August 22, 2014

আসামী হাজির





হ্যালো হ্যালো হ্যালো। কেমন আছেন সবাই। আমার অবস্থা এখন খানিকটা বলার মতো জায়গায় এসেছে। মোটা উপসর্গগুলো লালনীলসাদা ওষুধের তাড়া খেয়ে ভেগেছে, পড়ে আছে খালি মাথা ঘোরা আর হাঁটু কাঁপা। সেগুলোকে দু’বেলা মুসাম্বি লেবুর বাতাস দিচ্ছি, আশা করি অচিরে তারাও রাস্তা দেখবে।

মাঝখান থেকে দশটা দিন হাওয়া হয়ে গেল। কাজের কথা ছেড়েই দিলাম, দশ দিনে উল্টে দেওয়ার মতো কাজ যে কিছু করে ফেলতাম না সে ভরসা এতদিনে নিজের ওপর আমার হয়েছে। অবান্তরের দশটা দিন নিয়েই যা চিন্তা। মা অবশ্য অনেকদিন আগেই বলেছিলেন। বলেছিলেন ব্লগ লেখা যেমন একটা (বদ্‌)অভ্যেস, ব্লগ না লেখাটাও তেমনই একটা অভ্যেস। সাতটা দিন না লিখে দেখ, আট দিনের দিন মনেই পড়বে না যে কোনওদিন ব্লগ নামের কোনও বালাই জীবনে ছিল।

ব্যস্‌। দেখতে দেখতে দিনের চারটি করে ঘণ্টা সময় বেড়ে যাবে, মাথার ভেতরের জঞ্জাল পরিষ্কার হয়ে ফুরফুরিয়ে হাওয়া খেলবে, কেরিয়ার ডানা মেলবে, পারসোন্যাল লাইফ পরিপূর্ণতায় ভরে উঠবে। আর তারপর, সব কাজ সারা হলে, বলা যায় না, হয়তো মা সরস্বতীর হাঁস এসে কলমে ভর করলেও করতে পারেন। তখন শুরু হবে সত্যিকারের লেখা। লোকে যাকে সাহিত্য বলে। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ। কপাল তেমন ভালো হলে দেখ গে হুড়হুড়িয়ে কবিতাই লিখতে শুরু করে দিলি।

হোয়াট!

গল্পউপন্যাসের লোভ দেখিয়ে মা যতটুকু কার্যোদ্ধার করেছিলেন, কবিতার হুমকিতে সে সব হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ল। কবিতা লেখা ঠেকাতে আমি অনেক কিছু করতে রাজি আছি, অবান্তর খুলে রোজ রোজ বাজে কথার চাষ তো তুশ্চু। গত সাতদিনে শুয়ে শুয়ে আমি অবান্তরের চেহারা নিরন্তর কল্পনা করতে লাগলাম, অদর্শনে সে যাতে ফিকে হয়ে না পারে তাই তার লালসাদা অবয়ব অবিরাম আমার দৃষ্টির সম্মুখে সিলিং-এর ওপর ভাসিয়ে রাখলাম। এ নিরলস থট-এক্সারসাইজের ঠ্যালায় অবশেষে ঘাম দিয়ে জ্বর পালাল, আর আমিও জিভ বার করে ছুটতে ছুটতে অবান্তরের কাছে এসে এই আবার ধর্না দিয়েছি।

আপনারাও আছেন কি? নাকি বোর হয়ে এদিকওদিক চলে গেছেন? তাহলে শিগগিরি দয়া করে আবার ফিরে আসুন। ত্রিপল পাতা হয়ে গেছে, মাইক টেস্টিং সারা, কবিগুরুর ছবিতে গোড়ের মালা, ধূপকাঠিতে আগুন পড়ে গেছে, অবান্তরপ্রলাপ শুরু হতে আর দেরি নেই।


