November 29, 2015

দ্য মাস্টার অফ গো



সেদিন মেট্রো স্টেশনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পর পর পাঁচখানা খালি মেট্রো নাকের ডগা দিয়ে চলে গেল, ছ'নম্বর ট্রেনটা ঢুকতে দেখলাম ভিড়ের চোটে লোকের নাকের ডগা দরজায় সেঁটে গেছে আর তিন নম্বর কামরার দরজার কোণা থেকে ভিড়ের মাথার ওপর দিয়ে উঁকি মারছে একটা চেনা চশমার ফ্রেম আর ফ্রেমের পাশে টা টা করার ভঙ্গিতে নড়ছে পাঁচটা রোগা রোগা আঙুল। সেটা আমার উদ্দেশ্যেই হবে ধরে নিয়ে আমি আমার লোকাল ট্রেনের প্র্যাকটিস কাজে লাগিয়ে ঠেলেধাক্কিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম, উঠতে না উঠতে আমার ঝুঁটির এক মিমি দূরত্বে দরজাটা খটাস করে বন্ধ হয়ে গেল, আর আমি উচ্চকণ্ঠে "এক্সকিউজ মি এক্সকিউজ মি" চেঁচাতে চেঁচাতে চশমার ফ্রেমের মালিকের পাশে এসে সবে ডানপায়ের গোড়ালিটা রাখার জায়গা করেছি এমন সময় অর্চিষ্মান বলল, "ঠিক করে দাঁড়িয়েছ তো? গুড।" এই না বলে একটা বই দিয়ে নিজের নাকমুখ আবার আড়াল করে ফেলল।
বুঝুন। এতক্ষণ আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য দুঃখপ্রকাশ না, মিষ্টি হাসি না, "হাউ ওয়াজ ইয়োর ডে?" মার্কা ভদ্রতাসুলভ আলাপের কথা তো ছেড়েই দিলাম।
কাজেই বাধ্য হয়ে আমাকে বইখানা কেড়ে নিয়ে দেখতে হল যে কী এমন জরুরি ব্যাপার লেখা আছে তাতে। আর তখনই আমি নামটা প্রথম দেখলাম। দ্য মাস্টার অফ গো।
মাস্টার? অফ গো? এ কেমন বই, নামেই ব্যাকরণের ভুল করে রেখেছে? এতক্ষণের জমে থাকা বিরক্তিটা প্রকাশ হয়ে পড়ল। আর অমনি সুযোগ পেয়ে অর্চিষ্মান বলে উঠল, "ছি ছি, গো বলে একটা খেলা হয় তাও জানো না? চিন দেশে আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই বোর্ড গেমের আবিষ্কার। ইতিহাসে এর প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া গেছে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে। আর তুমি কি না এই দুহাজার পনেরোতে দাঁড়িয়ে বলছ গো কী বস্তু তুমি জান না?
ততক্ষণে লাজপত নগরে লোক নেমে মেট্রো খালি হয়ে গেছে। আমি দরজার পাশের জায়গাটায় দু'পায়ের ফাঁকে ব্যাগ নামিয়ে রেখে আরাম করে দাঁড়িয়ে বললাম, "বাজে বোকো না। তুমিও জানতে না গো খায় না মাথায় দেয়। এই বইটা অর্ডার দেওয়ার সময় উইকিপিডিয়া থেকে জেনেছ।"
ধরা পড়ে গিয়ে অর্চিষ্মান হাসতে লাগল, আর বিষাক্ত পার্টিকল ম্যাটারে ছয়লাপ দিল্লির কুয়াশা ভেদ করে দিগন্তে লোটাস টেম্পল পদ্মের মতো ফুটে উঠল।
খেলাধুলো নিয়ে পৃথিবীতে শিল্পসাহিত্য কম হয়নি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে রয়েছে জাপানি লেখক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা-র উপন্যাস 'দ্য মাস্টার অফ গো'। উপন্যাস হলেও 'দ্য মাস্টার অফ গো'-র ঘটনা একেবারে ঘোর বাস্তব। উনিশশো আটত্রিশ সালের 'গো' খেলার একটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে এই বইটি লিখেছিলেন ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা। ঊনচল্লিশ বছর বয়সী কাওয়াবাতা তখনই জাপানের রীতিমত নামকরা লেখক। লেখক হওয়ার পাশাপাশি কাওয়াবাতা ছিলেন একজন বিশিষ্ট 'গো'অনুরাগী। ওই ম্যাচটির গুরুত্বের কথা মনে রেখে 'ওসাকা' এবং ' টোকিও' নামের দুটি কাগজ তাঁকে ওই খেলাটির ধারাবিবরণী লেখার বরাত দেয়। চার বছর পর উনিশশো আটত্রিশ সালে মাষ্টার শুসাইয়ের মৃত্যুর পর কাওয়াবাতা তাঁর বিবরণী মাজাঘষা করে একটি সাময়িক পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে ছাপেন। তারও পরে উনিশশো চুয়ান্ন সালে বইয়ের আকারে প্রকাশ পায় 'দ্য মাস্টার অফ গো'। উনিশশো আটষট্টি সালে কাওয়াবাতা সাহিত্যে নোবেল পান। উনিশশো বাহাত্তর সালে ইংরিজিতে অনুবাদ হয় 'দ্য মাস্টার অফ গো'।
বইটা নিয়ে আর কিছু বলার আগে 'গো' খেলাটা সম্পর্কে লেখকের উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি। তাহলে অবান্তরের পাঠকদের মধ্যে আমার মতো যদি কেউ থেকে থাকেন, যিনি 'গো' খেলার অস্তিত্ব জানতেন না, তাঁর সুবিধে হবে। (যদিও 'দ্য মাস্টার অফ গো'-র রসাস্বাদনের জন্য 'গো' খেলাটা জানার কোনও দরকার নেই, কেন সেটা পরে বলছি।)
The game of Go is simple in its fundamentals and infinitely complex in the execution of them. It is not what might be called a game of moves, as chess and checkers... The object is to build up positions which are invulnerable to enemy attack, meanwhile surrounding and capturing enemy stones.
'দ্য মাস্টার অফ গো' শুরু হচ্ছে মাস্টার শুসাই-এর মৃত্যুসংবাদ দিয়ে। মাষ্টার শুসাই ছিলেন জাপানের 'গো' খেলার প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ হোনিনবো ঘরানার একুশতম মাস্টার বা মেইজিন। উনিশশো ছত্রিশ সালে তিনি নিজের 'হোনিনবো' মুকুট উত্তরাধিকারীর মাথায় তুলে দিয়ে অবসর নেন। এবং দু'বছর পর উনিশশো আটত্রিশ সালে একটি 'রিটায়ারমেন্ট গেম' খেলতে ফিরে আসেন। সেই খেলায় মাস্টারের চ্যালেঞ্জার ছিলেন মিনোরু কিতানি, ঊনত্রিশ বছরের এক উদীয়মান প্রতিভা। উনিশ বছর বয়সে একটি 'উইন অ্যান্ড কনটিনিউ' নকআউট গেম-এ পর পর দশজন বাঘাবাঘা গো-খেলোয়াড়কে পরাস্ত করে যিনি 'প্রডিজি' হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন।
আড়াইপাতার সংক্ষিপ্ত প্রথম পরিচ্ছেদের পর 'দ্য মাস্টার অফ গো'র দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শুরু হচ্ছে খেলার ফলাফল দিয়ে। 'গো' খেলার অবিসংবাদিত নায়ক, হোনিমবো ঘরানার একুশতম মেইজিন শুসাই, তাঁর জীবনের শেষ পেশাদার খেলায় তরুণ প্রতিপক্ষের কাছে পরাজিত হয়েছেন।
বুঝতে পারছেন, দ্য মাস্টার অফ গো-তে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার অবকাশ নেই। খেলায় কে জিতবে, কে হারবে, এমনকি খেলার শেষে কে মরবে (নিতান্ত স্বাভাবিক মৃত্যু) সবই আগে থেকে ফাঁস করে বসে আছেন লেখক। সাহিত্যিক পরিচর্যার সামান্য আড়াল সরিয়ে নিলে এ লেখা একেবারেই প্রতিবেদনমূলক। উনিশশো আটত্রিশ সালের ছাব্বিশে জুন থেকে চৌঠা ডিসেম্বর পর্যন্ত ছ'মাস ধরে, জাপানের তিনটি শহরে ঘুরে ঘুরে চলা একটি ঐতিহাসিক খেলার ধারাবিবরণী লিখেছেন গল্পের সাংবাদিক উরাগামি, বাস্তবের কাওয়াবাতা। (গল্পে মাত্র দুটি তথ্য বদলেছিলেন কাওয়াগাতা। নিজের নাম আর মাস্টারের প্রতিপক্ষের নাম। নিজে হয়েছিলেন 'উরাগামি', বাস্তবের মিনোরু কিতানি-কে করে দিয়েছিলেন ‘ওটাকে’।) এই ছ'মাসব্যাপী খেলার সঙ্গে বদলে যাওয়া প্রকৃতির, খেলোয়াড়দের বদলে যাওয়া শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বর্ণনাও যেমন আছে সে প্রতিবেদনে, তেমনি আছে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ চালের বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ। তার সঙ্গে সঙ্গে আছে পাতায় পাতায় গো বোর্ডের ছবি।
যদিও 'দ্য মাস্টার অফ গো'র রসাস্বাদনের জন্য সে সব ডায়াগ্রাম বোঝার কোনও দরকার নেই। ঠিক যেমন দরকার নেই চক্ দে ইন্ডিয়া দেখতে যাওয়ার জন্য হকি খেলা জানার। কিংবা কোনি পড়ার জন্য চিতসাঁতার দিতে পারার। কারণ সুইমিং পুল, সুইমিং কস্টিউম, সাঁতারের ক্লাবের পলিটিক্স, সাঁতারের কোচ, সাঁতারের প্রতিযোগিতা আর সাঁতারুদের নিয়ে লেখা হলেও সবাই জানে 'কোনি' আসলে সাঁতারের গল্প নয়। ঠিক তেমনই ‘দ্য মাস্টার অফ গো’-ও আসলে কেবল এক শতাব্দী প্রাচীন বোর্ড গেমের গল্প নয়। তার থেকে অনেক বেশি কিছু।
'দ্য মাস্টার অফ গো'র ইংরিজি অনুবাদক এডওয়ার্ড সাইডেনস্টিকারের মত হচ্ছে যে 'দ্য মাস্টার অফ গো'র ঘটনাপ্রবাহ তৎকালীন জাপানের ললাটে ঘনিয়ে আসা ঘটনাপ্রবাহের ইঙ্গিতসূচক। উনিশশো আটত্রিশ সালে যখন মাস্টার শুসাই জীবনের শেষ খেলা খেলতে বসেছেন তখন জাপানের সমাজ আর রাজনীতিতেও একটা গুরুতর সময় আসতে চলেছে। যুদ্ধ শুরু হল বলে। বিশ্বরাজনীতির আকাশে ঘনিয়ে আসছে মেঘ। তার ছায়া পড়েছে জাপানের আকাশে। আর কয়েকবছরের মধ্যে সে মেঘের ছায়া ফুঁড়ে নেমে আসবে লিটল বয়। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে হিরোশিমা নাগাসাকি, বদলে যাবে জাপানের সমাজরাজনীতির গতিপথ। ধ্বংসস্তুপ থেকে যে জাপান উঠে দাঁড়াবে, আকৃতিপ্রকৃতিতে সে সম্পূর্ণ নতুন। প্রাচীন জাপানের সঙ্গে চিন্তাভাবনায় চলনগমনে তার কোনও মিলই থাকবে না।
উৎস গুগল ইমেজেস

