April 15, 2015

৩০.৩.২০১৫ - ৫.৪.২০১৫



পরিবেশসংরক্ষণ সংক্রান্ত নিয়মকানুন না মানার জন্য হজখাস ভিলেজের বেশ ক’টি দোকানে তালা ঝুলেছে। বেছে বেছে আমাদের পছন্দসই দোকানগুলোতেই। তাতে আমি বেশ কিছুদিন মনমরা হয়ে ছিলাম। (পছন্দের দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়াতে এবং পছন্দের দোকানরা যে নিয়ম মানছিল না সেটা জেনেও) কিন্তু মনের প্লট বেশিদিন ফাঁকা পড়ে থাকে না। ভিতপুজোটুজো সারা, হজ খাসের ফাঁকা জমিতে হুড়মুড়িয়ে দেওয়াল তুলছে শাহপুর জাট ভিলেজ।

শুনলে মনে হতে পারে আমরা বুঝি এই সব শহুরে নকল ভিলেজে যেতে দারুণ পছন্দ করি। সে রকম নয়। এই সব ভিলেজের বেশিরভাগ দোকানপাটেরই দরজা ঠেলে ঢোকার সাহস বা সাধ্য কোনওটাই আমাদের নেই। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে জোম্যাটো রেটিংপ্রাপ্ত বেশির ভাগ খাবার দোকানই এই রকম ভিলেজগুলোয়।

আগেরবার শাহপুর জাটে এসেছিলাম বিহারী খানা খেতে, এবার বিলিতি। পটবেলি রুফটপ দেহাতি ক্যাফের খুব কাছেই আইভি অ্যান্ড বিন ক্যাফে।

চমৎকার সাজানো দোকান। বসার জন্য দু’রকম জায়গার ব্যবস্থা। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বদ্ধ ঘর আর আইভিলতার পাঁচিল দেওয়া খোলা ব্যালকনি।


এই সব শহুরে ভিলেজের বেশিরভাগ দোকানপাটেই কেনাকাটা খাওয়াদাওয়ার থেকে ‘এক্সপেরিয়েন্স’ কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মফস্বল থেকে শহরে এসে যখন প্রথম দেখেছিলাম লোকে গল্পের বই পড়তে ধড়াচুড়ো পরে, অটো ধরে, কফিশপে যায় – চোখ কপালে উঠেছিল, এখন দেখছি সঙ্গে করে বই আনারও দরকার নেই। কফিশপেই পড়ার জন্য বইয়ের স্টক থাকে। আর একটা দোকান কাছেই আছে শুনেছি যেখানে গিয়ে আপনি বই পড়তে শুরু করবেন, আপনাকে এসে একজন জিজ্ঞাসা করবে আপনি কফি খেতে চান কি না। চাইলে কফি এসে যাবে। মেনু না, দাম না, বিল না, টিপ না। টাকার কথাই তুলবে না কেউ। ধরে নেবে যে আপনার চোখে চামড়া বলে একটা পদার্থ আছে এবং দোকান ছাড়ার আগে আপনি বিবেচনামতো একটা মূল্য ধরে দিয়ে যাবেন।


এত হাসির কারণ হচ্ছে একটু আগেই স্টক পরীক্ষা করে এসেছি। ইংরিজি স্বপনকুমার আর পাণ্ডব গোয়েন্দায় ভর্তি।

আমাদের অবশ্য সে সব বই নেড়েচেড়ে দেখা হল না, খেতে খেতেই সব সময় চলে গেল। কালামারি উইথ আলুভাজা, ফিশ অ্যান্ড চিপস, সসেজ অ্যান্ড এগস। শেষে মুখশুদ্ধি হিসেবে আসাম টি আর লেমন অ্যান্ড মিন্ট আইসড টি। প্রত্যেকটি খাবারই চমৎকার।

আমরা খেতে খেতেই দোকান বেশ ভরে উঠেছিল। ওঠাই উচিত, এত ভালো দোকান। সে ব্যাপারে আমিও সক্রিয় অংশগ্রহণ করছিলাম। কোনদিকে যে সিঁড়ি, কোনদিকে যে গেট, সে সব স্পষ্ট করে না দাগিয়ে রাখা এইসব ভিলেজের দোকানগুলোর একটা বদঅভ্যেস। খেতে খেতে আইভিলতার ফাঁক দিয়ে মাঝেই মাঝেই দেখতে পাচ্ছিলাম দু’জন, তিনজন কিংবা চারজনের এক একটা দল হাতে মোবাইল নিয়ে এদিকওদিক তাকাচ্ছেন। দোতলায় দোকানটা তাঁরা দেখছেন স্পষ্ট কিন্তু সিঁড়ি দেখতে পাচ্ছেন না। আমি আইভি লতার ফাঁক দিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে তাঁদের ঠিক পথে চালনা করছিলাম। অর্চিষ্মান অবশ্য বলছিল আমার অত উত্তেজিত হওয়ার দরকার নেই, এতখানি রাস্তা নিজেরাই এসেছেন যখন তখন দোতলায় ওঠার রাস্তাটাও ফিগার আউট করতে তাঁদের সমস্যা হবে না। তবুও আমার দিক থেকে যতটুকু করা যায় আরকি।


*****

আমরা গিয়েছিলাম সাঁচী ভীমবেটকা, আমার বাবা মা গিয়েছিলেন হরিদ্বার, উত্তরকাশী হয়ে হরশিল। হরশিলের কথা একজন নাকি বাবাকে বলেছিলেন আজ থেকে কুড়ি বছর আগে। এত দিনে বাবার সময় হল। ভাগ্যিস হল। না হলে ফেরার পথে ঘণ্টা আষ্টেক আমাদের বাড়িতে কাটিয়ে যাওয়া হত না। মাবাবার অবশ্য কষ্টই হল হয়তো। এত ঘোরাঘুরির পর, রাত জেগে দেরাদুন থেকে দিল্লি ট্রেনজার্নি করার পর আবার লৌকিকতা করতে হল। আমার হাতের নুনকটা (এবং সেটা ঢাকার বৃথা চেষ্টায় একগঙ্গা জল ঢালা) ট্যালটেলে মাছের ঝোল খেয়ে বারবার ‘সত্যি বলছি সোনা, এত ভালো রান্না কবে খেয়েছি মনে পড়ছে না’ বলতে হল।

কিন্তু আমাদের বেজায় লাভ হয়েছে। পয়লা বৈশাখের ছুতো করে একগাদা নতুন জামাকাপড় জুটেছে, হরিদ্বার থেকে আনা বাক্সভর্তি প্যাঁড়া, বরফি, আর কাজু কিশমিশ আমন্ড আখরোট দিয়ে বানানো স্বর্গীয় মোয়া খেয়ে চলেছি আমরা এখনও। মায়ের ইচ্ছে ছিল একটা তরমুজও সঙ্গে আনার (“ওরা দু’জনেই ভালোবাসে”) অনেক কষ্টে বাবা আটকেছেন। কথা দিয়েছেন যে দিল্লিতে পৌঁছে তিনি সি আর পার্কের বাজার থেকেই আমাদের জন্য তরমুজ কিনে আনবেন’খন, হরিদ্বার থেকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে না।

প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে অর্চিষ্মানকে সঙ্গে নিয়ে বাবা গেলেন তরমুজ কিনতে, আমি আর মা ফ্যানের তলায় বসে আত্মীয়স্বজনের নিন্দে করতে লাগলাম। খানিকক্ষণ পর বাবা ফিরলেন, চমৎকার একখানা বটলগ্রিন রঙের নিটোল তরমুজ সঙ্গে নিয়ে। তরমুজখানা তো চমৎকারই, আরও চমৎকার তরমুজের বাহনখানা। আনকোরা নতুন একখানা সবুজহলুদ ডুরিকাটা বাজারের ব্যাগ।

বাবা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে বাজারের ব্যাগহীন একটা সংসার গত দু’বছর ধরে চলছে।

আত্মপক্ষ সমর্থন হিসেবে আমরা এটুকুই বলতে পারি যে বাজারের জন্য যে একটা যে স্থায়ী ব্যাগ কেনা উচিত, রোজ রোজ নতুন নতুন পলিথিন প্যাকে পুরে জিনিস কিনে আনা যে আমাদের এবং পৃথিবীর স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয় সেটা আমরা দুজনেই জানি। তবুও আমরা বাজারের ব্যাগ কিনিনি। কেন কিনিনি তার কোনও কারণ নেই। খুব সম্ভবত যে কারণে গত ছ’মাস ধরে কলিং বেলটা সারানো হচ্ছে না সেই কারণেই।

কিন্তু এখন আমরা নিয়মিত বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাজারে যাই। গম্ভীর মুখে আলু পটল ঢ্যাঁড়স টমেটো তুলে ব্যাগে পুরি, মাঝেমধ্যে শাকপাতা কিনলে এমন স্ট্র্যাটেজিক্যালি সেটাকে প্লেস করি যে ব্যাগ থেকে তাদের কচি ডগাগুলো মুখ বার করে হাওয়া খায়। নিজেদের কনফিডেন্সে তো বটেই, আমাদের প্রতি বাজারওয়ালাদের ভক্তিশ্রদ্ধাতেও বলার মতো তফাৎ টের পাচ্ছি। সেই যে একদিন বাজারে গিয়ে চালকুমড়োকে লাউ বলে ভুল করেছিলাম, তার পর থেকে আমাদের দেখলেই ভদ্রলোক বেঁকা হাসতেন, আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখে বাকি সবাইকে মালপত্র দিতেন। এখন সে রকম কিছু ঘটছে বুঝলেই ভুরু কুঁচকে বাজারের ব্যাগটা নাড়াইচাড়াই আর অমনি শুনি, “অ্যায় বাবলু, আড্ডা না মেরে দিদিভাইয়ের কী কী লাগবে দেখ না।”

সেদিন শুনলাম ফোনে বাবা অর্চিষ্মানকে পরামর্শ দিচ্ছেন, “বাজারের ব্যাগ হয়ে গেছে, এবার একটা সাইকেল কিনে ফেল। শনিরবি সকাল সকাল হ্যান্ডেলে ব্যাগ ঝুলিয়ে বাজারে চলে যাবে, জিনিসপত্র কিনে নিয়ে বাড়ি চলে আসবে। দেখবে কী আরাম। তাড়াতাড়ি হবে, হাঁটুনির খাটুনি থাকবে না . . . একটা সাইকেল ছাড়া কি সংসার চলে?”

*****

প্রেম ভালোবাসা নিয়ে মাথা ঘামানোর বয়স ছিল যখন তখন আমার এক বন্ধু আমাকে বলেছিল সে কোনওদিন প্রেম করবে না। অন প্রিন্সিপল। বাই চয়েস। আমি তখন হাঁদা ছিলাম, ভাবতাম প্রেম করাটা বুঝি চয়েস নয়, ওটার জন্য বুঝি কোনও প্ল্যানপ্রোগ্রাম লাগে না, ওটা বুঝি এমনি এমনিই হয়। তাও আমি ভদ্রতার খাতিরে বলেছিলাম, “কেন রে? প্রেম করবি না কেন?” উত্তরে আমার তেইশ বছরের বন্ধু বলেছিল, “মা বারণ করেছে।”

আমি হো হো করে হেসে ওঠায় সে খানিকটা লজ্জা পেয়েই বলেছিল যে ঠিক মায়ের নিষেধের জন্যও নয়, নিষেধের পেছনে মা যে যুক্তিটা দেখিয়েছেন সেটা মনে ধরেছে বলেই সে ঠিক করেছে এ জীবনে প্রেম করবে না। জানা গেল মা বলেছেন প্রেম হচ্ছে একটা রোগের মতো। কিন্তু অন্যান্য রোগের সঙ্গে এর তফাৎ হচ্ছে অন্য রোগ ওষুধে সারে, প্রেম সারে না। ও রোগ একবার ধরল তো জন্মের মতো হয়ে গেল। তুমি প্রেমে পড়লে, তুমি যার প্রেমে পড়লে সেও তোমার প্রেমে পড়ল, ব্যস্‌ ল্যাঠা চুকে গেল – ব্যাপারটা অত সরল নয়। প্রেমের ক্ষিদেটা তোমার মধ্যে জেগেই রইল। কিছুদিন পরেই তোমার আবার নতুন একটা প্রেমে পড়ার জন্য হাঁকপাঁক শুরু হবে। এই না বলে বন্ধু টেবিলে রাখা শালপাতার প্লেটে লেগে থাকা সামোসার গুঁড়ো আঙুল দিয়ে তুলে মুখে পুরতে লাগল আর মাঝে মাঝে আমার দিকে অর্থপূর্ণ তেরছা দৃষ্টিপাত করতে লাগল। আমার তখন সবে প্রথম প্রেমের খাতা বন্ধ হয়ে দ্বিতীয় প্রেমের খাতা খুলেছে, বুঝলাম মায়ের সতর্কবাণীর এমন হাতে গরম উদাহরণ পেয়ে তার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে। এ জন্মের মতো আর সে প্রেমের পথ পাড়াবে না।

ইদানীং মাঝে মাঝে বন্ধুর মায়ের কথাটা মনে পড়ে। ভাবি হয়তো কথাটা একেবারে মিথ্যেও নয়। প্রেমে পড়ার প্রাথমিক উত্তেজনার স্বাদ যে একবার পেয়েছে সে কি জীবনে কখনও সেটা ভুলতে পারে? সেই বুকের মধ্যে হৃদপিণ্ডের বদলে ডেথ মেটাল ব্যান্ডের ড্রামের বাদ্যি, পেটের মধ্যে চব্বিশ ঘন্টা পৃথিবীর সবথেকে উঁচু, সবথেকে ভয়ের রোলার কোস্টারে বসে ফুল স্পিডে নিচে নামার অনুভূতি, নিজেকে আর নিজের প্রেমটাকে ছাড়া বাকি দুনিয়াটাকে নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় বলে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার স্পর্ধা – সে নেশার স্মৃতি কি বুকের মধ্যে থেকে একেবারে মুছে ফেলা সম্ভব?