August 11, 2014

R. I. P./ প্রথম পর্ব



কালো দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে বুক দুরদুর করছিল অবিরামের। একবার অলরেডি টোকা দিয়েছেন তিনি। আবার দেবেন কি না, দিলেও কতক্ষণ পর দেওয়া উচিত হবে – এ সব ভেবে অস্থির হচ্ছিলেন। আর একবার ঘাড় উঁচু করে দরজার আশপাশ পরীক্ষা করে দেখলেন অবিরাম। কলিং বেল বা কড়া, কোনওটাই নেই। অবিরামের কেন যেন ধারণা ছিল এই জায়গাটা সেকেলে ধরণের হবে। বেশ সিংদরজা থাকবে, সিংদরজার গা থেকে বেশ কাঁটা কাঁটা বেরিয়ে থাকবে, দু’পাশে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে ইয়া গোঁফওয়ালা, সোনালি কোমরবন্ধ পরা দারোয়ান। সে সব কিছুই নেই দেখা যাচ্ছে। আছে কেবল একটা কালো কুচকুচে কাঠের দু’পাল্লাওয়ালা দরজা, পাল্লার গায়ে খোপখোপ ডিজাইন করা। ব্যস্‌।

ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশটা আর একবার দেখলেন অবিরাম। খাঁ খাঁ করছে। জনমানুষের দেখা পাওয়ার আশা তিনি করেননি, কিন্তু গাছপালা কুকুরবেড়ালের চিহ্নও নেই। দিগন্তজোড়া একটা ঘাসহীন ধূসর মাঠ, মাঠের মধ্যিখানে একটা কালো বন্ধ দরজা, দরজার বাইরে ক্যারি-অন সাইজের একটা সুটকেস হাতে দাঁড়িয়ে আছেন অবিরাম। দরজার আশেপাশে পাঁচিলটাঁচিল কিচ্ছু নেই। মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে থাকার পর দরজার পাশের ফাঁকা জায়গা দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন অবিরাম, পারেননি। চেষ্টা করা মাত্র হাওয়ার দেওয়াল তাঁকে ছিটকে ফেলে দিয়েছে। তার মানে দেওয়াল একটা আছে, কিন্তু সেটা চোখে দেখা যাচ্ছে না।

আর একবার টোকা দিলেন অবিরাম। আগের বারের থেকে জোরে দেবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু হয়ে গেল আগের বারের থেকেও আস্তে। নিজের ওপর এমন ধিক্কার হল অবিরামের। এত বয়স হয়ে গেল, ঠিক করে একটা টোকা তিনি মারতে শিখলেন না।

কান খাড়া করে রইলেন অবিরাম। ভেতর থেকে কোনও শব্দ আসছে কি? যে রকম চুপচাপ চারদিক, পিন পড়লেও শোনা যাওয়া উচিত। কিন্তু অবিরামের আবার কানে কম শোনার সমস্যা আছে। সমস্যা এতটা বেশিও নয় যে লোকে হিয়ারিং ইমপেয়ারড মনে করে সহানুভূতিশীল হবে আবার এতটা কমও নয় যে অবিরাম নিজে টের পাবেন না। কতবার যে বরাভয়দা’র জোকসের উত্তরে সবাইকে হাসতে দেখে তবে হাসতে শুরু করেছেন তিনি। জোকস বুঝতে পারেননি বলে নয় (বরাভয়দা অত সূক্ষ্ম জোকস বলতেন না) হাসতে দেরি হয়েছে জোকসটা ঠিকমতো শুনতে পাননি বলে।

নাঃ, কোনও আওয়াজ নেই। এ তো মহা ঝামেলাউল্টোদিকে ঘুরে চলে যেতে পারেন অবিরাম কিন্তু ফেরার রাস্তা জানা নেই তাঁর। এই দরজার বাইরে সারারাত দাঁড়িয়ে থাকতে হলেই তো হয়েছে। মরিয়া হয়ে আর এক বার হাত তুললেন অবিরাম।

