September 29, 2016

রানী ২/২




মূল গল্পঃ The Queen of the Mystery
লেখকঃ Ann Cleeves



*****

খাতার ওপর ঝুঁকে পড়ে লিখলে আমার ডানহাতের কনুইটা যেখানে ছুঁয়ে থাকে, এই টেবিলটার ঠিক সেই জায়গাটাতে একটা ছোপ। চেয়ারটাও আমার মাপে মাপে ফিট করে গেছে। কাজেই এগুলো আমারই। কিন্তু লেখার ঘরের বাইরে ধু ধু মাঠের মধ্যে এগুলোকে আনল কে? আমি তো আনিনি। সুষমা? নাকি রঞ্জন? রঞ্জন আমার পাশেই একটা খাটে শুয়ে আছে। খাটটা অবশ্য আমাদের না। কয়েকটা কাঠের তক্তা জুড়ে জুড়ে বানানো একটা সরু লিকপিকে ব্যাপার। পালিশটালিশ কিছু নেই। এদিকে চার পায়ায় বাঁধা রজনীগন্ধার ডাঁটি, ধূপ থেকে জুঁইয়ের গন্ধ সাদা সুতোর মতো পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে। ধপধপে সাদা চাদর গলা পর্যন্ত মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে রঞ্জন। ভীষণ রোগা লাগছে ওকে। গালদুটো ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে। ভুরুর হাড়দুটো উঁচু। নাকটা ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। রঞ্জন ঘুমোচ্ছে কিনা বুঝতে পারছি না। দু’চোখের ওপর দুটো তুলসি পাতা ঢাকা দেওয়া। আচমকা একটা জোর হাওয়া শুরু হল। টেবিলের ওপর রাখা কাগজের তাড়া এলোমেলো। মাঠের মাঝখানে লিখতে বসেছি অথচ পেপারওয়েট আনিনি? পাতা উড়ে উড়ে ছত্রাকার হয়ে যাচ্ছে সারা মাঠ। আমার এত যত্ন করে তৈরি আউটলাইন লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে, আমি অসহায়ের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। হাওয়ায় তুলসি পাতার ঢাকনি উড়ে গেছে, কিন্তু রঞ্জনের চোখ কোথায়? চোখের জায়গায় দুটো গর্ত, নাকের জায়গায় দুটো গর্ত, যেখানে ঠোঁট থাকার কথা সেখানটাতেও একটা গর্ত ফুটে উঠছে। গর্তটা ক্রমে গুহার মত বড় হয়ে উঠছে, হাওয়ার দাপটে সব শব্দ ভেসে যাচ্ছে, অনেক কষ্টে কান পেতে শুনছি, গুহার ভেতর থেকে একটা গম্ভীর যান্ত্রিক শব্দ বলে চলেছে, যে সেরা সে জিতবে, যে জিতবে সে সেরা।  

শেষরাতে মোটে ঘণ্টাদুয়েকের ঘুম, তাও দুঃস্বপ্নে ভর্তি, ছেঁড়া ছেঁড়া। সকাল ন’টা থেকে প্রশ্নোত্তর পর্ব। একটুও ইচ্ছে ছিল না যাওয়ার, কিন্তু গোটা ইভেন্টের এই একটামাত্র পর্বেই পাঠকপাঠিকার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ, কাজেই যাওয়াটা জরুরি। ঘুরিয়েফিরিয়ে সেই একই প্রশ্ন বছর বছর। আইডিয়া কোত্থেকে পান, মধুমাধবী আপনার নিজের ছায়ায় গড়া কি না, নতুন লেখকদের প্রতি আপনার টিপস। উত্তরে বছর বছর ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা বলা। কারণ সত্যিগুলো, বেশিরভাগ সত্যির মতোই, স্বীকার করা যায় না। আইডিয়া পাই অন্যের লেখা থেকে। আইডিয়া মানে আইডিয়ার বীজ। লোকাল ট্রেন থেকে শোনা সংলাপের সুতো ধরে গল্প লিখলে যদি চুরি না হয় তা হলে বইয়ের পাতায় পড়া সংলাপ বা পরিস্থিতি নিয়ে গল্প লেখা চুরি নয়। তাছাড়া গল্প প্লটে থাকে না, থাকে বলার মুনশিয়ানায়। মধুমাধবী যে আমি, এ বিশ্বাসটা গোড়া থেকেই ছিল। কোনও একটা গল্পে মধুমাধবীর বেগুনি রঙের প্রতি পক্ষপাত প্রকাশ হয়ে পড়ার পর থেকে পুজোতে আমার গোটা তিনেক বেগুনি শাড়ি বাঁধা। প্রথমটা অপমানজনক লাগত, মেয়েরা লিখলেই সেটা আত্মজৈবনিক হতে হবে কেন এ নিয়ে  ছায়ার সঙ্গে অনেক লড়াই লড়তাম মাথার মধ্যে, তারপর দেখলাম বিশ্বাসটা অ্যাকচুয়ালি আমার পক্ষে সুবিধের। লোকে মধুমাধবীকে অনেক চট করে ‘রিয়েল’ ভেবে নিতে পারে। তাছাড়া মধুমাধবীর কৃতিত্ব যে আমার নয়, যজ্ঞের আগুন থেকে বেরোনো সালংকারা দ্রৌপদীর মতো নিজের পছন্দঅপছন্দ, আচারবিচার, ধ্যানধারণা সমেত স্বয়ংসম্পূর্ণ সে ইউক্যালিপটাসের বনে আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল স্বীকার করে নিলে লেখক হিসেবে আমার গৌরব কিছু বাড়বে না। আর নতুন লেখকদের প্রতি আমার টিপস? বিশ্বাসী হলে তাগাতাবিজ ধারণ, মন্দিরে মাথা ঠোকা, আর আমার মতো অবিশ্বাসীদের জন্য কোন টিপস কাজে লাগবে আমার জানা নেই।  

এগারোটা নাগাদ ছুটি মিলল। ঘরে গিয়ে ঘুমোনোই উচিত ছিল হয়তো, কিন্তু জেগে থাকার জরুরি একটা কারণ আছে। সেটা হোটেলের সামনের রাস্তা পেরিয়ে বাঁ দিকে খানিকটা হেঁটে গিয়ে তিননম্বর গলি দিয়ে ঢুকে আরও হাফ কিলোমিটার মতো গিয়ে। 

একটা বইয়ের দোকান। গত পঁচিশ বছরে আমরা অনেককে দোকানটার ডিরেকশন দেওয়ার চেষ্টা করেছি, হাতে গোনা ক’জন ছাড়া কেউ খুঁজে পায়নি। এখন আমার বিশ্বাস হয়েছে যে দোকানটা দেখতে পাওয়া না পাওয়া আসলে অন্যের হাতে নেই। দোকানটা যাদের পছন্দ করে তাদের দেখা দেয়। আমাকে আর রঞ্জনকে খুবই পছন্দ করত দোকানটা বলতে হবে। গত পঁচিশ বছরে আমরা যতবার ওকে দেখতে চেয়েছি, পেয়েছি। 

আমরা দোকানটাকে খুঁজে পেয়েছিলাম নিজেরাই। তখন ব্যোমকেশ হোটেলের বদলে এই পাড়ারই একটা বাড়িতে হত। কর্মকর্তাদের কারও বাড়ি নিশ্চয়। পুরোনো আমলের কড়িকাঠ আর কুলুঙ্গিওয়ালা প্রকাণ্ড বৈঠকখানায় বাংলা সাহিত্যের নক্ষত্ররা যে যাঁর অনুরাগীসমেত দিব্যি এঁটে যেতেন। সে আমলেও প্রশ্নোত্তর পর্বের ব্যাপার ছিল। আমি তখন ছিলাম প্রশ্ন করিয়েদের দলে। আজ প্রশ্ন করতে আসা ছেলেমেয়েদের যা উদ্দেশ্য আমার উদ্দেশ্যও তা-ই থাকত। নিজেকে এই জগৎটাকে সঙ্গে পরিচিত করানো। এই জগৎটাকে নিজের সঙ্গে পরিচিত করানো। সে সব দায়িত্বকর্তব্য ফুরোলে আমরা কলকাতা ঘুরতে বেরোতাম। ঘুগনি, আলুকাবলি, ফুচকা খেতাম। ঘুরতে ঘুরতেই একদিন আচমকা চোখে পড়েছিল। দু’পাশের বড় বড় পুরোনো বাড়ির মাঝখানে প্রায় চেপ্টে যাওয়া, ফুটপাথের বড় বড় দেবদারুর আড়ালে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া একটা ছোট্ট দোকান। সবুজ কাঠের দরজার গায়ে কাচের আরশির ওপাশে অন্ধকারে কী আছে কিছুই বুঝতে পারিনি প্রথমে। যতক্ষণ না মাথার ওপর প্রায় মুছে যাওয়া, সামনে ঝুঁকে পড়া পেঁচানো ইংরিজি অক্ষরে লেখাটা ঠাহর হয়েছিল। ‘দ্য পয়জন পেন”। 

গলির ভেতর ঢুকে বড় রাস্তার কোলাহল এমনিই লবেজান হয়ে পড়ে, বাকিটুকু পয়জন পেন-এর উঁচু সিলিংছোঁয়া কালো কাঠের শেলফগুলো শুষে নেয়। মানুষের মনের অন্ধকার দিক নিয়ে যা যা গল্প ফাঁদা হয়েছে পৃথিবীর যেখানে যেখানে সব যেন জোগাড় করে রাখা হয়েছে দোকানটায়। গোয়েন্দা, ভূত, থ্রিলার। প্রাচীন চিনা রহস্য/অতিলৌকিক সাহিত্যের অনুবাদ থেকে শুরু করে আধুনিক নর্ডিক নোয়ার, প্রিয়নাথ মুখার্জি থেকে শুরু করে শর্মিষ্ঠা গুপ্ত। বছর সাতেক আগে আইডিয়ার একটা বাড়াবাড়ি রকম খরার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে, এই দোকানে পাওয়া একটা আফ্রিকান উপজাতির লোককথা সংকলন থেকে একটা গল্প ধার নিয়েছিলাম। প্লট অবিকল এক, খালি কুইডাডুর বদলে কোচবিহার, শিকারি উপজাতির ভস্মমাখা সদস্যদের বদলে বর্ধিষ্ণু পরিবারের শ্বশুরশাশুড়ি ছেলে বউ উচ্ছন্নে যাওয়া নাতি। পাবলিশ হওয়ার পর বেশ কিছুদিন দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যেত। প্রকাশকের দপ্তরে চিঠির পর চিঠি আসছে, তাতে রক্ত দিয়ে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা ‘অনসূয়া মিত্র চোর’। 

কিছুই হয়নি। পরের বছর শারদীয়ার জন্য তিন সপ্তাহে লিখে দেওয়া আমার একটা বড় গল্পের বিরুদ্ধে গোটা কয়েক চুরির অভিযোগ সম্পাদকের কাছে জমা পড়েছিল। ওই গল্পের জন্য চুরি করতে হলে লেখা ছেড়ে দেওয়া উচিত। 

দরজা ঠেলে ভেতরে পা দেওয়ার কয়েক সেকেন্ড পর থেকে ধীরে ধীরে দৃশ্যটা ফুটে উঠতে শুরু করে। মাটি থেকে সিলিং পর্যন্ত, ডানদিক থেকে বাঁদিক পর্যন্ত, দৃষ্টি জুড়ে, দৃষ্টি পেরিয়ে, ছত্রাকার বই। চলতে চলতে পায়ে ঠোক্কর দেওয়া বই, শেলফ থেকে সারি ভেঙে এগিয়ে এসে চুলে কোণা আটকে দেওয়া বই, অসামান্য অনাদরে ঠাসাঠাসি গাদাগাদি করে রাখা বই। শুরুতে একটা নিয়ম মানার চেষ্টা হয়েছিল বোঝা যায়। এদিকে ইংরিজি, ওদিকে বাংলা। বাঁ থেকে ডানে প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক যুগ। কিন্তু সেটা পরে মেন্টেন করা হয়নি। অমনোযোগী খদ্দের বা পাঠকের হাতে এ শেলফের বই ও শেলফে চলে গেছে। মেঝেতে নেমে এসেছে। দোকানের পেছনদিকে শেলফের আড়ালে ছোট একটা জায়গা খালি করে বসার জায়গার ব্যবস্থা - গোটা দুই পিঠ উঁচু মান্ধাতা আমলের চেয়ার, ফুলের ছাপওয়ালা ঢাকনা দেওয়া আপহোলস্টরি থেকে ভকভক করে ন্যাপথলিনের গন্ধ বেরোয়, কিন্তু বসলে অদ্ভুত আরাম - সেখানে প্রচুর বই ডাঁই হয়ে রয়েছে। 

শেলফগুলোর গা ঘেঁষে, বইগুলোর গায়ে আলতো হাত বুলোতে বুলোতে ধীরে ধীরে আমি হাঁটতে থাকলাম। আবার কবে এদের দেখব জানি না। কালি, পাতা, অক্ষর, গল্প মিলেমিশে অনেকদিন পর খুঁজে পাওয়া ভ্যানিলার বোতল খোলার মতো হালকা, উষ্ণ একটা গন্ধ। বুক ভরে নিজের ভাগের গন্ধটা নিলাম। রঞ্জনের ভাগেরটাও। শেলফের সারি শেষ হয়ে বসার জায়গাটা চোখের ওপর ফুটে উঠল। দুটো চেয়ারের একটা অলরেডি দখল। কেদারায় শরীর সম্পূর্ণ ন্যস্ত করে বসে আছে পাঠক। আরাম আর মনোযোগের প্রতিচ্ছবি। হাতলে কনুই, তেলোয় গাল। এক হাঁটুর ওপর তুলে রাখা অন্য হাঁটুর গা বেয়ে এলিয়ে নেমেছে হ্যান্ডলুমের শাড়ি। সবুজ জমির ওপর সরু গেরুয়া পাড়ের আড়াল থেকে উঁকি মারছে পায়ের আঙুল। কোলের ওপর বই খোলা। এক হাতে বইটা আলতো করে ধরা, তাতে ব্যাককভারের সবুজ রঙের একটুখানি দেখা যাচ্ছে। আমাদের উত্তরের ব্যালকনিটার ওপারের সবুজটা ঠিক এই শেডের। মলাটটা আরেকটু তুলে ধরলে দেখা যাবে একটা কাঠের রেলিং-এ একটা কনুই। কনুই বেয়ে ইঞ্চি চারেক ওপরে উঠলেই আমার মুখ। আমাকে ব্যালকনিতে দাঁড় করিয়ে ছবিটা তুলেছিল সমকাল-এর প্রতীক দাস। 

প্রশ্নোত্তর থেকে পালিয়ে, কেয়ার থেকে পালিয়ে, সবার থেকে পালিয়ে, পৃথিবীর এই অজ্ঞাত কোণে বসে মধুমাধবীর গল্পে ডুবে গেছে শর্মিষ্ঠা গুপ্ত। 


