”

আমি অবশ্য ব্যাপারটাকে অ্যাবিউস মনে করি না। কারণ আমার মনের গভীরে একটা সন্দেহ আছে যে ওটা করতে আমার আসলে ভালোই লাগত। হাততালি পাওয়ার প্রতি আমার এখন যে রকম অবিশ্বাস্য লোভ, সেটার অঙ্কুরোদ্গম তখনই হয়েছিল বলে আমার বিশ্বাস। পাঁচমাস বয়সে শিশু প্রথম হিংসে অনুভব করতে শেখে শুনেছি, তারপর ভালোবাসা, সহমর্মিতা, দয়ামায়া, করুণা ইত্যাদি। আমার ঘোর বিশ্বাস আমার ক্ষেত্রে হিংসের পিছুপিছুই হাততালি পাওয়ার বাসনা জেগেছিল। তারপর বাকি সব।

বলাই বাহুল্য, নিজের সন্তানের মুখস্থবিদ্যার এমন নমুনা বাবা রেকর্ড করতে ভোলেননি। সেই প্লাস্টিকের খাপের তলায় রুলটানা মলাট দেওয়া ক্যাসেটটা  এখনও আছে আমাদের বাড়িতে। ওপরে বাবার হাতে লেখা ‘সোনা’ আর ভেতরে সোনার বিদ্যের প্রমাণ। এক থেকে দশ, ওয়ান থেকে টেন, এ থেকে জেড, অ থেকে ঔ আর ক থেকে চন্দ্রবিন্দু। এইটুকু শুনে অবশ্য বাড়ির লোকের মন ভরত না। বর্ণমালার যে ক’টা অক্ষর বলতে আমার কচিকচি দাঁত প্রায় ভাঙোভাঙো হয়েছে, সেগুলো আবার বলানো হত। সে সবও ক্যাসেটে ধরা আছে। সেজকাকু বলছেন, “আচ্ছা, এবার ব-এ শূন্য র টা আর একবার বল দেখি সোনামণি।” সোনামণি আদেশ পালন করলেন। তারপর পিসির অনুরোধে ড-এ শূন্য ড়, অন্ত্যস্থ য আর চন্দ্রবিন্দুও আর এক বার করে বলতে হল। দিনে অন্তত পাঁচশোবার শোনার পরও “শন্নবিন্নু” শুনে একদল প্রাপ্তবয়স্ক লোকের অত হাসি কী করে পেত সেটা একটা রহস্য।

আমার উরুশ্চারণ নিয়ে যথাসম্ভব হাসিঠাট্টা করে হাঁফ ধরে গেলে ফরমায়েশ আসত সেই গল্পটা বলার। গল্পে মোটে চারটে চরিত্র। সোনা, পিসি, পেয়ারাগাছ আর টিয়াপাখি। পেয়ারাগাছে টিয়াপাখি এসে বসেছে আর পিসি তাকে “হুশ হুশ” করে তাড়া দিয়ে বলছে, “অ্যাই টিয়াপাখি, তুই পেয়ারা খাবি না, পেয়ারা আমাদের সোনা খাবে।” ব্যস, গল্প শেষ এবং পুরস্কার হিসেবে কথকের এন্তার আদর, গালটিপুনি ও হাততালি প্রাপ্তি।

সেই গল্পের চরিত্রদের মধ্যে এখন শুধু আমি আছি। উনিশশো অষ্টাশি নাগাদ সিঁড়ি আর নতুনঘর হওয়ার সময় পেয়ারা গাছ চলে গেল, দু’হাজার একে কিডনির রোগে ভুগে পিসি চলে গেলেন। অবাধ্য পাজি টিয়াপাখিগুলো কখন গেল সেটা আমার মনেই নেই।

আর সেটাই আশ্চর্যের ব্যাপার। জ্ঞান হওয়া ইস্তক আমি আমার চারপাশে সবুজ দেখেছি। ভোরবেলা চোখ মেলে দেখেছি জানালার বাইরে ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে পেঁপে গাছ, স্কুলে বেরোনোর সময় দেখেছি একটা লোক কোমরে গামছা বেঁধে রেডি হচ্ছে নারকেল আর সুপুরি গাছে চড়বে বলে। ওই নারকেলগাছটার বয়স আমার থেকে ঠিক তিনদিন কম। বাড়ি ফিরেই নাকে এসেছে গুড় দিয়ে নারকেল পাকের সুঘ্রাণ। ঠাকূমার ঘরে ঢুকে দেখেছি একদিকে বড় বড় তিনচারটে ঝুড়িভর্তি বাদামি রঙের পিংপং বলের মতো সুপুরি। চন্দনামাসির কাছে ঠাকুমা বাজারে সুপুরির দর জানতে চাইছেন, পাছে নিজে বিক্রি করে ঠকে না যান। প্রতিবছর কালবৈশাখীতে আমাদের দরজার সামনের আমগাছের তলায় দুষ্টু ছেলেদের ভিড় দেখেছি আমি। গল্প শুনেছি বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে থাকতেন দাদু আর দাদুর পাশে ছোট একটা টেবিলে রাখা থাকত রকমারি আম। ফজলি, হিমসাগর, ল্যাংড়া। দাদু একটা একটা করে আম খেতেন আর খাওয়া হয়ে গেলে আঁটিগুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে বাগানের এদিকসেদিক ফেলতেন। তারা একে একে সব বড় হয়ে গাছ হবে সেই আশায়। দাদুর আশা পূর্ণ করেছিল গেটের মুখে গিয়ে পড়া আঁটিটা।

এইরকম গাছসর্বস্ব পরিবেশে বড় হয়ে আমার মধ্যে গাছপালার প্রতি প্রতি প্রীতি কেন জন্মায়নি সেটা একটা ভাববার মতো বিষয়। আমার ধারণা উত্তরটা লুকিয়ে আছে ওই ছবিটার মধ্যে। আমার দাদু বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে ঠাকুরদা আম খাচ্ছেন, আঁটি নিক্ষিপ্ত হচ্ছে বাগানের চতুর্দিকে।

আমাদের বাগানটা দেখলে আপনি বুঝবেন শুধু আম নয়, গোটা বাগানটাই তৈরি হয়েছে ওই কায়দায়। যে যেখানে পেয়েছে সেখানে একটা করে গাছ পুঁতে দিয়েছে। আম কাঁঠাল নারকেল সুপুরি পেয়ারা। গাছেদেরও কি ছিরি। কলা পেঁপে নিম চালকুমড়ো। গল্পের বইয়ের দৌলতে আমার তখন ভদ্রসভ্য বাগানদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, সে সব বাগানের মোরাম বেছানো রাস্তার দুপাশে কেয়ারি করা ইঁটের পাঁচিল। পাঁচিলের ওধারে বসরাই গোলাপের বেডের পাশে পাতাবাহারের ছাঁটা ঝোপ। বাড়ির দেওয়াল বেয়ে লতিয়ে উঠেছে মাধবীলতা।

