December 04, 2019

উনিশ কুড়ি



ডিসেম্বর এসে গেল!

বিস্ময়চিহ্ন দিলাম যদিও বিস্ময় জাগার কথা নয়। বিস্ময় তখনই জাগতে পারত যদি জুনের পর একলাফে ডিসেম্বর এসে যেত, কিংবা জুলাইয়ের পর সোজা পরের বছর মার্চ। তা তো হয়নি। প্রতিটি সেকেন্ড প্রতিটি মিনিট প্রতিটি দিন গুনেগেঁথে জুনের পর জুলাই অগস্ট সেপ্টেম্বর অক্টোবর নভেম্বরের প্রতিটি উইকেন্ড পার করে অবশেষে ডিসেম্বরে এসে পৌঁছেছি। 

পৌঁছে গালে হাত দিয়ে বলছি, ভাবা যায়? ডিসেম্বর এসে গেল?

ঠাণ্ডাও এসেছে ভালোমতোই। রুম হিটার, লেপকম্বল ঝেড়েঝুড়ে নামানো হয়েছে। চা খাওয়ার থেকে চায়ের কাপের ওম প্রিয়তর হয়ে উঠছে। আমার চেনা অনেকেরই ঠাণ্ডা লাগছে আবার অনেকের লাগছে না। তাঁরা বলছেন, ধুর ধুর এ আবার ঠাণ্ডা হল। ঠাণ্ডা পড়ত গিয়ে… বলে কে জানে কোন স্বর্ণালী শীতের স্মৃতিতে মুখ হাঁড়ি করছেন।

ডিসেম্বর যখন এসেই গেল, তখন ডিসেম্বরে যা যা করার করে ফেলা যাক। পিছু ফিরি, সামনের জন্য কষে কোমর বাঁধি। আগের বছরের রেজলিউশনের লেপকাঁথাগুলো ঝেড়েমুছে রোদ্দুরে দিয়ে দেখি কতখানি আস্ত রয়েছে আর কতখানি পোকায় কেটেছে।

এ বছরের শুরুতে আমার ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার ছিল ফিনিশ। আমি যদিও শুরু করা কাজ শেষ করব, মাঝপথে ফেলে রেখে লাফ দিয়ে নতুন কিছু শুরু করব না, তারপর সেটা আধখ্যাঁচড়া ফেলে রেখে আরেকটা চকচকে কিছু পেছনে ছুটব না এত সব মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে শব্দটি বেছেছিলাম, বছরের শেষে সেটা নতুন মানে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

আজন্ম যে জীবনটা আমি নিজের বলে জেনে এসেছিলাম, দু’হাজার উনিশে তা শেষ হয়েছে।

আবার শুরুও হয়েছে। অন্যরকম, নতুন একটা জীবন। সেই নতুন জীবনটায় এমন খাপে খাপ ফিট করে গেলাম কী করে ভেবে এখনও মাঝে মাঝে অবাক হচ্ছি, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে  বিস্ময়ের মাত্রা কমছে। বুঝছি, যতদিন না আমি শেষ হচ্ছি ততদিন কিছু শেষ হওয়া মানে অন্য কিছু শুরু হওয়া। আমার বেঁচে থাকার জন্য আমার, কেবল আমার, প্রাণটুকু ছাড়া আর কিছুই অপরিহার্য নয়। 

শুরু যখন করতেই হবে, তখন সেটা স্বেচ্ছায় করাই ভালো। তাই আমার সামনের বছরের শব্দঃ শুরু। 

এ ছাড়া এ বছরে বলার মতো কিছু ঘটেনি। অন্যান্য বছরের মতোই বুড়ো হয়েছি, বেড়াতে গেছি, বই পড়েছি। যত পড়ব ভেবে রেখেছিলাম তার থেকে বেশিই পড়েছি। এ বছরের পড়া বই নিয়ে একটা পোস্ট লেখার ইচ্ছে আছে, কিন্তু নেক্সট কুড়িপঁচিশ দিনে আরও কয়েকটা বই পড়ে ফেলার উচ্চাশা আছে, কাজেই সে পোস্ট মাসের শেষে বা জানুয়ারির শুরুতেও আসতে পারে। 

এ বছর অনেক নতুন জিনিস জেনেছি। পুঁই শাকের যে বীজ হয় আর সে বীজ যে রান্না করে খাওয়া যায় এই বছরেই জানা হল। তাও শেষের দিকে এসে। আমার না-জানা দিয়ে অবশ্য সবজির বিরলত্ব প্রমাণ হবে না। আলু পটল ফুলকপি বাঁধাকপি বাদ দিয়ে এমনিই আমি তরিতরকারি বেশি একটা চিনি না, লাউ চালকুমড়োয় রেগুলার গুলোই, রং দেখে লাল শাক আর ভালোবাসা দিয়ে কলমি শাক চিনি। চিনি না বলে অবশ্য লজ্জা পাই না; মহাপুরুষরা তো বলেই গেছেন, যাবত বাঁচা তাবত শেখা। নতুন জিনিস দেখলেই প্রশ্ন করি, এটা কী, ওটা কী। না নিলেও, না খেলেও। জানতে তো দোষ নেই। অনেকে নিজের অজ্ঞানতা প্রকাশে ভয় পান; ট্যালা খদ্দের বুঝে দোকানি যদি বেশি দাম নেন। আমার এক ভাই এই ভয়ে ভুগত। একদিন তার ভেটকি খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে আর সে বাজারে গেছে। এদিকে সে ভেটকি চেনে না। আমি হলে সোজা জানতে চাইতাম, এই যে এত মাছ শুইয়ে রেখেছেন এর মধ্যে ভেটকি কোনটা? ভাই আমার মতো বোকা নয়। সে নাকি মুখটা জোর করে মাছের দিক থেকে ঘুরিয়ে রেখে বলেছিল, কী দাদা, ভেটকি নেই? তখন দাদা, কেন থাকবে না, ওই তো, বলে আঙুল দিয়ে ভেটকি পয়েন্ট আউট করেছিলেন। তখন ভাই আকাশ থেকে পড়ে বলেছিল, এহ হে, দেখেছেন একেবারে চোখের সামনেই আছে অথচ দেখতে পাইনি। তা কত করে দিচ্ছেন?

আমি আর বললাম না যে এ সব টিপস অ্যান্ড ট্রিকস আমাদের ডাকাতদাদার সঙ্গে চলবে না। আপনি ভারতীয় শাকসবজির চলন্তু এনসাইক্লোপিডিয়া হন কি ট্যালারাম সর্দার, ওঁর যদি ঠকানোর ইচ্ছে হয় তো ঠকাবেন। কম আর বেশি। এতদিন ঠকে ঠকে আমরা এখন বুঝতে পারি কোনদিন কম ঠকলাম কোনদিন বেশি। যেদিন উনি বেশি বেশি ধনেপাতা কাঁচালংকা ফ্রি দেন সেদিন বুঝি দাঁও মেরেছেন, আর যেদিন গুটিকয়েক শুঁটকো লংকা ছুঁড়ে ব্যাগে ফেলেন, সেদিন বুঝি দাদা হাত কামড়াচ্ছেন। 

কাল কচুপাতার মতো লম্বা লম্বা ডাঁটির মাথায় পাতা দেখে জিজ্ঞাসা করলাম এটা কী? (কচুপাতা চিনি, কাজেই কচুপাতা যে নয় সেটা শিওর ছিলাম) ডাকাতদাদার স্যাঙাৎ, আরে এটা তো শীষ পালং। দারুণ খেতে। বলেই দু'খানা ডাঁটি তুলে আমার ব্যাগে চালান করলেন। আমি বললাম, আচ্ছা, তাহলে দিয়ে দিন। গীতাদি সকালবেলা এসে ফ্রিজ খুলে খুব খুশি হলেন। আবার দুঃখও পেলেন। 

সঙ্গে একটু কুমড়ো আনোনি? আর একটুখানি বেগুন? বললাম পরের দিন আনব’খন। 

গীতাদির খুব দুঃখ আমরা যথেষ্ট খাইদাই না। নালিশ করেন, কী খালি আলু খাও সকালবিকেল। তোমাদের অল্প বয়স (গীতাদির তুলনায়), খাটের ওপর লেপের ভেতর বসে থাকবে, আমি রকম রকম রেঁধে দেব, খাবে। ঝাড়া হাত পা তোমাদের, আরাম করবে না তো কী করবে।

এই জিনিসটাও জানলাম, এ বছরে নয় অবশ্য। হারানো ক্রেডিট কার্ডের খোঁজে পোস্টঅফিস ব্যাংক এক করে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরলে নিচের কাকিমা জানালা থেকে মুখ বার করে জিজ্ঞাসা করবেন, সিনেমা দেখে ফেরা হল বুঝি? আবার হয়তো যাচ্ছি গ্যাসের দোকানে তাগাদা দিতে, ওপরের কাকিমা হেঁকে বলবেন, আজ কী খেতে যাওয়া হচ্ছে, দোসা না চাউমিন? 

