May 20, 2018

গুপ্তধনের সন্ধানে



উৎস গুগল ইমেজেস

গুপ্তধনের সন্ধানে-র চরিত্রদের নামকরণ মহা কনফিউজিং। সিনেমার আবীর হচ্ছেন বাস্তবের অর্জুন চক্রবর্তী আর বাস্তবের আবীর চ্যাটার্জী হচ্ছেন সিনেমার সুবর্ণ সেন, সোনাদা। অক্সফোর্ডে সাত বছর পড়িয়ে কলকাতা ফিরেছেন। ইনি সম্পর্কে সিনেমার আবীরের কাকা, কিন্তু আবীর ওঁকে দাদা বলেই ডাকে। আবীরের মামাবাড়ি মণিকান্তপুরের জমিদার। সাড়ে তিনশো বছরের পুরোনো জমিদারবাড়ির গল্প শুনে হিস্ট্রির প্রফেসর সোনাদা সেখানে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। মস্ত এস ইউ ভি চালিয়ে সোনাদা আর আবীর মণিকান্তপুর রওনা দিল। 

অকৃতদার জমিদার, আবীরের মামা হরি (চরিত্রের পুরো নাম ভুলে গেছি, অভিনয় করেছেন গৌতম ঘোষ) ঘরভর্তি বইয়ের মাঝখানে বসে থাকেন। জমিদারবাড়িতে আর থাকেন রামকৃষ্ণ নামের গোপালমন্দিরের পূজারী, মহাদেব, মহাদেবের স্ত্রী (নাম মনে নেই), আর এঁদের ছেলে নীলু। 

বাংলা সংস্কৃতিতে চাকরের ভূমিকা নিয়ে রিসার্চ হওয়ার দরকার। যে কোনও নাটক, নভেল, সিনেমা, ওয়েব শর্টস দেখুন, এক তো বটেই, খুব সম্ভব একাধিক চাকরের দেখা পাবেন। এবং এই সব সিনেমার চাকরবাকরের সঙ্গে রক্তমাংসের কাজের লোকদের কোনও মিল পাবেন না। অন্তত আমি পাইনি। বাড়ির কাজের লোকেদের সঙ্গেও আমাদের রীতিমত আন্তরিক সম্পর্কই ছিল দেখেছি, একসঙ্গে বসে চাবিস্কুট খাওয়া হত, আমার ঠাকুমাকে তাঁরা সব খবর দিতেনটিতেন কিন্তু তাঁরা কেউ আমার মা বাবা ঠাকুমাকে দেখলে আপসে হাফকুঁজো হয়ে যেতেন না। নিজেদের কোনওরকম অধিকারে (না বলে কামাই করার) হস্তক্ষেপ হওয়ার উপক্রম হলে পেলে রীতিমত ফোঁস করতেন। 

আপনি বলতে পারেন, সিনেমার কাজের লোকদের সঙ্গে রক্তমাংসের কাজের লোকদের মিল খুঁজতে যাওয়া বোকামি। বিশেষ করে সিনেমার জমিদারবাড়ির। এঁদের সম্পর্কটা চাকরমনিবের নয়, বাড়ির লোকের মতো হ্যানাত্যানা। যদিও এঁরা কোনওদিন বাড়ির লোকেদের সঙ্গে টেবিলে বসে খান না। নিজের ছেলে খাচ্ছে কি না তাতে এঁদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, সি জি আই সন্দেহ উদ্রেককারী সাইজের কাতলা মাছের মুড়ো মনিবের ছেলের পাতে তুলে দেওয়ার সময় এঁদের মুখের স্বর্গীয় আভা দেখলে আপনার চোখে জল এসে যাবে। মনিবের বাঁদরের একশেষ নাতির পেছনে চব্বিশঘণ্টা দৌড়নোর সময়ও এঁদের মুখের সেই আভা মেলায় না, আড়ালে পেলে কষে কান মলে দেওয়ার ইচ্ছে খালি আমার মতো দানবিক দর্শকদের মনেই জাগে। 

এই আনুগত্য কোথা থেকে আসে, সেটা একটা রহস্য। সিনেমায় কোথাও তো মাইনেকড়ি দেওয়া দেখানো হয় না, সম্ভবত প্রাসঙ্গিক নয় বলে, কিন্তু অন্য কোনওরকম দানদাক্ষিণ্যের নমুনাও তো দেখা যায় না।

এই সিনেমাটার কথাই যেমন ধরা যাক। জমিদারমশাই তাঁর অপদার্থ ভাগ্নেকে গুপ্তধনের সন্ধান দিয়ে যাওয়ার জন্য অস্থির, সে মামার ডাকে সাড়া না দিয়ে ট্রেকিং-এ চলে যাওয়া সত্ত্বেও এবং গুপ্তধন পাওয়ার কোনও যোগ্যতারই প্রমাণ দিতে না পারা সত্ত্বেও। ভূতের ভয়ে রাতে বাইরে যেতে পারে না, মামার লিখে রেখে যাওয়া আধখানা ক্লুয়ের সমাধানও যার দ্বারা হয়নি। খালি পারে গাঁক গাঁক করে খেতে। 

অথচ ওই বাড়িতেই একটি অত্যন্ত ব্রাইট ছেলে, মহাদেব এবং মহাদেবের স্ত্রীর একমাত্র সন্তান নীলু বড় হচ্ছে। যার বুদ্ধি আছে, লয়্যালটি আছে, মায়াদয়া আছে, লঘুগুরু জ্ঞান এবং সর্বোপরি বিবেক আছে,সেই ছেলেটির সঙ্গে অত ইন্টারেস্টিং মামাবাবু কোনওরকম যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা তো করেছেন বলে দেখা গেল না। 

যাই হোক, গুপ্তধনের সন্ধানে-র আর দুজন ইম্পরট্যান্ট চরিত্র হচ্ছেন জমিদার মামার আবাল্যের বন্ধু অখিলেশ (কমলেশ্বর)। এঁর মেয়ে ঝিনুক (ঈশা সাহা) যাদবপুরে কমপ্যারেটিভ লিটারেচার পড়ে। ছুটিতে বাড়ি গেছে। এর সঙ্গে সিনেমার আবীরের প্রেম হবে।

ক্রমে আবিষ্কার হয় যে মামাবাড়িতে মোগল আমলের গুপ্তধন আছে। সে গুপ্তধনের খোঁজ আবীরকে দিয়ে যাওয়ার জন্য মামাবাবুর রেখে যাওয়া একের পর এক ক্লু খুঁজে বার করে তার সমাধান করেন সোনাদা। ইন্টারভ্যালের আগে প্রোমোটার ভিলেনের আবির্ভাব হন। ইনি দুষ্টু লোক কাজেই এর দশানন দাঁ টাইপের নাম আর ইনি, অফ কোর্স, ইংরিজি বলতে পারেন না। দশানন ওরফে রজতাভ সারা সিনেমা পেশেন্সকে পেশেন্ট বলে দর্শকদের মনোরঞ্জন করলেন যতক্ষণ না অক্সফোর্ড ফেরত সোনাদা ঠিক শব্দটা শিখিয়ে দিলেন। ভাগ্যিস শেখালেন, কারণ তার অব্যবহিত পরেই দশানন গোটা সিনেমার বেস্ট সংলাপটা বললেন। আমার আক্ষরিক মনে নেই, প্যারাফ্রেজ করে বলছি…

আমার পেশেন্স কম বলে লোকাল হাসপাতালে পেশেন্ট এত বেশি।

দশানন আবীরকে ক্রমাগত হুমকি দিতে থাকে, বাবাকে বলে দিয়ো, বাড়ি আমি নিয়েই ছাড়ব। আবীর আর আবীরের প্রেমিকাও বাড়ি নিয়ে নানারকম প্ল্যানপ্রোগ্রাম চালাতে থাকে। একটা রহস্যময় ব্যাপার হল যে বাড়ি তো আবীরের বাবারও নয়, আবীরেরও নয়, আবীরের প্রেমিকার তো নয়ই। বাড়ি আবীরের মায়ের। কিন্তু বাড়ি নিয়ে কী করা হবে, বেচা হবে না রাখা হবে সে নিয়ে মহিলার মতামত নেওয়ার কোনও উদ্যোগ কারও মধ্যে দেখা যায় না। দশানন দাঁ টাইপের নামওয়ালা নায়েবের বংশধরের না হয় এই সহজ সত্যিটা মাথায় আসা কঠিন, কিন্তু অক্সফোর্ড ফেরৎ সোনাদাও তথৈবচ। সকলেই বলে, বাবাকে জিজ্ঞাসা কর। 

কিছুদিন আগে সংগীত বাংলা চ্যানেলে গুপ্তধনের সন্ধানে-র প্রোমোশনাল অনুষ্ঠানে সিনেমার হিরো আবীর চ্যাটার্জি আর পরিচালক শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথোপকথন দেখছিলাম। তাতে পরিচালক সিনেমাটির ইতিহাসমনস্কতা ছাড়াও আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সেক্স, মার্ডারের থেকেও বাঙালি দর্শকের কাছে সিনেমা বা যে কোনও শিল্পকর্ম হিট করানোর যা সিংগলমোস্ট কার্যকরী উপকরণ। 

বাঙালিয়ানা।

পরিচালকের দাবি ফাঁপা নয়। খাওয়া নিয়ে অবসেশন, ক্রন্দনোন্মুখ কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত, ইংরিজির অশুদ্ধতা নিয়ে কমিক রিলিফ ইত্যাদি বাঙালিয়ানা গুপ্তধনের সন্ধানে-র ছত্রে ছত্রে ছড়ানো। শিক্ষার প্রতি বাঙালির দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। অক্সফোর্ড ফেরৎ সোনাদা তো আছেনই, মণিকান্তপুরের গুণ্ডারা পর্যন্ত ভিকটিমের গলায় ছুরি ধরে দাঁড়িয়ে একে পক্ষ, দুয়ে চন্দ্র থেকে দশ দিক পর্যন্ত কণ্ঠস্থ বলতে পারে। 

