September 01, 2014

কুইজঃ আমি কে?



শিল্পীঃ James Baillie Fraser


সাতজনই বাঙালি, সাতজনকেই আমাদের চেনার কথা। সাতজনের মধ্যে ক’জনকে আপনি চেনেন সেটা পরীক্ষার জন্যই আজকের কুইজ। উত্তর দেওয়ার জন্য সময় থাকল চব্বিশ ঘণ্টা। দেশে মঙ্গলবার রাত আটটা, নিউ ইয়র্কে সকাল সাড়ে দশটা পর্যন্ত। ততক্ষণ কমেন্টে পাহারা থাকবে।

অল দ্য বেস্ট।

*****

১. জীবনের বিভিন্ন সময়ে আমার পদবী ছিল ঘোষ রায় চৌধুরী এবং দত্ত। আমি থেকেছি ফরিদপুর, কলকাতা এবং বম্বেতে। আমার বিখ্যাত স্বামীও আমার মতোই রুপোলি পর্দার জগতের মানুষ ছিলেন। ভারতবর্ষের একটি ডাকটিকিটে আমার ছবি আছে।

২. ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ফোটো এনগ্রেভিং, লিথোগ্রাফি, হাফটোন ব্লকমেকিং – আমার পড়াশোনা ও প্যাশন আমার লেখা এবং প্রকাশিত হওয়া কয়েকটি রচনার নাম Halftone Facts Summarized (Penrose Annual,1912), Standardizing the Original (Penrose Annual, 1913-'14)এ সব কারিগরি লেখালেখি ছাড়াও আমার বাংলা লেখালিখির শখ ছিল। আমার লেখা একটি দীর্ঘ কবিতার নাম ‘অতীতের কথা’। যদিও এটি আমার লেখা বিখ্যাততম কবিতা নয়।

৩. জন্ম উনিশশো চুয়াত্তরে। চার বছর বয়স থেকে স্টেজে গাইতাম। ন’বছর হওয়ার আগেই রেডিও টিভিতে মুখ দেখানো হয়ে গিয়েছিল। ইংরিজি অনার্স করে বেরোনোর পর বি. এড., তারপর টাকি মাল্টিপার্পাসের মাস্টারমশাই। এগারো বছর পর ‘ধুত্তেরি’ বলে সব ছেড়েছুড়ে গানকেই সম্বল করি। ভুল করিনি নিশ্চয় কারণ অলরেডি বেস্ট মেল প্লেব্যাক সিংগারের জন্য জাতীয় পুরস্কার পাওয়া হয়ে গেছে। ও, আর আমার ছেলের নাম রূপ আরোহণ প্রমেথিউস।

৪. আমার জন্ম রূপের বাবার জন্মের অনেক আগে। তা প্রায় ধরুন চোদ্দশো পনেরোশো বছর আগে। সত্যি বলতে কি সে সময় বাংলাদেশ বলতে কিছু ছিল না। গুপ্ত সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যাওয়ার পর সাত ভূতে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছিল। আমি তাদের থেকে খানিকটা জায়গা কেড়েকুড়ে নিয়ে আমার রাজত্ব স্থাপন করি। যেটাকে আপনি আদি বাংলা বলতে পারেন। তখন উইকিপিডিয়া ছিল না কিনা তাই আমার সম্পর্কে বেশি জানা যায় না। জানতে হলে পড়তে হবে হিউয়েন সাং, বাণভট্ট আর বৌদ্ধ বই আর্যমঞ্জুষামূলাকল্প। তবে ও সব না পড়াই ভালো। ও ব্যাটারা সব হর্ষবর্ধনের চ্যানেলের কেনা সাংবাদিক ছিল আর আমাকে উঠতেবসতে গালি দিত। বোঝাই যাচ্ছে সে সব অপপ্রচার কারণ এই দেখুন দেড় হাজার বছর কেটে যাওয়ার পরও আমাকে নিয়ে কুইজ হচ্ছে। ও, আর আমার ছেলের নাম মানব।   

৫. হাওড়ার ছেলে। ২০১০ দিল্লি কমনওয়েলথ গেমসে ভারোত্তোলনে ছাপ্পান্ন কেজি বিভাগে রূপো পেয়েছিলাম, চার বছর পর গ্লাসগো কমনওয়েলথে সোনা জিতে সে দুঃখ ভুলেছি আমার সময়ে অবশ্য উইকিপিডিয়া আছে কিন্তু আমি ফুটবল, ক্রিকেট এমনকি প্রো-কাবাডিও খেলি না কিনা তাই আমার সম্পর্কে আর বেশি কিছু লোকে জানে না। এইটুকু ক্লু থেকেই আপনাদের যা বোঝার বুঝে নিতে হবে।

