July 18, 2019

১৪ জুলাই, ২০১৯



আমার মা মারা গেছেন গত ১৪ই জুলাই। অবান্তরে কী লিখব, কেন লিখব কিছুই আমার কাছে আর স্পষ্ট নয়। সময় এ ধোঁয়াশা কাটিয়ে দেবে আশায় আছি। তখন আবার ফিরে আসব। ততদিনের জন্য আমার অনুপস্থিতি মার্জনা করবেন।

July 11, 2019

ফাদার ব্রাউন ও অভিশপ্ত বই রহস্য



প্রায় দু’বছর হতে চলল, গল্পটি অনুবাদের বরাত এসেছিল। সংকলনে প্রকাশ করা হবে বলে। সে প্ল্যান নির্ঘাত বাতিল হয়েছে। আমি ভাবলাম আর বসিয়ে বসিয়ে ডিম পাড়িয়ে লাভ নেই, অবান্তরেই প্রকাশ করে দেওয়া যাক। অনুবাদটি জি কে চেস্টারটনের ফাদার ব্রাউন সিরিজের একটি গল্প ‘দ্য ব্লাস্ট অফ দ্য বুক’ এর। বিশুদ্ধ অনুবাদ, ভাবানুবাদটাদ নয়। পড়ে জানাবেন কেমন লাগল।




উৎস গুগল ইমেজেস


*****


ফাদার ব্রাউন ও অভিশপ্ত বই রহস্য


মূল গল্পঃ The Blast of the Book
লেখকঃ G K Chesterton



প্রফেসর ওপেনশ সারাজীবন ভূতপ্রেতআত্মা নিয়ে গবেষণা করেছেন, কিন্তু  তিনি নিজে ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করেন কি না সেটা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। এই ধোঁয়াশা সৃষ্টিতে প্রফেসরের অবদানই ছিল সর্বাধিক। তাঁকে কেউ ‘বিশ্বাসী’ বলে দাগাতে চাইলে তিনি রেগে আগুন হতেন। শয়ে শয়ে উদাহরণের ঝুলি খুলে দেখাতেন কীভাবে তিনি প্রেতচর্চা নিয়ে একের পর এক ভাঁওতাবাজি ধরে দিয়েছেন।  আবার তাঁর সামনে যারা ‘ভূতটুত কিছু নেই, যত বাজে কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দিত সেইসব বস্তুবাদীদেরও তিনি ছেড়ে কথা বলতেন না। আজীবনের গবেষণা আর সংগৃহীত প্রমাণের ঝুলি থেকে এমন সব অলৌকিক ঘটনা হাজির করতেন, অতি বড় যুক্তিবাদীও সে সবের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ঘেমে উঠত।

মোদ্দা কথা, বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী কোনও দলকেই প্রফেসর ওপেনশ রেয়াত করতেন না এবং সুযোগ পেলে দু’দলের সঙ্গেই তর্কযুদ্ধে নামতেন।

এক দুপুরবেলা এ রকমই এক যুদ্ধ সেরে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন প্রফেসর। বাকবিতণ্ডার জেরে তাঁর মাথা তখনও গরম হয়ে ছিল। মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল নেড়ে, লোকের গণ্ডমূর্খতায় নতুন করে চমৎকৃত হতে হতে গজগজ করতে করতে হাঁটছিলেন তিনি। এমন সময় চোখ তুলেই তিনি দেখলেন রাস্তার উল্টোদিক থেকে একজন ভারি নিরীহ, ছোটখাটো চেহারার, কালো পোশাক পরা পাদরি হেঁটে হেঁটে আসছেন।

প্রফেসরের রাগ ঝপ করে পড়ে গেল। দু’হাত বাড়িয়ে তিনি হুংকার ছাড়লেন, ‘আরে, ফাদার ব্রাউন যে! কোথায় চললেন এদিকে?’

ফাদারের তেমন কোনও জরুরি কাজ নেই শুনে তাঁকে পাকড়াও করে প্রফেসর নিয়ে চললেন নিজের গন্তব্যের দিকে। হাতপা নেড়ে, চেঁচিয়েমেচিয়ে তাঁর সাম্প্রতিকতম তর্কে জয়ের বর্ণনা দিতে দিতে চললেন প্রফেসর, আর তাঁর পাশে পাশে, ‘বাঃ’, ‘চমৎকার’, ‘যা বলেছেন’, ইত্যাদি ফোড়ন দিতে দিতে চললেন গোলমুখো ফাদার ব্রাউন।

প্রফেসর বললেন, ‘উজবুকগুলো খালি জিজ্ঞাসা করে আমার প্রতিপাদ্যটা কী? ইহজগতের বাইরে কিছু আছে না নেই? অপোগণ্ডগুলো কিছুতেই বুঝবে না যে  আমি বিজ্ঞানী। আর বিজ্ঞানীর কাজ কিছু প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা নয়। বিজ্ঞানীর কাজ সত্যিটাকে খোঁজা।’

‘ঠিক ঠিক।’ বললেন ফাদার ব্রাউন।

পকেট থেকে পাইপ বার করে ধরিয়ে প্রফেসর অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। বড় করে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘বুঝলেন ফাদার, আমি এখনও স্পষ্টাস্পষ্টি কিছু বলার জায়গায় আসিনি, তবে একটা বিষয়ে ক্রমশ নিজের মনে নিশ্চিত হচ্ছি।’

ফাদার ব্রাউনের ভুরু কৌতূহলের ভঙ্গি করল। 

‘আমি ক্রমে নিশ্চিত হচ্ছি যে যদি কিছুর খোঁজ পাওয়ার থাকে তাহলে সেটা এইসব প্ল্যানচেট, মিডিয়াম, হানাবাড়ি, ভুতবাংলো - এ সবে খুঁজলে পাওয়া যাবে না। এ সবের মধ্যে সত্যি যতখানি, মানুষের মেলোড্রামার প্রতি আকর্ষণ তার থেকে বেশি।’

ফাদার ব্রাউন মিহিগলা ছাড়লেন।  ‘আমার সবসময়েই মনে হয়েছে এই যেখানেসেখানে মানুষের অবয়ব ধারণ করে অতিপ্রাকৃতের আবির্ভূত হওয়ার ব্যাপারটা কিঞ্চিৎ সন্দেহজনক। অতিপ্রাকৃত বলে  যদি কেউ বা কিছু থেকেই থাকে, তারা আমাদের সঙ্গে দেখা করার বা আমাদেরকে দেখা দেওয়ার জন্য হন্যে হয়ে আছে,, এমন মনে করার কোনও কারণ ঘটেছে কি? আমাদের সঙ্গের যদি তাঁদের এতই দরকার থাকে, তাহলে মাঝেসাঝে পৃথিবীতে ঢুঁ মেরে দুয়েকজনকে তুলে নিজেদের জগত নিয়ে যাওয়াটা প্ল্যান হিসেবে বেটার। কাজেই অতিপ্রাকৃতের প্রমাণ পেতে গেলে ভূতের আবির্ভাবের থেকে মানুষের উবে যাওয়া বা অন্তর্হিত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা তলিয়ে দেখলে বরং কিছু পাওয়া গেলেও যেতে পারে।’

‘বাই জোভ!’ মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়লেন প্রফেসর ওপেনশ। ‘আমিও তো ঠিক এইটাই ভাবছিলাম! এই যে নিশিডাক, জলপরী বা মৎস্যকন্যার পিছুপিছু সমুদ্রে নেমে যাওয়ার গল্প চলে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, এ সব কি শুধুমাত্র গ্রাম্য কুসংস্কার আর রূপকথা? আর প্রাচীন মিথের কথা যদি ছেড়েই দিই, এই যে রোজ খবরের কাগজে কোটি কোটি নিরুদ্দেশসংক্রান্ত ঘোষণা ছাপা হচ্ছে, এত সব লোক হারিয়ে যাচ্ছে কোথায়? এদের মধ্যে কতজন ফিরছে? যারা ফিরছে না কেন ফিরছে না? সে কি শুধু শখ করে, নাকি অন্য কোনও ধাঁধা আছে?’

মোড়ের মাথার চার্চের ঘড়িতে ঢং ঢং ঘণ্টা বাজল। পকেট থেকে ঘড়ি বার করে চোখ কপালে তুললেন প্রফেসর।

‘এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে পরে কোনও একদিন বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছে রইল ফাদার। এই অন্তর্ধানসংক্রান্ত একটা মারাত্মক ইন্টারেস্টিং চিঠি পেয়েছি, রেভারেন্ড লুক প্রিঙ্গলস বলে একজন লিখেছেন। চেনেন নাকি? অবশ্য উনি গত বেশ ক’বছর ধরে মিশনারি হিসেবে আফ্রিকায় আছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ওঁকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া আছে, মনে হচ্ছে একটা সূত্র পাওয়া গেলেও যেতে পারে…’ হাত নাড়তে নাড়তে মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন প্রফেসর ওপেনশ।

*****

মোড় ঘুরে খানিক দূরেই রাস্তার পাশের একটি বাড়ির দোতলায় প্রফেসরের দেড় কামরার অফিস। ওই অফিস থেকে প্রফেসর ‘আধিভৌতিক সংবাদ’ নামের একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। সে পত্রিকায় লঘু ভূতের গল্পের কোনও জায়গা নেই, ছাপা হয় খালি গম্ভীর, তথ্যসমৃদ্ধ, গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ। অন্যান্য পত্রপত্রিকার জন্যও প্রফেসর নিয়মিত লেখালিখি করেন, এদিকওদিক সভাসেমিনার লেগেই থাকে, সেসবের কাজকর্মও এই অফিসেই হয়। এসব কাজে তাঁকে সাহায্য করার জন্য একটি কর্মচারী আছে। প্রফেসর যখন অফিসে ঢুকলেন, সে বাইরের ঘরে বসে একমনে খটাখট টাইপ করছিল।

নিজের ঘরের দিকে এগোতে এগোতে প্রফেসর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রেভারেন্ড প্রিঙ্গলস এসেছেন?’

টাইপরাইটারের দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে কর্মচারী উত্তর দিল, ‘না।’

‘এলে সোজা আমার ঘরে পাঠিয়ে দেবে। আর ওই আর্টিকলটার প্রুফ আজকের মধ্যেই দেখে আমার টেবিলে রেখে যাবে।’

নিজের ঘরে ঢুকে কোট হ্যাঙ্গারে টাঙিয়ে চেয়ারে এসে বসলেন প্রফেসর ওপেনশ। ঘরের তিনদিকের দেওয়ালজোড়া বুকশেলফ বোঝাই কাগজপত্র, ঘরের মাঝখানে চওড়া সেক্রেটারিয়েট টেবিল, টেবিলের ওপাশে ভিজিটরদের জন্য দুটো হাতলওয়ালা সোজাপিঠের চেয়ার, আর এপাশে প্রফেসরের চামড়াবাঁধানো প্রিয় কেদারা। কেদারার বাঁয়ে জানালার ওপাশে রেলিং দেওয়া সরু বারান্দা। রেলিং-এর ফাঁক দিয়ে শহরের রাস্তা, গাড়িঘোড়া দেখা যায়। বসে বসে দেখতে বেশ লাগে।

সে সব দেখার সময় প্রফেসরের কোনওদিনই হয় না, আজও হল না। টেবিল থেকে মুখ ছেঁড়া বাদামি খামটা তুলে নিলেন তিনি। ভেতরের চিঠিটা আগে বারতিনেক পড়েছেন, আবার পড়লেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়ে লেখা সংক্ষিপ্ত চিঠি। এ ধরণের চিঠি প্রফেসর অহরহ পান। কত রকম লোকে যে চিঠি লেখে। আজকাল চিঠির প্রথম দেড় লাইন পরে তিনি বলে দিতে পারেন লেখক পাগল না ছাগল না বদমাশ। কিন্তু এই চিঠির প্রেরককে সে সবের কোনও দলেই ফেলতে পারলেন না তিনি। সংক্ষিপ্ত এবং সুচারু দু’ছত্রে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাওয়া হয়েছে, আর মিনিটখানেকের মধ্যেই…

গলাখাঁকারির শব্দে চমকে উঠলেন প্রফেসর। তাঁর অফিসের ঠিক মাঝখানে একজন লোক দাঁড়িয়ে।

‘ইয়ে, আপনার সেক্রেটারি সোজা ঢুকে আসতে বলল তাই…’

অপ্রস্তুত হাসলেন রেভারেন্ড লুক প্রিঙ্গলস।

উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করে রেভারেন্ডকে চেয়ার দেখিয়ে দিলেন প্রফেসর। ফাদার ব্রাউনকে দেখলেই যেমন পাদরি বলে চেনা যায়, রেভারেন্ড প্রিঙ্গলসকে দেখলে ঠিক তেমন যায় না, বরং লালচে বাদামি দাড়িগোঁফে ঢাকা মুখ, গলাবন্ধ কোট পরা লোকটার চেহারার সঙ্গে পাগলাটে বিজ্ঞানীর মিল আছে বেশি। প্রফেসর ওপেনশ নিজেকে মনে করালেন, লুক প্রিঙ্গলস বেশ কিছু বছর ধরে পশ্চিম আফ্রিকার জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে মিশনারির কাজ করছেন। তাঁর চেনা শহুরে মিশনারিদের সঙ্গে লুক প্রিঙ্গলসের চেহারার মিল না থাকাই স্বাভাবিক।

গোঁফদাড়ির আড়ালের রেভারেন্ডের বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি, বুদ্ধিদীপ্ত চাউনি প্রফেসরের পছন্দ হল। টেবিলে কনুই রেখে ঝুঁকে পড়ে বললেন, 'আপনার চিঠি পেয়ে থেকে উদগ্রীব হয়ে আছি। গোড়া থেকে বলুন দেখি কী কী হয়েছে?’

