March 31, 2015

সাঁচীর ফাঁকে সাপ্তাহিকী



ভীমবেটকার ছবিগুলো দেখলে আর সেই ছবিগুলো নিয়ে আবোলতাবোল লিখতে হবে মনে করলেই আমার কম্প দিয়ে জ্বর আসছে, তাই আমি একটুখানি ব্রেক নিয়ে চট করে একটা সাপ্তাহিকী ছেপে নিচ্ছি। কিছু মনে করবেন না। পরের পোস্টে সাঁচী ভীমবেটকার সমাপ্তি টানব, প্রমিস।

আলোকচিত্রীঃ Alexander Ogilvie

There is a rumour going around that I have found God. I think this is unlikely because I have enough difficulty finding my keys, and there is empirical evidence that they exist.
                                                                          ---Terry Pratchett



এইটা একটা রহস্য গল্পের চমৎকার প্লট হতে পারে।

অ্যাই, আজ টিফিনের পর কী পিরিয়ড রে? ইতিহাস? উঁহু, ক্যাফেটেরিয়া সার্ভিস।



কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমি কৃচ্ছ্রসাধন শব্দটাই ঠিক করে উচ্চারণ করতে জানতাম না, ইঞ্জিরি শব্দের কথা তো ছেড়েই দিলাম।


নেক্সট মঙ্গল অভিযানে নাম লেখাবেন ভাবছেন? তাহলে এটা পড়ে নিন।

ওপরের ছবিটা দেখার পর থেকে এই গানটা কেবলই মাথার ভেতর ঘুরঘুর করছে।  


March 29, 2015

সাঁচী ভীমবেটকা/ ২




সাঁচীস্তুপ কখন বানানো হয়েছিল সেটা মনে রাখা যদি কষ্টকরও হয়, সাঁচীস্তুপ সাঁচীতে কেন বানানো হয়েছিল সেটা মনে রাখা ভীষণ সোজা। অশোকের রানী দেবী ছিলেন এই সাঁচীর মেয়ে। দেবীর বাবা ছিলেন বিদিশা নগরের একজন বিশিষ্ট বণিক, দেবী জন্মেছিলেন সাঁচীতে। অশোক আর দেবীর বিয়েও হয়েছিল এই সাঁচীতেই। তাছাড়াও স্তুপ গড়ার জন্য সাঁচী আরও নানারকম গুণাবলী ছিল। স্তুপ সাধারণত বানানো হত উঁচু কোনও নির্জন পাহাড়ের ওপর। বেতোয়া নদীর সমতল উপত্যকায় জঙ্গলের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল সাঁচী পাহাড়, নির্জনতায় তাকে টেক্কা দেওয়া শক্ত।

সাধারণত বুদ্ধ বা বৌদ্ধধর্মের কোনও গুরুর দেহাবশেষের ওপর গড়া হত স্তুপ। সব স্তুপের নিচেই যে ভস্ম থাকবে তেমন কোনও কথা নেই, তবে সাঁচীর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্তুপে থাকাই সম্ভব। গল্পে বলে বুদ্ধদেবের মহানির্বাণের পর তাঁর দেহভস্ম নিয়ে আট রাজার মধ্যে মারামারি বেধেছিল। শেষে ভস্ম আট ভাগ হল, একেকজন একেকভাগ নিয়ে নিজ নিজ রাজ্যে ফিরে গেলেন। তারই একভাগ হাত ঘুরে সম্রাট অশোকের হাতে এসে পড়েছিল আর সেই দেহাবশেষের ওপরই তৈরি হয়েছিল সাঁচীস্তুপ।

অবশ্য অশোক যে স্তুপটি বানিয়েছিলেন তার সঙ্গে আজকের এই এত বড় জায়গাজোড়া, এত মন্দির, মনাস্টেরি, স্তম্ভ, মূর্তিওয়ালা সাঁচীস্তুপের কোনও মিল নেই। এমনকি সাঁচীস্তুপ বলতেই যে তিন থাকবিশিষ্ট দরজার কথা আমাদের মনে পড়ে সেও অশোক বানিয়ে যাননি। অশোক বানিয়ে গিয়েছিলেন শুধু একটা ইঁটের অর্ধগোলক স্তুপ, স্তুপ ঘিরে সাপের মতো পেঁচিয়ে ওঠা দুটি সিঁড়ি, স্তুপের মাথায় যষ্টি, যষ্টির মাথায় ছাতা। এ ছাড়া আর একটি মঠও বানিয়েছিলেন সম্রাট, আর পুঁতেছিলেন একটি স্তম্ভ। অশোকস্তম্ভ।

আমি এতদিন বোকার মতো ভাবতাম যে অশোকস্তম্ভ মানেই একটা লম্বা খাম্বার ওপর চারচারটে সিংহ পিঠে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, তাদের পায়ের নিচের গোল পাথরের বেড় ঘিরে থাকবে একটি ঘোড়া, একটি হাতি, একটি ষাঁড় ও একটি সিংহ। আর তাদের মাঝখানে চব্বিশটি দণ্ডওয়ালা একটি চক্র। বেসিক্যালি আমাদের টাকার নোটে যে ছবিটা ছাপা থাকে।

সাঁচী গিয়ে আমার অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর হল। আমি জানলাম যে সিংহ দেখে অশোকস্তম্ভ চিহ্নিত করতে যাওয়া রিস্কি, কারণ সব স্তম্ভের মাথায় যে সিংহমূর্তি থাকবে এমন কোনও কথা নেই। থাকলেও সে সিংহমূর্তি আমার চেনা সিংহমূর্তির মতো নাও দেখতে হতে পারে। আমার চেনা সিংহমূর্তিটা বসানো ছিল সারনাথের অশোকস্তম্ভের মাথায়। সাঁচীস্তুপের অশোকস্তম্ভের মাথায় চারটে সিংহ ছিল বটে কিন্তু চক্রটক্র ছিল না। 

অশোকস্তম্ভ কথাটার অর্থ একেবারেই আক্ষরিক। সম্রাট অশোকের স্থাপিত স্তম্ভ (বা সম্রাট অশোকের স্থাপিত স্তম্ভের আদলে বানানো স্তম্ভ। সাঁচী কম্পাউন্ডেই আরও দুটো অশোকস্তম্ভ আছে যার একটা শুঙ্গ আর একটা গুপ্তযুগে বানানো।) এবার তার মাথায় কী বসানো হবে বা আদৌ কিছু বসানো হবে কি না সেটা শিল্পী কিংবা সম্রাটের/পৃষ্ঠপোষকের রুচির কিংবা সামর্থ্যের ব্যাপার।

তা বলে কি অশোকস্তম্ভ চেনার কোনও উপায় নেই? তেমনটাও নয়। অন্তত অশোকের আমলে বসানো অশোকস্তম্ভ তো দেখলেই চেনার কথা। খুব সম্ভবত তাতে অশোকের লেখা নির্দেশাবলী থাকবে কিন্তু সে সব ব্রাহ্মী হরফে পালি/প্রাকৃত ভাষার লেখা যদি আপনি পড়তে নাও পারেন তবুও অসুবিধে নেই। চেহারাই যথেষ্ট। অশোকের আমলের অশোকস্তম্ভগুলো সব চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ফুট লম্বা হত আর ওজনে প্রায় পঞ্চাশ টন ভারী। সেগুলো বানানো হত মথুরা কিংবা চুনারের স্যান্ডস্টোন দিয়ে।


