June 23, 2018

রকস্টার হলে



'আমি তোর জন্য এত চিন্তা করি বাট ইউ ডোন্ট লাভ মি।' 

বাড়ি নেব তখনও ঠিক হয়নি, প্রথমবার দেখতে যাচ্ছি। মোড়ের মাথার বাড়ির ভদ্রমহিলা দরজা খুলে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে আসতে বললেন। 

বাড়ি নেব কনফার্ম হওয়ার পর এজেন্টদাদা বললেন সকালবিকেল জলের পাম্প চালানোর নিয়মকানুন বোঝানোর ক্লাস নেবেন। দিন ঠিক করে অফিস থেকে বেরিয়ে মিট করে আসছি দুজনে। পাশের বাড়ির গেট খুলে ফোন কানে একজন বেরিয়ে এলেন। 

'কফ বেরোচ্ছে? সাদা না ঘোলাটে? বলছি কফ সা-দা না ঘো-লা-টে?'

আগের পাড়াদুটোয় পাশের বাড়ির লোককে রাস্তায় দেখলে চেনার উপায় ছিল না। সবার দরজা পাটে পাটে বন্ধ, জানালার ডান বাঁ ওপর নিচ ব্ল্যাকআউট পর্দা টানটান। এই নতুন পাড়ায় সবাই কেমন খোলামেলা, রাখঢাক নেই, রাস্তায় দাঁড়িয়ে মনের কথা বলে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে  ব্লাড রিপোর্ট রিডিং পড়ে শোনানো পাড়ায় বড় হওয়া কুন্তলা ইমপ্রেসড হয়েছিল। 

শিফটের পর ঘরভর্তি বাক্সপ্যাঁটরার মধ্যে বসে ভাবছি কোথা থেকে শুরু করব, আজ করব নাকি কাল করাটাই বেটার হবে, আজ বরং সিনেমা দেখে আসি, ভেবে বুকমাইশোর অ্যাপ খুলতে যাচ্ছি, এমন সময় 'মা কলিং'। 'হ্যালো, মা... হ্যালো...হ্যাঁ হ্যাঁ বল...আমরা পৌঁছে গেছি, পোঁ-ও-ও-উ-ছে গে-এ-ছি... হ্যাঁ হ্যাঁ খেয়েছি, খে-য়ে-এ-এ ছি-ই-ই...হ্যালো, হ্যালো... 'বলতে বলতে টের পেলাম আমি আর ঘরের মধ্যে নেই। ফোন কানে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি। 

ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গলি পেরিয়ে মেনগেট খুলে রাস্তায় নেমে যেতে হয়েছে, তবে মা আমার কথা শুনতে পেয়েছেন, আমি মায়ের।

এই লাইনের বাড়িগুলোতে ফোনের নেটওয়ার্ক অকথ্য। ঘরের ভেতর, বিশেষ করে ভেতরের দিকের ঘরে থাকলে মোবাইল স্ক্রিনের বাঁদিকের ওপরের ত্রিকোণের সাদাটা কমতে কমতে ল্যাজের কাছে টিমটিম করে, অনেক সময় গোটা ত্রিকোণ খালি হয়ে গিয়ে পাশে ঢ্যাঁড়া পড়ে যায়। 

অর্থাৎ যতক্ষণ এ বাড়ির ভেতরে থাকব, সকালে কী খেলাম বিকেলে কী খাব জেরার মুখে পড়তে হবে না, বিজয়া ছাড়া আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ফোন করে নিয়মিত খবর দিই-নিই না কেন গঞ্জনা সইতে হবে না, রিওয়ার্ড মিলা হ্যায়, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর বাতাইয়ে-র চিটিংবাজির মোকাবিলা করতে হবে না, দুঃস্থ শিশুদের জন্য কাজ করা মানুষজনের জেনুইন আবেদনের উত্তরে, 'ভেরি ভেরি সরি' বলে ফোন নামিয়ে রাখার পর অলরেডি অষ্টাবক্র বিবেকের শূন্য দৃষ্টির সামনাসামনি হতে হবে না। 

'বল তো আমি কে? চিনতে পারছিস না? গেস গেস' খেলাটা আমাকে আর কখনও খেলতে হবে না, যতক্ষণ আমি এ বাড়ির ভেতর থাকব। এ বাড়ির চার দেওয়ালে মাথা কুটে নেটওয়ার্ক ফিরে যাবে, আমার গায়ে আঁচড়টি পড়বে না। 

***** 

শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের অনেকে অনেক কারণে ফ্যান। কেউ বব বিশ্বাসের 'নমস্কার, এক মিনিট' শুনে, কেউ হাতকাটা কাত্তিকের সপ্রতিভতা দেখে। হালের শবর দাশগুপ্তের চরিত্রেও ওঁকে ছাড়া আর কাউকে ভাবা শক্ত। কিন্তু আমি এ সবের কোনও কারণেই শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের ফ্যান নই। শাশ্বত যদি এঁদের একজনও না হয়ে শুধু শাশ্বত হয়েই থাকতেন তা হলেও আমার ওঁকে পছন্দ হত। 

কারণ শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় মোবাইল ফোন পছন্দ করেন না। কোনও এক ইন্টারভিউতে শুনেছিলাম বা পড়েছিলাম, ওঁর মোবাইল ফোন নেই। কখনও ছিল না, এখনও নেই। যোগাযোগ করতে গেলে ল্যান্ডলাইন ভরসা। 

এতে পেশার ক্ষতি হয় কি না জানতে চাওয়ায় শাশ্বত অতি ভদ্র ভাষায় যে উত্তরটা দিয়েছিলেন সেটা প্যারাফ্রেজ করে বললে হয়, চব্বিশঘণ্টা 'অ্যাকসেসিবল' নই বলে যদি কাজ না জোটে তবে মুখে ঝাঁটা অমন কাজের। 

আপনি কাকে বলেন জানি না, আমি রকস্টার এঁকেই বলি।

মোবাইল ফোন যে সাক্ষাৎ শয়তানের অবতার সে নিয়ে আমার কোনওদিন কোনও ভ্রম ছিল না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে চার বছর হোস্টেলে থাকা হয়ে যাওয়ার পর মা আমাকে মোবাইল ফোন নিতে বললে আমি চেঁচামেচি করি এবং মায়ের ব্যক্তিত্ব আমার তুলনায় মিনিমাম একশোগুণ শক্তিশালী হওয়ায় অচিরেই হার মেনে মোবাইল ফোন নিই। চাকরিতে জয়েন করার সময় বাকি সব তথ্যের সঙ্গে আমার মোবাইল নম্বর দিতে বলা হয়। দিয়ে দিই। 

দেওয়ার আগে মনে কিছু প্রশ্ন জাগতে পারত। জাগা উচিত ছিল। 

আমাকে মাইনে দেওয়া হচ্ছে দিনে সাড়ে আটঘণ্টা অফিসে কাজ করার জন্য। কাজের কথা আলোচনার জন্য সে সময় যথেষ্ট বলেই আমার বিশ্বাস।  আর যদি এমারজেন্সি কিছু হয়, ইমেল তো আছেই। কাজেই আমার মোবাইল ফোন নম্বর নেওয়ার অফিসের কোনও কারণ থাকতে পারে না। 

এসব প্রশ্ন আমার মনে জাগেনি। কারণ এক, আমি রকস্টার নই। দুই, ওই সময় ফোন নম্বর কেন, চাকরি পেতে গেলে এক বোতল রক্ত দান করতে হবে বললেও আমি দিয়ে ফেলতাম। 

