November 30, 2016

গোয়েন্দাগল্পের কয়েকটি অবগুণ



সুখীদুঃখী পরিবার নিয়ে টলস্টয়ের আনা কারেনিনার ওপেনিং লাইনটা একটু অদলবদল করে গোয়েন্দাগল্পের ক্ষেত্রেও চালিয়ে দেওয়া যায়। সব ভালো গোয়েন্দাগল্পই একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র (ইন ফ্যাক্ট, এই স্বাতন্ত্র্যই তাদের ভালোত্বের একটা বড় লক্ষণ), কিন্তু সব বাজে গোয়েন্দাগল্পই একরকম। একরকম বলতে আমি প্লট বোঝাচ্ছি না, আমি বলছি কিছু অবগুণ বা দোষের কথা। যে ক’টা বাজে গোয়েন্দাগল্প এ বছর পড়লাম তাদের সবকটিতেই দোষগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। 

কিন্তু আমি বাজে গোয়েন্দাগল্প পড়লাম কেন? পড়লাম একটা খামতি পূরণ করার জন্য। আমি গোয়েন্দা গল্প ভালোবাসি, কিন্তু সে ভালোবাসার অনুপাতে পড়েছি কি? বছরের শুরুতে স্টক নিলাম। খুচরোখাচরা ছেড়ে যে সব লেখকের লেখা ধরে পড়েছি তাঁদের মধ্যে আছেন আদিযুগের কোনান ডয়েল, পো। স্বর্ণযুগের ক্রিস্টি, ডরোথি সেয়ার্স, চেষ্টারটন, মার্জারি অ্যালিংহ্যাম, জোসেফাইন টে, নাইয়ো মার্শ। তার পরের যুগের, যেটাকে রহস্যরোমাঞ্চ সাহিত্যের টাইমলাইন সাইটে কনটেম্পোরারি বলে, সেখানকার রুথ রেন্ডেল, পি ডি জেমস, কলিন ডেক্সটার। আর সমসাময়িকদের মধ্যে অ্যান ক্লিভস, এলিজাবেথ জর্জ, শম্পার বদান্যতায় চার্লস ফিঞ্চ আর জেসন গুডউইন আর অফ কোর্স, রবার্ট গ্যালব্রেথ। (বাংলা গোয়েন্দাগল্প, গোয়েন্দাগল্প ভালো না বাসলেও স্রেফ বাংলায় লেখা হয়েছে বলেই পড়া হত, তাই সেগুলো বাদ দিচ্ছি।)

লিস্টের দিকে তাকালেই কয়েকটা ব্যাপার লাফ মেরে চোখের সামনে দাঁড়ায়। এক, আমার গোয়েন্দাগল্প পড়ার দৌড় নির্লজ্জরকম পশ্চিমমুখী। এ খুঁত অবিলম্বে সারানো দরকার। দু’হাজার সতেরোর আমার একটা রেজলিউশন, ননককেশিয়ান লেখকের ননককেশিয়ান গোয়েন্দার স্টক বাড়ানো। দ্বিতীয়, আমার মনোযোগের সিংহভাগ দখল করে রেখেছেন মহিলা লেখকরা। এটাকে অবশ্য আমি ঠিক সমস্যা বলব না, তবু একরকমের পক্ষপাতিত্ব তো বটেই। কিন্তু আমার মতে গুরুতর হচ্ছে তিন নম্বর সমস্যাটা। সমকালীনই রহস্য সাহিত্যে কী ঘটছে, সে কোন পথে চলেছে, সে সম্পর্কে আমি ঘুটঘুটে অন্ধকারে। আর তা যদি না থাকে তাহলে নিজেকে গোয়েন্দা গল্পের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জাহির করতে বিবেকে বাধে। 

সে বাধা কাটাতে এ বছরের আমার গোপন রেজলিউশনের একটা ছিল আমার জীবৎকালে, বা আরও ভালো হয় গত পাঁচ দশ বছরে, লেখা গোয়েন্দাগল্প পড়ে দেখা। মেনস্ট্রিম গোয়েন্দাগল্প। আগাথা ক্রিস্টি নিজের সময়ে যা ছিলেন, একেবারে মূল ধারার, সেই ধারাটার সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করা। সেটা করতে গিয়ে বুঝলাম সিলেবাস যা জমেছে এক বছরে তা মেক আপ দেওয়া অসম্ভব। শুধু ইংরিজি গোয়েন্দাগল্পই বছরে হাজারখানেক করে বেরোয়। কাজেই চাল টিপে ভাত বিচার ছাড়া রাস্তা নেই।

শুনলে মনে হবে আমি যেন দাঁড়িপাল্লা আর কষ্টিপাথর নিয়ে নেমেছিলাম, সে রকম একেবারেই নয়। নতুন গোয়েন্দাগল্প পড়ার ইচ্ছেটা জেনুইন ছিল। কারণ ভালোবাসাটাও জেনুইন। বুকটিউব আমার বই পড়ার ভোল পাল্টে দিয়েছে (সেটা যে পুরোটাই ভালো হয়েছে তেমন নয় কিন্তু সে নিয়ে পরে বলব) কাজেই আমি ভাবলাম গোয়েন্দাগল্পের ব্যাপারে ওঁরা কী বলেন দেখা যাক। হতাশ হলাম। রহস্যঘরানার প্রতি উৎসর্গীকৃত চ্যানেলের সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকমের কম। তবে ক্রাইম অ্যান্ড থ্রিলার সাহিত্য নিয়ে প্রচুর ব্লগ আছে। সেগুলো টপাটপ ফিডলিতে পুরে ফেললাম। তারপর মন দিয়ে তাঁদের রিভিউ আর সাজেশন পড়তে লাগলাম। কয়েকটা নাম বারবার চোখে পড়ল। লুইস পেনি, ট্যানা ফ্রেঞ্চ, চার্লস টড। এঁরা বছর বছর বেস্টসেলার বাজারে ছাড়েন। আবার কারও কারও নাম চোখে পড়ল যাঁরা লিখেছেন মোটে একটা বই এবং মাত করেছেন। যেমন সুইস লেখক জোয়েল ডিকার। 

সে সব বইয়ের কথা এ মাসের বইতে নেই কেন? কারণ সে সব বইয়ের রেঞ্জ ‘পাতে দেওয়া যায় না’ থেকে শুরু করে ‘চলতা হ্যায়’। কয়েকটা পড়তেই এত কষ্ট হয়েছে যে তাদের নিয়ে লেখার যন্ত্রণা নিজেকে দেওয়ার সাহস হয়নি। 

তবু আমার আফসোস নেই। আমি বিশ্বাস করি বাজে বই পড়া প্রায় ভালো বই পড়ার মতোই জরুরি। তাছাড়া বাজে গোয়েন্দাবই পড়েই তো সেই গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধিটা হল যেটা শুরুতেই লিখলাম। ভালো বই সব নিজের নিজের মতো, বাজে বই সব একরকম। 

বাজে বইদের যে কমন দোষগুলো আমার চোখে পড়ল সেগুলো নিয়েই আজকের পোস্ট। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা দোষ যে কোনও লেখার পক্ষেই প্রযোজ্য। তবে এটাও সত্যি, অন্য ধারার গদ্যে যে খুঁতগুলো চাপা দেওয়া অনেক সহজ, গোয়েন্দাগল্পে, যেখানে প্লটটাই মোদ্দা কথা, সেখানে এসব চাপা দেওয়া অনেক বেশি কঠিন। এই দোষগুলো বাজে গোয়েন্দাগল্পে অনেক বেশি থাকে, কিন্তু কিছু কিছু ভালো গোয়েন্দাগল্পেও থাকে। সে সব গল্পের দুয়েকখানার নামও সততার খাতিরে আমাকে উল্লেখ করতেই হল।

আমি কি এই সব খুঁতহীন লেখা লিখে দেখিয়ে দিতে পারব? মোটেই না। তাহলে অন্যের খুঁত ধরার অধিকার পেলাম কোত্থেকে? এর দুটো উত্তর হয়। মিথ্যে উত্তরটা হচ্ছে, সেখান থেকেই পেলাম যেখান থেকে প্রশংসা করার অধিকার পাই। আর সত্যি উত্তরটা হচ্ছে আমার অধিকার এসেছে, আজকাল বেশিরভাগ অধিকার যেখান থেকে আসে, সস্তা ইন্টারনেট আর কাজের অভাব থেকে। 

*****

১। আমার গোটা ব্লগটা যে ব্যাপারটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, অধিকাংশ বাজে গোয়েন্দাগল্পই সেই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে। অবান্তরতার ফাঁদ। অবান্তরতা দু’ভাবে আসতে পারে। এক, দৃশ্যের মাধ্যমে, দুই, চরিত্রের মাধ্যমে। অবান্তর দৃশ্য হচ্ছে যে দৃশ্য প্লট এগোতে সাহায্য করে না। যে সব দৃশ্য পাতা উল্টে গেলেও গল্পটা আপনি সম্পূর্ণ বুঝতে পারবেন। অবান্তর চরিত্র চিহ্নিতকরণেরও একই পদ্ধতি। চরিত্রটা বাদ দিয়ে দিলে গল্পের যদি কিছু যায় না আসে তবে সেটা অবান্তর চরিত্র। কাজেই পরিত্যাজ্য। 


একটাদুটো থাকলে তবু সহ্য হয়, লুইস পেনির আরম্যান্ড গামাশ সিরিজে এই রকম চরিত্র এবং দৃশ্যের গাদাগাদি ঠেলাঠেলি ভিড়। আরম্যান্ড গামাশ হচ্ছেন কানাডার কিউবেক পুলিশের চিফ ইন্সপেক্টর। শার্লক হোমসের যেমন লন্ডন, মিস মার্পলের যেমন সেন্ট মেরি মিড, ইন্সপেক্টর বার্নাবির যেমন মিডসমার, আরম্যান্ড গামাশের তেমন ‘থ্রি পাইনস’। কিউবেকের একটি অত্যন্ত ছোট, কাল্পনিক গ্রাম। এই থ্রি পাইনস-এ কয়েকজন বাঁধা বাসিন্দা আছেন। তাঁরা সব গল্পেই থাকেন। সে গল্পের প্লটে তাঁদের উপস্থিতির দরকার থাকুক আর না থাকুক। আর যেহেতু তাঁরা থাকেন, তাঁদের ফুটেজ দিতেই হয়। অর্থাৎ অবান্তর দৃশ্য। গামাশ সিরিজের একজন একজন চরিত্র হচ্ছেন রুথ, প্রাইজ পাওয়া কবি। আমি প্রায় হাফ সিরিজ (ছ-সাতটা উপন্যাস) পড়ে ফেলেছি, কোনওটায় রুথের থাকার কোনও কারণ পাইনি। (রুথ একলা নন, এরকম আরও একগাদা চরিত্র আছেন এই সিরিজে)। কোনও গল্পেই তিনি খুনি নন, গোয়েন্দা নন, সহকারী নন, রেড হেরিং নন, ভিকটিম নন। অথচ প্রতি গল্পে তিনি আছেন। এবং ফেলুদায় শ্রীনাথ কিংবা ব্যোমকেশে পুঁটিরামের মতো নেপথ্যচারীর মতো করে নয়, রুথ আছেন সদর্পে। গল্পের মোড়ে মোড়ে রুথকে লেখক কবিতার খাতা খুলে বসিয়ে দিয়েছেন। এমনও নয় সে সব কবিতার মধ্যে ক্লু লুকিয়ে আছে। ওই সব দৃশ্যের একমাত্র উদ্দেশ্য রুথের (বেসিক্যালি, লুইস পেনির, কারণ কবিতাগুলোও তিনিই লিখছেন) কবিত্ব প্রমাণ। 

অবগুণ বলছি বটে, কিন্তু এই অবগুণের উদ্দেশ্যটা মহৎ। অবান্তর চরিত্রের অবতারণা করা হয় পারিপার্শ্বিক ফুটিয়ে তোলার জন্য, আর অবান্তর দৃশ্যের অবতারণা করা হয় এই সব অবান্তর চরিত্রগুলোকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য। বেস্ট হয় এই দুটো কাজই গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে করতে পারলে। ভয়ানক শক্ত ব্যাপার। কিন্তু ভালো গোয়েন্দাগল্প লেখা সহজ তো কেউ বলেনি। 

