April 11, 2014

তবে যে শুনেছিলাম অদর্শনে প্রেম বাড়ে?



সুধী বন্ধুরা,

অনেক ভেবে শেষমেশ চিঠিটি লেখাই সাব্যস্ত করলাম।

আমার ল্যাপটপ ভেঙে গেছে, আমার হেডফোন হারিয়ে গেছে, আমার অফিসের ওয়ার্ক-উইক সাড়ে বেয়াল্লিশ ঘণ্টা থেকে বেড়ে চারশো বেয়াল্লিশ ঘণ্টা হয়ে গেছে, শনিবারের ছুটিটুটি আর লোকে রেয়াৎ করছে না। আর এ সবকিছুর বাইরে এমন কিছু কাজ এসে উপস্থিত হয়েছে, যেগুলো এইবেলা না করলে আমি ভবিষ্যতে না খেয়ে মরব। আমি বলিনি, আমার মা বলেছেন। মুখে বলেননি, ঠারেঠোরে বুঝিয়েছেন। আর কে না জানে, ঠারেঠোরে বোঝানো কথার গুরুত্ব মুখ ফুটে বানান করে বলা কথার থেকে লক্ষ গুণ বেশি?

অগত্যা আমি চললাম। আবার দেখা হবে আঠাশে এপ্রিল, দু’হাজার চোদ্দয়। ক্যালেন্ডারে দেখলে মাত্র দুটি সপ্তাহ। কিন্তু আমার কাছে দু’কোটি বছর। এই দু’কোটি বছর ধরে আমি আপনাদের বিরহে জ্বলেপুড়ে মরব, রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে যাব। যা খাব কিচ্ছু হজম হবে না, চোখের তলার বাটির কালি আরও তিন পোঁচ গাঢ় হয়ে জমবে।

তবু আমাকে যেতেই হবে। কারণ না গেলে আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব, আর পাগলের ব্লগ কেউ পড়ে না।

তাছাড়া এই সুযোগে সেই লক্ষবার শোনা কথাটা আবারও প্রমাণ হয়ে যাবে। এই ক’দিনের অদর্শনে আপনারা অবান্তরকে (এবং অবান্তরের মালিককে) আরও বেশি ভালোবাসলেন কি না সেইটা। একটা কথা মনে রাখবেন, এই দু’সপ্তাহে আমি আপনাদের যতখানি মিস করব, আপনাদের না দেখতে পেয়ে আমার যত কষ্ট হবে, তার এককোটি ভাগের এক ভাগ কষ্টও যদি আপনাদের হয়, তবে আমার অবান্তর লেখা সার্থক। না হলে আমার মায়ের বাকি সব কথার মতো এই কথাটাও সত্যি প্রমাণ হয়ে যাবে।

গত সাড়ে চার বছর ধরে আমি গুচ্ছের সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই করিনি।

আপনাদের কাঁধে আমার সবজান্তা জননীকে জীবনে অন্তত একটিবারের জন্য ভুল প্রমাণ করার গুরুদায়িত্ব দিয়ে আমি সামনের দুটি সপ্তাহের জন্য দোকান গুটোচ্ছি। আপনারা সব্বাই খুব ভালো হয়ে থাকবেন, গরমে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে নিজে ঘনঘন ঘোল খাবেন ও শত্রুদের খাওয়াবেন, আর দিনান্তে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অবান্তরের কথা একটিবারের জন্য মনে করবেন।

ইতি,
আপনাদের চরণতলাশ্রিত, 
কুন্তলা

পুনশ্চঃ আপনাদের দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে ভুলে যাবেন না।

  

April 08, 2014

কুইজঃ তিলুবাবু (উত্তর প্রকাশিত)



উৎস গুগল ইমেজেস

আজকের কুইজ আমাদের সকলের প্রিয় তিলুবাবুকে নিয়ে। তিলুবাবুকে অবান্তরের পাঠকরা হাতের তালুর মতোই চেনেন, কাজেই আমি আশা করছি সকলে দশে দশ পাবেন। সময় দিলাম চব্বিশ ঘণ্টা। কমেন্ট মডারেশন চালু করলাম ততক্ষণের জন্য। দেশে উত্তর বেরোবে বুধবার বেলা বারোটায়, নিউ ইয়র্কে মঙ্গলবার রাত আড়াইটেয়। টাইমিংটা একটু বেয়াড়া হয়ে গেল, অ্যাডজাস্ট করে নেবেন দয়া করে।

অল দ্য বেস্ট।

*****

১। তিলুবাবুর দাদুর নাম
ক) ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু
খ) ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু
গ) বটুকেশ্বর শঙ্কু

২। নিউটন, প্রহ্লাদ ও বিধুশেখরকে নিয়ে তিলুবাবু যখন মঙ্গলগ্রহ অভিযানে যাচ্ছিলেন তখন রকেটে বসে বসে বিধুশেখর তার যান্ত্রিক গলায় একটা গান গাইত ‘ঘঙো ঘাংঙ কুঁক্ক ঘঙা আগাঁকেকেই ককুং খঙা।’ গানটা চিনতে পারছেন?

৩। তিলুবাবুর ওজন
ক) পঞ্চাশ কেজি পঞ্চান্ন গ্রাম
খ) এক মণ এগারো সের
গ) একশো দশ পাউন্ড

৪। ম্যাকাও পাখিকে গুপ্তচর হিসেবে পাঠিয়ে তিলুবাবুর আবিষ্কৃত অদৃশ্য হওয়ার ফর্মুলা চুরি করিয়েছিলেন যে দুষ্টু বিজ্ঞানী তাঁর নাম
ক) গজানন তরফদার
খ) পুরন্দর পুরকায়েত
গ) অবিনাশচন্দ্র মজুমদার

৫। হং কং-এর যাদুকর চী-চিং এসে তিলুবাবুর দেওয়ালের ‘তিকিতিকি’কে সাময়িক ভাবে যে প্রাণীতে রূপান্তরিত করেছিলেন সেটি হল
ক) মানুষখেকো বাঘ
খ) অ্যাসিডখেকো ড্র্যাগন
গ) আগুনখেকো বিপ্লবী

৬। রোবট-মানুষ রোবুকে বানাতে তিলুবাবুর খরচ পড়েছিল মোটে (যদিও সস্তায় সারতে গিয়ে রোবুর চোখ ট্যারা হয়ে গিয়েছিল, যেটাকে ব্যালেন্স করতে গিয়ে তিলুবাবু রোবুর মুখে একটা হাসি দিয়ে দিয়েছিলেন। অঙ্ক যতই শক্ত হোক না কেন, রোবুর মুখ থেকে সে হাসি কক্ষনও মেলাত না।)
ক) তিনশো তেত্রিশ টাকা সাড়ে সাত আনা
খ) দুশো বাইশ টাকা বাইশ আনা
গ) পাঁচশো পঞ্চান্ন টাকা পনেরো আনা

