February 29, 2016

এ মাসের বই/ ফেব্রুয়ারি ২০১৬



একটা বই সম্পর্কে লেখার আদর্শ সময় কোনটা? যখন সেটা সবে পড়ে উঠেছি, বইটার প্রতি আমার ভালোবাসা, মুগ্ধতা, রাগ, ঘৃণা, বিরক্তি সব একেবারে এই মুহূর্তে আমার জানালার বাইরে রোদ্দুরটার মতো ঝকঝকে, তখন? নাকি বইটা শেষ করার বেশ কিছুদিন পর, যখন আমার চট-প্রতিক্রিয়াগুলো থিতিয়ে পড়ে, ধারালো খোঁজখাঁজগুলো ভোঁতা হয়ে গিয়ে বেশ একটা ঝাপসা কিন্তু নিটোল ছবি মনের মধ্যে ফুটে উঠেছে, তখন?

বইয়ের প্রতি সুবিচারের জন্য হয়তো দ্বিতীয় সময়টা ভালো, কিন্তু অবান্তরের পোস্ট লেখার জন্য একেবারেই নয়। কারণ তাহলে আমাকে স্রেফ ভালো লেগেছিল, খারাপ লেগেছিল, কেঁদে ফেলেছিলাম, হো হো করে হেসে উঠেছিলাম, এইটুকু বলেই ক্ষান্ত দিতে হবে। যেটা আমি একেবারেই চাই না। আমি চাই বইগুলোকে কেটেছিঁড়ে, সেগুলো থেকে বড় বড় কোটেশন দিয়ে তাদের কথা আপনাদের কাছে ব্যাখ্যান করে বলতে।  

পরে লিখব বলে ফেলে রাখলে আরও একটা সমস্যা হয়, সেটা হচ্ছে লেখার তাগিদটা চলে যাওয়া। যে কারণে ফেব্রুয়ারির শুরুতে বেশ কয়েকটা চমৎকার বই (হেমিংওয়ের প্যারিসবাসের স্মৃতিকথা A Movable Feast, তারপর Llosa-র Letter to A Young Novelist, চন্দ্রিলের হাহাহিহি ও অন্যান্য, অবন ঠাকুরের খাতাঞ্চির খাতা) পড়ে ফেলা সত্ত্বেও তাদের নিয়ে এই মুহূর্তে আমার কিছুই বলার নেই। এই রকম একটা কিছু যে ঘটতে পারে সেটা আঁচ করে মাসের মাঝামাঝি থেকে পড়তে শুরু করা বইগুলোর ক্ষেত্রে এ ভুল আমি আর করিনি। তাদের কথাই রইল এই পোস্টে।


Einstein’s Dream/ Alan Lightman


Tiny sounds from the city drift through the room. A milk bottle clinks on a stone. An awning is cranked in a shop on Marktgasse. A vegetable cart moves slowly through a street. A man and woman talk in hushed tones in an apartment nearby. In the dim light that seeps through the room, the desks appear shadowy and soft, like large sleeping animals. Except for the young man’s desk, which is cluttered with half-opened books, the twelve oak desks are all neatly covered with documents, left from the previous day. Upon arriving in two hours, each clerk will know precisely where to begin. But at this moment, in this dim light, the documents on the desks are no more visible than the clock in the corner or the secretary’s stool near the door. All that can be seen at this moment are the shadowy shapes of the desks and the hunched form of the young man.

Ten minutes past six, by the invisible clock on the wall. Minute by minute, new objects gain form. Here, a brass wastebasket appears. There, a calendar on a wall. Here, a family photograph, a box of paper clips, an inkwell, a pen. There, a typewriter, a jacket folded on a chair. In time, the ubiquitous bookshelves emerge from the night mist that hangs on the walls. The bookshelves hold notebooks of patents. One patent concerns a new drilling gear with teeth curved in a pattern to minimize friction. Another proposes an electrical transformer that holds constant voltage when the power supply varies. Another describes a typewriter with a low-velocity typebar that eliminates noise. It is a room full of practical ideas.

ওই যে হাঞ্চড ইয়ং ম্যান, উনিই হচ্ছেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। আর এই প্র্যাকটিক্যাল আইডিয়ায় ভরপুর ঘরটা ওঁর অফিস। এই কাকভোরে উনি অফিসে এসেছেন কেন? কেন সকালে উঠে গড়িমসি করে চা খেয়ে, যতখানি পারা যায় টিভির সামনে বসে থেকে শেষমুহূর্তে হাঁপাতে হাঁপাতে ওলা অটো ধরেননি? কারণ উনি আইনস্টাইন। আমার অফিস যাওয়া আর ওঁর অফিস যাওয়ার মধ্যে তফাৎ আছে অ্যাকচুয়ালি আইনস্টাইন আরও অনেক আগেই অফিসে আসতে পারতেন। কারণ তাঁর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল মাঝরাতেই। স্ত্রীর পাশ থেকে উঠে গিয়ে পা টিপে টিপে রান্নাঘরের আলো জ্বালিয়ে অংক কষছিলেন, ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে অফিসে এসে গেছেন, আরও অংক কষবেন বলে।

কিন্তু ঘুমটা ভাঙল কেন? একটা স্বপ্ন দেখে। ইদানীং ব্যাপারটা প্রায়ই ঘটছে। গতরাতে, তার আগের রাতে, তার আগের রাতেও স্বপ্ন দেখে আইনস্টাইনের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কীসের স্বপ্ন? সেই জিনিসের, যার কথা সারাদিন ভেবে ভেবে আজকাল আইনস্টাইনের মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় হয়েছে। সময়। আইনস্টাইনের রোখ চেপেছে সময়কে তিনি আগাপাশতলা চিনবেন। তার সমস্ত সিক্রেট উন্মোচন করবেন। প্রিয় বন্ধু সুইস ইঞ্জিনিয়ার মিশেল বেসোর সঙ্গে বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে, মাছ ধরতে গিয়ে সে কথা বলেওছেন তিনি। কিন্তু সেটুকুই। রাতে ঘুমোতে না দেওয়া স্বপ্নগুলোর কথা বলে উঠতে পারেননি।

আইনস্টাইনের সেই সব স্বপ্ন নিয়ে বই লিখেছেন অ্যালান লাইটম্যান। লাইটম্যান আইনস্টাইনের স্বপ্নের কথা জানলেন কী করে? উনিশশো পঞ্চান্ন সালে আইনস্টাইন যখন মারা গেলেন তখন লাইটম্যান তো সাত বছরের বালক? উত্তর হচ্ছে লাইটম্যান জানেন না। তিনি কল্পনা করেছেন। আইনস্টাইন'স ড্রিমস একটি আদ্যোপান্ত কাল্পনিক কাহিনী। সে কাহিনীতে বাইশ রাতের বাইশটি স্বপ্ন নিয়ে তৈরি হয়েছে বইয়ের বাইশটি চ্যাপ্টার। চোদ্দই এপ্রিল, ষোলই এপ্রিল, ঊনত্রিশে মে, নয়ই জুন ইত্যাদি। অর্থাৎ যে রাতে আইনস্টাইন ওই বিশেষ স্বপ্নটা দেখছেন আইনস্টাইন, সেটাই হল সেই চ্যাপ্টারের নাম।

একেক স্বপ্নে একেকরকম সময় আসে। কোনও কোনও সময় বৃত্তের মতো ঘোরে। কোনও সময় স্রোতের মতো বয়ে যায়, কোথাও পুরোনো হয়ে যাওয়া ঘড়ির মতো থেমে থেমে, হোঁচট খেতে খেতে, থেমে থেমে। আবার কোথাও সময় সরলরেখাও নয়, বৃত্তও নয়, বহুমাত্রিক একেক মুহূর্তে সময় একই সঙ্গে ছেঁড়া সুতোর মুখের মতো ভাগ হয়ে গিয়ে তিনটেচারটে একই বিশ্ব সৃষ্টি করে ফেলেছে, কোথাও কারণের আগেই ঘটে যাচ্ছে কার্য।

