July 30, 2015

The Weird Questionnaire




মার্সেল প্রুস্তের কোয়েশ্চেনেয়ারের কথা সকলেই জানে। তুলনায় Eric Poindron-এর কোয়েশ্চেনেয়ার কম পরিচিত। Poindron একজন লেখক, সমালোচক, সম্পাদক। তিনি বেশ কিছু রেডিও অনুষ্ঠানেরও সঞ্চালক।  

প্রুস্তের সঙ্গে Poindron-এর কোয়েশ্চেনেয়ারের বেশ অনেকগুলো তফাৎ আছে। এক, আয়তনের। প্রুস্ত-এর প্রশ্নপত্রে আছে মোটে খানতিরিশ প্রশ্ন, Poindron-এর প্রশ্নপত্রে প্রশ্নের সংখ্যা ষাটের কাছাকাছি। দুই, প্রুস্তের প্রশ্নপত্র আপনি কতক্ষণ ধরে সমাধান করবেন সেটা আপনার ব্যাপার। Poindron আশা করেন তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে আপনার বেশি সময় লাগবে না। ইন ফ্যাক্ট, তিনি চান যে উত্তরদাতা বেশি মাথা না ঘামান। যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মনে আসছে সেটাই লিখুন। তিন নম্বর তফাৎটা হল, প্রুস্ত-এর প্রশ্নপত্রের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল তাঁর নিজের মনের তল খোঁজা, Poindron প্রশ্নপত্র বানিয়েছিলেন “রাইটিং প্রম্পটস” হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।

আমি কোয়েশ্চেনেয়ারটির উত্তর দিলাম। আপনারাও নিজেদের উত্তর দেবেন এই আশা রইল।

*****

1.     1. Write the first sentence of a novel, short story, or book of the weird yet to be written. গরমবোধ আমার চিরকালই অসম্ভব রকমের বেশি ছিল।

2. Without looking at your watch: what time is it? আটটা পঁয়তাল্লিশ।

3. Look at your watch. What time is it? আটটা আটত্রিশ।  

4. How do you explain this – or these – discrepancy (ies) in time? বলা যেতে পারে যে আমি সময়ের থেকে এগিয়ে থাকতে পছন্দ করি, কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে যে আমার সময়জ্ঞান/টাইমিং খারাপ।

5. Do you believe in meteorological predictions? আমি ঠিক নিশ্চিত নই মিটিওরোলজিক্যাল প্রেডিকশন কাকে বলে, কিন্তু যেহেতু কোনও রকম প্রেডিকশনেই বিশ্বাস করি না তাই এটাতেও করছি না।

6. Do you believe in astrological predictions? উঁহু।

7. Do you gaze at the sky and stars by night? একসময় নিয়মিত তাকিয়ে থাকতাম। এখন তাকানো হয় না বলে আফসোস হয়।

8. What do you think of the sky and stars by night? আমার রিষড়ার বাড়ির ছাদের কথা ভাবি। অন্ধকার ছাদে এসে পড়া পাশের বাড়ির টিউবলাইটের আলোর কথা ভাবি। মাদুরের ওপর আমার পাশে শুয়ে থাকা মায়ের কথা ভাবি।  আর ভাবি যেগুলো নিয়ে ভেবে ভেবে সারাদিন সারা হই, সেগুলো আসলে কী অর্থহীন।

9. What were you looking at before starting this questionnaire? ঠিক আগের মুহূর্তে কীসের দিকে তাকিয়ে থাকতাম বলতে গেলে আনইন্টারেস্টিং জিনিসপত্র যেমন ল্যাপটপের স্ক্রিন ইত্যাদির কথা বলতে হবে। তার থেকে বরং বলি কোয়েশ্চেনেয়ারের উত্তর দেওয়া শুরু করার মিনিট দশেক আগে আমি একথালা ফ্রায়েডরাইস আর মাছভাজার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।  

