May 31, 2016

চায়োস




রাস্তার ধারের চায়ের দোকানেও চা পাওয়া যায়, চায়োস-এও চা পাওয়া যায়। তাহলে দুটোর মধ্যে তফাৎ কী?
  
১। মালিকের যোগ্যতা। চায়োস-এর মালিকেরা আই আই টি পাশ। বম্বে আই আই টি-র নীতিন সালুজা আর দিল্লি আই আই টি-র রাঘব ভার্মার সৃষ্টি চায়োস। 

২। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বসার জায়গা।

৩। চায়ের বৈচিত্র্য। চায়োস-এর ইউ এস পি হচ্ছে ‘মেরি ওয়ালি চায়’। দুধ (পানি কম, দুধ কম, রেগুলার, ফুল দুধ), চা পাতা (রেগুলার, কড়ক) এবং বিবিধ অ্যাড অন (তুলসী, আদা, মৌরি, এলাচ, গোল মরিচ, কাঁচা লংকা ইত্যাদি)-এর পারমুটেশন কম্বিনেশনে বারো হাজার রকমের চা নাকি বানিয়ে দিতে পারেন চায়োস-এর চাওয়ালা, থুড়ি, শেফ-রা।

৪। সজ্জা। সাধারণ চায়ের দোকানের পাশে সাইকেল সারানোর দোকান থাকে, তাদের ছেঁড়াফাটা টায়ার, ভাঙাচোরা ধাতব কাঠামো এদিকওদিক ছত্রাকার হয়ে থাকে, চায়োস-এ সে চাকা হলুদ রং হয়ে সিলিং-এ চড়েছে। চাকার ঝাড়লন্ঠন থেকে ঝুলছে ন্যাড়া বাল্ব। আমি ঠিক জানি না, তবে একেই বোধহয় ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল’ স্টাইল ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন বলে। 

অবশ্য ঝাড়লণ্ঠনের আলো আমাদের না হলেও চলত। দোকান খোলে সকাল আটটায়, আমরা পৌঁছেছিলাম আটটা পঁয়ত্রিশ নাগাদ। আমরাই ফার্স্ট। বড় বড় জানালা দিয়ে পর্যাপ্ত আলো আসছিল, আমরা জানালার পাশের টেবিল বেছে বসলাম।

 আমাদের ভিউ

৫। টা-এর বৈচিত্র্যপূর্ণ সংগ্রহ। মুম্বাইকরের ব্রেনচাইল্ড বলেই বোধহয় মূল জোরটা বান-মাসকার ওপর, কিন্তু অন্যান্য ভ্যারাইটিও আছে। আমরা সেগুলোই চেখে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি নিলাম এগ বান, বানের ভেতর মশলাদার মেয়োতে জটাপটি ডিমসেদ্ধর টুকরো, অর্চিষ্মান নিল বান ভুজিয়া। ওরটায় মেয়োর পরিমাণ কম, আর ডিমের বদলে সেউ ভাজা। সাহেবরা অনেকসময় ‘ক্রাঞ্চ’ এলিমেন্টের জন্য স্যান্ডউইচের ভেতর পটেটো চিপস দেয়, সেরকম। আমার কুলহড় চা, দুধ এবং আদা দেওয়া, চিনি ছাড়া। অর্চিষ্মানের কাগজের কাপে দেশী চা। কড়ক। চিনি এবং আদা সহ।

অর্চিষ্মানের দ্বিতীয় টা। কিমা পাও। আমার দ্বিতীয় চা। আগের কম্বোর সঙ্গে এবার বাড়তি শুধু হরি মির্চ। ইয়েস, কাঁচা লংকা। মেনুতে দেখা ইস্তক খাওয়ার জন্য প্রাণ আনচান করছিল। নর্ম্যাল চায়ের মতোই খেতে, খালি ঢোঁক গেলার পর গলার পেছন দিকে একটা হালকা ঝাঁজ টোকা মারে। দিব্যি লাগে। ভাবছি এবার থেকে বাড়ির চায়েও কাঁচা লংকা দেব। গম্ভীর মুখে সে কথাটা ঘোষণা করার পর অর্চিষ্মান মুখটা যেরকম করল সেটার বাংলা করলে হয় “বাঁচাও”।

৫। আর অবভিয়াসলি, দাম। তবুও আমার তো মনে হল সিসিডি বারিস্তার তুলনায় চায়োস অনেক বেশি পকেট-ফ্রেন্ডলি। আমাদের সংসারের বর্তমান “খরচ কমাও, সেভিংস বাড়াও” ক্যাম্পেনের পক্ষে মানানসই। মাকে ফোন করে যখন ভালো খবরটা দিলাম, একটা সস্তা চা ক্যাফের সন্ধান পেয়েছি, চা আর টা মিলিয়ে ওনলি ফোর হান্ড্রেড রুপিস ফর টু পিপল (অ্যাপ্রক্স.), মা কয়েকসেকেন্ড চুপ করে থাকলেন, তারপর বললেন, “দিল্লিতে একটা চায়ের দোকান খুলে দে না রে সোনা, ওখানে গিয়েই থাকি তবে।”

*****

এন সি আর অঞ্চলে বসে খাওয়া আর ডেলিভারি মিলিয়ে চায়োস-এর তিরিশটিরও বেশি আউটলেট আছে। আপনার বাড়ির কাছেরটা খুঁজে বার করতে হলে এই পাতাটা দেখতে পারেন। 


May 29, 2016

কুইজঃ আমি কোথায়? (উত্তর প্রকাশিত)



বহুদিন বেড়াতে যাওয়া হয়নি বলেই বোধহয় সর্বক্ষণ বেড়াতে যাওয়ার কথা মাথায় ঘুরছে। সারাদিন বসে বসে ভাবছি কোথায় বেড়াতে যাওয়া যায়। আর নয়তো ভাবছি কোথায় কোথায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। সে সব জায়গা সম্পর্কে শোনা গল্প, ছোট ছোট ঘটনা, সব সিনেমার মতো মাথায় ঘুরছে। কখন যে কীসে যে ট্রিগার করবে বোঝা যাচ্ছে না। গত সপ্তাহে দিল্লিতে দু’দিন ঝড়বৃষ্টি হয়ে বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। ট্যাক্সিতে বসে এসি বন্ধ করতে বলে জানালা নামালেই মনে হচ্ছে পাহাড়ের পথে চলেছি, ন্যাট জিও-তে মুষকো হরিণ দেখে ভাবছি বাড়ির পাশের করবেট এখনও অধরা রয়ে গেল, গ্যাসের সামনে দাঁড়িয়ে সসপ্যানে ফুটন্ত জলে চামচ মেপে চা পাতা ঢালতে গিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছে মাজুলির চারিআলির মোড়ের বটের তলার বিজেপির পোস্টারের নিচে বসে চায়ে চুমুক দেওয়ার কথা। 

কুইজেও যে তার ছাপ পড়বে তাতে আর আশ্চর্য কী। নিচে সাতটা জায়গা/ দ্রষ্টব্যের বর্ণনা রইল। সাতখানাই পশ্চিমবঙ্গে, সাত জায়গাতেই আমি গেছি। জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করার দায়িত্ব আপনাদের। 

খেলা চলবে সামনের চব্বিশ ঘণ্টা ধরে।  উত্তর বেরোবে সোমবার সন্ধ্যে সাতটায়। ততক্ষণ আমি কমেন্ট পাহারা দেব। 

অল দ্য বেস্ট। 

*****


১। আঠেরোশো ঊনত্রিশের নয়ই অগস্ট। ভিতপূজো চলছে। কর্নেল ম্যাকলয়েডের নেমন্তন্ন পেয়ে বাংলা বিহার ওডিশার রাজা হুমায়ুন (এঁর সঙ্গে আকবরের কোনও সম্পর্ক নেই) এসেছেন ভিত্তিস্থাপন করতে। ভিত এত গভীর খোঁড়া হয়েছে যে রাজামশাইকে মই বেয়ে নামতে হল ভিতের প্রথম পাথর পুঁততে। গর্তের চারদিকে ভিড় করে এত লোক দাঁড়িয়ে ছিল, রাজামশাই গর্তের নিচে পৌঁছে, অক্সিজেনের অভাবেই হোক, কিংবা ভয়েই হোক, অজ্ঞান হয়ে গেলেন। 

আমি অবশ্য অজ্ঞান হয়ে যাইনি, কিন্তু হেঁটে হেঁটে পা ব্যথা হয়ে গিয়েছিল মনে আছে। অবশ্য তখন আমার পায়ের বয়স কম ছিল। হেঁটেই চলেছি হেঁটেই চলেছি, বাড়ি আর ফুরোয় না। আর ফুরোয় না বাড়ির দরজা। ডাইনে দরজা, বাঁয়ে দরজা, সামনে দরজা, পেছনে দরজা। বাবা আর আমি গুনতে শুরু করেছিলাম, অচিরেই ক্ষান্ত দিতে হয়েছিল। পরে জেনেছিলাম বাড়ির যত দরজা তার নব্বই শতাংশই নাকি নকল। 

২। ইংরেজ আর ফরাসিদের পাশাপাশি পর্তুগিজরাও যে একসময় পশ্চিমবঙ্গে এসে বাসা বেঁধেছিল তার অন্যতম সাক্ষ্য এই দ্রষ্টব্যটি। ষোড়শো শতাব্দীর শেষ বছরে বানানো সম্পূর্ণ হয়, তার বছর তিরিশ পর মুরদের আক্রমণ ঘটে এবং এটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। সেই ধ্বংসস্তুপের ওপরেই তৈরি হয় আবার নতুন অবয়ব। হুগলী জেলায় যাদের বাড়ি তারা এই জায়গায় যায়নি এটা বিশ্বাস করা যায় না। আমিও গেছি। একাধিক বার। বাবামায়ের সঙ্গে, স্কুলের দিদিভাই আর বন্ধুদের সঙ্গে। বাবামায়ের সঙ্গে যাওয়ার স্মৃতি উবে গেছে, খালি মনে আছে সাদা টপের ওপর মেরুন টিউনিক আর মাথায় লাল ফিতে বেঁধে আমরা লাইন দিয়ে মহা ভক্তিভরে মোমবাতি জ্বালছি। 

৩। এই জায়গাটাতেও আমি একাধিকবার গেছি। বাবামায়ের সঙ্গে, স্কুলের সঙ্গে। সাধারণত ধর্মস্থান আমাকে খুব একটা টানে না, কিন্তু এই মন্দিরটা আমার অন্যতম প্রিয় বেড়াতে যাওয়ার জায়গা ছিল ছোটবেলায়। সবুজ মাঠ, পুকুর, এই সব মিলিয়ে চ্যাম্পিয়ন মন্দিরপ্রাঙ্গণ। সে স্মৃতি শুধুই আমার কল্পনা কি না সেটা চেক করার জন্য গুগল খুললাম। তাতে দেখি মাঠ পুকুর নিয়ে কোনও কথা নেই, উল্টে কত কেরামতি করে যে মন্দির বানানো হয়েছে, তার পাঁচটা তলা যে তান্ত্রিক মতে মানবদেহের পাঁচ পদার্থ ইড়া, পিঙ্গলা, বজ্রাক্ষ, সুষুম্না আর চিত্রিণী-র অনুকরণে তৈরি, আর তেরোটি মিনারের মাথায় প্রস্ফুটিত পদ্মফুল যে কীসের প্রতীক সেই সব ব্যাখ্যা করতেই ব্যস্ত সবাই। আর নীল রঙের নিমকাঠের মূর্তির অভিনবত্বের কথাও ভুললে চলবে না। 

মানছি, এ সবই চমৎকার। কিন্তু এসব তোলা থাক গবেষক আর তাত্ত্বিক আর তথ্যবিদ্‌দের জন্য, আমার চোখে আঁকা থাক শুধু সবুজ মাঠের ছবি। 

৪। মা তখন উত্তরবঙ্গের দিকে পোস্টেড ছিলেন। আমি কোথাও একটা ছিলাম। কোথায় ছিলাম সেটা ইম্পরট্যান্ট নয়, যেখানেই থাকি খুব খারাপ ছিলাম। আমাকে কীভাবে ভালো রাখবেন সেই ভেবে ভেবে মায়ের অলরেডি কম ওজন আরও কমে যাচ্ছিল। ছুটিতে মায়ের কাছে গিয়েছিলাম। মা সারাদিন অফিস করতেন, বিকেলে আমাকে নিয়ে এধারওধার বেড়াতে যেতেন, ফিরে এসে নানারকম ভালো ভালো রান্না করতেন, আমি সে সব দেখে “ভালোই, তবে বোরিং” বলে মুখ ব্যাজার করলে মার্কেটের একমাত্র এসি, চাইনিজ দোকানে খাওয়াতে নিয়ে যেতেন। শনিরবিবার এইসব ছোটখাটো বিনোদনে আমার মন ভরবে না এই আশংকায় দূরে বেড়াতে যাওয়া হত। সে রকমই এক শনিবার সকালে আমরা ট্রেনবাসে চেপে এই দ্রষ্টব্যের শহরে এসে পৌঁছেছিলাম। শহরে আরও অনেক দেখার জিনিস আছে, সেসব দেখে যখন এখানে এসেছি, তখন আকাশ মেঘে ভারি। টুপটাপ জলের ফোঁটা পড়ছে। লম্বা রাস্তা বেয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি একখানা বাজখাঁই রাজপ্রাসাদের দিকে। রাজা ভয়ানক বিলিতি মেজাজের ছিলেন, তাই মিস্তিরিদের আদেশ দেওয়া হয়েছিল রাজবাড়ি দেখতেশুনতে যেন বাকিংহ্যাম প্যালেসের মতো হয়। সেইরকমই উত্তরদক্ষিণে ছড়ানো দোতলা ইটের কাঠামো, ছাওয়া বারান্দা। সামনে গাড়িবারান্দা পেরিয়ে দরবার হল, রেনেসাঁস স্থাপত্য টুকে তৈরি। 

এ বাড়ির এক শ্বশুরমশাই আমাদের ব্রাহ্মসমাজের মাথা ছিলেন (তাঁর নাম বলতে পারলে হাততালি), আর এক উত্তরাধিকারী পরবর্তী কালে লোকসভা ভোটে ২৪৬,৫১৬-এর মধ্যে ১৯২,৯০৯ টি ভোট পেয়ে (আটাত্তর শতাংশের সামান্য বেশি) গিনেস বুকে ওয়ার্ল্ড রেকর্ড স্থাপন করেছিলেন (এঁর নাম বলতে পারলে এক্সট্রা হাততালি)।

