December 30, 2015

আসাম ১/ কাজিরাঙ্গার পথে



একদিন তরুণ ঔপন্যাসিক সুব্রত সেনগুপ্ত এই পত্রিকার দপ্তরে এসে খুব উৎকণ্ঠিত ও চিন্তিত ভাবে বললেন, একটু আগে শিবরাম চক্রবর্তীকে দেখলুম, ফুটপাথে শুয়ে আছেন, বোধহয় খুবই অসুস্থ, তারপর আস্তে আস্তে এখানেই এলেন...। আমি খোঁজাখুঁজি করে দেখলুম, তিনি চারতলায় ক্যাশিয়ারবাবুর কাছে একটা টুলে বসে আছেন। আমি প্রথমে সন্তর্পণে জিজ্ঞাসা করলুম, শিবরামদা, আপনি কেমন আছেন? উনি বললেন, এই তো, খুব ভাল আছি, এই মহীর পাশে বসলে শীত করে না। চারদিকে টাকার গরম তো! এরপর জিজ্ঞেস করলুম, আপনি নাকি ফুটপাথে শুয়ে পড়েছিলেন? উনি অবাক হয়ে বললেন, হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে? যেন বিকেলবেলা ফুটপাথে শুয়ে পড়া একজন বিখ্যাত লেখকের পক্ষে অতি সাধারণ ঘটনা! ফের জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ রাস্তায় শুতে গেলেন কেন! উনি বললেন, বুঝলে চাঙ্গোয়ার সামনে ইচ্ছে হলো রাস্তায় একটু বসি, বেশ ভালো গন্ধ তো! তারপর বসে থাকতে থাকতে শুয়ে পড়লুম, বেশ ভালো লাগে, শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখা যায়, আগে কোনওদিন দেখিনি...তারপর একটি ছেলে বুঝলে, লেখে-টেখে বোধহয়, আমার হাত ধরে তুলল, তারপর আমার হাত ধরে ধরে আসতে লাগল…বুঝলে, ছেলেটির বোধহয় স্বাস্থ্য খারাপ, নিজে হাঁটতে পারছিল না, তাই আমাকে ধরে ধরে...।

এবারের জন্মদিনে অর্চিষ্মান আমাকে যে তিনটে বই উপহার দিয়েছে তার মধ্যে একটা হচ্ছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আমার জীবনানন্দ আবিষ্কার ও অন্যান্য’। বিভিন্ন কবি ও সাহিত্যিকের সম্পর্কে লেখকের স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধের সংকলন। সেটা পড়তে পড়তে ‘মা লক্ষ্মী’ নামের বাসে চেপে কাজিরাঙ্গার দিকে চলেছিলাম। আসার পথে বলার মতো কিছু ঘটেনি। আমাদের প্লেন মোটামুটি ঠিক সময়েই ছেড়েছিল, গুয়াহাটি এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছেছিল সকাল আটটা নাগাদ। সুন্দর সাজানো গোছানো এয়ারপোর্ট অ্যারাইভালের গেট দিয়ে ঢুকেই দেখি একটা পেল্লায় কেঁদো গণ্ডার তার ছানাকে পাশে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য। আমরা গাড়ি ভাড়া করে কাজিরাঙ্গা যেতে পারতাম। সাড়ে তিন হাজার টাকা ভাড়া পড়ত, টাইম লাগত সাড়ে তিন ঘণ্টা। বাসে গেলে ভাড়া পাঁচশো, সময়ের ব্যাপারটা পরে বলছি। আমরা ঠিক করেছিলাম, শুরুর দিকে যখন শরীর মন চাঙ্গা আছে তখন যত পারা যায় কম খরচে ঘুরব যাতে পরে ক্লান্ত দেহে মনে একটু বিলাসিতা করার সুযোগ থাকে। কাজেই বাস। কিন্তু বাস ধরতে আমাদের যেতে হবে এয়ারপোর্ট থেকে খানিক দূরের ইন্টারস্টেট বাস টার্মিনাসে। প্রি পেড ট্যাক্সির খোপে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানলাম আই এস বি টি পর্যন্ত ট্যাক্সিভাড়া পাঁচশো। শুনেই আমাদের গায়ে ছ্যাঁকা লেগে গেল। আমি এদিকওদিক দেখে সিকিউরিটির খাকি পোশাক পরা একজন মহিলাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এখান থেকে অটো নিলে আই এস বি টি পৌঁছতে কত টাকা লাগার কথা? মহিলা খুব দুঃখী মুখ করে বললেন, অটো পাওয়া মুশকিল। বিশেষ করে এই সাতসকালে। আপ বচ্চে কো বাহার ভেজ দিজিয়ে, ট্যাক্সিসে বাত করকে দেখে অগর পাঁচশো সে কম মে রাজি হোতা হ্যায়...

বাচ্চা? বাচ্চা উনি দেখলেন কোথায়? এদিকওদিক তাকাচ্ছি, তারপর বুঝলাম উনি অর্চিষ্মানকে বাচ্চা বলে অভিহিত করছেন।

আমি মোটা গলায় অর্চিষ্মানকে করলাম, “বচ্চা, যাও ট্যাক্সি পকড়কে লাও”, বাচ্চা বাধ্যমুখে আদেশ পালন করতে চলে গেল।

বাইরের ট্যাক্সি নিয়ে খুব যে সুরাহা কিছু হল তা নয়, পাঁচশোর বদলে চারশো, কিন্তু তাও তো হল? তাছাড়া চালক ভদ্রলোক বেশ ভালো ছিলেন, আমরা টুরিস্ট বুঝতে পেরে আমাদের চারদিক দেখাতে দেখাতে নিয়ে চলছিলেন। আই এস বি টি এয়ারপোর্ট থেকে সামান্য দূরে। শহরের রাস্তা ছেড়ে আসতেই চোখের সামনে প্রকাণ্ড সব কলাগাছ আর সুপুরিগাছেরা মাথা তুলে দাঁড়াল। একটু পর বাঁ পাশে একটা মস্ত দিঘি দেখিয়ে ভদ্রলোক বললেন এই হচ্ছে দীপর বিল। আমি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। এই বিলের কথা আমি একজন অসমিয়া ব্লগারের ব্লগে পড়েছি। শান্ত স্থির আদিগন্ত বিলের জলের ওপর নানারকম পাখি উড়ে বেড়াচ্ছেডানদিকে তাকালাম। ছোট স্রোতের ওপর একটা জং ধরা সেতু। সেতু পেরিয়ে ফসল কেটে নিয়ে চলে যাওয়া ক্ষেত, ক্ষেতের পেছনে জঙ্গল, সেখান থেকে নাকি মাঝে মাঝেই পঞ্চাশষাটটা হাতির দল বেরিয়ে আসে।

অর্চিষ্মানকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ভালো লাগছে?”

আসাম বেড়াতে যাওয়ার উত্তেজনাও আমার যেমন ছিল, একটা ভয়ও ছিল। আসাম আমি আগেও গেছি। বেড়াতে, আলাদা আলাদা সময়ে মা বাবা যখন পোস্টেড ছিলেন তখন ছুটিতে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে। এবং প্রেমে পড়ে গেছি। আসামের প্রকৃতির, মানুষের, ভাষার, ব্রহ্মপুত্রের। সে প্রেমের কথা ব্যাখ্যান করে অর্চিষ্মানকে বলেছিঅর্চিষ্মানের এটাই প্রথম আসামদর্শন। মনে একটা হালকা ভয় ছিল, যদি অর্চিষ্মানের আসাম ভালো না লাগে? যদি মনে হয় ওভারহাইপড? আমার এত সাধের আসাম যদি অর্চিষ্মানকে একই রকম মুগ্ধ করতে না পারে তাহলে যেন কোথাও একটা পরীক্ষায় ফেলের অনুভূতি হবে।

কিন্তু আমি পাশ করে গেছি। উইথ ডিস্টিংশন। অর্চিষ্মানের সেই মুহূর্তের মুখটা দেখেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলাম। বিলের ওপর উড়ন্ত পাখি, জং ধরা সেতু, চারদিকের ঠাণ্ডা সবুজ অর্চিষ্মানের ওপরেও একই রকম ম্যাজিক করেছে, যেমন আমার ওপর করেছিল। যেমন পৃথিবীর যে কোনও মানুষের ওপর করবে।

এমন সময় শান্তি ভঙ্গ করে আমাদের গাড়ির ভোঁ বেজে উঠল। দেখি ভদ্রলোক উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। আমি ভাবলাম হাতি বেরোল নাকি? তারপর দেখি হাতিটাতি কিছু নয়, সামনে একটা টকটকে লাল রঙের বাস, প্রায় হাতির মতোই দুলকি চালে চলেছে

ওটা জোরহাটের বাস। ওটা কাজিরাঙ্গার ওপর দিয়ে যাবে।

আমাদের ড্রাইভারের “রও রও” চিৎকারে বাস দাঁড়িয়ে পড়ল। ভদ্রলোক ততক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে ট্রাংক খুলে আমাদের লাগেজ নামিয়ে দিয়েছেন একটা বাচ্চা ছেলে বাস থেকে নেমে তীরের মতো ছুটে এসে আমাদের ব্যাগ নিয়ে বাসে উঠিয়ে দিল। কী হচ্ছে কিছু বুঝতে না পেরে আমরাও বাসে উঠ পড়লাম। তারপর একেতাকে জিজ্ঞাসা করে আশ্বস্ত হওয়া গেল যে এটা জোড়হাটেরই বাস, এটা কাজিরাঙ্গার ওপর দিয়েই যাবে। তখন রোদ এসে পড়া দুটো পাশাপাশি সিট দেখে বসে ব্যাগ থেকে বই বার করে বুকমার্ক করা পাতাটা খুলে আরাম করে বসলাম। এইবার বই পড়তে পড়তে, জানালা দিয়ে আসাম দেখতে দেখতে যাব। স্বর্গ।