10. What do cathedrals, churches, mosques, shrines, synagogues, and other religious monuments inspire in you? অস্বস্তি।

11. What would you have “seen” had you been blind? অন্ধকার।

12. What would you want to see if you were blind? সব কিছু।

13. Are you afraid? হ্যাঁ।

14. What of? ব্যর্থতা।

15. What is the last weird film you’ve seen? কাল রাতেই পরপর দুটো দেখলাম। প্রথমটার নাম ‘তোমায় পাব বলে’ দ্বিতীয়টার নাম ‘সূর্য’। দুটোরই নায়ক প্রসেনজিৎ।

16. Whom are you afraid of? ঊর্ধ্বতন পদাধিকারী। মা।

17. Have you ever been lost? না।

18. Do you believe in ghosts? বিশ্বাস করি না, কিন্তু ভয় পাই।

19. What is a ghost? অন্ধকার। খাটের তলা। ঘাড়ের কাছে একটা রোম খাড়া করা অনুভূতি।

20. At this very moment, what sound(s) can you hear, apart from the computer? কানের ভেতর হেডফোনে একটা নাটক চলছে। অ্যালান প্লেটারের দ্য ডেভিল’স মিউজিক। তাছাড়াও ও ঘর থেকে আবছা আবছা টিভির আওয়াজ আসছে। খবর চলছে।  

21. What is the most terrifying sound you’ve ever heard – for example, “the night was like the cry of a wolf”? আমাদের অফিসের প্যান্ট্রির দরজাটা। লোকজন ঢুকতে বেরোতে থাকে আর দরজার স্প্রিংটা এমন আর্তনাদ করতে থাকে, র‍্যামসে ব্রাদার্সের ঠাকুরদা।

22. Have you done something weird today or in the last few days? হুম্‌ম্‌ম্‌, মনে পড়ছে না।

23. Have you ever been to confession? পাগল নাকি?

24. You’re at confession, so confess the unspeakable. মাথা খারাপ?

25. Without cheating: what is a “cabinet of curiousities”? কোনও আইডিয়া নেই।

26. Do you believe in redemption? নাঃ।

27. Have you dreamed tonight? কাল রাতে কিছু দেখিনি। আজ রাতে দেখব কি না জানি না।

28. Do you remember your dreams? প্রত্যেকটা। স্পষ্ট।

29. What was your last dream? অর্চিষ্মান টেবিলটেনিস খেলছে।

30. What does fog make you think of? পাহাড়। খাদ। নির্জনতা। সন্ধ্যে। চা। পকোড়া। অর্চিষ্মান।

31. Do you believe in animals that don’t exist? না।

32. What do you see on the walls of the room where you are? এখন আমার ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। খালি ল্যাপটপের স্ক্রিনটা জ্বলছে। কাজেই দেওয়ালে কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

33. If you became a magician, what would be the first thing you’d do? আমার মনের জোর আর পরিশ্রম করার ক্ষমতা বাড়াব।

34. What is a madman? যার নিজের ভালোমন্দ সম্পর্কে জ্ঞান নেই।

35. Are you mad? নিশ্চয়।

36. Do you believe in the existence of secret societies? মনে হয় না। তবে এখন মনে হচ্ছে ও’রকম সোসাইটি থাকাটা বেশ মজার ব্যাপার। অর্থাৎ কি না সিক্রেট সোসাইটির অস্তিত্বে আমি বিশ্বাস করি না, তবে চাই থাকুক।  

37. What was the last weird book you read? মনে পড়ছে না।

38. Would you like to live in a castle? কক্ষনও না। বেশি বড় বাড়ি আমার মোটে পছন্দ না।

39. Have you seen something weird today? না তো।

40. What is the weirdest film you’ve ever seen? হঠাৎ নীরার জন্য।

41. Would you like to live in an abandoned train station? না।

42. Can you see the future? না।

43. Have you considered living abroad? হ্যাঁ।

44. Where? অ্যামেরিকায়। আইসল্যান্ডে।

45. Why? আরামদায়ক জীবনযাপনের জন্য। নিরিবিলি জীবনযাপনের জন্য।

46. What is the weirdest film you’ve ever owned? ডাউনলোড করাকে own করা বলে যদি ধরেও নিই উইয়ার্ড মনে হওয়া কোনও ফিল্মই ডাউনলোড করিনি।  