৫। ক্লাস সেভেন। সেই প্রথম বোধহয় বাবামা ছাড়া বাড়ির বাইরে রাত্রিযাপন। একটুও ভয় লাগেনি, একটুও মন খারাপ হয়নি। তবে একটু বড় ট্রিপ বলেই হয়তো দিদিভাইরা নিজেরা পুরো দায়িত্ব নিতে ভরসা পাননি, খানিকটা আউটসোর্স করেছিলেন। তাছাড়া সামান্য পাহাড়ে চড়ার ব্যাপারও ছিল, যে জন্য বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি দরকার ছিল। বিশেষজ্ঞের ভূমিকা পালন করতে এসেছিলেন একদল ভ্রমণবিলাসী দাদা। তাতে সুবিধে খুবই হয়েছিল। দাদারা ও পাহাড়ে অনেকবার উঠেছেন, আমাদের সোজা রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। অসুবিধে যেটা হয়েছিল যে তাঁদের উপস্থিতিতে আমাদের কয়েকজন দিদির হৃদয়ে ভয়ানক আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল। 

যাই হোক, হৃদয়ের কথা থাক, পাহাড়ের কথা হোক। মহেন্দ্র পর্বত বা পূর্বঘাটের একটি অংশ এ পাহাড়। জীবজন্তুর ফসিল, প্রস্তরযুগের যন্ত্রপাতি পাওয়া গেছে এ পাহাড় থেকে। পাহাড়ের গায়ে আদিম মানুষের লেখাও নাকি আছে। দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গে থেকে যদি কেউ রক ক্লাইম্বিং করতে চায় তাহলে এই পাহাড়ে তাকে ঘোরাঘুরি করতেই হবে। 

৬। পাহাড়ে রেললাইন পাতা সোজা কথা নয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে সে কাজই হচ্ছিল। এমন সময় যেখানটায় গিয়ে আটকে গেল রেল লাইন, সেখানে সামনে নেমেছে একশো চল্লিশ ফুটের খাড়া উতরাই। ট্রেন, সে রিয়েলই হোক বা টয়, সে উতরাই বেয়ে নামতে পারবে না। সাহেব ইঞ্জিনিয়ার মাথা ঘামিয়ে ঘামিয়ে অবশেষে হার মানলেন। মেমসাহেবকে ফোন করে বললেন, “ডার্লিং, আমার দ্বারা আর হচ্ছে না। আমি দেশে ফিরছি।” মেমসাহেব ওই ঠাণ্ডা কুয়াশার দেশে একা বসে বোরের হদ্দ হচ্ছিলেন, খুব খুশি হয়ে বললেন, “ভেরি গুড হানি, কাম ব্যাক।”

কাম ব্যাক! সাহেবের মাথায় চড়াক করে বিদ্যুৎ খেলে গেল। “ওক্কে ডার্লিং, বি রাইট ব্যাক” বলে ফোন রেখে তিনি দৌড়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন ড্রয়িং খাতার ওপর। এগোতে অসুবিধে হচ্ছে যখন, পিছিয়ে আসলে কেমন হয়? ড্রয়িং খাতায় ফস ফস করে এঁকে চললেন সাহেব। পিছিয়ে এসে, একটা গেরো পেঁচিয়ে, আবার এগোলেন। প্রকৃতি হার মানল মানুষের শয়তানি বুদ্ধির কাছে। 

সাহেবের মাথা থেকে বেরোনো গেরোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন গল্প শুনছি তখন চারপাশে শোঁ শোঁ করে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। একটু আগে গাড়ি করে যে রাস্তাটা দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেটা নিচে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ওই রাস্তা ধরে আসতে আসতে গাঁইগুঁই করছিলাম আর বলছিলাম, “পাহাড়ে যাচ্ছি অথচ একটু ঠাণ্ডা নেই, এ কেমন বিশ্রী ব্যাপার।”* অথচ যেই না এখানে উঠে এসেছি, এমন ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করল, যে দৌড়ে নেমে গিয়ে নিচ থেকে গাড়ি থেকে সোয়েটার বার করে পড়ে আসতে হল সবাইকে। ছোটমামা তো মাফলারও পেঁচালেন। সার্থকনামা জায়গা।

*বোনাস কুইজঃ 

“আপনি কি বায়ু পরিবর্তনের জন্য এসেছেন?”
“তা বটে। তবে বায়ুর অভাবটাই যেন লক্ষ্য করছি বেশি। পাহাড়ে ঠাণ্ডাটা আর একটু বেশি এক্সপেক্ট করে লোকে।”

কোন গল্পের লাইন? (হিন্টঃ গল্পটা যে শহরে ঘটছে, আমরাও সেই শহরেই বেড়াতে যাচ্ছিলাম।)

৭। এ জায়গায় যাওয়ার বিপক্ষে যুক্তিঃ অষ্টপ্রহর সংকীর্তনে কান ঝালাপালা, ভোর চারটেয় দরজার কড়া নেড়ে রূঢ়স্বরে “হরে কৃষ্ণ” বলে ঘুম ভাঙানো, বাবামায়ের ভক্তিস্রোতে ভেসে গিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ন্যাড়া মাথায় টিকি রেখে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে বড় হওয়ার করুণ পরিণতি প্রত্যক্ষ করা। (অফ কোর্স, এখানে আমার প্রেজুডিস স্পষ্ট। আমি যে চালকলাবাঁধা বিদ্যের পেছনে ছুটেছি, সেখানেও আমার নিজস্ব ইচ্ছের কথা কেউ জানতে চায়নি। মাবাবার সিদ্ধান্তই শেষ কথা হয়েছে। এবং অন্য অনেক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমার বড় হওয়াটাও একই রকম করুণ মনে হতে পারে।)  গুচ্ছ গুচ্ছ মন্দির, মন্দিরে মন্দিরে নিমগাছ, সে সবক’টা নিমগাছের তলাকেই মহাপুরুষের জন্মস্থল বলে চালানোর বুজরুকি।

এ জায়গায় যাওয়ার সপক্ষে যুক্তিঃ গঙ্গার ধূসরের জলঙ্গীর শ্যাওলা সবুজে মিশে যেতে দেখা। দূরে ক্ষেতের ওপারে সূর্যাস্ত, সূর্যাস্তের আলোয় লাইন দিয়ে বাড়ি ফিরে চলা মোষের শান্ত গম্ভীর মুখ। ক্লাস ফাইভের বাংলা ক্লাসে ‘সাম্প্রতিক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা’ রচনায় সে মোষের মিছিল বর্ণনা করার সময় ‘অপসৃয়মান’ বিশেষণ ব্যবহার করে খাতায় ইয়াব্বড় ‘রাইট’ পেয়েছিলাম মনে আছে। চক্র না পদ্ম, কোন হোস্টেল ভুলে গেছি, তার ছাদে দাঁড়িয়ে নারকেল গাছের মাথায় ঝড় নামতে দেখেছিলাম, সে ছবি এখনও যখনতখন চোখ বন্ধ না করেই দেখতে পাই। 

কিন্তু সবথেকে বেশি যে কারণটার জন্য যেতে চাই, সেটা ওপরের কারণগুলোর মতো কাব্যিক নয় একটুও। শেষরাতে ‘হরে কৃষ্ণ’ বলে ঘুম ভাঙিয়ে চলে যাওয়ার পর আমরা উঠে নিচে আরতি দেখতে যাব বলে তৈরি হচ্ছিলাম। করিডরের কমন বাথরুমে কে ঢুকে বসেছিল, মা বার বার গিয়ে ফিরে আসছিলেন। শেষমেশ বাবা বললেন, “হরে কৃষ্ণ” বলে নক করে দেখেছ? 

আমি জানি আপনারা, "ম্যাগো কী ভয়ানক পি জে" বলে মুখ বেঁকাচ্ছেন, কিন্তু ওই পরিস্থিতিতে আমাদের সে কথা মনে হয়নি। ওই শেষরাতে ঘরের বিছানায় গড়াগড়ি খেয়ে আমরা তিনজন এত হেসেছিলাম, এত হেসেছিলাম, পেট ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। আরও অনেকবার অনেক মজার কথা বলেছেন আমার বাবা, মায়ের কাণ্ড দেখে আমরা দুজন ‘ধরণী দ্বিধা হও' হয়েছি (পুরী হোটেলের লিফটে), আউলিতে খোলা রোপওয়ে চড়ে যেতে যেতে নার্ভাসনেস চাপতে পাল্লা দিয়ে হেসেছি, কিন্তু ওই শেষরাতের সম্মিলিত অট্টহাস্যের স্মৃতি এখনও জ্বলজ্বল করছে। অর্চিষ্মানের সঙ্গে গিয়ে সেরকম কিছু হাসি জমিয়ে আনার শখ আমার খুব। 

*****


উত্তর

১। হাজারদুয়ারি প্রাসাদ, মুর্শিদাবাদ
২। ব্যান্ডেল চার্চ, ব্যান্ডেল
৩। হংসেশ্বরী মন্দির, বাঁশবেড়িয়া
৪। কোচবিহার প্রাসাদ, হাততালি প্রশ্নঃ ব্রহ্মানন্দ কেশব চন্দ্র সেন, এক্সট্রা হাততালির প্রশ্নঃ রাজমাতা গায়ত্রী দেবী
৫। শুশুনিয়া পাহাড়, বাঁকুড়া। এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলেছেন অযোধ্যা পাহাড়। আমার প্রশ্নে এমন কোনও হিন্ট ছিল না, যা দেখে অযোধ্যা শুশুনিয়ার ফারাক বোঝা যায়, কাজেই আমি অযোধ্যা পাহাড়কেও ঠিক উত্তর হিসেবে গুনছি।  
৬। বাতাসিয়া লুপ, দার্জিলিং, বোনাস কুইজঃ ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি
৭। ইস্কন মন্দির, মায়াপুর



May 28, 2016

সাপ্তাহিকী






Quality is not an act, it’s a habit.
                                                                                               ---Aristotle

এই লিংকটা আগে দিয়েছি কি না মনে করতে পারছি না। তাই আরেকবার দিয়ে দিচ্ছি। দ্য বুক সিয়ার।

একবিংশ শতকের শ্রম আইনঃ দ্য রাইট টু ডিসকানেক্ট। আমি ঝাণ্ডা উড়িয়ে সঙ্গে আছি।

বই পড়তে পারাটা যে কত বড় প্রিভিলেজ এই খবরগুলো পড়ে সে সত্যিটা মাঝে মাঝে ঝালিয়ে নেওয়া দরকার।

দ্য মোস্ট সাকসেসফুল ফিমেল এভারেস্ট ক্লাইম্বার অফ অল টাইম। আপনার চোখে যে মানুষটার ছবি ভেসে উঠছে তার সঙ্গে বোধহয় বাস্তবের খুব একটা মিল নেই।

ভুঁড়ি আর মুড়ি (চানাচুরের সঙ্গে এ মুড়ি যায় না)-র অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ব্যাপারে আমার মা আমাকে চিরদিন সতর্ক করে এসেছেন।


গেরো পাকাতে পছন্দ করেন? তাহলে এ লিংক আপনার কাজে লাগতে পারে।

এই ব্রিজে আমি চড়তে রাজি নই। আপনি?

May 27, 2016

Quotes from The Sympathizer by Viet Thanh Nguyen




উৎস গুগল ইমেজেস



ইদানীং ‘দ্য সিমপ্যাথাইজার’ পড়ছি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, উদ্বাস্তুদের সমস্যা, আমেরিকায় এসে বসত করা উদ্বাস্তুদের সমস্যা, আদর্শ আর নীতির সারশূন্যতা, আর সে সবের ফাঁদে পড়া মানুষের হেনস্থা, বলার অনেক কিছুই বলার মতো আছে এ বইয়ে, সে সব নিয়ে সামনের সপ্তাহে প্রকাশিতব্য ‘মে মাসের বই’ পোস্টে বলব, কিন্তু আরও যা আছে তা হল পাতায় পাতায় কোটেবল কোটস্‌-এর সম্ভার। পড়তে পড়তে কতবার যে থামছি আর বুকমার্ক করছি আর খাতা খুলে টুকছি, তার ইয়ত্তা নেই। এখনও পর্যন্ত যে উদ্ধৃতিগুলো মনে ধরেছে তাদের কয়েকটা আজকের পোস্টে তুলে দিলাম। 

*****

One must be grateful for one's education no matter how it arrives.

I had an abiding respect for the professionalism of career prostitutes, who wore their dishonesty more openly than lawyers, both of whom bill by the hour. But to speak only of the financial side misses the point. The proper way to approach a prostitute is to adapt the attitude of a theatregoer, sitting back and suspending disbelief for the duration of the show. The improper way is to doltishly insist that the play is just a bunch of people putting on charades because you have paid the price of the ticket, or, conversely, to believe utterly in what you are watching and hence succumb to a mirage. For example, grown men who sneer at the idea of unicorns will tearfully testify to the existence of an even rarer, more mythical species. Found only in remote ports of call and the darkest, deepest reaches of the most insalubrious taverns, this is the prostitute in whose chest beats the proverbial heart of gold. Let me assure you, if there is one part of a prostitute that is made of gold, it is not her heart. That some believe otherwise is a tribute to the conscientious performer. 

When he interviewed me he wanted to know whether I spoke any Japanese. I explained that I was born in Gardena. He said, Oh, you nisei, as if knowing that one word means he knows something about me. You’ve forgotten your culture, Ms. Mori, even though you’re only second generation. Your issei parents, they hung on to their culture. Don’t you want to learn Japanese? Don’t you want to visit Nippon? For a long time I felt bad. I wondered why I didn’t want to learn Japanese, why I didn’t already speak Japanese, why I would rather go to Paris or Istanbul or Barcelona rather than Tokyo. But then I thought, Who cares? Did anyone ask John F. Kennedy if he spoke Gaelic and visited Dublin or if he ate potatoes every night or if he collected paintings of leprechauns? So why are we supposed to not forget our culture? Isn’t my culture right here since I was born here? Of course I didn’t ask him those questions. I just smiled and said, You’re so right, sir. 

I was careful, then, to present myself as just another immigrant, glad to be in the land where the pursuit of happiness was guaranteed in writing, which, when one comes to think about it, is not such a great deal. Now a guarantee of happiness - that's a great deal. But a guarantee to be allowed to pursue the jackpot of happiness? merely an opportunity to buy a lottery ticket. Someone would surely win millions, but millions would surely pay for it. 


