December 31, 2016

হংসেশ্বরী



বাঁশবেড়িয়ার রাজারা পাটুলির লোক ছিলেন শুনে আমি খুব উৎসাহিত হয়েছিলাম তারপর বুঝলাম এ পাটুলি সে পাটুলি না, এ হল গিয়ে বর্ধমানের পাটুলি। ষোলশো তিয়াত্তরে জমিদার রামেশ্বর রায় চলে এলেন বাঁশবেড়িয়ায়। ত্রিবেণী আর ব্যান্ডেলের মাঝখানে গঙ্গার ধারে চারশো বিঘা জমি দিলেন ঔরঙ্গজেব আর দিলেন রাজা উপাধি। তাঁর তিন প্রজন্ম পরের রাজা নৃসিংহদেব সংস্কৃত পণ্ডিত ছিলেন এবং যোগসাধনা তন্ত্রমন্ত্র ইত্যাদিতে তাঁর উৎসাহ ছিল। তিনি বিলেত না গিয়ে বাঁশবেড়িয়ার জমিতে তিনি বানালেন এক মন্দির যার পাঁচটি তলা আমাদের কুণ্ডলিনী শক্তির পাঁচটি অংশ ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না, বজ্রাক্ষ আর চিত্রিণীর প্রতিনিধি। রাজামশাইয়ের মন্দির তৈরিতে ভয়ানক উৎসাহ ছিল। সে যুগে প্রায় লাখ টাকা খরচ করে নিজে গিয়ে চুনার থেকে মন্দির বানানোর পাথর কিনে এনেছিলেন। দুঃখের বিষয় মন্দিরের কাজ এগোতে না এগোতেই রাজামশাই মারা গেলেন। বড়রানী রাজার সঙ্গে চিতায় উঠলেন, ছোটরানী শংকরী মন্দির শেষ  করলেন আঠেরোশো চোদ্দয়। 


তেরোটা পদ্মের কুঁড়ির মতো চুড়োওয়ালা মন্দিরের ভেতরে নিমকাঠের নীলবর্ণ দেবী। মাকালীর এক রূপ, যদিও হংসেশ্বরী নামটা নৃসিংহদেবের মায়ের নাম থেকে দেওয়া। 

ষোলশো ঊনসত্তরে, মূল হংসেশ্বরী মন্দিরের অনেক আগে রাজা রামেশ্বর বানিয়েছিলেন টেরাকোটার এই অনন্ত বাসুদেব মন্দির। সারা গায়ে রামায়ণ মহাভারতের গল্প আঁকা। 


এই ছবিটা এখন দেখে এ আর এমন কী মনে হচ্ছে, কিন্তু আমি যখন দেখছিলাম তখন কুয়াশায় দূর থেকে আজানের আওয়াজ আর একটা উনুনধরানো গন্ধ ভেসে আসছিল। 

হংসেশ্বরী মন্দির আমি এর আগেও গেছি, স্কুলের সঙ্গে, বাড়ির সঙ্গে, কিন্তু সে বহুযুগ আগে। তবে ভালো লাগাটা মনে ছিল। এবারেও ভালো লেগেছে। ধর্মের ঘটা কম। নিজের মতো ঘুরেফিরে দেখা যায়। পুকুরের পাশে একটা নৌকোর উল্টোনো গায়ে নতুন আলকাতরা, আরেকটা নৌকো পুকুরঘাটে বাঁধা। আমরা যতক্ষণ ছিলাম ততক্ষণ ভিড়ও পাতলা ছিল। ফ্যামিলি আর কোচিংফেরত ছেলেমেয়ে। সন্ধ্যে বাড়তে ভিড় বাড়ল। আমরা তখন মন্দিরের চাতাল থেকে নেমে এসে চায়ের দোকানে ঢুকলাম। মিষ্টি কম দেওয়া চা আর সঙ্গে বয়ামের রম্বস-আকৃতির বিস্কুট।


*****
ব্যস। আজ রাতে চোখ বুজলেই দু’হাজার ষোল শেষ। কাল সকালে চোখ খুললে নতুন দিন, নতুন বছর। এ বছরে আপনি নিজেকে যেমন চান তেমন হয়ে উঠুন এই শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা রইল।


December 30, 2016

Monday Club



ক্লাবের সভ্যরা সকলেই বুদ্ধিমান লোক ছিলেন, কাজেই ইটিং ছাড়া মিটিং যে জমবে না তা তাঁদের জানা ছিল। ক্লাবের অধিবেশনের চিঠি-কাম-নেমন্তন্নপত্রের ক’টি উদাহরণ কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘সুকুমার রায় ও Monday Club’ লেখায় দিয়েছেন। আমি অবান্তরে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। 

‘আঃ! আবার খাওয়া!!

এই-তো সেদিন সবাইকে বুঝিয়ে বললুম যে আর ‘খাই খাই’ কোরো না - এর মধ্যে সুনীতিবাবু খাওয়াতে চাচ্ছেন। আমার হাতে কতকগুলো টাকা গছিয়ে দিয়ে এখন বলছেন, না-খাওয়ালে জংলিবাবুকে দিয়ে মোকদ্দমা করবেন। আমি হাতে-পায়ে ধ'রে নিষেধ করলুম, তা তিনি কিছুতেই শুনলেন না, উলটে আমায় তেড়ে মারতে আসলেন। দেখুন দেখি কী অন্যায়! তা আপনারা যখন উপদেশমতো চলবেন না, কাজেই অগত্যা সুকুমারবাবুকে ব’লে-ক’য়ে এই ব্যবস্থা ক’রে এসেছি যে তাঁর বাড়িতে আগামী মঙ্গলবার (৩০শে জুলাই) সন্ধ্যা ৭ টার সময় আপনি সুস্থদেহে হাজির হবেন। সুনীতিবাবুর ভোজের পাত সেখানেই পড়বে। এখন খুশি হলেন তো?
                                                                                                                            তক্ত্যবিরক্ত
                                                                                                                       শ্রী সম্পাদক’ 

(এই সম্পাদক খুব সম্ভবত শ্রী শিশিরকুমার সর্বাধিকারী।)


ইদানীং প্রতিবাদ-প্যারডির খুব চল হয়েছে। বলির পাঁঠা প্রধানত হয়েছেন সুকুমার, কাউকে দেখে গা জ্বললেই লোকে হ য ব র ল-র এক প্যারা খামচে নিয়ে তাতে নিজের রসবোধ আর সামাজিক প্রজ্ঞা প্রয়োগ করে চালিয়ে দিচ্ছে। সুকুমারের নিজের বানানো ক্লাবেও প্যারডি হত। নিচের প্যারডিটি স্বাক্ষরহীন, তবে যিনিই লিখুন না কেন, আমার মতে দারুণ লিখেছেন। আজকালকার প্রতিবাদ-প্যারডিগুলোর থেকে অনেক ভালো আর অনেক হাসির।

কেউ বলেছে খাবো-খাবো,
কেউ বলেছে খাই, 
সবাই মিলে গোল তুলেছে-
আমি তো আর নাই। 
ছোট্‌কু বলে “রইনু চুপে
ক-মাস ধ’রে কাহিলরূপে”;
জংলি বলে, “রামছাগলের
মাংস খেতে চাই।”
যতই বলি “সবুর করো” 
-কেউ শোনে না, কালা, 
জীবন বলে কোমর বেঁধে,
“কোথায় লুচির থালা?”
খোকন বলে রেগে-মেগে
ভীষণ রোষে বিষম লেগে-
“বিষ্যুতে কাল গড়পারেতে
হাজির যেন পাই।”



ঋণস্বীকারঃ কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়/ কিশোর রচনাসম্ভার ২


December 25, 2016

এ বছর বড়দিনে আমি যা যা জানলাম



  কলকাতা আগের থেকে অনেক পরিষ্কার অনেক মানে অনেক চোখে পড়ার মতো

  পশ্চিমবঙ্গের, অন্তত আমাদের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিটি আর আগের মতো পরিষ্কার নেই বেশ ঘোলাটে হয়েছে সেই সব সোনালি দিন গেছে যখন বাড়ির সবাই হয় সি পি এম, নয় অ্যান্টি সি পি এম এখন চয়েস বেড়েছে, একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাটিও উধাও হয়েছে খাবার টেবিলে আর পলিটিক্স পাড়া যাচ্ছে না


উৎস গুগল ইমেজেস

সাদাসিধে হওয়াটাকে আমি এতদিন শুধু গুণের লিস্টেই রাখতাম, ডবল ফেলুদা দেখে বুঝলাম সেটা কখনও কখনও বিপক্ষেও যেতে পারে ফেলুদাকে হাতে রজনীগন্ধার মালা পেঁচিয়ে মুজরোতে পাঠানোর দরকার নেই, কিন্তু শুধু বালি আর বামনগাছিতে ঘুরিয়ে মারলে একটু বোরিং লাগে বইকি এবার প্লিজ হত্যাপুরী হোক, প্লিজ

ডবল ফেলুদা দেখতে গিয়েছিলাম সাউথ সিটি আইনক্সে পার্কিং লটের বারান্দা থেকে সাউথ সিটির ফ্ল্যাটগুলো দেখতে দেখতে দেভের কথা মনে পড়ল ওই বাড়িরই কোনও একটা ফ্ল্যাটে থাকেন আমাদের বাংলার সুপারস্টার আমি দেভের প্রতি পার্শিয়াল তার কারণ, এক, দেভ লম্বা, দুই, দেভ নিজের কাজে সফল বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়েছি দেভ বলেছেন, শুধু সাউথ সিটির দর্শকদের জন্য বানানো ছবিতে অভিনয় করতে গেলে তাঁকে আর সাউথ সিটিতে ফ্ল্যাট কিনতে হত না আমি ভাবছিলাম, সাউথ সিটিতে ফ্ল্যাট কিনতে গেলে আমাকে কী করতে হবে

কলকাতায় থাকার যদি আধখানা কারণও আমাকে খুঁজে বার করতে বলা হয় তাহলে সেটা হবে বাংলায় কথা বলতে পারা অন্য ভাষাগুলোর তুলনায় বাংলায় আমার কমপ্যারেটিভ অ্যাডভান্টেজ কত বেশি হওয়া সত্ত্বেও আমাকে সকাল থেকে সন্ধ্যে অন্য ভাষাগুলোকে অস্ত্র করে লড়ে যেতে হয়, উপলব্ধি করে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে এই যেমন আজ দুপুরে ক্যাফে কফি ডে-তে কফির অর্ডার দিলাম ভদ্রলোক বললেন, কফি স্ট্রং হবে? আমি বললাম, হ্যাঁ তারপর দাম শুনে সন্দেহ হতে বললাম, দাঁড়ান দাঁড়ান, স্ট্রং কফির কি দাম বেশি? ভদ্রলোক বললেন হ্যাঁ আমি বললাম, তাহলে স্ট্রং চাই না, উইকই চলবে ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে কম্পিউটার স্ক্রিনে জোরে জোরে টোকা মেরে অর্ডার বদলালেন আমি বীরদর্পে টেবিলে ফেরত গেলাম এই চালাচালিটাই হিন্দি কিংবা ইংরিজিতে করতে গেলে আমার কনফিডেন্স অন্তত সিকিভাগ হয়ে যেত তখন ধড়িবাজিটা ধরে ফেলার পরও হয় স্রেফ কথা বাড়ানোর ভয়ে আমি বেশি টাকা দিয়ে স্ট্রং কফি খেতাম, নয় অর্ডার বদলাতে গিয়ে কোঁচকানো ভুরু দেখে হাঁটু কাঁপত। সারাদিন সব লড়াইয়ে যে হারি তার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল এতদিনে।



December 24, 2016

সাপ্তাহিকী








How much better is silence; the coffee cup, the table. How much better to sit by myself like the solitary sea-bird that opens its wings on the stake. Let me sit here for ever with bare things, this coffee cup, this knife, this fork, things in themselves, myself being myself. 
                                                                      ---Virginia Woolf, The Waves

একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা নিজের ফোন ইচ্ছে করে চুরি করিয়ে তারপর অ্যাপের সাহায্যে সেই ফোন/চোরকে ফলো করে একখানা সিনেমা বানিয়েছেন। অনেক চেষ্টা করেও আমি মন থেকে এই ভাবনাটা ঝেড়ে ফেলতে পারছি না যে এখানে চলচ্চিত্রনির্মাতার নীতিবোধটা বেশি প্রশ্নযোগ্য। 

আমাদের দৃষ্টির একটা স্পিড লিমিট আছে জানতেন? মানে কোনও বস্তু যদি সেই লিমিটের বেশি জোরে ছোটে তাহলে আপনি সেই বস্তুটিকে স্থির দেখবেন।

পৃথিবীর সবথেকে বড় পিরামিড কোন দেশে খুঁজে পাওয়া গেছে বলুন দেখি। ঠিকই ধরেছেন, দেশটার নাম ম দিয়েই শুরু বটে। কিন্তু মিশর নয়। মেক্সিকো। 



লেক মাথেসন। ভোর থেকে সন্ধ্যে, গ্রীষ্ম থেকে শীত। 

Strategy on the part of the good writer of prose consists of choosing his means for stepping close to poetry but never stepping into it. নিৎশের মতে।


Interesting facts about every country in the world. Part 1. Part 2.

