July 24, 2017

ম্যাগপাই মার্ডারস



উৎস গুগল ইমেজেস

লন্ডনের মাঝারি প্রকাশনা সংস্থা ক্লোভারলিফ পাবলিশিং। সংস্থার কর্ণধার চার্লস ক্লোভার। সুসান রাইল্যান্ড সংস্থার এডিটর এবং চার্লস ক্লোভারের ডানহাত। ক্লোভারলিফ এবং সুসান রাইল্যান্ডের পোর্টফোলিও-র সবথেকে বড় কুমীরছানা, রহস্যলেখক অ্যাল্যান কনওয়ে। কনওয়ে আগাথা ক্রিস্টি, ডরোথি সেয়ার্স ঘরানার চ্যাম্পিয়ন লেখক এবং কনওয়ের গোয়েন্দা অ্যাটিকাস পিউন্ড, পোয়্যারোর সার্থক উত্তরাধিকারী।  

পিউন্ড সিরিজের আটটা উপন্যাস সাফল্যের সব রেকর্ড ভেঙেছে। নবম এবং সিরিজের শেষ উপন্যাস ‘ম্যাগপাই মার্ডারস’-এর পাণ্ডুলিপি এসে পৌঁছেছে ক্লোভারলিফের অফিসে, অফিস থেকে রাইল্যান্ডের হাতে। রাইল্যান্ড পড়তে শুরু করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও। 

উনিশশো পঞ্চান্ন। স্যাক্সবি অন অ্যাভন ছোট্ট ঘুমন্ত গ্রামে পরপর দুটো মৃত্যু ঘটে। প্রথম মারা যান মেরি ব্ল্যাকিস্টন নামের একজন গৃহপরিচারিকা। গ্রামের সবথেকে বড়লোক স্যার ম্যাগনাস পাই-এর অট্টালিকা পাই হল, সেই হলের সিঁড়ির নিচে তাঁর দলামোচড়ানো মৃতদেহ আবিষ্কার হয়। বোঝাই যাচ্ছে কী হয়েছে। সিঁড়ির ওপরে রাখা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের এলোমেলো দড়িতে পা পেঁচিয়ে পতন এবং মৃত্যু। সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই। দ্বিতীয় মৃত্যুও ওই সিঁড়ির নিচেই, এবার শুধু চাকরের বদলে মালিক, স্যার মাগনাস স্বয়ং, আর এবারেও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই, রক্তে ভাসাভাসি হলের একদিকে স্যার পাইয়ের দেহ, আর দেহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মুণ্ডু গড়াগড়ি খাচ্ছে হলের অন্য দিকে। ওয়েপন অফ মার্ডার, ওই হলেরই একপাশে দাঁড় করানো সৌন্দর্যবর্ধক বর্মপরিহিত সেনামূর্তির হাতের তলোয়ার। সেটিও চুপটি করে শুয়ে রয়েছে ওই রক্তের সমুদ্রে। 

অ্যাটিকাস পিউন্ড, তাঁর সহকারী জেমস ফ্রেজারকে নিয়ে এলেন স্যাক্সন বাই অ্যাভন-এ রহস্যের সমাধান করতে। স্যাক্সন বাই অ্যাভন-এর শান্ত, নির্ঝঞ্ঝাট বর্ণনা শুনলে আপনার সেন্ট মেরি মিড-এর কথা মনে পড়বেই, আর মনে পড়বে সেন্ট মেরি মিড-এর সবথেকে বিখ্যাত বাসিন্দা মিস মার্পলের সেই অমোঘ বাণী। অণুবীক্ষণের তলায় এই শান্ত জীবনের একফোঁটা ফেলে দেখুন,  মাথার চুল খাড়া হয়ে যাবে। সাসপেক্টে থিকথিক করছে। মেরি ব্ল্যাকিস্টনের বদরাগী ছেলে রবার্ট আছে, এসট্রেঞ্জড স্বামী আছে, গ্গোলমেলে ভিকার এবং ভিকারের স্ত্রী আছেন, প্রতিশোধস্পৃহায় জরজর স্যার ম্যাগনাসের নিজের বোন আছেন, গ্রামের সবার হাঁড়ির খবর জানা ডাক্তার আছেন, এছাড়াও অশিক্ষিত বড়লোক আছে, লন্ডন থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা সন্দেহজনক ব্যবসায়ী আছে। আর এঁদের প্রত্যেকের কোটি কোটি মোটিভ এবং অপরচুনিটি আছে। বহুদিন আগে ঘটা আরেকটি মৃত্যুও আছে, অ্যাটিকাস পিউন্ড নিশ্চিত, যে মৃত্যুর ছায়া ঝুলে আছে এই গ্রামটির ওপর।

গল্প প্রায় শেষ হয় হয়, ক্লাইম্যাক্স আসন্ন, পিউন্ড তাঁর সহকারী ফ্রেজারকে বলে ফেলেছেন যে তিনি জানেন কে খুন করেছে। এমন সময় কিন্ডলের পাতা উল্টে আপনি হঠাৎ দেখলেন সুসান রাইল্যান্ড আবার ভেসে উঠেছেন কোথা থেকে। বলছেন, “অ্যানয়িং, ইজন’ট ইট?”

ভেরি, ভেরি অ্যানয়িং। সত্যি বলতে কি এতক্ষণে সুসান রাইল্যান্ড, ক্লোভারলিফ পাবলিশিং, আধুনিক লন্ডন এসব হিজিবিজির কথা আপনি ভুলেই গিয়েছিল, হঠাৎ কাঁচা ঘুম ভাঙানোর মতো করে সুসানের এই আবির্ভাবটা আপনি মোটেই ভালো চোখে দেখছেন না।

সুসানের ওপর রাগ করে লাভ নেই, ওঁর হাত পা বাঁধা, কারণ ম্যাগপাই মার্ডারস-এর পরের পাতাগুলো নেই। 

নেই? আপনি হাঁ করে তাকিয়ে থাকবেন। নেই মানেটা কী? আড়াইশো পাতা ধরে একটা গোয়েন্দা গল্প পড়ার পর বলে কি না লাস্ট চ্যাপ্টার নেই?

সত্যি নেই। সুসান চার্লসকে জিজ্ঞাসা করলেন, কনওয়ের ফোল্ডার যে রিসিভ করেছে সেই কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করলেন, সবাই বলল, যা এসেছে তোমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভেতরে কী আছে না আছে আমরা দেখিনি। অগত্যা সুসান গেলেন অ্যাল্যান কনওয়ের বাড়ি। কনওয়েকে সুসান একটুও পছন্দ করতেন না। খিটকেল প্রকৃতির লোক। বিশ্বশুদ্ধু সবাইকে চটিয়ে চলতে পছন্দ করে। প্রকাশক, এডিটর, টিভি প্রযোজক। তবু ম্যাগপাই মার্ডারস-এর শেষটুকু যেহেতু উদ্ধার করতেই হবে, সুসান কনওয়ের বাড়িতে গেলেন এবং দেখলেন কনওয়ে তার সম্প্রতি কেনা প্রাসাদোপম অট্টালিকার ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মরে গেছে। 

সুইসাইড নোটটোট পাওয়া গেল। সবাই দুঃখসূচক শব্দ করে মাথা নেড়ে বলল, ইংরিজি সাহিত্যের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। কিন্তু সুসান সারাজীবন ধরে গোয়েন্দাগল্প গুলে খাচ্ছেন, সুসান বুঝে গেলেন আসলে কী হয়েছে। তাছাড়া ম্যাগপাই মার্ডারস-এর শেষ চ্যাপ্টারটাও নেই কোত্থাও, স্রেফ উবে গেছে।

সুসান কাজে নামলেন। কাজটা খুব একটা সহজ হল না, কারণ সুসান অ্যাটিকাস পিউন্ড নন। এখানেসেখানে ঠোক্কর খেতে খেতে সুসানের ম্যাগপাই মার্ডারস-এর শেষ চ্যাপ্টার খোঁজা বা অ্যালান কনওয়ের মৃত্যুরহস্য সমাধান এগোল আর যত এগোল তত হতভম্ব হয়ে গেলেন সুসান। 

আর্ট ইমিটেটস লাইফ না লাইফ ইমিটেটস আর্ট? এ তো হুবহু ম্যাগপাই মার্ডারস-এর গল্প। অ্যাল্যান কনওয়েকে যদি স্যার ম্যাগনাস পাই হিসেবে কল্পনা করে নেওয়া যায়, যেটা একেবারে অযৌক্তিকও নয়, কারণ দুজনেই অভদ্র, নাকউঁচু, বদমেজাজি, লোক চটানোয় পি এইচ ডি, তাহলেই গোটা ঘটনাটা বইয়ের পাতার বাস্তব “ম্যাগপাই মার্ডারস” হয়ে যায়।  মিল শুধু ভিকটিমে নেই, তাঁদের আশেপাশের চরিত্ররাও যেন একে অপরের প্রতিচ্ছায়া, সেই অবহেলিত বোন, সেই অপমানিত স্ত্রী, সেই সিক্রেট পুষে রাখা ভিকার দম্পতি…

*****

গল্প হল, এবার গল্পের সমালোচনা। গল্পের নৈর্ব্যক্তিক সমালোচনা কী ভাবে করা যায় বা আদৌ যায় কি না সেটা তর্কের বিষয়। তবে নৈর্ব্যক্তিক হোক বা না হোক, যে কোনও সমালোচনার মূল তিনটে মাপকাঠি থাকে, তারা হল, এক, প্লট; দুই, চরিত্র; তিন, পারিপার্শ্বিক।

ওপরের গল্প শুনেই বুঝতে পেরেছেন আশা করি, ম্যাগপাই মার্ডারস-এর প্লট যথেষ্ট জটিল, কারণ ম্যাগপাই মার্ডারস হচ্ছে একটি গল্পের মধ্যে আরেকটা গল্প। তবে গল্পগুলো একাএকাও যথেষ্ট জটিল। রেড হেরিং, ক্লু, টুইস্টে ছয়লাপ। যদিও কোনওক্ষেত্রেই সে জটিলতা বুদ্ধির অগম্য হয়নি। সন্দেহভাজন চরিত্র, অগুন্তি। এটা অ্যান্থনি হরোউইটজ-এর থেকে আশা করাই যায়, কারণ এই হরোউইটজ-ই সৃষ্টি করেছিলেন 'মিডসমার মার্ডারস'। অবান্তরে মিডসমার মার্ডারস-এর কথা লিখেছি আগে, এখন সে পোস্টের লিংক খুঁজে বার করতে ইচ্ছে করছে না। আমার অন্যতম প্রিয় গোয়েন্দা টিভি সিরিজ। 'মিডসমার মার্ডারস' এবং 'ম্যাগপাই মার্ডারস', হরোউইটজ-এর দুই সৃষ্টিরই অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাসপেক্টের সংখ্যাধিক্য। গ্রামশুদ্ধু লোকেরই ভিকটিমের প্রতি রাগ, সেই সঙ্গে খুনের অপরচুনিটিও। সাসপেক্ট বেশি হওয়ার পক্ষেবিপক্ষে মত দুইই আছে। আমার নিজের মত অধিকন্তু ন দোষায়ঃ, কারণ তাতে সন্দেহটা অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে। সাসপেক্ট কম হলে খুনীকে ধরে করে ফেলার প্রবাবিলিটি বেড়ে যায়, সাম্প্রতিক কালে পড়া একটা গল্পে যা ঘটেছে। আমি মোটেই সেটা চাই না। খুনী ধরার দৌড়ে আমি লেখকের কাছে হারতেই চাই। 

চরিত্রসংখ্যা বেশি থাকলে মাপকাঠির তৃতীয় বিষয়টাতেও সুবিধে। অর্থাৎ পারিপার্শ্বিক সৃষ্টি বা ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং। বর্ণনা দিয়েও সে উদ্দেশ্য লেখক সাধন করতে পারেন, এই একটা পুকুর, ওই একটা গাছ, এই ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে।কিন্তু তা নিতান্ত বোরিং হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। অনেকটা বেড়াতে গিয়ে খালি পাহাড় নদী ঝরনার ছবি তোলার মতো। পাঁচ বছর বাদে কোথাকার পাহাড়, কোথাকার নদী কিচ্ছু চেনা যাবে না, অথচ সে নদীর পাড়ে কাব্যিক মুখে কিংবা ভি চিহ্ন দেখিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে, সব ছবির মতো মনে থাকবে।

