March 29, 2016

25 Bookish Facts About Me



১। গোয়েন্দাগল্প বাদ দিয়ে প্রায় সব বইয়েরই আমি শেষ পাতাটা প্রথমে পড়ে নিই। হ্যারি পটারেরও সপ্তম বইয়ের শেষ লাইনটা পড়ে নিয়েছিলাম। না হলে বড় টেনশন হয়। শান্তি করে পড়া যায় না।

২। আমার বয়স যখন দশের কম ছিল তখন আমি পাড়ার একজনের বাড়ি থেকে একটা ‘চাঁদমামা’ ধার নিয়ে এসে পড়েছিলাম। পরে সে দাবি করেছিল আমি তার বই ফেরত দিইনি। তারপর থেকে এ যাব আমি লাইব্রেরি ছাড়া আর কারও বই ধার নিইনি। ভবিষ্যতেও নেওয়ার ইচ্ছে নেই।

৩। আমি 'গেম অফ থ্রোনস' পড়া শুরু করেছিলাম, শ’খানেক পাতার বেশি এগোতে পারিনি।

৪। কোনও বই খারাপ লাগলে বইটারও থেকে আমার নিজেকে অপরাধী লাগে বেশি।

৫। টিভি কিংবা রেডিও চলতে থাকলে আমি বই পড়তে পারি না।

৬। বাসস্টপে, রেলস্টেশনে, চলন্ত বাস, অটোর চেঁচামেচির মধ্যে আমি দিব্যি বই পড়তে পারি। ইন ফ্যাক্ট, ওইসব জায়গাগুলো আমার অন্যতম প্রিয় পড়ার জায়গা।

৭। আমি লোককে তাদের পড়ার অভ্যেস দিয়ে বিচার করি। এবং আমাকেও যে লোকে করে, সেটা জানি।

৮। আমার মাবাবার সঙ্গে আমার পড়ার রুচির কোনও মিল নেই। এটা কী করে ঘটল সেটা আমার কাছে একটা রহস্য।

৯। আমি অনেকদিন পর্যন্ত গল্পের বইও মলাট দিয়ে পড়তাম। এখন যে কুঁড়েমো করে দিই না, সে বিষয়ে মনে মনে বেশ অপরাধবোধ হয়। হয়তো বইকে আগের মতো আর ভালোবাসি না। পরশু না কবে যেন টিভিতে 'চল, লেট’স গো' দিয়েছিল, সেখানে দেখি কে একজন বাসে বসে মলাট দেওয়া বই পড়ছিল বলে বাকিরা খুব মুখ চুমরে হাসছে। কী বিপদ। প্রথমেই মনে হয়েছিল বাবা লোকের মনে কত পাপ। পরে দেখি যে সবার সন্দেহটা সত্যি। ভদ্রলোক সত্যিই এক বইয়ের নাম করে মলাটের ভেতর অন্য বই পড়ছিলেন। কিন্তু আমি কক্ষনও সে রকম কিছু করিনি, অন গড ফাদার মাদার।

১০। আমার বয়স যখন ষোল সতেরো, তখন একটি আড়াই বছরের বাচ্চা এসে আমার বইয়ে পেন দিয়ে হিজিবিজি কেটে দিয়েছিল বলে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। আমার বাড়ির লোক মহা এমব্যারাসড হয়েছিলেন। বাচ্চাটির মা আর কোনওদিন আমাদের বাড়িতে আসেননি।

১১। কেউ আমার কাছে বইয়ের সাজেসশন চাইলে আমার ভয়ানক অস্বস্তি হয়। কারণ আমি নিরানব্বই শতাংশ নিশ্চিত আমি যে বইগুলোর নাম বলব সেগুলো তার পড়ে ভালো লাগবে না। তারপর সে আমার গুষ্টির তুষ্টি করবে।

১২। ইদানীং দেখছি আমার অডিওবুকের প্রতি বেশ ঝোঁক হয়েছে।

১৩। আপরুচি খানা আর পররুচি পরনা। কিন্তু ‘পড়না’টা এর মাঝামাঝি কোথাও পড়ে বলে আমার বিশ্বাস।  

১৪। মলাট দিয়ে বই আমি সত্যিই বই বিচার করি না। ভেতরে কী আছে সেটাই হল কথা।

১৫। বইয়ের কৌলীন্যের ব্যাপারে আমি একেবারেই উৎসাহী নই। ফার্স্ট এডিশন কেনার জন্য বাড়তি দশটাকাও দেব বলে মনে হয় না।

১৬। বরং যে ব্যাপারটার প্রতি আমার একটু শৌখিনতার ভাব আছে সেটা হচ্ছে বুককেস। বলাই বাহুল্য, কেনার সময় আমি পেপারফ্রাই হাউসফুল-এর সবথেকে সস্তা বুককেসটা কিনেছি, (কারণ আমি বুককেসের ব্যাপারে শৌখিন হতে পারি কিন্তু সব ব্যাপারেই কিপটে), কিন্তু আমি মাঝে মাঝেই অনলাইনে বুককেসের ছবি দেখে বেড়াই, হাউ টু ডেকোরেট ইয়োর বুককেস জাতীয় সার্চ দিয়ে সময় নষ্ট করি।

১৭। ছোটবেলায় দাআআআআরুণ লেগেছিল কিন্তু এখন পড়লে খারাপ লাগতে পারে, সে সন্দেহ আমার কিছু কিছু বইয়ের প্রতি আছে। ‘অ্যান অফ দ্য গ্রিন গেবলস’ তাদের মধ্যে একটা।

১৮। আমার কল্পবিজ্ঞান বিশেষ পোষায় না। আর রোম্যান্স। আর অ্যাডভেঞ্চার। আর ইয়াং অ্যাডাল্ট। আর সেলফ হেল্প।

১৯। গোয়েন্দাগল্পের মধ্যে 'হু ডান ইট' গল্প আমার সবথেকে প্রিয়, তারপর ক্রমে ঐতিহাসিক রহস্যকাহিনি, পুলিস প্রসিডিওরাল, কোর্টরুম মিস্ট্রি, স্পাই থ্রিলার। এই জন্য রেমন্ড চ্যান্ডলার আর এ জীবনে ভালো লাগাতে পারলাম না।

২০। বইয়ের ভেতর কদাপি লিখি না। পড়ার বইয়ের ভেতরেও না।

২১। উপহার পাওয়া বইয়ের প্রথম পাতায় সোনাকে/কুন্তলাকে বলে লিখে দিয়ে নিচে তারিখ দিয়ে উপহারক নিজের নাম লিখে দিলে সেটা অ-স-ম্ভ-ব পছন্দ করি। অনেক সময় বই না পড়ে, বইয়ের প্রথম পাতা খুলে খুলে ওই লেখাগুলো পড়ি বসে বসে।

২২। বুক চ্যারিটি-র উদারতা আমি দেখাতে পারিনি এখনও। পারব বলেও মনে হয় না। বরং নতুন কিনে দিতে পারি, তবু আমার বুককেসে হাত দেব না।

২৩। আমি একেবারেই রাগ পুষে রাখা টাইপ নই। কিন্তু ক্লাস এইটের ইংরিজি গ্রামার বই থেকে শুরু করে, আমার কোন বই কে ধার নিয়ে আর ফেরৎ দেয়নি সব কড়ায় গণ্ডায় মনে করে রেখে দিয়েছি।

২৪। আমি মোটে কবিতা পড়ি না। সেটা যে পাঠক এবং লেখক হিসেবে আমার  ক্ষতি করেছে সেটাও জানি।

২৫। বুকক্লাব ব্যাপারটা শুনতে বেশ ভালো, কিন্তু আমার ধারণা কাজে বেশ খারাপ।   
    


March 27, 2016

স্টেকেশন



staycation
steɪˈkeɪʃ(ə)n/
noun informal

  1. 1. a holiday spent in one's home country rather than abroad, or one spent at home and involving day trips to local attractions.
*****

বুধবার সকালবেলা টোল খাওয়া স্টিলের থালাটার ওপর দু’খানা চায়ের কাপ আর বিস্কুটের বয়ামটা ব্যালেন্স করে ঢুকতে গিয়ে চোখে পড়ল। বুককেসের দু’নম্বর তাকের ডানকোণে রাখা স্টিফেন কিং-এর 'অন রাইটিং'-এর ওপর আলো এসে পড়েছে। ঝকঝকে, চনমনে, ফুরফুরে।

