June 30, 2016

এ মাসের বই/ জুন ২০১৬: ভূত, ডাইনি আর ইঁদুর



বাকি সব কিছুর মতো পড়া ব্যাপারটাও যত না সময়ের দাস, তার থেকেও বেশি অভ্যেসের। আর অভ্যেসের বাজে ব্যাপারটা হচ্ছে সেটা তৈরি হতে অনেক সাধ্যসাধনা লাগে, কিন্তু মাটি হতে লাগে তিন দিন কি তার থেকেও কম। এ মাসের গোড়ার দিকে ফোনে একটা নতুন খেলা ডাউনলোড করে তিনদিন সেটার পেছনে পড়ে রইলাম। তারপর একটা শক্ত গাঁটে পৌঁছে যখন আর এগোতে পারছি না, তখন বইয়ের কাছে ফেরত এলাম। মার্গারেট অ্যাটউডের দ্য ব্লাইন্ড অ্যাসাসিন। অর্ধেক মতো পড়া হয়েছিল, দিব্যি লাগছিল। কিন্তু ফিরে এসে পড়তে গিয়ে দেখি আর ভালো লাগছে না। দু’পাতার বেশি আড়াই পাতা পড়তে গেলে মাথা ঘুরছে, প্লটটাকে মনে হচ্ছে অতিরিক্ত জটিল, চরিত্রগুলোকে দেখলে মনে হচ্ছে গলা টিপে ধরি।

এই করতে করতে যখন মাসের কুড়ি তারিখ হল, আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে 'এ মাসের বই’তে লেখার মতো কিছুই থাকবে না। ভালোই হবে, আগের পড়া বেশ কিছু বইয়ের কথা লেখা হয়নি, সেই ব্যাকলগগুলো ক্লিয়ার করা যাবে। এই সব ভাবছি এমন সময় একটা ঘটনা ঘটল। রীতিমত ভূতুড়ে।

কিন্ডলটা কিছুদিন অর্চিষ্মানের কবজায় ছিল। সেলফিশ জিন পড়ছিল ও সেটায়। (ওর হলে আমি পড়ব, কাজেই সামনের মাসের বইয়ের পোস্টে সেলফিশ জিন থাকলেও থাকতে পারে।) একদিন ফিরতি পথে অটোতে বসে, 'কই দেখি কেমন বই’ বলে কিন্ডলটা নিয়ে ইন্ট্রোডাকশন পড়তে শুরু করেছি। পাতা উল্টোতে যাব, এমন সময় অটোর সামনে একখানা উদাসীন গরু এসে পড়ল, অটোভাইসাব ব্রেক কষলেন, আমার স্টাইলাস পেন কিন্ডলের দক্ষিণপূর্ব কোণের বদলে উত্তরপশ্চিম কোণে গিয়ে পড়ল আর আমি গিয়ে পড়লাম একদম হোমে, যেখানে রিসেন্টলি অ্যাডেড বইরা সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। 

আর সেই সারিতে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম। ’True Irish Ghost Stories’ by John D. Seymour. আমি অবাক হয়ে অর্চিষ্মানকে বললাম, ‘এটা কী?’ অর্চিষ্মান আরও অবাক হয়ে আমাকে বলল, ‘দেখোনি? এটা তো অনেকদিন হল অ্যাড করেছি।’

রিডিং স্লাম্পের ভূতের ভয় দেখলাম সাংঘাতিক। পড়া শুরু করতেই বাপ বাপ বলে পালাল। 

*****

True Irish Ghost Stories/ John D. Seymour


আপনি কি বইয়ের ভূমিকা পড়েন? উৎসর্গপত্র? নাকি আপনার অত ধৈর্য থাকে না, লাফ দিয়ে প্রথম চ্যাপ্টারে গিয়ে নামেন? যদি শেষেরটা হয়, আমার একটা অনুরোধ, ট্রু আইরিশ ঘোস্ট স্টোরিস পড়ার সময় নিজের এই অভ্যেসটার দাস হবেন না। কারণ এ বইয়ের ইন্ট্রোডাকশনে জন সিমুর বইটা লেখা হওয়ার পেছনের গল্পটা বলেছেন, যেটা যে কোনও সত্যিকারের ভূতের গল্পের মতোই রোমহর্ষক। 

প্রথম রোমহর্ষক ব্যাপার হচ্ছে জন সিমুরের ভূতের গল্প লেখার ইচ্ছেটা। ভদ্রলোক মহা পণ্ডিত ছিলেন, তাঁর নামের পেছনে এ বি সি ডি-র মিছিল ছিল। কিন্তু সেটা অবাক হওয়ার কারণ নয়। অনেক পণ্ডিত লোক ভূতপ্রেতগোয়েন্দা নিয়ে আদিখ্যেতা করেছেন। এই ভদ্রলোকের ভূতপ্রেত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটির ইচ্ছেটা অদ্ভুত এঁর পেশার জন্য। ইনি ছিলেন আয়ারল্যান্ডের এক আর্চডিকন, আইরিশ অ্যাংলিকান চার্চের একজন মাথা। চার্চ কেবল যিশুর ভূতে বিশ্বাস করে, বাকি কোনও ভূতে করে না। এই বইয়ের ভেতর একটা ভূতের ঘটনা আছে যেখানে এক তাঁর চার্চের আওতায় এক ‘স্পিরিট’-এর দাপটের কথা শুনে এক পাদরি ভয়ানক রেগে গিয়েছিলেন।  My friend the parish priest spoke very forcibly from the altar on the subject of spirits, saying that the only spirits he believed ever did any harm to anyone were ——, mentioning a well-known brand of the wine of the country. এ রকম ভূতবিরাগী পাদরিদে ভিড়ে জন সিমুর একজন উজ্জ্বল উদ্ধার। তিনি শুধু ভূতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, ডাকিনীবিদ্যা নিয়েও তাঁর বই আছে দেখেছি। হাতে পেলে নিশ্চয় পড়ব, কেমন লেগেছে আপনাদের জানাব। কিন্তু এখন তাঁর ভূতের বইয়ের কথাই হোক।

দ্বিতীয় এবং প্রধান রোমহর্ষক ব্যাপারটা হচ্ছে গল্পগুলো সিমুর জোগাড় করলেন কীভাবে। নামের শুরুতে ‘ট্রু' দেখেই বুঝতে পারছেন এখানে কাল্পনিক ভূতেদের কথা বলা হচ্ছে না। সিমুর নিজে কোনওদিন ভূত দেখেননি, কিন্তু শুনেছেন অনেকেই দেখেছে। সিমুরের উদ্দেশ্য ছিল আয়ারল্যান্ডের সেই সব সত্যি ভূতেদের নিয়ে একখানা আকরগ্রন্থ লেখা। আইরিশ রূপকথা, লোককথার অনেক সংকলন তখন বাজারে ছিল, কিন্তু আইরিশ ভুতেদের কথা কেউ কখনও ভাবেনি। কিন্তু গল্প/ ঘটনা জোগাড় হবে কীভাবে? অনেক ভেবে সিমুর খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন। বিশুদ্ধ আইরিশ ব্র্যান্ডের খাঁটি ভূতের গল্প চাই। অভাবনীয় সাড়া পেলেন সিমুর। ঝাঁকে ঝাঁকে চিঠি এল। কেউ নিজের চোখে ভূত দেখার অভিজ্ঞতা জানাল, কেউ পরের মুখে ঝাল খেয়ে লিখল। কেউ নিজের নামে পাঠাল, কেউ বেনামে। কেউ অনবদ্য ইংরিজিতে পাঠাল, কেউ কোনওমতে দু’চারটে ভাঙাভাঙা শব্দ জুড়ে। কেউ হাততালি দিল, কেউ গালি দিল। বলল, এমন পাদরি আছে বলেই খ্রিস্টধর্মের আজ এই দশা। 

শেষের রকমের চিঠিগুলোকে জন সিমুর ময়লার ঝুড়িতে টিপ করে ফেললেন আর বাকি সব চিঠি ঝেড়েবেছে বই লিখলেন। রাগী ভূত, মোটা ভূত, বেঁটে ভূত, হিংসুটে ভুত, নিরীহ ভুত - তারা সকলেই সত্যি, সকলেই আইরিশ - জায়গা পেল তাঁর বইতে। উনিশশো চোদ্দ সালে সেটা ছাপল ডাবলিন শহরের প্রকাশক হজেস, ফিগিস অ্যান্ড কোং লিমিটেড।

তিনশো চোদ্দ পাতার বই। দশটা পরিচ্ছেদ।

I. HAUNTED HOUSES IN OR NEAR DUBLIN 

II. HAUNTED HOUSES IN CONN'S HALF 

III. HAUNTED HOUSES IN MOGH'S HALF 

এই ওপরের দুটো ভাগ হচ্ছে আয়ারল্যান্ডের এক প্রাচীন জমিভাগাভাগির উদাহরণ। একশো তেইশ খ্রিস্টাব্দে আয়ারল্যান্ডে এক ভয়ানক যুদ্ধ হয় Conn Cétchathach আর Éogan Mór-এর মধ্যে। তাতে Conn হেরে যান এবং তাঁকে আয়ারল্যান্ডের খানিকটা অংশ Éogan-কে ছেড়ে দিতে হয়। উত্তরের Connacht, Ulster and Meath নিয়ে হয় Conn's Half আর দক্ষিণের Munster, Osraighe and Leinster নিয়ে তৈরি হয় Eoghan's Half যেটাকে আবার Mogh's Half-ও বলা হয়ে থাকে।

IV. POLTERGEISTS

আমি এতদিন এই শব্দটাকে ইংরিজি ভাবতাম। সিমুরের বই পড়ে জানলাম শব্দটা জার্মান। এর ইংরিজি মানে হচ্ছে ‘boisterous ghosts’। অর্থাৎ এঁরা রাতের বেলা মুণ্ডু হাতে নিয়ে এসে চোখের সামনে নাচেন, খাট ধরে ঝাঁকান, সারা বাড়িতে খড়ম পরে দৌড়ে বেড়ান। গ্রিফিনডোরের নিয়ারলি হেডলেস নিক এই গোত্রে পড়বেন। 

V. HAUNTED PLACES

VI. APPARITIONS AT OR AFTER DEATH 

GROUP I Appearances at the time of death

GROUP II Appearances clearly after the time of death

GROUP III Appearances clearly before the time of death


VII. BANSHEES, AND OTHER DEATH-WARNINGS (অনেকটা নিশির ডাকের মতো ব্যাপার)

VIII. MISCELLANEOUS SUPERNORMAL EXPERIENCES 

IX. LEGENDARY AND ANCESTRAL GHOSTS 

X. MISTAKEN IDENTITY—CONCLUSION

বিভিন্ন রকম ভূতের কথা আছে এই বইতে। কেউ কেউ গার্ডেন ভ্যারাইটি, তাঁরা খালি নিরেট দেওয়ালের ভেতর দিয়ে যাওয়াআসা করেন, কেউ কেউ আরেকটু ডেঞ্জারাস, নতুন ভাড়াটেদের কচি কচি বাচ্চাদের কুচি কুচি করে বিছানার ওপর ছড়িয়ে রাখেন। আরেকজন ভূতকে ইন্টারেস্টিং লেগেছে আমার, তিনি রাতের বেলা আসেন হ্যান্ডশেক করতে। মানে নিজে আসেন না, কনুই থেকে কাটা হাতখানাকে পাঠান।

বইটা পড়ার সময় আপনাকে একটা কথা মাথায় রাখতে হবে যে এটা নন-ফিকশন। সিমুর যা যা ভূতের খবর পেয়েছেন সে সব সারি সারি লিখে গেছেন। তার আগে পিছে গল্প জুড়ে ঘটনাগুলোকে আরও বেশি রোমহর্ষক করে তোলার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। এই কারণেই ব্যাপারটা খানিক পরে একঘেয়ে লাগতে পারে। তাছাড়া এত ভূতের কথা একনাগাড়ে পড়লে একটুক্ষণ পরে ভয় কাটতে শুরু করে। কাজেই এই বই পড়ে রাতের বেলা একা একা বাথরুমে যেতে আপনার কোনও অসুবিধে হবে না। কিন্তু আপনি যদি ভূতেদের শুধু ভয় পাওয়ানোর যন্ত্র বলে মনে না করেন, যদি তাঁদের প্রতি আপনার শ্রদ্ধা সমীহ থাকে, তাহলে তাঁদের প্রতি উৎসর্গিত এই বই পড়তে আপনার ভালো লাগবে। আর মনে হবে, বাংলার ভূতেদের নিয়ে এমন বই হয় না কেন?

*****

The Witches/ Roald Dahl


"An absolutely clean child gives off the most ghastly stench to a witch," my grand-mother said. "The dirtier you are, the less you smell." 
"But that doesn't make sense, Grandmamma." 
"Oh yes it does," my grandmother said. "It isn't the dirt that the witch is smelling. It is you . The smell that drives a witch mad actually comes right out of your own skin. It comes oozing out of your skin in waves, and these waves, stink-waves the witches call them, go floating through the air and hit the witch right smack in her nostrils. They send her reeling." 
"Now wait a minute, Grandmamma..." 
"Don't interrupt," she said. "The point is this. When you haven't washed for a week and your skin is all covered over with dirt, then quite obviously the stink-waves cannot come oozing out nearly so strongly." 
"I shall never have a bath again," I said. 
"Just don't have one too often," my grand-mother said. "Once a month is quite enough for a sensible child." 