টোকাটা দরজার ওপর পড়ার আগেই ঘটাং করে দরজা খুলে গেল।

একটা ষণ্ডামার্কা লোক ভুরু কুঁচকে অবিরামের দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটা অবিরামের থেকে লম্বায় দেড়া, চওড়ায় দু’গুণ। বরাভয়দা’র বসার ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো তিব্বতি মুখোশটার কথা মনে পড়ে গেল অবিরামের। ঘোর সবুজ রঙের মুখমণ্ডলের হাঁমুখ থেকে ঝুলন্ত রক্তবর্ণ জিভ। ঠিকরে আসা চোখের কালো মণি ঘিরে হলুদ মাংস। এই ষণ্ডা লোকটার মুখের সঙ্গে মুখোশটার মুখের ভাবের অনেকটা মিল আছে। অবিরাম হাসতে চেষ্টা করলেন, পারলেন না। ‘নমস্কার’ বলার চেষ্টা করলেন, মুখ হাঁ হল শুধু, আওয়াজ বেরোলো না। গলা শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেছে। এবার ষণ্ডা লোকটা নিজের মুখ হাঁ করল। লাল টকটকে মুখ থেকে পুচ্‌ করে খানিকটা পানের পিক ফেলে চোখ পাকিয়ে বলল,

চলুন।

পেছন ফিরে জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করল লোকটা।

অবিরাম দরজার ভেতর পা রাখলেন। দরজার এ পাশটা একেবারে অন্যরকম। সবুজ পাতায় ছাওয়া বড় বড় গাছ, গাছের ডালে ডালে ফল। ঘন বাগানের মধ্যে দিয়ে কিচিরমিচির পাখির ডাক শুনতে শুনতে ষণ্ডার পেছন পেছন চললেন অবিরাম। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সোনালি রোদ্দুর অবিরামের গায়ে মাথায় এসে পড়তে লাগল। একটা খুব চেনা সোঁদা গন্ধ আসছিল নাকে। একটু মনঃসংযোগ করে ভাবতেই মনে পড়ে গেল। ছাতিম। ছোটনাগপুরের দিকের জঙ্গলে ছাতিম গাছ হয় খুব। ছোটবেলায় মামার বাড়ি গিয়ে সারাদিন এই গন্ধের ভেতর ডুবে থাকতেন অবিরাম।

ষণ্ডাটার হাফ ছোটা হাফ হাঁটার সঙ্গে তাল মেলাতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল অবিরামের। তার ওপর হাতে সুটকেস। লোকটা কি সুটকেসটা নিতে পারত না? পারত, কিন্তু নিল না। ওই যে দরজা খুলে ভাঁটার মতো চোখ দিয়ে মাপল, তখনই ঠিক করে ফেলল যে এর সঙ্গে সুটকেস বয়ে দেওয়ার ভদ্রতাটা না করলেও চলবে। হনহনিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ছোটবেলায় পড়া অমরচিত্রকথায় দেখা একটা ছবির কথা মনে করতে লাগলেন অবিরাম। মেদিনীপুরের কোনও এক স্টেশনের খাঁখাঁ প্ল্যাটফর্মে এসে থেমেছে একটা ট্রেন। ট্রেন থেকে নেমেছে একটা সুটবুট পরা একটা চালিয়াৎ মার্কা লোক। নেমে ‘কুলি কুলি’ বলে চেঁচিয়ে একটা ধুতি পরা লোককে ডেকে তার হাতে নিজের সুটকেসটা তুলে দিয়েছে। তারপর স্টেশনের বাইরে এসে যেই না পয়সা দিতে গেছে তখন লোকটা বলেছে ‘আমি কুলি নই, আমি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।’ তখন চালিয়াৎটার যা লজ্জা। কান ধরে পায়ে পড়ে একাকার। বিদ্যাসাগর তখন চালিয়াৎকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘নিজের বোঝা নিজে বওয়ার মধ্যে কোনও লজ্জা নেই।’