গোয়েন্দাগল্পের গুণ বিচারে এই তিনটে বিষয়ের বাইরে আরও একটা জিনিস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা হল গোয়েন্দা। 'ম্যাগপাই মার্ডারস'-এর একটা চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে এখানে আপনি এক দামে দুই গোয়েন্দা পাচ্ছেন। অ্যাটিকাস পিউন্ড, ম্যানারিজমে ভরপুর, বোকা সহকারী, শেষ সিনে সবাইকে বসিয়ে সব বুঝিয়ে দেন। আমার মতো সেকেলে পাঠকদের জন্য আদর্শ। আবার যারা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চান, তাঁদের জন্য আছেন সুসান রাইল্যান্ড। আধুনিক “গার্ল” ঘরানার রহস্যরোমাঞ্চ গল্পের হিরোদের মতো সুসান গোয়েন্দা নন, গোলেমালে গোয়েন্দার ভূমিকায় নামতে হয়েছে। গল্পের মাঝে মাঝে তার ব্যক্তিগত জীবনের দোলাচল উঁকি দিয়ে যায়। তার ক্যারেকটার আর্ক হবে সাংঘাতিক। গল্পের শুরুতে আর শেষে সে সম্পূর্ণ দুটো আলাদা মানুষ। 

ম্যাগপাই মার্ডারস আমার ভালো লাগার আরও একটা কারণ আছে। এ গল্পের চরিত্ররা কিংস অ্যাবট নামের গ্রামে থাকে, ব্লু বোর ক্যাফেতে চা খায়, চারটে পঞ্চাশের ট্রেনে চাপে। আগাথা ক্রিস্টির ভক্তদের কাছে এ বই একাধারে বই এবং ট্রেজার হান্ট। 

শুধু ভালো বললে রিভিউর মান থাকে না, তাই দুটো খারাপ লাগার কথা বলব। দুটোই অকিঞ্চিৎকর। এক, উপন্যাসের দুটো অর্ধেরই শুরুর দিকে এক্সপোজিশনের আধিক্য আছে, অর্থাৎ আগে কী হয়েছিল তার প্যারাগ্রাফের পর প্যারাগ্রাফ ধরে ব্যাখ্যা। দুই, কিছু কিছু ক্লু গতে বাঁধা, পড়ামাত্র আপনি সেগুলোকে ক্লু বলে চিনতে পারবেন।

অ্যান্থনি হরোউইটজ সেই গোত্রের মানুষ, যারা অতি অল্প বয়সেই নিজের লক্ষ্য চিনে ফেলেন এবং তার পর একবিন্দু সময় নষ্ট করেন না। ইংরিজি সাহিত্য আর আর্ট হিস্টরি নিয়ে ইউনিভার্সিটি থেকে বেরোনোর পর কপি এডিটরের চাকরি নিয়েছিলেন তিনি এবং “wrote in every spare minute  কুড়ি বছর বয়স থেকে পেশাদার ভাবে লিখে চলেছেন অ্যান্থনি হরোউইটজ, বাষট্টি বছরে এসে এই প্রথম নিজের গল্প, নিজের চরিত্রদের নিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গোয়েন্দা উপন্যাস ছাপালেন। মাঝের চল্লিশ বছরে তিনি ছোটদের জন্য স্পাই গোয়েন্দা ঘরানার বিপুল জনপ্রিয় সিরিজ লিখেছেন, টিভির বিখ্যাত গোয়েন্দা সিরিজ বানিয়েছেন। 'মিডসমার মার্ডারস'-এর কথা তো আগেই বলেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের প্রেক্ষাপটে বানানো 'ফয়েল’স ওয়ার'-ও হরোউইটজ-এর সৃষ্টি। ডেভিড সুশের পোয়্যারো সিরিজেরও বহু এপিসোডের অ্যাডাপ্টেশনের দায়িত্ব তাঁর ছিল। শার্লক হোমসের দু’দুখানা অফিশিয়াল প্যাস্টিশ লিখেছেন হরোউইটজ।

ম্যাগপাই মার্ডারস-এ প্রকাশনা জগত একটা বড় জায়গা নিয়ে আছে (এ প্রসঙ্গে রবার্ট গ্যালব্রেথের 'দ্য সিল্কওয়ার্ম'-এর কথা মনে পড়েছে অনেকের) লেখকের ইগো, বিশ্বাসের অভাব, খ্যাতির মোহ এ সবই নিশ্চয় খুব কাছ থেকে দেখেছেন হরোউইটজ নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়, সে সব ফুটে বেরিয়েছে ম্যাগপাই মার্ডারস-এ। আরও একটা বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন হরোউইটজ, সেটা হচ্ছে সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার সম্পর্ক। অনেকক্ষেত্রেই একটা সময় কেটে যাওয়ার পর সম্পর্কটা ফ্রাংকেনস্টাইন ও ফ্র্যাংকেনস্টাইনের দৈত্যের মতো হয়ে পড়তেও পারে। তখন কে যে লিখছে আর কে যে বেঁধেমেরে লিখিয়ে নিচ্ছে, তার ফারাক গুলিয়ে যায়। অনেক সময় এও হয়, লেখক যা লিখতে চান তা লিখতে পান না, পেট চালানোর জন্য যা লেখেন তার প্রতি নিজের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা থাকে না। ঘরানা গল্পের লেখকদের মধ্যে এ জিনিস হওয়ার চান্স বেশি। “লিটারেরি” হতে গিয়ে “জনেরিক” হয়ে যাওয়ার উদাহরণ  কম নেই। তখন মরো সারাজীবন দগ্ধে দগ্ধে। 

এই শেষের সমস্যাটা অ্যান্থনি হরোউইটজের নেই। ম্যাগপাই মার্ডারস-এর প্রতিটি শব্দ, বাক্য এবং বাক্যের বিরতিতে তার প্রমাণ আছে। হরোউইটজ গোয়েন্দাগল্পই লিখতে চেয়েছিলেন। এর থেকে মহত্তর কিছু করতে চাননি, বা অন্যভাবে বলা যায় গোয়েন্দাগল্পকে তিনি কিছু কম মহৎ মনে করেন না। হরোউইটজ যতখানি গোয়েন্দাগল্পের লেখক, ততখানিই পাঠকও। তিনি গোয়েন্দাগল্পের পাঠকদের বোঝেন। বোঝেন, যারা গোয়েন্দাগল্প পড়ে, কেন পড়ে। 
You must know that feeling when it's raining outside and the heating's on and you lose yourself, utterly, in a book. You read and you read and you feel the pages slipping through your fingers until suddenly there are fewer in your right hand than there are in your left and you want to slow down but you still hurtle on towards a conclusion you can hardly bear to discover.”

বিশুদ্ধ গোয়েন্দাগল্পের এই রকম হইহই উদযাপন আমি অনেক, অনেকদিন পরে দেখলাম। ম্যাগপাই মার্ডারস আমার হিসেবে পাঁচে পাঁচ। 



July 20, 2017

কী এনেছ?



ইন্টারনেটে ঘুরতে ঘুরতে নানারকম খেলা চোখে পড়ে। চরিত্র বিশ্লেষণ, স্বপ্নবিচার, আপনার পার্টনার আপনাকে ভালোবাসে কি না তার প্রমাণ। বই পড়া সংক্রান্ত খেলাধুলো আমার ফেভারিট। বই পড়া দিয়ে চরিত্র বিচার, চরিত্র দিয়ে বই পড়া বিচার, বইয়ের সঙ্গে লেখক মেলানো, লেখকের সঙ্গে বই ইত্যাদি। 

সেদিন এই আর্টিকলটায় পড়লাম এক ভদ্রলোক একখানা কম্পিউটার প্রোগ্রাম বার করেছেন, যেটাতে কোন লেখক তাঁদের লেখায় কোন শব্দ, শব্দবন্ধ, বাক্য, ক্লিশে সবথেকে বেশি ব্যবহার করেছেন সব বেরিয়ে যাচ্ছে। 

কারও কারও সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দ কার্যকারণরহিত, যেমন

রে ব্র্যাডবেরি = সিনামন
ভ্লাদিমির নাবোকোভ = মভ

আবার কারও কারও একেবারে দুইয়ে দুইয়ে চার। 

ক্রিস্টি = ইনকোয়েস্ট, অ্যালিবাই 
টলকিয়েন = এলভ্‌স, গবলিন, উইজার্ডস 

ক্লিশে ব্যবহারে সাধারণত নাক কোঁচকানো হলেও চেনা লেখকরা অনেকেই ক্লিশে ব্যবহার করতে পছন্দ করেন দেখা গেছে।

জেন অস্টেন = উইথ অল মাই হার্ট
ড্যান ব্রাউন = ফুল সার্কল
রোলিং = ডেড অফ নাইট
সলমান রুশদি = দ্য লাস্ট স্ট্র

বাংলা লেখকদের নিয়ে এরকম একটা কিছু থাকলে মন্দ হত না। কারণ সকলেরই কিছু না কিছু পোষা শব্দ থাকে। লেখায় থাকে, বলায় থাকে। অনেক সময় বহুব্যবহারের চোটে একেকটা লোকের চেহারা, চরিত্রের সঙ্গে একেকটা কথা খুব খাপ খেয়ে যায়, লোকটার কথা মনে পড়লেই ওই শব্দটার কথা মনে পড়ে। 

আমার এক বন্ধু বলেছিল, তাঁর বাবা নাকি কথা প্রায় বলতেনই না, নেহাত বলতেই হলে বলতেন, “দেখছি।” যেমন,

"বাবা, সাইকেল কিনে দাও।
-দেখছি।"

"বাবা, দার্জিলিং চল।
-দেখছি।" 

ইত্যাদি। 

আরেকজনের সঙ্গে  আমার আলাপ ছিল, সে খালি কথায় কথায় বলত, “ পরিস্থিতি” অর্থাৎ চারপাশে যা হচ্ছে সবই পরিস্থিতির চাপে হচ্ছে, তার নিজের কোনও দায় নেই। আমার ছোটবেলার একজন শিক্ষক ঘনঘন বলতেন, “কিস্যু হবে না”। বড়বেলার মাস্টারমশাইদের একজন প্রতিটি বাক্য শুরু করতেন “দেয়ারফোর” দিয়ে, আরেকজনের প্রতিটি বাক্য শেষ হত “সো অন অ্যান্ড সো অন অ্যান্ড সো অন…” দিয়ে। 

আমার মা সারাদিনে কতবার যে “আশ্চর্য!” বলেন গুনলে আশ্চর্য হতে হবে। আমার ঠাকুমা যখন সুস্থ ছিলেন তখন তাঁর কথায় “দ্যাশ/বরিশাল/পটুয়াখালি’ ইত্যাদির বাজার তেজী ছিল। অর্চিষ্মান সারাদিনে সবথেকে বেশিবার হয় “চা” বলে নয় বলে “ওরে বাবা”। “ওরে বাবা কুন্তলা, কেউ বকবে না/ তোমার চাকরি থাকবে/ অবান্তরে কমেন্ট পড়বে, সবে তো ছাপলে।”, “ওরে বাবা কুন্তলা, বাথরুমে টিকটিকি!”

আমি নিজে কী বেশি বলি সেটা ভেবে মনে করতে পারলাম না। “যত্তসব”, "যাচ্ছেতাই" “এরা কারা?” গোছের কিছু হবে। তবে সবথেকে বেশি কী বলতাম যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তবে বিনা প্রতিযোগিতায় জিতবে এই পোস্টের টাইটেল।

"কী এনেছ?"

আমি কথা বলতে শুরু করার পর থেকে মায়ের রিটায়ারমেন্ট পর্যন্ত প্রতি সন্ধ্যেয় (মায়ের ছুটিছাটা আর আমার হোস্টেলে থাকার দিনগুলো বাদ দিয়ে) দরজা খুলে মা’কে এই প্রশ্নটা করেছি। 

'কী এনেছ?" 