যেন খাওয়া আর সিনেমা দেখা ছাড়া আমাদের আর কোনও কাজ নেই। আমাদের দেখলে সম্ভবতঃ তাই মনে হয়, অবান্তরের পাতাতেও সেই রকমই একটা আভাস ফুটে বেরোয়, সে আঁচ আমি পেয়েছি।আমাদের এইরকম অকর্মার ঢেঁকি ইমেজ দেখে রাগ হতে পারত, কিন্তু হয় না। কারণ, এক, ইমেজটা সত্যি। দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে, কর্মবীর হওয়া, অন্তত আমার জীবনের সার্থকতার শর্ত যে নয় সেটা এ বছর নয়, গত বেশ কয়েক বছরে জেনে গেছি। বরং এই যে ফুরফুরিয়ে ভেসে যাচ্ছি, আমার জীবনের এই ছবিটাই যদি লোকের চোখে ভেসে থাকে আমার থেকে বেশি খুশি কেউ হবে না। কারণ ওটাই আমার অ্যাসপিরেশন।

সামনের বছর এ বছরের থেকেও নির্ভার জীবনযাপন করব। বই পড়া, শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাওয়া, প্রতিক্রিয়া আরও কমিয়ে আনা, এ সব গতে বাঁধা রেজলিউশনের পাশাপাশি ওটাই আমার দু’হাজার কুড়ির রেজলিউশন।


November 28, 2019

মার্গারেট মিলার



আগের বছর আমি গুডরিডস চ্যালেঞ্জ সম্পূর্ণ করতে পারিনি। পঞ্চাশের জায়গায় সম্ভবতঃ কেঁদেককিয়ে ছেচল্লিশটা বই পর্যন্ত গিয়ে ক্ষান্ত দিয়েছিলাম।। এ বছর জুলাই মাসের পর যখন এক পাতা পড়তেও কনসেন্ট্রেশনে টান পড়ছিল,  আমি সত্যিই ভেবেছিলাম এ বছরও গুডরিডস চ্যালেঞ্জে গাড্ডু পাব। 

তার বদলে আমি অলরেডি, (অক্টোবরের গোড়াতেই অ্যাকচুয়ালি) পাস করে গেছি শুধু তাই নয়, থামার কোনও লক্ষণ দেখাচ্ছি না। পঞ্চান্ন হয়ে গেছে, কপাল ভালো থাকলে ষাটও হয়ে যাবে। 

এর সিংহভাগ কৃতিত্ব মার্গারেট মিলারের। আর অল্প একটুখানি গার্ডিয়ান পত্রিকারও কারণ ওই পত্রিকারই অনলাইন সাইটে ‘ফরগটেন মিস্ট্রি রাইটার্স’ গোছের একটা প্রতিবেদনে আমি মার্গারেট মিলারের নাম আবিষ্কার করি। আরও কিছু অচেনা লেখক ওই লিস্টে ছিলেন যাঁদের লিখনশৈলী, সমসাময়িক সাহিত্যে অবদান ইত্যাদি গুরুতর প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে আলোকপাত করা হয়েছিল। কিন্তু স্বীকার করছি, তাঁদের প্রতি আমি ততটাও কৌতূহল বোধ করিনি যতটা মার্গারেট মিলার সম্পর্কে করেছিলাম। আমার চোখ টেনেছিল যে তথ্যখানা সেটা হচ্ছে আগাথা ক্রিস্টি মার্গারেট মিলারের ফ্যান ছিলেন।

মার্গারেট মিলার ছিলেন একজন অ্যামেরিকান ক্যানাডিয়ান রহস্যরোমাঞ্চ লেখক, জন্মেছিলেন উনিশশো পনেরোয়, মারা গিয়েছেন উনিশশো চুরানব্বইয়ে। উপন্যাস ছোটগল্প নাটক নানারকম লেখা লিখেছেন মিলার, অধিকাংশই রহস্যরোমাঞ্চ ঘরানার এবং আমি, বলা বাহুল্য, সেগুলোতেই আলোকপাত করব। রহস্যরোমাঞ্চর মধ্যেও ছোটগল্প আমি মোটে কয়েকটা পড়ে উঠতে পেরেছি, কাজেই এই পোস্টে তাঁর রহস্যরোমাঞ্চ উপন্যাস নিয়েই কথা হবে।

মার্গারেট মিলারের রহস্যরোমাঞ্চ উপন্যাসসমূহকে দুটো মোটা ভাগে ভাগ করা যায়। গোয়েন্দা সিরিজ আর স্ট্যান্ড অ্যালোন। মার্গারেট মিলার তিন জন গোয়েন্দাকে নিয়ে সিরিজ লিখেছেন, যদিও অন্যান্য গোয়েন্দালেখকদের তুলনায় তাঁর সিরিজগুলি স্বল্প দৈর্ঘ্যের। এক, সাইকায়াট্রিস্ট পল প্রাই (তিনটি গল্প) ; দুই, ইন্সপেক্টর স্যান্ডস (দুটি গল্প) এবং তিন, উঠতি উকিল টম অ্যারাগন (তিনটি গল্প)

আমি মিলারের প্রথম যে বইটা পড়েছিলাম তার নাম হচ্ছে 'দ্য ডেভিল লাভস মি', তার হিরো ছিলেন ডক্টর পল প্রাই। মনোচিকিৎসক পল প্রাইয়ের গোয়েন্দাগিরিতে তিনখানা উপন্যাস লিখেছিলেন মিলার, আমি পড়েছি তার মধ্যে মোটে একটা, কাজেই এইটুকুতেই মতামত জাহির, তাও আবার কি না নেগেটিভ, অন্যায় হতে পারে কিন্তু তবু ঝুঁকি নিচ্ছি। চাল একটা টিপেই ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রাইয়ের প্রধান অসুবিধেটা হচ্ছে ভদ্রলোক মারাত্মক স্মাগ। তাছাড়াও গল্প শুরুর তিন পাতার মধ্যে তিনি কুপিত হয়ে তাঁর বাগদত্তাকে ঠাস করে একটি চড় কষালেন এবং পরমুহূর্তেই বুকে টেনে নিয়ে পরম আশ্লেষে চুম্বন করলেন এবং বাগদত্তা কপট রাগে প্রাইকে “বিস্ট!” ভর্ৎসনা করলেন। যদিও সব মধুরেণ সমাপয়েৎ হল কিন্তু আমার মেজাজটা যে চটকে গেল, আর ঠিক হল না।

মিলারের দ্বিতীয় গোয়েন্দা ইন্সপেক্টর স্যান্ডসের দুটি উপন্যাস ‘ওয়াল অফ আইজ’ আর ‘দ্য আয়রন গেটস’ দুটোই আমার পড়া হয়েছে। এঁর চরিত্রে বলার মতো তেমন কিছু বিশিষ্ট নেই। গতে বাঁধা, শান্তশিষ্ট, ভদ্রসভ্য, মিতবাক পুলিস অফিসার। সেটা অ্যাকচুয়ালি আমার মতে ভালো। কানা মামার তুলনায় শূন্য গোয়াল আমার চিরকালই বেশি পছন্দের।  

মার্গারেট মিলারের তিন নম্বর গোয়েন্দা টম অ্যারাগন আমার মতে সবথেকে ইন্টারেস্টিং। অর্ধেক স্প্যানিশ এই তরুণ উকিল মিলার কেন, আমার পড়া গোয়েন্দাদের মধ্যে অন্যতম ছক-ভাঙা গোয়েন্দা। এক নম্বর, এঁর এথনিসিটি। দুই, এঁর কেসের অনেকগুলোই ঘটে মেক্সিকো অ্যামেরিকার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বা মেক্সিকোতে। টম অ্যারাগন নববিবাহিত এবং অ্যারাগনের স্ত্রী লরি একজন সফল এবং একনিষ্ঠ শিশুচিকিৎসক। টম এবং লুসির লং ডিসট্যান্স দাম্পত্য যাকে বলে #কাপলগোলস। এই রকম আধুনিক দাম্পত্য আমি আধুনিক সাহিত্যেও বেশি দেখিনি। কথোপকথনে প্রেম এবং সারকাজমের (কখনও একে অপরের প্রতি নয়) এমন মাপমতো মিশেল, বিরল।

মিলারের যে গোটা পনেরো উপন্যাস পড়েছি, সবগুলোর প্লট বলে আপনাদের বোর করব না, তার থেকে মিলারের লেখার যাকে বলে স্যালিয়েন্ট পয়েন্ট, আমার বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী তুলে ধরার চেষ্টা করি।

মিলারের গল্পে একের পর এক খুন, বসে বসে ক্লুয়ের হিসেবনিকেশ, এগুলো কম থাকে। ইন্সপেকটর স্যান্ডের গল্পগুলোতে তবু এই ধ্রুপদী চলন দেখা যায়, কারণ সেখানে পেশার কারণেই স্যান্ডকে একটা নির্দিষ্ট পথে রহস্যের সমাধান করতে হয়। তবুও সে যৎসামান্য। টম অ্যারাগনের অনেকটা অ্যাডভেঞ্চারমূলক, দেশেবিদেশে ছোটাছুটি, জালজালিয়াত ধরার ব্যাপার, অজ্ঞাতবাসী আততায়ীদের পশ্চাদ্ধাবন, আর প্রাইয়ের গল্পে, অন্ততঃ আমি যেটা পড়েছি, তাতেও ধাঁধা সমাধানের থেকে অন্যান্য বিষয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলেই আমার মনে হয়। 

তা বলে কিন্তু ভেবে নেবেন না যে মিলারের গল্প টানটান নয়। একেবারে লাস্ট পাতা পর্যন্ত আপনাকে বসিয়ে রাখার মতো ক্ষমতা মিলারের আছে, কিন্তু তাঁর টুলবাক্সে ক্লু, রেড হেরিং, আঙুলের ছাপ, ফরেনসিক রিপোর্ট ইত্যাদির থেকে জোরালো হল অপরাধ ও অপরাধীর বিশ্লেষণ। 

