June 30, 2015

ম্যাকলয়েডগঞ্জ ১




বেড়ানোর গল্প ঠিক কোথা থেকে শুরু হয়? বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে মনের মধ্যে জাগার মুহূর্ত থেকে? বাসের টিকিট কাটা আর হোটেল বুকিং হয়ে যাওয়ার পর থেকে? নাকি সেই জায়গায় পৌঁছোনো থেকে?


শেষেরটা যদি হয় তাহলে কেজরিওয়ালের গল্পটা বাদ পড়ে যাবে, কারণ সে গল্পটা শুরু হয়েছিল ম্যাকলিওডগঞ্জে পৌঁছনোর পাঁচশো কিমি পথ আর দশঘণ্টা বাকি থাকতেই। যখন আমরা আই এস বি টি-র বাসে উঠে নিজেদের সিট বেছে বসলাম আর কানের কাছে শুনলাম, “ম্যাডাম, ওহ্‌ উইন্ডো সিট মেরা হ্যায়।”

অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে দেখি আমার দিকে মুখ্যমন্ত্রী তাকিয়ে হাসছেন। সিট ছেড়ে দিয়ে অর্চিষ্মানের দিকে সরে এসে বললাম, “লোকটাকে দেখলে?”

বলাই বাহুল্য, ভদ্রলোক কেজরিওয়াল নন। খালি দৈর্ঘ্যপ্রস্থউচ্চতায়, মুখের আদল, গোঁফের কায়দায় কেজরিওয়ালের সঙ্গে তাঁর আশ্চর্য মিল। আমার ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করা ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তারপর দেখলাম ওঁর কথা বলার চাহিদাটা প্রায় প্যাথোলজিক্যাল। অন্তত চোদ্দটা ফোন করলেন, তারপর বৃহস্পতিবার রাতে টিকিট কাউন্টারে এত ভিড় কেন সেই নিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বিস্ময় প্রকাশ করতে লাগলেন। একবার শুরু করলে পাছে সারারাত কথা বলে যেতে হয়ে সেই ভয়ে আমি আর আলাপ বাড়ালাম না। বাসের ভিড়ের চেহারা যেমন আশা করেছিলাম তেমনই ছিল। গোটা তিন নবদম্পতি, কিছু এমনি লোক, একজোড়া নাচের মাস্টারমশাই ও ছাত্রী (নাচের ব্যাপারটা আমি ছাত্রীর হেয়ারস্টাইল আর কাজলের ঘটা দেখে আন্দাজ করেছিলাম, নিশ্চিত করল অর্চিষ্মান। মাস্টারমশাই ভদ্রলোক বসেছিলেন ওর কোণাকুণি সামনের দিকে, কাজেই তাঁর আইপ্যাডের স্ক্রিন অর্চিষ্মানের দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। ভদ্রলোক নাকি সারারাস্তা নাচের খবর পড়তে পড়তে আর নাচের ছবি দেখতে দেখতে চলেছিলেন। কী নাচ জিজ্ঞাসা করতে অর্চিষ্মান মাথাটাথা চুলকে বলল, ওই যে মহাপাত্র ভদ্রলোক যে নাচটা নাচতেন মোস্ট প্রব্যাবলি সেটা।) আর ব্যাকপ্যাক কাঁধে নেওয়া অল্পবয়সী ছেলের দল। ধরমশালার বাসে ড্রাইভার ও কন্ডাকটরের পরেই যাদের থাকা নিশ্চিত। তারা বসেছিল আমাদের আশেপাশেই। কথাবার্তা শুনে মনে হল আই আই টি। ধরমশালা পৌঁছনোর কথা ছিল বেলা দশটা নাগাদ, আমরা পৌঁছে গেলাম সকাল আটটায়। দু’ঘণ্টা আগে নিয়ে আসার জন্য ড্রাইভারজীকে মনে মনে ধন্যবাদ দেওয়াই উচিত ছিল কিন্তু এই সময়টুকু বাঁচানোর জন্য ভদ্রলোক সারা রাস্তা যে বেগে গাড়িটাকে ছুটিয়েছেন আর ঝাঁকিয়েছেন আর তার পরিণতি হিসেবে শেষ সিটে বসে আমাকে যে পরিমাণে লাফাতে হয়েছে, সেটা মনে করে আর দিতে পারলাম না।

বাস আসে ধরমশালা পর্যন্ত। ধরমশালা থেকে ম্যাকলিওডগঞ্জ সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার ওপরে। চাইলে আপনি ধরমশালাতেও থাকতে পারেন, তবে কেউ থাকে না। সকলেই ওই রাস্তাটুকু উজিয়ে ম্যাকলিওডগঞ্জে আসে। আমাদের সঙ্গে যে ছাত্রের দলটি যাচ্ছিল তাদের মধ্যে একজন ছিল স্বভাব-ওস্তাদ। কে নাকি বলেছে তাকে “আরে ধরমশালা মে কুছ নেহি হ্যায়, ফ্রেন্ডস কে সাথ মস্তি করনা হো তো ম্যাকলিওডগঞ্জ মে যাও।” আমরা অবশ্য মস্তি করব না, তবু আমরাও ম্যাকলিওডগঞ্জে যাব।

নানারকম করে ধরমশালা থেকে ম্যাকলিওডগঞ্জ যাওয়া যায়, তবে সবথেকে সোজা হচ্ছে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নীল বাসের যে কোনও একটায় উঠে পড়া। ঘনঘন ছাড়ে, দশটাকা টিকিট। মোটে দশটাকা খরচ করে কিছু একটা করতে পারছি ভেবে আনন্দও যেমন হয়, তার সঙ্গে অভিজ্ঞতাও হয় অমূল্য। ছোট সাইজের টাটা মার্কোপোলো বাস। দেওয়ালে লেখা ইউ আর আন্ডার ইলেকট্রনিক সারভেইলেনস, কিন্তু যেখানে ক্যামেরা থাকার কথা সেখানে স্রেফ একটা গর্ত। পেছনের কাঁচের মাথার ওপর বড় বড় লালরঙের অক্ষরে লেখা এমারজেন্সি ডোর। এমারজেন্সিতে পড়লে কীভাবে সেই ডোর ওপেন করতে হবে সে নির্দেশও দেওয়া আছে। টেক দ্য হ্যামার অ্যান্ড ব্রেক দ্য উইন্ডো। হ্যামারের খোপটা শূন্য পড়ে আছে। কাজেই এমারজেন্সি হলে ওঁ মণিপদ্মে হুম জপা ছাড়া উপায় নেই।

বাস চলল। বাসে চড়লে লোকের রসবোধ বৃদ্ধি পায় এটা আগেও দেখেছি। ট্রেনে কিংবা প্লেনে এটা হয় না। কন্ডাকটর যেই না বলবেন “পেছন দিকে এগিয়ে যান” অমনি কেউ বলবেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ এদিকে আসতে বল, ফুটবল খেলার জায়গা আছে।” কিংবা ফাঁকা স্টপেজে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে লোক ডাকতে থাকলে বলা হবে, “আহা এখান থেকে কেন, বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আয় গিয়ে।” পাহাড়ি বাসেও সে সব রসিকতা চলে। তবে কিনা এখানে ঘাম হয় না আর জ্যামও নেই, তাই রসিকতা শুনে গা জ্বলার বদলে হাসি পায়। তাছাড়া পাহাড়ি লোকেরা ভয়ানক পরোপকারী হয়। বাসে ওঠা মাত্র রোগা মহিলারা আমাকে দেখে সরে গিয়ে তাঁর অর্ধেক সিট আমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান। এই সব আধুনিক বাসের আবার দরজা বন্ধ করার ব্যাপার থাকে। এক স্টপেজে এক ভদ্রলোক উঠতে গিয়ে কিছুতেই দরজা খুলতে পারছিলেন না, অমনি বাসশুদ্ধু লোক চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, “প্রেশার ডালো ভাইয়া, প্রেশার ডালো।” বাসের সকলের সম্মিলিত উৎসাহে ভদ্রলোক প্রেশার ডাললেন, আর অমনি দরজা খুলে গেল।

আগের পোস্টে আপনাদের আমাদের কাছে ম্যাকলিওডগঞ্জের তাৎপর্য সম্পর্কে বলেছিলামবলেছিলাম যে এটা আমাদের দু’জনের প্রথম একসঙ্গে বেড়াতে আসা জায়গা। এ ছাড়াও অন্য সব বেড়ানোর জায়গার সঙ্গে একটা তফাৎ আছে এই জায়গাটার। এখানে এলে আমরা সরকারি হোটেলে থাকি না। আগেরবারও থাকিনি, এবারও থাকব না। এবারও আমরা থাকব আগেরবার যেখানে ছিলাম সেখানেই, পেমা থাং গেস্টহাউসে। পেমা শব্দের অর্থ পদ্ম, থাং-এর অর্থ মাঠ বা বাগান।

সারারাত ঝাঁকুনিতে সন্ধ্যেরাতের ভাত মাছের ঝোল হজম হয়ে গিয়েছিল, তাই আমরা প্রথমেই খেতে চলে গেলাম। হোটেলের লাগোয়া রেস্টোর‍্যান্ট লম্বাটে ঘরে সারি সারি কাঠের টেবিলচেয়ার, দেওয়ালে তিব্বতি থাংকা আর ছবির জমকালো সাজ। কিন্তু বাইরে এমন রোদ ছেড়ে সেই ঘরে যে বসে সে পাগল।




আমি নিলাম প্লেন অমলেট। অর্চিষ্মান নিল চিজ অমলেট। টোস্টও নেওয়ার কথা হয়েছিল। একটু পরে জানালা দিয়ে মুখ বার করে পরিবেশক জানালেন টোস্ট নেই, কিন্তু তিব্বতি চাপাটি আছে। চলবে?


