January 17, 2019

নয়




 

বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে লেখা সাতটা গল্প আর দু’টো মৌলিক গল্প নিয়ে আমার গল্প সংকলন ‘নয়’ বেরোচ্ছে ২০১৯-এর কলকাতা বইমেলায়। বার করছে সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী। রোহণের সৃষ্টিসুখ।

বইয়ের প্রচ্ছদ করেছে রোহণ। অনেক সাদা, অল্প রং মিলিয়ে আমার মনের মতো প্রচ্ছদ। তবে আরও মনের মতো দিয়েছে বইয়ের নাম।

বইয়ের নাম নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছিল এপ্রিল মাস থেকে। আমার পছন্দের নামগুলো শুনে অর্চিষ্মান মাথা নাড়ছিল, অর্চিষ্মানের সাজেসশন শুনে আমি মাথা চুলকোচ্ছিলাম। আমাদের দুজনের শর্টলিস্টেড নামগুলো শুনে রোহণ বলেছিল, ভেবে দেখি। তারপর ভেবেচিন্তে ও নাম রেখেছে ‘নয়’। সোজাসাপটা, ঝাড়াঝাপটা ‘নয়’। আমাদের আগের নামগুলোয় গল্পের এসেন্স-টেসেন্স, থিম-টিম গোঁজার অনেক চেষ্টা করেছিলাম, তারপর রোহণ বলল, গল্পের এসেন্স গল্পকেই প্রকাশ করতে দাও, কুন্তলাদি।

'নয়'-এর নাম 'নয়', কারণ বইতে ন'টা গল্প আছে।

রোহণ যেটা না জেনেই নামটা দিয়েছে, সেটা হচ্ছে ‘নয়’ আমার অন্যতম ভালোবাসার সংখ্যা। প্রিয়তম নয়। ভিড় ভালোবাসি না বলে আমার প্রিয় সংখ্যা এক, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি একের থেকেও ইন্টারেস্টিং হল ‘নয়’। তাছাড়া নয় আমার জীবনে বার বার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ফিরে ফিরে এসেছে। আমার প্রথমবার বাড়ির বাইরে থাকার ঠিকানা ছিল ‘রুম নাম্বার নাইন’। আমার জীবনে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দখল করে রাখা মানুষের জন্মদিন ন’তারিখ কিংবা জন্মদিনের যোগফল নয়।

নয়-এর অধিকাংশ গল্প আপনাদের চেনা। পাঁচটা গল্প (চক্ষুদান, ননীবালা, দিদিমার ভাবনা, বিচার) চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে পড়েছেন। খানদুয়েক (বুবুনের মা, রানি) অবান্তরে পড়েছেন। আর সাতকে নয় করার জন্য দু’খানা গল্প (ঠাউরুন, ঠাম্মার ভ্রমণকাহিনি - বয়স্ক মহিলাদের হিরোর চরিত্রে দেখতে যে আমার কত ভালো লাগে, সদ্য রিয়েলাইজ করেছি। অর্চিষ্মান বলছে এটা আগাথা ক্রিস্টি এফেক্ট। মিস মার্পল তো বটেই, ওঁর বেশিরভাগ গল্পেই বয়স্ক মহিলাদের কি-ভূমিকা থাকে। আমার এ প্রভাবে প্রভাবিত হতে আপত্তি নেই, মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন…ইত্যাদিপ্রভৃতি) আমি নিজে লিখেছি, একেবারে মাথা থেকে বানিয়ে। সে দুটো আপনারা আগে কোথাও পড়েননি।

নয়-এর গল্পগুলোর একটা সুতো আছে, সব গল্পেরই মেন রোলে মেয়েরা। সে সব ব্যাখ্যা বইয়ের ব্যাককভারে দেওয়া আছে, নিচের ছবি থেকে পড়ে নিতে পারেন। 




পুরনো গল্পগুলো অবিকল পুরনো চেহারাতেই বইতে যায়নি অবশ্য। ঝাড়াইবাছাইয়ের দরকার আছে জানতাম। নিজের পুরনো লেখা ফিরে পড়ার থেকে প্রাণঘাতী অভিজ্ঞতা আর কিছু হতে পারে বলে আমার জানা নেই। একেকটা লাইন পড়ি আর মনে হয় মেঝে খুঁড়ে ঢুকে যাই। প্রতিটি গল্পই সারিয়েছি। কয়েকটা গল্পের গোটা গোটা প্যারাগ্রাফ বাদ পড়েছে (লেখা সারানো, অন্তত আমার ক্ষেত্রে দেখেছি, সর্বদাই কমানোতে পর্যবসিত হয়। ঘষামাজা করতে করতে ভয় হয় গল্পটা শেষমেশ না এক লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়।) আর সবগুলোরই বাক্যবিন্যাস, শব্দব্যবহার বদলেছে। রোহণ ফাইন্যাল ম্যাটারটা পাঠানোর পর আমি মোটের ওপর চোখ বুলিয়ে ছেড়ে দিয়েছি কারণ এতকিছুর পর পড়তে বসলেও শিউরে ওঠার মতো ভাষার কারিকুরি বেরোবে। রোহণের পায়ে পড়তে হবে, এগুলো ছেপো না প্লিজ। আর একটু সময় দাও, সারিয়ে নিই। সে রিস্কে যাইনি।

শেষ করার আগে একটা কথা বলি। বইটার উৎসর্গপত্রে একজনেরই নাম লেখা আছে। অর্চিষ্মানের। নয়-এর নয় হয়ে ওঠার পেছনে অর্চিষ্মানের কেরামতি তো আছেই, কিন্তু উৎসর্গটা সেটার জন্য নয়। অর্চিষ্মান সারাদিনে তিনবার আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলে, মরমে মরে গিয়েও রেস্টোর‍্যান্টে আমি খাবারের ছবি তোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করে খাওয়া শুরু করে, আমার মন রাখতে এন ডি টি ভি-র বদলে নাপতোল চ্যানেল দেখে, সমাজের একজন মোটামুটি উৎপাদনশীল, কর্মক্ষম সদস্য হিসেবে আমার জীবনযাপন সম্ভব করায় এবং যাবতীয় ঠ্যাকনা দিয়ে দিনযাপনের ওয়্যার অ্যান্ড টিয়ারে আমার ক্ষয়া ঘুঁটের মতো ঝুরঝুর ঝরে যাওয়া প্রতিহত করে। এ সবের জন্য ওকে একটা ওভারঅল থ্যাংক ইউ বলার ছিল, থাকবে চিরদিন, এই সুযোগে বলে নিলাম।

কিন্তু লেখার জন্য যদি কৃতজ্ঞতা কাউকে জানাতে হয়, সে লেখা রোজকার ব্যাখ্যানই হোক, ছায়া অবলম্বনেই হোক, মৌলিকই হোক, তবে সে অবান্তর, আর অবান্তর বলে যে হেতু আসলে কেউ নেই, অবান্তরের আড়ালে রক্তমাংসের যাঁরা আছেন তাঁরা। অর্থাৎ আপনারা। অবান্তরের প্রতিটি পোস্ট আপনাদের জন্যই লিখি, এই বইটাও আপনাদের জন্যই লেখা হয়েছে। আরও যদি বই লেখা হয় কোনও দিন, সে সবও আপনাদের জন্যই হবে। কাজেই উৎসর্গের পাতায় যার নামই থাকুক না কেন, জানবেন প্রতিটি বই, প্রতিটি গল্প, আমার আঙুল থেকে বেরনো প্রতিটি অক্ষরই আসলে আপনাদের, অবান্তরের বন্ধুদের, উৎসর্গ করা। এই আমি আমার মন ছুঁয়ে বলে রাখলাম।

‘নয়’ যদি আপনারা কেউ প্রি-অর্ডার করতে চান, লিংক এই রইল।

প্রি-অর্ডার নয়ঃ https://sristisukh.com/bf19/product/নয়


January 15, 2019

পৌষমেলা ২০১৯



অপেক্ষাকৃত বড় বাড়িতে শিফট করার পর আর আরও খানিকটা অলস হয়ে যাওয়ার পর আমরা আমাদের বাড়ি পরিষ্কার করার দায়িত্ব আউটসোর্স করেছি এবং সে দায়িত্ব নিয়েছে রীতা। রীতা দরকারের বেশি কথা বলে না, না বলে কামাই করে না, চটপট কাজ করে, আমার দ্বারা হচ্ছে না দেখলে নিজেই মোড়ায় চড়ে ঝাঁটার হ্যান্ডেল দিয়ে খুঁচিয়ে একজস্ট ফ্যান চালু করে দেয়। 

সেই রীতা চা খেতে খেতে বলল, মেলায় যাচ্ছ তো?