৭। তিলুবাবু অসংখ্য আবিষ্কার করেছেন সারাজীবনে। তার মধ্যে এমন একটি আবিষ্কার ছিল যা তাঁর বেড়ালের ‘ম্যাও’-এর মানে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে দিতে পারত। তিন রকম ‘ম্যাও’ রেকর্ড করে তিন রকম মানে পেয়েছিলেন তিলুবাবু। এক রকম ম্যাওয়ের মানে ‘দুধ চাই’, আরেকরকম ম্যাওয়ের মানে ‘মাছ চাই’ আর শেষরকম ম্যাওয়ের মানে ‘ইঁদুর চাই’। এই অনবদ্য আবিষ্কারটির নাম হচ্ছে
ক) অমনিপ্লেন
খ) শ্যাঙ্কোভাইট
গ) লিঙ্গুয়াগ্রাফ

৮। তিলুবাবুর মাথায় প্রথম পাকা চুল দেখা দেয়
ক) সাত বছর বয়সে
খ) তেরো বছর বয়সে
গ)একুশ বছর বয়সে

৯। এল ডোরাডো অভিযানে তিলুবাবু যে ভদ্রলোককে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর নাম
ক) অবিনাশচন্দ্র মজুমদার
খ) নকুড়চন্দ্র বিশ্বাস
গ) প্রহ্লাদ

১০। তিলুবাবুর ডায়েরির লেখা ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়, টানলে ছেঁড়ে না, আগুন লাগলে পোড়ে না। কেবল একটি জিনিসের আক্রমণ সে সামলাতে পারে না। যার আক্রমণেই ওই মহার্ঘ ডায়েরি পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হয়। জিনিসটি কী?

*****

উত্তরঃ
১। প্রথম উত্তরটাতেই আমাকে কান ধরে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। তিলুবাবুর প্রপিতামহের নাম ছিল বটুকেশ্বর শঙ্কু। পিতামহের নাম আমিও জানি না। শঙ্কু নিজে ছিলেন ত্রিলোকেশ্বর, শঙ্কুর বাবা ছিলেন ত্রিপুরেশ্বর। কেয়ারলেস মিস্টেক করার জন্য অত্যন্ত দুঃখিত। (প্রোফেসর শঙ্কু ও ভূত)
২। ধনধান্যে পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা (ব্যোমযাত্রীর ডায়রি)
৩। খ) এক মণ এগারো সের (ব্যোমযাত্রীর ডায়রি)
৪। ক) গজানন তরফদার (প্রোফেসর শঙ্কু ও ম্যাকাও)
৫। খ) অ্যাসিডখেকো ড্র্যাগন (প্রোফেসর শঙ্কু ও চী-চিং)
৬। ক) তিনশো তেত্রিশ টাকা সাড়ে সাত আনা (প্রোফেসর শঙ্কু ও রোবু)
৭। গ) লিঙ্গুয়াগ্রাফ (প্রোফেসর শঙ্কু ও রক্তমৎস্য রহস্য)
৮। খ) তেরো বছর বয়সে (স্বপ্নদ্বীপ)। তেরো বছর বয়সে তিলুবাবুর প্রথম চুল পাকা দেখা যায়, সতেরো বছরে টাক পড়তে শুরু করে, একুশ পড়তে না পড়তে মাথাজোড়া টাক। তারপর পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে শঙ্কুর চেহারা একটুও পালটায়নি।
৯। খ) নকুড়চন্দ্র বিশ্বাস (নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো)
১০। ডেঁয়ো পিঁপড়ের কামড় (ব্যোমযাত্রীর ডায়রি)


April 07, 2014

মর্নিং ডাস নট শো দ্য ডে। নেভার এভার।



দুর্ঘটনা সেটাকেই বলা যায় যেটার ঘটমানতা সম্পর্কে আগে থেকে আঁচ পাওয়া যায় না। অর্থা না পড়ে পরীক্ষায় ফেল করলে সেটা দুর্ঘটনা নয়, কিছুই না পড়ে গিয়ে সব প্রশ্ন কমন পেয়ে যাওয়াটাই বরং দুর্ঘটনা।

কাজেই এই ঘটনাটাকে কোনওভাবেই দুর্ঘটনা বলে চালানো যাবে না। শনিবার রাতে যখন ল্যাপটপটাকে মেঝেতে নামিয়ে রাখছিলাম তখনই জানতাম নামানোর জায়গাটা ঠিক বাছছি না, ঘুম থেকে উঠে মেঝের ঠিক ওইখানটাতেই আমি পা দেব। তবুও ওখানেই নামিয়ে রাখলাম। ভোরবেলা অ্যালার্ম বাজলো। আমি উঠে প্রত্যাশামতো ঠিক সেইখানটাতেই পা ফেললাম যেখানটায় ল্যাপটপটা আছে।

ফল, এই।


যে কোনও রকম গোলমালেই আমার স্ট্যান্ডার্ড প্রতিক্রিয়াটা হল ঘটনাস্থল থেকে যথাসম্ভব দ্রুত পিঠটান দেওয়া। বিশেষত সে গোলমালের সঙ্গে যদি আমার কার্য-কারণঘটিত কোনওরকম সম্পর্ক থেকে থাকে। এক্ষেত্রেও সেটাই করলাম। দৌড়ে গিয়ে অর্চিষ্মানকে ধাক্কা মেরে বললাম, 'দেখো দেখো আমার ল্যাপটপ কেমন হয়ে গেছে।'

বেচারা ধড়মড় করে উঠে সব কিছু দেখেটেখে বলল, 'কী করে হল?'

আবার আমার স্ট্যান্ডার্ড প্রতিক্রিয়া। 'আমি জানি না।'

শুনে অর্চিষ্মান ঘুমঘুম চোখে আমাকে যে লুকটা দিল সেটা দুশো পার সেন্ট অবিশ্বাস আর তিনশো পার সেন্ট নিরুচ্চার ‘বস্‌স্‌স্‌স্‌স্‌স্‌...’ মেশানো।

আমি কাঁদোকাঁদো হয়ে বললাম, ‘আমি তো খুব আলতো করে পা-টা ফেলেছিলাম, এই এইরকম আলতো করে, আর আমার ওজন তো মোটে ___ কেজি, তাতে ল্যাপটপ ভেঙে যায় নাকি? তাহলে আর এত দাম দিয়ে ল্যাপটপ কেনার মানেটা কী?

