December 15, 2014

All Work and No Play






The relationship is non-linear: below an hour’s threshold, output is proportional to hours; above a threshold, output rises at a decreasing rate as hours increase.
---Pencavel, J. (2014), The Productivity of Working Hours. The Economic Journal. doi: 10.1111/ecoj.12166

December 14, 2014

চৌত্রিশ



বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের প্রথম বছরের একটি টিফিন পিরিয়ড। আগেপিছের অসংখ্য টিফিন পিরিয়ডের সঙ্গে তাকে আলাদা করার কোনও উপায় নেই। সেই সবুজ প্রকাণ্ড মাঠ। সেই টিফিন না খেয়ে খেলার ধুম। কুমিরডাঙা, ওপেন-ডি-বায়োস্কোপ, লুকোচুরি, ছোঁয়াছুঁয়ি, লক অ্যান্ড কি, পিট্টু, খো খো। নিজের নিজের শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা অনুযায়ী যে যার খেলা বেছে নিয়েছে। আমি পড়েছি লক অ্যান্ড কি-র দলে। আমার মাথায় কে যেন চাঁটি মেরে লক করে দিয়েছে, আমি বসে বসে ঘাস ছিঁড়ছি আর খো খো-র দিকে নজর রাখছি।

খো খো খেলা দেখেছেন কি কখনও? দুটো দল থাকে, এক দলের লোক সারি দিয়ে একজন এমুখো আর একজন ওমুখো হয়ে বসে থাকে, আর এক দল থেকে নাকি তিন জন এক এক বারে দৌড়তে নামে। বসার দলের উদ্দেশ্য এই দাঁড়ানো দলের লোকদের ছুঁয়ে দিয়ে আউট করা। এই আউট করার কাজটা যে দল কম সময়ে করতে পারবে তারাই জিতবে।

খো খো-র মতো রক্তগরম করা খেলা আমি কমই দেখেছি। সেদিনও খেলা জমে উঠেছিল। দাঁড়ানো দলের সবাই আউট হয়ে গেছে, শুধু একটা দিদি ছাড়া। বসার দলের লোকদের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে দৌড়ে, কখনও স্পিড বাড়িয়ে কখনও কমিয়ে, খুঁটির আশেপাশে ক্রমাগত লঘু পায়ে নেচে, দিদিটা একা কুম্ভের মতো বাড়িয়ে যাচ্ছে বিপক্ষ দলের টাইম। বসার দলের মানইজ্জত ধুলোয় লুটোপুটি।

হঠাৎ একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হল। দিদিটা যে ফাঁকটা দিয়ে গলছিল ঠিক সেই জায়গার খেলোয়াড় ‘খো’ পেয়ে উঠে পড়েছে। বাঘের মতো থাবা বাড়িয়ে ঝাঁপ মেরেছে দিদিটার দিকে। এক সেকেন্ডের জন্য মনঃসংযোগ হারিয়েছিল কি দিদিটার? বিপদ বুঝে স্পিড বাড়িয়েছে নিমেষে, প্রাণপণ দৌড়চ্ছে, চোখ ঠিকরে বেরোচ্ছে, দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছে ঠোঁট, কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। তাড়া করা মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিয়েছে যতখানি সম্ভব . . . এতক্ষণ বসে থেকে তার এনার্জি তুঙ্গে . . . দিদিটার পায়ে ক্লান্তি . . . হাতটা দিদির পিঠ প্রায় ছোঁয় ছোঁয় . . . দিদিটা পিঠ ধনুকের মতো বাঁকিয়ে দিয়েছে . . . এমন সময় হাতটা এসে পড়ল দিদির উড়ন্ত বিনুনিতে।  

আউট!

লাফিয়ে উঠল বসে থাকা দল আর দলের সমর্থকরা। আর সেই চিৎকার ছাপিয়ে বেজে উঠল বেল। টিফিন পিরিয়ড শেষ। মাঠের চেহারা নিমেষে ভাঙা হাট। পক্ষবিপক্ষ মিলেমিশে গেছে। এতক্ষণ যারা একে অপরের বুক চিরে রক্তপান করতে পারে মনে হচ্ছিল তারা গলা জড়াজড়ি করে ফিরছে ক্লাসের দিকে।

দিদিটা শুধু হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। এইবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে এলোমেলো বিনুনিটাকে টেনে আনল সামনের দিকে। ক্লান্ত, উদাসীন পায়ে ক্লাসের দিকে হাঁটছে দিদিটা। খোলা লাল ফিতেটাকে কোনওমতে জড়িয়েমড়িয়ে একটা ফুলের চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

আমি হাঁ করে দিদিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। টিফিন শেষ হতে আমার লক খুলে গেছে আপনা থেকেই। আমি উঠে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু ক্লাসের দিকে ফিরতে শুরু করিনি। দিদিটাকেই দেখে চলেছি। অবাক হয়ে ভাবছি এতও বড় হতে পারে একটা মানুষ?

অথচ এর আগেও বড় লোক দেখিনি যে তা তো নয়। সেকশনের ছত্রিশটা মেয়ে বাদ দিলে সারাদিন বড় মানুষ পরিবৃত হয়েই তো থাকতাম। মাবাবা ঠাকুমা, রবিকাকু, চন্দনামাসি, মেজদিভাই, সেজদিভাই, ফুলদিভাই। সকলেই তো বড়, এমনকি বুড়োও বলা যেতে পারে। কিন্তু তাদের বড়ত্বের ব্যাপারটা কখনও তলিয়ে দেখিনি। তেমন করে তাদের বড়ত্বটা আমাকে ছোঁয়নি কখনও, সেই আউট হয়ে যাওয়া দিদিটার বড়ত্ব সেদিন যেমন করে ছুঁল। হিংস্র শ্বাপদের মতো ওঁত পেতে বসে থাকা শত্রুব্যূহে একা একা এতক্ষণ দৌড়ল দিদিটা, নিজের জন্য নয়, দলের জন্য। এত দৌড়েও শেষরক্ষা হল না, মাঝখান থেকে ফিতেটাই গেল খুলে, এখন সেই ফিতে বাঁধতে বাঁধতে ক্লাসের দিকে হাঁটছে দিদিটা। মুখ দেখে মনে হচ্ছে বেশি দুঃখও হয়নি, কাল খেলা হলে আবারও খেলতে নামবে। কোনও একটা দলের হয়ে, হয়তো এই আজ যাদের উল্টোদিকে খেলছিল তাদের দলেই। যতক্ষণ দম থাকে প্রাণপণ দৌড়বে নিজের এবং তাদের জন্য, তারপর আউট। খুলে যাওয়া ফিতে গোটাতে গোটাতে মাঠ ছাড়বে আবার পরের দিন খেলতে নামার আশায়।