বড় বড় বাঁশ ফেলে চিত্তরঞ্জন পার্ক বঙ্গীয় সমাজ আয়োজিত পৌষমেলার প্যান্ডেল হচ্ছে বাড়ির উল্টোদিকের মেলা গ্রাউন্ডে, লগ্নজিতা আর অনুপম রায় গান গাইতে আসছেন, যাচ্ছি বইকি। রীতা বলল, ফাংশান তো সন্ধেবেলায়, দুপুরে ফুড ফেস্টিভ্যালে যাবে না? আমি শনিরবি দু’দিনই দোকান দিচ্ছি। শনিবার পাটিসাপটা, পুলিপিঠে আর রবিবার মাংসভাত।

স্বীকার করতে লজ্জাই হচ্ছে কিন্তু খবর শুনে লাফিয়ে পড়ে, ‘আহা চমৎকার কেয়া বাত’ বলার বদলে চোখ কপালে তুলেছিলাম। বলেছিলাম, সর্বনাশ, তোমার তো এমনিই পরিশ্রমের অন্ত নেই, আবার এত খাটবে? রীতা বলল, কেন মজা হবে তো। সংযত হলাম। বোঝাই যাচ্ছে ও আমার মতো যতটুকু না করলে নয় কোনওমতে সেরে তারপর চিতপাত হয়ে শুয়ে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলার নীতি নিয়ে চলে না। কায়িক পরিশ্রম করে আনন্দ পায়। আর নিরুৎসাহ করলাম না। বললাম, নিশ্চয় যাব। 

যাচ্ছি যাব করে শনিবার দুপুর একটা নাগাদ গিয়ে যখন মাঠে পৌঁছলাম তখন খাওয়াদাওয়া তুঙ্গে। অনেক খুঁজে রীতাকে আবিষ্কার করা গেল; ঝকমকে লাল শাড়ি পরে মহা ব্যস্ত হয়ে দোকান সামলাচ্ছে। দু’খানা পাটিসাপটা চাইলাম, তিনখানা দিল, হাফ দামে। হাফ দামেটা প্রথমে বুঝিনি। ভাবছি দশ টাকায় এতখানি নারকেলের পুর দেওয়া, এত বড়, এমন সুস্বাদু পাটিসাপটা? এর অর্ধেক সাইজের শুঁটকোমতো পাটিসাপটা সি আর পার্কের মিষ্টির দোকানগুলো চব্বিশ টাকা পিস নেয়। তারপর লোক সরে যেতেই দেখি টেবিলে ঝোলানো হাতে লেখা মেনুতে পাটিসাপটার পাশে দশ নয়, কুড়ি টাকা লেখা আছে। তাড়াতাড়ি বাকি টাকা দিতে গেলাম, রীতা আমার হাত ধরে টেনে দোকানের সীমা পার করে দিয়ে বলল, এখান থেকে যাও দেখি, ঝামেলা কোর না, কাস্টমার আসছে দেখছ না?

খাবারের দোকান, শাড়ির দোকান, ছবির দোকানের মধ্যে ঘোরাঘুরি করছি, রিসেপশান থেকে মাইকে লাকি ড্রয়ের ঘোষণা হচ্ছে। ষষ্ঠ প্রাইজ এয়ার পিউরিফায়ার শুনে তাকাতাকি করলাম। ওটা আমাদের কেনার প্ল্যান, লাকি ড্রয়ে পেলে বেশ হয়। অবশ্য এই গোছের লটারির খেলায় আমাদের আমাদের দুজনেরই লাক অতি খারাপ। অফিসের দিওয়ালি পার্টির তাম্বোলা থেকে ডি ডি এ ফ্ল্যাটের লটারি, কোনওটাতেই আমরা কিস্যু জিতি না কোনওদিন। কাজেই নাম দিলাম না। বার বার যেচে নিজেদের আনলাকি প্রমাণ করতে কার ভালো লাগে? 

কিন্তু তারপরই এমন একটা দোকান আবিষ্কার হয়ে পড়ল যে নিজেদের আর অত ভাগ্যহত মনে করা গেল না। কোণার দিকে দোকানটা। দোকানের ভেতর ধূলিধূসরিত, ছেঁড়াখোঁড়া, লাইব্রেরিমার্কা মলাটবাঁধাই সারি সারি বই।


বঙ্গীয় সমাজের লাইব্রেরিতে জায়গা আঁটছে না বলে কর্তৃপক্ষ বইপত্র বিদায় করছেন। রোগা বই তিরিশ টাকা, মোটা বই পঞ্চাশ। আমরা পাঁচটা মোটা বই আর আটটা রোগা বই কিনলাম। কয়েকটা বই আগে পড়া, কিন্তু পুরনো ছাপাতে এত সুন্দর লাগছে দেখতে যে লোভ সামলান গেল না। 



এখন অর্চিষ্মান শ্রেষ্ঠ কিশোর অমনিবাসটা পড়ছে আর ক্রমাগত খুকখুক আর মাঝে মাঝে হোহো করে হাসছে। আমাকে কাজ থামিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই হচ্ছে কী পড়ছ শুনি। ল্যাজে গরম চা ফেলে সিংহকে কাবু করা ইত্যাদি মচৎকার প্লটের গল্প। ওর শেষ হলেই আমি ধরব।

রাত আটটায় লগ্নজিতার অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা, সিট পাওয়া সুনিশ্চিত করতে সোয়া সাতটায় পৌঁছনোই যথেষ্ট মনে হয়েছিল। সাতটা কুড়িতে মেলা গ্রাউন্ডে ঢুকে দেখি আমাদের দুজনের তো ছেড়েই দিলাম, একটা মাছি বসারও জায়গা নেই। লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করার সুবাদে আমি যে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ লাইফ স্কিলের অধিকারী হয়েছি তার মধ্যে একটা হচ্ছে ফাঁকা সিট খুঁজে বার করা। শপিং মলের ফুড কোর্টে, ট্রেনে বাসে, পৌষমেলার ভিড়ে - আমার পাঁচশো মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ফাঁকা সিট থাকলে আমি গন্ধ পাই। এ মেলাতেও অন্যথা হল না। নাকের ডগায় একখানা সিট পেলাম এবং বসে পড়লাম। অর্চিষ্মানকে তারপরের দেড় ঘণ্টায় অন্তত আরও সাতটা সিট খুঁজে দিয়েছিলাম, ও বসতে রিফিউজ করল, কারণ লোক পেরিয়ে যেতে হবে। বললাম, তাহলে আমার সিটেই বস না হয়, একটু চেপে বসছি, দুজনে হেসেখেলে এঁটে যাব, তাতেও রাজি হল না। তারপর বললাম, ঠিক আছে আঁটাতে হবে না, আমি উঠছি, তুমি গোটা সিট নিয়েই বস না হয়। তাতেও রাজি নয়। রাত সোয়া এগারোটায় ফাংশান শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঝাড়া চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রইল। আমি দেড় ঘণ্টা পর উঠে পড়ে বাকি আড়াই ঘণ্টা ওকে সঙ্গ দিলাম।


লগ্নজিতা বললেন মাস্টার্সের শেষ বছর নাকি উনি দিল্লি ইউনিভার্সিটি থেকে করেছেন, নর্থ ক্যাম্পাসে থাকতেন, উইকএন্ডে দু’নম্বর মার্কেটে বাজার করতে আসতেন। মেলা গ্রাউন্ডে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাটেলাও করেছেন। সেই গ্রাউন্ডেই গানের অনুষ্ঠান করতে এসে রোমাঞ্চিত লাগাই স্বাভাবিক। লগ্নজিতা স্টেজে আসার সময় এবং গান চলাকালীনও দর্শকশ্রোতারা উত্তেজিত হয়ে হাততালি এবং আরও নানারকম উৎসাহব্যঞ্জক শব্দ করছিলেন কিন্তু তিনি মিনিট পঁয়তাল্লিশ গেয়ে নেমে যাওয়ার পর অনুপম রায় যখন দৌড়তে দৌড়তে, শূন্যে ঘুঁষি ছুঁড়তে ছুঁড়তে স্টেজে আবির্ভূত হলেন, জনতা এমন উদ্বেলিত হয়ে উঠল যে কহতব্য নয়।


স্বাভাবিক। গত আট বছরে হিট গান বলতে যা বোঝায়, যা লোকের মুখে মুখে ঘোরে, যার কথা সবার মুখস্থ হয়ে যায়, তেমন গানের অধিকাংশের মালিক অনুপম রায়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে খানদুয়েক হিন্দি, একখানা লোকগীতি আর একখানা পুরনো দিনের বাংলা গান বাদ দিয়ে সব নিজের গান গাইলেন অনুপম, সবই হিট এবং সবই জনতা সঙ্গে সঙ্গে মুখস্থ গাইতে পারে। 