চলবে মানে? দৌড়বে। প্লেটে করে এসে গেল গরম গরম বালেপ। ময়দার তৈরি, আর আমাদের রুটির থেকে সামান্য মোটা।

ম্যাকলিওডগঞ্জে লামা আছে, ধওলাধারের দমবন্ধ করা ভিউ আছে, হাজার হাজার ‘এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ’ ক্যাফে আছে, আর আছে কুকুর। বেওয়ারিশ, পোষা সব রকম। মানুষের পোষা তো আছেই, তাছাড়া ম্যাকলয়েডগঞ্জের সব হোটেল রেস্টোর‍্যান্টেরও একটা করে নিজস্ব কুকুর আছে। তারা সকলেই ভয়ানক স্বাস্থ্যবান আর কুঁড়ের বাদশা। সারাদিন রোদ এসে পড়া জায়গা বেছে শরীর যতখানি সম্ভব টানটান করে শুয়ে থাকে আর খাবারের গন্ধ পেলে ধীরেসুস্থে আড়মোড়া ভেঙে উঠে জিভ বার করে সে দিয়ে হাঁটা দেয়। আমরা খাওয়া শুরু করতেই আমাদের হোটেলের পোষা কুকুরটিও কোথা থেকে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে উপস্থিত। ইয়া দশাসই চেহারা, মুখ ঘিরে লোমের কেশর। খালি জিভটা একহাত বার না করে রাখলে আর পশমি ল্যাজটা আকাশের দিকে তুলে ঘনঘন না নাড়ালে সিংহের সঙ্গে তার তফাৎ করে কার সাধ্য।

রোদ্দুরে বসে ব্রেকফাস্ট খেতে চমৎকার লাগছিল। মনে পড়ে যাচ্ছিল, ছোটবেলায় রুটি দিয়ে অমলেট খেতে খুব ভালোবাসতাম। যেদিন টিফিনবাক্স খুলে এই দুটি বস্তু আবিষ্কার করতাম মন নেচে উঠত। এত প্রিয় আর এত সোজা একটা খাবারের কথা আমার মনেই ছিল না সেটা ভেবে বেশ অবাক লাগল।

রোদ্দুরের সঙ্গে ফাউ ছিল গিটারের টুং টাং বাজনা। এদিকওদিক তাকিয়ে দেখি একটু দূরে আমাদের একটু আগেই যে খাবার দিয়ে গেল সেই ছেলেটা একটা গিটার নিয়ে বাজাচ্ছে বা বাজানোর চেষ্টা করছে আর তার সামনে বসে আছে আরেকজন যে আমাদের তিব্বতি রুটির খবর দিয়েছিল। দ্বিতীয়জন প্রথমজনকে গিটার বাজানো শেখাচ্ছে। ছাত্রের হাত কাঁচা তবে শুনতে মন্দ লাগছিল না।

কিছুক্ষণ পরেই গিটার ছাপিয়ে আরেকটা শব্দ কানে এল। অসম্ভব নিচু পর্দায় একটা বোঁ বোঁ আওয়াজ। আচমকা শুনলে তাকে শুধু আওয়াজ বলেই মনে হয়, কিন্তু কান করে শুনলে বোঝা যায় ব্যাপারটার সুর আছে, নিচু পর্দা হলেও ওঠানামা আছে, এমনকি আপনার কান যদি তেমন কাজের হয় তাহলে দুয়েকটা কথাও আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন।

খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা শব্দের উৎসের দিকে হাঁটা লাগালাম। আমাদের গন্তব্য Tsuglagkhang মন্দির।

এত শক্ত শব্দ যদি উচ্চারণ করতে দাঁত ভেঙে যায় তাহলে আপনি আরও নানারকম করে জায়গাটাকে বোঝাতে পারেন। বলতে পারেন যে তিব্বতের বাইরে পৃথিবীতে যে সবথেকে বড় মনাস্টেরি আছে সেখানে যাব। বা দলাই লামার বাড়ি যাব। বা তিব্বতের গভর্নমেন্ট ইন এক্সাইল-এর হেডকোয়ার্টার্সে যাব।

বিবরণগুলো শুনেই বুঝছেন জায়গাটার গুরুত্ব কী অপরিসীম। অথচ বাইরে থেকে দেখলে সেটা আপনি আন্দাজ করতে পারবেন না। সাধারণ ইটকংক্রিট দিয়ে বানানো একটা বাড়ি। উনিশশো ঊনষাট সাল থেকে এই বাড়িতেই থাকেন চোদ্দ নম্বর দলাই লামা। যে বছর চিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ভারতে এসে আশ্রয় নেন, আর তাঁর সঙ্গে আসেন হাজার হাজার তিব্বতি নাগরিক। উনিশশো ষাট সালে ম্যাকলয়েডগঞ্জের এই বাড়িতেই স্থাপিত হয় গভর্নমেন্ট অফ টিবেট ইন এক্সাইল। এখনও প্রতি বছর প্রায় হাজার তিব্বতি শরণার্থী ম্যাকলয়েডগঞ্জে আসেন। এসে রাস্তায় মোমোর দোকান দেন, পাহাড়ি নুড়ির মালা গেঁথে পথের পাশে সাজিয়ে বসেন। সংসার পাতেন, ছেলেপুলে হয়। আবার নতুন করে একটা গোটা জীবন শুরু হয়। তবে সিংহভাগ তিব্বতিই ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন না। কখনও নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারবেন, সেই আশায়।

মন্দিরে আমরা অনেকক্ষণ সময় কাটালাম। সারি সারি ঘুরন্ত প্রার্থনা চক্রের পাশ দিয়ে হাঁটলাম, লাসা শহরের তিনদিকে তিন পাহাড়ঘেরা দলাই লামার আসল বাড়ি রাজকীয় পোটালা প্রাসাদের রাজকীয় ছবি দেখলাম। জুতো খুলে মন্দিরের ভেতর ঢুকে অবলোকিতেশ্বরের শান্ত মুখশ্রী দেখলাম, নাম না জানা দেবতার করালবদন দেখলাম। গুনে দেখার ধৈর্য ছিল না, তবে তার ন’টা মাথা আর চৌত্রিশটা হাত হওয়া কিছু অস্বাভাবিক নয়।* মন্দিরের চারদিক ঘেরা বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নিচে ছড়িয়ে থাকা বিরাট কাংড়া উপত্যকা দেখলাম, উপত্যকার ওপর ঝুঁকে পড়া আরও বিরাট ঝকঝকে নীল আকাশ দেখলাম। অর্চিষ্মান বলল, ওই গল্পটা মনে আছে? দ্য নাইন বিলিয়ন নেমস অফ গড? আমি বললাম, না তো, শুনি শুনি। গল্পটল্প শুনে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি একঘণ্টাও হয়নি। ল্যাপটপ, ফোন, ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে সময় অন্তত তিনগুণ আস্তে চলে এটা আগেও দেখেছি।

প্রার্থনা তখনও চলছিল। মূল মন্দিরের ভেতর মেরুন রঙের কাপড় পরা লামারা বসে মন্ত্র পড়ছিলেন আর বাইরে সাধারণ মানুষরা বই হাতে ধরে লামাদের সঙ্গে সঙ্গে সেই মন্ত্র বলছিলেন। কারও কারও হাতে সাদা পুঁতির জপমালা ছিল, কারও কারও হাতে জপযন্ত্র। এরই মধ্যে টুরিস্টরা ঘোরাফেরা করছিলেন, সেলফি স্টিক তুলে ছবি তুলছিলেন, তাঁদের শিশুরা লে’স-এর ফাঁপা প্যাকেট বুকে জাপটে ধরে ধাঁইধাঁই করে দৌড়চ্ছিল, চিৎকার করে নিজের অপছন্দ ও আপত্তি জাহির করছিল। আমি নিজেও টুরিস্ট এবং আমিও হয়তো প্রার্থনায় একই রকম বিঘ্ন সৃষ্টি করছিলাম, তবু ব্যাপারস্যাপার দেখে আমার মনে নানারকম হিংস্র অনুভূতির জন্ম হচ্ছিল। বৌদ্ধধর্মে ক্ষমা, শান্তি, করুণা ইত্যাদি ভালো ভালো জিনিস প্র্যাকটিস করা শেখানো হয় বলেই কি না জানি না, লামা এবং বাকি প্রার্থনাকারীরা দেখছিলাম ওই হট্টগোলে একটুও বিচলিত হচ্ছিলেন না। একমনে নিজেদের প্রার্থনা করে যাচ্ছিলেন। দেখেশুনে তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা একলাফে বেড়ে গেল।