তবে সময় কী, সেটা খায় না মাথায় দেয়, সেটা যারা জানে না, তাদের কাছে এই সমস্ত সম্ভাবনার কোনও মানে নেই। কিন্তু সেই সময়ের ফেরে পড়ে মানুষ কেমন ফালাফালা হয়, সেটা জানতে আমাদের ইচ্ছে করে বৈকি। লাইটম্যানের বইয়ের ভালো ব্যাপারটা সেখানেই। এই বিভিন্ন রকম সময় দিয়ে তৈরি বিভিন্ন বিশ্বে আটকে পড়া মানুষের ছবি এঁকেছেন তিনি। কোনও বিশ্বে সময় স্থির, অমরত্ব সেখানে স্বাভাবিক। সে বিশ্বে সব বিচ্ছেদ ফাইন্যাল, সব আলিঙ্গন অনন্ত। তাছাড়াও এই সব সময়েরা আরও ন্যায়নীতি, উচিতঅনুচিত ভালোমন্দের সংজ্ঞা গোলমাল করে দিতে ওস্তাদ। কার্যকারণের পরম্পরা যদি ধ্রুব না হয় তাহলে সে কাজের দায় চাপাব কার ঘাড়ে? বা ওই যে বহুমাত্রিক সময়ের একটা যে কোনও মুহূর্তে আসলে আমি তিনখানা সিদ্ধান্ত একসঙ্গে নিয়ে ফেললাম আর আমার জীবন তিন দিকে ধাইল, তার মধ্যে কোনটা আমার আসল জীবন? কোনটা নকল? কোনটার ওপর আমার মালিকানা অবিসংবাদিত?

সারি সারি স্বপ্নের মাঝে মাঝে দাঁড়িকমার মতো এসেছে প্রোলগ, দুটি ইন্টারলুড, এবং একটি এপিলগ। এই অংশগুলো স্বপ্ন নয়। বাস্তব। বাস্তবের আইনস্টাইন তাঁর বাস্তবের বন্ধু মিশেল বেসোর সঙ্গে বিকেলবেলা হাঁটতে বেরোচ্ছেন, বেসো তাঁকে সস্ত্রীক ডিনারে নেমন্তন্ন করছেন, মাছ ধরতে যাওয়ার প্ল্যান করছেন। আইনস্টাইন তাঁকে নিজের গবেষণার কথা বলছেন বেসো তাঁকে বলছেন,  

“I think you will succeed with your theory of time,” says Besso. “And when you do, we will go fishing and you will explain it to me. When you become famous, you’ll remember that you told me first, here in this boat.”

অ্যালান লাইটম্যান নিজেও সায়েন্সের লোক। তিনি যে সাহিত্যের লোকও হতে পারতেন তার নমুনা শুরুর দুটি অনুচ্ছেদ থেকেই বোঝা যাচ্ছে। ইন ফ্যাক্ট, এম আই টি-তে একই সঙ্গে বিজ্ঞান এবং হিউম্যানিটিস একসঙ্গে পড়ানোর বরাত পেয়েছিলেন তিনিই প্রথম। এই লেখাটা লেখার আগে তাঁর ও তাঁর এই বিশ্ববিখ্যাত বইটির সম্পর্কে ইন্টারনেটে কিছু খোঁজ নিচ্ছিলাম। দেখলাম কেউ কেউ বইটির সায়েন্টিফিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বলছেন লাইটম্যানের দেওয়া সময়ের নমুনাগুলো সব অবাস্তব, অযৌক্তিক, অবিশ্বাস্য। আইনস্টাইন যদি এই বই পড়তেন তাহলে কেঁদেকেটে সারা হতেন। এই বুদ্ধি নিয়ে লোকটা এম আই টি-র প্রফেসর হল কী করে?

বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে এ বই আমল পাবে কি না তার বিচার করার যোগ্যতা আমার নেই, তবে ভালো লাগার দৌড়ে আমার কাছে আইনস্টাইন’স ড্রিম আমার পড়া অনেক বইকে হারিয়ে দিয়েছে এটুকু আমি বলতে পারি।

The man in the queue/Josephine Tey
A Shilling for Candles/ Josephine Tey


জোসেফাইন টে-র আসল নাম এলিজাবেথ ম্যাকিনটশ। আমার পড়া টে-র প্রথম বই দ্য ডটার অফ টাইম। ব্রিটিশ ক্রাইম রাইটার্স' অ্যাসোসিয়েশনের মত অনুযায়ী যে বইটা পৃথিবীর সর্বকালের সেরা রহস্য উপন্যাস। বইটা আমারও দারুণ ভালো লেগেছিল। তা সত্ত্বেও টে-র আর একটিও বই আমি পড়ে উঠতে পারিনি সেটা একটা রহস্য।

পারিনি কি? মাসের মাঝামাঝি টে-র প্রথম বইটা, দ্য ম্যান ইন দ্য কিউ, পড়তে গিয়ে মনে হল, আগে বোধহয় পড়েছি। দ্বিতীয়টা, আ ক্যান্ডল ফর শিলিং, পড়তে গিয়ে নিশ্চিত হলাম আগে পড়েছি। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে দুটোর একটা বইয়েরও কে খুন করেছে কীভাবে খুন করেছে সে সব কিছুই আমার মনে ছিল না। কাজেই প্রথমবার পড়ছি ধরে নিয়েই পড়া চালিয়ে গেলাম।

দুটো গল্পের প্লট আগে বলে নিই। প্রথম বইটার নাম শুনেই বুঝতে পারছেন, গল্পে একটা লাইন আছে, লাইনে দাঁড়ানো একটা লোক আছে। লাইন লেগেছে লন্ডনের উফিংটন থিয়েটারের সামনে। রে মার্কেবল নামের প্রতিভাময়ী মিউজিক্যাল অভিনেত্রীর হিট নাটক "ডিডন’ট ইউ নো?"র লন্ডনে সেদিনই শেষ শো। ভিড় একেবারে ফেটে পড়ছে। একঘণ্টা, দুঘণ্টা, তিনঘণ্টাও অক্লেশে লোক দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ ফোল্ডিং চেয়ার নিয়ে এসেছে। অবশেষে একজন মোটা মতো মহিলা যখন দরজায় পৌঁছলেন, মোটা মহিলাদের যেমন হয়, ব্যাগ থেকে টিকিট বার করতে একঘণ্টা...পেছনের ভিড় অধৈর্য হয়ে উঠেছে... মহিলা ব্যাগের ভেতর জঞ্জাল ঘাঁটছেন... ঠেলাঠেলিতে পেছনের লোকটি তাঁর বিপুল পিঠের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। মহিলা সবে পেছন ফিরে দু’কথা শোনাতে যাবেন, এমন সময় দেখা গেল লোকটার পিঠ থেকে বেরিয়ে রয়েছে একটা চকচকে ছোরা।

টে-র দু'নম্বর বইয়ের নাম আ শিলিং ফর ক্যান্ডল। সকালবেলা ব্রেকফাস্টের জন্য খিদে চাগাতে হাঁটতে বেরিয়ে সমুদ্রতটে একটি মৃতদেহ আবিষ্কার করলেন এক ভদ্রলোক। জানা গেল মৃতদেহটি পৃথিবীবিখ্যাত অভিনেত্রী ক্রিস্টিনা ক্লে-র। কোথাও কোনও ক্লু নেই, কেবল ক্লে-র একঢাল সোনালি চুলে আটকে আছে একটি কোটের বোতাম। তদন্ত শুরু হল। মোটিভের খোঁজে প্রথমেই ডাক পড়ল ক্লে-র উকিলের। আশ্চর্যের ওপর আশ্চর্য। ক্রিস্টিনা ক্লে তাঁর অসীম ঐশ্বর্যের কিছু অংশ দিয়ে গেছেন অচেনা, আধচেনা লোকদের। আর সিংহভাগ রেখে গেছেন ইংল্যান্ডের সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য। আর নিজের রক্তের ভাইকে দিয়ে গেছেন একটিমাত্র শিলিং। ফর ক্যান্ডলস।

