টাফিদের আড্ডায়
সে মেধা নেই, সে নোবেল নেই, সে সি পি এম নেই, এমনকি সে আড্ডাও নেই। নেই নেই আর্তনাদ ছাড়া আর কিছু নেই বাঙালির। আড্ডার না থাকাটা সবথেকে বড় আফসোস। নোবেল, জ্ঞানপীঠ, ম্যাগসেসে, পলিটব্যুরোর সদস্যপদ, বসের পিঠচাপড়ানি, ফর্সা + রবীন্দ্রসংগীত জানা বউ, অ্যামেরিকার স্কলারশিপ, বাঙালি যতটুকু যা পেয়েছে, সব নাকি আড্ডা মেরেই পেয়েছে। অমর্ত্য সেন শান্তিনিকেতনের মাঠে আড্ডা দিতেন, তবে না অক্সফোর্ড কেম্ব্রিজ হার্ভার্ড, শান্তিদেব ঘোষ আর সুচিত্রা মিত্র কালোদার দোকানে বসে আড্ডা দিতেন, তবে না গলায় অমন দাপট। ছ’নম্বর প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটের আড্ডার দৌলতেই না যত আনন্দ, রবীন্দ্র, সাহিত্য অ্যাকাডেমি, জ্ঞানপীঠ।
তবে একেবারে কি নেই? আছে এদিকসেদিক ঘাপটি মেরে। আমাদের বাড়ির সামনেই একটা আছে। বিশুদ্ধ বাঙালি আড্ডা। ওই যে মোড়ের মাথায় বাড়ির (যার নেমপ্লেটে সারিসারি নাম আর প্রতিটি নামের পাশে নামের থেকেও বেশি জায়গা জুড়ে ‘আই আই টি’ লেখা), তার সামনের কংক্রিটের ঢালু হওয়া অংশটুকুতে আর রাস্তার ওপারে জমে ওঠা বালির পাহাড়ে ভাগ ভাগ হয়ে আড্ডা বসে। কখনও কখনও আড্ডা তর্কের আকার নেয়, তার চিৎকার পাঁচশো মিটার দূরের আমার এই ভাড়াবাড়ির দোতলাতেও পৌঁছোয়। মাঝে মাঝে খুব কৌতূহল হয় গিয়ে দেখি। কিন্তু সে আড্ডায় আমার প্রবেশাধিকার নেই।
টাফির আছে। টাফি আমাকে মোটামুটি নেকনজরে দেখে, ওর থেকে মাঝে মাঝে আড্ডার খবরাখবর পাই। রাজনীতির খবর বেশি দেয়টেয় না, বলে, “তুমি ওসব বুঝবে না।” সামাজিক ইস্যু হলে মুড ভালো থাকলে, গরম কম থাকলে, মাঝেসাঝে বলে।
গত সপ্তাহে দুদিন হঠাৎ মেঘলা হল (এ সপ্তাহে ছেচল্লিশ ছোঁবে, তারই আগাম সান্ত্বনা সম্ভবত), বৃষ্টির ছাঁট পাওয়ার আশায় জানালা খুলে রেখেছিলাম, চেঁচামেচি শুনতে পেলাম স্পষ্ট। খানিকক্ষণ পর জানালা দিয়ে লাফ মেরে ঢুকে, খাটে উঠে, সারা গা ভালো করে ঝাঁকিয়ে আমার বেডকভার ভিজিয়ে, আমার চায়ের কাপ থেকে চুকচুক করে খানিকটা চা খেয়ে মুখব্যাদান করে (ভদ্রলোকের মতো দুধচিনি দেওয়া চা খাও না কেন বল দেখি?) আরাম করে বসে টাফি বলল, “আড্ডা খুব জমেছিল আজ।” আমি বললাম, “শুনে তো তাই মনে হল। কী নিয়ে লেগেছিল?”
টাফি ততক্ষণে পকেট থেকে ফোন বার করেছে। দু’চারবার ওপরনিচে স্ক্রোল করে, দুচারজনের পোস্টে লাইক আর লাভসাইন মেরে, মুচকি হাসতে হাসতে নিজের স্টেটাস আপডেট দিল। যদিও ভদ্রতাবিরোধী, তবু উঁকি মেরে দেখলাম টাফি লিখেছে, #চিলিংউইডচা। টাফির প্রোফাইল পিকচারটা আমারই তোলা। আমারই বারান্দায়, আমারই কারিগাছের টবে হেলান দিয়ে, কালো সানগ্লাস পরে, জিভ বার করে, থাবা উঁচিয়ে রক সাইন দেখিয়ে টাফি দাঁড়িয়ে আছে।
অবশেষে ফোন নামিয়ে রেখে টাফি বলল, “হ্যাঁ, কী বলছিলে?”
