December 10, 2016

সাপ্তাহিকী







Children have never been very good at listening to their elders, but they have never failed to imitate them.
                                                   ---James Baldwin, Nobody Knows My Name


এই মেরেছে। আমি তো নিজেকে বেশ এমপ্যাথেটিক বলেই মনে করতাম। এরা বলছে ইমপালসের সঙ্গে নাকি এমপ্যাথি যায় না।

বিশ্বমানচিত্রের ভুল নিয়ে কিছুদিন আগে সাপ্তাহিকীতে একটা লিংক দিয়েছিলাম। এই ভিডিওটাতে আরেকটু প্রাঞ্জল করে বলা আছে বলে আবার দিচ্ছি।

জ্ঞানসংগ্রহ নয়, তথ্যআবিষ্কার নয়, বাস্তব থেকে পালানোর জন্য নয়, জীবনে ড্রামার খাঁই মেটানোর জন্য নয়। আমি ওই বারো পার্সেন্টের মধ্যে পড়ি, যারা বই পড়ে আরাম করা আর একলা থাকার জন্য। সারা বিশ্ব কীভাবে বই পড়ে জানতে হলে ক্লিক করুন। (ইন্ডিয়া নিয়ে চাঞ্চল্যকর একটা তথ্য জানতে হলেও।) 

ডাইনোসরের লেজসংক্রান্ত ‘রোম’হর্ষক খবর!

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এ বছরের সেরা পঞ্চাশটি ছবি। 

December 08, 2016

একটি নিখুঁত খুন



মূল গল্পঃ Blackfriars Bridge
লেখকঃ Anthony Horowitz


বিবেকানন্দ? ওহহ্‌ বালি ব্রিজ। বালি ব্রিজের ঘটনাটা শুনতে চান? না না, আপত্তি কীসের। সেই রাতের আগে শুনতে চাইলে আপত্তি থাকত, ফর অবভিয়াস রিজন্‌স, কারণ তখন ওটা ছিল একটা টপ সিক্রেট প্ল্যান, কিন্তু এখন তো আর সে রকম কিছু নেই। এখন বললেও যা, না বললেও তাই। বরং বলাই ভালো। 

ডিসেম্বর মাসের রাতে বালি ব্রিজের ওপর আমি যাকে খুন করেছিলাম তার নাম ছিল অগোছালো নীল, ব্র্যাকেটে বাপি। ওর মধ্যে একমাত্র বাপিটুকু পিতৃমাতৃদত্ত। স্কুলের নাম ছিল নীলকণ্ঠ, কবিতা লিখতে শুরু করার পর কণ্ঠ খসল, ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলার পর অগোছালো জুড়ল। মুশকিল হল বিখ্যাত হওয়ার পর। ম্যাগাজিন থেকে লোক এসে “অগোছালো নীলবাবুর বাড়ি কোথায়” জিজ্ঞাসা করলে কেউ বলতে পারত না। কাজেই বাপিটা ব্র্যাকেটে রাখতে হল। 

অগোছালো বাপিকে আমি কেন খুন করলাম? নাঃ, রোমহর্ষক কোনও কারণ আশা করলে পস্তাবেন। মানুষের খুনখারাপির ইতিহাসে যে দুটো মূল কারণ, সম্পত্তি আর সেক্স, তার একটার জন্য। অগোছালো বাপি আমার বউ সুনন্দার সঙ্গে সেক্স করছিল। তখন খুব রাগ হয়েছিল, এখন বুঝি, সুনন্দার দোষ ছিল না। আনন্দবাজারের বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল সুনন্দা সুন্দরী, সঙ্গীতজ্ঞা এবং স্নাতক, কবিতা পড়তে যে ভালোবাসে লেখা ছিল না। লিখবে কী, বাড়ির লোকেরা জানতই না। আমিও জানতাম না। জানলাম অগোছালো বাপির সঙ্গে সুনন্দার সম্পর্কটা আবিষ্কার করার পর। আবিষ্কার করলাম যদিও সুনন্দার বাড়ির লোকেরা আনন্দবাজারের বিজ্ঞাপনে বোল্ড লেটারে লিখে দিয়েছিলেন “ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া যোগাযোগ নিষ্প্রয়োজন” কিন্তু সুনন্দার আসলে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার কোনওটাই পছন্দ নয়। সুনন্দা পছন্দ করে কবিদের। কাজেই আমি যখন চেম্বারে পেশেন্টের পোকা ধরা দাঁত তুলতাম, তখন সুনন্দা ফাঁকা বাড়িতে অগোছালো বাপির সঙ্গে প্রেম করত।   

কী করে আবিষ্কার করলাম? নাঃ, এবারেও আপনাকে হতাশ হতে হবে। কোনও ভাগ্যের ফের নয়, সমাপতন নয়, দৈবদুর্বিপাকে নয়। যতখানি বোরিং ভাবে সম্ভব। এস এম এস থেকে। আগাথা ক্রিস্টি লিখে গিয়েছিলেন, মেয়েরা প্রেমিকের চিঠি ফেলতে পারে না। এখন চিঠি গিয়ে হয়েছে এস এম এস, এবং মেয়েরা প্রেমিকের এস এম এস-ও ডিলিট করতে পারে না। ক্রিস্টিকে এই জন্যই কালজয়ী বলে লোকে। সুনন্দাকে আমি সাধারণ মেয়েদের মধ্যে গণ্য করিনি কখনও। ওর চেহারা, ব্যক্তিত্ব, দরাদরি করার ক্ষমতা, সিরিয়ালের হিরোদের প্রতি সহমর্মিতা, কোনও কিছুই সাধারণ ছিল না, কিন্তু এই একটি ব্যাপারে সুনন্দা নিজেকে সাধারণ প্রমাণ করেছিল। অগোছালো বাপির রোম্যান্টিক এস এম এস-গুলো সব ফোনে জমিয়ে রেখে।

প্রথম থেকেই আমি জানতাম বাপিকে আমি খুন করব। সেই একই নিখুঁত প্রিসিশনে খুন করব যে প্রিসিশনে আমি অতি অবাধ্য, কন্সট্যান্টলি নড়তে থাকা পেশেন্টের থার্ড মোলারের গোড়ায় অ্যানাস্থেটিক পুশ করি। খুনটা হবে দ্রুত, পরিচ্ছন্ন এবং নির্ভুল। খুনের প্রতিটি অ্যাংগল, আগের ও পরের প্রতিটি পরিস্থিতি, কার্যকারণ, ঘটনা পরম্পরার প্রতিটি পারমুটেশন কম্বিনেশনের জন্য আমি তৈরি থাকব। শার্টের ছেঁড়া বোতাম, জুতোর পাটি, ফরেনসিক প্রমাণ ইত্যাদি আরও যা যা প্রমাণ পুলিশের চোখের সামনে সাজিয়ে রেখে যায় গোয়েন্দাগল্পের খুনিরা, বলতে গেলে প্রায় যেচেই হাতকড়ায় হাত গলিয়ে দেয়, ও সমস্ত কেয়ারলেস মিস্টেক থাকবে না আমার খুনে।

পুরো প্ল্যানটা ছকতে আমার লাগল মাসদুয়েক। বাপির এস এম এস আমি পড়লাম কালীপূজোর রাতে, খুনের দিন ধার্য করলাম বড়দিনের কাছাকাছি।

আমি আজীবন মেথডিক্যাল। এই প্রোজেক্টটার জন্য আমি একটা ফোল্ডার বানালাম। অফ কোর্স, আমার মগজের ভেতর। ফোল্ডারটার নাম দিলাম ‘দ্য মিষ্টিরিয়াস মার্ডার অফ আ মডার্ন পোয়েট’। পরের মাসকয়েক ধরে রোজ অল্প অল্প করে প্ল্যান ভাঁজতে লাগলাম, টুকটাক যখনই যা মনে আসত ফোল্ডারে গুঁজে রাখতাম। সম্ভাব্য খুনের সময়ের ওয়েদার, ট্র্যাফিক সিচুয়েশন, বাপির দৈনিক রুটিন, আমার দৈনিক রুটিন। সম্ভাব্য গোলযোগও বাদ দিতাম না। অনেক ঘষামাজার পর প্ল্যানটা এরকম দাঁড়াল। 

রোজ রাতে দক্ষিণেশ্বরের কোনও একটা বাড়িতে টিউশন সেরে ব্রিজের ওপর দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরত বাপি। ন’টায় টিউশন বাড়ি থেকে বেরোত, ন’টা দশে ব্রিজে চড়ত, ন’টা বত্রিশ থেকে বিয়াল্লিশের মধ্যে যে কোনও একটা সময় ব্রিজ থেকে নামত। রোজ ব্রিজ পেরোতে এক সময় না লাগার কারণ হচ্ছে মাঝে মাঝে বাপির ফোনে ফোন আসত। তখন ও থেমে রেলিং-এ ভর দিয়ে খুব হেসে হেসে কথা বলত। কে জানে হয়তো সুনন্দার সঙ্গেই। 

বাপি ব্রিজের ওপর থাকার ওই বাইশ কিংবা বত্রিশ মিনিটে আমি কাজ সারব। আমার পরনে থাকবে জিনসের প্যান্ট আর হুডি, আজকালকার ছেলেরা যা পরে। বাপি ব্রিজের ওদিক দিয়ে আসবে, আমি এদিক দিয়ে হাঁটব, সুবিধেজনক ডিসট্যান্সে এসে জিনসের পকেট থেকে ছুরি বার করে (যেটা আমি অলরেডি তারকেশ্বরের শালার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে ওখানকার লোক্যাল বাজার থেকে কিনে রেখেছিলাম, যাতে আমার রান্নাঘরের ছুরিতে ফরেনসিক এভিডেন্স না থাকে) অগোছালো বাপির পেট ফাঁসাব, তারপর রেলিং টপকে বডি গঙ্গায় ফেলে দিয়ে বাড়ি চলে আসব।  

প্ল্যান কাঁচা মনে হচ্ছে? অনেক ফুটো? জানতাম। আচ্ছা শুনি কোন কোন জায়গায় ফুটো দেখতে পাচ্ছেন? 