বিশেষ করে যে সব দিনে বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ দেখি রোদের বদলে শহরের আকাশে ভিড় করে এসেছে অসময়ের মেঘ, কংক্রিটের ছাদের ওপর ঝুঁকে পড়েছে তার কালো ছায়া, গাছের মাথায় মাথায় দুলছে হাওয়া, বন্ধ জানালার পেরিয়ে সেই হাওয়ার ঝাপট আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে যাচ্ছে। অনেক নিচে ফুটপাথ ছেয়ে যাচ্ছে নববসন্তের কচি পাতায়, সেই পাতার নকশার মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দুটো লোক। তাদের জামা, চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ঝড়ে। তাদের মুখ দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু একে অপরের কনুই জড়িয়ে টলমল পা ফেলার রকম দেখেই বেশ বুঝছি প্রেমের রোগ জাঁকিয়ে ধরেছে এদের।

আর অমনি আমার ভেতরের সুপ্ত রোগটাও লাফ মেরে উঠে বসে। ওই ভীষণ ভয়ের রোলার কোস্টারটার সুইচ অন করে দেয় কেউ, সেটা ঘুরতে শুরু করে, খুব আস্তে, কিন্তু অচিরেই গতি নেবে। আমি চ্যাটবাক্স খুলে “চলো প্রেম করে আসি” টাইপ করতে গিয়েও সামলে নিয়ে লিখি, ‘চল, লাঞ্চে দেখা করি।’

প্রেম করার জন্য পাহাড় নয়, সমুদ্র নয়, সেরা জায়গা হচ্ছে ঘিঞ্জি শহরের ভিড়ে ঠাসা রাজপথ। এত লোক যে কেউ তোমার দিকে তাকাবে না, এতই প্রকাশ্য যে তার মধ্যে দিব্যি নিজেদের আড়াল করে নেওয়া যাবে। কনট প্লেসের গিজগিজে করিডর দিয়ে আমি হেঁটে চললাম, কখনও স্রোতের পিছুপিছু কখনও উল্টোদিকে, হাতে ধরা গুগল ম্যাপ যখন যেমন বলল তখন তেমন ডানে বেঁকে, বাঁয়ে মুড়ে, ঘুমন্ত কুকুরের লেজ টপকে, পানের পিক বাঁচিয়ে। ম্যাগাজিন সিডির দোকানের র‍্যাকে রাখা যোগব্যায়ামের সিডির মলাট থেকে থেকে পদ্মাসনে বসা শিল্পা শেটি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, কানের কাছে চিৎকার করে হানি সিং গাইতে লাগলেন। হঠাৎ একটা বাঁক মুড়েই দেখি একশো গজ দূরে একটা লোক। ফুটপাথের ওপর দাঁড়িয়ে হাতের পাঞ্জা দিয়ে রোদ থেকে ফোন আড়াল করে খুব মন দিয়ে সেটার দিকে তাকিয়ে আছে। গুগল ম্যাপ বলছে আমার গন্তব্য আসেনি এখনও, যেখানে পৌঁছলে মহিলা বলে উঠবেন, ‘ইউ হ্যাভ অ্যারাইভড।’ কিন্তু মহিলা জানেন না আমার গন্তব্য আসলে ওই লাল বিন্দুটা নয়, আমার গন্তব্য আসলে ওই লোকটা। আই হ্যাভ অলরেডি অ্যারাইভড।

খেতে খেতেই বাইরে হাওয়ার গতি বাড়ল, ফুটপাথে পাতার সঙ্গে এখন উড়ছে ছেঁড়া পলিথিন, দোমড়ানো কফি কাপ। কিন্তু আমাদের এখনও আইসক্রিম খাওয়া বাকি। দুটো ব্লক পেরিয়ে আইসক্রিমের দোকানে পৌঁছে আইসক্রিম হাতে নিয়ে বসে খানিকক্ষণ গুলতানি হল। খদ্দেররা কে কোন ফ্লেভার অর্ডার করবে সেটা আগে থেকে বলতে পারার কম্পিটিশন। প্রেম পুরোনো হলে কম স্বার্থপর হয়, নিজেকে ছাড়া বাকি জগতটার দিকে তার মনোযোগ ফেরে। এই ঝুঁটি বাঁধা কানে দুল হাওয়াই চটি লোকটা, এ নির্ঘাত সীতাফল শেক অর্ডার করবে, মিলিয়ে নিও। আর এই যে বুর্জোয়া দেখতে মহিলা, ইনি চকো বাইটস।

এইসব করতে করতেই বাইরে ঝিমঝিম আওয়াজ, তাকিয়ে দেখি বৃষ্টি। শিগগিরি দৌড়োও। তীরের মতো বৃষ্টি এসে সারা গায়ে বিঁধছে, একটা মিহি সাদা পর্দা যেন ঝুলিয়ে দিয়েছে কেউ চোখের সামনে, হঠাৎ সে পর্দা ফুঁড়ে দেখি বেরিয়ে এসেছে একটা প্রকাণ্ড সাদা ঘোড়া, ক্ষুরে বাঁধা ঘুঙুরের শব্দের তালে তালে তার মুণ্ডু দুলছে। হাঁ করে ভাবছি স্বপ্ন নাকি, এমন সময় দৃষ্টিপথে একটা দুলন্ত হাওয়াই চটি দেখে ভুল ভাঙল। হাওয়াই চটির মালিক বসে আছেন ঘোড়ার ওপর। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে, কিন্তু এত খাওয়ার পর দৌড়ের বেগ বাড়াতে আমাদের প্রাণ বেরোচ্ছে। ওই তো দেখা যাচ্ছে মেট্রোর সাইন, গেট নম্বর থ্রি। দৌড়োতে দৌড়োতে শিল্পা শেটির দোকানটা পেরোতেই একটা চেনা সুর কানে এল। উঁহু, হানি সিং নয়। ম গ রে রে সা নি সা ধ নি ম গ রে। নির্ভুল জয়জয়ন্তী।  শুনলে! চিনতে পারছ গানটা! আমার দৌড় থেমে গেছে আপনা থেকেই। কী গান? আরে মেঘ মেদুর বরষায় চালিয়েছে কেউ, এইখানে, এই সি পি-র ফুটপাথে! তাই তো দেখছি। কিন্তু তুমি এখন চল, মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে গান শুনলে ভিজে গোবর হয়ে অফিসে ফিরতে হবে। আমরা দৌড়ে মেট্রোর পেটের তলায় সেঁধোলাম, পেছনে গাইয়ে গাইতে লাগলেন, ‘ফুল ছড়ায়ে কাঁদে বনভূমি . . .’


*****


ওই সপ্তাহেরই কোনও এক সন্ধ্যেয় ক্যামেরা নিয়ে খুটুরখাটুর করার সময় এই ছবিটা তোলা হয়েছিল। তাই আমি সাতপাঁচ না ভেবে এটাকেও পোস্টের অন্তর্ভুক্ত করলাম।


April 11, 2015

সাপ্তাহিকী





Atif Saeed-এর তোলা ছবিটা তো অবিশ্বাস্য বটেই, কিন্তু ছবির পেছনের গল্পটা পড়লে গায়ে সত্যি কাঁটা দেয়।

আমার ঠাকুমার হালিশহরে বাপের বাড়ির অবস্থা ভাল ছিল এবং মুসলমান ওস্তাদের কাছে বিয়ের আগে এগারো মাস গান শিখেছিলেন। তাঁর দরাজ গলায় গিটকিরি সহযোগে কীর্তন ও বাংলা গান শুনেছি। তার মধ্যে দুটি আমার বড়ই প্রিয় ছিল। প্রথমটি ‘চাপ দাড়ি রাখা, চোখে চশমা ঢাকা, ভয়ানক ঢেউ উঠেছে বাংলাতে’। দ্বিতীয়টি ‘যত রকমের ডাল আছে পৃথিবীতে, কড়ায়ের ডালের কাছে সব শালা হারে’। শেষোক্ত গানটি পিলু বারোঁয়ায়।
                      ---কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, কুদ্‌রত্‌ রঙ্গিবিরঙ্গী



লিংকটা সুগত প্রথম দিয়েছিলেন এই পোস্টের কমেন্টে। সেখানে হয়তো অনেকে মিস করে গিয়ে থাকতে পারেন তাই সাপ্তাহিকীতে তুলে আনলাম।

গাইয়েবাজিয়েদের মৃত্যুর রকম সম্পর্কিত এই চার্টটা চোখে পড়েছিল যখন তখন কুদ্‌রত্‌ রঙ্গিবিরঙ্গী পড়ছিলাম। সেখান থেকে ভারতীয় মার্গসংগীতের সাধকদের (বিশেষত কণ্ঠশিল্পীদের) মৃত্যুবরণের এই সম্ভাব্য রকমটির কথা জানতে পারি।
বড়ে মহম্মদ খাঁ গোয়ালিয়র ছাড়ার কিছুকাল পূর্বে দরবারে হদ্দু, হস্‌সু খাঁ দু ভাই গাইছেন মিয়া মহ্‌লার। তখন নানাপ্রকারের তানের বর্ণনা ছিল ‘নাঙ্গা তলোয়ার’ তান, ‘কড়ক বিজলী’ তান, ‘হাথী চিংঘাড়’ তান ইত্যাদি। হস্‌সু খাঁ নাকি গাইতে গাইতে এই ভয়ানক ‘হাথী চিংঘাড়’ তান দিলেন যা শুনলে নাকি হাতি পিলখানা থেকে বেরিয়ে আসে। বড়ে মহম্মদ খাঁ পর্যন্ত সে তান শুনে বিস্মিত হয়ে ‘সুভান্‌ আল্লা, সুভান্‌ আল্লা’ বলে চিৎকার করে উঠলেন; তারপর আবার শুনতে চাইলেন ওই তান। হস্‌সু খাঁ পেট থেকে গমক সহকারে সেই ভয়ানক তান নিতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেলেন। মুখ দিয়ে রক্ত উঠে এল। নথ্‌থন পীর বখ্‌শ পাশে বসেছিলেন; নিজের শাল দিয়ে নাতির মুখে মুছে দিয়ে বললেন, ‘বেটা মরনা হী হ্যায় তো তান পুরি করকে মরো।’



যদিও ঠাট্টাটা আমার মতো লোকদের নিয়েই করা হয়েছে তবু আমিও না হেসে থাকতে পারলাম না।

আমি ভাবছিলাম অফিসে এই রকম কিছু করার প্রস্তাব দিলে ডিরেক্টরের মুখটা কেমন হবে।

মানুষের চরিত্রে অ্যাগ্রেসিভনেসের থেকেও খারাপ যদি কিছু আমার লাগে তবে সেটা প্যাসিভ-অ্যাগ্রেসিভনেস