২। লেখকের পক্ষপাত। অথরব্যাকড রোল সিনেমাথিয়েটারে দেখতে যত ভালো লাগে, গোয়েন্দা গল্পে ততটা নয়। গোয়েন্দা বা তার সাঙ্গোপাঙ্গর প্রতি লেখকের পক্ষপাত চলতে পারে, তার বাইরে চালাতে গেলে বিপদ। এর উদাহরণ খুঁজতে গিয়ে শীর্ষেন্দুর শবর সিরিজের কয়েকটা গল্প মনে আসছে। ঈগলের চোখ-এর বিষাণ চক্রবর্তীর কথা মনে করুন। মারাত্মক ইন্টারেস্টিং চরিত্র। স্বভাব বিশৃঙ্খল, মুখে দর্শনের খই, চেহারা যৌন আবেদনে টইটম্বুর। একই সঙ্গে অপরচুনিটি আর মোটিভের দিক থেকে সন্দেহভাজনদের লিস্টের একেবারে মাথায় বিষাণের নাম। কিন্তু গল্পের গোড়া থেকেই গোয়েন্দা শবর এবং লেখক শীর্ষেন্দুর নেকনজর বিষাণের প্রতি। যত ভাবগম্ভীর ডায়লগ তার মুখে। শবরও সহকারীর কাছে একান্তে বিষাণের প্রতি সমব্যথা প্রকাশ করেন যখনতখন। একচোখোমিটা এতই প্রকট যে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে ধরে নেওয়া যায় যে একে জেলে পোরা লেখকের কলজেতে কুলোবে না। অর্থাৎ এ খুনি নয়। মোটিভ, অপরচুনিটি থাকা সত্ত্বেও স্রেফ লেখকের পক্ষপাতদুষ্টতার জন্য একজনকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে হওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। 

৩। পাঠকের বীতরাগ। লেখক নিজে কাউকে ভালোবাসবেন না ঠিকই, তা বলে কোনও চরিত্রকে অকারণে পাঠকের বিতৃষ্ণার পাত্র করে না তোলাই ভালো। ভিলেনকে করলে তবু একটা বোঝা যায়। কিছু কিছু গল্পে স্বয়ং গোয়েন্দা এত বিরক্তিকর হন, ভাবা যায় না। গোয়েন্দা বা প্রধান চরিত্রের প্রতি কেন পাঠকের নেকনজর থাকা উচিত তার একটা কারণ আমার মনে হয়, তাতে গল্পে ঢুকতে পাঠকের সুবিধে হয়। মিস মার্পল, ফেলুদা কিংবা পোয়্যারোকে যেহেতু আমি পছন্দ করি, তাঁদের গল্প খারাপ হলেও আমার পড়তে অসুবিধে হয় না। আমার চেনা অনেক লোকের ‘গার্ল অন্য দ্য ট্রেন’ ভালো লাগেনি মূলত গল্পের প্রধান চরিত্র ‍র‍্যাচেলকে ভালো লাগেনি বলে। গিলিয়ান ফ্লিন-এর গন গার্ল আমার ভালো লাগেনি। আমি যদি গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র নিক ডান-এর প্রতি আরেকটু সমব্যথা জোগাড় করতে পারতাম তবে ভালো লাগলেও লাগতে পারত। 

অফ কোর্স, পছন্দঅপছন্দের কথা তুললেই ব্যাপারটা ব্যক্তিগত হয়ে যায়। আমার উদাসীনতা ভালো লাগে না, কারও আবার ওইটাই ইরেজিস্টেবল লাগে। আমার চেনা কারও কারও দীপকাকুকে পছন্দ ওঁর ওই নিভুনিভু ব্যক্তিত্বের জন্যই। দীপকাকুর মতো একেবারেই নন হয়তো, দীপকাকু প্রাইভেট, ইনি পুলিশ, দীপকাকুর প্রেম নেই (থাকলেও আমরা জানি না), ইনি গল্পে গল্পে একেক নারীর প্রেমে পড়েন কিন্তু একটাও প্রেম করে উঠতে পারেন না, তবু দীপকাকুর কথা উঠলেই আমার কলিন ডেক্সটারের ইনস্পেক্টর মর্স-এর কথা মনে পড়ে। বলাই বাহুল্য, ভদ্রলোক আমার গুডবুকে নেই। 

ভালো লাগতে গেলে গোয়েন্দার প্রতি মনোভাব যে অনুকূলই হতে হবে এমন নয়। জাস্ট কৌতূহল অনেক সময় ভালো কাজ দেয়। গার্ল অন দ্য  ট্রেন-এর র‍্যাচেলকে ভালোলাগানো শক্ত, কিন্তু আমি মহিলার প্রতি কৌতূহলী ছিলাম। রবার্ট গ্যালব্রেথের করমোরান স্ট্রাইককে আমার মোটেই ভালো লাগে না। কিন্তু আমি লোকটার প্রতি কৌতূহলী। সে কেস সমাধান করতে পারল কি না তাতে আমার একটা কৌতূহল আছে। যুদ্ধফেরৎ বিকলাঙ্গ গোয়েন্দা, রকস্টার বাবার অবৈধ সন্তান। অন্যরকমত্বের ডিপো। কম শক্তিশালী কোনও লেখকের হাতে পারলে চরিত্রটা ক্যারিকেচার হয়ে যাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা ছিল। আমি কৌতূহলী জেসন গুডউইনের গোয়েন্দা ইয়াশিমের প্রতি। ইয়াশিমের যৌনপরিচয়, তাঁর রান্নাবান্নার প্রতি আগ্রহ, সবথেকে ইন্টারেস্টিং হল সে সময়ের ওটোমান সাম্রাজ্যের রাজারাজড়াদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা গলাগলি। 


তবে প্রেক্ষাপট ইন্টারেস্টিং হলেই যে গোয়েন্দা ইন্টারেস্টিং হয় না তার প্রমাণ রেখেছেন চার্লস টড তাঁর বেস ক্রফোর্ড সিরিজে। চার্লস টড হচ্ছেন অ্যামেরিকার মা (ক্যারোলিন টড) আর ছেলের (চার্লস টড) লেখক জুটি। এঁদের গোয়েন্দা হলেন বেস ক্রফোর্ড, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একজন নার্স। বুঝতেই পারছেন, প্রেক্ষাপট রোমহর্ষক। বেস সিরিজের যে গল্পটা আমি প্রথম পড়েছি, অ্যান ইমপার্শিয়াল উইটনেস, সেখানে দেখা যাচ্ছে একজন মৃত সৈনিকের সংগ্রহের একটি ছবির সূত্র ধরে বেস একটি রহস্যের খোঁজ পান এবং সমাধানে লেগে পড়েন। চার্লস টডের লেখা একেবারে প্রথম দরের নয়, তাছাড়া যে টেকনিক্যাল গলদগুলোর কথা ওপরে বললাম সে সবেরও কিছু কিছু আছে। কিন্তু বেস ক্রফোর্ড সিরিজের প্রধান খামতি বেস নিজে। সাহসী এবং স্বাধীন মহিলা চরিত্র লিখতে গিয়ে একটা ট্রোপ বারবার লেখকরা ব্যবহার করেন, গোয়েন্দা অগোয়েন্দা নির্বিশেষে, সেটা হচ্ছে চরিত্রটিকে প্লেন ঝগড়ুটে বানিয়ে ফেলা। এ কথাটা বলার সময় আমি মাথায় রাখছি যে  ‘সুললিত ব্যক্তিত্ব’ কোটার নম্বরটা মেয়েদের ক্ষেত্রে ওয়েটেজ অনেক বেশি পায়। তাছাড়া সে যুগ পুরুষসর্বস্ব কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য ও গুরুত্ব আদায় করতে গেলে পাপোশ হয়ে থাকলে যে চলত না সেটা নিয়েও আমার কোনও সন্দেহ নেই। এই সব মাথায় রেখেও বেসকে ইরিটেটিং বলতে আমি বাধ্য হচ্ছি।

৪।  শুনেছি নিয়ম না ভাঙলে গ্রেট হওয়া যায় না। কিন্তু গুড হতে গেলে কিছু নিয়ম মানা দরকার বলেই আমার বিশ্বাস। গোয়েন্দাগল্পের নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে।  যেমন It must baffle a reasonably intelligent reader. (Raymond Chandler)  কিংবা  There simply must be a corpse in a detective novel, and the deader the corpse the better. (S. S. Van Dine) এ সব নিয়ম আপেক্ষিক, এগুলো নিয়ে তর্কের অবকাশ আছে। কিন্তু তর্কাতীত কিছু টেকনিক্যাল নিয়মও আছে, যেমন যাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হবে তার সঙ্গে পাঠকের যথেষ্ট আলাপপরিচয় তৈরি করা। শেষ পাতায় গিয়ে হুড়মুড়িয়ে সব ব্যাখ্যা না দেওয়া। হ্যানসেল গ্রেটেলের মতো গল্পের পথে পাউরুটির গুঁড়োর মতো ক্লু ছড়াতে ছড়াতে যাওয়া, যাতে পাঠকরা নিজেরা রহস্য উন্মোচনের অন্তত অ্যাটেম্পট নিতে পারেন ইত্যাদি।


আরও একটা নিয়ম আছে, যেটাকে যে নিয়মের মধ্যে গণ্য করা দরকার সেটা আমার মাথাতেই আসেনি। ট্যানা ফ্রেঞ্চ-এর ডাবলিন মার্ডার স্কোয়্যাড সিরিজের প্রথম গল্প ‘ইন দ্য উডস’ না পড়লে আসতও না। হাঁটার নিয়ম যেমন একপায়ের সামনে আরেক পা ফেলা, খাওয়ার নিয়ম যেমন চিবোনোর পর গলাধঃকরণ, শত্রু কম রাখার নিয়ম যেমন মুখ বুজে থাকা তেমনি গোয়েন্দাগল্পের একটা বেসিক নিয়ম হচ্ছে যে সমস্যাটা দিয়ে গল্পটা শুরু হচ্ছে শেষে গিয়ে সে সমস্যার সমাধান পাঠকের গোচরে আনা। ‘ইন দ্য উডস’ শুরু হয় তিনটি বাচ্চার গল্প দিয়ে। দু’পাতার পূর্বরাগে চমৎকার ভাষায় লেখক এক বিকেলের বর্ণনা দেন, যখন পাড়ার তিনটি বাচ্চা খেলতে খেলতে গ্রামের পাশের বনে ঢুকে পড়ে আর ফিরল না। সারা সন্ধ্যে মাঝরাত পেরিয়ে শেষমেশ পাড়ার লোক আর স্থানীয় পুলিশ তিনজনের একজনকে খুঁজে পেল। ভয়ে প্রায় পাথর, গাছে পিঠ ঠেকে গেছে, নখ ঢুকে গেছে গাছের ছালে। ভয়ের এরকম জেনেরিক বর্ণনা দিয়েই ক্ষান্ত হননি লেখক, একটি কৌতূহলোদ্দীপক ক্লু-এরও উল্লেখ করেছেন। ছেলেটির মোজাও নাকি রক্তে ভেজা ছিল। এক, সেটা মানুষের রক্ত। দুই, সেটা তার নিজের রক্ত নয়। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ আর পরীক্ষানিরীক্ষার পর পুলিশ আর ডাক্তার দু’দলই মেনে নেন যে ছেলেটির স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে। ওই রাতের ঘটনা ছেলেটির মাথা থেকে সম্পূর্ণ মুছে গেছে। 

পরের চ্যাপ্টার শুরু হচ্ছে এর আঠেরো (নাকি কুড়ি? ভুলে গেছি। এত কথা যে মনে আছে তাতেই আমি ইমপ্রেসড) বছর পর। সেই খুঁজে পাওয়া ছেলেটি এখন পুলিশে চাকরি করে। দু’তিন পাতার মধ্যেই একটা কেস আসে থানায়। সেই বনে, যেখানে তার দুই বন্ধু চিরকালের মতো হারিয়ে গিয়েছিল, একটি মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে। পড়েই আপনি নড়েচড়ে বসছেন নিশ্চয়, এতদিনে তবে সেই রহস্যের সমাধা হবে। তদন্ত শুরু হল। স্বাভাবিক ভাবেই, তদন্ত চালাতে গিয়ে ছেলেটির মাথায় বারবার সেই রাতের টুকরোটুকরো স্মৃতি ভেসে উঠছে, মানসিক বিচলন, দুঃস্বপ্ন হ্যানাত্যানা। বর্তমান তদন্তটা একেবারে জোলো, কিন্তু আপনি আশা ছাড়ছেন না। আপনি ভাবছেন এক্ষুনি ছেলেটির হারানো স্মৃতি ফিরে আসবে। এই জোলো খুনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ওই রোমহর্ষক অন্তর্ধানের চাবিকাঠি। এগোতে এগোতে গল্প একসময় ফুরিয়ে গেল। কুড়ি বছর আগের রাতে কী ঘটেছিল অজানাই রয়ে গেল। পুলিশ হিরো দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আপনি বইখানা ছুঁড়ে ঘরের কোণে।