কাওয়াবাতার চোখে 'গো' বোর্ডের দু'দিকে বসে থাকা দুই প্রতিপক্ষ এই দুই জাপানের প্রতীক। নবীন ওটাকে সেই আসন্ন আধুনিকতার ঝড়, যার সামনে শেষ প্রতিরোধ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধ মাস্টার শুসাই। দু'জনের মাঝখানে 'গো' বোর্ডে পাথরের ঘুঁটির সজ্জা বদলাচ্ছে, কিন্তু কাওয়াবাতা মানসচক্ষে দেখছেন আসলে বদলাচ্ছে জাপানের আত্মপরিচয়।
এই দ্বৈরথে কাওয়াবাতা একেবারে নিরপেক্ষ প্রতিবেদক ছিলেন না। বয়সের দিক থেকে নবীন খেলোয়াড় ওটাকে-র কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও মনেপ্রাণে তিনি ছিলেন মাস্টার শুসাই-এর অনুরাগী। মাষ্টার শুসাই যে সময়ের প্রতিনিধি সেই সময়ের রীতিনীতির অন্ধ সাপোর্টার। এতদিন ধরে যা চলে এসেছে কাওয়াবাতা ছিলেন তার পক্ষে। প্রচলিত চলন যতই গোলমেলে হোক না কেন, তাতে একটা অভ্যেসের আরাম থাকে। আরও অনেকের মতোই কাওয়াবাতা সে আরাম থেকে বেরোতে চাননি। তার মধ্যে যতই অন্যায় অসাম্য থাক না কেন। তিনি লিখেছেন,
It may be said that the master was plagued in his last match by modern rationalism, to which fussy rules were everything, from which all the grace and elegance of Go as art had disappeared, which quite dispensed with respect for elders and attached no importance to mutual respect as human beings. from the way of Go the beauty of Japan and the Orient had fled. Everything had become science and regulation. the road to advancement in rank, which controlled the life of a player, had become a meticulous point system. one conducted the battle only to win, and there was no margin for remembering the dignity and the fragrance of Go as an art. the modern way was to insist upon doing battle under conditions of abstract justice, even when challenging the master himself. the fault was not Otaké's. perhaps what had happened was but natural, Go being a contest and a show of strength.

গোটা বইটা জুড়ে কাওয়াবাতার এই অযৌক্তিক একচোখোমি এতই প্রকট যে তাঁর এবং তাঁর গুরুদেব মাস্টার শুসাই-এর প্রতি মমতা বজায় রাখা শক্ত হতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে গোটা ব্যাপারটা যে অসম্ভব করুণ সেটাও অস্বীকার করার উপায় নেই। সেই যে রবীন্দ্রনাথ লিখে গিয়েছিলেন, "যে একেবারে চলিয়া যাইতেছে তাহাকে মাপ করিতে পারে না, এমন কঠিন মন অল্পই আছে।" এখানেও সেই একই ব্যাপার। মাস্টার শুসাই একেবারেই হেরে যাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এতদিনের প্রতিষ্ঠা, বোধ, সংস্কারের সলিলসমাধি আসন্ন জেনেও তিনি আরেকবার যুদ্ধের শেষ না দেখে ছাড়ছেন না, সে জন্য কোথাও তাঁর জন্য মনের কোণে শ্রদ্ধা না জন্মিয়েও পারা যায় না। সে শ্রদ্ধা যতই করুণামিশ্রিত হোক না কেন।



উৎস গুগল ইমেজেস



November 28, 2015

সাপ্তাহিকী






এবারে নারীবাচক শব্দগুলোর দিকে তাকাই। একটু ব্যুৎপত্তির দিকে যেতে হবে, একটু সহ্য করবেন এই অনুরোধ। অঙ্গনা, রমণী, কামিনী, ললনা, প্রমদা, যোষা, যোষিৎ, বনিতা কত নামই তো আছে নারীর। কিন্তু নারী হিসেবেই নারীর মর্যাদা সেখানে নেই। 'অঙ্গনা' শব্দে অঙ্গসৌষ্ঠবের আকর্ষকতাই বড়। 'রমণী' তো রমণেরই ইঙ্গিতবাহী (রমণে রমণী মরে কোথাও না শুনি - কবিকঙ্কণ)। 'কামিনী' - কম্ ধাতুজ, কামনারই ধন, ব্যাখ্যা করা হয়েছে অত্যন্ত কামুকী হিসেবে (কামিনী দেখিয়া কামে হইল বিভোল - কাশীরাম)। 'ললনা' মানে বিলাসিনী - পুরুষকে যে লুব্ধ করে ছলাকলায় (লালয়তি পুমাংসম্‌)। 'প্রমদা'য় আছে মাদকতার অর্থ। 'যোষা' 'যোষিৎ' ললনার অর্থবাহী। 'স্ত্রী' শব্দে গর্ভধারণের ব্যাপারটাই বড়। স্তৈ ধাতু এর মূলে, স্ত্যায়তে শুক্র শোণিতে য়ম্যাস্‌ (শুক্রশোণিত যাতে কাঠিন্য পায়)। লাতিন sator-এর সঙ্গে 'স্ত্রী'র উচ্চারণসাম্য লক্ষণীয়। লাতিন শব্দটির অর্থ begetter। স্ত্রী-বাচক 'দার' শব্দটির মূল অর্থ ('দার' পুংলিঙ্গ শব্দ) কৃষ্টভূমি। নারীও ভূমিকল্পা, বীজ-বপনে সন্তান-শস্য-উৎপাদিকা। একটা মনগড়া ব্যাখ্যা পাওয়া যায় - দারয়ন্তি ভ্রাতৃন্‌ ইতি দারাঃ অর্থাৎ ভাইদের যারা বিচ্ছিন্ন করে দেয় তারাই 'দার' - পদবাচ্য। কী অবমাননাকর কল্পনা। 'ভগিনী' শব্দটি (ভগযুক্তা) সরাসরি স্ত্রীচিহ্ন-ইঙ্গিতবাহী বলে ধরেন অনেকে। আলংকারিক-কবি দণ্ডী তো ভগিনী শব্দটিকে জুগুপ্সাব্যঞ্জক বলেছেন, সাহিত্যে শব্দটির ব্যবহার থেকে বিরত থাকতেও বলেছেন - 'ভগিনী-ভগবত্যাদি গ্রাম্যকক্ষাং বিগাহতে'। 'কন্যা'র মতো একটি শব্দেও দেখি কামনার গন্ধ। মহাভারতে ব্যাসদেবের ব্যাখ্যা - সর্বান্‌ কাময়তে যস্মাং ৩.৩০৬.১৩। তার মানে 'কন্যা' মানে 'কাম্যা'। 'কন্‌' আর 'কম্‌' কুটুম্ব-ধাতু। নারীবাদীরা যদি প্রতিবাদী হন ইংরেজ মহিলাদেরও সঙ্গে পেতে পারেন, কারণ woman, mistress, madam কোনওটিরই ইতিহাসই ভাল নয়। woman আসলে wifeman অর্থাৎ নারীর স্বতন্ত্র পরিচয় নেই, তার পরিচয় কারও স্ত্রী হিসেবেই। mistress আসলে ছিল অবৈধ প্রেমিকা, বর্তমান অর্থে আসতে বেশ সময় নিয়েছে। madam (ma dame=my lady) আগে স্ত্রীলোকের প্রতি প্রণয় সম্বোধন হিসেবেই চলত, চসার-এর সময়েও তার অর্থের অবনতি ঘটেনি। Restoration আমলে ১৬৬০ সাল থেকে শব্দার্থের অবনতি ঘটে, অর্থ দাঁড়ায় বেশ্যাবাড়ির মালকিন, অর্থাৎ আমরা যাকে 'মাসি' বলি। এখন অবশ্য শব্দটির অর্থোৎকর্ষ ঘটেছে।