কিছু বলতে গেলেই ঠাকুমা বলতেন, “ক্যান, আমাগো বাগানেও তো ফুলের অভাব নাই।” তা নাই, কিন্তু সেগুলোকে ফুল বলতে আমার রুচিতে বাধত। পাঁচরকম জবা, সাতরকম নয়নতারা, টগর, গাঁদা, গন্ধরাজ, কাঠগোলাপ, কলকে। আমার শোয়ার ঘরের জানালার শিকের ভেতর নাক গলিয়ে সেধে আলাপ করতে আসা একটা কাঞ্চন, গেটের পাশে একটা কূটকুটে সবুজ রঙের কামিনী গাছের ঝাড়। বাগানের কোণে একটা অষ্টাবক্র স্থলপদ্ম গাছ, বছরে তিনটে ফুল ফুটবে বলে মহাদরে রেখে দেওয়া হয়েছে।

গোলাপ পোঁতার প্রস্তাব দিয়েছিলাম আমি একবার। পোঁতার মতো ফাঁকা জায়গাও দেখিয়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম কাউকে কিছু করতে হবে না, সব দায়িত্ব আমার। উত্তর এল, “গোলাপ পুঁতে কী হবে, পুজোয় তো লাগবে না।” পরের সপ্তাহে দেখলাম সেই ফাঁকা জায়গাটা জুড়ে গাঁদাল পাতার বন গজিয়েছে একটা। বাড়ির লোকের পেটখারাপ হলে কাজে লাগবে।

এই সব ব্যাপারস্যাপার দেখে বাগানটাগান থেকে আমার মনটাই কেমন উঠে গিয়েছিল। খালি কাজ আর কাজ, কাজের বাইরেও যে জীবনের একটা অ্যাসথেটক দিক (অ্যাসথেটিক কথাটা আমি তখন নতুন শিখেছিলাম আর কেবলই চতুর্দিকে তার অভাব চোখে পড়ছিল) আছে, সেটাই যারা বোঝে না, তাদের বাড়িতে কিছু হবার নয়।

বাবার টেপরেকর্ডারের মতো ফাস্ট ফরওয়ার্ড করে কুড়িটা বছর এগিয়ে আসা যাক। এই বাগান সেই বাগানই আছে, এই আমি সেই আমিই আছি, খালি আমার হাততালির ক্ষিদে আর চশমার পাওয়ার বেড়েছে অনেকটা।

চোখ খুলে দেখলাম নাকতলার বাড়িতে আমি শুয়ে আছি। ঢাকের শব্দ কানে এল। মনে পড়ল আজ সপ্তমী। কাল মাঝরাতে আমরা এসেছি। উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে বাথরুমের দিকে যেতে গিয়ে দেখলাম মায়ের চা করা সারা। চা-টা খেয়ে বিছানায় এসে এলিয়ে পড়ে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথোপকথন পড়তে লাগলাম। রান্নাঘর থেকে ছ্যাঁকছোঁক শব্দ আর সুঘ্রাণ ভেসে আসতে লাগল। ভালো কিছু জলখাবার হচ্ছে মনে হয়।

কথা নেই বার্তা নেই ঠিক এই সময় আমার বিবেক জেগে উঠে আমাকে মোক্ষম কামড় দিল। কামড় খেয়ে আমি দৌড়ে রান্নাঘরে উপস্থিত হয়ে  “আমি কিছু করি আমি কিছু করি” বলে মাকে উত্যক্ত করতে লাগলাম। মা আমাকে নিরস্ত করার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন, আমি রণে ভঙ্গ দিয়ে ভেতর ঘরে ফিরে আসতে লাগলাম, কিন্তু আসামাত্র বিবেক আবার কামড় দিচ্ছিল এবং আমি আবার দৌড়ে গিয়ে “কিছু করি কিছু করি” লাফালাফি শুরু করছিলাম।

অবশেষে মায়ের মাথায় বুদ্ধি খেলল। কাজও দেওয়া হবে আবার আমার হাত থেকে মুক্তিও মিলবে এই না ভেবে মা বললেন, “কিছু যদি করতেই চাও তাহলে ছাদ থেকে কয়েকটা কারিপাতা তুলে আনো দেখি।”

আমি হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। এর থেকে যদি মা যদি গোটা বাড়ির রান্নাটাই আমাকে করতে বলতেন, কিংবা বলতেন বাড়ির সবার জামা কেচে দিতে, কিংবা হাতে ভরা তেলের বাটি নিয়ে সারা বাড়িটা যদি দুবার পাক খেয়ে আসতে, তাহলেও ভালো ছিল। কারণ সত্যিটা হচ্ছে, আমি কারিপাতা চিনি না।

কারিপাতা কাকে বলে জানি, খেয়েছি, রান্নায় দেওয়া হয়েছে কি না বলতে পারব, কিন্তু সেটা হাতে নিয়ে দেখিনি কখনও। এতদিন পর আমাদের দুঃখী বাগানের কথা আমার মনে পড়ল। মনে পড়ল শনিরবিবারের সকালের কথা। দশটা বেজে গেছে, বাড়ির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের পেট খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে অথচ সেদিকে কারও দৃকপাত নেই কেন খোঁজ নিতে দুমদুমিয়ে রান্নাঘরে গিয়েছি, দেখি মা বাগান থেকে উঠে আসছেন। হাতে একগোছা ঘাসপাতা। দরজার মুখে রাখা পাপোশে জোরে জোরে হাওয়াই চটি ঘষছেন পাছে বাগানের কাদামাটি ঘরে চলে আসে। মায়ের মুখ সর্বদাই যেমন থাকে, হাসিমাখা। হেসে হেসে মা বলছেন, “খুব খিদে পেয়ে গেছে সোনামা-র? এই তো কারিপাতা তুলে এনেছি, এবার সাড়ে তিনমিনিটে চিঁড়ের পোলাও হয়ে যাবে।” আমি দ্রুত মায়ের মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে হাতের পাতাগুলোর ওপর ফোকাস করার চেষ্টা করলাম। বিশ্রী একটা খ্যারখ্যার আওয়াজ করে ক্যামেরা বার বার তার অপারগতা জানান দিতে লাগল।

হাল ছেড়ে দিয়ে আমি আমাদের জঙ্গুলে বাগানের ম্যাপটা মাথার মধ্যে মেলে ধরলাম। কোথায় কারিগাছ, কোথায় সে গাছের পাতা। গাঁদালবনের পাশে? সুপুরিগাছের ছায়ায়? কোথাও তাকে খুঁজে পেলাম না। হঠাৎ আমার বাঁ পা-টা ধাঁই করে গদার মতো পড়ল আর সেই বিতিকিচ্ছিরি ঝটকায় চোখের সামনে থেকে মা, বাগান, কারিপাতা সব উধাও হয়ে গেল, আমি চমকে উঠে দেখলাম সিঁড়ির ধাপ শেষ হয়ে গেছে এক ধাপ আগেই, আমি নাকতলার ছাদের মুখে দাঁড়িয়ে আছি। ছাদের রেলিং জুড়ে আমার শাশুড়িমায়ের বাগান। পাতিলেবু থেকে শুরু করে পিটুনিয়া থেকে শুরু করে রক্তকরবী, কী নেই সে বাগানে।

