April 30, 2016

সাপ্তাহিকী








ওঙ্গে পাত্র- পাত্রী নিজেরাই নিজেদের বিবাহ ঠিক করে জানায় দু’পক্ষের পিতামাতাকে। অনেক সময়েই জানাবার প্রয়োজন হয় না, পিতামাতা টের পায় তাঁদের সন্তান কোথায় যায়, কার কাছে যায়। অভিভাবকরা তখন নিজেদের মধ্যে একটা দিন ঠিক করে। পাত্রীকে নিয়ে আসে পাত্রের বাড়িতে। ঘরের ভিতরে একটা মাচায় বসে পাত্র, একটা মাচায় বসে পাত্রী। পাত্রকে বলা হয় পাত্রীর হাত ধরে তার মাচায় তুলে নিতে। বর মাচা হতে নেমে এসে কনের হাত ধরে টানে। লাজুক কনে একটু একটু করে এগোয়, যেন জোর করেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ভাবটা। বর কনেকে নিয়ে মাচায় তোলে। বর বসে, কনে বসে বরের কোলে। ধীরে দু’জন দু’জনকে আলিঙ্গন করে। নিঃশব্দে দু’-তিন মিনিট সেই আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। বিয়ের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। বর-বউ নেমে আসে, গুরুজনদের কোলে বসে, সবাইকে এক এক করে সেইভাবে আলিঙ্গন করে। শ্রদ্ধা সম্মান দেখাবার এই রীতি এদের। …… শিশুর যখন জন্ম নেবার সময় হয়, প্রসূতির সঙ্গে তার স্বামীও পাশের মাচায় শুয়ে শুয়ে প্রসববেদনা অনুভূতিতে অনুভব করে। মায়ের মতো পিতাও যন্ত্রণায় কাতর হয়। সে সময়ে প্রসূতির স্বামী ছাড়া আর কোনও পুরুষ লোক থাকে না সে ঘরে। মেয়েরা থাকে - মায়ের কোলের শিশুরা থাকে - আর থাকে বালকরা। বালকদের থাকা নিষেধ নয়। 
                                                                 ---রানী চন্দ, আন্দামান (পথে-ঘাটে বই থেকে)

“It is better for the world, if instead of waiting to execute degenerate offspring for crime, or to let them starve for their imbecility, society can prevent those who are manifestly unfit from continuing their kind……. three generations of imbeciles are enough.” বিশ্বাস না হয় নিজের চোখে পড়ে দেখুন। 

"Every month for the next several years, 1 million Indians will turn 18" এটাও বিশ্বাস হচ্ছে না? নিজের চোখে দেখে নিন।



বুকশেলফ বিছানা। লিংক পাঠিয়েছে শ্রীমন্তী।

এই দেখুন, ‘দ্য এলিয়েনিস্ট’ নিয়ে এত কথা হতে হতেই ভালো খবর। ক্রাইৎজলার ফিরে আসছেন। 

এই বইটা পড়ার ইচ্ছে হচ্ছে। 

লিংকটা যদিও খানিকটা পুরোনো, তবু একসময় যে এই বইটা পৃথিবীর সবথেকে মোটা বই ছিল ভাবতেও ভালো লাগে। 





April 28, 2016

গত তিন বছরে আমি যা যা ভেঙেছি



উৎস গুগল ইমেজেস


(জিনিসগুলোর প্রতি আমার অনুরক্তির অধঃক্রমে সাজানো)

১। মায়ের দেওয়া একটা সাদা পোর্সিলিনের বাটি।

২। একটা লাল কাপ। নিজের কেনা। খুব শখের ছিল।

৩। ইলেকট্রিক কেটলি। কেটলিটা ভাঙেনি, ভেঙেছে ঢাকনাটা। বাকি শরীরের থেকে আলাদা হয়ে গেছে। আর এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত একটা চিড় ধরেছে। জল গরম করা যায়। তবে কাপে গরম জল ঢালার সময় সতর্ক থাকতে হয়, না হলে ঢাকনা আলগা হয়ে কাপের ওপর পড়ে যেতে পারে। পড়েওছে কয়েকবার। কিন্তু কোনও কাপ ভাঙেনি। এখনও পর্যন্ত। ভাঙলে সেগুলোকেও এই লিস্টে ঢোকাতে হত। কারণ প্রত্যক্ষভাবে না হলেও দুর্ঘটনাটার জন্য পরোক্ষভাবে আমিই দায়ী থাকতাম।

৮। একটা ল্যাপটপ। (আমার জীবনের প্রথম ল্যাপটপ। দু’হাজার আটে কেনা। তার আগের আঠাশটা বছর নাকি আমি নিজস্ব ল্যাপটপ এবং ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই, খেয়েদেয়ে, নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে, মানুষের সমাজে দিব্যি চলেফিরে বেড়াতাম। অন্তত কমন সেন্স তো সে রকমটাই দাবি করছে। যদিও আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।)

৯। আরেকটা ল্যাপটপ। রাতে চোখ বন্ধ করার আগে অর্চিষ্মানকে টপকে টেবিল অবধি হাত বাড়াতে কুঁড়েমো লাগছিল বলে খাটের নিচে নামিয়ে রেখেছিলাম। ঘুম থেকে উঠে রোজ যেখানটায় পা দিই,ঠিক সেইখানটায়। ভেবেছিলাম কাল সকালে ঘুম ভেঙে উঠে মনে করে এই জায়গাটা এড়িয়ে পা ফেলব। তারপর যা হওয়ার তাই হল। অর্চিষ্মান বলে আমি নাকি সকালবেলা উঠে ল্যাপটপের ওপর “নৃত্য” করেছিলাম, কিন্তু সেটা অতিশয়োক্তি। আমি খুব আলতো করেই পা রেখেছিলাম, তাতেই মট করে একটা আওয়াজ হল। তারপর কম্পিউটার অন করে দেখি স্ক্রিনে সারিসারি রামধনু। অথচ আমি সুগতর মুখে গল্প শুনেছি, ওঁর কোন চেনা লোক নাকি তোশিবা ল্যাপটপের টেঁকসয়িতার প্রমাণ দিতে গিয়ে বুটজুতো পরে ল্যাপটপের ওপর কোমরে হাত দিয়ে বুক ফুলিয়ে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিলেন। তোশিবা টসকায়নি। ভাবুন, প্রমাণ সাইজের একজন মানুষ। আর সোনি ভায়ো আমার মোটে একখানা পায়ের ওজন নিতে পারল না। একেই বলে কপালের নাম কুন্তলা।

১০। ওপরের ল্যাপটপটা আরেকবার। সারিয়ে আসার ঠিক পরে পরেই। এবার স্ক্রিন ঠিক ছিল। মনিটরটা কি-বোর্ড থেকে আলাদা হয়ে গেল। এটা কখন, কী করে হল আমি অনেক ভেবেও মনে করতে পারি না। অর্চিষ্মান হাই তুলে বলে, “কী করে আবার হবে। নিশ্চয় আবার ওটার ওপর চড়ে নৃত্য করেছিলে।“ ডাহা মিথ্যে কথা। করলে আমার মনে থাকত।

১১। ফোনের ফ্ল্যাপ-কভার। এটাও কী করে ভাঙল আমার মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে যে ভাঙার পর ঘটনাটাকে এতই তুচ্ছ মনে হয়েছিল যে আমি আরেকটা ফ্ল্যাপকভার কেনা দরকার মনে করিনি। তাছাড়া একটা পাতলা প্লাস্টিকের স্ক্রিনগার্ড তো আছেই। জিনিসপত্রের প্রতি আমার মতো যত্নশীল লোকের পক্ষে ওই যথেষ্ট মনে হয়েছিল। তবু কেন এটাকে লিস্টে পরের আইটেমটার আগে জায়গা দিলাম সেটা এক্ষুনি স্পষ্ট হবে।