এতক্ষণ যা বললাম তা নিছক পরিহাসবিজল্পিতং নয়। শব্দের মধ্যে সামাজিক মনোভাবটি যথার্থই ধরা আছে। শব্দ তো মনেরই দর্পণ।
---জ্যোতিভূষণ চাকী, বাগার্থকৌতুকী


উনিশশো ষোল সালের এক ডকুমেন্টে প্রথম এক লিটারেরি ক্লিনিকের উল্লেখ পাওয়া গেছে, যেখানে বিবলিওথেরাপি-র মাধ্যমে আর্তকে সেবা করা হয়। আমি মোটামুটি নিশ্চিত তার আগেও এ থেরাপি ছিল, তবে হয়তো সেটার কোনও নাম ছিল না। আমি আরও বেশি নিশ্চিত যে এ থেরাপি আরও অনেকদিন ধরে অনেক মানুষকে সুস্থতার খোঁজ দেবে।

জানালা দিয়ে মেঘ আমরা সকলেই দেখি। মেঘের মধ্যে ভালুক, উট, রেলগাড়ি, ক্লাসটিচারের খোঁপা - সেও অনেকেই দেখতে পায়। কিন্তু এসব দেখতে দেখতে তাদের গোত্রবিচার করার কথা বেশি লোকে ভাবে না। সেই বিরল লোকদের মধ্যে একজন ছিলেন লুক হাওয়ার্ড। তাঁর সম্পর্কে জানতে হলে ভিডিওটা দেখতে পারেন।

অস্বীকার করার কোনও জায়গাই নেই। নিজের জীবন দিয়ে জানি। People Who Live Alone Have Pretty Terrible Diets.

মাঝে মাঝে মনে হয় মৃত্যুর থেকেও ভয়ের যদি কিছু থেকে থাকে তবে তা হল অন্তর্ধান। হারিয়ে যাওয়া। ইতিহাসের বিখ্যাত কয়েকটি অন্তর্ধান রহস্যের কথা জানতে হলে ক্লিক করুন।

ম্যাগো।

ক্যামেরা রাখুন, খাতা পেনসিল ধরুন। কথাটা ভালো, তবে কানে গেলে হয়।

পাখির চোখে চিন।

কী দেখছেন সেটা কথা নয়। কে দেখছে সেইটাই কথা। আবারও তার প্রমাণ পাঠিয়েছেন সাপ্তাহিকীর পরম বন্ধু সুতীর্থ।

এরা যদিও ফিজিক্সের সেমিনার নিয়ে হেসেছে, তবে একটু ঘুরিয়েফিরিয়ে নিলে এই একই হাসি ইকনমিক্সকে নিয়েও হাসা যায়। লিংক পাঠিয়েছে হীরক।

সাপ্তাহিকীর শুরুতে সাইলেন্ট ফ্রেন্ডসদের কথা দিয়ে সাপ্তাহিকী শুরু হয়েছিল, শেষে আরেকরকম ফ্রেন্ডসদের কথা বলা যাক। এরা সাইলেন্ট নয়, কিন্তু ফ্রেন্ড নিসন্দেহে। কী করে বুঝলাম? কারণ এদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ করারও দরকার পড়ে না, স্রেফ ছবি দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। নিজেই পরীক্ষা করে নিন।

এ সপ্তাহের গান।
 

November 27, 2015

থ্যাংকসগিভিং ২০১৫



আমি থ্যাংকফুল . . .

ভালোমন্দ, উচিতঅনুচিত, সততাঅসততা, আয়, ব্যয়, সঞ্চয়ের প্রতি একই রকম দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন, যে মাসের ক্রেডিট কার্ডের বিল সে মাসেই শোধ করার জন্য একইরকম প্যানিকগ্রস্ত, চায়ের প্রতি একই রকমের নেশাগ্রস্ত এবং অন্যান্য নেশার প্রতি একইরকম উদাসীন জীবনসঙ্গীর জন্য।

রান্নাঘরে ইলেকট্রিক কেটলি আর টি ব্যাগের জন্য।

জীবনের প্রথমদিককার বোকাবোকা প্রেমগুলো ভেঙে যাওয়ার জন্য। সেগুলো হওয়ার জন্য।

খাওয়াপরা নিয়ে কোনওদিন কষ্ট না পাওয়ার জন্য।

এই পৃথিবীর রূপরসগন্ধ উপভোগ করার মতো পাঁচটি কর্মক্ষম ইন্দ্রিয়ের মালিক হওয়ার জন্য।

আত্মবিশ্বাসী মায়ের জন্য। ভ্রমণবিলাসী বাবার জন্য।

দাদু, ঠাকুমা, পিসি, কাকুপরিবৃত শৈশবের জন্য।

সবাইকে ছেড়ে একা থাকতে শেখার জন্য।

রোজ সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা জায়গায় গিয়ে সারাদিন কাটাতে পারার জন্য। সে জন্য মাসের শেষে মাইনে পাওয়ার জন্য।

অনলাইন ব্যাংকিং-এর জন্য।

মোবাইলে ইন্টারনেটের জন্য। ভালো কোয়ালিটির হেডফোনের জন্য। অফিসে, বাড়িতে, মেট্রোয় বসে নিমেষে বাকি দুনিয়ার সঙ্গে সমস্ত সংযোগ ছিন্ন করতে পারার জন্য।

কোনওদিন কোনও খরা, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর, ভূমিকম্প বা যুদ্ধের মাঝখানে পড়তে না হওয়ার জন্য।

প্রায় তিরিশ ছুঁইছুঁই বয়সে পৌঁছে একটা ভালোলাগার কাজ খুঁজে পাওয়ার জন্য। গত ছ'বছর ধরে সে কাজটা একনাগাড়ে করে যাওয়ার জন্য। আর সেটা সম্ভব করায় যাদের ভূমিকা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, সেই আপনাদের জন্য।





November 24, 2015

বিয়েবাড়িতে গিয়ে আমি যে সাতটা জিনিস জানলাম




১। গন্ধে যেমন অর্ধেক খাওয়া হয়, তেমনি জায়গার নাম শুনলে/পড়লেও অর্ধেক বেড়ানো হয়। অন্তত রাঁচি এয়ারপোর্টে নেমে ট্যাক্সির দোকানের গায়ে টাঙানো রেটচার্ট দেখে আমাদের সে রকমই মনের ভাব হল। চিনি চিনি! চাইবাসা, গিরিডি, ডালটনগঞ্জ, হাজারিবাগ, পাতরাতু। আঠেরো বছর বয়সে জীবনের প্রথম চাকরি নিয়ে আমার বাবা এই পাতরাতুতেই এসেছিলেন। ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঝাড়খণ্ড আমাদের টু গো লিস্টের মাথায় চড়ে বসল।

ওই দেড়দিনে এয়ারপোর্ট, হোটেল আর বধূমাতার বাড়ি যেতে আসতে যেটুকু চোখে পড়েছে, তাতেই রাঁচি শহরটা আমাদের পছন্দ হয়েছে বেশ। শান্তশিষ্ট, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। বিরসা মুন্ডা-র স্মৃতিতে ছয়লাপ। এয়ারপোর্ট, স্টেডিয়াম, রাস্তা, রাস্তার মোড়ে বিরাট কে এফ সি-র পাশে মুখচোরা টেলারিং শপ, সর্বত্রই বীর বিরসা-র নাম জ্বলজ্বল করছে।

২। ছড়া বলা স্টেজের আমিকে মনে রাখার মতো লোক এখনও এই পৃথিবীতে আছে। যেমন ম-মাসি। মাসি বললেন, “সোনা যখন ছোট ছিল, ‘একটা ছড়া বল তো সোনামণিবললেই গড়গড়িয়ে ছড়া বলতে শুরু করত।এই কথাটা একটু ঘুরিয়েফিরিয়ে অনেকেই অবশ্য আমাকে বলেছে। ছড়া বলতে বললেই সোনা ছড়া বলে, গান গাইতে বললেই গান গায়। কোনও প্যাকনা নেই। স্টেজ ফ্রাইট না আরও কী কী সব ভয়ানক শক্ত শক্ত ব্যারাম থাকে লোকের, সে সব কিচ্ছু নেই। আমি অবশ্য জানি আমার এই স্বভাবের পেছনে এইনেইগুলো যত না ইম্ররট্যান্ট তার থেকে বেশি ইম্পরট্যান্ট একটাআছেহাততালির জন্য হন্যে হয়ে থাকা ভাবটা। এখনও আছে, তখনও ছিল। হাততালি দেবে জানলে বলা যায় না, কোনওদিন হয়তো ডিগবাজি খেয়েও দেখাতে পারি। ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায়। সে যাক। মাসি বললেন আমার বলা একটা ছড়াও নাকি মাসির মনে আছে।বাড়ি আমার ভাঙন ধরা অজয় নদীর বাঁকে/ জল যেখানে সোহাগ ভরে স্থলকে ঘিরে রাখে।দুঃখের বিষয়, এই দুলাইনের পরেরটুকু আমার নিজেরই আর মনে নেই। মন খারাপ ডবল।

৩। একসময় জানতাম পৃথিবীতে চাল হয় শুধু দুই প্রকার। সেদ্ধ, যেটা আমরা খাই, আর আতপ, যেটা ঠাকুমা খায়। তারপর জানলাম বাসমতী আর গোবিন্দভোগ। আর দেরাদুন রাইস। এই বিয়েবাড়িতে গিয়ে শুনলাম চালের রকমের শেষ নেই। কালোজিরে, দুধের সর আর রাঁধুনিপাগল। শেষের চালটা হাতের কাছে পেলে পাগল হওয়ার একটা শেষ চেষ্টা করে দেখব ভেবে রেখেছি।

