July 20, 2014

ট্যাংরা মাছের ঝোল




রিংরিং রিংরিং রিংরিং . . .

হ্যালোওও, আমি সবে ভাবছি সোনাকে একখানা ফোন করি অমনি দেখি সোনাই আমাকে ফোন করেছে। কেমন আছ সোনামা? অর্চিষ্মান কেমন আছে?

দিব্যি। কালপরশু এখানে বেশ বৃষ্টিটিষ্টি হচ্ছিল। আজ আবার খটখটে। তোমরা কেমন ঘুরছ মা?

সোনা! নাক টানছ নাকি! গলাটাও কেমন ধরাধরা. . .

আর বোলো না। অ্যাদ্দিন গরমে কিস্যু টের পাওয়া যাচ্ছিল না, যেই বৃষ্টি নেমেছে অমনি অফিসের এ.সি. তেড়েফুঁড়ে হাওয়া ছাড়তে লেগেছে। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। অফিসশুদ্ধু লোক সারাদিন কুঁজো হয়ে ঘুরছে।

সে কী! এ.সি. ডিপার্টমেন্টকে চিঠি লেখো শিগগিরি। বল যে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছে, সত্বর এসি কমানোর ব্যবস্থা করুন।

উফ্‌ মা, এ কী তোমার সরকারি অফিস নাকি যে কথায় কথায় চিঠি লিখতে হবে? মুখে বললেই হবে।

তাহলে সোমবারে গিয়ে প্রথমেই সেটা বোলো। আর এখন বাড়িতে ক্রোসিন ক্যালপল কিছু থাকলে খেয়ে নাও। জ্বর এসে যাবে নয়তো।

আচ্ছা আচ্ছা। গরুমারা কেমন লাগছে তোমাদের?

খেও কিন্তু সোনা। মাকে মিছে কথা বলতে নেই কিন্তু।

ওরে বাবা, বলছি না মা। তোমরা কোন হোটেলে আছ গো?

আমরা? গরুমারা নেচার্স কটেজ। কী ভালো জায়গা রে সোনা। কুলকুল নদী, ফুরফুরে হাওয়া। যেদিকে তাকাও সবুজ আর সবুজ। চোখ জুড়িয়ে যায়। তোরা সময় পেলে আসিস একবার।

ইস্‌, কী মজা। আর ক’দিন থাকবে গো?

এই তো আজই সামসিং চলে যাচ্ছি। ওখানে কালপরশু থাকব, তারপর বাড়ি।

সামসিং নামটা ভালো। কেমন সিংজী সিংজী ভাব। আচ্ছা শোন না মা, তোমাকে একটা দরকারে ফোন করেছি। বলছি, ট্যাংরা মাছ কী করে রাঁধে গো?

ট্যাংরা কিনেছ? কেটেকুটে দিয়েছে?

হ্যাঁ হ্যাঁ। নয়তো কী? কাটতে হলে আর খাওয়া হত না। এবার কী করব?

কিচ্ছু না। কালোজিরে ফোড়ন দিবি, হলুদলংকাগুঁড়ো অল্প জলে গুলে দিয়ে দিবি, দুটো কাঁচালংকা চিরে দিয়ে, মাছ দিয়ে, ভালো করে ফুটিয়ে নামিয়ে নিবি। ব্যস।

মাছ কাঁচাই দিয়ে দেব? ভাজব না?

ও মা, সে তো ভাজতেই হবে।

উফ্‌ মা, ঠিক করে গোড়া থেকে স্টেপ বাই স্টেপ বল।

আচ্ছা আচ্ছা। প্রথমে মাছগুলো ভালো করে ধুয়ে নুনহলুদ মেখে রেখে দেবে খানিকক্ষণ। তারপর তেল গরম করে ভাজবে। সোনা, খুব সাবধান, ট্যাংরা মাছ কিন্তু কড়াইয়ে ছাড়লেই একেবারে চড়বড়চড়বড় করে উঠে চোখেমুখে তেল ছেটাবে। তুমি তেল গরম হলে গ্যাস থেকে কড়াই নামিয়ে মাছ ছেড়ে তারপর আবার কড়াই আগুনে তুলো।

বুঝেছি। নেক্সট?