গত পুজোয় পকেট ফরটির মাঠে অঞ্জন দত্তের লাইভ শো দেখেছিলাম। অঞ্জন দত্তর ক্যারিশমা, স্টেজের ওপর দখল অনেক বেশি। সেটা স্বাভাবিকও হয়তো। কিন্তু অনুপম রায় অত্যন্ত পরিশ্রমী পারফর্মার, দর্শকদের মনোরঞ্জনে ফাঁকি দেন না। ক্রমাগত ইন্টারঅ্যাকট করেন, বোরড হওয়ার সুযোগই দেন না। গান শুরু করার আগে গানের সম্পর্কে নানারকম ক্লু দেন। যেমন ধরুন বললেন, এখন যে গানটা হবে, সবাইকে মোবাইলের আলো জ্বেলে মাথার ওপর তুলে নাড়তে হবে কারণ আমরা এখন একটা অন্ধকার……বলে হাসি হাসি মুখ করলেন আর জনতা ‘বোওওবাআআ টাআআনেএএল’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। হাত তুলুন, চিৎকার করুন, ফোন জ্বেলে মাথার ওপর তুলে ধরে নাড়ান, দর্শকশ্রোতাদের প্রতি অনুপম রায়ের দাবি অগুনতি। তবে উনি নিজেও পরিশ্রম করেন কাজেই অন্যায্য লাগে না। জোড়া পায়ে লাফান, শূন্যে ঘুঁষি ছোড়েন, ঝুঁকে পড়ে এয়ার গিটার বাজান। ওঁর সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের দায়িত্বে যাঁরা স্টেজে ছিলেন তাঁরাও জমজমাটি। নবারুণ বলে যিনি কি-বোর্ডের দায়িত্বে ছিলেন তাঁর কথা না বললে অন্যায় হবে। এমন একেকটা মুহূর্ত আসছিল যে নবারুণের দুই হাত কি বোর্ডে এবং দুই পা শূন্যে ছিল। অন গড ফাদার মাদার। স্টেজ জুড়ে ধোঁয়া, লাফালাফির মধ্যে আসর খুবই জমে উঠেছিল। মাঝে মাঝেই শ্রী রায়, 'কাম অন, সি আর পাআআআর্ক!' হুংকার ছাড়ছিলেন। অনুপম বুদ্ধিমান, বোঝেন যে দর্শকের কোন বোতাম টিপলে কাজে দেবে। বলছিলেন, দুই কানে সি আর পার্কের চিৎকার নিয়ে কলকাতা ফিরে যেতে চাই, পাব কি? শুনে মেলা গ্রাউন্ড একেবারে পাগল হয়ে উঠছিল। লোকে স্কার্ফ খুলে মাথার ওপর নাড়িয়ে, লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে একাকার। অনুপম 'আমি আমি' বলে মাইক ঘোরাচ্ছিলেন, মেলা গ্রাউন্ড ‘জানি জানি’ গর্জে উঠছিল। সে এক দেখাশোনার মতো ব্যাপার।


অনুপম গেয়েওছেন ভালো। আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম উনি এখন গান শেখেন এবং চর্চা করেন। বোঝা যায়। না হলে আড়াই ঘণ্টা ধরে অত পরিশ্রম করে গাওয়া যায় না।

গান এতই জমে উঠেছিল যে আমরা সাড়ে ন’টা থেকে চল যাই, যাবে নাকি, উঠি নাকি, আর পাঁচ মিনিট করতে করতে শেষ পর্যন্ত রয়ে গেলাম। মাঝে একবার খাবারের খোঁজে যাওয়া হয়েছিল। অনেকরকম খাবারই ছিল, চাইনিজ, কাবাব হ্যানাত্যানা; দেখেশুনে বঙ্গীয় সমাজ ক্যান্টিনের স্টল থেকে গরম গরম কড়াইশুঁটির কচুরি আর ছোলার ডাল খেলাম। মচৎকার। অর্চিষ্মান ফিশ ফ্রাই নিয়েছিল দু’খানা, ফার্স্ট ক্লাস নাকি। ডেজার্টে আমরা কালা খাট্টা চুসকি খেলাম। আশেপাশে যাঁরা চুসকি খাচ্ছিলেন, তাঁরাও সবাই কালা খাট্টা চুসকিই খাচ্ছিলেন। যতবারই খাই, সর্বদা সহ-চুসকি খাইয়েদেরই কালা খাট্টা চুসকিই খেতে দেখি। আমার চুসকি খাওয়ার ইতিহাসে আমি এ যাবত একজনের দেখা পেয়েছি যিনি স্ট্রবেরি না কী একটা ওইরকম ফ্লেভারের চুসকি অর্ডার করেছিলেন। বাকি সবাই কালা খাট্টা। কালা খাট্টা ছাড়া আর যে সারি সারি লাল নীল হলুদ সবুজ সিরাপের বোতলগুলো সাজান থাকে দোকানে ওগুলোর কী হয় সেটা আমার জানার ইচ্ছে খুব। আমি আজীবন কালা খাট্টা খাই, অন্য কিছু খাওয়ার প্ল্যানও নেই। বাকিগুলো নির্ঘাত এক্সপায়ার্ড।

এগারোটা পাঁচে অনুপম অবশেষে 'আমাকে আমার মতো থাকতে দাও' ধরলেন। সাড়ে আটটা থেকে, যখন অনুপমের গলায় উত্তরীয় হ্যানাত্যানা দেওয়া হচ্ছে, একজন দর্শক চিৎকার করে গানটার অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। শেষটায় সাড়ে দশটা নাগাদ অনুপম আর না থাকতে পেরে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন, দেখুন, ওই গানটা না গেয়ে আমি তো কোথাও যাচ্ছি না, আপনার যদি তাড়া থাকে তো বলুন। গোটা প্যান্ডেল হেসে এর ওর গায়ে পড়ল। শেষটা যখন গানটা সত্যি সত্যি হল, সে এক আবেগঘন ব্যাপার। একটুও বাড়িয়ে বলছি না, আমার বাবার থেকেও বেশি বয়সী লোকেরা মাথা নেড়ে নেড়ে ‘নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি’ কোরাস ধরছিলেন। এটা আমি সবসময় বলি, তোমাকে চাই-এর পর আর কোনও গান যদি ফেনোমেনন হয়ে থাকে (দুটো গানের কোয়ালিটির তুল্যমূল্যতা নিয়ে মন্তব্য করছি না) , তবে সেটা 'আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।' 

লাইভ শো দেখার পর অ্যাড্রিনালিন রাশ হয়ে যায়। বাড়ি এসে আমরা আরও খানিকক্ষণ কী হল, কেমন হল,কে কেমন নাচ করল আলোচনা করলাম। অর্চিষ্মানের দেখি কেমন আনমনা, চিন্তিত ভাব। বললাম, কী হয়েছে বল দেখি। 

অর্চিষ্মান বলল, একটা জিনিস খেয়াল করলাম বুঝলে।

কী জিনিস?

অনুপম রায় তো ছেড়েই দাও, আমি লগ্নজিতার গানগুলোও সব জানি। কয়েকটার তো লিরিকসও জানি, যেগুলো জানি না সেগুলোও হুঁ হুঁ করে গাইতে পারার মতো চিনি।

আমিও চিনি। চেনাই স্বাভাবিক। আমাদের টিভিতে যে রেটে সংগীত বাংলা চলে না জানলেই অদ্ভুত হত। তাছাড়া উপল সেনগুপ্তর বাড়ির ছাদের রুফটপ কনসার্টের ইউটিউব প্লে লিস্ট ইত্যাদি আমাদের বাড়িতে ননস্টপ চলে। বাংলা আধুনিক গানের জ্ঞানের একেবারে ফ্রন্টিয়ারে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। 

অর্চিষ্মান শর্মিলা ঠাকুরের মতো মুখ করে বলল, সেটা ভালো না খারাপ?

ওর দ্বিধা হচ্ছে আমাদের কালচারাল কনসাম্পশনের ছিরি দেখলে লোকে আড়চোখে তাকাবে। নিজেদের ইনটেলেকচুয়াল বলে চালানোর আমাদের যে মারাত্মক সাধ, তা আর যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করা যাবে না।

আমি বললাম, ছাড়ো তো। লোকের কথা শুনে কেউ কোনওদিন বড়লোক বা ইন্টেলেকচুয়াল, কোনওটাই হয়নি।

অর্চিষ্মানের সংশয় ঘোচাতে পারলাম কি না জানি না। আর সবেতেই তো পিছিয়ে পড়েছি , অন্তত বাংলা মেনস্ট্রিম সংগীতের ক্ষেত্রে যে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পেরেছি তাতে আমি শুধু গর্বিত হওয়ারই কারণ দেখছি। 

শনিবার মেলার পেছনে অনেক সময় গেছে, কাজেই রবিবার কোমর বেঁধে কাজের সদিচ্ছা ছিল। কিন্তু রোদঝলমল শীতের দুপুর, গেটের বাইরে পা দিলে একটা আস্ত মেলা বসেছে, মাইকে গান, কথা, ভেসে আসছে, একবার উঁকি না দিলে কেমন না?

