February 13, 2019

অমৃতসর ৪ঃ কচৌরি, কুলচে, লস্যি




অমৃতসরের খাওয়ার জায়গা নিয়ে রিসার্চ করার থেকে ঝামেলার কাজ কমই আছে। টিক্কা থেকে ডাল ফ্রাই থেকে কুলচা থেকে লস্যি থেকে চাট থেকে আমসত্ত্ব - সবেরই লিজেন্ডারি দোকান থিক থিক করছে শহরে। তার ওপর কোন দোকান আগে ভালো ছিল, এখন পড়ে গেছে, কারা কারা হিডেন জেমস, পাশাপাশি দুটো দোকানের কোনটা আসল কোনটা জালি সে সব বাড়তি কনসার্ন তো আছেই। আবার নামের অল্প অদলবদল ঘটলে মিসগাইডেড হওয়ার চান্স খোলা। মানে কানহা সুইটস আর কানহালাল সুইটস, অশোক কুলচা আর অশোককুমার কুলচেওয়ালে কোনটায় খেলে ঠকবেন (কিংবা ঠকবেন না) সে নিয়ে চোখকান খোলা রাখতে হবে। 

তার ওপর আমরা থাকি দিল্লিতে। সহকর্মী থেকে সহযাত্রী থেকে ওলা উবারের ড্রাইভার ভাইসাব পর্যন্ত অমৃতসরের খাবারদাবার নিয়ে ইনফর্মড ডিসকোর্স চালাতে পারেন। না পারলেও, রিসোর্স পার্সন জানা আছে  বেশিরভাগেরই, হেল্পফুল হয়ে আলাপ করিয়ে দেবেন।

তবু আমরা রিসার্চ করেই গিয়েছিলাম। কারণ আমাদের হাতে দেড় দিন আর এই দেড় দিনে রাডারলেস শিপের মতো দৌড়োদৌড়ি করে লক্ষ্যে পৌঁছনো যাবে না। কী খাব, কোন দোকানে খাব, কখন খাব - সব আমাদের ছকা ছিল।  



চা-ব্রেকফাস্ট

অমৃতসরে ভারতবর্ষের বাকি সব শহরের মতোই ক্যাফে কফি ডে খুলেছে, টাউন হলেই দুখানা দেখলাম, কিন্তু দিন শুরু করার ট্র্যাডিশনাল তরিকা হল চা। বেশি করে আদা, এলাচ দেওয়া দুধ চা। একটা কথা সকলেই বলে দিয়েছিলেন, অমৃতসরে যাই খাও না কেন, যেখানেই খাও না কেন,  ফুড সাফারি খালি পেটে শুরু কোরো। একেবারে খালি তো আর থাকা যায় না। আমার দাদু গায়ত্রী মন্ত্র না জপে জলগ্রহণ করতেন না, চোখ খোলার পনেরো মিনিটের মধ্যে এক কাপ চায়ের সঙ্গে মোলাকাত না হলে আমার ধর্মসংকট উপস্থিত হয়। কাজেই যে রকম চা পেটে মিনিমাম জায়গা নেবে, অর্থাৎ দুধ চিনি ছাড়া লেবু চা, নিয়মরক্ষা এক কাপ খয়ে বেরিয়ে পড়লাম। 


আমাদের লিস্টের চায়ের দোকান ছিল কুপার রোডের গিয়ানি টি স্টল। হোটেল থেকে হেঁটে মিনিট কুড়ি। গিয়ানি ব্র্যান্ডের দোকানের অভাব নেই অমৃতসরে। কিন্তু ঠিক দোকানেই যে পৌঁছেছি তা নিয়ে কোনও সন্দেহই রইল না খদ্দেরদের দেখে। মাথায় কমলা পাগড়ি বেঁধে স্থানীয় সর্দারজিরা দোকানের সামনে বেঞ্চি পেতে বসে আছেন। হাঁটুতে এক হাত, অন্য হাতে চায়ের কাপ। হা হা হাসছেন যেন বাজ পড়ছে। আমি স্টিরিওটাইপিং করতে চাই না, রোগাভোগা সর্দারজিও কম দেখিনি অমৃতসরে, কিন্তু গিয়ানির দোকানের সামনে সেদিন সকালে যাঁরা বসে ছিলেন তাঁদের সত্যি সত্যিই যেমন বললাম তেমন দেখতে। দোকানের ভেতরে অলরেডি নানা ধরণের খাইয়ে। কেউই টুরিস্ট নয়। একলা সর্দারজী, দোকলা নন-সর্দারজি, স্কুল যাওয়া ছোট ছেলে আর ছেলের মা। মা চায়ে ডুবিয়ে ছেলেকে সামোসা খাইয়ে দিচ্ছেন। আমার কপালে কমপ্লানে ডোবানো মিল্ক বিকিস জুটত, মনে পড়ে বুক হুহু করে উঠল। কোণের টেবিলে চারজন পুলিসও দেখলাম। উর্দিটুরদি পরা। চার মাথা এক করে চোখমুখ নেড়ে খুব উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন।


চায়ের সঙ্গে নানারকম অস্বাস্থ্যকর টা পাওয়া যায়, যেমন সামোসা বললাম। কিন্তু সবথেকে অস্বাস্থ্যকর এবং ফেমাস হচ্ছে কচৌরি। বা বোমা বললেও চলে।

দু’গ্লাস চা আর দু’পিস কচুরি চাই বলা উচিত ছিল। দু’প্লেট কচৌরি অর্ডার করাতে পরিবেশক চারখানা বোমা আমাদের সামনে নামিয়ে রেখে গেলেন। ও জিনিস একটাও পুরো খেতে পারার কনফিডেন্স ছিল না আমার, আগের রাতে ডিনার বাদ দেওয়াতেই সম্ভবতঃ একটা গোটা শেষ করতে পারলাম। অর্চিষ্মান অন্যটায় চামচ বসিয়েও অর্ধেক পথ গিয়ে আর পারেনি। চাটনিটা পুদিনা চাটনির মতো দেখতে কিন্তু খেতে অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং। সম্ভবতঃ তেঁতুলের মিশেল আছে। বেশি এলাচটেলাচ দিলে অনেকসময় চায়ের সুগন্ধী শরবতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, গিয়ানির চা সে দোষমুক্ত। আমরা ‘ফিকি’ চা অর্ডার করার সাহস দেখাইনি কিন্তু এত কম মিষ্টি চা আমি আর অর্চিষ্মান রাস্তার দোকানে প্রায় খাইনি বললেই চলে। বোমার পাল্লায় সেই চাও পুরো শেষ করা গেল না। অর্ধেক খেয়ে বেরিয়ে এলাম।

অমৃতসরের খাবার জায়গা প্ল্যান করে যাওয়ার আরও একটা অসুবিধে সম্পর্কে আপনাদের সাবধান করে রাখি। প্ল্যান নিশ্চয় আপনি নিজের খাওয়ার ক্ষমতার এস্টিমেশন অনুযায়ী করবেন, সে এস্টিমেশন ভুল প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কাজেই লাস্ট মোমেন্টে প্ল্যানের অদলবদল করার জন্য তৈরি থাকবেন। আমরা যেমন ব্রেকফাস্টের আরও দুটো জায়গা শর্ট লিস্টে রেখেছিলাম, কানহা সুইটস আর কানহাইয়া লাল। ভেবেছিলাম সকালে চায়ের সঙ্গে একটা কচুরিতে আর কত পেট ভরবে, মাঝসকালের দিকে খেয়ে কানহাইয়ালালে গিয়ে একটু পুরী আলুর তরকারি, যা কি না সাধারণ তরকারির থেকে আলাদা এবং লৌঞ্জি নামে খ্যাত, খাব। পরদিন কানহা সুইটসে। প্রথমদিন বোমা হজম করতে আমাদের দুপুর দুটো বেজে গিয়েছিল আর দ্বিতীয় দিন কেন খাওয়া হয়নি পরে বলছি। 

কুলচা

অমৃতসরের সব খাবারদাবার নিয়েই রিসার্চ করা শক্ত শুরুতেই বললাম কিন্তু সবথেকে গোলমেলে গবেষণার খাবার হচ্ছে কুলচা। অমৃতসরি কুলচা। এ যেন পশ্চিমবঙ্গের কোনও এক পাড়ায় গিয়ে জিজ্ঞাসা করা, ভাই এখানে বেস্ট ফুচকা বা রসগোল্লা কে বানায় বলতে পার? ব্লগটলগ পড়ে, ভিডিওটিডিও দেখে অমৃতসরী কুলচার একাধিক লংলিস্ট, শর্টলিস্ট তো হয়েইছিল, শুক্রবার অর্চিষ্মানের উবারভাইসাব অমৃতসর যাওয়া হচ্ছে শুনে মহা উত্তেজিত হয়ে, কী যেন কী যেন নাম মনে পড়ছে না দাঁড়ান ভাইকে ফোন করি, বলে কাজিনকে ফোন করে অমৃতসরের বেস্ট কুলচার দোকানের নাম রেকমেন্ড করলেন। কারও সঙ্গে কারও রেকোমেন্ডেশনের মিল নেই, বলা বাহুল্য।

অর্চিষ্মানের এক কলিগই ঠিক বলেছিলেন। অমৃতসরি কুলচাকে বারে মে জাদা সোচোঁ মত। কহিঁ পে ভি খা লেনা। সারে আচ্ছে হ্যায়। 

কথাটা খাঁটি। বলাই বাহুল্য আমরা সারে কুলচা খেয়ে দেখিনি। দেড় দিনের ট্রিপে চা, ব্রেকফাস্ট, লস্যি, আমসত্ত্ব, মেন কোর্স খাওয়ার পর সারে কেন, দুইয়ের বেশি তিনজায়গার কুলচা চেখে দেখার চেষ্টাও বোকামি। কিন্তু অমৃতসরের রাস্তার দুপাশের অগুনতি রেস্টোর‍্যান্টের পাশ দিয়ে এই দু’দিন ক্রমাগত যাতায়াত করতে করতে একটা জিনিস আঁচ করতে পেরেছি। ও সব অনেক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেই আমরা উমদা খাবার খেতে পেতাম। শুধু কুলচা নয়, অমৃতসরের বাকি সব খাবারেরও স্বাদ অন্যান্য শহরের থেকে আলাদা। একটা ব্লগ না নিউজপেপার আর্টিকেলে পড়ছিলাম অমৃতসরের খাবারের এই কেরামতিটা কী জানতে চেয়েছেন লেখক। সিক্রেট মশলা? গোপন প্রণালী? তুকতাক? তাতে একজন অম্লানবদনে বলেছেন, পানি। অমৃতসরের পানিতেই রয়েছে অমৃত। ও দিয়ে যা রাঁধবে তাই ভালো খেতে লাগবে। 

অমৃতসরি কুলচা কাকে বলে? স্টাফড পরাঠা বললে খানিকটা অপমান করা হয়। বাঙালি বিয়েবাড়িতে আজকাল কুলচা (আবার প্রাপ্তবয়স্কও নয়, বেবি কুলচা) বলে যে জিনিসটা চ্যাৎনা পাত্রে পড়ে থাকে এবং অনভ্যস্ত হাতে চিমটে দিয়ে ব্যালেন্স করে পাতে তুলে নিতে গিয়ে পেছনের বুফের লাইন লম্বা হয়ে যায়, ওটা যদি কুলচা হয় তবে এটা কুলচা নয় আর এটা যদি কুলচা হয় তো ওটা আর যা খুশি হতে পারে, কুলচা ছাড়া। দিল্লির কুলচার সঙ্গেও অমৃতসরি কুলচা সম্পর্ক পাতাতে নারাজ। একজন অমৃতসরি কুলচা কনোসিওর দিল্লির কুলচা সম্পর্কে বলেছেন, ও কুলচা কিত্থে? ও তো স্টাফড তন্দুরি রুটি। 


কথাটা মিথ্যে নয়। অমৃতসরি কুলচা একরকমের ফ্ল্যাটব্রেড বটে, কিন্তু সে ব্রেড ফ্ল্যাট নয় মোটেই। তার পরৎ আছে থরে থরে। ওই থিন ক্রাস্টেই বাইরে মুচমুচে আর ভেতরে তুলতুলে। আমরা খাবারদাবারের ব্যাপারে দিল্লি ফুড ওয়াকের অনুভব সাপ্রার মতামতকে গুরুত্ব দিই। দিল্লিতে তো বটেই, ভারতের অন্যান্য শহরের খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রেও ওঁর সাজেশন আমাদের এখনও ডোবায়নি। অমৃতসরের তিনটি বিখ্যাত দোকানের কুলচা উনি চেখেছেন এবং রায় দিয়েছেন অশোককুমার কুলচেওয়ালা ওঁর ব্যক্তিগত ফেভারিট। আমরা অশোককুমার কুলচেওয়ালাতেই খাব ঠিক করলাম। প্রথমটা আমরা অশোক কুলচা আর অশোককুমার কুলচেওয়ালা গুলিয়ে ফেলছিলাম কিন্তু দুটো সম্পূর্ণ আলাদা দোকান এবং বেশ খানিকটা দূরত্বে।