জোসেফাইন টে-র গোয়েন্দার হলেন সি আই ডি ইন্সপেক্টর অ্যালান গ্রান্ট। চেহারা, হাবভাব কোনওদিক থেকে দেখেই তাঁকে পুলিশ মনে হয় না। মনে হয় বড়লোক বাড়ির মেধাবী ছেলে।

দুটো গল্পেরই ভালো লাগা ব্যাপারটা আগে বলি। স্বর্ণযুগের অধিকাংশ গল্পের মতোই জোসেফাইন টে-র গল্প শুরু হয় ক্রাইম দিয়ে। ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং, সিন সেটিং, ক্যারেকটার ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি সবই আসে নিজস্ব সময়ে, তদন্ত চলাকালীন, কথোপকথনের মাধ্যমে। টে-র ভাষাও সুন্দর। বর্ণনা, কাব্য সবই আছে, কিন্তু কোথাও তা রহস্যের গতি ব্যাহত করেনি।

দুটো গল্পেরই যে বিষয়টা আমার একটু কমজোরি মনে হয়েছে সেটা হচ্ছে সমাধান। সারা গল্প জুড়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করা সত্ত্বেও সমাধানের কৃতিত্ব যেন পুরোটা গ্রান্টকে দেওয়া যায় না, দুই ক্ষেত্রেই তা শিকে ছেঁড়া দইয়ের মতো তাঁর কোলে এসে পড়ে। জোসেফাইন টে-র বাকি গল্পগুলোতেও এরকম হয় কি না দেখার কৌতূহল হচ্ছে।              


The Haunting of the Hill House/ Shirley Jackson

ক্টর মন্টেগু পি এইচ ডি করেছিলেন নৃতত্ত্ববিদ্যায়। সেই থেকে সই করার সময় নামের আগে তিনি ডঃ লেখেন, হ্যান্ডশেক করে নিজের নাম বলার সময় ডক্টর শব্দটার ওপর জোর দেন। কিন্তু ডাক্তার মন্টেগুকে হামবাগ বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। এটা তাঁর যত না দর্প, তার থেকে বেশি বর্ম। নৃতত্ত্ব নিয়ে ডিগ্রি থাকলেও তিনি আসলে যে বিষয়টা নিয়ে গবেষণা করেন সেটা এতই অবৈজ্ঞানিক, প্রথাগত শিক্ষাদীক্ষার এতখানিই বাইরের ব্যাপার যে সেটা জানতে পাড়লে প্রতিক্রিয়া হিসেবে যে তাচ্ছিল্য তাঁর প্রতি নিশ্চিত ভাবে ধেয়ে আসবে, তার থেকে খানিকটা আড়াল করার জন্যই ওই ডক্টর শব্দটার আড়ালের প্রয়োজন পড়ে তাঁর।
ডক্টর মন্টেগু কী করেন? ভূত বা বলা উচিত ভূতের বাড়ি খুঁজে বেড়ান। He had been looking for an honestly haunted house all his life. অনেকটা আমাদের অনাথবাবুর মতো। কিন্তু অনাথবাবুর সঙ্গে মন্টেগুর মিল ওখানেই শুরু আর ওখানেই শেষ। অনাথবাবু হয়তো শুধু নিজের পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে ভূতকে অনুভব করতে পারলেই তৃপ্ত হতেন, কিন্তু ডক্টর মন্টেগু সে ভৌতিকতাকে মাপতে চান। তার উচ্চতা উষ্ণতা সব পুঙ্খানুপুংখ টুকে নিয়ে জার্নালে ছাপিয়ে অবিশ্বাসীদের মুখে ঠুলি পরানোই তাঁর উদ্দেশ্য।

খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে একটা বাড়ির সন্ধান মেলে Hill House, not sane, stood by itself against its hills, holding darkness within; it had stood so for eighty years and might stand for eighty more. Within, walls continued upright, bricks met neatly, floors were firm, and doors were sensibly shut; silence lay steadily against the wood and stone of Hill House, and whatever walked there, walked alone. ক্রমশ আমরা হিল হাউসের সম্পর্কে আরও নানা তথ্য জানতে পারি। Every door in this house swings shut when you let go of it. আমরা জানতে পারি হিল হাউসের “insistent hospitality”-র কথা। The last person who tried to leave hill house in darkness - it was eighteen years ago, I grant you - was killed at the turn in the driveway, where the horse bolted and crushed him against the big tree.”

হিল হাউস-এর সন্ধান পাওয়ার পর, এবং চারিদিক থেকে তার ‘হন্টেডনেস’ সম্পর্কে যথেচ্ছ শংসা পাওয়ার পর ডক্টর মন্টেগু সহকারী খুঁজতে বেরোন। সহকারীদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা একটাই, অলৌকিক ব্যাপারস্যাপারের সঙ্গে পূর্বপরিচয়। দলিলদস্তাবেজ ঘেঁটে সে রকম বেশ কয়েকটি নাম জোগাড় করেন তিনি। শেষমেশ মাত্র দু’জন তাঁর ডাকে সাড়া দেয়। একজন এলেনর ভ্যান্স। আরেকজন থিওডোরা। এ ছাড়াও ডাক্তারের টিমে যোগ দেয় লুক স্যান্ডারসন। লুকের সিভি তে অবশ্য ভূতের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষির কোনও প্রমাণ নেই, সে যোগ দিয়েছে হিল হাউসের বর্তমান মালিক স্যান্ডারসন পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে।

গল্পের মুখ্য চরিত্র এলেনর ভ্যান্স। মূলত তার জবানিতেই আমরা হিল হাউসের গবেষণাদলের এই নির্বাচন প্রক্রিয়া, দলের হিল হাউসে এসে পৌঁছনো এবং তারপরের ঘটনাবলী জানতে পারি। সে ঘটনা বলাই বাহুল্য আমি আপনাদের বলছি না, ইচ্ছে হলে নিজেরা পড়ে নেবেন।

এই বইটা আমি পড়লাম যত না বইটার জন্য তার থেকেও বেশি লেখকের জন্য। শার্লি জ্যাকসন বিংশ শতাব্দীর একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরর এবং সাসপেন্স লেখক। জ্যাকসনের একটিও লেখা আমি পড়িনি। তিনি সবথেকে বিখ্যাত তাঁর ছোটবল্প দ্য লটারি-র জন্য। আর তার পরেই দ্য হন্টিং অফ দ্য হিল হাউস। উনিশশো ঊনষাট সালে প্রকাশের পর পরের বছরই অ্যামেরিকার ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের জন্য ফিকশন বিভাগে মনোনীত হয়। সে বছর সেই বিভাগের অন্যন্য মনোনয়নের মধ্যে ছিল সল বেলো-র হেন্ডারসন দ্য রেইন কিং, উইলিয়াম ফকনারের দ্য ম্যানশন, জন আপডাইকের দ্য পুওরহাউস ফেয়ার, ওয়ারেন মিলারের দ্য কুল ওয়ার্ল্ড। জঁরা সাহিত্যের একটি বইয়ের এই লিস্টে জায়গা পাওয়া তখন অবিশ্বাস্য ছিল।

শার্লি জ্যাকসনের লেখা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গেলে তাঁর আরও অনেক বই পড়া জরুরি, তবে এই বইটা পড়ে আমার যা মনে হল সেটাই বলছি জরাঁ সাহিত্য প্রধানত প্লটনির্ভর হয়। শার্লির গল্পে প্লট একটা থাকলেও প্লটের থেকে অনেক বেশি প্রকট হয়ে ওঠে তাঁর সেটিং। হিল হাউসের প্রত্যেকটি দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার নৈঃশব্দ যেন আমরা নিজে অনুভব করি, তার বারান্দায় এসে পড়া শীতল রোদ্দুরে আমাদের রোমকূপ যেন এলেনরের রোমকূপের মতোই শঙ্কিত হয়ে ওঠে। সাধারণত এই ব্যাপারটা করতে গেলে অতিকথনের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু শার্লি সে ফাঁদে পা দেন না। হিল হাউসের বর্ণনায় ঠিক ততগুলোই শব্দ খরচ করেন তিনি, যতটুকু না হলে নয়। ইন ফ্যাক্ট, যত না বলেন, তার থেকে বেশি না বলা রেখে দেনযে কথাগুলো বলেন না, বলাই বাহুল্য, সেইগুলোই বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে আমাদের মাথার ভেতর ঢুকে যায়। কখনও কখনও এই মিনিম্যালিজমটা বেশ কাঠখোট্টা লাগতে পারে। লেখা যদি মিতভাষের মতো ঝাড়াহাত পা হয়, তাহলে সেটাকে ‘লেখা’ বলে মেনে নিতে কোথায় যেন বাধে। শার্লি জ্যাকসনের লেখা পড়ে সেটা হবে না। ভদ্রমহিলা যতটুকু বলেছেন, সেইটুকুতেই সাহিত্যগুণ ভরে দিয়েছেন।