আমি হলে এই আইস কিউব প্রাণে ধরে ব্যবহার করতে পারতাম না। ফ্রিজারে জমিয়ে রেখে দিতাম, মাঝে মাঝে খুলে দেখে চক্ষু সার্থক করতাম।



ভিক্টোরিয়ানরা ছবি তোলার সময় হাসতেন না কেন সেটা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু আমি এই বর্তমান সময়ের এমন অনেককে চিনি যাঁরা ক্যামেরা দেখলেই রামগরুড়ের ছানা হয়ে যান। এর ওপর দিয়েও যান কেউ কেউ যেমন আমার ইউনিভার্সিটির এক বন্ধু ছিল যে অন প্রিন্সিপল ভুরু কুঁচকে ছাড়া ছবি তুলত না।

ক্যামেরার সঙ্গে স্মার্টফোন জুড়লে যে চার্টটা হয় সেটা দেখুন।  

কতশত এভরিডে রেসিজম যে বয়ে চলি বুকের ভেতর। দেখ না দেখ একটাদুটো করে বেরিয়ে পড়ে আর শিউরে উঠি।

চৈত্রমাস শেষ হওয়ার আগে চট করে একটা চৈতী শুনে নেওয়া যাক। 


April 08, 2015

ছোটবেলার ভুল



শনিবার সকালে উঠে সাঁচীর গেস্টহাউসের ডাইনিং টেবিলে গিয়ে দেখি প্রায় সব টেবিল ভর্তি আর প্রায় সব টেবিলেই একটি দুটি তিনটি করে ছোট বাচ্চা। কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে, কেউ চেঁচাচ্ছে, কেউ গোমড়া মুখ করে বসে রয়েছে। কাল রাতেও এই প্রকাণ্ড আলোআঁধারি ডাইনিং হলটাকে প্রায় সাঁচীস্তুপের মতোই ধ্যানগম্ভীর দেখাচ্ছিল, এখন সকাল দশটার হাওড়া স্টেশন মনে হচ্ছে। আমরা ভীমবেটকা যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে ঘরে তালা মেরে বেরিয়েছি। এখন আবার ফিরে গিয়ে রুমসার্ভিস অর্ডার করার মেজাজ নেই। দেখেশুনে একটা আটটি চেয়ারসংবলিত টেবিলে চারটে খালি চেয়ার চোখে পড়ল, বাকি চারটে চেয়ারে লটবহর সহ এক দম্পতি বসে আছেন, আর টেবিলের ওপর বসে আছে তাঁদের বছর দুয়েকের সন্তান। চোখ থেকে ঘুম কাটেনি তখনও। বসে বসে এদিকওদিক দেখছে।

আমরা ওই টেবিলেই গিয়ে বসলাম। আগে আগে বেরোলে দুপুরের রোদ চড়ার আগে গুহা দেখে ফিরে আসা যাবে। টোস্ট অমলেট অর্ডার করা হল। পাশ থেকে চ্যাঁভ্যাঁ ইত্যাদে আওয়াজ পেয়ে বুঝতে পারছিলাম যে শিশুটির ঘুম কাটছে। দেখতে না দেখতে তার ঘুম পুরো ছুটে গেল এবং তার পর সে টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে এক হাতে নুন অন্য হাতে মরিচদানি, দুটো ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সারা টেবিলে নুনমরিচের বৃষ্টি শুরু করল এবং চিকার করে দুর্বোধ্য ভাষায় গান গাইতে গাইতে টেবিলের ওপর বাঁই বাঁই করে পাক খেতে শুরু করল।

মা প্রাণপণে ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা চালাতে লাগলেন, নুনমরিচদানির রেখে দিলে নিজের আইফোন তাকে সারাজীবনের মতো তাকে দিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। বাবা গম্ভীর হয়ে পাশে বসে রইলেন, ভাবখানা যেন এ সব ছোটখাটো গোলমালে নাক গলিয়ে তিনি নিজের বকুনির ধক মাটি করতে চান না। পরিস্থিতি সত্যি হাতের বাইরে গেলে মাঠে নামবেন। সত্যিটা অবশ্য সকলেই জানে। এই মিসাইল রোখার সাধ্য তাঁর নেই। পরিস্থিতি অলরেডি হাতের বাইরে।

একসময় এই ধরণের দৃশ্য দেখলেই লাফিয়ে পড়ে বাবামা’কে জাজ করে ফেলতাম। যেন সব দোষ বাবামায়ের শাসনের অভাবের, তাঁদের আদরের প্রাচুর্যের। তাঁরা যদি ঠিক মতো শাসন করতে জানতেন তাহলেই বাচ্চা বর্ণপরিচয়ের গোপাল হত। নিদেনপক্ষে ছোটবেলায় আমি যেমন সভ্যভব্য ছিলাম তেমন। এখন আর করি না। বাবামা’দের হাতে যে পুরোটা নেই সেটা এখন বুঝে গেছি। তাঁরা যত সচেতনই হোন না কেন, বাচ্চা বাঁদরামো করবেই, ক্রুশিয়াল দৃশ্যটিতে সিনেমাহলের টানটান নিস্তব্ধতা খানখান করে কান্না জুড়বেই। কারও কিছু করার নেই। বাচ্চাদের স্বভাবই হচ্ছে বড়দের জ্বালাতন করা।

এই সব ভাবছি বসে বসে এমন সময় আমাদের টোস্ট অমলেট এসে গেল আর দুষ্কৃতী বাচ্চাটির মা-ও ব্যাগ থেকে দুধের বোতল বার করলেন। প্রতিবাদে ডাইনিং হলের ছাদ ফাটার উপক্রম হল। খেয়ে নাও খেয়ে নাও, না হলে গায়ে জোর হবে কী করে ইত্যাদি ভুজুং দেওয়ার চেষ্টা করলেন মা, তাতে বিশেষ চিঁড়ে ভিজল না। মায়ের ব্যাকুল দৃষ্টি আমাদের দিকে ফিরল। তিনি বললেন যে দুধ খেলে সে অচিরেই এত শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে আংকল-আন্টিকেও কুস্তিতে হারিয়ে দিতে তার পাঁচ সেকেন্ডের বেশি লাগবে না। হিন্ট বুঝে আমরাও সোসাহে মাথা নাড়লাম। যেন অলরেডি হেরে চিপাত হয়ে পড়ে আছি। বিশ্বাস করবেন না, বাচ্চাটি এক চুমুকে পুরো দুধটুকু শেষ করে কটমট চোখে আমাদের দিকে এমন ভঙ্গিতে তাকাতে লাগল যেন এক্ষুনি পারলে আমাদের ঘাড়ে দু’খানা করে রদ্দা বসায়।

ছোটরা কেউ বাঁদর হয়, কেউ ক্যাবলা হয়, কেউ সেয়ানা হয়, কেউ বদের বাসা হয়, কিন্তু সকলেই যে বোকার হদ্দ হয় এ’টা আমি আগেও দেখেছি। বড় হয়ে যারা আমার মতো কেরানি হবে তারা তো হয়ই, যারা কৃতী হবে, নিজের কাজে সেরা হবে, দেশের দশের মুখ উজ্জ্বল করবে তারাও হয়। কৃতী মানুষদের ছোটবেলার গল্প পড়লেই সে কথা স্পষ্ট হয়ে যায়। ইন ফ্যাক্ট, তাঁদের জীবনীর মধ্যে শৈশবের বোকামির অংশগুলোই পড়তে আমার সবথেকে ভালো লাগে। সত্যজি রায় যে জীবনে প্রথমবার সজ্ঞানে আইসক্রিম খেতে গিয়ে বলেছিলেন আইসক্রিমটা গরম করে আনতে সেটা যতবার পড়ি ততবার অত আহ্লাদ হয় কেন কে জানে। হয়তো মনে মনে কোথাও একটা সান্ত্বনা পাই। আরও একজন দিগ্‌গজের ছোটবেলার গল্পে পড়েছিলাম তাঁর স্কুলের কোরাসসংগীতের কথা। ইংরিজি গান না বুঝে গাইতে গিয়ে সে গানের কী দশা হয়েছিল সেটা যতবার পড়ি আপসে বত্রিশ পাটি বেরিয়ে পড়ে।

কলোকী পুলোকী সিংগিল মেলালিং মেলালিং মেলালিং

(দিগগজের নাম আর আসল গানটার সম্ভাব্য শব্দগুলো (যেগুলো দিগ্‌গজ অনেক ভেবে ভেবে আন্দাজ করার চেষ্টা করেছিলেন) বলতে পারলে হাততালি।)

মুশকিলটা হচ্ছে ছোটরা নিজেদের বোকামি টের তো পায়ই না, উল্টে নিজেদের ভয়ানক বিজ্ঞ মনে করে। আমাদের স যেমন। স্কুলের দিদিভাইরা গরমের ছুটি পড়ার আগে হোমটাস্ক দিয়ে বাড়ি পাঠিয়েছিলেন। তিরিশ দিনে তিরিশটা যোগ, তিরিশটা বিয়োগ, তিরিশটা গুণ, তিরিশটা ভাগ আর তিরিশ পাতা হাতের লেখাপ্রতিদিন সকালে উঠেই স খাতাপত্র বার করে বসে একটা যোগ একটা বিয়োগ একটা গুণ একটা ভাগ আর এক পাতা হাতের লেখা লিখে দিনের মনে নষ্টামি করতে বেরোত। কাকিমাও ঠিক আর পাঁচজন হেলিকপটার পেরেন্টের মতো ছিলেন না, নেহাত বাড়াবাড়ি না করলে মেয়ের স্বাধীনতাকে সম্মান করতেন। ছুটি প্রায় অর্ধেক ফুরোলে, স সকালের পড়া সাঙ্গ করে খেলতে বেরোলে কাকিমা একদিন রান্নাঘর থেকে এসে খাতা খুলে দেখতে গেলেন হোমটাস্কের প্রোগ্রেস কী রকম।

অংক খাতা দেখে কাকিমা খুশি হলেন কিন্তু হাতের লেখার খাতা খুলে তাঁর চক্ষুস্থির হয়ে গেল। পাতার পর পাতা ভর্তি করে কন্যা লিখে রেখেছে ‘কবিরের গুরু রবীন্দ্রনাথ’। স-য়ের ডাক পড়ল। কাকিমা বললেন কবিরের নয়, ওটা কবিদের গুরু হবে। স বলল, উঁহু ওটা কবিরেরই হবে, দিদিভাই বলেছেন। কাকিমা বললেন, দিদিভাই এমন কথা বলতেই পারেন না, উনি কবিদের-ই বলেছিলেন তুমি শুনতে ভুল করেছ। স বলল আমি ভুল করিনি, দিদিভাই কবিরের-ই বলেছিলেন, আমি কবিরের-ই লিখব। তুমি কিছু জান না।

মায়েরা যে কিছু জানে না এই ভুলটা ছোটবেলার একটা অত্যন্ত কমন ভুল। দুঃখের বিষয় ছোটবেলার অন্যান্য ভুলগুলো যত দ্রুত ভেঙে যায় এটা তত দ্রুত ভাঙে না। ভাঙলে অনেক বিপদ এড়ানো যেত।

তবে অনেক বাবামা কাকিমার মতো ভুল ঠিক করে দেন না। নার্সারি কেজি ওয়ান কেজি টু-তে আমি যে স্কুলে পড়তাম সেখানে সেকশন-টেকশনের বালাই ছিল না। ক্লাস ওয়ানে উঠে তিন রেলস্টেশন দূরের স্কুলে পড়তে গিয়ে দেখলাম শুধু শ্রেণীই হয় না, শ্রেণীর আবার বিভাগও থাকে। মা সব বইতে বাঁশপাতার মলাট দিয়ে তার ওপর সাদা কাগজ চৌকো করে কেটে, চৌকোর চার কোণা কাঁচি দিয়ে গোল করে ছেঁটে তাতে আমার নাম, বিষয়ের নাম, প্রথম শ্রেণী, ক-বিভাগ লিখে দিলেন। খাতার লেবেলে ক-বিভাগ লেখা থাকলেও মুখে সবাই এ সেকশন বলত। আমি ছাড়া। আমি বলতাম এ সেকসন। দ্বিতীয় স-এর সঙ্গে প্রথম স-এর সঙ্গে দ্বিতীয় স-এর উচ্চারণের কোনও তফা রাখতাম না।