মূল মন্দিরের সামনের চত্বরের পেছনদিকে যেখানটায় আমরা বসেছিলাম সেখানে কয়েকটা নিচু কাঠের পাটাতন পাশাপাশি রাখা ছিল। সেগুলো খায় না মাথায় দেয় সেই নিয়ে আমরা নিচুগলায় বলাবলি করছি এমন সময় একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা বগলে করে একটা তোশকমতো নিয়ে উপস্থিত হলেন। লম্বাটে তোশকটা পাটাতনের ওপর বেছালেন। তারপর দুই হাতে দুই তোশকের গ্লাভস নিয়ে শুরু হল তাঁর প্রণাম। ব্যাপারটা দেখতে অনেকটা আমাদের সূর্যপ্রণামের মতো। দাঁড়িয়ে, হাঁটু ভেঙে বসে, সাষ্টাঙ্গ হয়ে শুয়ে, হাতের ওপর ভর দিয়ে উঠে, হাঁটু ভেঙে পিছিয়ে এসে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ানো। ভদ্রমহিলা অত্যন্ত দ্রুত ব্যাপারটা করে চললেন, একবার দু’বার, পাঁচবার, দশবার, কুড়িবার . . . অন্তত বারপঞ্চাশেক প্রণাম সেরে ভদ্রমহিলা আবার তোশকটোশক গুটিয়ে রেখে এসে নিজের জায়গায় বসে শান্ত মুখে মালা গুনতে শুরু করলেন। একটুও হাঁপালেন না, একটুও ঘামলেন না।

দেখেশুনে আমার আর অর্চিষ্মানের এমন হীনমন্যতা জাগল যে আমরা পাততাড়ি গুটিয়ে উঠে পড়লাম।

                                                                                                                               (চলবে)

বোনাস কুইজঃ নটা মাথা আর চৌত্রিশটা হাতওয়ালা তিব্বতি দেবতার নাম কী?  
   

June 25, 2015

টা টা বাই বাই/ আবার যেন দেখা পাই



বসের অনুমতি নেওয়া শেষ, বাসের টিকিট কাটা শেষ, হোটেলে ফোন করে ঘর বুকিং করা শেষ, অফিসের কাজ মুলতুবি রেখে নোটখাতার পেছনের পাতায় লিস্ট বানানোও শেষ। টুথব্রাশ থেকে শুরু করে হাওয়াই চটি। ও হ্যাঁ, আর অ্যাভোমিন। অ্যাভোমিন ভুললে চলবে না। একটা স্টার দিয়ে রাখি বরং। গুড।

এবার শুধু অফিস থেকে বাড়ি ফেরা, লিস্ট দেখে দেখে ধুপধাপ করে জিনিসপত্র ব্যাকপ্যাকে পোরা, আর ওলা/মেরু/উবার যে কোনও একটাকে ডেকে রাত দশটা নাগাদ আই এস বি টি-তে পৌঁছোনো। বাসে উঠে ঘুম, ঘুম ভাঙলে কাল সকালে ম্যাকলিওডগঞ্জ।

ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। সব বেড়াতে যাওয়ার আগেই হয়, কিন্তু এবার যেন আরও বেশি হচ্ছে। ইদানীং আমার মনটা বিশেষ ভালো যাচ্ছিল না। তাতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই অবশ্যনিরবচ্ছিন্ন মন ভালো থাকলেই বরং চিন্তার কথা। মাঝে মাঝে খারাপের ছিটে দেওয়া মোটের ওপর ভালো, আমার মতে মনের প্যাটার্ন এইরকমই হলেই বেস্ট। কিন্তু গত ক’দিনে সে প্যাটার্নে খানিক বদল টের পাচ্ছিলাম। ছিটেগুলো ক্রমেই বাড়তে বাড়তে গোটা মন অধিকার করে ফেলার চেষ্টা করছিল। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আবিষ্কার করছিলাম দম বন্ধ করে আছি। কাঁধদুটো শক্ত হয়ে, সিঁটিয়ে প্রায় কানের কাছে উঠে এসেছে। চারদিকে ঘিরে এসেছে ডিমেন্টরদের কালো ধোঁয়া ধোঁয়া শরীর।

তাদের এই রকম কাঁচকলা দেখিয়ে পালাচ্ছি বলে তো আনন্দ হচ্ছেই, তাছাড়াও অন্য একটা কারণ আছে। ম্যাকলিওডঞ্জ বা ধরমশালা আমার আর অর্চিষ্মানের একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার প্রথম জায়গা। তখন আমরা একে অপরকে এখনকার থেকে অনেক কম চিনতাম। (আজ থেকে পঁচিশ বছর বাদে মনে হবে দু’হাজার পনেরোর জুলাইয়ে আমি তো অর্চিষ্মানকে প্রায় চিনতামই না! ভাবা যায়?) তাছাড়া তখন ঝটিকাভ্রমণের কায়দাকানুন ফন্দিফিকিরগুলোও অজানা ছিল। ক্যামেরা ছিল না। জোম্যাটো ছিল না। বা থাকলেও ‘ধরমশালা রেস্টোর‍্যান্টস’ দিয়ে সেখানে সার্চ করার মতো বুদ্ধি আমাদের ছিল না।

কাজেই জায়গা বাসি হলেও এবার আমাদের বেড়ানোর অভিজ্ঞতা একেবারেই টাটকা হবে বলে আমার বিশ্বাস। চেনা জায়গাকে নতুন করে চেনার উত্তেজনায় হাতপা মনমাথা সেঁকছি গত চব্বিশঘণ্টা ধরে। আগেরবারের তুলনায় এবার হাতে সময়ও সামান্য বেশি, সেই সময়টুকু কীভাবে খরচ করব সে কথা ভেবে ভেবে রাতের ঘুম উড়ে গেছে। একবার মনে হচ্ছে পাহাড়ি রাস্তা ধরে খুব হাঁটব, একবার মনে হচ্ছে কোনও একটা শান্ত ক্যাফের কাঠের রেলিং দেওয়া বারান্দায় বসে কফি খেতে খেতে দূরে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকব। হয়তো ঝেঁপে বৃষ্টি নামবে, এ সব কিছুই করা হবে না, ঘরে বসে হোটেলের কুটকুটে কম্বল গলা পর্যন্ত টেনে টিভিতে সি আই ডি দেখতে হবে। আমার তাতে আপত্তি নেই।

যাই করি না কেন, সে সব কাণ্ডকারখানার গল্প আর ছবি সামনের সপ্তাহে ফিরে এসে আপনাদের শোনাবো আর দেখাবোততদিন আপনারা সবাই খুব ভালো থাকবেন।


June 23, 2015

যোগদিবসে কাবুলভ্রমণ



বছরের মাঝখানে পৌঁছে আমার বিবেক জেগে উঠেছে। আমার এককালের প্রাতর্ভ্রমণের অভ্যেস, অব্যবহারে অযত্নে যা প্রায় বিস্মৃত হয়েছিল, তাকে আবার ঝেড়েঝুড়ে রোজকার জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। তাতে সারাদিন বেশি এনার্জি, সকালবেলার মুক্তবায়ু সেবন (এটা অবশ্য বিতর্কযোগ্য। দিল্লির বায়ু সেবন করার থেকে বর্জন করাই স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো বলেন কেউ কেউ।) আরও যা যা প্রত্যাশিত উপকার হওয়ার ছিল সে সব তো হয়েছেই সঙ্গে সঙ্গে কিছু অপ্রত্যাশিত উপকারও হয়েছে। এক, পাড়ার সবক’টি কুকুরবেড়ালকে আমি আলাদা আলাদা করে চিনতে শিখেছি। বাদামি, কালো, ডোরাকাটা, সাদা, রোগা, মোটা তো বাইরে থেকে দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু কে শান্ত, কে দুষ্টু, কে বাধ্য বা বদমাশ সে সবও এ ক’দিনে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। আমার হাঁটার রুটে এক পশুপ্রেমী ভদ্রলোকের বাড়ি পড়ে। ভোর না হতেই তাঁর বাড়ির সামনে চারপেয়েদের মেলা বসে যায়। ওই জায়গাটা আমি আজকাল একটু আস্তে হাঁটি। প্রথমত, সাবধানতার খাতিরে। দ্বিতীয়ত, পশুচরিত্র পর্যবেক্ষণ করার লোভে। আগে আমি ভাবতাম কুকুর বেড়াল ইত্যাদি প্রজাতিগত পার্থক্য বাদ দিলে সব চারপেয়েই আসলে একই রকম। ঘুম পেলে ঘুমোয়, ক্ষিদে পেলে খায়। এখন দেখছি তাদের স্বভাবচরিত্র রীতিমত আলাদা। ওই ভদ্রলোকের বাড়ির সামনে নিয়মিত দুই বেড়াল হাজিরা দেয়। তাদের নাক চোখ মুখ গায়ের দাগের বিন্যাস সব হুবহু এক। কিন্তু একজন খালি ল্যাজ আকাশের দিকে তুলে ভদ্রলোকের দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে কাল্পনিক চার লেখার মতো করে ঘোরে আর অন্যজন রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়ে লাফ দিয়ে দিয়ে প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করে বেড়ায়।