অনেক চেষ্টা করেও চোখে দু’ফোঁটা জল আনতে পারলাম না। ভাগ্যিস অভিনয়ের লাইনে যাইনি।

অর্চিষ্মানের ঘুম ততক্ষণে পুরো ছুটে গেছে। নিজের ল্যাপটপটা আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, ‘টাইপ করো। আই স্টেপড অন মাই ল্যাপটপ স্ক্রিন।’ টাইপ করলাম। ঠিক মনে হচ্ছিল যেন ইস্কুলে বসে খাতা ভর্তি করে, ‘আর কখনও দিদিভাই ক্লাসে না থাকলে কথা বলব না’ গোছের মুচলেকা লিখছি। তবে সে ভাবটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। এন্টার মারতেই স্ক্রিনে যে দৃশ্যটা ফুটে উঠল তাতে আমার দুঃখটুঃখ গিল্টমিল্ট (অর্চিষ্মানের মতে আগাপাশতলা নকল) উড়ে গিয়ে যেটা পড়ে রইল সেটা শুধু বিস্ময়।

কোটি কোটি লোক রাতে ঘুমোনোর সময় ল্যাপটপ মেঝেতে নামিয়ে রাখে এবং কোটি কোটি লোক সকালবেলা ঘূম থেকে উঠে ঠিক ল্যাপটপের ওপরেই ল্যান্ড করে। যারা করে না তারাই বরং সংখ্যালঘু। কোটি কোটি ফোরাম রয়েছে 'স্টেপিং অন মাই ল্যাপটপ’-এর সমস্যা নিয়ে। সে ফোরামে কোটিকোটি লোক এসে কেঁদে পড়ছে, কোটি কোটি লোক এসে বলছে, ‘হে হে, ইন দ্য ইয়ার অমুক, আমারও ঠিক এইরকমটিই হয়েছিল, মাই কনডোলেনসেস, হে হে হে’, আর কোটি কোটি লোক এসে বকে দিচ্ছে। বলছে, ‘আগেই বলেছিলাম। যেমন কর্ম তেমনি ফল, এখন বোঝো ঠ্যালা।’

অনেক খুঁজে শেষে একজনকে পাওয়া গেল যে বলছে ‘যাকগে, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, সে নিয়ে ভেবে আর লাভ নেই। এখন কী করণীয় সেটাই ভাবার।' ভদ্রলোক মহামহোপাধ্যায় লোক, করণীয় কাজের একটা লিস্টিও দিয়েছেন দেখলাম। মনিটর রিপ্লেসমেন্ট ইত্যাদি প্রভৃতি। আমার ল্যাপটপের নামধাম টাইপ করে তার মনিটর বদলাতে কত খরচ পড়বে খোঁজ নিতেই, আবার দুঃখ। দুঃখও নয়, হার্ট অ্যাটাক।

এ মাসের বাজেটের ঘুড়ির লাটাইটা কোনওমতে বাগে এনেছিলাম, চোখের সামনে দেখতে পেলাম সে ঘুড়ি ভোঁকাট্টা হয়ে ভোর ছ’টার আকাশের আবছা নীলে উড়ে উড়ে বহুদূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

একটু বেলা বাড়লে অমলেট-টোস্ট খেয়ে ল্যাপটপ ঘাড়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য নেহরু প্লেস, দিল্লির লোকদের প্রযুক্তিগত যে কোনও ঝামেলা মেটানোর সুপ্রিমকোর্ট। ঝাঁঝাঁ রোদ্দুরে চোখ ঝলসে যাচ্ছিল। এপ্রিলের শুরুতেই এই, জুন মাসে যে কী হবে। নেহরু প্লেসে এসে সার্ভিস সেন্টারের খোঁজ নিয়ে জানলাম আজ সানডে হ্যায় না, ইসি লিয়ে সার্ভিস সেন্টার বনধ্‌ হ্যায়, সোমবার আনা পড়েগা।

রোদ্দুরে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল বলে একটা চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়ালাম। চা নিলাম দুটো। চাওয়ালা বুদ্ধি করে প্রাইম লোকেশন বেছেছে, মাথার ওপর কী জানি একটা মস্ত গাছ বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে ছায়া দিচ্ছে। পাতা দুলিয়ে দুলিয়ে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়াও দিচ্ছে সঙ্গে ফাউ। সে হাওয়া সহযোগে চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমরা পরবর্তী কর্মপদ্ধতি পর্যালোচনা করতে লাগলাম।

বোঝাই যাচ্ছে ল্যাপটপ-পরিস্থিতির আশু কিছু মীমাংসা হবে না। অতঃকিম? মা থাকলে বলতেন বাড়ি গিয়ে স্নান করে খেয়েদেয়ে পড়তে বসতে, কিন্তু আমরা কিনা নতুন যুগের মানুষ, বাড়ি যাওয়ার কথায় আমাদের কান্না পায়। তাছাড়া আরেকটাও ব্যাপার কাজ করছিল মাথার মধ্যে। বিষ যেমন বিষকে কাটে, একটা প্রেম ছাড়াতে যেমন আরেকটা প্রেমের দরকার হয়, তেমনই একটা টাকাখরচের দুঃখ ভোলাতে লাগে আরেকটা টাকাখরচ।

গাছের তলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে আমরা দেখলাম উল্টোদিকে নেহরু প্লেস মেট্রো স্টেশনের লাগোয়া মস্ত মল, সারা গায়ে বিজ্ঞাপন সেঁটে ঝকঝক করছে।

‘চল, আজ বাইরে খাবে?’

চায়ের কাপ ছুঁড়ে ফেলে আমরা ছুট লাগালাম। সে কী দৌড়। রাস্তার এ পারে ফ্রিজে রাখা ডাল ভাত আলুপটল টমেটোর চাটনির মরণফাঁদ, ওপারে হাতে চকচকে ছুরি বাগিয়ে আমাদের পথ চেয়ে বসে আছেন ধপধপে সাদা টুপিওয়ালা শেফ, পৌঁছলেই ঘচাং করে আমাদের গলা কেটে প্লেটে সাজিয়ে পরিবেশন করবেন, উইথ ল্যাম্ব ইন মাসাম্মান কারি অ্যান্ড টেণ্ডারলয়েন স্টেক অ্যান্ড ম্যাশড পটেটো। মরতেই যদি হয় তাহলে আলুপটলের ঝোলে ডুবে মরার থেকে স্টেক চাপা পড়ে মরা ঢের ভালো। কাজেই আমরা প্রাণ হাতে করে ছুটে এসে দোকানে ঢুকে জিভ বার করে হাঁপাতে লাগলাম।  

তারপর ঠাণ্ডা ঘরে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে ডায়েট কোকে চুমুক দিতে দিতে, পরিবেশকদের সঙ্গে ইংরিজিতে বাক্যালাপ করতে করতে আমাদের দিনের চেহারাটা ক্রমশ বদলাতে শুরু করল। ইংরিজিতে বাক্যালাপের ব্যাপারটা ভীষণ ইন্টারেস্টিং লাগে আমার। দু’পক্ষেরই দাঁত ভেঙে যাচ্ছে, অথচ কেউই জমি ছাড়বে না। ছোটবেলায় একটা উক্তি শুনতাম মায়ের মুখে, উৎসটুৎস জানি না। ‘মরিব মরিব, কৌশল করি মরিব’। দামি শপিং মলের দামি দোকানে খেতে গেলে আমার ঠিক এই অনুভূতিটা হয়। ‘মরিব মরিব, ইংরিজি বলিয়া মরিব’। যাই হোক, আমাদের ইংরিজি ওঁরা বুঝতে পারছিলেন, ওঁদের ইংরিজি আমরা বুঝতে পারছিলাম কাজেই নালিশের অবকাশ নেই। মাঝখানে একবার মাসাম্মান আর থাই রেড কারি নিয়ে সামান্য গোলযোগের উপক্রম হয়েছিল তবে তাতে ইংরিজির কোনও দোষ ছিল না। খেতে খেতে আর আড়চোখে পাশের টেবিলের লোকদের থালা পরীক্ষা করতে করতে আমাদের মন দারুণ ভালো হয়ে গেল। দরকারের থেকে অনেক বেশি খেয়ে ও টাকা খরচ করে যখন অটো চেপে বাড়ি ফিরছিলাম তখন ওই প্রাণঘাতী রোদও আর তেমন গায়ে লাগছিল না।