রুথ রেন্ডেলের লেখাতে অনেক সময় আমি চরিত্রের এবং অপরাধের ওপর এই ঝোঁকটা লক্ষ করেছি, তবে দুজনের লেখার মিলের ওইখানেই ইতি। মার্গারেট মিলারের লেখা অনেক বেশি “সুখপাঠ্য”। কারও লেখাকে সুখপাঠ্য শিরোপা দেওয়ার বিপদ হচ্ছে সিরিয়াস পাঠকরা ছিটকে উঠতে পারেন। কিছু লেখককে গর্ব করে বলতে শুনেছি, আমি সুখপাঠ্য লিখি না। তাঁদের ফানুস আমি ফুটো করতে চাই না। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে কোনও না কোনও পাঠককে তাঁদের লেখা সুখ দেবেই দেবে, আটকানো যাবে না। ডেভিড ওয়ালেস আর অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় পড়েও বহু পাঠক সুখ পেয়েছেন। ওঁরা বড়জোর যেটা দাবি করতে পারেন যে ওঁদের লেখা কেবল বুদ্ধিমানদেরই (ওঁদের সংজ্ঞায়) সুখদান করবে, সিরিয়াল যারা দেখে তাদের করবে না। 

যাই হোক, মিলার কমার্শিয়াল সাকসেস পেয়েছিলেন কাজেই ওর লেখা পাঠককে কী ধরণের সুখদান করে সেটা আপনি আন্দাজ করে নিতে পারেন। টানটান গল্প, বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ, শোয়িং অ্যান্ড টেলিং-এর নিখুঁত ব্যালেন্স, কমার্শিয়াল সাফল্য পাওয়ার জন্য যা যা দরকার সব ছিল মার্গারেট মিলারের বইতে। মিলারের হিট উপন্যাস ‘বিস্ট ইন ভিউ’ নিয়ে হিচকক তাঁর গল্প নিয়ে একটা এপিসোড বানিয়েছিলেন তাঁর 'অ্যালফ্রেড হিচকক প্রেজেন্টস’ সিরিজে।

আর আছে প্রেক্ষাপট, চরিত্র, মোটিভ আর অপরচুনিটির অপার বিস্তার। বন্ধ ঘরে খুন জাতীয় লেখা মিলার কম লিখেছেন কাজেই দেশ ঘুরে, শহরের পথে পথে, অভিজাতের প্রাসাদ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পাড়া থেকে জালিয়াত আধ্যাত্মিক সোসাইটি, সর্বত্র মিলার তাঁর গল্প ফেঁদেছেন।

মার্গারেট মিলারের লেখা পড়লে আরও যে বৈশিষ্ট্য যে কারও নজরে পড়বে, এবং আমার মিলারের প্রেমে পড়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ, তা হল মিলারের লেখায় মেয়েদের সবল, সপাট উপস্থিতি। মিলারের তিনজন গোয়েন্দার কেউই মহিলা নন ঠিকই, কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে ও সব গল্পেও সব থেকে ইন্টারেস্টিং চরিত্রগুলো কেউই গোয়েন্দারা নন। প্রায় প্রতি উপন্যাসেই সেই সিংহাসনটা অবধারিত কোনও না কোনও মহিলাচরিত্রের জন্য নির্ধারিত থাকে।

আনলাইকেবল মহিলা, পাপপুণ্য ভালোমন্দের সীমারেখা অনায়াসে পারাপার করা মহিলা, মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়ে অপরাধ সংঘটনকারী মহিলা, স্রেফ লোভের বশবর্তী হয়ে দুষ্কর্ম করা মহিলা, প্রেমে পাগল মহিলা, মন বলে বস্তু নেই মহিলা,  যুবতী সুন্দরী মহিলা, গতযৌবনা কুচ্ছিত মহিলা - মার্গারেট মিলারের নায়িকাদের রেঞ্জ অবিশ্বাস্য এবং গল্পের স্টিয়ারিং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদেরই হাতে।

দেখেশুনে আমি মিলারের অনুরাগী হয়ে পড়লাম। তাছাড়া টম অ্যারাগন সিরিজও ছিল।  যে সময় এবং যে ঘরানায় ডাইভারসিটি বলতে লালমুখো আর সাদামুখো সাহেব আর বড় জোর ফিল গুড কালো চাকর, সেখানে একটা নন-শ্বেতাঙ্গ দেশে গল্প নিয়ে ফেলা, গল্পে সে দেশের মানুষকে অর্থপূর্ণ অবদান রাখতে অ্যালাউ করা - সোজা কথা নয়।

অচিরেই মুগ্ধতা চোট খেলো। ক্রমে আবিষ্কার হল যে মিলারের গল্পে মেক্সিকোর প্রধান উপযোগিতা হচ্ছে অ্যামেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দুষ্কৃতীদের লুকিয়ে রাখা। তাতেও আমার অসুবিধে ছিল না, যতক্ষণ না মিলার মেক্সিকোর "ন্যাশনাল ক্যারেকটারিস্টিকস" লিখতে শুরু করলেন। এবং সে ক্যারেক্টারিস্টিকসগুলো হচ্ছে, অনৃতভাষণ, চৌর্যবৃত্তি, মাতলামো ইত্যাদি আরও সব ভালো ভালো ব্যাপার।

এইটা আমার ইন্টারেস্টিং লাগে। সারা পৃথিবী যাঁদের ন্যাশনাল ক্যারেক্টারিস্টিকস বলতে রসবোধ, সময়ানুবর্তিতা, সাহসিকতা ইত্যাদি চমৎকার সব গুণ বেছে নিয়েছে, বাকি পৃথিবীর বাকি দেশের বাকি জাতির লোকদের ক্যারেক্টারিস্টিকস বাছার সময় তাঁরা আরেকটু উদারতা দেখাতে পারেন না কেন কে জানে।

সবথেকে অদ্ভুত হচ্ছে ডিসঅ্যাডভান্টেজিয়াস অবস্থানে থাকার জ্বালা মার্গারেট মিলার নিজে বোঝেন না তো হতে পারে না, তাঁর বইয়ের প্রতি ছত্রে সে জ্বালার প্রমাণ আছে। নারীচরিত্রের "ক্যারেকটারিস্টিকস" নিয়ে কেউ লিস্টি বানাতে বসলে মিলারের যে গা জ্বলে যেত তাতে কোনও সন্দেহ নেই, অথচ তিনিই অম্লানবদনে গোটা মেক্সিকানজাতির মিথ্যেবাদিতা নিয়ে রসিকতা করে গেলেন কী করে?  

এটা আবারও প্রমাণ করে, যে আমাদের বেশিরভাগেরই ব্লাইন্ড স্পট থাকে। যিনি নারীবাদ নিয়ে উত্তেজিত, আগাপাশতলা সাম্প্রদায়িক হতে তাঁর কোনও বাধা নেই, আবার বর্ণাশ্রমজনিত গোলযোগ যিনি গুলে খেয়েছেন তিনি হয়তো মন থেকে বিশ্বাস করেন ছেলে আর মেয়েতে হাজার হলেও তফাৎ থেকেই যায়। 

যাই হোক, মোদ্দা কথা হল এইরকম ছুটকোছাটকা বাদ দিলে আমার মার্গারেট মিলার পড়ে দারুণ লেগেছে। একেবারে গোগ্রাসে গিলেছি।

সত্তর সাল থেকে মিলারের উপস্থিতি ফিকে হতে থাকে। বিখ্যাত অমর অ্যামেরিকান মিস্ট্রি লেখকদের লিস্টে রেগুলার মার্গারেট মিলার দেখা দিতেন, কিন্তু বইয়ের দোকান থেকে তাঁর বইগুলো হারিয়ে গেল। পুরোটাই আমার অনুমান বলা বাহুল্য, কিন্তু এর একটা কারণ হতে পারে যে উনি যে গল্পগুলো লিখছিলেন তারা মার্গারেটকে কোনও একটা নির্দিষ্ট গোত্রে বাঁধতে তখন অসমর্থ হয়েছিল। উনি স্বর্ণযুগের কোজি মিস্ট্রিও লেখেননি, যেখানে একটা সুস্পষ্ট ধাঁধা আছে, সাদাকালোর সোজাসুজি বিভেদ, গল্পের শেষে দুষ্টের দমন - অনেক ক্ষেত্রেই মার্গারেট মিলারের গল্পের শেষে এই স্যাটিসফ্যাকশনের কোনও গ্যারান্টি মার্গারেট মিলার দেন না - আবার হার্ডবয়েলড গোলাগুলিসমৃদ্ধ রহস্যও ফাঁদেননি।

নব্বইয়ের গোড়া থেকে মিলার আউট অফ প্রিন্ট হতে শুরু করলেন। বছরকয়েক ধরে তাঁকে আবার বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে খুঁড়ে বার করার চেষ্টা শুরু হয়েছে, খুব একটা এখনও পালে হাওয়া লাগেনি। অ্যামাজনে মিলারের বইয়ের বাড়ন্ত সম্ভার এবং দাম দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