 আমাদের গল্পের সেনসিবল্‌ চাইল্ড হচ্ছে একজন বালক, যার বয়স আটের কম, যে ইংল্যান্ডে বাবামায়ের সঙ্গে থাকে আর যার দিদিমা থাকেন নরওয়েতে। এই পর্যন্ত গল্পের লেখক রোয়াল্ড ডালের সঙ্গে নায়কের গোটাটাই মিলে যায়, রোয়াল্ড ডালও ইংল্যান্ডে বাবামায়ের সঙ্গে থাকতেন আর ছুটিতে নরওয়েতে  দিদিমার বাড়ি বেড়াতে যেতেন। ডালের ছোটবেলার স্মৃতিকথা ‘Boy: Tales of Childhood’ এ আমি পড়েছি। (আমার পড়া অন্যতম, অন্যতম সেরা ছোটবেলার স্মৃতিকথা, যাঁরা পড়েননি এবং পড়তে ইচ্ছুক তাঁরা দেরি করবেন না, প্লিজ।) তারপরই অবশ্য সব বদলে যায়। আমাদের বালকনায়কের বাবামা দুজনেই দুর্ঘটনায় মারা যান এবং নায়ক গিয়ে পড়েন তাঁর দিদিমার বাড়িতে। দিদিমা ইংল্যান্ডে থাকতে চান না, তিনি বলতেন,  Heaven shall take my soul, but Norway shall keep my bones.” আমাদের নায়কেরও দিদিমার মতে মত ছিল, কিন্তু ঘটনাচক্রে তাঁদের দুজনকে ইংল্যান্ডে এসে পড়তে হল আর শুরু হল এক রুদ্ধশ্বাস অ্যাডভেঞ্চারের। সে অ্যাডভেঞ্চারে আমাদের নায়ক আছেন, তার ভীষণ ইন্টারেস্টিং দিদিমা আছেন, একদল ডাইনি আছে যারা বাচ্চাদের দু’চোখে দেখতে পারে না, আর আছে বোতল বোতল FORMULA 86 DELAYED ACTION MOUSE- MAKER। তার একফোঁটা পেটে গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল হবে অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় পরে (‘ডিলেড অ্যাকশন’ দ্রষ্টব্য) ইঁদুরে পরিণত হবেন।

মোদ্দা কথা, দারুণ ভালো গল্প হতে গেলে যা যা উপকরণ দরকার সবই আছে। 

রোয়াল্ড ডালের বাচ্চা এবং বড়, দু’দলের জন্যই লিখেছেন। দুটোই তিনি খুব ভালো লিখেছেন, কিন্তু আমার মতে ছোটদের জন্য তাঁর লেখাগুলো একটু হলেও বেশি ভালো। বড়দের জন্য লেখা গল্পে গল্প ছাড়াও আরও নানারকম ভেজাল থাকলে বড়দের কিছু এসে যায় না। বরং বড়রা সেটা পছন্দই করে। গল্পের সুতো ছেড়ে খানিকটা চরিত্রের মনের দোলাচল, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স সম্পর্কে ধারাবিবরণী - এসব বড়দের কাছে লেখকের দর বাড়ায় বই কমায় না। ছোটরা এ সব সহ্য করে না। তারা চায় বিশুদ্ধ, খাঁটি গল্প। আর রোয়াল্ড ডালের থেকে উৎকৃষ্ট গল্প বলিয়ে আমি প্রায় দেখিনি। সেদিক থেকে রোয়াল্ড ডাল আমার দেখা অন্যতম নির্লোভ লেখকও বটে। গল্প আর পাঠকের মধ্যে মূর্তিমান বাধা যদি কেউ থেকে থাকেন তবে তিনি লেখক স্বয়ং। আর তাঁর লেখার শক্তি। গল্প বলার মাঝে চমৎকার একখানা মেটাফর বা গভীর কথা গুঁজে দেওয়ার লোভ সামলাতে খুব কম লেখকই পারে। রোয়াল্ড ডাল পারেন। তিনি ঠিক ততটুকুই বলেন যতটুকু বলার। অসম্ভব কেরামতিতে নিজেকে প্রায় অদৃশ্য করে ফেলতে পারেন তিনি। গল্প আর আমার মাঝখানের ফাঁকটা কমতে কমতে প্রায় নেই হয়ে যায়। মনে হয় ডাইনিদের মিটিংএর মধ্যিখানে আমি বসে আছি। দ্য উইচেস পড়ুন আর না পড়ুন, পড়া না থাকলে রোয়াল্ড ডাল অবশ্য পড়ুন, এ আমি সবসময় বলব।



June 29, 2016

Of Mice and Men



I found myself thinking, what's so wonderful about being a little boy anyway? Why is that necessarily any better than being a mouse? I know that mice get hunted and they sometimes get poisoned or caught in traps. But little boys sometimes get killed, too. Little boys can be run over by motor-cars or they can die of some awful illness. Little boys have to go to school. Mice don't. Mice don't have to pass exams. Mice don't have to worry about money. Mice, as far as I can see, have only two enemies, humans and cats. My grandmother is a human, but I know for certain that she will always love me whoever I am. And she never, thank goodness, keeps a cat. When mice grow up, they don't ever have to go to war and fight against other mice. Mice, I felt pretty certain, all like each other. People don't. Yes, I told myself, I don't think it is at all a bad thing to be a mouse.

                                                                                         ---Roald Dahl, The Witches


          

June 28, 2016

কুইজঃ বইটা কী? (উত্তর প্রকাশিত)





এই কুইজটা দেখে থেকে ইচ্ছে হচ্ছিল বাংলা বই নিয়ে এরকম একটা কুইজ অবান্তরে ছাপার। অবশেষে হল। নিচে দশটা বইয়ের নাম (উপন্যাসের, প্রবন্ধ সংকলনের, ভ্রমণকাহিনির, আত্মজীবনীর) স্বরবর্ণ এবং স্পেস মুক্ত করে দেওয়া হল। আপনাদের আসল নামটা বার করতে হবে। (রচয়িতার নাম বললে এক্সট্রা হাততালি)। 

প্রশ্নপত্র সোজা হয়েছে প্রতিবারের মতোই। তবু একটা ছোট টিপ দিয়ে রাখি, শব্দগুলো জোরে জোরে উচ্চারণ করলে আসল নামটা ঝপ করে নাগালে এসে যাবে। উত্তর বেরোবে বুধবার সকাল আটটায়, ততক্ষণ কমেন্ট মডারেশন চালু থাকবে। 

অল দ্য বেস্ট। 

*****


১। দবচধরন

২। বষদসনধ 

৩। সজনহরবল 

৪। পলম 

৫। তনকড়দশ

৬। সপরবনরসর* (এই হিন্টটা আগে "সপরগছরসর" ছিল, যেটা ভুল। অসুবিধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।)

৭। জগর

৮। পথরদব

৯। ললশল

১০। শনবরনর

*****

উত্তর

১। দেবী চৌধুরানী/ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
২। বিষাদসিন্ধু/ মীর মোশারফ হোসেন
৩। সুজন হরবোলা/ সত্যজিৎ রায়
৪। পালামৌ/ সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
৫। তিন কুড়ি দশ/ অশোক মিত্র
৬। সুপুরিবনের সারি/ শঙ্খ ঘোষ
৭। জাগরী/ সতীনাথ ভাদুড়ী
৮। পথের দাবী/ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
৯। লালশালু/ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌
১০ শুন বরনারী/ সুবোধ ঘোষ


June 27, 2016

সম্বল



গত রবিবার সন্ধ্যেবেলা দোসা খেয়ে, এক হাতে ফ্রাইং প্যান আর অন্য হাতে বাঁধাইয়ের দোকান থেকে খবরের কাগজে মোড়া দু’খানা মধুবনী পেন্টিং (এখান থেকে কেনা) দোলাতে দোলাতে যখন বাড়ির দিকে ফিরছি, তখন আকাশ জুড়ে থালার মতো চাঁদের চারপাশে ঘন লাল মেঘের বৃত্ত দেখেই বুঝেছিলাম যে বৃষ্টি হবে।

অ্যাকচুয়ালি বুঝেছিলাম তারও আগে। ফ্রাইং প্যান কেনা আর ছবি বাঁধাতে দেওয়ার মাঝখানে যখন চশমার দোকানে ঢুকেছিলাম তখনই। যতক্ষণ হাঁটছিলাম ততক্ষণ কিছু টের পাচ্ছিলাম না। মানে স্বাভাবিক গরম লাগছিল। দরজা ঠেলে এসির ভেতর ঢুকলাম আর শরীরের সমস্ত রোমকূপ থেকে বর্ষার মতো ঘাম ঝরতে শুরু করল। আর অমনি আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। ঠিক মায়ের কথা নয়, মায়ের ব্যারোমিটারের কথা। 

মা বলেন ওঁর শরীরের মধ্যে নাকি একটা ব্যারোমিটার বসানো আছে। প্রথম কবে বলেছিলেন সেটাও মনে আছে। হাওড়া স্টেশনের সাবওয়ের টিউবলাইট জ্বালা টিমটিমে, স্যাঁতসেঁতে, ভ্যাপসা গর্তটায় সিঁড়ি দিয়ে নামছি, মা মেয়ে দুজনে পাল্লা দিয়ে ঘামছি। আমি যথারীতি রুমাল আনতে ভুলে গেছি। মা নিজের ব্যাগ থেকে একটা এক্সট্রা রুমাল বার করে আমার হাতে গুঁজে দিতে দিতে বলছেন, আজ বৃষ্টি হবে সোনা। ব্যারোমিটার বলছে। ঘোর নিম্নচাপ।  

সেই থেকে মায়ের ব্যারোমিটার বিরাজ করছে আমাদের জীবনে। আমাদের মানে আমার আর মায়ের। এ ব্যারোমিটারের পূর্বাভাস আবহাওয়া কোম্পানির মতো ভুলভাল নয়। আজ পর্যন্ত কোনওদিন এ ব্যারোমিটার ফেল করেনি। কেউ যখন বলছে না বৃষ্টি হবে, মায়ের ব্যারোমিটার একা হাতে বৃষ্টি নামিয়েছে, সবাই যখন নিশ্চিত এ বছর মা দুর্গা নৌকো চেপে আসছেন যখন বন্যা কেউ আটকাতে পারবে না, মায়ের ব্যারোমিটার ঠোঁট টিপে মাথা নেড়েছে, আকাশ থেকে একটি ফোঁটাও ঝরেনি।

যাই হোক, চশমার দোকানে ঢুকে আমি এমন ঘামতে শুরু করলাম যে অর্চিষ্মানকে পকেট থেকে রুমাল বার করে দিতে হল। ঘাম মুছতে মুছতে বললাম, নির্ঘাত বৃষ্টি হবে। ঘোর নিম্নচাপ।

তারপর সোমবার দুপুরবেলা যখন সিটের পেছনের জানালায় মেঘের ছায়া ঘনিয়ে এল, বাইরের চাতালে রাখা সিমেন্টের বড় বড় টবে পোঁতা পামগাছগুলো জোরে জোরে মাথা নাড়তে লাগল, অফিসের সবাই যে যার সিট ছেড়ে উঠে হাতের কাছের জানালার সামনে ভিড় করে দাঁড়াল আর সবার চোখের সামনে অদৃশ্য জুবিন মেহতার হাতের দুলুনিতে হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল, তখন আমার ভীষণ, ভীষণ গর্ব হল। অবশেষে মায়ের মতো একটা ব্যারোমিটারের মালিক হতে পেরে। 

গর্বের ভাবটা অবশ্য কেটে গেল একটু পরেই, তার জায়গায় এসে গেল একগাদা দুঃখ। এমন সুন্দর আকাশমাটি এক করা বৃষ্টি অথচ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখার উপায় নেই, কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে আধাখ্যাঁচড়া রিপোর্ট কটমট করে তাকিয়ে আছে। সিটে ফিরে এসে টাইপ করতে শুরু করলাম। প্রতিশোধ হিসেবে রিপোর্টে একের চার মন রাখলাম, তিনের চার মন বৃষ্টিকে দিয়ে দিলাম। সে স্ক্রিনে ছায়া ফেলা মেঘের দিকে তাকিয়ে রইল আর ভাবতে লাগল, যদি নিজেই নিজের মালিক হত তাহলে এমন একটা দিন নিয়ে কী কী করত।

১। সকালে উঠে ডিসিশন নিত, আজ রেনি ডে। অফিস ছুটি।

২। জানালা খুলে দিত হাট করে, পর্দা সরিয়ে দিত। কোণাকুণি বাড়িটার তিনতলার বারান্দা থেকে চোখ বাঁদিকে ফেরালেই এই ঘরটা সোজা দেখা যায়, কিন্তু তাতে একটুও ঘাবড়াত না। চুলোয় যাক প্রাইভেসি। তাছাড়া যে নিজের মনে থাকে তার থেকে যে চুরি করে দেখে লজ্জার অংশটা তারই বেশি। অ্যাকচুয়ালি, পুরো লজ্জাই তার।

৩। ভাবত আদা দিয়ে চা খেলে কেমন হয়। যদিও সেটা বাস্তব হত না, কারণ বাইরের প্রকৃতি বদলেছে, ভেতরেরটা তো রয়ে গেছে যে কে সেই। যখন মালাইকারি খেতে ইচ্ছে করছে তখন নারকেলের দুধ নেই, যখন আদা দিয়ে চা খাওয়ার আদর্শ পরিস্থিতি তখন আদা নেই। গত একমাস ধরে ফ্রিজের নিচে গড়াগড়ি খাওয়া আড়াই ইঞ্চি আদা ফেলে দিল এই পরশু না তরশু। 

৪। মনটা খারাপ হয়ে যেত। কেন ও এরকম? কেন ও অন্যদের মতো নয়? গুছোনো? দূরদর্শী? রান্নাঘরের জানালার ওপাশে সানসেটের তলায় পায়রাগুলো রোজ ডানা ঝাপটাঝাপটি করে। আজ পায়রাদেরও রেনি ডে। ঝাপটার শব্দ মিস করতে করতে ভাবত, এই বৃষ্টির দিনটা ও কীভাবে কাটাবে? সেলফ পিটিতে ভুগে? না সমস্ত চিন্তা চুলোয় দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে? এই আচমকা ছুটির আরাম নিংড়ে নিতে নিতে?

