December 15, 2018

মটর কা পানি, ন্রুসিংহ কা খাজা



বাবামায়ের প্রতি আমার কোনও অভিযোগ নেই। সন্তানকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার ওয়ান শট গেমে ওঁরা আশাতীতরকম ভালো পারফর্ম করেছেন, কিন্তু এবার পুরী গিয়ে একটা করার মতো অভিযোগ জন্মাল। আমাকে এতদিন এতবার পুরী নিয়ে গিয়েও ওঁরা আমাকে মটর কা পানি একবারও খাওয়ালেন না কেন।  


মটর কা পানি ব্যাপারটা শুনতে যতটা অদ্ভুত, দেখতেও ততটাই। স্টোভের ওপর একটা বড় চ্যাৎনা পাত্রে কতগুলো ফ্যাটফেটে মটর একগলা জলের মধ্যে ভাসছে। আপনি গিয়ে দাঁড়ালে একটা মগে ওই মটর খানিকটা, মটরের জল খানিকটা, কাঁচা লংকা, তেঁতুল জল বেশ করে ঘুঁটে, ছোট স্টিলের বাটিতে ঢেলে চামচ সহযোগে আপনাকে দেওয়া হবে। সে বাটির রক্তশূন্য চেহারা আগে কখনও না দেখে থাকলে আপনার দশটাকা এইভাবে খরচ করার সিদ্ধান্তটার প্রতি সন্দেহ জাগতে বাধ্য।

যতক্ষণ না আপনি চামচে করে ওই ফ্যাকাসে তরল তুলে চুমুক দিচ্ছেন। ধোঁয়া ওঠা গরম। চোখে জল এনে দেওয়া ঝাল। আর সে টকের কথা মনে করলে এই সি আর পার্কের বাড়িতে হিটারের গায়ে সেঁটে বসে জিভে জল এসে যাচ্ছে। ওই সর্বরোগশোকহর তরল যতক্ষণ আপনার গলা দিয়ে নামবে ততক্ষণ বসের মুখ মনে পড়বে না, গ্যারান্টি।

দুঃখের বিষয়, বাটিটা শেষ হয়ে যাবে। আশার থেকে দ্রুত। তখন আরও এক বাটি নিয়ে হাফ হাফ করে খাওয়া ছাড়া উপায় নেই। দু’নম্বর মার্কেটে যদি মটর কা পানি বসত আমি রোজ, উইদাউট ফেল, খেয়ে বাড়ি ঢুকতাম। মটর কা পানির সঙ্গে আমি আমার ফেভারিট স্ট্রিট ফুডের তুলনা করতে চাই না, কিন্তু চেনা ঘুগনির থেকে এনি ডে বেটার। অর্চিষ্মানও এ মতে হাই ফাইভ। 

আমাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে খাচ্ছিলেন আরও অনেকে। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে একজনের চেহারাটাই সবথেকে বেশি মনে আছে। হাতখানেক হাইট। অর্চিষ্মানের মুখের দিকে তাকাতে গেলে মাথা নব্বই ডিগ্রি পেছনে হেলাতে হয়। সারা দেহ দস্তানা থেকে মোজা থেকে মাংকিটুপিতে এমন আঁটোসাঁটো মোড়া যে হাতপা নাড়ানোর অবস্থাতে নেই। খালি গোল মুখ, নাক আর কাজলটানা ড্যাবা ড্যাবা চোখ দৃশ্যমান। সেই অবস্থায় তিনি অল্প অল্প হাঁ করছেন আর গার্জেন নিজের খাওয়ার ফাঁকে চামচে করে মটরের জল ওই হাঁয়ের মধ্যে পুরে দিচ্ছেন। ওই মারাত্মক ঝাল, অম্লানবদনে গিলে আবার হাঁ। মনে মনে ‘জিতে রহো বাচ্চু’ আশীর্বাদ করে পরের গন্তব্যের দিকে গেলাম। 

গন্তব্য খাজাপট্টি। মন্দিরের গায়েই গলি। পুরীর সমুদ্রের পরেই যে জিনিসটা এতদিন (এতদিন কারণ এতদিন আমি মটর কা পানি খাইনি) আমার পছন্দের ছিল তা হচ্ছে খাজা। আমি নিজে কখনও খাজা কিনেছি বলে মনে পড়ছে না। বাবামায়ের সঙ্গে যদি বা কেনার সাক্ষী থেকে থাকি সে অনেক ছোটবেলায়, কোথা থেকে কেনা হয়েছিল মনে নেই, কাকাতুয়া টাকাতুয়া হবে। এ বাদ দিলে জীবনে খাওয়া বেশির ভাগ খাজাই আমাকে জোগাড় করতে হয়নি, আত্মীয়স্বজন পাড়াপ্রতিবেশী কেউ না কেউ পুরী যেতেই থাকেন, বাড়ি বসে খাজার সাপ্লাই পেয়ে গেছি।

এবার নিজেদের উদ্যোগ নিয়ে খাজা কিনে খেতে হবে। অফিসের রিসার্চে মন বসে না কিন্তু পৃথিবীর বাকি সব কিছু নিয়েই রিসার্চ করি। খাজা নিয়েও করেছি। রিসার্চে বেরিয়েছে জগন্নাথ মন্দিরের সন্নিকটস্থ খাজাপট্টির অভ্যন্তরস্থ ন্রুসিংহ সুইটসের খাজাই পুরীর অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ খাজা।

লখনৌয়ের দস্তরখোয়ানই হোক কিংবা ভোপালের গলির বিরিয়ানির দোকান, যে কোনও আইকনিক দোকানে খেতে গেলেই ডুপ্লিকেটের অসুবিধে ফেস করেছি। একই নামে ঘাড়ের কাছে নয়তো রাস্তার উল্টোদিকে আরেকটা দোকান। চোখে দেখে কোনটা আসল বোঝার উপায় নেই। পুরীর ন্রুসিংহ সুইটসও তার অন্যথা নয়। গলির মুখ থেকেই নৃসিংহ, নরসিংহ, আসল ন্রুসিংহতে খাজাপট্টি ছয়লাপ। কিন্তু অরিজিন্যাল ন্রুসিংহ সুইটস বার করতে কোনও অসুবিধে হবে না। কারণ পৃথিবীর যত খাজা খদ্দের একটাই দোকানে ভনভন করছে। 


ন্রুসিংহ সুইটসে খাজা কিনতে গেলে আপনাকে একটা নিয়ম মনে রাখতে হবে। সময় এবং ধৈর্য অনন্ত নিয়ে যেতে হবে। ওর পর কোনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখলে চলবে না। আমরা এ নিয়ম জানতাম না, কপালগুণে মঙ্গলাজোড়ি থেকে ফেরার পথে গেছি, খাজা কিনে হোটেলে চলে যাব। আর কোনও কমিটমেন্ট নেই। দোকানের সামনে অন্তত পাঁচ সারি লোক, মাথার ওপর নোট ধরা হাত তুলে চেঁচাচ্ছেন। কেউ লাইন ভেঙে ঢুকছেন। কেউ কেউ তৃতীয় সারি থেকে ক্রমাগত নিজের অর্ডার তোতাপাখির মতো চেঁচিয়ে চলেছেন, আশু খাজাপ্রাপ্তির কোনও সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও। এর মধ্যে কেউ কেউ পেছনে দাঁড়িয়ে হাতের তেলোখানা আমার পিঠে মেলে রেখেছেন পাছে আমি শুকনো ডাঙায় ব্যালেন্স হারিয়ে ওঁর ওপর পড়ে যাই। উনিই লাস্ট সারি, এমন নয় যে ওঁকে কেউ পেছন থেকে ঠেলছে এবং উনি টাল সামলানোর জন্য আমাকে ধরে আছেন। জাস্ট আরেকটা বডি সামনে আছে তাই উনি সেটা ছুঁয়ে আছেন।  

শারীরিক স্পর্শ বিষয়ে আমাদের দেশের লোকদের এই অসীম উদাসীনতা আমাকে বিস্মিত করে। যে কোনও লাইনে দাঁড়িয়ে দেখবেন, পেছনের জন আপনার গায়ে সেঁটে দাঁড়াবেন। তাঁকে এড়ানোর জন্য এক ইঞ্চি এগিয়ে যান, পত্রপাঠ এগিয়ে এসে আবার গায়ে সেঁটে যাবেন। খালি জায়গা নষ্ট করার বদভ্যেস ভারতীয়দের নেই। অপেক্ষা করলাম, মহিলা হয়তো খেয়াল করছেন না, খেয়াল করলে হাত সরিয়ে নেবেন। পাঁচ মিনিট পর ফিরে বলতে হল, হাতটা নামান দয়া করে। এই সব করে আমি অবশেষে ক্রমে চতুর্থ, তৃতীয় লাইনে এলাম আর বুঝলাম ভিড়টার আসল কারণ কী। খদ্দেরের ভিড় নয়। খদ্দের তো আছেই। অসংখ্য। কিন্তু তাঁরা খাজা কিনে সরে এলে এই ভিড়টা হয় না। হতে পারে না। 

দেরিটা হচ্ছে টেস্ট করতে গিয়ে। আধঘণ্টা চেঁচিয়ে গলা ভেঙে, ঠেলেঠুলে অবশেষে লাইনের সামনে এসেছেন। হতেই পারে না, টেস্ট করে খাজা খারাপ লাগলে না কিনে ফিরে যাবেন। তবু টেস্ট করার জন্য আকুতি। কেউ কেউ আবার টেস্ট করার কথা ভুলে গিয়েছিলেন। পাঁচ কেজি খাজা প্যাক করিয়ে পেছন ফিরেই মনে পড়ে গেছে, ফ্রিতে আধখানা খাজা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।  সঙ্গে সঙ্গে টার্ন অ্যারাউন্ড। ভাইয়াআআআ থোড়া টেস্ট করা দোওও। ভয়ানক ব্যস্ত কর্মচারীরা যতক্ষণ না সে আকুতিতে সাড়া দিয়ে খচাৎ করে একখানা খাজা ভেঙে ওঁর দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন ততক্ষণ এ হাতে পাঁচকেজি খাজার প্যাকেট নিয়ে ও হাত বাড়িয়ে থাকবেন। চমকের আরও বাকি ছিল। কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন পেছন থেকে একটি শীর্ণ হাত এগিয়ে এসে বলল,  ভাই একটা খাজা দাও না, টেস্ট করব। আমি ভাবছি উনি কি আশা করছেন আমি সামনের ঝুড়িতে রাখা খাজা তুলে ওঁকে পাস করব? কারণ আমি সেটা করব না। তারপর বুঝলাম উনি গোটা খাজা এমনকি আধখানা খাজাও চাইছেন না, উনি চাইছেন দাঁড়িপাল্লার কোণে যে গুঁড়ো খাজা পড়ে আছে সেগুলো। সিরিয়াসলি চাইছেন। আমি একটা চাকলা মতো তুলে দিলাম।হাত আবার এগিয়ে এল, আরেকটু দাও ভাই, ওঁকেও একটু টেস্ট করাব। এবার আর চাকলাও ছিল না। বললেন, গুঁড়োই দাও, ওতেই চলবে। 

দেখেশুনে আমার সন্দেহ হচ্ছে ন্রুসিংহ সুইটসের খাজাতে, বিশেষ করে টেস্ট করা খাজাতে কোনও দৈবীশক্তি থাকলেও থাকতে পারে। আমরা টেস্ট করিনি তাই বলতে পারব না। তবে কিনে আনা খাজাগুলো, সত্যিই এতদিন যে নন-ন্রুসিংহ খাজা খেয়েছি তাদের থেকে অনেক ভালো। অল্প মিষ্টি, কুড়কুড়ে, রসালো। মচৎকার।

ওই গলিতে মালাই কা পুরি (বেসিক্যালি মোষের দুধের ঘন সর চিনি ছড়িয়ে ভাঁজ করে কলাপাতায় পরিবেশিত) নামের একটি চমৎকার জিনিস পাওয়া যায়, কিন্তু আমরা যেতে যেতে সেটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। শুধু সর কাপে করে বিক্রি হচ্ছিল, কিন্তু আমরা খেলাম না। এ ছাড়াও ছেনা জিল্লি (ছানার জিলিপি তবে ছোট সাইজের আর প্যাঁচটা অনেক টাইট), চমচম, সিংহের মাথার মতো রসগোল্লা জাতীয় সুখাদ্যে ভর্তি। আমরা গলি পরিদর্শন করে এলাম কিন্তু খেলাম না কিছুই। মটর কা পানি খেয়ে মুখটা বেশ ঝালটক হয়ে ছিল সেটা মিষ্টি দিয়ে মাটি করতে মন চাইল না। তাছাড়া সেদিনই বি এন আর এ শেষ রাত, আর রেলওয়ে হোটেলের রান্না সত্যিই ভালো, হোটেলেই খাওয়া যাবে’খন।

