May 27, 2015

Graphology





প্রথমেই খারাপ খবর, আমি শাই কিংবা স্টুডিয়াস, দুটোর একটাও নই। কনসেনট্রেটেড আর মেটিকুলাসও নই। জঘন্য। অবশ্য ভালো খবর হচ্ছে খেলাটা তার মানে বুজরুকি নয়। আমাকে যদি কনসেনট্রেটেড বলত তাহলে আর কিছু বলার থাকত না। পরেরগুলো কী বলে দেখা যাক।

নাঃ, খেলাটাকে সিরিয়াসলি নিতে হচ্ছে। বলছে আমি আউটগোয়িং নই, পিপল-ওরিয়েন্টেডও নই। পিপল? পাগল? অ্যান্টি পিপল ওরিয়েন্টেড বলে যদি কিছু থেকে থাকে তবে আমি সেটা। বলছে আমি নাকি অ্যাটেনশনও ভালোবাসি না। হোয়াট? এক সন্তান, অ্যাটেনশন ভালোবাসি না কী রকম? পাই না সেটা আলাদা কথা। অবশ্য তাতে আমার দুঃখ নেই। যতক্ষণ মা আর অর্চিষ্মান (আর অবান্তরের পাঠকরাও) আমাকে অ্যাটেনশন দিচ্ছে ততক্ষণ আমি পৃথিবীর আর কারও অ্যাটেনশনের তোয়াক্কা করি না।

বাঃ বাঃ, এই তো আমাকে ওয়েল অ্যাডজাস্টেড আর অ্যাডাপ্টেবল বলেছে। বলেছিলাম, খেলাটা ভালো।

এই মেরেছে, বলছে শব্দের মধ্যে বিরাট বিরাট ফাঁক দিয়ে লিখলে তবেই নাকি সব স্বাধীনতাপ্রিয় আর তারা নাকি কেউ ভিড়ে যেতে পছন্দ করে না। আর যারা ঘেঁষাঘেঁষি করে লেখে তাদের নাকি একা থাকতে কান্না পায়। আমি একলা থাকতে মারাত্মক রকম পছন্দ করি কিন্তু আবার খাতার এমাথা ওমাথাতেও শব্দ লিখি না। স্বাভাবিক দূরত্ব রক্ষা করি। সেটার জন্য কোনও ক্যাটেগরি নেই? আচ্ছা আমি নিজেই তৈরি করে নিচ্ছি। আমার মতো লোকেরা একা থাকতে ভালোবাসে কিন্তু একা থাকতে থাকতে বোর হয়ে গেলে ভালোলাগার মানুষদের সঙ্গের জন্য হেদিয়ে মরে। তবে সে রকম লোক বড়জোর এক কিংবা দু’জন।

জানতাম, আর্টিস্টিক বা ক্রিয়েটিভ কোনওটাই আমি নই। লজিক্যাল আর সিস্টেম্যাটিক . . . হাহাহাহাহা, নই নই, এই রকম সোজা প্রেডিকশন করার জন্য এরা কি নোবেল পুরস্কার আশা করছে নাকি? তা বলে আমার সব খারাপ না। আমার সেলফ এস্টিম আছে যথেষ্ট পরিমাণে, আশা এবং উচ্চাশাও বেশ বাড়াবাড়ি রকমই আছে। না আমি মোটেই টকেটিভ নই, সোশ্যাল বদনামও কেউ দিতে পারবে না, বরং এরা যে বলছে আমার ধাতটা ইন্ট্রোভার্টের দিকেই, ঠিকই বলেছে এরা। তবে i-এর ওপরের বিন্দু দেখে দীর্ঘসূত্রিতার বিচার করা একটু ছেলেমানুষি। সে বিচারে দেখা যাচ্ছে আমি দীর্ঘসূত্রী নই, যেটা আপাদমস্তক ভুল। তাছাড়া বলা হচ্ছে আমি নাকি ডিটেল-ওরিয়েন্টেড, যেটা সত্যি হলে আমি খুশি হব।

আপনার হাতের লেখা আপনার সম্বন্ধে কী বলছে?