৫। উত্তর বেরিয়ে গেল ঝট করে। অফিস যাবে কি যাবে না সেই শক্ত প্রশ্নটার উত্তরটার মতোই। বৃষ্টির দিনে উত্তর খুব সহজে পাওয়া যায় দেখা যাচ্ছে। বাইরেটা যত ঘোলাটে, ঘরের ভেতরটা যত আবছা, দৃষ্টি ততই পরিষ্কার। 

৬।  চায়ের কাপ নিয়ে গ্রিলের বাইরে তাকিয়ে দেখত মোটা মোটা জলের ফোঁটার ঘা খেয়ে বাড়িওয়ালার সজনেফুলে ভরা গাছ কেমন মাথা নাড়ছে।

৭। দেখত আর মনে পড়ত একটা পেঁপে গাছের কথা। এরকম কুচি কুচি পাতা নয় সে গাছের। তার একেকটা শাখার অন্তে ছড়ানো আলপনার মতো বড় বড় পাতা, তার মিহি দেহের একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরোনোর সময় রোদের রং সবুজ হয়ে যায়। এ রকম দিনে সেই পাতা বেয়ে জলের ফোঁটা এসে নামছে জানালার শিকে। তারপর সোজা পথ বেয়ে সারি বেঁধে চলেছে। একে অপরের সঙ্গে ঠিক সমান দূরত্ব বজায় রেখে। কী নিয়মনিষ্ঠ, ছাব্বিশে জানুয়ারির প্যারেডও লজ্জা পাবে। চলতে চলতে পুষ্ট হবে, তারপর ভার সইতে না পেরে টুপ করে খসে পড়বে। দেখতে দেখতে ইচ্ছে হবেই, আঙুল দিয়ে তাদের মিছিল মাটি করে দেওয়ার। কিছুক্ষণ অনিয়ম, দোলাচল, তারপর আবার মিছিল শুরু। আগের নিয়মে। যেন জীবনের ছোট একটি ডেমো। একে অপরের পিছু পিছু অন্ধের মতো চলেছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ, অহংকার, চর্বি জমতে জমতে মুটোচ্ছি, মুটোতে মুটোতে যখন জীবনের গ্রিপ আলগা হয়ে যাবে, পড়ে মরে যাব। 

৮। বাড়ির বিভিন্ন কোণ থেকে ইনডোর প্ল্যান্টগুলোকে তুলে এনে জানালার বারান্দায় রেখে, দুহাতে তাদের পাতা জড়ো করে জানালার বাইরে বার করে দিত। বেচারারা দেখুক, কী জিনিস মিস করছে।

৯। বুককেসের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবত, কী পড়া যায়। ভাবাটা অবশ্য টাইমপাস, কারণ ও জানে এমন দিনে সঙ্গ দেওয়ার জন্য ওর বুককেসে একটাই (বা একজন লেখকেরই) বই আছে। ইন্ডিয়াফেরৎ স্মৃতিকাতর মেজরের দল, ভিকারেজে বিকেলের চায়ের আসর, ইঞ্চ-এর ট্যাক্সি সার্ভিস, লোকাল গেজেটের বিজ্ঞাপনে খুনের ঘোষণা নিয়ে আগাথা ক্রিস্টি গায়ে হালকা চাদরের মতো মুড়ে থাকতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত।

১০। মাঝখানে খেতে উঠতে হত অবশ্য। আজকের মতো অন্যরকম দিনেও রোজকার মতো খিদে পায় কেন? আর যদি পায়ই তাহলে মুখের সামনে খাবার ধরে দেওয়ার কেউ থাকে না কেন? (অ্যাকচুয়ালি থাকে না যে সেটা ভালোই, থাকলে তার উপকারের বদলে তার আদেশ মানতে হত।) কিন্তু নেই যখন সেই নিয়ে ভেবে মাথা ঘামানোর মানে হয় না। সমাধান হল গোটা ব্যাপারটা যথাসম্ভব শর্টে সারা। সসপ্যান, ফুটন্ত জল, ম্যাগি। দু’মিনিটটা বিজ্ঞাপনের ফাঁকি, আসলে রান্নাঘরে ঢোকা থেকে বেরোনো পর্যন্ত মিনিট পাঁচেক লাগে। সেটা অ্যাফোর্ডেবল। 

১১। হঠাৎ জেগে উঠে দেখত, বুকের ওপর বই ভাঁজ করে রাখা, ঘর অন্ধকার, বাইরে একটানা বৃষ্টির শব্দ। মাথা ভার, তার থেকেও বেশি মন খারাপ। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। ইস, দিনটা ফুরিয়ে গেল। দৌড়ে গিয়ে চা বসাত, ঘরের আলো জ্বালাত। এই গানটা জোরে চালাত ল্যাপটপে। 

১২। মনে পড়ত, আজ স্নান করা হল না। 

১৩। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকত। এখন আর সজনে গাছটাকে দেখা যাচ্ছে না। এখন শুধু ঘন ছায়ার মাঝে মাঝে কয়েকটা জানালার আলো। ব্যারোমিটারের কাছে খোঁজ নিত। কালও কি এমন কাটবে? উঁহু। পূর্বাভাস বলছে কাল খটখটে রোদ, সকালবেলা অফিসে পৌঁছে মেল খোলার সময় বুকের ভেতর মৃদু ভূমিকম্পের সম্ভাবনা।

১৪। ভয়ানক অবসাদ সেট করবে করবে এমন সময় সকালের প্রশ্নটা মনে পড়ে যেত। উত্তরটাও। রেনি ডে-তে দুঃখের জায়গা নেই।  গত ক'ঘণ্টাকে যত্ন করে মুড়ে বুকের ভেতর রেখে দিত ও। সামনের রৌদ্রকরোজ্বল দিনরাতের যুদ্ধক্ষেত্রে এইটুকুই তো সম্বল। 


June 25, 2016

সাপ্তাহিকী






The biggest human temptation is to settle for too little.
                                                                                 —Anonymous

প্রথমেই ভালো খবর। পৃথিবীর বেস্ট বুকওয়ার্ম আমরা।

এবার একটা খারাপ খবর। এশিয়ার প্রথম এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম ওয়ার্কিং ফোটোগ্রাফি স্টুডিও অবশেষে বন্ধ হল। আমাদের নাকের ডগাতেই। 

Belgian endive is shaped like a torpedo and grows to about six inches in length. It has tender white leaves with either yellow or red-colored leaf edges. The leaves offer a soft texture and delicate crunch with a pleasantly bitter flavor. While Belgian endive is commonly used raw in recipes it is also versatile in cooked preparations. Roast whole or halved endive with olive oil until softened and serve as a side dish with grated cheese. Grill endive halves and add to cooked grains or serve atop pizza. Add chopped or halved to tarts, quiche, soups, stews and stir-fries.  The bitter flavor of Belgian endive pairs well with onion, pear, apple, cranberries, herbs such as basil and thyme, walnuts, pecans, butter, cream based sauces, olive oil, bacon lardons, prosciutto, lamb, poultry and gorgonzola, manchengo, blue and feta cheeses. 
ওপরের প্যারাগ্রাফটা বেলজিয়াম এনডাইভ-এর বর্ণনা। আবার কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনাও বটে। অন্তত এঁরা সেরকমই দাবি করছেন। আপনার সঙ্গে কোন তরিতরকারির মিল আছে জানতে হলে ক্লিক করুন। 

ডেজার্টে আঠেরো স্কুপ আইসক্রিম? ফিদেল ক্যাস্ত্রোর বাঁয়ে হাথ কা খেল।

এতদিনে আমার নির্বান্ধব হওয়ার কারণটা বোঝা গেল। 

ভলটেয়ারের মতো কপাল হলে বন্ধু জুটতেও পারে। ভলটেয়ারের অন্যান্য নানারকম গুণের কথা তো শুনেছেন, তাঁর বিষয়বুদ্ধি সম্পর্কে জানতে হলে ক্লিক করুন। 

মনের মতো চাকরি পাচ্ছেন না? সুমুখ মেহতাকে দিয়ে সিভি লিখিয়ে দেখুন। 

এই খবরটা আগে সাপ্তাহিকীতে ছেপেছি কি না মনে পড়ছে না। খবরটা এমনই সাংঘাতিক যে দ্বিতীয়বার ছাপলেও ক্ষতি নেই। পৃথিবীর আকাশে চাঁদমামার একাধিপত্য শেষ।

এই “are writing” অংশটুকু বোধগম্য হচ্ছে না আমার। Women were always, always writing the best crime novels. 

সামনের লোকটার রাসায়নিক সংকেত উদ্ধার করতে চান? হ্যান্ডশেক করুন। চান না? বুকের কাছে হাত জড়ো করে ক্ষান্ত দিন। 


ফোন, ল্যাপটপ, টিভি ইত্যাদির স্ক্রিন থেকে যে নীল আলো বিচ্ছুরিত হয় তা আমাদের মগজের মেলাটোনিন প্রবাহকে বিঘ্নিত করে যার ফলে আমাদের ঘুম আসতে দেরি হয়। কাজেই আমাদের উচিত ঘুমোনোর অন্তত দু’ঘণ্টা আগে থেকে সবরকম স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা।

এ সপ্তাহের গান। এ শুনেও যদি বৃষ্টি না নামে তা হলে কিছু বলার নেই। 


June 21, 2016

What Literary Character is Your Mental Twin?




Honorable and empathetic, your mental twin is the legendary Atticus Finch. A noble soul whose experiences in life have shaped you into the morally-balanced person you are today, few others share your genuine passion for equality and justice. Whether it's in everyday life or in terms of overarching societal change, you cannot help but feel connected and driven to changing what is not "right". Above all else, you are a rare combination - someone who is as forgiving as they are morally inflexible. After all, you know more than most that there is no truth in justice unless a person has attempted to walk in another's shoes. Only then can one truly understand another's plight.

*****

আমি সম্মানিত, শিহরিত, উত্তেজিত। আপনার মানসিক যমজ বিশ্বসাহিত্যের কোন তারকা?


June 20, 2016

ডিয়ার পার্ক, হজ খাস




পুঁজিবাদে নিমজ্জিত হয়ে বাস করি, এদিকে পয়সার ওপর অবিশ্বাসের ভাবটাও কাটতে চায় না। অল গুড থিংস আর ফ্রি- র মতো উদ্ভট এবং মিথ্যে কোটেশনের ফাঁদ থেকে বেরোতে পারি না কিছুতেই। মাল্টিপ্লেক্সে যাই, এসি রেস্টোর‍্যান্টে গাঁকগাঁক করে খাই, ইন্দ্রিয়সুখ হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবার এ অনুতাপও খোঁচা মারে যে পয়সা দিয়ে না কিনে আর যেন আনন্দ করতেই ভুলে গেছি। অনুতাপটার একটা ছোট অংশ পয়সা খরচ নিয়ে, কিন্তু বেশিরভাগটা আমাদের বিনোদনের রকম নিয়ে। আর আমাদের বিনোদনের রকম তো শেষমেশ আমাদের সম্পর্কেই অনেক কিছু বলে, তাই না?

অথচ দিল্লিতে বিনাপয়সার বিনোদনের অভাব নেই। গুচ্ছ গুচ্ছ প্রদর্শনী, খোলা বাতাসে নাটক থিয়েটার, দূতাবাসে বা ভাষা শেখার স্কুলে বিদেশী সিনেমার স্ক্রিনিং, দেশী সিনেমার ফেস্টিভ্যাল, প্যান্ডেল বেঁধে ধ্রুপদী সংগীতের আসর - সব কিছুই হয় পুরোদমে। কিন্তু সে সব জায়গায় আমরা যাই না। ছবির কিছুই বুঝি না, ছবির প্রদর্শনী কী দেখতে যাব? নাটকগুলো এত রাতে শুরু হয়, বাড়ি ফিরব কী করে? আর ফিরলেও পরদিন অফিস যেতে লেট হয়ে যায় যদি? বছরে একবার ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ঢুঁ মারি আর ক্ল্যাসিক্যাল ফাংশানে গিয়ে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে মাঝপথে উঠে চলে আসি (অর্থাৎ কিনা হাফবার)।

বলেছিলাম, সমস্যাটা বিনোদনের সাপ্লাইয়ের নয়, সমস্যাটা আমাদের ডিম্যান্ডের। বা আরেকটু কড়া করে বললে, আমাদের রুচির।

গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে কি না বলুন? তাই আমি ঠিক করলাম ব্যাপারটার সংশোধনের সময় এসে গেছে। ক’সপ্তাহ আগের এক রবিবার ভোর ভোর উঠে অটো ডেকে আমরা চলে গেলাম হজ খাসের ডিয়ার পার্কে।

বিনাপয়সার বিনোদন খুঁজতে বসে প্রথমেই আমার মনে পড়েছিল দিল্লি শহরের লাখ লাখ সরকারি পার্কের কথা। পার্কে বেড়াতে যাওয়ার সুবিধেটা হচ্ছে গাছপালার কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করা যায়, কিন্তু অসুবিধেও কিছু আছে। প্রথম চিন্তা প্রেম। আমি প্রেমের ঝাণ্ডা-ওড়ানো স্লোগান-দেওয়া সমর্থক কিন্তু প্রত্যেকটা ঝোপের আড়াল থেকে যদি প্রেম উঁকি মারতে থাকে তাহলে অস্বস্তি বোধ না করার মতো স্মার্টও নই। সেই বাবদে বেশ কয়েকটা পার্ক বাদ পড়ে গেল। কটা পার্কের নাম সব লিস্টে আসছিল, সেটা আবার অর্চিষ্মানের অফিস যাওয়ার পথে পড়ে। ওখানে গেলে কেমন হয় জিজ্ঞাসা করাতে অর্চিষ্মান বলল না না ওখানে ভয়ানক প্রেমের প্রতাপ। আমি বললাম, আহা সে তো পার্ক মাত্রেই থাকবে। তখন অর্চিষ্মান খুব গম্ভীর মুখ করে, “তুমি বুঝতে পারছ না, ওখানের প্রেমের টাইপটা একটু ডেয়ারিং” বলে চোখ গোলগোল করে মিনিংফুল নীরবতা অবলম্বন করল, আর আমি ক্ষান্ত দিলাম। তারপর চোখে পড়ল হজ খাসের ডিয়ার পার্কের নাম। বাড়ির কাছে। তাছাড়া পার্কে হরিং আছে যখন ধরে নেওয়া যায় শিশুরাও থাকবে। আর শিশুদের সামনে ডেয়ারিং প্রেম করার সাহস প্রেমিকপ্রেমিকারা দেখাতে পারবেন না। কাজেই ফাইন্যাল।

সকাল সাতটা পনেরো থেকে কুড়ির মধ্যে আমরা পার্কের সামনে অটো থেকে নামলাম আর আমাদের মাথা ঘুরে গেল। স্বাস্থ্যোদ্ধারকারীর দল, হরিণদেখিয়ের দল, ব্যাডমিন্টন খেলুড়ের দল, সেলফি শিকারীর দলে প্রায় মেলা বসে গেছে। হজ খাস ভিলেজের গেটের সামনের ছোট্ট সবজিবাজারের গা ঘেঁষে বসা ঠেলাগাড়ির ওপর গবগব করে চা ফুটছে, তার ধোঁয়ার ওপাশে শুকনো ঝিঙে আর ফ্যাকাশে টমেটো নিয়ে বসা রোগা ভদ্রলোকের মুখের আউটলাইন ক্রমাগত কেঁপে উঠছে, উনুনের সামনে ফুলের মতো ফুটে রয়েছে ধপধপে সাদা ডিমের সারি, প্লাস্টিকের ভেতর থেকে উঁকি মারছে স্থানীয় বেকারির মোটা মোটা ফাঁপা পাউরুটি। এমন কি একখানা আইসক্রিমের গাড়িও গন্ধে গন্ধে হাজির, তার বিক্রিবাটাও হচ্ছে দিব্যি।

আমরা হচ্ছি গিয়ে ভ্রমণপিপাসু, রিয়েল ডিল, আর অন্যরা হচ্ছে গিয়ে কলকলে টুরিস্ট, এরকম অন্যায্য ভাবভঙ্গি আমাদের আছে। আর সেটা আছে বলেই ডিয়ার পার্কের গেটের চেহারা দেখে আমাদের আশাহত হওয়ার খুবই চান্স ছিল, কিন্তু হল না। কারণ ততক্ষণে কানে এসে পৌঁছেছে গগনবিদারী ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ। এ শব্দ আমি চিনি। জে এন ইউ-র জঙ্গলে মাঝরাত্তিরে এ ডাকের কম্পিটিশন হয়। এ ডাকের ডাকিয়ের মুড়োয় ঝুঁটি, ল্যাজে পেখম আর গলায় এমন অদ্ভুত রং যে তাকে ডিফাইন করার জন্য একটা আস্ত শব্দ জুড়তে হয়েছে অভিধানে।