লোকে দেখবে? আপনি কলকাতার লোক মনে হচ্ছে? হুম্‌ম্‌। শুনুন মশাই, ডিসট্রিক্ট আলাদা হয়ে গেলে জলবায়ু বদলে যায়, মানুষের স্বভাবচরিত্র, পোশাকআশাক, ভাষা, সাইকোলজি সব বদলে যায়। ও সময় আমাদের ওদিকে আপনাদের থেকে অন্তত পাঁচ ডিগ্রি টেম্পারেচার কম থাকে। ডিসেম্বর মাসের রাত সাড়ে ন’টায় খুন হতে দেখবে বলে কেউ বালি ব্রিজে গঙ্গার হাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকে না। 

তবে আমি আপনার কথা একেবারে উড়িয়েও দিচ্ছি না। বালি ব্রিজ দিয়ে ট্রেন যায়, আজকাল গাড়ির সংখ্যাও বেড়েছে। তাছাড়া, আরেকরকম সাক্ষীও আছে, যেটার কথা আপনি গোয়েন্দা গল্পের ঘাগু পাঠক হয়েও মিস করে গেছেন। তবে আমি আপনাকে দোষ দিচ্ছি না, সবটা বই পড়া বিদ্যেতে হয় না, খানিকটা অরগ্যানিকালি আসতে লাগে।

গাড়ি যদি নাও চলত, ট্রেন যদি নাও আসত, তবু আমাদের বালি ব্রিজে, আপনাদের বিবেকানন্দ সেতুতে একধরণের সাক্ষী থাকত। তারা হচ্ছে প্রেমিকপ্রেমিকা। আমি আমার হোল লাইফ ওই ব্রিজ দিয়ে যাতায়াত করেছি, দিনে রাতে বিভিন্ন সময়ে, একটিবারও বালি ব্রিজ প্রেমহীন দেখিনি। তারা আমাকে দেখত। ইন ফ্যাক্ট, আমি চেয়েছিলাম তারা আমাকে দেখুক। 

কেন? বুঝতে পারছেন না? এই তো। বিদেশী গোয়েন্দা গল্প পড়ে পড়ে আপনাদের বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে গেছে। তারা কী দেখত? দেখত হুডি পরা একটা ছোকরা আরেকটা ছোকরার পেটে ছুরি বসাচ্ছে। বালি ব্রিজে ঘটনার আগের ছ’মাসে অন্তত তেরোটা পকেটমারি হয়েছিল। সবাই জানত কারা করেছে। লেবুর ছেলেরা। কেউ কিচ্ছু বলেনি, বলার ক্ষমতাই নেই। খুন হতে দেখলে হয়তো বলত, কিন্তু বলত গিয়ে ওই লেবুকেই, পাড়ার রেসপেক্টেবল দাঁতের ডাক্তারবাবুকে না।

বাপির বডি ফেলে দিয়ে সরু সিঁড়ি দিয়ে ব্রিজ থেকে আমি নদীর পাড়ে নেমে আসব। কী বলছেন? ওই রাস্তায় দু’ফুট অন্তর অন্তর ত্রিফলা? ত্রিফলার আলোর রেঞ্জ দেখেছেন আপনি? তার পরেও এ কথা বলছেন? ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকলে অ্যাট লিস্ট হুলোগুলো দেখতে পেত, ত্রিফলার ধোঁয়ায় ওদেরও আইসাইট ঘুলিয়ে গেছে। পাঁচ মিনিট হাঁটলে আমার বাড়ির বাগান। নিচু পাঁচিল টপকে বাগানে ঢুকে আসব, বাবা ছেলেমেয়েকে খাঁটি গরুর দুধ খাওয়াবেন বলে গোয়াল বানিয়েছিলেন, সেখানে ঢুকে হুডি জিনস পোড়াব, সঙ্গে সঙ্গে যত ফরেনসিক এভিডেন্সে টা টা বাই বাই।  

কপাল যদি ভালো হয় তাহলে অগোছালো বাপি ভেসে ভেসে ডায়মন্ড হারবার দিয়ে সোজা বঙ্গোপসাগর চলে যাবে, তখন আর গল্পটা মিস্টিরিয়াস মার্ডার থাকবে না, হয়ে যাবে 'দ্য কিউরিয়াস কেস অফ ডিস্যাপিয়ারেন্স অফ আ মডার্ন পোয়েট'।

আমার বউ টের পাবে কি না? যাক। আমি আপনাকে এসব ব্যাপারে যত নভিস ভাবছিলাম আপনি ততটাও নন। অ্যাকচুয়ালি প্ল্যানের এই পার্টটা নিয়ে আমি একটু গর্বিত। কারণ এই পার্টটা যাকে বলে স্ট্রোক অফ জিনিয়াস। 

সুনন্দা রোজ সন্ধ্যে সাতটা থেকে দশটা সিরিয়াল দেখে। ডিনারটিনার সব টিভির সামনে। দশটায় টিভি বন্ধ করে শোবার ঘরে ঢুকে ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ে। আমি ততক্ষণ আমার লাইব্রেরিতে বসে আমার বিশ্ব গোয়েন্দাসাহিত্যের কালেকশন নাড়িচাড়ি। এইসব বাপিটাপির ঝামেলা যখন ছিল না তখন শোওয়ার আগে একবার দরজা ঠেলে উঁকি দিয়ে যেত, এখন সে সব পাট চুকেছে। যাই হোক, টিভিতে যখন পুণ্যিপুকুর বা মনসামঙ্গল বা ওইরকম কিছু একটা চলবে, আমি শোবার ঘরের জলের জগে একটুখানি অ্যানাস্থেটিক ফেলে দেব। খাটে গা ঠেকানোর একমিনিটের মধ্যে মাঝরাতের ঘুম। আমি কাজ সেরে বাড়ি ফিরে, হুডির সৎকার সেরে গিয়ে টুক করে পাশে শুয়ে পড়ব। সুনন্দা এমন ঘুমে অচৈতন্য থাকবে যে আমার নড়াচড়া টের পাওয়া তো দূর অস্ত, অগোছালো বাপির সুখস্বপ্নও দেখতে পাবে না। ঘুম ভাঙবে একেবারে সেই কাজের মাসি এসে দরজা ধাক্কানোর পর। উঠে দেখবে আমি পাশে শুয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছি। তখন রোজকার মতো ঠেলা দিয়ে বলবে, “খালি খাওয়া আর ঘুম, বাজার কে করবে? রোজ রোজ এই এক, আমার আর ভাল্লাগে না। কী গো উঠবে তো?”

মাস্টারস্ট্রোক কি না?

আপনি যে আমার প্ল্যনটাকে কাঁচা বললেন, ওই কাঁচাত্বটাই, ইন আদার ওয়ার্ডস, সিমপ্লিসিটিটাই আমার প্ল্যানের জিনিয়াস ছিল। হ্যাঁ, ক্রিস্টিসুলভ প্যাঁচ কিংবা শার্লকসুলভ ম্যাজিক ছিল না। কিন্তু আফটার অল, এটা রিয়েল লাইফ। গল্পের প্লট নয়। তাছাড়া, প্ল্যানটার এই যে ঘোর সোজাসাপটা চলন, এটা আমার মতে, আপনার মত আমার সঙ্গে মিলতেই হবে তার মানে নেই, আর্টের চূড়ান্ত পরিচয়। সে দিক থেকে দেখলে অগোছালো বাপির মার্ডার শুধু পারফেক্ট ছিল না, ইট ওয়াজ অলসো আর্টিস্টিক। ভাবুন একবার, মার্ডারারের আসল উদ্দেশ্য কী? ধরা না পড়া। লোকের চোখের আড়ালে থাকা। জ্যাক দ্য রিপার, মরিয়ার্টিদের নিয়ে লোকে লাফালাফি করে, আমি তো বলি ওরা মার্ডারার হিসেবে সবথেকে নিকৃষ্ট শ্রেণীর। ঢাক ঢোল পিটিয়ে, লোক জানিয়ে, এ কি মার্ডার হচ্ছে না মোচ্ছব? উল্টোদিকে অগোছালো বাপির মার্ডারের কথা ভাবুন। উন্মার্গগামী যুবসমাজের গালে আরেক পোঁচ চুনকালি, শহর তথা রাজ্যের ল অ্যান্ড অর্ডারের দুরবস্থার স্ট্যাটিস্টিকসে আরেকটা নম্বর, লেবুগুণ্ডার দলের কীর্তির মুকুটে আরেকটা পালক, ব্যস।

এ মার্ডারের শুধু যে সমাধান হবে না তাই নয়, লোকে ভুলেও যাবে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে। 

আমি বলছি আপনাকে। ইট ওয়াজ আ পারফেক্ট মার্ডার। পারফেক্ট অ্যান্ড আর্টিস্টিক।

একটা কথা স্বীকার করতে হবে, মার্ডারের আগের সময়টা আমার দারুণ আনন্দে কেটেছিল। চনমনে বোধ করতাম। ওই অ্যানাস্থেশিয়ার মাস্টারস্ট্রোকটা যেদিন মাথায় এসেছিল সেদিন তো ভাত খেতে খেতে নিজের মনে হেসেই ফেলেছিলাম। সুনন্দা “হাসছ কেন?” বলে খেঁকিয়ে উঠেছিল। “কার কথা মনে পড়ে এত ফুর্তি?” ভাবুন একবার! নিজে পরকীয়া করছে, এদিকে সন্দেহ করছে আমাকে! 