রেভারেন্ড লুক প্রিঙ্গলস তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন।

‘আমি জানি, প্রফেসর, আপনার কাছে এরকম চিঠি অনেক আসে, আপনি হয়তো আমাকে আরেকজন ভাঁওতাবাজ বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলে ধরে নিচ্ছেন, … ‘ মাথা নেড়ে প্রতিবাদ জানালেন প্রফেসর… ‘কিন্তু আমি খবরের কাগজে, পত্রপত্রিকায় আধিভৌতিক বিষয়ে আপনার গবেষণার নিয়মিত খবর রাখি। তাই ঘটনাটা যখন ঘটল, আপনার নামটাই প্রথম মনে এল।  কারণ ঘটনাটা অদ্ভুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ দুঃখজনকও বটে।  কোনওরকম হালকা চালে এটা নিয়ে আলোচনা হোক সেটা আমার ইচ্ছে ছিল না, আর এ ব্যাপারকে যথার্থ গুরুত্বসহকারে বিশ্লেষণ এবং ব্যাখ্যা করার জন্য আপনার থেকে যোগ্য লোক এ শহরে…’

রেভারেন্ড প্রিঙ্গলসকে মুহূর্তে মুহূর্তে আরও বেশি ভালো লাগতে শুরু করেছে প্রফেসর ওপেনশ-র।

‘পশ্চিম আফ্রিকার নিয়ানিয়া প্রদেশে আমি কিছুদিন মিশনের কাজে নিযুক্ত ছিলাম। জঙ্গলে আমি ছাড়া অন্য শ্বেতাঙ্গ বলতে ছিলেন ক্যাপ্টেন ওয়েলস। ক্যাপ্টেন ওয়েলস মিশনারিদের পছন্দ করতেন না, আমিও তাঁর সঙ্গে এ দেশে থাকলে বন্ধুত্ব পাতাতাম না হয়তো, কিন্তু সঙ্গের অভাবেই আমাদের মধ্যে সখ্য গড়ে উঠেছিল।’

‘একদিন তাঁর তাঁবুতে বসে একটা অদ্ভুত গল্প শোনালেন ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ছিল তাঁর সবসময়ের সঙ্গী ছোট একখানা ছোরা, একটা রিভলভার, আর ছেঁড়াফাটা চামড়াবাঁধাই একটা ছোট বই। ক্যাপ্টেন বললেন, কিছুক্ষণ আগেই তিনি নৌকো করে নদী দিয়ে আসছিলেন, নৌকোতে তাঁর সঙ্গে আরেকটা লোকও ছিল, বইটা নাকি তারই। লোকটা কেবলই বলে চলছিল, বইটা নাকি অভিশপ্ত। যে-ই এই বইয়ের পাতা খুলে ভেতরে দেখবে, তার ভয়ানক বিপদ ঘটবে। স্বয়ং শয়তান এসে তাকে তুলে নিয়ে যাবে। ওয়েলস স্বভাবতই বিশ্বাস করেননি। তিনি লোকটাকে ভীতু, কাপুরুষ,  অপদার্থ ইত্যাদি বলে গালি দিচ্ছিলেন, তাতেই বোধহয় লোকটা শেষটা না থাকতে পেরে তাঁর সামনেই বইটা খুলে ভেতরটা দেখে। আর দেখামাত্রই নাকি হাত থেকে বইটা ফেলে দিয়ে লোকটা উঠে দাঁড়ায়, তারপর হেঁটে হেঁটে  নৌকার কিনারায় গিয়ে…জাস্ট অদৃশ্য হয়ে যায়।’

প্রফেসর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘লোকটা বইটা কোথা থেকে পেয়েছিল?’

‘ক্যাপ্টেন ওয়েলস আমাকে যা বলেছিলেন, বইটা ডক্টর হ্যানকি বলে একজন প্রাচ্যদেশীয় লোকের। ভদ্রলোকটি নানা দেশ ঘুরে আপাতত নাকি ইংল্যান্ডেই এসে আস্তানা গেড়েছেন। ক্যাপ্টেন ওয়েলসের নৌকোর সঙ্গীকে ডক্টর হ্যানকি বইটা দিয়েছিলেন এবং দেওয়ার আগে পইপই করে সাবধানও করে দিয়েছিলেন যে বই খুললে বিপদ হতে পারে।’

প্রফেশর ওয়েলস তাঁর যত্ন করে ছাঁটা দাড়িতে হাত বুলোতে লাগলেন।

‘আপনি ক্যাপ্টেন ওয়েলসের কথা বিশ্বাস করেছিলেন?’

‘করেছিলাম।’

‘কেন?’

‘ক্যাপ্টেন ওয়েলসকে চিনলে আপনিও বিশ্বাস করতেন, প্রফেসর। এইরকম একটা ঘটনা বানিয়ে বলার কল্পনাশক্তি ক্যাপ্টেনের ছিল না।  লোকটার উধাও হয়ে যাওয়ার নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন ওয়েলস। এমনকি এটাও বলেছিলেন যে লোকটা অদৃশ্য হওয়ার সময় তিনি ভেবেছিলেন হয়তো লোকটা জলে পড়ে গেছে, কিন্তু কোনও ছলাৎ শব্দ না শুনতে পেয়ে তিনি নিশ্চিত হন সে রকম কিছু হয়নি। নিজে চোখে না দেখলে ক্যাপ্টেনের পক্ষে এত খুঁটিয়ে কোনও ঘটনার বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব।’

‘আর দুই,’ লুক প্রিঙ্গলসের মুখে ছায়া ঘনাল, ‘ক্যাপ্টেন ওয়েলসের কথা বিশ্বাস না করে আমার উপায় ছিল না, কারণ ক্যাপ্টেনের গল্পটা শোনার কয়েক মুহূর্ত পরে আমি ঘটনাটা নিজে চোখে ঘটতে দেখেছিলাম।’

ঘর নিস্তব্ধ হয়ে রইল। প্রফেসর লুক প্রিঙ্গলসের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

‘ক্যাপ্টেন ওয়েলস তাঁর হাতের ছোরা আর বইটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখেছিলেন। তাঁবুতে একটাই দরজা ছিল, আমি সেই দরজায় দাঁড়িয়ে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ক্যাপ্টেন ওয়েলস গজগজ করছিলেন। বলছিলেন, “এই বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করা পাগলামো আর মূর্খামি ছাড়া কিছু নয়।” আমি বুঝতে পারছিলাম, নিজের চোখে দেখা সত্ত্বেও ঘটনাটা মন থেকে মেনে নিতে ক্যাপ্টেন ওয়েলসের কষ্ট হচ্ছে। আমি নিজেও যে সেই মুহূর্তে খুব কনভিন্সড ছিলাম তেমন নয়, কিন্তু আমি সর্বদাই সাবধানতার পক্ষে। ক্যাপ্টেন ওয়েলস ক্রমাগত বলে চলেছিলেন, “একটা বই খুলে দেখলে কী ক্ষতি হবে? কী ক্ষতি হওয়া সম্ভব?” আমার একটু বিরক্তই লাগছিল। আমি বলেছিলাম, “কী ক্ষতি হতে পারে তো দেখলেন আপনি চোখের সামনে। নৌকোর ঘটনাটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?”’

‘কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করেও কোনও উত্তর না পেয়ে আমি পেছন ফিরলাম এবং আবিষ্কার করলাম তাঁবু ফাঁকা। ক্যাপ্টেন ওয়েলস কোথাও নেই। খালি তাঁবুর কাপড়ে একটা লম্বা আঁচড়ের মতো ফালি, ফালির নিচে মেঝেতে পড়ে আছে ক্যাপ্টেনের ছোরা।  আমি সেই ফাটল গলে জঙ্গলের গেলাম, আশেপাশের কয়েকটা ছোট গুল্ম থেঁতলে গেছে। বুঝতে পারলাম না সেগুলো তখনই জখম হয়েছে, না আগের দিন রাতে কোনও বড় প্রাণীর পায়ের চাপের পরিণতি। শুধু একটা ব্যাপার নিশ্চিত, ওই মুহূর্তের পর থেকে ক্যাপ্টেন ওয়েলসকে আর দেখা যায়নি। তিনি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।’

‘টেবিলের ওপর বইটা খোলা পড়ে ছিল। ‘বইটা সাবধানে কাগজে মুড়ে নিলাম,’ রেভারেন্ড প্রিঙ্গলসের মুখে হাসি ফুটে উঠে মিলিয়ে গেল, ‘বলা বাহুল্য, বইটার দিকে না তাকিয়ে। তারপর ওটা নিয়ে ইংল্যান্ডে চলে এলাম। সোজা ডক্টর হ্যানকি-র কাছেই যাওয়ার প্ল্যান ছিল, কিন্তু ট্রেনে কাগজে আপনার সাম্প্রতিক আলোচনা পড়ার সুযোগ হল যেখানে আপনি বলেছেন আধিভৌতিকের চাবিকাঠি থাকলেও থাকতে পারে মানুষের অন্তর্ধানের আড়ালে। তখনই প্ল্যান বদলে আপনার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করি।’

চেয়ারে হেলান দিয়ে  দু’হাত পেটের কাছে জড়ো করে খানিকক্ষণ বসে রইলেন প্রফেসর ওপেনশ। অন্যান্য সময়ে এ গল্প শুনলে তিনি ধরেই নিতেন আদ্যন্ত গুল। কিন্তু লুক প্রিঙ্গলসের অকপট চোখের দিকে তাকিয়ে প্রফেসর সে রকম করতে পারলেন না। এর আগে যতজন তাঁকে আধিভৌতিক ঘটনা শোনাতে বসেছেন, সবারই একটা না একটা এজেন্ডা ছিল। একটা মতকে সত্যি এবং অন্য সব মতকে ভাঁওতা প্রমাণ করার উদ্দেশ্য ছিল। সে রকম কোনও উদ্দেশ্য রেভারেন্ড প্রিঙ্গলসের মুখে খুঁজে পেলেন না প্রফেসর।

‘বইটা এখন কোথায় রেভারেন্ড?’