হ্যাঁ, সামান্য মনখারাপ হয়েছিল। আমি যে রকস্টার নই, সেটা বার বার প্রমাণ হতে দেখলে কারই বা ভালো লাগে।

কিন্তু মনখারাপ নিয়ে বাঁচা শক্ত। বিশেষ করে আমার মতো নন-রকস্টারদের পক্ষে। তার থেকে ঢের স্বস্তির আমার থেকেও যারা দুঃখে আছে তাদের কথা ভেবে নিজের দুঃখ ভুলে থাকা বা থাকার ভঙ্গি করা। আমি এমন টিমের কথা শুনেছি, যার অংশ হতে হলে বসের যে যে সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট আছে সেখানে সেখানে অ্যাকাউন্ট খুলে বসের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে হয়। যাতে আমি কবে কোথায় বেড়াতে যাচ্ছি, কী খাচ্ছি, কী ভাবছি, কোন ইস্যুতে কোন পক্ষকে সমর্থন করছি এ সব বস আঙুলের ছোঁয়ায় জেনে নিতে পারেন। 

আমার কোনও সন্দেহ নেই, আমি যদি অমন বসের পাল্লায় পড়তাম এবং আমাকে যদি ওটা করতে বলা হত 'না' বলার সাহস আমার হত না।  সেটা যে আমাকে করতে হয়নি, মোবাইল ফোনে যখনতখন সাড়া দেওয়ার জন্য তৈরি থেকেই পার পাওয়া গেছে, সে জন্য আমি রোজ সকালে উঠে ভগবানকে থ্যাংক ইউ বলি।

*****

নেটওয়ার্কহীন বাড়িতে পায়ের ওপর পা তুলে থাকব ভেবে প্রথমটা খুব ফুর্তি হয়েছিল। তারপর কতগুলো হাড়হিমকরা সম্ভাবনা মাথায় এল।

যদি মাঝরাতে হার্ট অ্যাটাক হয়?
যদি ধূমকেতু মাথায় পড়ে?
যদি রাতদুপুরে ডাকাত এসে বেল বাজায়? 

নেটওয়ার্ক থাকলে দরজা খুলে দেওয়ার আগে পুলিশকে ফোনটা অন্তত করে রাখা যাবে। 

আট বছর আগে ব্রডব্যান্ডের যে প্ল্যানটা কিনেছিলাম, যেটা এখনও ব্যবহার করি, তাতে একটা ল্যান্ডলাইনের অপশন জোড়া ছিল গোড়া থেকেই। একটা ফোনই লাইফ হেল করার জন্য যথেষ্ট ভেবে আমি ল্যান্ডলাইন নিইনি। অর্থাৎ গত আট বছর ধরে আমার একটা ব্যক্তিগত ল্যান্ডলাইন ফোনের নম্বর আছে কিন্তু ফোন নেই।

গত সপ্তাহে অ্যামাজন থেকে একটা সস্তা দেখে ফোন কিনেছি। বাইরে থাকলে মোবাইলে আর ঘরে থাকলে ল্যান্ডলাইনে, আমি এখন চব্বিশঘণ্টা অ্যাকসেসিবল।

*****

চলতেফিরতে ফোনটাতে চোখ পড়লে একটা ইচ্ছে উঁকি দিচ্ছে। কেমন হবে এখন থেকে কেউ কন্ট্যাক্ট নম্বর চাইলে যদি মোবাইলের বদলে ল্যান্ডলাইন নম্বরটা দিই? ফোননম্বর বলতে তো এককালে ল্যান্ডলাইন নম্বরই বোঝানো হত। নিজের ফোনে আমার নম্বর টুকতে টুকতে যতক্ষণে সে ব্যাপারটা টের পাবে ততক্ষণে আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি, শেষ দৃশ্যে শবররুপী শাশ্বত যেমন ফেরান। ছবি স্লো মোশন হয়ে যায়, ঝম্পরপম্পর বাজনা বেজে ওঠে। বাকি সবাই ঝাপসা। বুকপকেট থেকে বার করে একটি অব্যর্থ ঝাঁকুনিতে ডাঁটির ভাঁজ খুলে চোখে পরে, পকেটে হাত পুরে দর্শকদের দিকে হাঁটতে শুরু করেন রকস্টার।

কিছু স্বপ্ন এ জীবনে পূর্ণ হওয়ার নয়। 



June 19, 2018

"You're not going to out-work me."



রাজ্যসভা টেলিভিশনের গুফ্‌তগু ইন্টারভিউ সিরিজটা আমার এখন যাকে বলে স্টেপল ডায়েট। অনেকগুলোই শুনে আপনাদের শোনাতে ইচ্ছে করেছে, অবশেষে মনোজ বাজপায়ীর সাক্ষাৎকারটা আর না শুনিয়ে থাকতে পারলাম না। এটা শুনতে শুনতে অভিনেতা উইল স্মিথের বলা একটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল, সেটাই পোস্টের নামের জায়গায় সেঁটে দিলাম। যেখান থেকে লাইনটা নেওয়া, উইল স্মিথের সেই পুরো বক্তব্যটা পড়তে চাইলে এখানে পাবেন। 

মনোজ বাজপায়ী এই সাক্ষাৎকারে বলছেন, উনি বিশ্বাস করেন, তিরিশ বছর হওয়ার আগে মানুষের দিনরাত এক করে পরিশ্রম করা উচিত, কারণ ওই ভাঙিয়ে সারাজীবন খেতে হবে। ডেডলাইনটা বাড়িয়ে কি চল্লিশ করা যায় স্যার, না কি যা যাওয়ার তা গেছেই?





June 17, 2018

চেয়ার প্রসঙ্গে



রিষড়ার বাড়িতে সবসময়েই মানুষের থেকে চেয়ার বেশি ছিল। কোনওটা কাঠের, কোনওটা বেতের, কোনওটা প্লাস্টিকের, কোনওটা সস্তা স্টিলের কাঠামোর ওপর নাইলনের দড়ির বুনুনির। কোনওটা বেঢপ, কোনওটা ফোল্ডিং, কোনওটার একটা পায়ার নিচে ভাঁজ করা কাগজ গুঁজে বাকি তিনটে পায়ার সঙ্গে সমান করা। 

একটাও সুদৃশ্য কিংবা মহার্ঘ নয়, ইকো ফ্রেন্ডলি তো নয়ই। 

কিন্তু সবক'টাই মারাত্মক কাজের।

খেয়াল করুন, মানুষের থেকে বেশি চেয়ার বলেছি, দরকারের থেকে বেশি বলিনি। রিষড়ার বাড়ির আরও একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, অন্তত আমার বড় হওয়ার সময় ছিল, সেটা হচ্ছে নিমেষের মধ্যে বাড়িতে ঠাসাঠাসি ভিড় হয়ে যেতে পারত। মানে ধরুন আমি বাবা মা ঠাকুমা পিসি আপনমনে যে যার তালে ঘুরছি, হঠাৎ গেটের সামনে তিনখানা রিকশা এসে থামল, হাসি হাসি মুখে সাতজন নামলেন। রামরাজাতলা কিংবা হালিশহর কিংবা বেলঘরিয়া কিংবা মছলন্দপুর কিংবা টিটাগড় থেকে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। অকস্মাৎ। নোটিস দিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়াটা সে সময় ব্যাড ম্যানার্স বলে গণ্য হত। বাড়িতে বাড়িতে ফোন আসার আগে তো খবর দেওয়া সম্ভবও ছিল না, আসার পরেও বেশ ক'বছর কাউকে কারও বাড়ি ফোন করে যেতে দেখিনি। বাড়ির ফোন মূলত ব্যবহার হত পাশের বাড়ির লোকের ফোন এলে ডেকে দেওয়ার জন্য। 