গোয়েন্দাগল্পের সব নিয়মের বড় নিয়ম হচ্ছে It must be honest with the reader. (আবারও Raymond Chandler)। আমার মতে ট্যানা ফ্রেঞ্চের ইন দ্য উডস সে নিয়মটাই ভাঙে। এক (ভালো) রহস্যের গাজর নাকের সামনে ঝুলিয়ে সম্পূর্ণ অন্য (পচা) রহস্য চালায়। এর একমাত্র ব্যাখ্যা হচ্ছে সিরিজ বেচার ফন্দি। মোজার রক্তের উৎস ধাওয়া করতে আপনি পরের বই, তার পরের বই, তার পরের বই এই করে গোটা সিরিজ কিনবেন। অন্তত প্রকাশকের (লেখকেরও কি নয়?) তেমনই আশা। অন্যদের কথা জানি না, এ সব ফন্দিটন্দি দেখলে পড়ার ইচ্ছে আমার যত দ্রুত অন্তর্হিত হয় তত দ্রুত আর কিছুতে হয় না। 

*****

অবান্তরের পাঠকদের কাছে আমার অনুরোধ, যদি নতুন গোয়েন্দাগল্প কোনও ভালো লেগে থাকে, তাহলে আমাকে জানাবেন। ভালো লাগা খারাপ লাগা পরের ব্যাপার। পড়া তো হবে।

(ছবির উৎস গুগল ইমেজেস)



November 27, 2016

সাপ্তাহিকী



শিল্পীঃ Eric Standley. শিল্পীর আরও কাজের নমুনা এখানে দেখতে পাবেন। 

It is is better to know one book intimately than a hundred superficially. 
                                                   ---Donna Tartt, The Secret History


1) “Us” and “Them” 2) Obey orders 3) Do “them” harm 4) “Stand up” or “Stand by” 5) Exterminate. Five steps to tyranny.


নেদারল্যান্ডের ট্যুরিজম স্লোগানটা আমার দারুণ লেগেছে। দ্য অরিজিন্যাল কুল। আমাদেরটাও খারাপ না, ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া। অন্য সব দেশের ট্যুরিজম স্লোগান জানতে হলে এই ম্যাপটা দেখুন। 


ক্লিক ক্লিক ক্লিক। আমরা যখন ব্রাউজ করি তখন ব্রাউজার আমাদের সম্পর্কে কী কী ধরে ফেলতে পারে জানাটা বেশ আননার্ভিং

এন্ডলেস মেমোরি। যা যা ঘটেছে জীবনে কিছুই না ভোলা। গিফট কেন হতে যাবে বালাই ষাট, এর থেকে বড় অভিশাপ আর কিছু নেই। 

অন্য কোনও উদ্দেশ্য থাকলে দৌড়তেই পারেন। কিন্তু ফিটনেসের মোক্ষলাভে, হাঁটু মাটি করা ছাড়া দৌড়ের আর বিশেষ ভূমিকা নেই।

ইলেকট্রিক গাড়ি এত নিঃশব্দে চলে যে যখনতখন লোকে চাপা পড়তে পারে। আদালত বলেছে যে এবার থেকে গাড়িতে আওয়াজ করা বাধ্যতামূলক।

জিরাফ আমার অন্যতম প্রিয় জন্তু। লম্বাটে গড়ন, শান্ত চোখ। ওদিক থেকে একদল জিরাফ আসছে। এদিক থেকে একটা জিরাফ যাচ্ছে। এদিকটার জিরাফটার চালচলন বিশেষ ভালো না। ক্যাসানোভা বলা যায়। ওর ইচ্ছে ওদিক থেকে আসা জিরাফগুলোর সবাইকে চুমু খায়। এদিকের জিরাফের একটাই রিডিমিং গুণ, বাছবিচার নেই, যে আসবে তাকেই চুমু খাবে। সমস্যা হল ওদিক থেকে আসা জিরাফদের একেকজনের গলা একেক দৈর্ঘ্যের। আপনার দায়িত্ব হচ্ছে ক্যাসানোভা জিরাফের গলা দরকার মতো বাড়ানো কমানো যাতে সে একটাও চুমু মিস না করে। 


ব্যাম্বু বোট, গুরগাঁও



কালকের মতো সুন্দর সকাল দিল্লিতে কমই আসে। ঝকঝকে রোদ। পিঠের শাল ভেদ করে ঠিক ততটুকুই তাপ আসছে যতটুকু দরকার। বারান্দায় দাঁড়ালে সজনে গাছের হাওয়ায় গা শিউরোচ্ছে। আউটিং-এর জন্য পারফেক্ট। 

আউটিং-এর কথা সবাই জানত। আমরাই, অর্চিষ্মান ভুরু কোঁচকাচ্ছে, আচ্ছা, আমরা নয়, আমিই জানিয়েছিলাম। সেলফ হেল্প গুরুরা বলেন সাফল্যের একটা শুরুর শর্ত হচ্ছে অ্যাকাউন্টেবিলিটি। অর্থাৎ তুমি যদি পাঁচটা লোককে বল যে তুমি এবার থেকে রোজ দু’ঘণ্টা করে লিখবে, তাহলে লোকের কাছে মুখরক্ষার জন্যই দু’ঘণ্টা না হোক, আধঘণ্টা করে লিখতে বসা হবে। নিজের কাছে প্রমিস করে কিছু হয় না। নিজেকে নিজে বললে, আজ থেকে রোজ দু’ঘণ্টা লিখব, তারপর ভোরবেলা উঠে গা মুচড়ে বললে, আজ মনটা ভালো নেই, বড্ড পেট কামড়াচ্ছে, আজ থাক, কাল থেকে হবে। প্রমিস। ‘নিজে’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল। 

গত ক’মাস ধরে নিজেদের কাছে কতবার যে বেড়াতে যাওয়ার প্রমিস করলাম। সকালে অফিস যাওয়ার পথে উইকএন্ড ডেসটিনেশন ফ্রম ডেলহি দেখতে দেখতে গেলাম। বাড়ি এসে ইন্ডিয়ান রেলের সাইট ঘাঁটলাম। শতাব্দীর কোন কোচে কবে কত সিট খালি মুখস্থ হয়ে গেল। যাওয়া হল না।

সব গিয়ে যখন কালকের আউটিং স্থির হল, আমি পত্রপাঠ ফোন করে বলে দিলাম। তিন্নিকে, মাকে। যে শনিবার আমরা বেড়াতে যাচ্ছি। মা সক্কাল সক্কাল ফোন করে মনে করালেন, ‘কী সোনা, আজ তোমাদের আউটিং তো? সাবধানে যেও। স্টাইল করতে গিয়ে টুপি বাদ দিও না।’

তারপর সাবধানে, পাছে মেয়ের পার্সোনাল স্পেসে পা দিয়ে ফেলেন, বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছিস সোনা? নাকি সিক্রেট?’ আমি বললাম, ‘এই তো সিনেমা দেখে খেয়ে ফিরব।’ মা দু’সেকেন্ড পর বললেন, ‘ওহ, আমি ভাবলাম অনেক দূর যাচ্ছিস বুঝি।’ 

ন’টা পঞ্চাশে সত্যম নেহরু প্লেসে শো, সিনেমার নাম অ্যারাইভাল। একেকসময় এমন হয় একটাও পছন্দসই সিনেমা আসে না। আর এখন ফ্যান্টাস্টিক বিস্ট না অ্যারাইভ্যাল, কোনটা দেখব ঠিক করতে গলদঘর্ম। শেষপর্যন্ত বর্ণনায় বুদ্ধি করে ‘সাইফাই’এর সঙ্গে ‘মিস্ট্রি’ জুড়ে দেওয়ায় অ্যারাইভ্যাল জিতল। ফাঁকা হলে বসে পপকর্ন খেতে খেতে দু’ঘণ্টা কাটালাম। অ্যারাইভ্যাল আমাদের দুজনেরই ভালো লেগেছে। এ রকম সাইফাই সিনেমার একটা বোনাস ভালোলাগার ব্যাপার হচ্ছে কে ঠিক বুঝেছে আর কে ভুল সেটা নিয়ে টাইমপাস করা যায়। টুইটারে যে সব সেলিব্রিটি সিনেমা দেখে এসে একশোচুয়াল্লিশ বর্ণে সিনেমার গল্প না বলে থাকতে পারেননি তাঁদের বুদ্ধির দৌড় নিয়েও হাসাহাসি করা যায়। 

ভেবেছিলাম গুরগাঁও পর্যন্ত যেতে যেতে মাঝপথে কথা ফুরিয়ে যাবে, তাই একবার মনে হয়েছিল ব্যাগে দু’খানা বই ভরে নেব। একে অপরকে সিনেমার মানে বোঝাতে বোঝাতে আর সেলেব্রিটিদের নিয়ে হাসাহাসি থামতে থামতে দেখি অর্ধেক রাস্তা ফুরিয়ে গেছে। গুরগাঁও থেকে বহু লোকে দিল্লিতে রোজ চাকরি করতে আসে এবং ফিরে যায়। যারা যায় না তাদের কাছেই দূরত্বটা মনে হয় অনতিক্রম্য। ইদানীং জোম্যাটোতে পছন্দসই অনেক দোকানের ঠিকানাই গুরগাঁও দেখি। অনেক দূর বলে সরিয়ে রাখি।

সময়পুর বদলি-র মতো চমৎকার নামওয়ালা ষ্টেশন থেকে ইয়েলো লাইনের মেট্রো যায় হুডা সিটি সেন্টারমার্কা বদখত নামওয়ালা ষ্টেশনে। আমাদের মেট্রোটা অবশ্য একেবারে হুডা সিটি সেন্টার যায়নি, কুতুবমিনার ষ্টেশনে শেষ হয়ে গেল। প্ল্যাটফর্ম থেকে দিগন্তে জঙ্গলের মাথার ওপর জেগে থাকা কুতুবমিনারের তিনটে থাক দেখে ফোন তাক করলাম। করতে না করতেই পেছনে গুমগুম শব্দ, পাশের প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকে গেছে। অর্চিষ্মান কনুই ধরে টান মারল, কোনওমতে স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে ছুটলাম। দুটো করে সিঁড়ি টপকে নেমে দুটো করে সিঁড়ি টপকে উঠে ট্রেনে ঢুকে ফোন খুলে দেখি ক্যামেরা ঘোরানো ছিল সেলফি মোডে, কুতুবমিনারের বদলে নিজের নাকের ক্লোজ আপ তুলেছি। 

ইন্ডিগো গুরু দ্রোণাচার্য, সিসকা এল ই ডি এম জি রোড ষ্টেশন পেরোতে পেরোতে দেখলাম জঙ্গলের ওপারে পলিউশনের ধোঁয়ার মধ্যে মাথা তুলেছে বিরাট বিরাট অট্টালিকা। শালিমার হুডা সিটি সেন্টার ষ্টেশন থেকে দু’কিলোমিটার দূরে সুপারমার্ট টু। তার পেছনে ব্যাম্বু বোট রেস্টোর‍্যান্ট। দিল্লিতে থেকেই খোলা বুককেস ধুলোমুক্ত রাখতে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়, গুরগাঁওয়ের লোকেরা কী করেন আমি জানি না। চারদিকে বাড়ি বানানো চলছে, রাস্তা ছেড়ে ফুটপাথে নামলে দু’ইঞ্চি ধুলোয় জুতো ডুবে যায়। 