এই হচ্ছে সাঁচীস্তুপের অরিজিন্যাল অশোকস্তম্ভের ধ্বংসাবশেষ। স্বমহিমায়, সিংহমস্তক শুদ্ধু, এর দৈর্ঘ্য ছিল বেয়াল্লিশ ফুট। সিংহগুলো এখন স্তুপের পাশের সাঁচী মিউজিয়ামে রাখা আছে। কাল দেখতে যাব। চুনার থেকে আটশো কিলোমিটার বয়ে আনা প্রায় চল্লিশ টন ওজনের একটি মাত্র প্রস্তরখণ্ড খোদাই করে বানানো হয়েছিল এই স্তম্ভ। এই স্তম্ভের ভাঙা অংশটুকু দু’খণ্ড হয়ে পড়ে আছে পাশেই। শোনা যায় পরবর্তীকালের কোনও এক স্থানীয় জমিদার আখমাড়াই করার জন্য আর কিছু না পেয়ে অশোকস্তম্ভের খানিকটা ভেঙে নিয়ে সে দিয়ে কাজ চালিয়েছিলেন।

সারনাথের অশোকস্তম্ভ ভারতের জাতীয় চিহ্নের সাপ্লাই দিয়ে দিয়ে সাঁচীর ওপর এক হাত নিয়েছে বটে কিন্তু সাঁচীর অশোকস্তম্ভের অবদানও ভারতের ইতিহাসে কম নয়। সাঁচীর অশোকস্তম্ভের গায়ে ব্রাহ্মী লিপিতে পালি ভাষায় লেখা নির্দেশাবলী থেকেই এশিয়াটিক সোসাইটির জেমস প্রিন্সেপ (ঠিক ধরেছেন, ইনিই আমাদের প্রিন্সেপ ঘাটের প্রিন্সেপ) ব্রাহ্মী লিপির পাঠোদ্ধার করেন। যার ফলে দুর্বোধ্যতার ধোঁয়াশা কাটিয়ে ভারতের ইতিহাসের একটা বিরাট সময় আমাদের চোখের সামনে আত্মপ্রকাশ করে।*

সাঁচীস্তুপের সবথেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে ওই পুঁচকে পাহাড়ের মাথায় প্রায় পনেরোশো বছরের ইতিহাস কীভাবে জড়ামড়ি করে আছে। অশোকের পর মৌর্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে সঙ্গে সাঁচীস্তুপেরও দশা বেশ কাহিল হয়ে পড়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে শুঙ্গ রাজারা এসে সেই ভাঙাচোরা স্তুপকে শুশ্রূষা করে সারিয়ে তুললেন। শুধু সারিয়ে তুললেনই না, তার সৌন্দর্যবৃদ্ধিও করলেন বেশ খানিকটা। ইঁটের স্তুপ পাথরে মুড়ে দিলেন, স্তপের চারদিকে আর স্তুপের মাথার যষ্টির চারদিকে বাহারের পাঁচিল তুলে দিলেন।


সাঁচী স্তুপের সিগনেচার তিন থাক তোরণ যখন বানানো হল তখন অশোকের পর প্রায় দুশো বছর কেটে গেছে। অমরাবতীর সিংহাসনে তখন সাতবাহন রাজারা। পাথরের তোরণ খুদে জাতক বুদ্ধের গল্পের ছবি আঁকলেন বিদিশার শিল্পীরা।

উত্তরের তোরণ

যক্ষীর দল। ঠিক লাফিং বুদ্ধের মতো দেখতে না?



ইনি হচ্ছেন পূর্ব তোরণের শালভঞ্জিকা। অন্তে আ-কার দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে শালভঞ্জিকা হতে হলে সে মূর্তিকে নারী হতে হবে, আর আশেপাশে শালগাছও (অশোক হলেও চলবে) থাকতে হবে একখানা। শালভঞ্জিকা ভয়ানক অ্যাক্রোব্যাটিক ভঙ্গিতে সে শালগাছের ডাল ধরে দাঁড়িয়ে থাকবেন। এই আবশ্যিক দুটি শর্ত পূরণ করার পর শালভঞ্জিকার আরও কতগুলি বৈশিষ্ট্য থাকে। তাঁরা সকলেই বাড়াবাড়ি রকম যৌবনবতী হন, তাঁদের চুলে নানারকম বাহারি কায়দায় বাঁধা থাকে এবং অঙ্গে গয়নার গাদাগাদি লেগে থাকে। ভারতে শালভঞ্জিকার মূর্তি আরও নানা জায়গায় পাওয়া গেছে, বেলুর হ্যালেবিদ এমনকি পাটনাতেও, কিন্তু সৌন্দর্যে আর খ্যাতিতে আমাদের এই সাঁচীর শালভঞ্জিকাটি সবাইকে ফেল ফেলেছেন।

সাঁচীতে আবার বড় ধরণের কাজ হয়েছিল চতুর্থ শতাব্দীতে গুপ্তসম্রাটদের আমলে। বেশ কয়েকটি মন্দির, প্রার্থনাগৃহ বানানো হয়েছিল। এই আমলের একটা অশোকস্তম্ভও আছে সাঁচীতে।

গুপ্ত আমলে বানানো পঁয়তাল্লিশ নম্বর মন্দির

সাঁচীতে গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধস্থাপত্যের শেষ চিহ্ন পাওয়া গেছে বারোশো শতাব্দী নাগাদ। তার পর তেরোশো চোদ্দোশো শতাব্দী নাগাদ হাওয়া যে ঘুরতে শুরু করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় সে সময়ের কতগুলো ছোটখাটো মূর্তি থেকে। গজলক্ষ্মী, গজপতি, ললিতাসনে আসীন মহাদেব। সেই পাল্টা হাওয়ার ঘূর্ণিতে পড়েই বৌদ্ধসন্ন্যাসীদের সাঁচী ছাড়তে হল নাকি তাঁরা স্বেচ্ছায় স্তুপ ছেড়ে চলে গেলেন সে কথা প্রমাণ করার আর কোনও উপায় নেই। তবে এ কথা নিশ্চিত চোদ্দোশো শতাব্দীর পর থেকে সাঁচীস্তুপ নিষ্প্রাণ পড়েছিল যতদিন না আবার আঠেরোশো আঠেরো সালে জঙ্গল কেটে মাটি খুঁড়ে জেনারেল টেলর তাকে উদ্ধার করলেন।


লখনৌতেও এই ব্যাপারটা হয়েছিল। এ ইমামবাড়া সে ইমামবাড়া ঘুরতে ঘুরতে অওয়ধি নবাবদের বংশলতিকাটা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে এসেছিল মাথার ভেতর। কে কার নাতি, কে কার খুড়ো, কে কাকে মেরে সিংহাসনে চড়েছিল সে সব তখন আমাকে পড়া ধরলেই গড়গড় করে বলতে পারতাম (এখন ধরলে কিন্তু পারব না, আবার সব ধোঁয়াশা হয়ে গেছে)। সাঁচীতেও সে রকমই হল খানিকটা। অশোকের পর শুঙ্গ, শুঙ্গের পর সাতবাহন ইত্যাদি বেশ মনে রাখতে পারছি। ভাঙা মন্দিরের সামনের নীল বোর্ডে ব্র্যাকেটে লেখা সালতারিখ দেখেই অর্চিষ্মানকে বলছি, “দেখেছ, এই মন্দিরটা বানানো হয়েছিল অশোকের পরের বছর, ওই মন্দিরটা হর্ষবর্ধনের আগের বছর।”

বলতে বলতেই হঠাৎ মনে পড়ল, বছর বলছি কাকে? পরের বছর মানে পরের শতাব্দী! মাঝখানের একশো বছরে কত কিছু ঘটে গেছে, খরা বন্যা দুর্যোগ দুর্বিপাক এসে ফিরে গেছে, একটা গোটা প্রজন্ম জন্মে আবার মরে গেছে, কত লোক, তাদের কত সুখদুঃখ আশানিরাশা আনন্দ মনখারাপকে আমি স্রেফ একটা সময়ের মণ্ডে পরিণত করেছি!