আত্মীয়স্বজনের ভিড়টা সপ্তাহান্তেই বেশি হত, তা বলে উইকডেজে চেয়ারগুলো বসে বসে ফাঁকি মারতে পারত না। স্কুল কলেজ অফিসের ভিড় পাতলা হয়ে গেলে বেলা এগারোটা থেকে একটা পর্যন্ত (দেড়টায় মিউনিসিপ্যালিটির কলের জল চলে যাওয়া আগে চান সারতে হত) বাড়িতে পাড়ার মহিলাদের জমায়েত হত, চেয়ার ভর্তি হয়ে মাটিতেও বসতে হত কাউকে কাউকে। বিকেলে চাইনিজ চেকার চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করতে ঠাকুমার বন্ধুরা আসতেন, খেলোয়াড় দর্শক মিলিয়ে চেয়ার ফাঁকা পড়ে থাকত না। বিজয়ার সন্ধেয় পাড়ার পুকুরে ভাসান হওয়ার পর চেয়ারে কুলিয়ে ওঠা যেত না। একটা বয়সের ওপরের মানুষেরাই চেয়ারে বসতে পেতেন, একটা বয়সের নিচের লোকদের চেয়ার অফার করা হত না, করলেও তারা অ্যাকসেপ্ট করত কি না সন্দেহ। ঘরের একধার থেকে প্রণাম শুরু করে একবারে ওইধারে পৌঁছে তারা মাথা তুলত, তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই নাড়ু নিমকি খেয়ে, 'আচ্ছা ঠাকুমা/জেঠিমা/কাকিমা আসছি' বলে পাশের বাড়ির দিকে দৌড়োত। এই যে এখন সবাই যে যার মোবাইলে বিশ্বকাপ দেখছে এবং গোল হলেই দৌড়ে টুইটার ফেসবুকে গিয়ে 'গোওওওল' কিংবা, 'আহা, ফ্রি কিকটা দেখলে?' লিখছে, (আমি তাদের দোষ দিই না, বিশ্বকাপ ফুটবল একা একা দেখার থেকে প্যাথেটিক ব্যাপার কমই আছে), তখনও এমন দুর্দিন আসেনি। খেলার রাতে টিভির ঘরের প্রতিটি চেয়ার দখল হয়ে যাওয়ার পর কিছু লোককে তক্তপোশে এবং মাটিতে বসতে হত। তাতেও না কুলোলে টুল আনা হত। দুটো টুল ছিল আমাদের বাড়িতে। এখনও আছে। একটা কাঠের এবং লম্বা, একটা লোহার এবং বেঁটে। 

এই কোটি কোটি চেয়ারের মধ্যে কালো কাঠের বেঁটে বেঁটে একজোড়া চেয়ার, সামনের ঘরে কাঠের গোলটেবিলের (কে যেন বুদ্ধি খাটিয়ে সেটা ধপধপে সাদা রং করে দিয়েছিল) দুপাশে বসে থাকত। আমি জন্ম থেকে দেখছি চেয়ারদুটোকে। ষাট শতাংশ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, বাবাও ওদের জন্ম থেকে দেখছেন। কেউ কখনও খুঁচিয়ে চেয়ারদুটোর হাতলের জায়গায় জায়গায় কাঠের পালিশ তুলে দিয়েছিল কোনও কারণে, তারপর যারাই বসত আনমনে সে সব পালিশতোলা ক্ষতে হাত বোলাত, মনখারাপ হলে নখ দিয়ে খুঁটত, ব্রাজিল আর্জেন্টিনাকে গোল দিলে হাতপাখার হাতল ঠুকে এনকোর জানাত। বাবার আমলে কেমন ছিল জানি না, আমি যতদিনে সিনে এসেছি ততদিনে চেয়ারদুটোর দুই দুই চারখানা হাতল ক্লাস নাইনের কুন্তলার গালের মতো হয়ে গেছে।

দুটো চেয়ারেই ব্যবহারে ব্যবহারে চিঁড়ে চ্যাপটা হয়ে যাওয়া মেরুন রঙের ওয়াড়পরানো গদি ছিল আর পিঠে চাপানো ছিল মেরুন রঙের ঢাকনা। সেগুলোকে যখন কাচতে নিয়ে যাওয়া হত, সিটে আর পিঠে অল্প হলুদ হয়ে যাওয়া বেতের বুনুনি নিয়ে চেয়ারদুটো লজ্জিত মুখে বসে থাকত। খালিগায়ে ফ্যানের হাওয়া খেতে পেয়ে খুশিই হত মনে হয়।

চেয়ারদুটো এখন আর নেই। কবে গেল দিনতারিখ মনে নেই, কেন গেল মনে আছে। পোস্টিং-অন্তে তেজপুর থেকে চলে আসার সময় বাবা মায়ের জন্য একটা আসাম সিল্ক আর বাড়ির জন্য একটা ছোটখাটো সিংহাসনের আয়তনের বাঁশের চেয়ার নিয়ে এসেছিলেন। মা বলেছিলেন, আবার শাড়ি কেন, আলমারিতে তো আর জায়গা নেই। চেয়ার প্রসঙ্গে সে রকম কিছু বলা হয়েছিল কি না জানি না।

বলা উচিত ছিল, কারণ আলমারি আর শাড়ির সম্পর্ক যা, বাড়ি আর চেয়ারের সম্পর্কও তাই। যত চাই তত জড়ো করা যায় না। একসময় থামতে হয়। যদি না মার্ক ড্যানিয়েলিউস্কির 'হাউজ অফ লিভস'-এর বাড়ির মতো বাড়ি হয়, যে বাইরেটা একই রকম থাকে কিন্তু ভেতরটা অতি ধীরে ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। ভগবানের দয়ায় আমাদের বাড়ি সে রকম নয়, কাজেই সিংহাসনকে জায়গা দিতে কোনও না কোনও বলিদান লাগতই। ভেতরের ঘরের খাট আলমারি তো বিদায় করা যায় না, তাছাড়া অত বাহারের সিংহাসন, বাইরের ঘরে থাকলে তবু পাঁচটা লোকে দেখতে পাবে। বাইরের ঘরের তক্তপোশ বা টিভিও বলিদান দেওয়া যায় না, মা কালী আগেই থেকেই বুদ্ধি খাটিয়ে দেওয়ালের ওপর চড়ে বসে আছেন, জায়গা না থাকার অজুহাতে আর যাকেই হোক তাঁকে ফেলে দেওয়া যাবে না। 

সিদ্ধান্ত নেওয়া শক্ত হল না। কালো চেয়ারদুটোর চেহারা ততদিনে আরও খোলতাই হয়েছে, মেরুন ঢাকনা জায়গায় জায়গায় ফাঁসা। ফেলে দেওয়া অবশ্য হল না, বাবা চোখ কপালে তুলে চেয়ারের খোঁদলময় হাতলে হাত বুলিয়ে বললেন, ফেলে দেব?! এ কাঠ আজকাল আর পয়সা দিলেও পাওয়া যায় না, জানো?