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতে দুহাজার ষোলোর সেরা দশটি রহস্য উপন্যাস। এর মধ্যে ক্লেয়ার ম্যাকিনটশের ‘আই লেট ইউ গো’ পড়ার ইচ্ছে আছে খুব।

বারাক ওবামার এই ফেয়ারওয়েলের বাজারে বারাক ওবামার লাখ লাখ ছবি, ক্যান্ডিড কিংবা  ইন্টারনেটে ঘুরছে। কিন্তু এই ‘প্রেসিডেন্ট’এর গোটাটা এই সবে ক্যামেরাবন্দী করা গেল এতদিনে।


December 23, 2016

বাড়ি



এ বছর প্রথম (এবং শেষ)বারের জন্য বাড়ি যাচ্ছি। আমরা রেডি, দু’তরফের বাবামা রেডি, বসের সম্মতি আদায় হয়ে গেছে, টিকিট তো কাটা হয়ে গেছে, জানালার ধারের সিট বেছে চেক ইনও করে ফেলব, কেনাকাটা সারা, ব্যাগ গোছানো হয়নি কিন্তু হয়ে যাবে। বড়দিনে কী করছ?র উত্তরে যেই বলছি, বাড়ি যাচ্ছি, সবাই হিংসে হিংসে মুখে তাকাচ্ছে। তারপর জিজ্ঞাসা করছে, ক’দিনের জন্য? আমি বলছি এই তো শনিবার বেরোব, বুধবার ফিরব। 

অমনি হিংসে উধাও। 

মাত্র?

আরেকটু বেশিদিনের জন্য যেতে পারতে। 

ছুটি পেলে না নাকি?

আমি সুযোগ পেয়ে প্রশ্নটা ধরে ঝুলে পড়ি। ছুটির কথা আর বোলো না, যা টানাটানি।

কিন্তু এটা মিথ্যে কথা। সত্যি কথাটা হচ্ছে ছুটি পেলেও আমি এর থেকে বেশিদিনের জন্য বাড়ি যেতাম না। 

তার কারণ এই নয় যে আমার মাবাবাঠাকুমাকে যথেষ্ট ভালোবাসি না। মা যখন এনে জলের গ্লাসটা হাতে ধরান, আমার মনে হয় না, ওরে বাবা খেটে খেটে মরলাম। বাবা যখন সকালবেলা উঠে, কী সোনামা, কী খবর বলে খাটের পাশে এসে বসেন, বেড়ানোর গল্প করেন, চেনাঅচেনা জায়গার খোঁজখবর দেন, আমার মোটেই মনে হয় না যে এসব গল্প করার থেকে বরং রাজনীতির হেডলাইনগুলোতে চোখ বোলালে ভালো হত। ঠাকুমা যখন একশোবার বলার পরও একশো এক বারের বার অর্চিষ্মানের সঙ্গে আমার কখন কোথায় দেখা হল সে গল্প শুনতে চান, আমার একবারও মনে হয় না, উফ মহিলা বকে বকে মাথা ধরিয়ে দিলেন। 

বরং রোজ সকালে উঠে ঠাকুমাকে জাপটে ধরে ঠাকুমার ভাঙা গালে গাল পাততে যে আরামটা হয় সেটা প্রকাশ করার মতো ভাষা আমার নেই। আমার পাঁচ আটের ঠাকুমা, খাটে শুয়ে থেকে থেকে আমার প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছেন। ঠাকুমার আঙুলগুলো এখন টেনে সোজা করে না ধরলে সোজা হয় না, অথচ ওই আঙুল একদিন দুধওয়ালাকে, বাবাকে, এমনকি জেঠুকেও বকত। ভাতের গ্রাস আমার মুখে পুরে দিত, রান্নাঘরের দরজা দিয়ে আকাশের দিকে তাক করে আমাকে আকাশের দিকে দেখাত। ওটা কী? ওটা ঘন কালো মেঘ। উঁহু। ওটা হচ্ছে বকাসুর। সোনা ভাত খেয়েছে না গালে পুরে বসে আছে দেখতে এসেছে। 

মানুষগুলো যদি ছেড়েও দিই, বাড়িটাকেও আমার দারুণ ভালো লাগে। সুরকির দেওয়াল, উঁচু উঁচু চৌকাঠ, দরজায় খিল, জানালায় শিক, শিকের ওপারে পেঁপে আর রঙ্গনগাছ, ছাদ, ছাদের ওপর খোলা আকাশ। আকাশের গায়ে নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখা যায়। আর স্পষ্ট শোনা যায় দেড় কিলোমিটার দূর থেকে পরিশীলিত গলার ঘোষণা, দু’নম্বর প্ল্যাটফর্মে তারকেশ্বর লোকাল ঢুকছে।

তবু আমার বাড়িতে দু’দিনের বেশি থাকতে ভালো লাগে না কেন? কেন না, স্বাধীনতা হীনতায় আর কেউ চাক না চাক, আমি বাঁচতে চাই না। 

এটাও বলে বোঝানো শক্ত। আমার বাড়িতে আমি কি পরাধীন? মোটেই না। যখন বাড়িতে থাকতাম তখন কি স্বাধীনতা নিয়ে বাবামাঠাকুমাপিসির সঙ্গে প্রভূত সংগ্রাম করতে হত? তাও না। জীবনের প্রথমবার প্রেম করার উত্তেজনায় মাস চোদ্দ আমি কিছু বাঁদরামো করেছিলাম, সেটুকু ছাড়া আমার বাবামা স্বীকার করবেন যে আমাকে সামলাতে করতে তাঁদের কোনও সমস্যা হয়নি। ডানে যেতে বললে ডানে গেছি, বাঁয়ে বললে বাঁয়ে, উঠতে বললে উঠেছি, বসতে বললে বসেছি। এবং স্বেচ্ছায়ই করেছি। বাবামা যে বেঁধে মারছেন এ কথা মনে স্থানও পায়নি। এখন যখন বড়বড় লোকদের ইন্টারভিউতে তাঁদের ওয়াইল্ড ছোটবেলার কথা শুনি, কারও কথা শোনেননি, কোনওদিন নিয়মের নিগড়ে নিজেদের বাঁধতে পারেননি, আফসোস হয়। বুঝি কেন আমার কোনওদিন বড়মানুষ হওয়া হবে না। আমার ক্লেম টু ফেম, আমি ভয়ানক বাধ্য। এখনও পরিস্থিতি বিন্দুমাত্র বদলায়নি, বদলানোর আশাও নেই। আমার ছোটবেলার মতো বুড়োবেলাও আগাপাশতলা পোষমানা। কাজেই এমন নয় যে দিল্লির বাড়িতে আমি পার্টি করে ফাটিয়ে দিচ্ছি, রিষড়ার বাড়িতে সেসব করা যাবে না বলে আমি সেখানে থাকতে চাই না। 

কিন্তু এই জানাটা, যে এঁরা চাইলে আমাকে বকতে পারেন, আমার ওঠাবসা, জীবনাচরণ নিয়ে মন্তব্য করতে বা আপত্তি তুলতে পারেন, এবং যদি সে রকম হয় তাহলে আমি, স্রেফ বাধ্য হওয়ার সুবাদেই, আমার রকম ছেড়ে তাঁদের রকমে নিজেকে গুছিয়ে নেব, এই জানাটাতেই আমার আতংক হয়। কোনও আদর, কোনও নস্ট্যালজিয়া, কোনও চেনা দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ আমার সে আতংক নিরাময় করতে পারে না। আমার পিঠেপায়েস চাই না, রাতে ম্যাগি খেয়ে শুয়ে পড়ার অধিকারটুকু চাই। 

এই মুহূর্তে হাঁ করে আছি আর দু’দিন পর বাবামাঠাকুমাকে দেখব বলে, ছাদে উঠে ঘুরব বলে, মায়ের পাশে আমার চেনা জানালার পাশে শুয়ে ঘুমোব বলে। বাড়ি গেলে ভীষণ আনন্দ হবে জানি, কিন্তু আরাম হবে না। 

আরাম হবে আবার যখন চাবি ঘুরিয়ে আমার এই দু’কামরার ভাড়াবাড়িতে ঢুকব। নিজেকে নিজে সুটকেস কাল গোছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনওমতে জামাকাপড় ছেড়ে খাটের ওপর লেপের তলায় ঢুকে বুকের ওপর ল্যাপটপ নিয়ে কানে হেডফোন গুঁজব। তখনই আবার আমিই আমার মালিক। তখনই আবার আমি সবথেকে সুখী।

আপনাদের বাড়িতে থাকতে ভালোলাগে? ক’দিন?


December 22, 2016

স্ট্রিট কুইজিন / দ্য মসালা ট্রেল, জনপথ



আন্টিজির দোকানে ফিকি চায়ের আলাদা ব্যবস্থা নেই। সসপ্যানে চিনি দেওয়ার আগে যদি পৌঁছতে পারো তাহলে তোমাকে ‘ফিকি চা নিকালকে’ দেওয়া হবে, চিনি দেওয়া হয়ে গেলে হয় মিষ্টি চা খাও নয় পরের ব্যাচের চায়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাক। তবে আন্টিজির দোকানের যা বিক্রি তাতে পরের ব্যাচের জন্য দাঁড়াতে হলেও সেটা মেরেকেটে আট মিনিট। অনেক সময় আমাকে দেখে বৌমা ঘোমটার আড়াল থেকে হাসেন। চিনি ডাল দিয়া। আমি মুখে হতাশার ভাব ফুটিয়ে বলি, কোই নহি কোই নহি, কিন্তু মনে মনে ভয়ানক খুশি হই। বৌমা ভেজা ন্যাতায় সসপ্যানের গরম হাতল জড়িয়ে কেটলিতে চা ট্রান্সফার করে খালি সসপ্যানে জল ঢালেন। নর্ম্যাল ব্যাচের থেকে কম পরিমাণে, যাতে আমাকে বেশি দাঁড়াতে না হয়।   

কিন্তু আমার দাঁড়াতে ভালো লাগে। কারণ আমার ডেস্ক যতখানি বোরিং আন্টিজির দোকান ততখানিই জমজমাট। আন্টিজির দোকান হচ্ছে আন্টিজির সংসার। ছেলে বৌমা, নাতিনাতনি, আংকলজি। আর খদ্দের। তাঁরা অটো, স্কুলবাস, বাইক, গাড়ি থেকে নেমে আসেন, আংকল আন্টির খোঁজখবর নেন, নাতিনাতনির কান মুলে চুল ঘেঁটে দেন। কেউ আবার একেবারেই অপরিচিত। আসেন, খান, টাকা দেন, চলে যান। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি।

আন্টিজির নাতিনাতনি থাকলে তাদের দেখে দেখেই সময় কেটে যায়। এই একজন আরেকজনের পিঠে গুমগুম করে কিল মারছে, পরক্ষণেই গলা জড়িয়ে আদর, পরক্ষণেই ওয়ান টু থ্রি বলে খেলা শুরু। খেলার নিয়ম অতি সরল, একজন দৌড়লে বাকিরা তার পেছন পেছন দৌড়বে। কোনও কোনও দিন নাতিনাতনি, বকুনি খেলে কিংবা পরদিন ক্লাস টেস্ট ইত্যাদি থাকলে, ফুটপাথে মাদুর বিছিয়ে বসে হোমওয়ার্ক করে। তখন আমার অন্য দিকে তাকানোর ফুরসৎ হয়। যে দিকে আংকলজি উনুন নিয়ে বসেছেন। 

আংকলজির উনুনে সকালবেলা ব্রেড পকোড়া ভাজা হয়। আমি যখন যাই তখন ঝুড়িতে শুধু পকোড়ার গুঁড়ো, আর টিফিনবাক্সে তলায় আর আশেপাশে সবুজ পুদিনা চাটনির ফোঁটা ফোঁটা চিহ্ন পড়ে থাকে। আমি যখন যাই তখন লাঞ্চ তুঙ্গে।  

লাঞ্চের মেনু সরল। রুটি, সবজি (কখনও কখনও ডাল) আর সঙ্গে মশলামাখানো ডাঁটিশুদ্ধু মোটামোটা কাঁচালংকা। এই মশলা মাখানোর প্রক্রিয়াটার সাক্ষী হয়েছিলাম আমি একদিন। বড় ডেকচিতে কিলোখানেক সবুজ লংকা, বসে তাদের ম্যানেজ করা যায় না, দাঁড়িয়ে হাঁটুতে এক হাতের ভর রেখে অন্য হাতের হাতা দিয়ে আন্টিজি বেশ করে নাড়েনচাড়েন। ঝাল মিষ্টি, মেলানোমেশানো একদম অন্যরকম একটা গন্ধে চারপাশ ভরে থাকে।

খদ্দেরদের বসার জন্য ইটের পাঁজার কিংবা গাছের গুঁড়ির সিট। খালি ডালডার টিনের ডাইনিং টেবিল। খদ্দের আসনগ্রহণ করলে আংকলজি স্টিলের থালায় রুটি, রুটির ওপর একটি কি দুটো মশলাদার লংকা আর প্লাস্টিকের চৌকো প্লেট রাখেন। সেই প্লেটে  হাতা দিয়ে ডেকচি থেকে সবজি/ ডাল তুলে প্লেটে ঢেলে খদ্দেরের হাতে তুলে দেন। খানিকক্ষণ পর উল্টোদিক থেকে থালা এগিয়ে আসে, আবার এক হাতা সবজি কিংবা ডাল, আরও দুটো রুটি। 