ভূতের গল্প শুধু ভূতের হলেও ভালো, কিন্তু সে গল্পে যদি যদি অন্য কিছুও ফুটে বেরোয়, এবং ভূতের স্বাদগন্ধের সঙ্গে কোনওরকম কম্প্রোমাইজ না করে, তাহলে ব্যাপারটা একটা আলাদা মাত্রা পায়। হন্টিং অফ দ্য হিল হাউস পড়ে আমার মনে হয়েছে যেন রাতে উঠে একা বাথরুমে যাওয়া থেকে আমাকে নিরস্ত করাই লেখকের একমাত্র মতলব নয়, তার থেকেও বেশি কিছু তাঁর বলার আছে। এলেনর ভ্যান্স যখন হিল হাউসের দিকে চলেছে তখন তার যাত্রাপথের বর্ণনা পড়া যাক।

She had never driven far alone before. The notion of dividing her lovely journey into miles and hours was silly; she saw it, bringing her car with precision between the line on the road and the line of trees beside the road, as a passage of moments, each one new, carrying her along with them, taking her down a path of incredible novelty to a new place. The journey itself was her positive action, her destination vague, unimagined, perhaps nonexistent. She meant to savor each turn of her traveling, loving the road and the trees and the houses and the small ugly towns, teasing herself with the notion that she might take it into her head to stop just anywhere and never leave again. She might pull her car to the side of the highway—although that was not allowed, she told herself, she would be punished if she really did—and leave it behind while she wandered off past the trees into the soft, welcoming country beyond. She might wander till she was exhausted, chasing butterflies or following a stream, and then come at nightfall to the hut of some poor woodcutter who would offer her shelter; she might make her home forever in East Barrington or Desmond or the incorporated village of Berk; she might never leave the road at all, but just hurry on and on until the wheels of the car were worn to nothing and she had come to the end of the world.

বইটা কতখানি ভয়ের জানতে চাইছেন? তাহলে বলি, এ জিনিস ‘রিং’ নয়। এখানে ভূতকে কোথাও দেখা যায় না। কিন্তু কারণ ভয় পাওয়া মানে তো শুধু ভূতকে স্বচক্ষে দেখে দাঁতে দাঁত আর হাঁটুতে হাঁটু ঠোকাঠুকি নয়। বইয়ের পাতার ওপর ভেসে থাকা সারি সারি শব্দ আর তাদের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা একটা অস্বস্তি, একটা ঘোর বুকের মধ্যে স্পষ্ট অনুভব করতে পারাও ভয়। এই দ্বিতীয়রকম ভয়ের প্রতি ভালোবাসা থাকলে শার্লি জ্যাকসনকে ট্রাই করে দেখতে পারেন।  



February 27, 2016

সাপ্তাহিকী





The tragedy of this world is that no one is happy, whether stuck in a time of pain or of joy. The tragedy of this world is that everyone is alone. For a life in the past cannot be shared with the present. Each person who gets stuck in time gets stuck alone.
----Alan Lightman/ Einstein's dreams

In Ancient Greece, throwing an apple to a woman was considered a marriage proposal. মাইন্ডব্লোওন


এটা একেবারে হাড়ে হাড়ে সত্যি।

আমি ভাবছি এই চায়ের কাপটা অর্ডার দেব।

February 26, 2016

নিয়মিত ব্লগ লিখতেই পারি, কিন্তু কেন লিখব?



অফিস যেতে গেলে আমাকে দুখানা ফ্লাইওভার পেরোতে হয়। তার প্রথমটার এক পাশে মেট্রোলাইন অন্য পাশে বড়লোক পাড়ার ডিজাইনার দোকান। সে সব ডিজাইনারের নাম আমিও জানি কাজেই তাঁরা কত বিখ্যাত বুঝে দেখুন। ওই ফ্লাইওভারটা নিয়ে লেখার কিছু নেই। ইন্টারেস্টিং হচ্ছে দু’নম্বর ফ্লাইওভারটা।

সেটার শুরুতে হনুমান মন্দির, শেষে প্রকাণ্ড স্টেডিয়াম, মাঝখানে নিচ দিয়ে দুদিকে চলে যাওয়া লম্বা, ফাঁকা রাস্তা। রাস্তা বানানো হয়েছিল ওই স্টেডিয়াম বানানোর সঙ্গে সঙ্গেই, বোধহয় খেলোয়াড়দের চলাচল করার জন্য। খেলা শেষ, রাস্তার প্রয়োজনও ফুরিয়েছে। রাস্তার দুপাশে কেন্দ্রীয় সরকারি আবাসনের ক্যাম্পাস। লোহার পাইপের দুপাশে শ্যাওলায় কালো হয়ে যাওয়া দেওয়াল। খুপচি বারান্দায় উল্টোনো ফাটা বালতি আর রোদে জ্বলে যাওয়া আধমরা তুলসীর টব। বারান্দার এদিকওদিক টাঙানো প্লাস্টিকের দড়িতে বেঢপ অন্তর্বাস আর লোমওঠা তোয়ালে। সকাল সাতটা নাগাদ ওখান দিয়ে গেলে এসবের সঙ্গে সঙ্গে মানুষও দেখা যাবে নির্ঘাত। তোয়ালের গিঁটের ওপর থেকে জন্মে জিমের নাম না শোনা লোমশ ভুঁড়ি ঝুলে থাকবে, মুখ থেকে বেরিয়ে থাকবে টুথব্রাশের ডাঁটি, চিবুক বেয়ে নামবে সাদা ফেনা। আমরা যখন যাই তখন শুধু দেখি নীল বোর্ডের ওপর সাদা অক্ষরে নামঠিকানা লেখা গেট দিয়ে সস্তা স্কুটার চেপে বেরোচ্ছেন সর্দারজী, সিটের পাশ থেকে ঝুলছে স্টিলের পাঁচতলা টিফিন বাক্স। তার মধ্যে একটাতে নির্ঘাত আছে  থকথকে রাজমা মসালা। স্কুটারের সামনের ফাঁকা জায়গাটায় ভুরু কুঁচকে দাড়িয়ে আছে জুনিয়র সর্দার। হাফপ্যান্টের ভেতর থেকে রোগা রোগা পা বেরিয়ে আছে। পেছনের সিটের সিংহভাগ স্কুলের ব্যাগকে ছেড়ে দিয়ে বাবার পিঠের সঙ্গে সেঁটে আছে ভবিষ্যৎ সর্দারনী, তার তেলচুপচুপে বিনুনি আমার কবজির থেকে মোটা।

অথচ এই জায়গাটা কী হতে পারত। কল্পনা করার দরকার নেই। নমুনা আছে রাস্তার উল্টোদিকেই। ক্যাফে কফি ডে-র ওপরে প্রকাণ্ড বিজ্ঞাপন। গুড়গাঁওয়া ছাড়িয়ে কিংবা নয়ডা পেরিয়ে বানানো হচ্ছে, উঁহু, হাইরাইজ নয়, হেভেন। আপনার নিজস্ব, একান্ত হেভেন। তার আকাশচুম্বী বাড়ির সাদা রঙের দিকে তাকালে চোখ ঝলসে যায়। বাড়ির ছাদের ইনফিনিটি পুলের নীল রং এক শিমূলতলার আকাশ ছাড়া আর কোথাও দেখিনি। আর লনের গাঢ় সবুজ? ছোটবেলায় একটা মিলটনের বোতল ছিল আমার। অনেকটা তার মতো। সবাই মিলে রাস্তার ওপারের সরকারি দৃশ্যদূষণের দিকে তাকিয়ে আছে। অভিশম্পাত দিচ্ছে চব্বিশ ঘণ্টা। পড়, পড়, ভেঙে পড়, হাড়ে বটের চারা গজাক।