আবহাওয়ার দিক থেকে দেখতে গেলে চমৎকার, কিন্তু আর সমস্ত দিক থেকে দেখতে গেলেই বেড়ানোর সময়নির্বাচনটা আমাদের বোকার মতো হয়েছে। কাজিরাঙ্গার মতো টুরিস্ট হটস্পটে বড়দিনের লং উইকএন্ডে ভিড় হবে সেটা আন্দাজ ছিল। কিন্তু আমাদেরও ছুটির ব্যাপার আছে। তাছাড়া আসাম যাব আর এ বছরেই যাব এই জেদও ছিল। অগত্যা ক্রিসমাসের ছুটিই সইআমরা থাকব আসাম টুরিস্ট ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এ টি ডি সি)-র অরণ্য গেস্ট হাউসে। ইন্টারনেট থেকে ফোন নম্বর নিয়ে যেদিন অরণ্য গেস্টহাউসে ফোন করেছিলাম সেদিনই ওপারের ভদ্রলোক জানিয়েছিলেন যে ডিসেম্বর মাসের শেষ দশদিনে মাত্র একটি রাতে তাঁরা আমাদের জায়গা দিতে পারেন। বাইশে। অবশ্য উনি কাছের আরও দুটো সরকারি গেস্টহাউস বনানী আর বনশ্রীতেও ফোন করে খোঁজ নিতে বলেছিলেন, কিন্তু ছবিটবি দেখে আমাদের অরণ্যই পছন্দ হয়ে গেল আর আমরা বললাম বাইশ তারিখ আমরা আপনাদের হোটেলে থাকছি। ইন ফ্যাক্ট এই গোটা আসামভ্রমণটার নকশা হয়েছে ওই বাইশ তারিখে কাজিরাঙ্গায় এক রাতের বুকিংকে ঘিরে। সেটাও খুব একটা বুদ্ধিমানের মতো হয়নি হয়তো ছোটাছুটি বেশি হয়েছে, দুয়েকটা জায়গায় আরেকটু বেশি সময় কাটাতে পারলে হয়তো ভালো লাগত, কিন্তু কী আর করা।

দুপুর দুটো নাগাদ আমরা খেতে থামলাম। পথের পাশে ধাবা। চারপাঁচটা বাস, সাতআটটা গাড়ির খদ্দেরের ভিড়ে একেবারে গমগম করছে। আমি নিলাম নিরামিষ রুটির থালি আর অর্চিষ্মান নিল মাছ ভাত থালি। রুটি ভাত মাছ বাদ দিলে কমন আইটেম ছিল ডাল, আলু পেঁয়াজকলির শুকনো তরকারি, সয়াবিনের তরকারি, চাটনি, পায়েস। সাধারণ রান্না, কিন্তু খিদের মুখে আর ওই জমজমাট পরিবেশে অমৃতের মতো লাগছিল।

খেয়ে উঠে আবার বাস চলল। বাসটা কাজিরাঙ্গা কখন পৌছবে সে নিয়ে আমাদের দুজনের কারওরই কোনও ধারণা ছিল না। ইন্টারনেটে লেখা ছিল পাঁচ ঘণ্টা, অরণ্য-র ভদ্রলোক আভাস দিয়েছিলেন ঘণ্টা চারেক, আর গুয়াহাটি থেকে যে ভদ্রলোকের গাড়িতে এলাম তিনি বলেছিলেন দুআড়াই ঘণ্টা। এদিকে আমাদের ঘড়িতে তখন বাজে তিনটে। সাড়ে ন’টা নাগাদ আমরা বাসে চড়েছি, অর্থাৎ অলরেডি সাড়ে পাঁচঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। হাতে ধরা গুগল ম্যাপ বলছে এখনও একঘণ্টার মতো রাস্তা বাকি। কিন্তু সে একঘণ্টার রাস্তাটা ঠিক কতক্ষণে ফুরোবে সেটা আন্দাজ করা ভগবানের বাবারও সাধ্য নয় কারণ বাসটা আদৌ চলছে না। মানে চলছে, কিন্তু দশমিনিট চলে পনেরো মিনিট দাঁড়াচ্ছে। কন্ডাকটর দরজায় ঝুলে আছেন, রাস্তা দিয়ে যে-ই যাচ্ছে তাকেই জিজ্ঞাসা করছেন সে কোথায় যাবে, বাসে লিফট চাই কি না। অবশ্যই ভাড়ার বিনিময়ে। ইঞ্জিনের আওয়াজে একপক্ষ অন্যপক্ষের গলার আওয়াজ শুনতে না পেলে ড্রাইভার কনসিডারেটলি বাস থামাচ্ছেন, তখন কথোপকথন শান্তিতে সম্পূর্ণ হচ্ছে। কোনও একটা মোড়ের কাছাকাছি এসে বাস একেবারেই থেমে যাচ্ছে। কন্ডাকটর নেমে কোথায় চলে যাচ্ছেন, বেশ কিছুক্ষণ পর কখনও খালি হাতে, কখনও দুচারজন নিরীহ যাত্রীকে বগলদাবা করে ফিরছেন। বাসশুদ্ধু লোক নিশ্চিন্ত মুখে বসে আছে।

আমার অনেকদিন আগের একটা কথা মনে পড়ে গেল। খুব সম্ভবত ধুবড়ি কিংবা অন্য কোন ছোট শহর থেকে আমি আর মা বাড়ি ফিরছিলাম। সেই শহর থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত একটা প্লেনে যাব আমরা, গুয়াহাটি থেকে দমদম আরেকটা প্লেনপ্রথম প্লেনটা ধরার জন্য সকাল সকাল এয়ারপোর্টে পৌঁছলাম। খুবই ছোট এয়ারপোর্ট, প্রায় হেলিপ্যাড গোছের চেহারা। আরও কিছু লোক ছড়িয়েছিটিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। আমরা প্লেনের অপেক্ষা করে করে, চা খেয়ে খেয়ে বোরের হদ্দ হয়ে গেলাম। খবর এল, প্লেন আসবে না।

একজন কর্তৃপক্ষের লোক ভয়ানক ক্ষমাটমা চেয়ে আমাদের জানালেন যে চিন্তার কোনও কারণ নেই। বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সে আমাদের গুয়াহাটি এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে আসবে। এন্তার সময় আছে, চিন্তার কোনও কারণ নেই। বাস এল। আমরা সবাই বাসে উঠে সিট বেছে বসে পড়লাম। বাস ছেড়ে দিল।

মনে রাখতে হবে যে সেটা গুগল ম্যাপের জমানা নয়। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর আমরা গুয়াহাটি শহরে ঢুকলাম। প্লেনের সময় এদিকে ঘনিয়ে এসেছে। কিন্তু এয়ারপোর্টের দেখা নেই। বাস শহর ছাড়িয়ে কাঁচা রাস্তায় গিয়ে পড়ল। দুপাশে ক্ষেত। সবাই চুপ করে বসে আছে। আমিও বসে আছি। ভাবছি এয়ারপোর্ট তো শহর থেকে দূরেই হয়। এমন সময় পাশ থেকে আমার মা সিট ছেড়ে উঠে গিয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলেন, “রাস্তা চেনেন?” ড্রাইভার আমতা আমতা করে জানালেন যে তিনি এর আগে কোনওদিন গুয়াহাটি এয়ারপোর্টে আসেননি বটে, কিন্তু রাস্তা যখন এদিকে যাচ্ছে তখন এয়ারপোর্টও নিশ্চয় এদিকেই হবে। তাই না?

আমার মা চিৎকার করে ড্রাইভারকে বকতে শুরু করলেন। হিন্দি, বাংলা, অসমিয়া মেশানো একটা হাস্যকর জগাখিচুড়ি ভাষায়। বাসশুদ্ধু লোক চুপটি করে বসে দেখতে লাগল। আমি লজ্জায় বাসের মেঝেতে মিশে যেতে লাগলাম। কিন্তু মায়ের তাপউত্তাপ নেই। মা ড্রাইভারকে আদেশ করলেন, এইমুহূর্তে এইখানে গাড়ি দাঁড় করান। খাঁ খাঁ রাস্তা, কেউ কোথাও নেই। ড্রাইভার একবার বলার চেষ্টা করল যে আরেকটুক্ষণ এই পথেই চালানো যাক, যদি কাউকে পাওয়া যায় তাহলে তার থেকে ডিরেকশন নিয়ে নেওয়া যাবেখন। তাতে মা তার দিকে সেই লুকটা দিলেন যে লুকের উত্তরে হাঁ করা যায় কিন্তু গলা থেকে আওয়াজ বার করা যায় না। এমন সময় দূর থেকে একটা লোককে সাইকেল করে আসতে দেখা গেল। মা বললেন, “শিগগিরি এরে জিগান।” বলে আর বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করে নিজেই ড্রাইভারের সিটের পেছন দিয়ে জানালা গলিয়ে মাথা বার করে চিৎকার করলেন, “হ্যাঁ ভাই, এয়ারপোর্ট কোন ফালে?” বাসশুদ্ধু লোক চুপ করে বসে রইল। কেউ কেউ আমার দিকে খুব করুণার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। আমার জীবনের স্ট্রাগলটা অন্তত এরা কল্পনা করতে পারছে, এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। সাইকেলওয়ালা বললেন, এয়ারপোর্ট? বেশিদূর নয়, যে পথ দিয়ে আমরা এসেছি সে পথে মিনিট পঁয়তাল্লিশ ফিরে গেলেই এয়ারপোর্ট পাওয়া যাবে।

বাস পেছন ফিরে চলল। বাসশুদ্ধু লোক চুপ করে বসে রইল। গুয়াহাটি এয়ারপোর্টে যখন নামলাম তখন প্লেন ছাড়তে এক্স্যাক্টলি পনেরো মিনিট বাকি। কর্তৃপক্ষর লোক উদ্বিগ্ন মুখে এয়ারপোর্টের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। গোটা এক বাস যাত্রী হাইজ্যাক হয়ে গেল কি না সেটাই ভাবছিলেন বোধহয়। আমরা যেতেই আমাদের প্রায় পাঁজাকোলা করে নামিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বোর্ডিং পাস আর সিকিউরিটির লাইন পার করিয়ে দেওয়া হল।

আমার মা না থাকলে সেদিন কিছুতেই ওই প্লেনটা ধরা যেত না এটা সম্পূর্ণ বুঝতে পারার পরেও আমার লজ্জা করছিল মনে আছে। মনে হয়েছিল আমার মায়ের রমণীয়, মৃদুভাষী হওয়াটা প্লেন মিস হয়ে যাওয়ার থেকেও অনেক বেশি জরুরি।

অর্চিষ্মান বলল, আজ কপালে দুঃখ আছে।

আমি বললাম, নাও থাকতে পারে। দাঁড়াও।

আমি সিট ছেড়ে উঠে গেলাম। ড্রাইভারের কেবিনের সামনে গিয়ে গলা যতটা সম্ভব আত্মবিশ্বাস ফুটিয়ে (মায়ের মতো হল না, তবু চেষ্টা তো করতে হবে) জানতে চাইলাম, সমস্যাটা কী? বাসটা দাঁড়িয়ে আছে কেন? ড্রাইভার, কন্ডাকটর এবং বাসশুদ্ধু লোক চুপ করে রইল। আমি ফেরত চলে এলাম। পত্রপাঠ বাস ছেড়ে দিল।