পুরোনো জমিদার বাড়ির প্রেক্ষাপটে থ্রিলারের থেকে বেশি ভালো জমে ভূতের গল্প। পরিচালক সে লোভ সংবরণ করতে পারেননি। সিনেমা জুড়ে ছায়া ছায়া রাতে কারা যেন ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে, গরগর আওয়াজ তুলে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু গোটা সিনেমাটা আপাদমস্তক ইহলৌকিক, ভূতপ্রেতের বিন্দুমাত্র ছায়াও সেখানে নেই। কাজেই ওই দৃশ্যগুলো মিসলিডিং।

সিনেমাটায় সাসপেন্সেরও অভাব রয়েছে। আমরা প্রায় ফার্স্ট সিন থেকে ভবিষ্যদ্বাণী শুরু করেছিলাম যে এই লোকটাকে এখন ভিজে বেড়াল মনে হচ্ছে, পরে নির্ঘাত ভিলেন বেরোবে। বেরোয়নি। বাইরে থেকে যাদের দেখে যা মনে হচ্ছিল তারা শেষ পর্যন্ত ঠিক তেমনই রয়ে গেছে। অবশ্য আমাদের গেস করা উচিত ছিল, কারণ শুরুতে যাদের ভালোমানুষ মনে হয়েছিল তাদের সব শহুরে নাম, রাবীন্দ্রিক চাল আর শুদ্ধ ইংরিজি। শেষে গিয়ে তাদের খারাপ লোক দেখানো ডিফিকাল্ট। 

শেষ করার আগে সিনেমাটার দুটো ভালো দিকের কথা বলি। এক, এই সিনেমার চরিত্ররা কেউ অনীক দত্তের ভাষায় কথা বলেন না, কাজেই সংলাপ বসে শোনা যায়। আর সিনেমার হিরো সোনাদা, অ-বাঙালিচিত লেভেলের সুপুরুষ। আমার মতে এই সিনেমার বেস্ট ব্যাপার।


May 18, 2018

পেনশন ফান্ড



এই নেট ব্যাংকিং-এর যুগে মাসের এ মাথা ও মাথায় ব্যাংকে যাওয়ার কী দরকার থাকতে পারে আমি বুঝি না। প্রথমে ভেবেছিলাম মা বোধহয় অনলাইন ব্যাংকিং-এ সড়গড় নন। জলের মতো সোজা ব্যাপার, এই দেখো, বলে কম্পিউটার খুলে বোঝাতে গেছি, মা তাঁর তিনখানা অ্যাকাউন্টের ন'খানা ইউজার আইডি, লগ ইন পাসওয়ার্ড, প্রোফাইল পাসওয়ার্ড টপাটপ টাইপ করে অ্যাকাউন্টে ঢুকে আমাকে সব দেখিয়ে দিলেন। বললেন, আমার সাতষট্টি হল, তোর এমনিও সব দেখে রাখা দরকার, সোনা। আমি এদিকে আগের সপ্তাহেই আমার সবেধন একখানা অ্যাকাউন্টের একখানা প্রোফাইল পাসওয়ার্ড, হিন্ট কোয়েশ্চেন সব ভুলে মেরে দিয়ে ব্যাংকে হত্যে দিয়েছিলাম। সাতাশি পর্যন্ত এসব নিয়ে খবরদার মুখ খুলবে না, বলে কোনওমতে মান বাঁচিয়ে পালালাম।

তুমি তাহলে এত ঘনঘন ব্যাংকে যাও কী করতে জিজ্ঞাসা করাতে মা বললেন, আরে কাজ থাকেই, তুই জানিস না। কী কাজ আমি সত্যিই জানি না, তবে এটা জানি বাড়িতে হাতপা গুটিয়ে বসে থাকতে মায়ের ভালো লাগে না। তাই বললাম, আচ্ছা যাবে যখন যাও, কিন্তু সাবধানে যেয়ো, রাস্তায় ফোন এলে ধোরো না, আমার ফোন এলেও না, চলতে চলতে ফোনে কথা বোলো না, রেললাইন পেরোনোর সময় ডান, বাঁ, ডান দেখো আর ফিরে এসে যথেষ্ট বিশ্রাম নিয়ে যদি পৌঁছসংবাদ দাও ভালো না দিলেও কিছু না। আমি ফোন করে জেনে নেব।   

মা নিজেই খবর দেন। যাতায়াতের পথে, টোটোর লাইনে, ব্যাংকের ভিড়ে বলার মতো কিছু না কিছু ঘটেই, সে সব গল্প বলেন। কাজ হল কি না জানতে চাইলে বলেন, হবে না কেন, কী ভালো ভালো ছেলেমেয়ে সব আজকের জেনারেশনের। গেলেই বলে জেঠিমা বসুন, এক্ষুনি আপনারটা করে দিচ্ছি। কী আন্তরিক। হাসিমুখে দৌড়োদৌড়ি করে কাজ করে। সব টেবিলের সব কাজ জানে। কী এফিশিয়েন্ট।

বলতে বলতে মায়ের গলায় ছায়া ঘনায়। এত ভালোর পেছনে একটা কালো কোথাও ঘাপটি মেরে আছে। অবশেষে সেটা আত্মপ্রকাশ করে।

সব কন্ট্র্যাক্টে বসিয়ে রেখেছে। 

বলেই বোধহয় মায়ের মনে পড়ে যে তাঁর একটিমাত্র সন্তানও কন্ট্র্যাক্টের চাকরি করে, কাজেই মা কথা বাড়ান না। একসময় বাড়াতেন। হাতেপায়ে ধরতেন এমন একটা চাকরি করতে যেটা পার্মানেন্ট এবং যাতে পেনশন পাওয়া যায়। রিয়েল চাকরি। মা নিজে সারাজীবন যে রকম চাকরি করেছেন। মায়ের দোষ নেই। বেশিরভাগ সাধারণ লোকেই, আমি আমার মা শুদ্ধ, নিজের জীবন আর অভিজ্ঞতার বাইরে অন্য কোনও রকম জীবন বা অভিজ্ঞতার কথা কল্পনা করতে পারি না। চাকরি করলে স্বেচ্ছায় বেকার থাকার সিদ্ধান্ত কল্পনা করতে পারি না, দশটা পাঁচটা অফিস ঠ্যাঙালে ফ্রি ল্যান্সার শুনলে আঁতকে উঠি, ফ্রি ল্যান্সিং করলে দশটা পাঁচটাদের ক্রীতদাস মনোবৃত্তি নিয়ে মুখ ভেঙাই। 

অসাধারণরা কেউ কেউ এই সব অপারগতা মনে না রেখে প্রকাশ্যে আনেন এবং অন্যদের জীবিকা আর জীবনযাপনের ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে ব্যস্ত হন। এ রকম একজনের সঙ্গে আমার একবার ওলায় দেখা হয়েছিল। তিনি আজীবন রিয়েল চাকরি করেছেন। অনেক প্রশ্নোত্তরের পর তিনি অবশেষে আমার চাকরিখানার আগামাথা বুঝতে সমর্থ হলেন এবং বললেন, ওহ, প্রোজেক্ট বেসড চাকরি। তা প্রোজেক্ট শেষ হয়ে গেলে? হোপফুলি নতুন প্রোজেক্ট, বললাম আমি। উনি বাঁকা হাসলেন। আর নতুন প্রোজেক্ট না এলে? আমি খেলাটা বুঝতে পেরে হাসি হাসি মুখে চুপ করে গেলাম। এতক্ষণ ধরে যেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছিলেন, সেটা অবশেষে আমি দেখতে পেয়েছি রিয়েলাইজ করে উনি খুশি হলেন। 

আমি বেসিক্যালি গ্লোরিফায়েড বেকার।

আমার মা আশা করি অচেনা লোকের চাকরির ভুল ধরে বেড়ান না। খালি আমার পেনশনহীন ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন। আগে আরও বেশি করতেন, এখন কমে গেছে বা প্রকাশ কম করেন। মাঝে মাঝে আমাকে পেনশন স্কিমের খোঁজ পাঠান। ব্যাংকের ভালো ছেলেমেয়েগুলোও মাকে নানারকম স্কিমের খোঁজখবর দেয়। সেগুলো আমার গোচরে আনেন।

মায়ের ভয় যে আমাকে একেবারে ভয় পাওয়ায় না, তেমন নয়। যে রেটে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করি, প্রোজেক্ট ফুরিয়ে গেল আর টপ করে মরে গেলাম, এরকম হওয়ার চান্স কম। যতদিন বাঁচব ততদিন মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচার আশায় সঞ্চয় করি। আমি প্রকৃতিগতভাবে সঞ্চয়ী কাজেই খুব পরিশ্রম করতে হয় না কিন্তু টাকা বাঁচানো সোজা নয়। 

কারণ এটাও খানিকটা জীবিকার চয়েসের মতো ব্যাপার। আমাকে আপনার বাজে খরচ ধরিয়ে দিতে বলুন, পাঁচ মিনিটে পঞ্চান্নটা বার করে দেব, কিন্তু নিজের বাজে খরচটা দেখতেই পাব না। 

বাজে খরচ আইডেন্টিফাই হয়ে গেলেই যে সেটা কমাতে পারা যাবে তেমনও নয়। আমার বর্তমান বাড়ি থেকে সি আর পার্কের বাজার তিন মিনিট হাঁটা পথ আর গোবিন্দপুরীর মার্কেট সাত মিনিট। কিন্তু দুটো বাজারের দামের তফাৎ এত নগণ্য নয়। শাকসবজি, ফলমূল, মাছ মশলা সবই নাকি সি আর পার্কের তুলনায় গোবিন্দপুরীতে জলের দর। গোটাটাই গুজব হতে পারে কারণ আমরা নিজেরা কখনও গোবিন্দপুরীর মার্কেটে রোজকার বাজার করতে যাইনি। যাইনি আমাদের টাকা বাঁচানোর দরকার নেই বলে নয়, আমাদের কুঁড়েমো করার তাগিদ টাকা বাঁচানোর তাগিদকে মাত দিয়েছে। চার মিনিট এক্সট্রা হাঁটবে না এক্সট্রা ইউটিউব দেখবে? এ প্রশ্নে আমাদের দুজনের উত্তর দুজনেই জানি। মুখ ফুটে জিজ্ঞাসা করতে হয়নি কখনও।