May 24, 2016

May 23, 2016

পরশু সন্ধ্যেবেলা



বাকি সবাই যেটা করে, নিজে সে কাজটা না করার ইচ্ছে সবারই জীবনে কখনও না কখনও হয়। আমার এ’রকম প্রথম যে ইচ্ছেটা (বা অনিচ্ছে বলাই উচিত হবে বোধহয়) এখন মনে করতে পারি সেটা হল যে আমি কোনওদিন বিয়ে করব না। স্কুলের মাঝামাঝি নাগাদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তারপর হরমোনের তাগিদে বিয়েতে নিমরাজি হলেও মন বলল, সেটল বাবা করছি না কিছুতেই। ঘুরে ঘুরে বেড়াব সারা পৃথিবী। আজ আইসল্যান্ড তো কাল কেপটাউন তো পরশু মালসেজঘাট।

শেষে যখন ফুটো প্যারাশুট গুটিয়ে দিল্লিতে এসে নামতে হল তখনও আমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি। বুক ফুলিয়ে বললাম, জীবনে আর যা-ই করি না কেন, সি আর পার্কের ওই বাঙালি ঘেটোতে ঢুকছি না কিছুতেই। (তখনও যত্রতত্র ‘ঘেটো’ জাতীয় শব্দপ্রয়োগের রাজনৈতিক অসুবিধেটা হৃদয়ঙ্গম হয়নি।) ল্যাজ গুটিয়ে ‘সুরভি টেম্পু সার্বিস’ লেখা গাড়িতে চড়ে গুটি গুটি সি আর পার্কে এসে ঢুকেছি তাও হয়ে গেল ছ’বছর। এখন সি আর পার্ক ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার কথা হলে বুক ধড়াস ধড়াসও করে।

যদিও আমি জানি থাকার জন্য সি আর পার্ক অতি খারাপ জায়গা। তার প্রধান কারণটা এর অবস্থান। সি আর পার্কে যে দিক দিয়েই ঢুকতে যান না কেন জ্যামে আপনাকে পড়তে হবেই। আশেপাশে মেট্রো স্টেশনের মেলা বসে গেলেও সেগুলো সবক’টা সি আর পার্ক থেকে দু’কিলোমিটার দূরেই হবে, অটো চড়ে হাত গন্ধ করা থেকে মুক্তি নেই।

কিন্তু এগুলো সি আর পার্কের নিয়ন্ত্রণের বাইরের বিষয়, কাজেই এ নিয়ে তাকে তুলোধোনা করাটা ভালো দেখায় না। কিন্তু ভেতরের সুযোগসুবিধের দায়িত্ব কে নেবে? চারটের একটা মার্কেটেও হাওয়াই চটি পাওয়া যায় না। বাসনকোসনের দোকান? নেই। প্রেশারকুকারের দোকান? নেই। সেদিন অর্চিষ্মানের ব্যাগের জিপ সারাতে গেলাম, সেও শুনি নাকি কালকাজীতে গিয়ে সারাতে হবে। তবে সি আর পার্কে আছে কী? মোড়ে মোড়ে দুর্গন্ধময় মাছের বাজার, আর বাজারের জায়গা বেদখল করে তৈরি গুচ্ছ গুচ্ছ কালী আর শনিমন্দির। 

আমাদের রক্ত এমন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে যে আমরা এতেই কাজ চালিয়ে নিচ্ছি। এসব অসুবিধেকে অসুবিধেই মনে করছি না। নেহেরু প্লেসের ফ্লাইওভার থেকে ডানদিকে বেঁকে বাঁদিকে ঢুকে গেলেই যে বাংলাভাষায় নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করা যাবে, সেই স্বস্তিটাকেই জীবনের মোক্ষ বলে চোখ বুজে বসে আছি।

মাঝে মাঝে শুধু সে বোজা চোখের ভেতরেও গুঁড়ো গুঁড়ো বালির মতো কী সব যেন ঢুকে পড়ে সত্যিটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বেশ ক’মাস আগে অফিস থেকে ফেরার পথে রুটি কেনার জন্য ‘মা তারা’-র সামনে হত্যে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় এরকম দুটি বালুকণা, থুড়ি, মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল।

অবশ্য আকারআকৃতিতে তারা প্রায় বালুকণারই সমান। একজন ছেলে, একজন মেয়ে। দু’জনেরই সেই বয়স যখন শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় একফোঁটা অতিরিক্ত বডি ফ্যাট থাকে না। এদিকওদিক তাকানোর ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল তল্লাটে তারা নতুন। এটাও বোঝা যাচ্ছিল যে নিজেদের মধ্যে পরিচয়ও তাদের এমন কিছু পুরোনো হয়নি। এও স্পষ্ট যে দু তরফেই আলাপটা এগোনোর ইচ্ছে আছে। সি আর পার্কের ওই অফিসফেরতা ঘেমো ক্লান্ত মাঝবয়সী ভিড়ে নতুন প্রেমের ছোঁয়া এতই অন্যরকম যে আমরা সকলেই তাদের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখছিলাম। এতগুলো দৃষ্টির ফাঁদে পড়ে ছেলেমেয়েদুটোর নাভিশ্বাস।

অবশেষে আর সহ্য না করতে পেরে তারা তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করল, এখানে কফির দোকান আছে?

কফির দোকান? লোকজন এমন আকাশ থেকে পড়ল যেন বাজারে কফির দোকান আশা করার মতো অযৌক্তিক কথা তারা এর আগে জন্মে শোনেনি। অবশেষে একজন হাত তুলে একদিকে দেখিয়ে বললেন, ওই দিকে একটা চায়ের দোকান আছে, কফি পাওয়া যাবে কি না বলতে পারছি না।

বেচারারা প্রাণ নিয়ে সেদিকে পালাল।

আমাদের রুটি এসে গিয়েছিল। আমরাও পালালাম বাড়ির দিকে। পালাতে পালাতে আলোচনা করতে লাগলাম চায়ের দোকানটা দেখে ছেলেমেয়েদুটোর প্রতিক্রিয়া কী হবে।

হাওড়া স্টেশনের সাবওয়ে থেকে উঠলে ফুটপাথের ওপর যে জাল দেওয়া বাসগুমটিগুলো থাকে, যার ভেতর একজন (তাতেই গুমটি দৈর্ঘ্যেপ্রস্থে সম্পূর্ণ ভরে যায়) কন্ডাকটর মেজাজ টং করে বসে থাকেন, সেই আয়তনের একটা ঘর। তার ভেতর বসে আছেন দোকানের থেকেও দুঃস্থ এবং শীর্ণ চেহারার একজন বৃদ্ধ। তাঁর অবশ্য মেজাজ ঠাণ্ডা। কারণ মেজাজ খারাপ করতে যে এনার্জিটুকু দরকার সেটাও ভদ্রলোকের নেই। দোকানের সামনে কাঠের বেঞ্চ, একের পাশে আরেকজন বসলে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। সন্ধ্যেবেলা পাশের শনিমন্দিরে কানের পর্দা ফাটিয়ে পুজোআর্চা চলে। শুঁড়তোলা ইমপোর্টেড লেদার শু খুলে রেখে ভক্তরা গদগদ মুখে জোড়হস্তে লাইন দেন।

সি আর পার্কে একটা পদস্থ কফির দোকান নেই। সি আর পার্কে একটা ভদ্রস্থ প্রেম করার জায়গা নেই।

কী যে লজ্জা হয়েছিল আমার। লজ্জা, মনখারাপ সব।

সেদিন কী কারণে অফিস থেকে আগে ফিরে এসেছি, বেল শুনে দরজা খুললাম। পিঠ থেকে ব্যাগ না নামিয়েই অর্চিষ্মান বলল, এখানে একটা নতুন সিসিডি খুলেছে, দেখেছ?

আমি মুখ ভেচকে বললাম, কালকাজীতে আর ক’টা সিসিডি লাগবে?

আরে কালকাজীতে না, আমাদের তিনটে বাড়ি পর।


পরদিন আমিও দেখলাম। ঝকঝকে নতুন দোকান। উদ্বোধনের উদযাপন হিসেবে রংবেরঙের বেলুন টাঙানো হয়েছে। যে জায়গাটায় খুলেছে সেখানে গত তিন বছরে তিনটে ‘ডেলিভারি ওনলি’ রেস্টোর‍্যান্ট খুলে বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা ঠিক করলাম, দ্রুত যাওয়া দরকার। গায়ে নতুনের গন্ধ থাকতে থাকতেই। বেলুনটেলুন খুলে নেওয়ার আগেই।


শনিবার যাওয়া হল। আমি নিলাম ক্ল্যাসিক লেমোনেড, অর্চিষ্মান নিল কুল ব্লু। আর কোকো ফ্যান্টাসি আর ম্যাংগো শট। লেমোনেড যেমন খেতে হয় তেমনই খেতে, কুল ব্লু-টাও দিব্যি সুস্বাদু। ম্যাংগো শট কেমন খেতে জানি না, অর্চিষ্মান দাবি করছে ভালো। কোকো ফ্যান্টাসি হচ্ছে একটা তিনকোণা চকোলেট কেকের টুকরো। আমরা তার সঙ্গে আইসক্রিম আর চকোলেট সস কোনওটাই চাই না বলাতেও দেখলাম ওঁরা চকোলেট সস দিয়েছেন, এবং বেশ বেশি পরিমাণেই দিয়েছেন। মুখে দিয়ে বুঝলাম, কেন ওঁরা আমাদের কথায় কর্ণপাত করেননি। আসল ব্যাপারটা বেশ শুকনো, চকোলেট সস না দিলে খেতে অসুবিধে হত।


যাই হোক, ভালো কেক খাওয়ার ইচ্ছে থাকলে সিসিডি-তে যাওয়ার কোনও কারণ নেই। কফি শপে ইন ফ্যাক্ট কোনও খাবার খেতেই যাওয়া উচিত না। কফি শপে যাওয়া উচিত শুধু গল্প করতে আর লোক দেখতে। আমরাও দেখলাম। সি আর পার্কের একদল কচিকাঁচা গোল হয়ে বসে উচ্চকণ্ঠে নিজের নিজের বাবামায়ের নিন্দে করছিল। আরেকটা টেবিলে বসে ছিল একজোড়া বাবা আর ছেলে, আরেক টেবিলে তিনজনের একটা দল। একজনের হাতে ক্রেপ ব্যান্ডেজ। কিছুক্ষণ পর যখন তিনজনেই উঠে দাঁড়াল আর একে অপরের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল তখন বুঝলাম বিজনেস মিটিং চলছিল।

এটা আগেও খেয়াল করেছি, বাড়ির থেকে কফি শপের গল্পের চরিত্র, বিষয়, তাল, লয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। বাড়ির গল্পে যে সব সত্যি চাপা পড়ে থাকে, টেবিলের দুপাশে মুখোমুখি বসলে তারা সব হুড়হুড়িয়ে বেরিয়ে আসে। এতদিন একসঙ্গে আছি, অথচ ধুনোর গন্ধের প্রতি কার কী মনোভাব জানতাম না। সেদিন কফি খেতে খেতে জানা গেল। আমার ভালো লাগে, অর্চিষ্মানের বমি পায়। চিন্তার ব্যাপারটা হচ্ছে, বাড়ির এত কাছে কফির দোকানটা খুলেছে যখন ঘন ঘন না গিয়ে তো উপায় নেই। আর যতবার যাব ততবার কেঁচো খুঁড়তে আরও কী কী সাপ বেরোবে কে জানে।



May 21, 2016

সাপ্তাহিকী








I know now, what I didn't know then, that affection can't always be expressed in calm, orderly, articulate ways; and that one cannot prescribe the form it should take for anyone else.
                                                                                — Magda Szabó, The Door



The fight against Guantánamo.  সেই ফাইটের প্রধান কাণ্ডারি মারা গেলেন সদ্য।


There is no such thing as Free will. But we’re better of believing in it anyway. একেবারে একমত। বিশেষ করে দ্বিতীয় লাইনটার সঙ্গে।

কোকা কোলা-র কোকাটুকু সত্যি সত্যি কোকেন থেকে এসেছে। জানতেন?

যে যাই বলুক না কেন, আমি কোনওদিন চায়ের কাপে চায়ের আগে দুধ ঢালিনি, ঢালছি না, ঢালবও না।

সংশোধনের উপায় হিসেবে অপরাধবোধে সুড়সুড়ি দেওয়াটা আমি কেন যেন ঠিক নিতে পারি না। অবশ্য কেউ বলবে তাতে যদি কাজ দেয় ক্ষতি কী? (লিংক পাঠিয়েছে শ্রীমন্তী)

‘আয়ান র‍্যান্ড’ যে ছদ্মনাম জানতাম না।



May 19, 2016

A - Z book tag




উৎস গুগল ইমেজেস


এই পঁয়ত্রিশ বছরে আমি যে দুটো সত্যিকে কখনও মিথ্যে হতে দেখিনি তারা হচ্ছেঃ

১। একটা কাজ করতে আমার নিজের যতটা সময় লাগবে মনে হয়, আসলে সময় লাগে তার আড়াই কিংবা তিন গুণ। 

২। যে কাজে যত বেশি সময় ঢালার জন্য প্রস্তুত থাকি, সে কাজে তত বেশি সময় লাগে। অর্থাৎ, ডেডলাইন না থাকলে এ জন্মে আমার কোনও কাজই শেষ হত না ।

যেমন ধরা যাক, অবান্তরের পরবর্তী যে পোস্টটা ছাপার কথা, সেই কথাটা ঝুলে আছে গত চার মাস ধরে। আগের সাপ্তাহিকী ছাপার পর “এইবার হয় ওই পোস্টটা ছাপব না হলে আর কিছুই ছাপব না” বলে মাটি কামড়ে পড়লাম, আর অমনি আমাদের এসি খারাপ হয়ে গেল। 

এই বাজারে দিল্লিতে এসি খারাপ হওয়া মানে হচ্ছে লেভেল থ্রি এমারজেন্সি। সে এমারজেন্সি নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে, কিন্তু নতুন পোস্ট করার যে টাইমলাইনটা মাথার ভেতর ছিল সেটা গোলমাল হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম আজ সেটা পোস্ট করা যাবে, নিদেনপক্ষে কালকে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সোমবার টার্গেট করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। 

কিন্তু ততদিন অবান্তরকে খালি ফেলে রাখা ভালো দেখায় না। তাই একটা ফাঁকিবাজি পোস্ট করছি। ইন্টারনেটে ভেসে বেড়ানো লক্ষ লক্ষ ট্যাগ থেকে একটা তুলে নিচ্ছি। A-Z book tag। ট্যাগটা দেখা ইস্তক অবান্তরে ছাপার ইচ্ছে ছিল,  এও ভেবেছিলাম অ-ঔ বা ক-চন্দ্রবিন্দু তালিকা হিসেবে ছাপলে কেমন হয়?  কিন্তু সে সব কায়দা করার এখন সময় নেই। কাজেই A-Z ট্যাগ হিসেবেই ছাপলাম।