আমার কিংবা আমার মায়ের অভদ্রতার কথা ফলাও করার জন্য নয়, এই ঘটনাদুটো আমি বললাম অসমের লোকদের চুপ করে থাকার অসীম ক্ষমতার পরিচয় দেওয়ার জন্য। বাস তো ছেড়েই দিলাম, আমি নিশ্চিত পনেরো বছর আগের সেই দিনে প্লেন মিস হয়ে গেলেও তাঁরা কিছুই বলতেন না। চুপ করে পরের প্লেনের জন্য অপেক্ষা করতেন। এর পরের পাঁচদিন ধরে যে ক’বার বাস, ব্যাটারি অটো, ম্যাজিক টেম্পোতে উঠেছি, দেখেছি একই ব্যাপার। পাঁচজনের জায়গায় গাড়িতে পনেরোজন উঠছে, কারও মুখে রা নেই। একটা সিট খালি রয়ে গেছে বলে গাড়ি আধঘণ্টার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, গাড়ির ভেতর পাঁচজন চুপটি করে বসে আছে। রাগ নেই, তাপউত্তাপ নেই। কোথাও যাওয়ার কোনও তাড়া নেই। সময়ের বাঁধাবাঁধি নেই।

আমি এটা নিন্দে করার মতো করে বলছি না। কারণ অসমিয়াদের এই অনন্ত ধৈর্য আর অসামান্য ক্ষমা আমাকে ব্যক্তিগত জীবনে অনেক অকারণ প্রশ্রয় দিয়েছে। কাজেই আমার অভিযোগের কোনও জায়গাই নেই।

কাজিরাঙ্গার স্টপেজটার নাম কোহোরা মোড়। সেখানে যখন নামলাম তখন ঘড়িতে প্রায় চারটে। রাস্তার দুদিকে দুটো বড় বড় গেট। বাঁদিকে ঢুকে গেলে জঙ্গল, ডানদিকে গেলে গেস্টহাউস। আমরা গেস্টহাউসের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। দুপাশে হাতিকুলি চা বাগান। মাঝখান দিয়ে ঢেউখেলানো পাথরের ইটগাথা রাস্তা। রাস্তার ওপর দিয়ে ঘরঘরিয়ে আমাদের ক্যারি-অন সুটকেসের চাকা চলল। অনেকটা পুবদিকে চলে এসেছি বোঝা যাচ্ছিল। মোটে চারটে বাজে অথচ রোদ মরে এসেছে। সেই কত ভোরে বেরিয়েছি। আমি তো তাও কয়েকঘণ্টা ঘুমিয়েছি, অর্চিষ্মান তো রাতভর জাগা। অত ক্লান্তির মধ্যেও বুঝতে পারছিলাম দুপাশের দৃশ্য কী অদ্ভুত সুন্দর। ভোরবেলা দিল্লির এয়ারপোর্টে বসে থাকার সঙ্গে বিকেলবেলায় চা বাগানের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পটবদলের অবিশ্বাস্যতা, ওই রাতজাগা মগজেও ধরা পড়ছিল। প্রায় সাত মিনিট সোজা হেঁটে, ডানদিকে তারপর বাঁদিকে বেঁকে তিন মিনিটের একটা ছোটো চড়াই ভেঙে আমরা অরণ্য টুরিস্ট লজের গেটে এসে পৌঁছলাম। চায়ের তেষ্টায় তখন বুক ফেটে যাচ্ছে।

                                                                                                                                                                  
                                                                                                   (চলবে)    
আসাম ২/ পবনের পিঠে


December 28, 2015

বেড়ানোর আগে



কে কত ভালো বেড়াবে তা নির্ভর করে কে কত ভালো লিস্ট বানাবে তার ওপর।

এটা আমার বাবার মত। আমার বাবা খুব ভালো লিস্ট বানান। লোকে বলবে তা তো বানাবেনই, তোমার বাবা যখন। কিন্তু বাবার লিস্টের সঙ্গে আমার লিস্টের কোনও মিল নেই। প্রথমত, বাবার লিস্টের কোনও খাতা নেই। দ্বিতীয়ত এবং ইমপরট্যান্ট অমিলটা হচ্ছে রোজ সকালে উঠে সে লিস্টে আগামী ষোলঘণ্টায় ষোলহাজার কাজ গোঁজার অ্যাম্বিশন নেই বাবার, কাজেই রোজ রাতে সে লিস্টের দিকে তাকিয়ে হাত পা পেটের ভেতর সেঁধোনো প্যানিকও নেই। কী করবেন আর কী করবেন না, সারাজীবনের নিরিখেই বাবার সে ধারণা খুব স্পষ্ট, প্রতিদিনের নিরিখে তো বটেই। সেই কাজগুলো একটা নির্দিষ্ট ছন্দে, নিয়মিত করে যাওয়াই বাবার লিস্ট।

যেমন সকালে উঠে মশারির ভেতর বসে বসেই কর গুনে গায়ত্রীমন্ত্র বিড়বিড় করবেন বাবা। (বাবা মোটেই ধার্মিক নন, বহুদিন হল পৈতেও ত্যাগ দিয়েছেন, কিন্তু পৈতের দিনে শেখানো সকালে উঠে বিড়বিড়িয়ে গায়ত্রী মন্ত্র বলার অভ্যেসটা ছাড়তে পারেননি।) তারপর এককোয়া রসুন সহযোগে এক বড় গ্লাস জল খাবেন। দাদু মারা যাওয়ার পর মা ঠাকুমা দাদুর বিটকেল ভারি কাঁসার গেলাস তুলে রাখার ষড়যন্ত্র করেছিলেন, বাবা তাতে জল ঢেলে এখনও সেটা ব্যবহার করে চলেছেন। শীতকাল হলে রসুনের পর একচামচ চ্যবনপ্রাশ বা মধু। তারপর মেরি বিস্কুট দিয়ে চা। বাবা জানেন বিস্কুটটার নাম আসলে মারি, মেরি নয়। কিন্তু বাবা কোনওদিন মারি বলবেন না। যেমন বাবা কোনওদিনও মামলেটকে অমলেট বলবেন না। চা খেতে খেতে বাবা কাগজ পড়বেন তেল মেখে স্নান করবেন। নিজের গায়ে মাখার আগে ক্যারামের গুটি চালানোর ভঙ্গিতে মাটিতে তেলের ছিটে দেবেন। (এটাও অভ্যেস। অমর অশ্বত্থামা নাকি মাটির তলায় শুয়ে তেলের অভাবে শুকিয়ে কাঠ হচ্ছেন, অমরত্বের অভিশাপে মরে জ্বালা জুড়োনোর উপায় নেই। তাই স্বার্থপরের মতো একলা না মেখে সে বেচারাকেও একটু তেলের ভাগ দেওয়া)। অফিস (এখন বাজার/ব্যাংক/আড্ডায়) যাওয়ার আগে সিঁড়ির তলা থেকে সাইকেল নিয়ে সিটখানা একবার ঝেড়ে নিয়ে নিজের মনে "টাকা পয়সা রুমাল চিরুনি পেন চাবি মান্থলি আইডেনটিটি কার্ড" (এখন শেষ চারটে আইটেম বাদ) আবৃত্তি করবেন। এই সময় বাবার ভুরুটা সামান্য কুঁচকে থাকবেবাবার অলরেডি গম্ভীর মুখটা আরও গম্ভীর দেখাবে। মনে হবে বাবা রেগে গেছেন। কিন্তু বাবা রাগেননি। বাবা আসলে কনসেনট্রেট করছেন। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে বাবার মগজ থাবড়ে থাবড়ে দেখে নিচ্ছে যে সবাই ঠিক ঠিক জায়গায় আছে কি না। প্যান্টের পকেটে চাবি, রুমাল, বুকপকেটে মানিব্যাগ, মানিব্যাগে আই কার্ড, টাকা। আমি সারাজীবনে বাবাকে অন্ততপক্ষে লক্ষবার বাড়ি থেকে বেরোতে দেখেছি, কিন্তু মাঝরাস্তা থেকেএই যাঃ ওই জিনিসটা নিতে ভুলে গেছিবলে দৌড়ে বাড়ি ফিরতে একদিনও দেখিনি

যাই হোক মোদ্দা কথা হচ্ছে, খাতায়কলমে প্রমাণ না থাকলেও বাবার সারাটা দিন একটা সুনির্দিষ্ট লিস্ট ধরে চলে মাঝে মাঝে, স্পেশাল কেসে বাবা হাতেকলমে লিস্ট বানান। যেমন বেড়াতে যাওয়ার সময় অথচ আমার ধারণা বেড়াতে যাওয়ার জন্যই বাবার সবথেকে কম প্ল্যানিং দরকার।  বেড়াতে যাওয়াটা বাবার রক্তেমজ্জায় এমনভাবে ঢুকে গেছে যে ভারতবর্ষের ভেতরের কোনও জায়গার যাওয়ার জন্য দশমিনিটের নোটিসই বাবার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু বাবা কক্ষনও ওভাবে বেড়াতে যান না। প্রচুর আঁটঘাট বাঁধেন, জায়গাটা সম্পর্কে অন্তত মাসতিনেকের রিসার্চ চালান। তারপর দিনসাতেক বাকি থাকতে লিস্ট বানাতে বসেন। কী কী নিয়ে বেড়াতে যাওয়া হবে। সে লিস্ট বানানোর নিয়ম আছে। যেমন তেমন করে লিখে গেলে চলবে না। তাতে আইটেম মিস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। সকাল থেকে কী কী লাগতে পারে সেই ভেবে শুরু করা হবে। টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, তোয়ালে, চিরুনি, ওষুধ, গামছা, হাওয়াই চটি। একেকটা জিনিস ব্যাগে ঢুকবে আর সেই জিনিসের নামের ওপর পরিচ্ছন্ন একটা টিক পড়বে। কাটা দাগ নয়, টিকচিহ্ন। কাটাচিহ্ন পড়বে ফেরার পথে। যখন সেই লিস্ট দেখে দেখে আবার জিনিস ব্যাগে ঢোকানো হবে। তখন একটি পরিষ্কার দাগ দিয়ে জিনিসটার নাম কেটে দেওয়া হবে। অর্থাৎ কি না এবারের বেড়ানোয় তাদের অবদান শেষ।

