October 25, 2014

সাপ্তাহিকী



শিল্পীঃ Vitaly Samartsev


You don't have to burn books to destroy a culture. Just get people to stop reading them.
                                                                             ---Ray Bradbury

শুনেছি বিবেকানন্দ নাকি একবার তাকিয়েই একটা গোটা পাতা পড়ে ফেলতে পারতেন। শুধু পড়তেন না, সে পড়া মনেও রাখতে পারতেন। আপনার পড়ার স্পিড এবং হৃদয়ঙ্গমের ক্ষমতা জানতে চাইলে এইখানে ক্লিক করুন।

অ্যাকিনেটর, ওয়েব-সর্বজ্ঞ। আপনি মনে মনে যাঁর নামই ভাবুন না কেন, অ্যাকিনেটর ধরে ফেলবে। অন্তত আমারগুলো ধরে ফেলেছে। অর্চিষ্মানের ভাবা একটা নাম অবশ্য পারেনি।

আপনি মহানন্দে চিকেন জংলি স্যান্ডউইচ খাচ্ছেন, ঘুমোচ্ছেন, এদিকে আপনার প্লেনের গায়ে হয়তো একের পর এক বাজ পড়ছে, আপনি জানতেও পারছেন না। অবশ্য আপনি কি সত্যি জানতে চান?

এয়ারপ্লেন নিয়ে কথাই হচ্ছে যখন এই লিংকটাও পড়ে দেখুন।


আপনি কতক্ষণ শ্বাস না নিয়ে থাকতে পারেন? এই ভদ্রলোক বাইশ মিনিট থাকতে পারেন।


মানুষ যে আর ক’দিন বাদে মহাকাশে বাড়ি বানাবে সে নিয়ে আমার অন্তত সন্দেহ নেই। বাড়ির সামনে বাগান কী করে করবে সে নিয়ে একটু ধন্দ ছিল। এখন তাও ঘুচল।

কামাই করার জন্য লোকে কী না বলে।

ঈগলের ডানা থেকে প্যারিস।

অনেকদিন পর এই গানটার কথা মনে পড়ল। আমি শুনছি, আপনারাও শুনুন।

   

October 23, 2014

শুভ দীপাবলী




এই মুহূর্তে যদি সবক’টা ফ্লাইওভার আকাশের গা থেকে খুলে নিয়ে যায় কেউ, যদি রাস্তার মাথায় মাথায় সবুজ বোর্ডে সাদা রং দিয়ে লেখা চিরাগ দিল্লি, আশ্রম, ধওলা কুঁয়া লেখা বিরাট বিরাট বোর্ডগুলো নামিয়ে নেওয়া হয়, যদি খোঁড়া রাস্তার ধারে মেট্রোর চিহ্ন আঁকা টিনের পাঁচিল আর একটাও না থাকে, যদি বুলেভার্ডে শুয়ে থাকা ভিখিরিদের ভিড় খালি হয়ে যায় – আর তারপর যদি বলা হয় এইবার, এইবার শুধু আকাশবাতাস গাছপালা দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বল দেখি তুমি কোন শহরে আছ, তাহলে সত্যি বলছি আমি দিল্লিকে দিল্লি বলে চিনতে পারব না।

এখন দিল্লির হাওয়ায় আর আগুনে ঝাপট নেই, গোড়ালি-ফাটানো শুকনো পাতা-ওড়ানো ধুলোর হাওয়া এখনও বইতে শুরু করেনি। গলির মুখে এখনও মাটিতে শিউলি ফুল ঝরে আছে, এক বাড়ির কাজ সেরে অন্য বাড়ি যাওয়ার পথে উবু হয়ে বসে সে ফুল ওড়নায় কুড়িয়ে নিচ্ছে রোগা মাসিদের দল।

এখন দিল্লির প্রতিটি অটোভাইসাবের মেজাজ খুশ। এখন দিল্লির প্রতিটি সওয়ারির দিল দরাজ।

এখন দিল্লিকে দেখে সত্যি সত্যি নবাববাদশার শহর মনে হচ্ছে। আর একটু বাদেই দিল্লির পথে পথে, বারান্দায় বারান্দায় যখন আলো জ্বলে উঠবে, তখন তাকে দেখে চোখ না ঝলসে যায়।

আপনাদের সবার জীবনেও আলো জ্বলুক, দীপাবলীর সন্ধ্যেয় এই কামনা রইল। হ্যাপি দিওয়ালি।



October 21, 2014

পুরোনো অবান্তরঃ নামকরণের সার্থকতা



এবারের পুরোনো অবান্তরের মূল পোস্টটির সঙ্গে তার এই মাজাঘষা সংস্করণের মিল এতই কম যে দুটোকে এক বা একরকম বলে চালাতে আমার রীতিমত অসুবিধে হচ্ছে। কিন্তু আইডিয়াটি পুরোনো পোস্ট থেকে নেওয়া। দুয়েকটি ঘটনাও। কাজেই আমি এটাকে পুরোনো অবান্তর হিসেবেই পোস্ট করলাম।

*****

আমাদের এক বন্ধু ছিল, সায়ন। ছিল মানে এখনও আছে, শুধু কাছের বদলে দূরে আছে, দিল্লির বদলে ব্যাঙ্গালোরে আছে। সায়নের মতো ভালো ছেলে আমি বেশি দেখিনি। শান্তশিষ্ট, হাসিখুশি, বুদ্ধিমান। আড্ডার তোড়ে ভেসে গিয়ে অনেকেই অনেক কিছু বলে বা করে, বেমক্কা ইয়ার্কি, আলটপকা মন্তব্য – সায়নকে কখনও দেখিনি সে সব করতে। সায়ন বাকি সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজা করত, কিন্তু কখনওই শিষ্টতা বা ঠিকের সীমা অতিক্রম করত না।

এত গুণের ওপর সায়নের আরও একটা গুণ ছিল। অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি। আড্ডায় ভাঁটা পড়ছে দেখলেই তার একটি বিশেষ নমুনা শোনার জন্য আমরা সায়নকে চেপে ধরতাম।

দুয়েকবার গাঁইগুঁই করে হাল ছেড়ে সায়ন শুরু করত।

“কালজয়ী নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার একদা বলেছিলেন যে গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, সে সুন্দর। এ কথা সুগন্ধী কুসুমের ক্ষেত্রে সুপ্রযুক্ত হলেও সাহিত্যের আঙিনায় এর যথার্থতা সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। বস্তুত, সাহিত্যে নামকরণ এক পরম গুরুত্ববাহী বিষয়। শিরোনামের দর্পণেই আভাসিত হয়ে ওঠে গল্পের বিষয়বস্তু ও মূর্ছনা। রবীন্দ্রনাথ নামকরণকে পরম গুরুত্ব দিতেন। যতক্ষণ না সেরা শিরোনাম খুঁজে পেতেন ততক্ষণ চলত তাঁর নিরলস গভীরতম অন্বেষণ।”