পুরীতে আর খালি একটা সকাল বাকি। আরও কয়েকটা দ্রষ্টব্য বাকি রয়ে গিয়েছিল, দেখতে হলে হয় সেগুলো দেখতে হয় নয় সমুদ্রের সঙ্গে শেষ দেখা সারা যায়। আমরা কোনটা বাছলাম তাতে কোনও সারপ্রাইজ নেই। বি এন আর -এ কলকাতা থেকে আসা ট্রেনের সময়ের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সকাল আটটায় চেক আউট। ব্রেকফাস্ট করে ব্যাগ ক্লোক রুমে রেখে চললাম সমুদ্রের দিকে। প্রথমে ভেবেছিলাম আধঘণ্টা মতো থাকব। সেদিন পা ভেজানোর লোভটুকুও করা যাবে না, কারণ ওই জামায় আমাকে বাড়ি পর্যন্ত আসতে হবে আর অর্চিষ্মানকে উঠতে হবে ভুবনেশ্বরের গেস্টহাউসে। কাজেই আধঘণ্টার বেশি থেকে করবই বা কী। কিন্তু তারপর রবিবারের সকালের স্নানার্থীতে তট ভরে উঠল আর আমরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারলাম। নিজেরা স্নান করার থেকে কোনও অংশে কম রোমহর্ষক নয় অন্যদের স্নান করতে দেখা। আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে এক নুলিয়া ভদ্রলোকের ছাউনির নিচে চেয়ার প্রতি বিশটাকা ভাড়া দিয়ে আরও আধঘণ্টা বসলাম। একজন ভারায় মিষ্টির ডেকচি নিয়ে যাচ্ছিলেন, শালপাতায় করে চমচম খাওয়া হল। ছবি তুলব ভেবেছিলাম কিন্তু এতই ভালো খেতে যে খাওয়ার আগে ফোন তাক করতে করতেই চমচম ফিনিশ।




*****

এবারের বেড়ানোর শেষটা একটু বেশি দুঃখের। আমার জন্য দুঃখের কারণ আমাকে একা একা বাড়ি ফিরতে হবে আর অর্চিষ্মানের জন্য দুঃখের কারণ ওকে এখন আরও দুদিন কনফারেন্সে হেসে হেসে কথা বলতে হবে। কাজেই আমাদের ইচ্ছে ছিল ভুবনেশ্বরে ফিরেও আরেকটু সময় একসঙ্গে কাটানো। মন্দিরটন্দির দেখার সময় থাকবে না, তবে অন্য একটা কাজ তো থাকেই। যে কাজটা কখনও ফুরোয় না। সকালে খেলেও দুপুরে খেতে হয়ে। দুপুরে খেলেও রাতে না খেলে চলে না।

হোয়্যার টু  ইট ইন ভুবনেশ্বর সার্চ দিতে অনেক জায়গার নাম বেরিয়েছিল তারপর যাওয়ার পথে প্লেনে অর্চিষ্মানের সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল যাঁর বাড়ি ভুবনেশ্বরে। আমরা তাঁকে যেই না  জিজ্ঞাসা করেছি, আচ্ছা কোথায় খাওয়া যায় বলুন তো, উনি বললেন, এটার উত্তর আমি জানি, আমার বাড়িতে। ভারি সজ্জন লোক, আমাদের অনেক করে বলছিলেন, কিন্তু আমরা ‘না না এবার সময় নেই পরের বার প্রমিস’ অনুনয়বিনয় করাতে বললেন, ওডিশা হোটেল। 

নামজাদা খাওয়ার জায়গার লিস্টে সবেতেই এই নামটা আগে আমরা দেখেছি। ওডিশা হোটেলের দুটো দোকান, মেনটা চন্দ্রশেখরপুরের ইনফো সিটিতে, শাখাটি শহীদ নগরে । প্রথম রাতে এসে ভুবনেশ্বরের যে হোটেলে উঠেছিলাম সেটাও শহীদ নগরেই। হোটেলে ঢুকেছিলাম রাত দশটা পাঁচে আর দোকান খোলা ছিল সাড়ে দশটা পর্যন্ত। গুগল ম্যাপ দেখাচ্ছিল ছশো মিটারের রাস্তা। অন্ধকারে না দৌড়ে যতখানি জোরে হাঁটা যায় হেঁটে চললাম দোকানের দিকে। তখন স্বাভাবিক ভাবেই কোনও খাইয়ে নেই। বৃহস্পতিবার আবার ওই শাখাটিতে কেবল নিরামিষ পাওয়া যায়। আমরা রুটি তরকারি, ভেজ থালি ইত্যাদি নিয়েছিলাম। আমার আবার সবেতে পাকামো। মেনুতে যে নামটা চেনা যাচ্ছে না, নিজেকে অ্যাডভেঞ্চারাস প্রমাণ করতে সেইটিই অর্ডার করা চাই। একটা পদ সে ক্রাইটেরিয়া পূর্ণ করেছে মনে হল আর অমনি আমি বলে বসলাম চুঁই বেসর খাব। কোঁকড়াচুলো ছেলেটি হেসে ঘাড় নেড়ে চলে গেল। আমার কেমন সন্দেহ হওয়াতে গুগল করে দেখি হে ভগবান আমি সজনে ডাঁটার ঝোল অর্ডার করেছি। হাঁকডাক করে অর্ডার বদলালাম, বললাম অ্যাডভেঞ্চার মাথায় থাকুক, আপনি রাই (সর্ষে) মাশরুমই আনুন ভাই।


অর্চিষ্মান আবার কোথায় পড়েছে যে ওডিশা হোটেলে ভুবনেশ্বরের বেস্ট মাটন ঝোল পাওয়া যায়। কাজেই আমরা ফেরার দিনও ওডিশা হোটেলেই লাঞ্চ খাব স্থির করলাম। এবার আর ব্রাঞ্চে নয়, চন্দ্রশেখরপুরের ইনফোসিটির মেন দোকানে। আমার জন্য আলুকপির ঝোল, ডাল আর অর্চিষ্মানের জন্য পাঁঠার মাংস, ভাত নেওয়া হল। আলুকপির ঝোল যত ভালো সম্ভব ওঁরা তত ভালোই রান্না করেছিলেন। পাঁঠার ঝোল সম্পর্কে অর্চিষ্মানও একই মতামত দিল। কিন্তু যে জিনিসটা খেয়ে আমরা দুজনেই উচ্ছ্বসিত হলাম সেটা হচ্ছে মিক্সড ভাজা। কুমড়োফুল ভাজা, উচ্ছে ভাজা, শাক ভাজা, বরবটি ভাজা - সে একেবারে চমৎকার ব্যাপার। এক প্লেট খেয়ে আরেক প্লেট অর্ডার করা হল। ডেজার্টে গুলাবজামুন আর ক্ষীর নিলাম। ক্ষীরখানা একেবারে ফাসক্লাস। 



ওডিশা হোটেলের সবই ভালো, খালি ধাঁই কিরি কিরিটা একটু বেশির দিকে। মানে ক্ষীর আর বিল একই সঙ্গে এসে যাচ্ছে টাইপের। অথচ এমন নয় যে আমাদের টেবিলে বসবে বলে কেউ অপেক্ষা করছেন। আসলে ব্যস্ত দোকান বলেই বোধহয় ওটা অভ্যেস হয়ে গেছে, যখন ব্যস্ততার দরকার নেই তখনও সিস্টেম বিদ্যুৎবেগে কাজ করে।

একসঙ্গে থাকাটা আরও একটুখানি টেনে লম্বা করার জন্য গুগলম্যাপে নিকটবর্তী কফির দোকান সার্চ করে বারিসতা বেরোল, সেখানে গিয়ে ক্যাপুচিনো আর হানি জিঞ্জার টি নিয়ে আধঘণ্টা বসলাম। আর সত্যিই সময় নেই। ওলা ডেকে এয়ারপোর্ট। কাঁচের দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা অর্চিষ্মানকে টাটা করে ইন্ডিগোর কাউন্টারের দিকে হাঁটা লাগালাম আর আমাদের বেড়ানো সত্যি সত্যি ফুরিয়ে গেল।



December 12, 2018

সমুদ্রস্নানের সাত রকম




১। এঁরা সবার আগে বিচে আসবেন। সুইমসুট, সানগ্লাস, তোয়ালে, শতরঞ্জি, ছাতা, জুতো পাহারা দেওয়ার লোক -  সমুদ্রস্নানের সমস্ত প্রয়োজনীয় গিয়ার ঘাড়েবগলে করে। এর পর শতরঞ্জি পেতে ছাতা মেলে কিংবা নুলিয়াদের ছাউনি ভাড়া করে আরাম করবেন কিংবা স্রেফ সানগ্লাস আর শতরঞ্জির ভরসায় ডেয়ারডেভিল নেমে পড়বেন ট্যানের সাধনায়। কেউ মালিশওয়ালা ডেকে মাল্টিটাস্কিং-এ নিমগ্ন হবেন। এঁদের সন্তানসন্ততিরা প্যাস্টেল রঙের ছোট্ট বালতি বেলচা নিয়ে বালিতে শিল্পকর্ম ফাঁদবে। এঁদের আশপাশ দিয়ে কোটি কোটি লোক সমুদ্রে নেমে, স্নান করে, উঠে বাড়ি চলে যাবে। এঁদের জলে নামার ওয়ার্ম আপ ফুরোবে না। আদৌ জলে নামা হবে কি? আমি জানি না। আমি যতক্ষণ আশেপাশে থেকেছি নামতে দেখিনি কোনওবার, আমি চলে আসার পরে নেমে থাকলে আমার জানার কথা নয়।

আমার সন্দেহ হচ্ছে ইনি ওয়ার্ম আপ ক্যাটেগরিতেই পড়বেন, নিশ্চিত হতে পারছি না বলে আলাদা লিখছি। এঁকে প্রথম দেখা যাবে ডান কিংবা বাঁ দিকে, বহুদূরে, একটি কালো বিন্দু হিসেবে। বাড়তে বাড়তে সেটি অবশেষে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের আকার ধারণ করবে। দৃষ্টি নিচু বা সামনে, সমুদ্রের দিকে কদাচ নয়। কাঁধের তোয়ালে তাঁর স্নানের ইচ্ছের সাক্ষ্য দিচ্ছে, কিন্তু যে রকম ফোকাস এবং গতির সঙ্গে হাঁটছেন, চট করে থামবেন বা জলে নামবেন মনে হচ্ছে না। ক্রমে তিনি আপনাকে পার হয়ে করে দূরে চলে যেতে যেতে আবার বিন্দু হয়ে যাবেন। কোথা থেকে আসছেন? শংকরপুর হতে পারে, কোথায় যাচ্ছেন? কন্যাকুমারিকা হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। 

২। ওয়ার্ম আপ দলের একশো আশি ডিগ্রিতে আছেন ইনি। পায়ের তলায় বালি শুরু হওয়া মাত্র দুই হাত মাথার ওপর তুলে দৌড়তে শুরু করবেন, সমুদ্রে ঝাঁপানোর আগে পর্যন্ত থামবেন না। এঁর উল্লাসজনিত চিৎকার এঁর সমুদ্রস্নানের আনন্দ সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ রাখবে না। কিন্তু ইনি স্বার্থপরের মতো একা আনন্দ করতে চান না। সঙ্গীরা, যাঁরা নিজের মতো করে স্নান করছেন বা করছেন না, তাঁদের নিজের আনন্দের ভাগ দেওয়ার জন্য ইনি উৎকণ্ঠিত। কোনও সঙ্গী সমুদ্রস্নানে অনুৎসাহী হলে  এঁর অন্নপ্রাশনের ভাত হজম হবে না। জলকেলি ছেড়ে উঠে এসে সঙ্গীর হাত ধরে টানতে শুরু করবেন। সঙ্গী বিপদ বুঝে ত্রাহি চেঁচাবেন। চিৎকারে এফেক্ট উল্টো হবে, এঁর পরোপকারের স্পৃহা লকলকিয়ে উঠবে, সঙ্গীকে জলে চুবনোর প্রতিজ্ঞা দৃঢ় হবে। বালির ওপর দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে তিনি সঙ্গীকে সমুদ্রের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকবেন। কনটেক্সট ছাড়া দৃশ্যে ঢুকে পড়লে পুলিসকে ফোন করা কিংবা নিকটবর্তী চ্যালাকাঠ তুলে নিয়ে এঁর মাথায় বসিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে অস্বাভাবিক নয়। 

৩। ভিড়ে দাঁড়িয়ে বালিঘোলা ঢেউয়ের গুঁতোয় হাঁচোড়পাঁচোড় স্নানে ইনি নেই, গোলযোগ ছাড়িয়ে দূরে চলে যাবেন, তারপর ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে ভাসতে বাকিদের আনাড়িপনার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসবেন।

৪। এঁরা হারার আগেই হেরে বসে থাকবেন। ঢেউয়ের গুঁতোয় পড়ে গিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে করতেই পরের আরও বড় ঢেউটার আঘাতে পুনরায় পর্যুদস্ত হওয়াতেই যে সমুদ্রস্নানের আসল মজা, এই মতে এঁরা বিশ্বাসী নন। হারবই যখন ফাইট দিয়ে কী হবে ভেবে নিয়ে এঁরা বিচের ওপর হাত পা এলিয়ে বসে বা শুয়ে থাকবেন। ঢেউ সরে গেলেও উঠে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাবেন না। কী হবে উঠে, আবার তো শুইয়েই দিয়ে যাবে।

