September 23, 2017

কয়েকটা লিংক




শিল্পীঃ নিয়াজউদ্দিন



ধরা যাক মাটি খুঁড়ে একটা কবর বেরোলো। কবরের মধ্যে একটা কঙ্কাল। সঙ্গে তরবারি, কুঠার, বর্শা, বর্মভেদকারী ধারালো তীর, ছুরি ও ঢাল। আবার দু’খানি অশ্ব। হোমরাচোমরা কোনও সমরাধিপতির কঙ্কাল হবে। আরও বেরোলো কঙ্কালের কোলের ওপর রাখা একরকমের দান দেওয়া খেলার বোর্ড, যা দেখে ধরে নেওয়া যায় (এবং হলও) এই বীর যোদ্ধা যুদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতেন। সুইডেনের এমন একটা অংশে কবরটা বেরোলো যেখানে ভাইকিংদের বাড়বাড়ন্ত ছিল, কাজেই ইনি যে ভাইকিং যোদ্ধা ছিলেন সেটা ধরে নিতেও কোনও বাধা নেই। এই শক্তিধর, সম্মাননীয়, উচ্চপদস্থ বীর ভাইকিং যোদ্ধা পুরুষ না নারী? আঠেরোশো আশির দশকের শেষ দিকে আবিষ্কার হওয়ার পর এই প্রশ্নটা ওঠেনি কারণ উত্তরটা সবাই ধরেই নিয়েছিল। দেড়শো বছর পর সেই ধরে নেওয়াটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। 

বাজি থেকে বই। যদিও আর্টিকলটার তথ্যনিষ্ঠতা নিয়ে আমার সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। হেমিংওয়ের বিখ্যাত ‘বেবি শু’ সংক্রান্ত বিখ্যাত পরমাণু-গল্পটি হেমিংওয়ের লেখা কি না সে নিয়ে দ্বন্দ্ব যায়নি।






September 21, 2017

আমি দোষ স্বীকার করছি, ধর্মাবতার



ইউটিউবের অরিজিন্যাল ট্যাগের সঙ্গে আরও কয়েকটা দোষত্রুটি জুড়ে এই রইল আমার বই এবং বইপড়া সংক্রান্ত অপরাধের  ফিরিস্তি। 

যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য ছাড়া মিথ্যা বলিব না। 

১। উপহার পাওয়া বই কখনও অন্যকে উপহার দিয়েছেন?
না। যদিও প্রথম প্রশ্নেই কেমন হাই গ্রাউন্ড নেওয়া গেল, তবু এও স্বীকার করে রাখি, আমার কাছে যদি শীর্ষেন্দুর দশটা উপন্যাস দু’কপি উপহার থাকে, তাহলে আমি বিনা দ্বিধায় একখানা কাউকে উপহার হিসেবে গছাতে পারি। শীর্ষেন্দুর জায়গায় কামু, কাফকা, রোম্যা রোল্যাঁ হলেও পারি। না পারার কোনও কারণই খুঁজে পাচ্ছি না। 

২। কোনও বই না পড়েই পড়েছি বলেছেন?
এইটা এক কথায় বলতে যাওয়া মুশকিল। আমার বিশ্বাস প্রশ্নকর্তা আসলে জানতে চেয়েছেন স্রেফ জাতে ওঠার জন্য, “হ্যাঁ হ্যাঁ আমার তো দস্তয়েভস্কি মুখস্থ” বলেছি কি না। যতদূর মনে পড়ছে, বলিনি। তবে অনেক সময় এমন হয়েছে ধরুন কেউ, গজেন্দ্রকুমার মিত্র-র ওই গল্পটা পড়েছিস? বলে একটা গল্পের নাম বলল। নামটা আমি চিনতে পারলাম না। কিন্তু গজেন্দ্রকুমার মিত্র-র ছাপা হওয়া সব গল্পই যেহেতু আমি পড়েছি, তাই আমি সাদা মনে ঘাড় নেড়ে বলে দিলাম, “হ্যাঁ, পড়েছি।” আরও একটা বেটার রেসপন্স হতে পারত, “কোন গল্পটা বল তো?… ও আচ্ছা, আচ্ছা, হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, পড়েছি…” বলা, কিন্তু ঠিক সময়ে ঠিক প্রতিক্রিয়া মনে পড়লে আজ আমি যেখানে আছি সেখানে থাকতাম না, যা করছি তা করে দিনগত পাপক্ষয় করতাম না। 

৩। চ্যাপ্টার বাদ দিয়ে দিয়ে পড়েই পড়েছি বলেছেন? 
চ্যাপ্টার হয়তো নয়, তবে প্যারাগ্রাফ তো নিশ্চয় বাদ দিয়েছি, হরদম দিই। এবং তাতে মোটেই লজ্জা পাই না। শক্ত বইয়ের প্যারা বাদ দেওয়ার কথা বলছি না, শক্ত বই পড়ার বয়স আমার চলে গেছে। এখন যা সহজে মাথায় ঢোকে শুধু তাই পড়ি। সে সব সহজ বইয়ের অংশও হরদম বাদ দিই। এবং মনে করি, ওই অংশগুলো লেখকের, বা লেখক না হলেও এডিটরের আগেই বাদ দেওয়া উচিত ছিল।

My most important piece of advice to all you would-be writers: When you write, try to leave out all the parts readers skip. 
                                                                                                         - Elmore Leonard

এই রকম প্যারা লাফিয়ে, পাতা ঝাঁপিয়ে বইকে ‘পড়া বই’এর মধ্যে গুনি কি না? কী সাংঘাতিক, গুনব না কেন? তা হলে তো 'লর্ড অফ দ্য রিংস'-কেও না পড়া বইয়ের মধ্যে গুনতে হয়। কিংবা The Truth About the Harry Quebert Affair'- কেও। আমি এগুলোকে ‘পড়া’ বইয়ের মধ্যেই গুনি, এবং ‘পয়সা দিলেও আরেকবার পড়ব না’র মধ্যেও। 

৩। ধার নিয়ে কোনও বই ফেরত না দিয়েছেন?
না। অন প্রিন্সিপল, বই ধার নিই না। 

৪। কাউকে বই ধার দিতে অস্বীকার করেছেন? মুখের ওপর? আপনি কি মানুষ না পাষণ্ড? পারলেন কী করে?
প্রথমে মুখে বলতে চাইনি, হিন্ট দিয়েছি। কিন্তু একটা জিনিস আমি এই সাঁইত্রিশ বছরে বুঝেছি, লোকে কোয়ান্টাম মেকানিকস বুঝে ফেলে, হিন্ট বোঝে না। কাজেই বলতে হয়েছে। কারণ বই ধার দিয়ে ফেরত না পেলে তাকে মুখে বলে, ফোন করে, ইমেল করে, হোয়াটসঅ্যাপ ডাউনলোড করে দিবারাত্র পিং করে, তার বাড়িতে গিয়ে তার বুককেস হাঁটকে বই উদ্ধার করে নিয়ে আসতে হত, তারপর সম্পর্ক ছেদ করতে হত। সেটা আরও বেশি অভদ্রতা হত না?

৫। সিরিজ এলোমেলো করে পড়েছেন?
আমি যে রকম সিরিজ বেশি পড়েছি, ফেলুদা, ব্যোমকেশ, মিস মার্পল, পোয়্যারো, সেগুলো এলোমেলো করে পড়লে কিছু যায় আসে না। যেসব সিরিজে পারম্পর্য ম্যাটার করে, যেমন হ্যারি পটার, সেগুলো সিরিজ ধরেই পড়েছি। 

৬। কাউকে কোনও বইয়ের স্পয়লার দিয়ে দিয়েছেন?
মনে তো পড়ছে না, তবে একেবারে যে দিইনি, এ কথা তামাতুলসী ছুঁয়ে বলতে পারব না। কারণ আমি স্পয়লারের মর্ম বুঝি না। একটা এক লাইনের/ এক পাতা/দশ পাতার তথ্য বলে দেওয়ার জন্য বাকি গোটা পাঁচশো পাতার বই পড়া যে কারও মাটি হবে এটা বিশ্বাস করতে আমার অসুবিধে হয়। তবে আপনার যদি স্পয়লারে আপত্তি থাকে তাহলে ইচ্ছে করে সেটা মাটি করব না, নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি খারাপ, অতটাও খারাপ নই। 

৭। বইয়ের পাতা মুড়েছেন?
এরা আমাকে কী মনে করেছে, কালাপাহাড়?