যাই হোক, ঘটনার দিন সন্ধ্যেবেলা চেম্বার থেকে ফিরে আমি লাইব্রেরিতে ঢুকে গেলাম। বন্ধ দরজার ওপার থেকে টিভির উচ্চকণ্ঠে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। আমি রেডি হলাম, পাজামাপাঞ্জাবী ছেড়ে বুককেসের পেছনে লুকিয়ে রাখা প্লাস্টিক থেকে বার করে জিনস আর হুডি পরে নিলাম। ছুরিটা পকেটে পুরলাম। তারপর ন’টা নাগাদ লাইব্রেরির দরজা খুলে বাগানে, বাগান থেকে রাস্তায় নেমে এলাম। এই রাস্তাটা ধরে মিনিট দশেক গেলেই ব্রিজের সিঁড়ি।  

আমি হুডির পকেটে হাত গুঁজে মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকলাম। আমরা বুড়োরা সবসময় আজকের যুগকে খারাপ খারাপ বলি, কিন্তু এ যুগের অনেক ভালো জিনিস আছে যা আমাদের সময় ছিল না। যেমন এই হুডি। কী চমৎকার পোশাক। ঠাণ্ডা এড়াতে চাইলে মাথায় দিয়ে হাঁটুন, মার্ডার করতে চাইলে কপালের ওপর দিয়ে টেনে নামিয়ে দিন। মাল্টিপারপাস। জিনিয়াস। 

হাঁটতে হাঁটতে হুডির একটাই অসুবিধে আমি টের পাচ্ছিলাম। পোশাকটা যাদের ভুঁড়ি নেই তাদের জন্য বানানো। যেমন অগোছালো বাপি। বাবার পয়সায় খেয়েদেয়ে কবিতা লিখে ঘুরে বেড়ায়, অথচ সে খাওয়ার একটুও গায়ে লাগে না, হিলহিলে লম্বা, টিংটিঙে প্যাংলা। আমিও ছিলাম একদিন ও’রকম। আমার বাবা বলতেন, নেমকহারাম চেহারা। এত খাওয়াই তবু গায়ে লাগে না। 

স্যাডলি, আমার চেহারা আর সেরকম নেমকহারাম নেই। বরং দরকারের তুলনায় বেশিই কৃতজ্ঞতাভাজনেষু হয়ে পড়েছে। যা খাই, সব তিনগুণ হয়ে শরীরে লেগে যায়। হুডিটা বাকি সব জায়গায় ফিট করেছিল, ভুঁড়িটা ছাড়া। এদিকে জিনসটা আবার ঢিলে। ঢিলেটাই ফ্যাশন। টাইট হুডি আর ঢিলে জিনসের মধ্যে ইঞ্চিখানেক পেট ফাঁকা রয়ে গিয়েছিল, সেখানে হু হু করে গঙ্গার ঠাণ্ডা হাওয়া এসে লাগছিল। 

সিঁড়ি বেয়ে ব্রিজে উঠে এলাম। আমার আজন্মের চেনা বালি ব্রিজ। 

বেশিরভাগ লোকে দাঁতের পাটিকে যেরকম টেকেন ফর গ্র্যান্টেড নেয়, বালি ব্রিজকেও আমি সারাজীবন সে রকমই নিয়েছিলাম, জানেন। একটা নদীর ওপর একটা গামবাট ব্রিজ। ঝমঝম করে ট্রেন যায়, গুমগুম করে লরি। কিন্তু সেই রাতে হুডি মাথায় ব্রিজের রেলিং-এর ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে যেন আমি সবকিছু নতুন চোখে দেখলাম। আমার ফার্স্ট, হোপফুলি ওনলি, অ্যান্ড পারফেক্ট অ্যান্ড আর্টিস্টিক মার্ডারের পটভূমিকা হিসেবে বালি ব্রিজ যেন আমার কাছে নতুন করে প্রতিভাত হল। কী এলিগ্যান্ট চেহারা, কী রাজসিক আর্চ। আর চারপাশটা তো, আহা। কালো জলে ঝিকমিক করা কুচিকুচি আলো, গাছের আড়াল ছাড়িয়ে উঁচু হয়ে ওঠা দক্ষিণেশ্বরের চুড়ো, ছায়াছায়া বারোমন্দির। 

সে রাতে ব্রিজ যেন অন্য রাতের থেকেও বেশি ফাঁকা ছিল। আশেপাশে প্রেমিকপ্রেমিকাও চোখে পড়ছিল না তেমন। গাড়ি আসছিল একটা দুটো, তাও অনেক বাদে বাদে। ঠাণ্ডাটা আমাদের ওদিককার পক্ষেও একটু বেশিই ছিল। হুডিতে বিশেষ কাজ দিচ্ছিল না, আমি ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছিলাম, দাঁতে দাঁতে লেগে যাচ্ছিল। এমন সময় কী ভাগ্যিস, ব্রিজের অন্যদিক থেকে অগোছালো বাপির চেহারাটা উদ্ভাসিত হল। আমি পকেটের ভেতর ছুরির বাঁট শক্ত করে ধরলাম। 

বাপিকে আমি কখনও পাঞ্জাবী আর ঝোলা ব্যাগ ছাড়া দেখিনি, কিন্তু সেদিন ও-ও হুডি পরে ছিল। প্রথমে একটু অবাকই হয়েছিলাম কিন্তু তারপর মনে পড়ল বাপি এখন কবিসম্মেলন থেকে ফিরছে না, ফিরছে টিউশনি বাড়ি থেকে। আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, বাপির একটা হাত আমার মতোই হুডির পকেটে ঢোকানো, অন্য হাতটা একদিকের চোয়াল চেপে আছে। এ ভঙ্গি আমার চেনা। আমার চেম্বারে ঢোকার সময় অধিকাংশ লোকেই এই ভঙ্গিতে ঢোকে। 

বাপি দাঁতের ব্যথায় ভুগছে।

একমুহূর্তের জন্য আমি সব প্রতিহিংসাটিংসা ভুলে গেলাম জানেন, মনে হল বাপিকে বলি, কাল সকালে চেম্বারে এস, দেখে দেব। তারপরই চেতনা ফিরল। দাঁতের ব্যথা তো দূর অস্ত, বাপি নিজেই কাল সকাল পর্যন্ত থাকবে না। 

অগোছালো বাপি লম্বা লম্বা পা ফেলে নিজের মৃত্যুর দিকে এগিয়ে এল। আমি ঝটিতি প্যান্টের পকেট থেকে ছুরি বার করলাম, নতুন ছুরির ফলা ঝকঝক করে উঠল, আমি চাপা গলায় যতখানি সম্ভব চেঁচিয়ে উঠলাম, “আমার বউয়ের সঙ্গে প্রেম করার শাস্তি এই নে, অগোছালো বাপি…” 

“আমি অগোছালো নো-ও-ও-ই…” আর্তনাদটা শেষ হওয়ার আগেই ছুরির ফলা হুডি ফুঁড়ে বাপির পেটে ঢুকে গেল। আবেগ দরকারের থেকে বেশি হয়ে গিয়েছিল বোধহয়, ছুরিটা হাতল থেকে মুচড়ে আলগা হয়ে গেল। ফলাটা ঢুকে রইল শরীরের মধ্যে, হাতলটা রয়ে গেল আমার হাতে। চকচকে হলে কী হবে, কোয়ালিটি ভালো নয়। তারকেশ্বরের বদলে কাঞ্চননগর থেকে কিনলে বেটার হত। আমি ছুরিটা আমার সঙ্গে বাড়ি নিয়ে যাব ভেবেছিলাম, কারণ আমি চাই না বডিটার সঙ্গে ছুরিটাও আবিষ্কৃত হোক। প্ল্যানিংএর এই গ্লিচ কীভাবে সামলাব দ্রুত ভাবছি এমন সময় পরপর কতগুলো জিনিস আমার নজরে পড়ল। 

এক, এ অগোছালো বাপি নয়। হাইট এবং বিল্ড অগোছালো বাপির মতো, কিন্তু বাপি না। ছুরির আঘাতে লোকটার মাথা থেকে হুডি খসে পড়েছিল, ব্রিজের হলুদ ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমি দেখলাম বাপির সঙ্গে লোকটার কোনও মিলই নেই। বাপির ঝাঁকড়া চুল, এর সামনে প্রায় টাক, বাপির মুখে দাড়ির জঙ্গল, এ লোকটা মাকুন্দ।

সর্বনাশ? উঁহু, সর্বনাশ কীসের? আফটার অল, কী ঘটেছে? আমি বাপির বদলে সম্পূর্ণ অচেনা একজনকে খুনের অ্যাটেম্পট নিয়েছি, বা খুনই করেছি বলা ভালো (কিডনি তাক করে মেরেছি) কিন্তু সে ছাড়া আমাকে কেউ দেখেনি। আমি এই লোকটার সম্পূর্ণ অচেনা। লোক্যাল থানার ঘুষখোর অপদার্থগুলোর কথা ছেড়েই দিন, পৃথিবীর অতি বড় গোয়েন্দার পক্ষেও আমার পক্ষে একে খুন করার কোনও মোটিভ বার করা সম্ভব নয়। 

রাইট?

রং। 

কেন রং জানতে গেলে আমার পরের অবজার্ভেশনগুলো আপনার শুনতে হবে। ওই শীতের রাতে বালি ব্রিজের ওপর সম্পূর্ণ অচেনা একজন লোকের পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেওয়ার পর আমি রিয়েলাইজ করলাম লোকটার দাঁতে ব্যথা হয়নি। লোকটা নিজের চোয়াল চেপে হাঁটছিল না, লোকটা কানে একটা মোবাইল ফোন ধরে রেখেছিল। কারও সঙ্গে কথা বলছিল লোকটা।

ইন ফ্যাক্ট, তখনও বলছে। 

“লেবুদাআআআ! আমাকে মাডার করছে, মাডার! বালি ব্রিজের ওপর। চিনি না, নির্ঘাত কাত্তিকের লোক! মালটার চোখে চশমা, বাঁকা নাক, ফোলা গাল, ফস্‌সা রং, চিবুক নেই, মালটা বুড়ো কিন্তু হুডি পরে এস্‌সেচে…  লেবুদাআআ, পুলিস ডাকো, পুল্‌লিস্‌স্…মাগো… হেববি ব্লিডিং হচ্চে গো, ওরে ব- স-ন্‌-তি রে এ এ এ এ এ” বলে কে জানে কোন প্রেমিকা না স্ত্রীর নাম ধরে হাহাকার করতে করতে লোকটার গলা বুজে এল, হাত থেকে ফোনটা খসে পড়ল, লোকটা হাঁটু মুড়ে ব্রিজের ওপর বসে পড়ল, লোকটার হুড খোলা মাথাটা ঠকাস করে বালি ব্রিজের ফুটপাথে ঠুকে গেল। 

এসব লাইনের লোকদের বোধহয় ট্রেনিং থাকে, আমার মুখটাকে যে এরকম কয়েকটা কিওয়ার্ডস-এ বেঁধে ফেলা যায় সেটা আমি আগে কখনও ভাবিনি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজের মুখ দেখেছি রোজই, চোখে বুদ্ধির ঝিলিক, সঙ্গে সেবার একটা ভাবও চোখে পড়েছে। জীবনে প্রথমবার, ওই মুহূর্তে আমি বুঝলাম সেবটেবা, বুদ্ধিটুদ্ধির থেকেও লোকটার মৃত্যুকালীন বর্ণনাটা আমাকে ফিট করে অনেক বেশি। রোজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, নিজের দেহের ভেতর নিজের সঙ্গে সারাজীবন বাস করে আমি নিজেকে যেটুকু চিনেছিলাম, একটা লোক ছুরি খেয়ে মরতে মরতে ওই টিমটিমে আলোয় আমাকে তার থেকে বেশি চিনে এবং চিনিয়ে গেল। 

ভাবতে পারেন?