সেদিনের রৌদ্রকরোজ্জ্বল টিফিনবেলায় আমার মনে হয়েছিল, ওই দিদিটার মতো ক্লাস এইটে উঠতে পারাটাই বোধহয় বড় হওয়ার সীমা। যতই অবিশ্বাস্য মনে হোক না কেন, স্রেফ সময়ের ঘাড়ে চেপেই একদিন আমি ক্লাস থ্রি থেকে হাঁটিহাঁটি ক্লাস এইটে পৌঁছে যাব। দিদিটার মতো বড় এবং হয়তো দিদিটার মতোই বীর। এই অপ্রত্যাশিত উপলব্ধির ধাক্কায় আমার মনে বিস্ময়ের সীমা রইল না।

তখন যদি কেউ আমাকে এসে বলত ক্লাস এইট তো কোন ছার, স্রেফ নিয়ম মেনেই একদিন আমার চৌত্রিশ বছর বয়স হবে, তখন আমি নির্ঘাত ভাবতাম আমার সঙ্গে রসিকতা করছে বুঝি। একটা মানুষ যে চৌত্রিশ বছরের পুরোনো হতে পারে, সেটা আমার মাথায় ঢুকত না কিছুতেই। মনে হত নিশ্চয় একটানা অত বুড়ো হওয়া যায় না। মাঝপথে তিনচারবার থেমে, দম নিয়ে, জল খেয়ে, চোখেমুখে কানের পেছনে জলের ছিটে দিয়ে তবে পৌঁছতে হয়।

আজ একবার মাঠে বসে ঘাস ছেঁড়া সেই ক্লাস থ্রি-র আমির চোখের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলে মজা হত বেশ। বলে আসা যেত, “তুমি যতটা দূর ভাবছ তোমার জীবনের চৌত্রিশ নম্বর বছরটা তার থেকে অনেক অনেক অনেক বেশি কাছের। চৌত্রিশবার চোখের পলক ফেলে দেখ, পৌঁছে যাবে।”

*****

কিন্তু শুধু পৌঁছনোটাই কি সব? এই এতদূর পৌঁছতে গিয়ে কিছু পাথেয় সংগ্রহ হল কি না সেটার হিসেব বুঝি নিতে হবে না? সেই হিসেব নেওয়ার বাসনায় আমি গত চৌত্রিশ বছরে শেখা চৌত্রিশটি শিক্ষার কথা নিচে লিখলাম। এর মধ্যে একটা শিক্ষাও কি পরম? উঁহু। আজ এগুলোকে সত্যি মনে হচ্ছে, সামনের বছরই হয়তো দেখবেন আমার উপলব্ধি একেবারে উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছেছে। ইন ফ্যাক্ট, এটাই আমার চৌত্রিশ বছরে আহরিত প্রথম শিক্ষা।
     
1.    ১। জীবনের মতো, সত্যও অনিত্য।

২। Happiness is the best revenge.

৩। বেশিরভাগ পরিস্থিতিতে নিরুত্তর থাকাটাই সবথেকে ভালো এবং যথাযথ প্রতিক্রিয়া।

৪। তর্ক করে কাউকে কিছু বোঝানো যায় না।

৫। ডিগ্রিডিপ্লোমার সঙ্গে শিক্ষাদীক্ষার কোনও সম্পর্ক নেই।

৬। ফার্স্ট ইমপ্রেশন লাস্ট কিনা জানি না, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দ্য রাইট ইমপ্রেশন।

৭। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব মতামত রাখার ও জ্ঞাপন করার অধিকার আছে।

৮। ঠিক যেমন আমার অধিকার আছে কার মতামতকে আমি কতখানি গুরুত্ব দেব সেটা বিচার করার।

৯। নিজের মতামত নিজের কাছে রাখা, কেউ না চাইলে তো বটেই, চাইলেও। কারণ কেউ যখন কোনও বিষয়ে আমার মতামত জানতে চাইছে, তারা সেই বিষয়ে আমার মতামত জানতে চাইছে না। তারা জানতে চাইছে সেই বিষয়ে আমি তাদের মতামত সমর্থন করি কি না।  

১০। ফেলে আসা সোনার দিনগুলোকে ছুঁয়ে দেখার সবথেকে খারাপ রাস্তা হচ্ছে রি-ইউনিয়ন।

১১। পরিশ্রমের বিকল্প নেই।

১২। সময় টাকার থেকে দামি।

১৩। গার্লস স্কুল, বয়েজ স্কুল, মহিলামহল, চণ্ডীমণ্ডপের মহিলাবর্জিত ঠেক – সব একই রকমের ক্ষতিকারক।

১৪। কখনও কখনও শিল্পের দোহাই দিয়ে শিল্পীর অবিমৃষ্যকারিতা অগ্রাহ্য করা যায়। বেশিরভাগ সময়েই যায় না।

১৫। দুঃখ ভাগ করে নেওয়া শক্ত, আরও শক্ত আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।

১৬। সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।

১৭। আগাথা ক্রিস্টির কলমে ভাষার গভীরতা না থাকতে পারে, তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা একমাত্রিক হতে পারে, তাঁর প্লটে পৌনঃপুনিকতা থাকতে পারে – তবু তিনিই সেরা।

১৮। ফেরত পাওয়ার আশা নিয়ে ধার দিতে নেই।

১৯। At my time of life, one knows that the worst is usually true.  ---মিস মার্পল।