আমারও কপালে এমনটাই নাচছে। আমার রোজকার অফিস যাওয়া, অফিস থেকে ফেরা, মাইনে পাওয়ার আনন্দ, মাসের শেষের মনখারাপ, এই যে এই মুহূর্তে একান্ন নম্বর মনাস্টারির ওপারে সূর্য ডুবতে দেখে আমার মনে মনে এত গভীর উপলব্ধির উদয়, সে সবেরও একই পরিণতি হবে। সময়ের বুলডোজার এসে আমাকে, কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মহার্ঘ অস্তিত্বকে, তার দিনরাত মাসবছরকে শতাব্দী সহস্রাব্দের সঙ্গে মিশিয়ে দেবে। আমার চারপাশের এই ঘোর বাস্তব সময়টা, ব্রেকিং নিউজ আর কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, যুদ্ধবিগ্রহ আর শান্তিচুক্তিতে ছত্রাকার এই জলজ্যান্ত বর্তমানটাকেও। এর প্রতিনিধি হয়ে থেকে যাবে কতগুলো ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি জলের ট্যাংক বিজয়স্তম্ভ। অনেকদিন পর কেউ এসে সেগুলো উপড়ে নিয়ে যাবে আখমাড়াই করতে।

সিকিউরিটির ভাইসাবরা এতক্ষণ ধ্বংসস্তপের এদিকওদিকে ছায়ায় বসে আমাদের ওপর নজর রাখছিলেন। এখন দেখলাম তাঁরা প্যান্টের পকেট ঝাড়তে ঝাড়তে একে একে উঠে দাঁড়াচ্ছেন। সূর্য ডুবে গেছে। এবার আমাদের বার করে দেবে বোধহয়, না গো? তার থেকে চল নিজেরাই বেরিয়ে যাই।

পাহাড়ের গায়ে কাটা পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে প্রথমবার ক্লান্তিটা টের পেলাম। পা ভেঙে আসছে। স্বাভাবিক, সেই সকাল পাঁচটা থেকে ছুটোছুটি চলছে। এখন হোটেলে ফিরে গিয়ে রুমসার্ভিস ডিনার, তারপর সোজা ঘুম। কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে। গন্তব্য ভীমবেটকা।

                                                     (চলবে)


সাঁচী ভীমবেটকা/ ১

*একজন পাঠক জানিয়েছেন এই তথ্যটি ঠিক নয়। ব্রাহ্মীলিপি জেমস প্রিন্সেপই উদ্ধার করেছিলেন বটে, তবে সেটা সাঁচীস্তুপের অশোকস্তম্ভ থেকে নয়, দিল্লির লৌরিয়-নন্দনগড় অশোকস্তম্ভ থেকে।



March 26, 2015

সাঁচী ভীমবেটকা/ ১



ভোর ৪টে ৪৫: ফোন বাজছে। অন্ধ্রপ্রদেশের নম্বর। এখন ধরার প্রশ্নই ওঠে না। কেটে দিলাম। আবার বাজছে। উফ, কে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে ফোন করছে এখন? যত্ত সব। আবার কেটে দিতে যাব, এমন সময় বাজ পড়ার মতো করে মনে পড়ল।

মেরুক্যাব! আজ আমরা সাঁচী যাচ্ছি! ছটায় নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়বে। ট্যাক্সি আসতে বলা হয়েছে প'নে পাঁচটার সময়!

অ্যাই, ওঠো ওঠো, প'নে পাঁচটা বাজে, নিচে ট্যাক্সি এসে গেছে। এই না বলে আমি বাথরুমের দিকে ছুটলাম। অর্চিষ্মানও ধড়মড় করে উঠে বিছানা গুছোতে লাগল। ট্রেন মিস হয়ে গেলে কিছু বলার থাকবে না। ছি ছি ছি।

৫টা ১০: ট্যাক্সি চলতে শুরু করেছে। এই যে হুড়োতাড়াটা হল এর দোষ সম্পূর্ণ আমার। কমপ্লিটলি, এনটায়ারলি আমার। রোজ যে সময় অ্যালার্ম দেওয়া থাকে, চারটেয়, সে রকম দেওয়া থাকলে কোনও সমস্যাই হত না। কিন্তু সব ব্যাপারে একটু পাকামি না করলে আমার চলবে কেন। অবান্তরের জন্য একটা পোস্ট আশি শতাংশ লেখা হয়ে আছে, বাকি কুড়ি শতাংশ লিখে পাবলিশ করে বেরোব বলে তিনটেয় অ্যালার্ম দিয়েছি। এদিকে কাল অফিস থেকে ফিরতে বেজেছে আটটা। খেয়ে দেয়ে ব্যাগ গুছিয়ে টিভি দেখে (তখন টিভি না দেখে লেখাটা শেষ করলেই হত, কিন্তু সে রকম করলে তো অনেক কিছুই হত) শুতে শুতে এগারোটা। আর এগারোটায় শুয়ে তিনটেয় উঠে সাহিত্যসৃষ্টির তাড়না আমার এখনও জন্মায়নি। তিনটের সময় অ্যালার্ম বেজেছিল দুটো ফোনেই। দুটোই ডিসমিস করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি। তার পরিণতি এই।

যাই হোক, যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন ভেবে লাভ নেই। এবার জানালার বাইরে মন দেওয়া যাক। এই সময় রাস্তায় বেশি কেউ নেই, যারা আছে তারা এ সময় রোজই থাকে, আমাদের মতো এক আধদিন শখে বেড়াতে বেরোয় না। ট্যাক্সিতে ভাইসাব আস্তে করে রামলীলা চালিয়েছেন। দারুণ লাগছে শুনতে। গাইয়ে রীতিমত দক্ষ। একা গলায় রাম, লক্ষ্মণ এবং সীতার গান সামলাচ্ছেন। রামের গান যখন হচ্ছে তখন গলায় বেশ একটা ফোঁপরদালালির ভাব, লক্ষ্মণের বেলায় গলবস্ত্রতা, সীতার বেলায় অসহায় কাঁদুনি – সব নির্ভুল ফুটেছে। গানের মাঝে মাঝে যে কথাবার্তা আছে সেটাও নাটকের মতো করে বলছেন ভদ্রলোক। পতি কে লিয়ে মা-আ-লা বুন রহি হ্যায় সীতা। লা-য়ের ওপর এমন একটা ঝোঁক দিচ্ছেন যে শুনলেই কেয়া বাত কেয়া বাত, তওবা তওবা বলে উঠতে ইচ্ছে করেএই সময় যদি ট্রেন মিস করে যাওয়ার আতংকটা না থাকত আরও না জানি কত ভালো লাগত শুনতে।

৫টা ৪৫: করিনি! করিনি! ট্রেন মিস করিনি! করানোর জন্য সব রকম ব্যবস্থাই তৈরি ছিল। এটা আমি আগেও দেখেছি, একই ভুল অন্যে করলে দিব্যি পার পেয়ে যায়, আমি করলে আর রক্ষে নেই, শাস্তির খাঁড়া তিনগুণ হয়ে আমার গলায় নামবে। স্টেশনের বোর্ডে দেখি ট্রেন ছাড়বে অন টাইম। আমরা আসছি ষোলো নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিক থেকে, ভোপাল শতাব্দী দিয়েছে এক নম্বরে। আমাদের কোচটাও প্ল্যাটফর্মের ওই মাথায়, সিঁড়ির মুখ থেকে একশো মাইল দূরে। ট্রেনে পা রাখলাম যখন তখন বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে, মাথার রগদুটো ছিঁড়ে যাচ্ছে। খানিকটা টেনশনে, খানিকটা চায়ের অভাবে। এরা চা দেবে কখন?