একই জিনিস একই বাজার থেকে সবাই এক দামে কেনে না অবশ্য। খরচ কমানোর একটা উপায় হচ্ছে দরাদরি। আমার আর অর্চিষ্মানের অনেক অসুবিধেজনক মিলের মধ্যে একটা হচ্ছে দরাদরিতে আমাদের সম্পূর্ণ অপারগতা এবং অনীহা। পোষালে কেনা, না পোষালে ল্যাজ গুটিয়ে পিঠটান দেওয়া, এর মাঝামাঝি কোনও রাস্তা আমাদের জানা নেই।

একমাত্র একটা জায়গায় আমাদের খরচ কমানো কাজে দিয়েছে। বাইরে খাওয়া ড্র্যাস্টিক্যালি কমিয়েছি, খেলেও দোকানের চরিত্র বদলেছি। মাঝে মাঝে অতীতের সোনালি দিনগুলোর কথা মনে পড়লে মনখারাপ করে, বার্গার কিং আর সুইগির এস এম এস-গুলো না পড়ে ডিলিট করতে মাঝে মাঝে কান্না পায়। তখন একে অপরকে সান্ত্বনা দিই, সাময়িক সুখের বদলে পেনশন ফান্ড আয়তনে বাড়ছে। 

যে জায়গাটায় ততটাও কাজ দেয়নি সেটা দৈনিক যাতায়াত। এখন ভাবলে স্বপ্নের মতো লাগে, জয়েন করার পর প্রথম ক'মাস আমি অ্যাকচুয়ালি বাসে চেপে অফিস যেতাম। তারপর বাস থেকে মেট্রো ধরলাম, মেট্রো থেকে অটো, ক্রমে এত নির্লজ্জ হয়েছি যে এই গরমে এসিহীন অটোতে চড়ার কথা ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। পাড়ার  দু'কিলোমিটারের মধ্যে টকটকে লাল রঙের ঝকঝকে মেট্রো স্টেশন তৈরি হচ্ছে, পাশ দিয়ে যেতে যেতে দুজনে দুজনকে মনে করাই, এটা চালু হয়ে গেলে কিন্তু আর কোনও অজুহাত নয়, মেট্রোতেই যাতায়াত করব। আমাদের সদিচ্ছায় কোনও ফাঁকি নেই এই মুহূর্তে, কিন্তু ভবিষ্যতে কী ঘটবে ভবিষ্যৎই জানে।

ওলা উবার যখন চাই তখন পাওয়ার সুবিধে তো আছেই, তার থেকেও বেশি সুবিধে হল মানুষের সঙ্গে কথা বলার আর কোনও দরকারই নেই। মেট্রোটেট্রোতে যদি বা সরে দাঁড়ান দাদা বলার দরকার পড়ত, ওলাউবারে চাইলে সেটাও অ্যাভয়েড করা যায়। কিছুদিন আগে পর্যন্তও গল্প করতে করতে যাব বলে সকালবেলা অফিস যাওয়ার পথে দুজনে নিজস্ব ওলা নিতাম, টাকা বাঁচানোর তাগিদে সে বিলাসিতা বর্জন করেছি, এখন দুজনেই দুবেলা যে যার পুল। আমাদের টাকা বাঁচানোর মিশনের সিরিয়াসনেস বুঝতে পারছেন আশা করি। 

অবশেষে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে অপচয় উৎখাত করেছি নিশ্চিন্ত হয়ে হাঁফ ছাড়ছি যখন তখন একদিন ওলা বুক করতে গিয়ে আঙুলের বেখেয়ালে পিক আপ পয়েন্টের সবুজ পিনটা বাড়ির দরজা থেকে সরে রাস্তার উল্টোদিকে ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর দরজায় গিয়ে পড়ল। আর আমি রিয়েলাইজ করলাম রাস্তার ওপার থেকে আমার অফিসের ভাড়া রাস্তার এপার থেকে অফিসের ভাড়ার থেকে ষোলো টাকা কম।

মুহূর্তটা এখনও মনে আছে। উত্তেজনা, উল্লাস, এতদিন এটা আবিষ্কার না করতে পারার আফসোস। গাড়িতে উঠেই অর্চিষ্মানকে ফোন করেছিলাম। তারপর ও-ও ট্রিকটা কাজে লাগিয়ে দেখেছে, রাস্তার এপারওপারে ডেফিনিটলি ভাড়ার তফাৎ হয়।

মাঝে মাঝে হয় না। কিন্তু আমি দমি না। আমার বাড়ির সামনের রাস্তার এপার ওপার আছে, আর আমার অফিসের আছে তিনখানা গেট। পিক আপের দুই বিন্দু আর ড্রপ অফের তিনটি বিন্দু নিয়ে আমি ততক্ষণ পারমুটেশন কম্বিনেশন চালিয়ে যাই যতক্ষণ না পুলের ভাড়া ন্যূনতম হয়। বাড়ির সামনে থেকে এক, দুই বা তিন নম্বর গেট, এক নম্বর গেট থেকে বাড়ি বা উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের গেট। উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের গেট থেকে দু'নম্বর, দু'নম্বর থেকে বাড়ি, বাড়ি থেকে তিন নম্বর, তিন নম্বর থেকে ফ্ল্যাট।

লেট হয়ে যায়, হোকগে, এ যুদ্ধে আমি জিতেই ছাড়ি। 

এও একরকমের দরাদরি, এবং যে রকম দরাদরি থেকে আমি দৌড়ে পালাই তার থেকে সম্ভবত অনেক বেশি ছ্যাঁচড়া এবং নির্মম। কিন্তু বাকি দরাদরির সঙ্গে এর তফাৎ আছে। উল্টোদিকে কোনও মানুষ নেই। আমি কল্পনা করে নিয়েছি, উল্টোদিকে রয়েছে অদৃশ্য পুঁজিবাদী কর্পোরেশন যে আমার শ্রমের ফল চুরি করে মুনাফায় বদলাতে চায়। 

কাজেই আমার বিবেক ঝকঝক করে। নবোদ্যমে আমি সিস্টেমকে হারানোর যুদ্ধে নামি।

অনেক রকম পারমুটেশন কম্বিনেশন করে দেখেছি একদিকের ট্রিপে ষোলো টাকার বেশি বাঁচানো যায় না। ষোলোই সই। অফিসে মেডিক্যাল বিলের পয়সার অংশটা পর্যন্ত রাউন্ড ডাউন করে রিইমবার্স করে, ষোলো টাকা তো অনেক।

আজকাল সকালবিকেল ষোলো ষোলো বত্রিশ টাকা পেনশন ফান্ডে জমা করছি। আগের থেকে ভয়টা অনেক কম লাগছে।


May 15, 2018

মাইসোর ক্যাফে, ইন্ডিয়া গেট



আমা থাকালিতে খেতে যাওয়ার দিনটা ভালো ছিল। খাওয়া হল, রাহুলের সঙ্গে দেখা হল, রাহুলের বাড়ি যাওয়া হল, রাহুলের বোন শ্বেতার সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হল, রোমহর্ষক সব গল্প শোনা হল। বেরোনোর সময় শ্বেতা বলল, বাই দ্য ওয়ে, যদি কোনওদিনও তিনমূর্তি ভবনের দিকে যাও মাইসোর ক্যাফেতে খেয়ে আসতে পার।

তিনমূর্তি ভবনের দিকে আমাদের বিনাকারণে যাওয়ার চান্স খুবই কম। যদিও জায়গাটা আমাদের পছন্দের। প্রশস্ত পরিষ্কার রাস্তা, বড় বড় গাছ, গাছের ছায়ায় রাজকীয় বাংলো, পর্দাটানা অ্যামবাসাডর ইত্যাদি তো আছেই, ও সব ঝামেলা বড় রাস্তায় ছেড়ে গলির ভেতর ঢুকলেই একটা লুকোনো মধ্যবিত্ত পাড়াও আছে। দিল্লির বাকি মধ্যবিত্ত পাড়াদের মতো যেটা হতশ্রী নয়। এক ইঞ্চি জায়গার জন্য এখানে আঁচড়াআঁচড়ি করতে হয় না, দুটো রং চটা বাড়ির মধ্যে দম নেওয়ার ফাঁক থাকে। সস্তা পাজামা আর জ্যালজেলে তোয়ালেরা কংক্রিটের বিচ্ছুরিত তাপে ভাজাভাজা হয় না, গাছের হাওয়ায় দোল খেতে খেতে গা শুকোয়। দুপুরবেলা একের পর এক বাড়ির শবদেহের ওপর ফ্ল্যাট তৈরির হুংকারের বদলে সাইকেলচড়া ফিরিওয়ালার ডাক শোনা যায়। ঘাড়ের ওপর স্প্রলিং শপিং মলের স্বচ্ছ লিফট দিবারাত্রি মুখভেংচে ওঠানামা করে না, এ পাড়ার গলি আলো করে থাকে মাইসোর ক্যাফের মতো দোকান।


পরিচ্ছন্নতা, ভদ্র ব্যবহার, সুস্বাদু খাবার ইত্যাদি ছাড়া মাইসোর ক্যাফে আর সমস্ত রকম বাহুল্যবর্জিত। এমনকি ন্যাপকিনও নেই কারণ দেওয়ালের সঙ্গে লাগানো বেসিন আছে। আমার মতো আপনার বারোয়ারি বেসিন-ফোবিয়া থাকলে অবশ্য ওঁরা ন্যাপকিন দেবেন। তবে হোল্ডারটোল্ডার নেই। প্লাস্টিকের ছেঁড়া প্যাকেটের ভেতর থেকে বার করে নিতে হবে আপনাকেই। 