একটি বারও দম না নিয়ে, একটি বারও না হোঁচট খেয়ে সায়ন ওপরের গোটা প্যারাগ্রাফটা বলে যেত। মাধ্যমিকের আগে সেই যে বেচারা মুখস্থ করেছিল, এখনও ভুলতে পারেনি। যে কোনও গদ্য/পদ্য/প্রবন্ধের নামকরণের সার্থকতা সম্পর্কে প্রশ্ন এলেই চোখ বুজে আগে ওপরের প্যারাগ্রাফটি লিখত সায়ন, তারপর অন্য কথা।

*****

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার এই বিষয়ে মিল আছে দেখা যাচ্ছে। নামকরণকে আমিও পরম গুরুত্ব দিই। ভাতের সঙ্গে চালের যা সম্পর্ক, ডে-র সঙ্গে মর্নিং-এর, ইমপ্রেশনের সঙ্গে ফার্স্ট-এর – আমি মনে করি লেখার সঙ্গে সেই লেখার নামেরও তাই সম্পর্ক। যেমন ধরুন ‘বারীন ভৌমিকের ব্যারাম’ নামটুকু পড়েই কি বোঝা যায় না যে এর পর একটা ভালো কিছু ঘটতে চলেছে? এর জায়গায় যদি ‘অথ ক্লেপটোম্যানিয়া কথা’ নাম হত তাহলে কি গল্প অত জমত? আবার ‘পল্লীগ্রামস্থ প্রজাদের দুরবস্থা বর্ণন’টুকু পড়েই কি পাঠকের আসন্ন দুরবস্থা টের পাওয়া যায় না?

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার যে বিষয়ে একেবারেই মিল নেই সেটা হচ্ছে পরিশ্রমের অংশটায়। যে অংশটা ‘নিরলস গভীরতম অন্বেষণ’-এর। অবান্তরের কয়েকটা পোস্টের নাম তুলে দিলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। ‘ধরণী দ্বিধা হও . . .’, ‘বিষয়সংকট, শিশু ও প্রেম(হীনতা)’, ‘নিরলস নিষ্ক্রিয়তা ২’, ‘নদীর এপার ওপার এবং দীর্ঘশ্বাস’। সেদিন কোথায় যেন এক লেখকের সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। সাক্ষাৎকারী সব কথার শেষে যেই না বলেছেন ‘অধুনা বাংলা সাহিত্যে ব্লগের ভূমিকা নিয়ে ছোট করে কিছু বলুন’ অমনি সাহিত্যিক তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন। ‘ঝাঁটা মারো ও সব ব্লগের মুখে! একখানা কম্পিউটার আর ইন্টারনেট কানেকশন আর হাতে একগাদা সময় আছে যাদের তারা ব্লগ লিখবে আর একখানা কম্পিউটার আর ইন্টারনেট আছে কিন্তু ব্লগ লেখার সময় নেই যাদের তারা সে সব ব্লগ পড়বে। এর মধ্যে আবার সাহিত্যটাহিত্য আসে কোত্থেকে?’ আমার ‘সাহিত্যের’ এই রকম নামকরণ দেখলে যে তাঁর ব্লাডপ্রেশার কোথায় চড়বে সে কথা ভাবতেও আমার ভয় লাগছে।

লেখার নামের কথা থাক, মানুষের নামের কথায় আসা যাক। লেখার থেকে জ্যান্ত মানুষ যেমন অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং, লেখার নামের থেকে মানুষের নামও তেমনই।

মানুষের নামকরণের কথা বলতে গেলে প্রথমেই নামকরণের প্রক্রিয়াটার নিহিত অবিচারের কথা বলতে হয়। সারাজীবন যে জিনিসটা আমাকে চিহ্নিত করবে, আমাকে বিখ্যাত বা কুখ্যাত করবে বা করবে না, ইলেকশন কমিশনের খাতায় একটা এনট্রিমাত্র করে রেখে দেবে – সেই জিনিসটার ওপর আমার কোনও হাতই নেই। সেটার মালিকানা আমার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে যখন মতামত জানানো তো দূর অস্ত, আমার গলা থেকে আর্তনাদ ছাড়া আর কিছু বেরোতে শুরু করেনি।

নামের মালিকের সঙ্গে পরামর্শ না করে নাম রাখলে যা হয়, বাবা মা এবং অন্যান্য পূর্বপুরুষেরা নিয়মিত নামকরণে গোলমাল পাকিয়ে থাকেন। বেশিরভাগ মাবাবার কাছেই তাঁদের সন্তানরা জ্যান্ত পুতুলের মতো। খোকাখুকুরা যেমন পুতুলকে সাজায়গোছায়, পুতুলের ভুরু প্লাক করে, চুলে বিনুনি বাঁধে, ঠাস ঠাস চড় মেরে পুতুলকে শাসন করে, বাবামাও সন্তানকে নিয়ে অবিকল সেই কাজগুলোই করে থাকেন। বিশেষত যতক্ষণ না সন্তানের ট্যাঁফো করার ক্ষমতা জন্মাচ্ছে।

কিন্তু খোকাখুকুদের সঙ্গে বাবামায়েদের বিপজ্জনক তফাৎটা হচ্ছে খোকাখুকুদের মাথায় আইডিওলজি নামের পোকা থাকে না, বাবামায়েদের মাথায় থাকে। আইডিয়া ভালো জিনিস তবে তার মুখ্য অসুবিধেটা হল বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ কম। সারাজীবন ধরে এত ভালোভালো আইডিয়া ঝেড়েঝুড়ে বেছেবুছে বাবামা নিজেদের মাথায় পুরেছেন (বা অন্য কেউ পুরে দিয়েছে), একটা যে অ্যাপ্লাই করবেন তার জো নেই। পা ফাঁক করে, কোমরে হাত দিয়ে, ভুরু কুঁচকে পথ আটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাস্তব।

এমন সময় তাঁদের কোলে দুম করে একখানা জ্যান্ত পুতুল এসে পড়ল। পুতুলটা জ্যান্ত কিন্তু অবোলা। সারাদিন খালি কাঁদে আর চিংড়ির শুঁড়ের মতো টিংটিঙে হাতপা নাড়ে। বাবামা বিজয়োল্লাসে রিয়েল লাইফের দিকে তাকালেন। রিয়েল লাইফ জগন্নাথের মতো ঠুঁটো হয়ে রইল, তোমাদের ছাগল তোমরা লম্বালম্বি কাটবে না আড়াআড়ি সে ব্যাপারে তোমাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