সকালে হাঁটতে বেরোনোর দ্বিতীয় উপকারটা একেবারেই সাংসারিক। সফল-এর দোকানে ওই সময় লরি ভর্তি হয়ে নতুন জোগান আসে। একেবারে টাটকাতাজা তরিতরকারি, শাকপাতা, ফলমূল। সারা পাড়া হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আমিও হেঁটে ফেরার পথে মাঝেসাঝে যাই। আলুপটল নয়, আমার চোখ থাকে পুদিনার দিকে। ঘন সবুজ পাতাগুলোর ওপর সদ্য ছেটানো জলের ফোঁটা চিকচিক করে। একগোছা পুদিনা কিনে দোলাতে দোলাতে বাড়ি আসি। চায়ে দিয়ে খাই। অর্চিষ্মানকেও সাধি। ও বলে, “রক্ষে কর বাবা, অত স্বাস্থ্যকর চায়ে আমার কাজ নেই, আমার দুধচিনিই ভালো।”

রবিবার সকালে মেলা গ্রাউন্ডের মাঠে পৌঁছে চোখ কপালে উঠলমাঠের এক কোণে সাদা রঙের কাপড়ে মোড়া উঁচু মঞ্চ, তার সামনে লাল রঙের কার্পেট বিছোনো। কার্পেট জুড়ে লাইন দিয়ে বাচ্চাকাচ্চারা দাঁড়িয়ে আছে। মঞ্চের একপাশে তিনচারজন মোটা মোটা পুরুষমহিলা বসে আছেন। আর ঠিক মাঝখানে সাদা পায়জামা আর ও গেরুয়া পাঞ্জাবি পরা এক লিকপিকে ভদ্রলোক পি. টি.-র ভঙ্গিতে একবার দু’হাত কানের ওপর তুলছেন, একবার দু’পাশে ছড়াচ্ছেন আর জমায়েত বচ্চেলোগকেও সে সব করতে উসাহ দিচ্ছেন। এদিকসেদিক দুয়েকজন হাস্যকর রকমের ঢোলা খাকি প্যান্ট আর সাদা জামা পরে গম্ভীর মুখে ঘোরাফেরা করছে।

অমনি মনে পড়ে গেল। আজ তো বিশ্ব যোগ দিবস! এমন গুরুত্বপূর্ণ দিনটা আমি ভুললাম কী করে! এই দিনটা মনে রাখানোর জন্য গত একসপ্তাহ ধরে ঘণ্টায় তিনটে করে এস এম এস আসছে। সংগীত বাংলায় ‘বাওয়াল’ আর ‘জামাই চারশো বিশ’ সিনেমার গানের ফাঁকে ফাঁকে অভিনেতারা, যাঁরা এতক্ষণ “ঢিচক্যাঁও ঢিচক্যাঁও” গানের সঙ্গে (আমি বানিয়ে বলছি না, সত্যি সত্যিই গানের কথা “ঢিচক্যাঁও ঢিচক্যাঁও”) নেচে ফাটিয়ে দিচ্ছিলেন তাঁরা ভয়ানক সিরিয়াস মুখ করে এসে বলছেন, “সবাই ইয়োগা করুন। ইট ইস সোওওও গুড ফর স্ট্রেস

আমার হাঁটা চলতে লাগল। এক পাক ঘুরে এসে দেখলাম হাত পা নাড়া শেষ, ভদ্রলোক এখন দু’হাত সামনে ছড়িয়ে দিয়ে হাফ সিটিং-এ বসেছেন। পরের পাক সেরে এসে দেখলাম ভদ্রলোক পদ্মাসনে বসে ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস ছাড়ছেন। পরের পাক সেরে এসে আঁতকে উঠলাম। ভদ্রলোকের দুই পা এবার তাঁর ঘাড়ের পেছনে এসে উঠেছে। বচ্চেলোগ আর তাঁকে অনুসরণ করার কোনও চেষ্টা করছে না, ভয়ার্ত মুখে তাকিয়ে আছে।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি। ওই যে আসনটার কথা বললাম হঠযোগের গোটা সিলেবাসের মধ্যে ওইটাই অর্চিষ্মানের প্রিয়তম আসন। নিজে করার জন্য নয় অবশ্যই। আমি যখন সাড়ে তিন মাস বাদে বাদে একদিন  বসার ঘরের মেঝেতে যোগব্যায়াম করতে নামি (আপনারা কী ভেবেছিলেন, শুধু চানাচুর খাওয়াতেই আমার প্রতিভার শুরু আর শেষ?) তখন অর্চিষ্মান খুব বিরক্ত মুখ করে বলে, “ধুস্‌ কী সব সোজা সোজা আসন করছ, ওই পা তুলে ঘাড়ের পেছনে নেওয়ার ব্যায়ামটা যদি করতে পার, তবে বুঝি।”

ভদ্রলোক তার পরেও আরও কোনও কঠিনতর আসন করেছিলেন কি না জানি না, কারণ আমার বরাদ্দ পাক শেষ হয়ে গিয়েছিল মাঠ থেকে বেরিয়েই দেখি পাঁচিল ঘেঁষে বাঁশ পোতা সারা। এখন সেটা ঘিরে ব্যানার পেঁচানো চলছে। ব্যানারের গায়ে রংচঙে শিশিবোতলের ছবির ওপর বড় বড় করে লেখা ‘গুরুকুল আয়ুর্বেদ ফার্মেসি’।

আমি পুদিনা কিনে বাড়ি চলে এলাম। চা করে অর্চিষ্মানকে ঠেলা দিয়ে তুলে মেলাগ্রাউন্ডের ব্যাপারস্যাপার ফলাও করে বলতে বলতেই দেখি বন্ধ জানালার বাইরে বাড়িওয়ালার সজনে গাছটা মাতালের মতো দুলতে শুরু করেছে। দৌড়ে দরজা খুলে বারান্দায় বেরোলাম। কী ঝড়! কী ঝড়! আমাদের বাড়ির পেছনের গলিটার ধুলোগুলো সব পাক খেয়ে উড়তে লাগল, উল্টোদিকের বাড়ির ভদ্রমহিলা অত্যন্ত বিরক্ত মুখে ছাদে উঠে দড়িতে ঝোলানো জামাকাপড় টেনে টেনে নামাতে থাকলেন।আমাদের বারান্দায় দিবারাত্র শুয়ে রোদ পোয়ানো বেড়ালটার দুটো বাচ্চা হয়েছে, তারা সারাদিন দৌড়োদৌড়ি করে খেলে আর আমাদের কাউকে আসতে দেখলেই এমন ধড়ফড় করে ল্যাজ তুলে পালায় যেন আমরা পেশাদার বেড়াল-কিলার। বেশিদূর যায় না আবার, দেওয়ালের আড়াল থেকে মুণ্ডু বার করে দেখে আমরা আছি না গেছি। সেই বাচ্চাদুটো খেলা ফেলে বারান্দার তলায় উদাস মুখে বসে থাকা মায়ের কোলে এসে সেঁধোলো। গলি দিয়ে এক ভদ্রমহিলা এক বাড়ির কাজ সেরে অন্য বাড়ি যাচ্ছিলেন, তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে নাকমুখ ঢেকে খুব আস্তে আস্তে পায়চারি করার ভঙ্গিতে হেঁটে চললেন। কাজের মাঝে যতখানি হাওয়া খেয়ে নেওয়া যায়।

এইসব দৃশ্যাবলোকন করতে করতে আমরা ভাবতে লাগলাম মাঠের যোগসম্মেলনের কী হল? গুরুকুল ফার্মেসির চালা কি উড়ে গেল? বচ্চেলোগ কি ছত্রভঙ্গ হয়ে ছুটে পালাল? এমন সময় প্রকাণ্ড ফোঁটায় চড়বড় করে বৃষ্টি নামল।

আর ঠিক তখনই কাবুল ঘুরতে যাওয়ার কথাটা আমাদের মাথায় এল।

কাবুল?! ভিসা নেই, পাসপোর্ট নেই, কাবুল যাব মানে? এ কি জয়পুর পেয়েছি যে হোস্টেলে সারারাত আড্ডা মেরে চারটের সময় মনস্থির করে পাঁচটার বাস ধরে চলে যাব? তাও যাওয়ার আগে হাওয়াই চটি ছেড়ে জুতো পরতে গিয়েছিলাম বলে পরের ছ’মাস সবার ঠাট্টার পাত্র হতে হবে?

আর ছ’মাস বাদে পঁয়ত্রিশ হবে, হাওয়াই চটি পরে জয়পুর তো দূরস্থান, চুল না আঁচড়ে দু’নম্বর মার্কেটেও আর যেতে পারি না। কাবুল তো ছেড়েই দিলাম।

তবে?