৮। কোনও বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বীকার করতে অস্বীকার করেছেন? ইমেজ রক্ষার্থে?
এটা ডেফিনিটলি করিনি। এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারলাম, কারণ আমি বাজে বই পড়তে দারুণ ভালোবাসি। মনে করি সবার নিয়ম করে তিনটে ভালো বই পড়ার পর একটা করে বাজে বই পড়া দরকার।

১০। লেখক দিয়ে বইয়ের বিচার করেছেন?
এই রে, এইবার এরা আমার দুর্বল জায়গায় টর্চ ফেলেছে। আমি সত্যি সত্যিই লেখক দিয়ে বইয়ের বিচার করতে চাই না, শিল্প আর শিল্পী যে আলাদা এইসব তত্ত্ব আমি জানি এবং মনেপ্রাণে মানিও, কিন্তু মানা আর হাতে কলমে প্র্যাকটিস করার মধ্যে যে সাঁকো, সেটা এখনও পেরোতে পারিনি। ধরুন একজন লেখকের একটা উপন্যাস পড়ে দারুণ লাগল, সবাইকে বললাম পড়ুন পড়ুন/ পড়/ পড়িস। তারপর একজায়গায় সেই লেখক মহাশয়ের প্রায় দু’হাজার শব্দের আর একটা লেখা পড়লাম, প্রথম লেখাটা নিয়ে। দ্বিতীয় লেখাটার প্রথমার্ধে উক্ত লেখাটি কী ভাবে লেখক হিসেবে তাঁকে অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছে তাঁর বিবরণ, দ্বিতীয়ার্ধ রণহুংকার। উপন্যাসটি লিখে কেমন তিনি তাঁর শত্রুদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন, যে সব শালার তাঁর খ্যাতি দেখে চোখ টাটাচ্ছিল, তাঁর লেখা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যাঁরা চাদর মুড়ি দিয়ে এসে ইলেকট্রিকের লাইন কেটে দিয়ে যাচ্ছিল, তাঁদের থোঁতা মুখ কেমন ভোঁতা করে দিয়েছেন তার আখ্যান।

এই দ্বিতীয় লেখাটা পড়ার পর থেকে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে, লেখকের প্রথম লেখাটা আমি আর কাউকে রেকমেন্ড করতে পারছি না। করতে গেলেই অদৃশ্য দুটো হাত গলা টিপে ধরছে, জিভ অসাড়, স্মৃতি ঝাপসা। 

এর সমাধান একটাই, লেখকের ব্যক্তিগত জীবন বা মতামত থেকে শতহস্ত দূরে থাকা। এই হাটে হাঁড়ি মিডিয়ার জগতে যা ভয়ানক শক্ত। চোখ বন্ধ করে থাকতে চাইলেও উপায় নেই। এই কালকেই রোয়াল্ড ডাল সম্পর্কে কী সব জেনে ফেললাম। তবু চোখ বন্ধ করে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। 

১১।  বই দিয়ে পাঠক বিচার করেছেন? 

এই বিচারটা ওপরেরটা থেকেও বেশি অন্যায়, এবং সত্যি সত্যি দুঃখ এবং লজ্জার সঙ্গে স্বীকার করছি, এটাও আমি করি। আত্মপক্ষ সমর্থনে একটাই কথা বলতে পারি এইসব ছুঁৎমার্গ আচারবিচার নিজের মনেই (আর অর্চিষ্মানের কানে) রাখি, ফ্রিডম অফ স্পিচ ফলিয়ে, “এরা কারা, বস?” চেঁচিয়ে আত্মগর্ব অনুভব করি না। কারণ আমি জানি এটা অন্যায় আর এইসব বিচারে আমিও কোথাও দাঁড়াব না, ফুৎকারে উড়ে যাব। কাজেই এই অন্যায়টা আমি অজ্ঞাতে নয়, জ্ঞাতসারেই করি, এবং সর্বদা চেষ্টায় থাকি না করার।

এতে কি দোষ খানিকটা স্খালন হয়, নাকি আমি সত্যি সত্যিই কালাপাহাড়?

September 20, 2017

নিল গেমন'স ফার্স্ট ল + টগবগ উৎসব সংখ্যা ১৪২৪




“Picking up your first copy of a book you wrote, if there’s one typo, it will be on the page that your new book falls open to the first time you pick it up.” 
                                                                                   – Neil Gaiman’s First Law


আমার মতে বড় কথা টাইপোর চোখে পড়া নয়। টাইপোর থেকে যাওয়াটা। শুধু টাইপো হলে তবু একরকম। আরও কত কিছু যে থেকে যায়, চোখে পড়ে। কত ত্রুটি, কত গোঁজামিল। অনেককে বলতে শুনেছি নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখা নাকি নিজের সন্তানকে প্রথমবার দেখার মতো। সন্তানকে দেখে যদি কারও প্রথমেই, ‘ইস নাকটা কী বোঁচা’, ‘মাগো মাথায় কেন টাক’ ইত্যাদি মনে না হয় তাহলে তাঁর সঙ্গে আমার বিশেষ মিল নেই। 

আমাদের বঙ্কিমও বলেছিলেন, তিন মাস পরে নিজের লেখা পড়লে নাকি তাঁর ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। ধরে নিচ্ছি, সে যুগেও টেবিল ছেড়ে প্রকাশকের টেবিল ঘুরে বই হয়ে আসতে একটা লেখার তিন মাস বা তার বেশিই লেগে যেত, কাজেই বঙ্কিমের উক্তিটাকে নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখার প্রতিক্রিয়া হিসেবেও ধরে নেওয়া যেতে পারে।

বঙ্কিম, গেমন-এরই এই, তাহলে তিনমাস পর আমার লেখার অবস্থা কী হয় ভাবুন।

নড়বড়ে গাঁথুনি, নিড়বিড়ে ভাষা, পর পর দুটো সেন্টেন্সে একই শব্দ ব্যবহার, সব বইয়ের পাতা থেকে গুলতির মতো ছিটকে ছিটকে চোখে বেঁধে। অথচ গল্পটা পাঠানোর আগে দুশোতমবার যখন চোখ বোলাচ্ছিলাম (আর একটিবারও বোলালে বমি করে ফেলতাম নিশ্চিত), এগুলো চোখে পড়েনি।

নিল গেমন আরও একটা কথা বলেছিলেন, দশ মিনিট গুগল সার্চ করে পেলাম না, প্যারাফ্রেজ করে বলছি। বলেছিলেন, তাঁর লেখক জীবনের সারাৎসার হচ্ছে  - লেখা, ছাপতে দেওয়া, ছাপা হওয়ার পর পড়ে শিউরে ওঠা এবং পত্রপাঠ পরের লেখাটা লিখতে বসা। আবার ছাপা, আবার শিহরণ, আবার লেখা, আবার ছাপা, আবার শিহরণ…

কিশোর সাহিত্য পত্রিকা টগবগ-এর উৎসব সংখ্যা ১৪২৪-এর একটা ভালো উদ্যোগ ছিল, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের গল্পের অনুবাদ প্রকাশ। আমার দায়িত্ব ছিল কাশ্মীরী গল্প অনুবাদ করার। গল্পের লেখক এম কে রায়না ভারি ভদ্রলোক, ওঁর একটা গল্প ইংরিজি করাই ছিল, নিজেই করে রেখেছিলেন, আমি সেটা ইংরিজি থেকে বাংলা করলাম। বলাই বাহুল্য, নিজের সামান্য ফোড়ন দিতেও ছাড়লাম না। সেই গল্পটার খানিকটা তুলে দিয়েছে দেখলাম রোহণ বিজ্ঞাপন হিসেবে। পড়ে আমার শিহরণ হল। তা সত্ত্বেও, সেটাই নিচে দিচ্ছি।