লজ্জা নেই, লজ্জা নেই। বিড়বিড় করতে করতে জোরে জোরে পা চালাতে লাগলেন অবিরাম। কাজে দিল না। কোনওদিন দেয়নি। মাথার ভেতরের যুক্তিবাদী গলাটা ক্রমাগত বাগড়া দিতে লাগল। হাইটটা যদি আর একটু বেশি হত, বুকের খাঁচাটা আর একটু বেশি চওড়া, মুখের চামড়াটা আর একটু পরিষ্কার। চিবুক বলে যদি একটা বস্তু থাকত অবিরামের তাহলে আজ সুটকেসটা তাঁর বদলে থাকত ষণ্ডাটার হাতে। অবিরামের মনটা খারাপ হতে শুরু করল। মনের কোণে কোথাও একটা আশা কি জমতে শুরু করেছিল তাঁর, যে এবার থেকে সব অন্যরকম হবে? আগের সব উপেক্ষা অবহেলা মুছে গিয়ে নতুন করে সব শুরু করতে পারবেন অবিরাম?

মিনিট দশেক হাঁটার পর বনের ভেতর একটা বাড়ি দেখতে পেলেন অবিরাম। সাদা রঙের দোতলা বাড়ি। আরেকটু কাছে গিয়ে দেখলেন বাড়ি ঘিরে সাদা পাঁচিল, পাঁচিলের গায়ে সবুজ রঙের গ্রিলগেট। ষণ্ডার পেছন পেছন গেটের ভেতরে ঢুকে অবিরাম দেখলেন একটা লালচে নুড়ি বেছানো রাস্তা, রাস্তার পাশে বসানো তিনকোণা উঁচু উঁচু ইঁটের কেয়ারি, কেয়ারির ওপারে আগাছাভর্তি বাগান। অবিরামের হাত নিশপিশ করে উঠল। গাছপালার সঙ্গে অবিরামের সম্পর্ক চিরকালই নিবিড়। সবাই হাল ছেড়ে দেওয়ার পর মহিষাদলের বাড়ির অত বড় বাগান একা হাতে সামলাতেন তিনি। মানুষের টান অনেকদিন ফুরিয়েছিল, কিন্তু বাগানের টানে মাসে অন্তত দু’বার বাড়ি যেতেই যেতেন অবিরাম। পাটুলির ভাড়াবাড়িতে ছিল রুমালের সাইজের বারান্দা। সকালে আধঘণ্টা ছাড়া সে বারান্দায় রোদের পা পড়ত না। সেই বারান্দায় টবে জুঁই ফুটিয়েছিলেন অবিরাম। গ্রীষ্মে জুঁই বেল, শীতে চন্দ্রমল্লিকা। বাজারে একদিন ফ্রি ধনেপাতা নিয়ে অপমানিত হওয়ার পর ধনেপাতার বীজ কিনে এনেও পুঁতেছিলেন। দেখতে দেখতে টব উপচে জঙ্গল। ওপরের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলা একদিন অবিরামের দরজায় এসে উপস্থিত। একটু ধনেপাতা নেব, দাদা? অবিরাম খুশিই হয়েছিলেন। গাছের ছুতোয় যদি পড়শিদের সঙ্গে দূরত্বটা ঘোচে। ঘোচেনি। মহিলা সপ্তাহে তিনদিন অবিরামের অফিস বেরোনোর ঠিক মুখটায় এসে বেল বাজাতেন, গটগটিয়ে বারান্দায় এসে টব প্রায় ন্যাড়া করে ধনেপাতা মুড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মিষ্টি করে থ্যাংক ইউ বলতেন, ব্যস্‌।     

এরা যদি অনুমতি দেয়, এই বাগানের ভোল পালটে দিতে পারেন অবিরাম। কত জায়গা! টব নয়, আসল মাটি! অনেকক্ষণ পর লম্বা একটা শ্বাস নিলেন অবিরাম। কাঁধদুটো একটু হলেও শিথিল হল।

রাস্তা পেরিয়ে বারান্দা, বারান্দা পেরিয়ে কালো দরজা। দরজার ভেতর ঢুকে অবিরামের চোখ টেরিয়ে গেল। পাঁচতারা হোটেলে যাওয়ার সুযোগ কখনও পাননি তিনি, কিন্তু মনে মনে যে রকম হবে বলে কল্পনা করেছিলেন, এ ঘর সে কল্পনার ওপর কয়েক কাঠি। কড়া এসি, পুরু কার্পেট, ঝাড়লণ্ঠন। ঘরের মাঝখান দিয়ে চওড়া বেঁকানো সিঁড়ি উঠে গেছে। বাঁদিকে কালো চামড়ার সোফাসেটি, নিচু কাঁচের টেবিলের ওপর দু’তিনটে বাহারি বই, দামি ফুলদানি। ফুলদানি থেকে উঁকি মারছে শুকনো ফুলের গোছা।