মাইসোর ক্যাফেতে মূলত দক্ষিণ ভারতীয় খাবারই পাওয়া যায়, তবে আমরা যতক্ষণ ছিলাম দুজনকে ভাতডালের থালিও খেতে দেখলাম। অর্চিষ্মান নিয়েছিল মাইসোর মসালা দোসা, আমি মাইসোর প্লেন। মাইসোর ক্যাফের দোসা মুচমুচে, চাটনি ঘন, সম্বর ধোঁয়া ওঠা এবং সবক’টিই অতীব সুস্বাদু।

দোসার থেকেও আমাদের বেশি পছন্দ হয়েছে পানিয়ারম বলে এই পদটি। অন্যান্য সাউথ ইন্ডিয়ান দোকানের মেনুতেও এই নামটা দেখেছি, কিন্তু দোসা ইডলি মেদু বড়া ইত্যাদি খাওয়ার পর পাছে আর পেটে জায়গা না থাকে, অর্ডার দিয়ে পয়সা নষ্ট হয়, এই ভয়ে অর্ডার করিনি কখনও। মাইসোর ক্যাফেতে সেই ভয় কম কারণ দুজনের খেতে খরচ হয় কমবেশি দুশো টাকা। 

জিনিসটা খেতে আমার এত ভালো লেগেছে যে ভাগের থেকে একটা বেশি খেয়ে নিয়েছি।


বাড়িতে এসে ইন্টারনেটে রেসিপি সার্চ করে মন আরও খুশি হল। জিনিসটা আর কিছুই না, দোসা বানানোর যে চালডালের মিশ্রণ, সেটাকে গোল বলের মতো আকার দিয়ে অল্প তেলে সেঁকলেই তৈরি হয়ে যায় পানিয়ারম। পানিয়ারম বানানোর বিশেষ পাত্রও পাওয়া যায় বাজারে, আমাদের চিতই পিঠের সাজের মতোই, খালি মাটির বদলে মেটাল আর গর্তগুলো বেশি গভীর। আমি মারাত্মক উৎসাহিত হয়ে পড়লাম। একটা কিনে নিই, শনিরবিবার পানিয়ারম ভেজে খাওয়া যাবে। রেডিমেড দোসা ব্যাটারের প্যাকেটও কেনাই আছে বাড়িতে। 

তারপর মনে পড়ল। ওই প্যাকেটটা কেনার আগেও অবিকল এই উত্তেজনা অনুভব করেছিলাম। প্রতি শনিবার সকালে দোসা-পার্টি আয়োজনের প্রত্যয় টের পেয়েছিলাম। কেনার পর ছ’মাসে (ন’মাসও হতে পারে) একদিন দোসা বানিয়ে খাওয়া হয়েছে। 

কাজেই আপাতত পানিয়ারম পাত্র কেনা স্থগিত রেখেছি। ইচ্ছে হলে বরং মাইসোর ক্যাফেতে গিয়ে খেয়ে আসব।




May 13, 2018

মায়ের চাওয়া



অনলাইন বেচাকেনার এই বাজারে সোমবার সকালে অফিস পৌঁছে ডেস্কের ওপর পার্সেল পড়ে থাকতে দেখাটা কিছু সারপ্রাইজ নয়। কিন্তু সে বাক্সের ওপর প্রিন্ট আউটে খুদি খুদি অক্ষরের বদলে নীল কালিতে গোটা গোটা অক্ষরে আমার নামঠিকানা লেখা থাকাটা সারপ্রাইজ। কে পাঠিয়েছে তাতে অবশ্য কোনও সারপ্রাইজ নেই, অক্ষরের ছাঁদ আমার চেনা। 

মা অফিসে মেডিক্যাল বিল জমা দিতে গিয়েছিলেন। কলেজ স্ট্রিট হয়ে বই কিনে পাঠিয়েছেন। সাহিত্য অকাদেমি প্রকাশনের 'বাংলা গল্প সংকলন' প্রথম এবং দ্বিতীয় খণ্ড। ফ্লিপকার্ট থেকেও পাঠাতে পারতেন কিন্তু তাতে নিজে হাতে লিখে দিতে পারতেন না, তাই সশরীরে কিনে প্রথমপাতায় শুভেচ্ছাবার্তা লিখে পাঠিয়েছেন। 

খুব খুশি হলাম, তারপর মনে হল আমারও মাকে কিছু দেওয়া উচিত। তাছাড়া আমাদের বিবাহবার্ষিকী উদযাপনের এত কাছে মাদার’স ডে, মাকে কিছু দেওয়ার এর থেকে ভালো ছুতো আর কী হতে পারে। 

মাকেই জিজ্ঞাসা করলাম। তোমাকে কী দেব মা? শাড়ি? পাগল, কয়েকটা নিয়ে গিয়ে আমার আলমারিটা খালি কর সোনা। স্মার্ট ফোন? সুখে থাকতে ভূতের কিল খাওয়াবি সোনা? কাছে থাকলে খাওয়াতে নিয়ে যাওয়া যেত, যদিও সেটাও একটা স্ট্রাগল। মা বলবেন, কী হবে সোনা একগাদা টাকা নষ্ট করে বাইরে খেতে গিয়ে? তার থেকে আমি গরম গরম দুটো রুটি করে দিই, আলুভাজা ভেজে দিই। ধড়াচূড়া পরে দোকানে গিয়ে খাওয়ার থেকে বেশি আরাম হবে, দেখিস। সে আমিও জানি হবে। কিন্তু দ্যাট ইজ নট দ্য পয়েন্ট। এটা তোমার দিন, আমি তোমার আরামের খেয়াল রাখব, তুমি আরাম করবে, সেটাই মাতৃদিবস পালনের পয়েন্ট। মা হাঁ করে থাকেন। আমার আরাম, বিশেষ করে মায়ের পরিশ্রমের ফলে জাত আমার আরাম থেকে তাঁর নিজের আরাম যে আলাদা হতে পারে, এই শক্ত কথাটা তাঁর মাথায় ঢোকে না।

ব্লগেট্‌লগে মাদার’স ডের গিফট গাইড দেখেছি, মনে করার চেষ্টা করলাম। মুখে মাখার ক্রিমট্রিম পাঠালে মাখার দু’মিনিটের মধ্যে মা গলগল করে ঘামতে শুরু করবেন (আমি জানি, ঘামার প্রতিভা আমাদের দুজনের কমন) দৌড়ে গিয়ে ধুয়ে ফেলে প্রাণে বাঁচতে হবে। বই পাঠানো যায়, কিন্তু সে বই মা বিকেলবেলা গিয়ে লাইব্রেরি থেকে তুলে আনতে পারেন। ফুল চকোলেট টেডি বিয়ার পাঠানো মহা হাস্যকর হবে।

খবরদার পয়সা খরচ করবি না সোনা। 

ভাবনা ছিঁড়ে মায়ের সতর্কবাণী ঢুকে পড়ে।

ওহ, মা মেটেরিয়াল কিছু চান না তার মানে। ইমমেটেরিয়াল কিছু... কথাটা মাথায় আসামাত্র আমার হৃদপিণ্ড ডিগবাজি খায়। 

যদি চেয়ে বসেন, এবার থেকে আমার সব কথা শুনে চলবি? আমার কাছে যতদিন ছিলি ততদিনের মতো রোজ সকালবিকেল পড়তে বসবি, ইন্টারনেটের নেশা ছাড়বি, রোজ মন দিয়ে একঘণ্টা রেওয়াজ করবি?

তোকে নিয়ে যত স্বপ্ন দেখেছিলাম সব পূর্ণ করবি?

ওড়নার প্রান্ত তুলে মুখের সামনে নাড়তে শুরু করলাম। অফিসের এসিগুলো কি সব ছুটিতে গেছে? 

যে কোনও প্যাঁচালো পরিস্থিতির মতোই এই পরিস্থিতিতেও আমার একটাই প্রতিক্রিয়া মাথায় এল। এবং এই পার্টিকুলার পরিস্থিতিতে সে প্রতিক্রিয়াটির আয়রনি বুঝে হাসিও পেল। 

আমি আজীবন বিপদে পড়লে মাকে ডেকেছি। স্কুলে নোটখাতা না নিয়ে গেলে কানমলার অপমান থেকে বাঁচতে মাকে ডেকেছি। সিলেবাস শেষ না করে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে মাকে ডেকেছি। বাড়ির চাবি হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে মাকে ডেকেছি। অ্যাপ্রাইজালের ইনটারভিউর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মাকে ডেকেছি। 

সবসময় যে ডাকা কাজে দিয়েছে তা নয়। যেমন কর্ম তেমন ফল বলেও একটা কথা আছে। মায়ের কথা অমান্য করে সিলেবাস শেষ না করে পরীক্ষায় বসলে হাজার মাকে ডাকলেও কাজ দেয় না। যা পরিণতি হওয়ার তাই হয়।

আবার কখনও কখনও দিয়েছেও। আমার আগের বেঞ্চ পর্যন্ত নোটখাতা চেক হওয়ার পরই টিফিনের ঘণ্টা বেজে গেছে। আমাকে কানমলা খেতে হয়নি। সিলেবাস শেষ না করেও মোটামুটি গয়ংগচ্ছ দিনাতিপাত হয়ে যাচ্ছে। এ সবের পেছনেও মায়ের হাত বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

কাজেই মায়ের হাত থেকে বাঁচতেও আমি মাকেই ডাকলাম। এবং মা সাড়া দিলেন। 

যদি দিতেই হয়…

মা মনস্থির করে ফেলেছেন। আমিও ফেললাম। মা চাইলে যে কোনও কথা দিতে হয় দেব। যদি একলব্য হতে হয় হব।