“তর্কটা কী নিয়ে লেগেছিল?”
“বাংলা।”
আমি ভুরু কোঁচকালাম। নিজের ফোন তুলে একবার ক্যালেন্ডার চেক করতে যাচ্ছি, টাফি হাই তুলে বলল, “না না, এটা ফেব্রুয়ারি মাসও নয়, আজ একুশ তারিখও নয়।” বলে চিত হয়ে চার পা আকাশে তুলে শুলো।
আমি ইশারা বুঝে ওর নরম সাদা পেটটা চুলকোতে লাগলাম। টাফি লাল জিভটা অল্প বার করে, চোখ বুজল।
আমি বললাম, “তবে?”
টাফি বলল, “গ্লোবাল ওয়ার্মিং চলছে জান না? সিজন ব্যাপারটাই উঠে গেছে। বর্ষাকালে বৃষ্টি হচ্ছে না, ডিসেম্বরে শীত পড়ছে না, বাংলা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে ফেব্রুয়ারির কী দরকার।”
তা বটে।
আমার মুখ দেখে টাফির দয়া হল বোধহয়। দু’কথায় আমাকে ধরতাই দিয়ে দিল। এবার থেকে রাজ্যের সব স্কুলে বাংলা পড়া আবশ্যিক।
নাঃ, তর্ক লাগার মতোই বিষয় বটে। আমি বললাম, “শুনি শুনি, কারা সমর্থন করল, আর কারা বলল চলবে না?”
টাফি থাবা দিয়ে পেটের একটা অংশ নির্দেশ করে বলল, “এ কি তোমাদের শহরতলি ইশকুলের বিতর্কসভা পেয়েছ, যে দিদিমণি বলে দিলেন সভার মত হল এই, বাংলা বাধ্যতামূলক, এবার একদল তেলচিটে বিনুনি বাঁধা মেয়ে কোমরে আঁচল কষে সভার পক্ষে বলবে, আরেকদল তেলচিটে বিনুনি বাঁধা মেয়ে বিপক্ষে? এখন ওসব পক্ষে বিপক্ষে হয় না। এখন মতামতের স্পেকট্রাম। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে থেকে শুরু করে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তার মাঝে কত অ্যাংগেলে ঘোরে, কত স্পিড, ঘোরা ভালো না খারাপ, ডানদিকে ঘোরে না বাঁদিকে, ক্লকওয়াইজ ঘোরে না অ্যান্টিক্লকওয়াইজ ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ে বিবিধ লোকে মত প্রকাশ করে।”
তেলচিটে বিনুনির খোঁচাটা আমার ভালো লাগল না। আমি হাত সরিয়ে নিয়ে বললাম, “ওহ, তা তোমার শহুরে পরিশীলিত বন্ধুরা কে কী বলল শুনি?”
টাফিও বুঝেছিল, খোঁচাটা একটু বেশি ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। গা ঘেঁষে, আমার গালটা একবার চেটে দিয়ে গল্প শুরু করল।
“শুরুতে যে চিৎকারটা শুনেছ সেটা মোস্ট প্রব্যাবলি লাল্টুবিল্টুর দলের। তখনও বেশি লোক জমেনি। ওরাই লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে শার্ট উড়িয়ে উল্লাস করছিল। না না, বাংলার জন্য নয়। বাঙালির জন্যও নয়। রাজ্যে, মেনলি কলকাতায় থাকা মেড়ো আর খোট্টাগুলো যে কেস খাবে, এইটাই এই দলের উল্লাসের মূল কারণ।"
"তারপর গুটিগুটি আরও অনেকে এসে জড়ো হল। এরা লাল্টুবিল্টুর থেকে আরেকটু বুঝদার।”
আমি বললাম, “কী রকম?”