***** 

Author you’ve read the most books from: আগাথা ক্রিস্টি

Best Sequel Ever: হ্যারি পটার

Currently Reading: Viet Thanh Nguyen-এর দ্য সিমপ্যাথাইজার। এই বইটা এ'বছর পুলিৎজার পেয়েছে।

Drink of Choice While Reading: চা

E-reader or Physical Book? যখন যা পাওয়া যায় তাই। আপাতত ই রিডারে পড়ছি। 

Fictional Character You Probably Would Have Actually Dated In High School: হাই স্কুল কেন, আমি সারাজীবন তাঁকে ডেট করতে রাজি আছি। প্রদোষ চন্দ্র মিত্র।

Glad You Gave This Book A Chance: হ্যারি পটার। চান্স দেওয়ার কথা হচ্ছে কারণ আমি হ্যারি পটার পড়েছি বেশ বড় বয়সে। এম এ পড়ার সময়। তখন যেটা হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি ছিল সেটা হচ্ছে হ্যারি পটারকে বিলিতি টিনএজারদের হুজুগ বলে উড়িয়ে দেওয়া। ভাগ্যিস দিইনি।

Hidden Gem Book: এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বিপদ হচ্ছে আমার কাছে যা হিডেন তা হয়তো বিশ্বের সবার কাছে জনপ্রিয়। আমার উত্তর শুনে তাঁরা মুখ বেঁকিয়ে হাসবেন। সে ঝুঁকি নিয়েই বলছি। মণীন্দ্র গুপ্তের ‘অক্ষয় মালবেরি’ আর জন কেনেডি টুলের ‘আ কনফেডেরাসি অফ ডান্সেস’।

Important Moment in your Reading Life:  আমার জন্য মায়ের পথের পাঁচালী কিনে আনা। আমার অক্ষরজ্ঞান হওয়ার আগে। 

Just Finished: Daniil Kharms-এর 'ইনসিডেনসেস'। এত অদ্ভুত বই আমি আগে পড়িনি। মে মাসের বইয়ের পোস্টে বিশদে বলব।

Kinds of Books You Won’t Read: সে রকম কিছু নেই। হাতে সময় থাকলে আর পড়ার কিছু না থাকলে দ্য মংক হু সোলড হিজ ফেরারি-ও আরেকবার পড়তে পারি।

Longest Book You’ve Read: হুম্‌মম, এই মুহূর্তে ভেবে তো হ্যারি পটারের শেষের দিকের বইগুলোর কথাই মনে পড়ছে।

Major book hangover because of: এই হ্যাংওভার দু’রকমের হতে পারে। ভালো রকমের হ্যাংওভার অনেক বই পড়েই হয়েছে, টু কিল আ মকিং বার্ড, আগাথা ক্রিস্টির অনেক গল্প, সুকুমার রায় হ্যাংওভার তো সারাজীবনের, ইদানীং এলেনা ফেরেন্তের নিওপলিট্যান সিরিজটা পড়ে অদ্ভুত হ্যাংওভারে ভুগছি, যে সম্পর্কে আপনাদের বলব একদিন। খারাপ হ্যাংওভারও হয়েছে তবে সংখ্যায় কম। যে বইটার কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে সেটার নিন্দে অবান্তরে আগেও করেছি। আয়ান র‍্যান্ডের দ্য ফাউন্টেনহেড। পড়ার পর প্রায় দশ বছর কেটে গেছে, এখনও বইটার কথা মনে পড়লে গা জ্বালা করে।

Number of Bookcases You Own: মোটে দুটি

One Book You Have Read Multiple Times: সুকুমার সমগ্র। 

Preferred Place To Read: খাটের ওপর।

Quote that inspires you/gives you all the feels from a book you’ve read: 

উদ্ধৃতি ১।  “পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন - মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠ্যাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়? তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে … দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গণ্ডী এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশ্যে …

দিন রাত্রি পার হয়ে, জন্ম মরণ পার হয়ে, মাস, বর্ষ, মন্বন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চ’লে যায় … তোমাদের মর্মর জীবন-স্বপ্ন শেওলা-ছাঁটার দলে ভ’রে আসে, পথ আমার তখনও ফুরোয় না … চলে … চলে … চলে … এগিয়েই চলে …

অনির্বাণ তাঁর বীণ শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ …

সে পথের বিচিত্র আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমায় ঘরছাড়া ক’রে এনেছি! … চল এগিয়ে যাই।”

উদ্ধৃতি ২। “প্রার্থনা করিও, আর যাহাই হোক, যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময় যেন একটি স্নেহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে - যেন একটি করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও একফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।”

Reading Regret: কিছু নেই

Series You Started And Need To Finish(all books are out in series): এলেনা ফেরেন্তের নিওপলিট্যান সিরিজ। দুটো বই পড়েছি, দুটো বাকি আছে।

Three of your All-Time Favorite Books: সুকুমার সমগ্র। পথের পাঁচালী। টু কিল আ মকিং বার্ড।

Unapologetic Fangirl For: আগাথা ক্রিস্টি।

Very Excited For This Release More Than All The Others: রিলিজ নিয়ে হইচইটা একেবারেই বিলিতি ব্যাপার। বাংলা বই কী রিলিজ করছে আমি জানি না। কাজেই না চাইলেও জে কে রোলিং-এর পরবর্তী করমোরান স্ট্রাইক উপন্যাসটার কথাই বলতে হবে।

Worst Bookish Habit: জোগাড় করে, না পড়ে ফেলে রাখা।

X Marks The Spot: Start at the top left of your shelf and pick the 27th book: আমি এই মুহূর্তে বুককেসের সামনে নেই, কাজেই এই উত্তরটা দেওয়া গেল না।

Your latest book purchase: ম্যাগডা জাবো-র দ্য ডোর। 

ZZZ-snatcher book (last book that kept you up WAY too late): জে কে রোলিং-এর ক্যাজুয়াল ভেকেন্সি।


May 14, 2016

সাপ্তাহিকী




এরকম একটা জানালা আর জানালার বাইরে অমন দৃশ্য যদি থাকত।


এরা বলছে আমি নাকি 'বুক নার্ড'।

পনেরো বছরের উইলিয়াম হারিয়ে যাওয়া মায়ান শহর আবিষ্কার করে ফেলেছে। কী করে করেছে সেটা ভালো করে বোঝা আমার এই পঁয়ত্রিশ বছরের কচি ব্রেনে সম্ভব নয়। আপনারা নিজেরা পড়ে নিন।

আমি জানতাম, দোষ আমার নয়।

তা বলে বাবামা’র সম্পর্কে এইরকম সত্যি আবিষ্কার করতে হয়নি ভাগ্যিস।

Bike in a backpack. ব্যাংগালোরের এক ডিজাইন কোম্পানির সৃষ্টি।

এই লিস্টের প্রথমে যে পাহাড়টার নাম, তার চুড়োয় আমি সর্বক্ষণ চড়ে বসে থাকি।

মাকাল ফলের উল্টোটা যদি কিছু থাকে তবে এই বাড়িগুলো সেই।

সব বাণীগুলোর সঙ্গে আমি একমত নই, তবে ক্যালিগ্রাফিটা চমৎকার।

এত কায়দার জায়গায় বসে পড়তে গেলে পড়ার বদলে আমি ঘুমিয়ে পড়ব।

তেরোটার একটা প্রশ্নও আমরা কেউ কাউকে করিনি। কপালে যে কী আছে কে জানে।








May 13, 2016

কিন্ডল



গতমাসে উইন্ডফল গেন হয়ে দুজনের ব্যাংকেই কিছু বাড়তি টাকা এসে গেল। টাকাটা দিয়ে দরকারি অদরকারি অনেক কিছু করা যেত। বেড়াতে যাওয়া যেত। রান্নাঘরের ননস্টিক বাসনকোসনের একটিকেও আর চোখের মাথা না থেকে ননস্টিক বলা যায় না, ছাত্রাবস্থার দু’লিটারের প্রেশার কুকারে মাংসের সঙ্গে আলু দিলে ঢাকনা বন্ধ হয় না - সে সব সমস্যার সমাধান করা যেত, কিন্তু সেসবের আমরা কিছুই করলাম না।

কারণ কী করা যায় প্রশ্নটা যে মুহূর্তে মুখ থেকে বেরিয়ে দুলতে দুলতে চোখের সামনে এসে দাঁড়াল, সঙ্গে সঙ্গে উত্তরটাও এসে গেল। আর আমরা কিন্ডল অর্ডার করে ফেললাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যে।

টিভি, ফ্রিজ, এসি, ক্রোমকাস্ট কেনা, এমনকি ভাড়াবাড়ি পাল্টানো নিয়েও এত ভাবিনি যত কিন্ডল কেনা নিয়ে ভেবেছি। ভেবে ভেবে মাথা খারাপ করেছি, নিজেরা রিসার্চ করে পাগল হয়েছি, কিন্ডলওয়ালা লোকদের খুঁচিয়ে পাগল করেছি। উইশলিস্ট থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ বই (কিছু পড়া হয়েছে কিছু হয়নি), যোগব্যায়ামের মাদুর (যেটা গত দু’বছরে সাত বার ব্যবহার হয়েছে), ওজন মাপার মেশিন (যেটার খেলনায় পর্যবসিত হয়েছে), ট্র্যাক প্যান্টস (ভবিতব্য জানতে হলে আগের দুটি আইটেম দর্শনীয়), টিফিন বাক্স (যেটার ঢাকনা বন্ধ করা যাচ্ছিল না বলে ফেরত গেছে), কাচের জলের বোতল (চারটে কিনেছিলাম, একটা গেছে), রাইস কুকার (আগেরটা দিব্যি কাজ করছিল, যতদিন না আমি প্লাস্টিকের ঢাকনা পরানো প্লেট কুকারের ভেতরে রেখে ভাত রান্না করে ফেললাম আর প্লাস্টিক গলে একটা ভয়াবহ কাণ্ড হল) কেনা হয়ে গেল, কিন্ডল গ্যাঁট হয়ে বসে রইল যে রইলই।

সমস্যাটা যে শুধু টাকার অভাবের ছিল তা নয়। হ্যাঁ, আমি “কিনলে পেপারহোয়াইটই কিনব” বলে গোঁ ধরে বসে ছিলাম ঠিকই কিন্তু চাইলে হিসেবটিসেব করে, সংসারের অনন্ত হাঁ থেকে টাকা বাঁচিয়ে এতদিনে সেটা কেনা যেত। কিনি যে নি, সেটার কারণ মনের সাড়া না পাওয়া। কেন যেন মনে হচ্ছিল কিন্ডল কিনলে সত্যিকারের বইয়ের সঙ্গে বেইমানি হবে। কাগজের বই আর বৈদ্যুতিন বই যেন একে অপরের অ্যান্টিথেসিস, একজন রাত হলে অন্যজন দিন, একজন নাস্তিক হলে অন্যজন আস্তিক, একজন উচ্ছে হলে অন্যজন রসগোল্লা, একজন বর হলে অন্যজন পরপুরুষ। স্টিফেন ফ্রাই-এর চমৎকার উক্তি “Books are no more threatened by Kindle than stairs by elevators.” পড়ার পরও মনকে ভোলাতে পারিনি একেই তো ওদের আর আগের মতো ভালোবাসি না, পড়াশোনা জানা সংসারে একটা লাইব্রেরি কার্ড নেই, ফেলে রেখে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলি, তার ওপর যদি একখানা কিন্ডল এনে হাজির করি তাহলেই যেন বিট্রেয়ালটা সম্পূর্ণ হয়। মুখের ওপর বলে দেওয়া হয়, যে দেখ ভাই, যদিও ছোট থেকে তোমরাই আমাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছ, ক্ষতিকারক কিন্তু সুস্বাদু আইডিয়া দিয়ে মগজ ভর্তি করেছ, পরীক্ষার আগেও পড়ার বইয়ের থেকে দূরে রেখে রেজাল্ট খারাপ করিয়েছ, তবু তোমাদের প্রয়োজন আমার কাছে ফুরিয়েছে। এখন আমি লায়েক হয়েছি, তোমরা আমার কাছে ব্যাকডেটেড হয়েছ। অর্চিষ্মানও এইরকম করেই ভাবত বা এখনও ভাবে আমি নিশ্চিত। কারণ কিন্ডল কেনার ব্যাপারে উৎসাহ দেখালেও ও আস্তে করে একবার বলেছে, “আমরা কিন্তু কাগজের বই কেনা বন্ধ করব না, কেমন?” আমি বলেছি, “পাগল?”

