July 31, 2016

স্মৃতিভ্রংশ, প্রতিশোধ এবং একটি পারফেক্ট উপন্যাস/ জুলাই (২০১৬) মাসের বই



Stoner/John Williams



হোয়াট ডিড ইউ এক্সপেক্ট? 

বইয়ের শেষ পাতায় পৌঁছে যখন জানালার ওপারে দিনের আলো নিভে এসেছে, শরীরের ভেতরটা কুরে খেয়ে নিয়েছে ক্যান্সার, প্রিয়জনের উপস্থিতিশূন্য বিছানার পাশে শুধু চুড়ো হয়ে আছে বইপত্রের ঢিপি; সারাজীবন চাকরি করার পর অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরের পদ থেকে এক পা-ও এগোতে না পারা, স্ত্রীকন্যার ভালোবাসা জয় করতে না পারা, উইলিয়াম স্টোনার মরে যেতে যেতে তখন নিজেকে জিজ্ঞাসা করছে, হোয়াট ডিড ইউ এক্সপেক্ট?

স্টোনার শেষ করার পর আমি নিশ্চিত ছিলাম বইটা নিয়ে আমার কিছু লেখা সম্ভব হবে না। অথচ এরকম একটা বই পড়ার পর চুপ করে বসে থাকেই বা কী করে মানুষ? একবার মনে হয়েছিল নিজে এ গুরুদায়িত্ব মাথায় না নিয়ে অন্যের সাহায্য নিই। যে যা বলেছে সেগুলো লিখে দিই। 

Stoner is a perfect novel, so well told and beautifully written, so deeply moving, that it takes your breath away. 
New York Times

A beautiful novel… a marvellous discovery for everyone who loves literature.
Ian McEwan 

The greatest American novel you’ve never heard of. 
The New Yorker

A book for everyone, democratic in how it breaks the heart…It is a triumph of literary endeavour. It deserves the status of a classic. 
Independent

A beautiful and moving novel, as sweeping, intimate and mysterious as life itself. 
Geoff Dyer

Why isn’t this book more famous?
CP Snow

অ্যারোগ্যান্স শব্দটা পৃথিবীর আর যা কিছুর বর্ণনায় ব্যবহার করা যাক না কেন, গল্পের নায়ক উইলিয়াম স্টোনার সম্পর্কে কিংবা লেখক জন উইলিয়ামের লেখা সম্পর্কে যায় না। তবু যখন দেখি দুশো অষ্টাশি পাতার বইয়ের মূল কথাটা জন উইলিয়াম বলে দিয়েছেন একেবারে শুরুর দুটো প্যারাগ্রাফে, তখন এই অসঙ্গত শব্দটাই মাথায় আসে। 

William Stoner entered the University of Missouri as a freshman in the year 1910, at the age of nineteen. Eight years later, during the height of World War I, he received his Doctor of Philosophy degree and accepted an instructorship at the same University, where he taught until his death in 1956. He did not rise above the rank of assistant professor, and few students remembered him with any sharpness after they took his courses. When he died, his colleagues made a memorial contribution of a medieval manuscript to the University library. This manuscript may still be found in the Rare Books Collection, bearing the inscription: “Presented to the Library of the University of Missouri, in memory of William Stoner, Department of English. By his colleagues.

An occasional student who comes across the name may wonder idly who William Stoner was, but he seldom pursues his curiosity beyond a casual question. Stoner’s colleagues, who held him in no particular esteem when he was alive, speak of him rarely now; to the older ones, his name is a reminder of the end that awaits them all, and to the younger ones it is merely a sound which evokes no sense of the past and no identity with which they can associate themselves or their careers.

এক কথায়, স্টোনার একজন নোবডি। নাথিং। হতদরিদ্র চাষির ঘরে জন্ম, একটা চরম ভুল বিয়ে - এ গুলোকে না হয় ভাগ্যের মার হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, কিন্তু অন্য যে সুযোগগুলো স্টোনারের সামনে এসেছিল, হিরো না হলেও অন্তত সামথিং, সামবডি হয়ে উঠতে পারার, যেগুলো সে নিজে হাতে নষ্ট করেছে? দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধে নিজের দেশের হয়ে লড়তে যাওয়ার গৌরবের অধিকার পেয়েও স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছে। বলেছে, আমি বরং শেক্সপিয়ার পড়ব ঘরের কোণে বসে। মানসিকভাবে অসুস্থ স্ত্রীর হাতে নিজের একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যৎ সঁপে দিয়েছে শুধু কনফ্রনটেশনের শক্তি জোগাড় করতে পারেনি বলে। অথচ নিজের ডিপার্টমেন্টের রাজনীতিতে, হার নিশ্চিত জেনেও ‘ঠিক’ কাজটা করার জন্য লড়ে গেছে শেষ পর্যন্ত। 

স্টোনার হিসেবি নয়, স্টোনার বেহিসেবি নয়। জীবনের পরীক্ষায় স্টোনার পাশ নয়, ফেলও নয়। স্টোনার মানবসভ্যতার সেই বিশাল প্রকাণ্ড অংশের মতো যাদের নিয়ে ভাবনার এককুচিও খরচ করা অপচয়। 

সেই উইলিয়াম স্টোনারের জীবন নিয়ে একখানা উপন্যাস লিখেছেন জন উইলিয়ামস। উপন্যাসও না ঠিক, বলা উচিত ধারাবিবরণী। আর সেই ধারাবিবরণী আমাকে, আরও অনেকের মতো, দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। অফিসের ডেস্কে, অটোতে কাঁদিয়ে এমব্যারাসডের চূড়ান্ত করেছে। এ কান্নার কোনও কারণ নেই। কোনও প্লট পয়েন্ট, শেষ লাইনে হৃদয় মোচড়ানো টুইস্ট এর জন্য দায়ী নয়। এ কান্না স্টোনারের জন্য নয়, নিজের জন্যও না। 

ইনসাইড আউট সিনেমাটা যারা দেখেছেন তাঁরা মনে করতে পারবেন, সিনেমার শেষে আমাদের মগজের হেডকোয়ার্টারে যখন অনুভূতিদের মিটিং বসেছে, তখন আমরা দেখি বিরাট সেক্রেটারিয়েট টেবিলে আরও সব ঝলমলে আবেগঅনুভূতির - আনন্দ, বিস্ময়, ভয়, রাগ, হিংসে আরও যাদের উপস্থিতি আমরা দিনের মধ্যে কে জানে কতবার টের পাই - মধ্যমণি হয়ে বসে আছে নীলবরণ স্যাডনেস। বাকিরা কলরব করছে, আর সে তার বিষণ্ণ আঙুলে আমাদের জীবন গুছিয়ে দিচ্ছে। 

আমাদের জীবনের দিশা ঠিক করে দেওয়া এই দুঃখের সঙ্গে আমাদের দেখা হয় খুব কম। মানুষের বানানো খুব, খুব, খুব কম জিনিসের ক্ষমতা আছে আমাদের এই গভীর, গোপন, অকারণ দুঃখের আগুনে ফুঁ দেওয়ার। সুর পারে। কোনও কোনও মাঝরাতের দরবারী পারে। হয়তো সুর সাজাতে আয়োজন লাগে না বলেই। যে সৃষ্টির পেছনে যত আয়োজন, আমাদের ভেতরের দুঃখের থেকে তার দূরত্ব তত বেশি। 

যৎসামান্য হলেও লেখাতেও আয়োজন প্রয়োজন আর তাই লেখার পক্ষেও কাজটা শক্ত। খুব কম লেখা পারে। স্টোনার পেরেছে। জন উইলিয়ামসের নিরাভরণ ভাষা মানুষের জীবনের সমস্ত অকিঞ্চিৎকরতাকে মেলে ধরেছে পাঠকের চোখের সামনে আর সে ছবির বিবর্ণতায় ঝলসে গেছে আমাদের চোখ। স্টোনার-এর ভেতর কোথাও কোনও আড়াল নেই, আর তাই ব্যাপারটা সহ্য করা এত শক্ত। পড়তে পড়তে পাঁজরের ভেতরের হাওয়া ফুলে উঠবে, অসহায়তায় দম বন্ধ হয়ে আসবে। বই মুড়ে ডিপ ব্রেথ নিতে নিতে ভাবতে হবে, মাগো, এর কী শেষ নেই?

অথচ স্টোনারের গল্প কিন্তু শুধুই পরাজয় আর অপমান আর না পাওয়ার নয়। স্টোনারের জীবনে তো ভালোবাসাও এসেছে। তিন তিনবার। প্রথমবার ইংরিজি সাহিত্যের প্রতি, দ্বিতীয় বার আত্মজার প্রতি, তৃতীয় এক নারীর প্রতি। তিনজনেই স্টোনারকে ছেড়ে গেছে শেষমেশ। প্রথমে মেয়ে, তারপর ক্যাথরিন। যে প্রেম মানবিক নয়, সে-ই থেকেছে সবথেকে বেশিক্ষণ। মরণের একেবারে আগের মুহূর্তে স্টোনারের হাত খসে সেও পালিয়েছে। স্টোনার রয়ে গেছে একা। সারাজীবনের মতো। 

উনিশশো পঁয়ষট্টি সালে প্রথম প্রকাশের পর দু’হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল ‘স্টোনার’। পরের বছর আউট অফ প্রিন্ট। 

হোয়াট ডিড ইউ এক্সপেক্ট? 

উনিশশো পঁয়ষট্টি সাল থেকে দু’হাজার বারো সাল পর্যন্ত স্টোনার বিক্রি হয়েছিল চার হাজার আটশো তেষট্টি কপি। তারপর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ইউরোপে লোকজন বইটা পড়তে শুরু করল। দু’হাজার বারো সালের শেষে, প্রথম প্রকাশের ছত্রিশ বছর পর, জন উইলিয়ামসের মৃত্যুর সতেরো বছর পর সারা বিশ্বে স্টোনার-এর বিক্রির গুনতি দাঁড়ালো এক লাখ চৌষট্টি হাজার কপি। দুহাজার তেরো সালে ব্রিটেনের ওয়াটারস্টোনস বুক অফ দ্য ইয়ার-এর প্রাইজ জিতল স্টোনার। আর এখন এই দু’হাজার ষোলো সালে স্টোনার-এর পেপারব্যাক হাতে ধরে ইউটিউবে ক্যামেরার সামনে বসে লোকজনকে কিনে পড়তে ঝুলোঝুলি করছে স্মার্ট ঝকঝকে বলিয়েকইয়ে আত্মবিশ্বাসী নতুন যুগের ছেলেমেয়েরা। একুশটি দেশে লক্ষ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে উইলিয়াম স্টোনারের অর্থহীন জীবনের জীবনী।


বিক্রিবাটার নম্বরের ঋণস্বীকারঃ 




*****


‘জাপানিজ জুন’ উদযাপনের অংশ হিসেবে জুন মাস জুড়ে কয়েকজন বুকটিউবার মিলে অনুবাদকৃত জাপানি সাহিত্য পড়ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকেই আমি জানলাম ইয়োকো ওগাওয়ার কথা। 


The Housekeeper and the Professor/ Yōko OgawaStephen Snyder (Translator)

এক প্রফেসরের বাড়িতে হাউসকিপার হিসেবে কাজ করার বরাত পান দ্য হাউসকিপার, যার বয়ানে আমরা গল্পটা শুনছি। চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসে তিনি প্রথম জানতে পারেন প্রফেসরের একটি বিশেষ অসুবিধে আছে। তিনি আশি মিনিট, অর্থাৎ এক ঘণ্টা কুড়ি মিনিটের পুরোনো কিছু মনে রাখতে পারেন না। উনিশশো পঁচাত্তর সালে একটি মোটর দুর্ঘটনায় প্রফেসরের এই স্মৃতিবিভ্রম ঘটে। উনিশশো পঁচাত্তরের আগের সব কথা তাঁর সম্পূর্ণ মনে আছে, তার পরের এই আশি মিনিটের গেরো। 

এইবার যদি আপনি ভাবেন যে বইটা গজনী বা মেমেন্টো গোছের কিছু তা হলে মস্ত ভুল করবেন। এ গল্পে প্রতিশোধ, খুনখারাপি, নাটকীয়তা কিচ্ছু নেই, আছে শুধু খুব অপ্রত্যাশিত কিছু মানুষের একে অপরের জীবনকে প্রভাবিত করা। গল্পের মূল চরিত্র প্রফেসর, হাউসকিপার আর হাউসকিপারের ন-দশ বছরের ছেলে ‘রুট’। রুটের মাথার গড়ন চ্যাপ্টা। মুখ আর মাথা মিলিয়ে তার প্রোফাইল ‘স্কোয়্যার রুট’ চিহ্নের মতো দেখতে লাগে বলে প্রফেসর তার নাম দিয়েছেন রুট।

গল্পে এই তিনজনকে যে আঠার মতো জড়িয়ে রেখেছে সে হল অংক। প্রফেসর একসময় অংক পড়াতেন। এখন স্বাভাবিক কারণেই তাঁর পক্ষে আর পড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি অংকের মায়া ছাড়তে পারেননি। রুট আর রুটের মা প্রফেসরের জীবনে নিয়ে আসে বেসবল মাঠ, কফির দোকান, বা স্বাভাবিকতা। আর প্রফেসর মা ছেলের পরিচয় করিয়ে দেন অংকের সঙ্গে। এই নিয়েই একশো আশি পাতার শান্ত উপন্যাসিকা দ্য হাউসকিপার অ্যান্ড দ্য প্রফেসর। 

দ্য হাউসকিপার অ্যান্ড দ্য প্রফেসর আমার খুবই ভালো লেগেছে।  ঘটনার ঘনঘটা নেই, বুক দুরদুর নেই। রয়েছে মোটে দু’চারটি চরিত্রের প্রতি গভীর দৃষ্টিপাতে তাদের দৈনন্দিনতা পর্যবেক্ষণ। বয়স হয়ে গেছে বোঝা যায়। 


Revenge: Eleven Dark Tales/ Yōko OgawaStephen Snyder (Translator)


ওগাওয়ার যে বইয়ের খবর আমি প্রথম পেয়েছিলাম সেটা এটা। প্রথমে অনলাইন খুঁজলাম। পেলাম না। তখন কিন্ডল স্টোর থেকে অর্ডার দেওয়া হল। পেপারব্যাকের থেকে সেখানে দাম প্রায় ষাট টাকা কম। কিন্তু তখন অর্চিষ্মান দ্য ভেজিটারিয়ান-এর মাঝপথে। কাজেই আমার বসে বসে গালে টোকা মারা ছাড়া উপায় নেই। অপেক্ষার সময়টুকু আমি ওগাওয়া সম্পর্কে ইন্টারনেটে খোঁজখবর নিতে থাকলাম। তাতে জানতে পারলাম ওগাওয়ার আরেকটি বিখ্যাত বইয়ের নাম, দ্য হাউসকিপার অ্যান্ড দ্য প্রফেসর। সেটা অনলাইনে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল। পড়ে ফেললাম। ততদিনে অর্চিষ্মানের পড়া হয়ে গেল, আমি রিভেঞ্জ পড়তে শুরু করলাম। 

এগারোটা গল্প, খুব হালকা একটা সুতো দিয়ে জোড়া। তবে সে সুতো ধরে সোজা এগোতে গেলে আপনি হতাশ হবেন। সুতো আছে ঠিকই, কিন্তু সে এগিয়েছে এঁকেবেঁকে, হয়তো কখনও এগোয়ওনি। এগিয়েপিছিয়ে থেমে ঘুরে, একটা গভীর জটিল প্যাঁচের সৃষ্টি করেছে।

এগারোটা গল্প, তাতে খুন আছে, অবৈধ প্রেম আছে, খুন করে হাত কেটে আলাদা করে ফেলে স্বামীর বাকি লাশটুকু বাগানে লুকিয়ে রাখা আছে, সেই বাগানে তারপর কেজি কেজি পুরুষ্টু গাজরের ফলন আছে, তাদের সবক’টা মানুষের হাতের পাঁচ আঙুলের মতো দেখতে। পার্কিং লটে বন্ধ ফ্রিজের ভেতর থেকে বাচ্চা ছেলের জমাট বেঁধে যাওয়া মৃতদেহ আছে। ডাক্তারের কোটের ভেতর থেকে গড়িয়ে পড়া দেহ থেকে সদ্য আলাদা হওয়া উষ্ণ জিভ আছে। মিউজিয়াম অফ টর্চারে সারি সারি অত্যাচারের যন্ত্র সাজানো আছে, যেগুলো সত্যিকারের ব্যবহার হয়েছে, নিতান্ত শো পিস নয়। 

এসবই যথেষ্ট ভয়ংকর, কিন্তু তার থেকেও যেটা বেশি ভয়ংকর সেটা হচ্ছে ক্রাইম এবং ভয়াবহতার প্রতি লেখকের অবিশ্বাস্য, শীতল উদাসীনতা। 

They said the victim was a doctor at the university hospital, that he was stabbed to death by his mistress, almost decapitated, actually. It’s too horrible to think about. But it’s an old story: blind love and jealousy. Though I don’t know why she went of the throat. I think I’d aim for a spot with more meat, the chest or the belly. The neck is such a small target; you might miss completely, and I doubt it would be very satisfying, even if you did hit it. If you were that angry, wouldn’t you want to tear his guts out or something?  