ডানদিকে তাকালেন অবিরাম। মেহগনি রঙা কাঠের রিসেপশন ডেস্কের উঁচু আড়ালের ওপারে কম্পিউটারের মাথা দেখা যাচ্ছে। ষণ্ডা গিয়ে কনুইয়ের ভর রেখে দাঁড়াল।

চলে আসুন।

অবিরাম এগিয়ে গেলেন। কম্পিউটারের আড়ালের মুখটা এতক্ষণে নজরে এল তাঁর। কুতকুতে চোখ, বাঁকা নাক, তোবড়ানো গাল। তেলচিটে চুল মাথার সঙ্গে লেপটে আঁচড়ানো।

অবিরাম সুটকেস নামিয়ে রাখলেন কার্পেটের ওপর। লোকটা অবিরামের দিকে তাকাচ্ছে না। লোকটার চোখের মণি স্ক্রিনের ওপর সাঁটা। লোকটার আঙুল মাউসের ওপর ক্রমাগত ক্লিক করে চলেছে। অবশেষে আঙুল স্থির হল।

নাম? খ্যানখেনে তিতিবিরক্ত গলা।

অবিরাম ভট্টাচার্য।

কী?

টেনশনে গলার আওয়াজ বেশি নেমে গেছে অবিরামের।

অবিরাম। অবিরাম ভট্টাচার্য।

মায়ের মেডেন নাম?

বীণাপাণি গাঙ্গুলী।

সিক্রেট আনসার?

সিক্রেট?

আরে মশাই ছোটবেলায় কুকুরবেড়ালইঁদুরবাদুড় যা পুষেছিলেন তার নাম বলুন। ষণ্ডা খেঁকিয়ে উঠল।

ওহ্‌। টুকটুকি।

সাদা রঙের এই এত্তটুকু একটা লোমের বলের ভেতর থেকে বাদামি রঙের কাঁচের গুলির মতো দুটো চোখ অবিরামের বুকের ভেতর ভেসে উঠল।

পেশা?

সরকারি কেরানি।

নেশা?

চা।

আরে ধুর মশাই, সে সব নেশার কথা হচ্ছে না। হবি হবি। পাসটাইম। প্যাশন। প্যাশন কী আপনার?

অবিরাম থমকে গেলেন। প্যাশন দিয়ে কী হবে? পেশা জানাই তো যথেষ্ট। বারান্দাটার কথা মনে পড়ল। সারি সারি টব। কী জুঁইই না ধরেছিল এবার। গত ক’ঘণ্টার ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে এই প্রথম সামান্য আফসোস টের পেলেন অবিরাম। গাছগুলো সব মরে যাবে এবার। ওপরতলার মহিলা যদি খবর পেয়ে বুদ্ধি করে ধনেপাতার টবটা নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান তবে সেটা বাঁচলেও বাঁচতে পারে।

কিন্তু চোখের সামনে বারান্দা আবছা হয়ে আসছে কেন? তার জায়গায় অন্য একটা দৃশ্য ভেসে উঠছে। অবিরামের বারো বাই চোদ্দ বেডরুম। সিংগল খাট। খাটের ডানদিকে দেওয়ালে ঝুলছে মহাদেবের মুখ আঁকা ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারের নিচে টেবিল। টেবিলে পেনদানি, জোয়ানের আরক, ফুটপাথ থেকে কেনা চাইনিজ অ্যালার্ম ঘড়ি। আর একটা খোলা খাতা। নীলগগন ব্র্যান্ডের। ব্র্যান্ডেড খাতার দাম বেশি, কিন্তু এই জায়গাটাতে কোনও দিন কাটছাঁট করেননি অবিরাম। খাতার পাতায় একটা নীলকালির পেন, সেটাও খোলা। তার নিবের কাছে কতগুলো বিক্ষিপ্ত শব্দ ছড়িয়ে আছে। শব্দগুলো চোখে পড়ে যাওয়ার আগেই আগেই চোখ টিপে বন্ধ করে ফেললেন অবিরাম।