তাহলে আমি বইগুলো জোগাড় করলাম কী করে? মার্গারেট মিলার একা আমার গুডরিডস চ্যালেঞ্জ সফল করেননি, আরও একজনের, বা একখানা ওয়েবসাইটের কৃতিত্ব আমাকে স্বীকার করতেই হবে। Internet Archive Digital Library. এখানে আপনি অ্যাকাউন্ট খুলুন, একেবারে ফ্রি। (কোনও রকম কার্ড ডিটেলস ইনপুট করতে হবে না, হলে আমি পত্রপাঠ পিঠটান দিতাম।) এইবার আপনার পছন্দমতো বই খুঁজুন। সে বই যদি “ফাঁকা” থাকে তাহলে আপনি তৎক্ষণাৎ চোদ্দ দিনের জন্য পেয়ে যাবেন।সে বই ডাউনলোড করা যাবে কি না, সে সব আমি খোঁজ নিইনি। যে হেতু আমার স্ক্রিনে পড়ায় কোনও আপত্তি নেই, পড়ার সময় হলে অ্যাকাউন্টে লগ ইন করেই পড়েছি। যদি বই ফাঁকা না থাকে তাহলে আপনাকে লাইনে দাঁড়াতে হবে, আপনার আগে কতজন আছেন সব ইনফরমেশন আপনি পেয়ে যাবেন। আমি মিলারের বেশিরভাগ বই লাইনে না দাঁড়িয়েই পেয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু গোটাতিনেক বইয়ের জন্য লাইন দিতে হয়েছিল। বলা বাহুল্য আর্কাইভে এ বছরের ম্যান বুকার পাওয়া বই পাওয়া যাবে না, কিন্তু মার্গারেট মিলারের মতো বিস্মৃত নক্ষত্রদের আবিষ্কার করার জন্য আর্কাইভ মচৎকার।

আপনারা যদি কেউ মার্গারেট মিলার আগে পড়ে থাকেন তাহলে জানাবেন আপনাদের কেমন লেগেছে। 


November 17, 2019

স্বপ্নের গুঁতো




স্বপ্নের কার্যকারণ হয় বলে আপনি বিশ্বাস করেন? আমি কিছু কিছু ক্ষেত্রে করি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বপ্নের কার্যকারণ নিয়ে সন্দেহ করা বোকামি। যে শুক্রবার আমি দু’প্লেট ফুচকা (এক্সট্রা কাঁচালংকা দেওয়া) আর একপ্লেট আলুকাবলি (এক্সট্রা কাঁচালংকা দেওয়া) দিয়ে ডিনার সারি সে শুক্রবার সারারাত স্বপ্নে পাগলা হাতির তাড়া খেয়ে সি আর পার্কের অলিতে গলিতে দৌড়ে মরলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অ্যাপ্রাইজালের আগের রাতে ভূগোল পরীক্ষার দিন ইতিহাস পড়ে চলে যাওয়ার স্বপ্নেও না। তবে সব স্বপ্নের কার্যকারণে আমি অত্যধিক জোরও দিতে চাই না। অনেক বছর আগে এক রাতে এক দূরসম্পর্কের (কিন্তু কাছের) দিদার স্বপ্ন দেখে উঠেই মাকে ফোন করে জেনেছিলাম দিদা গত রাতে মারা গেছেন। বেশি ভাবিনি ব্যাপারটা নিয়ে। ভাবলে ভয়ে পরের রাতগুলোর ঘুম মাটি হত। আর দিদা যদি সত্যি আমাকে ভালোবেসে থাকেন (যেটা সন্দেহ করার কোনও কারণ নেই), আমাকে ইনসমনিয়ায় ভোগাতে চাইবেন না। কাজেই ঘটনাটা কাকতালীয় ধরে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি। তাছাড়া সবকিছুর পেছনে গভীর অন্তর্নিহিত ইউনিভার্সের সিগন্যাল খুঁজতে যাওয়া আমার নাপসন্দ। আজীবন দেখে আসছি আমি ডাউনে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকলে যত ট্রেন আপ দিয়ে যায়। আবার আমি আপে দাঁড়িয়ে থাকলে ঠিক উল্টো। এ নিয়ে ভাবতে বসলে নিজেকে জন্মহতভাগ্য মনে হবে আর কোনওদিন কোনও কমপিটিটিভ পরীক্ষায় বসা যাবে না।কাজেই ন'মাসে ছ'মাসে স্বপ্ন বাস্তবের সমাপতনে আমি উত্তেজিত হই না। 

কাল স্বপ্ন দেখলাম আমার বাড়ির গাছগুলো মারাত্মক চোট পেয়েছে। গাছগুলো রাখা একটা ছোট ঘরের ভেতর, যে রকম ঘরে আমি কোনওদিন থাকিনি বা দেখিওনি। ওভারঅল দুর্দশার ফিলিংটা জোরদার করার জন্য ওইরকম একটা ঘরের আমদানি হয়েছে মনে হয়। জন্ডিস রং দেওয়াল সিলিং, উঁচুতে একটা খুপরি জানালা, আলোবাতাস সব যা আসার সব ওই দিয়েই। যাই হোক, সেই জানালা দিয়ে কড়া রোদ এসে পড়ে যে গাছগুলোর নতুন পাতা বেরিয়েছিল, সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দিয়েছে। আবার কিছু গাছ, ব্রাইট, ইনডিরেক্ট লাইট যাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য তারা কিছুই পায়নি এবং আধমরা হয়েছে। 

ঘরের মেঝে জলে কাদায় মাখামাখি। কে বা কারা এসে বালতি বালতি জল ঢেলেছে আমার গাছেদের গায়ে। নার্সারির ভাইসাব একটা বাত ইয়াদ রাখতে বলেছিলেন, কম জলে গাছ মরে না, বেশি জলে মরে। এই ব্যাপারে মানুষের সঙ্গে গাছেদের মিল আছে। বেশিরভাগেরই, যাদের নিয়মিত খাবারদাবারের জোগান আছে, তাদের বেশি খাওয়াটাই সমস্যা, কম খাওয়া নয়। টবের অর্ধেক মাটি জলে গুলে উপচে বাইরে চলে এসেছে, ভারি হয়ে পাতারা মাথা তুলতে পারছে না। 

ঘরটা বেসিক্যালি আমার সাধের গাছেদের কবরখানা।

কেঁদে ফেলার জোগাড় হল। নতুন শখ বলেই হয়তো গাছ নিয়ে অবসেশনটা এখনও চলছে। প্রতিদিন সকালে উঠে দেখতে যাই নতুন পাতা বেরোলো কি না। পারলে ফিতে দিয়ে মিলিমিটার বৃদ্ধি মাপি। একদিন পর্দা না সরিয়ে অফিস চলে গিয়েছিলাম, বাড়ি এসে যখন আবিষ্কার করলাম গাছগুলো সারাদিন ব্রাইট ইনডিরেক্ট সানলাইট থেকে বঞ্চিত হয়েছে, গালে ঠাস ঠাস চড়াতে ইচ্ছে করছিল। দিব্যি ছিল নার্সারিতে পেশাদার মালির যত্নআত্তিতে, তাদের যেচে বাড়িতে এনে খুন করার কোনও মানে হয়? একে তো গাছগুলো পুঁচকে টবের বদ্ধ মাটিতে বন্দী। দোষটা পুরোটা আমারও নয়। বারান্দায় আউটডোর গাছ লাগানোর মতো রোদ আসে না, কিন্তু যেটুকু আসে সেটুকু ইনডোর সুখী গাছেদের ঝলসে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। একমাত্র সমাধান হচ্ছে ঘরের ভেতর ইনডোর গাছ রাখা, যারা মাঝারি এবং কম আলোতে বাঁচতে পারে। আর ঘরে রাখতে হয় বলেই খুব বড় টবে রাখা যায় না। গাছগুলো অত বড়ও হয়নি যে ওদের বড় টবে স্থানান্তরিত করা যাবে। কাজেই আপাতত ছোটো টবের কম মাটিতেই চলছে। এর ওপর যদি দরকারমতো জল আলো দেওয়াতেও গাফিলতি করি তাহলে আর ক্ষমা করার থাকে না। 

কাজেই স্বপ্নটাকে স্বপ্ন না বলে দুঃস্বপ্ন বলাই উচিত।

দুঃস্বপ্নটা কীসে ভাঙল? যখন আমি প্রাণপণে টবগুলো টানাটানি করতে লাগলাম। পুঁচকে টবগুলো স্বপ্নে কী করে যেন বিরাট বিরাট কংক্রিটের টবে পরিণত হয়ে গেছে, অফিসে যেমন থাকে। আমি সেই বিরাট বিরাট টবগুলো টেনে টেনে, জল কাদা মৃত পাতাময় মেঝেতে ঘষটে ঘষটে একটা ছোট চৌকোটার মধ্যে আঁটানোর চেষ্টা করছি যেখানে উঁচু খুপরি জানালাটা দিয়ে ব্রাইট ইনডিরেক্ট সানলাইট এসে পড়েছে…

অত পরিশ্রম করতে গিয়েই ঘুম ভেঙে গেল। ভেঙেই দেজা ভ্যু। আজ, কয়েকঘণ্টা আগেই আরেকবার ঘুম ভেঙেছিল না?  দাঁত মেজেছি, লোকজনের সঙ্গে বসে চা খেয়েছি, নেটে কুতুবমিনারের টাইমিং এন্ট্রি ফি জেনে সে তথ্য সরবরাহ করেছি। তারা যাওয়ার পর দরজাও বন্ধ করেছি। করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি। এখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। বাইরে ঝকঝকে রোদের আভাস। কিন্তু সে রোদের একটুও আমার ঘরে এসে পৌঁছচ্ছে না কারণ পর্দা সরানো হয়নি। 