মা কখনও নিরাশ করেননি। বেশিরভাগ সন্ধ্যেতেই বাজারের মিষ্টির দোকানের সবথেকে ছোট বাক্সে দু’টাকা পিসের দু’পিস সন্দেশ আসত। কোনও কোনওদিন বাদাম চাক। আর আমার স্কুলের শেষ দিকে হাওড়া স্টেশনে মনজিনিস-এর শাখা খুলেছিল, খুব ঝুলোঝুলি করলে মা সেখান থেকে পিৎজা আনতেন। মাসে একবারের বেশি নয়। কচুরির সাইজের ময়দার তালের ওপর সস্তা চিজ আর টমেটোর লাল সাদা জমাট বেঁধে থাকত এদিকসেদিক। কিন্তু কোনও হ্যান্ডমেড আর্টিসান থিনক্রাস্ট চীজবার্স্ট পিৎজার ঠাকুরদার ক্ষমতা নেই সেই পিৎজাকে হারায়। 

*****

সপ্তাহের শুরুর দিকে সকালবেলা ঘুম ভেঙে চোখ খোলারও আগে টের পেলাম গলায় অসহ্য ব্যথা, ঢোঁক গিলতে প্রাণ বেরোচ্ছে। সোমমঙ্গল কোনওমতে চলল, বুধবার চলল না। ছুটি নিলাম। 

শুধু যে শারীরিক কারণেই নিলাম তা বলব না। ইদানীং কাজ জমে যাচ্ছে খুব। কিছুই সামলে উঠতে পারছি না। হাঁফ ছাড়ার জন্য একদিনের ছুটি দরকার ছিল। ছুটিতে কাজ এগোব ভেবেছিলাম, কিন্তু টাইমিং-এ ভুল করে ফেলে মঙ্গলবার সন্ধ্যেয় কিন্ডলে অ্যান্থনি হরোউইটজ-এর “ম্যাগপাই মার্ডারস” কিনে ফেললাম।

(কেউ যদি বলে ওই বইটা ছিল বলেই সকালে উঠে আমার গলাব্যথা হল, তাহলে আমি বলব, “পাপী মন।”)

বুধবার সকালে অর্চিষ্মান অফিস চলে গেল, আমি ‘ম্যাগপাই মার্ডারস’ শেষ করলাম বসে বসে। দু’দিন আগের পোস্টেই বই পড়ায় ফাঁকিবাজির দোষ বইয়ের ঘাড়ে চাপিয়েছিলাম। ভাব দেখিয়েছিলাম, আমি তো পড়তেই চাই, লেখকরা ভালো বই না লিখতে পারলে আমি কী করব। 

ম্যাগপাই মার্ডারস আমার সে দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে। ইংল্যান্ডের গ্রামে ফাঁদা খুনের গল্প, গল্পের মধ্যে আবার গল্প, খুনের পর আবার খুন। ক্রিস্টির ফ্যানবয় হরোউইটজ, ছত্রে ছত্রে রেফারেন্স ছিটিয়ে রেখেছেন। কোনও রকম কায়দাকানুন না করে, গোল্ডেন এজ-এর স্টাইলের বেড়া না ভেঙে কী অপূর্ব গল্প বলা যায়, জানতে হলে পড়তে হবে। দুপুর নাগাদ পড়া শেষ হল, কিন্ডল মুড়ে চুপ করে শুয়ে রইলাম আরও খানিকক্ষণ। জমাটি গোয়েন্দাগল্প পড়ার সুখের সঙ্গে দুনিয়ার আর কোনও সুখের যে তুলনা চলে না সেটা আরও একবার টের পেলাম, আর আমি যে এরকম ভালো গল্প কোনওদিন লিখতে পারব না সেই হতাশাও ছেয়ে এল। সব মিলিয়েমিশিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। 

ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বিকেল। মাথাব্যথা, গলাব্যথা, কাজ না হওয়ার আতংক সব তিনগুণ হয়ে ফিরে এল। বালতির সাইজের একখানা কাপ ভর্তি চা নিয়ে নতুন চেয়ারটেবিলে বসে ঘণ্টাখানেক কাজের ভঙ্গি করেছি, এমন সময় দরজায় বেল। চেয়ার ঠেলে উঠে দরজা খুলে বললাম, "কী এনেছ?" 

বিশ্বাস করুন, গত পনেরো বছর আমি প্রশ্নটা করিনি। করার এক সেকেন্ড আগেও প্রশ্নটা আমার মাথায় ছিল না। অথচ ওই মুহূর্তে দরজা খুলে দাঁড়ানোমাত্র শব্দদুটো আমার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল। 

পরমুহূর্তেই ভয় হল। অর্চিষ্মান তো জানে না কিছু আনতে হবে। রোজ যে আমরা দুজনেই বাড়ি ফিরি, কেউই তো কিছু আনি না, কারণ সন্ধ্যেবেলা কিছুমিছু খাওয়ার অভ্যেসটা আমরা কাটিয়ে ফেলেছি, সোজা রাতের রুটি তরকারিতে ঝাঁপাই।

দুরু দুরু বুকে দাঁড়িয়ে রইলাম। অর্চিষ্মানের দুই কানে ইয়ারফোন, হেড ব্যাংগিং-এর বহর দেখে মনে হচ্ছে রেডিওতে বাদশার র‍্যাপ চলছে। মাথা ঝাঁকানো না থামিয়েই ডানহাতটা তুলে আমার নাকের সামনে ধরল। হাতে প্লাস্টিকের প্যাকেট, প্যাকেটের ভেতর খুশবু।

তারপর আমরা চা আর রোল আর ঝালমুড়ি খেলাম বিছানায় বসে বসে আর লোকজনের নিন্দে করলাম, আর গলাব্যথা, মাথাব্যথা, টেনশন কখন সব হাওয়া হয়ে গেল। 


July 16, 2017

পারকিনসন'স ল



সিরিল নর্থকোট পারকিনসন (১৯০৯-১৯৯৩)
উৎস গুগল ইমেজেস

ছোটবেলায় শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা মহম্মদ আলির জীবনী পড়া ইস্তক 'পারকিনসন'স' বললেই রিফ্লেক্সে ‘ডিজিজ’ শব্দটা মাথায় আসত, গত দুদিন ধরে অন্য একটা শব্দ মাথায় আসছে। 

ল। পারকিনসন’স ল। যদিও যদিও ল’এর অনেক আগে পারকিনসন এসেছেন (ল’ আবিষ্কারের সময়, বা আবিষ্কার জগতের কাছে উন্মোচনের সময় তাঁর বয়স ছিল ছেচল্লিশ) তবু তাঁর থেকে তাঁর ল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ল না থাকলে সিসিল নর্থকোট পারকিনসনের নাম এই এতদিন পরে এত দূরে বসে আমি জানতেই পারতাম না। কাজেই ল-টা আগে বলে নিই। 

Work expands so as to fill the time available for its completion.

যে রকম শুনতে লাগছে, সে রকম গম্ভীর করে কথাটা পারকিনসন বলেননি। সিরিল নর্থকোট পারকিনসন ছিলেন ব্রিটিশ বুরোক্রেসির ভেতরের লোক। সিস্টেমের অপদার্থতা, ক্রমবর্ধমান আয়তন, গুচ্ছের অকাজের লোককে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো, এ সব সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং গাত্রদাহ আর পাঁচটা বাইরের লোকের থেকে বেশিই ছিল। সেই নিয়েই একখানা বিদ্রূপাত্মক, ননসিরিয়াস লেখা, সিরিয়াস পত্রিকা দ্য ইকনমিস্ট-এ লিখেছিলেন পারকিনসন। ছাপা হয়েছিল উনিশশো পঞ্চান্ন সালের নভেম্বর মাসে। বিদ্রূপে ভরপুর সে লেখায় The Law of Multiplication of Subordinates গোছের থিওরি, সাবথিওরি, অ্যাক্সিয়ম, ভয়ালদর্শন ফর্মুলাটরমুলা সহকারে প্রমাণটমান ছিল।

সে সব সময়ের তোড়ে ভেসে গেছে, বেঁচে গেছে শুধু আড়াই হাজার শব্দের লেখার প্রথম লাইনটা। যেটা কোনও রকম আড়ম্বর ছাড়াই পারকিনসন পেশ করেছিলেন, এমনকি কৃতিত্বও নিতে চাননি। 

It is a commonplace observation that work expands so as to fill the time available for its completion. 

কমনপ্লেস তো অনেক কিছুই, কিন্তু সব কমনপ্লেস জিনিসই যে আমদের কমন সেন্সে জায়গা পায় তা তো নয়, তাই পারকিনসন যখন কাজ আর সময়ের মধ্যে সরল সম্পর্কটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, তখন সবাই কমেন্টে এসে বলল, “খাঁটি কথা”। 

পারকিনসন ভালো শিক্ষক ছিলেন, কথা হাওয়ায় ভাসিয়েই হাত ঝাড়েননি, উদাহরণও দিয়েছেন। সময়ের নিয়ম মেনে সে উদাহরণ হয়তো স্বাভাবিকভাবেই সামান্য সমস্যাজনক, তবু ইতিহাসের মুখ চেয়ে সেই উদাহরণটাই এখানে দিলাম।

Thus, an elderly lady of leisure can spend the entire day in writing and despatching a postcard to her niece at Bognor Regis. An hour will be spent in finding the postcard, another in hunting for spectacles, half-an-hour in a search for the address, an hour and a quarter in composition, and twenty minutes in deciding whether or not to take an umbrella when going to the pillar-box in the next street. The total effort which would occupy a busy man for three minutes all told may in this fashion leave another person prostrate after a day of doubt, anxiety and toil.

*****
প্রেজেন্টেশন শেষ হওয়ার পর টেবিলের চারপাশ থেকে সবাই হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে। আমি যে এত মডেলের কথা বললাম, অত ডেটা, তত রিগ্রেশন — কেউ ইমপ্রেসড নয়। ডেটাকে টর্চার করে যে যা খুশি বলানো যেতে পারে, স্ট্যাটিসটিকস অতি ভয়ংকর লায়ার, এই সব প্রাচীন প্রবাদ সবাই মুখস্থ করে রেখেছে, ও দিয়ে চিঁড়ে ভিজবে না। মন্ত্রীমশাই থোড়াই তোমার রিগ্রেশন টেবিল পড়বেন, ওঁর কাছে সিগনিফিকেনস অ্যাট ফাইভ পার্সেন্টও যা ঘোড়াড্ডিমও তাই। তোমার এত ডেটা ধামসানো ফালতু, যদি তার কোনও পলিসি ইমপ্লিকেশন না থাকে। 

অবান্তরের পাঠকদেরও কারও কারও সেরকম মনে হতে পারে। ল পড়ে কী হবে, যদি আমার তাতে কিছু এসে না যায়? 

যাবে যাবে, নিশ্চয় আসবে যাবে। যাঁরাই কাজ করেন, (যেটা আমি ধরে নিচ্ছি, সবাই) তাঁদেরই আসবে যাবে। যাঁরা কাজ সময়ে শেষ করতে পারেন না বা করতে গিয়ে গলদঘর্ম হন (যেটা আমি আশা করছি, অনেকেই) তাঁদেরও। (এমন যদি কেউ থাকেন যে কাজ আসামাত্র লাফিয়ে সারেন, সেরে, হাত ঝেড়ে ডেডলাইন পর্যন্ত বাকি সময়টা পপকর্ন খান আর টিভি দেখেন, ওয়েল, আমি তাঁদের নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাই না।) 

পলিসি ইমপ্লিকেশনে যাওয়ার আগে ল-টা আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। 

Work expands so as to fill the time available for its completion.

টার্মপেপারের কথা মনে করুন। ক্লাসের কেউ লিখেছিল এক রাতে, কেউ এক সপ্তাহে, হাতে গোনা যমের অরুচি কেউ কেউ ছিল যারা সেমেস্টারের ফার্স্ট উইকে নোটিস পাওয়া থেকে কাজ শুরু করে সারা সেমেস্টার খেটে জমা দিয়েছিল।  

তাহলে একটা টার্ম পেপার লিখতে আসলে কত সময় লাগে?