ভালো লাগার থেকেও রিভেঞ্জ আমার অভিনব লেগেছে বেশি।

July 30, 2016

ম্যাকবুক আর সাপ্তাহিকী



বয়স হলে মানুষের নীতিতে টান পড়ে। আসলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। আমি যে নীতিতে বিশ্বাস করি সেটা সত্যি বিশ্বাস করার মতো কি না এই সব প্রশ্ন জাগে। আর পাঁচ বছর আগে যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করত যে তুমি কখনও ম্যাকবুক (বা অ্যাপেল কোম্পানির যে কোনও প্রোডাক্ট) ব্যবহার করবে কি না তাহলে আমার উত্তর কী হত সেটা আর এখানে রিপিট করার দরকার নেই। আমি একজন ম্যাটকে চিনতাম যে বলত সে কোনওদিন ম্যাক ব্যবহার করবে না কারণ ‘ইট ইজ টু পপুলার’। হুজুগের প্রতি বিতৃষ্ণা আমার ম্যাকবুক ব্যবহার না করার একটা কারণ, কিন্তু আরও একটা কারণ ছিল। চশমার পাওয়ার মাইনাস বারো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখের আরও একটা সমস্যা আছে। সেটা হচ্ছে সবার, সবকিছুর ভেতর একটা ‘টাইপ’ নজর করা। আমার মনে হয়েছিল অ্যাপেল একটা বিশেষ ‘টাইপ’এর লোক ব্যবহার করে। নিজেকে সেই টাইপে ফেলতে আমার ইচ্ছে করেনি। আমি সম্পূর্ণ সচেতন যে 'কোনওদিন অ্যাপেল ব্যবহার করব না’টাও একটা টাইপ। কিন্তু এই টাইপটায় নিজেকে ফেলতে আমার আগেরটার থেকে কম অনিচ্ছে হয়েছিল। 

তারপর বয়স হল। টাইপ বিচারের অব্যর্থতা নিয়ে নিজের মনে নানারকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব জন্মাতে লাগল। মনে হতে লাগল স্থিতিস্থাপকতা দার্ঢ্যের থেকে সুবিধেজনক। ঠিক এই সময় আমার দু’নম্বর সোনি ভায়ো দেহ রাখল। অর্চিষ্মান নিজে ‘ম্যাকবুক টাইপ’ (অর্চিষ্মানের আর কোনও টাইপ নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, কারণ অর্চিষ্মান শেষ পর্যন্ত ‘আমার টাইপ’), ওর মৃদু উসকানি ছিলই। এমন সময় অ্যামাজনে সস্তায় (ম্যাকবুকের তুলনায় সস্তা) ম্যাকবুক প্রো-এর অফার শুরু হল। সব মিলিয়ে আমার বাঁধ ভাঙল। কিনে বাড়ি আনলাম। নিজের মনের খচখচানি দূর করার জন্য মাইক্রোসফট অফিস কিনে ইনস্টল করলাম। অভ্র না নামালে আমার চলত না। তাই অভ্র নামালাম।

ম্যাকবুক চলা বন্ধ করে দিল। কেনার পরের দিন। 

আমাদের বাড়ি থেকে পঞ্চাশ হাত দূরে একটা অ্যাপেল সারাইয়ের দোকান আছে। সেখানে বেশিরভাগই আইফোন সারানোর খদ্দের আসেন। যা-ই খারাপ হোক না কেন দোকানের পক্ষ থেকে বলে দেওয়া হয় ইয়ে রিপেয়ার নহি হোতা। কম্পানি পলিসি নেহি হ্যায়। আমাকে সেরকম কিছু বলা হল না। একদিন বয়সী ম্যাকবুক ব্যবহারকারীকে সেরকম কিছু বলতে গেলে বুকের রীতিমত পাটা আর চোখের রীতিমত চামড়া লাগে বলেই বোধহয়। তবে জিজ্ঞাসা করা হল অভ্র নামিয়েছেন? থার্ড পার্টি ডাউনলোড? এর পরেও যদি ম্যাকবুক চলে তাহলেই নাকি আশ্চর্য। আমি অপরাধীর মতো চুপ করে রইলাম। ফরম্যাটিং হল। সাতদিন ভয়ে ভয়ে থাকার পর অভ্র ডাউনলোড করলাম। এবার বন্ধ হল না। ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে চলতে লাগল।

অর্চিষ্মান বলত, এটা স্বাভাবিক নয়। তোমার কপালে খারাপ মেশিন জুটেছে। আমি কিছু বলতাম না। কারণ আমি জানতাম এ হচ্ছে নিজের নীতি, তা সে যতই অযৌক্তিক হোক না কেন, থেকে সরে আসার শাস্তি। দশ মাস কাটার পর অবস্থা এমন সঙ্গিন হল যে ল্যাপটপ একবার শাটডাউন করলে আধঘণ্টার আগে খোলা যেত না। একদিন জাস্ট খুলল না। 

আবার গেলাম দোকানে। ম্যাকবুক নিয়ে কর্তৃপক্ষ অফিসের ভেতর অদৃশ্য হলেন। বেরিয়ে এসে বললেন, সব ঠিক করে দিয়েছেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, বহোত ইউজ হুয়া হ্যায়।

তা হুয়া হ্যায়। সকাল সন্ধ্যে বাংলা টাইপ আর ইউটিউব। ম্যাকবুকের তন্বীতনু সে ধকল সইতে পারেনি। যে কথাগুলো বলতে ইচ্ছে করছিল সেগুলো গিলে বাড়ি চলে এলাম। একই সমস্যা আবার হল। আবার দোকানে গেলাম। এবার দোকানিরা চিন্তায় পড়লেন। যত দুর্ব্যবহারই হোক না কেন, এরকম বেগড়বাই করা ম্যাকবুকের পক্ষে ভালো দেখায় না। তাঁরা নিদান দিলেন, হার্ড ড্রাইভ মে হি প্রবলেম হোগা। 

গোটা ঘটনাটার মধ্যে একমাত্র ভালো খবরটা তখনই পাওয়া গেল। দশ মাসের মাথায় ধরা পড়েছে, কাজেই হার্ড ড্রাইভ বদল হবে বিনামূল্যে। হলও তাই। এখন ম্যাকবুক দিব্যি চলছে। আমরা বুঝলাম কম দামে পচা জিনিস চালিয়ে দেওয়াই হচ্ছে অনলাইন ‘অফার’। আমাদের কপালে বেশি খারাপ জিনিস জুটেছিল, এক বছরের লক্ষ্মণরেখা পেরোনোর ক্ষমতাও তার ছিল না। ভাগ্যিস। 

এই ল্যাপটপটা যে বছর খানেক পরেই দেহ রাখবে সে নিয়ে আমার কোনও বিভ্রম নেই। আমি অলরেডি ভাবতে শুরু করেছি এটার পর কী কেনা যায়। যাই কিনি না কেন, হালকা কিনব। ছোট নয়, হালকা। অর্চিষ্মান একবার টুক করে বলেওছে, এয়ার কিনতে পার। এবং আমি অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দিয়েছি, হ্যাঁ সেটাও দেখা যেতে পারে। 

*****

এ বার এ সপ্তাহের ইন্টারনেট। 


                What you do speaks so loud that I cannot hear what you say.
                                                                                                – Ralph Waldo Emerson



খবরাখবর

ফুল স্টপেই ফুল স্টপ পড়ে যাচ্ছে নাকি। পূর্ণচ্ছেদের পরিণতি নিয়ে বলতে পারব না, তবে বিস্ময়চিহ্নের ব্যবহার যে বাড়াবাড়ি রকম বেড়েছে সেটা কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছিল বটে। 


What does it mean when you dream you’re being chased by an elephant? Does anyone have a copyright on the Bible? Does the Pope have to be a virgin? নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির ‘মানুষ গুগল’দের নিত্য এই সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। 

আমার যদি গাছপালা বাঁচিয়ে রাখার প্রতিভা থাকত তাহলে আমি এইরকম বাড়িতে থাকতে লাফিয়ে রাজি হতাম। 

আমি নিজে Fuck Off Fund-এর মস্ত বড় সমর্থক। তবে ফান্ড থাকা সত্ত্বেও লোককে মুখ বুজে মার খেতে দেখেছি আমি। আসলে লড়াই করতে গেলে ফান্ড, ব্যক্তিত্ব, সাহস সবগুলোই লাগে। কোনওটা কম পড়লেই চলে না। 

ছবি/সচল ছবি


নিঃসন্দেহে ইতিহাসের বিখ্যাততম থেরাপি কাউচ। এই কাউচে শুয়ে শুয়ে ফ্রয়েডের রোগীরা নিজেদের পেটের কথা উজাড় করতেন।  

হায়দ্রাবাদের ন্যাশনাল ফিশারিজ ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের বিল্ডিংটা সত্যি সত্যি মাছের মতো দেখতে জানতেন? 

ভিডিও


খেলা/কুইজ/লিস্ট

উইজডম হ্যানাত্যানা বলেছে বটে, কিন্তু আসল কথাটা হচ্ছে আমার কথা শুনলে আমাকে বুড়োহাবড়া মনে হয়। (এক্স্যাক্ট বয়স বার করেছে আটষট্টি।) 

পরশুর ইংরিজি হচ্ছে ওভারমরো। ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট আসলে অ্যামেরিক্যান অ্যাকসেন্টের উত্তরসূরী।  ক্রিয়াপদ হিসেবে ‘আনফ্রেন্ড’ ব্যবহার হয়ে আসছে ষোলোশো ঊনষাট থেকে। এসব আমি জানলাম এই লিস্টটা থেকে। 

গান 

রেডিওতে শুনে নতুন করে ভালো লেগে গেল। আপনারাও শুনুন। 



July 29, 2016

বই থেকে সিনেমা থেকে বই





উৎস গুগল ইমেজেস


আজকের ট্যাগ হচ্ছে বই থেকে বানানো ‘বই’দের নিয়ে। কিংবা যে সব ‘বই’দের অবিলম্বে বই হয়ে ওঠা দরকার তাদের নিয়ে। এ মর্মে কয়েকটা ট্যাগ বুকটিউবে খুব চলে। আর আমি যেহেতু বুকটিউবের মস্ত বড় ফ্যান, তাই সে ট্যাগকে অবান্তরে ছেপে দিলাম। ওঁদের সঙ্গে আমাদের খেলার তফাৎ হচ্ছে আমরা খেলছি শুধু বাংলা বইদের নিয়ে। এই ট্যাগের স্রষ্টা হিসেবে দু’জনের নাম পাচ্ছি। একজনের ভিডিও এখন আর পাবলিক নেই তাই সেটার লিংক দেওয়া গেল না। তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জানালাম। 


*****

১। আপনার প্রিয় কোন বই যা সিনেমা/ টিভি সিরিজে রূপান্তরিত হয়েছে? সে রূপান্তর কি আপনার ভালো লেগেছে? এ উত্তরটা ভীষণ প্রেডিক্টেবল। আমার প্রিয় বই পথের পাঁচালী সিনেমায় রূপান্তর হয়েছে। আমার রূপান্তরটা ভীষণ পছন্দও হয়েছে। টিভি সিরিজের উত্তরটা একটু বিতর্কিত হলেও হতে পারে। ফেলুদা ৩০ বলে যে সিরিজটা হয়েছিল সেটার শুরুর দিকের এপিসোডগুলো বেশ ভালো লেগেছিল। সব্যসাচী তখন ফেলুদা হিসেবে চমৎকার। আমরা এখনও মাঝে মাঝে সেগুলো চালিয়ে দেখি। দিব্যি লাগে।

২। বই থেকে সিনেমা/ টিভিতে আপনার প্রিয়তম রূপান্তর কী? পথের পাঁচালী। গুপি গাইন বাঘা বাইন। সোনার কেল্লা।  

৩। বইটা তত ভালো লাগেনি কিন্তু বই থেকে বানানো সিনেমাটা দুর্দান্ত লেগেছে? অরণ্যের দিনরাত্রি

৪। বই থেকে সিনেমায় আপনার সবথেকে খারাপ লাগা রূপান্তর? চাঁদের পাহাড়

৫। কোন বইকে আপনি সিনেমা হতে দেখতে চান? সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ উপন্যাসের নামটা মনে আসছিল তবে একটা সন্দেহ হতে চেক করে দেখলাম গৌতম ঘোষ সেই নিয়ে অলরেডি সিনেমা বানিয়ে ফেলেছেন। আমার দেখা হয়নি। দেখতে হবে। এই মুহূর্তে আর কোনও বইয়ের নাম মনে পড়ছে না যেটাকে আমি সিনেমা হতে দেখতে চাই। 

৬। কোন বইকে আপনি কার্টুন/ গ্রাফিক নভেল/ মিউজিক্যাল হতে দেখতে চান? কোনও বইকেই, যেটাকে অরিজিন্যালি কার্টুন বা গ্রাফিক নভেল হিসেবে লেখা হয়নি, আমি কার্টুন বা গ্রাফিক নভেল হিসেবে দেখতে চাই না।  এই ইচ্ছার পেছনে সামান্য প্রেজুডিস যে নেই তা বলব না। কিন্তু তবু আমি সত্যি সত্যি ভাবতে চেষ্টা করেছিলাম, মনে পড়ল না। আপনাদের মনে পড়লে বলতে পারেন। 

মিউজিক্যাল প্রসঙ্গে একটা বইয়ের কথা লাফ মেরে মাথায় এসেছিল প্রথমেই, বাণী বসুর 'গান্ধর্বী'। হিন্দুস্থানি মার্গসঙ্গীতে সম্পৃক্ত হয়ে থাকা মধ্যবিত্ত বাঙালি ড্রামার এর থেকে ভালো উদাহরণ আমার জানা নেই। কিন্তু আমার ভীষণ সন্দেহ হচ্ছে যে এটা নিয়ে হয় সিনেমা নয় টিভি সিরিয়াল কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু উইকি সে বিষয়ে নিরুত্তর। যাই হোক, হয়ে থাকলে ভালো, না হয়ে থাকলে ‘গান্ধর্বী’ নিয়ে মিউজিক্যাল বানানোর দাবি আমি এই জানিয়ে রাখলাম। 

৭। কোন বইকে আপনি কোনওদিন সিনেমা/টিভি সিরিজ হতে দেখতে চান না? এই লিস্টটা লঅঅঅঅঅম্বা। কারণ আমার প্রিয় বইয়ের তালিকার সঙ্গে এই তালিকাটা প্রায় অবিকল এক। তাও চট করে যে নামগুলো মনে পড়ছে সেগুলো বলি। প্রথম প্রতিশ্রুতি, ঢোঁড়াই চরিত মানস, গল্পগুচ্ছ-এর সবক’টা গল্প, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী আর রমাপদ চৌধুরী সবক’টা ছোটগল্প।  

৮। কোন সিনেমাকে আপনি বই হিসেবে পড়তে চান? মেরেছে। আমি সিনেমা খুব কম দেখেছি। যা দেখেছি তার মধ্যে এই মুহূর্তে বলতে বললে আবার আমাকে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাগুলো নিয়েই টানাটানি করতে হবে। তাঁকে অলরেডি এই ট্যাগে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আর দিলাম না।

সোজা কথায় আমার কাছে এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই। আপনাদের উত্তর কী?