তিনশো মিটার দূর থেকে অশোককুমার কুলচেওয়ালের ভিড় চোখে পড়ে। রাস্তায় পাতা চেয়ারটেবিলে শনিবার দুপুরের হট্টগোল। তবে ভিড়ের একটা বড় অংশ এস ইউ ভি-র ভেতরে খাবার আনিয়ে নিয়ে খাচ্ছে। আমরা নিলাম একটা অমৃতসরি কুলচা মাখ্‌খন মারকে আরেকটা আলুগোবি কুলচা মাখখ্‌ন প্লাস মিরচা মারকে। অরিজিন্যাল অমৃতসরি কুলচার পুর বিশুদ্ধ আলু। কিন্তু পুরের যা বৈশিষ্ট্য, অনেক রকম এক্সপেরিমেন্ট করা যায়। কাজেই কপি থেকে কিমা সবই চলে।


সাপ্রা অশোককুমার কুলচের পুরের বিশেষ করে প্রশংসা করেছিলেন, সত্যি চমৎকার। সঙ্গের যত চাও তত খাও টকমিষ্টি ছোলেটিও চমৎকার। একটা জিনিস খেয়াল করে দেখলাম, দিল্লির ছোলের যে একটা ভয়ানক মশলাদার গলায় শুকনো লংকার ঝাঁজে গলা বন্ধ করা মশলায় কালচে ব্যাপার থাকে, অমৃতসরের কুলচার ছোলে তার থেকে অনেক হালকা। অন্ততঃ আমরা যে যে কুলচা খেয়েছি সেখানে এই অভিজ্ঞতাই হয়েছে। অশোককুমার কুলচেওয়ালায় চোখ বুজে খেতে পারেন। চমৎকার, প্রাণভরানো, মনভরানো কুলচা।

আমাদের পাশে দুতিনটে অল্পবয়সী ছেলে বসে অনেকক্ষণ ধরে কুলচা অর্ডার করে পাচ্ছিল না, আমাদের অর্ডার মারাত্মক দ্রুত এসে যাওয়াতে তারা নিজেদের মধ্যে রেগে গিয়ে কী সব বলতে লাগল। ক্যামেরা শব্দটা শুনে বুঝলাম তাদের রাগের কারণ হচ্ছে আমরা ছবি তুলব বুঝে পার্শিয়ালিটি করে তাড়াতাড়ি খাবার দেওয়া হয়েছে। সত্যিই পার্শিয়ালিটি হচ্ছিল সম্ভবতঃ। ন্যাপকিন চাওয়া মাত্র দৌড়ে একটা না দুটো না একেবারে গোটা ন্যাপকিনের প্যাকেট দিয়ে যাওয়া হল। পাশের টেবিলের ছেলেগুলো এত রেগে গিয়েছিল যে সেই প্যাকেট থেকেই চার পাঁচটা ন্যাপকিন কেড়ে নিয়ে হাতমুখ মুছতে লাগল, কুলচা টেবিলে এসে পৌঁছনোর আগেই। 

ঝটপট থালা সাফ হয়ে গেল দুজনেরই। আমি ভাবছি আরেকটা খাই, অর্চিষ্মানের উঠি উঠি ভাব। বাবা, এতেই পেট ভরে গেল? আমি তো এখনও আরেকটা হেসেখেলে খেতে পারি। গর্ব করে কথাটা বলতে অর্চিষ্মান বলল, আমিও পারি। কিন্তু এই দেখ কী দেখাচ্ছে, বলে ফোনটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দিল।


গুগল ম্যাপ। ‘ইয়োর লোকেশন’ থেকে ‘কুলচা ল্যান্ড’ হেঁটে মোটে বারো মিনিট। কুলচা ল্যান্ড হচ্ছে অমৃতসরের সেই সব দোকানের মধ্যে অন্যতম যার প্রতিভায় হিডেনটিডেন কিছু নেই। অমৃতসরের সেরা কুলচার প্রায় সব লিস্টের এক দুই তিনের মধ্যে কুলচা ল্যান্ডের সিট বাঁধা। অর্চিষ্মানের প্ল্যানটা হচ্ছে পেটে যা জায়গা আছে তা কুলচা ল্যান্ডের কুলচা দিয়ে ভরানো। তাহলে অমৃতসরি কুলচার বেশ একটা তুলনামূলক স্টাডি করা সম্ভব হবে। আমরা টাকা দিয়ে হেঁটে হেঁটে চললাম কুলচা ল্যান্ডের দিকে। হেঁটে যাওয়া আরও একটা কারণ আছে, খাওয়া হজম করায়। কুলচা ল্যান্ডেও গিজগিজ ভিড়। 


কুলচা ল্যান্ডের মেনু। এখানেও আমরা একটা অমৃতসরি, একটা মসালা কুলচা নিলাম। অমৃতসরি কুলচার পুর সেই খাঁটি আলুসেদ্ধ, আর মসালা কুলচার আলুটা বেশ করে মশলা দিয়ে মাখা। 


অদ্ভুত। অসামান্য। অত্যাশ্চর্য। সেই খাস্তা এবং মসৃণতার অত্যাশ্চর্য সমন্বয়। আমি আর অর্চিষ্মানের সামান্য মতানৈক্য হয়েছে। আমার মতে কুলচা ল্যান্ডের মসালা কুলচা অশোককুমার কুলচেওয়ালের আলুগোবির থেকে বেটার। চুল পরিমাণ, কিন্তু বেটার। অর্চিষ্মানের ভোট অশোককুমারের প্রতি।

কিন্তু যে ব্যাপারটায় আমরা দুজনেই একমত সেটা হচ্ছে কুলচা ল্যান্ডের ছোলের পাশের খোপের টাকনাটির শ্রেষ্ঠত্বে। এখানে অশোককুমারের প্রতি যাতে অন্যায় না হয় তাই বলে নিই, কুলচা ল্যান্ডে দুটি পদ দেওয়া হয় কুলচার সঙ্গে। একটা ছোলে, আরেকটি এই টক টক, ঝাল ঝাল শশা পেঁয়াজ দেওয়া অমৃত রসটি। অশোককুমারের ছোলে এই দুটি পদ পাঞ্চ করলে যেটা হয়, অর্থাৎ টক ছোলে, সেটা। কুলচা ল্যান্ডের ছোলে আমাদের চেনা ছোলের অনেক কাছাকাছি (যদিও দিল্লির থেকে অনেক কম মশলাদার)। কিন্তু ওই টক চাটনিখানা, আমি সিরিয়াসলি বর্ণনা করতে অক্ষম। গলা দিয়ে নামার সময় সত্যি সত্যি আহা উহু বেরিয়ে আসে।

লস্যি

অমৃতসরে লস্যির দোকানেরও কম্পিটিশন প্রচুর। আহুজা মিল্ক হাউস থেকে শুরু করে গিয়ানি দি লস্যি।  হাথি গেটের গিয়ানি দি লস্যির ছবিটবি দেখে রিভিউটিভিউ পড়ে আমরা ওখানেই যাব স্থির করেছিলাম।  ঠিক করলাম হাথি গেট চলে যাওয়া যাক, তারপর হেঁটে গিয়ানি দি লস্যিতে পৌঁছনো যাবে। কুলচা হজমও হবে, হেঁটে শহর দেখাও হবে। 

উবার ডাকলাম। ভুবনেশ্বরে যেমন নাকের ডগায় ওলাউবার দাঁড়িয়ে থাকে, অমৃতসরে অতটাও নয়। পুলটুল নেই, মোটরবাইক দিয়ে শুরু করে তারপরেই প্রিমিয়ার। সে গাড়িও এত কম, এই দেড়দিনে আমাদের একজন ভাইসাবের গাড়ি রিপিট হয়েছে। ভাবুন। একই উবার ট্যাক্সি দু’বার। আরেকজনেরও রিপিট হয়েছিল, দু’বারই তিনি ক্যান্সেল করেছেন। আমাদের নাম পছন্দ হয়নি সম্ভবতঃ। কুলচা ল্যান্ড থেকে হাথি পোল নিয়ে যাওয়ার জন্য যিনি এলেন তিনিই সকালে আমাদের রঞ্জিত সিং মিউজিয়াম থেকে পার্টিশন মিউজিয়াম নিয়ে গিয়েছিলেন। রকমসকম দেখে বুঝতেই পেরেছিলেন আমরা হদ্দ টুরিস্ট, হাথিপোলের কাছাকাছি এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হাথি পোল যানা হ্যায় কে গিয়ানি দি লস্যি পিনা হ্যায়? আমরা লস্যি লস্যি বলে চেঁচিয়ে উঠতেই শর্ট কাটে একটা গলির মুখে নামিয়ে দিয়ে বললেন, সোজা হাঁটো, গলি যেখানে শেষ সেখানে গিয়ানির দোকান। আমরা গলিতে ঢুকে পড়লাম।

নতুন শহরের গলিতে হাঁটার অভিজ্ঞতায় জানি, সর্বদা সেকেন্ড ওপিনিয়ন নেওয়া জরুরি। হয়তো উল্টোবাগে হাঁটছি। গলিতে ঢোকার মুখেই এক দোকানে বসে থাকা এক বর্ষীয়ান ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম। গিয়ানি দি লস্যি এদিকেই তো? তিনি উবার ভাইসাবের দিকনির্দেশ রিপিট করলেন। নাকবরাবর চলে যান, গলি যেখানে মেন রোডে মিশছে সেখানেই গিয়ানি দি লস্যি। 

দু’ সেকেন্ড থেমে জুড়লেন। পহলেওয়ালা।

সেরেছে। তার মানে মোহিনীমোহন, আদি মোহিনীমোহন কেস। গলির মোড়ে পৌঁছে আবিষ্কার করলাম সত্যিই দুখানা গিয়ানি দি লস্যি। আমরা যেদিক থেকে আসছি সেদিক থেকে পহলেওয়ালাটি স্থাপিত হয়েছিল উনিশশো একুশ সালে, পরেরটি উনিশশো সাতাশ সালে। 


যে ভদ্রলোক আমাদের প্রথম অর্থাৎ উনিশশো একুশের গিয়ানি দি লস্যিতে খাওয়ার টিপ দিলেন, তিনি উনিশশো সাতাশে জন্মাননি কাজেই টুকলি নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা থাকার কারণ নেই ধরে নিচ্ছি। এও হতে পারে ওঁর বাবা আসলি গিয়ানি টুকলি গিয়ানির তফাৎ বুঝিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ট্র্যাডিশন উনি রক্ষা করে চলেছেন। কিংবা সাতাশের বর্তমান দোকানির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত চটাচটি আছে। 

কারণ যাই হোক না কেন, আমরা ওঁর কথা মতো পহলেওয়ালা অর্থাৎ উনিশশো একুশ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া গিয়ানিতেই ঢুকে গেলাম।


দর্শনধারী যে গুণবিচারী ভুলে যান। মনে রাখুন, মাকাল ফলের দ্যোতনাটা অনেক বেশি উপযুক্ত এ পৃথিবীর পক্ষে। ম্যাড়মেড়ে স্টিলের গ্লাসে পেস্তাবাদামহীন গিয়ানির লস্যির চেহারা দেখে ভুলবেন না। লস্যির কিনারে ওই যে চামচের ডগা দেখতে পাচ্ছেন ওটাকে হেলাছেদ্দা করবেন না। ম্যাগো, এই রকম সারা গায়ে দই লাগা চামচ দিয়ে আমি খাই না, এক্ষুনি স্ট্র এনে দাও, বলে হাত পা ছুঁড়বেন না। স্ট্র এ সিচুয়েশনে আপনাকে বাঁচাবে না। এ লস্যির যতখানি চুমুক দিয়ে খাওয়ার, ততখানিই চামচ দিয়ে কেটে কেটে মুখে পুরে চিবিয়ে চিবিয়ে। কারণ অফুরন্ত মালাই। খাঁটি, বিশুদ্ধ মালাই। ভেবেছিলাম দোকানের বাইরে দাঁড়িয়েই খাব। তারপর দোকানের ভেতরে ঢুকে চেয়ার টেনে বসলাম।সকালের কচুরির পর শিক্ষা হয়েছিল, একগ্লাস লস্যিই নিয়েছিলাম, মুখোমুখি আমি আর অর্চিষ্মান, মাঝখানে লস্যির গ্লাস নিয়ে মিনিট দশেক কেটে গেল।

গিয়ানিতে আরেকরকম লস্যি প্রবাদপ্রতিম, পেড়া লস্যি। পাছে পেট কম ভরে, পুষ্টির খামতি হয়, সেই ভয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি মালাইয়ের সঙ্গে ক্ষীরের প্যাঁড়া, দোকানের সামনে কাঁচের বয়ামে যা সারি সারি সাজানো আছে, চারখানা গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেওয়া হয়। সকালে একখানা বোমা কচুরি আর দুপুরে দু’খানা কুলচা খাওয়ার পর আমাদের আর পুষ্টির দরকার ছিল না, আমরা নরম্যাল লস্যিই অর্ডার করেছিলাম। তাছাড়া ততক্ষণে শিওর হয়ে গেছি যে অমৃতসরে আবারও আসা হচ্ছে, কাজেই প্যাঁড়া লস্যিটা পরের বার খাব। পরের বা উনিশশো সাতাশের গিয়ানির লস্যিও খাব। কনফিডেন্স আছে, সেটাও খারাপ হবে না।