১০ টা ৫০: আমি ঘণ্টা তিনেক চেয়ার হেলিয়ে মুখ হাঁ করে ঘুমিয়ে নিয়েছি। মাথাধরাটা এখনও ছাড়েনি। এদের টিব্যাগ চোবানো গরম জলে ছাড়ার আশাও নেই। মধ্যপ্রদেশে পৌঁছে সত্যিকারের চা খেতে লাগবে। রাজস্থানে উটের দুধের চা, মানস সরবোরে চমরি গাইয়ের দুধের চা পাওয়া যায় শুনেছি। মধ্যপ্রদেশে কোন এক্সোটিক জন্তুর দুধের চা পাওয়া যাবে সেটা ভাবতে ভাবতেই জানালা দিয়ে দেখলাম একদল নধর ছাগল রেললাইনের পাশের ক্ষেতে চরে বেড়াচ্ছে।

মধ্যপ্রদেশ আসাটা অনেকটাই হুট করে। দিল্লিতে থাকলে বেড়াতে যাওয়ার জন্য প্রথমেই মাথায় আসে কুমাউন গাড়োয়ালের নাম। কিন্তু আমি বেঁকে বসেছিলাম যে এবার পাহাড় যাওয়া চলবে না। গত সপ্তাহে একদিন কী কারণে পুরোনো ফোল্ডার খুলে ছবি দেখতে গিয়ে কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাছের ছবি দেখে মিনিটখানেকের জন্য ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলাম। এটা কসৌলির কুয়াশা, নাকি রামগড়ের, নাকি ম্যাকলয়েডগঞ্জ? নাকি শিলঙের? এমন নয় যে কুয়াশা দেখতে আমার একঘেয়ে লাগে। কিন্তু এটাও সত্যি চট করে ঘুরে আসা যায় বলে আমরা পাহাড়ে যত যাই, অন্য জায়গায় তত যাওয়া হয় না।
যাওয়ার জন্য এবার আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল আসাম। তিনসুকিয়া-শিবসাগর না হাফলং-জাটিঙ্গা সেই নিয়ে ক’দিন খুব জলঘোলা হল। তারপর দূরত্বের দোহাই দিয়ে নর্থ ইস্ট বাতিল হয়ে গেল, আমরা ভাবলাম বরং জয়সলমীর যাই। তাঁবুর বাইরে খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে মরুভূমির আকাশের তারা দেখে আসি। রাতে আকাশভরা নক্ষত্রাবলোকন, সকালে উষ্ট্রপৃষ্ঠে স্যান্ডসাফারি।

হঠাৎ কখন মন দিক বদলে দক্ষিণ দিকে রওনা দিয়েছে আমরা টেরও পাইনি। আর দক্ষিণ বলতে হাতের কাছে মধ্যপ্রদেশ। আর মধ্যপ্রদেশে যেতে হলে যাওয়া সবথেকে সুবিধে ভোপালে। আর ভোপালের হাতের কাছেই সাঁচী-ভীমবেটকা। ব্যস। মনস্থির হয়ে গেল।

১০টা ৫০: এটা কী স্টেশন? ঝাঁসি? এখানে ট্রেন থামবে মনে হচ্ছে। আমাদের কোচ থেকে দু’জন বিদেশী ট্যুরিস্ট নামার তোড়জোড় করছেলক্ষ্মীবাইয়ের বাড়ি দেখতে যাচ্ছে বোধহয়। মাথার ওপর দৈববাণীর মতো মহিলার গলা ভেসে এল। ঝাঁসি মে ট্রেন আট মিনিট রুকেগি।

আ-আ-ট মিনিট! আমি অর্চিষ্মানকে তাড়া লাগালাম। যাও যাও, মুখ চালানোর জন্য কিছু কিনে আনোঅর্চিষ্মান, “বা, বেশ মজা তো” বলে প্রতিরোধের খানিকটা অপচেষ্টা করে শেষে রওনা দিল। আমি বললাম, “টেনশন কোরো না, ভেস্টিবিউল ট্রেন, ছেড়ে দিচ্ছে দেখলে যে হাতের সামনের কামরায় উঠে পোড়ো।”

অর্চিষ্মান চোখ ঘুরিয়ে চলে গেল, আমি বসে বসে নিজের পরিবর্তন দেখে অবাক হতে লাগলাম। আমার বাবা যখন আট মিনিট কিংবা আধ মিনিটের তোয়াক্কা না করে প্রতিটি স্টেশনে নামতেন, তখন টেনশনে আমার মাথার প্রতিটি চুল খাড়া হয়ে থাকত, যতক্ষণ না বাবাকে আবার দেখতে পেতাম ততক্ষণ নামত না। বাবাও কখনওই ট্রেন ছাড়ার আগে উঠতেন না। আমার মনে আছে প্রথম যখন অর্চিষ্মানের সঙ্গে দূরপাল্লার ট্রেনে করে যাচ্ছিলাম, তখন ও যে ট্রেন থামামাত্র নেমে প্ল্যাটফর্মে উধাও হয়ে যায় না এই ব্যাপারটা দেখে আমার মনে বেশ নিশ্চিন্তিভাব জেগেছিল। যাক বাবা, ওয়ান টেনশন লেস। (এই তিনটে ইংরিজি শব্দ দেখে আমার একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল, আপনাদের পড়ছে কি? একটা সূত্র দিই, টেনশনের জায়গায় একটা  বিষধর সাপের নাম বসিয়ে দেখুন তো) আর এখন কি না আমিই ওকে নামার জন্য তাড়া দিচ্ছি। আবার বলছি,ছেড়ে দিলে না ঘাবড়ে রানিং ট্রেনে উঠে পোড়ো।

মধ্যপ্রদেশ আসা আমার এই প্রথম। ট্রেনের জানালা থেকে এ পর্যন্ত তার যতটুকু দেখেছি তাতে আমি ইমপ্রেসড। প্রচুর সবুজ, প্রচুর ক্ষেত, দূরে দিগন্তরেখা। আমার কেন যেন ধারণা ছিল ট্রেনের জানালা থেকে বাংলাদেশ বাদে যে ভারতবর্ষটুকু দেখা যায় তার সবটুকুই রুক্ষ, শুষ্ক, নীরস। দেখতে দেখতে চললাম। ট্রেন এখনও রাইট টাইম। এইভাবে চললে দুটোয় ভোপাল পৌঁছবে।

উর্দি পরা লোকজন হাতে কাগজের কাপ নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করছে। এখনই সুপ দিচ্ছে নাকি? দিলে অবশ্য অসুবিধে নেই। ব্রেকফাস্টের দু’দুটো কাটলেট হজম হয়ে গেছে অলরেডি। ট্রেনে উঠলে এত খিদে পায় কেন কে জানে।

দুপুর ২টো ৩০: ট্রেন ঠিক সময়েই ঢুকেছিল ভোপালে। এই দুপুরে বোধহয় বিজনেস ডাউন থাকে, বেরোনো মাত্র অটো ট্যাক্সির যে ছেঁকে ধরা ভাবটা হয় সেটা এখানে হল না দেখলাম। একজনই ছিলেন, তাঁর সঙ্গে মিনিট দুয়েক দরাদরির পর রফা হয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। অর্চিষ্মান বলল, শোলে দেখেছিলে? আমি বললাম হ্যাঁ। সুর্মা ভোপালিকে মনে আছে? আছে। ওর হিন্দিটা? ওরে বাবা, অত মনে নেই। এই লোকটার হিন্দির মতো অবিকল।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে যতটুকু ভোপাল চোখে পড়ল তাতে মন ভালো হয়ে গেছে। স্টেশনের পাশে ছোট ছোট খুপরি বাড়ি। বাড়ি ঘিরে আনাড়ি হাতে গাঁথা আঁকাবাঁকা দেওয়ালের গায়ে উজ্জ্বল নীল রং। সে দেওয়ালের গায়ে সাঁটা ছোট্ট রকে বসে পা দোলাচ্ছে আরও ছোট মেয়ে। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট, কপালে কাজলের টিপ, চোখে কাজলের কড়া পাহারা। মাথার পাট করে আঁচড়ানো চুল দেখে বোঝা যাচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই মা স্নান করিয়ে চুল আঁচড়িয়ে খাইয়ে দিয়েছেন। এখন হয়তো নিজে খাচ্ছেন কিংবা খাওয়া সেরে ঘণ্টাখানেকের জন্য গড়িয়ে নিচ্ছেন। সেই ফাঁকে স্যান্ডো গেঞ্জি পালোয়ান গেটের বাইরে বসে চারদিকে নজর রাখছে। দু’চোখে ভাতঘুমের চিহ্নমাত্র নেই। কোনওদিন থাকবে বলে মনেও হচ্ছে না। যতদিন না ইস্কুল থেকে ফিরে সন্ধ্যেবেলা বই খুলে বসার কথা উঠছে।