যতীনবাবু এলেন। চেয়ারদুটো টুকরো টুকরো করে ফেলে, শিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষে, দরকার মতো এদিকসেদিক জুড়ে বা ছেঁটে তাদের নতুন ফ্যাশানের দু'খানা চেয়ারে পরিণত করে ভ্যানে চাপিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেলেন। নতুন  চেয়ারেরা বারান্দায় অধিষ্ঠিত হলেন। তাঁদের সম্মানে বারান্দার মিনি সিলিংফ্যান ঝুলল। ফ্যানের তলায় সে চেয়ারে ক'বছর আগে পর্যন্ত ঠাকুমা বসে থাকতেন। এখন বাবামা বসে থাকেন। 


*****

সকালবিকেল কারিগাছে জল দিতে যাওয়ার সময় পার হওয়া ছাড়া এ বাড়ির একটা ঘর এখনও আমাদের কোনও কাজে লাগেনি। মাঝে মাঝে বলাবলি করি, কী লাভ হল বড় বাড়িতে এসে? ওই ঘরটা তো পুরো ওয়েস্ট। 

কিন্তু ব্যবহার করি না বলে একটা ঘরকে একেবারে ফাঁকা ফেলে রাখা যায় না। দুটো বুককেসের একটা ওই ঘরে রেখেছি, তিনটে বাঁধানো ছবির একটা ওই ঘরে টাঙিয়েছি। এখনও আমাদের বাড়িতে কেউ আসেনি কিন্ত আসতেও তো পারে? এলে ওই ঘরে বসতে দেব ঠিক করে রেখেছি। বসতে দিতে গেলে চেয়ার লাগবে। দুটো চেয়ার আছে আমাদের, লেখাপড়ার টেবিলদের সঙ্গে এসেছিল। বাড়াবাড়ি রকমের কেজো দেখতে।

অফিসের রিসার্চে আর অবান্তরের লেখায় ফাঁকি দিয়ে ইন্টারনেটের বাজারে চেয়ারের সন্ধানে নামলাম। বাজেটের মধ্যের পছন্দমতো চেয়ার খুঁজে খুঁজে বুকমার্ক করলাম। বাজেটের সামান্য বেশি অথচ চোখে- লাগছে-বেশ চেয়ারদেরও বাদ দিলাম না।

শুক্রবার লাঞ্চের পর 'আমি কী খেলাম তুমি কী খেলে' নিয়মরক্ষা ফোনে চেয়ারের কথা উঠল। বুকমার্ক করা গোটা পঞ্চাশ চেয়ার দেখতে উৎসাহী কি না জানতে চাইতে অর্চিষ্মান বলল, ওরে বাবা কুন্তলা, বস তাগাদা দিচ্ছে, অনেক কাজ। কাল সকালে চা খেতে খেতে বেছে অর্ডার দিয়ে দেব। 

তারপর বলল, জানো তো, বসার ঘরের জন্য একরকমের চেয়ারের খুব শখ আমার।

আমি বললাম, শুনি শুনি কী রকম।

সেই যে পুরোনো দিনের কাঠের চেয়ার হত না?...

আমার গলার স্বরে আতংক বেরিয়ে পড়ল। যে সব চেয়ারের পায়ার বদলে সিংহের থাবা থাকে?

অর্চিষ্মান বলল, কুন্তলা, আমারতোমার বসার ঘরে সিংহের থাবা পাগলের কাণ্ড দেখাবে।

সে তো দেখাবেই। 

থাবাটাবা নয়, সিম্পল স্ট্রেটফরওয়ার্ড কাঠের চেয়ার, খালি বসার আর পিঠের জায়গাটা সাদা বেতের ক্রিসক্রস।

আরও কী সব বলছিল অর্চিষ্মান, কিন্তু আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। উল্টোদিক থেকে দু'জন আসছিলেন হেঁটে হেঁটে। বেঁটেমতো, শ্যামলা রং। আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন। আমিও মুখ হাসি হাসি করলাম, করেই সম্বিত ফিরল, চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পরীক্ষা করে নিলাম পেছনের রাস্তাটুকু। দুপুর দুটোর আটচল্লিশ ডিগ্রি রোদে খাঁ খাঁ, অনেক দূরে একজন সিকিউরিটি ভাইসাব গাড়ির চাকার নিচে আয়না ধরে পরীক্ষা করছেন। যাক, ওঁরা আমাকে দেখেই হেসেছেন তার মানে। ক্যান্টিনে বা কনফারেন্সে কোথাও একটা দেখে থাকবেন নিশ্চয়। 

আন্টিজির দোকান থেকে চা খেয়ে এসে চেয়ার খুঁজছি, মিনিট দশেক বাদেই কাজ শুরু করব ভাবছি, স্ক্রিনের কোণে চ্যাটবাক্স মাথা তুলল। অন্যদিনের মতো ইউটিউবের না, গুগল ইমেজেস-এর লিংক। 

ei je eitar kotha bolchilam. bhalo na?

ক্লিক করলাম। ট্যাব খুলে গেল।

স্ক্রিন থেকে একটা চেয়ার আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চেয়ারটাকে আমি চিনি। সেই কালোকোলো বেঁটেখাটো ষণ্ডা চেহারা, সেই সামান্য হেলানো পিঠ, সেই বেতের বুনুনি। খালি মেরুন ঢাকনা নেই আর হাতলদুটো স্পটলেস।

*****


চেয়ারের নিচে যে দামটা লেখা ছিল সেটা দেখে হাসাও যায় কাঁদাও যায়। অফিসে বসে কোনওটাই করা উচিত হবে না মনে করে ট্যাব বন্ধ করে বেরিয়ে এলাম। চেয়ার খোঁজায় ক্ষান্ত দিয়ে অফিসের কাজে মন দিলাম। পরদিন সকালে চা খেতে খেতে অর্চিষ্মান বলল, তোমার বুকমার্ক করে রাখা চেয়ারগুলো দেখি চল।

আমি বললাম, না থাক। বরং ওই চেয়ারটার মতো কিছু জোগাড় করার চেষ্টা করা যাক। 

পুরোনো ফার্নিচারের মার্কেট দিল্লিতে বেশ কয়েকটা আছে। পঞ্চকুইয়া রোড, মুনিরকা, মহীপালপুরের দিকটায়, কীর্তিনগরে। আমাদের বাড়ির সবথেকে কাছে লাজপত নগরের অমর কলোনির ফার্নিচার মার্কেট। সেদিন দুপুরেই গেলাম। সারি সারি দোকান, কোনখানটায় একটা শেষ হয়ে অন্য দোকান শুরু হচ্ছে ঠাহর হয় না। দোকানের পেছন দিকে শিল্পীরা বসে কাঠের কাজ করছেন। বড় বড় ধাতব কুলার ঘরঘর ঘুরছে। 

বেতের বুনুনির কাঠের চেয়ার সব দোকানেই আছে বা অর্ডার দিলে তৈরি হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের সকলের চেহারাই আমার আর অর্চিষ্মানের পছন্দের সামান্য এদিকওদিক। হয় বাড়াবাড়ি রকম চওড়া হাতল, নয় সেটের অন্তর্গত -  আলাদা বিক্রি হবে না, নয় আমাদের বাজেটের বাইরে। চারটে দোকান দেখা হয়ে গেছে, মার্কেটের মুড়ো থেকে শুরু করেছিলাম ল্যাজা নজরে আসছে, এমন সময় একটা দোকানের সামনে এক ভদ্রলোককে কানে ফোন নিয়ে বসে থাকতে দেখলাম। ওঁরও মুখ বিরক্ত, আমরাও হতোদ্যম। ওঁকেই ধরলাম। আমাদের মাইলখানেক লম্বা স্পেসিফিকেশন শুনে ভদ্রলোকের মুখ আরও ব্যাজার হল। হাঁকিয়েই দিতেন হয়তো, কী মনে করে ফোন কেটে দিয়ে উঠলেন। বললেন, ওইরকম দুটো চেয়ার তিনি কোনও একটা কোণে পড়ে থাকতে দেখেছেন। 