১২। ফোনের স্ক্রিন। এই সেদিন রাতে চোখ বন্ধ করার আগে অর্চিষ্মানকে টপকে টেবিলে রাখতে গিয়ে হাত ফসকে টেবিল আর খাটের মাঝখানের সরু গলিটায় পড়ে গেল। গিয়ে স্ক্রিনটা ফেটে গেল। প্লাস্টিকের স্ক্রিনগার্ডটা কোনও কাজেই দিল না। দোকানে গেলাম। দোকানি দেখেশুনে বললেন, “এই জন্যই বলি ফ্ল্যাপ কভার লাগান। আপনারা তো ভাবেন আমরা খালি ইচ্ছে করে আপনাদের পয়সা খরচ করাই।" নতুন স্ক্রিন বসানো হল। বাড়ি এসে দেখলাম কলিং সেন্সর খারাপ হয়ে গেছে। অর্থা একবার ফোন করার পর বা ধরার পর স্ক্রিন অন্ধকার। আমার পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব নয়। অন হোল্ড রাখা সম্ভব নয়, লাউডস্পিকার চালু করা সম্ভব নয়। সবথেকে অসুবিধের ব্যাপার যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে ফোন কাটা পর্যন্ত যাচ্ছে না। এই চক্করে পড়ে গত দু’দিনে অন্তত পাঁচবার ইভেন-অড নিয়ে কেজরিওয়ালের বক্তৃতা শুনেছি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।

*****

অথচ আমার জন্মের সময় উপহার পাওয়া প্লাস্টিকের গোলাপি হাতি, চারটে থামের মতো পা, দুটো কুলোর মতো কান, দুটো মার্বেলের মতো চকচকে চোখ, একটা সমীহ উদ্রেককারী শুঁড় আর একটা হাস্যকর ল্যাজ নিয়ে এখনও শো-কেসের ভেতর অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে। এই পঁয়ত্রিশ বছর পরেও। অদ্ভুত।


April 27, 2016

গোয়েন্দাগল্পে প্রেক্ষাপট




উৎস গুগল ইমেজেস

অবান্তরের একটা পুরোনো পোস্টে আমি দাবি করেছি, যদিও গোয়েন্দাগল্প প্লটপ্রধান, তবু গোয়েন্দাগল্পের সার্থকতা/সফলতার প্রধান উপকরণ প্লট (অর্থাৎ খুন, চুরি, কিডন্যাপ, ক’টা খুন, কী চুরি, কে কিডন্যাপ) নয়, বরং গল্পের নায়ক অর্থাৎ গোয়েন্দার চরিত্র। বলাই বাহুল্য এখানে গোয়েন্দার নৈতিক চরিত্রের কথা বোঝানো হচ্ছে না (তাহলে ফাদার ব্রাউন কোকেনখোর হোমসের থেকে অনেক বেশি জনপ্রিয় হতেন), বরং তার ‘ক্যারেকটার’ হয়ে উঠতে পারার ক্ষমতার কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ সে বাদবাকি পাঁচটা লোকের থেকে যথেষ্ট পরিমাণে আলাদা কি না, বই শেষ করে উঠে খুনির নাম ভুলে গেলেও তাকে মনে থাকবে কি না ইত্যাদি। 

সম্প্রতি একেনবাবুর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আরও একটা জরুরি বিষয়ের কথা মনে পড়ল। প্রেক্ষাপট বা ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং। চরিত্রগুলোর সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রদের চারপাশটাকেও জীবন্ত করে তোলা। লিটারেরি বা সাই-ফাই বা ইয়ং অ্যাডাল্ট ঘরানার সাহিত্যের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটার প্রয়োজন সকলেই স্বীকার করবেন। হ্যারি পটারের প্রতিভার কারিকুরি পাঠকের কোনও কাজেই লাগত না যদি না অমন নিখুঁত একখানা হগওয়ার্টস তৈরি করতেন জে কে রোলিং। ঠিক তেমনি মিস মার্পলের কিচেন সিংকের মতো মগজেও মরচে ধরে যেত যদি না সেন্ট মেরি মিডের মতো একখানা গ্রামকে তিনি চারণভূমি হিসেবে পেতেন। বা বলা যেতে পারে, সেন্ট মেরি মিড-ই হচ্ছে মিস মার্পলের কিচেন সিংকের মতো মগজের আসল মিস্তিরি। সেন্ট মেরি মিডের ভিক্টোরিয়ান স্পিনস্টারের দল, ভিকারেজ, ভিকারেজে প্রতি বৃহস্পতিবারের গসিপসহ চায়ের আড্ডা। মিস মার্পলের ভাইপো রেমন্ড ওয়েস্ট যাকে ডোবার পচা, স্থবির জলের সঙ্গে তুলনা করেছেন কিন্তু আসলে যা অণুবীক্ষণের তলায় ধরা ডোবার জলের মতোই ঘটনাবহুল, বিচিত্র।

শার্লক হোমসের উদাহরণও দেওয়া যেতে পারে। ডিডাকশন, বেহালা, কোকেনটোকেন মিলিয়ে ভদ্রলোক নিজে যথেষ্টই ‘ক্যারেকটার’, কিন্তু তাঁর ক্যারেকটারের একটা বড় অঙ্গ হচ্ছে লন্ডন -  "that great cesspool into which all the loungers and idlers of the Empire are irresistibly drained." শার্লকের অসংখ্য অমানুষিক গুণের মধ্যে একটা হচ্ছে এই গ্রেট সেসপুলের নাড়িনক্ষত্র শিরাধমনী রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেনা। শুধু লন্ডনের গলি বেশি চেনেন বলেই অনেক সময় অনেক অপরাধীদের তিনি ধরে ফেলেছেন। 

তবে মিস মার্পল আর শার্লক হোমস গোয়েন্দা গল্পে প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য খুব একটা ভালো উদাহরণ নন। কারণ লোকে দাবি করতে পারে ‘আ মার্ডার ইস অ্যানাউন্সড’-এর মতো ধুন্ধুমার প্লট কিংবা শার্লক হোমসের মতো চরিত্রের ক্যারিশমাই এই সব গোয়েন্দার সাফল্যের আসল কারণ। প্রেক্ষাপটটা ফাউ। সেটা বাজে হলেও এঁরাব বিশ্ববিখ্যাত হতেন। কাজেই সে সব গোয়েন্দার দিকে নজর ফেরানো যাক, যাদের প্লট কিংবা ক্যারিশমার দিকে অত ঝোঁক নেই, যারা প্রেক্ষাপটপ্রধান। 