(চলবে)

অমৃতসর ১
অমৃতসর ২
অমৃতসর ৩



February 08, 2019

অমৃতসর ৩ঃ জালিয়ানওয়ালাবাগ, পার্টিশন মিউজিয়াম





দেখেশুনে আমি সিদ্ধান্তে এসেছি নেচার, নারচার দিয়ে সবটা ব্যাখ্যা করা যায় না। কিছু লোক স্রেফ খুঁতো প্রোগ্রামিং নিয়ে জন্মায়। উদাহরণ, জেনারেল ডায়ার। বিচারের সময় নাকি বলেছিলেন নেহাত গাড়ি ঢোকার জায়গা ছিল না, না হলে উনি মেশিনগানওয়ালা গাড়ি নিয়ে ঢুকে ভিড়ের ওপর গুলি চালাতেন। 

গুরুদ্বারার নাকের ডগায় জালিয়ানওয়ালাবাগ। মাঠের মাঝখানে স্টেজ বেঁধে আলোচনাসভা চলছিল। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে গবেষণামূলক একটি বই লিখেছেন এক মহিলা। বইয়ের নাম, লেখকের নাম খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল। ভদ্রমহিলা বলছিলেন, বইয়ের জন্য রিসার্চ করতে গিয়ে, জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংসতার নমুনার নতুন করে মুখোমুখি হয়ে ওঁর ঘুম উড়ে গিয়েছিল। হাজার হাজার লোক, অসহায়ের মতো মরে গেল, কেউ বাঁচাতে এল না। ভদ্রমহিলা বলছিলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে জালিয়ানওয়ালাবাগ পিকনিক স্পট নয়।

জায়গাটার চেহারাটা এখন পিকনিক স্পটেরই মতো হয়েছে সন্দেহ নেই। স্কুলের বাচ্চা, কলেজের ছেলেমেয়ে, প্রেমিকপ্রেমিকা, সিংগল, কাপল, ইট’স কমপ্লিকেটেড - গিজগিজ। গুলির গর্ত খুঁজে পাশে দাঁড়িয়ে ভিক্টরি সাইন দেখিয়ে ছবি তুলছেন দর্শনার্থীরা। কেউ কেউ ঘাসে শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। হাই তুলছেন, উল বুনছেন, কমলালেবু ছাড়িয়ে খাচ্ছেন। খাওয়া হয়ে গেলে খোসা বিচি অদূরবর্তী ডাস্টবিনে ফেলে আসবেন, হোপফুলি।

ভাবলাম, কোনটা হওয়া উচিত। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দগদগে ক্ষত জালিয়ানওয়ালাবাগ; সেই অন্ধকুয়ো, গুলি থেকে বাঁচতে যার মধ্যে স্বেচ্ছায় ঝাঁপ দিয়ে মরেছিলেন নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু; ডাঁই হওয়া মৃতদেহের ছিন্নভিন্ন পায়ের পাতা, কারণ মাথা বাঁচাতে শুয়ে পড়েও রক্ষা হয়নি, ডায়ারের লোকেরা বন্দুকের নলের তাক অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছিল;  সেই সব শত শত নিরস্ত্র নিরপরাধের যন্ত্রণা, ভয়, আতংক, অসহায়তার কথা মনে রেখে, তাঁদের প্রিয়জনদের অপূরণীয় ক্ষতির কথা মনে করে সেই জায়গাটার শোকস্তব্ধতাকে সংরক্ষণ করা?

নাকি মনে রাখা যে  উনিশশো উনিশ সালের তেরোই এপ্রিলের আগে জালিয়ানওয়ালাবাগ একটি সুরম্য উদ্যানই ছিল।  সে উদ্যানে বাচ্চারা দৌড়ত, বড়রা গল্প করত, উল বুনত, রোদ্দুরে বসে খোসা ছাড়িয়ে কমলালেবু খেত। তারপর একটা খুঁতো প্রোগ্রামিংওয়ালা লোক এসে ওই অকথ্য ঘটনা ঘটালো। সে ঘটনার ক্ষত তো মুছবে না, দেওয়ালে দেওয়ালে তার চিহ্ন থেকে যাবে। কিন্তু সেই ক্ষতকে স্রেফ দাগে পর্যবসিত করে বাগকে আবার জনতার উল্লাস দিয়ে ভরে দেওয়াও কি একরকমের জয় হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে না?

বাগানের একদিকে মিউজিয়াম। সেখানে জালিয়ানওয়ালাবাগ ম্যাসাকারের নথিপত্র সংরক্ষিত আছে। একদিকের দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবির ওপর টাঙানো নাইটহুড ত্যাগ করার ঘোষণাজনিত চিঠির বয়ান।

“The time has come when badges of honour make our shame glaring in their incongruous context of humiliation, and I for my part wish to stand, shorn of all special distinctions, by the side of my country men.”

*****


ছড়ানো চাতাল ঘিরে লাল বাড়ি, থামওয়ালা বারান্দা, বাহারি উঁচু গেট মিলিয়ে অমৃতসরের টাউন হল কলোনিয়াল স্থাপত্যের একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন।। সাতচল্লিশ সালের আগে এই বাড়িই ছিল অমৃতসরের প্রশাসনিক হেডঅফিস। এক দিকের হাতায় ছিল পুলিস বিভাগ, সেই হাতাতেই এখন খুলেছে পার্টিশন মিউজিয়াম।

ভারত পাকিস্তানের পার্টিশন চোদ্দ মিলিয়ন মানুষকে ঠাঁইনাড়া করেছিল। পার্টিশনের নজিরবিহীন নৃশংসতা, রাজনৈতিক ঘুঁটি চালাচালির অপরিসীম স্বার্থপরতা ইত্যাদি যদি ছেড়েও দেওয়া হয়, স্রেফ মাত্রার দিক থেকে এই ঘটনা পৃথিবীর অন্যতম ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। তা সত্ত্বেও ভারত পাকিস্তানের পার্টিশন যে বিশ্বইতিহাসে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে নেই, তার কারণ অনুমান করা কষ্টকর নয়। 



ঘটনাটিকে তার যথাযোগ্য গুরুত্ব সহকারে সংরক্ষণ করার জন্য এই পার্টিশন মিউজিয়ামের অবতারণা। অবতারণা করেছেন আর্টস অ্যান্ড কালচারাল হেরিটেজ ট্রাস্ট। তাছাড়াও এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আছে ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টারি লাইব্রেরি, আমাদের ন্যাশনাল আর্কাইভ, পাঞ্জাব ডিজিটাল লাইব্রেরি, কেম্ব্রিজ ইউনিভারসিটি, লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স, সাউদ্যাম্পটন ইউনিভারসিটি, অ্যামিটি ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি।

আমাকে সবথেকে বেশি ছুঁয়েছে, মিউজিয়াম অমৃতসরে হলেও দেশের অন্যপ্রান্তের আরেকটি অঞ্চলও যে পার্টিশনের কোপ সয়েছিল তার সমান সমান স্বীকৃতি। ঢোকার আগে থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মিউজিয়ামের ভেতর ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ বারংবার, ঘুরে ঘুরে, বাজে।


দেশভাগজনিত বিবিধ দলিলদস্তাবেজ, নথিপত্র, ছবি, অডিও ভিস্যুয়াল নথিপত্র দিয়ে তৈরি পার্টিশন মিউজিয়াম ওই সময়ের ভারতীয় রাজনীতির এক অসামান্য দলিল। এ শুধু পরাধীনতার শেকল ছেঁড়ার সময় নয়, নিজেদের রাজনৈতিক সাবালকত্ব অর্জনেরও সময়। স্বার্থ বুঝে, নিক্তি মেপে আমার তোমার বুঝে নেওয়ার সময়। ছবিতে, কোটেশনে, কাগজের কাটিং-এ সে বোঝাবুঝি, মাপামাপির দড়ি টানাটানি দেখলে গা শিরশির করে। তার থেকে পরের শয়তানির সাক্ষী হওয়া যেন কম কষ্টের। 


সান্ত্বনার বিষয়, সে শয়তানির সাক্ষ্যের অভাব নেই। বড় বড় ঝোলানো ম্যাপ, সেই উনিশশো পাঁচ থেকে শুরু হওয়া কাটাকুটি খেলার মাঠ। একবার নদীয়া ওদিকে, খুলনা এদিকে; পরের রিভিশনে খুলনা ওদিকে, নদীয়া এদিকে। সবুজ লাইনের ওপর দিয়ে লাল লাইন। একটা ভূখণ্ড ভাগ হয়ে যাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ লোক বেঘর হয়ে যাচ্ছেন। যারা ভাগ করছেন তারা সেই ভূখণ্ডের মাটিতে কোনওদিন একঘণ্টা পায়ে হাঁটেননি। সেপাইসান্ত্রী সুরক্ষিত প্রাসাদকক্ষে বসে মানচিত্রের ওপর লালনীল আঁক কাটছেন।

দেওয়ালে টাঙানো টিভি থেকে কথা বলেন কুলদীপ নায়ার। সিরিল র‍্যাডক্লিফকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন উনি, আপনার মনে হয় দাগটা যুক্তিযুক্ত টানা হয়েছিল? র‍্যাডক্লিফ জবাব দিয়েছিলেন, আমাকে যা সময় দেওয়া হয়েছিল তাতে আমি ওর থেকে ভালো করতে পারতাম না। আরও সময় পেলে আরেকটু বেটার দাগ টানার চেষ্টা করে দেখতে পারতাম। 

আরেক ঘরের দেওয়ালে টাঙানো টিভি থেকে এক বৃদ্ধ বলছিলেন, গ্রামের বাড়ি থেকে মা পাঠাতেন অমৃতসরে দিদির বাড়ি, দিদি নিয়ে যেতেন লাহোরে দাঁতের ডাক্তার দেখাতে। একদিন জানা গেল আর লাহোর যাওয়া যাবে না। ওটা অন্য দেশ। অন্য পার। অমৃতসর রইল এদিকে। কেন? কারণ আমরা তোমাদের কলকাতা দিয়েছি। ওদের একটা বড় শহর দিতে হবে। অতএব লাহোর ওদের, তোমরা অমৃতসর নিয়ে তুষ্ট থাকো।

নথিপত্র, দলিলদস্তাবেজ ঐতিহাসিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই কিন্তু কোনও অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় অলিপিবদ্ধ ইতিহাস। মুখের কথার ইতিহাস। স্মৃতির ইতিহাস। মাঝরাতে অনেক লোকের চিৎকারে ঘুম ভেঙে যাওয়ার স্মৃতি। চিৎকার দ্রুতবেগে গলি দিয়ে এগিয়ে আসছে। সামনে দিয়ে বেরোনো নিশ্চিত মৃত্যু, পেছনের দরজায় অলরেডি কোপ পড়তে শুরু করেছে। ছাদের দিকে দৌড়নো ছাড়া উপায় নেই। এতদিন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা মানুষ ছিটকে গেছে, কী ভাগ্যিস মহল্লার ছাদগুলো এখনও সেতুর মতো জুড়ে আছে। ছাদ থেকে ছাদে লাফাচ্ছি, আর উদ্বাস্তু হয়ে যাচ্ছি একটু একটু করে। 

গায়ে কাঁটা দেয় একটা ঘরে ঢুকে। দেওয়ালজোড়া ছবির দিকে তাকানো যায় না। মৃতপ্রায় মানুষের ওপর ঝুঁকে প্রাণের শেষ আশা হাতড়াচ্ছে আরেক মৃতপ্রায় মানুষ। তাকানো যায় না সেই সব ছবিগুলোর দিকেও, যেখানে আপাতভাবে কোনও বিপদ নেই। ওয়ার্স্ট ইজ ওভার। একজন মানুষ রাস্তার ধারে ঝুড়িতে কয়েকটা ফল নিয়ে উবু হয়ে বসে আছেন গালে হাত দিয়ে। দৃষ্টি কোনদিকে বোঝা যায় না। তাঁর আর প্রাণের ভয় নেই। তিনি ভাগ্যবান। কিন্তু তাঁর শূন্য দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে সে কথা বলার সাহস হবে না আপনার।

আরেকটা ঘরের দেওয়াল জুড়ে রিফিউজি ক্যাম্পের ছবি। মাইকে ঘোষণা ভেসে আসছে। একের পর এক নাম। প্রিয়জনের নাম। কোন লরিতে এসে পৌঁছেছেন তাঁরা ক্যাম্পে, আদৌ পৌঁছেছেন কি না তাই বা কে জানে। তবু না খুঁজে তো থাকা যায় না। খুঁজতে তো হবেই। ঘোষণা হচ্ছে মেয়েদের সন্ধের বাইরে তাঁবুর বাইরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা।