জিনিসটা হাতে এসেছিল বেশ কিছুদিন আগেই, কিন্তু ব্যবহার না করে সেটার সম্বন্ধে ফস করে কিছু বলা উচিত হবে না বলে ঘাপটি মেরে ছিলাম। অবশেষে অপেক্ষার অন্ত হয়েছে। একটা গোটা বই আমি কিন্ডলে পড়ে উঠেছি। হাঙ্গেরিয়ান লেখক Magda Szabo-র উপন্যাস The Door। চমৎকার বই। কিন্তু সে বইয়ের কথা মে মাসের বইয়ের গল্পে হবে, এখন শুধু বই-বাহনের কথাই হোক। এই প্রাথমিক মোলাকাতের পর কিন্ডলের উপকারিতা অপকারিতা যা যা মনে হয়েছে সেগুলো নিচে লিখছি।

একটা কথা বলে রাখা ভালো, স্ক্রিনে বই পড়ার অভ্যেস আপনাদের সবার মতোই আমারও আছে। ইন ফ্যাক্ট, গত ক’বছর ধরে যত বই পড়েছি তার অধিকাংশই অনলাইন, কাজেই কিন্ডলে পড়তে গিয়ে বইয়ের পাতার সোঁদা গন্ধ পাচ্ছি না আর তাতে পড়ার আনন্দ অর্ধেক মাটি হয়ে যাচ্ছে, এই অভিযোগ আমার করা সাজবে না। বই বনাম কিন্ডলের যুদ্ধে পড়ার আরাম সংক্রান্ত কোনও পয়েন্ট তাই আমার লিস্টে থাকল না।


উপকারিতা

১। আজকাল বেশিরভাগ বইই ইন্টারনেট পড়ছি বললাম বটে, কিন্তু সত্যি কথাটা হচ্ছে যে বইগুলো পড়েছি সেগুলো সবই পুরোনো। টাটকা নতুন বই অনলাইন পাওয়া যায় না, বা পাওয়া গেলেও তাকে খুঁজে বার করার দক্ষতা আমার নেই। তাছাড়া লেখকদের রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত করার খচখচানিটাও একেবারে অস্বীকার করা যায় না। কিন্ডলে এত খোঁজাখুঁজির ঝামেলা নেই, চুরিচামারির অপরাধবোধ নেই। ফাঁকি মেরে রোজগার করা পয়সা দিয়ে বই কিনে বুক ফুলিয়ে পড়ব।

২। Magda Szabo-র বইটার পেপারব্যাকের দাম ছিল ছ’শো আটাত্তর টাকা। আমি কিন্ডলে কিনে পড়েছি দু’শো চুরানব্বই টাকায়। এর পর যে বইটা কিনব ভাবছি সেটার পেপারব্যাকের দাম সাতশো ঊনচল্লিশ টাকা। কিন্ডল সংস্করণ? তিনশো একান্ন।

৩। আর কাগজের বই কিনলে বুককেস কিনতে হবে। যদিও আমি সস্তা ওয়েবসাইট থেকে কমপ্রেসড কাঠের বুককেস কিনব, বই রাখলে যার তাকগুলো বিপজ্জনক রকম বেঁকে যাবে, তবু সে’রকম বুককেসের দামও যথেষ্ট। আর বুককেস রাখার জন্য বড় বাড়িতে উঠে যেতে হলে চোট বাড়বে বই কমবে না। তাছাড়া বুককেস কিনলেই তো হবে না, ধুলোও তো ঝাড়তে হবে।

৩। ক) স্থানসংকুলানের পয়েন্টে থাকতে থাকতে আমার অফিসের ব্যাগের কথাও তোলা উচিত। স্রেফ বই নিয়ে যাওয়ার জন্য অফিসের সঙ্গে আরেকটা ব্যাগের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। আর একেকটা বইয়ের যা ওজন, ডানকাঁধটা পার্মানেন্টলি বাঁ কাঁধের তুলনায় নিচু হয়ে গেছে। কাঁধ ঠিক করতে হলে এখন দু’শো গ্রামের কিন্ডলই ভরসা।

৪। রাতে আলো নেভানোর পরও পড়া যায়। আমাদের বেডসুইচহীন সংসারে এই উপকারিতাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


অপকারিতা

১। সারাদিনের একমাত্র যে বিনোদনটা কম্পিউটার স্ক্রিনের নাগালের বাইরে ছিল, সেটাও গেল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এবার নির্ঘাত ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম’ হবে। যখনতখন যেখানেসেখানে চোখে সর্ষেফুল দেখব, এক বস্‌ দু’জন হয়ে প্রতিভাত হবেন। অশ্রুগ্রন্থি কালাহারি হয়ে যাবে, কান্না পেলেও কাঁদতে পারব না। নিত্য মাথাব্যথা হবে, ঘাড়ে স্পন্ডেলাইটিস। প্রাণটা না বেঘোরে যায়।

২। প্রথম বইটা শেষ করার পর থেকে ক্রমাগত নতুন বই কেনার জন্য মন ছোঁকছোঁক করছে। অর্চিষ্মানকেও বই কিনতে সকালবিকেল উদ্বুদ্ধ করছি। বইয়ের দামে যে মাইলেজটুকু পেয়েছিলাম, এই রেটে চললে অচিরেই তা মাঠে মারা যাবে মনে হচ্ছে।

৩। বাড়ির ‘ইলেকট্রনিক্স’ ড্রয়ারে আরও একটা ডেটা কেবল যুক্ত হয়েছে। এটা কত নম্বর সেটা গোনার আমার সাহস হয়নি। আমাদের দুটো ল্যাপটপ (কখনও কখনও তিনটে), দুটো ফোন (কখনও কখনও তিনটে), একটা হার্ড ড্রাইভ, একটা স্পিকার, আর এখন একটা কিন্ডল যখন একসঙ্গে স্বমহিমায় সারা ঘরে ছড়িয়ে থাকে, তখন তারের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, এদের দেখে যতটা প্রাণহীন মনে হচ্ছে এরা আসলে ততটাও নয়, প্রথম বর্ষার জল পাওয়া জঙ্গলের মতো লকলকিয়ে বেড়ে উঠে একদিন এরা আমাদের বাড়িছাড়া করবে। সব কিছু গুছিয়ে নেওয়ার সময়টুকুও দেবে না। সে সংকটমুহূর্তে বইয়ের তাক থেকে কয়েকটা সেকেলে, সত্যিকারের বই বগলদাবা করে যেন পালাতে পারি, দেখো ঠাকুর।


May 11, 2016

লেদার



সঙ্গে থাকার নানারকম সংজ্ঞা হয়। আর সেসব সংজ্ঞা অনুযায়ী গুনতিও নানারকম হয়। যদিও সেদিন আমরা জানতাম না যে আমরা কখনও একসঙ্গে থাকব, তবু পরে যা যা ঘটেছে ওই দিনটি না থাকলে সে সবের কিছুই ঘটত না, এই যুক্তিতে দু’হাজার নয় সালের সেপ্টেম্বর মাসের ওই দিনটা থেকেই যদি গুনতি শুরু করি তাহলে আমি অর্চিষ্মানের সঙ্গে আছি সাড়ে ছ’বছরের সামান্য বেশি সময়। 

আবার ওই বছরেরই মাসতিনেক পরের ডিসেম্বর মাসের শীতকাতর দিনটা থেকে যদি গুনি, যেদিন সকাল থেকে আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ, বাতাসে দূষিত কুয়াশার ছায়া বুঝতে দিচ্ছে না দিনটা ঠিক কোনদিকে গড়াবে, কিন্তু বিকেলসন্ধ্যে জুড়ে নদীর ধারে হেঁটে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে, থাই রেস্টোর‍্যান্টে গ্রিন কারি আর রাইস খেয়ে গরম টু গো কফির কাপে হাত সেঁকতে সেঁকতে যখন অর্চিষ্মান আমাকে বাসস্ট্যান্ডে ছেড়ে দিতে এল, তখন মেঘকুয়াশা কেটে আকাশ একেবারে দ্বিধাহীন নীল, আর তাতে ফুটে আছে নিঃশঙ্ক তারা - সেই দিনটা থেকে যদি হিসেব করা হয় তবে আমরা একসঙ্গে আছি সাড়ে ছ’বছরের সামান্য কম সময়।

আর যদি এইসব সংজ্ঞায় আপনার আস্থা নয়া থাকে, যদি আপনি বিশ্বাস করেন ওইসব নিজেদের হয়ে নিজেরাই নেওয়া “এইবার আমরা একসঙ্গে থাকব” সিদ্ধান্তে কিছু চিঁড়ে ভেজে না, সে সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিতে একজন বেঁটেখাটো রেজিস্ট্রার লাগে, সমাজের আরও তিনজন মান্যগণ্য ভদ্রমহোদয় মহিলার সাক্ষ্য লাগে, অ্যাটেস্ট করা রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবি, আসামী দুজনের সই এবং টিপছাপ লাগে, আর এসবের ওপর যদি সামান্য সানাই, পাড়াশুদ্ধু লোক আর কবেকার সুতো ছিঁড়ে যাওয়া আত্মীয়স্বজন, রিমা ক্যাটারারের বেবি নান আর মাটন বিরিয়ানি, আর মে মাসের ভ্যাপসানো সারাদিনের পর  সন্ধ্যেবেলা ঠিক যতটুকু দরকার ততটুকু বৃষ্টি নেমে হাওয়া ঠাণ্ডা করে দেওয়া থাকে তাহলে অধিকন্তু ন দোষায় - তবে এই সব আনুষঙ্গিকমণ্ডিত সেই সন্ধ্যেটা থেকে গুনলে আমি অর্চিষ্মানের সঙ্গে আছি আজ কাঁটায় কাঁটায় তিন বছর।

সঙ্গে আছি। উঠছি, বসছি, খাচ্ছি, শুচ্ছি, রাস্তায় হাঁটছি। হাত ধরে বা না ধরে, হাসতে হাসতে বা সিরিয়াস মুখে, ফুরফুরে মেজাজে ঝালমুড়ি খেতে খেতে, অফিসের পর ধুঁকতে ধুঁকতে। তরমুজের ভারে পলিথিনের হ্যান্ডেল আঙুল কেটে বসে যাচ্ছে। অফিস কেটে ডেটে যাচ্ছি, ডাক্তারখানায় গিয়ে লাইন দিচ্ছি। কপালে শিকে ছিঁড়লে ভোররাতে ট্যাক্সি ধরে পাহাড়ে পালাচ্ছি, আর না ছিঁড়লে রোজ সকালে ট্যাক্সি ডেকে ডেসটিনেশনের খোপে লিখছি “ওয়ার্ক”। কোনদিন যে কেমন কাটবে কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না। এই ভীষণ সুখ, এই অল্প মন খারাপ, এই গায়ের রক্ত জমিয়ে দেওয়া টেনশন, এই ফ্রাইডে নাইটের হাত পা এলিয়ে দেওয়া আরাম। এই সব নিয়ে ভীষণ সাসপেন্সফুল, ভীষণ ইন্টারেস্টিং, ভীষণ রোমহর্ষক সহবাস করছি আমরা।

কিন্তু আরও এক ভাবে আমি অর্চিষ্মানের সঙ্গে আছি। আরও একটা জায়গায় আছি। এই রুদ্ধশ্বাস রিয়েল লাইফটার বাইরে। এর মান অপমান, প্রাপ্তি, দম্ভ, টেনশন, দুঃখ, সব হুশ হুশ করে চোখের সামনে দিয়ে ছুটে চলে যাচ্ছে কোন চুলোয় কে জানে, আমি আর অর্চিষ্মান সাইডলাইনে বসে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে দেখছি আর হাসছি। 

আমি একা হলে পারতাম না। রিয়েল লাইফ আমাকে দুমড়ে, মুচড়ে, হাঁটিয়ে, ছুটিয়ে, বেদম করে ফেলত। দৈনিক ঘটনার ঢেউয়ে উঠতে নামতে, নিজের কুটিল মনের প্রতিটি ভ্রূভঙ্গির হিসেব রাখতে গিয়ে আমি নাকালের হদ্দ হতাম। অর্চিষ্মান আমাকে যে হেনস্থা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আমি জানি, আমার এই আমিটার রোজকার দিনরাতের ওপর দিয়ে যতই ঝড় বয়ে যাক না কেন, আমার আরেকটা আমি এইসব ঝুটঝামেলার হাত ছাড়িয়ে পালিয়েছে। ঝড়ের নাগালের বাইরে, অর্চিষ্মানের পাশে বসে মহানন্দে ছুটি কাটাচ্ছে। 

সে ছুটির দিন নেই, মাস নেই, বছর নেই, গুনতি আর হিসেব নেই, শুরুও নেই, শেষও নেই। পাহাড় নেই, সমুদ্র নেই, টিকিট নেই, ট্রিপঅ্যাডভাইসর নেই। খালি আমি আছি, অর্চিষ্মান আমার সঙ্গে আছে, আর আকণ্ঠ নিশ্চিন্তি আছে। আজ আমাদের বিয়ের তিন বছরের জন্মদিনে তিন, চার, পাঁচ, পঁচিশ, তিরিশ, ষাণ্মাসিক, বার্ষিক, ত্রৈরাশিকের হিসেবহীন, চিন্তাহীন, বাঁধনহীন সে ছুটিটা অনন্ত হোক, এই আমার চাওয়া।


May 10, 2016

Writing Tag



উৎস গুগল ইমেজেস

লোকের লেখা পড়তে তো আমার ভালো লাগেই, কিন্তু লোকে কী করে লেখে সেটা পড়তেও সমান ভালো লাগে। কখন লেখে, কোথায় লেখে, টানা লেখে না লিখতে লিখতে বার বার জল খেতে ওঠে এইসব। যাঁরা বিখ্যাত লেখক তাঁদের সৃষ্টির প্রক্রিয়ার কথা তো জানতে ইচ্ছে করেই, কিন্তু ইন্টারনেটের সুবিধে হচ্ছে আমার মতো অলেখকরাও চাইলে নিজেদের কথা নিজেরা বলতে পারি। 'রাইটিং ট্যাগ বলে একটা প্রশ্নপত্র আছে ইন্টারনেটে, আমি সেটা সলভ্‌ করে ছেপে দিলাম। যেহেতু ট্যাগটা ওদের দেশে তৈরি, তাই তাতে নানারকম আগডুম বাগডুম প্রশ্ন ছিল, যেমন ‘হাতের লেখা' প্রিন্টেড না কার্সিভ?' যেগুলো আমার ক্ষেত্রে অবান্তর। কাজেই আমি সেগুলো বাদ দিয়ে নিজে কিছু প্রশ্ন যোগ করেছি। আরও একটা ডিসক্লেমার, আমি এখানে ব্লগিংকে রাইটিং-এর সঙ্গে একাকার করে দেখেছি, আশা করি সত্যিকারের রাইটাররা রাগ করবেন না।


*****

১। লেখার আইডিয়া আসে কোথা থেকেঃ অন্যের লেখা, গল্পের বই, রাস্তাঘাট থেকে। অসংখ্য, অগুন্তি আইডিয়া। আমার সমস্যাটা আইডিয়ার অভাবের নয়। আমার সমস্যা হল সেই আইডিয়াগুলোর পেছনে সময় না দেওয়ার।

২। আইডিয়ার পাওয়ার পরঃ লেখা শুরু হয়। একটা ব্যাপার আমি বার বার খেয়াল করেছি, আইডিয়া বেশিদিন ফেলে রাখলে অবধারিত সেটাকে বোকা বোকা মনে হয়। মনে হয়, মাগো, এই নিয়ে আবার লেখে কী করে লোকে? কাজেই পত্রপাঠ লেখা শুরু করা দরকার। লেখার শুরু, মাঝখান, শেষ তক্ষুনি মাথায় আসে না। খানিকক্ষণ বিষয়টা নিয়ে আনতাবড়ি টাইপ করার পর মনে হয় আচ্ছা, এইভাবে শুরু করা যেতে পারে। তাছাড়া লেখা শুরুর আগে এবং চলাকালীন যে সব পয়েন্টগুলো মাথায় আসে আলাদা কোনও জায়গায় লিখে রাখলে সুবিধে হয়ে দেখেছি। এখন আমি গোয়েন্দা পরাশর বর্মা-কে নিয়ে একটা পোস্ট লিখছি, তার পয়েন্টস তালিকা আপাতত এইরকম দেখাচ্ছে (এই পয়েন্টগুলো অবশ্য লিখতে লিখতে নয়, পড়তে পড়তে মাথায় এসেছে, তবু উদাহরণ হিসেবে দিলাম।)-

