February 28, 2015

সাপ্তাহিকী




আলোকচিত্রীঃ Marcello Maiorana


Become like water my friend.
                                                              ---Bruce Lee


একই জামার রং আমি দেখলাম সাদা-সোনালী, অর্চিষ্মান দেখল নীল-কালো। কিন্তু কেন?

হয়তো এমন একটা সময় আসবে যেদিন 'নর্মাল’-এর বদলে আমরাই হব প্রান্তিক। স্পেকট্রামের মধ্যমণি হয়ে থাকবে আরও অনেক রকম মানুষ। সে সময়ের জন্য নিজেকে মনে মনে প্রস্তুত করতে সুতীর্থর পাঠানো লিংকে ক্লিক করুন।


নস্যির বদলে চকোলেট। আইডিয়াটা মন্দ না।


এ’রকম হল আমার শহরে থাকলে আমি প্রতি সপ্তাহে একটা করে সিনেমা দেখতে যেতাম।

এ সপ্তাহের গান। ব্রেকফাস্টের জন্য মন আকুল হয়েছে বুঝতেই পারছেন।


February 27, 2015

বাতিক



এই পোস্টের কমেন্টে ক্যাডবেরি কেমন করে খাওয়া হবে নিয়ে লোকজনের আলোচনা পড়ে অনেকদিন আগে লেখা অবান্তরের একটা পোস্টের কথা মনে পড়ে গেল। সেই একই বিষয় নিয়ে আবার যে একটা পোস্ট লিখছি তার গৌণ কারণ হচ্ছে সেই পোস্টটা খুঁজে বার করতে ইচ্ছে করছে না। মুখ্য কারণ হচ্ছে বিষয়টা আমার প্রিয়মুখ্যতর কারণও আছে একটা, পরে বলছি

আমাদের ছোটবেলায় শুনেছি পৃথিবীতে ছত্রিশ রকম পাগল ছিল। এখন পাগলের ডাক্তারই আছে অন্তত ছত্রিশ রকম (সাইকায়াট্রিস্ট, চাইল্ড সাইকায়াট্রিস্ট, অ্যাডোলেসেন্ট সাইকায়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্ট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, স্কুল সাইকোলজিস্ট, থেরাপিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি থেরাপিস্ট, মেন্টাল হেলথ কাউন্সেলর, লাইসেন্সড প্রফেশনাল কাউন্সেলর, সার্টিফায়েড প্রফেশনাল কাউন্সেলর, সার্টিফায়েড অ্যালকোহল অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাবিউস কাউন্সেলর, প্যাস্টোরাল কাউন্সেলর, নার্স সাইকোথেরাপিস্ট, সাইকিয়াট্রিক নার্স, পিয়ার স্পেশালিস্ট, ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং আদার্স), পাগলের রকম নির্ঘাত বেড়ে ছত্রিশ কোটি হয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই সেই ছত্রিশ কোটির কোনও কোনও এক রকমের মধ্যে পড়ি।

তা বলে আমাদের সবাইকে ডাক্তারের কাছে যেতে হয় না। আমাদের সবাইকে দেখে পাগল বলে মনেও হয় না। আমরা যে যার নিজস্ব পাগলামি চমৎকার ভাবে রাখাঢাকা দিয়ে স্কুলকলেজ অফিসকাছারি করে বেড়াই। তা বলে কি আমরা পাগল নই? এ টি এম-এর লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সামনের প্রায় প্রতিটি লোক এক মানুষ সমান উঁচু অক্ষরে ‘পুল’ লেখা দরজা অম্লানবদনে পুশ করে ঢুকছে দেখে আমাদের মাথার ভেতর যে ধরণের উত্তেজনা ও হিংস্র অনুভূতির উদ্রেক হয় সেগুলো বাইরে থেকে দেখা গেলে লোকে আমাদের শুধু পাগলই বলত না, উল্টোদিক থেকে আসতে দেখলে ভয়ে রাস্তা পাল্টাত।

এ রকম পাগলামি আমাদের সবার থাকে। আমার পুশ পুল নিয়ে আছে, আমার এক বন্ধুর টয়লেট পেপারের প্যাঁচ নিয়ে ছিল। টয়লেট পেপার কোনদিক দিয়ে ঘুরবে, ক্লকওয়াইজ না অ্যান্টিক্লকওয়াইজ, সেটা নিয়ে তার মতো মাথা ঘামাতে আমি আর দ্বিতীয় কোনও মানুষকে দেখিনি। অনেক মাথা ঘামিয়ে সে অবশেষে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। (সিদ্ধান্তটা আমি ভুলে গেছি কারণ পেপার যে দিক দিয়েই ঘুরুক না কেন আমার কিছু এসে যায় না। কিন্তু পুশ লেখা দরজা পুল করে যারা ঢোকে তাদের সম্পর্কে আমার অত্যন্ত কড়া একটা সিদ্ধান্ত আছে, সেটা এখানে বলছি না) এক শুক্রবারের সন্ধ্যেয় সে বেচারা ভালো মনে আমাদের বলতে গেছে যে কেন ব্যাপারটা ক্লকওয়াইজ কিংবা অ্যান্টিক্লকওয়াইজ হওয়া উচিত, তা সেটা তো মন দিয়ে কেউ শুনলই না উল্টে হ্যা হ্যা করে হাসল। একজন যুক্তিবাদী আবার জানতে চাইলেন যে যদি তিনি নিয়ম না মেনে উল্টোদিক দিয়ে ঘোরান তাহলে কী এমন অনাসৃষ্টি হবে? বলাই বাহুল্য আমার বন্ধুর কাছে এ প্রশ্নের কোনও উত্তর ছিল না, সে মুখ চুন করে বসে রইল, আমাদের যুক্তিবাদী দাদা যুক্তিবাদী সাপোর্টার জোগাড়ের লক্ষ্যে ছক্কা হাঁকানোর মতো মুখ করে এদিকওদিক তাকাতে লাগলেন।