দৌড়ে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দিলাম। গাছগুলো ব্রাইট ইনডিরেক্ট সানলাইটে ভেসে গেল।

বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে শুনলাম গাছগুলো বলছে, দেখেছিস, আমরা সবাই মিলে ভয়ের স্বপ্ন দেখালাম বলেই তাড়াতাড়ি উঠে পর্দা সরাল তো? না হলে কে জানে আরও কতক্ষণ ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোত আর আমাদের পড়ে থাকতে হত এই অন্ধকূপে।

এবার থেকে স্বপ্নের কার্যকারণে বিশ্বাস করব ঠিক করেছি।



November 15, 2019

চার্জার



যাঁরা বিয়ে করতে চান না তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই এই ভয়টা পান যে বিয়ের পর নিজস্ব বলে কিছু আর থাকবে না। সেম হৃদয়, সেম ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সেম খাট, সেম বিছানা, সেম বাথরুম, সেম আলমারি. সেম নেটফ্লিক্স অ্যাকাউন্ট, সেম ভাতের থালা…

শেষেরটা অবশ্য আমি অ্যাপ্লাই করে দেখিনি। এই ব্যাপারে ঠাকুমার বদলে আমি আমার মায়ের দলে। মা যখন আত্মজার এঁটো খাবার খেতে অস্বীকার করেছিলেন, তখনই সম্ভবতঃ এ প্রসঙ্গে দুজনের বিরোধটা প্রকট হয়।

ঠাকুমা খাবার নষ্ট করার পক্ষপাতী ছিলেন না। আমার আধখাওয়া থালা মায়ের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলেছিলেন, আমরা খাইতে পারি, আমাগো কিছু হয় না।

মা নরমসরম লোক হলেও যে সব জায়গায় অনড় থাকতে চাইতেন, থাকতেন। তিনি বলতেন, প্রশ্নটা পারার না। প্রশ্নটা চাওয়ার। আমি চাই না।  

ঠাকুমা বলতেন, এক পাতে খাইলে ভালোবাসা বাড়ে। 

ভালোবাসা কম পড়ার ভয়েও মা কখনও আমার এঁটো খাবার খাননি। আমাকেও কারওটা খেতে দেননি। 

অকওয়ার্ড হচ্ছে বুঝেও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দোকানে খেতে বসে কখনওই আমি তাঁদের খাবার চেখে দেখার প্রস্তাব দিই না এবং তাঁদের উদার আমন্ত্রণ বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করি। ঝালমুড়িদাদা মাঝে মাঝে জানতে চান, একসঙ্গে দুটো বানিয়ে দেব? হয়তো ঠোঙা সাশ্রয় হয়। আমি রাজি হই না। পরিস্থিতি লঘু করার জন্য বলি, কে কতটা খেল সেই নিয়ে যদি মারামারি লাগে? দাদাও হাসেন, আমিও হাসি।  

বাড়িতেও এ নিয়ম রক্ষা করেছি। ক্বচিৎকদাচিৎ কোন কাপে চিনি দিয়েছি ভুলে গেলে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে দেখে নিই, ব্যস। মা নির্ঘাত চামচ ব্যবহার করতেন, কিন্তু আমি মায়ের তুলনায় এক কোটিগুণ অলস, কাজেই।

তবে সংসারের সব জায়গায় এই রকম নিজস্বতা মেন্টেন করা যায় না। বেশিরভাগই মিলেমিশে ঘণ্ট পাকিয়ে যায়। সাত জন্ম পরপর একে অপরের বিবাহিত হতে হতে দুজনের চেহারাও নাকি একটা মধ্যবিন্দুতে কনভার্জ করতে থাকে।

আমি যদিও মানি অর্চিষ্মান আমার থেকে সুন্দর দেখতে; যদি পরজন্ম থাকে আর সে সব জন্মে যদি বিয়ে করতে হয়, অর্চিষ্মানকে বিয়ে করতে আমার আপত্তি নেই;  কিন্তু আমি অর্চিষ্মানের মতো দেখতে হতে চাই না। বয়স হওয়ার একটা সুবিধে হচ্ছে নিজেকে নিয়ে বেশ আরাম বোধ করা যায়। একসময় ছিল, ইস নাকটা কেন এ রকম, ঠোঁটটা কেন ও রকম নয়। সে সব জ্বালা বহুদিন ঘুচেছে। আমি যে রকম, সে রকম আমিটাকেই এখন আমার পছন্দ। দাঁত মাজতে মাজতে চশমাছাড়া ঘুমচোখে আয়নায় ক্লিওপেট্রার মতো নাক আর অ্যাঞ্জেলিনা জোলির মতো ঠোঁট দেখলে ভিরমি যাব। কুন্তলার বদনে কুন্তলার মতো ঠোঁট আর নাকই বেস্ট।

নাকচোখমুখ ভাগ করতে রাজি না থাকলেও খাট থেকে নেটফ্লিক্স ভাগ করে নিতে অসুবিধে হয়নি। নিজে যদিও আপাতত একটাই বিয়ে করেছি, তবু ব্যাপারটার ভাবগতিক সম্পর্কে একটা আন্দাজ ছিল, কাজেই তৈরি ছিলাম।

তা বলে ফোন চার্জার ভাগাভাগি করা? 

বলা বাহুল্য, ফোন দুজনেরই আলাদা আলাদা। হেডফোন লাগিয়ে যে যার ফোনের দিকে হাসিমুখে চেয়ে থাকার সময়টুকুও যার যার তার তার। সে সময়ে কেউ বাগড়া দিতে এলে, এইও! মি টাইম! বলে আমরা দুজনেই নিয়মিত লাফিয়ে পড়ে থাকি।

শুরুতে এমনটা ছিল না। যে কোনও ওয়েল ফাংশনিং প্রাপ্তবয়স্কের মতোই আমাদের দুজনের নিজস্ব ফোন এবং নিজস্ব ফোন চার্জার ছিল। কখন যে সেটা একটায় এসে ঠেকল মনে করতে পারি না। গত সাড়ে সাত বছরে আমি মিনিমাম তিনটে ফোন হারিয়েছি, কাজেই তিনটে কিনেওছি। আর ফোন চার্জার ফোনের সঙ্গেই এসেছে। সেগুলো সব গেল কোথায়?

থাকলে ইলেকট্রনিক্স ড্রয়ারটায় থাকবে। ড্রয়ারের গালভরা নাম দেওয়ার দরকার কী? অ্যাডাল্ট যে হয়েছি তার প্রমাণ। জায়গার জিনিস জায়গায় রাখার ইনসেন্টিভ। একই কারণে আকাচা জামার জন্য আলাদা ঝুড়ি কেনা হয়েছিল, যাতে চেয়ারের কাঁধে না রাখা হয়। চার্জ দেওয়া হয়ে গেলে চার্জার কোথায় থাকবে? ইলেকট্রনিক্স ড্রয়ারে। বার বার কেনার ঝামেলা, একসঙ্গে বারোটা ডবল এ ব্যাটারি কিনে দুটো ব্যবহার করে বাকি দশটা কোথায় রাখা হবে? ইলেকট্রনিক্স ড্রয়ারে। অফিস থেকে ফিরে ছাড়া জামা কোথায় থাকবে? লন্ড্রি ঝুড়িতে।

কনফিউশন খতম পয়সা হজম।

তা বলে কি আমাদের বাড়িতে খবর না দিয়ে এলে আপনি চেয়ারের পিঠে জামা দেখতে পাবেন না? আলবৎ পাবেন। অফিস থেকে ফিরে আমি মারাত্মক ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন জামা চেয়ারের পিঠে ছাড়া অন্য কোথাও রাখার সম্ভাবনাতেও কান্না পায়। 

'বাড়ি ফিরে টাটকা খাবার রেঁধে খাই না কেন’র উত্তরে একবার অ্যাপোলোজেটিক হয়ে বলেছিলাম ফিরে আসার পর কুটোটি নাড়তে ইচ্ছে করে না। ফ্রিজের খাবার গরম করে খেলেই নিজেকে মেডেল দিতে ইচ্ছে করে। যুক্তিটা নিজের কানেই অজুহাতের মতো ঠেকতে বলেছিলাম, কেন এত ক্লান্ত হয়ে পড়ি কে জানে। সারাদিন তো বসেই থাকি, সাত হাত মাটি তো কাটি না অফিসে। 

না না, তোমাদের মাথার কাজেও পরিশ্রম লাগে তো। বলেছিলেন বুঝদার প্রশ্নকর্তা।

হয় উনি বিদ্রূপ করছিলেন, না হয় উনি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে আমার অফিসের কাজটা করতে বুদ্ধি খরচ করতে হয়। দুটোর প্রত্যুত্তরেই চুপ করে থাকাই বুদ্ধিমানের মনে হয়েছিল।

আমি নিজেও ভেবে পাই না ক্লান্তিটা কীসের। সম্ভবত স্ট্রেসের। মানবজমিন যে পতিত ফেলে রাখলাম, তার স্ট্রেস।

সেই স্ট্রেস কাটাতে আমি অফিস থেকে ফিরে জামা ছেড়ে চেয়ারে ঝুলিয়ে বাদামভাজার শিশি নিয়ে নাটবল্টুর কাণ্ডকারখানা দেখি। মানবজমিন যেই কে সেই পতিত থাকে।