‘ল্যাপটপের ওপর নৃত্য করে’ (এদিকে বাড়িতে আমার বদনাম, আমি নাকি রং চড়িয়ে ছাড়া কথা বলতে পারি না) যে দিনটা শুরু হয়েছিল, সেটা শেষমেশ দারুণ আনন্দে কাটল। এর পরেও যাঁরা দাবি করেন মর্নিং শোস্‌ দ্য ডে, তাঁদের আমার আর কিছু বলার নেই।


April 04, 2014

কখনও কখনও দুপুরবেলাতেই


১।

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বেড়াতে বেরোনোটা আমাদের নিয়মে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। আমি, সায়ন্তন, জয়দীপ আর শাহরুখ। আমি বেরোই ট্রানজিট হাউস থেকে, সায়ন্তন দক্ষিণাপুরম থেকে। রাস্তায় মাঝে মাঝে আমাদের দেখা হয়ে গেলে, দুজনে মিলে হেঁটে সেই জায়গাটায় এসে দাঁড়াই যেটাকে ক্যাম্পাসশুদ্ধু লোক টি পয়েন্ট বলে জানে। টি পয়েন্টে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলতে বলতেই ছায়ামূর্তিটার দিকে চোখ পড়ে যায়। তাপ্তী হোস্টেলের দিক থেকে হেঁটে আসছে। আমরা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে আছি কাজেই ছায়ামূর্তি নিশ্চয় আমাদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। বুঝতেও পারছে যে আমরা ওর জন্যই অপেক্ষা করছি। তবু ছায়ার হাঁটার গতি একচুলও বাড়ে না। সন্দেহ হয়, উল্টে আরও আস্তে হাঁটছে কি না। যেন আমাদের সঙ্গে দেখা করার ওর কোনই ইচ্ছে নেই, স্রেফ নিয়মরক্ষা।

ক্লাসিক জয়দীপএকদিন ছশো পনেরো বাস থেকে নেমে দেখি জয়দীপও নেমেছে পেছন পেছন। আমি বললাম, ‘আরে তুই! কোথা থেকে!’ জয়দীপ বলল, ‘সি পি।’

‘আমিও তো সি পি থেকে উঠেছি, কই দেখতে পাইনি তো?’

‘দেখার কথাও নয়। তোর পেছনের সিটে বসেছিলাম।’

একটা লোক, যাকে আমি গত পঁচিশ বছর ধরে চিনি, প্রথমে ক্লাসমেট তারপর সহকর্মী, যার সঙ্গে আমি পঁচিশ বছর আগে ধাবায় বসে আড্ডা মারতাম, পঁচিশ বছর পর রোজ রাতে খাওয়ার পর হাঁটতে বেরোই---সে এক ঘণ্টা বাসে আমার ঠিক পেছনের সিটে বসে এসেছে অথচ আমাকে টোকা দেয়নি। অন্য কেউ হলে আমি অবাক হতাম, জয়দীপ বলেই হলাম না। আমি অবাক হলে জয়দীপ আরও অবাক হবে। বলবে, 'কিন্তু আমার তো কিছু বলার ছিল না। হঠাৎ টোকা দেবই বা কেন?

জয়দীপ ল্যাম্পপোস্টের নিচে পৌছনোর পর আমরা হাঁটতে শুরু করি। শাহরুখও মটকা ভেঙে উঠে গা ঝাড়া দিয়ে চলে আমাদের পেছন পেছন। রোজই এক রাস্তা। অ্যাডমিন. ব্লককে ডানদিকে রেখে রিং রোড ধরে নাকবরাবর। রাস্তার একঘেয়েমি কাটানোর জন্যই গল্পে বৈচিত্র্য আনার একটা চেষ্টা থাকে বোধহয়। শুধু একটাই নিয়ম মানা হয়, পেশা নিয়ে কোনওরকম কথা বলে না কেউ।

সেদিন রাতে কুয়াশাটা একটু বেশিই ছিল মনে আছে। দিওয়ালির পর ঠাণ্ডাটাও বেশ গায়ে লাগছিল। শার্টের গলার বোতাম আটকে নিয়েছিলাম আমরা তিনজনেই। হাত পকেটে। হাঁটতে হাঁটতে পি এস আরের কাছে পৌঁছতেই হঠাৎ দপদপ করে মাথার ওপরের ল্যাম্পপোস্টটা নিভে গেল। আর তক্ষুনি একটা ময়ূর বীভৎস ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ করে ডেকে উঠল জঙ্গলের কোথাও।

সায়ন্তনই বলেছিল বোধহয়। অন্ধকার হলে কি ভয় বেশি লাগে? কই দুপুরবেলা তো এই একই রাস্তা, একই জঙ্গল, একই ময়ূর---এত ক্রিপি লাগে না?

দুপুর . . . ভয় . . . আমার ঘাড়ে কে যেন বরফ বুলিয়ে দিল। কেঁপে উঠে দু’হাত দিয়ে নিজেকে জড়ালাম। গলা থেকে আবছা একটা আর্তনাদও বেরিয়েছিল বোধহয়। সায়ন্তন বলল, ‘আরে ভয় পাস না, কথা দিচ্ছি ভূত বেরোলে অবলাকে একা ফেলে পালাব না। শাহরুখকে রেখে যাব, ও তোর জন্য ভূতের সঙ্গে ফাইট করবে। কী রে করবি না?’

শাহরুখ এতক্ষণ আমাদের পায়ের সঙ্গে ঘেঁষটে ঘেঁষটে হাঁটছিল, সায়ন্তনের প্রশ্ন শুনে নেহাত চক্ষুলজ্জার খাতিরে একটা নিমরাজি ‘ঘেউ’ দিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল। আমি বললাম, ‘যাক নিশ্চিন্তি।’

কিন্তু সে রাতের মতো আমার শান্তি বিদায় নিল। ঘরের লাইট জ্বালিয়ে সারারাত খাটে কাঠ হয়ে শুয়ে রইলাম। সিলিং ফ্যানের থেকে ঠায় তাকিয়ে। যেন এক সেকেন্ডের জন্যও চোখ সরিয়ে নিলে ওখানে একটা কিছু বীভৎস ব্যাপার ঘটবে। যে ব্যাপারটা গত তিরিশ বছর ধরে আমাকে দিনেরাতে, রাস্তায়ঘাটে, ক্লাসরুমে, শয়নেস্বপনেজাগরণে যখনতখন আক্রমণ করেছে, বিধ্বস্ত করেছে, সেই ভয়ংকর ব্যাপারটা সেই রাতে আবার ঘটা থেকে ঠেকাতে ওই শেষ অক্টোবরের রাতেও আমার ঘাম ছুটে যাচ্ছিল।

