May 28, 2016

সাপ্তাহিকী






Quality is not an act, it’s a habit.
                                                                                               ---Aristotle

এই লিংকটা আগে দিয়েছি কি না মনে করতে পারছি না। তাই আরেকবার দিয়ে দিচ্ছি। দ্য বুক সিয়ার।

একবিংশ শতকের শ্রম আইনঃ দ্য রাইট টু ডিসকানেক্ট। আমি ঝাণ্ডা উড়িয়ে সঙ্গে আছি।

বই পড়তে পারাটা যে কত বড় প্রিভিলেজ এই খবরগুলো পড়ে সে সত্যিটা মাঝে মাঝে ঝালিয়ে নেওয়া দরকার।

দ্য মোস্ট সাকসেসফুল ফিমেল এভারেস্ট ক্লাইম্বার অফ অল টাইম। আপনার চোখে যে মানুষটার ছবি ভেসে উঠছে তার সঙ্গে বোধহয় বাস্তবের খুব একটা মিল নেই।

ভুঁড়ি আর মুড়ি (চানাচুরের সঙ্গে এ মুড়ি যায় না)-র অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ব্যাপারে আমার মা আমাকে চিরদিন সতর্ক করে এসেছেন।


গেরো পাকাতে পছন্দ করেন? তাহলে এ লিংক আপনার কাজে লাগতে পারে।

এই ব্রিজে আমি চড়তে রাজি নই। আপনি?

May 27, 2016

Quotes from The Sympathizer by Viet Thanh Nguyen




উৎস গুগল ইমেজেস



ইদানীং ‘দ্য সিমপ্যাথাইজার’ পড়ছি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, উদ্বাস্তুদের সমস্যা, আমেরিকায় এসে বসত করা উদ্বাস্তুদের সমস্যা, আদর্শ আর নীতির সারশূন্যতা, আর সে সবের ফাঁদে পড়া মানুষের হেনস্থা, বলার অনেক কিছুই বলার মতো আছে এ বইয়ে, সে সব নিয়ে সামনের সপ্তাহে প্রকাশিতব্য ‘মে মাসের বই’ পোস্টে বলব, কিন্তু আরও যা আছে তা হল পাতায় পাতায় কোটেবল কোটস্‌-এর সম্ভার। পড়তে পড়তে কতবার যে থামছি আর বুকমার্ক করছি আর খাতা খুলে টুকছি, তার ইয়ত্তা নেই। এখনও পর্যন্ত যে উদ্ধৃতিগুলো মনে ধরেছে তাদের কয়েকটা আজকের পোস্টে তুলে দিলাম। 

*****

One must be grateful for one's education no matter how it arrives.

I had an abiding respect for the professionalism of career prostitutes, who wore their dishonesty more openly than lawyers, both of whom bill by the hour. But to speak only of the financial side misses the point. The proper way to approach a prostitute is to adapt the attitude of a theatregoer, sitting back and suspending disbelief for the duration of the show. The improper way is to doltishly insist that the play is just a bunch of people putting on charades because you have paid the price of the ticket, or, conversely, to believe utterly in what you are watching and hence succumb to a mirage. For example, grown men who sneer at the idea of unicorns will tearfully testify to the existence of an even rarer, more mythical species. Found only in remote ports of call and the darkest, deepest reaches of the most insalubrious taverns, this is the prostitute in whose chest beats the proverbial heart of gold. Let me assure you, if there is one part of a prostitute that is made of gold, it is not her heart. That some believe otherwise is a tribute to the conscientious performer. 

When he interviewed me he wanted to know whether I spoke any Japanese. I explained that I was born in Gardena. He said, Oh, you nisei, as if knowing that one word means he knows something about me. You’ve forgotten your culture, Ms. Mori, even though you’re only second generation. Your issei parents, they hung on to their culture. Don’t you want to learn Japanese? Don’t you want to visit Nippon? For a long time I felt bad. I wondered why I didn’t want to learn Japanese, why I didn’t already speak Japanese, why I would rather go to Paris or Istanbul or Barcelona rather than Tokyo. But then I thought, Who cares? Did anyone ask John F. Kennedy if he spoke Gaelic and visited Dublin or if he ate potatoes every night or if he collected paintings of leprechauns? So why are we supposed to not forget our culture? Isn’t my culture right here since I was born here? Of course I didn’t ask him those questions. I just smiled and said, You’re so right, sir. 

I was careful, then, to present myself as just another immigrant, glad to be in the land where the pursuit of happiness was guaranteed in writing, which, when one comes to think about it, is not such a great deal. Now a guarantee of happiness - that's a great deal. But a guarantee to be allowed to pursue the jackpot of happiness? merely an opportunity to buy a lottery ticket. Someone would surely win millions, but millions would surely pay for it. 


May 26, 2016

জয়জয়ন্তী



মুল গল্পঃ The Day It Rained Forever
লেখকঃ Ray Bradbury

*****

খাঁ খাঁ মাঠের মধ্যে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। কাল থেকে সন্ধ্যে। গনগনে সূর্যের আলোয় পুড়ছে। পালাবে যে তার জো নেই, যতদূরে চোখ যায় দিগন্তরেখা ঘিরে আছে চক্রব্যূহের মতো। গাছপালাও একটা নেই যে তাপ শুষে নেবে। যা ছিল পুড়তে পুড়তে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। থাকার মধ্যে আছে একটা পথ। বাড়িটার সামনে দিয়ে সোজা চলে গেছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। খালি চোখে তাকে দেখা যায় না। আগুনের আঁচ থেকে বাঁচতে সেটা যেন মাটির ভেতর যতখানি পারে সেঁধিয়ে যেতে চেয়েছে। তবু যারা জানে তারা জানে যে আছে ওইখানে একখানা পথ। অবশ্য যে পথ দিয়ে কেউ চলে না, তাকে পথ বলা চলে কি না সেই নিয়ে পদ্মরানী অনেক ভেবেছে। রোজই ভাবে। যেমন এখন ভাবছে। বারান্দায় বসে বসে, অদৃশ্য পথটার দিকে চোখ মেলে রেখে। বারান্দায় বসার সময় শুধু এইটুকু। সারাদিন ঘরের বাইরে বেরোনো যায় না। দরজা জানালায় খিল এঁটে মোটা চটের বস্তা ঝুলিয়ে রাখতে হয়। আর ঘণ্টায় ঘণ্টায় জলের ছিটে দিতে হয়। তাতে যদি গায়ে ফোসকা পড়া এড়ানো যায়। সূর্য দিগন্তের নিচে নেমে যাওয়ার  পরও কিছুক্ষণ চারদিকটা গনগনে হয়ে থাকে। তারপর চোরের মতো খিল খুলে পা টিপে টিপে বারান্দায় এসে বসা। আর অদৃশ্য পথটার দিকে তাকিয়ে থাকা আর ভাবা, যদি কেউ না-ই আসে কোনওদিন তাহলে ওটা থেকে লাভ কি?

“একটা ঠাণ্ডা মেশিন কিনলে হয় না?” 

