September 14, 2014

জাকোই



ভারতের বাকি রাজ্যগুলো সম্পর্কে আমার ধারণা এতই কম যে পরজন্মে কোন রাজ্যের অধিবাসী হয়ে জন্মাতে চাও জিজ্ঞাসা করলে আমি মাথাটাথা চুলকে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ই বলব। কিন্তু যদি আমাকে কেউ বলে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতবর্ষের অন্য কোন রাজ্যের বাসিন্দা হয়ে জন্মাতে চাও, তা হলে আমি এক সেকেন্ডও না ভেবে বলব ‘আসাম’।

আমার আসাম ভালো লাগে, আসামের আকাশবাতাস নদীপাহাড় বনজঙ্গল ভালো লাগে, আসামের মানুষজন ভালো লাগে। অথচ আসামের খাবারদাবারের সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় শূন্য কেন সেটা একটা রহস্য।

আবার রহস্য নয়ও। আসাম এবং আসামের যাবতীয় ভালো জিনিসের সঙ্গে আমার পরিচয় শুরু যখন আমি দিল্লি শহরে একা একা হোস্টেলে থাকি, মেসের অকথ্য খাবার খাই, পড়াশুনো করার বদলে ধাবায় বসে আড্ডা মারি। আমার মা তখন আসামের ধুবড়ি শহরে একা একা থেকে চাকরি করেন, প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা গৌরীপুরের প্রকাণ্ড মাঠ আর মাঠের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অশ্বত্থগাছ পেরিয়ে বাড়ি ফেরেন, শনিরবিবার বিকেলে ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে বসে দূরে সবুজ চরের দিকে তাকিয়ে বাদামভাজা খান।

মায়ের বাদামভাজায় ভাগ বসাবো বলে ছুটি পেলেই আমি ধুবড়ি রওনা দিতাম। ট্রেনের জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখতাম খাঁ খাঁ প্ল্যাটফর্মে রোগা এক ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। তারপর রিকশা চড়ে দুলে দুলে বাড়ি। পথনির্দেশ অতি সোজা। ধুবড়ি থানা? থানার উলটোদিকে সেনগুপ্তদের বাড়ি? সেই বাড়ি যাব ভাই।

সেনগুপ্তরা ছিলেন মায়ের বাড়িওয়ালা। তিন না চার ভাই ভুলে গেছি। দুই না তিন বোন সেটাও মনে নেই। বোনেরা সব কাছাকাছিই থাকতেন। ভাইরা সবাই থানার উলটোদিকের পৈতৃক বাড়িতে থাকতেন। আলাদা আলাদা সংসার কিন্তু বেশ মিলমিশ আছে। সেজ সেনগুপ্তের দাপট ছিল সবথেকে বেশি। সেজদা এককালে পুলিশ ছিলেন, ভালো ফুটবল খেলতেন। চেনা লোকের অভাব ছিল না। কাগজওয়ালা, দোকানওয়ালা, হাবিলদার, রিকশাওয়ালা, প্রাতঃভ্র্মণার্থী। যে-ই যেত তাকেই ডেকে সেজদা আলাপ করতেন। মাঝে মাঝে ব্রহ্মপুত্রের চর থেকে আনা সবজির ঝুড়ি নিয়ে সবজিওয়ালা যেত। সে সব শাকসবজির সঙ্গে আমাদের শহুরে বাজারের শাকসবজির কোনও তুলনা হয় না। এগুলো আসে সব হিমঘর থেকে আর ওগুলো সোজা ক্ষেত থেকে। সেজদা হাঁক পাড়তেন। গলায় গামছা পেঁচানো গরিব সবজিওয়ালা ছুটে আসত। সেজদার পায়ের কাছে ঝুড়ি রেখে উবু হয়ে বসত। পুলিশ রিটায়ার করলেও তার সামনে সবাই চোর। সেজদা হাঁটুতে হাত রেখে ঝুড়ির ওপর ঝুঁকে দাঁড়াতেন।

লাউ কত কইর‍্যা?

ভীমের গদার সাইজের একএকটা লাউ। সবুজ, ডাঁটো।

পাস ট্যাহা দিবেন স্যাজদা।

এক থাপর দিমু। তিন ট্যাহার এক পয়সা বেশি না। উঁহুহুহুহু, অইডা না অইডা না, বড়ডা, বড়ডা।

মায়ের শোওয়ার ঘর ছিল ফুটবল মাঠের সাইজের আর রান্নাঘর ছিল এই এত্তটুকু। কিন্তু তার মধ্যেই মা নানারকম ম্যাজিক করতেন। দু’বেলা সে রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, মাখন, ঝুরিঝুরি আলুভাজা, টমেটো দিয়ে মুসুর ডাল, কাঁচালংকা কালোজিরে দিয়ে মাছের শান্ত ঝোল, শনিরবিবার সকালে লুচি দিয়ে আলুর তরকারি, সঙ্গে সিমুই কিংবা সুজির পায়েস বেরোত। ঘরের মেঝেতে শতরঞ্চি পেতে আমরা বসতাম, আমাদের সামনে পুরোনো আনন্দবাজারের ওপর থালাবাটিরা বসত। জানালার বাইরে নর্থ ইস্টের জেদী বৃষ্টি ঝরত অবিরাম।

সেনগুপ্তদের বাড়ির যে ব্যাপারটা আমাকে সব থেকে অবাক করত তা হচ্ছে যে প্রায় তিনপুরুষ ধরে ধুবড়ি শহরে বসত করা সত্ত্বেও অসমিয়া সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের কোনওরকম মিলমিশ হয়নি। ছেলেদের জন্য বউ আর মেয়েদের জন্য জামাই আসত সেই হাওড়া, হুগলী, বর্ধমান থেকে। বিয়ের বাজার করতে সবাই কলকাতায় আসত। সব ভাইবউরাই মাকে বেশ পছন্দ করতেন। মাঝেমাঝেই তাঁদের হেঁশেল থেকে মায়ের জন্য বাটি ভরে নানারকম সুখাদ্য আসত। আপাদমস্তক বাঙালি সুখাদ্য।

মোদ্দা কথা হচ্ছে তিন বছরে অন্তত বার পাঁচেক আসামে গিয়ে মাসখানেক করে থাকা সত্ত্বেও আমি আসামের রান্না খেয়ে উঠতে পারিনি।

বান্টি বলল, ‘বাজে এক্সকিউজ দিও না। বাড়িতে না হয় ভেতো বাঙালি, দোকানে গিয়ে খেলেই পারতে। টানা একমাস তুমি রেস্টোর‍্যান্টে না গিয়ে সারভাইভ করেছিলে সেটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলছ?’

