November 23, 2014

কুইজঃ কার লেখা কে লেখে? (উত্তর প্রকাশিত)



উৎস গুগল ইমেজেস


নিচের তালিকাটা দেখলেই গোলমালটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। যিনি ক তিনি এক নম্বর লেখা লেখেননি, (ইন ফ্যাক্ট, তিনি দু’নম্বর লেখাটিও লেখেননি, তিন নম্বরটিও . . . নাঃ, আর হিন্ট দেওয়াটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে), যিনি খ তিনি দু’নম্বরটি লেখেননি, ইত্যাদি প্রভৃতি। ক খ-র সঙ্গে এক দুই ঠিকঠাক ম্যাচিং করে তালিকার গোলমাল সারানোই আপনাদের আজকের খেলা।

খেলা শুরু হল এখন থেকে, শেষ হবে ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা পর। দেশে সোমবার রাত আটটায়। ততক্ষণ আমি কমেন্ট পাহারা দেব। অল দ্য বেস্ট।


*****


ক) প্রেমেন্দ্র মিত্র
১। বোবা কাহিনী
খ) রমাপদ চৌধুরী
২। বারো ঘর এক উঠান
গ) বিমল মিত্র
৩। বালিকা বধূ
ঘ) বিমল কর
৪। সাহেব বিবি গোলাম
ঙ) জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
৫। শিবুর ডায়রি
চ) জসিমুদ্দিন
৬। হুগলীর ইমাম বাড়ি
ছ) লীলা মজুমদার
৭। বাঙালি জীবনে রমণী
জ) সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
৮। খারিজ
ঝ) নীরদ সি চৌধুরী
৯। পাঁক
ঞ) স্বর্ণকুমারী দেবী
১০। ডাবল বেডে একা
ট) সতীনাথ ভাদুড়ী
১১। অরণ্যের অধিকার
ঠ) শিবরাম্ চক্রবর্তী
১২। মোৎজার্টের স্বরলিপি
ড) নবনীতা দেবসেন
১৩। চার ইয়ারি কথা
ঢ) উৎপল দত্ত
১৪। আমি রাসবিহারীকে দেখেছি
ণ) বুদ্ধদেব বসু
১৫। ডোডো তাতাই পালাকাহিনী
ত) নারায়ণ সান্যাল
১৬। বিজলীবালার মুক্তি
থ) তারাপদ রায়
১৭। বাড়ি থেকে পালিয়ে
দ) মহাশ্বেতা দেবী
১৮। গোলাপ কেন কালো
ধ) প্রমথ চৌধুরী
১৯। ঢোঁড়াই চরিত মানস
ন) মতি নন্দী
২০। মঁসিয়র হুলোর হলিডে


*****


উত্তর


ক) প্রেমেন্দ্র মিত্র
৯। পাঁক
খ) রমাপদ চৌধুরী
৮। খারিজ
গ) বিমল মিত্র
৪। সাহেব বিবি গোলাম
ঘ) বিমল কর
৩। বালিকা বধূ
ঙ) জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
২। বারো ঘর এক উঠান
চ) জসিমুদ্দিন
১। বোবা কাহিনী
ছ) লীলা মজুমদার
৫। শিবুর ডায়রি
জ) সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
১০। ডাবল বেডে একা
ঝ) নীরদ সি চৌধুরী
৭। বাঙালি জীবনে রমণী
ঞ) স্বর্ণকুমারী দেবী
৬। হুগলীর ইমাম বাড়ি
ট) সতীনাথ ভাদুড়ী
১৯। ঢোঁড়াই চরিত মানস
ঠ) শিবরাম্ চক্রবর্তী
১৭। বাড়ি থেকে পালিয়ে
ড) নবনীতা দেবসেন
২০। মঁসিয়র হুলোর হলিডে
ঢ) উৎপল দত্ত
১২। মোৎজার্টের স্বরলিপি
ণ) বুদ্ধদেব বসু
১৮। গোলাপ কেন কালো
ত) নারায়ণ সান্যাল
১৪। আমি রাসবিহারীকে দেখেছি
থ) তারাপদ রায়
১৫। ডোডো তাতাই পালাকাহিনী
দ) মহাশ্বেতা দেবী
১১। অরণ্যের অধিকার
ধ) প্রমথ চৌধুরী
১৩। চার ইয়ারি কথা
ন) মতি নন্দী
১৬। বিজলীবালার মুক্তি



November 20, 2014

খারাপ লাগা ভালো বই



ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় ঘটনাটা ঘটে গেল। লাইব্রেরি থেকে একটা গল্পের বই এনে পড়তে শুরু করে আমি দেখলাম ভালো লাগছে না। বই ভালো না লাগার ঘটনাটা নতুন নয় অবশ্য। তার আগেও আমার বিস্তর বই ভালো লাগেনি। “তাতে অসুবিধে কিছু নেই”, বলতেন আমাদের লাইব্রেরিয়ান আশুকাকু। কাকুর মত ছিল, নিয়ম করে ভালোলাগা বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে পথ্য করার মতো করে বাজেলাগা বই পড়া উচিত। বিশেষ করে যারা এখনও বীজগণিত শিখতে শুরু করেনি তাদের তো উচিতই। “বলা যায় না, পড়তে পড়তে একদিন দেখবি হয়তো বাজেগুলোকেই ভালো লাগবে, আর ভালোগুলোকেই আর পাতে তুলতে পারবি না।”

কাজেই আমি হাতের কাছে যা পেতাম তাই পড়তাম, ফেলুদা ভালো লাগত তাও পড়তাম, পাণ্ডব গোয়েন্দা ভালো লাগত না, তাও পড়তাম। ফেলুদা একবইঠায় শেষ করতাম, কাকাবাবু দু’তিন বইঠা লাগত, পাণ্ডব গোয়েন্দা চার-পাঁচ, কিন্তু যত বইঠাই লাগুক না কেন শেষ না করে ছাড়িনি কখনও।