টগবগ উৎসব সংখ্যা ১৪২৪ কাগজের কিনতে হলে চলে যান এইখানে

ই-বুক কিনতে হলে এইখানে 

কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চাখতে হলে, এইখানে


*****

এম কে রায়না-র ‘দ্য লাস্ট গেম’ ছোট গল্প অবলম্বনে আমার অনুবাদ ‘শেষ খেলা’র উদ্ধৃতাংশ


আবার কাজে নামল লালজী। মায়ের চোখ বাঁচিয়ে রান্নাঘরের জ্বালানি কাঠকুটো হাঁটকে একটা বেশ চওড়া চ্যালা কাঠের তক্তা জোগাড় করে নিয়ে গেল রাজুভাইয়ার কাছে। নিজের গুমটির ভেতর, কানে পেনসিল গুঁজে তখন রাজুভাইয়া খুব মন দিয়ে শিরীষ কাগজ দিয়ে ঘষে ঘষে একটা কাঠের লম্বা পাটাতনকে মসৃণ করছিল। হাতের কাঠটা দিয়ে লালজী সব বুঝিয়ে দিল রাজুভাইয়াকে। পরদিন স্কুলের পরে সবাই মিলে গিয়ে দেখল রাজুভাইয়া সেই চ্যালাকাঠটাকে কেটে ছেঁটে, হাতলটাতল বসিয়ে, পালিশ-টালিশ করে দিব্যি একটা ব্যাট বানিয়ে রেখেছে। সবাই খুব খুশি হল ব্যাট দেখে, কিন্তু আসল ভয়ের কাজটাই এখনও বাকি। খুচরো পয়সাগুলো হাতে মুঠো করে লালজী জিজ্ঞাসা করল, “কত দাম ব্যাটের?” রাজুভাইয়া একবার ওদের মুখের দিকে, একবার লালজীর মুঠোর দিকে তাকাল।

“কত এনেছ?”

“চার টাকা।” মুঠো খুলে খুচরোগুলো দেখাল লালজী। রাজুভাইয়া আশ্চর্য হয়ে গেল। ব্যাটের মজুরিও তো চার টাকাই! ভীষণ খুশি হয়ে ব্যাট নিয়ে ফিরতে যাবে এমন সময় পিছু ডাকলেন রাজুভাইয়া। “ব্যাট লাগবে, বল লাগবে না?” নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করল ওরা। কাগজ গোল্লা পাকিয়ে গার্ডার পেঁচিয়ে রেডি করা আছে। রাজুভাইয়া উঠে গিয়ে দোকানের ভেতর থেকে একটা কাঠের বল বার করে দিল ওদের হাতে। বলল, “নতুন পলিসি চালু হয়েছে দোকানে, ব্যাট কিনলে বল ফ্রি।”

বসন্ত ততদিনে পুরোদস্তুর জেঁকে বসেছে মনিয়ারে। তুঁতগাছের সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে মুকুলের আভাস। হাওয়ায় কামড় উধাও। সবাই বলল, “শুভকাজে আর দেরি কেন, ম্যাচের দিন স্থির করে শত্রুপক্ষকে নেমন্তন্ন করা হোক, পিচের ধুলোয় ব্যাটাদের নাকগুলো ঘষে দেওয়া যাক।” এই ব্যবস্থায় সবথেকে বেশি যার উৎসাহ থাকবে ভেবেছিল সবাই, সেই লালজীই তেমন গা করল না। বলল, “ম্যাচ পরে হবে, তার আগে আমাদের খানিকটা প্র্যাকটিস করা দরকার।”

পরের রবিবার ভালো করে জলখাবার খেয়ে লালজী, রফিক, কুন্দন, রঘু, কবীর আর রামজী ব্যাট, বল আর তুঁতগাছের চারটে ডাল নিয়ে চলল পাড়ার বাইরের সেই কাঁটাতার ঘেরা মাঠের দিকে। ওদের সুপার সিক্স টিমের খবর এর মধ্যে চাউর হয়েছে, ওদের স্কুলেরই ছোট ক্লাসে পড়া ডজনখানেক উৎসাহী দর্শকও জুটল। মাঠের ধারে লাইন দিয়ে বসল তারা। ব্যাটিং অর্ডার স্থির করার রাস্তা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। চিরকুটে এক, দুই নম্বর লিখে ভাঁজ করে দুই হাতের আঁজলায় নিয়ে দাঁড়াল রামজী। চিরকুট তুলে নিল বাকি পাঁচজন। দেখা গেল লালজীর চিরকুটে বড় বড় করে লেখা আছে ‘এক’।

প্রথম বল করবে কুন্দন। নতুন বল নিয়ে কুন্দন হেঁটে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল উলটোদিকে। নতুন ব্যাট নিয়ে লালজী গিয়ে দাঁড়াল তিনটে তুঁতডালের সামনে। শেষবারের মতো ব্যাট ঠুকে পিচের গতিপ্রকৃতি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল লালজী। চোখ চালিয়ে দেখে নিল বিরোধীপক্ষের ফিল্ডারদের অবস্থান। দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে অল্প ঝুঁকে খুনে দৃষ্টি নিয়ে লালজীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে রঘু, রফিক, কবীর, রামজী। কে বলবে এতদিনের বন্ধু? চোখে খুনে দৃষ্টি, এক চুল ভুল করলে ‘আউট’ বলে চেঁচিয়ে উঠবে সবাই।

বুকের মধ্যে অল্প একটু কাঁপন ধরল কি লালজীর? কুন্দনকে চেঁচিয়ে বলল ও, প্রথম বলটা নেট প্র্যাকটিসের জন্য, ফলাফল যাই হোক না কেন হিসেবে ধরা হবে না। ক্যাপ্টেনের কথা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা কারোর নেই। কুন্দন মনে মনে সবুজ খাতার পড়া ঝালিয়ে নিল। স্পিন না পেস না গুগলি? অনেক ভেবে-টেবে অল্প ছুটে এসে একটা স্পিন বল দিল কুন্দন। লালজী ডিফেন্সের ভঙ্গিতে ব্যাট তুলল, চ্যালাকাঠের ব্যাটে ঠকাস করে ঠোকা খেয়ে বল চলে গেল কুন্দনের দিকে। চটাপট হাততালি দিয়ে উঠল মাঠের চারপাশের দর্শকরা। রান হল না কোনও।

দ্বিতীয় বল। কুন্দন এবার দৌড় শুরু করেছে খানিকটা দূর থেকে। প্র্যাকটিস বল সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে ব্যাটসম্যানের আত্মবিশ্বাসও তুঙ্গে, বল কাছে আসার তর সইল না, এগিয়ে গিয়ে ব্যাট চালাল লালজী।

আবার ‘ঠকাস’ করে শব্দ। কিন্তু ব্যাটে তো বল লাগেনি! অথচ একটা চিৎকার উঠেছে চারদিকে, কান ফাটানো হাততালি, নিজের নিজের জায়গা ছেড়ে ফিল্ডাররা ছুটেছে কুন্দনের দিকে, সবাই মিলে জড়াজড়ি করে এখন একটাই পিণ্ড হয়ে গেছে। সবাই একদিকে, লালজী একদিকে। পেছনে ফিরে তাকাল লালজী। যা দেখল বিশ্বাস হল না তার। তিনটে ডালের মাঝেরটা মাটি থেকে উপড়ে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে, তখনও অল্প অল্প গড়াচ্ছে বিশ্বাসঘাতক বলখানা।