ব্যাম্বু বোট। মূলত ডেলিভারির জন্য বানানো হয়েছিল, খদ্দেরদের দাবিতে বসার জায়গার ব্যবস্থা পরে করা হয়েছে। ব্যাম্বু বোট-এ কোরিয়ান, জাপানিজ, ভিয়েতনামিজ আর টিবেটান গোটাদুই আইটেমও পাওয়া যায়। আমরা গিয়েছিলাম মূলত বান মি-র আকর্ষণে। বান মি হচ্ছে ভিয়েতনামিজ একরকমের স্যান্ডউইচ। স্যান্ডউইচ আমার অন্যতম প্রিয় ফুড গ্রুপ আর আমার প্রিয়তম স্যান্ডউইচ হচ্ছে বান মি। ভিয়েতনামিজ ব্যাগেটের ভেতর পোরা মাংস কিংবা মাংসের পেস্ট কিংবা অন্য কিছু। তবে আমার মতে মাংসটা আসল নয়, আসল হচ্ছে ভিয়েতনামিজ ব্যাগেট যেটা ফ্রেঞ্চ ব্যাগেটের থেকে বেঁটে আর নৌকোর মতো দেখতে আর তার থেকেও আসল হচ্ছে ভিনিগারে ভেজানো শশা, ধনেপাতা, গাজর, ডাইকন আর পাতলা পাতলা লাল কচি মুলো মিলিয়ে যে একটা তাজা সুগন্ধী কম্বিনেশন। 

স্যাডলি, ব্যাম্বু বোট-এর বান মি-তে এ দুটোর কোনওটাই নেই। ব্রেডের ব্যাপারটা ভদ্রমহিলা শুরুতেই বলে দিলেন। ভিয়েতনামিজ ব্যাগেট ওঁর খরিদ্দাররা পছন্দ করেনি। শক্ত বলে অভিযোগ করেছে। এই অভিযোগটা আমি কল্পনা করতে পারি। অর্চিষ্মানও কড়মড়ে পাউরুটি পছন্দ করে না, ওর ভালো লাগে অ্যামেরিকান স্টাইল হোয়াইট ব্রেড যেগুলো চিবোতে গেলে টাকরায় সেঁটে যায়। কাজেই ব্যাম্বু বোট এখন ভারতীয় পাউরুটি দিয়ে বান মি বানায়। 

পুলড পর্ক বান মি। ভেতরে শশা ধনেপাতা মুলোও নেই। বেসিক্যালি পুলড পর্ক স্যান্ডউইচ। ভালো খেতে। অর্চিষ্মান খুব তারিয়ে তারিয়ে খেয়েছে। আমি বান মি-র জন্য হন্যে হয়ে না থাকলে আমারও ভালো লাগত।

এই হার্টব্রেকটা বাদ দিলে ব্যাম্বু বোটের আর সব ভালো। বসার জায়গা ভালো। ডানদিকে উঁচু পাঁচিলের আড়াল থেকে এসে পড়া সূর্যের রশ্মি ভালো, গাছের সবুজ সজ্জা ভালো, ভদ্রমহিলার ব্যবহার অত্যন্ত ভালো। সবথেকে বড় কথা বাকি যে দুটো খাবার আমরা অর্ডার করেছিলাম, টুনা কিমবাপ আর চিকেন রমেন, সে দুটোও মারাত্মক ভালো।

আমার বেস্ট লেগেছে টুনা কিমবাপ। কিমবাপকে কোরিয়ান সুশি বলে চালানো যায়। শুকনো সিউইডে জড়ানো আঠাভাত আর টুনামাছের পেস্ট। বান মি-তে যে জিনিসটা থাকার কথা ছিল, ওই শশা ধনেপাতার কম্বোটা, এই কিমবাপে আছে। টুনার পরিমাণেও কিপটেমো নেই। তিল ভাসানো সয়া সসে চুবিয়ে মুখে পুরলেই স্বর্গ। 

চিকেন রমেন, খুব সরল করে বললে, ম্যাগির সুপ। খারাপ লাগার কথাও ছিল না, লাগেওনি। আবহাওয়া ঠাণ্ডা হয়ে আসতে বাড়িতে আমরা আজকাল ঝোলঝোল ম্যাগি খাচ্ছি মাঝে মাঝে, ব্যাম্বু বোটের রমেনে এক্সট্রা হল গিয়ে মিসো পেস্টের নোনতা স্বাদ, মোটা মোটা মুরগির মোটা কিন্তু নরম টুকরো, আর মাশরুম। মচৎকার।

দূরত্ব আর অ্যাকটিভিটির মাপকাঠিতে আমাদের কালকের বেড়ানোকে আউটিং বলাটা বাড়াবাড়ি হবে হয়তো, কিন্তু আনন্দ দিয়ে মাপলে দশটা আউটিং-এর সমান হয়েছে।



November 20, 2016

November 19, 2016

সাপ্তাহিকী







What it comes down to, Red, is some people refuse to get their hands dirty at all. That's called sainthood, and the pigeons land on your shoulders and crap all over your shirt. The other extreme is to take a bath in the dirt and deal any goddamned thing that will turn a 37 dollar-guns, switchblades big H. . .  guys like us, Red, we know there's a third choice. An alternative to staying simon-pure or bathing in the filth and the slime. It's the alternative that grown-ups all over the world pick. You balance off your walk through the hog-wallow against what it gains you. You choose the lesser of two evils and try to keep your good intentions in front of you. And I guess you judge how well you're doing by how well you sleep at night . . . and what your dreams are like. " 
                                  --- Stephen King, Rita Hayworth and Shashank Redemption



ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার। Post-truth:  relating to or denoting circumstances in which objective facts are less influential in shaping public opinion than appeals to emotion and personal belief.

এই আর্টিকলটা পড়ার পর থেকে ভাবা নিয়ে ভাবছি। রোজ বেরোনোর আগে যখন ভাবি ‘গ্যাস বন্ধ করেছি তো?’ তখন কি এই চারটে শব্দ মাথায় আসে নাকি রান্নাঘরে গ্যাসের ছবিটা আর ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েকটা শব্দ মিলেমিশে আসে?

মাইকেল রকেফেলার কে সেটাই জানতাম না। তাঁর কী হয়েছিল তো দূরের কথা। 


এটাও জানা কথা, তবে মনের আড়ালে ছিল। ঠিকই। প্রোডাক্টিভিটির রহস্য আসলে কী কী করলাম তা নয়। কী কী করলাম না, তাই। কারণ কিছু না করে বসে আছি এমন তো কখনওই ঘটে না। নানারকম আবোলতাবোল করে সময় খরচ করি। কাজেই টু ডু লিস্টের বদলে আমার নট-টু-ডু লিস্ট বানানো উচিত। যেমন, বিছানা ছাড়ার আগে ইন্টারনেটের মুখদর্শন না করা, কাজ শুরুর আগে ওয়ার্ম আপে দশ মিনিটের বেশি ব্যয় না করা ইত্যাদি। 



November 16, 2016

On Lightness of Literature



After forty years of writing fiction, after exploring various roads and making diverse experiments, the time has come for me to look for an overall definition of my work. I would suggest this: my working method has more often than not involved the subtraction of weight. i have tried to remove weight, sometimes from people, sometimes from heavenly bodies, sometimes from cities, above all i have tried to remove weight from the structure of stories and from language. 

                                   ---Italo Calvino, Six Memos for the Next Millennium



November 13, 2016

সাপ্তাহিকী






The way a person does one thing is the way they do everything.
                                                                                                      —Zen Proverb 

আপনার কফির কাপ দিনে ক’বার ধোওয়া উচিত? এদের উত্তরটা আমাকে অবাক করেছিল, দেখুন তো আপনাকে করে কি না। 

ভয়ার্ত মাধুরী দীক্ষিতের পেছনে গোটা কলেজ নিয়ে গান গাইতে গাইতে ছুটতে থাকা আমির খানকে দেখে বড় হলেও এ জিনিস হৃদয়ঙ্গম না করার একটা সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে।  


এ সপ্তাহের গান। শুনলেই স্ট্রেস হুড়হুড় করে কমবে। 


November 12, 2016

Shocking and depressing things I learned this week



আমি শকড, আমার বাড়ির লোক শকড, আমার লতাপাতার আত্মীয়রা শকড, আমার অফিসের সহকর্মীরা শকড, আমার উবারপুলের সহযাত্রীরা শকড, আমার ফিডলিতে যে সব ব্লগাররা আছেন, বই থেকে বিউটি থেকে বেকিং থেকে বাড়ি সাজানো, তাঁরাও সকলেই শকড। 

আমি যে অ্যামেরিকাটাকে চিনি, সে অ্যামেরিকাটাও অন্য অ্যামেরিকাটাকে দেখে শকড।

অ্যামেরিকা পর্যন্ত যাওয়ার দরকার নেই। আমার দেশের মধ্যেও কোটি কোটি দেশ ঘাপটি মেরে রয়েছে যাদের সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণ অন্ধকারে। মাঝে মাঝে সে সব দেশের সঙ্গে আমার মোলাকাত হয়ে যায় এবং আমি শকড হই। যত দিন যাচ্ছে তত শকের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ছে। আমার সঙ্গে এক ভাষা, এক শহর, এক মফস্বল, এক সরকারি স্কুলিং, বার্ষিক আয়ের এক ব্র্যাকেট, নানাবিধ প্রিভিলেজ ও প্রতিকূলতার স্তর ভাগ করে নেওয়া লোকজন, আমি ধরে নিয়েছিলাম তাঁরা নিশ্চয় আমার মতোই হবেন, আমি শকড এই দেখে যে সেই ধরে নেওয়াটা কী অসাধারণ ছেলেমানুষি হয়েছিল। তাদেরও বেশিরভাগকেই আমি আসলে চিনি না। যে লোকটার কথা শুনে আমার হাত পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে, ঘাড়ের রোঁয়া খাড়া হয়ে যাচ্ছে, সেই একই লোকের সেই কথাগুলো শুনেই তাঁদের কারও কারও মনে হচ্ছে যাক, এতদিনে কেউ সত্যি কথা বলার সাহস দেখাল। হয়তো তিনিও আমাকে দেখে আমার মতোই অবাক হচ্ছেন। ভাবছেন এও তো আমাদের মাটিতেই গজিয়েছে, তাহলে এ এরকম উদ্ভট হল কী করে? গ্লাস সিলিং ভাঙল না বলে হাহুতাশ করছি, কিন্তু এও তো একরকমের কাচের বুদবুদ, যেটা আমি নিজেই নিজের চারপাশে বানিয়ে রেখেছি। আমি শকড যে সেই বুদবুদটার পরিধি আসলে কতখানি সংকীর্ণ। আমি শকড যে আমি কত কম লোককে চিনি, এবং যাদের চিনি তারা সকলেই কী ভয়ংকর রকম আমার মতো।

*****

প্যানিক হয়েছিল। যতটা নিজেদের জন্য তার থেকে বেশি মাবাবার জন্য। আমার বাড়িতে খাবারদাবার আছে, আমার ফোনে পেটিএম আছে, উবার অ্যান্ড ওলামানি আছে, জোম্যাটোয় অনলাইন খাবার অর্ডার দেওয়ার অপশন আছে। 

আমার মাবাবার ক্রেডিট কার্ড আছে, কিন্তু তাঁরা যে সব দোকান থেকে মুড়িচিঁড়ে কেনেন সে সব দোকানে সে কার্ড মিনিংলেস। যে সব যানবাহনে তাঁরা চড়েন, রিকশা, অটো এবং ট্রেন, সে সব বাহনে ক্রেডিট কার্ড একটা প্লাস্টিকের কার্ড বই আর কিছু না। 

তোমাদের খুব অসুবিধে হচ্ছে, তাই না মা? 

এই প্রশ্নটায় অন্তর্নিহিত শঠতা আছে। কারণ মাবাবার অসুবিধে হলেও আমি তার সুরাহা করতে যাব না। তবু জিজ্ঞাসা করি। এই পরিস্থিতিটা অবশ্য ইউনিক, কারণ মাবাবা যে দ-য়ে আমিও সেই দ-য়েই, কিন্তু আমার অন্তত প্লাস্টিক টাকা আছে, সে টাকা ব্যবহারের জায়গা আছে, আমার মাবাবার সেটা নেই। 

টাকা ফুরিয়ে গেলে কী করবে? যথেষ্ট চালডাল আছে ঘরে? ওষুধ কিনে রেখেছ?