বাড়ির দেওয়ালে না থাকলেও আবাসনের ক্যাম্পাসে বট অশ্বত্থ আছে দেদার। তাদের চেহারাও সুবিধের নয়। রাস্তার গাছ যেমন হয়। ধুলোয় ধূসর, পোকায় কাটা পাতা। তবে অযত্নের প্রাণ তো, ফাইট দেওয়ার অসামান্য ক্ষমতা। মালি ছাড়াই লকলকিয়ে বাড়ছে, ইলেকট্রিকের লোকেদের কোপ দেওয়া ঘা থেকে একটার বদলে দুটো ডাল গজাচ্ছে। বেশ কতগুলো গাছ এ বছরের দিল্লির মাথা হেঁট করা শীতেও পাতা ঝরিয়ে সম্পূর্ণ ন্যাড়া হয়ে গিয়েছিল। গত সপ্তাহ থেকে দেখছি তাদের কেঠো গায়ে লাল ফুল ফুটেছে। পাতা নেই একটাও।

অর্থাৎ বসন্ত এসে গেছে। যেটুকু শীত ছিল সেটুকু হাওয়া। অর্চিষ্মানের জন্ডিসও। কিন্তু আমি অসুখে পড়েছি। ব্লগার্স ব্লক। সাদা পাতার সামনে পড়লেই মগজ ঢুঁ ঢুঁ, মন উড়ুউড়ু। কী নিয়ে লিখব? কখন লিখব? সবথেকে বড় কথা কেনই বা লিখব? কেন সে সময়টায় ক্যান্ডি ক্রাশ খেলব না? আর ক’টা বছরই বা পড়ে আছে যে সেগুলোকে ফেলে ছড়িয়ে ইচ্ছেমতো খরচ করব না?

*****

আশেপাশে বাংলা বইয়ের দোকানের অভাব যারা অনুভব করছেন তাঁদের জন্য একটা ভালো খবর। রুবানশপ বলে একটি অনলাইন দোকান খুলেছে। দোকানে প্রচুর বই। প্রচুর। প্রথমেই লাফিয়ে সবাইকে খবরটা দেওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু ভাবলাম আগে হাতেকলমে পরীক্ষা করে দেখা দরকার। অর্চিষ্মান আর আমি দুজনেই আলাদা আলাদা ভাবে পরীক্ষায় নামলাম এবং সানন্দে জানাচ্ছি যে দুজনেরই পরিক্ষার ইতিবাচক ফল বেরিয়েছে। আমাদের টেবিলে এখন চার চারটে ঝকঝকে, নতুন বাংলা বই শোভা পাচ্ছে। মধ্যবিত্ত সন্দেহবাতিকতার শিকার হয়ে প্রথমবার দুজনেই ক্যাশ অন ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় অর্ডার করেছিলাম। এর পর থেকে নেট ব্যাংকিং বা ক্রেডিটেই করব। 

একটাই অসুবিধে, রুবানশপের ডেলিভারি সামান্য ধীরগতির। মানে দিনসাতেক। বছরের পর বছর, মাসের পর মাস নিজের পছন্দের বাংলা বই না পড়ে থাকার তুলনায় এইটুকু সময় কিছুই না। দু’নম্বর অসুবিধে অর্ডার করার সময় জানা যায় না ডেলিভারি কবে হবে। হয়তো ডেট দিয়ে রাখতে না পারার ঝুঁকি এড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই সতর্কতা নিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। আমার মতে ভালোই করেছেন।

*****

এর মধ্যে একদিন গাজিয়াবাদ থেকে শ্রমণ এসেছিল গল্প করতে। বলল, আচ্ছা সাহিত্যের সঙ্গে ব্লগসাহিত্যের পার্থক্য কোথায়? মানে ব্লগটাকে আলাদা করে ব্লগসাহিত্য বলা হচ্ছে কেন? তার মানে কি ব্লগ ব্যাপারটা সাহিত্য নয়? ঠিক যেমন ইকনমিক্স সায়েন্স নয়, স্রেফ সোশ্যাল সায়েন্স?

আর লোকে যখন এসব বলে আমি কি দুঃখ পাই?

মোটেই না। ইকনমিক্সকে যে সায়েন্সের বেঞ্চে বসতে দেওয়া হয় না, তাতেও পাই না, ব্লগকে যে সাহিত্যের আগে হাইফেন দিয়ে বসানো হয়, তাতেও না। বরং সাহিত্যটাকে ব্লগের পেছন থেকে ছেঁটে ফেলে ভারমুক্ত হওয়াতেই আমার বেশি উৎসাহ আছে।

তাছাড়া ব্লগকে কেন লোকে সাহিত্য বলে মনে করবে না তার কতগুলো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আছে। এক নম্বর হল গোটা ব্যাপারটা মধ্যে “আমি”র অবস্থান। আত্মজৈবনিক লেখার প্রতি মানুষের তাচ্ছিল্য চিরকালই ছিল। থাকাই উচিত। আমরা তো ঠিক কল্পনা খাটিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করছি না। কোথায় গেলাম, কী খেলাম, তার ডায়রি লিখছি।

তবে সবাই সে কাঁচা কাজটা করেন না। প্রচুর ব্লগে নিয়মিত মৌলিক কল্পকাহিনী ছাপা হয়। সেগুলোকে লোকে সাহিত্য ভেবে পড়ে নাকি ‘ব্লগ’সাহিত্য ভেবে, আমি জানি না।   

দু’নম্বর আপত্তির কারণ আমার মতে ব্যাপারটার সহজলভ্যতা। কোনও সম্পাদকের মোটা চশমার ছাঁকনি দিয়ে পেরোতে হয়নি যে লেখাকে সে কি ভালো হতে পারে? ব্লগ খুলতে পয়সা লাগে না, পরিশ্রম লাগে না, প্রতিভাই বা লাগবে কেন?

আপনাদের মত কী? ব্লগ যারা লেখে তাদের কী ভাবেন, লেখক না ব্লগার? আপনি যখন ব্লগ পড়েন তখন কী ভেবে পড়েন? যে এদের দ্বারা কোনওদিন গল্পউপন্যাস লেখার ক্ষমতা হবে না, তাই যা লিখছে সেটাই পড়ে এদের উৎসাহ দিই, নাকি এই ভেবে পড়েন যে এরা যেটা লিখছে সেটা লাইব্রেরি থেকে চেকআউট করে আনা বইয়ে পাব না, কাজেই এদেরটা পড়ি?

উত্তরের আশায় বসে রইলাম।


February 20, 2016

সাপ্তাহিকী





নক্ষত্রবিদায়। হার্পার লি উমবার্তো ইকো

ডারউইনের সন্তানসন্ততি অরিজিন অফ স্পেসিস-এর ম্যানুস্ক্রিপ্ট নিয়ে কী করেছিল জানতে হলে ক্লিক করুন।



পৃথিবীর সব  নীল চোখ মানুষের টিকি বাঁধা আছে একজন পূর্বপুরুষের হাতে।


সাপকে ‘লতা’ বললে আমরা গেঁয়ো বলে হাসি, এদিকে সাহেবরাও এই সেদিন পর্যন্ত টর্নেডোর নাম মুখে আনতে ভয় পেত।

সবই প্রায় একরকম, খালি যন্ত্রপাতি আর সুরক্ষাব্যবস্থা আধুনিক। টাইটানিক টু-র টিকিট কাটবেন নাকি?


February 17, 2016

কথা নেই বার্তা নেই ...