সেদিন যে আমি বিশ্রাম না নিয়ে চার্জার খুঁজতে বেরোলাম তার কারণ আছে। ক্যালকুলেশনের ভুলে আগের রাতে চার্জ দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। অফিসে গিয়ে ব্যাগ থেকে চার্জার বার করতে গিয়ে দেখি অর্চিষ্মান সকালে কখন আমার চার্জার ছিনতাই করেছে, আমি বিনা চার্জারে অফিস চলে এসেছি। গলবস্ত্র হয়ে একজনের চার্জার ধার নিলাম, সে দশ মিনিট পর এসে বলে তার ফোন নাকি তিন পার সেন্টে। সারাদিন বুকধড়ফড়। ফোন সুপারপাওয়ার মোডে রেখে বিকেলে কোনওমতে উবার বুক করে বাড়ি ফেরা গেল। কী ভাগ্যিস অর্চিষ্মান চার্জারখানা অফিস নিয়ে যায়নি। সকেটে ঝুলছিল। পত্রপাঠ ফোন চার্জে বসালাম।

নাটবল্টু বলিদান দিয়ে গেলাম এক্সট্রা চার্জার খুঁজতে। ইলেকট্রনিক্স ড্রয়ারে কোটি কোটি সাদা কালো ইউ এস বি কেবল,  ডাবল আর ট্রিপল এ ব্যাটারি,  কোনওটা কাজ করে, কোনওটা করে না। অকেজোগুলো কেন রাখা হয়েছে জিজ্ঞাসা করবেন না। কয়েকটা রহস্যজনক চাবিও ড্রয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে। কীসের চাবি ভগবান জানেন। জানি না বলেই ফেলে দিতে ভয় লাগছে। যদি আমাদের স্বপ্নের হয়।

বিয়ের পর আমাদের ফোনগুলোও ত্যাঁদড় হয়ে গেছে, থাকলে একই সঙ্গে চার্জ থাকে, গেলে একই সঙ্গে যায়। আমি সর্বদাই ফোনে হান্ড্রেড পার সেন্ট চার্জ রাখার পক্ষপাতী। অর্চিষ্মান আবার এ ব্যাপারে মারাত্মক অ্যাডভেঞ্চারাস। অম্লানবদনে শেষবিন্দু চার্জ পর্যন্ত টুইটার চষে বেড়ায়, ফোন অন্ধকার হয়ে গেলে পকেটে পুরে বলে, তোমার ফোনে চার্জ আছে তো? আমারটা কিন্তু শেষ।

আগে বলতাম, এত কনফিডেন্স পাও কোত্থেকে যে আমার ফোনে চার্জ থাকবে? তারপর মনে পড়ে এই কনফিডেন্স পাওয়া এমন কিছু শক্ত ব্যাপার নয়। ফোনে চার্জের ব্যাপারে আমি প্যারানয়েড। নিয়মিত দুঃস্বপ্ন দেখে থাকি ফোনে চার্জ নেই; উবার না ডাকতে পেরে আমি মাঝরাস্তায় বন্দী। ঘেমেনেয়ে ঘুম ভেঙে নিজেরটা ফুলচার্জ দেখে অর্চিষ্মানের ফোন চার্জে বসিয়ে দিয়েছি এমনও হয়েছে। 

আমি সাধারণতঃ ‘অন্য কারও পাল্লায় পড়লে বুঝতে’ জাতীয় ডায়লগ এড়িয়ে চলি, নাটকনভেল থিয়েটারের মুখরা স্ত্রীর স্টিরিওটাইপে ফিট করতে চাই না। তবু মাঝে মাঝে ভেবেছি, এমন যদি কারও সঙ্গে অর্চিষ্মানের জীবন কাটাতে হত যে ওর মতোই যে জিরো পার সেন্ট চার্জ নিয়ে অবলীলায় ঘোরাফেরা করে? 

এমারজেন্সিতে কে উবার বুক করত? কার ফোনে অ্যালার্ম বাজত? পথ হারালে কার ফোনে গুগল ম্যাপ খুলত? 

বলা বাহুল্য, এক্সট্রা চার্জার পাওয়া গেল না। এর মধ্যে অর্চিষ্মান এসে পড়ল। ঘরে ঢুকেই বলল, কী লাক দেখেছ, সিঁড়ির লাস্ট সিঁড়িতে পা দিতেই চার্জটা চলে গেল। তারপর আমার চার্জরত ফোনটা হাতে নিয়ে, ওরে বাবা, তেত্রিশ পার সেন্ট?! বলে আমার ফোন খুলে নিজের ফোন চার্জে বসিয়ে, নিজে চা নিয়ে আর আমাকে দিয়ে, কমিকবুক নিয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। 

যে বইটা আমি ওকে এ বছরের জন্মদিনে উপহার দিয়েছি।

একবার ভেবেছিলাম ফোন চার্জার উপহার দেব। তারপর বইই দিলাম। চার্জার উপহার দেওয়াটা প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভ ঠেকতে পারে। তাছাড়া গোটা জীবনটা যদি ভাগ করে নিতে রাজি থাকি,  চার্জার ভাগ না করতে চাওয়ার কোনও কারণ নেই। 

তাছাড়া বলা যায় না, এক চার্জারে ফোন চার্জ করলে হয়তো যোগাযোগ আর ভালোবাসা দুইই বাড়ে।


November 04, 2019

সনকা সেনের পরীক্ষা




ভাবানুবাদের থেকেও ঝামেলার হচ্ছে ভাবানুবাদের উপযুক্ত গল্প খুঁজে বার করা। ‘গিফট অফ দ্য ম্যাজাই’ গল্প অতি ভালো কিন্তু পাগল না হলে কেউ ওতে হাত দেয় না। আবার অধিকাংশ অচেনা গল্পেরই অচেনা থেকে যাওয়ার পেছনে কারণ থাকে। হিডেন জেম আর ক’টা। থাকলেও তারা আমার চোখে পড়বে, আমি তাদের প্রতি সুবিচার করব, অনেক যদি কিন্তু বরং-এর ঘনঘটা। 

তাছাড়া আমি যতই গলা ফাটাই ওই গল্পের নায়িকার ককেশিয়ান খাড়া নাক আমার গল্পে অস্ট্রো মোংগোলয়েড বোঁচা নাক করেছি, শেষমেশ সবই অন্যের ঘাড়ে রেখে বন্দুক চালানো। যে কোনও অ্যাসপায়ারিং লেখককে  বিকল্প দিন, সরেস ভাবানুবাদক হবেন না কি হরেদরে মৌলিক গল্প লেখক, তাহলেই পরিস্থিতিটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। 

সোমেনকে ভয়ে ভয়ে লিখলাম। আমি কি নিয়ম ভেঙে একটা নিজের লেখা গল্প জমা দিতে পারি? সোমেন চোখ কপালে তোলার ইমোজি সহ উত্তর দিলেন, নিয়ম?! কীসের নিয়ম?! আপনার যা ইচ্ছে লিখে জমা দেবেন। 

আমি বললাম, কিন্তু শুরুতে যে কথা হয়েছিল অনুবাদ ইত্যাদি…সোমেন বললেন আহা সে তো আপনি  অনুবাদ করেন জেনে আপনাকে অনুবাদ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সে ছাড়া কিচ্ছুটি করতে পারবেন না এমন কোনও কথা নেই।

বুঝুন। আমাকে সুরিন্দরজী যে তিরস্কার করেছিলেন, আপকা প্রবলেম কেয়া পতা হ্যায় কুন্তলাজী, আপ লোগোঁ সে বাত নেহি করতে হো,’  দেখা যাচ্ছে সত্যি। এই মনের বাৎচিতটা মনে না রেখে আগেই বলে ফেললে আগেই সমাধান হয়ে যেত।

এই পরিস্থিতিটাকে ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’ কিংবা ‘শেয়ালকে ভাঙা বেড়া দেখানো’ সঙ্গেও তুলনা করা যেতে পারে। আমি আমার নবলব্ধ ‘পারমিশন’ পেয়েই একখানা মৌলিক গল্প নামিয়ে ফেলেছি। অ্যাকচুয়ালি ঘটনাটা এত স্মুদলি হয়নি। ‘নয়’ যে ‘দশ’ হতে হতে হল না, সে জন্য এই গল্পটা শেষ করে না উঠতে পারা, বা বলা ভালো শেষের সাহস না করে উঠতে পারা দায়ী। কে জানে কেমন হবে। 

সুরিন্দরজী হলে বলতেন, আপ ম্যাডাম বহোৎ ঘাবরাতে হো।

ঘাবরাহট সরিয়ে গল্পখানা চার নম্বরে জমা করলাম। এ মাসের মেলট্রেনে সেটা বেরিয়েছে। 

November 02, 2019

সিম্পলের মধ্যে গর্জাস/ ওরছা ৩ (শেষ পর্ব)