প্রতি দিন অফিস থেকে ফিরে বাবা আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন আজ আমাদের “সেকসনে” কী কী ঘটনা ঘটল। শনিবার সকালে করতেন, রবিবার সকালেও করতেন। তারপর সোনামা, তোমাদের সেকসনে এ সপ্তাহে কী কী ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল? আমিও খেলিয়ে বলতাম আজ আমাদের সেকসনে কী হল, ওদের সেকসনে কী হল না। সেকসনের প্রতি একটা অদ্ভুত, অযৌক্তিক সলিডারিটি সেই প্রথম দিন থেকেই অনুভব করেছিলাম, যেটা স্কুলজীবনের শেষ পর্যন্ত ছিল। ক্লাস নাইনে উঠে সেকশন চেঞ্জ হওয়াতে মনে হয়েছিল আমার জীবনটা এখানেই ফুরিয়ে গেল।

অর্চিষ্মানকে জিজ্ঞাসা করলাম ও ছোটবেলায় কী কী শব্দ ভুল বলত। প্রথমে ও, কই সে রকম তো কিছু মনে পড়ছে না, সব ঠিকঠাকই বলতাম বোধহয়, বলে আমাকে ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগানোর চেষ্টা করছিল, আমি চেপে ধরাতে বলল, বেশি নয়, এই হরিণকে হরিং বলতাম, কঠিনকে কঠিং বলতাম আর ত্রুটি পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝে ক্রুটি পড়ে ফেলতাম। শুনে আমার বাবার প্রতি এতদিনের পোষা রাগ জল হয়ে গেল। আমার সামনে ওই সাইজের কোনও লোক ত্রুটিকে ক্রুটি বা হরিণকে হরিং বললে আমিও ভুল তো ধরাতামই না, বরং ভুলটা যাতে দীর্ঘস্থায়ী হয় সে জন্য সক্রিয় চেষ্টা চালাতাম।

আমার মাবাবারও অবশ্য নিজস্ব ছোটবেলার ভুল ছিল। মা ভাবতেন রেডিওর ভেতর একটা ছেলে আর একটা মেয়ে বসে থাকে তারাই নাটক করে, খবর পড়ে, অনুরোধের আসরের অনুরোধ আসা চিঠিও তারাই পড়ে আবার অনুরোধের সব গানও তারাই গায়। মাঝে মাঝে অনুষ্ঠান থামিয়ে গেয়ে নেয় টিনোপল টিনোপল টিনোপল কিংবা সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন।

ছোটবেলার ভুল যে শুধু হাস্যকরই হতে হবে তার মানে নেই। কিছু কিছু ছোটবেলার ভুল এমনই যুক্তিপূর্ণ যে সেই ভুলটা আমি ছোটবেলায় করিনি কেন সেই ভেবে আফসোস হয়। সে রকম একটা ভুলের কথা শুনলাম সেদিন। টিভিতে যে সিটকম হয় তাতে লাফিং ট্র্যাক চলে শুনেছেন নিশ্চয়একজন বললেন ছোটবেলায় তিনি ভাবতেন ওই আওয়াজগুলো আসলে অন্যান্য বাড়িতে বসে যারা সিটকমটা দেখছে তাদের হাসির সম্মিলিত আওয়াজ। তাই তিনি এই সব সিরিয়াল চললে টিভির খুব কাছে গিয়ে বসে থাকতেন আর যেই না হাসির শব্দ আসত অমনি মুখটা টিভির সঙ্গে প্রায় লাগিয়ে দিয়ে খুব জোরে জোরে হাসতেন যাতে অন্যান্য বাড়ির লোকেরাও তাঁর হাসির শব্দ শুনতে পায়।

ছোট মেয়েদের একটা একচেটিয়া ভুলের জায়গা হচ্ছে পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা। এ বিষয়ে আমার বোকামির কথা আগেও বলেছি অবান্তরে, এই সুযোগে আর একবার বলে নিই। মা যখন সব পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলেন তখন আমার কেন যেন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে এই ভয়ানক ব্যাপারটা পৃথিবীর সব মহিলার সঙ্গে ঘটতে পারে। নিশ্চয় কেউ কেউ পার পেয়ে যায়? আমি বার বার আমার যত চেনা মহিলা আছে তাঁদের নাম ধরে ধরে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম, আচ্ছা মা, অমুকেরও এ’রকম হয়? তমুকের? মা আমার গায়ে হাত বুলিয়ে আশ্বাস দিতে লাগলেন সক্কলের হয়। এই করতে করতে চেনা সব মহিলার নাম যখন ফুরিয়ে গেল তখন আমি হার মেনে চুপ করে যাব কি না ভাবছি এমন সময় ধাঁ করে একটা নাম আমার মাথায় এসে গেল।

ইন্দিরা গান্ধীরও হত মা?

মায়ের সংযমের কথা ভাবলে আমি এখন মুগ্ধ হই, কিন্তু মুখের একটিও পেশী না নাড়িয়ে মা বলেছিলেন, হত তো। সেই শুনে আমার সব আতংক, হতাশা, দুঃখ নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। ইন্দিরা গান্ধীর মতো মহামহোপাধ্যায় মহিলারও যখন পিরিয়ড হত তখন আমার পিরিয়ড হওয়াটা নিয়ে মাথা ঘামানোটা যে ভালো দেখায় না এই সাব্যস্ত করে আমি চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে জীবনসংগ্রামে নেমে পড়লাম।

আমার চেনা একটি মেয়ে প্রথম পিরিয়ড হওয়ার পর বাথরুম থেকে “আমার ব্লাডক্যান্সার হয়েছে, আমি মরে যাচ্ছি” বলে হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এসেছিল। তার সেই সময়ের নিদারুণ আতংকের কথা কল্পনা করেও পরে যতবারই দৃশ্যটা ঘটনাটা মনে পড়েছে অট্টহাস্য পেয়েছে।

মানুষের যৌনজীবন সংক্রান্ত ভুলের দায় অবশ্য ছোটদের নয়। আমরা যে আমলে যে সব স্কুলে পড়তাম যৌনশিক্ষা দেওয়ার কথা সে সব স্কুলে ভাবা হত না, বাড়ির কথা তো ছেড়েই দিলাম। বেশির ভাগ বাবামা-ই মনে করতেন ওগুলো শেখানোর কিছু নেই, সময়ে আপসে শিখে যাবে। আমার বাবামা-ও এই গোত্রেই পড়তেন। ছোটরা অনেকসময় বাবামা-কে মানুষের জন্মরহস্য জানতে চেয়ে বিব্রত করে শুনেছিআমার ধারণা ভাইবোন থাকলে তারা হঠা এল কোথা থেকে, গাছ থেকে পড়ল না বাজার থেকে কিনে আনা হল, সে বিষয়ে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। আমার ভাইবোন ছিল না কাজেই তাদের উস সম্পর্কে আমি কখনও কোনও ঔসুক্য বোধ করিনি। আমি নিজে কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাব এ প্রশ্নও আমার মাথায় কোনওদিন জাগেনি সেটা অবশ্য আমার দার্শনিক দৃষ্টির অভাবও হতে পারে।

তবে শিশুরা কোথা থেকে আসে না জানলেও কখন আসে সেটা জানা ছিল আমার। আমার চারপাশে যাদের বাচ্চা ছিল তাঁদের সকলেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল (ছাপোষা মধ্যবিত্ত মানসিকতার পাড়ায় থাকতাম বুঝতেই পারছেন) এবং যখনকার কথা বলছি তার বছর দুয়েক আগে ম-পিসির বিয়ে খেতে গিয়েছিলাম, (সে বিয়ের আর কিছু মনে নেই, খালি মনে আছে কলাপাতার মুড়ে মাছ খেতে দিয়েছিল। কলাপাতাটা ধুয়েছে কিনা সে চিন্তায় আমার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় হয়েছিল, ভাবছিলাম বলব আমার কলাপাতা চাই না, আমাকে আমার থালার ওপরেই এমনি একটা মাছ দাও। কিন্তু বলিনি। ভয়ানক টেনশন বুকে চেপে সে মাছ শেষ করেছিলাম। সাধে কি মাথার চুলগুলো পেকেছে?) সেই ম-পিসির সদ্য একখানা ছেলে হয়েছিল।

অর্থা কি না শিশু যদি কার্য হয় তবে বিয়েটা হচ্ছে তার কারণ।

একদিন বিকেলে ব-দিদির বাড়ি খেলতে গিয়ে দেখলাম বাড়ির লোকে খুব উত্তেজিত, পোষা ছাগলের চার চারটে ছানা হয়েছে। মা ছাগল চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, জেঠি তার গায়ে আদর করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর কুচকুচে কালো চারটে ছানা ভয়ানক গুঁতোগুঁতি লাগিয়েছে দুধ খাবার জন্য। সে দৃশ্য দেখে আমি ভয়ানক অবাক হয়ে গিয়ে খেলাটেলা ভুলে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “তোমাদের ছাগলের বিয়ে হল কবে?”

আপনারাও কি ছোটবেলায় আমার মতো ছাগল ছিলেন? নাকি সবাই সব বুঝেটুঝে ঝুনো হয়ে গিয়েছিলেন? সংসারের সব সারতত্ত্ব আপনার নখের ডগায় ছিল? সে রকম হলে তবে আমাকে বলবেন না প্লিজ, আমার ভয়ানক হিংসে হবে, কিন্তু যদি না হয়ে থাকে তাহলে আপনার ছোটবেলার ভুল জানাজানির গল্প আমাকে বলুন, শুনে আমি একটু শান্তি পাই।

পুনশ্চঃ ও হ্যাঁ, হাওড়া স্টেশনে ঢূকে যাওয়ার পর ট্রেনটা আবার মুখ উল্টোদিকে ঘোরায় কী করে সেটা আমি অনেকদিন ধরে ভেবেছিলাম। আর গোল গোল সয়াবিন যে গাছে ফলে থাকে সে নিয়ে আমি নিঃসংশয় ছিলাম, কবে পর্যন্ত সেটা বলতেও আমার লজ্জা করছে। হিন্ট, ততদিনে আমি বাড়ি ছেড়েছি।   



April 04, 2015

সাঁচী ভীমবেটকা/ শেষ পর্ব



শনিবার
ভোর ৪টে ১০: শাঁখ বাজাল কি কেউ? শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে আমার। ঘুটঘুটে অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা তুলে সময় দেখলাম। আবার হল শব্দটাএবার বুঝলাম শাঁখ নয়, ট্রেনের হর্নকাল স্তুপের পথে যেতে দেখেছি চৌমাথার মাথায় ঝোলানো বোর্ডে তীরচিহ্ন দেওয়া ডানদিকে  স্তুপে যাওয়ার রাস্তা, বাঁদিকে স্টেশনে যাওয়ার। এত জোর হর্নের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে যখন তখন স্টেশন খুব কাছেই। কিন্তু এত অন্ধকার কেন রে বাবা ঘুমোনোর আগে অর্চিষ্মান সব লাইট নিভিয়ে দিয়েছিল নাকি? আমরা বাড়িতেই ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার করে ঘুমোই না, এই বিদেশবিভূঁইয়ে এসে হঠাৎ অর্চিষ্মানের এ ধরণের পরীক্ষানিরীক্ষার কারণ কী?