ডাক লক্ষ্য করে জোরে পা চাললাম। ঘটনাস্থলে পৌঁছে চক্ষুস্থির। কম্পিটিশন হচ্ছে বটে, কিন্তু ডাকের নয়, পেখম মেলার। এদিকে একজন ট্যাঁ করে ডেকে নিজের পেখম মেলেছে, তো ওদিক থেকে তার দ্বিগুণ জোরে ট্যাঁ করে উঠে আরও একজোড়া ময়ূর পেখম মেলেছে। তাই দেখে আমাদের কাছাকাছি যে প্রতিযোগী সে মনমরা হয়ে পেখম নামিয়ে নিয়েছে। তাড়াহুড়ো করে বার করতে গিয়ে ক্যামেরার ফিতে, ব্যাগের ফিতে জড়িয়েমড়িয়ে একাকার। ভাগ্যিস বুদ্ধি করে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ব্যাটারি আর এস ডি কার্ড যথাস্থানে ভরে নিয়ে এসেছিলাম, না হলে আরও সময় নষ্ট হত। অবশেষে যখন ক্যামেরা বেরোল, ততক্ষণে ময়ূর পেখম গোটাতে শুরু করে দিয়েছে।

ছবি তোলা সেরে আবার হাঁটা শুরু করতে যাব দেখি কয়েকজন বেঁটেখাটো মানুষ জালের দেওয়ালের বরফিতে ছোট ছোট আঙুল ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবামার তাড়ার উত্তরে বলছে, পাঁচ মিনট অওর, মাম্মা, প্লিইইইজ।


কী দেখছে ওরা? পেখম তো নেমে গেছে অনেকক্ষণ। তবু হাঁ করে ময়ূরটার দিকে তাকিয়ে আছে কেন? কিছু ইন্টারেস্টিং ছবি মিস করে যাচ্ছি কি না দেখতে আবার একবার জালের ধারে ফিরে এলাম। বাচ্চাগুলোর দৃষ্টি লক্ষ্য করে ময়ূরটার দিকে তাকালাম। খোলা অবস্থাতে পেখম সুন্দর সকলেই জানে। বন্ধ অবস্থাতেও যে পেখম এত সুন্দর, আবার নতুন করে মনে পড়ল। শুধু পেখমই তো নয়, গলার রংটাও। পিসির একটা ময়ূরকণ্ঠী রঙের শাড়ি ছিল, ডান হাত থেকে বাঁ হাতে নিলে তার রং বদলে যেত। শাড়িতে যে এমন কাণ্ড হবে সেটা মেনে নিতে কোনও অসুবিধে হয়নি। আফটার অল, মেশিনে বানানো। তা বলে জ্যান্ত প্রাণীর গলায় অমন কেরামতি? প্রতিবার দাম্ভিক ঘাড় ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে গলায় নীলের চকচকে শেডের মেলা? শত শত কালো গভীর চোখ আঁকা পেখমটা যেন একটা বিরাট বাহারি ঝালর, দিল্লির ধুলো ঝাঁট দিতে দিতে চলেছে।


ছোটদের তো ক্যামেরা নেই, তাই ওরা এখনও চোখ দিয়ে দেখে। আমরা দেখি গাছের মাথায় পাতার জঙ্গল, ওরা দেখে ফেলে পাতার আড়াল থেকে একটা প্রাইভেসি-প্রিয় ময়ূরের ঝুলন্ত ল্যাজের ডগা। হরিণের শিং দেখে, সদ্য শেখা ওয়ান টু থ্রি-র বিদ্যা প্রয়োগ করে ওরা হরিণের শিং গোনে, জালের ভেতর হাত গলিয়ে মিহি সোনালি লোমে ঢাকা, নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে কাঁপতে থাকা শরীরে হাত বোলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। তাদের স্নেহ থেকে আমাদের দিশি কুকুরেরাও বাদ পড়ে না। পড়া উচিতও নয়। পার্কের মালিকানা যদি কারও হাতে থেকে থাকে তবে সে হরিণও নয়, ময়ূরও নয়, সে আমাদের নেড়ি। তার শিং-ও নেই, পেখমও নেই, কিন্তু আত্মবিশ্বাস সব খামতি পূরণ করে দিয়েছে।

ছোটরা নিজেরাও অবশ্য দেখার মতোই জিনিস। এটা আমি তাদের প্রতি কোনওরকম তাচ্ছিল্য বা অনুগ্রাহক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলছি না। কিন্তু যে কোনও পরিস্থিতিতেই যে তারা বড়দের থেকে সপ্রতিভ, বুদ্ধিমান এবং আকর্ষণীয়, সেই সত্যিটা আবারও হৃদয়ঙ্গম করে বলছি। আমরা এবং বাবামায়েরাও যেটা প্রায়ই ভুলে যাই। সে প্রমাণ ডিয়ার পার্কে অহরহ পাচ্ছিলাম। বাবামা ঘর্মাক্ত দেহে ছুটতে বেরিয়েছেন, সঙ্গে তাঁদের পুত্র বা কন্যা। বাড়িতে একা রাখার অসুবিধে বলে ট্যাঁকে করে নিয়ে এসেছেন। ঘুষ হিসেবে গেটের মুখ থেকে কুরকুরে কিনে দেওয়া হয়েছে। তারা সেগুলো বুকে আঁকড়ে ধরে বিরসবদনে বাবামায়ের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে। এমন সময় বাবার মাথায় কী ভূত চাপল, কিংবা ভূত নয়, ছেলেমেয়ের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যেই তিনি প্রস্তাব দিলেন, চলো, রেস করতে হ্যায়। ছেলেমেয়ের মুখে নিমেষে হাসি। কুড়কুড়ের প্যাকেট পতাকার মতো মাথার ওপরে নাড়াতে নাড়াতে তারা ছুট লাগাল, দেখতে দেখতে আড়াই ফুটের পলকা শরীর বাঁক পেরিয়ে অদৃশ্য, এদিকে তাড়া করে দু’পা যেতে না যেতেই বাবামায়ের জিভ বেরিয়ে ভুঁড়ি ছুঁয়ে ফেলার দশা।

আরেকটু দূরে দেখি একটা বুড়ো বটগাছের গা বেয়ে ঝুরি নেমেছে মোটা মোটা, সেই ধরে একজন ছোট দোল খাচ্ছে। হাঁটু ভেঙে বুকের কাছে নিয়ে এসেছে যাতে গ্রিপ শক্ত থাকে আর অদ্ভুত কায়দায় নিজের ছোট শরীরটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে স্থবির ঝুরিতে গতি আনার চেষ্টা করছে। পাশে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন, মাথার ওপর তোলা দুই হাতের পাঞ্জা একটা ঝুরি জড়িয়ে আছে। মুখে নার্ভাস হাসি। পাশে দুলন্ত সন্তান চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছে, দু’পা মাটি থেকে তুলে ফেলার। বাবার মুখের নার্ভাস হাসি দেখে বোঝা যাচ্ছে যে ইচ্ছে আছে খুবই, কিন্তু ভরসা করতে পারছেন না। ওই প্রাচীন প্রকাণ্ড বট যদি তাঁর মতো নশ্বর মানুষের ভার না বইতে পারে? ভরসাও নেই, মাটিকে লাথি মেরে ওড়ার সাহসও না।


দিল্লিতে ঘুরব অথচ পুরোনো ভাঙাচোরা বাড়ি চোখে পড়বে না তা কি হয়?


এটা একটা মসজিদ। বোর্ডে নাম সন ইতিহাস লেখা ছিল, এখন মনে পড়ছে না।


হজ খাসের ডিয়ার পার্ক একটা বায়োডাইভার্সিটি পার্কও বটে। গোলাপের বাগান, আরও নানারকম লক্ষ লক্ষ বিরল সুলভ গাছ গুল্ম বৃক্ষের সংগ্রহ আছে এখানে। আমাদের মতো গাছ না চেনা লোকেদের জন্য তাদের গায়ে যত্ন করে হিন্দি, ইংরিজি, ল্যাটিনে নামধাম লেখা। তবে এত এক্সোটিক গাছের মধ্যেও আমার সবথেকে ভালো লাগে বটগাছ। যত বুড়ো তত ভালো। আশেপাশের যত আন্দোলন আর কোলাহল সব নিজের শরীরের গোলকধাঁধার মধ্যে শুষে নেওয়ার অদ্ভুত প্রতিভা থাকে বটের। তার তলায় এসে বসলে মনে হয় একটা শব্দ নিরোধক বুদবুদের মধ্যে ঢুকে পড়লাম যেন।


হাঁটতে হাঁটতে একটা সৎসঙ্গের আসর পেরোতেই চোখের সামনে এই দৃশ্য উন্মোচিত হল।


সব গুড থিংস ফ্রি কি না জানি না, কিন্তু বিস্তর ভেরি গুড থিংসের গায়ে যে এখনও প্রাইস ট্যাগ লাগেনি, হজ খাসের ডিয়ার পার্ক তার প্রমাণ। তাছাড়া পার্কের লোকেশনও দারুণ। পার্ক থেকে বেরিয়ে তিন মিনিট হেঁটে গিয়ে কাঁচালংকা দেওয়া চা খাওয়া যায়। ডিয়ার পার্কে তো আবার যাবই, দিল্লির অন্যান্য সরকারি বাগানগুলোও সময় করে ঘুরে ফেলতে হবে।

বুড়োদের ভিড়ে নতুন প্রজন্মকে চোখে পড়ছে কি?

     

June 18, 2016

সাপ্তাহিকী







Touch comes before sight, before speech. It is the first language and the last, and it always tells the truth.
                                                        —Margaret Atwood, The Blind Assassin


স্বস্তি মিত্র। বেঁচে থাকতে এঁর নাম জানতাম না।

এই লিংকটা দেখে প্রথমেই যেটা চোখে লাগল সেটা হচ্ছে মনীষীদের ছবির বদলে মডেলের ব্যবহার। তারপর আসল বক্তব্যের দিকে নজর গেল। সেটাও অতি সরলীকৃত মনে হল। অবশ্য সেটাই প্রত্যাশিত। এদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই সমস্ত মহামানবদের সারাজীবনের সাধনার মূল সুরটিকে একটি প্রশ্নে প্রকাশ করা। সে প্রশ্ন আর কত জটিল হবে। আরেকটা জিনিসও খেয়াল করছিলাম, এবং করে খুশিই হচ্ছিলাম, যে মহামানবদের লিস্টে এঁরা শুধু ককেশিয়ানদের জায়গা দিয়ে হাত ঝাড়েননি, বাকি পৃথিবীটার দিকেও চোখ মেলে তাকানোর পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু তারপর স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎ আমার একজন ভীষণ চেনা লোকের ছবি/মডেল বেরিয়ে পড়ল আর আমার সব যুক্তিবুদ্ধি এমন গুলিয়ে গেল…  কর্তৃপক্ষের কাছে আমার অনুরোধ, সব কালা আদমিই একরকম দেখতে হন না। দয়া করে এবার থেকে মডেলের বদলে ছবি ব্যবহার করলে বাধিত হব। 

বুককেসসজ্জা দিয়ে চরিত্র বিচার? দেখা যাক আমার সম্পর্কে এরা কী বলেঃ

The Genre Coordinator: Fantasy, romance, literary, YA, they all have their place—grouped together. You’re a logical, organized thinker. Books of the same feather flock together, right? Thematically speaking, you’ve got your things together. Your choices have rational decisions behind them, and you’re all about easily accessing what you want. When you approach a problem, your initial thought is to examine and absorb information, and then solve the issue. Your motto? It’s what’s inside that counts.
শেষ বাক্য বোল্ড আমি করেছি। কারণ বাকি সব চরিত্র বিশ্লেষণ যদি মিথ্যেও হয়, ওই লাইনটা ডাহা সত্যি। ঘরানা অনুযায়ী বই সাজানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি বই অনুভূমিক ভাবেও রেখে থাকি। এরা সেটার জন্য একটা আলাদা ক্যাটেগরি করেছে দেখলাম।
Sideways Stacker: The great thing about you is that you observe the world from a unique perspective. Why should books be straight up and down when it’s easier to read the spines horizontally? Logical and different. Plus, it gives your shelves some pizazz. You adapt this attitude to everything you do. Embrace the fact that you were the weird kid growing up, because it means you have an awesome future ahead. The weird ones always end up in first place. Stay quirky forever, Sideways Stacker.
এটা একেবারেই হয়নি, আমি কোনওকালেই উইয়ার্ড কিড ছিলাম না, কোয়ার্কি বিশেষণটাও আমার ওপর বাজে খরচ। আমি একেবারেই চোখে ঠুলি বেঁধে ছোটা (খোঁড়ানো বলাই উচিত) গাধা।

রণথম্বোরে যখন সাফারি করতে গিয়ে বাঘ দেখেছিলাম তখন যদি এরকম হত? মাগো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অনেক অভিনব উপায়ে সংকেত আদানপ্রদান হত শুনেছি, কিন্তু তা বলে এই উপায়ে?

গল্প যখন লেখা হয় তখন লেখকদের মাথায় একটা নাম থাকে, আর সে গল্প যখন আমাদের হাতে এসে পৌঁছয় তখন তা হয়ে যায় অন্য নামের। এরকম কয়েকটা গল্পের প্রথম নাম আপনাদের বলছি, দেখুন তো পরের নামগুলো চিনতে পারেন কি না। Trimalchio on West Egg, পারলেন? পারলেন না? অবশ্য এটা একটু শক্ত। আচ্ছা এইটা বলুন। Four and a Half Years of Struggle Against Lies, Stupidity and Cowardice. এটাও চিনতে পারছেন না? হুম্‌ম্‌। আচ্ছা এইটা নিশ্চয় পারবেন। Atticus. পেরেছেন তো? আগেই বলেছিলাম। 

মাটি খুঁড়ে লোকে গুপ্তধন পায়, ডাইনোসরের ফসিল হয়ে যাওয়া চোয়াল, ম্যামথের দাঁত, অমর হওয়ার উচ্চাশায় পুঁতে রাখা নাটক নভেল প্রেমের কবিতা পায়। তা বলে এই জিনিস?