মা বললেন, যদি দিতেই হয়, সেদিন সকালে উঠে একবার মা বলে ডেকে দিস। তাহলেই হবে।

*****

ডাকব মা। তুমি বললেও ডাকব, না বললেও ডাকব। মাদার্স ডে-তেও ডাকব, বাকি তিনশো চৌষট্টি দিনও সকালবিকেল দুপুরসন্ধে ডাকব। আরামের দিনে যদি বা ভুলে যাই, বিপদের দিনে গলা ফাটিয়ে তোমাকেই ডাকব। আজীবন যেমন ডেকে এসেছি। বাকি জীবনটাও অন্যথা হবে না। 

হ্যাপি মাদার’স ডে, মা।


May 11, 2018

কাঠ



আমার পুরোনো ছবি দেখতে ভালো লাগে না। যে সব ছবিতে আমাকে দারুণ দেখতে লাগছে, সে সব ছবিও না। বাড়ির ছাদে কিংবা ইউনিভার্সিটির মাঠে, দোলের রং মেখে কিংবা রেস্টোর‍্যান্টে ক্যান্ডলাইটের আলোয়, কোনও জায়গায় কোনও পরিস্থিতিতে তোলা ছবিই না। কারণ একটা পার্টিকুলার মুহূর্তকে বন্দী করলেও ছবি দেখতে বসে আমি শুধু সেই মুহূর্তটা দেখি না, আশেপাশের অনেক মুহূর্তও দেখতে পাই। এক বা একাধিক ছায়া। একটা ফোনকল বা একটা কথোপকথন। মুহূর্তের হাসির আর সুখের ছটায় অন্ধ কুন্তলার গোচরের আড়ালে, সাত দিন কিংবা তিন মাস, ম্যাক্সিমাম ছ’মাস দূরে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। আচম্বিতে আড়াল থেকে যখন ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে তখন হাসি কেমন উড়ে যাবে, সেই কল্পনায় তাদের ঠোঁট বঙ্কিম।

পুরোনো ছবি দেখলে তাই আমার আরাম হয় না। আফসোস হয়। যদি সাবধান করতে পারতাম। যদি ফোটোর ভেতর হাত বাড়িয়ে ওই অজ্ঞান, অচেতন মেয়েটার কাঁধে টোকা দিতে পারতাম। 

অত না হেসে পড়তে বস। 

*****

অর্চিষ্মানের ফোনে আমাদের দুজনের একটা ছবি আছে। বছর ছয়েক আগের। আমরা তখন আই ব্লকের বাড়িটাতে থাকতাম। ডিসেম্বর মাস ছিল। তিন্নি এসেছিল দিল্লিতে। কোনও একটা শনি বা রবি তিনজন বেড়াতে বেরিয়েছিলাম। কনট প্লেস আরও কোথায় কোথায় ঘুরে হুমাউন’স টুম্ব। আমাদের অন্যতম ফেভারিট জায়গা। তিন্নিরও ভালো লেগেছিল। হাসিহাসি মুখের প্রচুর ছবি তোলা হয়েছিল সকলের। 

এই ছবিটা তিন্নি তুলে দিয়েছিল। টুম্বে ঢোকার মুখে ডানদিকে একটা পাঁচিলঘেরা জায়গা আছে। পাঁচিলের ভেতরদিকের সারি সারি খোপে নাকি টুম্বের কারিগররা থাকতেন। পাঁচিলের গায়ে কাঠের পেল্লায় দরজা, দরজায় লোহার নাটবল্টু হীরেজহরতের মতো গাঁথা। দরজার সামনে অর্চিষ্মান আর আমি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। অর্চিষ্মানের গায়ে কালো সোয়েটার, আমার বেগুনি। কাটছি কাটব করেও না-কাটা চুল ঝাঁপিয়ে অর্চিষ্মানের ডানচোখ ঢেকে ফেলেছে। আমার চশমার কাঁচে, কুচো চুলের ডগায় সোনালি রোদ চিকচিক। খুব হাসছি দুজনে।

অর্চিষ্মান বলে, এটা আমাদের একসঙ্গে তোলা বেস্ট ছবি। 

পুরোনো ছবির সঙ্গে আমার সম্পর্ক মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হয়ে হাত বাড়াই। কোনটা দেখি?

একনিমেষ তাকিয়েই বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে ওঠে। তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিই। অর্চিষ্মান বলে, ভালো না? 

ঠোঁট টিপে ঘাড় নেড়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনে মুখ ফেরাই। 

অর্চিষ্মানের পাশে দাঁড়িয়ে সাড়ে পাঁচবছর আগেকার যে কুন্তলা হাসছে, ও জানে না ওর জন্য কী অপেক্ষা করে আছে। 

ও জানে না, আর বছরখানেকের মধ্যে ভুল করে ড্রায়ারে ঢুকিয়ে দিয়ে সাধের বেগুনি সোয়েটার আর পরার যোগ্য থাকবে না। চশমার ফ্রেম বদলাবে আরও দু’বার। দু’বার পা ভাঙবে (আগের বত্রিশ বছরে একবারও ভাঙেনি, ভাবা যায়?)। অর্চিষ্মানের চুল আর কোনওদিন অত লম্বা হবে না, চশমার পাওয়ার বাড়বে, গোড়ালি একবার ভাঙবে, একবার থুতনি কাটবে, একবার জন্ডিস।

খালি ওই হাসি আর দুজনের ঘেঁষাঘেঁষি দাঁড়ানোর ওই আরাম আর নিশ্চিন্তি আর ভালোলাগাটুকু একই থাকবে। পাঁচবছরের গার্হস্থ্যের ঘষটানি রোদের সুখটুকুতে শান দিয়ে এত তীব্র, এত ঝকঝকে করে তুলবে যে ছবিতে চোখ ফেলা মাত্র চোখে এসে বিঁধে যাবে। গলার কাছে আটকে গিয়ে দম বন্ধ করে দেবে।

*****

আমার চশমার কাঁচ আর চুলের ডগার জীবনভরের রোদ্দুরকে, হ্যাপি কাষ্ঠজয়ন্তী।


May 09, 2018

চোপতা, তুঙ্গনাথ, চন্দ্রশীলা, ক্ষিরসুঃ ৩ (শেষ)





চোপতার কাছে সারি গ্রাম, সেখান থেকে ঘণ্টাখানেক ট্রেক করলেই দেওরিয়াতাল। ভাগ্যবানেরা যার টলটলে জলে চৌখাম্বার ছায়া দেখতে পান। বছর বছর দিওয়ালিতে অফিসের তাম্বোলা পার্টিতে অংশগ্রহণ করে নিজের ভাগ্যের দৌড় আমার জানা হয়ে গেছে, তবু যে দেওরিয়াতালে যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল তার দুটো কারণ।

এক, দেওরিয়াতাল একটি বুগিয়ালের মধ্যে। বুগিয়াল হচ্ছে পাহাড়ি প্রান্তর যা আমার মতে কখনও কখনও পাহাড়ের থেকেও বেশি সুন্দর। উঁচু শৃঙ্গের রাজসিকতা নেই, কিন্তু শান্তি আছে। সেই রকম সবুজ মাঠে ওপর পুকুরের ধারে বসে থাকার আইডিয়াটা আমার মনে ধরেছিল। 

দুই, কেউ কেউ বলে এই তালেই নাকি যুধিষ্ঠির ও যক্ষের প্রশ্নোত্তরপর্ব চলেছিল। মহাভারতের বিরল গল্পের একখানা, যাতে চিটিংবাজি নেই, বস্ত্রহরণ নেই, ঊরুভঙ্গ নেই, বুক চিরে রক্তপান নেই, জাস্ট মুখোমুখি বসে সিভিলাইজড কথোপকথন। পরীক্ষার একটা অ্যাংগল আছে ঠিকই, কিন্তু সে পরীক্ষার রেজাল্ট সবাই জানে।কাজেই টেনশনের কিছু নেই। 

দেওরিয়াতাল পৌঁছনো চন্দ্রশীলা চড়ার মতো কঠিন নয়, ঘণ্টা তিনেকের ওঠানামা। সোমবার সকালে বারান্দা পর্যন্ত গিয়ে ভিউ দেখতেই কান্না পেয়ে যাচ্ছিল আমার, কাজেই দেওরিয়াতালের প্ল্যান ক্যান্সেল করলাম।

চোপতায় অনেকে পাখি দেখতে যান। আমি অতি কষ্টে পাতি আর দাঁড়কাকের ফারাক করতে পারি, সেই আমার চোখেও হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অচেনা অদেখা পাখি ধরা দিল। লাল রং, ঝোলা লেজ, মাথায় ঝুঁটি। ব্যস্ত হয়ে ডালে ডালে ঘুরে ডাকাডাকি করছে। 

বাটার টোস্ট আর চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য ক্ষিরসু। এ বারের বেড়ানোর শেষ স্টপ।

*****


আসতে আসতে আলোচনা করছিলাম, রাস্তা হিসেবে হিমাচলের রাস্তা উত্তরাখণ্ডের রাস্তার থেকে বেশি সুন্দর। এরকম বলার কারণ হল উত্তরাখণ্ডের যে জায়গাগুলোতে গেছি, বেশিরভাগেরই যাওয়াআসার পথের দুপাশ জনবসতিময়। দেবপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ, শ্রীনগর, পৌরি, রীতিমত ঘিঞ্জি শহর। তার ওপর চারধাম খুলে গেছে, কোটি কোটি গাড়ি ধেয়ে চলেছে পাহাড়ে। অগস্ত্যমুনির মেন বাজারে রীতিমত যানজট। খাকি পুলিস লাঠি তুলে গাড়ি ঠ্যাঙাচ্ছে। মাঝপথে থেমে থেমে চা, চিপস হল কিন্তু ওই গরমে অত দুধচিনি দেওয়া চা দুয়ের বেশি তিনকাপ খাওয়া যায় না। 