আন্দাজে হাত বাড়িয়ে বেডসাইড টেবিলে রাখা ফোন, ফোনের তার ছুঁয়ে সুইচবোর্ডে হাত পৌঁছিয়েই বুঝে গেলাম অর্চিষ্মান নির্দোষ। সুইচ অন, কিন্তু আলো জ্বলছে না। অর্থাৎ কি না লোডশেডিং। এ তো আচ্ছা জ্বালা হল। ফোনে যে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলব তার উপায় নেই, ব্যাটারি তলানিতে। অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে ট্রেনের হর্ন শোনা ছাড়া গতি নেই। মেজাজ খিঁচড়ে গেছে। এখন আর ট্রেনের ভেঁপু শুনে শাঁখটাখ ইত্যাদি কাব্য মনে আসছে না, মনে হচ্ছে কানের পর্দা ফাটল বলে।

সকাল ৮টাঃ জানালার বাইরে ভোরের আলো আর কারেন্ট, দুটো একই সঙ্গে এসেছিলআমি তড়াক করে উঠে ফোন চার্জে বসিয়ে ফোন করে চা আনাতে বলে অর্চিষ্মানকে ঠেলা দিয়ে বললাম, ওঠো ওঠো, গাড়ি এসে যাবে কিন্তু। তখন আমাকে দোষ দিতে পারবে না।

সকালটা ভীষণ সুন্দর। বাগানে দোলনা ঢেঁকি স্লিপ ইত্যাদি আছে, আশেপাশে কেউ নেই দেখে আমি খানিকটা দোলনা চেপে নিয়েছি। ব্রেকফাস্ট হয়ে গেছে। মেনুতে অনেকরকম পদ লেখা ছিল কিন্তু আসলে পাওয়া যাচ্ছিল মোটে দুটো জিনিস – আলু পরাঠা আর অমলেট টোস্ট। আমরা দুজনেই দ্বিতীয়টা নিয়েছিলামসঙ্গে দু’কাপ করে চা। গাড়ি এসে গেছে। গাড়িওয়ালা হোটেলের চেনা লোক, তিনি কোথাও একটা বসে ব্রেকফাস্ট করছেন, তাঁর হয়ে গেলেই আমরা বেরোব।

সাড়ে ন’টাঃ ভোপাল থেকে সাঁচী যত দূর ভীমবেটকাও তত দূর। কালকের অটো ভাইসাব, যিনি আমাদের ভোপাল থেকে সাঁচী পৌঁছে দিয়েছিলেন, আমরা ভোপালের বদলে সাঁচীতে থাকছি শুনে সখেদে মাথা নেড়েছিলেনদূরত্ব ও খরচ মিনিমাইজ করতে গেলে হয়তো ভোপালে থেকে একবার সাঁচী একবার ভীমবেটকা যাওয়াই বুদ্ধিমানের। তাহলে ভোপাল শহরটাও দেখতে সুবিধে।

ভীমবেটকায় যাওয়ার রাস্তার সঙ্গে কাল দুপুরে সাঁচী আসার রাস্তার কোনও পার্থক্য নেই, তবে দুপুরের বদলে এখন সকাল বলে সে রাস্তার চরিত্র কিছু আলাদা। কাল খাঁ খাঁ করছিল, আজ লোকজন দেখা যাচ্ছে। কাল সোনালী ক্ষেত দেখেছিলাম, আজ দেখছি ক্ষেতের ভেতরের মেঠো পথ দিয়ে লাইন দিয়ে চলেছেন রংচঙে শাড়ি পরা মহিলার দল, তাদের মাথায় থাক করে বসানো রুপোলি ঘড়া। তাদের ঝকঝকে গায়ে রোদ্দুর এমন ঠিকরোচ্ছে যে একটানা তাকানো যায় না ঘড়ার নিষ্কলঙ্কতার থেকেও দেখার মতো হচ্ছে মহিলাদের ব্যালেন্স। একেকজনের মাথায় তিনচারটে করে কলসি বসানো অথচ তাঁরা ওই এবড়োখেবড়ো পথ দিয়ে হেঁটে চলেছেন হেলদোলহীন। ছোটবেলার স্পোর্টসের কথা মনে পড়ে গেল, হাঁড়ি মাথায় হাঁটা রেসে নাম দিয়েছিলাম একবার। দু’পা যেতে না যেতেই হাঁড়ি মাথা থেকে খসে সোজা হাতে। আমার লজ্জা কমাতেই বোধহয় বাকিদেরও টপাটপ হাঁড়ি পড়ে গেল, লাস্টে দু’জনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হল যিনি জিতলেন জিতলেন, যিনি জিতলেন না তিনি রাগের চোটে হাঁড়ি আছড়ে ভেঙে মাঠ ছাড়লেনতাঁর অগ্নিগর্ভ মেজাজ দেখে কেউ কেউ হেসেছিল (সামনে নয় অবশ্যই, আড়ালে, সামনে হাসলে আর একখানা হাঁড়ি হাসিয়ের মাথায় ভাঙত) কিন্তু আমি তাঁর জেতার ক্ষিদে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মধ্যে যে ও জিনিস নেই সেই উপলব্ধি করে ছোটমতো একটা দীর্ঘশ্বাসও বেরিয়েছিল।

যাই হোক, দীর্ঘশ্বাসের কথা থাক, পথের কথায় ফেরা যাক। আমাদের গাড়ির আশেপাশে আগেপিছে একটা মোটরবাইক যাচ্ছে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। বাইকে বসা তিনজনকে দেখে ধরে নেওয়া যায় যে এরা বাবা মা ছেলে। বাবা চালাচ্ছেন, মা পেছনে বসেছেন আর বাবার সামনে বসেছে ছেলে। তার বয়স নির্ঘাত আটের নিচে, তার হাত বাইকের হ্যান্ডেলে (যেন বাবা নন, বাইকটা সে-ই চালাচ্ছে) এবং তার চোখেমুখে অদ্ভুত কনফিডেন্স। কনফিডেন্সটা অকারণ নয়, কনফিডেন্সের উৎসটা অত্যন্ত স্পষ্ট। একটা সানগ্লাস। সানগ্লাসটা মুখ্যত সবুজ রঙের, তবে ঠিকঠাক অ্যাঙ্গেলে রোদ পড়লে মাঝে মাঝে ময়ূরকণ্ঠী রংও খেলবে বোঝা যায়।

হঠাৎ দেখলাম বাবা বাইকের ব্রেক কষলেনঅর্চিষ্মানও যে দৃশ্যটার ওপর নজর রাখছিল সেটা এতক্ষণ বুঝিনি। বলল, সানগ্লাস উড়ে গেছে” আমি গাড়ির পেছনের কাঁচ দিয়ে তাকালাম। সে রকমই কিছু একটা ঘটেছে নির্ঘাত বাইক থেমে গেছে আর মা নেমে পেছন দিকে হাঁটছেনসানগ্লাস কুড়িয়ে আনতে যাচ্ছেন বোধহয় বাবা ছেলে পেছন দিকে শরীর বেঁকিয়ে তাকিয়ে আছে। এই দুর্ঘটনায় আমরা বেশ খানিকটা এগিয়ে গেলাম বাকি রাস্তায় আর তাদের দেখা পেলাম না।

ভালোই হল একদিক থেকে, খানিকটা প্রকৃতির দিকে মনোনিবেশ করা গেল। মানুষ ভয়ানক ডিসট্র্যাকটিং জিনিস, সে সামনে থাকলে আর কোনওদিকে চোখ ফেরানো শক্ত। এবার দেখলাম ক্ষেতের ওপারে বাঁ দিগন্তে বিন্ধ্য-সাতপুরার ছায়া, ডান দিগন্তে ভোপালের স্কাইলাইন রাস্তার পাশে মাঝে মাঝে প্রকাণ্ড পাইপলাইন মাথা তুলছে। খানিকক্ষণ আমাদের সঙ্গ দিয়ে আবার পাতালপ্রবেশ করছে। এই একরঙা দৃশ্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো পাতাহীন পলাশের গাছ। গাছ ঝেঁপে ফুল এসেছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে কেঠো ডালে কেউ যেন লাল রঙের সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে। দেখতে দেখতে কখন যে ক্ষেত সরে গিয়ে জানালার বাইরে পাথুরে জমি শুরু হয়েছে, কখন যে আমরা চড়াই উঠতে শুরু করেছি খেয়ালই করিনি।  তারপর যেই না গাড়ি ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল আর ড্রাইভারজী বলে উঠলেন “আ গয়া ভীমবেটকা” অমনি আমরা ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম এই দৃশ্য।


ডক্টর বিষ্ণু ওয়াকাংকরও দেখেছিলেন। ট্রেনে চেপে যেতে যেতে। গাইড বললেন, “দূর সে উনকো লগা থা কে কোই ফোর্ট হ্যায় জঙ্গল কি অন্দর” তাই উনি ট্রেন থেকে নেমে দেখতে এসেছিলেন ব্যাপারটা কী। আমার আনাড়ি চোখে অবশ্য ব্যাপারটাকে দুর্গ-দুর্গই লাগছে, কিন্তু ডক্টর ওয়াকাংকর তখন রীতিমত প্রতিষ্ঠিত প্রত্নতত্ত্ববিদ, দেশেবিদেশে ঘুরে রক আর্ট দেখেছেন ও সেই নিয়ে চর্চা করেছেন, তাঁর পক্ষে রক শেল্টার দেখে ফোর্ট বলে ভুল করাটা একটু বাড়াবাড়ি। কিন্তু আবার এও সত্যি ট্রেন থেকে রক শেল্টার দেখে তার ভেতর কী পাওয়া যেতে পারে আগেভাগেই আন্দাজ করে বনবাদাড় ঠেঙিয়ে আসার তুলনায় ফোর্ট খুঁজতে এসে সে ফোর্ট খুঁড়তে রক শেল্টার বেরোনো ঢের ভালো গল্প। আর ভালো গল্পকে যারা যুক্তিতর্কের খাতিরে নস্যাৎ করে দেয় সে সব মহাপাতকীর দলে আমি পড়ি না।
  

ভোপাল-হোসাঙ্গাবাদ হাইওয়ের পাশে, বিন্ধ্যপাহাড়ের পায়ের তলায়, রাতাপানি অভয়ারণ্যের ভেতর দশ বাই তিন কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে ছড়ানো ভীমবেটকার প্রাকৃতিক রক শেল্টার সাইট। এইটুকু জায়গার মধ্যে পাওয়া গেছে সাতশোটি রক শেল্টার যাদের মধ্যে চারশোটিরও বেশি শেল্টারে ছবি আঁকা আছে। সে সব ছবির মধ্যে সবথেকে পুরনো ছবি প্রায় তিরিশ হাজার বছরের পুরোনোযদিও এখানে মানুষের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে এক লাখ বছর আগে থেকেই। (সে সব মানুষের সঙ্গে আমার আপনার মিল খুঁজতে গেলে কিন্তু চলবে না। আমরা হচ্ছি হোমো সেপিয়েনস সেপিয়েনস আর তারা ছিল হোমো ইরেকটাস) বলাই বাহুল্য, ছবিটবি আঁকার আগে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর দরকার পড়েছিল। পাথরের নানারকম অস্ত্রশস্ত্র – কুঠার, শাবল ইত্যাদির সন্ধান পাওয়া গেছে। সেগুলো এখন সব রাখা আছে ভোপালের মিউজিয়ামে। আমরা কর্তৃপক্ষের টাঙানো বোর্ডে সে সবের ছবি দেখলাম। নুড়িপাথরের কতগুলো হাতিয়ারও চোখে পড়ল। খালি চোখে দেখলে সেগুলোকে হাতিয়ার বলে মনেই হয় না। রাস্তায় দেখলে হয়তো সাধারণ পাথর বলে পায়ে ঠোক্কর মেরে চলে যাব, কিন্তু খেয়াল করলে তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো নজরে পড়ে। হয়তো দেখবেন সে নিরীহ নুড়ির এক দিক ঘষে ঘষে এমন ছুঁচোলো করা আছে যে আমার আপনার পেট ফাঁসিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।


তবে ভীমবেটকার আসল আকর্ষণ সে সব নয়, আসল আকর্ষণ রক শেল্টারের দেওয়ালে আঁকা ছবি। প্রাণ যখন বাঁচল, পেট যখন ভরল, বৃষ্টি যখন নামল, সে বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাতে ছাতার মতো ঢাকনা দেওয়া পাথরগুলোর তলায় দৌড়ে এসে মানুষ যখন ঢুকল তখন খানিক বাদেই বেশ একটা নতুন রকমের অনুভূতি জাগল তার মনের ভেতর। ক্ষিদে নয়, আক্রোশ নয়, হিংসে নয়, রাগ নয়, প্রতিশোধ নয়, তাদের থেকেও ভয়ংকর এক অনুভূতি। বোরডম। কাঁহাতক আর বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় গালে হাত দিয়ে বসে থাকা যায়? চোখে পড়ল যুগ যুগ ধরে হাওয়া, জল, রোদে পুড়ে, ভিজে, ক্ষয়ে মসৃণ হয়ে থাকা ক্যানভাসের মতো পাথুরে দেওয়াল আর ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা পাথর আর গাছের ডাল।