অল ফরওয়ার্ড! অল ব্যাক! স্টপ! আমাদের মতো নবীশদের জন্য আর বেতোয়ার অপেক্ষাকৃত শান্ত নদীবক্ষের (অন্তত আমার যে অংশটুকু পার হব) জন্য এই তিনটে ইন্সট্রাকশনই যথেষ্ট। বললাম, আমরা কিন্তু জীবনে এইসব র‍্যাফটিংম্যাফটিং করিনি। পুষ্পেন্দ্রজী আর লক্ষ্মীনারায়ণজী বললেন, 'চিন্তা মত কিজিয়ে, আজ করা দেঙ্গে।' ওঁদের কনফিডেন্সকে অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। শুধু যে হৃষীকেশ গিয়ে র‍্যাফটিং-এর ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন তাই নয়, গত সেপ্টেম্বরে বেতোয়ায় যে বান এসেছিল আর যাতে বেশ কিছু লোক আটকা পড়ে গিয়েছিলেন তাঁদের উদ্ধারের জন্যও এঁদেরকেই পাঠানো হয়েছিল।

হলিডিফাই আর ট্রিপোটো আরও প্রভূত সাইট থেকে ইমেলে ক্রমাগত বেড়াতে যাওয়ার সাজেশন আসে। বাজেট, লাক্সারি, রোম্যান্টিক, পকেট ফ্রেন্ডলি, উইকএন্ড,লং উইকেন্ড, যে রকম চান সে রকম। ডেডলাইন সামনে থাকলে আমি সে মেলগুলো খুলে খুলে দেখি, এমনকি ফরেন ট্রিপগুলোও বাদ দিই না। সেই আমিও কোনওদিন অ্যাডভেঞ্চার ডেসটিনেশনের লিংক খুলে দেখিনি। 

অর্চিষ্মানকে জিজ্ঞাসা করিনি কিন্তু ওর আচরণ অন্যরকম কিছু হওয়ার আশংকা নেই।

সেই আমরা হঠাৎ রিভার র‍্যাফটিং করার সিদ্ধান্ত নিলাম কেন? হতে পারে এ বারের বেড়ানোটা রেবেলিয়াস হবে নিয়তিনির্ধারিত ছিল। একে তো পাহাড়ের মায়া ত্যাগ করা, তারপর বেড়াতে গিয়ে কিছুই না করে ফিরে আসার বদনামটা ঘোচানোরও সুযোগ এবারেই আসার ছিল।


আর র‍্যাফটিং যদি করতেই হয় তাহলে বেতোয়ার টলটলে জলে করলেই ভালো। এর আগে হৃষীকেশের গঙ্গায় র‍্যাফটারদের ট্র্যাফিক জ্যাম দেখেছি। ইচ্ছে থাকলেও ওই ঠেলাঠেলিতে যেতাম না। সে তুলনায় বেতোয়া স্বর্গ। যেমন পরিষ্কার জল, তেমনি ভিড়ভাট্টাহীন।

বেতোয়া রিট্রিট থেকেই সব বুকিংটুকিং হয়। র‍্যাফট পিছু আড়াই হাজার টাকা ভাড়া। ঘণ্টাখানেক সাড়ে চার কিলোমিটারের নদীবক্ষে দাঁড় বাওয়া। একটা র‍্যাফটে সব মিলিয়ে ছ'জন বসতে পারে। ম্যানেজারবাবু এসে বললেন, আরও দুজন যাচ্ছেন আমাদের এখান থেকে, আপনাদের সঙ্গে করে দেব?

অর্চিষ্মান লাজুক আর আমি অসামাজিক, কাজেই মানা করে দিলাম। ম্যানেজারবাবু আমাদের লোভ দেখাতেই বোধহয় বললেন, টাকা শেয়ার হয়ে যাবে, তাছাড়া ওঁরা আউটলুকের ফোটোগ্রাফার ... আমি ভাবছি, থামুন থামুন আর এগোবেন না, কিন্তু উনি বলে বসলেন। 

আপলোগোকা আচ্ছা ফোটো ভি আ যায়েগা।

অর্চিষ্মান আঁতকে উঠে বলল, নেহি নেহি, হাম অকেলে হি যায়েঙ্গে। 

ততক্ষণে উক্ত ফোটোগ্রাফাররা এসে পড়েছেন। আমরা একটু লজ্জাতেই পড়ে গেলাম, কে জানে শুনতে পেয়েছেন কি না। আমরা যে ওঁদের সঙ্গে নিতে চাইছি না। ভদ্রতা করতে আলাপ করলাম। বললাম, কাল আপনাদের লাইট অ্যান্ড সাউন্ডে দেখলাম, র‍্যাফটিং-এ যাচ্ছেন বুঝি, আমরা তো কোনওদিন করিনি, কে জানে কেমন হবে, আপনারা আগে করেছেন নাকি হ্যানাত্যানা। 

মহিলা জানালেন যে উনি জাম্বিয়াতে বাঞ্জি জাম্পিং থেকে শুরু করে জান্সকারায় রিভার র‍্যাফটিং থেকে শুরু করে ঈশা সদগুরু ফাউন্ডেশনের যোগপুকুরে নিয়মিত যোগডুবকি দিয়ে থাকেন। আমি ভয়ানক ইমপ্রেসড হলাম। এ রকম একটা অভিজ্ঞ লোককে সঙ্গে রাখলে সুবিধে হতে পারে। বললাম, আপনাদের আমাদের সঙ্গে যেতে আপত্তি নেই তো? উনি বললেন, আপত্তি তো নেইই, বরং সেফটির দিক থেকে ভাবলে একসঙ্গেই যাওয়া ভালো কারণ র‍্যাফটের ওজন কম হলে ঢেউয়ের ধাক্কায় উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। 

অর্চিষ্মানও মেনে নিল, র‍্যাফট উল্টে বেতোয়ার জলে হাবুডুবু খাওয়ার থেকে দু'একটা ছবি উঠে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া বেটার। সবাই মিলে জিপে করে চলে গেলাম র‍্যাফটিং শুরুর পয়েন্টে। তারপর ঘণ্টাখানেক ধরে চলল অল ফরওয়ার্ড! অল ব্যাক! রাইট ব্যাক, লেফট ফরওয়ার্ড! স্টপ! আমার সত্যি কথা বলতে কি বেশ জোশ এসে গিয়েছিল। অন্যদের ভুলটুল ঠিক করে দিচ্ছিলাম। বেতোয়ার র‍্যাফটিং, অন্তত আমরা যে অংশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, বোঝাই যাচ্ছে সোজার দিকে, মাঝে মাঝে একটু দোলাচল। একবারই একটা 'র‍্যাপিড' এসেছিল। সে কী উত্তেজনা।


উত্তেজনার সঙ্গে সঙ্গে ভিউও রিভার র‍্যাফটিং-এ যাওয়ার একটা প্রধান কারণ হতে পারে। জামনি নদী হল বেতোয়ার একটি প্রধান উপনদী। জামনি এসে ওরছার কাছেই বেতোয়াতে এসে মিশেছে। নদীর দুপাশে জলে ঝুঁকে পড়েছে কাঠজামুনের গাছ। আর ছোট ছোট ঘূর্ণি আর ঘূর্ণির ওপর ফড়িং। জেগে থাকা শিলাখণ্ডের ওপর পাখা মেলে শুকিয়ে নিচ্ছে পানকৌড়ি। পার থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে প্রাসাদের ভাঙা দেওয়াল আর মন্দিরের চুড়ো।

শুনি মহিলা বলছেন, নদীতে নামা যায় না?  পুষ্পেন্দ্র আর লক্ষ্মীনারায়ণ দেখি উৎসাহ দিচ্ছেন। আউটলুকের দুজন পত্রপাঠ নেমে পড়লেন। এঁরা কেউ সাঁতার জানেন না। র‍্যাফটের পাশে দড়ি লাগানো আছে, লাইফভেস্ট পরা আছে, নেমে দড়ি ধরে ভেসে থাকবেন। আমার প্রেস্টিজ নিয়ে টানাটানি। তাড়াতাড়ি জলে নেমে খানিক খেলা দেখাতে হল।


এই সব করে আমাদের ভীষণ খিদে পেয়ে গেল।

ছোট শহরের একটা সমস্যা যেটা আমরা বোধ করেছি সেটা হচ্ছে ভালো খাবার বলতেই কন্টিনেনটাল চাইনিজ ইটালিয়ানের দাপাদাপি। নিজেদের ঘরের খাবারকে বাজারের সাজ পরিয়ে দর বাড়াতে এঁরা এখনও অতটা দড় হননি। কিন্তু তবু চেষ্টা তো চালিয়ে যেতেই হবে। বুন্দেলখণ্ডের প্রাচীন ভূমিতে গিয়ে হট অ্যান্ড সাওয়ার সুপ আর  পনীর টিক্কা মসালা খাওয়া যায় না। যা পড়ে বুঝলাম বুন্দেলখণ্ডী খানায় বেশি পরিমাণে মশলার ব্যবহার হয়, একটা ক্ষীর খুব পপুলার, আর একটা খাবার আছে যার নাম ইন্দ্রহার। ভিডিও দেখে বোঝা গেল সেটা হচ্ছে কঢ়িতে ডোবানো ধোঁকা। আমার ধোঁকা অত ভালো না লাগলেও কঢ়ি খুবই ভালো লাগে। স্যাডলি, অনেক খুঁজেও ইন্দ্রহার পাওয়া গেল না। তবে তক্কে তক্কে আছি, পেলেই খাব।