ইটের পাঁজার পিঁড়িতে উনুনের সামনে বসে থাকেন আংকলজি, উনুন আর তাঁর মাঝখানের ফুটপাথে একটা টাইলের টুকরো। পাশের পাত্র থেকে একেকটা লেচি তুলে এনে সেই টাইলের ওপর বেলেন আংকলজি,  বেলুনির আগুপিছুর তালে তালে রুটি ঘোরে, ছোট থেকে বড় হয়। আন্টিজি গোটাদুয়েক কয়লা ফেলে দেন উনুনে, আগুন গনগন করে ওঠে, দুয়েকটা ফুলকি ছিটকে এসে গায়ে লাগে মাঝে মাঝে। কবজির শিরা ফুলিয়ে আংকলজি লোহার চাটু উনুনে ওঠান নামান। চিমটে চাপা রুটি দ্বিমাত্রিক বৃত্ত থেকে ত্রিমাত্রিক ফুটবল হয়ে যায়। একটা ঝুড়ি পাশে রাখা থাকে বটে কিন্তু পিক টাইমে সে ঝুড়িতে গিয়ে পড়ার সময় হয় না তার, উনুন থেকে সোজা খদ্দেরের প্লেটে। 

আমার ফিকি চা গবগবিয়ে ফোটে, আমি হাঁ করে আংকলজির রুটির কারখানা দেখি। আংকলজির পায়ের পাতা, কবজি, খদ্দেরের সোয়েটারঢাকা পিঠে রোদ্দুর ঝিলমিল করে, আমার বেসমেন্টের ঠাণ্ডা, টিউবলাইটজ্বালা ঠাণ্ডা ক্যান্টিনের কথা মনে পড়ে, যেখানে একটু আগে ফয়েলছেঁড়া রুটি দিয়ে টিন্ডার তরকারি খেয়েছি বসে বসে। আর যেদিন টিন্ডার ভয়ে সিকিউরিটিরক্ষিত দামি দোকানের দেড়শো টাকার স্যান্ডউইচ খেয়ে আসি, বিস্বাদ এবং বাসি, সেদিন পাপবোধে সারা গা রি রি করে। 

ভাবি, কবে ইটের পাঁজায় বসে স্টিলের থালার বাড়ানো হাতের মিছিলে লাইন দেওয়ার সাহস হবে আমার।

*****

আমার ফেভারিট কুইজিন জিজ্ঞাসা করলে ভিয়েতনামিজ, আর কোন কুইজিন সয় না জিজ্ঞাসা করলে কানটান মুলে, জার্মান বন্ধুদের কাছে ক্ষমাটমা চেয়ে, ইটস নট ইউ ইটস মি বলেটলে ওদের খাবারের নাম নিই বটে, কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে এগুলো সবক’টাই মিথ্যে। কারণ সাইকেলের ঝুড়ি ভরে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করা, নরম প্যাঁচালো প্রেটজেলে কামড় বসানো আমার কাছে পৃথিবীর সেরা ফিলিংগুলোর একটা। কিংবা বাজারের পাথরপাতা গলিতে দাঁড়ানো ঠেলাগাড়ি, যার ছাদ থেকে ঝোলে একটা লাল কেচাপ আরেকটা হলুদ মাস্টার্ডের বোতল আর আগুনে সেঁকা মাংসের গন্ধে জিভে জল এসে যায়। পাউরুটির দৈর্ঘ্য ছাপিয়ে এদিকওদিক থেকে বেরিয়ে থাকে সসেজের মুণ্ডু আর লেজ। একজন বলেছিল, ইটস জাস্ট ফর হোল্ডিং দ্য হট সসেজ। ইউ মিন দ্য ব্রেড ওয়ার্কস লাইক আ ন্যাপকিন? এক্স্যাক্টলি। সসেজে কামড় বসালে আগুনে পোড়া চামড়া দাঁতের আগায় কুড়কুড় করে ভাঙে। পরীক্ষা করে দেখার দরকার নেই, পাঁচতারা রেস্টোর‍্যান্টের ইস্তিরি উর্দিবাহিত হয়ে আসা ভিয়েতনামিজ খাবারের থেকে ও জিনিস আমার প্রত্যেকবার বেটার লাগবে। 

অর্থাৎ, আমার ফেভারিট কুইজিন হল স্ট্রিট কুইজিন। মায়ের হাতের মতো রাস্তার সঙ্গেও খাবারদাবারের একটা আত্মিক যোগাযোগ আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। রেস্টোর‍্যান্টে বসে কাঠি রোল খাই। কিন্তু কিছুতেই ছোটবেলার বাপি রোল সেন্টারের রোলের স্বাদ পাই না। টুপি পরা শেফ বাপির থেকে খারাপ রোল বানান এ তো হতে পারে না, কিংবা তাঁর অরগ্যানিক মুক্তমনা শশা রিষড়া বাজারের ছাঁট শশার থেকে খেতে খারাপ তাও অসম্ভব। কাজেই একটাই ব্যাখ্যা। দৃষ্টির পেরিফেরিতে খোলা ড্রেন নেই, আর পায়ের কাছে বসে নেই হাসিহাসি মুখের লেজনাড়া নেড়ি। এ দুটোর ব্যবস্থা করতে পারলে শেফ বাপির সঙ্গে টক্কর দিতে পারবেন, না হলে এ জীবনে আর হল না।  আমার অনেকসময় বাড়ির খাবারও রাস্তায় খেতে ভালো লাগে। বিশেষ করে ফল। রাস্তার দোকানের কাটা শশা কিংবা পেয়ারা, মশলানুন দিয়ে।। এমনকি যে সিঙ্গাপুরি কলা আমার দু’চক্ষের বিষ, ছোটবেলায় দিল্লি বেড়াতে এসে যন্তরমন্তরের বাইরের এক কলাবিক্রেতা সেই সিঙ্গাপুরি কলাই মাঝখান থেকে চিরে সরু ছুরির মাথায় মশলানুন পুরে দিয়েছিলেন। খেয়ে মাকে বলেছিলাম, তুমি যদি এরকম করে দাও তাহলে আমি রোজ সিঙ্গাপুরি কলা খেতে পারি। মা মুখে কী বলেছিলেন মনে নেই, মনে মনে নির্ঘাত বলেছিলেন, তাহলে না খেয়েই থাক।

কিন্তু এটাও সত্যি যে স্ট্রিট কুইজিন স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে খাওয়ার কিছু বাধাবিপত্তি আছে। এক, স্বাস্থ্যজনিত। দুই, এত খেয়ে শেষ করা সম্ভব নয়। আর কিছু কিছু অপারগতা জাস্ট গাধামো। লোকে কী ভাববে। আমার মতো দেখতে কেউ ওখানে দাঁড়িয়ে খাচ্ছে না, আমি গেলে নির্ঘাত লোকে পাগল ভাববে ইত্যাদি। 

শেফ ওসামা জালালি আমার মতো গাধাদের জন্য জনপথে প্রকাণ্ড, আধুনিক, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেস্টোর‍্যান্ট খুলেছেন, নাম দিয়েছেন ‘দ্য মসালা ট্রেল’। দোকানের স্পেশালাইজেশন হচ্ছে ভারতের নানা প্রদেশের স্ট্রিট ফুড। কলকাতার ফুচকা (ফুচকা শব্দটা যথেষ্ট কিউট মনে হয়নি বোধহয়, মেনুতে ‘ফুচকাই’ লিখে রেখেছে), চৌপট্টির ভেলপুরি, আগ্রার পরোটা, বেনারসের কচুরি ও চাট, অমৃতসরের কুলচা, দিল্লির লাড্ডু।

দোকানের ঠিকানা বাহান্ন, জনপথ। সারাভানা ভবনের ঠিক পাশেই। শনিবার দুপুরবেলা সারাভানা ভবনের বাইরে মেলার মতো ভিড়। সমানসমান না হলেও মসালা ট্রেল-এর সামনেও জটলা। দেখে আশ্বস্ত হলাম। তার মানে হাইপটা শুধু জোম্যাটোর সাইটে নয়, বাস্তবেও। আমি গিয়ে সবে অপেক্ষার লিস্টে আমার নামের শর্ট ভার্শানটা লেখাচ্ছি, কে ব্যানার্জি, এমন সময় দোকানের দরজা খুলে একজোড়া মিলিটারি গোঁফ উঁকি মেরে বললেন, দো হ্যায় কোই? আমরা হ্যায় হ্যায় বলতে বলতে দৌড়ে ঢুকে গেলাম।


বেনারসের কচুরি। ছোলার ঘুগনির বিছানায় পুর ভরা কচুরির ওপর লাল চাটনি, কাঁচালংকা আর আদাকুচি। 

কাঁচালংকার পরোটা দিয়ে কাশ্মীরী আলুর দম। এত ভালো আলুর দম আমি কম খেয়েছি। আলু তো ভালোই, বলার মতো হচ্ছে ঝোলখানা। এত ভালো যে নিজস্ব ছবি দাবি করে। এতরকম স্বাদের এমন সূক্ষ্ম সহাবস্থান, কেউ যদি বলত এর রেসিপিতে চৌষট্টিটা সিক্রেট মশলা আছে, আমি বিশ্বাস করে ফেলতাম। 


শেষে কুলফি ফালুদা। ভালো, তবে এর থেকে ভালো কুলফি আমি খেয়েছি। এই দিল্লিতেই। পাণ্ডারা রোড বাজারের চিলতে কিন্তু ঐতিহ্যশালী কৃষ্ণা কুলফিতে। 

অভিযোগ? আছে। স্ট্রিট কুইজিনের মুকুটহীন রাজা যিনি, তাঁকেই মেনু থেকে বাদ দেওয়া। সত্যি বলছি, সেই মুহূর্তে ফালুদা কুলফি আমার দরকার ছিল না। সেই মুহূর্তে আমার দরকার ছিল ফুটিয়ে ফুটিয়ে ঘোর বাদামিবর্ণ এক ভাঁড় কড়া চায়ের। 

দ্য মসালা ট্রেল আমাদের দুজনেরই অসম্ভব ভালো লেগেছে। প্রতিটি রান্নায় যত্নের ছাপ, যা খেয়েছি সবই অসামান্য খেতে। আর তাইতে আমাদের বিশ্বাস জন্মেছে যে যা যা খাওয়া হল না সেগুলোও খেয়ে দেখা জরুরি। আগ্রা কবে যাব না যাব, তা বলে কি আগ্রার পরোটা খাব না? পুরোনো দিল্লির পাপড়ি চাট না হয় একদিন গিয়ে খেয়ে আসা যাবে, কিন্তু রাজস্থানের বাজরার খিচুড়ি? আর মাইসোরের আলুবোন্ডা? এ সবের মায়া যদি ছেড়েও দিই, কানপুরের ‘গড়বড় চাট’ শুধু নামেই আমাকে কাত করেছে, মেনুতে দেখে এসে ইস্তক শয়নেস্বপনে তার নিশিডাক শুনছি। এরপর কোনওদিন সি পি-র ওদিকে গেলে সময় করে খেয়ে আসতে হবে। 



December 19, 2016

এ মাসের বই/ নভেম্বর ২০১৬ঃ তিনটি নভেলা




নভেম্বর মাসের বইয়ের পোস্টের নাম হওয়া উচিত ছিল 'একটি নভেল ও তিনটি নভেলা'। নভেলটা বাদ গেল, কারণ সেটার প্রতি আমার মনোভাব এত জটিল এবং অসংবদ্ধ যে লিখতে গিয়ে প্রাণান্ত হচ্ছে। এদিকে ডিসেম্বর মাস শেষ হতে আসছে প্রায়। তাই আমি নভেল বাদ দিয়েই পোস্ট ছাপলাম। নভেলের কথা পরের মাসের (ডিসেম্বরের) বইদের সঙ্গে থাকবে। এত দেরি করে বইয়ের পোস্ট লেখার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। 


একটা কথা আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।  লেখক কী করে ঠিক করেন যে কোন গল্পটা ছোটগল্প হবে, কোনটা নভেলা, আর কোনটা উপন্যাস? যে কোনও আইডিয়াকেই কি ইচ্ছে করলে ছোটগল্প, ইচ্ছে করলে নভেলা আবার ইচ্ছে করলে টেনে উপন্যাস বানানো যায়? নাকি আইডিয়াদের নিজস্ব সম্ভাবনা থাকে? লেখকের কেরামতি শুধু সেই সম্ভাবনাটাকে চিহ্নিত করায়?

*****

The Hangman/ Louise Penny


লুইস পেনির আরম্যান্ড গামাশ সিরিজের নভেলা ‘দ্য হ্যাংম্যান’। কানাডার কিউবেক অঞ্চলের থ্রি পাইনস গ্রামের পাশের জঙ্গলের একটি গাছ থেকে একদিন একটি মৃতদেহ ঝুলতে দেখা যায়। চট করে দেখে মনে হবে আত্মহত্যা। কিন্তু অফ কোর্স, চিফ ইন্সপেক্টর গামাশ একবার তাকিয়েই বুঝে ফেলবেন যে ওটা আত্মহত্যা নয়, খুন। তদন্ত শুরু হবে এবং অপরাধীরা ধরা পড়বে। 

হ্যাংম্যান আমি পড়তাম না। কারণ তার আগের খেপের রিডিং স্লাম্প চলাকালীন, ‘ইজি রিড’ হওয়ার সুবাদে আমি গামাশ সিরিজের পরপর পাঁচছ’খানা উপন্যাস পড়েছি এবং দ্বিতীয়টা প্রথমটার থেকে, তৃতীয়টা দ্বিতীয়টার থেকে এবং চতুর্থটা তৃতীয়টার থেকে ইত্যাদি . . . বেশি খারাপ লেগেছে। 

তার পরেও আমি হ্যাংম্যান পড়লাম কেন?