মা হা হা করে হাসলেন। আমাদের এখানে জন্মকর্ম বাস, আমাদের এখানে অসুবিধে হবে? টাকা ফুরিয়ে গেলে কেষ্টদার ছেলে আমাদের চাল দেবে না? জহর ডিম দেবে না? কল্পতরু ক্যালপল দেবে না?

লোকগুলোর মুখ মনে পড়ল। সম্ভাবনাটা সত্যি কল্পনার অতীত। এঁদের সঙ্গে মা জীবনের ঊনচল্লিশটা বছর, বাবা আরও বেশি, ইনভেস্ট করেছেন। আর এ তো ব্যাংক নয়, মানুষ। সম্পর্ক। এর রিটার্ন নিয়ে কোনও অনিশ্চয়তা নেই। 

মা বললেন, অসুবিধে হবে তোদের। কারণ সব জায়গায় কার্ড চলবে না, আর যে সব জায়গায় চলবে তারা তোদের ভালো করে চেনেই না। 

বেসিক্যালি আমিই ব্যাকফুটে। আমার বাবামা নন। 

ডিপ্রেসিং।

*****

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যেবেলায় মুদির দোকানে চাল কিনতে গিয়েছিলাম। শুধু চালই কারণ তার থেকে বেশি কিছু কেনার ক্যাশ আমার কাছে ছিল না। আমার পাশে একজন দাঁড়িয়ে চারটে বড় বড় প্লাস্টিকের প্যাকেট ভর্তি করে থরে থরে চালডাল দুধদই চিজমাখন ডিমপাউরুটি কিনছিলেন এবং দোকানদারকে উপদেশ দিচ্ছিলেন কেন কার্ডব্যবস্থা চালু করা উচিত। 

আর সেই মুহূর্তেই আমার প্রথম ভুলটা হল। আমি একটা কথা বলে ফেললাম। 

আমি বলে ফেললাম যে, সিরিয়াসলি। যা অবস্থা।

অথচ বলার কোনও কারণ ছিল না। ইন ফ্যাক্ট, না বলার প্রভূত কারণ ছিল। সে কারণগুলো আমার চোখে পড়ল মুখ থেকে কথাটা বেরিয়ে যাওয়ার পর। যখন আমার সহক্রেতা তীরবেগে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, কেন? কী অবস্থা?

যখন আমি দেখলাম মানুষটির সর্বাঙ্গ দিয়ে কনফিডেন্স ঠিকরে বেরোচ্ছে। আমি এ চেহারা আগে দেখেছি। অনেক দেখেছি। এঁরা কখনও কোনও বক্তব্য রাখার সময় “আমার মতে” বা “আমার মনে হয়” গোছের অপ্রয়োজনীয় শব্দ জোড়েন না। কারণ এঁরা জানেন যে এঁরা যেটা জানেন সেটাই সর্বৈব সত্য। 

আমি অবাক হলাম। একটু খুশিও। যাক, আমার থেকেও কম কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের জ্ঞান নিয়ে কেউ চলে ফিরে বেড়ায়। আমি বললাম, কেন, এই যে অবস্থা চলছে? এই যে এটিএম থেকে টাকা তোলা যাচ্ছে না, এই যে…

তিনি বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, কিন্তু তাতে তো ভালোই হচ্ছে। আম্বানিদের কালো টাকা সাদা হচ্ছে, শচিন তেন্ডুলকর আর শাহরুখ খানেরা গরিব হয়ে যাচ্ছেন। অবস্থা তো কিছু হয়নি।

আমার বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছিল। বললাম, অনেক লোকের তো অসুবিধেও হচ্ছে। 

কাদের?

এই ছোটখাট ব্যবসায়ী, যারা আমার আপনার বাড়িতে কাজ করেন…

চোখ কপালে উঠল। 

ওরা গরিব কে বলল আপনাকে? আপনাকে ব্যাংক স্টেটমেন্ট এনে দেখিয়ে দেব আমি। আমার আপনার থেকে বড়লোক। শুনুন মশাই, ভারতে এখন এমন গরিব কেউ নেই যে দু’দিন (*তখনও দুদিনের প্রমিসটা লাগু ছিল) ক্যাশ ছাড়া চালাতে পারবে না। 

একটু থেমে জুড়লেন, অ্যাট লিস্ট আমি যদি পারি তাহলে সবাই পারবে। 

এর আগের কথোপকথনের পুরো দায়টাই আমার, আমি সেটা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু এর পরের প্রশ্নটার জন্য আমি নিজেকে দোষী করছি না। কারণ এই প্রশ্নটা আমার ঐচ্ছিক প্রক্রিয়ার অধীন ছিল না, একেবারে বিশুদ্ধ বিমূঢ় বিস্ময় থেকে প্রশ্নটা আমার মুখে এসে গিয়েছিল। 

আপনি সত্যি আপনার থেকে গরিব লোক দিল্লিতে দেখেননি?

না। চকচকে চোয়াল নাড়িয়ে তিনি আমাকে জবাব দিলেন। ও রকম দেখতেই গরিব লাগে, আসলে সব টাকার কুমীর। আমি যদি দু’দিন টাকা না তুলে আরামে থাকতে পারি তবে বাকি সবাইও পারবে। আর বাকি সবাই যদি গরিব হয়, দিন এনে দিন খাওয়া পার্টি হয়, তাহলে আমিও দিন আনি দিন খাই। 

অবশেষে আমার বোধোদয় হল। আমি “আচ্ছা” বলে অকুস্থল পরিত্যাগ করলাম। বুক ধড়ফড় করছিল। কী কী বলা উচিত ছিল মনের ভেতর ঘাই মারছিল। কিন্তু এও জানতাম আর কিছু বললে এই বুক ধড়ফড়ানিটা দীর্ঘায়িতই হত শুধু। তাছাড়া যোগ্য জবাবের শেষ নেই, যা-ই বলি না কেন, যতই বলি না কেন, বলা হয়ে যাওয়ার পর তার থেকে বেটার কিছু সবসময়েই মাথায় আসবে। 

বাড়ি গিয়ে এক শিশি চানাচুর খেয়ে ধড়ফড়ানিটাকে শান্ত করলাম। চানাচুর শেষ করেই অবশ্য আফসোস হল। কারণ আমার ক্যাশ নেই, ঝট করে চানাচুর রিপ্লেনিশ করা যাবে না। 

এখন আর বুক ধড়ফড়াচ্ছে না। ঘটনাটার থেকে বেশ কয়েকঘণ্টা দূরে চলে এসেছি বলেই বোধহয়। তাছাড়া শুক্রবার সকালসকাল ব্যাংকে দু’ঘণ্টা লাইন দিয়ে কড়কড়ে বেগুনি দু’হাজারি নোট পেয়ে বুকের ভেতরটা শান্তও হয়েছে। চানাচুরের স্টকও রিফিলড। 

তবু এখনও ঘটনাটা উঁকি মারছে মাঝেমাঝে। এবং এখনও আমি স্থির করতে পারছি না ঘটনাটাকে শকিং বলব না ডিপ্রেসিং। 


November 09, 2016

10 types of co-passengers one meets in uberPool or OLA Share




১।  সন্দিগ্ধ টাইপঃ

হ্যালোর উত্তরে কুঁকড়ে যান। যেন এর পরের প্রশ্নটা হতে চলেছে, “দশটা টাকা হবে, দাদা?”

২। চক্ষুলজ্জাহীন টাইপঃ 

“ভাইয়া আপ কাহাঁ হো? কিতনা টাইম লাগেগা? জলদি আইয়ে”

বুকিং আসার এক সেকেন্ড পর থেকে ওঁর পিক আপ পয়েন্টে পৌঁছনোর মাঝের দশ মিনিটে অন্তত তিনবার ফোন করেন। হুমকি টোনের গলা এত উঁচু তারে বাঁধা থাকে যে পেছনের সিট থেকে স্পষ্ট শোনা যায়। গন্তব্যে পৌঁছলে, অফ কোর্স, ইনভেরিএবলি, দশ মিনিট পর হেলতেদুলতে উদয় হন। 

৩। বিবেচক টাইপ

গলির ভেতর বাড়ি হলে এগিয়ে এসে মোড়ের মাথায় অপেক্ষা করেন। কিংবা মোড়ে নেমে যান। 

৪। পয়সা-উশুল টাইপ

গন্তব্যের পাঁচ মিটার দূরে এসে জ্যামে দশ মিনিট ধৈর্য ধরে বসে থাকেন। নামার পর দু’টাকা খুচরো ফেরত নিতে (যেটা ড্রাইভার ভাইসাব শার্টের পকেট, প্যান্টের পকেট, ড্যাশবোর্ডের ওপর স্মিতমুখে বসে থাকা সাঁইবাবার পকেট হাঁটকেও পাচ্ছেন না) আরও দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকেন।  

৪। যারা কোন গ্রহ থেকে এসেছে বোঝা দুষ্কর টাইপঃ

পুল বা শেয়ারে সজ্ঞানে বুকিং করে উঠে তারপর যতবার অন্য বুকিং আসে ততবার ভাইয়াকে ক্যান্সেল করে দিতে অনুনয় করেন। কারণ? ওঁর দেরি হয়ে যাচ্ছে। 

৫। ভদ্র টাইপঃ

হাসির উত্তরে হাসেন, হ্যালোর উত্তরে হ্যালো বলেন। পলিউশন নিয়ে দুয়েকটা মন্তব্য ফাউ জুড়ে দিতে কার্পণ্য করেন না। 

৬। অতি ভদ্র টাইপঃ

প্রবল বেগে ভাইব্রেট করতে থাকা ফোন হাতে নিয়ে উৎসুক চোখে সহযাত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। মে আই টেক দিস কল প্লিজ?

৭। বন্ধুত্বপূর্ণ টাইপঃ 

৭। ক) রাজনৈতিক টাইপঃ তো, কে জিতবে বলে আপনার মত?

৭। খ) অ্যাকটিভিস্ট টাইপঃ সো, হোয়াট আর ইকনমিস্টস’ ওপিনিয়ন অ্যাবাউট ক্লাইমেট চেঞ্জ?

৭। গ) ওপিনিয়নেটেড টাইপঃ হোয়াট! ইউ ডোন্ট হ্যাভ এনি ওপিনয়ন অন এনি অফ দ্য অ্যাবাভ? দিস ইজ আনঅ্যাকসেপ্টেবল। ইউ মাস্ট হ্যাভ অ্যান ওপিনিয়ন অন এভরিথিং। 

৮। অতিবন্ধুত্বপূর্ণ টাইপঃ

মাই গড! ইয়েওয়ালা বঢ়িয়া হ্যায়। ও মাই গড! ইয়ে তো অর ভি বঢ়িয়া হ্যায়। হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ… দেখো দেখো। ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে হোয়াটসঅ্যাপের চুটকি পড়ান। 

নাম, পেশা, ঠিকানা, (ও মা, আমি তো ওর পাশের ব্লকেই, আচ্ছা তোমাদের ধোপার রেট কত? ইশ, জানতাম, আমাদের ধোপাটা একটা ডাকাত) জানার পর একখানা বর আছে সেটাও আবিষ্কার করে ফেলার পর ঝুলোঝুলি করেন, প্লিজ প্লিজ ছবি দেখাও, প্লিইইইইইইইজ…

৯। জীবন্ত জিপিএস টাইপঃ

আরে ভাই, ইয়াহাঁ সে রাইট লে লো না, সিধা জ্যাম হোগা ……কেয়া? জি পি এস?! কামাল হ্যায় ভাইয়া, আপকো সিরিয়াসলি লাগতা হ্যায় কে ও জিপিএস মুঝসে বেটার রাস্তা পহচানতা হোগা? 