প্যাকিং করার লিস্ট হয়তো অনেকেই করে। কিন্তু আমার বাবা আরও নানারকম লিস্ট করেন। টাইমটেবিল বার করে যে সব স্টেশন দিয়ে ট্রেনটা যাবে তাদের সবগুলোর নাম লেখেন। ছোটবড় নির্বিশেষে। বড় স্টেশনগুলোর পাশের কলামে টাইম লেখা হয়। ট্রেন কখন ঢুকবে, কখন বেরোবে। সে সব স্টেশনে পৌঁছে সবাই যখন জানালা দিয়ে ঘাড় বার করে চা-ওলা খুঁজবে ট্রেন কত লেট জানার জন্য তখন আমার বাবা পকেট থেকে একতাড়া কাগজ বার করবেন। মোগলসরাইয়ে গাড়ি ঢোকার কথা ছিল পাঁচটায়, এখন বাজে সাতটা। এর পরেও যারা আশা করে এ দেশের কিছু হবে তারাই পাগল। আমার বাবা নন।

কিন্তু লোকে নিশ্চয় বাবাকেই পাগল ভাবে। আমি অন্তত ভাবতাম। বাবার এই গুনেগেঁথে বেড়াতে যাওয়ার অভ্যেসকে ভয়ানক হেলার চোখে দেখতাম। আমার মনে হত বেড়াতে যদি যেতেই হয় তাহলে বোহেমিয়ানদের মতো করে বেড়ানো উচিত। এই মনে হবে বেড়াতে যাব, এই পায়ে চটি গলিয়ে বেরিয়ে পড়ব। আমার খুব শখ ছিল বড় হয়ে বোহেমিয়ান হওয়ার। খুব আফসোস হত, বাবা যে কেন বোহেমিয়ান হতে পারেন না।

এখন আর হয় না। এখন আমিও বেড়াতে যাওয়ার আগে বাবার মতো যত্ন করে লিস্ট বানাই। বোহেমিয়ান হওয়ার শখ ঘুচে গেছে বলে নয়। মধ্যবিত্তের মতো খুচরো গুনে বাঁচা অভ্যেস হয়ে গেছে বলেও নয়। অন্য একটা কারণের জন্য। আমি নিশ্চিত বাবাও যে কারণটার জন্য প্রত্যেকবার অত ঘটা করে লিস্ট বানান।

কারণ ওই লিস্ট বানানোর ছল করে বাবা আরেকবার জায়গাগুলোয় বেড়িয়ে আসতে পারেন। লিস্টে মোগলসরাইয়ের নাম আর ট্রেনের সময় লিখতে লিখতে বাবা আসলে মোগলসরাই পৌঁছে যান। ট্রেন একেবারে টাইমে ঢুকেছে। খবরের কাগজ আর চাওয়ালারা ভয়ানক চেঁচামেচি লাগিয়েছে। বাবা ট্রেন থেকে নেমে চা খেতে গেছেন। চায়ের দোকানের কাঁচের বাক্সের ভেতর সামোসা। নির্ঘাত কাল সন্ধ্যের বাসি। কিন্তু বাবার ইছে করছে খেতে। বাবা সকাল ছটায় মোগলসরাই স্টেশনে দাঁড়িয়ে অম্লানবদনে বাসি সিঙাড়া খাচ্ছেন। লিস্টে টুথব্রাশ টুথপেস্ট লেখা হচ্ছে। হোটেলের ঘরে সবাই ঘুম থেকে উঠেছি। মা দাঁত মাজতে যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছেন। এদিকে বাথরুমে গিজারের সুইচ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাবা রিসেপশনে ফোন করছেন। মা জিজ্ঞাসা করছেন "ছাতা নিতে হবে নাকি? যদি বৃষ্টি হয়?" বাবা বলছেন, "নিয়ে নাও, জাগা তো আছে অনেক" (সব বাঙালই জায়গাকে 'জাগা' বলে কি?) আর আমরা পুরীর সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মায়ের নীল রঙের সিল্কের শাড়ির আঁচল পতপত করে পতাকার মতো উড়ছে। সমুদ্রের ওপরে দৈত্যের মতো কালো মেঘ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, বড় বড় জলের ফোঁটা বাণের মতো বিঁধে যাচ্ছে বালির বুকে। আমার হাতে ধরা ছাতা এই উল্টোলো বলে। সারাটা জীবনকে সায়েন্টিফিক্যালি ব্যাখ্যা করা আমার মা আমাকে দেখিয়ে দিচ্ছেন, হাওয়া কোন দিক থেকে আসছে, ছাতা কোনদিকে মুখ করে ধরতে হবে।

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে পাঁচটায় প্লেন। সোমবার অফিস থেকে ফিরে ইচ্ছে করবে না তাই রবিবার সন্ধ্যে হতে না হতেই আমরা লিস্ট বানাতে শুরু করলাম। সকাল থেকে কী কী লাগবে? থ্রি জি ব্যালেন্স, ফোন, চার্জার, চপ্পল, টুথব্রাশ, টুথপেস্ট। মাথা খাটিয়ে লিখছি আর গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছি। সি আর পার্কের দোতলার ভাড়াবাড়ি মুছে গিয়ে ফুটে উঠছে দিগন্তবিস্তৃত কাজিরাঙার জঙ্গল, চাবাগানের মাথায় সাদা মিহি মশারির মতো কুয়াশা নামছে। আমরা ঘরের কম্বলের তলায় পা গুঁজে বসে ফোন কানে তুলে বলছি, "ভাইসাব, দো চায় ভেজ দিজিয়ে। চিনি অলগসে দেনা প্লিজ।

সোমবার সারাদিন অফিসের ফাঁকে ফাঁকে প্রস্তুতি চলল। মাস দেড়েক আগে কেটে রাখা টিকিট ইনবক্স হাতড়ে খুঁজে বার করা হল। গেস্ট হাউসের পাঠানো অগ্রিম ভাড়ার রসিদ। তারপর দেখি অর্চিষ্মান নামের একজন একটা মেল পাঠিয়েছে। মেরুক্যাব বুক হয়ে গেছে। রাত তিনটেয় আমাদের বাড়ি থেকে পিক আপ করবে। তখন সত্যি মনে হচ্ছিল তিনটে পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে পারব না। এই মুহূর্তে পাঁচতলার জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে উড়তে উড়তে একেবারে গণ্ডারের পিঠে গিয়ে চড়ি।

প্লেনের টাইমিংটা উৎকট, কিন্তু একদিক থেকে ভালোই। দিল্লির আকাশে নোংরা কুয়াশা দৃশ্যমান হওয়ার আগেই প্রাণ নিয়ে পালানো যাবে। সমস্যা হচ্ছে জেগে থাকা। আমি নিজেকে জানি, তেড়েফুঁড়ে রাত জাগব বলে ফ্লাস্কভর্তি চা নিয়ে বসলেও এগারোটা বাজতে না বাজতে ঢুলতে শুরু করব। এই সব কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্যই নির্ঘাত আমার আর অর্চিষ্মানের দেখা হয়েছিল। অর্চিষ্মান স্বাভাবিক রাতেই দুটো অবধি জেগে থাকে। স্পেশাল কেসে তিনটে পর্যন্ত টেনে দেওয়া ওর পক্ষে কোনও ব্যাপার না। আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে চলে গেলাম। অর্চিষ্মান পাহারায় রইল।

সোয়া দুটো। অর্চিষ্মান ডেকে দিয়েছে। আমাদের দাঁত মাজা সারা। টুথপেস্ট টুথব্রাশ ব্যাগে ঢুকিয়ে লিস্টে টিক দিয়ে দিয়েছি। এস এম এস এসে গেছে। বিজয়কুমারজী গাড়ি নিয়ে সি আর পার্কে ঢুকে গেছেন। কিন্তু রাতের বেলা বেশিরভাগ গেট বন্ধ তাই বাড়ির সামনে পৌঁছতে পারছেন না। অর্চিষ্মান মাথায় টুপি চাপিয়ে তাঁকে পথ দেখাতে গেল। আমি লিস্ট দেখে দেখে না হাওয়াই চটি ফোন ফোনের চার্জার ব্যাগে ঢোকালাম। সকেট থেকে প্লাগ টেনে টেনে খুললাম। জানালা দরজার ছিটকিনি, গ্যাসের নবে হাত বুলিয়ে দেখলাম সবাই বন্ধ আছে কি না। অর্চিষ্মান ফিরল।আমি আরেকবার দেখে আসি, হ্যাঁ?” বলে ছিটকিনি আর গ্যাসের নবে হাত বুলোতে গেল। আমি মাফলার পেঁচাতে পেঁচাতে শেষবারের মতো চারপাশ জরিপ করলাম। খাট ওয়ার্ডরোব টেবিল টিভি বুককেস। যে যেখানে থাকার সেইখানে আছে। পাঁচরাত আর ছ'দিন বাদেও যেন থাকে ঠাকুর। অর্চিষ্মান বেরিয়ে এল। শেষবারের মতো টিকিট আর আই ডি কার্ড। সব নেওয়া হয়েছে। সত্যিই আর কিছু বাকি নেই।

রেডি? রেডি। খোলা লিস্টের ওপর রাখা পেনটা তুলে নিলাম। দুটো আইটেম বাকি আছে। সে দুটো কেটে দিলাম। খাতা আর পেন। তারা আমার কাঁধের ব্যাগে ঢুকে গেল।

বেড়ানো শুরু হয়ে গেল।
                       (চলবে)



December 21, 2015

৩৫ বছরের জন্মদিনে আমি যা যা করলাম




ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কাশ্মীরে বরফ পড়ায় আমাদের দিল্লির আকাশও বেশ ক'দিন মেঘলা ছিল। শুক্রবার লাঞ্চে বেরিয়েও দেখেছি চারদিক কেমন স্যাঁতসেঁতে, ভেজা ভেজা। এদিকে আমার পঁয়ত্রিশ বছরের জন্মদিন পড়েছে সোমবার। যা উদযাপন করার শনিরবিতেই করতে হবে। তাই বেশ টেনশনে ছিলাম। কিন্তু ভালো লোকদের সবসময় ভালোই হয়। তাই রবিবার সকালবেলা হতে না হতেই ঝলমলে রোদ্দুরে আমাদের বারান্দা ভেসে গেল। আমি সেই সুযোগে আমার গাছগুলোকে একটু রোদে শুকোতে দিলাম। তারপর অটো ডেকে বেরিয়ে পড়লাম। যাব পুরানা কেল্লা।