ওয়েল, এসব কথা আমিও তখন ভাবতে পারিনি, কারণ লোকটা মাটিতে পড়ে যাওয়ায় আমার ভিশনটা ক্লিয়ার হয়ে গেল আর আমি টের পেলাম যে কেউ আমাকে দেখেনি কথাটা ঠিক নয়। আমি, অগোছালো বাপির প্রক্সি, ফোনের ওপারে লেবুগুণ্ডা - এই তিনজন ছাড়াও আরেকজন ঘটনাস্থলে আছে। লেবু তো শুধু বর্ণনা শুনেছে, কিন্তু এ একেবারে প্রত্যক্ষদর্শী।

একটা নেড়ি। বাদামি রঙের, আধপেটা খাওয়া, শীর্ণ একটা নেড়ি। লোকটার পেছন পেছন আসছিল। এখন বিস্ফারিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নেড়িটার চোখে চোখ পড়া মাত্র আরও একটা জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। স্ত্রী না প্রেমিকা না বোন না বন্ধু না, এই নেড়ির নামই বাসন্তী। আর যেই না এই সত্যিটা রিয়েলাইজ করলাম, এক প্রবল গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বাসন্তী প্রায় উড়ে এসে আমার পায়ে দাঁত বসিয়ে দিল।  

এই দেখুন, এখনও সে দাগ আছে। ওরে বাবাই বটে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটেছিল। জাস্ট ভাবুন একবার, আমি ভেবেছিলাম কোনও ফরেনসিকের বাবা আমাকে ধরতে পারবে না, আর এদিকে বাসন্তীর কল্যাণে বালি ব্রিজের ফুটপাথে ফোয়ারার মতো আমার বি পজিটিভ রক্ত ছিটকোচ্ছে। ব্যথা লাগেনি আবার? কিন্তু তখন ব্যথা ওয়াজ লিস্ট অফ মাই কনসার্নস। আমি দুই হাতে বাসন্তীকে পা থেকে কোনওমতে টেনে ছাড়িয়ে ফুটপাথে ছুঁড়ে ফেললাম। ওর দাঁতে আমার জিনসের একটা টুকরো ফড়ফড় করে ছিঁড়ে এল। ফুটপাথে আছাড় খাওয়ার পরমুহূর্তে আবার ছুটে এসে বাসন্তী আমার পায়ে লটকে গেল।

আমার সমস্ত ফোকাস তখন বডিটাকে নদীর জলে ফেলে দেওয়ায়। বাসন্তী চিৎকার করে গোটা ব্রিজ মাথায় তুলেছে, এক্ষুনি কেউ এল বলে, কিংবা গাড়ি থামিয়ে নামল বলে। আমি কোনওমতে লোকটাকে হিঁচড়ে টেনে তুললাম। সেটাকে নিয়ে রেলিং-এর গায়ে ভর দিয়ে রেখে রামধাক্কা দিতে রেডি হচ্ছি এমন সময় ঝমঝম করে ট্রেন এসে গেল। 

আমার পারফেক্ট প্ল্যানে ট্রেন আসার সম্ভাবনাটা ছিল। কিন্তু এতক্ষণের ঘটনার ঘনঘটায় সম্ভাবনাটা আমার মাথা থেকে বেরিয়েও গিয়েছিল। আওয়াজে চমকে উঠে আমি পেছন ফিরে তাকালাম। হলদে আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিল। ততক্ষণে ডেডবডি আর বাসন্তীর সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে আমার হুডি মাথা থেকে খসে গেছে। আই ওয়াজ ইন ফুল ভিউ। স্পষ্ট দেখলাম প্রতিটি কামরার জানালা দরজা থেকে সারি সারি মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অত রাতে অত ভিড় ট্রেন আগে আমি দেখিনি কখনও।

তখনও, তখনও বাঁচার চেষ্টা করা যেত, যদি আমি বডিটা হাওয়া করে দিতে পারতাম। পারলামও। সর্বশক্তি দিয়ে বডিটাকে রেলিং-এর ওপারে ঠেলে দিলাম। 

ধপ করে একটা শব্দ হল। 

ইয়েস, ধপ করে। ঝপ করে না। 

সঙ্গে সঙ্গে একটা চিৎকার। “উরিত্তারা! এ মালটা কী রে?”

আমি রেলিং-এর ওপর দিয়ে উঁকি মারলাম।

জলপুলিশের লঞ্চ। আলোকিত ডেকের ওপর একটা পুলিশ কোমরে হাত দিয়ে মুখ হাঁ করে ওপর দিকে তাকিয়ে আছে, আর তার পায়ের কাছে হাত পা ছত্রাকার করে পড়ে আছে, না অগোছালো বাপি নয়, নাককাটা পচা। 

নামটা জানতে আরও কিছুদিন লেগেছিল, অফ কোর্স। তক্ষুনি যেটা শুনলাম সেটা সাইরেন। আকাশবাতাস এক করা সাইরেন। আমার অরিজিন্যাল প্ল্যানে এর পরের স্টেপ ছিল সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া, কিন্তু সে সিঁড়িটার দশ হাতের মধ্যে সেই মুহূর্তে পুলিশ লঞ্চ সাইরেন বাজিয়ে বনবন করে চতুর্দিকে সার্চলাইট ঘোরাচ্ছে। আমি রেলিং ছেড়ে নেমে ব্রিজের উল্টোদিকে ছুটে গেলাম, বাসন্তী তখনও আমার পা থেকে ঝুলছে এবং আমার পা থেকে গলগলিয়ে রক্ত ঝরছে। আমি দিকবিদিকশূন্য হয়ে সেই সব শুদ্ধু দৌড়লাম। একটা ভারি কিছু (একটা হলদে কালো ট্যাক্সি)  প্রচণ্ড বেগে এসে আমাকে ধাক্কা মারল। 

জ্ঞান ফিরল হাসপাতালের বেডে। নিউমোনিয়া আর রক্তক্ষয়। দুর্বলতা সামান্য কমলে বিচার হল। উল্টোদিকের কাঠগড়ায় একের পর এক এসে দাঁড়াল ট্যাক্সির ড্রাইভার, লেবু। কার্তিকের স্ট্যান্ডিং থ্রেট আছে, তাই পুলিশ লেবুকে প্রোটেকশন দিয়ে নিয়ে এসেছিল। কাঠগড়ায় উঠে সে কী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না লেবুর, “পচা আমার ভাইয়ের মতো ছিল স্যার, একেবারে আপন ভাইয়ের মতো” জাজও কালো আলখাল্লার খুঁট দিয়ে চোখ মুছছিলেন। তবে লেবুর থেকেও স্টার উইটনেস ছিল একজন, সে এল লাস্টে। বাসন্তী। পুলিশের বকলস পরে, সিংহের মতো গটমট করে এল। আমাকে দেখে কী চিৎকার। মোটা মোটা পুলিশরা টেনে রাখতে হিমশিম। শুনেছিলাম বাসন্তী সাহসিকতার জন্য কী সব অ্যাওয়ার্ডট্যাওয়ার্ডও পেয়েছে। আর আজীবন ওসি-র লাঞ্চের মুরগির হাড় পেনশন। 

তারপর থেকে এই জেলেই আছি। তা হল অনেকদিন। আরও অনেকদিন থাকতে হবে। খুন তো একটা না, দুটো। টেনশনে সুনন্দার গ্লাসে অ্যানাস্থেটিকের মাত্রা বেশি দিয়ে দিয়েছিলাম। অ্যাকচুয়ালি, এই একটাই দুঃখ আমার জানেন। আমি সিরিয়াসলি ভেবেছিলাম অগোছালো বাপিকে সরিয়ে দিলে আমার আর সুনন্দার সংসারটা আবার আগের মতো সুখের হয়ে যাবে।

তাহলে? মর‍্যাল অফ দ্য স্টোরি কী দাঁড়াল? মর‍্যাল অফ দ্য স্টোরি দাঁড়াল এই যে গোয়েন্দাগল্পে সব বাজে কথা লেখা থাকে। মার্ডার ইজ নট ইজি। ডেফিনিটলি নট। চারদিক দেখেশুনে, ভেবেচিন্তে, গুনেগেঁথে প্ল্যান করা মার্ডারও না। 

উঠছেন? ওহ। তা হলও অনেকক্ষণ। আমাকেও যেতে হবে। তবে, আপনাকে আমার ভালো লেগেছে জানেন। বহুদিন বাদে কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলে আরাম লাগল। আসবেন আবার, যদি সময় পান। তবে বেশি দেরি করবেন না, বুঝলেন, হেহে। কেন? ওয়েল, আপনি বলেই বলছি, মার্ডারটা পারফেক্ট হয়নি, কিন্তু আমি একটা পারফেক্ট এসকেপ প্ল্যান করছি। এখানে পেশেন্টের ঝামেলা নেই, সুনন্দার খ্যাচখ্যাচ নেই, কাজেই এবারের প্ল্যানটা আগেরটার থেকেও ফুলপ্রুফ হবে, আমি শিওর। ডিটেলসটা এক্ষুনি আপনাকে বলছি না, কয়েকটা জায়গা আরেকটু ঠিক করতে হবে। ঘটনাটা কাগজে বেরোবে নিশ্চয়, তখন পড়ে নেবেন, ওকে? কিছু মাইন্ড করলেন না আশা করি? প্লিজ করবেন না। থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।


December 07, 2016

Morality vs. Self Righteousness



"I followed my own conscience.” “I did what I thought was right.” How many madmen have said it and meant it? How many murderers? Klaus Fuchs said it, and the men who committed the Mountain Meadows Massacre said it, and Alfred Rosenberg said it. And, as we are rotely and rather presumptuously reminded by those who would say it now, Jesus said it. Maybe we have all said it, and maybe we have been wrong." 

 . .  . Of course we would all like to “believe” in something, like to assuage our private guilts in public causes, like to lose our tiresome selves; like, perhaps, to transform the white flag of defeat at home into the brave white banner of battle away from home. And of course it is all right to do that; that is how, immemorially, things have gotten done. But I think it is all right only so long as we do not delude ourselves about what we are doing, and why.

. . . It is all right only so long as we recognize that the end may or may not be expedient, may or may not be a good idea, but in any case has nothing to do with “morality.” Because when we start deceiving ourselves into thinking not that we want something or need something, not that it is a pragmatic necessity for us to have it, but that it is a moral imperative that we have it, then is when we join the fashionable madmen, and then is when the thin whine of hysteria is heard in the land, and then is when we are in bad trouble.