কিন্ত এখন বাগান অ্যাপ্রিশিয়েট করার সময় নয়। এখন কারিপাতা খুঁজে বার করে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময়। স্কুলে সাহানা একবার আমাকে অজানা প্রশ্ন দেখে না ঘাবড়ানোর টোটকা শিখিয়েছিল। ধরা যাক প্রশ্ন এসেছে সালোকসংশ্লেষ কাকে বলে। এদিকে আমার কোনও আইডিয়াই নেই যে সালোকসংশ্লেষ খায় না মাথায় দেয়, খালি মনে পড়ছে মাখনদাদুদের দোতলায় একটা বিশ্বপাকা ছেলে ভাড়া এসেছে, আশ্রমে পড়ে, নাম সালোক দাশগুপ্ত। এ রকম পরিস্থিতিতে সাহানার বক্তব্য ছিল, মাথা থেকে সালোক দাশগুপ্তকে বার করে সালোকসংশ্লেষের ওপর মনঃসংযোগ করতে। প্রথমেই শব্দটাকে ছোট করে ফেলতে হবে। সালোক আর সংশ্লেষ। সালোক মানে স-আলো, আর সংশ্লেষ মানে, ওয়েল, সংশ্লেষ। অর্থাৎ আলো দিয়ে কোনও কিছুর সংশ্লেষ। এবার পরীক্ষাটা যেহেতু জীবনবিজ্ঞানের সেহেতু সংশ্লেষটা ঘটছে নিশ্চয় কোনও একটা জীবনের মধ্যে। মানুষ, কুকুর, গাছ, অ্যামিবা।

সাহানার বক্তব্য ছিল এইভাবে ভাবলে যে কোনও প্রশ্নের উত্তরের কাছাকাছি পৌঁছনো যায় এবং এই ভাবনার প্রক্রিয়াটা খাতায় লিখে আসলে ‘প্রচেষ্টা’র খাতিরে ‘রা’দিদিভাই নম্বরও দেন। অন্তত দেওয়া উচিত। আমি কারিপাতা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। কারিপাতা সম্পর্কে কী কী জানি আমি? এক, এ পাতা কারিতে দেওয়া হয়। দুই, আমার একটা আবছা ধারণা আছে যে কারি গাছ কলাগাছের মতো বড় নয় আবার ধনেপাতার মতো বেঁটেও নয়। তিন, নাকের কাছে তুলে ধরে শুঁকলে কারিপাতা কারিপাতা গন্ধ বেরোতে পারে। তাকিয়ে দেখলাম, ছাদের তিন রেলিং জুড়ে কোটি কোটি গাছ। এত গাছের এত পাতা শুঁকে শুঁকে পরীক্ষা করতে গেলেই হয়েছে। রান্নাঘরে মায়ের চেহারাটা একবার মনে পড়ল। “ছাদের এই দিকে আছে, দেখবে।” বলে একটা অনির্দিষ্ট হাত ঘুরিয়েছিলেন। আমি মনে মনে সেই দিকটা আন্দাজ করে এগিয়ে গেলাম।

সর্বনাশ। এদিকের সবক’টা গাছই দেখছি মনে মনে আমি কারিপাতার গাছকে যেমন কল্পনা করেছি সেরকম দেখতে। হাঁটুর সমান উঁচু, রোগা কেঠো ডাল, ছোট ছোট সবুজ পাতা। নিচু হয়ে শুঁকলাম। গন্ধ . . . গন্ধ . . . এইটায় একটু আছে মনে হচ্ছে? যা থাকে কপালে বলে আমি পটাপট কুড়ি পঁচিশটা পাতা ছিঁড়ে ফেললাম। গাছটা প্রায় হাফ ন্যাড়া হয়ে গেল।

মা দেখে বললেন, “ওমা, এগুলো কী পাতা এনেছ?”

ব্যস। হয়ে গেল। আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম এ গাছ অতি বিরল, স্পেশাল অর্ডার দিয়ে আনানো। এ গাছে নিশ্চয় পাঁচবছর পর পর মাঘ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে ফুল ধরে। এ বছরই নির্ঘাত সেই পবিত্র বছর। আর এ বছরেই আমি অর্ধেক পাতা ছিঁড়ে গাছটাকে মেরে ফেললাম। বিয়ের সই সেরে উঠে প্রণাম করার পর ঠাকুমার আশীর্বাদের কথাটা মনে পড়ল। “শাশুড়িরে ভালোবাইসো, শাশুড়ির ভালোবাসা পাইও।” আশীর্বাদের সেকেন্ড পার্টটা আর এ জীবনে ফলল না মনে হচ্ছে।

আবার ছাদে গেলাম। এবার দিক ভালো করে জেনে নিয়ে গেলাম। গিয়ে যে গাছটাকে দেখে সন্দেহ হল সেটার পাতার কাছে নাক নিয়ে যেতেই নির্ভুল কারিপাতার গন্ধ নাকে এল। পাতা মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে ঘরে এসে গোটা ঘটনাটা অর্চিষ্মানকে বলাতে ও এমন জোরে হাসতে লাগল যে ভয় হতে লাগল এক্ষুনি না দম আটকে যায়।

সেই থেকে মনে মনে রেখেছিলাম, গত সপ্তাহে কাজে করে ফেলেছি। অনলাইন অর্ডার করে জীবনের প্রথম গাছ কিনে ফেলেছি আমি। কী গাছ আন্দাজ করার জন্য কোনও প্রাইজ নেই। তবু যদি হিন্ট চান তা হলে বলব এ গাছের পাতা কারিতে দেওয়া হয়, এ গাছের পাতা ধনেপাতার থেকে বড় কিন্তু কলাপাতার থেকে ছোট আর এ পাতা নাকের কাছে নিয়ে শুঁকলে একটা বিশেষ গন্ধ পাওয়া যায়, যে গন্ধটা আপনাদের সবার চেনা।



January 26, 2015

ছাব্বিশে জানুয়ারি



আজ একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে তো বটেই, আমার জীবনেও। বান্টি বলল, “কিছু বাড়তি কথা বলতেও পার বটে তুমি। ভারতবর্ষের জন্য যা ইম্পরট্যান্ট, তোমার জন্য তো তা ইম্পরট্যান্ট হবেই। শুধু ইতিহাস কেন, ভূগোল, ভৌতবিজ্ঞান, জীবনবিজ্ঞান, পিসিকালচার, হর্টিকালচার – ভারতবর্ষের পক্ষে যা যা ইম্পরট্যান্ট, তোমার পক্ষেও তা ইম্পরট্যান্ট হতে বাধ্য। সে তুমি স্বীকার কর আর না কর।”