উত্তর সোজা। যে যতখানি সময়ে টার্ম পেপারটা লিখে শেষ করেছে, তার একটা টার্ম পেপার লিখতে ততটাই সময় লাগে।

আপনি কতক্ষণে লিখেছিলেন? ঠিক আছে, বলতে হবে না, আমারটাই শুনুন বরং। আমি জানি আমার টার্ম পেপার লিখতে কত সময় লাগে, কারণ আমি শত শত টার্ম পেপার ওই একই সময়ের মধ্যে লিখেছি এবং জমা দিয়েছি।

এক রাত। 

আরেকটা উদাহরণ দিই। শনিবার সন্ধ্যে সাতটায় এস এম এস এল।

দু’নম্বরে। পাবদা কেনা হয়ে গেছে। দাদুর চপের লাইনে। কুন্তলার বেগুনী নিয়ে নিয়েছি, তুই আলু না পেঁয়াজি শিগগির জানা। পাঁচ মিনিটে দেখা হচ্ছে। 

ল্যাপটপের নিচ থেকে বেরোলাম। চানাচুরের শিশির ঢাকনা বন্ধ করে রান্নাঘরে রাখতে যাচ্ছি, যেতে যেতে ভেতরের ঘরের খাটের ওপর তিনটে জামার দিকে চোখ পড়ল। এমন নয় আগে পড়েনি। গত শনিবার কেচে ইস্তিরি হয়ে আসা থেকে বারবার চোখ পড়ছে, বারবার চোখ সরিয়েও নিচ্ছি। 

সেদিন সরালাম না। চানাচুরের শিশি নামিয়ে রেখে জামাগুলো তুললাম, আলমারির দরজা খুললাম, ভেতরে রেখে দরজা বন্ধ করলাম। ডিসিশন নেওয়া থেকে কাজটা শেষ করা পর্যন্ত আমার সময় লাগল সাত সেকেন্ড।

ওই মুহূর্তে “জামা খাট থেকে আলমারিতে তুলতে কত সময় লাগে?" জিজ্ঞাসা করলে আমার উত্তর হত, “সাত সেকেন্ড”। এস এম এস পাওয়ার আগে ওই একই প্রশ্নের উত্তর সাত দিন, এমন কি ওই মুহূর্তে এস এম এস টা না পেলে চোদ্দ দিন, একুশ দিন, এক মাস, তিন মাস… যা খুশি হতে পারত।

প্রোডাকটিভিটি গুরুরা বলছেন, একটা কাজকে ঠিক ততটাই সময় দিন যতখানি তার প্রাপ্য, এক সেকেন্ডও বেশি নয়। জামাগুলো সাত সেকেন্ডেই তুলুন, কারণ আপনি জানেন, হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছেন, জামাটা তুলতে সত্যিই সাত সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে না। সাত সেকেন্ডে জামা তোলার জায়গায় সাত দিন ধরে সেটাকে তুলছি তুলব করে মানবসম্পদের অপচয় করবেন না।

আপনি যেহেতু জানেন টার্ম পেপার এক রাতে লেখা সম্ভব কাজেই সেটা এক রাতেই লিখুন, তার পেছনে আর একবেলাও বেশি খরচ করবেন না।

(ওয়েল, এই পরামর্শের দায় প্রোডাকটিভিটি গুরুরা নিতে চাইবেন কি না আমি নিশ্চিত নই, তবে পারকিনসন ল-কে নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করার মূল এসেন্সটা আপনাদের ধরাতে পেরেছি আশা করি।

হ্যাঁ, এমন অনেক কাজ থাকবে যেগুলো করতে কত সময় লাগবে আপনার জানা থাকবে না। জীবনে একটাও উপন্যাস না লিখে থাকলে আপনার জানা সম্ভব নয় একটা উপন্যাস লিখতে আপনার কত সময় লাগা উচিত। জীবনে একটাও প্রেম না করে থাকলে আপনার জানা অসম্ভব কতক্ষণ আপনি একটা প্রেমের পেছনে পরিশ্রম করবেন আর কখনই বা বুঝে নেবেন যথেষ্ট হয়েছে, এবার বলার সময় এসেছে, নে-এ-এ-ক্সট।

একটু রিসার্চ করুন, তবে সময় বেঁধে। (কারণটা ঠিকই ধরেছেন, রিসার্চ এক্সপ্যান্ডস সো অ্যাজ টু ফিল দ্য টাইম অ্যাভেলেবল ফর ইটস কমপ্লিশন। আরও একটা কথা মনে রাখলে সুবিধে, একটা কাজ করতে যত সময় লাগবে বলে আপনার বিশ্বাস, প্রায় সবক্ষেত্রেই সে কাজটা করতে আসলে লাগে তার থেকে অনেক কম সময়।) অভিজ্ঞ লোকদের পরামর্শ নিন, গুগল করুন, তারপর সময়সীমার যে রেঞ্জটা পাচ্ছেন তার লোয়ার লিমিটে নিজেকে বাঁধুন। কাজটা আপনি ওই সময়ের মধ্যে শেষ করবেন। 

চরমপন্থীরা আরও একধাপ এগোন। তাঁরা বলেন ওই ন্যূনতম সময়েরও অর্ধেক সময় নিজেকে দিন। অর্থাৎ কেউ যদি মোটে তিন ঘণ্টায় একটা কাজ শেষ করে থাকে, তাহলে আপনি ঠিক করে নিন, আপনি দেড়ঘণ্টায় কাজটা শেষ করবেন।

মনে রাখবেন, একটা কাজকে আপনি যত সময় দেবেন, সে ঠিক ততটাই সময় নেবে। 

*****

গোটা আর্গুমেন্টে আমার মতে প্রোডাকটিভিটি গুরুরা একটাই ফাঁক রেখে দিয়েছেন। কাজ সময়ে শেষ করতে একটি তৃতীয় শক্তির অনুপ্রবেশ লাগে। আমার অভিজ্ঞতায় যেটা কাজ এবং সময়, দুইয়ের তুলনাতেই বেশি শক্তিশালী। 

হুমকি। আলটিমেটাম। 

টার্মপেপার আজ না লিখলে, ফেল। 

রিপোর্ট আজ সাবমিট না করলে, বেকার।

অতিথি আসার আগে ঘর না গুছোলে, জাজমেন্ট।

এইটুকু ভুল শোধরানো সোজা। পারকিনসন’স ল-কে নিজের সুবিধার্থে সার্থকভাবে প্রয়োগ করতে গেলে নিজের জন্য উপযুক্ত হুমকির ব্যবস্থা করে নিন। মুখে কালি, বসের বিরাগভাজনতা, যার যা কাজে দেয়। তারপর কাজে নামুন। মনে রাখবেন, আপনি যতখানি অ্যালাউ করবেন, কাজ ঠিক ততখানিই সময় নেবে। 

*****

এই পোস্টটা আমি গত তিনদিন ধরে পাবলিশ করব করব ভাবছি। লিখছি ক’দিন ধরে সে কথা মনে করে আর গ্লানি বাড়াতে চাই না। প্রতিদিনই ঘণ্টাখানেকের কাজ বাকি থেকে যাচ্ছে। আজ সকালে উঠে ঠিক করলাম এক ঘণ্টা নয়, আধঘণ্টায় আমি পোস্টটা শেষ করে ছাপাব। না হলে ব্লগ লেখা ছেড়ে দেব। সারাদিন শুধু অফিসের কাজ করব মন দিয়ে।

পোস্ট শেষ করে ছাপাতে কত সময় লাগল বলুন দেখি? 

কুড়ি মিনিট।

জয় পারকিনসন। জয় পারকিনসনের ল। 


*****

পারকিনসনের মূল লেখাটি যদি কারও পড়ার ইচ্ছে থাকে, এই রইল লিংক।

http://www.economist.com/node/14116121


July 12, 2017

সিগারেট, মোবাইল আর বই। তিনটেই স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।



সিগারেট অনেক লোকে অনেক ভাবে ছাড়ে। আমার মতে ছাড়ার বেস্ট উপায় না ধরা, কিন্তু যদি ধরেই ফেলে কেউ তাহলে নেক্সট বেস্ট হচ্ছে কোল্ড টার্কি পদ্ধতি। আমার বাবা ওইভাবেই ছেড়েছিলেন। তবে আরও নানারকম ভাবে ছাড়া যায় শুনেছি, ইলেকট্রিক সিগারেট ফুঁকে, গায়ে নিকোটিন প্যাচ লাগিয়ে। নেহেরু প্লেসের জ্যামে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে বাবাজীদের বিজ্ঞাপনের কার্ড উড়ে এসে গায়ে পড়ে, সেখানে দেখেছি বাবাজী অ্যামেরিকায় চাকরি দেওয়ানো, কালো মেয়ের পাত্র জোটানোর সঙ্গে সিগারেটের নেশাও সফলভাবে ছাড়ানোর দাবি করেছেন। ফোন নাম্বারও দেওয়া আছে। সেভাবেও হয়তো ছাড়ে কেউ কেউ। কলেজ ইউনিভার্সিটিতে লোকজনকে আরেকরকম উপায়ে সিগারেট ছাড়তে (বা ছাড়ার চেষ্টা করতে) দেখেছি। সেটা হচ্ছে, নিজের পয়সায় খাওয়া বন্ধ করা। কেউ কিনে দিলে, বা বন্ধুদের থেকে কাউন্টার নিয়ে খাওয়া। আশায় থাকা এরকম ফ্রি রাইড বেশিদিন চালাতে বন্ধুরা অ্যালাউ করবে না, আর তখন এই মারাত্মক নেশার হাত থেকে মুক্তি মিলবে। 

মাসতিনেক আগে আমি যখন ফোনে গেম খেলা ছাড়ব ঠিক করলাম, এই পদ্ধতিটাই পছন্দ হল। অর্থাৎ আমি নিজের ফোনে গেম খেলব না, খেলতে হলে শুধু অন্যের ফোনে খেলব। এখন, অন্যের ফোন বলতে তো বাড়িওয়ালার ফোন চাইতে যাওয়া যায় না, অর্চিষ্মানই ভরসা। স্নানেটানে ঢুকলে বা ভুলে ফেলে রেখে আইসক্রিম আনতে গেলে, ঝট করে দুটো লেভেল খেলে নিই। আমি গর্বিত যে আমার শপথ রাখতে পেরেছি, গত তিন মাসে একটি বারও নিজের ফোনে গেম খেলিনি। খুব শক্ত কাজ, ফাঁকা বসে থাকলে মাঝে মাঝে ভীষণ ইচ্ছের বেগ আসে, মনে হয়, কী হবে একটা লেভেল খেললে? আচ্ছা, হাফ লেভেল?  সিকি লেভেল? তখন দুই হাত উল্টো করে তার ওপর বসে ঘন ঘন দুলি আর বিড়বিড় করি, ‘কেটে যাবে কেটে যাবে এক্ষুনি কেটে যাবে।’ 

খেলা ছাড়তে শুধু আমার মনের জোরই কাজে দিয়েছে তেমন নয়, আমার বাবাও হেল্প করেছেন। যদিও এটা গোড়া কেটে আগায় জল ঢালার একটা নমুনা হতে পারে, কারণ নেশাটা ধরিয়েছিলেনও বাবা। পার্টিকুলারলি এই নেশাটার কথা বলছি না, যাবতীয় নেশা। বাবা হাতে করে ধরাননি, কিন্তু চরিত্রের এই যে “নেশাখোর” বৈশিষ্ট্যটা, এটা জিনের মাধ্যমে আমার মধ্যে সংক্রামিত করেছেন। সিগারেট, তাস, নাটক, বেড়ানো, ক্ল্যাসিক্যাল গান - কোনও জিনিসটাই বাবা সুস্থ লোকের মতো করেন না, সেটাকে একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যান। ছোটবেলায় শুনেছিলাম এটাকে বলে মাত্রাজ্ঞানের অভাব, বড় হয়ে জেনেছি এটাকে বলে অ্যাডিকটিভ পার্সোন্যালিটি। আমার এই দ্বিতীয় ডায়াগনোসিসটা বেশি পছন্দের, কারণ প্রথমটার মধ্যে একটা নালিশ নালিশ ভাব আছে। যেন মাত্রাজ্ঞান না থাকাটা আমার বাবার (এবং আমার) দোষ। কিন্তু কারও যদি পার্সোন্যালিটিই অ্যাডিকটিভ হয়, তার মধ্যে একটা নিয়তির মারের ব্যাপার থাকে। 

আমার বাবা ভিডিও গেমও খেলেন, এবং নেশাখোরের মতো খেলেন। বাবা অবশ্য ফোনে খেলেন না, বাবার ভিডিও গেম খেলার যন্ত্র আছে। প্লেস্টেশন নয়, বাবার আছে ট্রেনে বিক্রি হওয়া প্লাস্টিকের লম্বাটে যন্ত্র, দাম পনেরো থেকে পঞ্চাশের মধ্যে, ঊর্ধ্বাংশে সরু অনুজ্জ্বল স্ক্রিন, নিম্নাংশে হলদে বোতামের সারি। টিপলে প্যাঁপোঁ আওয়াজ বেরোয়। এ বি সি ডি নানারকম গেম আছে। আমার বাবা (আমারও) ফেভারিট ‘এম’ গেম। স্ক্রিনের ওপর থেকে নিচে নানারকম আকৃতি ঝরে ঝরে পড়ে, বোতাম টিপে টিপে সেগুলোকে থাকে থাক খাপে খাপ সাজাতে হয়। আমি যখন বাড়ি যাই, এই ঘরের খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে মায়ের ফোনে স্নেক খেলি, ওই ঘরে বাবা অবিকল এক ভঙ্গিতে চিৎ হয়ে শুয়ে প্যাঁ প্যাঁ করে ‘এম’ গেম খেলেন। 