সেই প্রথমবার লাইব্রেরি থেকে আনা বইটা আমি শেষ করতে পারলাম না। বইখানা খুললাম, একপাতা পড়লাম, বন্ধ করলাম। আবার খুললাম, এবার দু’পাতা পড়েই মন উঠে গেল। তিন নম্বর বার বকেঝকে কাল্পনিক চড়চাপড় মেরে মনকে দশ পাতা পর্যন্ত নিয়ে গেলাম, কিন্তু তার বেশি আর যাওয়া গেল না।

সাতদিন বইটা কোলে করে বসে থাকার পর অবশেষে লাইব্রেরিতে গিয়ে বইটা ফেরৎ দিয়ে অন্য বই নিয়ে আসলাম। মনের ভেতরটা মরমে মরে রইল। সেই দশ বছর বয়সেই আমার অপরাধবোধ হিংসে করার মতো ছিল। বইটা যে খারাপ হতে পারে এ কথা কিছুতেই মনে ঠাঁই দিতে পারছিলাম না। খালি মনে হচ্ছিল দোষ নিশ্চয় আমার। বইটা পড়া ও পড়ে মর্মোদ্ধার করার যোগ্যতাই নিশ্চয় আমার নেই।

বিশেষ করে বইটার লেখকের নাম যখন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সেই সবে শুরু। এর পরেও অনেকবার ঠিক এই অনুভূতিটা হয়েছে। বিভূতিভূষণের ‘অনুবর্তন’ শেষ করে, তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ শেষ না করে, ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’ খারাপ লেগে আমি মরমে মরে থেকেছি। নিজের বুদ্ধিহীনতায়, রুচিহীনতায় শিউরে উঠেছি বার বার। গুণীসমাজে জলচল হওয়ার আতংকে আমার রাতের ঘুম উড়ে গেছে।

আমাদের ভালোলাগা মন্দলাগার ব্যাপারটা কতখানি আমাদের নিজেদের স্থির করা আর কতখানি অন্যের ঠিক করে দেওয়া সেটা কেউ জানে না। যা যা আমাদের ভালো লাগে তার সবখানিই কি আমাদের সত্যি ভালো লাগে, নাকি আমরা জানি যে এই জিনিসগুলো ভালো, এগুলো আমাদের ভালো লাগা উচিত, সেই জন্য ভালো লাগে? অনেকদিন আগে একটা গল্প পড়েছিলাম। লেখক একটি ছোট ছেলেকে নিয়ে ট্রেনে চেপে যাচ্ছিলেন। একটি বিস্তীর্ণ জলখণ্ডের ওপর একটি ব্রিজ দিয়ে দিয়ে ট্রেনটি যাচ্ছিল। ব্রিজের গুমগুম শব্দ হচ্ছিল। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। তার আলো শান্ত জলে মাখামাখি হয়েছিল। ভদ্রলোক মুগ্ধ দৃষ্টিতে সে দৃশ্য দেখছিলেন। এমন সময় তাঁর চোখ পড়ল তাঁর সঙ্গের বালকটির দিকে।

জানালার পাশে বসা ছেলেটি এক মনে তার হাতে ধরা গুলতি নিয়ে খেলা করছে। বাইরের স্বর্গের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে। ভদ্রলোক অবাক হলেন। কিছুক্ষণ পর থাকতে পেরে তিনি বললেন, “জানালার বাইরেটা দেখেছ?” ছেলেটি মাথা তুলে দেখল, আবার মাথা নামিয়ে গুলতির দিকে মনঃসংযোগ করল। ট্রেন ছুটতে লাগল। ব্রিজ গুমগুম শব্দ করতে লাগল। আর একটু পরেই জল শেষ হয়ে আসবে, সূর্য ডুবে যাবে, জলের ওপর তৈরি হওয়া এই অবিশ্বাস্য মায়া উধাও হয়ে যাবে। ভদ্রলোক অধৈর্য হয়ে উঠলেন। ভদ্রলোক এইবার আর হিন্ট দিলেন না, সোজা লিডিং কোশ্চেনের পথ ধরলেন। “বাইরেটা কেমন সুন্দর দেখেছ?” বাধ্য ছেলেটি আরও একবার মাথা তুলে তাকাল। এইবার একটু বেশি সময় তাকিয়ে থাকল। আবার মাথা নামিয়ে গুলতিতে মনোনিবেশ করল। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, “এই যে এত বিস্তীর্ণ জল, জলের ওপর রঙের খেলা, আকাশ জুড়ে মেঘ আর সূর্যের মাখামাখি – তোমার ভালো লাগছে না?”

ছেলেটি এবার জানালার বদলে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল, বলল, “ভালো, কিন্তু বোরিং।” তার মাথা ঘুরে গেল গুলতির দিকে।

স্তম্ভিত ভদ্রলোক মুখ তুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। মুগ্ধতা কেটে গিয়ে তাঁর মনের ভেতর তখন শুধু অবিশ্বাস। বাইরেটা একই রকম রইল ট্রেন ছুটতে থাকল, ব্রিজ গুমগুম শব্দ করতে লাগল, জলের ঢেউয়ে খানখান হয়ে যেতে লাগল সূর্যের অস্তরশ্মি – এই প্রথম ভদ্রলোকের মনের কোণে উঁকি দিয়ে গেল, সত্যিই কি ব্যাপারটা একঘেয়ে? প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা কি আমাদের জন্মগত? নাকি ট্রেনিং-এর ফল?