তারপর ভাজা মাছগুলো তুলে নিয়ে, বাকি তেলটায় কালোজিরে দেবে। একটা ছোট প্লেটে পরিমাণমতো হলুদ আর লংকাগুঁড়ো অল্প জলে গুলে রাখবে, কালোজিরে ফুটফুট করে উঠলে সেটা ঢেলে দিয়ে নাড়বে। দুটো কাঁচালংকাও চিরে দিতে পার। মশলাগুলো একটু রান্না হয়ে গেলে ভাজা মাছগুলো দিয়ে বেশ করে নেড়েচেড়ে মশলা মাখিয়ে নিও। তারপর একটুখানি গরম জল দিয়ে ঢাকা দিয়ে দিও। জল অল্প দিও, ট্যাংরায় বেশি ঝোল ভালোলাগে না। মাখামাখাই ভালো।

ওক্কে। তারপর?

তারপর আর কী? পুরো ব্যাপারটা গবগব করে ফুটে উঠলেই রান্না শেষ। নামিয়ে গরমগরম ভাতের সঙ্গে খাবে। ভাতটা একটু বেশি করে খাস মা।

সে কী, এরই মধ্যে রান্না শেষ। হেবি সোজা তো।

সোজাই তো।

আর কিছু লাগবে না? আরও কী সব মশলাপাতি যেন দেয় দেখি ফুডব্লগে। চারমগজ? চাটমশলা? নিদেনপক্ষে বাটার? জান মা, ফ্রেঞ্চ শেফরা শুনেছি সব রান্নার শেষেই একখাবলা বাটার দিয়ে নামায়। তাতেই নাকি খাবারটা নিমেষে মর্ত্যীয় থেকে স্বর্গীয় হয়ে যায়।

ফুঃ, বাটার দিতে গেলে ফ্রেঞ্চ শেফ হওয়ার দরকার কি, বাঙালি রাঁধুনি হলেও হবে। তবে আমরা বাটার শেষে নয়, শুরুতে দিই। গরম ভাতে বেশ করে মেখে আলুভাজা দিয়ে খাই। অ্যাকচুয়ালি আমি বলতে ভুলেই গেছিলাম। ট্যাংরা মাছের রেসিপির শুরুতেই বাটার আর আলুভাজা দিয়ে বেশি করে ভাত মেখে খাওয়ার নিয়ম লেখা আছে। তারপর ডালতরকারি, লাস্টে মাছ। খেয়ে উঠে মুখ ধুয়ে প্লেটে করে দই। এই গোটা রেসিপি ফলো না করলে ট্যাংরার মহিমাই মাটি।

আচ্ছা মা, যথেষ্ট রসিকতা করে ফেলেছ, এবার ছাড়ান দাও। ভালো করে সামসিংজী ঘুরে এস। সাবধানে যেও।

তুমিও ওষুধ খেও। অফিসে এ.সি. কমাতে বোলো। আর তেলে মাছ ছাড়ার সময় সাবধানে ছেড়ো।

ছাড়ব মা, তুমি নিশ্চিন্তে থাক। মাছের ঝোল রেঁধে অক্ষত শরীরে তোমাকে ফোন করে জানাব। এখন রাখি। রেসিপির জন্য থ্যাংক ইউ। তোমরা সামসিং পৌঁছে ফোন কোরো। রাস্তাটা খুব সুন্দর লাগলে রাস্তা থেকেও ফোন করতে পার। টা টা মা।

টা টা সোনা।




July 19, 2014

সাপ্তাহিকী



আলোঝলমল প্যারিসের মেট্রো স্টেশন। উৎস


Little triumphs are the pennies of self-esteem.
                            ---Florence King

সক্কালসক্কাল এ’রকম হুড়োতাড়া দিয়ে আপনাদের সপ্তাহান্ত শুরু করতে চাই না, কিন্তু আমি নিরুপায়। শুনতে চাইলে আজকালের মধ্যেই শুনতে হবে। বিবিসি প্রযোজিত ‘থ্রি মেন ইন আ বোট’-এর মিউজিক্যাল সংস্করণ। আমার দারুণ লেগেছে, আপনাদের কেমন লাগে দেখুন না।

সবসময় যে ‘বিগার পিকচার’টা দেখার মতো হয় তা নয় কিন্তু। বিশেষ করে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে।