“এরা প্রমাণ ছাড়া তর্ক করে না। মুশকিল হল, বেশিরভাগেরই প্রমাণ স্বয়ং নিজে। নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতা দিয়ে জগতের উচিতঅনুচিত ভালোমন্দ প্রমাণ হবে। যেমন ধরো ওই মোড়ের বাড়ির কালোটা।”
আমি বললাম, “কালো কোথায়, কানের কাছে একটু সাদা ছোপ আছে তো।”
টাফি নাক দিয়ে ভুক করে একটা শব্দ করল (অনেকটা আমাদের ধুস-এর মতো শুনতে), “আমার মতো সর্বাঙ্গ ধপধপে সাদা তো নয়, ওদের আমি কালোই বলি।”
টাফির বর্ণবিদ্বেষ আমার পছন্দ নয়, কিন্তু এখন ওসব পয়েন্ট আউট করতে গেলে গল্প মাটি হয়, কাজেই কিছু বললাম না।
বললাম, “কী বলল, কালোটা?”
“খুব চোখটোখ ঘুরিয়ে বলল, ‘কই আমি তো আজীবন ইংরিজি মিডিয়ামের ডাস্টবিনের আশেপাশে ঘুরেছি, আমার চোদ্দ পুরুষের কেউ কখনও বাংলা মিডিয়ামের দারোয়ানের লাঠির বাড়ি খাওয়া তো দুরে থাক, ছায়া পর্যন্ত পাড়ায়নি। তা বলে কি আমরা বাংলা বলতে শিখিনি?’ এই বলে বালির পাহাড়ে উঠে বুক চিতিয়ে ‘এসেছে শরৎ হিমের পরশ’ গোটাটা আবৃত্তি করে শুনিয়ে দিল।
“এই ভর জ্যৈষ্ঠ মাসে?”
“বিউটিপার্লারের দোতলার টমিটাপেন্সও কালোটাকে সাপোর্ট করল।”
আমি বললাম, “এরা আবার কারা?”
টাফি বলল, “কেন তুমি যখন অফিসে যাও পাশাপাশি গলায় বকলস বেঁধে দুজন বেরোয় দেখোনি? সোনালি ঝুপো ঝুপো লোম…”
“ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝেছি। তা এঁরা কি গোয়েন্দাটোয়েন্দা নাকি?”
টাফি তেরিয়া হয়ে বলল, “তোমাকেও তাই বলেছে বুঝি? !@#৳ মিথ্যেবাদী কোথাকার!”
আমি কানে আঙুল দিয়ে বললাম, “না না, ওঁরা কিছু বলেননি, আমি এমনিই আন্দাজ করলাম।”
টাফি বলল, “আরে ওরা সবাইকে বলে বেড়ায় ওরা নাকি সিক্রেট সার্ভিসে ছিল, আপাতত রিটায়ার্ড। যত সব গুলতাপ্পি। জন্মে থেকে দেখছি সকালবিকেল একনম্বর পর্যন্ত জিভ বার করে হাঁপাতে হাঁপাতে যায়, আর হাঁপাতে হাঁপাতে ফেরে। বাকি সময় বারান্দায় বসে ঝিমোয়। সিক্রেট সার্ভিস না হাতি।”
আমি বললাম, “ওদের গোটা তিনেক ছানা আছে না? গলায় ওয়াটার বটল ঝুলিয়ে বাড়ির সামনে স্কুলবাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে? ভীষণ মজার।”
“মজার?” টাফি চোখ কপালে তুলল। “একেকটা একেক পিস। দু’নম্বরের শনিমন্দিরের মেঝেতে পুঁতলে একনম্বরের কালীমন্দিরের মেঝে ফুঁড়ে বেরোবে। আমাকে দেখলেই ‘টাফি, তোর গোদা পায়ে লাথি’ ছড়া কাটে আর মুখ ভেংচায়।”
আমি হাসি চেপে বললাম, “কী বলল টমিটাপেন্স?”
“টমি বলল, ‘আমরাও তো ছেলেপুলেকে ইংরিজি ইশকুলে দিয়েছি, না হয় এখন রাইমস ছাড়া আর কিছু দাঁতে কাটছে না, তা বলে কি আমার ছেলেমেয়ে বাংলা শিখবে না? এই যে আমি প্রতিবছর বইমেলা গিয়ে চুন চুন কে বাংলা সাহিত্যের মণিমুক্তো কুড়িয়ে আনছি, যত্ন করে জমাচ্ছি বুকশেলফে, সুকুমার রায় টু সতীনাথ ভাদুড়ী, রাইমসের চাপ একটু কমলে কি বাচ্চারা সেগুলো পড়বে না?’