আমার ঠাকুমা এই ক্যাটেগরির স্নানার্থী ছিলেন। আমি একবার ঠাকুমার দেখাদিখি গড়াগড়ি স্টাইলে সমুদ্রস্নানের অ্যাটেম্পট নিয়েছিলাম। জঘন্য আইডিয়া। সারা গায়ে বালি কিচকিচ। বারদুয়েক গড়াগড়ি খেয়ে উঠে পড়ে নালিশ করাতে ঠাকুমা বলেছিলেন, এই সেম বালি মহাপ্রভু গায়ে মেখেছিলেন। কাজেই কিচকিচানি নন-ইস্যু। 

৫। এঁদের শুধু স্নান করলে হবে না, স্নানের মুহূর্তটিকে অমর করে রাখতে হবে। যারা অ্যাথলেটিক নন তাঁরা হাঁটু ভাঁজ করে জলে এক হাত ছুঁইয়ে, অন্য হাতে ভি দেখিয়ে ক্ষান্ত দেবেন। অ্যাথলেটিকরা নিজস্ব ক্ষমতা অনুসারে ঢেউয়ের মাথার ওপর দিয়ে লাফিয়ে, কাউকে ঘাড়ে নিয়ে/ কারও ঘাড়ে উঠে, কার্টহুইল করতে করতে সমুদ্রে নামার ছবি তোলাবেন।

সকলেরই ঠিক সেই মুহূর্তের ছবি চাই যে মুহূর্তে সফেন ঢেউ তাঁকে ঘিরে উচ্ছ্বল। সমস্যাটা হচ্ছে মুহূর্তটা আগে থেকে গেস করা অসম্ভব। কখনও ঢেউ মাধ্যমিকে সাতখানা লেটার বাগিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে টায়টায়, এদিকে ইনি শুকনো বালিতে ছাদের সমান লাফিয়ে আহাম্মক। আবার কখনও কখনও লাস্ট মোমেন্টে পিক আপ নিয়ে ঢেউ ভিক্টরি সাইন ডুবিয়ে তাঁকে চুবিয়ে চলে যাচ্ছে, সেই মুহূর্তে একগলা নোনাজল গেলা মুখ আর যাই হোক ফোটোজেনিক থাকছে না। একটাই বাঁচোয়া, ডিজিট্যাল জমানা, মেমোরি মেকিং মনোমত না হওয়া পর্যন্ত ক্লিক করে যাওয়া যাবে। ততক্ষণ সমুদ্রতট শোয়া, বসা, শূন্যে ত্রিভঙ্গ অবস্থা থেকে ‘এবার!’ ‘এবার!’ ‘এবার!’ কলরবে মুখরিত হয়ে থাকবে, এই যা।

৬। এঁরা পেটের-ভেতরটা-কেমন-করে-বলেই-তো-জায়েন্ট-হুইল-চড়ি, মুখ-চুলকোয়-বলেই-তো-বেগুন-খাই মোটো নিয়ে জীবনের মধ্য দিয়ে চলেন। মাথার দু’হাত ওপর থেকে ঢেউ যখন প্রচণ্ড বেগে নেমে আসছে গিলে খাবে বলে, মাথা ফাঁকা, চোখ বোজা, শ্বাস রুদ্ধ, ভেসে যাওয়ার অত কাছাকাছি আর আসা হবে না কখনও, ওই মুহূর্তের ওপারে কী আছে জানা নেই, সেই মুহূর্তটাই এঁদের মতে পুরীর বেস্ট মুহূর্ত। 

ইন ফ্যাক্ট, সেই মুহূর্তটাই পুরী। 

আর সেই মুহূর্তের মুখোমুখি হওয়ার একটাই স্ট্র্যাটেজি এঁদের জানা আছে। ঢেউয়ের উচ্চতা এবং শক্তি এবং নিজের নাস্তানাবুদ হওয়ার মাত্রা বুঝে ভিন্ন স্কেলে, ভিন্ন পিচে গলা ছাড়া। চেঁচানোটা এঁদের কোপিং মেকানিজম।

৭। এঁরা নাকেমুখে জল ঢুকতে ঢুকতেও, আছাড় খেতে খেতেও লোকলজ্জায় মরবেন। বলবেন, ওরে বাবা কুন্তলা অত চেঁচিয়ো না, ওই যে ওরা তাকাচ্ছে। 



December 06, 2018

রঘুরাজপুর আর মঙ্গলাজোড়ি




মঙ্গলাজোড়ি যাওয়া ফাইন্যাল অবশেষে হল শুক্রবার সন্ধেবেলা স্বর্গদ্বারে বসে লেবু চা খেতে খেতে। শনিবার কোথাও একটা যাব সেটা জানতাম কিন্তু যাওয়ার জায়গাটা নিয়ে সংশয় ছিল। কোনারক দুজনেরই দেখা, দুজনেরই নন্দনকাননে অনাগ্রহ। নাকতলার বাবা মঙ্গলাজোড়ির খবর দিয়েছিলেন। চিলিকা হ্রদের উত্তরপ্রান্তের ছোট্ট গ্রাম। সাইবেরিয়া মংগোলিয়া এই সব জায়গায় এখন ঠাণ্ডাটা একটু বেশি তাই পাখিরা উড়ে উড়ে এসে জড়ো হয় মংগলাজোড়ির বিরাট জলাজমি। নলঘাসের বনের অলিগলি বেয়ে মঙ্গলাজোড়ির মিষ্টি জল চিলকার নোনতা জলের সঙ্গে মিশেছে সে ভুলভুলাইয়া নেটিভ, পরিযায়ী মিলিয়ে এই ক'মাস, নভেম্বর থেকে মার্চ, প্রায় নাকি তিন লাখ পাখির আখড়া। গত কয়েকবছরে কিছু বদমেজাজি পায়রা ছাড়া আর বিশেষ কোনও রকম পাখির সঙ্গে ওঠাবসা নেই, আমি তাও অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে ফিঙেটিঙে চিনতে পারি, অর্চিষ্মানের কাক পায়রা শালিক চড়ুই পার হলে সব পাখিই ডাইনোসরের বংশধর। কাজেই মঙ্গলাজোড়ি যদি যাই একটা নতুন জায়গায় যাওয়া হবে ভেবেই যাব। পুরীতে সারাদিন থেকেই বা কী করব। 

যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা আছে। মঙ্গলাজোড়িতে বেস্ট পাখি দেখার সময় ভোর নয়তো সন্ধে। পুরী থেকে মংগলাজোড়ি গাড়িতে লাগে দু'ঘণ্টা কাজেই ভোর আউট অফ কোশ্চেন। সূর্যোদয় দেখব বলে দুদিন পিক আপ নিয়ে দুদিনই ফেল করছি, রাত দুটোয় পাখি দেখতে বেরোনর উদ্যম আমাদের থেকে আশা করা বৃথা। কাজেই বিকেলের স্লট টার্গেট করতে হবে। 

তাহলে সকালে কী করব?

রঘুরাজপুর যাওয়া যায়। পথেই পড়বে। সেখানে পট্টচিত্র শিল্পীদের গ্রাম আছে, তাঁদের স্টুডিও দেখে, শিল্পসৃষ্টির প্রক্রিয়া ফার্স্ট হ্যান্ড পর্যবেক্ষণ করে মংগলাজোড়ির রাস্তা ধরা যায়।

আমি একেবারেই উৎসাহী ছিলাম না। কারণ এই নয় যে পট্টচিত্র সম্পর্কে আমার উৎসাহ নেই। চোখের সামনে শিল্পীদের শিল্পসৃষ্টি করতে দেখার অভিজ্ঞতাটাও যে অন্যরকম তাও জানি। কিন্তু এও জানি যে ওই দেখাটা আসল ব্যাপার নয়। আসল ব্যাপার শুরু হবে ওসব ঝামেলা ফুরোলে। বেচা এবং কেনা। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে খবর আছে, কেনানোর ঝুলোঝুলি লিজেন্ডারি। আমি বেচাকেনার বিরুদ্ধে নই। শিল্প যে ফাইন্যালি প্রোডাক্ট ইত্যাদি নিয়েও আমার সন্দেহ নেই কিন্তু মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, আমার সত্যিই পট্টচিত্র কেনার ইচ্ছে নেই। কারণ এক, দরকার নেই, দুই, যেগুলো পছন্দ হবে সেগুলো কেনার সাধ্য আমাদের নেই, তিন, চক্ষুলজ্জার খাতিরে যেগুলো কিনে আনব সেগুলো পড়ে পড়ে ধুলো খাওয়া ছাড়া আর কোনও উপকারে লাগবে না। তার ওপর গোটা ব্যাপারটায় ফোড়ন হবে অপরাধবোধ। একজন শিল্পী এমন সুন্দর জিনিস নিজে হাতে বানিয়েছেন, সেগুলো ঝেড়েবেছে, না দাদা পোষাচ্ছে না বুঝলেন, বলে উঠে আসার পরিস্থিতিতে আমি নিজেকে ফেলতে চাই না। সাধ করে তো না-ই।

তবু  মঙ্গলজোড়ি  ফাইন্যাল হল যখন রঘুরাজপুর যাওয়াও ফাইন্যাল হল। চন্দনপুরের মোড় থেকে গাড়ি ঢুকল ডানদিকে। রাস্তা ঝপ করে সরু হয়ে গেল। মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পর পথ আবার দু’ফালি, ডানদিকে রঘুরাজপুর নামের নিচে তীরচিহ্ন। গাড়ি নাকবরাবর চলেছে। ব্যাপার কী? লক্ষণ বললেন, চিত্র দেখবেন তো, আমি যেখানে যাচ্ছি সেখানে চলুন, রঘুরাজপুরের থেকে ঢের ভালো করে দেখিয়ে দেবে সবকিছু। কী আর বলব। যেচে যন্ত্রে গলা দিয়েছি। নিয়ে চলুন যেখানে মন চায়।

গাড়ি একটা গলির মধ্যে ঢুকল। একটা সাদা রং করা ছোট বাড়ি থেকে একজন রোগা ভদ্রলোক এসে নমস্কার করে আমাদের নিয়ে গেলেন সিঁড়ি দিয়ে দোতলার ঘরে। খালি ঘরের মাঝখানে মাদুর পাতা, একদিকে বসার বেঞ্চ, বাকি ঘর জুড়ে ভাঁজ করা তালপাতা, গোল পাকানো কাগজ ভর্তি। ঘরের লাগোয়া রোদ আসা বারান্দায় বসে তিনজন মেয়ে ডেস্কের ওপর তালপাতা রেখে তার ওপর কারিকুরি করছিলেন,  পট্টচিত্রের কাজ শিখছেন। বারান্দার বাইরে একখানা মন্দির উঠেছে গা ঘেঁষে। 



এই হচ্ছে তালপাতা। নিম হলুদের জলে চুবিয়ে শুকোনো হয়েছে পোকাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। চিত্র তৈরির প্রথম ধাপ হচ্ছে একরকমের ছুঁচলো লোহার পেনসিলের আঁচড়ে পাতায় ডিজাইন আঁকা। নমুনা হিসেবে ভদ্রলোক একটা পাখি আঁকলেন। আঁকলেন মানে তিন চারটে টান দিলেন। আমাদের হাতে দিয়ে বললেন, ঝট করে কিছু মাথায় এল না, তাই খুব সাধারণ একটা পক্ষী আঁকলাম আরকি।  আমাকে তিন সেকেন্ডে একখানা পাখি আঁকতে দিলে যা কাণ্ড হত আর বললাম না। 


তারপর উনি একটা বোতল থেকে কাজলের কালি গাছের আঠা মেশানো একটা তরল কাপড়ে ঢেলে পাখিটার ওপর ঘষঘষ ঘসলেন।



 তারপর এমনি প্লেন জল দিয়ে পরিষ্কার করে মুছে দিতেই হয়ে গেল পট্টচিত্রের পাখি। সত্যিই ম্যাজিকের মতো।