আর এ রকম গোয়েন্দা গল্পের সবথেকে ভালো উদাহরণ হচ্ছে ব্রিটিশ লেখক অ্যান ক্লিভস-এর গল্প। গল্প বলার ধরণে একেবারেই না থাকলেও আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে তাঁর দুটো গুরুত্বপূর্ণ মিল আছে। এক নম্বর মিল, ক্রিস্টির মতো ক্লিভসও প্রায় একইরকম জনপ্রিয় দুটি গোয়েন্দা চরিত্রের সৃষ্টি করেছেন। দু’নম্বর মিল, সে দুটি গোয়েন্দাচরিত্রের একজন পুরুষ, অন্যজন মহিলা। পুরুষ গোয়েন্দা জিমি পেরেজ, মহিলা গোয়েন্দা নাম ভেরা স্ট্যানহোপ। চরিত্রের দিক থেকে পেরেজ এবং স্ট্যানহোপ দুজনেই স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। কিন্তু তাঁদের থেকেও উজ্জ্বল তাঁদের গল্পে তাঁদের নিজ নিজ জুরিসডিকশনের প্রকৃতি এবং মানুষের ভূমিকা। জিমি পেরেজ-এর জুরিসডিকশন হচ্ছে শেটল্যান্ড আর ভেরা স্ট্যানহোপের নর্দাম্বারল্যান্ড। পেরেজ-এর গল্প পড়ার আগে পর্যন্ত আমি জানতাম না শেটল্যান্ড খায় না মাথায় দেয়, ভূগোলে আমার মতো গোল যদি অবান্তরে আরও কেউ থেকে থাকেন তাহলে তাঁদের সুবিধের জন্য বলে দিচ্ছি। শেটল্যান্ড হচ্ছে স্কটল্যান্ডের উতরে একটি সাবআর্কটিক দ্বীপপুঞ্জ। একশোরও বেশি দ্বীপ নিয়ে তৈরি এই দ্বীপপুঞ্জ পৃথিবীর অন্যতম নির্জন লোকবসতির মধ্যে একটি। আর্কটিক সাগর ঘেরা এই ধূসর দ্বীপপুঞ্জের সবক’টি দ্বীপ মিলিয়ে বাসিন্দা এখন মোটে হাজার তেইশ,  দু’হাজার ছয় সালে পেরেজ সিরিজের প্রথম গল্প ‘রেভেন ব্ল্যাক’ প্রকাশিত হওয়ার সময় কত ছিল কে জানে। এখানে মানুষ মাইনরিটি, প্রকৃতি প্রবল। পনেরোশোঁ মাইল ভাঙাচোরা তটরেখা ঘেরা শেটল্যান্ডের যে বিন্দুতেই আপনি থাকুন না কেন সমুদ্রের নাগাল থেকে পালাতে পারবেন না। গ্রীষ্মে শেটল্যান্ডের বিস্তীর্ণ মাঠ ঘাস আর বুনোফুলে ঢেকে যায়, কিন্তু সে মাত্র কয়েকটা মাসের জন্য। বছরের বাকি সময় সবুজের চিহ্নহীন বরফের মরুভূমি। মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে ফেরার পথে এক শীতের এক সকালে সেই সাদা মরুভূমির মধ্যে দূরে একটুকরো লাল রং দেখতে পায় ফ্র্যান হান্টার (শেটল্যান্ড সিরিজের পরের গল্পগুলোতে ফ্র্যানের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে)  আর দেখে তার ওপর গোল হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে কুচকুচে কালো তিনটে বিন্দু, ব্ল্যাক র‍্যাভেনের দল। ওই সাদা, লাল, কালো রঙের অদ্ভুত বিন্যাস নিমেষে অ্যান ক্লিভসকে গোয়েন্দা গল্পের আকাশে তারার জায়গা দিয়েছিল। এই বইটির জন্যই ক্লিভস 'ডানকান লরি ড্যাগার অ্যাওয়ার্ড' পেয়েছিলেন। অ্যান ক্লিভস-এর গল্পে সাসপেন্স আছে, চরিত্রদের টানাপোড়েন আছে, প্লটের কারিগরি আছে, আর এই সবকে নিখুঁত সুতোয় বেঁধেছে ক্লিভসের গল্পের অকুস্থল।

ঠিক যেমন ভেরা স্ট্যানহোপের জুরিসডিকশন ইংল্যান্ডের উত্তরপূর্ব কোণের নর্দাম্বারল্যান্ড। সমুদ্র অ্যান ক্লিভসের খুব পছন্দের বোঝা যায় কারণ নর্দাম্বারল্যান্ডও উত্তর সাগরের তীরে। ছবির মতো সেই উঁচু ক্লিফ ধরে যখন সত্যের সন্ধানে ছুটে চলে ভেরা স্ট্যানহোপের দানবিক, কুৎসিত ল্যান্ড রোভার তখন চোখ ফেরানো যায় না। যদিও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্ক নেই তবু ভেরা প্রসঙ্গে একটা মজার কথা আপনাদের না বলে পারছি না। ভেরা স্ট্যানহোপ সিরিজের প্রথম উপন্যাস 'দ্য ক্রো ট্র্যাপ’ যখন লিখছিলেন অ্যান ক্লিভস, তখন তাঁর কল্পনায় ভেরার ছায়ামাত্র ছিল না। ইন ফ্যাক্ট, গল্পে রহস্য থাকবে, সাসপেন্স থাকবে, সাইকোলজি থাকবে, রহস্য থাকবে, কিন্তু রহস্যভেদী থাকবে না, এমনই একটি অভিনব ফন্দি নিয়ে ক্রো ট্র্যাপ লিখতে শুরু করেছিলেন ক্লিভস। কিন্তু লিখতে লিখতে গল্প আটকে গেল। কিছুতেই আর এগোয় না। তখন অ্যান ক্লিভস-এর গোয়েন্দা গল্পের মাস্টারমশাই রেমন্ড চ্যান্ডলারের একটা কথা মনে পড়ল। "If you are stuck with a book, have a guy burst through a door with a gun." "মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন…” ইত্যাদি মনে করে ক্লিভস ফের গল্পে ঝাঁপ দিলেন। মার্ডারকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দিয়ে দিব্যি চার্চে ফিউনেরাল হচ্ছে এমন সময় চার্চের দরজা প্রায় ভেঙে ফেলে ঢুকে এলেন, না বন্দুক হাতে ফিলিপ মার্লো নন, বরং a large woman, big bones amply covered, a bulbous nose, man-sized feet…Her face was blotched and pitted. গায়ে একখানা অন্তত তিনসাইজ বড় কোট। দেখলে মনে হবে ন্যালাখ্যাপা ঠাকুমা, কিন্তু আসলে তিনি ডি সি আই ভেরা স্ট্যানহোপ।

প্রেক্ষাপট যে অ্যান ক্লিভস-এর গল্পে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ সেটা বোঝা যায় তাঁর দুটি গোয়েন্দা সিরিজেরই টেলিভিশন সংস্করণের জনপ্রিয়তা দেখে। স্ট্যানহোপ এবং পেরেজ দুটোরই টিভি সিরিজ হয়েছে এবং সেগুলো দৃষ্টিনান্দনিকতার দিক থেকে অসামান্য। আপনারা না দেখে থাকলে দেখতে পারেন।

ঐতিহাসিক গোয়েন্দাকাহিনিরও মেরুদণ্ড প্রেক্ষাপট। খুনখারাপি নিয়ে ভাবলেই শুধু হবে না, যারা খুন করছে বা হচ্ছে, তারা কী পরত কী খেত কী ভাবত সব নিয়ে ভালো লেখক ভাববেন। এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে আলোচনা করা ক্যালেব কার-এর 'দ্য এলিয়েনিস্ট' গল্পের কথা মনে করা যেতে পারে। দেহব্যবসায় লিপ্ত বালকের খুনের ব্যাপারটা টাইমলেস। তখনও ওটা হাই রিস্ক প্রফেশন ছিল, এখনও আছে। এখনও আমাদের চারপাশে যথেষ্ট সংখ্যক উন্মাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে যারা মনে করে দেহব্যবসায়ীদের ধরে মারলেই বোধহয় সমাজটা শুধরে যাবে। কাজেই ক্যালেব কার যদি শুধু ওইটুকু নিয়ে গল্প ফাঁদতেন সেটা অভিনব কিছু হত না। এলিয়েনিস্ট অভিনবত্বের পুরোটাই ওই সময়টাকে অত ছবির মতো বইয়ের পাতায় তুলে আনাটা। সেই সময়ের বৃহত্তর সমস্যা, দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক ওঠাপড়া যেমন এসেছে, তেমনি ছোটছোট আঞ্চলিক ঘটনাও বাদ পড়েনি।  

এলিয়েনিস্ট যারা পড়েছেন জানবেন, তখন স্বচ্ছ ভারতের মতো স্বচ্ছ নিউ ইয়র্ক আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনটা ছিল মূলত স্বেচ্ছাসেবীচালিত। সারারাত ধরে তারা শহরের রাস্তাঘাট পরিষ্কার করে বেড়াত, কোনও পথচারী গুটকার প্যাকেট ফেললে তাকে দল বেঁধে ঠেঙাত। এলিয়েনিস্ট-এর গোয়েন্দাবাহিনী যখন গভীর রাতে উন্মাদ দুষ্কৃতীকে ধরতে রাস্তায় রাস্তায় টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন এই সব দুর্দান্ত স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে দুয়েকটা দৃশ্যে আমাদের দেখা হয়। না হলেও কিছু ক্ষতি হত না। প্লটে কোনও হেরফের হত না। কিন্তু দেখা যে হল, সেটা গল্পটা কে একটা আলাদা মাত্রা দিল। আর পাঁচটা দেহব্যবসায়ী খুনের গল্পে পর্যবসিত হল না।