আমরা মানতে চাই বা না চাই, আমাদের ভালোলাগা মন্দলাগার একটা বিরাট অংশ পরের মুখে ঝাল খাওয়া। যাঁদেরকে আমাদের ভালোলাগে, আমরা যাঁদের মতো হতে চাই, তাঁদের ভালোলাগামন্দলাগা বিশ্বাসঅবিশ্বাস আমাদের প্রভাবিত করে। পরের মুখে ঝাল খাওয়া কথাটার মধ্যে একটা নেগেটিভ দ্যোতনা আছে, কিন্তু সেটা সবক্ষেত্রে খারাপ নাও হতে পারে। পরের মুখে ঝাল না খেলে আমার জীবনেও ইঞ্জিরি গান শোনা হত না। চোখ কান বুজে “এই পর্যন্ত যা শুনেছি যা শিখেছি সেই যথেষ্ট, আর কিছু শুনব না শিখব না লালালালালালা” করলে বব ডিলানকে আমার কোনওদিন চেনা হত না। সেটা একটা খারাপ ব্যাপার তো হতই। মানছি, ইঞ্জিরি গান শোনার প্রথম প্রেরণাটা এসেছিল যত না গানের তাড়নায় তার থেকে অনেক বেশি ত-দাদার ও ত-দাদার গিটারের প্রতি অব্যক্ত অনুরাগের রাস্তা ধরে, কিন্তু যার যে ভাবে হয়। এলভিসের ঝুলপির প্রেমে পড়ে কেউ যদি রক অ্যান্ড রোল আবিষ্কার করে ফেলে তা হলে মন্দ কী?

মুশকিল হচ্ছে ভালোলাগা মন্দলাগা দিয়ে আমরা নিজেদের এবং অন্যদের বিচার করি। মার্গসংগীত শোনা লোকটার রুচি সংগীত বাংলা দেখা লোকটার রুচির থেকে উচ্চমানের ধরে নিই। ধরে নিই চেতন ভগত পড়া লোকটার বুদ্ধি অমিতাভ ঘোষ পড়া লোকটার বুদ্ধির থেকে কম।

বুদ্ধিরুচি পরিমাপের এই প্রচলিত ব্যবস্থাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি না সে নিয়েও আমি অবশ্য  নিশ্চিত নই। হতেই পারে জ্যাজসংগীতের মর্ম বুঝতে সত্যিই একটা ন্যূনতম শিক্ষা ও পালিশের দরকার হয়, সিমোন দ্য বুভোয়াঁ পড়ে বুঝতে গেলে একটা মানুষকে আর পাঁচটা এলিতেলি হরিদাসপালের থেকে বেশি কিছু হতে লাগে।

কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে আমার কোনও সন্দেহই নেই যে একটা মানুষকে মাপর জন্য সেই মানুষটার বুদ্ধি, রুচি, শিক্ষা, সংস্কৃতিচর্চা, আস্তিকনাস্তিক স্ট্যাটাস – খুব একটা সুবিধেজনক মাপকাঠি নয়। কারণ, সেই পরের মুখে ঝাল খাওয়া। এগুলো বেসিক্যালি খোলস। চান্স ফ্যাক্টর। আজ যে ঘোর মাওবাদী, উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর কমবেশি হয়ে অন্য কলেজে ভর্তি হলে সে-ই হয়তো বিকেলবেলা পাড়ার ছেলেদের জুটিয়ে হাফপ্যান্ট পরে ভারতমাতার জয় স্লোগান দিয়ে প্যারেড করে বেড়াত। এই আমি এখন চেতন ভগতের নাম শুনলে রেগে দু’গ্রাস ভাত বেশি খেয়ে ফেলছি, আর তিনটে বাড়ি এগিয়ে গিয়ে জন্মালে আমি হয়তো চেতন ভগতের অটোগ্রাফ নিয়ে বসার ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখতাম। সোফাসেটির সজ্জা এমন মাথা খাটিয়ে করতাম যে ঘরে ঢুকে বসলে অতিথিদের প্রথম সেই ফ্রেমটাই চোখে পড়ত।

এত কথা যখন বুঝে ফেললাম তখন আমার সেই ক্লাস সিক্সের বিকেলটার কথা মনে পড়ল। না পড়া অবনীন্দ্রনাথ বুকে জড়িয়ে ধরে গুটি গুটি যাচ্ছি লাইব্রেরির দিকে। মনে হচ্ছে, হে ভগবান, কেন আমি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছি না। মনে হচ্ছে চারদিক থেকে সবাই আমাকে দেখছে আমার নিজেদের মাথার মধ্যে চিৎকার করে বলছে, “ওই, ওই মেয়েটা অবনীন্দ্রনাথ বোঝে না, ওই মেয়েটা! হাহাহাহাহা! ওই যে, ওই মেয়েটা!”

এতদিন পর আমি সেই বিকেলটাকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলাম।  সেই প্রথম মনে হল হয়তো দোষটা আমার রুচিপছন্দের নয়, হয়তো দোষটা অবনীন্দ্রনাথের। হয়তো তিনি ওই গল্পটা অত ভালো লিখতে পারেননি। হতেই তো পারে। অবনীন্দ্রনাথও তো মানুষ।

তারপর মনে হল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই বা দোষ হতে হবে কেন? দোষ আমারও না, তাঁরও না। পৃথিবীর সব ‘ভালো’ জিনিস যেআমার ভালো লাগতে হবে এমন মাথার দিব্যি কে-ই বা দিয়েছে? ভাবতেই আমার ঝুঁকে পড়া কাঁধ সোজা হয়ে গেল, মাথা উঁচু হয়ে গেল, মাথার ভেতরটা এমন আলোবাতাস খেলতে লাগল যেমনটা আগে কখনও খেলেনি।

সেই নবলব্ধ সাহসের ওপর ভর দিয়ে আজ আমি এমন কয়েকটা বিশ্ববিখ্যাত বইয়ের নাম আপনাদের কাছে বলছি যেগুলো আমার মোটে ভালো লাগেনি। কাউকে বলিনি এতদিন, এই আজ আপনাদের বলছি।  এতদিন পর মনের কথা খুলে বলতে পেরে কী আরাম যে লাগছে, সে আমি বলে বোঝাতে পারব না।

