May 21, 2013

শিলং




মে মাসের গোড়ার দিকেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে বেড়াতে যাওয়ার সম্ভাবনা টলোমলো। বিয়ের ছুটি যৎসামান্য। তারপর দিল্লিতে ফিরে এসে দুজনের অফিসেই দক্ষযজ্ঞ শুরুর ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল। তখন একটা লম্বা উইকএন্ড নিয়ে পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যানটা যে খাটবে না সেটাও বুঝতে পারছিলাম।

তাই বলে কি বেড়ানো বাদ দেওয়া যায়? কক্ষনও না। এ বেড়ানো তো বেড়ানো নয়, খুড়োর কলের সামনে ঝোলানো হাতেগরম ফুলকো লুচি। বিয়ের প্রস্তুতির ডামাডোলের মধ্যে রোজ সকালে উঠে আমি একবার নিজেকে মনে করাতাম, এই তো আর ক’টা দিন, তারপরেই পাহাড় পাহাড়, ছুটি ছুটি।

কাজেই আমরা ঠিক করলাম দিল্লির ভরসায় বেড়ানোটা ফেলে রাখা উচিত হবে না। বউভাতের পর ওই যে তিনদিন লৌকিকতা বাবদে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, সেটা ভ্রমণখাতে খরচ করে ফেলা হোক। ভীষণ ভয়েভয়ে প্রস্তাবটা দিতে আমাদের অবাক করে দিয়ে দুপক্ষের মা-ই বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বেড়িয়ে এস। আবার কখন যাওয়া হয় না হয়। কোথায় যাবে কিছু ঠিক করেছ?”

ঠিক মানে একটা আন্দাজ তো ছিলই। কলকাতার নাগালে পাহাড় বলতে তো দার্জিলিং আর গ্যাংটক। তিনদিনের মধ্যে ব্যাপারটা সারতে হবে বলে গ্যাংটক বাদ হয়ে গেল। পড়ে রইল দার্জিলিং।

দার্জিলিং আমার আর অর্চিষ্মান দুজনেরই খুব প্রিয় জায়গা। লক্ষবার গেছি, আরও লক্ষবার যেতে পারি। যাবও। তাছাড়া কাঞ্চনজঙ্ঘায় অলকানন্দা রায়কে দেখা ইস্তক আমার ওই জ্যাকেটের গলার ওপর দিয়ে শাড়ির আঁচল দেখা যাচ্ছে, এই পোশাকে ম্যালে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সাধ। কিন্তু তবু কেমনকেমন লাগতে লাগল। কোথায় ভাবছিলাম খাজ্জিয়ারের নীরবতায় দু’দিন দম নেব, আর শেষে কি না দার্জিলিং-এর হট্টগোলে? তাও কি না সামার ভেকেশনের সিজনে?

টপ করে শিলং-এর নামটা মাথায় এসে গেল। কোথা থেকে কে জানে। শিলং আমি ছোটবেলায় বাবামায়ের সঙ্গে একবার গেছি। তখনই শহরটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। পত্রপাঠ প্লেন, হোটেল সবকিছু বুক করে ফেলা হল।

যাত্রার শুরুতেই কলকাতা-গুয়াহাটি বিমানযাত্রা। কলকাতার নতুন এয়ারপোর্টটা বেশ ঝকমকে। সিলিং-এ আবার ঐক্য বাক্য মাণিক্য প্রেম হাওয়া রোদ্দুর এইসব লেখা।


ট্রিপ অ্যাডভাইসরের কথামতো আমাদের গুয়াহাটি থেকে শিলং যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি বা বাস নিতে হত। এয়ারপোর্টে নেমেই মেঘালয় ট্যুরিজমের ছিমছাম কিয়স্ক চোখে পড়ল। পরিপাটি রিসেপশনিস্ট দুমিনিটের মধ্যে আমাদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলেন। চালকের নাম বিজয় সিং। আদতে নেপালি কিন্তু জন্মেছেন, বড় হয়েছেন শিলং-এ।

যাত্রা শুরু হল। আমি ভারতবর্ষের সবক’টা রাজ্য দেখিনি, কিন্তু যেক’টা দেখেছি তারমধ্যে সুন্দরীতম আসাম। নদী, পাহাড়, সবুজ সব মিলিয়ে আসামের গোটা ব্যাপারটা এত মোলায়েম, এত নরম, শান্ত, ভেজাভেজা---যে ভালো না লেগে পারা যায় না। আসামের মানুষেরাও ওই প্রকৃতিটার ছাঁচে গড়া। ধীর, শান্ত, ভালোমানুষ।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের পথ ধরলেন বিজয় সিং। কী সুন্দর ইউনিভার্সিটি। রাস্তার দুপাশে সারি দেওয়া ঘন গাছের ফাঁকেফাঁকে ছড়ানো পুরোনো বিল্ডিং। টিপটিপ বৃষ্টিতে ছাতা মেলে মেয়ের দল এ বিল্ডিং থেকে ও বিল্ডিং-এ চলেছে। আমরা জানালায় নাক ঠেকিয়ে দেখতে দেখতে চললাম। ঘোর ভাঙল বিজয়বাবুর গলায়।

“ভেজ ইয়া ননভেজ?”

শুরুতে খানিকটা থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। তারপর বুঝলাম আমাদের লাঞ্চের ব্যাপারে জানতে চাইছেন ভদ্রলোক। আমরা তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, “ননভেজ, ননভেজ।”

“ননভেজ বোলে তো? কেয়া কেয়া চলতা হ্যায়?”