                                                                                                 Joan Didion

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ Brain Pickings


December 06, 2016

বার্ষিক জমাখরচ ১/৪



ঠাণ্ডা ছাড়া ডিসেম্বরের আরেকটা ভালো ব্যাপার হচ্ছে ব্লগের বিষয়ের প্রাচুর্য। কোন কোন রেজলিউশন রাখা হল না, সামনের বছরের জন্য কী কী রেজলিউশন নিলাম, কী নিজের সম্পর্কে কী কী জানলাম, কী বই পড়লাম, টপ ফাইভ বুকস, টপ ফাইভ ফিল্মস, টপ ফাইভ রেস্টোর‍্যান্টস। এত বিষয় যে কবে কোনটা নিয়ে লিখব বোঝা মুশকিল। একবারে সব নিয়ে লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। তাই ঠিক করেছি প্রতি সপ্তাহে একটা করে এই মর্মে পোস্ট লিখব। প্রথম সপ্তাহের কিস্তি এই রইল। 

*****

এক কথায় ২০১৬? 
শান্তিপূর্ণ।

২০১৬র রেজলিউশন রেখেছি কি? 
কিছু রেখেছি, কিছু রাখিনি।

২০১৭র জন্য নতুন রেজলিউশন নেব?
নিশ্চয়।

২০১৬য় এমন কী করেছি যা আগে কখনও করিনি?  
বাড়ির চশমা বাইরের চশমা আলাদা করেছি। 
নিয়মিত রান্না ধরেছি। 
কিছু পছন্দ না হলে (বই, সিনেমা, মানুষের সঙ্গ) সেটা থেকে উঠে চলে এসেছি। এবং বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ টের পাইনি। 

২০১৭য় কী থাকলে খুশি হব যা ২০১৬ এ ছিল না (কম ছিল)? 
আরেকটু ফোকাস। আরেকটু রুটিন। 

সবথেকে বড় সাফল্য?
বই পড়ার অভ্যেস ফিরিয়ে আনা। অবান্তরের বাইরে লেখার জন্য সময় বার করা। 

সবথেকে বড় ব্যর্থতা?
অবান্তরের বাইরের লেখার জন্য যতখানি সময় বার করতে পারা উচিত ছিল ততখানি না পারা।

২০১৬র প্রিয়তম বই?
স্টোনার। এখনও আরও ক'খানা বই পড়া হবে, তবে আমি মোটামুটি নিশ্চিত স্টোনার-এর থেকে ভালো আমার তাদের লাগবে না।

২০১৬র প্রিয়তম গান?
এটার উত্তর নেই। তবে অফিস বেরোনোর আগে রেডি হতে হতে সংগীত বাংলায় যে গানটা এলে মন ভালো হয়ে যাচ্ছে সেটা এইটা।  

আরও বেশি কী করা উচিত ছিল? 
বেড়াতে যাওয়া। অবশ্য উচিত বলব না কারণ ইচ্ছে বা আলসেমি করে যাইনি এমন নয়। যাওয়া সম্ভব ছিল না বলেই যাইনি। এ আক্ষেপ ২০১৭য় মেটাতেই হবে। 

কী আরেকটু কম করলেও চলত? 
গেমস খেলা। 

নিজের সম্পর্কে কী জানলাম? 
ডেডলাইন ছাড়া আমি ডেড। 

অন্যের সম্পর্কে? 
প্যাট্রোনাইজ করাটা আসলে একরকমের ডিফেন্স মেকানিজম। যারা এটা করে তারা আমার রাগ নয়, করুণার পাত্র।  

২০১৫র তুলনায় ২০১৬য় আমি
বেশি খুশি? মনে হয় না।
বেশি রিল্যাক্সড? মনে হয় না।
বেশি বড়লোক? একেবারেই না।
বেশি স্থিরলক্ষ্য? হ্যাঁ

নতুন বন্ধু হল?
না।

পুরোনো শত্রুর হাত থেকে মুক্তি মিলল? 
শত্রু থাকার মতো ইম্পরট্যান্ট লোক আমি নই, তবে অপছন্দের লোকদের সঙ্গে সম্পর্ক/ যোগাযোগ রাখার দায় অনেক কম বোধ করেছি। 

২০১৬র সবথেকে সমীচীন পয়সা খরচ?
কিন্ডল

২০১৬র সবথেকে পয়সা নষ্ট?

এ বছরে আমি সবথেকে বেশি কৃতজ্ঞ? 
বিষয়টা ২০১৬র আগেও সত্যি ছিল। কিন্তু ২০১৬তেই আমি প্রথম বিষয়টা সম্পর্কে সচেতন হলাম। আমার অনেক কিছু নেই, কিন্তু নিজের জন্য, নিজের ভালোলাগা কাজ বা অকাজের পেছনে ঢালার জন্য সময় আছে। সুযোগ আছে। আমার স্থানকালপরিস্থিতিতে থাকা বেশিরভাগ লোকেরই এটা নেই। এবং আমি এ জন্য আকণ্ঠ কৃতজ্ঞ। (তাঁদের না থাকার জন্য নয়, ইন ফ্যাক্ট, আমার আন্তরিক চাওয়া তাঁরা নিজেদের জন্য সময় পান। আমি কৃতজ্ঞ আমার সময় থাকার জন্য।) 

আর অর্চিষ্মানের জন্য তো বটেই। 


December 04, 2016

গেটাফিক্স, গ্রেটার কৈলাশ ১



আমার গেটাফিক্স-এর খাবার ভালো লেগেছে, সজ্জা ভালো লেগেছে, জানালা ভালো লেগেছে, জানালার ব্লাইন্ডের ফাঁক দিয়ে গায়ে এসে পড়া ডোরাকাটা রোদ্দুর ভালো লেগেছে, কর্তৃপক্ষের ব্যবহার ভালো লেগেছে, আমাদের আশেপাশে বসে খাওয়া বাবামাবাচ্চা, প্রেমিকপ্রেমিকা, বন্ধুবান্ধবদের ভালো লেগেছে, ওপেন কিচেনের ফাঁক দিয়ে দেখা যাওয়া শেফ আর সু-শেফদের ধপধপে সাদা জামা আর টুকটুকে লাল টুপি ভালো লেগেছে। আমার গেটাফিক্সের সব কিছু এত এত ভালো লেগেছে যে অদূর ভবিষ্যতে যে ক’দিনের জন্য আমার টেম্পোরারি প্রোষিতভর্তৃকা হওয়ার চান্স আছে, সে ক’দিন সময় পেলে এসে গেটাফিক্সের জানালার ধারের টেবিলটায় বসে কফি আর স্যালাড খেতে খেতে অবান্তর লেখার ইচ্ছে আছে। অবশ্য লেখা কত হবে কে জানে কারণ ওয়াই ফাই ফ্রি। 


আমার উত্তেজিত প্ল্যান শুনে অর্চিষ্মান চোখ ঘোরাল। ও জানে যে আমার ভালো লাগার কোনও মাত্রা নেই। খারাপ লাগারও না। ইন ফ্যাক্ট, গেটাফিক্সের দুর্দান্ত রিভিউ মারকাটারি রেটিং-এর কথা আমি অনেকদিনই জানতাম, কিন্তু কখনও যাওয়ার কথা ভাবিনি। কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম গেটাফিক্স আমার খারাপ লাগবে। ভীষণ খারাপ লাগবে। প্রথম খারাপ লাগবে লোকেশন। জি কে ওয়ান এন ব্লক মার্কেটে আমি যতবার গেছি, বাড়ি ফিরতে প্রাণান্ত হয়েছে। সে ওলা উবারের আগের জমানা। কোনও অটো পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় খারাপ লাগবে খাবার। গেটাফিক্সের ট্যাগলাইনের প্রথম শব্দ হচ্ছে ‘হেলদি’। অর্থাৎ ময়দার বদলে ভুষিওয়ালা আটা দিয়ে বানানো খসখসে বার্গার-বান, চোয়াল ব্যথা করা গ্লুটেন-ফ্রি পাস্তা আর ডিমের সাদার বিস্বাদ অমলেট। তিন নম্বর এবং সবথেকে বেশি খারাপ লাগবে ক্রাউড। পয়সা দিয়ে যাঁরা চিয়াসিড ছড়ানো পালংশাকের জুস আর ভেগান কেক খেতে যান তাঁদের টাইপ সম্পর্কে আমার একটা মতামত আছে এবং সেটা হচ্ছে . . . ওয়েল, তাঁরা আমার টাইপ নন এটুকু বলাই যথেষ্ট।

তবু গেলাম কেন? গেলাম শনিবার দুপুর বলে। বেয়াল্লিশ ঘণ্টা ছুটি হাতে থাকলে কোনওকিছুই খারাপ লাগে না, হতাশ হওয়ার সম্ভাবনায় ভয় লাগে না, লাগলেও সেটাকে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ বলে চালিয়ে নেওয়া যায়। সাবিত্রী ফ্লাইওভার সারানো হচ্ছে কে জানে কদ্দিন ধরে, রোজ ফেরার সময় বাড়ির নাকের ডগায় এসে আধঘণ্টা জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকতে কান্না পায়, শনিবার দুপুরবেলা মনে হয় দেশের উন্নতির জন্য এটুকু কষ্ট করা আমার কর্তব্য। তার ওপর ওইরকম রোদ্দুর। তবু গেটাফিক্স আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল না। কিন্তু প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় পছন্দের কোনওটাই যখন আমাদের ট্যাঁক এবং পছন্দসই দূরত্বের সীমার মধ্যে পড়ল না তখন স্থির হল গেটাফিক্সই সই।

জি কে ওয়ান মার্কেটের ভেতরের গলিতে গেটাফিক্স। ঢোকার সিঁড়িটা সরু, কিন্তু ঢুকে পড়লে চৌকো ছড়ানো বসার জায়গা, দেওয়ালে বিদেশী ক্যাফের ছবি, লাইটের ফিক্সচার যেন সে ক্যাফের সামনের রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট।