৪। ভোজরাজের ঢিপির গল্পটা মনে আছে নিশ্চয়। কালের খেয়ালে ভোজরাজের রাজ্য, রাজবাড়ি সব মাটির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল, সিংহাসনটা যেখানে চাপা পড়েছিল সেখানটা উঁচু হয়ে একটা ঢিপির মতো হয়েছিল। চেহারায় সে ঢিপি আর পাঁচটা গেঁয়ো ঢিপির মতোই তবে ভোজরাজের সিংহাসনের সৎসঙ্গ করে করে তার চরিত্রে বিস্তর বৈশিষ্ট্য জন্মেছিল। সে ঢিপির ওপর যেই চড়ত তার মধ্যেই বিবিধ রজোগুণের প্রকাশ ঘটত। মানে ধরুন বোকাহাঁদা চাষির ছেলে ছাগল চরাতে এসেছে, যেই না ঢিপির ওপর চড়ে গামছা পেতে শোওয়ার উপক্রম করেছে অমনি তার মাথায় বুদ্ধির ঢেউ খেলেছে। ঢিপিতে বসে বসে সে তার সমস্ত বন্ধুর সমস্যার সমাধান করে দিত, দুঃস্থকে সান্ত্বনা দিত, দোষীকে শাস্তি দিত, ঝগড়া মেটাত। কিন্তু ঢিপি থেকে নেমে এলেই আবার যে কে সেই। বুদ্ধি সব বাষ্প হয়ে উড়ে গিয়ে আবার গেঁয়ো চাষা।

বিয়ের সিংহাসনও অনেকটা ভোজরাজের ঢিপির মতো। পাগলের মতো সেজে সে সিংহাসনে দুসন্ধ্যে চড়ে থেকে আপনি স্মিতহাস্যে তাকিয়ে থাকবেন, আপনার চোখের সামনে দিয়ে সুবেশা সুগন্ধী মানুষেরা সারি দিয়ে চলে যাবেন, আপনার হাতে অনেক মাথা খাটিয়ে কিনে আনা উপহার তুলে দেবেন, বাড়ির কেউ দাঁড়িয়ে এসে তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন। নমস্কার, প্রতিনমস্কার, থ্যাংক ইউ, আহা এর আবার কী দরকার ছিল, সবই চলবে ছবির মতো করে।

কিন্তু একবার সিংহাসন থেকে নেমে আসুন, সব ধোঁয়া। পরের বার দেখা হলে আপনি এঁদের একজনেরও মুখ মনে করতে পারবেন কি না সন্দেহ। নাম কী, কোথায় থাকে, কে কার পিসের জামাই, মেসোর নাতি, সাতাশজন বাপ্পা আর সাঁইত্রিশজন মৌ-এর কে কোন তরফের --- সব আবার কেঁচে গণ্ডূষ করতে হবে। আর তখন যদি কেউ বলেন, "সেকী বিয়ের দিন গিফট দেওয়ার সময় সব বুঝিয়ে বলেছিলাম তোতখন দাঁত বার করে হাসা ছাড়া উপায় নেই।

এই সব কথা মনে করে আমি আর নতুন বউয়ের সঙ্গে আলাপ করতে উৎসাহ দেখাইনি। তাছাড়া স্টেজে যা ভিড়। ওদিকে না গিয়ে আমি প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে শরবৎ আর চিকেন বলস্‌ আর ফ্রুট চাট খেয়ে খিদে বাড়াচ্ছিলাম। শেষটা ভাইয়ের ডাকাডাকিতে একবার ছবি তুলতে যেতে হল। গিয়ে বধূমাতার কানে কানে বলে এসেছি, এখন আমি কে সেটা বললে তোমার মনে থাকবে না, পরে একদিন আরাম করে বসে আলাপ করব।

৫। রাঁচিতে হোটেলের সিঁড়িতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভালো দেখতে মহিলার পিঠে টোকা দিয়ে বললাম, “সোনাদিদি (আমাদের বাড়িতে শিশুদের নাম রাখার ক্ষেত্রে কল্পনার দৈন্য চোখে পড়ার মতো), চিনতে পারছ?” তিনি মহা বিরক্ত মুখে আমার দিকে ফিরেই চোখ কপালে তুলে দুহাত মুখে চাপা দিয়ে, “ও মা গো, এই ছোট-মণিপিসিটা কোত্থেকে এল গো?” বলে আর্তনাদ করে উঠলেন। তারপর যতবার তাঁর সঙ্গে দেখা হল তিনি একে একে আবিষ্কার করতে লাগলেন যে আমার মুখ মণিপিসির মতো, হাত মণিপিসির মতো, এমনকি আমার কথা বলার ভঙ্গিও নাকি অবিকল মণিপিসির মতো। শুনে আমার খুবই আহ্লাদ হল। কারণ হাতে গোনা দুয়েকটা ব্যাপার বাদ দিলে, মায়ের মতো হওয়াই আমার জীবনের লক্ষ্য। আবার কষ্টও হল একটু একটু। নাকচোখ তো বুঝলাম, উদ্যম, ইচ্ছাশক্তি, কর্মক্ষমতা ইত্যাদি ভালো ভালো জিনিসগুলো যে কবে মণিপিসির মতো হবে ভগবানই জানেন। অ্যাকচুয়ালি, আমিও জানি। এই পঁয়ত্রিশেও যখন হয়নি, আর হবে না।


৬। একমাত্র বাড়ির জানালার বাইরেই এখনও এমন রোদ ওঠে। বাড়ির পর্দা উড়িয়েই এমন হাওয়া দেয়। জগদ্ধাত্রী পুজোর ঢাক, সাইকেল চাপা ফেরিওয়ালারপুঁটি মাছ চাই পুঁটি মাছচিৎকার, ঊষা কোম্পানির পুরনো ফ্যানের আওয়াজ মিলিয়ে মিশিয়ে অতখানি নিস্তব্ধতা তৈরি হয় একমাত্র বাড়ির দুপুরেই

৭। পাঁচদিনের মধ্যে দুটো বিয়েবাড়ি + পাটুলির মোড়ের ‘চাওম্যান’ দোকানের কাঁকড়ার ঝোল আর চিলি শ্রিম্প আর বার্ন্ট গারলিক ফ্রায়েড রাইস সামলে পোস্তর বড়া, কিশমিশ দেওয়া ঘন দুধের পায়েস, চুনো মাছের চচ্চড়ি, ল্যাটা মাছের ঝোল, তেল কই, সর্ষে দেওয়া শিম, পাঁঠার মাংস হজম করা যায় একমাত্র বাড়ির ডাইনিং টেবিলে বসেই। এসবের ওপর গাছ থেকে পাড়া নারকেলের নাড়ুও যদি থাকে তাহলে একটু সমস্যা হলেও হতে পারে। তবে তারও সমাধান আছে, শিশিতে পুরে দিল্লি নিয়ে এলেই হবে।


November 18, 2015

নোটিস






যদিও আজকাল বিনানোটিসে হাপিশ হওয়ার বদঅভ্যেস অবান্তরের মালিকের চরিত্রে বেশ জেঁকে বসেছে, তবু সেটার প্রতিকারের চেষ্টায় এই পোস্ট। এই পোস্ট আপনারা যখন পড়বেন তখন আমরা ওলাক্যাব চেপে এয়ারপোর্টের দিকে ছুটেছি, গন্তব্য রাঁচি, উপলক্ষ্য আমার মামাতো ভাইয়ের বিয়ে। মামাবাড়ির দিকে আমাদের প্রজন্মে এই শেষ বিয়ে, কাজেই এ বিয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম। রাঁচি থেকে বিয়ে খেয়ে শতাব্দী চেপে কলকাতায় বৌভাত খেয়ে দিল্লি ফিরতে ফিরতে সেই রবিবার গভীর রাত।

কাল সন্ধ্যে পর্যন্তও আমি নিশ্চিত ছিলাম যে এই পোস্টটা লেখার আমার দরকার পড়বে না। আমি এও নিশ্চিত ছিলাম যে যাওয়ার আগে দুটো পোস্ট আমি শেডিউল করে রেখে যেতে পারব। একটা বই রিভিউ বৃহস্পতিবার বেরোবে, আরেকটা সাপ্তাহিকী শনিবার। রবিবার রাতে ফিরে এসে না ঘুমিয়ে আরেকটা পোস্ট লিখে সোমবার সকালে সেটা ছেপে দিলে কেউ টেরই পাবে না যে আমি আদৌ ঠাঁইনাড়া হয়েছি।

এখন আপনারাও নিশ্চয় নিশ্চিত হয়ে গেছেন যে আমার জীবনের বেশিরভাগ ফুলপ্রুফ প্ল্যানের মতোই এই প্ল্যানটাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাই বুক রিভিউ মাঝপথে বন্ধ রেখে এই নোটিস লিখতে বসেছি। জানালার বাইরে ঘোর অন্ধকার, ছটপুজো উদযাপক বোমা ফাটছে দূরে অনবরত। দেওয়ালের ওপারে আমার মতোই শেষরাতে ওঠা বাড়িওয়ালির নড়াচড়ার শব্দ পাচ্ছি। ল্যাপটপের ডানপাশে অফিসের নোটবুকের খোলা পাতায় লেখা লিস্টের বেশিরভাগ আইটেেমের পেট কাটা হয়ে গেছে। খালি টুথব্রাশ, ফোন, চার্জার ইত্যাদি যেগুলো আজ সকালে ব্যাগে ঢোকাতে হবে সেগুলো ছাড়া।