সার্থক প্রেক্ষাপটওয়ালা ঐতিহাসিক গল্পের আরেকটা চমৎকার উদাহরণ হবেন জেসন গুডউইন-এর গোয়েন্দা ইয়াশিম টোগালু। ইয়াশিম টোগালু তৎকালীন ইস্তানবুলের রাজপরিবার এবং অন্যান্য প্রভাবশালী লোকজনের সান্নিধ্যভোগী একজন মানুষ। আঠেরোশো ছত্রিশ সালের ইস্তানবুলে সে ঘোরেফেরে, ডাক পড়লে ( রহস্য সমাধানের) রাজবাড়িতে যায়, না হলে নিজের খুপরি ঘরে বসে রান্না করে। ইয়াশিম-এর গল্পে সে সময়ের ইস্তানবুলের ছবি এত চমৎকার ফোটে, যে মনে হয় আমি ওই শহরটাতে বসে আছি। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, ঐতিহাসিক গল্পে লেখক সে সময়ের বা সমাজের যে ছবিটা আঁকছেন সেটা ঠিক কিনা সে বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি সে চেষ্টাও করছি না। দুহাজার ষোলোর ইস্তানবুল কেমন সে সম্পর্কেই আমার কোনও আইডিয়া নেই, আঠেরোশো ছত্রিশের ইস্তানবুল তো ছেড়েই দিলাম। তবে ছবিটা ভালো আঁকা হয়েছে না দায়সারা সেটা সব পাঠকই বোঝে। পড়লেই পরের ছুটিতে ইস্তানবুল বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করছে কি না সেটাই লেখকের সবথেকে বড় পরীক্ষা।

আমি যে শহরে থাকি ঐতিহাসিক গল্প ফেঁদে বসার জন্য সেও উপযোগিতায় কিছু কম যায় না। সে দরকারি কাজটা করেছেন মধুলিকা লিডল। এঁর গোয়েন্দার নাম মুজফফর জং, আর তাঁর চারণভূমি সপ্তদশ শতাব্দীর শাহজাহানের দিল্লি। যদিও দুঃখের বিষয় এঁর প্রথম বই (এবং বেস্টসেলার), দ্য ইংলিশম্যান’স ক্যামিও ছাড়া মুজফফর জং-এর আর কোনও গল্প আমার পড়া হয়নি। দ্রুত এই ভুল সংশোধন করা দরকার।

সবসময় যে প্রেক্ষাপট নৈসর্গিক বা নাগরিকই হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। প্রেক্ষাপট অনেক সময় হতে পারে শ্রেণী বা ক্লাসভিত্তিক। আর যে দেশে একসময় ক্লাসের রমরমা ছিল সে দেশের গোয়েন্দা গল্পে যে এর প্রমাণ থাকবে তাতে আশ্চর্য কী। ডরোথি সেয়ার্স-এর লর্ড পিঁটার উইমসি যেমন। ব্রিটেনের প্রাচীন বংশের উত্তরাধিকারী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে শেল-শকড, পয়সা রোজগারের চিন্তা নেই, আপাতত রহস্য সমাধান করে বেড়ান। সাধারণ সমাজের খুনখারাপিও সমাধান করেন তবে তাঁর সব গল্প জুড়েই তাঁর লর্ড,  লেডি, ডিউক, ডাচেস আত্মীয়বন্ধুদের ভিড় লেগে থাকে। বিশেষ করে ‘ক্লাউড অফ উইটনেস’ গল্পে, যেখানে তাঁর নিজের দাদা, ডিউক অফ ডেনভার, স্বয়ং অপরাধী বলে অভিযুক্ত হন সেই গল্পে তো ছবিটা খুবই স্পষ্ট। উইমসি-র আরেকটা গল্প ‘গডি নাইট’-এ সমাজের একটা খুব ইন্টারেস্টিং, শ্রেণী নয়, গ্রুপই বলা ভালো, তার ছবি আছে। এ গল্পে গোলমাল ঘটছে অক্সফোর্ডের মহিলামহলের ভেতর। ডরোথি সেয়ার্স নিজে অক্সফোর্ড পাশ ছিলেন, আর সে সময় সমাজের ওই শ্রেণীটিকে, অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের রীতিমত সন্দেহের চোখে দেখা হত। তাদের মধ্যে যদি একটা খুনখারাপি হত তখন আলোচনাটা শুধু আততায়ী ভিকটিমে সীমাবদ্ধ থাকত না, একগাদা রাজনৈতিক, সামাজিক প্রশ্ন উঠে পড়ত। গডি নাইট-এ সেসব প্রশ্ন চমৎকার তুলে এনেছেন সেয়ার্স। বইটা যদি পড়ার সুযোগ না পান তাহলে চিত্রায়ণটা দেখে নিতে পারেন। ইউটিউবে আছে।

প্রেক্ষাপট যে শুধু গল্পের কাজে লাগে তা নয়, প্রেক্ষাপট যদি তেমন ভালো হয় তাহলে প্লটের খামতি তা দিয়ে ঢাকা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে আমি শার্লক হোমসের 'দ্য হাউন্ড অফ দ্য বাস্কারভিলস'-এর নাম করব। আপনাদের সকলেরই গল্পটা মনে আছে তবু আরেকবার ঝালিয়ে দিই। ডেভনশায়ারের ডার্টমুর বংশের এর বাস্কারভিল বংশের প্রাচীন অভিশাপ হল যে রাক্ষুসে হাউন্ডের কবলে পড়ে সবাই মরবে। স্যার হেনরি যখন মারা গেলেন তখন তাঁর মৃতদেহের পাশে রাক্ষুসে হাউন্ডের পায়ের ছাপ দেখে বাস্কারভিলদের হিতৈষী প্রতিবেশী ডাক্তার মর্টিমার এলেন শার্লক হোমসের কাছে পরামর্শ চাইতে। হেনরির উত্তরাধিকারী চার্লস আসছেন কানাডা থেকে, বাস্কারভিল হলের দায়িত্ব নিতে। হোমসকে তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। স্যার চার্লস লন্ডনে পৌঁছনোর পর সেখানেই এমন সব কাণ্ডকারখানা ঘটতে লাগল যে বোঝা গেল সেসবের পেছনে নরকের হাউন্ডের থেকে মর্ত্যের মানুষের কেরামতিই বেশি।

ওয়াটসনকে চলনদার করে শার্লক হোমস স্যার চার্লসকে পাঠিয়ে দিলেন ডার্টমুরে। সেখানে পৌঁছে নানারকম রোমহর্ষক কাণ্ডকারখানা হল, খানচারেক রেড হেরিং আর একখানা প্রেম আর একজন পলাতক অপরাধীর আমদানি ঘটল, ঘটনার ঘনঘটায় ওয়াটসন এবং পাঠক যখন গলা পর্যন্ত ডুবে আছে, তখন শার্লক হোমস হাসতে হাসতে সিনে ঢুকে বললেন, সেকী, বুঝতে পারোনি খুনি কে? ওই তো অমুকে। (হ্যাঁ, এইরকমের গোয়েন্দাকাহিনিও বাস্তবে হয়, 'হুডানইট'-এর বদলে যেগুলোকে বলা হয় 'হাউক্যাচদেম'। যেখানে গোড়াতেই আপনি বুঝে যান কে খুন করেছে, তারপর শুধু অপেক্ষা গোয়েন্দা খুনিকে কী করে ধরে সেই দেখার। আমি আর অর্চিষ্মান ইদানীং এই গোত্রের একটা গোয়েন্দা টিভি সিরিজ দেখছি, পরে কখনও সে বিষয়ে লেখার ইচ্ছে রইল। হাউন্ড অফ দ্য বাস্কারভিলস সে জাতের গল্প বলে আমার মনে হয় না। ) এ যেন ঠিক জটায়ুর কায়দায় রহস্য সমাধান। আগে খুনি ঠিক হয়ে গেল, তারপর তার ঘাড়ে চাপল মোটিভ, মিনস আর অপরচুনিটির জোয়াল। কিন্তু শার্লক হোমস কী করে ওই বেচারাকে চিহ্নিত করলেন তার কোনও আভাস গল্পে নেই। একটি ছেলেকে দিয়ে খোঁজখবর আনানোর কাজে রাখা হয়েছিল, হয়তো সে-ই খবর এনে দিয়ে থাকবে। যদি তাও হয়, তাহলে সেটাও ঘটেছে পাঠকের চোখের আড়ালে। গোয়েন্দাগল্পের যে কটা টেক্সটবুকে যত নিয়ম আছে, সবেতে কাটা গোল্লা। 