দেখামাত্র বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সামনে চারচারটে দিন ছুটি, অথচ আমাদের কোথাও যাওয়ার নেই। না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে যে ক’টা যুক্তি ছিল, খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে, শারীরিক ধকল, প্রচুর জমে থাকা কাজ, সবগুলোকে গোল্লায় পাঠিয়ে করে নতুন করে চেষ্টায় লাগলাম। জায়গার বাছবিচার নেই, যাওয়া নিয়ে কথা। চকরাতা, দেরাদুন, নওকুচিয়াতাল, বিনসর, মাউন্ট আবু। তৎকাল পাওয়া গেল না, কুছ পরোয়া নেই। বাস তো আছে। তাতে যদি কষ্ট হয় তাহলে না হয় গাড়ি নিয়েই যাব, রোজগার করছি কি ব্যাংকে টাকা রাখার জন্য? জি এম ভি এন, কে এম ভি এন-এর প্রায় সাতখানা গেস্টহাউসের ফোন নম্বর ডায়াল করে করে আঙুল ব্যথা হয়ে গেল, রুম নেহি হ্যায়, রুম নেহি হ্যায়। বুধবার দিন যখন ফুরিয়ে এল আর হোলি মিলনোৎসভ-এর প্রত্যাশায় অফিসের প্যান্ট্রিতে থরে থরে গুজিয়া, বরফি, পকোড়ার প্যাকেট, লাল নীল কমলা অরগ্যানিক আবিরের প্যাকেট জমে উঠল, তখন আমার মনে উৎসবের রেশমাত্র নেই, কেবল হতাশা। টেরাসে ছুটোছুটি করে এর ওর গালে রং মাখাতে না পারলে যেন আমার জীবন বৃথা, তবুও ভীষণ কাজ তাই চলে যাচ্ছি ভঙ্গি করে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

হতাশা কাটাতে কাজে মনোনিবেশ করলাম। কাজেই মুক্তি। কাল সারাদিন কিছু পাকা বাচ্চা আর অপরিপক্ক বড়রা ছুটোছুটি করে রং খেলবে, তাই জনজীবন স্তব্ধ। দরকারি জিনিসপত্র সব কিনে বাড়ি যেতে হবে। দরকার বলতে চা আর জল। চা আছে। জল প্রায় ফুরোয় ফুরোয়। ঘন সবুজ রঙের মিনি টেম্পোতে চেপে বিসলেরির ছাপ্পা মারা কুড়ি লিটারের বোতল বিলি করে বেড়ান যিনি, তাঁকে ফোন করা হল। ঘাড়ে করে বোতল নিয়ে এসে মুখের সিল ছুরি দিয়ে কেটে সেটাকে ডিসপেনসারের ওপর উপুড় করে দেবেন, গবগব করে জল নামবে। ওঁর থেকেই আমি শিখেছি ছুরি কাউকে হাতে হাতে দিতে নেই। রোজ যখন আসেন সেই সময়টা পেরিয়ে আরও ঘণ্টাখানেক কেটে গেল, তাঁর দেখা নেই। অবশেষে এলেন যখন তখন সব দরজায় তালা পড়ে গেছে। নিস্তব্ধ সিঁড়িতে হাওয়াই চটির উৎকট শব্দ যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে করতে নেমে গেলাম। সিঁড়ি ঘরের টিমটিমে টিউবলাইটের আলো পড়ে ভদ্রলোকের কপালের ঘাম চকচক করে উঠল। জল ঢেলে, পুরোনো বোতল নিয়ে, খুচরো ফেরত দিতে দিতে দু’বার ওঁর ফোনে তাড়া এসে গেল। ভদ্রলোক ফোন তুলে আশ্বাস দিলেন। আজ যত রাতই হোক না কেন তিনি সবাইকে জল পৌঁছে তবেই বাড়ি যাবেন।

ঘরে ফিরে এসে দরজাজানালার ছিটকিনি, গ্যাসের নব, পরীক্ষা করে এসে বিছানায় গা ঠেকালাম তখন আবার মনে পড়ে গেল। চারচারটে দিন। এ বছরের সবথেকে লোভনীয় ছুটিটা আমরা বাড়িতে বসে কাটাতে চলেছি। আজ সন্ধ্যে থেকে নিজামুদ্দিন, পাহাড়গঞ্জ, আই এস বি টি, থেকে ট্রেন, বাস, আকণ্ঠ লোক গিলে পাহাড়, জঙ্গল, মরুভূমির দিকে চলে যেতে শুরু করেছে, তাদের কোনওটার জানালার পাশের দুটো সিটে আমরা নেই। আমরা আছি যেখানে গত কে জানে কত যুগ ধরে ছিলাম। সামনের চারদিনও থাকব। চেয়ারে জমিয়ে রাখা কাচা জামা প্যান্ট ইস্তিরি করে ভাঁজ করব। অবান্তর লিখব বা লিখব লিখব ভাবব। অফিসের অসংখ্য জমে থাকা কাজ করবই না।

চোখ লেগে আসার আগের মুহূর্তে শুনলাম নিচের গলিতে হইহই উঠেছে। হোলি শুরু হয়ে গেছে।

*****

সকালের ভালো ব্যাপারটা হচ্ছে, আগের রাতে যা-ই ঘটুক না কেন, ভালো বা খারাপ, মনের অবস্থা যেমনই থাক না কেন, উত্তেজিত, হতাশ, বা অবসন্ন, সেই ঘটনা বা অনুভূতিদের সঙ্গে একটা রিজনেবল দূরত্ব তৈরি হয়। আনন্দটাকে আর ততখানি উদ্দাম মনে হয় না, হতাশার ভেতরেও খানিকটা ফাঁকফোকর বেরিয়ে পড়ে যার ভেতর দিয়ে খানিকটা আলো চোখে এসে পৌঁছয়। ভালোমন্দ, আশানিরাশা সবকিছুকেই বাড়িয়ে কমিয়ে সকাল একটা মাঝামাঝি জায়গায় নিয়ে আসতে পারে। সকালের মাত্রাবোধ অসীম, সকালের দৃষ্টি নৈর্ব্যক্তিক ও নির্মোহ।

ঘুম থেকে উঠে অর্চিষ্মান গেল রান্নাঘরে। আজ ও শেফ, আমি সু-শেফ। অর্থাৎ ডিমের দায়িত্ব আজ ওর, আমার ঘাড়ে সাইড ডিশ। অর্থাৎ চায়ের জল গরম করা, পাউরুটি সেঁকতে বসানো। রোজ আমরা হাফ ফ্রাই ডিম খাই, আজ অন্য কিছু খাব। কী খাব সেটা অর্চিষ্মান ফাঁস করল না। সারপ্রাইজ। থালা নিয়ে ঘরে ঢুকতে লাফ দিয়ে উঠলাম। সারপ্রাইজই বটে। বড়বেলায় ইউটিউব দেখে শেখা ধপধপে সাদা অমলেট নয়, ছোটবেলার মতো পেঁয়াজকুচি, লংকাকুচি দিয়ে উঁচু আঁচে ভাজা ভাজা মামলেট। দুজনের জন্য দুটো ডিম, আর হোলির জন্য এক্সট্রা আরেকটা ডিম দিয়েছে অর্চিষ্মান। স্টিলের প্লেটের গোটাটা জুড়ে আবার এদিকওদিক থেকে খানিকটা ল্যাজা মুড়ো বার করে শুয়ে আছে পেটমোটা মামলেট। যেন শহর থেকে প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি আসা জামাইয়ের জন্য বানানো।

আজ দুপুরের মেনু আলুউচ্ছে, বড়ি দিতে ভুলে যাওয়া নটেশাক আর দই মাছ। খেয়ে উঠে অর্চিষ্মান গেল ফ্রুট অ্যান্ড নাট আইসক্রিম আনতে। খেয়েদেয়ে খুব ঘুমোলাম। ঘুম থেকে উঠে মাকে ফোন করলাম আর ভালোভালো জিনিস জানা হয়ে গেল। মা পরশু শব্দজব্দ সলভ করেছিলেন, যেগুলো পারেননি সেগুলো আজ সমাধান দেখে দেখে মেলাচ্ছেন। ওমানের জাতীয় ফুল পপি, মঙ্গল গ্রহের আরেক নাম কুব্জ, আকাশে অগস্ত্য নামের তারা ফুটলে শরৎকালের সূচনা হয়।