বললাম, ‘বলছি না তো। সাতদিনে না হলেও দশদিনে একবার তো বটেই। তবে ও সব জায়গায় তখনও ‘ওহ্‌ ধুবড়ি’ মার্কা রেস্টোর‍্যান্ট গজায়নি যে সেখানে গিয়ে কবজি ডুবিয়ে অসমিয়া খানা খাওয়া যাবে। বাইরে খাওয়ার ইচ্ছে হলে আমরা যেতাম ব্যাম্বু গার্ডেনে। গিয়ে সেজুয়ান নুডল্‌স্‌ আর হিউনান চিকেন খেতাম মজাসে। ধুবড়ির বাকি সবাইও ওখানেই যেত নির্ঘাত। কখনওই গিয়ে আধঘণ্টার আগে বসতে পেয়েছি মনে পড়ে না।

তাই গোয়া নিবাসের পর আবার কোনও একটা স্টেট ক্যান্টিনে খেতে যাওয়ার কথা উঠল যখন আমি বললাম, ‘আসাম ভবন গেলে কেমন হয়?

দিল্লিতে আসাম ভবনের ক্যান্টিন আছে দুটো। একটা আসাম ভবনে, আরেকটা আসাম হাউসে। ভবনের ক্যান্টিনটির নাম জাকোই। এটার নামই বেশি লোকে জানে। আসাম হাউসের ক্যান্টিনটা নামগোত্রহীন। রসিকেরা দাবি করেন ওই ক্যান্টিনটিতেই আসল অথেনটিক আসামিয়া খানা পাওয়া যায়। কিন্তু অনলাইনে ছবিটবি দেখে আমাদের জাকোই বেশ পছন্দ হল। রংচঙের মুখ চেয়ে আমরা অথেনটিসিটি গোল্লায় দেওয়া মনস্থ করলাম। আগে তো দর্শনধারী, পরে তো গুণবিচারি?

জাকোই দেখে মন ভরে গেল। বারান্দায় বাঁশের জালির দেওয়াল, মাটির বাসনকোসন, গাছপালা। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বসার জায়গায় ঢোকার দরজায় বাঁশের হ্যান্ডেল। ভেতরে মেখলার সাজ, জালি কাটা লণ্ঠনের ভেতর থেকে নরম হলুদ আলো ছিটকোচ্ছে। দেওয়ালে অসমিয়া তারকাদের সাদাকালো ছবি। মিঠে গলার গান বাজছে, ‘জিরি জিরি জিরি পাহারো জুরি ভোয়া মলয় বই যায়’।

আমাদের হাতে সময় শুধু লাঞ্চব্রেকটুকু। কাজেই নজর সাজসজ্জার থেকে খাবারদাবারের দিকে ফেরাতে হল। জাকোই হচ্ছে চোঙার মতো একটা মাছ ধরার যন্ত্র। মেনুকার্ডের আকৃতি অনেকটা জাকোইয়ের আদলে তৈরি। মেনুতে ‘লুসি ভাজি’ আর ‘সিরা পুলাও’ দুটোই ছিল, দুটোই আমাদের দুজনেরই অত্যন্ত প্রিয় খাবার, কিন্তু আমরা দুটোর একটাও অর্ডার করলাম না। আমরা অর্ডার করলাম একটা নিরামিষ আর একটা আমিষ থালি।


দুটো থালিতেই ছিল ভাত, অমিতার ক্ষার (অমিতা হল পেঁপে আর ক্ষার হল ক্ষার। অর্থাৎ কি না সোডিয়াম বাইকার্বনেট), ডাইল, ভাজি (আলু পেঁয়াজকলি), আলু পিটিকা (আলুসেদ্ধ), দই। দুটো থালির পাশেই ছোটো প্লেটে করে রাখা ছিল খরিসা (বাঁশের ডগা বাটা), খরোলি (সর্ষেবাটা), কাহুডি (টক সর্ষেবাটা) আর কাঁচালংকা।

নিরামিষ থালিতে এছাড়া ছিল পনীরের তরকারি, মাহর বর টেংগা (মটরডালের বড়ার টক) আর আমিষ থালিতে ছিল টেংগা রোহু (রুই মাছের টক) আর চিকেন কারি।

খুব খেলাম। থালিতে যা যা ছিল সব তো শেষ করলামই, আলাদা করে বাটিতে বাড়তি যে ভাতটুকু দেওয়া ছিল সেটাও চেঁচেপুঁছে নিলাম। দারুণ ভালো লাগল তবে টেংগার দাপট আর সামান্য কম হলে আরও ভালো লাগত। আবার এটাও মনে হল যে সেটা হলে রান্নাগুলোর সঙ্গে বাঙালি রান্নার আর কোনও তফাৎই থাকত না। কাজেই এই বেশ হয়েছে।

খেয়েদেয়ে বেরিয়ে পুদুচেরি ভবনের সামনে ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে অটো ধরার চেষ্টা করতে করতেই অবশ্য টের পাচ্ছিলাম যে বেশ হয়নি। দরকারের থেকে অনেক বেশি খেয়ে ফেলেছি। কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না।

সত্যিকারের জাকোই


September 13, 2014

সাপ্তাহিকী




তিন মাস ধরে এক লাখেরও বেশি ছবি তুলে তবে ধোঁয়ার ভেতর নিজের পছন্দের ছবি খুঁজে পেয়েছেন আলোকচিত্রী Thomas Herbrich.

Whenever I feel the need to exercise, I lie down until it goes away.
                                                                     --- Paul Terry

Wes Anderson-এর বেশি ছবি আমি দেখিনি, কিন্তু যা দেখেছি ভালোলাগা জন্মানোর তা-ই যথেষ্ট।অদ্ভুত সুন্দর সব দৃশ্য তৈরি করতে পারেন ভদ্রলোক। তাঁর তৈরি করা কিছু গাড়িঘোড়ার দৃশ্য জড়ো করে এই ভিডিওটা বানানো হয়েছে। আমার তো খুব ভালো লেগেছে দেখতে।


একটা আস্ত বোয়িং প্লেনের সমান ছিল এক একটা ডাইনোসর।

সুগত খবর দিলেন, সেদিন নাকি পাঁচ মিলিয়ন গুগল অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড লিক হয়েছে। আপনার পাসওয়ার্ডও তাদের মধ্যে আছে কিনা শিগগিরি দেখে নিন।


এই একটা কাজের লিস্ট বানিয়েছে উইকিপিডিয়া।

একসময় আমাদের বাড়িতে গ-মাসি বলে একজন রান্না করতে আসতেন। আমার তাঁর রান্না ভালোই লাগত কিন্তু ঠাকুমা বলতেন গ-মাসির নাকি হাসপাতালের রান্নাঘরে চাকরি নেওয়া উচিত কারণ তিনি ‘হসপিটাল ফুড’ ছাড়া আর কিছুই রাঁধতে পারেন না। এই লিংকটা দেখে কথাটা মনে পড়ে গেল।

সত্যজিতের গল্পে সেই অনুকূলের কথা পড়েছিলাম আর এই চোখে দেখলাম জিবোকে।

কেউ বলে জটা, কেউ বলে ডি-কনস্ট্রাকটেড বিনুনি।

ঘর রং করার এই কায়দাটা আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে।


আমার ফেএএএএএভারিট দুঃখের গান। আমি নিশ্চিত আপনাদের অনেকেরও।


September 10, 2014

পুরোনো অবান্তরঃ মিনি মিত্তিরের প্রেম



অবান্তরের শুরুর দিকের একটা বিরাট অংশ লেখা হয়েছিল বাংলা ভাষায় কিন্তু ইংরিজি হরফে। সেগুলো পড়তে যে অসুবিধে হচ্ছে সে অভিযোগ আসছিল আমার কাছে বহুদিন ধরেই। জবাবে আমি সত্যি কথাটাই বলছিলাম। বলছিলাম যে এখন ওই সব লেখার হরফ বসে বসে বাংলা করার ধৈর্য আমার নেই। তার থেকে নতুন লেখা নিয়ে মারামারি করব সেও ভি আচ্ছা।