*****


ড্রেসিংটেবিলটা ঘরের একটা বিতিকিচ্ছিরি জায়গায়। জানালার মুখোমুখি। পর্দার ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের আলো এসে আয়নায় ঠিকরোচ্ছে। মুখ দেখতে পাচ্ছি না। পর্দা টেনে দিতে পারি। আয়নার ওপর একটা আলো আছে, যেটা আমার মুখে পড়ার কথা, সেটা যথেষ্ট জোরালো নয়। বাথরুমের আয়নায় সাজা যায়। কিন্তু তাহলে দাঁড়িয়ে সাজতে হবে। আজকাল অতক্ষণ টানা দাঁড়াতে কষ্ট হয়। 

রঞ্জন থাকলে তাড়া দিত। বলত, হল তোমার যুদ্ধসাজ? যেন যুদ্ধটা আমি সেধে করছি, না করলেও চলে। যেটা ও কোনওদিন বোঝেনি, কেউই বোঝে না, রানী হওয়াটাই একটা আজীবনের যুদ্ধ। সিংহাসনে আরোহণ করার পর সেই যে শুরু হয়, আর থামে না। আর কয়েকঘণ্টা পর যখন আমি আবার রানীর মুকুট পরার জন্য স্টেজের দিকে হাঁটতে শুরু করব সে হাঁটাটা শুরু হয়েছে আসলে তিরিশ কিংবা তারও বেশি বছর আগে থেকে, প্রথমবার যখন গল্প এসে আমার মগজের জানালায় ছায়া ফেলে দাঁড়িয়েছিল। এই তিরিশ বছর ধরে ছায়া বদলেছে, কিন্তু যুদ্ধটা রয়ে গেছে এক। সেই ছায়াকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করা, তার হাড় শক্ত কি না, মজ্জা টাটকা কি না, একটা গোটা প্লটের, চরিত্রদের, চরিত্রদের টানাপোড়েনের ভার, শেষ পরিচ্ছেদের চমক এবং মোড়ে মোড়ে কোণে কোণে ক্লু লুকিয়ে রাখার যোগ্যতা তার আছে কি না। সে সব শেষ হলে তার ওপর অভেদ্য দুর্গের মতো প্লট বোনা, প্রকাশকের তাগাদা সামলে, তারপর নির্বোধ নিন্দুককে অগ্রাহ্য করা, ফিল্মের লোকজনদের ঝাড়াইবাছাই, গল্প বিক্রি, রয়্যালটির খেয়াল রাখা, রয়্যালটির খেয়াল যে রাখে তার খেয়াল রাখা, এবং এই সব কিছুর মধ্যে মধ্যে কান খাড়া চোখ টান রাখা কখন আবার একটা ছায়া এসে খাতার ওপর উঁকি মারে। এ যুদ্ধ ছাড়া আর কী?

এই যে আমি এখন আয়নার সামনে বসে রং মাখব, সেটাও যুদ্ধের একটা অঙ্গ। আলোর অপ্রতুলতা, হাঁটুর ব্যথা এ সব বিঘ্নের বিরুদ্ধে আমার একমাত্র অস্ত্র সময়। তা আমি অনেক নিয়ে বসেছি। যাতে তুলির টান প্রথমবার বেঁকে গেলে সেটা মুছে আবার টানা যায়, ভুল হয়ে গেলে মুছে আবার, আবার আবার আবার, যতক্ষণ না তা আমার সংজ্ঞায় নিখুঁত হচ্ছে। যত্ন করে ভুরু আঁকলাম। বিজয়ী হিসেবে আমার নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন আমি তাদের উত্থিত করব যাতে আমার কপট বিস্ময় নিখুঁত ফোটে। ঠোঁটের খাঁজে খাঁজে গাঢ় রং দিয়ে ভরাট করলাম। পুরস্কার নেওয়ার আগে এবং পরে যখন আমি ঘুরে ঘুরে, হেসে হেসে নেটওয়ার্কিং করব, অটোগ্রাফ বিলোব, ব্যাংকোয়েট হলের আলোর চড়া ওয়াটের সঙ্গে যাতে আমার হাসি পাল্লা দিতে পারে। 

সবথেকে বেশি সময় দিলাম চোখে। মহার্ঘ রঙে রাতের ঘুমহীনতার চিহ্ন মুছে দিলাম। আমার চোখ দেখে কেউ যেন আঁচ না পায় একমুহূর্তের জন্যও আমি হারার সম্ভাবনাকে চিন্তায় স্থান দিয়েছি, একমুহূর্তের জন্যও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আমার মনে কোনও দ্বিধা ঠাঁই পেয়েছে। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রানী হিসেবে অন্য কারও নাম উচ্চারণ করার স্পর্ধা যেন কারও না হয়। 

ফোন এল। ওরা রেডি। আমি উঠে দাঁড়ালাম। জিজ্ঞাসা করলাম, কে জিতবে? রঞ্জন নিজের দশ আঙুল আমার দশ আঙুলে শক্ত করে জড়ালো। শান্ত, দীঘল, মায়াবী, উজ্জ্বল চোখদুটো আমার দু’চোখে ঢেলে দিয়ে বলল, তুমি। কারণ তুমি সেরা।  

ফোন এল। ওরা রেডি। আমি উঠে দাঁড়ালাম। জিজ্ঞাসা করলাম, কে জিতবে? ফাঁকা ঘরের আনাচেকানাচে ঠোক্কর খেয়ে প্রশ্ন ফিরে এল আয়নার ওপারের লোকটার  কাছে। আমি অপেক্ষা করলাম। সে আমার দিকে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল রং করা চোখ মেলে তাকিয়ে রইল।


*****


হয়তো আসবে না। কিন্তু যদি পরে কোনওদিন এ সন্ধ্যের স্মৃতিচারণ করার সুযোগ আসে তাহলে আমার মনে পড়বে শুধু একটা বিরাট ঘোলাটে কুয়াশার তাল। ফুল আর পারফিউমের গন্ধে ভারি, ভেজা, স্যাঁতসেঁতে। তার মধ্যে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি। কানের কাছে কতগুলো দুর্বোধ্য শব্দ ঘাই মেরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ফ্যান, পুরস্কার, ভোট, শর্মিষ্ঠা গুপ্ত, কোজি মিস্ট্রি, ইয়ং ব্লাড, নতুন মুখ। কুয়াশার মধ্যে ভেসে উঠছে কতগুলো অশরীরী মুখ, ধড়, মুণ্ডু, বাড়ানো হাতে ধরা অটোগ্রাফের খাতা। আমি সই দিচ্ছি, হাসছি, ঘুরছি, ঘাড় নাড়ছি। সবটাই নিখুঁত অভ্যেসে। 

অবশেষে কথাবার্তা ফুরোলো, সৌজন্যবিনিময় থামল। এখন সবাই যে যার নির্দিষ্ট স্থানে এসে বসেছে। হল জুড়ে টেবিল, টেবিল ঘিরে আধখানা চাঁদের মতো চেয়ার। সাদা কভারে তাদের পায়া ঢাকা। সকলের নিজস্ব গুরুত্ব অনুসারে টেবিল আছে। পেছন দিকের টেবিলে কোনও উপায়ে পাস জোগাড় করা সাধারণ দর্শক। তারপর প্রকাশক, সমালোচক, প্রযোজক, অভিনেতা, অভিনেত্রী। তারপর মনোনীত বিভাগের লেখক। অনুবাদক, প্রতিবেদক, সিরিয়াল লেখক, নাট্যকার, ছোটগল্পকার। আর একেবারে সামনের টেবিলের অধিকারী সাহিত্যের মাথার মণি, উপন্যাস। টেবিল ঘিরে আমি। আমার পাশে শর্মিষ্ঠা, সৌরীশ, অনুপমা চাকি আর মৌসুমী পাল। 

আলো মৃদু হয়ে এল। গুনগুন স্তিমিত হয়ে এল। চোখের সামনে মঞ্চ এখন উদ্ভাসিত। ব্যাকড্রপে হাই রেজলিউশন রক্তাক্ত ছোরাখানা জ্বলজ্বল করছে।

সামান্য উত্তেজনা স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। সেটা না থাকলে বুঝতে হবে বিষয়টা সম্পর্কে সিরিয়াসনেসের অভাব আছে। কিন্তু আমার এখন যেটা হচ্ছে সেটা প্যানিক। বুকের ভেতরটা ফাঁকা, শ্বাস নিতে কষ্ট। রঞ্জন, রঞ্জন, রঞ্জন। কোথায় তুমি। একমনে আমার জমে বরফ হয়ে যাওয়া হাতের তেলোয় আমি ওর হাতের তেলো কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম। কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম আমার কাঁপতে থাকা শরীর ঘিরে ওর চির আশ্বাসদায়ী উপস্থিতি বেড় দিয়ে আছে। বার বার মনঃসংযোগ টলে যেতে লাগল।

একে একে সব পুরস্কার শেষ। মঞ্চে উঠে এল কেয়া, টালিগঞ্জের জনপ্রিয় অভিনেত্রী - মধুমাধবীর আগের সিনেমাটায় ও নামভূমিকায় ছিল, আর সুটবুট পরা এক বেঁটেমোটা ভদ্রলোক। হলের দেওয়াল ছয়লাপ হয়ে থাকা ক্রিম আর চুলের কলপের কোম্পানির অধীশ্বর। কেয়ার হাতে নমিনেশনের তালিকা। এ বছরের সেরা রহস্য উপন্যাসের দৌড়ে পাঁচটি উপন্যাস। সৌরীশ রায়চৌধুরীর কর্ণসুবর্ণ, মৌসুমী পালের অতলের তলে, অনুপমা চাকির নিতাই গুহ যেদিন মারা গেলেন, অনসূয়া মিত্রের সপ্তম স্বর্গ আর শর্মিষ্ঠা গুপ্তর বিকেলের আলো। শেষ বইটা এখন পড়ে আছে এই হোটেলের সাতশো ছত্রিশ নম্বর রুমের, আমার রুমের, বিছানার পাশের টেবিলে। প্রতিদ্বন্দ্বীর শক্তি না মেপে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হওয়া কাঁচা যোদ্ধার লক্ষণ। বইটা ব্যাগেই ছিল। অবশেষে ভয় জয় করে কাল রাতে পড়তে শুরু করেছিলাম। তিনশো সাতাশ পাতার বই। আমি জানতাম সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বেশি সময় লাগবে না। বড়জোর একশো পাতা। 

অতদূর অপেক্ষা করতে হয়নি। খানতিরিশ পাতা পড়েই চোখ খুলে গিয়েছিল, তিনশো সাতাশ নম্বর শেষ করে যখন বইটা মুড়ে রাখলাম তখন সমস্ত সন্দেহ অন্তর্হিত হয়েছে। 

আমি বিশ্বাস করি, অ্যাকচুয়ালি, আমি জানি, লেখা শেখা যায়। গলায় সুর না নিয়ে জন্মালে গান করা যায় না, মাথা নিয়ে না জন্মালে অংক কষা যায় না, কিন্তু অক্ষরজ্ঞান থাকলে, যা সকলেরই থাকে, লেখা শেখা যায়। আমি নিজে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। আমি নিজে নিজে লিখতে শিখেছি। অক্লান্ত পরিশ্রমে তাকে নিখুঁত করেছি। 

একই সঙ্গে আমি এও জানি, শেখা লেখা দিয়ে শুধুমাত্র একটা উচ্চতা পর্যন্ত যাওয়া যায়। খারাপ লেখা অভ্যেসে ভালো হয়। ভালো লেখা অভ্যেসে মহৎ হয় না। সে’রকম লেখা কেউ কেউ লিখতে পারে। এবং তাদের লেখা পড়েই বলে দেওয়া যায়, তারা লেখা শেখেনি। শিখেই জন্মেছে। 

শর্মিষ্ঠা গুপ্ত সেই সব লেখকদের একজন। 

শুধু লেখা নয়, মহৎ লেখা লিখতে গেলে দৃষ্টিও লাগে। কাটোয়ার বি এড পড়া মেয়েদের হোস্টেলের প্রেক্ষাপটে মানুষের গভীর গোপন কামনাবাসনা, লোভ, পাপ, ঈর্ষা, যৌনতা যে দৃষ্টি দিয়ে ছেনে গল্প লিখেছে এই সাতাশ বছরের মেয়ে, আরও তিরিশ বছর লিখলেও আমি সে দৃষ্টি অর্জন করতে পারব না।  


*****


কেয়ার হাতে একটা খাম। বাঁ হাতে তুলে ধরে ডান হাতের এক টানে মুখটা ছিঁড়ে ফেলল কেয়া। 

আমার কানের পাশ দিয়ে শোঁ শোঁ করে হাওয়া বইছে। সেন্টের বদলে সে হাওয়ায় সমুদ্রের নোনা গন্ধ। আমার খালি পায়ের তলায় শ্যাওলাপড়া এবড়োখেবড়ো পাথর। পাথরের দেওয়ালের গায়ে, যে দেওয়ালের কিনারে আমি দাঁড়িয়ে আছি, অনেক নিচে ধাক্কা মারছে সাদা ফেনা। যা কিছু আন্দোলন সব ওই দেওয়ালের কাছটুকুতে, বাকি আদিগন্ত জুড়ে গাঢ় নীল শান্তি।

অ্যান্ড দ্য উইনার ইজ… 

আমি দু’পা এগিয়ে গিয়ে দু’হাত মেলে দিলাম। আমার পায়ের তলায় আর পাথর নেই। এখন আমার সারা শরীরটা মুড়ে রেখেছে লবণাক্ত হাওয়া। এখন শুধু অপেক্ষা কয়েকটা মুহূর্তের। হয় অতল, নয় অমরত্ব।  

সারা আকাশ জুড়ে আবার শুরু হয়েছে সেই যান্ত্রিক দৈববাণী, যে সেরা সে জিতবে। যে জিতবে সে সেরা। 

অ্যান্ড দ্য উইনার ইজ… উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল কেয়া। 

কে সেরা? গর্জে উঠল চরাচর।

শ-র-মি-শ-ঠা  গু-প-তো . . . মাথার ভেতর নামটা বিস্ফোরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীর ঠাণ্ডা জল ছুঁল। 


*****


এও আরেকরকমের ভাসা। হাওয়ার বদলে জল। এও আরেকরকমের আলো। সবুজ। মেদুর। শ্যাওলা আর গুল্ম ভেসে বেড়াচ্ছে আমার চারপাশে, ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার চোখের পাতা, চিবুক, অল্প অল্প দোলা দিয়ে যাচ্ছে আমাকে। অনেক ওপরে জলে বিলি কাটছে সূর্যের সোনালি আলো। কী আরাম, কী শান্তি। যুদ্ধ শেষ। আমি চোখ বুজলাম। আমার যুদ্ধসাজ মুছে নিচ্ছে জল। আমার বর্ম একে একে খুলে নিয়ে যাচ্ছে ঢেউ। 

এমন সময় আমার বাহু ছুঁয়ে গেল,না উদ্ভিদ নয়, উষ্ণশোণিত!