এ ধরণের বাতিক, যেগুলো ধ্রুপদী পাগলামির মর্যাদা পায়নি, কিন্তু “এ রকম না হয়ে ও রকম হলে কী হবে?” বোরিং বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসার উত্তর যাদের কাছে নেই, তাদের প্রতি আমার দুর্বলতা জন্মগত। আমার ঠাকুমার সেই “মিলাইয়ারে মেলে” ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্যি প্রমাণিত করে আমার চারপাশে আমি সবসময়েই কিছু না কিছু এ ধরণের বাতিকগ্রস্ত লোককে পেয়েছিতাদের মধ্যে টয়লেট পেপারের দিক ঠিক করে দেওয়ার নিরীহ বাতিকওয়ালাও যেমন আছে, আইসক্রিম খেয়ে ফেলার পর বাসে চড়ে যে দোকানে থেকে আইসক্রিম কেনা হয়েছে সে দোকানের ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে আইসক্রিমের মোড়ক ফেলতে গেছে এমন বাতিকওয়ালাও আছে। আবার এমনও লোককে দেখেছি সময়ভেদে যার বাতিক বাড়ে কমে। সেমেস্টারের শুরুতে যে জোড় সংখ্যায় খাবার চিবিয়েই ক্ষান্ত দেয় কিন্তু সেমেস্টারের শেষে লাইব্রেরি থেকে বাড়ি ফেরার দশ মিনিটের রাস্তা পেরোতে যার চল্লিশ মিনিট লাগে। কারণ তার মনে হয় প্রত্যেকবার ডানদিকে মোড় না ঘুরলে তার পরীক্ষা খারাপ হতে বাধ্য।

এতরকম বাতিক এত কাছ দেখেছি বলেই বোধহয় আমার বাতিকদৃষ্টি প্রখর। মানে যখন সকলে দেখছে কর্পোরেটের স্মার্ট কর্পোরেটের বাবু হাতে ব্রিফকেস নিয়ে মাথা উঁচু করে গটগটিয়ে হাঁটছেন, আমি দেখছি বাবুর প্রতিটি পদক্ষেপ পড়বি তো পড় মেট্রো স্টেশনের এক একটা চৌকো টালির ভেতরেই পড়ছে। আর পড়ছে এতই স্বাভাবিকভাবে যাতে এই পড়ানোটা যে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সে সম্পর্কে সন্দেহের কোনও জায়গাই থাকছে না  

আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে এ রকম একটা হঠাৎ চোখে পড়া বাতিকের কথা আমার এখনও মনে আছে। ঘটনাটা যে সময়ের সেই সময়টার কথা আমার কিন্তু বিশেষ মনে নেই। অনেক সময় কেটে গেছে বলে নয়। ওর থেকে পুরোনো অনেক কথা আমার দিব্যি স্পষ্ট মনে আছে। ওই সময়টার কপালেই এমন বিস্মৃতির অভিশাপ কেন সেটা ভাবতে গিয়ে মনে হচ্ছে আসলে ওই সময় আমার মনে এত রকম অনুভূতি, মগজে এত রকম চিন্তা, হাতে এত রকমের কাজ ছিল যে সে সব কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে একটা মণ্ডে পরিণত হয়েছে, এত দূর থেকে তাকিয়ে কুয়াশা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না।

এই কুয়াশার মধ্যে আশ্চর্য রকম স্পষ্ট সেই অল্পবয়সী ওয়েটার ছেলেটির মুখটা। ঝুঁকে দাঁড়ানোর সেই বিনীত ভঙ্গি।

অচিরেই বোঝা গেল ছেলেটি দেখতে যত, কাজে তত বিনয়ী নয়। অন্তত আমার সঙ্গীর মতে। সঙ্গীর মত নির্মম হতে পারে কিন্তু একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়। ছেলেটি সত্যিই অদ্ভুত। দোকানটার নাম, বা দোকানটা কোন দেশী খাবারের ছিল সেটা আমার মনে নেই, কিন্তু সেটা যে বেশ মহার্ঘ ছিল সেটা মনে আছে। যে রকম দোকানে পরিবেশকরা খাবার প্লেটে বেড়ে দেয়। ছেলেটিও দিচ্ছিল। তাতে আমাদের কোনও অসুবিধে ছিল না। অসুবিধে যেটা হচ্ছিল সেটা এই যে ছেলেটা খাবার দিয়েই যাচ্ছিল, থামতে বললেও থামছিল না।

বাড়িতে-মামাবাড়িতে এ ধরণের চেপে ধরে খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা আমাদের সকলেরই আছে, কিন্তু রেস্টোর‍্যান্টে এ ব্যবহার পেলে হাঁসফাঁসের থেকে বিরক্তিটাই বেশি হয়। প্রথম পদ পরিবেশনের সময় আমারও হয়েছিল। দ্বিতীয় পদ পরিবেশনের সময় একটা হালকা সন্দেহ হল। তিন নম্বর বার আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম।

ছেলেটির তিনের বাতিক আছে।

অর্থাৎ ছেলেটি তিন হাতার কম খাবার পরিবেশন করতে পারে না। আমি আমার সঙ্গীকে ব্যাপারটা বললাম। আমার যুক্তিবাদী, বাতিকবিহীন সঙ্গী নরম হলেন না। আমরা বিল মিটিয়ে টেবিলে টিপ রেখে বেরিয়ে এলাম। ছেলেটি দরজা ধরে দাঁড়িয়েছিল, আমরা বেরোনোর সময় নিচু গলায় বলল, “থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।”

এবার আমার এই বিষয় নিয়ে আবারও পোস্টটা লেখার মুখ্যতর কারণটা বলি। বাতিক নিয়ে লেখা অবান্তরের পুরোনো পোস্টটার সবথেকে বেশি যে জিনিসটার কথা আমার মনে আছে সেটা হচ্ছে পোস্টের কমেন্টগুলো। সেখানে সবাই এসে নিজের নিজের ছোটখাট পাগলামি বা বাতিকের গল্প শুনিয়েছিলেন। সে সব গল্প পড়তে আমার কী রকমের ভালো লেগেছিল সেটা আমার এখনও মনে আছে। আশা করি তেমন আরও অনেক গল্প এই পোস্টের নিচেও জমা হবে।