৯। বই থেকে হওয়া এমন কোনও সিনেমা যেটা আপনি বইটা পড়ার আগে দেখেছেন বা বইটা আদৌ পড়েনইনি? কমলকুমারের ‘তাহাদের কথা’ গল্পটা আমি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ওই একই নামের সিনেমাটা দেখার পর পড়েছিলাম। বাণী বসুর গল্প ' শ্বেত পাথরের থালা’-ও পড়েছিলাম ওই বইয়ের ওপর ভিত্তি করে বানানো প্রভাত রায়ের সিনেমাটা দেখার পর। আদৌ বইটা পড়িনি কিন্তু সিনেমাটা দেখেছি এরকমও বাংলা সিনেমাও নিশ্চয় গুচ্ছ গুচ্ছ আছে, আমার নাম মনে পড়ছে না। 

*****

এই রইল আমার মতামত। আপনাদের মতামত জানার অপেক্ষায় রইলাম।

বুকটিউবে আমার পছন্দের দু'জন বুকটিউবার এই ট্যাগ পোস্ট করেছেন। Reads and Daydreams আর 1book1review.

July 27, 2016

ফাঁকির রুটিন



জমানো কাগজ ঘাঁটতে বসলে প্রায়ই একেকটা খোলা পাতা বেরিয়ে পড়ে, যেগুলোর দিকে ভালো করে না তাকিয়েই আমি বাজে কাগজের ঝুড়িতে চালান করি। কারণ ওই একনিমেষেই আমি দেখে নিয়েছি পাতাগুলোয় খোপ খোপ কাটা। আমি জানি ওই খোপের বাঁদিকের কলামে ওপর থেকে নিচে সাতটা খোপে লেখা আছে সাতটা দিনের নাম আর সবার ওপরের রোয়ে লেখা আছে সকাল চারটে থেকে রাত দশটা পর্যন্ত সময়, বিভিন্ন মাপে ভাগ করা। পাতার বাকি খোপগুলোয় অফিস, গান, অবান্তর, গান, হাঁটা, রান্না, বেড়ানো ইত্যাদি শব্দ সেজেগুজে বসে আছে। আমারই অপেক্ষায়। 

রুটিন বানানোর রোগটা আমার এই সেদিন পর্যন্ত ছিল। দু’ঘণ্টা লিখব, একঘণ্টা হাঁটব, একঘণ্টা গাইব, আটঘণ্টা কাজ করব - কাজের সময় বসে বসে এইসব ভাবতে, নিত্যনতুন ভাবে চব্বিশঘণ্টাকে কাটাছেঁড়া কী যে ভালো লাগত।

যতদিন না মেনে নিলাম যে রুটিন মেনে চলা আমার পক্ষে অসম্ভব। কেন অসম্ভব সেটা বুঝতে লেগে গেল আরও অনেক সময়। অসম্ভব, কারণ আমি গোটা ঘটনাটাকে অ্যাপ্রোচ করছিলাম ভুল দিক থেকে। রুটিন তখনই কাজে লাগে যখন তা রুটিন পালনকারীর ধাত বুঝে বানানো হয়। কাজ আমার ধাতে নেই, কাজেই কাজের রুটিন আমার চলবে না। আমার দিনটাকে সাজাতে হবে অন্যভাবে, আমার ধাতের কথা মাথায় রেখে।

আমার পক্ষে আদর্শ রুটিন হবে যা ফাঁকি বা ফাঁককে ঘিরে বানানো হয়েছে। এই সহজ কথাটা আমি বুঝলাম এই সেদিন। যেদিন আবিষ্কার করলাম অজ্ঞাতেই আমার জীবনটা একটা রুটিনবাঁধা পথে চলতে শুরু করেছে। আর সে রুটিনটা দাঁড়িয়ে আছে আমার সারাটা দিনের কয়েকটা ফাঁকের কাঁধে ভর দিয়ে। বাড়িতে থাকার সময়টা পুরোটাই ফাঁকি, তাই সেগুলো বাদ দিলাম। সোম থেকে শুক্র প্রতিদিন অফিসে কাটানোর যে প্রাণঘাতী ন’ঘণ্টা, তার বুনিয়াদ যে ক’টা ফাঁক বা ফাঁকি, তাদের কথা রইল এই পোস্টে। 

বোনাস ফাঁকিঃ প্রথমেই বলে নিই অফিসে পৌঁছনোর পরের আধঘণ্টার কথা। এই সময়টাকে অবশ্য আমি ফাঁকি বলতে রাজি নই। এর মধ্যে পনেরো মিনিট যায় বোতলে জল ভরতে, চায়ের জোগাড় করতে, মাকে ফোন করে পৌঁছসংবাদ দিতে, অর্চিষ্মানের পৌঁছসংবাদ নিতে। বাকি পনেরো মিনিট আমি তৈরি হই আসন্ন যুদ্ধের জন্য। 

দিনের প্রথম বৈধ ব্রেকটা আমি নিই বেলা এগারোটা নাগাদ। এ সময় আমার পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে, চোখ ব্যথা করে, মন খারাপ লাগে। বেশি কাজ করে ফেলার লক্ষণ সর্বাঙ্গে ফুটে বেরোয়। তাছাড়া একটা কী খাই কী খাই ভাব হয়। আমি ফোন আর পার্সটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। আমাদের অফিসের পেছনে একটা ছোট কিয়স্ক আছে, সেদিকে হাঁটি। একজোড়া মাঝবয়সী ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা কিয়স্কটা চালান। কিয়স্কে চা, সিগারেট, ম্যাগি পাওয়া যায়। বাইরে জালির তালাবন্ধ বাক্সে কুরকুরে আর বিংগো টেড়েমেড়ে, কিয়স্ক থেকে তেঁতুল গাছের ডাল পর্যন্ত টাঙানো দড়িতে হলদিরামের বেগুনি হলুদ প্যাকেট নমকিনের প্যাকেট। কিয়স্কের ভেতরের ফ্রিজে মাদার ডেয়ারির দই, তড়কা লস্যি, কোল্ড ড্রিংকসের ছোট ছোট কাচের বোতল আর সামনে কাচের হট বক্সে শিঙাড়া, ব্রেড পকোড়া। তেঁতুল গাছের গোড়ায় কাত করে দাঁড় করানো স্কুটারের চাকার কাছে থাবায় মাথা রেখে শুয়ে থাকে একটা কালো কুকুর, যার মাথা আর শরীরটা নেড়ি কিন্তু লেজখানা বাজখাঁই ঝালরের মতো। 

আমি গত প্রায় দু’বছর ধরে ওই একই সময়ে ওই কিয়স্কে যাই। হয় শিঙাড়া নয় নাট ক্র্যাকারের পাঁচ টাকার প্যাকেট কিনি। নাট ক্র্যাকার কিনলে ঝামেলা নেই, শিঙাড়া কিনলে ভদ্রলোকের সঙ্গে একটা কথোপকথন চালাতে হয়। আমি শিঙাড়াটা প্যাক করে দিতে বলি। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করেন প্লেট এবং টমেটো সসের পাউচও প্যাক করতে হবে কি না। আমি দুটোতেই না বলি। অবিকল এই কথোপকথনটা গত দু’বছর ধরে চলছে। আমি প্রথমটা ভাবতাম ভদ্রলোক আমাকে অপছন্দ করেন তাই আমার সঙ্গে অপরিচয়ের দূরত্বটা একইঞ্চিও কমাতে রাজি নন। কিন্তু এখন সন্দেহ হয় ঘটনাটা শর্ট টার্ম মেমোরি লস-এরও হতে পারে। 

আমার দিনের দ্বিতীয় রুটিনমাফিক ফাঁক হচ্ছে লাঞ্চ। অফিসের বেশিরভাগ লোকই বাড়ি থেকে খাবার আনে। কেউ কেউ কাছাকাছি রেস্টোর‍্যান্টে খেতে যায়। কয়েকজন বাইরে থেকে অর্ডার করে। আর হাতে গোনা কয়েকজন যায় অফিসের ক্যান্টিনে। ক্যান্টিনটা আমাদের অফিসের নয়। আমাদের অফিসের পাশাপাশি আরও অনেক অফিস আছে ও তল্লাটে। তাদের সবার কথা মাথায় রেখে ক্যান্টিন বানানো হয়েছে। শসা, আচার, ডাল, একটা সবজি, ভাত, রুটি এবং একটি মিষ্টি পদ পঁয়ত্রিশ টাকায় পাওয়া যায়। আমি ওখানেই খাই। আমার ধারণা ছিল সবাই ওখানেই খায়। ইন ফ্যাক্ট, কেন কেউ ওখানে ছাড়া আর কোথাও খাবে সেটাই আমার ধারণায় ছিল না। কিন্তু দেখলাম ঘটনাটা সত্যি নয়। যাঁদের খরচ করার মতো পয়সা আছে তাঁরা প্রায় কেউই ক্যান্টিনে খান না। দেড়শো টাকার মাঞ্চুরিয়ান কিংবা আড়াইশো টাকার সুপ + স্যালাড বোনানজা অফার অ্যাভেল করেন।

ক্যান্টিনের খাবার না খাওয়ার অবশ্য গোটা দুই যুক্তি আছেও। অনেকেরই শুধু নিরামিষ খাবারে অসুবিধে হয়। অনেকের বোরিং লাগে। রোজ রোজ সেই ডাল তরকারি। এই অভিযোগটা সত্যি। বৈচিত্র্যের সন্ধানে থাকলে ক্যান্টিনের খাবার হতাশ করবে। আমার আবার ওই একঘেয়েমিটাই পছন্দ। নানারকম থাকলেই বাছতে হয়। মাথা খাটাতে হয়। আমার দিনের হাতে গোনা হক্কের ফাঁকিতে আমি সে পরিশ্রমটুকু করতে রাজি নই। 

তিন নম্বর এবং শেষ বিরামটা আমি নিই সাড়ে তিনটে থেকে চারটের মধ্যে। ওই সময়টা আবার চায়ের প্রয়োজন পড়ে। এই চা-টা আমি অফিসে খাই না। সকালের কিয়স্কেও না। এই ব্রেকে আমি যাই অফিসের অন্যদিকের খাঁটি রাস্তার চায়ের দোকানে। পাঁচিলের গা ঘেঁষে খেলিয়ে বানানো। মাথার ওপর ত্রিপলের ছাউনি। দোকানের পেছনদিকে পাতা চাদর বালিশ দেখে বোঝা যায় সাময়িক রাত্রিবাসের ব্যবস্থা আছে। চাদরের সামনে বাবু হয়ে বসে চা বানান হয় মা, নয় ছেলে, নয় ছেলের বউ। সম্পর্কগুলো আমি চেহারা আর বয়স দেখে আন্দাজ করেছি। একটা কাঠের সেকেলে সুটকেসের ভেতর প্লাস্টিকের প্যাকেটে বিস্কুট রাখা থাকে। পুরীর খাজার মতো দেখতে কিন্তু খাজার থেকে অনেক হালকা একরকমের নোনতা বিস্কুট, যাকে বলে ফেন আর মোটা মোটা মঠ্‌ঠি। একটা খেলে পরের দু'ঘণ্টা আর খাবার চিন্তা মাথায় আসবে না। আমি নিই একখানা 'ফিকি' চা আর খিদে বুঝে কোনওদিন ফেন, কোনওদিন মঠ্‌ঠি। এ দোকানের লোকজন আমার সঙ্গে রীতিমত কথাবার্তা বলেন। লোকজন মানে শাশুড়ি। আমি একদিন হাজিরা কামাই দিলে শাশুড়ি রীতিমত অভিযোগ জানান। ছেলে মুখচোখে ফ্রেন্ডলি ভঙ্গি জাগিয়ে রাখেন কিন্তু দরকারের বাইরে কথা বলেন না। ছেলের বউ তিনজনের মধ্যে সবথেকে গম্ভীর। চিবুক পর্যন্ত টানা ঘোমটার আড়ালে তার মুখ আমি কোনওদিন দেখিনি, কিন্তু গলা শুনেছি। পার্সোনালিটি টইটম্বুর। তবে বোধহয় আমি ওঁর গুডবুকে আছি। আমার দিকে চায়ের কাগজের কাপ এগিয়ে দেওয়ার আগে উনি সর্বদা আরেকটা প্লাস্টিকের কাপের ভেতর সেটাকে রেখে তবেই দেন। পাছে আমার আঙুলে ছ্যাঁকা লাগে। আমি খেয়াল করে দেখেছি আর কোনও খদ্দেরের ভাগ্যে এ ট্রিটমেন্ট জোটে না।

সারাদিনে আর কোনও কাজ হোক না হোক, এই ফাঁকের রুটিনে আমার একদিনও ফাঁকি পড়ে না। জীবনে একটা রুটিন অবশেষে মানতে পেরে কী যে গর্ব হয়। 


July 25, 2016

চারের তিন



রিষড়ার বাড়ির বিছানায় যিনি শুয়ে আছেন, তিনি থাকলে ছবিটা সম্পূর্ণ হত। নেই যখন তখন এই দিয়েই কাজ চালাতে হবে।

  

July 23, 2016

ল্যাংড়া আম, কেক আর সাপ্তাহিকী



এই সাপ্তাহিকীটা অবান্তরে মুখ দেখানোর কাছাকাছি সময়েই যদি আপনার চোখে পড়ে তাহলে খুব সম্ভবত তখন আমি আর অর্চিষ্মান আমার বাবামার সঙ্গে বসে চা, জ্যাম/মাখনটোস্ট, সসেজ, হাফ ফ্রাই আর হ্যাশ ব্রাউন খাচ্ছি। রিষড়া বাজারে নাকি অভূতপূর্ব ল্যাংড়া আমের ফলন হয়েছে, ভবিষ্যতে আর হয় কি না সন্দেহ। মাবাবার বোঁচকার মধ্যে জোরজার করে তাদের দুয়েকপিস যদি উঠেই পড়ে তাহলে মাবাবা তাদের না বলতে পারবেন না। সে রকম হলে হ্যাশ ব্রাউন আর সসেজের মাঝে কাঁটায় গেঁথে ল্যাংড়া আমও মুখে পোরা হচ্ছে টুকটাক।

আপনি যদি আরেকটু দেরি করে ফেলেন তাহলে ততক্ষণে আমরা রাষ্ট্রপতি ভবন পৌঁছে গেছি। ডানহাতে আধার কার্ড আর বাঁহাতে মোবাইলে আসা “ইয়োর রিকোয়েস্ট ফর আর বি ভিজিট উইথ রেজিস্ট্রেশন নাম্বার অমুক ইজ অ্যাপ্রুভড” নোটিফিকেশন মেলে ধরে লাইন দিয়েছি। ভবন ঘুরে যাওয়া হবে হেইলি রোডে বঙ্গভবনের পাশের অগ্রসেন কি বাউলি দেখতে।