টাপেন্স বলল, ‘আর তাছাড়া নাচের ইশকুলে তো এই বছরেও ঋতুরঙ্গ করেছে আর ড্রামা স্কুলে অবাক জলপান। আবার কত চাই? যত্ত সব।’”
আমি বললাম, “তা বটে।”
টাফির গল্পের মুড এসে গিয়েছিল। “এই সব হতে হতে মাছের বাজারের দিক থেকে বাদামি দুটো নেড়ি এসে হাজির। একটা বেশ নাদুসনুদুস, অন্যটার অর্ধেক লোম উঠে গেছে। ওটা বেশি কথা বলে না, চুপচাপ থাকে। নাদুসনুদুসটাকে দেখেছ বোধহয়, পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ, পনেরোই আগস্টে প্রভাতফেরি লিড করে। গলায় সুর নেই বিশেষ, দরদ দিয়ে মেকআপ দেয়।”
মাথা নাড়লাম। দেখেছি। বা শুনেছি বলা ভালো।
“নাদুসনুদুস খুব দৌড়ে এসে, জিভ বার করে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘বন্ধুগণ ব্রেকিং নিউজ, এখন থেকে বাংলা বাধ্যতামূলক।’
শুনে সবাই হাই তুলে, তুড়ি বাজিয়ে, পাশ ফিরে শুল। নাদুসনুদুস বলল, ‘ওহ, সেই নিয়েই কথা হচ্ছে বুঝি? দারুণ হয়েছে, এতদিনে একটা কাজের মতো কাজ হয়েছে, জয়ব্বাংলা।’
টাপেন্স মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘আমাদের ছেলেপুলেরা তো আর মাছের বাজারে চুরি করে লাইফ কাটাবে না। আমাদের ছেলেপুলে রেসপেক্টেবল অফিসে রেসপেক্টেবল চাকরি করবে। তাদের ইংরিজি শেখা মাস্ট।’
টাপেন্স যদিও কথাটা আকাশের দিকে নাক তুলে বলেছিল, সকলেই বুঝেছে কাকে উদ্দেশ্য করে বলা। নাদুসনুদুস তেরিয়া হয়ে বলল, ‘বাংলা পড়লে ইংরিজি শেখা যায় না কে বলল? আমার ঠাকুরদা বাংলা পড়ে রায়চৌধুরী খেতাব পেয়েছিলেন, আমার মাসতুতো দাদার পিসতুতো বোন বাংলা ইশকুলে পড়ে বিলেতে পি এইচ ডি করছে, আমিও তো ইতিহাস ভূগোল অংক ইংরিজি সব বাংলাতেই পড়েছি, তা বলে কি ইংরিজি বলতে পারি না? এ বি সি ডি ই এফ জি এইচ, ক্যাট ব্যাট ম্যাট ফাক শিট। কে বলে বাংলা পড়লে ইংরিজি শেখা যায় না?’
“স্যার জেমস এর মধ্যে কখন সফল-এর সামনে থেকে গুটি গুটি এসে আড্ডায় যোগ দিয়েছে কেউ খেয়ালই করেনি। স্যার জেমসকে চেনো তো?”
চিনি। সারাজীবন বিলেতে কাটিয়ে এ পাড়ায় নতুন এসেছেন। সাহেবি চেহারা, সাহেবি হাবভাব। সুট প্যান্ট বোলার হ্যাট পরে ঘোরেন। ইংরিজি ছাড়া কথা বলেন না, 'সিট'-এর বদলে ‘বোসো’ বললে দাঁড়িয়ে থাকেন।
“ঠিক ধরেছ। ওটাই। স্যার জেমস থাবা মুখের কাছে এনে গলা খাঁকারি দিল। টমিটাপেন্স উঠে দাঁড়িয়ে বাও করল, নাদুসনুদুস মুখ বেঁকিয়ে ঘাড়টা অন্যদিকে ঘোরালো, কিন্তু কানদুটো খাড়া করে রইল।
সব উশখুশ থামলে গলা খাঁকারি দিয়ে হ্যাটপরা মাথাটা যথাসম্ভব উঁচু করে উদাত্ত কণ্ঠে স্যার জেমস বলল, “ফ্রেন্ডস, রোমানস, কান্ট্রিমেন। আমি বয়সে বুড়ো কিন্তু হাবেভাবে নবীন। আমার সমসাময়িকরা যখন ধর্মগ্রন্থ বগলে বাণপ্রস্থে গেছে তখন আমি বালখিল্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্মার্টফোনে টাইপ করা শিখেছি। আমার এ বিষয়ে কিছু বলার আছে।’
“আমি অমনি কচুগাছের আড়াল থেকে বলেছি, ‘সে আপনার কোন বিষয়ে কিছু না বলার থাকে দাদু?’” টাফি ফ্যাচফ্যাচ করে হাসছে।
আমি বললাম, “তুমি কোনদিন মারধোর খাবে। স্যার জেমস রাগলেন না?”