আমরা বুক ফুলিয়ে বললাম, “সব চলতা হ্যায়।”

বিজয়বাবু দেখি বিশ্বাস করছেন না।  

“সব বোলে তো?”

“সব বোলে তো সব। পাঁঠা মুরগি বাছুর বরাহ সাপ ব্যাঙ বিচ্ছু সব।”

বিজয় সিংজী উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “তব তো আপ লোকাল খানা খা পায়েঙ্গে।”

পায়েঙ্গে মানে কী? লোকাল খানাই খায়েঙ্গে। ঘণ্টাদুয়েক চলার পর একটা জায়গায় এসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে বিজয় সিং জানালেন লাঞ্চের জায়গা এসে গেছে।

পথের পাশে একটা পাকাবাড়িতে খাওয়ার ব্যবস্থা। দোকানের গুণগত মান যাচাইয়ের যেটা সবথেকে বড় প্রমাণ, স্থানীয় লোকের ভিড়, সেটা দেখি এ দোকানে পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। ছেলেবুড়োমহিলাপুরুষ সকলেই কাঠের বেঞ্চিতে বসে একটা স্টিলের থালা থেকে চামচে করে কীসব খাচ্ছে। বিজয় সিংজী বুঝিয়ে দিলেন। এখানে হচ্ছে প্লেট ব্যবস্থা। একটা প্লেটে আপনি আপনার ইচ্ছেমতো ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ মাংস যা খুশি নিতে পারেন। সেটা শেষ হয়ে গেলে ওই থালাতেই সবকিছু বা আপনার যেটা চাই সেটা আবার নিতে পারেন।

আমরা ভাত তরকারি মাংস নিলাম। কাউন্টারের ওপার থেকে একজন অল্পবয়সী খাসি মহিলা হাসিমুখে প্লেট এগিয়ে দিলেন। ভাতটা স্থানীয় চালের, ওঁরা বলেন রেড রাইস। দেখতে অনেকটা সাদাভাত লালশাক দিয়ে মাখলে যেমন দেখায় সেরকম। তার পাশে রাখা আলু আর বিন্‌স্‌ ভাজা, ঝোলসহ দুপিস মাংসের টুকরো, দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভীষণ ভালো খেতে এবং অসম্ভব ঝাল, কুচো টমেটো শশা ধনেপাতার স্যালাড আর তার সঙ্গে একচামচ, বিশ্বাস করবেন না, ঘন সবুজ খারকোল বাটা।

একেই বলে নিয়তি। বিয়ের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মা যে কথাটা প্রথম বলেছিলেন সেটা হচ্ছে, “ইস্‌ কত ভেবেছিলাম তোকে একটু খারকোল বাটা খাওয়াব, এত ভালোবাসিস। সময়ই হল না, ধুর।”

আমি প্লেট বেঞ্চিতে নামিয়ে রেখে মাকে ফোন করলাম। মা ভীষণ খুশি হয়ে বললেন, “খাও খাও মা, পেট ভরে ভালো করে খাও।”

কী ভালো করেই না খেলাম। ওই আলু বিন্‌স্‌ ভাজা দিয়েই আমার পুরো ভাত উঠে যেত, নেহাত মাংসের জন্য কিছুটা বাঁচিয়ে রাখতে হল। মাংসটির কথা এখনও মনে করে দিল খুশ হয়ে যাচ্ছে। ধোঁয়া ওঠা গরম, মুখে দিলে মিলিয়ে যায় নরম, আর তেমনি ঝাল। কিছু ঝাল খেতে পারে বটে ওদেশের লোক। বাঙালদের প্রায় হারিয়ে দেয় আর কি। তার ওপর দেখি চ্যালেঞ্জ দেওয়ার মতো করে আবার বাটিভর্তি লালসবুজ লংকা বেঞ্চির ওপর রেখে গেছে। আশেপাশের সবাই উদাস মুখে ওই ঝাল মাংস মুখে পুরে দিব্যি কটাস্‌ করে লংকায় কামড় বসাচ্ছে। আমাকেও চক্ষুলজ্জার খাতিরে একটা লংকা খেতে হল। স্বীকার করছি, একফোঁটা জল এসেছিল চোখে। সেই দেখে অর্চিষ্মানের হাঁটু থাবড়ে কী হাসি। বলে কি না, “আরও যাও বীরত্ব দেখাতে।”

আরও দু’ঘণ্টা চলার পর হোটেল এসে গেল। আমাদের হোটেলটা গোটাটাই একসময় ছিল ত্রিপুরারাজার বাড়ি। রবীন্দ্রনাথ এই বাড়িতে রীতিমতো বাস করেছেন। তাঁর ব্যবহার করা পালংক এখনও হোটেলে রাখা আছে, অ্যামেরিকান সাহেমমেমেরা খচাৎ করে ডলার ফেলে সেই খাটে শোয়। বাড়ির এক অংশে এখনও রাণীমা থাকেন শুনলাম।


আমাদের পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গিয়েছিল। হোটেল ছিল শহর থেকে একটু দূরে। বিজয় সিংজী প্রথমে সেই নিয়ে খুব আক্ষেপ করছিলেন, “কাঁহা জঙ্গল মে আ কে বৈঠ গয়ে” কিন্তু আমরা তাঁকে বোঝালাম যে জঙ্গলই আমাদের পছন্দ। সেদিন বিকেলে আমরা রুমসার্ভিসে দার্জিলিং চা আর গরমগরম ফিশ ফিংগার আনিয়ে এম টিভি দেখতে দেখতে খেলাম। ঘরের ভেতর এত ঠাণ্ডা ছিল যে ব্লোয়ার চালিয়ে রাখতে হয়েছিল।