প্রথমেই নামকরণের পালা এল। বাবামা মগজে জমানো আইডিয়ার ঝাঁপি খুলে বসলেন। বাবামা লিঙ্গপরিচয়ে বিশ্বাস করেন না – মেয়ের নাম হল স্টর্ম। বাবামা পদবীতে বিশ্বাস করেন না – ছেলের নাম হল সুবলজাত শ্যামলীপুত্রী। বাবামা কেউ কারও পদবীর হক ছাড়তে রাজি নন – মেয়ের নাম হল শাল্মলী রায়চৌধুরী পুরকায়স্থ। বাবা বঙ্কিমচন্দ্রের ফ্যান – দু’হাজার চোদ্দ সালে জন্মানো মেয়ের নাম হল শৈবলিনী। মা অমিতাভ বচ্চনের নামে দু’ঢোক জল বেশি খেতেন এককালে – ছেলের নাম হল অভিষেক।

এ ছাড়া নিজেদের নামের সঙ্গে সন্তানের নাম মিলিয়ে রাখার তাড়না তো আছেই। তবে এই অত্যাচারটা ছেলেদের ওপর বেশি হয়। হরিশংকরের ছেলে কালীশংকরের ছেলে শিবশংকরের ছেলে রুদ্রশংকরের ছেলে শুভ্রশংকর। আমার চেনা একজনের নাম ছিল মৃগাঙ্ক, সে অনেক খুঁজে আর কিছু না পেয়ে তার ছেলের নাম রেখেছিল আতঙ্ক। বড়রা অনেক বারণ করেছিলেন, সমবয়সীরা অনেক হুমকি দিয়েছিল, ছোটরা অনেক পায়ে ধরেছিল, মৃগাঙ্কবাবুকে টলানো যায়নি। আমিও প্রথমটা শুনে চোখ কপালে তুলেছিলাম, তারপর যখন একবছর বাবামার সঙ্গে পুজোর পর বিজয়া করতে সাড়ে তিন বছরের আতঙ্ক আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এল তখম আমার মন থেকে সব সংশয় দূর হল। ঘরে ঢোকার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঠাকুমার লাল দন্তমঞ্জন নিজের সারা গায়ে ছিটিয়ে সে যখন আমার বাবামায়ের খাটের ছত্রী ধরে দোল খেতে লাগল, তখন তাকে দেখে আমার মনে যে ভাবটা জেগেছিল সেটাকে বিশুদ্ধ আতঙ্ক ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। কোনও মানুষের এত সার্থক নামকরণ আমি আগে আর কখনও দেখিনি, পরেও দেখব কি না সন্দেহ।

মেয়েদের ক্ষেত্রে বাবা বা মায়ের থেকে দিদির সঙ্গে নাম মেলানোর চল বেশি। গীতার বোন নমিতা, অপর্ণার বোন অর্চনার বোন আল্পনা। সব উদাহরণ আমাদের বাড়ি থেকে দেওয়া হল। বিখ্যাত উদাহরণও আছে, ডিম্পল কাপাডিয়ার বোন সিম্পল কাপাডিয়া। আমার সঙ্গে গান শিখত সোনামণি আর তার বোন খুকুমণি।

আমাকে এ যাবৎ কোনও শিশুর নাম রাখতে হয়নি কিনা, তাই এ বিষয়ে আমার কিছু বক্তব্য আছে। আমি মনে করি সন্তানের নাম রাখার সময় কয়েকটি ব্যাপার বাবামায়েদের খেয়াল রাখা উচিত। বিশেষত জীবনের বিভিন্ন স্টেজে তার ব্যবহারযোগ্যতার কথা। আজকাল অবশ্য সম্পর্ক ব্যাপারটা উঠে গেছে, সকলের সঙ্গেই সকলের ফার্স্ট নেম বেসিসের গলাগলি, কিন্তু আর ক’বছর আগেও লোকে বয়স বুঝে মাসিমা, জেঠিমা, কাকু, দাদু – এইসব বলে ডাকাডাকি করত। সেই সময় কাউকে যদি খোকনদাদু বলে ডাকতে হয় বা বুড়িদিদি, তাহলে কেমন কেমন লাগে।

দু’নম্বর খেয়াল রাখার বিষয় হচ্ছে পদবী। পদবী ঠাকুর হলে দয়া করে সন্তানের নাম রবীন্দ্রনাথ রাখবেন না, খান হলে শাহরুখ, সেন হলে সুচিত্রা। পদবী মল্লিক হলে নাম কোয়েল যদি বা চলতে পারে মল্লিকা নৈব নৈব চ। জানি ভয়ানক লোভ হবে, কিন্তু সে লোভ সংবরণ করবেন।

তিন নম্বর বিষয়টা নামের মানেসংক্রান্ত। একসময় আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম মানুষের নামের একটা মানে থাকা উচিত। টম, হ্যারি, ডেভিড, জেন, অ্যান, ন্যান্সি, ক্যাটনিস নয়; নাম হবে অমিত, লাবণ্য, শোভন, নিখিল, নবীন, দীপাবলী, সত্যবতী। নামকে শুধু একটা চিহ্ন হিসেবে বন্দী করে রাখা কেন, যখন তাকে তার থেকেও বেশি কিছুতে উন্নীত করা যায়। বলা তো যায় না, ক্রমাগত বইতে বইতে বোঝার কিছু গুণ গাধার ভেতর ঢুকে পড়বে হয়তো। ঋতম্ভররা সত্যে অবিচল হবে, দীপান্বিতারা আলো জ্বালাবে আশেপাশের প্রতিটি মানুষের জীবনে।

আবার উল্টো বিশ্বাসও দেখেছি, মানুষের দোষগুণ নামের ভেতর চারিয়ে যাওয়ার বিশ্বাস। যে বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে লোকে ছেলের নাম রাবণ রাখলেও কদাপি বিভীষণ রাখে না। বিশ্বাসই করতে পারেন না অমিতাভ নামের শিশু বড় হয়ে একজন হিংসুটে, কুচুটে, বিতিকিচ্ছিরি মানুষে পরিণত হতে পারে। কোন্নগরের শকুন্তলা কালীর প্রভাব তো আছেই, কিন্তু আমার নামের পেছনে এই দ্বিতীয় বিশ্বাসের কেরামতিও আছে। খিদিরপুরে আমার ঠাকুরদাঠাকুমার কোয়ার্টারের পাশের কোয়ার্টারে একটি পরিবার এসে উঠেছিল কিছুদিনের জন্য। সে বাড়ির মেয়ে ছিল কুন্তলা। রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। সাত চড়ে সে মেয়ে রা কাড়ত না, পাঁচবার ‘অ্যাঁ?’ না করলে কথা শোনা যেত না এমনি নম্র ছিল সে মেয়ের কণ্ঠস্বর। নিজের ছেলেমেয়ের পালা সাঙ্গ হয়েছিল ততদিনে, কাজেই ঠাকুমা সংকল্প করে রেখেছিলেন এর পর বাড়িতে যে মেয়ে হবে সে মেয়ের নাম হবে কুন্তলা।

