January 31, 2017

নতুন পোয়্যারো



*কোনও স্পয়লার নেই।

উৎস গুগল ইমেজেস

নতুন হারক্যুল পোয়্যারোর বই বেরোতে শুরু করেছে দু’হাজার চোদ্দ থেকে। আমি কেন এতদিন পড়িনি তার মুখ্য উত্তর, ভয়। কিন্তু বছরের শুরুতে হঠাৎ একদিন চ্যাটবাক্সের ওপার থেকে প্রশ্ন এল, পড়েছ? আমি বললাম, না। চ্যাটবাক্স বলল, পড়বে নাকি? কিন্ডলে দারুণ সস্তা। বল তো অর্ডার করে দিই। সাহসী হওয়া আমার এ বছরের রেজলিউশন, লিখে দিলাম, দাও দাও। 

নতুন পোয়্যারো লিখেছেন সোফি হানা, একজন ইংরেজ লেখক ও কবি। নতুন পোয়্যারো লেখার আগে তাঁর নিজের আটখানা ক্রাইম নভেল ছাপা হয়ে গিয়েছিল। আগাথা ক্রিস্টি এস্টেট-এর বরাতে পোয়্যারোর ‘কনটিনিউয়েশন’ উপন্যাস লিখতে শুরু করেন সোফি হানা। পূর্ববর্তী লেখকের তৈরি চরিত্র বা ঘটনাপ্রবাহ অবলম্বন করে যখন পরবর্তী লেখক নতুন করে লেখেন তখন সেটা হয় কনটিনিউয়েশন লেখা। আমার পড়া বাংলায় যে কনটিনিউয়েশন লেখার উদাহরণ এই মুহূর্তে মনে আসছে তা হল তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কাজল’। গোয়েন্দা গল্পে এ ধরণের কনটিনিউয়েশনের উদাহরণ প্রচুর। জেমস বন্ড, শার্লক হোমস সবাইকে নিয়েই বিস্তর গল্প এখনও লেখা হয়ে চলেছে। কনটিনিউয়েশন রচনার প্রতি সকলের মনোভাব সমান নয়। কেউ বলেন, হোক না। এই করে যদি নতুন যুগের ছেলেমেয়েরা হোমস, অপুকে চিনতে পারে, ক্ষতি কী? কেউ একে পরের ধনে পোদ্দারি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেন না। আমার নিজের মত এ বিষয়ে, অন্য বেশিরভাগ বিষয়েরই মতো। অর্থাৎ, জোরালো কোনও মত নেই। আমি মনে করি না পোয়্যারো কিংবা শার্লক কিংবা অপু কিংবা ব্যোমকেশ বা ফেলুদাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করার জন্য তাদের নিয়ে গল্প লিখে যাওয়ার প্রয়োজন আছে, আবার যদি কারও ইচ্ছে করে লিখতে তাহলে তিনি যে লিখতেই পারেন সে নিয়েও আমার কোনও সন্দেহ নেই। এতে আসল চরিত্র বা আসল চরিত্রদের সম্মানহানির কোনও সম্ভাবনা আমি দেখতে পাই না। 

যাকগে। এবার সোফি হানা-র পোয়্যারোর কথায় আসি। এখনও পর্যন্ত পোয়্যারোকে নিয়ে দু’খানা উপন্যাস লিখেছেন সোফি। দ্য মোনোগ্রাম মার্ডারস আর ক্লোজড কাসকেট। আগে গল্পদুটোর ধরতাই দিয়ে নিই, তারপর আমার কেমন লেগেছে বলছি। 

মোনোগ্র্যাম মার্ডারস: হারক্যুল পোয়্যারো রেস্টোর‍্যান্টে বসে খাবার খাচ্ছিলেন, এমন সময় এক বছর চল্লিশের মহিলা, দৃশ্যতই আতংকিত, সেই রেস্টোর‍্যান্টে এসে ঢুকলেন এবং পোয়্যারোর বন্ধুত্বপূর্ণ জেরার উত্তরে জানালেন যে তাঁকে অচিরেই কেউ খুন করতে চলেছে। এই কথা শুনে স্বভাবতই পোয়্যারোও আতংকিত হয়ে পড়লেন এবং মহিলাকে সাহায্য করতে চাইলেন কিন্তু মহিলা সাহায্যগ্রহণে অস্বীকৃত হয়ে যেমন দৌড়ে ঢুকেছিলেন তেমনই দৌড়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেলেন। সেই রাতেই লন্ডনের এক অভিজাত হোটেলের তিনটি ঘরে তিনটি মৃতদেহ আবিষ্কার হল, প্রতিটি দেহের মুখের ভেতর একটি করে কাফলিংক, সবকটি কাফলিংক-এ একই মোনোগ্রাম খোদাই করা, পি আই জে। 

 ক্লোজড কাসকেটঃ এ গল্পের চলন একেবারে স্বর্ণযুগের গোয়েন্দাগল্পের চলনে ঢালা। লেডি প্লেফোর্ড তাঁর মস্ত ম্যানসনে ছেলেমেয়ে, উকিল, গোয়েন্দা, পুলিশ সবাইকে জোগাড় করেছেন। তারপর ডিনার টেবিলে ঘোষণা করেছেন যে তিনি তাঁর উইলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে চলেছেন। ঘোষণা শুনে সবার চোখ কপালে ওঠে এবং সেই রাতেই একখানা খুন হয়।  (আপনি যাকে ভাবছেন, সে নয়, খুন হয় অন্য একজন। ইন ফ্যাক্ট, এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, যেটা কিছুদিন ধরে আমার মাথায় ঘুরছিল। অনেক সময় গল্প একেবারে খুন দিয়েই শুরু হয়, আবার অনেক গল্প চরিত্রদের সঙ্গে পরিচিতি দিয়ে। একদল লোক, যাদের মধ্যে একজন খুন হবে, আর একজন হবে খুনি। ইদানীং একটা গোয়েন্দা সিরিজ দেখছি, যেটা এই দ্বিতীয় গোত্রের। গল্প শুরু হওয়ার তিন মিনিটের মধ্যে বোঝা যায় কে খুন হবে। কারণ সে বাকিদের এমন চটিয়ে রেখেছে যে তাদের কেউ একজন আর রাগ সামলাতে না পেরে স্ট্রিকনিন কিংবা পিস্তলের দ্বারস্থ হবে। কে খুন করবে সেটার সম্পর্কেই লেখকরা সব সাসপেন্স জমিয়ে রাখেন, কিন্তু কে খুন হয়েছে বা হবে সে বাবদেও যদি কিছু চমক দেওয়া যায়, মন্দ হয় না। ক্লোজড কাসকেট-এ হানা এটা দারুণ সফলভাবে করেছেন।) 

 এবার বইদুটো সম্পর্কে আমার মতামতে আসি। পড়া শুরু করার আগে দুটো জিনিস সম্পর্কে আমি নিশ্চিত ছিলাম। এক, বইগুলো আগাথা ক্রিস্টির বইয়ের মতো ভালো হবে না। আর দু’নম্বর হচ্ছে, আমি চেষ্টা করেও বইগুলোকে একেবারে দূরছাই করতে পারব না। সোফি হানা লেখক হিসেবে কাঁচা হতে পারেন কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি যে ভয়ানক সাহসী সে নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। না হলে কেউ যেচে পোয়্যারো নিয়ে গল্প লিখতে বসে না। কাজেই স্রেফ সাহসিকতার খাতেই তাঁর কিছু নম্বর বাঁধা।
  
আমার প্রথম বিশ্বাসটা মিলে গেছে। সোফি হানা আগাথা ক্রিস্টি নন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বাসটা খানিকটা মিলেছে, খানিকটা মেলেনি। এবং না মেলায় আমি যারপরনাই খুশি হয়েছি। হানাকে আমি নম্বর দিয়েছি, কিন্তু সেটা শুধু সাহসিকতার জন্য নয়। সোফি হানা ক্রিস্টি নন, কিন্তু তিনি অন্য অনেকের থেকে ভালো। প্রচুর খেটে প্লট বানিয়েছেন হানা। সে প্লটে যথাসম্ভব গেরো পাকিয়েছেন এবং যথাসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে সে গেরো খুলেছেন। গল্পের গতি চমৎকার। প্রথম গল্পে শুরুতে একটু ঢিলেমি চলছিল, অচিরেই সমস্ত মনোযোগ গ্রাস করে ফেলেছে।

কিন্তু শুধু প্রশংসা করলে মজা নেই। ক্রিস্টির থেকে কোনখানটায় হানা কম পড়লেন, সে চুল না চিরলে মনে আনন্দ নেই। সত্যি কথা বলতে কি, হানার খামতি নিয়ে কথা বলা আসলে ক্রিস্টির উৎকর্ষ নতুন ভাবে উপলব্ধি করা এবং নতুন করে চমৎকৃত হওয়াও। কাজেই এ পোস্টে যত কথা সোফি হানাকে নিয়ে বলব, তার সমান কথাই আমাকে ক্রিস্টিকে নিয়েও বলতে হবে।

আমার মতে হানা প্রথম হোঁচট খেয়েছেন ভাষায়। তাঁর একটি ইন্টারভিউতে সেই পুরোনো প্রসঙ্গটা আবার উঠেছে। যে আগাথা ক্রিস্টি বেসিক্যালি ভালো ধাঁধা বানাতে পারতেন, সাহিত্যসৃষ্টির কোনও ক্ষমতা তাঁর ছিল না। সোফি হানা এ মতের বিরোধিতা করে বলেছেন যে একজন লেখকের “স্টাইলিস্টিক” খামতি থাকতেই পারে, তা বলে তাঁকে বাজে লেখক বলা যায় না। 

সোফি হানার উদ্দেশ্য মহৎ, আমার এবং তাঁর প্রিয় লেখককে ডিফেন্ড করা, কিন্তু আমি তাঁর সঙ্গে একমত নই। কারণ আমার মতে আগাথা ক্রিস্টির স্টাইল অতি উচ্চমানের। লেখা যেখানে ‘লেখা’ বলে বোঝা না যায়, আমার মনে হয় সেখানেই লেখকের আসল কেরামতি। বলাই বাহুল্য, ভাষার পছন্দঅপছন্দ বেজায় ব্যক্তিগত ব্যাপার। এমনকি পরিস্থিতিভেদে একই ব্যক্তির পছন্দঅপছন্দ পালটে যেতে পারে। আমার নিজেরই আলংকারিক ভাষাওয়ালা বহু লেখা দারুণ লাগে। কিন্তু মোটের ওপর আমি ন্যাড়াবোঁচা লেখার দলে। 

সোফি হানা পোয়্যারোর গল্পে খুব সাহিত্য ফলিয়েছেন বলব না। তবে তিনি যে ‘লেখক’ গল্পের ভাষায় তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর তিনি যে কবি, কিছু কিছু জায়গায়, বিশেষ করে বর্ণনামূলক অংশে তা লুকোতে পারেননি। তুলনাটা যেখানে আগাথা ক্রিস্টির মুখের কথার মতো তরল এবং সপাট ভাষার সঙ্গে, সে অংশগুলো আমার একটু কেমন কেমন লেগেছে। তাছাড়া ক্রিস্টির লেখায় একটা ফুরফুরে রসের স্রোত অহরহ বয়, সেটাও হানার লেখায় অনুপস্থিত।

হানার দ্বিতীয় হোঁচট, কারিগরিতে। এবং সেটাও হানার খামতির থেকেও ক্রিস্টির নৈপুণ্যই বেশি মনে করায়। গোয়েন্দাগল্পের ‘ক্রাফট’ যে আগাথা ক্রিস্টি কী অসামান্য বুঝেছিলেন এবং তাতে কী অভূতপূর্ব দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, সেটাই আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। গোয়েন্দাগল্প লেখা একই সঙ্গে যেমন সততার পরীক্ষা তেমনি আবার পাঠককে ভুল পথে চালিত করারও। একগাদা ক্লু আছে, লেখক জানেন কোন ক্লু-এ কত ধক, সেই বুঝে তিনি তাদের এগিয়েপিছিয়ে রাখেন। এই এগোনোপেছোনোর মধ্যেও একটা খেলা থাকে। যে ক্লু একেবারে চোখের সামনে থাকে, তার ওপর ভরসা কোনও পোড়খাওয়া পাঠকই করে না। যে বেচারার মোটিভ স্ট্রং আর অ্যালিবাই খোঁড়া, সে খুনি নয়। আবার কোনও কোনও ক্লু হালকা হাওয়ায় ভাসিয়ে লেখক এগিয়ে যান (ভাঙা ঘড়ি কিংবা সেলাইর ফোঁড়), অতি চালাক পাঠক ভাবেন সেই দিয়ে তিনি বাজিমাত করবেন, শেষে গিয়ে দেখা যায় ওগুলো নেহাত অপ্রয়োজনীয় তথ্য ছাড়া কিছু নয়। বেশি বুদ্ধি খাটাতে গিয়ে চোখের সামনের ক্লুটাই চোখ এড়িয়ে গেছে।

আমার মনে হয়েছে, সোফি হানা এই খেলাটায় খুব একটা দড় হতে পারেননি এখনও। কে কখন চা খেয়েছে, এ নিয়ে হানা যখন পাতার পর পাতা আলোচনা করে চলেন, ঘাগু পাঠক সাবধান হয়ে যান যে এটা খুব একটা ক্রুশিয়াল পয়েন্ট হতে পারে না। সোফি হানার  যেমন ধরুন যখন চানাচুরের শিশি ফাঁকা হয়েছিল আমি তখন ঘুমোচ্ছিলাম এই যদি আমার অ্যালিবাই হয় আর সাক্ষী যদি হয় অর্চিষ্মান, আর ও যদি খুব মাথা ঝাঁকিয়ে বলে যে হ্যাঁ হ্যাঁ আমি তো জেগেই ছিলাম, কই কুন্তলা তো একটি বারও ঘুম থেকে ওঠেনি, আর তারপর লাস্ট সিনে যদি বলে, ইয়ে মানে আমি মিছে কথা বলেছিলাম, আর অমনি যদি সব সমস্যা সমাধান হয়ে যায়, তখন একটু হাঁ করে থাকতে হয় বইকি। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে ঘটনাবলীর অবস্থান। মোনোগ্রাম মার্ডারস-এ সমাধান হয়ে যাওয়ার পর অন্তত আরও চারটে চ্যাপ্টার ধরে গল্প চলতে থাকে, এবং আমার মতে, তেমন কোনও উন্মোচন ছাড়াই। 

তবে এ সমস্ত কাঠামোগত অসুবিধে সোফি হানা প্রভূত পরিমাণে কাটিয়ে উঠেছেন ক্লোজড কাসকেট-এ।  তাছাড়া এগুলোর কোনওটাই আমার মতে সোফি হানার পোয়্যারো উপন্যাসের প্রধান দুর্বলতা আমার মতে হানার অ্যাকিলিস’ হিল হচ্ছে তাঁর সৃষ্ট একটি চরিত্র, যে সে চরিত্র নয়, গল্পের বক্তা, এডওয়ার্ড ক্যাচপুল। 

এডওয়ার্ড ক্যাচপুল হচ্ছেন নতুন পোয়্যারোর হেস্টিংস। এবং একইসঙ্গে জ্যাপও। কারণ ক্যাচপুল স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বত্রিশ বছর বয়সী একজন পুলিশ গোয়েন্দা। কিন্তু ক্যাচপুলকে এ দুটোর একটাও মনে হয় না। বত্রিশ বছরের একজনের যুবকের তাঁর হাবভাব বুড়ো হেস্টিংস-এর সঙ্গে অনেক বেশি মেলে। আমি বলছি না বত্রিশ বছরের যুবক হলেই তাকে প্রাণবন্ত হতে হবে, আমি নিজেই বত্রিশে তা ছিলাম না, বাইশেও না, কিন্তু ক্যাচপুল বড্ড বেশি ঝিমোনো। মোনোগ্রাম মার্ডারস-এর প্রথম যে দৃশ্যে ক্যাচপুলের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হচ্ছে সেখানে দেখা যাচ্ছে ডেডবডি দেখে এমন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন যে হোটেল থেকে বাড়ি (গেস্টহাউস) চলে এসে চুপ করে বসে আছেন। আমি জানি না ঘটনাটা আমার যতখানি অদ্ভুত লেগেছিল ততখানি আমি প্রকাশ করতে পারলাম কি না। ক্যাচপুলের ট্রমার কারণ পরে (খুব সম্ভব চতুর্থ চ্যাপ্টারে) উদ্ঘাটিত হয়, কিন্তু সত্যি বলছি, ক্যাচপুলের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।

 তার থেকেও বেশি অদ্ভুত হচ্ছে ক্যাচপুলের পুলিশ পরিচয়। ভদ্রলোকের যে অফিস বলে কোনও বস্তু আছে, গল্প পড়ে তার কোনও আভাস পাওয়া যায় না। পোয়্যারোর পেছন পেছন ঘুরছেন, পোয়্যারো যে মুহূর্তে বলছেন, চল একটু বাসে করে ঘুরে আসি, মাথা পরিষ্কার হবে, ক্যাচপুল বিনা বাক্যব্যয়ে বাসে চেপে চলেছেন। একবার ফাঁকতালে বলা হয়েছে যে পোয়্যারোর খ্যাতির কথা জানা আছে বলে ক্যাচপুলের ঊর্ধ্বতন অফিসাররা তাঁকে সম্পূর্ণরূপে পোয়্যারোর কাছে ছেড়ে রেখেছেন কিন্তু এটা ফ্র্যাংকলি বিশ্বাসযোগ্য নয়। 