       

February 26, 2015

পুনর্ব্যাচেলর ভব



আর যার বিরুদ্ধেই ডিসক্রিমিনেশনের অভিযোগ আনা যাক না কেন, ডিকশনারির বিরুদ্ধে আনা যাবে না কিছুতেইআমরা যাতে হিংসে না করি, আমাদের মনে যাতে কষ্ট না হয় সে জন্য সব শব্দের জন্যই আমাদের জন্য সে একটা প্রতিশব্দ বরাদ্দ করে রেখেছে। লেখকের জন্য লেখিকা, গায়কের জন্য গায়িকা, ঔপন্যাসিকের জন্য ঔপন্যাসিকা, নায়কের জন্য নায়িকা কিন্তু তা সত্ত্বেও কারও কারও মন উঠছে না, তারা “না না না, অন্য শব্দ চাই না, ওই ওর যেটা আছে সেটাই আমার চাই” গোঁ ধরে পা ঠুকছে আর টেনে ঝুঁটির রাবারব্যান্ড খুলে ফেলছে 

সেই সব নেমকহারামদের মধ্যে আমি একজন। আমি মনে করি শব্দ আলাদা হলে শব্দের মানেও আলাদা হতে বাধ্যকাজ যতই এক ও অবিকল হোক না কেন। কোনও কোনও সময় তো সে মানে এমন বদলে যায় যে বানানের মিল ছাড়া তাদের মধ্যে কোনও মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে

যেমন ধরুন ব্যাচেলর শব্দটা।

ব্যাচেলর বললেই মনের মধ্যে কেমন একটা সুন্দর ছবি ভেসে ওঠে, বেপরোয়া বুনো ঘোড়ার মতো একটা মানুষ পৃথিবীর পথ দিয়ে টগবগিয়ে ছুটে চলেছে, সোনালি কেশরের মতো হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল, লাউডস্পিকারে মহম্মদ রফি গলা খুলে গাইছেন, “ম্যায় জিন্দেগি কা সাথ নিভাতা চলা গয়া/ হর ফিক্‌র্‌ কো ধুঁয়া মে উড়াতা চলা গয়া”। রাস্তার দুপাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘটক, পাত্রীর বাবা, বিবাহিত বান্ধবীর দলতারা হাতে ল্যাসো নিয়ে মাথার ওপর সাঁই সাঁই ঘোরাচ্ছে, ছুঁড়ে দিচ্ছে ঘোড়ার মাথা লক্ষ্য করে, কিন্তু ফসকে যাচ্ছে বারবার। পরাজিত বেতো ঘোড়ারাও মজা দেখতে এসেছে। স্বেচ্ছায় এসেছে না কি ল্যাসোধারী গৃহিণীদের রক্তচক্ষুর শাসানি অস্বীকার করতে পারেনি বলে এসেছে সেটা তর্কের বিষয়। রাস্তার পাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে ল্যাসোছুঁড়িয়েদের দিকেই তাদের সমর্থন, যতবার ল্যাসো ফসকাচ্ছে ততবার মুখে “হায় হায়” ধ্বনি তুলছে কিন্তু মনে মনে দেখুন গিয়ে বলছে, “সাবাস বেটা, চালিয়ে যা। আমার মতো এদের হাতে ধরা পড়িসনি, পড়িসনি, পড়িসনি

উল্টো ছবিটা মনে করে দেখুন।

আইবুড়ো মেয়ে, ভাগ্যিস মা চেপে ধরে সেলাইটা শিখিয়েছিলেন তাতে করে দু’বেলা অন্নসংস্থান চলছে অবশ্য চলছে মানে চলছেই, চপ্পলের স্ট্র্যাপটা ছিঁড়ে গেছে কতদিন, সেটা সারানোর জন্য আর বাঁচছে না কিছুই। টিউশনি সেরে ফেরার সময় এঁদোগলির কোনও বাড়ির ভাঙা রেডিওর এফ এম থেকে হিংস্র দেবতার অভিশাপের মতো ভেসে আসছে সেই হাত পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে দেওয়া হুমকি, “কেমন হবে আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?”    

শব্দের দোষ নয়, দোষ আমার দেখার? হতে পারে।

এই তো গেল দিশি ব্যাচেলরেটদের ছিরি, বিদেশী ব্যাচেলরেট বললেই আমার মাথায় যে ছবিটা ভেসে ওঠে সেটা আরও চমৎকার। ‘ব্যাচেলর’ নামক রিয়্যালিটি শো-এর বাঁধভাঙা সাফল্যের পরের সিজনেই ‘ব্যাচেলরেট’বেসিক্যালি, স্বয়ংবরসভা। বেদপুরাণের যুগেও যে নারীস্বাধীনতা ছিল তার মোক্ষম প্রমাণ। তা সেই সভায় পাণিপ্রার্থী হয়ে যাঁরা আসেন তাঁদের দেখলে, সত্যি বলছি, আমি মালাটালা ফেলে উল্টোদিকে দৌড়তাম। ওই স্বয়ংবরসভার নায়িকা হওয়ার থেকে ছেঁড়াচপ্পল পরিহিতা সেলাইদিদিমণি হওয়া একশোগুণ ভালো।

আঙুর ফল টক? হতে পারে।

সে যাই হোক, আমি কেন ব্যাচেলর শব্দটার জন্যই বায়না ধরি আর ব্যাচেলরেট শব্দটার সঙ্গে কোনওরকম সম্পর্ক স্বীকার করতে চাই না সেটা নিশ্চয় আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। বিশেষ করে আমার জীবনের একটা বেশ বড় অংশ আমি যখন সেই ব্যাচেলর অবস্থায় কাটিয়েছি। এবং এখনও মাঝে মাঝে কাটাই, যখন “এই একটু আসছি” বলে হাতে সুটকেস ঝুলিয়ে অর্চিষ্মান চম্পট দেয়। পাঁচ, সাত, পনেরোদিনের জন্য।