আমার কপাল ভালো হলে মাঝখানে কেটে যাওয়া দু’যুগে ঠাকুমা তাঁর সংকল্প ভুলে মেরে দিতেন, কিন্তু আমার কপাল আর কবেই বা ভালো হয়েছে। ঠাকুমা তক্কেতক্কে ছিলেন, জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার নাম রেখে দিলেন কুন্তলা। ঠাকুমার স্ট্র্যাটেজি তো খাটলই না, নামটা আমারও কোনওদিন মনে ধরল না। কত গভীর অর্থবহ নাম হয় বাকি সবার – শ্রেষ্ঠা, অপরাজিতা, সঙ্ঘমিত্রা, সে জায়গায় কুন্তলা কী রকম তাৎপর্যহীন, খেলো। বছর বিশেক ঘর করে নামটাকে কোনওমতে সইয়ে নিয়েছি, এমন সময় আমার মাথার চুল উঠতে শুরু করল। এখন যখনই নামের মানে কী-র উত্তরে বলি, ‘মাথায় চুল আছে যে মহিলার’ লোকে সোজা আমার মাথার দিকে তাকায়। ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’-এর এমন হাতেগরম উদাহরণ পেয়ে তাদের মুখে আর কথা সরে না।

কাজেই আমি এখন বিশ্বাস করি মানেওয়ালা নাম এড়িয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অন্তত এমন নাম, যার মানে খালি চোখে পরখ করা যায়।

বাঙালি নামের কথাই যখন হচ্ছে তখন ডাকনামের ব্যাপারটা এড়ানো চলে না। ডাকনামের আমি মস্ত বড় সমর্থক। ডাকনাম বলতে আমি স্কুলের নামকে ছাঁটকাট করে নেওয়া ‘নিক’নামের কথা বলছি না কিন্তু। অর্থাৎ সিদ্ধার্থ থেকে সিড নয়, অনন্যা থেকে অনি নয়; টেঁপি, গুপি, ঘন্টু, ল্যাংচা, পটলা, ছক্কা, বুঁচি, গদাই। ডাকনাম যত খারাপ, তত ভালো। মনে মনে একবার বইমেলার কথা কল্পনা করুন, কিংবা একডালিয়া এভারগ্রিনের মণ্ডপ। হেমন্ত মুখার্জির গলা থামিয়ে মাইকে একজন বলছেন, ‘পানিহাটি থেকে আসা পটলা, তুমি যেখানেই থাক, মেলা অফিসে এসে যোগাযোগ কর। তোমার মাস্টারমশাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’ সে জায়গায় যদি বলা হয় ‘সাদার্ন অ্যাভিনিউর সিড’ তবে কি মেলা জমে? সাদার্ন অ্যাভিনিউর সিডেরা মহা সেয়ানা, ভিড় দেখলে ভড়কায় না, বেচারা পটলাদেরই খালি মাস্টারমশাইদের সঙ্গে হাতছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তাই আমার সহানুভূতি চিরকাল পটলাদের দিকে।

দেখেশুনে মনে হতে পারে যেন ছেলেমেয়ের নাম রাখাটা বোধহয় একটা বেজায় শক্ত কাজ। তা একটু শক্ত তো বটেই, সারা জীবনের ব্যাপার যখন। তা বলে বেশি শক্তও না। বাবামায়েরা যদি নাম রাখার সময় নিজেদের কথা না ভেবে যার নাম রাখা হচ্ছে তার কথা বেশি ভাবেন, যদি মনে রাখেন সেই নাম নিয়ে শিশুটিকে স্কুলকলেজে যেতে হবে, বন্ধুবান্ধবদের মোকাবিলা করতে হবে, যথাসময়ে কাউকে প্রেমে ফেলতে হবে, বসের সামনে দাঁড়াতে হবে – তাহলেই কাজটা নিমেষে সোজা হয়ে যায়।

অবশ্য বাবামায়েরা যদি সেটুকু ভাবনাও না ভাবতে চান তাহলেও অসুবিধে নেই। অপছন্দের নাম ঘাড়ে করে ঘোরার দিন ঘুচেছে। পিতৃমাতৃদত্ত বিচ্ছিরি নাম পড়ে পড়ে পচুক সার্টিফিকেটের বান্ডিলে, এখন সবাই যে যার নিজের নাম নিজেরা রেখে নেবে। যার যেমনটি চাই। বর্ণালী যদি বোরিং লাগে তবে নাম বদলে ‘বৃষ্টির ছাঁট’ করে নিলেই হল। কিংবা মহীনের বদলে বদলে ‘মহাকাশচ্যুত নক্ষত্র’। কেউ ভুরু কুঁচকোবে না, কেউ বলবে না ‘এ আবার কেমন নাম, এ নামকরণ সার্থক হয়নি।’ রিয়েল লাইফ আর বাগড়া দেবে না, সোশ্যাল মিডিয়াই এখন রিয়েল লাইফ। সেখানে সার্থকতার সংজ্ঞা বদলে গেছে অনেকদিন হল।

  

October 18, 2014

সাপ্তাহিকী



আলোকচিত্রীঃ Akos Major

A truth that's told with bad intent/ Beats all the lies you can invent.
                                                     ---William Blake, Auguries of Innocence


আপনি কি আমার মায়ের মতো, মিউজিয়ামের একদিক দিয়ে ঢুকে তিন মিনিটের মধ্যে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে আসেন? নাকি আমার বাবার মতো, প্রতিটি ছবির সামনে তাঁবু খাটিয়ে বসেন?

টাইমস রোম্যান কেন টাইমস ইন্ডিয়ান নয়? জর্জিয়া কেন আটলান্টা নয়?

আজকাল আর কেউ ভালো, সত্যবাদী, সাহসী হতে চায় না। সকলেই ‘পজিটিভ’ হতে চায়। বি পজিটিভ। তবে খেয়াল রাখবেন, পজিটিভিটি বেশি হয়ে গেলে সেটা আদতে নেগেটিভ হতে পারে।


কুকুরবেড়াল পোষায় আমার আগ্রহ নেই। একটা সিংহ পাই তো পুষি।



শীত পড়ছে। হাওয়ায় টান। সকলেই গায়ে মুখে পন্ডস মাখতে শুরু করেছেন নিশ্চয়। বোতলের গায়ে স্পষ্ট বড় বড় করে লেখা ‘ফর এক্সটারনাল ইউজ ওনলি’। আপনি অক্ষরে অক্ষরে সে কথা মেনে চলছেন। গায়ে মাখছেন, চামচে করে গলায় ঢালছেন না। নাকি ঢালছেন?



হিন্দি সিনেমা দেখে বড় হয়েছে অথচ কখনও নায়কনায়িকার একে অপরের দিকে দৌড়ে আসা ভেঙিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে স্লো মোশনে দৌড়োয়নি, এমন লোক কি আছে কোথাও?