এডওয়ার্ড ক্যাচপুলকে পুলিশ করার আদৌ কোনও প্রয়োজন ছিল কি না, দেখেশুনে সেটাই আমার প্রশ্ন জেগেছিল। এমনি একজন রিটায়ার্ড বুড়োকে দেখালেই হত। প্রধান গোয়েন্দা পুলিশ হলে তাও না হয় বুঝি, সহকারী পুলিশ হওয়ার সুবিধে কী? তারপর মনে পড়ল এতে বোধহয় তদন্তের তথ্য ইত্যাদি পেতে সুবিধে হয়। যাই হোক, পুলিশে আমার আপত্তি নেই কিন্তু তাহলে সে পেশাসংক্রান্ত আরও কিছু ডিটেলস আমি আশা করেছিলাম।  

কিন্তু প্লট নয়, কাঠামো নয়, ক্যাচপুল তো নয়ই, যাঁর জন্য সোফি হানার উপন্যাস পঞ্চাশটির মতো ভাষায় অনুবাদ হয়েছে আর লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে তিনি হলেন বেঁটেখাটো, গোঁফসর্বস্ব, হামবাগ সেই বেলজিয়ান ডিটেকটিভ। তাঁকে কেমন এঁকেছেন হানা? এই পোয়্যারো সেই পোয়্যারোর থেকে ফরাসিটা একটু বেশি বলেন। আরেকটা অসুবিধে হচ্ছিল আমার গোড়ার দিকে, তবে সেটা মানসিক বলেই আমার ধারণা। মানে পুরোনো পোয়্যারো রেস্টোর‍্যান্টের কাঁটাচামচ সোজা করে রাখলে আমার কিছুই মনে হত না, কিন্তু যেই না নতুন পোয়্যারো কাঁটাচামচ সোজা করে রাখছেন আমার মনে হচ্ছে, দেখেছ, খালি অথেনটিসিটি প্রমাণ করার চেষ্টা। এ সব বাদ দিলে সব ঠিকই আছে। সেই দেমাক, সেই সমাধানের গন্ধ পেলে চোখে সবুজ আলো জ্বলে ওঠা, সবই আছে যেখানে যা থাকার। সোফি হানার পোয়্যারো প্রায় আমাদের চেনা পোয়্যারোর মতোই এবং সবথেকে আশ্বাসের কথা, একটুও ক্যারিকেচারিশ নন। 

এক প্যারা প্রশংসা করে পাঁচ প্যারা খুঁত ধরলাম বটে, কিন্তু সত্যি কথাটা হচ্ছে যে কোনও ভালো গল্পের, গোয়েন্দাগল্পের তো বটেই, যেটা প্রধান গুণ, পাঠককে গ্রাস করে ফেলা,  সোফি হানার পোয়্যারোর গল্পে সে গুণ ষোলো আনার আঠেরো আনা আছে। দ্য মোনোগ্রাম মার্ডারস আর ক্লোজড কাসকেট পড়ার দু’দিন আমি অন্য কথা ভাবতে পারিনি। মানে ভাবতে তো হয়েছেই, না হলে আর মাইনে দেবে কেন, কিন্তু যখনই সে সব আবোলতাবোল জিনিস মাথা থেকে সরেছে, পোয়্যারোর গল্প ফিরে এসে মগজ জুড়ে বসেছে। আধপড়া গোয়েন্দাগল্পের কাছে ফিরে আসার যে কী অসামান্য আনন্দ, সেটা যে না পেয়েছে তাকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া অবাস্তব। সোফি হানা (নাকি পোয়্যারো?) আমাকে বহুদিন পর সেই সুখ ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর পরের পোয়্যারোর গল্পগুলো আমি অবশ্যই পড়ব। একটুও ভয় না পেয়েই।



January 22, 2017

এ মাসের বই/ ডিসেম্বর ২০১৬ঃ বইয়ের বোঝা



এই পোস্টটা লিখতে যে এত দেরি হল সে অপরাধ পুরোটা আমার নয়। আমি লিখতে শুরু করেছিলাম অনেকদিন আগেই। ‘ডিসেম্বর মাসের বই’ নামের একটা ফাইল অবান্তর-এর ‘ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস’ ফোল্ডারে রাখাও ছিল। আমি নিজে রেখেছিলাম। গোটা ডিসেম্বর মাস ধরে যতবার ওই ফোল্ডারে ঢুকছিলাম, চোখে পড়ছিল। জানুয়ারি মাসের শুরুতে একদিন দেখলাম ফাইলটা নেই। আমি বেশি মাথা ঘামালাম না। সাতদিন বাদে যখন জানুয়ারি মাসের বইয়ের ফাইল খুলে ফোল্ডারে সেভ করা হল তখন আরেকবার ডিসেম্বরের হারানো পোস্টের কথা মনে পড়ল। এবারে আমি আরেকটু সময় নিয়ে (দু’মিনিট) খুঁজলাম এবং আবারও খুঁজে না পেয়ে বেরিয়ে এলাম। ভাবলাম, কোথায় আর যাবে। উবে তো আর যায়নি। আছে নিশ্চয় এখানেই আমার চোখে পড়ছে না।

জানুয়ারির অর্ধেক যখন চলে গেল তখন আমার টনক নড়ল। আমি নির্দিষ্ট ফোল্ডারে ঢুকে ডিসেম্বর মাসের বইয়ের পোস্ট খুঁজলাম,আঁতিপাঁতি করে, পেলাম না। সে ফোল্ডার থেকে বেরিয়ে এসে অন্য ফোল্ডারে ঢুকলাম, খুঁজলাম, সেখানেও নেই। পোস্টটা সত্যিই উবে গেছে।

কাজেই আবার নতুন করে লিখতে হচ্ছে। ভাগ্যিস ডিসেম্বর মাসে বেশি বই পড়িনি (তার মধ্যে একটা আবার নভেম্বর মাসের)। যে দুটো বইয়ের কথা লিখতে যাচ্ছি তাদের নিয়ে বলার কথা আমার অনেক ছিল, কিন্তু এখন লেখার সময় নেই। তাই কম করেই লিখছি। কেন যেন মনে হচ্ছে সেটা শাপে বরই হবে।

***** 

তবে বইয়ের কথায় যাওয়ার আগে অন্য একটা কথা বলি। শিল্পকর্ম ব্যাপারটাই সাবজেক্টিভ, একই জিনিস একজনের ভালো একজনের খারাপ লাগতে পারে, কথাটা সেটা নয়। কথাটা হচ্ছে কোনও শিল্পকর্ম খারাপ লাগলে আমরা যে ভাবে খারাপ লাগাটা প্রকাশ করি তার প্রকারভেদটা। আরও পরিষ্কার করে বললে, শিল্পকর্মভেদে (নাকি শিল্পীভেদেই বলা উচিত) আমার মতো হিপোক্রিটদের খারাপ লাগা প্রকাশ করার ধরণটা।

যেমন সেদিন টিভিতে ‘বসতির মেয়ে রাধা’ হচ্ছিল। খেতে খেতে দেখছিলাম আর কী করে এত খারাপ সিনেমা বানায় লোকে ভেবে ভেবে আশ্চর্য হচ্ছিলাম। মিনিট দশেক পর আর থাকা গেল না, চ্যানেল চেঞ্জ করতে হল। ওই চ্যানেলেই যদি ‘কোমল গান্ধার’ চলত, তখনও আমি খানিকক্ষণ দেখার পর চ্যানেল চেঞ্জ করতাম এবং যুক্তি হিসেবে বলতাম, নিশ্চয় খুব ভালো জিনিসই হচ্ছে, আমিই নিশ্চয় বুঝতে পারছি না। 

কমলকুমারের বাংলা পড়েও “এটা কী, বস্‌?” বলার সাহস আমার হয় না, কারণ যাঁরা কমলকুমারকে বাংলা সাহিত্যের দিকপাল আখ্যা দিয়েছেন তাঁদের বিদ্যাবুদ্ধি সম্পর্কে আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে। এবং তাঁরা যে বাংলা গদ্য আমার থেকে ভালো বোঝেন সে নিয়েও সংশয় নেই। 

অর্থাৎ আমার কোনকিছু ভালো লাগা না লাগার (বা সেটা প্রকাশ্যে স্বীকার করা না করার) একটা বিরাট অংশ পরের মুখে ঝাল খাওয়া। যাঁদের আমি সে বিষয়ে আমার থেকে বেশি জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান মনে করি, তাঁদের মত আমার নিজস্ব মতের থেকে বেশি ন্যায্য মনে করি। 

এবং এটা করা যে একেবারে অযৌক্তিকও নয় সেটাও আমি মানি। আমি নিজে আমির খানের আলাপ পাঁচ মিনিট শুনে “ওরে বন্ধ কর, বন্ধ কর, বন্ধ কর’ বলে লোককে কান চেপে দৌড়ে পালাতে দেখেছি। অথচ আমি দৃঢ়নিশ্চিত, আমির খানের আলাপ অতি ভালো জিনিস, এবং যে সেটার স্বাদগ্রহণ করতে পারছে না সে বুঝতে পারছে না বলেই করছে না। মার্গসংগীতের সঙ্গে তার পরিচয় নেই, তাই অমৃত গরল ঠেকছে। 

কাজেই আমার ভালো না লাগা বেশিরভাগ শিল্পকর্মই যে আমি বুঝতে পারছি না বলেই ভালো লাগছে না সেটা মেনে নিতে আমার কোনও অসুবিধে নেই। আমার খচখচানিটা শুধু একটা জায়গায়। ‘বসতির মেয়ে রাধা’-ও যে আমি না বুঝতে পারি সেটা আমার কখনও মাথায় আসে না কেন। 

এত কথা বললাম শুধু এই কারণে যে নিচে যে দুটো বইয়ের কথা বলব, তাদের কোনওটাই আমি বুঝিনি।

*****

The Secret History/ Donna Tartt

উৎস গুগল ইমেজেস

না টার্টের বিখ্যাত আত্মপ্রকাশকারী উপন্যাস ‘দ্য সিক্রেট হিস্টরি’ শুরু হয় গল্পের বক্তা রিচার্ড পাপেন-এর স্বীকারোক্তি দিয়ে। সে ও তার চার বন্ধু মিলে তাদের দলের ষষ্ঠ বন্ধুকে খুন করেছে। পরের পাঁচশো চুয়াল্লিশ পাতা ধরে এই খুনের ব্যাকস্টোরি উন্মোচিত হয়। অর্থাৎ চিরাচরিত হুডানইটের বদলে, হোয়াইডানইট। 

বিশ্বসাহিত্যে আনলাইকেবল চরিত্র সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট প্রাইজ যদি আয়ান র‍্যান্ড জেতেন, ডনা টার্ট বেশি পেছনে থাকবেন না। প্রথমে প্রোটাগনিস্ট রিচার্ড পাপেনের কথা ধরা যাক। ক্যালিফোর্নিয়ার পিয়ানো (কাল্পনিক) নামের একটি অখ্যাত ছোট শহরের একটি নিম্নমধ্যবিত্ত এবং অসুখী পরিবারের ছেলে রিচার্ড। রিচার্ড পাপেনের চরিত্র সম্পর্কে দু’লাইন গল্পের শুরুতে তার নিজের মুখেই বলিয়ে নিয়েছেন। 

Does such a thing as ‘the fatal flaw,’ that showy dark crack running down the middle of a life, exist outside literature? I used to think it didn’t. Now I think it does. And I think that mine is this: a morbid longing for the picturesque at all costs.

স্রেফ নিজের ‘আনপিকচারেস্ক’ জীবন থেকে পালাতেই রিচার্ড ভারমন্ট রাজ্যের হ্যাম্পডেন কলেজে পড়তে যায়। প্রথমে সে গিয়েছিল ডাক্তারি পড়তে, তারপর বদলে সাহিত্য, তারপর রিচার্ডের নজরে পড়ে গ্রিক সাহিত্যের ছাত্রের একটি দলের দিকে। চারটি ছেলে ও একটি মেয়ে। প্রত্যেকেই ধনী ঘরের। তাদের সাজপোশাক, আচারব্যবহার বাস্তব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, প্রত্যেকেই নিজেদের ছাড়া আর কারও সঙ্গে মেশার প্রয়োজন মনে করে না। আমাদের রিচার্ড তাদের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং এই বড়লোক, উন্নাসিক দলটিতে নিজের নাম লেখানোর অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ থেকেই একরকম, নিজের ক্লাস ছেড়ে গ্রিক সাহিত্যের ক্লাসে ভর্তি হয়। 

তারপর গল্প শুরু হয়। গল্প অর্থাৎ খুনের ব্যাকস্টোরি উন্মোচন। 

দ্য সিক্রেট হিষ্ট্রি ডনা টার্ট-এর প্রথম উপন্যাস। কিন্তু আর পাঁচজন বিখ্যাত লেখকের আর পাঁচটা প্রথম উপন্যাসের থেকে আলাদা। বিখ্যাত প্রকাশনী অ্যালবার্ট নফ ‘সিক্রেট হিস্ট্রি’ ছাপে। অন্যান্য আত্মপ্রকাশকারী উপন্যাস যেখানে প্রথম সংস্করণ দশ হাজার কপি ছাপা হয় সেখানে সিক্রেট হিস্ট্রি ছাপা হয়েছিল পঁচাত্তর হাজার কপি। বই কেউ পড়ার আগেই নক্ষত্র হয়ে গিয়েছিলেন ডনা টার্ট। বই ছাপা হয়ে বেরোনোর পর সে ইমেজ আরও ঝকঝকে হয়েছে। 

আমি অবশ্য সিক্রেট হিস্ট্রি দিয়ে ডনা টার্ট শুরু করিনি। আমি প্রথম পড়েছিলাম গোল্ড ফিঞ্চ। গোল্ড ফিঞ্চ পড়ে আমার ওঁর লেখা সম্পর্কে যে ধারণা হয়েছিল, দুঃখের বিষয়, সিক্রেট হিস্ট্রি পড়ার পর সে ধারণাটা আরও জোরালো হয়েছে। 

সেটা হচ্ছে ডনা টার্ট আমার জন্য নন। যদিও ডনা টার্ট কেন এত জনপ্রিয় এবং সমালোচকরা কেন ওঁকে নিয়ে এত উচ্ছ্বসিত সেটা বোঝা শক্ত নয়। ইদানীংকালে সফল, বাজারি উপন্যাসের যে ধারা, যে চলন, প্লট পয়েন্ট যে যে জায়গায় রাখার “নিয়ম”, গদ্য ভালো হওয়ার জন্য যা যা টিপস অ্যান্ড ট্রিকস (যেমন, ঝরঝরে, গতিময় ইত্যাদি) সব যেন ধরে ধরে ভাঙতে ভাঙতে গেছেন লেখক। প্লটের বাঁধুনির প্রতি শুধু মনোযোগ খরচ করেননি তা নয় (কেন খুন সেটা উন্মোচন হয়ে গেছে দুই তৃতীয়াংশেই, তারপরও গল্প চলতে থাকে, কী উদ্দেশ্যে আমি ঠিক নিশ্চিত নই) লেখার ক্ষেত্রে লেখার ক্ষেত্রে ম্যাক্সিমালিজম বলে যদি কিছু থাকে তাহলে তার সাধনায় যেন বসেছেন লেখক। প্রতিটি কথা, প্রতিটি কথোপকথন, অকিঞ্চিৎকর কথোপকথন লিখে গেছেন মনের আনন্দে। 

অনেকেই বলেছেন, এটা লেখকের ইচ্ছাকৃত। আধুনিক ‘কমপ্যাক্ট’ নভেলের বদলে উনি অনুসরণ করেছেন ভিক্টোরিয়ান নভেলের চলন, যখন পাঠকরা বই আকারে সেগুলো পড়ত না, পড়ত ধারাবাহিকের চেহারায়। কাজেই প্লটের সংবদ্ধতার থেকে চরিত্রদের সঙ্গে সময় কাটানোটাই ছিল আসল উদ্দেশ্য। তাহলে বলতে হবে, প্রায় সাড়ে পাঁচশো পাতা ধরে সিক্রেট হিস্ট্রি-র চরিত্রদের সঙ্গে সময় কাটিয়েও আমি তাদের সকলের সম্পর্কে সমান অবগত হতে পারিনি। দ্বিতীয় সারির চরিত্রদের কথা যদি ছেড়েও দিই (যেমন, গ্রিক সাহিত্যের মাস্টারমশাই জুলিয়ান), গল্পের প্রধান ছয় চরিত্র, ছয় বন্ধুর মধ্যে মোটে তিনটি চরিত্র সম্বন্ধে আমাদের তবু সামান্য কিছু ধারণা জন্মায় তারা হল রিচার্ড, চার্লস আর ‘বানি’ ওরফে এডমন্ড। বাকি তিন প্রধান চরিত্র, ক্যামিলা, চার্লস এবং ফ্রান্সিস ছায়া হয়েই থেকে যায়। 

ডনা টার্টের দুটো উপন্যাস পড়ে আরও একটা জিনিস আমার নজরে পড়েছে, তা হল, কোনও একটা বাহ্যিক থিমের প্রতি লেখকের ‘অবসেশন’। গোল্ড ফিঞ্চ-এ ছিল আর্ট, সিক্রেট হিস্ট্রি-তে সাহিত্যের ইতিহাস। কী অসামান্য জ্ঞানের প্রকাশ রেখে গেছেন লেখক ছত্রে ছত্রে, এবং এ বই লিখতে তাঁকে কত পড়াশোনা করতে হয়েছে, ভাবা যায় না। সেগুলোর যথাযথ মর্যাদা যে করতে পারলাম না, সে জন্য সত্যি বলছি আমার আফসোস আছে, কিন্তু এও সত্যি যে আমার আর ধৈর্য থাকছিল না। 