১০। নরকের কীট টাইপঃ

সারা রাস্তা মুখের সামনে বই খুলে বসে থাকেন, যেন কতই না সরস্বতীর সাধনা চলছে। এদিকে সারাক্ষণ সহযাত্রীদের জরিপ করেন। তারপর বাড়ি এসে তাঁদের নিয়ে ঠাট্টা করে ব্লগে পোস্ট দেন। 



November 08, 2016

Maya




উৎস গুগল ইমেজেস

Success is liking yourself, liking what you do, and liking how you do it.
                                                                          – Maya Angelou



November 06, 2016

কুইজঃ জোড়ায় জোড়ায়





জোড়ার একজন ক, খ স্তম্ভে, আরেকজন ১, ২, ৩ স্তম্ভে। আপনাদের কাজ হল দু’জনকে মেলানো। সময় চব্বিশঘণ্টার কিছু বেশি। উত্তর বেরোবে সোমবার রাত আটটায়। ততক্ষণ কমেন্ট মডারেশন চালু থাকবে। 

কিছু জোড়া কাল্পনিক। 

অল দ্য বেস্ট। 

*****


১) রাজ্যশ্রী                             ক) অডিসিউস

২) উইলিয়াম                          খ) বনলক্ষ্মী/সুনয়না/নৃত্যকালী

৩) আনন্দীবাঈ                      গ) মণীন্দ্র

৪) টেড                                   ঘ) এলেন

৫) মণিকর্ণিকা                        ঙ) বঙ্কিম

৬) সুনীল                               চ) মাধবীলতা

৭) রাধিকা                              ছ) হাভিয়ার (Javier)

৮) রাজলক্ষ্মী                          জ) হর্ষবর্ধন

৯) এলেন ‘নেলি’ টারনান        ঝ) প্রণয়

১০) ভ্লাদিমির                          ঞ) স্বাতী

১১) অনিমেষ                          ট) সিলভিয়া 

১২) গৌতম                              ঠ) গোপালরাও

১৩) রাজ                                ড) অহল্যা

১৪) পেনেলোপি                       ঢ) আর্থার

১৫) পেনেলোপি                      ণ) চার্লস

১৬) পোর্শিয়া                          ত) সিমরণ

১৭) কচ                               থ) অ্যান হ্যাথাওয়ে

১৮) মলি                                দ) ভেরা

১৯) দেবারতি                         ধ) গঙ্গাধর

২০) ভুজঙ্গধর                         ন) দেবযানী



উত্তর

১) রাজ্যশ্রী  জ) হর্ষবর্ধন
২) উইলিয়াম (শেক্সপিয়ার)  থ) অ্যান হ্যাথাওয়ে
৩) আনন্দীবাঈ জোশী (ভারতের প্রথম মহিলা ডাক্তারদের মধ্যে একজন) ঠ) গোপালরাও
৪) টেড (হিউস)  ট) সিলভিয়া (প্ল্যাথ)
৫) মণিকর্ণিকা (লক্ষ্মীবাঈ)   ধ) গঙ্গাধর
৬) সুনীল (গাঙ্গুলি) ঞ) স্বাতী (ব্যানার্জি)
৭) রাধিকা (রায়)  ঝ) প্রণয় (রায়) (এনডিটিভি)
৮) রাজলক্ষ্মী  ঙ) বঙ্কিম(চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)
৯) এলেন ‘নেলি’ টারনান  ণ) চার্লস (ডিকেন্স)
১০) ভ্লাদিমির (নাবোকভ)  দ) ভেরা (নাবোকভ)
১১) অনিমেষ  চ) মাধবীলতা (কালবেলা/সমরেশ বসু)
১২) গৌতম  ড) অহল্যা (ভারতীয় পুরাণ)
১৩) রাজ  ত) সিমরণ (ডিডিএলজে)
১৪) পেনেলোপি   ক) অডিসিউস (গ্রীক পুরাণ)
১৫) পেনেলোপি (ক্রুজ)  ছ) হাভিয়ার (Javier) (বার্ডেম)
১৬) পোর্শিয়া (ডে রসি)  ঘ) এলেন (ডেজেনেরাস)
১৭) কচ  ন) দেবযানী (ভারতীয় পুরাণ)
১৮) মলি  (উইসলি)  ঢ) আর্থার (উইসলি) (হ্যারি পটার)
১৯) দেবারতি (মিত্র)  গ) মণীন্দ্র (গুপ্ত)
২০) ভুজঙ্গধর   খ) বনলক্ষ্মী/সুনয়না/নৃত্যকালী (চিড়িয়াখানা/শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়)



November 05, 2016

সাপ্তাহিকী






It even immunizes them against fear, if they honestly believe that a martyr’s death will send them straight to heaven. What a weapon! Religious faith deserves a chapter to itself in the annals of war technology, on an even footing with the longbow, the warhorse, the tank, and the hydrogen bomb.
                                                      --- Richard Dawkins, The Selfish Gene

ছিয়ানব্বই শতাংশ কার্যকারিতার সম্ভাবনা ছিল। অনেক ঘটা করে গবেষণা শুরু হয়েছিল। পরীক্ষানিরীক্ষা। এখন আর চলছে না। যাঁদের ওপর পরীক্ষা চালানো হচ্ছিল, পুরুষরা, কারণ জিনিসটা পুরুষদের জন্মনিরোধক, তাঁরা বিবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতা জানানোয় তড়িঘড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো হল মুড সুইং, যৌন ইচ্ছার পরিবর্তন, ব্রণ। মহিলাদের জন্মনিরোধক যারা ব্যবহার করেন, বেসিক্যালি তাঁরা যেগুলো রোজ ফেস করেন।


মানচিত্র আঁকা যতখানি শক্ত মনে হয়, আসলে ঠিক ততখানিই শক্ত। আর সেইজন্যই ভুল হয়ে যায় অহরহ। আমরা পৃথিবীর যে মানচিত্রটা দেখি পৃথিবী আসলে সেরকম দেখতে নয়। গ্রিনল্যান্ড আর অ্যান্টার্কটিকা অত বড় নয়। অ্যাফ্রিকা অত ছোট নয়। এগুলো জানা ভুল। এগুলো সারাতে গেলে আরও বড় ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তাই এদের ঘাঁটানো হয় না। সদ্য একখানা ম্যাপ বানানো হয়েছে যাতে এই ভুলগুলো সারিয়ে বাস্তবের আরেকটু কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পুরোনো মানচিত্র দেখে দেখে এমন চোখ সয়ে গেছে যে হঠাৎ দেখে কোনটা কোথায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

সাড়ে আট মিনিটের সাই-ফাই ফিল্ম নেভার হ্যাপেনড। ( NSFW)

এই কুইজটা আদ্যোপান্ত ভুল। আমার সম্পর্কে এরা বলছে You’re adventurous and mischievous, and people go to you to feel young again. সবথেকে খারাপ ব্যাপার হচ্ছে সব মিলিয়ে আমি নাকি এস’মোরস, যেটা আমার সিরিয়াসলি খারাপ লাগে খেতে।

হিলারি ক্লিনটনের ওয়েবসাইটের এরর পেজ।

অ্যাবাভ অ্যাভারেজ সাহস না থাকলে সিংহগর্জনের এই লিংকটা না খোলাই ভালো।


November 04, 2016

এ মাসের বই/ অক্টোবর ২০১৬ঃ ছোটগল্প না উপন্যাস? ফর্ম না কনটেন্ট?



Olive Kitteridge/ Elizabeth Strout



এলিজাবেথ স্ট্রাউটের লেখা অলিভ কিটরিজ নামের উপন্যাসের কথা আমি শুনেছিলাম বেশ ক’মাস আগেই আমার প্রিয় এক বুকটিউব চ্যানেলে। পড়ব বলে ঠিকও করেছিলাম। তারপর ষষ্ঠীর আড্ডায় নতুন কী দেখলে? উত্তরে এক বন্ধু বলল, অলিভ কিটরিজ। 

দেখলে মানে? শুনলাম অলিভ কিটরিজ নাকি অলরেডি মিনি সিরিজ হয়ে গেছে। তাতে নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন আমার অন্যতম প্রিয় অভিনেতা ফ্রান্সিস ম্যাকডারমন্ড, সেই ফার্গো-র ফ্রান্সিস ম্যাকডারমন্ড। বোঝো।আমারও দেখতে হবে। কিন্তু তার আগে কিনতে হবে। আড্ডায় বসে বসেই কিনে ফেললাম। কিন্ডলের এই ব্যাপারটা বেস্ট। ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশনের একেবারে তুঙ্গ। কিন্ডলের দু’নম্বর ভালো ব্যাপারটা হচ্ছে রাতে আলো না জ্বালিয়ে পড়া যায়। ষষ্ঠীর রাত একটায় শুরু করলাম, অষ্টমীর সকালে দু’শো অষ্টাশি পাতার অলিভ কিটরিজ শেষ হয়ে গেল। 

কৃতিত্ব আমার নয়, কৃতিত্ব এলিজাবেথ স্ট্রাউটের। এখনও দু'মাস বাকি, তবে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে বলা যায় দু’হাজার ষোলোয় পড়া সেরা পাঁচটা বইয়ের মধ্যে অলিভ কিটরিজ থাকবে। 

গল্পের পটভূমি অ্যামেরিকার আটলান্টিক তীরের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের মেইন রাজ্যের একটি পাড়া।  পাড়া। সেখানে থাকে হেনরি কিটরিজ, হেনরির স্ত্রী অলিভ কিটরিজ আর তাদের ছেলে ক্রিস্টোফার কিটরিজ। প্রথম গল্প হেনরি কিটরিজ আর তার ফার্মেসিতে কাজ করা ডেইজিকে নিয়ে। তারপর গল্প ছড়ায় শহরের অন্যান্য পরিবারেও। থিবোডু, ফস্টার, লার্কিন, গ্রেঞ্জার। প্রথমটা অদ্ভুত লাগে, যার নামে বই, তার চরিত্র এত আবছা কেন? মাঝে মাঝে কিটরিজদের বাড়িতে গল্প ফিরে আসে, অলিভ ক্রমশ স্পষ্ট হয়, বোঝা যায় গল্পের এটাই মূল সুতো। বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনও এগোয়। 

এলিজাবেথ স্ট্রাউটের ভাষা নিচুস্বরে, কিন্তু নিখুঁত করে বাঁধা। স্ট্রাউটের গল্প আঞ্চলিক কিন্তু সর্বজনীন। ছোট শহরের বুকে বাসা নেওয়া গল্প আমার চিরকালের পছন্দের। এই চরিত্রগুলো হয়তো বড় শহরের ভিড়ে চাপা পড়ে যেত, কিন্তু ছোট শহরের নিস্তরঙ্গ প্রেক্ষাপটে তারা জ্বলজ্বলে। ওই ছোট শহরের মতো স্ট্রাউটের ভাষাও নিস্তেজ, ঢিমেতালা কিন্তু বর্ণময়। সমুদ্রতটের লোনা হাওয়ার মতো ধারালো, চোখে এসে বিঁধলে জ্বালা ধরায়।

তেরোটা ছোট ছোট খণ্ড নিয়ে তৈরি  নভেল, কিন্তু আলাদা করে পড়লে তাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ গল্প বলে ধরাই যায়। দু’হাজার নয়ের পুলিৎজার পেয়েছিল অলিভ কিটরিজ।  

*****


A Girl is a Half Formed Thing/ Eimear McBride



গদ্যসাহিত্য ভাষার ভূমিকা আসলে কী? গল্পকে ঠ্যাকনা দেওয়া? গল্পকে পাঠক পর্যন্ত পৌঁছে দিতে যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই নিজেকে উদ্ভাসিত করা? নাকি গল্প যেতে পারে যে চুলোয় ইচ্ছে, ভাষা চলবে নিজের খেয়ালে, নিজের ছন্দে, কারও তোয়াক্কা না করে। নাকি আদর্শটা এই দুইয়ের মাঝামাঝি কিছু?

For you. You’ll soon. You’ll give her name. In the stitches of her skin she’ll wear your say. Mammy me? Yes you. Bounce the bed. I’d say. I’d say that’s what you did. Then lay you down. They cut you round. Wait and hour and day. 