আপনারা যদি তারও পরে সাপ্তাহিকীতে আসেন তাহলে ধরে নিতে পারেন আমরা আছি খান মার্কেটে। এমনিতে তো যা-ই ভালো খাই, ভালো দেখি, মনে হয় বাবামাকে খাওয়াব, বাবামাকে দেখাব। কিন্তু ডিসিশন টাইম ঘনিয়ে এলে বোঝা যায় ব্যাপারটা অত সোজা না। ওঁদের পক্ষে জাপানি সাশিমি যদি টু এক্সোটিক হয়ে যায়, মজনু কা টিলার টিবেটান টিংমো টু গ্রাঞ্জ? ষোলো বছর বয়সে ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ পড়ে মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। ইস এত ভালো বই, কিন্তু মা (আমার দিদিমা) বুঝবে না। আমাদেরও হয়েছে সেইরকম দশা। বাবামা যদি জীবনটাকে আরেকটু বেশি বুঝতেন, এই আমাদের মতো, পৃথিবীটার প্রতি আরেকটু এক্সপোজার যদি বাবামার থাকত, যেমন আমাদের আছে, তাহলেই এত মাথা ঘামাতে হত না।

একবার মনে হয়েছিল ধুর এত না ভেবে চাইনিজ দোকানে যাই। কিন্তু চাইনিজ তো ইচ্ছে হলেই বাপি রোল সেন্টার থেকে বাবা প্যাক করিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। অনেক ভেবে আমরা ঠিক করলাম চেনা আর উদ্ভটের স্কেলে পার্সি খাবারটা মাবাবার পক্ষে পারফেক্ট হবে। আমাদের বাড়ির অপেক্ষাকৃত কাছে 'রুস্তম কি ভোনু' ছিল, সেখানের খাবারদাবারও চমৎকার, কিন্তু সোডাবটলওপেনারওয়ালা অনেক বেশি গমগমে।

আপনি যদি আরও দেরি করে সাপ্তাহিকীতে উঁকি মারেন তাহলে কখন আছি কোথায় আছি সে সব নিশ্চিত করে বলা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। তবে কী আর অন্যরকম হবে। হলে নিচের বিষয়গুলোরই বিন্যাসসমাহার। 

ইলিশ, আম, বেড়ানো, গল্প, ঘুম, চা, মায়ের হাতে বানানো কেক, জানালার পর্দা খোলা এবং টানা নিয়ে মতবিরোধ (প্রকাশ্য নয়। প্রকাশ্য মতবিরোধ আমাদের সিলেবাসে নেই), চা, বেড়ানো, ঘুম, গল্প, লুচি, সেমাইয়ের পায়েস, হলুদ এবং সাদা আলো নিয়ে মতবিরোধ (অপ্রকাশ্য), গল্প, ঘুম, ঠাকুমাকে ফোন…ইত্যাদি ইত্যাদি। 

*****

এবার এ সপ্তাহের ইন্টারনেট।


There is no art without laziness. 
                                                                      -Mladen Stilinović


ইতিহাস

বৈকাল হ্রদের তীরে ব্রোঞ্জ যুগের মানুষের পাঁচহাজার বছর পুরোনো কংকাল। এখনও দুজন দুজনের হাত ছাড়েনি।

বিজ্ঞান


সমকাল

অফিস যাওয়ার পথে আমস্টারডামের লোকেরা কী খেলেন? উঁহু, পোকেমন গো নয়। এ খেলতে যন্ত্র লাগে না। 

ছবি


জানি লোকে আমাকে পক্ষপাতদুষ্ট বলবে কিন্তু সূর্যকে পৃথিবী থেকে দেখতে যত সুন্দর লাগে তত আর কোথাও থেকে লাগে না। 

ভিডিও


লিস্ট

আধুনিক যুগের দশটি ভার্চুর কোন কোনটি আপনার আছে?

কুইজ/খেলা

রাজা বললেন, চোখ খুলে প্রথম যে শব্দ দেখবেন সেটাই গায়ে ট্যাটু করে নেবেন। আমি সে রকম কোনও দাবি করছি না কারণ গায়ে H O P E এঁকে ঘুরলে লোকে হিপি বলবে। 

জানালার দিকে মুখ ফেরানো লেখার টেবিল বাছামাত্র জানি আমাকে এরা এই দলে ফেলবে। You are part of the Transcendentalist movement along with writers Henry David Thoreau, Ralph Waldo Emerson, Louisa May Alcott, and Walt Whitman. The poetry and philosophy of this 19th-century American movement was concerned with self-reliance, independence from modern technology. One of the transcendentalists' core beliefs was in the inherent goodness of both people and nature, in opposition to ideas of man as inherently sinful, or "fallen," and nature as something to be conquered.


July 20, 2016

শিম টুর, পাহাড়গঞ্জ



লেফট টার্ন ফ্রি নেহি হ্যায়। গভীর খেদের সঙ্গে জানালেন ভাইসাব। ভাইসাব সি আর পার্কের সবগুলো লাইট ভাঙতে ভাঙতে গেছেন, আর সি পি-র সবগুলো লাইটে দাঁড়াতে দাঁড়াতে। ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে দুর্দান্ত অটোওয়ালাদেরও সামলে চলতে হয়। সিগন্যাল হল আর আমরাও বাঁয়ে বেঁকে পঞ্চকুইয়া রোডে এসে পড়লাম।

কনট প্লেস আর পঞ্চকুইয়া রোডের মধ্যে তফাৎ মোটে একটা লেফট টার্নের, কিন্তু সন্ধ্যের চেহারায় তফাৎটা সকাল দশটার এসপ্ল্যানেডের সঙ্গে রাত আটটার রিষড়ার বাড়ির সামনের রাস্তার মতো। এই সাদা থামওয়ালা প্রাসাদের গা-ঝলসানো আলো, এই ফ্লাইওভার চেরা অন্ধকার রাস্তা। ফ্লাইওভারের তলা দিয়ে ওপাশের উঁচু ফ্ল্যাটের জানালায় ম্লান আলো। টিউবলাইট মোছা হয়নি অনেক দিন। আমরা যেমন বিকেলে দাদুর চপ খেতে যাই, এসব বাড়ির লোকেরা তেমনি কনট প্লেসে মর্নিং ওয়াকে যায়। অথচ জানালার সাইজ আর আলোর ভোল্টেজ থেকেই স্পষ্ট এগুলো সরকারি ফ্ল্যাট। কী যে ভালো লাগে আমার এসব জায়গায় সরকারি ফ্ল্যাট দেখতে। সি পি-তে, জোড়বাগে। পয়সার সঙ্গে রিয়েল এস্টেট লোকেশনের সরল সম্পর্কটাকে পেঁচিয়ে দেওয়ার স্পর্ধা যদি কারও থাকে তাহলে সে শুধু সরকারি আবাসনের।

ফ্লাইওভারের তলা দিয়ে ডানদিক নিয়ে ঢুকে পড়লাম রামদোয়ারা রোডে, আর তক্ষুনি পঞ্চকুইয়া রোডের সঙ্গে তফাৎটা হয়ে গেল তিনখানা বড়বাজারের যোগফল আর আমাদের পাড়ার পুকুরঘাটের।

আমরা যাচ্ছি পাহাড়গঞ্জের কোরিয়ান রেস্টোর‍্যান্ট শিম টুর-এ। দিল্লিতে যে ক’টা কোরিয়ান খাবারের দোকান আছে তার মধ্যে শিম টুর রেটিং-এর বিচারে রীতিমত ওপর দিকে, দামের বিচারে বেশ তলার দিকে কাজেই আমাদের মতে পারফেক্ট।

জি পি এস না দেখে শিম টুর-এ পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব। জি পি এস দেখেও বেশ শক্ত। মেন বাজার রোড থেকে ডানদিকে ঘুরে মুশতাক রাই খান্না মার্গ পর্যন্ত অসুবিধে হবে না। ওপচানো ভ্যাট, দুর্গন্ধ, ভাঙাচোরা রাস্তা, নাম কা ওয়াস্তে আলো। পাহাড়গঞ্জের আর পাঁচটা গলির মতোই। কিন্তু তারপর যে জায়গাটায় গিয়ে ন্যাভিগেশন বলবে, নাউ টেক রাইট, তখন আপনি থমকাতে বাধ্য। ঠিকানা অনুযায়ী এটার নাম টুটি গলি, কিন্তু এ তো গলি নয়, এ তো দুটো ভাঙাচোরা বাড়ির দেওয়ালের মাঝখানের ফাঁকা জায়গা। কোণের পানের দোকান থেকে একজন আপনাদের দিকে নজর রাখবেন। মনে মনে গুনবেন, এক দো তিন চার পাঁচ… দশে পৌঁছনোর অনেক আগেই আপনি এগিয়ে যাবেন তাঁর দিকে আর জানতে চাইবেন, ভাইসাব ইয়ে নভরং হোটেল কেয়া…

শিম টুর এই নভরং হোটেলেরই দোতলায়।

সিধে যাকে রাইট।

টুটি গলিতে পা দিয়ে আপনি বুঝবেন বেসিক্যালি ওটা একটা বাথরুম। চারপাশ থেকে অ্যামোনিয়া এবং আরও যা যা দেহনিঃসৃত অ্যাসিড, ক্ষার, ক্ষারকমিশ্রিত হাওয়া আকাচা মাফলারের মতো আপনার নাকমুখ পেঁচিয়ে ধরবে। দশ পা গিয়ে গলি টুটে এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়েছে, নাকের জ্বলুনি আর সহ্য করা যাচ্ছে না, হাতের জি পি এস দপদপাচ্ছে, ইউ হ্যাভ অ্যারাইভড! কিন্তু কোথায়? কোথায় নভরং? কোথায় শিম টুর?

এমন সময় আরেকজন। আধময়লা শ্যাওলা সবুজ টি শার্ট, টাকমাথা, সামান্য ভুঁড়ি। হাত দুলিয়ে ডানদিকের অন্ধকার থেকে আলোয় বেরিয়ে এলেন। আপনাদের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। ফ্রেন্ডলি হাসি দেখে আপনি ভাবছেন এঁকেই পাকড়ানো যাক, নভরং কাঁহা হ্যায়, এমন সময় উনি অবান্তর প্রশ্নের পারম্পর্য ভেঙেচুরে মোদ্দা কথায় গিয়ে পড়বেন।

কোরিয়ান খানা হ্যায়? উধার।

ডানদিকে দু’পা হেঁটে একটা বাড়ির মাথায় লেখা নভরং হোটেল। রিসেপশনের কাউন্টারের ওপর উল্টোনো নীলকমলের ভাঙা চেয়ার বুঝিয়ে দিচ্ছে আপাতত বন্ধ। আর তারই মধ্যে দেওয়ালের গায়ে ভীষণ, ভীষণ আবছা অক্ষরে লেখা শিম টুর। পাশে কয়েকটা সরলরেখার কাটাকুটি আর একটা তীরচিহ্ন। এবার সত্যিকারের সারি সারি বাথরুমের পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে একটা সিঁড়ি, সিঁড়ির গায়ে লাল হলুদ নীল সবুজ উজ্জ্বল রঙে আঁকা ঢোলা শার্ট আর সারং পরা হাসিমুখ প্রাচ্য মানুষমানুষী নাচের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। দোতলায় উঠে ডানদিকে এয়ারকন্ডিশনড বসার জায়গা, বাঁদিকে ওপেন রেস্টোর‍্যান্ট।


এখন দিল্লির সন্ধ্যেবেলায় এসিতে বসার কোনও কারণ নেই। ওপেন রেস্টোর‍্যান্টে ঢুকে চোখ জুড়িয়ে গেল। পরিষ্কার, আলো ঝলমলে। গাছ, ছবি, বইয়ের আলমারি দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। দেওয়ালে হাতে আঁকা ভারতের ম্যাপ। সব রাজ্যের নাম ইংরিজি এবং কোরিয়ানে লেখা।


বিভিন্ন রাজ্যের সীমানার ভেতর উল্লেখযোগ্য জিনিসপত্রর ছবি আঁকা আছে, যেমন ওডিশায় রথ, বিহারে বুদ্ধদেবের মুখ। পশ্চিমবঙ্গে চার্চ আর যিশুখ্রিস্ট দেখে আমার প্রথমেই মাথায় এল ব্যান্ডেল চার্চ। তারপর মনে পড়ল কলকাতাতেও আছে বটে খানকয়েক চার্চ। কলকাতা রিষড়া বাদে আরও অনেক জায়গাতেই নিশ্চয় আছে। কোন চার্চের কথা মনে করে এই ছবিটা আঁকা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে আপনার?


শিম টুর-এর মেনুর বিখ্যাততম আইটেম নিঃসন্দেহে সাম কিয়াপ সল বা কোরিয়ান বার বি কিউ। ব্যাপারটা অত্যন্ত সরল, আগুনে সেঁকা পর্ক, কিন্তু আয়োজন চমৎকার। বাঁ থেকে ডানে যথাক্রমে কাঁচা পর্ক, লেটুস, পিকলড শসা (ওপরের বড় প্লেট), এগরোল, মাঝের চারটে ছোট ছোট খোপে কোরিয়ান লাল সস (এটার নাম পরিবেশক তিনবার বলার পর আর জিজ্ঞাসা করিনি), কাঁচা রসুন, কাঁচা লংকা, আর একরকমের নুনের মিশ্রণ। আর কিমচি। আর স্টিলের চপস্টিক। খুবই ইকো ফ্রেন্ডলি। আর সবার পর এল রান্নার সবথেকে জরুরি উপকরণ। উনুন। উনুনের নিচে একটা ফানেলের মতো করা আছে সেখান থেকে ফ্যাট গড়িয়ে সোজা কাগজের কাপে পড়বে। 


রান্নাটা যে টেবিলেই হবে সেটা আমরা জানতাম। এমন কিছু হাতিঘোড়া ব্যাপার নয় হয়তো, কিন্তু আমরা রান্না করার মুডে ছিলাম না। ভদ্রলোক বললেন তিনি সাহায্য করবেন।


প্রথম ব্যাচে প্লেটে একটা একটা করে পর্কের টুকরো পড়ল। আমরা কাঁপা কাঁপা চপস্টিক দিয়ে সেগুলো তুলে লাল সসে চুবিয়ে মুখে পুরলাম। সদ্য পোড়ানো মাংস খেতে খারাপ লাগার কোনও কারণ নেই, লাগলও না। কিন্তু ভদ্রলোক দেখলাম রান্না থামিয়ে দিলেন। হাতের চপস্টিক নামিয়ে রেখে উনুনের আঁচ কমালেন। তারপর একখানা লেটুস হাতে নিয়ে তার ওপর একখানা রান্না হওয়া মাংসের টুকরো, তার ওপর লাল সস, আর তিনখানা রসুন রাখলেন। তারপর গোটা ব্যাপারটা মুড়ে একজনের হাতে তুলে দিলেন।

বললেন, একবার মে খা লিজিয়ে।


আমার সন্দেহ ছিল রসুনটাকে নিয়ে। আমার বাবাকে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে কাঁচা রসুন খেতে দেখছি আমি গত তিরিশ বছর ধরে, আমাকেও যে মাঝে মাঝে ওই অত্যাচার সহ্য করতে হয়নি তা নয়। কিন্তু তা বলে তিনচারটে কাঁচা রসুন একসঙ্গে চিবিয়ে খাওয়াটা একটু বাড়াবাড়ি। আমি বাকিটুকু ভদ্রলোকের দেখাদিখি করে রসুন তিনটের জায়গায় একটা নিলাম। তারপর লেটুস পাতার পানে খিলি বানিয়ে মুখে পুরে দিলাম।