৬. আমি যখন দিল্লি এসেছিলাম তখন এ শহরে মোটরগাড়ি ছিল না, ইলেকট্রিসিটি ছিল না, সি. আর. পার্ক ছিল না, এমনকি অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তারখানাও ছিল না। আমিই দিল্লির প্রথম অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার। লোকে আমাকে ভগবানের মতো মানত। দেশীরা তো আসতই, ইংরেজরা পর্যন্ত আমার কাছে চিকিৎসা করাতে আসতেন। এখন বাঙালিরা দিল্লি গেলে হয় বঙ্গভবন নয় কালীবাড়িতে থাকে, তখন আমার বাড়িতে থাকত। রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, শরৎচন্দ্র, সুভাষ বোস, সবাই আমার দিল্লির বাড়িতে থেকে গেছেন। দিল্লিতে দুর্গাপুজোয় এখন যে এত হুড়োহুড়ি তার সূচনাতেও আমার হাত আছে।

৭. আমি আদ্যোপান্ত কলকাতার লোক। জন্ম থেকে শুরু করে জিওলজিতে পি. এইচ. ডি. পর্যন্ত সব আমার কলকাতায়। যাদবপুর ইউনিভার্সিটি। পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে টানত পাহাড়। দার্জিলিঙের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে আমাকে পাহাড়ে চড়তে শিখিয়েছিলেন খোদ তেনজিং নোরগে। আর এই জিওলজি, মাউন্টেনিয়ারিং সব মিলিয়েমিশিয়েই উনিশশো তিরাশি সালে আমি পাড়ি দিয়েছিলাম সেই অ্যান্টার্কটিকা। তারপর আরও কয়েকবার গেছি, কিন্তু ফিরে এসেছি সেই কলকাতায়। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে।


August 31, 2014

ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে পুঁই শাকের চচ্চড়ি





মা তোমার কি মনে আছে আজ থেকে প্রায় লক্ষাধিক বছর আগে তোমার একটা মেয়ে হয়েছিল?

লক্ষাধিক কোথায়! এই তো মোটে তেত্রিশ বছর . . . আচ্ছা চৌত্রিশই না হয় হল। এরই মধ্যে ভুলে যাব?

রকমসকম দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। ফোনটা ভালো করে চোখ মেলে দেখ একবার। অন্তত সাতটা কল করেছি সকাল থেকে।

সাআআআত? কই আমি তো একটাও দেখলাম না? সরি সোনামা, সরি সরি . . .

জঘন্য। ফেলে দাও তোমার ফোন। মা, তোমাকে একটা স্মার্ট ফোন দেব গো পুজোয়? বেশ টাচ স্ক্রিন?

খবরদার না সোনা। এই বোতামটেপা ফোনই আগে সামলে নিই। কী করছিস মা ছুটির দিন বসে বসে?

কিসুই না। করার মতো একটা ভদ্রস্থ কাজই নেই। খালি টিভি দেখছি আর বোর হচ্ছি। তুমি এত কাজ পাও কোত্থেকে ভগবানই জানেন।

আমার আবার কাজ কোথায় দেখলি? সকাল থেকে উঠে খালি খাচ্ছি আর খাওয়ার পর আবার কী খাব ভাবছি। ব্যস। এই তো কাজ।

কী খাবে গো মা?

ওরে বাবা, কত কিছু যে খাব। বলতেও লজ্জা করে। এই তো সাড়ে ছ’টার সময় চা বিস্কুট খেলাম। তারপর ন’টা বাজতে না বাজতেই এমন খিদে পেয়ে গেল যে দুধরুটি খেতে হল। এখন মীরামাসি উচ্ছে ভাজা, টমেটো দিয়ে ডাল, আলুপটলের তরকারি আর বেগুন দিয়ে ইলিশ মাছ রাঁধছে, একটা বাজতে না বাজতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সেগুলো আবার খাব।

মা! মিল মিল! আমরাও আজ ইলিশ খাব। শোনো না মা, আমাদের না ভেজে খেতে খেতে মাছের পিসগুলো সব খাওয়া হয়ে যায়, খালি মাথাটা পড়ে থাকে। আমি বুদ্ধি খাটিয়ে কাল পুঁইশাক কিনে এসেছি। তুমি একটা সেই চচ্চড়ি মতো করতে না মাথাটাথা শাকটাক দিয়ে?

করতাম তো।

একটু রেসিপিটা বল না মা।

ধুর, অত সোজা রান্নার আবার রেসিপি কীসের। বলে দিচ্ছি, শোন। কিন্তু চচ্চড়িতে তো আরও কিছু তরকারি লাগে, আলু বেগুন কুমড়ো . . . কিনেছিস সে সব?