টাফি বলল, “রাগবে না আবার। রেগেকেঁপে একশা। একেবারে ছাদের সমান লাফ দিয়ে উঠে বলছে, ‘কে কে কে? কে বলল এসব, সবক’টাকে কান ধরে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বার করে দেব।’”
“তারপর?”
“তারপর আবার কী। সবাই হাতেপায়ে ধরে ঠাণ্ডা করল। ছেড়ে দিন দাদা, ইগনোর করুন, হেটারদের পাত্তা দেবেন না, আমাদের কথা ভেবে বক্তৃতা চালিয়ে যান। দুয়েকজন বলল, ‘ফেক প্রোফাইল, রিপোর্ট করে এলুম।’ অমনি একযোগে রোল উঠল, ‘রিপোর্টেড, রিপোর্টেড।’”
“আবার গলা খাঁকরানি, আবার ফ্রেন্ডস অ্যান্ড রোমানস আর হ্যানাত্যানা শেষ করে স্যার জেমস আসল কথায় এল। এই কথাগুলোও নতুন কিছু নয়, সকলেই শুনেছে আগে। 'আপনারা সকলেই জানেন, যাঁরা জানেন না তাঁদের অবগতির জন্য জানাই, আমি আজীবন বিলেতে কাটিয়েছি। এখন এই আই আই টি মোড়ে আপনাদের নেতৃত্ব দিচ্ছি বলে ভাববেন না আমি আপনাদের লোক। আমি মনেপ্রাণে বিলিতি। এখনও আমার ফ্যামিলি বিলেতে থাকে, আমার নাতিরা তো ওখানেই জন্মেছে। ভাবুন একবার। বিলিতি নাতি। কই তারা তো বাংলা পড়ছে না। তা বলে কি তারা বছর বছর পুজো ফাংশানে “যদি কুমড়োপটাশ নাচে” আবৃত্তি করছে না? এনকোর পাচ্ছে না? তবে আমার নাতিরা, বিলেতে জন্মেছে বলেই বোধহয়, দারুণ শার্প। আপনাদের নাতি হলে কে জানে কী করত। ইন ফ্যাক্ট, তাদের এই পারফরম্যান্সের ভিডিও আমার বাড়িতে তুলে রাখা আছে, আমি প্রস্তাব করছি,’ নাদুসনুদুসের দিকে তাকিয়ে স্যার জেমস বলল, ‘সমিতির আগামী মিটিং-এ সেটা দেখানোর ব্যবস্থা হোক। বাংলা না পড়লে বাংলা সাহিত্যে দিকপাল হওয়া যায় না, এ সর্বৈব অপপ্রচার। আমার বিলিতি নাতিরা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।’
টমিটাপেন্সের বিচ্ছুগুলো ইশকুল থেকে ফিরে বাড়ি না গিয়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল, তাদের একটার গলা থেকে ওয়াটার বটল খুলে নিয়ে চুমুক দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিল স্যার জেমস।
‘আমি যেটা বলতে চাই, আপনাদের কারও ছেলেমেয়ে নাতিপুতি যখন আমার নাতিদের সমকক্ষ হতে পারবে না, কী পড়ানো হবে না হবে, বাংলা না ইংরিজি না হিব্রু, সেটা, পার্ডন মাই অনেস্টি,’ থাবা তুলে আবার গলা খাঁকরালো স্যার জেমস, ‘ইমমেটেরিয়াল, ইররেলেভ্যান্ট। ইশকুলে না পাঠালেও কিছু আসবে যাবে না। আর যদি পাঠাতেই হয়, তাহলে আমার মতে, আমার বিলিতি নাতিদের বিলিতি স্কুলের মহান ঐতিহ্য অনুসরণ করে বাংলা বাধ্যতামূলক করার বদলে, বাংলা ব্যান করা সরকারের পবিত্র কর্তব্য। আমি এসব বিবেচনা করে বাংলা ব্যান করার পিটিশন লিখেই এনেছি, আপনারা যদি ঝামেলা না করে পিটিশনে থাবাছাপ দিয়ে দেন, তাহলেই ল্যাঠা চুকে যায়।’ এই না বলে স্যার জেমস পকেট থেকে একটা পাকানো কাগজ বার করে গলা খাঁকারি দিয়ে পড়তে শুরু করল।