চোখ খুললাম। ভেসে উঠল একটা মানুষের মুখ। এই মুখটা আমি খবরের কাগজে দেখেছি। ম্যাগাজিনে দেখেছি। শর্মিষ্ঠা গুপ্ত। ওর ঝকঝকে চোখদুটো আমার চোখে নিবদ্ধ। ঠোঁটে মিষ্টি হাসি।

কনগ্র্যাচুলেশনস, দিদি। 

ঘোর কেটে গেল। সমুদ্রের সবুজ মায়া কেটে গিয়ে ফ্ল্যাশের আলো ঝাঁপিয়ে পড়ল চোখে, কান বিদ্ধ করল হাততালি আর উল্লাস। ঘরশুদ্ধু লোক উঠে দাঁড়িয়েছে, এগিয়ে আসছে আমার দিকে, আমাকে জড়িয়ে ধরেছে মৌসুমী, “হোয়াট আ সারপ্রাইজ!” হা হা করে হাসছে সৌরীশ। স্টেজের ওপর থেকে কলরব ছাপিয়ে কেয়ার গলা শোনা যাচ্ছে, পাঠকের বিচারে এ বছরের ব্যোমকেশ সেরা রহস্য সম্মানের দাবিদার নির্বাচিত হয়েছে অনসূয়া মিত্র, আমাদের সবার প্রিয় অনুদির মধুমাধবী সিরিজের তেইশ নম্বর উপন্যাস সপ্তম স্বর্গ। 

আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। আমি জলের গ্লাসটা হাতে তুলে নিলাম। কেউ আমার হাত ধরে স্টেজের দিকে নিয়ে চলেছে। নায়িকা আমাকে আলিঙ্গন করল। ক্রিম কোম্পানির অধীশ্বর আমার হাতে তুলে দিলেন মানপত্র, ছুরির মডেল আর চেক। 


*****


এই যে উঁচু, আলোকিত মঞ্চ থেকে আমি মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি আর নিচ থেকে মানুষ, চিবুক তুলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, এটা আমার ফেভারিট পয়েন্ট অফ ভিউ। এই দৃশ্যে আর কোনও সংশয়ের জায়গাই থাকে না যে আমি রানী। আমিই। ওরা সমস্ত মনোযোগ দিয়ে আমাকে দেখছে, অপেক্ষা করছে আমার কথা শোনার জন্য। আমি ওই দৃষ্টিগুলোকে, এই অপেক্ষাটাকে, বুকের ভেতর নিলাম।

ব্যোমকেশের ছুরি আর জলের গ্লাস নামিয়ে রেখেছি পোডিয়ামের ওপর, উত্তরীয় আর মানপত্র নিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে নম্র মডেল।

আমার বেশি বলার নেই, কিন্তু যা বলার আছে তা জরুরি। আমি সময় নিই। নিজেকে সুস্থিত করি। নিজের শপথ নিজেকে মনে করাই। আজ যা বলব সত্যি বলব। সত্যি বই মিথ্যে বলব না। 

আমি বাংলা রহস্য সাহিত্যের পাঠকদের আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। সহলেখকদের। ব্যোমকেশ কর্তৃপক্ষকে। কেয়াকে। বলি, আমি যা পেয়েছি তা কল্পনা করা সম্ভব নয় কোনও নশ্বর সাহিত্যিকের পক্ষে, আমিও করিনি। পুরোটাই আমার পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। 

আমি স্বীকার করি, এ বছরের ব্যোমকেশ জেতা আর সব বছরের ব্যোমকেশ জেতার থেকে জরুরি ছিল আমার কাছে। কারণ এটাই মধুমাধবীর শেষ বছর। সপ্তম স্বর্গই মধুমাধবী সিরিজের শেষ উপন্যাস। 

সশব্দ বিস্ময় হল জুড়ে। কেউ কেউ মুখে হাত চাপা দিয়েছে। কারও কারও চোখ বিস্ফারিত। 

আমি চুপ করলাম। আমার কথা শেষ। আমার যাওয়ার সময় এসে গেছে। স্তম্ভিত নীরবতা ভেঙে একটা দুটো করে হাততালির শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে হলের এ কোণা থেকে ও কোণা। সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। ভিড়ের মধ্যে চেনাঅচেনা মিলেমিশে একাকার। একবার খুঁজে বার করে শর্মিষ্ঠার মুখটা দেখলাম। পরের বছর ও মুখ থাকবে আমার জায়গায়। নতুন রানী নিজের সাম্রাজ্য বুঝে নেবে। 

আর তখনই চোখে পড়ল। কখন এসেছে টেরই পাইনি। ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে হাসছে। সেই প্রথম দেখার মুহূর্তের রঞ্জন, স্বাস্থ্যে উজ্জ্বল। আনন্দে উচ্ছল। জোরে জোরে হাততালি দিচ্ছে। প্রত্যয়ে টইটম্বুর হাসি। আমি এত কষ্ট পেলাম, ওর যেন কোনও সন্দেহই ছিল না এ জয় নিয়ে। 

একঝলক বুনো গন্ধ ঝাপটা দিয়ে গেল। ইউক্যালিপটাসের ছায়া নিয়ে মধুমাধবী, তুমিও এসেছ? আমার বন্ধু। আমার সখা। আমার জীবনের সোনার কাঠি।  

কিছু অনুতাপ কি রয়ে গেল? কিছু মনোবাঞ্ছা অপূর্ণ? ঠিক এই প্রশ্নটাই করেছিল বিমলের সাহিত্য ক্লাবের পাঠকরা। ঠিক সময় ঠিক প্রশ্নটা কে আমার কাছে পাঠায় কে জানে। হেসে বলেছিলাম, রয়ে গেল তো। অন্তত এক ডজনকে ও জিনিস দিয়ে মেরেছি, অথচ নিজে কোনওদিন চোখে দেখলাম না। সবাই হেসে উঠল, যেন সায়ানাইড চোখে দেখাটা জলভাত। আমি বিমলকে দেখছিলাম। বিমল হাসছে, কিন্তু একই সঙ্গে সংকল্পও নিচ্ছে রানীর ইচ্ছে পূরণ করার। আর ক’দিন পর বিজয়ার প্রণাম করতে আসবে ও বউছেলে নিয়ে। আমাকে প্রণাম করে, মুড়িমুড়কি নিমকি নাড়ু লুচি মাংস খেয়ে, চলে যাওয়ার আগে, বউছেলেকে গাড়িতে গিয়ে বসতে বলে, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলবে, আপনি একটা কথা বললেন সেদিন লঞ্চে . . . আমি ভাব করব যেন আমার মনেই নেই কিছু . . . তারপর পকেটের ভেতর থেকে ওর হাতে উঠে আসবে একটা ছোট কাচের শিশি, এই মাত্র দু’কর লম্বা, নিচে নুনের মতো সাদা গুঁড়ো গুঁড়ো কী সব . . . প্রথমেই মনে হবে এইটুকু যথেষ্ট কি, তারপর নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজেই মনে মনে হেসে উঠব অথচ মুখে কিছুই ফুটে উঠবে না।

সেই সাদা গুঁড়ো এখন এই গ্লাসের জলে, সম্পূর্ণ দ্রবীভূত।

রঞ্জন অস্থির হয়ে উঠেছে। হাত বাড়িয়ে ডাকছে, আর কীসের দেরি? মধুমাধবীও অপেক্ষা করছে। তিরিশ বছর ধরে।  এই আমার সুযোগ, রানীর খোলস ছেড়ে ফেলে, যুদ্ধসাজ ছেড়ে ফেলে ওদের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার। 

কিন্তু আর কয়েকটা মুহূর্ত দাও আমাকে। শেষবারের মতো এ সিংহাসনের শৈত্য গায়ে মেখে নিতে দাও। কানে ভরে নিতে দাও প্রজাদের উল্লাস। চরাচর কানায় কানায় ভরে দেওয়া মুগ্ধতা আর ঈর্ষার সমুদ্রে শেষবারের মতো গা ডুবিয়ে নিতে দাও। বড় অদ্ভুত এ সমুদ্র। আকণ্ঠ জলে দাঁড়িয়েও তেষ্টা মেটে না। আমি হাত বাড়াই জলের গ্লাসের দিকে।
                                                                                                                           (শেষ)


September 26, 2016

রানী (১/২)




মূল গল্প: The Queen of the Mystery
লেখক: Ann Cleeves

*****

হাতির দাঁতের হাতলটা বাহারি। সামান্য ঢেউ খেলানো দেহে খাঁজ কাটা, যাতে মুঠোর ভাঁজে নিখুঁত ফিট করে আর গ্রিপও শক্ত হয়। বাঁটের সঙ্গে ফলার সংযোগস্থলে দুদিকে দুটো সোনালি ডানার মতো বেরিয়ে আছে। ডানার ওপাশে চকচকে স্টিলের ফলা, প্রায় ছ’ইঞ্চি লম্বা। ডগা থেকে দু’ফোঁটা রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। যতবার ওদিকে চোখ পড়ে শিল্পীর মাত্রাবোধের প্রশংসা করি।

জানালার পাশে, এখন যেখানে আমি বেতের দোলনা চেয়ারে বসে ইউক্যালিপটাসের হাওয়া খাচ্ছি, সেখান থেকে অবশ্য রক্ত দেখা যাচ্ছে না। পুরু হ্যান্ডমেড কাগজের চিঠিটা আধখোলা হয়ে পড়ে আছে টেবিলের ওপর। ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে শুধু আইভরি রঙের বাঁটের একটা কোণা। বাঁটের মাথায় সোনালি ডানা, স্টিলের ব্লেড, রক্ত, সব আমি স্মৃতি থেকে বললাম। রক্তের ফোঁটার দু'ইঞ্চি নিচ থেকে যে বয়ানটা শুরু হয়েছে সেটারও দুয়েকটা শব্দ এদিকওদিক করে আমি পুরোটা বলে দিতে পারি। কারণ এই চিঠিটা আমি এর আগেও অগুনতিবার পেয়েছি।

সুধী,

নিখিল বঙ্গ রহস্যরোমাঞ্চ সমিতির পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই। আমাদের বহুপ্রতীক্ষিত বাৎসরিক ব্যোমকেশ সম্মান প্রদানের ঋতু আসন্ন। সপ্তবিংশতিতম ব্যোমকেশ সম্মানসন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে আগামী এতই ডিসেম্বর, অমুক হোটেলের ব্যাংকোয়েট হলে।

আমরা অত্যন্ত গর্ব ও প্রীতির সঙ্গে জানাচ্ছি যে পাঠকের বিচারে আপনার রচিত অমুক উপন্যাসটি এ বছরের সেরা রহস্য উপন্যাস বিভাগে মনোনীত হয়েছে।

এ বছরের সভা সাফল্যমণ্ডিত করতে আপনার উপস্থিতি ওঁ অংশগ্রহণ কামনা করি। বিস্তারিত কর্মসূচি এই চিঠির সঙ্গে . . . ইত্যাদি।

বয়ানের নিচে ‘মুখ্য কার্যনির্বাহক, নিখিল বঙ্গ রহস্যরোমাঞ্চ সমিতি' টাইপের ওপর প্যাঁচালো সই। সই করার সময় যে পরিমাণ রাগ কার্যনির্বাহকের হয়েছে তার তিলমাত্রও বোঝার উপায় নেই। আমার অটোগ্রাফ দেখেই কি লোকে বুঝতে পারে সেই মুহূর্তে আমি কত বিরক্ত, চিন্তিত, অন্যমনস্ক, প্রতিশোধস্পৃহায় জর্জরিত?

কেয়া চেষ্টা করেছিল যাতে আমি না যাই। নমিনেশনের লিস্ট বেরোনোর পর ফোন করেছিল।

অনুদি, তুমি এবার না আসতে চাইলে উই কমপ্লিটলি আন্ডারস্ট্যান্ড। আমরা তোমাকে খুব মিস করব, বাট উই উইল আন্ডারস্ট্যান্ড।

জানি রে। আমি বলেছিলাম। কিন্তু গেলে হয়তো আমারই ভালো লাগবে। একটা চেঞ্জ অফ প্লেস। একলা বাড়িতে সারাক্ষণ . . .

ইন দ্যাট কেস, তুমি সিক্সটিনথ না এসে সেভেন্টিনথ আসতে পার। সিক্সটিনথে তো জাস্ট ডিনার ছাড়া আর কিছু নেই।

দেখি, বলে প্রসঙ্গ বদলেছিলাম। সিক্সটিনথের ডিনারটা যে শুধু ডিনার নয় সেটা আমিও জানি, কেয়াও জানে। এটাও জানে যে বাংলাভাষার যে কোনও পেশাদার রহস্যরোমাঞ্চ লেখকের কাছে গোটা ইভেন্টটার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ওটাই। লেখক, প্রকাশক, সম্পাদক, ফিল্মপ্রযোজক, সাংবাদিক, সমালোচক, টিভি, রেডিও . . . সবাই থাকবে ওখানে। সাধারণ পাঠক ছাড়া। যারা বইগুলো পয়সা দিয়ে কিনে পড়েছে। আমরা প্রেসের লোক, আমরা প্রযোজকের অফিস থেকে বলছি এইসব বলে ফ্রি কপি আদায় করেনি।

অথচ গোটা ব্যাপারটাতে পাঠকদের ভূমিকাটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। আমার মতো পুরোনোদের মতে ব্যোমকেশের একমাত্র বিশ্বাসযোগ্যতা এখন এটাই যে গোটা ব্যাপারটা পাঠকের ভোটে হয়। এই কেয়া আর কেয়ার চ্যালাচামুণ্ডার সেটা পছন্দ নয়। কী না, সাধারণ পাঠকের ভোট আনএডুকেটেড, আনইনফর্মড। চেষ্টারটন মুখস্থ না থাকলে নাকি রহস্যগল্পের রসোদ্ধার করা যায় না। শেওড়াফুলির মেয়ের এত এলিটিজম আসে কোত্থেকে কে জানে। আমার আগে মনে হত এসব খাটুনি কমানোর ফন্দি। পুজোর সময় খবরের কাগজে, ম্যাগাজিনে, টিভিতে, রেডিওতে নমিনেশনের লিস্ট বার কর, আজকাল ওয়েবসাইটও খুলেছে, সে সব সামলাও। বছর বছর ক্যাটেগরি বাড়ানোর বেলা তো উৎসাহের অভাব নেই, উপন্যাস, ছোটগল্প, ট্রু ক্রাইম, তদন্তমূলক, ধারাবাহিক, নন-ফিকশন। তার প্রতিটি বিভাগে লাখে লাখে ভোট আসবে। শহর, গ্রাম, সারা ভারত, সারা বিশ্ব থেকে। সে সব ঝাড়োবাছো। তার থেকে পাঁচ বিশেষজ্ঞের কমিটি বসিয়ে দিলে ঝামেলা অনেক কম। তাঁরা পাঁচটা করে বই বেছে তার মধ্যে একটাকে প্রাইজ দিয়ে দেবেন। এখন সন্দেহ হয় এসব তুলে দেওয়ার পেছনে আরও একটা একটা কুমতলব থাকতে পারে। ইদানীং গোয়েন্দাগল্প নিয়ে সিনেমা বানানোর একটা ঝোঁক এসেছে। হয়তো প্রোডাকশন হাউসের সঙ্গে আঁতাত আছে। যে গল্পটা প্রোডিউসারের পছন্দ সেটাকে প্রাইজ দিতে পারলে হয়তো সিনেমার বিজ্ঞাপনে সুবিধে হবে।