পরাশর বর্মা সত্যি একজনের ছায়াবলম্বনে
কবি হিসেবে তিনি মান পেতে চান, গোয়েন্দা হিসেবে নয়
"দোলা দেবার মতো মেয়ে/ যেন সমস্ত চোখের জল শুকিয়ে গিয়ে মরা নদীর বালি আর নুড়িগুলো বেরিয়ে আছে। "
একবারে পুরো গল্পটা বলা হচ্ছে, গল্পের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এগোচ্ছি না। 
পরাশর ও সাংঘাতিক শিশিঃ বম্বে
পরাশর ও অশ্লীল গল্পঃ দিল্লি
নামকরণের অ্যাংগেল
মাঝখান থেকে গল্প শুরু করার প্রবণতা
বোম্বাই বার বার ফিরে ফিরে এসেছে, প্রেমেন্দ্র মিত্রের বম্বে যাওয়ার ব্যাপারটা লিখতে হবে
ঘনাদার ছাপ, ভাঙা রেডিও, ইনফ্রারেড আলোর ক্যামেরা আর টেপরেকর্ডার বসানো (আসলে নেই)
পরাশরের কবিতা দর্শন বোঝানোর জন্য 'পরাশর বর্মা ও কবিতার ঘণ্ট’ থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে (সমগ্র ২)
কবিতার ঘণ্ট-তে খুনি পরাশর বর্মাকে ডাক পাঠাচ্ছে, সেই চমকও আছে। 
কোথাওই/ বেশিরভাগ গল্পেই ক্লায়েন্টের সঙ্গে পরাশরের প্রথম মোলাকাত দেখা যায় না। 
পরাশর শখের বৈজ্ঞানিক
 প্লটবৈচিত্র্যঃ ত্রিকোণ প্রেমের গল্প, বিদেশী মুদ্রা পাচার…।

ফাইন্যাল লেখায় খুব সম্ভবত সবগুলো পয়েন্ট ছুঁয়ে যাওয়া হবে না, তবু কী কী ছুঁয়ে যাওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে একটা ধারণা করার জন্য এই লিস্ট খুব কাজে দেয়।

৩। লেখার স্পিডঃ মারাত্মক ঢিলে। আমি খেয়াল করে দেখেছি, ফাঁকিবাজি, ইন্টারনেট চেক, জল খাওয়া, বাথরুম যাওয়া ইত্যাদি মিলিয়ে আমি গড়ে দু’ঘণ্টায় মোটে শ’পাঁচেক শব্দ লিখি/টাইপ করি। 

৪। কোথায় লিখতে ভালো লাগে? খাটে বসে। কিন্তু অচিরেই বসাটা আধশোয়া এবং তারপর শবাসনের রূপান্তরিত হয়, যে ভঙ্গিটা লেখার পক্ষে অসুবিধেজনক। কাজেই ভালো না লাগলেও লেখার জন্য চেয়ারটেবিল আদর্শ। বিছানার ওপর অনেকসময় ছোট টেবিলটা নিয়ে বসি, কিন্তু ওই পুঁচকে টেবিলকেও কান ধরে নামিয়ে দিতে কতক্ষণ? কাজেই সেফেস্ট হচ্ছে চেয়ারটেবিলে বসে লেখা।

৫। কখন লিখতে ভালো লাগে? লেখার বিষয়বস্তু মাথায় থাকলে এবং মনে সদিচ্ছা থাকলে সারাদিনই লিখতে ভালো লাগে। কিন্তু সেটা খেয়েপরে বাঁচার পক্ষে বিশেষ অনুকূল নয়। কাজেই আমি চেষ্টা করি ভোরবেলা লিখতে। এতে দুটো সুবিধে হয়। এক, দিনের শুরুটা একটা ভালোলাগা কাজ দিয়ে করা যায়। আর সারাদিন ‘লিখলাম না লিখলাম না' সে অপরাধবোধ বা আফসোস হয় না।

৬। লেখার টার্গেটঃ হয় দু’ঘণ্টা নয় এক হাজার শব্দ। রোজ হয় না বলাই বাহুল্য, কিন্তু রোজ যে হওয়ানোর ইচ্ছে থাকে সেটা সত্যি। 

৭। লিখতে লিখতে গান শুনি কি? শুনি, তবে বাণীপ্রধান নয়। সেগুলো ভাবনায় ছেদ ঘটায়। বেস্ট হচ্ছে হিন্দুস্থানী মার্গ সংগীত। শুনতেও ভালো, কাজেও অসুবিধে করে না।

৮। একসময় কি একটা লেখাই লিখি? পাগল? পাঁচশোটা ড্রাফট, একেকটা একেক স্টেজে আটকে থাকে। একটার থেকে আরেকটায় লাফালাফি করে বেড়াই। কোনওটাই শেষ করি না।

৯। লেখাসংক্রান্ত প্রিয় উদ্ধৃতিঃ অনেক আছে, তবে নিচে যে দুটো লিখলাম সে দুটো আমার মতো প্রতিভাহীনদের আশ্বস্ত করার জন্য দরকারি।

I think that all writing is useful for honing writing skills. I think you get better as a writer by writing, and whether that means that you're writing a singularly deep and moving novel about the pain or pleasure of modern existence or you're writing Smeagol-Gollum slash you're still putting one damn word after another and learning as a writer.
                                                                                                              —Neil Gaiman

Quantity generates quality. 
                                                                                                      — Ray Bradbury 

১০। কম্পিউটার না খাতা? কম্পিউটারের সুবিধে হচ্ছে কম সময়ে বেশি লেখা যায়। আমার (এবং বাকি সবারই আমার ধারণা) হাতের লেখার থেকে টাইপিং-এর স্পিড অনেক বেশি। তাছাড়াও এন্ড প্রোডাক্টটা যেহেতু কম্পিউটারেই যাবে, টাইপ করার সময়টা বাঁচে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে খাতার উপযোগিতা অনস্বীকার্য। এক, ইন্টারনেটের ছোঁয়া নেই, দুই, যেহেতু বাধ্য হয়েই সময় বেশি লাগে, লিখতে লিখতে মাথা চালানোর সুযোগটা বেশি থাকে। অর্থাৎ, ব্রেনস্টর্মিং-এর পর্যায়ে খাতা বেটার। তবে আমার মতো লোকের খাতায় লেখার অসুবিধে হচ্ছে যে আমার সবসময়েই নতুন খাতায় লিখতে ইচ্ছে করে। কাজেই তারা সংখ্যায় রক্তবীজের মতো বাড়তে থাকে। শত শত খাতা, ডায়রি, নোটপ্যাড মাত্র দু’তিন পাতা লেখা হয়ে বাড়িতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ওগুলোতে আর ফিরে গিয়ে লেখা হবে না জানি, কিন্তু কত রেনফরেস্ট কচুকাটা করে ওই সব খাতা বানানো হয়েছে মনে পড়লে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হাত কাঁপে।

১১। প্রিয় পেন? সেলো ব্র্যান্ডের যে কোনও পেন। আপাতত সেলো ফাইনগ্রিপ-এ লিখছি। কোন্‌ কনফারেন্স-এ যেন দিয়েছিল।

১২। লিখতে লিখতে খাওয়া? নাঃ। বড্ড ডিস্ট্র্যাক্টিং। বড়জোর চা চলতে পারে। বিস্কুট ছাড়া।

১৩। লেখার জন্য সবথেকে উপকারীঃ পড়া

১৪। লেখার জন্য সবথেকে ক্ষতিকরঃ ইন্টারনেট

১৫। গোটা ব্যাপারটার মধ্যে সবথেকে শক্ত ব্যাপারঃ লেগে থাকা। লিখতে লিখতে নিজেই যখন বুঝি লেখাটা জঘন্য হচ্ছে তখনও ‘হোক খারাপ, তবু লিখব’ বলে ল্যাপটপ বা খাতা কামড়ে পড়ে থাকা।

১৬। লেখাবিষয়ক কোন অভ্যেস আমার আশু দরকারঃ যা শুরু করেছি, তা শেষ করা।

১৭। কেন লিখি? একসময় মনে হত, বিখ্যাত হওয়ার জন্য। এখন মনে হয়, না লিখলে খুব খারাপ লাগবে, তাই।



May 09, 2016

এ মাসের বই/ এপ্রিল ২০১৬/ প্রথম পর্ব



The Little Stranger/ Sarah Waters


উৎস গুগল ইমেজেস

একটা চমৎকার দৃশ্য দিয়ে গল্প শুরু করেছেন সারা ওয়াটারস। এলাকার বিখ্যাত বাড়ি হান্ড্রেডস-এর মাঠে মেলা বসেছে। গ্রামের সব লোক ঝেঁটিয়ে এসেছে। বালক ফ্যারাডেও এসেছে মায়ের সঙ্গে। হান্ড্রেডস-এর কর্তা কর্নেল আয়রেস দৃপ্ত ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পারদর্শিতার পুরস্কার হিসেবে মেডেল দিচ্ছেন  লেডি আয়রেস। পড়াশোনায় ভালো ফ্যারাডেও লাইনে দাঁড়িয়ে সে মেডেল নিচ্ছে। সোনারোদে ঝলমল করছে হান্ড্রেডস-এর বিরাট প্রাসাদ। তার খোলা দামি, ভারি কাঠের দরজা জানালায় বাঁধা রঙিন ফিতে জানান দিচ্ছে মাঠে অবাধ বিচরণের সুযোগ থাকলেও তার ভেতরে ঢোকার অধিকার কারও নেই।

কিন্তু ফ্যারাডের আছে। কারণ তার মা হান্ড্রেডস-এর প্রাক্তন পার্লারমেড। মেলার শেষে ফ্যারাডের সব বন্ধু যখন মাঠ থেকে ফিরে গেছে, মায়ের সহকর্মীদের ষড়যন্ত্রে চুপিচুপি পেছনের দরজা দিয়ে ফ্যারাডে তার মায়ের সঙ্গে হান্ড্রেডস-এর রান্নাঘরে ঢুকে আসে। মা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করেন আর অন্ধকার রান্নাঘরের বিরাট টেবিলে বসে ফ্যারাডে মেলার জন্য বানানো মিষ্টি খায়। তারপর সবার নজর যখন কোনও কারণে অন্যদিকে সরে গেছে, চুপিচুপি সে চাকরদের অঞ্চল ছেড়ে মূল বাড়িতে ঢুকে আসে। পকেট থেকে পকেটনাইফ বার করে হান্ড্রেডস-এর দেওয়াল থেকে একটি প্লাস্টারের অলঙ্করণ উপড়ে, পকেটে পুরে বাড়ি ফিরে যায়।

তারপর টেমস দিয়ে অনেক জল বয়ে যায়। ইংল্যান্ডের বিশ্বশাসকের মুঠো শিথিল হচ্ছে। (ইন ফ্যাক্ট, যে বছরে লিটল স্ট্রেঞ্জার-এর ঘটনাগুলো ঘটছে, সেটা উনিশশো সাতচল্লিশ, আমরা স্বাধীন হচ্ছি।) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে, কৃচ্ছ্রসাধনের বোঝায় দেশ ধুঁকছে। বংশগরিমা আর সম্পদের গর্বে যারা সমাজের মাথায় চেপে বসে ছিল, তারাও গায়েও আঁচ এসে লাগছে। সোজা কথায়, ‘ব্রিডিং’ ধুয়ে আর জল খাওয়া যাচ্ছে না। ফ্যারাডে বালক থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছেন, ডাক্তারি শিখে আবার পুরোনো গ্রামেই ফিরে এসেছেন। তিনিও খানিক হতাশই বলা চলে। ওয়ার্কিং ক্লাসের চক্রব্যূহ ভেঙে বেরিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাতে মোক্ষলাভ কিছু হয়নি। প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেও অকৃতদার রয়ে গেছেন, পসারও যে খুব জমেছে তেমন নয়।

এমন সময় একটা ঘটনা ঘটে গেল। পারিবারিক ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে হান্ড্রেডস-এর একমাত্র কাজের মেয়ে ‘বেটি’র চিকিৎসার জন্য তাঁর ডাক পড়ল। সেই মেলার দিনের উত্তেজনা বুকে নিয়ে ফ্যারাডে গেলেন হান্ড্রেডস-এ। গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাঁর শৈশবের অবসেশন, অচিনপুরী হান্ড্রেডস ধুঁকছে। ভেঙে পড়েছে। সময় লক্ষ লক্ষ বালক ফ্যারাডের রূপ ধরে এসে পকেটনাইফ দিয়ে খুঁড়ে তুলে নিয়ে গেছে হান্ড্রেডস-এর সমস্ত অলংকার, সাজ, দর্প। তার ধ্বংসস্তুপের মধ্যে ভূতের মত ঘুরে বেড়াচ্ছেন দারিদ্র্যকবলিত মিসেস আয়রেস, তাঁর ছেলে রডরিক আর মেয়ে ক্যাথরিন, বেটি আর ক্যাথরিনের পোষা কুকুর জিপ।

চিকিৎসা করতে গিয়ে ডক্টর ফ্যারাডে বুঝলেন বেটি-র আসলে কোনও অসুখ হয়নি। বেটি অসুখের ভান করছে। ডক্টর ফ্যারাডে যখন সে কথাটা ধরে ফেললেন বেটি কেঁদে ফেলল। বলল, ওর এ বাড়িতে থাকতে ভয় করে। অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে, দীর্ঘ করিডর বেয়ে চলাচল করতে আর ওই লাইব্রেরিটা, ওর বুকশেলফের ফাঁকে ফাঁকের অন্ধকারগুলো, ওর পুরোনো পোকায় কাটা হলুদ কাগজের সোঁদা গন্ধওয়ালা ওই লাইব্রেরিটা পরিষ্কার করতে। এ বাড়িতে খুব খারাপ কিছু একটা আছে, বেটি জানায় ডাক্তারকে।

হান্ড্রেডস হাউসে সত্যি খারাপ কিছু আছে কি না, নাকি সবই বেটি-র চোদ্দ বছরের মনের কল্পনা সেটা জানতে হলে আপনাদের বইটা পড়তে হবে। ডক্টর ফ্যারাডে আসার পরে পরেই হান্ড্রেডস-এ যে সব অদ্ভুত, ভূতুড়ে ঘটনা ঘটতে শুরু করে সেগুলোর জন্য কোনও শয়তান অশরীরী শক্তি দায়ী (বেটির বিশ্বাস) নাকি সবগুলোরই একটা সরল যুক্তিগ্রাহ্য বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা আছে ((ডক্টর ফ্যারাডের মত) সেটা জানতে হলেও।