আলু কুমড়ো কিনেছি। বেগুন কেনার জো নেই। সবার নাকি অ্যালার্জি।

আহা, সে অনেকেরই অ্যালার্জি হয় বেগুনে। বেগুন ছাড়াই দিব্যি হবে। প্রথমেই মাছের মাথাটা ধুয়ে নুনহলুদ মেখে রেখে দেবে। ইলিশমাছ অবশ্য বেশি ধুতে নেই, গন্ধ চলে যায়। তবে মাথা তো, তুমি ভালো করেই ধুও।

হ্যাঁ হ্যাঁ, পাগল নাকি। গন্ধের মায়ায় শেষে কলেরা হয়ে মরি আরকি।

আঃ সোনা, এ সব কী পচা কথা!

আচ্ছা আচ্ছা, তারপর বল।

মাছ রেখে দিয়ে পুঁই শাকটা ধোবে শাকে কিন্তু ভীষণ মাটিঝাটি লেগে থাকে সোনা, তোমার ওই যে ঝাঁঝরি মতো জিনিসটা আছে সেটায় রেখে একেবারে কলের তলায় ধরে খচরমচর করে ধোবে। তারপর জল ঝেড়ে টুকরো টুকরো করে কাটবে। সাবধান, হাত যেন না কাটে।

তারপর?

ডাঁটাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিস না কিন্তু সোনা। পুঁইয়ের আসল মহিমা ওই ডাঁটাতেই। একেবারে গোড়ার দিকের শক্ত জায়গাগুলো বাদ দিবি, তাছাড়া সব যাবে। আলু, কুমড়োও মাপমতো কেটে নিবি। মুলো দিলেও বেশ হয়। কিনেছ নাকি?

পাগল নাকি? আমার রান্নাঘরে মুলো ব্যান। বেগুনের বদলা।

আঃ সোনা, বদলা আবার কী? একসঙ্গে থাকতে গেলে একে অপরের পছন্দঅপছন্দ মানিয়েগুছিয়ে চলতে হয়। দুজনেই একটুআধটু অ্যাডজাস্ট করবে। এর মধ্যে বদলার তো কিছু নেই।

ওরে বাবা মা, ওটা রসিকতা করেছিলাম। ঘাট হয়েছে। তারপর বল।

তারপর আবার কী, হয়েই তো গেল। মাছের মাথাটা ভালো করে ভেজে তুলে নিয়ে হাতা দিয়ে অল্প ভেঙে নিস। একেবারে গুঁড়ো করে ফেলিস না, আবার বিরাট বড় বড় টুকরোও রাখিস না। 

বুঝেছি। বাইট সাইজ।

ঠিক। এবার একই তেলেই পাঁচফোড়ন, শুকনো লংকা ফোড়ন দিবি। তেজপাতা আছে? না থাকলেও ক্ষতি নেই।

আছে আছে। শুকনো লংকা, তেজপাতা, ম্যাগি টেস্ট মেকার, আজিনামোটো সব আছে। আমার রান্নাঘরকে আন্ডারএস্টিমেট কোরো না মা, হুঁহুঁ।

না না, পাগল নাকি। ফোড়ন হয়ে গেলে এইবার তরকারি ছাড়বে। সব একসঙ্গে ছেড়ো না কিন্তু। কোনটার পর কোনটা ছাড়বে বল দেখি?

এটা আমি জানি। শক্ত থেকে শুরু করে নরম। প্রথমে যাবে আলু, পাঁচ মিনিট পর কুমড়ো, বেগুন থাকলে সেটা তারও পরে যেত। কিন্তু স্যাডলি বেগুন নেই। আর লাস্টে শাক দিয়ে ঢাকা দিয়ে দিতে হবে।

ভেরি গুড। এই তো আমার সোনা ক্রমশ রন্ধনে সৈরিন্ধ্রী হয়ে উঠছে। তরকারিগুলো ভাজার সময় মাপমতো নুন হলুদ দিস মনে করে। একটা কাঁচালংকা চিরে দিস। এক চিমটি চিনিও।

অ্যাঁ! চিনি! ছি ছি মা, তুমি না ঢাকাই বাঙাল?! তুমি কি না রান্নায় চিনি দিতে বলছ? ছি ছি ছি।

আহা, আমি কি গাদাগাদা দিতে বলছি নাকি। চচ্চড়িটচ্চড়িতে একটু মিষ্টি লাগে। চামচের একদম ডগায় করে এএএকটুখানি দিস। নিয়মরক্ষা।

নাঃ, আই অ্যাম ডিস্যাপয়েন্টেড। যাকগে, বলছ যখন দেব এক চিমটে। তারপর কী করব?