আমার থাই প্রন স্যালাড। লেটুস, হলুদ সবুজ লাল ক্যাপসিকাম, গ্রিলড পেঁয়াজ, মিষ্টি নোনতা আঠালো ড্রেসিং। যতটুকু দরকার ততটুকু। অন্য সবকিছুকে ডুবিয়ে মারছে না। তরিতরকারি সতেজ, লেটুস সজীব, মোটা মোটা চিংড়ির পরিমাণ ভদ্রলোকের মতো। প্রথমে ভেবেছিলাম ছুরি কাঁটাই তো যথেষ্ট আবার চামচ দিয়েছে কী করতে। তারপর যখন স্যালাডের শেষ লেটুসের পাতাটা মুখে পোরার পর গভীর প্লেটের নিচে খানিকটা ড্রেসিং পড়ে থাকতে দেখলাম, তখন বুঝলাম কেন। ভাগ্যিস চামচ দিয়েছিল, প্লেট কাত করে সেটুকু খেয়ে নেওয়া গেল। 


অর্চিষ্মানের বারিটো চিকেন বোল। ভাত, লাল (রাজমা) কালো বিনস, পেঁয়াজ, ক্যাপসিকাম, মিষ্টি ভুট্টার দানা, টমেটোকুচি, চিপোটলে মশলা মাখিয়ে গ্রিল করা মুরগির লেগপিস হাড় ছাড়িয়ে টুকরো টুকরো করা। পাতিলেবুর রস। উনুনগরম। পাশে সাওয়ার ক্রিম আর সালসা। 

অন্তে দার্জিলিং উলং চা আর গাজরের কেক। ডিমহীন। চিনির বদলে গুড় আর মাখনের বদলে তিসির তেল দিয়ে বানানো। তাতে স্বাদ টসকেছে কেউ বলতে পারবে না। কেকের পাশে সম্ভবত বেরিজাতীয় কোনও ফলের রস। চিনিহীন।

খুঁত ধরতেই হবে? তবে বলি জলের জাগে কমলালেবুর টুকরো ভাসিয়ে রাখার আইডিয়াটা আমার ভালো লাগেনি। আমি যখন জল খেতে চাই তখন বিস্বাদ, বোরিং জলই খেতে চাই। কমলালেবু খেতে চাইলে সফলের দোকান থেকে কমলালেবু কিনে খাব। 

জীবনে দু’রকম হেলদি খাবার দেখেছি। একরকম হচ্ছে গাঁদাল পাতার ঝোল আর বার্লি। স্বাস্থ্যে টইটম্বুর, স্বাদে অকথ্য। দ্বিতীয়রকম হেলদির উদাহরণ হল গরম ভাত, মুসুর ডালের সঙ্গে পটলভাজা আর কাঁচালংকা কালোজিরে দেওয়া রুইমাছের ঝোল। ভালো খেতে কিন্তু স্বাদটা পয়েন্ট নয়, পয়েন্ট হল আরামটা। কুলকুচি করে জিভ থেকে স্বাদ মুছে ফেলার পরও যেটা অনেকক্ষণ বুক ভরিয়ে রাখবে। 

ভুল প্রমাণিত হয়ে এত খুশি জীবনে কমই হয়েছি। 

গেটাফিক্সের হেলদি খাবার এই দ্বিতীয় রকমের হেলদি। পেট তো ভরেই, মন ভরে তার থেকেও বেশি। কাছাকাছি থাকলে অবশ্য যাবেন।


December 03, 2016

সাপ্তাহিকী



Based on the experience of my life, which I have not exactly hit out of the park, I tend to agree with that thing about, If it's not broke, don't fix it. And would go even further to: Even if it is broke, leave it alone, you'll probably make it worse.
                                                       ---George SaundersTenth of December

প্রাণ বাঁচাতে আফ্রিকান হাতিরা অবশেষে নিজেদের দাঁত ঝেড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  




" . . . with a uniform, there’s less thinking, and, in a way, more reverence, whether it’s hoodies or pinstripes. রেভারেন্সের কথা জানি না, আমি অফিসে প্রায় এক জামাকাপড় পরে যাওয়া পছন্দ করি ওই ‘লেস থিংকিং’ অংশটুকুর জন্য। 


সেদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে অর্চিষ্মানের সঙ্গে আমাদের দুজনের প্রথম সাবওয়ে স্যান্ডউইচ অর্ডারের দুঃস্বপ্ন নিয়ে কথা হচ্ছিল। আর সেদিনই বাড়ি এসে এটার খোঁজ পেলাম। আমার সাবওয়ে অর্ডার থেকে আমার বয়স এবং চুলের রং ধরে ফেলার কুইজ। আমাকে এরা বলছে, You’re 26 years old with red hair. 

ছবি দেখে ‘পান’ ধরতে পারবেন? আমি কয়েকটা পেরে ভয়ানক খুশি হয়েছি।

অনেকদিন বাদে আবার গান শুনছি। যাঁর সুরে আপাতত ডুবে আছি তাঁর একখানা গান এই রইল। 


November 30, 2016

গোয়েন্দাগল্পের কয়েকটি অবগুণ



সুখীদুঃখী পরিবার নিয়ে টলস্টয়ের আনা কারেনিনার ওপেনিং লাইনটা একটু অদলবদল করে গোয়েন্দাগল্পের ক্ষেত্রেও চালিয়ে দেওয়া যায়। সব ভালো গোয়েন্দাগল্পই একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র (ইন ফ্যাক্ট, এই স্বাতন্ত্র্যই তাদের ভালোত্বের একটা বড় লক্ষণ), কিন্তু সব বাজে গোয়েন্দাগল্পই একরকম। একরকম বলতে আমি প্লট বোঝাচ্ছি না, আমি বলছি কিছু অবগুণ বা দোষের কথা। যে ক’টা বাজে গোয়েন্দাগল্প এ বছর পড়লাম তাদের সবকটিতেই দোষগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। 

কিন্তু আমি বাজে গোয়েন্দাগল্প পড়লাম কেন? পড়লাম একটা খামতি পূরণ করার জন্য। আমি গোয়েন্দা গল্প ভালোবাসি, কিন্তু সে ভালোবাসার অনুপাতে পড়েছি কি? বছরের শুরুতে স্টক নিলাম। খুচরোখাচরা ছেড়ে যে সব লেখকের লেখা ধরে পড়েছি তাঁদের মধ্যে আছেন আদিযুগের কোনান ডয়েল, পো। স্বর্ণযুগের ক্রিস্টি, ডরোথি সেয়ার্স, চেষ্টারটন, মার্জারি অ্যালিংহ্যাম, জোসেফাইন টে, নাইয়ো মার্শ। তার পরের যুগের, যেটাকে রহস্যরোমাঞ্চ সাহিত্যের টাইমলাইন সাইটে কনটেম্পোরারি বলে, সেখানকার রুথ রেন্ডেল, পি ডি জেমস, কলিন ডেক্সটার। আর সমসাময়িকদের মধ্যে অ্যান ক্লিভস, এলিজাবেথ জর্জ, শম্পার বদান্যতায় চার্লস ফিঞ্চ আর জেসন গুডউইন আর অফ কোর্স, রবার্ট গ্যালব্রেথ। (বাংলা গোয়েন্দাগল্প, গোয়েন্দাগল্প ভালো না বাসলেও স্রেফ বাংলায় লেখা হয়েছে বলেই পড়া হত, তাই সেগুলো বাদ দিচ্ছি।)

লিস্টের দিকে তাকালেই কয়েকটা ব্যাপার লাফ মেরে চোখের সামনে দাঁড়ায়। এক, আমার গোয়েন্দাগল্প পড়ার দৌড় নির্লজ্জরকম পশ্চিমমুখী। এ খুঁত অবিলম্বে সারানো দরকার। দু’হাজার সতেরোর আমার একটা রেজলিউশন, ননককেশিয়ান লেখকের ননককেশিয়ান গোয়েন্দার স্টক বাড়ানো। দ্বিতীয়, আমার মনোযোগের সিংহভাগ দখল করে রেখেছেন মহিলা লেখকরা। এটাকে অবশ্য আমি ঠিক সমস্যা বলব না, তবু একরকমের পক্ষপাতিত্ব তো বটেই। কিন্তু আমার মতে গুরুতর হচ্ছে তিন নম্বর সমস্যাটা। সমকালীনই রহস্য সাহিত্যে কী ঘটছে, সে কোন পথে চলেছে, সে সম্পর্কে আমি ঘুটঘুটে অন্ধকারে। আর তা যদি না থাকে তাহলে নিজেকে গোয়েন্দা গল্পের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জাহির করতে বিবেকে বাধে। 

সে বাধা কাটাতে এ বছরের আমার গোপন রেজলিউশনের একটা ছিল আমার জীবৎকালে, বা আরও ভালো হয় গত পাঁচ দশ বছরে, লেখা গোয়েন্দাগল্প পড়ে দেখা। মেনস্ট্রিম গোয়েন্দাগল্প। আগাথা ক্রিস্টি নিজের সময়ে যা ছিলেন, একেবারে মূল ধারার, সেই ধারাটার সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করা। সেটা করতে গিয়ে বুঝলাম সিলেবাস যা জমেছে এক বছরে তা মেক আপ দেওয়া অসম্ভব। শুধু ইংরিজি গোয়েন্দাগল্পই বছরে হাজারখানেক করে বেরোয়। কাজেই চাল টিপে ভাত বিচার ছাড়া রাস্তা নেই।

শুনলে মনে হবে আমি যেন দাঁড়িপাল্লা আর কষ্টিপাথর নিয়ে নেমেছিলাম, সে রকম একেবারেই নয়। নতুন গোয়েন্দাগল্প পড়ার ইচ্ছেটা জেনুইন ছিল। কারণ ভালোবাসাটাও জেনুইন। বুকটিউব আমার বই পড়ার ভোল পাল্টে দিয়েছে (সেটা যে পুরোটাই ভালো হয়েছে তেমন নয় কিন্তু সে নিয়ে পরে বলব) কাজেই আমি ভাবলাম গোয়েন্দাগল্পের ব্যাপারে ওঁরা কী বলেন দেখা যাক। হতাশ হলাম। রহস্যঘরানার প্রতি উৎসর্গীকৃত চ্যানেলের সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকমের কম। তবে ক্রাইম অ্যান্ড থ্রিলার সাহিত্য নিয়ে প্রচুর ব্লগ আছে। সেগুলো টপাটপ ফিডলিতে পুরে ফেললাম। তারপর মন দিয়ে তাঁদের রিভিউ আর সাজেশন পড়তে লাগলাম। কয়েকটা নাম বারবার চোখে পড়ল। লুইস পেনি, ট্যানা ফ্রেঞ্চ, চার্লস টড। এঁরা বছর বছর বেস্টসেলার বাজারে ছাড়েন। আবার কারও কারও নাম চোখে পড়ল যাঁরা লিখেছেন মোটে একটা বই এবং মাত করেছেন। যেমন সুইস লেখক জোয়েল ডিকার। 