ম্যান্টিস চিংড়ি খালি চোখে ক্যান্সার দেখতে পায়। তাদের চোখের নকল করে বিজ্ঞানী ক্যামেরা বানাচ্ছেন।


সাপ্তাহিকীতে এই গানটা সম্ভবত আগেও এসেছে। আবারও রইল।


October 15, 2014

জামা মসজিদ



রবিবার সকালে ঘুম ভেঙে টের পেলাম ঠাণ্ডায় সারা শরীরের রোমকূপ খাড়া, মুখের চামড়ায় টান, খোলা জানালার ধারে রেখে শোওয়া বোতলের জল প্রায় ফ্রিজের মতো ঠাণ্ডা। জানালার বাইরে তখনও ঘুরঘুটে অন্ধকার।

মিনিট দশেক মটকা মেরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে উঠে বাথরুম গেলাম। দাঁতটাত মেজে জল খেতে খেতে দেখি বাইরের কালো একটু যেন ফিকে। দরজা খুলে বারান্দায় বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা হাওয়া জাপটে ধরল। এইবেলা চাদরমাদর বার করতে হবে। কোথায় যে আছে ভগবানই জানে। কাবার্ডে থাকলেই মঙ্গল। নাকি আগের বছর বেশি গোছাতে গিয়ে ডিভানের তলায় তুলে রেখেছি?

বকেঝকে মনকে ডিভানের ভ্যাপসা গুমোট থেকে বার করে নিয়ে এলাম। কোথাও কোনও শব্দ নেই। একটা হালকা মিষ্টি গন্ধ ভাসছে হাওয়ায়। নিচে তাকিয়ে দেখলাম পাঁচিলের বাইরে গলা বাড়ানো শিউলি ডালের নিচে সাদাকমলা কার্পেট। আকাশের দিকে মুখ তুলে দেখলাম নীল আকাশে ফুটে রয়েছে ফ্যাকাশে চাঁদ।

ঘরে এসে অর্চিষ্মানকে ঠ্যালা দিয়ে বললাম, ‘চল কোথাও যাই।’

অর্চিষ্মান ঘুম গলায় ‘সিনেম্‌....’ বলে সবে শুরু করতে যাবে আমি বললাম, ‘যাওয়ার জায়গা খোলামেলা হওয়া চাই, খাওয়াকেন্দ্রিক আউটিং চলবে না, একবেলার মধ্যে ফেরৎ আসতে হবে।’ শর্তের বহর শুনে অর্চিষ্মানের ঘুম ছুটে গেল। চা খেতে খেতে ব্রেনস্টর্মিং হল খুব। আমি বললাম ‘ইন্ডিয়া গেট’, অর্চিষ্মান বলল, ‘দরিয়াগঞ্জ’। তারপর দুজনেই একসঙ্গে বললাম, ‘জামা মসজিদ!’ অর্চিষ্মান মুচকি হেসে বলল, ‘সেই ভালো। ইট’স অ্যাবাউট টাইম।’

অর্চিষ্মানের মুচকি হাসির মানে বোঝাতে গেলে আমাকে একটা স্বীকারোক্তি করতে হবে। সে স্বীকারোক্তি এমন ভয়ানক যে লোকের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে হয়। বিভিন্ন খেপে দিল্লিতে কাটানো দীর্ঘ আটটি বছরে আমি একটি বারও জামা মসজিদ যাইনি।

আপনারাও নির্ঘাত ততখানিই মুখ হাঁ করেছেন খবরটা প্রথম জেনে অর্চিষ্মান যতখানি হাঁ করেছিল।

‘সিরিয়াসলি?’

‘সিরিয়াসলি।’

‘একবারও না?’

‘আধবারও না।’

‘তার মানে করিমসেও খাওনি?’

মাঝগঙ্গায় কুটো ধরার মতো করে হাঁকপাকিয়ে আমি বলেছিলাম, ‘না না, নিজামুদ্দিনের করিম’সটায় খেয়েছি তো, আফগানি চিকেন আর গুর্দা কলেজি আর . . .’

‘আই মিন, রিয়েল করিম’স-এ?’

লজ্জায় এই বার আমার চিবুক বুকে ঠেকে গিয়েছিল।

মার্কেট টু-র মোড় থেকে অটোতে উঠলাম যখন তখন ঘড়ির কাঁটা আটটা পেরিয়েছেঅর্চিষ্মান আফসোস করল, ‘ইস আর একটু আগে বেরোলে হত, বুঝলে। রোদ উঠে যাবে।’ অর্চিষ্মানের আফসোস শুনতে পেয়েই নির্ঘাত অটোভাইসাব স্পিড তুললেন। ফাঁকা রাস্তায় পক্ষীরাজের মতো ছুটল তাঁর গাড়ি।

এই রাস্তা দিয়েই আমরা রোজ অফিস যাই, তাই বেড়াতে যাচ্ছি ভাবটা মনের মধ্যে ফুটতে একটু দেরি হচ্ছিল। রোজ যে মোড়টা থেকে আমার অটো বাঁদিকে ঘোরে, সেই মোড়টা পেরিয়ে সোজা এগিয়ে আসতেই ফুর্তিতে মন লাফ মারল। এইবার নতুন রাস্তা, নতুন ফ্লাইওভার, ফ্লাইওভারের পাশে নতুন গাছে নতুন ফুল। ফাঁকা ফ্লাইওভারের ধারে দেখি দাঁড় করানো একটি মোটরবাইক, তার হেলমেট পরা মালিক রেলিং-এ ভর দিয়ে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মন ভালো হয়ে গেল ঘড়ির মুখে ছাই দিয়ে এখনও তার মানে কেউ মাঝপথে থেমে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে?

ফুরফুরে মনে চলেছি, হঠাৎ অটো ভাইসাব ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষলেন। আমরা সচকিত হয়ে ‘কেয়া হুয়া কেয়া হুয়া’ করে উঠেই দেখি চৌমাথা জুড়ে মোটা দড়ির বেড়া, বেড়ার ওপাশে সাদা নীল পোশাক পরা পুলিশ ভাইসাব আর তারও ওদিকে ফাঁকা রাস্তা ধরে কিছু লোক হাফ দৌড়চ্ছে, হাফ হাঁটছে। ম্যারাথন! দৌড়বীরদের পরনে সাদা জামা নীল প্যান্ট। তবে ইচ্ছেমতো পোশাকেও লোকজন দৌড়চ্ছেন। একজনকে দেখলাম স্যান্ডোগেঞ্জি পরে দৌড়তে। আমি আর অর্চিষ্মান মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। পেছনে ঠ্যাঙা নিয়ে কেউ তাড়া করেনি, অথচ লোকে দৌড়চ্ছে – এই ঘটনা আমাদের দু’জনের মনে যেমনটি বিস্ময়ের সৃষ্টি করে তেমনটি আর কিছুটি করে না। দৌড়বীরদের একটা বড় ঝাঁক পেরিয়ে যাওয়ার পর পুলিশকাকু আমাদের রাস্তা ছেড়ে দিলেন। চলতে চলতে আরও অনেক দৌড়বীর চোখে পড়ল। রাস্তার ধারে ছোট প্যান্ডেলের সামনে স্বেচ্ছাসেবকরা জলের বোতল ধরা হাত এগিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমার বেশ কিছুক্ষণ থেকে মনটা খুঁতখুঁত করছিল। হঠাৎ সামনে এক প্রতিযোগীকে দেখে সে খুঁতখুঁতানি হাওয়া হয়ে গেল। এই তো! এক, দুই, তিন, চার . . . মহিলা ম্যারাথনার। পুরুষ প্রতিযোগীদের সিন্ধুতে তাঁরা বিন্দু, তবুও তাঁদের উদ্দেশ্যে মনে মনে জয়ধ্বনি দিলাম।