তার একটু পরেই শহর ফুরিয়ে গেল আর আমরা প্রকাণ্ড খাঁখাঁ মাঠের মধ্যে এসে পড়লাম। মাঠ বলা অবশ্য উচিত নয়, যতদূর দু’চোখ যায় সোনালি ক্ষেত, ক্ষেতের ওপর ঝকঝকে রোদ। সে রোদের হুমকি অগ্রাহ্য করে চোখ কুঁচকে যদি দিগন্তের দিকে চাইতে পারেন তাহলেই দেখবেন দিগন্তে প্রকাণ্ড অজগরের মতো শুয়ে আছে বিন্ধ্যপর্বত। বিরাট, গম্ভীর, ছায়াময়। ক্ষেতের মধ্যে মাঝে মাঝে একটাদুটো পাকাবাড়ি ঘিরে লালনীলহলুদসবুজ চকচকে পতাকার সাজ।

ও, আর একটা ভয়ানক মজার জিনিস দেখলাম রাস্তায়। রাস্তার ধারে ধারে প্রকাণ্ড ব্যানারে কবিসম্মেলনের বিজ্ঞাপন। কবিদের ছবি দেওয়া। একটা দুটো বিজ্ঞাপন নয়, ওই পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার রাস্তায় অন্তত পঁয়তাল্লিশটা চোখে পড়ল।

পথে আরও একটা চমৎকার জিনিস চোখে পড়লদিওয়ানগঞ্জের বাজার ছাড়িয়ে খানিকটা এগোতেই দেখি রং দিয়ে আঁকা দুটো লাইন। লম্বালম্বি নয়, আড়াআড়ি। রাস্তার পেট ফুঁড়ে এদিক থেকে ওদিকে চলে গেছে। রাস্তা পেরিয়ে লাইন যেখানে এসে মাঠে মিশেছে সেখানে পোঁতা বোর্ডের দিকে তাকিয়ে অর্চিষ্মান চেঁচিয়ে উঠল “ট্রপিক অফ ক্যান্সার!” আমি চেঁচালাম “কর্কটক্রান্তি!”

এই ব্যাপারটা আমার এত মজা লাগে, ছোটবেলায় স্কুলের বইতে পড়া শব্দগুলো যে যে ভাষায় পড়েছে তার মাথায় সেই ভাষাতেই আজীবনের মতো গেঁথে যায়। তা সে শব্দগুলো বাস্তব জীবনে যতই বিরল বেমানান হোক না কেন। সবাই বলে ডেসিডুয়াস, আমি ভাবি, “সেটা যেন কী? ও হ্যাঁ পর্ণমোচী, মনে পড়েছে।” একই ঘটনা ঘটে জীবনবিজ্ঞান, ভূগোল, অংকের ক্ষেত্রেও। অভিযোজন, চলনগমনরেচন, কর্কটক্রান্তি, মকরক্রান্তি, স্তরীভূত শিলা, পাললিক শিলা, লম্ব, ভূমি, অতিভুজ।

যাই হোক, মজার ব্যাপারটা এটা নয়। আমরা দিব্যি যাচ্ছিলাম অটো চেপে, ভারতবর্ষের মধ্যপ্রদেশের রায়সেন জেলার কংক্রিটের রাস্তা দিয়ে। দিওয়ানগঞ্জ ছাড়িয়ে সালামতপুরের দিকে। এমন সময় কর্কটক্রান্তির বোর্ড দেখে হঠাৎ সে সব মাথার ভেতর থেকে উধাও হয়ে গেল আর আমি স্পষ্ট দেখলাম কমলালেবুর মতো পৃথিবী বিপজ্জনকভাবে কেতরে বাঁই বাঁই করে ঘুরতে ঘুরতে কক্ষপথ ধরে এগোচ্ছে। সে পৃথিবীর গায়ে লম্বালম্বি আর আড়াআড়ি কতগুলো লাইন টানা। যে লাইনটার গায়ে লেখা আছে তেইশ দশমিক পাঁচ ডিগ্রি উত্তর, সেই লাইনটার গায়ে একটা ছোট্ট কালো ফুটকির মতো আমাদের পুঁচকে অটো বীরবিক্রমে ছুটছে।

বিকেল ৪টেঃ ছাগলের দুধ দিয়ে বানানো কি না জানি না, এদের চা’টা ভালো। পর পর দু’কাপ খেতেই মাথাধরাটা ছেড়ে গেছে। ঘরে ঢুকেই চা আর পকোড়া অর্ডার করাটা ক্রমেই আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিণত হচ্ছে। এবারে ঐতিহ্য রক্ষায় কোনও অসুবিধেই হয়নি কারণ আমাদের দুজনেরই খিদে পেয়েছিল জোর। তাই চা, পকোড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাই এবার বাড়তি চিকেন স্যান্ডউইচ।


ঐতিহ্যের কথা লিখতে গিয়ে হঠাৎ একটা কথা মাথায় এল। লোকে কত রকমের কত প্রোজেক্ট নেয় জীবনে, আমরা একটা নিতে পারি যে ভারতবর্ষের সবক’টি রাজ্যের সবক’টি ট্যুরিস্ট ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের হোটেলের মিক্সড ভেজ পকোড়া আমরা খেয়ে দেখব। আইডিয়াটা অর্চিষ্মানকে বলে দেখতে হবে।

আমরা ঘর নিয়েছি মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের গেটওয়ে রিট্রিট হোটেলে। অনলাইন বুকিং করা ছিল। আমরা চিরকাল সরকারি হোটেলের পৃষ্ঠপোষক। শুরুতে কারণটা ছিল ট্যাঁক, কিন্তু এখন এমন খারাপ অভ্যেস হয়েছে যে সরকারি জায়গা ছাড়া অন্য কোথাও থাকার সম্ভাবনাটাই মাথায় আসে না (ট্যাঁকের কারণটা অবশ্য এখনও প্রযোজ্য আছে)। সে ট্রিপঅ্যাডভাইসর ফোরামে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, সরকারি হোটেল আমাদের মন্দ লাগে না। হ্যাঁ গোটা ব্যাপারটায় একটু ঢিলেঢালা ভাব থাকে, কর্মীরা মাঝে মাঝে ধান শুনতে পান শোনেন, হট অ্যান্ড সাওয়ার সুপের জায়গায় সুইট কর্ন এনে হাজির করেন, বাথরুমের টয়লেট পেপার ফুরিয়ে গেলে মাঝে মাঝে রুমসার্ভিসের নম্বরে ফোন করে তাড়া দিতে হয়, তবুও।

এই গেটওয়ে রিট্রিটে দেখলাম সেই ঢিলেঢালা ব্যাপারটা একেবারেই নেই। বিরাট জায়গা জুড়ে হোটেল, বাগানে ফুলের ছড়াছড়ি। ঘরদোর অত্যন্ত পরিষ্কার, টয়লেটে “স্যানিটাইজড ফর ইয়োর সেফটি”র সিল।