চেয়ারের কাপড়গুলো শুধু ভাঁজ করা হল না। অবশ্য আরও তিনদিন তো আছে।

*****

শুক্রবার আমি কী করেছি কিছুই মনে নেই। শুধু মনে পড়ছে টিভি, ইউটিউব আর গল্পের বইয়ের গভীর খোঁয়ারি ভেঙে উঠে দেখলাম অর্চিষ্মান আমাদের বইয়ের তাক পরিপাটি গুছিয়ে ফেলেছে।


*****

আমাদের বাড়িতে একটিও গগলস/সানগ্লাস নেই। আমার কেন নেই তার ব্যাখ্যা আমার চোখের পাওয়ার। সানগ্লাস পরতে হলে আমার কনট্যাক্ট লেন্স পরা ছাড়া গতি নেই আর কনট্যাক্ট লেন্স আমার বিশ্রী লাগে। নবনীতা দেবসেন শুনেছি চশমার ওপর দিয়ে সানগ্লাস পরেন। একবার পদ্ধতিটা পরখ করে দেখব ভাবছি।

অর্চিষ্মানের গগলস না পরার পেছনে এরকম শারীরবৃত্তীয় কোনও কারণ নেই। যা আছে তা মানসিক। ও বলে গগলস পরলে নাকি মানুষের চেহারায় একটা চট্-আত্মবিশ্বাসের ছাপ ফোটে, যেটা ওর মতে “ভয়াবহ”। সানগ্লাস পরলে যে লোককে গ্ল্যামারাস দেখায় সে বৈজ্ঞানিক তথ্যটা আমি আগে জানতাম, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অ্যাংগেলটা আগে মাথায় আসেনি। অর্চিষ্মানের মনোভাব জানার পর থেকে আমি ব্যাপারটা খেয়াল করার চেষ্টা করছি, এবং বলতে বাধ্য হচ্ছি যে অর্চিষ্মানের কথাটা সত্যি। হয়তো শুধু ছাপই পড়ে না, হয়তো সত্যি সত্যিই আত্মবিশ্বাস খানিকটা বাড়ে।

শনিবার ন্যাচারাল’স আইসক্রিমের দোকানের দোতলায় বসে সত্যিটা আরেকবার মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ এল। (অর্চিষ্মান নিয়েছিল একটা সবেদা আর একটা ডাব আইসক্রিম, আমি নিলাম এক স্কুপ ‘ঠাণ্ডাই’ আইসক্রিম, হোলি স্পেশাল।) একতলা থেকে এক ভদ্রলোককে দেখতে পাচ্ছিলাম না, শুধু শুনতে পাচ্ছিলাম। শুনেই বুঝতে পারছিলাম ভদ্রলোক ভয়ানক আত্মবিশ্বাসী। না হলে ফোনে কেউ অত চেঁচিয়ে কথা বলে না। একটু পর ভদ্রলোক কথা বলতে বলতে দোকানের বাইরে বেরিয়ে এলেন। গলার সঙ্গে মানানসই আত্মবিশ্বাসী চেহারা। গলায় চেন, হাতে আংটি, পরনে হাফপ্যান্ট ও হাওয়াই চটি, এবং চোখে সানগ্লাস। দোকানের ভেতরেও তিনি সানগ্লাস পরে ঘোরাঘুরি করছেন কেন ভাবতে গিয়ে আত্মবিশ্বাসের ব্যাপারটা মনে পড়ল। খুললে যদি কনফিডেন্স কমে যায় তাহলে পরে থাকাই ভালো।

বাড়তি ছুটি শেষ, এবার হক্কের ছুটিদুখানা মাত্র পড়ে আছে ভেবে মন খারাপ হচ্ছিল, সেটা কাটাতে শনিবার সকাল হতে না হতেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছি। সারাভানা ভবনে অর্চিষ্মান তা-ই খেল, যা ওর পক্ষে এখন খাওয়া সম্ভব। সম্বরে ডোবানো ছোট্ট ছোট্ট নরম ফুলকো ইডলি, আমি খেলাম একটা নতুন রকমের দোসা, নাম কাল দোসাই। দেখতে প্যানকেকের মতো, বৈশিষ্ট্যেও প্যানকেকের মতোই ফ্লাফি, খালি ময়দা আর ডিমের গোলার বদলে চালডাল বাটা। খাওয়ার পর দুকাপ কফি।

*****

সকালে উঠে সেই বিশ্রী অনুভূতিটা টের পেলাম যেটা প্রতি সপ্তাহে রবিবার সকালে ঘুম ভেঙে পাই। দুদিন ছুটি শেষ হলেই বিশ্রী লাগে, চারদিন ছুটি শেষ হলে কেমন লাগবে সেটা বলার কিছু নেই। মা বলেন মন খারাপ হলেই কালক্ষেপ না করে পথে বেরিয়ে পড়তে। আমি এ টোটকা কাজে লাগিয়ে দেখেছি আগে, অব্যর্থ। মর্নিং ওয়াক অন্তত কুড়ি মিনিটের ধাক্কা, তাছাড়া আমার পছন্দের পার্ক বেশ দূর। কাছের মেলা গ্রাউন্ড খুঁড়ে রেখেছে দেখেছিলাম, এখন সারিয়েছে কি না জানি না। কাজেই বিনোদনের অন্য রাস্তা দেখতে হবে।

ওই ভোরে আর একটি মাত্র বিনোদনই সম্ভব, আর সেটার উৎস আমার বাড়ির খুব কাছেই। কাজেই সেদিকে হাঁটা লাগালাম। দূর থেকে জায়গাটা চোখে পড়তে বুঝলাম ভুল কিছু করিনি। ‘সফল’ সবজির দোকান একেবারে গমগম করছে।

বাজার করার নেশার ব্যাপারটা আমি শুনেছি তো বটেই নিজে চোখে দেখেওছি। এক কিলোমিটারের মধ্যে বাজার থাকলেই বাবা কিছু একটা কিনে ফেরেন। দরকার থাকুক ছাই না থাকুক। জিজ্ঞাসা করলে বলেন, আরে এত কচি ডাঁটা/ টাটকা বেগুন/ জ্যান্ত মাছ/ ফ্রেশ এঁচোড়/ তাজা মোচা . . . দেখেও ছেড়ে আসা যায় নাকি? আমি এতদিন ভাবতাম, যাবে না কেন, নিশ্চয় যায়। নোংরা, ভেজা, স্যাঁতসেঁতে, ভ্যাপসা, গরম, চিৎকার, ঝগড়াঝাঁটির বাজার, সেখান থেকে শুধু প্রাণ ছাড়া আর কিছু নিয়ে কেন কেউ ফিরতে চাইবে সেটাই বরং একটা রহস্য।

বেশিরভাগ দিনই অফিস থেকে ফেরার পথে বাজার সারি, ক্বচিৎ কদাচিৎ ছুটির দিন সকালে বেরোনো হয়। যেদিন যেদিন সেরকমটা ঘটে সেদিন সেদিন আমি ওই রহস্য সমাধানের দিকে একেক পা এগিয়ে যাই। ক্রেট উপচে কমলা, হলুদ, বেগুনি, লাল আর অন্তত গোটা দশেক শেডের সবুজ। ঠাণ্ডা জলের ফোঁটা লেগে থাকা টমেটো, লিস্টে লেখা না থাকলেও একবার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। টাটকা কড়াইশুঁটির সিজন শেষ হয়ে গেছে শুনে বুকে শেল। ফ্রোজেন লে লিজিয়ে। মাগো, কীসের সঙ্গে কীসে। দৌড়ে গিয়ে শেষ শীতের ক’টা বাঁধাকপি তুলে নিই, কবে শেষ হয়ে যাবে। বাঁধাকপি নিলাম, পুদিনা পাতা দেখেও লোভ সামলানো গেল না। আমি যতক্ষণে অফিস থেকে ফিরি ততক্ষণে এই সব মহার্ঘ জিনিসপত্র ফুরিয়ে যায়। কিনে ফেললাম এক আঁটি। কীসে দেব কে জানে। একটা জ্যামের শিশি সদ্য খালি হয়েছে। কিছু না পেলে শিশিতে জল ভরে তাতে ডুবিয়ে জানালার ধারে রেখে দেব। বেশ উইন্ডোসিল গার্ডেনিং হবে। আমার বহুদিনের শখ।

*****

এ তো গেল চার দিনের দৈনিক বিবরণ। আর একটা অদ্ভুত ঘটনা এই চারটে দিন ধরেই ঘটছিল। চা খেতে খেতে, টিভি দেখতে দেখতে, দোসা খেয়ে অটো করে ফিরতে ফিরতে। অনবরত ভাবছিলাম, যদি বেড়াতে যাওয়া হত তাহলে এই মুহূর্তে আমরা কী করতাম? এই হয়তো দরজায় টোকা মেরে চা আর চায়ের সঙ্গে টোস্ট উইদআউট বাটার আসত। এবার তো ভেজিটেবল পকোড়া খাওয়া যেত না। এই হয়তো পাহাড় বেয়ে কুয়াশা নামত, এই হয়তো নওকুচিয়াতালের জল হাওয়ায় শৌখিন পাঞ্জাবির হাতার মতো কুঁচকে যেত।

তারপরেই কল্পনার দৌড় ফুরিয়ে যাচ্ছিল। আড় চোখে তাকিয়ে পাশের জনের মুখের ভাব বোঝার চেষ্টা করছিলাম। আমি যা ভাবছি, সেও কি তাই ভাবছে? সত্যিই কি আমরা রাজযোটক? সাসপেন্স সহ্যাতীত হওয়ায় অবশেষে বুক ঠুকে সত্যিটা স্বীকার করতে যাব, ও মা সেও দেখি মুখ হাঁ করেছে। বলছে, “ভালোই হয়েছে বল? না বেড়াতে গিয়ে?”