২০। “আকাশে চান্দ উঠলে, হক্কলে দেখে।” ---আমার দিদিমা

২১। “বাবারা যা পায়নি তা আমরা পাব না।” ---চন্দ্রবিন্দু

২২। ডবল মাটন ডবল চিকেন ডবল এগ রোলের থেকে চিকেন মাটন এগ রোল ভালো খেতে, চিকেন  মাটন এগরোলের থেকে চিকেন এগ রোল ভালো খেতে, চিকেন এগ রোলের থেকেও ভালো খেতে এগ রোল। সিংগল এগ রোল।

২৩। শিখতে চাইলে শিখে নেওয়াই যায়, তবে আমার মতো ছবি-তুলিয়ের পক্ষে ক্যামেরার অটোম্যাটিক সেটিংস গুড এনাফ।

২৪। পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষই সুখী নয়। আমি যাদের দেখে হিংসেয় জ্বলেপুড়ে মরছি তারাও না।

২৫। বোকা বন্ধুর থেকে বুদ্ধিমান শত্রু ভালো।

২৬। একশোজন বন্ধুর থেকে একজন সঙ্গী ভালো।

২৭। নিশ্ছিদ্র আত্মবিশ্বাসের থেকে সামান্য নার্ভাসনেসমিশ্রিত আত্মবিশ্বাস বেশি কাজের।

২৮। খাওয়া জরুরি, ঘুম আরও জরুরি।

২৯। মানুষ প্রেমে পাগল হয় আর বাৎসল্যে অন্ধ।

৩০। সাধনা সিদ্ধ হয় – মনে, বনে, কোণে।

৩১। প্রশংসা লাভের থেকে বেশি ক্ষতি করে।

৩২। কল্পনার থেকে বাস্তব সবসময়েই বেশি বর্ণময়, বেশি আগ্রহোদ্দীপক।

৩৩। আধঘণ্টা ব্যায়াম, গায়ে তেলমালিশ করে স্নান, ঠোঁটে বোরোলিন মেখে ঘুমোতে যাওয়া আর ভোর বা সন্ধ্যের কিছুটা সময় খোলা আকাশের নিচে (হেডফোন ছাড়া, একা) কাটানো। রোজ এই চারটে কাজ নিয়ম করে করতে পারলে (আমার) আর কোনওরকম রূপচর্চার দরকার পড়ে না।

৩৪। এখনও আমার অনেক কিছু শেখার বাকি আছে।


December 13, 2014

সাপ্তাহিকী





শান্তি দেবতারই ভোগ্য, মানুষের জীবনকে অর্থ দেয় শুধু প্রচেষ্টা।
                           ---বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্তঃ কবি


কুম্ভমেলায় হারিয়ে যাওয়া যমজ সহোদরের মত আমাদের দুনিয়ারও যদি কোনও সহোদর থাকে? আর যদি সে দুনিয়ার সবাই বেঞ্জামিন বাটনের মতো হয়? আমরা ছোট থেকে বুড়ো হই, ওরা বুড়ো থেকে ছোট হয়?


Listen and Nod. শুধু ঘ্যানঘেনে নালিশ-করিয়েদের জন্য কেন, আমার মতে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষকে মোকাবিলা করারই এটাই অস্ত্র।



অ্যামাজনের কর্মী। তবে মানুষকর্মীদের মতো এরা একঘণ্টার লাঞ্চব্রেককে টেনে আড়াইঘণ্টার বানায় না।


'দ্য লিটল প্রিন্স' সিনেমা হয়ে আসতে চলেছে খুব শিগগিরই। আমাকে অবশ্য সাবটাইটল দিয়ে দেখতে হবে।

বাকিংহাম প্যালেসের বাসিন্দাদের কারও সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে ফস করে তাকে জড়িয়ে ধরতে যাওয়ার আগে এই নিয়মগুলো পড়ে নিন।

Days of My Youth. অফ কোর্স, আমার ইয়ুথ নয়, কিন্তু কারও কারও যৌবন এমনটাও হয়।



December 11, 2014

আড্ডা



সেদিন অনেককাল পর একটা আড্ডায় যাওয়ার সুযোগ হল। ‘সুযোগ’ কথাটা শুনলেই এমন একটা কিছুর কথা মনে পড়ে যাকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধরতে হয়। যেটা হাত ফসকে পালালে আফসোসের সীমা থাকে না। কালকের আড্ডাটা সে রকম অপরিহার্য কিছু ছিল না। সেটাতে কালকের আড্ডাটার দোষ নেই কোনও, দোষ সম্পূর্ণ আমার। ইদানীং সব আড্ডাই আমার কাছে অপরিহার্যতা হারিয়েছে। তার প্রধান কারণ আড্ডা বিষয়টা শুনতে যত সোজা কাজে করা ততই কঠিন। বিশেষ করে সেটা যদি বাঙালিদের আড্ডা হয়। বাকিরা আড্ডাকে যত হালকা ভাবে নেয় আমরা সে রকম নিই না। আমরা মনে করি আমাদের আজ যত যা খ্যাতিউন্নতি; জ্ঞানেবিজ্ঞানে, কাব্যেউপন্যাসে – দেশেবিদেশে আজ যে বাঙালিদের এত রমরমা এর পেছনে কৃতিত্ব তিনটি জিনিসের। সকালের লুচি, দুপুরের ঘুম আর বিকেলের আড্ডার। আর রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই।

জাতির মেরুদণ্ডের এমন চমৎকার ঠ্যাকনাটিকে ঝেড়েমুছে তকতকে করে রাখার জন্য আমাদের যত্নের অভাব নেই। পাছে আমাদের আড্ডা স্রেফ বাজে গল্প আর সময়নষ্টে রূপান্তরিত হয় সেই ভয়ে আমরা সর্বদা কাঁটা হয়ে থাকি। আমাদের সবসময় চেষ্টা থাকে আড্ডাকে কার্যকরী করে তোলার। এই সুযোগে কিছু শিখে নেওয়ার, তার থেকেও বেশি শিখিয়ে দেওয়ার।