টাকা জেরক্স করার চেষ্টা করে দেখেছেন কখনও? পারবেন না। কেন পারবেন না জানতে হলে ক্লিক করুন। 


এতদিন কিছুকিছু লেখককে দেখে অবাক হতাম। ধারাবাহিক উপন্যাসের একেকটা পর্ব লিখছেন আর ছাপিয়ে দিচ্ছেন, নিজেই নিজেকে ভালো বলছেন, অন্যের লেখার তেড়ে নিন্দে করছেন। দেখতাম আর জাজ করতাম। আর করব না। সে সব লেখকরা এরকম আচরণ করেন, থামবেন না, চালিয়ে যান। আপনাদের মধ্যে জেমস জয়েস হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। 

এ সপ্তাহের গান। একটা বড় খেয়ালের শুধু দ্রুত অংশটুকু। সাধারণত এরকম কাটাকুটির আমি পক্ষপাতী নই, তবু এই ভিডিওটার লিংক দিলাম। গান শুনতে শ্রোতার যত মজা লাগে, গান গাইতে গাইয়ের তার থেকে কত বেশি মজা লাগে এই ভিডিওটা সেটার জলজ্যান্ত প্রমাণ।  


June 17, 2016

শাসন



বাবার নাকে একটা আড়াআড়ি কালশিটের মতো দাগ আছে যেটা দেখলে মনে হয় ক্লাস এইট থেকে চশমা পরার ফল। কিন্তু বাবা যখন চশমা পরে থাকেন তখন বোঝা যায় যে চশমার সঙ্গে ও দাগের কোনও সম্পর্ক নেই।

ওটা আমার ঠাকুমার এককালের প্রবল প্রতাপের চিহ্ন। আবার ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করলে ঠাকুমা বিনয়ের সঙ্গে নিজের প্রতাপের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাবেন। বলবেন, ওটাকে বাবা ছোটবেলায় কী রকম বাঁদর ছিলেন সেটার প্রমাণ হিসেবেই দেখা উচিত। কোনও একটি মতদ্বৈতের পরিস্থিতিতে ঠাকুমা বাবার গালে একটি প্রকাণ্ড চড় বসান এবং বাবার মুণ্ডু ঘুরে গিয়ে জানালার শিকে ধাক্কা খায়। সেই থেকে ও দাগ নাকের ওপর বিরাজ করছে। 

ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হচ্ছে, দাগের উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঠাকুমা এবং বাবা দুজনের মুখেই এমন নরম আলো ফোটে যেন তাঁরা কোনও হিংস্র ঘটনার স্মৃতিচারণ করছেন না, যেন পুরীর সমুদ্রতটে বসে জীবনে প্রথমবার ঢেউ গোনার কথা মনে করছেন। দাগটা যেন কোনও ক্ষত নয়, দুজনের জীবনেরই একটা সুখের সময়ে স্মৃতি। যখন ঠাকুমার অথরিটি সংসারে সর্বময় ছিল, আর আমার বাবার জীবনের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নাকে ব্যান্ডেজ বাঁধতে গিয়ে খেলতে যেতে দেরি হয়ে যাওয়া।

কিন্তু শুধু নস্ট্যালজিয়া নয়, ওই আলোর মধ্যে আরও একটা অনুভূতি লুকিয়ে আছে। ঠাকুমার ক্ষেত্রে সেটা গর্বের। মারসি, তবে না মানুষ হইসে? বাবার কাছে সেটা কৃতজ্ঞতার। ভাগ্যিস শাসন করেছিলে, তাই তো করে খাচ্ছি। দুজনেই যখন বিকেলবেলা বারান্দায় বসে থাকেন (এখন ঠাকুমা আর বসার অবস্থায় নেই, ক’বছর আগেও ছিলেন, এটা তখনকারই কথা) আর নিজেদের বিস্তৃত পরিবারের অপেক্ষাকৃত কম সৌভাগ্যজনক শাখাপ্রশাখার কথা আলোচনা করেন, যাদের উত্তরসূরিরা ততটাও দাঁড়াতে পারেনি, তখন দুজনেই একমত হন, শাসনের অভাবই তাঁদের ব্যর্থতার একমাত্র কারণ। দুজনের মৃদুগলার আলোচনা ডুবিয়ে দিয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে চিৎকার করতে করতে ছেলেরা হুশ করে সাইকেল চালিয়ে চলে যায়, চমকে উঠে দুজনেই চুপ করে যান, অপ্রসন্ন মাথা নাড়েন, খানিকটা অননুমোদনে, খানিকটা খেদে। এদের বাড়িতে যদি নাক-ফাটানো মা থাকত।

আমার বাবা-ঠাকুমার শাসনসংক্রান্ত আরও একটা থিওরি হচ্ছে, মোর ইজ বেটার। শুধু শাসনই নয়, শাসন করার লোকও যত বেশি হয় তত ভালো। ঠাকুরদার বেশ কিছু বন্ধুর হাতে বাবাদের শাসন করার অধিকার দেওয়া ছিল। তাঁরা ইচ্ছে করলেই বা দরকার বুঝলেই ঠাকুরদা ঠাকুমার পাঁচ ছেলেমেয়ের কান মুলতে পারতেন। এ ব্যাপারে বাংলা ভাষার এক বিখ্যাত সাহিত্যিকের সঙ্গে তাঁদের মত মেলে। সে সাহিত্যিকের ছোটবেলার স্মৃতিচারণে পড়েছি, তিনি একদিন ভরদুপুরে পাশের পাড়ায় এক বন্ধুর বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে বন্ধুর নাম ধরে উচ্চস্বরে ডাকাডাকি করছিলেন। এমন সময় বন্ধুর পাশের বাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে তাঁর কান মুলে/ চড় মেরে তাঁকে বকে বলেছিলেন যে ভরদুপুরবেলা এ রকম চিৎকার করাটা ভয়ানক অসভ্যতা। সাহিত্যিক খুবই নস্ট্যালজিয়ার সঙ্গে সে ঘটনাটি স্মরণ করেছিলেন। তাঁর লেখায় এ আফসোস স্পষ্ট ছিল যে যত দিন যাচ্ছে তত এ ধরণের ঘটনা বিরল হয়ে যাচ্ছে। আজকাল রাস্তাঘাটে ছেলেমেয়েদের প্রচণ্ড অসভ্যতা করতে দেখলেও বড়রা কিছু বলে না, চোখ উল্টে বসে থাকে। শেখার জায়গা আমাদের ক্রমে কমে আসছে।

বাবাদের স্কুলের মাস্টারমশাইদের গল্প শুনে ছোটবেলায় আমার ঘাড়ের চুল খাড়া হয়ে যেত। তাঁরা কোনওরকম দুষ্কর্ম দেখলে ছাত্রের জুলপির চুল ধরে ওপরদিকে হ্যাঁচকা টান দিতেন, মাঝখানে পেনসিল রেখে দুই আঙুল পেঁচিয়ে দিতেন।  তাঁদের সবাই খুব সম্মান করত। বাবামারা ছেলেপুলেদের তাঁদের কাছে সারাদিনের জন্য গচ্ছিত রেখে শান্তিতে থাকতেন।

দুঁদে শাসকদের প্রতি সম্মানের এই ব্যাপারটা আমি পরেও খেয়াল করেছি। তখন বাবাদের যুগ শেষ। আমি বড় হচ্ছি। পেয়ারা গাছ পাড়ায় দ্রুত কমে আসছে কাজেই পেয়ারা গাছের ডাল ভেঙে ছেলেমেয়ে ঠ্যাঙানোর গল্প ক্রমে লিজেন্ডে পরিণত হচ্ছে। সেই সময়ে আমাদের পাড়ায় একঘর নতুন ভাড়াটে এল। রাজু, রাজুর বাবা, রাজুর মা। রাজুর বয়স দশ, কালো গোল মুখের ওপর খাড়া খাড়া চুল দেখলে স্ট্যাটিক খাওয়া সজারুর কথা মনে পড়ে, দাদারা কেউ বলে দোদোমা, কেউ বলে ধানি পটকা। পড়াশোনা খেলাধুলো কোনওদিকেই রাজুর প্রতিভার কোনও ছাপ দেখা যেত না। রাজুর জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল কারও কথা না শোনা।

তবু পাড়ার কারওরই, বিশেষ করে চল্লিশের বেশি বয়স যাদের, সন্দেহ ছিল না যে রাজু বড় হয়ে একজন সফল মানুষ হবে। তার কারণ, রাজুর মা। রাজু সারাদিন দুষ্টুমি করত। রাজুর মা সারাদিন রাজুকে শাসন করতেন। চিৎকার করে। অবশ্য ভালো কাজ লুকিয়েচুরিয়ে করবেনই বা কেন। অনেক সময় সে শাসনের নমুনা চোখেও দেখতে পেতাম। রাজু বিদ্যুৎবেগে বাড়ি থেকে ছুটে বেরোচ্ছে আর বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে রাজুর বাবার একখানা এগারো নম্বর সাদানীল হাওয়াই চটি উড়ে আসছে। সঙ্গে রাজুর মায়ের চিৎকার। জুতো কখনওই লক্ষ্যভেদ করতে পারত না। খানিকক্ষণ পর রাজুর মা হেলেদুলে বেরিয়ে এসে রাস্তা থেকে চটি উদ্ধার করে নিয়ে যেতেন। আশেপাশের বাড়ির প্রতিবেশীদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করতেন। তাঁর মুখে মিনিটকয়েক আগের ক্রোধের চিহ্নমাত্র থাকত না। আমরা ভাবতাম এত শাসন, কাজে তো লাগে না দেখি। কিন্তু বড়রা বলতেন, ভেতরে ভেতরে কাজ ঠিকই দিচ্ছে, বড় হয়ে রাজু একজন গ্রেট ম্যান হবে।

সময়সমাজ ভেদে শাসনের উপায়, তীব্রতা ভিন্ন হয়, তার থেকেও ভিন্ন হয় মানুষভেদে। বাবাদের একই সময়ে বড় হওয়া সত্ত্বেও আমার মা মামা মাসিরা একেবারেই মারধোর খাননি। অথচ তাঁরা কিছু কম নৃসিংহঅবতার ছিলেন না। তাছাড়া তাঁরা সংখ্যায় বাবাদের থেকে বেশি ছিলেন। বাবারা পাঁচ, মায়েরা আট। আটজনই একসঙ্গে বড় হচ্ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু তাতে আমার দিদিমাদাদুর কিছু সুরাহা হয়নি। যারা বড়  হয়ে গেছে, তাঁদের ছেলেমেয়েরা এসে দলে ভিড়েছিল। তাদের খেলা, মারামারি, আক্রমণ, ডিফেন্স, কান্না, হাসি—সব মিলিয়ে কী পরিমাণ শব্দব্রহ্ম সৃষ্টি হত সেটা আমি আমার প্রৌঢ় মাসিমামাদের ডাইনিং টেবিলের চারদিকে বসে কুশলবিনিময়ের ডেসিবেল দেখেই আন্দাজ করতে পারি।

অথচ কেউ কিছু বলত না। দাদুর বলার সময় ছিল না, দিদিমা ভয়ানক শান্ত ছিলেন। পরিস্থিতি নিতান্ত খারাপ হলে রান্নাঘর থেকে মাঝে মাঝে “আহি, আহি” বলে হাঁক দিতেন। তাতে কোনও কাজ দিত না। কারণ ছেলেমেয়েরা জানত যে রান্নাঘর ছেড়ে মায়ের আসার সময় নেই। হুমকিই সার। দিদিমার আরেকটা বকুনি খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। ছেলেমেয়েদের দুষ্টুমি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলতেন, “জ্যান স্বরাজ পাইসে” (জ্যান-এর বানান অন্ত্যস্থ য হবে, কিন্তু টাইপ করা যাচ্ছে না। দুঃখিত।) দিদিমা যখন বড় হচ্ছিলেন তখন স্বরাজ পাওয়াকে একজন মানুষের আনন্দের, বাঁধনহীনতার, স্বাধীনতার চূড়ান্ত মনে করা হত। সমসাময়িক সমাজের স্বপ্ন, ইচ্ছে, আশা কেমন বকুনির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সেই রিসার্চে এই গল্পটা কাজে লাগতে পারে।

আমি যখন বড় হচ্ছিলাম তখন শাসনপদ্ধতি বাবাদের সময়ের থেকে অনেক বদলে গেছে। মারধোর কমে এসেছে, কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি একেবারে। তবে আমি চারপাশে যা যা দেখেছি, তাও গল্প করার জন্য যথেষ্ট।

আমাদের স্কুলে নিয়মিত মান্থলি টেস্ট হত। এখনকার ডেইলি টেস্টের বাজারে আমাদের জীবন কেকওয়াক মনে হলেও পঁচিশ বছর আগে সেটা যথেষ্ট কড়াকড়ির পর্যায়ে পড়ত। মান্থলি টেস্টের নম্বরের গড় করে সেটা হাফইয়ার্লি আর অ্যানুয়াল পরীক্ষায় যোগ কার ব্যবস্থা ছিল মনে হয়, কাজেই মাবাবারা সেটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। এ রকম এক মান্থলি পরীক্ষার খাতা বেরিয়েছিল সে দিন। ছুটির পর কারও কারও মা আসতেন নিতে। সেরকম একজন মা ঝাঁপিয়ে পড়ে খাতা দেখতে চাইলেন। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে খাতা বার করে দিল। মায়ের নম্বর পছন্দ হল না। তিনি বললেন, “ছি ছি ছি। এই দ্যাখ, তোর জন্য সন্দেশ এনেছিলাম, কিন্তু দেব না।" এই না বলে ক্লাস ফাইভে পড়া সন্তানের চোখের সামনে বাক্স খুলে কপকপ করে চারটে কাঁচাগোল্লা খেয়ে ফেললেন।

ট্রেনে এরকম আরেকজন মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি তাঁর পাশে বসা আরেকজন মায়ের সঙ্গে আলাপ করতে করতে যাচ্ছিলেন। ছেলেমেয়েরা যে কিছুই খেতে চায় না সে নিয়ে কথা হচ্ছিল। অন্য মা অনুযোগ করছিলেন যে ছেলে কিছুই খেতে চায় না। মানে চায়, কিন্তু সব খারাপ জিনিস। ডিমসেদ্ধ কপাকপ খেয়ে ফেলে কিন্তু হরলিক্সের গ্লাস যেমন কে তেমন পড়ে থাকে। সেই শুনে আমাদের মা বললেন, "আমি তো না খেলে একবার জিজ্ঞাসা করি, 'খাবি?' দুবার জিজ্ঞাসা করি, 'খাবি?' তারপর আর কথা না বাড়িয়ে নিজেই গ্লাস তুলে ঢক ঢক করে খেয়ে নিই।”