আছে আছে, আমাদের মনের মিল আছে! ভাগ্যিস যাইনি! ভাগ্যিস এই চারদিন টানা, বিচ্ছেদহীন, বোরিং বাড়িতে বসে, মুখস্থ হয়ে যাওয়া রেস্টোর্যান্টের ঠোঁটস্থ হয়ে যাওয়া মেনু না দেখেই অর্ডার দেওয়া ইডলি দোসা খেয়ে, দু’নম্বর মার্কেটে ঘোরাঘুরি করে কাটিয়েছি। পথে পথে ঘুরলে আনন্দ হয়তো হত, এত আরাম তো হত না।

আর এত আরামের বলেই ব্যাপারটা ডেঞ্জারাস। প্রতিবার ছুটির আগেই যদি এই আরামের স্মৃতিটা মনে পড়ে যায় আর আমাদের বেড়াতে যাওয়া লাটে ওঠে? সে ভয়ানক হবে। তাই আমরা একে অপরের কাছে প্রমিস করেছি যে নেক্সট ছুটিতে বেড়াতে যাবই যাব। কোথায় যাব সেটাও প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। ড্যাং নয়, ক্যাং-ও নয়। আর হিন্ট দেওয়াটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।



March 20, 2016

শনিরবি



শনিবার ভোরবেলা বাড়িওয়ালা দরজায় ধাক্কা মেরে জানতে চাইলেন, কুন্তলা, আওয়াজটা শুনেছ?

আওয়াজটা আমরাও পাচ্ছিলাম বেশ কয়েকদিন ধরে। ক্যাঁচ ক্যাঁচ ক্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁচ ক্যাঁচ। রীতিমত জোর। আমাদের ফ্যান্সি ল্যাপটপের সাউন্ডসিস্টেম তার কাছে ফেল পড়ে যাচ্ছে। হাউন্ডের ডাক কানে পৌঁছচ্ছে না। স্পিকার লাগাতে হয়েছে। আমি, হ্যাঁ শুনেছি তো, বলতে ভদ্রমহিলা বললেন, আমি তো শব্দের খোঁজে একতলা তিনতলা বাগান বারান্দা সব ঘুরে এলাম, তারপর বুঝলাম, এই, এইখান থেকেই শব্দটা আসছে। তাই ভাবলাম তোমাদের জিজ্ঞাসা করি।

আমি বললাম, ভালোই করেছেন। আওয়াজটা আসছে এইখান থেকেই, বলে আঙুল দিয়ে আমাদের ফ্যানের দিকে দেখিয়ে দিলাম।

গত বছরেই শুরু হয়েছিল। গরমের শেষের দিকে। মেকানিক ডাকছি ডাকব করতে করতেই দিল্লির বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে এল। আমরাও, বাঁচা গেছে, একটা কাজ এড়ানো গেল বলে মহানন্দে টিভি খুলে বসলাম।

আওয়াজের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। মনে পড়ল আবার এই ক’দিন আগে। যখন সুইচটা দিলাম আর বিকট আর্তনাদ করে ফ্যান অত্যন্ত অনিচ্ছাসহকারে দুলে উঠল। সেই থেকে এইরকমই চলছে। আমরা রোজই একবার করে আলোচনা করছি, এইবার খবর দিতেই হবে।

বাড়িওয়ালা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এই নিয়ে রোজ রাতে ঘুমোচ্ছো? আমি হেসে বললাম, সবই তো অভ্যেস। যেটা বললাম না সেটা হচ্ছে আমরা রোজ হাউন্ডের হুংকার শুনতে শুনতে ঘুমোই, এই বুড়োহাবড়া ঊষা কোম্পানির ফ্যানের আর্তনাদ তার কাছে তুশ্চু।

দেমাক দেখালাম, আর অমনি কোপ পড়ল। এটা আমি আগেও দেখেছি। কত লোক কতকিছু করে পার পেয়ে যায়, অথচ আমার সব পাপের শাস্তি নগদ, হাতে গরম। বাড়িওয়ালা পেছন ফিরলেন, আর শেষবারের মতো একটা কলজে মোচড়ানো আর্তনাদ ছেড়ে আমাদের ফ্যান থেমে গেল।

আর আমাদের যা গরম লাগল, সে যদি ভাষায় বোঝাতে পারতাম। মাথা ঘুরে উঠল, কপালে অদৃশ্য স্বেদবিন্দুরা ভিড় করে এল, মনে হল ফ্যান ছাড়া আর বাঁচব না। 


আপাতত ভরদ্বাজজী এসে ফ্যান খুলে নিয়ে গেছেন, খবর পেয়েছি তার বল বেয়ারিং, কয়েল আরও কী কী সব যেন খারাপ হয়ে গেছে। সে সব বদল হয়ে আজ দুপুরে সে যখন ফিরবে, তখন নাকি আমরা তাকে আমাদের ফ্যান বলে চিনতেই পারব না। বিলকুল নয়া জ্যায়সা।

*****

ফ্যান যাওয়ার দুঃখ তো ছিলই, তার ওপর দিল্লি বইমেলা শেষ হয়ে যাওয়ার তাড়াও ছিল। কাজেই বিকেলবেলা আমরা ওলা ডেকে চলে গেলাম মন্দির মার্গ। মন্দির মার্গের কালীবাড়ি প্রাঙ্গণে বাঙালি বইমেলা চলছে পনেরো থেকে কুড়ি মার্চ পর্যন্ত। মন্দিরের গেটে রংচঙে প্যান্ডেল। ফুটপাথে সারি সারি গাড়ি। প্যান্ডেলে ঢুকেই ডানদিকে খাবারের দোকান। প্রথমে সেখানেই গেলাম। অর্চিষ্মানকে বললাম, আর যদি কোনওদিন কলকাতা বইমেলায় বইয়ের স্টলের সঙ্গে বেনফিশের স্টলের ভিড় তুল্যমূল্যতা নিয়ে উইটি মন্তব্য করি, আজকের কথাটা মনে করিও।  দোকানে চপ, ঘুগনি আরও যা যা ভালো ভালো খাবার এখন আমাদের খাওয়ার উপায় নেই, থরে থরে সাজানো। যারা ভিড় করে সেসব খাচ্ছিলেন তাঁদের প্লেটে ভয়ানক রকম লোভ দিয়ে আমরা দুজনে দুখানা চায়ের কাপ নিয়ে সাইড ঘেঁষে দাঁড়ালাম।  সারি দিয়ে নির্মল বুক এজেন্সি, অক্ষর পাবলিকেশন, আনন্দ, দে’জ,  সৃষ্টিসুখ, অভিযান। মাঝখানের সরু গলি দিয়ে বই কিনিয়ে আর দেখিয়ের দল মৃদুমন্দ পায়ে ঘোরাঘুরি করছেন। সন্ধ্যে নামছে, ভিড় বাড়ছে অল্প অল্প করে। ভিড়ের মধ্যে সবথেকে চোখ টানছে ছোট বাচ্চারা, শুধু বই কিনে যাদের শান্তি নেই, বইয়ের প্যাকেটটাও তারাই বইবে। বাবামার হাতে থাকলে চলবে না।