পরদিন ভোরবেলা উঠে খুচখাচ ফোটোসেশন সেরে ব্রেকফাস্ট খেতে যাওয়া হল। অপশন ছিল নানারকম। পরাঠা থেকে পাউরুটি, সিরিয়াল থেকে সসেজফ্রাই। আমরা ডিম পাউরুটি সসেজ খেয়ে উঠতে না উঠতেই বিজয় সিং ভেঁপু বাজিয়ে এসে গেলেন। তিনজনে মিলে চেরাপুঞ্জির পথে বেরোনো গেল।



বছর দশেক আগে যখন চেরাপুঞ্জি এসেছিলাম ভীষণ মজা লেগেছিল। একটা জায়গা, সেখানে সর্বক্ষণ টিপটিপ বৃষ্টি পড়েই চলেছে। এত বৃষ্টি হলে যা হয়, লোকজন পাত্তাই দিচ্ছে না। ছাতামাতা ছাড়াই দিব্যি রাস্তাঘাটে চলাচল করছে। বৃষ্টির থেকেও যেটা বেশি মজা লেগেছিল সেটা হচ্ছে মেঘের ছড়াছড়ি। একটা দোকানে বসে আমি মা আর বাবা লাঞ্চ খাচ্ছিলাম আর দোকানের জানালা দিয়ে ধোঁয়ার মতো কীসব ঢুকে আসছিল। বাবা বলেছিলেন, ওগুলো আসলে মেঘ। বিশ্বাসই হয়নি।

কিন্তু এবার সেসব আবার দেখতে পাওয়ার আশার বদলে বুক ধুকপুক করছিল বেশি। বিয়েবাড়িতে একঘর আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল যাঁরা সদ্য চেরাপুঞ্জি ঘুরে এসেছেন। মুখ বেঁকিয়ে বলেছিলেন, মেঘ বৃষ্টি কিস্যু নেই, স্রেফ খটখটে রোদ। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এ আবহাওয়ার ভোল পালটে ছেড়েছে। তাঁরা বলেছিলেন, “ওসব চেরাপুঞ্জি গিয়ে কী হবে, তার থেকে বরং কাছেই সাউথ ইস্ট এশিয়ার ক্লিনেস্ট ভিলেজ আছে সেটা দেখে আয়।”

আমরা অবাধ্য ছেলেমেয়ে, কথা না শুনে চেরাপুঞ্জিতে যাওয়াই ঠিক করেছিলাম। ভুল যে করিনি, আধঘণ্টাখানেক চলার পরেই সেটা বোঝা গেল। দুপাশের কুয়াশা ক্রমশ দুর্ভেদ্য হয়ে উঠল, জানালার কাঁচে বিন্দুবিন্দু জলের ফোঁটা জমে উঠল, শেষে হেডলাইট জ্বালানো ছাড়া গতি রইল না। বিজয় সিংজী কেবল মাথা চাপড়াতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন, “কেয়া ঘটিয়া নসিব, কুছ ভি দেখনে কো নেহি মিলেগা। আপলোগোকা পুরা পয়সা বরবাদ হো গয়া...”


আমরা এদিকে গাড়ির ভেতর বসে প্রায় লাফাতে লাগলাম। এই তো চেয়েছিলাম। মেঘালয়ে এসে যদি মেঘ না দেখি তাহলেই তো পয়সা বরবাদ। ঝলমলে রোদ্দুর চাইলে তো ফ্লোরিডা গেলেই হয়। বিজয় সিংজী ঘন কুয়াশার দিকে আঙুল দেখিয়ে দেখিয়ে বলতে লাগলেন, এখানে অমুক জলপ্রপাত আছে, ওখানে তমুক জলপ্রপাত, আর বলতে বলতে তাঁর দুঃখ উথলে উঠতে থাকল। আমাদের মন তো খারাপ হলই না, কুয়াশার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সে আরও চাঙ্গা হয়ে উঠল।


অবশেষে চেরাপুঞ্জি পৌঁছলাম। মওসমাই গুহায় একটা দুঃখের ব্যাপার ঘটেছিল, সেইটা বলি। মওসমাই গুহা ভারত বাংলাদেশের সীমান্তে। ট্যুরিস্টদের জন্য গুহায় সুন্দর আলোর ব্যবস্থা করা আছে। সিস্টেমটা হল একদিক থেকে ঢুকে আরেকদিক থেকে বেরোতে হবে। বিজয় সিংজী বলে দিয়েছিলেন, গুহার ভেতর জল থাকলে না এগোতে। গুহার মুখে পৌঁছে দেখি আশেপাশে যে গুটিকতক লোক আছে সবাই বাঙালি। সারা রাস্তাতেই এঁদের সঙ্গে দেখা হতে হতে এসেছে। আমরা চা খেতে নেমে দেখেছি এঁরা ফ্রুট স্যালাড খাচ্ছেন। আমরা কুয়াশার ফোটো তুলতে নেমে দেখেছি এঁরাও গাড়ি থামিয়ে ফোটো তুলছেন। গুহায় পৌঁছেও এঁদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দুদলই নিজেদের জন্য এবং ক্যামেরার জন্য টিকিট কাটলাম।