এবার থেকে বেশিবেশি করে নীল বা হলুদ রঙের জামা পরে বেরোতে হবে দেখছি। লাল তো যেনতেনপ্রকারেণ এড়িয়ে চলতে হবে।

বিশেষ করে প্রিয়াঙ্কার পাঠানো এই খেলাটা খেলার পর। এরা বলছে আমার সঙ্গে নাকি ‘সাইরেন’ নাম্নী কোনও মিথিক্যাল চরিত্রের মিল আছে। শুনে হাসব না কাঁদব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তখন প্রিয়াঙ্কা সান্ত্বনা দিয়ে বলল, সাইরেন হচ্ছে বিউটিফুল অ্যান্ড ডেঞ্জারাস। তখন ধড়ে প্রাণ এল। বুঝলাম আমার ক্ষেত্রে ওই ডেঞ্জারাসটুকুই মিলেছে। আপনার সঙ্গে কোন চরিত্রের মিল বেরোল?

ক্যালভিনের সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পেলে মনটা কী ভালো হয়ে যায় না?

সময়ে সব ফ্যাকাশে হয়ে যায়, ট্যাটু হয় না কেন? এঁরা ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন আপনার শরীরের সঙ্গে ট্যাটুর সম্পর্ক কেন চিরস্থায়ী (এবং কেন আমি কখনও স্বেচ্ছায় ট্যাটু করাব না)।

মা ছোটবেলায় একটা গল্প বলতেন। দুটি ছোট ছেলেকে পড়ানোর জন্য গৃহশিক্ষক রাখা হয়েছে। পড়াশোনার প্রতি ছেলেদের মনোভাব বোঝানোর জন্য আমার দাদুর একটা কথাই যথেষ্ট। ‘সাত হাত মাটি কাটতে রাজি হয়, তবু পড়তে রাজি হয় না।’ মাস্টারমশাই অচিরেই বুঝে গেলেন সোজা পথে এখানে বিদ্যাভ্যাস হওয়া মুশকিল। বুঝে তিনি ছাত্রদের নিয়ে বিকেলবেলা ছাদে উঠলেন ঘুড়ি ওড়াতে। এ’রকম বন্ধুত্বপূর্ণ ও ‘কুল’ মাস্টারমশাই পেয়ে ছাত্ররা তো আহ্লাদে আটখানা। তারা তাড়াতাড়া ঘুড়ি, লাটাই, মাঞ্জা নিয়ে ছাদের দিকে উঠল। ঘুড়ি যখন মাঝ আকাশে পতপত করে উড়ছে, মাস্টারমশাই গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, এখন তোমার কাছে চারটে ঘুড়ি আছে, ধর পটাই তোমার দুটো ঘুড়ি কেটে দিল . . . আহা, আহা ধরার কথা বলছি, পটাইয়ের ঘাড়ে অতগুলো মাথা নেই সে আমি জানি . . . যাই হোক, ধর যদি দুটো কেটে নেয়, তাহলে তোমার কাছে আর ক’টা ঘুড়ি বাকি থাকবে? দুই ভাইয়ের মধ্যে যে বড় সে মাথা চুলকে কর গুনতে শুরু করল, মাস্টারমশাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে রইলেন। এমন সময় ছোটভাই চিৎকার করে বলল, ‘শিগগিরি চলে আয় দাদা! ঘুড়ির নাম করে অঙ্ক শিখিয়ে দিচ্ছে!’---এরাও তেমনি গানের নাম করে লেখালিখি শেখাতে চায়। আপনি যদি ছোটভাইয়ের মতো চালাকচতুর হন তাহলে কেটে পড়বেন, আর যদি বড়ভাইয়ের মতো সরল টাইপ হন তাহলে শুনবেন। আমি কোন ভাইয়ের মতো সেটা আর খুলে বলার দরকার নেই নিশ্চয়?  

এই টোস্টারটা কিনলে কেমন হয়?