বোঝাই যাচ্ছে, এত সব শেখাশেখি করতে গেলে একটা ন্যূনতম আগ্রহ, উদ্দীপনার দরকার হয়। যে বিষয়টা নিয়ে জ্ঞানের আদানপ্রদান হচ্ছে সেটাতে যে আমার কিছু যায় আসে, সেই ভানটুকু করার দায় থাকে। মুশকিলটা হচ্ছে, উদ্দীপনা আর দায় – দুটো জিনিসই আমার ভেতর থেকে অন্তর্হিত হতে হতে এখন একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। যেটুকু বাকি আছে সেটুকু আড্ডায় খরচ না করে টাইপ করায় খরচ করব ভেবে রেখেছি।

তবু যে কালকের আড্ডাটায় গেলাম (তাও আবার অফিসফেরতা) তার অনেকগুলো কারণ আছে। এক, বাড়িতে কথা বলার লোক নেই। দুই, টিভির রিমোটের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে। তিন, আড্ডার কিছু সদস্য আমার চেনা। পূর্বাশ্রমে যখন আমার আড্ডায় অরুচি ছিল না তখন এঁদের সঙ্গে হোস্টেলের উল্টোদিকের বাবলাগাছের তলায় বসে আমি বিস্তর বকেছি। এঁরা যখন আছেন তখন এঁরাই সভা আলো করে রাখবেন, আমি কোণে বসে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলছি কি না সে দিকে কারও নজরই যাবে না – এই সব সাতপাঁচ ভেবে আমি আড্ডার ঠিকানায় উপস্থিত হলাম।

গিয়ে দেখি আড্ডায় শুধু মানুষ ছাড়াও একখান গিটারও উপস্থিত আছে। মন নেচে উঠল। কথা একেবারে বলতেই হবে না। শুধু শুনে গেলেই হবে। চমৎকার। ভালো দেখে একখানা কোণ বেছে, অফিসব্যাগটা দেওয়ালে ঠেকিয়ে, তার ওপর নিজেকে ঠেকিয়ে বসে পড়লাম। ব্যস। দু’ঘণ্টার মতো নিশ্চিন্ত।

আড্ডা জমে উঠল। আড্ডা জমানোর পেছনে অভিজ্ঞ আড্ডাবাজদের অবদান তো ছিলই, আমার বন্ধুর বাড়িটিও আড্ডা জমানোর জন্য একেবারে অর্ডার দিয়ে বানানো। প্রতিভাবান আড্ডা-বসিয়ে হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বন্ধু দেখিয়েছিল ছোটবেলাতেই। দিনেদুপুরে, রাতেবিরেতে, সকলেই যে যার হোস্টেলের ঘর ছেড়ে ওর ঘরে উজিয়ে যেতাম আড্ডা মারতে। দিল্লির ফেব্রুয়ারির শীতে রাত দশটার সময় এক হোস্টেল থেকে আর এক হোস্টেলে হেঁটে হেঁটে যাওয়া আবার রাত তিনটের সময় হেঁটে হেঁটে নিজের হোস্টেলে ফেরা যা-তা কথা না। তবু সবাই যেত। সেদিন গিয়ে দেখলাম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুর আড্ডা বসানোর প্রতিভায় একটুও জং ধরেনি। সুন্দর করে সাজানো ঘর, কিন্তু সাজটা কোথাও আরামে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না। যারা ফাঁকি মেরে পরের ঘাড়ে চেপে আড্ডা-বৈতরণী পেরোতে চায় (অবান্তরের লেখক) তাদের জন্য কোণাঘুচিও যেমন আছে, তেমন আড্ডার কর্ণধারদের জন্য ঘরের মাঝখানে টানটান করে পাতা ফরাসও আছে। টাইট জিনসওয়ালাদের জন্য চেয়ার আছে, ঢোলাপাজামাওয়ালাদের জন্য নিচু মোড়া আছে। অথচ ঘরে ঢুকে একবারও ফার্নিচারের দোকানে ঢুকে পড়েছি মনে হচ্ছে না, আধো আলোছায়ায় তারা সবাই একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে।

ভালো জাতের আড্ডার জন্য আড্ডাবাজদের ভালো হওয়া যতটা দরকারি তার থেকে কোনও অংশে কম দরকারি নয় আড্ডার ঠেকের ভালো হওয়া।  তার কারণ, আড্ডা একটা সচল-সজীব বস্তু। আপনি বলবেন সে তো বটেই, “মরা মানুষে কি আড্ডা দিতে পারে নাকি?” আমি মানুষের নয়, আড্ডার সজীবতার কথা বলছি। আড্ডা নিজে সজীব বলেই বেড়ে ওঠার জন্য তার উপযুক্ত বাতাবরণ লাগে। মাপমতো সার, জল ও সূর্যালোকের দরকার হয়। অনুকূল ঠেকে এ সব উপাদান পর্যাপ্ত পরিমাণে পেয়ে আড্ডা লকলকিয়ে বাড়ে। ক্রমে ক্রমে বেড়ে সে একটা স্বতন্ত্র শরীর পায়, আর আড্ডাবাজেরা পরিণত হয় শরীরের একএকটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। একটা শরীর জন্মায় গঙ্গার ঘাটে, একটা মন্দিরের চাতালে, আর একটা জন্মায় স্টেশন রোডে রামকৃষ্ণ বস্ত্রালয়ের বারান্দায়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এক জায়গার আড্ডার শরীর তুলে অন্য আড্ডার মাটিতে পুঁততে যান, আড্ডা বেঘোরে মরবে। এ আড্ডার মাথা কেটে ও আড্ডার গোড়ালিতে জুড়ে দিন, দুটোর একটাও বাঁচবে না।

এত কথা অবশ্য খালি চোখে যা ধরা পড়ে না। খালি চোখে দেখলে মনে হয় সফল আড্ডার সব কৃতিত্বই বুঝি আমার, আমাদের। এই যে বেছে বেছে এমন বিষয় বার করছি, যা ইন্টেলেক্টের গোড়ায় সারও যেমন দিচ্ছে, তেমনি আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে নায়ক সিনেমার সংলাপও গুঁজে দিতে দিচ্ছে। এটা তো আর আড্ডা করে দিচ্ছে না, যা করার আমিই করছি।

কিন্তু একটা আড্ডা শুধু বিষয়ে চলে না, সংলাপে তো নয়ই। ইন ফ্যাক্ট আমার তো মনে হয় যে কোনও আড্ডার সার্থক হয়ে ওঠার পেছনে সে আড্ডার বিষয়ের অবদানের অংশটুকুই সবথেকে গৌণ। বিষয় চাইলে বক্তৃতাসভায় গেলেই হয়, কিংবা বিতর্ক সমিতিতে। নিয়ম করে অফিসের সবগুলো পিপিটি প্রেসেন্টেশন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বসে বসে শুনলেও বা আটকাচ্ছে কে?