তবু নিজের মনই খুটখুট করত কেমন। তাছাড়াও পুরোনো লেখা পড়তে গিয়ে আঁতকে ওঠার ব্যাপার তো ছিলই। তাই আমি এক ঢিলে দুই পাখি মারব মনস্থ করেছি। লেখাগুলো খানিকটা সারাইও হবে, বাংলাও।

নতুন পাঠকরা, যাঁরা এই লেখাগুলো পড়েননি, তাঁরা যদি পড়েন এবং তাঁদের যদি পড়ে ভালো লাগে তবে সেটা উপরি পাওনা।

পুরোনো অবান্তরের প্রথম পোস্ট 'মিনি মিত্তিরের প্রেম'। বেরিয়েছিল দু'হাজার এগারো সালের পয়লা অগস্ট, 'মিনি মিত্তির' নামে। পোস্টটার কথা মনে পড়িয়ে দেওয়ার জন্য শম্পাকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ। এটাকে অবান্তরের প্রথম 'বানানো গল্প' বলা যেতে পারে।  

*****


মিনি মিত্তিরের বয়স মোটে এক। ওর নামটা যে বিশেষ সুবিধের রাখা হয়নি সেটা অবশ্য মিনি এখনই বুঝতে পারে। শুধু নাম কেন, নাকটা মায়ের মতো না হয়ে বাবার মতো আর গায়ের রংটা বাবার মতো না হয়ে মায়ের মতো হলে যে আখেরে কাজে দিত সে সবও মিনি এখনই ভালোই বোঝে।

এগুলোকে নিয়তিনির্বন্ধ বলে মেনে নিতে মিনির আপত্তি নেই, কিন্তু জন্মদিনে একগাদা ভূত খাওয়ানোর ব্যাপারটা মিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। আর লোক খাওয়াবি খাওয়া, তাদের মনোরঞ্জনের জন্য সারা সন্ধ্যে মিনিকে একটা ভয়ংকর কুটকুটে জামা পরিয়ে বসিয়ে রাখাটা কী রকম বিবেচনার পরিচয়, সেটা মিনি সিরিয়াসলি জানতে ইচ্ছুক।

চটেমটে মিনি অসহযোগের রাস্তা ধরল। ভগবান দয়ালু লোক, বাকশক্তি এখনও দেননি বটে, কিন্তু গলায় জোর ঠেসে দিয়েছেন। গত এক বছরের অভিজ্ঞতায় মিনি জেনেও ফেলেছে, চেঁচানো আসলে কথা বলার থেকে অনেক বেশি কার্যকরী।

কাজেই মিনি চেঁচালো। প্রাণপণ। চেনা, অচেনা, হাফচেনা যে কেউ ওকে কোলে নেওয়ার উপক্রম করলেই বা ওর মোটা মোটা নরম গালের দিকে আঙুল বাড়াচ্ছে দেখলেই। যতক্ষণ না সামনের লোকটা ‘ওরে বাবা! ঠিক আছে ঠিক আছে!’ বলে ছিটকে যাচ্ছে। মিনির কানে এসেছে মায়ের আড়ালে কেউ কেউ, ‘কী ছিঁচকাঁদুনে মেয়ে হয়েছে রিমলির, বাব্বা’ বলে মুখ বেঁকিয়েছে, কিন্তু ও সব গায়ে মাখেনি মিনি। লোকের সব কথায় কান দিতে গেলে আর জীবনে চলতে হচ্ছে না।

হলের ওদিকটায় খাবার দেওয়া শুরু হতেই ভিড় পাতলা। এতক্ষণ যারা মিনিকে চটকানোর জন্য ঠেলাঠেলি করছিল তারা এখন আলুটিক্কি চাটের লাইনে ঠেলাঠেলি করতে ছুটেছে। বাঁচা গেছে। মিনি হাঁফ ছাড়ল। এদিকওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে মাকে খোঁজার চেষ্টা করল। পেল না। কেউ যাতে লজ্জা করে না খায় সেই তদারকি করতে গেছেন বোধ হয়।

কী করা যায় ভাবতে ভাবতে এদিকওদিক তাকালো মিনি। টেবিলের ওপর একগাদা উপহার। থালাবাটি, জামাকাপড় আরও কী সব আবোলতাবোল। একটাও পাতে দেওয়ার মতো না। বীতশ্রদ্ধ হয়ে মিনি শেষমেশ ওর জামার বুকের কাছে যে অর্থহীন গোলাপি সিল্কের বো-টা লাগানো আছে সেটার একটা কোণা ধরে টানতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে ফরফর করে বো অর্ধেক খুলে হাতে। মা ভয়ানক রাগ করবেন, কিন্তু মিনি নিরুপায়। টাইমপাস করতে হবে তো?

টানতে টানতে পুরো বো-টাই যখন প্রায় খুলে এসেছে আর মিনি ভাবছে, ইস এরা জামায় আরেকখানা বো দেয়নি কেন, তক্ষুনি মায়ের উচ্ছ্বসিত গলা কানে এল মিনির। মিনি মুখ তুলে তাকাল, আর তাকাতেই ওর ছোট্ট বুকটা ধড়াস করে উঠল।

জিতু! অনির্বাণ ও তমিস্রা বসুর একমাত্র পুত্র জীমূতবাহন, ওরফে জিতু, বাবামায়ের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকছে।

জিতু সত্যিকারের স্কুলে যায় আর মিনিরা ওদের বাড়ি বেড়াতে গেলে স্পাইডারম্যান বাইক চেপে মিনিকে ইমপ্রেস করতে চায় না। শেষের অত্যাচারটা থেকে বাঁচতে আজকাল ঘোষজেঠুদের বাড়িতে যাওয়ার আগে প্রত্যেকবার প্রবল কান্নাকাটি বাধায় মিনি, কিন্তু মাবাবা হিন্ট বুঝলে তো।

জিতুকে প্রথম কবে দেখেছিল মনে নেই মিনির, কিন্তু জিতু যেদিন তমিস্রামাসির চাপাচাপিতে নিজের ছোট্ট গিটারটায় ‘আলো আমার আলো’ বাজিয়ে শুনিয়েছিল চার লাইন, সেদিন যে মিনি জিতুর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিল না সেইটা স্পষ্ট মনে আছে মিনির।

তারপরও অনেকবার জিতুদের বাড়ি গেছে ওরা। প্রত্যেকবার মিনির আফসোস হয়েছে। ইস, মা আরও ভালো দেখে একটা জামা পরালেন না কেন? সেই যে গোলাপি রঙের জামাটা কেনা হল আগের মাসেই? আর এই লাল জুতোটাই বা কী রকম? মিনি কি আর লাল জুতো পরার মতো ছোট আছে?