47. Would you like to have lived in a vicarage? হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা। সেন্ট মেরি মিডের ভিকারেজ, প্লিজ।

48. What is the weirdest book you’ve ever read? দ্য কনফেডারেসি অফ ডান্সেস।

49. Which do you like better, globes or hourglasses? গ্লোব। আওয়ারগ্লাস থাকলে আমি সর্বক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে বসে থাকব।

50. Which do you like better, antique magnifying glasses or bladed weapons? অ্যান্টিক আতসকাঁচ।

51. What, in all likelihood, lies in the depths of Loch Ness? কোনও ধারণা নেই।

52. Do you like taxidermied animals? নাআআআআআআআআআআ।

53. Do you like walking in rain? পায়ের তলায় কাদা না থাকলে। বাড়ি ফেরার তাড়া না থাকলে।

54. What goes in on tunnels? দিন আনা দিন খাওয়া জীবন।

55. What do you look at when you look away from the questionnaire? অন্ধকার। পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা পাশের ঘরের মৃদু হলুদ আলো।

56. What does this famous line inspire in you: “And when he had crossed the bridge, the phantoms came to meet him.”? ব্রিজ কখনওই ক্রস না করার ইচ্ছে।

57. Without cheating: where is that famous line from? জানি না।।

58. Do you like walking in graveyards or the woods by night? হাহাহা, না।

59. Write the last line of a novel, short story, or book of the weird yet to be written. আমি সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।

60. Without looking at your watch: what time is it? ন’টা বারো।

61. Look at your watch. what time is it? ন’টা চোদ্দ।



July 29, 2015

জাদুঘর




আমার বাবামায়ের যখন আমার মতো বয়স ছিল তখন তাঁরা আমার তুলনায় কত বেশি কাজ করতেন এটা আমার একটা নিত্য অপরাধবোধের উৎস। আমি নিজেকে সামলাতেই অস্থির, তাঁরা নিজেদের সঙ্গে সঙ্গে বয়স্ক বাবামায়ের দেখাশোনা করতেন, সন্তানের ভরণপোষণ করতেন। অফিসটা আমার সঙ্গে তাঁদের কমন ছিল কিন্তু আমার অফিস করা আর তাঁদের অফিস করায় আকাশপাতাল পার্থক্য ছিল। আমি যেমন অটোতে চড়ি আর গল্পের বই পড়তে পড়তে কুড়ি মিনিট পর (ফেরার পথে জ্যাম থাকলে চল্লিশ) অফিসের গেটে এসে নামি, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অত সহজ ছিল না। তাঁরা নিজেরা রেডি হতেন, আমাকে রেডি করাতেন, দৌড়ে ট্রেন ধরতেন, হাওড়ায় নেমে দৌড়ে সাবওয়ে পেরোতেন, দৌড়ে লঞ্চ কিংবা বাস ধরতেনফেরার পথে গোটা ঘটনাটা পুনরাবৃত্তি হত। এবং এই পুরো ব্যাপারটা করতে হত আরও লাখখানেক ছুটন্ত লোকের সঙ্গে কম্পিটিশন করে।

আমার বাবামা আমার থেকে কত উন্নততর জীবন যাপন করতেন সেটা আমার দ্বিতীয় এবং প্রথমটার থেকে গভীরতর অপরাধবোধের উৎস। সপ্তাহের পাঁচদিন ওই অমানুষিক পরিশ্রম করার পর শনিরবি ছুটিতে তাঁরা বাড়ির কাজ করতেন, আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের বাড়ি সৌজন্য করতে যেতেন, আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের নিজেদের বাড়িতে ডাকতেন, লোকলৌকিকতার পাট না থাকলে নাটক থিয়েটার দেখতে কিংবা সংগীত সম্মেলন শুনতে বেরোতেন। বলাই বাহুল্য সেগুলো করার জন্য আবার ঠেঙিয়ে কলকাতায় আসতে হত।