আমার মতে একটা ভালো আড্ডা সেটাই যেটায় যে কোনও বিষয় নিয়ে আরাম করে কথা বলা যায়। তথ্যে ভুল করে ফেলার টেনশন না রেখে, এই বুঝি আমাকে কেউ বোকা ভাবল সে নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে। সোজা হয়ে বসে, বালিশের ওপর কাত হয়ে পড়ে, দাবার চাল দিতে দিতে, কিংবা মিউট করে রাখা টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই।

তার মানে কি কোনও বিষয়ে না জেনে যা প্রাণে চায় যেমনতেমন করে তাই বকে যাওয়ার লাইসেন্স থাকাটাকেই ভালো আড্ডার শিরোপা দিচ্ছি? মোটেই না। আমি বলছি না হলিউডি সিনেমার মতো করে রিলেটিভিটির ব্যাখ্যা দিতে হবে বা বাবা রামদেবের মতো করে জিনের রহস্য ফাঁস করতে হবে। সমকামীর ছেলে সমকামী হয়, বিষমকামীর ছেলে সমকামী হয় না। ছেলে যখন হয়েছে তখন নিশ্চয় বাবা সমকামী নন। সুতরাং প্রমাণিত হল যে ছেলের পক্ষে সমকামী হওয়া অসম্ভব। সে নিয়ম মানলে তো আইনস্টাইনকে কোনওদিন কোনও আড্ডাতেই প্রবেশাধিকার দেওয়া যায় না। তাহলে তো রকেটসায়েন্সে গবেষণা করা বন্ধুটি রকেট উৎক্ষেপণে সলিড ও লিকুইড প্রপেল্যান্টের নিজ নিজ ভূমিকার কথা বন্ধুদের জলের মতো করে বুঝিয়ে দিতে চাইলে তার মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে তাকে ঘরের কোণে বসিয়ে রাখতে হয়।

আমার বক্তব্য শুধু এই যে রকেটের বর্ণনা শেষ হয়ে গেলে ঘরের কোণে বসে চোখ বুজে হাঁটুতে মৃদু মৃদু তাল রাখা বন্ধু হঠাৎ চোখ খুলে উঠে যদি বলে, “আচ্ছা, তোদের লিটারেচারে ইউ এফ ও নিয়ে কী বলছে?” তাহলে “এটা কে, কোত্থেকে এসেছে” করে হই হই করে ঝাঁপিয়ে তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া ভালো আড্ডায় চলে না। তাহলেই প্রমাণ হয়ে যাবে এ আড্ডা ভালো আড্ডা নয়। ভালো যদি হত তাহলে সবাই বরং ঝাঁপিয়ে পড়ে ইউ এফ ও নিয়ে নিজের নিজের মত জাহির করত। ইউ এফ ও ফাঁকিবাজি না বুজরুকি না পেন্টাগনের চেপে দেওয়া সত্যিকারের ফেনোমেনন এই নিয়ে পরের দেড়টি ঘণ্টা কোথা দিয়ে কাবার হয়ে যেত কেউ টেরও পেত না।

ভালো আড্ডার আর একটা উপাদান হচ্ছে খাওয়াদাওয়া। খাওয়াদাওয়ার ভালোমন্দ উচিতঅনুচিত ভালোমন্দ নিয়ে নিদান দেওয়ার মতো মূর্খ আমি নই। আড্ডার বিষয়ের মতোই খাওয়াদাওয়ার পছন্দঅপছন্দও যার যার আপরুচির ওপর ন্যস্ত করা ভালো। তবে বিষয় আর খাবারের মধ্যে একটা গোড়ার অমিল তো আছেই। একটা মূলত বায়বীয় আর অন্যটা ঘোর বস্তুমূলক। যে যা খুশি নিয়ে বক্তব্য রাখতেই পারে কিন্তু যে যা খুশি খেতে চাইলে সেটা ব্যবহারিক দিক থেকে অসুবিধেজনক।

আড্ডার খাওয়াদাওয়া স্থির করতে বসে প্রথম মনে রাখার কথাটা হচ্ছে আড্ডায় খাটবে মূলত মগজ, পাকস্থলী নয়। দু’নম্বর মনে রাখার কথাটা হচ্ছে যে মানুষের শরীরে এনার্জি সীমিত। পাচনক্রিয়ায় যেটুকু খরচ হয়ে যাবে, মাথাখাটানোর জন্য সেটুকুকে পাওয়া যাবে না। একই দশা হবে খাবার তৈরি করতে বা থালায় থালায় বাড়তে বা এঁটো থালা তুলতে খরচ হওয়া এনার্জিরও। কাজেই আড্ডার মেনুতে বিরিয়ানি, মুর্গমুসল্লম কিংবা ধোঁকার ডালনা না থাকলেই ভালো। তিন নম্বর এবং সবথেকে জরুরি মনে রাখার কথাটা হচ্ছে ভালো আড্ডার যা নিয়ম, ভালো আড্ডার খাওয়াদাওয়ারও সেই নিয়ম। সবার জন্য, সবার মতো করে। যাতে ফুডিসম্রাটও না খেতে পেয়ে মরবেন না, আবার পেটরোগা, দুঃখী সদস্যটিও শুধু মুখে বাড়ি ফিরে যাবেন না। সব কূল বাঁচিয়ে আমার মতে বাঙালি আড্ডার সবথেকে উপযুক্ত খাবার হচ্ছে চা আর মুড়ি। শুকনো বা তেললংকা দিয়ে মাখা।