ওঁরা গটগটিয়ে এগিয়ে গেলেন। আমাদের দুজনেরই আবার ধীরেসুস্থের বাতিক, আমরা একবোতল লিমকা কিনে আরাম করে খেতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে গুহার দিকে এগোতে গিয়ে দেখি আগের দলটি ফেরত আসছে। ব্যাপারখানা কী? আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একজনের তিতিবিরক্ত গলা শুনতে পেলাম, “আরে ধুর, এটা আবার গুহা নাকি। সে গেছিলাম বোরাগুহায়, আরাকুভ্যালিতে...” বলে উপকারী ভদ্রলোক আমাদের উদ্দেশ্য করে, “যাবেন না, মেঝেতে একগাদা জল জমে আছে...” ছুঁড়ে দিয়ে চলে গেলেন।

আমরা দুজন খুব হাসতে হাসতে, নিচুগলায় কাওয়ার্ড ইত্যাদি বলেটলে বীরবিক্রমে গুহার দিকে এগোলাম। অর্চিষ্মান আমারও আগে গটগট করে গুহায় ঢুকে গেল। গুহায় তিনচারটে ল্যাম্প জ্বলছিল বটে, কিন্তু সূর্যের আলোর তুলনায় সে হাস্যকর। হঠাৎ আলো থেকে আঁধারে এসে পড়ায় আমার চশমার অ্যাডজাস্ট করতে একটু টাইম লাগছিল, আমি ধীরে ধীরে দেওয়াল ধরে ধরে এগোচ্ছিলাম। এমন সময় অর্চিষ্মান মুখ চুন করে ফিরে এসে বলল, “যাওয়া যাবে না মনে হয়, বুঝলে।”

আমি ভয়ানক খুশি হয়, “বোঝা গেছে নাকতলার দৌড়, এইবার দেখবে মফস্বলের কামাল” বলে এগিয়ে গেলাম। যা হওয়ার তাই হল। মায়ের ফেভারিট প্রবাদ, ‘অহংকার পতনের মূল’, অক্ষরে অক্ষরে ফলল। সত্যি দেখি গুহার মেঝেতে জল জমা আছে, তার ওপর দিয়ে কাঠের সরু সরু দুটো পাটাতন ফেলা।

আমরা গম্ভীরমুখে গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম। আসতে আসতে দেখলাম একটি পাঞ্জাবি ফ্যামিলি গুহার দিকে এগোচ্ছে। বাবা মা আর বছর পাঁচেকের একটি ছেলে। একবার ভাবলাম বলি যে যাবেন না। কিন্তু বললাম না। বাইরে এসে বাকি লিমকাটুকু খেয়ে ব্যর্থতার জ্বালা ভুলছি, মিনিট দশ পরেই দেখি গুহার এক্সিট দিয়ে পাঞ্জাবি পরিবার অক্ষত দেহে হাসিমুখে বেরিয়ে আসছে। সবার আগে লাফাতে লাফাতে বাঁদর ছেলেটা।

স্থানীয় দোকানিদের কাছ থেকে শুনে বোঝা গেল একজন বাঙালিও সেদিন সকাল থেকে ওই গুহা পেরোতে পারেনি, প্রথম যে অবাঙালি পরিবারটি এসেছে, তারাই পেরেছে।

রাগ ধরে না বলুন?

যাই হোক, ফেরার পথে বিজয় সিংজীর মন ভালো করে দিয়ে ঝলমলে রোদ্দুর উঠেছিল আর আমরাও যাবতীয় প্রপাত স্বমহিমায় দেখতে পেয়েছিলাম।


ফেরার পথে আর বলার মতো কিছু ঘটেনি। সকালের সসেজগুলো শুধু পেটের মধ্যে আবার বাছুরে পরিণত হয়ে গুঁতো মারছিল, গাড়ি দাঁড় করিয়ে পাহাড়িরাস্তার নিয়মরক্ষা বমি করে তাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেল। এইসব করেটরে আমরা এমন নেতিয়ে পড়লাম যে বিজয় সিংজী বললেন, “লাগতা হ্যায় আজ আপলোগ সিটি মে ঘুম নেহি পায়েঙ্গে।”

আমরা এমন ভাব দেখালাম যেন, ম্যাগো, সিটিটা আবার একটা ঘোরার জায়গা হল? ঘরে ফিরে ব্লোয়ার চালিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে সেই যে ঘুমোলাম, ঘুম ভাঙল একেবারে দরজায় রুমসার্ভিসের টোকায়।

ডিনারে আমরা আগে থেকে খাসি খাবার অর্ডার করে রেখেছিলাম। জাডো বলে একরকমের ভাত হয় আর তার সঙ্গে পর্ক কারি। আমাদের যেহেতু কোনও ধারণাই নেই, তাই কারির রকমটা হোটেলের লোককেই ঠিক করতে দেওয়া হয়েছিল। ঢাকনা তুলতেই সুগন্ধে ঘর ভরে গেল। সবুজ রঙের কারি। শুনলাম ওটাকে বলে দো জেম। তিল দিয়ে রান্না করতে হয়। ভীষণ ভালো খেতে।          

পরদিনই ফেরার পালা। আগের দিনের অভিজ্ঞতা মনে থাকায় আর সসেজমুখো হলাম না। স্রেফ কর্নফ্লেক্স খেয়ে রওনা দিলাম। কোনও জায়গা থেকে ফেরার পথে কেমন একটা ক্লান্তি কাজ করে না? সেদিন রাস্তাটা ঝিমিয়েই কেটে গেল। মনে হচ্ছিল এবার বাড়ি পৌঁছলেই হয়। ঘণ্টাচারেক পর যখন রাস্তার দুপাশে “ছিটি ছেলুন চপ” জাতীয় ব্যানারের আবির্ভাব হল, আর দেখলাম আশপাশ দিয়ে যত গাড়ি ওভারটেক করছে তাদের সবার একদিকে STOP আর অন্যদিকে “রও” লেখা, তখন মন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বুঝলাম গুয়াহাটি এসে গেছে।
         

মাগো, কী বিচ্ছিরি!