তবে আর কিছুই না। এক পাড়াতে পাঁচটা বাপি থাকতে পারে আর এক পৃথিবীতে একটার বেশি কাবুল থাকতে নেই বুঝি? আমরা যে কাবুলে যাওয়ার প্ল্যান করলাম সে ছিল আমাদের হাতের কাছেই। সেখানে যেতে ভিসা লাগে না, পাসপোর্ট লাগে না, অটোতে মোটে ষাট টাকা ওঠে (যদি অবশ্য অটো ভাইসাব মিটারে যেতে রাজি থাকেন)

দিল্লির লোকেরা এতক্ষণে বুঝতে পেরে গেছেন আমি কোন জায়গার কথা বলছি। লাজপত নগর।

সি আর পার্কে যেমন বাঙালিদের, লাজপত নগরে তেমনি আফগানিদের বাড়বাড়ন্ত অনেকদিনের। কবে প্রথম তাঁরা লাজপত নগরে বাসা বাঁধতে শুরু করেছিলেন সে সব সনতারিখ ঐতিহাসিকরা বলতে পারবেন। আমি শুধু জানি লাজপত নগরের অলিতেগলিতে তাঁরা ক্রমেই জাঁকিয়ে বসছেন। এতই জাঁকিয়ে বসছেন যে পুরোনো পাঞ্জাবি অধিবাসীরা মুখ গোমড়া করে বলছেন, “আমরাই তো এখানে সংখ্যালঘু এখন, লাজপত নগর নাম বদলে আফগান নগর করে দিলেই হয়

সবাই যে স্থায়ী বাসিন্দা তেমন নয় কিন্তু। অস্থায়ী অতিথিও আছেন প্রচুর। প্রচুর আফগান ছাত্র আজকাল দিল্লিতে পড়তে আসেন। তাঁদের থেকেও বেশি সংখ্যায় আসেন আফগান রোগীরা। বলাই বাহুল্য, তাঁরা এসে ভাইবেরাদরের কাছেই থাকতে চান। তাছাড়া সাকেতের ম্যাক্স হাসপাতাল আর মূলচন্দ মেডসিটির হাতের নাগালে হওয়াটাও নাকি আফগান রোগীদের কাছে লাজপত নগরের দর বাড়ার একটা কারণ।

আর থাকা মানেই খাওয়া। বিদেশে গিয়ে সে দেশের রান্নাবান্না চেখে দেখার বিলাসিতা শখের ঘুরিয়েদের পোষায়। যারা পড়তে এসেছে কিংবা অসুখ সারাতে কিংবা হয়তো ভিটেমাটির পাট চুকিয়ে এসেছে চিরজন্মের মতো, তাদের নিজেদের দেশের খাবার খেতে ইচ্ছে করে। লাজপত নগরের গলিতে গলিতে শের-ই-পাঞ্জাব আর পিণ্ড বালুচ্চির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খুলেছে আফগানি খাবারের দোকান। সে রকমই একটা দোকান হল কাবুল দিল্লি।

জি পি এস যেখানে গিয়ে বলল “ইউ হ্যাভ অ্যারাইভড”, যথারীতি সেখানে গিয়ে আমরা কিচ্ছু দেখতে পেলাম না। ঘাবড়াইনি অবশ্য। চোখের সামনে আফগান দরবার জ্বলজ্বল করছে, কাবুল দিল্লি না পেলে সেখানেই ঢুকে যাব। একটা ওষুধের দোকানের সামনে মাথায় পাগড়ি বাঁধা এক কিশোর সর্দারজী একাগ্রচিত্তে মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি আর লোক না পেয়ে তাকেই জিজ্ঞাসা করলাম, “কাবুল দিল্লি কাঁহা হ্যায় পাতা হ্যায়?” সে ছেলে ফোন থেকে মুখ তুলে একবার আমার দিকে, একবার ওষুধের দোকানের বোর্ডটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ইয়ে তো নেহি হ্যায়

আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল। আমার মুখ দেখে ছেলেটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুটো সিঁড়ি উঠে গিয়ে দোকানের দরজাটা ঠেলে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ইয়ে কাবুল দিল্লি হ্যায় কেয়া?”

আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মুখ আরও বড় হাঁ করে অর্চিষ্মানের দিকে তাকালাম, অর্চিষ্মান দাঁত বার করল যেন খুব হাসির ব্যাপার কিছু হয়েছেদোকানের ভেতর থেকে কেউ একজন মুহ্‌তোড় জবাব কিছু দিলেন বোধহয় কারণ ছেলেটা লজ্জা লজ্জা মুখ করে হাসল। তারপর ভেতর থেকে আরও কিছু একটা নির্দেশ এল আর ছেলেটা গলির ভেতর দিকে আঙুল দেখিয়ে আমাদের বলল, “ম্যাডাম, উধার চলে যাইয়ে।”

উধারপানে দশ পা যেতেই দেখলাম কাবুল দিল্লি রেস্টোর‍্যান্ট। রেস্টোর‍্যান্টের টি আর ইউ-র পরের এ টার রং চটে গেছে। জোম্যাটোর ছবিতেও ঠিক এই রকমই দেখেছিলাম! যাক বাবা, অথেনটিক কাবুল দিল্লিতে এসে পড়েছি।

কাবুল দিল্লি বেশ মনোরম রেস্টোর‍্যান্ট। দু’জন খাইয়ের পাশাপাশি আরাম করে বসতে পারার মতো গদি আঁটা মুখোমুখি দুটি সোফার মাঝে একটি করে টেবিল। দুটি বসার জায়গার মধ্যে কলকার কাজ করা কাঠের উঁচু দেওয়াল। আমাদের টেবিলের আড়াআড়ি টেবিলের পাশের দেওয়ালে একজন আফগান বড়মানুষের চিত্র ঝুলছিল। আমি তখন নামটা মুখস্থ করে নিয়েছিলাম কিন্তু এখন আর মনে পড়ছে না। সেই টেবিলে একজন একলা খাইয়ে বসেছিলেন। তাঁর এক চোখে মোটা ব্যান্ডেজ বাঁধা। ভদ্রলোকের বোধহয় খুব কষ্ট হচ্ছিল কারণ তিনি মাঝে মাঝেই মাথা টেবিলে নামিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। বেশি খেতেও পারলেন না মনে হল। খালি বড় এক টি-পট ভর্তি চা নিলেন আর এক প্লেট কাবাব। সেটাই ধীরে ধীরে খেলেন অনেক সময় নিয়ে।


আমরা অবশ্য প্রাণ ভরে খেলাম। দু’রকমের কাবাব, একরকমের মাটন পোলাও। পোলাওয়ের সঙ্গে একটা ঝোলওয়ালা পদও অর্ডার করব ভেবেছিলাম, বিশেষ করে মেনুতে ইয়াখ্‌নি দেখে মন নেচে উঠেছিল, কিন্তু শেষমেশ করিনি। ভাগ্যিস করিনি, কারণ ওই খাবার শেষ করতেই আমাদের প্রাণ বেরোনোর দশা হয়েছিল।

আফগানি খাবার খুবই আমিষকেন্দ্রিক কিন্তু বেশি মশলাদার নয়। এই যেমন কাবুল উজবেগি পোলাওয়ের কথাই ধরা যাক। আকারআকৃতিতে আমাদের বিরিয়ানির মতোই, কিন্তু স্বাদেগন্ধে একেবারেই আমাদের বিরিয়ানির মতো নয়। অন্তত চারভাগের একভাগ তেল দিয়ে বানানো, মশলাও নামমাত্র। তা বলে স্বাদে কোনও অংশে খাটো নয়। পার্সি দোকানে বেরি পোলাও খেয়েছিলাম, তার সঙ্গে বেশ মিল আছে। তবে বেরি পোলাওয়ের থেকে অনেক বেশি সুগন্ধী। প্লেট এনে সামনে রাখা মাত্র সারা টেবিল একেবারে ম’ ম’ করে উঠেছিল। গাজর, কিশমিশ আরও নানারকম ভালো ভালো জিনিস দিয়ে তৈরি হয় এই পোলাও।

কিন্তু গাজর কিশমিশ যতই ভালো হোক না কেন, সেগুলো খেতে তো যাইনি। প্লেটটা প্রথম দেখে গন্ধে অভিভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আতংকও হয়েছিল।

মাংস কোথায় গো! ভেজিটেরিয়ান পোলাও দিয়ে গেল নাকি?

আহা, একটু দেখ আগে, ভাতের নিচে চাপা পড়ে গেছে হয়তো।

তাই বটে। চামচ দিয়ে ভাতের আড়াল খানিক সরাতেই তাঁরা বেরিয়ে পড়লেন।

এই হচ্ছে গিয়ে জিগর কাবাব। বেসিক্যালি, আগুনে সেঁকা মেটে। খাবার জিনিসের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, কান, কানকো, মাথা, মগজ, কলজে, পাকস্থলী সবই আমি খেতে পারি, অর্চিষ্মান আবার আলাপপরিচয় অত গভীরে নিয়ে যেতে পছন্দ করে না, “হ্যালো ওয়াস্‌সাপ”-এই কাজ সারে। এই কাবাবটা মূলত আমার পছন্দের কথা ভেবেই অর্ডার করা হয়েছিল। অর্চিষ্মান এক পিস খেয়ে “অ্যাঃ, গন্ধ” বলে আর ছোঁয়নি। আমার অবশ্য ভালোই লেগেছে।  

কিন্তু সেদিনের লাঞ্চের দিল, জান, জিগর যদি কিছু হয়ে থাকে তবে তা আর কেউ নয়। সে এই চোপান কাবাব।


অন্য সব ভালো জিনিসের সংজ্ঞা যা, আমার মতে ভালো খাবারের সংজ্ঞাও তাই। ভালো বন্ধু সে-ই যার সঙ্গে থেকে আপনি একটু ভালো হয়ে যান। ভালো প্রতিযোগী সে-ই যাকে হিংসে করে আপনি নিজের কাজে ক্রমে ভালো থেকে ভালোতর হয়ে ওঠেন।