মা মাথা নাড়েন। 

সপ্তাহখানেক আগে অফিসের ইমেলে চিঠি এল একটি অনলাইন সমীক্ষায় অংশগ্রহণ করার অনুরোধ নিয়ে। চিঠিটা পাঠিয়েছে অফিসেরই টেলিকম প্রোজেক্টের টিম। সমীক্ষার বিষয় হচ্ছে মোবাইল ফোন বা মোবাইল ফোনের ওপর আমার নির্ভরতা। সাধারণত এই রকম সার্ভেটার্ভে দেখলে পত্রপাঠ ডিলিট করি এবং সেই জন্যই জানি যে এর উত্তর জোগাড় করা কী ঝামেলার। অফিসের লোককে অফিসের লোক ছাড়া কে দেখবে, ভেবে শুরু করলাম। 

কতক্ষণ নেট দেখি? কতক্ষণ খেলি? কতক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটাই? ফোনে সবথেকে বেশি কী করি? কথা বলি, এস এম এস করি, চ্যাট করি, নেট ঘুরি না গেমস খেলি? ধরে ধরে সবক'টার উত্তর দিলাম। শেষেরটার উত্তর মাসতিনেক আগেও দেওয়া সহজ ছিল, এখনও দেওয়া সোজা। যদিও দুটো উত্তর আলাদা। তিনমাস আগে আমি ফোনে সবথেকে বেশি গেমস খেলতাম। ক্যান্ডি ক্রাশ, ক্যান্ডি ক্রাশের লাইফ ফুরিয়ে গেলে ক্যান্ডি ক্রাশ সোডা, সোডার লাইফ ফুরোলে পেপার প্যানিক, প্যানিক ফুরোলে স্ক্রাবি ডাবি। তারপর তিনমাস আগে আমার ফোন ভেঙে গেল, আমা বাবা পেনশনের এরিয়ার পেয়ে আমাকে নতুন ফোন উপহার দিলেন। আমি ঠিক করলাম, এই সুযোগে জীবনে একটা পজিটিভ পরিবর্তন আনা যাক। গত তিনমাসে আমি আমার ফোনে একবারও গেমস খেলিনি, কম্পিউটারে খেলেছি, অর্চিষ্মানের ফোনে খেলেছি, কিন্তু নিজের (বাবার দেওয়া) ফোনে খেলিনি।

যথাসম্ভব সততার সঙ্গে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলাম। সততার দরকার, কারণ অজান্তেই নিজের উত্তরে জল মেশানোর একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। আমার ভাবতে ভালো লাগে আমি ঘণ্টাআধেকের বেশি গেমস খেলি না, বা ঘণ্টা খানেকের বেশি ফোনে ইন্টারনেটে ঘুরি না, কিন্তু সকলেই জানে যে সেটা সত্যি নয়। পারি না, কিন্তু চেষ্টা করি ফোনের দিকে সর্বদা তাকিয়ে না থাকতে। কেন চেষ্টা করি, ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলে খারাপ কীসের, সে সম্পর্কে স্বচ্ছ কোনও ধারণা নেই যদিও। সবাই বলে, তাই আমি বিশ্বাস করি, ফোনের দিকে দরকারের বেশি তাকিয়ে থাকা খারাপ। অটোতে বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকা খারাপ, অথচ বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকাটা, সামহাউ, প্রশংসার। ইন্টারনেটে লাখ লাখ আর্টিকল ঘুরছে, এই ফোনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই কীভাবে মানবসভ্যতা একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সেদিন (ফোনেই) আরেকটা আর্টিকল পড়ছিলাম, ঠিক এই সেন্টিমেন্টের প্রতিফলন। তফাৎ শুধু ফোনের বদলে বই। ছাপাখানা যখন শুরু হল, বই সহজলভ্য হল, কারা যেন বলেছিলেন, এই শুরু হল ধ্বংসের। মানুষ আর মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না, বই মুখে করে উঠবে বসবে খাবে শোবে। তাছাড়া ছাপাখানা যখন এসেছিল তখনও ঘরে ঘরে ইলেকট্রিসিটি আসেনি। এদিকে ঘরে ঘরে লোকে বই পড়তে শুরু করেছে। আর যারা বই পড়ে তারা জানে, আলো ফুরিয়ে গেছে বলে কিংবা ঘুম পেয়ে গেছে বলে বই অর্ধেক পড়ে ছাড়া যায় না, তখন লন্ঠন আর আধপড়া বই নিয়ে শুতে যেতে হয়। এমন নাকি অনেক হয়েছে যে পাঠক বই এবং লন্ঠন নিয়ে বিছানায় গেছেন, সকালবেলা প্রতিবেশীরা উঠে দেখেছেন বাড়ির জায়গায় পড়ে আছে একমুঠো ছাই। 

*এই আর্টিকলের লিংকটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, এখন পেলাম।

The Dangers of Reading in Bed



July 09, 2017

বাংলা বই + 'অপার্থিব'



আমার বই পড়া চোট খেয়েছে। সিরিয়াস চোট। খানিকটা আমার দোষে, খানিকটা অফিসের দোষে, খানিকটা লেখার দোষে। লেখা বাড়লে পড়া কমে যায়। লিখছি বলে পড়তে পারছি না, এটা ফাংশানে বেশি গাইছি বলে রেওয়াজ কম হচ্ছে, বা বেশি বেশি খাচ্ছি বলে রাঁধার সময় পাচ্ছি না গোত্রের আয়রনি, কিন্তু এটাই সত্যি। 

খানিকটা দোষ বইয়েরও। গত ক’মাসে এমন একটাও বইয়ের দেখা পাইনি যা একেবারে আমাকে কপ করে গিলে ফেলেছে। একেবারে যে পড়িনি তা নয়, দুটো অতি বিখ্যাত/ ক্রিটিক্যালি অ্যাক্লেইমড গোয়েন্দা গল্প পড়েছি, পড়ে মনে হয়েছে, “এই?”,সেই নিয়ে ঘটা করে রিভিউ লিখতে ভালো লাগে না।

বই অর্ধেক, দুই তৃতীয়াংশ, তিন চতুর্থাংশ এমনকি নয়ের দশ ভাগ পড়ে ফেলে রাখার প্রবণতা বেড়েছে। অতখানি পড়েছি যখন বাকিটা না পড়ার কোনও কারণ নেই, তবু। 

আমার ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে চলা পড়ার গাড়ি একেবারে থেমে না যাওয়ার কৃতিত্ব একমাত্র বাংলা বইয়ের। ক্রমাগত নতুন নতুন বাংলা বই বেরোচ্ছে, কিনছি এবং পড়ছি। সেগুলোর রিভিউ করছি না কেন? তার একটা কারণ ভালো লাগা না লাগা তো বটেই, এ ছাড়া আরও একটা কারণ আছে, যেটা বলার আগে খানিকটা গৌরচন্দ্রিকার প্রয়োজন।

একটা অভিযোগ ওড়ে বাজারে যে আজকাল যত লোকে পড়ে, লেখে তার থেকে বেশি লোক। আমি একমত। আমি নিজেও সেই সব লেখকের দলেই পড়ি। কিন্তু আমার আজকাল আরও একটা জিনিস মনে হচ্ছে, আজকাল যত লোকে লেখে, তার থেকেও বেশি লোকে বই ছাপে। এতেও আমার উল্লাসেরই কারণ, কারণ যত বেশি লোক বই ছাপতে নামবে, আমার মতো হাফ-লেখকদের বই ছাপা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে তত বেশি। কাজেই আমি এই ট্রেন্ডকে দুই হাতে স্বাগত জানাই। লেখক বাড়ুক, প্রকাশক বাড়ুক, ইন্ডাস্ট্রি ফুলেফেঁপে উঠুক। বাংলা বইয়ের পাঠক, হাফ-লেখক এবং কোনও একদিন পুরো লেখক হয়ে ওঠার সুপ্ত আশা মনে পুষে, আমি এটাই চাই। 

কিন্তু লেখকের লেখা আর প্রকাশকের ছাপানো, দুইয়ের মধ্যে আরও অনেকগুলো ধাপ থাকে। আরও অনেকের উপস্থিতি লাগে। ভালো ছবি আঁকিয়ে লাগে, ভালো মুদ্রক, ভালো বিজ্ঞাপক, ভালো সমালোচক, সকলেই অপরিহার্য। বাকিদের কথা আমি বলতে পারব না, কিন্তু এঁদের মধ্যে একজনের অভাব ইদানীং আমার বড় বেশি চোখে পড়ছে। 

তিনি হচ্ছেন এডিটর। সম্পাদক লিখলাম না ইচ্ছে করেই, কারণ সম্পাদক বললেই হয় সাগরময় নয় বারিদবরণ ঘোষের কথা মনে পড়ে, যাঁরা গল্প ঝেড়ে বেছে একজায়গায় করেন।  

আমি বলছি গল্প-সারাই-করা সম্পাদকের কথা। পশ্চিমের বইয়ের পুঁজিবাদী বাজারে এঁদের ভূমিকা সাংঘাতিক। লেখকের প্লটের কাঠামোর ফাঁকফোকর সারাই করা, গল্পের ‘ভয়েস’ সংক্রান্ত মতামতজ্ঞাপন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা তো এঁরা করেনই, বাক্যগঠন, বানান ইত্যাদি সর্দিকাশির ওষুধও দেন। এখন এই সব বড়সড় উপসর্গের চিকিৎসা অনেকক্ষেত্রেই সাবজেকটিভ, কাজেই সে সব নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকতে পারে, কিন্তু বানান এবং সাধারণ ব্যাকরণের ভুল না থাকলেই ভালো।

সম্প্রতি কিছু বাংলা বই পড়তে গিয়ে ক্রমাগত হোঁচট খেলাম। লাখ লাখ ভুল। বানান ভুল বলতে আমি ‘রাণী না রানি’ এই ধরণের ঝামেলার কথা বলছি না, আমি বলছি ‘এনার’ ‘ওনার’ ‘মৌনতা’ ‘সখ্যতা’ ‘নিরবিচ্ছিন্ন’ ‘জোরজবস্তি’ ‘উনস্বর’ স্তরের ভুলের কথা, যেগুলো আমার মতো অগার চোখেও বেঁধে। 

এবং লেখকের জন্য মায়ায় বুক ভাঙে। একটা রীতিমত খেটে লেখা বই, দারুণ কনসেপ্ট, দারুণ প্লট, ভাষার দারুণ বাঁধুনি সত্ত্বেও পাতায় পাতায় যদি এই রকম ছেলেমানুষি ভুল থেকে যায়, তাহলে একটা বিশ্রী তেতো স্বাদে মুখ ভরে যায় না কি? দোষ লেখকের নয়, সবাইকে বামনদেব গুলে খেয়ে লিখতে নামতে হবে এমন দাবি কেউ করছে না।  যিনি রাত জেগে প্রুফ দেখে সকালে অফিস গেছেন দোষ সেই প্রকাশকেরও নয়। কারণ তাঁর ওটা কাজ নয়। দোষ যদি কারও থেকে থাকে তবে সেটা অনুপস্থিত এডিটরের।

কেন এডিটর নেই সে প্রশ্নের উত্তর আন্দাজ করা সোজা। টাকা নেই। তাই যোগ্য এডিটরও নেই। এটা অজুহাত নয়। আমি দিল্লি বইমেলার শেষদিনে একজনের বই কিনতে গিয়ে শুনলাম তিনি বেস্ট সেলার। গোটা মেলায় তাঁর বই বিক্রি হয়েছে তে-এ-রো-ও কপি।

যাঁরা বাংলা বই পড়তে ভালোবাসেন, তাঁরা যদি কোমর বেঁধে এগিয়ে আসেন তবে কিছু হলে হতে পারে, না হলে এইরকমই চলবে। কাজেই আমার আপনাদের কাছে অনুরোধ, বাংলা বই কিনুন। এত সস্তা যে মনেও থাকবে না ওই টাকাটা খরচ করেছেন। রেকোমেন্ডেশন হিসেবে আমি এক্ষুনি একটা বইয়ের কথা বলতে পারি।