এরপর যা হওয়ার তাই হল। উনি আমাদের ওঁর এবং ওঁর ছাত্রছাত্রীদের হাতে বানানো চমৎকার চিত্র দেখালেন, তালপাতার ওপর সে সব টানের সূক্ষ্মতা আমি কল্পনা করতে পারি না, আপনাদের ব্যাখ্যা করে বোঝানো তো ছেড়েই দিলাম। দশাবতার, রাসলীলা, গণেশ। ওইটুকুটুকু ছবির জায়গায় জায়গায় আবার ফ্ল্যাপের মতো করা, এপাশে ওপাশে আলাদা ছবি। দেশী সিল্কের ওপর আঁকা রঙিন ছবি, তার জৌলুস বিশ্বাস হয় না। মস্ত মস্ত কার্টন টেনে টেনে এনে ছবির পর ছবি বার করে আমাদের দেখাতে লাগলেন। এত সুন্দর সে সব ছবি, দেখলে কিনে ফেলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু যা ভেবেছিলাম তাই। এমনি এমনি তো চুল পাকেনি। যেটা চোখে লাগছে, সেটাই সাধ্যের বাইরে। বার বার বললাম, দেখাবেন না দাদা, আমরা সত্যিই পারব না। মিনিট চল্লিশ পর ওঁর বিশ্বাস হল। ভদ্রলোক অসম্ভব ভদ্র। বিরক্ত লাগছিল নিশ্চয়, তবু ব্যবহার একই রকম শান্ত রেখে পাশের ঘর থেকে আরেকটা বাক্স এনে বললেন, এইগুলো দেখুন তবে। নারকেলের খোলার গায়ে ঝলমলে রং দিয়ে আঁকা জগন্নাথের মুখ। দাম শুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে দু'খানা তুলে প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছি এমন সময় ঝুমুর ঝুমুর। ওপরতলা থেকে নামছে দুই আড়াই হাত লম্বা বালিকা, ঝলমলে শাড়ি,  চোখে কাজল, হাতে আলতার সূর্য, তেল চুকচুকে বয়েজ কাট চুলে ফুলের মুকুট। সেজেগুজে কনফিডেন্স তাদের তুঙ্গে, তাড়াতাড়ি সাইড দিলাম। অর্চিষ্মান গত বেশ কিছুদিন ওডিশায় ঘোরাঘুরি করছে, বলল, গোটিপুয়া নাচ হবে বুঝি? পাশের ঘরে অনেকক্ষণ ধরে বিদেশী গলা পাচ্ছিলাম, তাঁদের জন্য পারফরমেন্সের ব্যবস্থা হয়েছে। অর্চিষ্মানও নাকি সে নাচ দেখেছে। দেখার মতো নাকি ব্যাপার। সে অবশ্য শিল্পীদের দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছিল।

গাড়িতে ওঠার পর লক্ষ্মণ বললেন, আবার রঘুরাজপুর যাবেন নাকি? আমরা বললাম, না ভাই আজকের মতো নেগোশিয়েশনের কোটা শেষ, আপনি বরং এবার সোজা মঙ্গলাজোড়িই চলুন। লক্ষণ বললেন, সেই ভালো, দেরিও হয়ে যাবে। চন্দনপুরের মোড়ে এসে ডানদিকে বাঁক নিয়ে ঘুরল আমাদের গাড়ি। 

নিরাকারপুর, শ্রীমুকুন্দপুর এই রকম চমৎকার চমৎকার সব নামের জায়গা পেরিয়ে গাড়ি চলল। একটা একটা বড় লোকালয় আসে, আর আমরা জানালা দিয়ে যতখানি সম্ভব জায়গাটা দেখে নেওয়ার চেষ্টা করি। এই জায়গাগুলোয় কখনও বেড়াতে আসা হবে না, কাজেই এই সুযোগ। এখানে নৃত্যগীত অ্যাকাডেমির বেশ প্রচলন আছে দেখলাম। আর দেখলাম মানুষ, গরু, ফুচকার গাড়ি, চায়ের দোকান, শাকসবজির বাজার। সে সব বাঁধাকপি বেগুনের সতেজতা দেখলে সি আর পার্কের কপি বেগুন লজ্জা পাবে। বসতির মাঝে মাঝে দীর্ঘ রাস্তা জুড়ে দুদিকে নিচু ক্ষেত, জলে ভর্তি। নাকি সব জুলাই মাসের বন্যার জল, এখনও নামেনি। বারদুয়েক চা খেয়ে চিপস কিনে মঙ্গলজোড়ি পৌঁছলাম বেলা আড়াইটে নাগাদ।


মংগলাজোড়ি ইকো রিসর্ট। পাখি-উৎসাহীরা এখানে এসে থাকতে পারেন। বেসিক ব্যবস্থা, কিন্তু পরিচ্ছন্ন। ছাউনি ঢাকা ওই গোল জায়গাটায় জনাপাঁচেক লোককে খেতে দেখে মনে পড়ল দুপুরের খাওয়া নিয়ে ভাবা হয়নি। অর্চিষ্মান আমার কানে কানে, জিজ্ঞাসা কর না আমাদের তিনজনকে খেতে দেবে কি না, বলেই দৌড়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল।

আমি মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়ে আমাকেও বাথরুমটা দেখাবেন আর ইয়ে তিনজনের লাঞ্চ পাওয়া যাবে কি? 

মহিলা জিভ কাটলেন। এই মহিলার সঙ্গে গতকাল রাত থেকেই ফোনে কথা হচ্ছে। যা বুঝলাম, উনি রিসর্টের ফোনও ধরেন, প্যাকেজের খবরও দেন, রান্নাঘরেরও তদারকি করেন, টাকাপয়সারও হিসেব রাখেন। বললেন, পাওয়া তো যায়, কিন্তু আগে থেকে বলতে হয়। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ঠিক আছে ঠিক আছে, আমরা পাখিটাখি দেখে এসে না হয়... মহিলা বললেন, আসতে ছ'টা বেজে যাবে। দাঁড়ান দেখছি। আমি কাঁচুমাচু হয়ে পেতে রাখা টেবিল চেয়ারে বসলাম। অর্চিষ্মান এসে বলল, ব্যবস্থা করে ফেলেছ? বাঃ।

খাবার এল। ভাত, ডাল, আলু ফুলকপির তরকারি আর বেগুনভাজা।  দইয়ের সঙ্গে শশা, গাজর, পেঁয়াজ। প্রত্যেকটি জিনিসই যা বোঝা গেল আরও চাইলে পাওয়া যেত। আমরা চাইনি। কারণ আমাদের হয়েও বেশি হয়েছিল।

ওডিশা আর আসামের খাবারের সম্পর্কে আমরা একটা আলোচনা মাঝে মাঝেই করি। বিশেষ করে যখন এ দুটি রাজ্যের খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়। আলোচনার বিষয় হল যে এই রাজ্যদুটোর খাবারের প্রতি অবিচার করতে আমরা বাধ্য। কারণ এ জায়গাদুটোর খাবার বড্ড বেশি আমাদের খাবারের মতো। মানে মাছের ঝোল আর মুগের ডাল আর কলমি শাক নিয়ে কত উচ্ছ্বসিত হওয়া সম্ভব, সে যতই ভালো রান্না হোক না কেন? গত আটত্রিশ বছরে যে আটত্রিশ কোটি বার আমি মাছের ঝোল, ডাল, তরকারি খেয়েছি বাড়ির পিঁড়ি কিংবা টেবিলে বসে, কখনও না কখনও তো এর থেকে ভালো রান্না হয়েইছিল। সরসোঁ দা সাগ খেয়ে বরং আমার পক্ষে অভিভূত হওয়া সহজ। আলুনি কিংবা নুনপোড়া না হলেই হোক না কেন হাড়িপ্পা বলে লাফিয়ে উঠব।

আমরা যতক্ষণ খেলাম গাছের ডালে একটা কাক আর মাটিতে একটা বেড়াল বসে পাহারা দিল। ছাউনির নিচে পাখিড়ুদের খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল, বসে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন, একজন লাগলেন, আর ভাই আমি কলকাতায় থাকি না, আমার আবার স্ট্যাটাস, হ্যাঃ।

সেদিন দুপুরের খাওয়া সম্পর্কে একটাই বলতে পারি, আমাদের খাওয়া আটত্রিশ কোটি ডাল ভাত তরকারির মধ্যে মনে করে রাখার মতো  ডালভাত তরকারি খাইয়েছিল মঙ্গলাজোড়ি ইকো রিসর্ট। খাওয়া সেরে টাকাপয়সা মিটিয়ে গাড়ি চড়ে চলে গেলাম বার্ড ওয়াচিং টাওয়ারে, যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন অশোক। অনেকগুলো দাঁড়-বাওয়া নৌকো সারি দিয়ে দাঁড় করানো ছিল, একটার দাঁড় বেয়ে একজন কাছে নিয়ে এলেন। আমি, অর্চিষ্মান আর অশোক চড়ে বসলাম। আমাদের একটা বাইনোকুলার দেওয়া হল। 


মঙ্গলাজোড়ির ইতিহাস রোমহর্ষক। একসময় এই গ্রামের লোকজন পরিযায়ী পাখি শিকার করে খেতেন। । বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে এখন ভক্ষক টু রক্ষক হয়েছেন। পাখি চেনার চোখের এঁদের তৈরি হয়েছিল এক কারণে, এখন অন্য কারণে কাজে লাগছে। অশোকের ট্রেনিং হয়েছে সে রকম একজন ওস্তাদ শিকারীর হাতে। একদিনে একটা পাখি, এই ছিল তাঁর পাখি চেনানোর পদ্ধতি। 

নানারকম পাখি দেখা হল। পার্পল মুরহেন, কমন মুরহেন, হুইস্কারড টার্ন, উড স্যান্ডপাইপার, নর্দার্ন পিনটেইল, গ্রেহেড আর রেড ওয়াটল ল্যাপউইং, রাডি শেলডাক যা নাকি আমাদের পুরাণের চখাচখী, সর্বদা জোড়ায় জোড়ায় থাকে। যারা পরিযায়ী পাখি নিয়ে চর্চা করেন তাঁরা বলতে পারবেন আমরা বেশি পাখি দেখেছি না কম দেখেছি নাকি এই রকমই দেখা যায়। আমার সবথেকে চমক লাগছিল পাখিগুলো যখন হঠাৎ উড়ান নিচ্ছিল, আর অমনি একরঙা পাখির ডানায় ম্যাজিকের অন্য রং, সাদা ডানার মাঝখান দিয়ে হঠাৎ চওড়া বাদামী রঙের পোঁচ, কারও একই রঙের ভিন্ন ভিন্ন শেডসারি সারি, শাড়ির কুঁচির মতো। 

কিন্তু সত্যি বলব? এই একটি পাখিও না দেখতে পেলে আমার মঙ্গলাজোড়ি একই রকম ভালো লাগত। দাঁড়ের ঠেলায় নলঘাসের বনের গলিতে ভেসে পড়ার প্রথম মুহূর্ত থেকেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম. শান্ত জায়গায় তো অনেক গেছি। পাহাড় শান্ত, ভোরবেলা আমার বাড়িও শান্তই, কিন্তু এ আমি আগেও খেয়াল করে দেখেছি, জলের একটা আলাদা শান্তি আছে। স্থির জলের। মাইথন, মুকুটমণিপুর, এমনকি আমাদের পাড়ার পুকুরঘাটটারও শান্তিকেও আর কোনও শান্তির সঙ্গে যাকে গুলোন চলে না। সব কষ্ট শুষে নেওয়া, মুছে নেওয়া শান্তি।

অথচ একেবারে শান্তও তো ছিল না জায়গাটা। চখাচখী তো ভয়ানক চেঁচামেচি লাগিয়েছিলই, মোষগুলোও হেঁড়েগলায় ডেকে উঠছিল মাঝে মাঝেই। দাঁড়ের ঘায়ে জল জলের গায়ে লাট খাচ্ছিল। আমরা মঙ্গলাজোড়িতে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম দিনের ব্যস্ততম সময়ে। পাখিদের, মোষদের তখন বাড়ি ফেরার সময়। মোষগুলোকে না হয় জড়ো করার জন্য লোক আছে, কিন্তু পাখিরা বাড়ি ফেরার সময় হলে নিজেরাই হেঁকে ডেকে সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়। খালি চোখেই বোঝা যাচ্ছিল, অশোকের জোরাজুরিতে চোখে বাইনোকুলার ঠেকিয়ে দেখলাম একটা বিরাট জায়গা পাখিতে পাখিতে কিলবিল করছে। পাখিদের সাড়ে ছ'টার হাওড়া স্টেশন। একে একে উড়ছে আকাশে। 


এমনকি যারা উড়তে পারে না, ডাকতে পারে না, দূর থেকে দেখলে ধ্যানস্থ মনে হয়, তারাও কাছে গেলে বোঝা যায় জেগে রয়েছে দিব্যি। জলের দু'ইঞ্চি নিচ দিয়ে শিকড়ের স্তূপ, গুল্ম, শ্যাওলা, জড়াজড়ি করে ভেসে চলেছে সংসার নিয়ে। অশোকের নির্দেশে নৌকোর ছুঁচোল নাক ঢুকে যাচ্ছে কচুরিপানার বনে, খসখস আপত্তির তুলে জায়গা দিচ্ছে নারাজ কচুরিপানার জঙ্গল। 

জল যখন চারদিক থেকে যখন ঘিরে ধরে, অনভ্যস্ত চোখের দিক গুলিয়ে যায়। কোনদিক থেকে এসেছিলাম, কোথায় যাচ্ছি সব একশা। উঁচু হয়ে থাকা লাল মাটির রাস্তাটা অনেকক্ষণ চোখে চোখে রেখেছিলাম। কখন হারিয়ে গেছে খেয়ালই করিনি। ঘণ্টাদুয়েক পর উঁচু নলঘাসের পাঁচিল সরে যেতেই দেখি নৌকো দাঁড়িয়ে আছে ফেরির একেবারে সামনে। 

December 01, 2018

পুরী



রেলের খাবারের যা ছিরি হয়েছে আজকাল, রেলওয়ে হোটেলের খাওয়া যে সে স্ট্যান্ডার্ডের হবে না সে রকম একটা আন্দাজ ছিল। পুরীবাসের আড়াই দিনে সেটা বুঝেছি, কিন্তু নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম হোটেলে পৌঁছনোর আধঘণ্টার মধ্যে ভেজ পকোড়া আর চা খেয়েই। 