গত দু’দিনের স্বর্গীয় বারান্দা, পাখির ডাক, শিলাবৃষ্টি, শিরশিরে হাওয়া, কুয়াশার মধ্যে দাঁড়কাকের উড়ান, সব যেন পূর্বজন্মের স্মৃতি। 

চোপতা যাওয়ার সময় ক্ষিরসুর লেখা তীরচিহ্ন দেওয়া বোর্ড দেখেছি শ্রীনগর শহরের মধ্য দিয়ে, কাজেই আরও একপ্রস্থ জ্যাম হট্টগোলের মধ্যে পড়ার জন্য তৈরি ছিলাম, হঠাৎ দেখি একটা মোড়ের মাথায় গাড়ি থেমেছে আর আশিস জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করছে ক্ষিরসু যাওয়ার শর্টকাট এটাই কি না।

ওটাই। বড় রাস্তা থেকে বাঁ দিকে বাঁক নিলাম আর অমনি উত্তরাখণ্ড আমাদের দেখিয়ে দিল সুন্দর রাস্তা কাকে বলে।  এ রাস্তা কোনও তীর্থে পৌঁছচ্ছে না। এ রাস্তায় জনপ্রাণী নেই, দোকান নেই, বাড়ি নেই, হোটেল নেই। আছে খালি গাছ আর নদী আর আকাশ। এতক্ষণ আমরা পাহাড় থেকে নামছিলাম, আবার শুরু হল পাহাড়ে ওঠা।

আমাদের তো মন ভালো হলই, আশিসও খুশি। কালকের অ্যাডভেঞ্চারের পর বেচারার পায়ে ব্যথা হয়েছে, এ রকম মাখনের মতো রাস্তা, ট্র্যাফিকহীন রাস্তা পেয়ে গল্প করতে করতে চলল। বলল, গাড়োয়াল আর কুমায়ুন, দুই অঞ্চলের আদবকায়দা, খাওয়াদাওয়া, ভাষায় প্রভূত বিভেদ। আশিসের বাড়ি হিমাচল বর্ডারে, হিমাচলি সংস্কৃতির সঙ্গে আশিসের দহরমমহরম বেশি। এই চারদিনে কত যে হিমাচলি গান শুনলাম। চুড়পুড়া বলে কোনও এক অজ্ঞাত গন্তব্যে যাওয়ার একটা গান শুনলাম, গাইয়েদের উৎসাহ আর আকুলতা শুনে মনে হল নিশ্চয় যাওয়ার মতো একটা জায়গা হবে। দু’নম্বর মনে থাকা গান হচ্ছে একজন বয়স্ক মানুষ আর একটি নব্যযুবকের মধ্যে চাপানউতোর। বয়স্ক ভদ্রলোক গাড়োয়াল অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের নাম বলে জানতে চাইছেন যুবক কোন গ্রামের লোক। তাতে যুবক মহা বিরক্তির সঙ্গে উত্তর দিচ্ছে এই সব গ্রাম্য অঞ্চলের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই, সে ট্রাউজার পরে, সিগারেট খায়, হিন্দিতে কথা বলে। গ্রামের কেন হতে যাবে বালাইষাট, সে টপ টু বটম দেরাদুনওয়ালা।

রাস্তা দিয়ে গলায় ঘণ্টা বেঁধে গরুর দল চলেছে, কে জানে চুড়পুড়ার উদ্দেশে কি না। বাছুরেরা গাড়ির সঙ্গে এখনও অত সড়গড় হয়নি, কাছ দিয়ে গেলে ভয় পেয়ে হাঁটু বেঁকিয়ে লেজ তুলে দৌড়োদৌড়ি লাগায়। আশিস বলল, এই যদি শহরের গরু হত, গাড়ি ঘাড়ের ওপর এসে গেলেও বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। মর্জি না হলে এক ইঞ্চি নড়ত না।

প্রায় একঘণ্টার রাস্তায় একটাও গাড়ি দেখলাম বলে মনে পড়ল না। সেজন্যই মোড়ে মোড়ে লিফটের অপেক্ষায় কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন সম্ভবত। আশিসের মেজাজ প্রসন্ন ছিল, দুজনকে গাড়িতে তুলে নিল। কিছুক্ষণ পর পাহাড়ের মাথার ওপর কতগুলো ঘরবাড়ি দেখিয়ে বলল, ওটাই ক্ষিরসু। পাহাড়ের গায়ে পুতুলের গ্রাম।

সেই গ্রামের দিকে যত এগোতে লাগলাম একটা শব্দ আসতে লাগল। পাখির ডাক না, পাহাড়ি কুকুরের ওয়েলকামসূচক ঘেউ ঘেউ না, পাতার শনশনানি না। নীল আকাশ, ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে মানানসই এমন কোনও শব্দই না। বরং আমাদের চেনা একটা শব্দ। 

সহযাত্রী সামনের সিট থেকে হাসি হাসি মুখ ফিরিয়ে বললেন, খুব ভালো সময়ে এসেছ তোমরা, আজ আমাদের ক্ষিরসুতে সম্বৎসরের মেলা। 

*****


অর্চিষ্মানের শত সান্ত্বনাতেও আমার শোক বাধা মানল না। বেড়াতে গেলে যে একটি জিনিস আমি অ্যাভয়েড করতে চাই সেটা হচ্ছে মানুষ। ক্ষিরসু আমি বেছেছিলাম জায়গাটার একটেরেপনার জন্য,সেখানে কিনা বেছে বেছে বার্ষিক মেলার দিন গিয়ে পৌঁছনো?

বাকিরা আমার মতো বেরসিক নয় বলাই বাহুল্য। আশিস আমাদের নামিয়ে কোনওমতে গাড়ি পার্ক করে দৌড়ে মেলা দেখতে বেরিয়ে  গেল। আমরাও ঘরে ব্যাগ রেখে চা খেয়ে বেরোলাম। অর্চিষ্মান টেনে বার করল। ভালো লাগবে, চল। 

রীতিমত বড় মেলা। আশেপাশের গ্রামের লোক এসেছে। পিলপিল করছে লোক, পাঁচ থেকে পঁচাশি, তবে পনেরো থেকে পঁচিশেরাই বেশি চোখে পড়ে। তারা রাস্তা জুড়ে হাঁটে, যেখানে সেখানে থেমে সেলফি নেয়, কে জানে কাকে দেখে মুচকি হাসে, চুলে আঙুল বোলায়। রাস্তার পাশে বুড়ির চুল, কানের দুল, বস্তার ওপর ঢিবি করা রকমারি ডাল। দরাদরি করে সবাই একই প্লাসটিকে সবরকমের ডাল একসঙ্গে ভরে নিয়ে চলে যাচ্ছে। বাড়ি গিয়ে নিশ্চয় বাছতে বসবে না, আজ রাতের মেনুতে নিশ্চয় পাঁচমেশালি ডাল।


ক্ষিরসুর জি এম ভি এন-এর বারান্দায় বসে হিমালয়ের বিস্তৃত বরফাবৃত রেঞ্জ তো দেখাই যায়, সঙ্গে লাল গোলাপি বেগুনি সাদা হলুদ গোলাপের বাগান ফাউ। বারান্দায় বসে এই সব ভালো ভালো জিনিস দেখে মনে বেশ একটা উচ্চমার্গের ভাব আনার চেষ্টা করছি কিন্তু মন কেবলই দশ হাত দূরে বসা জনাচারেক নারীপুরুষের দিকে চলে যাচ্ছে। কে কী বলছে, কার সঙ্গে কার কী সম্পর্ক ইত্যাদি রহস্যভেদের আকাঙ্ক্ষায় আনচান করছে। 

এমন সময় অর্চিষ্মান আর্তনাদ করে উঠল। কী সাংঘাতিক! এগুলো গোলাপ! আমি বললাম, তুমি কী ভাবছিলে? অর্চিষ্মান নাকি ভেবেছে পাটুলির প্রতি পাঁচিল থেকে র‍্যান্ডম যে সব বারোয়ারি লাল ফুল ফুটে থাকে সে সব হবেটবে। 

বেচারাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ভালো জিনিস একসঙ্গে এত দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত হয়। কাজিরাঙায় প্রথমবার যখন গেছিলাম বাবামার সঙ্গে, গাইড গাড়ি দাঁড় করিয়ে বলেছিলেন, ওই দেখুন গণ্ডার। দূরে একটা সবুজ ঘাসের মাঠে কালো কালো বিন্দু। শতশত না হলেও খুব কমও নয়। আমরা বিশ্বাসীরা তো আহা ওহো করে অস্থির, খালি মা ভুরু কুঁচকে বলেছিলেন, এত গণ্ডার? ছাগল নয় তো? 


বিকেল যত ঢলল আলো কমে এল, কালো মেঘের পটে সাদা পাহাড়চুড়ো স্পষ্ট হয়ে ফুটল। হাওয়ার বেগ বাড়তে বাড়তে রীতিমত ঝড়। লাল গোলাপের পাপড়ি গড়াগড়ি খেতে লাগল সবুজ ঘাসের ওপর। দৌড়ে ঘর থেকে কোট পরে এলাম। ঝড়ের হাওয়ায় বাংলোর সীমানাচিহ্নক রঙিন পতাকা পতপত করে উড়তে লাগল। চোখ বন্ধ করে শুনলে অবিকল জলের ফোঁটা পড়ার শব্দ।

ক্ষিরসুতে বিশেষ কিছু করার নেই। ইন্টারনেটে লিখে রেখেছে বটে আপেলের বাগানের কথা কিন্তু ম্যানেজারবাবু বললেন ওসব একসময় ছিল এখন নেই। সত্যিই নেই নাকি ভদ্রলোকের ক্ষিরসুর ওপর বেশি টুরিস্টের নজর পড়ুক চান না তাই কমসম করে বলছেন সরেজমিনে পরদিন সকালে দেখতে বেরোনো যেত। আবার ঘুমোনোও যেত। আপেলবাগানে হাঁটার সুযোগও যেমন হয় না তেমন মঙ্গলবার সকালে জানালার বাইরে হিমালয়ের আবছা উপস্থিতি নিয়ে ভোঁসভোঁসিয়ে ঘুমের সুযোগই বা কটা আসে? 