May 26, 2015

রোসাং সোল ফুড



দিল্লিতে গরম পড়েছে। অফিসে অফিসে কাজের ধুম। উৎপাদনশীলতা আকাশ ছুঁয়েছে। সকাল ন’টা বাজতে না বাজতে সবাই সিটে, এসির তলায়। পাঁচটা সাতাশ বাজলে যারা কম্পিউটারের ঝাঁপ ফেলত তারা সাড়ে ছ’টায় জানালার বাইরের চোখধাঁধানো আলোর দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠছে। বলছে, আরও খানিকটা কাজ সেরে নিই এইবেলা। একের পর এক রেকর্ড ভাঙছে। ওয়ার্মেস্ট মনডে ইন ফর্টি ইয়ারস। হটেস্ট ওয়েনস্‌ডে ইন থার্টি। মেয়েরা জিনস ত্যাগ দিয়ে ফিরে গেছে চিকনের কুর্তি আর সুতির ঢিলে সালওয়ারে। ছেলেদের সহ্যশক্তি দেখে তাদের চোখ কপালে। ওরা এখনও ট্রাউজার চালাচ্ছে কোন ভরসায়? পাজামা/ধুতি দোষ করল কীসে? সন্ধ্যেবেলা প্রতিদিন ঝড় উঠছে। নিষ্ফলা ঝড়। অটোভাইসাবকে নেহরু প্লেসের জ্যাম এড়িয়ে জি. কে. ওয়ান ধরার পরামর্শ দিয়ে মুখ বন্ধ করতেই দাঁতের সারি জুড়ে কিচকিচে ধুলো। গোটা শহরটা চাপা পড়ে গেছে খটখটে শুকনো ধুলোর তলায়। অটোর কাঁচে দুফোঁটা জল পড়ল? নাকি মূলচন্দের মোড়ে মরীচিকা দেখছি?

আমার দেহটাই শুধু পড়ে আছে দিল্লিতে। গরমে ভাজাভাজা হচ্ছে, লু-তে পুড়ছে, ধুলোয় মাখামাখি হচ্ছে, এয়ারকন্ডিশনড অফিস থেকে বেরিয়ে ব্লাস্ট ফার্নেস অটো আর ব্লাস্ট ফার্নেস অটো থেকে বেরিয়ে এয়ারকন্ডিশনড অফিসের কনফিউশনে হেঁচেকেশে সারা হচ্ছে। আমার মন পালিয়েছে অন্য কোথাও। আমি জানি না কোথায়। তবে নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়ার যে ট্র্যাভেল ম্যাপটা বুকমার্ক করে রেখেছিলাম সেটাকেও খুঁজে পাচ্ছি না যখন তখন ধরে নেওয়া যায় ওদিকটাতেই গেছে। শুনেছি ওদিকটায় এখনও অনেক সবুজ, ভেজা হাওয়া ধুলোদের ধমকে মাটিতে মিশিয়ে রাখে, হঠা একেকটা ঝোড়ো হাওয়ায় শার্টের গোটানো হাতা থেকে বেরিয়ে থাকা চামড়ায় কাঁটা দেয়। ঢালু ছাদওয়ালা কাঠের বাংলোর বারান্দায় সাবেকি ডিজাইনের গামবাট চেয়ারটেবিলে বসে লোকে চা খায় আর যতদূর চোখ যায় ততদূর ছড়ানো চাবাগানের সবুজের দিকে তাকিয়ে চোখের ব্যায়াম করে।

মনের পিছুপিছু এখন আমার সেখানে দৌড় লাগানোর উপায় নেই, তাই ভাবলাম সান্ত্বনা হিসেবে শরীরটাকে ওদিককার একটা কোনও দোকানে খাবার খাইয়ে আনি। অসম আর মেঘালয়ের খাবার চেখে দেখেছি আগেই। বাকি আছে অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা আর সিকিম। কোন রাজ্যের ভবনে যাব সে ডিসিশন নিতে হিমশিম। এমন সময় একটা দোকানের খবর পাওয়া গেল যেখানে গেলে আটটা রাজ্যেরই খাবার পাওয়া যাবে। বাছবিচারের ঝামেলা নেই।

রোসাং সোল ফুডের মেনুতে অরুণাচল, আসাম, মণিপুর, মিজোরাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও সিকিম – সব রাজ্যের খাবার পাওয়া যায়। রোসাং সোল ফুড (বার বার এত বড় নামটা লেখার কারণ রোসাং নামের আরও একটা রেস্টোর‍্যান্ট আছে সফদরজং-এ। সেই রোসাং-এর এই রোসাং-এর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক আছে কি না আমি জানি না।) খুঁজে পাওয়া খুব সোজা। সি আর পার্কের দিক থেকে আসলে আই. আই. টি. ফ্লাইওভারের তলা দিয়ে ডানদিকে বেঁকে অরবিন্দ মার্গ ধরে সোজা চলতে চলতেই বাঁদিকে গ্রিন পার্ক। সেখানে কুখ্যাত উপহার সিনেমাহলের ভাঙাচোরা বাড়িটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সে বাড়ির দিকে মুখ করে দাঁড়ালে বাঁদিকেই রোসাং সোল ফুড। বড় বড় করে নাম লেখা দোকান। হারানোর সম্ভাবনা শূন্য।