যথাক্রমে পান্থনিবাস এবং পুরী হোটেল দিয়েই পুরীতে থাকার জায়গার খোঁজ শুরু হয়েছিল, প্রত্যাশিতভাবেই পাওয়া যায়নি। তারপর ভিক্টোরিয়া ক্লাব, হোটেল হলিডেজ আরও যা যা সমুদ্রমুখী হোটেল আছে সবেতেই মাথা ঠুকে ব্যর্থ হয়েছি। দুঃখের কথা জানাতে নাকতলার বাবা বললেন ওঁর একজন পরিচিত রিসেন্টলি বি এন আর পুরীতে থেকে এসেছেন এবং উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। 

অর্চিষ্মান শুনেই বি এন আর-এ ফোন করল এবং ওঁরা বললেন, চলে আসুন, ঘর আছে। সেই খবরটাই আমাকে ফোন করে দেওয়ার চেষ্টা করছিল অর্চিষ্মান, পাজি পাজেরোটা ওভারটেক করে যে কনভারসেশনটা মাটি করে।

আমরা প্রথমটা দোনোমোনোই করেছিলাম। কারণ বি এন আর আমাদের বাজেটের বাইরে। তারপর অনেকগুলো যুক্তি মাথায় এল। এক, বোঝাই যাচ্ছে পুরীতে এখন ইলিইলি কিলিকিলি ভিড়। এই বাজারে ঘর পাওয়া গেলেও স্বর্গদ্বারের কাছাকাছি থাকাটা খুব একটা বুদ্ধিমানের হবে না। ও তল্লাটে ঘর অবশ্য পাওয়া যাচ্ছেও না। একটি দুটি হোটেল তাদের ‘মহারাজা সুইট’ খালি আছে আশ্বাস দিয়েছে কিন্তু এই পিক সিজনে দাম আর ঘরের নামের ভারসাম্য কতখানি রক্ষা হচ্ছে আমাদের সন্দেহ আছে। মহারাজা সুইট আসলে হয়তো দেখব গিয়ে সেনাপতিপুত্রের কামরা। টাকাও যাবে, আফসোসও রাখার জায়গা থাকবে না।

আর একটা অপশনও আছে। পুরীও পালাচ্ছে না, আমরাও পালাচ্ছি না, ভিড়টা একটু কমলে না হয় …

পালাচ্ছি না কেন রহস্য, কারণ পালানো আমাদের দরকার। ভীষণ ভীষণ ভীষণ দরকার। কাজেই এই শেষের অপশনটা বাতিল করলাম। চলেই যাই, ফিরে এসে ক’দিন বাইরে কম খাব না হয়। ভালোই করেছি গিয়ে। বি এন আর আমাদের খুবই ভালো লেগেছে। ওঁদের ঘরগুলোর সব রেলওয়ে ক্যারেজে আর স্টেশনের নামে নাম। আমাদের ঘরটা ছিল বারোঘ স্টেশনের নামে। সিমলা কালকা লাইনের সেই ভীষণ সুন্দর বারোঘ। যেখানে টয় ট্রেন থেকে নেমে আমরা ছবি তুলেছিলাম, ভেজ কাটলেট আর চিপস খেয়েছিলাম।

বি এন আর-এর মাইনাস পয়েন্ট একটাই, হোটেলটা সমুদ্রতটে নয়। দূরেও নয়, সমুদ্র আর হোটেলের মাঝখানে জাস্ট এক রো বাড়িঘর। পাঁচ মিনিট হাঁটলেই সে সব পেরিয়ে বিচে পৌঁছনো যায়। সে বিচ অপূর্ব শান্ত, ফাঁকা এবং স্বর্গদ্বারের তুলনায় স্বর্গের মতো পরিষ্কার। 

বারোঘের চমৎকার বিছানা দেখেই ভিট্রুভিয়ান ম্যান হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল, ইচ্ছে দমন করলাম। একটা গোটা সন্ধে মাটি করা যাবে না। চা আর ভেজ পকোড়া সাঁটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

আমার সমুদ্রের থেকে পাহাড় বেশি ভালো লাগে কিন্তু সমুদ্রের একটা অ্যাডভান্টেজ স্বীকার করতে হবে। পাহাড়ের রঙ্গরসটা একটু কম। (অবশ্য লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে ওটাও পাহাড়ের প্লাস পয়েন্ট) হঠাৎ বাঁক ঘুরলে আর পাহাড় চুড়োয় বরফটরফশুদ্ধু সারপ্রাইজ! বলে ঘাড়ে এসে পড়ল এরকম হয় না। সমতল দিয়ে যেতে যেতে প্রথমে ছোটখাটো টিলা দিয়ে শুরু হয়ে ক্রমশঃ উঁচু হতে হতে যতক্ষণে মনের মতো পাহাড়ের সামনে গিয়ে পৌঁছচ্ছি ততক্ষণে পাহাড় দেখার প্রস্তুতি সারা হয়ে গেছে।

সমুদ্রের আবার ও সব ছলাকলা প্রচুর। সমুদ্র আপনাকে দেখা দেওয়ার আগে নানারকম টিজার দেবে। সংকেতের সাহায্যে নিজের অস্তিত্বের জানান দেবে। যে রাস্তাটা অলমোস্ট সমকোণে এসে ডানদিকে মোড় নেয় স্বর্গদ্বারের দিকে, সেই রাস্তাটা দিয়ে রিকশা করে আসতে আসতে আপনি সমুদ্র দেখার আগে আকাশ দেখবেন। স্বাভাবিক আকাশের মতো নয়, মাটির কাছাকাছি ঝুঁকে এসেছে। দেখে আপনি বুঝবেন সমুদ্রের আর দেরি নেই।

এখন আকাশ দেখে সমুদ্র আঁচ করার উপায় নেই। অনেকখানি পুবদিকে এসে গেছি, সাড়ে পাঁচটাতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। এবারের টিজার, আকাশের বদলে গর্জন। আমরা হোটেলের সিকিউরিটি ভাইসাবের দেখানো রাস্তায় চলেছি। ঠিকই চলেছি, কারণ গর্জন ক্রমে বাড়ছে। অবশেষে সব আড়াল সরে গেল। পায়ের তলায় কংক্রিট ফুরিয়ে বালি, সামনে অন্ধকারের সীমাপরিসীমা নেই। সেই অসীম অন্ধকারে একটা দুটো সাদা রেখা উল্কার মতো ফুটে মিলিয়ে যাচ্ছে। 

কিছু কিছু সিচুয়েশনে পড়লে মনে একটা প্রশ্ন জাগে। ঠিক সময়ে প্রশ্নটা মাথায় এলে সিচুয়েশনগুলোতে পড়তেই হত না। যেমন প্লেন ধুপধাপ এয়ার পকেটে পড়ার সময়। চড়ার আগে কখনও মনে হয় না যে আমার আকাশে ওড়ার কথা নয়। অটো কিংবা উবারপুলে পৃথিবীর মাটিতে চলেফিরে বেড়ানোর কথা। তা সত্ত্বেও যেচে কেন উড়তে গেলাম?

অন্ধকার সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে আবার সেই প্রশ্নটাই মনে এল। যে অন্ধকারটার সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি, যেটা ক্ষণে ক্ষণে আমাকে দেখে দাঁত খিঁচোচ্ছে, গোটা পৃথিবীর ওটা তিনভাগ, আর বাকি একভাগের কত শতাংশ জমি তিন্নির দেওয়া বাহারি চটিশোভিত আমার পা দু’খানা অধিকার করে রেখেছে - দুটোর তুলনা আমার কল্পনায় কুলোচ্ছে না, কিন্তু বইয়ে পড়েছি কাজেই আন্দাজ করতে পারি। হঠাৎ ভর সন্ধেয় যেচে এর গায়ে এসে পড়ার তো কোনও কারণ ছিল না। দু’নম্বর মার্কেট থেকে ঝালমুড়ি আর মোমো প্যাক করিয়ে ঘরে ঢুকে পরিপাটি ছিটকিনি তুলে দিলেই হত, রোজ যেমন দিই।

অর্চিষ্মান আমার থেকে সাহসী, তাই ভয় স্বীকার করতে পারে। বলল, ভয় লাগছে না? ঘাড় নাড়ছি আর বাঁ চোখের কোণ দিয়ে দেখছি অনেক দূরে বালুতট ফুঁড়ে একটা ল্যাম্পপোস্ট উঠছে। উঠছে তো উঠছেই। বাকি সব ল্যাম্পপোস্টের মাথা ছাড়িয়ে প্রায় আকাশে ঠেকে গেছে যখন বুঝলাম ওটা কার্তিকপূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের আলোয় অন্ধকারটা সামান্য ফিকে হল আর দেখলাম ঢেউয়ের গায়ে আমার আর অর্চিষ্মানের ছায়া দুলছে। 

ভয় চলে গেল অনেকটা। হাত পা ঘাড়ের খিল খুলে গিয়ে আবার বেশ নাড়াতেচাড়াতে পারলাম, শ্বাস নিয়মিত হল, বুকের কাঁপুনিও কমল অনেকটা। এই যে বালির রেলিং আছে হাতখানেক উঁচু হয়ে, যার নিচে এসে বাঁদর ঢেউগুলো হাল ছেড়ে ফিরে যাচ্ছে, সেগুলোর এধারে থাকলেই অনেকটা সেফ, বল?

একটু হাঁটা যাক নাকি? যাক যাক। এদিককার বিচটা দিনে হয়তো রূপসী (সত্যিই) কিন্তু রাতের বেলা একটু বেশি ফাঁকা ফাঁকা। ইতিউতি ছায়ার পুঁটলির কোনটা যে বালির স্তূপ কোনটা যে প্রেমিকপ্রেমিকা জগন্নাথই জানেন। দু’কিলোমিটার দূরে স্বর্গদ্বারের আবছা আলো লক্ষ করে হাঁটতে শুরু করলাম। মাঝপথে ছোট নালা মতো পড়ল, সমুদ্রের ঢেউ এসে জমছে, বিকট গন্ধ, চটি হাতে নিয়ে সেই নালা পেরোলাম। 

একটু দূর যেতেই ঢেউয়ের মাথায় কী সব চিকচিক। অমনি কেতাবি বিদ্যে জাহির করলাম, নির্ঘাত ফসফরাস।

যথারীতি ভুল। তাছাড়া ফসফরাস হলে যেখানেসেখানে জ্বলত, এ চিকচিকানি একেবারে সরলরেখা ধরে চলেছে লম্বালম্বি। ওগুলো আসলে জালের দড়ির গিঁট। তিনজন লোক একটা জাল টেনে সমুদ্র থেকে তোলার চেষ্টা করছে। চেষ্টা না বলে যুদ্ধ বলাই উচিত। পারের কাছে ঢেউয়ের গতি দুদিকেই, আসার আর ফেরার। কায়দাটা হচ্ছে আসার সময় ঢেউয়ের আনুকূল্যে হই হই করে যতখানি সম্ভব জালটাকে তুলে আনা, তারপর যখন ঢেউ ফিরছে এবং সঙ্গে সঙ্গে জালও তখন হেঁইও বলে বালিতে গোড়ালি গেঁথে শরীর যতখানি সম্ভব পেছনে হেলিয়ে জাল টেনে রাখা। তাতেও জাল খানিকটা চলেই যাবে, কারণ ওদিকে তিনভাগ আর এদিকে একভাগের শতাংশের যে হিসেবটা একটু আগে দিলাম, সেটা। খালি এইটুকু চেষ্টা যতখানি উদ্ধার করে আনা হয়েছিল তার থেকে যেন কম খোয়া যায়। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সমুদ্র না সমুদ্রের সঙ্গে এই অসম সংগ্রাম কোনটা বেশি ফ্যাসিনেটিং ভাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু প্র্যাকটিস নেই তাই বেশি ভাবলে ব্রেন ব্যথা করে। ভাবা থামিয়ে যেদিকে যাচ্ছিলাম সেদিকেই রওনা দেওয়া গেল।

স্বর্গদ্বার। কিলবিল করছে ভিড়। ভালোই হয়েছে এখানে ঘর না পেয়ে। পেলে চব্বিশ ঘণ্টা এরই মধ্যে থাকতে হত। তার থেকে ঘণ্টাখানেক বসে ভিড়ের আনন্দ উপভোগ করে নিরিবিলি পাড়ায় গিয়ে ঘুমব। বিচ থেকে উঠে এসে, চটি ঝেড়েঝুড়ে যথাসম্ভব বালিমুক্ত করে রাস্তার ধারের রেলিং-এ গিয়ে সমুদ্রের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসলাম। 

মিথ্যে বলব না, প্রথমটা কেবলই কে বিস্কুট খেয়ে প্যাকেট অম্লানবদনে বিচে ফেলছে, পপকর্নের প্লাস্টিক ফুটপাথে কারণ ছ’ইঞ্চি অক্ষরে ইউজ মি লেখা বিন তাঁর বাঁ দিকে আর পপকর্নের প্যাকেট ডান হাতে, পুরী হোটেলের বারান্দায় কারা হাফপ্যান্ট পরে ঠ্যাং নাচাতে নাচাতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে, ওই লোকগুলো বসেছে বলেই আমি বসতে পারছি না - এই সবই মনে আসছিল। তারপর নিজেকে বললাম, সোনা, বি পজিটিভ। অমনি দেখলাম ঝলমলে জামা পরে বালকবালিকা হাতে বেলুন নিয়ে চলেছে। গম্ভীর মুখে সামনে দিয়ে যাচ্ছেন একজোড়া দম্পতি। একজন অন্যজনকে পরামর্শ দিচ্ছেন, ‘অমুকদাকে বলবে আমরা খেতে যাচ্ছি, তারপর ওদের ব্যাপার।’ দল বেঁধে পুরী যাওয়ার প্ল্যান করার সময় কমরেডারি উথলে উঠছিল, এখন ছায়া দেখলেও গা জ্বলছে। সবাই ঝালমুড়ির তিনকোণা ঠোঙা হাতে নিয়ে আসছে ওইদিক থেকে। একটু দূরে ডেকচি নিয়ে একজন বসেছেন, কেউ সামনে গিয়ে দাঁড়ালে ডেকচি থেকে ধোঁয়া ওঠা সেদ্ধ ভুট্টা চিমটে দিয়ে তুলে কাগজের প্লেটে রেখে মশলা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আমার বিন্দুমাত্র খিদে নেই, কিন্তু সবাই খাচ্ছে সেটাই কি খাওয়ার যথেষ্ট ভালো কারণ নয়? তারপর ভাবলাম নাঃ, লোভে পাপ, পাপে ইনো। তার থেকে লেবু চা খাওয়া যাক বরং। 

অর্চিষ্মান বলল, এসে ভালোই হয়েছে বল? 