আধুনিক বাঙালি আড্ডায় অবশ্য চায়ের মতোই সুলভ হয়ে পড়েছে শিভাস রিগ্যাল। আড্ডার সাফল্যের কথা বোঝাতে ‘কাপের পর কাপ চা উড়ে গেল’র বদলে আজকাল হামেশাই শোনা যাচ্ছে ‘পেগের পর পেগ উড়ে গেল'। আড্ডাবাজদের যদি সে রসে উৎসাহ থাকে তবে তাঁরা সে পথে যাবেন, কার কী বলার আছে,  তবে আমার ব্যক্তিগত ভোট সবসময় থাকবে চায়ের পক্ষে।

আমার পক্ষপাতটা যত না গোঁড়ামিজনিত তার থেকে অনেক বেশি অভিজ্ঞতাসম্ভূত। কাপের পর কাপ চা উড়ে গেলেও আড্ডাবাজদের আচরণে তার আশু কোনও ছায়া পড়ার সম্ভাবনা কম। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যাফাইন, থেব্রোমাইন, থিওফিলাইন রক্তে মিশে গিয়ে ব্রেন উত্তেজিত হবে, স্নায়ু টানটান হবে, গলার শির ফুলে উঠবে। বড়জোর রাতে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শুনতে হবে, ব্যস।

শিভাস রিগ্যালের প্রভাব এত নিরীহ না-ও হতে পারে। এর বিস্তর উদাহরণ আমি দেখেছি। তার একটা আপনাদের বলি।

শীতকালে কবিতা লিখতে দাদা গিয়েছিলেন পাহাড়ে।

শুনে আমরা বললাম, “ড্যাং না ক্যাং না গ্যাং?” (কোন গল্প বলতে পারলে হাততালি।)

জানা গেল গ্যাং। ট্যুরিস্ট স্পট বলে গাড়িঘোড়া থাকাখাওয়ার পরিকাঠামোগত সুবিধেটুকুও পাওয়া যাবে, আবার অফ সিজন বলে আদেখলা হামলে পড়া ভিড়ও থাকবে না, এত সব ভেবেটেবে যাওয়া। কিন্তু গিয়ে শুধু গ্যাংটকে দাদার মন উঠল না, তাঁর ইচ্ছে হল বরফপাত দেখার। কাজেই একটা গাড়িভাড়া করে আরও উঁচু পাহাড়ের দিকে রওনা দিলেন দাদা।

রাতের বেলা গা গরম করবে বলে ড্রাইভার আর খালাসি মদ খাওয়ার তোড়জোড় করল। সাবজী প্রসাদ করবেন কি না জিজ্ঞাসা করাতে দাদা বললেন, “আলবাত।” তারপর বললেন, সোডা জল ইত্যাদি রসভঙ্গকারী ইমপিওরিটির ব্যবস্থা তাঁর জন্য করতে হবে না, তিনি এমনিই “স্ট্রেট মেরে দেবেন এখন।” তারপর সেই যে শুরু হল দাদার মার, যতক্ষণ না ড্রাইভার আর খালাসি সাষ্টাঙ্গ হয়ে পড়ে তাঁর কাছে নাড়া বাঁধল ততক্ষণ থামল না।

এদিকে গল্পের মৌতাতেই হোক, কি শহরের বদ্ধ ঘরের দূষিত জলবায়ুর জন্যই হোক, আড্ডায় বসে একের বেশি দু’টি পেগ স্ট্রেট মেরেই দাদা বেসামাল হয়ে পড়তে লাগলেন। গল্পের দাদার সঙ্গে বাস্তবের দাদার অমিল ঘোরতর প্রকট হয়ে উঠতে লাগল। শেষটায় গ্যাংটকের মলে কার অঞ্চলপ্রান্তের গেরোয় নিজের হৃদয় বাঁধা রেখেছিলেন সেই কথা মনে করে উচ্চস্বরে ভেউভেউ কান্নায় আড্ডার সমাপ্তি হল। ইউ এফ ও নিয়ে একটা ভয়ংকর ইন্টারেস্টিং আলোচনা হচ্ছিল, সব মাটি।

এর থেকে র’চা ভালো কি না?

‘শুনুন,’ আগন্তুক বললেন, ‘লাঞ্চ তো হল – আগে এক কাপ চা হবে কি?’
‘সার্টেনলি।’
‘শুধু একটা কাপ আর লিকার দিলেই হবে। আমি র’টী খাই।’

কোন গল্প?

এই যে’রকম আড্ডার কথা বললাম, খুব শক্ত লাগল কি? লাগল না তো? অথচ বাস্তবে এই সহজসরল আড্ডাই কত বিরল সে কথা ভাবলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। বাস্তবকে দোষ দিয়ে লাভ নেই অবশ্য। আড্ডার দেমাকে মশমশ করা বাঙালির সাহিত্যেও বিশুদ্ধ আড্ডা কিছু ঘাট খেলছে না। অথচ সম্ভাবনা ছিল। শিবু, শিশির, গৌর, সুধীর, ক্যাবলা, হাবুল, পটলরাম এরা সবাই আসর সাজিয়েই বসেছিল, এমন সময় দাদারা সে আসরে ঢুকে পড়ে আড্ডা মাটি করলেন। ঘরজোড়া মাদুরের মধ্যে একখানা ইজিচেয়ার এসে উপস্থিত হল। বক্তা-শ্রোতা ইত্যাদি জাতিভেদের উৎপত্তি হয়ে ভালো আড্ডার গোড়ার শর্তটাই গেল ভেস্তে।

তা বলে কি ভালো আড্ডার উদাহরণ একটিও নেই? আছে বৈকি। চৌদ্দ নম্বর হাবশীবাগান লেনের মেসের আড্ডাটাই প্রায় নিখুঁত আড্ডার উদাহরণ। সে আড্ডায় মাসিক পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে পাখোয়াজ ইত্যাদি চিত্তবিনোদনের বিচিত্র উপকরণ যেমন আছে তেমনি বিচিত্র চিত্তবিনোদনকারীদের জমায়েত। কলেজের প্রফেসর, ইনশিওরেন্সের দালাল, অফিসের কেরানি। বৈচিত্র্য যে আড্ডার স্বাস্থ্যের কতখানি উপকার করে হাবশীবাগানের মেসের আড্ডা তার প্রমাণ। হঠযোগ, বাবাজী, ঝি-বেটির খোঁজ করা, অফিসের ছোটসায়েবের পিণ্ডি-চটকানো – একঘেয়েমির সম্ভাবনাই নেই।  