জোম্যাটোয় রোসাং সোল ফুডের প্রচুর রেটিং, প্রচুর প্রশংসা। নিন্দেও আছে খানকতক। তবু আমার অবশ্য সন্দেহ ছিল না যে খাবার আমাদের ভালোই লাগবে। কারণ উত্তরপূর্ব ভারতের খাবার আমার ভালো লাগে। একটাদুটো ব্যতিক্রম বাদ দিলে ওদের সব খাবারই চোখে জল আনা ঝাল। আর পর্ক। রাজকীয় পর্ক। খারাপ লাগার কোনও কারণই নেই।

আঁটটা রাজ্যের খাবার এক মেনুতে আঁটানোর সমস্যা হল যে অর্ডার করা কঠিন হয়ে পড়ে। এখন অবশ্য জোম্যাটোতে মেনুটেনু সব আগেভাগেই দেখতে পাওয়া যায় তাই একটা আন্দাজই ছিল কী কী অর্ডার করব। ড্রিংকসের অংশটুকু সোজা। ওয়ান ফ্রেশ লাইম সোডা (সুইট) ফর হিম, ওয়ান ফ্রেশ লাইম সোডা (সল্টি) ফর হার। সঙ্গে স্টার্টার হিসেবে মিজোরামের Bwangsa Kan


ব্যাপারটা দেখতে আমাদের বেগুনির মতো। কিন্তু বেগুনের বদলে বেসনের খোলার ভেতর রয়েছে মাংসের চটপটি। তাছাড়া বেগুনির মতো নরমও নয়। ছুরিকাঁটা দিয়ে কাটতে বেশ গায়ে জোর লাগে। তার থেকে এদিকওদিক তাকিয়ে টুক করে হাতে দিয়ে তুলে কামড় বসানো সোজা। সঙ্গে ছিল একটি লাল ও একটি ঘোর বাদামিবর্ণ চাটনি। উপস্থিতিতে মাংসের বেগুনির থেকে তারা কোনও অংশে কম যায় না। গোটা ভোজে এটাই অর্চিষ্মানের ফেভারিট ডিশ।


মেন কোর্সে আমরা নিলাম মেঘালয়ের Jaddoh আর মণিপুরের Voksa Meh টাকনা দেওয়ার জন্য সঙ্গে নেওয়া হল শুকনো মাছের চাটনি। Jaddoh আমরা আগেও খেয়েছি। শিলঙে। এবার অন্যকিছু নেওয়া যেত, কিন্তু নস্ট্যালজিয়ার মুখ চেয়ে আমরা আবার Jaddoh-ই অর্ডার করলাম। Jaddoh কে খাসি পলান্ন বলা যেতে পারে। তবে অন্নটা আমাদের বাসমতীর মত শহুরে নয়, বন্য। বেঁটেখাটো। আমাদের ভাতের মতো ঝরঝরেও নয়, বরং সুশির স্টিকি রাইসের সঙ্গে তার সাদৃশ্য বেশি। রাগীরাগী মুখ করে নাদুসনুদুস পর্কের টুকরোগুলোকে গার্ড দিচ্ছে।


দ্বিতীয় মেনকোর্স Voksa Meh। মণিপুরের খাবার। রোসাং সোল ফুডের মেনুতে Voksa Meh-র বিবরণ দেওয়া আছে মিট উইথ মণিপুরী হার্বস। ইন্টোরনেটে একজায়গায় দেখলাম মিট উইথ ব্যাম্বু শুট। সে হার্বই হোক বা ব্যাম্বু শুট, পর্কের কাছে সবাই ম্লান। এত নরম, এত স্বাদু মাংস আমি শেষ কবে খেয়েছি মনে নেই।


এই হল গিয়ে রিভার ফিশ চাটনি। বেসিক্যালি শুঁটকি মাছ গুঁড়ো। নোনতা, কুড়কুড়ে। সামান্য আঁশটে গন্ধ পদটাকে একটা আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আমি বলছি না, আমি ছাড়া আমাদের বাড়িতে আরেকজন যে থাকে, যে কিনা শুঁটকির নাম শুনলে নাক কুঁচকোয়, সে বলেছে।