পদ্মরানীর চিন্তার খেই ছিঁড়ে দিয়ে কথাটা বলে উঠল সে বসে আছে কাছেই। বারান্দা থেকে নেমে যাওয়া সিঁড়ির দুটো ধাপ ছেড়ে তিন নম্বর ধাপে, বসে বসে শাড়ির আঁচল নেড়ে নেড়ে মশা তাড়াচ্ছে। 

“এসি কিনলে হয় না একটা?” আবার বলল সন্ধ্যা।

পদ্মরানী জবাব দিল না। উত্তরটা সন্ধ্যা নিজেও জানে। জমানো টাকায় ঠাণ্ডা মেশিনের হাওয়া খাওয়ার বিলাসিতা করা যায় না। পদ্মরানীর বিছানার চেপ্টে যাওয়া তোশকের নিচের লুচিভাজা হিসেবের খাতাটা আছে তাতে গত দশবছর ধরে আয়ের দিকে একটি আঁচড় পড়েনি।  বছর দশেক আগে, সন্ধ্যার মুখের সস্তা পাউডার ভেদ করে যখন সুতোর মতো দাগগুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছিল তখন থেকেই আয় কমতে শুরু করেছিল, তারপর খনি চেঁছে কয়লার শেষ তালটুকু তুলে নিয়ে কারখানায় তালা ঝুলিয়ে চলে গেল যখন মালিক, তখন সব শেষ। যেসব মেয়ের বয়স কম ছিল, বুকে সাহস ছিল, বাড়ি খালি করে তারাও চলে গেল। রয়ে গেল শুধু সন্ধ্যা আর বকুল।  

“বকুল কই?” পদ্মরানী জিজ্ঞাসা করল। 

“সে ঘরে দোর দিয়ে শুয়ে আছে। বৃষ্টি না হলে নাকি নামবে না।”

আলোর আভাস একেবারে মুছে যেতে, অন্ধকারে খানিকক্ষণ দেহ জুড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়ল ওরা। রান্নাঘরে গিয়ে ভাত চড়াতে হবে। রান্না হলে হাঁড়িতে জল ঢেলে রেখে দেবে, কাল সকালে পান্তা করে কাঁচালংকা আর পাতিলেবু দিয়ে খাবে তিনজনে। রাতের জন্য চিঁড়েমুড়িই যথেষ্ট। 

খাওয়াদাওয়া সেরে হ্যারিকেন হাতে দোতলায় উঠে এল পদ্মরানী। আজকাল সিঁড়ি বাইতে কষ্ট হয় তার। হাঁটুতে, কোমরে টান ধরে। দোতলায় উঠে এসে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে হাঁফ ছাড়ল কিছুক্ষণ। টানা বারান্দার দু’নম্বর এবং শেষ ঘরটা ওর। ঘরে যাওয়ার আগে প্রথম দরজাটার কাছে একবার থামল পদ্মরানী। দরজার পাল্লায় হাতের তেলো দিয়ে চাপ দিল। মচমচ করে উঠল পুরোনো কাঠ। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। 

‘বকুল, ও বকুল? খাবি না?”

উত্তর নেই। পদ্মরানী অপেক্ষা করল কিছুক্ষণ। তারপর বাকি বারান্দাটুকু পেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজার শিক তুলে দিল। না দিলেও কিছু না। আশেপাশে চোরডাকাত নেই। থাকলেও তারা এ বাড়িতে চুরি করতে আসবে না। নেওয়ার মতো কিছুই নেই আর এ বাড়িতে। টাকা পয়সা, হিরেজহরত, যৌবন। পদ্মরানীর ঘরটাই বাড়ির মধ্যে সবথেকে বড়। ঘরের বেশিরভাগ অংশই হ্যারিকেনের আলোর নাগালের বাইরে ঘাপটি মেরে বসে আছে। সলতেটা বাড়িয়ে হেঁটে হেঁটে তক্তপোশের কাছে এল পদ্ম। পালংকখানা গেছে অনেকদিন, এ তক্তপোশের অঙ্গে অঙ্গে পদ্মরানীর মতোই বাত। উঠতে গেলে মচমচ, বসতে গেলে মচমচ। দেওয়ালের কাছে গিয়ে হ্যারিকেনটা উঁচু করে ধরল পদ্মরানী। নতুন ক্যালেন্ডার নিয়ে এসেছে সন্ধ্যা শ্রীগুরু সিমেন্টের দোকান থেকে। শীর্ণ তর্জনী খানিকক্ষণ দ্বিধাভরে বাতাসে ভেসে থেকে অবশেষে একটা খোপে গিয়ে নামল। চোখ কুঁচকে ভালো করে তারিখটা দেখল একবার পদ্মরানী। যা ভেবেছে তাই। কাল ঊনত্রিশে বৈশাখ। 

*****

পরদিন সকালে সূর্য যেন আরও তেজে উঠল। সাতটা বাজতে না বাজতে রান্নাঘরের পুব দেওয়ালের ঘুলঘুলি বেয়ে ধুলোর জীবন্ত থাম বেয়ে নেমে এল তেজী রোদ।  কুয়োতলার জ্বলন্ত কংক্রিটে দু’পায়ের পাতা আলগোছে ফেলে কোনওমতে হেঁটে বালতি দু’য়েক জল এনে সন্ধ্যা দরজা দিল। 

“কী হল তোমার বিষ্টির?” 

“দাঁড়া, সবে তো সকাল।” 

নাকের ভেতর একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করল সন্ধ্যা। পদ্মরানী আমল দিল না। তার জন্মের পর থেকে এমন এক বছরও যায়নি যেদিন ঊনত্রিশে বৈশাখ বৃষ্টি হয়নি। এত বছর বেঁচে, এত অভিজ্ঞতা দিয়ে পদ্মরানী দুটো জিনিস বুঝেছে। মানুষের ওপর ভরসা করা যতখানি বোকামো, ভগবানের ওপর বিশ্বাস হারানো তার থেকেও বেশি বোকামো। আর রোদ বৃষ্টি আকাশ বাতাস ঝড় বন্যা তো একরকমের ভগবানই। ভগবানের দুনিয়ায় নিয়মের এদিকওদিক হয় না। ঊনত্রিশে বৈশাখ যদি বৃষ্টি হওয়ার কথা থাকে, তবে বৃষ্টি হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না। 

রোদ যখন পুব দেওয়ালের ঘুলঘুলি ছেড়ে বাড়ির দক্ষিণপশ্চিম দেওয়ালের ঘুলঘুলিতে বাসা বেঁধেছে তখন কিন্তু পদ্মরানীর ভয় লাগতে শুরু করল। কিন্তু এই ভয়কে বিশ্বাস হারানোর সঙ্গে তুলনা করলে ভুল হবে। পদ্মরানীর বিশ্বাস আগের মতোই অটুট। ঊনত্রিশে বৈশাখ বৃষ্টি হয়। যদি না ভগবান কুপিত হন। আর পদ্মরানী জানে ভগবানকে কুপিত করার লোকের অভাব নেই। সে নিজেই সারাজীবনে কম পাপ তো করেনি। সেই ফল এখন হয়ত ফলছে। ঘরের ঠাণ্ডা মেঝেতে শুয়ে শুয়ে পদ্মরানী নিজের পাপের কথা ভাবতে লাগল। আজ বৃষ্টি না হলে যদি সামনের একবছর বৃষ্টি না হয়? 