শুনেছি এই দিল্লির তলায় নাকি আরও ছ’ছটা দিল্লি চাপা পড়ে আছে। একটা দিল্লিকে আক্রমণ করে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে বহিরাগত শত্রুর দল, সে ধ্বংসস্তুপের ওপর আরেকটা দিল্লি তৈরি হয়েছে। সে দিল্লির ওপর হা রে রে রে করে এসে পড়েছে আরেকদল গুণ্ডা, দিল্লি আবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু দাঁড়িয়েছেও আবার মাথা তুলে। আবার পড়েছে, আবার উঠেছে, আবার পড়েছে, আবার উঠেছে। এই করে করে সাত নম্বর বারের যে দিল্লি, সেই দিল্লিতেই ঘুরছি ফিরছি অফিস করছি ফুচকা খাচ্ছি আমি আর অর্চিষ্মান।

কিন্তু এই সাত নম্বর দিল্লির মধ্যেও কি অনেকগুলো দিল্লি ঘাপটি মেরে নেই? কালীমন্দির আর মাছের বাজার থেকে শুরু করে সাউথ দিল্লির দৈত্যাকার ফ্লাইওভারের নেটওয়ার্ক পেরিয়ে এই যে এখন লুৎইয়েনস সাহেবের দিল্লির পথ দিয়ে ছুটছে আমাদের অটো – চেহারা, হাবভাব দেখলে কি বোঝার জো আছে যে এরা একই শহর? গম্ভীর, ছায়াচ্ছন্ন তিলকমার্গের দু’পাশে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে প্রাসাদোপম বাড়ি, তার ধপধপে সাদা গায়ে সময়ের ছোপ। বাড়ির আশেপাশে জমির পরিমাণ দেখে আমাদের চোখ কপালে। কত দাম হবে? মধ্যবিত্ত কল্পনাকে যতদূর প্রসারিত করা যায় করে স্থির হল, ‘মিনিমাম একশো কোটি তো হবেই, বল?’

একশো কোটি টাকা কেমন দেখতে হতে পারে সেই ভাবতে ভাবতে খানিক দূর এগিয়ে দেখি খাঁ খাঁ রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক। পরনে ন্যাতাকানি, মাথাভর্তি চুল, মুখভর্তি দাড়িতে কত পোষা উকুন কিলবিল করছে কে জানে। কিন্তু সে সব অগ্রাহ্য করে ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে ট্র্যাফিক কন্ট্রোল করছেন। আমাদের অটো দেখেই প্রবল বেগে হাত ঝাঁকিয়ে রাস্তা দেখালেন।

ভদ্রলোকের দেখানো রাস্তায় খানিকটা যেতেই দিল্লির স্কাইলাইনে বড় বড় গম্বুজ দেখা দিতে শুরু করল। গম্বুজের মাঝে মাঝে মিনার। আকাশ থেকে মাটিতে দৃষ্টি নামিয়ে দেখি ফুটপাথ ছেয়ে গেছে বইয়ে। নতুন পুরোনো, আস্ত, ছেঁড়া, পাঠ্য অপাঠ্য। দরিয়াগঞ্জের বইয়ের বাজার তখনও ভালো করে বসেনি। বইওয়ালারা তখনও উবু হয়ে বসে বই সাজাচ্ছেন। আমাদের উঁকিঝুঁকির বহর দেখে অটো ভাইসাব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘উতরনা হ্যায়?’ আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘নাহ, যেখানে যাব মন করে বেরিয়েছি সেখানেই যাওয়া যাক।’

‘বহোৎ আচ্ছা’ বলে অটো ভাইসাব একটা গলির সামনে এনে অটো থামালেনআমরা টাকা মিটিয়ে অটো থেকে নামলাম আর আমাদের চোখের সামনে ফুটে উঠল এক্কেবারে নতুন আরেকটা দিল্লি।

অটোর হর্নে, রিকশার ভেঁপুতে, মানুষের কলরবে গমগম করছে সে দিল্লি। রাস্তার দু’পাশে জমে উঠেছে বাজার। ঠ্যালাগাড়ির ওপর চূড়ো করে রাখা টি-শার্ট, পাজামা, হাওয়াই চটি নেড়েচেড়ে পরখ করে দেখছে কিনিয়ের দল। ঝলমলে জামা পরে বাবামায়ের হাত ধরে হাঁটছে শিশু, ইস্কুল যেতে না হওয়ার ফুর্তি ফুটে বেরোচ্ছে তার প্রতিটি পদক্ষেপে। ‘মেশিন কা ঠাণ্ডা পানি’ লেখা স্টিলের চৌকো ভারি গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে দু’জন। যে রেটে হাওয়া ঠাণ্ডা হচ্ছে, এদের ব্যবসার আয়ু আর বেশিদিন নেই। সামনের মাস থেকেই অন্য রাস্তা দেখতে হবে। ফুটপাথের বিরিয়ানির দোকানে ভিড় দেখলে কে বলবে সকাল ন’টা বাজতে এখনও ঢের দেরি। মশলাদার বিরিয়ানির গন্ধে গোটা এলাকা ম'ম' করছে। হঠাৎ সে সুবাসের আস্তরণ ফুটো করে নাকে হুল ফোটালো আরেকটি গন্ধ। ‘ওঁরে বাঁবা, এঁ আঁবার কোঁত্থেকে আঁসছে গোঁ’ রুমালের চাপার ভেতর থেকে কোনওমতে অর্চিষ্মানকে জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছি এমন সময়ে চোখের সামনে উৎস সশরীরে আবির্ভূত হলেন। কী দেমাক, ক্ষুরে ক্ষুরে কী রাজকীয় ঠমক, কৃষ্ণকালো পশম গায়ে আলোর সে কী পিছলানি! এঁকে যারা বোকাপাঁঠা বলে তাদের বুদ্ধির দৌড় নিয়েই আমার সন্দেহ হয়। পাঁঠা মহোদয়ের উচ্চতা তো দেখার মতোই, পিঠে চেপে বসলে আমার পা মাটি পাবে না, তার থেকেও দেখার মতো হচ্ছে তাঁর কানের দৈর্ঘ্য। লতপত লতপত করে সে কান দুলিয়ে তিনি আমাদের পথ আটকে ধীরেসুস্থে চললেন। এমন রাজকীয় পাঁঠাকে ‘হ্যাট হ্যাট’ বলার প্রশ্নই ওঠে না, এদিকে রুমালের চাপায় দমবন্ধ হয়ে মরার উপক্রম, কাজেই আমরা কোনওমতে ‘এক্সকিউজ মি’ বলেটলে তাঁর পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম।