*****

দ্য লর্ড অফ দ্য রিংসঃ আমি শেষ করতে পারিনি। সিনেমাগুলোই পারিনি, বই তো দূর অস্ত। মোটা বই দেখলে এমনিতেই আমার কম্প দিয়ে জ্বর আসে, কিন্তু দ্য হবিট পড়ে এত ভালো লেগেছিল যে LOTR-এ হাত দিয়েছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আমার মাথা ঘুরতে লাগল। কারা যে ফোর্সেস অফ লাইট, কারা যে ফোর্সেস অফ ডার্কনেস, কারা যে এলভ্‌স্‌, কারা যে হাফ-এল্ভেন, কারা যে ট্রোলস, কারা যে উরুক-হাই, কারা যে হবিট, কারা যে মানুষ – সব আমার মগজের মধ্যে ঘণ্ট পাকিয়ে যেতে লাগল। 

গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো চেপে বসল গান। আধপাতা যেতে না যেতেই সবাই মিলে তিনপাতা লম্বা লম্বা কোরাস গান ধরেছে, সে সব গানের ভাষাও আমার যে পুরো বোধগম্য হচ্ছে তেমন নয়। শেষটা আমি গানের জায়গাগুলো পাতা উল্টে উল্টে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হল না। আমি মেনে নিলাম LOTR-এর মহিমা আমার আর এ জীবনে বোঝা হল না।   


গুড ওমেনসঃ “টপ টেন কম্যান্ডমেন্টস ফর রাইটারস” গোছের যত লিস্ট পৃথিবীতে আছে, তার প্রতিটির প্রথম পাঁচে না থাকলেও ছ’নম্বরে যে নির্দেশটি থাকেই সেটা হল “কিল ইয়োর ডার্লিংস”অর্থাৎ কি না, কোনও একটি শব্দ/ লাইন/ অনুচ্ছেদ লেখার পর যদি লেখকের মনে হয়, “উঃ! কী দিয়েছি!” তাহলে পত্রপাঠ সেটাকে বাতিল করাএই দুর্মূল্য উপদেশটি কার বলা শক্ত, কারণ যুগে যুগে উইলিয়াম ফকনার, জি কে চেস্টারটন, চেকভ, স্টিফেন কিং – সকলের ঘাড়েই এই উপদেশটির দায় চাপানো হয়েছে।

উপদেশটা আমার খুব মনে ধরেছিল। এই গোছেরই একটা কথা বহুযুগ আগে মাস্টারমশাই বলেছিলেন। “যেদিন নিজের গান নিজের কানে ভালো লাগবে, সেদিন বুঝবি সব শেষ।”

নিল গেমন (আমি অ্যাদ্দিন গাইম্যান বলতাম কিন্তু এটা শোনার পর আর বলি না) আবার একেবারে উল্টো কথাটা বললেন। তিনি বললেন, “লাফ অ্যাট ইয়োর ওন জোকস” ভেবে দেখলে এই কথাটিও মিথ্যে নয়, নিজের লেখা জোকস পড়ে যদি নিজেরই হাসি না পায় তাহলে অন্যের পাবে কেমন করে? আমার তো মনে হয় একজন লেখক মনের মধ্যে যতখানি যা আবেগ টের পান তার কণামাত্র অক্ষরের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। দেবদাস-এর শেষ প্যারা লিখতে গিয়ে শরৎচন্দ্র নিজে নির্ঘাৎ কেঁদেকেটে একশা হয়েছিলেন, তবেই পাঠকদের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল জমেছিল।

কিন্তু নিজের লেখা জোকস পড়ে খুব জোর হাসি পেলে তার পরিণতি কী হতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ গুড ওমেনস। বইটি পড়তে পড়তে অনেক সময়ই আমার মনে হচ্ছে টেরি প্র্যাচেট আর নিল গেমন একে অপরের সঙ্গে রসিকতা করছেন, একে অপরকে নিজের লেখা দিয়ে ইমপ্রেস করতে চাইছেন। আমি বেচারা পাঠক যে বইয়ের এদিকে বসে গল্পের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করছি, সে দিকে তাঁদের বিন্দুমাত্র খেয়াল রয়েছে বলে মনে হচ্ছিল না। অবশেষে তাঁদের (এবং প্রকাশকদেরও) চেষ্টা সফল হল, আমি শেষটা গল্প ছেড়ে গল্পের লেখকদের নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে লাগলাম। এই জায়গাটা মোটামুটি লাগছে, এটা নিশ্চয় প্র্যাচেটের লেখা, এই জায়গাটা জাস্ট পাতে দেওয়া যাচ্ছে না, এটা নিশ্চয় গেমন।


ও হেনরি-র গল্পঃ ও হেনরির লেখা প্রথম গল্প পড়েছিলাম দ্য গিফট অফ ম্যাজাই। অভূতপূর্ব লেগেছিল। বই মুড়ে খানিকক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছিল। মনে হয়েছিল এমনও গল্প হয়? এমন হৃদয়দোমড়ানো শেষ, এমন বুকমোচড়ানো আত্মবলিদান?

দ্বিতীয় গল্প, দ্য লাস্ট লিফ। গল্পের শেষে আবার খানিকক্ষণের নিস্তব্ধতা। আবার জানালার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবা, এমন হৃদয়দোমড়ানো শেষ, বুকমোচড়ানো আত্মবলিদান?

তিন নম্বর থেকে শুরু করে আর একটাও গল্প আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে প্রতিটি গল্পের শেষে সেই অনুভূতি, সেই একই প্রশ্ন। এমন হৃদয়দোমড়ানো শেষ, এমন বুকমোচড়ানো আত্মবলিদান?