ষোলোর ডিনারে এই সব হবে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবি তোলা হবে। সে ছবি কাগজে, ম্যাগাজিনে, টিভিতে, পাঠকরা দেখবে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা তাঁদের বাড়ির লোককে সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। আমার সঙ্গে আলাপ করাবেন। আমি হাসব, কথা বলব, সই দেব। আগের বছর পরিচয় হয়ে থাকলে সে কথা মনে করাতে পারলে আর কথাই নেই। যাঁদের সঙ্গে এটা করব তাঁদের অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ ওই তিন মিনিটের মনোযোগের বদলে পরের বছর  আমাকে ভোট দেবে। 

ঘর কাঁপিয়ে হাসত রঞ্জন। 

একবছর আগে তুমি কাকে দেখে হেসেছিলে সে কথা মনে রেখে লোকে তোমাকে ভোট দেবে? লোকে ভোট দেবে তোমার বই পড়ে। এমন প্লট ফাঁদবে, শেষপাতায় এমন টুইস্ট দেবে যে লোকে তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভোট দিতেই পারবে না।

বাইরে থেকে দেখলে সে রকমটাই মনে হয় বটে। যে লেখকদের বাজার শুধুমাত্র লেখা দিয়েই নির্ধারিত হয়। যে লোকগুলো এ কথা বিশ্বাস করে তাদের জিজ্ঞাসা করুন যে আপনাদের লাইনে, চাকরিতে, ব্যবসায়, কী দিয়ে ভালোমন্দ ঠিক হয়, বেশিরভাগই লাফিয়ে উঠে বলবে মামাকাকা দিয়ে, ধরাকরা দিয়ে, যৌবনের ছলাকলা দিয়ে। ওয়েল, লেখার লাইনটাও আর পাঁচটা লাইনের মতোই। ভালো হওয়ার সুবিধে একেবারে নেই বলব না, কিন্তু শুধু ভালো দিয়ে হয় না, আরও নানারকম কায়দাকানুন লাগে। 

আমার তো এখন মনে হয় লেখালিখির সঙ্গে অন্য পেশার তফাৎ শুধু পরিশ্রমের সঙ্গে পারিশ্রমিকের অনুপাতে। নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে সেটা পেট চালানোর মতো নয়। এমনকি নেগেটিভও হতে পারে। গোড়ার দিকে আমার যেটা ছিল। রাত জেগে গল্প লিখে কলকাতার নামি কাগজে পাঠাতাম। কম কথায় আমি তখনও সারতে পারতাম না। এই মোটা মোটা পাণ্ডুলিপি হত। বিস্তর পোস্টেজ। ফেরৎ আসত। বসে বসে সারাতাম। সারাতে গিয়ে পাণ্ডুলিপি আগের থেকে মোটা হয়ে যেত। আবার খামে পুরে স্ট্যাম্প মেরে পাঠাও। সব রঞ্জনের টাকায়। একবার ভেবেছিলাম নিজে রোজগার করব। ওদের কোঅপারেটিভের একটা স্কুল ছিল, এখনও আছে, বাগানের কম্পাউন্ডেই। সেখানে পড়ালে অন্তত পোস্টের খরচাটা উঠে আসবে। আমার ঝুলোঝুলিতে রঞ্জনই ওঁদের বলেছিল। নাম কা ওয়াস্তে ইন্টারভিউ দিয়ে আমি স্কুলে জয়েন করি। 

মাস্টার্সে জিওগ্রাফি ছিল, ক্লাস এইটে পড়াতে দিয়েছিল। সাতদিন গিয়েছিলাম। ক্লাসে দাঁড়িয়ে পর্বতের রকমফের বোঝাতাম, আর মাথার ভেতর ঘুরত পাহাড়ের ওপর কুয়াশা ঘেরা বাংলো। বাংলোর ভেতর ফার্নেস, ফার্নেসের সামনে কার্পেটের ওপর হাত পা চিতিয়ে পড়ে আছে একটি সুন্দরী সদ্য কৈশোর পেরোনো দেহ, প্রাণহীন। হ্যাঁ হ্যাঁ, আগাথা ক্রিস্টির একটা গল্পের শুরু অবিকল এই রকম। আমি নিজের গল্প বলছি না, উদাহরণ দিচ্ছি। 

আমার মুখ দেখে রঞ্জনই বলেছিল, যথেষ্ট হয়েছে। আমি বলে দেব, তোমাদের বোকা ছাত্র পড়িয়ে আমার বউয়ের মাথাব্যথা হয়েছে। আর আসতে পারবে না। গ্লানিতে মরে ছিলাম কয়েকদিন। নিজেকে অপদার্থ মনে হচ্ছিল। আমাকে চাঙ্গা করতে তখনই রঞ্জন গ্যারাজের ওপরের ঘরটা সারাতে শুরু করে। পুবের দেওয়াল কেটে ডবল জানালা, জানালার পাশে মেহগনি কাঠের চওড়া টেবিল, গদি আঁটা চওড়া চেয়ার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে লিখলেও পিঠ ব্যথা করবে না। টেবিলের ওপর ফুলদানিতে সাজানো সুষমার রোজ যত্ন করে সাজানো রডোডেনড্রনের ছটা থেকে চোখ তুললেই দেখা যাবে পাহাড়ের আবছা এবড়োখেবড়ো চুড়ো।

ওই জানালার বাইরে একদিন আমি মধুমাধবী মুখোপাধ্যায়কে প্রথম দেখি। অলৌকিকে বিশ্বাস আমার নেই, কিন্তু যা সত্যি তাকে অগ্রাহ্য করি কী করে। বসে বসে পেন কামড়াচ্ছি, কোনও আইডিয়া আসছে না, যা লিখছি ফেরত আসছে, সত্যি বলতে কি লেখাগুলো আমারও যে খুব মনের মতো হচ্ছে তা নয়। চেয়ারের গদিতে পিঠ ঠেকে গেলেই গ্লানি চড়চড়িয়ে বাড়ছে, আমার জন্য এত খরচ অথচ . . .  যখন ভাবছি সব তাকে তুলে এবার সুষমার কাছে রান্নাবান্না শিখে সংসারে মন দিই, এমন সময় একদিন রডোডেনড্রনের ঝাড় থেকে মুখ তুলে দেখলাম জানালার বাইরে ইউক্যালিপটাসের ছায়ায় মধুমাধবী মুখোপাধ্যায় দাঁড়িয়ে আছে। সোজা আমার দিকে তাকিয়ে। রক্তমাংসের মানুষের থেকেও স্পষ্ট। পরের আট মাস ওই টেবিলে আমার পাশে মধুমাধবী বসে রইল। আমি লিখলাম ‘বিষের নদী’। পাঠিয়ে দিলাম। চিঠি এল। মনোনীত। তারপরের আট মাস ধরে বাংলাভাষার সবথেকে জনপ্রিয় দৈনিকের রবিবারের পাতায় ধারাবাহিক বেরোলো ‘বিষের নদী’। 

মাত্র দেড়খানা বছর। তার ওপারে আমি বাবার পয়সায় উচ্চশিক্ষিত হয়ে বরের পয়সায় বসে খেয়ে নারীবাদের মুখে চুনকালির গ্লানিতে সিঁটিয়ে থাকা বড়লোকের আদুরে অপদার্থ বউ। আর এপারে বাংলা সাহিত্যের উদীয়মান নক্ষত্র। রয়্যালটির টাকা। বেস্টসেলার। সংবর্ধনা। ফ্যান মেল। অটোগ্রাফ। পরের বছর। নতুন বই। বেস্ট সেলার। সংবর্ধনা। ফ্যান মেল। অটোগ্রাফ। তার পরের বছর। নতুন বই। রিপিট। উদীয়মান খসে গেল। বাংলা সাহিত্যের আকাশে আমি নক্ষত্র হয়ে টিমটিম জ্বলতে লাগলাম। গত তিরিশ বছর ধরে জ্বলছি। 

ইন্টারভিউ নিতে আসা চশমা পরা চোখা ছেলেরা অবশ্য সবসময় 'রহস্য' শব্দটা গুঁজে দেয়। বাংলা ‘রহস্য’ সাহিত্যের নক্ষত্র। আমার কিছু মনে হয় না। বাংলা 'রহস্য' সাহিত্যের সবথেকে বেশি বিক্রি হওয়া লেখকও আমি। সেটার কথা অবশ্য ভুলেও মনে করাই না। ওরা সরস্বতীর পূজারী, তাহলে ঘৃণায় আমার দিকে তাকাতেও পারবে না। আমি নিজেকে সুগৃহিণী হিসেবে প্রোজেক্ট করি। সুষমার রাঁধা খাবারদাবার নিজে হাতে বেড়ে খাওয়াই। সুদৃশ্য ছাঁকনি দিয়ে রঞ্জনদের বাড়ির দেড়শো বছরের পুরোনো চায়ের সেটে সুষমার বানানো চা ঢেলে দিই। নিজে হাতে বাগান দেখাই, তকতকে করে গুছিয়ে রাখা গেস্টরুমে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জলের বোতল, তোয়ালে গুছিয়ে দিই। পনেরো দিন বাদে মেলে ম্যাগাজিন আসে, ছ'পাতার ফিচার ‘রহস্যের রানী’। অনেক প্রশংসার মধ্যে ঘরোয়া আর ডাউন টু আর্থ শব্দগুলোই বার বার ফিরে ফিরে আসে। আমি জানি ওই ছেলে সারাজীবনের মতো আমার পাঠক হয়ে গেছে, প্রত্যেক বছর ওই একটা ভোট আমার বাঁধা। 

প্রথম রয়্যালটির চেকটা হাতে নিয়ে আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। হাতে নিয়ে ভূতের মতো বসে ছিলাম। রঞ্জন একাই দু’জনের সমান উল্লাস করে বেড়াচ্ছিল। বলছিল, আহা অত স্তম্ভিত হওয়ার কী আছে, এ তো হওয়ারই ছিল। সেলিব্রেট করতে সেই বিকেলেই পাঁচ কিলোমিটার দূরের গেঁয়ো বাজারে গিয়েছিলাম আমরা। রয়্যালটির পয়সায় দু’জনে কফি আর স্যান্ডউইচ। 

সত্যি বলব? সেই বিস্ময় আমার এখনও কাটেনি। অন্যান্য চাকরির সঙ্গে লেখার চাকরির এটা আরেকটা তফাৎ। আপনার কি প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে মনে হয়, চাকরিটা আসলে একটা স্বপ্ন? আজকেই অফিসে পৌঁছে আবিষ্কার করবেন যে অফিসটফিস আসলে ছিল না কোনওদিন কোথাও, গোটাটাই আপনার কল্পনা? আমার হয়। তিরিশ বছর আগে টেনশন হত ছাপবে না, এখন সন্দেহ হয় বেস্টসেলার হবে না। আমার বদলে অন্য কারও গল্প নিয়ে সিনেমা বানিয়ে ফেলবে টালিগঞ্জের ঝকঝকে পরিচালক। আতংকটা আলাদা, কিন্তু তীব্রতা একইরকম। যতক্ষণ পারা যায় ভুলে থাকার চেষ্টা। কিন্তু মনে পড়বেই। তখন চারপাশটা স্লো মোশন হয়ে যাবে। হৃদপিণ্ডের চিৎকারটা ক্রমশ বাড়তে বাড়তে বাকি সব শব্দ ডুবিয়ে দেবে। বুকের ভেতর একটা টর্নেডো ক্রমশ প্রকাণ্ড হয়ে উঠবে, মনে হবে তার টানে আমার আমার সারা শরীরটা গুঁড়ো হয়ে ভুস করে মিলিয়ে যাবে এক্ষুনি।

*****

গাড়ির কাচ নামিয়ে দিলাম। মৌরির কৌটোটা নিয়ে বেরোতে ভুলে গেছি। কষ্টের সময় মুখে মৌরি দিলে আরাম হয়। আর মিনিট দশেক এগিয়ে একটা বাজার আছে। ওখানে এমনিও দাঁড়াতে হবে। অসুবিধে নেই। গাড়ি বার করতে বলেছিলাম হাতে অনেক সময় নিয়েই। তাড়াহুড়ো আর পোষায় না। বাগডোগরার কালো মসৃণ রাস্তা, বর্ষায় ভিজে চকচকে হয়ে রয়েছে। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি হু হু করে ছুটছে।

বাজারের বাইরে গাড়িটাকে পার্ক করিয়ে ড্রাইভারকে মৌরি আর দু’চারটে টুকিটাকি আনতে পাঠালাম। এখানে একসময় স্রেফ জঙ্গল ছিল। আর একটা কাঁচা রাস্তার চৌমাথা। শনিবার শনিবার দু’চারজন ঝাঁকায় করে মালপত্র নিয়ে এসে বসত। তারপর রাস্তা পাকা হল। ঝাঁকা ঠেলাগাড়ি হল। একটা, দুটো, দশটা। এখন ঠেলা ঝাঁকা দুটোই প্রায় অদৃশ্য। পাকা বাড়ির দোকান ছাড়া প্রায় নেইই। একটা মুদির দোকান, একটা জেনারেল স্টোর, একটা সেলুন আর একটা ফার্মেসি। সাদা সাইনবোর্ডে লাল অক্ষর দিয়ে বড় বড় করে লেখা, জয়গুরু ফার্মেসি। 

ফার্মেসির দরজা ঠেলে একটা ছেলে বেরিয়ে এল। ছেলে না, এখন লোক। ওর নাম বিমল। ওর বউয়ের নাম সুমনা। ওর ছেলের নাম শুভজিৎ। জানালা দিয়ে হাত বার করে নাড়লাম। বিমল হাসতে হাসতে এগিয়ে এল। 

চললেন, দিদি? অল দ্য বেস্ট। এবারও আপনিই পাচ্ছেন। কেউ আটকাতে পারবে না। আমাদের লট চলে গেছে। 

হাসলাম। ওর বাড়ির লোকের খবর নিলাম। সুমনা? শুভজিৎ? বিমলের মুখের হাসি চওড়া হল। খুব ভালো আছে দিদি, মহা দুষ্টু হয়েছে। একদম পড়াশোনা করতে চায় না। 

বিমলকে আমি চিনি প্রায় পঁচিশ বছর। এই বাজারের ভেতরেই একটা লাইব্রেরির দোতলায় স্থানীয় সাহিত্য সমিতির তরফ থেকে আমাকে একবার সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সাহিত্যিকরা সকলেই প্রবীণ পুরুষ, সকলেই প্রাবন্ধিক কিংবা কবি। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই প্রবীণ সভাপতি আমাকে জানিয়েছিলেন সাধারণত সংবর্ধনা দেওয়ার সময় নন-ফিকশন কিংবা কবিদেরই বিবেচনা করা হয়। আমি ব্যতিক্রম। এঁরা কেউই আমার লেখা পড়েননি। এঁদের বাড়ির মহিলারা পড়েছেন এবং স্বামীদের বুঝিয়েছেন যে আমি বাৎসরিক সংবর্ধনা পাওয়ার যোগ্য। তাছাড়া আমি উত্তরবঙ্গের লেখক হয়ে কলকাতা জয় করেছি সেটাও সিদ্ধান্ত সহজ করেছিল। ঘোষক ক্রমাগত আমাকে ‘দেবী’ বলে সম্ভাষণ করেছিলেন। বাঙালি ঘরের দৈনন্দিন টানাপোড়েন নিয়ে শ্রীমতী অনসূয়া দেবী জটিল রহস্যের অবতারণা করে. . . ইত্যাদি ইত্যাদি। সংবর্ধনা শেষে আমরা যখন মালা মিষ্টির প্যাকেট গাড়িতে তুলছি, তখন বিমল এসেছিল। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে রোগা রোগা হাফপ্যান্ট পরা পা,  সদ্য গোঁফের রেখা। অটোগ্রাফের খাতা আর পেন এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, আপনার লেখা আমার খুব ভালো লাগে। 