ভালো মানে? না এলে জয়জগন্নাথ পাপ দিতেন। 

লেবু চা-টা দারুণ ভালো তাই না? আরেক কাপ খাবে? 

বাঁধনছাড়া বাঁচার সাহস যে আমাদের নেই প্রমাণ হয়ে গেছে অনেকদিন। কিন্তু পর পর দু’কাপ লেবু চা খাওয়ার আছে। দুজনে দুই দুই চার কাপ লেবু চা নিয়ে বসলাম, সামনে দিয়ে কলরব করে জনতা, অটো, ট্যাক্সি চলাচল করতে লাগল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে সিদ্ধান্ত নিলাম, এই মুহূর্তটাকে জীবনের মনে রাখা মুহূর্তের হল অফ ফেম-এ জায়গা দেওয়া যেতে পারে।

                                                                                                                  (চলবে)




November 28, 2018

ভুবনেশ্বর




দিল্লির বাইরে বেরোনর পর প্রথম যেটা চমকে দেয় সেটা হচ্ছে বাকি দেশটার লোকজন কী ভদ্র এবং বিনীত। ভদ্র মানুষজন ছাড়াও ভুবনেশ্বরের আরও অনেক গুণ আছে। ভুবনেশ্বর শুনেছি আধা-প্ল্যানড শহর। রাস্তাঘাট দেখলে সেটা বোঝা যায়। রীতিমত পরিষ্কার। তাছাড়া পুরুষ হকি বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে তাই মোড়ে মোড়ে ব্যানার সেঁটে শহরটা আরও সেজেগুজে রেডি। আর ভালো শহরের ওলাউবার পরিষেবা। যে সময়টুকু ভুবনেশ্বরে ছিলাম ওলাউবারের অটো ট্যাক্সিই ব্যবহার করেছি। হায়েস্ট অপেক্ষা করতে হয়েছে পাঁচ মিনিট। একজন খালি ওলা মানিতে যেতে অসম্মত হয়েছিলেন, তাঁকে ক্যাশে পেমেন্ট করেছি। ব্যস।

অফিস সেরে ভুবনেশ্বর পৌঁছতে হয়ে গিয়েছিল রাত দশটা পাঁচ। হোটেলে ব্যাগ রেখেই দৌড়েছিলাম ডিনার খেতে, সে গল্প পরে বলব। খেয়েদেয়েই ঘুম, কারণ সকাল থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ঘোরাঘুরি শুরু করতে হবে। পরদিন দুপুর পর্যন্ত ভুবনেশ্বরে থাকার মেয়াদ। তার মধ্যে যা দেখার দেখে ফেলতে হবে, যা খাওয়ার খেয়ে ফেলতে হবে। হোটেলে ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি ছিল, কিন্তু সে সব খেয়ে পেট ভরানো চলবে না। ইউটিউব দেখে, ব্লগ পড়ে কয়েকটা খাওয়ার জায়গা বাছা আছে, সব হয়ত যাওয়া অসম্ভব কিন্তু কয়েকটায় যেতেই হবে। বিশেষ করে রবি মৌসা-র দোকানে।


রবি মৌসার দোকান এখন আর মৌসার নয়। বিখ্যাত হওয়ার পর মৌসা নিজেকে ভাইয়া বলে চালিয়েছেন। দোকানে দেখলাম ওঁকে, সত্যিই মৌসা বলাটা বাড়াবাড়ি। ইন্টারনেটের ম্যাপে, উবার কিংবা গুগল ম্যাপে সার্চ দিলে রবি ভাইয়া'স কিচেন বলে যেটা আসে ওটাই মৌসার দোকান। অটোপ্সি রোডের ওপর ঝুপড়ি। গ্রাঞ্জ কুইজিনের ঠাকুরদাদা। অটো নিয়ে পৌঁছলাম সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ। ফুটন্ত তেলের কটাহে গবগব করে জিনিসপত্র ভাজা হচ্ছে। এই দোকানের লিজেন্ড হচ্ছে রবি মৌসা, থুড়ি, ভাইয়া গরম তেলে হাত ডুবিয়ে চপ বা বড়া ছাড়তে পারেন। ভিডিও দেখেছি, দাবি ফাঁপা নয়। কিন্তু স্যাডলি সে অভিনব কেরামতি আমরা চাক্ষুষ করতে পারিনি। কারণ ভাইয়া সম্ভবত: অসুস্থ। তিনি দোকানের ভেতর দুই পায়ে চন্দনের মতো কী সব লেপে, নয়তো পতলা মোজার মতো পরে সামনের চেয়ারে ছড়িয়ে বসে ছিলেন।


আমরা সবকিছুই স্যাম্পল নিলাম। ইডলি,ভাজা  ইডলি, ঘুগনি আর ওই গোলটা হচ্ছে আলুর বড়া বা চপ।  

চপের প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ল। আমার গল্প নয়, অর্চিষ্মানের গল্প। হোস্টেলের ওডিশাবাসী বন্ধু মহা উত্তেজিত হয়ে আড্ডায় এসে বলল, কাছেই একটা দোকান খুলেছে, ওডিশার স্পেশাল খাবার পাওয়া যায়। চল খেয়ে আসি। চল, চল বলে সবাই মিলে হই হই করে যাওয়া হল। অর্চিষ্মান এই জায়গাটায় পৌঁছে অর্থপূর্ণ পজ দেয়।  বলে, বলতো কীসের দোকান?

কীসের?

চপের।

ওড়িয়ারা কিছু তেলেভাজা খেতে পারে। আমি সি আর পার্কের বাঙালিদের রাত আটটার সময় চপ খেতে দেখে শিহরিত হই, ওড়িয়ারা ব্রেকফাস্টে আলুর চপ খায়। অবশ্য এই ক্লাসের আলুর চপ হলে খাওয়াই যায়। ওই রকম পাতলা মোড়ক আমি কোনও চপের খাইনি।

অর্চিষ্মান বলল ওর সব থেকে ভালো লেগেছে ভাজা ইডলি, আমি ভোট দিলাম আলুর চপকে। সবই সাময়িক, কারণ আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে এমন একটা জিনিস আমরা খাব যা আমাদের সব ভোটাভুটি বানচাল করে দেবে।দোকানের একদিকে বড় বড় এলুমিনিয়ামের ডেকচিতে রসের পুকুরে রসগোল্লা চমচম ভাসছিল। ও সবে উৎসাহ ছিল না। ফিরে আসতে গিয়েও ভাবলাম একবার জিজ্ঞাসা করেই দেখা যাক।

ছেনা পোড়া হ্যায়, ভাইসাব?


আস্ক অ্যান্ড ইউ শ্যাল রিসিভ।

চলে এল আমার আর অর্চিষ্মানের অভিজ্ঞতায় শ্রেষ্ঠ ছানা পোড়া। এমন মসৃণ, এমন নরম, এমন সুস্বাদু, সর্বাঙ্গসুন্দর ছানা পোড়া আমরা কখনও খাইনি।
*****

ভুবনেশ্বরে আরও অনেককিছু আছে নিশ্চয় দেখার, মিউজিয়াম,পার্ক, কিন্তু ভুবনেশ্বর সবথেকে বিখ্যাত যে সব দ্রষ্টব্যের জন্য, মন্দির, আমরা সেগুলোই ঘুরে দেখব ঠিক করলাম। প্রথম গন্তব্য সব মন্দিরের মধ্যে বিখ্যাততম লিঙ্গরাজ। মন্দিরের দিকে এগোতে এগোতেই টের পেলাম কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। ভিড় বাড়ছে। দুপাশে পুজোর জিনিসপত্র নিয়ে হাঁক পাড়ছেন বিক্রেতারা। বোঝা যাচ্ছে বেশিরভাগই অস্থায়ী। মন্দিরের সামনে পৌঁছে আমরা হতভম্ব। পাণ্ডা গিজগিজ করছে, গেটের সামনে লাইন একেবেঁকে কোথায় অদৃশ্য হয়েছে কে জানে। ওই লাইনে দাঁড়িয়ে মন্দিরে ঢোকার প্রশ্নই নেই। তাছাড়া আমাদের উদ্দেশ্য মন্দিরের শোভা অবলোকন, এই পরিস্থিতিতে সেটা জাস্ট অসম্ভব। ছাড়ান দিলাম। আফসোস হল, শুনেছি অনেক বড় জায়গা নিয়ে খেলানো মন্দির, চমৎকার দেখতে।

পরে অটো ভাইসাবের কাছে জেনেছিলাম, গোটা কার্তিক মাসই ওডিশাতে পুজোপার্বণের মাস, পারা চড়তে চড়তে পূর্ণিমায় তুঙ্গে ওঠে। আর হবি তো হ' সেদিনই পূর্ণিমা। এই দিনেই নাকি পুজো করে নদীতে বাণিজ্যতরীর যাত্রা শুরু হত। পারাদ্বীপ এবং গোপালপুর বন্দরে নাকি এই কার্তিকপূর্ণিমার গুরুত্ব সাংঘাতিক। রাস্তার দুপাশে কলার খোলায় প্রদীপ নিয়ে প্রচুর বিক্রেতা বসেছিলেন, মনে পড়ল।


লিঙ্গরাজের পাশেই একটা বন্ধ মন্দির। অনেক ছোট, পুজো হয় না বলে ভিড় নেই। ওখানে ঢুকে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটান গেল। লিঙ্গরাজ দেখা হল না, আফসোস রয়ে গেল। পরের বার মনে করে কার্তিক পূর্ণিমা বাদ দিয়ে আসতে হবে।


রাজারানি মন্দিরে এমনিতেও যেতাম, তাছাড়া ও মন্দিরে পুজো হয় না, বাড়তি সুবিধে। রাজারানি শব্দটা এসেছে রাজারানিয়া থেকে, যে নামের পাথর দিয়ে মন্দির তৈরি হয়েছিল। মন্দিরচত্বর চমৎকার মেন্টেন করা। ঘাস, ফোয়ারা। চাতালে যেদিকে ছায়া পড়েছে সেখানে রোমান্টিক ফোটোশুট চলছিল। আমরা মন্দিরের চারদিক ঘুরে এসে ভদ্রস্থ দূরত্বের গাছের ছায়ার একখানা বেঞ্চে বসে সেই দেখলাম খানিকক্ষণ। বাগানে স্প্রিংকলারের চারদিকে রাজহাঁস-হাঁসিদের উত্তেজনাও দেখার মতো। তারপর একজন এসে ওই স্প্রিংকলারটা বন্ধ করে দেওয়াতে তারা মারাত্মক গজগজ করতে করতে হেলেদুলে পাশের স্প্রিংকলারের দিকে গেল। নিরাপদ দূরত্বে ছিলাম, দৌড়ে এসে ঠুকরে দিতে পারবে না আশ্বাস ছিল, কাজেই প্রাণ খুলে হাসলাম।


কোন যক্ষীর মাথা কেটে নিয়ে গিয়েছিল চট্টরাজের লোক জানি না, আমি তাই এমনিই দুই মাথাওয়ালা যক্ষীর ছবি তুলে এনেছি।


লাস্ট স্টপ, মুক্তেশ্বর। মুক্তেশ্বরেও কার্তিকপূর্ণিমার ভিড় আছে তবে লিঙ্গেশ্বরের তুলনায় কিছুই না।