... আমার ইনবক্সে হঠাৎ এরা এসে হাজির। যাকে চিনতে পারছেন না সে হচ্ছে আমার ভাই, যার বিয়ে খেতে আমি রাঁচি গিয়েছিলাম গত বছর। 

আলোকচিত্রী নিঃসন্দেহে আমার ছোটমামা


February 15, 2016

ক্লু কুইজ (উত্তর প্রকাশিত)




এ বছরের শুরুতে মনে মনে রেসলিউশন নিয়েছিলাম অবান্তরে কুইজ আবার ফেরত আনব। অন্তত প্রতি মাসে একটা করে। জানুয়ারি মাসে অলরেডি সে শপথ ভঙ্গ হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যাতে না হয় সে জন্য আজ একটা মিনি কুইজ রইল।

এ কুইজে কতগুলো ক্লু আছে। এই ক্লুগুলোর সাহায্যে গল্পের গোয়েন্দা রহস্য সমাধান করেছিলেন। আপনারা সে গল্প আর গোয়েন্দাদের চিনতে পারেন কি না সেটাই দেখার।

খুব, খুব চেনা গোয়েন্দাদের গল্পের ক্লু দিলাম। এখানে কিছু কিছু ক্লু আছে, যেটা হয়তো গল্পে নেই, কিন্তু গল্প থেকে বানানো সিনেমায় আছে।  সে সিনেমাও আপনারা চোদ্দ লক্ষ বার দেখেছেন, কাজেই উত্তর দিতে কোনও অসুবিধে হবে না। 

কুইজ খোলা থাকবে চব্বিশঘণ্টার জন্য। উত্তর বেরোবে দেশে মঙ্গলবার রাত আটটায়। ততক্ষণ আমি কমেন্ট পাহারা দেব। অল দ্য বেস্ট।

***** 


১।  সিং...সিং...

২। কাল টেবিলের  উপর দেখেছিলাম ঘুমের ওষুধ দশটা। আজও দেখছি দশটা। আপনি কি কাল তাহলে ঘুমের ওষুধ খাননি?

৩। হুগলী? হুগলী জেলার লোকে বাসা বলে?

৪। She wasn’t there.

৫। ও মুখ দেখলে মনে থাকত।

৬।  আপনি কি এখনও সেই লিক-করা কলমটাই ব্যবহার করছেন, মিঃ ___?

৭। পাঁচিলের গায়ে হাতের ছাপ দেখেই ধরেছিলাম। অল্প বয়সের ছেলের হাতে এত লাইন থাকে না, তাদের হাত আরো অনেক মসৃণ থাকে।

৮।  The mirror crack'd from side to side;
       'The curse is come upon me,' cried
                                 The Lady of Shalott.

৯। I only had three pairs in the world—the new brown, the old black, and the patent leathers, which I am wearing. Last night they took one of my brown ones, and to-day they have sneaked one of the black.

১০। অগ্নির উপাসকের অসীম বদান্যতা/ নবরত্ন বাঁদরের হিসাবে দু'হাজার পা। 


*****


উত্তর

১। জয় বাবা ফেলুনাথ, ফেলুদা/ সত্যজিৎ রায়
২। গোলোকধাম রহস্য, ফেলুদা/ সত্যজিৎ রায়
৩। চিড়িয়াখানা, ব্যোমকেশ/ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
৪। A Murder is Announced, Miss Marple/ Agatha Christie
৫। রুম নম্বর দুই, ব্যোমকেশ/ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
৬। যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে, ফেলুদা/ সত্যজিৎ রায়
৭। শেয়াল দেবতা রহস্য, ফেলুদা/ সত্যজিৎ রায়
৮। The Mirror Crack'd from Side to Side, Miss Marple/ Agatha Christie
৯। The Hound of the Baskervilles, Sherlock Holmes/ Arthur Conan Doyle
১০। ছিন্নমস্তার অভিশাপ, ফেলুদা/ সত্যজিৎ রায়


February 14, 2016

নাটক দেখতে গিয়ে



আমাদের বাইরে খাওয়ার পাট একেবারেই চুকেছে। ডাক্তার বলেছেন মাসখানেক রেস্ট্রিকশনে থাকলেই যথেষ্ট, বাড়ির লোকেরা বলেছে অন্তত মাস, আর আমাদের বাড়িওয়ালা, যিনি আমাদের উল্টোদিকেই থাকেন এবং আমাদের দরজার সামনে পিৎজা আর ডোনার আর চিকেন চাউমিন আর বিরিয়ানির লাইন দেখে শিউরে শিউরে ওঠেন (উঠতেন এতদিন), তিনি বলেছেন সা-রা-জী--। সারাজীবন এইরকম খাবে, কুন্তলা। ওকে তো খাওয়াবেই, নিজেও খাবে। তারপর দেখবে তোমার স্কিন কত ভালো হয়ে গেছে, চুল কত কালো হয়ে গেছে . . .

সেসব হবে কি না সেটা পরীক্ষার বিষয়, তবে কয়েকটা বদল অলরেডি ঘটেছে। এক, আমি ডালভাত চচ্চড়ি (তাও আবার তেল ছাড়া) রান্নায় একেবারে দ্রৌপদী হয়ে উঠেছি। এবং রান্না ব্যাপারটা যে কত সোজা সেটা আবিষ্কার করে চমকে গেছি। অফিস থেকে এসে রান্না করতে হবে জানলে আগে মনে হত মরেটরেও যেতে পারি, এখন দেখছি সে সব করেও সি আই ডি, মাস্টারশেফ দেখতে দেখতে খেয়ে, সানডে সাসপেন্স শুনতে শুনতে ঘুমোনোর শক্তি দিব্যি বাকি থাকে। এটা আমার মায়ের আরেকটা কথা প্রমাণ করে গায়ে খাটা পরিশ্রমের ক্ষেত্রে আমাদের শরীর সত্যি সত্যিই মহাশয়, যতখানি সওয়াবে ততখানিই সয়।

দুই, এখন আমরা নিয়মিত টিফিন নিয়ে অফিস যাচ্ছি। সকালে যখন সবথেকে বড় বাক্সটোয় রুটি, মাঝারিটায় তরকারি আর সবথেকে ছোট বাক্সটায় আঙুর ঠেসেঠুসে পুরি, তখন দুপুরবেলা সে সব ভালো ভালো জিনিস খাব ভেবে আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে একটা আলতো দুঃখও হয়। বাবামায়ের জীবনগুলোর থেকে যতখানি দূরে যাব ভেবেছিলাম, ঠিক ততখানিই তাঁদের মতো রয়ে গেছি।

তিন, গত তিনবছরে আমরা দুজনে মিলে যা খেয়েছি তার ডবল ফল খেয়েছি গত দেড়মাসে। কমলালেবু, কলা, পেয়ারা, আঙুর, বেদানা, আপেল, সবেদা, পেঁপে, কুল। (এই শেষ তিনটেয় আমি নেই) ইন ফ্যাক্ট, এই ফল দেখেই আমার বাড়িওয়ালা প্রথম ধরে ফেললেন যে গুরুতর কিছু একটা ঘটেছে। আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, উনি নামছেন, ওঁর মুখটা সবে হাসিহাসি হয়ে উঠেছে এমন সময় ওঁর দৃষ্টি আমার মুখ থেকে সরে আমার হাতের প্লাস্টিকের দিকে গেল। যার ভেতর ঘটের মতো বসে আছে একখানা সবুজহলুদ পেঁপে। অমনি হাসিকে কনুই মেরে সরিয়ে আতংক এসে জায়গা নিল। কী হয়েছে? হঠাৎ ফল খাচ্ছ? তখন বলতেই হল। অবশ্য ফল খেতে আমাদের খারাপ লাগছে না। আগে যে কেন খেতাম না সেটা ভেবে অবাক হচ্ছি। মায়েরা তো বলার কোনও কসুর রাখেননি।