‘হার ম্যাজেস্টি দ্য কুইন…’
এমন সময় সবার চোখ ঘুরে গেল। নাদুসনুদুসের চ্যালা, মার্কেটের লোম ওঠা ঘেয়ো কাঁপতে কাঁপতে স্যার জেমস-এর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক থাবা তুলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে, ‘কোথায় ছাপ দিতে হবে স্যার? আমার মধ্যে পোটেনশিয়াল ছিল, বিশ্বাস করুন স্যার, কেরানি বাবামা কিপটেমো করে বাংলা স্কুলে পাঠিয়েছিল বলে আজ এই দশা।’ ঘেয়োকে দেখে স্যার জেমস রিফ্লেক্সে নাক চাপা দিয়েছিল, এখন আহ্লাদিত হয়ে ‘এখানে এখানে’ বলে পিটিশন নিয়ে এগিয়ে গেল।
সবাই কেমন থতমত খেয়ে গিয়েছিল, প্রথম সম্বিত ফিরল নাদুসনুদুসের। ‘আরে আরে কর কী কর কী’ বলে সে দৌড়ে এল, একটা গোলমাল বাধে দেখে খুশি হয়ে লাল্টুবিল্টুর দল হইহই করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওদিক থেকে টমিটাপেন্স, টমিটাপেন্সের খোকাখুকুর নাচের ক্লাসের, আবৃত্তি ক্লাসের টিচাররা, তাইকোন্ডু ক্লাসের টিচাররা ধেয়ে এল।
“কারা কোন দলের হয়ে লড়ছিল?” আমার কৌতূহল তুঙ্গে।
“কে জানে।” টাফি মুখ ছেতরালো। “অত হট্টগোলে বোঝা যায় নাকি। যদ্দূর মনে পড়ছে নাচগানআবৃত্তির টিচাররা বাংলার ফরে লড়ছিল, আর তাইকোন্ডুর টিচাররা সেভাবে কারও পক্ষ নিচ্ছিল না, যারাই মার খাচ্ছিল, তাদের হয়ে লড়ছিল। ঘেয়োর হয়ে দু’তিনজন খুব ঘুঁষি চালাচ্ছিল দেখলাম।”
শুনে আমার কীরকম রক্ত গরম হয়ে উঠল। বললাম, “তুমি কোথায় ছিলে?”
“আমি আবার কোথায় থাকব, আমি কচুঝোপে বসে চেঁচালাম খানিকক্ষণ, তারপর ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলাম, হেবি মশা। মারামারি তখন তুঙ্গে, চারদিক থেকে ‘ইংরিজি গোল্লায় যাক, বাংলা গোল্লায় যাক, মেড়ো গোল্লায় যাক, খোট্টা গোল্লায় যাক, বাঙালি গোল্লায় যাক’ স্লোগান উঠেছে, আমার কথা কারও মনেই নেই। আমি হাতপা চালালাম এদিকওদিক। যাকে সামনে পেলাম চড়চাপাটি দিলাম, কানটান মুললাম। ঝগড়ার ঝোঁক একটু কমে আসছে দেখলেই, একেকবার একেকজনের কানের কাছে গিয়ে বলছিলাম, ‘ধোর মশাই, আপনি কিসু zানেন না।’ তাতে কাজ দিচ্ছিল খুব।”
টাফি হাসির চোটে দুবার গড়াগড়ি খেল খাটের ওপর।
“তারপর সব মহা বোরিং লাগতে লাগল, বৃষ্টিও নেমে গেল, আমি ভাবলাম যাই, তোমার খবর নিয়ে আসি।”
বৃষ্টি থেমে গিয়ে একটা অসামান্য হলুদ আলো ফুটেছে জানালার বাইরে, সেদিকে তাকিয়ে দুজনে বসে রইলাম।
কিছুক্ষণ পর একটা প্রশ্ন মনে এল। “এ ব্যাপারে তোমার কী মত?”
টাফির ভুরু কোঁচকাল, “কোন ব্যাপারে?”
“বাংলা বাধ্যতামূলক করা উচিত নাকি উচিত না?”