‘বাইরের ঘরে রেখে এসেছি। আমার ভয় ছিল এ ঘরে নিয়ে এলে আপনি আমার পুরো কথা শোনার আগেই বইটা খুলে দেখতে চাইবেন। আমি সে ঝুঁকি নিতে চাইনি। অবশ্য বাইরে রেখে আসাটাও…মানে আপনার কর্মচারী যদি বইটা খোলে…’

হাত নেড়ে লুক প্রিঙ্গলসের দুশ্চিন্তা উড়িয়ে দিলেন প্রফেসর।

‘বেরিজ নিজের কাজ ছেড়ে অন্যের বই খুলে দেখতে যাবে না। অত কম কৌতূহলী লোক আমি আমার জীবনে দেখিনি।’

চেয়ার ঠেলে উঠে পড়লেন প্রফেসর। ‘চলুন, বইটাকে দেখা যাক। বইটাকে নিয়ে কী করা উচিত সেটাও ভাবতে হবে। হ্যানকিকে পাঠিয়ে দেওয়া নাকি নিজেদের কাছে রেখে গবেষণা চালানো।’

দরজা খুলে বাইরের ঘরে এলেন প্রফেসর ওপেনশ আর রেভারেন্ড প্রিঙ্গলস। টেবিলের ওপর টাইপরাইটারের পাশে বাদামি কাগজের খোলা মোড়ক, মোড়কের পাশে একটা বই। বইটা খোলা। টেবিলের পেছনের জানালার কাচের ঠিক মাঝখানে একটা বিরাট গর্ত দিয়ে বাইরের বারান্দা দেখা যাচ্ছে, যেন কারও ভয়ংকর তাড়া ছিল, দরজা খোলার সময় হয়নি, দৌড়ে গিয়ে জানালার কাচ ফুঁড়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

*****

প্রফেসর ওপেনশই প্রথম কথা বলার শক্তি জোগাড় করতে পারলেন। রেভারেন্ডের বিস্ফারিত দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, রেভারেন্ড। আমার স্বীকার করতে লজ্জা নেই, আপনাকে আমি এতক্ষণ সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, কিন্তু এর পর আর তর্ক চলে না। এত বড় প্রমাণের মুখে অবিশ্বাসী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো সাহসী কিংবা মূর্খ কোনওটাই আমি নই।

রেভারেন্ড ধাতস্থ করলেন নিজেকে। ‘আমাদের মনে হয় একটু খোঁজাখুঁজি করা দরকার। আফটার অল, এটা তো আফ্রিকার জঙ্গল নয়। আপনি আপনার কর্মচারীর বাড়ির ঠিকানা বা ফোন নম্বর কিছু জানেন?’

‘ওই নর্থের দিকে কোথায় একটা থাকে, এক্স্যাক্ট ঠিকানাটা তো… ওর ফোন নম্বরও আমি জানি না। জানার দরকার হয়নি কখনও।’

রেভারেন্ড বললেন, ‘পুলিশকেও মনে হয় একটা খবর দেওয়া দরকার।’

‘পুলিশ?’ মানুষ আর ভূতের বাইরে এই তিননম্বর প্রাণীটির কথাটা যেন এতদিন তলিয়ে ভাবেননি প্রফেসর।

‘ওরা চেহারার একটা বর্ণনা চাইবে। আপনি একটা চলনসই বর্ণনা দিতে পারবেন তো?’

প্রফেসর ঠোঁট চাটলেন। ‘বর্ণনা… মানে বেরিজের তো বৈশিষ্ট্য কিছু ছিল না, বাকি সবার মতোই, দাড়িগোঁফ কামানো, মাঝারি হাইট, মাঝারি চেহারা… কিন্তু রেভারেন্ড, ওসব পরে হবে,’ নিজেকে ঘোরের মধ্যে থেকে টেনে বার করে আনলেন প্রফেসর, ‘বইটাকে নিয়ে আমাদের পরবর্তী করণীয় কী?’

‘আপনি চিন্তা করবেন না, প্রফেসর। আপনি এদিকটা সামলান। আমি বইটা নিয়ে ডক্টর হ্যানকির কাছে যাই, আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে। বাড়িটাও কাছেই, আমার গিয়ে আসতে বেশি সময় লাগবে না। আমি ওঁর সঙ্গে কথা বলি।  জিজ্ঞাসা করি ব্যাপারটা কী। এইরকম একটা গোলমেলে জিনিস উনি পেলেন কোথায় আর পেলেনই যদি এটাকে খোলা বাজারে এভাবে ছেড়েই বা রেখেছেন কেন। যা কথা হবে, আপনাকে এসে সব জানাব।’

ঘণ্টাখানেক পর রেভারেন্ড লুক প্রিঙ্গলস যখন ফিরে এলেন তখনও অবশ্য প্রফেসর ওয়েলস নিজের ঘরে জানালার পাশেই বসে আছেন। চোখমুখের বিভ্রান্ত ভাবটা একটু কমলেও সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়নি। উল্টোদিকের চেয়ারে ধপ করে বসলেন প্রিঙ্গলস।

প্রফেসর টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। ‘দেখা হল? কী বললেন ডক্টর হ্যানকি?’

‘ডক্টর হ্যানকি বইটা ঘণ্টাখানেকের জন্য নিজের কাছে রেখে দিলেন। কয়েকঘণ্টা পর আমাকে আপনাকে দুজনকেই দেখা করতে বলেছেন। তখন তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত জানাবেন যে বইটা নিয়ে কী করা হবে। উনি আপনার কাজের সঙ্গে খুবই পরিচিত প্রফেসর। আমাকে বিশেষ করে বলে দিয়েছেন, যাতে পরের বার সঙ্গে করে আপনাকেও নিয়ে যাই।’

প্রফেসর পাইপ ধরালেন। ‘লোকটাকে কেমন দেখলেন?’

‘ডক্টর হ্যানকি? ভালোই। আধিভৌতিক বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা আছে। ঘুরেছেনও প্রচুর। ভারতবর্ষের কোণায় কোণায় ঘুরে প্রচুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়  করেছেন। আমার কথা বলে খুব একটা খারাপ লাগেনি, তবে আপনি দেখা হলে আরও বেটার বলতে পারবেন নিশ্চিত।’

প্রফেসর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি ডক্টর হ্যানকির সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। ঘণ্টাখানেক পর কোট পরতে গিয়ে একটা কথা তাঁর মাথায় এল। টেবিলের কাছে ফিরে গিয়ে ফোনটা তুলে নিয়ে ডায়াল করলেন। ওদিক থেকে মিহি গলায় হ্যালো শোনামাত্র প্রফেসর তাঁর গমগমে গলায় বলে উঠলেন, ‘ফাদার? আমি প্রফেসর প্রিঙ্গলস বলছি। আজ সন্ধ্যেবেলা আমার সঙ্গে ডিনারে একবার  দেখা করতে পারবেন? সকালে যে বিষয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল সে বিষয়ে অলরেডি কিছু তথ্য হাতে এসেছে, এবং শিগগিরই আরও তথ্য হাতে আসতে চলেছে। আপনার সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। ...পারবেন? ভেরি গুড। দেখা হচ্ছে তাহলে।’

*****

ফাদার ব্রাউন ঠিক সময়েই নির্দিষ্ট রেস্টোর‍্যান্টে পৌঁছেছিলেন, কিন্তু প্রফেসর  ওয়েলসের দেখা মিলল না। তাতে ফাদারের বিশেষ  অসুবিধে হল না। একা সময় কাটাতে তাঁর কোনও অসুবিধে হয় না, তাছাড়া শহরের ব্যস্ত রেস্টোরেন্টে সন্ধ্যেবেলায় বসে থাকলে অনেক রকম লোক দেখা যায়। অনেকে ফাদারকে চিনতেও পারল, এসে আলাপ করে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ পর রেস্টোর‍্যান্টের দরজা ঠেলে ঢুকলেন দুজন লোক। প্রফেসরের চুল উসকোখুসকো, চোখমুখ উদ্ভ্রান্ত।  ডক্টর হ্যানকির সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়েছে। শহরের উত্তরে একটি শান্ত পাড়ায় ডক্টর হ্যানকির বাড়ি, দরজায় পেতলের প্লেটে ডক্টর হ্যানকি, এম ডি, এম আর সি এস লেখা। বেল বাজানোর দরকার হয়নি, দরজা অর্ধেক খোলাই ছিল। ভেতরে বসার ঘরের টেবিলে খোলা পড়ে ছিল ফুটিফাটা মলাটের বইখানা আর উল্টোদিকের দেওয়ালে আরেকটা দরজা খোলা গিয়ে পড়েছিল বাগানে। বুট পরা দুটো পায়ের ছাপ চিহ্ন বাগানের নরম মাটিতে মাঝখান পর্যন্ত গিয়ে মিলিয়ে গেছে।

বইটা রেস্টোর‍্যান্টের  টেবিলে সাবধান্যে নামিয়ে রাখলেন রেভারেন্ড। ফাদার ব্রাউন উঁকি মেরে দেখলেন। চামড়ার বাঁধাই ফেটে গেছে, ভেতর থেকে আবছা লাল কালিতে ‘অভিশপ্ত’ শব্দটা চোখে পড়ল ফাদারের।

হাত নেড়ে পরিবেশককে ডাকলেন ফাদার। তাঁর তেষ্টা পেয়েছে। রেভারেন্ড আর প্রফেসরের ওসব দিকে লক্ষ্যই নেই। উত্তেজিত গলায় দু’জনে  পরবর্তী কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন।

রেভারেন্ড লুক প্রিঙ্গলস জানালেন তিনি বইটা নিয়ে আরও কিছু সময় কাটাতে চান। প্রফেসর যদি অনুমতি দেন, তাহলে তিনি প্রফেসরের অফিসটা ব্যবহার করতে পারেন। প্রফেসর এককথায় রাজি। পকেট হাতড়ে রেভারেন্ডকে অফিসের চাবি দিতে যাবেন, রেভারেন্ড বিষণ্ণ হেসে বললেন, ‘আপনি ভুলে যাচ্ছেন প্রফেসর। আপনার অফিসের জানালায় এখন একটা মানুষপ্রমাণ গর্ত আছে।’  

বই বগলদাবা করে বেরিয়ে গেলেন প্রিঙ্গলস। প্রফেসর ওপেনশ তাঁকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।

টেবিলে ফিরে প্রফেসর ওপেনশ দেখলেন ফাদার ব্রাউন পরিবেশকের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছেন। তার বাড়ির লোকের খবরাখবর নিচ্ছেন। এই দোকানে তিনি ন’মাসে ছ’মাসে একআধবার আসেন, তখনই এদের কর্মচারীদের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছে। প্রফেসর ওপেনশও আসেন এই দোকানেই খেতে। সপ্তাহে বারতিনেক। কিন্তু যতক্ষণ থাকেন, মানুষের সঙ্গ যথাসম্ভব পরিহার করে চলার চেষ্টা করেন। সঙ্গে করে পড়ার বা লেখার কোনও কাজ আনেন, কাজও হয়, লোকের সঙ্গে অবান্তর কথাও বলতে হয় না।

আফ্রিকার জঙ্গলের নৌকো থেকে উধাও হয়ে যাওয়া, ক্যাপ্টেন ওয়েলসের তাঁবু থেকে রহস্যজনক অন্তর্ধান, বন্ধ ঘরের দেওয়াল ফুঁড়ে তাঁর কর্মচারী বেরিজের উধাও হয়ে যাওয়া, হ্যানকির বাগানের মাঝপর্যন্ত পায়ের ছাপ। সকাল থেকে যা যা ঘটেছে, ফাদারকে বিস্তারে বললেন প্রফেসর।  ফাদার শান্ত মুখে পুরোটা শুনলেন। প্রফেসরের বর্ণনা সবে শেষ হয়েছে, এমন সময় একজন এসে জানাল প্রফেসরের জন্য টেলিফোন এসেছে। প্রফেসর উঠে গিয়ে ফোন তুলে কানে ঠেকালেন।

‘প্রফেসর?’ ওদিক থেকে লুক প্রিঙ্গলসের গলা শোনা গেল। জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে।

“হ্যাঁ। কী হয়েছে রেভারেন্ড?  সব ঠিক আছে তো?’