(এখানে খালি মায়েদের শাসন করার কথাই লিখছি। এই বাজারে, যেখানে টিভি খুললেই পরিষ্কার হয়ে যায় বাচ্চার সর্দি লাগা প্রতিরোধ করা থেকে শুরু করে দৌড়ে এরোপ্লেনকে হারাতে পারা থেকে শুরু করে ভাঙা পা নিয়ে সাঁতার কাটা শুরু করে নিজের জুতো গরিব বন্ধুকে দিয়ে দেওয়ার মহত্ব শেখানো সবই মায়েদের সাফল্য অথবা ব্যর্থতা, সেখানে কেবলমাত্র মায়েদের শাসনপদ্ধতি নিয়ে কথা বলাটা রিস্কি। লজ্জা পেয়ে আমি বাবাদের শাসনপদ্ধতি নিয়ে ভাবতে বসলাম। কিল চড় ঘুষি আর অত পরিশ্রম করার ইচ্ছে না থাকলে “কিস্যু হবে না” ভবিষ্যদ্বাণী ছাড়া আর কোনও ইন্টারেস্টিং উদাহরণ মনে পড়ল না। কাজেই আমি নিরুপায়। আপনাদের যদি বাবাদের শাসনের কোনও ইন্টারেস্টিং উদাহরণ জানা থাকে তাহলে মন্তব্যে এসে লিখতে পারেন।)

তবে স্কুলের শাসন বাবাদের সময়েও অদ্ভুত ছিল, আমাদের সময়েও ছিল। কিছু সাইকোপ্যাথ তখনও সেধে বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটানোর পেশা বেছে নিতেন, আমাদের সময়েও নিতেন। জোড়া স্কেল ক্লাস থ্রি-র বাচ্চার পিঠে ভেঙে ফেলতে দেখেছি আমি নিজে চোখে। আরেকজনকে দেখেছি, ক্লাসে খাতা না আনার বা ওই গোত্রের কোনও অপরাধের জন্য একটি বাচ্চা মেয়ের জামা খুলে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। এবং খুলতে শুরু করে দিয়েছেন। ক্লাসশুদ্ধু আতংকিত বন্ধুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেয়েটি ঠকঠক করে কাঁপছে।

আমি নিজে বেশি মারধোর খাইনি। মা শান্ত ছিলেন, আমি মায়ের থেকেও শান্ত ছিলাম। আমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালেই আমার হয়ে যেত। তবু চড়থাপ্পড় খেয়েছি কয়েকখানা। দুঃখের বিষয় সেগুলোর বেশিরভাগই অন্যের ভাগের। রাগ হলে যাদের ওপর রাগ হয়েছে তাদের ধরে মারা যায় না, তাই মা আমাকে ধরে মারতেন। তবে সে মার মাঝারি গোছের চড়ের সীমা ছাড়ায়নি কখনও। আমার এইরকম বোরিং শাসনের জীবনে একটা ঘটনা মনে রাখার মতো। তখন আমি খুবই ছোট। পাতিহাঁস আঁকা টেপফ্রক পরে ঘুরি। সেই সময় একদিন সন্ধ্যেবেলা ইংরিজি কোনও বানান উপর্যুপরি ভুল করার অপরাধে মা আমাকে বাগানে বার করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা যত এলেবেলে শুনতে লাগছে ততটাও নয়, কারণ তখনও আমাদের নতুন ঘর হয়নি, বাগান জুড়ে আম কাঁঠাল নিম পেয়ারা কুল নারকেলের ছড়াছড়ি। তারা সব ভূতের মতো হাতপা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। আর এখন কেন যেন মনে হয় সে রাতে চাঁদের আলোও ছিল না।

আমার ভয় করছিল খুবই, কিন্তু ভয়ের থেকেও চমকে গেছিলাম বেশি। তাই কাঁদিটাদিনি। মিনিটখানেক পরেই মা দরজা খুলে আমাকে তুলে আনলেন। অনেক অনেক দিন পর বকাঝকা নিয়ে গল্প করার সময় আমি মাকে বাগানের এপিসোডটার কথা মনে করাতে মা জিভ কেটে কান ধরেছিলেন। ঘটনাটা মা-ও ভুলতে পারেননি। কারণ নিজের আচরণ তাঁকেও অবাক করেছিল। তারপর মা আমাকে বললেন এ সবই হচ্ছে অবচেতনের খেলা। মায়ের যখন পাতিহাঁস আঁকা টেপফ্রক পরার বয়স ছিল তখন নাকি মানুষের দেহে ক’টা হাড় থাকে বলতে না পারায় সেজমাসি মাকে বাড়ির বাইরে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। ভাগ্যিস দাদু তখন বাজার করে ফিরছিলেন তাই মায়ের অপমান দীর্ঘ হয়নি। সেই থেকে মায়ের অবচেতনে ছিল যে শাসনের তূণে 'বাইরে বার করে দেওয়া’ অস্ত্রটা থাকা জরুরি। সে অস্ত্র জীবনে একবারের জন্য হলেও প্রয়োগ না করে মায়ের মুক্তি ছিল না।


June 15, 2016

20 (more) random facts about me



এই ছবিটা সারিস্কায় তোলা


১। আমি তরল কিছু চামচ দিয়ে গোলার সময় কবজি সর্বদা অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ ঘোরাই। এবং আমার চেনা সকলেই ক্লক ওয়াইজ ঘোরায়। আপনি কোন দিকে ঘোরান?

২। ছোটবেলায় আমার ধারণা ছিল বাচ্চা হওয়ার সঙ্গে সিঁদুর পরার একটা সম্পর্ক আছে। 

৩। মানুষের জন্মরহস্য আমি হাস্যকর (কিংবা কান্নাউদ্রেককারী) রকম বড় বয়সে জেনেছি। বি এস সি ফার্স্ট ইয়ার। অবশ্য ততদিন যে সিঁদুরটাকে কারণ ভেবে এসেছি তেমন নয়। ছোটবেলায় সিঁদুরের কথাটা মনে হয়েছিল, তারপর মাথা থেকে বেরিয়েও গিয়েছিল। মাঝের সময়টুকু ব্যাপারটা নিয়ে ভাবিনি।

৪। আমার ‘বিগ বস’ দেখলে কান্না পায় (রসিকতা করে বলা হচ্ছে না, সত্যি সত্যি কান্নার কথা বলা হচ্ছে।)

৫। ‘গুণ্ডা’ সিনেমাটা দেখেও আমার সত্যি সত্যি কান্না পেয়েছিল। 

৬। আমার ধারণা যারা ‘বিগ বস’ উপভোগ করে তারা ওপরে যতই নিরীহ হোক, ভেতরে হিংস্রতার ক্ষমতা রাখে। ‘গুণ্ডা’র পৃষ্ঠপোষকদের জন্যও একই জাজমেন্ট প্রযোজ্য।

৭। আমার বাঁ হাতের তর্জনীর নখটা সামান্য বেঁকা। ছোটবেলায় কাপালিকের গল্প পড়তে গিয়ে জেনেছিলাম তারা গ্রাম থেকে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের তুলে নিয়ে যেত বলি দেওয়ার জন্য। কিন্তু শর্ত একটাই, নিখুঁত হতে হবে। আমি ঠিক করে রেখেছিলাম আমাকে যদি কেউ কখনও ধরে নিয়ে গিয়ে হাঁড়িকাঠে চড়ানোর উপক্রম করে তাহলে আমি আমার বেঁকা নখখানা দেখিয়ে বলব, দেখুন, আমি কিন্তু খুঁতো। আমাকে বলি দিলে কিন্তু মাকালী পাপ দেবেন। 

৮। আমি যে ভোরে চারটেয় ঘুম থেকে উঠি আর অর্চিষ্মান যে সকাল সাতটায় ওঠে সেটা আমার ধারণা আমাদের সম্পর্কের পক্ষে স্বাস্থ্যকর। সকালের ওই তিনঘণ্টা আমার একার সময়। আবার রাত সাড়ে ন’টা থেকে সাড়ে বারোটা ওর। 

৯। স্বপ্ন যে মানুষের অবচেতনেরই প্রকাশ এ থিওরির আমি টেক্সটবুক এক্স্যাম্পল। ইদানীং যেমন পরীক্ষা এসে গেছে কিন্তু আমার পড়া হয়নি সেই থিমের স্বপ্ন দেখা চলছে। কিন্তু স্বপ্নটার জরুরি পার্টটা এটা নয়। আমি কিছুই পড়িনি কিন্তু বাকি সবাই সবকিছু পড়ে ফেলেছে, এইটা হচ্ছে জরুরি। 

১০। ‘নেভার’ শব্দটায় আমার খুব একটা বিশ্বাস নেই। যেটাই জন্মে করব না ভাবব পরিস্থিতি ঘাড় ধরে সেটাই করিয়ে নেবে, এই ভয় আমার সর্বদা কাজ করে। তবু যদি কেউ মাথায় বন্দুক ধরে তাহলে বলতে পারি, আমি কখনও গায়ে ট্যাটু আঁকাব না। 

১১। মাশরুম খেতে একসময় খুব খারাপ লাগত, এখন চলনসই লাগে। 

১২। ছোটবেলায় উচ্ছে করলা নাক টিপে খেতে হত, এমন স্বর্গীয় মনে হয়। উচ্ছে আলু ভাতে, পাঁচফোড়ন দিয়ে উচ্ছে আলুর চচ্চড়ি,  কুরকুরে ভাজা—— ইস, জিভে জল চলে আসছে। 

১৩। আমি সিগারেট খেয়ে দেখেছি। একাধিকবার। এবং এত ভালো লেগেছে যে পত্রপাঠ খাওয়া বন্ধ করেছি। (না হলে নেশা হয়ে যেত।)

১৪। আমি মদ খেয়ে দেখেছি। একাধিকবার। এবং এত খারাপ লেগেছে যে আর কোনওদিন ছুঁইনি। তবে মদ না খাওয়ার পেছনে বিস্বাদের সঙ্গে সঙ্গে আমার মধ্যবিত্ত ছুঁৎমার্গ কাজ করেছে সেটা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। 

১৫। বিউটি পার্লার যেতে আমার রীতিমত ভয় করে। কিন্তু চুল কাটার জন্য যেতেই হয়। আর যাওয়া মাত্র আমি যে এই ভাবে প্রকাশ্যে ঘুরছি সেটা দেখে ওঁরা শিউরে ওঠেন। তারপর পয়েন্ট আউট করতে শুরু করেন যে আমার কী কী নিয়মিত করা উচিত। আমি ওঁদের সব প্রেসক্রিপশনই অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে কুঁকড়েমুকড়ে অগ্রাহ্য করলে যে মুখভঙ্গিটা করেন তার মানে হচ্ছে, “নিজের ভালো যে না বোঝে তাকে আর কে বোঝাবে।” প্রতিবার ওই প্রস্তরকঠিন অভিব্যক্তির মুখোমুখি হতে ভালো লাগে না। তাই আমি ভাবছিলাম অর্চিষ্মানের চুল কাটার দোকানে যাওয়া ধরব কি না। চুলের গোছা চেপে ধরে সোজা কাঁচি চালাতে ওঁরা খুবই পারবেন সে নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। আর গোটা ব্যাপারটা কত সস্তায় হবে সেটাও একটা প্লাস পয়েন্ট। তারপর শুনলাম ওখানেও নাকি চুল কাটার পর ফেশিয়াল করানোর জন্য ঝুলোঝুলি করে। মহা মুশকিল। 

১৬। আমার জুতোর মাপ বাটা-র পাঁচ। 

১৭। ট্যাক্সিতে বসে এফ এম-এ শোনার পর থেকে গত দু’দিন ধরে আমার মাথায় 'গাপুচি গাপুচি গাম গাম' গানটা ক্রমাগত ঘুরে চলেছে। 

১৮। আমার ডাকনাম অবান্তরের সকলেই মোটামুটি জানেনঃ সোনা। কিন্তু ছোটবেলায় আমার আরও অনেক ডাকনাম ছিল। আমার বাবা আমাকে ‘পাঁচু’ বলে ডাকতেন, সেজকাকু 'কঙ্গো/কনুয়া’ বলে, ছোটকাকু ‘নাসো’ বলে (সকলেই নিজের মতো নাম দিচ্ছে দেখে কাকুরও ইচ্ছে হয়েছিল নিজের একটা নাম দেওয়ার। অনেক মাথা খাটিয়েও কোনও পছন্দসই নাম না পেয়ে কাকু অবশেষে সোনা-কে উল্টে নিয়ে ডাকতে শুরু করেন।) আর পিসি ‘ভুচু/পাগলি’ বলে ডাকতেন। পাশের পাড়ায় সেজকাকুর কিছু বন্ধু ছিল, তারা আমাকে ‘মিমি’ বলে ডাকত। ভগবানই জানেন কেন। 

১৯। কুন্তলা নামটা ঠাকুমার রাখা। কিন্তু 'সোনা' নামটা ঠাকুমা এবং মা দুজনেই দাবি করেন তিনি রেখেছেন। এই বিষয়টা নিয়ে অনেকদিন পর্যন্ত দুজনের একটা ঠাণ্ডা লড়াই চলত। অবশেষে মা ক্ষান্ত দিয়েছেন। আর ঠাকুমাও ‘সত্যমেব জয়তে’ ভঙ্গিতে আমার দু’দুখানা নামকরণের কৃতিত্বই হস্তগত করেছেন। 

২০। কানের দুল আর ঘড়ি ছাড়া আমি তিনটে গয়না নিয়মিত পরি। বাজারে দোকানে রেস্টোর‍্যান্টে অফিসে হিলস্টেশনে সমুদ্রতটে। বাঁ হাতের তর্জনীতে বিয়ের আগে অর্চিষ্মানের দেওয়া আংটি। ওই হাতেরই অনামিকায় বিয়ের সময় অর্চিষ্মানের দেওয়া আংটি। ডানহাতের তর্জনীতে মায়ের দেওয়া একটা নীল পাথরের আংটি। ওগুলো পরলে মনে হয় আমার প্রিয়তম দুজন মানুষ সর্বত্র আমার সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। কেউ আমার টিকি ছুঁতে পারবে না।