রবিবার দুপুরে ওই তল্লাটে হইহই করছে ভিড়। সুখের বিষয় সে ভিড়ের অধিকাংশই এসেছে চিড়িয়াখানায়। আমরা টিকিট কেটে কেল্লায় ঢুকলাম। ঢুকেই ডানদিকে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ছোট্ট মিউজিয়াম। কেল্লার মাটি খুঁড়ে পাওয়া প্রচুর ভাঙাচোরা শিল্পসামগ্রী, যন্ত্রপাতি, গয়না, মূর্তি সাজানো আছে। পুরানা কেল্লার মাটির তলা থেকে পাওয়া এসব জিনিসপত্রের সবথেকে পুরোনোগুলোর বয়স যিশুর জন্মের প্রায় একহাজার বছর আগে। তারপর মৌর্য, শুঙ্গ, শক-কুষাণ, গুপ্ত, গুপ্ত-পরবর্তী যুগ, রাজপুত, দিল্লি সুলতানাত এবং শেষে মুঘল যুগের জিনিসপত্র রাখা আছে মিউজিয়ামে। সে সব দেখে আর দেওয়ালে টাঙানো লেখাপত্র পড়ে একটা জিনিস বোঝা গেল। এখন যে জায়গাটাকে 'পুরোনো দিল্লি' বলা হয় বয়সের দিক থেকে দেখতে গেলে সে জায়গাটা দিল্লির সবথেকে নতুন অংশ। সে জায়গার রমরমা শুরু হয়েছে শাহজাহান আসার পর। ষোলশো আটত্রিশে। তার আগে দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন শহর আগে থেকেই ছিল।

কেউ কেউ বলে সে সব শহরের মধ্যে সবথেকে পুরোনো হল পাণ্ডবদের শহর ইন্দ্রপ্রস্থ। ইন ফ্যাক্ট দাবি করা হয় যে এখন যেখানে পুরানা কেল্লা, সেখানেই ছিল ইন্দ্রপ্রস্থ। তার সপক্ষে খুব যে প্রমাণ পাওয়া গেছে তা নয়, তবে উনিশশো তেরো সালেও যে কেল্লার দরজার ভেতরে ইন্দরপত নামের একটা গ্রাম ছিল সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। যদি ইন্দ্রপ্রস্থের অস্তিত্ব স্বীকার করি তবে দিল্লির ইতিহাস পাঁচহাজার বছর পিছিয়ে যায়। আর যদি তা না করি তবে দিল্লির শহরের ইতিহাস শুরু হয় নবমদশম শতাব্দী থেকে। যখন সুরজকুণ্ডে তোমর রাজারা এসে ঘাঁটি গাড়লেন। মুসলিম আক্রমণকারীদের মোকাবিলা করার জন্য এগারোশো আশি নাগাদ পৃথ্বীরাজ চৌহান এসে কেল্লা বানালেন এখনকার মেহরৌলিতে, মোংগলদের মারার জন্য তেরোশো তিন সালে আলাউদ্দিন খলজি বানালেন সিরি ফোর্ট। সবথেকে মজা লাগল এই ভেবে, এখন যে জায়গাগুলোতে আমরা অটো চেপে হুশ করে চলে যাই, সেগুলো আগে একেকটা আলাদা আলাদা শহর ছিল। তেরোশো কুড়ি নাগাদ তুঘলকাবাদে কেল্লা বানিয়ে বসতি স্থাপন করলেন ঘিয়াসুদ্দিন তুঘলক, এঁরই ছেলে মহম্মদ পরে পাগল এবং প্রতিভাবান হিসেবে তুঘলক বংশের নাম উজ্জ্বল করবেন। বাবার বানানো কেল্লা পছন্দ না হওয়াতেই বোধহয় সিরি আর তুঘলকাবাদের মধ্যে জাহাঁপনা নামে আরেকটা শহর স্থাপন করলেন মহম্মদ বিন তুঘলক। তেরোশো পঞ্চাশ সালে ফিরোজাবাদ বানালেন ফিরোজশাহ তুঘলক, সেটা আরেকটা নতুন শহর বলে বিবেচিত হল, সেই কেল্লার ধ্বংসাবশেষই এখন ফিরোজ শাহ কোটলা বলে। এর পর বেশ কিছুদিন আবার শহর বানানো বন্ধ রইল। পনেরোশো আটত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ সাল পর্যন্ত হুমায়ুন আর শেরশাহ একই জায়গায় মারামারি করে দিনপনাহ্‌ আর শেরগড় নামের শহর বানালেন। এই জায়গাই এখন পুরানা কেল্লা বলে খ্যাত হয়েছে। সুরজকুণ্ড থেকে গুনতে শুরু করলে দিনপনাহ্‌/ শেরগড়/ পুরানা কেল্লা হল দিল্লির ষষ্ঠ শহর। এরও প্রায় একশো বছর পর, ষোলশো আটত্রিশ সালে লাল কেল্লা আর চাঁদনিচক ঘিরে শাহজাহানাবাদ বানালেন শাহজাহান। হাস্যকরভাবে যেটা পুরানি দিল্লি বলে খ্যাত হয়েছে।

যাই হোক, দিল্লির কালকাজী সন্নিহিত অঞ্চলে যে প্রস্তরযুগের মানুষদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করা গেছে সেটা জেনে, ঘাড়ের রোম খাড়া করে আমরা মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এলাম। এবার আসল কেল্লা দেখতে বাকি।

দেড় কিলোমিটার বিস্তৃত আঠেরো মিটার উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা কেল্লায় ঢোকার তিনটে গেট। এক, বড়া দরওয়াজা যেটা দিয়ে আমরা ঢুকলাম, দুই, হুমায়ুন দরওয়াজা, তিন তালাকি (ডিভোর্সের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই, এ তালাক-এর অর্থ নিষিদ্ধ) দরওয়াজা। কেল্লার ভেতরের অংশটা কমবেশি আয়তাকার।


পুরানা কেল্লা গোড়াতে ছিল হুমায়ুনের বানানো শহর দিনপনাহ-র রাজধানী। পনেরোশো তেত্রিশ থেকে শুরু করে পাঁচবছর ধরে তিনি এই কেল্লা বানিয়েছিলেন। কেল্লা বানিয়ে সবে হাঁফ ছাড়ছেন হুমায়ুন, অমনি হইহই করে এসে পড়লেন শেরশাহ সুরি। হুমায়ুন তাড়া খেয়ে একেবারে পারস্যে গিয়ে পৌঁছলেন। শেরশাহ কেল্লার নাম বদলে করে দিলেন শেরগড়। এবং আরও নানারকম ঘরবাড়ি বানালেন। সত্যি কথা বলতে কি হুমায়ুনের ব্রেনচাইল্ড হলেও পুরানা কেল্লায় এখন যে সব স্থাপত্য দেখতে পাওয়া যায় সেগুলো বেশিরভাগই শেরশাহের তৈরি।
যেমন এই মসজিদ। এর নাম কিলা-ই-কুহনা অর্থাৎ পুরোনো কেল্লার মসজিদ। পনেরোশো চল্লিশ বা একচল্লিশ নাগাদ নিজস্ব ব্যবহারের জন্য এই মসজিদ বানিয়েছিলেন শেরশাহ। শোনা যায় লাল সাদা পাথরের সঙ্গে সোনা ও আরও নানারকম দামি পাথর দিয়ে বানানো হয়েছিল এই মসজিদ। মসজিদের ভেতরের হলের ছাদ প্রায় ষাট ফুটেরও বেশি উঁচু। কাজেই ওখানে চেঁচালে বেশ একটা প্রতিধ্বনি হয়। আমাদের ভারতীয়দের মধ্যে আবার সব জিনিস হাতে কলমে পরীক্ষা করার একটা তাগিদ থাকে। দেওয়াল দেখলেই নিজের নাম লিখি, পাঁচিল দেখলেই লাফিয়ে টপকাই, কুয়ো দেখলেই লাফিয়ে নামি আর ফাঁকা উঁচু হলঘর দেখলেই চেঁচাই। চেঁচামেচিতে অস্থির হয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম। এদিকওদিক তাকিয়ে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ইন্টারেস্টিং বাড়ি চোখে পড়ল, সেদিকে হাঁটলাম।

কেউ এ বাড়িটাকে হুমায়ুনের লাইব্রেরি বলে, কেউ বলে শের মণ্ডল। চাইলে বাবরের নামেও এটাকে চালানো যায় কারণ বাড়িটার আসল প্ল্যান করেছিলেন তিনিই। যদিও বানিয়ে যেতে পারেননি। তাঁর সেই কাজ শেষ করেন শেরশাহ। শেরশাহ এটা ব্যবহার করতেন "পারসোনাল প্লেজার"-এর জন্য। তারপর পনেরোশো পঞ্চান্ন সালে কেল্লা পুনর্দখল করে হুমায়ুন ফের এটাকে নিজের লাইব্রেরি বানিয়ে ব্যবহার করতে থাকেন। মাত্র বছরখানেক বাদে পনেরোশো ছাপ্পান্ন সালের জানুয়ারি মাসের এক সন্ধ্যেবেলা আজানের ডাক শুনে এই লাইব্রেরি থেকেই তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জখম হন হুমায়ুন। তিনদিন পর তাঁর মৃত্যু হয়।



কেন হয়নি সেটা আশ্চর্য, কিন্তু পুরানা কেল্লা কিন্তু সহজেই হানাবাড়ি বা খুনি কেল্লা বলে পরিচিত হতে পারত। কোনও রাজার কপালেই পুরানা কেল্লার সুখ স্থায়ী হয়নি। হুমায়ুনের কথা তো বললামই. হুমায়ুনকে পুরানা কেল্লা থেকে তাড়িয়ে মোটে পাঁচ বছর বেঁচে ছিলেন শেরশাহ। কিন্তু হুমায়ুন শেরশাহ ছাড়াও পুরানা কেল্লার কোপ যে রাজার ওপর সবথেকে বেশি করে পড়েছিল, তিনি হলেন হেমচন্দ্র ওরফে হেমু।