নিজেদের চিনতে বাকি আছে এখনও তাই ভেবেছিলাম বাড়ি ফিরে ফুলকপির তরকারি দিয়ে ডাল ভাত খাব। মাঠে চেয়ার পেতে রোদ পোয়াতে পোয়াতে জনতাকে নানারকম সুখাদ্য সেবন করতে দেখে হাঁটু দুর্বল হল, বিরিয়ানি আর চাউমিন দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সারলাম।


খাওয়ার পর চা খুঁজতে গেলাম, পেলামও একেবারে যা চাই তাই। লেমন টি। বাড়ি গিয়ে কাজ করলেও হত, আবার চায়ে চুমুক দিতে দিতে চেয়ারে বসে সামনে পা টানটান ছড়িয়ে কুইজ শুনলেও হত। আমরা কোনটা করলাম আন্দাজ করার জন্য কোনও প্রাইজ নেই। পুরস্কার বিতরণ দেখে, জোরে জোরে হাততালি দিয়ে বিজয়ীদের অভিনন্দিত করে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে অর্চিষ্মান বলল, সামনের বছর আমি তুমি নাম দিই চল কুইজে।

কুইজ হয় ফাংশানের মূল মঞ্চে, গোটা মেলা গ্রাউন্ড এবং সি আর পার্ক মেন রোডকে সামনে রেখে। প্রতিযোগীরা হাতে ধরা মাইকে উত্তর দেন, যাতে গোটা মাঠ আর মাঠের চারপাশের বাড়ির লোকেরা বাড়িতে বসেই সব শুনতে পান। 

সবকিছু জানা সত্ত্বেও যে অর্চিষ্মান যে সামনের বছর কুইজে নাম দিতে চাইছে তার দোষ নির্ঘাত বিরিয়ানি, লেমন টি, শীতের ছুটির দুপুর আর দুপুরের ওই মিষ্টি রোদ্দুরটার। আর কোনও ব্যাখ্যা থাকতেই পারে না।














January 12, 2019

বৃশ্চিক ২ এবং কেন আমার রহস্য গল্প লিখতে গায়ে জ্বর আসে




'বৃশ্চিক ১: একটি রহস্যরোমাঞ্চ কাহিনি সংকলন'-এর খবর আমি পেয়েছিলাম বইটি প্রকাশ হওয়ার কিছুকাল পরে এবং কিনেওছিলাম। কাজের কথা না বলা, মানুষজন্ম সার্থক করার টিপস না দেওয়া, মানবমনের গভীর অগভীর উপলব্ধি নিয়ে বকে বকে মাথা না ধরানো ঘরানার সাহিত্যের প্রতি আমার দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। সেই সব ঘরানার গল্প নিয়ে বুক ফুলিয়ে একটা বই বেরোচ্ছে জেনে ভালো লেগেছিল।

বইটা হাতে নিয়ে আরও ভালো লেগেছিল। ভালো বাঁধাই, ভালো ছাপা, ভালো ছবি, ভালো পাতা। হাতে নিলেই বোঝা যায় ভালোবেসে বানানো। কয়েকটা গল্প মৌলিক, কয়েকটা অনুবাদ। দুয়েকটা চেনা নাম, বাকি অচেনা। কয়েকটা গল্প চমকে দিয়েছিল। টুইস্টে, প্লটে, ভাষায়, অনুবাদের সাবলীলতায়। 

কিন্তু সবথেকে বেশি চমকেছিলাম ক'মাস পর বৃশ্চিকের সম্পাদকমণ্ডলীর তরফে ঋজু গাঙ্গুলির মেল পেয়ে। বৃশ্চিক ২ রহস্যরোমাঞ্চ কাহিনীর সংকলন বেরোচ্ছে এবং সেখানে ওঁরা আমার একখানা গল্প রাখতে চান। মেলে একটা জিনিস খেয়াল করেছিলাম; ওঁরা 'আপনার লেখা' শব্দ দুখানা ব্যবহার করেছেন অর্থাৎ চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে যে ছায়া অবলম্বনের খেলাটা খেলি সেটা চলবে না। দুয়েকবার মেল চালাচালির পর ঋজু এটাও বলেছিলেন যে ভৌতিক বা আধিভৌতিক এড়াতে পারলেই ভালো।

অর্থাৎ আমাকে একখানা মৌলিক রহস্য ছোটগল্প ফাঁদতে হবে।

লাফিয়ে হ্যাঁ বলে দিয়েছিলাম। ঋজু যা ডেডলাইন দিয়েছিলেন তার মধ্যে একখানা মৌলিক রহস্য গল্প ফাঁদা, বাঁয়ে হাত কা খেল বোধ হয়েছিল। 

গল্প জমা দিতে দিতে অরিজিন্যাল ডেডলাইন পার হয়ে আরও তিনটে ডেডলাইন (যেগুলো আমি নিজেই সাজেস্ট করেছিলাম, প্রত্যেকটাই বাঁয়ে হাত কা খেল হবে মনে করে) এসে টাটা করে চলে গেল। ঋজু টুঁ শব্দ না করে অপেক্ষা করলেন। জন্মসূত্রে ধৈর্য এবং ঠাণ্ডা মাথা না নিলে জন্মালে কেউ চেষ্টা করে সম্পাদক হতে পারে না, ঋজু দুটো বরই নিয়ে জন্মেছেন।

দেরি হল কেন? এক তো নিজের বাঁ হাতের খেলা দেখানোর ক্ষমতার ওভারএস্টিমেশন। দুই, সময়ের গতি সম্পর্কে, এই এতখানি সময় পৃথিবীর মাটিতে কাটানোর পরেও অজ্ঞানতা। একঘণ্টা মানে কত খানি, সাত দিন মানে আসলে কতটা সময়, দেড় মাসের আসল দৈর্ঘ্য, ইত্যাদি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতনতা।

দ্বিতীয় কারণটা আরেকটু জটিল। কাজটাকে আমি একেবারে যে হেলায় নিয়েছিলাম তেমনও নয়। আমার গানের মাস্টারমশাই বুদ্ধিমান লোক ছিলেন, নানারকম দামি উপদেশ দিয়ে রেখেছিলেন। বলেছিলেন, কোনও কাজ খাটলে উতরোতে পারে আবার নাও পারে (খাটিয়ের ক্ষমতা আর কপাল ম্যাটার করবে), কিন্তু না খাটলে যে উতরোবে না সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আমি ভালো করে খেটেখুটে লিখব বলেই নেমেছিলাম। নতুন নোটখাতার ওপর বৃশ্চিক রহস্য গল্প লিখে নতুন পাতায় তারিখবার দিয়ে লেখা শুরু করার সিরিয়াসনেস নিয়ে নেমেছিলাম। 

কিন্তু ব্যাপারটা ক্রমেই সন্দেহজনক প্রতিভাত হতে লাগল। 

খুনের গল্পই যে লিখব সে নিয়ে নিঃসংশয় ছিলাম। কিডন্যাপ কিংবা ব্যাংকডাকাতির রহস্য নিয়ে লেখার মতো নিষ্পাপতা আর নেই। কিন্তু খুনের গল্প লেখার প্রথম এবং প্রধান অসুবিধে হচ্ছে খুনের জুতসই কারণ বা মোটিভ খুঁজে বার করা। কেন কেউ কাউকে একেবারে খুন করে ফেলবে, সে রকম একটা যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আমি এখনও বার করতে পারিনি। কথা বন্ধ না, কুশপুতুল দহন না, বসের কাছে লাগানো না, একেবারে খুন? গোয়েন্দাগল্প লেখকরা যতই বলুন না কেন, সম্পত্তি কিংবা প্রেম, কোনও কারণই একেবারে খুন করে ফেলার মতো যথেষ্ট নয়। খুন করে ফেলার যদি একটা কারণ থাকেও, খুন না করার অন্ততপক্ষে একশোটা কারণ বার করে দেওয়া যাবে।

তার ওপর সেই খুনের আগে যথেষ্ট প্যাঁচ খেলানো এবং খুন করে ফেলার পর অম্লানবদনে বসে থাকার মতো কলজেওয়ালা লোক আমি একজনকেও চিনি বলে মনে পড়ল না। আমি যাঁদের ভয়ানক ধূর্ত ধড়িবাজ বলে মনে করি, তারাও কেউ এ জিনিস ম্যানেজ করতে পারবে বলে মনে হল না। 