কিন্তু সবথেকে বড় যে বদলটা ঘটেছে সেটার কথা গোড়াতেই বললাম। আমাদের বাইরে খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। তবে দুঃখের ঝোঁকটা যত নাখাওয়া, তার থেকে বেশিবাইরেশব্দটার ওপর। কারণ হোম ডেলিভারিও বন্ধ হয়েছে, কিন্তু সেটা বিশেষ গায়ে লাগছে না। আমাদের পাশের পাড়ায় খিদমৎ বলে একটি মোগলাই রেস্টোর্যান্ট আছে। ধ্রুপদী দোকান। সর্বাঙ্গ দিয়ে রেসপেক্টেবিলিটি চুঁইয়ে পড়ছে। গাঢ় রঙের ফাঁপানো সিটের সোফা, টেবিলের ওপর টুপির মতো ভাঁজ করা ধপধপে সাদা মোটা কাপড়ের ইস্তিরি করা রুমাল। যাঁরা সবুজসাদা ইউনিফর্ম পরে দুহাত জড়ো করে আমাদের টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন তাঁরা এটিকেট ক্লাসে হেসেখেলে আমাদের থেকে বেশি নম্বর পাবেন। সত্যি বলতে তাঁদের মুখের দিকে তাকালে আমার বেশ ভয়ই লাগে। কিন্তু মাসে দুবার খিদমৎ-এর বিরিয়ানি না খেলে অর্চিষ্মানের মন খারাপ হয়। তখনও হত, এখনও হচ্ছে। তাই আমরা তখন বাড়িতে বিরিয়ানি আনাতাম। ময়দার লেই দিয়ে মুখ আঁটা মেটে হাঁড়ির ঢাকা খুললে যে সুবাস ছড়াত তা ভাষায় বর্ণনা করার দুঃসাহস আমার নেই। সে সুগন্ধ আমাদের নাকে আসেনি বহুদিন। এদিকে রোজ দুজনের ফোনে মেসেজ আসছে। খিদমৎ-এর চব্বিশ বছর বয়স হল, সেই উপলক্ষ্যে চব্বিশ শতাংশ ছাড়। দীর্ঘশ্বাস চেপে মেসেজ ডিলিট করে দিচ্ছি। কষ্ট হচ্ছে, তবে বেশি নয়। তার থেকে ঢের বেশি কষ্ট হচ্ছে কফি শপে গিয়ে মুখোমুখি বসে বিশ্রী তেতো আর আধঠাণ্ডা কফিতে চুমুক না দিতে পারার জন্য।

কিন্তু বাইরে যেতে অসুবিধেটা কোথায়? এমন সুন্দর শহর, এমন সুন্দর আবহাওয়া, এমন সুন্দর ক্লাসিকাল জলসার সিজন? গানবাজনা শুনতে না ইচ্ছে করে শহরের খানেক ভাঙাচোরা প্রাসাদের একটায় গিয়ে ঘোরাঘুরি করা যায়, ছবি তোলা যায়, আর্ট একজিবিশন, মিউজিয়ামে গিয়ে টাইমপাস কর। বাইরে খাওয়ার তুলনায় এসব বিনোদনে পয়সাও লাগে যৎসামান্য। কিন্তু আমরা ওসবের কিছুই করি না। কারণ বাইরে খেতে গিয়ে যে বিনোদন সেটা পকেটের দিক থেকে ভারি হলেও মগজের দিক থেকে ভীষণ সোজা। আর মগজ খরচ করা পয়সা খরচ করার থেকে অনেক শক্ত কাজ। আমার মাতামহ বলতেন, "সাত হাত মাটি কাটতে রাজি হয়, সাত পাতা পড়তে রাজি হয় না" 

বাড়িতে বসে থেকে থেকে শেষটা এমন অবস্থা হল যে হাতের কাছে "আইনের চোখে নারী"মার্কা সেমিনারও যদি পাই তো গিয়ে বসে শুনি। আর কী ভাগ্য, তক্ষুনি ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার বার্ষিক ভারত রঙ্গ মহোৎসব শুরু হল। প্রতি বছরই হয়। সারা ভারত থেকে নাটকের দল আসে। আমরা খুঁজে খুঁজে বাংলা নাটকগুলো বার করলাম (মগজ দরকারের বেশি খরচ করা চলবে না) তার মধ্যে থেকেও ঝেড়েবেছে দু'জন সেলিব্রিটির নাটক পছন্দ করা হল। কৌশিক সেনের আন্তিগোনে আর ব্রাত্য বসুর বোমা।

আন্তিগোনের গল্প সকলেই জানেন। থেবস দেশের রাজা অওদিপাউস। তাঁর দুই ছেলে, ইতিওক্লিস আর পলিনাইসিস, আর দুই মেয়ে, আন্তিগোনে আর ইসমেনে। দেবতাদের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি করে অজান্তে নিজের পিতাকে হত্যা করে, নিজের মায়ের গর্ভে সন্তান উৎপাদন করে, শেষে এই সব ভয়ানক সত্য উদ্ঘাটন করে নিজেই নিজের চোখ অন্ধ করে অওদিপাউস থেবস ছেড়ে চলে গেলেন। অমনি রাজপুত্রদের নজর খালি সিংহাসনের ওপর পড় মারামারি বাধ মারামারিতে নিজেরাই নিজেদের হত্যা রলেন। থেবস-এর হাড় জুড়োল। সিংহাসনে বসলেন রাজপুত্র রাজকন্যাদের মামা ক্রেয়ন।

ক্রেয়নের প্রথম কর্তব্য হল রাজপুত্রদের খেয়োখেয়িতে ছিন্নভিন্ন থেবস- শান্তিস্থাপন। আর শান্তিস্থাপনের সবথেকে সহজ উপায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিপ্রদান। ক্রেয়ন হুকুম দিলেন ইতিওক্লিস-এর মৃতদেহ তুলে নিয়ে গিয়ে রাজসম্মানে কবরস্থ করার, আর রাজদ্রোহের অপরাধে পলিনাইসিস-এর দেহ অনাবৃত, অসৎকৃত ফেলে রেখে চিলশকুন দিয়ে খাওয়ানোর।

রাজার আদেশের বিরুদ্ধে কথা বলার কারও সাহস হল না। এক আন্তিগোনে ছাড়া। ভাইয়ের সম্মান রক্ষার জন্য আন্তিগোনে বিচলিত হলেন। রাতের অন্ধকারে পলিনাইসিসের দেহ ভূমিস্থ করতে গিয়ে ধরা পড়লেন এবং রাজার আদেশ অস্বীকার করার দায়ে অন্ধকূপে নিমজ্জিত হলেন। শেষটায় যখন রাজার মন নরম হয়ে এসেছে, হাজার হোক ভাগ্নি, তখন রাজা শাস্তি মকুব করতে গিয়ে দেখলেন আন্তিগোনে অন্ধকূপের ভেতর আত্মহত্যা করেছেন।

আন্তিগোনে নাটকের দৃশ্য। উৎস গুগল ইমেজেস

আন্তিগোনে আমার ভালো লেগেছে। বিশেষ করে শেষ দৃশ্যে যখন থেবস-এর রাজপথে জমে ওঠা মৃতদেহের তলায় ক্রেয়নরূপী কৌশিক সেন চাপা পড়ে যাচ্ছেন আর মৃতদেহের ঢিপির তলা থেকে তাঁর ডানহাত কাঁপতে কাঁপতে আকাশের দিকে উঠতে চাইছে সেই জায়গাটা বেশ গায়ে কাঁটা দেওয়া। নাটকের শুরুতে কিছু চমক ছিল, সেগুলো আমার বিশেষ কার্যকরী মনে হয়নি

পরের দিনের নাটক ব্রাত্য বসুর বোমা। একই সময়, একই ভেনু। সোয়া ছটা নাগাদ কামানি অডিটোরিয়ামের সামনে নেমে অটোভাড়া দিচ্ছি, হঠাৎ শুনি "কুন্তলা!" মুখ তুলে দেখি রাস্তার ঠিক উল্টোদিকের ফুটপাথে অর্চিষ্মান। - তক্ষুনি অটো থেকে নেমেছে এই যে দিল্লির রাস্তা হঠাৎ দেখা, আমাদের উদ্দেশ্য সফল হল নাটকটাটক তো ছুতো।