ল্যাপটপটাও সঙ্গে যাচ্ছে। বইয়ের রিভিউটা শেষ করে ফেরার ইচ্ছে আছে। অনুবাদ করার মতো একটা জম্পেশ গল্পও পেয়েছি। বিয়েবাড়িতে হল্লা করার মাঝে মাঝে দুটো পোস্টই শেষ করে ফেলব। অন্তত সেরকমই প্ল্যান।

আলো ফুটেছে পর্দার ওপারে। বোমার আওয়াজও ফিউ অ্যান্ড ফার বিটউইন। সকালে লোকের ঘুম এমনিই ভেঙে যায় কিনা,  বোমা ফাটিয়ে ঘুমন্ত মানুষের হার্ট অ্যাটাক হওয়ানোর মস্তিতে ভাঁটা পড়ছে। আমিও আসলাম। কপাল ভালো থাকলে সোমবারের আগেই, ভালো না থাকলেও সোমবার দেখা হচ্ছেই। ততদিন আপনারা সবাই ভীষণ ভালা থাকবেন, আনন্দে থাকবেন, অবান্তরকে মিস করবেন।

টা টা বাই বাই, আবার যেন দেখা পাই।


November 16, 2015

কুইজঃ শেষ লাইন (উত্তর প্রকাশিত)



উৎস গুগল ইমেজেস


আজকের কুইজ বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত শেষ লাইনদের নিয়ে। যাদের দেখে আপনাকে রচনা এবং রচয়িতাকে চিনতে হবে।

কেউ যদি চুলচেরা বিচার করতে চান তাহলে নিচের দুয়েকটা লাইন আক্ষরিক অর্থে শেষ লাইন নয়। কারণ তার পরেও পরিশিষ্ট বলে একটা চ্যাপ্টার ছিল। তবে পরিশিষ্টর শেষ লাইনগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইন্টারেস্টিং হয় না, তাই আমি তাদের ধরিনি। সে জায়গায় নিচের লাইনগুলো প্রত্যেকটাই ইন্টারেস্টিং এবং স্মরণীয়। আমার তো অনেক ক্ষেত্রে শুধু এই লাইনগুলোই মনে আছে, বাকি গল্পটা ভুলে মেরে দিয়েছি।

নিয়ম সেই আগের মতোই। তবে এতদিনের অনভ্যাসে যদি কেউ ভুলে গিয়ে থাকেন তবে আবার মনে করিয়ে দিই। খেলা চলবে চব্বিশ ঘণ্টা ধরে। অর্থাৎ উত্তর বেরোবে দেশে মঙ্গলবার িকেল পাঁচটায়। ততক্ষণ কমেন্ট পাহারা দেব আমি।

অল দ্য বেস্ট।

*****

বিসর্জ্জন আসিয়া প্রতিষ্ঠাকে লইয়া গেল।

তাঁর বুকে গুলি লেগেছিল, তাঁর হয়ে গেছে।  

তোমাদের কিনা এখনও বেশি বয়স হয়নি, তাই তোমাদের কাছে ভরসা করে এসব কথা বললাম।

দুঃখের বিষয়, সান্ধ্য আড্ডাটি ভাঙিয়া গিয়াছে।

দূর গাধা, যাঃ মানেই হ্যাঁঃ।

যেমন মনে করিয়াছিলাম তেমন করিয়া ইলেকট্রিক আলো জ্বালাইতে পারিলাম না , গড়ের বাদ্যও আসিল না , অন্তঃপুরে মেয়েরা অত্যন্ত অসন্তোষ প্রকাশ করিতে লাগিলেন , কিন্তু মঙ্গল-আলোকে আমার শুভ উৎসব উজ্জ্বল হইয়া উঠিল ।

একটি মাত্র চোখ, হেমলকে প্রতিবিম্বিত চক্ষুসদৃশ, তাঁহার দিকেই, মিলন অভিলাষিণী নববধূর দিকে চাহিয়াছিল, যে চক্ষু কাঠের, কারণ নৌকাগাত্রে অঙ্কিত, তাহা সিন্দূর অঙ্কিত এবং ক্রমাগত জলোচ্ছ্বাসে তাহা সিক্ত, অশ্রুপাতক্ষম, ফলে কোথাও এখনও মায়া রহিয়া গেল।

সবাই সকল কাজে ব্যস্ত ,—শুধু সেই পোড়া খড়ের আঁটি হইতে যে স্বল্প ধুঁয়াটুকু ঘুরিয়া ঘুরিয়া আকাশে উঠিতেছিল, তাহারই প্রতি পলকহীন চক্ষু পাতিয়া কাঙালী ঊর্ধ্বদৃষ্টে স্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিল।

একা অতদূরে কুবের পাড়ি দিতে পারব না?

কিন্তু আমার মনে হল চতুর্দিকের বরফের চেয়ে শুভ্রতর আবদুর রহমানের পাগড়ি, আর শুভ্রতম আবদুর রহমানের হৃদয়।

এমনি ছিল আমার প্রথমবার মামাবাড়ি যাবার ব্যাপার।

তখন অনেকেই তাদের দিকে তাকাল এবং দেখল পাগলাটে একটা লোকের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে ফোঁপাচ্ছে - যে মেয়েটি এইমাত্র আশ্চর্য সাঁতার দিল, আর তার মাথায় টপটপ করে জল ঝরে পড়ছে।

চল এগিয়ে যাই।  

*****


উত্তর


আনন্দমঠ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


ঘরে বাইরে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


হ য ব র ল, সুকুমার রায়


চিকিৎসা সঙ্কট, রাজশেখর বসু


বিরিঞ্চিবাবা, রাজশেস্খর বসু


কাবুলিওয়ালা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


অন্তর্জলী যাত্রা, কমলকুমার মজুমদার


অভাগীর স্বর্গ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


পদ্মা নদীর মাঝি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়


দেশে বিদেশে, সৈয়দ মুজতবা আলী


পদিপিসির বর্মিবাক্স, লীলা মজুমদার


কোনি, মতি নন্দী


পথের পাঁচালী, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

November 15, 2015

দ্য ব্লু ডোর ক্যাফে



দিল্লিতে বলার মতো ব্রেকফাস্ট খাওয়ার জায়গা খুঁজতে বেরোলে ইন্টারনেটে যে কটা লিংক বেরোবে তাদের প্রায় প্রত্যেকটাতেই থাকবে খান মার্কেটের 'দ্য ব্লু ডোর ক্যাফে'-র নাম। অনেকদিন ধরে যাচ্ছি যাব করে কাল সকালে অবশেষে যেখানে আমাদের যাওয়া হল।

অবশ্য ব্লু ডোর ছাড়াও আরও অনেক দোকানের নামই ঘুরে ফিরে সব লিস্টে আসে। লোকেশন, রিভিউ, রেস্ত, লোকেশন, কুইজিন - দোকান বাছার জন্য মোটামুটি এই থাকে আমাদের শর্ত। ব্রেকফাস্টের দোকানের ক্ষেত্রে একটা পাঁচ নম্বর শর্ত যোগ হয়। সময়। দিল্লির অনেক প্রাতরাশ সার্ভ করা দোকান খোলে বেলা এগারোটার সময়। যখন আমার প্রায় লাঞ্চের সময় হয়ে এসেছে। সে জায়গায় ব্লু ডোর ক্যাফে উজ্জ্বল উদ্ধার। সাড়ে সাতটায় খুলে যায়।

চাদরে মাথা মুড়ে অটো চেপে যখন খান মার্কেটে গিয়ে পৌঁছলাম তখনও সাড়ে ন'টা বাজেনি। বাজার পাটে পাটে বন্ধ। বাহরিসনস বুকসেলারস-এর বন্ধ দোকানের কাঁচের গায়ে সাজানো অভিরূক সেনের 'আরুশি'র সারি পেরিয়ে মিডল লেনে পৌঁছে ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে কিছু না পেয়ে বাঁদিকে ঘাড় ঘোরাতেই দেখি ব্লু ডোর ক্যাফের সাইনবোর্ড আকাশের গায়ে ঝুলছে।


এই শুরুর শীতের বাজারে সাড়ে ন'টা এমন কিছু বেলা নয়। বিশেষ করে শনিবার সকালের পক্ষে তো নয়ই। কাজেই দোকানে ঢুকে যখন দেখলাম বসার জায়গা প্রায় অর্ধেক ভর্তি, (আমরা থাকতে থাকতেই সবগুলো ভর্তি হয়ে গিয়েছিল) বেশ চমক লাগল। দোকানের আবহাওয়াটা বেশ। দেওয়ালের প্রকাণ্ড কাঁচের জানালা দিয়ে আসা আলোতে চারদিক ভেসে যাচ্ছে, টিভিতে ইন্ডিয়া সাউথ আফ্রিকার খেলা চলছে, তিনটে এসি চেরা মুখ হাঁ করে ঠাণ্ডা হাওয়া ছাড়ছে, বিটের ইংরিজি গান চলছে মাঝারি শব্দে, শুনলেই তালে তালে মাথা নাড়াতে ইচ্ছে করে।

চেয়ারে বসে প্রথমে আমি ঠিক আমাদের দিকে মুখ করে থাকা এসিটা নেভাতে বললাম, তারপর রেগুলার 'পিনে কা পানি' চাইলাম, তারপর সামনে তাকিয়ে দেখি জানালা দিয়ে এই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।


দৃশ্য দেখতে দেখতে মেনু এসে গেল। এই ইন্টারনেট আর জোম্যাটোর যুগে মেনু দেখার জন্য আর দোকান পর্যন্ত যাওয়ার দরকার নেই। আগেই ঠিক করা ছিল কী কী খাব। ব্লু ডোর-এ খাব যেদিন ঠিক করেছি, সেদিনই মেনু পরীক্ষা করে কী খাব তাও ঠিক করে ফেলেছি। তবু খানিকক্ষণ এ পাতা ওপাতা উল্টে দেখে অর্ডার দিলাম।