অতএব, গোটা ব্যাপারটা কল্পনা থেকে লিখতে হবে। যারা বলে কল্পবিজ্ঞান আর রূপকথাই খালি সম্পূর্ণ কাল্পনিক হয়, বাকি সব গল্পেই বাস্তব ছায়া ফেলে যায়, তারা কেউ কোনওদিন খুনের গল্প লেখার চেষ্টা করেনি।

কল্পনা করতে গিয়ে তিন নম্বর অসুবিধেটা হল। যা যা কল্পনা আমার পক্ষে করা সম্ভব সবই আর কেউ করে ফেলেছেন। প্লটে, গল্প বলার স্ট্রাকচারে, খুনী ধরার খেলায়, ধরা না দেওয়ার খেলায়, আগে খুনীর নাম বলে দিয়ে, খুনীর নাম আদৌ না বলে, সংলাপ, আত্মকথন, ফার্স্ট পার্সন, থার্ড পার্সন, ক্লু, রেড হেরিং যা নিয়ে যত রকম পারমুটেশন কম্বিনেশন করা সম্ভব, সব গোয়েন্দা গল্পের লেখকরা আগে করে গিয়েছেন।

এই সব নানা ঝামেলায় পড়ে আমার তিনখানা ডেডলাইন পেরিয়ে গেল। শেষমেশ আমি যেটা লিখে উঠলাম সেটাকে রহস্যগল্প বলা যায় কি না জানি না, বরং পারফেক্ট মার্ডার বা নিখুঁত খুনের ওপর আলোকপাতজনিত আলোচনা বলা যেতে পারে।

কী বললেন? পারফেক্ট মার্ডার হয় না? আমি বলছি হয়। আমার 'খুনের সহজপাঠ' ছোটগল্পে, যেটা 'বৃশ্চিক ২' রহস্যরোমাঞ্চ গল্প সংকলনের অংশ হয়ে দু'হাজার উনিশের কলকাতা বইমেলায় বেরোচ্ছে, সেটাই প্রমাণ করেছি আমি, সঙ্গে কিছু টিপসও দিয়েছি। যদি আপনাদের কারও পারফেক্ট মার্ডার করার দরকার পড়ে কখনও, দেখে নিতে পারেন।





বৃশ্চিক ২: রহস্যরোমাঞ্চ গল্প সংকলনের এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন অর্ক পৈতণ্ডী। আমার ভালো লেগেছে, মায়েরও ভালো লেগেছে। আপনাদেরও ভালো লাগবে আশা করি। আপনারা যদি কেউ বইটা কিনতে চান তা হলে নিম্নলিখিত তথ্যগুলো কাজের হতে পারে। 


বৃশ্চিক ২
প্রকাশক: অরণ্যমন
প্রকাশকাল: কলকাতা বইমেলা ২০১৯
পাওয়া যাবে:
অফলাইন~ অরণ্যমন (কলেজ স্কোয়্যার, মেলায় ৪৪৫ নম্বর স্টল), রিডবেংগলিবুকস্টোর, বইচই (ভারতী বুক স্টোর, মেলায় ৩৩৬ নম্বর স্টল)
অনলাইন: রিডবেংগলিবুকস, বইচই
পৃষ্ঠা ৩৪৪, মূল্য ২৭৫/- টাকা



January 09, 2019

কাজের গাছ অকাজের গাছ




গাছের শখ ব্যাপারটা আমার কাছে বহুদিন পর্যন্ত অবোধ্য ছিল। একুশ বছর বয়স পর্যন্ত আমি এমন একটা বাড়িতে থাকতাম যেখানে অগুনতি গাছ ছিল এবং কোনওটাই শখের ছিল না। প্রত্যেকটাই অপরিসীম কাজের। শুধু আমাদের বাড়ির নয়, আশেপাশের সব বাড়ির গাছেরাই দরকারি ছিল। বৃহস্পতিবার বৃহস্পতিবার ঠাকুরের ঘটে দেওয়ার কলা, বেলপাতা, আম্রপল্লবের জন্য আম কলা বেলগাছের জোগাড় সব বাড়িতেই থাকত, তাছাড়া কাঁঠাল পেয়ারা নারকেল সুপুরি জাতীয় গাছও সবাই নিজের বাড়িতেই পুঁতে রাখত। নিমটিমও রাখা হত, যাতে বাজার থেকে বেগুন কিনে নিমপাতা কিনতে ভুলে গেলেও মেনু থেকে নিমবেগুন বাদ না পড়ে, ছাদের পাঁচিলে চড়ে পেড়ে নিলেই মিটে যায়। 

ফুলের ব্যাপারেও তাই। এখনকার মতো তখন ঘরে ঘরে নাস্তিক আর অজ্ঞেয়বাদীর চাষ হত না; সকলেই ভগবানকে ভয় পেত। পাড়ার যে সব দাদারা দাড়ি রাখতেন, চশমা পরতেন, ভোটের আগে বাড়ি বাড়ি নাম মেলাতে আসতেন এবং কেটে ফেললেও অঞ্জলি দিতেন না, তাঁরাও অষ্টমীর রাতে কুইজ পরিচালনা করতেন। সকলের বাড়িতেই পুজোআর্চার আর পুজোআর্চার জন্য ফুলের ব্যবস্থা ছিল। টগর, কলকে, কামিনী, কাঞ্চন এ সব কায়েমি গাছের সঙ্গে সঙ্গে সিজনাল শিউলি আর গাঁদাও বাড়িতে বাড়িতে থাকত। যাঁদের থাকত না তাঁদের ভোর চারটের সময় লগা নিয়ে অন্যের বাড়ির ফুল সংগ্রহে বেরোতে হত। তার নানারকম অসুবিধে ছিল যেমন কম ঘুম, শীতকালে ঠাণ্ডা লাগা, কুকুরের তাড়া খাওয়া ইত্যাদি। উদ্যমী ফুলচোরেরা কেউ কেউ এগুলো অতিক্রম করতে সক্ষম হলেও আরেকরকম অসুবিধে থেকে তাঁদের নিস্তার ছিল না। আমার ঠাকুমার মতো কেউ না কেউ সব পাড়াতেই থাকতেন যাঁরা রাত তিনটে থেকে জানালার শিকে নাক ঠেকিয়ে বসে থাকতেন। সাত দিন, বারো মাস। নিজের বাড়ির গাছের ফুলের দিকে কেউ চোখ তুলে তাকালে আকাশবাতাস বিদীর্ণ করে তো ফেলতেনই, প্রতিবেশীর গাছের দিকে লগা এগোতে দেখলেও চিৎকার করে সতর্ক করতেন, ও বলাই, টুকাই, রত্না, ফুল নিয়া গেল। শেষে সবাই পিটিশন জমা দিয়েছিল, মাসিমা/ঠাকুমা, চেঁচাবেন/চেঁচিয়ো না, নিয়ে গেলে নিয়ে যাক।

বাড়ি ছাড়ার পরেও বেশ কয়েক বছর গাছের মধ্যে ছিলাম। চোখ এবং মনের আরামের জন্য যতখানি হলে চলে যায়, চারপাশে সবুজ তার থেকে বেশিই ছিল। সবথেকে ভালো ব্যাপার ছিল সে সবুজের অগোছালোপনা। ইউনিভার্সিটির বাগান নয়, জঙ্গলের মধ্যে ইউনিভার্সিটি। সে সব গাছ গাছের মতোই দেখতে, কেউ তাদের ছেঁটেকেটে জিরাফ, ওরাংওটাং, হিপোপটেমাসের চেহারা দিয়ে রাখেনি। 

তারপর কত কিছু দেখলাম, কত ধানে কত চাল গুনলাম। জানলাম গাছ জীবনধারণের জন্য অতটাও অপরিহার্য নয়। বিশেষ করে বড় শহরে গাড়ি ছাড়া সারভাইভাল অসম্ভব, গাছ না হলে দিব্যি চলে যায়। 

এখানে আমার একটা বাতিকের কথা স্বীকার করে রাখা ভালো। গাছ বলতে আমি রেলিং-এ ঝোলান লাল নীল সবুজ টবের গাছ এমনকি বারান্দার টবে আস্ত পামগাছকেও ধরছি না। আমি বলছি রিয়েল মাটি ফুঁড়ে বেরনো রিয়েল গাছের কথা। যারা না থাকলে আমার জীবন চলত না, সেই সব কাজের গাছের কথা। সে রকম গাছের অভাব শখের গাছে মেটাব না এই গোঁ ধরে বহুদিন পর্যন্ত আমি গাছবিহীন অস্তিত্ব কাটিয়েছি।