শতশত সোফা, সেটি, কফি টেবিল, বাহারি বাক্স, গদি আঁটা চেয়ারের তলা থেকে তারা বেরোলো। আকারেপ্রকারে রিষড়ার বাড়ির চেয়ারদুটোর মতোই, কিন্তু বাড়ির চেয়ারদুটো শেষ অবস্থাতেও এদের সঙ্গে আত্মীয়তা স্বীকার করতে রিফিউজ করত। ধুলোয় ধুলোময়, বেতের ব নেই, সিট আর পিঠের জায়গায় দু'খানা হাঁ হাঁ গর্ত। ভদ্রলোক এতক্ষণে একটু নরম হয়েছিলেন, সান্ত্বনা দিলেন, ঘাবড়াবেন না, পালিশটালিশ করলে, বেতটেত বুনলে একদম নতুন হয়ে যাবে।  

সত্যি কথা বলতে কি ওঁর সান্ত্বনা শুনে নয়, ওই গরমে আর ঘুরতে পারছিলাম না বলেই 'যা থাকে কপালে' বলে অর্ডার দিয়ে দিলাম। গুড্ডুজি বললেন চার পাঁচ দিনেই হয়ে যাবে। হলে উনি ফোন করে জানিয়ে দেবেন। আমরা অ্যাডভান্স দিয়ে বানকাহিতে খেতে চলে গেলাম। 

গুড্ডুজির ফোন এল সোমবার লাঞ্চের আগেই। অফিসফেরতা চেয়ার নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। কাঠের স্বাভাবিক রং রেখে দিয়েছেন ওঁরা। ভালোই করেছেন। কালো রং করে দিলে ও চেয়ারজোড়ার দিকে তাকালে আমার গা ছমছম করত। 

আপাতত খালি ঘরে, একখানা বুককেস আর দু'খানা ছবির সঙ্গে অতিথির অপেক্ষায় দুজনে চুপটি করে বসে আছে। 

আর আমি অফিসের কাজ আর অবান্তরের লেখায় ফাঁকি দিয়ে ইন্টারনেটে ওদের জন্য মেরুন ঢাকনা খুঁজে বেড়াচ্ছি। 



June 13, 2018

৬ জুন, ২০১৮, সন্ধে



এই জন্য আমি যত্রতত্র কান থেকে গান খোলার বিরোধী। ট্যাক্সির রেডিওতে আর আমার ফোনের রেডিওতে এক চ্যানেলে একই গান বাজলেও আমি হেডফোনে সে গান শোনা পছন্দ করি। ছয়ই জুন অফিস থেকে ফেরার পথেও সে রকমই শুনছিলাম। কিন্তু যিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি মাঝেমাঝেই বিড়বিড় করছিলেন আর আমার আশঙ্কা হচ্ছিল আমাকে কিছু বলছেন বুঝি। ওঁর ওইদিকের কানে যে ব্লু টুথ গোঁজা আছে সে তো আমি দেখিনি। শেষটা কান থেকে হেডফোন খুলে 'হাঁ জি?' বললাম, ড্রাইভারজি মাথা নেড়ে বোঝালেন যে আমাকে কিছু বলেননি আর সেই ফাঁকে রেডিও থেকে এক মহিলার মিষ্টি গলা বেজে উঠে বলল, 'এই যে ছয়ই জুনের সন্ধে, এটা আর আপনার জীবনে কোনওদিনও আসবে না, ভেবে দেখেছেন?'

দেখিনি। আজকের সন্ধেটা যে আর কোনওদিন আসবে না, এই যে গ্রেটার কৈলাসের মেট্রো স্টেশনের সামনে রিকশা, অটো, পদাতিক, টেম্পো এবং বি এম ডবলুর জ্যাম ঠেলে পোঁ পোঁ হর্ন বাজিয়ে চলে যাচ্ছি, এক্স্যাক্ট এই জ্যাম ঠেলে আর কোনওদিন যাব না, আমার হাতে পায়ে শরীরের এই মুহূর্তের যে জোরটুকু, বুকের ভেতর টিমটিম করা আশাটুকু থাকবে না, গত সাড়ে সাঁইত্রিশ বছরের কত বিকেল এইভাবে আমার অচেতন মগজের পাহারা এড়িয়ে পালিয়ে গেছে, আরও কত পালিয়ে যাবে এবং আমার সিকিখানা উপন্যাসও লিখে ওঠা হবে না, এই সব নিয়ে আমি ওই মুহূর্তে সত্যিই ভেবে দেখছিলাম না। কিন্তু এই যে আপনি দেখালেন, আর চোখ বন্ধ করে থাকতে পারছি না। থ্যাংক ইউ। এবং এই ভাবনাটা আমার মাথায় নেক্সট অন্তত পঁয়তাল্লিশ মিনিটের জন্য ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যও। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। 

মগজের বক্রোক্তি বৃথা গেল, কারণ ভদ্রমহিলা ততক্ষণে হাওয়া হয়েছেন, কিশোর কুমার গাইছেন, 'জিন্দেগি কি ইয়েহি রীত হ্যায়/ হার কে বাদ হি জিত হ্যায়।' 

***** 

যত্রতত্র হেডফোন না খোলার মতো কিছু কিছু বিষয় নিয়ে না ভাবা আমার নীতি। যেমন,

১। আমার কেন কিছু হল না
২। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় আমি কতটুকু 
৩। আমার ভালোলাগা মন্দলাগা পছন্দ অপছন্দ নীতিবোধ মূল্যবোধ জাজমেন্টের গুরুত্ব কতখানি
৪। আমার এখনও সিকিখানা উপন্যাসও লেখা হয়নি
৫। আমার জীবনটা কী দ্রুততায় আমার মুঠো গলে পালাচ্ছে এবং আমি কেমন নিশ্চেষ্ট বসে বসে তাকে পালাতে দিচ্ছি

কারণ এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে বসলে মন খারাপ হওয়া গ্যারান্টি।

হলও। বুধবার অফিস সেরে সাপ্তাহিক টানেলের গভীরতম অংশ পেরিয়ে উইকেন্ডের আভাস পাওয়ার ফুর্তি নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠেছিল এক কুন্তলা, মার্কেট টু-এর সামনে ট্যাক্সি থেকে নামল সব কিছু ফুরিয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় ভুরু কোঁচকানো, ভয়ে দোমড়ানো আরেক কুন্তলা। 

ওই মুহূর্তে আশ্রয় দেওয়ার মতো খুব বেশি কেউ পৃথিবীতে নেই। যারা আছে, তাদের একজন, কপাল ভালো, হাতের কাছেই আছে। যেখানে ট্যাক্সি থেকে নামলাম, তার থেকে দেড় মিনিট হাঁটাপথ দূরত্বে। 

*****

আদিগন্ত হার্টব্রেকিং নিউজের মধ্যে একটাই ভালো খবর, দু'নম্বর মার্কেটের ফুচকা পরিস্থিতির উন্নতি। পদস্থ ফুচকা খেতে হলে আগে যেতে হত এক নম্বরে। সেখানে এত ভিড় যে পাঁচ মিনিট না দাঁড়ালে ফুচকা পরিবেশকের মাথা দেখা যায় না। একদিন আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে ফুচকা খেয়ে অপেক্ষারত জনতার কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে ছিটকে বেরিয়ে এসে আবার ঠেলাঠেলি করে দাম চুকিয়ে ফাঁকায় এসে দম ছাড়ছি, চেনা ঝালমুড়িওয়ালা কানে কানে বললেন, 'বলছিলাম কি দিদি, খেতে হলে ওই সাইডের দোকানে ফুচকা খাবেন, এখানে খাবেন না।' আমি বললাম, 'কেন কেন?' তিনি হাতজোড় করে বললেন, 'যা বলেছি তার বেশি বলতে পারব না দিদি, ক্ষমা করবেন, নেহাত আপনাকে চিনি, দোহাই আপনার, জোর করবেন না...'