যে ব্যাপারটা সব সরকারি হোটেলেরই প্লাস পয়েন্ট সেটাও এর আছে। লোকেশন। সাঁচী স্তুপ হাঁটাপথ। হোটেলে ঢোকার আগেই উঁচু পাহাড়ের জঙ্গলের ফাঁকে স্তুপের গোল মাথা চোখে পড়েছিল। ইতিহাস বইয়ের চেনা ছবি।

চা খেতে খেতে, মুখেচোখে জল দিতে দিতে সাড়ে চারটে বেজে গেল। এখন স্তুপে গেলে কি বোকামো হবে? অবশ্য না গিয়েই বা করব কী? অর্চিষ্মানের মত হচ্ছে হাঁটতে হাঁটতে যতদূর যাওয়া যায় যাওয়া, যতটুকু দেখা যায় দেখা। আমার অমত নেই।

৫টা ১৫: সাঁচীস্তুপের মাথায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা এখন। ভালোই হয়েছে এসে। টিকিটঘরের সামনে টাইমিং লেখা আছে দেখলাম সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত। চমৎকার লেগেছে আমার। কমনসেন্স একেই বলে। আলো থাকলে দেখব, আলো নিভে গেলে দেখব না। ব্যস, খেল খতম। পৃথিবীর সব নিয়ম কেন এত সরল হয় না?

সাঁচী বেজায় পুরোনো ব্যাপার। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক। আপনি যদি আমার মতো ইতিহাসবিদ হন তাহলে অবশ্য আপনাকে এই রকম করে সময় বোঝানো অর্থহীন। আপনার কাছে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকও যা ত্রয়োদশও তাই। কিন্তু কেউ যদি বলে, "আরে বুঝলে না, সেই যখন কলিঙ্গ যুদ্ধটুদ্ধ শেষ, কলিঙ্গ আর মৌর্য দুই তরফের লাখ লাখ লোক মরে গেছে, সেই রক্তগঙ্গার দিকে তাকিয়ে সম্রাট অশোকের রাগ তো পড়েছেই, বেশ একটু অনুতাপের ভাবও জাগছে। তিনি ভাবছেন চণ্ডাশোক তো অনেক হল এইবার ধর্মাশোক হলে কেমন হয়? তাছাড়া পশ্চিমে হিন্দুকুশ থেকে পূর্বে বাংলাদেশ, উত্তরে গান্ধার থেকে দক্ষিণে প্রায় কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত যে প্রকাণ্ড সাম্রাজ্য তিনি ফেঁদে বসেছেন সে সামলাতে গেলে যে ধর্মীয় ঐক্য ছাড়া গতি নেই, এ কথা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে আর তখনই তাঁর মাথায় আসছে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের আইডিয়াটা – সাঁচী হচ্ছে সেইইই সময়কার ব্যাপার" তাহলেই আপনি বলবেন "ব্যস্‌ ব্যস্‌ আর বলার দরকার নেই, একেবারে ক্রিস্ট্যাল ক্লিয়ার হয়ে গেছে।"

                                                                                                                     (চলবে)


March 23, 2015

বিলম্বিত সাপ্তাহিকী



একটা বিশেষ (এবং ন্যায্য) কারণে এবারের সাপ্তাহিকী ছেপে উঠতে পারিনি। কিন্তু এ সপ্তাহেই সাপ্তাহিকীর জন্য যত ভালো ভালো লিংক জোগাড় হয়েছিল। সেগুলো আপনাদের দেখানোর জন্য সামনের শনিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করল না। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।




It is better to keep your mouth closed and let people think you are a fool than to open it and remove all doubt.
                                                                         --- Mark Twain


মানুষের জীবনে পরিস্থিতিই যে শেষ কথা নয়, বেবি হালদার তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।


ফার্গো আমার অন্যতম, অন্যতম, অন্যতম প্রিয় ছবি। আর ফ্রান্সেস ম্যাকডারমন্ড অভিনীত মার্জ চরিত্রটি আমার অন্যতম, অন্যতম, অন্যতম প্রিয় চরিত্র। আমি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে জানি, সিনেমাটা একবার দেখলে আজীবন আর ভোলা যায় না। কিন্তু সেটা যে এমনভাবে কারও মাথা বিগড়ে দিতে পারে, সে কথা আমি জানতাম না।

ফোটো তোলা যে শুধু চোখের সামনে ক্যামেরা ধরে শাটার টিপে যাওয়া নয়, সে ফোটোর আকার আয়তন অবস্থান পরিমিতি ত্রিকোণমিতিও যে মাথায় রাখতে লাগে, সেটা আর মনে থাকে কই? মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এঁর থেকে ভালো লোক পাওয়া মুশকিল।  

এতদিন কফির ছবি/ভিডিওর লিংক দেখেছেন সাপ্তাহিকীতে, এবার কফি দিয়ে আঁকা ছবির লিংক দেখুন।

আজকাল সবাই দেখছি খুব এই খেলাটা খেলছে। আপনিও খেলেছেন নাকি?

এই ছবিটা দেখে একটু গা কেমন কেমন করতে পারে, তবু দেখুন। ইন্টারেস্টিং।


আগে এই গানটা সাপ্তাহিকীতে দিয়েছি কি? মনে পড়ছে না। দিলেও ক্ষতি নেই, এ গান যতবার শোনা যায় ততই ভালো।


March 22, 2015

মায়ের রিইউনিয়ন



মুখোমুখি কথা বলার থেকে ফোনে কথা বলার একটা সুবিধে হচ্ছে অনৃতভাষণ ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে যায়। বিশেষ করে মোবাইলেসেদিন নেহেরু প্লেস থেকে অটো চড়ে বাড়ির দিকে আসছি, রাত ন’টার পরে ফাঁকা রাস্তায় অটো পক্ষীরাজের মতো ছুটছে এমন সময় ভাইসাবের ফোন বাজল। ভাইসাব গতি কমিয়ে পকেট থেকে ফোন বার করে নম্বরের দিকে তাকিয়ে যে মুখভঙ্গিটা করলেন সেটা ফোনের স্ক্রিনে বসের নাম ফুটে উঠতে দেখলে আমিও করি। তার পর ফোন তুলে গলায় পঞ্চাশ শতাংশ অনুতাপ, চল্লিশ শতাংশ হতাশা,  আট শতাংশ নিরুপায় ভাব আর প্রায় ধরাই যায় না এমন দু’শতাংশ “কেমন দিলুম” ভাব মিশিয়ে বললেন, “আরে সারজী, অব তো আ নহি পাউঙ্গা, অব তো ম্যায় সফদরজং এনক্লেভ মে জাম মে ফঁসা হু, কিতনা জ্যাম, বাপ রে বাপ রে বাপ, কাল মিলুঙ্গা জরুর, মা কসম।” এই না বলে ফোন কেটে দিয়ে গোঁওওওও করে স্পিড বাড়িয়ে ফ্লাইওভারের নিচের লাল সিগন্যাল অম্লানবদনে পেরিয়ে এলেন।

আবার অসুবিধেও আছে। সুবিধের থেকে অন্তত একশো গুণ বেশি। প্রথম অসুবিধেটার ওপরের সুবিধেটার সঙ্গে সম্পর্কিতমানুষ আর মানুষকে বিশ্বাস করছে না। আমি যখন বলছি জ্যামে আটকে আছি, তখন ওপাশ থেকে হেঃ হেঃ করে হেসে বলছে “জ্যাম? ভালো ভালো। যাই হোক, যখন মর্জি হয় চলে এস।” দ্বিতীয় অসুবিধেটা হচ্ছে লোকের মনোযোগের প্রতি লোকের দাবি বাড়াবাড়ি রকম বেড়েছেল্যান্ডলাইন বেজে বেজে থেমে গেলে সবাই ধরে নেয় যে ফোনের আশেপাশে লোক নেই। ধরে নিয়ে ক্ষমাঘেন্না করে দেয়। কিন্তু মোবাইল বেজে থেমে গেলে আর রক্ষা নেই। সামনে ছিলে না মানেটা কী? যেখানে খুশি থাক না থাক, মোবাইলকে তো তোমার সামনেই রাখার কথা। এটা কি মোবাইল পেয়েছ না পেপারওয়েট?