২।

দিল্লিতে মেয়েকে গ্র্যাজুয়েশন করানোর আইডিয়াটা আমার বাবামায়ের ছিল না। ছিল বড়মামার। মামার দুই মেয়ে দিল্লিতে জন্মেছে, বড় হয়েছে, স্কুলকলেজ গেছে। মামা বাবাকে বললেন, ‘মেয়েকে আর কদ্দিন আগলে রাখবে কল্যাণ, এবার দিল্লিতে পাঠিয়ে দাও।’ বাবাও রাজি হয়ে গেলেন। বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে আমরা মামার লাজপতনগরের ফ্ল্যাটে এসে উঠলাম। কলেজের রেজিস্ট্রেশন শেষ হলে বাবামা ম্লান মুখে আবার পূর্বায় উঠে পড়লেন আর আমিও আমার সুটকেস নিয়ে এসে উঠলাম কিদোয়াইনগরে পেয়িং গেস্ট থাকব বলে।

মামামামি ভীষণ আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু মামাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করা নিয়ে নানারকম দুঃখের গল্প প্রচলিত আছে বলেই বোধহয় মা রাজি হলেন না। মামির হাত ধরে বললেন, ‘তোমাদের ভরসাতেই তো রেখে যাচ্ছি বৌদি, কিন্তু আমার এই কথাটা শোনো, রুকুকে বাইরে থাকতে দাও। শনিরবি না হয় এসে তোমাদের সঙ্গে দেখা করে যাবে।’

পি জি থাকতে এসে আমার একসঙ্গে অনেকগুলো উপকার হল। তাদের মধ্যে প্রধান দুটো হচ্ছে, এক, সপ্তাহে পাঁচদিন গার্জেনহীন থাকার স্বাধীনতা, দুই, রাশিনার বন্ধুত্ব।

রাশিনা আমার বয়সী, রাশিনা আমারই কলেজের আমারই ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে। বন্ধুত্ব হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল, কিন্তু যখন বেরিয়ে গেল রাশিনারও প্রিয় চরিত্র Esther Greenwood, তখন বন্ধুত্বটা আর শুধু বন্ধুত্ব না থেকে এক নিমেষে গাঢ় বন্ধুত্বে বদলে গেল।

ঘুমের সময়টুকু বাদ দিয়ে আমরা প্রায় সর্বক্ষণই একসঙ্গে থাকতাম। আমাদের দুজনের জন্য ফার্স্টবেঞ্চের দুটো জায়গা বাকিরা খালি ছেড়ে রাখত। ক্লাসের পর দু’জনে লাইব্রেরি যেতাম। লাইব্রেরির ফাঁকে ক্যান্টিনে আমি ইডলি, রাশিনা কাটলেট, আর আমরা দুজনেই চা খেতাম। সন্ধ্যেবেলা একসঙ্গে বাড়ি ফিরে আসতাম, শুক্রবার রাতে কেউই অন্য বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করতে বেরোতাম না। একঘেয়েমির প্রতি দুজনেরই টান ছিল।

তা বলে অমিল যে ছিল না তা নয়। আমি ফাঁক পেলেই গলগল করে বাড়ির কথা বলতাম। হোমসিকনেসের সঙ্গে লড়াই করার ওটাই উপায় ছিল হয়তো। বাড়ির কথা, বাড়ির লোকজন, গাছপালার কথা। মায়ের চিঠিতে মজার কোনও খবর থাকলে সে খবর ট্রানস্লেশন করে রাশিনাকে শোনাতাম। আমার সব গল্প মন দিয়ে শুনত রাশিনা। মায়ের চিঠি শুনে হাসত। হাসি থামলে আমরা দুজনেই চুপ করে থাকতাম। একটা অস্বস্তিকর নীরবতা মাঝখানে ঝুলে থাকত। আমি অপেক্ষা করতাম, এই বুঝি সে নীরবতা ভেঙে এসে দাঁড়াবেন রাশিনার মা, রাশিনার বাড়িতে আরও যাঁরা যাঁরা আছেন বা নেই, পোষা কুকুর বা বেড়ালের পেছনে ছুটোছুটি করা রাশিনার শৈশব---কিন্তু কেউ আসত না। প্রশ্ন করার স্বভাব আমার এখনও নেই, তখনও ছিল না। শেষটায় আমি আর রাশিনার কে প্রথম কথা বলে উঠত মনে নেই আর। শুধু মনে আছে, জাগরণের প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত একসঙ্গে কাটিয়েও আমি রাশিনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে একটি তথ্যও জানতাম না।

রাশিনার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত না।

অবশ্য এই না জানাটা আমাদের বন্ধুত্বে কোনও ছাপ ফেলতে পারেনি। আমরা রোজ ইডলি আর কাটলেট খাচ্ছিলাম, লাইব্রেরি যাচ্ছিলাম, পরীক্ষার আগে রাশিনার ঘরে রাত জেগে পরীক্ষার পড়া পড়ছিলাম।

রাশিনার ঘরে বসে পড়ার কারণ হচ্ছে রাশিনার ঘর আমার ঘরের থেকে অনেক শান্ত ছিল। আমার ঘরেও অশান্তির কোনও কারণ ছিল না, কিন্তু রাশিনার ঘর ছিল গুহার মতো। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেই বাইরের জগতের সঙ্গে সমস্ত সংযোগ ছিন্ন। আমাদের সবার ঘরেই ছিল একটা খাট, একটা বুককেস, একটা পাল্লাওয়ালা দেওয়াল আলমারি আর একজোড়া টেবিলচেয়ার। রাশিনার বিছানার চাদর সর্বদা টানটান থাকত, দেওয়াল আলমারির পাল্লা সবসময় টাইট করে বন্ধ করা। বুককেসে ছবির মতো গোছানো বই। টেবিলের ওপর ঘাড় নিচু করা টেবিলল্যাম্প। হয়তো একটি বা দুটি খাতাবই। থাক করে গুছিয়ে রাখা। বই থাকুক আর না থাকুক, টেবিলের ওপর একটা কাঁচের গ্লাস থাকতই, আর গ্লাসের জলের মধ্যে ডাঁটি ডুবোনো একটিমাত্র সূর্যমুখী ফুল। টাটকা, পূর্ণ প্রস্ফুটিত। ফুলটি তাকিয়ে থাকত দেওয়ালে টাঙানো একটি সাদাকালো ছবির দিকে। ছবি থেকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন Esther Greenwood.