গল্পের শেষের অপ্রত্যাশিত টুইস্টকে কী করে চরম প্রত্যাশিত ও নিতান্ত একঘেয়ে করে তোলা যায় সেটা ও হেনরি না পড়লে আমি বুঝতে পারতাম না।


শেষের কবিতাঃ শেষের কবিতা আমার কেন ভালো লাগেনি সেটা নিয়ে ভেবে ভেবে আমি যত সময় ব্যয় করেছি তার সিকিভাগও ওপরের আর কোনও বই/লেখককে নিয়ে করিনি। কারণ বোঝা শক্ত নয়। পাড়ার লোকের চালচলন অপছন্দ হওয়া যতটাই স্বাভাবিক, বাড়ির লোকের চালচলন অপছন্দ হওয়া তেমনই আশ্চর্য। তার ওপর সেই লোকটার বাকি সব কিছু যখন আমার দারুণ পছন্দের। তারও ওপর লোকটার ঠিক সেই জিনিসটাকেই অপছন্দ করা যা দেখে বাকি সবাই ধন্য ধন্য করছে। এ যেন বোমা ছুঁড়তে ছুঁড়তে পালানো ডাকাত দলের পেছনে সদরদরজার খিল হাতে নিয়ে ছুটে যাওয়া আমার সেজকাকুকে দেখে বলা, “এই, তপনের এক্স্যাক্টলি এই ডাকাবুকোপনাটাই পোষায় না আমার।’

মেটাফর একটু বাড়াবাড়ি রকম হয়ে গেল কিন্তু আমি কী বলতে চেয়েছি আপনারা বুঝতে পেরেছেন আশা করি। একে তো রবিঠাকুরের কিছু খারাপ লাগা, তাও আবার যে সে কিছু নয়, খোদ শেষের কবিতা!

এমন নয় যে শেষের কবিতার মূল বক্তব্য নিয়ে আমার কিছু বলার আছে। “বিয়েই প্রেমের একমাত্র পরিণতি নয়” এ সারসত্য নিয়ে কারওরই কিছু বলার থাকতে পারে বলে আমি মনে করি না। আমার সমস্যা হয় কথাটা যে বলছে তাকে নিয়ে।

“দাড়িগোঁফ-কামানো চাঁচা মাজা চিকন শ্যামবর্ণ পরিপুষ্ট মুখ, স্ফূর্তিভরা ভাবটা, চোখ চঞ্চল, হাসি চঞ্চল, নড়াচড়া চলাফেরা চঞ্চল, কথার জবাব দিতে একটুও দেরি হয় না; মনটা এমন এক রকমের চকমকি যে, ঠুন করে একটু ঠুকলেই স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ে” যার সেই অমিত রে-কে আমার কোনওদিন মনে ধরেনি। অমিত রে-র চটকদার সাজপোশাক, তুড়ুকদার জবাব চিরকাল আমাকে ইমপ্রেস করার থেকে বিরক্ত করেছে বেশি। অমিত রে আমার পছন্দের পক্ষে বড় বেশি চটপটে, বড় বেশি ঠুনকো। এমনতর অমিত রে-র মুখে “বিয়ে ছাড়াও প্রেম করা যায়” কথাটা বড়ই সুবিধেবাদী শুনতে লেগেছে আমার। এই কথাটাই যদি রবিঠাকুর বিহারীকে দিয়ে বলাতেন, নিদেনপক্ষে নিখিলকে দিয়েও, তাহলেই আর কোনও সমস্যা থাকত না। আমি তাদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলতাম, “যা বলেছ ভায়া, এই নাও হাই হায়ার হায়েস্ট ফাইভ।”

*****

আমার স্বীকারোক্তি শেষ, এবার আপনাদের পালা। এমন বিখ্যাত বইয়ের নাম করতে হবে যেটা পড়ে আপনি হাঁ করে ভেবেছেন, “এও ভালো লাগে লোকের? লোকেরা কি ছাগল? নাকি আমিই গাধা?” যদি বলেন সে রকম বই আপনার একটাও নেই, তা হলে আমি বিশ্বাস করব না।



November 17, 2014

চিকেন বয়েল অ্যান্ড ফিশ খাপ্পা



দু’হাজার বারো সালের কোনও একটা দুপুর। কোন মাস মনে নেই, তবে মে জুন জুলাই অগস্ট নয়। কারণ ওই ভরদুপুরের হাওয়াতেও একটুও তাপ ছিল না, বদলে বেশ ‘বেড়াতে যাই বেড়াতে যাই’ ভাব জাগানো একটা ফুরফুরে ভাব ছিল।

তবু, কলকাতা শহরের একটি সুসজ্জিত অঞ্চলের একটি প্রশস্ত ছায়া মেলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমি ঘামছিলাম। আমার বুক ধড়ফড় করছিল। হাতের তেলো অল্প অল্প চ্যাটচ্যাট করছিল। কারণ আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার সম্ভাব্য শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কথা।

পরে শুনেছি সেই দুপুরে মা-ও আমার মতোই নার্ভাস ছিলেন, অর্চিষ্মান তো ছিলই। দেখা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার আর মায়ের নার্ভাসনেস নার্ভাসনেসে কাটাকুটি হয়ে গেল। ঝলমলে রোদ্দুরে আমরা তিনজন এদিকওদিক হেঁটে বেড়ালাম খানিকক্ষণ, আমার দারুণ একখানা জামা প্রাপ্তি হল, তারপর আমাদের তিনজনেরই ভীষণ ক্ষিদে পেয়ে গেল, আমরা একটা রেস্টোর‍্যান্টে ঢুকে পড়লাম।

রেস্টোর‍্যান্টে ঢুকে দেখি ঘুরঘুটে অন্ধকার। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। সেকেন্ড পাঁচেক পর চোখ ধাতস্থ হলে বুঝলাম একেবারে অন্ধকার নয়। সফিসটিকেটেড লুক আনার জন্য যতটুকু না হলে নয় ততটুকুই আলো জ্বালানো হয়েছে। প্রতি টেবিলে নুড়িপাথর আর ক্যাকটাসের জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে দপদপ করছে মোমবাতি আর ছাদ থেকে ঝুলছে অস্বচ্ছ কাঁচে ঢাকা একটি কি দুটি আলো, মেঝে পর্যন্ত যাদের আলো পৌঁছচ্ছে না।