কিন্তু ফোনে কথা বলার যে অসুবিধেটা আমাকে সবথেকে বেশি পীড়া দেয় সেটায় মোবাইল ল্যান্ডলাইন দুজনের পারফরম্যান্সই সমান। ফোনে শুধু কথাই বলা সম্ভব, যে কথা বলছে তার মনের ভাব বোঝার কোনও উপায় নেই। মোটা দাগের রাগ ভালোবাসা প্রেম বিরহ, যা ভাষায় প্রকাশ হয়, তার বাইরের সূক্ষ্মতর আবেগ, অভিমান, মৌন সম্মতি বা অসম্মতি বোঝাতে ফোন একেবারেই অপারগ।    

যদি না দু’পারের বক্তার সম্পর্ক আমার আর আমার মায়ের মতো হয়। আমি আর আমার মা জীবনে নিজেদের মধ্যে যত কথা বলেছি (বাড়াবাড়ি রকম বেশি) তার বেশিরভাগই ফোনে। একটা সময়ের পর  কাজের সূত্রে মায়ের বাইরে যাওয়া শুরু হল, তারপর আমি বাড়ি ছাড়লাম। প্রমাণ হয়ে গেল অদর্শনে সব সময় কথা কমে না, অনেক সময় বাড়েওদুজনের দুটো আলাদা পৃথিবী হয়, দুই পৃথিবীর দু’রকম আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা হয়, সে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য কথাকেও দ্বিগুণ হতে হয় আর সে সব কথাই হয় ফোনের মধ্যে দিয়ে।  

আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয় হয়তো এখন আমার এমন অনেক কথা আছে যা আমি ফোনেই শুধু মাকে বলতে পারব। কিংবা ফোনে যত ভালো করে মাকে বোঝাতে পারব সামনে বসে তত ভালো করে পারব না। মাও কি পারবেন? আমার হ্যালো শুনেই মা বুঝতে পেরে যান কেচে তুলে ফেলা সোয়েটার নোংরা করার ভয়ে আমি ঠাণ্ডায় গুটিসুটি হয়ে ঘুরছি, মায়ের হ্যালো শুনেই আমি কেমন ধরে ফেলি মা ব্যায়ামে ফাঁকি দিচ্ছেন, মায়ের কোমরটা আবার ভোগাচ্ছে। চোখের সামনে থাকলে কি একে অপরের প্রতি এত মনোযোগ থাকত আমাদের?

সেদিন যেমন মায়ের হ্যালো শুনে আমি বুঝলাম মায়ের আমার সঙ্গে কথা বলার মন নেই। মায়ের মন অন্য কোথাও পড়ে আছে। এ জিনিস রোজ ঘটে না। জিজ্ঞাসা করতেই হল ব্যাপার কী। শুনলাম ব্যাপার অতি গুরুতর। মা কফি হাউস যাচ্ছেন, কলেজের পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে।

কফি হাউস মায়ের পুরোনো পাড়া। মা অবশ্য কলেজে পড়ার সময় দারুণ কফি হাউসে যেতেন তেমন নয়, বরং অনেক বেশি যেতেন মায়ের বন্ধু ক-মাসি। ক-মাসির সঙ্গে মায়ের অদ্ভুত যোগাযোগ। দুজনে এক পাড়ায় থাকতেন, এক স্কুলের এক ক্লাসে পড়তেন। ক্লাস এইটে উঠে দু’জনেই পাড়ার স্কুল থেকে হাওড়া গার্লস, কলেজ দুজনেই প্রেসিডেন্সি, দুজনেরই বোটানি চাকরি নেওয়া থেকে দুজনের চাকরি আলাদা হয়ে গেল, আর তারপর এতদিনের এত মিলকে কাঁচকলা দেখিয়ে দুজনের জীবন বইল সম্পূর্ণ অন্যরকম খাতে।

যাই হোক, যেদিনের ঘটনা বলছি সেদিন ছিল মায়দের কলেজে যাওয়ার প্রথম দিনমা রেডি হয়ে ক-মাসিকে ডাকতে গিয়েছেন। ঘরে ঢুকে মায়ের চক্ষুস্থির। ক-মাসির মায়ের একেবারে কাঁদোকাঁদো দশা। তিনি মেয়েকে বলছেন, “এই আমার পা ছুঁয়ে দিব্যি করে বল, সোজা কলেজে যাবি আর আসবি, কোনওদিন কফিহাউসে যাবি না, বাজে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দিবি না।” মাকে ঠাণ্ডা করতে ক-মাসিকে পা ছুঁয়ে সে সব শপথ করতেও হয়েছিল। তারপর যখন বছরের শেষে অ্যাটেনডেন্স গোনার দিন এল দেখা গেল ক-মাসি প্রায় অর্ধেকদিনই অনুপস্থিত। বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন কলেজ যাওয়ার জন্য, তারপর পথ ভুলে ক্লাসের বদলে কফি হাউসে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। জরিমানা হল। সে জরিমানার টাকা জোগাড়ে দুই বন্ধুকে নানারকম মাথা খাটাতে হয়েছিল।

সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে দেখি বাড়ির নম্বর থেকে মিসড্‌ কল, রাস্তার হট্টগোলে শুনতে পাইনি। বুঝতে পারলাম মা বাড়ি ফিরে ফোন করেছেন। ফোন করলাম। রি-ইউনিয়ন ব্যাপারটা নিয়ে আমার সন্দেহ চিরকালের। সেটা করতে মা এত দূর থেকে উজিয়ে যাবেন শুনে মুখে “বাঃ বাঃ” বললেও মনে মনে বলেছিলাম “তার থেকে সামনের বারান্দায় বসে কাগজ পড়লে ভালো হত না?” “হ্যালো” শুনেই বুঝতে পারলাম আমার চিন্তার কোনও কারণ নেই, মায়ের গলা উৎসাহে ঝকঝক করছে। শারীরিক কিংবা মানসিক, কোনও রকম ক্লান্তির চিহ্নই তাতে নেই।

শুনলাম দারুণ মজা হয়েছে। আধঘণ্টার মিটিং, ইটিং নিয়ে দেড়ঘণ্টায় পর্যবসিত হয়েছে। যাদের যাদের আসার কথা ছিল তারা সকলেই এসেছিলেন। একজনের সঙ্গে নাকি মায়ের চুয়াল্লিশ বছর পর দেখা হল। সেই একাত্তর সালে কলেজ ছাড়ার সময় হয়েছিল, আবার এই দু’হাজার পনেরোতে। চু-য়া-ল্লি-শ বছর! সময়টার গুরুত্ব অনুধাবন করতে আমার মতো আধবুড়িরও আরও দশ বছর লাগবে।

দেখে চিনতে পারলে মা?

হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা। রাস্তায় দেখলেও চিনতে পারতামওই বয়সটার পর তো মুখের আদল বেশি পালটায় না। তারপর যখন কথা বলতে শুরু করল তখন তো . . . কলেজেও ওরকম হাঁকপাঁক করে কথা বলত ও। হাহা করে হাসত।

এখন কী করেন তোমার সেই বন্ধু?

করে না, করত। খুব ভালো করেই করত। অমুক কলেজে পড়াত, লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে রাষ্ট্রপতির থেকে।

বাবা, তোমার তো সব হাইফাই বন্ধু দেখছি। কী খেলে গো?