জিতুর প্রতি টান সেই থেকে ক্রমশ বেড়েছে মিনির, কিন্তু জিতুর দিক থেকে কোনওরকম সাড়াশব্দই নেই। অত হট্টগোলের মধ্যে বসেও হঠাৎ মনটন ভয়ানক খারাপ হয়ে যায় মিনির। ফোঁসফোঁস করে নিঃশ্বাস পড়ে। নিচের ঠোঁটটা ঠেলে বেরোতে চায়। মা কোথায় গেলেন? কাদের কাছে গেলেন? এমন কষ্টের সময় মেয়ের থেকে মায়ের পর আপন হল?

চোখের জলের বাঁধ সবে ভাঙে ভাঙে, গলা দিয়ে ভ্যাঁ প্রায় বেরোয় বেরোয় এমন সময় মিনি দেখল মাসিমেসোকে নিয়ে মা ওর দিকেই আসছেন। জিতুও আসছে সঙ্গে সঙ্গে। জিতুর হাতে রঙিন কাগজ মোড়া একটা ইয়াবড় বাক্স।

আতঙ্কিত মিনি ঘাড় ঘুরিয়ে প্রাণপণে একটা সুবিধেজনক কোল খুঁজতে লাগল, যেটায় চেপে পালানো যায়। বৃথা আশা। আলু টিক্কি চাট এখন তুঙ্গে।

দেখতে দেখতে মাসিরা একেবারে মিনির সামনে এসে পড়লেন। মুখ নিচু করে কোনওমতে হাত দিয়ে খোলা বো-টা গোছানোর চেষ্টা করল মিনি। ইস, কেন যে একদণ্ড চুপ করে বসতে পারে না মিনি? নিজেকে মায়ের থেকেও মোটা গলা করে বকতে ইচ্ছে হল মিনির।

জিতু এখন একেবারে মিনির মুখোমুখি। জিতুর বাক্সশুদ্ধু জিতুর হাত মিনির দিকে প্রসারিত। তমিস্রামাসির গলা। ‘আহা, ওকে প্যাকেটটা খুলে দেখা জিতু? অতটুকু মেয়ে কি ধরতে পারে?’ জিতু খচরমচর করে প্যাকেট খুলে বাক্সের ভেতর থেকে গোলাপি রঙের ডোরা দ্য এক্সপ্লোরার গিটার বার করে মিনির কোলের ওপর রাখল। মা চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘ও মা! কী সুন্দর গিটার? জিতুকে থ্যাংক ইউ বলেছ মিনি? . . . কী সুন্দর জামা পরেছিস রে জিতু? . . . চল চল তমিস্রা, চল অনির্বাণদা, খাবে চল . . .

মাসিমেসো আর মা আলু টিক্কি টেবিলের দিকে হাঁটা লাগালেন। জিতুও গেল, কিন্তু দু’সেকেন্ড পর। যাওয়ার আগে মিনির ডানগালে আলতো করে নিজের বাঁ হাতটা একবার ছুঁইয়েই পেছন ফিরে মাবাবার পেছন পেছন ছুট লাগালেন শ্রীমান জীমূতবাহন।

কোলের ওপর গোলাপি গিটার নিয়ে স্থির হয়ে বসে রইল মিনি। কানের কাছে হট্টগোল মিলিয়ে এল, চোখের সামনে লোকের ভিড় আবছা হয়ে এল। জীবনের প্রথম জন্মদিনে, জীবনে প্রথমবার প্রেমে পড়ল মিনি মিত্তির।   

       

September 09, 2014

পাঁচ



কাউকে যে কথা বলার নয়, ঠিক সেই কথাটাই সবাইকে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে। না হলেই সেই নাপিতের মতো পেট ফেটে মরার দশা হয়। আর মরতে না চাইলে একটা ভালো দেখে গাছ খুঁজে বার করতে হয়। রাতের বেলা চুপি চুপি গিয়ে যার কোটরে গিয়ে কথাটা জমা রেখে আসা যাবে।

গত বছর আমারও নাপিতের দশা হয়েছিল। অবান্তর বই হিসেবে বেরোনোর ব্যাপারটা সবে নিশ্চিত হয়েছে। মনে ফুর্তির ঢেউ, কিন্তু সে ফুর্তি প্রকাশ করা যাচ্ছে না। বাড়িতে থাকলে তাও একরকম হত, রোজ ঘণ্টায় একবার করে বিষয়টা উত্থাপন করে অর্চিষ্মানকে জ্বালানো যেত। কিন্তু আমি তখন বাড়ির ত্রিসীমানায় নেই। বন শহরে গ্লোবাল সাউথের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। জ্বালাতে চাইলে স্কাইপ খুলে জ্বালানোই যায়, কিন্তু বৈদ্যুতিন জ্বালাতনে সে তৃপ্তি নেই।

এমন গোলমেলে সময়ে আমাদের ট্রেনিং-এর মধ্যে দিন তিনেকের আর একটি মিনি ট্রেনিং-এর আবির্ভাব হল। লিডারশিপ ট্রেনিং। এক সোমবার সক্কালসক্কাল সবাই মিলে বাসে চেপে বন শহর থেকে একঘণ্টা দূরের একটা সত্যি সত্যি বনের মধ্যে গিয়ে উপস্থিত হলাম। বনের ভেতর দোকানপাট সুপারমার্কেট বিউটিপার্লার মাল্টিপ্লেক্স কিচ্ছু নেই। আছে শুধু এদিক ওদিক ছড়ানো দুয়েকটা বাড়ি আর একখানা পেল্লায় হোটেল। সেই হোটেলেই আমরা তিনদিন তিনরাত খাবদাবঘুমোব আর কনফারেন্স রুমে বসে সারাদিন আমাদের মধ্যেকার নেতৃত্ব দেওয়ার সুপ্ত সম্ভাবনায় ধোঁয়া দেব।

সে ট্রেনিং-এর বৃত্তান্ত একদিন আপনাদের খেলিয়ে বলব, কারণ সে বলার মতোই জিনিস, তবে আজ নয়। আজ শুধু ট্রেনিং-এর একটা বিশেষ অংশের কথাই বলি। যে সে অংশ নয়, সবথেকে খতরনাক অংশ।

জিনিসটার নাম সার্কল। জিনিসটার চেহারা তো নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, কাজটা অনেকটা তাৎক্ষণিক বক্তৃতার মতো। তফাৎ হচ্ছে সার্কলে বক্তৃতার কোনও বিষয় নেই। যে যা খুশি বলতে পারে। তবে নিজের ‘ফিলিংস’-এর কথা বলতেই বেশি উৎসাহ দেওয়া হয়। মা যে বলেন, সমস্যার কথা একা একা বসে ভাবার থেকে অন্যের সঙ্গে (অর্থাৎ কি না ওঁর সঙ্গে) ভাগ করে নিলে অনেক সময় সমাধানের পথ বেরিয়ে আসে, সার্কলের মূল কথাটিও সেটি। আপনি আপনার গভীর গোপন সুখদুঃখজ্বালাযন্ত্রণার কথা বৃত্তের সবার সঙ্গে ভাগ করে নেবেন, নিয়ে হালকা হবেন, এটাই হচ্ছে সার্কলের উদ্দেশ্য।