সেই বিমলের এখন বউ ছেলে নিয়ে ভরা সংসার। সেই বিমল এখন স্থানীয় মিস্ট্রি ক্লাবের হোতা। প্রতি বছর পুজোর মুখে আমার নতুন উপন্যাস বেরোলে বিমল সে বইয়ের ‘লঞ্চ’ আয়োজন করে, ‘লেখিকার সঙ্গে মুখোমুখি’ আলোচনাসভার আয়োজন করে। আমি সেখানে গিয়ে পাঠকদের প্রশ্নের উত্তর দিই। বই সই করি। প্রতি বছর ব্যোমকেশের আগে বিমল আর বিমলের সাঙ্গোপাঙ্গরা সমিতির ফান্ড থেকে আমার বই কিনে বিলোয়, ভোট জোগাড়ের জন্য বাড়ি বাড়ি ঘোরে। 

আমি শুধু প্রত্যেকবার এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ওর দোকানের সামনে থামি। ওর ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করি। ওর বউয়ের কথা, মায়ের সায়াটিকার ব্যথার কথা।

গাড়ি ছেড়ে দিল। বিমল গাড়ির সঙ্গে দৌড়ে এল দুয়েক পা। তারপর থেমে হাত নাড়তে লাগল। আমিও হাত নাড়লাম। ওর দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকলাম যতক্ষণ না গাড়ি বাঁক নেয়। 

*****

অনুদিইইইই! 

পৃথিবীর কোনও কোনও লোককে দেখলে আমার নিজের কল্পনাকে বাস্তব রূপ পেতে দেখতে ইচ্ছে করে। কেয়া মুন্সী তাদের মধ্যে একজন। মৃতদেহের বর্ণনা দিতে গিয়ে আমি প্রায়ই কেয়ার চেহারা কল্পনা করি। গুলি খেয়ে কেয়া পড়ে আছে, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। ফ্যান থেকে কেয়া ঝুলছে, ঠোঁট থেকে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে। অথচ কেয়ার ওপর আমার এত রাগের কোনও কারণ নেই। হ্যাঁ, ও আমার বইয়ের নিন্দে করে। অফ কোর্স, আমার বইয়ের নয়। আমার বইয়ের উন্মুক্ত নিন্দে করার জায়গা এখন আর কোনও সমালোচকের নেই। কেয়া মুন্সীরও না। কিন্তু যখনই অন্য কোনও বইয়ের সমালোচনায় আমার ওপর রাগটা ফুটে বেরোয়। নিন্দে করতে গিয়ে লেখে, “কোজি, সংকীর্ণ প্রেক্ষাপটে রহস্য গল্প ফাঁদার যে ক্ষতিকারক প্রবণতা আমাদের বাংলা সাহিত্যে আছে”. . . প্রশংসা করতে গিয়ে লেখে, “সস্তা জনপ্রিয়তার লোভ কাটিয়ে যারা এখনও ঘরোয়া প্রেক্ষাপট থেকে বেরোতে পারেন না”… চাইলে আমি ব্যাপারটা বন্ধ করতে পারি। কিন্তু তাহলে খোলাখুলি যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যেটা আমার মতে বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

অনুদিইইইইইই…

কড়া এসির হাওয়া ফুঁড়ে কেয়ার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর আবার কানে এসে বিঁধল। আমার ডাকনাম কিন্তু অনু নয়। আমার মা বাবা কাকা পিসে বন্ধুবান্ধব কেউ কোনওদিন আমাকে অনু বলে ডাকেনি। রঞ্জনও প্রকাশ্যে আমার পুরো নাম ধরে ডাকত, আড়ালে আমার সত্যি ডাকনাম ধরে। কেয়া প্রথমদিন থেকেই অনুদি, প্রথম দিন থেকেই তূমি। 

ছদ্ম উত্তেজনায় আধা দৌড়ে আধা হেঁটে আয়নার মতো চকচকে কাঠের মেঝের ওপর দিয়ে হিলের খুরখুর তুলে কেয়া এগিয়ে এল। একটা টাইট হাঁটু পর্যন্ত জামা পরেছে। মিনিমাম পঁয়তাল্লিশ তো হবেই, ফিগারটা মেন্টেন করেছে ভালো। ওর পেছনে ধূমকেতুর লেজের মতো একটা ভিড়। বেশিরভাগই চেনা মুখ। অবন্তিকা সান্যাল। মৌসুমী পাল। মৌসুমীর প্রদ্যুৎ সিরিজটা আমার খারাপ লাগে না। ভিড়ের এক হাত ওপরে ভাসছে সৌরীশ সেনগুপ্তের টাক। আড়ালে লোকে বলে ও হচ্ছে বাংলা রহস্য সাহিত্যে জেন্ডার ইকুয়ালিটির টোকেন। ঐতিহাসিক ঘরানায় লেখে। গত বছর ওর গৌড়ের ওপর বেস করা উপন্যাসটা অ্যাকচুয়ালি বেশ জমাটি। এ বছর নমিনেশন আছে। 

সৌজন্যবিনিময়, আলিঙ্গন আর একে অপরের বইকে ভালো বলার পর উচ্ছ্বাস মিইয়ে এল। কেয়ার নেতৃত্বে লেখকদের ভিড় সরে গেল অন্যদিকে। রয়ে গেলেন কিছু আয়োজক। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ লেখালিখিও করেন। একজন রিটায়ারমেন্টের পর সাহিত্য ধরেছেন। গোয়েন্দাগল্প লিখছেন। আগের বছর আমাকে ওঁর প্রথম তিনটে চ্যাপ্টার পড়তে দিয়েছিলেন। গোয়েন্দার নাম মধুসূদন মাইতি। আমি দশপাতা পড়ার চেষ্টা করে ছাড়ান দিয়েছি। বলেছি, চমৎকার বাঁধুনি। তিনি জানালেন তাঁর খসড়া কমপ্লিট, এবার যদি আমি আমার প্রকাশককে . . . আমি বললাম, নিশ্চয়। তারপর তাঁর নাতির কথা জিজ্ঞাসা করলাম। প্রত্যাশামতোই, পাণ্ডুলিপি প্রকাশক উবে গেল। টানা পাঁচমিনিট রুদ্ধশ্বাস নাতিভজনার পর আমি আস্তে করে বললাম যে এবার ঘরে যাব। সকলেই বুঝদার। নিশ্চয় নিশ্চয়, এই বয়সে এতখানি জার্নি। 

প্রকাণ্ড লবির দেওয়াল ঘেঁষে সিলিং ছোঁয়া পাম গাছের বর্ডার। ইতিউতি নরম সোফাসেটি, বাহারি ঝরনা। ঠাণ্ডা সুবাসিত হাওয়ায় হালকা সন্তুরের আওয়াজ। কথোপকথনে বাধা সৃষ্টি করবে না, কিন্তু ফাঁক পড়লে সে ফাঁক ভরাট করবে। রিসেপশনের উডওয়ার্কের আড়াল থেকে নরম হলুদ আলো ছিটকোচ্ছে। ওপাশে দাঁড়ানো সারি সারি নিখুঁত মুখ। কাছে না এগিয়ে গেলে, ফুলের মতো দাঁতের হাসি দেখতে না পেলে, মিষ্টি গলার কথা শুনতে না পেলে চারপাশের সজ্জা থেকে এদের আলাদা করা অসম্ভব। 

চাবি নিয়ে পেছন ফিরতে যাব, মেয়েটি নরম গলায় ডাকল, “ম্যাম?” ফিরে দেখি ডেস্কের আড়াল থেকে মেয়েটার হাতে উঠে এসেছে মধুমাধবী সিরিজের তেইশ নম্বর উপন্যাস। মুখে এটিকেট ভঙ্গ করে ফেলার অপরাধী হাসি। এরা ভাবে অটোগ্রাফ চেয়ে এরা আমাদের বিব্রত করে। নাম জিজ্ঞাসা করলাম। মিহি গলায় মেয়েটা বলল, শ্রুতিস্মৃতা। ইদানীং ভয় হয়, কোনদিন না অটোগ্রাফ দেওয়ার আগে নামের বানান জিজ্ঞাসা করতে হয়। শ্রুতিস্মৃতাকে শুভেচ্ছা আর ভালোবাসার সঙ্গে নিজের নাম সই করে পেছন ফেরার আগেই কেয়ার শীৎকার কানে এল। 

সলেজ ধূমকেতু আবার ছুটে চলেছে দরজার দিকে। ঠাহর করার আগেই লক্ষ্যবস্তুটিকে ঘিরে ফেলেছে। আমি তাকিয়ে রইলাম। আমাকে যখন ভিড় ঘিরে ধরে তখন এ রকম দেখতে লাগে তার মানে। কিন্তু আমি তো এখানে, তাহলে ওরা ওখানে কেন? আমার পাদুটো কাঠের মেঝেতে গেঁথে রইল।

বেশ খানিকক্ষণ পর ভিড়ের পাপড়ি খুলে উন্মুক্ত হল একটি মানুষ। 

এত ছোটখাটো? পাঁচ ফুট টেনেটুনে। মোছামোছা রঙের একটা সুতির শাড়ি। হিলহীন চটি। সম্ভবত বাটার। শ্রীলেদার্সেরও হতে পারে। কাঁধ থেকে ঝুলন্ত কাপড়ের ব্যাগ। চুল টেনে পেছনে খোঁপা বাঁধা। কালো ফ্রেমের চশমার ওধার থেকে একজোড়া চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। থতমত দৃষ্টি। দোকান বাজার রেস্টোর‍্যান্টে ঢুকতে গিয়ে কিংবা সিগন্যালে দাঁড়ানো অবস্থায় গাড়ির কাচ নামিয়ে এ দৃষ্টি আমি আগে অনেক দেখেছি।  

কিন্তু এ দৃষ্টি স্পেশাল। কারণ এ দৃষ্টির আমার শত সহস্র ফ্যানের কোনও একজনের নয়, এ দৃষ্টির মালিক শর্মিষ্ঠা গুপ্ত। সাহিত্য পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন, খবরের কাগজের বইবিভাগে গত ক’মাস ধরে যার ছবি, যার প্রথম উপন্যাসের প্রশংসা আমার দিকে অহরহ চেয়ে থেকেছে। জীবনের প্রথম উপন্যাস লিখে ব্যোমকেশ রহস্য সম্মানের সেরা রহস্য ক্যাটেগরিতে মনোনয়ন যে ছাড়া আর কেউ পায়নি। আমিও না। কেয়ার সমালোচনার শিরোনাম ছিল, রহস্যের নতুন রানী? বাকিরা এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও উচ্ছ্বাসটা সকলেরই কমন। হাতে গোনা কিছু সমালোচক আরেকটু ধৈর্য ধরার পক্ষে, অন্তত দ্বিতীয় উপন্যাসটা পর্যন্ত, কিন্তু বেশিরভাগেরই মত এ ঝড় তাৎক্ষণিক নয়।  

আমি? আমি ধৈর্য ধরার পক্ষে। গত তিরিশ বছর ধরে এ রকম নতুন রাজা নতুন রানীর দেখা আমি কম পাইনি। এখন ভাবলে হাসি পায়, কিন্তু বছর দশেক আগে কেয়া মুন্সী নিজে এই খেতাবের দাবিদার ছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরণের জনপ্রিয়তাটা একই হাতের লেখা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে পাঠকের স্বাদবদলের স্বাভাবিক চাহিদা। আর কিচ্ছু না। দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তাটা একটা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। যেটার সঙ্গে ভালো লেখার কোনও সম্পর্ক নেই। অবিশ্বাস্যরকম বেশি লোক ভালো লেখে। সত্যি বলতে কি আমার তিরিশ বছরের কেরিয়ারে খারাপ লেখা আমি প্রায় দেখিইনি। কাজেই ভালো লেখে কথাটার আমার কাছে কোনও মানে নেই। আমি কৌতূহলী জানতে এ মেয়ের আমাকে সিংহাসনচ্যুত করার ক্ষমতা আছে কি না। আমার সমান বই বিক্রির ক্ষমতা আছে কি না। টানা তিরিশ বছর ধরে বাংলাভাষার সেরা রহস্যলেখকের মুকুট পরে থাকার ক্ষমতা আছে কি না। 

শর্মিষ্ঠা গুপ্ত এখনও আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের ঘোরটা কেটে গেছে। এখন ওর আর কোনও সন্দেহ নেই যে আমিই আমি। মেয়েটা আমার দিকে হাঁটতে শুরু করল। 

সতর্ক হলাম। নার্ভাসনেসটা প্রকাশ হতে দেওয়া যাবে না।  

আমি আপনার খুব বড় ভক্ত। বুকের কাছে হাত জড়ো করে বলল মেয়েটা।

হেসে নমস্কার ফিরিয়ে দিলাম। 

মধুমাধবী আমার পৃথিবীর সবথেকে প্রিয় গোয়েন্দা। 

মেয়েটার বয়স এত কম ছবিতে বুঝিনি। নিঃসন্দেহে তিরিশের ওপারে। যদিও সামনের একগাছি চুল পেকেছে, আর জামাকাপড়ও পরেছে মাসিপিসির মতো।

আমি বিশ্বাস করি, ও রকম চরিত্র বিশ্বসাহিত্যে আর একটিও লেখা হয়নি।

এটাও শোনা, তবে কম। অন্তত যারা বলেছে তারা কেউই নিজেরা লেখে না। এ শর্মিষ্ঠা গুপ্ত তো? 