দ্য লিটল স্ট্রেঞ্জার নিয়ে আলোচনা দুটো রাস্তায় করা যায়। গল্পে এভিল-এর উপস্থিতি, এলিট শ্রেণীর পতন ইত্যাদি গুরুতর থিমের উপস্থিতি নিয়ে। কিংবা ভূতের গল্প হিসেবে এর সার্থকতা নিয়ে। আমি কোন রাস্তাটা নেব সেটা নিয়ে আপনাদের নিশ্চয় সন্দেহ নেই।

দ্য লিটল স্ট্রেঞ্জার একেবারে জাত ভূতের গল্প। মাঝে মাঝে বিশ্বাস হয় না এটা লেখা হয়েছে এই সেদিন, দুহাজার নয় সালে। সারা ওয়াটারস-এর ভাষা একেবারেই সেকেলে নয়। কিন্তু গায়ে কাঁটা দেওয়ানোর ধরণটা সেকেলে। আধুনিক জাপানি সিনেমার মতো এখানে টিভি থেকে ভূত সশরীরে বেরিয়ে আসে না, বরং বিরাট প্রাসাদের কোণে কোণে ঘাপটি মেরে থাকে, ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাতের অন্ধকারে তাদের পায়ের শব্দ পাওয়া যায়, দীর্ঘ শূন্য করিডরে তারা হেঁটে বেড়ায়। অ্যালগারনন ব্ল্যাকউড, হেনরি জেমস, এইচ পি লাভক্রাফট, এডগার অ্যালান পো ইত্যাদি বাঘা বাঘা ভৌতিক লেখকের অবদান জোরগলায় স্বীকার করেছেন।

দ্য লিটল স্ট্রেঞ্জার-এর আরও একটা জিনিস আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। গল্পের একেবারে শেষ পর্যন্ত একটা সাসপেন্স টেনে নিয়ে গেছেন ওয়াটারস। মানে আমি অন্তত বুঝতে পারছিলাম না যে দোষী আসলে কে, ভূত না মানুষ। কারণ হান্ড্রেডস-এ গোলমাল পাকানোর মোটিভ ভূত ছাড়াও আরও অনেকের ছিল। হান্ড্রেডস আর হান্ড্রেডস-এর আশেপাশের বিস্তীর্ণ জমি গিলে খেতে চাওয়া রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার ছিল, বাড়ির সদস্যদের প্রচ্ছন্ন উন্মাদনার ইতিহাস ছিল, ক্যাথরিনের সব মায়ার বাধন কাটিয়ে মুক্তির ইচ্ছে ছিল, আর ডক্টর ফ্যারাডের শৈশবলালিত অবসেশন তো ছিলই।

শেষপর্যন্ত দোষী কে বেরোলো, ভূত না মানুষ, সেটা জানতে গেলে আপনাদের বইটা পড়ে দেখতে হবে।

*****

Midnight in the Garden of Good and Evil: A Savannah Story/John Berendt

উৎস গুগল ইমেজেস

এমনিই খুনখারাপির গল্প মানুষের ভালো লাগে, সে খুনখারাপি যদি সত্য ঘটনা অবলম্বনে হয় তা হলে তো সোনায় সোহাগা। আমাদের চেনা এই ধরণের সাহিত্যের উদাহরণ হল আরুশি তলওয়ারের খুনের ঘটনা নিয়ে লেখা অভিরূক সেনের ‘আরুশি’। অবশ্য ইরফান খান, কঙ্কণা সেনশর্মা অভিনীত ‘তলওয়ার’ সিনেমাটাও ট্রু ক্রাইম শিল্পের উদাহরণ।

বিশ্ববিখ্যাত ট্রু ক্রাইম লিটারেচারের যে কোনও লিস্টের দুই বা তিন নম্বরে যে বইটার নাম থাকবে, সেই বইটা আমি এমাসে পড়লাম। জন বেরেন্ডট-এরMidnight in the Garden of Good and Evil: A Savannah Story। বইটার কথায় যাওয়ার আগে ক্রাইমটার কথা বলে নেওয়া যাক। জেমস আর্থার উইলিয়ামস ছিলেন জর্জিয়া রাজ্যের সাভানা শহরের একজন অত্যন্ত সফল অ্যান্টিক ডিলার এবং হাউস রেস্টোরার। সাভানা অত্যন্ত প্রাচীন শহর এবং সেই প্রাচীন শহরে রেস্টোর করার মতো প্রাসাদের অভাব ছিল না, এবং জিম উইলিয়ামস অচিরেই নিজেকে সে কাজে সফল প্রমাণ করেছিলেন। উনিশশো ঊনসত্তর সালে জিম উইলিয়ামস ‘মার্সার হাউস’ নামে একটি অব্যবহৃত পুরোনো অট্টালিকা কেনেন, এবং রেস্টোর করে বেচে দেওয়ার বদলে নিজেই থাকতে শুরু করেন। একাই। উনিশশো একাশি সালের দোসরা মে, গভীর রাতে ওই মার্সার হাউসের একটি ঘরে একান্ন বছরের জিম উইলিয়ামস তাঁর অ্যানটিক ব্যবসার কর্মচারী এবং নিজের যৌন সঙ্গী একুশ বছরের যুবক ড্যানি হ্যান্সফোর্ডকে গুলি করে মারেন। উইলিয়ামস দাবি করেন ঘটনাটি আত্মরক্ষামূলক। ড্যানি তাঁর দিকে প্রথমে গুলি চালায়, ড্যানিকে তিনি না মারলে ড্যানি তাঁকে মেরে ফেলত। জিমের বন্দুকটির সঙ্গে সঙ্গে সত্যিই পুলিশ অফিসাররা ড্যানির মৃতদেহের ঠিক পাশে আরেকটি বন্দুক (সেটাও জিম উইলিয়ামসের বন্দুক। জিম উইলিয়ামস নিজের বাড়িতে একাধিক বন্দুক রাখতেন এবং বিশ্বশুদ্ধু লোক সে কথা জানত) আবিষ্কার করে। সেই বন্দুকটা থেকেই যে গুলি ছোঁড়া হয়েছে জিম উইলিয়ামস ঘটনার সময় যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন (অ্যাট লিস্ট, যেখান থেকে তিনি ড্যানিকে গুলি করেছিলেন) সেদিকে গুলি ছোঁড়া হয়েছে তার প্রমাণও পাওয়া যায়।

জিম উইলিয়ামসকে পুলিস গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল। বিচার হল। ড্যানি হ্যান্সফোর্ডের এলাকায় যা পরিচিতি ছিল, তাতে আত্মরক্ষার জন্য উইলিয়ামসের গুলি চালানোর দাবিটা খুব একটা অবিশ্বাস্য ছিল না, কিন্তু কয়েকটা সামান্য ডিটেলের উপস্থিতি, বা অনুপস্থিতি, জিম উইলিয়ামসকে প্যাঁচে ফেলে দিল। ড্যানির বন্ধুদের সাক্ষ্য, ড্যানির মৃতদেহের পড়ার ভঙ্গি ইত্যাদি। নির বন্ধুরাও ড্যানির মতোই ছিল, তাদের সাক্ষ্য খুব একটা অসুবিধে করতে পারত না। জিম উইলিয়ামসকে প্যাঁচে ফেলল আরেকটা ছোট্ট ডিটেল। বা ডিটেলের অনুপস্থিতি। ড্যানি হ্যান্সফোর্ডের হাতে, জামায়, শরীরের কোথাও গানপাউডারের চিহ্নমাত্র ছিল না।

জর্জিয়া রাজ্যে জিম উইলিয়ামস প্রথম ব্যক্তি একই অপরাধের জন্য চারবার যাঁর ট্রায়াল হয়। উনিশশো বিরাশি সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমবার জিম উইলিয়ামস খুনের দায়ে যাবজ্জীবন সাজা পান এবং পুনর্বিচারের জন্য আবেদন করেন। এর মধ্যে উইলিয়ামসের উকিলের কাছে নতুন তথ্যপ্রমাণ এসে জড়ো হয় এবং আগের রায় বানচাল হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার ট্রায়াল শুরু হয়, জিম উইলিয়ামস আবার সাজা পান। আবার নতুন প্রমাণ আসে। তৃতীয়বার ট্রায়াল শুরু হয়। এবার যেটা হয় সেটা প্রায় টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান-এর গল্পের মতো। বারো জন জুরির মধ্যে এগারো জন জিমের অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও একজন মহিলা জুরির অনমনীয়তায় ট্রায়ালটি মিসট্রায়াল হিসেবে গণ্য হয়।

এই সব কাণ্ড হচ্ছিল সাভানাতেই। জিমের উকিলদের সেটা গোড়া থেকেই পছন্দ হচ্ছিল না। তাঁরা গোড়া থেকে কলরব করে আসছিলেন যে ড্যানি বদমাশ হোক, লুচ্চা হোক, লুম্পেন হোক, প্রমিসকিউইয়াস প্রস্টিটিউট হোক, তবু সে হচ্ছে সাভানার সন অফ দ্য সয়েল, কাজেই এ শহরে জিম উইলিয়ামসের নিরপেক্ষ বিচার সম্ভব নয়। অবশেষে তাঁদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল। ড্যানির হত্যার আট বছর পর চতুর্থ ট্রায়াল শুরু হল সাভানায় নয়, অগস্টায়। জুরি একঘণ্টার মধ্যে ফিরে এসে রায় দিল, জিম উইলিয়ামস নির্দোষ।

সসম্মানে ছাড়া পাওয়ার ছ’মাস পর জিম উইলিয়ামস, মাত্র ঊনষাট বছর বয়সে, তাঁর সাভানার মার্সার হাউসে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। সেই ঘরে, যে ঘরে ন’বছর আগে তিনি ড্যানিকে আত্মরক্ষার্থে গুলি করে মেরেছিলেন। মিডনাইট-এর লেখক বেরেন্ডট দাবি করেছেন, ন’বছর আগে ড্যানির গুলি যদি সত্যি সত্যি জিম উইলিয়ামসের গায়ে বিঁধত, তাহলে তিনি ঘরের ঠিক যে জায়গাটায় পড়ে মরতেন, হার্ট অ্যাটাকটাও নাকি হয়েছিল অবিকলসেই স্পটে। তবে বেরেন্ডট সেটা সাহিত্যের খাতিরে রং চড়িয়েছিলেন কিনা সে সম্বন্ধে আমার সন্দেহ রয়েই যাচ্ছে।

এবার গল্পে আসা যাক। গল্পের লেখক জন বেরেন্ডট নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকতা করতেন, কিন্তু সিটির গোলযোগ থেকে বাঁচতে তিনি সাভানা বেড়াতে যান এবং পত্রপাঠ সাভানার প্রেমে পড়ে যান। তালেগোলে জিম উইলিয়ামসের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বও হয়। গোটা দশ বছর তিনি সাভানার জীবনযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ছিলেন। সেই সময়েই জিম উইলিয়ামস এবং ড্যানি হ্যান্সফোর্ডের চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। একদিক থেকে দেখতে গেলে মিডনাইট বেরেন্ডট-এর সাভানা বাসের স্মৃতিকথা। গোটা বইটি লেখা হয়েছে ছোট ছোট চ্যাপ্টারে। শুরুর দিকে বেশ কয়েকটি চ্যাপ্টারে সাভানার বিভিন্ন চরিত্রের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। বিচিত্র, বর্ণময় সব চরিত্র। একজন বুড়ো লোক আছেন তিনি সাভানার রাস্তায় রাস্তায় হাঁটেন, লোকজন আসছে দেখলে দাঁড়িয়ে তাদের অপেরার গান শোনান, আর মাঝে মাঝে পেছন দিকে তাকিয়ে একটি অদৃশ্য কুকুরকে বলেন পা চালিয়ে আসতে। চরিত্রগুলো এতই গল্পের মতো যে বেরেন্ডট তাদের সত্যি সত্যি সাভানায় দেখেছিলেন নাকি মন থেকে বানিয়ে লিখেছেন সন্দেহ জাগে। এই সব গল্পের মাঝে মাঝে জিম উইলিয়ামস-এর জীবনে ঘনিয়ে আসা ঝড়ের আভাস যে পাওয়া যায় না তা নয়, তবে তা ওই আভাসই। শেষদিকের ক’টি চ্যাপ্টারে লেখক সম্পূর্ণভাবে জিম উইলিয়ামস-এর ট্রায়ালের বর্ণনায় ডুব দেন। সেটা প্রত্যাশিত, কারণ ওই সময় উইলিয়ামসের বিচারের থেকে বেশি আলোচিত ঘটনা সাভানায় আর ছিল না।

মিডনাইট গল্পের ভালো আর মন্দ একে অপরের সঙ্গে এমন মেশামেশি হয়ে আছে যে আলাদা করে তাদের চিহ্নিত করা খুব মুশকিল। মানুষের চরিত্রের একই বৈশিষ্ট্য যেমন পরিস্থিতি ভেদে গুণ এবং দোষ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে, মানে অংক না মেলা পর্যন্ত খাতা ছেড়ে না ওঠার গোঁয়ারতুমি যেমন প্রশংসনীয়, তেমন টিভি দেখা বা বড়দের কথা না শোনার ক্ষেত্রে সেই গোঁয়ারতুমিই মহা দোষ, মিডনাইট- বইয়েরও সেরকম ব্যাপার। লেখকের সাভানাবাসের মেমোয়ার হিসেবে যদি দেখতে যান তাহলে মিডনাইট চমৎকার। কিন্তু যদি নন-ফিকশনাল ক্রাইম উপন্যাসের ধ্বজাধারী হিসেবে একে প্রতিষ্ঠা করতে যান, তাহলে মুশকিল। তাহলে আপনার চোখে পড়বে একটা ঢিলে-বাঁধুনি উপন্যাস, যার শুরুর অর্ধেকটার শেষের অর্ধেকটার সঙ্গে যোগ প্রায় নেই। শুরুটা যেন ক্যারেকটার স্টাডিজ-এর সিরিজ, একেকটা চ্যাপটার যেন একেকটা ছোটগল্প। আর শেষের অর্ধেক যেন হুড়মুড়িয়ে বলা একখানা কোর্টরুম ড্রামা। 

জন বেরেন্ডট-এর লেখার হাত সুন্দর। ছবির মতো সাভানা দেখতে পাবেন আপনি। কল্পনাশক্তি বা ইমপালস বেশি হলে ভিটেমাটি তুলে সাভানায় গিয়ে তাঁবু ফেলার ইচ্ছেও আশ্চর্য নয়। 

ও হ্যাঁ, আর উনিশশো একাশির দোসরা মে রাত্তিরে সত্যি সত্যি কী ঘটেছিল, জিম উইলিয়ামস ড্যানি হ্যান্সফোর্ডের দিকে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছিলেন না ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছিলেন, সেটা চার নম্বর এবং শেষ ট্রায়াল শুরু হওয়ার আগে তিনি বেরেন্ডটকে বলে গিয়েছিলেন। সেই সত্যিটা জানতে হলে আপনাদের কী করতে হবে সেটা আমি আর বলছি না।

মিডনাইট নিয়ে লেখার শুরুতে বলেছিলাম বিশ্ববিখ্যাত ট্রু ক্রাইম সাহিত্যের লিস্টের দুই বা তিন নম্বরে এই বইয়ের নাম থাকবে। ওই লিস্টের এক নম্বরে যে বইটার নাম থাকবে সেই বইটাও আমি পড়েছি এই মাসেই, কিন্তু সেটা নিয়ে লেখার আমার এই মুহূর্তে ধৈর্য নেই, ওটা পার্ট টু-এর জন্য তোলা রইল।

                                                                                                                  (চলবে) 



May 08, 2016

মাদার্স ডে



বেসনের ডিব্বার ওপর নিউট্রিলার লালহলুদ আধখালি বাক্সটা গ্যাঁট হয়ে বসে আছে সেই কবে থেকে। অ্যাকচুয়ালি, আমি জানি কবে থেকে। আগের বার যখন অর্চিষ্মান বাড়ি ছেড়েছিল, তবে থেকে। সয়াবিন খেতে আমার বেশ বেশিই ভালো লাগে, আর ও জিনিসের নাম শুনলে অর্চিষ্মান চোখ বিস্ফারিত করে, জিভ বার করে, দুহাত দিয়ে নিজের গলা টেপার ভঙ্গি করে নাটকীয়তার চূড়ান্ত করে। তাই আমি ও বাড়ি না থাকলে সয়াবিন রান্না করে খাই। এবারেও খেয়েছি। 

আগেরবারও রাঁধার আগে মাকে ফোন করেছিলাম, এবারও করলাম। 

"মা সয়াবিন কী করে রাঁধে গো?” 