অস্বীকার আমি করছি না মোটেই। ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে আজকের দিনটা আমার কাজে জরুরি তো বটেই। ছেষট্টি বছর আগে আজকের দিনটা ঘটেছিল বলেই আমি কথায় কথায়, অটোর সঙ্গে দরাদরিতে, অর্চিষ্মানের সঙ্গে তর্কে, যখন তখন কথায় কথায় আমার ‘কনস্টিটিউশনাল রাইটস্‌’-এর ধুয়ো ধরতে পারছি, সে অস্বীকার করছি না। আমি শুধু বলতে চাইছি, আমার হাতে সে রাইটস্‌-এর মালিকানা ন্যস্ত করা ছাড়াও আজকের দিনটার আমার জীবনে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ছেষট্টি বছর পরের এই দু’হাজার পনেরো সালে।

আজ আমার বছরের প্রথম তিনদিন লম্বা উইকএন্ডের শেষ দিন।

এই উইকএন্ডটা অনেক রকম করে কাজে লাগানো যেত। ছুটির আঁচ পেলেই প্রথম যে কাজটার কথা মনে পড়ে – কাজ ছেড়ে পালানোর কাজ, আর সে সঙ্গে এই কর্মময় শহরটা ছেড়েও পালানোর কাজটার কথা আমাদের প্রথমেই মনে এসেছিল। পালিয়ে বেশি দূর যেতেও হত না। মোটে দুশো সত্তর কিলোমিটার দূরে দেশের বিখ্যাততম সাহিত্যমেলা বসেছিল। দেশবিদেশের সাহিত্যিক, সাহিত্য বিশেষজ্ঞ, সাহিত্য অনুরাগীদের, সাহিত্যিকদের(যাঁদের কারও কারও প্রতি আমার মোহমুগ্ধতাও আছে যথেষ্ট পরিমাণে) ঝলমলে মেলা। মেলা ভালো না লাগলে হাওয়ামহলে হাওয়া খেতে যাও, হাওয়া খেয়ে খিদে না মিটলে ডাল-বাটি-চুরমার সন্ধানে বেরোও, আটকাচ্ছে কে?

মনকে বুঝিয়ে এনেছিলাম প্রায়। আর টি ডি সি-র হোটেলে খালি ঘর আছে দেখে, ট্রেনে সিট না পেয়ে “বাসেই যাব” সংকল্পে বুক বেঁধেও . . . শেষমুহূর্তে গেলাম না। ঠিক করলাম বাড়িতে বসে আরাম করব। বাহাত্তর ঘণ্টার নিশ্ছিদ্র আরাম।

বয়স হয়েছে বোঝা যাচ্ছে।

বার্ধক্যের সত্যিটা মেনে নিয়েও বলছি, এই অদ্ভুতুড়ে সিদ্ধান্তের পেছনে কিছু যুক্তি ছিল। কয়েকটা সংকল্প। তারা কেউই নতুন বছরের রেসলিউশনের মর্যাদা পাওয়ার মতো গুরু নয়। সে রকম কিছু কিছু অপ্রধান সংকল্পের মধ্যে একটা ছিল বাড়ির ওজন কমানোর সংকল্প। দু’হাজার বারো সালের শেষের দিকে দু’জনে মিলে যখন বাড়িটা দেখতে এসেছিলাম তখন লোকেশন আর বাড়িওয়ালার পাশাপাশি যেটা দু’জনেরই মনে ধরেছিল সেটা হচ্ছে বাড়িটার একহারা, নির্মেদ চেহারা। যতটুকু দরকার ততটুকুই আছে, তার বেশি নেই। বাজে খরচ নেই একরত্তি।

বাড়িটার সেই হিংসে করার মতো ফিগার, গত দু’বছর ধরে আমরা মাটি করেছি। বাইরে থেকে যেটুকু দেখা যায়, মুখচোখ নাককান, মেজেঘষে ধুয়েমুছে রেখেছি; যেটুকু দেখা যায় না, শরীরের যে সব খাঁজভাঁজ, মোড়মোচড় আড়ালে লুকিয়ে থাকে, সেখানে প্রয়োজনের বেশি সঞ্চয়ে, নিয়মিত ব্যায়ামের অবহেলায় জমিয়ে তুলেছি অনাবশ্যক মেদের পরত।

এই জমার প্রক্রিয়াটা মানুষের শরীরের মতো হলেও, খরচের প্রক্রিয়াটা, সুখের ব্যাপার, মানুষের শরীরের থেকে সোজা। পরিশ্রম ও সময়, দুদিক থেকেই। মাসের পর মাস জিমে যাওয়া নেই, জিভে জল আনা খাবারের সামনে আত্মসংযম অভ্যেস করা নেই। চাই শুধু একটা ছুটির সকাল আর একজন পরিচিত কাবাড়িওয়ালার ফোন নম্বর।

তিনটে ফাঁকা সকাল থেকে এই কাজটার জন্য আমরা বেছে নিয়েছিলাম রবিবারের সকালটা। ডাঁই করা কাগজের পাহাড় ভেঙে বেরোলো হারানো চেকবই আর দু’বছর আগের মাইনের স্লিপ। দেখে মিশ্র অনুভূতি জাগল মনে। মাইনে বেড়েছে দেখে খানিকটা খুশি, আবার যতটা বাড়া উচিত ছিল ততটা বেড়েছে কি না সংক্রান্ত খানিকটা সন্দেহ। আর বেরোলো লাখ লাখ অর্ধেক লেখা খাতা। সেগুলো এবারও জমিয়ে রাখলাম, সামনের বছর ছাব্বিশে জানুয়ারির আগে ফুরোনো যায় কি না দেখা যাক।

কাগজ বিক্রি হল, পুরোনো প্যাকিং কেস বিক্রি হল, অসংখ্য সেমিনার থেকে পাওয়া অগুন্তি প্লাস্টিকের ফোল্ডার বিক্রি হল, কোটি কোটি জলের বোতল বিদেয় হল। বাড়িটার ওজন কমে গেল এক ঝটকায় অনেকটা। চোখ ফেরাতে গিয়ে এখাঁজে ওখাঁজে চোখ আটকে যেতে লাগল হঠাৎ হঠাৎ। যে খাঁজভাঁজগুলো ছিল যে সেটাই ভুলতে বসেছিলাম আমরা।

মানুষর ওজন কমানোর সঙ্গে বাড়ির ওজন কমানোর প্রক্রিয়ার আরও একটা তফাৎ চোখে পড়ল। জিম মেম্বারশিপে এক পয়সাও খরচ হল না, উল্টে কাবাড়ি ভদ্রলোক আমাদের একশো টাকা দিয়ে গেলাম। তাও তো আমরা মোটে দরাদরি করিনি, করলে দেড়শো টাকা পর্যন্ত আদায় করা যেত বলেই আমাদের বিশ্বাস।