কারণ আরেকটা রিডিং স্লাম্প। সেলফিশ জিন ঠেলে এগোতে পারছিলাম না। আর আগের খারাপলাগাগুলোও ফিকে হয়ে এসেছিল। তাই হ্যাংম্যান শুরু করলাম। পড়লাম এবং গল্পটা শেষ করে প্লেজেন্টলি সারপ্রাইজড হলাম। গামাশ সিরিজের যাবতীয় বইয়ের মধ্যে এইটাই বেস্ট লাগল। 

তার অন্যতম কারণ শব্দসংখ্যার সীমাবদ্ধতা। গল্প ছেড়ে এদিকওদিক চলে যাওয়ার প্রবণতা, যা লুইস পেনির মধ্যে অতিমাত্রায় বিদ্যমান, সেটা এখানে করার চান্স নেই। গল্প ছোট রাখতে গিয়ে অবান্তর চরিত্রদের অকারণ ফুটেজ দেওয়ার আরামও বলি দিতে হয়েছে লেখককে। এ গল্পে গামাশ আর গামাশের সহকারী বাদে মোটা গোটা দুই চরিত্র চেনা, তাও গল্পে তাদের উপস্থিতি অকিঞ্চিৎকর। সব মিলিয়ে দ্য হ্যাংম্যান শর্ট এবং সহনীয়র থেকে খানিকটা বেশিই। পাঁচে তিন। 

*****

Rita Hayworth and Shawshank Redemption/ Stephen King


স্টিফেন কিং-এর ‘রিটা হেওয়ার্থ অ্যান্ড শশাংক রিডেম্পশন’ নভেলা শুরু করার আগে আমি ভাবলাম সিনেমাটার নামের সঙ্গে বইটার নামের মিল আছে, তার মানে কি সিনেমার গল্পের সঙ্গে কিং-এর গল্পের কোনও মিল আছে?

সত্যিটা উপলব্ধি করার পর যে গ্লানিটা জেগেছিল সেটা কাটতে লাগল মিনিট দশেক। তারপর আমি গল্পটায় ঢুকলাম। 

গল্প তো সকলেই জানেন। শশাংক হচ্ছে অ্যামেরিকার মেইন রাজ্যের একটি কাল্পনিক সংশোধনাগার। যদিও তার ভেতরের রকমসকম দেখলে আন্দাজ করা শক্ত যে সেখানে কারও কোনওরকম সংশোধন হওয়া সম্ভব। সেই জেলে অ্যান্ড্রু নামের এক উচ্চবিত্ত ব্যাংকার, স্ত্রী ও স্ত্রীর প্রেমিককে খুন করার মিথ্যে অভিযোগে সাজা কাটাতে আসে। তারপর তার জীবনে, শশাংকের তৎকালীন অধিবাসীদের জীবনে কী কী ঘটনা ঘটে তাই নিয়েই শশাংক রিডেম্পশনের গল্প। 

পোস্টারে বড় বড় করে ‘হোপ’ ইত্যাদি ছাপা দেখে সন্দেহ হতে পারে গল্পটা বোধহয় পাওলো কোয়েলহো ঘরানার, কিন্তু তা নয়। হোপ গল্পটির মূল কথা সত্যিই এবং অবিশ্বাস্য প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে বুকের ভেতরকার ‘লাইট’ অনির্বাণ রাখাটাই রিটা হেওয়ার্থ অ্যান্ড শশাংক রিডেম্পশন’-এর থিম, কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে আমাকে সেগুলো তত টানেনি। আমাকে টেনেছে রেড। অ্যান্ড্রু যতখানিই অবাস্তব (বা অ্যাসপিরেশনাল), রেড ততখানিই রক্তমাংসের। 

রেড শশাংকের আরেক লং-টার্ম বাসিন্দা। সম্পত্তির জন্য স্ত্রীকে খুন করে, আরও এক মহিলা এবং তাঁর নবজাতককে কোল্যাটারাল ড্যামেজ হিসেবে বলি দিয়ে, (যদিও সেটা রেডের প্ল্যানের অংশ ছিল না) রেড জেলে ঢুকেছে। এই রেডই আমাদের গল্পটা বলে। রেডের মতো কাউকে আমি চিনি না, চেনার সম্ভাবনাও প্রায় শূন্য, কিন্তু স্টিফেন কিং রেডের কণ্ঠস্বর এমন ভালো ফুটিয়েছেন যে আমার সত্যি মনে হয়েছে যে রেডের মতো রক্তমাংসের চরিত্র আমি বহুদিন দেখিনি। 

রেডকে তো ভালো লেগেছেই, তার থেকেও আমার ভালো লেগেছে নেপথ্যে থেকে রেডের গল্প বলার ভঙ্গি, বা রেডকে দিয়ে গল্প বলানোর লেখকের সিদ্ধান্ত। এই যে দরজার একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে ঘটনা ঘটতে দেখা, এইটা আমার ফেভারিট পজিশন, কী বাস্তবে, কী গল্পে। অনেকে এই ভঙ্গি পছন্দ করেন না। বলেন, বক্তার নেপথ্যচারিতা ঘটনাবলীর সঙ্গে পাঠকের দূরত্ব তৈরি করে। তাছাড়া বক্তা যদি প্লটের গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি না হন তাহলে তার প্রতি পাঠকের কিছু আসা-না-যাওয়ার মনোভাব তৈরি হতে পারে, যেটা ডেঞ্জারাস। 

আমার মত উল্টো। খারাপ করে করলে হয়তো এ সব সত্যি হবে, কিন্তু ভালো করে করলে এ দৃষ্টিকোণকে মাত দেওয়া শক্ত। তাছাড়া রেড প্রধান চরিত্র না হলেও গল্পের ঘটনাস্রোতে তার অবদান অসীম। অ্যান্ড্রুর কাছের বন্ধু হওয়ার বিরল গুরুত্ব তার আছে, আবার লাইমলাইট থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার উদারতাও। 

খুঁত কি একেবারেই ধরা যায় না? যায়। আমাদের এডিটর পেপার পড়ে নাক কুঁচকে যেটাকে বলেন “ভার্বোস”। কমসম করে লিখতে পারেন না স্টিফেন কিং। সারাংশ লিখতে দিলে গোল্লা পেতেন নির্ঘাত। এই যে আশি পাতার বই, মিতভাষী লেখকের হাতে পড়লে ষাটে গোটানোই যেত বলে আমার বিশ্বাস। 

*****

Carmilla/ Joseph Sheridan Le Fanu


She used to place her pretty arms about my neck, draw me to her, and laying her cheek to mine, murmur with her lips near my ear, "Dearest, your little heart is wounded; think me not cruel because I obey the irresistible law of my strength and weakness; if your dear heart is wounded, my wild heart bleeds with yours. In the rapture of my enormous humiliation I live in your warm life, and you shall die--die, sweetly die--into mine. I cannot help it; as I draw near to you, you, in your turn, will draw near to others, and learn the rapture of that cruelty, which yet is love; so, for a while, seek to know no more of me and mine, but trust me with all your loving spirit."
And when she had spoken such a rhapsody, she would press me more closely in her trembling embrace, and her lips in soft kisses gently glow upon my cheek.

এ সব কথা আমাদের বলছে লরা। অধুনা অস্ট্রিয়ার দক্ষিণপূর্ব কোণে স্টাইরিয়া, সেখানকার এক ঘোর জঙ্গলের মধ্যে প্রাসাদে থাকে মাতৃহারা লরা আর তার বাবা। আর থাকেন সংসার আর লরাকে দেখাশোনা করার জন্য দু’জন মহিলা। তাঁরা কেউই ইংরেজ নন। তাই পাছে মাতৃভাষা বিস্মৃত হন এই ভয়ে লরা আর লরার বাবা নিজেদের মধ্যে কেবল ইংরিজিতে কথা বলেন।

সে বনের বর্ণনা শুনলেই আপনার দৌড়ে সেখানে চলে যেতে ইচ্ছে করবে।

Nothing can be more picturesque or solitary. It stands on a slight eminence in a forest. The road, very old and narrow, passes in front of its drawbridge, never raised in my time, and its moat, stocked with perch, and sailed over by many swans, and floating on its surface white fleets of water lilies.

এমন সময় এক বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহে লরাদের বাড়িতে এক অদ্ভুত মেয়ের আগমন হয়। তার নাম কার্মিলা। সে আসার পর থেকেই প্রাসাদে এবং প্রাসাদের আশেপাশে নানারকম অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে। অল্পবয়সী মেয়েরা টপাটপ রহস্যময় অসুখে পড়ে মারা যায়, আমদের লরা-ও মরতে বসে। অসুখের কারণ এতক্ষণে না বুঝলে আপনি প্রতিভাবান, কার্মিলা হচ্ছে একজন লেসবিয়ান ভ্যাম্পায়ার যে অল্পবয়সী কুমারীদের বুকে দাঁত বসিয়ে রক্ত চুষে খায়।

জোসেফ শেরিডন লে ফানু কার্মিলা লিখেছিলেন ব্র্যাম স্টোকারের ড্রাকুলার প্রায় পঁচিশ বছর আগে। তখনও ছিল, এখনও কার্মিলা চাপা পড়ে আছে কাউন্ট ড্রাকুলার কালো আলখাল্লার ছায়ায়। জনপ্রিয়তার দিক থেকে না হলেও ভ্যাম্পায়ারঘরানার বিশেষজ্ঞরা চিরদিন কার্মিলার গুরুত্ব স্বীকার করে এসেছেন। প্রাচীনত্বের সুবাদে তো বটেই, তার থেকেও বেশি যৌনগন্ধী ভ্যাম্পায়ারের যে ট্র্যাডিশন চলে আসছে সেই ড্রাকুলা থেকে এই টুইলাইট অবধি, তার পথিকৃৎ হওয়ার সুবাদে। 

একটা নমুনা তো শুরুতেই দিয়েছি। লরা এবং কার্মিলার ওইরকম নিবিড় অন্তরঙ্গতার বর্ণনায় কার্মিলা ছয়লাপ। কার্মিলার সিকি শতাব্দী পরে লেখা ড্রাকুলাতেই ব্র্যাম স্টোকার যৌনতার মাত্রা অনেক কমিয়ে এনেছেন, তাছাড়া ড্রাকুলার যৌনতা মুখ্যত বিসমলিঙ্গের অর্থাৎ অনেক বেশি সামাজিক। সেদিক থেকে দেখলেও লরা এবং কার্মিলার অন্তরঙ্গতাকে সাহসিকতার বিচারে বেশি নম্বর দিতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ভিক্টোরিয়ান সমাজে, যেখানে যৌনতার নামে সবাই আঁতকে উঠে কানে আঙুল দিত সেখানে এমন গল্প লেখা হয় কী করে? এক একটা উত্তর হতে পারে সমাজটা ওরকম বলেই লেখা হয়। কার্মিলা (এবং ড্রাকুলাতেও) যৌনতা এসেছে তার ‘ইভিল’ত্ব প্রমাণ করার জন্যই। যে যৌনতার লোভ দেখায়, সে অমানুষ, ভ্যাম্পায়ার, আর যারা সে লোভের পথে পা বাড়ায় তাদের শাস্তি মৃত্যু। কার্মিলার ভিকটিমরা সকলেই মর্মরমূর্তির মতো সাদা এবং নিষ্কলঙ্কা কুমারী। শেষে এই সব মেয়েদের পুরুষ অভিভাবকরা ভ্যাম্পায়ারকে কোতল করে আবার মেয়েটিকে পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনেন।

কার্মিলা পড়তে কেমন? সে সময়ের মানানসই ফুলেল ভাষা, চরিত্ররাও যথাযথ। প্রধানচরিত্রের মেয়েরা হয় ভ্যাম্পায়ার নয় ভ্যাম্পায়ারের শিকার ইত্যাদি বাদ দিলে টানটান গতি এবং শেষে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যবনিকাপাত। 


December 18, 2016

Quote of the Week



পরদিন সকাল আন্দাজ সাড়ে সাতটার সময় ব্যোমকেশ বসবার ঘরে খবরের কাগজটা মুখের সামনে উঁচু করে ধরে গত রাত্রের থিয়েটারের খুনের বিবরণ পড়ছিল। সত্যবতী সকালে বাড়ি ফিরেছে, ব্যোমকেশকে এক পেয়ালা চা খাইয়ে গড়িয়াহাটে বাজার করতে গেছে, ফিরে এসে ব্যোমকেশকে আর এক পেয়ালা চা ও প্রাতরাশ দেবে। বাড়িতে কেবল অজিত আছে।

                                                           ---শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশুপাল বধ (অসমাপ্ত)



December 17, 2016

সাপ্তাহিকী




"We have inherited from somewhere—maybe from the era when there was only an hour of news available a day—the belief that having a superficial awareness of the day’s most popular issues is somehow helpful to those most affected by them."

খবরের কথাই যখন হচ্ছে তখন খবর তৈরি করিয়েদের কথাও হোক। আসল নয়, নকল। 

The world presented to us by our perceptions is nothing like reality. 