Tenth of December/ George Saunders




উৎস গুগল ইমেজেস

২০১৩য় জর্জ সন্ডার্স-এর ছোটগল্প সংকলন টেনথ অফ ডিসেম্বর প্রকাশিত হওয়ার পর নিউ ইয়র্ক টাইমস বলেছিল, দ্য বেস্ট বুক ইউ উইল রিড দিস ইয়ার। দ্য টাইমস সন্ডার্সের মধ্যে “অরওয়েল অফ দ্য মিলেনিয়াম” হয়ে ওঠার ছায়া দেখেছে। লেখক জেডি স্মিথ বলেছেন মার্ক টোয়েনের পর অ্যামেরিকায় এই রকম স্যাটায়ারিস্ট আর জন্মায়নি। 

দশটি ছোটগল্প নিয়ে তৈরি টেনথ ডিসেম্বর। এক পাতার গল্প থেকে শুরু করে কুড়ি-পঁচিশ পাতার গল্পও আছে। মাসখানেক আগে পড়েছি, একটি গল্পও আমার মনে নেই। (এটা একটু অতিকথন হল বোধহয়, কারণ এখন এক মিনিট থেমে ভাবতে গিয়ে একটা গল্পের আবছায়া মনে পড়ছে।) জর্জ সন্ডার্স-এর লেখার একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পাঠককে একেবারে গল্পের মাঝখানে ফেলে দেওয়া। তারপর তাকে সাঁতরে তীরে ওঠার জন্য হাঁকপাঁক করতে দেখা। কে যে বলছে, কী যে বলছে, কেনই যে বলছে, এ সব আপনাকে ‘ফিগার আউট’ করতে হবে, কোনও সূত্র ছাড়াই। জর্জ সন্ডার্সের স্টাইলের ভক্তেরা এটাকে গুণ বলেই ধরেন। কারণ সন্ডার্স পাঠককে বোকা ধরে নিচ্ছেন না, পাঠকের বুদ্ধির ওপর সন্ডার্সের আস্থা আছে, তিনি চামচে করে পাঠককে গল্প গিলিয়ে দেওয়ায় বিশ্বাসী নন। তাঁর গল্পের রসাস্বাদন করতে গেলে পাঠককে পরিশ্রম করতে হবে। 

 আমি পরিশ্রম করেছিলাম, বিশ্বাস করুন, কিন্তু পারিশ্রমিক এতই কম জুটল যে পড়তা পোষালো না। বই মুড়ে রাখার পর থেকে যত সময় যাচ্ছে গল্পগুলো তত ফিকে হয়ে আসছে, জ্বলজ্বলে হয়ে থাকছে শুধু লেখকের চাতুরী। 



January 17, 2017

ভালো ডাক্তার



আমার আর অর্চিষ্মানের সারাদিনের সবথেকে ব্যস্ত সময় কোনটা? অন্য কাউকে আন্দাজ করতে বললে তারা হয়তো বলবে, সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যের সময়টাই হবে। অফিসে যাওয়ার আগের তাড়াটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তাড়া। যারা কোনওদিন অফিসে যায়নি তারাও এ তাড়ায় ভুগেছে। যেমন আমার ঠাকুমা। অফিস যাওয়া নিয়ে কেউ মাসল ফোলাতে এলে ঠাকুমা বলতেন, আমরা অফিস যাই নাই তো কী হইসে, আমরা অফিসের ভাত দিসি। যে তাড়া শুধু ব্যক্তির নয়, গোটা বাড়ির গায়ে যার আঁচ লাগে, তার থেকে বড় তাড়া কি হতে পারে কিছু? 

হতে পারে। আমরাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সকালের ওই সময়টা আমাদের দেখলেই সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। চায়ে চুমুক দিচ্ছি যেন বিলম্বিত ধামার, আঁকশি দিয়ে মগজের কোণাঘুঁজি থেকে টেনে এনে কথা বলছি তো বলছিই। কবে কোথায় কী হয়েছিল, স্কুলের স্পোর্টসে কবে ব্যান্ড বাজিয়েছিলাম, সেই বিট মনে করে বিস্কুটের প্যাকেটের ওপর বাজিয়ে শোনাচ্ছি। যা এখনও হয়নি, হবে, ছাব্বিশে জানুয়ারির ছুটিতে বেড়াতে যাব, কত মজা হবে, সেই নিয়ে লেবু কচলাচ্ছি। কথা না থাকলে টিভি আছে। কিছু না পেলে নাপতোল। ন’শো নিরানব্বই টাকার জুসারনিষ্পেষিত কমলার রসে চুমুক দিয়ে ঘোষকের শিহরণ দেখছি হাঁ করে। 

এ সবই আসলে নিজের মনকে চোখ ঠারানোর চেষ্টা। আর কিছুক্ষণের মধ্যে যে বধ্যভূমির দিকে রওনা দিতে হবে সেই হুমকিটার মুখে বুক চিতিয়ে থাকার একটা অন্তিম আয়াস। তা সে যতই জোয়ারের মুখে বালির বাঁধ হোক না কেন। 

আমাদের তাড়া যদি দেখতে চান তাহলে আমাদের বাড়িতে আপনাকে আসতে হবে সন্ধ্যেবেলা। যখন আমরা অফিস থেকে বাড়ি ফিরব। চাবি ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকে, ব্যাগ রেখে, জামা পালটিয়ে, খাবার খুঁজে খেয়ে, বাসন তুলে, দাঁত মেজে, রান্নাঘর, গ্যাসের নব, গিজারের সুইচ বন্ধ করে, বন্ধ হয়েছে কিনা একশোবার চেক করে দৌড়ে এসে লেপের তলায় সেঁধোবো। এ সব কাজ করার সময় আমাদের তাড়া দেখার মতো। কারণ এ কাজগুলোর ওপারেই রয়েছে ইন্টারনেটের অপার সমুদ্র। যত তাড়াতাড়ি এদের সারা যাবে, তত তাড়াতাড়ি সে সমুদ্রে ডুব দেওয়া যাবে। 

ওই সময়টা আমাদের সারাদিনের সবথেকে তাড়াহুড়োর, সবথেকে আনন্দের। এবং আতংকেরও। কারণ আমাদের বাড়ির যত অ্যাকসিডেন্ট সব এই সময়েই হয়েছে। কেউ কাউকে জায়গা না ছেড়ে সরু দরজা দিয়ে পাশাপাশি পাস করতে গিয়ে টক্কর লেগে একজনের হাত থেকে ভর্তি ডালের বাটি, অন্যজনের হাত থেকে টইটম্বুর ঝোলের কড়াই ছিটকে গেছে, মসৃণ মার্বেলে পিছলে পড়ে থুতনি থেঁতলে গেছে, লোহার টুল মেঝের বদলে পায়ের পাতার ওপর নামিয়ে রেখে কড়ে আঙুল ডিসলোকেট হয়ে গেছে।

অবশেষে আমরা ঠেকে শিখেছি। ওই সময়টা আমরা খুব সাবধানে চলাফেরা করি। এমন কিছু করি না যাতে মনঃসংযোগ বিঘ্নিত হয়। একে অপরের সঙ্গে বাক্যালাপ, ইয়ার্কিফাজলামি মিনিমাম রাখি। কারও স্পিড বিপজ্জনকরকম বেড়ে যাচ্ছে দেখলে বা কেউ ফুর্তি চেপে না রাখতে পেরে হানি সিং গেয়ে উঠছে দেখলে চেঁচিয়ে সাবধান করি।  

সামলে! কিছু একটা হয়ে গেলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে কিন্তু! 

অমনি সাপের মাথায় ধুলো পড়ে, গাড়ির মুখে স্পিডব্রেকার। কারণ ছিটকে পড়া ডাল পরিষ্কার করার থেকেও, ফাটা থুতনি আর নড়ে হাওয়া আঙুলের ব্যথা সহ্য করার থেকেও আমরা ডাক্তারের কাছে যেতে খারাপ বাসি। 

আপনি বলবেন, কে-ই বা ভালোবাসে? ট্রেনের জন্য অপেক্ষার থেকেও অকথ্য হচ্ছে ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে বসে থাকা। প্ল্যাটফর্মে তবু মেজাজের ভ্যারাইটি মেলে, কেউ হাসছে, কেউ ভুরু কুঁচকোচ্ছে, কেউ কান চুলকোচ্ছে, কেউ হাই তুলছে। ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে যারা অপেক্ষা করছে তাদের সবারই মুখ হাঁড়ি, সকলেই তিতিবিরক্ত। 

কিন্তু আমাদের খারাপ লাগাটা রোগীদের মুখভঙ্গির বৈচিত্র্যের অভাবসংক্রান্ত নয়। জন্মে থেকে আমরা দুজনেই অগুন্তি ডাক্তারের কাছে গেছি, গড়পড়তা বাঙালি যেমন যায়, যেতে যেতে দুজনেরই ডাক্তারের কাছে যাওয়াটা জলভাত হয়ে গেছে। ডাক্তারখানা যেতে আমাদের ভালো না লাগলেও খারাপ লাগে না।

আমাদের অ্যালার্জি স্বয়ং ডাক্তারে। বেখাপ্পা সময়ে, ধরা যাক রাত আটটায়, গুরুতর কিছু ঘটলে, যেমন থুতনি ফাটলে, আমাদের যে ডাক্তারবাবুর কাছে যেতে হয়, তাঁর কাছে যেতে আমরা ভালোবাসি না। ইন ফ্যাক্ট, তাঁর কাছে যাওয়ার কথা মনে পড়লেই আমাদের গা জ্বালা করে। 

অথচ জ্বলার কোনও কারণ নেই। কারণ যখনই গেছি, যতবারই গেছি, তিনি আমাদের সব সমস্যার সমাধান করেছেন। ফাটা থুতনি জুড়ে দিয়েছেন, বেঁকা আঙুল সোজা করে দিয়েছেন। তবু, অনেক চেষ্টা করেও আমরা তাঁর প্রতি এককুচি কৃতজ্ঞতাও জোগাড় করে উঠতে পারি না। প্রতিবার ওঁর চেম্বার থেকে বেরিয়ে দুশো গজ রাস্তা পেরিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে ওঁর গুষ্টির তুষ্টি করি। একটা স্প্রে দিতে পাঁচশো টাকা নিয়ে নিল, দেখলে? ডাকাত কোথাকার।

আমার মতে, ডাক্তারের সাফল্যের পুরোটাই রোগ সারানোর ওপর নির্ভর করে না। খানিকটা রোগীর বুকে সাহস আর ভরসা জাগানোর ওপরেও করে। কার লেখাতে যেন পড়েছিলাম, ডাক্তার নীলরতন সরকারকে দেখলেই নাকি লোকের অর্ধেক রোগ সেরে যেত। আমি বিশ্বাস করি ওই গুণটা ভালো ডাক্তার হওয়ার একটা আবশ্যিক শর্ত। আপনি বলতে পারেন ডাক্তারদের সম্পর্কে আমি মন্তব্য করার এত অধিকার পেলাম কোত্থেকে? তাহলে বলতে হবে কৃতিত্ব আমার নয়, মায়ের। আমার মা আমাকে ছোটবেলা থেকে অনেক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছেন। অনেকসময় আমাকে যেতেও হয়নি, ডাক্তাররা যেচে এসে আমাকে দেখেছেন। যেমন ট্রেনে একদিন একজন সুবেশা আমার উল্টোদিকে বসেছিলেন। অনেকক্ষণ ধরেই তিনি আমাকে নজরে রেখেছিলেন। লিলুয়া ছাড়িয়ে ট্রেন যখন হাওড়ায় ঢুকবে ঢুকবে করছে,তখন তিনি আর থাকতে পারেননি। ব্যাগ থেকে ফস করে একটা প্রেসক্রিপশনের প্যাড বার করে তাতে ব্রণ সারানোর পাঁচখানা ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন। আমি অবশ্য সেগুলো কিনে লাগাইনি, কারণ যেচে করা ডাক্তারির মূল্য নেই। যাই হোক, আমি বলতে চাই যে গত ছত্রিশ বছরে বহু ডাক্তার আমার পেট টিপে, কান টেনে, চোখের পাতা তুলে, গলায় টর্চ ফেলে পরীক্ষা করেছেন এবং এই প্রক্রিয়ায় নিজেরাও আমার দ্বারা পরীক্ষিত হয়েছেন। সে সব পরীক্ষার পর আমি সিদ্ধান্তে এসেছি যে শুধু রোগ সারালেই ডাক্তার ভালো হয় না।

অবশ্য আমার ভালোর সংজ্ঞাও অনেকের সঙ্গে না মিলতে পারে। ভালো ছেলে কাকে বলা হবে সেই নিয়ে একজনের সঙ্গে আমার কথোপকথন প্রায় তর্কের দিকে যাচ্ছিল। দোষের মধ্যে আমি কেবল বলেছিলাম যে বাইরে থেকে দেখে ফস করে কার ছেলে ভালো কার মেয়ে খারাপ এসব সিদ্ধান্তে পৌঁছোনোটা গোলমেলে হতে পারে। তাতে তিনি রেগে গিয়ে তাঁর এক কলিগের ছেলের উদাহরণ দিলেন, আই আই টি থেকে পাশ করে মাসে দেড় লাখ টাকার চাকরি বাগিয়েছে। “তুমি একে ভালো ছেলে বলবে, নাকি একেও ভালো ছেলে বলবে না?” আমি মেনে নিয়ে বললাম, “হ্যাঁ, এই হচ্ছে ছেলের মতো ছেলে।” তখন তিনি খুব খুশি হলেন, আর আমি যে ভালো মেয়ে, ওঁর এ বিশ্বাসটা ভাঙতে ভাঙতেও ভাঙল না। 

ডাক্তারের ভালোমন্দ নিয়েও আমার সঙ্গে লোকের মেলে না। আমার ছোটবেলায় দেখা দু’জন ডাক্তারের একজন ছিলেন চক্রবর্তী, একজন ছিলেন সেনগুপ্ত। চক্রবর্তীর পসার সেনগুপ্তর থেকে কম ছিল। চক্রবর্তী চিকিৎসা করতেন পাড়ায়, সেনগুপ্তের ক্লিনিক ছিল স্টেশনের কাছে। চক্রবর্তী সাইকেল চেপে রোগীর বাড়ি বাড়ি যেতেন, সেনগুপ্ত কীসে চড়ে যেতেন আমি জানি না, আমাদের বাড়িতে কোনওদিন ওঁকে হাউসকল দেওয়া হয়নি, তবে সেই আমলেই ওঁর একটা লাল টুকটুকে মারুতি আটশো ছিল। সবাই বলত সেনগুপ্ত চক্রবর্তীর থেকে ভালো ডাক্তার। কঠিন অসুখ হলে বলত, এ কেসটা চক্রবর্তীর হাতে ফেলে রাখা হবে উচিত না, সেনগুপ্তর কাছে নিয়ে যাও। আমার মা আমাকে নিয়ে একবার সেনগুপ্তর কাছে গিয়েছিলেন। খানপঁচিশ লোক লাইন দিয়ে বাইরে বসে ছিল, ঘণ্টাখানেক পর আমাদের ডাক পড়ল। চক্রবর্তী কেমন হেসে হেসে কথা বলতেন, কোন ক্লাসে পড়, বড় হয়ে কী হবে ইত্যাদি জানতে চাইতেন, আর সেনগুপ্ত মুখের দিকে তাকালেন পর্যন্ত না। ওই একবারই সেনগুপ্তর কাছে যাওয়া হয়েছিল, তারপর থেকে আমরা আবার চক্রবর্তী ডাক্তারকে দেখাতে শুরু করলাম। এখনও দেখাই। চক্রবর্তী ডাক্তার এখন সাইকেল ছেড়ে স্কুটার ধরেছেন। সেনগুপ্ত অনেক দিন আগে মারুতি আটশো ছেড়ে এস ইউ ভি তে প্রোমোশন নিয়েছেন। এখন তাঁর চেম্বারের জায়গায় পাঁচতলা নার্সিংহোম। এবার গিয়ে দেখলাম নার্সিংহোমের পাশে একটা স্কুলও খোলা হয়েছে। ওটা মিসেস সেনগুপ্ত দেখেন। স্কুলের নাম আমার মনে নেই, টাইনি টটস্‌ বা মামা’জ প্রাইড, দুটোর মধ্যে যে কোনও একটা হবে। শিক্ষা ও চিকিৎসা, এই দুই মহান আদর্শের ঘাড়ে ভর দিয়ে সেনগুপ্ত সাম্রাজ্য হইহই করে বিস্তৃত হচ্ছে। আর চক্রবর্তী স্কুটার চেপে রোগীর বাড়ি বাড়ি দৌড়োচ্ছেন। কে ভালো ডাক্তার এ নিয়ে কারও মধ্যেই কোনও সন্দেহ নেই, ঠিক যেমন আমার নিজের মনেও সন্দেহ নেই যে আমার বা আমার প্রিয়জনের অসুখ হলে আমি কার কাছে যাব।