উৎস গুগল ইমেজেস

অপার্থিব, অনিন্দ্য সেনগুপ্তের লেখা কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস। দু’হাজার পঁয়ষট্টি সাল, আমাদের পৃথিবীর বেশিরভাগটাই আটটি প্রতিদ্বন্দ্বী কর্পোরেশনের দখলে। এই সময় পৃথিবী থেকে ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে প্রক্সিমা সেন্টরি তারকামণ্ডলের করোনা গ্রহে প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায়, একদল বৈজ্ঞানিককে সেখানে পাঠানো হয় এবং সেখানে পৌঁছে তাঁরা ধীরে ধীরে সকলেই জরদ্গবে পরিণত হতে থাকেন। এই সময় এন্ট্রি নেন আমাদের অ্যান্টিহিরো দারিয়াস মজুমদার, পেশায় হ্যাকার, কর্পোরেশনের কাছে থ্রেট, এবং যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত। তিনি করোনা রহস্য সমাধান করতে পারবেন কি না, সেই নিয়েই অনিন্দ্য সেনগুপ্তের উপন্যাস ‘অপার্থিব’।

বইয়ের শুরুতেই সতর্কতাবাণী দেওয়া আছে, এ বই “ছেলেভুলানো অ্যাডভেঞ্চার নয়।”  মিথ্যে বলব না, ভয় পেয়েছিলাম। পড়তে শুরু করে বুঝলাম সে ভয় অমূলক। অপার্থিব বেবিফুড নয় ঠিকই, কিন্তু যথেষ্ট পাঠযোগ্য। পেটরোগা বাঙালি দিব্যি হজম করতে পারবে। না করার কোনও কারণ নেই। 

বাংলা মূলধারার/শারদীয়া সাহিত্যের একটা জঘন্য ব্যাপার হচ্ছে, কল্পবিজ্ঞান, গোয়েন্দা, ভূত ইত্যাদি ঘরানা সাহিত্য সর্বদাই কিশোরদের উপযোগী হয়ে পড়ে। প্রাপ্তবয়স্ক বাঙালিরা খালি অসুখী দাম্পত্যের গল্প পড়েন নয়তো মহাভারতের রিমেক। বড়দের জন্য গোয়েন্দাগল্প দু’চারটে যদি বা দেখা যায়, কল্পবিজ্ঞান আর ভূতের সে চান্স নেই। 

অপার্থিব সেই ফাঁকটা ভরাট করার লক্ষ্যে নেমেছে এবং সফল হয়েছে। অপার্থিব বড়দের কল্পবিজ্ঞান গল্প। "অ্যাডাল্ট" বড়দের নয়, তবে গল্পের চলনবলনের মধ্যে ছেলেমানুষি সর্বান্তঃকরণে বর্জনের চেষ্টা হয়েছে। যে কোনও চেষ্টার মতোই, এরও ভালোমন্দ দুইই আছে। ভালো ব্যাপারটা তো আগেই বললাম, গল্পটা বেবিফুড নয়, জলে গুলে খাইয়ে দেওয়া হয়নি, গল্পটার মধ্যে দাঁত ফোটানো যায়। মন্দটা হচ্ছে কখনও কখনও দাঁত ফোটানো যায় না, বিশেষ করে ভাষায়। আমার মত যদি জিজ্ঞাসা করেন, ভালোর পাল্লাটাই বেশি। অনিন্দ্য সেনগুপ্ত খেটে প্লট বানিয়েছেন, চরিত্র ফেঁদেছেন, থিম ঢুকিয়েছেন, ( সে থিম কখনও কখনও, বিশেষ করে শেষদিকে গিয়ে একটু উচ্চকিত হয়ে পড়েছে, কিন্তু সেটুকু ইগনোর করা যায়) মেধা এবং হৃদয় দুইই সম্পূর্ণ ব্যবহার করে গল্প বলেছেন। লেখকের এইটিই প্রথম উপন্যাস, জানলে আরও আশ্চর্য হতে হয়। বইটা দেখতেও বেশ ভালো। অভীক কুমার মৈত্রের প্রচ্ছদ চমৎকার। হার্ডকভার বই, হাতে নিলেই গাম্ভীর্য বোঝা যায়। 

কল্পবিজ্ঞানে উৎসাহ থাকলে, বা আমার মতো না থাকলেও, অপার্থিব পড়ে দেখতে পারেন। কারণ ফাইন্যালি তো ভালো গল্প নিয়ে কথা। অপার্থিব ভালো গল্প। 

*****

বাংলা বই পুরো দামে কিনে পড়ার ইচ্ছে না থাকলে তারও উপায় আছে। সম্প্রতি শুরু হয়েছে। শুরু করেছে রোহণ, সৃষ্টিসুখ। বেসিক্যালি, লাইব্রেরি। অনলাইন। ধুলো পড়া মান্ধাতার আমলের বই নয়, ঝকঝকে সাম্প্রতিক বই, আর ইস্যু করে ফেরত দিতে ভুলে যাওয়ার অপরাধবোধের ব্যাপারও নেই। নিরানব্বই টাকা ফেলুন (প্রিপেড), আর সারা মাস ধরে পাঁচটা বই পড়ুন। সে মাসের বইগুলো কী কী সেটা আগে থেকেই জেনে নিতে পারবেন। ইন্টারেস্টিং লাগছে তো? জানতাম। অনেক প্রশ্নও জাগছে নিশ্চয় মনে? এটাও জানতাম। তবে সে সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না, চলে যান সোজা নিচের ঠিকানায়। 

সৃষ্টিসুখ ই-লাইব্রেরি

আপনারা সম্প্রতি কোনও ভালোলাগা বাংলা বই পড়েছেন কি? নতুন বা পুরোনো? আমাকে জানান, আমিও পড়ব।


July 06, 2017

নারকান্ডা-সিমলা




সিমলা থেকে টানা ন’ঘণ্টার জার্নি করে রকশম যাব না বলে সারাহান থেমেছিলাম, রকশম থেকে সিমলা টানা ন’ঘণ্টার জার্নি করব না বলে থামব নারকান্ডায়। সিমলা থেকে ঘণ্টা দুয়েকের দূরত্বে চেনা হিলস্টেশন নারকান্ডা। রকশম চিৎকুলের তুলনায় রীতিমত মেট্রোপলিস বলা যেতে পারে। থেমে থেমে চা খেতে খেতে এলেও রাস্তায় কষ্ট হল। অনেকটা নেমে আসায় টেম্পারেচার বেড়ে গেছে, ওই ভর দুপুরে অতক্ষণ টানা গাড়িতে বসে থাকা, বিশ্রী। নারকান্ডায় আমরা এসে পৌঁছলাম সাড়ে তিনটের সময়। ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল। পুরোটাই শারীরিক নয়। ছুটি আর মোটে এক রাত। কাল বাড়ি ফেরা। আমরা উঠেছি হিমাচল সরকারের হোটেল হাটু-তে। অনেক লোক। ঈদের লং উইকএন্ডে সকলেই বেড়াতে বেরিয়েছেন। সত্যি বলছি, ইচ্ছে করছিল শুধু বিছানায় শুয়ে শুয়ে পকোড়া খেতে খেতে টিভি দেখি, ইচ্ছেতে লাগাম পরালাম। 

কারণ সময় আর হাতে বেশি নেই। নারকান্ডায় আমাদের হাতে শুধু একটা সন্ধ্যে। কিছুই দেখা হবে না, তবে হাটু হোটেল থেকে হাটু রোড ধরে সাত কিলোমিটার দূরে হাটু পাহাড়ের চুড়োয় হাটু দেবীর মন্দির দেখতে সবাই যায়, আমরাও যাব। পিচরাস্তা ধরে ঘণ্টাদুয়েক চড়লেই শৃঙ্গজয়। আমাদের মতো শখের হাঁটিয়েদের জন্য আদর্শ। যদিও ওই মুহূর্তে হাঁটার প্রশ্ন নেই। ঈশ্বরজীই ভরসা। 


পকোড়া খেয়েটেয়ে আরাম করে সাড়ে পাঁচটায় বেরোনো হল। চমৎকার রাস্তা ধরে পাহাড়ে চড়ছি, আর দেখছি পাইনের ডালের জালে আটকা পড়া কুয়াশা। অনেকদিন আগে পড়েছিলাম ওয়েদার ডট কম হচ্ছে বুড়োদের এম টিভি,নিজের ক্ষেত্রে প্রমাণ পাচ্ছি হাতেনাতে। দিল্লির নেক্সট তিনমাসের আবহাওয়া আমার মুখস্থ, যাওয়ার আগে সারাহান, রকশম, চিৎকুল, নারকান্ডারও ওই ক’দিনের আবহাওয়া মুখস্থ করেছিলাম। সব জায়গায় মেঘ, বৃষ্টি দেখিয়েছিল। ছাতা নিয়ে গিয়েছিলাম দুটো বয়ে বয়ে। অথচ সারাহান, রকশম, চিৎকুল কোথাওই বৃষ্টি হয়নি, মেঘ পর্যন্ত পাইনি। স্রেফ ঝকঝকে রোদ। বৃষ্টি যেটুকু হয়েছে, রাতে। শেষরাতে লেপের তলায় শুয়ে শুয়ে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ পেয়েছি, ভোর ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সব পরিষ্কার হয়ে গেছে।


নারকান্ডাতেও বৃষ্টি নেই, কিন্তু ভীষণ কুয়াশা। পাহাড় বেয়ে গাড়ি চলল। ঝকঝকে তকতকে রাস্তা, কিন্তু বেশ খাড়াই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে তিন হাজার মিটার উঁচুতে হাটু পিক, প্রায় চিৎকুলের সমান। ভাগ্যিস ঈশ্বরজী ছিলেন।

হাটু এসে গেল। গাদাগাদা গাড়ি, বেশিরভাগই ফিরছে। এত লোকের থাকার জায়গা নারকান্ডায় নেই আমি নিশ্চিত। বেশিরভাগই এসেছেন সিমলা, খানিকটা সময় বাঁচিয়ে এসেছেন দু’ঘণ্টা দূরের এই অপেক্ষাকৃত খালি শহরটিতে। 


হাটু পিকের মাথায় হাটুমাতার মন্দির, যিনি আমাদের চেনা মন্দোদরী। 


কুয়াশার একটা ভালো ব্যাপার হচ্ছে যে আশেপাশে চিৎকারচেঁচামেচি না থাকলে নিজেদের বুঝিয়ে নেওয়া যায় যে পাহাড়চুড়োয় শুধু আমি আর আমার ফোটোগ্রাফার ছাড়া আর কেউ নেই।

ছুটি টেকনিক্যালি শেষ। কিন্তু ঈশ্বরজী আমাদের এত সহজে ছাড়বেন না। বলেন, সিমলা দিয়েই তো যাব, ওখানে ঘুরে নেবেন দেড়দুই ঘণ্টা। আমরা যত হাতেপায়ে ধরি, ছেড়ে দিন ভাইসাব, গালেমুখে চুনকালি পড়ে যাবে, উনি কিছুতেই ছাড়বেন না। অবশেষে নিজেদের ইচ্ছেতে নয়, ঈশ্বরজীর জোরাজুরিতেই থামতে হল সিমলাতে।

ওপরের প্যারাগ্রাফটা নির্জলা মিথ্যে। সিমলা আসার জন্য আমরা যথেষ্ট মুখিয়ে ছিলাম। এবং সিমলায় নেমে কী কী খাওয়া যেতে পারে সে নিয়ে অনলাইন রিসার্চও চালিয়েছিলাম জোর। আমাদের ইচ্ছে ছিল অথেনটিক হিমাচলি খাবার খাওয়ার। খুঁজেটুজে বিশেষ সুবিধে হল না। 


ম্যাল রোডের ধারে আমাদের নামিয়ে দিলেন ঈশ্বরজী। ম্যাল রোডে গাড়ি ঢোকা নিষেধ। প্রায় রথের মেলার মতো ভিড়। লং উইকএন্ডের শেষদিনে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ঘোড়া, মানুষ, আইসক্রিম, বাচ্চা, বাচ্চার হাতে ফুঁ দিয়ে ওড়ানো বুদবুদখেলনা, সেলফিস্টিক এবং হাঁসঠোঁটে গমগম, জমজম করছে সিমলা ম্যাল। আমরা কোথাও যাবটাব না, ইচ্ছেও নেই, সময়ও নেই, তবে নাকের ডগায় চার্চ, একবার নমো না করে আসাটা ভালো দেখায় না। দশ হাতের মধ্যে গুফা-আশিয়ানা বার অ্যান্ড রেস্টোর‍্যান্ট, ঢুকে পড়লাম সেখানে। এই দোকানের নাম আগেও এসেছে আমাদের রিসার্চে। (যদিও অত রিসার্চ কোনও কাজে লাগেনি। লাঞ্চটাইম শুরু হয় একটা থেকে, তখন থেকেই হিমাচলি খাবার মেলে, আমরা পৌঁছেছি সাড়ে বারোটায়। কাজেই আমাদের ভাগ্যে খালি চিজ টোস্ট আর মাশরুম অমলেট আর চার কাপ চা। 