*****

গল্পের সঙ্গতে চমৎকার ছবিটি এঁকেছেন অরিজিৎ ঘোষ। 



September 19, 2017

এখন-তখন




যা যা বদলেছে
যা যা একই আছে


আগে মহালয়ায় সবাই যে যার নিজের বাড়িতে রেডিও শুনত এখন মাইক লাগিয়ে পাড়ার সবাইকে শোনায়।

তখনও রেডিওর মহালয়া বেস্ট ছিল, এখনও বেস্ট


আগে এই দিনটা এলে মনে হত, এবার সত্যিই পুজো এসে গেছে এখন সেটা খুঁটিপুজোর দিন মনে হয়


তখনও টিভির মহালয়া বেশি এন্টারটেনিং ছিল, এখনও তাই আছে কারণ, ব্রহ্মার দাড়ি তিরিশ বছর ধরে সমান হাস্যকর


আগে চারপাশে সকলেই মহালয়া খায় না মাথায় দেয় জানত। "আজ তুমলোগ কেয়া করতে হো?” গোছের অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হত না। উত্তরটা সোজা, কিন্তু প্রশ্নকর্তার রিঅ্যাকশন গোলমেলে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


তখনও রেডিও শুনে আর টিভি দেখে মহালয়া উদযাপন করতাম, এখনও করি।


আগে মহালয়া আসতে আসতে জামাজুতো কেনা হয়ে যেত। কারণ তখন বাবামা দায়িত্ব নিতেন। জীবনের ওপর কন্ট্রোল তাঁদের আমাদের থেকে বেশি ছিল।
তখনও মহালয়ার দিন পড়ায় মন বসত না, আজও কাজে মন বসছে না। ফাঁকি দিয়ে বাজে পোস্ট ছাপছি।




September 17, 2017

ঘরের কাজঃ কান্না-পাওয়া থেকে না-করতে-পারলে-মন-খারাপ ক্রমানুসারে



অনেক সময় হয় না, একটা লোককে অনেক দিন চোখের চেনা হওয়ার পর সে লোকটার সঙ্গে পরিচয়, ক্রমে এতখানি ঘনিষ্ঠতাও হয়, যে ওই চোখে চোখে চেনার সময় লোকটা আপনার সম্পর্কে কী ধারণা করেছিল সেটা সে আপনার কাছে স্বীকারও করে? আমার যে ক’জনের সঙ্গে এ রকম হয়েছে, তারা মূলত তিনটে বিষয় আমার কাছে স্বীকার করেছে, যেগুলো তারা আমার সম্পর্কে ভেবেছিল। 

প্রথম দর্শনেই নাকি তারা ধরে ফেলেছিল, আমি বাঙালি। দু’দিন দেখে নিশ্চিত হয়েছিল, আমি বদমেজাজী, রাগী বাঙালি। ধমকাতেও হবে না, ভুরু কুঁচকে তাকালেই গরু দুধের বদলে দই দিতে শুরু করবে। আরও কিছুদিন আমাকে অবজার্ভ করে তাদের মনে হয়েছিল আমার কোনও কাজ নেই। দুশ্চিন্তা নেই, দায়িত্ব নেই, কর্তব্য নেই। জোয়াল ঠেলছি না, যেন আতর মেখে হুঁকো টানতে টানতে চলেছি জীবনের মধ্যে দিয়ে। তারা অবশ্য ওপরের উপমাটা ব্যবহার করেনি, কারণ তারা হুঁকো জানে না, হুকা বার জানে। (একটা জিনিস জেনে আমি চমকে গেছি। হুকা বারের হুঁকোতে নাকি তামাকটামাক থাকে না, স্রেফ গন্ধওয়ালা ধোঁয়া! সেটাই লোকে গুচ্ছ পয়সা খরচ করে গুড়ুক গুড়ুক টানতে থাকে! ) তারা আমার এই ভঙ্গি বর্ণনা করার সময় বলেছিলেন, “মুংফলি খাতে খাতে, গানা গাতে গাতে।”

এই তৃতীয় অবজার্ভেশনটা স্বীকার করার সময় লোকে খুব লজ্জা লজ্জা মুখ করে। আমাকে দেখে যে দামি এবং ভারী মনে হয় না, মনে হয় না আমার ডায়রিতে জায়গা পাওয়ার জন্য মিটিং এবং টেলিকনরা গুঁতোগুঁতি করছে, এটা মনে করিয়ে দিলে পাছে আমি অফেন্স নিই।

আশ্বস্ত করি। অফেন্স মোটেই নিইনি, নিলে ভণ্ডামি হবে। কারণ সত্যিই দায়িত্বকর্তব্য আমার অভিধানের প্রিয়তম শব্দ নয়, আজ কী কী কাজ না করে ফেলে রাখা যেতে পারে, রোজ ভোরে চোখ খোলারও আগে আমার সে চিন্তা শুরু হয়। অফিসের কাজ করি পেটের দায়ে, বাড়ির কাজ করি লোকলজ্জায়।

মুখে বলি বটে, কিন্তু মনে মনে মনখারাপও হয়। কেন ভগবান আমাকে এরকম ফাঁকিবাজ করে বানালেন। এক ঠোঙা মুংফলি কিনে অফিসের দিকে হাঁটতে থাকি, কিন্তু গানা আসে না গলায়। আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকি, সব কাজ একটা লোকের কী করে খারাপ লাগতে পারে, দুয়েকটা নিশ্চয় বেরোবে যেগুলো করতে ভালো লাগে? অন্তত, কম খারাপ? অফিস বরাবরের মতোই হতাশ করে। জল খাওয়া আর আন্টিজির দোকানে যাওয়া ছাড়া আর পাতে দেওয়ার মতো কাজ খুঁজে পাই না। 

বুক বেঁধে বাড়ির দিকে তাকাই। একমনে ভাবতে ভাবতে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখা যায়। আছে আছে, কাজ আছে! যেগুলো করতে আমার কান্না পায় না, এমনকি রীতিমত ভালোও লাগে।

আমার কান্না পাওয়া থেকে ভালো লাগার ক্রম অনুযায়ী কয়েকটা সাংসারিক কাজের একটা লিস্ট এই রইল। আপনাদের সঙ্গে কী মিলল, কী মিলল না জানতে কৌতূহলী রইলাম। 

ইস্তিরি করাঃ অ্যাকচুয়ালি, ইস্তিরি করাকে এই লিস্টে রাখা ইস্তিরি করা-কে অপমান, কারণ লিস্টের বাকি কাজগুলোর প্রতি আমার খারাপ লাগাদের যোগ করে, যোগফলের বর্গফল বার করলেও সে খারাপ লাগা ইস্তিরি করার খারাপ লাগাকে ছুঁতে পারবে না। তাই আমি একে অফিশিয়াল লিস্টের বাইরে রাখলাম।

কেন এত খারাপ লাগে সেটা বুঝিয়ে বলা মুশকিল, একটা হতে পারে, আমি বিষয়টাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করি। পরিষ্কার জামা, ছেঁড়াফাটা নয়, সেটা আবার টানটান হতে হবে কে বলল? তার ওপর যখন রোহিত বাল কলসি থেকে বার করা জামা প্যান্ট পরে রাজদ্বার থেকে ম্যাগাজিন কভার দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন? সে বেলা? 