কিন্তু গোঁয়ারতুমি বা প্রিন্সিপল, যাই বলুন না কেন, আমার স্বভাবে নেই। যখন বোধোদয় ঘটল যে রিয়েল মাটিতে জন্মানো রিয়েল গাছ ঘেরা রিয়েল বাড়ি আমার এ জীবনে বানিয়ে উঠতে পারার আশা নেই, টবে গাছ লাগানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখলাম। পুরোটা মচকাইনি অবশ্য। ফুলটুল না লাগিয়ে একখানা কারিগাছের টব কিনে এনেছিলাম। যাতে চিঁড়ের পোলাও কিংবা উপমা বানানো হলে অন্তত কাজে লাগানো যায়। সে গাছের গল্প আগে অবান্তরে বলেছি। 

মাসছয়েক আগে একদিন অর্চিষ্মান বাড়ি ফিরে বলল, এই দেখ প্র দিয়েছে। প্র ওর কাজতুতো এবং মাঝেসাঝে উবারপুলতুতো বন্ধু। প্লাস্টিকের থলির ভেতর সবুজ পাতাটাতাশুদ্ধু টুকটুকে লাল টমেটো। প্র-এর নিজের হাতে, নিজের বারান্দায় বানানো। আমি তো ইমপ্রেসড। অর্চিষ্মান ইমপ্রেসডের থেকেও বেশি। মাঝেমাঝেই খেয়াল করি হাউ টু গ্রো ভেজিটেবলস ইন ইয়োর হোম ভিডিও দেখছে।

সিরিয়াসলি নিইনি। ডেডলাইন থাকলে আমি কাজ ফেলে ডিমের সাদা আলাদা করার যন্ত্রের ডেমোও দেখি। রান্নাঘরের শুকনো লংকার শিশি পেড়ে খান কুড়ি বিচি যখন ভেজানো হল, তখনও সিরিয়াসলি নিইনি। পরের শনি না রবি খান মার্কেটে খেয়ে ফেরার পথে মসজিদ নার্সারিতে থেমে একটা ছোট মতো টব আর কিছু মাটি কিনে আনা হল, সেও খেলা খেলাই। সে টবে কুড়িটা বিচিই পুঁতে দিলাম যখন (সব ইউটিউব ভিডিওতেই বেশি করে বীজ পোঁতার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল কারণ সম্ভবতঃ বেশিরভাগই বাঁচবে না। শখের চাষীদের হাতে সম্ভাবনা আরওই কম।) তখনও ভাবছি আলটপকা শখ। একটাও গাছ বেরোবে না আর মন উঠে যাবে। 

চারা বেরোল, কুড়িটাই। সবুজ রোগা রোগা ডাঁটি মাটি থেকে মাথা তুলল এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় লম্বা হতে লাগল। 

সিরিয়াসলি নেওয়া ছাড়া উপায় থাকল না। দৌড়ে মসজিদ নার্সারিতে গেলাম। আরও টব কেনা হল। আগেরবার খেয়ে ফেরার পথে নার্সারি যাওয়া হয়েছিল, এবার নার্সারি যেতে হবে বলে খেয়ে এলাম। চারাগুলো একটা টব থেকে তুলে চারটে টবে ছড়িয়ে রাখা হল। তারা হই হই করে বাড়তে লাগল এবং ইউটিউব বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যদ্বাণী মেনে মরে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই দেখাল না। আমরা আবার নার্সারিতে দৌড়লাম এবং বড় দেখে গোটা দশেক টব এবং মাটি নিয়ে এলাম। এবার খেতে যাওয়ার কথা মনেই রইল না। শনিরবি বারান্দায় থেবড়ে বসে রান্নাঘরের বাড়তি একখানা কাঠের হাতা সম্বল করে মাটি ঘেঁটেঘুঁটে গাছ আবার নতুন টবে ট্রান্সফার করা হল। একটা শিকড়ও যাতে না ছেঁড়ে। কুড়িটাকেই বড় করা যাবে না যে সেটা জানতাম কিন্তু জাস্ট তুলে তুলে ফেলে দেওয়া তো যায় না। সেটা তো মার্ডার। তাছাড়া কোনটাকে রাখব, কোনটাকে ফেলব? সবক’টাই তো ড্যাব ড্যাব করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কোনটাকে বলব, তুমি একটু বেশি রোগা তাই তোমাকে তুলে ফেলে দিচ্ছি? অর্চিষ্মান বলল, রাতে গিয়ে মেলা গ্রাউন্ডে পুঁতে দিয়ে আসি? শিউরে উঠলাম। অত বড় মাঠের এক কোণে এই রকম বিঘৎ খানেক চারা, ভয়েই মরে যাবে বেচারারা। আরেকবার ভাবলাম লুকিয়েচুরিয়ে টবে করে এর ওর বাড়িতে রেখে আসি। শেষপর্যন্ত কিছু করা হল না। কুড়িখানা লংকাগাছ বারান্দা জুড়ে হইহই করে বাড়তে লাগল। অফিস বেরনোর আগে ‘গ্যাস বন্ধ করেছ তো?’র থেকে ‘গাছে জল দিয়েছ তো?’ বেশি জরুরি প্রশ্নের জায়গা নিল। প্রথম যেদিন আবিষ্কার করলাম একটা গাছ কাত হয়ে পড়েছে মনে হয়েছিল আমার একটা পাঁজর কাত হয়ে গেল বুঝি। 

অবশেষে প্রায় দু’হাত লম্বা হওয়ার পর একে একে গাছেরা ক্রমশঃ ঝিমিয়ে পড়তে লাগল। নার্সারি থেকে ওষুধ নিয়ে এসে স্প্রে করলাম, জল দিলাম, চা পাতা আর ডিমের খোলার গুঁড়ো দিলাম, কিছুতেই কিছু হল না। শেষে বাড়িওয়ালির গাছ-তত্ত্বাবধায়ক বিট্টু এসে বিধান দিল, গাছেরা রোদ কম পাচ্ছে। বুকে পাথর রেখে টবগুলোকে ছাদে কাকিমার অন্য কোটি কোটি গাছের সঙ্গে রেখে এলাম।  

অকাজের গাছসংক্রান্ত প্রিন্সিপলটাও ভেঙে গেছে। সহকর্মীদের ফেলে যাওয়া পাতাবাহার আর সুখী বাঁশেরা আমার অফিসের ডেস্কের প্রায় সবটুকু ফাঁকা জায়গা দখল করে ফেলেছে। ওরা কোনও কাজে লাগে না। আবার লাগেও। যখন আর কারও মুখ দর্শন করতে ইচ্ছে করে না, আমি ওদের দিকে তাকিয়ে থাকি। পেছনের দেওয়ালের জানালা থেকে সারা সকালদুপুর রোদ এসে পড়ে ডেস্কটপের স্ক্রিনের ওপর, কিচ্ছু দেখা যায় না। ঘাড় ঘুরিয়ে ভিউ দেখা হয় না বলে এতদিন ও ব্লাইন্ড টানাই থাকত। ইদানীং আমার ধারণা হয়েছে যে গায়ে রোদ লাগাটা গাছেদের স্বাস্থ্যের পক্ষে জরুরি কাজেই আমি ব্লাইন্ড খুলে রাখি এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোকেশন বদলাতে থাকা রোদের পিছু ধাওয়া করে গাছেদের জায়গা বদলাই। ব্লাইন্ড বন্ধ করার কুচিন্তাও মাথায় আসে না। কম্পিউটারের স্ক্রিনের প্রতিফলন আগের মতোই চোখ ধাঁধিয়ে দেয় কিন্তু আমি মনিটর বেঁকিয়েচুরিয়ে যথাসম্ভব রোদের নাগালের বাইরে রাখার চেষ্টা করি, ব্যর্থ হলে গা করি না। কাজ করে তো উদ্ধার করে দিচ্ছি, তার থেকে ওদের গায়ে রোদ লাগাটা অনেক বেশি জরুরি। গাছগুলোকে রোদে রেখে সিটে ফিরে এসে দেখি, একটা ছোট মতো পাতা বড় পাতাদের ছায়ার আড়ালে পড়ে গেছে। উঠে গিয়ে আবার এক মিলিমিটার ক্লকওয়াইজ ঘুরিয়ে পাতাটাকে রোদের আওতায় দিয়ে আসি। পাতাটা খুশিতে চকচক করে ওঠে।