ডাক্তারের ভালোমন্দ সম্পর্কে আরও একটা খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে যিনি যত নাগালের বাইরে তিনি তত ভালো ডাক্তার। ভালো ডাক্তারের নমুনা দিতে গিয়ে কেউ বলে না, উনি আমার বা আমার চেনা কাউকে সারিয়ে দিয়েছেন। বলে বাপরে, উনি স্বয়ং ভগবান, বিকেল তিনটেয় দেখাতে গেলে সকাল চারটে থেকে লাইন দিতে হয়। এর পরেও ডাক্তারবাবুর ক্ষমতা সম্বন্ধে সন্দেহ থাকলে আপনি পাগল। এরকম একজন ডাক্তারবাবুর কাছেও মা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সকাল আটটায় গেলাম, পালা এল বিকেল সাড়ে তিনটেয়। ভারি দরজা ঠেলে ঢুকে তাঁর চেম্বারের বিশালত্ব, সজ্জা এবং স্বয়ং ডাক্তারবাবুর গাম্ভীর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তবে সবথেকে মুগ্ধ হয়েছিলাম ডাক্তারবাবুর চেম্বারের প্রশাসনিক দক্ষতায়। আপনি ডাক্তারবাবুর চেম্বারের চৌকাঠ পেরোনোর মুহূর্ত থেকে আবার চৌকাঠ ডিঙিয়ে এপারে আসা পর্যন্ত আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ, নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস মাপার জন্য পাহারাদার আছেন। তিনি প্রায় আপনার কনুই ধরে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসাবেন, নিজের সমস্যার বর্ণনা শুরু করার আদেশ দেবেন এবং এও বলে দেবেন যে এবার থামুন, ডাক্তারবাবু বুঝে গেছেন, আর বলার দরকার নেই। ডাক্তারবাবুর দামি সময়ের একবিন্দুও যাতে নষ্ট না হয় সে দিকে নজর রাখাই এঁর কাজ। খুবই জরুরি কাজ, কারণ ইনি থাকতেই এবং নিজের কাজ এমন দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতেই সকাল আটটায় আসা রোগী বেলা তিনটেয় ঢুকতে পারছে, ইনি না থাকলে সেটা নির্ঘাত পরদিন সকাল আটটায় দাঁড়াত। 

এতদিনের অভিজ্ঞতায় আমি বুঝেছি যে ডাক্তারের ভালোমন্দ নিয়ে প্রত্যেকের নিজস্ব একটা ধারণা আছে। অন্যের কাছে ভালো ডাক্তার কীসে হয় আমার জানা নেই, আমি কাকে ভালো ডাক্তার বলি শুধু সে কথাই আমি অবান্তরে বলতে পারি। এক, ডাক্তারকে ডাক্তারের মতো দেখতে হতে হবে। ডাক্তারকে কেমন দেখতে হওয়া উচিত জিজ্ঞাসা করলে আমি উত্তর দিতে পারব না, তবে কর্পোরেটের সি ই ও-র মতো দেখতে যে নয় সেটা বলতে পারি (আমাদের রাত আটটার আপৎকালীন ডাক্তারবাবুকে অবিকল ও’রকম দেখতে)। দুই, ডাক্তারকে অতিব্যস্ত হলে চলবে না। মানে আমার কথা, তা সে যতই বোকাবোকা কিংবা অপ্রয়োজনীয় হোক না কেন, শোনার সময় তাঁর থাকতে হবে। তিন, ডাক্তারবাবুর সঙ্গে ওইসব জায়গার সংস্পর্শ না থাকলেই ভালো হয় যেখানে ন’হাজার ন’শো নিরানব্বই টাকায় হোল বডি চেকআপ প্যাকেজ হয় আর প্যাকেজে কর্নফ্লেক্স আর দাগ লাগা কলাওয়ালা ব্রেকফাস্ট ফাউ থাকে। আমার চতুর্থ এবং শেষ শর্ত হচ্ছে ডাক্তারবাবুর হাতে আংটি আর দেওয়ালে সত্য সাঁইবাবা কিংবা মা সারদা বিরাজ না করলেই ভালো। ডাক্তারের কাছে গেছি মানে আমি নিজেই যথেষ্ট ভয় পেয়ে আছি, এমন কারও কাছে আমি যেতে চাই না যিনি আমার থেকেও বেশি ভয় পেয়ে আছেন। 

সুখের বিষয়, অন্য অনেক রকম ডাক্তারবাবু দেখলেও সারাজীবন আমি এমন ডাক্তারবাবুদেরও সান্নিধ্য পেয়েছি যিনি আমার সমস্ত শর্ত পূরণ করেছেন। ছোটবেলার চক্রবর্তী ডাক্তারের কথা তো আগেই বললাম, বড়বেলাতেও আছেন ডাক্তার দাস। আমাদের মাম্পস থেকে জন্ডিস সব সারিয়ে দিয়েছেন। ইন ফ্যাক্ট, চেম্বারে ঢুকে ওঁর উল্টোদিকে বসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মন থেকে অর্ধেক ভয় চলে গেছে, আমরা নিঃসন্দেহ হয়েছি যে সারাতে পারলে ইনিই পারবেন। হেসে কথা বলেছেন। চেম্বারে, রাস্তায়, রসরাজে মিষ্টি কিনতে কিনতে। যেচে জিজ্ঞাসা করলে বলেছেন, এখন টেস্ট করানোর দরকার নেই, লাগলে আমি বলে দেব। 

আমাদের এখন আফসোস হয়, ডাক্তারবাবু জেনারেল ফিজিশিয়ান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাঁত, নাক, কান, চোখ, হাড় এ সব নিয়েও কেন পড়াশোনা করে রাখলেন না। তাহলে আমাদের আর অফিস থেকে ফিরে অত পা টিপেটিপে হাঁটাচলা করতে হত না। 



January 15, 2017

সাপ্তাহিকী






Don't you understand that we need to be childish in order to understand? Only a child sees things with perfect clarity, because it hasn't developed all those filters which prevent us from seeing things that we don't expect to see. 
                                —Douglas Adams, Dirk Gentley’s Holistic Detective Agency

দেশের খবর বিদেশের কাগজে/সাইটে পড়তে সত্যিকারের গ্লানি হয়। তাও যখন খবরটা এমন ভালো।

পৃথিবীর সবথেকে পুরোনো ডোবার বয়স কত বলুন দেখি? মোটে দু’মিলিয়ন। 



একেবারে বদলে দিয়েছে বলাটা বাড়াবাড়ি, তবে কোন অভ্যেস আমার জীবনে বলার মতো প্রভাব ফেলেছে বললে আমি বলব প্ল্যানার ব্যবহার করার অভ্যেস। সেই একই প্রশ্নের উত্তরে আরও অনেকে অনেক কিছু বলেছেন, যেমন বারোমাস ঠাণ্ডা জলে স্নান করা, চেঁচিয়ে কথা বলা বন্ধ করা। আমার পড়তে ইন্টারেস্টিং লেগেছে, আপনারও লাগে কিনা দেখতে পারেন।

এ মাসের গান।


লিটল সাইগন, হজ খাস মার্কেট



উবার-এর সহযাত্রীদের টাইপসংক্রান্ত পোস্ট লেখার সময় একখানা টাইপ আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। এঁরা হচ্ছেন সেই টাইপ যাঁরা কথা না বলে থাকতে পারেন না। ড্রাইভারের সঙ্গে দরকারি কথোপকথন শেষ হওয়া মাত্র ব্যাগ থেকে ফোন বার করে লোক শিকারে বেরোন। অনেক সময় উল্টোদিকের লোকটি আগ্রহীও থাকেন না, তা এদিকের “অওর বাতাও”, “অওর বাতাও”-এর ঘনঘটা দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু কখনও কখনও মণিকাঞ্চনযোগ ঘটে, যেমন সেদিন ঘটেছিল, আর সেই যোগে আমার মতো উলুখাগড়ার লাভ হয়। 

সেদিন তিনটে ফোন “অওর বাতাও”-এ শেষ হওয়ার পর চতুর্থ ফোনে আমার সহযাত্রীর শিকে ছিঁড়ল। উল্টোদিকের লোকটিও সঙ্গের জন্য হন্যে হয়ে ছিলেন, তিনি একেবারে ডিনারের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। ইনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, “শিওর শিওর, কাহাঁ পে? হ্যাভ ইউ বিন টু লিটল সাইগন? নো? লেট’স গো টু লিটল সাইগন দেন।”

সে রাতের মতো একা ডিনার খাওয়ার সম্ভাবনা এড়াতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে সহযাত্রী সিটে হেলান দিয়ে বসলেন। আমার গন্তব্য এসে গেল। আমি নেমে বাড়ি চলে এলাম, লিটল সাইগন নামটা মগজের ভেতর জেগে রইল। 

নামটা একেবারে অচেনা নয়। অনেকদিন আগে শুনেছিলাম, ভুলেও গিয়েছিলাম। কেন কে জানে। ভিয়েতনামিজ খাবারের জন্য ওঁত পেতে থাকি, বান মি-র গন্ধে গন্ধে গুড়গাঁও পর্যন্ত ধাওয়া করেছি, অথচ হজ খাস মেন মার্কেটের লিটল সাইগন-এর নাম শোনা সত্ত্বেও ভুলে গেছি। জোম্যাটো খুলে চোখ কপালে উঠল। রেটিং পাঁচে চার। রিভিউর পর রিভিউ জুড়ে শুধু প্রশস্তি, “অথেনটিক”, “ইয়াম্মি”, “রিমাইন্ডেড মি অফ দ্য ইয়ার অমুক হোয়েন আই ওয়াজ অন সাইট ইন ভিয়েতনাম।”

আর নিজেকে ভুলতে অ্যালাউ করলাম না। নিজেকে ভুলতে না দেওয়ার একমাত্র রাস্তা হচ্ছে হাতের কাছে যাকে পাওয়া তাকে অহোরাত্র মনে করানো। অষ্টপ্রহর লিটল সাইগন লিটল সাইগন করে অর্চিষ্মানের কানের পোকা ঝালাপালা করে দিলাম, অবশেষে শনিবার দুপুরে উবার ডেকে চলে গেলাম হজ খাস মেন মার্কেট। 

যেটা হজ খাস ভিলেজের থেকে আলাদা। ইদানীং কিছু কিছু লোক, কোনও কোনও জায়গার কাছাকাছি এলে নিজের বাড়ন্ত বার্ধক্য টের পাই, হজ খাস ভিলেজ তার মধ্যে একটা। শেষ যেবার হজ খাস ভিলেজে গিয়েছিলাম সেদিন ছিল দিল্লি ইউনিভার্সিটির ভোট। ভিলেজের চেহারা দেখে “মাগো” ছাড়া আর কোনও কথা বেরোয়নি আমার মুখ থেকে। আমার স্বীকার করে নিতে লজ্জা নেই, হজ খাস ভিলেজ আমার পক্ষে এখন টু কুল, টু হিপ, টু ইয়ং।

আমার পক্ষে বরং ঢের সুটেবল হজ খাস মেন মার্কেট। দিল্লির আর পাঁচটা মার্কেটের মতই, লাভলি ড্রাই ক্লিনারের পাশে মেহরা জেনারেল স্টোর্সের পাশে স্টেট ব্যাংক অফ পাতিয়ালা। আর এই স্টেট ব্যাংক অফ পাতিয়ালার পাশেই লিটল সাইগন। 


ভাগ্যিস ফোন করে গিয়েছিলাম। ঠেসেঠুসে চোদ্দ জন বসা যায়, তার মধ্যে আটজনের জায়গা অলরেডি বুকড। আমাদের ভাগ্যে জুটল একটা প্লাস্টিকের চেয়ার, একটা প্লাস্টিকের টুল। আমরা থাকতে থাকতেই কিছু খদ্দের এসে ফিরে গেলেন কারণ তাঁদের বুকিং ছিল না। 

এর থেকে কম সাজাগোজা রেস্টোর‍্যান্ট আর হতে পারে না। প্লাস্টিকের চেয়ারটেবিলের কথা তো আগেই বললাম, দু’খানা টেবিল দেখলাম আসলে রিসাইকেলড সেলাই মেশিনে স্ট্যান্ড। তকতকে পরিচ্ছন্ন দোকানে সাজ বলতে দেওয়ালে ঝোলানো কয়েকটি ভিয়েতনামিজ (আমি অ্যাকচুয়ালি জানি না ওগুলো কোন দেশী, ভিয়েতনামিজ দোকান বলে ধরে নিচ্ছি ভিয়েতনামিজই হবে) টোকা।

যাই হোক, সাজ দেখতে তো যাইনি, গেছি খেতে। ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে দশ হাত দূরের ঘষা প্লাস্টিকের সুইং ডোরের ওপারে রান্নাঘরে একটা কী যেন ফোড়ন দিল আর তার গন্ধে আমাদের খিদে একেবারে তুঙ্গে। পত্রপাঠ অর্ডার করলাম। 


ফ গা। ভিয়েতনামিজ চিকেন সুপ। স্বচ্ছ সুপের মধ্যে মোটা মোটা রাইস নুডলস, চিকেনের টুকরো, লাল লংকাকুচি। আপাদমস্তক মিনিম্যালিস্টিক। সোজা, কিন্তু সরল নয়। ওই যে পরিষ্কার টলটলে ঝোল, ওর মধ্যে টক ঝাল মিষ্টি উমামির কত পরত যে লুকিয়ে আছে, নিয়মিত খেলে মনের না হোক, শরীরের ক্লেদ, গ্লানি ধুয়ে যেতে বাধ্য। ওঁরা কতক্ষণ রেঁধেছিলেন ভদ্রতার খাতিরে আমি জিজ্ঞাসা করিনি, কিন্তু আমি শুনেছি এই ঝোল রাঁধতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে। 


এই খাবারটার মেনুতে নাম লেখা আছে 'লিটল সাইগন প্লেটিং'। বেসিক্যালি জিনিসটা হচ্ছে একটা ডিকনস্ট্রাকটেড র‍্যাপ। আপনাকে সেটা আবার রিকনস্ট্রাকট করে খেতে হবে। র‍্যাপে থাকে অবশ্যই তাজা লেটুস, ঠাণ্ডা ঝুরঝুরে নুডলস, লাল টুকটুকে টমেটো, পর্ক বার্গার, বাদামের গুঁড়ো, আর লেটুসের পাতার পাশে যে সবুজ পাতার গোছা, তাতে আছে বাসিল, পুদিনা ইত্যাদি, আপনার ইচ্ছেমতো সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন। আর অফ কোর্স, ফিশ সসে চুবোনো লাল লংকা। 


লিটল সাইগনের লেটুসও তাজা, টমেটোও সজীব, নুডলসও ঝরঝরে, পুদিনা বাসিলও সুগন্ধী, আর পর্ক বার্গারও অতীব সুস্বাদু। কাজেই গোটা ব্যাপারটাও ভালো। তবে এধরণের র‍্যাপ বানিয়ে আমরা শিম টুর-এ আগে খেয়েছি। এবং গ্রাউন্ড পর্কের বদলে গোটা পর্কের টুকরো ব্যবহারের জন্যই হোক বা রসুনের উপস্থিতির জন্যই হোক, বা আর কিছু না হলেও, রান্নাটা যে আমাদের চোখের সামনে ঘটছে সেই চমকের জন্যই হোক, আমাদের বেশি ভালো লেগেছিল। 


চিংড়িমাছ পোরা সামার রোলও আমাদের খাওয়ার ইচ্ছে ছিল কিন্তু পেটে আর জায়গা ছিল না। তাছাড়া মেনুর কোকোনাট আইসক্রিমটা খেতেই হত। এ জিনিসটা আসে গ্লাস জেলির সঙ্গে, কিন্তু গ্লাস জেলি ফুরিয়ে গিয়েছিল, তাই আমরা শুধু শুধু আইসক্রিমই খেলাম। এর সঙ্গে ন্যাচারাল-এর টেন্ডার কোকোনাট আইসক্রিমের কোনও মিলই নেই। ওটা মসৃণ, এটায় দানা দানা নারকেল মুখে পড়ে। লক্ষ্মীপুজোর চিনির নাড়ু যদি আইসক্রিম হিসেবে আপনাকে খেতে দেওয়া হয় তাহলে যেমন হবে, লিটল সাইগনের কোকোনাট আইসক্রিম অবিকল সেরকম খেতে। তবে নাড়ুর থেকে মিষ্টিটা একটু হালকা। 


লাস্টে কনডেন্সড মিল্ক ঢালা ভিয়েতনামিজ কফি। খেয়ে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার থেকে নিজেরাও সপ্তাহে একদিন অন্তত দুধের বদলে মিল্কমেড দেওয়া কফি খাব।

লিটল সাইগন আমাদের দুজনেরই দারুণ ভালো লেগেছে। এই শীতের ক’মাসে যদি আরও বারচারেক ওখানে গিয়ে অন্তত সুপটা না খাই তাহলে খুবই বোকামো হবে।

এই পর্যন্ত লিখে লিটল সাইগনের গল্প থামানো যেতে পারত কিন্তু গল্পের হিরোর কথাই তাহলে বলা হত না। লিটল সাইগনের হিরো হচ্ছেন হ্যানা হো। দিল্লির তাজ প্যালেসে ব্লু জিঞ্জার রেস্টোর‍্যান্টের (যেটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে) ভিয়েতনামিজ রান্নার দায়িত্বে ছিলেন হ্যানা। ব্লু জিঞ্জার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি লিটল সাইগন খোলেন। তিনিই লিটল সাইগনের মালিক, রাঁধুনি (তাঁর এক আত্মীয় তাঁকে রান্নায় সাহায্য করেন), ম্যানেজার, অতিথিআবাহক, অর্ডারগ্রাহক এবং টেবিলপরিষ্কারক। (মহিলা নাকি আবার আমারই বয়সী, যাকগে সে কথা মনে করে আর কষ্ট পাওয়ার দরকার নেই।) তাছাড়াও আমি নিশ্চিত আমি যেটুকু দেখতে পাচ্ছি সেটা একটা গোটা রেস্টোর‍্যান্ট চালানোর যাকে বলে ওনলি টিপ অফ দ্য আইসবার্গ, বাকি সব কাজও হ্যানাকেই সামলাতে হয়।