‘আমি আর পারছি না, প্রফেসর। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। যাই হোক না কেন আর কয়েকমুহূর্তের মধ্যে আমি বইটা খুলব। হয়তো আপনার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না, কিন্তু বইয়ের ভেতর কী আছে না জেনে আমার শান্তি নেই। গুডবাই…’

‘না, রেভারেন্ড, না, না! বই খুলবেন না! রেভারেন্ড? রেভারেন্ড প্রিঙ্গলস? হ্যালো, হ্যালো…’ ফোনে চিৎকার করতে থাকলেন প্রফেসর। উত্তর এল না।

ফোন রেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন প্রফেসর ওপেনশ। ধীরে ধীরে টেবিলে ফিরে এলেন। ফাদার ব্রাউনকে জানালেন এইমাত্র কী ভয়ানক ঘটনা ঘটেছে।

‘এই নিয়ে পাঁচ হল। জঙ্গলে নৌকো থেকে, তাঁবু থেকে, আমার অফিস  থেকে,  হ্যানকির  বাড়ি  থেকে  এবং আবারও আমার অফিস থেকে।  এর আগে আরও কত লোক অদৃশ্য হয়েছে কে জানে। পরেও…’

প্রফেসরের মুখচোখ সাদা হয়ে গেছে।  ফাদার জলের গ্লাস এগিয়ে দিলেন। এক চুমুকে সেটা খালি করে খানিকটা ধাতস্থ হলেন প্রফেসর।

‘তবে ফাদার, এত জনের মধ্যে আমি সবথেকে আশ্চর্য হয়েছি বেরিজের অদৃশ্য হওয়ায়। হয়তো ওকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতাম বলেই। বইটার মধ্যে নিশ্চয় কোনও আকর্ষণী শক্তি আছে। না হলে বেরিজের মতো একটা আপাদমস্তক কল্পনাশক্তিহীন, বোরিং লোক হঠাৎ অন্য লোকের জিনিস খুলে দেখতেই বা যাবে কেন আমার মাথাতেই ঢুকছে না।’

চশমার আড়ালে ফাদারের চোখ চিকচিক করল।

‘বেরিজের পক্ষে অন্য লোকের জিনিস খুলে দেখাটা অদ্ভুত বটে, কিন্তু সেটা সহবতের কারণে। আপনি যে যে কারণগুলো বললেন সে জন্য নয়। কল্পনাশক্তিহীন বা বোরিং কোনওটাই নয় বেরিজ। ইন ফ্যাক্ট, অসম্ভব রসিক এবং বুদ্ধিমান। বেড়াতে ভালোবাসে, বই পড়তে ভালোবাসে। ওর লোক্যাল ক্লাবে, শহরের অ্যামেচার ক্লাবেদের মধ্যে রীতিমতো নামকরা, নিয়মিত অভিনয় করে। আমাকে শেক্সপিয়ারের দু’কলি অভিনয় করে দেখিয়েওছিল। দারুণ।’

‘আপনাকে?’ প্রফেসর ওপেনশ-র মুখ হাঁ হয়ে গেল। ‘আপনার সঙ্গে আলাপ ছিল নাকি বেরিজের?’

‘আলাপ কিছু না, ওই মাঝেসাঝে আপনার অফিসে যখন গেছি, আপনার জন্য অপেক্ষা করার সময় কথাবার্তা হয়েছে।’

‘ওহ!’ প্রফেসর সামলে নিয়ে বললেন, ‘কিন্তু বেরিজের অভিনয়ক্ষমতা আমাদের আজকের ঘটনার পক্ষে অবান্তর। তার সঙ্গে ওর রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার সম্পর্ক নেই। বা বাকিদের উধাও হওয়ার সঙ্গেও।’

পরিবেশক খাবার নিয়ে এল। ফাদার ব্রাউনের ভয়ানক ক্ষিদে পেয়েছিল, তিনি পত্রপাঠ খাবারে মনোযোগ দিলেন।  ‘বাকিদের বলতে?’

প্রফেসর তাকিয়ে থাকলেন ফাদার ব্রাউনের দিকে। ফাদারকে তিনি অনেকদিন ধরে চেনেন। এমন কিছু বয়সও হয়নি তাঁর ভীমরতি হওয়ার মতো। কিন্তু হয়েছে যে দেখাই যাচ্ছে। কাঁটাচামচ নামিয়ে  রেখে ফাদারের দিকে ঝুঁকে পড়ে থেমে থেমে, স্পষ্ট উচ্চারণে তিনি বললেন, ‘বাকিদের বলতে আরও যে চারজনের কথা আমি আপনাকে বললাম। যারা ব্যাখ্যার অতীত উপায়ে অদৃশ্য হয়েছে, তারা।’

কাঁটা নামিয়ে, রুমাল দিয়ে মুখ মুছে প্রফেসরের রাগী চোখে নিজের শান্ত চোখ রেখে ফাদার ব্রাউন বললেন, ‘মাই ডিয়ার প্রফেসর, একজন লোকও অদৃশ্য হয়নি।’

ফাদারের ভীমরতি নিয়ে যেটুকু সন্দেহ প্রফেসরের ছিল, রইল না।  ফাদার ব্রাউন বলে চললেন, ‘সবথেকে কেরামতির জায়গাটা হচ্ছে ঘটনাটাকে একটা সিরিজে পরিণত করা। একটা অবিশ্বাস্য ঘটনাকে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন নয়, কিন্তু পাঁচটা অবিশ্বাস্য ঘটনা যখন পরপর ঘটে, তখন তারা একইরকম অবিশ্বাস্য হওয়া সত্ত্বেও তাদের বিশ্বাস করে নিতে কোনও কষ্টই হয় না।’

‘ওই নৌকোর লোকটা অদৃশ্য হওয়ার ঘটনাটা আলাদাভাবে শুনলে আপনি বিশ্বাস করতেন? করতেন না। এমনকি তাঁবু থেকে ক্যাপ্টেন ওয়েলসের উধাও হওয়ার ঘটনাটাকে উড়িয়ে দিতেও আপনার কোনও অসুবিধে হত না। অভিশপ্ত বইতে আপনার বিশ্বাস জন্মাল যখন সিরিজের তিন নম্বর ঘটনাটা ঘটল, আপনার কর্মচারী বেরিজ অদৃশ্য হল এবং…’

‘এবং আমি নিজের চোখে সেই ঘটনাটা দেখলাম।’ টেবিল চাপড়ে হুংকার দিয়ে উঠলেন প্রফেসর। আশেপাশের টেবিলের লোক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।

ফাদার মাথা নাড়লেন।

‘আপনি বেরিজকে অদৃশ্য হতে দেখেননি প্রফেসর, বরং উল্টোটাই দেখেছেন। আপনি বেরিজকে আপনার অফিসঘরের মাঝখানে আবির্ভূত হতে দেখেছেন। মুখভরা লালচে দাড়িগোঁফ, গলাবন্ধ মোটা কোট…’

‘রেভারেন্ড লুক প্রিঙ্গলস?’ শব্দ তিনটে কোনওমতে বেরোল প্রফেসরের গলা দিয়ে। 

‘এক্স্যাক্টলি। রেভারেন্ড লুক প্রিঙ্গলস।

‘কিন্তু আ-আমি, আমি ওকে চিনতে পারব না? গত দেড় বছর ধরে ও আমার জন্য কাজ করছে?’

‘পারবেন? আচ্ছা বলুন দেখি বেরিজকে কেমন দেখতে? পুলিশকে আপনি বেরিজের বর্ণনা দিতে পারতেন? দাড়িগোঁফ নেই আর চশমা আছে, এই দুটো তথ্য ছাড়া আর কিছুই বেরিজের সম্পর্কে আপনার জানা ছিল না। আপনারই অফিসের টাইপরাইটারে রেভারেন্ড লুক প্রিঙ্গলসের নামে একটা চিঠি টাইপ করে আপনাকে পাঠিয়ে, একটা বইকে মোটামুটি ফুটিফাটা চেহারা দিয়ে, চশমা খুলে, দাড়ি লাগিয়ে আপনার ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালে আপনি যে কিছুতেই ওকে চিনতে পারবেন না সেটা বেরিজ জানত, এবং সে সেটাই করেছিল।

বিহ্বলতা কেটে গিয়ে প্রফেসরের মুখে বিষাদ ঘনাল।

‘কিন্তু আমার সঙ্গে এরকম একটা নিষ্ঠুর ঠাট্টা করল কেন বেরিজ?’

‘করল, কারণ আপনি ওর দিকে বিন্দুমাত্র মনোযোগ দিতেন না। ওকে কল্পনাশক্তিহীন, নির্বোধ কেরানি ভাবতেন। করল, কারণ আপনি বিশ্বাস করতেন মানুষকে তার সমস্ত ভড়ং, মুখোশ পেরিয়ে ‘চিনে’ ফেলতে পারেন। বেরিজ আপনার এই বিশ্বাসটাকেই একটু চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিল আরকি। সে জন্য এত হাঙ্গামা পোয়াতে ও পিছপা হয়নি। গল্প তো ফেঁদেছেই, আগে থেকে অফিসের জানালার কাচটা কেটে রেখে, কাপড় জড়ানো হাতুড়ি দিয়ে আলতো টোকা মেরে সেটা ভেঙেছে। তারপর ডক্টর হ্যানকি বলে একজন কাল্পনিক ডাক্তারের নামে নেমপ্লেট ছাপিয়ে নিজের বাড়ির দেওয়ালে সেঁটে, বাড়ির বাগানে জুতোর ছাপ ফেলে আপনাকে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছে। এর পরও আপনি ওকে কল্পনাশক্তিহীন, বোরিং বলবেন? 

‘ওটা বেরিজের বাড়ি!’

‘আর কার? আপনি তো বেরিজের ঠিকানাটাও ঠিক করে জানতেন না। শহরের উত্তরে থাকে সেটুকুই। হ্যাঁ, শুধু আপনাকে…’ ‘শিক্ষা দেওয়ার জন্য’ বলতে গিয়েও সামলে নিলেন ফাদার ব্রাউন, ‘আপনার সঙ্গে রসিকতা করার জন্য এত ঝামেলা সবাই করত না, কিন্তু বেরিজ সবাই নয়, এটা আপনি এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন আশা করি।’

মুখ নিচু করে গ্লাসের কিনারায় আঙুল বোলাতে লাগলেন প্রফেসর।

ফাদার ব্রাউন বললেন, ‘বেরিজের ওপর রাগ করবেন না, প্রফেসর। ভূতপ্রেতদের প্রতি আপনি যত মনোযোগ, সময়, সাধনা দিয়েছেন, তার তিলমাত্রও খরচ করেননি আপনার আশেপাশে হেঁটেচলে বেড়ানো রক্তমাংসের মানুষের প্রতি। সেটারই প্রায়শ্চিত্ত বলে ঘটনাটাকে ধরে নিন।’

প্রফেসর চুপ করে রইলেন। তাঁর মুখ গম্ভীর। তাঁদের টেবিলের চারপাশে রেস্টোর‍্যান্টের টুংটাং, হাসিকথা ভেসে বেড়াচ্ছে।

‘এখন বেরিজ কোথায়?’

‘আমি নব্বই শতাংশ নিশ্চিত, আপনার অফিসে। মুখ গুঁজে কাজ করছে। যে মুহূর্তে রেভারেন্ড লুক প্রিঙ্গলস আপনাকে ফোন করে জানালেন যে তিনি বইটা খুলতে চলেছেন এবং তারপরের নীরবতায় আপনি নিশ্চিত হলেন যে রেভারেন্ড প্রিঙ্গলস অদৃশ্য হয়েছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই বেরিজ,নিজের সিটে, নিজের টাইপরাইটার এবং খাতাপত্রের সামনে ফিরে এসেছে।’

লম্বা শ্বাস নিয়ে সোজা হয়ে বসলেন প্রফেসর ওপেনশ। মেঘ কেটে তাঁর মুখে হাসি ফুটল। টেবিলে চাপড় মেরে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন।

‘ব্রাভো বেরিজ। ঠিকই করেছে ও যা করেছে। আমার এটা প্রাপ্য ছিল। আমি আজই ওর মাইনে বাড়াব।’

পরক্ষণেই তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল। ফাদার ব্রাউনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। ‘কিন্তু ফাদার, আপনাকে স্বীকার করতে হবে, গল্পটা কিন্তু ও সত্যি সাংঘাতিক ফেঁদেছিল। আপনি বলুন, একমুহূর্তের জন্য হলেও কি আপনার ওই বদখত বইটার দিকে তাকিয়ে গা ছমছম করেনি?’