জীবনে প্রথমবার মুলো কিংবা গাঁদালপাতা চেখে দেখার সময় আমার মুখটাও নির্ঘাত এইরকমই হয়েছিল।



May 20, 2013

মাস্টারমশাই আর দিদিমণিরা



বিয়েবাড়িতে একটা জিনিস খেয়াল করে আমার মন খুশি হয়ে গেল। দেখলাম আমার চারপাশের অনেক মানুষই শিক্ষক। আমি নিজে শিক্ষকতা করিনি কিন্তু এটা যে আমার প্রিয়তম প্রফেশন তা নিয়ে কোনও দ্বিধাই নেই। আমার শাশুড়ি মা, আমার প্রিয়বন্ধু স্বাতী, স্বাতীর বর সোমনাথদা, আমার বড়দাদু, পিসিশাশুড়ি---দেখা গেল এঁরা সকলেই শিক্ষকতা করেন বা একসময় করতেন।

ফলে যেটা হল, শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা নিয়ে একগাদা গল্প জোগাড় হল। মাস্টারমশাইরা বললেন, দিদিমণিরা বললেন, বাদবাকি যাঁরা এককালে ছাত্র ছিলেন তাঁরাও গল্প বলায় বাদ গেলেন না। সেই গল্পগুলো জড়ো করে এই পোস্টটা লিখছি।

গল্প শুরু করার আগে বলে রাখি গল্প যে সব ভালো তা নয়। কিছু ভালো, কিছু হাসির। মাস্টারমশাইরাও তো মানুষ তাই তাঁদের মধ্যেও কাউকে কাউকে দেখে হয়তো হাসি পায়। তার মানে কিন্তু এই নয় যে তাঁদের প্রতি আমার ভক্তি কিছু কম আছে।

প্রথমেই আমার মাস্টারমশাইয়ের গল্প। আমাকে গ্র্যাজুয়েশনে অর্থনীতি পড়াতেন শ্রী সলিল কুমার সিদ্ধান্ত। যেমন গম্ভীর নাম, স্যারের চেহারা এবং ব্যক্তিত্বও মানানসই ছিল। ওঁর পরে অনেক নামজাদা লোকের কাছে পড়েছি কিন্তু মার্জিন্যাল ইউটিলিটি বা ব্লিস্‌ পয়েন্ট স্যারের থেকে বেশি জলভাত করে বোঝাতে পারতে কাউকে দেখিনি।

স্যার জীবনে লক্ষলক্ষ খাতা দেখেছিলেন। সেরকমই একটা খাতায় নাকি এক ছাত্র সবুজ বিপ্লব কাকে বলে লিখতে গিয়ে পাঁচ প্যারাগ্রাফ ধরে ধুন্ধুমার যুদ্ধের বর্ণনা লিখে তারপর লিখেছিল, “এই বিপ্লবে যত রক্তপাত হইয়াছিল সকলই সবুজ রঙের হওয়াতে ইতিহাসে এই বিপ্লব সবুজ বিপ্লব নামে খ্যাত।”

আচ্ছা, আপনারাই বলুন, এত কাঁচা গল্প বিশ্বাস করা যায়? আমিও করিনি।

কিন্তু এবারের গল্পটা আমার মেজমামার মুখে শোন। আর আমার মেজমামাকে চিনলে আপনি বুঝতে পারতেন, ফাজলামি মারা ওঁর ধাতে নেই। কাজেই বিশ্বাস করতেই হয়েছে।

মামাদের স্কুলে ভূগোল পড়াতেন ইন্দ্রস্যার। ভালোই পড়াতেন, তবে ছাত্রমহলে জনপ্রিয় ছিলেন না। তার কারণ ছিল ইন্দ্রস্যার ছাত্রদের মানুষ মনে করতেন না। “তোরা তো সব পোলাপান” গোছের একটা তাচ্ছিল্য তাঁর হাবভাবের মধ্যে সবসময় ফুটে বেরোত। একদিন নাকি ইন্দ্রস্যার ক্লাসে ঢুকেই, সিলেবাসের বাইরে থেকে ছাত্রদের একটা ভয়ানক খটমট প্রশ্ন ধরেছিলেন। কেউই বলতে পারেনি, এমনকি ফার্স্ট বয়ও না। তখন ইন্দ্রস্যার “পারলি না তো? জানতুম” একটা হাসি দিয়ে চেয়ারে এলিয়ে পড়ে, সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন,

“একএক সময় ভাবি, কী করে এত জানলাম।”

কথাটা যে স্যার ভয়ানক হাসির বলেছেন, সেটা ওই হাফপ্যান্ট পরা বয়সেও মামারা বুঝে ফেলেছিলেন। আর কোনওদিন আড়ালে কোনও ছাত্র ওঁকে ‘জ্ঞানীস্যার’ ছাড়া আর কিছু বলে ডাকেনি।