“ওটা লিনেন।” ইস্তিরি-পুলিস চোখ বন্ধ করে মাথা নেড়ে বলেন। 

সামনের জন্মের আগে আমার গোটা ওয়ার্ডরোব লিনেন-এ বদল করার আগে কোনও সম্ভাবনা দেখছি না, কাজেই এ যমযন্ত্রণা আপাতত চলবে। (কারও কারও আবার শুধু জামা ইস্তিরি করে কুলোয় না, মাথার চুলও রোজ ইস্তিরি না করে তাঁরা প্রকাশ্যে পা রাখেন না। সাষ্টাঙ্গ প্রণাম ছাড়া তাঁদের আমার আর কিছু বলার নেই।)

৭। ফ্রিজ পরিষ্কারঃ যেদিন যেদিন ঘুম থেকে উঠে মনে হয়, বাঃ, মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছে, ডেডলাইন নেই, আফসোস নেই, দিগন্তে অপরাধবোধের ছায়া পর্যন্ত নেই, মোটামুটি নব্বই শতাংশ নিশ্চিত হয়ে বলা যায় সেইদিনই, ঠিক সেইদিনই আমার ফ্রিজ পরিষ্কার করার দিন। 

একটা গোটা দিনকে মাটি করার ক্ষমতা, আমার অফিসের কিছু কিছু লোকের আছে, আর আছে আমার ফ্রিজের। ফ্রিজ না বলে অন্ধকূপ বলাই ভালো। কিংবা ‘হাউস অফ লিভস’ গল্পের সেই ভৌতিক করিডোরের মতো। বহিরঙ্গের সঙ্গে অন্দরের কোনও সম্পর্ক নেই। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, এইটুকু, অবশ্য দু’জনের সংসারে আর কত বড়ই বা লাগে। আমরা তাঁদের আশ্বস্ত করি, যত ছোট দেখতে লাগছে জিনিসটা আসলে তত ছোট নয়। আড়াল আবডাল থেকে কত কিছু যে বেরোয়, কল বেরোনো ছোলা, হারিয়ে যাওয়া টিফিনবাক্সের ভেতর একটুকরো পাতিলেবু। আধবাটি চাউমিন, দু’ চামচ মুগের ডাল। শুধু আয়তনই যে ডিসেপটিভ তা নয়, আমার ধারণা ফ্রিজটার একটা অলৌকিক শক্তি আছে, খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার। 

পরিণাম, ধরে ধরে খাবার ফেলা, এবং নিজের প্রিভিলেজের এই রকম নির্লজ্জ অপব্যবহারে শিউরে শিউরে ওঠা।

৬। ধুলো ঝাড়া/ ঝাঁট দেওয়াঃ ধুলো ঝাড়তে আমার ভালো লাগে না, তারও পেছনে অপরাধবোধ। প্রতিটি জিনিস হাতে তুলে মুছতে গিয়ে মনে পড়ে, কী আবোলতাবোল জঞ্জালে বাড়ি ভর্তি করে রেখেছি। বসের বকুনি খেয়ে অনলাইনে ‘কিপ কাম অ্যান্ড ড্রিংক টি’ কিনেছিলাম। দীপাবলীতে অফিস থেকে কুৎসিত মোমবাতি দিয়েছিল, এখনও জুতোর কেসের ওপর অধিষ্ঠান করছে। ধুলো ঝাড়ার আরেকটা খারাপ ব্যাপার হচ্ছে সিদ্ধান্ত নেওয়া। রাখব না ফেলব। 

ধুলো ঝাড়ার পরে আসে ঝাঁট দেওয়ার পালা। ধুলো ঝাড়ার থেকে কম বিরক্তিকর, তবে ফ্যান বন্ধ করতে হয়, সেটা আরামদায়ক নয়। আবার কিছু বেয়াদপ ঝুল থাকে, শুয়ে পড়ে খাটের তলা থেকে বার করে আনার পর তারা আবার উড়ে উড়ে খাটের তলায় সেঁধোতে থাকে, আমার নাকের ডগা দিয়ে, সেটাও আত্মবিশ্বাসের পক্ষে ক্ষতিকারক।

৫। কাপড় কাচাঃ কাপড় কাচায় এ ধরণের মানসিক চাপ নেই। পরিশ্রম আছে বিস্তর। কাচার পর তোয়ালে নিংড়ে জল বার করেছেন যাঁরা, জানেন। কাপড় কাচার যে ব্যাপারটা আমাকে ভাবায় সেটা হচ্ছে কাজটার, বা কাজটার নামের অন্তর্লীন অসততা। 

কাপড় কাচা আসলে কাপড় কাচা নয়। কাপড় কাচা হল জামা বাছা, ভেজানো, কাচা, মেলা। মনে করে ক্লিপ লাগানো। না হলে অফিস থেকে এসে দেখা কাল ঝাঁট দেব বলে ফেলে রাখা বারান্দার মেঝেতে তারা গড়াগড়ি খাওয়ারত অবস্থায় আবিষ্কার করা। শুকোলে মনে করে তোলা। না তুললে, বৃষ্টি গ্যারান্টি। এবং আমার একটিমাত্র জিনস ভিজে গোবর। 


৪। বাজার করাঃ কাপড় কাচার মতো এই শেষ হয়েও হইল না শেষ দোষটা বাজার করারও আছে। স্রেফ ওই তোয়ালে চেপা, ক্লিপ দেওয়ার অংশটা নেই বলে কান ঘেঁষে বাজার করা জিতে গেল। বাজার করা কখনওই শেষ হয় না। চাল আনলে আটা ফুরোয়, লাইজল আনলে মনে পড়ে ওডোনিলও আনতে হত। আলু কিনে পোস্ত ভুলে যাই, পোস্ত কিনলে পাঁপড়, পাঁপড় পাঁপড় জপতে জপতে বাজারে গিয়ে যদি বা মনে করে তাকে ব্যাগে পুরি, রবিবার বিকেলে চা বানিয়ে আবিষ্কার হয় পপকর্ন নেই। 

একটা ছিল না?! বাজার যাওয়ার আগে দেখলাম যে! 

মাথায় হাত দিয়ে বসি। এখন কী খাব আমরা? 

শেলফের ওপর থেকে পাঁপড়গুলো চোখ পিটপিট করে।

আমার দুঃখ দ্বিগুণ হয়। পাঁপড়? মাগো, পাঁপড় মানুষে খায়?

তবু বাজার করা আমার লিস্টের এত নিচের দিকে কেন? ধড়াচূড়া পরে বাইরে বেরোতে হওয়া সত্ত্বেও এবং মানুষের সঙ্গে কথোপকথন চালাতে হওয়া সত্ত্বেও? কারণ বাজার করার এতগুলো খারাপ দিক আছে বলেই আমি প্রতিবার বাজার করতে গিয়ে দু’প্লেট করে ফুচকা খাই। 

এবং বাজার করা ভালো লাগা কাজের লিস্টে হইহই করে ওপরে উঠে আসে। 

৩। রান্না করাঃ রান্না করতে আমার খারাপ লাগে না। মাঝে মাঝে সিম করে এসে টিভি দেখা যায়, ভালো হলে ভালো, খারাপ হলেও অসুবিধে নেই, নিজের হাতের রান্না খেতে কারওরই খারাপ লাগে না, আর অর্চিষ্মান ভালোখারাপ যেমনই হোক না কেন, মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করে। খারাপ লাগার বিশেষ কিছুই নেই।

তবু যে এক নম্বরে জায়গা পেল নাতার কারণ হচ্ছে রান্না রোজ করতে হয়, চট করে শেষ হয়ে যায়, তখন আবার রান্না করতে বসতে হয়। বিশেষ করে ভালো খেতে হলে তো অসুবিধেজনক রকম তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। (তখন আমাদের অলৌকিক ফ্রিজ কোনও কম্মে লাগেন না।) 

২। গাছে জল দেওয়াঃ গাছে জল দেওয়া যে আমার লিস্টের এক নম্বর ভালো লাগা কাজ নয় সেটা দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেছি। একটু ভাবতেই অবশ্য কারণটা বেরিয়ে পড়ল। 

ভালো লাগার কারণ তো বুঝিয়ে বলার কিছু নেই। জল দিলে গাছ সাড়া দেয়। ছোট ছোট পাতা বার করে মাথা নাড়ে। পা উঁচু করে জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি মারে। 