*****


আমার সম্পর্কে আরও কুড়িটা তথ্য জানতে হলে। 


June 13, 2016

আমোর




দুঃখের যদি কোনও স্কেল থেকে থাকে তাহলে তার টঙের দিকে থাকবে ভিসা না পাওয়ার দুঃখ। ভাবুন একবার, সবাইকে খবর দেওয়া সারা, সেরকম কাছাখোলা হলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণাও হয়তো করে ফেলেছেন, না হলে ঘোষণার পাঞ্চলাইন ভেবে রেখেছেন। আত্মীয়স্বজনকে খবর দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন মাবাবা। মাস্ট ডু, মাস্ট সি, মাস্ট ইট, মাস্ট বাই লিস্টে বুকমার্কে কম্পিউটার টইটম্বুর। আর তখন আপনি খবর পেলেন যে ভিসা আপনি পাবেন না। প্রথমে একটা শকের মতো লাগবে। এ রকম ঘটতে পারে? ঘটছে? আমার সঙ্গে? তারপর প্ল্যান বি-র জন্য ফ্র্যানটিক হাতড়ানি। কী করবেন? জাত্যাভিমান চুলোয় দিয়ে অফিসারের পায়ে ধরবেন? কেঁদে ফেলবেন? বলবেন, আপনার মানমর্যাদা, সুখশান্তি, আপনার মায়ের রাতের ঘুম, পাড়ায় বাবার প্রতিষ্ঠা, সব সব মাটি হয়ে যাবে এই ট্রিপটা না হলে? তাতে চিঁড়ে ভিজবে না। তখন হবে রাগ। মাথা জ্বলে যাবে। এমন সব কথা আপনার মাথায় আসতে থাকবে, যা আপনার প্রগতিশীল সত্তার সঙ্গে একটুও খাপ খায় না। হু কেয়ারস। ব্যাটা লালমুখো। শিক্ষা নেই, কালচার নেই, ইতিহাস নেই, উদ্বাস্তুর জাত, শুধু আছে পয়সা। ইয়াংকি কোথাকার।

সে রাগও একসময় পড়ে যাবে। তখন শুধু ভিসাহীন আপনি আর আপনার সামনে ডাইনে বাঁয়ে বিস্তৃত শান্তিপথ। পথের দুপাশে অমলতাসের বনে হলুদ ফুল ধরেছে, তকতকে নির্জন রাস্তায় একটা কুড়কুড়ের ছেঁড়া প্যাকেট ঠোক্কর খেতে খেতে উড়ছে।

এই জায়গায় পৌঁছে অর্চিষ্মান ভয়ে ভয়ে সহকর্মীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “ফির কেয়া কিয়া?” সহকর্মী বলেছিলেন, “ফির কেয়া। আমোর বিস্ত্রো চলি গয়ি। অ্যান্ড গট ওভার ইট।”

অর্চিষ্মান চ্যাটবাক্সে বলল, “বুঝলে এবার আমোর না কী একটা আছে সেখানে যেতে হবে।”

কিছুদিন দুঃখের অপেক্ষায় থাকলাম। আমোর-এ যাওয়ার একটা ছুতো তো চাই। দুঃখ এল না। জানতাম। যখন পথ চেয়ে বসে আছি তখন তার দেখা নেই। অসতর্ক মুহূর্তে এসে মাথায় হাতুড়ি মেরে বলবে, ‘সারপ্রাইজ!’ অপেক্ষা করে করে অধৈর্য হয়ে আমরা বিনাদুঃখেই আমোরে চলে গেলাম এক সন্ধ্যেবেলা।


দিল্লির যে জায়গাটায় ধুলো নেই, ভিখিরি নেই, চওড়া ঝকঝকে রাস্তার মুখে সবুজ বোর্ডে সাদা রং দিয়ে হিন্দি আর উর্দুতে লেখা নামগুলো কায়দা করে ফ্রেমের বাইরে রেখে ছবি তুলতে পারলে যে জায়গাটাকে দিব্যি ফরেন বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, আমোর বিস্ত্রো সেইখানে। চারদিকে অভিবাসীদের বাস। তারা সকার প্র্যাকটিস শেষ হলে এস ইউ ভি চেপে মায়ের সঙ্গে আমোরে আসে। এসে একেকজনে একেকটা গোটা গোটা পিৎজা সাবাড় করে ফেলে। দেওয়ালের জোরালো এসির হাওয়ায় ঘেমো টি শার্ট শুকিয়ে ফ্যাকাসে গা থেকে অবশেষে আলগা হয়ে যায়। আরেকদিন ভারতীয় হকি দলের ক্যাপ্টেন সর্দার সিং-কে দেখেছিলাম। বোঝা যাচ্ছিল আমোর-এ তিনি নিয়মিত খদ্দের। খাওয়া শেষ হলে দোকানের ম্যানেজার আর টেবিলের ভারপ্রাপ্ত একাধিক ওয়েটার টেবিলের কাছে গিয়ে সারি বেঁধে দাঁড়ালেন। আমরা কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু দোকানের পক্ষের সবাইকে শিউরে উঠে জিভ কেটে কানের লতি ছুঁতে দেখে বুঝলাম বিলের কথা উঠেছে। সর্দার সিং “কেয়া ইয়ার” ভঙ্গি করে রুপোলি বালা পরা দুই হাত বাতাসে ঘোরালেন। সোফা ছেড়ে উঠে জিনসের পেছনের পকেট থেকে মোটা এক তাড়া নোট বার করে সবথেকে কাছাকাছি দাঁড়ানো ওয়েটারের পকেটে গুঁজে দিয়ে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।


আমি আর অর্চিষ্মান লজ্জাটজ্জা ভুলে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। কী বডি! কংকালের কাঠামোর ওপর শুধু পেশী। তাও যেখানে যতটুকু থাকার কথা। জিমে গিয়ে মাসলের পাহাড় বানানো সিনেমার হিরোগুলোর লজ্জা পাওয়া উচিত।

সর্দার সিং-এর স্বাস্থ্যের মতোই ভালো আমোর-এর খাবার। কন্টিনেন্টাল, ইট্যালিয়ান, মেডিটেরেনিয়ান খাবারের দোকান আমোর। (হজ খাসে এদেরই আরেকটা ক্যাফে অ্যান্ড বার রেস্টোর‍্যান্ট আছে। ) প্রথম দিন অর্চিষ্মান খেয়েছিল স্টেক। আমি কী খেয়েছিলাম ভুলে গেছি। কিন্তু চামচ মুখে পুরে আনন্দে মাথা নেড়েছিলাম মনে আছে।  দ্বিতীয় দিন আমরা দুজনেই নিয়েছিলাম পিৎজা, আর কী একটা যেন স্টার্টার। আমরা সাধারণত দোকানে খেতে গিয়ে পিৎজা অর্ডার করি না। পিৎজা হচ্ছে আমাদের বাড়িতে রান্না/ রান্নার ইচ্ছে না থাকলে, মনে অপরাধবোধ চেপে রেখে সস্তার হোম ডেলিভারি। সেগুলো খিদের মুখে আর গরম থাকতে থাকতে দারুণ লাগে, কিন্তু লাস্ট ত্রিকোণে পৌছতে পৌঁছতে যখন পেট ভরে যায় আর পিৎজাও ঠাণ্ডা হয়ে যায়, তখন 'তুমি খাও তুমি খাও' বলে ঠেলাঠেলি করতে হয়। এবং সে ঠেলাঠেলির সঙ্গে সৌজন্যের কোনও সম্পর্ক নেই। আমোর-এর উডফায়ার আভেনের পিৎজার সুখ্যাতি শুনে অর্ডার করেছিলাম। ঠকিনি।

গত ক’মাসের খরার পর তাই যখন কোথাও খাওয়ার কথা উঠল তখন আমোর-এর নামটাই একসঙ্গে দুজনের মাথাতে এল। চলে গেলাম সকাল সকাল। গরম এড়ানোও হল, আর আমোর-এর ব্রেকফাস্টও প্রথমবারের জন্য চাখা হল।

কাল সকালটা খুব সুন্দর ছিল, রোদ ওঠেনি, আর অটোর জানালা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া এসে গায়ে লাগছিল। কিন্তু আমি সে সবে মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। দোষটা আমারই। 'দোকানে গিয়ে তো খাবই' ভেবে চা না খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। সময় যত পেরোচ্ছিল, মনে হচ্ছিল আমার মাথার ভেতর থেকে রক্তমাংসঘিলু বার করে নিয়ে কে যেন গলানো লোহা ঢেলে দিচ্ছে।


এখন ক্যামেরার দিকে তাকানোর সময় নেই।


নাও, এবার কত পোজ দিতে হবে দিচ্ছি।


আমরা নিলাম ফ্রিটাটিনা অর্থাৎ ছোটো সাইজের ফ্রিটাটা (বেসিক্যালি জিনিসপত্র দেওয়া ওমলেট)। মাশরুম আর অলিভ দেওয়া। সঙ্গে কমপ্লিমেন্টারি ফ্রেঞ্চ পাউরুটি, হ্যাশ ব্রাউন আর সেঁকা টমেটো। আর পাছে প্রোটিন কম পড়ে তাই বেকন হ্যাম সহযোগে কার্নিভোরাস প্ল্যাটার। এই প্ল্যাটারের সঙ্গে এল রুটি, হ্যাশ ব্রাউন, টমেটো, আমাদের পছন্দ মতো সানি সাইড আপ, এক্সট্রা রসুনগন্ধী অলিভ অয়েলে নাড়াচাড়া করা পুষ্ট মাশরুম আর বেকড বিনের ছোট্ট বাটি।


খাওয়া শেষ করে আমি আরেককাপ চা নিলাম। অর্চিষ্মানের প্রথম কাপ তখনও চলছে। আমাদের দুজনেরই পেট ভদ্রস্থ রকম ভরেছিল, কিন্তু সেটাকে আইঢাই স্টেজে নিয়ে যেতে না পারলে মজা নেই। ভাবছিলাম আর কিছু অর্ডার দেব কি না, এমন সময় ভদ্রলোক এসে সুখবর দিলেন। কার্নিভোরাস প্ল্যাটারের সঙ্গে এক টুকরো কেকও নাকি আমাদের প্রাপ্য।

লাল নীল সবুজ মোরব্বার টুকরো গাঁথা নরম গরম কেকের সঙ্গে চা খেতে খেতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে দিব্যি লাগছিল। ধোপা এসে কাচা সোনালি রঙের ন্যাপকিনের বান্ডিল ফেরৎ দিয়ে নোংরা ন্যাপকিন গুনে বান্ডিল বেঁধে নিয়ে গেলেন। কাছেই বোধহয় মাদার ডেয়ারি আছে, দু’চারজন লোক চকচকে স্টিলের ক্যান হাতে দুলিয়ে গেল দেখলাম। তারপরই হঠাৎ এক ধাক্কায় মেঘটা সরে গিয়ে সূর্য ঝলমল করে উঠল। আমরা বিল মিটিয়ে প্রাণ নিয়ে বাড়ি পালালাম।


June 11, 2016

সাপ্তাহিকী






“Why is it we want so badly to memorialize ourselves? Even while we're still alive. We wish to assert our existence, like dogs peeing on fire hydrants.” 
                                                         ---Margaret Atwood, The Blind Assassin


প্রথম ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হচ্ছে, কল্পনায় আকাশের ভাগটা কত বেশি। দ্বিতীয় ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হচ্ছে, ইন্টারনেট কোত্থাও নেই। লিংক পাঠিয়েছে শ্রীমন্তী।

অফিসে আমিও কাজ করি না, তা বলে এ রকম বুক ফুলিয়ে কাজে ফাঁকি?

সব ভুলে যাওয়ার পর মানুষের যে ক’টা ভাষা মনে থাকবে তার মধ্যে হিন্দি একটা।

পালং শাক আর তরমুজ খরমুজ ভারতে প্রথম উৎপন্ন হয়েছিল সেটা মেনে নিতে রাজি আছি, তা বলে লেটুস?

এইরকম ছাতা বাজারে বেরোলে আমি কিনব।

এ মাসের গান। শুনে যদি বৃষ্টি নামে। 


June 10, 2016

এ মাসের বই/ মে ২০১৬ (২)



আন্তর্জাতিক বইয়ের বাজারে এখন পুরস্কারের মরশুম। লেখকদের এই আনন্দের সময়ে পাঠকদের পক্ষে যা করা সম্ভব তা হচ্ছে তাঁদের এত খাটাখাটনি করে লেখা বইগুলো পড়া। আমিও তাই করলাম। সব প্রাইজ পাওয়া বইগুলোই পড়তে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু আপাতত দুখানাই পড়ে উঠতে পেরেছি।

*****

The Sympathizer/ Viet Thanh Nguye



I am simply able to see any issue from both sides. Sometimes I flatter myself that this is a talent, and although it is admittedly one of a minor nature, it is perhaps also the sole talent I possess. At other times, when I reflect on how I cannot help but observe the world in such a fashion, I wonder if what I have should even be called talent. After all, a talent is something you use, not something that uses you. The talent you cannot not use, the talent that possesses you – that is a hazard, I must confess. But in the month when this confession begins, my way of seeing the world still seemed more of a virtue than a danger, which is how some dangers first appear.