এই তিনদিনে যে দু’নম্বর কাজটা করার ইচ্ছে ছিল সেটা হচ্ছে কাজ করার জন্য বাড়ির ভেতর নিজের জন্য একটা জায়গা বানানোর। বাড়িতে জায়গা আছে যথেষ্টই। সে জায়গায় আমার যে অধিকার কিছু কম আছে তেমনও নয়। গোটা বাড়িটাই আমার রাজত্ব। যেখানে খুশি বস, যেখানে খুশি শোও, যেখানে খুশি যা খুশি কর।

মুশকিলটা হচ্ছে এত জায়গা থাকতেও কোনও জায়গাতে বসেই আমার কোনও কাজ হচ্ছে না। কাজ করার দরকারটাই বা কি যদি জানতে চান, তাহলে অবশ্য আমার কাছে পদস্থ কোনও উত্তর নেই।অফিসে বেগার খেটে দিনের আট ঘণ্টা কাটে, পথে পথে আরও দুই, খেয়েশুয়ে ইন্টারনেট দেখে আরও বারো, তার পরেও হাতে দু’ঘণ্টা ফালতু পড়ে কাটে। সুখে থাকতে আমাকে ভূতে কিল মেরেছে, আমার শখ হয়েছে সে দু’ঘণ্টা কাজ করে নষ্ট করার। কিন্তু কাজ করব বললেই তো করা যায় না। অন্তত, আমি পারি না। কাজ করার কথা মাথায় উদয় হলেই কেউ কেউ হয়তো হইহই করে কাজে নেমে পড়েন। আমি তাদের মধ্যে পড়ি না। কাজের কথা মাথায় এলে আমি প্রথমে খানিকক্ষণ সাড়াশব্দ না করে ঘাপটি মেরে থাকি। অপেক্ষা করি, যদি কাজের লোকের অভাবে কাজ ফিরে যায়। সে ফন্দি যদি ফেল করে তবে মুখব্যাজার করে উঠে এদিকওদিক হাঁটি, এটাসেটা গুছোই্। কাজকে বলি, “দাঁড়াও দাঁড়াও, ভালো করে তোমার উপযুক্ত সমাদর করব বলেই তো অ্যাটমসফিয়ার তৈরি করছি।” অবশেষে কাজের ধৈর্যচ্যুতি হয়, সে “নিকুচি করেছে তোর অ্যাটমসফিয়ারের” বলে দুমদুমিয়ে হাঁটা মারে। আমি “কেমন দিলাম” বলে নিজের পিঠ চাপড়ে দিই।

এ বছর ভূতের কিলটা আমার পিঠে খানিক জোরেই পড়েছে দেখতে পাচ্ছি। কাজের উপযোগী অ্যাটমসফিয়ার তৈরি করতে আমার উদ্যোগ দেখে আমি নিজেই চমৎকৃত। আমাদের বাড়িতে সাকুল্যে দুটি ঘর, তার একটি ঘরে রেডিও টিভি বুককেস ইত্যাদি আরও নানারকম মেনকারম্ভারা ঘাঁটি গেড়ে আছেন, সেখানে কোনও রকম সাধনার উপায় নেই। অন্য ঘরটি কোণের দিকে, লোকসমাজের চোখের আড়ালে। পর্দা টেনে দিলেই ঠিক যেন হিমালয়ের নির্জন গুহা। সাধনায় সিদ্ধিলাভ করার জন্য অর্ডার দিয়ে বানানো।

এতদিন সে গুহায় ঢোকার আমার কোনও সদিচ্ছা হয়নি। দিব্যি সামনের ঘরে হাটের মধ্যে বসে থেকেছি, টিভি দেখতে দেখতে, গান শুনতে শুনতে, ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে খেলতে যতটুকু কাজের ভড়ং হয়েছে ততটুকুতেই নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি। হঠাৎ আর চলছে না। হঠাৎ মনে হচ্ছে, আর একটু মন দিয়ে কাজ করলে বোধহয় লাভ হতে পারে।

তাই এই উইকএন্ডে আমি ভেতরঘরে একখানা জায়গা বানিয়েছি। নিজের জায়গা। খাট তো ছিলই, খাটের ওপর পেতেছি একখানা বিছানা-ডেস্ক, খাটের পাশে রেখেছি একখানা ছোট টেবিল, টেবিলের ওপর ডাঁই করেছি আমার অর্ধেক লেখা অগুন্তি নোটবুক, কালিফুরোনো অসংখ্য অকেজো পেন। সেই সব পেন দিয়ে লিখে সেই সব নোটবুক ফুরিয়ে ফেলব, এই আমার উচ্চাশা। মাঝরাতে আমার নোটবুকে আলো ফেলতে এনে বসিয়েছি পুরোনো আকাশীরঙা টেবিল ল্যাম্পকে। অর্চিষ্মানের আলমারি হাঁটকে বার করে এনেছি একখানা লাল টুকটুকে মাল্টিপ্লাগ, তাতে আমার ল্যাপটপ আর ফোন চার্জ হবে। বাকি যেটুকু জায়গা বাকি থাকবে, সেখানে আমি চায়ের কাপ নামিয়ে রাখব।

অ্যাটমসফিয়ার তৈরির কাজ শেষ। এবার শুধু কাজটা করাই যা বাকি।

তিন নম্বর যে জিনিসটার জন্য বাড়িতে থেকে যাওয়া, সেটা হচ্ছে শীত। দিল্লির শীত লাস্ট ল্যাপ দিচ্ছে। আর টেনেটুনে একটা মাস, তারপরই কষ্ট শেষ। আর সকালে লেপ ছেড়ে বেরোতে কান্না পাবে না, আর রাতে শুতে যাওয়ার সময় মনে হবে না, কে যেন শত্রুতা করে বিছানায় বরফ জল ঢেলে রেখে গেছে। আর সর্বাঙ্গ মুড়ে অটো চেপে অফিস যাওয়ার সময় মনে হবে না, “হে ভগবান, গাল, কপাল আর চিবুকটা ঢাকার জন্য কেন কিছু বেরোয়নি গো”, আর যখন তখন ঢোঁক গিলতে গেলে গলায় কাঁটা ফুটবে না।

আর একমাস বাদে হাঁ করে নিঃশ্বাস ছাড়লে মুখের ভেতর থেকে ঘন ধোঁয়া বেরোবে না, সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালার বাইরে তাকালে মনে হবে না মেঘ আর কুয়াশা কেটে গেলেই ওপারে কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝলমল করে উঠতে পারে যে কোনও মুহূর্তে, বিকেলবেলা জানালার কাঁচ বেয়ে নামবে না বাষ্পের বৃষ্টি।