আমরা ঘুমোলাম। যতক্ষণ না শরীরের সমস্ত রন্ধ্র, তন্তু, রক্তবিন্দু, মাংসপেশী পূর্ণ করে বিশ্রাম উপচে পড়ল ততক্ষণ। 

অবশেষে আড়মোড়া ভেঙে কফির খোঁজে বেরিয়ে দেখি রান্নাঘরে কেউ নেই। রাতের ঝড়ে পুরোনো পতাকা ছিঁড়েখুঁড়ে একশা, সবাই মই জোগাড় করে হলুদ রঙের ছেঁড়া পতাকা নামিয়ে বেগুনি রঙের ঝকঝকে নতুন পতাকা টাঙাচ্ছে।

*****

হরিদ্বারে পৌঁছনো আর ট্রেন ছাড়ার মধ্যে আড়াইঘণ্টা সময় ছিল। তার মধ্যে আমরা চোটিওয়ালার দোকানে খেলাম। খুব আস্তে আরাম করে খেয়েও একঘণ্টার বেশি খরচ হল না, বাকি দেড়ঘণ্টা ক্যাফে কফি ডে আর হর কি পৌড়ির ঘাটের ওপরের ফুটব্রিজে দাঁড়িয়ে দৌড়ে চলা ঘোলা জল আর মারাত্মক সাহসী পোশাকপরিহিত লোকজনের সে জলে ডুব দেওয়া, নাক ঝাড়া, থুতু ফেলা দেখে কেটে গেল।

হরিদ্বারের রাস্তায় দু’হাত দূরে কাঁচের বয়াম গলা পর্যন্ত ভর্তি পানিপুরি বা গোলগাপ্পার ঠেলা। ভাবলাম খাই, কিন্তু পেটে সত্যিই জায়গা ছিল না। অনেক বছর আগে, স্কুলের ছোট ক্লাসে পড়ার সময় বেড়াতে এসে হরিদ্বারের ফুচকা খেয়েছিলাম মনে আছে। আমাদের সঙ্গে ঠাকুমাও খেয়েছিলেন। বাড়িতে ফুচকাটুচকা ছুঁতেন না, হয়তো দেবস্থানে খেলে পাপ হবে না বা কম হবে না মনে হয়েছিল।

হরিদ্বার- মুম্বাই লোকমান্য তিলক টার্মিনাস সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের কামরায় সকলেই বাঙালি ছিলেন, যদিও কেউই কারও সঙ্গে আলাপের চেষ্টা করিনি। ট্রেন টাইমে ছেড়ে টাইমে নিজামুদ্দিনে ঢুকে গেল। ওলাভাইসাব বাড়ির গেটে নামিয়ে দিয়ে গেলেন যখন, রাত বারোটা বেজে গেছে।

                                                                                                                      (শেষ)



May 06, 2018

চোপতা, তুঙ্গনাথ, চন্দ্রশীলা, ক্ষিরসুঃ ২




পাহাড়ের ওয়েদার অনেকটা আমার মেজাজের মতো। এই চা খেতে খেতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পরিষ্কার আকাশে সূর্যাস্ত দেখলাম, এই সূর্যের শেষ রশ্মি পাহাড়ের ওপারে অদৃশ্য হতে না হতে গুড়গুড় মেঘ ডেকে ঝমঝম বৃষ্টি নেমে গেল। অর্চিষ্মান ভেবে অস্থির, কাল বৃষ্টি হলে পাহাড় চড়বে কী করে। প্রকাশজি আশ্বাস দিলেন। কুছ নেহি হোগা, সকালবেলা সব ঝকঝকে হয়ে যাবে। আর যদি নেহাতই বৃষ্টি পড়ে তবে রেনকোট নিয়ে যাবেন নিচ থেকে, সব মিল যাতা হ্যায় উধর।

আলো থাকতে থাকতে খেয়ে নিলাম। পেঁয়াজ, লংকা সহকারে ডাল, রুটি, তরকারি। নাইটক্যাপ ফিকি চা। ডাইনিং হল থেকে একটা সোলার ল্যাম্প দিয়ে দিলেন প্রকাশজি। মাঝরাতে যদি ঘুমটুম ভাঙে, বাথরুমটাথরুম যেতে হয়। বৃষ্টি হয়ে ঠাণ্ডাটা আরও জাঁকিয়ে নেমেছে। লেপের তলায় ঢুকলাম।

এই সেদিন শান্ত জায়গার কথা হচ্ছিল, চোপতাও ভারি শান্ত জায়গা। এত শান্ত যে প্রতিটি রাতপাখির ডাক, রান্নাঘরে রুটি এহাত ওহাত হওয়ার চটপট, পাতার ফাঁকে হাওয়ার শনশন, কংক্রিটের বারান্দায় বৃষ্টির ফোঁটার পটপট সব প্রকাণ্ড হয়ে কানে আসে। 

দুপুরে ঘুমিয়েছি, ভেবেছিলাম আর ঘুম আসবে না বোধহয়। কিন্তু লেপের ভেতর শুয়ে শুয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম, কখন আলো নিভে গেছে টের পাইনি।

*****

জায়গা ঠিক হওয়ার পর সেই জায়গাসংক্রান্ত ট্র্যাভেলগ, ব্লগপোস্ট ইত্যাদি পড়া আমাদের বেড়ানোর প্রস্ততির অঙ্গ। চোপতা তুঙ্গনাথ চন্দ্রশীলাও ব্যতিক্রম হয়নি। অর্চিষ্মান যে ক’টা আর্টিকল পড়েছে, সবেতে লিখে রেখেছে তুঙ্গনাথ হচ্ছে বিগিনারস্য বিগিনারদের ট্রেক, দু’ঘণ্টায় উঠে দেড়ঘণ্টায় নেমে আসা যায়।। পালস রেট শপিং মলে হাঁটার থেকে বেশি হওয়ার কথা নয়, হলে আপনার নিজের ফিটনেস নিয়ে লজ্জা হওয়া উচিত।  

আর আমি যে লেখাগুলো পড়ছি, সেখানে সব প্রফেশনাল নৃত্যশিল্পী আর দৌড়বীর, মাসের এমাথা ওমাথা ক্যাজুয়ালি টেন কিলোমিটারস দৌড়ে আসেন, হাঁটা শুরু করার একশো মিটারের মধ্যে তাঁদের নাকি জিভ বেরিয়ে গেছে। ডান পা ফেলেন মুভ লাগান, বাঁ পা ফেলেন মুভ লাগান, এই করে নাকি উঠেছেন, তাও চন্দ্রশীলা পর্যন্ত পৌঁছোতে পারেননি।

বৃহস্পতিবার রাতে অফিস থেকে ফেরার পথে মুভ কিনে ব্যাগে পুরেছিলাম। গর্বের সঙ্গে জানাচ্ছি, সে মুভ যেমন কে তেমন ফেরত এসেছে, ক্যাপের সিল ভাঙতে পর্যন্ত হয়নি। 

*****


স্নো ভিউ থেকে আপার চোপতায় হাঁটা শুরুর পয়েন্ট গাড়িতে আধঘণ্টার রাস্তা। আমি যদি আবার কোনওদিন চোপতা যাই, পাহাড়ে না চড়ে সকালবিকেল এই রাস্তাটায় হাঁটব। জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে দুপাশে সাদা বর্ডার আঁকা কালো পিচের রাস্তা, মাঝে মাঝে মোড় ঘোরার সময় হঠাৎ গাছের মাথার ওপর রাজকীয় চৌখাম্বা দেখা দিয়ে দমবন্ধ করে দেয়। 


সোয়া আটটা নাগাদ আমরা হাঁটা শুরু করলাম। লাল রঙের তোরণের সামনে থেকে লাঠি ভাড়া নেওয়া হল, রেনকোটও খুঁজেছিলাম, কিন্তু তখন আকাশে ঝকঝকে রোদ্দুর তাই অত গা করেও খুঁজিনি। তাছাড়া লাঠিওয়ালার কাছে রেনকোট ছিল না, তিনি সোৎসাহে আমাদের নিরুৎসাহ করলেন। বারিষ নেহি হোগা। গ্যারান্টি। 

আমি ভেবেছিলাম শীতের কোটটোট নেওয়া অতিরিক্ত নিড়বিড়েপনা হয়েছে, সোয়েটারটাই লাগে কি না সন্দেহ। গাড়ি থেকে নামামাত্র হাড় কেঁপে গেল। কী ঠাণ্ডা। গলা পর্যন্ত কোটের জিপ টেনে হাঁটতে শুরু করলাম। আশিসও দেখি আমাদের সঙ্গে পাহাড়ে চড়ার জন্য রেডি হচ্ছে। বলল, কেয়া করনা গাড়ি মে বইঠকে।

চোপতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৬৮০ মিটার উচ্চতায় আর তুঙ্গনাথের উচ্চতা হচ্ছে ৩৬৮০ মিটার। সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তা। ঘোড়ার ব্যবস্থা আছে, তবে আমরা হেঁটে যাওয়াই স্থির করেছিলাম। আমাদের স্ট্র্যাটেজি ছিলঃ

এক, ভীষণ আস্তে হাঁটব। কেউ ওভারটেক করছে দেখলে নার্ভাস হয়ে স্পিড বাড়াব না। 

দুই, যেখানে কষ্ট হবে, দাঁড়াব। 

তিন, আগেরবার ত্রিউন্ড চড়ার সময় যে ভুলটা করেছিলাম সেটা করব না। অর্থাৎ চারদিকের সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে উঠব। জার্নি ইজ মোর ইম্পরট্যান্ট দ্যান দ্য ডেসটিনেশন ইত্যাদি বিস্মৃত হব না। 