কারণ সবাই রিফিউজি হলেও সবার সমান বিপদ নয়। রিফিউজি ক্যাম্পেও নারী ইজি টার্গেট। নারীর বিপদ বেশি। একটা ঘরের মাঝখানে কুয়ো খোঁড়া। অনার কিলিং কুয়ো। আক্রান্ত হওয়ার আগে মেয়েদের ফেলে দাও। পুরুষের প্রাণ যাবে। মেয়েদের যাবে আরও বেশি কিছু। রিফিউজি ক্যাম্পেও দলিতরা দলিত। অতীত রক্তাক্ত, ভবিষ্যতের ঠিকঠিকানা নেই, এমন সময়েও বর্ণপরিচয় টনটনে। রিফিউজি ক্যাম্পেও নিচু জাতের সঙ্গে থাকতে ঘেন্না করে। 

সরকারি এবং ব্যক্তিগত অবদানে ভরে উঠেছে মিউজিয়াম। কাঁচের আড়ালে খাঁটি ফুলকারি শাল মেলা। ওপার থেকে অনেক জিনিসের সঙ্গে কী মন্ত্রবলে অক্ষত এসে পৌঁছেছে। দু’খানা ঢাকাই শাড়ি দিয়েছেন কেউ। বাড়ির মা জেঠি আসার সময় নিয়ে এসেছিলেন। এখন মলিন, কিন্তু একসময় সে শাড়ির দাপট আন্দাজ করতে অসুবিধে হয় না। কেউ পছন্দ করে কিনেছিল, বা ভালোবেসে দিয়েছিল সেই ভালোবাসায় নরম হয়ে আছে।

জায়গায় জায়গায় কালি ধেবড়ানো চিঠিতে, অভূতপূর্ব ইংরিজি হাতের লেখায় বন্ধুকে লেখা বন্ধুর চিঠি। কৈশোরে ছাড়াছাড়ি হয়েছিল, ভিসাপাসপোর্টকে কাঁচকলা দেখিয়ে চিঠির স্রোত এপার থেকে ওপারে বয়েছে সারাজীবন। এর খবর, তার খবর, কে ভালো চাকরি বাগিয়েছে, এমনকি কে ভয়ানক মোটা হয়ে পড়েছে তারও খবরও। চোখ ছলছল আর গলা টনটনের মধ্যেও হাসি এসে যায়।

পার্টিশন মিউজিয়ামের সবথেকে বড় কেরামতিটা ওখানেই। যারা পারল না, হারিয়ে গেল, মরে গেল, তাদের জন্য হৃদয়বেদনা, আর যারা সব হারিয়ে আবার নতুন করে শুরু করার সুযোগটুকু পেল, তাদের সংগ্রামের প্রতি সমান শ্রদ্ধা জাগানোর ক্ষমতা রাখে। নবযুগের লোকদের শিল্পসৃষ্টির অক্ষমতা সম্পর্কে আফসোস করতে গিয়ে সম্ভবতঃ ঋত্বিক ঘটকই বলেছিলেন, যারা দাঙ্গা দেখেনি, দেশভাগ দেখেনি, সমস্ত দুর্ভাগ্যের আঁচ থেকে গা বাঁচিয়ে জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে - তাদের থেকে কতখানিই বা সংবেদনশীলতা আশা করা যায়? শিল্পসৃষ্টির জন্য যা সাফিশিয়েন্ট না হলেও নেসেসারি শর্ত? একটুও আঁচ না পোহালে খাদমুক্ত কি হতে পারে মানুষ?

পার্টিশন মিউজিয়ামে গেলে সেই আগুনের আঁচও নয়, আঁচ নিভে যাওয়ার পরের ছাইটুকু দেখেও হলেও বুকের ভেতর কিছু একটা গলতে শুরু করে। বড়লোক দেশের কয়েকখানা ট্রমা মিউজিয়াম দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার, নিঃসংশয়ে বলতে পারি অমৃতসরের টাউন হলের পার্টিশন মিউজিয়াম তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারে। 

মিউজিয়ামের কিছুই ভোলার নয়, কিন্তু একটা ছবি আমার চিরদিন মনে থাকবে। ফেরিঘাট। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা একটি পরিবার সদ্য নেমেছে স্টিমার থেকে। প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে নিশ্চয় খানিকক্ষণ আগে, সকলেই ভিজে চুবড়ি। পায়ের কাছে ট্রাংক। ঢোলা হাফপ্যান্ট আর হাফশার্ট পরা দুটি ছেলে, একজন ভুরু কুঁচকে ক্যামেরার দিকে সোজা তাকিয়ে আছে। আর আছেন তিন মহিলা। তরুণী। একজনের কোলে ক্রন্দনরত শিশু। এক তরুণীর হাতে সেতার। ঘরোয়া কায়দায় শাড়ি পরা অন্য মেয়েটির হাতে রাইফেল। এই শেষের দুজন মুখভঙ্গি করে শিশুটিকে ভোলানোর চেষ্টা করছেন। 

দুর্দশা, ক্ষতি, আর মানুষের বেঁচে থাকার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা বা মির‍্যাকল, একই ফ্রেমে এমন করে কোথাও ধরা পড়তে দেখিনি আমি কখনও। আপনারাও যদি দেখতে চান, যদি কখনও অমৃতসর যাওয়ার সুযোগ হয়, টাউন হলের পার্টিশন মিউজিয়াম মিস করবেন না। 

January 30, 2019

অমৃতসর ২: হরমন্দির সাহিব, মহারাজা রঞ্জিৎ সিং মিউজিয়াম




অমৃতসর টুরিস্টদের জায়গা। দেখার, খাওয়ার, ঘোরার জিনিসের লিস্টের অভাব নেই। আমরা কী কী দেখব ঠিকই করে রেখেছিলাম। তার মধ্যে প্রথম ছিল রামবাগে রাজা রঞ্জিত সিং-এর গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ। 

ঘোর গোলমেলে শহরের একেবারে মধ্যিখানের পাড়া রামবাগ। রাজারাজড়াদের জায়গা বলে কথা। পরিষ্কার রাস্তা, দুপাশে বৃক্ষরাজি, পুরোন ইমারত মিলিয়ে বেশ ইতিহাস ইতিহাস ভাব।


যে শহরের তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ায় সেখানে কেন কেউ সাধ করে গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ বানাতে যাবে ভেবে আমরা মাথা চুলকোচ্ছিলাম। সিমলা কিংবা শিলং থাকতে? কিন্তু অমৃতসরে সত্যি সত্যিই মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর সামার প্যালেস ছিল। পুরোনো প্রাসাদ সারানো হচ্ছে। নরম্যাল সময়ে ভেতরে ঢোকা যায় কি না জানি না। প্রাসাদ কম্পাউন্ডের প্রান্তে একটি আধুনিক দোতলা বাড়িতে মহারাজা রঞ্জিত সিং মিউজিয়াম। 

মিউজিয়ামে শুনেছি দেখার মতো অনেক কিছু আছে, রঞ্জিত সিং-এর আমলের মুদ্রা, বইপত্র, অস্ত্রশস্ত্র, কিন্তু সারাইটারাই হচ্ছে বলেই হয়তো কয়েকখানা চমৎকার পোর্ট্রেট আর পেন্টিং আর কিছু রাজসিক পোশাকআশাক ছাড়া আর কিছু প্রদর্শন করা ছিল না। দেওয়ালজোড়া পেন্টিং-এর ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হচ্ছে একই দৃশ্যে বিবিধ সামাজিক স্তরের, বিবিধ অনুভূতির সহাবস্থান। চাঁদোয়ার নিচে রাজারানীর সামনে মেঝেতে মহার্ঘ কার্পেটের শুয়ে বেবি রঞ্জিত হাত পা নেড়ে খেলা করছেন, পাঁচ হাত দূরেই একজন দুঃখী হাত পা ঊর্ধ্বমুখে কাতরাচ্ছেন, কুকুর লেজ তুলে দৌড়চ্ছে।  


মিউজিয়ামের মূল আকর্ষণ হচ্ছে একটা অডিটোরিয়ামের মতো ঘরে তিনশো ষাট ডিগ্রি জুড়ে ত্রিমাত্রিক মূর্তি গড়ে রঞ্জিত সিং-এর নানাবিধ যুদ্ধের দৃশ্যের লাইট অ্যান্ড সাউন্ড সহযোগে বর্ণনা। সে বেশ দেখার মতো জিনিস। 

রঞ্জিত সিং যুদ্ধ করেছিলেন প্রচুর। দশ বছর বয়স থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত রঞ্জিত সিং যুদ্ধ করেছেন। তাঁর আগে পাঞ্জাব ছোট ছোট ‘মিসল্’ বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। রঞ্জিত সিং যুদ্ধবিগ্রহ করে এবং বিবাহসম্পর্ক স্থাপন করে তাদের সংঘবদ্ধ করেছিলেন। রঞ্জিত সিং ছোটখাটো দেখতে ছিলেন, পড়াশোনাও জানতেন না বিশেষ, শৈশবে বসন্তরোগে তাঁর একটি চোখ ‌নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তিনি নিয়ে জন্মেছিলেন এবং আজীবন তা অটুট ছিল। কিন্তু তাই বলে তাঁর গোটা জীবনটাকে যুদ্ধ দিয়ে মাপা কেমন যেন। বিশেষ করে রঞ্জিত সিং-এর আরও নানারকম বলার মতো জিনিস ছিল। সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, যত মত তত পথে বিশ্বাস রাখতেন, প্রচুর দানধ্যান করেছেন। সেগুলো আরেকটু হাইলাইট করা যেত। হরমন্দির সাহিবের মাথা সোনা দিয়ে মুড়ে রঞ্জিত সিং-ই তাকে গোল্ডেন টেম্পল করে তোলেন।

তিনি মারা যাওয়ার সময় তাঁর পত্নী উপপত্নী মিলিয়ে জনা এগারো মহিলা সতী হয়েছিলেন।   


আমরা যখন মিউজিয়াম দেখছিলাম কোনও এক বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও মিউজিয়াম দর্শনে এসেছিল। শৈশবকৈশোরের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্যাপারটা অত্যন্ত হাই ডেসিবেলের। আমার অফিস কম্পাউন্ডের দেওয়াল শেয়ার করে একটি স্কুল। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে যতক্ষণ ছেলেমেয়েরা মাঠে থাকে, সে চিৎকার কল্পনা করা যায় না। কোনও প্রাপ্তবয়স্ক, ঘরে আগুন না লাগলে ওই লেভেলে গলা ছাড়ে না। যখন পোস্ট-লাঞ্চ চা খেতে আন্টিজীর দোকানে যাই, তখন ছোট ক্লাসের ছুটি হয়। সে গোলযোগের বর্ণনাও দুঃসাধ্য। একে বয়সজনিত দোষ, তায় ছুটির আনন্দ। সবথেকে মজার হচ্ছে গোটা চেঁচামেচির অকারণতাটা। বাসের দিকে দৌড়তে দৌড়তে গলা সপ্তমে ছেড়ে রাখা। জাস্ট এমনিই। 



মোদ্দা কথা, প্যানোরামার বদ্ধ ঘরে বালিকাদের কলকাকলির আবহ মারাত্মক হয়ে উঠছিল। রঞ্জিত সিং-এর যুদ্ধের হাড়হিম সাউন্ড এফেক্টও ফেল। তারপর দুয়েকজন নার্ভাস দেখতে মেয়ে দৌড়ে এসে ঘোষণা করল, মিস অমুক নিচে ডাকছেন, গুটি গুটি ভিড় খালি হয়ে গেল। আমাদেরও দেখা শেষ হয়ে গিয়েছিল, আমরা নেমে এসে উবার বুক করে টাউন হলের দিকে চললাম।


অমৃতসরের সবথেকে সুন্দর অংশটা হচ্ছে টাউন হল এবং হলসংলগ্ন অঞ্চল। সর্বাধিক টুরিস্টলাঞ্ছিতও বটে। ওই অঞ্চলের তিনদিকে হরমন্দির সাহেব অর্থাৎ গোল্ডেন টেম্পল, নবনির্মিত পার্টিশন মিউজিয়াম, জালিয়ানওয়ালাবাগ। জায়গাটা চমৎকার সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এই জায়গাটা নাকি সম্প্রতি এই রকম হয়েছে। বছরখানেক আগেই এই গোটা রাস্তায় গাড়ি ঢুকত এবং যানজট চলত মন্দিরের প্রায় মুখ পর্যন্ত। এখন একেবারে সৌন্দর্যায়নের হদ্দমুদ্দ। রাস্তার দুপাশে গাছ, মূর্তি, সারি সারি দোকান, জুত্তি স্টোর, কৃপাণ ভাণ্ডার, ম্যাকডোনাল্ডস -  তাদের নামধাম সব একই ছাঁদ, রং এবং হরফের নাম দিয়ে লেখা। গোটা চত্বরের মাঝখানে মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর চমৎকার অশ্বারোহিত মূর্তি। সম্প্রতি গাড়িটাড়ি ঢোকা বারণ হয়েছে কাজেই চালকরা তাঁদের অটো, ব্যাটারি অটো, ট্যাক্সি বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে চত্বরে ঢুকে ক্রমাগত ঘোরাঘুরি করতে থাকেন এবং চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে খদ্দের জোগাড় করতে থাকেন। চেঁচানোর ভলিউম এবং ফ্রিকোয়েন্সি দেখে অমৃতসরের টু ডু লিস্টের জনপ্রিয়তার ক্রম আন্দাজ করা যায়। 


