Posts

অরুণাচল ৩ঃ লস্ট

সকালে উঠে দাঁত মেজে, কফি বানিয়ে, খাতাপেন নিয়ে রোয়িং-এর স্টোন হিলস কটেজের বারান্দায় এসে বসেছি। আজ সোমবার। শনিবার ক্লাস টেস্ট। রবিবার ফাইন্যাল পরীক্ষা। কাল প্রায় কিছুই পড়িনি। আজ না পড়লে গোল্লা পাব। অর্চিষ্মান বলে, কুন্তলা নম্বর ইম্পরট্যান্ট নয়, শেখাটাই ইম্পরট্যান্ট। বেশি নম্বর পেলেই বেশি শেখা বা কম নম্বর পেলে কম শেখার কোরিলেশন অত সরল এবং সহজ নয়। আমার এক ইউনিভার্সিটির বন্ধুর মতে অবশ্য অতটাই। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল, আসলে গ্র্যাজুয়েশনে ইকনমিক্সটা ভালো করে শিখতে গেলাম কি না তাই ফার্স্ট ক্লাস ফসকে গেল। চব্বিশ বছর আগে থতমত খেয়েছিলাম। এখন হলে খেতাম না। কারণ এখন জানি সব মায়া হোক না হোক সবই কোপিং। আমার পড়ার মেটেরিয়াল হচ্ছে ক্লাসনোট। নোট অনেকেই নেয়, খুব ভালো নেয়। স্প্যানিশ ক্লাসমেটদের কারও কারও নোটখাতা খাতা কম, কালার কোডেড এক্সেল শিট বেশি। আপনি যতক্ষণে কন্ট্রোল এফ টিপে পি টাইপ করে ও -এর দিকে আঙুল বাড়াবেন, সে ততক্ষণে জাবদা খাতার মাথা থেকে উজিয়ে থাকা এক কোটি রংবেরঙের স্টিকি নোটসের টিকি ধরে 'পজেসিভোস টনিকোস' বার করে দেবে। আমার নোট তার ধারেকাছে না। আমার নোট নেওয়ার মধ্যে পাঁচটা সাঁইত্রিশে হাওড়া ব্...

পুজো

ষষ্ঠী গতকাল অর্থাৎ পঞ্চমীতে কফিশপে একজন জানতে চাইছিল আমি অন্যদিনের থেকে এক্সট্রা হাঁইমাই করে টাইপ করছি কেন। বললাম, কারণ আমার একটা জিনিস শেষ করতে হবে, কাল থেকে পুজো শুরু হবে, আজ রাতেই সবাই দিল্লি ঢুকছে, আর যদিও আমার বয়স পাঁচ নয় এবং পুজোর সময় কাজ ডকে তুলে বসে থাকার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই, স্টিল আই উইল বি সো এক্সাইটেড যে সামনের পাঁচদিন কিছুই করতে পারব না। লোকটা বলল, তা তো বটেই তা তো বটেই। ভদ্রতা করল নির্ঘাত। পুজো অনেকভাবে আসে। ডিব্রুগড় থেকে বেরিয়ে হাইওয়ের দুপাশের মাঠে দৈত্যাকার কাশফুলে চড়ে। গেটের সামনে বাড়িওয়ালার গাছ থেকে ছত্রাকার শিউলি ডিঙোতে ডিঙোতে। অর্চিষ্মান যখন রাস্তায় বেরিয়ে বলে ওঠে, বস্‌স্‌স্‌ এই ওয়েদারটা... বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, সে দীর্ঘশ্বাসে ভেসে । বিস্ময় সুন্দরের প্রতি। আর দীর্ঘশ্বাস সেই সত্যের প্রতি যে এ জিনিস থাকবে না, সব ভালো জিনিসের মতো পলক ফেলতে ফুড়ুৎ হবে। কয়েকবছর ধরে হোয়াটসঅ্যাপে দুর্গাপুজো মিট গ্রুপেও পুজো আসছে। চাকরিসূত্রে এন সি আর-এ ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বন্ধুবান্ধব পুজোতে সি আর পার্কের আশেপাশে এয়ারবিএনবিতে এসে থাকে। দেড় সপ্তাহ আগে থেকে, আমার ধারণা এয়ারবিএনবি বুকিং সারা...