একটু পরেই চোখের সামনে এই দৃশ্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।


মসজিদ-এ-জাহাঁ-নুমা। শাহজাহানের ইচ্ছেয়, ছ'হাজার শ্রমিকের পরিশ্রমে, ষোলশো পঞ্চাশ থেকে ষোলোশো ছাপ্পান্ন খ্রিষ্টাব্দ - ছ'বছর ধরে তৈরি হওয়া জামা মসজিদ।

ওই দূরে দেখা যাচ্ছে লাল কেল্লা।

চটি হাতে মসজিদের চত্বরে আমরা ঘুরতে লাগলাম। দলে দলে সাহেবমেমেরা গাইডের পিছু পিছু ঢুকতে লাগলেন। সাহেবদের কোমরে লুঙ্গি জড়িয়ে, মেমসাহেবদের গায়ে জোব্বা চড়িয়ে, সব্বার জুতোয় কাপড় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। মসজিদের চত্বরের মাঝখানে ছোট্ট বর্গাকার পুকুর। অগভীর কিন্তু কানায় কানায় টলটল করছে। মরীচিকার মতো। এর দিকে তাকিয়ে দ্যাশের কথা মনে পড়ত কি মরুভূমি থেকে আসা মানুষদের?

মাথার ওপর যেই না সূর্যের তেজ বাড়ল, পেটের ভেতর যেই না ব্রেকফাস্টের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠল, অমনি ইতিহাসটিতিহাস থেকে আমার মন উঠে গেল। আমার শাশুড়িমা সম্প্রতি হাজারদুয়ারি বেড়িয়ে এসে একটা গল্প বলেছিলেন, সেটা মনে পড়ে গেল। হাজারটা দরজা যে বাড়ির তার সাইজ তো আন্দাজ করাই যাচ্ছ, সে বাড়ির আনাচকানাচ ঘুরে দেখতে দেখতে মায়েরা ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তাঁরা বিশ্রাম নিচ্ছেন এমন সময় মা শুনলেন পাশে প্রাসাদের বারান্দায় বসে একজন মহা বিরক্ত গলায় বলছেন, ‘এই যা বানাইয়া থুইসে, দ্যাখনের আর শ্যাষ নাই।’ আমার মনের ভাবটাও অনেকটা সেই রকম হল। আমি পত্রপাঠ মনের ভাব প্রকাশ করে ফেলতে অর্চিষ্মান বলল, ‘খিদে পেয়েছে তো খেলেই হয়।’ আমি বললাম, ‘কোথায় খাব? কত দূর যেতে হবে?’ অর্চিষ্মান বলল, ‘বেশি নয়, ওই তো ওই গলিটার ভেতর।’


ক্যামেরায় যদি গন্ধ বন্দী করে আনার টেকনোলজি থাকত তাহলে এই গলির গন্ধটা আমি আপনাদের শোঁকাতামই শোঁকাতাম। সেঁকা মাংস, ঘি চপচপে বিরিয়ানি, তন্দুর, সব মিলিয়েমিশিয়ে সে এক অবর্ণনীয় ব্যাপার। গলিতে ঢুকে খানিকটা গিয়ে বাঁদিকে আরেকটা গলি, সেই গলিতে ঢুকে একটা ছোট চত্বর, চত্বর ঘিরে কয়েকটা ঘর, প্রতিটি ঘরের মাথায় লেখা করিম’স। বেশির ভাগ ঘরেরই ঝাঁপ বন্ধ, যেটার খোলা সেটার সামনে অন্তত সাতআটজনের একটা লাইন। লাইনে দাঁড়ালাম। অর্চিষ্মান অভিজ্ঞ গাইডের মতো আমাকে বলল, ‘ভিড়ের সময় এই সবগুলো ঘরই খোলা থাকে।’ আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, ‘সকাল দশটার সময় মাংসরুটি খাওয়ার জন্য লাইন পড়েছে, এর থেকে আর কত বেশি ভিড় হবে?’ শুনে অর্চিষ্মান আমার দিকে তাকিয়ে এমন একখানা করুণার হাসি দিল যে আমি চুপ করে গেলাম।

এদিকে লাইনে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। আমাদের সামনে হিপস্টারদের একটা বড় দল, তাদের সকলেরই গায়ে চে গুয়েভারা মার্কা গেঞ্জি, সকলেরই পরনে আকাচা জিনস, সকলেরই পায়ে স্ট্র্যাপছেঁড়া হাওয়াই চটি, সকলেরই কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, সকলেরই মাথায় ঝুঁটি। ভাবভঙ্গি দেখে বোঝা গেল এরা এ পাড়ায় বেশ আসেটাসে, জানেটানে। একজন অস্থির হয়ে বার বার লাইন ছেড়ে রান্নাঘরের দিকটায় গিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছিল আর ফিরে এসে বন্ধুদের বলছিল, ‘আরে প্যাক করা লেতে হ্যায় ইয়ার, ওহাঁপে খতম হো রহা হ্যায়।’ অর্চিষ্মান ফিসফিস করে আমাকে বলল, ‘নাহারি খতম হয়ে যাওয়ার কথা বলছে।’ আমি বললাম, ‘নাহারি কী?’ অর্চিষ্মান বলল, ‘করিম’স-এর ইউ এস পি। লিজেন্ড বলে, তুমি এখন যে নাহারিটা খাবে, যদি অ্যাট অল খেতে পাও, সেটা উনুনে চাপানো হয়েছে কাল বিকেল চারটের সময়। আমি বললাম, ‘অ্যাঁ! সে জিনিস খেতে না পেলে তো মহা লস্‌। চল চল, হাম ভি প্যাক করা লেতে হ্যায়।’ উত্তেজনায় আমার মুখ থেকে রাষ্ট্রভাষা বেরিয়ে পড়ল। অর্চিষ্মান দ্বিধান্বিত মুখে এদিকওদিক তাকাচ্ছে এমন সময় একজন উর্দি পরা পরিবেশক দোকানের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দো লোগ হ্যায় কোই?’ আমরা মহোল্লাসে ‘হ্যায় হ্যায়!’ বলতে বলতে হিপস্টারদের টপকে দোকানে ঢুকে পড়লাম।

মেনুর অনুরোধ জানাতে পরিবেশক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘নাহারি ইয়া পায়া?’ বাঃ, বাছাবাছির ঝামেলা নেই দেখা যাচ্ছে। আমরা একটা নাহারি নিলাম, একটা পায়া, আর রুটি। একটু পরে খাবার এসে গেল। একটা গোটা প্লেট জুড়ে রুটি, জ্বাল দেওয়া দুধের মতো গায়ের রঙে মাঝেমাঝে বাদামি ফোসকা, বেশিরভাগই ছোট, দুয়েকটা ফুটবলের মতো ফুলে উঠেছে। পাশের প্লেটে লাল তেলের দিঘির মধ্যে নাক ভাসিয়ে আছে কয়েক টুকরো গাঢ় কালচে বাদামি মাংসের টুকরো। তেল দেখে বুক অলরেডি ধুকপুক করছিল। আমি অল্প একটুখানি রুটি ছিঁড়ে সেই তেলে ডুবিয়ে মুখে পুরলাম . . .