লিস্টের টপে ওয়াগা বর্ডার দর্শন। দ্বিতীয় পপুলার হচ্ছে জুত্তি, ফুলকারি শপিং। এ ছাড়া হোটেলের দালালও কিছু ঘোরাঘুরি করছেন। 

আমাদের তিনটের একটাও দরকার ছিল না, কাজেই চিত্ত অবিচলিত রেখে হেঁটে চললাম স্বর্ণমন্দিরের দিকে। হাঁটার সময় এদিকওদিক থেকে কমলা রঙের ভাঁজ করা কাপড়ের টুকরো ধরা হাত এগিয়ে আসতে লাগল। আমরা দর করিনি, কিন্তু শুনেছি চল্লিশপঞ্চাশ টাকা চেয়ে বসা কোনও ব্যাপারই না। অর্চিষ্মানের এক সহকর্মী সাবধান করে রেখেছিলেন, মন্দিরের থেকে বেশি দূরে মাথা ঢাকার কাপড় না কিনতে। মন্দির থেকে পাঁচশো মিটার দূরে যে কাপড়ের দাম চল্লিশ, মন্দিরের গেটের বাইরে তাই দশ। 

আমি বলব দশ টাকাও খরচ করার দরকার নেই। গেটের ভেতর ঢুকে যান। জুতো রেখে মূল প্রবেশদ্বারের দিকে এগোন। একটা ঝুড়ি দেখবেন। ফিরে যাওয়ার সময় ওই ঝুড়িতে দর্শনার্থীরা মাথার কাপড় খুলে রেখে যাচ্ছেন, একটা তুলে মাথায় বেঁধে নিন। চল্লিশটাকা না, দশটাকা না, এক্কেবারে ফ্রি। আমরা মাথায় কাপড় বাঁধছি এমন সময় একজন এসে বললেন জুতোটা কিন্তু জুতো রাখার জায়গাতেই রেখে আসবেন, না হলে চুরি হয়ে যেতে পারে। আমাদের দেখে নতুন মনে হয়েছে সম্ভবতঃ বা অন্য কোনও কারণে, তাই সাবধান করলেন। আমাদের ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দেখে, 'আমার আসলে এখানে ডিউটি তো' বলে জ্যাকেট সরিয়ে ওঁর ব্যাজটা দেখিয়ে হাসিমুখে চলে গেলেন।

অমৃতসরের সর্বত্র তো বটেই, বিশেষ করে হরমন্দির সাহিবের ভেতরে লোকজনের ভদ্র ব্যবহার চোখে না পড়ে থাকে না। এবং এই ব্যবহার শঠে শাঠ্যং নীতিতে বিতরণ করা হয় না। তাহলে এই মোবাইল মহামারী জমানায় অর্ধেক লোকের প্রবেশাধিকার থাকত না। সেদিন একটা আর্টিকল দেখলাম কোনও একটা সাইটে, লিখেছে এখন আমরা সিগারেটকে যে চোখে দেখি, এক সময় আসবে যখন সেলফোনকে সেই একই দৃষ্টিতে দেখা হবে। গুরুদ্বারার ভেতরে ছবি তোলার নিয়ম নেই। কিন্তু প্রচুর লোকে মোবাইলে ছবি তুলছেন। সেলফি, গ্রুপফি, পোর্ট্রেট, আরও যা যা ভঙ্গিতে তোলা সম্ভব। তাছাড়া কথা বলা তো আছেই। মন্দিরের একেবারে নাকের ডগায় গিয়ে একজন ফোনে কানে ধরে কথা বলে চলছিলেন। একজন কর্তৃপক্ষের লোক, যিনি সিল্কে মোড়া ডাণ্ডা তুলে ও নামিয়ে মন্দিরের ভিড়ের স্রোত নিয়ন্ত্রণ করছেন, বারণ করলেন। ভদ্রলোক ফোনটা নিষেধকারী যেদিকে ছিলেন সেদিকের কান থেকে সরিয়ে অন্য কানে ধরলেন এবং কথা চালিয়ে গেলেন। তখন একজন ভক্ত এগিয়ে এসে, অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে ঝুঁকে পড়ে বললেন, অনুগ্রহ করে ফোনটা রাখুন দাদা। 

পরের দিন, অর্থাৎ রবিবার সকালবেলার আরেকটা ঘটনায় আমি আরও ইমপ্রেসড। একটা বড় গ্রুপের সবাই এক এক করে দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে, হাহাহিহি করে, সোনার মন্দিরকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে ছবি তুলছে। পাশ দিয়ে যাচ্ছিল একটি কিশোর, সাদা পোশাক, কমলা পাগড়ি, কোমরে কৃপাণ। মন্দিরের লোক। দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, সবাই পাশাপাশি দাঁড়ান, গ্রুপ ফোটো আমি তুলে দিচ্ছি। বলে সবাইকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে দিল। তারপর ফোন ফেরত দিয়ে বলল, এই তো সবারই ফোটো তোলা হয়ে গেল, আর তুলবেন না দয়া করে। 

আমি যদি ওই কিশোরের জায়গায় থাকতাম, আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হত হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে পুকুরে ফেলে দেওয়া। সেটা করার সাহস না পেলে নিদেনপক্ষে মন্দিরে ঢোকার মুখে লাগানো বোর্ড দেখিয়ে বলা, চোখে ন্যাবা নাকি? আমি জানি ভদ্র ব্যবহারের জন্য বয়সটা ইস্যু নয় কিন্তু ওইটুকু ছেলের আত্মনিয়ন্ত্রণ দেখে লজ্জাই পেলাম। নিজেকে আরেকটু মোলায়েম করার ইচ্ছে হল। দেখা যাক, পারি কি না। 

হরমন্দিরে সব ফ্রি। জুতো রাখা, ব্যাগ রাখা, প্রবেশ, লঙ্গরখানায় খাওয়া, সুজিপ্রসাদ সব। মন্দিরের চেহারা দেখে বোঝাই যায়, অর্থের অভাব নেই। মন্দিরের চারদিকে লাগানো স্পিকারে গান ভেসে আসছে, সবক’টা স্পিকার বোসের। আমার আবার মধ্যবিত্ত মানসিকতা, টাকা সম্পর্কে ট্যাবু এখনও কাটাতে পারিনি। নিজের থেকে বড়লোক দেখলেই মনে হয় নির্ঘাত বাজে লোক। মন্দিরের ভালো ব্যবহার, ভক্ত-ফ্রেন্ডলিনেস ইত্যাদি দেখেটেখে মন নরম হয়েই ছিল। অর্চিষ্মান যেই না বোসের স্পিকার পয়েন্ট আউট করল আমি লাফিয়ে গুরুদ্বারাকে ডিফেন্ড করতে নেমে পড়লাম। বড়লোক হলে কী হবে, লোক ভালো। আমার মতো যদি কেউ থাকেন তাঁদের আশ্বস্ত করার জন্য বলি, গোল্ডেন টেম্পলের টাকা আছে কিন্তু টাকার গরমটা একেবারেই নেই। টাকা থাকা আর না থাকা মানুষের মধ্যে ফারাক করার অসভ্যতাটাও না।

হরমন্দির সাহিবের প্রথম আইডিয়া এসেছিল শিখ সম্প্রদায়ের তৃতীয় গুরু অমর দাসের মাথায়। তিনি যখন মন্দিরের জায়গা পছন্দ করেন তখন ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিক। তাঁর উত্তরাধিকারী চতুর্থ গুরু রাম দাস মন্দিরের জন্য সে জায়গার স্বত্ব কেনেন। মন্দিরের কাজ শুরু করেন পঞ্চম গুরু অর্জন। আট বছর ধরে দিঘি খোঁড়া হয়, দিঘির মাঝে বানানো হয় ইটের মন্দির। গুরু অর্জনই মন্দিরে গ্রন্থসাহিব প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর দিঘি জলে ভরে দেওয়া হয়।

শিখ ধর্মের দিক থেক হরমন্দির সাহিব সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই, রাজনৈতিক দিক থেকেও এ মন্দির চিরদিন মধ্যমণি থেকেছে। সেই গুরু রাম দাস জমির স্বত্ব জোগাড়ের সময় থেকে শুরু করে মাঝপথে বারংবার আক্রান্ত হওয়া থেকে অপারেশন ব্লু স্টার পর্যন্ত, যুগে যুগে রাজারাজড়ার লোভ, আক্রোশ, হিংসের ভিকটিম হয়েছে। অনেক ঘা, অনেক চোট পেয়েছে, অনেকবার সে ক্ষত ভরা হয়েছে।

গুরু অর্জন নাকি বাকি শহরের থেকে সামান্য নিচু করে মন্দির বানানোর কথা বলেছিলেন, বিনম্র থাকার গুরুত্ব মনে রাখার জন্য। মন্দিরের চারদিকে দরজা রাখা হয়েছিল যাতে সবাই মন্দিরে ঢুকতে পারে। দিঘি খোঁড়া, মন্দির বানানোর কাজে হাত লাগিয়েছিল অগুনতি স্বেচ্ছাসেবী।

স্বেচ্ছাসেবার সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। এখনও মন্দির পরিচালনার একটা বিরাট অংশ স্বেচ্ছাসেবীরা দেখেন। জুতো, ব্যাগ রাখার কাউন্টারে স্বেচ্ছাসেবী ভক্তরা পালা করে কাজ করেন। লঙ্গরখানার রান্না করেন, বাসন ধোয়ামোছা করেন। মন্দিরের বিশাল চত্বর, দিঘির জলের সাফসাফাই, সবেতেই স্বেচ্ছাসেবী। 

ভক্ত পরিষেবা ব্যাপারটা শুনতে অদ্ভুত কিন্তু হরমন্দির সাহিবে সেটাই চোখে পড়ে সবথেকে বেশি করে। গুরুদ্বারায় পা ধুয়ে ঢোকার জন্য যে পরিখা কাটা থাকে তাতে যে জলটা বইছে সেও অল্প উষ্ণ করা, যাতে ভক্তদের পায়ে কষ্ট না হয়। হাত ধোয়ার জন্য কল থেকে জল পড়ছে, তাও উষ্ণ।

মন্দিরের ভেতর ঢুকে প্রথম যেটা টের পাওয়া যায়, বিশেষ করে বছরের এই সময়টায়, বাইরের সঙ্গে ভেতরের তাপমাত্রার তফাৎ। বাইরের কড়া ঠাণ্ডার পর ভেতরের ওম চমৎকার আরাম দেয়। তারপর ঝলসে দেয় ঝকমকে ইনটেরিয়র। সোনালি দেওয়াল সিলিং ছেয়ে অতি সূক্ষ্ম ফুলের ডিজাইন। লতাপাতা। 

তারপর কানে আসে গান। 

মন্দিরের মূল কক্ষের মাঝখানে সোনার লতাপাতায় আঁকা মহার্ঘ লাল চাদর দিয়ে ঢাকা বাক্স, ওর মধ্যেই আছে গ্রন্থসাহেব। একজন বসে তার সামনে বসে বিড়বিড় করে কিছু একটা পাঠ করছেন। আর একপাশে মাইকের সামনে বসেছেন গাইয়ের দল। সোনালি হারমোনিয়ামের বেলো টেনে টেনে গান ধরেছেন দু’জন, পাশ থেকে সোনালি বাঁয়াতবলায় ঠেকা দিচ্ছেন আরেক পাগড়িধারী। আশেপাশে ইতিউতি বসে গলা মিলিয়েছেন ভক্তরা। 

গ্রন্থসাহেবের বেদী আর বেদীসংলগ্ন খানিকটা জায়গা সোনালি রেলিং দিয়ে ঘেরা। তারপর ঘরে আর বেশি জায়গা থাকে না। আমরা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গেলাম। দোতলায় চারদিকের বারান্দায় জানালা কাটা, সেই জানালার ধারে বসে আপনি গান শুনতে পারেন। করিডরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে চুপ করে বসে গান শুনছেন মানুষ, কেউ বসেছেন জানালায় হেলান দিয়ে।

আমরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। গান শুনতে শুনতে আরেকটা সন্ধের কথা মনে পড়ল। সারাহানের ভীমকালী মন্দির, এ গুরুদ্বারার তুলনায় অনেক ছোট, কিন্তু সেখানেও মন্দিরের মূল কক্ষ ঘিরে সরু কাঠের বারান্দা, সেই বারান্দায় বসে গান শুনছিলেন জনাকয়েক শ্রোতা। তাঁরা সম্ভবতঃ রোজই আসেন। সে গান কেউ লাইভও গাইছিল না, ভজনের রেকর্ড বাজছিল, তবু ওই পাহাড়ঘেরা মন্দিরের সরু বারান্দার ভেতর নিবুনিবু বাল্বের আলোয় চেনা ভজন অন্য মাত্রা পাচ্ছিল। ছোটবেলায় দক্ষিণেশ্বরে ভিড়ের ঠেলা পেরিয়ে মাকালীর মুখ দেখতে পাইনি, একটা সময়ের পর ইচ্ছেও হয়নি। কিন্তু নাটমন্দিরের গানের প্রতি মুগ্ধতা কখনও কমেনি। কিংবা অনেক বছর আগে গান শিখে ফেরার পথে সন্ধেবেলা রেললাইনের পাশে মস্ত অশ্বত্থগাছটার নিচে ছোট হনুমানমন্দিরের সামনের লাল চাতালে বসে ঢাকঢোল বাজিয়ে হনুমানচালিশা শুনতে পেতাম। টিউনিং না করা হারমোনিয়ামের প্যাঁ প্যাঁ, ঢোলের ধুমধাড়াক্কা, আমার সদ্য শিখে আসা লয়কারী তানকারী ঠমকগমক মাথা থেকে বার করে দিত। আফসোস হত আরেকটু সাহসী কেন হলাম না, তাহলে ‘আমিও গাইব’ বলে চাতালে উঠে গলা ছাড়া যেত। বড় বয়সে নিজামুদ্দিন দরগাতেও সেই একই অনুভূতি হয়েছে। হারমোনিয়াম বাজিয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে যখন সুফি কাওয়ালি ধরা হয় তখন আমার মতো হাতে পায়ে খিল ধরা লোকেরও সতর্ক থাকতে হয়, কখন না উত্তেজনার বশে দুই হাত মাথার ওপর তুলে নাচতে শুরু করি।

বসে বসে সারা সন্ধে গান শোনাই যেত, কিন্তু আমাদের দেড়দিনের টুরিস্ট, টু ডু লিস্টের অর্ধেকও টিক মারা যাবে কি না সন্দেহ হচ্ছে তাই আর অপেক্ষা করলাম না। গুরুদ্বারার ভেতরেই আরেকটা টু ডু ছিল। কড়া প্রসাদ। অর্থাৎ কি না গব্যঘৃতে রান্না হওয়া সুজির হালুয়া। অনেকদিন আগে মণিকরণের গুরুদ্বারায়, পরে মায়ের সঙ্গে ধুবরির গুরুদ্বারায়, যেখানে নাকি স্বয়ং নানকের পদধূলি পড়েছিল, সেখানেও এই সুজিপ্রসাদ খেয়েছি। সুজি তো জীবনে কম খাইনি, কিন্তু অভিজ্ঞতায় জানি, গুরুদ্বারার প্রসাদের সঙ্গে স্বাদে পাল্লা দেওয়া সুজি চট করে পাওয়া শক্ত। মিস করার প্রশ্নই ওঠে না। 

হাতে লেগে থাকা সুজির গুঁড়ো জিভের ডগা দিয়ে চেটে নিয়ে, কলের জলে হাত ধুয়ে, মাথার বাসন্তী বসন ছেড়ে ফেলে, জুতো পরে গুরুদ্বারার বাইরে বেরিয়ে এলাম।

(চলবে)




January 27, 2019

এ বি সি ডিঃ কী ছিলেন, কী হইয়াছেন



বেড়ানোর গল্পের ফাঁকে একটু লেখাপড়া করা যাক। 



 A একসময় হরিণের মাথা ছিলেন, H মাঝপথে পাশ ফিরে শুয়েছেন, K একশো আশি ডিগ্রি পালটি খেয়েছেন, O বহুদিন ধরেই O, X মার্কস দ্য স্পটও। 


January 25, 2019

অমৃতসর ১ঃ শুরু



দশ বছর ধরে ব্লগ লিখতে লিখতে এমন হয়েছে, অন্যরকম কোনও একটা ঘটনা ঘটলে, খুব বেশি অন্যরকম হওয়ারও দরকার নেই, কোনও অটো ভাইসাব মিটারে যেতে রাজি হয়ে গেলে, বস পিঠ চাপড়ে হেসে উঠলে বা যাতায়াতের পথের সিগন্যালগুলো সব সবুজ থাকলেই, ব্লগে তাই নিয়ে পোস্ট লিখে ফেলতে হাত নিশপিশ করে।  

আর ঘটনাটা বেড়াতে যাওয়া হলে তো কথাই নেই। টিকিট কাটা হয়ে গেলেই স্ক্রিভনারে ফাইল খুলে রেডি। যখন যা ঘটবে, কাব্যিক লাইন আসবে মাথায়, ভালো ভালো ভাব জাগবে লিখে ফেলব।

অমৃতসর নামের ফাইলটা ডকুমেন্টে বসে ছিল প্রায় মাসতিনেক। এটা আমার পক্ষেও বাড়াবাড়ি। ফাইল খুলেছিলাম যাওয়ার ঘনাঘনই, কোথায় যাব, কোথায় খাব, কোন ছবিটা কোন অ্যাংগল থেকে তুলব সব স্থির এমন সময় দুর্ঘটনার ঘনঘটায় টিকিট ক্যানসেল করতে হল। কনফার্ম টিকিট। ভাবুন। সে মনঃকষ্ট, কী বলব। টিকিট ক্যানসেল করলাম, হোটেল বুকিং গচ্চা গেল, কিন্তু স্ক্রিভনার ফাইলটা ডিলিট করলাম না। রেখে দিলাম। যাতে আগুনটা বুকের মধ্যে জ্বলতে থাকে। যাতে যতবার চোখ পড়ে বুক মুচড়ে ওঠে। যাতে জল মাথার নিচে নামলেই দৌড় দেওয়া যায়। 

দিল্লি থেকে অমৃতসর ভ্রমণের সুবিধে হল, লংটং লাগে না, নর্মাল উইকএন্ডেই সেরে দেওয়া যায়। এক বৃহস্পতিবার সিগন্যালে দাঁড়িয়ে কথা হল, আরেকবার ট্রাই নেওয়া যাক? কাল শুক্রবারটা একটু বাড়াবাড়ি হবে, নেক্সট শুক্রবার যাই চল। অফিস থেকে সাড়ে পাঁচটার বদলে তিনটেয় বেরোব। অমৃতসর শতাব্দীর চেয়ারকার চড়ব বিকেল সাড়ে চারটেয়, রাত দশটায় নামব অমৃতসর। স্বর্ণশতাব্দী ছাড়ে এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে, কাজেই আজমেরী গেটের বদলে ওলায় ডেসটিনেশন দেব পাহাড়গঞ্জ গেট। 

গেটের পাঁচশো মিটার দূরে পৌঁছে ভাইসাব জানতে চাইলেন, লাগেজ জ্যাদা হ্যায় ম্যাডাম? এবং একই সঙ্গে আমার দিকে চকিত দৃষ্টিপাত করলেন। মিথ্যে কথা বলার সুযোগ নেই। স্রেফ ব্যাকপ্যাক নিয়ে বসে আছি। ভাইসাব বললেন, এখানকার লাইটে নাকি পন্ধরা মিনিট হেসেখেলে দাঁড়াতে হয়, কাজেই… ওঁর মনের ইচ্ছে বুঝে নেমে পড়লাম। অন্য সময় হলেও হয়তো নামতাম, কিন্তু মনের মধ্যে ক্ষোভ গরগর করত। বোকা পেয়ে ঠকিয়ে দিল। কেন সবাই আমাকেই ঠকায় ঠাকুর? এখন বেড়াতে যাচ্ছি তাই ফুর্তিতে মন টইটম্বুর। ক্ষোভ জায়গা পাচ্ছে না।

সিকিউরিটি চেকের কনভেয়ার বেল্টে ব্যাগ চাপিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে দাঁড়ালাম। হ্যালো হ্যালো, আমি ঢুকে গেছি। তুমি কোথায়? দশ মিনিট এখনও? পনেরোও হতে পারে? না না, মাইন্ড করার কিছু নেই, একটা ভয়ানক মজার কুকুর বসে আছে সামনে, তার দিকে তাকিয়ে দশ মিনিট কেটে যাবে। বাকি পাঁচ মিনিট লোক দেখে।

অমৃতসরে যাওয়ার সুবিধে হল, সকলেই আগে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের যা পুরী, দিল্লির তাই হল অমৃতসর। বাড়িওয়ালি গেছেন, সহকর্মীরা গেছেন। নিজেরা গেছেন, বাবামাকে নিয়ে গেছেন। অনেক সহকর্মী আবার ওখান থেকেই এসেছেন। কাজেই টিপস অ্যান্ড ট্রিকসের অভাব হয় না। হোয়াট টু ডু, হোয়াট টু ইট তো ইন্টারনেটেই পাওয়া যায় কিন্তু থাকার ব্যাপারটায় ফার্স্ট হ্যান্ড অভিজ্ঞতা থাকলে সুবিধে। বিশেষ করে পাঞ্জাব টুরিজমের কিছু যখন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথমবার যখন যাওয়ার কথা উঠেছিল, একজন আমাদের গোল্ডেন টেম্পলের গেস্টহাউসে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে মারাত্মক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সাইটে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন-টেশন করে একাকার। নিরুৎসাহ তো করা যায় না, কিন্তু আমরা খুব একটা উৎসাহও বোধ করছিলাম না। গেস্টহাউসে যাঁরা থাকবেন ধরে নেওয়া যায় তাঁরা ভক্তমানুষ; আমরা অজান্তে কিছু বেচাল করে ফেললেই হয়েছে। গেস্টহাউসে জায়গা পাওয়া গেল না যখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ভদ্রলোক বললেন, ওঁরা যখন যান অত বুকিংটুকিং-এর ধার ধারেন না, গুরুদ্বারার চাতালে শুয়েই রাত কাটিয়ে দেন। (গুরুদ্বারায় পরিচ্ছন্নতা এবং সুব্যবস্থার যে রকম নমুনা দেখলাম, হেসেখেলে করা যায়) আমরা অত অ্যাডভেঞ্চারাস না হয়ে অন্যান্য খোঁজখবর নিতে লাগলাম। ওয়ো রুমের কথা অনেকেই বলছিল। শেষটা শ বলল ‘ওয়ো ৮৫১০ ওয়েলকাম ইন’-এ যাও, প্রিমিয়াম রুম, রেলস্টেশনের পাঁচশো মিটারের মধ্যে, আমরা দু’হাজার সতেরোতে গিয়ে চমৎকার সাফসুতরো পেয়েছি।

দু’হাজার আঠেরোতেও ওয়ো ৮৫১০ ওয়েলকাম ইন ঝকমকে সাফসুতরো আছে। আপনারা গেলে চোখ বুজে থাকতে পারেন। 

দশ মিনিট দূরস্থান, দু’মিনিট যেতে না যেতেই কুকুরটা কুণ্ডলী ভেঙে উঠে হাই তুলে একবার ডাউনওয়ার্ড ডগ হয়ে হেলেদুলে হাঁটা দিল। ভাবছি এবার কী দেখা যায়, অমনি স্টেশনে চাঞ্চল্য, গাড়ি ঢুকছে।

প্যানিক কাকে বলে। অর্চিষ্মানের দেখা নেই। এদিকে গাড়ি ঢুকে যাবে অথচ আমি তাতে না চড়ে দাঁড়িয়ে থাকব, যারপরনাই শারীরিক এবং মানসিক অস্বস্তির ব্যাপার। ভাবছি উঠেই পড়ি, ফোন করে দেব, দেখি গাড়ি থামার নাম না করে স্পিড বাড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওটা চণ্ডীগড় শতাব্দী। আমাদেরটা অমৃতসর। এর পর ঢুকবে। 

অমৃতসর শতাব্দী ঢোকার আগে অর্চিষ্মান ঢুকে গেল। ট্রেনও এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। ওদিকের ভিড় এদিকে এল, এদিকের ভিড় ওদিকে, পেছনের ভিড় এগোল, সামনের ভিড় আরও এগোল। ধাক্কা না দিয়ে, না খেয়ে এঁকেবেঁকে যেতে যেতে কানে এল নার্ভাস গলায় নালিশের সুর।  

ডাব্বাডুব্বা পতা ভি হ্যায়?

ভিড়ের মধ্যে কে বলছে কে জানে। চিনি না, জানি না। যে-ই বলে থাকুক তার সঙ্গে প্রিয় সিনেমা, প্রিয় বই, প্রিয় হিরো, প্রিয় খাবার না মেলার প্রব্যাবিলিটি হাই। কিন্তু আমরাও এই রকম টেনশনের সিচুয়েশনে বলি, এই জন্য বলি নম্বরটম্বরগুলো মুখস্থ করে রাখলে সুবিধে। ওরাও তেমনি বলে ডাব্বাডুব্বা পতা করে রাখনি? গুচ্ছ অমিলের মধ্যে এই যে নম্বরটম্বর আর ডাব্বাডুব্বা-র মিল, কেমন একটা আত্মীয়তার সেতু গড়ে দিল। 

সিটের কাছে পৌঁছে দেখি দুজন বসার উপক্রম করছেন। ওঁদেরও নাকি আটচল্লিশ ঊনপঞ্চাশ। বগিও নাকি এক, যাত্রার ডেটও গোলায়নি।  ট্রেনে আমার কনফিডেন্স ডবল হয়ে যায়, নিজের টিকিটখানা হাতছাড়া না করে বললাম, কই দেখি আপনাদের টিকিট। যা ভেবেছি তাই। আটকে আটচল্লিশ পড়েছে।

অবশেষে সব ঝামেলা মিটল। ব্যাকপ্যাক তাকে তুলে আরাম করে বসলাম। মাকে ফোন করে বললাম, গাড়ি ছাড়বে ছাড়বে। মা বললেন, অমৃতসরে ভয়ানক ঠাণ্ডা, মাফলারখানা…হ্যাঁ হ্যাঁ বলে ফোন রাখামাত্র ট্রেন ছেড়ে দিল। অর্চিষ্মান আর আমি প্রায় একইসঙ্গে বললাম, এবার খাবার দিলে পারে, বল?