ওরছাতে রাস্তার পাশের ধাবাও যেমন আছে, তেমনি লাক্সারি হোটেলের রেস্টোর‍্যান্টও আছে, আবার বিদেশী টুরিস্টদের আকর্ষণ করার জন্য “হ্যান্ড ক্রাফটেড” ক্যাফেও আছে। একটা জায়গার রেটিং দেখলাম খুব হাই। অরগ্যানিক ফুড, অধিকাংশ খদ্দেরই বিদেশী। সকলেই রান্না করছে, মাটিতে বসে খাচ্ছে। সুপার হিপি ব্যাপারস্যাপার। আমাদের চেখে দেখার ইচ্ছে ছিল, লোক্যাল খাবারও হয়তো ওখানেই পাওয়া যেত, কিন্তু এ সব জায়গার একটা আতংকের পয়েন্ট হচ্ছে এখানে ফেলো ফিলিং-এর জোয়ার খুব বেশি হয়। চুপচাপ বসে খেলে চলবে না, হয়তো রান্নাও করতে হল কিংবা হাততালি দিয়ে কোরাস গান। তার থেকে নন-হিপি দোকানে বসে জালফারেজি খাব, সেও ভি আচ্ছা। 


অমর মহল বলে একটি হোটেলের রেস্টোর‍্যান্টে খাওয়া হল একদিন দুপুরে। আমার মহারানি থালিতে ছিল পোলাও, নান, ডাল, সবজি, পনীর, পাঁপড়, রায়তা, রসগোল্লা কাচুম্বর। আমি আলাদা করে বেগুনভর্তা অর্ডার করছি দেখে পরিবেশক ভাইসাব স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বললেন, ওটা নাকি উনি থালির মধ্যেই করে দেবেন। আমি কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে বললাম, তাহলে প্লিজ পোলাওটা বাদ দিয়ে দেবেন। আশ্বাস দিলেন, কর দেঙ্গে।

আর কোনওটাই শেষ করতে পারিনি, কিন্তু ভর্তার বাটি প্রায় মুখ দেখার মতো পরিষ্কার করে ফেলেছিলাম।

বুন্দেলখণ্ডী থালিতে রসগোল্লা রাখাটা শুধু কৌতূহলোদ্দীপক। ফলাফলও আশানুরূপ হয়েছে। আমি দোষ দিই না। আমাদের মেনুতে ডেজার্টে ঠেকুয়া রাখলে তার দশাও এই হত। কেন যে গুলাব জামুন রাখেননি সেটা একটা রহস্য।


ওরছার সিগনেচার লুক - ক্যালেন্ডারে, ফোটোশুটে, ট্যুরিজম কোম্পানির ব্রশিওরে যে ছবিগুলো থাকে সেগুলো রাজমহলেরও না, মন্দিরেরও না, বেতোয়ারও না। সেগুলো হচ্ছে এই ছত্রীর। ছত্রী হচ্ছে রাজারাজড়ার স্মৃতিতে বানানো সৌধ। ছত্রীগুলো খুবই সুন্দর করে দেখাশোনা করা হয়েছে। বাগানে ঘুরে ঘুরে বেশ অনেকটা সময় কাটানো যায়। অসামান্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ।  পরে আবার কখনও ওরছা যাই, এই ছত্রীর ধারে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে অনেকটা সময় কাটাব।


ব্যস, হয়ে গেল আমাদের ওরছা ঘোরা। ঝাঁসি থেকে নতুন দিল্লি শতাব্দী ছাড়ে প'নে সাতটা নাগাদ। বারোটায় চেক আউট করে বেরিয়ে হাতে প্রচুর সময় থাকবে। সে সময় ঝাঁসি ঘুরে দেখা যেতে পারে। ঝাঁসিতে দেখার জিনিস মূলতঃ ঝাঁসি দুর্গ, যা বানানো হয়েছিল বুন্দেলা মহারাজ বীর দেও সিং-এর জমানাতেই।



বীর দেও সিং, যিনি জাহাঙ্গিরের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ওরছার জাহাঙ্গির মহল বানিয়েছিলেন। বুন্দেলাদের হাত থেকে মারাঠাদের হাতে বুন্দেলা রাজা ছত্রশালের আমলে। ছত্রশালের আমলে মহম্মদ খান বাঙ্গাশ ওরছা আক্রমণ করেন। সারাজীবন ধরে অনেক যুদ্ধবিগ্রহ করে ছত্রশাল ততদিনে চুল পাকিয়েছেন, বুঝলেন শুধু বুন্দেলা শক্তির ওপর ভর করে এ যুদ্ধ জেতা যাবে না। ডাক পাঠালেন মারাঠা বীর পেশোয়া বাজিরাও (প্রথম)কে। যুদ্ধজয়ের পর কৃতজ্ঞতার টোকেন হিসেবে ঝাঁসির দুর্গ মারাঠাদের অর্পণ করলেন।

এ দুর্গের সবথেকে বিখ্যাত অধিবাসীর আসল নাম বলিউডের সুবাদে এখন ভারতবর্ষের সবাই জানে। মণিকর্ণিকা, আমাদের লক্ষ্মীবাঈ। যে 'জাম্পিং পয়েন্ট' থেকে ঘোড়ায় চড়ে শিশুপুত্রকে নিয়ে রানি ঝাঁপ দিয়েছিলেন, সেখানে দাঁড়িয়ে কেমন মনখারাপ হয়ে গেল।


আরও তো কত যে সব কেল্লা দুর্গ দেখেছি, যাদের গল্পগুলো হয় জানি না জানলেও ওপর ওপর পড়েছি,সেগুলো গল্প হয়েই রয়ে গেছে। চোখে জল কিংবা গায়ে কাঁটা জাগায়নি। কিন্তু ছোটবেলা থেকে শোনা গল্পের  জায়গায় গেলে এখনও সে অনুভূতিগুলো অবিকল জাগে। চিতোরে গেলেই যেমন মনে হয়, এই মোড় ঘুরলেই ঝনঝন যুদ্ধ হচ্ছে, ওই পদ্মাবতী জানালায় দাঁড়িয়ে আছেন (কোনওদিন নাকি ছিলেন না, কিন্তু এতদিনের মিথ ভাঙবে কে?), তেমনি ঝাঁসির দুর্গের জাম্পিং পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আমার শুধুই মন খারাপ হতে লাগল।


অবশ্য দৃশ্যশব্দগন্ধেরও এই মনখারাপে অবদান থাকতে পারে। বিকেলের রোদে ছড়ানো ঝাঁসি শহর। শহরের বাঁ প্রান্ত থেকে মাইকে রামভজন, মাঝখানে ক্রিকেট মাঠ থেকে ধারাবিবরণী এবং ওভার শেষ হলে পিলে চমকানো পাঞ্জাবী নাম্বারস, ডানদিক থেকে বিকেলের আজানের ককটেল বেশ একটা মোহময় ভাব জাগিয়েছিল। যাদের কানের কাছে বাজছে তাদের অবস্থা কল্পনা করতে অবশ্য মোহটা ঝপ করে অনেকটা কমে গেল।

ওরছা থেকে অটো নেওয়া হয়েছিল এই কড়ারে যে সোজা ঝাঁসি ষ্টেশন ছেড়ে দিলে তিনশো, আর ঝাঁসি ঘুরিয়ে ছাড়লে পাঁচশো টাকা দেওয়া হবে। দুর্গের ঠিক নিচেই নাকি রানিমহল। অটোভাইসাবকে বললাম, একটু চলুন দেখে আসি। তিনি চোখ কপালে তুলে বললেন, পাগল? ওখানে গাড়ি ঢুকতে দেয় না, বলে আমাদের হ্যাঁ না-এর অপেক্ষা না করে স্পিড তুললেন। নিজেদের সান্ত্বনা দিলাম, ইউটিউবে দেখে নেব।

ফেরার সময় দেখি স্টেশনচত্বরে শামসুদ্দিন ভাইসাব, যিনি আমাদের যাওয়ার সময় ঝাঁসি স্টেশন থেকে ওরছা পৌঁছে দিয়েছিলেন, ঘোরাঘুরি করছেন। বললেন, ফির আনা। আমরা বললাম, জরুর জরুর। 

আপনারাও সময় পেলে ওরছা যাবেন। রাজাগজার প্রাসাদ দেখবেন, রিভার র‍্যাফটিং করবেন, নদীর ওপারে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নেচার ওয়াকে যাবেন।

আর সন্ধের মুখে বেতোয়ার তীরে অবশ্যই বসবেন। প্রচণ্ড টানের স্রোতে কালোকোলো দস্যি ছেলেদের উল্লসিত সাঁতার দেখবেন। গেরুয়াধারী যে সাধুবাবা অস্ফূট "সীতারাম" অভিবাদন জানিয়ে জঙ্গলের দিকে গিয়েছিলেন তাঁকে মিনিট দশ বাদে পরিষ্কার শার্টপ্যান্ট পরে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে চমৎকৃত হবেন। সন্ধে নামার মুখে দূরে মন্দিরে ঢং ঢং ঘণ্টা শুরু হবে, ছাতিমের গন্ধ ছেয়ে ফেলবে আকাশবাতাস। বীর দেও সিং-এর বানানো চারশো বছরের বুড়ো ব্রিজের ওপর দিয়ে লেটেস্ট মডেলের বাইক হর্ন দিতে দিতে যাবে, পাখির দল চেঁচামেচি করতে করতে ছত্রীর মাথার ওপর রং বদলাতে থাকা আকাশ দিয়ে কে জানে কোন যুগের উদ্দেশ্যে উড়ে যাবে, আর আপনি নতুন করে টের পাবেন, সিম্পলের মধ্যে গর্জাস কাকে বলে।



(শেষ)


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.