এই হেমু খুব ইন্টারেস্টিং চরিত্র। পনেরোশো এক সালে তাঁর জন্ম। জন্মের জায়গা নিয়ে মতভেদ থাকলেও সব বিশেষজ্ঞই একমত হয়েছেন যে হিমু জন্মেছিলেন গরিব ঘরে। জীবনের শুরুতে তিনি নুনের ব্যবসা করতেন। ক্রমে দিল্লির ব্যবসাবাণিজ্যের জগতে তাঁর গুরুত্ব বাড়তে থাকে এবং হেমু রাজারাজড়ার চোখে পড়তে শুরু করেন। ব্যবসা ছাড়াও ছোটখাটো যুদ্ধ লড়ার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। সেটা হেমুর সি ভি-তে কাজে লেগেছিল খুব। পনেরোশো পঁয়তাল্লিশে শেরশাহের মৃত্যুর পর শেরশাহের ছেলে ইসলাম শাহ সিংহাসনে বসলে হেমু তাঁর মুখ্য পরামর্শদাতার স্থান নেন। পনেরোশো তিপান্নতে ইসলাম শাহের মৃত্যুর পর শেরশাহের ভাইপো আদিল শাহ সুরি নামে সিংহাসন দখল করেন। কিন্তু আদিল শাহ ছিলেন পাঁড় মাতাল এবং সর্বার্থেই রাজার অযোগ্য সন্তান। আদিল শাহের আমলে হেমুই হয়ে উঠলেন আসল রাজা। ছোট ছোট আফগান রাজাদের নিজের দলে টেনে নিয়ে তিনি এক ভয়ানক শক্তিশালী সেনাদল বানালেন। কিন্তু এই গোলযোগে মুঘলরা আবার শক্তিশালী হয়ে উঠল। হুমায়ুন পারস্য থেকে ফিরে এসে আদিল শাহ সুরির ভাই সিকন্দর সুরিকে গোহারা হারিয়ে আবার পুরানা কেল্লায় ঢুকে পড়লেন। সেটা পনেরোশো পঞ্চান্ন সাল। হিমু তখন বাংলাদেশের রাজা মহম্মদ শাহের বিদ্রোহ ঠাণ্ডা করতে ব্যস্ত। বিদ্রোহ ঠাণ্ডা হল, মহম্মদ শাহ কোতল হলেন। ঠিক এই সময়েই পুরানা কেল্লার সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে হুমায়ুন মারা গেলেন। হেমুর কানে খবর গেল। পুরানা কেল্লার তথা দিল্লির সিংহাসন খালি। মুঘল সেনাপতি বৈরম খানের তত্ত্বাবধানে হুমায়ুনের চোদ্দ বছরের ছেলে আকবরের তড়িঘড়ি রাজ্যাভিষেক হয়েছে বটে কিন্ত সে দিল্লিতে নয়, পাঞ্জাবে। হেমুর মনে হল এই সুযোগ। এতদিনের কাজের রাজা হয়ে থেকেছেন তিনি। এবার সুযোগ এসেছে নামেও রাজা হওয়ার। প্রায় পঞ্চাশহাজারের সেনাদল নিয়ে বাংলা থেকে বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশের মধ্য দিয়ে দিল্লির দিকে যাত্রা করলেন হেমু। তাঁর রণোন্মত্ত চেহারা দেখে বেশির ভাগ মুঘল ফৌজদার ঘাঁটি ছেড়ে পালাল। যারা পালাল না তাদের হেমু যুদ্ধে হারিয়ে ঘাঁটি দখল করলেন। আগ্রার মতো গুরুত্বপূর্ণ মুঘল শিবিরও হেমুর কাছে বিনা বাধায় আত্মসমর্পণ করল। পনেরোশো ছাপ্পান্ন সালের ছয়ই অক্টোবর তুঘলকাবাদের সীমায় এসে পৌঁছলেন হেমু। দিল্লির দায়িত্ব তখন তারদি বেগ-এর হাতে। বেগ বিপদ বুঝে বৈরম খানকে খবর দিলেন। বিচক্ষণ বৈরম খান তেরো বছরের আকবরকে তো যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠালেনই না, নিজেও এলেন না। তাঁদের হয়ে যুদ্ধ করতে এলেন বৈরম খানের বিশ্বাসভাজন পির মহম্মদ শরওয়ানি। কিন্তু হেমুকে আটকানো গেল না। মাত্র একদিনের যুদ্ধে মুঘলরা হেমুর কাছে হেরে গিয়ে পালাল। হেমু দিল্লির রাজা হলেন। পুরানা কেল্লায় মহা ঘটা করে তাঁর অভিষেক হল। হেমু নিজের নাম রাখলেন হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য।



মাত্র একমাস রাজত্ব করতে পেরেছিলেন হেমু। নভেম্বর পড়তে না পড়তে পানিপথের মাঠে বৈরম খান আর আকবরের সেনারা এসে তাঁকে যুদ্ধে আহ্বান করল। দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ শুরু হল। এর আগে জীবনে বাইশটি যুদ্ধ লড়েছিলেন হেমু। বাইশটিতেই জিতেছিলেন। কিন্তু এই যুদ্ধে পারলেন না। হাতির ওপর বসে থাকা হেমুর চোখে তীর এসে লাগল। তিনি পড়ে যেতে তাঁর সেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। জখম হেমুকে মুঘল সেনারা বন্দী করে নিয়ে গেল বৈরমের কাছে। শুধু রাজ্য কেড়ে নিলেই হত, কিন্তু বৈরম খান হেমুর মাথা কেটে নিলেন। মাথা গেল কাবুলে, দিল্লি দরওয়াজার সামনে সেটাকে ঝুলিয়ে রাখা হল। মাথাহীন ধড়টাকে ঝোলানো হল পুরানা কেল্লার সামনে। মুঘলদের চ্যালেঞ্জ করলে তার পরিণতি কী হয় সেটা সবাইকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।


ব্যাপার হাসির নয় মোটেই, কিন্তু হাসি ছাড়া আর কীই বা করার আছে।


এইসব দেখতে দেখতে পশ্চিমে বড় দরওয়াজার পেছনে সূর্য লাল হয়ে ডুবতে বসল। কেল্লার টিকিট কাউন্টারে তখন লাইট অ্যান্ড সাউন্ড দেখার জন্য লাইন পড়েছে। আমরা বেরিয়ে এলাম, কারণ আমাদের এখন সিটিস অফ স্লিপ দেখতে যেতে হবে। পঁয়ত্রিশতম জন্মদিন উদযাপনের শেষ ইভেন্ট।


*****



আপনারা নিশ্চয় ভাবছেন, উপোসি পেটে এ কেমন জন্মদিন উদযাপন? উপোস আমরা করিনি মোটেই। আমার অফিসের দুজন জন্মদিন পালন করতে ডিগিন'এ গিয়েছিল, এসে খুব সুখ্যাতি করেছিল। সেই থেকে আমার যাওয়ার ইচ্ছে।

ইচ্ছেপূরণ না হওয়ার একটা প্রধান কারণ দোকানটার অবস্থান। ডিগিন আনন্দলোকে গার্গী কলেজের ঠিক উল্টোদিকে। ওই অঞ্চলটা আমাদের কারওরই যাতায়াতের পথে পড়ে না। ছুটির দিনে যাওয়া যায়, কিন্তু ইটালিয়ান খাবার আমাদের দুজনের কারওরই পছন্দের প্রথমদিকে না থাকায় যাচ্ছি যাব করে আর হয়ে উঠছিল না।

আমার বন্ধুরা বলেছিলেন খাবার তো ভালোই, ডিগিন দেখতেও দারুণ। সত্যিই চমৎকার সাজানো দোকান। দোলনায় বাচ্চারা দুলছে, একতলা আর দোতলার বারান্দায় এসে পড়া মিঠে রোদ্দুরে বসে খাচ্ছে লোকজন।



বন্ধুরা যদিও বাইরে বসার সাজেশন দিয়ে রেখেছিল, কিন্তু আমরা জায়গা পেলাম না। তখন বেলা দেড়টা, গমগম করছে ভিড়। মাত্র দুটি চেয়ারওয়ালা একটি টেবিল খালি ছিল, কোনওমতে দৌড়ে গিয়ে সেখানে নিজেদের তশরিফ রাখলাম। এত ভিড় যে পরিবেশকদের মনোযোগ পেতেই গলদঘর্ম। অবশেষে একজন আমাদের ডাকে সাড়া দিলেন। খাবার অর্ডার দিলাম। অটোতে আসতে আসতে হাওয়া লেগে গিয়েছিল বোধহয়, মাথা টিপটিপ করছিল। কাজেই সবার আগে কফি।


ডিগিন'-এর কফি বেশ ভালো লেগেছে আমার। তবে কফির থেকেও ভালো লেগেছে কফির সঙ্গে আসা এই ব্রেড বাস্কেটের ব্যাপারটা। এতে ছিল চারটে ব্রাউন পাউরুটি, দুটো স্টিক বিস্কুট (রাজধানীতে সুপের সঙ্গে যেগুলো দেয়, তবে রাজধানীর বিস্কুটের থেকে রোগাভোগা) আর দুটো গারলিক ব্রেডের নট (গেরো)। এই শেষের আইটেমটাই সবথেকে ভালো খেতে। তুলোর মতো নরম, মেঘের মতো ফুসকো।


মেন কোর্সে আমি নিয়েছিলাম প্রন স্কুইড পিৎজিওলা। পিৎজিওলা হচ্ছে টমেটো, অরিগ্যানো, বাসিল দিয়ে বানানো একরকমের ইটালিয়ান সস। ইটালিয়ান সসের টমেটোর আধিক্যটা আমার পছন্দ নয়, কিন্তু প্রন এবং স্কুইড দুটোই দারুণ প্রিয়। সব মিলিয়ে বেশ ভালোই লাগল খেতে।

প্রন স্কুইড পিৎজিওলার সঙ্গে ফাউ এসেছিল স্যাফ্রন দিয়ে রান্না করা মোটা দানার ভাত আর রোস্টেড গাজর, বিন, ব্রকোলি, জুকিনি। আমি তরকারিগুলো উৎসাহভরে খেতে শুরু করেছিলাম, তারপর যখন দেখলাম যে পিৎজিওলা খেয়েই পেট ভরে যাচ্ছে তখন সবজি ছেড়ে সেই দিকেই মনোনিবেশ করলাম। ভাত ভাতের মতো পড়ে রইল।


অর্চিষ্মান নিয়েছিল ল্যাম্ব শ্যাংক। রেড ওয়াইন সসে ঢাকা নরম তুলতুলে মাংসের সঙ্গে রোস্টেড ভেজিটেবল আর বেবি পটেটো।




জন্মদিনে পেটকে একটু বাড়তি অত্যাচার করার জন্য ডেজার্টে ডিগিন স্পেশাল কফি খাওয়া হল। এসপ্রেসোর মধ্যে এক স্কুপ জেলাতো, চকোলেট সস আর চকোলেট চিপস। এ কফি খেলে ঘুম কাটার বদলে উল্টে পেয়ে যায়। কিন্তু আমাদের তখন ঘুমোলে চলবে না, কেল্লা দেখতে যেতে হবে। কাজেই হাইটাই চেপে অটোতে উঠে পড়লাম। তারপর কী হল সে তো ওপরেই লিখেছি।
*****