তারপর শাক ছেড়ে কড়াই ঢাকা দিয়ে এসে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে পালিয়ে এসে ফ্যানের তলায় বসে থাকবি। মাঝে মাঝে গিয়ে নেড়েচেড়ে দেখবি কদ্দূর হল। তলা ধরে যাচ্ছে দেখলে জলের ছিটে দিতে পারিস। তবে মনে হয় না লাগবে, শাক থেকেই যথেষ্ট জল বেরোবে।

বুঝেছি, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করব।

এক্স্যাক্টলি। যখন দেখবি গোটা ব্যাপারটা মিলেমিশে বেশ চচ্চড়িচচ্চড়ি দেখতে হয়েছে তখন বুঝবি রান্না শেষ। তখন ভেজে রাখা মাছের মাথাটা দিয়ে নেড়েচেড়ে গ্যাস বন্ধ করে দিবি। ব্যস। বাকি থাকল শুধু আরাম করে খাওয়া।

গুড। খেয়ে তোমাকে বলব কেমন হল। তোমার মতো হবে না, স্টিল।

ভ্যাট্‌, আমার থেকে ভালো হবে দেখিস।

সান্ত্বনা দিও না মা, তুমিও জান তোমার মতো হবে না। তুমিও তো বল তোমার রান্না কিছুতেই দিদিমার মতো হয় না। যাই হোক। শোন না মা, এখন রাখি। অনেক কথা বলে ফেলেছি। পরে আবার ফোন করব। অবশ্য যদি তুমি শুনতে পাও।

শুনতে পাব না মানে? এই আমি ফোন আঁচলে বেঁধে রাখলাম। এবার দেখবি একটা রিং হতে না হতেই খপ করে তুলে হ্যালো বলব।

বোঝা গেছে। ঠাকুমার সঙ্গে এখন আর কথা বললাম না, কাল বলব।

ঠিক আছে, আমি বলে দেব’খন।

রাখছি মা। টা টা।

টা টা সোনামা।
  

  

সাপ্তাহিকী




এক সুইডিশ মহিলা, এক নিও-নাৎজির মাথায় ব্যাগের বাড়ি মারছেন। শোনা যায় ভদ্রমহিলা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প সারভাইভার ছিলেন। উনিশশো পঁচাশির ছবি। সাহসী নারীদের এ রকম ছবি আরও দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।


Everybody does have a book in them, but in most cases that's where it should stay.
                             -Christopher Hitchens

দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আড়াইশোরও বেশি মৃত্যুদণ্ড প্রত্যক্ষ করেছেন Michelle Lyons। তাঁকে আমি হিংসে করি না।

মাল্টিটাস্কিং-এর বলিহারি বোধহয় একেই বলে। কফিও হবে, ঘুমও ভাঙবে। আমার জন্য অবশ্য কফির জায়গায় চা হলে ভালো হয়।

আমি হাই তুললেই অর্চিষ্মান হাই তোলে। আবার ও হাই তুললেই আমি হাই তুলি। কেন? বিজ্ঞানীরাই জানেন।

If your name is uncommon, you are more likely to be a delinquent.
এই সব আর্টিকেলের যে কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই সেটা ওপরের বাক্যটা থেকেই বোঝা যায়। আমি আর যাই হই, delinquent ছিলাম না কোনও দিন।

আমি আনন্দ পাওয়ার জন্য ঘুমোই, আর এরা এই করে বেড়ায়।

সুতীর্থর পাঠানো লিংক থেকে শিখে নিন, কী করে নিজের বাজনা নিজে বানিয়ে নিজেই বাজানো যায়।


গোটা উইকএন্ড ধরে একটা লেখার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চোখ ব্যথা হয়ে গেল। এখন কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না, যেই না ডিরেক্টরের কাছে যাবে অমনি সাড়ে তিনখানা টাইপো বেরিয়ে পড়বে।

রামচন্দ্র চোদ্দ বছরের জন্য বনে গিয়েছিলেন, ইনি গিয়েছিলেন প্রায় তিরিশ বছরের জন্য। স্বেচ্ছায়।

যমুনা কিনারে মোরা গাঁও। বড় ভালো লেগেছে আমার। আপনাদের?


August 30, 2014

R. I. P. / তৃতীয় ও শেষ পর্ব




বরাভয় বাগচী, সাহিত্যসভা আহ্বায়ক ও মানেবই লেখক, ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলেন যে, যে অবিরাম ভট্টাচার্যকে তিনি গত তিন বছর ধরে পাত্তা দেননি, তিনি মৃত্যুর পর হঠাৎ করে ভয়ানক বিখ্যাত হয়ে গেছেন। বরাভয়ের মনে পড়ল যে গত আড্ডায় অবিরাম তাঁর লেখা একটি কবিতার ম্যানুস্ক্রিপ্ট জমা রেখে গিয়েছিলেন। বরাভয় সেখান থেকে একটি লাইন কোট করে স্ট্যাটাস মেসেজ দিয়ে দিলেন।

অবিরামকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে ষণ্ডা গেল হেড অফিসে। সেখানে গিয়ে অবিরামের যমরাজার সঙ্গে দেখা হল। যমরাজের কাছে অবিরাম খবর পেলেন যে যদিও বেঁচে থাকতে তাঁর কবিতা এমনকি কোনও ওয়েবজিনে পর্যন্ত ছাপা হয়নি, তবু তিনি মর্ত্যে বিখ্যাত হয়ে গেছেন। তিনি এটাও জানতে পারলেন যে বিখ্যাত লোকেরা মারা গেলে আজকাল তাঁদের অনলাইন শ্রাদ্ধ হয়, যেটাকে ভালো ভাষায় RIP পার্টিও বলে। যমরাজের ফেক ফেসবুক প্রোফাইল ‘চিরসখা’র সাহায্যে অবিরাম সাক্ষী হলেন তাঁর জন্য আয়োজিত RIP পার্টির।


*****


উচ্চমেধার টপ ফ্লোরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন অবিরাম। অত উঁচু থেকে চারপাশের বনটাকে সবুজ সমুদ্রের মতো দেখাচ্ছে। গাছের মাথাগুলো যেন ফুলে ওঠা ঢেউ, শূন্যে স্তব্ধ হয়ে গেছে। অভিভূত ভাবটা কাটছিল না অবিরামের। কালকের অভিজ্ঞতাটা ভুলতে পারছিলেন না কাল তিনি নিজে চোখে দেখেছেন মানুষ তাঁকে চিনেছে, সম্মান দিয়েছে, তাঁর লেখা পড়েছেপাটুলির ওই স্যাঁতসেঁতে এক কামরার ফ্ল্যাটে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে লেখা কবিতার লাইন মুখে মুখে ফিরেছে পাঠকের মুখে মুখে।

অবিরামের চোখ জ্বালা করে এল। আজীবন বুকের ভেতর যে না-পাওয়ার শূন্যতাটা বয়ে বেড়িয়েছেন তিনি, মরণের পর তা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। আর এই পূর্ণ করার কৃতিত্ব যে মানুষটার, তাঁর নাম বরাভয় বাগচী। বরাভয়দার মুখটা কাল থেকে বড্ড মনে পড়ছে অবিরামেরসাহিত্যসভার ভিড়ের পেছনে বসে যে হামবাগ, দাম্ভিক মুখটা দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন অবিরাম সে মুখটা নয়। অন্য একটা মুখদয়ামায়া সহানুভূতি শ্রদ্ধা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ একটা মুখ। একজন শিল্পীকে মৃত্যুর পর তার প্রাপ্য সম্মানের অধিকার দিতে উদ্যোগ নেওয়া একটা মুখ

অবিরামের কোনওদিন বলার মতো ব্যাংক ব্যালেন্স ছিল না, গায়ে জোর ছিল না, চরিত্রে দৃঢ়তা ছিল না। কিন্তু যে জিনিসটা চিরদিন তাঁর দরকারের থেকে অনেক বেশি ছিল, তা হল কৃতজ্ঞতাবোধ। ফতুয়ার হাতায় চোখ মুছে নিলেন অবিরাম। বনের ও পারে, অদৃশ্য দেওয়ালের ও পারে, খাঁ খাঁ ধূসর মাঠের ও পারে, জীবনমৃত্যুর সীমানার ও পারে ফেলে আসা একটা পৃথিবীর একটা শহরের কথা ভীষণ মনে পড়তে লাগল অবিরামের


*****


সিরিয়াল দেখতে দেখতে ডিনার করার পরও খানিকটা জেগে থাকেন বরাভয়, এ গ্রুপে সে গ্রুপে ঘোরেন, টুকটাক গেম খেলেন, ইচ্ছে হলে দুয়েকটা স্ট্যাটাস লেখেন। আজ আর কিছু করতে ইচ্ছে হল না। অবিরামকে নিয়ে উন্মাদনাটা যে এই লেভেলে পৌঁছবে সেটা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। দিকে দিকে অবিরাম ভট্টাচার্যকে নিয়ে অভূতপূর্ব উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে। সারাদিন দফায় দফায় চ্যাটে, ফোনে লোকে অবিরাম ভট্টাচার্যের সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। সে কেমন ছিল, কী খেতে ভালোবাসত, কোন পার্টি করত, কোন পার্টির গুষ্টির পিণ্ডি চটকাত, তার বাবামাভাইবোনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন ছিল, বৈধঅবৈধ প্রেম ছিল কি না – সব নিয়ে লোকের কৌতূহলের আর সীমা নেই। বরাভয় যতখানি পেরেছেন বানিয়ে বানিয়ে কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করেছেন। সারাদিন ধরে এতগুলো মিছে কথা বলার ধকলে বরাভয়ের এখন রীতিমত ক্লান্তই লাগছে। ক্লান্তির সঙ্গে অবশ্য খুশিও মিশে আছে। সন্ধ্যেবেলা ‘বিপ্লবী সাহিত্যিক ফোরাম’-এর সুপ্রকাশ ফোন করে জানিয়েছে আগামী শনিবার ‘অগত্যা অবিরাম’ শীর্ষক একটি আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠান বেশি দীর্ঘ নয়, উদ্বোধনী সংগীত, দুটো লাইটওয়েট, একটা হেভিওয়েট বক্তৃতা। শুরুতে ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’ বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন প্রাবন্ধিক পরিমল পাণ্ডা এবং ‘সমকালীন মূল্যবোধের প্রসারে কবির দায়িত্ব’ বিষয়ে বলবেন ব্লগার বিনয় বসু। অনুষ্ঠানের মেন বক্তৃতাটার দায়িত্ব ওরা বরাভয় ছাড়া কাউকে দিতে ভরসা পাচ্ছে না। হাজার হোক অবিরামকে ব্যক্তিগত স্তরে পরিচয়ের সুবিধে বরাভয় ছাড়া আর কারও নেই। সব কিছু শুনেটুনে বরাভয় রাজি হয়ে গেলেন তিনি বক্তব্য রাখবেন ‘কমরেড কবি অবিরাম ভট্টাচার্যঃ জীবন ও মরণোত্তর প্রভাব’ সম্পর্কে। বক্তৃতা দেওয়াটা এখন জলভাত বরাভয়ের কাছে। যাওয়ার আগে খালি আরও ম্যানুস্ক্রিপ্টটা নিয়ে বসে বারকয়েক ক্রিকেট খেলে কোটেশনের স্টকটা একটু বাড়িয়ে নিতে হবে। ব্যস। 