সেদিন ছিল ট্রেনিং-এর শেষ দিন। বিকেলবেলা বাস আসবে, এসে আমাদের এই জঙ্গল থেকে সভ্যতায় ফেরৎ নিয়ে যাবে। আর ক’ঘণ্টা বাদেই সুপারমার্কেটে গিয়ে দেদার পয়সা খরচ করতে পারার উত্তেজনায় সবার মুখ চকচক করছে। সবাই উৎফুল্ল মনে সার্কেলে গিয়ে বসেছি। দিদিমণি আর দিদিমণির স্যাঙাতের সঙ্গে হাই হ্যালো হয়েছে। দিদিমণি তাঁর প্রশান্ত চোখদুটি সার্কেলের সবার মুখের ওপর ঘুরিয়ে এনেছেন। আমরা কান খাড়া করে অপেক্ষা করছি কখন দিদিমণি কিছু বললেন। অবশেষে দিদিমণি বললেন,

‘শেষ দিন আর দুঃখের কথা নয়। আজ আমরা সবাই আমাদের আনন্দের কথা বলব। অহংকারের কথা। গর্বের কথা। আর আজ সার্কল ওপেন করবে . . .’

এই না বলে দিদিমণি আমার দিকে ফিরে তাঁর ভুবনমোহিনী হাসি হাসলেন।

‘. . .  খুনঠ্যালা।

অমনি সর্বনাশটা ঘটে গেল। অতর্কিত হামলার মুখে পড়ে আমি টাল হারালাম, আর আমার জিভের ডগায় যে কথাটা ‘বেরোই বেরোই’ করে নাচানাচি করছিল সেটা এই সুযোগে বন্দুকের গুলির মতো ছিটকে বেরিয়ে পড়ল।

‘আগামী বছর কলকাতা বইমেলায় আমার একটা বই বেরোচ্ছে।

বাক্যটা শেষ হওয়ারও আগে বুঝেছিলাম কী কেলেংকারি করে ফেললাম, কিন্তু তখন আর ফেরার উপায় নেই। চটাপট হাততালি, ‘ওয়াও!’ আর ‘র‍্যাড ম্যান!’ থামার পর একজন জিজ্ঞাসা করল,

‘হোয়াট ইস ইট অ্যাবাউট?’

‘ইট’স . . . ইট’স অ্যাবাউট মাই লাইফ আই গেস।’

কে বুঝতে পারলাম না, গোলের মধ্যে থেকে একজন কেউ ফোড়ন দিলেন।

‘অলরেডি?’


*****


আমি দায়িত্ব নিয়ে শুধু নিজের পছন্দের কথাই বলতে পারি, দু-তিনটে ছাড়া আর যত ক’টা (বেশি নয়, স্বীকার করছি) আত্মজীবনী আমি পড়েছি কোনওটাই আমার বিশেষ সুবিধের লাগেনি। লেখার দোষে নয়। আমার অনেক প্রিয় লেখক আত্মজীবনী লিখেছেন। আমার মতে সেগুলোর কোনওটাকেই তাঁদের সৃষ্টির তালিকায় প্রথম পাঁচ কেন, প্রথম পনেরোতেও রাখা যায় না। তার কারণ হচ্ছে সত্যিকারের জীবনের কথা ছাপার অক্ষরে পড়লে বোঝা যায় মানুষের জীবন আসলে কত কম ইন্টারেস্টিং। সে আপনি যতই বুদ্ধিমান হোন না কেন, আপনার বাড়িভর্তি যতই বিখ্যাত আত্মীয়স্বজন থাকুক না কেন, আপনারও জীবন আসলে সেই থোড়বড়িখাড়া আর খাড়াবড়িথোড়।

কী খেলাম, কোথায় গেলাম, আজ সকালে উঠে আমার কী কী গভীর কথা মনে হল। ব্যস।

অথচ গত পাঁচ বছর ধরে আমি ফেনিয়ে ফেনিয়ে আমার সেই থোড়বড়িখাড়া জীবনের প্যাঁচাল পেড়ে চলেছি। বুদ্ধি বা বিখ্যাত আত্মীয়, দুটোর একটাও না থাকা সত্ত্বেও দমছি না মোটেই।

আর তাই আপনারা, গত পাঁচ বছর ধরে যাঁরা এই চর্বিতচর্বণ পড়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

আমি প্রথমে ভেবেছিলাম অবান্তরের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে আপনাদের সবার নাম ধরে কৃতজ্ঞতা জানাব। আপনারা সবাই সমষ্টিগতভাবে অবান্তরের পাঠক ঠিকই, কিন্তু তা ছাড়াও আপনাদের নিজস্ব উপস্থিতি আছে যা একে অপরের থেকে একান্ত স্বতন্ত্র। আপনারা কেউ আমার বাড়ির লোক, কেউ পঁচিশ বছরের পুরোনো বন্ধু, আর বাকিদের বেশিরভাগকেই আমি কোনওদিন চর্মচোখে দেখিনি। দেখার সম্ভাবনাও প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু চোখে দেখা অনেক লোকের থেকে আমি আপনাদের অনেক কাছ থেকে চিনি। অন্তত আমার সে রকম ভাবতে ভালো লাগে। নাম দেখারও আগে, আপনাদের লেখা দু’লাইন পড়েই আমি বলে দিতে পারি আপনারা কারা।

শুধু আমি না, অনেকেই পারেন। আপনাদের অনেকেরই নিজস্ব অনুরাগী আছে, এই অবান্তরেই। আমার মতো তাঁরাও নাম না দেখেই আপনাদের চিনতে পারেন। তাঁরা আমাকে মেল করে বলেন, ‘ওই যে ও আছে না? আমার ওর কমেন্ট পড়ে খুব ভালো লাগে।’ আমি উত্তর দিই, ‘আমারও।’

সকলেই বাকি সবার থেকে আলাদা হতে চায়, অবান্তরও চায় নিশ্চয়। আর অবান্তরের সে ইচ্ছের এক কণাও যদি পূরণ হয়ে থাকে, তার কৃতিত্ব কেবল আপনাদের। অবান্তরের থেকে অবান্তরের কমেন্টসের পাঠক যে অন্তত পাঁচগুণ বেশি সে নিয়ে আমার কোনও সংশয় নেই। বুদ্ধি, রসবোধ, আগ্রহ, উদ্দীপনা দিয়ে আপনারা অবান্তরকে যে ভাবে ঝকঝকে করে রাখেন, আমি একা হাতে তা কিছুতেই পারতাম না। কিছুতেই না।

অনেক কথা বলেও আপনাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা, মুগ্ধতা, ঋণ, ভালোবাসার কথা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না, কাজেই সে চেষ্টায় ক্ষান্ত দিচ্ছি। তবে ক্ষান্ত দেওয়ার আগে যার জন্মদিন তাকে নিয়ে কিছু না বললে নিতান্ত অন্যায় হয়ে যাবে।