মুক্তেশ্বর আর পরশুরামেশ্বর একেবারে গায়ে গায়ে।  পরশুরামেশ্বরের মন্দির আরও ফাঁকা তাই আরও সুন্দর। রাস্তার লাগোয়া মন্দির। দেখা শেষ করে উবার ডেকে মন্দিরের পাঁচিলে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছি, আমি রাস্তার দিকে পিঠ করে, অর্চিষ্মান সাইড করে। হঠাৎ রাস্তার দিকে মুখ ঘুরিয়েই অর্চিষ্মান কেমন থতমত খেয়ে গেল তারপর হাসল। বললাম কী হল কী হল,  অর্চিষ্মান বলল, একটা বাচ্চা মেয়ে যাচ্ছিল রাস্তা দিয়ে, একটু হলেই তোমার মাথায় চাঁটি মারার উদ্যোগ নিয়েছিল, আমার চোখে চোখ পড়ে যাওয়ায় হাত নামিয়ে নিল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। ফুট দুয়েক দৈর্ঘ্য, বছর সাতেক বয়স, লাল রঙের ঘাগরা এবং ব্লাউজ, গলায় লাল পুঁতির মালা, ন্যাড়া না হয়ে যতখানি ছোট করে চুল কাটা যায় সে রকম হেয়ারস্টাইলে লাল হেয়ারব্যান্ড। এক হাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত গার্জেনের হাতে। আমরা ওর দিকে দেখছি দেখে মিচকি মিচকি হেসে মাথা নিচু করে লাল জুতো দিয়ে ধুলো ছিটকোচ্ছে।



কোনও জায়গায় যাওয়ার আগে হোমওয়ার্ক যে কী জরুরি জিনিস খণ্ডগিরি উদয়গিরি দেখতে গিয়ে আবারও রিয়েলাইজ করলাম। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের গুহা সব, জৈন সাধুদের খোদাই করা, তার গায়ে ব্রাহ্মীতে লেখা শ্লোক, সিংহ, হাতি, ফুল ফল পাতা, মারাত্মক ঐতিহাসিক তাৎপর্যময় ব্যাপার, অথচ আমরা এমনি পার্কে বেড়ানোর মতো করে ঘুরে এলাম।



লাঞ্চ? দুজনেই মাথা নাড়লাম। আলুর চপ এখনও খেল দেখাচ্ছে। খণ্ডগিরি উদয়গিরির এন্ট্রিগেটের সামনে সারি দিয়ে ফুচকা বসেছে, সেই খাওয়া যাক বরং এক প্লেট করে। তারপর একখানা ডাব, হাফ হাফ।

ভুবনেশ্বরেরর পালা শেষ। এবার সেই জায়গাটাতে যাব, যেখানে যাওয়ার আমাদের আসল আকুতি। কীভাবে যাব এখনও শিওর নই। ওলাউবার তেরোশ-র আশেপাশে হিসেব দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের সন্দেহ যে এর থেকে ঢের সস্তায় ব্যাপারটা সারা সম্ভব। চেক আউটের সময় ভদ্রলোক কনফার্ম করলেন। অটো নিয়ে চলে যান মাস্টার ক্যান্টিনের বাসস্ট্যান্ডে, সরকারি লাল বাস চলছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়, চকাচক এসি, পৌঁছে দেবে দেড় ঘণ্টার ভেতর। ভাড়া? মোটে একশো টংকা। খুশি হয়ে বাসে চড়লাম। শহর পড়ে রইল পেছনে। দু'দিকে খালি মাঠে উঁচু উঁচু কাশেরা দুলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর সূর্য লাল হয়ে উঠল তাদের মাথায়।  

November 26, 2018

শুরুর আগেঃ গ্রহতারার অসহযোগ



এ জিনিস আগেও ঘটেছে। সংসারের অর্ধেক ভুবনেশ্বর পৌঁছে গেছে, আনলাকি অর্ধেক পড়ে আছে দিল্লিতে। পড়ে পড়ে শিলবাটা হচ্ছে। প্রথমবার সম্ভাবনাটা ঘাড়ে এসে পড়েছিল আচমকা, প্রস্তুতি ছিল না। একেবারে কি আর ছিল না? মন তৈরি ছিল, যেমন সর্বদাই থাকে। স্টার্টিং লাইনে দমবন্ধ, পেশি টানটান, এক পা এগোনো, দুই হাত মুঠো, চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি প্রত্যয়ী। বাঁশি বাজলেই 'ছুটি ছুটি' বলে ছিটকে যাবে। স্যাডলি, মনের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। অনেক রকম শিকল সেধে পেঁচিয়েছি জীবনে। সকালবিকেল ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখছি, আহা কী রূপই না খুলেছে। 

আগেরবার সে সব শিকলে ঝাঁকুনি না দিয়ে যতখানি চেষ্টা করা সম্ভব করেছিলাম। যা হওয়ার তাই হল। দিল্লি আরও জোরে গলা টিপে ধরল, ভুবনেশ্বর হাত বাড়াল না। অর্চিষ্মান, 'নেক্সট টাইম, প্রমিস,' বলে টা টা করে চলে গেল। 

ওর প্রমিস রাখতেই হয়তো নেক্সট টাইম এল। এল তো এল একেবারে নানকজয়ন্তীর লং উইকএন্ডের গায়ে গায়ে। 

বাক্যব্যয় না করে দিল্লি ভুবনেশ্বর রিটার্ন টিকিট কেটে ফেললাম। ইউনিভার্সকে সিগন্যাল দিলাম, আমার কাজ আমি করেছি, বাকি গ্রহতারাদের একলাইনে আনাটুকুর দায়িত্ব অন্ততঃ নাও। 

গ্রহতারা অতি ত্যাঁদড় জিনিস। বলে, এখন কেন? প্রগতিশীল নাম কেনার তাড়নায় আমাদের হেলাছেদ্দা করার সময় মনে ছিল না? কী সব পুরুষকারটার আছে তোমাদের, তাদের ধর গে যাও। আমরা বিজি। 

থাকার জায়গা খালি নেই। একা আমার তো নয়, সকলেরই লং উইকএন্ড। অথচ জায়গা একটা ঠিক করা চাই। ধাবা থেকে আসছি বলে দু'দিনের রোড ট্রিপ সেরে আসার দিন গেছে। গিজারওয়ালা পরিষ্কার বাথরুমের গ্যারান্টি ছাড়া আজকাল বেড়াতে যেতে পারি না। ও টি ডি সি-র পান্থনিবাসের অনলাইন বুকিং-পাতা খুলে ক্রমাগত রিফ্রেশ করতে লাগলাম। যেখানে যেখানে যাওয়ার ইচ্ছে সে সব জায়গায় সব ঘর ভর্তি। শেষে ঠিক করলাম গন্তব্য যেহেতু ম্যাটার করে না, জার্নিটাই যেহেতু আসল তাই যেখানের পান্থনিবাস খালি থাকবে সেখানেই যাব। তাতেও হল না। সরকারির আশা ত্যাগ দিয়ে প্রাইভেটের দ্বারস্থ হতে হল। ট্রিপঅ্যাডভাইসরে রিভিউ পড়া বন্ধ করলাম। কোন হোটেল রুম সার্ভিসে এক কাপ চা পাঠাতে চল্লিশ মিনিট লাগিয়েছে হু কেয়ারস, কত চল্লিশ মিনিট ক্যান্ডি ক্রাশের গর্ভে যাচ্ছে রোজ। লিস্ট ধরে ধরে ফোন করতে করতে ওডিশার সব ট্যুরিস্ট স্পটের এস টি ডি কোড মুখস্থ হয়ে গেল। কোথাও জায়গা নেই। সব ফুল। দয়ালু হোটেল কর্তৃপক্ষরা আমার গলা শুনে বললেন, 'কবে আসছেন? আসার আগের রাতে ফোন করবেন, কেউ ক্যানসেল করলে…' 

কেউ ক্যানসেল করবে না। উনিও জানেন। আমিও জানি। সোনালি বালুতট, মন্দির, জঙ্গল, ছেনা ঝিল্লির স্বর্গে, যে যার নিজস্ব নরক থেকে পালিয়ে তিনদিন, কোন পাগলে ক্যান্সেল করবে? 

ক্ষীণ হতে হতে মগজের সেরোটোনিনের স্রোত অবশেষে শুকিয়ে গেল। হল না এবারও। হবে না। হওয়ার নয়। দিল্লিতেই থাকব। এমন তো নয়, কাজের পাহাড় জমে নেই। লং উইকএন্ডে বসে বসে সে সব কাজ শেষ করব না হয়। বা অন্যান্য লং উইকএন্ডের মতো ভাবব করব, ভাবতে ভাবতে উইকএন্ড ফুরিয়ে যাবে, কাজ পড়ে থাকবে যে কে সেই, সোমবার অফিস যাওয়ার সময় শুক্রবারের থেকেও বেশি ক্লান্ত লাগবে। এ সত্যির থেকে পালানোর জন্য যত ছটফট করব, দড়ি তত গলায় ফাঁস হয়ে বসবে। ভবিতব্য মেনে নেওয়াই ভালো। 

'টিকিট ক্যান্সেল করে দাও, বুঝলে?' বলব সুইচ টিপে ফোন আলো করেছি অমনি ফোন বেজে উঠল। টেলিপ্যাথির ঠাকুরদাদা। 

হ্যালো হ্যালো... 

অর্চিষ্মানের নতুন অফিসে নেটওয়ার্ক কানেকশন ভয়ানক খারাপ। 'শুনতে পাচ্ছ?' 'শুনতে পাচ্ছি' বাদ দিলে গোটা কনভারসেশন ঘিজঘিজ। দুয়েকটা শব্দ তারই মধ্যে বোধগম্য হল। 

কুন্তলা... বাবা বলল… আরেকটা অপশন......ফোন করেছি..... বলেছেন হয়ে… 

ক্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁচ। ওলাক্যাব বিপজ্জনক বাঁক নিয়েছে ডানদিকে, বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে আসা একটা এস ইউ ভি-কে জায়গা দিতে গিয়ে। হৃদপিণ্ডের গতি স্বাভাবিক হতে লাগল সাত সেকেন্ড। তালেগোলে ফোন গেছে কেটে।একটা ভয়ানক সন্দেহ ফেনিয়ে উঠছে বুকের ভেতর। কিন্তু এখনই উৎসাহ দেখানো চলবে না। গ্রহতারাগুলো পাজির পাঝাড়া, টেরিয়ে টেরিয়ে নজর রেখেছে এদিকে। আমাকে চাঙ্গা হতে দেখলেই ভেজা কম্বল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এখন ঘণ্টাখানেক 'আমার কিছু যায় আসে না' ভঙ্গি করে থাকি, অর্চিষ্মান বাড়ি ফিরলে সন্দেহ ঘোচাব না হয়। 

(চলবে)

November 21, 2018

শীতের স্নান



মেয়েকে বাংলা মিডিয়ামে পড়ানোর জেদ করেছিলেন মা, তার মাশুল গুনতে হয়েছিল আমাকে। রোজ রাতে সাড়ে ন'টার ইংরিজি নিউজ শুনতে হত। কে কী বলছে কিচ্ছু মাথায় ঢুকত না, গোটা সময়টা ঢুলতাম খালি ওয়েদারের খবরের আগামাথা উদ্ধার হত। ভারতবর্ষের ম্যাপের নানা জায়গায় মেঘ বৃষ্টি সূর্যের ছবি দেখে দিব্যি বোঝা যেত ব্যাকগ্রাউন্ডে ঘোষক কী বলছেন। ওয়ান টু জানতাম কাজেই  চারটি মেট্রোপলিসের তাপমাত্রাও বোঝা যেত। কলকাতারটা থেকে চার ডিগ্রি মাইনাস করে আমরা রিষড়ার তাপমাত্রা ধরে নিতাম। কিন্তু আমাদের রিয়েল উত্তেজনা ছিল দিল্লির টেম্পারেচার নিয়ে। দিল্লিতে তখন আমার বড়মামা মামী মামাতো দিদিরা থাকতেন। নভেম্বর মাস থেকে শুরু করে দিল্লির তাপমাত্রা ক্রমে পনেরো, বারো, দশ, আট হত এবং আমাদের বিস্ময় বাড়ত। এবং একদিন সেই অমোঘ দিনটি আসত যখন দিল্লির টেম্পারেচার সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁত।  

সাত! 