ফ্যাশন ডিজাইনারদের প্রতি আমার অশ্রদ্ধাটা আরেকটু বেড়ে গেল। যাদের কল্পনাশক্তি এত কম তারা আবার লোকের পোশাকআশাকের ‘ট্রেন্ড সেট’ করার ওভারকনফিডেন্স দেখায় কী করে কে জানে বাবা।

আপনারও কি আমার মতো লোকের বাড়ির জানালা খোলা দেখলেই আপসে চোখ সেদিকে চলে যায়? তাহলে এই ছবিগুলো ভালো লাগতে পারে।

Titanic ডোবার কথা তো সবাই শুনেছেন, পড়েছেন, সিনেমাতেও দেখে ফেলেছেন। কিন্তু Britannic ডোবার খবরটা  জেনেছেন কি? না জানলে জেনে নিতে পারেন।

দিল্লির এই মুহূর্তের আকাশবাতাসের জন্য বড্ড লাগসই এ সপ্তাহের গান। গানটা এ সপ্তাহের হলে কী হবে, গানের রেকর্ডিং-এর বয়স ছিয়াত্তর। এ গান সে সময়ের, যখন গলার খামতি ঢাকার জন্য চতুর্দিকে জগঝম্পের ধোঁয়াশা লাগত না। একখানা প্যাঁ প্যাঁ হারমোনিয়াম আর একখানা টং টং তবলা হলেই হয়ে যেত। শুনেই দেখুন কেমন লাগে।    


July 16, 2014

কুইজঃ শব্দ



কাল রাতে কেন জানি ঘুম আসতে ভীষণ দেরি হচ্ছিল আর বুকশেলফের একটা বইও পছন্দ হচ্ছিল না। ব্যর্থ প্রেম, রহস্য, ফিলসফি, কমিক্‌স্‌, ইকনমিক্‌স্‌ সবরকম নাম লেখা মলাটের ওপর থেকে পিছলে পিছলে শেষমেশ চোখে এসে থামল লালনীল মলাট পরা একটা গাঁট্টাগোঁট্টা বইয়ের ওপর।

ভালোই হল, এই সুযোগে প্রথমবার সংসদ অভিধানের গোড়া থেকে শেষ প্রথমবারের মতো উল্টে দেখা হয়ে গেল। কত পুরোনো শব্দ মনে পড়ল, কত নতুন শব্দ চোখে পড়ল। গম্ভীর শব্দ, মিষ্টি শব্দ, ফিচেল শব্দ। দুষ্কৃতি আর দুষ্কৃতী শব্দদুটোকে যে চাইলেই একটা আরেকটার জায়গায় বসিয়ে দেওয়া যায় না, ভুলেই গেছিলাম। কাল রাতে ষণ্ডা বইয়ের পাতা উল্টোতে গিয়ে মনে পড়ল।

অভিধান পড়তে যে এত ভালো লাগে কে জানত। বাকি সব বইয়ে শব্দকে সর্বদা প্রসঙ্গের কম্বলমুড়ি দিয়েই দেখতে পাই, স্বমহিমায় তাদের দর্শন পেতে গেলে ডিকশনারির দ্বারস্থ হতে লাগে। কাল রাতে দৈবক্রমে সে দর্শন পেয়ে মন ভালো হয়ে গেল। দেখতে দেখতে আরও একটা কথা আবিষ্কার করলাম। সব শব্দই ভালো, কিন্তু কিছু কিছু শব্দ বাকিদের থেকে বেশি ভালো। ঘুমটা একেবারে চটে গিয়েছিল, তাই একটা নোটবুকে বেশি ভালো শব্দগুলোকে টুকে ফেললাম। প্রথমে লিস্টটা প্রায় দেড়শো শব্দের হয়েছিল, অনেক ঝেড়েবেছে সেটাকে পঞ্চাশে এনে দাঁড় করিয়েছি। দাঁড়ান, সে তালিকা আপনাদের দেখাই।

অবুঝ
আলনা
আহ্লাদ/ আহ্লাদি
উদাস (উদাসীনতা নয় কিন্তু)
একা
কুটির
কিংশুক
খেলনা
গল্প
ঘুম
চিঠি
চড়ুইভাতি
জেল্লা
টিপটিপ
ট্যাঁফো
ডাগর
ডিঙি
ঢ্যাঁড়স
তদন্ত
তম্বি
তোরঙ্গ
থতমত
দালান
দেউলে
ধনুক
ধানাইপানাই
নয়ানজুলি
নির্জন
পুঁথি
প্রকৃতি
প্রতিজ্ঞা
ফুচকা
ফৌত
বিন্তি
ভিটে
ভোর
মাঝি
যক্ষ
যাযাবর
রাংতা
রিক্ত
রোখ
রুচি
লুচি
শনৈঃশনৈঃ
শিরীষ
সহজ
সমাপ্তি
হাপুস
হৃদয়