ঘুম ভাঙা আর চোখ খোলার মাঝের যে সময়টা, যেখানে নিজের ইচ্ছেমতো স্বপ্ন বানানো যায়, সেই তন্দ্রার মধ্যে পদ্মরানীর কানে শব্দটা এল। তীক্ষ্ণ ফলাওয়ালা তীর এসে যেন শক্ত জমিতে পরপর বিঁধে যাচ্ছে। অনেকগুলো সম্ভাবনা পরপর খেলে গেল পদ্মরানীর মাথায়। প্রথমেই মনে হল, বৃষ্টি! তারপর মনে হল, নির্ঘাত সে বৃষ্টির স্বপ্ন দেখছে। তারপর যখন তন্দ্রাটা কেটে চারপাশটা প্রকট হয়ে উঠল তখন সে বুঝল আওয়াজটা আসলে আসছে দরজার বাইরে থেকে। কেউ দরজার কড়া নাড়ছে। 

আঁচল গুছিয়ে উঠে এসে দরজা খুলে পদ্মরানী দেখল সন্ধ্যার ব্যাজার মুখ। পদ্মরানীর দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে মাথাটা সামান্য বাঁদিকে ঘোরাল সন্ধ্যা। ওইদিকে বাড়ির সদর দরজা।

"কী হচ্ছে দেখবে চল।” 

ঘুলঘুলি থেকে আলো মুছে গেছে। আবছা সিঁড়ির রেলিং ধরে সাবধানে নেমে এল পদ্মরানী। দিগন্ত ছুঁয়ে ফেলা সূর্যের আলোয় একটা লম্বা ছায়া এসে পড়েছে খোলা সদর দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে। ছায়াটার পাশে একটা সুটকেস আর একখানা কাপড়ের থলি। 

“বকুল!"

চোখ ফিরিয়ে তাকাল বকুল। গোটা বাড়িতে সবথেকে সুন্দর চোখ ছিল বকুলের। এখন সেখানে ফ্যাকাসে, শূন্যতাময় দুটো কোটর।

“আমি যাচ্ছি।”

“কোথায়?”

“যেখানে বৃষ্টি হবে।”

বকুলের স্বর নিচু এবং স্পষ্ট। সিদ্ধান্তে স্থির। 

“যাচ্ছিস? যাচ্ছিস মানে? গত দশ বছর ধরে এক পয়সা ঠেকাসনি। আমার পয়সায় খেয়েছিস পরেছিস ফুর্তি করেছিস। যেতে হলে আমার ধার শোধ করে যা।” পদ্মরানীর মাথাটা ঘুরে উঠল হঠাৎ। রাগে, ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে। বকুলের দিকে বজ্রদৃষ্টি হেনে দ্রুত এগিয়ে এসে পদ্মরানীকে জাপটে ধরে সাবধানে বারান্দায় রাখা মোড়াটায় বসিয়ে দিল সন্ধ্যা। আঁচল দিয়ে যত্ন করে কপালের ঘাম, ঠোঁটের কোণের থুতু মুছিয়ে দিল।  

খানিকক্ষণ পদ্মরানীর দিকে তাকিয়ে থাকল বকুল। তারপর বলল, “তুমিও চল।”

“শোন, বকুল, আজ রাতটুকু দেখ… আজ ঊনত্‌…“

“তুমি সত্যি বিশ্বাস কর আজ বৃষ্টি হবে? তুমি কি পাগল?” 

পদ্মরানীর ইচ্ছে হল বলে, বিশ্বাস না করলে হবে বুঝি বৃষ্টি? কিন্তু বলল না। হাতটা চোখের ওপর এনে আকাশের দিকে তাকাল। সূর্য ডুবে গেছে। কিন্তু আগুনের আভাস এখনও লেগে আছে আকাশের গায়ে। যেন কেউ সিগারেটের জ্বলন্ত প্রান্ত এতক্ষণ চেপে ধরে রেখেছিল আকাশের গায়ে, সরিয়ে নেওয়ার পরও ক্ষতটা জ্বলজ্বল করছে। পদ্মরানী ঠাহর করতে চাইল সে ক্ষতের ওপর কোথাও মেঘের প্রলেপ পড়েছে কি না। এক ফোঁটাও জলও যদি ঝরে, তার সংসারটা এভাবে টুকরো হয়ে যায় না। 

বকুল মুখ ঘুরিয়ে নিল। ডানদিকে সামান্য ঝুঁকে সুটকেসের দড়ি বাঁধা হ্যান্ডেলে হাত গলিয়ে তুলতে যাবে, এমন সময় শব্দটা কানে এল বকুলের। বকুলের পরেই সেটা শুনতে পেল সন্ধ্যা। পদ্মরানী সব শেষে। 

একটা গুড়গুড় শব্দ আসছে কোথাও থেকে। ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট।

তিনজনে এসে বারান্দার কিনারে পাশাপাশি দাঁড়াল। মিনিটে মিনিটে স্পষ্ট হচ্ছে আওয়াজটা। দক্ষিণ দিকের আকাশে ধোঁয়ার মতো মেঘ পাকিয়ে উঠেছে। 

তিনজনে ঘাড় টান করল। কারও মুখে কথা নেই। ঘরঘর খরখর আওয়াজটা ক্রমে মৃদু থেকে তীব্র হল, কালো ধোঁয়া জমতে জমতে ক্রমে ঝোড়ো মেঘের পুঞ্জে রূপান্তরিত হল। অবাধ প্রান্তরের ওপর দিয়ে ডঙ্কা বাজাতে বাজাতে ঝড়টা যেন ছুটে আসতে লাগল বাড়িটার দিকেই। তিনটে শীর্ণ হাতের পাঞ্জার ছায়ার তলার তিনজোড়া চোখ লক্ষ্য করে। মুহূর্তে মুহূর্তে ফুলেফেঁপে উঠতে লাগল তার আয়তন। তারপর ধুলোয় আকাশ অন্ধকার করে, একটি প্রবল বিস্ফোরণের মতো আছড়ে পড়ল বাড়িটার ওপর। 

ধোঁয়া খানিকটা পাতলা হলে দেখা গেল বিস্ফোরণের কেন্দ্রে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে একটি অতি প্রাচীন মোটরগাড়ি। তার বনেটের ভেতর থেকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ওঠা কালো ধোঁয়া প্রমাণ দিচ্ছে যে সেটির অতি প্রাচীন, অতিব্যবহৃত জীবনের সদ্য সমাপ্তি ঘটেছে। গাড়ির ছাদে দড়ি দিয়ে বাঁধা মালপত্র। গাড়ির ভেতর স্টিয়ারিং-এ দু’হাত রেখে স্থির হয়ে বসে আছে প্রায় গাড়ির মতোই প্রাচীন একটা লোক। পাথরের মত স্থির। যেন নিজের সঙ্গীর এই মৃত্যুর ক্ষণটিকে কোনওরকম আলোড়ন দিয়ে বিক্ষুব্ধ করতে চায় না। এই চিরবিদায়ের ক্ষণটির সমস্ত শোক অটুট রেখে নিজের সত্তায়, স্মৃতিতে মিশিয়ে নিতে চায়। 