চোপান কাবাব খেতে খেতে আপনিও ভালো মানুষ হয়ে উঠবেন। আপনার বাচালতা কমে আসবে, দৃষ্টি মেদুর হবে, হৃদয় উদার হবে। মনে পড়ে যাবে, কতদিন আপনি ঠাকুমাকে ফোন করেননি। শপথ নেবেন, আজ বাড়ি গিয়ে ঠাকুমার গলা না শুনে ক্যান্ডি ক্রাশের চক্রব্যূহে পদার্পণ করবেন না। প্লেটের শেষ কাবাবটা তুলে নিতে গিয়ে ভাববেন, নাঃ, আমি তো অনেক খেয়েছি, এটা ও খাক।

শেষ কাবাবটা নিয়ে তিনবার “তুমি খাও তুমি খাও” বলে একে অপরের প্লেটে চালাচালি করার পর (সেটা সদ্যলব্ধ উদারতার কারণেও হতে পারে আবার আর খেলে সত্যি সত্যি পেট ফেটে যাবে সেই আশংকাতেও হতে পারে) আমরা বিল আনতে বললাম। খাওয়া শুরু করার আগে ডেসার্টে চা খাওয়ার যে পরিকল্পনাটা ছিল সেটা বাতিল করতে হল। এখন সোজা বাড়ি গিয়ে প্রথমে খাটের ওপর দু’ঘণ্টা শবাসন, তারপর অন্য কথা।


সব অর্ডারের সঙ্গে আফগানি নান আর এক প্লেট রাজমা ফাউ আসে। নানগুলো খুবই চমকার খেতে। নরম, ফুলকো। কিন্তু দুঃখের বিষয় পোলাওয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। কাজেই আমরা দু’জনে খালি চেখে দেখার জন্য এক কামড় এক কামড় করে খেয়েছিলাম, বাকি বাটি অধরা পড়েছিল। রাজমার প্লেটের দিকে তো তাকানোরও ফুরসৎ পাইনি।

যুদ্ধ শেষ

কারা জিতেছে সেটা নিশ্চয় আর বলে দিতে হবে না

দিল্লিতে এত রকম খাবারের এত রকম দোকান যে খুব কম দোকানে দ্বিতীয়বার যাওয়া হয়ে ওঠে। সেটা আমাদের একটা বড় আফসোস। কত দোকানে খাবার খেয়ে উঠে আসার সময় বলাবলি করি, আবার আসব কিন্তু, আসবই। আর হয়ে ওঠে না। মেঘালয় ভবনের ফিশ কাপ্পাটার কথা এখনও মাঝে মাঝেই মনে পড়ে, ত্রিবেণী কলাকেন্দ্রের ক্যান্টিনের ফিশফ্রাইটার কথাও। হাঁটু ধরে চারতলা সিঁড়ি ভেঙে পটবেলি রুফটপ ক্যাফেতে উঠেছিলাম লিট্টি চোখা আর চম্পারণ মাটন খেতে। মেনুতে ম্যাগির রকমফের দেখে চোখ টেরিয়ে গিয়েছিল। ধামাকা ম্যাগি, কিমা ম্যাগি, ম্যাগি মাশরুম। যাব যাব করে যাইনি, এখন তো ম্যাগি উঠেই গেল। শীতের সকালের রোদ পিঠে নিয়ে রোজ ক্যাফেতে বসে দার্জিলিং চা আর পিটা চিপস খেয়েছিলাম, মনে হয়েছিল অর্চিষ্মানকে চিমটি কেটে দেখি এই পৃথিবীতেই আছি না স্বর্গে চলে গেছি। সেই স্বর্গেও আর ফিরে যাওয়ার সময় হয়নি। নতুন একটা হিডেন জেম বেরিয়ে পড়েছে, কেউ ফোন করে খবর দিয়েছে, “ওই দোকানটায় যাসনি এখনও? আর ইউ গাইস লিভিং আন্ডার রক অর হোয়াট?”

কাবুল দিল্লি-র সঙ্গেও সেরকমটাই ঘটবে হয়তো। এখন মনে হচ্ছে খুব শিগগিরি যাব, যাবই। চোপান কাবাবের টান এড়িয়ে থাকব কী করে? সে টান সময়ে কমে আসবে। কিন্তু আমরা যদি আর না-ও যেতে পারি, আপনারা, যারা কাছেপিঠে থাকেন, মাংস খেতে ভালোবাসেন, তাঁরা অবশ্য করে যাবেন। আমি কথা দিচ্ছি, পস্তাবেন না।

*****


Kabul Delhi Restaurant
E 104, Ground Floor, Near Central Market, Lajpat Nagar 2, New Delhi
011 29824782, +91 7838978899 

       

June 21, 2015

সাপ্তাহিকী






Anybody can sympathise with the sufferings of a friend, but it requires a very fine nature to sympathise with a friend's success.
                                                         ---Oscar Wilde

আমি বেড়াল। আপনি কী?

ছবিতে হলুদ রঙের বাড়াবাড়ি দেখলে সেটাকে মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়ে ভ্যান গঘ বলে চালিয়ে দেওয়ার টোটকাটা এক আর্টবোদ্ধা বন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছিলাম। অন্য কয়েকজন শিল্পীর ছবি চিনতে পারার টোটকা এঁরা দিচ্ছেন।

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের আঁকা আত্মপ্রতিকৃতি তো সকলেই দেখেছেন, কিন্তু ফোটোগ্রাফ দেখেছেন কি?


বেডরুমে, বাথরুমে, রান্নাঘরের কাউন্টারে, সিঁড়িকোঠায় এমনকী খোলা মাঠেও লোকে ওসব করে শুনেছি। তা বলে মহাকাশে?

মানুষ পড়ে গেলে যত হাসি পায় রোবট পড়ে গেলেও কি ততটাই হাসি পায়? পরীক্ষা করে দেখুন।



সুইডেন বেশ ভালো দেশ এটা আগেও শুনেছিলাম।

পৃথিবীর সবথেকে বিখ্যাত সমীকরণ কোনটা জিজ্ঞাসা করলে সবাই বলতে পারবেন। কিন্তু সেই সমীকরণটার মানে কী জিজ্ঞাসা করলে ক’জন হাত তুলবেন? আমি তো তুলব না।


  

June 20, 2015

Things I am Loving




গত শনিরবি হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই বৃষ্টি নেমেছিল দিল্লিতে। একেবারে মেঘ ডেকে, বিদ্যুৎ চমকে, ঝমঝম আওয়াজ করে, সোঁদা মাটির গন্ধ ছেড়ে। আমি তো অবাক। জুনের শুরুতে বৃষ্টি? দিল্লিতে? তারপর মা যখন জানালেন যে আবহাওয়া অফিস থেকে বলেছে এ বছর বৃষ্টি কম হবে, অন্যান্য বছরের তুলনায় মোটে নাকি অষ্টাশি শতাংশ, তখন রহস্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল।

এখন আবার যে কে সেই হয়ে গেছে, কিন্তু সেই বৃষ্টির জের বেশ কদিন চলেছিল। বেশ কদিন সারাদিন মেঘেরা আড়াল তুলে সূর্যকে ঢাকা দিয়ে রেখেছিল, বেশ কদিন রাতে এসি নিভিয়ে জানালা খুলে ঘুমোনো গিয়েছিল। তাতে মাঝরাতে ঘুম ভাঙছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা মশার কামড়ে, গরমে ঘেমে নয়।

আর ওই সময়টাতেই এই পোস্টটার কথা মগজে আসতে শুরু করেছিল। থিংস আই অ্যাম . . .নামের ট্যাগটা বহুদিন একা পড়ে আছে, সেটাকে এই বেলা হৃষ্টপুষ্ট করে তোলা যাক। আচ্ছা, ভালো ভালো সব ব্যাপার ঘটে বলে মন ভালো থাকে, নাকি মন ভালো থাকে বলেই সাধারণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারগুলোও ভালো বলে ঠেকে? যাকগে এসব জটিল প্রশ্ন নিয়ে ভেবে মাথাগরম করে লাভ নেই, সোজা লিস্টে ঝাঁপানো যাক।

১। লিস্টের প্রথম দুটো জিনিসই ওপরের ছবিতে আছে। বৃষ্টির আগে যখন অমানুষিক গরমটা পড়েছিল তখন এই রেসিপিতে চা বানাতে শুরু করি। সকালবেলার চায়ে দুধ দেখলেও তখন আমার মাথা ঘুরে যাচ্ছিল। আমি চায়ে দুধের বদলে একটি করে পুদিনার একটি করে পাতা আর এক ফালি লেবু দিতে শুরু করলাম। এখন তো একটা ছোট  বাক্সে করে শুকনো পুদিনা পাতা অফিসেও নিয়ে যাই। লেমন টি ব্যাগের সঙ্গে একটা কি দুটো মিশিয়ে দিই। চমৎকার লাগে। আগে সকালের চায়ে ঘুম ছাড়ত, এখন মন ভালো হয়ে যায়।

আপনারাও খেয়ে দেখতে পারেন। ব্যাপারটা ভালো খেতে এটা যদি যথেষ্ট জোরালো যুক্তি না হয় তাই আমি আপনাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য ইন্টারনেট ঘেঁটে পুদিনা-চায়ের উপকারিতা খুঁজে বার করেছি। এই রকম চা খেলে নাকি IBS নামের এক কঠিন অসুখ সারে (জ্যোতি বসুর নাকি IBS ছিল। আনন্দবাজারের হেডলাইনে পড়েছিলাম।) তাছাড়াও ব্রণ উপশম হয়, রক্ত পরিষ্কার হয়, দেহ থেকে টক্সিন দূর হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