এমন সময় শোঁ শোঁ শব্দে, শুকনো পাতা আর ধুলো উড়িয়ে ঝড় উঠল। সঙ্গে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। প্যান্ডেলের ভেতর একটা দমবন্ধ ভাব ছিল, নিমেষে সেটা কেটে গিয়ে চারদিক ফুরফুরে হয়ে উঠল।

আমরা প্রধানত দেখলাম, কিনলাম মোটে একটা বই। মঞ্চে সত্তরের দশকে দিল্লির বাঙালিদের সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, খানিকক্ষণ বসে বসে সেসব শুনলাম। তারপর চা হজম হয়ে পেট যখন, খাবার চাই খাবার দাও, বলে ঝামেলা করতে লাগল, তখন আবার ওলা ধরে বাড়ি। 


যে বইটা কিনেছি সেটা হল শঙ্খ ঘোষের 'বইয়ের ঘর’। লেখকের বই পড়ার অভিজ্ঞতার গল্প নিয়ে লেখা। কাল রাতে শুয়ে শুয়ে পড়ছিলাম। ক্রমে সুন্দরকাকার কথা এল। সুন্দরকাকা একসময় বই বিক্রি করতেন, ট্রাংকের ভেতর তাঁর বিক্রির বই থাকত, ভাইপোভাইঝিরা যখনতখন বার করে পড়ত। ট্রাংকের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে টেক্সট বই বেরোত। একজন ভাইপো একদিন সেরকমই একখানা বই বার করে জোরে জোরে পড়তে লাগল, “এফ আর ও জি ফ্রগ, ফ্রগ মানে ব্যাঙ, যা আমারে বড়োমামায় কয়।”

*****

আগে শনিরবি পোস্টে ভালো ভালো দোকানের ভালো ভালো খাওয়ার ছবি থাকত। এখন দোকান নেই। তাই বাড়ির ছবিই ভরসা। আজকের দ্বিপ্রাহরিক মেনু কিমা পাস্তা। এত ভালো হয়েছিল যে বানানোর পর আর ছবি তোলার জন্য অপেক্ষা করা যায়নি। কাজেই আগে যা তোলা হয়েছে সেই দিয়েই কাজ চালালাম। 



March 19, 2016

সাপ্তাহিকী








The effect, or lack of it, that you have on the opposite sex is important because it tells you whether or not you are in touch with the spirit of the times, of which the opposite sex is invariably the custodian.
                                                          ---J. G. Farrell, The Siege of Krishnapur


A man may take to drink because he feels himself to be a failure, and then fail all the more completely because he drinks. It is rather the same thing that is happening to the English language. It becomes ugly and inaccurate because our thoughts are foolish, but the slovenliness of our language makes it easier for us to have foolish thoughts. 
বাংলা সম্পর্কেও এ কথা বলা চলে কি? জর্জ অরওয়েল-এর এই লেখাটা পড়তে পড়তে ভাবুন।

আপনার বিশ্বাস কী বলে? বুদ্ধি ব্যাপারটা জন্মগত, নাকি সেটাকে চেষ্টা করে বাড়ানো সম্ভব? জানতে চাইছি এই কারণে যে বিশ্বাসভেদে আপনার অংক পরীক্ষার নম্বরের হেরফের হতে পারে। অন্তত এঁরা তেমনই দাবি করছেন।



ডিসলেক্সিয়া যেমন দেখতে।

ইস, সব মোহাঞ্জন এভাবে মুছে দিতে আছে?

পৃথিবীতে যদি মোটে একশোটা লোক থাকত।

ডেনমার্ক তার প্রয়োজনের একশো চল্লিশ শতাংশ বিদ্যুৎ বাতাসের শক্তি দিয়ে উৎপাদন করে ফেলেছে।

এই ফেসবুকটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। অ্যাকাউন্ট খোলা যেত, কিন্তু এরা বলছে আমার বয়সটা একটু বেশি হয়ে গেছে।


While it’s tough to prove, it’s believed that during the Victorian and Edwardian eras, smiling was looked down upon and considered to be something reserved for “idiots.”

March 18, 2016

বৈচিত্র্য বনাম বোরডম



সম্পর্ক তরতাজা রাখার প্রথম দশ, প্রথম সাত, প্রথম তিন তালিকাতেও এই টিপটা থাকে। একে অপরকে চমকে দেওয়ার টিপ ব্যভিচারেও নাকি বিয়ে ভেঙে দেওয়ার ততখানি জোর থাকে না, যতখানি থাকে বোরডমে। কিছুতেই যাতে সম্পর্কে বোরডম সেট না করে সে বিষয়ে সর্বদা তক্কে তক্কে থাকুন, আজ সকালে উঠে রোম্যান্টিকপ্রবর হোন, আগামীকাল সন্ধ্যেয় পার্টিপ্রেমিক, পরশু দুপুরে ভাবুক এবং কবিতাপাঠক, তরশু সকালে সেনসিটিভ এবং কেয়ারিং আর দোহাই আপনার, যাই হোন না কেন, সেন্স অফ হিউমারটা কনস্ট্যান্ট রাখুন, ওটা বাড়ন্ত হলেই বিপদ একদিন মিনিস্কার্ট পরুন, একদিন কপালে টি দিয়ে ধ্রুপদী সাজুন, ভাতের পাতে একদিন চিংড়ি রাখুন তো একদিন চিলিচিকেন। পারিবারিক পত্রিকা হলে এখানেই ক্ষান্ত দেয়, প্রগতিশীল হলে দাম্পত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্যের পরামর্শ দিতে আগে বাঢ়ে

আমি অবশ্য এই টিপ কাজে লাগানোর পক্ষপাতী নই। এক তো কুঁড়েমির ব্যাপার আছে। প্রতিদিন নিজের নতুন নতুন চেহারা বার করা অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজদু’নম্বর আপত্তিটা আসে বিশ্বাসের জায়গা থেকে। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের থেকে বোরডম অনেক বেশি জরুরি। আমার মতে সম্পর্ক সফল রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে একে অপরকে নিজেদের যে চেহারা দিয়ে ইমপ্রেস করেছিলাম, সেই চেহারাতেই এ জীবনের মতো থিতু হওয়া। আমি অর্চিষ্মানের সঙ্গে আর অর্চিষ্মান আমার সঙ্গে প্রথম দেখা করতে গিয়েছিলাম রোজকার জিনস আর রোজকার টি শার্ট পরে। এখন হঠা একজন আদিবাসী জুয়েলারি পরতে শুরু করলে কিংবা ঘাড়ে ট্যাটু আঁকলে, অন্যজন ভয় পেয়ে যাবে। সম্পর্কের শুরুতে লীলা মজুমদার আর পাগলা দাশুর মিল আবিষ্কার করে আমরা পাগলের মতো খুশি হয়েছিলাম, এখন একজন লাইব্রেরি থেকে ক্রমাগত বার্থেজ আর কোয়েলহো তুলতে শুরু করলে অন্যজনের মহা বিপদ।

রোম্যান্টিক সম্পর্ক বাদ দিয়ে অন্য সম্পর্কের উপমা দিলে ব্যাপারটা আরও সহজে বোঝা যাবে। আমার মা যদি হঠা এখন আমাকে বকাঝকা বন্ধ করে দেন, কিংবা আমিও কথায় কথায় মায়ের মুখে মুখে “বেশ করেছি” ইত্যাদি চোপা করতে শুরু করি তাহলে বৈচিত্র্য আসবে ঠিকই, কিন্তু সম্পর্কটা মাঠে মারা যাবে। কাজেই যে যেমন ছিল, তেমন থাকাটাই সম্পর্কের স্বাস্থ্যের পক্ষে সবথেকে ভালো সারপ্রাইজ ব্যাপারটা জন্মদিন আর বার্ষিকীর সন্ধ্যেবেলার জন্যই তোলা থাক।

অন্তত এতদিন আমি সেইরকমই ভাবতাম। খুব সম্প্রতি এই বিশ্বাস টলে যাওয়ার মতো একটা ঘটনা ঘটল। দিনটা ঠিক মনে নেই, গত সপ্তাহের গোড়ার দিকেই হবে, তবে ক্ষণটা আছে। চোখ খুলে দেখলাম পাশে অর্চিষ্মান অঘোরে ঘুমোচ্ছে, অন্ধকার ঘরে ল্যাপটপের নীল আলো, সেদিক থেকেই মৃদু পুরুষকণ্ঠে কথোপকথন ভেসে আসছে। ভয় পেলাম না। গলার মালিকদের আমি চিনি। ডার্টমুরের রুক্ষ প্রান্তরে প্রস্তরযুগের মানুষদের বানানো গুহার সামনে দেখা হয়ে গেছে শার্লক হোমস আর ওয়াটসনের। তাঁরা কথাবার্তা বলছেন।