তুঙ্গনাথের পাথর বাঁধানো পরিষ্কার রাস্তা। তবে খাড়াই। লাঠি ব্যবহার করায় আমাদের দুজনের পায়ে তেমন কিছু ব্যথাও হয়নি। তুঙ্গনাথ পর্যন্ত উঠতে ব্যথা হয়নি একটুও। যেটা হয়েছে সেটা দমের কষ্ট। উচ্চতাটাও সম্ভবত আমাদের মতো আনাড়িদের কাছে ম্যাটার করেছে। 


গোটা রাস্তা জুড়ে বরফঢাকা রাজকীয় শৃঙ্গেরা সঙ্গ দেয়। নন্দাদেবী, ত্রিশূল, কেদার, বাঁদরপুচ্ছ। আর পান্নার মতো ছড়ানোছেটানো বুগিয়াল। দেখলেই দৌড়ে গিয়ে শুয়ে চিৎপাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। 


সহযাত্রীদের মধ্যে প্রচুর ছিলেন মারাঠি, তার থেকেও বেশি বাঙালি। কান পাততে হয় না, এমনিই এদিকওদিক থেকে বাংলা কথা কানে আসে। সবাই কানে গান গুঁজেছে, কেউ তো হানি সিং মোবাইলে স্পিকারে বাজিয়েই উঠছে, বাঙালি দম্পতি নিজেদের সেরা বিনোদন, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে করতে চলেছেন। বললাম তাড়াতাড়ি ঘুমোও, না, আমার ঘুম পাচ্ছে না। অ্যাডিকোয়েট ঘুম হলে এত পা ব্যথা হত না।

আশিস বলল, তোমাদের সাইডের লোক খুব আসে এখানে। ও-ও গিয়েছিল আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রশীলা পর্যন্ত। আমরা তো জানিই আমাদের ফিটনেস জিরো, যেখানে সেখানে বসে পড়ে জিভ বার করে হাঁপাতে মোটেই লজ্জা পাচ্ছি না। আশিস বেচারা যতবার দাঁড়াচ্ছে মাথা নেড়ে বলছে, আমার স্বাস্থ্য আগে কত ভালো ছিল, দশ দশ কিলোমিটার তো আমরা হেঁটে স্কুলে যেতাম, হে ভগবান আমার হাঁটার স্পিড দেখে লোকে আমাকে না টুরিস্ট ভেবে বসে, এই যে গত ছ’সাত বছরে হরিদ্বারে গিয়ে স্টিয়ারিং-এর সামনে বসেছি, আমার ফিটনেস শেষ হয়ে গেছে। আমরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম, কাজ দিল বলে মনে হল না। 


নিজেদের অবাক করে আমরা ঘণ্টা আড়াইয়ের মধ্যে তুঙ্গনাথ পৌঁছে গেলাম। কেদারবদ্রী নিয়ে আরও যে সব পঞ্চকেদার আছে, তুঙ্গনাথ তাদের মধ্যে একটা। মন্দির তখনও বন্ধ। খুলবে দিনদুয়েকের মধ্যেই। আমরা ক্ষিরসুর দিকে নামছিলাম আর কোটি কোটি বাস, মিনিবাস, এস ইউ ভি ওপরদিকে চলেছিল কেদারদর্শনে। জোর বাঁচা বেঁচেছি। 


তুঙ্গনাথ থেকে চন্দ্রশীলা শৃঙ্গটা ঝামেলার। মোটে দেড় কিলোমিটার দূর কিন্তু রাস্তা বলে কিছু নেই। পাথর আর মাঠ। জার্মানদের নাকের মতো উঠে গেছে। আমার তো হারার আগেই হেরে বসে থাকা স্বভাব, মনে হচ্ছিল না শেষরক্ষা হবে। যেখানে কষ্ট হবে পাহাড়ের মুখে লাথি মেরে সেখান থেকে নেমে চলে যাব, অর্চিষ্মানের ক্রমাগত আশ্বাস ভর করে অবশেষে চড়লাম চন্দ্রশীলা।


অর্ধেক পথ এসেই গেছি, আর অর্ধেক গেলেই এভারেস্টের চুড়ো।

এবং যথারীতি, মেঘে চতুর্দিক আচ্ছন্ন। এত শুনেছি থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি ভিউর মহিমা, সে সব কিছুই দেখা গেল না। অপার কুয়াশার ভেতর দ্রিঘাংচুর দল কঃ কঃ করে মাথার ওপর পাক খেতে লাগল। 

নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম যে ভিউ দেখতে কেউ পাহাড়ে চড়ে না। পাহাড় আছে, তার ওপর চড়ে আমার কেরামতি দেখাব, সেটাই পাহাড় চড়ার এক এবং একমাত্র কারণ। চুড়োয় মারাত্মক শীত। এত শীত যে দু হাতের আঙুল মনে হচ্ছিল খুলে পড়ে যাবে। এখানে আর বেশিক্ষণ থেকে কাজ নেই, একমত হলাম সবাই।

ওঠার সময়েই খবর পেয়েছিলাম, সেদিনই চন্দ্রশীলা থেকে নামার সময় নাকি একজন অতি এক্সপার্ট ট্রেকারের পা পিছলে ভেঙে গেছে। আমরা আনাড়ি, খুব সাবধানে নামতে শুরু করলাম। তুঙ্গনাথের আশেপাশে বেশ কয়েকটা ঝুপড়ি দোকান আছে, পরোটাটরোটা চা-টা পাওয়া যায়। ওঠার সময় অনেককেই খেতে দেখেছি, কিন্তু থামিনি পাছে এই সব ডিস্ট্র্যাকশনে সঙ্কল্প নড়বড়ে হয়ে যায়। নিজেদের কথা দিয়েছিলাম চন্দ্রশীলায় পৌঁছোতে পারলে নেমে এসে উদযাপন করব। 


খেতে খেতেই শুনি গুড়গুড় শব্দ। দেখতে দেখতে কালো হয়ে চারদিক ঢেকে গেল, যাকে ভেবেছিলাম কুয়াশা সেটা আসলে মেঘ, পিঠের ওপর ঠাঁই ঠাঁই করে বাড়ি মারছে, বাপরে এ কী রকম বৃষ্টি?

চারদিক থেকে ওলা ওলা রব উঠল। ওদেশে শিলাকে বলে ওলা। ছোট ছোট কড়াইশুঁটির সাইজের শিলা, পটাপট পড়তে লাগল আকাশ থেকে। শিলাবৃষ্টি কখন থামবে প্রেডিক্ট করা শক্ত, তাছাড়া আমাদের তরও সইছিল না। ম্যাগি আর চায়ের টাকা মিটিয়ে, কোটের হুডি মাথায় তুলে হাঁটা শুরু করলাম। 

আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় দেখেছি, নামা সবসময়েই ওঠার থেকে বেশি কঠিন। ত্রিউন্ড থেকে নামার সময় ভীষণ কষ্ট হয়েছিল, ভেবেছিলাম জুতোর দোষে হয়েছে। এবার যাতে তা না হয় সে জন্য ডেকাথলন থেকে নতুন জুতো কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। কাজেই এবারের কষ্টটার দায় জুতোর ঘাড়ে দেওয়া যাবে না। ওঠার সময় কিছুই কষ্ট হয়নি, নামার সময় প্রতিটি পা ফেলার সময় বুড়ো আঙুলদুটো জুতোর সঙ্গে ঘষা খেতে লাগল আর মনে হল একেকটা করে ফোঁড় খুলে নখটাকে আমার পা থেকে কেউ আলাদা করে আনছে। 

চন্দ্রশীলাতে উঠতে পারব কি না ঘোর সন্দেহ ছিল আমার মনে, কিন্তু নেমে এসে সত্যি অবাক হয়েছিলাম। ওই নরকযন্ত্রণা কখনও ফুরোবে আমি আশা করিনি। 

আমাদের কোট ভিজে চুবড়ি। গাড়িতে উঠে বসলাম। চারটে বাজে, কিন্তু চারদিক অন্ধকার। জঙ্গলের সবুজ ভিজে আরও গাঢ় হয়েছে, রাস্তার পিচ আরও কালো। আমার জুতোর ভেতর দুই বুড়ো আঙুলের ডগায় দুটো হৃদপিণ্ড, দপদপ করছে। হোটেলে পৌঁছে জুতোটা খুলতে গিয়ে প্রায় চামড়া টেনে খোলার অনুভূতি হল। বুড়ো আঙুল আষাঢ়ের আকাশের রং ধারণ করেছে। লেপের ওয়াড়ের ছোঁয়া লাগলেও মনে হচ্ছে ওইখান দিয়ে প্রাণটা বেরিয়ে যাবে। দরজায় টোকা পড়ল। প্রকাশজি পকোড়া পাঠিয়ে দিয়েছেন, সঙ্গে সোলার ল্যাম্প। ক্লান্তির চোটে আমরা সঙ্গে করে আনতে ভুলেছি। সোলার ল্যাম্প জ্বালিয়ে ধোঁয়া ওঠা পকোড়ার ওপর মনোনিবেশ করলাম, আঙুলের যন্ত্রণা যদি খানিকক্ষণের জন্যও ভুলে থাকা যায়।  




                                                                                                                               (চলবে)



চোপতা, তুঙ্গনাথ, চন্দ্রশীলা, ক্ষিরসুঃ শুরুর আগে
চোপতা, তুঙ্গনাথ, চন্দ্রশীলা, ক্ষিরসুঃ ১
চোপতা, তুঙ্গনাথ, চন্দ্রশীলা, ক্ষিরসুঃ ২
চোপতা, তুঙ্গনাথ, চন্দ্রশীলা, ক্ষিরসুঃ ৩ (শেষ)



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.