ঠিক উল্টো ব্যাপারটা হয় ফেলে রেখে বেড়াতে চলে গেলে। নিজেরা হেসে খেলে বেড়িয়ে ফিরে আসি, দেখি গাছ নেতিয়ে পড়েছে। জল না পেয়ে আধমরা। এবং সবথেকে খারাপ দিকটা হচ্ছে, ওকে না খেতে দিয়ে মেরে ফেলার জন্য গাছের আমার প্রতি কোনও অভিযোগ নেই। চুপ করে মরে যাবে। এবং তাৎক্ষণিক হলেও, ওর মৃত্যুর তুলনায় হাস্যকররকম অকিঞ্চিৎকর হলেও, আমাকেও খানিকটা মেরে যাবে।

অতএব? বাকি কী রইল? আমি মনে মনে জানতাম এর জেতার একটা জোর সম্ভাবনা রয়েছে, সে সম্ভাবনা নিশ্চয়তায় রূপান্তরিত হয়েছে।

১। বাসন মাজাঃ বাসন মাজার কোনও খারাপ দিক, এই মুহূর্তে আমি খুঁজে পাচ্ছি না। একজায়গায় দাঁড়িয়ে করা যায়, কারও সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকট করতে হয় না, লেবুগন্ধের প্রিল দিয়ে কবজি একবার আলতো করে ঘোরাতে না ঘোরাতেই চকচকে। (একমাত্র রাইস কুকারটা মাজতে একটু অসুবিধে হয়, সাইজে বেঢপ বলে বেসিনের সাইডে লেগে ঘটর ঘটর আওয়াজ করে।) 

আর যদি পাজামার পকেট থাকে, আর মোবাইলটা যদি সেই পকেটে ফেলে রাখা যায়, আর কোন চ্যানেলে যদি এই গানটা দেয়, তাহলে বাসন মাজা রীতিমত লোভনীয় টাইমপাস। এমন অনেক সময় হয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যে সাতটায় টেলিকনফারেন্সে, একটাই কথা পাঁচটা লোকের মুখে পাঁচশো রকম ভাবে শোনার পর, আমার রান্নাঘরের বাসন মাজার ছোট্ট কোণটার কথা মনে পড়ে বুক মুচড়ে উঠেছে। 

আরও একটা কারণ আছে বাসন মাজতে ভালো লাগার। অর্চিষ্মান বেসিনের দিকে এগোলেই “না না, এগুলো আমি ম্যানেজ করে নেব, তুমি বরং ইস্তিরির দিকটা দেখো গিয়ে” বলে ঝাঁপিয়ে গিয়ে পড়ার। যে কারণটা আমি আগে কাউকে বলিনি, এই আপনাদের বলছি। আগাথা ক্রিস্টি নামের একজন খুব বুদ্ধিমান আর সফল লেখক বলেছিলেন, তাঁর বেস্ট আইডিয়াগুলো তিনি সব পেয়েছেন বাসন মাজতে মাজতে। 

দুঃখের বিষয়, আমার সঙ্গে সে রকম কিছু ঘটেনি এখনও। তবু আমি হাল ছাড়ছি না। এখনও অনেক বাসন মাজার আছে, আজ না হোক কাল না হোক, একদিন না একদিন আইডিয়াকে এসে ধরা দিতেই হবে। যতদিন না আসছে,ততদিন আমার ভালো লাগা কাজের লিস্টে বাসন মাজার সিংহাসন কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।


September 14, 2017

কোথায় বেড়াতে যাওয়া যায় বলুন দেখি?




গত বছর প্রায় ঠিক এই সময়ই মালশেজঘাট যাওয়া হয়েছিল

অফিসের যারা এখন বেলা চারটের সময় সাঁইত্রিশ ডিগ্রিতে ঘামতে ঘামতে পকোড়া খাচ্ছে, ন’মাস আগে এই সময় ডেস্কে বসে বন্ধ এসি-তেও কাঁপতে কাঁপতে ফ্যাট ফ্রি দই খাচ্ছিল, ঝপাঝপ মোটিভেশনাল উদ্ধৃতি ডাউনলোড করতে করতে। তারপর দইয়ের আগুনে দপ করে জ্বলে ওঠা খিদের মুখে ‘মাইন্ড ওভার ম্যাটার’ বিড়বিড় করতে করতে সে সব কোটেশনের প্রিন্ট আউট জোগাড় করতে হাঁটছিল জেরক্স রুমের দিকে। রেনফরেস্টের শ্রাদ্ধ করে টাইমস রোম্যান বোল্ড এবং বত্রিশ ফন্টের প্রিন্ট আউট নিয়ে এনে সাঁটছিল চোখের সামনে।

রেনফরেস্টের প্রতি আমারও যে খুব মায়াদয়া আছে এমন দাবি করতে পারি না। মোটিভেশনাল কোটেও অরুচি নেই, তবে পরিমিতিতে বিশ্বাস আছে। বেশ ক’দিন ধরে একটাই কোটেশন আমার বোর্ডে ঝুলছে, অদূর ভবিষ্যতেও ঝুলবে, কারণ কোটেশনের প্রাসঙ্গিকতা এখনও ফুরোয়নি। 

ডান ইজ বেটার দ্যান পারফেক্ট। 

আমার পারফেকশনিস্ট সহকর্মীরা আতংকিত হন, কিন্তু আমি দমছি না।

যে প্রিন্ট আউটটা দেখে তাঁরা আরও বেশি আতংকিত হবেন, সেটা আমি, তাঁদের মুখ চেয়েই, আরেকটু আড়ালে রেখেছি। ইন ফ্যাক্ট, আমার চেয়ারে না বসলে (অর্থাৎ আমার পারস্পেকটিভ বিনা) সেটা দেখতে পাওয়া অসম্ভব। সেটা হচ্ছে সারা বছরের ছুটির লিস্ট। এ নিরীহ জিনিস এত লুকোনোর কী আছে জানতে চাইছেন? ডেস্কে মার্ডার মিস্ট্রি রাখার যা বিপদ, বোর্ডে ছুটির লিস্ট টাঙিয়ে রাখারও তাই। লোকে ধরে নেয় ফাঁকিবাজ। 

তাতে অবশ্য আমার আপত্তি থাকা উচিত নয়, কারণ আমি সত্যি সত্যিই ফাঁকিবাজ। সে সত্যিটা বারংবার প্রমাণ হওয়ার রিস্ক নিয়েও আমি লিস্টটা ছিঁড়ে ফেলতে পারি না। সারাদিন চোখের সামনে থেকে তারা আমাকে আশ্বাস দেয়, আছে আছে, মুক্তি আছে। 

বছর শেষ হয়ে আসছে বলেই হয়তো ছুটির কথা ইদানিং বেশি বেশি মনে পড়ছে। আগের বছরটা (২০১৬) যেমন খরা ছিল, ছুটির বিচারে এ বছরটা ছিল ততটাই ভরা। বারোটার মধ্যে আটটা ছুটিই ছিল শুক্র কিংবা সোমবারে, বাকি চারটে মঙ্গল বা বৃহস্পতি। এরকম ত্র্যহস্পর্শযোগ আমার জীবৎকালে আর হবে কী না কে জানে।

চিন্তা হচ্ছে, বছরটাকে আর বছরের ছুটিগুলোর যথেষ্ট সদ্ব্যবহার করতে পারলাম কি? বছরের শেষ লম্বা ছুটিটা (শুক্রবার নবমী/দশেরা, সোমবার গান্ধীজয়ন্তী) আসন্ন। যদিও বেড়াতে যাওয়ার পক্ষে ছুটিটা বিশেষ সুবিধের নয়, কারণ সবারই ছুটি, সবাই বেড়াতে যাবে। তবু একেবারে বাড়িতে বসে নষ্ট করতে মন চায় না।