অমনি সেঁকা পর্কের তাপ, লেটুসের কচকচে ঠাণ্ডা, কোরিয়ান লাল সসের টক মিষ্টি মদের গন্ধ আর কাঁচালংকা আর রসুনের ঝাঁজ মিলিয়ে মিশিয়ে যে ম্যাজিকটা ওপর ঘটল জিভের ওপর, কোনও পর্কের, সে যত ভালো কোয়ালিটিরই হোক না কেন, সাধ্য ছিল না একা হাতে সেটা করার।

শিম টুর-এ কোরিয়ান বার বি কিউ-র নিয়ম হচ্ছে এটা একবারে দু’প্লেট অর্ডার করতে হয়। স্কেল ইকনমির ব্যাপার থাকে বোধহয়। একবারে শুধু এক প্লেট রান্না করা বোধহয় জ্বালানি ইত্যাদির জন্য অপটিমাম নয়। যাই হোক, তিনজনে মিলে দু’প্লেট মাংস সাবাড় করতে আমাদের কোনও কষ্টই হল না। বরং ঠিক হল সেফটির জন্য আরও কিছু খেয়ে নেওয়া যাক। এখন পেটে জায়গা নেই ঠিকই কিন্তু তা বলে পরেও থাকবে না এমন তো কেউ বলেনি। মাঝরাতে খিদেয় ঘুম ভেঙে গেলে সর্বনাশ।


শিম টুর-এর মেনুতে বাকি মেন ডিশ বেশিরভাগই ভাতের সঙ্গে আসে। আর ভাত খাওয়ার ইচ্ছে আমাদের ছিল না। সুশি নেওয়া যেত। কিন্তু শিম টুর-এর সুশি নিরামিষ। সেটাও ইচ্ছে ছিল না। শেষমেশ আমরা অর্ডার করলাম সিফুড প্যানকেক। প্যানকেক কাটার জন্য এল একটা জাঁদরেল কাঁচি আর ডুবিয়ে খাওয়ার জন্য সয়া সস। আমি লোভে পড়ে বড় একটুকরো নিলাম বটে কিন্তু শুরু করেই বুঝলাম আমার দ্বারা আর হবে না। পেটের ভেতর পর্করা আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে বসেছে। আর কাউকে জায়গা দিতে নারাজ। কাজেই স্কুইডগুলো প্যানকেক থেকে তুলে তুলে খেয়ে নিলাম।

তিনজনে খেতে শিম টুর-এ আমাদের খরচ পড়ল এগারোশো পঁচানব্বই। এই দামে এত ভালো এক্সোটিক খাবার দিল্লিতে পাওয়া শক্ত। তাছাড়া এক্সোটিক লোকেশনের দামও তো ধরতে হবে? শিম টুর শুধু খাওয়া নয়, শিম টুর হছে দিল্লির বুকে একখানা ছোটখাটো কোরিয়ান অ্যাডভেঞ্চার। আপনাদের সে অ্যাডভেঞ্চারে রুচি থাকলে যেতে পারেন।

*****

The Shim Tur
3 F, Navrang Guest House, Tooti Galli, Main Bazaar, Paharganj, New Delhi
+91 9810386717





July 18, 2016

অন্যজন



দিদিমণির ভাণ্ডারে বিবিধ রতন। ফ্যাকাশে সাদাকালো ছবি, কোণা দুমড়োনো পোস্টকার্ড। পুরোনো চিঠি সববাড়িতেই থাকে, কিন্তু দিদিমণির ভাঁড়ারের চিঠিগুলো স্পেশাল। কারণ তাঁর কাছে এমন কিছু চিঠি আছে যাদের লেখকদের দিদিমণি ছাড়াও বাংলাদেশের আরও অনেকে চেনেন। অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, প্রমথ বিশী। এই দ্বিতীয়জনের সঙ্গে দিদিমণির ছাত্রশিক্ষকের সম্পর্ক ছিল। পরীক্ষায় কাজে লাগতে পারে ভেবে মাস্টারমশাইয়ের লেখা একখানা বই কেনার জন্য দিদিমণি তৈরি হচ্ছেন জেনে মাস্টারমশাই বললেন, কেনার দরকার নেই, আমিই এক কপি দেব’খন। বই নিয়ে দিদিমণি বাড়ি ফিরে দেখেন তার প্রথম পাতায় লেখা “শ্রীমতি … কে বইখানি না-পড়ার জন্য দেওয়া হইল।”

তবে বিখ্যাত লোকেদের সঙ্গে সঙ্গে অবিখ্যাত লোকদেরও দিদিমণি চিনতেন। না চিনলেই ভয়ের কথা। তাঁরাও দেদার চিঠি লিখেছেন দিদিমণিকে। বিখ্যাত অবিখ্যাত সকলের পোস্টকার্ডেরই কমন পয়েন্ট হল তারা সকলেই ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে, সকলেরই বাংলা ভাষার ওপর দখল, হাতের লেখা ও রসবোধ চমৎকার। কয়েকটা, বিশেষ করে বাড়ির লোকের পাঠানো পোস্টকার্ডে জায়গা কথার তুলনায় কম পড়েছে, তখন ফন্ট সাইজ কমিয়ে “স্নেহের” ওপরের আর আশীর্বাদক-এর নিচের শূন্যস্থান পূরণ করতে হয়েছে। 

চিঠির মতোই মজার হচ্ছে ছবি। দিদিমণি খাটের ওপর আধশোয়া হয়ে ছেলের পড়ার তত্ত্বাবধানে, দিদিমণি সানগ্লাস পরে, দিদিমণি টেনিস খেলার পোশাকে। আমরা মুগ্ধ হয়ে দিদিমণির ছবি দেখি আর দিদিমণি নিজের দিকে দেখিয়ে বলেন, “সবাই ভাবে আমি বোধহয় এমনি হয়েই জন্মেছি। এখন বিশ্বাস হল?” 

এর পরের ছবিটায় একটা ছাদ (কিংবা বারান্দাও হতে পারে)। একসারি লোক চেয়ারে বসা, তাদের পেছনে একসারি দাঁড়িয়ে, আর সামনে বাবু হয়ে বসেছে আরেক সারি। চেয়ারে যাঁরা বসে আছেন তাঁদের আমি কোনওদিন দেখিনি, নাম জানি না। বেশিরভাগ সময়ে এঁদের নামের প্রসঙ্গটাই ওঠে না, দাদু, ঠাকুমা, দিদিমাতেই কাজ চলে যায়। তাঁদের কেউ কেউ আশি ছুঁতে চলেছেন, অথচ মাথার চুল কুচকুচে কালো। পেছনর সারিতে দাঁড়ানো কাউকেও আমি দেখিনি, কিন্তু আমাকে যারা এঁদের চিনিয়েছেন তাঁরা এঁদের ভালো করে চেনেন, কাছ থেকে দেখেছেন। এঁদের বিদ্যাবুদ্ধি, রসবোধের সঙ্গে গল্পের মাধ্যমে আমার জানাচেনা আছে। এঁদেরই মধ্যে কোনও একজন আমার শাশুড়ি মা’কে সন্ধ্যেবেলা ভূতের ভয়ে খুব জোরে দৌড়ে বাড়ি ঢুকতে দেখে অবাক হয়েছিলেন। “তোমার কি ধারণা, ভূত তোমার থেকে আস্তে দৌড়োয়?”   

ইন্টারেস্টিং হচ্ছে সামনের সারির লোকজন। ছাদের মেঝেতে হাফপ্যান্ট কিংবা ফ্রক পরে যাঁরা বাবু হয়ে বসে আছেন। যাঁদের কারওরই চুল কানের লতি ছাড়ায়নি, ক্যামেরা দেখলেই হাসতে হবে এমন বোকা যুক্তিতে যাঁদের কেউই তখনও বিশ্বাস করেন না। 

এঁরা ইন্টারেস্টিং কারণ দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বাড়িয়ে, চুলদাড়ি পাকিয়ে, চশমা পরিয়ে, অভিজ্ঞতার প্রলেপ মাখিয়ে চেনামুখে পরিণত করার খেলাটা আমার পক্ষে একমাত্র এঁদের সঙ্গেই খেলা সম্ভব। কাউকে কাউকে পারি, কাউকে কাউকে পারি না। ঠিক উত্তর জেনে হাঁ হয়ে থাকি। আমার দেখা অন্যতম গম্ভীর ভদ্রলোকের ওইরকম বেলবটম প্যান্ট আর ওইরকম চোয়াল ছোঁয়া জুলপি?

কিন্তু একজনকে চিনতে আমার কক্ষনও ভুল হয় না। কোলে চাপা ছবি থেকে শুরু করে চন্দনের সাজ, ফ্রক থেকে শুরু করে শাড়ি। গোড়ার দিকে আমার চোখ পড়ার আগেই কেউ একজন ছবির একজায়গায় আঙুল রেখে বলত, “আর এটা কে বল দেখি?” এখন সেটারও দরকার হয় না। মাকে আমি দেখলেই চিনে ফেলতে পারি। 

*****

সুমিতামামি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, মাকে নিয়ে আমি কখনও অবান্তরে লিখিনি কেন। মা তো লেখার মতোই ব্যাপার। মামির সঙ্গে আমি একমত। একেবারে যে লিখিনি তা নয়, মায়ের ভুলো মনের গল্প লিখেছি, (যাঁরা মিস করে গিয়েছিলেন তাঁদের জন্য আবার বলছি। মা একদিন ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে রোদের ঠেলায় নিচে নেমে এসে গগলস পরে আবার ছাদে গিয়েছিলেন। এবং নেমে এসে বলেছিলেন, কী যে হয়, এই ঝাঁ ঝাঁ রোদ, আবার এই মেঘলা করে এসেছে। কাপড়গুলো দিয়ে এলাম, এক্ষুনি আবার তুলতে যেতে হবে নির্ঘাত।) মায়ের ছাদের বাগানের ছবি দেখিয়েছি, (মায়ের বাগান কেজো ও অকেজোর অতি বিরল সঙ্গম, এ রেলিং-এ পাতিলেবু, ও রেলিং-এ পিটুনিয়া), একবার মাকে “হেল্প” করতে গিয়ে কারিগাছের বদলে অন্য গাছের পাতা ছিঁড়েখুঁড়ে দেওয়ার গল্পও লিখেছি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। নিজের মাকে নিয়ে যেমন অবান্তরে আদিখ্যেতার শেষ রাখিনি, অর্চিষ্মানের মা’কে নিয়ে সেরকম করিনি কখনও।

কেন করিনি সেটা আপনারা সকলেই নিশ্চয় আন্দাজ করেছেন, নাকতলার মা-ও করেছিলেন। বিয়ের পরের দিনতিনেক ওঁকে ‘মা’ আর বাবাকে ‘বাবা’ বলতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছিলাম, কেবলই ‘কাকিমা’ আর ‘কাকু’ বেরিয়ে পড়ছিল। মা বলেছিলেন, “তুমি আমাদের যা ইচ্ছে তাই ডাকবে কুন্তলা। মা তো একজনই হন। সে ডাকে সবাইকে ডাকবেই বা কেন?” 

নাকতলার মা আমার নিজের মা নন। তাই তাঁকে নিয়ে অবান্তরে লেখার আগে অনেকবার ভাবি। নিজের মাকে নিয়ে লেখার আগে ভাবি না। নিজের আজকালপরশু হাঁটকে পোস্ট লেখার রসদ না পেলে মায়ের জীবন হাঁটকাই। তাঁর অনুমতির ধার না ধেরে তাঁরই ছোটবেলা বড়বেলা থেকে গল্প চুরি করে অবান্তরে ছেপে দিই। এ কথা জানা সত্ত্বেও যে পাবলিক ব্লগে ব্যক্তিগত হাঁড়ির খবর ছাপানো মায়ের ভয়ানক অপছন্দের। কী আর হবে। মা রাগ করবেন। বকবেন। দু’দিন খালি কাজের কথাটুকু বলে ফোন নামিয়ে রাখবেন। তারপর? চারদিনের দিন তো আবার ঘুরেফিরে আমার কাছেই আসতে হবে। সারাজীবনের মতো দুজনের হাতে হাতকড়া পরিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন ভগবান, আমাকে ছেড়ে মা পালানোর রাস্তা বন্ধ।

নাকতলার মায়ের প্রতি আমার সে কনফিডেন্স নেই, কারণ উনি, আফটার অল, আমার নিজের মা নন। উনি বলতেই পারেন, তোমার কাজ নেই তুমি ব্লগ লিখবে লেখ, আমাকে নিয়ে টানাটানি কেন? কিন্তু তিন বছর কেটে গেছে, তাছাড়া আগের পোস্টগুলোতে মাকে নিয়ে অল্পস্বল্প লেখাতে মা কিছু আপত্তি জানাননি, কাজেই আমার সাহস বেড়ে গেছে। 

নাকতলার মা’কে নিয়ে লেখার দু’নম্বর সমস্যাটা হচ্ছে মায়ের সঙ্গে আমার পরিচয়ের অপ্রতুলতা। তিনটে বছর আর কতটুকু, তাও ফোনের ওপার থেকে? আরও অসুবিধের ব্যাপারটা হচ্ছে মা আমার জীবনে এসেছেন সামাজিক সম্পর্কের প্যাকেটমোড়া হয়ে। আমার শাশুড়ি, অর্চিষ্মান-তিন্নির মা, এটাই আমার কাছে মায়ের প্রধান পরিচয়। এই সম্পর্কগুলোর বাইরের যে মা, যাঁর প্রমাণ আছে দোতলার ঘরের শোকেসে ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া উপহারে, মায়ের সঙ্গে এখনও জড়িয়ে থাকা পুরোনো ছাত্রদের গল্পে, তাঁদের মেয়েদের মাকে দেওয়া হাতের লেখার হোমটাস্কের পাতায়, দিদিমণির পুরোনো পোস্টকার্ডে, তাঁর সম্পর্কে আমার কোনও আইডিয়াই নেই। নাকতলার বাড়ির বাইরের সেই মা, যিনি কারও মা নন, স্ত্রী নন, শাশুড়ি নন, যিনি নিজেই নিজের, সেই মা’কে কখনও দেখিনি আমি, দেখার চান্সও নেই। 

কিন্তু সেটা কি আদৌ সম্ভব? কাউকে সামাজিক সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে দেখা? আমার নিজের মাকেই কি ‘মা’ কথাটার বাইরে গিয়ে কখনও দেখেছি আমি? তাঁর বাকি সব পরিচয়ই কি সেই এক অক্ষরের ব্ল্যাকহোলে ডুবে মরেনি? তাছাড়া বাইরের দুনিয়াটাও তো ঊর্ধ্বস্তন, অধস্তন, শিক্ষক, ছাত্র, মাইনে, স্ট্যাটাস, আরও নানারকম সম্পর্ক ও সংজ্ঞার জ্বরে জর্জরিত? সেখানেই বা আসল লোকটাকে খুঁজে পাওয়ার আশা করছি কী করে আমি?