খাওয়া চলাকালীন বুঝিনি, খাওয়া শেষের পর বুঝতে পারলাম কী পরিমাণ খেয়ে ফেলেছি। তাও Jaddoh-র বাটি পুরো শেষ করতে পারিনি বলে মেরি দুঃখীমুখ করলেন। বললেন, “আই হ্যাভ আ ব্যাড ফিলিং।” আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে খাবার শেষ করতে না পারাটা আমাদের বাঙালি রুগ্ন পেটের দোষ (আমার বাবা হলে বলতেন, স্বভাবের) রান্নার নয়। সত্যিসত্যিই এত ভালো রান্না চট করে পাওয়া যায় না।

ফেরার পথে রিং রোডের ফ্লাইওভারের ওপর যখন দাঁড়িয়ে আছি তখন দিল্লির একটাও গাছের একটাও পাতা নড়ছে না। লাখ লাখ এসি গাড়ি আমাদের অসহায় অটোটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ফুটন্ত লাভার মতো ভাপ ছাড়ছে। আমরা চুপ করে অটোর ভেতর বসে আছি, হাত পা নাড়ানোর ক্ষমতা নেই। ফুড কোমা বোধহয় ওকেই বলে। শরীরের মধ্যে কোথাও একটা চেতনা টিমটিম করছে কারণ টের পাচ্ছি আর দু’মিনিটের মধ্যে জ্যাম না ছাড়লে জ্যান্ত সেদ্ধ হয়ে যাওয়া থেকে আমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। এমন সময় হঠাৎ চোখের সামনে থেকে দিল্লিটিল্লি সব হাওয়া, আমি ঢালু ছাদওয়ালা বাংলোর বারান্দার কড়িকাঠ থেকে বাঁধানো দোলনায় চড়ে দুলছি। আমার চোখে সবুজ, গায়ে ঠাণ্ডা হাওয়া, চোখে সবুজ, মনে শান্তি।

সঙ্গে সঙ্গে অটোটা চলতে শুরু করল আর আমার এমন সুন্দর হ্যালুসিনেশনটাও ভেঙে খানখান হয়ে গেল। বাড়ি এসে জুতো ছেড়েই ল্যাপটপের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমি আরেকখানা নর্থ ইস্টের ম্যাপ ডাউনলোড করে সেটাকে ব্যাকগ্রাউন্ড বানিয়ে ফেললাম। এখন যখনই গরম সহ্যসীমা ছাড়াচ্ছে সেটার দিকে তাকিয়ে বসে থাকছি। দেখছি সবুজ বন আর ধূসর পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে কেমন সুন্দর এঁকেবেঁকে চলেছে নীল ব্রহ্মপুত্র। চমৎকার কাজ দিচ্ছে।

*****

Rosang Soul Food
S-20, Ground Floor, Near Uphaar Cinema, Block A, Green Park Extension, Green Park, New Delhi, Delhi 110016
Phone 084479 63810



May 23, 2015

সাপ্তাহিকী






Solitude is fine but you need someone to tell that solitude is fine.
                                                                                                    --- Honoré de Balzac

ধারাবাহিক পড়া কিংবা দেখা, কোনওটাই আমার পছন্দ নয় (কমিটমেন্ট ইস্যুস)। তবে এই ধারাবাহিকটা নিয়ম করে দেখব ভাবছি।


একফোঁটা বৃষ্টির জন্য চাতকপাখি হয়ে বসে আছি ঠিকই কিন্তু এইরকম বৃষ্টি চাই না তা বলে।


শেষ কবে পাখির ডাক শুনেছেন মন দিয়ে? অভ্যেসটা ফিরিয়ে আনার কারণ আছে কিন্তু।

ডেনমার্কের বাজারে একটা বিপ্লব আসতে চলেছে।



বিখ্যাত অভিনেতাদের অডিশন শোনার আগ্রহ থাকলে ক্লিক করুন।



  

May 19, 2015

Tom Wolfe on the Intellectual


We must be careful to make a distinction between the intellectual and the person of intellectual achievement. The two are very, very different animals. There are people of intellectual achievement who increase the sum of human knowledge, the powers of human insight, and analysis. And then there are the intellectuals. An intellectual is a person knowledgeable in one field who speaks out only in others. Starting in the early twentieth century, for the first time an ordinary storyteller, a novelist, a short story writer, a poet, a playwright, in certain cases a composer, an artist, or even an opera singer could achieve a tremendous eminence by becoming morally indignant about some public issue. It required no intellectual effort whatsoever. Suddenly he was elevated to a plane from which he could look down upon ordinary people. Conversely — this fascinates me — conversely, if you are merely a brilliant scholar, merely someone who has added immeasurably to the sum of human knowledge and the powers of human insight, that does not qualify you for the eminence of being an intellectual.