আমি বলছি না, হ্যানা-র এই অসামান্য পরিশ্রমের মর্যাদা দিতে আপনি হজ খাস মার্কেটের লিটল সাইগন-এ একদিন খেয়ে আসুন। লিটল সাইগন-এ আপনার এমনিই খেতে যাওয়া উচিত, স্রেফ খাবারগুলো ভালো বলেই। কিন্তু যদি যান তাহলে হ্যানা-র পরিশ্রমও পুরস্কৃত হয়, এই আরকি।


January 09, 2017

উৎসর্গ


গত বছর অক্টোবরের শেষে বইকথা ওয়েবপত্রিকায় আমার এই ছোটগল্পটা বেরিয়েছিল। সম্পাদকের অনুমতি নিয়ে অবান্তরে ছাপছি।

***** 

শেষ দাঁড়িটা টাইপ করে শিরদাঁড়াকে নমনীয় হতে অনুমতি দিলেন লেখক। চোখ বুজলেন। পা দু’খানা হাঁটু থেকে সোজা করে টেবিলের তলায় ছড়িয়ে দিলেন যতক্ষণ না আঙুলের ডগা দেওয়াল ছোঁয়। দু’কাঁধ ঠেলে পেছনে নিয়ে গেলেন যতখানি সম্ভব। দশ আঙুল একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে কানের পাশ দিয়ে তুলে মাথার ওপর তুলে ধরলেন।  তাঁর গোটা শরীরটা এখন একটা স্ট্রেট লাইন। হাড়ের জোড়ায় জোড়ায়, তন্তুতে তন্তুতে একটা মোক্ষম টান। দীর্ঘ প্রশ্বাসে বুকের ভেতর বাতাস পুরে নিয়ে দম বন্ধ করে খুব ধীরে দশ গুনলেন লেখক। তারপর নিঃশ্বাস ছেড়ে দিলেন।

কেঠো চেয়ারের ওপর ভেজা ন্যাতার মতো এলিয়ে পড়ল তাঁর শরীর। দশ মাস পর এই প্রথম যেন তিনি প্রথমবার সম্পূর্ণ বিশ্রাম বোধ করছেন। দশ মাসের হিসেবটা মনে পড়তেই লেখকের ভুরু সামান্য কুঁচকে গেল। গুনতে নিশ্চয় ভুল হচ্ছে তাঁর, মোটে দশ মাস? চোখ খুললেন তিনি। সামনের দেওয়ালের গায়ে একখানা ক্যালেন্ডার। প্লাস্টিকের কালো রঙের স্প্রিং থেকে ঝুলন্ত চৌকো মোটা পাতা, পাতার ওপর মাসের নাম আর বছরের তলায় খোপ কাটা। বার নেই,শনিরবিতে লাল ছোপ নেই, তিথি সংক্রান্তি, ব্যাংক হলিডে কিচ্ছু নেই। খালি এক থেকে তিরিশ বা একত্রিশ বা আঠাশ পর্যন্ত নম্বর। চট করে এ রকম ক্যালেন্ডার দেখা যায় না। লেখক অন্তত দেখেননি। যদিও এর কাছাকাছি একটা কিছু তাঁর কল্পনায় ছিল। বহু খুঁজে শেষে যখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন, বছর পঁচিশ আগে, তখন একদিন অফিসের উল্টোদিকের ফুটপাথে, ভাবা যায়? ঠিক উল্টোদিকে, যেখানে তিনি রোজ চা খেতে যেতেন, একটা দোকানের সাইনবোর্ডের দিকে নজর পড়েছিল।  নীলের ওপর সাদা দিয়ে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা ‘এখানে ক্যালেন্ডার ছাপা হয়’। ব্যস।নাম না ধাম না কিচ্ছু না। কলকাতা শহরে লোকে কত অদ্ভুত কাজ করে লোকে বাঁচে ভাবতে ভাবতে চায়ের ভাঁড়খানা ছুঁড়ে ফেলে দোকানের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন লেখক। এগোতে এগোতে ছায়া ক্রমে দেহ ধরেছিল। রোগা মুখ,চোয়াল ঘিরে দাড়িতে মেহেন্দির ছোপ। মাথার পাতলা হয়ে আসা চুলের ওপর লেসের কাজ করা গোল টুপি।

লেখক জানিয়েছিলেন এমন একটা ক্যালেন্ডার তাঁর চাই যাতে খালি দিন সপ্তাহ মাস বছর ছাড়া আর কিছু নেই। যেখানে শনিরবি আলাদা করা যাবে না। ছুটির দিন আলাদা করা যাবে না। তিথি নক্ষত্র পূর্ণিমা অমাবস্যা, নাথিং। আছে?লেখককে চমকে দিয়ে বিষণ্ণ মুখ ওপর নিচে নেড়েছিলেন ভদ্রলোক। আছে। একবার চকিতে লেখকের মাথায় এসেছিল বলেন, ঈদ কিংবা মহরমের উল্লেখও থাকবে না কিন্তু। কথাটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই যে ছিছিক্কার জন্মেছিল নিজের প্রতি, সেটাও অবিকল মনে করতে পারলেন লেখক।

অবয়ব সরে গিয়েছিল। আবছা অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকারে। দোকানের পেছন দিক থেকে একটা গোল পাকানো ডাণ্ডার মতো জিনিস হাতে নিয়ে আবার লেখকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ভদ্রলোক। গার্ডার খুলে কাগজটার পাক খুলছিল যখন শীর্ণ আঙুলগুলো লেখকের মনে হয়েছিল তিনি যেন সম্রাট আর এ যেন ভগ্নদূত, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ বহন করে এনেছে। খবর এনেছে যে লেখক যা চাইছেন, সে রকম ক্যালেন্ডার পৃথিবীর কোথাও তৈরি হয় না।

পাক খুলে কাগজটা তাঁর দিকে ঘুরিয়ে ধরেছিল উসমান আলি। ক্যালেন্ডার আর উসমান  আলির মেহেন্দি দাড়িতে অশ্বত্থ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এসে পড়া ঝিলমিল রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে যে অনুভূতিটা হয়েছিল সেটা তাঁর লেখার কেরিয়ারে হাতে গোনা বারই হয়েছে। যখন লেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি চরিত্রটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেছেন। একে তো তিনি ভাবেননি। এ রকম একজনের কথা ভেবেছিলেন লেখা শুরুর আগে। এ রকম দেখতে,স্বভাবচরিত্রও এরই কাছাকাছি, কিন্তু এ নয়। এর গালে এই যে একটা লাল জড়ুল, যেটা না থাকলে গোটা চেহারাটা মাটিই হয়ে যেত প্রায়, সেটা তো কই তাঁর কল্পনায় ছিল না। কিংবা এই ঘাড় বাঁকিয়ে তাকানোটা অথবা আপাদমস্তক একটা নিরীহ কথোপকথনে হঠাৎ তীক্ষ্ণ রসবোধের ঝিলিক, এসব তো তিনি কল্পনা করেননি।

তিনি ঠিক যা চাইছেন, যা চেয়ে এসেছিলেন এতদিন, তার থেকেও পারফেক্ট ক্যালেন্ডার তাঁকে দেখিয়েছিল উসমান  আলি। যে ক্যালেন্ডারে কোনও ছুটি নেই,ফাঁকি নেই, আরামের আশ্বাস নেই, বিশ্রামের প্রতিশ্রুতি নেই, পালানোর কোনও জায়গাই নেই। খালি একেকটা দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর শেষ হয়ে যাওয়ার রিমাইন্ডার আছে। জীবনটা আরও একটা দিন ছোট হয়ে যাওয়ার চেতাবনী আছে।

হয় তুমি লিখলে, নয় লিখলে না।

চেয়ার থেকে উঠে, দেওয়ালের পেরেক থেকে ক্যালেন্ডারটা খুলে এনে দ্রুত পাতা উল্টে পেছোলেন লেখক। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়,এই তো, দশ নম্বর পাতার সাত তারিখের ওপর সবুজ কালি দিয়ে তাঁর সদ্য শেষ করা বইয়ের নাম লেখা। অর্থাৎ লেখা শুরু হল। অর্থাৎ সত্যি সত্যি মাত্র দশ মাস ধরে লিখেছেন তিনি গল্পটা। অথচ মনে হচ্ছে যেন দশ বছর। যবে থেকে গল্প বলতে শুরু করেছেন তবে থেকে যেন এই গল্পটাই বলতে চেয়েছেন তিনি। যতবার কাগজ কলম টেনে লিখতে কিংবা ল্যাপটপ খুলে টাইপ করতে শুরু করেছেন ততবার যেন এই গল্পটাই লিখবেন বলে বসেছেন, লেখা শেষ করার পর দেখেছেন কখন শব্দগুলো অন্য গল্প হয়ে গেছে। কখনও অজ্ঞাতে,কখনও জ্ঞাতসারে। কখনও এই গল্পটা বলতে ভয় পেয়েছেন, মনে হয়েছে এই গল্পটা লেখার জন্য যে ভাষা প্রয়োজন তা তাঁর এখনও শেখা হয়ে ওঠেনি। যে দক্ষতা দরকার তা এখনও আয়ত্ত্বে আসেনি।

অবশেষে সে গল্প বলা শেষ হয়েছে।  এবং, স্বীকার করতে বাধা নেই, ভালো করেই বলা হয়েছে। অন্তত তাঁর কোনও অতৃপ্তি থেকে যায়নি।  আবার একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন লেখক। বুকের ভেতরটা খালি লাগছে। তারপর খুব ধীরে,প্রায় শীতের কুয়াশার মতো নিঃশব্দে, একটা ভাবনা গুঁড়ি মেরে ঢুকল সে ফাঁকায়। এতদিন যে ভাবনাটা মাথাতেই আসেনি। কী করে? প্লট নিয়ে, চরিত্র নিয়ে ভাবতে ভাবতে, প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ  বিশ্লেষণ করতে করতে, যা লেখা হল আর যা বুনে দেওয়া হল লেখার ফাঁকে ফাঁকে, সে সব নিয়ে চুল চিরতে চিরতে এই অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটাই তাঁর মাথা থেকে বেরিয়ে গেল?

কাকে উৎসর্গ করে যাবেন তিনি তাঁর এই মাস্টারপিস?

***

তাঁর লেখার ঘরে একটাও জানালা নেই। ইচ্ছে করেই রাখেননি। যাতে বাইরের দিকে তাকিয়ে লেখার মহার্ঘ সময় নষ্ট না হয়। ওই ক্যালেন্ডারটা ছাড়া এই ঘরের দেওয়ালে আর কোনও ছবি নেই, কোনও তাক, কুলুঙ্গি, কুলুঙ্গিতে দৃষ্টিনন্দন সজ্জাবস্তু, বুককেস কিংবা বই, কিছুই নেই। সারা ঘরে এমন কিছুই নেই, রাখতে চাননি লেখক, যাকে আঁকড়ে ধরে তাঁর লেখার বাইরের চিন্তা লকলকিয়ে বাড়তে পারে। এমনি সময় এই ব্যবস্থায় তাঁর অসুবিধে হয় না,মনঃসংযোগে সুবিধে হয়, কিন্তু এখন অস্বস্তি হতে লাগল। ঘর যেন আর ফাঁকা নেই, তাঁর টেবিলের ওপর বন্ধ করে রাখা ল্যাপটপ আর নোটখাতার ভেতর থেকে কালো কালো অক্ষরগুলো যেন বেরিয়ে এসে যেন এই বন্ধ ঘরের হাওয়ায় মিশে গেছে। লেখককে ঘিরে ঘুরছে,কানের কাছে বিনবিন করছে, চোখের সামনে কালো মাছির মতো ঝাঁক বেঁধে আসছে।

কার জন্য গত দশ মাস ধরে নিশ্চিন্ত ঘুম খুঁড়ে আমাদের জাগিয়ে খোলা পাতায় মেলে ধরেছ? কার হাতে দিয়ে যাবে আমাদের?

আক্রমণ থেকে বাঁচতে লেখক দ্রুত ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। আর চৌকাঠের বাইরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে একটা শব্দের ঢেউ তাঁর ওপর  আছড়ে পড়ল। রান্নাঘরের ছ্যাঁকছোঁক, কলের জলের ছরছর, বাসনের ঠনঠন, কাকের চিৎকার, পাশের ফ্ল্যাটের কনস্ট্রাকশনের ধাঁই ধাঁই ধপ ধপ। আর এসবের সঙ্গে একটা বেসুরো টুং টাং। লেখকের একমাত্র পুত্র, সঙ্গীতসাধনা করছে।

এই বেসুরো গিটারবাদককে তিনি তাঁর জীবনের বেশ ক’টি বই উৎসর্গ করেছেন। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে চিবুক চুলকোতে চুলকোতে লেখক ভাবতে লাগলেন,কেন করেছেন? সে সব বইয়ের বিষয় কিংবা প্রস্তুতিতে তাঁর সন্তানের কোনওরকম অবদান তো ছিলই না, জন্মের পর থেকে এই সন্তান তাঁর লেখায় ব্যাঘাত ঘটানো ছাড়া আর কিছু করেনি। খেলাচ্ছলে ম্যানুস্ক্রিপ্ট জানালার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। ইদানীং অবাধ্য টিনএজার সুলভ আচরণ করে তাঁর মানসিক শান্তি যারপরনাই বিঘ্নিত করছে। এমন সময় লেখকের দৃষ্টি পড়ল ফ্রিজের মাথায় রাখা একটা ছবির দিকে। এই গিটারবাদকের মুখেভাতের ছবি। হাঁ করে কান্নার মাঝপথে তোলা। তিনি আর তাঁর স্ত্রী একমত হয়েছিলেন, সারা অনুষ্ঠানের এইটাই বেস্ট ছবি। তাই এটাকে বাঁধিয়ে ফ্রিজের ওপর রাখা হয়েছে।

ছবিটা দেখতে দেখতে মুচকি হাসি ফুটল লেখকের মুখে। স্পষ্ট দেখতে পেলেন, অফিস থেকে ফেরার পর মায়ের কোল থেকে দু’হাত বাড়িয়ে তাঁর কোলে ঝাঁপিয়ে আসছে এই শিশু। তাঁর কোলে উঠে ফোকলা হাসিতে মুখ ভরিয়ে, তাঁর গলা জড়িয়ে ধরছে। তাঁর গলার চারপাশে সেই নরম ছোঁয়াটা আবার যেন পেলেন লেখক। সেই বেবি পাউডারের গন্ধটাও যেন ঘ্রাণ ছুঁয়ে গেল।

-‘খাবে তো?’

রান্নাঘরের দরজা থেকে একটা মুখ উঁকি মারল।

দাও, বলে টেবিলে এসে বসলেন লেখক। হাত-ঘোরা সকালের কাগজ হাত ঘুরে এসে টেবিলে অগোছালো পড়ে আছে। কিছুই পড়ার নেই, তবু অভ্যেসে নেড়েচেড়ে দেখা। খানিকক্ষণ পর একজোড়া হাত এসে খবরের কাগজটা তাঁর হাত থেকে কেড়ে নিল। কাগজের আড়াল সরে যেতে লেখক দেখলেন তাঁর সামনে স্টিলের কানাতোলা জলখাবারের থালা। চেয়ার টেনে ধপাস করে বসলেন লেখকের স্ত্রী। ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মুখ। বিরক্ত দৃষ্টি সিলিং ফ্যান থেকে ঘুরে লেখকের মুখের ওপর এসে থামল। লেখক চোখ নামিয়ে নিলেন। ফ্যানটা সত্যি বাড়াবাড়ি রকম আস্তে চলছে। ইলেকট্রিশিয়ান ডাকার দায়িত্বটা তাঁর স্ত্রীই পালন করেন, কিন্তু এও দাবি করেন যে মহিলারা ডাকলে লোকজন অত গুরুত্ব দেয় না, যত বাড়ির কর্তাকে দেয়। সে কর্তাগিরিটা ফলাতে যাওয়া হচ্ছে না তাঁর।
আজ কিন্তু মাছ লাগবেই’। হাতপাখার বদলে খবরের কাগজ দ্রুতগতিতে নাড়তে নাড়তে জানালেন লেখকের স্ত্রী।

এই ভদ্রমহিলাকেও বই উৎসর্গ করেছেন তিনি একাধিক। রুটি বেগুনভাজা চিবোতে চিবোতে লেখক ভাবতে চেষ্টা করলেন কেন করেছেন। লেখক নিশ্চিত নন তাঁর স্ত্রী তাঁর লেখা একটাও বই আদৌ পড়েছেন কি না। তাঁর বইয়ের সমালোচনা অবশ্য উনি পড়েন এবং খুঁটিয়েই পড়েন। যে সব সমালোচক উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন সভাসমিতি পুরস্কার বিতরণী উৎসবে তাঁদের সঙ্গে হেসে কথা বলেন, আর যাঁরা কড়া কথা লেখেন অনুষ্ঠান শেষ হলে তাঁদের পোশাকআশাক চলনবলনের নিন্দে করেন। এছাড়া লেখকের সৃষ্টিশীল জীবনের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলার কোনও সম্পর্ক নেই, কোনও অবদানও নেই। বরং আজকাল লেখকের মনে হয় সংসার করে হয়তো ভুলই করেছেন তিনি। সংসারের দিকে মনোযোগ দিতে পারলেন না, আবার লেখাকেও সর্বস্ব দেওয়া হল না।