দেখে আমি মোটেই খুশি হলাম না। ক্যান্ডেললাইট ডিনার ব্যাপারটা আমার কোনওদিনই ধাতে সয় না। “আঙুর ফল টক” বলে আপনারা খলখল হেসে ওঠার আগেই বলি, ঘটনাটা সে রকম নয় একেবারেই। ক্যান্ডেললাইট ডিনার খাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল বেশ ছোটবেলাতেই। আমি যখন ক্লাস টু-থ্রিতে পড়ি তখন আমাদের পাড়ার ম-দিদির বিয়ে হয়েছিল। ম-দিদি ছিলেন সাত পয়সাওয়ালা দাদার একমাত্র বোন। সেই ম-দিদির বিয়েতে ক্যান্ডেললাইট নেমন্তন্ন খেয়েছিলাম আমি আর আমাদের পাড়ার প্রায় পাঁচশো লোক।

ম-দিদির দাদাদের হিংসে করার মতো রোজগারের অন্যতম একটা উৎস ছিল পাঁচটি গরু। আজকালকার লোকেরা শুনেই চোখ কপালে তুলবে, কিন্তু আমার ছোটবেলায় মফস্বল অঞ্চলে গরু পোষা ব্যাপারটা বিশেষ নভেল ছিল না। আমাদের পাশের বাড়িতে মাখনদাদুর গরু ছিল। আমাদের পাশের পাড়ায় আলোপিসির বাড়িতে গরু ছিল। আলোপিসের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই গরুদের কাঁধে চেপেই আলোপিসি সংসার বৈতরণী পার হয়েছিলেন, দুই ছেলেকে পড়িয়ে চাকরি পাইয়েছিলেন, মেয়েকে পড়িয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন।

কিন্তু মাখনদাদু আর আলোপিসির গরুদের সঙ্গে ম-দিদির দাদাদের গরুদের একটা ফারাক ছিল। প্রথম দুজনের গরুরা যতই উপকারী হোক না কেন, তারা থাকত লোকের চোখের আড়ালে, বাড়ির পেছন দিকের গোয়ালে। ম-দিদির দাদারা তাঁদের ব্যাংক ব্যালেন্সে গরুদের অবদান খোলা মনে স্বীকার করতেন এবং বাড়ির ঠিক সামনে প্রকাণ্ড খোলা জায়গার একপাশে বিরাটাকৃতি গোয়ালে তারা খেলিয়ে থাকত।

তখনও বাড়িভাড়া করে বিয়ের চল শুরু হয়নি। সত্যি কথা বলতে কি ম-দিদির দাদাদের বাড়িভাড়া করার দরকারও ছিল না। বাড়িতেই জায়গা যথেষ্ট ছিল। বাড়ির সামনের গোয়ালের পাশের ফাঁকা জায়গাটুকুতেই, কন্যাপক্ষের পাঁচশো আর বরপক্ষের দেড়শো লোককে খাইয়ে দেওয়া গিয়েছিল, মোটে সাড়ে সাতটি ব্যাচে।

ঝামেলা শুধু পাকিয়েছিল গোয়ালঘরের মশারা। ক্যান্ডেললাইটের আলোয় আকৃষ্ট হয়ে তারা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমাদের প্লেটের রাধাবল্লভী ও কাশ্মীরী আলুরদমের ওপর । শেষে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ক্যাটারারের কিছু লোককে পরিবেশনের দায়িত্ব থেকে তুলে নিয়ে ঝাড়ন হাতে টেবিলের পাশে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কাজেই রেস্টোর‍্যান্টে ক্যান্ডেললাইটের ব্যবস্থা দেখে আমি একটুও খুশি হলাম না। এ রকম একটা ক্রুশিয়াল দুপুরে, যখন আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ অন্য একটি বাঁচামরা বিষয়ের ওপর সংবদ্ধ রাখার দরকার, তখন প্রতি মুহূর্তে প্লেটের ওপর থেকে মশামাছি তাড়াতে হলেই হয়েছে।

এ সব ভাবছি আর পা ঘষটে ঘষটে কোনওমতে এগোনোর চেষ্টা করছি এমন সময় সুটবুট পরা এক ভদ্রলোক এসে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমাদের টেবিলে নিয়ে যেতে চাইলেন। মা বললেন, “একটু আলোওয়ালা টেবিল যদি . . .” ভদ্রলোক শশব্যস্ত হয়ে “নিশ্চয় নিশ্চয়” বলে আমাদের একটা টেবিলের দিকে নিয়ে গেলেন। আমার বুক থেকে একটা পাথর নেমে গেল। এই শাশুড়ির সঙ্গে আমার মিলবে।

টেবিলে বসে এ কথা ও কথা বলতে বলতেই আরেকজন সুটবুট পরা লোক এসে গেলেন। তিনি কোনও কথা না বলে আমাদের টেবিলের ঠিক মাঝখানে একটা চৌকো ট্যাবলেটের মতো জিনিস রাখলেন। আমি আর না থাকতে পেরে বলে উঠলাম, “মেনু, প্লিজ।” ভদ্রলোক উত্তর দিলেন না। বাও করে চৌকো ট্যাবলেটের দিকে নির্দেশ করলেন।

হাতে তুলে নিতেই ট্যাবলেটে আলো জ্বলে উঠল। দেখি সারি সারি খাবারের নাম লেখা, পাশে জিভে জল আনা ছবি। নিচে স্টার দিয়ে লেখা ডিসক্লেমারঃ ইমেজেস মে নট লুক লাইক সার্ভড ফুড।

বুঝলাম রেস্টোর‍্যান্টের নীরবতা ও সফিস্টিকেশন রক্ষা করার জন্য টাচ মেনুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কেবল ছুঁয়েই খাবার অর্ডার করা যাবে। কথা একেবারে বলতেই হবে না।