এবার আমার শ্বশুরবাড়ির এক মাস্টারমশাইয়ের গল্প বলি। এই মাস্টারমশাইয়ের গল্পটাও একটু হাসির, কিন্তু তাতে মাস্টারমশাইয়ের কোনও দোষ নেই। তিনি নেহাতই পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। মাস্টারমশাই আমার শাশুড়ি মা, মাসিশাশুড়ি, মামাশ্বশুরদের অংকের গৃহশিক্ষক ছিলেন। সপ্তাহে তিনদিন সন্ধ্যেয় অংকের ক্লাস বসত। সেরকমই এক সন্ধ্যেয় এক ভয়ানক অংকের আবির্ভাব ঘটল। ভাইবোনরা সবাই ধরাশায়ী হল, এমনকি অংকে যার মাথা আশ্চর্যরকম বেশি খেলত সেই বড়মামাও রক্ষা পেলেন না। তখন সবাই মিলে মাস্টারমশাইকে ডেকে বলল, “দেখুন না মাস্টারমশাই, এই অংকটা কিছুতেই হচ্ছে না।”

ভালোমানুষ মাস্টারমশাই, “কই দেখি কী অংক” বলে বই টেনে নিলেন। বইয়ের পর খাতা টানলেন। খাতার পাতায় আঁকিবুকি কাটতে কাটতে মাস্টারমশাইয়ের মুখ ক্রমশ গম্ভীর হতে লাগল। ছাত্রছাত্রীরা সব চারদিক থেকে গোলগোল চোখে তাকিয়ে ছিল, মাস্টারমশাই যে প্যাঁচে পড়েছেন সেটা আর কারও বুঝতে বাকি রইল না।  

মিনিটদশেক ধস্তাধস্তির পর মাস্টারমশাই অবশেষে হাল ছাড়লেন। বইখাতা সরিয়ে রেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “এইডা কালকে হইবখানে। কোথায় জানি একখান্‌ মজা কইর‍্যা থুইসে।”

সেই থেকে আমি কথার মধ্যে চান্স পেলেই যখনতখন “মজা কইর‍্যা থুইসে” গুঁজে দিচ্ছি। মেট্রোর কার্ড স্ক্যান হচ্ছে না, নির্ঘাত কিছু একটা “মজা কইর‍্যা থুইসে”। মায়ের ফোন কিছুতেই পাচ্ছি না, বারবার “নট রিচেবল্‌” বলে চলেছে, সেখানেও নিশ্চয় কেউ বা কারা “মজা কইর‍্যা থুইসে”।    

সে যুগের মাস্টারমশাইরা যেমন অংক নিয়ে বিপদে পড়তেন, এ যুগের মাস্টারমশাইরা তেমন প্রেম নিয়ে বিপদে পড়েন। শুনছি নাকি ক্লাস ওয়ান টু থেকে আজকাল ছাত্রছাত্রীরা টুকটাক প্রেমে পড়তে শুরু করে। মিড্‌ল্‌স্কুলে উঠতে উঠতে সেটা ক্লাস ছেয়ে ফেলে আর হাইস্কুলে রীতিমতো মহামারীরূপ ধারণ করে। 

বেশিরভাগ শিক্ষকই এই মহামারীর সামনে সশ্রদ্ধ হার স্বীকার করেন, কিন্তু কিছু কিছু গোঁয়ার মাস্টারমশাই ফাইট দিতে ছাড়েন না। কেন কে জানে। একজন জীবনবিজ্ঞানের মাস্টারমশাইয়ের কথা শুনেছিলাম, তিনি নিজের কোচিংক্লাসে প্রেম রোধ করার জন্য বাধ্যতামূলক ভাইফোঁটা এবং রাখিবন্ধন চালু করেছিলেন।

ভাগ্যিস আমি ওই কোচিং-এ পড়তে যেতাম না।

তবে প্রেম নিয়ে যে অভিজ্ঞতাটার কথা স্বাতী বলল সেটাকে চট করে হার মানানো মুশকিল। কাজেই সেটা দিয়ে পোস্ট শেষ করব। স্বাতী আর ওর বর সোমনাথদা দুজনেই স্কুলে পড়ায়। আলাদাআলাদা স্কুল। স্বামীস্ত্রী এক জীবিকায় থাকার কিছু অমূল্য সুবিধে থাকে, যেমন একে ওপরের শিডিউল, কাজের চাপ ইত্যাদি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ইত্যাদি প্রভৃতি। তাই সেদিন যখন সেকেন্ড পিরিয়ডের পর স্টাফরুমে ফিরে এসে স্বাতী দেখল মোবাইলে সোমনাথদার মিস্‌ড্‌ কল তখন ও বেশ অবাক হয়ে গেল। টিফিনটাইম ছাড়া তো ওরা একে অপরকে ফোন করে না। ভাবতেভাবতেই আবার ফোন। স্বাতী ফোন তুলে বলল, “ব্যাপার কী?”

ওদিক থেকে সোমনাথদা ভীষণ উত্তেজিত স্বরে বলল, “আরে এটা তোমাকে না বলতে পারলে আমার পেট ফেটে যাচ্ছিল। জানো আজ ফার্স্ট পিরিয়ডে ক্লাস ফাইভের ছেলের খাতা থেকে কী আবিষ্কার করেছি?”

স্বাতীও ঘাগু টিচার। জিজ্ঞাসা করল, “কী শুনি? প্রেমপত্র?”

সোমনাথদা বলল, “প্রেমপত্র বলে অত হেলাছেদ্দা কোর না গো। ক্লাস ফাইভেরই আরেক ছাত্রীর উদ্দেশ্যে সে ছেলে লিখেছ...