এখনও রাশিনার ঘর বলতে আমার Esther Greenwood-এর ছবিটার কথা মনে পড়ে। ছবির চোখদুটোর কথা। যতবার রাশিনার ঘরের দরজায় দাঁড়াতাম, সকালে কলেজ যাওয়ার আগে কড়া নেড়ে ওকে ডাকার সময়, রাতে গুডনাইট বলার সময়, পড়তে বসার সময়, পড়া শেষ করে উঠে আসার সময়---ওই চোখদুটোকে আমি এড়াতে পারতাম না। আর যতবার Esther Greenwood-এর চোখে চোখ পড়ত, একটা অস্বস্তি শরীর ছেয়ে ফেলত। মাথা মন দেহ সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে যাওয়ার বিশ্রী একটা অনুভূতি। অনেকবার ভেবেছি রাশিনাকে বলি ছবিটা সরিয়ে দিতে। বলিনি। কারণ এক, আমি বলার কে? দুই, জানতাম বললেও রাশিনা ছবিটা সরাবে না, আর তিন, ছবিটা ছাড়া ঘরটার কথা আমি নিজেও কল্পনা করতে পারতাম না। রাশিনার রংহীন, রিক্ত ঘরের সমস্ত প্রাণ যেন এসে জড়ো হয়েছিল ওই দুটি চোখে।

ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষার পর ছুটি কাটিয়ে বাড়ি থেকে ফিরে রাশিনার ঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে ঢুকে যখন সিলিং ফ্যান থেকে রাশিনার ঝুলন্ত দেহটা আবিষ্কার করেছিলাম, তখনও আমার চোখ প্রথমেই টেনেছিল দেওয়ালের ওই দুটো চোখ। দপদপ করে জ্বলছে। অন্যদিনের থেকে বেশি। ঘরের অন্য একমাত্র প্রাণটিকে আত্মসাৎ করার জয়ের হিংস্র উল্লাস ফেটে পড়ছে দৃষ্টি থেকে ।

পি জি মালিকের ফোন পেয়ে মামামামি তক্ষুনি এসে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে। পরের বাহাত্তর ঘণ্টা আমি একটিও কথা বলতে পারিনি। সবাই বলেছিল, শক। ডেডবডি আবিষ্কারের, তার ওপর সেটা আবার বেস্ট ফ্রেন্ডের। কলেজে কথা বলে ছুটি করিয়ে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন বাবামা। মাসখানেক পর দিল্লি ফিরে এসেছিলাম আমি। মামামামি আর কোনও কথা শোনেননি। বাকি দু’বছর মামাবাড়িতে থেকেই কলেজ করেছিলাম। রেজাল্টে লাভক্ষতি কিছু হয়েছিল কি না জানি না, শুধু গ্র্যাজুয়েশনের শেষে ওজন কেজি দশেক বেড়ে গিয়েছিল।

বন্ধুত্ব আর কারও সঙ্গে হয়নি। রাশিনার সঙ্গে যেমন হয়েছিল তেমন তো নয়ই, তার থেকে অনেক কমও না। হাই হ্যালো, চোখে চোখ পড়লে ভদ্রতাসূচক হাসি, দরকারে নোটস্‌ বিনিময়। ব্যস। সে জন্যই বোধহয় কেউ আমাকে কখনও জিজ্ঞাসা করেনি রাশিনা কেমন অমন করেছিল। ভাগ্যিস করেনি। কারণ করলে আমি উত্তরটা দিতে পারতাম না। আর না পারলে সবাই হয়তো ভাবত রাশিনা আমার অত ভালো বন্ধুও ছিল না।

সবাই বলে কলেজের তিনটে বছরই নাকি জীবনের সেরা বছর। আমি মেলাতে পারি না। আমার কলেজের তিনটে বছর মানে শুধু ভেজানো দরজার ওপারে একটিমাত্র সূর্যমুখী ফুল, জ্বলন্ত দুটি চোখ আর চোখের সামনে হাওয়ায় দুলন্ত দুটো পায়ের পাতা।

থার্ড ইয়ার শুরুর সময় যখন কলেজে ফিরলাম তখন আমি সম্পূর্ণ ফোকাসড। বছরের শেষ থেকেই বিভিন্ন জায়গায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্সে ভর্তির পরীক্ষা শুরু হবে। পাখির চোখের মতো একটি ইউনিভার্সিটির নাম আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পাসপোর্ট অ্যাপ্লিকেশন জমা দেওয়া হয়ে গেছে। সামনের অন্তত দশ বছরের জীবন আমি চোখের সামনে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। মসৃণ রাজপথের মত পায়ের কাছে পড়ে আছে আমার ছুটে যাওয়ার অপেক্ষায়।

এমন সময় রাস্তায় একটি ছোট্ট স্পিডব্রেকারের আবির্ভাব হল। থার্ড ইয়ারের প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকে দেখলাম ফার্স্ট বেঞ্চের কোণায় রাশিনা বসে আছে।

আমি পরে অনেক ভাবার চেষ্টা করেছি সেই মুহূর্তে আমার মনের ভাব ঠিক কী রকম হয়েছিল। আতঙ্ক? বিস্ময়? শোক? দমবন্ধ উত্তেজনা? নাকি আনন্দ? প্রিয় বন্ধুকে অপ্রত্যাশিত ফিরে পাওয়ায়? মনে পড়েনি। শুধু মনে আছে যাই মনে হোক না কেন সেটা এক সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হয়নি।

মেয়েটা রাশিনা নয়। মেয়েটা রাশিনার লুক-অ্যালাইকও নয়। মেয়েটাকে দেখলে রাশিনার যমজ বোন বলে ভুল করবে না কেউ। তবু আমার রাশিনার কথা মনে পড়ল কেন?

প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম। মা ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছিলেন ফার্স্ট বেঞ্চে বসতে। গত একটা বছর মায়ের কথার অবাধ্য হয়েছি আমি, ফার্স্ট বেঞ্চের দিকেও যাইনি, কিন্তু সেদিন গেলাম। আমি গেলাম না কেউ টেনে নিয়ে গেল? ব্যাগ রেখে সন্তর্পণে চেয়ার টেনে বসতে মেয়েটা হাসল আমার দিকে তাকিয়ে। রাশিনার হাসি মনে পড়ে যাচ্ছে আমার হু হু করে। রাশিনার ঘাড় বাঁকিয়ে তাকানো . . .

আমি টিপে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। মাথার ভেতর থেকে ধাক্কা দিয়ে রাশিনাকে বার করে দিয়ে চোখ খুললাম আবার। মেয়েটা তখনও হাসিমুখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। মেয়েটা রাশিনা নয়। মেয়েটার হাসির সঙ্গে রাশিনার হাসির কোনও মিল নেই, থাকতেই পারে না। বুক থেকে একটা পাথর নেমে গেল।

হাই, আই অ্যাম রচনা।

রচনা, রাশিনা। জিভের ওপর আলতো করে দুটো নাম গড়িয়ে নিলাম একবার। উঁহু, আদ্যক্ষর ছাড়া আর কোনও মিল নেই। বাঁচা গেছে।

মেয়েটার সঙ্গে আলাপ হল। বাবার বদলির চাকরি, তাই বেটাইমে কলেজে ভর্তি হতে হয়েছে। রাশিনার সঙ্গে আরও একটা অমিল। মাথার ভেতর নোট করে নিলাম। বাবার চাকরি নিয়ে যেচে তথ্য সরবরাহ করত না রাশিনা। এই মেয়েটা রাশিনা নয়। রাশিনা হতেই পারে না। রাশিনা ঝুলছে কিদোয়াইনগরের পি জি বাড়ির দোতলার ঘরে। রাশিনার পায়ের পাতাদুটো এখনও হাওয়ায় দুলছে। দুলবে সারাজীবন। আর দুলন্ত পায়ের পাতার ওপারে জ্বলজ্বল করবে দুটো চোখ।

মেয়েটা কী সব বলে চলেছে। আমি নিজেকে টেনে বাস্তবে ফেরালাম। ইন্ডিপেন্ডেনস। প্রাইভেসি। মেয়েটা এ দুটোর একটাও খোয়াতে চায় না বলে বাড়িতে থাকছে না। একা পি জি-তে থাকছে। ক্লাসের পর মেয়েটাকে লাইব্রেরি চেনাতে নিয়ে গেলাম। ওই বলল নিয়ে যেতে। লাইব্রেরি দেখে মেয়ে ইমপ্রেসড।
‘ভেরি নাইস। উই ক্যান স্টাডি হিয়ার, নো?’