তাঁকে শান্ত করে চলে এলাম, কিন্তু বুকের ভেতর খচখচ করতে লাগল। ফুচকা খাওয়া অস্বাস্থ্যকর জেনে নয়। অনেককেই অনেকরকম কনফিউশন নিয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দেন - ঈশ্বর আছেন না নেই, আংটি পরে নিয়তি বদলানো যায় কি না, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে না পৃথিবী সূর্যের, কিন্তু ফুচকা স্বাস্থ্যকর না অস্বাস্থ্যকর এই নিয়ে কোনও কনফিউশন কারও মনে নেই। আমারও না। ফুচকার চরম অস্বাস্থ্যকরতা নিয়ে আমি নিঃসংশয় এবং নিঃশঙ্কচিত্ত। ছোটবেলা থেকে অনেকবার মা ফুচকা তৈরির প্রণালীট্রনালি নিয়ে অনেকরকম প্রাণঘাতী সত্যি উদ্ঘাটন করেছেন, এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বার করেছি। কিন্তু এক, তখন আমার যৌবনের জোর ছিল, দুই, মায়ের কথা উড়িয়ে দেওয়া সোজা, তিন, আমি যদি ঝালমুড়ি ভদ্রলোকের মুখটা আপনাদের দেখাতে পারতাম তাহলে বুঝতেন ওঁকে উড়িয়ে দেওয়া অত সোজা নয়।

দু'নম্বর মার্কেটে বেশ ক'বছর ধরে ফুচকার স্টল বসছিল আর উঠছিল, জমছিল না। অবশেষে দাদুর চপের দোকানের সামনে একটা বসেছে। সে দোকানের ফুচকা, আলু, তেঁতুলজল সবই পারফেক্ট। আমি নিয়মিত খেয়েই বলছি, ফ্লুক নয়। অথেনটিক অস্বাস্থ্যকর ফুচকা। এমনকি যেদিন যেদিন ত্র্যহস্পর্শ ঘটে সেদিন আমার যৌবনের হেদুয়ার উল্টোদিকের ফুচকার কথা মনে পড়াতে পারে। এর মধ্যে একদিন মিউনিসিপ্যালিটির হল্লাগাড়ি এসে ফুচকার টেবিল তুলে দিয়েছিল। আমি এমনিতে খুবই আইনকানুন মানা মানুষ, ওলাউবারে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে কেউ বেল্ট না লাগালে আকাশের দিকে তাকিয়ে 'মাইন্ড ওভার ম্যাটার' বিড়বিড় করি, পাছে মুখ ফসকে 'দাদা/দিদি, বেল্ট লাগান প্লিজ' বেরিয়ে যায়। বাজারের যেখানেসেখানে ফুচকা, চুসকি, শোয়ারমা, মোমো, ঝালমুড়ি এসবের স্টল বসানো যে অন্যায় ও অনুচিত, সেও আমি জানি। কিন্তু সেদিন যখন ট্যাক্সি থেকে নেমে দূর থেকে ফুচকার স্টলের জায়গাটা খালি দেখলাম, বুক কেঁপেছিল। গা জ্বলেছিল। কোটি কোটি টাকা মেরে লোকজন বিদেশ পালাচ্ছে তাদের বেলা কিছু না, যত কোপ আমার ফুচকার ওপর? পরদিন যখন অকুতোভয় ছেলেগুলো ওই একই জায়গায় বসল এবং থপাস থপাস করে আলুসেদ্ধ চটকাতে চটকাতে শিস দিয়ে গান গাইল, গর্বে বুক ভরে উঠেছিল।

ছয়ই জুনের সন্ধেতে মিউনিসিপ্যালিটির হল্লাগাড়ি ছিল না, বাজারে কেনাকাটি ছিল, কিন্তু আগে মেজাজ সারানো দরকার। সোজা ফুচকার দিকে হাঁটলাম। এক প্লেট খেলাম। সেদিন ত্র্যহস্পর্শ ঘটেনি, ফুচকাগুলো একটু বেশি ভাজা হয়ে গিয়েছিল, ভাঙার পর মুখের এদিকওদিক খোঁচা মারছিল। অসুবিধে নেই। নেই ফুচকার থেকে ধারালো ফুচকা ভালো। ছ'পিস হয়ে যাওয়ার পর বাটিতে জমা তেঁতুলজলে চুমুক দিয়ে বললাম, আরেক প্লেট দাও। আমার যে রকম মনখারাপ এক প্লেটে কাটবে না। (দ্বিতীয় বাক্যটা বলিনি।) নুন আর কাঁচা লংকাটাও আরেকটু ঠেসে দিতে অনুরোধ করলাম। নাক দিয়ে জল গড়াক, চোখের জলে মগজের বিষ বেরিয়ে যাক। শক শোককে লাথি মেরে তাড়াক। 

বাজারে অনেকগুলো কাজ ছিল, তার মধ্যে ঝাড়ু কেনা অন্যতম। ঝাড়ু কিনতে গেলেই আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। ছোটবেলায় লজ্জা পেতাম এমন অনেক বিষয় নিয়ে - শরীর, ইংরিজি বলা - আমার লজ্জা সম্পূর্ণ কেটে গেছে। ঝাড়ু কেনা বা বলা উচিত কেনা ঝাড়ু বওয়া নিয়েও। মায়ের সঙ্গে বাজার থেকে ফেরার সময় বাকি সব বয়ে দিতে আমি রাজি থাকতাম, খালি ঝাড়ু ছাড়া। আমার ধারণা ছিল ঝাড়ু হাতে নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটলে লোকে আমার দিকে তাকাবে, আর লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার থেকে পাতালপ্রবেশ করাও ভালো।

হলধরের মতো কাঁধে ঝাড়ু চাপিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ির দিকে চললাম। ছোটবেলার ঝাড়ু বওয়া সংক্রান্ত অস্বস্তির কথা, আমি কেমন বড় হয়ে গেছি, লোকের তাকানোতে মোটেই ঘাবড়াই না, সবথেকে বড় কথা সবারই নিজের কাজ আছে, কেউ আমার দিকে তাকিয়ে বসে নেই, ভাবতে ভাবতে রাস্তা পেরোলাম। এমন সময় ঘেউ ঘেউ কানে এল। পাড়ার কুকুরগুলো আমাকে চেনে তবু চেঁচাচ্ছে কেন আমাকে দেখে? নাকি আমার ঝাড়ু দেখে? তারপর ঝপাং ঝপাং শব্দ আর মানুষের গলায় 'হেই হেই হ্যাট হ্যাট' শুনে ঘাড় তুলে দেখি সি আর পার্কের গলির ওপর ঝুঁকে পড়া দুদিকের আমগাছের ডালে ডালে প্রবল আন্দোলন। পাতার ফাঁকে লম্বা বাদামি লেজ বিদ্যুৎরেখার মতো ঝলসাচ্ছে।