শুরু হল শিল্পসাধনা। দেবতাকে উৎসর্গ করে নয়, প্রতিবেশীকে উদ্দেশ্য করে নয়, হাততালি কুড়োনোর লক্ষ্যে নয়, কমেন্ট জোগাড়ের মতলবে নয়। শুধুই বৃষ্টি থামার অপেক্ষায়। বিশুদ্ধ আত্মবিনোদনের উদ্দেশ্যে। প্রথমেই নিজেকে আঁকল মানুষ। গোল মুণ্ডু, কাঠি কাঠি হাত পা। তারপর এল হাতি ঘোড়া বাইসন। বাস্তবের হাতি ঘোড়া বাইসনের সঙ্গে তাদের কিছুমাত্র মিল নেই তবু চিনতে কষ্ট হয় না একরত্তি। সামঞ্জস্য, অনুপাত – এ সব অপ্রয়োজনীয় খটমট ধ্যানধারণার ধার ধারেননি শিল্পী। কখনও ধড়ের তুলনায় মুণ্ডু বড় হয়ে গেছে কখনও মুণ্ডুর তুলনায় ধড়। ঢ্যাঁড়া মেরে এঁকেছেন ঘোড়ার শরীর, সরলরেখায় এঁকেছেন চার পা, শিং ও ল্যাজ। কখনও চার পা আর শিং-এর ভেতর ঢ্যাঁড়ার বদলে সসেজের মতো লম্বা একটা দেহ। এটা আবার কী বস্তু? কেন এই যে সসেজের ওপর আড়াআড়ি দাগ কাটা আছে, দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে এটা হল গিয়ে একটা ডোরাকাটা বাঘ।   


এই নাকি আমার তিরিশ হাজার বছরের বুড়ো পূর্বপুরুষের শিল্প? এ তো শিশুর খেলা। কাঁচা হাতের হিজিবিজি কাটাকুটি।


গুহার পর গুহা ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলেন গাইড ভাইসাব। ছবি বদলাচ্ছে, ছবির বিষয় বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে পারসপেকটিভ, পাওয়ার ইকুয়েশনে প্রকৃতির সঙ্গে জায়গা বদলাচ্ছে আমার পূর্বপুরুষ। শুরুতে প্রকাণ্ড বাইসনের সামনে অসহায় শিকার হিসেবে কিছুই ভাবতে পারেনি যে নিজেকে, মাত্র কয়েক হাজার বছর পেরোতে না পেরোতেই সে নিজেকে চড়িয়েছে ছুটন্ত বুনো হাতির ওপর। বীরের মতো বুক চিতিয়ে দু’পা ফাঁক করে দাঁড়িয়েছে সেই অসমতল পিঠে, এক হাতে উঁচিয়ে ধরেছে ত্রয়োদশীর চাঁদের মতো বাঁকা তরবারি, অন্য হাতে তাক করে ছুঁড়ছে বর্শা। আমার পূর্বপুরুষ বড় হচ্ছে। হাতে গাছের ডালের তুলি ক্রমশ বশ মানছে, ছবির তীক্ষ্ণ কোণা নিটোল ও মোলায়েম হচ্ছে, শেষের দিকের ঘোড়াগুলো তো রীতিমত ঘোড়ার মতোই দেখতে। একই দেওয়ালে ত্রিভুজে আঁকা ঘোড়ার সামনে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সুডৌল ঘোড়া্‌, তার মাথায় কেশরের চিহ্ন, হাঁটুতে গতির ছোঁয়া, সামান্য আনত ঘাড়ে চ্যালেঞ্জের আভাস। পূর্বপুরুষের আনাড়ি সরলরেখা-সম্বল ঘোড়ার সামনে দাঁড়িয়ে যেন বলছে সে, দেখ দেখি, আমার মালিক তোর মালিকের থেকে কত ভালো আঁকিয়ে।


জাস্ট ভাবুন একবার। দশ কিংবা তারও বেশি হাজার বছর আঁকা ছবির সামনে, কিংবা তার ওপরেই এসে ছবি এঁকে চলে যাচ্ছে লোকজন, আপার প্যালিওলিথিক শিল্পীকে টেক্কা দিয়ে কলার তুলছে আর্লি হিস্টোরিক যুগের ছোঁড়ার দল। একবারও মনে হচ্ছে না, আঁকাটা পয়েন্ট নয়, প্রাচীনত্বটাই পয়েন্ট। এগুলোর সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তুলোয় মুড়ে মিউজিয়ামে তুলে রাখা উচিত, নিদেনপক্ষে চব্বিশ ঘণ্টা সেখানে কড়া পাহারার বন্দোবস্ত করা উচিত যাতে রংতুলি হাতে কোনও দুর্বৃত্তকে সেদিকে আসতে দেখলেই কারাদণ্ড এবং জরিমানা ধার্য করা যায়।


আর আমরা কি না পাঁচশো বছর পুরোনো কেল্লার গায়ে প্রেমিকপ্রেমিকার নাম দেখে খেদে মাথা নাড়ছি। বলছি, অশিক্ষিত দেশে এছাড়া আর কী-ই বা আশা কর তুমি? বলছি, আসলে সিস্টেমটাই ঘুণ ধরা।

পঞ্চাশ হাজার বছর পর দু’জন লোক হয়তো লং উইকএন্ডে সে ভাঙাচোরা কেল্লা দেখতে আসবে। অবাক হয়ে কেল্লা দেখবে, আরও অবাক হয়ে পড়বে কেল্লার গায়ে লেখা নাম। দেখেছ কেমন অদ্ভুত সব নাম হত হোমো সেপিয়েনস সেপিয়েনসদের? রাজ, সিমরণ। মাঝখানে আবার উল্লম্ব আর অনুভূমিক দুটো লাইন দিয়ে কী একটা এঁকেছিল, ওটা বোধহয় ওদের আমলের ভালোবাসার চিহ্ন, না গো? এই না বলে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসবে আমাদের বংশধরেরা। একজনের নাম অং বং চং, অন্যজনের হিং টিং ছট।


বেলা ১২টাঃ ভীমবেটকা ঘোরা শেষ। এবার সাঁচী ফেরার পালা। ফেরার পথে আমরা ভোজপুরে ঢুঁ মেরে ফিরব। সেখানে নাকি আছে এক শিবমন্দির আর সে মন্দিরে আছে ভারতের দীর্ঘতম শিবলিঙ্গ।


ফেরার পথে বলার মতো বিশেষ কিছু ঘটেনি। খালি রাস্তার দু’পাশে দেখলাম খাঁখাঁ মাঠের মধ্যে ছোট ছোট শহরতলি মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। শপিং মল বানানো হয়ে গেছে, তৈরি হয়ে গেছে জিম ও স্পা। এবার স্পা-এর মেম্বার জোগাড় হলেই হয়। মেম্বার জোগাড়ের জন্য বড় বড় বিজ্ঞাপন পড়েছে দেখলাম। সুলভ দামে প্লট কিনে বাড়ি বানানোর বিজ্ঞাপন। একটা শহরতলির নাম দেখলাম রাখা হয়েছে ভব্যগণেশ।  

দুপুর আড়াইটেঃ বাপরে বাপ, কী গরম! গাড়ির ভেতর থেকেই রোদের দিকে তাকিয়ে চোখ ঝলসে যাচ্ছিল, বাইরে থাকলে না জানি কী হত। খুব বাঁচা বেঁচে গেছি, আর দুটো উইকএন্ড পরে এলেই আর দেখতে হত না। খুব ইচ্ছে করছিল ঘরে গিয়ে এসি চালিয়ে কোল্ড ড্রিংকস খেতে খেতে চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকার কিন্তু আরও বেশি ইচ্ছে করছিল সাঁচী মিউজিয়ামটা দেখার। তাই হোটেলে না নেমে মিউজিয়ামে নেমেছি। ঠিক মিউজিয়ামে না, মিউজিয়ামের পাশে মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের ক্যাফেটেরিয়ায়। এরও নাম আমাদের হোটেলের নামেই। গেটওয়ে রিট্রিট। মেনুটেনুও অবিকল এক, খালি আমিষের পাতাটা নেই। স্তপের কাছাকাছি বলে বোধহয়।

কুছ পরোয়া নেই, নিরামিষই সহি। আমরা অর্ডার করলাম ভাত, রুটি, আলুগোবি, শবনম কারি (মাশরুম দিয়ে একরকমের তরকারি), কাচুম্বর স্যালাড, পাঁপড় আর দু’বোতল থামস আপ। কুলারের ঠাণ্ডা ঝোড়ো হাওয়া সহযোগে সে সব উদরস্থ করে হৃতশক্তি পুনরুদ্ধার হল। বিল মিটিয়ে আমরা মিউজিয়ামের দিকে হাঁটলাম।

উনিশশো উনিশ সালে এই মিউজিয়ামটি স্থাপন করেছিলেন স্যার জন মার্শাল, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল। খোঁড়াখুঁড়ি করে যে সমস্ত ভাঙাচোরা মূর্তিটুর্তি পাওয়া যাচ্ছিল সে সব রাখার জন্য পাহাড়ের মাথাতেই একটা ছোট্ট বাড়ি বানানো হয়েছিল তারপর খুঁড়তে খুঁড়তে জিনিস বাড়ল, পাহাড়ের ওপরের বাড়িতে আর আঁটল না, তখন তাকে উঠিয়ে আনতে হল পাহাড়ের তলায়, জন মার্শালের বাড়ির পাশে।


উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত একতলা মিউজিয়ামটা বেশ সুন্দর মিউজিয়ামে ছবি তোলা বারণ তাই মুখেই বর্ণনা দিচ্ছি। দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা বড় হল, সেই হলে আছে সাঁচীস্তুপ থেকে উদ্ধার হওয়া সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন। আমলের বাছবিচার করা হয়নি। অশোকের আমলের চতুর্সিংহ যেমন আছে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর যক্ষীও তেমন আছেন, চতুর্থ শতাব্দীর ধ্যানী বুদ্ধও যেমন আছেন, পঞ্চম শতাব্দীর পদ্মপাণি অমিতাভও তেমন আছেন আবার আছেন সাতবাহন আমলের ডানাভাঙা সিংহও(উঁহু, টাইপো নয়, বানানোর সময় সিংহের দুদিকে দুটো ডানা জূড়ে দেওয়া হয়েছিল)পরের ঘরগুলোতে সময়কাল ধরে ধরে শুঙ্গ, সাতবাহন, গুপ্ত ইত্যাদির শিল্পকর্ম সাজানো। বৌদ্ধসন্ন্যাসীদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, সারি দিয়ে বুদ্ধমূর্তি। ললিতাসনে আসীন, পদ্মাসনে আসীন, দাঁড়ানো, হাতে ব্রজ কিংবা পদ্মফুল ধরা। অধিকাংশই মস্তকহীন। এমন সুন্দর করে শল্যচিকিৎসকের নৈপুণ্যে সে সব মাথা ধড় থেকে আলাদা করা হয়েছে যে দেখলে সন্দেহ হয় এ জিনিস প্রকৃতির কাজ হতে পারে না। সব মূর্তিই চমৎকার, তবে আমার আর অর্চিষ্মানের সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর যক্ষিণীর মূর্তিটা। তার নাকচোখমুখ সবে ভেঙে গেছে, শুধু শরীরটুকু আছে আর আছে পিঠের ওপর সুপুষ্ট সাপের মতো এলিয়ে থাকা বেণী। প্রায় অক্ষত। জমকালো কোমরবন্ধে এসে সে বেণী মিশে গেছে। বেণী দেখেই আমরা সম্মোহিত, যক্ষিণীর মুখচোখ দেখতে পেলে যে কী হত কে জানে।

সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টাঃ হোটেলে ফিরে এসেছি বেশ খানিকক্ষণ। চা পকোড়া খাওয়াও সারাএখন আর বেরোনো নেই। এখন শুধু হোটেল কম্পাউন্ড ঘুরে দেখো, চাইলে দোলনা চড়ো। শনিবারের বাজারে বেশ কয়েকজন নতুন ভ্রমণার্থী এসেছেন দেখছি। সামনের চত্বরটা গাড়িতে ছেয়ে গেছে। অন্ধকার হয়ে আসছে। এবার ঘরে যাওয়া যাক। কাল টিভিতে ‘আদালত’-এর আজকের এপিসোডের ট্রেলর দেখাচ্ছিল। খাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কে ডি পাঠক, আর একটা প্রকাণ্ড ডাইনোসর দাঁত খিঁচিয়ে তাঁর দিকে তেড়ে আসছে। এটা মিস করা যাবে না।