প্রাথমিক আবেগের ভাবটা কেটে গিয়ে মেয়েটা এখন অনেকটা সংযত।

আমার নাম শর্মিষ্ঠা। শর্মিষ্ঠা গুপ্ত।

আমি ভুরুতে বিস্ময় ফোটালাম। 

ওহ্‌হ্‌হ্‌, তুমি। তোমার কথা তো শুনেছি। 

নতুন, সাড়া ফেলা লেখকদের প্রতি এটা আমার স্ট্যান্ডার্ড উত্তর। তাদের বই পড়া সত্ত্বেও আমি কখনও বলি না যে ওহ, তোমার বই তো পড়েছি। তোমার কথা শুনেছি-র দুটো মানে হতে পারে, যে যার আত্মবিশ্বাস অনুযায়ী বেছে নেবে। এক, তোমার সম্পর্কে আমি এখনও সিদ্ধান্তে পৌঁছইনি। অথবা, আরও খারাপ, তোমাকে পড়ে দেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি না। শর্মিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ নিয়মের ব্যত্যয় করার কোনও কারণ নেই। তাছাড়া শর্মিষ্ঠা গুপ্তর বই আমি সত্যিই পড়িনি, প্রকাশকের পাঠানো কপি বাড়িতে পৌঁছোনো সত্ত্বেও। কাজেই মিথ্যাচারের পাপ হল না। কিন্তু সত্যিটাও বলা হল না। সেটা বলতে গেলে বলতে হত তোমার বই পড়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পড়িনি। কারণ তিরিশ বছরে এই প্রথম কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীর বই পড়ে দেখতে সাহসে টান পড়েছে আমার।

মেয়েটা অপ্রতিভ হল। চোখ নামাল। ইতস্তত ভঙ্গি। নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। এবার নিজের বইয়ের কথা তুলবে। বলবে, আমার বইটা পড়েছেন দিদি? কেমন লেগেছে? সেরকম স্মার্ট হলে বলতে পারে, ভুলভ্রান্তি হলে শুধরে দেবেন, আপনাদের কাছ থেকেই তো শিখব।

শান্ত দুটো চোখ আবার উঠে এল আমার চোখে। 

আপনি আমার রোল মডেল ছিলেন। এখনও আছেন। আমি সবসময় আপনার মতো হতে চেয়েছি।

নিরাবরণ হাসি হাসল শর্মিষ্ঠা গুপ্ত। 


*****
                                                                                                                                   (চলবে)

দ্বিতীয় পর্ব



September 20, 2016

মরশুমি ভালো-খারাপ




১। আমাদের বাড়িওয়ালার গাছে শিউলিফুল এসেছে। ভোরবেলা, এমনকি অফিস বেরোনোর সময়েও দরজার আশেপাশের চার পা সুবাসিত হয়ে থাকে। ভালোবাসি। 

২। ফুলগুলো আর ক’দিন বাদে গাছ থেকে ঝরে মাটিতে পড়বে এবং লোকজন নির্বিচারে সেগুলো পদদলিত করে যাতায়াত করবে। ভালোবাসি না। লোকজনের দোষ নেই। এড়ানো শক্ত। কিন্তু কেউ এড়ানোর চেষ্টাও করে না সেটাও ঠিক।

৩। মেলাগ্রাউন্ড জুড়ে প্যান্ডেল। মাঠ ছিঁড়েখুঁড়ে বাঁশ, ত্রিপল, রঙিন কাপড়, লোহার কাঠামো। একটুও ভালোবাসি না। ভোরবেলা ফাঁকা মাঠে কুকুরগুলো ছোটাছুটি করে খেলত। একটা সাদা, একটা কালো, একটা সাদাকালো। এখন ছোটার জায়গা নেই, তাছাড়া কর্মযজ্ঞ দেখে বেচারারা ঘাবড়েও গেছে। চুপচাপ বসে থাকে ছড়িয়েছিটিয়ে। 

৪।  ওই একই কারণে আমার শরীরচর্চা রুটিনে (রেডিওতে বিজ্ঞাপন সহ সাত থেকে দশটা গানের (এনার্জি আর ঘড়ি বুঝে) সমান হাঁটা, তারপর দুটো গানের সমান দোলনা চড়া) রীতিমত বিঘ্ন ঘটেছে। দোলনা ঘিরে প্যান্ডেলশিল্পীদের অস্থায়ী কুটির বানানো হয়েছে। এখন দোলনায় আমার বদলে তাঁদের গামছা দোলে। ভালো তো লাগেই না, রীতিমত দুঃখ হয়। 

৫। কেনাকাটি। ভালোবাসি না। দেওয়াদেওয়ি। একটুও ভালোবাসি না। ছোটবেলায় নতুন জামা পেতে ভালো লাগত। কিন্তু ছোটবেলায় তো খালি পুজোতেই জামা হত। বড়জোর পয়লা বৈশাখে একপিস সুতির হাতকাটা ফ্রক। এখন যখন ইচ্ছেমতো, যখনতখন জামা কিনে আনছি তখন পুজোর জামার মহিমা কিছু বাকি নেই। এখন শুধু অভ্যেস। আর ভদ্রতা। আর অপচয়। শুধু টাকার নয়। কোনও পক্ষের আলমারিতেই তো আর জায়গা নেই। 

৬। শালিমারের বিজ্ঞাপন। যেটায় চন্দ্রিল আছেন। কমলা রঙের পাঞ্জাবি পরে দু’হাত অঞ্জলির ভঙ্গিতে তুলে ধরছেন, রূপমের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন। কাশফুল আর ঢাকের থেকে ওই বিজ্ঞাপনটা আমার কাছে অনেক বেশি পুজোর বার্তাবাহী। খুবই ভালোবাসি। 

৭।  পুরী থেকে বাবার এনে দেওয়া কটকিটা অবশেষে যে পরার সুযোগ আসতে চলেছে এইটা ভালোবাসি।

৮। কিন্তু তার আগে যে ব্লাউজ বানাতে ছুটতে হবে (যদি অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে না দিয়ে থাকে) সেটা একটুও ভালোবাসি না। 

৯। অর্চিষ্মানের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোব, আইসক্রিম আর কালা খাট্টা চুসকি খাব ভাবতেই ভালো লাগে। 

১০। আমাদের সঙ্গে আরও এক কোটি লোক ঠাকুর দেখতে বেরোবে আর আইসক্রিম কালা খাট্টা চুসকি খাবে আর তাদের আঙুল, কনুই, চিবুক গড়িয়ে গাঢ় বেগুনি তরল মাটিতে পড়বে, কিংবা এক হাতে আইসক্রিম সামলে অন্য হাতে ফোন তাক করে সেলফি তুলতে গিয়ে এ হাত কাত হয়ে আইসক্রিম খসে মাটিতে পড়বে, তার ওপর এক কোটি জোড়া জুতোর ধুলো, ভাবতেই কান্না পায়।

১১। স্মল টকের অসম্ভব সহজ হয়ে যাওয়াটা ভালোবাসি। লিফটে, রেস্টরুমে, ক্যান্টিনে চেনা আধচেনা লোকের সঙ্গে অস্বস্তিকর নীরবতা হাওয়া। দেখা হলেই হিন্দি ইংরিজি বাংলায়, “ঘর নেহি যাওগে?” ট্যাক্সিতে উঠে ডেসটিনেশন সি আর পার্ক দেওয়া মাত্র, “রাস্তা কব সে বন্ধ হো রহা হ্যায়, ম্যাডাম?” 

১২।  কিন্তু এই মরশুমের যে জিনিসটা সবথেকে, সবথেকে ভালোবাসছি সেটা হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতিতে আসা জোয়ার। টিভি দেখাটা মারাত্মক ইন্টারেস্টিং হয়ে গেছে। বিনোদনের মুখ চেয়ে কলকাতা সি আই ডি-র পাঁচবার দেখা এপিসোডগুলো ছ’বার করে দেখার যন্ত্রণা নেই। কাল পাওলি দামের সাতদিনের লুক দেখলাম। নতুন নতুন সিনেমার ট্রেলার। কলার তোলা ট্রেঞ্চ কোট থেকে সিক্সপ্যাক-এদিকে-গালফোলা হিরোর বুকখোলা রোম্যান্স থেকে শহরের তলার শহরের গুন্দাগর্দি। ইন্ডাস্ট্রির সেরা অভিনেতাদের জীবনের সেরা অভিনয়। দেখলে পিলে চমকে যায়। গায়ে কাঁটা দেয় গানের কথা। ভেঙেচুরে গেছে ঘরবাড়ি/চাপা দিয়ে চলে গেছে লরি/ উচ্ছে করলা গাড়িগাড়ি/ আমি রেঁধে খাব তরকারি। তারকাদের ইন্টারভিউ। এত বিখ্যাত অথচ আমার আপনার মতোই। রেগুলার গাই। অবসর টাইমে ডগদের নিয়ে ওয়াকে যান। সিঙ্গাপুরে শুটিং-এ গিয়ে ফান হ্যাভ করেন। ইয়াহ্‌। লাইক ক্রেজি। শুনতে শুনতে নস্ট্যালজিয়ার ঢেউ মগজে আছাড় খায়। মাবাবার ঘাড়ে চেপে দায়দায়িত্বহীন জীবনযাপনের সোনালি দিনগুলো , শ দিয়ে শকুন কাঁদে গরুর শোকে আর ভি ফর ভালচার যখন একইসঙ্গে চলছিল। তখন মুহূর্তের ব্রেনওয়েভে ভাষার ব্যারিকেড ভেঙেচুরে ‘ভালচার কাঁদে কাউ-র শোকে’। এ বাংলাভাষায় আমার কপিরাইট থাকবে না? 



September 17, 2016

সাপ্তাহিকী




খবরাখবর


আত্মবিশ্বাসের খারাপ ব্যাপার হচ্ছে জিনিসটা কখনওই মাপমতো থাকে না। কম হলে তবু একরকম। বেশি হলে ভয়াবহ। এবং হাস্যকর।

কে বলতে পারে এখন শরীরচর্চা ইন্ডাস্ট্রি টাকা খাওয়াচ্ছে না? কিংবা অরগ্যানিক ইন্ডাস্ট্রি?

শরীরচর্চার কথা বলতে মনে পড়ল। অক্ষয়কুমার ঊনপঞ্চাশ হলেন। যিনি না থাকলে আমার মতে হিন্দি সিনেমায় সুপুরুষ নায়কের কোটাটা খালি পড়ে থাকত। তাঁর স্বাস্থ্যের রহস্য আর্লি টু বেড আর্লি টু রাইজ। এবং জিমে না যাওয়া।

সঞ্চয়প্রতিভা নয়, ঔদার্যও নয়, গোটা গল্পটার সবথেকে অবিশ্বাস্য ব্যাপার আমার মতে এত টাকা জমিয়েও লোকটা টাকার গরম লুকিয়ে রাখল কী করে সেটা।


ভিডিও

ধ্যানের বৈজ্ঞানিক উপকারিতা প্রমাণ হলে অনেকেই ব্যাপারটা চেখে দেখতে চাইবে।

লিস্ট

অ্যাংজাইটি বলতে আমি যা বুঝি তার মধ্যে এগুলোর অনেকগুলোই পড়ে না। তবু চোখ বোলাতে মন্দ কী।

ট্রেনলাইনে যারা বড় হয়েছে তাদের সবার হয়েছেই হয়েছে L’appel du vide বাংলাদেশের প্রতি আমার কোনও Kaukokaipuu নেই। আমি মারাত্মক মাত্রার Malu-তে ভুগি। ইদানীং সর্বক্ষণ Torschlusspanik হচ্ছে।

কুইজ/খেলা

আমি পূর্ণচ্ছেদে বিশ্বাসী। সম্পর্কের, কথোপকথনের, সমস্যার। দেখে ভালো লাগল যে এরা আমার চরিত্রকে দাঁড়ির সঙ্গেই তুলনা করেছে।

মিস মার্পল তাঁর কেরিয়ারে ক’কাপ চা খেয়েছিলেন সেটা বলতে না পারলেও ক’টা খুন সমাধান করেছিলেন সেটা পারা উচিত ছিল। নিজেকে নিয়ে চূড়ান্ত হতাশ।


September 15, 2016

বিহার নিবাস, দ্য পটবেলি





লালু ভালো নীতিশ খারাপ। মৈথিলী ভাষায় অইখন মানে এখানে তইখন মানে সেখানে। ভোজপুরী ফিল্মি গানের ভাষা এমন যে ফ্যামিলিকা সাথ বইঠকে শোনা যায় না। অথচ সেই গান শুনে শুনে মৈথিলী যুবসম্প্রদায় গোল্লায় যাচ্ছে। এ সব খবর আমরা পেলাম ঈদের দুপুরে বাড়ি থেকে বিহার নিবাস যেতে যেতে। 

ট্যাক্সিতে উঠেই যেই না বললাম বিহার নিবাস যানা হ্যায়, ভদ্রলোক এক গাল হেসে জি পি এস বন্ধ করে দিলেন। ট্যাক্সিচালকরা দু’প্রকার। একদল জি পি এস-এর দেখানো রাস্তার এক ইঞ্চি এদিকওদিক দিয়ে যেতে রাজি হন না। আর একদল জি পি এস-এর সাহায্য নেওয়াকে কাপুরুষতা মনে করেন। প্রথমে ভেবেছিলাম এই ভদ্রলোক দ্বিতীয় দলের। তারপর অন্য কারণটা বেরোলো। নার্ভাস হয়ে আমরা কিন্তু রাস্তা চিনি না বলাতে আশ্বাসের হাত তুলে বললেন, আপনা হি স্টেট হ্যায়, ভবন তো পাতা হি হোনা চাহিয়ে।

কৌটিল্য মার্গের বিহার ভবন ওঁর পাতা ছিল ঠিকই কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ক্যান্টিনটা তেনজিং নোরগে মার্গের বিহার নিবাসে। দুটোর মধ্যে দূরত্ব মোটে পাঁচ মিনিট।

বিহার নিবাসের ক্যান্টিনকে অবশ্য ক্যান্টিন বলা উচিত নয়। কারণ সেটা একটা বাহারি দোকান। শাহপুর জাট ভিলেজে পটবেলি রুফটপ ক্যাফের ধুন্ধুমার ব্যবসা দেখে বিহার ভবন/নিবাসের কর্তারাই পটবেলি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন বিহার নিবাসে তাঁদের দোকান খুলতে। সিদ্ধান্ত যে ভুল হয়নি তা মঙ্গলবারের (অবশ্য ছুটির মঙ্গলবার) দুপুরের হাউসফুল দিয়েই পরিষ্কার। 

শাহপুর জাটের চারতলা বাইতে যাঁদের হাঁটু কাঁপে, কিংবা হিপস্টারদের যাঁরা ভয় পান তাঁদের পক্ষে বিহার নিবাসের পটবেলি আদর্শ। ঝলমলে, অতিথিবৎসল আবহাওয়া। কাউন্টারে যিনি বসেছিলেন আর যিনি ঘুরে ঘুরে তদারকি করছিলেন, দু’জনকেই শাহপুর জাটের ক্যাফেতে দেখেছি।

পটবেলির মেনুতে স্টার্টারের নামগুলো পড়লেই অর্ডার করতে ইচ্ছে করে। আলু লালু চপ, কিমা গোলি, পোঠিয়া মছলি ফ্রাই। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে জানি, ওগুলো খেলে আর কিছু খাওয়া যায় না। তাই সোজা মেন কোর্স। আমার জন্য চিকেন তিখা ইস্টু, অর্চিষ্মানের জন্য খড়া মসালা মাটন। প্রথমটা ভাত আর দ্বিতীয়টা পরোটার সঙ্গে আসে। আর গলা ভেজানোর জন্য নেওয়া হল সল্টি অ্যান্ড স্পাইসি লস্যি। 