পৃথিবীর প্রথম ‘সফট’ রোবট।



December 14, 2016

36 Things I Do Not Want To Do Before I Die



১। ম্যারাথন দৌড়তে

২। এরোপ্লেন থেকে ঝাঁপ দিতে

৩। সিনেমায় নামতে

৪। টেড টক দিতে (ইন ফ্যাক্ট, কোনও রকম পাবলিক স্পিকিং করতে) 

৫। আয়ান র‍্যান্ডের বই পড়তে

৬। মদগাঁজাসিগারেট ধরতে

৭। চা ছাড়তে

৮। ডলফিনদের সঙ্গে সাঁতার কাটতে

৯। গণ-বেড়াতে যেতে

১০। লিডারশিপ/ওয়েলনেস মার্কা ট্রেনিং-এ গোল হয়ে বসে মনের কথা বলতে

১১। অষ্টমীর রাতে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে বেরোতে

১২। অর্চিষ্মানকে ছেড়ে থাকতে

১৩। বিগ বসের বাড়িতে পা রাখতে

১৪। যুদ্ধের মধ্যে পড়তে

১৫। এভারেস্ট চড়তে

১৬। চিটফান্ডে বিনিয়োগ করতে

১৭। অর্ণব গোস্বামীর অটোগ্রাফ নিতে

১৮। বাবা/মাতা/সংঘ/মিশনের পাল্লায় পড়তে

১৯। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হতে

২০। ট্যাটু আঁকতে

২১। যাঁরা বলেন নারীবাদের দরকার কী, একেবারে মানববাদ হলেই তো ভালো হয়, তাঁদের সঙ্গে কথা বাড়াতে

২২। খ্যাপা ষাঁড়ের সামনে হাজার হাজার লোকের সঙ্গে দৌড়তে

২৩। হাজার হাজার লোকের সঙ্গে পাকা টমেটো গায়ে মাখতে

২৪। একলা ঘরে ভূতের সিনেমা দেখতে

২৫। ভূতুড়ে বাড়িতে রাত কাটাতে

২৬। রাজনীতিতে নামতে

২৭। শুক্কুরবার শুক্কুরবার সন্তোষী মা-র ব্রত রাখতে

২৮। টিকিট কেটে (সত্যি বলতে কি, ফ্রিতেও) বক্সিং ম্যাচ দেখতে

২৯। আইসল্যান্ড না দেখেই মরে যেতে

৩০। অলিম্পিক/ওয়ার্ল্ড কাপ ইত্যাদি সশরীরে দেখতে যেতে

৩১। মহাশূন্যে ভাসতে

৩২। ‘এক্সট্রিম পিকনিক’ করতে 
উৎস গুগল ইমেজেস

৩৩। সালসা/জুম্বা নাচতে

৩৪। বাঘ কিংবা অন্য কারও গলায় মালা দিতে

৩৫। কলকাতা সি আই ডি-র সব সিজনের সব এপিসোডের ডিভিডি না কিনেই মরে যেতে

৩৬। পরের বছর সাঁইত্রিশজনিত লিস্ট বানানোর আইডিয়া মাথায় এলে পত্রপাঠ সেটাকে কুলোর বাতাস দিতে। ছত্রিশেরটা বানাতে গিয়ে কেমন গলদঘর্ম হয়েছিলাম সে কথা ভুলতে।


December 13, 2016

সাহিত্য, শেক্সপিয়ার, বব ডিলান



I was out on the road when I received this surprising news, and it took me more than a few minutes to properly process it. I began to think about William Shakespeare, the great literary figure. I would reckon he thought of himself as a dramatist. The thought that he was writing literature couldn't have entered his head. His words were written for the stage. Meant to be spoken not read. When he was writing Hamlet, I'm sure he was thinking about a lot of different things: "Who're the right actors for these roles?" "How should this be staged?" "Do I really want to set this in Denmark?" His creative vision and ambitions were no doubt at the forefront of his mind, but there were also more mundane matters to consider and deal with. "Is the financing in place?" "Are there enough good seats for my patrons?" "Where am I going to get a human skull?" I would bet that the farthest thing from Shakespeare's mind was the question "Is this literature?"
                                                             ---Bob Dylan, 2016 Nobel Acceptance Speech
পুরো বক্তৃতা এইখানে

December 12, 2016

বার্ষিক জমাখরচ ২/৪ঃ ২০১৬ রেজাল্ট, ২০১৭ রেজলিউশন




২০১৬ রেজাল্ট

ফেল করার আসল ডেঞ্জার আমার মতে ফেল করা নয়। আসল ডেঞ্জার হল ফেল করা অভ্যেস হয়ে যাওয়াটা। আমার দ্বারা যে পাশ করা সম্ভবই না সেই জানার বীজ বপন হয়ে যাওয়াটা। নতুন বছরের রেজলিউশন নেওয়ার আগে পুরোনো বছরের রেজলিউশন রাখতে পারার পরীক্ষার সময় যখন এল, আমার এক্স্যাক্টলি এই কথাটা মাথায় এল। যে দেখে কী লাভ। ফলাফল তো জানাই। কিন্তু দু’হাজার সতেরোর আমার একটা রেজলিউশন হল সাহসী হওয়া। পাশ ফেল যাই হোক না কেন, সত্যেরে লওয়া সহজে। এখন থেকেই তার অন্যথা করা উচিত হবে না মনে করে আমি দেখতে গেলাম দু’হাজার ষোলোতে আমি কত খারাপ করে ফেল করেছি।

গিয়ে দেখলাম,আমার দু'হাজার ষোলোর রেজলিউশন ছিল 
রোজ সকালবিকেল পড়তে + লিখতে বসা, রোজ আধঘণ্টা করে সারেগামা সাধা, রোজ মেলাগ্রাউন্ডের মাঠে সাত পাক হাঁটা - জীবনের যে কোনও কাজে, প্রতিটি কাজে, 'রেগুলার' হওয়াই আমার দু'হাজার সালের রেসলিউশন। 

আরও একটা ছিলঃ রেগুলার বই পড়া।

সাহসী হওয়ার পুরস্কার হাতে গরম পেয়েও গেলাম। অ্যাকচুয়ালি, দু’হাজার ষোলোর রেজলিউশন আমার রাখা হয়েছে। জীবনের অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে আমি রেগুলারিটি আনতে পেরেছি। দুটি সচেতন চেষ্টায়, অন্যটি ঠেলায় পড়ে। প্রথম দুটি হল পড়া এবং লেখা। তৃতীয়টি হল রাঁধা।

পড়ার ব্যাপারটা আপনারা নোটিস করেছেন হয়তো। আমার এ বছরের টার্গেট ছিল পঞ্চাশটা বই। আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে পঞ্চাশের বেশিই পড়া হয়েছে। পড়ে আমার কী হাতিঘোড়া হল, দুহাজার সতেরোয় আমি কী পড়তে চাই, ক’টা বই পড়তে চাই, দুহাজার ষোলোর থেকে পড়ার প্যাটার্নে কোনও রকম বদল আনতে চাই কি না, সে সব আলোচনা বর্ষশেষের বই পোস্টের জন্য তুলে রাখলাম। 

লেখার রেগুলারিটির অবান্তর নিজেই একটা প্রমাণ। কিন্তু এ বছর আমি অবান্তরের বাইরের লেখাকে নিয়মিত সময় দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তাতে ফল ফলেছে কি না বা ফললেও কেমন ফলেছে, সে ভবিষ্যৎ বলবে। তবে একটা তফাৎ আমি নিজেই টের পাচ্ছি। আমার লেখার স্পিড বেড়েছে। টাইপিং-এর নয়, লেখার। আগে যে সময়ে আড়াইশো শব্দ নামিয়ে ধন্য হয়ে যেতাম, এখন সেই একই সময়ে পাঁচশো লিখতে অসুবিধে হয় না।

তিন নম্বর যে কাজটা রেগুলার করছি আজকাল, সেটা হল রান্না। রান্না নিয়েও একটা পোস্টের চিন্তা আছে মাথার মধ্যে, বেশি কথা সেখানেই বলা যাবে, কিন্তু গত এক বছরে পরিস্থিতি কতখানি বদলেছে সেটা বোঝাতে একটা উদাহরণ দিই। অর্চিষ্মানের জন্ডিস ধরা পড়ার পরপর, জানুয়ারি মাস নাগাদ আমি অফিস থেকে এসে একদিন ঢ্যাঁড়স ভেজেছিলাম। এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে এ জিনিস আর যার পক্ষেই সম্ভব হোক, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এগারো মাস পর, গত সপ্তাহে আমি দু’নম্বর মার্কেটে নেমে মাংস কিনে বাড়ি ফিরে সেটাকে ম্যারিনেট করতে দিয়ে, ঢ্যাঁড়স ভেজে, টমেটো পেঁয়াজ দিয়ে ডাল আর আলু ফুলকপির শুকনো তরকারি রেঁধে, ডিঙি মেরে গ্যাসের নিচের র‍্যাক থেকে প্রেশার কুকার বার করে মাংস বসাতে যাব, এমন সময় বেল বাজিয়ে অর্চিষ্মান এসে পড়ল। এসেই “বিশ্বাস কর, লাগবে না” বলে হাত থেকে টানাটানি করে প্রেশারকুকার নিয়ে যথাস্থানে রেখে দিল। তারপর আমরা চা খেতে খেতে জয়ললিতার খবর শুনলাম। আমি সম্পূর্ণ চাঙ্গা ছিলাম। মাংস রান্না করতে আমার একটুও কষ্ট হত না। এমন তো হতে পারে না যে এগারো মাস বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার এনার্জি, গায়ের জোর ইত্যাদি বেড়েছে। ঢ্যাঁড়সভাজার কোয়ালিটি হয়তো একই আছে, কিন্তু রান্না করাটা যে আমার অনেক বেশি ধাতস্থ হয়েছে সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 


২০১৭ রেজলিউশন

“রেগুলারিটি”র থিম এ বছরও বহাল থাকবে। রেগুলারিটির নমুনা হিসেবে পড়া, লেখা, গান ও শরীরচর্চার কথা লিখেছিলাম আগের বছর, শেষ দুটো বিষয়ে দু'হাজার ষোলোতে চরম ফেল করেছি, সতেরোতে তার পুনরাবৃত্তি হলে চলবে না। পড়াসংক্রান্ত রেজলিউশনের খুঁটিনাটি আরও কিছু আছে, সেটা বর্ষশেষের বই পোস্টে বিশদে লিখব। তাছাড়াও আরও কয়েকটা বিষয়ের দিকে দু’হাজার সতেরোতে নজর দেওয়ার ইচ্ছে আছে, সেগুলো নিচে লিখলাম। 

১। সাহসী হব। বাঞ্জি জাম্পিং, হোয়াইট ওয়াটার র‍্যাফটিং সাহসী নয়। সে রকম সাহস বাড়লেও ভালোই হবে, কিন্তু আমি সে সাহসের কথা বলছি না। নিজের সিদ্ধান্তে স্টিক করার সাহস, প্রশংসা এবং নিন্দের মুখোমুখি হওয়ার সাহস ইত্যাদি বাড়ানো আশু দরকার। 

২। শ্রমের মাঝে বিশ্রাম কমাব। দশ মিনিট কাজ করে এক ঘণ্টা হাঁফ ছাড়ব না। 

৩। গানকে জীবনে ফেরত আনব। গান শেখা ছেড়েছি চোদ্দ বছর হয়ে গেল, কিন্তু গান গাওয়া ছেড়ে এত দীর্ঘদিন কখনও থাকিনি যতদিন দুহাজার ষোলোতে থেকেছি। এ ক্ষতি, এ ভুল শোধরাতেই হবে। আধঘণ্টার জন্য হলেও আমি রোজ রেওয়াজে বসব। দুনিয়া একেবারে এধারওধার না হয়ে গেলে দু’হাজার সতেরোতে রোজ আমি গলা দিয়ে সা বার করব। 

৪। রুটি করতে শিখব। বাড়ির রোজকার রান্না সবই আমি করতে পারি, এক রুটি ছাড়া। রুটিও পারি, তবে সেগুলো রুটি কম পাঁপড় বেশি হয়ে যায়। রুটির জন্য দ্বারস্থ হতে হয় মা তারা-র, পাঁচটাকা পিস, হাতে গড়া, গরম, নরম রুটি। পাঁচ টাকাটা সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে পরমুখাপেক্ষিতাটা। কাজেই প্রতিকারের চেষ্টা করে দেখতে হবে। প্রতিকার যে হবে সেটার আশা আছে বলেই আমি রেজলিউশনটা নিচ্ছি। আমি আজীবন চ্যাম্পিয়ন রুটি করিয়েদের মধ্যে বড় হয়েছি। সবাই বলে ভাত রান্না রুটি করার থেকে সোজা, আমার পিসি বলতেন, মা এখনও বলেন, রুটি করা অনেক বেশি সোজা। এঁটোকাঁটার ঝামেলা নেই, জল ঘাঁটতে হয় না, দ্রুত হয়। (সবথেকে বড় কথা, খেতেও বেটার)। রুটি করা যদি এত সোজাই হয়ে থাকে, তাহলে আমার সেটা না পারার কারণ নেই। 

৫। চপস্টিকে স্বচ্ছন্দ হব। প্লেটের শেষতম লেটুস কিংবা এক সেন্টিমিটার দীর্ঘ চাউমিনের টুকরো তুলে খেতে পারার মতো স্বচ্ছন্দ। ইচ্ছেটা অনেকদিনের। ডেলিভারির সঙ্গে কে জানে কবে একজোড়া চপস্টিক এসেছিল। বাড়িতে প্র্যাকটিস করা যাবে ভেবে যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম। তারপর যথারীতি যা হওয়ার তাই হল। সেদিন হাতাখুন্তির তলা থেকে বেরোল। রেজলিউশনের সিজনে চপস্টিকের পুনরাবিষ্কৃত হওয়ার এই সিগন্যালটা আমি অস্বীকার করতে পারলাম না। এতদিন শুধু আমি চাইছিলাম, এখন দৈবও চাইছে। অর্থাৎ সাফল্য নিশ্চিত। কাজেই এবার থেকে বাড়িতে ম্যাগি খেতে হলে চপস্টিক দিয়ে খাব। অর্চিষ্মানের অট্টহাসির পরোয়া না করেই। 


December 10, 2016

সাপ্তাহিকী







Children have never been very good at listening to their elders, but they have never failed to imitate them.
                                                   ---James Baldwin, Nobody Knows My Name


এই মেরেছে। আমি তো নিজেকে বেশ এমপ্যাথেটিক বলেই মনে করতাম। এরা বলছে ইমপালসের সঙ্গে নাকি এমপ্যাথি যায় না।

বিশ্বমানচিত্রের ভুল নিয়ে কিছুদিন আগে সাপ্তাহিকীতে একটা লিংক দিয়েছিলাম। এই ভিডিওটাতে আরেকটু প্রাঞ্জল করে বলা আছে বলে আবার দিচ্ছি।

জ্ঞানসংগ্রহ নয়, তথ্যআবিষ্কার নয়, বাস্তব থেকে পালানোর জন্য নয়, জীবনে ড্রামার খাঁই মেটানোর জন্য নয়। আমি ওই বারো পার্সেন্টের মধ্যে পড়ি, যারা বই পড়ে আরাম করা আর একলা থাকার জন্য। সারা বিশ্ব কীভাবে বই পড়ে জানতে হলে ক্লিক করুন। (ইন্ডিয়া নিয়ে চাঞ্চল্যকর একটা তথ্য জানতে হলেও।) 

ডাইনোসরের লেজসংক্রান্ত ‘রোম’হর্ষক খবর!