*****

এবার কুইজের প্রসঙ্গে আসি। আজকের কুইজটা ঠিক অন্যদিনের কুইজের মতো নয়। অন্তত চারখানা তফাৎ আছে। এক, এ কুইজে কমেন্ট পাহারা থাকবে না। দুই, পাহারা থাকবে না কারণ এ কুইজে আপনারা কেউ কারও উত্তর টোকাটুকি করতে পারবেন না। তিন, কুইজে সময়সীমা অনন্ত। যার যখন উত্তর মনে আসবে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হোক বা চব্বিশ বছর বাদে, যখন খুশি এসে উত্তর লিখে যেতে পারেন।

চার নম্বর তফাৎটা হচ্ছে যে আজকের কুইজের একটাই প্রশ্ন। আপনাকে আপনার পছন্দের দশটি বাংলা শব্দ বলতে হবে। আমি ডিকশনারি খুলে টুকেছি বলে অ আ ক খ-র ক্রম রক্ষা করেছি, আপনাদের ও সব হাঙ্গামা করার দরকার নেই। আনতাবড়ি লিখে যাবেন, নো নেগেটিভ মার্কিং।

যদিও বাঁধাধরা সময়সীমা নেই, তবু ভালো কাজে গড়িমসি করে লাভ কী? নিন শুরু করুন। আপনাদের প্রিয় শব্দ শোনার জন্য আমাকে বেশিক্ষণ প্রতীক্ষা করাবেন না, এই আমার একান্ত অনুরোধ।

(গড়িমসি, প্রতীক্ষা আর একান্ত---তিনটেই প্রথম লিস্টে ছিল, ঝাড়াইবাছাইয়ে বাদ পড়েছে।)


July 15, 2014

The Trinity





শিল্পীঃ Willem Pirquin



ভালো শব্দ মন্দ শব্দ



বান্টির সঙ্গে আমার খটামটি বেধেছে অগুন্তিবার আমাদের রোজকার স্বাভাবিক ও সহৃদয় কথোপকথনকেই অনেকে কোমর বেঁধে ঝগড়া বলে ভুল করে, কিন্তু ঝগড়ার মতো ঝগড়া আমাদের হয়েছে মোটে তিনবার। প্রথম ঝগড়াটা লেগেছিল আলাপের তিনমাসের মধ্যে। বিষয় ছিল নাদাল-ফেডেরার। তৃতীয়বারের ঝগড়ার বিষয় সম্পূর্ণ ভুলে গেছি, শুধু মনে আছে তিনদিন কথা বন্ধ ছিল।

দু’নম্বরের ঝগড়ার কারণটা এখনও মনে জ্বলজ্বল করছে, আর সেটা নিয়েই আজকের অবান্তর পোস্টদু’নম্বর ঝগড়াটা হয়েছিল শব্দের ভালোমন্দ নিয়ে।

শুক্রবারের সন্ধ্যেবেলা সবাই মিলে রেস্টোর‍্যান্টে বসে খাচ্ছিলাম। আমাদের রেস্তর পক্ষে রেস্টোর‍্যান্টটি বেশ দামিই ছিল, তাই প্রতি সপ্তাহের বদলে আমরা মাসে একবার করে ওই দোকানটিতে যেতাম। খুশমেজাজে খাচ্ছিলাম আর চোখের কোণ দিয়ে দেখছিলাম আমার ডানদিকে বসা বান্টি একটা হাড়ওয়ালা চিকেনের গোবদা পিস ছুরি দিয়ে কেটে খেতে গিয়ে গলদঘর্ম হচ্ছে। হঠাৎ ছুরিটা উড়ে গিয়ে ঠন্‌ন্‌ন্‌ শব্দ করে পাশের টেবিলের পায়ের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ল আর সেই টেবিলে বসা সব-পরীক্ষায়-হায়েস্ট-পাওয়া চেহারার মেয়েটা ভয়ানক গম্ভীর মুখ করে বান্টির দিকে চোখ তুলে তাকাল। যেই না তাকানো অমনি বান্টি প্রশ্বাসের নিচে এমন একটা শব্দ উচ্চারণ করল যেটা লিখতে গেলে অনেকগুলো তারাচিহ্ন খরচ করতে হবে। এমন নয় যে বান্টির মুখে ও শব্দ আমি আগে শুনিনি, কিন্তু সেদিন ঝোঁকের মুখে ‘আঃ, এ কী ভাষা!’ বলে রিঅ্যাক্ট করে ফেললাম আর বান্টি ছুরিটুরি ভুলে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল

কেন, ভাষা খারাপ কীসে?