অনেক পেট চুলকোনোর পর, কানে হাত বোলানোর পর, রাতে কলকাতা বিরিয়ানি হাউসের মাংসের টুকরো খাওয়াব কথা দেওয়ার পর, টাফি অবশেষে নিজের মতটা বলতে রাজি হল। কিন্তু একটা শর্তে।
"কী?"
"তোমার ওই ব্লগে লিখবে না, খবরদার।"
লিখব না। কথা দিলাম। টাফি সবে আমার কানে ফিসফিস করে নিজের মতটা বলেছে, অমনি মোড়ের মাথা থেকে আবার চিৎকার শুরু হল।
টাফির কান অমনি খাড়া। “ওই ওই, আরেকটা ডিসকোর্স শুরু হয়েছে।”
আমি বললাম, “কী নিয়ে?” টাফি বলল, “সে ঘটনাস্থলে না গিয়ে কী করে বুঝব। আমিষ-নিরামিষ হতে পারে, বাংলা-হিন্দি হতে পারে, আস্তিক-নাস্তিক হতে পারে, সাদাপোস্ত-হলুদপোস্ত হতে পারে, সিরাজ-আরসালান হতে পারে। যাই হোক না কেন, আমি ছাড়া জমবে না। তেমন কিছু হলে খবর দেব, বারান্দার দরজাটা খুলে রেখো।”
এক লাফে বারান্দা পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল টাফি।
আপনার ব্লগের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকি। আবদার এই যে রোজ একটি করে লিখুন।
ReplyDeleteধন্যবাদ, সূচনা। আমি খুবই সম্মানিত যে আপনারা আমার পোস্টের অপেক্ষা করেন, কিন্তু সত্যি বলছি, রোজ লেখা সম্ভব না। আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করব কথা দিচ্ছি, তবু সপ্তাহে দু-তিনবারের বেশি হবে বলে মনে হচ্ছে না। দুঃখিত।
Deleteআপনি আমায় "আপনি" বলবেন না. আমি অনেক ছোট আপনার থেকে, সবে ইউনিভার্সিটি পাস করেছি। আর আপনাকেও আপনি বলে ইচ্ছে করে না. জানি একটু হটাত এই উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো ব্যাপার কিন্তু আপনার ব্লগ গুলো পড়লে মনে হয় খুব কাছের চেনা কোনো দিদি গল্প করছে।
Deleteপুনশ্চ- এটাও জেনে খুব ভালো লাগলো যে আমি আপনার বাড়ির কাছাকাছি এ থাকি. আপনি রিষড়া আমি দক্ষিনেশ্বর।
না না, উড়ে এসে জুড়ে বসা একেবারেই নয়, সূচনা। আমার তো মন ভালো হয়ে যায় তোমাদের কমেন্ট পড়লে। আর সময় এবং উদ্যোগ নিয়ে কমেন্ট করা সোজা ব্যাপার নয়, সে বাবদে আমার কৃতজ্ঞতা রইল। দক্ষিণেশ্বর তো একরকম পাড়াই হল। এবার শেয়ালদা দুরন্ত চেপে বাড়ি যাচ্ছিলাম, আমাদের পাশের সহযাত্রী দম্পতি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরকে খুব ঘটা করে নমো করে দক্ষিণেশ্বর স্টেশনটাকে আরও ঘটা করে নমো করলেন দেখলাম। #ট্রুস্টোরি
Deleteহাহা. আমিও বহুবার এমন দেখেছি যে বেশ কিছু মানুষের ডালা হাতে লাইন ভোর বেলা বন্ধ টিকেট কাউন্টার এর সামনে।
Deleteসাংঘাতিক।
DeleteDarun! Bratati
ReplyDeleteধন্যবাদ, ব্রততী।
DeleteNatun taste kintu kemon taste bujhte parchina (jadio khub sundar) mujtaba ali o addar khub fan chilen kintu tar taste alada eta advut
ReplyDeleteধন্যবাদ, আশিস।
Deletebhari moja pelam pore, bangla badhyotamulok hobar pore facebook e thik ei dharar i ekta torko bitorko cholchhey. :P
ReplyDeleteথ্যাংক ইউ, চুপকথা।
DeleteOsadharon likhechen. Natun style e likhechen, darun maniyeche. Apnar ei lekha ke sahos kore poroshuram er uttorsuri bola jai. Tufy-r nijer mot ta ki chot kore bole deben na ki ? O ki jante parbe ?