সে দুপুরের কথা স্বাভাবিকভাবেই আমি এখনও ভুলিনি। কোনওদিনও ভুলব কি না সন্দেহ। মায়ের দেওয়া সেদিনের সেই জামাটা পরলে, বা কখনওসখনও ক্যান্ডেললাইট আলোকিত খাবার দোকানে ঢুকলেই সেদিনের সেই দুপুরটা মনের মধ্যে স্পষ্ট ফুটে ওঠে।

আর মনে পড়ে কোনও কোনও দিন ঘুম থেকে ওঠার পর। যে সব দিনে চোখ খোলারও আগে বুঝতে পারি, সফিস্টিকেশনের জন্য নয়, স্রেফ মনমেজাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্যই আজ মুখ বন্ধ রাখা দরকার। মনে হয়, আহা, এখন যদি একটা টাচ মেনু হাতের কাছে পেতাম, শুধু টাচ করে মনের কথা সবাইকে বুঝিয়ে দেওয়া যেত, কথা একেবারে বলতেই হত না।

বলাই বাহুল্য ঠিক সেই দিনগুলোতেই অটোভাইসাব ঝগড়ার মুডে থাকেন, ঠিক সেইদিনই ইনশিওরেন্স এজেন্ট ফোন করে করে পাগল করে দেন, ঠিক সেদিনই মেঘালয় ভবনের ক্যান্টিনে ফোন করে জানা যায় টাচ মেনু তো দূর অস্ত, মেনু ব্যাপারটাই নাকি তাঁদের নেই।

ইধার মেনু নেহি হোতা ম্যাডাম।

সে কী, ফির?

ফির কেয়া? আপ মুঝে বতাইয়ে আপকো কেয়া খানা হ্যায়, ম্যায় আপকো বতাউঙ্গা ও মিলেগা কে নেহি। মিলেগা তো বহোত আচ্ছা, নেহি তো আপ দুসরা কুছ বতায়েঙ্গে, ম্যায় ফির বতাউঙ্গা . . .

ফোন কানে ধরেই মনে করার চেষ্টা করলাম ভোরবেলা কার মুখ দেখে উঠেছিলাম। অর্চিষ্মানের ঘাড়ে দোষটা দিতে চেয়েও দেওয়া গেল না। ঘুম থেকে উঠে আমি যখন মনে মনে কম কথা বলার শপথ নিচ্ছিলাম তখন বেচারা মাথা মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছিল। দাঁত মাজতে মাজতে আয়নায় নিজের মুখটাই দেখেছিলাম নির্ঘাৎ।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি জানালাম যে রোজকার রোটি রাইস চিকেন কারিতে আমাদের রুচি নেই, আমরা অন্যরকম কিছু খেতে চাই। সামথিং এক্সোটিক ফ্রম খাসি, গারো কুইজিন। লাইক জাডো রাইস অ্যান্ড পর্ক কুকড উইথ সেসামি সিডস . . .

ভদ্রলোক জানালেন, জাডো কিংবা পর্ক, দুটোই তাঁদের বাড়ন্ত। আমার গলা দমে গেল। ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “চিকেন, ফিশ দোনো হি মিল যায়েগা ম্যাডাম। বয়েল মিলেগা, খাপ্পা মিলেগা, আপকো কেয়া চাহিয়ে বতাইয়ে।”

অ্যাঁ? খাপ্পা? সে আবার কী?

জানা গেল খাপ্পা হল গারো পাহাড়ের ডিশ। ভেরি স্পাইসি।

আমি ভেবেচিন্তে এক প্লেট চিকেন বয়েল আর এক প্লেট ফিশ খাপ্পার অর্ডার দিলাম। রাইসের সঙ্গে।

“ভাজি? ভাজি নেহি চাহিয়ে?” ভদ্রলোকের গলা শুনে বোঝা গেল, ভাজি ছাড়া মিলের কথা তিনি কল্পনা করতে পারছেন না।

“বেংগনকা ভাজি বনা দু?”

আমি বললাম, “সর্বনাশ, বেংগন নহি চলেগা, মেরা হাজব্যান্ডকা বেংগন মে অ্যালার্জি হ্যায়।”

বাঃ, শুধু কথাই বলতে হচ্ছে না, সম্পূর্ণ অচেনা একজন লোককে সংসারের হাঁড়ির খবরাখবরও দিতে হচ্ছে। কাল থেকে চশমা খুলে দাঁত মাজব।

ভদ্রলোক আর আমাকে সুযোগ দিলেন না। নিজেই মেনু ঠিক করে দিলেন। রাইস, খাসি স্টাইলের চিকেন বয়েল, গারো স্টাইলের ফিশ খাপ্পা, আলুভাজি।

সত্যি বলছি, একটু হতাশ লাগছিল। মেঘালয় ভবনে খাওয়ার ব্যাপারটা পুরোটাই যে টস করে ঠিক করা এমনটা নয়। অন্তত আমার দিক থেকে। আগের গোটা সপ্তাহটা ধরে চেষ্টা করেও যখন নিরাপত্তা, ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি আবোলতাবোল কারণে মহারাষ্ট্র, নাগাল্যান্ড, সিকিম – তিনটের একটাও ভবনেও খেতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা গেল না তখন আমি খুব খুশি হয়েই মেঘালয়ে ভবনে খেতে যাওয়ার প্রস্তাবটা দিয়েছিলাম। দিল্লিতে সকালে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে বলেই কি না জানি না, বেশ কিছুদিন ধরেই মেঘালয়ের কথা মনে পড়ছিল। মনে পড়ছিল শিলং যাওয়ার পথে সেই কেমন রাস্তার পাশের একটা পাইস হোটেলের নড়বড়ে বেঞ্চিতে বসে ভাত, ভাজি আর মাংসের থালি খেয়েছিলাম। ওস্তাদি করে বেঞ্চির ওপর আধময়লা বাটিতে রাখা লংকায় কামড় বসিয়ে কেমন এই গর্বিত বাঙালের নাকেচোখে জল এসে গিয়েছিল। সেই কেমন রাতের বেলা হোটেলের লেপে পা মুড়ে বসে পর্কের টুকরোর গায়ে লেগে থাকা সবুজ রঙের রগরগে ঝোলমাখা ভাত মুখে পুরছিলাম আর বাইরে শোঁশোঁ করে ঠাণ্ডা, ঝোড়ো হাওয়া বইছিল।