অর্থা, মাঝরাত। কিন্তু আমার ঘুমটা ভাঙল কীসে? ঠিক সেই মুহূর্তে হোমস আর ওয়াটসনের গলা ছাপিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে বাস্কারভিলের হাউন্ডের গগনবিদারী আর্তনাদ ভেসে এল ওতেই কি? উঁহু। হাউন্ডের চিকার যতই গায়ে কাঁটা দেওয়া হোক, ঘুম ভাঙায় নাউল্টে ঘুম পাড়ায় তাই আমরা রোজ ওটা চালিয়ে ঘুমোতে যাই। শুয়ে শুয়ে বিরক্ত মনে ঘুম ভাঙার কারণ আবিষ্কার করার চেষ্টা করছি এমন সময় অন্য একটা আওয়াজ কানে এল। গুড়গুড় গুড়গুড় ওহ্‌। এই ব্যাপার। শব্দের আর আমার ঘুম ভাঙার কারণটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল আর বিরক্তিটাও ঝড়াক করে বেড়ে গেল।

এ তল্লাটে একটি বাইকার বাহিনী আছে। তাদের আমি চোখে দেখিনি, শুধু কানে শুনেছি। আমাদের বাড়ির পেছনের রাস্তায় গভীর রাতে সাইলেন্সারহীন বাইক চালিয়ে তারা ঘোরাঘুরি করে। পাশ ফিরে আবার ঘুমোনোর উপক্রম করছি, এমন সময় শব্দটা আবার হল। গুড়গুড় গুড়গুড়।

আর আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। বাইক নয়! মেঘ! মেঘ ডাকছে। এবং ল্যাপটপে নয়। পাঠকের গায়ে কাঁটা দেওয়ানোর জন্য ডার্টমুরের চোরাবালিময় প্রান্তর, জেলপালানো আসামি আর রাক্ষুসে হাউন্ডটাউন্ড নিয়ে একটা ভয়ানক ছবি এঁকেছেন বটে আর্থার কোনান ডয়েল, কিন্তু তাতে মেঘের ডাক জোড়েননি। কাজেই আওয়াজটা আসছে অন্য জায়গা থেকে। আর সেটা একটি জায়গাই হওয়া সম্ভব।

আমার ডানপাশে জানালা, জানালার বাইরে সজনে ডাঁটার ডালপালামেলা গাছ, গাছের ওপারে সরু গলি, আর গলির মাথায় সরু একফালি আকাশআওয়াজটা আসছে সেই আকাশ থেকে।

ঠিক তার দু’দিন আগেই কথা হচ্ছিল। জন্ডিসের পাল্লায় পড়ে আমাদের কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি গত দু’মাসে, আগামী দু’মাসেও হবে বলে মনে হয় না। এদিকে শীত চলে গেল, গরম আসছে। এই সময় দিল্লিতে ছুটিহীন বন্দী হয়ে থাকাটা যে কী ভয়ানক হতে চলেছে, অফিস যেতে যেতে সেই নিয়ে হাহুতাশ চলছিল। তাও যদি শহরটায় একটা বর্ষাকাল থাকত। জুনজুলাই মাসে যখন বাড়িতে ফোন করলে মায়ের গলা ছাপিয়ে পেছনের মাঠের বলশালী ব্যাঙেদের গলা শুনতে পাব, তখন আমাদের দশ মিনিট টানা জলের ছিটে পড়বে কি না সন্দেহ। ধুস্‌, চল অন্য কোথাও চলে যাই।

আমি দমবন্ধ করে শুয়ে রইলাম। এই বুঝি গুড়গুড়ানি থেমে যায়। কিন্তু থামল না। বরং একটু পর আরেকটা শব্দ যোগ হল তাতে, টুপটাপ টুপটাপ। জলের ফোঁটা নামছে আকাশ থেকে। সজনে পাতার ওপর, কংক্রিটের ওপর, মাটির ওপর। একেক স্কেলে, একেক লয়ে।

ঘুম থেকে উঠে দেখলাম চারদিক ভেজা। অপদার্থ মিস্তিরির হাতে বানানো অসমান বারান্দার এখানেওখানে ছোট ছোট লিলিপুট ডোবা। সেদিন সারাদিন টুপটাপ চলল। মাঝে মাঝে রোদ্দুর উঠল, কিন্তু সে একেবারে আগমার্কা বর্ষার রোদ। ভেজা এবং লাজুক।

শুধু যে সেদিন চলল তেমন নয়। সেই থেকে চলছে। বৃষ্টি আর হয়নি বটে, কিন্তু গ্রিলের বাইরে মেঘলা আকাশ নিয়ে ঘুম থেকে উঠছি। রোজই ঠাণ্ডা জল গায়ে ঢালা মাত্র শরীরের সব রোম খাড়া হয়ে উঠছে, রোজই রাতে ফ্যান চালালে গায়ের ওপর একটা পাতলা চাদর থাকলে আরাম লাগছে।

দিল্লির সঙ্গে আমার গত সম্পর্ক প্রায় চোদ্দ বছরের হতে চলল। এই চোদ্দ বছরে মার্চ মাসে শহরটাকে কোনওদিন এই চেহারায় দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। দিল্লি আমাকে চমকে দিয়েছে। অথচ চমকে গিয়ে আমি ভয় পাইনি একটুও, বরং মনের ভেতর বেশ ভালোলাগা টের পাচ্ছি। বাড়ির বারান্দা থেকে, অটোর ফোকর গলে, অফিসের জানালা দিয়ে নতুন চোখে শহরটাকে দেখছি। আর ভাবছি একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে দোকান থেকে টেম্পোরারি ট্যাটু কিনে এনে অর্চিষ্মানের মিহি বাইসেপে সেঁটে দেখব, কেমন লাগে।


March 16, 2016

বাঙাল বাড়ির আলুপোস্ত



মাঝে মাঝে নাকতলার মায়ের সঙ্গে রান্নাবান্না নিয়ে কথাবার্তা হয়। রেসিপি চালাচালি। চালাচালি মানে শুধুই চলা, একদিক থেকে অন্যদিকে। মা বলেন, আমি দ্রুত মগজে টুকে নিই। মায়েদের রেসিপি যেমন হয়, সোজা এবং অব্যর্থ। তাছাড়া অফিস যাওয়া মায়েদের রেসিপির যে সুবিধটা বাড়তি সেটা তো আছেই। সকালবেলা রেঁধেবেড়েখেয়ে টাইমে অফিস বেরোনো যায়, আর অফিস থেকে ফিরে রেঁধেবেড়েখাওয়ার শক্তি থাকে। নাকতলার মায়ের থেকে শেখা একটা থ্রি-ইনগ্রেডিয়েন্টস্‌ (নুন গুনলে ফোর) মুরগির রেসিপি শিখেছি, তাছাড়াও এবার বাড়ি গিয়ে একটা অসামান্য টমেটোর সুরুয়া খেয়ে এসেছি, সেগুলো অবান্তরে ছাপানোর ইচ্ছে আছে।)

ক্কচিৎ কদাচিৎ হাততালি পাওয়ার লোভে আমি মাকে আমার রান্নার গল্প শোনাই। কোনও একটা রান্না আমি কীভাবে করলাম, সেসব ফলাও করে বলি। সেদিন যেমন চিঁড়ের পোলাও খেতে খেতে রন্ধনপ্রণালী আলোচনা হচ্ছিল। “তারপর ওই আগে ভেজে রাখা বাদামগুলো আর ধনেপাতাকুচি দিয়ে নামিয়ে নিলাম, ব্যস হয়ে গেল” বলে যেই না শেষ করেছি, মা দু’সেকেন্ড কীসের জন্য যেন অপেক্ষা করে থাকলেন, তারপর বললেন, “আর চিনি? চিনি দিলে না?”