বলতে গেলে অবশ্য খারাপ কথাটাই আগে বলতে হয়। গত পাঁচ বছরে অবান্তর আমার অনেক ক্ষতি করেছে। সময় নষ্টের কথা যদি ছেড়েও দিই, মানুষ হিসেবে আমাকে কান ধরে টেনে নামিয়েছে অবান্তর। আমাকে এমন একজন বিতিকিচ্ছিরি মানুষে পরিণত করেছে যে প্রশংসায় ভোলে, নিন্দায় রাগে, কে কী বলল সেই নিয়ে মাথা ঘামায়। লেখারও আগে সে লেখা ক’জন পড়বে সেই হিসেব কষে।

কিন্তু অনেকদিন আগে কে যেন আমাকে বলেছিল, নিচে না নামলে জীবনে আসলে কোনও মজা নেই। উচ্চমার্গ জায়গাটা কথায় যত ভালো, কাজে ততটাই বোরিং। অবান্তর আমাকে সে কথা হাতেনাতে বিশ্বাস করিয়ে ছেড়েছে। গত পাঁচ বছরে যত আনন্দ সে আমাকে দিয়েছে পৃথিবীতে খুব কম জিনিসের কাছেই আমি তা পেয়েছি, মানুষের কথা তো ছেড়েই দিলাম।

গত পাঁচ বছরে অবান্তর আমাকে এমন একটা কাজের খোঁজ দিয়েছে যেটা করতে আমার সত্যি সত্যি সত্যিইইইই ভালো লাগে। এত ভালো লাগে যে কেমন-পারির তোয়াক্কা না করে সে কাজটা আমি করে যেতে পারি ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন।

নিজের জীবনের কথা নিজের মুখে বলার মধ্যে যতই নির্লজ্জতা থাক না কেন, লজ্জার মাথা খেয়ে আমাকে স্বীকার করতেই হবে, অবান্তর লিখতে আমি একটুও লজ্জা পাই না। গত পাঁচ বছরে একদিনও পাইনি, আগামী পাঁচ কোটি বছরেও পাব না।

হ্যাপি বার্থডে, অবান্তর। তোমাকে কিছু দেওয়ার নেই আমার, আগামী পাঁচ কোটি বছর ধরে এই দিনটা আমার জীবনে ফিরে ফিরে আসুক, মনের ভেতর থেকে এইটুকু শুধু চেয়ে রাখলাম।


September 06, 2014

সাপ্তাহিকী



আলোকচিত্রীঃ Jennifer Macneill (লিংক পাঠিয়েছে তিন্নি)


If A is a success in life, then A equals x plus y plus z. Work is x; y is play; and z is keeping your mouth shut.
                                                                                                 --- Albert Einstein

ই-বুকের থেকেও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বই কী বলুন দেখি? বুক-বুক।


এবার গুয়াহাটি গেলে একবার আই আই টি ক্যাম্পাসে যাব ভাবছি। (লিংক সৌজন্য সুগত)


আমাদের ড্রয়ারে অন্তত সাতখানা ব্যাটারি গড়াগড়ি খাচ্ছে। কোনটা যে ব্যবহারযোগ্য সেটা বোঝে কার সাধ্য। এবার থেকে এই কায়দাটা অ্যাপ্লাই করব ভাবছি।

ভূমিকম্প মাপার জন্য রিখটার স্কেলের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে সেই সত্তরের দশকে। জানতেন?

ইমোজির সাহায্যে পৃথিবীর বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর প্রথম লাইন যদি কেউ আঁকে? চিনতে পারবেন?



সকাল যদি এমন সুন্দর গান শুনে শুরু করা যায় তাহলে অন্তত বিকেল পর্যন্ত ভালো না গিয়ে পারে না।

                                    

September 05, 2014

মিতিনমাসি আর দীপকাকুর প্রতি



যাঁদের স্মৃতিশক্তি ভালো তাঁরা হয় তো বুঝতে পারবেন, এটা আসল পোস্ট নয়। দরকারি কারণে কিছু অদলবদল করা হয়েছে। তবে তাতে মূল ভাবের পরিবর্তন হয়নি বলেই আমার বিশ্বাস। কমেন্ট বিভাগেও কিছু অদলবদল ঘটাতে আমি বাধ্য হয়েছি। আপনার মন্তব্যে যদি কাটাছেঁড়া চলে থাকে, তবে আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। আমার ওপর দয়া করে কুপিত হবেন না। অসংখ্য ধন্যবাদ।

*****

ক’দিন আগে আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী ১৪২১ হস্তগত হল। আর হওয়ার পরই অকাজ এমন বেড়ে গেল যে সেটা উলটেপালটে দেখার সুযোগ পর্যন্ত পেলাম না। বেশ ক’দিন পর একদিন রাতে খেয়েদেয়ে উঠে, বাকি সব ট্যাব বন্ধ করে, তিন্নির দেওয়া নরম হলুদ আলোর বাহারি ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে, ঘরের ভেতর বেশ মায়ামায়া ভাব সৃষ্টি করে আনন্দমেলা খুলে বসলাম।

পূজাবার্ষিকী পড়ার আমার চিরকালের বাঁধা নিয়ম আছে। এই বয়সে এসে সে নিয়মের ব্যত্যয় করার কোনও কারণ নেই। গোটা বইটা একবার স্ক্রোল করে ঘুরে এলাম। তারপর ফেলুদা কমিকস পড়লাম। তারপর মিতিনমাসি, তারপর দীপকাকু।

তারপর খানিকক্ষণ হাঁ করে বসে বসে ভাবলাম। মনের মধ্যে যে ভাবটা হচ্ছিল সেটার ওপর কিছুতেই আঙুল রাখতে পারছিলাম না। কেমন ফাঁকাফাঁকা, খালিখালি, নেইনেই, চাইচাই, খাইখাই।

ধাঁ করে মাথায় এসে গেল।

বেশ কিছুদিন আগে হাতে সময় বাড়াবাড়ি রকম বেড়ে গিয়েছিল, তখন আমি কিছুদিন লো-কার্ব ডায়েট ফলো করার চেষ্টা করেছিলাম। এই এত্তটুকুন ভাত, বাকি মাছতরকারি সব পরিমাণমতো। ছুটিতে বাড়ি গিয়ে পত্রপাঠ ডায়েটের কথা ঘোষণা করে দিলাম। যাতে কেউ খা খাজোরজার করে আমার হেলদি লাইফস্টাইল মাটি না করে। মা গম্ভীর মুখে খেতে দিতে দিতে বললেন, ‘সে নাহয় করব না, কিন্তু এক ঘণ্টা বাদে চুপি চুপি রান্নাঘরে ঢুকে যখন বিস্কুট খেতে হবে তখন কার্ব কমের বদলে বেশি না হয়ে যায়।

ব্যস, ডায়েটিং-এর বারোটা বেজে গেল।

কিন্তু ডায়েটিং যতদিন চলেছিল ততদিন খেয়ে ওঠার পরের (এবং বিস্কুটের বয়াম নিয়ে বসার আগের) সময়টুকুর সঙ্গে এই মুহূর্তের মনের ভাবের মিল আছে।

সমস্যাটা কোথায়?