বনেটের ধোঁয়ার শেষ শিখাটুকু হাওয়ায় মিশে গেলে লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। শীর্ণ মুখ। তেলচুকচুকে কালো চুলের গোছা সরু কপালের একদিক ঢেকে নেমে এসেছে। গালের উঁচু হাড় আর খাড়া নাকের মাঝে অবতল গাল। তামাকের অত্যাচারে কালো হয়ে যাওয়া ঢেউয়ের মতো ঠোঁটের ওপর যত্ন করে ছাঁটা সরু কালো গোঁফ। 

দরজা খুলে নেমে এল লোকটা। বুকের কাছে হাত জড়ো করে নুয়ে পড়ে বলল, “আজ্ঞে, আমার নাম শ্রী সরিৎ কুমার বিশ্বাস, হিন্দুস্থানী মার্গ সংগীত শিক্ষক, বিশেষ করে ধ্রুপদধামারে তালিম দিয়ে থাকি। আমি আসছি ম-পুর থেকে, যাব প-নগরে। এর মধ্যে…” 

হাত দিয়ে নিজের মোটরগাড়ির মৃতদেহের দিকে দেখালেন সরিৎকুমার। 

বকুলের চলে যাওয়া নিয়ে একটুক্ষণ আগে যে টানটান উত্তেজনাটার সৃষ্টি হয়েছিল সেটা ঢিলে হয়ে গিয়ে তিনজনের মধ্যে আবার স্বাভাবিক শৃঙ্খলার প্রত্যাবর্তন ঘটল। পদ্মরানী এগিয়ে এসে বলল, “আসুন, ভেতরে আসুন।” 

সরিৎকুমার কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়লেন। পেছন ফিরে গাড়ির ছাদ থেকে মালপত্র নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পদ্মরানীর ইশারায় সন্ধ্যা এগিয়ে গেল সাহায্য করতে। সুটকেস, হোল্ডঅল একে একে এসে বারান্দায় উঠল। সবশেষে সরিৎকুমার গাড়ির পেছনের দরজা খুলে অতি যত্নে একটা সবুজ কাপড়ে মোড়া তানপুরা বার করে আনলেন। সবাই একে একে ঘরে ঢুকে এল। দরজা দেওয়ার আগে বারান্দা থেকে বকুলের সুটকেসটাও ভেতরে নিয়ে এল সন্ধ্যা। বকুল দেখল, কিন্তু কিছু বলল না।

*****

ঘণ্টাখানেক বাদে সদর ঘরের মাঝখানে মাদুর বিছিয়ে, তার ওপর একটি হ্যারিকেন রেখে সেটাকে ঘিরে তিনজন বসে ছিল। মাদুরের মাঝখানে একটা বড় বাটিতে মুড়ি, পাশে স্টিলের গ্লাসে জল। বাটির সামনে বাবু হয়ে বসে ছিলেন সরিৎকুমার, পলার আংটি পরা হাত মুঠো করে অল্প মুড়ি তুলে মুখে পুরছিলেন। পদ্মরানী সৌজন্যের সীমা রক্ষা করে যতখানি কাছে বসা যায়, ততখানি কাছে বসে হাতপাখা নাড়ছিল। সন্ধ্যা বসেছিল আলো থেকে একটু দূরে, এক হাঁটু মুড়ে, তার ওপর চিবুক রেখে। বকুল তার ব্যর্থ বিদ্রোহের জ্বালা বুকে নিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দোর দিয়েছিল। সন্ধ্যার অনেক ডাকাডাকিতেও খোলেনি।

পদ্মরানী বলল, “তারপর কী হল?”

সরিৎকুমার গ্লাস তুলে একচুমুক জল খেলেন। বললেন, “তারপর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলাম। কোনওদিন খেতে পেলাম, কোনওদিন কলের জল খেয়ে পেট ভরালাম। জল খেয়ে লোকের বারান্দায়, বারান্দা না পেলে গাছের তলায় শুয়ে থাকতাম, শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করতাম কখন মাথা থেকে গান শেখার ভূতটা নামবে, কিন্তু অপেক্ষাই সার হল। 

সরিৎকুমার হেসে উঠলেন। দেওয়ালে হাতপাখার প্রকাণ্ড ছায়া দুলতে লাগল।  

সরিৎকুমার বললেন, “সেই ভূতটাই জুটিয়ে দিল বোধহয়। একদিন জানালার বাইরে থেকে রেওয়াজ শুনলাম। আর বুঝে গেলাম গুরু পেয়ে গেছি।” চোখ বন্ধ করে দুই কানে দু’হাতের আঙুল ছুঁলেন  সরিৎকুমার। 

“আমার মধ্যে কী দেখেছিলেন তিনিই জানেন” ছদ্ম বিনয়ের হাসি ফুটল সরিৎকুমারের ঠোঁটে, “শ্রীচরণে ঠাঁই দিলেন। তাঁর বাড়িতে থেকে চাকরের কাজ করতাম, খেতাম, পরতাম, আর তিনি যখন ছাত্রদের যখন গান শেখাতেন দরজার বাইরে বসে শুনতাম। ছাত্রদের কপালে শুধু নিজের নিজের ভাগেরটুকু জুটত, আমি সবারটা শিখতাম। ভোরবেলা উঠে গুরু গুরুমার ছাড়া কাপড় কাচতাম, শুনতাম গুরু ভৈরবীতে সুর লাগিয়েছেন। দুপুরবেলায় বৃন্দাবনী সারং, সন্ধ্যেবেলায় কাফি। বছর পাঁচেক পর একদিন ছাত্ররা বিদেয় হলে পর্দার আড়াল থেকে ঘরে ডাক পড়ল। বললেন, “তোর শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে, এবার ভাগ। নিজের গুরুর ঠিকানা দিয়ে দিলেন। সেখানে গিয়ে আরও পাঁচ বছর বাসন মাজলাম, কাপড় কাচলাম, গুরুর ছেলেপুলের কাঁথাকানি কাচলাম। আর যেটুকু সময় পেলাম তাতে গান শুনলাম।”

“তারপর?”

“তারপর শেখার পালা শেষ। শেখানোর পালা শুরু। একটা স্কুলে চাকরি নিলাম। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আসত গান শিখতে। এক এক সপ্তাহে একেকটা রাগ। না হলে সিলেবাস শেষ করা যাবে না।” লন্ঠনের মৃদু আলোও সরিৎকুমারের মুখের বিষাদ লুকোতে পারল না।  “ইমন, ইমনের পর খাম্বাজ, খাম্বাজের পর ভৈরব। আর তিনটে রাগের পর একটা নজরুলগীতি।”