করছি না। শুধু আফসোস করছি মায়ের জীবনের ওই ভীষণ ব্যস্ত, ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর গল্প আমার হাত ফসকে পালিয়েছে বলে। সেগুলো জোড়া দিয়ে দিয়ে মায়ের যে ছবিটা হত, সেটা নিখুঁত না হতে পারে, এখনকার ছবির থেকে স্পষ্ট তো হত।  

কিন্তু যা নেই তা নিয়ে আফসোস থাকা বোকামো। গত তিন বছরে গল্প করে বলার মতো ঘটনা হয়তো খুব বেশি জমেনি, কিন্তু ক্বচিৎকদাচিৎ মুখোমুখি আর বাকিটুকু শ্রবণের মধ্য দিয়ে যেটুকু জমেছে সেটাও যথেষ্ট। আর কে বলল গল্প হতে গেলে ঘটনা লাগে? ইদানীং তো আমার এও মনে হতে শুরু করেছে, ভালো হতে গেলে গল্পে হয়তো ঘটনা লাগেই না। সকালবিকেলের কথোপকথন, চলাফেরার মধ্যে থেকে যে একটা সুর স্পষ্ট হয়, সেটা ঘটনার থেকে অনেক বেশি এফেক্টিভ। অনেক বেশি চমকপ্রদ। 

চমকের সবথেকে বড় বিষয় হচ্ছে পরনিন্দাপরচর্চা ছাড়া একটা লোক থাকে কী করে। মৌলবাদী কিংবা সলমান খানের নিন্দে না করে অনেকেই থাকতে পারে, তা বলে পাড়াপ্রতিবেশীর? আত্মীয়স্বজনের? আমি নিজে পরচর্চার ভক্ত। যার চর্চা করলাম তার কোনও ক্ষতি হল না, আমার মন খানিকটা হালকা হল। ফুলপ্রুফ প্যারেটো ইমপ্রুভমেন্ট। নাকতলার মাকে আমি কখনও নিজের জন্য ওই আরামটুকু খুঁজে নিতে দেখিনি। আমরা কারও প্রতি নিন্দের তুফান তুললে বরং মা চুপ করে থেকেছেন, তারপর সেই লোকটির একটা ভালো দিকের কথা বলেছেন। 

পরচর্চা করা লোক আমি একেবারে দেখিনি বলব না, কাউকে কাউকে দেখেছি। তবে তাঁরা কেন অন্যকে নিয়ে কথা বলেন না তার একটা কারণ হতে পারে নিজেকে নিয়ে কথা বলতে গিয়েই তাঁদের সব সময় ফুরিয়ে যায়। মা সেই দলেও পড়েন না। ’আমি' বা ‘আমার’ দিয়ে মা সারাদিনে ক’টা বাক্য শুরু করেন সেটা আমার ধারণা সহজেই গুনে ফেলা যাবে। 

আমরা অনেকসময় গল্প করতে করতে দেখি মা আমাদের হাতের নাগালেই আছেন, কিন্তু আবার নেইও। পরীক্ষা নেওয়ার মতো করে হঠাৎ যদি তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, বল/বলুন দেখি এতক্ষণ কীসের কথা হচ্ছিল? তাহলেই মা ধরা পড়ে যাবেন। বেরিয়ে পড়বে যে মা আসলে এতক্ষণ আমাদের তত্ত্বালোচনা কিচ্ছু শোনেননি। অনেক সময় আমাদের অনুপস্থিতিতে তোলা মায়ের ছবি দেখি। অনেক লোকের সঙ্গে গ্রুপফোটোতে মা। আমরা বলাবলি করি, মা কিন্তু নেই, দেখেছ/দেখেছিস? এতদিন আমি ভাবতাম মায়ের এত ভুলোমন কি না, তাই বোধহয় মা মাঝে মাঝে ভুলে যান যে তাঁর চারপাশে এই মুহূর্তে কিছু একটা চলছে। ইদানীং সন্দেহ হচ্ছে আসলে তা নয়, আসল কথা হচ্ছে আমরা যেহেতু সবসময়েই অন্যকে কিংবা নিজেকে নিয়ে কথা বলি আর মা যেহেতু ও দুটোর একটাতেও ইন্টারেস্টেড নন, তিনি বোরড হয়ে অন্য কথা ভাবতে শুরু করে দেন।

মোদ্দা কথা হচ্ছে মায়ের সঙ্গে ভীষণ আরাম করে, হাত পা ছড়িয়ে থাকা যায়, কোথাও খোঁচা লাগে না, অস্বস্তি হয় না। ঠাকুমা বলেন, পিতৃমুখী মেয়েরা সুখী হয় আর মাতৃমুখী ছেলেরা। আর মায়ের মতো স্বভাব যে সব ছেলেদের? তাদের সম্পর্কে শাস্ত্রে কিছু লেখেনি। সে না লিখুক, আমি জানি। সে সব ছেলের মায়েরা যদি আমাদের মায়ের মতো হন, তাহলে তাদের রুমমেটরাও ভয়ানক সুখী। 


July 16, 2016

এ সপ্তাহে + সাপ্তাহিকী



গত সপ্তাহে আমরা তিনটে সিনেমা দেখলাম। হলে গিয়ে দেখলাম 'সিক্রেট লাইফ অফ পেটস'। দিল্লিতে পপকর্ন আর কোল্ডড্রিংকস সহ দুজনে সিনেমা দেখলে পকেট আর বিবেক দুটোর ওপরেই মারাত্মক চাপ পড়ে।  রবিবার সকালের শোয়ের দাম তবু মানুষের মতো। তাই আমরা বেশিরভাগ সময়েই রবিবার সকালের শোয়ে সিনেমা দেখতে যাই। ন'টার শো ধরতে সাড়ে আটটায় বেরোতে হয়। প্রায় অফিস যাওয়ার মতোই দাঁড়ায় ব্যাপারটা। বাড়িওয়ালার মুখোমুখি পড়ে গেলে অকওয়ার্ড। তাই আমরা বেরোনোর আগে ক্যাটস আই দিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করে বাজার খালি দেখে তবেই চটি হাতে করে গুটিগুটি সিঁড়ি দিয়ে নামি বেরোই। কখনও কখনও এত সতর্কতা মাঠে মারা যায়।  হঠাৎ তিনতলা থেকে তিনি নেমে আসেন। কিংবা একতলা থেকে উঠে। “একী আজ আবার কোথায় চললে?” “এই সিনেমায়।” তাঁর মুখে আলো জ্বলে ওঠে। হাতে ধরা ফোন দেখিয়ে তিনি বলেন, "সুলতান? মিন্টিরাও দেখছে আজ, ইন ফ্যাক্ট এখনই। ওদের ওখানেও (ডে মইন) রিলিজ করেছে তো।" আমরা সত্যিটা স্বীকার করি। সুলতান দেখছি না আমরা, আমরা দেখতে যাচ্ছি কুকুরবেড়ালের কার্টুন।

"কী ছেলেমানুষি!" প্রশ্রয়ের হাসি হাসেন তিনি। ছদ্ম বকুনি দেন। "দেখবে না, চারদিক থেকে বাচ্চাকাচ্চা চ্যাঁভ্যাঁ করবে।” হলে পৌঁছে আমাদেরও চোখ কপালে উঠল। পালে পালে শিশু। "পাপা পাপা" চিৎকারসহ কোলে চড়ে পাপাদের কলার টেনে পপকর্নের দিকে নির্দেশ করছে। আমরা শঙ্কিত মুখে থ্রি ডি চশমার লাইনে দাঁড়ালাম। একেবারে প্রথমে। পেছনে পিল পিল করে লোক আসছে। পপকর্নের বালতি বুকে আঁকড়ে, অর্ধেক খই তকতকে মেঝেতে ছড়াতে ছড়াতে শিশুর দল পাপাদের কোলে চেপে উল্টোদিকের 'সুলতান'-এর অডিটোরিয়ামে ঢুকে গেল। 'সিক্রেট লাইফ অফ পেটস' দেখল গোটা দুই বাচ্চা, গোটা দশেক মাঝবয়সী আর গোটা চারেক সিনিয়র সিটিজেন।

আমাদের খুব ভালো লেগেছে সি লা অ পে। মিষ্টি কুকুর, কুচুটে বেড়াল, বদমাশ খরগোশ, বিবেক জাগ্রত হওয়া খুনে ঈগল, ধপধপে সাদা তুলোর মতো লোমওয়ালা অ্যাংরি ইয়ং নায়িকা। খারাপ লাগার কোনও কারণ নেই।

দুই আর তিন নম্বর সিনেমাটা দেখলাম বাড়িতে বসে। দ্বিতীয়টার নাম 'দ্য উইচ'। অনেক দিন দেখার ইচ্ছে ছিল। একটি ধর্মপ্রাণ পরিবারের জঙ্গলের ধারে বসতি পাতার পর নানারকম অলৌকিক ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার গল্প। হরর ঘরানার সিনেমা বটে, কিন্তু ধুমধাম আওয়াজ করে চমকে দেওয়া নেই, আর মাথার সব চুল মুখের সামনে ঝুলিয়ে দিয়ে ভয় দেখানোও না। সাধারণ দেখতে লোকজন, সাধারণ ঘটনাবলী, ধর্মের নামে পাগলামি, মাঝে মাঝে অন্ধকারের ভেতর আবছায়া কিছু অদ্ভুত দৃশ্য, একটা মারাত্মক অস্বস্তির সৃষ্টি করে। 

তিন নম্বরটা আজ দুপুরেই দেখলাম। 'ডায়াল এম ফর মার্ডার'। আগে দেখা, তবু একইরকম ভালো লাগল। 

*****

গত সপ্তাহে দিল্লিতে বৃষ্টি হল। "বৃষ্টি হোক হোক" বলি বটে, কিন্তু মনে থাকে না যে বৃষ্টির জন্য আমরা তৈরি থাকলেও দিল্লি শহরটা তৈরি নয়। শহরের নর্দমা, সিগন্যাল ব্যবস্থা, কর্তৃপক্ষ, কেউ না। বৃহস্পতিবার রাস্তায় এমন জল জমল, যে একঘণ্টার রাস্তা পেরোতে অর্চিষ্মানের লাগল আড়াই ঘণ্টার ওপর, তাও শেষের দু' কিলোমিটার ট্যাক্সি থেকে নেমে হাঁটল বলে। আমার আবার এই সময়েই অফিসে অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু হয়েছে। সে সব সেরে জ্যাম পেরিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছলাম, ততক্ষণে দিল্লির দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করেছে। 

তবু আমি বৃষ্টির পক্ষে। আজ সকাল ছ’টাতেও যখন বারান্দার চিকের ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকে এল না, তখন আমার সন্দেহ হল। আমি কান থেকে গান খুললাম। কানের সন্দেহটা নিরসন হল। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতে চোখের সন্দেহও ঘুচে গেল। জাত বর্ষা নেমেছে। বাড়ির মতো। বেশ কিছুক্ষণ থাকবে। মাটি ভিজতে না ভিজতে পালাবে না। সারাদিনই চলল। বিকেলেও মেঘে ছেয়ে ছিল আকাশ। এখন চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। 




****

এবার এ সপ্তাহের ইন্টারনেট।


লেখাপত্র

Regardless of what country you live in, and what stage of life you might be at, having kids makes you significantly less happy compared to people who don’t have kids. It’s called the parenting happiness gap.

ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে শান্তি করে ভাত খেতে পারছেন না? এই চালাকিটা করে দেখতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন এভাবে নাকি ভাতের প্রায় অর্ধেক ক্যালরি কাউন্ট কমিয়ে ফেলা যায়।

ভালোবাসার গল্পচরিত্রের দৌড়ে হ্যারি পটারকে হারিয়ে দিয়েছেন একজন। সত্যি বলতে কি, তাঁকে আমিও হ্যারির থেকে বেশি ভালোবাসি।

মুখ ফসকে যা বেরোয় তা যে আসলে মনেরই কথা সে নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। ফ্রয়েডের বেশিরভাগ দাবিই ভুল প্রমাণ হয়েছে, কিন্তু ফ্রয়েডিয়ান স্লিপ নিয়ে এখনও বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছেন না।

পাখি হতে অনেকের ইচ্ছে করে শুনেছি। তা বলে ছাগল হতে?


ভিডিও

চল্লিশ বছরের জন্মদিনে আমি এরকম কিছু একটা করব ভেবেছি।





ছবি



অডিও

বিবিসি রেডিও ফোর-এ চলছে ক্রাইম ফেস্টিভ্যাল। এ মাসে চারটি ছোট অপরাধমূলক ছোটগল্প (তিরিশ মিনিট করে) পড়ে শোনানো হবে। এ সপ্তাহের গল্প অ্যান ক্লিভস-এর। এঁর কথা অবান্তরে আগেও হয়েছে। আপনাদের ইচ্ছে হলে শুনতে পারেন।




July 13, 2016

থ্যাংকস টু বুকটিউব



দু’হাজার ষোলোর অর্ধেক শেষ। কী করে আমি জানি না। না জানার কোনও কারণ নেই যদিও। যাওয়ার আগে গত ছ’মাসের প্রতিটি সেকেন্ড মিনিট ঘণ্টা আমাকে জানান দিয়েই গেছে। আমিই টের পাইনি। মাঝে মাঝে, ক্বচিৎকদাচিৎ পেয়েছি। একেক দিনের শেষে বিছানায় ঢুকে মনে হয়েছে, যাঃ, আজকের দিনটাও মাটি। রবিবারের রাতগুলোতে টের পেয়েছি দু’দিনের ছুটি কীভাবে অপচয় করলাম, কাজ তো হল না, আনন্দটাও কি মনের মতো হল?

কিন্তু ছ’মাস কেটে গেল যেই অমনি আমার টনক নড়ল। ছ’মাসে কত কী করে ফেলে লোকে, পলা হকিন্স ছ’মাসে ‘দ্য গার্ল ইন দ্য ট্রেন’ লিখে ফেলেছিলেন, আর আমি কী করলাম? (এটাও একটা লক্ষ্যণীয় এবং দুঃখের বিষয় যে আমার কাছে সময়ের হিসেব এসে ঠেকেছে শুধু 'আমার কী হল' আর 'কী হল না'-তে। সময়কে অন্য কোনওভাবে মাপার পদ্ধতি নিশ্চয় আছে। থাকতেই হবে। আপনাদের কারও যদি জানা থাকে আমাকে জানাবেন দয়া করে।) 

দু’হাজার পনেরোর শেষে অনেকগুলো শপথ নিয়েছিলাম। সময়ের কাজ সময়ে করব, ফাঁকি মারব না ইত্যাদি। সেগুলো নিয়ে সংগত কারণেই আমি কথা বলতে চাই না। যেটা নিয়ে চাই, সেটা ছিল বোনাস রেসলিউশন। দু’হাজার ষোলোতে বেশি বই পড়ব। আপনাদের কাছে শুধু বেশি বই পড়তে চাই বলে ক্ষান্ত দিয়েছিলাম, ক’টা বই পড়তে চাই সেটা নিয়েও মনে মনে একটা আইডিয়া ছিল। মনে হয়েছিল সপ্তাহে একটা করে বই ম্যানেজেবল। আর পুজোর ছুটি গরমের ছুটি ইত্যাদি ধরে ঠিক করেছিলাম দু'হাজার ষোলোতে আমি পঞ্চাশটা বই পড়ব।  

ছ’মাস পরে দেখা যাচ্ছে আমি তার মধ্যে একত্রিশটা বই পড়ে ফেলেছি। অর্থাৎ পঞ্চাশ শতাংশ সময়ে আমার লক্ষ্যের বাষট্টি শতাংশ পূরণ হয়েছে। আমার চেনা কেউ কেউ (একজন) সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে লক্ষ্যপূরণের জন্য আমি বেছে বেছে সরু বই পড়েছি, কিন্তু সেরকম কোনও চিটিংবাজি আমি করিনি। যা পড়তে ইচ্ছে করেছে, সরু মোটা গ্রাহ্য না করে পড়েছি। 

মোদ্দা কথা সামনের ছ’মাসে খুব অদ্ভুত কিছু না ঘটলে আমার এই রেসলিউশনটা রক্ষা হচ্ছে। শুধু রক্ষাই হচ্ছে না, আমি নিজের প্রতি নিজের প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে যাচ্ছি।