অর্চিষ্মান নিল ক্যাফে লাটে, আমার জন্য এল ইংলিশ ব্রেকফাস্ট চা। আর সেই সঙ্গেই এসে গেল ব্লু ডোর ক্যাফে-র প্রতি আমার প্রথম এবং একমাত্র নালিশের সুযোগ। চা পাতা/ টি ব্যাগ দেওয়ার আগে কাপে গরম জল ঢালা। আমি মনে করি ভালো চা বানানোর একশো পঁচিশটা শর্তের একটা জরুরি শর্ত হচ্ছে ফুটন্ত জল। সে জায়গায় পরিবেশক জল কাপে ঢেলেছেন, টি ব্যাগ প্লেটে রেখেছেন, চামচ খুঁজেছেন, চামচ প্লেটে রেখেছেন, কাপপ্লেট ট্রেতে তুলেছেন, চিনির প্যাকেটের বাক্স খুঁজতে গেছেন, এবং সবশুদ্ধু নিয়ে আমার টেবিলে যতক্ষণে আমার টেবিলে পৌঁছেছেন ততক্ষণে জল আর যাই হোক, ফুটন্ত নেই। আমার বিচারে তাকে বরং লিউকওয়ার্ম বলা চলে।

ব্লু ডোর ক্যাফের খদ্দেরদের গড় বয়স দেখলাম বেশ কমের দিকে। ছেলেমেয়েদের একটা বড় দল আমাদের পেছনের টেবিলে বসে কলকল করছিল। কারও পরনে ট্র্যাকপ্যান্টস, কারও কারও পাজামা, আর সবার হাতেই ফোন। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেলফি তোলা চলছিল পুরোদমে।



নানারকম ব্রেকফাস্ট প্ল্যাটার পাওয়া যায় ব্লু ডোর ক্যাফেয়, তার মধ্যে একটা হচ্ছে 'দ্য ওয়ার্কস'। অর্চিষ্মান ওটা পছন্দ করল। আমি হলেও ওটাই পছন্দ করতাম, কারণ ওটাতে ডিম সসেজ টোস্ট বেকন টমেটো হ্যাশ ব্রাউন ইত্যাদি আছে যা যা আমাদের ভালো লাগে আর বেকড বিনস নেই যেটা আমাদের খুব খারাপ লাগে। কিন্তু অর্চিষ্মান ওই ডিশটা আগেই দখল করে ফেলায় আমি অর্ডার করলাম 'ওয়াফল স্ল্যাম'।



ওয়াফল খেতে যে আমার দারুণ কিছু ভালো লাগে তা নয়, তার থেকে ঢের বেশি ভালো লাগে অমলেট খেতে, বেশ কয়েকটা রিভিউতে ব্লু ডোর-এর অমলেটের সুখ্যাতি পড়েছি, তবু আমি অমলেট নিলাম না। কারণ ব্রেকফাস্ট মানেই অমলেট আর অমলেট মানেই ব্রেকফাস্ট, আমার নিজের মাথার মধ্যেকার এই স্টিরিওটাইপটা ভাঙার দরকার ছিল।

'ওয়াফল স্ল্যাম'-এ ওয়াফল ছাড়াও ছিল আমার পছন্দসই কায়দায় বানানো ডিম (স্ক্র্যাম্বলড), পর্ক সসেজ, বেকন আর অবশ্যই ওয়াফলের সঙ্গে মেপল সিরাপ।

ওয়াফলটা আরেকটু নরম আর আরেকটু গরম হলেও হতে পারত, কিন্তু আমি তাতে দমে না গিয়ে বেশি বেশি করে মেপল সিরাপ ঢেলে সেগুলো খেয়ে ফেললাম। ঘন, মিষ্টি, মেপল সিরাপ ধীরে ধীরে ওয়াফলের খোপে খোপে ঢুকে জাঁকিয়ে বসল। সঙ্গে ছিল মোটা বেকনের ফালি। মাপমতো কুড়কুড়ে, মাপমতো নরম করে ভাজা। আর পর্ক সসেজের লিংক। আমার ফেভারিট। কোনটা ফেলে কোনটা খাব।



কিন্তু গোটা প্লেটের স্টার ছিল স্ক্র্যাম্বলড এগ। ফার্স্ট ক্লাস। ভালো স্ক্র্যাম্বলড এগ বানানো ইয়ার্কি না। নিজে বানাতে গিয়েই সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি, প্রায়শই পেয়ে থাকি। দানা থাকা চলবে না, বাদামি রং ধরা চলবে না, শুকনো হওয়া চলবে না, জল ছাড়া চলবে না। তাকে হতে হবে নরম বাসন্তী রঙের মেঘের মতো, মুখে দিলে মিলিয়ে যাবে। ব্লু ডোর ক্যাফের স্ক্র্যাম্বলড এগ যেমনটা যাচ্ছিল।

অর্চিষ্মান বলল ওর 'দ্য ওয়ার্কস'ও নাকি দারুণ খেতে। আমি বিশ্বাস করে নিলাম। না করার কোনও কারণ ছিল না। ওর আর আমার প্লেটের বেশির ভাগ জিনিসই কমন, খালি আমার ওয়াফলের বদলে ওর মাখন টোস্ট, আমার স্ক্র্যাম্বলডের বদলে ওর সানি সাইড আপ। এক্সট্রা বলতে খালি রোস্ট করা টমেটো আর হ্যাশ ব্রাউন। টমেটোয় আমার আগ্রহ নেই, আমি কাঁটা বাড়িয়ে হ্যাশ ব্রাউনের এক কোণা ভেঙে মুখে দিয়েছিলাম। বঢ়িয়া।

পাশের টেবিলে দুজন লম্বা দুটো জুসের গ্লাস নিয়ে বসেছিল, দেখে আমাদেরও ইচ্ছে হচ্ছিল খাওয়ার, কিন্তু লোভ সংবরণ করে বিল মিটিয়ে উঠে পড়লাম। বাইরে এসে দেখি খান মার্কেট আড়মোড়া ভাঙছে। ঝাঁট দিয়ে দরজার সামনে টাঙানো গাঁদাফুলের মালা থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাপড়ি সরানো চলছে, লম্বা ডাণ্ডায় জড়ানো ভেজা ন্যাতা দিয়ে ঘষে ঘষে মেঝে থেকে পোড়া বারুদের চিহ্ন আর প্রদীপ থেকে গড়িয়ে পড়া তেলের দাগ লোপাট করা চলছে। আমরা মেট্রোর দিকে হাঁটা লাগালাম। হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম 'দিল্লি স্ট্রিট আর্ট'-এর লোকজন শনিবার সকালে রং তুলি নিয়ে নেমে পড়েছেন।


*****



The Blue Door Cafe

66 Middle Lane, Khan Market,

New Delhi 110003
011 2464 0013
011 2461 8727

November 14, 2015

সাপ্তাহিকী



শিল্পী বিল ওয়াটারসন 

Experience is the comb that nature gives us when we are bald. 
                          ---Belgian proverb


খেলাটা প্রথমবার খেলে আমার বয়স বেরোল একান্ন, তার পরের বার একচল্লিশ, তার পরের বার সাঁইত্রিশ, তার পরের বার একত্রিশ, তার পরের বার সাতাশ, তার পরের বার চব্বিশ। তার পরের বারও যখন চব্বিশ বেরোল তখন আমি চেষ্টা করা বন্ধ করলাম।

ভাঙা জিন জোড়া লাগানোর উপায় বার করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। এর ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব আসতে পারে।


একটা দুটো থাকলে না হয় বোঝা যেত, কিন্তু একটা বনের সবকটা গাছই বাঁকা হলে মাথা চুলকোতে হয় বৈকি।

আমার যে রোজ অফিস থেকে ফেরার পথে তেলেভাজা খেতে ইচ্ছে করে তার মানে হচ্ছে আমার শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব ঘটেছে। দুধ, চিজ, শাকপাতা খেলে যেটা মিটবে। অর্থাৎ কিনা দাদুর চপ না খেয়ে বাড়ি এসে লালশাকের ঘণ্ট খেলেও চলবে।



সিঁড়িগুলো দেখেই আমার মাথা ঘুরছে।


শব্দ না থাকলে কি বর্ণও থাকে না? বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, যখন 'নীল' শব্দটা ছিল না ততদিন নাকি মানুষের ইতিহাসে নীল রংটাও ছিল না।

উৎপাদনশীলতার এই ২০%-এর নিয়মটা আমার বেশ মনে ধরেছে। সেটা পালন করব কি না সেটা অবশ্য অন্য ব্যাপার।


November 13, 2015

১০-১১ নভেম্বর, ২০১৫



১০ নভেম্বর, কালীপুজো

একদিনের উৎসব যে মন ভরানোর পক্ষে যথেষ্ট নয় এটা গোড়াতেই বুঝে দুর্গাপুজোওয়ালারা পাঁচদিনের ব্যবস্থা করেছিলেন। দিওয়ালিওয়ালারা বোঝেননি, এখন তার খেসারত দিচ্ছেন। আগেপিছে টেনেটুনে, গোঁজামিল দিয়ে বাড়াতে হচ্ছে। গতকালই অফিস থেকে সবাইকে ড্রাই ফ্রুটের বাহারি বাক্স ধরানো হয়েছে। সবার ডেস্কে ডেস্কে ঘুরে, দরজা ঠেলে ঢুকে হ্যাপি দিওয়ালির শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।