সে সব বইয়ের কথা এ মাসের বইতে নেই কেন? কারণ সে সব বইয়ের রেঞ্জ ‘পাতে দেওয়া যায় না’ থেকে শুরু করে ‘চলতা হ্যায়’। কয়েকটা পড়তেই এত কষ্ট হয়েছে যে তাদের নিয়ে লেখার যন্ত্রণা নিজেকে দেওয়ার সাহস হয়নি। 

তবু আমার আফসোস নেই। আমি বিশ্বাস করি বাজে বই পড়া প্রায় ভালো বই পড়ার মতোই জরুরি। তাছাড়া বাজে গোয়েন্দাবই পড়েই তো সেই গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধিটা হল যেটা শুরুতেই লিখলাম। ভালো বই সব নিজের নিজের মতো, বাজে বই সব একরকম। 

বাজে বইদের যে কমন দোষগুলো আমার চোখে পড়ল সেগুলো নিয়েই আজকের পোস্ট। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা দোষ যে কোনও লেখার পক্ষেই প্রযোজ্য। তবে এটাও সত্যি, অন্য ধারার গদ্যে যে খুঁতগুলো চাপা দেওয়া অনেক সহজ, গোয়েন্দাগল্পে, যেখানে প্লটটাই মোদ্দা কথা, সেখানে এসব চাপা দেওয়া অনেক বেশি কঠিন। এই দোষগুলো বাজে গোয়েন্দাগল্পে অনেক বেশি থাকে, কিন্তু কিছু কিছু ভালো গোয়েন্দাগল্পেও থাকে। সে সব গল্পের দুয়েকখানার নামও সততার খাতিরে আমাকে উল্লেখ করতেই হল।

আমি কি এই সব খুঁতহীন লেখা লিখে দেখিয়ে দিতে পারব? মোটেই না। তাহলে অন্যের খুঁত ধরার অধিকার পেলাম কোত্থেকে? এর দুটো উত্তর হয়। মিথ্যে উত্তরটা হচ্ছে, সেখান থেকেই পেলাম যেখান থেকে প্রশংসা করার অধিকার পাই। আর সত্যি উত্তরটা হচ্ছে আমার অধিকার এসেছে, আজকাল বেশিরভাগ অধিকার যেখান থেকে আসে, সস্তা ইন্টারনেট আর কাজের অভাব থেকে। 

*****

১। আমার গোটা ব্লগটা যে ব্যাপারটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, অধিকাংশ বাজে গোয়েন্দাগল্পই সেই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে। অবান্তরতার ফাঁদ। অবান্তরতা দু’ভাবে আসতে পারে। এক, দৃশ্যের মাধ্যমে, দুই, চরিত্রের মাধ্যমে। অবান্তর দৃশ্য হচ্ছে যে দৃশ্য প্লট এগোতে সাহায্য করে না। যে সব দৃশ্য পাতা উল্টে গেলেও গল্পটা আপনি সম্পূর্ণ বুঝতে পারবেন। অবান্তর চরিত্র চিহ্নিতকরণেরও একই পদ্ধতি। চরিত্রটা বাদ দিয়ে দিলে গল্পের যদি কিছু যায় না আসে তবে সেটা অবান্তর চরিত্র। কাজেই পরিত্যাজ্য। 


একটাদুটো থাকলে তবু সহ্য হয়, লুইস পেনির আরম্যান্ড গামাশ সিরিজে এই রকম চরিত্র এবং দৃশ্যের গাদাগাদি ঠেলাঠেলি ভিড়। আরম্যান্ড গামাশ হচ্ছেন কানাডার কিউবেক পুলিশের চিফ ইন্সপেক্টর। শার্লক হোমসের যেমন লন্ডন, মিস মার্পলের যেমন সেন্ট মেরি মিড, ইন্সপেক্টর বার্নাবির যেমন মিডসমার, আরম্যান্ড গামাশের তেমন ‘থ্রি পাইনস’। কিউবেকের একটি অত্যন্ত ছোট, কাল্পনিক গ্রাম। এই থ্রি পাইনস-এ কয়েকজন বাঁধা বাসিন্দা আছেন। তাঁরা সব গল্পেই থাকেন। সে গল্পের প্লটে তাঁদের উপস্থিতির দরকার থাকুক আর না থাকুক। আর যেহেতু তাঁরা থাকেন, তাঁদের ফুটেজ দিতেই হয়। অর্থাৎ অবান্তর দৃশ্য। গামাশ সিরিজের একজন একজন চরিত্র হচ্ছেন রুথ, প্রাইজ পাওয়া কবি। আমি প্রায় হাফ সিরিজ (ছ-সাতটা উপন্যাস) পড়ে ফেলেছি, কোনওটায় রুথের থাকার কোনও কারণ পাইনি। (রুথ একলা নন, এরকম আরও একগাদা চরিত্র আছেন এই সিরিজে)। কোনও গল্পেই তিনি খুনি নন, গোয়েন্দা নন, সহকারী নন, রেড হেরিং নন, ভিকটিম নন। অথচ প্রতি গল্পে তিনি আছেন। এবং ফেলুদায় শ্রীনাথ কিংবা ব্যোমকেশে পুঁটিরামের মতো নেপথ্যচারীর মতো করে নয়, রুথ আছেন সদর্পে। গল্পের মোড়ে মোড়ে রুথকে লেখক কবিতার খাতা খুলে বসিয়ে দিয়েছেন। এমনও নয় সে সব কবিতার মধ্যে ক্লু লুকিয়ে আছে। ওই সব দৃশ্যের একমাত্র উদ্দেশ্য রুথের (বেসিক্যালি, লুইস পেনির, কারণ কবিতাগুলোও তিনিই লিখছেন) কবিত্ব প্রমাণ। 

অবগুণ বলছি বটে, কিন্তু এই অবগুণের উদ্দেশ্যটা মহৎ। অবান্তর চরিত্রের অবতারণা করা হয় পারিপার্শ্বিক ফুটিয়ে তোলার জন্য, আর অবান্তর দৃশ্যের অবতারণা করা হয় এই সব অবান্তর চরিত্রগুলোকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য। বেস্ট হয় এই দুটো কাজই গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে করতে পারলে। ভয়ানক শক্ত ব্যাপার। কিন্তু ভালো গোয়েন্দাগল্প লেখা সহজ তো কেউ বলেনি। 

২। লেখকের পক্ষপাত। অথরব্যাকড রোল সিনেমাথিয়েটারে দেখতে যত ভালো লাগে, গোয়েন্দা গল্পে ততটা নয়। গোয়েন্দা বা তার সাঙ্গোপাঙ্গর প্রতি লেখকের পক্ষপাত চলতে পারে, তার বাইরে চালাতে গেলে বিপদ। এর উদাহরণ খুঁজতে গিয়ে শীর্ষেন্দুর শবর সিরিজের কয়েকটা গল্প মনে আসছে। ঈগলের চোখ-এর বিষাণ চক্রবর্তীর কথা মনে করুন। মারাত্মক ইন্টারেস্টিং চরিত্র। স্বভাব বিশৃঙ্খল, মুখে দর্শনের খই, চেহারা যৌন আবেদনে টইটম্বুর। একই সঙ্গে অপরচুনিটি আর মোটিভের দিক থেকে সন্দেহভাজনদের লিস্টের একেবারে মাথায় বিষাণের নাম। কিন্তু গল্পের গোড়া থেকেই গোয়েন্দা শবর এবং লেখক শীর্ষেন্দুর নেকনজর বিষাণের প্রতি। যত ভাবগম্ভীর ডায়লগ তার মুখে। শবরও সহকারীর কাছে একান্তে বিষাণের প্রতি সমব্যথা প্রকাশ করেন যখনতখন। একচোখোমিটা এতই প্রকট যে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে ধরে নেওয়া যায় যে একে জেলে পোরা লেখকের কলজেতে কুলোবে না। অর্থাৎ এ খুনি নয়। মোটিভ, অপরচুনিটি থাকা সত্ত্বেও স্রেফ লেখকের পক্ষপাতদুষ্টতার জন্য একজনকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে হওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। 

৩। পাঠকের বীতরাগ। লেখক নিজে কাউকে ভালোবাসবেন না ঠিকই, তা বলে কোনও চরিত্রকে অকারণে পাঠকের বিতৃষ্ণার পাত্র করে না তোলাই ভালো। ভিলেনকে করলে তবু একটা বোঝা যায়। কিছু কিছু গল্পে স্বয়ং গোয়েন্দা এত বিরক্তিকর হন, ভাবা যায় না। গোয়েন্দা বা প্রধান চরিত্রের প্রতি কেন পাঠকের নেকনজর থাকা উচিত তার একটা কারণ আমার মনে হয়, তাতে গল্পে ঢুকতে পাঠকের সুবিধে হয়। মিস মার্পল, ফেলুদা কিংবা পোয়্যারোকে যেহেতু আমি পছন্দ করি, তাঁদের গল্প খারাপ হলেও আমার পড়তে অসুবিধে হয় না। আমার চেনা অনেক লোকের ‘গার্ল অন্য দ্য ট্রেন’ ভালো লাগেনি মূলত গল্পের প্রধান চরিত্র ‍র‍্যাচেলকে ভালো লাগেনি বলে। গিলিয়ান ফ্লিন-এর গন গার্ল আমার ভালো লাগেনি। আমি যদি গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র নিক ডান-এর প্রতি আরেকটু সমব্যথা জোগাড় করতে পারতাম তবে ভালো লাগলেও লাগতে পারত। 

অফ কোর্স, পছন্দঅপছন্দের কথা তুললেই ব্যাপারটা ব্যক্তিগত হয়ে যায়। আমার উদাসীনতা ভালো লাগে না, কারও আবার ওইটাই ইরেজিস্টেবল লাগে। আমার চেনা কারও কারও দীপকাকুকে পছন্দ ওঁর ওই নিভুনিভু ব্যক্তিত্বের জন্যই। দীপকাকুর মতো একেবারেই নন হয়তো, দীপকাকু প্রাইভেট, ইনি পুলিশ, দীপকাকুর প্রেম নেই (থাকলেও আমরা জানি না), ইনি গল্পে গল্পে একেক নারীর প্রেমে পড়েন কিন্তু একটাও প্রেম করে উঠতে পারেন না, তবু দীপকাকুর কথা উঠলেই আমার কলিন ডেক্সটারের ইনস্পেক্টর মর্স-এর কথা মনে পড়ে। বলাই বাহুল্য, ভদ্রলোক আমার গুডবুকে নেই। 