জ্যান্ত জিনিসের যত্ন করার এই একটা সুবিধে। সাড়া দেয়। যত্ন করলে বাড়ে, চকচক করে। অযত্নে ম্লান হয়। সে গ্লানির কথা আর কী বলব। পুরনো বাড়ির বারান্দায় ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুর আসত সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত; এক বছর মে জুন জুলাইতে চোখের সামনে কারিগাছ জ্বলে গেল। তার মধ্যে বেড়াতে গিয়েছিলাম দিন দশেকের জন্য। এসে দেখি একটি পাতাও নেই, খালি কয়েকটা কাঠি হাত তুলে হাহাকার করছে। নিজেকে খুনী মনে হতে লাগল। ও দৃশ্য যাতে দেখতে না হয়,বারান্দায় যাওয়া বন্ধ করে দিলাম প্রায়। অর্চিষ্মানের সাহস, ধৈর্য দুইই আমার থেকে বেশি, ওই কাঠির গায়ে দুবেলা জল ঢালত, উইদাউট ফেল। তারপর সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ একদিন বারান্দা থেকে জলের মগ হাতে নিয়ে এসে বলল, একবার দেখবে এস। গিয়ে দেখলাম কাঠির শরীরে সবুজ! পাতা তাকে তখনও বলা চলে না, জাস্ট একটা বিন্দু, কিন্তু সবুজ বিন্দু। আমার ধারণা হল অর্চিষ্মানের হাতযশেই এ মির‍্যাকল ঘটেছে এবং আমি এখন নাক গলালেই সবুজ বিন্দু হাওয়া হয়ে যাবে। কাজেই আমি নিজে জল না দিয়ে, পাঁচশো বার জল দেওয়ার কথা মনে করিয়ে অর্চিষ্মানের জীবন অতিষ্ঠ করে তুললাম। কারি গাছ পাতায় পাতায় ভরে উঠল।

এই শীতে কারিগাছের আবার একটু কাবু অবস্থা চলছে; যে ক’টা পাতা আছে বেশিরভাগই হলদে, ভঙ্গুর। কিন্তু বেশ কয়েকটা শীতগ্রীষ্ম কাটিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা আর সাহস খানিকটা বেড়েছে। আশা /বিশ্বাস রেখেছি যে শীত কমলে কারিগাছ আবার স্বমহিমায় ফিরবে। রোজ বারান্দায় গিয়ে বলছি, ফাইট কারিদা, ফাইট, আর দু’মাস, বসন্ত এল বলে।

অর্চিষ্মান প্র-কে জিজ্ঞাসা করেছিল, নিজের গাছের টমেটো দিয়ে তরকারি রাঁধলে খেতে এক্সট্রা ভালো লাগে নিশ্চয়? প্র বলেছিল, খাই না তো, দেখতেই ভালো লাগে। কাঁচালংকা গাছ লাগানর ইচ্ছে অর্চিষ্মানের কেন হয়েছিল জিজ্ঞাসা করা হয়নি, আমার নিজেরই বা গোড়াতে কী প্ল্যান ছিল ভুলে গেছি, কিন্তু যে মুহূর্তে মাটি থেকে ওই সবুজ মাথাগুলো উঠল সে মুহূর্ত থেকে ওরা বড় হয়ে লংকা ফলাবে আর সে সব লংকা গরম ভাতে ঘি আলুসেদ্ধর সঙ্গে কামড়ে কামড়ে খাব এ সব চিন্তা অন্তর্হিত হয়েছিল। জরুরি ছিল ওরাই। ওদের বাঁচাটা এবং সুস্থ থাকাটা। কাত হয়ে না পড়াটা। মা ফলেষু কদাচন-র এর থেকে ভালো হাতেকলমে প্রয়োগ জীবনে কমই করেছি। গোটাটাই যদি বিফলে যেত কিছু যেত-আসত না, কিন্তু ফল যখন ধরেছেই তখন সে ফলের ছবি আপনাদের দেখাই।






January 04, 2019

Not more than 4 Hours a day keeps dyspepsia away



In a world where no one is compelled to work more than four hours a day, every person possessed of scientific curiosity will be able to indulge it, and every painter will be able to paint without starving, however excellent his pictures may be. Young writers will not be obliged to draw attention to themselves by sensational potboilers, with a view to acquiring the economic independence needed for monumental works, for which, when the time at last comes, they will have lost the taste and the capacity.
[…]
Above all, there will be happiness and joy of life, instead of frayed nerves, weariness, and dyspepsia. The work exacted will be enough to make leisure delightful, but not enough to produce exhaustion. Since men will not be tired in their spare time, they will not demand only such amusements as are passive and vapid. At least 1 per cent will probably devote the time not spent in professional work to pursuits of some public importance, and, since they will not depend upon these pursuits for their livelihood, their originality will be unhampered, and there will be no need to conform to the standards set by elderly pundits. But it is not only in these exceptional cases that the advantages of leisure will appear. Ordinary men and women, having the opportunity of a happy life, will become more kindly and less persecuting and less inclined to view others with suspicion. The taste for war will die out, partly for this reason, and partly because it will involve long and severe work for all. Good nature is, of all moral qualities, the one that the world needs most, and good nature is the result of ease and security, not of a life of arduous struggle. Modern methods of production have given us the possibility of ease and security for all; we have chosen, instead, to have overwork for some and starvation for the others. Hitherto we have continued to be as energetic as we were before there were machines; in this we have been foolish, but there is no reason to go on being foolish for ever.
                                                         Bertrand Russell, In Praise of Idleness

ঋণস্বীকার



January 02, 2019

নভেম্বর





চন্দ্রবিন্দুর কোনও একটা গানের লাইনে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘কে না ভালোবাসে শৈশব’। উনি যে ভালোবাসেন সে তো বোঝাই যাচ্ছে, ওঁর বানানো প্রথম সিনেমাটা দেখলেও সেটা স্পষ্ট। (দ্বিতীয়টা  তৃতীয়টা এখনও দেখা হয়নি, কবে টিভিতে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হবে হত্যে দিয়ে বসে আছি। আপনারা দেখেছেন নাকি কেউ ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’?) অনিন্দ্য একা নন, জিজ্ঞাসা করলে অধিকাংশ লোকেই শৈশব ভালোবাসেন বলে দাবি করবেন। খারাপ লাগার তো কিছু নেই, খাওয়াদাওয়ার চিন্তা নেই, বসের গালি খাওয়া নেই, গুরুজনেদের ঘাড়ে বডি-ফেলা জীবনযাপন। তলিয়ে দেখলে কী বেরোবে অবশ্য বলা যায় না। আমার এমনিতে তলিয়ে-টলিয়ে দেখার বদভ্যেস নেই কিন্তু সেদিন আচমকা একটা সত্য, শৈশব-সংক্রান্ত, উদ্ঘাটিত হল। নিতান্ত অনাড়ম্বর সেটিং-এ। কোনও এক শনিরবি, সাড়ে দশটা নাগাদ বিছানায় শুয়ে শুয়ে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে খেলতে কিংবা মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার এপিসোড অটো প্লে-তে দেখত দেখতে (দুটো একইসঙ্গে করতে করতেও হতে পারে) আকস্মিক আমি ওই মুহূর্তের অসামান্য সুখ উপলব্ধি করতে পারলাম। এবং গ্রেটফুল হলাম।

গ্রেটফুল হলাম বড় হওয়ার জন্যও। শৈশবের শনিরবিগুলো মনে পড়ে গেল। শনিবার হলে সকাল সাড়ে দশটার সময় প্রার্থনার লাইনে দাঁড়িয়ে আছি আর রবিবার সাড়ে দশটা হলে তবলার মাস্টারমশাই এসেছেন, হাঁ করে জৌনপুরী কিংবা কালিংড়া ধরেছি, গান সেরে স্নানে যেতে হবে, তারপর গাজরসেদ্ধ দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে বাধ্যতামূলক ঘুম থেকে উঠে ট্রেনে চড়ে গানের স্কুল। গান ভালো করে করতে না পারলে বা মাঝপথে তান কাটলে মাস্টারমশাই মাথা নাড়বেন। মা এমন মুখ করবেন যেন আমি নয়, তিনিই অংক পরীক্ষায় গোল্লা পেয়েছেন। 