এই হল আমার বুড়োবয়সের জন্মদিন উদযাপনের গল্প। আর এই গল্পের সঙ্গে সঙ্গে আমি অবান্তর থেকে সাতদিনের ছুটি নিলাম। গণ্ডার দেখতে যাচ্ছি। ফিরব সেই রবিবার গভীর রাতে। সোমবার একটা পোস্ট ছাপলেও ছাপতে পারি, তবে সেটা ভ্রমণবৃত্তান্ত হবে না, কারণ সে বৃত্তান্ত লিখতে (তার থেকেও বেশি ছবির ব্যবস্থা করতে) ক'দিন সময় লাগবে। ততদিন আপনারা খুব ভালো হয়ে থাকবেন, বড়দিনে বেশ করে মাংকিটুপি পরে কেক খাবেন। টা টা বাই বাই, আবার যেন দেখা পাই।
*****

Diggin
Anand Lok Shopping Centre, Opposite Gargi College, Anand Lok, New Delhi
011 33105376







December 16, 2015

Cities of Sleep





"আজাদ ওহ্‌ হ্যায় যো আপনি মর্জি সে শোয়ে অওর জাগে।"

স্বাধীনতার একটা সংজ্ঞা যে এই ভাবেও দেওয়া যেতে পারে, সেটা আগে জানতাম না। সিটিস অফ স্লিপ দেখতে গিয়ে জানলাম। পরের চুয়াত্তর মিনিট ধরে আরও অবশ্য অনেক কিছু জানা হল। যে শহরে উঠিবসি খাইশুই, তার একটা সম্পূর্ণ অন্য চেহারা, অন্য অর্থনীতি, অন্য রাজনীতির দিক জীবনে প্রথমবার দেখলাম।

অথচ এমন নয় যে সেই শহরটা বা শহরের সেই দিকটা আমার চোখের আড়ালে ঘটছে। প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের ফ্লাইওভারের মাঝখানের বিভাজিকাতে নোংরা লেপকম্বলের ঢিপি দেখেছি। জুলাই-এর গরমে দেখেছি, এই ডিসেম্বরের ঠাণ্ডাতেও দেখছি। এও জানি যে ওই ঢিপির নিচে একজন মানুষ আছে। দুপাশ দিয়ে এই ছুটন্ত গাড়ির পাইপ দিয়ে অনর্গল বেরোনো ক্লোরোফ্লুরোকার্বনের বিষ, সাইলেন্সারহীন মোটরবাইকের অশিষ্ট আত্মবিশ্বাসকে কাঁচকলা দেখিয়ে ভোঁসভোঁস করে ঘুমোচ্ছে। ইন ফ্যাক্ট, তাকে ঘুম থেকে তুলে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে এই শব্দ আর গরম হাওয়ার ঝাপটে তার অসুবিধে হচ্ছে কি না তাহলে সে চোখ কপালে তুলে বলতে পারে, অসুবিধে? এসব তো হেল্প করে মশাই! ওই যে ছুটন্ত গাড়ি থেকে দমকা গরম হাওয়া ওতেই তো মশাটশা সব উড়ে যায়।

"ডেঙ্গু মলেরিয়াসে অগর বচনা হো দিল্লিমে, ডিভাইডার মে শোনা হোগা।"

সিটিস অফ স্লিপ-এর কথা আমি প্রথম শুনেছিলাম তিন্নির মুখে। হ্যাঁরে, তোদের দিল্লিতে রাতে ঘুমোনর নাকি একটা বাজার আছে? আছে বুঝি? হ্যাঁ আছে তো। প্রপার বাজার। সে বাজারে ক্রেতা বিক্রেতা আছে, তোলাবাজ আছে, মাফিয়া আছে। স্লিপ মাফিয়া। সেই সব নিয়ে ডকুমেন্টারি বানিয়েছে একটা নতুন ছেলে, শৌণক সেন। বাঃ বাঃ, সুযোগ পেলে দেখব তবে, মুখে বলেছিলাম বটে, কিন্তু জানতাম দেখব না। ডকুমেন্টারি দেখার অভ্যেস আমার একেবারেই নেই। তবে বিষয়টার অভিনবত্ব মনে ধরেছিল। তারপর আরও বন্ধুবান্ধবের মুখে যখন সিটিস অফ স্লিপ-এর নাম শুনতে শুরু করলাম। তারপর হঠাৎ যখন দেখলাম তেরোই ডিসেম্বর সন্ধ্যে সাতটায় ইন্ডিয়া হ্যাবিটাট সেন্টারে সিটিস অফ স্লিপ দেখানো হচ্ছে, পাসটাস কিচ্ছু লাগবে না, তখন ছবিটা দেখতে যাব ঠিক করে ফেললাম। পঁয়ত্রিশতম জন্মদিন উদযাপনের অঙ্গ হিসেবে খালি গাঁক গাঁক করে খাওয়া আর রাস্তায় রাস্তায় চরে বেড়ানোর সঙ্গে একটু সংস্কৃতিচর্চার ভঙ্গি হবে অন্তত।

সিটিস অফ স্লিপ শৌণক সেনের প্রথম ছবি। ছবির মধ্যে দুটো আলাদা আলাদা সুতো ধরে এগিয়েছেন পরিচালক। একটা সুতো হচ্ছে বায়োগ্রাফি অফ আ পার্সন, যেখানে শাকিল নামে এক গৃহহীনের গল্প বলা হয়েছে। দু'নম্বর সুতোটা হচ্ছে বায়োগ্রাফি অফ আ প্লেস, যেখানে লোহাপুল নামে যমুনার ওপর একটি ব্রিজের নিচের শোওয়ার জায়গার কথা বলা হয়েছে।

প্রথম সুতো শাকিল। শাকিল একজন গৃহহীন মানুষ, যে উত্তর দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে রাত কাটায়। এই সব শিবিরের মধ্যে 'অফিশিয়াল' যে  নাইট  শেল্টার বলে উল্লেখ করা হচ্ছে, সেখানে শাকিল পারতপক্ষে ঘুমোয় না। কারণ একে তো শোয়ার জায়গা পাওয়া যায় না, তার ওপর দরজার কাছে চপ্পল খুলে রেখে ঢুকলে চপ্পলও চুরি হয়ে যায়। যদিও শাকিলের কয়েকজন পরিচিত পরে ছবির বিভিন্ন জায়গায় এসে অভিযোগ করেছে যে শাকিল কুঁড়ে এবং চরম মিথ্যেবাদী, এই চপ্পল চুরির ব্যাপারটা মিথ্যে নয়, কারণ ছবিতে আমরা সবাই নিজের চোখেই দেখলাম যে শাকিল চটি ছেড়ে শেল্টারে ঢুকল আর বেরিয়ে এসে চপ্পল কাহাঁ হ্যায় চপ্পল কাহাঁ হ্যায় বলে চেঁচামেচি শুরু করল। কাজেই এখানে শাকিলকে বিশ্বাস করতেই হবে।

তাহলে শাকিল ঘুমোয় কোথায়? মীনাবাজারে জামালভাই বলে একজন চায়ের দোকানদার একটা ব্যক্তিগত রাত্রিআবাস চালান, মূলত সেইখানে। আবাস মানে প্লাস্টিকের ঢাকনা দেওয়া চত্বর, সেখানে চল্লিশটাকা ভাড়ায় খাটিয়া ভাড়া পাওয়া যায়, সঙ্গে কম্বল। কিন্তু সেখানেও শাকিল শুতে ভালোবাসে না, কারণ জামালভাই। অবশ্য জামালভাইকে খুব কম লোকেই ভাই বলে ডাকার সাহস করে, বেশিরভাগের কাছেই জামালভাই হলেন জামালস্যার। কারণ ও তল্লাটে, ইন ফ্যাক্ট গোটা উত্তর দিল্লিতেই রাতে কেউ ঘুমোতে পারবে কি না সেটার লাগাম রয়েছে জামালস্যারের হাতে। রাত গভীর হতে না হতে উমেদারের দল জামালস্যারের দোকানে ভিড় করে। জামালস্যার কঠিন মুখে ছাঁকনি দিয়ে ডেকচির চায়ে দ্রুত ছাঁকনি ডোবান তুলে আনেন, আর তাঁর সামনে রাখা সরু কাঠের বেঞ্চিতে বসে লোকে গান শোনায়, শায়েরি আবৃত্তি করে। অপেক্ষায় থাকে কখন জামালস্যারের কঠিন মুখ নরম হবে, তিনি বলে উঠবেন, ইসকো এক কম্বল দে দে।

সিটিস অফ স্লিপ-এর দ্বিতীয় সুতো হচ্ছে লোহাপুল। ওপরে পুল, নিচে যমুনার মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় রাতে শুয়ে থাকে মানুষেরা। আর এই শোওয়ার জায়গাটা দেখভাল করে রঞ্জিত। রাতে ঘুমোনোর জায়গা হিসেবে লোহাপুলের নিচের এই রিয়েল এস্টেটের দর অনেকদিন ধরেই চড়া। কারণটা লোহাপুল নাইট শেল্টারের মালিক রঞ্জিত বুঝিয়ে দিলেন। লোহাপুলের বড় বড় বিমের সজ্জার মাধ্যমে মে চ্যানেল তৈরি হয়েছে, সে দিয়ে যখন হাওয়া বয়, পুরা এসি জ্যায়সা।

রঞ্জিতের উত্থান রূপকথার মতো। আজ থেকে বছর পাঁচছয়সাতআট আগে রঞ্জিত নিজে এই লোহাপুলের নিচে ঘুমোত। এখন সে লোককে ঘুমোতে দেয়। শেল্টারে রঞ্জিত টিভির ব্যবস্থা করেছে। কারণ রঞ্জিত মনে করে একটা লোকের জন্য কেবল খাওয়া, ঘুম ইত্যাদি যথেষ্ট হতে পারে না। বিনোদনও চাই। শেল্টারের রংচঙে কার্পেটের ওপর চিৎপাত হয়ে শুয়ে আরাম করে, ইচ্ছে হল টিভিতে চলা সিনেমার দিকে তাকায় কিংবা উল্টোদিকে ফিরে ঘুমোয়। কেউ কেউ টিভি দেখতে দেখতে ঝিমোয়। এই লোহাপুলের নিচে যারা ঘুমোতে আসে তাদের অনেকেই এখানে নিজেদের জন্য মোটামুটি একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করেছে। যেমন সঞ্জয় আর তার দুই ছেলে। ছেলেদের বয়স দশেরও নিচে। দিনের বেলা সঞ্জয় ওই শেল্টারেই পানগুটখার দোকান দেয়। রাতে ঘুমোনোর সময় সঞ্জয় তার ছেলেদের সারা গায়ে মুখে মসকুইটো রেপেলিং ক্রিম মাখায়। পাশে শুয়ে খরগোশ আর কচ্ছপের গল্প বলতে বলতে ঘুম পাড়ায়। খরগোশ শো গয়া, কছুয়া ভাগতে রহা। গল্প শেষ হলে সঞ্জয়ের ছেলে উৎসাহিত গলায় গল্পের মর‍্যাল বলে। ইসকা মতলব হ্যায়, রোকনা নহি হ্যায়। ভাগতে রহনা হ্যায়।  