(অবশ্য এমন ইন্টারেস্টিং আড্ডাটিও একেবারে দোষমুক্ত নয়। আমার বিশ্বাস এস্ট্রোজেনের একটু ছিটে পড়লে এ আড্ডার রং আরও খুলত বই কমত না। তবে আমার কিনা এই আড্ডার রচয়িতার প্রতি পক্ষপাত আছে তাই আমি এটা তাঁর দোষ না বলে সময়ের দোষ ধরে নিচ্ছি।)

দেখেছেন, আড্ডায় কিছু বলার না থাকলেও, আড্ডা নিয়ে বলার কথা আমার আছে যথেষ্টই। আড্ডা বিষয়ে আমি ভয়ানক ডিম্যান্ডিং। হাই মেন্টেন্যান্স। আমার এই মনোভাবের সঙ্গে সেই লোকটার মিল আছে যে অনেকদিন আগে, ছোটবেলায় একবার বাবার সঙ্গে হরিদ্বারের গলিতে রাবড়ি খেয়েছিল। কেউ না নিলেও, সেই থেকে সে নিজেই নিজেকে রাবড়ির একজন মস্ত বড় সমঝদার বলে ধরে নিয়েছে। খাওয়াদাওয়ার আড্ডা বসলেই খালি ঘুরেফিরে বলছে, “আহা, সেই যে হরিদ্বারের গলির দোকানে বাবার সঙ্গে বসে মাটির ভাঁড়ে রাবড়ি খেয়েছিলাম, তেমনটি আর কোথাও খেলাম না।”

হয়তো কথাটা সত্যি নয়। যদিও হয়তো সেই পাঁচবছর বয়সের পর সে ভালোখারাপ কোনওরকম রাবড়িই আর কোনওদিন চেখে দেখেনি। হয়তো আবছা হতে হতে জিভ থেকে সে রাবড়ির স্বাদ উবে গেছে অনেকদিন আগেই, সময়ের পাকে খালি স্মৃতির ভেতর ঘন থেকে ঘনতর হয়েছে তার স্বাদ। নামহীন দোকানের সামনে রাস্তার ওপর দুধের কড়াইয়ের পেছনে বসে থাকা গরিব ময়রা রূপান্তরিত হয়েছে রাষ্ট্রপতির প্রশংসা পাওয়া খানদানি ভিয়েনশিল্পীতে। নোংরা লেগে থাকা তোবড়ানো স্টিলের প্লেটের ছবিতে মুছে সে জায়গায় সোঁদা গন্ধওয়ালা নতুন মাটির ভাঁড় এঁকে নিয়েছে নস্ট্যালজিয়া।

আমারও হয়েছে সেই দশা। কতদিন আড্ডা মারিনি, তবু আড্ডার ভালোমন্দ বিচার করার অধিকার নিয়ে আমার কোনও সংশয় নেই। সেই যে বাবলাগাছের নিচে বিকেলবেলা আড্ডা বসত। সেই সিনিয়র জুনিয়র, ছেলেমেয়ে, সায়েন্স-সোশ্যাল সায়েন্স, এস এফ আই-আইসা ভেদাভেদমুক্ত আড্ডা। গাজা স্ট্রিপ থেকে শুরু করে অনিল বিশ্বাস ছুঁয়ে মেসে দুপুরের ঘাসের ঝোলে এসে ডুবে মরা আড্ডা। নারায়ণভাইয়ার বেশি মিষ্টি চা আর হাফ জিলিপি খেয়ে বাকি হাফ শাহরুখনাম্নী কুকুরছানার মুখে গুঁজে দেওয়া আড্ডা। আমার মনের মধ্যে দিনের পর দিন সে আড্ডার স্মৃতি ক্রমেই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। যে কোনও আড্ডার নেমন্তন্নে গিয়েই মন বার বার মিলিয়ে নিচ্ছে এই আড্ডার সঙ্গে সেই আড্ডার খুঁটিনাটি। বলাই বাহুল্য, স্মৃতির সঙ্গে অসম যুদ্ধে বাস্তব গোহারা হারছে প্রতিবার। সবাই যখন জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে, আমি বসে বসে ভাবছি, শেষমেশ কি না এই? এর থেকে তো বাড়িতে গিয়ে ঘুমোনো ভালো ছিল।


December 09, 2014

December 07, 2014

কুইজঃ খাই খাই (উত্তর প্রকাশিত)



শিল্পীঃ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি; উৎসঃ গুগল ইমেজেস 

খেতে ভালো লাগে, আরও ভালো লাগে ভালো করে লেখা খাওয়ার বর্ণনা পড়তে। নিচে বাংলা ও ইংরিজি সাহিত্য থেকে তুলে নেওয়া আটটি খাওয়াদাওয়াসংক্রান্ত অংশ দেওয়া হল। দেখুন তো, লেখা ও লেখককে চিহ্নিত করতে পারেন কি না। সময় রইল চব্বিশ ঘণ্টা। উত্তর বেরোবে দেশে সোমবার রাত আটটায়। ততক্ষণ কমেন্টে পাহারা বসানো থাকবে। 


অল দ্য বেস্ট।

***** 

১। যাহারা বলে, গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অন্তঃপুরে বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে। আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপর বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাঁটু চিবুক পর্যন্ত উত্থিত করিয়া কাঁচা তেঁতুল, কাঁচা লঙ্কা এবং চিংড়িমাছের ঝাল-চচ্চড়ি দিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পান্তাভাত খাইতেছিলেন। বাহির হইতে যখন ডাক পড়িল তখন স্তূপাকৃতি চর্বিত ডাঁটা এবং নিঃশেষিত অন্নপাত্রটি ফেলিয়া গম্ভীরমুখে কহিলেন, “দুটো পান্তাভাত যে মুখে দেব, তারও সময় পাওয়া যায় না।”

২। (he) always liked a little something at eleven o'clock in the morning, and he was very glad to see Rabbit getting out the plates and mugs; and when Rabbit said, "Honey or condensed milk with your bread?" he was so excited that he said, "Both," and then, so as not to seem greedy, he added, "But don't bother about the bread, please."