অন্যমনস্ক হয়ে বেরোনোর মুখে নিচু হতে ভুলে গিয়ে দরজার ফ্রেমে মাথাটা ঠুকে গেল। রক্তও বেরোলো সামান্য। স্ত্রী দৌড়ে এসে ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেড সেঁটে দিলেন। সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললেন, মাথাটাথা ঘুরছে নাকি,তাহলে বাজারে গিয়ে দরকার নেই। লেখক শুনলেন না। বেরিয়ে পড়লেন। প্রথম শীতের সুন্দর রোদ গায়ে পড়তে আরাম লাগল। বাজারের ব্যাগ হাতে হাঁটতে হাঁটতে আবার নতুন করে ঝালিয়ে নিলেন তিনি সত্যিটা। এই সংসারের মধ্যে লেপটে না থাকলে তিনি যা লিখেছেন, যেটুকু লিখেছেন, সেটুকুও লিখতে পারতেন না। তিনি হচ্ছে আদুরে ফুল, যত্নে, ছায়ায় বাড়েন। সংসার তাঁকে সেই ছায়াটুকু দিয়েছে। মুক্তবিহঙ্গ হওয়ার কপাল যেমন তিনি করে আসেননি, সে ক্ষমতাও তাঁর ছিল না। কত লেখক মুক্তবিহঙ্গ হতে গিয়ে সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি হয়ে গেল, তাঁর পরিণতিও ওই একই হত।

মাথার দপদপানিটা অগ্রাহ্য করে বাজারের দিকে চললেন লেখক। চালডাল আলুপটল কিনলেন। মাছের কানকো তুলে, পেট টিপে পরীক্ষা করলেন। বাক্যালাপের খণ্ডাংশ এসে কানে ঢুকতে লাগল। কান খাড়া করে রাখতে হয় না আজকাল, অভ্যেস হয়ে গেছে। রিয়েল লাইফে লোকের কথা বলার সঙ্গে বইয়ের চরিত্রের কথা বলার কত তফাৎ এটা প্রথম খেয়াল করে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন লেখক। বেশিরভাগ লোক “কোথায়”-এর পর যাচ্ছ/যাচ্ছিস/যাচ্ছেন যোগ করে না, শুধু কোথায়-এর য়-এর সময় গলাটা সামান্য তুলে দেয়। ওই গলার মোচড়টা যদি ভাষায় তুলে আনা যেত। মাছওয়ালার বঁটির ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কেমন একটানে মাছটাকে নামিয়ে আনে আর মাছটা দু’টুকরো হয়ে যায়। বঁটির গায়ে মরা মাছের যাত্রাপথের ম্যাপটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন লেখক। ওটার কি কোনও নাম আছে? ওটা নিয়ে কোনওদিনও গল্প লিখতে পারবেন না ভেবে মন খারাপ হয়ে গেল তাঁর।

ফেরার পথে বইয়ের দোকানে থামলেন। পত্রিকার নতুন সংখ্যা বেরিয়েছে। ছেলেটা চেনা। খুচরো ফেরত দিয়ে বলল এবারের পুজোসংখ্যার লেখাটা দারুণ ভালো রিভিউ পেয়েছে স্যার। অনেকে ওইটার জন্যই কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তাই?লেখক হাসলেন। ফেরার পথে আরও দু’চারজন একই কথা বলল। এবার পুজোর উপন্যাসটা খুব ভালো হয়েছে।

লেখকের মন ভালো হয়ে গেল। আর তখনই উত্তরটাও পেয়ে গেলেন তিনি।

এত ভাবার তো কিছু নেই। এই বইটা তিনি পাঠককে উৎসর্গ করবেন। আসলে কি বইটা তিনি পাঠকের জন্যই লেখেননি? বা এতদিন তিনি যা যা লিখেছেন,সবই কি পাঠকই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়নি? লেখক ছাড়া বই অকল্পনীয় হতে পারে, কিন্তু পাঠক ছাড়া বই? লেখক ভাবতে চেষ্টা করলেন তাঁর ওই শব্দ, গন্ধ,বর্ণহীন রুদ্ধকক্ষে বসে তিনি লিখে চলেছেন। পাতার পর পাতা, ফাইলের পর ফাইল। সবার চোখের আড়ালে। তখনও কি তিনি নিজেকে লেখক বলার অধিকারী হতেন? তখনও কি তিনি এ-ই হতেন, আজ তিনি যা?

মনস্থির করে ফেললেন লেখক। তিনি তাঁর আজ সকালে শেষ হওয়া উপন্যাস,তাঁর সারাজীবনের সাধনার ফল, তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি উৎসর্গ করে যাবেন তাঁর পাঠকদের। আজ যারা তাঁর বই পড়ছে,  আবেগে ভেসে গিয়ে খানিকটা দিবাস্বপ্নই দেখে ফেললেন লেখক, এই পৃথিবী থেকে তিনি চলে গেলেও যারা তাঁর বই পড়বে।

***

বুকের ভারটা নেমে গেল। মগজের ভেতর জমা ধোঁয়াশাটা কেটে গেল। আর তখনই লেখক আবিষ্কার করলেন ভাবতে ভাবতে বাড়ির দিকে হাঁটার বদলে ঠিক উল্টোদিকের রাস্তায় চলে এসেছেন তিনি। একমুহূর্ত লাগল তাঁর ধাতস্থ হতে। তিনি সামান্য বেখেয়াল বটে, তাই বলে বাড়ির রাস্তা ভুলে যাওয়া?উৎসর্গের ব্যাপারটা কতখানি ভুগিয়েছে তার মানে। কিন্তু সমাধান হয়ে গেছে। আর ভাবনার কিছু নেই। এবার বাড়ি যাওয়া যাক।

আচ্ছা, এই রাস্তাটাতেই তাঁর এক স্কুলের বন্ধুর বাড়ি ছিল না? কতদিন আসেননি এদিকে। তাঁর বাড়ির এত কাছে, অথচ আসা হয়নি, আসার কোনও কারণই ঘটেনি কত বছর। এত অবিশ্বাস্য লাগল ব্যাপারটা তাঁর যে লেখক আবার চারদিক ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন। নাঃ, এটাই সেই রাস্তা। বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিলেন, থমকে দাঁড়ালেন। একটা কথা তাঁর মনে পড়ে গেছে। যদি এটাই সেই রাস্তা হয়ে থাকে তাহলে এই দিক দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে . . .

প্রায় সাড়ে তিন মিনিট হাঁটার পর বাঁ দিকে গাছপালার আড়ালে জল চিকচিক করে উঠল। রাস্তা থেকে নেমে কাঁচা মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে গাছের আড়াল ভেদ করে পুকুরঘাটে এসে দাঁড়ালেন লেখক। লাল রঙের বাঁধানো ঘাট,ভেঙেচুরে গেছে। স্কুল ছুটির পর, বা কখনও কখনও ক্লাস কেটেই বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যখন আসতেন লেখক তখনও অবিকল এ রকমই ছিল। গত তিরিশ চল্লিশ বছরে একটুও বদলায়নি। সিঁড়ির এক কোণে বটের ছায়া পড়া সিঁড়ির কোণে একটা শীর্ণ কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। মৃদু হাওয়ায় ঘাটের একদম নিচের সিঁড়ির গায়ে জল আলতো আলতো দুলছে। সেই হাওয়া এসে লাগল লেখকের মুখে। জুড়িয়ে দিল। দু’তিনটে সিঁড়ি নেমে এসে মাছের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে, হাতের পত্রিকাটা দিয়ে এপাশ ওপাশ ঝেড়ে, বসলেন।

পাতা খুলে প্রথমেই নামটা চোখে পড়ল। ইনি একটা ধারাবাহিক লিখছেন এ পত্রিকায় জানতেন লেখক। বরাতটা তাঁর কাছেই প্রথমে এসেছিল। কিন্তু তিনি ততদিনে মনস্থির করে ফেলেছেন এবছর পুজোবার্ষিকীর একটা ছোট উপন্যাস ছাড়া আর কিছু লিখবেন না কোথাও, সমস্ত মনোযোগ দেবেন এই লেখাটায়। সম্পাদক প্রায় হাতে পায়ে ধরেছিলেন, মনে পড়ে সূক্ষ্ম একটা হাসি ফুটে উঠল লেখকের ঠোঁটে। তারপর সম্পাদক এই অন্য লেখকটির কাছে যান এবং বোঝাই যাচ্ছে অনুরোধ বিফলে যায়নি।

নিজের লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণেই, অন্তত লোকে সেইরকমই ভাববে,উপন্যাসটা ফলো করেননি লেখক। এখন এই শান্ত পুকুরধারে বসে পাতার নম্বর খুঁজে পড়তে শুরু করলেন তিনি। ধারাবাহিক অনেক এগিয়ে গেছে, গল্প ফলো করা আর সম্ভব হবে না। লেখকের তা উদ্দেশ্যও নয়। তিনি দেখবেন লেখা। শব্দচয়ন। বাক্যের ছন্দ। দুটি বাক্যের মধ্যের বিরাম। সংলাপ। সংলাপের সাবটেক্সট। এবং যত দেখলেন তত তাঁর মনে শান্ত ভাবটা সরে গিয়ে একটা উল্লাস জেগে উঠল। কী খারাপ, কী খারাপ। এই লিখেও যে বিখ্যাত হওয়া যায় এটা ভেবে, চোখের সামনে দেখে, কেমন একটা অবিশ্বাসের ভাব হল। এবং এই ভেবে গর্ব হল যে বাকিদের থেকে কতখানি ভালো। কতখানি এগিয়ে। আর তখনই নিজের সৃষ্টির আসল অনুপ্রেরণা স্পষ্ট হয়ে গেল লেখকের কাছে। সন্তানের হাসি নয়, সংসারের নিরাপত্তা, পাঠকের অনুরাগ নয়। তাঁর লেখার প্রধান অনুপ্রেরণা তিনি নিজেই। তাঁর খ্যাতির লোভ। অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা। ঈর্ষা। কবে তিনি সিরিয়াসলি লিখতে শুরু করেছিলেন মনে পড়ে গেল লেখকের। গাঁজা খেতে খেতে শেষমেশ এম এ পরীক্ষাটাই দেওয়া হল না। তারপর যখন বন্ধুরা সবাই চাকরিবাকরি নিয়ে কলকাতা, দিল্লি, বিদেশ, তখন তিনি ভাড়াবাড়িতে ভাইবোনের সঙ্গে ভাগ করা ঘরের মেঝেয় তিন ইঞ্চি পুরু তোশকের ওপর শুয়ে সিলিং-এর ছ্যাতলার মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে আছেন। ঠিক ওই ভঙ্গিতে শুয়ে থাকতে থাকতে প্রথম ডুবে যাওয়ার অনুভূতিটা হয়েছিল। খটখটে শুকনো দুপুরে স্পষ্ট টের পেলেন নাকমুখ জড়িয়ে যাচ্ছে শ্যাওলায়, গলা পর্যন্ত উঠে আসছে পাঁকভর্তি ঘোলা জল। এই পৃথিবীর কেউ তাঁর নাম জানার আগে, তাঁকে চেনার আগে এই ভাঙা তক্তপোষে শুয়ে তিনি মরে যাচ্ছেন, তাঁর বাবা কাকা ঠাকুরদা যেমন গেছে। ওই মৃত্যুসুড়ঙ্গ থেকে বেরোনোর একমাত্র অস্ত্র ছিল লেখা। তাঁর প্রথম প্রেমের উপন্যাসে লেখক হাত দিয়েছিলেন প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর। হানিমুনে দার্জিলিং-এর টিকিট কাটার পয়সা জোগাড় করতে না পারার পর তিনি ফেঁদেছিলেন পাহাড়ের পটভূমিকায় এক ঐতিহাসিক উপন্যাস। লেখা কোনওদিন তাঁর মোক্ষ হয়ে ওঠেনি, মোক্ষলাভের পথ হয় রয়ে গেছে। জীবনের প্রতিটি আঘাতের প্রত্যুত্তর তিনি দিয়েছেন লেখা দিয়ে। শুধু শ্রেষ্ঠ কেন, তাঁর জীবনের প্রতিটি লেখাই যদি কাউকে উৎসর্গ করতে হয় তাহলে সেটা করা উচিত তাঁর এই কাটাগোল্লা পাওয়া জীবনটাকে। তাঁর প্রতিটি পরাজয়কে, প্রতিটি অপ্রাপ্তির অবসাদকে, অজ্ঞাতসারে মরে যাওয়ার আতংককে। আর কাউকে না।

***

পরদিন শেষরাতে বিছানা ছাড়লেন লেখক। বহু বছর হল আর অ্যালার্মের প্রয়োজন পড়ে না। সারা বাড়ি, সারা পাড়া, সারা চরাচর অচৈতন্য। এ রকমই থাকবে বেশ কয়েকঘণ্টা। লেখক পা টিপে টিপে বাথরুমে গেলেন। রান্নাঘরে ঢুকে চা বানালেন। তারপর লেখার ঘরে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি তুলে চেয়ারে এসে বসলেন।

চায়ের ওম হাতের তেলোয় আরাম দিচ্ছে। টেবিলের ওপর বন্ধ ল্যাপটপটার দিকে তাকিয়ে লেখকের মনে পড়ে গেল উৎসর্গের স্লট এখনও খালি। কিন্তু এখন সেই নিয়ে ভাবার সময় নয়। ক্যালেন্ডারটা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। একটা নতুন খোপ। নতুন সংখ্যা। নতুন দিন। হয় তিনি লিখবেন, নয় লিখবেন না।


দ্বিতীয়টা কোনও বিকল্পই নয়। নতুন ফাইল খুলে টাইপ করতে শুরু করলেন লেখক। একটা আইডিয়া অনেকদিন ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। লেখকের শিরদাঁড়া টানটান হল, হাতের আঙুল গতি নিল, মস্তিষ্ক সংহত হল তীব্র মনঃসংযোগে। 

***

লেখকের মৃত্যুর দশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে যখন রাজ্য জুড়ে আবার তাঁর লেখা নিয়ে সেমিনার আর আলোচনাসভার বান ডাকল তখন আবার নতুন করে প্রশ্নটা উঠল। স্ত্রী বলেছিলেন, কী জানি বাবা, গাদাগুচ্ছের লোক আসত, লক্ষবার চা করে দিতে হত, ও নাম কখনও শুনেছি বলে তো মনে পড়ে না। লেখকের রকস্টার ছেলে, যিনি একসময় বুর্জোয়া বাবার বুর্জোয়া সাহিত্যের বিরুদ্ধে গান বেঁধে গেয়েছিলেন, এখন অনেকটা পোষ মেনে এসেছেন, সাহিত্যসভায় বাবার ছেলে হওয়ার অনুভূতিজ্ঞাপনে আপত্তি করেন না, তিনিও বলেছেন যে যদিও তিনি আর তাঁর বাবা খুবই “ক্লোজ” ছিলেন, এই নামের কোনও লোকের কথা বাবা কখনও বলেননি। মোস্ট প্রব্যাবলি ইট ইজ আ মেড আপ নেম।

সবদিক বিবেচনা করে সেটাই বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন গবেষকরা। লেখককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, একাধিকবার, তিনি কোনওদিন জবাব দেননি। হেসে এড়িয়ে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ডায়রি ঘেঁটে, চিঠি হাঁটকে কোথাও কোনও উল্লেখ পাওয়া যায়নি। তাঁর বাড়ির বুককেস উষ্টুমধুষ্টূম করে খুঁজে, শেষে তাঁর লেখার ঘরে ঢুকে থামতে হয়েছিল। খোঁজার মতো কিছু নেই, শ্মশানের মতো শূন্য  একটা ঘর। দেওয়ালে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছিল, অতি উৎসাহী একজন ছোকরা সাংবাদিক সেটাই উল্টে দেখেছিল। যেন ওর আড়ালে একটা জলজ্যান্ত মানুষ লুকিয়ে থাকলেও থাকতে পারে।

ফক্কা!

তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি যাকে উৎসর্গ করে গেছেন লেখক সেই উসমান  আলির চিহ্ন কোথাও পাওয়া যায়নি।


January 08, 2017

বার্ষিক জমাখরচ ৩/৪ঃ দু'হাজার ষোলোর বই, দু'হাজার সতেরোর বইয়ের রেজলিউশন



এ পোস্ট লেখার কথা ছিল ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে। সে জায়গায় জানুয়ারির প্রথম। ক্ষমা চাইছি। 

*****

গুনতি

প্রতি বছরই শুনি আগের বছর বেশি শীত পড়েছিল। কাজেই চোদ্দ বছর আগে কেমন শীত পড়েছিল বুঝে দেখুন। তার ওপর আমরা হাঁটছিলাম ইস্ট গেটের দিকটায়। চারদিক ফাঁকাফাঁকা, নিস্তব্ধ। ময়ূরগুলো ক্যাঁ ক্যাঁ করছিল মাঝে মাঝে।

যে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরছিলাম তার মানুষ বিচার করার মাপকাঠি ছিল বই। কে কটা বই পড়েছে। মারাঠি হলে কটা মারাঠি বই, পাঞ্জাবি হলে কটা পাঞ্জাবি বই, বাঙালি হলে কটা বাংলা বই। ইস্ট গেট থেকে ফেরার পথে বন্ধু বলল, আজ দুপুরে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা উপন্যাস শেষ করলাম। 

আমি বললাম, ও। কেমন লাগল?

উত্তর না দিয়ে সে বলল, এটা নিয়ে একশো আটাত্তরটা হল। তোর ক’টা হয়েছে?