May 18, 2015

কালো ডাণ্ডা



কালো ডাণ্ডাদুটো কোথা থেকে আমাদের বাড়িতে  এসেছিল কেউ জানে না।

আমার জানার কথাও না অবশ্য, কিন্তু মাও নাকি জানেন না। বললেন, “সেই বিয়ে হওয়া থেকে দেখছি।” বাবা বললেন, “বিয়ে? ফুঃ। আমি দেখছি সেই জন্মে থেকে।” ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করতে ঠাকুমা আকাশ থেকে পড়ে বললেন, “কালো ডাণ্ডা? কোন কালো ডাণ্ডা?”

“আরে, ওই যে একহাত মতো লম্বা, কুচকুচে কালো, মোলায়েম গা।”

ঠাকুমা সিলিং-এর দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন।

“আরে, ওই যে নতুনঘরের খাট আর ম্যাট্রেসের ফাঁকে যে ডাণ্ডাদুটো শুয়ে থাকে। মা রোজ মশারি গোঁজার সময় সেগুলো সরিয়ে চেয়ারে রাখে আবার সকালবেলা বিছানা তোলার সময় স্বস্থানে ফিরিয়ে দেয়।”

“ওঃ, ওই ডাণ্ডাদুটো? ওগুলো তো সেই যে বছর কলকাতায় ভয়ংকর বৃষ্টি হয়েছিল, রেললাইন ডুবে গিয়ে ট্রেনমেন সব বন্ধ হয়ে সে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড ঘটেছিল। সাঁতরাগাছির লোকোমোটিভ ফ্যাক্টরি থেকে ধুতি হাঁটুর কাছে তুলে খপরখপর করে সেই জল ভেঙে হেঁটে হেঁটে হাওড়া এসে সেখান থেকে ঠ্যালাগাড়ি চেপে সব বাড়ি এসেছিল। একা নয় অবশ্য, সঙ্গে বন্ধুবান্ধবও ছিলশান্তিকাকুকে দেখেছিস তো তুই? শনিরবিবার সকালে তোর বাবাকাকাকে অংক করাতে আসত। সরু করে ছোলা পেয়ারা গাছের ডাল পাশে নিয়ে বসত, ঘণ্টা তিনেক ছেলেপুলের মুখে আর রা নেই, ঘাড় গুঁজে সব অংক কষছে। উফ, কী শান্তি কী শান্তি। আমি সেই ফাঁকে রান্নাবান্না ফেলে একটু ঝিমুনি দিয়ে নিতাম। সেই শান্তিকাকুকে চিনিস না? চন্দন, অ্যাই চন্দন? শান্তিকাকু আসেনি কখনও এ বাড়িতে? ইস, ডাকা উচিত ছিল। তোরাও তো ছুটির দিন দেখে যেতেটেতে পারিস। বেশি দূর তো নয়, বনগাঁ। অ্যাঁ, বনগাঁ নয়, নৈহাটি? ওই একই হল। একদিন সময় করে গিয়ে দেখে আসিস।”

কালো ডাণ্ডাদুটো দেখতে চমৎকার। কুচকুচে কালো মসৃণ গা। হাতে তুলে ধরে দেখলে বোঝা যায় বেশ হালকা। কিন্তু ঠাসবুনোট কাঠের তৈরি। যে মারবে তার বেশি পরিশ্রম হবে না, যার পিঠে পড়বে সে মজা টের পাবে।

মজা ভেরিফাই করার অবশ্য কোনও উপায় নেই যদ্দূর জানি আমাদের বাড়ির কারও পিঠে ডাণ্ডাদুটো পড়েনি কোনওদিন। বাড়ির বাইরের কারওর পিঠেও পড়েনি। কলতলায় ধুতে নিয়ে যাওয়া মাছের টুকরো মুখে নিয়ে পালানো হুলোর পিঠেও না, গেট খোলা পেয়ে ঢুকে ঠাকুমার লাউচারা মুড়িয়ে খেয়ে যাওয়া বাছুরের পিঠেও না।