দিনের শেষ মেসেজ ‘গুডনাইট, RIP অবিরাম’ লিখে ফেসবুকের দোকান বন্ধ করে বেরিয়ে এলেন বরাভয়। নিয়ম মতো ইসবগুল খেয়ে শুয়ে পড়লেন। বেশ সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে আজ। বালিশে মাথা ঠেকানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যে তাঁর দু’চোখে ঘুম ঘনিয়ে এল।

রাত প’নে বারোটা নাগাদ স্বপ্নটা দেখতে শুরু করলেন বরাভয়। আশ্চর্য রিয়্যালিস্টিক স্বপ্ন। বরাভয় দেখলেন তিনি দোতলার দক্ষিণপূর্বের ঘরটাতে আরাম করে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন, জানালা দিয়ে চৈত্ররাতের হাওয়া ফুরফুরিয়ে ঘরে ঢুকছে। ঘুম ভেঙে যদি ঘড়ির দিকে তাকাতেন বরাভয় তাহলে দেখতে পেতেন স্বপ্নের ঘড়িতেও তখন ঠিক বারোটা বাজতে পনেরোঘুমের ঘোরে স্বপ্নের বরাভয় পাশ ফিরলেনআর ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর ঘরে তিনি আর একা নেইআরেকটা লোক আছে।

চোখ খুললেন বরাভয়। দক্ষিণের দেওয়ালের জানালাটা দিয়ে আসা চাঁদের আলো ঘরের মেঝেতে চৌকো একটা জ্যোৎস্নার ফালি তৈরি করেছে। কিন্তু চৌকোটা এখন আর শুধু চৌকো নেই। তার মধ্যে ছায়া দিয়ে কেউ একটা মাথা এঁকেছে, মাথার নিচে গলা, গলার নিচে বুক পেট – একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষ। হাত দুটো মানুষটা বুকের কাছে জড়ো করে রেখেছে, শরীরের ছায়ার সঙ্গে তারা মিশে গেছে, আলাদা করে দেখা যাচ্ছে না।

ছায়াটা তাঁর চোখের সামনে না চোখের ভেতর? রেটিনায় জমা জলীয় পদার্থরা নড়াচড়া করে নানারকম অবয়ব সৃষ্টি করে, এই ছায়াটাও কি তাদেরই সৃষ্টি? চোখের পলক দু’বার ঝাপটালেন বরাভয়। জ্যোৎস্নার ভেতর ছায়া যেমনকার তেমনটি রইল

অবিরাম এসেছিলেন অনেকক্ষণ। উচ্চমেধা হোস্টেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই যে তিনি মনস্থির করলেন, ‘আমি বরাভয়দার কাছে যাব’, করে যেই না এক পা বাড়ালেন, অমনি সোজা এই ঘরের ভেতর। দোতলায় ওঠা, জানালা গলে ঢোকা, এ সব কোনও সমস্যাই হল না। এসে পড়ে অবশ্য অবিরাম বুঝলেন টাইমিংটা একটু বেগড়বাই হয়ে গেছেস্বর্গের বারান্দা থেকে যখন রওনা দিয়েছিলেন তখন সেখানে ছিল খটখটে সকাল, আর এখন এখানে এসে দেখছেন ঘুটঘুটে রাত। এই সময় বরাভয়দাকে ঘুম থেকে তুলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে কি না এই সব সাতপাঁচ ভাবতে লাগলেন অবিরাম। আসার আগে বুকের ভেতর যে জোরটা টের পাচ্ছিলেন সেটা এখন আর পাচ্ছেন না। পৃথিবীর হাওয়াবাতাসেই এমন একটা কিছু আছে যা অবিরামের নাগাল পাওয়ামাত্র তাঁর ভেতর থেকে সমস্ত সাহস, আত্মবিশ্বাস শুষে নিয়েছে। বরাভয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন অবিরাম। ঘুমন্ত একজন লোককে যে এতখানি দাপুটে দেখাতে পারে অবিরাম কল্পনা করেননি।