সিটিস অফ স্লিপ-এর সবথেকে ভালো ব্যাপার হচ্ছে গল্পটা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও লোকের মন থেকে কৌতূহল যায় না। ভিড়ে ঠাসা অডিটোরিয়ামের এদিকওদিক থেকে প্রশ্ন ভেসে আসে। হোয়াট হ্যাপেনড টু শাকিল? হোয়াট হ্যাপেনড টু জামালভাই? হোয়াট হ্যাপেনড টু দ্যাট গাই, যে জামালভাইয়ের শেল্টারের কোণে বসে চুপচুপে ভেজা কম্বল গায়ে দিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল আর কাঁদছিল? জামালভাই এন জি ও-র অ্যামবুলেন্স ফোন করে ডেকে আনল। আর লোকজন দিয়ে যখন ছেলেটাকে যত্ন করে অ্যামবুলেন্সে তুলে দিল তখনও যে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, ম্যায় নহি যাউঙ্গা, ওহ মুঝে মার ডালেঙ্গে।

সভ্যতা চালানোর জন্য ভাষার দরকার আছে ঠিকই, কিন্তু ভাষা ব্যাপারটা যে কতখানি অপ্রতুল সেটা মানুষজনকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য সিটিস অফ স্লিপ জাতীয় ছবি বেশ কাজের। বিশেষ করে আমার মত চোখে ঠুলি পরে চলাচল করা মানুষদের। বড়লোক, বুদ্ধিজীবী, আঁতেল, গৃহহীন - এই সব শব্দগুলোর আড়ালে আসলে যে কত ভাঁজ, কত পরত চাপা পড়ে থাকে তার ইয়ত্তা নেই। শাকিল যখন জন্মদিনের কেক কাটে, বউ মাংস খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় সে কেমন করে চুলের মুঠি ধরে বউয়ের মাথা দেওয়ালে ঠুকে দিয়েছিল সে কথা যখন বুক ফুলিয়ে বলে, সঞ্জয় যখন রাতে থাবড়া মেরে মেরে ছেলেদের ঘুম পাড়ায়, যখন সিনেমা শেষ হওয়ার পর জানতে পারিপিকেছবির যে দৃশ্যে আমির খান একজন ভিখিরিকে ভিক্ষে দিলেন সেই ভিখিরি আসলে আমাদের শাকিল, তখন একমুহূর্তের জন্য হলেও ওইগৃহহীনশব্দটার বিতিকিচ্ছিরি পর্দাটা সরে যায় আর তার নিচে চাপা পড়া মানুষগূলো প্রকাশ হয়ে পড়ে। একজ্যাক্টলি আমার মতো মানুষগুলো।

ইন ফ্যাক্ট আমার থেকে ঢের বেশি ইন্টারেস্টিং। যমুনা নদী দিয়ে এত লাশ ভেসে যেতে দেখেছে রঞ্জিত যে আজকাল নতুন লাশ আবিষ্কার করলে পুলিশ প্রথমে রঞ্জিতকে ফোন করে। রঞ্জিত দুয়েকটা খোঁজখবর নেয়। ঠোঁট কতখানি নীল, বডি কতখানি ভ্যাপসানো। তারপর নির্ভুল বলে দেয়মারকে ফেকানাফেককে মারা   

*****

সিনেমাটা দেখতে দেখতে যে প্রশ্নটা আমার মাথায় ঘুরছিল, প্রশ্নোত্তরপর্ব শুরু হতেই সেটা একজন জিজ্ঞাসা করলেন। হোয়্যার আর দ্য উইমেন? হলশুদ্ধু লোকের মাথা নড়ে উঠল। বোঝা গেল প্রশ্নটা সবাইকেই ভাবাচ্ছিল। দিল্লিশহরে গৃহহীন মহিলাদের ঘুমোনোর জায়গার অভাব নেই এ কথা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। তাহলে তারা রাতে থাকে কোথায়?

জানা গেল দিল্লিতে গৃহহীন মহিলাদের রাত্রিবাসের ব্যবস্থা আছে, এবং সে ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত যা যা সমস্যা থাকা সম্ভব সে সবও আছে। সে সব জায়গায় ক্যামেরা হাতে ঢোকা শক্ত। সিটিস অফ স্লিপ-এর পরের পর্বে সে শক্ত কাজের চ্যালেঞ্জ নেওয়া হয়েছে বলে জানালেন পরিচালক শৌণক সেন।


December 13, 2015

সাপ্তাহিকী





The test of a first-rate intelligence is the ability to hold two opposed ideas in mind at the same time and still retain the ability to function.
F. Scott Fitzgerald


"You have one year off from your job to write whatever you please. Merry Christmas."

২০১৩তে Yvonne Brill নামে একজন রকেট বিজ্ঞানীর মৃত্যুর পর নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছিল “She made a mean beef stroganoff, followed her husband from job to job and took eight years off from work to raise three children. The world’s best mom,’ her son Matthew said. পরের প্যারাগ্রাফে ---[she] was also a brilliant rocket scientist who in the early 1970s invented a propulsion system to keep communications satellites from slipping out of their orbits.

ভালো না অবিচুয়্যারিটা? অস্ট্রেলিয়ান বেস্টসেলিং লেখক Colleen McCullough-র মৃত্যুর পর যেটা ছাপা হয়েছিল সেটা অবশ্য আরও সরেস। “Plain of feature and certainly overweight, she was, nevertheless, a woman of wit and warmth.” মরেও নিস্তার নেই।

প্রতিদিন সকালবেলা অটো চেপে মেট্রো স্টেশনের দিকে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে অর্চিষ্মান মোবাইল ফোন খুলে খবরাখবর চেক করে। বাড়িতে থাকাকালীনও করে, কিন্তু তখন বেরোবার তাড়া থাকে। অটো চেপে যাওয়ার সময়ও তাড়া থাকে, কিন্তু সে ব্যাপারে আমাদের সে কিছু করার থাকে না, যা করার অটো ভাইসাব করবেন। কাজেই আমরা বাধ্য হয়েই রিল্যাক্স করি। মাংকি ক্যাপ পরে কাঁদোকাঁদো মুখে স্কুলের দিকে হাঁটা বালকবালিকাদের দেখি, সোয়েটার পরা কুকুরদের মুখের ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করি, অর্চিষ্মানের ফোনে গুগল-এর পাঠানো নানারকম ইন্টারেস্টিং তথ্য পড়ি। বাতাসের তাপমাত্রা কত, অফিসে পৌঁছতে কত সময় লাগবে, নেহরু প্লেসের আশেপাশে কী কী দ্রষ্টব্য আছে (ইন কেস আমরা অফিস যাওয়া স্থগিত রেখে সে সব জায়গাতে বেড়াতে যাওয়া মনস্থ করি) ইত্যাদি। কিছুদিন আগে অর্চিষ্মানের এক বন্ধু আমেদাবাদ থেকে এসেছিল, আসার আগে তার আসাযাওয়ার টিকিটের কপি অর্চিষ্মানের ইনবক্সে পাঠিয়েছিল, পরদিন সকালে দেখি অর্চিষ্মানের ফোনে সকালের শুভেচ্ছা এসেছে, সুপ্রভাত ছে। কিছুদিন আগে হঠাৎ দেখেছিলাম আমার ইনবক্সে শাদি ডট কম-এর বিজ্ঞাপনের বন্যা। প্রথমটা অবাক হয়েছিলাম, তারপর মনে পড়ল, ক'দিন আগে অর্চিষ্মানের জন্মদিনের আগ দিয়ে 'রোম্যান্টিক রেস্টোর‍্যান্টস ইন ডেলহি' বলে গুগল সার্চ করেছিলাম বটে। গুগল-এর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বাহিনী অমনি ক্যাঁক করে ধরেছে।

আমরা ওই ইন্টেলিজেন্সের একটা চেহারা ভেবে বার করেছি। দুটো মানুষ, মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল, চোখে শয়তানি, বাঁহাতে ধরা ঠোঙা থেকে ডান হাতে বাদামভাজা ঢেলে মুখে ছুঁড়ছে আর পা নাচাচ্ছে, চোখের সামনে আমাদের গুগল সার্চ হিস্ট্রি খোলা। একজন আরেকজনকে বলছে, "মালটা রোম্যান্টিক রেস্টোর‍্যান্ট খুঁজছে কেন রে? রোম্যান্সের অভাব হয়েছে বোধহয় জীবনে। শাদি ডট কম-এর অ্যাড পাঠা।" কিংবা "মালটার ইনবক্সে আমেদাবাদ টু দিল্লি টু আমেদাবাদ টিকিট কেন রে? গুজরাতে শিফট করছে নাকি? চল চল গুজরাতিতে মেসেজ পাঠাই।" "হাহা, বেড়ে আইডিয়া গুরু। গুজরাতি কী করে লেখে জান?" "আরে জানার আবার কী আছে, রোজ যা লিখিস তাই লেখ, লাস্টে একটা ছে গুঁজে দে। খেল খতম।"

এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। এখন শুনছি ওই দুজন আমাদের মেল পড়ে নিজেরাই মাথা খাটিয়ে তার উত্তর দেবে। পরিণতি কী হবে ভাবতেও শিউরে উঠছি। 

সবার জন্য মোনালিসা।

একলা তিমি। 

বলিপ্রদত্ত চেয়ার। আমাদের একখানা আছে। ভেতরের ঘরে রাখা। আপনাদের?

টিকিট নেই? বই আছে তো? ব্রাজিলের সাবওয়েতে শুরু হয়েছে টিকিট-বই ব্যবস্থা। দিল্লিতেও এ'রকম করলে পারে। 

দিল্লিতে এ'রকম বাড়িও বানালে পারে। 

অ্যালাবামার এই দোকানে শুধু লেখক-স্বাক্ষরিত বইই বিক্রি হয়। 

টোকিও। 

এই গানটা পরশুদিন বিবিধভারতীতে প্রথম শুনলাম। আপনারা হয়তো আগে শুনেছেন। আরেকবার শুনুন।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.