রবিবার


সকাল ৮টাঃ আরও ভোরেই আসব ভেবেছিলাম, কিন্তু ব্যাগপত্র গুছিয়ে রেখে বেরোতে দেরি হয়ে গেল। সকালে একটু সাঁচিীস্তুপ ঘুরে তারপর ফিরে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ব। কাল এক আর তিন নম্বর স্তুপ আর আশেপাশের টেম্পল মনাস্টেরিগুলো দেখেছি। দু’নম্বর স্তুপটা পাহাড়ের গা দিয়ে খানিক নেমে গিয়ে জঙ্গলের ভেতর। যাওয়া যাক।


আবার শাঁখের আওয়াজ! পাহাড়ের গায়ে বেড় দিয়ে রেললাইন আছে টেরই পাইনি।

সত্যি বলব? পরশু আসার পথে অটোভাইসাব যখন বলেছিলেন, “আপলোগোনে প্ল্যানিং ঠিক নেহি কিয়া, দো দিন ইয়াহে পে খারাব কর রহে হো” তখন আমার মন সত্যি সত্যি সংশয়ে দীর্ণ হয়েছিল। এত প্ল্যান করে, এত খরচ করে, সবথেকে বড় কথা অফিসে একদিন ছুটি নিয়ে আসা (তাও ট্রেনে বসে বসেই ফোন এসে গেছে) তার পর যদি বেড়ানোটা সর্বাঙ্গসুন্দর না হয় তাহলে মন খুঁতখুঁত করে। যাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্তে সুখী থাকতে পারেন তাঁদের হয়তো করে না কিন্তু আমার মতো চিরঅসুখী, চিরঅতৃপ্ত লোকের করে। শহরে থাকব না জেদ ধরে ভোপাল থেকে চলে এলাম, হয়তো বোকামিই হল। ভোপালে থেকে একদিন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সকালে সাঁচী বিকেলে ভীমবেটকা ঘুরে আবার ভোপালে ফিরে যাওয়া উচিত ছিল। রুট সোজা হত, খরচা কম পড়ত আবার ভোপালও দেখা হত।


এখন আর সে আফসোস হচ্ছে না। এখন ভাবছি কী ভাগ্যিস সাঁচীতে থেকেছিলাম। তাই তো বার বার ঘুরে ঘুরে এই স্তপের কাছে আসতে পারলাম, সন্ধ্যের ছায়ায় আর সকালের আলোয় একই বুদ্ধমূর্তির নিমীলিত চোখের পাতায় কেমন আলাদা আলাদা মায়া ফোটে স্বচক্ষে দেখতে পেলাম।   


খুব বড় কিছুর সামনে দাঁড়ালে মাথা পরিষ্কার হয়ে যায় শুনেছি। শুধু শুনেছি কেন, দেখেওছি। পাহাড়, সমুদ্র কিংবা খুব পুরোনো কোনও গাছের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু অ্যাপ্রাইজালের চিন্তায় মগ্ন থাকা শক্ত। খোলা হাওয়ায় চিন্তা কেবল নিজেতে আবদ্ধ থাকতে চায় না, কেবলই এদিকওদিক ছুটে পালাতে চায়, মাঠ দেখলে গড়াগড়ি খেতে চায়, সাগর দেখলে ঝাঁপিয়ে সাঁতার দিতে চায়, পাহাড় দেখলে টঙে চড়ে বসতে চায়। বদ্ধ ঘরে ল্যাপটপের সামনে বসে নিজের দামি মতামত দামি শব্দে মুড়ে পৃথিবীর উদ্দেশ্যে পাঠাতে পাঠাতে নিজের প্রতি মুগ্ধতা যখন ফেঁপে উঠে পাঁজর ফাটিয়ে বেরোবার উপক্রম করে তখন দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালেই গজদন্তমিনার চুরমার, ফানুস চুপসে একশা। আকাশবাতাস গাছপালার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের হাস্যকরতা লুকোনোর পথ পাই না। টবের কারিপাতার গাছটাও আমার থেকে বেশি কাজের, ভাবলেই লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে। অ্যবার উল্টোদিক থেকে যখন ভাবি, এই কারিপাতার গাছটা, ওই পাহাড়টা, ওই আকাশের তারাগুলোর দৃষ্টি দিয়ে যখন নিজেকে দেখার চেষ্টা করি, আর আবিষ্কার করি সে দৃষ্টির নিচে আমার আর অমর্ত্য সেনের মধ্যে অ্যাবসলিউটলি কোনও ফারাক নেই, হাড় মাংস রক্ত হরমোন আর পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়ানোর মত একতিল সময়টুকু ছাড়া দুজনেরই ভাঁড়ারে মা ভবানী, তখন ঠিক কেমন একটা উল্লাস হয় সেটা বলে বোঝানো অসম্ভব।


এই উল্লাসটা অনুভব করতে হলে আকাশ পাহাড় গাছের কাছে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। অর্থাৎ যেগুলোর সৃষ্টিতে মানুষের কোনও কারিকুরি নেই। বুর্জ খলিফাও তো দারুণ বড় ব্যাপার, পৃথিবীর সবথেকে লম্বা গাছেরও কলজেয় কুলোবে না তার সঙ্গে হাইটের টক্কর দেয়, তা বলে বুর্জ খালিফার সামনে হাঁ করে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কি এই উল্লাস হবে? আমি যদিও দাঁড়িয়ে দেখিনি তবু আমার অটল বিশ্বাস, হবে না। সাফ হওয়ার বদলে পারসপেকটিভে বরং আরও গেরো পাকিয়ে যেতে পারে।

কিন্তু সে তো আজ। এই সমকালে। বুর্জ খলিফা যখন অনেক অনেক বুড়ো হবে, যখন সমুদ্র কিংবা মরুভূমি খুঁড়ে আবার একদল মানুষ তুলে আনবে হাড়গোড় ভাঙা বুড়ো খলিফাকে, বিংশ শতাব্দীর আদিম মানুষের কাণ্ড দেখে হাসবে না কাঁদবে ভেবে পাবে না, তখন তাদেরও সেই বিদঘুটে বুর্জ খলিফার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

কারণ তখন অতদিন ধরে সমুদ্রের নিচে থেকে মানুষের সঙ্গবর্জিত হয়ে থেকে থেকে মনুষ্যত্বের শেষ স্পর্শটুকু থেকে বুর্জ মুক্তি পেয়েছে। তার গা থেকে কালো টাকা, বিলাসব্যসনের গন্ধ ঝরে গেছে, টম ক্রুজের ট্রেকিং-এর রুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চের শেষ স্মৃতিটুকু মুচকি হেসে মূছে নিয়ে চলে গেছে সময়। তখন বুর্জ খলিফা ঠিক আর মানুষ, মানে মানুষের বানানো মরণশীল রিয়েল এস্টেট নয়, সমুদ্র আর বালির অংশ হয়ে গেছে সে।

এই যে অশোকস্তম্ভের ভাঙা গুঁড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, ওটাই কি এতদিনে ভেতরে ভেতরে একটা গাছ হয়ে যায়নি? এই যে এই স্তুপটা, সম্রাট অশোকের মহত্ব সে বিস্মৃত হয়েছে কবেই, বিদিশার গরিব শিল্পীদের উদয়াস্ত পরিশ্রমের স্মৃতি, যে মহাত্মা এসে দেওয়ালের বুদ্ধমূর্তির গলায় কোপ বসিয়েছিলেন তাঁর ক্রোধের ছায়াও আর কোথাও এর গায়ে লেগে নেই। কালে কালে আমরা বুড়ো হয়ে মরে যাই, আর এই সব ইটকাঠপ্রস্তরে প্রাণ সঞ্চার হয়। পাথরের গায়ে অদৃশ্য সারি সারি চোখ ফোটে। গাছের চোখ, তারার চোখ, পাহাড়ের চোখ, সাগরের চোখ। পক্ষপাতশূন্য, মায়াহীন, ত্রিকালজ্ঞ চোখ। যে চোখ আমাকে, আমার ডিগ্রি, কালচার, মধ্যবিত্ততা ও বিবিধ পরাজয়ের পরত ভেদ করে আমার ভেতর পর্যন্ত, অনায়াসে দেখে ফেলতে পারে । আর তার চোখে ফুটে ওঠা প্রতিবিম্বর সামনে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্তের জন্য আমিও দেখে নিই নিজেকে। সত্যি সত্যি আমি যা, তাকেই দেখি। একতিল বেশি হয় না, কমও পড়ে না একচুল।       


দুপুর ১২টা ১০: ভোপাল বাসস্ট্যান্ডে নামলাম এক্ষুনি। সাঁচী থেকে গাড়ি নেওয়া যেত, অটো নেওয়া যেত, ট্রেন নেওয়া যেত, গাড়ি নেওয়া যেত, বাসও নেওয়া যেত। ট্রেন নিলে আরাম বেশি কিন্তু সময়ের বাঁধাবাঁধি, অটো বা গাড়ি নিলে টাকা বেশি কিন্তু নিজেরাই নিজেদের মর্জির মালিক, যখন খুশি বেরোও, মাঝপথে যখন খুশি থামো, চা খাও, কবি সম্মেলনের পোস্টার দেখে দাঁত বার করে হাসো, ক্ষেতে নেমে সেলফি তোলো, কারও কিছু বলার নেই। সেই রকম সাব্যস্ত করে হোটেল থেকে বেরিয়েই দেখি একটা বাস হেলেদুলে আসছে মাথায় ইয়া বড় বড় চুমকি বসানো অক্ষরে লেখা “ভোপাল”হাত দেখিয়ে লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম। ছায়ার দিকে জানালার পাশে সিট বেছে বসে চলে এলাম দিব্যি। 

মুশকিল হচ্ছে এখন বাজে মোটে বারোটা আর আমাদের ট্রেন ছাড়বে সোয়া তিনটেয়। ভোপালে অবশ্য দেখার জিনিসের অভাব নেই। কাল ভীমবেটকার গাইড ভাইসাব বলেছিলেন টাইম পেলে যেন ভোপালের স্টেট আর ট্রাইব্যাল মিউজিয়ামটা অবশ্য করে দেখি, বাবা বলেছিলেন বেগমের হাভেলিটা মিস করিস না, ট্রিপঅ্যাডভাইসর ফোরামের সবাই বলেছে ভোপালের লেক দেখতে যেতে। কিন্তু আমরা সবার কথা অগ্রাহ্য করে রকি-ময়ূরের কথা শুনব ঠিক করেছি। রকি-ময়ূর, হাইওয়ে অন মাই প্লেটের বিখ্যাত জুটি, বলেছেন লখনৌ নয়, হায়দরাবাদ নয়, কলকাতা তো নয়ই, ভারতবর্ষের সবশ্রেষ্ঠ বিরিয়ানি পাওয়া যায় এই ভোপালে চটোরি গলির জামিল রেস্টোর‍্যান্টে।

অটোয় উঠে পড়লাম। গলির গলি তস্য গলি পেরিয়ে অটো ভাইসাব ব্রেক কষলেন আর গলিতে পা রেখেই আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল।

অবশ্য এ’রকমটা যে হবে এটা আশা করাই উচিত ছিল। এই ধরণের টিভি শো খ্যাত দোকান থাকা মানেই (লোকাল খ্যাতি হয়তো আগেই ছিল, আমি গ্লোবাল খ্যাতির কথা বলছি) সেই দোকানের একটা দুটো তিনটে করে নকল থাকবে। থাকবেই। গলির এই ফুটে একটা জামিল দেখছি, ঘাড় ঘুরিয়ে ওই ফুটে আর একটা। অলমোস্ট মুখোমুখি। একটা বেশ বড়। খানিকটা টুন্ডে টুন্ডে দেখতে। অন্যটা নিরীক্ষণের জন্য এগিয়ে যেতে বুঝলাম এই সেটি দোতলায়। কিন্তু একতলায় খদ্দের ধরার জন্য একজন দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে দেখেই আমরা আর এগোলাম না। গুটি গুটি এসে আগের দোকানটায় ঢুকে পড়লাম।

এ কী, এখনও খোলেনি নাকি? কাকপক্ষী আছে বলে তো মনে হচ্ছে নাজোম্যাটোয় যে লিখেছে বারোটা না ক’টায় খোলে, এখন তো সোয়া বারোটা বেজে গেছে। কী ঝামেলা। চল ভেতরে গিয়ে দেখা যাক।

বসামাত্র এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। বিরিয়ানি? আভি তো বনা নহি। টাইম লাগেগা। কোর্মা লে লিজিয়েআর কী। কোর্মাই আনুন। অলরেডি মুখ বিস্বাদ হয়ে গেছে। রিভিউতে অবশ্য এদের কোর্মারও তারিফ করেছিল খুব, কিন্তু ভারতশ্রেষ্ঠ তো আর বলেনি। একবার লেক ঘুরে আসব নাকি? গুগল ম্যাপে হাঁটাপথ দেখাচ্ছে। ক্ষিদে বাড়বে, এদের বিরিয়ানিও হয়ে যাবে। কিন্তু বাইরে বড় রোদ। ধুর, কোর্মাই খাই চল। কপালে যখন কোর্মাই আছে। আমার কপাল বলে কথা। কেন আমার সঙ্গেই এত অনাচার, ভগবান?