গোটাবিশেক হনুমান। গাছ থেকে গাছে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পাতা ছিঁড়ছে, আম ছিঁড়ছে, আঁটি ছুঁড়ছে। গাছের মালিকরা ঘরের ভেতর ঘাপটি মেরে থেকে বুক চাপড়াচ্ছেন, তম্বি করছেন। বিন্দুমাত্র কাজ দিচ্ছে না।  

বাঁদর নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা ভালো নয়, ক'মাস আগে চিতোরদুর্গে আক্রান্ত হওয়ার স্মৃতি এখনও টাটকা, কাজেই আমি ভগবানকে ডাকতে ডাকতে হাফ হাঁটা হাফ ছোটা লাগালাম। ভাগ্যিস বাড়ি কাছে এসে গিয়েছিল। বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকে, সিঁড়ি বেয়ে উঠে, ঝাড়ু সামলে, বাজারের থলি সামলে, অফিসের ব্যাগ হাঁটকে চাবি বার করে দরজার গর্তে ঢোকাতে যাব…

এটা এই দরজার চাবি নয়। আমি আমার পুরোনো ভাড়াবাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। 

*****

ছয়ই জুন, দু'হাজার আঠেরোর বিকেলটা চিরদিনের মতো চলে গেল বলে যা যা হল অবান্তরে লিখে রাখলাম। যাতে ভুলে না যাই। 



June 12, 2018

তা বলে ১৪৪ চরিত্রেও নয়



মাঝে মাঝে জীবনে ক্ষুদ্র তুচ্ছ ঘটনারা ঘটে। হাসির, রাগের, দুঃখের বা হতভম্বের। তাদের নিয়ে একা একা হাসা যায় কিংবা চোখ গোলগোল করে বসে থাকা যায় ফাঁকা ঘরে, কিন্তু ঢাক পিটিয়ে লোক জানাতে পারলে আরও ভালো। শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং। অবান্তরে সে সব নিয়ে পাঁচশো শব্দের পোস্ট লিখতে আলস্য লাগে, অকারণ ফেনাতে হয়। তখন বুঝি টুইটার কোন ফাঁকটা ভরাট করেছে।

আজ সকালে সে রকম একটা ঘটনা ঘটল। একবিন্দু বাড়িয়ে বলছি না। যা লিখছি নির্জলা সত্যি।

অবান্তরের পরের পোস্ট টাইপ করা থামিয়ে উঠে দ্বিতীয় কাপ চা আনতে রান্নাঘরে গেছি, অর্চিষ্মান অকাতরে ঘুমোচ্ছে। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে খুশি হয়ে জোরে জোরে গেয়ে উঠলাম, 'আমি কি তোমায় খুব বিরক্ত করছি?'

অর্চিষ্মান নড়ে উঠে ঘুমজড়ানো গলায়, 'না না, সেকি, হঠাৎ বিরক্ত করবে কেন, একটুও করছ না, সত্যি।'  বলে ওপাশ ফিরে বালিশ জড়িয়ে আবার তলিয়ে গেল ঘুমের ঘোরে।


June 11, 2018

বানকাহি, অসম ভবন



স্টেট ভবন ক্যান্টিনে খেতে যাওয়া এবং সেই নিয়ে অবান্তরে পোস্ট লেখার সমস্যাটা হচ্ছে, একসময় রাজ্যের স্টক ফুরিয়ে যেতে বাধ্য। ঊনত্রিশটি রাজ্য এবং সাতটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ক্যান্টিনেই আমরা খেয়েছি এমন দাবি করি না। কারণ এক, সব রাজ্যের ক্যান্টিনে আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকের প্রবেশাধিকার নেই, যেমন জম্মু কাশ্মীর। একসময় ছিল, বছর সাতেক আগে খেয়েছিলাম, ইয়াব্বড় বড় গুশতাবা আর সিল্কের মতো ইয়াখনি, কিন্তু তখন ব্লগে লেখার আইডিয়া মাথায় আসেনি, এখন আর যাওয়া যায় না, কাজেই বাদ। উত্তরপূর্ব ভারতের কয়েকটি রাজ্যের ক্যান্টিনে কখনও কখনও যাওয়া যায়, কখনও যাওয়া যায় না। দুই, কিছু রাজ্যের ক্যান্টিনে যাওয়ার উৎসাহ বোধ করিনি, কারণ সে সব রাজ্যের ক্যান্টিন হয় নেই নয় যা পাওয়া যায়, ইডলি দোসা, বাটার চিকেন, বাইরের দোকানেও পাওয়া যায়। হয়তো বেটার পাওয়া যায়। 

কিছু ক্যান্টিন রিপিট করেছি। বিহার অগুনতিবার, মহারাষ্ট্র অর্চিষ্মান এবং অন্যান্য লোকের সঙ্গে ঘুরিয়েফিরিয়ে বারতিনেক, অন্ধ্রপ্রদেশ আমি রাজি থাকলে প্রতি দু'সপ্তাহেই রিপিট হত, কিন্তু আমি রাজি নই। 

অসম রিপিট করার একটা ছুতো মিলে গেল সম্প্রতি। অসম ভবনের ক্যান্টিন জাকোই বন্ধ হওয়ার খবর পেয়েছিলাম কিছুদিন আগে। গত সপ্তাহের শুরুর দিকে পেলাম বানকাহি খোলার খবর। নতুন মালিক, নতুন রেস্টোর‍্যান্ট। রিভিউ পজিটিভ, কাজেই দেরি করার মানে হয় না। এই শনিবারই হয়ে যাক।

শনিবার সকালে রুটিন না থাকাটা যেমন আরামের, তেমনি ঝামেলারও। তাছাড়া নতুন বাড়িতে সেটল করার পর্ব এখনও থামেনি। অনেক কাজ জমানো ছিল। সে সব সেরে ট্যাক্সিতে উঠে টের পেলাম সকালের ব্রেকফাস্ট মিস হয়ে গেছে। 


সর্দার প্যাটেল মার্গ আর কৌটিল্য মার্গের সংযোগস্থলে অবস্থিত অসম ভবনের বেসমেন্টে বানকাহি। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। চাইলে বাইরে বসা যায়। সুন্দর ঘের দেওয়া বসার জায়গা আছে। কিন্তু দিল্লির মধ্যজুনের এই বাজারে দুপুর দুটোর সময় বাইরে বসতে কেউই চাইবে না। ভেতরটাও ছবি, আলোটালো দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। আমরা পৌঁছলাম যখন দু'জন খাচ্ছিলেন, আমাদের অর্ডার আসতে না আসতে গোটা খাবার ঘর ভরে গিয়ে গমগম করতে লাগল।

রিভিউ পড়ে সন্দেহ হয়েছিল, আশেপাশের সব টেবিলের অর্ডার দেখে নিশ্চিত হলাম, বানকাহির জনপ্রিয়তম ডিশ এইটা। বড়া প্ল্যাটার। পুদিনা ধনেপাতার চাটনির বাটি ঘিরে বিবিধ বড়া ভাজার সমাহার। ডালের বড়া, পোস্তর বড়া, কালো তিল বাটার বড়া। যে বড়াটি অচেনা সেটি হল কারি পাতার বড়া। বেসনে ডুবিয়ে ভাজা কারি পাতা যে খেতে এমন সুস্বাদু হতে পারে, ভাবা যায় না। ডাঁটিশুদ্ধু ভাজার জন্য দেখতেও স্ট্রাইকিং।