রেসিপি বলে মায়ের অভ্যেস নেই, তাই কোনখানটা যে বিশদে বলতে হবে, আর কোনখানটা না বললেও চলবে সেটা গোলমাল করে ফেলেন। আলু কাটার নির্দেশাবলী দিতেই মায়ের লেগে গেল পাঁচ মিনিট।  আলু ভালো করে ধুয়ে নেবে, তারপর বড় না, ছোট না, আলুপোস্তর আলুর সাইজে টুকরো টুকরো করে কাটবে, ভীষণ সাবধানে, হাত যেন না কাটে, একা বাড়িতে রক্তারক্তি হলে কিন্তু সর্বনাশ, সোনা। বরং আলুটা বাদ দিবি নাকি? এমনিও ভালোই হবে…”

অনেক কষ্টে আলুর পর্ব থেকে ঠেলে মাকে বার করা গেল। তিনি সয়াবিনে পৌঁছলেন। “ওই তো, সয়াবিনগুলো একটা বাটিতে নিয়ে সেদ্ধ করবি তারপর জল ফেলে দিয়ে সয়াবিনগুলো ভালো করে চিপে… সাবধান সোনা, সয়াবিনের ফোঁপরের মধ্যে গরম জল ঢুকে থাকে কিন্তু, এমনি বোঝা যায় না, চিপতে গেলে মারাত্মক গরম লাগে, তুই বরং খানিকক্ষণ রেখে বা ঠাণ্ডা করে নিস বা ঠাণ্ডা জল ঢালিস… আচ্ছা সয়াবিন ছাড়া অন্য কিছু রাঁধলে হয় না?” 

এর পরেও যারা মেজাজ ঠাণ্ডা, গলা মৃদু রাখতে পারে তারা প্রতিভাবান।

"ওরে বাবা মা, থামবে? সয়াবিন কতক্ষণ সেদ্ধ করতে হবে সেটা বল, জল কী করে চিপব সেটা আমি ভাবব।”

মা কয়েক সেকেন্ড ভেবে বললেন, "তোর তো দাঁত আছে, তুই মিনিট পাঁচেক সেদ্ধ করলেই হবে মনে হয়।”  

*****

হলুদসবুজ পাতিহাঁস আঁকা টেপফ্রক পরে সাবধানে পা ফেলে ফেলে এঘর থেকে ওঘর যাচ্ছি, ঠাকুরদা যত্ন করে বাড়ি বানিয়েছেন, বাড়ির থেকেও যত্ন করে বানিয়েছেন চৌকাঠ। একবার হোঁচট খেলে আর রক্ষা নেই, দাঁতের পাটির সঙ্গে ওখানেই শেষ দেখা। এমন সময় একটা বেশ জোর ধাক্কা আমার ভারসাম্যের দফারফা করে দিল। কোনওমতে সবুজ কাঠের ফ্রেম ধরে টাল সামলে দেখি মা কোমরে হাত দিয়ে ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি ভাবছি, হঠাৎ হল কী, এই তো দিব্যি রান্নাঘরে খুন্তি নাড়তে নাড়তে গান করছিলেন, কোথাও কোনও পাগলামোর চিহ্নমাত্র ছিল না, এমন সময় মা বলে উঠলেন, “কী হচ্ছে কী দাদা, দেখে চলতে পারেন না?”  

ওহ, খেলা। আমার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব চিরকালই বাড়ন্ত, আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম। এদিকে মায়ের ভুরুর ভাঁজ তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হয়ে উঠছে, কিছু একটা বলা দরকার তাড়াতাড়ি। মায়ের সংলাপটাই টুকে দিই অগত্যা। “আপনি দেখে চলতে পারেন না?” মা পা ঠুকে হুংকার ছেড়ে বললেন, “দেখতে না পান তো চশমা পরে চলুন।” আমি বললাম, “আপনি চশমা পরুন, আপনি চশমা পরুন।” টোকা সংলাপও খুব খারাপ বলা হচ্ছে। তেড়েফুঁড়ে, মুখচোখ ঘুরিয়ে, হাত নেড়ে ঝগড়ুটে পথচারীর ভূমিকায় এত ভালো আর এত বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করছেন মা যে আমার হাসি পেয়ে যাচ্ছে। অন্য কেউ হলে আমার মতো এমন বাজে খেলোয়াড়ের সঙ্গে আর কোনওদিন খেলত না, কিন্তু মায়ের ডিকশনারিতে হাল ছেড়ে দেওয়া কনসেপ্টটাই নেই। কাল আবার নতুন কোনও একটা খেলা হবে। রিকশাওয়ালা সওয়ারি খেলা, মুটে-মালিক খেলা। বিছানা পাতা বা তোলার সময় বালিশের ওপর বালিশ মাথায় চাপিয়ে “চালের বস্তা কোথায় রাখব, বাবু?’ খেলা। একজন ভীষণ ভালো খেলোয়াড়, অন্যজন চলনসইয়ের থেকেও খারাপ। কিন্তু খেলা থামবে না। 

*****

আমার মা’কে যারা ভালো চেনে তারা সকলেই জানে, কেউ কেউ মুখ ফুটে বলে। মণির মেয়ে ভালো, কিন্তু মণির মতো ভালো না। সে উদ্যম কোথায়? সে পরিশ্রম করার ক্ষমতা? সে মনের জোর? সে প্রাণশক্তি? মায়ের ভালো কিছুই আমি পাইনি। সত্যি বলতে বাবার ভালো কিছুও না। দুজনের বেছে বেছে যা যা সমস্যাজনক, সব আমার মধ্যে এসে জুটেছে। কিন্তু সত্যি বলছি, মায়ের ভালো আর কাজের গুণগুলোর প্রতি আমার কোনও লোভ নেই। বরং যে কোনও পরিস্থিতিতে একটা নতুন খেলা খুঁজে বার করার, ঘোর গুরুতর পরিস্থিতিতে একটিমাত্র হাস্যকর কথা বা দৃশ্য মনে টুকে নিয়ে পরে সুবিধেমতো সেগুলো ভেবে ভেবে একা একাই হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার যে অকাজের প্রতিভাগুলো মায়ের, সেগুলোর জন্য আছে। বুকের মধ্যে ওই অনন্ত ফুর্তির ফোয়ারাটা যদি থাকত। 

*****

কিন্তু মাদার্স ডে এলে মায়ের সম্পর্কে ভালো ভালো কথা ভেবে মুগ্ধ হওয়া আর মা না থাকলে আমার কী সর্বনাশ হত সে কথা ভেবে শিউরে ওঠার থেকেও বেশি গুরুতর চিন্তাটা হচ্ছে যে মাদার্স ডে আদৌ থাকা উচিত কি না। আর থাকলেও আমার মতো তাত্ত্বিক বুদ্ধিজীবীর হলমার্কের এমন পুঁজিবাদী ফাঁদে পা দেওয়াটা শোভা পায় কি না। আমার গোটা অস্তিত্বটার কৃতিত্ব যার, বছরের মাত্র একটা দিনে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বা ভালোবাসা জাহিরের কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আছে কি না। 

আমার তো নেই-ই। মাদার্স ডে থাকার যুক্তি থাকলেও নেই, না থাকলেও নেই। কারণ মায়ের প্রতি আমি কোনও কর্তব্য করি না। মা বেয়াল্লিশ ডিগ্রি গরমে ট্রেন বাস ঠেঙিয়ে কলকাতা যান অফিসে মেডিক্যাল বিল জমা দিতে, আমি এসি-তে বসে পা নাচাই।  মাঝেসাঝেই লোকজন কামাই করে, ঠাকুমার সঙ্গীসাথীরা আসব বলেও আসে না, আমার তেষট্টি বছরের মা নিচু হয়ে হয়ে সারা বাড়ি ঝাঁট দেন, আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে ক্যাডবেরি চকোলেটের মোড়ক গোল্লা পাকিয়ে ঘরের কোণের কাগজের ঝুড়িতে ফেলার তাক প্র্যাকটিস করি। অবধারিত কোমর ব্যথা হয় (আমার নয়), আমি ফোনে “কেন তুমি ঝাঁট দিলে, থাকত বাড়ি অপরিষ্কার" চেঁচিয়ে কর্তব্য সাঙ্গ করি, বাবা স্কুটারে চাপিয়ে মাকে ফিজিওথেরাপি করাতে নিয়ে যান। মা বলেন না, কিন্তু কোনও কোনও ভোরবেলা বা সন্ধ্যেয় ফোন করে বুঝতে পারি মায়ের মন খারাপ হয়েছে। মা ছাদে ঘুরছেন। আকাশ বাতাস, নারকেল গাছ, ছাদের পাঁচিল, পাঁচিলের পাশের ঝুপসি আমগাছের (যার বয়স আমার বয়সের মাসচারেক এদিকওদিক) কাছে কাছে - যদি তারা সঙ্গ দেয়। আমি দু’চার কথার পর ফোন নামিয়ে রাখি। দু’মিনিট পর সব ভুলে যাই। 

কী লাভ হল মায়ের? জানপ্রাণ দিয়ে আমাকে বড় করে? ( বা বাবার? তাঁরই বা কোন কম্মে লাগলাম আমি?) ওঁদের জীবনের সোনার সময়টা চুরি করে আমি পগারপার হলাম। আনন্দ, দুঃখ ভাগ করলাম না, যত্ন নিলাম না। এখন যখন ওঁদের শক্তি কমে আসছে, তখনও নিচ্ছি না, স্বার্থপরের মতো নিজের জীবন গুছোচ্ছি (সেটাও ভালো করে গুছোলে তবু একটা কথা ছিল)। বাবামায়ের একটিও প্রয়োজনের বা অপ্রয়োজনের মর্যাদা না রেখে বার্ষিক দিবসের শুভেচ্ছা জানানো আর যদি কারও পক্ষে নাও হয়, আমার পক্ষে চরম এবং নির্লজ্জ আদিখ্যেতা। 

সবথেকে খারাপ ব্যাপারটা হচ্ছে আমার মতো মোটা মাথাতেও যখন এই সত্যিটা ঢুকছে, ওঁরা কি আর টের পাচ্ছেন না? বুঝছেন না কি দুধকলা দিয়ে কী অকৃতজ্ঞ পুষেছেন ওঁরা? ওঁরা আমার ঘরে জন্মেছেন না ওঁদের ঘরে আমি জন্মেছি? ভয়ে আমার হাতপা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। আতংক সহ্যসীমা পেরোলে আমি ফোন করি। দু’চারটে ভদ্রতাসূচক কুশলপ্রশ্ন সেরে ফোকাসটা ঘোরাই। আমাদের সম্পর্কের যা মূল কথা, সেই আমার দিকে।

“মা, তুমি আমাকে ভালোবাসো?”

“অ্যাঁ?”

"আগের মতো ভালোবাসো? সত্যি বলবে।"

কোনও উত্তর নেই। আমার বুকের মধ্যে আতংকটা জমাট বাঁধতে থাকে।

“কী গো?"

“আরে দাঁড়া, এত শক্ত প্রশ্ন, ভেবে বলতে হবে না?” মা ভাবতে থাকেন। আমার বুকের, পেটের, গলার ভেতর হোস্টেল নাইট ডান্স পার্টির সাউন্ড সিস্টেমের বিট পড়তে থাকে। 

অবশেষে মা মনস্থির করে ওঠেন। 

“হুম্‌ম্‌, বুঝলি সোনা, ভেবে দেখলাম বাসি তো বটেই, আগের থেকে একটু যেন বেশিই ভালোবাসি। কেন বল্‌তো? ভারি অদ্ভুত ব্যাপার কিন্তু।”

*****

আমার মতো অগা খেলোয়াড়ের সঙ্গে কোনওদিন খেলা না থামানোর জন্য, কোনও কারণ ছাড়াই আমাকে এতখানি ভালোবাসার জন্য, আর বেসেই চলার জন্য আমি বছরের প্রতি দিন তোমাকে “হ্যাপি মাদার্স ডে” বলতে রাজি আছি মা। বছরের একটা কেন, প্রতি মাস, প্রতি সপ্তাহ, প্রতি দিনও যদি মাদার্স ডে হয়, আমি সেটা ঝান্ডা উড়িয়ে পালন করতে রেডি আছি। যতদিন সেটা না হচ্ছে, ততদিন এই একটা দিনেই কাজ চালিয়ে নাও। হ্যাপি, হ্যাপিয়ার, হ্যাপিয়েস্ট মাদার্স ডে।



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.