সত্যি বলছি, এই সব প্রতিশ্রুতিতে কান দেওয়া আমি অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছি। আমি সারাদিনে অন্তত চার লিটার জল খাই (কারণ সেই ছুতোয় অফিসের কাজ আর অবান্তরের লেখা থেকে একশোবার ওঠা যায়) আর অবান্তরের স্টেট ভবনের পোস্ট পড়ে যা-ই মনে হোক না কেন, আমি বেসিক্যালি রুটি আর কলমিশাক খেয়ে জীবনধারণ করি। এর থেকে হেলদি ডায়েট পৃথিবীর আর কেউ মেন্টেন করে বলে আমার জানা নেই। এবং আমার মুখে সর্বক্ষণই অন্তত সাড়ে তিনখানা করে ব্রণ বিরাজ করে।

দেখেশুনে আমি বাবার মতই মেনে নিয়েছি। কপালে (আর গালে, আর চিবুকে) যদি ব্রণ লেখা থাকে, তবে কোনও ডায়েট, কোনও ডাক্তারের সাধ্য নেই তাকে আটকায়। ঠিক যেমন কপালে ঝকঝকে, তুলতুলে ত্বক লেখা থাকলে কোনও সিঙাড়া, কোনও আলুর চপের সাধ্য নেই তাকে মাটি করে।

কিন্তু আপনারা যদি গুণাগুণ দেখে উৎসাহ বোধ করেন তাই বললাম। আমি পুদিনা চা খাই স্রেফ ভালো লাগে বলে। গরম জলে পড়ে যখন শুঁটকো পাতাটা ফুলের মতো ফুটে ওঠে, আর চুমুক দেওয়ার পর ঝাঁঝালো মিঠে গন্ধটা মুখের ভেতর ছড়িয়ে যায় তখন মনে হয় এ যেন সামান্য রোজকারের চা খাওয়া নয়, তার থেকে বেশি কিছু।

২। দ্বিতীয় ভালোলাগার জিনিসটাও পুরোটা না হলেও অল্প অল্প ওই ছবিতেই দেখা যাচ্ছে। আমার জানালার বাগান।

ঠাকুমা চোখ কপালে তুললেন বাস্তবের ঠাকুমা, যিনি রিষড়ার বাড়ির বিছানায় শুয়ে শুয়েই সারা পাড়ার খবর জোগাড় করছেন তিনি নন, আমার মাথার মধ্যে যিনি চব্বিশঘণ্টা বিরাজ করেন তিনি।

বাগান?!”

আচ্ছা বাবা, বাগান নয়। গার্ডেন। হয়েছে? ঊইন্ডোসিল গার্ডেন।

গার্ডেন আর বাগান একই কথা। বয়েজ স্পেলিং বুক পড়েছি আমি। আমাকে ভুজুং দিস না। এগুলো কী?”

একেবারে বাঁ দিকেরটা সিংগোনিয়ামএকটু থেমে আমি যোগ করি, “ইন এক্সকুইজিট অরেঞ্জ মেটাল প্ল্যান্টার মাঝেরটা অ্যাগলোনেমা হোয়াইট গ্রিন থ্রি ইন ওয়ান, ডানদিকেরটা ক্লোরোফাইটাম কোমোসাম। জিভে আটকে গেলে স্পাইডার প্ল্যান্টও বলতে পার। অবশ্য কেন যে স্পাইডার ভগবান জানে, তার থেকে ফোয়ারা প্ল্যান্ট বললে অনেক লাগসই হত। তার পাশেরটা . . .

এগুলো কোন কাজে লাগে?” অভদ্রের মতো আমার কথার মধ্যে কথা বলে ওঠেন ঠাকুমা

ফল দেয়? ফুল দেয়? পুজোয় লাগে? (শুধু সৌন্দর্যবৃদ্ধি করে যে সব ফুল তাদের ঠাকুমার ফুলের গোত্রে ফেলেন না), সকালবেলা উঠে কাঁচা পাতা চিবিয়ে নয় তো বেটে খেলে পেট ঠাণ্ডা হয়?”

উফ ঠাকূমা, সর্বক্ষণ পেট পেট কোরো না তো। মাথার কথাটাও একটু ভাব।

ওরে, ভুঁড়ি ঠিক না থাকলে মুড়িও ঠিক থাকে না রে। এই সহজ কথাটা যে কবে বুঝবি।

আমি ঠাকুমার কথায় কান দিই না।

এ কি তোমার দুর্গন্ধময় গাঁদাল পেয়েছ যে যখনতখন তুলে বেটে খেয়ে নেবে? এ সব অনেক উচ্চমার্গের গাছ। এদের মূল অবদানটা হচ্ছে এয়ার পিউরিফিকেশন অ্যান্ড স্ট্রেস রিডাকশনের ফিল্ডে পাঁচ মিনিট টানা তাকিয়ে থাকলেই বুঝবে হৃদপিণ্ডের গতি কমে আসছে, নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস মোলায়েম হয়ে আসছে . . .

বুঝেছি। আগাছা।

চোখ ঘুরিয়ে ঠাকুমা আলোচনায় দাঁড়ি টানেন।

সে ঠাকুমার সংজ্ঞায় এ আগাছাই হোক বা আবর্জনা, আমার কাছে এরা গাছ। রীতিমত বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন, সংবেদনশীল গাছ। যেদিকে আলো সেদিকে পাতা বাড়ায়, জল দিলে দুদিন পরে ছোট ছোট নতুন পাতা বার করে। এমনকি বৃষ্টি পড়লে জানালা খুলে দিলে, মাথা নেড়ে নেড়ে থ্যাংক ইউবলতেও স্পষ্ট শুনেছি।

 যবে থেকে এই পোস্টটা মাথার ভেতর দানা বাঁধতে শুরু করেছে তবে থেকে ভেবে চলেছি এই ভালোলাগাটাকে পোস্টে রাখাটা উচিত হবে কি না ওপর ওপর দেখলে ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছে কাজেই থিংস আই অ্যাম লাভিং পোস্টে ঘটনাটার জায়গা হওয়া উচিত। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে ব্যাপারটা যতটা না ভালোলাগার তার থেকে বেশি অহংকারের। মায়ের মতে, সব পতনের মূলে যা।

যাই হোক, পতনই হোক বা উত্থান হোক, মাথায় এসেছে যখন বলেই ফেলি। ইদানীং আমাদের অফিসে লাঞ্চে ভবন/সদন/নিবাসের ক্যান্টিনে খেতে যাওয়ার একটা হাওয়া উঠেছে। আমি জানি যে স্টেট ক্যান্টিনে খেতে যাওয়াটা দিল্লি শহরের একটা অতি পুরোনো এবং চেনা টাইমপাস। সকলেই জানে যারা জানে না, তারাই পাগল। কিন্তু অনেক সময় জানার ওপরেও তো বিস্মরণের ধুলো পড়ে, তাই না? আমাদের অফিসের লোকজনেরও তাই হয়েছিল নির্ঘাত। আমার ঘন ঘন স্টেট ভবনে খেতে যাওয়া এবং খেয়ে এসে দুয়েকজনের কাছে গল্প করে বলার পর সে ধুলো সরে গেছে। সবাই এখন দল বেঁধে যাচ্ছে, কোনওদিন ওডিশা নিবাস, কোনওদিন জাকোই, কোনওদিন ভিভা লা ভিভা। যাওয়ার আগে মাঝেসাঝে আমার কাছে টিপস নিতে আসে। আমি মুখে খুব উৎসাহ দেখিয়ে বলি, “এখানে যাও ওখানে যাওকিন্তু মনের ভেতরে ভয় ভয় করে। আমার মতো বুড়োদের স্টেট ক্যান্টিনে খেতে ভালো লাগে বলে এ সব তরুণ তুর্কিদেরও যে ভালো লাগবে তার তো মানে নেই। সরকারি বাড়ির সরকারি চাল, কেঠো চেয়ারটেবিল, সরকারি পরিষেবার সংজ্ঞা এদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কি না সেই নিয়ে ভেতরভেতর টেনশন হয়।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত প্রতিবারই টেনশন অযথা প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিবারেই খেয়েদেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ফিরেছে সবাই। কেউ কেউ আবার বাড়ির লোক সঙ্গে নিয়েও গেছে শুনেছি। যাক বাবা।

৪। তালিকার শেষ ভালোলাগাটা অটো থেকে দেখা একটা দৃশ্য। দিল্লিতে এখন মেশিন কা ঠাণ্ডা পানি’-র সিজন শুরু হয়েছে। দো রুপেয়া গিলাস। প্রতি ফুটপাথের এ মাথা ও মাথায় একজন করে ভুট্টাবিক্রেতা আর একটা করে ঠাণ্ডা পানির মেশিন। বেসিক্যালি, স্টিলের চৌকো ফ্রিজ। ফ্রিজের ওপর একটা ডাণ্ডা মতো উঁচিয়ে থাকে। সেটা হচ্ছে পাম্প। পাম্প চেপে ধরলে গায়ে লেগে থাকা কল থেকে কনকনে ঠাণ্ডা জল বেরিয়ে আসে। সে জল পরিবেশনের জন্য পাশে সাজানো থাকে সারি সারি উল্টোনো কাঁচের গ্লাস। যে সব বিক্রেতার সাজগোজের দিকে নজর থাকে তাঁরা গ্লাসগুলোকে তাসের বাড়ির মতো করে একটার ওপর একটা রেখে তাসের বাড়ির মতো সাজান। এঁদের মেশিনের ওপর আবার গোছা করে ধনেপাতাও রাখা থাকে, যদিও আমি কখনও কাউকে জলের সঙ্গে ধনেপাতা মিশিয়ে খেতে দেখিনি। তবে দেখনদার অদেখনদার সব রকম জলবিক্রেতার মেশিনের ওপরেই একটা চিৎ করা গ্লাসে ঠাসাঠাসি করে পাতিলেবু রাখা থাকে। আর চামচ ডোবানো একটা বয়ামে বিটনুন।