এত কাজের ওপর শাকের আঁটির মতো ছিলাম আমি। আমার স্কুল, আমার গানের স্কুল, অখিলবঙ্গ অতুলপ্রসাদী নিখিলভারত নজরুলগীতি কম্পিটিশন, চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া, জাদুঘর, এডুকেশন ফেয়ার।

আর আমি? ছুটি পেলে ভোঁসভোঁস করে ঘুমোই, ঘুম থেকে উঠে শপিং মলে কফি খেতে যাই। খাওয়া এবং সিনেমা দেখা ছাড়া আর কোনও রকম বিনোদন যে হতে পারে সেটা ভুলতে বসেছি। আমার মতো কারও ঘরে জন্মালে আমার যে কী হাল হত ভাবলেও আমার হৃৎকম্প হয়।

অপরাধবোধ কমাব বলে শনিবার সকাল হতেই ডিক্লেয়ার করলাম যে আজ কিছু একটা করতে হবে, খাওয়া আর সিনেমা দেখা ছাড়া।

অর্চিষ্মান বলল, “আমার অনেকদিনের ইচ্ছে, চল মিউজিয়াম যাই।”

‘ম-মিউজিয়াম?”

“মিউজিয়ামদিল্লিতে কতশত মিউজিয়াম আছে বল দেখি? ন্যাশনাল, আর্ট। আরও যেন আছে কী সব।”

ফোন টেনে নিয়ে খুঁজতে শুরু করে দিল অর্চিষ্মান।

“এই তো, এয়ারফোর্স, আর্কিওলজিক্যাল, ক্র্যাফট, ন্যাচারাল হিস্ট্রি, চিলড্রেনস, গান্ধী মিউজিয়াম, গালিব মিউজিয়াম, পুলিশ মিউ . . . এই পুলিশ মিউজিয়ামে যাবে? ইন্টারেস্টিং হবে মনে হচ্ছে।”

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইলাম। আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। মিউজিয়ামের প্রতি অর্চিষ্মানের ভালোবাসাটা কি নতুন করে জন্মাল, নাকি ছিল গোড়া থেকেই? গত প্রায় ছ’বছরের প্রাকবৈবাহিক এবং বৈবাহিক সম্পর্কে এ জিনিস তো টের পাইনি? পেলে . . .

মিউজিয়ামের প্রতি আমার কোনও নালিশ নেই। মানবসভ্যতার বিকাশে অতীত সংরক্ষণের ভূমিকা এবং সে ব্যাপারে মিউজিয়ামের অবদান নিয়ে আমি নিঃসন্দেহ। আমার যেটা আছে সেটা হচ্ছে ট্রমা। দগদগে এবং গভীর

সেটার কারণ আমার বাবা। আমার বাবাকে মিউজিয়ামে একবার ঢোকালে বার করা শক্ত। অন্যে যে ছবিটা পাঁচমিনিটে দেখে সেটা আমার বাবা অন্তত পনেরো মিনিট ধরে দেখেন। ডাইনোসরের মডেলটডেল থাকলে তো আর রক্ষা নেই। হাড়প্রতি পাঁচ মিনিট। কত হল? সবাই হেঁটে হেঁটে বোরিং জিনিসগুলো পেরিয়ে গিয়ে মজাদার আয়নার ঘরে ঢুকে হাহাহিহি করে টাইমপাস করত, আমারও খুব ইচ্ছে করত যাই, কিন্তু বাবা মিনি টর্নেডোর কাঁচের বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন তো থাকতেনই, আবার আমাকে ক্রমাগত মনে করাতেন (পাছে আমার বিস্ময় প্রয়োজনের থেকে কম পড়ে), "কী ফোর্স দেখেছিস সোনা? বাক্সের মধ্যেই এই, খোলা মাঠে ওই ঘূর্ণির মুখে পড়লে কী হবে বুঝতে পেরেছিস?"