এই শেষের শীতটুকুতে আরাম করে গড়াগড়ি খাব বলে বাড়িতে থেকে গেলাম। সকাল সাড়ে সাতটার সময় ঘড়িকে কাঁচকলা দেখাতে দেখাতে চল্লিশ মিনিট ধরে চা খেলাম, বিছানায় এসে পড়া মিষ্টি রোদ্দুরে খবরের কাগজ পেতে খুব করে কমলালেবু আর নারকেল কুল খেলাম দুজনে। দুপুরের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে রোদ্দুরে পিঠ সেঁকতে সেঁকতে নাটক দেখতে গেলাম। ফেরার পথে মেট্রো স্টেশনে নেমে অটো নেওয়ার বদলে হেঁটে হেঁটে ফিরলাম বাড়ি পর্যন্ত। ফ্লাইওভারের তলায় যাযাবরদের ডেরায় কাঠকয়লার আগুনের পটপট আওয়াজ শুনলাম, ধোঁয়ার গন্ধ শুঁকলাম।

আজ তিন নম্বর দিন। আজ ছুটি শেষ। যা হল তা হল, যা হল না তা হল না, তুলে রাখলাম সামনের ছুটির মুখ চেয়ে। ছুটি শেষের খবরটা আমি যেমন পেলাম, অর্চিষ্মান যেমন পেল, দিল্লির আকাশবাতাসও তেমনি পেয়েছে মনে হচ্ছে। সকাল থেকে রোদের মুখ দেখিনি আজ। বেলা ঢলে গেছে, ঘড়িতে তিনটে বাজতে চলল, দেখার আশাও নেই আর। ঘন হয়ে অন্ধকার নামছে জানালার কাঁচ বেয়ে, ঠাণ্ডা, স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার। ব্লোয়ারের উষ্ণ হাওয়ার তেজ ক্রমশ কমছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মন খারাপ। গ্যাসে সিম করা আঁচে জ্বলছে পাঁঠার মাংস। মন খারাপ যদি কেউ দূর করতে পারে তবে ও-ই পারবে।


January 25, 2015

সাপ্তাহিকী



The hierarchy of disagreement  


The scholar's greatest weakness: calling procrastination research.
                                              --- Stephen King

১। সেদিন গুগল ম্যাপস হাতে বাগিয়ে ধরে শাহপুরজাটের গলিতে ঘুরতে ঘুরতেই কথাটা মাথায় এসেছিল।  ম্যাপ দেখে যথাস্থানে পৌঁছে (শেষমুহূর্তে পানের দোকানে জিজ্ঞাসা করতে হয়েছিল, তবে ওটা আমাদের বুরবকি। দোকান খোঁজার জন্য আমার আগেপিছে ডায়েবাঁয়ে, পুবপশ্চিম উত্তরদক্ষিণ ঈশানঅগ্নি নৈঋতবায়ু সব দিকে ঘাড় ঘুরিয়েছিলাম, বাদ রেখেছিলাম খালি ঊর্ধ্ব আর অধঃ। ঊর্ধ্বপানে তাকালেই মাথার ওপর ঝুলন্ত জং ধরা বোর্ডে চোখে পড়ত, অধোপানে চাইলেই পায়ের শাহপুরজাট ভিলেজের জমা জলের পুকুরে আমরা সে বোর্ডের ছায়া দেখতে পেতাম)। যাই হোক, পানওয়ালা ভাইসাবের দেখানো সিঁড়ি বেয়ে আমরা যখন দোকানে উঠে এলাম আর ঠাসাঠাসি দোকানে একখানা বিতিকিচ্ছিরি টেবিল আমাদের কপালে জুটল, তখন চেয়ারে তশরিফ রেখেই প্রথম যে কথাটা আমি বলেছিলাম সেটা হচ্ছে, “গুগল ম্যাপ কিন্তু রাস্তা চেনানোর জন্য ভালো, তাই না?” আর বলেই আমার মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল।

মনখারাপ হল বাবার কথা ভেবে। আমার বাবা যে কোনও শহরে সকালবেলা ঢুকে বিকেলবেলা বেড়াতে বেরিয়ে অটো/ট্যাক্সিওয়ালাকে বলতে পারেন, “ভাইসাব, স্টেটব্যাংক এ টি এম কা বগলকা রাস্তা লিজিয়ে। জলদি হোগা।” এবং অনেক ক্ষেত্রেই বাবার এই ব্যাপারটা করার পেছনে একটা শার্লক হোমসোচিত উদ্দেশ্য থাকে। শার্লক হোমস যেমন ওয়াটসনকে চমকে দেওয়ার জন্য ওয়াটসনের চিন্তাসূত্র ধরে দিয়ে ওয়াটসনকে চমকে দিতেন, বাবাও তেমনি আমাদের চমকে দিতে চান। আবার অবাক হয়ে ওয়াটসন শার্লক হোমসকে যখন এই চমৎকার ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে বলেন তখন হোমস যেমন চোখ ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেন যে এই ডিডাকশনের গোটা রাস্তাটা ওয়াটসনের চোখের সামনেই ছিল সর্বক্ষণ, তেমনি আমার বাবাও (চোখ না ঘুরিয়ে) বলেন, “আরে এই রাস্তাটা দিয়েই তো সকালবেলা গেলাম, মনে নেই?”

আমার মনখারাপ হল এই ভেবে যে আমার বাবার এই চমকে দেওয়ার নিরীহ খেলাটা আর কিছুদিনের মধ্যে লুপ্ত হয়ে যাবে। কেউ আর বাবার রাস্তা চেনার ক্ষমতা দেখে চমকাবে না, হয়তো নিজেদের মধ্যে বলবে, “লোকে কিছু আবোলতাবোল জিনিস মনে রেখে মস্তিষ্কের র‍্যাম খরচ করতেও পারে, বস্‌স্‌”। আমার বাবা সিধুজ্যাঠার মতো অবান্তর হয়ে যাবেন।

তেমনি লন্ডনের ট্যাক্সিওয়ালারাও কি হারিয়ে যেতে বসেছেন? বাড়িঘর, দোকানপাট, ব্যাংকপোস্টঅফিস শুদ্ধু লন্ডনের পঁচিশহাজার রাস্তা অলিগলি নখাগ্রে রাখা ক্যাবিরা?    