গুফা আশিয়ানা সরকারি দোকান, কাজেই লোকেশন চমৎকার, একেবারে ম্যাল রোডের ওপর। আশিয়ানায় আমাদের টেবিলের লোকেশনও চমৎকার। একেবারে রাস্তার পাশে। ভিড়ে গা না ঠেকিয়ে ভিড় দেখার জন্য আদর্শ। 

সিমলা ম্যাল রোড দেখার মতোই। অত লোক কিন্তু কী ঝকঝকে পরিষ্কার। অত লোকে আইসক্রিম খাচ্ছে, একটি থ্যাঁতলানো কোন গড়াগড়ি খাচ্ছে না। নো চিপসের প্যাকেট, নো ঘোড়ার নোংরা, নো নাথিং। মেন্টেন্যান্স কাকে বলে শিখতে হয় সিমলার কাছ থেকে। 

খাওয়া শেষ। এবার হেঁটে হেঁটে আমাদের যেতে হবে সিমলা রেলস্টেশন। ট্রেনে চাপব বলে নয়, ঈশ্বরজী ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন, আমাদের পৌঁছে দেবেন কালকা, যেখানে আমাদের জন্য শতাব্দী এক্সপ্রেস অপেক্ষা করছে। ম্যাল রোড থেকে রেলস্টেশন যাওয়ার রাস্তাটা শান্ত ছবির মতো, বাঁদিকে দূরে পাহাড়, ডানদিকে বড় বড় অফিসবিল্ডিং, পোস্টঅফিস। চোখ পড়ল জ্বলজ্বলে চারটি অক্ষরে। বি এস এন এল। মনে মনে স্যালুট করলাম। আমাকে খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করেছে। 

সারি সারি লোক আমাদের সঙ্গে চলেছে। সকলেরই প্রশান্ত মুখ, কারও হাতে সেলফি স্টিক, কারও হাতে বাচ্চা, বাচ্চার হাতে বুড়ির চুল, পতাকার মতো উঁচু করে ধরা। সকলেই কথা বলতে বলতে চলছে, একটা গুনগুন কানে আসছে, আলাদা করে কে কী বলছে বোঝা যাচ্ছে না, তার মধ্যে বাংলা শুনলে একটু যা কান খাড়া। আমাদের পেছনে একদল আসছিলেন, বিশুদ্ধ বাঙাল। আমরা স্পিড কমিয়ে তাঁদের কাছাকাছি হাঁটার চেষ্টা করলাম।

দূর থেকে প্ল্যাটফর্মের ঢালু টিনের ছাদ দেখা গেল। এইখানে আসবেন ঈশ্বরজী, আমাদের পিক আপ করতে। এই জায়গায় পুলিসের খুব কড়াকড়ি, যেখানেসেখানে গাড়ি দাঁড়াতে দেবে না। গোটা হিমাচল জুড়েই মহিলা ট্র্যাফিক পুলিসের দাপাদাপি দেখেছি, ঈশ্বরজী অনেকেরই মুখ চেনেন। চেনা জায়গার চেনা মোড় পেরোতে পেরোতে বলেছেন, এই ম্যাডাম লোক ভালো তাই যেতে দিল, আরেক ম্যাডামের ডিউটি পড়ে এই মোড়ে, এক নম্বরের খড়ুস। এখানেও এক ম্যাডাম টুপি পরে লাঠি নেড়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছেন। সদাশয় না খড়ুস মুখ দেখে বুঝতে পারছি না, কাজেই সতর্ক থাকতে হবে। ঈশ্বরজীকে দেখা মাত্র দৌড়ে উঠে পড়তে হবে। অর্চিষ্মান আমার এক হাত ধরে অন্য হাতে ফোনে ওঁকে কনট্যাক্ট করার চেষ্টা করছে। 

মনে মনে সিমলাকে বললাম, আসব আবার, সময় নিয়ে। ছুটি বাঁচিয়ে। ম্যাল রোডের খুব ঘুরব, খুব আইসক্রিম খাব, ঘোড়ায় চাপব না দূর থেকেই অ্যাপ্রিশিয়েট করব, আর তোমার ফাঁকা ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটব এদিকেসেদিক। চিৎকুলের পাইনবন, তোমার সঙ্গে দেখা হবে না হয়তো আর, তোমার ভাইবেরাদর কল্পা, কাজা, নাকো…তাদের পাইনবনও তো দেখতে হবে, সে সব বনের ছায়ায় ছায়ায় কত লালসাদাবেগুনি ফুল ফুটে আছে, তাদেরও তো এড়িয়ে এড়িয়ে পা ফেলতে হবে। তা বলে ভেব না তোমার ফুল, ছায়া, প্রজাপতিদের ভুলে যাব। বুকের ভেতর গর্জন উঠল। তোমাকে তো মনে রাখবই, ছোট্ট বসপা, যদি আর জীবনেও না দেখি তোমায়, অন্য পাহাড়ি নদীদের সঙ্গে তোমাকে গুলিয়ে ফেলব না কিছুতেই। প্রমিস। আঙুলের ডগায় তোমার ঠাণ্ডা ছোঁয়া পুরে নিয়েছি, কানে তোমার ডাক, চোখে তোমার ঊর্ধ্বশ্বাস ছোটা। আমার চিহ্ন হিসেবে একখানা পুঁচকে নীল নুড়ি তোমার বুকের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়ে এসেছি, তুমিও মনে রেখো আমাকে।

হাতে টান পড়ল। চোখ খুললাম। রাস্তার ওপারে গাড়ির জানালা থেকে ঈশ্বরজী হাত নাড়ছেন। 
                                                                                                                            (শেষ)


টয় ট্রেন
সারাহান
রকশম-চিৎকুল-কামরু ফোর্ট


July 04, 2017

রকশম-চিৎকুল-কামরু ফোর্ট



রকশম নামটা আগে শুনিনি, সাংলা শুনেছি। আমি শুনেছি মানে সকলেই শুনেছে, সাংলা ভ্যালির ভরকেন্দ্র হচ্ছে সাংলা শহর। কিন্তু সে তো নামেও শহর, কাজেও শহর, সাইজে যা একটু ছোট, সেখানে আমাদের থাকতে ইচ্ছে করল না। খুঁজতে খুঁজতে আমরা পেয়ে গেলাম রকশম-এর নাম। ছবি দেখে, রিভিউ পড়ে পছন্দ হয়ে গেল। সারাহান থেকে ঘণ্টা চারেক সাংলা, সাংলা থেকে ঘণ্টা আধেক দূরে বসপা নদীর তীরে, আপেল বাগানের ভিড়ে, সমুদ্রবক্ষ থেকে সাড়ে তিন হাজার মিটার উচ্চতায় ছোট্ট গ্রাম রকশম। 

যাওয়ার পথে টাপরিতে চা খেলাম আর কারছামে দেখলাম বিখ্যাত কারছাম-ওয়াংটু নামের বারোশো মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। 


যাওয়ার রাস্তার বর্ণনা দিতে পারি, কিন্তু তার থেকে ঢের সোজা হবে বোঝানো যদি বলি গোটা রাস্তাটাই যায় কিন্নরের মধ্যে দিয়ে, স্থানীয় লোকেরা যাকে বলে কিনৌর। উত্তরে কিন্নর কৈলাস, দক্ষিণে গাড়োয়াল, আর শতদ্রু, বসপা, স্পিতি উপত্যকা জুড়ে তৈরি এই কিন্নর। বাকি পৃথিবীটা যদি মানুষের হয় তবে কিন্নর দেবতাদের। নদী, পর্বত আর জঙ্গলে ঘেরা কিন্নরে মানুষই বিরল এবং বেমানান। 

রকশমের অসুবিধে একটাই। থাকার হোটেল নেই বেশি। আছে শুধু রুপিন রিভার ভিউ হোটেল। বসপা নদীর একেবারে ঘাড়ের ওপর ঝুলে আছে।  আমরা মাসখানেক আগেই বুক করে রেখেছি। আপনারা গেলেও আগেভাগে বুক করেই যাবেন। ভয়ানক ডিম্যান্ড।


রুপিন রিভার ভিউ-তে পৌঁছতে দুপুর দুটো নাগাদ পৌঁছে, রুটি আলুজিরা খেয়ে, বেরোলাম। হাওয়া রীতিমত ঠাণ্ডা। অর্চিষ্মান বুদ্ধি করে সোয়েটার এনেছে, আমি পাকামো করে একটা ফিনফিনে চাদর, গায়ে দিতে না দিতে উড়ে যায়। 

রকশম গ্রামে জনা সাতশো মানুষের বাস। আবহাওয়ার কারণেই এঁরা যাযাবর। শীতে বরফে ঢেকে যাওয়ার সময় এঁদের নিচে নেমে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না । এঁদের ছোটছোট বাড়ির পেছনের গলি দিয়ে আমরা বসপা নদীর তীরে নেমে গেলাম। 

পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে সরবে ছুটছে বসপা। তিব্বতের সীমানা থেকে শুরু হয়ে কারছামের কাছে গিয়ে শতদ্রুতে মিশেছে ছোট্ট নদীটা। ছোট্ট কিন্তু তেজীয়ান। গোটা রাস্তায় চিৎকুল থেকে কারছাম পর্যন্তই এর ধারে মনুষ্যবসতি, তাও বছরের শীতের সময়টা ছাড়া, বাকি সময় বসপার সঙ্গী কেবল পাহাড়, পাইন, ওক, জুনিপার, ইউক্যালিপটাস।মাঝে মাঝে বুকের ওপর পাথরের মাথা দেখে লোভ হয়, হেঁটে পেরিয়ে যাওয়ার চিন্তা মাথায় আসে। কিন্তু সে চিন্তা ভয়ংকরী। কারণ জলের নিচে খাদ থাকা বিচিত্র নয়। তাই সরকারি ব্রিজ ধরেই হাঁটা স্থির করলাম। সরকারি ব্রিজের পাশের বোর্ডে ব্রিজ তৈরির তারিখ, শেষ হওয়ার তারিখ, এস্টিমেটেড কস্ট, ইনকারড কস্ট, পপুলেশন বেনিফিটেড সব লেখা আছে। ট্রান্সপ্যারেন্সির হদ্দমুদ্দ। ব্রিজ পেরিয়ে এসে আমরা নদীর পাড় ধরে হাঁটা শুরু করলাম। পাড় মানে পাহাড় আর নদীর মাঝে চিলতে পাথুরে পথ, কিন্তু তাতেই যে থেমে থাকতে হবে এমন দিব্যি কেউ দেয়নি। নদীতে নেমে না পড়তে পারি, তবে তার যথাসম্ভব কাছে তো আসতে পারি।  আমরা নদীর ধারে পাথরের ওপর পা ফেলে ফেলে চললাম। পাইনের বন ঘন হয়ে এল, পায়ের নিচে ঘন বেগুনি রঙের অসংখ্য ছোটছোট ফুল, সবুজ কুচিকুচি ঘাস, ঝরে পড়া পাইন কোণ। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর ঠাণ্ডা বাড়তে লাগল। হোটেলে ফিরে এলাম। 


রুপিন রিভার ভিউর ঘরবাথরুম সব পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন, কিন্তু সরকারি হোটেলের ঘরে থাকার অভ্যেস থাকলে  ঘর ছোট লাগবে। খাটসর্বস্ব ঘর। টিভি আছে, যা প্রায় বাথরুমের মতোই দরকারি। খেয়েদেয়ে ঘরে ফিরে 'ডাবল অ্যাটাক টু' দেখলাম। সিরিয়াসলি, সিনেমাটা সত্যিই ওই নামের। অত অ্যাকশনেও রক্ষা হয়নি, সিনেমা শেষ হওয়ার আগেই দুজনে ঘুমিয়ে পড়েছি। মাঝরাতে উঠে টিভি বন্ধ করলাম, নিচে বসপা প্রবল গজরাচ্ছে। 