কিন্তু গল্পটা পড়ার সময় (বা সানডে সাসপেন্স-এ মিরের হাড়হিম করা গলায় শোনার সময়) ওসব নিয়ম আপনার মনেই আসবে না। তখন কেবলই মনে পড়বে বিস্তীর্ণ ধূসর জলাভূমির কোণে কোণে একটা হ্যাংলা হাউন্ড জিভ লকলক করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পাথরের আড়ালে ঘাপটি মেরে আছে কোনও জেলপালানো খুনে, আর দূরে পাহাড়ের মাথায় প্রস্তরযুগের মানুষের বানানো পাথরের বাড়ির গায়ে ঠাণ্ডা চাঁদের আলোয় ফুটে উঠেছে অজ্ঞাতচারীর ছায়া। তখন স্রেফ ঘাড়ের রোঁয়া খাড়া হয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনও প্রতিক্রিয়া হবে না কারও। 

গোয়েন্দাগল্পের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে সেটা বোঝার জন্য অবশ্য এত বিদেশবিভূঁইয়ে ঘুরে মরার দরকার নেই। আমাদের হাতের কাছেই একজন আছেন। তিনি কোকেন খান না, সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাননি, দুহাতে অব্যর্থ বন্দুক চালাতে পারেন না, দু’বার মাত্র পড়ে গোটা দেবতার গ্রাস মুখস্থ করার কথা তো ছেড়েই দিলাম। স্ত্রী পুত্র সংসার নিয়ে লেপটে থাকা বাঙালি বলতে যা বোঝায় তিনি হচ্ছেন তাই। তাঁর ভাবনাচিন্তার সঙ্গে যেটুকু পরিচয় হয়েছে তাতে তাঁর প্রগতিশীলতাও যে সময়ের তুলনায় বিরাট কিছু এগিয়ে ছিল বলে তো মনে হয় না। বরং সময়ে সময়ে মহিলাজাতির প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি হজম করা রীতিমতো শক্ত। তবু তাঁর মৃত্যুর পঁয়তাল্লিশ বছর পরেও হিট সিনেমা বানাতে গেলে টালিগঞ্জে তাঁকে নিয়েই টানাটানি পড়ছে। কী করে এরকম হয় সেটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আর যতবারই ভেবেছি একবার করে বুককেস থেকে ব্যোমকেশ সমগ্রটা নামিয়ে পড়েছি। আর যতবারই নামিয়েছি যতক্ষণ পড়ব ভেবেছি তার থেকে অনেক বেশি সময় চলে গেছে। একটা অদ্ভুত টানে হুড়হুড় করে পাতার পর পাতা উল্টে গেছি। টানটা কীসের? চরিত্রের? কিন্তু  শুরুতেই তো প্রমাণ হয়ে গেল, চরিত্রটা অসাধারণ নয়। প্লটের? লোকে যতই ডায়াগ্রাম এঁকে বুঝিয়ে দিক না কেন আমার সেটাও মনে হয় না।

এখন মনে হয় টানটা আসলে অজিতের গল্প বলার কায়দাটার। পাতার ওপর কলম ছোঁয়ালেই সমসাময়িক কলকাতা শহরটার সশরীরে চোখের সামনে এনে দাঁড় করানোর ক্ষমতার। ওই সত্যবতী, খোকা, স্বামীস্ত্রীর খটাখটি, দেওর বৌদির খুনসুটি নিয়ে এমন একটা চেনা, আশ্বাসময়, আরামদায়ক ঘেরাটোপের সৃষ্টি করার যার ভেতর পা রাখলে আর ফেরার উপায় থাকে না। টানটা আসলে প্রেক্ষাপটের।
    


April 25, 2016

পাড়ার প্রেম



সকাল প’নে আটটা নাগাদ, আমার দু’নম্বর আর অর্চিষ্মানের এক নম্বর চা খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর ক্বচিৎ কদাচিৎ আমাদের বাড়িতে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। সেদিনও ঘটল। আমাদের পশ্চিমের দেওয়ালে ল্যাম্পশেডের নিচে গোল মুখের যে ঘড়িটা ঝোলানো আছে সেটায় প্রাণসঞ্চার হল। কাঁটা দুটো জ্যান্ত হয়ে প্রচণ্ড জোরে দৌড়তে শুরু করল। বারোটা কালো অক্ষরের খোঁদল হয়ে গেল বারো খানা ধকধকে চোখ। আর ঘড়ির ঠিক মাঝখানটা ধ্বসে গিয়ে একটা খাদের মতো হয়ে গেল, আর সেই খাদের চারধার থেকে অমসৃণ শ্বদন্তের মতো ধারালো দাঁত ঠিকরে বেরোল। ঠিক যেন ভূগোল বইয়ের পাতার ছবি। অন্ধকার, ভয়াল বোরা গুহার মুখে ঝুলে আছে স্ট্যালাগটাইট স্ট্যালাগমাইট। আমরা হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি আর ঠিক তক্ষুনি…

‘অ্যান্ড ইয়োর টাইম স্টার্টস নাউ!’

কীসের টাইম? আর গলাটাই বা কার? ঘড়ি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেখি ঘরটা হয়ে গেছে একটা সার্কাসের তাঁবু, লালনীল দেওয়াল, মেঝে জুড়ে রঙিন আলো জ্বলছে নিভছে, এক সেকেন্ডের বেশি তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আবার একজন রিং লিডারও এসে জুটেছেন। ইনিই চেঁচাচ্ছিলেন নাকি? চেনা চেনা, কোথায় যেন দেখেছি, এক মহিলা, মেয়ে বলাই উচিত, পঁচিশের কাছাকাছি বয়স, মেকআপে মুখে অকালপক্কতার প্রলেপ পড়েছে। তাঁর হাতের দিকে তাকাই, না চাবুক নেই, তার বদলে মাইক।

মহিলা সেটা মুখের কাছে তুলে নিয়ে আবার চেঁচালেন, অ্যান্ড ইয়োর টাইম স্টার্টস নাউ। উত্তেজনায় তাঁর কপালের রগ আর গলার শিরা স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আর অমনি মনে পড়ে গেল। এটা সার্কাস নয়, গেম শো। এঁকে আমি টিভিতে দেখেছি। 

কাম অন! 

আমাকে উদ্দেশ্য করেই চেঁচাচ্ছেন মহিলা। চেঁচাচ্ছেন আর ভুরু নাচিয়ে জ্যান্ত হয়ে যাওয়া ঘড়িটার দিকে ইঙ্গিত করছেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি স্ট্যালাগটাইট স্ট্যালাগমাইটের সারির মধ্যে ফাঁকটা ক্রমে বুজে আসছে। আর এর মধ্যে  আমার পায়ের কাছে লাল নীল হলুদ সবুজ প্লাস্টিকের বল রেখে গেছে কে, তাদের একটার গায়ে লেখা ‘টিফিন গোছানো’, একটার গায়ে 'গাছে জল দেওয়া’, একটার গায়ে  'ওষুধ খাওয়া’, একটার গায়ে ‘বিছানা তোলা’, আরেকটার গায়ে ‘চান’।  

টেন…নাইন…এইট…

আমি কালক্ষেপ না করে একটা একটা বল তুলে ঘড়ির বীভৎস হাঁ-এর মধ্যে ফেলতে থাকলাম, দাঁতের সারি ধার দেওয়া ছুরির মতো চকচক করছে, 'টিফিন গোছানো' হয়ে গেছে,  'ওষুধ খাওয়া’ ডান...                               