এ সব শনিরবির সঙ্গে সে সব শনিরবি? কীসে আর কীসে।

ঠাট্টা মনে করতে পারেন কেউ কেউ, যদিও আমি আপাদমস্তক সিরিয়াস হয়েই বলছি। আমার বিশ্বাস করি বড়দের শৈশব ভালোলাগে কারণ বড়রা এ ব্যাপারে ভয়ানক ছেলেমানুষ, শৈশবের যত ভালো জিনিসগুলোই খুঁটে খুঁটে মনে রাখে আর যত খারাপ জিনিস ঝটপট ভুলে যায়। হ্যাঁ, শৈশবে আপনি জীবনের প্রথম আইসক্রিম খাচ্ছেন, প্রথমবার জায়ান্ট হুইল চড়ছেন, প্রথমবার মাহেশের রথের মেলায় গিয়ে পাঁপড়ভাজা খেয়ে আর মাটির ট্রাফিক পুলিসের মালিক হয়ে বাবার সাইকেলের সামনের রডে লাগান সিটে দু’পা ঝুলিয়ে বসে বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু শৈশবে আরও অনেক জিনিস প্রথমবার হচ্ছে। শৈশবে আপনি প্রথমবার টের পাচ্ছেন যে যে ছোট্ট মেয়েটিকে বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে আপনার মন চায়, সে আপনার ফ্রেন্ডও হতে চায় না। শৈশবে আপনি প্রথম জানছেন সান্ত্বনা পুরস্কার বলে একটা ব্যাপার হয় এবং সেটা প্রতি বছর আপনার জন্য বাঁধা থাকে। শৈশবে ভিড় ট্রেনে প্রথম একটা গোঁফওয়ালা লোক আপনার দু’পায়ের মাঝখানে হাত দেয়। 

এবং সেই লোকটার মুখ, সব ভুক্তভোগী ছোটরাই জানে, প্রথম আইসক্রিমের স্বাদের থেকে স্মৃতিতে অনেক বেশি টেঁকসই। 

আমাদের শিল্প সাহিত্য গান কবিতায় ওই দ্বিতীয় শৈশবটা অনুপস্থিত। কাশের বনে ফড়িং-এর পেছনে দৌড়নো নিয়ে কত গান কত কবিতা বাঁধা হল, কিন্তু সে ফড়িংকে একবার ধরে ফেলার পর পটাং পটাং ডানা ছিঁড়ে তার গায়ে সুতো বেঁধে বন বন করে ঘোরানো কিংবা শিশিতে বন্ধ করে রাখার অংশটুকু নিয়ে সবাই স্পিকটি নট। 

ব্যতিক্রমও আছে। ইংরেজ লেখক গ্রাহাম গ্রীন মূলতঃ থ্রিলার এবং ধর্মকেন্দ্রিক উপন্যাস লেখার জন্য বিখ্যাত ছিলেন কিন্তু তিনি ছোটগল্পও লিখেছেন অনেক। উনিশশো চুয়ান্ন সালে প্রকাশিত তাঁর ‘টোয়েন্টি ওয়ান স্টোরিজ’ ছোটগল্প সংকলনের বেশ কয়েকটি গল্পের থিম সেই সন্ত্রস্ত, ঈর্ষান্বিত, হিংস্র, আশাহত, বঞ্চিত, অবদমিত শৈশব যা বড়রা ভুলে যায় বা ভুলে থাকে। টোয়েন্টি ওয়ান স্টোরিজ-এর বেশিরভাগ গল্পই পড়ার পর ভোল বদলানোর লোভ জেগেছিল কিন্তু শেষমেশ ‘দ্য ইনোসেন্ট’ গল্পটি বাকিদের হারিয়ে দিল।

‘দ্য ইনোসেন্ট’ গ্রীন লিখেছিলেন উনিশশো সাঁইত্রিশ সালে। উনিশশো সাতচল্লিশ সালে গল্পতি আরও আঠেরোটি গল্পের সঙ্গে ‘নাইনটিন স্টোরিজ’ নামের ছোটগল্পের সংকলনে আত্মপ্রকাশ করে। সাত বছর পর উনিশশো চুয়ান্ন সালে আরও তিনটে ছোটগল্প জুড়ে এবং একটি গল্প বাদ দিয়ে ‘টোয়েন্টি ওয়ান স্টোরিজ’ নামের ছোটগল্প সংকলনে ঠাঁই পায়। চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে ‘দ্য ইনোসেন্ট’-এর ছায়া অবলম্বনের লেখা আমার ছোটগল্প ‘নভেম্বর’-এর লিংক এই রইল।



December 31, 2018

আমার দু'হাজার উনিশের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ




অবশেষে সেই ক্ষণ উপস্থিত। দুহাজার আঠেরো, যা কি না কল্পবিজ্ঞানের কোনও বছর, তার ফুরিয়ে যাওয়ার। এই সব মুহূর্তে বিশ্বাস করতেই হয়, দু’হাজার বাইশ, দু’হাজার তেইশ ইত্যাদি সাল, আর্থার সি ক্লার্ক কিংবা অদ্রীশ বর্ধনের বইয়ের পাতা ছাড়া যারা কোথাও নেই, থাকা উচিত নয়, সেগুলোরও এই রকম স্মরণসভা লেখার সময় আসবে। যে রেটে চলছে, আমিই লিখব। পাকা চুল হয়তো আরও কয়েকটা বাড়বে, সম্ভবতঃ অনুতাপও, কিন্তু এ ঘটনা ঘটবে।

বছরের এই সময়টা আমার প্রিয়। গরম লাগছে না, ঘাম হচ্ছে না। চারদিকে গত বারো মাসের বারোটি বেস্ট বই, তেরোটি বেস্ট সিনেমা, সতেরোটি বেস্ট ছবির লিস্ট। উৎসব-উৎসব ফিলিং, গিভ অ্যান্ড টেক-বিহীন। সবথেকে ভালো খোলস ছাড়ানোর, শুকনো আমি খসে যাওয়ার অনুভূতিটা। একটাই খারাপ, সামনের বছরের রেজলিউশনসংক্রান্ত স্বপ্নের পোলাওয়ে ঘি ঢালার স্বপ্ন শেষ, কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে সত্যি সত্যি সেগুলো রক্ষার্থে নামতে হবে। বিচক্ষণরা এই জন্য রেজলিউশন নেওয়ার বোকামো করেন না এবং প্রত্যাশা পূর্ণ না করার ফেলিওর থেকে নিজেকে মুক্তি দেন। তাছাড়া রেজলিউশন নেওয়া সহজ, শক্ত হচ্ছে নিজেকে বদলানো। আর যদি সেটা না পারা যায় তাহলে নতুন কিছু হওয়ার চান্স নেই। যা এতদিন হয়ে এসেছে তারই পুনরাবৃত্তি হবে। আর নিজেকে আদৌ বদলান যায় কি না সে নিয়ে তো সংশয়ের বিরাট স্কোপ রয়েছেই। যদি পুরনো কুন্তলার টাইপ হয় রেজলিউশন নেওয়ার জন্য নেওয়া এবং সেগুলো রক্ষা করতে না পারা, আর পুরনো কুন্তলা যদি পুরনো কুন্তলাই থাকে, তাহলে নতুন বছরের নতুন রেজলিউশনের পরিণতিই পুরনোই হবে।

কিন্তু যদি আমরা আমাদের টাইপের দাসই হয়ে থাকি, তাহলে রেজলিউশন নেওয়া থেকেও আমার মুক্তি নেই। কারণ আমার টাইপ রেজলিউশন নেওয়া। নেশা, পেশা এবং স্বাস্থ্য, এই তিন ক্ষেত্র জুড়ে আমার দু’হাজার উনিশের রেজলিউশন নেওয়া শেষ। অনেকে রেজলিউশনে অবিশ্বাসীরা ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার প্রেফার করেন। এমন একটা শব্দ যা তাঁদের সামনের বছরের কম্পাস হবে।  আমার আরেকটা টাইপ হচ্ছে যেটাতে বিশ্বাস করা সেটাতে খুব জোরদার বিশ্বাস করা। যাতে যাতে কাজ দেওয়া সম্ভব বা কাজ দিলেও দিতে পারে বা কারও কাজ দিয়েছে শোনা গেছে, রেজলিউশনসংক্রান্ত এমন সমস্ত টোটকা তাগা তাবিজ মাদুলি, ঝাড়ফুঁক, জাদুটোনা, বাটি-চালানোতে আমি বিশ্বাস করি। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। আমার দু’হাজার উনিশের শব্দ ‘শেষ’। এ বছর আমি বই পড়া শুরু করলে শেষ করব। লেখা শুরু করলে শেষ করব। আগের কিংবা তারও আগের বছর শুরু হয়ে যা যা আধখানা হয়ে পড়ে আছে সেগুলো শেষ করব। যা যা শুরু করিনি, যদি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিই, শেষ করব।

আপনারা যাঁরা যা টাইপই ( ‘টাইপই’ লিখতে গিয়ে ‘টাইপো’ লিখে ফেলেছিলাম, অসুবিধে নেই, আপনি টাইপো হলেও এ বার্তা আপনার জন্য প্রযোজ্য) হোন না কেন, রেজলিউশন-নেওয়া, না-নেওয়া, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, হঠকারী, বিচক্ষণ  - আপনাদের সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। দু’হাজার উনিশ খুব ভালো আর খুব আনন্দে কাটুক। যা চান তাই যেন পান। 

হ্যাপি নিউ ইয়ার। 


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.