ঠিক সেই সময়ে বরাভয়ের চোখ খুলে যাওয়ায় অবিরামের চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। অবিরাম এক পা এগোলেন। বরাভয়দা কি চিনতে পারবেন অবিরামকে? না পারার কথা নয়। গত চব্বিশঘণ্টায় তাঁর মুখ বাংলার সংস্কৃতি জগতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অবশ্য ছবির যা ছিরিসে দেখে আসল মানুষ চেনার আশা না করাই ভালো।

নিজের পরিচয় দেওয়ার জন্য মুখ খুললেন অবিরাম।

চিনতে পারছেন? বরাভয়দা?

চিনতে আবার পারেননি? চিনতে বরাভয় খুবই পেরেছেন। ছবির সঙ্গে আসল লোকের মিল থাকুক আর না থাকুক, ওই কুঁকড়ে দাঁড়ানো, বুকের কাছে জড়ো করা নুলোর মতো হাত দেখেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছেন তিনি। অবিরাম এসেছে। উঁহু, অবিরাম নয় অবিরামের প্রেতাত্মা। গত তিন বছরের অবহেলা আর উপেক্ষার জবাব দিতে এসেছে। প্রেতাত্মারা সব জানতে পারে। ও জেনে ফেলেছে যে বরাভয় ওর ম্যানুস্ক্রিপ্ট আসলে পড়েননি, স্রেফ বুক ক্রিকেট খেলে কোটেশন তুলে দিয়েছেন সেই রাগে প্রেত তাঁর ঘাড় মটকাতে এসেছে। বরাভয়ের গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোল না। ক্ষমা চাওয়ার জন্য হাত তুলে কান ধরার চেষ্টা করলেন, পারলেন না। তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমস্ত সাড় চলে গেছে। কাটা কলাগাছের মতো বরাভয়ের বিশাল বপু খাটের ওপর পড়ে রইল

উত্তর না পেয়ে অবিরাম আরও এক পা এগোলেন বরাভয়দা তাঁকে দেখতে পেয়েছেন। জানালা দিয়ে এসে পড়া চাঁদের আবছা আলোয় বরাভয়ের খোলা চোখদুটো কাঁচের গুলির মতো দেখাচ্ছে। জাম্বো সাইজের গুলি। বরাভয়দা চোখ এত গোল করেছেন কেন? মুখ এত বড় হাঁ? বরাভয়দা কি কিছু বলতে চাইছেন?

অবিরাম বরাভয়ের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লেন।

বরাভয়দা, আমি কী বলে আপনাকে ধন্যবাদ দেব জানি না। আপনি আমার জন্য যা করলেন, আমি সাত জন্মেও সে ঋণ শোধ করতে পারব না। আপনি . . .

অবিরামের প্রেতাত্মা পায়ে পায়ে বরাভয়ের দিকে এগিয়ে আসছে। মুখটা ঝুঁকে পড়ছে তাঁর মুখের ওপর। প্রেতাত্মার বরফের মতো শীতল নিশ্বাস এখন তাঁর মুখে পড়ছে। প্রেতাত্মার চোখদুটো জ্বলছে। বরাভয় সে চোখ থেকে দৃষ্টি সরাতে পারছেন না। প্রেতাত্মাটা কী সব যেন বলছে। বরাভয় কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছেন না। তাঁর কানের ভেতর লাখখানেক ঝিঁঝিঁ পোকা চিৎকার করছে

বুকের নিচে সরু চিনচিনে একটা ব্যথা শুরু হল বরাভয়ের। একটা অসহ্য চাপ। মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা ফেটে যাবে এক্ষুনি। দমবন্ধ হয়ে আসছে। ব্যথাটা বাড়ছে। তাঁর বাবা, কাকা, শ্বশুরমশাই সবাই হার্ট অ্যাটাকে গেছেন, তিনিও কি তবে . . . টেবিলের ওপর সরবিট্রেট রাখা আছে, হয়তো অবিরামের ম্যানুস্ক্রিপ্টটার ওপরেই। বরাভয়ের বিস্ফারিত চোখের কোণে দু’ফোঁটা জল জমে এল।

এই প্রতিদান দিলি অবিরাম? এত বছরের পরিচয় . . . মানছি তোর সঙ্গে অনেক অন্যায় হয়েছে, অনেক অবিচার, তাই বলে পৃথিবীর এত বড় ক্ষতিটা তুই করতে পারলি? এখনও কত ভালো ভালো কথা বলার ছিল, কত উপদেশ দেওয়ার ছিল, সবাইকে সাম্যসিদ্ধান্ত পড়ানো হল না . . .