চিৎকুল

পরদিন সকালে পুরিভাজি খেয়ে বেরোলাম। আজ আমরা যাব চিৎকুল। ভারত তিব্বত সীমান্তে ভারতবর্ষের শেষ গ্রাম। চিৎকুলে থাকা যায়, নদীতটে ক্যাম্প থেকে শুরু করে গ্রামে হোটেলও আছে এখন, কিন্তু রকশমে থাকার সিদ্ধান্তে আমরা অখুশি নই।

অখুশি নই কারণ রকশম থেকে চিৎকুল যাওয়ার রাস্তাটা চমৎকার। গোটা বারো কিলোমিটার, যেতে লাগে আধঘণ্টা মতো। সীমান্ত কাছে, তাই পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যাপার আছে। মস্তরং বলে একটি জায়গায় থেমে পরিচয়পত্র দেখাতে হল। ঝকঝকে রোদ্দুর ছিল আকাশে, পাইনের ফাঁক দিয়ে সে আলো এসে পড়ছিল পাহাড়ের গায়ে, গাড়ির জানালা গলে আমাদের চশমার কাঁচে। পাহাড়ি রোদের একটা ম্যাজিক আছে, দৃষ্টি, শ্রুতি, ঘ্রাণ সব সাফ করে দেয়। পথের পাশ দিয়ে আমাদের উল্টোদিকে চলেছে কুলকুল করে ছোট নালা, নালার ধারে গুচ্ছ ফুল, হলুদ, সাদা, বেগুনি। তার ওপর ছোট্ট হলুদ প্রজাপতি ফুরফুরিয়ে উড়ছে। একবার মনে হচ্ছে হলুদ ফুলগুলোই সবথেকে সুন্দর, পরক্ষণেই মনে হবে বেগুনি ফুলগুলো বেস্ট, অমনি পাশ থেকে সাদা ফুল গলা বাড়াবে। বোরিং, কিন্তু সাদার থেকে সুন্দর আর কী কিছু হয়?

এমন সময় গাড়ি ঘ্যাঁচ করে থামালেন ঈশ্বরজী। কিন্তু চিৎকুল কোথায়? এখনও তো রাস্তা ফুরোয়নি। বরং  বাঁদিকের পাহাড়ে ধ্বসের ছাপ স্পষ্ট। এখনও ছোট ছোট নুড়ি নেমে আসছে, ধুলোর সঙ্গে সঙ্গে। ঈশ্বরজী বললেন, “ফোটো লেনা নহি হ্যায় কেয়া?” 


ইগোটাও যদি অতটুকু হত

ছোটবেলায় আমার মতো যাঁরা স্টুডিওতে ফোটো তুলতে গেছেন, তাঁদের হয়তো মনে আছে। পেছনে একটা ছবি থাকত? হয় তাজমহল, নয় ওই দশ ফুট বাই তিন ফুট বোর্ডের মধ্যেই একই সঙ্গে ধপধপে পর্বত, তিরতিরে নদী, ছায়াছায়া জঙ্গল? ওই ছবিটাই চিৎকুল।

চিৎকুল অবিশ্বাস্য রকম সুন্দর। চিৎকুল হাস্যকর রকমের সুন্দর। 

এই সৌন্দর্যের ভেতর সামনের তিনঘণ্টা আমরা ছাড়া গরু। নদীতে নেমে যাব, পাথরে বসে ছবি তুলব, কনকনে ঠাণ্ডা জল, আঙুল দশ সেকেন্ডের বেশি ডুবিয়ে রাখা যায় না, কিন্তু উল্টোদিকে বরফপাহাড়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা সঙ্গীর গায়ে ছিটোনোর জন্য যথেষ্ট সময়। পায়ের তলায় সাদা বেগুনি হলদে ফুলের দল অবুঝের মতো ঘন হয়ে আসে, একসময় আর ডিঙিয়ে যাওয়া যায় না। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তা আলাদা হয়ে যায় কখন, হঠাৎ দেখা যায় সেটা মাথার বিশ হাত ওপর দিয়ে বইছে। সেখানে পৌঁছোতে গেলে হয় যতদূর হেঁটে এসেছ ততদূরে হেঁটে হেঁটে যাও, নয়তো পাথুরে দেওয়াল ধরে ধরে ওঠো। পারব? অমনি একটা বীভৎস আওয়াজ, একটা গরু, এতক্ষণ দেখতে পাইনি, পাথুরে পাহাড়ের গায়ে ঘুরে ঘুরে ঘাস খাচ্ছে। অ্যাকচুয়ালি, খাচ্ছিল। এখন খাওয়া থামিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হ্যা হ্যা হাসছে। আমাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব টের পেয়েছে নিশ্চয়। রোখ চেপে যাবে, পাথর আঁকড়ে আঁকড়ে উঠে আসব রাস্তায়, উঠে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে গরুটার চোখে চোখ ফেলতে চাইছি, কিন্তু সে হাই তুলে অদৃশ্য তুড়ি বাজিয়ে অন্য ঘাসের গোছা টার্গেট করেছে। এবার ফিরলেও হয়, কিন্তু না ফেরাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। পাহাড়ের গা জুড়ে পাইনের বন। কেউ সাজায়নি, বেছে বেছে বোনেনি পাহাড়ের গায়ে, নিজেরাই কেমন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছে, কেমন ফিগার মেন্টেন করেছে নিজেদের। ছোট পাইন গাছগুলোর শ্যাম্পু করা ফুরফুরে পাতা, ওপর দিকে সবক'টা হাত বাড়িয়ে আছে। কোলে নাও শিগগিরি, চারদিকে ধেড়ে ধেড়ে সব দাঁড়িয়ে আছ, কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না। বড় গাছেদের হাতা সমান্তরাল, ছোটদের মাথায় ছাতা মেলে আছে। কী ডিসিপ্লিন, কী ল অ্যান্ড অর্ডার। এমর আম জাম সজনে? ট্র্যাফিকনিয়ম ভেঙে ছুটেছে এদিকসেদিক যেদিকে মন চায়। হোপলেস।


এই বোর্ডের ওপাশে গেলে পুলিস, থুড়ি প্যারামিলিটারি ধরবে। 


কামরু ফোর্ট 

কামরুর প্রসঙ্গ সারাহানের পোস্টে একবার এসেছিল মনে আছে? বুশেহরের রাণা/রাজাদের আদত শক্তিকেন্দ্র ছিল এই কামরু। কামরু সাংলা উপত্যকার একটি বর্ধিষ্ণু জনপদ। এখান থেকেই তাঁরা প্রথমে সারাহান এবং পরে রামপুরে সরে যান। সাংলা শহর থেকে কিলোমিটার দুয়েক দূরে কামরু দুর্গ এখনও আছে পাহাড়ের ওপর। ঈশ্বরজীর সঙ্গে আমরা চললাম সে দুর্গ দেখতে।

সাংলার প্রধান চক থেকে ডানদিকে গোঁত্তা নিয়ে খাড়াই একটা ঢাল বেয়ে উঠে গাড়ি থামল একটা বড় গেটের সামনে। দেখে আমার একটু, একটু না বেশই, অভক্তি হল। চারদিকে গিজগিজ করছে বাড়ি/ গিজগিজে বাড়ির মাঝখানে একটা চুনসিমেন্টের তোরণ, গায়ে কাঁচা হাতের ফুলপাতা ডিজাইন। তোরণের সামনে একটা তুলসী মঞ্চের মতো ব্যাপার, শ্রীকৃষ্ণ না কোন ঠাকুরের মন্দির। একটা রাস্তা তোরণের ভেতরে ওপর দিকে উঠে গেছে, বাঁধানো পাথরের রাস্তা, দুপাশে চেপে এসেছে বাড়িঘর, পাশে সরু নালা। ময়লা কাপড় পরা এক বুড়ি বসে বসে ডাল দিয়ে খুঁচিয়ে সে নালা সাফ করছে। ঈশ্বরজী আমাদের উৎসাহ দিলেন, যাইয়ে যাইয়ে। 

গেলাম। উঠছি আর সন্দেহ ক্রমেই ঘনাচ্ছে, এ কীরকম ফোর্ট? গোবরে ছয়লাপ রাস্তা, দুপাশের বাড়ি থেকে জল বেরিয়ে নর্দমায় পড়ছে, কোনও বাড়ির সামনের দিক, কোনও বাড়ির পেছনের চাতাল, চাতালে বসে ব্যাজার মুখে কেউ ইট ভাঙছেন হাতুড়ি দিয়ে।

আমার বুকের ভেতরও হাতুড়ি পড়ছিল। কী খাড়াই কী খাড়াই। দশ পা চলতে না চলতে হৃদপিণ্ড দুই হাতে কেউ চেপে ধরে, ভয় লাগে ফট করে ফেটে যাবে এক্ষুনি। নাকের ডগা জ্বলতে শুরু করেছে বাতাসের কামড়ে। একেকটা মোড় ঘুরছি আর সামনে আবির্ভূত হচ্ছে প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি খাড়া রাস্তা। প্রতিবার থেমে শপথ নিচ্ছি বাড়ি গিয়ে যোগব্যায়াম শুরু করব। দুটো কলাবিনুনি বাঁধা মেয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে মোড়ের মাথায় রাস্তার ধারের রেলিং-এ বসে কীসব চেটে চেটে খেতে খেতে গুজগুজ ফুসফুস করছিল, আমাদের প্রশ্নের উত্তরে জানাল, ফোর্ট আরও পনেরো মিনিট। টলতে টলতে চললাম। অবশেষে হঠাৎ দুম করে চারপাশের বাড়িঘর ফুরিয়ে গেল, চোখের সামনে একখানা বাজখাঁই দরজা বেরিয়ে পড়ল, হ্যাঁ এটাকে দেখে একটু একটু কেল্লা কেল্লা মনে হচ্ছে বটে।


গেটের ভেতরে আরও একটা গেট। এই দ্বিতীয় গেটের ওপর সাঁটা কাঠের নোটিসবোর্ড।

টুপি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। 
কোমরবন্ধনী ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। 
ঋতু চলাকালীন মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ। 

ওয়েল, আত্মসম্মান বলে যদি কোনও বস্তু থেকে থাকে, তাহলে এর একটা প্রতিবাদ করতে হয়। কয়েকটা অপশন মাথায় এল। এক, মারাত্মক নিরীহ দেখতে যে বুড়োটা গেটে বসে আছে, তার সঙ্গে ঝগড়া করা। যে রকম রোগাপটকা দেখতে, মারামারি লাগলে আমার জেতার একটা চান্স আছে। (তাছাড়া আশা করা যায় অর্চিষ্মানও আমার হয়ে ঘুঁষি চালাবে।) দুই, কেল্লা না দেখে ফিরে যাওয়া। এই অপশনটার কথা ভাবলাম আমি মন দিয়ে। পেছনের রাস্তাটার কথা মনে পড়ল। বুকের হাতুড়ির কথা মনে পড়ল। এর পর কেল্লা না দেখে ফিরে যাব? মাটিতে ভাত খেলেও এর থেকে বেশি ক্ষতি হয় চোরের। 

আমার মতো নিড়বিড়ে মেরুদণ্ডহীন মানুষদের জন্য আরেকরকম প্রতিবাদ হয়, সেটা হচ্ছে গোটা ব্যাপারটাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন। তুমি উন্মাদ তাই বলিয়া আমি সুস্থ হইব না কেন।

ঢুকে পড়লাম। টুপি পরে ছবিও তুললাম দাঁত বার করে। 



কামরু কেল্লার মতো আর কোনও কেল্লা দেখিনি আমি। ছোট্ট, কিন্তু গরিমা কম নেই। কেল্লার সামনে ছোট চাতালে দুটো গোলাপি রঙের গোলাপের গাছ, ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে।


কামরু নাম এসেছে কামাখ্যা থেকে। কেল্লার মধ্যে আছেন দেবতা বদ্রীনাথ, দেবী কামাখ্যা। নাকি আসাম থেকে আনা। এই সেই দেবী, বছর বছর অম্বুবাচীতে একবার করে যার ঋতু হয়, এবং সেই নিয়ে একমাস ধরে আদিখ্যেতার অনন্ত হয়। সে মন্দিরেও ঋতু চলাকালীন মেয়েদের প্রবেশাধিকার নেই। পুরুষ পুরোহিতদের মা স্বপ্নে আদেশ দিয়েছেন সম্ভবত।

মা মাগো, তুলে নাও মা।
                                                                                                                (চলবে)

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.