একদিক থেকে দেখলে এই অধুনা ব্যাচেলরত্বটা আমার আগেকার ব্যাচেলরত্বের থেকে ভালো। যখনতখন এদিকসেদিক থেকে ল্যাসো এসে গলায় পড়ার হুমকি নেই, ঝাড়া হাত পা হয়ে থাকার নিশ্চিন্তিটুকু আছে। সেট্‌ল্‌ করার ডেডলাইন পেরিয়ে যাওয়ার আতংক নেই, ভিট্রুভিয়ান ম্যানের ভঙ্গিতে একটা খাট একাই দখল করে শোওয়ার আরাম আছে।

আশ্চর্যের ব্যাপারটা হচ্ছে সেই একলা জীবনের সবটাই যে যে এই দোকলা জীবনটার থেকে ভালো ছিল তা তো নয়, (ঠিক যেমন এই দোকলা জীবনটারও সবকিছু সেই একলা জীবনটার থেকে ভালো নয়) তবু আমি ভয়ানক উৎসাহের সঙ্গে এই ক’দিনের জন্য সেই জীবনটায় ফিরে যাই।  সেই আগের মতো নিজে নিজের মনে থাকি, ন্যূনতম দরকারের বাইরে সমস্ত রকম মনুষ্যসংসর্গ পরিহার করে চলি, দেদার ম্যাগি আর বেগুন খাই। বেছেবেছে সেই সব গানগুলো শুনি যেগুলো আমি সেই আমার সত্যিকারের ব্যাচেলর থাকার দিনগুলোতে লুপে চালিয়ে শুনতাম।

আজ আমার এই খেপের পুনর্ব্যাচেলরত্বের শেষ রাত্তির। আজ ডিনারে নিশ্চিত ম্যাগি। পিৎজা হাটের ডেলিভারির সঙ্গে আসা চিলি ফ্লেকস ছড়ানো। তারপর খালি আমি আর ইন্টারনেট, ইন্টারনেট আর আমি। যতক্ষণ না ক্লান্তিতে দু’চোখ বুজে আসে, ল্যাপটপের তলায় বুকের পাঁজরগুলো কনকন করে ওঠে। তখন তাকে খাটে নামিয়ে, জোয়ান হিকসনের গলায় 'আ মার্ডার ইস অ্যানাউন্সড' অডিওবুক চালিয়ে উল্টোদিক ফিরে ঘুম।

ঘণ্টা পাঁচেক পর যখন মিস মার্পল সবাইকে বুঝিয়ে দেবেন কী করে যুক্তি আর অভিজ্ঞতার সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে তিনি খুনীকে ধরে ফেললেন, গল্প ফুরোবে, তখন নৈঃশব্দের ভারে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাবে আমার। ল্যাপটপ, চশমা, ফোন, চার্জার, বই, খাতা, পেন, চুলের ব্যান্ড, মাউস, চায়ের কাপে ছত্রাকার ব্যাচেলর বিছানায় ধড়মড় করে উঠে বসব। নিদ্রা আর জাগরণের মাঝের শূন্যতাটা পেরিয়ে আসতে দু’সেকেন্ড যা দেরি, তারপরেই হুড়মুড়িয়ে মনে পড়ে যাবে। আজ সাতাশ! ফোনটা চোখের কাছে এনে সময় দেখব, আর মাত্র ক’ঘণ্টা!

চোখ কচলে বিছানা ছাড়ব। বাথরুম থেকে ফিরে বিছানাটাকে পরিষ্কার করে ঝেড়ে মুছে, আবার ভদ্রলোকের মতো চেহারায় ফিরিয়ে আনব। সিংকে জমা বাসনক’টা ধোয়ামোছা হয়ে শুকোতে যাবে, ও ঘরের বিছানায় জড়ামড়ি করে পড়ে থাকা সুগন্ধী সাবানের গন্ধ মাখা জামাকাপড়েরা বাধ্য শিশুর মতো হাত পা গুটিয়ে কাবার্ডের নির্দিষ্ট খোপে ঢুকে যাবে। ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা গত ক’দিনের খবরের কাগজেরা চলে যাবে বিক্রির ঝুড়িতে। ল্যাপটপে বেজে উঠবে আমার আজকের জীবনটার সঙ্গে মানানসই সংসারী, বিচক্ষণ গান। মৃদু আওয়াজে যাতে দরজার বাড়াবাড়ি রকম আস্তে টোকাটা আমি মিস না করে যাই।

সে টোকা শুনে লাফ মেরে গিয়ে দরজা খুলব যখন তখন আমার ঘরে, মেঝেতে, জানালায়, জানালার পর্দায়, টেবিলের ওপর পাটপাট করে রাখা খাতাবইয়ের খাঁজে, কোথাও আমার ব্যাচেলর জীবনটার তিলমাত্র ছায়াও আর লেগে থাকবে না। ম্যাজিকের মতো নিজের সমস্ত চিহ্ন মুছে নিয়ে আমার মগজের অসংখ্য খুপরির একটায় লুকিয়ে পড়বে সে। বালিশবিছানা পেতে আরামে শীতঘুম লাগাবে। ততক্ষণ ঘুমোবে যতক্ষণ না আবার একদিন সকালে অর্চিষ্মান ভাগলবা হচ্ছে, আর একা বাড়িতে দমবন্ধ হয়ে আমি আবার তাকে ডাক পাঠাচ্ছি।

       

February 24, 2015

Which kind are you?