এই ভাবে শুরু হয় আ গার্ল ইজ আ হাফ ফর্মড থিং। এবং চলতে থাকে দু’শো সাতাশ পাতা ধরে। আপনার যদি খুব খারাপ লাগে এ ভাষা তাহলে না এগোনোই ভালো। কিন্তু যদি ধৈর্য থাকে বা কৌতূহল, তাহলে আমি বলব এগোতে। এগোতে এগোতে একটা গল্পের ছায়া বেরিয়ে আসবে। একটা মেয়ে, যার নাম আমরা জানতে পারব না, তার মা, ধর্মান্ধ। মেসোমশাই, যে মেয়েটিকে তেরো বছর বয়সে মেয়েটির সঙ্গে শারীরিকভাবে উপগত হন। আর ভাই, ছোটবেলায় টিউমার বাদ দিতে গিয়ে শৈশবে যার ব্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

আ গার্ল ইস আ হাফ ফর্মড থিং অনেক দিক থেকে অন্যরকম। তার মধ্যে একটা অন্যরকমত্ব হচ্ছে গল্পের পারস্পেক্টিভ। সবথেকে বিরলব্যবহৃত পারস্পেক্টিভ, মধ্যম পুরুষে, লেখা হয়েছে গল্পটা। মেয়েটি সে কথা বলছে “তুমি”কে উদ্দেশ্য করে। এই ‘তুমি’ হচ্ছে তার ভাই। মেয়েটির জীবনে এই ভাইয়ের ভূমিকা আমার থেকে দ্য গার্ডিয়ান বেটার বলেছে, তাই আমি তাদের কথাটাই টুকে দিচ্ছি। "... the love she has for him is a clean space in a soiled world”. 

সয়েলড বললে অবশ্য কিছুই বলা হয় না। একজন মানুষের জীবনে যে এত কষ্ট, অন্যের এবং স্ব-আরোপিত এত অত্যচার, যন্ত্রণা, একটা জীবন যে এইভাবে অপচয় হতে পারে সেটা ম্যাকব্রাইডের প্রথম উপন্যাস পড়লে বিশ্বাস হয়। হ্যাঁ, আগের বাক্যে কোনও টাইপো নেই। এ বইয়ের চরিত্রদের কাউকে আমি ফেস করিনি কোনওদিন, কানাঘুষোয় এদের সম্পর্কে কোনও গুজবও আমার কানে আসেনি কোনওদিন, আসার সম্ভাবনাও কম, তবু এরা যে সত্যি, কল্পনা নয়, এই কথাটা একবারের জন্যও বিস্মৃত হতে পারিনি আমি। বইটা পড়ার সময়ও না, পড়ার পর এতদিন কেটে যাওয়ার পরও না। আমার ধারণা আরও অনেকদিন পরেও এরা আমার মনে সমান জ্বলজ্বলে থাকবে। 

এ বই আপনাকে আঘাত করবে। উত্তেজিত করবে। চরিত্রদের প্রতি ঘৃণায়, অনুকম্পায়, করুণায়, রাগে, হতাশায় আপনি অস্থির হবেন। সেনসিটিভ টাইপ হলে প্রকাশ্যে এ বই পড়া অ্যাডভাইজেবল নয়। বিব্রত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। 

আইমিয়ার ম্যাকব্রাইডকে কেউ বলছেন জয়েস, কেউ বলছেন জিনিয়াস। ম্যাকব্রাইডের জিনিয়াসটা এখানেই যে বইটা পড়ার পর কল্পনা করতে কষ্ট হবে যে অন্য কোন ভাষায় এই গল্প বলা যেত। এই তুলকালাম জীবনের গল্প বলার জন্য ওই তুলকালাম ভাষাই প্রয়োজন ছিল হয়তো। নিরীক্ষামূলক ভাষায় বাড়াবাড়ি রকম অ্যালার্জি না থাকলে বইটা পড়তে পারেন। আমি অন্তত এ’রকম কিছু আগে কখনও পড়িনি। 

দু'হাজার ষোলোর প্রথম পাঁচে এটাও ঢুকে গেছে। 

*****


So Many Ways to Begin/ Jon McGregor



ডেভিড একজন মিউজিয়াম কর্মচারী। বেশিরভাগ লোকই কাজ পেটের দায়ে করে, ডেভিড করেন ভালোবেসে। ডেভিড যুদ্ধক্ষেত্র (তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডেবরি ইতিউতি পড়ে থাকত) এনে ঘরের ভেতর মিউজিয়াম সাজিয়ে বসে থাকত। শখ ছিল নিজের মিউজিয়াম খোলার। সে স্বপ্ন সত্যি হয়নি। ডেভিডের স্ত্রী, এক সন্তান। অত্যন্ত সাধারণ একটি জীবন ডেভিডের, শুধু একটি অসাধারণত্ব ছিল সে জীবনে। ডেভিডের মা ডরোথির এক বন্ধু, জুলিয়া, যিনি ছোটবেলা থেকে ডেভিডের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন, অকালে স্মৃতিভ্রংশতার কোপে পড়েন, এবং এক বিস্মরণের মুহূর্তে তিনি ডেভিডকে বলে দেন যে ডেভিড আসলে ডরোথির সন্তান নন। যুদ্ধকালীন লন্ডনে একটি অজানা মেয়ে হাসপাতালে ডেভিডকে প্রসব করে দত্তকের জন্য ছেড়ে দিয়ে যায়।

ডেভিড শুরু করে তার সেই হারানো মাকে খুঁজতে। 

একদিক থেকে এটাই গল্পের মুখ্য প্লট পয়েন্ট হলেও সব সময় গল্প এই অভিমুখে ধাবিত হয়নি। জন ম্যাকগ্রেগরের লেখা অত্যন্ত ছড়ানো, শাখানদীর মতো একেকটা সুতো একেক চরিত্রের হাত ধরে বেরিয়ে পড়েছে, ডেভিডের স্ত্রী এলেনর, জুলিয়া আন্টি, ডেভিডের মা ডরোথি। গল্পের চলন অনেকটা অলিভ কিটরিজ-এর মতোই। চ্যাপ্টারগুলো আলাদা আলাদা ভাবে পড়লেও একেবারে অর্থহীন মনে হবে না। তবে অলিভ কিটরিজের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণও নয় গল্পগুলো। অলিভ কিটরিজের মতোই শান্ত, বর্ণনামূলক ভাষা। 

আমার মতে একটু বেশিই বর্ণনামূলক। লেখার জগতে একটা উপদেশ খুব চলে “শো ডোন্ট টেল।” বাংলায় যাকে বলে ছবির মতো ফুটিয়ে তোলা। এখন সে ছবির বদলে ক্যামেরা কল্পনা করুন। এবার ক্যামেরাটা একেবারে অভিনেতার ঘাড়ের ওপর কল্পনা করুন। তার প্রতিটি ভ্রুভঙ্গি, হাত নাড়া, চেয়ার ছেড়ে ওঠা, খাটে এসে বসা, সব যদি আপনি পরপর দেখতে থাকেন তাহলে যেটা হয়, 'সো মেনি ওয়েজ টু বিগিন'-এ তাই হয়েছে। শব্দবাহুল্য। তাতে গল্প অনাবশ্যক ঢিলে হয়েছে বলে আমার মত।

জন ম্যাকগ্রেগরের প্রথম উপন্যাস “ইফ নোবডি স্পিকস অফ রিমার্কেবল থিংস” সাড়া ফেলেছিল। ছাব্বিশ বছর বয়সে লেখা প্রথম উপন্যাস একেবারে বুকার প্রাইজের লং লিস্টে। এখন কিন্ডলে 'রিমার্কেবল থিংস' রীতিমত সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু আমি যখন খুঁজেছিলাম তখন পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই আমি 'সো মেনি ওয়েজ' ই কিনে ফেলেছিলাম। এটা পড়ার পর 'রিমার্কেবল থিংস' পড়ার বিশেষ উৎসাহ পাচ্ছি না, তবে দেখা যাক, মত বদলাতেও পারি।

*****

বইয়ের ছবির উৎস গুগল ইমেজেস। 


November 03, 2016

গোনাইল



মুখের সঙ্গে নামের, জায়গার সঙ্গে ঘটনার, খাবারের সঙ্গে স্বাদের, শব্দের সঙ্গে গন্ধের, ফোন স্ক্রিনে ফুটে ওঠা নামের সঙ্গে কণ্ঠস্বরের, কবির সঙ্গে কবিতার, পরিচালকের সঙ্গে সিনেমাহলে মাথা ধরার, ধার্মিকের সঙ্গে বকের, অফিসের সঙ্গে আতংকের, রঙের সঙ্গে সৌন্দর্যের, দম্ভের সঙ্গে বুদ্ধির, বিনয়ের সঙ্গে কাপুরুষতার। লক্ষ লক্ষ অ্যাসোসিয়েশন মগজে পুরে আমরা বাঁচি। পৃথিবীর পথে হাঁটি। বেশিরভাগ অ্যাসোসিয়েশনই অচেতন। কিছু পাভলভীয়, কিছু ফ্রয়েডীয়, আর কিছু অভিজ্ঞতাজাত। এই প্রথম দু’রকম অ্যাসোসিয়েশন বিজ্ঞান (এবং সামাজিক বিজ্ঞান)সম্মত, তাই মোটামুটি সকলেরই কমন পড়ে। যেমন শিউলিফুলের সঙ্গে প্যান্ডেলের, সানাইয়ের সঙ্গে সিঁদুরের। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জাত অ্যাসোসিয়েশনগুলো আলাদা আলাদা হয়। কোনও গান শুনে কারও দারুণ নাচ পায়,  কারও পার্টির কোণে দাঁড়িয়ে স্বপ্নের মানুষকে অন্যের সঙ্গে নাচতে দেখার স্মৃতি মনে পড়ে কান্না পায়। আমাদের বাড়ির পাশের লিলুয়াপাড়ার মোড়ের সঙ্গে নিশ্চয় অনেকের অনেক রকম অ্যাসোসিয়েশন আছে। (থাকতেই হবে এমন কথা নেই) ওখানে রিকশাস্ট্যান্ড ছিল, এখনও আছে। লিলুয়াপাড়ার মোড় পেরোতে কারও হয়তো রিকশার কথা মনে পড়ে, কিংবা রিকশা না পেয়ে ট্রেন ফেলের আতংক হয়। আমারও ওই মোড়ের সঙ্গে একটা আতংক, বা ট্রমাই বলা উচিত, জড়িয়ে আছে। তবে সে ট্রমায় রিকশা নেই, আছে একটা সাইকেল, আমার নিজেরই লাল রঙের হিরো সাইকেল, আর আছে একটা নর্দমা। পেছন ফিরে কাকে যেন টা টা করতে গিয়ে, তখন রীতিমত ধেড়ে, ক্লাস টেন, সাইকেল নিয়ে সোজা নর্দমায় নেমে গিয়েছিলাম। ট্রমার কারণটা সেটাও নয়। ও রকম পতন আমার অনেক হয়েছে। এই সেদিনও আমি অফিসের সামনে সমতল মাটিতে আছাড় খেয়েছি, ডিরেক্টরকে ‘আহা’ বলে দৌড়ে আসতে হয়েছে। মোড়ের মাথায় আমার কাছাকাছি বয়সেরই পুংলিঙ্গের ক’জন প্রতিনিধি জটলা করছিল, বালিকা বিদ্যালয়ের ট্রমার প্রধান কারণ ছিল সেটাই। ওই মোড় দিয়ে যাওয়ার সময় এখনও মাঝে মাঝে সেই কান গরম, নাক ঘামা, মাথা ঝাঁ ঝাঁ অনুভূতিটা স্পষ্ট টের পাই। 

শ্মশ্রুগুম্ফসম্বলিত, সামান্য ট্যারা চোখ, গেরুয়া পরিহিত, মাথায় ম্যানবান বাঁধা একটা বিশেষ মুখের সঙ্গেও আমার একটা অ্যাসোসিয়েশন আছে। এই মুখটা আজকাল খুব দেখা যায়। দেখতেই হয়। আমাদের পাশের পাড়ার বড় রাস্তার অনেকগুলো দোকানের মাথায়, তাদের আবার নাম মেগামার্ট, এই মুখটা জ্বলজ্বল করে। প্রকাণ্ড দোকানের মাথায় প্রকাণ্ড ব্যানার থেকে হাই রেজলিউশন বদান্য হাসি ছিটকোয়। যখনই দেখি তখনই আমার একটা দৃশ্য চোখে ভাসে। 