ছোট ছোট নকুলদানা খেতে লাগে মিষ্টি
তোমার আমার ভালোবাসা বিধাতার সিস্টি।”


ছুটির পরে


হ্যালো হ্যালো হ্যালো, কেমন আছেন সবাই? ভালো আছেন তো? আমি খুব ভালো আছি। চক্ষের পলক না ফেলতে ফেলতে হুস্‌ হুস্‌ করে ক’টা দিন কেটে গেল। তবে তাতে আফসোস নেই কারণ আর একদিনও অবান্তর বিহনে থাকতে হলে আমার প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া হয়ে যেত।

আচ্ছা, এবার এ’কদিন কী হল সে কথায় আসা যাক। কথা কম নয়, তার ওপর শাকের আঁটির মতো গুচ্ছের ছবিও জমেছে। কাজেই আপনাদের ধৈর্য ধরে বসতে হবে। উঠিউঠি পালাইপালাই করলে চলবে না। ভেবেছিলাম ভেঙেভেঙে লিখব, কিন্তু তাতে যন্ত্রণা আরও বাড়বে বই কমবে না। তাছাড়া সময় যত যাবে স্মৃতিও তত ফিকে হবে। ছোটছোট কথা, হাসি, মানঅভিমান, মুহূর্ত কোথায় হাপিস হয়ে যাবে কে জানে। তাই ভাবলাম যত লম্বাই হোক না কেন, পুরো গল্পটা এই বেলাই বলে রাখি।

১১ই মে, ২০১৩, সকালবেলা

বিয়ে নিয়ে আমার আর অর্চিষ্মানের একটা প্রধান ঐক্যমত্যের জায়গা ছিল পুজোপাঠের বালাই না রাখা। খানিকটা অবিশ্বাস থেকে আর খানিকটা টোপরমুকুটধরাচূড়া পরা এড়ানো থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। আমাদের বাবামায়েরা ভয়ানক বাধ্য মানুষজন, তাই তাদের বাগ মানাতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। যাই দাবি করলাম, বাবামা ঘাড় নেড়ে রাজি হয়ে গিয়ে বললেন, “নিশ্চয়, তোমাদের ইচ্ছাই আমাদের ইচ্ছা।”

কিন্তু তারপর বাবা যে কথাটা বললেন সেটা শুনে আমাকে থমকাতে হল। বাবা বললেন, “তুমি আধুনিক হয়েছ খুব ভালো কথা। কিন্তু তাই বলে পূর্বপুরুষদেরও যে ঘাড় ধরে আধুনিক বানাতে হবে তেমন তো কোনও কথা হয়নি। কাজেই আমাকে তাঁদের জল দিতে দেওয়া হোক।” ঠাকুমাও বিছানায় শুয়েশুয়েই পা ঠুকে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “হোক হোক।” বিপদ দেখে আমি মায়ের দিকে তাকাতে মা কিছু বললেন না, শুধু একবার চোখ মটকালেন।

অগত্যা আমি বিদ্ধিতে রাজি হয়ে গেলাম।


বিদ্ধি নিয়ে আরেকটা মজার গল্প বলার আছে। ছোটবেলায় যখন দুপাতা ক্যাটম্যাটব্যাট পড়ে আমি ধরাকে সরা এবং ঠাকুমাকে একেবারে দুধভাত জ্ঞান করছিলাম, তখন একদিন কী একটা কথায় ‘বিদ্ধি’র কথা উঠেছিল। বোধহয় মুন্নাদিদির বিয়ের প্রসঙ্গেই হবে। ঠাকুমা খুব উৎসাহ নিয়ে বিদ্ধি কে করবে, কখন করবে এই নিয়ে কথা বলছিলেন। আমি শুনে খুব ঘাড় হেলিয়ে গা কাঁপিয়ে হেসে উঠে বললাম, “উফ্‌ ঠাকুমা, তুমি এত্ত কিউট না। ওটা ‘বিদ্ধি’ না, ‘বৃদ্ধি’।”

ঠাকুমা নাতনির জ্ঞানে ইমপ্রেসড্‌ হয়ে গিয়ে দুচারবার যেই না জোরে জোরে ‘বৃদ্ধি’ বলা প্র্যাকটিস করেছেন অমনি বাবা ঘরে ঢুকে বললেন, “আঃ মা, ভুলভাল বোলো না তো। বৃদ্ধি আবার কীসের, ওটা বিদ্ধি।”

যাই হোক, বিদ্ধি তো হয়ে গেল। বাবার ওপর দিয়েই চোটটা গেল বেশি। কিচ্ছুটি না খেয়ে ঘণ্টা তিনেক ধরে বাবু হয়ে বসে অং বং চং। সেই না দেখে মাও উপোস দিয়ে রইলেন। আমি আমার পাঁচমিনিটের দায়িত্ব সেরে এসে লুচি আলুর তরকারি নিয়ে ফ্যানের তলায় বসে গেলাম।

১১ই মে, বিকেলবেলা

বিয়ের সন্ধ্যে নিয়ে তো বিশেষ কিছু বলার নেই। আর পাঁচটা বিয়ের সন্ধ্যের মতোই। তবে অনেকদিন পর সেই সন্ধ্যেতেই আধঘণ্টাচল্লিশমিনিটের জন্য একবার বৃষ্টি নেমে চারপাশটা অসম্ভব মনোরম করে দিয়ে গেল। সেই দেখে সুমনদোলনমনাটুনার গ্যাং, “উফ্‌ কী সিম্বলিক দেখেছ সোনা/সোনাদিদি, অর্চিষ্মানও তোমার জীবনে শান্তির বারিধারা নিয়ে এসেছে কি না, এটা হচ্ছে তারই সিগন্যাল” গোছের বস্তাপচা রসিকতা করে হ্যাহ্যা করে হাসতে লাগল। জঘন্য।  