খড়া মসালা মানে গোটা মশলা। এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি, জিরে, ধনে, গোলমরিচ, জয়িত্রী, জায়ফল - কেউ কেউ গন্ধের জন্য মৌরিও দেন - তেলে ফোড়ন (গোটা কিংবা মোটা করে গুঁড়িয়ে) দিয়ে মাংস রান্না করাই হচ্ছে খড়া মসালা মাটনের মোদ্দা রেসিপি। এত তরিবত করে রাঁধলে তো রান্না খারাপ হওয়ার কোনও কারণ নেই, খড়া মসালা মাটন প্রত্যাশিতভাবেই ভালো। কিন্তু আমাকে রুদ্ধবাক করল চিকেন তিখা স্টু। গাজর আর আলুর টুকরো দিয়ে রান্না ঝাল ঝাল, টক টক মুরগির পাতলা ঝোল। জিভে ছোঁয়ানোমাত্র মাথা থেকে পা পর্যন্ত যত ঘুমন্ত কোষ, ঝিমন্ত রন্ধ্র ঝাঁকুনি খেয়ে বাপ বাপ বলে উঠে দাঁড়ায়, দু’হাত তুলে গলা খুলে “জিয়া হো বিহার কে লালা” রাঁধুনিবন্দন শুরু করে। 


বাইরে ছাতার তলায় লিট্টি উৎপাদনশালা। খোলা আগুনের ওপর লোহার জালির ওপর বড় সাইজের সবেদার মতো সারি সারি লিট্টি। হাতের তেলো দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চারপাশ সমান করে সেঁকা চলছে। 

কাচের দেওয়াল ভেদ করে এমন মিষ্টি আলো আসছিল যে আমরা ভাবলাম আরেকটু বসা যাক। সঙ্গ দিতে এল পাইনঅ্যাপেল আপসাইড ডাউন কেক উইথ আইসক্রিম। অথেনটিক না হতে পারে, চমৎকার। আনারসের চোখওয়ালা টুকরো ঢাকা নরম মসৃণ স্পঞ্জকেক। পাইনঅ্যাপেলের উপস্থিতি প্রমাণের তাগিদে কোনও রকম সেন্টের ব্যবহার করা হয়নি। আমার মতো গন্ধবিচারীদের পক্ষে রক্ষে। 


শেষে ভালো খাওয়া উদযাপন করতে এক কেটলি চা। আদালবঙ্গএলাচ দিয়ে বেশ করে ফোটানো।

দিল্লিবাসী হলে আর স্টেট ক্যান্টিনে খাওয়ার আগ্রহ থাকলে বিহার নিবাসের দ্য পটবেলি-কে লিস্টের ওপরদিকে রাখুন। আর যাঁরা দিল্লিতে কিংবা বিহারে থাকেন না তাঁরা শিগগিরি বাড়ির কাছে বিহারী দোকান খুঁজে খেতে যান।




September 13, 2016

আমার জীবনের কুড়িটি জ্বলন্ত সমস্যা



১। তেষ্টা মেটার আগেই চা ফুরিয়ে যাওয়া। প্রত্যেকবার।

২। চায়ের দুধ, চিনি, নুন, বয়ামে কখনওই প্যাকেটের পুরোটার জায়গা না হওয়া। বাকিটুকু গার্ডার পেঁচিয়ে রাখতে বাধ্য হওয়া। চোখের সামনে রাখলে দৃশ্যদূষণ, আড়ালে রাখলে বিস্মৃতি। 

৩। ওষুধ ফুরোনোর আগেই অসুখ সেরে যাওয়া। তারপর সারাবাড়ি ওষুধের গোরস্থান।

৪। বাড়িতে প্লাগ পয়েন্টের থেকে গ্যাজেট বেশি থাকা।

৫। অর্চিষ্মান আর আমার ফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদির চার্জ সর্বদা, সর্বদা, একসঙ্গে ফুরোনো। এবং তখন ওপরের সমস্যাটা প্রকটতর হয়ে ওঠা।

৬। আশু দরকারি কাজটা ছাড়া পৃথিবীর সব কাজ করতে ইচ্ছে করা। 

৭।  পড়তে শুরু করা বইটা ছাড়া পৃথিবীর অন্য সব বই পড়তে ইচ্ছে করা। 

৮। সব খাবার গরম হয়ে যাওয়ার পর সিনেমা বেছে বাফারিং-এ দেওয়ার কথা মনে পড়া। তখন হয় সিনেমা বাছতে গিয়ে খাবার ঠাণ্ডা কর, নয় সিনেমা চালাতে চালাতে খাওয়া শেষ।

৯। বাঁধানো ছবির তুলনায় দেওয়ালে পেরেক কম পড়া। নিজেরা মারার এলেম নেই। আর পেরেক মারার জন্য এখনও লোক ভাড়া পাওয়া যায় না। হাঁ করে বসে থাকা কখন বড় কিছু খারাপ হবে - কলিং বেল, গিজার - তখন ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে পেরেক পুঁতিয়ে নেওয়ার জন্য। 

১০। ইলেকট্রিশিয়ান আসা থেকে চলে যাওয়া পর্যন্ত দুজনের মাথা থেকে পেরেকের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ বেরিয়ে যাওয়া।   

১১। মুদির দোকানে হোম ডেলিভারির অর্ডার দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ চেয়ে থাকা। 

১২। অর্ডার দেওয়ার পাঁচ মিনিট পর ফোন করে একটা ভুলে যাওয়া আইটেম জুড়ে দেওয়ার কথা বললে শোনা, “দিদি, এক্ষুনি আপনার মালটা বেরিয়ে গেল।” 

১৩। ঠিক সে সব ক্ষেত্রেই নুন দিয়েছি কি না ভুলে যাওয়া, যে সব ক্ষেত্রে চেখে দেখা সম্ভব নয়। মাংস ম্যারিনেট করতে দিয়ে, ডিম ফেটানোর পর।

১৪। রিল্যাক্সেশন পুরো হওয়ার আগেই ভিডিও গেমের লাইফ ফুরিয়ে যাওয়া।

১৫। দিন ফুরিয়ে গেলেও ইউটিউবে দেখার মতো ভিডিও না ফুরোনো। 

১৬। সুবিধেজনক দিকে পড়ার সমান সুযোগ থাকলেও জিনিসপত্রের সর্বদা খাটের সেদিকে পড়া যেদিকে হাত ঢোকানোর জায়গা নেই। 

১৭। একটা হারানোর পর অনেক খুঁজে না পেয়ে শেষমেশ অন্যটা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার চব্বিশঘণ্টার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া দুলটা বেরিয়ে পড়া। 

১৮। ইন্টারনেটে যাদের দেখলে ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যায়, তাদের খবরই সবথেকে বেশি নিতে ইচ্ছে করা।

১৯। উল্টোদিক থেকে চেনা লোক আসতে দেখলে তার উপস্থিতি অ্যাকনলেজ করা মোক্ষম মুহূর্তটা চিহ্নিত করতে না পারা। সবসময়েই টু আর্লি, নয়তো টু লেট।

২০। অনেক ভেবেও কুড়ি নম্বর অসুবিধেটা মনে করতে না পারা। এবং এটা জানা যে পাবলিশ করার কুড়ি সেকেন্ডের মধ্যে আমার জীবনের জ্বলন্ততম সমস্যাটা মনে পড়বে যেটা এই লিস্টে অনুপস্থিত।  



September 10, 2016

সাপ্তাহিকী



Intelligence is really a kind of taste: taste in ideas. 
                                                                                             ---Susan Sontag


Mother's genes go directly to the cerebral cortex, those of the father to the limbic system. 

পৃথিবীর প্রথম চুটকি হল খ্রিস্টপূর্ব উনিশশো শতকের একটি সুমেরিয়ান প্রবাদ। 

জাপানে বোমাপতনের পরে ভিয়েতনামের যুদ্ধে রাস্তায় ছুটতে থাকা ছোট মেয়েটির ছবি ফেসবুকের সংজ্ঞায় ফুল ফ্রন্টাল নুডিটি-র উদাহরণ। কাজেই বাতিল।
  
চারচারটে জন্তুকে আমরা জিরাফ নামের ছাতার তলায় গুঁজে রেখেছি। (নিউ ইয়র্ক টাইমস)

উনিশশো চুয়াত্তর সালে টুইন টাওয়ার তৈরি হওয়ার খবরটা দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারে বসে পেয়েছিলেন ইনি। তখনই ঠিক করেন এক টাওয়ারের ছাদ থেকে অন্য টাওয়ারের ছাদ পর্যন্ত হাঁটবেন। প্রস্তুতির আট মাসে দড়িতে হাঁটা মোটে একবার প্র্যাকটিস করেছিলেন তিনি। তাঁর মূল মাথাব্যথা ছিল হাঁটার পার্টটা নয়, গার্ডের চোখ এড়িয়ে ছাদ টু ছাদ তার লাগানোর পার্টটা। কারণ ঘটনাটা ঘটানোর জন্য তাঁর অনুমতি ছিল না। কাজেই নিচে সেফটি নেটও ছিল না। 
“On the last step, as I gave myself up to the police, it started to rain. They were very angry. It took them an entire afternoon to process and get rid of me. They were rough, but some asked for my autograph."

জেতার টোটকা? উঁহু, এক্সেলেন্স নয়। ইকুয়ালিটি। 

 ছবির পেছনে জল ছিটকানোর ব্যাকগ্রাউন্ড বানাতে চাইলে। 




আমার বাবামার জন্মবছরের বেস্টসেলার বই দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই, আমার জন্মবছরের বেস্টসেলার দ্য বোর্ন আইডেন্টিটি, অর্চিষ্মানের জন্মবছরের বেস্টসেলার সিক্রেটস। আপনার?



September 08, 2016

সাত



গোড়ায় অসুখবিসুখের প্রসঙ্গে সাত বছর সময়টা জরুরি ছিল। বলা হত এ পৃথিবীতে এমন কিছু রোগ আছে, শরীরের এবং মনের, যা সারতে লাগে সাত বছর। তারপর বিশেষজ্ঞরা বার করলেন মানুষের সম্পর্কেও সাত বছর সময়টা জরুরি। সম্পর্ক মানে মূলত রোম্যান্টিক সম্পর্ক, জোগাড় করা থেকে টিকিয়ে রাখা, সবকিছুতেই যাদের পেছনে কাঠখড় পোড়াতে হয়। জন্মলগ্নে মুফতে পাওয়া সম্পর্ক, বিজয়ায় একটা ফোন করলেই পরের বছরের জন্য যাদের থাকা নিশ্চিত, তারা নয়। বিশেষজ্ঞরা বললেন এই সব কঠিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাত বছর সময়টা ক্রুশিয়াল। শুরুতে হালকা ইরিটেশন, লাল হওয়া, ফুসকুড়ি। পত্রপাঠ ব্যবস্থা না নিলে একেবারে বিচ্ছেদে গড়ানো অসম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা কিছু বললে অবশ্য একটা সান্ত্বনা থাকে। যে আরেকদল বিশেষজ্ঞ ঠিক উল্টো কথাটা প্রমাণ করে দেবেন। এ ব্যাপারেও তাই হল। অন্যরা বললেন যে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা তো নেই, বরং সাত বছর যদি কোনও সম্পর্ক টিকে যায় তাহলে বরং নিশ্চিত হওয়া যায় বাকি জীবনটাও সেটা টিকবে। সাত বছর একসঙ্গে থাকা মানে পালানোর রাস্তা সব একে একে বন্ধ হয়েছে, একে অপরকে হাড়েমজ্জায় অভ্যেস হয়ে গেছে, বাকিটুকু জাস্ট নিয়ম করে টেনে দিলেই হল। 

কোন তত্ত্বটা যে ঠিক সেটা তো জানিই না, কোনটা যে বেশি ভয়ের সেটাও নিশ্চিত নই। 

যেমন আজ রাত পোহালে আমার অবান্তর লিখে চলার সাত বছর পূর্ণ হবে, এ খবরটা উদযাপনের না বুক চাপড়ানির, সেটা আমার গুলিয়ে যাচ্ছে। 

জন্মের বাইরে পাওয়া আমার কোনও সম্পর্ক, রোম্যান্টিক বা ননরোম্যান্টিক, সাত বছর টেকেনি। (এখন যে রোম্যান্টিক সম্পর্কটায় আছি সেটা অ্যাকচুয়ালি সাত ছুঁতে চলেছে, মাগো...) কেউ আমাকে তাড়িয়েছে, কাউকে আমি কাটিয়েছি। কোনওটা সম্পর্কের পেডেস্ট্যাল থেকে হড়কাতে হড়কাতে এখন পরিচয়ের ক্ষীণ সুতোয় ঝুলছে। আর কোনওটার দিকে আঙুল তুলে যারা বলছে, কই এইগুলো তো বেশ জং ধরা মনে হচ্ছে, তাদের আমি রহস্য করে উত্তর দিচ্ছি, তবেই বুঝুন। 

অবান্তরের সঙ্গে সম্পর্কটা সাত বছর কী করে টিকল সেটা একটা রহস্য। সে রহস্যের চাবি আমি নই। হতেই পারি না। তাহলে আমার অন্যান্য সম্পর্কেও এর ছাপ পড়ত। 

দায়ী নির্ঘাত অন্য পক্ষ। অর্থাৎ, অবান্তর।

কিন্তু অবান্তর কি সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে পারে? শেষপর্যন্ত তো সে স্ল্যাশ, কোলন, হাইফেন আর ডট দিয়ে লেখা একটা নাম। থাকে ল্যাপটপে, খায় ইন্টারনেট। সে সাত বছর ধরে এইরকম একটা মিনিংফুল রিলেশনশিপ পুষছে এটা আমি অনেক চেষ্টা করেও মেনে নিতে পারলাম না।

তখন আমার নজর পড়ল অবান্তরের ওপারের ছায়াটার দিকে। আপনার ছায়া। আপনাদের ছায়া। যার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ আলাপ নেই, অথচ সারাদিনের সমস্ত সশরীরী কথোপকথন, দেওয়ানেওয়াকে ম্লান করে যে ছায়া আমাকে ঘিরে থাকে, যে ছায়া রসিক ও সংবেদনশীল, বুদ্ধিমান ও বিনীত, আত্মবিশ্বাসী ও শিখতে রাজি, বলার থেকে শুনতে খুশি, যে ছায়ার মেজাজ নরম, শিরদাঁড়া শক্ত, চোখ চকচকে, হাসি পরিষ্কার, আর যে ছায়া ভেতর থেকে ভালো।

আমার ঠিক যেমনটি পছন্দ, আপনারা ঠিক তেমনই। আপনাদের জন্যই সাত বছর ধরে অবান্তরে ফিরে ফিরে আসছি, আপনারা আমাকে না ছাড়লে আরও অন্তত সাত বছর আসব। আমার জীবনের অন্যতম পারফেক্ট সম্পর্কে সাত বছর ধরে আমাকে থাকতে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনেক ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা রইল। এই সাড়ে চারশো শব্দের মধ্য দিয়ে যতটুকু প্রকাশ করতে পারলাম তার থেকে অন্তত সাড়ে চারশো কোটি গুণ। 