মুখের গ্রাস ধীরেসুস্থে শেষ করে ফাদার ব্রাউন বললেন, ‘ওহ, ওই বইটা? আপনি যখন লুক প্রিঙ্গলস, ইয়ে, বেরিজের সঙ্গে কথা বলছিলেন আমি পাতা উল্টে ওর ভেতরটা দেখলাম তো। ভেতরে সাদা পাতা ছাড়া কিচ্ছু ছিল না।’

*****



July 09, 2019

একটি বইপ্রকাশ অনুষ্ঠান ও একটি বই





অমিতাভ ঘোষ জ্ঞানপীঠ পেলেন। গোপালকৃষ্ণ গান্ধী যেদিন ওঁকে পুরস্কার দিলেন তার পরদিনই অমিতাভ ঘোষের সাম্প্রতিকতম উপন্যাস ‘গান আইল্যান্ড’ আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হল। 

জ্ঞানপীঠ দেওয়ার দিন পাস জোগাড়ের ঝামেলা ছিল তাছাড়া পুরস্কার নেওয়া কী দেখতে যাব, তার থেকে বই কিনে পড়লে লেখকের বেশি মর্যাদা করা হবে। বুক লঞ্চ উন্মুক্তদ্বার, আগে আসুন আগে বসুন ব্যবস্থা, চলে গেলাম দুজনে।

এত উৎসাহ অমিতাভ ঘোষ বলেই। যে ক’’জন লেখকের প্রায় সব বই আমাদের বাড়িতে আছে তাঁদের মধ্যে অমিতাভ ঘোষ একজন। এবং যে সব লেখকের প্রায় সব বই বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও সেসবের প্রায় কোনওটিই আমি পড়িনি, তার মধ্যেও অমিতাভ ঘোষ একজন। বা একাই। ওঁর 'ক্যালকাটা ক্রোমোজোম' পড়ে সেই যে মাথা চুলকোনো ভাব হয়েছিল, বাকিগুলো আর পড়া হয়নি। তারপর বছর তিনেক আগে বেরোনো ওঁর নন-ফিকশন রচনা 'দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট' পড়েছিলাম, ব্যস। 

আমরা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশের সব খালি চেয়ার ভরে গেল। অর্চিষ্মানের পাশের খালি চেয়ারে শেষ মুহূর্তে একজন এসে বসলেন যাঁকে আমাদের দুজনেরই ভয়ানক চেনা লাগছিল। সে এক অসামান্য সাসপেন্স। ভদ্রলোক একেবারে পাশে বসে আছেন কাজেই ফিসফিস করে এটা কে এটা কে-ও করা যাচ্ছে না। একটাই ক্লু, উনি আইলে দাঁড়িয়ে এদিকওদিক তাকানোর সময় আমাদের পেছনের সারি থেকে একজন 'মিস্টার রায়না!' ডেকে তাঁকে অর্চিষ্মানের পাশের খালি সিটটার দিকে নির্দেশ করেছিলেন। ভদ্রলোক তখন চোখ গোল করে অল্প দৌড়ে আসার যে ভঙ্গিটা করেছিলেন, তাতেই আমার ওঁকে বেশ পছন্দ হয়েছিল। আর যাই হোন, রামগরুড়ের ছানা নন। তারপর আমরা দুজনেই ভীষণ লুকিয়ে গুগল করে দেখলাম যে উনি হচ্ছেন প্রসিদ্ধ অভিনেতা এম কে রায়না।

সাতটায় ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অমিতাভ ঘোষ এবং রঘু কারনাড মঞ্চে এলেন। রঘু কারনাড, যাঁকে সন্দেহ করেছেন তিনিই, গিরীশ কারনাডের ছেলে। গিরীশ কারনাড তখন সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। তবু যে তিনি এই অনুষ্ঠানটির জন্য দিল্লি উড়ে এসেছেন সে জন্য আয়োজক এবং অমিতাভ ঘোষ দু’পক্ষই তাঁকে ধন্যবাদ জানালেন।

আলোচনা 'গান আইল্যান্ড' নিয়েই হল। কিন্তু আলোচনা শুরু হলে ঘোষের মতো দীর্ঘ কেরিয়ার সম্বলিত লেখকের আগেকার লেখার কথাও এসে যায়, এলও। তারপর প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হল। সাবঅল্টার্ন সাহিত্য থেকে শুরু করে 'আফিমের গল্পগুলো কি স্রেফ ফিকশন নাকি লিখতে গিয়ে একটুআধটু…' সব রেঞ্জেরই প্রশ্ন হল। ব্যক্তিগতভাবে তো চিনি না, ওইটুকু সময় দেখে ঘোষবাবুকে ভালোমানুষ বলেই মনে হল, ভদ্রসভ্য স্বাভাবিক ব্যবহার, সেলিব্রিটিসুলভ গাম্ভীর্য একেবারে অনুপস্থিত। 

আলোচনা শেষে যেই না ঘোষণা হল এইবার লেখক বই সই করবেন যা ঘটল কহতব্য নয়। হলের বাইরে টেবিল থেকে সকলেই বই কিনেছে, পিল পিল করে ছুটে গিয়ে লাইন দিল। আমরা বই প্রি-অর্ডার করে রেখেছিলাম, লঞ্চের পরদিনই আমার অফিসে ডেলিভারি হয়ে যাওয়ার কথা, লেখকের সই শুদ্ধু, তাই ওই হুটোপাটির মধ্যে পড়তে হল না। ( প্রি অর্ডার না করলেও লাইন দিতাম না, কারণ লেখক তো বইয়ের প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি প্যারায়, প্রতিটি অক্ষরে তাঁর সই দিয়েই রেখেছেন।) শুধু সই করলেই হবে না, হ্যান্ডশেক করে আবার দু’চার কথা বলতে হবে। এত লোকের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে হলে, লোকে হাসুক আর যাই করুক, গ্লাভস পরে আসাই উচিত। 

*****

একটা জিনিস আগেও খেয়াল করেছি, লেখককে দেখলে, ইন্টারভিউ শুনলে বই পড়ার আগ্রহ জন্মায়। গান আইল্যান্ড আসার পরের তিনদিনে অর্চিষ্মান শেষ করল, তারপর আমি শুরু করলাম।

গল্পের পরিসর গ্লোবাল। দীননাথ, নিউ ইয়র্কে থাকা একজন পুরনো জিনিসপত্র বইপত্রের ব্যবসায়ী।  কলকাতায় এসে তিনি এক অল্পশ্রুত কাব্যের নায়কের কথা জানতে পারেন। বন্দুকী সদাগর। দীননাথ চাঁদ সদাগর জানেন, কিন্তু বন্দুকী? তাঁর খবরি তাঁকে খবর দেয়, বন্দুকী সদাগরের চাঁদ সদাগরের সঙ্গে অনেক মিল আছে, তাঁরও সারাজীবনের সংগ্রাম মনসাদেবীর সঙ্গে। বিশ্বাস না হলে দীননাথ গিয়ে দেখে আসতে পারেন, সুন্দরবনের গহন বনে সেই বন্দুকী সদাগরের ধাম বা মন্দির এখনও আছে।

দীননাথ হাজির হন সদাগরের ধামে। সেখানে নানারকম অদ্ভুত চিহ্ন আবিষ্কার করে। তারপর নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গল্প চলে সুন্দরবন থেকে ভেনিস। আরও নানা চরিত্ররা এসে হাজির হয়। ময়না, টিপু, রফি, চিনতা (বাঙালি চিন্তা নয়, ভেনেশিয়ান চিনতা), পিউ। এর মধ্যে বেশ কিছু চরিত্র যা বুঝলাম আগের সুন্দরবনকেন্দ্রিক হাংরি টাইড উপন্যাসেও ছিল।

একটা তত্ত্ব ঘোষ ইন্টারভিউতেও বলেছিলেন, বইতেও লিখেছেন। ব্যাপারটা আমার মাথায় আগে আসেনি কথাটা তাই ভারি চমৎকৃত হয়েছি। চাঁদ সদাগর আর মনসা, বা  বন্দুকী সদাগর আর মনসার দ্বন্দ্বটা যেমন মানুষ-দেবতার সংঘর্ষ হিসেবেও দেখা যেতে পারে তেমনি পুঁজি বনাম প্রকৃতির লড়াই হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

অমিতাভ ঘোষ  'দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট' বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন যে ক্লাইমেট চেঞ্জ, জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিশ্বজোড়া সমস্যা, রাজনীতি, কূটনীতি, বিজ্ঞান, মানুষের জীবন, জীবিকা, মরণবাঁচনে থাবা ফেললেও সাহিত্য আশ্চর্যজনক রকম গা বাঁচিয়ে থাকতে পেরেছে।

"....when the subject of climate change occur in these publications, it is  almost always in relation to nonfiction; novels and short stories are very rarely to be glimpsed within this horizon. indeed , it could even be said that fiction  that deals  with climate change is almost by definition not of the kind that is taken seriously  by serious literary journals: the mere mention of the subject is often enough to relegate a novel or a short story to the genre of science fiction. it is as though in the literary imagination climate change were somehow akin to extraterrestrials or interplanetary travel. 

...

But why? Are the currents of global warming too wild to be navigated in the accustomed barques of narration? But the truth, as is now widely acknowledged, is that we have entered a time when the wild has become the norm: if certain literary forms are unable to negotiate these torrents ,then they will have failed and their failures will have to be counted as an aspect of the broader imaginative and cultural failure that lies at the heart of the climate crisis." (The Great Derangement: Climate Change and The Unthinkable, Amitav Ghosh)

'গান আইল্যান্ড'-এ তিনি সাহিত্যের এই খামতিকে পূরণ করার সমস্ত চেষ্টা করেছেন। বন্দুকী সদাগরের মিথ ছাড়াও  সুন্দরবনের দ্রুত বদলে যাওয়া পরিবেশ, সেখানকার মানুষজনের দুর্দশা, পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে একইরকম পরিবেশ ও জলবায়ুসংক্রান্ত দুর্ঘটনা, সামুদ্রিক প্রাণীদের মৃত্যু, পরিবেশগত উদ্বাস্তুদের দেশ থেকে দেশে মাথা কুটে ফেরা, এই সমস্ত বিষয় গান আইল্যান্ড -এ এসেছে।

গান আইল্যান্ড-এর রিভিউতে অধিকাংশ রিভিউয়ার বইটির অনাকর্ষণীয়তার পেছনে এজেন্ডার ঘনঘটাকেই দায়ী করেছেন। প্রাথমিকভাবে কথাটা আমারও মনে ধরেছিল। আমি নিজে নাটকনভেলে এজেন্ডার ঘোর বিরোধী। গল্প পড়তে বসে যদি বোঝা যায় লেখক গল্প বলা ছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্য (সাধারণতঃ মহৎ) নিয়ে লিখতে বসেছেন তার থেকে গল্প মাটি করার আর সহজ রাস্তা আর কিছু হয় বলে আমার জানা নেই।

গান আইল্যান্ড-এর সঙ্গে সমস্যাটা খানিকটা এটাই ঘটেছে তাও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটার সমাধানটা কী হবে সেটা নিয়ে আমার মতের কিঞ্চিৎ বদল ঘটেছে। লেখকের এজেন্ডা থাকেই, না থাকাটা অসম্ভব বলেই বুঝেছি। যে বিষয়ে মতটা বদলায়নি সেটা হচ্ছে গল্পের থেকে সেই এজেন্ডা বড় হয়ে ওঠার অসুবিধেটায়। একটা যদি শক্তপোক্ত প্লট থাকে যে নিজের কাঁধে লেখকের বক্তব্য, এজেন্ডা বয়ে নিয়ে যেতে পারে, তাহলেই ল্যাঠা চুকে যায়। গান আইল্যান্ডে সেটারই অভাব ঘটেছে। 

গান আইল্যান্ড-এর প্লটটি যথেষ্ট জোরালো নয়। ঘটনার ঘনঘটা আছে, সাপ, সংকেত, পুরাণ ইত্যাদি নানারকম রোমহর্ষক উপাদান আছে কিন্তু কোনওটাই দানা বাঁধেনি। এর একটা কারণ আমার মনে হয় চরিত্রের খামতি। ঘটনার ঘনঘটা পাঠককে টেনে রাখতে পারে কিন্তু একমাত্র তখনই যখন সেই ঘটনা যাঁদের সঙ্গে ঘটছে, অর্থাৎ গল্পের চরিত্রদের প্রতি পাঠকদের মাথাব্যথা থাকে। গান আইল্যান্ডে চরিত্র প্রচুর কিন্তু কারও সঙ্গেই পাঠকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠে না। পিউ, চিনতা, গল্পের অনেকখানি জায়গা জুড়ে থাকা চরিত্রদের কেবল প্লট ডিভাইস বলে বোধ হয়। অন্যদিকে টিপু এবং রফি, যে দুটি চরিত্রের প্রতি (এবং এই দুজনের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতিও) পাঠকের কৌতূহল জাগাতে সক্ষম হন লেখক, তারা মাঝে মাঝেই গল্প ছেড়ে হাওয়া হয়ে যায়, আবার কখন ভুস করে ভেসে উঠবে বলে।