ভালো লাগতে গেলে গোয়েন্দার প্রতি মনোভাব যে অনুকূলই হতে হবে এমন নয়। জাস্ট কৌতূহল অনেক সময় ভালো কাজ দেয়। গার্ল অন দ্য  ট্রেন-এর র‍্যাচেলকে ভালোলাগানো শক্ত, কিন্তু আমি মহিলার প্রতি কৌতূহলী ছিলাম। রবার্ট গ্যালব্রেথের করমোরান স্ট্রাইককে আমার মোটেই ভালো লাগে না। কিন্তু আমি লোকটার প্রতি কৌতূহলী। সে কেস সমাধান করতে পারল কি না তাতে আমার একটা কৌতূহল আছে। যুদ্ধফেরৎ বিকলাঙ্গ গোয়েন্দা, রকস্টার বাবার অবৈধ সন্তান। অন্যরকমত্বের ডিপো। কম শক্তিশালী কোনও লেখকের হাতে পারলে চরিত্রটা ক্যারিকেচার হয়ে যাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা ছিল। আমি কৌতূহলী জেসন গুডউইনের গোয়েন্দা ইয়াশিমের প্রতি। ইয়াশিমের যৌনপরিচয়, তাঁর রান্নাবান্নার প্রতি আগ্রহ, সবথেকে ইন্টারেস্টিং হল সে সময়ের ওটোমান সাম্রাজ্যের রাজারাজড়াদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা গলাগলি। 


তবে প্রেক্ষাপট ইন্টারেস্টিং হলেই যে গোয়েন্দা ইন্টারেস্টিং হয় না তার প্রমাণ রেখেছেন চার্লস টড তাঁর বেস ক্রফোর্ড সিরিজে। চার্লস টড হচ্ছেন অ্যামেরিকার মা (ক্যারোলিন টড) আর ছেলের (চার্লস টড) লেখক জুটি। এঁদের গোয়েন্দা হলেন বেস ক্রফোর্ড, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একজন নার্স। বুঝতেই পারছেন, প্রেক্ষাপট রোমহর্ষক। বেস সিরিজের যে গল্পটা আমি প্রথম পড়েছি, অ্যান ইমপার্শিয়াল উইটনেস, সেখানে দেখা যাচ্ছে একজন মৃত সৈনিকের সংগ্রহের একটি ছবির সূত্র ধরে বেস একটি রহস্যের খোঁজ পান এবং সমাধানে লেগে পড়েন। চার্লস টডের লেখা একেবারে প্রথম দরের নয়, তাছাড়া যে টেকনিক্যাল গলদগুলোর কথা ওপরে বললাম সে সবেরও কিছু কিছু আছে। কিন্তু বেস ক্রফোর্ড সিরিজের প্রধান খামতি বেস নিজে। সাহসী এবং স্বাধীন মহিলা চরিত্র লিখতে গিয়ে একটা ট্রোপ বারবার লেখকরা ব্যবহার করেন, গোয়েন্দা অগোয়েন্দা নির্বিশেষে, সেটা হচ্ছে চরিত্রটিকে প্লেন ঝগড়ুটে বানিয়ে ফেলা। এ কথাটা বলার সময় আমি মাথায় রাখছি যে  ‘সুললিত ব্যক্তিত্ব’ কোটার নম্বরটা মেয়েদের ক্ষেত্রে ওয়েটেজ অনেক বেশি পায়। তাছাড়া সে যুগ পুরুষসর্বস্ব কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য ও গুরুত্ব আদায় করতে গেলে পাপোশ হয়ে থাকলে যে চলত না সেটা নিয়েও আমার কোনও সন্দেহ নেই। এই সব মাথায় রেখেও বেসকে ইরিটেটিং বলতে আমি বাধ্য হচ্ছি।

৪।  শুনেছি নিয়ম না ভাঙলে গ্রেট হওয়া যায় না। কিন্তু গুড হতে গেলে কিছু নিয়ম মানা দরকার বলেই আমার বিশ্বাস। গোয়েন্দাগল্পের নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে।  যেমন It must baffle a reasonably intelligent reader. (Raymond Chandler)  কিংবা  There simply must be a corpse in a detective novel, and the deader the corpse the better. (S. S. Van Dine) এ সব নিয়ম আপেক্ষিক, এগুলো নিয়ে তর্কের অবকাশ আছে। কিন্তু তর্কাতীত কিছু টেকনিক্যাল নিয়মও আছে, যেমন যাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হবে তার সঙ্গে পাঠকের যথেষ্ট আলাপপরিচয় তৈরি করা। শেষ পাতায় গিয়ে হুড়মুড়িয়ে সব ব্যাখ্যা না দেওয়া। হ্যানসেল গ্রেটেলের মতো গল্পের পথে পাউরুটির গুঁড়োর মতো ক্লু ছড়াতে ছড়াতে যাওয়া, যাতে পাঠকরা নিজেরা রহস্য উন্মোচনের অন্তত অ্যাটেম্পট নিতে পারেন ইত্যাদি।


আরও একটা নিয়ম আছে, যেটাকে যে নিয়মের মধ্যে গণ্য করা দরকার সেটা আমার মাথাতেই আসেনি। ট্যানা ফ্রেঞ্চ-এর ডাবলিন মার্ডার স্কোয়্যাড সিরিজের প্রথম গল্প ‘ইন দ্য উডস’ না পড়লে আসতও না। হাঁটার নিয়ম যেমন একপায়ের সামনে আরেক পা ফেলা, খাওয়ার নিয়ম যেমন চিবোনোর পর গলাধঃকরণ, শত্রু কম রাখার নিয়ম যেমন মুখ বুজে থাকা তেমনি গোয়েন্দাগল্পের একটা বেসিক নিয়ম হচ্ছে যে সমস্যাটা দিয়ে গল্পটা শুরু হচ্ছে শেষে গিয়ে সে সমস্যার সমাধান পাঠকের গোচরে আনা। ‘ইন দ্য উডস’ শুরু হয় তিনটি বাচ্চার গল্প দিয়ে। দু’পাতার পূর্বরাগে চমৎকার ভাষায় লেখক এক বিকেলের বর্ণনা দেন, যখন পাড়ার তিনটি বাচ্চা খেলতে খেলতে গ্রামের পাশের বনে ঢুকে পড়ে আর ফিরল না। সারা সন্ধ্যে মাঝরাত পেরিয়ে শেষমেশ পাড়ার লোক আর স্থানীয় পুলিশ তিনজনের একজনকে খুঁজে পেল। ভয়ে প্রায় পাথর, গাছে পিঠ ঠেকে গেছে, নখ ঢুকে গেছে গাছের ছালে। ভয়ের এরকম জেনেরিক বর্ণনা দিয়েই ক্ষান্ত হননি লেখক, একটি কৌতূহলোদ্দীপক ক্লু-এরও উল্লেখ করেছেন। ছেলেটির মোজাও নাকি রক্তে ভেজা ছিল। এক, সেটা মানুষের রক্ত। দুই, সেটা তার নিজের রক্ত নয়। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ আর পরীক্ষানিরীক্ষার পর পুলিশ আর ডাক্তার দু’দলই মেনে নেন যে ছেলেটির স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে। ওই রাতের ঘটনা ছেলেটির মাথা থেকে সম্পূর্ণ মুছে গেছে। 

পরের চ্যাপ্টার শুরু হচ্ছে এর আঠেরো (নাকি কুড়ি? ভুলে গেছি। এত কথা যে মনে আছে তাতেই আমি ইমপ্রেসড) বছর পর। সেই খুঁজে পাওয়া ছেলেটি এখন পুলিশে চাকরি করে। দু’তিন পাতার মধ্যেই একটা কেস আসে থানায়। সেই বনে, যেখানে তার দুই বন্ধু চিরকালের মতো হারিয়ে গিয়েছিল, একটি মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে। পড়েই আপনি নড়েচড়ে বসছেন নিশ্চয়, এতদিনে তবে সেই রহস্যের সমাধা হবে। তদন্ত শুরু হল। স্বাভাবিক ভাবেই, তদন্ত চালাতে গিয়ে ছেলেটির মাথায় বারবার সেই রাতের টুকরোটুকরো স্মৃতি ভেসে উঠছে, মানসিক বিচলন, দুঃস্বপ্ন হ্যানাত্যানা। বর্তমান তদন্তটা একেবারে জোলো, কিন্তু আপনি আশা ছাড়ছেন না। আপনি ভাবছেন এক্ষুনি ছেলেটির হারানো স্মৃতি ফিরে আসবে। এই জোলো খুনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ওই রোমহর্ষক অন্তর্ধানের চাবিকাঠি। এগোতে এগোতে গল্প একসময় ফুরিয়ে গেল। কুড়ি বছর আগের রাতে কী ঘটেছিল অজানাই রয়ে গেল। পুলিশ হিরো দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আপনি বইখানা ছুঁড়ে ঘরের কোণে।

গোয়েন্দাগল্পের সব নিয়মের বড় নিয়ম হচ্ছে It must be honest with the reader. (আবারও Raymond Chandler)। আমার মতে ট্যানা ফ্রেঞ্চের ইন দ্য উডস সে নিয়মটাই ভাঙে। এক (ভালো) রহস্যের গাজর নাকের সামনে ঝুলিয়ে সম্পূর্ণ অন্য (পচা) রহস্য চালায়। এর একমাত্র ব্যাখ্যা হচ্ছে সিরিজ বেচার ফন্দি। মোজার রক্তের উৎস ধাওয়া করতে আপনি পরের বই, তার পরের বই, তার পরের বই এই করে গোটা সিরিজ কিনবেন। অন্তত প্রকাশকের (লেখকেরও কি নয়?) তেমনই আশা। অন্যদের কথা জানি না, এ সব ফন্দিটন্দি দেখলে পড়ার ইচ্ছে আমার যত দ্রুত অন্তর্হিত হয় তত দ্রুত আর কিছুতে হয় না। 

*****

অবান্তরের পাঠকদের কাছে আমার অনুরোধ, যদি নতুন গোয়েন্দাগল্প কোনও ভালো লেগে থাকে, তাহলে আমাকে জানাবেন। ভালো লাগা খারাপ লাগা পরের ব্যাপার। পড়া তো হবে।

(ছবির উৎস গুগল ইমেজেস)



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.