বাঁ দিক। ক্রাস্ট ফেলে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পিৎজার ওই অংশটাই আমার সবথেকে ভালো লাগে। তবে আজকাল এক রকম পিৎজার বিজ্ঞাপন দেখায় টিভিতে যেটাতে ক্রাস্টের ভেতরেও চিজ পোরা থাকে। কামড় দিলে ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়ায়। ওই রকম পিৎজা হলে অবশ্যই ডান দিক।

ডান দিক। আমি সর্বদা দাম দেখে খাবার অর্ডার করি। নিজে দাম দিলেও, অন্যে দাম দিলে তো বটেই।

ডান দিক। মাস্টার্ড। যত ঝাঁঝালো তত ভালো।

বাঁ দিক। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর টমেটো কেচাপ ততক্ষণ একে অপরের থেকে সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখবে যতক্ষণ না আমি তাদের এক করে মুখে পুরছি। ইন ফ্যাক্ট, আমার সামনে বসে কেউ ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের ওপর টমেটো কেচাপ ছড়িয়ে মাখামাখি করে খেলে আমি আর বিশেষ কিছু খেতে পারব কি না সন্দেহ।

বাঁ দিক। কোকা কোলা ভালো, কোক জিরো আরও ভালো, ডায়েট কোকা কোলা অত ভালো না। তবে পেপসির তুলনায় সবকটাই ঢের ভালো।  

দু’দিকই। বাইরে খেলে কাঁটাচামচ দিয়ে খাই, বাড়িতে নিজের লোকজনদের সঙ্গে বসে খেলে হাত চালাই।

বাঁ দিক। যারা ও রকম খামচে খামচে ক্যাডবেরি খায় আমি তাদের সহ্য করতে পারি না। মনে হয় ডেকে বলি, “আসুন, আপনাকে ক্যাডবেরি কী করে খেতে হয় শিখিয়ে দিই।”

ডান দিক। নো চিজ প্লিজ।

এই ছবিটা আমি বিশেষ বুঝিনি, কিন্তু যদ্দূর মনে হচ্ছে ডানদিকেরটা মদের বোতল আর বাঁ দিকেরটা জলের বোতল। তাই যদি হয় তবে আমি বাঁ দিক। মদ অত্যন্ত খারাপ খেতে, পেপসির থেকেও খারাপ।

বাঁ দিক। আমি চেরিটা আগে খেয়ে কেকটা পরে খাই। অনেক সময় হাতের কাছে সুবিধেজনক লোক পাওয়া গেলে আর সে যদি হাঁদার মতো কেকের প্লেট হাতে নিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে তার ভাগের চেরিটাও টপ করে খেয়ে নিই। তারপর ধীরেসুস্থে নিজের ভাগের কেকটায় মন বসাই।

বাঁ দিক। রণে বনে জলে জঙ্গলে প্রেমে যুদ্ধে খেলায় ভালোবাসায় সকালে বিকেলে দুপুরে মাঝরাত্তিরে . . .চা আমার চাই।

পরিস্থিতিভেদে দু’দিকই। বাংলায় বললে টমেটো বলি, ইংরিজিতে বললে টোম্যাটো।


*****


আপনি কোন দিকের লোক



February 23, 2015

থাম্বস আপ



নিজের মনকে চোখ ঠারিয়ে লাভ নেই। বুঝে গেছি মানবসম্পর্কের জটিল টানাপোড়েনের অকূল পাথারে সাঁতরানোর দম আমার আর নেই, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের চতুর রিক্যাপ মগজস্থ হওয়ার বুদ্ধিও না। এখন আমাকে বইয়ের পাতার ওপর টেনে রাখতে পারে একমাত্র খুনজখম রক্তারক্তি।

তাই যখন খবর পেলাম দেশ পত্রিকায় গজপতি নিবাস রহস্য ধারাবাহিক ভাবে বেরোতে শুরু করছে, আমি দেখলাম এই সুযোগ। এক ঢিলে একাধিক পাখি মারার। বাংলা উপন্যাস পড়ার আর তার সঙ্গে দেশ পত্রিকা পড়ার অভ্যেসটাকেও ঝালিয়ে নেওয়ার। মনে মনে শপথ নিলাম সুখেদুঃখে, ভালোয়মন্দেয়, খুনজখম কিডন্যাপিং-এ আমি গজপতি নিবাসের সঙ্গে থাকব, একটি সংখ্যাও মিস করব না।

বাজারে একটা কাগজের দোকান থেকে নিয়মিত দেশ কিনে পড়া শুরু করলাম। দোকান বলাটা অবশ্য বাড়াবাড়ি। বাজারের সীমানানির্ধারক চওড়া সিমেন্টের পাঁচিলের গায়ে লাগানো তক্তার টেবিল, তার ওপর সারি সারি কাগজ ম্যাগাজিন। টেবিলের চারদিকে চারটে বাঁশ গোঁজা। বছরের পাঁচ সন্ধ্যেয় বৃষ্টি হলে যাতে তার ওপর নীল প্লাস্টিকের ছাউনি টাঙানো যায়। বাঙালি পাড়া, কাজেই বাংলা পত্রপত্রিকার ভাগই বেশি। যদিও টেবিলের পাশে যে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে থাকেন তাঁর খাড়া নাক আর নাকের নিচে মেহেন্দি করা ঝুপো গোঁফ দেখে অবাঙালি বলেই আমি সন্দেহ করেছিলাম।

একদিন দোকানে গিয়ে কিছু একটা কিনলেই সন্দেহের নিরসন হয়ে যেত, কিন্তু আমি যাইনি কখনও। কেন যাইনি তার পেছনে একটা কারণ আছে, কারণের পেছনে আছে একটা ঘটনা, আর ঘটনার পেছনে একটা তাত্ত্বিক ‘এফেক্ট’। সে তত্ত্বটার সঙ্গে আমার আলাপ ইকনমিক্সের বইতে, তবু সেটাকে ফস করে ইকনমিক তত্ত্ব বলে বসতে ভরসা হচ্ছে না। সকলেই জানে ইকনমিক্স বিষয়টাই তৈরি হয়েছে এদিকওদিক থেকে চুরিচামারি করে।

যাই হোক, উৎস নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই, বরং এফেক্টটার কথায় আসা যাক। এফেক্টটার নাম র‍্যাচেট এফেক্ট। উইকিপিডিয়া বলছে, A ratchet effect is an instance of the restrained ability of human processes to be reversed once a specific thing has happened.