৩। The whole family saved up their money for that special occasion, and when the great day arrived, (he) was always presented with one small chocolate bar to eat all by himself. And each time he received it, on those marvellous birthday mornings, he would place it carefully in a small wooden box that he owned, and treasure it as though it were a bar of solid gold; and for the next few days, he would allow himself only to look at it, but never to touch it. Then at last, when he could stand it no longer, he would peel back a tiny bit of the paper wrapping at one corner to expose a tiny bit of chocolate, and then he would take a tiny nibble — just enough to allow the lovely sweet taste to spread out slowly over his tongue. The next day, he would take another tiny nibble, and so on, and so on. And in this way, (he) would make his sixpenny bar of birthday chocolate last him for more than a month.

৪। খাইতে বসিয়া খাবার জিনিসপত্র ও আয়োজনের ঘটা দেখিয়া সে অবাক হইয়া গেল। ছোট একখানা ফুলকাটা রেকাবিতে আলাদা করিয়া নুন ও নেবু কেন? নুন নেবু তো মা পাতেই দেয়! প্রত্যেক তরকারির জন্য খাবার আলাদা আলাদা বাটি! – তরকারিই বা কত! অত বড় গল্‌দা চিংড়ির মাথাটা কি তাহার একার জন্য?

লুচি! লুচি! তাহার ও দিদির স্বপ্নকামনার পাড়ে এক রূপকথার দেশের নীল-বেলা আবছায়া দেখা যায়....কত রাতে, দিনে, ওলের ডাঁটাচচ্চড়ি ও লাউ-ছেঁচকি দিয়া ভাত খাইতে খাইতে, কত জল-খাবার-খাওয়া-শূন্য সকালে বিকালে, অন্যমনস্ক মন হঠাৎ লুব্ধ উদাস গতিতে ছুটিয়া চলে সেখানে –

৫। If anything vexed her, it was the perpetual chain of daily meals. For they not only had to be served on time: they had to be perfect, and they had to be just what he wanted to eat, without his having to be asked...Even when it was not the season for asparagus, it had to be found regardless of cost, so that he could take pleasure in the vapors of his own fragrant urine. She did not blame him: she blamed life. But he was an implacable protagonist in that life. At the mere hint of a doubt, he would push aside his plate and say: This meal has been prepared without love. In that sphere he would achieve moments of fantastic inspiration. Once he tasted some chamomile tea and sent it back, saying only: This stuff tastes of window. Both she and the servants were surprised because they had never heard of anyone who had drunk boiled window, but when they tried the tea in an effort to understand, they understood: it did taste of window.

৬। হরিপদর ছোট ভাই শ্যামাপদ এসে বলল, “দাদা শিগ্‌গির এস। পিসিমা এই মাত্র এক হাঁড়ি দই নিয়ে তাঁর খাটের তলায় লুকিয়ে রাখলেন।” দাদাকে এত ব্যস্ত হয়ে এ-খবরটা দেবার অর্থ এই যে, পিসিমার ঘরে যে শিকল দেওয়া থাকে, শ্যামাপদ সেটা হাতে নাগাল পায় না – তাই দাদার সাহায্য দরকার হয়। দাদা এসে আস্তে আস্তে শিকলটা খুলে, আগেই তাড়াতাড়ি গিয়ে খাটের তলায় দইয়ের হাঁড়ি থেকে এক খাবল তুলে নিয়ে খপ করে মুখে দিয়েছে। মুখে দিয়েই চীৎকার! কোথায় বলে ‘ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছে,’ কিন্তু হরিপদর চেঁচানো তার চাইতেও সাংঘাতিক! চীৎকার শুনে মা-মাসি-দিদি-পিসি যে যেখানে ছিলেন সব ‘কি হল’ ‘কি হল’ বলে দৌড়ে এলেন। শ্যামাপদ বুদ্ধিমান ছেলে, সে দাদার চীৎকারের নমুনা শুনেই দৌড়ে ঘোষেদের পাড়ায় গিয়ে হাজির! সেখানে অত্যন্ত ভালোমানুষের মতো তার বন্ধু শান্তি ঘোষের কাছে পড়া বুঝে নিচ্ছে। এদিকে হরিপদর অবস্থা দেখে পিসিমা বুঝেছেন যে, হরিপদ দই ভেবে তাঁর চুনের হাঁড়ি চেখে বসেছে! তারপর হরিপদর যা সাজা! এক সপ্তাহ ধরে সে না পারে চিবোতে, না পারে গিলতে! তার খাওয়া নিয়েই এক মহা হাঙ্গামা! কিন্তু তবু তো তার লজ্জা নেই – আজ আবার লুকিয়ে কোথায় লাড়ু খেতে গিয়েছে! ওদিকে মামা তো ডেকে ডেকে সারা!

৭। He had never seen so many things he liked to eat on one table: roast beef, roast chicken, pork chops and lamb chops, sausages, bacon and steak, boiled potatoes, roast potatoes, fries, Yorkshire pudding, peas, carrots, gravy, ketchup, and, for some strange reason, peppermint humbugs.

৮। মন্দির হইতে ফিরিয়া শিবু বড় এক ঠোঙা তেলেভাজা খাবার, আধ সের দই এবং আধ সের অমৃতি খাইল। তার পর সমস্ত দিন জন্তুর বাগান, জাদুঘর, হগ সাহেবের বাজার, হাইকোর্ট ইত্যাদি দেখিয়া সন্ধ্যাবেলা বীডন স্ট্রিটের হোটেল-ডি-অর্থোডক্সে এক প্লেট কারি, দু প্লেট রোস্ট ফাউল এবং আটখানা ডেভিল জলযোগ করিল। তার পর সমস্ত রাত থিয়েটার দেখিয়া ভোরে পেনেটি ফিরিয়া গেল।

*****

উত্তর
১। রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২।  Winnie the Pooh, A. A. Milne
৩। Charlie and the Chocolate Factory, Roald Dahl
৪। পথের পাঁচালী, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
৫। Love in the Time of Cholera, Gabriel Garcia Marquez
৬। পেটুক, সুকুমার রায়
৭। Harry Potter and the Philosopher's Stone, J. K. Rowling
৮। ভূশণ্ডীর মাঠে, পরশুরাম,


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.