আপাতদৃষ্টিতে দেখতে গেলে ডাণ্ডাদুটোর মতো এত ইউজলেস অস্তিত্ব আমাদের বাড়ির আর কোনও জিনিসের নেই। আমারও না (আমাকে অবশ্য ইউজলেস বলেনি কেউ। উল্টে এমন ভান করেছে যেন জন্মেই আমি বাড়িশুদ্ধু লোকের চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করে দিয়েছি। তাদের ব্যক্তিগত সূর্যচন্দ্রগ্রহতারা সারাদিন আমাকে ঘিরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। সত্যিটা আমি নিজেই টের পেয়েছি।) আমাদের ছাদের চিলেকোঠার পেছনে দাঁত ছিরকুটে পড়ে থাকা মাটির ভাঙা হাঁড়িটারও না। হাঁড়িটার ভেতর জমা জলেও বর্ষাকালে মশারা ডিম পাড়ে, নম নম করে ম্যালেরিয়ার ক্যাম্পেনিং শুরু হয়। ডাণ্ডাদুটো সেটুকু কাজেও লাগে না।

কেউ বলতে পারেন, “আহা, শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে তো ডাণ্ডা কাজে লাগার কথাও নয়, বাড়িতে চোরডাকাত পড়লে না হয় ওরা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের একটা সুযোগ পেত।”

উঁহু। সে সুবর্ণসুযোগ এসে ফিরে গেছে, ডাণ্ডা ডাণ্ডার মতো কাঠ হয়ে ম্যাট্রেসের খাঁজে শুয়ে থেকেছে। কাজে লাগার কোনওরকম উদ্যোগ দেখায়নি। কোন সালে ভুলে গেছি, পঁচাশি ছিয়াশি সাতাশি সাল হবে। সরকারদের বাড়িতে এক রাতে ডাকাত পড়েছিল। কেন পড়েছিল সে সম্পর্কে অনেক রকম থিওরি শোনা গিয়েছিল পরে। কেউ বলেছিল মেয়ের বিয়ের পণ দেওয়ার জন্য, কেউ বলেছিল ছেলের চাকরিতে ঘুষ দেওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে টাকা তুলে এনে আলমারিতে রেখেছিলেন সরকারবাবু, সেই টাকা নিতেই নাকি ডাকাত এসেছিল। টাকার খবর ছড়িয়েছিল কোথা থেকে সেই নিয়েও অনেকে অনেকরকম বলেছিল। কেউ বলেছিল কাজের লোকের মুখে, কেউ বলেছিল মিস্তিরির মুখে। কেউ বলেছিল ওসব বাইরের লোকটোক না, সরকারবাবুর ছেলেই নাকি পুকুরঘাটে স্নান করতে এসে গামছা দিয়ে গা ডলতে ডলতে বারফট্টাই করে টাকার কথা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল।

খবর কোন পথে কথা বেরিয়েছিল সে নিয়ে হাজার সন্দেহ থাকলেও ডাকাত যে সত্যি সত্যি এসেছিল সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আমরা সবাই নিজের চোখে দেখেছিলাম। বা শুনেছিলাম। ন্যাড়াপোড়ার রাতেও অত চেল্লামিল্লি হতে শুনিনি কখনও। অভিজিৎদা’র সাহসী মা ছাদে উঠে স্টিলের থালায় স্টিলের খুন্তি দিয়ে ঠাঁই ঠাঁই পিটিয়ে পাড়ার লোক জাগিয়েছিলেনকে যেন একটা সাইকেল চেপে অলিগলি ঘুরছিল আর চিৎকার করে বলছিল, “ডাকাত! ডাকাত!” উত্তেজনায় তার গলা ভয়ানক কাঁপছিল তাই অনেকেই ডাকাত শুনতে অন্য কিছু শুনেছিল।

আধঘণ্টা বাদে টাকাপয়সা সোনাদানা নিয়ে বোম ফেলতে ফেলতে চলে যাওয়ার পর সে রাতের মতো ঘুমের আশা জলাঞ্জলি দিয়ে যখন পাড়ার লোকে মোড়ে মোড়ে জটলা করে কনস্পিরেসি থিওরি কপচাচ্ছিল (“পুলিশ কত দেরিতে এল দেখলি?”) তখন সে সব ভুল শোনাশুনির কিছু নমুনা পাওয়া গিয়েছিল। বোসজেঠি বলেছিলেন, “বলছে ‘ডাকাত! ডাকাত!’ আমি ঘুমের ঘোরে শুনছি ‘ছাগল! ছাগল!’ আর ভাবছি মাগো একটা ছাগলের পেছনে পাড়াশুদ্ধু লোক ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে ছুটলে বেচারা তো হার্টফেল করে মরবে।”     