ভাষা? উঁহু। মিতিনমাসি, দীপকাকু দুজনের স্রষ্টাই ঘাঘু লেখক, বহুদিন ধরে লিখছেন, লিখে লিখে মাথার চুল পাকিয়েছেন, ঝরঝরে বাংলা, তরতরে সংলাপ। এঁদের লেখার দোষ ধরব এমন বুকের পাটা আমার নেই।

তাহলে নির্ঘাত প্লট।

ভিলেনদের নাম করছি না, আলোচনার সুবিধার্থে প্লটগুলোর কথা ছোট্ট করে বলছি। ১৪২১, অর্থাৎ এই বছরের মিতিনমাসির রহস্যের বিষয় একটি ছোট মেয়ের দুঃস্বপ্ন এবং সেই স্বপ্নের সূত্র ধরে কলকাতার একটি পুরোনো জৈন পরিবারের গুপ্তধন ইত্যাদি। দীপকাকুর রহস্যে ছদ্মনামে গল্প লিখে একজন আরেকজন রক্তমাংসের লোককে চোর বলে চালাতে চাইছেন, দীপকাকুকে দুষ্টু লেখককে ধরে এনে দিতে হবে।

হুম্‌।

ডেটাপয়েন্ট বাড়ানোর জন্য ১৪২০র আনন্দমেলা বার করলাম। সে বছর মিতিনমাসির গল্পের বিষয় ছিল ওডিশার জঙ্গলে ঘড়িয়াল কুমির পোচারচক্রের রহস্যোদ্ধার, দীপকাকুর বিষয় ছিল মুকুটচুরি।[1]

একটাতেও খুনের নামগন্ধ নেই। ঘড়িয়াল-খুন আছে অবশ্য, কিন্তু আমি মানুষখুনের কথা বলছি। আর আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি খুন ছাড়া গোয়েন্দাগল্প থাকাও যা না থাকাও তা। একের পর এক খুন হচ্ছে, একের পর এক লোকের দিকে সন্দেহের তীর ঘুরছে, একের পর এক ক্লু পাওয়া যাচ্ছে, সে ক্লুয়ের সমুদ্রে হাবুডুবু খেয়ে মরছে গোয়েন্দা আর গোয়েন্দার সঙ্গে সঙ্গে আমিও, তবে না?

আমার কেমন জেদ চেপে গিয়েছিল। আমি ১৪১৯-এর আনন্দমেলা টেনে বার করলাম। ইউরেকা! খুন! কলকাতার পুরোনো এক ইহুদি পরিবারের ওপর নেমে এসেছে মৃত্যুর করাল ছায়া, মিতিনমাসি খুনি ধরে দিলেন। দীপকাকু . . . উঁহু, নো খুন। ক সেজে খ দোকান থেকে ধারে জিনিস কিনে নিয়ে যাচ্ছে, দোকানদার ক-কে চেপে ধরে বলছে, কই দাদা টাকাটা দিলেন না?

নিশ্চিত হয়ে গেলাম, এটাই মিতিনমাসি আর দীপকাকুর গোলমালের কারণ। খুনের অভাব। আর খুন না থাকলে গোয়েন্দা গল্প কীসের?

খুন কেন নেই, সরল মনে সেটার কারণ ভাবতে বসলে মনে হতে পারে আসলে কোনও কারণই নেই। লেখক নিজেই বুদ্ধি খাটিয়ে খুনখারাপিহীন প্লট ফেঁদেছেন। তাঁর মনে হয়েছে ডাকটিকিট চুরি দিয়েই যথেষ্ট রোমহর্ষক গল্প ফাঁদা সম্ভব। আর যদি খুব বেঁকিয়েচুরিয়ে ভাবি, তাহলে মনে হতে পারে কর্তৃপক্ষ শাসিয়ে রেখেছেন, শীর্ষেন্দুকে গঞ্জ নিয়েই লিখতে হবে আর গোয়েন্দাগল্পে রক্তপাত চলবে না। কিশোরমনে ট্রমার সৃষ্টি হতে পারে।

যদি এই দুটোর মধ্যে একটা কারণও সত্যি হয় তাহলে আলোচনা আর এগোয় না। ওককে বস্‌বলে প্রসঙ্গ পালটাতে হয়।

কিন্তু আমার ঘুম আসছিল না, আমি মিতিনমাসি আর দীপকাকুর সপক্ষে আরও যুক্তি জোগাড় করতে লাগলাম। তিনটে পূজাবার্ষিকী ঘেঁটে যা বুঝলাম গোয়েন্দা উপন্যাসের জন্য ধার্য থাকে পাতা চল্লিশেক। সেটুকুর মধ্যে কি খেলিয়ে খুন, খুনের পেছনে গোয়েন্দার ধাওয়া, বোকা দারোগা, খানচারেক রেড হেরিং ইত্যাদি আমদানি করা সম্ভব?

যদি কিছু সম্ভব হয় তবে বাসস্টপে দাঁড়িয়ে ঝিনুককে দিয়ে ক্যারাটে চপ ছোঁড়ানোই সম্ভব।

এত ভাবতে গিয়ে আমার ঘুম পেয়ে গেল, ল্যাপটপ বন্ধ করে ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠে চোখ খুলেই দুটো নাম মনে পড়ে গেল। সোনার কেল্লা, বাদশাহী আংটি।

একটাতেও খুন নেই। আই মিন, সোনার কেল্লায় একটা অ্যাটেম্পটেড মার্ডার ছিল, কিন্তু সে দিয়ে আর কী হয়। অথচ . . .

গত রাত্তিরে অত কষ্ট করে জোগাড় করা সান্ত্বনার ঘর হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ল। আমার মতো রক্তপিপাসু লোকও স্বীকার করতে বাধ্য হলাম, খুনটাই শেষ কথা নয়। রহস্যে যদি বুনোট থাকে, গোয়েন্দার যদি ক্যারিশমা থাকে তাতেও গল্প দিব্যি উতরে যেতে পারে।

উত্তরটা বেরিয়ে গেল।

গোলমালটা গল্পে নয়, প্লটে নয়, ভিলেনের শয়তানিতে নয়, গোলমালটা গোয়েন্দায়।

এ জীবনে যত গোয়েন্দাগল্প পড়েছি একে একে তাদের সবগুলোর কথা মনে করতে লাগলাম। মনে পড়ার মতো যেগুলো সেগুলো চট করে মনে পড়ে গেল। ভেবে দেখলাম তাদের অনেকগুলোরই প্লটের গলিঘুঁজি ফিকে হয়ে এসেছে, কিন্তু যিনি মনের ভেতর জ্বলজ্বল করছেন তিনি গল্পের গোয়েন্দা।

গল্প শেষ করে বই মুড়ে উঠে পড়ার পর মিতিনমাসি আর দীপকাকুর কথা কি কোনও পাঠকের মনে জ্বলজ্বল করবে?