আমি সত্যি কথাটাই বললাম। কোনও আইডিয়া নেই। কিন্তু কিছু কিছু পরিস্থিতিতে সত্যি উত্তর ঠিক উত্তর নয়। বন্ধুর কোঁচকানো ভুরু দেখে বুঝলাম ওটাও সেরকমই একটা পরিস্থিতি। তাড়াতাড়ি শুধরে নিয়ে বললাম, তবে একশো আটাত্তরের অনেক কম। 

সেদিন বলতে পারিনি, কিন্তু আজ বলতে পারব। গোটা জীবনে না হলেও গত বছর আমি ক’টা বই পড়েছি। বাংলা, ইংরিজি, নভেল, ছোটগল্প, নভেলা সব মিলিয়ে আমি গতবছর পড়েছি বেশিকম ষাটটা বই। 

কথা হচ্ছে, আমার বন্ধুর গুনে বই পড়া নিয়ে যদি হাসি তাহলে নিজের গুনে বই পড়া নিয়েও হাসতে হয়। তাছাড়া সে গুনেছিল বাইশ বছর বয়সে যখন হাসির কাজ না করাই হাস্যকর, আর আমি গুনতে বসেছি ছত্রিশে। কাজেই আমার গোনাটা ছত্রিশগুণ বেশি হাসির। আপনারা যত পারেন হাসুন। কিন্তু আমি হাসছি না। কারণ না গুনলে আমি এত বই পড়তাম না। না পড়লেই বা কী হত? কিছুই না। তবু বই পড়া, বা বই পড়ার অভ্যেসটা ফেরানো আমার এ বছরের রেজলিউশন ছিল এবং সে রেজলিউশন রাখতে আমি সফল হয়েছি এবং এই সাফল্যলাভে গুনতি আমাকে প্রভূত সাহায্য করেছে। 

গুনে পড়ার একটা বিপজ্জনক দিক হচ্ছে যে ব্যাপারটা শেষপর্যন্ত সংখ্যায় পর্যবসিত হতে পারে। মানে কী পড়লাম সেটা আর বিবেচ্য নয়, ক'টা পড়লাম সেটাই মুখ্য। আমি সে বিষয়ে সচেতন থাকার চেষ্টা করেছি। তবে সবসময় সফল হয়েছি বলতে পারি না। বিশেষত কোনও কঠিন বইয়ে আটকে গেলে যত দ্রুততায় তাকে ফেলে রেখে অন্য বই হাতে তুলে নিয়েছি, গুনতির তাড়া না থাকলে সেটা করতাম না। 

কিন্তু রে ব্র্যাডবেরির একটা কথা আমি আজকাল খুব মানি। কোয়ানটিটি প্রোডিউসেস কোয়ালিটি। যে কোনও বক্তব্যের মতো এর বিপক্ষেও হাজার হাজার যুক্তি খাড়া করা যায়, আবার পক্ষেও যায়। আমি পক্ষের যুক্তিগুলোকেই আঁকড়ে থাকব ঠিক করেছি। আমি যদি গাদাগাদা অপছন্দের বই না পড়তাম, তাহলে পছন্দের বইও পড়া হত না।  


বুকটিউব 

এ বছর যা পড়েছি তার প্রায় সবই বুকটিউবের রেকমেন্ডেশন। বুকটিউব দেখে বই পড়ে আমার অনেক লাভ হয়েছে, নিজের কমফর্ট জোনের বাইরের বই (অ্যাঞ্জেলা কার্টার, অ্যালি স্মিথ, আইমিয়ার ম্যাকব্রাইড) পড়েছি। অনেক বইয়ের নাম জানতে পেরেছি যেগুলো জানতেই পারতাম না। আবার খারাপও হয়েছে। বুকটিউবের অনেকটাই হচ্ছে “ফলোয়িং দ্য ট্রেন্ড”। ট্রেন্ড যে সবসময় ভালো হবে না তা তো বটেই, ভালো হলেও সে ট্রেন্ড যে আমাকে সুট করবে তার কোনও গ্যারান্টি নেই। কিন্তু সুট করল কি করল না তা না চেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব। বুকটিউব আমাকে সে চাখাচাখির কাজে অসম্ভব সাহায্য করেছে। এবছরের অখাদ্যতম বইখানা আমাকে বুকটিউবই পড়িয়েছে, আবার ‘স্টোনার’ও পড়িয়েছে, যা শুধু এ বছরের নয়, আমার জীবনভরের অন্যতম প্রিয় বই হয়ে গেছে অলরেডি। কাজেই বুকটিউব থাকছে, দু’হাজার সতেরোতেও। 


আমার দু’হাজার সতেরোর বইসংক্রান্ত রেজলিউশন

- গুনতির খেলা থাকছে। তবে নম্বরটা থাকছে আমার মগজে। ততগুলো বই যদি সত্যি পড়তে পারি তবে আপনাদের বলব। না পারলেও বলব। অন গড ফাদার মাদার।

- বাংলা বই পড়ব। গত বছর বাংলা পড়া চোট খেয়েছে। এটা হওয়ার কোনও কারণ ছিল না কারণ আমি ইংরিজির থেকে বাংলা পড়তে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ এবং পড়িও ঢের বেশি তাড়াতাড়ি। (এটা একটা ইনসেনটিভ হতে পারে, গুনতির খেলায়)। তবু কেন বাংলা বই পড়া হয় না? তার একটা কারণ হচ্ছে বাংলা বই নিয়ে আলোচনার অভাব। বা আমার সে সব আলোচনার খোঁজ না রাখার। ইংরিজি বই যেমন লেখাও হয় বেশি, তেমনি তাদের নিয়ে কথাও হয় বেশি। লাখ লাখ ব্লগ, হাজার হাজার বুকটিউব চ্যানেল। বেচারি মাতৃভাষার কপালে সে সব নেই।

সুখের কথা, বছরের শেষে বাড়ি যাওয়ার কল্যাণে আপাতত একগাদা নতুন বাংলা বই বাড়িতে। তাছাড়া দিল্লি বইমেলা থেকে একখানা বই কিনেছি কাল, সেটাও বাংলা। কাজেই বছরের শুরু দেখে মনে হচ্ছে এই রেজলিউশনটা থাকবে। 

বাই দ্য ওয়ে, আপনার সন্ধানে বাংলা বইসংক্রান্ত আলোচনা, রিভিউ ইত্যাদির খোঁজ থাকলে আমাকে জানাবেন দয়া করে।

- ননফিকশন পড়ব। আমি যে ননফিকশন পড়ি না, সেটা স্বীকার করতে আমার লজ্জা করে। কারণ আমার আলোকপ্রাপ্ত বন্ধুরা সকলেই ননফিকশন পড়েন। কিন্তু ক'দিন আগে এমন একটা ঘটনা ঘটল যা আমার লজ্জা অনেকাংশে কমাতে সাহায্য করল। গত বছর আইডেন্টিটি ফাঁস হয়ে যাওয়ার হট্টগোলে এলেনা ফেরেন্তের নাম অনেকেরই কানে গেছে, এমনকি আমার ননফিকশন পড়া বন্ধুদেরও। তাঁদের একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আমি ফেরেন্তের নিওপলিট্যান সিরিজ পড়েছি কিনা। আমি বললাম পড়েছি তো বটেই, ভীষণ ভালোওবেসেছি। আপনিও পড়ুন, প্লিজ। তাতে তিনি ভয়ানক অপ্রস্তুত মুখ করে (ননফিকশনের কথা উঠলে আমার মুখটা ঠিক যেমন হয়) বললেন, হ্যাঁ পড়ব, কিন্তু না পড়ে পড়ে এমন অবস্থা হয়েছে যে মন বসাতে পারি না। তখন আমি বুঝলাম যে অসুবিধেটা আসলে বুদ্ধির নয়, অসুবিধেটা আসলে অভ্যেসের। আর চেষ্টা করলে সব অভ্যেসই হয়। এ বছর আমি ননফিকশন পড়ার অভ্যেস করব। প্রতি মাসে অন্তত একটা।

-মোটা বই পড়ব। বুককেসে কয়েকটা মোটা বই জড়ো হয়েছে, ভয়ে তাদের দিকে এগোতে পারছি না। চেস্টারটন (এটা অবশ্য খানিকটা পড়া আছে), হিলারি ম্যান্টেলের দু’খানা উপন্যাস, হাউস অফ লিভস ইত্যাদি। গুনতির খেলাতেও জিতব, মোটা বইও পড়ব। কী করে আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না। আমি জানি না। 


দু’হাজার ষোলোর আমার পড়া সেরা বই

পাঁচটা বলারই ইচ্ছে ছিল, কিন্তু অনেক ভেবে দেখলাম চারটে বই বাকিদের থেকে এতটাই এগিয়ে যে পাঁচটা জোগাড় করতে গেলে গাজোয়ারি খাটাতে হবে। তাই চারটেই বলছি। তবে তার আগে কয়েকটি বইয়ের কথা না বললেই নয়। ওই চারটি বই না থাকলে এঁরা প্রথম পাঁচ হতেন। কাজেই অনারেবল মেনশন হিসেবে এঁদের কথা রইল। এই সব বইদের নিয়ে বিস্তৃত কথা সেই সেই মাসের পোস্টে বলা আছে, আমি লিংক দিয়ে দিলাম। 

ক্যালেব কার-এর দ্য এলিয়েনিস্ট। আঠেরোশো ছিয়ানব্বইয়ের নিউ ইয়র্ক সিটি। থিওডোর রুজভেল্ট শহরের পুলিশপ্রশাসন ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছেন, পুলিশফোর্সে মেয়েদের জায়গা হচ্ছে, পুলিশ হিসেবে নয়, অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অংশ হিসেবে, তবু তাতেই সবার গা জ্বলছে। আর ডাক্তার ক্রাইৎসলার সমাজের অন্ধকার গলি থেকে অপরাধপ্রবণ ছেলেদের জোগাড় করে নিজের সংগঠনে আশ্রয় দিচ্ছেন। এবং ভারি আশ্চর্যের কথা শোনাচ্ছেন যে এরা নাকি জন্মঅপরাধী নয়, পারিপার্শ্বিক নাকি এদের অপরাধের পথে ঠেলে দিয়েছে। এরই মধ্যে একের পর এক ইমিগ্র্যান্ট এবং যৌনকর্মী বালক খুন হতে শুরু করল। সে সব হত্যার নৃশংসতা দেখলে পোড়খাওয়া পুলিশও বমি করে ফেলে। ক্রাইৎসলারের ওপর দায়িত্ব পড়ল খুনিকে ধরার।

গল্পটা তো ভালোই, কিন্তু তার থেকেও ভালো সেইসময়ের নিউ ইয়র্ক সিটির বর্ণনা। 

এমা ডনহিউ-র রুম। এক বন্দী মা আর পাঁচ বছরের ছেলের গল্প। পাঁচ বছরের সেই ছেলের মুখে বলা। প্লট, ভাষা, চরিত্রচিত্রণ, সবই অসামান্য।

অ্যালান লাইটম্যান-এর আইনস্টাইন’স ড্রিম। আমরা ভাবি সময় সোজা লাইনে চলে। কিন্তু তা তো নাও হতে পারে? সময় এঁকেবেঁকে চলতে পারে, সমান্তরাল চলতে পারে, বৃত্তের চালে চলতে পারে, আবার এমনও হতে পারে যে সময় আদৌ চলেই না, থেমে থাকে। এ সমস্ত সম্ভাবনার কথা ভাবছেন আমাদের আইনস্টাইন বসে বসে। আর তাঁর ভাবনার সময়ের এই সব চলন নিয়ে ছোট ছোট গল্পের মতো লিখেছেন লেখক। আমি এরকম বই আগে পড়িনি।

দ্য ব্লাডি চেম্বার্স-এর মতো বই অবশ্য পড়েছি। কারণ এটা হচ্ছে রিটেলিং-এর যুগ। কিন্তু এ যুগের অনেক আগে চেনা রূপকথার গল্পগুলোকে নতুন করে বলেছিলেন অ্যাঞ্জেলা কার্টার। নিরীক্ষামূলক ভাষায় আর নারীবাদের দৃষ্টিতে। অনেক আগেই পড়া উচিত ছিল। তবু বেটার লেট দ্যান নেভার। 

মাজদা সাবো-র দ্য ডোর। এক গৃহপরিচারিকা আর তার মালকিনের সম্পর্কের গল্প। এই গল্পটা পড়েই আমি প্রথম রিয়েলাইজ করতে শুরু করি যে ভালো অনেকরকম হয়। কোনও সংলাপ ছাড়া, কোনও প্লট ছাড়া, কোনও টুইস্ট, মোচড়, বাঁক, সাসপেন্স, চরিত্রের বৈচিত্র্য ছাড়াও যে এমন ভালো গল্প বলা যায়, দ্য ডোর পড়ার আগে আমি জানতাম না।  

এবার দু'হাজার ষোলোর সেরা চার।

উৎস গুগল ইমেজেস

ক্যাজুয়াল ভেকেন্সিঃ হ্যারি পটারের প্রতি পক্ষপাত না থাকলে আমি বলতাম জে কে রোলিং-এর লেখা সেরা বই ক্যাজুয়াল ভেকেন্সি।  স্থানীয় ভোটকে কেন্দ্র করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের, বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন লিঙ্গ, ধর্ম এবং সামাজিক অবস্থানের দ্বন্দ্ব এত ভালো ফুটিয়েছেন রোলিং, আরও বেশি লোকের এ বই পছন্দ নয় কেন সেটা একটা রহস্য। 

অলিভ কিটরিজঃ এলিজাবেথ স্ট্রাউট-এর লেখা অলিভ কিটরিজ টুকরো টুকরো ঘটনা দিয়ে গড়া একটি উপন্যাস। আলাদা করে পড়লে ছোটগল্প, এক সুতোয় গাঁথলে উপন্যাস। এ রকম গঠনের উপন্যাস আমি আগে পড়িনি। তাছাড়া স্ট্রাউটের শান্ত ভাষাও মন টেনেছে। 

আ গার্ল ইজ আ হাফ ফর্মড থিং: স্ট্রাউটের ভাষা যদি শান্ত হয়, তবে ম্যাকব্রাইডের ভাষা ঝোড়ো। একটি উদ্দাম মেয়ের স্ট্রিম অফ কনশাসনেস বয়ানে তার জীবনের গল্প। অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য। এ'রকম বইও আমি আগে পড়িনি। পরেও খুব বেশি পড়ব বলে মনে হয় না।

স্টোনারঃ উইলিয়াম স্টোনারের অকিঞ্চিৎকর জীবন নিয়ে জন উইলিয়ামসের লেখা স্টোনার, এ বছর আমার পড়া সেরা বই। শুধু এ বছরের নয়, আমার জীবনে পড়া অন্যতম সেরা বইগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে স্টোনার। এ বইটি সম্পর্কে যা বলার জুলাই মাসের পোস্টেই বলেছি। শুধু নিউ ইয়র্ক টাইমস স্টোনার সম্পর্কে যা বলেছে সেটাই আবার বলি, কারণ সেটা আমারও মত। আ পারফেক্ট নভেল। 



January 07, 2017

সাপ্তাহিকী




সুন্দরবনে চোখপরীক্ষা চলছে। ছবি তুলেছেন Brent Stirton. কৃতজ্ঞতাস্বীকার National Geographic. 

কেউ কেউ বয়স হলে ঝিমিয়ে পড়েন, কেউ কেউ থাকেন তাজা। এই দ্বিতীয় দলের বিজ্ঞানীরা নাম রেখেছেন সুপারএজার। সুপারএজার হতে গেলে কী করতে হবে? "make a New Year’s resolution to take up a challenging activity. Learn a foreign language. Take an online college course. Master a musical instrument. Work that brain. Make it a year to remember." (নিউ ইয়র্ক টাইমস) Brent Stirton

কথায় কথায় সবাই বলে তারা নাকি ‘এক্সিসটেনশিয়াল ক্রাইসিস’ এ ভুগছে। ক্রাইসিসটা আসলে কীসের?