*****

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর সরিৎকুমার বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। আজ যে পূর্ণিমা যে সে কথা তাঁর মনেই ছিল না। শহরে এরকম পূর্ণিমা তিনি দেখেননি আগে কখনও। চাঁদের আলোয় চারপাশে ধুয়ে যাচ্ছে। দুপুরবেলায় গনগনে রোদে আসতে আসতে যে ভূমিকে তাঁর নিষ্ফলা, শুষ্ক মনে হয়েছিল, শীতল চন্দ্রালোকে তার যেন অন্তরের সমস্ত রহস্য উন্মুক্ত হয়েছে। সরিৎকুমার দুচোখ মেলে দেখতে লাগলেন। বহু বছর আগে, সমুদ্রধারের এক শহরে গুরুজীর সঙ্গে একবার এক সংগীত সম্মেলনে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। হোটেলের ছাদে দাঁড়ালে সমুদ্র দেখা যেত। একের পর এক ঢেউ এসে আছড়ে পড়ত বালির ওপর, সারাদিন সারারাত। তাঁর চারপাশে এও যেন এক শাপগ্রস্ত সমুদ্র। মৃদু উদ্বেলিত জমি ঢেউ তুলতে তুলতে দিগন্তে মিশে গেছে। 

সন্ধ্যা ডাকতে এল। সরিৎকুমার ভেতরে গেলেন। বাইরের ঘরের মেঝের মাদুর সরিয়ে বিছানা পাতা হয়েছে। বালিশের পাশে ঢাকা দেওয়া জলের গ্লাস। পদ্মরানী অপেক্ষা করছিল, সরিৎকুমারকে দেখে বলল, 

“আপনি এবার শুয়ে পড়ুন।”

সরিৎকুমার বললেন, “আপনারা আমার এত উপকার করলেন, আমি আপনাদের কিছু দিতে চাই।”

ঘরে নিস্তব্ধতা গভীর হয়ে এল। সরিৎকুমার ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। 

“আপনারা ভুল বুঝছেন। আপনাদের দয়ার প্রতিদান দেওয়ার মতো কিছু নেই আমার কাছে। কিন্তু যেটুকু আছে সেটুকু না দিলে গুরুজী আমাকে ক্ষমা করবেন না।” কানের লতি আলতো ছুঁলেন সরিৎকুমার। ঘরের কোণে সবুজ কাপড়ে মোড়া তানপুরাটা নিয়ে এসে চাদরের ওপর বাবু হয়ে বসলেন। আবরণ থেকে তানপুরা বেরিয়ে এল। পালিশ করা গাঢ় মেহগনি কাঠের গাঢ় পালিশ লন্ঠনের মৃদু আলোয় চকচক করে উঠল। সরিৎকুমার আঙুল রাখলেন তারের ওপর। পদ্মরানী দেখল, এই  শুকনো, শীর্ণ শরীরের লোকটার হাতের আঙুল কী মসৃণ। বাকি মানুষটার থেকে হাতের আঙুলগুলোর বয়স যেন তিরিশ বছর কম। সারা শরীরের সমস্ত লাবণ্য যেন এসে জড়ো হয়েছে ওই ক’টি আঙুলে। পেলব মসৃণ আঙুল দিয়ে তারে আঘাত করলেন সরিৎকুমার। ঘরের বাতাস শিউরে উঠল। পদ্মরানী বুঝল সরিৎকুমারের আঙুলের চিরযৌবনের রহস্যটা কী। সব ওই তারের সঞ্জীবনীর কেরামতি। সরিৎকুমার যত্ন করে সুর বাঁধলেন। তানপুরার তীক্ষ্ণ আপত্তিতে কর্ণপাত করলেন না।

সুর বাঁধা হলে সরিৎকুমার শিরদাঁড়া টান করে, চোখ বুজলেন। ছেঁড়া ছেঁড়া সুরের শেষটুকু মিলিয়ে গিয়ে যখন সম্পূর্ণ নীরবতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হল ঘরের হাওয়ায় তখন সরিৎকুমারের গান ধরলেন। নাভি থেকে উৎসারিত হল গম্ভীর, শান্ত ষড়জ। গুরু শিখিয়েছিলেন, শুধু যন্ত্র বাঁধলেই চলে না, নিজেকেও বাঁধতে হয়। সা-এ নিজেকে বেশ করে বাঁধলেন সরিৎকুমার। ঋষভ, কোমল গান্ধার ছুঁয়ে নেমে এসে ধৈবত হয়ে পঞ্চমে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে, নিষাদ মধ্যমের মীড়ে ভেসে গিয়ে আবার ঋষভে এসে থামলেন। সরিৎকুমারের চোখের পাতায় বহু বহুদিন আগের এক দিনশেষের ছবি কাঁপতে থাকল। সূর্য ডুবে গেছে, সাতরঙা কোনও পাখি তার শরীরের সমস্ত পালক যেন উড়িয়ে দিয়ে গেছে সারা আকাশ জুড়ে। তার বুকের রক্তের লালে, পালকের রামধনুতে মাখামাখি হয়ে আছে চারদিক। দক্ষিণপশ্চিম কোণে দৈত্যের মতো গুঁড়ি মেরে উঠছে কালো মেঘের দল।     

দামিনী দমকে, ডর মোহে লাগে। উমঙ্গে দলওয়া, ঘন শ্যাম ঘটা।

বাইরে জ্যোৎস্না নিভে এল। কোথা থেকে গানের টানে দলে দলে ভেসে এল সমঝদার মেঘের দল। সরিৎকুমারের রেওয়াজি মীড়ের দোলায় দুলতে লাগল, দীর্ঘ বিস্তার সম্পূর্ণ করে সরিৎকুমার যখন স্থায়ীতে ফিরতে লাগলেন, অদৃশ্য কিন্তু অমোঘ তালবাদ্যের সঙ্গে নিখুঁত সমে ‘দমকে’-র ‘দ’ মিশে গেল বারবার, তারিফে তারিফে উদ্বেল হয়ে উঠল। 

আলাপ সম্পূর্ণ হল।  রাগ এখন তৈরি। তার সাজ শেষ। সাত স্বরের অলংকার যথাস্থানে পরে সালংকারা রাগ এসে দাঁড়াল পূর্ণ সভার মাঝে। লাগাম ছাড়া ঘোড়ার মতো উদারামুদারাতারা একাকার করে সপাট তান ছুটে গেল, হর্ষে ফেটে পড়ল আকাশ। সরিৎকুমারের রেওয়াজি গলার গিটকিরির জবাবে বাজ আছড়ে পড়ল বকুলের বন্ধ জানালার পাল্লায়, কাঠচেরা ফাঁক দিয়ে ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ। ভয়ে শিউরে উঠল বকুল। এক্ষুনি যেন পাল্লা ভেঙে ফেলে ঝড় ঘরে ঢুকে আসবে। তাকে উপড়ে তুলে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে আবার। এই পৃথিবীতে তার চেনা একটিমাত্র কুটোর কথা মনে পড়ল বকুলের, যাকে আঁকড়ে ধরে সে বহু ঝড় থেকে রক্ষা পেয়েছে। একদৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে পদ্মরানীর কোল ঘেঁষে গুটিসুটি মেরে বসল বকুল। 

সরিৎকুমার মগ্ন হয়ে গেয়ে চললেন। বাইরে ঝড় থেমে গিয়ে বৃষ্টি নামল। জ্যোৎস্না ধুয়ে জলের ধারা পড়তে লাগল ফুটি ফাটা মাটির ওপর। হাঁ হয়ে থাকা ফাটল চুঁইয়ে গভীরে গিয়ে ঘুম ভাঙাল মাটির। স্তব্ধ সমুদ্র দুলে উঠল। কেঁপে উঠল পদ্মরানীর বাড়ি, সংসার। সন্ধ্যা আর বকুলকে দুহাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বসল পদ্মরানী। তার এতদিনের নোঙর ফেলা ভেলা অবশেষে ভাসতে শুরু করেছে। কোথায় গিয়ে ভিড়বে কেউ জানে না। 