বানকাহির মেনুতে স্টার্টার, মেন কোর্স থেকে শুরু করে ডেজার্ট সবই আছে, কিন্তু অপরিচিত বা অল্পপরিচিত কুইজিনের দোকানে খেতে গেলে সবথেকে সোজা এবং নিরাপদ যে অর্ডার, আমরা সেটাই করলাম। ভেজ এবং ননভেজ থালি। 

ভেজ থালিতে ভাত ঘিরে লেবু লংকা কাসুন্দি, ক্ষার, আলু পিটিকা (আলু সেদ্ধ), বেগুন পোড়া, আলু পেঁপের তরকারি, আলু পোস্ত, ডাল (কী ডাল আমি চিনি না, মুগ বা মুসুর তো মনে হল না), ডালের বড়ার টেংগা (টক),  রাঙা আলুর পিটিকা।


ননভেজ থালিতে এ সবের সঙ্গে, আলু পোস্ত আর বড়ার টেংগার বদলে মাছ ও মুরগি। 

অর্চিষ্মানের বেস্ট লেগেছে ক্ষার। যেটা বেসিক্যালি বেশি করে সর্ষের তেল দিয়ে বানানো পেঁপের শুক্তো। সত্যি সত্যি ওই দিয়েই অনেকটা ভাত খেয়ে নেওয়া যায়। রান্নায় এঁদের সর্ষের তেলের ব্যবহার মন ভালো করে দেওয়া। পেঁয়াজকুচি দিয়ে মাখা আলুভাতে মুখে দিলেও সেই চেনা ঝাঁজের ঝটকা। ঝটকা অবশ্য যদি চান তাহলে তরকারি ছেড়ে লেবু ও লংকার সঙ্গে আসা কাসুন্দির এই ছোট কিন্তু এফেক্টিভ গুলিটিই যথেষ্ট। 


আলুপোস্ত তো খারাপ লাগার কথা নয়, লাগেওনি, পেঁপের তরকারিও অনেক সময় আমি নিজের বাড়িতে খেতে পারি না, বানকাহির বাটি সাফ করে খেয়েছি। কাগজি লেবু চিপে ডালের বাটিও প্রায় ফাঁকা করে দিয়েছি। ডালের বড়ার ঝোল রিষড়ার বাড়িতে হত খুব। কয়েকটা বড়া ভাজা অবস্থায় রেখে দেওয়া হত ডালের সঙ্গে খাওয়ার জন্য। বংশের বাতি হওয়ার সুবাদে আমি ভাজা হওয়ার সময়েও পেতাম, আবার বাকিরা যখন ডালের সঙ্গে খেত তখনও। এখানে অবশ্য সে সব খাতিরের সম্ভাবনা নেই, কিন্তু বাড়ির কথা মনে পড়াতে পারাও সোজা নয়, বানকাহি সেটা পেরেছে। এঁদের টেংগা আমি আগেও খেয়েছি, ভালো লেগেছে। রান্নায় ঝাল ছাড়া টক, মিষ্টি ইত্যাদি আমি বিশেষ পছন্দ করি না, সেই আমারও ভালো লেগেছে। ঠাকুমা টকের অতি বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, ঠাকুমার নিশ্চয় আরও ভালো লাগত।

কারি পাতার বড়া বাদ দিয়ে আমার সেকেন্ড বেস্ট যেটা লেগেছে সেটা অবশ্য থালিতে নেই। সেটা আমরা আলাদা করে অর্ডার করেছিলাম। জোলাকিয়া ভাত। ভুবনবিখ্যাত জোলাকিয়া মরিচ আর রসুন ফোড়ন দেওয়া। সোজাসাপটা, ফুরফুরে ফ্রায়েড রাইসের কথা ভাবুন, আর প্রতি গ্রাসের পর গলার কাছটায় একটা হালকা ঝাঁজের ছোঁয়া কল্পনা করুন। সঙ্গে বেগুন কিংবা আলু ভাজা বা কারি পাতা ভাজা থাকলেও আমার আর কিছু লাগবে না, প্রমিস। জোলাকিয়া জোগাড় করার উদ্যম নেই, কিন্তু গোলমরিচ রসুন দিয়ে ভাজা ভাত বাড়িতে করাই যায়। ট্রাই করে দেখব একদিন।


ননভেজ থালির মাছ মাংসও অতি উমদা কোয়ালিটির। মাছের অত বড় পিস আমাদের আশার বাইরে ছিল। বানকাহির বাকি পদের কথা বলতে পারি না, কিন্তু ভেজ আর নন ভেজ থালি অবাক করার মতো কম দাম। 

রাঙা আলুর পিটিকা আমি খাইনি, কারণ খেলে ডাক্তার ডাকতে হত। ওই সব বাটি শেষ করার (প্লাস অর্চিষ্মানের থালির বেগুনপোড়ার বাটি) আমার ওই সুদৃশ্য সিটে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছিল। অর্চিষ্মানের অবস্থাও তথৈবচ। ভীষণ ইচ্ছে ছিল শেষ পাতে আসাম চায়ের সঙ্গে নারিকোলের লাড়ু খাব, কিন্তু তখন খাওয়ার চোটে নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কোনওমতে ঠোঁট নেড়ে একে অপরকে 'ভাগ্যিস ব্রেকফাস্ট করিনি' বলে হাই ফাইভ দিলাম। লাড়ুর প্রশ্নই নেই, কিন্তু চা না খেলে উঠে আসতে পারব না। 


বানকাহিতে আসাম টি মানে টুইনিংস-এর টি ব্যাগ। বিশুদ্ধতাবাদীরা বিচলিত হবেন হয়তো। আমাদের পাশের টেবিলে একদল বসেছিলেন, দু'পক্ষই দু'পক্ষকে চোখে চোখে রাখছিলাম, যেই না আমাদের চা এল পাশ থেকে উত্তেজিত ফিসফিস শোনা গেল, 'টি ভি মিলতা হ্যায়? হোয়াট কাইন্ড অফ টি ইজ দ্যাট?' যেই না দেখলেন আমাদের টি ব্যাগের লেজ টি পটের গা বেয়ে ঝুলছে, বললেন, 'মাই ঘ্যাড, টি ব্যাগ?' বলে পরিবেশককে হুকুম করলেন, 'সাউথ ইন্ডিয়ান ফিল্টার কাপি লাও, জলদি।'


এই পাত্রটিকেই নাকি বলে বানকাহি। এটি মিনিয়েচার সংস্করণ। 

বিল মেটানোর সময় মালিকের সঙ্গে আলাপ হল। ভদ্রলোক পরিষ্কার বাংলা বলেন, সি আর পার্কের বি ব্লকে থাকেন, ওঁর মেয়ে আই ব্লকে থাকে। ভারি ভদ্রলোক। ওঁর সঙ্গে কথা বলে বানকাহি রিপিট করার ইচ্ছেটা একেবারে ঝাণ্ডা গাড়লো। আপনারা যদি আশেপাশে থাকেন বানকাহি যাবেন অবশ্য করে। যেদিন যাবেন মনে করে ব্রেকফাস্টটা বাদ দেবেন। 



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.