ReplyDeleteথ্যাংক ইউ, ঘনাদা। টাফি ওরকম মিষ্টি দেখতে হলে কী হবে, ধুরন্ধর দি গ্রেট। ও অলরেডি আপনার মন্তব্য পড়েছে, এবং আমার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে মুণ্ডু নাড়ছে। টাফি আশেপাশে না থাকলে বলব একদিন।
DeleteIye, ekta kotha hothat mone pore gelo. Ei lekha tai tufy je bhumika-te ache; apnar purono lekha-te banti onekta ek i rokom bhumika-i thakto na ?
Deleteআপনার স্মৃতিশক্তি অসামান্য, ঘনাদা। ঠিকই ধরেছেন, টাফির কথা লিখতে গিয়ে আমারও বান্টির কথা মনে পড়েছিল বহুদিন বাদে।
Deleteসিট'-এর বদলে ‘বোসো’ বললে দাঁড়িয়ে থাকেন।
ReplyDelete:D :D :D
স্যার জেমস একঘর, বিম্ববতী।
Deleteki bhalo ki bhalo. pore amar midweek monkharap kom hoye gelo.
ReplyDeleteমিডউইক মনখারাপ একটা লেজিটিমেট অসুখের নাম হতে পারে, কুহেলি। ভালো নামকরণ।
Deletebohudin pore osadharon ekta lekha porlam.. tomar ei dhoroner lekhagulo boro kono jaygay publish howa uchit.. eta mone hocche Sukumar Ray ke tribute chilo?
ReplyDeleteথ্যাংক ইউ, ঊর্মি। জ্ঞানত ছিল না, তবে অজ্ঞানে ট্রিবিউট হয়ে গেলে যেতেই পারে।
DeleteDarun. Notun style e lekha, khub bhalo laglo :)
ReplyDeleteTuffy k amar hoye ekta dhonyobad janiye deben, ei je o eto kichhu janalo.
টাফি বলছে, "মেনশন নট।"
Deleteআর আমি বলছি, থ্যাংক ইউ, অরিজিত।
Khub mon kharap hole apnar lekha gulo pori. Aste aste koshto chole jaaye, bhalo lage.
ReplyDeleteথ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।
Deleteঅসাধারন। কিচ্ছু বলার নেই। আহ্লাদিত !!
ReplyDeleteআপনার মন্তব্য পড়ে আমিও আহ্লাদিত, অনির্বাণ।
Deleteকেয়াবাৎ। বহুৎ খুব।
ReplyDeleteশুক্রিয়া, সন্ময়।
Deleteআপনি জিনিয়াস, আর আপনার ব্লগ একটি স্বর্ণখনি। কী আর বলব। লিখে চলুন, আর আমরা পাত পেড়ে, মানে অনলাইন থেকে, বসে থাকি।
ReplyDeleteআরে ঋজু, লজ্জা দেবেন না। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।
Deleteহাহাহা, দারুণ হয়েছে এটা। আপিস থেকে ফাঁকি মেরে টাফিদেত আড্ডায় আমিও কচুবনের আড়াল থেকে দেখি কিনা, তাই আরো ভাল্লাগেছে। 😂
ReplyDeleteকচুবনের আড়ালটাই বেস্ট পজিশন, প্রদীপ্ত।
Deleteদুর্দান্ত! টাফি আড্ডার আরও আপডেট দিলে জানাবেন দয়া করে :)
ReplyDeleteনিশ্চয়, অন্বেষা। টাফি ভয়ানক গর্বিত হবে ওর আড্ডা সম্পর্কে কেউ উৎসাহ প্রকাশ করেছে জানলে।
DeleteBah ! noborupe ho jo bo ro lo
ReplyDeleteথ্যাংক ইউ, তিলকমামা।
Deleteসত্যি অসাধারণ লেখা হয়েছে। বান্টির কথা মনে পড়িয়ে দিলো। বান্টিকে নিয়ে লেখাগুলো খুব ভালো লাগতো। এখন টাফি মনে হচ্ছে মাঝে মাঝেই উপস্থিত হবে লেখায়। চারপেয়েরা যে তোমার ভালোই মন কেড়েছে বোঝা যাচ্ছে। সুকুমার রায় রেফারেন্সটা একদম ঠিক। আবারো বলছি অসাধারণ ভালো লাগলো পড়ে।
ReplyDeleteথ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ, অমিতা।
DeleteDarun lekha, koekdin age pore gechhi. comment deoa hoeni."টাফি" durdanto.. :-)
ReplyDeleteথ্যাংক ইউ, ইচ্ছাডানা।
Delete