কোর্মা এল। পিলে চমকে দেওয়ার মতো তার চেহারা। খেলেই তিন দিন আয়ু কমে যাবে সন্দেহ হয়। অবশ্য এই ইউজলেস আয়ু বাড়িয়েই বা লাভ কী? মনের দুঃখে একচামচ তেল মুখে পুরে দিলাম। খেতে কিন্তু ভালো, না? বাবা রুটিগুলো কী পাতলা। সত্যি সত্যি রুমাল মনে হচ্ছে।


আচ্ছা, বলছি কি, আমাদের তো তাড়া নেই, এখানে বসে বিরিয়ানি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করলে হয় না?

দিব্যি হয়।

বলে দেখি, অ্যাঁ?

বল বল।

আমাদের টেবিল দখল করে বসে থাকায় ভাইসাবেরও আপত্তি নেই বোঝা গেল। তিনি রান্নাঘরে গিয়ে খবরটা দিয়ে এলেন। যিনি রাঁধবেন তিনি মনে হয় রেগে গেছেন। ধীরে সুস্থে আড়মোড়া ভেঙে দিনের কাজ শুরু করবেন ভেবেছিলেন এখন হুড়োতাড়া করে রাঁধতে হচ্ছে। ভয়ানক সব আওয়াজ আসছে রান্নাঘরের দিক থেকে। দুমদাম, ঝনঝন, শোঁশোঁ, গোঁগোঁঅর্চিষ্মান আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, হয়তো রাগ হয়নি, হয়তো বিরিয়ানি রাঁধতে গেলে ওই রকমই সব শব্দ হয়। এ তো আর কলকাতা বিরিয়ানি হাউসের বিরিয়ানি নয়, ভারতসেরা বিরিয়ানি।


বিরিয়ানি রান্না হতে থাকল, আমরা ব্যাগ থেকে বইপত্র খেলনাপাতি বার করে ছড়িয়ে বসলাম। রহস্য জমে উঠেছে, বহ্নি যে শকুন্তলাদেবী সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে, এখন পতঙ্গটি কে, নর্মদাশংকর না রতিকান্ত, সেটাই দেখা বাকি। সামনের সিসিটিভিতে দেখতে পেলাম দোকানে আরও দুজন খদ্দের এসেছেন। এঁরাও বিরিয়ানি অর্ডার করলেন মনে হয়। ভাইসাব এঁদেরও বসিয়ে রেখে এসে নিজেও এসে একটা টেবিলে বসে খুব মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়তে লাগলেন। একটু পর বিরিয়ানি এসে গেল।


ভারতসেরা কী না জানি না, এ রকম বিরিয়ানি আমি আগে কোনওদিনও খাইনি। না এ রকম দেখতে, না এ রকম খেতে। আমি যে খাইনি সেটা বিশেষ আশ্চর্যের নয়, অর্চিষ্মান বলল ও-ও নাকি খায়নি। ভাতটা আলাদা, ওপরে ভাজা পেঁয়াজ কুচি ছড়ানোর কায়দাটা আলাদা। আর মাংসটাও। সতর্ক ভাবে এককুচি মাংস মুখে পুরেই অর্চিষ্মানের মুখটা কালো হয়ে গেল।

বাঙালি বিরিয়ানির সব ভালো, শুধু মাংসটা যদি এদের মতো ম্যানেজ করতে শিখত 


সত্যি, মাংসটা চমৎকার। অ্যাকচুয়ালি চমৎকার শব্দটা খানিকটা খাটো পড়ে। মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য ভাষা যে যথেষ্ট নয় সেটা আমি আগেও দেখেছি। আমি দেখিনি, মা দেখিয়েছেন। বার বার তাঁর অসামান্য মনের অসাধারণ ভাবেদের প্রকাশ করতে গিয়ে ঠোক্কর খেয়েছেন শুধু ঠিকমতো শব্দের অপ্রতুলতায়। কিন্তু ভাষার অভাবে ভাবপ্রকাশ বন্ধ রাখার বান্দা আমার মা নন। তিনি চালু শব্দটাই একটু অদলবদল করে ব্যবহার করতেন। আমার জায়গায় যদি আমার মা থাকতেন, আর মাংসটা খেয়ে যদি তাঁর মনে হত চমৎকার বললে এর প্রতি অবিচার হয় (অবশ্য মাংসের প্রতি মায়ের এ ধরণের মুগ্ধতা জাগা বেশ কঠিন, মাংসের জায়গায় রসগোল্লা হলে বরং মানানসই হবে) তাহলে তিনি খানিকক্ষণ ভেবে ঘোষণা করতেন, এ মাংসটা হচ্ছে মচৎকার।

সেই মচৎকার মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে আমরা মুখে পুরতে লাগলাম। গলা দিয়ে আঃ উঃ নানারকম তৃপ্তিসূচক আওয়াজ বেরোতে লাগল, মাথা দুলতে লাগল, চোখ বুজে আসতে লাগল। ভাইসাব যখন ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “ক্যায়সা লাগা বিরিয়ানি?” তখন আমাদের বাকশক্তি লোপ পেয়েছে, খালি হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে একখানা গোল্লা পাকিয়ে, বাকি তিনটে আঙুল হাতপাখার মতো মেলে ধরে দেখানো ছাড়া উপায় নেই। মচৎকার। অওর লাউঁ? লাইয়ে লাইয়ে। সিসিটিভিতে দেখতে পাচ্ছি দোকান ভরে উঠছে। বিরিয়ানির পর বিরিয়ানির থালা বেরোছে রান্নাঘর থেকে। এখন আর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। রাঁধিয়ে বোধহয় বুঝতে পেরেছেন, আজও তাঁর বিরিয়ানি হিট। আর অমনি তাঁর রাগ পড়ে গেছে। স্বাভাবিক। যোগ্য তারিফ না পেলে শিল্পীর চলবে কেন?


পৃথিবীতে কিছু কিছু খাবার থাকে ক্ষিদে পাওয়ার সঙ্গে যাদের কোনও সম্পর্ক নেই। ক্ষিদেয় অক্ষিদেয় রুচিতে অরুচিতে আরামে ব্যারামে তাদের খাওয়া চলে। মায়ের হাতের সব রান্না সেই শ্রেণীতে পড়ে, আর পড়ে হাতে গোনা কয়েকটা খাবার, যেমন ফুচকা। জামিল হোটেলের বিরিয়ানিও তাদের মধ্যে একটা। এই যে আমরা আরও একটা প্লেট নিলাম তার কি কোনও দরকার ছিল? পেট কি অলরেডি বলছে না, “ওরে আর খাস না? জেলুসিলও তো আনিসনি সঙ্গে।” কিন্তু জিভ বলছে, “আরে ওর কথা শুনো না, আর এক চামচ বিরিয়ানি পাঠাও আমার দিকে গোলমাল বুঝলে বাইরে বেরিয়ে এক বোতল থামস আপ কিনে নিও’খন। সব হজম হয়ে যাবে।”

বেলা ৩টে ২০: শতাব্দী অনটাইম ছেড়েছে। ভালোই হয়েছে, এতেই দিল্লি পৌঁছোতে মাঝরাত হবে, কাল সকালে আবার অফিস। উঁহু এখন আমি অফিসের কথা ভাবব না কিছুতেই। এখন পাকস্থলীতে ভারতবর্ষের সেরা বিরিয়ানি আর মগজে দৃষ্টিতে ভারতবর্ষের বুড়োথুত্থুড়ে ছবি ভরে নিয়ে চলেছি আমি। একান্ন নম্বর মনাস্টেরির ওপারে অস্তসূর্যের সেই অদ্ভুত আলোটার কথা মনে পড়ছে খুব, আর একবার যদি দেখতে পেতাম। আরও একবার যদি ভীমবেটকার ওই কচ্ছপ পাথরটার সামনে বসে সামনের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারতাম, যেখানে দাঁড়িয়ে ভীম বাইনোকুলার হাতে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতেন। ভোপালও তো দেখা হল না। সন্ধ্যের আলোয় চটোরি গলির ঠাটঠমক দেখা হল না। সাইকেল ভাড়া করে বিকেলবেলা লেকের ধারে চক্কর মারা হল না (অর্চিষ্মানের সাইকেল চালাতে পারার দাবির সত্যাসত্য পরখের সুযোগটাও ফসকে গেল।)


অনেক দিন আগে টিভিতে শুনেছিলাম গানটা। মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের বিজ্ঞাপন। ওদের রাজ্যে কত ভালো ভালো দেখার জিনিস আছে তার ব্যাখ্যান করে একটি গান। সে গানের কথা সব ভুলে মেরে দিয়েছি, খালি সুরটা এখনও মাথায় গেঁথে আছে আর গেঁথে আছে গানের শেষ পংক্তিদুটো। ঘুরিয়েফিরিয়ে গাইয়ে গাইছেন, “হিন্দুস্তান কা দিল দেখো/ হিন্দুস্তান কা দিল দেখো”। (এই বিজ্ঞাপনটা খানিক পরের, এটিও চমৎকার) গত দু’দিন ক্ষেত দেখছিলাম, স্তুপ দেখছিলাম, ভাঙা স্তম্ভের গায়ে যক্ষীর অক্ষত ভুঁড়ি আর শালভঞ্জিকার ক্ষীণকটির ছন্দ দেখছিলাম, ভীমবেটকার আদিম ছেলেমানুষদের ছবি দেখছিলাম, ভোজপুরের ভাঙা মন্দির দেখছিলাম, ক্ষেতের পথে কলসি মাথায় মহিলা, সেলফি নেওয়া যুবক দেখছিলাম আর দেখতে দেখতে মাথার মধ্যে লাইনটা ঘুরঘুর করছিল। হিন্দুস্তান কা দিল দেখো হিন্দুস্তান কা দিল দেখো।

কবে শুনেছি, অথচ এই চৌঁত্রিশ বছরে পৌঁছে তবে আমার ফুরসৎ হল হিন্দুস্তানের দিল দেখতে আসার। তাও কি দেখা হল? হিন্দুস্তানের বিরাট বিস্তৃত আদিগন্ত রৌদ্রস্নাত রক্তপলাশের ছিটে লাগা দিল, সে কি এই আটচল্লিশ ঘণ্টার ঝটিকাসফরে দেখে ফেলা যায়? না সে চেষ্টা করা উচিত? সে করতে এসে উল্টো বিপদ হল। এই যে আমরা এখন ফিরে চলেছি দিল্লির দিকে, দুটো ব্যাকপ্যাক আর একখানা ক্যামেরার ব্যাগ আর স্টেশন থেকে কেনা একখানা থামস আপ-এর বোতল – এই চারটে লাগেজ আর আমাদের দুটো দেহ দুটো মুণ্ডু দুটো নাক দুটো মুখ চারটে কান বত্রিশ বত্রিশ চৌষট্টিখানা দাঁত আর কুড়ি কুড়ি চল্লিশখানা আঙুল, দু’জনে মিলে দু’শো বার করে গুনে মনে করে ট্রেনে তুলেছি, কিন্তু দিল? এখন যখন ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে দেখছি দু’টো দিলই আধখানা করে মিসিং। তারা বাঁধা পড়ে আছে ভীমবেটকার গুহায় হাতির পিঠে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো সেই বীরপুরুষের বর্শার ফলায় আর সেই থুত্থুড়ি যাদুকরী যক্ষিণীর বেণীর ফাঁদে।

সে ফাঁদ ছাড়িয়ে তাদের এ জীবনের মতো ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার দুরাশা নেই আমাদের। কিন্তু তাদের টানে যে আরও অনেকবার মধ্যপ্রদেশে ফিরে আসব আমরা সে প্রত্যয়টুকু আছে ষোলো আনা।


                                            (শেষ)





 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.