২। একটা স্বীকারোক্তি। এই লিংকটা আমি নিজে পড়িনি। কারণ এই রোদঝলমল রবিবারের সকাল (এবং আগামীকালের প্রজাতন্ত্রের ছুটি) মাটি করার আমার কোনও ইচ্ছে নেই। তবে আপনার যদি কলজের জোর থাকে, বিষণ্ণতা যদি আপনাকে কাবু না করতে পারে তাহলে আপনি পড়তে পারেন।

৩। ক’টা বাজে? ঘড়ি দেখতে না জানলেও উত্তরটা এবার থেকে দেওয়া যাবে। 

৪। লিখতে লিখতে থেমে ইউটিউব দেখেন? উইকিপিডিয়া পড়েন? নিজের আইকিউ কাল সন্ধ্যের থেকে কতটা বাড়ল জানতে কুইজ খেলেন? তাহলে আপনার চাই-ই চাই হেমিংরাইট। 


৬। দিল্লিতে বার্গার কিং খুলেছে। লাইন পড়ছে এ পাড়া ছাড়িয়ে ও পাড়া পর্যন্ত। কৌতূহল দমন না করতে পেরে সেদিন অফিসের পর গিয়েছিলাম। দশ টাকার ঝালমুড়ির বদলে পাঁচশো টাকার চিকেন হুপার, চিকেন তন্দুরি গ্রিল। মিলের অংশ হিসেবে কোল্ড ড্রিংকস আর আলুভাজা। আলুভাজার চেহারা দেখে প্রথমে বেশ উৎসাহ জেগেছিল। সোনালি সোনালি, মোটা মোটা। মুখে দিয়েও ভালো লাগাটা বজায় ছিল, কিন্তু আলুবাজার বাক্স যত খালি হতে থাকল তত অন্য একটা আলুভাজার কথা আমার আর অর্চিষ্মান, দুজনের মনেই উঁকি দিতে লাগল। ম্যাকডোনাল্ডসের। এ দোকানের মতো ষণ্ডা নয়, কিন্তু এর থেকে ভালো খেতে। সত্যি বলতে কি, ম্যাকডির থেকে ভালো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আমি খুব কম খেয়েছি। এই ভিডিওটা দেখলে সে আলুভাজার রহস্য খানিকটা উদ্ধার হতে পারে।

৭। অফিস করেন? সঙ্গে সঙ্গে প্যারাগ্লাইডিং শিখতে চান? প্যারাগ্লাইডিং করেন? পাশাপাশি একটা উপন্যাস লিখতে চান? উপন্যাস লেখেন? সাইডে সিনেমায় নামতে চান? চিন্তার কোনও কারণ নেই। রিচার্ড ব্র্যানসন উপায় বাতলে দিচ্ছেন। 

৮। কলেজের সময় এক স্যারের কাছে পড়তে যেতাম। গ্রীষ্মের দুপুরে তিনি ছেলেদের ফ্যানের তলা থেকে তুলে দিয়ে বলতেন, “মেয়েরা নরম, মেয়েরা লাবণ্যময়ী, মেয়েদের গরমে বেশি কষ্ট হয়।” এই বলে ছেলেদের ফ্যানের তলা থেকে তুলে দিয়ে আমাদের বসতে দিতেন। ছোটবেলায় এক আত্মীয়র বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। সে বাড়ির কলেজে পড়া ছেলে যেচে সবার জন্য চা বানাতে উঠলে, প্রশংসায় সারা বাড়ি কলরব করে উঠেছিল। বলেছিল, এই ছেলেকে যে মেয়ে বিয়ে করবে, তার মতো ভাগ্যবতী আর দুনিয়ায় দুটো হবে না। তখন বুঝিনি এগুলো কী। এগুলো হচ্ছে Benevolent sexism.

৯। পৃথিবীতে কত রকমের প্রতিযোগিতা হয় সত্যি ভাবা যায় না।  এই হচ্ছে সে রকম একটা প্রতিযোগিতার ছবি।

১০। রুল অফ থাম্ব কথাটা জানতাম, কথাটার ব্যবহার জানতাম, কিন্তু কথাটা কোথা থেকে এসেছে সেটা জানতাম না।

১১। পঁয়তাল্লিশ মিনিট। ছত্রিশটি প্রশ্ন। প্রশ্নের শেষে মৌনমুখর চারটি মিনিট। ব্যস। প্রেম হতে এর থেকে বেশি কিছু লাগে না। স অবশ্য মানবে না। স ছিল মার্স্টার্স করাকালীন আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। স বলত প্রেম করা যায় না, প্রেম হয়ে যায়। করতেই যদি হল তাহলে আর প্রেমের সঙ্গে ক্যালকুলাসের তফাৎ রইল কী সে? আমি আবার চিরকালের “চেষ্টায় কি না হয়” নীতিতে বিশ্বাসী। চেষ্টায় প্রেম হয় না এটা আমি তখনও বিশ্বাস করতে পারতাম না, এখনও পারি না। কিন্তু আমি সবসময়েই তর্কে হারতাম (কারণ বহু চেষ্টাতেও তর্কটা আমার হয়নি)। হারতাম না, যদি আমার সাধারণ জ্ঞানের দৌড়টা আর একটু বেশি হত। যদি আমি নিউ ইয়র্কের স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রী আর্থার অ্যারনের নাম জানতাম।

উনিশশো সাতানব্বই সালে, Personality and Social Psychology Bulletin-এ The Experimental Generation of Interpersonal Closeness নামে ডঃ আর্থার অ্যারনের একটি পেপার বেরিয়েছিল। সেই পেপারেই ছিল ওই ছত্রিশটি প্রশ্নসম্বলিত একটি প্রশ্নপত্র। তিনি দাবি করলেন, সেই প্রশ্নপত্রটি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলে যে কোনও দুজন মানুষ একে অপরের প্রেমে পড়তে বাধ্য।
A heterosexual man and woman enter the lab through separate doors. They sit face to face and answer a series of increasingly personal questions. Then they stare silently into each other’s eyes for four minutes. The most tantalizing detail: Six months later, two participants were married. They invited the entire lab to the ceremony.
আমার অবশ্য দাবির সত্যমিথ্যে যাচাইয়ের উপায় নেই। অর্চিষ্মানের সঙ্গে খেলাটা খেললে চিটিং করা হবে, আর অর্চিষ্মান ছাড়া কারও সঙ্গে খেলতে বসাটা, ওয়েল, রিস্কি। সত্যি বলতে কি আমার প্রেমে পড়াপড়ি নিয়ে অত বেশি উৎসাহ নেই। দুটো লোক কী করলে একে অপরের প্রেম থেকে বেরিয়ে যেতে পারে সেই খেলাটা নিয়েও না। অন্তত এখন তো না-ই। বছর সাতেক আগে এই খেলাটার সন্ধান পেলে কী যে উপকার হত।

১২। সব শেষে প্রেমে পড়াপড়ি নিয়ে একটা গান হয়ে যাক।


গোকর্ণ



গোকর্ণ সমুদ্রতটে বাবার তোলা কয়েকটা ছবি দেখাই আপনাদের। 



January 23, 2015

চৌত্রিশ/ পর্ব ২



চৌত্রিশ বছরের জন্মদিনের পোস্টটা লেখার পর অবান্তরেরই এক পড়ুয়া আমাকে বুদ্ধি দিয়েছিলেন চৌত্রিশ বছরে আমি কী কী শিখিনি সেটা নিয়ে একটা পোস্ট লিখতে। পরামর্শটা আমার বেশ মনে ধরেছিল। যা যা শেখা হয়ে গেল সে তো হয়েই গেল, যা যা হল না সেগুলোকে লিখে চোখের সামনে টাঙিয়ে রাখলে যদি কোনওদিন সেগুলো শিখে ওঠা হয়।