আমার সেজকাকু যদিও ঠিকই শুনেছিলেন। শুনে ধড়মড় করে উঠে, “কোথায় ডাকাত? কোনদিকে ডাকাত?” বলে গেঞ্জি গলিয়ে অস্ত্র হিসেবে সদর দরজার কোণে দাঁড় করিয়ে রাখা বেঢপ খিলটা তুলে নিয়ে ছুটে বেরিয়েছিলেন। কালো ডাণ্ডাদুটোর কথা তাঁর মনেই আসেনি।

মোদ্দা কথা, কালো ডাণ্ডাদুটো আমাদের বাড়ির কারও কোনও কাজে লাগেনি কোনওদিন।

এক আমার ছাড়া।

সে জন্য কালো ডাণ্ডাদুটোর কৃতিত্বের থেকে আমার চরিত্রই দায়ী। আমার সেজকাকুর কথা তো শুনলেন, আমার বাড়ির বাকি সকলেও বেশ ডাকাবুকো। ঠাকুরদা শুনেছি নিরীহ প্রকৃতির ছিলেন, কাজেই এই গুণটা ঠাকুমার থেকে এসেছে ধরে নিতে হবে। গায়ে যখন জোর ছিল তখন কুয়োর পাড়ে উঠে ঠাকুমাকে কাঁঠাল পাড়তে দেখেছি আমি নিজের চোখে। আমার বাবার সাহসেরও অনেক গল্প চালু আছে ফ্যামিলিতে। বাকি রইলেন আমার মা। তিনি নিয়মিত সাহসের পরিচয় দিয়ে থাকেন। রাস্তাঘাটে বেগড়বাঁই হচ্ছে দেখলে আমি যখন মায়ের কনুই টেনে বলি, “ওরে বাবা মা, শিগগিরি এখান থেকে পালাই চল” মা তখন “কী হচ্ছেটা কী এখানে? অ্যাঁ?” বলে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

সেই বাড়ির কুলাঙ্গার বংশধর হচ্ছি গিয়ে আমি। আমার অস্তিত্বের স্বাভাবিক অবস্থাটাই হচ্ছে নার্ভাস অবস্থাসর্বদাই হাতপা কাঁপে, মনে হয় এই বুঝি কেউ বকে দিল। পাবলিক প্লেসে কথা বলতে গিয়ে গলা শ্রবণসীমার নিচে নেমে যায়, পাছে আমার গলা শুনে কেউ হেসে ফেলে। যে কোনও ঘটনার পরিণতি হিসেবে সবথেকে খারাপ সম্ভাবনাটাই আমার মাথায় প্রথম আসে। কনভেয়ার বেল্টে প্রথম সুটকেসটা আমার নয় মানেই লাগেজ হারিয়েছে। অ্যাপ্রাইজালের ঋতুতে বস দেখা করতে ডেকেছে মানেই আর রক্ষা নেই, এইবার জবাব দেবে।

অর্চিষ্মানের সঙ্গে আলাপ গাঢ় হওয়ার আগে এই সমস্ত আতংকের পরিস্থিতিতে মা-ই ছিলেন আমার একমাত্র ভরসা। কেনই বা কেউ বকবে? কেনই বা কেউ হাসবে? কেনই বা জবাব দেবে? তেমন হলে তো আগে থেকে বোঝাই যেত। সকলেরই তো নিজের নিজের কাজ আছে, কেউ তো আমাকে দেখে হাসার জন্য বসে নেই। এইসব নানারকম যুক্তি ফেঁদে মা’কে আমার মরাল বুস্টিং করতে হত। পরিস্থিতি সহজ হলে তাতে কাজ দিত, কঠিন হলে দিত না।

তখন মা ঝুলি থেকে ব্রহ্মাস্ত্রটি বার করতেন।

“আর যদি কেউ বকেই, আমাকে বলবি, আমি কালো ডাণ্ডাটা নিয়ে যাব’খন

ব্যস্‌। এতক্ষণ এত যুক্তিতে যা হয়নি, এক নিমেষে সে অসাধ্যসাধন হয়ে যেত। আমার টেনশন দুর হত, বুকে বল ফিরে আসত। বাস্তব যেখানে ফেল ফেলেছে, সেখানে বিপদে পড়লে আমার সুপারভাইজার বা বস বা দুর্বিনীত অটোওয়ালা বা ইমিগ্রেশন অফিসারকে আমার সাতচল্লিশ কেজি ওজনের মায়ের এসে ডাণ্ডাপেটা করে যাওয়ার কল্পনা আমাকে আশ্বস্ত করত।