আমরা শুধু মিউজিয়ামে বেড়াতে যেতাম তাই নয়, কোথাও বেড়াতে গিয়ে মিউজিয়ামের সন্ধান পেলে সব মজা ফেলে সেখানে ঢুকে বসে থাকতাম। আমার পরিশ্রমী বাবামা আমাকে ঘাড়ে করে কম জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাননি এবং সে সব জায়গার প্রতিটি মিউজিয়ামও আমাকে দেখিয়েছেন। সাবালকত্ব প্রাপ্তির আগে আমি শপাঁচেক মিউজিয়াম দেখে ফেলেছিলাম, সাবালকত্ব পেয়ে আর আধখানা মিউজিয়ামও দেখিনি। (ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু সেগুলো ব্যতিক্রমই।)

অর্চিষ্মান আমার মুখটা দেখে আঁচ করেছিল বোধহয়বলল, “কেন তুমি মিউজিয়ামে যেতে চাও না? চাইলে অন্য কোথাও-ও যাওয়া যেতে পারে

আমার এতদিনের চেপে রাখা বিরাগ প্রায় টর্নেডোর তেজে বেরিয়ে এল।

“মিউজিয়াম বিশ্রী, বোরিং, প্রথম আধঘণ্টা তাও যদি বা সহ্য হয় তারপর খালি পায়ে ব্যথা ছাড়া আর কিচ্ছু টের পাওয়া যায় না

অর্চিষ্মান বলল, “এই আমি প্রমিস করছি যতক্ষণ ভালো লাগবে ঠিক ততক্ষণ দেখব, তার পর একটি মিনিটও দেখব না

আমি বললাম, “প্রমিস?”

“অন গড ফাদার মাদার প্রমিস।”


মিউজিয়ামে পৌঁছে টিকিট কাটা হল। আমাদের দশ দশ কুড়ি টাকা আর স্থির ক্যামেরার জন্য কুড়ি টাকা। সব মিলিয়ে চল্লিশ। হয়তো ব্যাপারটা স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত, কিন্তু আমার প্রত্যেকবার বিস্ময় জাগে। এক সন্ধ্যেয় অটো চেপে গিয়ে বার্গার আর কালামারি ফ্রাইস খেয়ে ফিরতে হাজার টাকা উড়ে যায়, আর এখানে কিনা চল্লিশ টাকা দিয়ে আমরা পাঁচ হাজার বছর ধরে তিলে তিলে জোগাড় করা দু’লাখেরও বেশি জিনিস দেখব? আট হাজার বছর বুড়ো শিশুদের খেলনাবাটি দেখব, তাদের মাজেঠিমার হাতের চুড়ি কানের দুল দেখব, মিয়াঁ তানসেনের ঝাপসা হয়ে যাওয়া মিনিয়েচার পেন্টিং দেখব, মাটি খুঁড়ে তুলে আনা বুদ্ধদেবের খুলির টুকরো রাখা সোনার মোড়া মন্দির দেখব? শুধু দেখব না, ছবি তুলে এনে আবার দেখেছি যে সেটা ফলাও করে সবাইকে দেখাব? চল্লিশ টাকায়?

দ্য ওল্ড ওয়ার্ল্ড

অবাকটবাক হওয়ার পালা সাঙ্গ করে আমরা মিউজিয়ামে ঢুকে পড়লাম। সিনিয়রিটির সুবাদে প্রথমেই হরপ্পান সভ্যতার ঘর। সেখানে মাটি দিয়ে বানানো বাসনকোসন, সিলমোহর, গয়নাগাঁটি, পোড়ামাটির মূর্তি, তামা দিয়ে বানানো ছোরাছুরি, শাবল, কুঠার সব সারি সারি সাজানো। বেশিরভাগ জিনিসপত্রের পাশেই দেওয়ালে বোর্ডে লেখা ‘লোন ফ্রম আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’। সবকিছুই দেখতে ভালো লাগে। ছোট ছোট মূর্তির মুখে স্মাগ লুক দেখে হাসি পায়। তবে সব থেকে ভালো লাগে সেগুলো দেখতে যেগুলোর ছবি ইতিহাস বইয়ের পাতায় দেখেছি।


হরপ্পান সভ্যতার ঘর পেরিয়ে আমরা ক্রমে ক্রমে মৌর্য, শুঙ্গ, সাতবাহন, কুষাণ (এর মধ্যেই গান্ধার, মথুরা আর ইক্ষকু শিল্প পড়বে), গুপ্ত আর মধ্যযুগের শিল্প দেখলাম।