নাম যখন পোলাও যখন তখন সেটাতে চিনি দেওয়াই উচিত, কিন্তু আমি দিই না। কারণ আমার বাড়ির চিঁড়ের পোলাওয়ে কখনও চিনি দেওয়া হয় না। অর্চিষ্মান আজীবন মিষ্টি চিঁড়ের পোলাও খেয়ে বড় হয়েছে, ওর নিশ্চয় আমার রাঁধা চিঁড়ের পোলাও খেতে অখাদ্য লাগে, কিন্তু ভদ্রতা করে মুখ বুজে খেয়ে নেয়। আমিও ওর ভদ্রতার সুযোগ নিয়ে বাড়িতে চিনিহীন চিঁড়ের পোলাওয়ের প্রবর্তন করেছি। আমার নিজের অংশটুকু তুলে রেখে অর্চিষ্মানের অংশটুকুতে চিনি মিশিয়ে দিলেই হয়, তাও দিই না।

কেন দিই না, সেটার পেছনে হয়তো আমার অভদ্রতা বা ঠ্যাঁটামোটাই প্রধান, কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে যে অন্য একটা চোরা কারণও আছে। কারণ না বলে সেটাকে ইনস্টিংক্ট বলাই ভালো। আমার বাড়ির, আমার শৈশবের, আমার অভ্যেস, আমার ট্র্যাডিশনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার ইনস্টিংক্ট। (এমন নয় যে আমাদের বাড়িতে কেবল আমার বাড়ির ট্র্যাডিশনই চলে। অনেক কাজই নাকতলার কায়দায় হয়। কারণ আলোচনা করে আমরা দেখেছি যে সেই কাজের পক্ষে ওই কায়দাটা বেটার। কিন্তু রান্নাটা যেহেতু শুধুই আমি করি, তাই রান্নাঘরে যখন দু’রকম ট্র্যাডিশনের বিবাদ বাধে, তখন আমার ট্র্যাডিশনটা চালিয়ে দেওয়ার একটা অবভিয়াস সুযোগ/ অধিকার আমার আছে। আর নিখুঁত সৌজন্যবোধসম্পন্ন সঙ্গীর সঙ্গে থাকার সুবিধে তো আছেই।)

খুব গোদাভাবে দেখতে গেলে বাঙালি খাওয়াদাওয়ার দুটো গোদা ট্র্যাডিশন। ঘটি ট্র্যাডিশন, বাঙাল ট্র্যাডিশন। তবে এর ভেতরেও অনেক ঘোরপ্যাঁচ থাকতে পারে। নাকতলার বাড়িতে যেমন। নাকতলার মা খাঁটি বাঙাল বাড়ির মেয়ে, নাকতলার বাবা খাঁটি ঘটি। সাতপুরুষ ধরে সাকিন বাগবাজারকিন্তু বাবার বাবা জীবনের বেশিরভাগ সময় চাকরিসূত্রে বাংলার বাইরে কাটিয়েছিলেন এবং বোধহয় সেই কারণেই আমার দিদিশাশুড়ির রান্নায় নাকি ঘটি ছোঁয়া প্রায় ছিলই না। এদিকে আজীবন ঘটি প্রতিবেশীদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করার ফলেই বোধহয় মায়ের বাপের বাড়িতে রান্নায় ঘটিদের মতো মিষ্টি দেওয়ার চল আছে। কাজেই ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল যে শাশুড়ি ঘটি হয়েও রান্নায় মোটেই মিষ্টি দিতেন না, আর মা ঘোর বাঙাল হয়েও রান্নায় মিষ্টি ছাড়া খেতে পারতেন না। মা বলেছেন, শ্বশুরবাড়িতে প্রথমপ্রথম এসে মিষ্টিহীন রান্না খেতে তাঁর বেশ অসুবিধে হত। তাঁর শাশুড়িমা তখন মায়ের জন্য সেটাই করতেন যেটা আমি অর্চিষ্মানের জন্য করি না, অর্থা কি না নিজেদের রান্না নামিয়ে রেখে পুত্রবধূর জন্য আলাদা করে চিনি মিশিয়ে দিতেন। খেতে বসে কুচকুচ করে চিনি মুখে পড়ত। সেটাও বেশ অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।

তবে শ্বশুরবাড়ির খাবার অদ্ভুত লাগার ব্যাপারটা যে খালি ঘটি বাঙালের সংঘাত হলেই হবে, তেমন নয়। আমার বাড়িতে যেমন এ সমস্যা নেই, আমার বাবা মা দুজনের পূর্বপুরুষই পদ্মাপারের লোক। মামাবাড়ি ঢাকা, বাবার বাড়ি বরিশাল। তবু দু’তরফের রান্নাতে বিস্তর তফা। তফাতের একটা কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। বরিশালের লোকেরা নদী আর নারকেল গাছের রাজত্বে বাস করে। তাই তারা যাতে পায় তাতেই নারকেলকোরা আর শুঁটকি মাছ দেয়। প্রথমবার বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি এসে মা এ সত্য টের পেয়েছিলেন। পাইকপাড়া থেকে রিষড়া অনেকখানি রাস্তা, তাছাড়া বেরোনোর আগে কান্নাকাটি করে মায়ের বেজায় খিদে পেয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি আশীর্বাদের পিঁড়িতে বসে সাত সাতটা রসগোল্লা খেয়ে ফেলেছিলেন। মা অবশ্য এখন দাবি করেন যে খিদেতে নয়, তিনি সাতটা রসগোল্লা খেয়েছিলেন ভদ্রতা করে। আমি ভাবছি আশীর্বাদ করে সবাই একখানা করে রসগোল্লা মুখের কাছে ধরছে, না বললে বোধহয় খারাপ দেখাবে, তাই আমি মুখ বুজে খেয়ে নিচ্ছি। লজ্জা করে যে না বলতে হবে সে কী করে জানব। সে যাই হোক, আমার ঠাকুমা ভয়ানক মিষ্টি খেতে ভালোবাসতেন, পুত্রবধূর রসগোল্লা খাওয়ার ক্ষমতা দেখে তিনি ইমপ্রেসড হলেন। যাক, এতদিনে মিষ্টি খাওয়ার একটা সঙ্গী পাওয়া গেল। সবার আশীর্বাদ হতে আমার ঠাকুমার পালা এল। জেঠিটেঠিরা সব শাঁখ বাগিয়ে ধরলেন, সন্ধ্যের সবথেকে ক্রুশিয়াল আশীর্বাদ হতে চলেছে। সবাই রসগোল্লা নিয়ে এসেছিল, ঠাকুমা এলেন পায়েসের বাটি হাতে নিয়ে। চামচে করে পুত্রবধূর মুখে পায়েস তুলে দিলেন। সারারাত নিভু আঁচে জ্বাল দিয়ে ঘন করা দুধে অল্প সুগন্ধী চাল আর বেশি করে নারকেল কোরা গিজগিজ করছে। পায়েস মুখে দিয়ে মায়ের চোখে নতুন করে জল এসে গেলসবাই ভাবল আহারে, মা মরা মেয়ে নতুন করে মা পেয়ে অভিভূত হয়ে পড়েছে। আসল কারণটা শুধু মা জানলেন (আর অনেকবছর পরে জানলাম আমি)। মায়ের চোখে জলটা এসেছিল মরা মায়ের নয়, মরা মায়ের হাতের পায়েসের কথা মনে করে।

পিঠেপায়েসটা যে ঢাকার লোকে বানাতে জানে এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। ঢাকার লোকে অবশ্য দাবি করে পিঠেপায়েস চচ্চড়ি চাটনি সবই তারা অন্যদের থেকে ভালো বানাতে জানে। দাবিটায় সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে। আমার মেজমামি ছিলেন ঢাকার মেয়ে। মামির হাতের পাটিসাপটার মতো স্বর্গীয় জিনিস আমি আর খাইনি। মামির হাতের হিংবেগুনের মতো স্বর্গীয় জিনিসও খাইনি। মামির হাতের রুই মাছের ঝোল, পালং শাকের ঘন্ট, শুক্তোর মতোও না। ঢাকার মেজমামির সঙ্গে ফাইট দিলেও দিতে পারেন একমাত্র আমার ফরিদপুরের জেঠি। তবে গোটা ফরিদপুরের লোক ওইরকম রাঁধতে পারে নাকি আমার জেঠির মতো কিছু ক্ষণজন্মা প্রতিভারাই পারেন, সেটা আমি জানি না।