খারাপ নয়? তুই এক্ষুনি যেটা বললি সেটা খারাপ কথা নয়?

মোটেই নয়। ওটা তো একটা শব্দ। স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ দিয়ে তৈরি করা একটা জিনিস। তার আবার ভালোখারাপ কীসের?

বাঃ, শব্দ কি শুধু শব্দ নাকি? শব্দের আড়ালে একটা ভাব নেই? ভাবের ভালোমন্দ নেই?

যাস্‌সা*, সে যুক্তিতে তো ভয় ঘেন্না লজ্জা অত্যাচার জাতপাত এইসব শব্দও বলা বারণ হয়ে যাওয়া উচিত।

আচ্ছা, ভাব নয় তবে, ভাবপ্রকাশের উপায়? তার তো একটা ভালোমন্দ আছে মানবি?

উঁহু মানব না। ফস্‌ করে ভালোমন্দ ডিক্লেয়ার করে দেওয়ার আগে গোটা ব্যাপারটার পেছনের পলিটিক্সটা বোঝার চেষ্টা কর। এই সব পরিশীলিত ভাষাটাষা হচ্ছে সবলের দুর্বলের প্রতি ডিসক্রিমিনেশনের আরেকটা অস্ত্র। তোমার কলেজ এডুকেশন আছে, তোমার ভাষা ভালো অ্যাকসেপ্টেবল। মুটেমজুরের কলেজ এডুকেশন নেই, তাদের ভাষা আনঅ্যাকসেপ্টেবল

আমি মোটেই মুটেমজুরের ভাষা নিয়ে কিছু বলিনি। আমি গালিগালাজ দেওয়া নিয়ে বলেছি।

আরে তোমার কাছে যেটা গালি মনে হচ্ছে, সেটা সবার কাছে গালি হবে মনে করছ কেন। ভোকাবুলারির দোষগুণ সম্পর্কে তোমার মতামত ইউনিভার্সাল, এই ভাবনাটাই তো আগাগোড়া আপত্তিজনক।

কথায় কথায় ইউনিভার্স টানিস না ইউনিভার্স আবার কী? আমরা প্রত্যেকে যে যার নিজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইউনিভার্সে বাস করি এবং সেই সব ইউনিভার্সের নিয়মকানুনরীতিরেওয়াজ মেনে চলার চেষ্টা করি। বলিস না যে তুই সেই চেষ্টাটা করিস না। বাকি সব বেলায় নিজের পরিশীলিত ইউনিভার্সের সবক’টি নিয়ম মেনে চলব কারণ তাতে বিলং করতে সুবিধে হবে আর হঠাৎ ভাষার বেলায় অন্য ইউনিভার্সের প্রতি দরদ উথলে উঠবে, এটা হাস্যকর।

সে তোমার ইউনিভার্স ক্ষুদ্র হতে পারে, আমারটাও যে ক্ষুদ্র সে রকম ভাবছ কেন?

ততক্ষণে আমার কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করেছে।

তুই একটু আগে যে শব্দটা বললি, ক্যাম্পাসিং-এর ইন্টারভিউতে গিয়ে হাত থেকে পেন পড়ে গেলে সেটা বলতিস?

অফ কোর্স, বলতাম না।

কেন? কেন বলতিস না? তোর বিশাল, উদার, অল-ইনক্লুসিভ ইউনিভার্স শুক্রবার সন্ধ্যে আর সোমবার সকালের মাঝখানের বাহাত্তর ঘণ্টার সময়ের হেরফেরে সামান্য ভাষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারত না?