উদাহরণ দিলে হয়তো ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হবে। আমার দ্বারা অর্থনৈতিক উদাহরণ দেওয়াই সম্ভব, কাজেই তাই দিচ্ছি। ধরুন আমাদের উদাহরণে ইনডিভিজুয়্যাল হচ্ছেন একজন ছাপোষা মধ্যবিত্ত লোক। বাসেট্রামে চেপে অফিস যান, ঠ্যালাগাড়ি থেকে গরমকালে পটল আর শীতকালে ফুলকপি কিনে খান, খুব যে কষ্টে আছেন তা মনে হয় না। এমন সময় হঠাৎ ছন্দপতন। ইকনমির চাকা বাঁইবাঁই করতে ঘুরতে শুরু করল, ভদ্রলোকের মাইনেটাইনে বেড়ে একাকার কাণ্ড হল। মাইনে বাড়ল অথচ খরচ বাড়ল না, এ জিনিস ইকনমিক্সের বইতে ঘটে না অতএব বাস্তব জীবনেও সে রকম ঘটার কোনও কারণ নেই। ভদ্রলোক বাস ছেড়ে অল্টো ধরলেন, বাজারে গিয়ে এবার সে দোকানে ঢুকলেন যেটায় এতদিন ঢোকার তো দূরের কথা, তাকিয়ে দেখারই সাহস হয়নি। ওই যে সব দোকানের দরজায় একটা পাহারাদার দাঁড়িয়ে থাকে আর ভেতরে শেলফে সারিসারি জিনিস সাজানো থাকে, নিজে নিজে সেগুলো তুলে একটা চাকাওয়ালা গাড়িতে নিয়ে ঠেলে ঠেলে ঘোরা যায়।

টাকার গরমে তাঁর ভয় কেটে গেল, তিনি গটগটিয়ে গিয়ে দোকানে ঢুকে চাকাওয়ালা গাড়ি নিয়ে ঘুরতে শুরু করলেন। প্যাকেটে মোড়া টমেটো, প্যাকেটে মোড়া ধনে পাতা। দাম বেশি, তা তো হবেই, প্যাকেটের দামটাও ধার্য আছে যে। দামটা তাঁর গায়ে লাগল না, খালি দরাদরি যে করা যায় না এইটা পাঁজরে মাঝে মাঝে খোঁচা দিতে লাগল। করা যে যাবে না সেটা দোকানের কোথাও লেখা নেই, কিন্তু ভদ্রলোকের সাহস হল না। অত বড়লোক তিনি এখনও হননি। মনটা দমে গেল। পরক্ষণেই কাঁচের দরজার বাইরে দাঁড়ানো ঠ্যালাগাড়ির সামনের একটা লোকের দিকে তাঁর চোখ পড়ল। কাঠামোটা অবিকল তাঁরই, খালি খোলসটা ম্লান, আর মধ্যবিত্ততার সংকোচে কাঁধদুটো খানিকটা ঝোঁকা। প্যাকেটহীন আলু কুমড়ো টিপে টিপে দেখছে। আমাদের ভদ্রলোকের ছাতি নিমেষে দু’সেন্টিমিটার চওড়া হয়ে গেল। উনি যে ওই লোকটার থেকে বড়লোক সেই ফিলিংটাও তো অমূল্য নয়। সেটার জন্য দরাদরির সত্ব তিনি ছাড়তে রাজি আছেন।

তারপর যা হওয়ার হল। ইকনমির চাকা ধীর হল। মুদ্রাস্ফীতির গ্রাফ সাঁইসাঁই চড়তে শুরু করল, মাইনের গ্রাফ আটকে রইল যে কে সই। আমাদের ভদ্রলোককে বাধ্য হয়ে মাসের শেষে মাঝে মাঝে অল্টো ছেড়ে অটো নিতে হল, কিন্তু গাড়িটা তিনি যত সহজে কিনেছিলেন, তত সহজে প্রাণে ধরে বেচে দিতে পারলেন না। যত সহজে ঠ্যালাগাড়ি ছেড়ে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে গিয়েছিলেন, তত সহজে বেরিয়ে আসতে পারলেন না। কাঁধটাই যা শুধু আগের মতো টানটান রইল না, একটু ঝুঁকে গেল।

আজ থেকে ক’বছর আগে আমার অবস্থাটাও ছিল অনেকটা ওই হঠাৎ বড়লোক হওয়া ভদ্রলোকের মতো। এ দেশে জন্মে, বড় হয়ে, এ দেশের চালডাল খেয়ে বড় হয়ে, এ দেশের চালচলনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা থেকেও মাত্র ক’দিনের জন্য বড়লোক দেশে ঘুরতে গিয়ে আমার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। ক’বছর বাদে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে এলাম, কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। দোকানবাজার করতে গিয়ে অকারণ হেসে কথা বলি, কথোপকথনের শেষে থ্যাংক ইউ, প্লিজ-এর ময়ূরপুচ্ছ জুড়ে দিই। সামনের লোক মনে মনে ভাবে, যত্ত সব দেখানেপনা।

সব ক্ষতির কথা এখন না পেড়ে বসলেও চলবে, আজকের গল্পের জন্য যে ক্ষতিটা প্রাসঙ্গিক সেটা বইয়ের দোকানসংক্রান্ত। বড়লোক দেশের বিরাট বইয়ের দোকান বিরাট দোতলার বিরাট সোফায় বসে যত খুশি বই পড় কেউ কিছু বলতে আসে না। প্রথম দিকে একটু ভয় ভয় করলেও দ্রুত সেটা কেটে গিয়েছিল, আমি ওই সোফায় বসে হ্যারি পটারের চার, পাঁচ, ছয় ও সাত নম্বর বই গোগ্রাসে গিলে ফেলেছিলাম। কেউ ফিরেও তাকায়নি। 