আসল মজাটা অবশ্য হবে আজ, যেদিন আমাদের কালীপুজো আর ওদের ছোটি দিওয়ালি। আজ খাওয়াদাওয়া হবে, খেয়েদেয়ে উঠে তাম্বোলা খেলা হবে। তাম্বোলামাম্বোলা আমি আগে জানতাম না, এই অফিসে চাকরি করতে এসে জেনেছি। একটা কাগজের টুকরো দেবে আপনার হাতে, তাতে কাটাকুটি ঘর কাটা, প্রতিটি ঘরে একটা করে নম্বর ছাপা আছে। আপনাকে শুধু মনে করে একটা পেন নিয়ে খেলতে বসতে হবে। ভুলে গেলেও অসুবিধে নেই। খেলার ঘরের বাইরেই কর্তৃপক্ষের তরফের একজনের ডেস্ক, যাঁর দায়িত্ব খাতা পেন পেনসিলের খাঁই মেটানোর। নিজের ডেস্ক পর্যন্ত হেঁটে না গিয়ে ভুলোমনেরা সবাই তাঁর ডেস্ক থেকে টপাটপ পেন তুলে নেবেন, এক দুপুরে অফিসের পেনের স্টক অর্ধেক

খেলার নিয়মটা মোটামুটি সোজা। টেবিলের মাথায় দাঁড়িয়ে একজন মাতব্বর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে একেকটা নম্বর বলবেন, আর আপনি সেই নম্বরটা নিজের চিরকুটে খুঁজবেন। যদি না পান তাহলে তো হয়েই গেল, পেলে পত্রপাঠ টিক দেবেন। এইবেলা একজন জিজ্ঞাসা করবেন, আচ্ছা ক্রস দিলে চলবে না? চলবে। ক্রস, গোল্লা, হার্ট সাইন, স্বস্তিকাচিহ্ন, সব চলবে। যার চিরকুটের একটা পাশাপাশি বা লম্বালম্বি বা কোণাকুণি সারির সবক'টা নম্বরে দাগ পড়ে যাবে, সে জিতবে। একটা সারি ফুরোলে একরকম প্রাইজ, দুটো সারি ফুরোলে তার থেকে বেশি প্রাইজ, আর যার পাশাপাশি, লম্বালম্বি, কোণাকুণি মিলে চিরকুটের সব সংখ্যার গায়েই দাগ পড়ে যাবে, তিনি চ্যাম্পিয়ন। খেলা শুরু হবে। বা হওয়ার উপক্রম হবে। সারা ঘর নিঃশব্দ, সকলের ঘাড়ের রোঁয়া ফুলে উঠেছে, রিফিলের ডগা চিরকুটের ওপর কাঁপছে। চাই মুখ হাঁ করেছেন, "সেভ্‌

"ওয়েট, সো..."

দেজা ভু। একই গলা, একই মুখ। আগের বছরও ঠিক একই সময় বাগড়া দিয়েছিল। ইনি নিয়মটা বোঝেননি। টাইম সিরিজ গুলে খেয়েছেন, কিন্তু কাটাকুটি খেলার রহস্যভেদ করতে পারেননি।

অবশেষে খেলা শুরু হবে। নিয়মিত ইন্টারভ্যালে ঠাসা ঘরের এ কোণা ও কোণা থেকে চিৎকার উঠবে, মিল গয়া। একে একে একেকটা সারির ওপর দখল কায়েম করবে আমার একেকজন সহকর্মী। ইনটার্ন কেউ প্রাইজ পেলে সারা ঘর হাততালিতে ফেটে পড়বে, ডিরেক্টর পেলে সাবোটেজের নালিশ উঠবে।

এদিকে আমার চিরকুটের মোটে তিনটে খোপে দাগ পড়েছে, তাও তিনটে আলাদা আলাদা সারিতে। আমি কোনওদিন এইসব লটারিমার্কা খেলায় জিতিনি। জিতি না। অবশ্য এই যে বললাম "আমি জিতি না", এটা না জেতার একটা কারণ হতে পারে। প্রথমবার তাম্বোলা খেলতে বসার আগে আমাদের অফিসের একজনকে বলতে শুনেছিলাম, "আই নো আই উইল উইন সামথিং। বিকজ আই অলওয়েজ উইন।" তিনি সেবছর জিতেছিলেন। পরের বছরও জিতেছিলেন। তার পরের বছরও। আমার তাম্বোলা খেলার ইতিহাসে আমি ওঁকে কখনও হারতে দেখিনি।

কিন্তু আমি উনি নই। আমি যতবার খেলি ততবারই হারি, হেরেছি। পরের বারও যে হারব যে সে নিয়ে আমার কোনও সংশয় নেই। লোকে বলবে সেই ভয়েই হয়তো আমি আজ অফিস গেলাম না। মুখ লুকিয়ে ঘরে বসে থাকলাম।

কিন্তু সেটা সত্যি নয়। তাম্বোলায় হারের ভয়ে নয়, আমি অফিস গেলাম না কারণ আজ অর্চিষ্মান একটা ঝটিকা সফর সেরে বাড়ি ফিরবে। প্রথমে ঠিক ছিল যে ও সোজা এয়ারপোর্ট থেকে আমার অফিসে যাবে, সেখান থেকে কোথাও একটা খেয়ে আমরা বাড়ি ফিরব। আজ প্রাক-দিওয়ালি উপলক্ষ্যে অফিস তাড়াতাড়ি ছুটি হবে, কাজেই নো প্রবলেম। কিন্তু সকালে উঠে আমার মহা কুঁড়েমি লাগল আর মনে পড়ল যে আজ অফিসে কেবল হইচই, খাওয়াদাওয়া আর তাম্বোলা আর হার আর অপমান, কাজেই আমি কুঁড়েমিকে প্রশ্রম দিয়ে বাড়িতে বসে রইলাম।

বসে থাকতে থাকতে মনে পড়ে গেল ফ্রিজারে পাঁচশো গ্রাম মুরগি আছে, রেঁধে ফেলা যাক। রেসিপি অতি সিম্পল। টক দই, আদারসুন দিয়ে মাংস মেখে রাখব। তারপর একটু খবরের কাগজটাগজ পড়ে, গাছে জলটল দিয়ে আবার রান্নাঘরে যাব। আলু ভাজব। অল্প লাল লাল হলে তুলে রেখে পেঁয়াজ ভাজব। আজ স্পেশাল অকেশন মুরগি, তাই তরিবৎ করে কম আঁচে পেঁয়াজ ভাজা হবে। লাল হবে, অথচ পুড়বে না। তারপর তিনটে ছোট এলাচ, তিনটে লবঙ্গ, একটা এককর লম্বা দারচিনি। তারপর নুন, হলুদ, কাঁচালংকা চেরা, লংকাগুঁড়ো (জানেন কি, লংকাগুঁড়ো যদি সামান্য তেলে মিশিয়ে কড়াইয়ে ছাড়েন তাহলে বেশি রং ছাড়ে?) দিয়ে নেড়েচেড়ে দইওয়ালা মাংস দিয়ে হাই আঁচে ভাজাভাজা করে গরমজল আর ভাজা আলু দিলেই রান্না শেষ। জলের মতো সোজা।

কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ হল না। বেশি ভালো করে রাঁধব বলে বেশি দই দিয়ে ফেলেছিলাম, দেখি মাংসের ঝোলের বদলে মাংসের আচার হয়ে গেছে। টোকো ভাব কমাতে গিয়ে নুন দিলাম। নোনতা হয়ে গেল। চিনি দিলাম। মিষ্টি হয়ে গেল। তখন যা থাকে কপালে বলে এক খাবলা নুন আর একমুঠো ধনেপাতা দিয়ে লাস্টবারের মতো ফুটিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

অর্চিষ্মান এল। প্লেনে খেয়ে এসেছে কাজেই খাওয়ার তাড়া নেই। আমরা আরাম করে চা নিয়ে বসলাম। অফিসের উপহারের সদ্গতি করা হল।


বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ খিদে পেয়ে গেল। মাংসভাত খেয়ে আমরা বেড়াতে বেরোলাম। মাংসটা নুনচিনিদই মিলিয়েমিশিয়ে উতরে গিয়েছিল। বেরিয়ে দেখি ওইটুকু দু'নম্বর বাজারে দু'খানা পুজো হচ্ছে। একটা ফিশ অ্যান্ড ভেজিটেবল মার্কেটের। অন্য প্যান্ডেলটার গায়ে কোনও নাম ছিল না। কিন্তু যেহেতু প্যান্ডেলটা একেবারে দাদুর চপের দোকানের সামনে তাই আমরা ধরে নিলাম যে ওটার মুখ্য স্পনসর দাদু ছাড়া আর কেউ নন।


এরপর যেটা হল শুধু সেটার জন্যই ২০১৫ কালীপুজো আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। টুকটাক জিনিস কেনার ছিল, চেনা মুদির দোকানে ঢুঁ মারলাম। চাল, রিন সাবান, আদা লজেন্স। তারপর গত দুমাস ধরে অভ্যেসমতো আবৃত্তি করা লাইনটা বললাম। "ম্যাগি এসেছে, দাদা?" উত্তরটা জানাই ছিল, কাজেই সেটার অপেক্ষা না করে পেছন ফিরে চলে আসতে উদ্যত হয়েছি, এমন সময় দোকানদার বললেন, “হ্যাঁ, এসেছে তো।