পারত না তোমাদেরই জন্য সোসাইটিটাকে যা করে রেখেছ। ভালো-খারাপ, শ্লীল-অশ্লীল, অ্যাকসেপ্টেবল-আনঅ্যাকসেপ্টেবল। তবে আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি, অচিরেই সফল হব। তখন ক্যাম্পাসিং-এ, বাসরঘরে, জেলখানায়, ক্লাসরুমে---বুক ফুলিয়ে যার যে রকম খুশি সে রকম ভাষা বলবে। তোমাদের মতো জাজমেন্টালদের ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকবে না।

আমার ততক্ষণে শাটডাউন হয়ে গেছে। নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় বন্ধ, চোখের সামনে সর্ষেক্ষেত, কানের ভেতর ভোঁভোঁ, মাথার ভেতর রাগের তপ্ত হাওয়া পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছে। চারপাশের দুনিয়াটাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বার করে চেতনার খিল তুলে দিয়েছি। কে বান্টি, সে কী বলছে, কেন বলছে---কিচ্ছু আর তখন আমাকে স্পর্শ করতে পারছে না।

যাদের শাটডাউন হয় না, তারা দেখেছি এই অবস্থাটাকে অনেক সময় ‘হেরে যাওয়া’ অবস্থা বলে ভুল করে। ভাবে যুক্তির ভাঁড়ারে টান পড়েছে বলে বুঝি আমার মুখ দিয়ে আর কথা সরছে না। শত্রুর থোঁতা মুখ আচ্ছাসে ভোঁতা করে দেওয়া গেছে ভেবে তারা উল্লসিত আহ্লাদিত ইত্যাদি নানারকম হয়। কিন্তু আসল কথাটা জানি আমরা যাদের দিনের মধ্যে অন্তত তিনবার করে শাটডাউন হয়। আমরা আর কথা বলছি না কারণ আমরা আর প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন বলে বোধ করছি না। বুঝে গেছি এ জিনিস ‘লস্ট কজ’। আমার মহার্ঘ মতামত এর পেছনে বাজে খরচ করে লাভ নেই। এখান থেকে ‘ওক্‌কে বস, তুমি ঠিক আমি ভুল’ বলে বেরিয়ে আসাটাই গোটা ব্যাপারটার ওপর যথাসম্ভব সম্মানজনক দাঁড়ি টানার একমাত্র রাস্তা।

কেউ এতশত বোঝে না। কেউ কেউ বোঝে, বুঝে চুপ করে যায়। কেউ বুঝেও চালিয়ে যায়। বান্টি বুঝে চালাচ্ছিল না না-বুঝে আমি জানি না।

সমাজসময়ভেদে একই শব্দ মেনস্ট্রিম থেকে মার্জিন্যাল হয়ে যেতে পারে, সেটা নিশ্চয় তোমার জানা আছে। রামকৃষ্ণর মুখের ভাষা শুনলে তুমি অজ্ঞান হয়ে যেতে। আচ্ছা, রামকৃষ্ণকে যদি তোমার যথেষ্ট ইন্টেলেকচুয়্যাল বলে মনে না হয় হুতোমপ্যাঁচার এক্স্যামপলটাই ধর না হয়। খারাপ কথায় তোমার যে রকম অ্যালার্জি দেখছি, ওঁর সঙ্গে ডিসকোর্সে বসলে তো তুমি পাঁচমিনিটও সারভাইভ করতে না। ‘এ কে বস?’ বলে দৌড়ে বাড়ি এসে কানে ডেটলের ঝাপটা দিতে।

এই না বলে বান্টি স্ট্র দিয়ে খানিকটা চকোলেট শেক গুড়গুড় করে মুখের ভেতর টেনে নিয়ে ভুরু নাচিয়ে বলল,

হুতোম পড়েছ? নাকি ভাষা আনঅ্যাকসেপ্টেবল লেগেছে বলে কাটিয়ে দিয়েছ?

আমি লেটুসপাতা মুখে পুরে জোরে জোরে কচরমচর চিবোতে লাগলাম। প্লেটের ওপর খটাস খটাস করে কাঁটা ঠুকে খাবারদাবার বিঁধতে লাগলাম। না চাইতেও প্লেটের জায়গায় চেনা একটা লোকের গলা ভেসে উঠতে লাগল বারবার।   

অবশেষে ধীরেসুস্থে চকোলেট শেকের গ্লাস নামিয়ে রেখে, ন্যাপকিন দিয়ে মুখ আঁতিপাঁতি করে মুছে, একখানা পিত্তিজ্বালানো হাসি দিয়ে বান্টি বলল,