ব্যস, আমার অভ্যেস খারাপ হয়ে গেল। ক’বছর বাদে অভ্যেসের বশে বাজারে ঘুরতে ঘুরতে একটা বইয়ের দোকান দেখে দাঁড়ালাম। গরিব দেশের গরিব দোকান। দোকান বলাটা অবশ্য বাড়াবাড়ি। চারদিকে মুদির দোকান আর মোবাইল ফোনের দোকানে ঘেরা চত্বরের মাঝখানে একটা তক্তার টেবিল, তার ওপর সারি সারি কাগজ ম্যাগাজিন। টেবিলের চারদিকে চারটে বাঁশ গোঁজা। বছরের পাঁচ সন্ধ্যেয় বৃষ্টি হলে যাতে তার ওপর নীল প্লাস্টিকের ছাউনি টাঙানো যায়। বাঙালি পাড়া, কাজেই বাংলা পত্রপত্রিকার ভাগই বেশি।

পুজোবার্ষিকীর ঋতু ছিল, চকচকে নতুন বইগুলো দেখে আমি লোভ সামলাতে পারলাম না। এগিয়ে গিয়ে আনন্দমেলার প্রথম পাতাটা উল্টে দেখলাম। সূচিপত্রটুকুই। তার বেশি সময় ছিল না, ইচ্ছেও না। বড় জোর আধ মিনিট দাঁড়িয়ে সূচিপত্রটায় চোখ বুলিয়ে এগিয়ে আসছি এমন সময় পরিষ্কার বাংলায় পেছন থেকে শুনতে পেলাম, “এরা শুধু দেখবে, কিনবে না।” সঙ্গে একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি। হাসি এবং কথা দুটোই দোকানে দাঁড়ানো কোনও একজন শ্রোতার উদ্দেশ্যে বলা, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য আমাকে শোনানো।

মনে হল কথাগুলো আর হাসিটা আমার পিঠে এসে বিঁধে গেলযেন লোহার শিক আগুনে পুড়িয়ে কেউ আমার পিঠে লিখে দিল, “এ শুধু দেখে, কেনে না।” সর্বাঙ্গ জ্বালা করে উঠলেও আমি থামলাম না, সোজা হাঁটতে থাকলাম। আর কী-ই বার করার ছিল? আমার জায়গায় ব-দিদি থাকলে ফিরে গিয়ে চেঁচিয়ে বলতে পারত, “আপনি তো আচ্ছা ছ্যাঁচড়া ছোটলোক মশাই, দেখা বারণ তো সেটা লিখে দোকানে টাঙিয়ে রাখলেই পারতেন, দেখতে আসতাম না। আর দেখেছি তো কী হয়েছে, ছিঁড়ে তো দিইনি।” উত্তরে ভদ্রলোক যে কিছু বলতে পারতেন না সেও জানি। নার্ভাস হাসি হেসে প্রাণপণে ব-দিদির সঙ্গে আই কনট্যাক্ট এড়িয়ে যেতেন। পাঁচদশটা লোক জড়ো হত। বেশিরভাগই নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করত, দুয়েকজন মাতব্বর এগিয়ে এসে বলত, “ছেড়ে দিন দিদি, ছেড়ে দিন।” ব-দিদি শ্রবণসীমার বাইরে চলে গেলে বলত, “কী খাণ্ডারনি, মাইরি!” যেটা কেউ বলত না সেটা হচ্ছে, “কী কাওয়ার্ড, মাইরি!” কিন্তু আমি ব-দিদি নই, আমি মনে মনে বিশ্বাস করি খাণ্ডারনি হওয়ার থেকে কাওয়ার্ড হওয়া ঢের ভালো। কাজেই আমি বাক্যব্যয় না করে পিঠটান দিলাম।

এর পর আমি আর কখনও ওই রকম দোকানে যাইনি। দেখতে তো নয়ই, কিনতেও না। র‍্যাচেট এফেক্টের হাতযশ মেনে নিয়ে, যেতে হলে বড় দোকানেই যেতাম, যেখানে সারি সারি সব ইংরিজি বই সাজানো, আইলের আড়ালে দাঁড়িয়ে একটা টেনে নিয়ে পাতা উল্টে দেখলে চট করে চোখে পড়ার সম্ভাবনা কম। তাও আমি ঘড়ির দিকে নজর রাখতাম, কেনাকাটির ইচ্ছে না থাকলে পাঁচ মিনিট হয়ে গেলেই চম্পট দিতাম।

তারপর ওয়ান বেডরুম ফ্ল্যাটে আমাদের আর আঁটল না, আমরা পাড়া বদল করলাম। নতুন পাড়া, নতুন বাজার, নতুন তক্তার টেবিলে নতুন ম্যাগাজিনের দোকান, নতুন দোকানি। খাড়া নাক, গোঁফে মেহেন্দি। বেশ কিছুদিন পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কিছু একটা গোল বাধল, অটো থেকে নেমেই অর্চিষ্মান বলল, “চল চল দেখি বাংলা কাগজে কী লিখেছে।” এই না বলে ওই গুঁফো দোকানির দোকানের দিকে হনহনিয়ে হাঁটা দিল।

আমি আঁতকে উঠে কনুই টেনে ধরে বললাম, “কিনবে কি? তাহলে যাব। যদি না কেন, তাহলে আমি এই এখানেই বসলাম।” বলে আমি এগরোলের দোকানের সামনে তাঁবু ফেলার উপক্রম করলাম।

অর্চিষ্মান আকাশ থেকে পড়ল। “মানে?”