September 06, 2016

ধর্মের বিষ আর কুমারীর বাস/ অগস্ট (২০১৬) মাসের বই



The Poisonwood Bible/ Barbara Kingsolver




উৎসঃ গুগল ইমেজেস

উনিশশো ঊনষাট সালে চার মেয়ে র‍্যাচেল, লিয়া, আডা, রুথ মে এবং এক বউ অরলিয়ানাকে সঙ্গে করে এভ্যানজেলিক্যাল ব্যাপ্টিস্ট নাথান প্রাইস কঙ্গো পৌঁছন মিশনারি দায়িত্ব সারতে। গন্তব্য কিলাংগা নামের একটি ছোট গ্রাম। প্রাইস পরিবারের সংক্ষিপ্ত কিলাংগাবাসের অভিজ্ঞতা এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবনে অভিজ্ঞতার দীর্ঘ, অতি দীর্ঘ ছায়াপাত নিয়ে বারবারা কিংসলভারের লেখা পয়জনউড বাইবেল, প্রায় সাড়ে পাঁচশো পাতার বই, হার্পার প্রকাশনী থেকে ছাপা হয়েছিল উনিশশো আটানব্বই সালে। উনিশশো নিরানব্বই সালের ফিকশন বিভাগে পয়জনউড ফাইন্যালিস্ট ছিল। ( জিতেছিল মাইকেল ক্যানিংহ্যামের দ্য আওয়ারস।)

গল্পটা আমাদের বলে অরলিয়ানা এবং তার চার মেয়ে। নাথানের কোনও বক্তব্য আমরা শুনতে পাই না। তার কারণ আডার মন্তব্যে স্পষ্ট। “Our father speaks for all of us”।  মা আর চার মেয়ে পাঁচরকম ভাবে আমাদের কিলাংগা, কিলাংগার মানুষ, মাঠ, নদী, নদীর কুমীর, খরা, বন্যা, শিকার, পুরুষতন্ত্র, ওঝাতন্ত্র, খুনি পিঁপড়ে, আপাতভাবে কিলাংগার নাগালের বাইরে কিন্তু কিলাংগাকে নিরন্তর ছুঁয়ে যাওয়া কঙ্গো এবং বিশ্ব রাজনীতির* গল্প বলে। আর সে গল্পের মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে কী ভাবে পালটে যাচ্ছে এই পাঁচটি মানুষের দর্শন, পারস্পরিক সম্পর্ক। কারও চোখ ফোটে, কেউ অন্ধ হয়ে যায়। কঙ্গো, কিলাংগা, আফ্রিকা কীভাবে প্রাইস পরিবারকে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ে তারই গল্প হচ্ছে পয়জনউড বাইবেল। 

* প্রাইসরা পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই কঙ্গোর রাজনীতিতে পালাবদল শুরু হয়। বেলজিয়াম শাসন শেষ হয়ে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত হন প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিক লুমুম্বা। তারপর অ্যামেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বেলজিয়াম, ইউ এন এবং কঙ্গোর ক্ষমতালোভী লোকজন মিলে এক অভূতপূর্ব গোলযোগের সৃষ্টি করে। উনিশশো একষট্টি সালে প্যাট্রিক লুমুম্বা অকথ্য অত্যাচার সয়ে খুন হন এবং জোসেফ মোবুটু নামের এক বাঁধিয়ে রাখার মতো মানুষের হাতে পড়ে (এবং সাদা বড়লোক দেশদের সম্পূর্ণ সহযোগিতায়) পরবর্তী তিরিশ বছর ধরে কঙ্গো লুণ্ঠিত হতে থাকে। এসবই বারবারা কিংসলভার ছুঁয়ে গেছেন তাঁর বইয়ে।

পয়জনউড বাইবেলের সবথেকে ভালো জিনিস হচ্ছে কিলাংগা। আর তারপরই কিংসলভারের ভাষা। পাঁচ বয়সের পাঁচ মহিলার ভাষা একেবারে পাঁচরকম। খানিকটা পড়ার পর আপনি নিজে থেকেই বুঝতে পারবেন কোন গলাটা কার। আর কিংসলভারের রসবোধ। ওই গোলমালের মধ্যেও মাঝে মাঝে সশব্দ হাসি বেরিয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে পয়জনউড বাইবেল জমজমাট, একবার শুরু করলে থামতে না পারা বই। 

তবু কেন আমি পয়জনউডকে পাঁচে তিন দিলাম সে কথায় আসি। পয়জনউড বাইবেলের প্রধান অসুবিধে আমার মতে ভালোখারাপের ভাগাভাগি। নাথান প্রাইস একটি ধর্মান্ধ, অত্যাচারী, নারীবিদ্বেষী অমানুষ। কাজেই তার নিন্দে করার জন্য খুব বেশি মগজ খরচ না করলেও চলে। আর লোকটা এই রকম বলেই তার বক্তব্যটা সম্পূর্ণ নীরব করে দিয়ে কিংসলভার পাঠকের কাজটা অত্যন্ত বেশি সোজা করে দিয়েছেন। পাঁচ ভিকটিমের মধ্যেও কিংসলভারের পক্ষপাতিত্ব প্রকট। বোনেদের মধ্যে একজন আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছে, একজন বিদ্যাবুদ্ধির জন্য, আরেকজন বিষয়সুখের জন্য। এই বিষয়সুখলোভী বোনটিকেও প্রায় ক্যারিকেচারের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন লেখক। এবং শুধু তাতেই ক্ষান্ত দেননি, সকলের মধ্যে সে বেচারাকেই অসুখী করে রেখেছেন। কোনও কোনও সন্ধ্যেবেলা দামি ওয়াইন নিয়ে প্রাসাদের বারান্দায় বসে একা তারই মনে হয় সব থেকেও কী যেন নেই। যারা আদর্শবাদী কিংবা বুদ্ধিজীবী, তাদের মনে কখনও এরকম কিছু আক্ষেপ জাগে না। বড়লোক বোনের প্রাচুর্যের দিকে তাকিয়ে কখনও তাদের ঈর্ষা হয় না। কখনও, কোনও দুর্বল মুহূর্তেই আদর্শ/+ ডিগ্রির মুখে লাথি মেরে স্রোতে ভেসে যাওয়ার ইচ্ছে তাদের বুকে কখনও মাথা তোলে না। 

*****

Parfume: The Story of a Murderar/Patrick Süskind
অনুবাদকঃ John E. Woods

উৎসঃ গুগল ইমেজেস

পারফিউমঃ দ্য স্টোরি অফ আ মার্ডারার-এর আসল নাম Das Parfum। জার্মান ভাষায় বইটা লিখেছিলেন Patrick Süskind। উনিশশো পঁচাশি সালে বইটি ছাপা হওয়ার পর এ যাবৎ আটচল্লিশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বিক্রি হয়েছে কুড়ি মিলিয়ন কপির বেশি। 

গল্পের মার্ডারার হচ্ছেন সতেরোশো আটত্রিশ সালে প্যারিসের জন্মানো Jean-Baptiste Grenouille। ফরাসিতে Grenouille শব্দের মানে ব্যাং, কাজেই Jean-Baptiste-এর চেহারা সম্পর্কে একটা ধারণা সেখান থেকে করে নেওয়া যায়। Jean-Baptiste-এর মা ছিলেন এক মাছব্যবসায়ী। Jean-Baptiste-এর আগেও তাঁর বেশ ক’টি সন্তান হয়েছিল। তিনি প্রতিটি সন্তান প্রসব করেছিলেন ওই মাছের বাজারে কাজ করতে করতে। এবং প্রসবান্তে তাদের ওই বাজারেরই নোংরা গাদায় ফেলে রেখেছিলেন যাতে তারা পত্রপাঠ মারা যায়। মায়ের কপাল খারাপই বলতে হবে, তাঁর গর্ভে Jean-Baptiste জন্মালো। মা জন্ম দিলেন এবং অভ্যেসমতো নোংরা গাদায় ফেলে দিলেন। 
একটু বাদে সেই নোংরা গাদা থেকে উঠে এল এক গগনবিদারী আর্তনাদ। বাজারশুদ্ধু লোক ছুটে এল। আস্তাকুঁড় থেকে বেরোলো নবজাতক। মায়ের অপরাধও বেরোলো। জানা গেল এ-ই প্রথম নয়, এর আগেও  সে এই কাণ্ড করেছে। নিজের সন্তানদের খুনের অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড হল। Jean-Baptiste বেঁচে রইল। বেঁচে রইল কেবল Jean-Baptiste বলেই। অন্য কেউ হলে বাঁচত না। কেউ Jean-Baptiste কে ভালোবাসত না। সকলেই তাকে ভয় পেত। কেউ কেউ মুখে বলতও, Jean-Baptiste মানুষ নয়। সাক্ষাৎ শয়তান।

Whoever has survived his own birth in a garbage can is not so easily shoved back out of this world again. He could eat water soup for days on end, he managed on the thinnest milk, digested the rottenest vegetables and spoiled meat. In the course of his childhood he survived the measles, dysentery, chicken pox, cholera, a twenty foot fall into a well, and a scalding with boiling water poured over his chest. এর পর ট্যানারিতে কাজ করতে করতে Jean-Baptiste-এর অ্যানথ্রক্স হয় এবং সে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকেও Jean-Baptiste বেঁচে ফেরে। 

ধ্বংসের অতীত হওয়াই অবশ্য Jean-Baptiste-এর একমাত্র বৈশিষ্ট্য নয়। Jean-Baptiste-এর সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার ঘ্রাণশক্তি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘ্রাণশক্তির সদ্ব্যবহার করে Jean-Baptiste একজন পারফিউমার হয়ে ওঠে। গন্ধ তার কাছে শুধু পেশা ছিল না, ছিল অস্তিত্বের মূল কথা। 

কিন্তু মার্ডার কোথায়? সেটা আমারও প্রশ্ন। নিজের গন্ধের নেশা চরিতার্থ করতে Jean-Baptiste একাধিক খুন করে ঠিকই, কিন্তু গল্পটা পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন সে সব খুন গল্পের অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর জায়গা দখল করে আছে। যারা খুন হয়েছে তাদের নামধাম কিছুই আমরা জানতে পারি না। তারা গল্পে ছিল Jean-Baptiste নামের একটি অতি অদ্ভুত মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে। 

Patrick Süskind-এর ভাষা খুবই শক্তিশালী। বর্ণনামূলক লেখা আমার মতে এমনিই শক্ত, আর এ বর্ণনার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে ঘ্রাণশক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান। পাতার পর পাতা জুড়ে গন্ধের বর্ণনা দিয়ে গেছেন লেখক অথচ তা কখনও একঘেয়ে হয়ে ওঠেনি। 

পারফিউম-এর প্রতি আমার একটিই নালিশ। কিন্তু যত সময় যাচ্ছে পারফিউম-এর সব বড় গুণ ছাপিয়ে সেই নালিশটাই ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে। যখনই মনে পড়ছে পৃথিবীর সেরা গন্ধের উৎস হিসেবে লেখক সুন্দরী সদ্যযৌবনোদ্গমা কুমারী (কুমারীর অংশটা জরুরি। চুলের রং একটু ফ্যাকাশে, নাকচোখমুখ একটু কম কাটাকাটা হলেও চলবে, কিন্তু অনাঘ্রাতা না হলে চলবে না) ছাড়া আর কিছু পেলেন না, তখনই নাকখানা কুঁচকে যাচ্ছে। ওই খবরটা যেন এককুচি মরা ইঁদুরছানা, গোটা দুশো তেষট্টি পাতার প্রস্ফুটিত মুঘল গার্ডেনকে মাটি করার জন্য একাই একশো। 


September 03, 2016

সাপ্তাহিকী




Boredom is the legitimate kingdom of the philanthropic. 
                                                                ---Virginia Woolf


খবরাখবর

মাঝে মাঝে আমার আফসোস হয় যে আমি এত বাড়াবাড়ি রকমের ‘নর্ম্যাল’ কেন। আরেকটু কম নর্ম্যাল হলে জীবনটা আরেকটু ইন্টারেস্টিং হত। এখন মনে হচ্ছে কি জানি, যতটা ভেবেছিলাম ততটা নর্ম্যাল হয়তো আমি নই। কারণটা অবশ্য …  

অস্কারের মনোনয়ন দিয়েও ফিরিয়ে নেওয়া? একাধিকবার ঘটেছে। তবে চার্লি চ্যাপলিনকে চারচারখানা নমিনেশন দিয়েও ফিরিয়ে নেওয়ার কারণটা মচৎকার। 

ন্যাচারাল আইসক্রিমকে আঙুর আইসক্রিম বানানোর চ্যালেঞ্জটা দিয়ে দেখা যেতে পারে। 

ভিডিও


ছবি

ঘুমোতে যাওয়ার আগে আপনি কী নিয়ে ভাবেন?

আমাদের প্রেসিডেন্ট/প্রধানমন্ত্রীদের যৌবনের ছবির এ’রকম একটা সিরিজ থাকলে পারে।

পয়সা ফেললেই স্নিকারস আর কোকা কোলার বদলে ছোট গল্প। 

এটা অবশ্য, পয়সা দিয়ে কেনা নয়, চুরি করে আনা ছোট গল্প। 

গান

সারা সপ্তাহের ফিল গুড ফ্যাক্টরের কোটা খানিকটা পূরণ করতে।

September 02, 2016

On Tea




উৎস গুগল ইমেজেস



Make Tea, Not War. 
—Monty Python

If man has no tea in him, he is incapable of understanding truth and beauty. 
– Japanese Proverb

It is very strange, this domination of our intellect by our digestive organs. We cannot work, we cannot think, unless our stomach wills so. It dictates to us our emotions, our passions. After eggs and bacon, it says, "Work!" After beefsteak and porter, it says, "Sleep!" After a cup of tea (two spoonsful for each cup, and don't let it stand more than three minutes), it says to the brain, "Now, rise, and show your strength. Be eloquent, and deep, and tender; see, with a clear eye, into Nature and into life; spread your white wings of quivering thought, and soar, a god-like spirit, over the whirling world beneath you, up through long lanes of flaming stars to the gates of eternity!" 
– Jerome K. Jerome, Three Men in a Boat (To Say Nothing of the Dog), 1889

A cup of tea is a cup of peace. 
– Soshitsu Sen XV, quoted by Kenneth S. Cohen

I always fear that creation will expire before tea time. 
– Reverend Sydney Smith

Drink your tea slowly and reverently, as if it is the axis on which the world earth revolves – slowly, evenly, without rushing toward the future. 
– Thich Nhat Hanh, Zen Teacher

Tea is wealth itself, because there is nothing that cannot be lost, no problem that will not disappear, no burden that will not float away, between the first sip and the last. 
– The Minister of Leaves, The Republic of Tea

We had a kettle; we let it leak:
Our not repairing made it worse.
We haven't had any tea for a week...
The bottom is out of the Universe. 
– Rudyard Kipling, The Collected Poems of Rudyard Kipling

A crisis pauses during tea. 
– Terri Guillemets

A true warrior, like tea, shows his strength in hot water. 
– Chinese Proverb

When you have nobody you can make a cup of tea for, when nobody needs you, that's when I think life is over. 
– Audrey Hepburn




ঋণস্বীকারঃ ইন্টারনেট


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.