অথচ ওর থেকেও ঠাণ্ডা জায়গা যে পৃথিবীতে আছে জানতাম। ট্রেন থেকে বিশ্বের একশোটি আশ্চর্য তথ্য না ওই রকম নামওয়ালা চটি বই নিয়ে এসেছিলেন মা, তাতে লেখা ছিল সাইবেরিয়ার কোন গ্রামে গরমকালে তাপমাত্রা মাইনাস চল্লিশ না ওইরকম থাকে। থাকে তো থাকে। আম্বানিরা মাসে কত রোজগার করে জেনে কি আমি ইমপ্রেসড হই? আমি মুগ্ধ হই গত মাসে জয়েন করা সহকর্মীর মাইনে নেগোশিয়েশনের দক্ষতার কানাঘুষো শুনে। 

দিল্লির আবহাওয়ায় সর্দির দাপট গেছে, সিংহাসনে এখন দূষণ। একজন ভালোবাসার লোক সেদিন ফোন করে বললেন, সোনা, শুনছি নাকি দিল্লিতে দরজাজানালা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকলে কুড়িটা সিগারেট খাওয়ার সমান আর রাস্তায় বেরোলে চল্লিশটা সিগারেট খাওয়ার সমান পলিউশন? বললাম, হ্যাঁ দূষণ তো মারাত্মক। কিন্তু কুড়িখানা সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারটা মাথায় ঘুরতে লাগল। অর্চিষ্মান যে তিনমাস ধরে 'পিউরিফায়ার কিনি চল পিউরিফায়ার কিনি চল' করছে, সেটা এবার উদ্যোগ নিয়ে করে ফেলতে হবে। 

দিল্লির ঠাণ্ডা নিয়ে আমাদের উত্তেজনা স্তিমিত হলেও মায়ের হয়নি। মা রোজ বারান্দায় বসে বসে আমার ঠাণ্ডা লাগা প্রতিরোধের উপায় ভাঁজেন তারপর ফোন করে সেগুলো পয়েন্ট করে করে বলেন। মায়ের লিস্টের সবথেকে ওপরের থাকে টুপি পরার পয়েন্ট। সোনা, মাথাটাই আসল। যতই লজ্জা করুক না কেন অফিসে মাথা মুড়ি দিয়ে বসে থাকবে। উপদেশে এইরকম রাবড়ির মতো পরত একমাত্র মায়ের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। মাথা ঢাকতে বলাও হল, আবার ভ্যানিটি নিয়ে ভর্ৎসনাও হল। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ল মানবদেহের কোনখান দিয়ে ঠাণ্ডা লাগে সেটা নিয়ে নানা লোকের নানা মত। কেউ বলেন ঠাণ্ডা লাগে বুক দিয়ে, কেউ বলেন কান এবং মাথা দিয়ে, কেউ বলেন গলাটাই আসল, ওটাকে যে কোনও মূল্যে রক্ষা করতে হবে। আমার চেনা একজন 'গলা বাঁচাও কমিটি'র প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং কালীপুজো পেরোলেই গলায় ভুষি রঙের মাফলার পেঁচিয়ে ঘুরতেন। জানুয়ারি মাস এসে গেলে মাফলার ছাড়া তাঁকে দেখা যেত না। রাতে এপাশওপাশ করার পর সেই মাফলার গলায় জড়িয়ে একবার শ্বাসরোধের উপক্রম হয়েছিল, তবু শিক্ষা হয়নি। 

গলা দিয়ে কী করে ঠাণ্ডা লাগবে সেটা অবশ্য আমি শিওর নই। গলা দিয়ে ঠাণ্ডা লাগলে হাতের পাতা, পায়ের পাতা, হাঁটু ছেঁড়া জিনস পরলে হাঁটু দিয়েও সমপরিমাণ ঠাণ্ডা শরীরে ঢোকার কথা। কানের ফুটো দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঠাণ্ডা লাগার থিওরিটা বরং আমার অনেক যুক্তিযুক্ত মনে হয়। আর মাথা ঢাকলে কানের ফুটোটাও ঢাকা হবে। তা বলে আমি মাথা মুড়ি দিয়ে ঘুরি না মোটেই অফিসে। বহিরঙ্গ নিয়ে অতখানি নির্মোহ এখনও হতে পারিনি। 

সত্যি বলতে অফিসে অত ঠাণ্ডা লাগেও না। বছরের বাকি দশ মাস বরং অফিসে বসে আমি রীতিমত হাঁসফাঁস করি। কারণ আমার অফিসের বাকি সবাই সর্বক্ষণ নালিশ করে এসি নাকি মারাত্মক বাড়িয়ে রাখা হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার। আমি অনেক গুরুতর ব্যাপারেও মুখ বন্ধ রাখার পক্ষপাতী, এসির খোলাবন্ধ নিয়ে মতপ্রকাশের প্রশ্নই নেই। খালি একদিন রেগে গিয়েছিলাম। জুলাই মাস ছিল, বসের মাথা এবং ফলতঃ আমার মাথাও গরম ছিল। এসি চড়া থাকলে সুবিধেই হত। কিন্তু শীতকাতুরেরা ভীষণ চেঁচামেচি করে এসি কমিয়ে রাখলেন। আমি রাগ চেপে বাড়িতে চলে এসে অর্চিষ্মানকে সবে বলতে গেছি, 'কারা এরা? কাদের এত ঠাণ্ডা লাগে সর্বক্ষণ?' তার আগেই শুনি অর্চিষ্মান বলছে, 'আর বোলো না, অফিসে সবাই ঠাণ্ডায় কাঁপছে আর দু’জন চেঁচাচ্ছে, মরে গেলাম, এসি বাড়াও। কারা এরা?' 

আমার শীতকাল গরমের থেকে সর্বদাই বেশি পছন্দের কারণ ঠাণ্ডা লাগলে একটার ওপর আরেকটা জামা গায়ে চাপানো যায়, কিন্তু যতই গরম লাগুক একটা লিমিটের পর আর জামা খোলা যায় না। এইটাই হচ্ছে গরমের তুলনায় শীতের শ্রেষ্ঠত্বের সহজ যুক্তি। কিন্তু নম্বরের মুখ চেয়ে স্কুলের রচনায় আরও আবোলতাবোল লিখতে হত। শীত ভালো লাগে কারণ ফুলকপি পাওয়া যায়, জলবাহিত রোগ কম হয়, মেলা বসে, ডোভার লেনে ভীমসেন জোশী গান ধরেন হাবিজাবি। নম্বর বেশি পাওয়ার জন্য এর ওপর আবার কাব্য করার চেষ্টা হত। কবিত্বশক্তি কোনওকালেই ছিল না, কাজেই সেগুলোও 'কুয়াশার মধ্যে দূর থেকে ট্রেনের হর্ন' মার্কা স্টকের কাব্যই হত। 

শীতের একটাই অসুবিধে মাঝে মাঝে টের পাই, স্নান করার অসুবিধে। অ্যাকচুয়ালি স্নান করার থেকেও, স্নান যে করতে হবে সেই জানাটা বেশি অসুবিধেজনক। অর্চিষ্মানের সঙ্গে থাকতে শুরু করার পর এই বিষয়ে খানিকটা সুবিধে হয়েছে। 'তুমি আগে স্নানে যাও, তোমার হয়ে গেলে আমি ঢুকব,' এ উচ্চারণের থেকে আরামের কিছু নেই। এ দৈনিক দড়ি টানাটানিতে জয়ের আনন্দ যিনি জিতেছেন তিনিই জানেন। আমার আনন্দ আরও বেশি কারণ বাড়ি ছাড়ার আগে পর্যন্ত এ আনন্দ থেকে আমি বঞ্চিত ছিলাম। চন্দ্রবিন্দুর গানে  'তাড়াতাড়ি চানে যাও/ শুনে দেখো মা'র কথা' লাইনদুটো শোনার আগে পর্যন্ত আমার জানাই ছিল না, মায়ের কথা না শুনে দেখাটাও একটা অপশন। এখনও মাঝে মাঝেই হার মেনে আমাকেই আগে স্নানে যেতে হয়। তখন আমি প্রতিশোধ হিসেবে স্নান করে বেরিয়েই অর্চিষ্মানকে বলি, 'আহ, কী আরাম, স্নান করে নাও, দেখবে আর ঠাণ্ডা লাগবে না।' 

এখন তো তাও অনেক সুবিধে। গিজার চালাও, কল খোলো, গরম জল পাও। আমার বাড়ির কেউ কেউ রান্নায় গুঁড়োমশলা ব্যবহার করা এবং কৃত্রিম উপায়ে গরম হওয়া জলে স্নান করার বিরোধী ছিলেন। জলের বালতি রোদে রেখে গরম করে সেই জলে স্নান করাটাই সবথেকে স্বাস্থ্যকর, দাবি করতেন তাঁরা। রোদে গরম করা জল অনেকটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মতো। আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে রোদে রেখে জল যথেষ্ট গরম হয়েছে, তাহলে সম্ভবতঃ আপনার অসুবিধে হবে না। কিন্তু যদি আপনার মনে বিন্দুমাত্র সংশয় থেকে থাকে যে শীতের মরা রোদে জল কিছুতেই পর্যাপ্ত গরম হতে পারে না, তাহলে গায়ে ওই জল ছোঁয়ানোমাত্র শক গ্যারান্টিড। দ্বিতীয় যে উপায়টা আমাদের বাড়িতে জল গরম করার জন্য ব্যবহৃত হত সেটা হচ্ছে গ্যাসে বা স্টোভে হাঁড়ি বসিয়ে গরম করা। গ্যাসের উনুন আটকা থাকলে কেরোসিন স্টোভে গোঁগোঁ আওয়াজ তুলে জল গরম হত। তারপর সেই হাঁড়ির গলা কাপড় জড়িয়ে ধরে দৌড়ে দৌড়ে সেটা নিয়ে যাওয়া হত বাথরুম পর্যন্ত। দৌড়ে, কারণ সকাল সাড়ে আটটার সময় হেঁটে নষ্ট করার মতো টাইম মায়ের থাকত না। ওই ফুটন্ত জলের হাঁড়ি নিয়ে দৌড়তে গিয়ে মা যে কোনওদিন মুখ থুবড়ে পড়েননি, শুধু এইরকম কতগুলো উদাহরণের জন্য এখনও অ্যাগনস্টিক শব্দটার খুঁটি ছেড়ে দিতে পারছি না। 

তারপর আমাদের বাড়িতে একটা অত্যাশ্চর্য জিনিসের আবির্ভাব ঘটল, সেটা হচ্ছে ইমারশন হিটার। যেন আগুন আবিষ্কার হল। বিজ্ঞানের অগ্রগতি দেখে সবাই মুগ্ধ। সবার জন্য পার্সোন্যাল ইমারশন হিটার কেনা হল। বিভিন্ন সাইজের বালতির জন্য বিভিন্ন সাইজের হিটার। বিঘৎপ্রমাণ মিনি ইমারশন হিটারও যে পাওয়া যায় জেনে সবাই চমৎকৃত হলেন। বলাবলি হল, আর দেরি নেই, এইবার রান্নাঘরে রেভলিউশন আসছে। গ্যসের খরচ মারাত্মক কমে যাবে। চা ইত্যাদি করার জন্য তো আর রান্নাঘরমুখো হওয়ারই দরকার নেই, যে যার কাপে ইমারসন হিটার ডুবিয়ে জল গরম করে নিলেই হবে। কিনে ফেলা হল গোটাচারেক। 

একটাই অসুবিধে, সুইচ না নিভিয়ে, জল যথেষ্ট গরম হল কি না দেখতে জলে হাত ডোবানো যাবে না। ডোবালে কারেন্ট মারতে পারে। বিজ্ঞান যদিও আশ্বাস দিচ্ছে সে রকম কিছু ঘটার চান্স নেই, কিন্তু বিজ্ঞানে ভরসা করে পাগলে। আজ বলছে পৃথিবী চ্যাপ্টা। কাল বলবে গোল। যে কোনও দিন এসে বলবে ও সব ঐতিহাসিক ভুল ছিল, আসলে পৃথিবী রম্বস। 

রান্নাঘরে রেভলিউশনও এল না। কারণ সবাই টের পেল চা তেষ্টা পেলে যে যার নিজের বুদবুদ থেকে বেরিয়ে ইমারশন হিটার প্লাগ ইন করে জল গরম বসানোর থেকে সোজা হচ্ছে মায়ের উদ্দেশ্যে 'একটু চা হবে নাকি' চেঁচানো। সবথেকে বড় সুবিধে, মা কারেন্ট মারবেন না। 

***** 

ইউনিভার্সিটির এক দাদা বারোমাস ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেন। বলতেন, শুরুতে একটু কষ্ট হয়, কিন্তু একবার ঠাণ্ডা জলে স্নানের অভ্যেস করে নিতে পারলে জরাব্যাধি থেকে মুক্তি, শোকতাপ থেকে মুক্তি, এমনকি ঘটনাটা শুদ্ধমনে ঘটাতে পারলে মাধ্যাকর্ষণ থেকেও নাকি মুক্তি সম্ভব। তিরিশ বছর রোজ দু'বেলা ঠাণ্ডা জলে স্নান করার পর কে যেন বাবু হয়ে বসা অবস্থায় খাট থেকে ছ’ইঞ্চি ভেসে থাকতে সক্ষম হয়েছে। 

অনেক ভেবে দেখেছি। বাবু হয়ে বাতাসে ভেসে থাকতে পারা আমার বাকেট লিস্টে সত্যিই নেই। তাছাড়া অর্চিষ্মানের কথাও ভাবা উচিত। যতই আগে স্নানে যাওয়ার যুদ্ধে আমাকে গোহারা হারাক, হঠাৎ ল্যাপটপ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে যদি দেখে আমি বাতাসে ভাসন্ত অবস্থায় ওর দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাচ্ছি, ভালো হবে না। কাজেই আমি এক্ষুনি গিজারটা ফেলে দিচ্ছি না। আপাতত গরম জলে স্নানই চলুক। ইন ফ্যাক্ট, এই পোস্টটা শেষ করতে এত দেরি হয়ে যাচ্ছে যে আজ মনে হয় না অফিস যাওয়ার আগে আদৌ স্নান করা সম্ভব হবে।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.