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এ বছরের সেরা পঞ্চাশটি ছবি। 

December 08, 2016

একটি নিখুঁত খুন



মূল গল্পঃ Blackfriars Bridge
লেখকঃ Anthony Horowitz


বিবেকানন্দ? ওহহ্‌ বালি ব্রিজ। বালি ব্রিজের ঘটনাটা শুনতে চান? না না, আপত্তি কীসের। সেই রাতের আগে শুনতে চাইলে আপত্তি থাকত, ফর অবভিয়াস রিজন্‌স, কারণ তখন ওটা ছিল একটা টপ সিক্রেট প্ল্যান, কিন্তু এখন তো আর সে রকম কিছু নেই। এখন বললেও যা, না বললেও তাই। বরং বলাই ভালো। 

ডিসেম্বর মাসের রাতে বালি ব্রিজের ওপর আমি যাকে খুন করেছিলাম তার নাম ছিল অগোছালো নীল, ব্র্যাকেটে বাপি। ওর মধ্যে একমাত্র বাপিটুকু পিতৃমাতৃদত্ত। স্কুলের নাম ছিল নীলকণ্ঠ, কবিতা লিখতে শুরু করার পর কণ্ঠ খসল, ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলার পর অগোছালো জুড়ল। মুশকিল হল বিখ্যাত হওয়ার পর। ম্যাগাজিন থেকে লোক এসে “অগোছালো নীলবাবুর বাড়ি কোথায়” জিজ্ঞাসা করলে কেউ বলতে পারত না। কাজেই বাপিটা ব্র্যাকেটে রাখতে হল। 

অগোছালো বাপিকে আমি কেন খুন করলাম? নাঃ, রোমহর্ষক কোনও কারণ আশা করলে পস্তাবেন। মানুষের খুনখারাপির ইতিহাসে যে দুটো মূল কারণ, সম্পত্তি আর সেক্স, তার একটার জন্য। অগোছালো বাপি আমার বউ সুনন্দার সঙ্গে সেক্স করছিল। তখন খুব রাগ হয়েছিল, এখন বুঝি, সুনন্দার দোষ ছিল না। আনন্দবাজারের বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল সুনন্দা সুন্দরী, সঙ্গীতজ্ঞা এবং স্নাতক, কবিতা পড়তে যে ভালোবাসে লেখা ছিল না। লিখবে কী, বাড়ির লোকেরা জানতই না। আমিও জানতাম না। জানলাম অগোছালো বাপির সঙ্গে সুনন্দার সম্পর্কটা আবিষ্কার করার পর। আবিষ্কার করলাম যদিও সুনন্দার বাড়ির লোকেরা আনন্দবাজারের বিজ্ঞাপনে বোল্ড লেটারে লিখে দিয়েছিলেন “ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া যোগাযোগ নিষ্প্রয়োজন” কিন্তু সুনন্দার আসলে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার কোনওটাই পছন্দ নয়। সুনন্দা পছন্দ করে কবিদের। কাজেই আমি যখন চেম্বারে পেশেন্টের পোকা ধরা দাঁত তুলতাম, তখন সুনন্দা ফাঁকা বাড়িতে অগোছালো বাপির সঙ্গে প্রেম করত।   

কী করে আবিষ্কার করলাম? নাঃ, এবারেও আপনাকে হতাশ হতে হবে। কোনও ভাগ্যের ফের নয়, সমাপতন নয়, দৈবদুর্বিপাকে নয়। যতখানি বোরিং ভাবে সম্ভব। এস এম এস থেকে। আগাথা ক্রিস্টি লিখে গিয়েছিলেন, মেয়েরা প্রেমিকের চিঠি ফেলতে পারে না। এখন চিঠি গিয়ে হয়েছে এস এম এস, এবং মেয়েরা প্রেমিকের এস এম এস-ও ডিলিট করতে পারে না। ক্রিস্টিকে এই জন্যই কালজয়ী বলে লোকে। সুনন্দাকে আমি সাধারণ মেয়েদের মধ্যে গণ্য করিনি কখনও। ওর চেহারা, ব্যক্তিত্ব, দরাদরি করার ক্ষমতা, সিরিয়ালের হিরোদের প্রতি সহমর্মিতা, কোনও কিছুই সাধারণ ছিল না, কিন্তু এই একটি ব্যাপারে সুনন্দা নিজেকে সাধারণ প্রমাণ করেছিল। অগোছালো বাপির রোম্যান্টিক এস এম এস-গুলো সব ফোনে জমিয়ে রেখে।

প্রথম থেকেই আমি জানতাম বাপিকে আমি খুন করব। সেই একই নিখুঁত প্রিসিশনে খুন করব যে প্রিসিশনে আমি অতি অবাধ্য, কন্সট্যান্টলি নড়তে থাকা পেশেন্টের থার্ড মোলারের গোড়ায় অ্যানাস্থেটিক পুশ করি। খুনটা হবে দ্রুত, পরিচ্ছন্ন এবং নির্ভুল। খুনের প্রতিটি অ্যাংগল, আগের ও পরের প্রতিটি পরিস্থিতি, কার্যকারণ, ঘটনা পরম্পরার প্রতিটি পারমুটেশন কম্বিনেশনের জন্য আমি তৈরি থাকব। শার্টের ছেঁড়া বোতাম, জুতোর পাটি, ফরেনসিক প্রমাণ ইত্যাদি আরও যা যা প্রমাণ পুলিশের চোখের সামনে সাজিয়ে রেখে যায় গোয়েন্দাগল্পের খুনিরা, বলতে গেলে প্রায় যেচেই হাতকড়ায় হাত গলিয়ে দেয়, ও সমস্ত কেয়ারলেস মিস্টেক থাকবে না আমার খুনে।

পুরো প্ল্যানটা ছকতে আমার লাগল মাসদুয়েক। বাপির এস এম এস আমি পড়লাম কালীপূজোর রাতে, খুনের দিন ধার্য করলাম বড়দিনের কাছাকাছি।

আমি আজীবন মেথডিক্যাল। এই প্রোজেক্টটার জন্য আমি একটা ফোল্ডার বানালাম। অফ কোর্স, আমার মগজের ভেতর। ফোল্ডারটার নাম দিলাম ‘দ্য মিষ্টিরিয়াস মার্ডার অফ আ মডার্ন পোয়েট’। পরের মাসকয়েক ধরে রোজ অল্প অল্প করে প্ল্যান ভাঁজতে লাগলাম, টুকটাক যখনই যা মনে আসত ফোল্ডারে গুঁজে রাখতাম। সম্ভাব্য খুনের সময়ের ওয়েদার, ট্র্যাফিক সিচুয়েশন, বাপির দৈনিক রুটিন, আমার দৈনিক রুটিন। সম্ভাব্য গোলযোগও বাদ দিতাম না। অনেক ঘষামাজার পর প্ল্যানটা এরকম দাঁড়াল। 

রোজ রাতে দক্ষিণেশ্বরের কোনও একটা বাড়িতে টিউশন সেরে ব্রিজের ওপর দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরত বাপি। ন’টায় টিউশন বাড়ি থেকে বেরোত, ন’টা দশে ব্রিজে চড়ত, ন’টা বত্রিশ থেকে বিয়াল্লিশের মধ্যে যে কোনও একটা সময় ব্রিজ থেকে নামত। রোজ ব্রিজ পেরোতে এক সময় না লাগার কারণ হচ্ছে মাঝে মাঝে বাপির ফোনে ফোন আসত। তখন ও থেমে রেলিং-এ ভর দিয়ে খুব হেসে হেসে কথা বলত। কে জানে হয়তো সুনন্দার সঙ্গেই। 

বাপি ব্রিজের ওপর থাকার ওই বাইশ কিংবা বত্রিশ মিনিটে আমি কাজ সারব। আমার পরনে থাকবে জিনসের প্যান্ট আর হুডি, আজকালকার ছেলেরা যা পরে। বাপি ব্রিজের ওদিক দিয়ে আসবে, আমি এদিক দিয়ে হাঁটব, সুবিধেজনক ডিসট্যান্সে এসে জিনসের পকেট থেকে ছুরি বার করে (যেটা আমি অলরেডি তারকেশ্বরের শালার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে ওখানকার লোক্যাল বাজার থেকে কিনে রেখেছিলাম, যাতে আমার রান্নাঘরের ছুরিতে ফরেনসিক এভিডেন্স না থাকে) অগোছালো বাপির পেট ফাঁসাব, তারপর রেলিং টপকে বডি গঙ্গায় ফেলে দিয়ে বাড়ি চলে আসব।  

প্ল্যান কাঁচা মনে হচ্ছে? অনেক ফুটো? জানতাম। আচ্ছা শুনি কোন কোন জায়গায় ফুটো দেখতে পাচ্ছেন? 

লোকে দেখবে? আপনি কলকাতার লোক মনে হচ্ছে? হুম্‌ম্‌। শুনুন মশাই, ডিসট্রিক্ট আলাদা হয়ে গেলে জলবায়ু বদলে যায়, মানুষের স্বভাবচরিত্র, পোশাকআশাক, ভাষা, সাইকোলজি সব বদলে যায়। ও সময় আমাদের ওদিকে আপনাদের থেকে অন্তত পাঁচ ডিগ্রি টেম্পারেচার কম থাকে। ডিসেম্বর মাসের রাত সাড়ে ন’টায় খুন হতে দেখবে বলে কেউ বালি ব্রিজে গঙ্গার হাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকে না। 

তবে আমি আপনার কথা একেবারে উড়িয়েও দিচ্ছি না। বালি ব্রিজ দিয়ে ট্রেন যায়, আজকাল গাড়ির সংখ্যাও বেড়েছে। তাছাড়া, আরেকরকম সাক্ষীও আছে, যেটার কথা আপনি গোয়েন্দা গল্পের ঘাগু পাঠক হয়েও মিস করে গেছেন। তবে আমি আপনাকে দোষ দিচ্ছি না, সবটা বই পড়া বিদ্যেতে হয় না, খানিকটা অরগ্যানিকালি আসতে লাগে।

গাড়ি যদি নাও চলত, ট্রেন যদি নাও আসত, তবু আমাদের বালি ব্রিজে, আপনাদের বিবেকানন্দ সেতুতে একধরণের সাক্ষী থাকত। তারা হচ্ছে প্রেমিকপ্রেমিকা। আমি আমার হোল লাইফ ওই ব্রিজ দিয়ে যাতায়াত করেছি, দিনে রাতে বিভিন্ন সময়ে, একটিবারও বালি ব্রিজ প্রেমহীন দেখিনি। তারা আমাকে দেখত। ইন ফ্যাক্ট, আমি চেয়েছিলাম তারা আমাকে দেখুক। 

কেন? বুঝতে পারছেন না? এই তো। বিদেশী গোয়েন্দা গল্প পড়ে পড়ে আপনাদের বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে গেছে। তারা কী দেখত? দেখত হুডি পরা একটা ছোকরা আরেকটা ছোকরার পেটে ছুরি বসাচ্ছে। বালি ব্রিজে ঘটনার আগের ছ’মাসে অন্তত তেরোটা পকেটমারি হয়েছিল। সবাই জানত কারা করেছে। লেবুর ছেলেরা। কেউ কিচ্ছু বলেনি, বলার ক্ষমতাই নেই। খুন হতে দেখলে হয়তো বলত, কিন্তু বলত গিয়ে ওই লেবুকেই, পাড়ার রেসপেক্টেবল দাঁতের ডাক্তারবাবুকে না।

বাপির বডি ফেলে দিয়ে সরু সিঁড়ি দিয়ে ব্রিজ থেকে আমি নদীর পাড়ে নেমে আসব। কী বলছেন? ওই রাস্তায় দু’ফুট অন্তর অন্তর ত্রিফলা? ত্রিফলার আলোর রেঞ্জ দেখেছেন আপনি? তার পরেও এ কথা বলছেন? ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকলে অ্যাট লিস্ট হুলোগুলো দেখতে পেত, ত্রিফলার ধোঁয়ায় ওদেরও আইসাইট ঘুলিয়ে গেছে। পাঁচ মিনিট হাঁটলে আমার বাড়ির বাগান। নিচু পাঁচিল টপকে বাগানে ঢুকে আসব, বাবা ছেলেমেয়েকে খাঁটি গরুর দুধ খাওয়াবেন বলে গোয়াল বানিয়েছিলেন, সেখানে ঢুকে হুডি জিনস পোড়াব, সঙ্গে সঙ্গে যত ফরেনসিক এভিডেন্সে টা টা বাই বাই।  