সায়েন্টিস্টদের একসময় বলা হত ‘ম্যান অফ সায়েন্স’। কারণ আন্দাজ করা খুবই সোজা। কিন্তু একসময় ওই শব্দবন্ধে আর কুলিয়ে ওঠা গেল না, নতুন শব্দের আমদানি করতে হল। সে আমদানির গল্প পড়তে হলে ক্লিক করুন। 


রিসাইক্লিং-এর চোটে সুইডেনের আবর্জনা শেষ। আমাদের এখান থেকে কিছু রপ্তানি করা যায় না? ওরা টাকা দিতে রাজি। 

কম পয়সা, কম জাঁকজমকেও যে ভালো কাজ হতে পারে সে কথাটা নতুন বছরের শুরুতে আরেকবার মনে করে নেওয়া ভালো। 

যদি আমি মদ খেতাম তবে নাকি আমার প্রিয় মদ হত টেকিলা। কারণ আমি নাকি "wild and fun and this drink only adds to your crazy personality." আপনার চরিত্রের সঙ্গে কোন মদ যায় জানতে হলে খেলতেই হবে। 

ইউনাইটেড স্টেটস অফ অ্যামেরিকা স্প্যাম ইমেল পাঠানোয় সেরা, মেয়েদের পার্লামেন্টে পাঠানোয় রোয়ান্ডা সেরা, কিউবার শ্রেষ্ঠত্ব ডাক্তার তৈরিতে, আমরা সেরা কলা উৎপাদনে আর পাকিস্তান সেরা পর্ন বানানোয়। আমি বলিনি, এরা বলেছে।

কাল সামনে বসে এঁর গান শুনে এলাম। আপনারাও শুনুন। 


January 06, 2017

লেপকম্বল



ফেরার সময় মা কেক দিলেন, পুরীর খাজা দিলেন, গাছ থেকে একটা পাকা পেঁপে নেমেছে সেটা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, তারপর চোরচোর মুখে একখানা সুটকেস নিয়ে এলেন। 

এটা অন্তত নিয়ে যা সোনা। 

মায়ের পক্ষেও হঠাৎ অকারণে একখানা সুটকেস গছাতে চাওয়া অস্বাভাবিক। আমি প্রথমে চোখ কপালে তুললাম। তারপর সন্দেহ হতে সুটকেস হাতে তুলে দেখলাম ভেতরে মালপত্র আছে। খুলতেই একখানা চমৎকার সাদাবেগুনি ছোট ছোট ফুলছাপ ওয়াড় পরানো নতুন লেপ বেরিয়ে পড়ল। 

আন্দাজ করা উচিত ছিল। কারণ আমি জানি বাড়িতে ক’দিন আগে একটা লেপ বানানো হয়েছে। মায়ের জন্য। কাজেই আমারও যে একটা লেপ জুটবে সেটা বলা বাহুল্য। ধরা যাক আমি মাংসভাত খাচ্ছি, আর মা খাচ্ছেন দুধভাত। আমি মহানন্দে খাচ্ছি, মাকে সাধছিটাধছি না। খানিকক্ষণ বাদে মা বলবেন, সোনা, দুধভাত খাবি নাকি একটু? খুব ভালো খেতে লাগছে। ভালো কিছু জিনিস মা একা একা ভোগ করবেন, আমাকে বাদ দিয়ে, এ যেন শাস্ত্রে বারণ। পয়লা আষাঢ় খবরের কাগজে মেঘের ছবি ছাপা হলে মা কেটে রাখেন। একসময় পোস্টঅফিসে গিয়ে পোস্ট করতেন, বকা খেয়ে থেমেছেন। এখন বাড়িতে ফাইল করে রাখেন, আমি গিয়ে দেখব বলে। এমন ভালো জিনিস উনি দেখলেন আর আমি মিস করে গেলাম, চলবে না। সেই মা নতুন লেপ দিয়ে শোবেন আর আমি সেই পুরোনো লেপে, এটা আশা করাই আমার অন্যায় হয়েছিল। 

কড়া করে, ‘পাগল নাকি?’ বলে লেপশুদ্ধু সুটকেস ফেলে রেখে চলে এসেছি। আমার বাড়িতে আর এক্সটা লেপ রাখার জায়গা নেই, আনলে গায়ে মুড়ি দিয়ে বসে থাকতে হবে। 

অবশ্য কাউকে যে লেপমুড়ি দিয়ে থাকতে দেখিনি এমন নয়। আমাদের পাড়ায় এক কাকু ছিলেন, তিনি সারা বছর গামছা পরে ঘুরতেন। বাড়িতে, বারান্দায়, ছাদে, পাড়ার মোড়ে। এমনকি কাকিমা জল বসিয়ে যদি দেখতেন চা ফুরিয়ে গেছে কিংবা চিনি নেই তখন কাকু “কুছ পরোয়া” নেই বলে গামছা পরেই বাইক চেপে দোকান চলে যেতেন। 

সেই কাকুরই পুজো ফুরোলে অন্য চেহারা। স্বাভাবিক চাদরে কাকুর শীত ঘুচত না। তাই বিছানার চাদর জড়িয়ে ঘুরতেন। ডিসেম্বর এলে চাদর বদলে হয়ে যেত লেপ। সকালবেলা ছাদে ঘুরে ঘুরে মোগল সাম্রাজ্যের পতন মুখস্থ করছি এমন সময়, ‘কী সোনা, প্রিপারেশন ভালো হচ্ছে তো? পড় পড় মন দিয়ে পড়।’ আমি এদিকওদিক তাকাচ্ছি, কেউ কোথাও নেই। খালি কাকুর বারান্দা থেকে একটা লাল রঙের লেপ কথা বলছে। তারপর বুঝলাম লেপের ভেতর কাকু আছেন। লেপমুড়ি দিয়ে কাকু স্পোর্টসে পাড়ার মাঠে যেতেন, পাড়ার মোড়ে পি এন পি সি করতে যেতেন। তবে লেপমুড়ি দিয়ে তাঁকে বাইক চালাতে দেখিনি কোনওদিনও। 

রিষড়া স্টেশনে একজন ছিলেন যিনি বারোমাস লেপ মুড়ি দিয়ে বসে থাকতেন, তাঁকে আমরা ঘাঁটাতাম না। 

 মোদ্দা কথা আমাদের দিল্লির বাড়িতে লেপের অভাব নেই। দুজনের ব্যাচেলর অবস্থার সিংগল লেপ, বিবাহিত অবস্থার ডবল লেপ, নাকতলার মায়ের দেওয়া হালকা জয়পুরি লেপ। গোটা দুয়েক ভুশকো কম্বলও আছে যেগুলো কোথা থেকে এসেছে কেউ জানে না। আমি তো কিনিনি। অর্চিষ্মানের দিকে তাকালে ও-ও পত্রপাঠ ঘাড় নাড়ে। আমিও না। 

কম্বল কেমন লাগে আপনার? আমার বিতিকিচ্ছিরি লাগে। কুটকুটে। ওয়াড় না পরালে গায়ে ঠেকানো যায় না। তাছাড়া জিনিসটাকে দেখলেই মনে হয় নোংরা। নাকের কাছে আনলে নির্ঘাত গন্ধ বেরোবে। তবে সবই ছোটবেলার কন্ডিশনিং। ছোটবেলায় বাড়িতে সর্বদা লেপই দেখেছি তাই লেপ ভালো লাগে। কম্বল দেখিনি তাই কম্বল খারাপ। কম্বল ব্যবহার হত একমাত্র হোটেলে আর রাজধানীতে। রাজধানীর কম্বল গায়ে দেওয়ার আগে নানারকম কায়দা করতাম। দুটো চাদরের একটা বাংকে পাততাম, অন্য চাদরটা গায়ের ওপর পেতে তার ওপর দিয়ে কম্বল। গলার কাছে নিচের চাদরটা সামান্য ওপরদিকে টেনে এনে কম্বলের ধার বেশ করে মুড়ে নিতাম, যাতে গলা কুটকুট না করে। 

দিল্লির শীতে চলবে না, তবে পছন্দের দিক থেকে লেপকম্বল দুইয়ের থেকেই আমার বেশি পছন্দ কাঁথা। এ ভালোলাগার মূলেও শৈশবের স্মৃতি। আমাদের বাড়িতে কাঁথার অভাব ছিল না, কারণ কাঁথাশিল্পী বাড়িতেই থাকতেন। ঠাকুমার মতো কাঁথা বানাতে আমি কম লোককেই দেখেছি। ঠাকুমার কাঁথা, কেজো কাঁথা। ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেওয়ালে টাঙানো যাবে না, কিন্তু গায়ে দিলে শীত যাবে। পুরোনো সাদা শাড়ির জমি দিয়ে হত কাঁথার গা, আর পাড় দিয়ে হত কাঁথার পাড়। কাঁথার ভেতরে থাকত কোটি কোটি ফেলে দেওয়া ছোট বড় সমান অসমান কাপড়ের টুকরো। কাঁথা সেলাইয়ের সুতোও ঠাকুমা নিজের পুরোনো ছেঁড়া শাড়ি থেকে বার করতেন। সামনের বারান্দায় বসে মন দিয়ে শাড়ির একটা একটা সুতো টেনে টেনে বার করতেন, আঙুলে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সেলাইবাক্সে পুরে রাখতেন যাতে জট না পাকিয়ে যায়। এদিকে মশারা ছেঁকে ধরে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জোগাড়। ঠাকুমার হুঁশ নেই। হঠাৎ হুঁশ ফিরলে প্রচণ্ড রেগে একধাক্কায় গোটা পঁচিশ মশা মেরে ফেলতেন। তারপর মৃতদেহগুলো একজায়গায় জড়ো করে রাখতেন। কেউ পাশ দিয়ে গেলে যাতে দেখাতে পারেন। ঠাকুমার পরিশ্রমের ট্রফি। 

লেপকম্বলকাঁথা দিয়ে মানুষের চরিত্র বিচার করা যায় বলে আমার ধারণা। আপনি শীতকালে কারও বাড়ি গেলেন, সে আপনাকে বক্সখাটের ভেতর থেকে লেপ বার করে দিল। হয়তো সেই আগের বছর ভাঁজ করে রাখা হয়েছিল। ভাঁজ খোলা মাত্র ন্যাপথলিনের গন্ধ আর বছরখানেকের জমাটবাঁধা ঠাণ্ডা। ঠাণ্ডা যাবে কী, ঢোকার পর অন্তত দশ মিনিট আপনি হি হি করে কাঁপবেন। আবার কেউ কেউ আপনার যাওয়ার খবর পেয়ে লেপ বার করে বারান্দা কিংবা ছাদে মেলে রাখবেন। ন্যাপথলিনের গন্ধ হাওয়ায় উড়ে যাবে, তুলোরা গিঁট খুলে হাত পা ছড়াবে, সূর্যরশ্মি তাদের ফাঁকেফাঁকে ঢুকে ঘাপটি মেরে বসবে। রাতে যখন আপনি সে লেপের ভেতর ঢুকবেন, আপনার গায়ে মিষ্টি মিষ্টি সেঁক দেবে। সুখস্বপ্ন গ্যারান্টিড। 

লেপকম্বল ব্যবহারের রকম দেখেও মানুষ চেনা যায়। মুখচোরা লোক সর্বাঙ্গ লেপাবৃত করে শোয়, আত্মবিশ্বাসী দামালরা মাঝরাত যেতে না যেতেই হাত পা ছুঁড়ে লেপের বাইরে বার করে ফেলে। আর আমার মতো মুখচোরা প্লাস মৃত্যুভয়ে জর্জরিত যারা তারা সারা গা লেপে ঢেকে নাকটুকু বাইরে রাখে। পাছে দমবন্ধ হয়ে মারা যায়।

বাংলা সাহিত্যে লেপকম্বলকাঁথার এক অসামান্য অবদান আছে বলে আমি মনে করি। একটা গল্প পড়েছিলাম বহুদিন আগে। লেখকের নামটাম ভুলে গেছি। কিন্তু গল্পটা ভুলতে পারিনি। 

এক চোর চুরি করতে ঢুকেছে এক বাড়িতে। গরিব বাড়ি, মাটির দেওয়াল, কিন্তু আমাদের চোরও নির্লোভ। তাছাড়া শীত প্রচণ্ড। আর ঘুরতে ইচ্ছে করছে না চোরের। অল্পস্বল্প হলেই তার চলে যাবে। মাটির দেওয়াল সিঁধ দিয়ে কেটে চোর ঘরের মধ্যে ঢুকল। অন্ধকার ঘর, কোণায় একটা কুপি জ্বালা। চোর প্রথমে কিছুই দেখতে পেল না। খানিকক্ষণ পর কুপির আলোয় চোখ ধাতস্থ হলে চোর দেখল ঘরের এককোণে একটা তক্তপোষের ওপর লেপের ঢিপি। ঢিপির তলায় নিশ্চয় কেউ শুয়ে ঘুমোচ্ছে। চোর হাতড়ে হাতড়ে দেখতে শুরু করল নেওয়ার মতো কিছু আছে কী না। হাতড়াতে গিয়েই সে বুঝল বাইরে থেকে বাড়ির মালিককে যত গরিব মনে হয়েছিল তিনি আসলে তার থেকে অনেক বেশি গরিব। কিছুই প্রায় নেই। কিছু হাঁড়িকড়া মাটির দেওয়ালের পাশে সাজানো ছিল, নাড়তে গিয়ে  খালি হাঁড়ি বেজে উঠল। আর অমনি নড়ে উঠল লেপ। লেপের ভেতর থেকে খুনখুনে বুড়ি গলা কেঁপে কেঁপে বলল, শিবু এলি নাকি?

চোর চুপ করে রইল। বুড়ি বলল, খাবার ঢাকা আছে কুপির কাছে। চোর গুটি গুটি কুপির কাছে গিয়ে থালার ঢাকা তুলে দেখল পোলাও মাংস, মণ্ডা মিঠাই। ঠাণ্ডায় চোরের মগজের ঘিলু জমে গিয়েছিল, কাজেই এরকম হাঘরে বাড়িতে এসব সুখাদ্য আসে কী করে এসব কঠিন প্রশ্ন তার মাথায় এল না, সে হামহাম করে সব খেয়ে ফেলল। বুড়ি শিবুকে খুবই ভালোবাসে বলতে হবে, থালার পাশে আবার জলও ঢাকা দেওয়া ছিল। জল খেয়ে চোর গুটি গুটি বেরোতে যাবে এমন সময় লেপ আবার নড়ে উঠল। খুনখুনে স্বরে বুড়ি বলল, আমার মাথাটা একটু টিপে দে না রে শিবু, বড্ড ধরেছে। 

আমাদের চোর, চোর হলে কী হবে, কৃতজ্ঞতাবোধ তার খুব ছিল। সে গেল বুড়ির মাথা টিপে দিতে। তক্তপোষের একপ্রান্তের লেপের তলা দিয়ে হাত ঢোকাতে হাতে ঠেকল হাড় বার করা, গুলি উঁচোনো দু’খানা গোড়ালিফাটা পায়ের পাতা। খুনখুনে গলা বলে উঠল, ওরে ওদিকে না, এদিকে। চোর তক্তপোষের ওদিকে গিয়ে লেপের ভেতর হাত ঢোকালো আর তার হাতে ঠেকল হাড় বার করা, গুলি উঁচোনো দু’খানা গোড়ালিফাটা পায়ের পাতা।

অনেকেই বলবে গল্পটা চোরের। কেউ কেউ ভূতেরও বলতে পারে। কিন্তু আমার ধারণা গল্পটা আসলে লেপের। তাই লেপসংক্রান্ত পোস্টে লিখে দিলাম।


January 04, 2017

নীললোহিত




উৎস গুগল ইমেজেস

"এরকম চেনা লোক পথেঘাটে অসংখ্য থাকে। পরিচয়র গাঢ়তা অনুযায়ী সম্ভাষণ হয়। যেমন প্রাথমিক স্তরে ভ্রূ-নৃত্য। এই স্তরের লোকদের সাধারণত দূর থেকে দেখতে পেলে অন্যমনস্ক হবার ভঙ্গি করতে হয়, অত্যন্ত উদাসীনের মতো পথের পোস্টার পড়তে-পড়তে দুজনে দুজনকে অতিক্রম করে যাই। দৈবাৎ চোখাচোখি হয়ে গেলে ভুরুদুটো একবার নাচানো। এরপরের স্তরের সঙ্গে দেখা হলে ভ্রূদ্বয়ের ছুটি। সেখানে চোখ ও মুখে মোনালিসা ধরনের সুপ্ত হাসি এঁকে একবার তাকানো, বড়োজোর অস্ফুটভাবে বলা, ভালো! - এর উত্তর শোনার জন্য থামতে হয়না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর আসেনা। 

তৃতীয় স্তরের সম্ভাষণই সবচেয়ে বিপদজনক। সেখানে এক মিনিট দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে হয়, কী খবর? - এই চলে যাচ্ছে আর কী! সত্যি যা গরম পড়েছে! ও তাই নাকি! আচ্ছা, চলি! - এসব লোকের সঙ্গে দেখা হলে প্রায়ই মনে পড়েনা, লোকটির সঙ্গে আগে ‘তুমি’ কিংবা ‘আপনি’ কোনটা বলতাম। তখন ভাববাচ্যের আশ্রয় নিতে হয়। - কী করা হয় আজকাল? কোথায় যাওয়া হচ্ছে? কলকাতার বাইরে থাকা হয় বুঝি? কথা বলার সময়েই মনে-মনে হিসেব করতে হয়, যথেষ্ট ভদ্রতাসূচক সময় ব্যয় করা হয়েছে কিনা এর সঙ্গে। 

এরপর যাঁরা, তাঁদের সঙ্গে কোন-না-কোন সূত্রে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা থাকার কথা, অথচ মনে-মনে নেই, মুখেও বিশেষ কিছু বলার নেই। আত্মীয় বা বন্ধুর বন্ধু বা প্রেমিকার অন্য প্রেমিক। এঁদের সঙ্গে দেখা হলে যথেষ্ট উল্লাসের ভঙ্গিতে বলতে হয়, আরে কী খবর! দেখাই নেই যে! চেহারাটা খারাপ হয়ে গেছে দেখছি! - তারপর, অমুক কেমন আছে? ওখানে আর গিয়েছিলেন? - এইসব কথা বলার সময় এমন ভাব করতে হয় যেন ওঁকে দেখে আমি সমস্ত বিশ্বসংসার বিস্মৃত হয়েছি। তারপর সূক্ষ্মকোণী চোখে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে অকস্মাৎ সমস্ত শরীর ঝাঁকিয়ে বলে উঠি, আরেঃ তিনটে বেজে গেছে! ইস্‌, একটা বিশেষ কাজ আছে, ভুলেই গিয়েছিলাম। চলি। আবার দেখা হবে। অ্যাঁ? - এরপর অত্যন্ত দ্রুতভাবে কিছু দূর গিয়ে চলন্ত ট্রামে উঠে পড়তে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।"

                                                                               —নীললোহিত-সমগ্র প্রথম খণ্ড থেকে

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.