*****



May 24, 2016

May 23, 2016

পরশু সন্ধ্যেবেলা



বাকি সবাই যেটা করে, নিজে সে কাজটা না করার ইচ্ছে সবারই জীবনে কখনও না কখনও হয়। আমার এ’রকম প্রথম যে ইচ্ছেটা (বা অনিচ্ছে বলাই উচিত হবে বোধহয়) এখন মনে করতে পারি সেটা হল যে আমি কোনওদিন বিয়ে করব না। স্কুলের মাঝামাঝি নাগাদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তারপর হরমোনের তাগিদে বিয়েতে নিমরাজি হলেও মন বলল, সেটল বাবা করছি না কিছুতেই। ঘুরে ঘুরে বেড়াব সারা পৃথিবী। আজ আইসল্যান্ড তো কাল কেপটাউন তো পরশু মালসেজঘাট।

শেষে যখন ফুটো প্যারাশুট গুটিয়ে দিল্লিতে এসে নামতে হল তখনও আমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি। বুক ফুলিয়ে বললাম, জীবনে আর যা-ই করি না কেন, সি আর পার্কের ওই বাঙালি ঘেটোতে ঢুকছি না কিছুতেই। (তখনও যত্রতত্র ‘ঘেটো’ জাতীয় শব্দপ্রয়োগের রাজনৈতিক অসুবিধেটা হৃদয়ঙ্গম হয়নি।) ল্যাজ গুটিয়ে ‘সুরভি টেম্পু সার্বিস’ লেখা গাড়িতে চড়ে গুটি গুটি সি আর পার্কে এসে ঢুকেছি তাও হয়ে গেল ছ’বছর। এখন সি আর পার্ক ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার কথা হলে বুক ধড়াস ধড়াসও করে।

যদিও আমি জানি থাকার জন্য সি আর পার্ক অতি খারাপ জায়গা। তার প্রধান কারণটা এর অবস্থান। সি আর পার্কে যে দিক দিয়েই ঢুকতে যান না কেন জ্যামে আপনাকে পড়তে হবেই। আশেপাশে মেট্রো স্টেশনের মেলা বসে গেলেও সেগুলো সবক’টা সি আর পার্ক থেকে দু’কিলোমিটার দূরেই হবে, অটো চড়ে হাত গন্ধ করা থেকে মুক্তি নেই।

কিন্তু এগুলো সি আর পার্কের নিয়ন্ত্রণের বাইরের বিষয়, কাজেই এ নিয়ে তাকে তুলোধোনা করাটা ভালো দেখায় না। কিন্তু ভেতরের সুযোগসুবিধের দায়িত্ব কে নেবে? চারটের একটা মার্কেটেও হাওয়াই চটি পাওয়া যায় না। বাসনকোসনের দোকান? নেই। প্রেশারকুকারের দোকান? নেই। সেদিন অর্চিষ্মানের ব্যাগের জিপ সারাতে গেলাম, সেও শুনি নাকি কালকাজীতে গিয়ে সারাতে হবে। তবে সি আর পার্কে আছে কী? মোড়ে মোড়ে দুর্গন্ধময় মাছের বাজার, আর বাজারের জায়গা বেদখল করে তৈরি গুচ্ছ গুচ্ছ কালী আর শনিমন্দির। 

আমাদের রক্ত এমন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে যে আমরা এতেই কাজ চালিয়ে নিচ্ছি। এসব অসুবিধেকে অসুবিধেই মনে করছি না। নেহেরু প্লেসের ফ্লাইওভার থেকে ডানদিকে বেঁকে বাঁদিকে ঢুকে গেলেই যে বাংলাভাষায় নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করা যাবে, সেই স্বস্তিটাকেই জীবনের মোক্ষ বলে চোখ বুজে বসে আছি।

মাঝে মাঝে শুধু সে বোজা চোখের ভেতরেও গুঁড়ো গুঁড়ো বালির মতো কী সব যেন ঢুকে পড়ে সত্যিটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বেশ ক’মাস আগে অফিস থেকে ফেরার পথে রুটি কেনার জন্য ‘মা তারা’-র সামনে হত্যে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় এরকম দুটি বালুকণা, থুড়ি, মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল।

অবশ্য আকারআকৃতিতে তারা প্রায় বালুকণারই সমান। একজন ছেলে, একজন মেয়ে। দু’জনেরই সেই বয়স যখন শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় একফোঁটা অতিরিক্ত বডি ফ্যাট থাকে না। এদিকওদিক তাকানোর ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল তল্লাটে তারা নতুন। এটাও বোঝা যাচ্ছিল যে নিজেদের মধ্যে পরিচয়ও তাদের এমন কিছু পুরোনো হয়নি। এও স্পষ্ট যে দু তরফেই আলাপটা এগোনোর ইচ্ছে আছে। সি আর পার্কের ওই অফিসফেরতা ঘেমো ক্লান্ত মাঝবয়সী ভিড়ে নতুন প্রেমের ছোঁয়া এতই অন্যরকম যে আমরা সকলেই তাদের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখছিলাম। এতগুলো দৃষ্টির ফাঁদে পড়ে ছেলেমেয়েদুটোর নাভিশ্বাস।

অবশেষে আর সহ্য না করতে পেরে তারা তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করল, এখানে কফির দোকান আছে?

কফির দোকান? লোকজন এমন আকাশ থেকে পড়ল যেন বাজারে কফির দোকান আশা করার মতো অযৌক্তিক কথা তারা এর আগে জন্মে শোনেনি। অবশেষে একজন হাত তুলে একদিকে দেখিয়ে বললেন, ওই দিকে একটা চায়ের দোকান আছে, কফি পাওয়া যাবে কি না বলতে পারছি না।

বেচারারা প্রাণ নিয়ে সেদিকে পালাল।

আমাদের রুটি এসে গিয়েছিল। আমরাও পালালাম বাড়ির দিকে। পালাতে পালাতে আলোচনা করতে লাগলাম চায়ের দোকানটা দেখে ছেলেমেয়েদুটোর প্রতিক্রিয়া কী হবে।

হাওড়া স্টেশনের সাবওয়ে থেকে উঠলে ফুটপাথের ওপর যে জাল দেওয়া বাসগুমটিগুলো থাকে, যার ভেতর একজন (তাতেই গুমটি দৈর্ঘ্যেপ্রস্থে সম্পূর্ণ ভরে যায়) কন্ডাকটর মেজাজ টং করে বসে থাকেন, সেই আয়তনের একটা ঘর। তার ভেতর বসে আছেন দোকানের থেকেও দুঃস্থ এবং শীর্ণ চেহারার একজন বৃদ্ধ। তাঁর অবশ্য মেজাজ ঠাণ্ডা। কারণ মেজাজ খারাপ করতে যে এনার্জিটুকু দরকার সেটাও ভদ্রলোকের নেই। দোকানের সামনে কাঠের বেঞ্চ, একের পাশে আরেকজন বসলে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। সন্ধ্যেবেলা পাশের শনিমন্দিরে কানের পর্দা ফাটিয়ে পুজোআর্চা চলে। শুঁড়তোলা ইমপোর্টেড লেদার শু খুলে রেখে ভক্তরা গদগদ মুখে জোড়হস্তে লাইন দেন।

সি আর পার্কে একটা পদস্থ কফির দোকান নেই। সি আর পার্কে একটা ভদ্রস্থ প্রেম করার জায়গা নেই।

কী যে লজ্জা হয়েছিল আমার। লজ্জা, মনখারাপ সব।

সেদিন কী কারণে অফিস থেকে আগে ফিরে এসেছি, বেল শুনে দরজা খুললাম। পিঠ থেকে ব্যাগ না নামিয়েই অর্চিষ্মান বলল, এখানে একটা নতুন সিসিডি খুলেছে, দেখেছ?