কিন্তু যাব কোথায়? টু ট্র্যাভেল লিস্ট তো উপচে পড়ছে। ভেবে রেখেছিলাম এ বছর ডুয়ার্স যাবই, কেরালা বাকি রয়ে গেল, আন্দামান হল না। মাঝখান থেকে হঠাৎ দুজনের মাথাতেই পুরী ঘাই মারছে ঘুরে ফিরে। পাক্কা আট বছরের ঘেঁষাঘেঁষির পরও যে স্বর্গদ্বারে পাশাপাশি বসে চমচম খাওয়ার সময় হয়নি আমাদের, মনে পড়লে শিউরে উঠছি। বা টাইগার হিলে মাংকি টুপি পরে দাঁড়িয়ে কুয়াশা দেখে তাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা বলে চালিয়ে দেওয়ার, মনে করলে নিজেদের ক্ষমা করতে পারছি না।

তার মধ্যে ক্রমাগত নতুন নতুন জায়গার খবর আসছে। আমার ডেস্ক প্রতিবেশী ‘স’ কেরালার লোক , যদিও নাম শুনে আর চেহারা দেখে আমি হান্ড্রেড পার সেন্ট শিওর ছিলাম বাঙালি। ডেস্কটপে মালয়ালম খবরের কাগজ খোলা দেখেও সন্দেহ হয়নি, উল্টে মারাত্মক ইমপ্রেসড হয়েছিলাম। আরে বাঃ, মালয়ালম পড়তে পারা বাঙালি। (একটু মিথ্যাচার হল, আমি লেখাটা মালয়ালম বলে চিনতে পারিনি, ‘সাউথ ইন্ডিয়ান’ স্ক্রিপ্ট এটুকুই বুঝেছিলাম, এবং ইমপ্রেসডও হয়েছিলাম ‘সাউথ ইন্ডিয়ান’ স্ক্রিপ্ট পড়তে পারা বাঙালি ধরে নিয়েই।) 

আমি কেরালা যেতে চাই শুনে ‘স’ জিজ্ঞাসা করল কেরালার কোথায় যেতে চাই। আমি চেনা নামগুলো বললাম। “শান্তিতে ঘুরতে চাইলে ওসব জায়গায় না গিয়ে এখানে এখানে যাও,” বলে স চারটি অচেনা নাম দিল। ডেস্কে ফিরে এসে সে সব জায়গার ছবি দেখে আমার সত্যি সত্যি মনে হচ্ছিল এক্ষুনি ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়ি, বেরোনোর আগে অর্চিষ্মানকে চ্যাটে জায়গাটার ল্যাটিচ্যুড লংগিচ্যুড জানিয়ে দিয়ে যাই।

আরেক ‘স’, কিছুদিন আগে চলে গেছে অফিস ছেড়ে, যাওয়ার আগে বলে গেল, “আর কোথাও যাও না যাও পণ্ডিচেরিটা ঘুরে এস।” এত আন্তরিক ভাবে বলল, হাতের পেপার ফেলে রেখে ফোন বার করে অপূর্ব সব ছবিও দেখাল যে একরকম মনস্থির করেই ফেললাম। অর্চিষ্মানেরও নাকি অনেকদিনের ইচ্ছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, “বলনি কেন?” পণ্ডিচেরিতে বুঁদ হয়ে আছি, হোটেলমোটেল সব পছন্দ হয়ে গেছে, এমন সময় বাবার ফোন, ছোটদাদু-দিদা দিল্লিতে। গেলাম একদিন দেখা করতে, দাদুরাও এলেন। বেড়ানোর গল্প হল খুব। দিদা বললেন, “আর কোথাও না যাও সোনা, শ্রীখোলা একবার যেও, আর ক্ষীরসু -টাও বাদ দেওয়ার মানে হয় না।”

বাবা বলে রেখেছেন, গোকর্ণ। বিজাপুর। ম্যাঙ্গালোর। 

মা মাঝে মাঝে মনে করান। গরুমারার কটেজের বারান্দায় বসে বৃষ্টি। সূর্য ডোবার ঠিক আগে মূর্তি নদীর তীর।  

এদিকে ক্যালেন্ডারে বছর শেষ, বছরের শেষ ভদ্রস্থ ছুটিটাও ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। অথচ আমাদের এখনও কোথাও যাওয়া ঠিক হয়নি। খুব দূরে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তাই পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছি, টেন/ ফিফটিন/ফিফটি অফ বিট উইকএন্ড/ লং উইকএন্ড ডেস্টিনেশনস অ্যারাউন্ড ডেলহি।

মুশকিল হচ্ছে, পঁচিশটা সাইটে যদি একটাই অফ বিট ডেসটিনেশনের নাম পঁচিশবার লেখা থাকে, তাহলে সেটা যথেষ্ট অফ বিট কি না সে সন্দেহ হয়।

সব মিলিয়ে কেমন একটা হতাশা জাগছে। শেষে না সি আর পার্কের প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে বুড়ির চুল খেয়ে কাটাতে হয়। সেটা যে আমার খারাপ লাগবে তা নয়। তাছাড়া গীতাদি আজ সকালে যাওয়ার সময় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে গেলেন, “মেলা গ্রাউন্ডের ঠাকুরটা এ বছর দারুণ হবে। অলরেডি ছবি টাঙিয়ে দিয়েছে, মনে হচ্ছে মা এক্ষুনি ঝাঁপিয়ে নামবে।”তবু এখন যখন ভাবছি বছর শেষ, ছুটি শেষ, তখন বেড়াতে না যেতে পারাটাকে চরমতম শাস্তি মনে হচ্ছে। 

তাই আমি আপনাদের শরণাপন্ন হয়েছি। বেড়াতে যদি না-ই যেতে পারি, অন্তত বেড়ানোর গল্পে নিজেকে মুড়ে রাখি। তাছাড়া এই সুযোগে আরও কয়েকটা নাম লিস্টে জোড়া হবে। দুঃখ হলে লিস্ট নেড়েচেড়ে, ইন্টারনেটে সে সব জায়গার ছবি দেখব। 

একবার ভেবেছিলাম, শর্ত দেব। অ্যারাউন্ড ডেলহি, অফ বিট, ওভারনাইট জার্নি হ্যানাত্যানা। কিন্তু দিলাম না। আমার দাবি একটাই, আপনারা আমাকে এমন জায়গার গল্প বলুন যেখানে গিয়ে আপনাদের ভীষণ আনন্দ হয়েছিল, মনে হয়েছিল আবার আসব, না এসে থাকতেই পারব না। সে জায়গা পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে হতে পারে, চাঁদে হলেও আপত্তি নেই। 

এই আমি অপেক্ষায় বসলাম।


September 10, 2017

যকের ধন




উৎস গুগল ইমেজেস


সিনেমার টিকিট কাটার সময় আমাদের সর্বদা প্রায়োরিটি থাকে, সাধ্যে কুলোলে, হলের শেষ সারির টিকিট কেনার।

আপনারা যে কারণে ভাবছেন, সে কারণে নয়। 

সিনেমা হলের সবথেকে পেছনের সারির টিকিট কেনার আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য, আমার সিটের পেছনে ক্রমাগত কেউ যাতে লাথি না মেরে যেতে পারে সেটা সুনিশ্চিত করা। যাতে অবশেষে আমাকে পেছন ফিরে অনুরোধ করতে না হয়,“দাদা/দিদি/ভাই/বোন, এই বেলা একটু ক্ষান্ত দিন।” যাতে তারপর একটা বিশ্রী, আড়ষ্ট অস্বস্তি মনমাথা না ছেয়ে থাকতে পারে।

আপনারা হয়তো মনে করছেন আমি একটি রগচটা সহদর্শক, পায়ের ভাঁজ খুলে এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে যেতে গিয়ে একবার আলতো খোঁচা লাগলেই খাঁড়া নিয়ে লাফিয়ে পড়ি। আফটার অল, সেই প্রবাদটা তো আছেই, সারাদিন যদি আপনার সবাইকে দেখে গা জ্বলে তাহলে দোষটা বাকিদের থেকে আপনার গায়ের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