অর্চিষ্মানকে ফোন করে বললাম, “চলে এস, অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে। খাসি বয়েল আর গারো খাপ্পা।”

অর্চিষ্মান খুব খুশি হয়ে বলল, “বাঃ বাঃ, খাসির অনেক রকম প্রিপারেশন খেয়েছি, বয়েল কখনও খাইনি, আজ আরাম করে খাওয়া যাবে।”

আমি আর কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দিলাম।  

অর্চিষ্মানের ভুল ভাঙানোর সুযোগ এল ঠিক একটার সময়, ন’ নম্বর অওরংজেব রোডে মেঘালয় ভবনের সামনে। ভবনে ঢুকে এ ফোর কাগজে আটচল্লিশ ফন্টের টাইমস নিউ রোম্যানে ছাপা C A N T E E N আর তার নিচের তীরচিহ্ন ধরে বাঁ দিকে বেঁকেই দেখি চারদিকে বারান্দাওয়ালা একটা চৌকো মাঠ, বাঁদিকের বারান্দার গায়ে ক্যান্টিন।   

ক্যান্টিন হচ্ছে একটা বড় চৌকো ঘর, সিমেন্টের মেঝে, সানমাইকার আস্তরণ দেওয়া সারি সারি টেবিল, টেবিলের চারদিকে সাজানো কাঠের চেয়ার। শীত নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যবস্থা নেই, আতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য সিলিং থেকে কয়েকটা ফ্যান ঝুলছে। বড় বড় চৌকো জানালা দিয়ে ঢোকা শীতের রোদ্দুরে ভেসে যাচ্ছে সারা ঘর।

আমরা গিয়ে বসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেতর থেকে একটা ছোট ছেলে বেরিয়ে এসে পাহাড়ি চোখেমুখে একগাল হাসি ফুটিয়ে বলল, “আপনে ফোন কিয়া থা?”

এ কী! এ তো ভদ্রলোক নয়, এ তো রীতিমত ছেলেমানুষ! ছেলেটা একবার অর্চিষ্মানের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝোঁকাল, তারপর জানাল যে সে এক্ষুনি খাবার নিয়ে আসছে।

ক্যান্টিনের চেহারা দেখে আমি মনে মনে নিশ্চিত ছিলাম খাবার আসবে স্টিলের খোপ কাটা থালায়। মাঝের সবথেকে বড় খোপটায় থাকবে ভাত, সামনের তিনটে পাশাপাশি সমান খোপের একটায় থাকবে সেদ্ধ চিকেনের সাদাটে টুকরো, পাশেরটায় মাছের খাপ্পা (কে জানে কেমন দেখতে হবে), তিন নম্বর খোপে থাকবে আলুভাজি। থালার সাইডের ফালি টুকরো দুটোর একটাতে থাকলেও থাকতে পারে কাটা শশা, পেঁয়াজফালির ছিটে আর ঘন সবুজ রঙের কাঁচা লংকা।

আমাকে চমকে দিয়ে খাবার এল ধবধবে সাদা ভঙ্গুর বাটিতে।


আমরা শুরু করলাম চিকেন বয়েল দিয়ে। আমাদের ভাষায় চিকেন সুপ। ঝাঁঝালো, সুগন্ধী তরলের মধ্যে ভাসন্ত গাজর, বিনস আর মুরগির ঠ্যাং-এর মাংস। মসৃণ অথচ ঠাসবুনোট। কামড় দিলে বুকের মাংসের মতো সুতোসুতো হয়ে ছিঁড়ে যায় না।


খাসি রান্নার অন্যতম পদ খাপ্পা/কাপ্পা। মশলা বলতে তেল, নুন, কাঁচালংকা। আমাদের রান্নায় যেমন স্তরের পর স্তর। এক গ্রাস খাবার মুখে দিলে সর্ষে ফোড়নের ঝাঁঝ, শুকনো লংকার কামড়, গরম মশলার ওম সব একের পর জিভের ওপর রামধনুর মতো ফুটে ওঠে, এ রান্নায় তেমনটি হবে না। এ রান্না পাহাড়ি পাইনের মতো সোজাসাপটা। জটিলতাশূন্য। তা বলে একে গভীরতাহীন মনে করার কোনও কারণ নেই কিন্তু। আমরা টলটলে ঝোল দিয়ে ভাত মেখে চামচে করে মুখে পুরতে লাগলাম, আর বিশুদ্ধ কাঁচালংকার নির্যাস আমাদের সমস্ত রুদ্ধ ইন্দ্রিয়পথ খুলে দিয়ে আমাদের একেবারে ভেতরে গিয়ে সেঁধোতে লাগল। বাইরে সবুজ মাঠের ঘাসে অতি ধীরে দীর্ঘ হতে লাগল মেঘালয় ভবনের পশ্চিমের ছাদের ছায়া।


আরাম করে বসে সে ছায়ার গতিবিধি পাহারা দেব তার সময় ছিল না। অফিসে ফিরতে হবে। খাওয়া শেষ হতে না হতেই ছেলেটাকে বিল আনার জন্য ডাকাডাকি করতে লাগলাম। টাকা নিয়ে ছেলেটা হেসে বলল, “ফির আইয়েগা।” আমরা বললাম, “জরুর।” বলতে গিয়ে টের পেলাম কথা বলার অনিচ্ছেটনিচ্ছে উবে গিয়ে আমার বুকের ভেতরটা একেবারে ঝকঝকতকতক করছে।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.