বরাভয়ের মাথার পাশ দিয়ে জলের ফোঁটাদুটো গড়িয়ে পড়ে গেল                     

*****

রিংরিং রিংরিং রিংরিং

হ্যালো?

স্যার, বরাভয় বাগচী? সেই যে স্যার সাহিত্যসভা? মানেবই?

হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝেছি।

ফুটে গেছে স্যার।

অ্যাঁ? কখন?

এই তো, আধঘণ্টা হল।

আআআধঘণ্টাআআ! এতক্ষণ কী করছিলে? ঘুমোচ্ছিলে?

কেউ টের পায়নি স্যার।

টের পায়নি মানে! এই টেকনোলজির যুগে আধঘণ্টার মানে জানো? প্রায় অর্ধকল্প। এতক্ষণে RIP পার্টি শুরু হয়ে গেল দেখ গিয়ে, ছি ছি ছি ছি।

চাপ নেবেন না, স্যারযখন হয়েছে তখন গোটা শহরের সার্ভার ডাউন ছিল। আপনিই ফার্স্ট জানলেন স্যার।

না জানলেই বা কী? যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। ছি ছি ছি ছিযাই হোক, অনেক করেছ, এবার ফোন রাখ। আমাকে এক্ষুনি কাজে বসতে হবে। ছি ছি ছি ছি।

যমরাজের মেজাজ গরম হয়ে গেল। যত সব অকর্মাদের নিয়ে অফিস খুলে বসেছেন তিনি। বরাভয় বাগচীর মৃত্যু একটা বিগ ডিল, খবরটা যদি তাঁর আগেই কেউ শেয়ার করে ফেলে তাহলে আর লজ্জা রাখার জায়গা থাকবে না। চটি গলিয়ে তাড়াতাড়ি ল্যাপটপের কাছে পৌঁছলেন যমরাজঢাকনা তুললেন নরম নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল।

ধুকপুকোনো বুকে লগ ইন করলেন চিরসখা। বরাভয় বাগচীর মৃত্যুসংবাদ নিয়ে কোনও পোস্ট নেই। বুক থেকে পাথর নেমে গেল। আর জাস্ট পাঁচটা মিনিট চাই তাঁর। জাস্ট পাঁচ দ্রুত উইন্ডো মিনিমাইজ করে একটা ফোল্ডার খুললেন চিরসখা। সার্চ দিলেনটর্চের আইকন ঘুরে ঘুরে ফাইল খুঁজতে লাগল। এই তো। বরাভয় বাগচীর ভোটার আই কার্ড। এবার জাস্ট একটা কপি পেস্ট, ব্যস।

ছবিটার দিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন চিরসখা। ভোটার আই কার্ডের ছবি যেমন হয়, দুর্বোধ্য, ঝাপসা। অফিশিয়াল নিয়ম, সরকারি ছবিই ব্যবহার করতে হবে, অন্য কোনও ছবি চলবে না। পাসপোর্ট, ভোটার আই ডি, বড় জোর প্যান কার্ড যত্তসব সেকেলেপনা। চিরসখার হাতে যদি ক্ষমতা থাকত তাহলে তিনি সব অ্যালাউ করতেন। ছবি নিয়ে কথা, সে অফিশিয়াল না সেলফি সে নিয়ে বাছবিচার কীসের ভগবানই জানেন।

স্ক্রিনে বরাভয় বাগচীর ছবি জ্বলজ্বল করতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের জন্য সব তাড়া ভুলে গেলেন চিরসখা ভাবতে অবাক লাগে তাঁর, এত যুগ হয়ে গেল এই কাজ করতে করতে, তবু এই মুহূর্তটা এখনও তাঁকে নাড়া দেয়, বিচলিত করে? ছবির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন চিরসখা। তাঁর সে দৃষ্টির সামনে ছবির মুখ থেকে ভয়, দুঃখ, সুখ, দম্ভ একে একে সব খসে পড়ে গেল। পড়ে রইল শুধু একটা মানুষ। নির্দোষ, নির্গুণ।

ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস চাপলেন চিরসখা। আর দেরি করে লাভ নেই। শহরের লোকের ঘুম ভাঙল বলে। মাউস ক্লিক করতে গিয়ে এক মুহূর্ত থমকালেন চিরসখা। ছবির নিচে টাইপ করলেন, RIP

                                               (শেষ)


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.