সেভেন…সিক্স…ফাইভ…

দাঁতগুলো ভীষণ কাছাকাছি চলে এসেছে, মাগো। আমার মগজের মধ্যে কেউ বলল, ডেলিগেট! আমি চেঁচিয়ে অর্চিষ্মানকে 'বিছানা তোলা' আর 'গাছে জল দেওয়া’ বলগুলোর ব্যবস্থা করতে বললাম। বলে ‘চান' লেখা বলটা তুলে মুখের ভেতর ফেলতে যাব, এমন সময় টের পেলাম আমার চারপাশটা আবার দ্রুত বদলে যাচ্ছে, সার্কাসের তাঁবু বদলে ক্লাস থ্রি, এ সেকশনের ক্লাসরুমটার মতো হয়ে গেছে, তিন দেওয়ালে লোহার শিক লাগানো বড় বড় জানালা দিয়ে উদাত্ত আলো আর পেছনের পুকুরের হাওয়া আসছে, আর আমাদের ক্লাসের ‘ঊ’ আমার দুহাত দিয়ে মুখ আড়াল করে ঠোঁট প্রায় আমার কানে ঠেকিয়ে বলছে, “প্রেম কাকে বলে জানিস?”

*****

ন’মাসে ছ’মাসে এরকম ঘটে। বেমক্কা সময়ে গল্প পায়। শনিরবি সকালবেলা বা বাকি পাঁচ দিন সন্ধ্যেবেলা যখন বাড়ি ফিরে দুজনে চার কানে ইয়ারফোন গুঁজে বসে থাকি তখন পেলে কোনও ঝামেলা হয় না, কিন্তু সপ্তাহের মাঝখানে সকালবেলা গল্প পেলে মহা সমস্যা। অফিস লেট। 

অর্চিষ্মান বলল, ‘তুমি কী বললে?’

আমি বললাম, ‘যা সত্যি তাই বললাম। জানি না।’

ঊ আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। তাতে আমার মাথায় যেটুকু ঢুকেছিল তাতে বুঝেছিলাম প্রেম মানে ভালোবাসা। ওহ, তার মানে আমি আমার ঠাকুমার সঙ্গে প্রেম করি? উঁহু। পিসির সঙ্গে? না। বাবার সঙ্গে? না রে বাবা না। তাহলে মায়ের সঙ্গে যেটা করি সেটা নির্ঘাত প্রেম? ঊ ক্ষান্ত দিয়েছিল। বলেছিল, 'আপাতত শুধু শব্দটা জেনে রাখ, কাকে বলে জানতে হবে না। ও জিনিস দেখলেই চিনতে পারবি।’  

আমার সন্দেহ ছিল। স্তরীভূত শিলা কাকে বলে না জানলে স্তরীভূত শিলা দেখে চেনা যায় নাকি? বা সরলবর্গীয় বন? (ক্লাস থ্রি-তে অবশ্য আমি স্তরীভূত শিলা বা সরলবর্গীয় বন কোনওটাই শিখিনি, কিন্তু ক্লাস থ্রি-তে কী শিখেছিলাম অনেক ভেবেও মনে করতে পারলাম না তাই এই উদাহরণই দিলাম।)

এখন সন্দেহ ঘুচেছে। ইন ফ্যাক্ট, এখন আমি এ দাবিও করতে রাজি যে পৃথিবীতে এমন যদি কোনও জিনিস থাকে যার কোনও সংজ্ঞা নেই, শুধুমাত্র উপসর্গ আছে, যা দেখে তাকে নির্ভুল চেনা যায়, তা হচ্ছে প্রেম। কত রকমের প্রেম দেখলাম, একতরফা, দুতরফা, সফল, ব্যর্থ, হিসেব-কষা চালাক প্রেম, ভেসে যাওয়া বোকা প্রেম, নিয়ম-মানা প্রেম, নিয়ম-ভাঙা প্রেম, বৈধ প্রেম, অবৈধ প্রেম - সংজ্ঞা দিয়ে তাদের এক ছাতার তলায় আনে কার সাধ্য। কিন্তু উপসর্গ মেলালে? সব আগাপাশতলা এক ও অবিকল।

-এর এপিসোডের কিছুদিনের মধ্যেই আমার চারপাশে সে সব উপসর্গের বান ডাকল। আমার জীবনে নয়, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ, আমার বন্ধুদের জীবনে। আমার পাড়ার বন্ধুরা ছিল আমার থেকে চারপাঁচ বছরের বড়। তাদের সঙ্গে সঙ্গে (আসলে পেছন পেছন) আমি রোজ বিকেলে সাইকেল চালিয়ে এ গলি ও গলি ঘুরতাম, পুজোর সময় ঠাকুর দেখতে বেরোতাম, ছাদে বসে তাদের জীবনের সংকটের গল্প শুনতাম। আর শুনে শুনে বুঝে গেলাম যে জীবনে সংকট বলে যদি কিছু থাকে তা হল প্রেম। 

শুধু শুনলাম না অবশ্য, চোখেও পড়ল। দিদিদের সঙ্গে সাইকেল নিয়ে বেরোলেই পেছন থেকে গুটি গুটি আরও কটি সাইকেল এসে জুটত। ঘুড়ি আর ঘুড়ির ল্যাজের মতো সাইকেলের মিছিল এঁকেবেঁকে চলত আমাদের পাড়ার গলি জুড়ে। দোল, সরস্বতীপুজো, পুজোয় উপসর্গ জোরদার হত।। সারাবছর যারা ধৈর্য ধরে সাইকেলে চেপে পিছু নিয়েছে, কিংবা স্কুল থেকে ফেরার সময় ঘড়ি দেখে রোদ বৃষ্টি ঝড় তুচ্ছ করে মোড়ের মাথায় উপস্থিত দিয়েছে, তাদের প্রতি দিদিদের মুখের অসীম তাচ্ছিল্যের পর্দা ভেদ করে প্রশ্রয়ের মৃদু হাসি ফুটত। 

দেখেশুনে আমার ধারণা হয়েছিল প্রেম আসলে শিকার। ব্যাধের মতো জাল ফেলে ঘাপটি মেরে বসে থাক, আজ নয়তো কাল চিড়িয়া জালে পড়বেই। হান্ড্রেড পার সেন্ট কেসে ব্যাধ হবে ছেলেরা। তারা প্রথমে প্রেমে পড়বে , তারপর যে মেয়েটির প্রেমে পড়েছে তার পেছনে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকবে, যতক্ষণ না মেয়েটিও উল্টে প্রেমে পড়ছে। হিন্দি সিনেমার গান দেখে এই ধারণা আরও জোরদার হয়েছিল। তবে সেটা সিনেমা তাই লার্জার দ্যান লাইফ, পাড়ার চারপাঁচজন বন্ধুর বদলে কলেজের পাঁচশো ছেলে ছেলেটির বন্ধু, এবং পাঁচশো জন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে সে একটি মেয়েকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে প্রেমের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। মেয়েটির মুখচোখ দেখে মনে হচ্ছে না যে সে ছেলেটির প্রেমে পড়েছে, উল্টে ভয়ের চিহ্নই প্রকট, কিন্তু  ঘাবড়াও মৎ, ভয় উড়ে গিয়ে প্রেম জাগা শুধু সময়ের অপেক্ষা।

এইরকম শিকারের কায়দায় প্রেমের বহু নমুনা দেখেছি পরবর্তী জীবনে, কিন্তু প্রথম যেটা দেখেছিলাম সেটা সবথেকে বেশি মনে আছে। আমি তখন ফাইভ কিংবা সিক্স। অষ্টমী কি নবমীর রাত। যাঁরা ম্যাডক্স স্কোয়্যার কিংবা একডালিয়ার প্যান্ডেলে ঘুরে বড় হয়েছেন, তাঁদের চোখে অষ্টমী নবমীর রাতের যে ছবিটা আছে, আমার ছোটবেলার অষ্টমীনবমীর রাতের সঙ্গে তার কোনও মিল নেই। আলো বলতে প্যান্ডেলের টিউবলাইট। একশো গজ দূরে তার আলো পৌঁছয় না। বাকি সারা পাড়া অন্ধকারে ঢাকা। স্ট্রিটলাইটের ঝামেলা নেই, মাঝে মাঝে কোনও বাড়ির টিভির পুজো পরিক্রমার যেটুকু নীল আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে রাস্তায় এসে পড়েছে, শুধু সেইটুকু। 