অরুণাচল ২ঃ নিজে নিজে, একা একা

একগাদা দোসামোসা খেয়ে উঠেছি, এদিকে সিটবেল্ট সাইন নিভতেই গলা উঁচু করে উঁকিঝুঁকি মারছি কখন ট্রলি দেখা যায়। মনে করার চেষ্টা করছি, কী কী বুক করা হয়েছিল টিকিটের সঙ্গে। মনে পড়েছে। অর্চিষ্মান চিকেন কাঠি রোল। আমি ম্যাজিক উপমা। বাটির ঢাকনা খুলে গরম জল ঢেলে চট করে ঢাকনা দিয়ে বিড়বিড় মন্ত্র পড়ে বাটিবন্ধন সেরে দিদিমণি সে মন্ত্রঃপূত বাটি আমাকে সোপর্দ করবেন,  শত কৌতূহলেও যেন পাঁচ মিনিট পূর্ণ হওয়ার আগে ঢাকনা না খুলি, খুললেই রাজপুত্রের বদলে বাঁদর, নাকের বদলে নরুন, উপমার বদলে ভুষি। জীবনের দীর্ঘতম পাঁচ মিনিটে পনেরোবার ঘড়ি দেখে ফাইন্যালি যখন ঢাকনা তুলব, বাটির মধ্যে ম্যাজিকের মতো উপমা আবির্ভূত হবে। মাইন্ড ওভার ম্যাজিক উপমা করতে ল্যাপটপ খাটালাম। অর্চিষ্মান অলরেডি খাটিয়ে ফেলেছে। বেশিক্ষণ অভিনয় করতে হল না, ট্রলি দেখা গেল। আমার থেকেও স্পিডে ল্যাপটপ গুটিয়ে কোলে নামিয়েছে অর্চিষ্মান। ট্রে ঝেড়েটেড়ে সোজা হয়ে বসেছে। একঘণ্টা লেটে ডিব্রুগড়ে নামলাম। বিমানবন্দরের বাইরে গার্জেন গণ্ডারের পাশে শিশু গণ্ডারের ভাস্কর্য। এয়ারপ্লেন মোড অফ করা মাত্র অর্চিষ্মানের ফোনে বান ডেকেছে। আমিও ফোন কানে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু আমার ফোনের উল্...

অরুণাচল ১ঃ অ্যান্ড আই সিনসিয়ারলি উইশ টু রাইট ইট কুইকলি

উপদেশ বা জ্ঞান নিয়ে আমার একটা থিওরি আছে। একটা প্র্যাকটিকালও আছে, এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বার করে দেওয়ার, কিন্তু আপাততঃ থিওরির কথাই হোক। আমার মতে উপদেশের ভালোমন্দ নির্ধারণের ক্রাইটেরিয়া হচ্ছে প্রয়োগক্ষেত্রের আয়তন। যে উপদেশ যত বেশিসংখ্যক ঘটে কাঁঠালি কলা, সে উপদেশের মান তত ভালো। উদাহরণ, পরিশ্রমের বিকল্প নেই। পকেটমারিতে উন্নতি করতে চাইলেও পরিশ্রম। পি এইচ ডি রেকর্ড টাইমে শেষ করতে চাইলেও পরিশ্রম। ফলসিফায়েবিলিটি প্রায়, প্রায় না, সম্পূর্ণ শূন্য। এর নিচের ধাপের উপদেশের উদাহরণ হচ্ছে পরচর্চা মহাপাপ। মহাও নয়, পাপও নয়, বিপজ্জনক ডেফিনিটলি। নিন্দের নিরাপদতম ক্যান্ডিডেটরা নৈর্ব্যক্তিক। আবহাওয়া। বাংলা সিনেমা। শারদীয়া সাহিত্য। চান্স পেলেই নিন্দে করুন। নিন্দে করে শুইয়ে দিন। ব্যক্তিবাচকের নিন্দে করতে হলে কালেক্টিভ নিয়ে শুরু করুন। আজকালকার প্রজন্ম। নারীবাদী। নিওলিব্যারালস। বুর্জোয়া পুঁজিবাদী। ব্যক্তিচর্চার আরাম করতে হলে শাহরুখ খান টাইপের লোক বাছুন, যিনি তারকা কাজেই পুরোপুরি ব্যক্তি নন। যেটা করবেন না সেটা হচ্ছে কমন চেনার সঙ্গে বসে আর একজন কমন চেনার নিন্দে। কর্মফল বা কেস - অবধারিত। অ্যাকচুয়ালি, কমন...