কাজেই আমাকে যদি সব হলে, সব সিনেমার, সব শোতে কেউ না কেউ লাথি মারে, তাহলেও দোষটা সে লোকটার পায়ের থেকে বেশি আমার পিঠের হওয়ার কথা, কিন্তু আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, ঘটনাটা সেরকম নয়। আমি দাঁতে দাঁত চেপে গোটা সিনেমা জোড়া পায়ের লাথি খেয়ে চুপ করে থাকার চেষ্টা করেছি, অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছি, এমনকি আমার পিঠে লাথির শব্দ এবং কম্পনে চমকে গিয়ে অর্চিষ্মান চমকে ঘাড় ঘুরিয়েছে এমনও হয়েছে। 

এবং মেনে নিয়েছে, বা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে, যে লাথি-মারা লোকদের সঙ্গে আমার সিটের একটা অলৌকিক সমাপতন আছে।

'যকের ধন' দেখব ঠিক করা ছিল, সে নয়ডা গিয়ে হলেও, তারপর কতগুলো ঘটনা এমন ঘটল যে আমরা নিশ্চিত হলাম যে সিনেমার দেবতা আমাদের 'যকের ধন' দেখাতে চান। শুক্রবার খেয়াল করলাম নয়ডার সঙ্গে সঙ্গে সাকেতেও চলছে 'যকের ধন'। তারপর এস এম এসে ওলাঅটোর প্রোমোশন কোড এসে গেল, আর আমরা সত্তর টাকার রাস্তা (মিটারে পঞ্চাশ) চব্বিশ টাকায় পৌঁছে গেলাম।

যতটুকু টাকা বাঁচল তার পাঁচগুণ খরচ করে পপকর্নের গামলা আর কোল্ড ড্রিংকসের বালতি নিয়ে হলে ঢুকে বসলাম। চেয়ারের পিঠ হেলিয়ে দেওয়ালে ঠেকালাম, শান্তিতে মন ছেয়ে গেল। সিনেমা চলাকালীন আড়চোখে দেখলাম, অর্চিষ্মানের ওপাশে বসা ভদ্রলোকটি ক্রমাগত সামনের সিটে লাথি মেরে চলেছেন। আমার আরাম দ্বিগুণ হয়ে গেল। 

সবার রিভিউতে পড়লাম, হেমেন রায়ের মূল গল্প থেকে সিনেমার গল্প বেশ খানিকটা আলাদা। বইয়ের গল্প আমি সম্পূর্ণ ভুলে গেছি, কাজেই কোথায় কোথায় আলাদা বলতে পারব না, সিনেমার গল্পটাই বলি আপনাদের। বিমল প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক,কুমার তার বন্ধু, অ্যাড এজেন্সিতে কাজ করে। (অ্যাড এজেন্সিতে কাজ করানোর একটা সুবিধে হচ্ছে পৃষ্ঠপোষকদের প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট। যেমন ধরা যাক, কুমার যদি চ্যাম্পিয়ন ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপনের প্রোজেক্টে কাজ করে, তাহলে ল্যাপটপ স্ক্রিন থেকে 'চ্যাম্পিয়ন'-এর বিজ্ঞাপন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকায় অস্বাভাবিক কিছুই নেই।)  

যাই হোক, বাড়ির পুরোনো ঘর থেকে কুমারের বড় ঠাকুরদা বীরেন্দ্র রায়ের বাক্স উদ্ধার হয়, ভেতর থেকে বেরোয় একখানা মড়ার মাথার খুলি। খুলির ওপর নানারকম অদ্ভুত সংখ্যাটংখ্যা লেখা। নির্ঘাত গুপ্তধনের সঙ্কেত। এদিকে ভারতীয় জাদুঘরের অ্যাসিস্ট্যান্ট কিউরেটর হিরণ্ময়কে (কৌশিক সেন) তলব করেন করালী (সব্যসাচী চক্রবর্তী)। করালীর কাছেও রয়েছে একখানা উচেন লিপিতে লেখা কাগজ। এইবার ভালো লোক দুষ্টু লোক সবাই মিলে গুপ্তধন ধাওয়া করে। দ্বিতীয়ার্ধ্বে শর্মিষ্ঠা ( প্রিয়াঙ্কা সরকার), শম্ভু গোম্পা (সমিধ মুখার্জি) ইত্যাদি চরিত্ররা আসে। প্রিয়াঙ্কা সরকারের চরিত্রটা একটু জোর করেই ঢোকানো হয়েছে মনে হয়, তবে সেটা ভালোই হয়েছে, একেবারে মেয়েশূন্য গল্প ভালো দেখাত না।

আড়াইঘণ্টার সিনেমার প্রথমার্ধটা আমার খারাপ লাগেনি, যদিও অ্যাডভেঞ্চার মিস করছিলাম। যকের ধন-এর গল্প ভুলে গেছি বটে, কিন্তু তাতে অ্যাডভেঞ্চার যে ভরপুর ছিল, সেটা ভুলিনি। ফার্স্ট হাফে গল্প কলকাতাতেই ঘোরে, যদিও পটপরিবর্তনের জন্য গুচ্ছ পুরোনো বাড়ির ছাদ, ভারতীয় জাদুঘরের রাজকীয় বারান্দা, প্রেসিডেন্সির ঐতিহ্যশালী সিঁড়ির ব্যবহার করেছেন পরিচালক। সেগুলো সব গল্পের প্রয়োজনেই হয়েছে, কাজেই কিছু বলার নেই, কিন্তু মাঝে একবার বিমল আর কুমার গঙ্গাবক্ষে লঞ্চের ওপর আলোচনারত ছিলেন, সেটার কোনও কারণ আমি খুঁজে পাইনি। (যদি না “এক নাগাড়ে স্টুডিওর বদ্ধ পরিবেশে শুটিং চিত্র তারকাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর” এই আপ্তবাক্যটি পরিচালক মাথায় রেখে এ সিদ্ধান্ত নেন। সম্ভাবনাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কেন পরে স্পষ্ট হবে।)

অ্যাডভেঞ্চার ভরপুর আছে সেকেন্ড হাফে। আর সেই সব অ্যাডভেঞ্চার সামলাতে গিয়ে সিনেমাটা একটু নড়বড়ে হয়ে গেছে মনে হয়েছে আমার। ক্লাইম্যাক্সে রাতের বেলা ঘন বনের ভেতর গোলাগুলি চলছে, কাজেই আলোর অনুপস্থিতি প্রত্যাশিত, কিন্তু সেটা একই সঙ্গে কী-থেকে-কী-হয়ে-গেল গোছের একটা ফিলিং জাগায়। 

সিনেমাটায় ভালো জিনিস আছে অনেক, দেখলে উত্তরবঙ্গে বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে। সব্যসাচীকে তো আমি পছন্দই করি, বেশ কিছুদিন ধরে দুষ্টু লোকের ভূমিকায় দেখার পর কৌশিক সেনকে হীরুদার চরিত্রে বেশ পছন্দ হয়েছে আমার। বাংলা সিনেমার হিরো হয়েও যে এত স্পষ্ট উচ্চারণে বাংলা বলেন, সেটার জন্য পরমব্রতর একটা জোর হাততালি প্রাপ্য।  

তাছাড়া বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সুকুমার রায় এবং আবোলতাবোলের অবদান নিয়ে আপনার মনে যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহ থেকে থাকে, তাহলে বিমলকে আড়াইঘণ্টা স্ক্রিনে দেখার পর আর থাকবে না। বাংলা সিনেমায় সত্যজিৎ এবং সোনার কেল্লার অবদানের গুরুত্ব নিয়েও। গড়পারের রায়চৌধুরীদের নিয়ে বিমল অবসেসড। কথায় কথায় আবোলতাবোল আবৃত্তি করে, ফেলুদার ডায়লগ বলে। এতবার বলে যে সন্দেহ হয় অবসেশনটা বিমলের, নাকি পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের, হাতের মুঠোয় একটা চরিত্র পেয়ে তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারেননি? 

লাস্ট সিনে স্পষ্ট হয়ে যায় সিকোয়েল আসছে। বলাই বাহুল্য, দেখব। 


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.