আমি হাসলাম। পারি তো বটেই, কিন্তু চাই কি?

মেয়েটা ছাড়বার পাত্রী নয়। পিছু লেগে রইল। ‘ক্যান ইউ শো মি দ্য ক্যান্টিন প্লিজ?’ আমি একটু বিরক্ত হচ্ছিলাম, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একটা স্বস্তিও হচ্ছিল। রাশিনার সঙ্গে রচনার পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাশিনা এ রকম লেপটে থাকত না কারও সঙ্গে। রাশিনা অন্যকে নিজের দিকে টেনে আনতে পারত। রাশিনার মতোই, কিংবা রাশিনার থেকেও বেশি টেনে আনার ক্ষমতা ছিল Esther Greenwood-এর দুটো চোখের।

ছোটু আমার সামনে ঠক করে ইডলির প্লেট নামিয়ে রাখল। এখন আর ওকে বলতে হয় না। আমি রচনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম ও কিছু খেতে চায় নাকি।

রচনা ঘাড় নাড়ল। খেলেই হয় কিছু ছোটামোটা।

ছোটু গড়গড়িয়ে মেনু বলতে শুরু করল। সামোসা, অমলেট, ব্রেড অমলেট, বান অমলেট, আণ্ডা ভুজিয়া . . .

‘কাটলেট মিলেগা? ফির মেরে লিয়ে দো কাটলেট লে আ ছোটু প্লিজ। অর এক কাপ চায়।’

আমি নিজেকে বিচলিত হতে অ্যালাউ করলাম না। পৃথিবীর কোটি কোটি লোকের কাটলেট খেতে ভালো লাগতে পারে। তাছাড়া মেয়েটা হয়তো আজকে কাটলেট অর্ডার করছে, কাল হয়তো অন্য কিছু করবে। হয়তো আমার দেখাদিখি ইডলিই করবে। আমি বলব ওকে ইডলি অর্ডার করতে, বাবুভাইয়ার ক্যান্টিন ইডলির জন্য বিখ্যাত।

রচনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আমার সচেতন প্রতিরোধ সত্ত্বেও। মেয়েটা ভালো বেশ। পড়াশোনায় মন আছে, পার্টিতে মন নেই। তা বলে বোরিং নয় একটুও। অনেকদিন পর আমার আবার কলেজ যেতে ভালো লাগতে শুরু করল। কোনওদিন আগে পৌঁছে গেলে বেঞ্চের কোণার সিটটা ছেড়ে রেখে অপেক্ষা করতাম। দরজা দিয়ে রচনাকে ঢুকতে দেখে মন খুশি হয়ে যেত। যাক, সারাদিন আর মুখ বুজে থাকতে হবে না। একসঙ্গে লাইব্রেরি যেতাম আমরা। ক্যান্টিনে যেতাম। আমি ইডলি খেতাম, রচনা কাটলেট খেত। খাওয়া শেষ করে দু’কাপ চায়ে আরাম করে চুমুক দিতাম দুজনে।

পরীক্ষার পর একদিন রচনা খুব লজ্জা লজ্জা মুখ করে প্রস্তাবটা দিল। ওর পি জি-র লোকজন সব বাড়ি চলে গেছে। ও থেকে যাচ্ছে এন্ট্র্যান্সের প্রিপারেশন নেওয়ার জন্য। আমি যদি শনিরবিবার ওর সঙ্গে থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করতে চাই তাহলে চলে আসতে পারি। ও পি জি আন্টিকে জিজ্ঞাসা করে রেখেছে, তিনি সানন্দে রাজি হয়েছেন। এখকন আমি যদি আমার মামামামিকে রাজি করাতে পারি . . .

আমার মন ভালো হয়ে গেল। কতদিন কোনও বন্ধুর সঙ্গে বসে পড়াশোনা করিনি আমি। পাশাপাশি বসে নিজের নিজের বইয়ের খোলা পাতায় মগ্ন হয়ে যাইনি। মগ্নতা ভেঙে একে অপরের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করিনি, কলেজের প্রফেসরদের নিয়ে, সহপাঠীদের নিয়ে হাসিনি, নিন্দে করিনি।

আমি রাজি হয়ে গেলাম। মামামামির জন্য চিন্তা নেই। সপ্তাহান্তে একসঙ্গে পড়া তৈরি করার মতো বন্ধু আমার হয়েছে জানলে তাঁরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন। গত দু’বছর ধরে এই দিনটার জন্যই অপেক্ষা করে আছেন তাঁরা।

রচনার চোখমুখ হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একটা নোটপ্যাডের পাতায় খসখস করে কী একটা লিখে পাতাটা ছিঁড়ে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ইয়ে লে মেরা অ্যাড্রেস। বহোত আসান হ্যায়। আই এন এ মার্কেটকে তরফ সে আয়েগি তো রাইট মে ফার্স্ট যো কাট আয়েগা . . .’

সেই কাট নিয়ে পাঁচ মিনিট সোজা হেঁটে গিয়ে বাঁদিকের গলি বেয়ে দশ পা, তারপর ডানদিকে বেঁকে ডানহাতের তৃতীয় বাড়ি। আমাকে ও বাড়ি চেনানোর কোনও দরকার নেই। দিল্লিতে ওটাই আমার প্রথম ঠিকানা ছিল। এখনও চোখ বেঁধে দিলে আমি ও বাড়ি পৌঁছে যেতে পারব।

ছেঁড়া কাগজের টুকরোটা থেকে মুখ তুলে তাকালাম। রচনা তখনও পথনির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিল। আমি আর হাসছিলাম না। রচনা বলল, ‘সমঝা?’