. . . আর অমনি মায়ের হাতের গুড়ের পায়েস, মেজমামির হাতের ক্ষীরের পাটিসাপটা, জেঠী/জেঠতুতো দিদির হাতের তেতোচচ্চড়ির পর আমার লিস্টে চার নম্বর খাবার যোগ হল যেটা খেয়ে চুপ করে থাকা যায় না, চোখ বুজে মাথা নেড়ে ‘হায় হায়! উমদা উমদা! নাজুক নাজুক!’ বলে চেঁচিয়ে উঠতে হয়।


আমি বালিশের মতো নরম রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে ঝোলে ডুবিয়ে ডুবিয়ে মুখে পুরতে লাগলাম। উষ্ণ, রগরগে ঝোল আমার খাদ্যনালী জ্বালিয়েপুড়িয়ে নিচে নামতে লাগল। কবিরা যে বলেন ‘এমন জ্বালায় জ্বলে মরণও ভালো’, নির্ঘাত এই রকম জ্বালার কথাই বলেন। ‘আহা, রুটি দিয়েই পেট ভরিয়ে ফেলবে দেখছি, মাংস খাও’ এই না বলে অর্চিষ্মান আমার প্লেটে মাংস তুলে দিল। কাল বিকেল চারটে থেকে গুমে গুমে সে মাংস তখন এলিয়ে পড়েছে, চামচ দিয়ে কেটে জিভের ওপর রাখতেই মাখনের মতো মিলিয়ে গেল। আমি আরেকবার চোখ বুজে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘কেয়া বাত কেয়া বাত’।


নাহারির পর পায়া, পায়ার পর ফিরনি। সবই ভালো, কিন্তু নাহারি এতই ভালো যে তার পাশে সব ফিকে।

বেড়ানো শেষ। এবার বাড়ি ফেরার পালা। গলির মুখ থেকে রিকশায় চড়ে বললাম, ‘চাঁদনি চক মেট্রো স্টেশন চলিয়ে ভাইসাব।’ রিকশা হেলেদুলে চলল। গলি গলি তস্য গলি। গলির ওপরের চিলতে আকাশ ফর্দাফাই করা ইলেকট্রিক তারের কালো জটা। গলির সাইজ দেখলে বোঝা যায়, এ গলি যখন বানানো হয়েছিল তখন স্করপিও বা প্যাজেরোর কল্পনাও কেউ করেনি। গিজগিজ করছে লোক। থিকথিক করছে দোকান। বিরিয়ানি, বাসনকোসন, মণিহারি। উবু হয়ে বসে কাগজের প্যাকেট থেকে সস্তা ওজন মেশিন বার করছে পাখির মতো রোগা একটা লোক। রামলাল চুন্নুপ্রসাদ জেনেরাল স্টোরসের বারান্দায় চাল ডাল আটার বস্তার ঢিপির মাথার ওপর বনবন করে ঘুরছে ছোট্ট ফ্যান। এরা কারা? ছোটবেলার বন্ধু? দেশভাগের সময় ওপার থেকে এসে শূন্য থেকে শুরু করা প্রতিবেশী? রামলাল চুন্নুপ্রসাদের উৎস সম্পর্কে নানারকম থিওরি আলোচনা করতে করতে আমরা দিল্লি সিক্সের উঁচুনিচু গলি দিয়ে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চললাম। একে অপরকে সাবধান করলাম, ‘শক্ত করে ধরে বোসো।’ অবশ্য এখানে পড়ে গেলে বেশি ব্যথা লাগবে না। কারণ মাটিতে পড়ার জায়গা নেই, পড়লে কারও একটা ঘাড়ে পড়তে হবে।

ভাগ্যিস রবিবারের বাজারে মেট্রো ফাঁকা ছিল, চাঁদনি চক থেকে উঠেই দুটো বসার সিট পেয়ে গেলাম। বসে বসে আলোচনা করছি কেমন সুন্দর ঘোরা হল, এমন সময় পরের স্টেশন থেকে একটা মেয়ে ট্রেনে উঠল। দেখি মেয়েটার গেঞ্জির বুকে নম্বর সাঁটা। ম্যারাথন দৌড়ে এসেছে! মুখেচোখে ক্লান্তির চিহ্নমাত্র নেই, দিব্যি পা ছড়িয়ে বসে চিপস খাচ্ছে। অর্চিষ্মানকে চ্যালেঞ্জ করে বললাম, ‘তুমি পারতে ম্যারাথন দৌড়ে মেট্রো চেপে বাড়ি ফিরতে?’ অর্চিষ্মান হার মেনে নিয়ে বলল, ‘পাগল? সোজা ট্যাক্সি ধরতে হত।‘ আমি বললাম, ‘তাও ভালো। আমার মিনিমাম স্ট্রেচার লাগত।’ এই না বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছি এমন সময় রাজীব চক ঢুকে গেল।



October 12, 2014

শনিরবি


এ বারের শনিরবিতে গত কয়েকদিনে তোলা কিছু ছবি রইল। বাড়ি যাওয়ার আগে চতুর্থীর রাতে সি. আর. পার্কে কয়েকটা ঠাকুর দেখেছিলাম। সেগুলোর থেকে কয়েকটা ছবি রইল, আর রিষড়ার বাড়িতে তোলা দুটো ছবি।

মেলা গ্রাউন্ডের মাদুর্গা। মায়ের বিভঙ্গ খেয়াল করুন। আর বিম্ববতী যেমন বলেছিল, মা ত্রিশূল বেঁধাচ্ছেন অসুরের বুকে কিন্তু তাকিয়ে আছেন সিংহের দিকে।

তমলুকে ঠাকুর দেখতে গিয়ে তমাল গাছ দেখেছিলেন মা। সেই গাছের একটা পাতা কুড়িয়ে এনেছিলেন আমাকে দেখাবেন বলে। মায়ের ব্যাগে থেকে পাতার দশা কিছু কাহিল হয়ে পড়েছে। এখন সে শুয়ে আছে একটা মোটা বইয়ের ভেতর। কিছুদিন বাদে পাতার অংশটুকু চলে গিয়ে শুধু তার শিরা উপশিরার কঙ্কালটা পড়ে থাকবে। এই প্রক্রিয়াটার খটমট ইংরিজি নামটা মা বলেছিলেন, আমি ভুলে গেছি।



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.