‘ধনেপাতা’ শব্দটা মুখ থেকে বেরোতে বেরোতে কী করে যে দুমড়েমুচড়ে ‘কবিতা’ হয়ে গেল, অবিরাম টের পেলেন না।

কবি?

লোকটা এই প্রথম অবিরামের মুখের দিকে তাকাল।

পুরস্কারটুরস্কার পেয়েছেন?

আজ্ঞে না।

ক’টা বই?

আজ্ঞে?

বলছি ক’টা বই বেরিয়েছে?

বেরোয়নি।

নিজের গালে ঠাস ঠাস করে চড় মারতে ইচ্ছে করছিল অবিরামের। কেন প্যাশনের জায়গায় বাগান করার কথাটা বললেন না।

পূজাবার্ষিকী? পত্রপত্রিকা? লিটল ম্যাগাজিন? ছেপেছে কোথাও?

না।

অবিরামের গলা আবার ক্রমশ শ্রবণসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু এবার আর উত্তরগুলো বুঝতে লোকটার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না।

ওয়েবজিন?

অবিরামের গলা দিয়ে আর আওয়াজ বেরোল না। মাথাটা দুদিকে নড়ল শুধু।

হুম্‌।

লোকটা কী যেন ভাবছে। স্ক্রিনের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে তর্জনী দিয়ে অন্যমনস্কভাবে মাউসের ওপর টোকা মারছে। দশ সেকেন্ড পর লোকটার হাত মাউস থেকে সরে কি-বোর্ডের ওপর চলে গেল। খটাখট টাইপ করে ক্লিক করল লোকটা।

ঘড়ঘড় শব্দ শুনে অবিরাম তাকিয়ে দেখলেন পাশে রাখা একটা প্রিন্টার থেকে কাগজ বেরিয়ে আসছে। কাগজগুলো বার করে সেগুলো দুটো আলাদা সেটে ভাগ করে, স্টেপ্‌ল্‌ করে, দুটো সেটের নিচেই নিজের সই করে একটা সেট অবিরামের দিকে এগিয়ে দিল লোকটা।

এটা সঙ্গে রাখুন। হারাবেন না। ইম্পরট্যান্ট। রিলিজের সময় লাগবে। এর সঙ্গে চলে যান। ঘর দেখিয়ে দেবে।

ষণ্ডা লোকটার দিকে কথা শেষ করল লোকটা। লোকটার চোখ আবার কম্পিউটারের স্ক্রিনে সেঁটে গেল।

কাগজটা দেখলেন অবিরাম। হোস্টেল অ্যালটমেন্ট লেটার। ওপরে ডানদিকে তাঁর একটা আবছা ছবি। তাঁর ভোটার আই কার্ডের ছবি। নাকচোখমুখ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এদের কাছে আর ভালো ছবি নেই নাকি? ভেবেই মনে পড়ল, আর ছবি ছিলই বা কোথায় তাঁর? গ্রুপ ছবি হয়তো থাকলেও থাকতে পারে, অফিসে বছরে একটা করে তোলা হত, তার বাইরে আর কিছু নেই। ছবির নিচে আবাসিকের নাম, বয়স, ডেট অফ ডেথ, গতজন্মের পেশা, নেশা, অ্যাওয়ার্ডস অ্যান্ড অ্যাচিভমেন্টস (বোল্ড লেটারে লেখা নট অ্যাপ্লিকেবল শব্দদুটোয় নিজেকে থামতে অ্যালাউ করলেন না অবিরাম), সবশেষে হোস্টেলের নাম রুমনম্বর, তারও নিচে ‘ফর অফিশিয়াল ইউজ ওনলি’।