নিজের অপমানের কথা তো যেচে আর কত বলব, সে যতই ঘরের লোক হোক না কেন। এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু অর্চিষ্মানের গোঁ ফ্যামিলিবিদিত। শুনেই ছাড়ল। বলতে গিয়ে ওই অতদিন পরেও জ্বালাটা আবার টের পেলাম। মনে হল ক্ষতের জায়গাটায় আবার কেউ ছুরি বুলোচ্ছে। “এ শুধু দেখে, কেনে না।”

শুনেটুনে অর্চিষ্মান মুখের এমন একটা ভঙ্গি করল যেটার মানে “সিরিয়াসলি?/ পারোও বটে/ বাড়াবাড়ি কোরো না” তিনটের যে কোনও একটা হতে পারে। তারপর আমার হাত ধরে টেনে একেবারে দোকানের সামনে নিয়ে গিয়ে উপস্থিত হল। এই কাগজ ওই ম্যাগাজিন নেড়েচেড়ে দেখল। আমি ভয়ে চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখলাম। পাক্কা পাঁচ মিনিট পর একটা কাগজ বেছে নিয়ে ভদ্রলোকের হাতে দিতে তিনি দাম বললেন। এতক্ষণে আমার সাহস হল চোখ ফেরানোর। টাকা কাগজ দেওয়ানেওয়া হল, আমি ওঁর বদান্যতায় গলে পড়ে “থ্যাংক ইউ” বললাম, তার উত্তরে ভদ্রলোক আমাকে জোড়া থাম্বস আপ দেখালেন।

আমার ভয় কাটতে শুরু করল।

অর্চিষ্মান না থাকতেও তারপর একা একাই ওঁর দোকানে যেতে শুরু করলাম, যদিও না কিনে ফিরিনি কখনও। তার পর গজপতি নিবাস রহস্য ছাপা শুরু হল, ওঁর দোকান থেকেই কিনতাম দেশ। মাসে দুটো। শেষ দিকটায় আমার সাহস এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে কেনার আগে পাতা উল্টে সূচিপত্র দেখে পাতা বার করে ‘আগের সংখ্যায় যা ঘটেছে’টা পড়েও দেখে নিতাম যে মাঝখানে কোনও সংখ্যা বাদ পড়েছে কি না।

সেটা করতে গিয়েই নজরে পড়ল। একটা সংখ্যা শুধু মিসই হয়নি, হবি তো হ সেই সংখ্যাটাই, যেটায় একটা খুন হয়েছে। খুন! মিস! আতংকে আমার মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম হল। যে কোনও উত্তেজনার মুহূর্তে আমার বাংলাটাই গোলমাল হয়ে যায়, হিন্দিইংরিজির কথা তো ছেড়েই দিলাম। আমি বলতে লাগলাম, “মিলেগা? নেহি মিলেগা? কী সাংঘাতিক। মিলনা হি পড়েগা, ভাইসাব, নেহি তো অনর্থ হো যায়েগা।”

পাশেই একজন জেঠু দাঁড়িয়ে ছিলেন, বেশ দয়ালু দেখতে। তিনি বললেন, কী হয়েছে? আমি বললাম, “আরে ধারাবাহিক উপন্যাস মিস হয়ে গেছে, তাও আবার রহস্য উপন্যাস।” তিনি বললেন, “গজপতি নিবাস?” আমি বললাম, “হ্যাঁ হ্যাঁ!”

ঘটনার গুরুত্ব বুঝে তিনিও আমার হয়ে সওয়াল করা শুরু করলেন। তাঁর সওয়াল শুনে আর আমার বাজ-পড়া চেহারাটা দেখে দোকানি ভদ্রলোকের দয়া হল। তিনি মেহেন্দি গোঁফ দু’বার নাচিয়ে বললেন, তিনি আমাকে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য বইখানা ধার দিতে পারেন। অন্য এক পাঠকও নাকি আমার মতোই ভুল করেছেন, কিন্তু আমার আগে সেই ভুল আবিষ্কার করেছেন ও বলে রেখেছেন তাঁর জন্য এক পিস বাঁচিয়ে রাখতে। সেই পাঠকের সঙ্গে তাঁর ডিল “ডান” হয়ে রয়েছে, কাজেই বইখানা তিনি সেই পাঠককেই দেবেন, আমাকে নয়।

আমি একেবারে লাফিয়ে উঠলাম। এক নিঃশ্বাসে থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ বলে যেতে লাগলাম। ভদ্রলোক কান না দিয়ে জানতে চাইলেন,

“চব্বিশ ঘণ্টা বলতে আপনি কত ঘণ্টা বোঝেন?”

“চব্বিশ ঘণ্টাই। সেটা তেইশ ঘণ্টা আঠাশ মিনিট তেত্রিশ সেকেন্ডও হতে পারে।”

(কোন গল্পের ছায়া অবলম্বনে?)

“তব ঠিক হ্যায়। লেকিন সির্ফ এক দিন। যো ডান হ্যায়, ও ডান হ্যায়।”

একটু দূরে দাঁড় করানো একটা স্কুটারের সিট তুলে কুঠুরি থেকে একটা বই বার করে আনলেন ভদ্রলোক। সেই মিসিং দেশ! কোণাদুটো সামান্য দুমড়ে গেছে, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। মলাটের ভেতর খুনটা ঠিক ততখানি টাটকাই আছে যেমন পনেরো দিন আগে ছিল।

আমি বই বগলে বাড়ি চলে এলাম। জামাকাপড় ছাড়ারও আগে সূচিপত্র দেখে পাতা খুঁজে উপন্যাসটা বার করে গোগ্রাসে পড়ে ফেললাম। মাথা ঠাণ্ডা হল।

পরদিন বই ফেরৎ দিতে গিয়ে দেখি টেবিল তখনও ঢাকা দেওয়া। পাশের চায়ের দোকানের খদ্দেররা জানালেন, “বাংলা কাগজ আনতে গেছে। এক্ষুনি এসে পড়বে।” আমি এক ঠোঙা ঝালমুড়ি নিয়ে খেতে খেতে দোকানের ওপর নজর রাখলাম। ঠোঙা শেষ হতে না হতেই ভদ্রলোক এসে পড়লেন। আমি এগিয়ে গিয়ে ওঁর হাতে বই প্রত্যর্পণ করলাম। গোঁফের ফাঁকে ভদ্রলোক হাসলেন কি না বুঝতে পারলাম না। কিন্তু আমি আর অপেক্ষা করলাম না। দু’হাতের বুড়ো আঙুল তুলে ওঁকে থাম্বস আপ দিলাম। দেখানো নয়, নিখাদ আন্তরিক।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.