আমাদের বাড়ির রান্নায় অবশ্য এখন আলাদা করে ঢাকা বা বরিশাল কোনও ছোঁয়া আলাদা করে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।  আমার ধারণা দুটো মিলেমিশে গেছেতার একটা কারণ হচ্ছে মা যতদিন দিদিমার ছত্রছায়ায় ছিলেন ততদিন কিছুই রান্না করেননি, পুরোটাই করেছেন শ্বশুরবাড়িতে এসে। ঠাকুমাও যে মাকে খুব করে বরিশালের রান্নায় দীক্ষিত করতে পেরেছেন তেমন নয়। কারণ আমার ঠাকুমা রান্নাবান্না ব্যাপারটা খুব পছন্দ করতেন না। কিন্তু ঠাকুমা যে আমলে যে বাড়ির বউ ছিলেন, তাঁদের কাছে “আমার রান্না করতে জঘন্য লাগে” মুখ ফুটে বললে সবাই ওঝা ডাকতে ছুটত। একটা অবিশ্বাস্য দীর্ঘ সময় ধরে, শাশুড়ি ননদ স্বামী এবং পাঁচসন্তানের সংসারে তাঁকে তাঁর বিশ্রী লাগা কাজটা করে যেতে হয়েছে। মা এসে রান্নাঘরের দায়িত্ব নেওয়ার পর ঠাকুমা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। মা নিজের মতো করে রান্না করতেন, ভয়ে ভয়ে থাকতেন অনভ্যস্ত হাতের রান্না খাওয়ার মতো হচ্ছে কি না, কিন্তু সব রান্না মুখে দিয়েই ঠাকুমা সোসাহে বলতেন, দারুণ হয়েছে। দুর্দান্ত হয়েছে। ঠাকুমার উসাহ দেখে বাকিরাও কোনওদিন কিছু বলেনি। এখন আমার মা জ্যামিতিবইয়ের বৃত্তের মতো গোল রুটি বেলতে পারেন, কিন্তু শুরুতে সবক’টাই অস্ট্রেলিয়ার ম্যাপ হয়ে যেত। ঠাকুমার কাছে সেই নিয়ে লজ্জাপ্রকাশ করায় তিনি বলেছিলেন, “আমরা অস্ট্রেলিয়ার ম্যাপের মতো রুটি খেতেই ভালোবাসি। গোল রুটি তো সবাই খায়।”

তবে আমার বিশ্বাস মা একেবারে আনাড়ির মতো রাঁধতেন না। কারণ রেসিপি খুব অদ্ভুত জিনিস। ও জিনিস বইতে থাকে না। থাকে হাতের আঙুলে, জিভের স্মৃতিতে, দৃষ্টিতে, গোটা শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মা কখনও নিজে রান্না করেননি, কিন্তু রান্নাঘরে দিদিমার কাছে বসে স্লেটপেনসিলে অংক তো কষেছেন? জ্বর গায়ে স্কুল কামাই করে পিঁড়িতে বসে দুধমুড়ি তো খেয়েছেন? খেতে খেতে কখন দুধের বাটিটা হয়ে গেছে আর্কটিক মহাসাগর, মুড়িগুলো তিমি মাছ, আর চামচটা ঠিক যেন হারপুন। একচোখে কালো ফেট্টি বাঁধা মা বীরবিক্রমে তিমি শিকার করে বেড়াচ্ছেন, দু’হাত দূরে একজন যে তেল গরম করে জিরে তেজপাতা ফোড়ন দিচ্ছে, মাছ কেটে নুনহলুদ মাখাচ্ছে, সেসব ধুয়েমুছে সাফ। কিন্তু মায়ের মগজ ওই বয়সেই মারকাটারি মাল্টিটাস্কার, সে আড়চোখে সব দেখে নিচ্ছে, টুকে রাখছে। দিদিমা পাঁচআঙুল জড়ো করে জিরে তুললেন, তারপর তিন আঙুলে নুন। বহুবছর পর যখন মা উনুনের সামনে দাঁড়াবেন, কোথায় ভাইকিং, কোথায় তিমি, কোথায় হারপুন, কোথায় দিদিমা? এই সারি সারি ধনে জিরে লংকা হলুদের অকূল পাথার কে তাঁকে পার করাবে? মায়ের মন বলবে, আর রক্ষা নেই, মগজ বলবে, ঘাবড়িও না, আমার কাছে রেসিপি আছে। আমি জানি কোনটা দিয়ে কী করতে হয়। এই বলে ওই ধুদ্ধুড়ে আউট অফ ফোকাস ছবিখানা স্মৃতির খাঁজ থেকে বার করে হাতের তেলো বুলিয়ে যথাসম্ভব টান করে মায়ের হাতে ধরিয়ে দেবে আর মায়ের অনভ্যস্ত হাতের পাঁচ আঙুল জড়ো হয়ে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে যাবে জিরের কৌটোর দিকে।

আমার অবশ্য মা আছেন। তার থেকেও বড় কথা ইন্টারনেট আছে। আলুপোস্ত খাওয়ার ইচ্ছে হলে গুগলে আলুর পর পি টাইপ করতে না করতে সাড়ে তিন লাখ আলুপোস্তর রেসিপি বেরিয়ে পড়বে। হলুদ দেওয়া এবং না দেওয়া, পেঁয়াজ দেওয়া এবং না দেওয়া, জিরে ফোড়ন দেওয়া এবং না দেওয়া, তেল দেওয়া এবং না দেওয়া। মাইক্রোওয়েভে রাঁধা, স্লোকুকারে রাঁধা, গ্যাসে রাঁধা, ওভেনে রাঁধা। অবিশ্বাস্য রেঞ্জ। কিন্তু আরও অবিশ্বাস্য ব্যাপার হচ্ছে এই সাড়ে তিন লাখ কায়দার মধ্যে একটিও আমার বাড়ির মতো না। আমার ছোটবেলায় টিভি দেখতে দেখতে রুটি দিয়ে খাওয়া আলুপোস্তর মতো না। নামিদামি শেফেরা তাঁদের আজীবনের অভিজ্ঞতা খরচ করে আলুপোস্ত রেঁধেছেন, ক্রমাগত ট্রায়াল অ্যান্ড এররের মাধ্যমে রেসিপিকে খুঁতহীন করেছেন, তবু আমার মাজেঠিমার হাতের মতো করতে পারেননি। অদ্ভুত।

কাজেই এই আমাদের বাড়ির আলুপোস্তর রেসিপি ইন্টারনেটের ব্যাংকে জমা রইল। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, এভাবেই পোস্ত রাঁধব। আমার বাড়ির ট্র্যাডিশন আমি না রাখলে কে রাখবে?


আমাদের বাড়ির মতো আলুপোস্ত রাঁধতে গেলে . . .  

কী লাগবেঃ
চারটে বড় আলু খোসা ছাড়িয়ে টুকরো করে কাটা
পোস্ত দুই বড় চামচ, নুন কাঁচালংকা দিয়ে বাটা* (মা বলেন, খুব মিহি করে না বাটতে,  পোস্ত একটু “গোড়া গোড়া” রাখতে)
নুন ও সর্ষের তেল, প্রয়োজনমতো

কী করে করবেন
জলে নুন দিয়ে আলু সেদ্ধ করতে বসান। এমন পাত্রেই বসান যেখানে গোটা রান্নাটা করতে পারবেন।  আলু পুরো সেদ্ধ হওয়ার পর বাড়তি জলটুকু ফেলে দিন (বা একটা পাত্রে রাখুন, পরে দরকার হলে অল্প দেবেন)। পোস্তবাটাটা আলুগুলোর মধ্যে দিয়ে নাড়ুনচাড়ুন। যদি দেখেন খুব শুকনো লাগছে, পাশে রাখা জলটা অল্প অল্প দিন, যতক্ষণ না ঝোলের ঘনত্ব আপনার মনমতো হচ্ছে। নুনঝাল চাখুন। গ্যাস বন্ধ করুন। ওপর থেকে সর্ষের তেল চামচে করে ছড়িয়ে দিন।

গরম রুটি দিয়ে টিভি দেখতে দেখতে খান।

*আমার শিলনোড়া নেই, মিক্সিও না। ছাত্রজীবনের স্মৃতি হিসেবে একখানা কফিগ্রাইন্ডার আছে। আমি পোস্তটা কোর্স সেটিং-এ দিয়ে গুঁড়ো করে নিয়ে, তারপর জল মেশাই, তারপর কাঁচালংকা ঘষে মিশিয়ে দিই।


এই অবস্থায় খেতে তো অমৃতের মতো লাগেই, কিন্তু এর পরিপূর্ণ মহিমা টের পেতে হলে পরদিন সকালে জ্বাল দিয়ে ঝোল সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিয়ে মুড়ি দিয়ে খেয়ে দেখতে হবে। ভাবুন একবার, মুড়িপোস্ত! বাঙাল বাড়িতে?! আগেই বলেছিলাম, ট্র্যাডিশন খুব অদ্ভুত জিনিস।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.