ম্যাগি যখন বন্ধ হয়ে গেল, তখন আমাকে যাঁরা চেনেন তাঁদের কেউ কেউ আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ব্যাপারটা নিয়ে অবান্তরে লিখতে। আমি লিখিনি। জীবনের কিছু কিছু ঘটনা বা দুর্ঘটনা থাকে, যেগুলো নিয়ে কাব্য বা সাহিত্য করা বা ব্লগ লেখা যায় না। বিশেষ করে আমার মতো লোকের পক্ষে, যে মনে করে দুঃখ শেয়ার করলে বাড়ে বই কমে না। ম্যাগির বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়াই আমার মনে জন্মায়নি, কারণ আমি শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। খাবার হিসেবে আমি ম্যাগিকে দেখে আসিনি কখনও। ম্যাগি আমার দুঃখে সান্ত্বনা, আমার নির্ঘুম মাঝরাতের সঙ্গী ছিল। আমার বারো টাকা ভিজিটের ইনস্ট্যান্ট থেরাপি। আমার টু মিনিটস সিপ্রালেক্স।

চারটে ম্যাগি কেনা হল। প্যাকেটের ওপর চোখে পড়ার মতো করে ছাপা 'কমিটমেন্ট' আর 'ট্রাস্ট' শব্দগুলো। দরকার ছিল না, কারণ ম্যাগির প্রতি আমার কমিটমেন্টে কোনও টান পড়েনি। ম্যাগির প্রতি আমার ট্রাস্ট তখনও অবিচল ছিল, এখনও আছে, চিরকাল থাকবে।

এমন নয় যে এই কমাস আমি ইন্সট্যান্ট নুডল ছাড়া থেকেছি। থাকার কোনও কারণ ছিল না। বাজারে হাজার হাজার ব্র্যান্ড আছে। ইপ্পি, টপ রমেন। সেগুলো পেট ভরায় ঠিকই কিন্তু একইসঙ্গে ম্যাগির অভাবকে আরও বেশি করে মনে পড়ায়। ম্যাগি বানালাম, যত্ন করে। শুকনো নয়, ঝোলঝোল নয়। নামানোর আগে দেওয়ার পর রেড চিলি ফ্লেকসের একটা প্যাকেট উপুড় করে দিলাম। বাটিতে ঢেলে সামনের ঘরে টিভির সামনে এসে বসলাম। পুণ্য অমাবস্যা তিথিতে আকাশে গ্রহতারারা নির্ঘাত সব এক লাইনে দাঁড়িয়েছিল, হবি তো হ' সেই সময়েই সোনি আটে 'সি আই ডি কলকাতা ব্যুরো' শুরু হল। আমি ম্যাগি খেতে লাগলাম, টিভির পর্দায় সিনিয়র ইন্সপেক্টের রণজয় সাঙ্গপাঙ্গ ও হুংকারসহ লাফালাফি করতে লাগলেন, বারান্দার‍ রেলিঙে তিরতির করে মোমবাতির আলো কাঁপতে লাগল।

১১ নভেম্বর, দিওয়ালি

পরপর দুদিন ছুটি থাকলেই খালি শনিরবি বলে ভুল হয়। অথচ আজ রবিবার নয়, বৃহস্পতিবার বুধবার। আজ দিওয়ালি। আজ আমাদের দুজনেরই ছুটি। সেটা সেলিব্রেট করার জন্য আমরা যাব সিনেমা দেখতে।তিতলিদশটা পাঁচে, সাকেতের ডি এল এফ প্লেস মলে ডিটি সিনেমাহলে শো।

রাস্তায় বেরিয়ে মন ভালো হয়ে গেল। মাঝ নভেম্বরের রোদে আকাশবাতাস চকচক করেছে। শুধু আলো আছে, তাপ নেই একটুও। মলে পৌঁছে দেখি একটাদুটো দোকানের কাঁচ ঘষামোছা চলছে, বেশিরভাগেরই শাটার পাটে পাটে বন্ধ। চারদিকে ফোয়ারা, বেলুন। আলো দিয়ে বানানো একটা ঘোড়ায় টানা মস্ত রথের মতো দেখলাম। এখন জ্বলছে না, সন্ধ্যেবেলা জ্বলবে। তখন এই জায়গাটা লোকের ভিড়ে কেমন সরগরম হবে ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিল। দিওয়ালি সজ্জার অংশ হিসেবে আরেকটা নতুন জিনিস দেখলাম। বুদ্ধদেবের একখানা বাজখাঁই মূর্তি। নিমীলিত চোখে, পদ্মাসনে সৌম্যমূর্তি ভগবান বুদ্ধ বসে আছেন, তাঁর পায়ের তলায় গোটা গোটা চনমনে ফন্টে লেখাগো শপিং!

সিনেমাহলেও ছুটির মেজাজ। প্রচুর অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে, এরা সাধারণত খাবারদাবার বিক্রি করার জায়গায় থাকে, কিংবা টিকিট কাউন্টারে, আজ সকলেই সেজেগুজে এসেছে। দল বেঁধে সেলফি তুলছে। পপকর্ন আর কোকের সঙ্গে অন্যদিন গোমড়া মুখ ফাউ পাওয়া যায়, আজ একগাল হাসির সঙ্গে "হ্যাপি দিওয়ালি" পাওয়া গেল। বোঝা গেল নতুন জামা, জুতো, সেট করা চুল আর মেকআপ ভেদ করে উৎসবটা বুকের ভেতর গিয়ে পৌঁছেছে। মন ভালো হয়ে গেল।

জীবনে এই প্রথমবার আমরা একটা সিনেমা দেখলাম যেখানে হলে আমরা ছাড়া আর কেউ ছিল না। এর আগে আমরা চারপাঁচজন দর্শকওয়ালা হলে বসে সিনেমা দেখেছি, এই দিল্লিতেই, কিন্তু শুধু আমরা দুজন এই প্রথম। এবং গোটা সিনেমাটা আমরা দুজনেই দেখলাম, আর কেউ এল না। তবে হল ফাঁকা ছিল বলে এটা ভাববেন না কিন্তু তাতে 'তিতলি'র কোনও দোষ আছে। আমার সিনেমাটা খুব ভালো লেগেছে। বিশেষ করে রণবীর শোরে চমৎকার।

ফাঁকা হলে সিনেমা দেখে মিশ্র অনুভূতি হল। ব্যাপারটার অভিনবত্বে বেশ মজা লাগল কিন্তু এটাও বুঝতে পারলাম যে ভরা হলের একটা আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। হলে গিয়ে সিনেমা দেখার মজা শুধু বড় পর্দায় আর পপকর্নের গামলায় নেই, আশেপাশের ননস্টপ ফিসফাসে, চেয়ারের পেছনের ইতস্তত লাথিতে, ফোন তুলে "রাইট নাউ আই অ্যাম ইন আ সিনেমা, উইল কল ইউ লেটার'" গোছের আপৎকালীন ঘোষণাতেও আছে। বোরের হদ্দ হয়ে যাওয়া শিশুর চিৎকারে আছে। বা যারা অতটাও শিশু নয়, মাবাবার কোল থেকে স্লিপ খেয়ে নেমে পড়ে যারা হলময় ঘুরে বেড়াচ্ছে, এবং আমার কর্নার সিটের হ্যান্ডেল ধরে হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছে, "আন্টিকি নোজ বিলকুল মাশরুম জ্যায়সি" তাদের সেই অবাক দৃষ্টিতে আছে।

ভেবেছিলাম হল থেকে বেরিয়ে খেয়ে ফিরব। কিন্তু দেখা গেল আধ গামলা করে পপকর্ন আর কোকা কোলা খেয়ে আমাদের গলা পর্যন্ত ভরে গেছে। অটোতে আসতে আসতে জোম্যাটো খুলে 'নিয়ার বাই' ফিল্টার দিয়ে যে অত সার্চ করা হল, সব মাঠে মারা গেল। মনের দুঃখে ফিরতি অটো ধরলাম। সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে এক নম্বর মার্কেটে নেমে রাজুর চায়ের দোকানে মসালা লেমন টি খাওয়া হল। জিনিসটা খেতে যেমন ভালো, তার থেকেও ভালো বানানোটা দেখা। রাজুবৌদি কত কিছু যে দিলেন। বিটনুন, চিনি, হজমিগুলি, তেঁতুলের ক্বাথের মতো একটা জিনিস, লেবুর রস। দারুণ হয়েছিল খেতে।


ব্যস। দীপাবলী শেষ। এই পোস্টও। তবে শেষ করার আগে আমাদের এবছরের দিওয়ালি বাম্পার শপিং দেখাই আপনাদের। আমাদের বাড়ির পাশের আনন্দ-এর দোকানে একটা চমৎকার ডিল চলে সারাবছর। আপনি যে দামের বই কিনবেন, তার একটা অনুপাতের মূল্যের বই ফ্রি পাবেন। সবথেকে ভালো ব্যাপারটা হচ্ছে সেই ফ্রি বইগুলোর পছন্দও আপনার। আমরা কিনলাম রানী চন্দের 'পথে ঘাটে', সুকুমার সেনের 'ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি' আর শরদিন্দু সমগ্রের তিন নম্বর খণ্ড যেটাতে ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলো আছে। ঐতিহাসিক উপন্যাসের কালেকশনটা কলকাতায় আছে, কিন্তু দিল্লিতেও একটা থাকা দরকার। ফ্রি বই হিসেবে আমরা নিলাম অবনীন্দ্রনাথের 'খাতাঞ্চির খাতা' আর জ্যোতিভূষণ চাকীর 'বাগর্থকৌতুকী'


আমি আর অর্চিষ্মান এখন কাড়াকাড়ি করে 'ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি' পড়ছি। মারকাটারি বই। জানেন কি, বাকি আর কিছু থাকুক আর না থাকুক, গোয়েন্দাগল্প সত্যি সত্যিই 'ব্যাদে' ছিল? কিন্তু সে প্রসঙ্গ এখন থাক, পরের কোনও পোস্টে হবে।




 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.