এই গল্পটা যদি টিপুর হত কিংবা রফির বা ওদের দুজনের, আমি গোগ্রাসে পড়তাম, গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। কিন্তু এখানে অমিতাভ ঘোষ গল্পের কেন্দ্রে রেখেছেন দীননাথকে। যে উত্তম পুরুষে গোটা গল্পটা বলে। উত্তম পুরুষে গল্প বলার সুবিধে যেমন আছে (চট করে বক্তার সঙ্গে একাত্ম হতে পারা), অসুবিধেও আছে। অসুবিধে হচ্ছে 'আমি' 'আমি' করে গল্প বললে অজান্তেই পাঠক সেই চরিত্রটিকে গল্পের নায়ক বলে ভেবে নেয় এবং তার থেকে নায়কোচিত কাণ্ডকারখানা আশা করে। এখানে কাণ্ডকারখানা বলতে আমি বলছি না যে সেই চরিত্রটিকে একা একশো গুণ্ডাকে ঢিট করতে হবে। সে যদি আমার মতো নিড়বিড়েও হয়, পাঠক আশায় থাকে যে গল্পের সেরা ভাগ্যের মার অন্তত বাকিদের ছেড়ে তার ঘাড়েই পড়বে। 

দীননাথ সেই রোলে একেবারে ফেল। গোটা ঘটনায় ভদ্রলোকের বিশেষ স্টেক নেই, গোটাটাই শখে। চরিত্রটিও ভারি নিরুৎসাহ এবং নিরুদ্যমী গোছের। এর প্রতি রাগ, অনুরাগ, বীতরাগ, কোনও অনুভূতিই জোরালো হয়ে জাগে না।


July 08, 2019

শনিবার বিকেল



মেঘলা হলেও ছিল মন ভালো করা। তাপমাত্রা সহ্যের সীমার এপারে। পার্কে কচিবুড়ো গলার খলখল। মৃদুমন্দ হাওয়া। সে হাওয়ায় আবার হলুদ অমলতাসের পাপড়ি ঘুরে ঘুরে নাচছে।


সে নাচেরই ছবি তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু ফোনের ক্যামেরার অপ্রতুলতা বা আমাদের আনাড়িপনা যে কারণেই হোক, উঠল না। উঠল খালি রাস্তা আর গাড়ি আর ল্যাম্পপোস্ট। 

যাচ্ছিলাম দোসা খেতে। অধুনা দিল্লিতে বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং দক্ষিণী খানার দোকান খুলেছে। খাবার সেই দোসা ইডলি, চমক কেবল সাজেগোজে আর দোসার নামে। কার্ণাটিক ক্যাফে এদের মধ্যে পথপ্রদর্শক। আমরা প্রায়ই গিয়ে থাকি। সম্প্রতি জাগারনট নামে একটি দোকান এসেছে বাজারে। জোম্যাটোতে তার রেটিং আকাশছোঁয়া, রিভিউ স্পটলেস। বাড়ি থেকে কাছেও।

অনেকদিন ধরে তাল খুঁজছিলাম যাওয়ার। ঠিক হয়েও হচ্ছিল না। শেষমুহূর্তে প্ল্যান বদলে যায়, খিদে পায় না, পেলেও দোসার বদলে চাউমিন খেতে ইচ্ছে করে। এমনকী অফিসের একজন জন্মদিনের খাওয়া খাওয়াবে বলল, হয় কার্ণাটিক ক্যাফেতে নয় জাগারনটে। মুখে তো বলা যায় না, মনে মনে চাইছিলাম জাগারনটেই যেন জন্মদিন পালন হয়। হল না। ঘুরেফিরে সেই কার্ণাটিক ক্যাফে।

নিজের আলসেমোতে যতদিন যাওয়া হচ্ছিল না একরকম ছিল, অন্যে যেই হতাশ করল অমনি আমার জাগারনটে খাওয়ার ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠল। এ অন্যায় আর মেনে নেওয়া যায় না। 

কৈলাস কলোনিতে জাঁকালো তিনতলা দোকান জাগারনট। দোকানে ঢোকার সময় নাকি সবার মাথায় টিকা দেওয়া হয়, সে অংশটা নিয়ে আমরা নার্ভাস ছিলাম মিথ্যে বলব না, কিন্তু দোকানে ঢুকে দেখি একপাশের টেবিলে বরণডালা রাখা, আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। পা টিপে টিপে এগোতেই একটা বাচ্চা ছেলে কোথা থেকে দৌড়ে এসে, 'ওয়েলকাম ওয়েলকাম,' বলে থালা হাতে নেওয়ার যেই না উপক্রম করছে, আমরা ‘থ্যাংক ইউ ভাইসাব, নেহি চাহিয়ে,’ বলে পিক আপ নিয়ে এক দৌড়ে তিনতলায়।


জাগারনটের একতলায় কনফেকশনারি, দোতলা তিনতলা খাওয়ার জায়গা। রিভিউতে একজন লিখে রেখেছিলেন দোতলা হচ্ছে আলোঝলমল, ধ্রুপদী স্টাইলে সাজানো,আর তিনতলার টেরাস হল গিয়ে টিমটিম ক্যান্ডেললাইট। “ডিম অ্যান্ড এজি।” ভাবলাম কপাল ঠুকে দেখিই একবার নিজেদের এজি বলে চালানো যায় কি না, বলা যায় না অন্ধকারে অত বোঝা নাও যেতে পারে। তিনতলায় পৌঁছে সবে হাঁ করেছি, 'টেবিল ফর…' আমার আগাপাশতলা চট করে চোখ বুলিয়ে ভাইসাব রায় দিলেন, 'নিচে চলা যাইয়ে ম্যাডাম। ওহি আপকে লিয়ে ঠিক রহেগা।' (এই লাইনটা মুখে বলেননি। হাবেভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন।)

ল্যাজ গুটিয়ে নেমে এলাম। আমাদেরই দোষ। ময়ূরপুচ্ছ গুঁজলেও কাককে কাক বলে চেনা যায়, তেমনি মোমবাতির আধোঅন্ধকারে আমাদের নন-এজিত্ব ড্যাবড্যাব করতে থাকে।



তবে সুখের কথা এই যে এই এপিসোডটি আমাদের সে সন্ধের আনন্দকে ডিম করতে পারেনি। আমি চেট্টিনাড প্লেন, অর্চিষ্মান পোড়ি ঘি রোস্ট মসালা, আর দুজনেই দই বড়া আর কফি খেয়েছি। খেতে খেতে বাংলা নাটকনভেলসিনেমার গুছিয়ে নিন্দে করেছি, আশেপাশের টেবিলের কথাবার্তায় আড়ি পেতেছি, আড়চোখে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছি টেবিলের এপারেওপারে বসে থাকা লোকেদের সম্পর্ক প্লেটোনিক না রোম্যান্টিক। 


মোদ্দা কথা শনিবার সন্ধেটা দারুণ আনন্দে কেটেছে। এবং সেই যে বেরোনোর সময় অমলতাসের ছবি তুলতে গিয়ে আড় ভেঙে যাওয়াতেই সম্ভবতঃ, অনেকদিন পর সারা সন্ধে জুড়ে ছবিও তুলেছি। তার কয়েকটা আপনাদের দেখালাম।



July 03, 2019

মিতা, মাসিমা আর পঞ্চাশ বছর আগের একটা চিঠি





এবারের চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের ছোটগল্পের ছায়া জোগান দিয়েছেন ইংরেজ ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, ছোটগল্পকার জুলিয়া ডার্লিং, তাঁর ছোটগল্প ‘লস্ট লেটারস’-এর মাধ্যমে। গল্পটি আমি পড়িনি, বিবিসি রেডিওতে পাঠ শুনেছিলাম। 

পোস্টঅফিসে কাজ করা এক অল্পবয়সী মেয়ে, এক হারিয়ে যাওয়া চিঠি ফেরত দিতে আসে এক বৃদ্ধা মহিলাকে।

আমার গল্পেও একটা চিঠি আছে, আর দু’জন মহিলা আছেন। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের জলহাওয়ায় তাঁদের পরিস্থিতি, আকারপ্রকার, সমস্যা এবং সমাধান (যদি কিছু থেকে থাকে) সবই বদলেছে। আর এসেছে কিছু ছায়ার মতো চরিত্র যারা স্টেজে নামেনি কিন্তু উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে মূল চরিত্রদের ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছে। 

গল্পটি এদের মধ্যে কার? কীসের? জুলিয়া ডার্লিং নামকরণেই সংশয় মিটিয়ে দিয়েছেন, তাঁর গল্পটা হারিয়ে যাওয়া চিঠিটার বা চিঠিদের। আমি অতখানি নিঃসংশয় হতে পারিনি। তাই নামে তিন প্রধান চরিত্রকেই জায়গা দিয়েছি। 

জুলিয়া ডার্লিং-এর ছোটগল্প 'লস্ট লেটারস'-এর ছায়া অবলম্বনে লেখা আমার ছোটগল্প 'মিতা, মাসিমা আর পঞ্চাশ বছর আগের একটা চিঠি' বেরিয়েছে চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর জুলাই মাসের মেল ট্রেনের গল্পের কামরায়। 


June 25, 2019

প্রিন্টার বনাম মিনিম্যালিজম




নতুন অফিসে জাঁকিয়ে বসেছি। আগের অফিসের ড্রয়ারে যা যা রাখতাম সে সব এই অফিসের ড্রয়ারে ঢুকিয়েও জায়গা বাকি থেকে গেছে। আগের অফিসের ডেস্কের ওপর রাখা জিনিসগুলোও চোখের আড়ালে চালান করলাম। তারপর ডেস্কের দিকে তাকিয়ে খুশি হয়ে ভাবলাম, নাঃ, এতদিনে হয়েছে ডেস্কখানা মিনিম্যালিস্টের মতো মিনিমালিস্ট।

পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে দেখি ডেস্কের ওপর একখান প্রিন্টার গ্যাঁট হয়ে বসে আছে এবং আমার ডেস্কখানা আর মিনিম্যালিস্ট নেই। 

মিনিম্যালিজমের সংজ্ঞা নিয়ে একজনের সঙ্গে একবার আলোচনা হচ্ছিল। সে জানতে চাইছিল মিনিম্যালিজম বলতে আমি কী বুঝি। বললাম, যতটুকু লাগে ততটুকু নিয়ে জীবন কাটানোই মিনিম্যালিজম। সে বলল, তা হলে পৃথিবীর সব লোকই নিজেকে মিনিম্যালিস্ট বলে দাবি করতে পারে। আমি বললাম, কী রকম? সে বলল, যদি ধর মুকেশ আম্বানি দাবি করে যে অ্যান্টিলার সাতাশ তলার প্রতিটি তলাই ওর বসবাসের জন্য লাগে আর ওই ছশো পরিচারকের একজনকে ছাড়াও ওর চলবে না, তোমার যুক্তি মেনে তা হলে কি মুকেশ আম্বানিও মিনিম্যালিস্ট হলেন না? বলে, ‘কেমন দিলুম?’ ভুরু নাচাল। আমি হাঁ বন্ধ করে, তাই তো, ঠিক তো, বলে প্রাণ বাঁচালাম।

প্রিন্টার জরুরি জিনিস। সকলেরই কাজে লাগে। কারও বেশি লাগে কারও কম। আমার বেশিরভাগ সহকর্মীদের তুলনায় আমার কম কাজে লাগে হয়তো, কিন্তু লাগে। কাজেই প্রয়োজনের যুক্তিতে প্রিন্টারওয়ালা ডেস্কের মিনিম্যালিস্ট হতে বাধা নেই। 

কিন্তু আমি যুক্তিবাদী নই। অদরকারি পাঁচটা গাছ ভিড় করে থাকলেও ডেস্ককে মিনিম্যালিস্ট শিরোপা দিতে আমার বাধবে না, কিন্তু মাত্র একখানা প্রিন্টার আমার মিনিমালিজমের সাধনা মাটি করতে যথেষ্ট।

নিজের গালে ঠাস ঠাস চড়াতে ইচ্ছে করছিল। কারণ দোষটা আমারই। ফ্লোরের বাকি সবাই তাদের ম্যাক্সিমালিস্ট সংসার পেতে রেখেছে টেবিল জুড়ে এদিকে আমার টেবিলে খাঁ খাঁ। প্রিন্টার বসিয়ে যাওয়ার জন্য একরকম নেমন্তন্নই করে রেখেছি আমি। 