প্রচুর খেলাম। মাটন আফগানি, চিকেন কাটলেট, কফি, কোল্ডকফি উইথ আইসক্রিম। একেক জন একেক রকম জিনিস নিয়েছিল, সবাই মিলে খেয়েছে।

গল্প শুনে শুনে আমার মায়ের ছোটবেলার ছবিটা আমি কল্পনা করতে পারি। আট ভাইবোনের সাত নম্বর বোন, জাঁদরেল দাদাদিদিদের ভয়ে কাঁটা হয়ে ঘুরছেন। কইপুকুরের ভাড়াবাড়ির বাগানে বিকেলবেলা ফুটবল খেলা জমেছে, আমার মা গোলকিপার হয়ে হাতে হাওয়াই চটি পরে দাঁড়িয়ে দেখছেন পাশের বাড়ির গোয়ালঘরের চালের টালির ওপর উল্টোনো মাটির হাঁড়ির ওপর বসে বাড়ির চাকর গান ধরেছে। দেশের ভাষায় গান, হয়তো দেশের আকাশের দিকে মুখ করে। মা হাঁ করে সেই গান শুনছেন এদিকে গো – ও – ও – ল। মেজমামা এসে মায়ের মাথায় গাঁট্টা লাগাচ্ছেন। বাড়িতে এই অত্যাচার, বাইরেও পরিস্থিতি এমন কিছু আরামের নয়। ঘরের বাঙাল আর বাইরের কলকাতার পরিশীলিত বাংলা জাগলিং করা কি অতটুকু মেয়ের পক্ষে সম্ভব? দিদিমা উনুনে ভাত বসিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে মা’কে নিয়ে পাড়ার ডাক্তারখানায় ছুটতেন, মা ছোট ছোট পায়ে তাল রাখতে রাখতে বলতেন, “ওখানে গিয়ে কিন্তু “প্যাট” বলবা না মা, বলবা ‘ডাক্তারবাবু ওর পেটব্যথা করছে কেন দেখুন না?’” পেট আর প্যাটের মধ্যে যে ফারাক যে শুধু একটা এ কার আর য ফলার নয়, ফারাক যে আসলে একটা গোটা দেশের, সেটা দিদিমা কোনও দিন মনে রাখতে পারেননি আর দিদিমার ছেলেমেয়েরা পারেননি ভুলতে। রবিবার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে দাদু বাজারে চুল কাটাতে যেতেন। সাম্যবাদী ইটালিয়ান সেলুনে সকলের এক ছাঁট। ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবারই বয়কাট, তেলপাটপাট চুলের সোজা সিঁথি যেখানে গিয়ে ফুরিয়েছে সেখান থেকে তিনচারটি রোগা চুলের গুচ্ছ ফোয়ারার মতো উঁচু হয়ে থাকত। সেই দেখে (এবং বাকি বন্ধুদের ডেকে দেখিয়ে) সোমবার সকালে মায়ের ক্লাসমেট অ বলত, “এই অর্চনা, তুই এ রকম ছেলেদের মতো চুল কাটিস কেন রে?”

তখন কিছু বলতে পারেননি মা, মনের রাগ মনেই পুষে রাখতে হয়েছিলটিনের সুটকেসে বই গুছিয়ে নিয়ে, লাল হলুদ নীল সবুজ রামধনুরং ছাতা মাথায় দিয়ে গটগটিয়ে ইস্কুলে আসত অছাতাসুটকেস কল্পনাতেই ছিল না, কোনও বছর বুকলিস্টের একখানা বই নতুন পেলেই মায়েরা বর্তে যেতেন। আমার যখন নার্সারিতে ভর্তি হওয়ার বয়স হল তখন স্কুল ইত্যাদি ঠিক হওয়ারও আগে একখানা টিনের সুটকেস আর রঙিন ছাতা এসেছিল মনে আছে।

তার পর মা যখন মা হলেন তার পরের চেহারাটা তো মনে আছেই। তার নাকচোখমুখ যে খুব স্পষ্ট দেখতে পাই তেমন নয়, যেটা পাই সেটা একটা ছুটন্ত হাওয়ায় ঝাপটাখুঁটিয়ে দেখলে সে ঝাপটার মধ্যে আমার মায়ের রোগা অবয়ব, চেনা শাড়ির চেনা আঁচলের নকশা চোখে পড়বে। ছুটে রান্নাঘর থেকে বাবাকে চা দিতে যাচ্ছেন, ছুটে স্নানে ঢুকছেন, ছুটে রবিকাকুর রিকশায় উঠছেন, ভোঁ দিয়ে দেওয়া ট্রেনকে ছুটতে ছুটতে  হাত দেখিয়ে থামাচ্ছেন, ছোটাছুটি করে অফিসের কাজ করছেন সারাদিন, আবার সাড়ে পাঁচটা বাজলেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুট ছুট ছুট, কাল আমার মান্থলি টেস্ট।

এই দুটো মায়ের মধ্যিখানের আমার যে মা, কলেজে পড়া, কফিহাউসে বসে আড্ডা দেওয়া মা, তাকে আমি অনেক চেষ্টা করেও কল্পনায় আনতে পারি না। সে সময়ের মায়ের একটা ছবি আছে আমাদের অ্যালবামে, সম্ভবত সম্বন্ধ খোঁজার জন্য স্টুডিওতে গিয়ে তোলা হয়েছিল একটা গাঢ় রঙের সিন্থেটিক শাড়ি পরে অসম্ভব শান্ত মুখে আমার মা ক্যামেরার দিকে মুখের বাঁ পাশ ফিরিয়ে বসে আছেন। দেখলে কে বলবে অত শান্ত একটা মেয়ের মাথায় তখন গিজগিজ করছে রাষ্ট্র, সন্ত্রাস, স্বাধীনতার মতো বিটকেল শব্দগুলো, অত নিরীহ মুখের একটা লোক ক্লাস কামাই করে কফিহাউসে পালাচ্ছে, হা হা করে টেবিল চাপড়ে হাসছে, বাড়ির সবার কথা অমান্য করে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মুখ চেয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে ছাই দিয়ে চাকরিতে ঢুকে পড়ছে ভাগ্যিস পারছেনা পারলে আর ক’বছর পরে সেই অফিসেই চাকরি করতে আসা দাড়িওয়ালা চশমাপরা লম্বামতো একটা ছেলের সঙ্গে তার আলাপ হবে কী করে? ছেলেটা দারুণ গান গায়। মেয়েটাও গান গাইতে পারে, তবে ছেলেটার মতো ভালো পারে না তার ক’বছর পর দৃশ্যে আমার প্রবেশ আর আমার মাবাবার জীবন থেকে গান হাওয়াশুরু হবে দৌড়। অফিস সামলে, সংসার সামলে, লোকলৌকিকতা সামলে, মেয়েকে স্কুল আর গানের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার দৌড়।

এই দৌড়ের ছবিটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। সে দেখতে পাওয়ায় আমার স্মৃতির কৃতিত্ব খুবই কম, দেখতে পাওয়ার মূল কারণটা হচ্ছে সেই ছবিটার এক কোণে, উঁহু, মধ্যিখানে আমি আছি। আমাকে ঘিরে ঘুরছে দুটো মানুষের জীবন, আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন। এই ছবিটা দেখতে দেখতে আমি এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে নিজেকে বাদ দিয়ে সে দুটো মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করতে আমার কষ্ট হয়।

কিন্তু সেদিন হল না। ষাটোর্ধ একদল মহিলা কোল্ড কফিতে চুমুক দিতে দিতে হেসে গড়িয়ে পড়ছেন, এর ওর প্লেট থেকে কাটলেটের টুকরো তুলে মুখে পুরছেন, অদৃ্শ্য একটা টাইম মেশিনে চড়ে সেই সময়টায় ফিরে গিয়েছেন যখন আমি কেন, আমার সম্ভাবনাও কোথাও নেই – এই ছবিটা আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। ফোনের এপার থেকেই।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.