(চলবে)



January 24, 2019

তিরিশ লাগবে না, দশেই হয়ে যাবে



ঘর গুছনো স্পেশালিস্ট মারি কোন্ডোর নাম আপনারা শুনে থাকতে পারেন। দু’হাজার চোদ্দ সালে ওঁর জাপানি বইয়ের আমেরিকান সংস্করণ ‘দ্য লাইফ চেঞ্জিং ম্যাজিক অফ টাইডিয়িং আপ’ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘কোনমারি’ অর্গানাইজেশন মেথড আন্তর্জাতিক ঝড়ে পরিণত হয়। বইটি বিশ্বের শক্তিশালী ভাষাগুলিতে অনুবাদ হয়, মারি সেলিব্রিটি হন, খ্যাতি হয়, টাকা হয়, লস অ্যাঞ্জেলিসে বাড়ি হয়, সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে শো-ও হয়েছে। 

নেটফ্লিক্সে শো শুরু হওয়ার পর কোন্ডো বিতর্কের মুখে পড়েছেন। সেলিব্রিটি হলে বিতর্কও হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ঘর গুছনো নিয়ে টুইটারে কতই বা গা গরম করা সম্ভব তাই মারি কোন্ডো এতদিন বিতর্ক এড়িয়ে থাকতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু আর পারলেন না। নেটফ্লিক্সের শো-তে বলে বসলেন, যদি জমাতেই হয়, তিরিশটির বেশি বই বাড়িতে জমানো উচিত না। 

আর যায় কোথায়। লোকে বল্লম নিয়ে লাফিয়ে পড়েছে। এটা আগেও খেয়াল করে দেখেছি। অতি বড় মিনিম্যালিস্ট, জামাকাপড়, গয়নাগাঁটি, বাড়িগাড়ি কেনা না নিয়ে গর্ব করেন তিনিও ডাইনেবাঁয়ে বই কিনতে থাকেন এবং তাতেও গর্বের অন্ত বোধ করেন না। কেনারও দরকার নেই। যেনতেনপ্রকারেণ জমাতে পারলেই হল। বাকি সব শিল্পকর্মের থেকে বইয়ের চিরদিন আলাদা স্টেটাস। লোকে ছবি, নাটক, সিনেমা, ছবি প্রদর্শনী, আবৃত্তি, সব সুড়সুড় করে টিকিট কেটে দেখতে রাজি থাকে খালি বইয়ের বেলা, ‘পি ডি এফ হবে দাদা?’ না হলে দক্ষযজ্ঞ। কিছুদিন আগে ‘ওশেনঅফপিডিএফ’ বলে একটি সাইট নিয়ে রক্তগঙ্গা বইবার উপক্রম হয়েছিল। সাইটটি সার্থকনামা, তারা সত্যিই জালি বইয়ের মহাসমুদ্র ফেঁদে বসেছিল। বিখ্যাত সব বই, পুরস্কার পাওয়া, পুরনো, আধাপুরনো, নতুন, এমনকি রিলিজ করার সপ্তাহ শেষ হতে না হতে নিখুঁত পি ডি এফ বার করে দিচ্ছিল। লেখকরা একজোট হয়ে সাইটটি লাটে তোলার ব্যবস্থা দেখেন এবং সফল হন। ব্যস। সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম। বই পড়া মানুষের জন্মগত অধিকার, সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করার সাহস হয় কী করে? তাও আবার বইয়ের মতো এমন মহৎ জিনিস উৎপাদন করে, বাজারে বেচে, পেট চালানোর সাহস করা যমের অরুচি লেখকদের? প্রতিবাদটা ইন্টারনেটে বলে ঘটনা লেখকদের ডেথ থ্রেট (লেখিকা হলে রেপ ফাউ) দেওয়া পর্যন্ত অবধি গড়িয়েছিল। 

বই পড়ার অধিকার নিয়ে লোকের যত উৎসাহ, বই পড়া নিয়ে অর্ধেকও যদি থাকত। 

পোস্ট লম্বা করার আগে মারি কোন্ডোর মেথডটা আপনাদের বলা দরকার। আমি কী করে জানলাম? কারণ আমি ওঁর বইটির বেআইনি পি ডি এফ পড়েছি। কোনমারি মেথডের এক লাইনের সংজ্ঞা হচ্ছে অকাজের জিনিস টান মেরে ফেলে দেওয়া। কিন্তু কোন জিনিসটা কাজের আর কোন জিনিসটা অকাজের কে ঠিক করবে? আমার মনে হতে পারে আমার পেনদানিতে এইমুহূর্তে যে পনেরোটা পেন, যার তেরোটায় কালি নেই, তারা সকলেই কাজের। বা এই মুহূর্তে কাজের নয়, কিন্তু কোনও সময় কাজে লাগতেও পারে। আমি এমন লোককে চিনি যিনি দরকারের সময় সেফটিপিন বার করে দিয়ে বলেন, তবে? এই যে বল ফেলে দাও দাও কাজে লাগল তো? গত পনেরো বছর ধরে ব্যবহার হওয়া সব ডাবর হানির খালি শিশি ধুয়ে রাখছি বলে যে আপত্তি করছ, কোনদিন দেখবে ওইগুলোও কাজে লাগবে।

মারি কোন্ডো তাই কাজটাজের ধার ঘেঁষেননি। উনি জিনিস রাখা না-রাখা বিচারের অন্য কষ্টিপাথর বার করেছেন। বাড়ির সব জিনিস হাতে নিন। চোখের কাছে তুলে ধরুন। মনে ‘জয় স্পার্ক’ করছে কি? করলে রাখুন। না রাখলে ফেলুন। ওই যে মোজা, গোড়ালির কাছটা ছিঁড়তে শুরু করছে, ওটা হাতে নিন। নিন, নিন। হ্যাঁ এইবার দেখুন মোজাটা আপনার মনে আনন্দের বান ডাকছে কি না। মোজা, পেন, পুরোন খবরের কাগজ, বিয়ের শাড়ি, ফেয়ারওয়েলের ঘড়ি, অ্যামেরিকার কাজিনের দেওয়া সেন্ট সবেরই পরীক্ষার এক পাসমার্ক। জয় স্পার্ক করা। 

মোজাটোজা পর্যন্ত লোকে শুনতে রাজি ছিল। কিন্তু মারি কোন্ডো বোকার মতো বইয়ের দিকে নজর দিতে গেছেন। তিরিশটার বেশি বই কোনও মানুষের মনে জয় স্পার্ক করে কি না সে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। উনি বোঝেননি বই জিনিস নয়, বই ইমেজ। মোজার সঙ্গে তাকে গোলানো চলে না। বই জয় স্পার্ক করুক না করুক, ইমেজ চকাচক স্পার্ক করে। 

আপাতত চতুর্দিকে নানা লিস্ট বেরোচ্ছে, সরি মারি কোন্ডো, আমার বইয়ের দিকে বুরি নজর দেওয়া অ্যালাউ করব না। সকলেই মনে জয় স্পার্ক করা বইয়ের লিস্ট দিচ্ছে। লিস্টে আইটেম তিরিশের অনেক বেশি।

আমিই বা বাদ থাকি কেন। 

কিন্তু লিস্ট বানাতে গিয়ে দেখছি তিরিশটার অনেক কম বইই আমার মনে আনন্দ ঝলকায়। গোটাদশেকেই সেরে দেওয়া যাচ্ছে। বুককেসের বাকি বই ফেলে দিতে আমার কষ্ট হবে, কিন্তু এগুলো ফেলতে সিরিয়াস, সিরিয়াস কষ্ট হবে। মনে রাখতে হবে, এখানে শ্রেষ্ঠ বইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে না, কোন বই পড়লে মোক্ষলাভ হবে এবং না পড়লে আমি নিজেকে সিরিয়াস পাঠক হিসেবে প্রমাণ করতে পারবেন না তার খতিয়ান এখানে দেওয়ার দরকার নেই। এখানে সেই সব বইয়ের কথাই বলা হয়েছে যার আমার জীবনে ব্যক্তিগত প্রভাব রয়েছে। সে বই বিখ্যাত হতে পারে, নাও পারে। পুরস্কার পাওয়া কিংবা পপুলার হওয়া কিছুই ম্যাটার করবে না, শুধু আমার মনে তার জয় স্পার্ক করার ক্ষমতা থাকতে হবে। 

কয়েকটা ডিসক্লেমার। 

এক, এখানে এমন কয়েকটা বইয়ের কথা বলা আছে, লিস্ট পড়লেই আপনাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে কোন বই, যেগুলো আমার কেন, কারওর মনেই ‘জয়’ স্পার্ক করবে না। উল্টে গভীর ডিপ্রেশনে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু আওয়ার সুইটেস্ট সংস আর...হ্যানাত্যানা। না হলে দেবদাস কেউ একবারের বেশি দেড়বার পড়তে বসত না।

দুই, লিস্টে সমগ্রর উল্লেখ দেখে চিটিং মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সব সমগ্র বইগুলোই আমি রেখেছি যেগুলো আমি প্রথম থেকেই সমগ্র হিসেবে পড়েছি।

তিন, সত্যজিৎ রায় আর আগাথা ক্রিস্টির কোনও বই এখানে নেই। তার গৌণ কারণ হচ্ছে, ওই দুজনের লেখার হার্ড কপি আমার কাছে বেশি নেই। সত্যজিৎ বা আগাথার বই আমি যতবার পড়েছি, লাইব্রেরি থেকে নিয়েই পড়েছি। (এখন বেআইনি পি ডি এফ গুগল ড্রাইভে সেভ করা আছে।) বছর ছয়েক আগে পর্যন্ত তো একটাও ছিল না। অর্চিষ্মানের হার্ডকপির শখ তাই ওর কল্যাণে বাড়িতে কয়েকটা সিংগল শঙ্কু আর সিংগল ফেলুদা - বাদশাহী আংটি, সোনার কেল্লা, হত্যাপুরী জড়ো হয়েছে।

মূল কারণ হচ্ছে আমি সেগুলোর একটারও নাম করিনি, কারণ সত্যজিৎ বা আগাথা ক্রিস্টির আলাদা আলাদা লেখা বা সমগ্রেরও নাম এ লিস্টে করার মানে হয় না। ওঁরা যা লিখেছেন, কম ভালো বেশি ভালো নির্বিশেষে, সবই আমার মনে অপার আনন্দ ঝলকায়। যতবার পড়ি, যতবার বিবিসি কিংবা রেডিও মিরচিতে অডিওবুক কিংবা নাটক শুনি, এমনকি জাস্ট গল্পগুলোর কথা মনে পড়ে আমি খুশি হয়ে গেছি এও ঘটেছে। কাজেই ওঁরা বাদ।

*****

১। পথের পাঁচালীঃ এই উপন্যাসটি, আরও অসংখ্য বাঙালির মতো আমারও প্রাণের উপন্যাস, কিন্তু আমি বইটা ওই উপন্যাসটি প্রিয় বলে রাখব না। রাখব ওই বিশেষ কপিটির জন্য। আমার মা এই বইটি যখন আমার জন্য কিনে এনেছিলেন তখন আমার ‘পশুর ছড়া’ বইয়ের বেড়ালের ছবিতে ম্যাও ম্যাও বলে থাবড়া মারার স্টেজ। বাড়ির প্র্যাকটিকাল সদস্যরা বলেছিলেন, এ দিয়া অহন অইবটা কী? পড়তে তো পারব না। আমার মা এমনিতে নরম মাটি কিন্তু কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে, যার মধ্যে আমি পড়ি, গ্র্যানাইট। একটুও না ঘাবড়ে বলেছিলেন, বড় হয়ে পড়বে। এই বই উদ্ধারের জন্য আমি স্কুটি চালিয়ে তিন স্টেশন উজিয়ে আত্মীয়ের বাড়ি গিয়েছিলাম। তারা বই নিয়ে গিয়ে ক্ষান্ত দেয়নি, নীল কালি দিয়ে নিজেদের নামও লিখে রেখেছিল পাতায়। সেই নাম আমি হোয়াইট আউট দিয়ে ঢেকেছি এবং আমার মনের একজায়গায় সেই হোয়াইট আউটের ছোপের সমান একটা ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়েছে, আমার সেই আত্মীয়দের প্রতি। বাড়িতে আগুন লাগলে আমি একহাতে অর্চিষ্মান আর আরেক হাতে এই বইটা নিয়ে দৌড়ব।

২। বর্ণপরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডঃ গোলাপি ফিনফিনে মলাট দেওয়া সংস্করণ। নো ছবি। সিরিয়াস বিজনেস। এই বইটা থাকবে জয় উদ্রেক করে বলে নয়, থাকবে কারণ এই বইটা না থাকলে কোন বই থাকবে কোনটা যাবে এই গোটা ঝামেলাটারই উদ্রেক হত না বলে। তাছাড়া বইটা আমার হিরোর লেখা।