এই পর্যন্ত শুনে বান্টি বলল, “ও, তার মানে তোমার ধারণা পৃথিবীতে তোমার মোটে চৌত্রিশটা কাজ শিখতে বাকি আছে। বাকি সব তুমি গুলে খেয়ে নিয়েছ। বাঃ, তোমার আত্মবিশ্বাস দেখে আমি মুগ্ধ।”

বান্টির প্রশ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি, কিন্তু আপনাদের দিচ্ছি। অফ কোর্স, চৌত্রিশ কেন, চৌত্রিশ লক্ষ কোটি অযুত নিযুত কাজ আমার শেখা নেই। আমি সেতার বাজাতে পারি না, ঘোড়ায় চড়তে পারি না, মনে করে ওষুধের কোর্স শেষ করতে পারি না।  সেই কাজগুলো শিখতে পারলে ভালোই হত, কিন্তু এই চুপিচুপি স্বীকার করছি, কোনওদিন সেগুলো শেখার কথা আমার খুব একটা ইচ্ছে হয়নি। সর্দি সেরে গেলেও শুধু প্রেসক্রিপশনে লেখা আছে বলে কেন আমাকে আরও তিনদিন সেটজিন খেয়ে যেতে হবে এবং তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অফিসের চেয়ারে বসে ঢুলতে হবে আমার মাথায় ঢোকেনি ।

কিন্তু এই চৌত্রিশটা কাজ, যা গত চৌত্রিশ বছরে আমার শিখে ওঠা হয়নি, সেগুলো আমি সত্যি সত্যি শিখতে চাই।

১। অন্যের বুদ্ধির ওপর ভরসা রাখতে

২। সেমিকোলনের ব্যবহার শিখতে

৩। স্টকমার্কেট আর ফাটকার তফা বুঝতে

৪। একটা বাদামভাজা খেয়ে থামতে

৫। সময়ের ঠিকঠিকানা রাখতে/ টাইম ম্যানেজমেন্ট শিখতে

৬। সান্ত্বনা দিতে

৭। এক ঘর বসে থাকা লোকের সামনে দাঁড়িয়ে উঠে না ঘাবড়ে কথা বলতে

৮। টিভিতে খবর শুনে ব্লাডপ্রেশার না বাড়াতে

৯। ঘুড়ি ওড়াতে

১০। সবে মিলে কাজ (টিম ওয়ার্ক) করতে

১১। সিদ্ধান্ত নিতে

১২। সিদ্ধান্তে অটল থাকতে

১৩। ‘জানি না’ বলে লজ্জা না পেতে

১৪। আমার ডেস্ক, অফিসের এবং বাড়ির পরিষ্কার রাখতে (যদিও অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, “If a cluttered desk is a sign of a cluttered mind, of what, then, is an empty desk a sign?”, তবুও)

১৫। অন্যের কথা শুনতে (নিজে না বলে)

১৬। নেটওয়ার্কিং করতে 

১৭। বাঙালির সামনে ইংরিজিতে কথা বলতে (অবাঙালির সামনেও আমি এমন কিছু ভালো ইংরিজি বলি না, কিন্তু বাঙালির সামনে বলতে গেলে একেবারে ইজ/আর হ্যাজ/হ্যাড গুলিয়ে একশা হয়। ভগবানই জানেন কেন।)


১৯। ডনবৈঠক দিতে

২০। মেজাজ ঠাণ্ডা রেখে তর্ক করতে

২১। মতের মিল না হওয়া মানেই যে মনের অমিল হওয়া নয় এটা বূঝতে

২২। খাবার থালায় ফেলে রেখে উঠে পড়তে। সে পেট যতই ফাটোফাটো হোক না কেন। (মায়ের কথাটা মনে রাখতে, “সোনা,  নিজের পেটটা ডাস্টবিন নয়”)

২৩। গালফোলা ও গম্ভীর শিশুদের দেখে অট্টহাস্য চেপে রাখতে

২৪। সুইমিং কস্টিউম পরার ভয় জয় করে নিয়মিত সাঁতার কাটা শুরু করতে  

২৫। একটা রুমাল সাতদিনের পর আটদিন না যেতে যেতে হারিয়ে না ফেলতে

২৬। একটা নোটবুক শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করতে (মনে রাখতে নতুন নোটবুকের নতুন পাতা মানেই নতুন জীবন নয়। সেই আমি যে আমিই থাকি)

২৭। দুধ চিনি ছাড়া কফি খাওয়া অভ্যেস করতে।

২৮। জায়েন্ট নাগরদোলায় চেপে না হেসে থাকতে (ওটা আসলে হাসি নয়, ওটা আসলে ভয়ের চোটে বত্রিশপাটি বেরিয়ে পড়া।)   

২৯। হাঁ-এর পর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জী জুড়তে (প্রতিবার হাঁ বলে থেমে যাওয়ার এক মিলিসেকেন্ড পর আতংক হয়, সামনের লোকটা আমাকে দুর্বিনীত রাক্ষস ভাবছে নির্ঘাত।)

৩০। ‘Overwhelming’ শব্দটা না ঠোক্কর খেয়ে বলতে

৩১। রেস্টোর‍্যান্টে গিয়ে “রেগুলার ওয়াটার, প্লিজ” বলার বদলে “নর্ম্যাল ওয়াটার, প্লিজ” বলা থামাতে (ওয়াটার যে অ্যাবনর্ম্যাল হতে পারে না, সেটা আমি জানি, কিন্তু মনে রাখতে পারি না।)

৩২। বিন্দুসার আর বিম্বিসারকে গুলিয়ে না ফেলতে

৩৩। R.S.V.P. –র পুরো কথাটা যে Répondez s'il vous plait সেটা মনে রাখতে (এবং উচ্চারণ করতে)

৩৪। R.S.V.P.-র আদেশ পালন করতে (এটা একেবারে লজ্জায় মাটিতে নুয়ে পড়ে স্বীকার করছি)


ব্যস। আমার সব অক্ষমতার লজ্জা আমি আপনাদের সামনে উন্মুক্ত করলাম। সে লজ্জা যদি কিছুমাত্র লাঘব করতে চান, তবে আপনার না-শেখা কাজগুলো আমাকে বলুন। যে কাজগুলো আপনি পারেন না, কিন্তু পারতে চান। শেখেননি, কিন্তু শিখতে চান। ভয় পাবেন না, এই ছুতোয় আমি আপনার বয়স ধরে ফেলতে চাইছি না। আপনার য’টা ইচ্ছে, একটা, দুটো, পাঁচটা, দশটা অক্ষমতার কথা আপনি বলুতে পারেন।


এই আমি শুনব বলে বসে রইলাম।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.