এক্ষুনি আমার প্রতি তোমার মনের ভাবটা ঠিকঠিক প্রকাশ করতে হলে যে যে শব্দ দরকার তোমার পরিশীলিত ডিকশনারি হাঁটকেও সেগুলো খুঁজে পাচ্ছ না তো? পাবেও না। ছুঁড়ে ফেলে দাও তোমার ওই @#৳% ডিকশনারি। আমার ডিকশনারিটা ইউজ করা শুরু কর। দেখবে পৃথিবীটা একসেকেন্ডে অন্তত তিনকোটিগুণ রঙিন আর ইন্টারেস্টিং হয়ে গেছে।

*****

এই ঘটনার অল্প কিছুদিন পরেই সেলফ ডিফেন্স ট্রেনিং-এর গুরুত্ব প্রচারের জন্য আয়োজিত এক সেমিনার অ্যাটেন্ড করতে যেতে হয়েছিল। বক্তৃতার পর ছিল ডেমনস্ট্রেশন। অংশগ্রহণকারীদের গোল করে দাঁড় করিয়ে পার্সোন্যাল স্পেস কী, এবং কী কী ঘটলে সে স্পেস লঙ্ঘিত হতে পারে সেই সব বোঝাচ্ছিলেন আমার মায়ের মতোই রোগা আর মায়ের থেকেও নিরীহ দেখতে একজন দিদিমণি।

ডেমো প্রায় শেষ হয়ে আসছে এমন সময় তিনি বললেন, ক্যারাটেকুংফু যদি একান্তই না শিখতে চাও শিখো না, কিন্তু ছোটখাটো বিপদের জন্য যে জিনিসটা অবশ্য করে সবার জেনে রাখা উচিত সেটা হচ্ছে ‘হাউ টু সোয়্যার’। আমার মতো অনেকেই মুখ হাঁ করেছে দেখে তিনি আবার জোর দিয়ে বললেন, ইয়েস, সোয়্যার। যত ডার্টি তত ভালো।

এই না বলে হঠাৎ দিদিমণি চেল্লাতে শুরু করলেন। মুখ থেকে ছিটকে বেরোতে লাগল  একেবারে বাছাই করা সব শব্দ। বান্টির চোদ্দপুরুষ সে সব শব্দ জানে কি না সন্দেহ, ব্যবহার করা তো দূর অস্ত। আর আওয়াজ! ওই পাঁচফুটিয়া চেহারা থেকে যে ওইরকম বাজডাকানো শব্দ বেরোতে পারে আমি না দেখলে কল্পনা করতে পারলাম না। দিদিমণি ঘরের মাঝে বাঘের মতো পায়চারি করতে করতে কাল্পনিক দুষ্কৃতীর গুষ্টির পিণ্ডি চটকাতে লাগলেন, ঘাবড়ে গিয়ে গোল ছত্রাকার হয়ে গেল।

দিদিমণি শান্ত হয়ে আবার মিষ্টি হেসে বললেন, তোমাদের মতো অত না পেলেও দুষ্কৃতী একটু ভয় তো পাবেই। তাছাড়া কাছাকাছি অন্য লোক থাকলে তাদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে।

আমি চমৎকৃত হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। বিকেলে বান্টি চা খেতে এল। বেচারার খুব ইচ্ছে ছিল সেমিনারে যাওয়ার। অন্য কাজ এসে পড়েছিল বলে যেতে পারেনি। চা খেতে খেতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইল সেমিনারে কে কী বলেছে। ডেমো সেশনও হয়েছে শুনে বেচারার আফসোস নতুন করে উথলে উঠল। কী শেখাল কী শেখাল বলে একেবারে অস্থির। আমি যথাসম্ভব মনে করে করে বললাম। বললাম দুয়েকটা বেসিক মারামারির প্যাঁচঘোঁচও শিখিয়েছে, তুই চাইলে তোর ওপর অ্যাপ্লাই করে দেখাতে পারি। দেখবি?

সে দেখায় দেখলাম ওর বেশি উৎসাহ নেই। কত কী মিস হয়ে গেল ভেবে বান্টি মনখারাপ করে বেশি বেশি চানাচুর খেতে লাগল। যেটা ও জানতেও পারল না সেটা হচ্ছে যে ডেমোর গালাগালি দেওয়ার অংশটা আমি ওর কাছে কেমন সম্পূর্ণ গোপন করে গেছি।

   
 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.