এখনও করে। আমার বুকে সাহস নেই, মুখে দাপট নেই, নামে ভার নেই, কথায় ধার নেই। এই চকচকে ঝকঝকে পৃথিবীতে চলেফিরে বেড়ানোর জন্য যে ত্বরিত স্মার্টনেস দরকার তার ছিটেফোঁটা আমার মধ্যে নেই। কিন্তু বুকের ভেতর জন্মসূত্রে পাওয়া কবচকুণ্ডল আছে। কালো ডাণ্ডা হাতে নিয়ে আমার রোগা মা দাঁড়িয়ে আছেন টোয়েন্টিফোর সেভেন, আমার দিকে কেউ চোখ তুলে তাকানোমাত্র তাকে ঠেঙিয়ে ঠাণ্ডা করে দেবেন বলে।

বিবাহবার্ষিকীর পোস্টটা লিখে আগেভাগে শেডিউল করে রেখেছিলাম, যাতে ঘড়ির কাঁটা দশ পেরিয়ে এগারো তারিখে পা দেওয়া মাত্র বিয়ের দু’বছর পূর্তির ভালো খবরটা সবাই জানতে পারে। অথচ তার আগের দিন বিশ্বশুদ্ধু সবাই মাদার্স ডে উদযাপন করেছে, মায়ের জন্য একটা পোস্ট লেখার আমার সময় হয়নি। অবশেষে আজ হল। মাদার্স ডে-র আট-আটটা দিন কেটে যাওয়ার পর। তাতে অবশ্য ক্ষতি নেই কিছু। কারণ মা জানেন, আমার ক্যালেন্ডারে বছরের তিনশো পঁয়ষট্টিটা দিনই মাদার্স ডে।


May 16, 2015

সাপ্তাহিকী






The second half of a man’s life is made up of nothing but the habits he has accumulated during the first half.
                                                                                                         ---Doetoevsky

মঙ্গলে যাওয়ার আমার যেটুকু শখ ছিল এই ছবিটা দেখে উবে গেল।


অবান্তরের সুহৃদরাও অবান্তরের কেয়ারটেকারের মতো খুনখারাপিতে ইন্টারেস্টেড জানলে যে কী আনন্দ হয়। সে রকম একজন সুহৃদ এই লিংকটা পাঠিয়েছেন। লেডিকিলারদের কথা তো আকছার শোনা যায়, লেডি কিলারদের কথা জানতে হলে এই লিংকে আপনাকে ক্লিক করতেই হবে।  

আগের বারের সাপ্তাহিকীতে ফেসবুকে হাসিমুখ ছবি লাগানো সংক্রান্ত ঝামেলার লিংক লাগানোর পর পরই চুপকথা এই লিংকটা খুঁজে কমেন্টে পোস্ট করেন। কেউ যদি মিস করে গিয়ে থাকেন তাই এবারের সাপ্তাহিকীতে আমি সেটা ছাপলাম। সোশ্যাল মিডিয়ায় আর বাস্তবে একটা মানুষ যে কত আলাদা হতে পারে সেই সহজ সত্যিটার একটা হৃদয়বিদারক উদাহরণ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় মনের ভাব সত্যি সত্যি প্রকাশ করার জন্য এই লিংকটার থেকে ভালো ইনসেনটিভ আর কিছু আছে কি না আমি জানি না।  




ক্যানাডিয়ান কেন, সি আর পার্কের একজন ভেতোবাঙালির মনঃসংযোগের ক্ষমতা টেস্ট করলেও ফল খুব আশাপ্রদ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

এরোপ্লেনের জানালায় যে ছ্যাঁদা থাকে সেটাই আমি জানতাম না। কেন থাকে সে নিয়ে মাথা ঘামানোর কথা তো ছেড়েই দিলাম।   


নেপালে ভূমিকম্প ছাড়াও আরও কতকিছু হচ্ছে সে খবর আমাদের কানে আসে না। যেমন ধরা যাক Resham Filili নামের সিনেমাটা রিলিজ করার সঙ্গে সঙ্গে সে সিনেমার Jaalma’  নামের টাইটেল সং ভাইরাল হয়ে যাওয়ার খবর। আজ গোটা সন্ধ্যে ধরে আমি আর অর্চিষ্মান ইউটিউব ঢুঁড়ে সে গানের একাধিক ডান্স কভার দেখেছি। তাছাড়াও সে গানের কলকাতা সংস্করণ, দার্জিলিং সংস্করণ বাদ দিইনি।

ওপরের গানটা শুনে মাথা ধরে গেলে এ সপ্তাহের গান শুনে দেখতে পারেন। মনমাথাপ্রাণ সব জুড়িয়ে যাবে, গ্যারান্টি।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.