হাতির পিঠে চলেছেন শুঙ্গ রাজা

কুষাণ যুগের কুবের

মহিষাসুরমর্দিনী

তারপরেই আমাদের ফেভারিট ঘরটা চলে এল। মিনিয়েচার পেন্টিংস। রাজস্থানি পেন্টিং, মালওয়া পেন্টিং, পাহাড়ি পেন্টিং। আমি ছবির কিছুই বুঝি না, কিন্তু তাদের এমন উজ্জ্বল রং, বিষয়বস্তুর এমন বৈচিত্র্য যে দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়।

যুদ্ধশেষ। বীর হনুমানের কপালে টিকা পরাচ্ছেন রামচন্দ্র

মোদক খাচ্ছেন গণপতি। 

একটা দারুণ জিনিস দেখলাম, বিভিন্ন রাগরাগিণীর ছবি। মেঘ রাগ, তোড়ি রাগ, কেদার রাগ। বেশ মানানসই করে আঁকা। মানে ধরুন মেঘ রাগের ছবিতে রাধাকৃষ্ণ বসে দোলনায় দুলছেন, ঘন কালো আকাশে চারটে ধপধপে সাদা বক ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। তোড়ি রাগের ছবিতে সূর্য উঠছে। কেদারে একেবারে ঝমঝমিয়ে বর্ষা। মুগ্ধ হয়ে দেখছি এমন সময় অর্চিষ্মান এসে আমার পিঠে টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এদিকে এস, তোমার একটা ছবি পেয়েছি।”

আমি খুব উৎসাহিত হয়ে দেখতে গেলাম।


গিয়ে দেখি কলহান্তরিতা নায়িকার ছবি।

আমি বললাম, তবে রে, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। এই না বলে কোমর বেঁধে ঝগড়ুটে নায়কের ছবি খুঁজতে নামলাম। একটাও পেলাম না। স্বাভাবিক। তখন সব ছবি পুরুষরাই আঁকতেন কি না, তাঁদের যত এনার্জি নায়িকার শ্রেণিবিভাগ করতেই খরচ হয়ে যেত, নিজেদের কথা ভাবার আর ফুরসৎ থাকত না। শেষমেশ হাল ছেড়ে আমি আরেকটা ছবি পছন্দ করলাম যেটা আমার পরিস্থতি তাও কিছুটা বর্ণনা করে।

ইনি হচ্ছেন বিরহোৎকণ্ঠিতা নায়িকা। ইংরিজি অনুবাদে লেখা ছিল ডিলাইটেড হিরোইন ওয়েটিং ফর হার বিলাভেড।


ততক্ষণে প্রায় দেড়ঘণ্টা কেটে গেছে, আমার পা ব্যথা করব করব করছে। আমি অর্চিষ্মানকে প্রমিসের কথা মনে করিয়ে দিলাম। ওরও মনোযোগ উঠি উঠি করছিল, কাজেই আমরা দ্রুত বুদ্ধিস্ট আর্ট, ডেকোরেটিভ আর্ট আর গয়নাগাঁটির ঘরগুলো ঘুরে মিউজিয়াম ভ্রমণের পালা সাঙ্গ করলাম।

হাতির দাঁত উপড়ে নিয়ে তার ওপর শিল্পকর্ম করাটা সমর্থন করি না, তবে শিল্পকীর্তিটা যে দেখার মতো সেটাও ঠিক। 

সে দুপুরটা তো আনন্দে কেটেছিলই, কিন্তু সবথেকে ভালো যেটা হয়েছিল সেটা হচ্ছে মিউজিয়ামের প্রতি আমার বিরাগ খানিকটা হলেও কেটেছিল। ফেরার পথে আমরা এও বলাবলি করলাম যে পরের কোনও একটা শনিরবি দেখে বাকি ঘরগুলো ঘুরে যাওয়া যেতে পারে। আর তারও পরের কোনও শনিরবি দেখে পুলিশ মিউজিয়ামটা।

















 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.