এ’রকম মুহূর্ত আমার জীবনে আগে আসেনি। পরেও আসবে কি না জানি না। কাজেই এই মুহূর্তটাকে অন্যান্য মুহূর্তের মতো বেখেয়ালে বইয়ে দেওয়া যাবে না। উদযাপন চাই। এই অসাধ্যসাধন কী করে হল সে নিয়ে চর্চা চাই যাতে ভবিষ্যতে এ সাফল্য রেপ্লিকেট করার একটা সম্ভাবনা অন্তত থেকে যায়। কারা এই অসাধ্যসাধনে আমাকে উদ্বুদ্ধ করলেন, তাঁদের খোঁজ নেওয়া চাই। অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন চাই। 

প্রথমেই আসবে বিবেকের নাম। দিনরাত কামড়ালে যা হয়, এঁর বেশিরভাগ কামড়ই এখন নির্বিষ, নির্ধক। কিন্তু বই পড়া নিয়ে ইনি যে কামড়টা দিয়েছেন সেটার দাগ একেবারে কেটে বসেছে। দিনটা আমার এখনও মনে আছে। বসে বসে সিভি আপডেট করছিলাম। ‘আদার ইন্টারেস্টস’-এ গিয়ে থামতে হল। কী আমার ইন্টারেস্ট? ব্লগিং শুনতে সন্দেহজনক। রাইটিং শুনতে হাস্যকর। ভেবেচিন্তে দেখলাম সবথেকে নিরাপদ ইন্টারেস্ট হচ্ছে রিডিং। জনপ্রিয় কিন্তু ভিড়ে মিশে থাকা। লিখে দিলাম। এও জানলাম যে সিভি-তে মিথ্যাচার করলাম আমি। রিডিং আমার ইন্টারেস্ট ছিল একসময়, এখন আর নেই। অতীত ধুয়ে আর কদ্দিন জল খাব ভেবে কষ্ট হয়েছিল।

আমার বই পড়ার শপথ রক্ষায় আমাকে অসম্ভব সাহায্য করেছে কিন্ডল। একটা চকচকে নতুন গ্যাজেটের অ্যাপিল তো আছেই, কিন্তু অনেকগুলো সত্যিকারের সুবিধেও আছে। গত মাসে কিন্ডল হাতে পাওয়ার পর থেকে আমি কাগজের বই প্রায় পড়িইনি। ইন্টারনেট থেকে চুরিচামারি করা পিডিএফও কিন্ডলে খুলে পড়েছি। হাত দিয়ে করাই যায়, কিন্তু পাতা ওলটানোর জন্য একটা স্টাইলাস পেন কিনেছি। সেটা স্ক্রিনের ওপর উঁচিয়ে ধরে সিরিয়াস মুখে আমাকে বই পড়তে দেখলে লোকে হাসে। আমি গা করি না। যে পুজোর যে উপচার। 

কিন্তু আমাকে বই পড়তে যে সবথেকে বেশি সাহায্য করেছে সে ওপরের দুটোর একটাও নয়। গত ছ’মাসে আমাকে বই পড়তে সবথেকে বেশি উদ্বুদ্ধ করেছে ইউটিউব। চমকালেন তো? আমিও চমকেছিলাম। কারণ আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম গত ক’বছরে আমার বইপড়া যদি কেউ একা হাতে চৌপট করে থাকে তবে সে ইউটিউব। তারপর একটা পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল। 

ইউটিউব হচ্ছে দ্বার। সে দ্বার দিয়ে ভ্রম ঢুকবে না সত্য, তার সম্পূর্ণ দায় দ্বাররক্ষকের। যে রোলে আমি ডাহা ফেল। যখন এই সত্যিটা আমি স্বীকার করলাম তখন পরিস্থিতি বদলে গেল। ইউটিউব পড়া মাটি করেছিল, সেই ইউটিউবই আবার পড়া ধরালো। ঠিক ইউটিউব নয়, বুকটিউব। 

উৎস গুগল ইমেজেস

বুকটিউব কাকে বলে আমি সদ্য জেনেছি। আমার চেনা লোকেদের বলতে গিয়ে জেনেছি তাঁরাও এতদিন জানতেন না। আমাদের মতো যদি কোনও অবান্তরের পাঠক থেকে থাকেন তবে তাঁর জন্য বুকটিউব কাকে বলে সেটা আগে বলি। ইউটিউবের কোটি কোটি ভিডিওর মধ্যে বাজার তেজী হচ্ছে সাজগোজ, রান্নাবান্না, খেলা, অপমানসূচক  কমেডি, বেড়ালছানার ভিডিওদের। এদের ভিড়ে লুকিয়ে আছে টিমটিমে একটি পাড়া, যেখানে কিছু লোক শুধু বই নিয়ে আলাপআলোচনা করছেন। পছন্দের বইদের মাথায় তুলছেন, অপছন্দের বইদের তুলো ধুনছেন। কেউকেউ পুলিৎজার, বুকার সিজন এলে উত্তেজনায় উদ্বেলিত হচ্ছেন, কেউকেউ তাঁদের ভয়ানক করুণার চোখে দেখে খুঁজে খুঁজে খালি সেই সব বই-ই পড়ছেন যাদের নাম কেউ কখনও শোনেনি। সবল দুর্বল, মাতব্বর, মুখচোরা সবই আছে এ পাড়ায়। ভ্যাম্পায়ার প্রেম, গেম অফ থ্রোনস জাতীয় ফ্যান্টাসির মাতব্বরিই সবথেকে বেশি। সাইফাই-ও তেড়ে পাল্লা দিচ্ছে।

দেখেশুনে প্রথমটা দমেই গিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর একে একে আড়ালআবডাল থেকে আমার পছন্দমতো বুকটিউবাররা আত্মপ্রকাশ করতে লাগলেন। তাঁরা কেউ ক্ল্যাসিক পড়েন, কেউ গোয়েন্দা আর ভূতের পোকা, কেউ রাশিয়ান সাহিত্যে এম এ, কেউ জাপানি রূপকথার অনুরাগী। বইপড়ার প্রতি এঁদের নিষ্ঠা, আগ্রহ, উত্তেজনা, ভালোবাসা আমার বইপড়ার রেসলিউশনের পালে নতুন করে হাওয়া দিল। 

বুকটিউব আরও একটা গুরুতর উপকার করেছে আমার। সিনেমার মতো দৃশ্যবর্ণনা, সংলাপ আর ঘটনার ঘনঘটা যেমন কার্যকরী হতে পারে, তেমনি সংলাপহীন, ঘনঘন পটপরিবর্তনের উত্তেজনাহীন, শুধুমাত্র ভাষাকে ভর করে এগিয়ে যাওয়া লেখাও যে মনকে একইরকম ছুঁতে পারে, ক্রমাগত একই ধরণের লেখা পড়তে পড়তে আমি সেটা ভুলতে বসেছিলাম। বুকটিউব তার বৈচিত্র্য দিয়ে আমাকে সেটা মনে করিয়ে দিয়েছে। 

আমি জানি আমার কাছে যা বিচিত্র ঠেকছে বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে, প্রিভিলেজের নিরিখে, ভাষার নিরিখে, এমনকি জেন্ডারের নিরিখেও তা মারাত্মক একপেশে এবং সংকীর্ণ। নিচের আমার পছন্দের বুকটিউবারদের তালিকা দেখলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবু আমার ছ’মাস আগের পরিস্থিতির তুলনায় এ একরকমের এগোনো বলেই বিশ্বাস করি আমি। 

অনেক বুকটিউবারকেই ফলো করি আমি। নিচে তাঁদের কয়েকজনের চ্যানেল সম্পর্কে দু'কথা রইল। আপনাদের ইচ্ছে হলে দেখতে পারেন।

*****


অনেক ধরণের বই পড়েন ইনি (লেখেন প্রধানত কবিতা), কিন্তু আমার মতে এঁর স্পেশালাইজেশন রূপকথায়। বা বলা উচিত রূপকথার রিটেলিং-এ। অ্যাঞ্জেলা কার্টারের সত্তর দশকে লেখা পথদেখানো রূপকথা রিটেলিং-এর বই 'দ্য ব্লাডি চেম্বার অ্যান্ড আদার স্টোরিস'-এর খোঁজ ইনিই দিয়েছিলেন। রূপকথার ইতিহাস নিয়ে ‘ফেয়ারি টেলস উইথ জেন’ নামে একটা সিরিজ চলছে এঁর চ্যানেলে। ইচ্ছে হলে দেখতে পারেন। এই রইল তাদের লিংক। 






ইতিহাস আর ইংরিজি সাহিত্যের ছাত্রী কেটি-র চারণ ক্ষেত্র হচ্ছে উনিশ শতকের ভিক্টোরিয়ান সাহিত্য। ব্রন্টে বোনের দল, জেন অস্টেন, চার্লস ডিকেন্স। আমি নিজে ও জিনিস খুবই কম পড়েছি, তবু কেটি-র উৎসাহ আমাকেও সংক্রামিত করেছে। চার্লস ডিকেন্স-এর প্রতি কেটি-র উচ্ছ্বাস আর সত্যজিৎ রায়ের লেখার প্রতি আমার অন্ধভক্তির কোথাও না কোথাও মিল তো আছেই। 




পছন্দের মিলের থেকে অপছন্দের মিল যে কখনও কখনও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেটা আবারও প্রমাণ হল। লরেন-এর সঙ্গে বইয়ের পছন্দ আমার প্রায় আইডেন্টিকাল, কিন্তু যেদিন শুনলাম ওঁরও কাজুও ইশিগুরোর বিশ্ববিখ্যাত ‘নেভার লেট মি গো’  খারাপ লেগেছে আমি একেবারে আনন্দে গড়াগড়ি খেতে লাগলাম। আমার ‘ভালো লাগা খারাপ বই’-এর তালিকার প্রায় ওপরদিকেই থাকবে ইশিগুরো-র ‘নেভার লেট মি গো’। লরেন-এর চ্যানেল আমার আগেই ভালো লাগত, এখন রীতিমত আত্মীয়তা বোধ করি। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ সবরকম বই নিয়ে মিলিয়েমিশিয়ে কথা বলেন লরেন। 




ক্লিফ সার্জেন্ট আবার অত মেশামিশিতে যান না, তিনি কথা বলেন কেবল কড়া লিটারেরি সাহিত্য নিয়ে। বই পড়ার পাশাপাশি ক্লিফ সিনেমাও বানান, কাজেই তাঁর কিছু কিছু ভিডিওতে নানারকম কারিকুরি থাকে। দানিয়ুবের তীরের ভূতুড়ে উইলো গাছের বনের মধ্যে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা অ্যালগারনন ব্ল্যাকউডের বিখ্যাত গল্প ‘দ্য উইলোজ’, বিংশশতাব্দীর গা ছমছমে গল্পের ধারাকে যে নাকে দড়ি দিয়ে টেনে নিজের পিছু পিছু টেনে নিয়ে গেছে, সেই গল্পের রিভিউ ক্লিফ করেছেন বুদাপেস্ট শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া দানিয়ুবের তীরে বসে। তাছাড়া আমার এই সাড়ে পঁয়ত্রিশ বছরে পড়া টপ টেন বুকস-এর লিস্টের একটা বইয়ের খোঁজও ক্লিফের দেওয়া। সেটার কথা খুব শিগগিরি আপনাদের বলব। 

*****

এ ছাড়াও আরও অনেক বুকটিউবার আছেন যাঁদের আমি নিয়মিত চোখে চোখে রাখি। আপনারা যদি তাঁদের পরিচয় জানতে ইচ্ছুক হন তাহলে তাঁদের নিয়ে পরের কোনও পোস্টে আলোচনা করা যেতে পারে। আর আপনারা যদি বুকটিউবের দর্শক হন তাহলে আপনাদের প্রিয় বুকটিউবারদের বিষয়ে আমাকে জানাবেন, প্লিজ।  



July 09, 2016

সাপ্তাহিকী






"The mathematical order is beautiful precisely because it has no effect on the real world. Life isn't going to be easier, nor is anyone going to make a fortune, just because they know something about prime numbers. Of course, lots of mathematical discoveries have practical applications, no matter how esoteric they may seem. Research on ellipses made it possible to determine the orbits of the planets,and Einstein used non-Euclidean geometry to describe the form of the universe. Even prime numbers were used during the war to create codes--to cite a regrettable example. But those things aren't the goal of mathematics. The only goal is to discover the truth……Eternal truths are ultimately in visible,and you won't find them in material things or natural phenomena, or even in human emotions. Mathematics, however,can illuminate them,can give them expression--in fact, nothing can prevent it from doing so."
---Yōko Ogawa, The Housekeeper and the Professor (অনুবাদক Stephen Snyder)


শহর। শেষ একশো বছরে যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটল।

ঘুম পাওয়ানোর জন্য লোকে এতদিন কী না করেছে। ওষুধ খেয়েছে, প্রাণায়াম করেছে, সারাদিন পাগলের মতো পরিশ্রম করেছে। এ সবের থেকে অনেক সোজা উপায় হচ্ছে একজন ভয়ানক বোরিং লোককে কানের কাছে বসিয়ে রাখা।    

এই ক্লাবেও যদি হাসিই শেখানো হত, তবু এর চরিত্র লাফিং ক্লাবের থেকে অনেক আলাদা। 

বইয়ের ভেতর আমার মাকে গাছের পাতা রাখতে দেখেছি। কিছুদিন পর দারুণ আর্ট হয়ে যেত। আমি মায়ের মতো ক্রিয়েটিভ নই, আমি বুকমার্ক ছাড়া কিছু রাখি না। আপনি কী রাখেন? (লিংক পাঠিয়েছেন সায়ন।)

আমি অবশ্য স্মল টক পছন্দই করি। বিগ টকের থেকে এনি ডে নিরাপদ। কিন্তু আমার চেনা অনেকেই স্মল টক অপছন্দ করেন। তাঁদের জন্য এই লেখাটা রইল। 


এ সপ্তাহে গানের বদলে গানরসিক। 


July 08, 2016

বঙ্গ ভবন





স্টেট ক্যান্টিনে যাওয়ার খাতা যদি আবার খুলতেই হয় তাহলে চেনা স্টেট দিয়ে খোলাই ভালো, ভেবে আমরা রবিবার চলে গেলাম বঙ্গভবন। যদিও আমরা বঙ্গভবনের ক্যান্টিনে খাইনি, খেয়েছি ক্যান্টিনকে দু’ভাগ করে একভাগে বিজলি গ্রিলের যে রেস্টোর‍্যান্ট খুলেছে সেখানে। কাজেই এটাকে স্টেট ক্যান্টিন তালিকায় ঢোকানো যাবে কি না সে নিয়ে তর্ক চলতে পারে। 

এখন দিল্লির আবহাওয়া চমৎকার রকম ভালো যাচ্ছে। ভালো মানে রিষড়ার সঙ্গে তুলনা করলে অবশ্য হবে না, যেখানে ফোন করলে ওপার থেকে ব্যাঙের ডাক শোনা যায়। কিংবা বম্বের সঙ্গে তুলনা করলেও হবে না, যেখানে দুপুরে শ্যাম্পু করলে সন্ধ্যেতেও চুল পুরো শুকোয় না। কিন্তু দিল্লির তুলনা আমি রিষড়া বা বম্বের সঙ্গে করবই বা কেন? যে কোনও তুলনাই, এই সাড়ে পঁয়ত্রিশ বছরে পৌঁছে বুঝতে পারছি, আসলে হওয়া উচিত নিজের সঙ্গে। নিজের গতকালের সঙ্গে। একমাস আগের দিল্লির আবহাওয়া কেমন ছিল? ভয়াবহ। ড্রয়ারের মারি বিস্কুট/ ডাইজেস্টিভ ফুরিয়ে গেলেও, চায়ের সঙ্গে টা না থাকলেও, বেলা চারটেয় অফিস থেকে বেরিয়ে দোকানে যাওয়ার উপায় ছিল না। আমাদের বাড়ির সামনের বুলেভার্ডে সদ্য পুঁতে যাওয়া গাছগুলো ধুলোয় ধূসর হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। আর এখন দিল্লির আবহাওয়া কেমন? সারাদিনই মেঘ মেঘ, মাঝে মাঝে টুপটাপ, এসি বন্ধ করে পাঁচ মিনিট কেন, ঘণ্টাখানেকও বসে থাকা যায়। কাজেই দিল্লির আবহাওয়া এখন চমৎকার। 