এই দেখুন সেই সন্ধ্যের কয়েকটা ছবি।

                           

১২ই মে, ২০১৩

এদিন সকালে উঠে স্নান করে খেতেখেতেই হঠাৎ দেখি বিকেল হয়ে গেছে। বিয়ের থেকেও এই দিনটা নিয়ে আমার টেনশন ছিল বেশি। আমার বাড়ির লোকজন আত্মীয়স্বজনদের আমার চেনা আছে, মেয়েবিদায়ের সময় কাঁদতে পেলে তাঁরা আর কিচ্ছু চান না। সেটা আটকানোর জন্য আমি নিজে অকারণে বেশিবেশি হাসতে লাগলাম। তবু দেখি মায়ের গলা ক্রমশ বুজে আসছে, বাবা মুখ কালো করে প্রাণপণে আই কনট্যাক্ট এড়াচ্ছেন। মামিদিদা বারবার গায়ে মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলতে লাগলেন, “ভালো থেক সোনামণি, সাবধানে থেক।” বুচিদিদিও দেখি রুমাল দিয়ে গাল মুছছে। জেঠি যে কোথায় লুকোলেন আর খুঁজেই পেলাম না। আমার ছোটকাকিমা খুব সাহসী মহিলা, একমাত্র তিনি দেখলাম একটুও কাবু হননি। গটগটিয়ে এসে আমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে, টা টা বাই বাই করে দিলেন। পেছন ফিরে সবাইকে টা টা করে বললাম, “কাল তাড়াতাড়ি যেয়ো কিন্তু।” এই না বলে আমি তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে তিন্নিকে বললাম, “শিগগিরি চল্‌। এখানে আর বেশিক্ষণ থাকলেই বিপদ।”

রাস্তায় আর বিশেষ কিছু ঘটেনি। গোলপার্কের কাছাকাছি পৌঁছে শরীরটা একটু কেমনকেমন লাগছিল। গাড়ি থামিয়ে অর্চিষ্মানকে দিয়ে একখানা লিমকা কিনে এনে দুচুমুক খেতেই আবার সব ঠিক হয়ে গেল।

ওবাড়ি পৌঁছে রাজকীয় অভ্যর্থনা পেলাম। আশীর্বাদের পালা শুরু হতে না হতেই বাইরে হইহই করে ঝড় উঠল। তার সঙ্গে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। ঘরের পর্দাটর্দা উড়ে বৃষ্টির কণা ঘরে ঢুকে পড়ল। শ্রীলঙ্কার উপকূল থেকে মহাসেন নামের যে ঝড় আসার কথা ছিল তারই প্রকোপে বোধহয়। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ভাগ্যিস আমার ডেঁপো ভাইবোনগুলো ধারেকাছে নেই। থাকলেই বলত, “দেখেছিস, সোনাদিদি যে অর্চিষ্মানের জীবনে সাইক্লোন হয়ে এসেছে, এ হচ্ছে তারই সিগন্যাল।”

১৩ই মে, ২০১৩

বউভাতের দিন সকালে বাড়িতে গানের অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হয়েছিল। মূলত তিন্নির উদ্যোগেই। গানটান খাওয়াদাওয়া সেরে আমি আর তিন্নি সাজতে চলে গেলাম। সেজেগুজে এসে দেখি লোকজন ততক্ষণে আসতে শুরু করেছেন।




১৪ই মে, ২০১৩

দ্বিরাগমনের আসল নিয়ম বোধহয় বউভাতের পরের পরের দিন বাপের বাড়ি এসে দুই রাত্রি কাটানো। কিন্তু আমরা জেটযুগের লোক, তাই সেটা বউভাতের পরের দিনই হল আর দুইয়ের বদলে মোটে একরাত হল। আমরা সেদিন শুধু পুরোনো ছবি দেখলাম, খাটে পা মুড়ে বসে ঘোর গরমে পাটিসাপটা, দুধপুলি আর পায়েস খেলাম, আর ছাদে গিয়ে আমগাছের তলায় ফোটোসেশন করলাম। এই দেখুন তার প্রমাণ।



ব্যস্‌, হয়ে গেল বিয়ে। আমি আর অর্চিষ্মান নাচতে নাচতে দিল্লি ফিরে এলাম আর কোটিকোটি উপহারের ভাণ্ডার মাথায় নিয়ে আমাদের দুই মা কলকাতায় বসে রইলেন। ওগুলো ওঁরা কী করে গোছাবেন, ভগবানই জানেন।

পুরো অভিজ্ঞতাটা আমার কেমন লাগল? খুব ভালো। আমি কেন যেন ধরেই রেখেছিলাম বিয়ে করতে আমার দারুণ খারাপ লাগবে। সে কথা এক্কেবারে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, আরও চেনাআধচেনা যাঁরা কষ্ট করে এই গরমে ঘেমেনেয়ে আমাদের বিয়েতে এসেছিলেন, ওই দুটো সন্ধ্যেকে অত সুন্দর করে তুলেছিলেন, তাঁদের সবার প্রতি আমাদের চিরকৃতজ্ঞতা রইল।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.