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কল্পনা করে মাথা ঘুরতে লাগল। আমি বলব, ডেস্ক থেকে প্রিন্টার সরান। যাকে বলব সে বলবে, কিন্তু কোথাও তো একটা রাখতে হবে। আমি বলব, সেটা আমার টেবিল নয়। অন্য যার খুশি টেবিলে রাখুন গে। সেই লোকটা বলবে, আচ্ছা স্বার্থপর তো আপনি, চক্ষুলজ্জা বলে কোনও বস্তু নেই? আমি বলব, আমার চক্ষুলজ্জা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না, যা বলছি তাই করুন। লোকটা বলবে, না করলে কী করবেন? আমি বলব, তবে রে? এই দেখ তাহলে…

সকাল সকাল একটা ঘোরতর স্ট্রাগলের মধ্যে পড়তে হবে।

ব্র্যান্ড নিউ ব্র্যান্ডেড এসির হাওয়াতেও ঘাম ছুটল। যদিও রবীন্দ্রনাথ আর বুদ্ধিজীবীর পর বাঙালির তৃতীয় প্রিয়তম শব্দ স্ট্রাগল আর যদিও আমি একশো এক শতাংশ বাঙালি, আমি স্ট্রাগল ঘৃণা করি। আমি স্ট্রাগলের ঘোর বিরোধী। আমি মনে করি না স্ট্রাগল করলে চরিত্রগঠন হয়। আর যদি বা হয়েও থাকে অমন চরিত্রবান হতে আমি চাই না। আমি চাই না পৃথিবীর কেউ স্ট্রাগল করুক। কেউ যদি স্ট্রাগল করে জীবনে উন্নতি করতেও চায় আমাকে যেন করতে না হয়। আমি চাই আমার জীবন কেকওয়াক হোক। কত ধানে কত চাল টের না পেয়েই যেন আমি সারাজীবন কাটাতে পারি।

ফোন করলাম। যাকে করলে সমাধান হবে তাকে না। ওই ক্রুশিয়াল ফোনটা মাথাগরম অবস্থায় করা যাবে না। এমন কাউকে করা দরকার যে সারাজীবন আমার মাথা ঠাণ্ডা রাখার মুচলেকা নিয়েছে।

সে বলল, ওরে বাবা কুন্তলা, এটা এমন কিছু সমস্যা নয়। ফোন করে বল যে প্রিন্টার সরিয়ে দিন। গাঁইগুঁই করলে প্রস্তাব দিয়ো নিজেই অন্য ডেস্কে সরে যাওয়ার। 

তেতে উঠে বললাম, ঠিক বলেছ, ডেস্কে হয় প্রিন্টার থাকবে নয় আমি থাকব।

অত গরম হয়ে বোলো না আবার। মিষ্টি করে বোলো।

হ্যাঁ রে বাবা হ্যাঁ। গলবস্ত্র হয়েই বলব, মনের রিয়েল ভাবটা তোমার কাছে প্রকাশ করলাম।

গুড। আর যদি নতুন টেবিলে যাও, দয়া করে মিনিম্যালিজম প্র্যাকটিস কোরো না। যা সম্পত্তি আছে সব ছত্রাকার করে টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রাখবে। না হলে যখন আবার ফ্যাক্স মেশিন বসিয়ে যাবে তখন বুঝবে মজা।

বলে ফোন কেটে দিল।

এবার ক্রুশিয়াল ফোনটা করলাম। বললাম, দয়া করে যদি আমার টেবিল থেকে প্রিন্টারটা সরিয়ে...নিতান্ত অসুবিধে হলে আমিই না হয়…

তিনি বললেন, পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন। বলে তিন মিনিটের মধ্যে এসে আমার টেবিল থেকে প্রিন্টার তুলে সহকর্মীর টেবিলে বসিয়ে দিলেন।

তেতাল্লিশ মিনিট বাদে সহকর্মী অফিসে এল। এসেই বলল, ওহ! 

আমি ভয়ানক মন দিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

সহকর্মী আমার টেবিলে এসে বলল, প্রিন্টার বসিয়ে গেছে দেখেছ?

আর থাকতে না পেরে গলা ঝেড়ে ইয়ে বলে শুরু করতে যাব সহকর্মী বলল, অবশেষে একটা কাজের কাজ হয়েছে। এখন প্রিন্ট নিতে আকাশপাতাল এক করতে হবে না, সিটে বসে বসেই হয়ে যাবে। কম্যান্ড দাও, কালেক্ট কর।

সহকর্মীর মুখের দিকে তাকালাম। কোঁচকানো ভুরু দেখব ভেবেছিলাম, চোখে পড়ল ঠোঁটে হাসি। তিতিবিরক্তিতে টইটম্বুর গলা শুনব আশা করেছিলাম, খুশিমিশ্রিত উত্তেজিত কণ্ঠ কানে এল। আমার-সঙ্গেই-কেন-এমন-হয়-ঠাকুর বডি ল্যাংগোয়েজের সামনে পড়ার অপেক্ষায় ছিলাম, সহকর্মীর সারা অস্তিত্ব থেকে প্রিন্টারের মালিকানার গর্বের ছটা ঠিকরে এসে লাগল । 

বললাম, যা বলেছ।

সে গলা ঝেড়ে বলল, ইয়ে শোনো না, আমার টেবিলেই রেখেছে বলে বিন্দুমাত্র সংকোচ কোরো না কিন্তু, দরকার হলেই প্রিন্ট দিয়ো, যখন তখন, যত খুশি। ফিল ফ্রি। 

বললাম, থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ। 

*****

অবাঞ্ছিত প্রিন্টার, না পরা জামা, আধপড়া বই, ফুরিয়ে যাওয়া প্রেম - যা যা আপনার জীবনের অকারণ জায়গা দখল করে আছে, বিনা অপরাধবোধে বিদায় করুন। অন্য কেউ তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়ার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে আছে।


June 22, 2019

তখনকার পড়া, এখনকার পড়া



মাঝখানের কয়েকটা বছর বই পড়ার সময়ে টান পড়েছিল। ভেবেছিলাম জীবনে বই পড়ার থেকে গুরুতর যে সব কাজ আছে সব একে একে শেষ করে আবার পড়া শুরু করব। কাজেরা যতদিনে গুরুত্ব হারাল ততদিনে আরও অনেক কাজ জুটে গেছে। যেগুলো সবক’টাই বই পড়ার থেকে সোজা। টিভি দেখা, ইন্টারনেট সার্ফিং, ক্যান্ডি ক্রাশ খেলা। এগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা করলেও বইয়ের কথা একবারও মনে পড়ে না। অথচ বইয়ের চারপাঁচ পাতা পড়তে না পড়তেই এগুলোর কোনও একটা খুলে বসতে মন আনচান করে। 

তা বলে বই একেবারেই কি আর পড়তাম না? পড়তাম। ইচ্ছে হলে। মাঝেসাঝে। কিন্তু গোটা একটা দিন, কখনও কখনও পরপর দুই তিন চারদিন বইমুখো না হয়ে কাটিয়ে দেওয়াটা ধাতে সয়ে এসেছিল।

মন খারাপ হত। একটা দামি জিনিস যে হারিয়েছি সেটা সর্বক্ষণ চেতনায় খোঁচা দিত। মনে পড়ত, একসময় বই পড়াটা তেষ্টা পেলে জল খাওয়ার মতোই সোজা ছিল। যখন বই পড়তাম আর যখন বই পড়ছি না,  জীবনের এই দুটো পর্বের ভাবগতিকও তুলনা করার জন্য ছিল হাতের সামনেই। কার্যকারণ কে ঠিক করে। হতে পারে শান্তি গেছে বলেই বই পড়ার অভ্যেস গিয়েছিল কিন্তু আমার ভয় হত উল্টোটাই ঘটেছে। বই পড়ছি না বলেই সব অগোছালো হয়ে গেছে।

কেনার অভাবে পড়া হচ্ছিল না তেমন নয়। আমার বই পড়ার অভ্যেস কমা আর বই কেনার অভ্যেস বাড়ার মধ্যে একটি স্পষ্ট সমাপতন লক্ষ করেছি। সমাপতনটার মিল কাক বসা তাল পড়ার থেকে ঝড় ওঠা বক মরার সঙ্গেই বেশি বলে সন্দেহ। বই কিনলে একটা ঘ্রাণেন অর্ধভোজনং ভাব জাগে। কিনে তো রাখাই আছে। সময় করে পড়াটাই যা বাকি। অন্যান্য পদ্ধতিতে বই জমানোরও একই পরিণতি ঘটতে দেখেছি। সের দরে বই ডাউনলোড করছি কিংবা পি ডি এফ জমাচ্ছি এদিকে পড়ছি না এক লাইনও, আকছার ঘটে।

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। এ বছরের দিল্লি বইমেলার শেষ দিনে সাহিত্যিক অমর মিত্রর সাক্ষাৎকার শুনছিলাম। প্রবীণ সাহিত্যিকের ভালো ব্যাপার যেটা লাগল তা হচ্ছে সাহিত্যটা উনি খাতায় কলমেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, ওঁর কথাবার্তার মধ্যে বিন্দুমাত্র সাহিত্য নেই। সেটা আমাদের সাধারণ লোকের মতোই সোজাসাপটা। কথাপ্রসঙ্গে ইদানীং অনলাইনে পাইকারি দরে নতুন পুরনো বাংলা বইয়ের পি ডি এফ পাওয়া যাওয়ার কথা উঠল। অমর মিত্র বললেন, কী আর করা যাবে। যে যুগের যে চাল। উঠল যে কোনও বইয়ের খবর পেলেই, ‘পি ডি এফ পাওয়া যাবে দাদা?’, বলে ঝেঁকে আসা পাঠ্যানুরাগীদের কথা। সাহিত্যিক বিরক্তি চাপার চেষ্টা করলেন না।  বললেন, আরে ধুর ওরা পড়বে নাকি। ওই জমানোই সার।

বাকিদের কথা জানি না, আমাকে উনি ঠিক চিনেছেন। আমারও কিছু পি ডি এফ জমানো আছে বছরের পর বছর ধরে। পড়া আর হয়ে উঠছে না। বইয়ের অভাব নেই, সময়েরই যা অভাব।

ওই বই না পড়ার সময়টাতে একটা জিনিস টের পেয়েছিলাম। বই পড়া সাঁতার কাটার মতো নয়। সাঁতার একবার শিখে রাখলে আবার যদি কোনওদিন জলে পড়েন, সে যত দিন, যত মাস, যত বছর পরেই হোক না কেন, আপসে হাত পা নড়তে শুরু করবে, মাথা ভেসে থাকবে জলের ওপর। বই পড়া ভোলা বাঁ হাতের খেলা। সাঁতার শিখতে প্রচুর জল খেতে হয়েছিল, বই পড়া শিখতে কোনও কসরৎ করেছি বলে মনে পড়ে না। অথচ ভুলতে দিতে সাঁতার যতখানি নাছোড়, পড়া ততখানিই প্রতিরোধহীন।

ভাবলাম ব্যাপারটাকে সইয়ে সইয়ে ফিরিয়ে আনব। প্রথমবার অভ্যেসটা কীভাবে হয়েছিল মনে করা জরুরি। নিজে থেকে কিছু করেছি বলে তো মনে পড়ল না। যা করার মা করে থাকবেন। কী করেছিলেন মনে করার চেষ্টা করলাম। বই কিনে এনে দিতেন, আর টিভি দেখতে দিতেন না। নিজেও দেখতেন না। এমনকি মহাভারত, চিচিং ফাঁক, ফেলুদা ৩০ ইত্যাদি যা যা আমার দেখার অনুমতি ছিল এবং আমি একটিও এপিসোড বাদ না দিয়ে হাঁ করে গিলতাম সেগুলোও মা দেখতেন না। আপনি আচরি ধর্মের মা মস্ত বড় প্রচারক।

কিন্তু আমি মা নই। অত সংযম আমার সইবে না। ইন্টারনেটের থানে মাথা ঠুকলাম। হাউ টু রিড মোর/ হাউ টু ক্রিয়েট হ্যাবিট অফ রিডিং টাইপ করলাম। 

উত্তরটা কি অলরেডি জানা ছিল না? ছিল। পড়ার অভ্যেস ফিরিয়ে আনার এক এবং একমাত্র রাস্তা বই পড়া। নিয়মিত বই পড়া। বেশি বেশি বই পড়া। এই সমস্ত হাবিজাবি সার্চ না করে সেই সময়টা বই পড়া। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে বই পড়ার থেকে নেট ঘাঁটা সোজা, আরও সোজা নিজেকে ফাঁকি মারা। কাজেই। 