অটো থেকে বঙ্গভবনের যে দরজাটার সামনে আমরা নামলাম সেখানে 'ভি আই পি এন্ট্রি ওনলি' বা ওই গোছের কিছু একটা লেখাই ছিল। তবু আমরা কেন যে ওদিক দিয়ে ঢুকতে গেলাম কে জানে। সিকিউরিটি ভাইসাব দৌড়ে এলেন। বললেন, “জনাব, ইধার সে নহি, উধার সে যাইয়ে।” 

এই রকম ভালো আবহাওয়ায় গাছপালা আকাশবাতাসের থেকেও যে জিনিসটায় তফাৎ সবথেকে বেশি চোখে পড়ে তা হল মানুষের মেজাজ। রাস্তাঘাটে ঝগড়াঝাঁটি কম হয়, হর্ন কম বাজে। আমরা যে ভি আই পি না হওয়া সত্ত্বেও ভি আই পি গেট দিয়ে ঢুকছি, খটখটে রোদে হলে এর প্রতিক্রিয়া অন্যরকম হতে পারত। ভাইসাবের ভুরু তো কুঁচকোতোই, আমাদের হ্যাটহ্যাট করে তাড়িয়ে হয়তো তিনি নিজের মনে বলতেন, “অন্ধা @#৳%”" কিন্তু এখন আকাশে মেঘ, বুলেভার্ডের গাছগুলো আবার লকলকিয়ে উঠেছে, ভাইসাবের খুপরি ঘরের বাতাস সওনা বাথের কথা মনে পড়াচ্ছে না। এখন তিনি দৌড়ে এসে বললেন, “জনাব, ইধার সে নহি, উধার সে যাইয়ে।”

আমরা তাঁকে টাটা করে পাশের গেট দিয়ে ঢুকলাম। ওটাই ঠিক গেট কি না সে নিয়ে একটু দোনোমোনো ছিল, কিন্তু ওখানের দায়িত্বরত ভাইসাব হাত নেড়ে ডাকলেন। বললেন, “আইয়ে আইয়ে, মচ্ছি ভাত খাকে যাইয়ে” তখন আর কোনও সন্দেহই রইল না। 

ঢোকারও আগে নাকে এল গন্ধ। পাড়ার বিয়েবাড়ির গন্ধ। ভালো ব্যবস্থাওয়ালা বিয়েবাড়ির কাছাকাছি গেলে, টিউবলাইটের আলো চোখে আসারও আগে, প্যান্ডেলের চুড়ো চোখে পড়বারও আগে, এই গন্ধটা আসে। মাংস, গরম ভাত, বেগুনভাজা মেলানোমেশানো একটা গন্ধ।

ক্যান্টিন ভর্তি ছিল। রেস্টোর‍্যান্টও মোটামুটি ভর্তি, যে টেবিলগুলো ফাঁকা তাতে 'রিজার্ভড' নোটিস সাঁটা। এক ভদ্রলোক তত্ত্বাবধান করছিলেন, তিনি আমাদের দেখে দয়া করে সে রকম একটা টেবিলের নোটিস সরিয়ে আমাদের বসতে দিলেন। আমরাও পত্রপাঠ অর্ডার দিয়ে দিলাম।

জোম্যাটো এসে যাওয়ার পর থেকে দোকানে গিয়ে মেনু দেখে খাবার বাছাবাছি করার ব্যাপারটা উঠেই গেছে। যে সব জায়গাইয় প্ল্যান করে যাওয়া হয়, সে সব জায়গায় গিয়ে কী খাব সেটাও প্ল্যান করাই থাকে।  আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় খাওয়ার থেকেও খাওয়ার প্ল্যানিংটা বেশি আনন্দের। বেড়াতে যাওয়া আর বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যানিং-এর মতো। শুক্রবার বাড়ি ফিরে শুয়ে শুয়ে বুকের ওপর ল্যাপটপ খুলে রাধাবল্লভী খাব না লুচি, সেইটা ভাবা, সত্যি সত্যি রাধাবল্লভী আর লুচি খাওয়ার মতোই কি তার থেকে একটু বেশিই ভালো। আমরা ঠিক করে এসেছিলাম যে শাক ডাল তরকারির ফেরে পড়ব না। ওসব বাড়িতে বানিয়ে খাওয়া যায়। আমরা এমন ফেরে পড়তে চাই যেগুলোতে বাড়িতে পড়া যায় না। বা পড়তে গেলে কষ্ট করতে হয়। সেই মতো আমরা খাওয়া শুরু করলাম মশলা কোক আর ফিশ (ভেটকি) ফ্রাই দিয়ে। মেন কোর্সে রাধাবল্লভী + আলুরদম কম্বো, আর লুচি + মাংস + রসগোল্লা কম্বো।  

কেমন লাগল বলার আগে দুচারটে কথা বলি। কিছুদিন আগে আমার একজন প্রিয় মানুষ আমাকে একটা কথা বলেছেন যেটা আমাকে ভাবিয়েছে। তিনি বলেছেন আমার ব্লগ পড়ে মনে হয় আমি যেখানে যেখানে খেতে যাই সব জায়গাই আমার দারুণ লাগে। এমন কোনও জায়গায় কি আমরা খাই না যেখানে খারাপ লাগে? আমি বললাম, "লাগে তো।" তিনি বললেন, "তখন কী কর?" আমি বললাম, "চেপে যাই।" (বইয়ের ক্ষেত্রেও একই নীতি আমার।  যেগুলোকে ভালো বলা যায় সেগুলোকে ভালো বলি, খারাপ লাগা বইগুলোকে জিহ্বার তল করে রেখে দিই।) তখন তিনি বললেন যে এতে করে আমার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগতে পারে। 

আঁতকে উঠলাম। ঠিক করলাম এবার থেকে হাততালি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যা যা খারাপ লাগবে সেগুলোও বলব। এই পোস্টে বঙ্গভবনের খাবারের দু’চারখানা নিন্দে শুনলে কেউ ভাবতে পারেন যে আমি কাঁকড়ার মতো আচরণ করছি, তাই ভেঙে এত কথা বললাম। বাঙালি দিয়ে শুরু করছি, কিন্তু এর পর থেকে গুজরাটি, মারাঠা, দ্রাবিড়, উৎকল, ইংরেজ, অ্যামেরিকান কাউকে ছেড়ে কথা বলব না। 

বাঙালি দোকানে খেতে যাওয়ার আকর্ষণ শুধু খাবারের নয়। আরও একটা সুবিধে আছে। দুঃখের বিষয়, সেটা বললে আমি যে কাঁকড়া, তা অপ্রমাণ করার আর কোনও জায়গা থাকবে না। তবু বলছি। যেহেতু ভাষাটা বোঝা যায়, তাই না চাইতেও আড়ি পাতা হয়েই যায়। আর দারুণ দারুণ সব কথোপকথন (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বক্তৃতা) কানে আসে।  যেমন অর্চিষ্মানের পেছনে বসা সত্তর দশকের সৌমিত্র মার্কা চশমা আঁটা ভদ্রলোকের কাসুন্দি প্রস্তুত প্রণালী নিয়ে বক্তৃতা। যেমন ইনফরমেটিভ তেমনি এন্টারটেইনিং। (আমি অর্চিষ্মানের সঙ্গে বাজি ধরতে রাজি ছিলাম কাসুন্দি তো দূরের কথা, উনি লাইফে এক পিস বেগুনও ভাজেননি। অর্চিষ্মান রাজি হল না। তখন আমি বললাম আচ্ছা এইটা নিয়ে বাজি ধরা যাক যে যদি উনি আদৌ বেগুন না ভেজে থাকেন তবু বেগুন ভাজা নিয়ে বলতে বললে পাঁচ মিনিট না থেমে বলতে পারবেন। অর্চিষ্মান এতে আমার সঙ্গে সহমত হল কাজেই আর বাজি ধরতে হল না।) একটাই সান্ত্বনা যে আমাদের নিয়েও সবাই কথা বলে। এই সেদিনও তার প্রমাণ পেলাম। কোণের টেবিলের একদলকে কিছুক্ষণ ধরে জরিপ করে অর্চিষ্মানকে তাদের নামে কীসব যেন বলছি, এমন সময় হঠাৎ চোখ পড়ে যাওয়াতে দেখলাম ওই টেবিল থেকেও একজোড়া চোখ আমাকে দেখছে। আমার চোখে চোখ পড়া মাত্র চোখজোড়া সরে গেল, ঘাড়টা ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে সঙ্গীর দিকে একটু ঝুঁকে পড়ল আর ঠোঁটদুটো নড়তে লাগল। কাঁকড়া কাঁকড়া কাটাকাটি, আমার বিবেক আবার তকতকে। 


মাছভাজা এল। তপ্ত। ফ্লেকি। দামের দুঃখ ভুলিয়ে দেওয়া। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই সুখের প্রতি আমরা বেশিক্ষণ মনঃসংযোগ করতে পারলাম না। তার কারণ মাছভাজার প্লেটের দক্ষিণ পশ্চিম কোণের সাদা বাটিটার ভেতরের ওই হলুদ রঙের পদার্থটা। 

কাসুন্দি আমি অনেক খেয়েছি। নিয়মিত খাই। কাসুন্দি আমার ফেভারিট টাকনা। বিলিতি মেয়ো, কেচাপ,  দিশি আচার, চাটনি, আরও যা যা হয়, সবের থেকে আমি কাসুন্দি বেশি পছন্দ করি। হোমমেড বিশুদ্ধ কাসুন্দি খেয়েছি, বোতলে পোরা জোলো কাসুন্দি খেয়েছি, চেনা ব্র্যান্ডের কাসুন্দি খেয়েছি, অচেনা ব্র্যান্ডের কাসুন্দি খেয়েছি। কিন্তু বলতেই হবে, দিল্লির বঙ্গভবনের বিজলি গ্রিলের কাসুন্দির মতো কাসুন্দি আমি কোত্থাও খাইনি। চেহারা দেখে বাকি সব কাসুন্দির মতোই লাগল, তাই আমি দু’চামচ ভরে ভরে কাসুন্দি তুলে থালার পাশে নিলাম। অর্চিষ্মান কাসুন্দির পাশে কেচাপও নিল দেখে মুচকি হাসলাম। এইবার বাগবাজার দেখবে বরিশালের খেল। তারপর মাছভাজার ছোট একটা টুকরো কাঁটায় গেঁথে, সেটাকে এপাশ ওপাশ বেশ করে কাসুন্দিতে চুবিয়ে মুখে পুরলাম। মুখে তোলার পথে টুকরো থেকে এক ফোঁটা কাসুন্দি টুপ করে থালার ওপর পড়ল।

তারপর যেটা হল সেটা বাড়িতে হলে আমি হাতের কাঁটা ছুঁড়ে ফেলে, "মাগো, মেরে ফেলল গো" চিৎকার করতে করতে বাথরুমে গিয়ে কল খুলে তার তলায় মাথা পেতে দিতাম নির্ঘাত, কিন্তু এটা রেস্টোর‍্যান্ট। আমি আস্তে করে কাঁটাটা নামিয়ে রাখলাম। দু’হাত তুলে মাথা চেপে ধরে চোখ বুজলাম। আগুনের মতো ঝাঁজ আমার জিভ, গলা, ঘাড়, মাথার পেছন বেয়ে ব্রহ্মতালুতে পৌঁছল। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমার মাথার ভেতরের নিউরনগুলো ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো পটপট করে ফুটছে। 

অর্চিষ্মান বলল আমার চোখগুলো নাকি কাপালিকের মতো আর নাকখানা নাকি টমেটোর মতো লাল হয়ে গিয়েছিল। ততক্ষণে কেচাপের সঙ্গে মিশিয়ে একটুখানি কাসুন্দি অর্চিষ্মানও মুখে দিয়েছে। ও টেবিলের ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে আমার হাতদুটো ধরে বলল, “আর খেয়ো না কুন্তলা, প্লিজ। তোমার কিচ্ছু প্রমাণ করার দরকার নেই।” 

এর পরেও অল্প অল্প কাসুন্দি খাইনি যে তা নয়, কিন্তু অল্প মানে অল্পই। আমাদের করা হয়নি, আপনারা যদি কেউ বিজলি গ্রিলে খেতে যান আর মাছভাজা অর্ডার করেন, তাহলে জিজ্ঞাসা করবেন তো ওঁরা কোথা থেকে কাসুন্দি আনান। তারপর আমি আপনার থেকে জেনে নেব। 

তারপর প্ল্যান মতো এল রাধাবল্লভী + আলুরদম আর লুচি + মাংস + রসগোল্লা। অত বড় রাধাবল্লভী আমি আগে দেখিনি। অর্ধেক খেতে না খেতেই পেট ভর্তি। সদ্য ভাজা, গরম, নরম। আলুরদম তো খারাপ খেতে হওয়ার কোনও কারণ নেই। হয়ওনি, বরং খুবই ভালো হয়েছিল। লুচিও লুচির মতোই খেতে, এক প্লেটে ছ’পিস। পাঁঠার মাংসও ভালো, তবে এর থেকে নরম করা যেত। আর মাংসে আলু নেই, সেটার জন্য আমি নম্বর কাটলাম। 


এক প্লেট লুচি + মাংস + রসগোল্লার কম্বোতে যে একটা রসগোল্লাই আসবে, সেটা আমাদের মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা একটা দই নিলাম। দুটোই হাফ-হাফ করে খাওয়া হল। 

রসগোল্লাটা তুলোর মতো নরম, অল্প মিষ্টি। একশোয় একশো। মিষ্টি দইয়ের নম্বর নিয়ে আমার আর অর্চিষ্মানের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে। আমি বলেছি রসরাজের থেকে ভালো (রসরাজ হচ্ছে আমাদের পাড়ার মিষ্টির দোকান, কাজেই আপাতত পৃথিবীর সব বাঙালি মিষ্টির বেঞ্চমার্ক) অর্চিষ্মান বলেছে রসরাজের মতোই।

তারপর মৌরি, চিনি, বিল, কার্ড। তার পর আমাদের নেহরু প্ল্যানেটোরিয়ামে গিয়ে সাড়ে তিনটের শো দেখার প্ল্যান ছিল, কিন্তু অটো ডেকে প্ল্যানেটোরিয়ামে যেতে যেতে, লাইনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে, মিহি গলায় “পাপা পাপা, মুন দিখায়েগা কেয়া?” শুনতে শুনতে, কাউন্টারের সামনে পৌঁছতে পৌঁছতে টিকিট ফুরিয়ে গেল। কাজেই সেই গল্পটা আজ বলা যাচ্ছে না, পরে কোনও দিন হবে।

*****

প্ল্যানেটোরিয়াম যাওয়ার পথে অটো থেকে কয়েকটা ফোটো তুলেছিলাম। সেগুলো দেখাই আপনাদের। আমাদের প্রোজেক্টে যাঁরা টাকা ঢালেন (অর্থাৎ ঘুরিয়ে আমাদের মাইনে দেন) তাঁরা এইসব রাস্তাঘাট দেখে হতাশ হয়ে বলেন, “বাট দিস ইজ নট রিয়েল ইন্ডিয়া!” আমরা তখন তাঁদের চাঁদনি চকে পাঠিয়ে দিই। সেখানে ভিড়ের ধাক্কা আর গরুর গুঁতো খেয়ে ভীষণ খুশি হয়ে দেশে ফিরে গিয়ে তাঁরা পরের প্রোজেক্টটা পাস করে দেন।



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.