কপাল যদি ভালো হয় তাহলে অগোছালো বাপি ভেসে ভেসে ডায়মন্ড হারবার দিয়ে সোজা বঙ্গোপসাগর চলে যাবে, তখন আর গল্পটা মিস্টিরিয়াস মার্ডার থাকবে না, হয়ে যাবে 'দ্য কিউরিয়াস কেস অফ ডিস্যাপিয়ারেন্স অফ আ মডার্ন পোয়েট'।

আমার বউ টের পাবে কি না? যাক। আমি আপনাকে এসব ব্যাপারে যত নভিস ভাবছিলাম আপনি ততটাও নন। অ্যাকচুয়ালি প্ল্যানের এই পার্টটা নিয়ে আমি একটু গর্বিত। কারণ এই পার্টটা যাকে বলে স্ট্রোক অফ জিনিয়াস। 

সুনন্দা রোজ সন্ধ্যে সাতটা থেকে দশটা সিরিয়াল দেখে। ডিনারটিনার সব টিভির সামনে। দশটায় টিভি বন্ধ করে শোবার ঘরে ঢুকে ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ে। আমি ততক্ষণ আমার লাইব্রেরিতে বসে আমার বিশ্ব গোয়েন্দাসাহিত্যের কালেকশন নাড়িচাড়ি। এইসব বাপিটাপির ঝামেলা যখন ছিল না তখন শোওয়ার আগে একবার দরজা ঠেলে উঁকি দিয়ে যেত, এখন সে সব পাট চুকেছে। যাই হোক, টিভিতে যখন পুণ্যিপুকুর বা মনসামঙ্গল বা ওইরকম কিছু একটা চলবে, আমি শোবার ঘরের জলের জগে একটুখানি অ্যানাস্থেটিক ফেলে দেব। খাটে গা ঠেকানোর একমিনিটের মধ্যে মাঝরাতের ঘুম। আমি কাজ সেরে বাড়ি ফিরে, হুডির সৎকার সেরে গিয়ে টুক করে পাশে শুয়ে পড়ব। সুনন্দা এমন ঘুমে অচৈতন্য থাকবে যে আমার নড়াচড়া টের পাওয়া তো দূর অস্ত, অগোছালো বাপির সুখস্বপ্নও দেখতে পাবে না। ঘুম ভাঙবে একেবারে সেই কাজের মাসি এসে দরজা ধাক্কানোর পর। উঠে দেখবে আমি পাশে শুয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছি। তখন রোজকার মতো ঠেলা দিয়ে বলবে, “খালি খাওয়া আর ঘুম, বাজার কে করবে? রোজ রোজ এই এক, আমার আর ভাল্লাগে না। কী গো উঠবে তো?”

মাস্টারস্ট্রোক কি না?

আপনি যে আমার প্ল্যনটাকে কাঁচা বললেন, ওই কাঁচাত্বটাই, ইন আদার ওয়ার্ডস, সিমপ্লিসিটিটাই আমার প্ল্যানের জিনিয়াস ছিল। হ্যাঁ, ক্রিস্টিসুলভ প্যাঁচ কিংবা শার্লকসুলভ ম্যাজিক ছিল না। কিন্তু আফটার অল, এটা রিয়েল লাইফ। গল্পের প্লট নয়। তাছাড়া, প্ল্যানটার এই যে ঘোর সোজাসাপটা চলন, এটা আমার মতে, আপনার মত আমার সঙ্গে মিলতেই হবে তার মানে নেই, আর্টের চূড়ান্ত পরিচয়। সে দিক থেকে দেখলে অগোছালো বাপির মার্ডার শুধু পারফেক্ট ছিল না, ইট ওয়াজ অলসো আর্টিস্টিক। ভাবুন একবার, মার্ডারারের আসল উদ্দেশ্য কী? ধরা না পড়া। লোকের চোখের আড়ালে থাকা। জ্যাক দ্য রিপার, মরিয়ার্টিদের নিয়ে লোকে লাফালাফি করে, আমি তো বলি ওরা মার্ডারার হিসেবে সবথেকে নিকৃষ্ট শ্রেণীর। ঢাক ঢোল পিটিয়ে, লোক জানিয়ে, এ কি মার্ডার হচ্ছে না মোচ্ছব? উল্টোদিকে অগোছালো বাপির মার্ডারের কথা ভাবুন। উন্মার্গগামী যুবসমাজের গালে আরেক পোঁচ চুনকালি, শহর তথা রাজ্যের ল অ্যান্ড অর্ডারের দুরবস্থার স্ট্যাটিস্টিকসে আরেকটা নম্বর, লেবুগুণ্ডার দলের কীর্তির মুকুটে আরেকটা পালক, ব্যস।

এ মার্ডারের শুধু যে সমাধান হবে না তাই নয়, লোকে ভুলেও যাবে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে। 

আমি বলছি আপনাকে। ইট ওয়াজ আ পারফেক্ট মার্ডার। পারফেক্ট অ্যান্ড আর্টিস্টিক।

একটা কথা স্বীকার করতে হবে, মার্ডারের আগের সময়টা আমার দারুণ আনন্দে কেটেছিল। চনমনে বোধ করতাম। ওই অ্যানাস্থেশিয়ার মাস্টারস্ট্রোকটা যেদিন মাথায় এসেছিল সেদিন তো ভাত খেতে খেতে নিজের মনে হেসেই ফেলেছিলাম। সুনন্দা “হাসছ কেন?” বলে খেঁকিয়ে উঠেছিল। “কার কথা মনে পড়ে এত ফুর্তি?” ভাবুন একবার! নিজে পরকীয়া করছে, এদিকে সন্দেহ করছে আমাকে! 

যাই হোক, ঘটনার দিন সন্ধ্যেবেলা চেম্বার থেকে ফিরে আমি লাইব্রেরিতে ঢুকে গেলাম। বন্ধ দরজার ওপার থেকে টিভির উচ্চকণ্ঠে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। আমি রেডি হলাম, পাজামাপাঞ্জাবী ছেড়ে বুককেসের পেছনে লুকিয়ে রাখা প্লাস্টিক থেকে বার করে জিনস আর হুডি পরে নিলাম। ছুরিটা পকেটে পুরলাম। তারপর ন’টা নাগাদ লাইব্রেরির দরজা খুলে বাগানে, বাগান থেকে রাস্তায় নেমে এলাম। এই রাস্তাটা ধরে মিনিট দশেক গেলেই ব্রিজের সিঁড়ি।  

আমি হুডির পকেটে হাত গুঁজে মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকলাম। আমরা বুড়োরা সবসময় আজকের যুগকে খারাপ খারাপ বলি, কিন্তু এ যুগের অনেক ভালো জিনিস আছে যা আমাদের সময় ছিল না। যেমন এই হুডি। কী চমৎকার পোশাক। ঠাণ্ডা এড়াতে চাইলে মাথায় দিয়ে হাঁটুন, মার্ডার করতে চাইলে কপালের ওপর দিয়ে টেনে নামিয়ে দিন। মাল্টিপারপাস। জিনিয়াস। 

হাঁটতে হাঁটতে হুডির একটাই অসুবিধে আমি টের পাচ্ছিলাম। পোশাকটা যাদের ভুঁড়ি নেই তাদের জন্য বানানো। যেমন অগোছালো বাপি। বাবার পয়সায় খেয়েদেয়ে কবিতা লিখে ঘুরে বেড়ায়, অথচ সে খাওয়ার একটুও গায়ে লাগে না, হিলহিলে লম্বা, টিংটিঙে প্যাংলা। আমিও ছিলাম একদিন ও’রকম। আমার বাবা বলতেন, নেমকহারাম চেহারা। এত খাওয়াই তবু গায়ে লাগে না। 

স্যাডলি, আমার চেহারা আর সেরকম নেমকহারাম নেই। বরং দরকারের তুলনায় বেশিই কৃতজ্ঞতাভাজনেষু হয়ে পড়েছে। যা খাই, সব তিনগুণ হয়ে শরীরে লেগে যায়। হুডিটা বাকি সব জায়গায় ফিট করেছিল, ভুঁড়িটা ছাড়া। এদিকে জিনসটা আবার ঢিলে। ঢিলেটাই ফ্যাশন। টাইট হুডি আর ঢিলে জিনসের মধ্যে ইঞ্চিখানেক পেট ফাঁকা রয়ে গিয়েছিল, সেখানে হু হু করে গঙ্গার ঠাণ্ডা হাওয়া এসে লাগছিল। 

সিঁড়ি বেয়ে ব্রিজে উঠে এলাম। আমার আজন্মের চেনা বালি ব্রিজ। 

বেশিরভাগ লোকে দাঁতের পাটিকে যেরকম টেকেন ফর গ্র্যান্টেড নেয়, বালি ব্রিজকেও আমি সারাজীবন সে রকমই নিয়েছিলাম, জানেন। একটা নদীর ওপর একটা গামবাট ব্রিজ। ঝমঝম করে ট্রেন যায়, গুমগুম করে লরি। কিন্তু সেই রাতে হুডি মাথায় ব্রিজের রেলিং-এর ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে যেন আমি সবকিছু নতুন চোখে দেখলাম। আমার ফার্স্ট, হোপফুলি ওনলি, অ্যান্ড পারফেক্ট অ্যান্ড আর্টিস্টিক মার্ডারের পটভূমিকা হিসেবে বালি ব্রিজ যেন আমার কাছে নতুন করে প্রতিভাত হল। কী এলিগ্যান্ট চেহারা, কী রাজসিক আর্চ। আর চারপাশটা তো, আহা। কালো জলে ঝিকমিক করা কুচিকুচি আলো, গাছের আড়াল ছাড়িয়ে উঁচু হয়ে ওঠা দক্ষিণেশ্বরের চুড়ো, ছায়াছায়া বারোমন্দির। 

সে রাতে ব্রিজ যেন অন্য রাতের থেকেও বেশি ফাঁকা ছিল। আশেপাশে প্রেমিকপ্রেমিকাও চোখে পড়ছিল না তেমন। গাড়ি আসছিল একটা দুটো, তাও অনেক বাদে বাদে। ঠাণ্ডাটা আমাদের ওদিককার পক্ষেও একটু বেশিই ছিল। হুডিতে বিশেষ কাজ দিচ্ছিল না, আমি ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছিলাম, দাঁতে দাঁতে লেগে যাচ্ছিল। এমন সময় কী ভাগ্যিস, ব্রিজের অন্যদিক থেকে অগোছালো বাপির চেহারাটা উদ্ভাসিত হল। আমি পকেটের ভেতর ছুরির বাঁট শক্ত করে ধরলাম। 

বাপিকে আমি কখনও পাঞ্জাবী আর ঝোলা ব্যাগ ছাড়া দেখিনি, কিন্তু সেদিন ও-ও হুডি পরে ছিল। প্রথমে একটু অবাকই হয়েছিলাম কিন্তু তারপর মনে পড়ল বাপি এখন কবিসম্মেলন থেকে ফিরছে না, ফিরছে টিউশনি বাড়ি থেকে। আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, বাপির একটা হাত আমার মতোই হুডির পকেটে ঢোকানো, অন্য হাতটা একদিকের চোয়াল চেপে আছে। এ ভঙ্গি আমার চেনা। আমার চেম্বারে ঢোকার সময় অধিকাংশ লোকেই এই ভঙ্গিতে ঢোকে। 

বাপি দাঁতের ব্যথায় ভুগছে।

একমুহূর্তের জন্য আমি সব প্রতিহিংসাটিংসা ভুলে গেলাম জানেন, মনে হল বাপিকে বলি, কাল সকালে চেম্বারে এস, দেখে দেব। তারপরই চেতনা ফিরল। দাঁতের ব্যথা তো দূর অস্ত, বাপি নিজেই কাল সকাল পর্যন্ত থাকবে না। 

অগোছালো বাপি লম্বা লম্বা পা ফেলে নিজের মৃত্যুর দিকে এগিয়ে এল। আমি ঝটিতি প্যান্টের পকেট থেকে ছুরি বার করলাম, নতুন ছুরির ফলা ঝকঝক করে উঠল, আমি চাপা গলায় যতখানি সম্ভব চেঁচিয়ে উঠলাম, “আমার বউয়ের সঙ্গে প্রেম করার শাস্তি এই নে, অগোছালো বাপি…” 

“আমি অগোছালো নো-ও-ও-ই…” আর্তনাদটা শেষ হওয়ার আগেই ছুরির ফলা হুডি ফুঁড়ে বাপির পেটে ঢুকে গেল। আবেগ দরকারের থেকে বেশি হয়ে গিয়েছিল বোধহয়, ছুরিটা হাতল থেকে মুচড়ে আলগা হয়ে গেল। ফলাটা ঢুকে রইল শরীরের মধ্যে, হাতলটা রয়ে গেল আমার হাতে। চকচকে হলে কী হবে, কোয়ালিটি ভালো নয়। তারকেশ্বরের বদলে কাঞ্চননগর থেকে কিনলে বেটার হত। আমি ছুরিটা আমার সঙ্গে বাড়ি নিয়ে যাব ভেবেছিলাম, কারণ আমি চাই না বডিটার সঙ্গে ছুরিটাও আবিষ্কৃত হোক। প্ল্যানিংএর এই গ্লিচ কীভাবে সামলাব দ্রুত ভাবছি এমন সময় পরপর কতগুলো জিনিস আমার নজরে পড়ল। 

এক, এ অগোছালো বাপি নয়। হাইট এবং বিল্ড অগোছালো বাপির মতো, কিন্তু বাপি না। ছুরির আঘাতে লোকটার মাথা থেকে হুডি খসে পড়েছিল, ব্রিজের হলুদ ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমি দেখলাম বাপির সঙ্গে লোকটার কোনও মিলই নেই। বাপির ঝাঁকড়া চুল, এর সামনে প্রায় টাক, বাপির মুখে দাড়ির জঙ্গল, এ লোকটা মাকুন্দ।

সর্বনাশ? উঁহু, সর্বনাশ কীসের? আফটার অল, কী ঘটেছে? আমি বাপির বদলে সম্পূর্ণ অচেনা একজনকে খুনের অ্যাটেম্পট নিয়েছি, বা খুনই করেছি বলা ভালো (কিডনি তাক করে মেরেছি) কিন্তু সে ছাড়া আমাকে কেউ দেখেনি। আমি এই লোকটার সম্পূর্ণ অচেনা। লোক্যাল থানার ঘুষখোর অপদার্থগুলোর কথা ছেড়েই দিন, পৃথিবীর অতি বড় গোয়েন্দার পক্ষেও আমার পক্ষে একে খুন করার কোনও মোটিভ বার করা সম্ভব নয়। 

রাইট?