ঘটনার সময় আমি আরও দুচারজন দিদির সঙ্গে পাড়ার দাদাদের দেওয়া স্টলে কাঠের ফোল্ডিং চেয়ারে বসে অমলেট খাচ্ছিলাম। এমন সময় আরেকজন দিদি, ধরা যাক তার নাম , ছুটতে ছুটতে এসে বলল, জানিস, ওরা  কে ধরেছে। 

ওরা কারা?  আর -এর দলবল। কে আমরা সকলেই চিনতাম। এই দিদির পেছনে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে ঘোরাঘুরি করছিলেন, অবশেষে এই অষ্টমীর রাতে অ্যাকশন নিয়েছেন।

ধরল কোথায়? মোড়ের মাথায়। কোন মোড়? সরকারবাড়ির মোড়। স আর ওপাড়ার ঠাকুর দেখে ফিরছিল, ওদের পুজোর বাজেটেরও আমাদেরই দশা, টিউবলাইট সম্বল। সরকারবাড়ির মোড় হচ্ছে একটা তেমাথা, তার একদিকে পরিত্যক্ত জঙ্গল, অন্যদিকে একটা কাঁচা গলির মুখে বন্ধ হওয়া মুদির দোকান আর অন্যদিকে সরকারবাড়ি সে বাড়ির লোক সেজেগুজে খানিকক্ষণ আগেই শ্রীরামপুরে ঠাকুর দেখতে গেছে আমরা সবাই দেখেছি, কাজেই কেউ টিভিতে পুজো পরিক্রমা দেখছে না। অর্থাৎ মোড় নিকষ অন্ধকার। 

এই মুহূর্তে অন্ধকার মোড়ের মাথায় একটি মেয়েকে চারপাঁচটি ছেলে ঘিরে ধরার খবর পেলে আমি চেঁচিয়ে লোক জোগাড় করে লাঠিসোঁটা সহ সেদিকে ছুটে যেতাম, কিন্তু তখন কোনওরকম মনে হেলদোল জেগেছিল বলে মনে পড়ে না। আমি নির্বিকার মুখে অমলেট খেতে লাগলাম, সঙ্গী দিদিরা উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, বিপদের আশংকায় নয়, আসন্ন প্রেমের গন্ধ পেয়ে। ততক্ষণে একটু শান্ত হয়েছে। তার কাছ থেকে গোটা ঘটনাটা শোনা গেল। ওরা নাকি ওপাড়ার প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে মোড় ঘুরেছে, আর অমনি তিনচারটে সাইকেল চেপে পাঁচছটা ছেলে এসে ঘিরে ধরেছে। অন্ধকারে প্রথমটা বোঝা যাচ্ছিল না, কিন্তু গলা শুনে বোঝা গেল তারা -এর দলবল। সাইকেল থেকে নেমে তারা ম আর স-কে  ঘিরে দাঁড়াল, গম্ভীর গলায় বলল, 'দাঁড়াও, কথা আছে।' তারপর -এর একজন স্যাঙাৎ -কে বলল, 'তোমার সঙ্গে কথা নেই, তুমি যাও।' 

এখন মনে হয়, ম-দিদির কি আঁতে লেগেছিল? হয়তো। হয়তো নয়। আমাকেও দুয়েকবার আমার থেকে আকর্ষণীয় এবং সুন্দরী বন্ধুদের প্রেমের দূতীগিরি করতে হয়েছে, কিন্তু আমি তাতে খুব একটা ক্ষুণ্ণ হয়েছি বলে মনে পড়ে না। হয়তো হতাম, যদি সেই প্রেমিকদের প্রতি আমার কোনও টান থাকত। কপালগুণে সেরকম প্যাঁচালো পরিস্থিতিতে কখনও পড়তে হয়নি। 

পাড়ার প্রেমের বাজারে একটা কমন ঘটনা ছিল গৃহশিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রীর প্রেম। গানের মাস্টারমশাই, নাচের মাস্টারমশাইরাও এ ব্যাপারে কিছু কম যেতেন না। আর একদলের বাজার এই দু’দলের থেকেই তেজী ছিল। যদিও তাঁরা টেকনিক্যালি মাস্টারমশাই ছিলেন না। আর সেজন্যই বোধহয় কেউ তাঁদের কেউ মাস্টারমশাইদের প্রাপ্য সৌজন্য দেখাত না। গ্রিলের গেটে আওয়াজ হলে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বলত, 'অ্যাই বুড়ি, তোর তবলচি এসেচে, দরজা খুলে দে।’

এই তবলার মাস্টারমশাই-ছাত্রীর প্রেমসংক্রান্ত একটি রোমহর্ষক প্রেমের ঘটনা আমাদের পাড়ায় ঘটেছিল। আমার এক চেনা মেয়ের গানের সঙ্গে সঙ্গত করতে তবলার মাস্টারমশাই আসতেন। স্যান্ডো গেঞ্জির লেবেলটা পর্যন্ত পড়া যায় এমন ফাইন আদ্দির পাঞ্জাবি পরে, ঘাড়ে নাইসিল ছিটিয়ে। পরিণতি যা হওয়ার হল। স্কুলে যাতায়াতের পথে, বিকেলবেলা লাইব্রেরির রাস্তায় আচম্বিতে তবলার দাদার সঙ্গে মেয়েটির দেখা হয়ে যেতে লাগল। নিজের প্রেম বাছার ব্যাপারে আমি একটি আস্ত পাঁঠা হলেও অন্যের প্রেমের গুণবিচারে আমি চিরকালই নিখুঁত। তবলাদাদাকে আমার মোটেও সুবিধের লাগত না। বলাই বাহুল্য, আমার মত আমি নিজের মনেই রেখেছিলাম, মেয়েটিকে বলিনি। বললেও কাজে দিত না, মাঝখান থেকে বন্ধুত্বটি মাটি হত। বেশ ক’দিন পর প্রেমের চোটে যখন আমার বন্ধুর নাওয়াখাওয়া পড়াশুনো মাথায় উঠেছে, একদিন স্কুল থেকে ফিরে সিঁড়ির তলায় সাইকেল রেখে 'মা খেতে দাও', বলতে বলতে বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে সে থমকে গেল। বসার ঘরে লোক থই থই, সলজ্জ মুখে তবলাদাদা দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েটি ঘরে ঢুকতেই সবাই হই হই করে উঠল। মেয়েটির বুক ধক করে উঠল, তাহলে কি সবাই জেনে গেছে? তারপর চোখে পড়ল দাদার পাশে দাঁড়ানো ছোটমাসির লজ্জারাঙা মুখ। মেয়েটির মনে পড়ে গেল, ছোটমাসির রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে সঙ্গত করতেও তো আসেন দাদা। সকালে ছোটমাসির রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে, বিকেলে বোনঝির ক্ল্যাসিক্যালের সঙ্গে সঙ্গত করার এমন ভার্সেটাইল তবলচি পেয়ে বাড়ির লোক তো বর্তেই গিয়েছিল। জানা গেল, সঙ্গতের তলে তলে সম্পর্ক অনেকদূর গড়িয়েছে, এখন দাদা এসেছেন বাড়ির বড়দের কাছে ‘মেসো’ হওয়ার অনুমতি চাইতে। অনুমতি পেতে কোনও অসুবিধেই হল না। আমি যদ্দূর জানি, এখনও আমার বন্ধুটি ফি বিজয়ায় লোকটাকে ‘ছোটমেসো’ ডেকে প্রণাম করে। 