হোয়াট উই ডোন্ট হ্যাভ

মেলার ওপেনিং নাইটে গেয়েছিলেন মনোময় ভট্টাচার্য। খুবই দক্ষ শিল্পী। তালিম তো আছেই, বহুদিন ধরে স্টেজে উঠছেন, স্টেজ ক্রাফটও আয়ত্ত্ব। রামপ্রসাদ থেকে রবীন্দ্র থেকে নজরুল - সবই ভালো গান। এবং যথোপযুক্ত হাঁ করেন। কিন্তু সে তো জানাই কথা। কারণ ভালো গান গাইতে গেলে ... রবীন্দ্রসংগীত ও রহস্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করলেন মনোময়। বলুন তো কী গাইব? বর্ষার গান, বিটের গান, সবার চেনা গান। অর্চিষ্মান কানের কাছে মুখ এনে বলল, বল তো দেখি কুন্তলা কোন গান করবেন। মন মোর মেঘের সঙ্গী? অর্চিষ্মান বলল, উঁহু ওইটা গাইবে, আরে বল না, ওই যে গো, যে গানটায় যে উত্তমকুমার আর মাধবী মাঠের মধ্যে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে। ময়দানে সম্ভবতঃ তবে ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োতেও হতে পারে, হুলিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, তার মধ্যে উত্তমকুমার হেঁটে হেঁটে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে এল, মাধবীও পিছু পিছু...নির্ঘাত তিন মাসের কম প্রেম। বাজনা শুরু হল,মনোময়ের মনোমুগ্ধকর গলা বেজে উঠল। চেনাশোনার কোন বাইরে, যেখানে পথ নাই নাই রে, সেখানে অকারণে যায় ছুটে... মনোময় আঙুল তুললেন, প্যান্ডেল ফেটে পড়ল। পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে, পাগল আমার মন জেগে ওঠে। * পৃথিবীর আট বিলিয়ন লোককে নিশ্ছিদ্র দুই দলে ...

তুলির চয়েস

এই পোস্টটা মূলতঃ পাতা ভরানোর। অনেকদিন খালি পড়ে আছে। পৌষমেলার অন্তিম পর্ব লেখাও চলছে। আরও অনেক কিছু চলছে, কিছুই শেষ হচ্ছে না। নারীদিবসের পুণ্য অবকাশে আনন্দবাজারের রবিবাসরীয়-তে আমার একটা গল্প বেরিয়েছিল। গল্প চাওয়ার সময় আমাকে ওঁরা আটশো শব্দ আর সাত দিন বেঁধে দিয়েছিলেন। শব্দসংখ্যার ব্যাপারে জানি না, সময়সীমা কাজের জিনিস। না থাকলে কী হয় আমার জীবন তার প্রমাণ। গল্পটা ছাপার আগে ওঁরা সম্পাদনা করেছিলেন, করবেন জানতাম, কোথায় কোথায় করবেন সে সম্পর্কেও আভাস ছিল। লাইনে লাইনে এত ইংরিজি শব্দ অ্যালাউ করবেন না, আর ওই অপ্রাসঙ্গিক 'ফাক'ও কাটবেন।  তবু ওই সব শুদ্ধুই পাঠিয়েছিলাম। কারণ আমি শ্রমবিভাজনে বিশ্বাস করি। লেখকের কাজ লেখা, সম্পাদকের কাজ সম্পাদনা করা। আমার দ্বারা যদ্দুর হয় যা হয় আমি লিখব, তারপর সম্পাদক বুঝবেন  কী কাটবেন কী রাখবেন, আদৌ রাখবেন কি না। প্রকাশক বুঝবেন আদৌ প্রকাশ করবেন কি না। পাঠক বুঝবেন আদৌ পড়বেন কি না। এঁরা আমার লেখার এক লাইনও লিখে দেবেন সে আশা আমি করি না, কাজেই এঁদের কাজও এক কণাও আমি করে দেব না। অধিকাংশ বইয়ের শেষে ধন্যবাদজ্ঞাপনে দরাজ লেখকরা লেখেন - বই লেখা নাকি টিমওয়ার্ক। আমার বুক ধড়...