দু’হাজার ষোলোর পুলিৎজারজয়ী বই Viet Thanh Nguye-এর ‘দ্য সিমপ্যাথাইজার’-এর একেবারে গোড়ার দিক থেকে নেওয়া ওপরের লাইনগুলো। একটা স্বীকারোক্তির অংশ। জেলখানায় বসে স্বীকারোক্তি লিখছেন আমাদের প্রোট্যাগনিস্ট, “ক্যাপ্টেন”, দ্য সিমপ্যাথাইজার। এই স্বীকারোক্তিটই পরেদ্য সিমপ্যাথাইজারউপন্যাস হয়ে বেরোবে।

সে কী, কোথাকার জেলখানা? ভিয়েতনামের। তাও জঙ্গলের ভেতরের গুপ্ত গেরিলা জেলখানা। কেনই বা জেলখানা? কারণ প্রোট্যাগনিস্টদ্য ক্যাপ্টেনএকজন স্পাই। সর্বনাশ। কাদের স্পাই? ভিয়েতকং-এর। বা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট-এর। বা কমিউনিস্টদের। স্পাইগিরিটা কাদের বিরুদ্ধে? দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার আর সেই সরকারের পৃষ্ঠপোষক অ্যামেরিকার।

যারা ওই জায়গার ওই সময়ের ইতিহাসে সড়গড় তাঁদের কাছে হয়তো ওপরের প্রশ্নোত্তর অর্থবহ, কিন্তু আমার মতো পাতিহাঁস যদি কেউ থেকে থাকেন তাহলে তাঁদের জন্য আরেকটু খোলসা করে বলা দরকার।

অ্যামেরিকা আর ভিয়েতনামের যুদ্ধটা আসলে উত্তর বনাম দক্ষিণ ভিয়েতনামেরও যুদ্ধ। উত্তর ভিয়েতনামের হয়ে লড়ছিল রাশিয়া, চিন আর অন্যান্য কমিউনিস্ট শক্তি আর দক্ষিণ ভিয়েতনামের হয়ে লড়ছিল অকমিউনিস্টরা, যাদের মুরুব্বি ছিল অ্যামেরিকা। উনিশশো তিয়াত্তর সালে খাতায় কলমে ভিয়েতনামের সঙ্গে অ্যামেরিকার সমস্ত সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। কিন্তু যুদ্ধটা আসলে শেষ হয় উনিশশো পঁচাত্তর সালের তিরিশে এপ্রিল, যখন উত্তর ভিয়েতনাম থেকে পিপলসআর্মি অফ ভিয়েতনাম আর ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট ঝাঁক বেঁধে নেমে এসে দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সাইগন দখল করে।

সিমপ্যাথাইজার/ক্যাপ্টেনের স্বীকারোক্তি শুরু হচ্ছে এই দখলের ঠিক আগে থেকে। দক্ষিণ ভিয়েতনামের পতন তখন নিশ্চিত। দেশের প্রেসিডেন্ট ক’দিন আগে দেশছাড়া হয়েছেন, তাঁর হাতের সুটকেসের ভার এয়ারপোর্টের কর্মীদের বিস্মিত করেছে। যারা অবাক হয়নি তাদের মধ্যে আমাদের ক্যাপ্টেন একজন। ভারি তো হবেই, প্রেসিডেন্ট দেশের ব্যাংক খালি করে সোনার বাট সুটকেসে পুরেছেন যে।

দেশের মাথারা চলে গেছেন। কিন্তু পড়ে রয়েছে আরও হাজার হাজার ভিয়েতনামিজ। আর কিছু অ্যামেরিকান। তাদের আর কিছু ‘অ্যাট রিস্ক’ ভিয়েতনামিজদের অ্যামেরিকায় ফিরিয়ে আনার জন্য শুরু হয়েছে অপারশন ‘ফ্রিকোয়েন্ট উইন্ড’। সকলেই সেই লিস্টে নাম ওঠাতে চায়। ‘অ্যাট রিস্ক’ লেবেলের কেনাবেচায় বাজার সরগরম। কেউ থাকতে চায় না, সবাই পালাতে চায়। কিন্তু কেন চায়? এতদিনের বিদেশী শাসনের পর নিজের লোকের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হওয়ার এমন মাহেন্দ্রক্ষণে? কারণ তারা জানে যে শাসকের আসলে দেশীবিদেশী বলে কিছু নেই, শ্বেতাঙ্গ পীতাঙ্গ নেই, ভাষার বিভেদ নেই, ধর্মের ফারাক নেই, নীতির তফাৎ নেই। সব জাতির, সব ধর্মের, সব গায়ের রঙের শাসকের আইডিওলজি, প্রোপাগ্যান্ডা, ম্যানিফেস্টোর কি-ওয়ার্ডস এক ও অভিন্ন। শোষণ আর অত্যাচার। নিজের ঘরের আরামে বসে অচেনা শোষকের হাতে পড়ার থেকে তাই তারা চেনা শোষকের সঙ্গে সাগর পাড়ি দিতে রাজি। এ আশঙ্কা যে কতখানি সত্যি সেটা ক্যাপ্টেন নিজেই বুঝেছেন। গল্পের শেষে আবার যখন তিনি দেশে ফিরে গেছেন, তখন দেশের পরিস্থিতির কথা জানতে চাওয়ায় একজন তাঁকে বলছেন, Before the communists won, foreigners were victimizing and terrorizing and humiliating us. Now it’s our own people victimizing and terrorizing and humiliating us. I suppose that’s improvement.

যাই হোক, আবার গল্পের শুরুতে ফিরে আসা যাক, যেখানে দলে দলে, কাতারে কাতারে লোক জড়ো হয়েছে হেলিপ্যাডের ধারে, একটামাত্র থলিতে নিজেদের গোটা অতীতটাকে পুরে নিয়ে। সারাদিন, সারারাত অপেক্ষা করছে, জল ছাড়া, খাবার ছাড়া, মাথার ওপর ছাউনি ছাড়া। কোথায় তাদের নিয়ে যাওয়া হবে কেউ জানে না, সেখানে কী অপেক্ষা করে আছে তাদের জন্য কেউ জানে না। বসে বসে তারা কী ভাবছে? তা কল্পনা করার ক্ষমতা বা সাহস কোনওটাই আমার নেই। তবু Viet Thanh Nguyen – এর হাতে পড়ে উদ্বাস্তু শব্দটা খানিকটা অবয়ব পায়। বইয়ের পাতা থেকে একটা প্রকাণ্ড কালো ছায়া ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়ায় চোখের সামনে, যার আড়ালে কী তীব্র যন্ত্রণা, আশা, স্বপ্ন লুকিয়ে আছে ভাবলেও ঘাড়ের রোম খাড়া হয়ে ওঠে।

সবাই পালাতে চায়, কিন্তু সবাই পালাতে পারবে না। ওখানে অপেক্ষারত মানুষেরা জানে না, কিন্তু আমরা যারা গল্পটা পড়েছি তারা জানি, ইভ্যাকুয়েশনের মাঝপথে বোমা এসে পড়বে হেলিপ্যাডের ওপর, শতশত মানুষ নিমেষে ধোঁয়া হয়ে যাবে। তাদের পরিণতি তবু একরকম। তাদের অকিঞ্চিৎকর জীবনের ওইখানেই ইতি। কিন্তু যারা মরল না, স্ত্রীর কোলে জাপটে থাকা শিশুসন্তানের পিঠ ফুঁড়ে স্ত্রীর বুকে গুলি বিঁধে যেতে দেখল, স্ত্রীর বুক থেকে মৃত সন্তানকে টেনে খোলা রানওয়েতে ফেলে রেখে এসে আধমরা স্ত্রীকে টানতে টানতে চলন্ত হেলিকপ্টারে নিজেকে গুঁজে দিতে পারল, মানুষের মানটুকু বিদায় দিয়ে রেখে শুধু হুঁশটুকু সম্বল করে যারা ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে ঘুরে বেড়ালো, আবার শূন্য থেকে শুরু করল কিংবা পারল না, তাদের কী হল? কী হবে? সারাজীবন রাঁধুনিচাকরপরিবৃত বড়লোকের বউ নিজের রান্নাঘরে ‘অথেনটিক’ খাবারের দোকান খুলবেন, ক্ষমতাচ্যুত জেনারেল অন্ধকার ঘরে একা বসে নেশা করবেন, রাস্তার আলো পড়ে শার্টে আঁটা সারি সারি মেডেলরা চকচক করবে। যে এদেশে বেশ্যা ছিল সে ওদেশেও বেশ্যাবৃত্তি করবে। খালি নতুন দেশে্র নতুন ভাষায় তার দরকষাকষির ক্ষমতা তলানিতে এসে ঠেকবে।

কেমন লাগবে তাদের? আমি জানি না। জানতে চাইও না। ভিয়েতনামের কথা ছেড়েই দিলাম, এ ঘটনা তো ঘটেছে আমাদের বাড়ির ভেতর। মোটে একটা প্রজন্ম আগে। ভালো ছাত্র ভালো স্কুল ছেড়ে এসে দিনে চাকরি, রাতে নাইটস্কুল, সাপের মুখে পড়ে একেবারে নিচে নেমে এসে আবার শিখরের দিকে দৌড় এবং জয়। ফেলে আসা জমিদারির গল্প শুনে সবাই মুখ টিপে হাসে, সে সব সত্যি বা মিথ্যে গপ্প ফাঁদার দরকার কী? তার থেকে এই দ্বিতীয় জীবনটার গল্প তো অনেক বেশি সত্যি, অনেক বেশি রোমহর্ষক।

যুদ্ধ, উদ্বাস্তু, আদর্শের টানাপোড়েন, অচেনা কংক্রিটে শিকড় ছড়ানোর যন্ত্রণাময় প্রক্রিয়া নিয়ে অনবদ্য ভাষায় লেখা এই গভীর এবং গতিময় উপন্যাসটি পড়তে আমি সবাইকে বলি।



The Vegetarian/Han Kang


পুলিৎজারের পালা শেষ, এবার লাইনে ম্যানবুকার ইন্টারন্যাশনাল। এ বছরের ম্যানবুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ পেয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ান উপন্যাস দ্য ভেজিটেরিয়ান-এর লেখক হ্যান কাং। বইটি ইংরিজি ভাষায় অনুবাদ করেছেন ডেবোরা স্মিথ।

'দ্য ভেজিটেরিয়ান' হচ্ছে তিনটি খণ্ডওয়ালা একটি উপন্যাস বা উপন্যাসিকা। প্রথম অংশের নাম 'দ্য ভেজিটেরিয়ান', দ্বিতীয় অংশ 'মংগোলিয়ান মার্ক', তৃতীয় 'ফ্লেমিং ট্রিজ'। তিনটে গল্প আপনি আলাদা আলাদা ভাবে পড়তে পারেন আবার একসঙ্গেও পারেন। কারণ গল্প তিনটের একটা কমন সুতো আছে। প্রথম গল্পটা যে ভদ্রমহিলাকে নিয়ে,দ্বিতীয় গল্পটা সেই ভদ্রমহিলার ভগ্নীপতিকে নিয়ে, তিন নম্বর গল্পের মূল চরিত্র ভদ্রমহিলার বোন। তিনটি গল্পেরই ইনসাইটিং ইভেন্ট, অর্থাৎ যে ঘটনাটা ঘটল বলে গোটা গল্পটা বলার দরকার হল, ঘটে এক নম্বর গল্প দ্য ভেজিটেরিয়ান-এর শুরুতে। এক সাধারণ পরিবারের সাধারণ মহিলা হঠাৎ একদিন ঘোষণা করলেন তিনি আর মাংস খাবেন না। ছোঁবেনও না। অর্থাৎ কি না তাঁর স্বামীরও (নিজে না রাঁধলে) বাড়িতে মাংস খাওয়া বন্ধ। বাইরে অবশ্য স্বামী নিয়মিত মাংস খান। কিন্তু বাড়িতে যে খেতে পাচ্ছেন না, সে নিয়ে ক্রমে তাঁর মনে অসন্তোষ জমতে থাকে।

অচিরেই অসন্তোষটা স্বামী থেকে পরিবারের অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। স্বামী নিজেই ফোন করে শ্বশুরবাড়িতে (মহিলার বাড়িতে) খবরটা জানালেন। তারপর যা কাণ্ড ঘটল সে বইটা না পড়লে আপনারা বিশ্বাস করতে পারবেন না।

আমিও পারছিলাম না। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক মাছমাংস ছোঁবে না বলাতে লোকজন এত রিঅ্যাক্ট করে নাকি? অবাস্তব। তারপর আমার মাথা খুলল। আমি বুঝলাম অসুবিধেটা মহিলার আমিষ খাওয়া না খাওয়ার নয়। অসুবিধেটা হচ্ছে স্বামীর অপছন্দ হবে জেনেও মহিলার নিজদায়িত্বে একখানা সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এবং সে সিদ্ধান্তে অটল থাকায়। মহিলার বাড়ির লোক যে অদ্ভুত আচরণটা করেছে সেটার ইনসাইটিং ইভেন্ট হিসেবে যদি আমিষ না খাওয়ার মতো তুচ্ছ (অবশ্য আমার কাছে যতটা তুচ্ছ, সাউথ কোরিয়ার মাংসপ্রধান খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে ততটাও তুচ্ছ নয়) বিষয়টাকে যদি অন্য কোনও গুরুতর বিষয় দিয়ে রিপ্লেস করি (ডিভোর্স চাওয়া, সন্তান না চাওয়া, লোকের পছন্দের উল্টো স্রোতে গিয়ে নিজের পছন্দমতো পোশাক পরা, বাচ্চা ফেলে রেখে চাকরি করতে যাওয়া, নিজের জন্য আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট মেন্টেন করাঃ যে যার ইচ্ছেমতো গুরুতর ঘটনা বসিয়ে নিতে পারেন) তাহলেই আচরণগুলো অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। অবদমিত যৌনতা, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের (বিশেষ করে মেয়ে সন্তানের) প্রতি বাবামায়ের "তোমার জীবনের ভালোমন্দ স্থির করে দেওয়ার অধিকার এখনও আমাদের (আর তোমার স্বামীর)” সে সন্তানের বেচালের সব দায়িত্ব নিজেদের ঘাড়ে নিয়ে জামাইয়ের কাছে গলবস্ত্র হয়ে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি, মায়ের কেঁদে মন গলানোর চেষ্টা, তা বিফলে গেলে বাবার (যিনি এতক্ষণ সাংসারিক খিটিমিটিতে না ঢোকার সংযম দেখিয়ে হাততালি কুড়োচ্ছিলেন) থাপ্পড় মেরে গাল ফাটানো শাসন – এগুলো বিশ্বাস করতে কল্পনাশক্তির ওপর বিশেষ চাপ সৃষ্টি না করলেও চলে।

দ্য ভেজিটারিয়ান খুব নিরীহ বই নয়। পড়তে পড়তে অস্বস্তি হবে। অন্তত আমার হয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, বাবা এত অত্যাচার সহ্য করার দরকার কী, আরেকটু গতে বাঁধা হলেই তো হত। কিন্তু তারপর নিজেই লজ্জা পাচ্ছিলাম। আর হান ক্যাং-এর প্রতি শ্রদ্ধাটা আরও বেড়ে যাচ্ছিল। কারণ তিনি মহিলার লড়াইটাকে একটুও জোলো করে দেখাননি কোথাও, মহিলার কোনও সিদ্ধান্তকে জাস্টিফাই করার প্রয়োজন বোধ করেননি। মানসিক, শারীরিক, সমস্ত আক্রমণের উত্তরে মহিলা “আমি মাংস খাই না” – এই চারটে শব্দ ছাড়া আর কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করেননি।

ভেজিট্যারিয়ান আমার ভালো লেগেছে। কোনও কোনও যুক্তি, অ্যাকশন বড় বেশি ধারালো, বড় বেশি অকারণও লেগেছে। কোথাও কোথাও চরিত্রদের ‘চরিত্রে’র প্রতি জাজমেন্টালও হয়ে পড়ছিলাম। কিন্তু সে আমার মধ্যবিত্ততার দোষ। হ্যান ক্যাং-এর তাতে কোনও দোষ নেই। তাঁর ভাবনা, ভাষা, চরিত্রচিত্রণ, প্রতিবাদ - প্রাইজ পাওয়ারই মতো।

তবুও তিনি প্রাইজটা পেতেন না, যদি না ডেবোরা স্মিথের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হত। ডেবোরা স্মিথ ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ ইংরিজিতে অনুবাদ করেছেন। ওঁর ক্ষমতা, নিষ্ঠার বিচার করার জন্য একটি তথ্য জানাই যথেষ্ট। ডেবোরা স্মিথ কোরিয়ান ভাষাটা শিখতে শুরু করেছিলেন মোটে তিন বছর আগে।



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.