আমি ঘাড় নাড়লাম। যদিও আমি কিচ্ছু বুঝিনি। আমার মাথার ভেতর সব গুলিয়ে গেছে। একটা ক্ষীণ যুক্তি মাথার ভেতরে ক্রমাগত বলে যাচ্ছে, কাকতালীয় ঘটনা এখনও পৃথিবীতে ঘটে রুকু। এটা সে রকমই একটা ঘটনা। গত এক বছরে নিশ্চয় ওই বাড়িতে অনেক লোক থেকেছে, এসেছে গেছে। রচনাও তাদেরই মধ্যে একজন।

আর একজন বলেই শনিবার ওই বাড়িটায় রচনার সঙ্গে আমি দেখা করতে যাব। যেতেই হবে আমাকে। না গেলে আমি শান্তি পাব না।

কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেল বাকি ক’টা দিন। শনিবার সকালে উঠে যন্ত্রের মতো মামির হাতের লুচিতরকারি খেলাম, তৈরি হলাম, চুল আঁচড়ালাম। মামি বন্ধুর বাড়িতে পরার জন্য জামাকাপড় বেছে রেখেছিলেন, গামছা টুথব্রাশ---যন্ত্রের মতো সেগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম।

ঠিক আধঘণ্টা বাদে দেখলাম আমি কিদোয়াইনগরের বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মোটে একবছরে বদলানোর কথাও নয়, বদলায়ওনি বাড়িটা। সবুজ রঙের গ্রিল গেট ঠেলে ঢুকে ছোট বাগান। তখনও আগাছাভর্তি ছিল, এখনও আছে। বাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে বাড়ির পাশের দিকে চলে গেলাম আমি। আন্টিজীর ফ্যামিলি বাড়ির সামনের দরজা দিয়ে যাতায়াত করে, পি জি-র মেয়েরা পাশের দরজা দিয়ে। সে দরজা খোলাই ছিল। আমি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে শুরু করলাম।

আমার কোনও সন্দেহই ছিল না রচনা ওই ঘরটাতেই থাকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথম ঘরটা। আমি থাকতাম দ্বিতীয়টায়। সন্দেহ ছিল না বললে ভুল হবে। আমার তখন সন্দেহ, বিশ্বাস, অবিশ্বাসের ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। হেঁটে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ালাম আমি। দরজায় টোকা মারার আগে দু’সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। বুকের ভেতরটা ভীষণ খালি লাগছিল। কেন এলাম আমি এখানে? কীসের আশায়? কাকে দেখব বলে? কার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিলাম আমি? রচনা? নাকি আগাগোড়াই রচনার মধ্যে অন্য কাউকে দেখতে চেয়ে এসেছি আমি?

আমার হাতের আঙুলগুলো দরজায় টোকা মারল। কোনও উত্তর নেই। রুকু, ফিরে চল। এক্ষুনি নেমে যাও ওই সিঁড়ি দিয়ে, যে সিঁড়ি বেয়ে তুমি উঠে এসেছ। আমার হাত আবার টোকা মারল। এবার আগেরবারের থেকে জোরে। ভেতরে কেউ একটা নড়াচড়া করছে।

‘জাস্ট আ সেকেন্ড।’

রচনার গলা। রচনা। রচনা থাকে এখানে এই ঘরটায়। রচনা। যে আমার পাশে বসে ক্লাস করে রোজ, যে আমার সঙ্গে লাইব্রেরি যায়, ক্যান্টিনে গিয়ে নিয়ম করে কাটলেট অর্ডার করে। যে পার্টি করতে ভালোবাসে না। যার সেন্স অফ হিউমারকে আমি হিংসে করি, যার সঙ্গে একদিন দেখা না হলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়, সেই রাশিনা থাকে এখানে।

দরজা খুলে গেল। আমার সামনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমি তার দিকে দেখছি না। আমার চোখ তার মাথার পাশ দিয়ে সোজা চলে গেছে ওপাশের দেওয়ালের দিকে। দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবি। ছবিটাও একটা মেয়ের। মেয়েটা সোজা তাকিয়ে আছে আমার দিকে। সটাং। নিষ্পলক। Esther Greenwood-এর সে জ্বলন্ত দৃষ্টির সামনে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে আমার সমস্ত প্রতিরোধ। আমার হাঁটু কাঁপছে। আমি আর তাকিয়ে থাকতে পারছি না। ছবি ছেড়ে আমার চোখের দৃষ্টি নেমে আসছে নিচের দিকে। নিচে ফাঁকা টেবিলের ওপর একটা কাঁচের গ্লাসের ভেতর ফুটে আছে একটিমাত্র সূর্যমুখী ফুল। উজ্জ্বল। পূর্ণ প্রস্ফুটিত।

‘ম-মুঝে যানা হোগা।’ আমি টলন্ত পায়ে পিছিয়ে আসছি।

‘অন্দর নেহি আওগি?’ দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা জানতে চাইছে। হাসছে মেয়েটা।

আমার কাঁধ থেকে মামির গুছিয়ে দেওয়া ব্যাগ খসে পড়ে গেছে। পড়ুক। চাই না আমার ব্যাগ। আমি পেছন ঘুরি। দশ পা ডানদিকে হেঁটে যেতে পারলেই সিঁড়ি। আমি পা বাড়াই।

একটা হাত আমার পিঠে এসে থামে। ভীষণ নরম, আলতো একটা হাত।

‘রুক্মিণী . . .’

প্রথমবার এই গলাটা শুনে বোরোলিনের বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়েছিল আমার। শ্রাবন্তী মজুমদার ফ্যাঁসফেঁসে গলায় গাইছেন, ‘সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন’। গলাটা গত একবছর শুনিনি আমি। জাগরণে শুনিনি, কিন্তু প্রতি রাতে দুঃস্বপ্নে এই গলাটা এসে আমাকে ডেকেছে। রুক্মিণী, রুক্মিণী, রুক্মিণী।

কিন্তু এটা তো স্বপ্ন নয়, এটা তো ঘোর বাস্তব। এখন তো রাত নয়। চোখের ওপর দিল্লির দুপুরের আলো ঝকঝক করছে। রাস্তার হর্নের আওয়াজ কানে আসছে আবছা আবছা।

‘রুক্মিণী . . .’

আমি পেছন ফিরব না। আমি বাড়ি যাব। আর মোটে দশটা পা।

‘রুক্মিণী . . .’

আমি ঝটকা মেরে পেছন ফিরলাম। পেছনের মেয়েটার চোখে চোখ রাখব বলে। কিন্তু পেছনে তো কেউ নেই। দূরে দেওয়ালে Esther Greenwood-এর ক্ষুধার্ত চোখ, চোখের নিচে হলুদ সূর্যমুখী যেমনকার তেমনি আছে। সূর্যমুখী আর আমার মাঝখানে শূন্য হাওয়ায় শুধু দুলছে একজোড়া পা।


৩।

আমার চিৎকার শুনে নিচের তলা থেকে লোকজন ছুটে এসে মূর্ছিত আমাকে এবং সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা রচনা শ্রীবাস্তব দুজনকেই আবিষ্কার করে। মামামামিকে আবার ফোন করা হয়। বাবামা আবার কলকাতা থেকে ছুটে এসে আমাকে বাড়ি নিয়ে যান। সবাই ভেবেছিল এ ধাক্কা আমার পক্ষে আর সামলানো সম্ভব হবে না। কিন্তু সে রকম কিছুই হয়নি। আমি ঠিকই ছিলাম। পরীক্ষা দিয়ে নিজের পছন্দের ইউনিভার্সিটিতে ভর্তিও হয়েছিলাম। পাসপোর্টে ভিসার ছাপও পড়েছিল। পরের জীবনটুকু যেমন ভেবেছিলাম, ছোটখাটো ওঠাপড়া বাদ দিলে সেভাবেই চলেছিল আমার জীবনটা। শুধু সূর্যমুখী ফুলের দিকে আর কখনও আমি তাকাতে পারিনি।            


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.