আমি মুখ ভেচকে বললাম, কালকাজীতে আর ক’টা সিসিডি লাগবে?

আরে কালকাজীতে না, আমাদের তিনটে বাড়ি পর।


পরদিন আমিও দেখলাম। ঝকঝকে নতুন দোকান। উদ্বোধনের উদযাপন হিসেবে রংবেরঙের বেলুন টাঙানো হয়েছে। যে জায়গাটায় খুলেছে সেখানে গত তিন বছরে তিনটে ‘ডেলিভারি ওনলি’ রেস্টোর‍্যান্ট খুলে বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা ঠিক করলাম, দ্রুত যাওয়া দরকার। গায়ে নতুনের গন্ধ থাকতে থাকতেই। বেলুনটেলুন খুলে নেওয়ার আগেই।


শনিবার যাওয়া হল। আমি নিলাম ক্ল্যাসিক লেমোনেড, অর্চিষ্মান নিল কুল ব্লু। আর কোকো ফ্যান্টাসি আর ম্যাংগো শট। লেমোনেড যেমন খেতে হয় তেমনই খেতে, কুল ব্লু-টাও দিব্যি সুস্বাদু। ম্যাংগো শট কেমন খেতে জানি না, অর্চিষ্মান দাবি করছে ভালো। কোকো ফ্যান্টাসি হচ্ছে একটা তিনকোণা চকোলেট কেকের টুকরো। আমরা তার সঙ্গে আইসক্রিম আর চকোলেট সস কোনওটাই চাই না বলাতেও দেখলাম ওঁরা চকোলেট সস দিয়েছেন, এবং বেশ বেশি পরিমাণেই দিয়েছেন। মুখে দিয়ে বুঝলাম, কেন ওঁরা আমাদের কথায় কর্ণপাত করেননি। আসল ব্যাপারটা বেশ শুকনো, চকোলেট সস না দিলে খেতে অসুবিধে হত।


যাই হোক, ভালো কেক খাওয়ার ইচ্ছে থাকলে সিসিডি-তে যাওয়ার কোনও কারণ নেই। কফি শপে ইন ফ্যাক্ট কোনও খাবার খেতেই যাওয়া উচিত না। কফি শপে যাওয়া উচিত শুধু গল্প করতে আর লোক দেখতে। আমরাও দেখলাম। সি আর পার্কের একদল কচিকাঁচা গোল হয়ে বসে উচ্চকণ্ঠে নিজের নিজের বাবামায়ের নিন্দে করছিল। আরেকটা টেবিলে বসে ছিল একজোড়া বাবা আর ছেলে, আরেক টেবিলে তিনজনের একটা দল। একজনের হাতে ক্রেপ ব্যান্ডেজ। কিছুক্ষণ পর যখন তিনজনেই উঠে দাঁড়াল আর একে অপরের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল তখন বুঝলাম বিজনেস মিটিং চলছিল।

এটা আগেও খেয়াল করেছি, বাড়ির থেকে কফি শপের গল্পের চরিত্র, বিষয়, তাল, লয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। বাড়ির গল্পে যে সব সত্যি চাপা পড়ে থাকে, টেবিলের দুপাশে মুখোমুখি বসলে তারা সব হুড়হুড়িয়ে বেরিয়ে আসে। এতদিন একসঙ্গে আছি, অথচ ধুনোর গন্ধের প্রতি কার কী মনোভাব জানতাম না। সেদিন কফি খেতে খেতে জানা গেল। আমার ভালো লাগে, অর্চিষ্মানের বমি পায়। চিন্তার ব্যাপারটা হচ্ছে, বাড়ির এত কাছে কফির দোকানটা খুলেছে যখন ঘন ঘন না গিয়ে তো উপায় নেই। আর যতবার যাব ততবার কেঁচো খুঁড়তে আরও কী কী সাপ বেরোবে কে জানে।



May 21, 2016

সাপ্তাহিকী








I know now, what I didn't know then, that affection can't always be expressed in calm, orderly, articulate ways; and that one cannot prescribe the form it should take for anyone else.
                                                                                — Magda Szabó, The Door



The fight against Guantánamo.  সেই ফাইটের প্রধান কাণ্ডারি মারা গেলেন সদ্য।


There is no such thing as Free will. But we’re better of believing in it anyway. একেবারে একমত। বিশেষ করে দ্বিতীয় লাইনটার সঙ্গে।

কোকা কোলা-র কোকাটুকু সত্যি সত্যি কোকেন থেকে এসেছে। জানতেন?

যে যাই বলুক না কেন, আমি কোনওদিন চায়ের কাপে চায়ের আগে দুধ ঢালিনি, ঢালছি না, ঢালবও না।

সংশোধনের উপায় হিসেবে অপরাধবোধে সুড়সুড়ি দেওয়াটা আমি কেন যেন ঠিক নিতে পারি না। অবশ্য কেউ বলবে তাতে যদি কাজ দেয় ক্ষতি কী? (লিংক পাঠিয়েছে শ্রীমন্তী)

‘আয়ান র‍্যান্ড’ যে ছদ্মনাম জানতাম না।



May 19, 2016

A - Z book tag




উৎস গুগল ইমেজেস


এই পঁয়ত্রিশ বছরে আমি যে দুটো সত্যিকে কখনও মিথ্যে হতে দেখিনি তারা হচ্ছেঃ

১। একটা কাজ করতে আমার নিজের যতটা সময় লাগবে মনে হয়, আসলে সময় লাগে তার আড়াই কিংবা তিন গুণ। 

২। যে কাজে যত বেশি সময় ঢালার জন্য প্রস্তুত থাকি, সে কাজে তত বেশি সময় লাগে। অর্থাৎ, ডেডলাইন না থাকলে এ জন্মে আমার কোনও কাজই শেষ হত না ।

যেমন ধরা যাক, অবান্তরের পরবর্তী যে পোস্টটা ছাপার কথা, সেই কথাটা ঝুলে আছে গত চার মাস ধরে। আগের সাপ্তাহিকী ছাপার পর “এইবার হয় ওই পোস্টটা ছাপব না হলে আর কিছুই ছাপব না” বলে মাটি কামড়ে পড়লাম, আর অমনি আমাদের এসি খারাপ হয়ে গেল। 