রং। 

কেন রং জানতে গেলে আমার পরের অবজার্ভেশনগুলো আপনার শুনতে হবে। ওই শীতের রাতে বালি ব্রিজের ওপর সম্পূর্ণ অচেনা একজন লোকের পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেওয়ার পর আমি রিয়েলাইজ করলাম লোকটার দাঁতে ব্যথা হয়নি। লোকটা নিজের চোয়াল চেপে হাঁটছিল না, লোকটা কানে একটা মোবাইল ফোন ধরে রেখেছিল। কারও সঙ্গে কথা বলছিল লোকটা।

ইন ফ্যাক্ট, তখনও বলছে। 

“লেবুদাআআআ! আমাকে মাডার করছে, মাডার! বালি ব্রিজের ওপর। চিনি না, নির্ঘাত কাত্তিকের লোক! মালটার চোখে চশমা, বাঁকা নাক, ফোলা গাল, ফস্‌সা রং, চিবুক নেই, মালটা বুড়ো কিন্তু হুডি পরে এস্‌সেচে…  লেবুদাআআ, পুলিস ডাকো, পুল্‌লিস্‌স্…মাগো… হেববি ব্লিডিং হচ্চে গো, ওরে ব- স-ন্‌-তি রে এ এ এ এ এ” বলে কে জানে কোন প্রেমিকা না স্ত্রীর নাম ধরে হাহাকার করতে করতে লোকটার গলা বুজে এল, হাত থেকে ফোনটা খসে পড়ল, লোকটা হাঁটু মুড়ে ব্রিজের ওপর বসে পড়ল, লোকটার হুড খোলা মাথাটা ঠকাস করে বালি ব্রিজের ফুটপাথে ঠুকে গেল। 

এসব লাইনের লোকদের বোধহয় ট্রেনিং থাকে, আমার মুখটাকে যে এরকম কয়েকটা কিওয়ার্ডস-এ বেঁধে ফেলা যায় সেটা আমি আগে কখনও ভাবিনি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজের মুখ দেখেছি রোজই, চোখে বুদ্ধির ঝিলিক, সঙ্গে সেবার একটা ভাবও চোখে পড়েছে। জীবনে প্রথমবার, ওই মুহূর্তে আমি বুঝলাম সেবটেবা, বুদ্ধিটুদ্ধির থেকেও লোকটার মৃত্যুকালীন বর্ণনাটা আমাকে ফিট করে অনেক বেশি। রোজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, নিজের দেহের ভেতর নিজের সঙ্গে সারাজীবন বাস করে আমি নিজেকে যেটুকু চিনেছিলাম, একটা লোক ছুরি খেয়ে মরতে মরতে ওই টিমটিমে আলোয় আমাকে তার থেকে বেশি চিনে এবং চিনিয়ে গেল। 

ভাবতে পারেন?

ওয়েল, এসব কথা আমিও তখন ভাবতে পারিনি, কারণ লোকটা মাটিতে পড়ে যাওয়ায় আমার ভিশনটা ক্লিয়ার হয়ে গেল আর আমি টের পেলাম যে কেউ আমাকে দেখেনি কথাটা ঠিক নয়। আমি, অগোছালো বাপির প্রক্সি, ফোনের ওপারে লেবুগুণ্ডা - এই তিনজন ছাড়াও আরেকজন ঘটনাস্থলে আছে। লেবু তো শুধু বর্ণনা শুনেছে, কিন্তু এ একেবারে প্রত্যক্ষদর্শী।

একটা নেড়ি। বাদামি রঙের, আধপেটা খাওয়া, শীর্ণ একটা নেড়ি। লোকটার পেছন পেছন আসছিল। এখন বিস্ফারিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নেড়িটার চোখে চোখ পড়া মাত্র আরও একটা জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। স্ত্রী না প্রেমিকা না বোন না বন্ধু না, এই নেড়ির নামই বাসন্তী। আর যেই না এই সত্যিটা রিয়েলাইজ করলাম, এক প্রবল গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বাসন্তী প্রায় উড়ে এসে আমার পায়ে দাঁত বসিয়ে দিল।  

এই দেখুন, এখনও সে দাগ আছে। ওরে বাবাই বটে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটেছিল। জাস্ট ভাবুন একবার, আমি ভেবেছিলাম কোনও ফরেনসিকের বাবা আমাকে ধরতে পারবে না, আর এদিকে বাসন্তীর কল্যাণে বালি ব্রিজের ফুটপাথে ফোয়ারার মতো আমার বি পজিটিভ রক্ত ছিটকোচ্ছে। ব্যথা লাগেনি আবার? কিন্তু তখন ব্যথা ওয়াজ লিস্ট অফ মাই কনসার্নস। আমি দুই হাতে বাসন্তীকে পা থেকে কোনওমতে টেনে ছাড়িয়ে ফুটপাথে ছুঁড়ে ফেললাম। ওর দাঁতে আমার জিনসের একটা টুকরো ফড়ফড় করে ছিঁড়ে এল। ফুটপাথে আছাড় খাওয়ার পরমুহূর্তে আবার ছুটে এসে বাসন্তী আমার পায়ে লটকে গেল।

আমার সমস্ত ফোকাস তখন বডিটাকে নদীর জলে ফেলে দেওয়ায়। বাসন্তী চিৎকার করে গোটা ব্রিজ মাথায় তুলেছে, এক্ষুনি কেউ এল বলে, কিংবা গাড়ি থামিয়ে নামল বলে। আমি কোনওমতে লোকটাকে হিঁচড়ে টেনে তুললাম। সেটাকে নিয়ে রেলিং-এর গায়ে ভর দিয়ে রেখে রামধাক্কা দিতে রেডি হচ্ছি এমন সময় ঝমঝম করে ট্রেন এসে গেল। 

আমার পারফেক্ট প্ল্যানে ট্রেন আসার সম্ভাবনাটা ছিল। কিন্তু এতক্ষণের ঘটনার ঘনঘটায় সম্ভাবনাটা আমার মাথা থেকে বেরিয়েও গিয়েছিল। আওয়াজে চমকে উঠে আমি পেছন ফিরে তাকালাম। হলদে আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিল। ততক্ষণে ডেডবডি আর বাসন্তীর সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে আমার হুডি মাথা থেকে খসে গেছে। আই ওয়াজ ইন ফুল ভিউ। স্পষ্ট দেখলাম প্রতিটি কামরার জানালা দরজা থেকে সারি সারি মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অত রাতে অত ভিড় ট্রেন আগে আমি দেখিনি কখনও।

তখনও, তখনও বাঁচার চেষ্টা করা যেত, যদি আমি বডিটা হাওয়া করে দিতে পারতাম। পারলামও। সর্বশক্তি দিয়ে বডিটাকে রেলিং-এর ওপারে ঠেলে দিলাম। 

ধপ করে একটা শব্দ হল। 

ইয়েস, ধপ করে। ঝপ করে না। 

সঙ্গে সঙ্গে একটা চিৎকার। “উরিত্তারা! এ মালটা কী রে?”

আমি রেলিং-এর ওপর দিয়ে উঁকি মারলাম।

জলপুলিশের লঞ্চ। আলোকিত ডেকের ওপর একটা পুলিশ কোমরে হাত দিয়ে মুখ হাঁ করে ওপর দিকে তাকিয়ে আছে, আর তার পায়ের কাছে হাত পা ছত্রাকার করে পড়ে আছে, না অগোছালো বাপি নয়, নাককাটা পচা। 

নামটা জানতে আরও কিছুদিন লেগেছিল, অফ কোর্স। তক্ষুনি যেটা শুনলাম সেটা সাইরেন। আকাশবাতাস এক করা সাইরেন। আমার অরিজিন্যাল প্ল্যানে এর পরের স্টেপ ছিল সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া, কিন্তু সে সিঁড়িটার দশ হাতের মধ্যে সেই মুহূর্তে পুলিশ লঞ্চ সাইরেন বাজিয়ে বনবন করে চতুর্দিকে সার্চলাইট ঘোরাচ্ছে। আমি রেলিং ছেড়ে নেমে ব্রিজের উল্টোদিকে ছুটে গেলাম, বাসন্তী তখনও আমার পা থেকে ঝুলছে এবং আমার পা থেকে গলগলিয়ে রক্ত ঝরছে। আমি দিকবিদিকশূন্য হয়ে সেই সব শুদ্ধু দৌড়লাম। একটা ভারি কিছু (একটা হলদে কালো ট্যাক্সি)  প্রচণ্ড বেগে এসে আমাকে ধাক্কা মারল। 

জ্ঞান ফিরল হাসপাতালের বেডে। নিউমোনিয়া আর রক্তক্ষয়। দুর্বলতা সামান্য কমলে বিচার হল। উল্টোদিকের কাঠগড়ায় একের পর এক এসে দাঁড়াল ট্যাক্সির ড্রাইভার, লেবু। কার্তিকের স্ট্যান্ডিং থ্রেট আছে, তাই পুলিশ লেবুকে প্রোটেকশন দিয়ে নিয়ে এসেছিল। কাঠগড়ায় উঠে সে কী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না লেবুর, “পচা আমার ভাইয়ের মতো ছিল স্যার, একেবারে আপন ভাইয়ের মতো” জাজও কালো আলখাল্লার খুঁট দিয়ে চোখ মুছছিলেন। তবে লেবুর থেকেও স্টার উইটনেস ছিল একজন, সে এল লাস্টে। বাসন্তী। পুলিশের বকলস পরে, সিংহের মতো গটমট করে এল। আমাকে দেখে কী চিৎকার। মোটা মোটা পুলিশরা টেনে রাখতে হিমশিম। শুনেছিলাম বাসন্তী সাহসিকতার জন্য কী সব অ্যাওয়ার্ডট্যাওয়ার্ডও পেয়েছে। আর আজীবন ওসি-র লাঞ্চের মুরগির হাড় পেনশন। 

তারপর থেকে এই জেলেই আছি। তা হল অনেকদিন। আরও অনেকদিন থাকতে হবে। খুন তো একটা না, দুটো। টেনশনে সুনন্দার গ্লাসে অ্যানাস্থেটিকের মাত্রা বেশি দিয়ে দিয়েছিলাম। অ্যাকচুয়ালি, এই একটাই দুঃখ আমার জানেন। আমি সিরিয়াসলি ভেবেছিলাম অগোছালো বাপিকে সরিয়ে দিলে আমার আর সুনন্দার সংসারটা আবার আগের মতো সুখের হয়ে যাবে।

তাহলে? মর‍্যাল অফ দ্য স্টোরি কী দাঁড়াল? মর‍্যাল অফ দ্য স্টোরি দাঁড়াল এই যে গোয়েন্দাগল্পে সব বাজে কথা লেখা থাকে। মার্ডার ইজ নট ইজি। ডেফিনিটলি নট। চারদিক দেখেশুনে, ভেবেচিন্তে, গুনেগেঁথে প্ল্যান করা মার্ডারও না। 

উঠছেন? ওহ। তা হলও অনেকক্ষণ। আমাকেও যেতে হবে। তবে, আপনাকে আমার ভালো লেগেছে জানেন। বহুদিন বাদে কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলে আরাম লাগল। আসবেন আবার, যদি সময় পান। তবে বেশি দেরি করবেন না, বুঝলেন, হেহে। কেন? ওয়েল, আপনি বলেই বলছি, মার্ডারটা পারফেক্ট হয়নি, কিন্তু আমি একটা পারফেক্ট এসকেপ প্ল্যান করছি। এখানে পেশেন্টের ঝামেলা নেই, সুনন্দার খ্যাচখ্যাচ নেই, কাজেই এবারের প্ল্যানটা আগেরটার থেকেও ফুলপ্রুফ হবে, আমি শিওর। ডিটেলসটা এক্ষুনি আপনাকে বলছি না, কয়েকটা জায়গা আরেকটু ঠিক করতে হবে। ঘটনাটা কাগজে বেরোবে নিশ্চয়, তখন পড়ে নেবেন, ওকে? কিছু মাইন্ড করলেন না আশা করি? প্লিজ করবেন না। থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.