সব প্রেমের অবশ্য এরকম করুণ পরিণতি হত না। বেশিরভাগ গুরুতর হতে না হতেই মিলিয়ে যেত, যেগুলো যেত না সেগুলো বিয়েতে পর্যবসিত হত। অল ইজ ওয়েল দ্যাট এন্ডস ওয়েল। যেমন ওপরের ত আর স-এর প্রেম। আগের বার বাড়ি গিয়ে দেখলাম মেয়ের হাত ধরে স-দিদি ঊর্ধ্বশ্বাসে টিউটরের বাড়ি ছুটছেন। মেয়েটির মুখ একেবারে ত দাদার মুখ কেটে বসানো। তাই গার্জেনরা এগুলো নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতেন না। ক্বচিৎ কদাচিৎ গৃহত্যাগের ঘটনা ঘটত, সে নিয়ে কিছুদিন পাড়ার মোড়, রক সরগরম থাকত, তারপর দিন দশেক বাদে পাত্রপাত্রী ফিরে এলে সবাই সবকিছু ভুলে তাদের মহাসমারোহে বরণ করে নিত। পরে যে শ্বশুরশাশুড়ি নিজের নিজের পুত্রবধূ/ জামাইয়ের গুষ্টির তুষ্টি করেছিলেন, তাঁরাই বলে বেড়াতেন অমন ভালো বউ/জামাই আর কারও হয় না।

বড়দের প্রেমের বেলা অবশ্য এত সহজে ছাড় হত না। কারণ বেশির ভাগ বড়দের কাছেই একটিমাত্র রকমের প্রেমের রাস্তা খোলা থাকে, অবৈধ প্রেম। যেহেতু নিজের ক্ষুদ্র বৃত্তে ঘটতে দেখিনি তাই অনেকদিন পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল যে অবৈধ প্রেম ব্যাপারটা শুধু নাটকনভেলেই হয় আর মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকরা মদ খায় না। দুটো ভুলই ভেঙেছে, কিন্তু প্রথমটা ছোট থাকতে থাকতেই ভেঙেছে। পাড়ায় দু’জন দিব্যি গোলগাল, নাদুসনুদুস, নাড়ুগোপালের মতো দেখতে প্রতিবেশী ছিলেন, তাদের একজনকে আমি কাকু ডাকতাম অন্যজনকে জেঠু। তাদের দুজনেরই সুন্দর পাকা বাড়ি ছিল, সে সব বাড়ির দেওয়ালে বছর বছর হলুদ, গোলাপি, হলুদ রঙের পোঁচ পড়ত, ছেলেমেয়েরা ক্লাস থেকে ক্লাসে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠত, কাকিমা আর জেঠিমা খোঁপায় গোড়ের মালা পেঁচিয়ে র-সু-ন জয়ন্তীতে 'দারুণ অগ্নিবাণে রে’ আর বিজয়া সম্মিলনীতে 'এবার নবীন মন্ত্রে হবে’ কোরাস গাইতেন। কাকু আর জেঠু ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে গান শুনতেন, ছেলেমেয়েরা রান-এ জিতে লাল গামলা উপহার পেলে হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিতেন। কারও জীবনে প্রেমের অভাব আছে বলে সন্দেহ হয়নি কখনও। তারপর জানা গেল, অভাব তো নেইই, বরং কিঞ্চিৎ বাহুল্য আছে। দুজনেরই নাকি দ্বিতীয় আরেকটি করে সংসার আছে অন্য কোথাও। সে সব সংসারে তাঁরা নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। শুনে আমাদের পাড়াটা কেমন থম মেরে গিয়েছিল ক’দিনের জন্য। তবে বেশিদিনের জন্য নয়। অচিরেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এল। কাকু এবং জেঠু আগের মতোই অফিসকাছারি করতে লাগলেন, ছেলেমেয়ের স্পোর্টসের লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিতে লাগলেন। কিছুদিন পর তাঁদের ঘিরে যে কোনও একটা স্ক্যান্ডাল হয়েছিল সেটা মনে করতেও স্মৃতিশক্তির ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হত। 

যে স্ক্যান্ডালটা থিতোলো না তার কেন্দ্রে ছিলেন একজন কাকিমা। অনেক অনেক কাল আগে তাঁর ছোটছোট ছেলেমেয়েকে আমার পিসি পড়াতে যেতেন, সেই সূত্রে কাকিমাকে আমি মুখ চিনতাম।  সেই ছেলেমেয়ে যখন বড় হয়ে গেল, একদিন খবর পাওয়া গেল, ছেলের কলেজে পড়া বন্ধুর সঙ্গে কাকিমা গৃহত্যাগ করেছেন। কাকুর বয়স সাতদিনে যেন সাতবছর বেড়ে গেল। শিক্ষিতভদ্রলোকমন্ডিত আমাদের পাড়ায় কেউ মুখের ওপর কিছু জিজ্ঞাসা করত না, খালি কাকু কিংবা কাকিমার ছেলেমেয়েরারাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে চুপ করে যেত। জানালার পর্দা সরিয়ে উঁকি মারত। বছর দুই বাদে কাকিমা বাড়ি ফিরে এলেন। কাকুর উদ্দেশ্যে সারা পাড়ায় ধন্য ধন্য রব উঠল। এত কিছুর পরেও তিনি কাকিমাকে বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছেন। কাকিমার ছেলের প্রতি সারা পাড়ার শ্রদ্ধায় সারা পাড়ার মাথা নিচু হয়ে এল। কাজের লোকে খবর এনেছে, সে মায়ের হাতের জল পর্যন্ত ছোঁয় না। কাকিমা আর কোনওদিন দেখিনি। তিনি বাড়ি থেকে বেরোতেন না। ক'বছর আগেকার সেই কাকিমা আর জেঠিমাকেও আর কোনওদিন পাড়ার ফাংশানে গান গাইতে দেখিনি।

*****

এত সব গল্পগাছা করে অফিস যেতে সেদিন ঝাড়া আধঘণ্টা দেরি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেই আধঘণ্টায় যা মজা হয়েছিল আড়াইশো দিন টানা অফিস করলেও তার এককণা হয় না, কাজেই নো আফসোস। 



April 24, 2016

I want to be proud of myself as well as my husband



উনিশশো তিয়াত্তরে প্রকাশিত নিচের টেস্টটি মূলত মহিলাদের জন্য। তবে যেহেতু এটা দু'হাজার ষোলো, তাই অবান্তরের পুরুষ পাঠকরাও টেস্টে অংশ নিতে পারেন। আমার টেস্টের রেজাল্ট পোস্টের নামেই ছেপে দিয়েছি, আপনাদের রেজাল্ট জানার জন্য বসে রইলাম। 




April 23, 2016

সাপ্তাহিকী







The most frequent question writers are asked is some variant on, “Do you write every day, or do you just wait for inspiration to strike?” I want to snarl, “Of course I write every day, what do you think I am, some kind of hobbyist?” But I understand the question is really about the central mystery – what is inspiration? Eternal vigilance, in my opinion. Being on the watch for your material, day or night, asleep or awake.
                                                                                                             ---Hilary Mantel


কোনও বই অনুবাদের জন্য অনুপযুক্ত বিবেচিত হওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে, কিন্তু এই কারণটা?   

এই সমস্যাটার কথা প্রথম আমার মা আমাকে বলেছিলেন। বলেছিলেন, তিনি নাকি পুজো প্যান্ডেলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অনেক চেষ্টা করেছেন কানের পর্দা ফাটানো ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’-র সঙ্গে তাল না মিলিয়ে হাঁটতে, কিছুতেই পারেননি। স্পিড বাড়িয়েছেন, কমিয়েছেন, সম্পূর্ণ থেমে গিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করেছেন, লম্বা স্টেপের পর বেঁটে স্টেপ ফেলেছেন, সব প্রচেষ্টা মাটি করে শেষমেশ আশা ভোঁসলের তালজ্ঞানের কাছে তাঁকে হার মানতে হয়েছে। তালের সান্নিধ্যে বেতালা হওয়া নাকি অসম্ভব। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম এটা আমার মায়ের নানারকম উদ্ভট অভিজ্ঞতার একটা, কিন্তু বিজ্ঞানীরাও যখন বললেন তখন আমার সব সন্দেহ দূর হয়ে গেল। 

কে না ভালোবাসে (টেকনোলজিহীন) শৈশব? (লিংক পাঠিয়েছেন সুগত)

এই লিংকটা দিলাম শুধু শেষ ছবিটার জন্য। 




 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.