এই বাজারে দিল্লিতে এসি খারাপ হওয়া মানে হচ্ছে লেভেল থ্রি এমারজেন্সি। সে এমারজেন্সি নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে, কিন্তু নতুন পোস্ট করার যে টাইমলাইনটা মাথার ভেতর ছিল সেটা গোলমাল হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম আজ সেটা পোস্ট করা যাবে, নিদেনপক্ষে কালকে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সোমবার টার্গেট করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। 

কিন্তু ততদিন অবান্তরকে খালি ফেলে রাখা ভালো দেখায় না। তাই একটা ফাঁকিবাজি পোস্ট করছি। ইন্টারনেটে ভেসে বেড়ানো লক্ষ লক্ষ ট্যাগ থেকে একটা তুলে নিচ্ছি। A-Z book tag। ট্যাগটা দেখা ইস্তক অবান্তরে ছাপার ইচ্ছে ছিল,  এও ভেবেছিলাম অ-ঔ বা ক-চন্দ্রবিন্দু তালিকা হিসেবে ছাপলে কেমন হয়?  কিন্তু সে সব কায়দা করার এখন সময় নেই। কাজেই A-Z ট্যাগ হিসেবেই ছাপলাম।

***** 

Author you’ve read the most books from: আগাথা ক্রিস্টি

Best Sequel Ever: হ্যারি পটার

Currently Reading: Viet Thanh Nguyen-এর দ্য সিমপ্যাথাইজার। এই বইটা এ'বছর পুলিৎজার পেয়েছে।

Drink of Choice While Reading: চা

E-reader or Physical Book? যখন যা পাওয়া যায় তাই। আপাতত ই রিডারে পড়ছি। 

Fictional Character You Probably Would Have Actually Dated In High School: হাই স্কুল কেন, আমি সারাজীবন তাঁকে ডেট করতে রাজি আছি। প্রদোষ চন্দ্র মিত্র।

Glad You Gave This Book A Chance: হ্যারি পটার। চান্স দেওয়ার কথা হচ্ছে কারণ আমি হ্যারি পটার পড়েছি বেশ বড় বয়সে। এম এ পড়ার সময়। তখন যেটা হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি ছিল সেটা হচ্ছে হ্যারি পটারকে বিলিতি টিনএজারদের হুজুগ বলে উড়িয়ে দেওয়া। ভাগ্যিস দিইনি।

Hidden Gem Book: এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বিপদ হচ্ছে আমার কাছে যা হিডেন তা হয়তো বিশ্বের সবার কাছে জনপ্রিয়। আমার উত্তর শুনে তাঁরা মুখ বেঁকিয়ে হাসবেন। সে ঝুঁকি নিয়েই বলছি। মণীন্দ্র গুপ্তের ‘অক্ষয় মালবেরি’ আর জন কেনেডি টুলের ‘আ কনফেডেরাসি অফ ডান্সেস’।

Important Moment in your Reading Life:  আমার জন্য মায়ের পথের পাঁচালী কিনে আনা। আমার অক্ষরজ্ঞান হওয়ার আগে। 

Just Finished: Daniil Kharms-এর 'ইনসিডেনসেস'। এত অদ্ভুত বই আমি আগে পড়িনি। মে মাসের বইয়ের পোস্টে বিশদে বলব।

Kinds of Books You Won’t Read: সে রকম কিছু নেই। হাতে সময় থাকলে আর পড়ার কিছু না থাকলে দ্য মংক হু সোলড হিজ ফেরারি-ও আরেকবার পড়তে পারি।

Longest Book You’ve Read: হুম্‌মম, এই মুহূর্তে ভেবে তো হ্যারি পটারের শেষের দিকের বইগুলোর কথাই মনে পড়ছে।

Major book hangover because of: এই হ্যাংওভার দু’রকমের হতে পারে। ভালো রকমের হ্যাংওভার অনেক বই পড়েই হয়েছে, টু কিল আ মকিং বার্ড, আগাথা ক্রিস্টির অনেক গল্প, সুকুমার রায় হ্যাংওভার তো সারাজীবনের, ইদানীং এলেনা ফেরেন্তের নিওপলিট্যান সিরিজটা পড়ে অদ্ভুত হ্যাংওভারে ভুগছি, যে সম্পর্কে আপনাদের বলব একদিন। খারাপ হ্যাংওভারও হয়েছে তবে সংখ্যায় কম। যে বইটার কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে সেটার নিন্দে অবান্তরে আগেও করেছি। আয়ান র‍্যান্ডের দ্য ফাউন্টেনহেড। পড়ার পর প্রায় দশ বছর কেটে গেছে, এখনও বইটার কথা মনে পড়লে গা জ্বালা করে।

Number of Bookcases You Own: মোটে দুটি

One Book You Have Read Multiple Times: সুকুমার সমগ্র। 

Preferred Place To Read: খাটের ওপর।

Quote that inspires you/gives you all the feels from a book you’ve read: 

উদ্ধৃতি ১।  “পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন - মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠ্যাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়? তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে … দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গণ্ডী এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশ্যে …

দিন রাত্রি পার হয়ে, জন্ম মরণ পার হয়ে, মাস, বর্ষ, মন্বন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চ’লে যায় … তোমাদের মর্মর জীবন-স্বপ্ন শেওলা-ছাঁটার দলে ভ’রে আসে, পথ আমার তখনও ফুরোয় না … চলে … চলে … চলে … এগিয়েই চলে …

অনির্বাণ তাঁর বীণ শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ …

সে পথের বিচিত্র আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমায় ঘরছাড়া ক’রে এনেছি! … চল এগিয়ে যাই।”

উদ্ধৃতি ২। “প্রার্থনা করিও, আর যাহাই হোক, যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময় যেন একটি স্নেহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে - যেন একটি করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও একফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।”

Reading Regret: কিছু নেই

Series You Started And Need To Finish(all books are out in series): এলেনা ফেরেন্তের নিওপলিট্যান সিরিজ। দুটো বই পড়েছি, দুটো বাকি আছে।

Three of your All-Time Favorite Books: সুকুমার সমগ্র। পথের পাঁচালী। টু কিল আ মকিং বার্ড।

Unapologetic Fangirl For: আগাথা ক্রিস্টি।

Very Excited For This Release More Than All The Others: রিলিজ নিয়ে হইচইটা একেবারেই বিলিতি ব্যাপার। বাংলা বই কী রিলিজ করছে আমি জানি না। কাজেই না চাইলেও জে কে রোলিং-এর পরবর্তী করমোরান স্ট্রাইক উপন্যাসটার কথাই বলতে হবে।

Worst Bookish Habit: জোগাড় করে, না পড়ে ফেলে রাখা।

X Marks The Spot: Start at the top left of your shelf and pick the 27th book: আমি এই মুহূর্তে বুককেসের সামনে নেই, কাজেই এই উত্তরটা দেওয়া গেল না।

Your latest book purchase: ম্যাগডা জাবো-র দ্য ডোর। 

ZZZ-snatcher book (last book that kept you up WAY too late): জে কে রোলিং-এর ক্যাজুয়াল ভেকেন্সি।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.