আমি বলছি না যে মনে থাকার জন্য গোয়েন্দাকে অদ্ভুত হতে হবে। তাকে পেটেন্ট লেদারের জুতো পরতে হবে, গোঁফে নিয়মিত মোম মালিশ করতে হবে বা দুহাতে তিনটে করে বন্দুক চালাতে হবে। কিন্তু তাঁর মধ্যে একটা কিছু থাকতে হবে যা তাঁকে আমাদের কাছে প্রিয় করে তুলবে। শুধু ক্ষুরধার বুদ্ধি আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার থেকে বেশি কিছু। তাঁর সহানুভূতিবোধ। রসবোধ। ন্যায়বোধ। অবসরযাপনের অভিনব উপায়। সংগীতপ্রীতি। খাদ্যরসিকতা। এমন কিছু যা তাঁকে গোয়েন্দার বাইরেও একজন ইন্টারেস্টিং মানুষে পরিণত করবে। তবেই না আমরা তাঁর প্রতি ইন্টারেস্টেড হব? তবেই না ক্রিমিন্যাল বনাম তাঁর যুদ্ধে আমরা তাঁর হয়ে গলা ফাটাব? গল্পের শেষে তিনি যখন সবটা বুঝিয়ে দেবেন, সে ঘরভর্তি লোকের সামনেই হোক কিংবা একান্তে নিজের সহকারীকে, তবেই না তখন গর্বে আমাদেরই বুক ফুলে উঠবে? একে অপরকে বলব, ‘দেখেছিস, লোকটার কী বুদ্ধি? ক্রিমিন্যাল ভাবল কী করে এর হাত ছাড়িয়ে পালাতে পারবে?’

মিতিনমাসি বা দীপকাকু, কারও প্রতিই আমি সেই টান অনুভব করি না।

কারণ এতদিন এতগুলো গল্প পড়ার পরও দুজনের সম্পর্কে আমি প্রায় কিছুই জানি না। যাও বা জানি, টান জন্মানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।

মিতিনমাসির কথাই ধরা যাক। মাঝবয়সের এদিকের একজন মহিলা, বুদ্ধি রাখেন, গোয়েন্দাগিরি করেন। এর বাইরে ছেলে পড়ান, ইরিটেটিং টু দ্য পাওয়ার ইনফিনিটি স্বামীকে ঠেস দিয়ে কথা বলেন। সত্যি কথা বলতে কি, গোয়েন্দাগিরি করাকালীন যত না, পার্থমেসোকে ব্যাঁকা কথায় বেঁধার সময় আমি মিতিনমাসির মধ্যে পার্সোন্যালিটির পরিচয় ঢের বেশি পাই।

দীপকাকু আমার কাছে একটা রহস্য। গোটা একটা সিরিজের নায়ককে এতখানি ঔজ্জ্বল্যহীন করে কেন তৈরি করতে চেয়েছেন লেখক সেটা আমার সত্যি মাথায় ঢোকে না। বাস্তবের কাছাকাছি রাখবেন বলে? এসপ্ল্যানেডের কোনও বহুতলের খুপরিতে অফিস খুলে ব্যাজার মুখে বসে থাকা রক্তমাংসের গোয়েন্দাদের মতো করে চরিত্রটাকে বানাবেন বলে? দীপকাকুকে কিশোর গোয়েন্দা সাহিত্যের নায়কের থেকে জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত সৈনিক বেশি মনে হয়। দীপকাকু কী ভাবেন সে সব তো ছেড়েই দিলাম, গোয়েন্দাগিরি ছাড়া উনি আর কী ভালোবাসেন সেটাই আমরা জানি না (ঝিনুকের মায়ের হাতের লুচি ভালোবাসেন, কিন্তু সে কেই বা ভালোবাসবে না?)

দীপকাকুর প্রতি আমার আরও একটা অভিযোগ আছে। ওঁর মতো রসকষহীন লোক আমি বাস্তবেও বেশি দেখিনি। রসকষ থাকা মানে কিন্তু কথায় কথায় জোক বলা নয়। রসকষ থাকা বলতে আমি বোঝাচ্ছি চরিত্রের একেবারে গভীরে একটা হাসিহাসি ভাব ওতপ্রোত হয়ে থাকা। দীপকাকুর মধ্যে সেটা এক্কেবারে নেই। তিনি হচ্ছেন সোজা কথায়, গোমড়া। এতদিন ধরে ঝিনুক ওঁর সহকারী, অথচ উনি ঝিনুকের সঙ্গে যে ভঙ্গিতে কথা বলেন তার থেকে ঢের কম উদাসীনতা নিয়ে সি. আর. পার্কের অটোকাকুরা আমার সঙ্গে কথা বলেন। উনি যখন ঝিনুককে ধমক দেন, বইয়ের পাতার এ পারে বসে আমি কুঁকড়ে যাই। কী কর্কশ, কী স্নেহশূন্য। এ রকম লোকের সামনেই আমি পড়তে চাই না, তাকে নিয়ে লেখা গল্প পড়তে চাওয়া তো দূর অস্ত।

আপনি বলতে পারেন তার মানে এ রকম লোকজনের কি গোয়েন্দাগিরি করার অধিকার নেই? সারকাস্টিক, বিষণ্ণ, গোমড়ামুখো লোকজনের? আমি বলব নিশ্চয় আছে। আলবাত আছে। তবে সে সব গোয়েন্দার সঙ্গে সার্থক ঠেকা দিতে হলে মুকুটচুরির গল্প যথেষ্ট নয়। গোয়েন্দা যদি বিবর্ণ হয় তবে অন্তত গল্পকে রংচঙে হতে হবে। তিনটে মার্ডার, পাঁচটা কিডন্যাপ, অবৈধ প্রেম, বি ডি এস এম যাতে তার জোরে অন্তত গল্পটা দাঁড়িয়ে যায়।

অন্তর থেকে বলছি, আমি আপনাকে ভালোবাসতে চাই মিতিনমাসি। দীপকাকু, আমি আপনার ফ্যান হতে চাই। গল্প পড়তে পড়তে আমি টুপুরের সঙ্গে নিজেকে গুলিয়ে ফেলতে চাই, ঠিক যেমন তোপসের সঙ্গে ফেলতাম। অন্য সব গোয়েন্দার তুলনায় দীপকাকুর বুদ্ধি, সাহস, অবজার্ভেশন পাওয়ারের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যেয় চেঁচিয়ে গলা ভাঙতে চাই। আপনারা আমাকে সে সুযোগ করে দিন। অনেকদিন তো হল, এইবার অন্তত আপনারা হিরো হয়ে উঠুন। এই আমি আপনাদের পায়ে পড়ি।





[1] ময়ূরবাড়ির রহস্যে একটা খুন ছিল অবশ্য, কিন্তু সেটা ছিল নিছকই চুরির ল্যাংবোট হিসেবে। সে খুন নিয়ে গোটা গল্পে দশটার বেশি বাক্য খরচ করেননি লেখক। 

বান্টি এক্ষুনি মনে করিয়ে দিল বাদশাহী আংটিতেও খুন ছিল
, যদি স্পাইডার দেখিয়ে বনবিহারী কর্তৃক পিয়ারীলালের হার্ট অ্যাটাক ঘটানোটাকে ধরা হয়। যাই হোক, তাতে আমার বক্তব্য বদলাবে না। 




 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.