০.০০০০৫৬৭ সেকেন্ডে সার্থকভাবে হ্যাবিট গড়ে তোলার ৯৮৩৭৬৬২ টি সমাধান বেরিয়ে এল। প্রথম তিনটে পাতা পরীক্ষা করলেই নেক্সট তিরিশ মিনিট বইমুখো না হয়ে পার পাওয়া যাবে। আধঘণ্টা, একঘণ্টা পেরিয়ে দেড়ঘণ্টায় ঠেকল। মোটামুটি যে পরামর্শগুলো ফিরে ফিরে এল আর আমার মনেও ধরল তা হল দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় বই পড়ার জন্য ‘কার্ভ আউট’ করে নেওয়া। ওই সময় বই পড়ুন। অ্যালেক্সাকে বলে রাখুন, মনে করিয়ে দিতে। পরিবারকে জানিয়ে দিন এটা আপনার বই পড়ার সময়। মেলা ঝামেলা না করতে।

ছোটবেলায় আমার একটা বই পড়ার সময় ছিল বটে। সারাদিনের ফাঁকফোকরেও বই পড়া চলত কিন্তু দিনের একটা সময় শুধু বই পড়াই হত, রোজই হত। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর। মা বিছানা ঝাঁট দিতেন, মশারি টাঙাতেন, গরমকাল হলে জানালা খুলে পর্দা তুলে দিতেন, শীতকাল হলে সাটিনের ওয়ার দেওয়া লেপ পাততেন। আমি বই মুখে বসে থাকতাম। বাঁদিকে গোদরেজ আলমারি আর ডানদিকে কাঠের আলনার মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায়, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে, বাবু হয়ে, কোলের ওপর বই রেখে। ফাল্গুন টু কার্তিক পরনে লালকমলা সুতো দিয়ে আঁকা সাদা টেপফ্রক, ভূমাসন। অগ্রহায়ণ টু মাঘ মায়ের হাতে বোনা সোয়েটার আর তশরিফের নিচে রংচটা ডুরে শতরঞ্চি। 

ডায়রিতে লিখলাম, দিনের শেষে একঘণ্টা পড়ব। সপ্তাহে টোটাল সাত ঘণ্টা পড়া হবে। যদিও সাপ্তাহিক টু ডু লিস্টে পড়ার খাতে পাঁচ টু দশ ঘণ্টাই বরাদ্দ করলাম। আনরিয়েলিস্টিক আমাকে বলতে পারবে না কেউ। কোন সপ্তাহে বই পড়ার থেকে বেশি জরুরি কাজ পড়ে যায়, কোন সপ্তাহে গল্পের প্লট জমে ওঠে। অর্চিষ্মান ইয়ারফোন গুঁজে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দ হাসিতে কাঁপছিল। কাঁধে টোকা মারলাম। বললাম, রাত আটটা টু ন’টা আমার গল্পের বই পড়ার সময়। নেহাত এমারজেন্সি না হলে ওই সময়টা মেলা ঝামেলা না করলে বাধিত হব। অর্চিষ্মান চোখ ঘুরিয়ে ইয়ারফোন গুঁজে আবার স্ক্রিনের দিকে ফিরে দাঁত বার করল।

একেবারে যে কাজে দেয়নি বলব না। বই পড়া আগের থেকে অনেক বেড়েছে। রোজ রাতে পড়া হয় না, কিন্তু ধীরে ধীরে দিনের অন্যান্য সময়েও পড়া শিকড় মেলেছে। পাঁচ টু দশের রেঞ্জ পরিস্থিতি ভেদে তিন টু তেরোতেও ঠেকেছে। 

তবু আমার মন ভরেছে কি? সব আগের মতো হয়েছে কি? মেঝেয় বসে বই পড়ার আনন্দ ফিরে এসেছে কি? আসেনি।  

কেউ বলতে পারে, ওর সঙ্গে ভালোমন্দের কোনও সম্পর্ক নেই। ওটা নস্ট্যালজিয়া যার সঙ্গে যুদ্ধে বাস্তব সর্বদাই হারবে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি গোটা ব্যাপারটা স্মৃতিমেদুরতা নয়। তাছাড়াও একটা কারণ আছে। ওই মেঝেতে বসে বই পড়ার সময় বই পড়ার উপযোগিতা সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা ছিল না। বই কেউ লিখেছে, ছেপে বার করেছে, সে বই আমার হাতে এসে পৌঁছেছে, আমি পড়ছি। ব্যস। 

এখন 'হাতের কাছে পাচ্ছি তাই পড়ছি' এই কারণটা প্রায় উবেই গেছি। এখন আমি বই পড়ি কারণ আমি জানি বই পড়লে মনের জানালা খোলে, বই পড়লে অজানাকে জানা হয়, ইমেজ চকচকে হয়। এখন আমি বুঝে গেছি লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট বলে কিছু হয় না, না মানুষের সঙ্গে, না বইয়ের সঙ্গে। বই পড়াটাও একটা প্র্যাকটিস করার জিনিস, বই পড়াতেও ভালো হওয়ার সুযোগ আছে। প্রথম দর্শনে প্রেমে না পড়া বইয়ের সাধনায় লেগে থাকি। কেবলই হাই ওঠে, চোখ পিছলে যায়, শক্ত অক্ষরে, শক্ত বাক্যে, দুর্বোধ্য বাক্যে ঠোক্কর খায়। মাঝে মাঝে কোনও বইয়ের মাঝপথে ছেড়ে রেখে আবার হাতে তুলে নিতে গিয়ে মনের ভাব, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভুজঙ্গাসন করতে হবে মনে পড়লে যেমন হয়, তেমন হয়। আমি হাল ছাড়ি না। নিজেকে মনে করাই বই পড়া স্রেফ বিনোদন নয়, বই পড়া একটা মহৎ হবি। আরাম যত কম, উপযোগিতা তত বেশি। বই পড়ায় নিজেকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য গুডরিডসে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ি নিজেকে।  

বই পড়ি, কিন্তু আমার এই রকম বই পড়তে ভালো লাগে না। কারণ আমি জানি আরেকরকম করে বই পড়া যায়। যে বইপড়ার কোনও মাপজোপ নেই, যে বইপড়া শিক্ষামূলক হয়ে ওঠার কোনও প্রতিশ্রুতি দেয় না, যে রকম বইপড়ার লজিক বলে কাল বায়োলজি পরীক্ষা তো কী হয়েছে, তা বলে বিষবৃক্ষ অর্ধেক পড়ে ওঠে নাকি কেউ? 

সেইরকম বইপড়ার বর্ণনা একজন দিয়ে গেছেন বাংলা ভাষায়। তাঁর থেকে ভালো আমি পারব না, তাই তাঁর কথাই তুলে দিলাম।

"প্রতিদিন দুপুরবেলা আলমারী হইতে বাছিয়া এক-একখানি করিয়া বই সতুর নিকট হইতে চাহিয়া লইয়া যায় বাঁশবনের ছায়ায় কতগুলো শেওড়াগাছের কাঁচা ডাল পাতিয়া তাহার উপর উপুড় হইয়া শুইয়া একমনে পড়ে। বই অনেক আছে - প্রণয়-প্রতিমা, সরোজ-সরোজিনী, কুসুম-কুমারী, সচিত্র যৌবনে যোগিনী নাটক, দস্যু-দুহিতা, প্রেম-পরিণাম বা অমৃতে গরল, গোপেশ্বরের গুপ্তকথা… সে কত নাম করিবে! এক…একখানি করিয়া সে ধরে শেষ না করিয়া আর ছাড়িতে পারে না। চোখ টাটাইয়া ওঠে, রোগ টিপ্‌ টিপ করে; পুকুরধারের নির্জন বাঁশবনের ছায়া ইতিমধ্যে কখন দীর্ঘ হইয়া মজা পুকুরটার পাটাশেওলার দামে নামিয়া আসে, তাহার খেয়ালই থাকে না কোন্‌ দিক দিয়া বেলা গেল!

এক-একটি অধ্যায় শেষ করিয়া অপুর চোখ ঝাপসা হইয়া আসে - গলায় কি যেন আট্‌কাইয়া যায়। আকাশের দিকে চাহিয়া সে দুই-এক মিনিট কি ভাবে, আনন্দে বিস্ময়ে, উত্তেজনায় তাহার দুই কান দিয়া যেন আগুন বাহির হইতে থাকে, রুদ্ধনিঃশ্বাসে পরবর্তী অধ্যায়ে মন দেয়। সন্ধ্যা হইয়া যায়, চারিধারে ছায়া দীর্ঘ হইয়া আসে মাথার উপর বাঁশঝাড়ে কত কী পাখীর ডাক শুরু হয়, উঠি-উঠি করিয়াও বইয়ের পাতার এক-ইঞ্চি ওপরে চোখ রাখিয়া পড়িতে থাকে - যতক্ষণ অক্ষর দেখা যায়।"

*****

গত সপ্তাহে স্টেকহোল্ডার কনসাল্টেশন ছিল। গালভরা নাম, কাজ আসলে বোরিং বক্তৃতা শোনা। কনসাল্টেশন হল। টুথপিকে গাঁথা পনীর টিক্কা আর টমেটো সুপের মৃদু নেটওয়ার্কিং হল। একে অপরের চাকরির ঠ্যাকনা হয়ে ওঠা হল। তারপর হাঁফ ছেড়ে হোটেলের ঘরে প্রত্যাবর্তন। ঘোরাঘুরির প্রশ্নই নেই। প্রথম কথা, সময় নেই, দ্বিতীয় কথা, জায়গা আগে দেখা। সবথেকে বড় কথা, রাজপুতানার রোদ চোখের সামনে যা পাচ্ছে পুড়িয়ে ফেলছে। ওর মধ্যে পাগল ছাড়া কেউ বেড়াতে বেরোয় না।

হোটেলের ঘরে গিয়ে লম্বা হলাম। যাঁদের ঘনঘন হোটেলে থাকতে হয় তাঁরা দ্বিমত হবেন হয়তো, আমার হোটেলে থাকতে ভালো লাগে। হোটেলের ঘরে যে নির্জনতাটা, সেটা নিজের বাড়িতে সব রকম আওয়াজ বন্ধ করলেও পাওয়া যায় না। ওই একখানা ঘরের মধ্যে সবটুকু অস্তিত্ব এঁটে যাওয়ার ব্যাপারটা টানে। আর টানে শিকড়হীন, দায়িত্বহীন ভোগের সুখ। বিছানায় শোব কিন্তু চাদর কাচা নিয়ে মাথা ঘামাব না। চা খাব আমি, কাপ ধোবে অন্য কেউ। 

সময় কাটানোর জন্য টিভি দেখলেও হত। আমার আবার হোটেলের টিভিতে সি আই ডি-র রি-রান দেখার একটা ঐতিহ্য আছে। কিন্তু এবার দেখলাম না। অন্য বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল ফোনের ভেতর। অ্যান ক্লিভস-এর ভেরা স্ট্যানহোপ সিরিজটার মোট আটখানা বইয়ের সাড়ে পাঁচখানা বই পড়া ছিল। ভেরা স্ট্যানহোপের কথা আগেও লিখেছি অবান্তরে, আবার লেখার ইচ্ছে আছে। উনি হচ্ছে নরদাম্বারল্যান্ড অঞ্চলের গোয়েন্দা পুলিস। পড়তে শুরু করলাম। অর্ধেক পড়া বইটা শেষ করলাম। উঠে চা নিয়ে এলাম এককাপ। পরের গল্পটা যখন শেষ হল ঘড়ির লাল অক্ষরে প'নে দু’টো দপদপাচ্ছে। রাস্তার মৃদু গাড়ির শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না আর। আরেক কাপ চায়ের সময় হয়েছে।

সিরিজের শেষ উপন্যাসের শেষ পাতাটা ক্লিক করে বন্ধ করলাম যখন তখন হোটেলের পর্দার ওপাশে সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে।

মাথা দপদপ করছিল। সারারাত জাগার বিস্বাদ মুখের ভেতর। কিন্তু বুকের ভেতর সেই কবেকার মেঝেতে বসে বই পড়ার অনুভূতি। মা শুতে যাওয়ার তাড়া দিচ্ছেন। আমি বলছি, এই তো হয়ে এসেছে, আর মোটে দশ পাতা। 

মা নেই, আমিও বদলে গেছি, মেঝেটুকুও কম্পিউটার টেবিল এসে দখল করে নিয়েছে। কিন্তু অনুভূতিটা অবিকল। চিনতে ভুল হয়নি আমার। মনে করে রেখেছি। আবার কবে দেখা পাই না পাই।



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.