আমি যখন সকালবেলা অফিস যাই, এই ঠাণ্ডা পানিওয়ালারাও অফিস যান। বা অফিসটাকেই ঠেলে ঠেলে নিয়ে যান বলা ভালো। অত ভারি অফিস ঠেলা কি সোজা কথা? সকলেই বুদ্ধি করে শার্ট খুলে গাড়ির ওপর রাখেন, কিন্তু তাতে আর কত গরম কমে। ঘামে ভিজে তাঁদের গেঞ্জির রং গাঢ় হয়ে যায়। যে যার বাড়ির সামনেই কেন মেশিন নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন না সেটা একটা রহস্য। ফুচকাওয়ালা আর আইসক্রিমওয়ালাদের মধ্যেও এ ব্যাপারটা দেখেছি। মাঝরাতে দমদমে নেমে ত-কাকুর গাড়ি চেপে বাড়ি ফিরছি, বালি ব্রিজ থেকে নেমে রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিয়ে হাওড়া পেরিয়ে হুগলিতে ঢুকছে সেখানে দেখি ফুচকাওয়ালাদের মৌনমিছিল চলেছে। লাইন দিয়ে একের পর একজন গাড়ি ঠেলে হনহন করে হাঁটছেন। কারও মুখে কথা নেই।

বাবা বলেছিলেন এতে নাকি অবাক হওয়ার কিচ্ছু নেই। কোন একটা জায়গার নাম বলেছিলেন ভুলে গেছি, শুধু মনে আছে সেটা অনেক দূর। এই সব ফুচকাওয়ালারা নাকি সবাই সেখানে থাকেন। রোজ সকালে ফুচকার গাড়ি ঠেলে এক, দেড়, দুঘণ্টা হেঁটে যে যার নির্দিষ্ট জায়গায় যান আবার রাতে হেঁটে হেঁটে ফিরে আসেন। আইসক্রিমওয়ালাদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। মাঝরাতে ইন্ডিয়া গেট থেকে মিছিল শুরু হয়, কোথায় গিয়ে থামে কে জানে।

সমতল রাস্তা হলে তাও একরকম। কিন্তু দিল্লির মতো শহরে, যেখানে ট্র্যাফিকের সুবিধে (আবহাওয়া-বিজ্ঞানীরা অবশ্য অনেকেই এতে কোনও সুবিধে দেখেন না। তাঁরা বলেন গলগল করে কার্বন মোনোক্সাইড ওগরানো বাহনের সুবিধে বাড়ানো মানেই পৃথিবী আর তার বাসিন্দাদের অসুবিধে বাড়ানো।) আর শোভাবর্ধনের জন্য ফ্লাইওভারে ছেয়ে ফেলা হয়েছে চারদিক, সেখানে এই গাড়ি ঠেলা অমানুষিক পরিশ্রম। বিশেষ করে জলের গাড়ি। অমানুষিকই নয়, প্রায় অসম্ভবও।

তাই গাড়িওয়ালারা একটা উপায় বার করেছেন। ফ্লাইওভারের মুখে পৌঁছে দুজন গাড়ি থামান। এবার একটা গাড়িকে দুজন মিলে ঠেলে ঠেলে ব্রিজের ওপরে তোলেন। সেখানে সেটাকে রেখে আবার ব্রিজের মুখে ফিরে আসেন। অন্য গাড়িটাকে দুজনে মিলে ঠেলে ব্রিজের ওপরে তোলেন। তারপর যে যার গাড়ি নিয়ে ব্রিজ থেকে নেমে যান।

সেদিন আমার বেরোতে সামান্য দেরি হয়ে গিয়েছিল। সাধারণত একটা সময়ের পর অটো পেতে প্রাণান্ত হয়, কিন্তু কী ভাগ্যিস সেদিন একজন অটো ভাইসাবও লেট করে স্ট্যান্ডে এসেছিলেন। লাফ দিয়ে চড়ে বসে রওনা দিলাম। সকালবেলা সামান্য পনেরো মিনিটের আগুপিছুতে ট্র্যাফিকের পরিস্থিতি কতটা বদলে যায় যতবার দেখি নতুন করে চমক লাগে। পনেরো মিনিটের লেট বাড়তে বাড়তে কুড়ি থেকে পঁচিশ মিনিট হতে চলল প্রায়, এমন সময় ডিফেন্স কলোনির মোড়ে পৌঁছে দেখি একজন জলওয়ালাও সেদিন লেট করে ফেলেছেন, ফ্লাইওভারের মুখে দাঁড়িয়ে জড়ানোমড়ানো শার্টটা দিয়ে মুখের ঘাম মুছছেন, আজ তাঁকে একাই গাড়ি ঠেলে তুলতে হবে, বাকি সব জলওয়ালারা আগে চলে গেছেন।

ভদ্রলোক ঠেলতে শুরু করলেন। পা যতদূর সম্ভব পিছিয়ে, মাথা দুহাতের মধ্যে গুঁজে। গাড়ি নড়ল। ভদ্রলোক জোর বাড়ালেন। গাড়ি এগোল। ইঞ্চিখানেক। আজ অনেক সময় লাগবে ভদ্রলোকের ব্রিজ পেরোতে। সিগন্যাল সবুজ হয়ে গেছে। ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে গাড়ি যাচ্ছে। সকালবেলা সবার তাড়া। বাইক, অটো, লাল কমলা ধুমসো সরকারি বাস, ইউ এন-এর নম্বরপ্লেট লাগানো এস ইউ ভি। ভেতরে সোনালি চুলের কজন বাচ্চা কলবল করছে। এদিকে নির্ঘাত একটা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল আছে, প্রায়ই দেখি গাড়িটাকে।

ভদ্রলোক ঠেলতে লাগলেন। দ্রুত চলতে থাকা গাড়িদের পাশে তাঁর জলের গাড়ির গতি আরও শ্লথ, আরও ঢিলে মনে হতে লাগল। গাড়িটা কি এগোচ্ছে আদৌ? নাকি ভদ্রলোক বৃথাই পরিশ্রম করে চলেছেন? কাউকে ডাকছেন না কেন। ফ্লাইওভারের মুখেই হনুমানজী না কার একটা মন্দির আছে, সেটার দরজার কাছে দিবারাত্র কয়েকজন বসে জটলা করতে থাকে। তাদের একজনকে ডেকে আনলেই হয়।

ওদিকের সিগন্যাল বন্ধ হয়ে আমাদের দিকের সিগন্যাল খুলল। অটো ভাইসাব খবরের কাগজ মুড়ে রেখে গাড়িতে স্টার্ট দিলেন। আর তক্ষুনি আমি ভদ্রমহিলাকে দেখতে পেলাম। হন হন করে ফ্লাইওভারের ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে আসছেন। প্রায় দৌড়চ্ছেনই বলা ভালো। মুখ গম্ভীর, শরীরের দুপাশে দুটো হাত প্যারেড করার ভঙ্গিতে এগোচ্ছে পিছোচ্ছে। পরনে ফুলছাপ কাপড়ের কামিজ, ঢোলা সালওয়ার, পায়ে ধপধপে সাদা স্নিকার। দিল্লি শহরের চেনা চেহারা।

আমাদের অটোটা বাঁক নিয়ে ফ্লাইওভারে উঠে এল। আর সেকেন্ডখানেকের মধ্যে জলওয়ালা ভদ্রলোককে পেরিয়ে এগিয়ে যাবে। এমন সময় দেখতে পেলাম ফুটপাথ থেকে মহিলা নেমে এসেছেন। জলওয়ালা ভদ্রলোকের পাশে দাঁড়িয়ে, পা পিছিয়ে দিয়ে, দুহাতের মাঝে মাথা গলিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলা মেরেছেন গাড়িটাকে। এক ঠেলায় গাড়ি গড়গড় করে গড়াতে শুরু করেছে।

আমি অটোর ফোকর থেকে যতক্ষণ পারা যায় মুণ্ডু গলিয়ে পেছন দিকে তাকিয়ে থাকলাম। গাড়ি তরতর করে এগোচ্ছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে ব্রিজের মাথায় পৌঁছে যাবে।

মেয়েদের নিয়ে গর্ব করার মতো জিনিসের অভাব নেই এখন পৃথিবীতে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, খুনি, বদমাশ, বিদ্বান, বিদূষক, পুলিশ, পরিব্রাজক সব ভুমিকাতেই তারা নিজেদের সফল প্রমাণ করেছে। কিন্তু দরকার পড়লে যে তারা রাস্তায় নেমে রোগা পানিওয়ালার গাড়িও ঠেলতে পারে, এটা দেখে সেদিন যে আমার কী গর্ব হল সে আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.