জনসমুদ্রের মাঝখানে উঁচু মাচা। বক্তৃতা চলছে। জনতা মন্ত্রমুগ্ধ। এমন সময় হঠাৎ গোলযোগ। পুলিশ রেড। পালানোর পথ না পেয়ে মাচা থেকে ঝাঁপ মেরেছেন বাবাজী। এর মাঝে কখন যেন ড্রেস চেঞ্জ করে নিয়েছেন। তাঁর পরনে এখন শাড়ি। নিচের জনতা প্রথমে একটা গোটা মানুষ ঘাড়ে এসে পড়ার আতংকে আর্তনাদ করে উঠেছিল কিন্তু স্বয়ং বাবাজী পড়ছেন দেখে সামলে নিয়ে অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে দু’হাত তুলে ধরেছে। এই জায়গাটায় এসে দৃশ্য স্লো মোশন হয়ে যায়। আর খানিকটা ক্লোজ আপও। স্বর্গ থেকে থেকে নারীরূপে ভক্তদের মধ্যে নেমে আসছেন বাবাজি, তাঁর পূত আঁচল এবং দাড়ি পতপত করে উড়ছে। টিভি স্ক্রিন অর্ধেক করে ডানদিকে পাঠক চেঁচিয়ে খবর পড়ছেন, বাঁ দিকে বাবাজীর ঝাঁপ লুপে চালিয়ে রাখা হয়েছে। বাবাজী কেবলই লাফাচ্ছেন। কেবলই লাফাচ্ছেন। কেবলই লাফাচ্ছেন।

আর কথা বাড়ানোর আগে অ্যাসোসিয়েশন ব্যাপারটার আরও একটা বৈশিষ্ট্যের কথা বলে নেওয়া দরকার। অ্যাসোসিয়েশন, বিশেষ করে ব্যক্তিগত যেগুলো, অনেকক্ষেত্রেই আপেক্ষিক এবং তথ্যনিষ্ঠ নয়। আমার স্কুলের এক বন্ধুর সম্পর্কে ধারণা ছিল, ঝগড়ুটে। তারপর তার সঙ্গে পরে মাঝেসাঝে কথা হয়েছে, তখন দেখেছি ঝগড়ুটে তো সে নয়ই, বরং অধিকন্তু রকম নিরীহ। অথচ এখনও তার নাম মনে পড়লে আমার ঝগড়ূটে শব্দটাই প্রথম মাথায় আসে। আমার স্পষ্ট মনে আছে এক আত্মীয়ের বিয়েতে আমি বসে রসগোল্লা খাচ্ছি, অথচ সালতারিখ মেলালে দেখা যাবে ওখানে আমি থাকতেই পারি না, কারণ বিয়েটা ঘটেছে আমার জন্মের আগে। আমি প্রথমে অনেক প্রতিবাদের চেষ্টা করেছিলাম। বার বার বলেছিলাম, আমার স্পষ্ট মনে আছে কাকিমা কী রঙের বেনারসী পরে ছিলেন, তখন সবাই হেসে অ্যালবাম থেকে ফোটো বার করে বলল নির্ঘাত এই ফোটোটা দেখেছিস। 

বাবাজীর ঝাঁপের স্মৃতিটাও এই গোত্রে পড়বে। ধরা পড়ত না, যদি না আমি লেখা থামিয়ে গুগল সার্চ করতাম। করলাম কারণ ভয় লাগল। এ তো আর কাকিমার বেনারসী নয়, এর সঙ্গে জাতীয় সংবেদনশীলতা জড়িয়ে আছে।

করতেই বেরিয়ে পড়ল স্মৃতিটা সত্যি নয়। পুরোটা কল্পনা নয়, অংশগুলো সত্যি। পুলিশের তাড়াটা সত্যি। বারো মিটার উঁচু স্টেজ থেকে বাবাজীর ঝাঁপ মারাটাও সত্যি। আমার কল্পনার মাচার উচ্চতা যদিও মিনিমাম একশো বারো মিটার। তারপর দেখা গেল ঝাঁপ মারার সময় তিনি পরে ছিলেন তাঁর চিরাচরিত গেরুয়া ইউনিফর্ম। আমি হতভম্ব। নারীরূপের গোটাটাই কি আমার মস্তিষ্কপ্রসূত? আবার সার্চ সার্চ সার্চ। উঁহু। এই তো। তবে শাড়ি নয়, সাদা সালওয়ারকামিজ। আর এখানে লাফালাফির ব্যাপারও নেই। দিব্যি সমতলে, ভিড়ের মাঝে ওড়না মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন গুরুদেব।

কাজেই আমি পুরোটা না হলেও, অল্প ভুল। কিন্তু এটাও ঠিক যে আমার কল্পনাটা - উঁচু মাচা থেকে ফরিশ্‌তার মতো অদৃশ্য ডানা মেলে সোনালি রোদ্দুরের জ্যোতির্বলয় মেখে নেমে আসছেন বাবাজী, শাড়ির আঁচল, দাড়ি পতপত করে উড়ছে - বাস্তবের থেকে অনেক বেশি গ্র্যান্ড। কাজেই আমি এক্ষুনি সেটা বাতিল করছি না।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, কোনও মুখ দেখলেই যদি এই ছবিটা মনে পড়ে তাহলে সে মুখের ছবি লাগানো দোকানে ঢুকে জিনিসপত্র কেনা একটু কঠিন। কাজেই আমি কিনি না। অর্চিষ্মানও কোনওদিন কেনেনি, কেনার উৎসাহও দেখায়নি। ওরও কোনও অ্যাসোসিয়েশন থেকে থাকবে হয়তো। অর্থাৎ আমাদের সংসারে বাবাজী প্রবেশ করেননি এখনও। আমাদের চারপাশে অনেকের সংসারেই করেছেন। চোখের সামনে দেখেছি সিঁড়ির কোণে রাখা ফিনাইলের শিশি বদলে গোনাইল হয়ে যেতে। সে তাঁরা তাঁদের মেঝে ফিনাইল দিয়ে মুছবেন না গোনাইল দিয়ে তাঁরাই বুঝবেন। কিন্তু তাঁরা শুধু নিজেদের মেঝে মুছেই ক্ষান্ত দেন না, আমাদেরও বাবাজীর জিনিস কিনতে উদ্বুদ্ধ করেন। শুধু ভক্তিমতে চিঁড়ে ভিজবে না বুঝে অন্যপথে বিজ্ঞাপন চালান। বাবাজীর টুথপেস্টে কার ক্যাভিটি সেরে গেছে, বাবাজীর নুডল নাকি দু’মিনিটও লাগে না দেড় মিনিটেই রান্না হয়ে যায়, এই ভেজালের দুনিয়ায় একমাত্র বাবাজীর প্রোডাক্টই শুদ্ধ, এই মুনাফালোভী ধান্দাবাজির দুনিয়ায় একমাত্র বাবাজীর উদ্দেশ্যই মহৎ। তোমরা ইউজ করো না কেন? এবার থেকে করবে।

আমরা “নিশ্চয়, সত্যি এতদিন না করে খুবই বোকামো হয়েছে” ঘাড় নাড়ি, আর উল্টোদিকে বক্তা যতবার বাবাজীর নাম উচ্চারণ করেন ততবার, চোখ বন্ধ না করেই, তাঁর মাথার পেছনে শূন্য থেকে বাবাজীকে ঝাঁপ মারতে দেখি।

অবশেষে আর ঠেকানো গেল না। দীপাবলীর উপহার হিসেবে বাবাজী আমাদের সংসারে প্রবেশ করলেন। দরজা খুলে দেখলাম শোনপাপড়ির বাক্স হাতে নিয়ে বন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন। তার পাঁচ মিনিট আগেই আমরা কী খাই কী খাই করছিলাম, বাড়িতে যা যা আছে কোনওটাই মনে ধরছিল না। চানাচুর? ছোঃ। পপকর্ন? মানুষে খায়? চকোলেট? তার থেকে ভুখা মরাও ভালো। শোনপাপড়ি দেখে মনে হল এর থেকে ভালো জলখাবার পৃথিবীতে আর হয় না। বন্ধুর এক হাতে শোনপাপড়ির প্যাকেট, অন্য হাত সে হাতের কনুই ছুঁয়ে। সামান্য কোমর ঝুঁকিয়ে বললেন, হ্যাপি দিওয়ালি। এই নাও বাবাজীর শোনপাপড়ি।

খিদেয় ততক্ষণে পাগল হওয়ার জোগাড় হয়েছিল, নিরীহ গরুটার মুখখানা চড়াৎ করে ছিঁড়ে শোনপাপড়িতে পৌঁছলাম। তাড়া ছিল, কিন্তু একটা কৌতূহলও যে ছিল সেটা স্বীকার করছি। কীসে কীসে খুঁত বার করা যায়। প্যাকেজিং খারাপ না। অ্যাকচুয়ালি বেশ ভালো। প্যাকেটের ভেতর একটা বাক্স। অর্ধেক খেয়ে ঢাকা দিয়ে রাখা যাবে। আমরা অবশ্য শোনপাপড়ি কিনে খাই না, এটাই স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং কি না জানি না। ঝুরঝুরে শোনপাপড়ি। হাতে করে তোলা মুশকিল। চামচে করে তুলে মুখে পুরলাম। ভালো খেতে। অবশ্য শোনপাপড়ি খারাপ খেতে বানানোটাই প্রতিভা।

একটা শেষ করে আরেকটা শোনপাপড়ি শুরু করেছি এমন সময় টিভিতে ওই চ্যানেলটা এল যেটাতে সর্বক্ষণ হয় বাবাজীর প্রোডাক্ট নয় এক ইঞ্চি লকেটের মধ্যে গোটা হনুমান চালিশা নয় পবিত্র কুরআন এইসব চলে। আমরা টাইমপাস হিসেবে মাঝে মাঝে দেখি। তখন, কী আশ্চর্য সমাপতন, বাবাজীর অ্যাড চলছিল। বাবাজী প্রকৃতির ভেতর ঘুরছেন ফিরছেন, স্বচ্ছতোয়া নদীর জলে হাত ধুচ্ছেন, পাখিসব কিচমিচ করে তাঁর জয়গান গাইছে, এর মাঝে বন থেকে বালাকৃষ্ণ, যার কি না বাবাজীর ব্র্যান্ডে চুরানব্বই শতাংশ শেয়ার, হাসি হাসি মুখে বেরিয়ে আসছেন। পেছন থেকে একটা ভক্তিগদগদ গলা প্রাচীন ভারতের গৌরবের কথা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে। প্রাচীন ভারতের মুনিঋষি, গরুরা, তাদের পবিত্র শিং, ল্যাজ, গোবর ও চোনা, সবই যে পবিত্র এবং উপকারী, ভণ্ড অধার্মিকদের দ্বারা চেপে যাওয়া এই তথ্যটা যে বাবাজী বেদপুরাণ খুঁড়ে বার করে এনেছেন, মানুষের কল্যাণে প্রয়োগ করেছেন . . .

আমার চোয়াল থেমে গেল। চামচ টলে শোনপাপড়ি মেঝেতে পড়ে গেল। এই ভয়ানক সম্ভাবনাটা আমার মাথা এড়িয়ে গেল কী করে। বাক্স দেখে মহা খুশি হয়ে ওপরের মোড়কটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম, দু’বার না ভেবে বাস্কেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে সেটা উদ্ধার করলাম। ইস, ইনগ্রেডিয়েন্ট লিস্ট আর নিউট্রিশনাল ইনফোর ঠিক মাঝখান দিয়ে ছিঁড়েছি। কোনওমতে দু’হাত দিয়ে দুটো অংশ যতখানি সম্ভব পাশাপাশি রেখে পড়তে লাগলাম। প্রায় সাত রকমের ময়দা, বেসন, হ্যানাত্যানা, কাউ’স . . .  কাউ’স! মাগো. . . কাউ’স পিওর ঘি, যাক বাবা, সুগার এবং আরও সব নিরীহ জিনিস। শোনপাপড়িতে যা যা এক্সপেক্ট করে লোকে, তাই তাই। তার বাইরে কিছু নয়।

বুকটা তখনও এত ধড়ফড় করছিল যে চেয়ারে বসতে হল। কান ঘেঁষে বেঁচেছি। সামান্য শোনপাপড়ি খেতে গিয়ে এত টেনশন? বাবাজীর খাবারদাবার শরীরের পক্ষে ভালো হতে পারে, হার্টের জন্য খুবই  বিপজ্জনক দেখা যাচ্ছে। প্রতিজ্ঞা আমার কখনওই টলেনি, এই ঘটনায় সেটা আরেকটু শক্ত হল। বাবাজীর যেখানে থাকার কথা সেখানেই থাকুন, অর্থাৎ কি না মাথায়, শোনপাপড়ি আর ফিনাইলে তাঁকে আমার না পেলেও চলবে। 



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.