৩। সুকুমার সমগ্রঃ জয়। বিশুদ্ধ জয়। 

৪। উপেন্দ্রকিশোর সমগ্রঃ এই ধরণের গ্র্যান্ড মন্তব্য করার পক্ষপাতী আমি নই তবু করছি; আমার মনে হয় সবথেকে আন্ডাররেটেড ‘রায়’ হচ্ছেন ইনি। রূপকথা থেকে পুরাণ থেকে হাসির গল্প থেকে শিক্ষামূলক - এই রেঞ্জে এমন সাবলীল বিচরণ রায়বাড়ির আর কেউ তো ছেড়েই দিলাম, বাংলাভাষার অন্যান্য কোনও লেখকও করেছেন বলে আমার জানা নেই। তাছাড়া রিফ্লেক্স প্রকাশনীর বাঁধানো মলাটে বরের সাজে বাঘমামার ছবিখানা আমার প্রিয়। 

৫। পরশুরাম সমগ্রঃ এই বইটা আমার বুককেসে কেন থাকবে আমি বলতেই পারি কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলী যখন বলেই গেছেন তখন আমার মুখ বন্ধ রাখাই সমীচীন। আলীসাহেব এই বইয়ের লেখককে বলেছিলেন, যদি আপনার সব লেখা কখনও হারিয়ে যায় আমাকে বলবেন আমি স্মৃতি থেকে সব বলে দেব। আরেকজায়গায় লিখেছিলেন, আমি বিশ্বের কয়েকটি ভাষার সাহিত্য মোটামুটি ভালো করে পড়েছি, সেই জ্ঞান দিয়ে বলতে পারি, পৃথিবীর যে কোনও ভাষায় লিখলে রাজশেখর বসু গ্রেটেস্টদের মধ্যে পরিগণিত হতেন।

৬। অক্ষয় মালবেরিঃ এই বইটার রিভিউ অবান্তরে লিখব ভেবেছি অনেকবার। পারিনি। হৃদয়ের প্রতিটি কোষে সুতো বেঁধে যদি কেউ টান মারে, তা হলে যেমন লাগে, এই বইটা পড়তে পড়তে সে রকম লেগেছিল। প্রতিবারই লাগে। কবি না হলে এমন গদ্য যে লেখা যায় না, তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

৭। বেল জারঃ এই বইটা রাখার সিদ্ধান্তটা একটু অদ্ভুত কারণ সম্ভবতঃ এই বইটা আমি আর কোনওদিন পড়ব না।  একবার পড়ে আমার যা হাল হয়েছিল, দ্বিতীয়বার ও জিনিসের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস আমার নেই। তবু নেব। কিন্তু ওই যে গোড়াতেই বললাম, বই পড়ার আনন্দ সবসময় আনন্দে হয় না; হৃদয় মুচড়ে ব্যথা দিলেও, দম বন্ধ করে মারার উপক্রম করাটাও একরকম আনন্দ দেয়; বেল জার সেই জন্য থাকবে।

৮। ক্যালভিন অ্যান্ড হবসঃ আমাদের বাড়িতে দুটো আছে, দুটোই থাকবে, কারণ এই বইদুটো আমার অর্চিষ্মানের সঙ্গে প্রেমের শুরুর দিকের কথা মনে পড়ায়। 

৯। দ্য কনফেডেরাসি অফ ডান্সেসঃ এই বইখানা পড়ার আগে পরে হাতে গোনা কিছু ইউনিক বই পড়েছি, কিন্তু এই বইটা জাস্ট ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। মনে হয়েছিল এই রকমটা আর কোথাও পড়িনি। তাছাড়া এই বইটার হয়ে ওঠার গল্পেও একটা রোম্যান্টিকতা আছে। বইটা লিখে রেখে লেখক আত্মহত্যা করেছিলেন। সে ঘটনার কিছু বছর পর লেখকের মা পাণ্ডুলিপি খুঁজে পেয়ে প্রকাশকদের দোরে দোরে ঘুরতে শুরু করেন এবং অবশেষে মৃত পুত্রের লেখা ছাপাতে সক্ষম হন। প্রকাশিত হওয়ার পর বইটি মডার্ন ক্লাসিকে পরিণত হতে বেশি সময় নেয়নি। না নিলে অন্যায় তো হতই, বিশ্বসাহিত্যের ক্ষতি হত বলেও আমার বিশ্বাস।

১০। নির্বাচিত ত্রৈলোক্যনাথঃ এঁর লেখা  লাইব্রেরি থেকে নিয়ে, পত্রপত্রিকায়, সিলেবাসে বিচ্ছিন্নভাবে পড়েছিলাম। দু’হাজার চোদ্দর বইমেলায় চর্যাপদর স্টলে বইটা দেখে সারা মেলা ঘুরে আবার ফিরে গিয়ে কিনেছিলাম। এই বইটা থাকবে, কারণ এই বইটার মতো সত্যিই আর কিছু পড়িনি। যতদিন বাঁচব পড়ব কি না সন্দেহ আছে।

বোনাস বইঃ  টু কিল আ মকিং বার্ডঃ এটা জয়টয়-এর জন্য নয়, অ্যাটিকাস ফিঞ্চের জন্য থাকবে।



January 17, 2019

নয়




 

বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে লেখা সাতটা গল্প আর দু’টো মৌলিক গল্প নিয়ে আমার গল্প সংকলন ‘নয়’ বেরোচ্ছে ২০১৯-এর কলকাতা বইমেলায়। বার করছে সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী। রোহণের সৃষ্টিসুখ।

বইয়ের প্রচ্ছদ করেছে রোহণ। অনেক সাদা, অল্প রং মিলিয়ে আমার মনের মতো প্রচ্ছদ। তবে আরও মনের মতো দিয়েছে বইয়ের নাম।

বইয়ের নাম নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছিল এপ্রিল মাস থেকে। আমার পছন্দের নামগুলো শুনে অর্চিষ্মান মাথা নাড়ছিল, অর্চিষ্মানের সাজেসশন শুনে আমি মাথা চুলকোচ্ছিলাম। আমাদের দুজনের শর্টলিস্টেড নামগুলো শুনে রোহণ বলেছিল, ভেবে দেখি। তারপর ভেবেচিন্তে ও নাম রেখেছে ‘নয়’। সোজাসাপটা, ঝাড়াঝাপটা ‘নয়’। আমাদের আগের নামগুলোয় গল্পের এসেন্স-টেসেন্স, থিম-টিম গোঁজার অনেক চেষ্টা করেছিলাম, তারপর রোহণ বলল, গল্পের এসেন্স গল্পকেই প্রকাশ করতে দাও, কুন্তলাদি।

'নয়'-এর নাম 'নয়', কারণ বইতে ন'টা গল্প আছে।

রোহণ যেটা না জেনেই নামটা দিয়েছে, সেটা হচ্ছে ‘নয়’ আমার অন্যতম ভালোবাসার সংখ্যা। প্রিয়তম নয়। ভিড় ভালোবাসি না বলে আমার প্রিয় সংখ্যা এক, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি একের থেকেও ইন্টারেস্টিং হল ‘নয়’। তাছাড়া নয় আমার জীবনে বার বার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ফিরে ফিরে এসেছে। আমার প্রথমবার বাড়ির বাইরে থাকার ঠিকানা ছিল ‘রুম নাম্বার নাইন’। আমার জীবনে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দখল করে রাখা মানুষের জন্মদিন ন’তারিখ কিংবা জন্মদিনের যোগফল নয়।

নয়-এর অধিকাংশ গল্প আপনাদের চেনা। পাঁচটা গল্প (চক্ষুদান, ননীবালা, দিদিমার ভাবনা, বিচার) চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে পড়েছেন। খানদুয়েক (বুবুনের মা, রানি) অবান্তরে পড়েছেন। আর সাতকে নয় করার জন্য দু’খানা গল্প (ঠাউরুন, ঠাম্মার ভ্রমণকাহিনি - বয়স্ক মহিলাদের হিরোর চরিত্রে দেখতে যে আমার কত ভালো লাগে, সদ্য রিয়েলাইজ করেছি। অর্চিষ্মান বলছে এটা আগাথা ক্রিস্টি এফেক্ট। মিস মার্পল তো বটেই, ওঁর বেশিরভাগ গল্পেই বয়স্ক মহিলাদের কি-ভূমিকা থাকে। আমার এ প্রভাবে প্রভাবিত হতে আপত্তি নেই, মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন…ইত্যাদিপ্রভৃতি) আমি নিজে লিখেছি, একেবারে মাথা থেকে বানিয়ে। সে দুটো আপনারা আগে কোথাও পড়েননি।

নয়-এর গল্পগুলোর একটা সুতো আছে, সব গল্পেরই মেন রোলে মেয়েরা। সে সব ব্যাখ্যা বইয়ের ব্যাককভারে দেওয়া আছে, নিচের ছবি থেকে পড়ে নিতে পারেন। 




পুরনো গল্পগুলো অবিকল পুরনো চেহারাতেই বইতে যায়নি অবশ্য। ঝাড়াইবাছাইয়ের দরকার আছে জানতাম। নিজের পুরনো লেখা ফিরে পড়ার থেকে প্রাণঘাতী অভিজ্ঞতা আর কিছু হতে পারে বলে আমার জানা নেই। একেকটা লাইন পড়ি আর মনে হয় মেঝে খুঁড়ে ঢুকে যাই। প্রতিটি গল্পই সারিয়েছি। কয়েকটা গল্পের গোটা গোটা প্যারাগ্রাফ বাদ পড়েছে (লেখা সারানো, অন্তত আমার ক্ষেত্রে দেখেছি, সর্বদাই কমানোতে পর্যবসিত হয়। ঘষামাজা করতে করতে ভয় হয় গল্পটা শেষমেশ না এক লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়।) আর সবগুলোরই বাক্যবিন্যাস, শব্দব্যবহার বদলেছে। রোহণ ফাইন্যাল ম্যাটারটা পাঠানোর পর আমি মোটের ওপর চোখ বুলিয়ে ছেড়ে দিয়েছি কারণ এতকিছুর পর পড়তে বসলেও শিউরে ওঠার মতো ভাষার কারিকুরি বেরোবে। রোহণের পায়ে পড়তে হবে, এগুলো ছেপো না প্লিজ। আর একটু সময় দাও, সারিয়ে নিই। সে রিস্কে যাইনি।

শেষ করার আগে একটা কথা বলি। বইটার উৎসর্গপত্রে একজনেরই নাম লেখা আছে। অর্চিষ্মানের। নয়-এর নয় হয়ে ওঠার পেছনে অর্চিষ্মানের কেরামতি তো আছেই, কিন্তু উৎসর্গটা সেটার জন্য নয়। অর্চিষ্মান সারাদিনে তিনবার আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলে, মরমে মরে গিয়েও রেস্টোর‍্যান্টে আমি খাবারের ছবি তোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করে খাওয়া শুরু করে, আমার মন রাখতে এন ডি টি ভি-র বদলে নাপতোল চ্যানেল দেখে, সমাজের একজন মোটামুটি উৎপাদনশীল, কর্মক্ষম সদস্য হিসেবে আমার জীবনযাপন সম্ভব করায় এবং যাবতীয় ঠ্যাকনা দিয়ে দিনযাপনের ওয়্যার অ্যান্ড টিয়ারে আমার ক্ষয়া ঘুঁটের মতো ঝুরঝুর ঝরে যাওয়া প্রতিহত করে। এ সবের জন্য ওকে একটা ওভারঅল থ্যাংক ইউ বলার ছিল, থাকবে চিরদিন, এই সুযোগে বলে নিলাম।

কিন্তু লেখার জন্য যদি কৃতজ্ঞতা কাউকে জানাতে হয়, সে লেখা রোজকার ব্যাখ্যানই হোক, ছায়া অবলম্বনেই হোক, মৌলিকই হোক, তবে সে অবান্তর, আর অবান্তর বলে যে হেতু আসলে কেউ নেই, অবান্তরের আড়ালে রক্তমাংসের যাঁরা আছেন তাঁরা। অর্থাৎ আপনারা। অবান্তরের প্রতিটি পোস্ট আপনাদের জন্যই লিখি, এই বইটাও আপনাদের জন্যই লেখা হয়েছে। আরও যদি বই লেখা হয় কোনও দিন, সে সবও আপনাদের জন্যই হবে। কাজেই উৎসর্গের পাতায় যার নামই থাকুক না কেন, জানবেন প্রতিটি বই, প্রতিটি গল্প, আমার আঙুল থেকে বেরনো প্রতিটি অক্ষরই আসলে আপনাদের, অবান্তরের বন্ধুদের, উৎসর্গ করা। এই আমি আমার মন ছুঁয়ে বলে রাখলাম।

‘নয়’ যদি আপনারা কেউ প্রি-অর্ডার করতে চান, লিংক এই রইল।

প্রি-অর্ডার নয়ঃ https://sristisukh.com/bf19/product/নয়


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.