বোমা নাটকের বিষয়বস্তু হল আলিপুর বোমা মামলা। উনিশশো পাঁচে বঙ্গভঙ্গর সিদ্ধান্ত  পাশ হওয়ার পর থেকেই বাঙালি যুবকদের মধ্যে বিপ্লবের বীজ মাথা তুলছিল। মেদিনীপুর, ঢাকা ইত্যাদি জায়গায় ছেলেপুলেরা ইংরেজ শাসকদের তিতিবিরক্ত করে তুলছিল কিন্তু সবথেকে বেশি ডানপিটে ছিল মানিক তলায় অরবিন্দ ঘোষের বাগানবাড়িতে জড়ো হওয়া ছেলেপুলেরা। হেমচন্দ্র দাস কানুনগো প্যারিস থেকে বোমা বানানো শিখে এসেছিলেন, নিজের বাড়ির ল্যাবরেটরিতে বোমা বানানোয় হাত পাকাচ্ছিলেন উল্লাসকর দত্ত। ওই বাগানবাড়িতে বসে যুক্তি করেই বদমাশ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য প্রফুল্ল চাকী আর ক্ষুদিরামের মুজফফরপুর পাঠানো হয়েছিল। তিরিশে এপ্রিল তাঁরা কিংসফোর্ড ভেবে কেনেডিদের গাড়িতে বোমা ছুঁড়লেন, আর দোসরা মে ভোররাতে বাগানবাড়িতে হানা দিয়ে পুলিশ তেত্রিশজন বিপ্লবী আর প্রচুর কাগজপত্র উদ্ধার করল। এর পর বিচার, অরবিন্দের মুক্তি এবং সম্পূর্ণভাবে অধ্যাত্মবাদে ডুবে যাওয়া, বাকি বন্দীদের সেলুলার জেলে যাওয়া, বারো বছর পর ছাড়া পাওয়া, সবই আছে নাটকে।

বোমা নাটকের দৃশ্য। উৎস গুগল ইমেজেস

যদিও এই সব ঐতিহাসিক তথ্যের বর্ণনা দেওয়া বোমা- উদ্দেশ্য নয়। বোমা- উদ্দেশ্য টা প্রমাণ করা যে দেশপ্রেমের উদ্দীপ্ত হয়ে, সুখী, নিরাপদ, ঝুঁকিহীন জীবনের প্রলোভন, প্রাণের মায়া ত্যাগ করে দেশের কাজে ঝাঁপানো মানুষদের মধ্যেও হিংসা, ক্ষমতার লোভ, স্বার্থচিন্তা টইটম্বুর থাকে বোমা আমার খুবই ভালো লেগেছে, আন্তিগোনের থেকেও বেশি ভালো। জমজমাট বিষয়, অভিনয়, মঞ্চসজ্জা। তবে অরবিন্দ আগাপাশতলা ভালোমানুষ আর বারীন ঘোষ আদ্যোপান্ত পাজির পাঝাড়া। কালোয়ভালোয় আরেকটু মেশামিশি হলে মনে হয় ভালো হত।

আসল হল বেড়াতে যাওয়া, সুদ হল নাটক দেখা। আর সে সুদের ওপর আরও বড় সুদ হল সেলিব্রিটি দর্শন। স্থানকালপাত্র বিচার করে আমাদের আন্দাজই ছিল যে এখানে বেশ কিছু নক্ষত্রের দেখা মিলবে। শুরু থেকেই তক্কে তক্কে ছিলাম। অবশ্য বেশি তক্কে না থাকলেও চলে, সেলিব্রিটি দেখলেই চেনা যায়। এক, তাঁরা কখনওই একা চলেন না। দুই, তাঁদের মুখেচোখে একটা দীপ্তি থাকে। আগে আমি ভাবতাম দীপ্তিটা ফেশিয়ালের, এখন বুঝেছি সেটা নয়। ওই দীপ্তিটা ইন ফ্যাক্ট ওঁদের কোনও হাতই নেই গোটাটাই আমার অবদান। এই যে আমি, আমার মতো আরও শত শত হাজার হাজার লোক ওঁদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি, সেই দৃষ্টির মুগ্ধতা ওঁর গাল, কপাল, নাকের ডগায় পড়ে সেগুলোকে চকচকে করে তুলেছে। তাছাড়াও ওই দীপ্তিটার আরও একটা উপযোগিতা আছে। ওটা ওঁদের একরকম সুরক্ষা দেয়। মুগ্ধতা জমে জমে চারপাশে একটা অদৃশ্য দেওয়াল তোলে। সে অদৃশ্য দেওয়ালের গায়ে অদৃশ্য কাঁটা বেরিয়ে থাকে, অসম্ভব সেনসিটিভ কাঁটা সামনে কোনও মানুষ এলেই সেটা কাজ শুরু করে। আগুন্তক কি সেলিব্রিটি? উত্তর হ্যাঁ হলে তারা গুটিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়, আর না হলে তেড়েফুঁড়ে খোঁচা মেরে তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়।

কাঁটার খোঁচা অ্যাভয়েড করার জন্য আমরা নিরাপদ দুরত্বে দাঁড়িয়ে সেলিব্রিটি দেখছিলাম। কাউকে কাউকে দেখামাত্র চিনে ফেললাম, কাউকে অর্চিষ্মান চিনতে পারল আমি পারলাম না বা উল্টোটা, কাউকে আমাদের দুজনেরই চেনা চেনা ঠেকল আর কাউকে একেবারেই চিনতে পারলাম না। কিন্তু সব লক্ষণ মিলে যাওয়ায় বুঝলাম তিনি একজন “কেউ”।

যাকে নিশ্চিত করে দু'দিনই চিনতে পারলাম তিনি অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় নি পাল। কিন্তু যাকে দেখে আমরা উত্তেজিত হলাম তিনি হচ্ছেন তসলিমা নাসরিন। বোমা নাটকের শেষে পৌলমী বসুর হাতে ফুলের তোড়া দিতে মঞ্চে উঠেছিলেন। ভদ্রমহিলা যে এত লম্বা কেন যেন আশা করিনি। বেরোবার সময় আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ ছিল, নেহাত নিজের দোষেই হল না। সিঁড়ি দিয়ে নেমে হলের ঠিক মাঝখানে সুন্দর করে ফুলের আলপনা দেওয়া ছিল। ওই আলপনার নাকের ডগাতেই দেওয়ালজোড়া ছবি। এই রকম পরিস্থিতি সবসময়েই আমাকে নার্ভাস করে দেয়। পাছে আমি ছবি দেখতে গিয়ে আলপনা পাড়িয়ে দিই অ্যাকচুয়ালি, আমি যে আলপনা পাড়িয়ে দেব না সে কনফিডেন্স আমার আছে, কিন্তু অন্য কেউ যে পাড়াবে না, সে কনফিডেন্স নেই। না থাকার কারণও আছে। কারণ কেউ না কেউ থাকবেনই যিনি প্রায় তাঁর শরীরের মাপের আলপনা না দেখতে পেয়ে গটগটিয়ে তার ওপর উঠে যাবেন।

নাটক দেখে দোতলা থেকে নেমেছি, একতলার বেশি দামি টিকিটের দরজা দিয়ে দলবল নিয়ে সেলিব্রিটিরা বেরোচ্ছেন, আমরা সশ্রদ্ধ পায়ে ধীরে ধীরে দূরে দূরে হাঁটছি, এমন সময় বিরাটকায় বুট পরা একজন দর্শক এসে উপস্থিত হলেন। আলপনার বিপজ্জনক রকম কাছে। আলপনার অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে ব্যস্তমুখে তিনি  হাঁটাহুটি করতে লাগলেন, মাঝেমাঝেই তাঁর বুটের ডগা গাঁদাফুলের পাপড়ি আলতো ছুঁয়ে গেল। যেন বড়লোকের পোষা অ্যালসেশিয়ান রাস্তার ধারে সদ্য জন্মানো বেড়ালছানাকে শুঁকে দেখছে। আমি মুখে হৃৎপিণ্ড নিয়ে ওঁর জুতোর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। অবশেষে যখন তিনি গতিপথ বদলে অন্যদিকে গেলেন এবং দৈবের কৃপায় ফুলগুলো রক্ষা পেল, অর্চিষ্মান বলল ততক্ষণে তসলিমা গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছেন। গেছেন নাকি একেবারে আমার কাঁধের পাশ দিয়েই।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.