‘মধ্যমেধা’, গ্রাউন্ড ফ্লোর, রুম নম্বর 009

এক হাতে হোস্টেলের ফর্ম গোল পাকিয়ে ধরে অন্য হাতে সুটকেস তুলে নিয়ে ষণ্ডার পেছন পেছন আবার হাঁটা লাগালেন অবিরাম। আবার বন, ঝিলিমিলি রোদ্দুর, কিচিরমিচির পাখির ডাক আর ছাতিমের গন্ধ পেরিয়ে মিনিট পাঁচেক হেঁটে আবার একটা সাদা রঙের বাড়ির কাছে এলেন অবিরামরা। এই বাড়িটায় বাগানটাগানের বালাই নেই। সমস্ত রকম বাহুল্য ও শ্রী বর্জিত একটি ইঁটসিমেন্টের কাঠামো ধাঁইধাঁই উঠে গেছে ওপরের দিকে।

জন্মে রোদ না ঢোকা একতলার বারান্দা দিয়ে সোজা হেঁটে গিয়ে একেবারে শেষের বাঁদিকের ঘরটার সামনে থামল ষণ্ডা। পকেট থেকে চাবির গোছা বার করে একটা চাবি বেছে নিয়ে দরজা খুলে সরে দাঁড়াল। অবিরাম ঘরের ভেতর ঢুকলেন।

একটা বেশ বড় ঘর। পাটুলির ঘরের অন্তত দ্বিগুণ। ঘরের মাঝখানে একটা খাট। খাটের একদিকে একটা ছোট টুল, অন্যদিকে একজোড়া টেবিলচেয়ার। টেবিলের ওপর একটা ঝকঝকে আকাশি রঙের টেবিলল্যাম্প নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছে। টেবিলের পাশেই একটা কাঁচের জানালা। খাটের পায়ের দিকের দেওয়ালের গায়ে লাগানো একটা দেওয়াল আলমারি।

অলরাইট?

ষণ্ডা পেছন ফিরে চলে যাওয়ার উপক্রম করল। অবিরাম জিজ্ঞাসা করলেন,

এটা কি স্বর্গ?

ষণ্ডা ঘুরে তাকাল। এই প্রথম ষণ্ডার মুখে একটা ভাব ফুটল যেটাকে হাসি বলে ভুল করা যেতে পারে। দরজার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল ষণ্ডা।

কী মনে হচ্ছে?

অবিরাম চুপ করে রইলেন।

স্বর্গনরক বলে কিছু নেই। ও সব থাকে শুধু মানুষের মনে। ভাবসম্প্রসারণ করেননি ইসকুলে? এখানেও আপনাদের ওখানের মতোই ব্যাপার। জায়গা সেম, তারই মধ্যে কেউ কেউ ভালো হোস্টেল পায়, কেউ খারাপ। ভালো হোস্টেলে চব্বিশঘন্টা কারেন্ট, রানিং ওয়াটার, গরমে এসি, শীতে হিটার।

খারাপ হোস্টেলের ব্যাপারটা আর বিশদ করল না ষণ্ডা। সে তো চোখেই দেখা যাচ্ছে।

এখানে থাকুন আপাতত। যতদিন না আবার ফেরত যাওয়ার টিকিট পাচ্ছেন।

যেতেই হবে?

ষণ্ডা দু’সেকেন্ড অবিরামের দিকে তাকিয়ে থাকল। হাসিহাসি ভাবটা চলে গিয়ে মুখ আবার তিব্বতি মুখোশ। দৃষ্টি আবার জ্বলন্ত ভাঁটা।

না গেলে হোস্টেল খালি হবে কী করে? নতুন পাবলিকরা থাকবে কোথায়? আর এখানে থেকে করবেনটাই বা কী? সিনেমা নেই থিয়েটার নেই মিটিং নেই মিছিল নেই প্রেমভালোবাসাবিচ্ছেদবিরহ প্রোমোশন কিস্যু নেই। বলি টাইমপাসটা হবে কী করে?

প্রোমোশনের কথাটা মনে পড়েই বোধহয় ষণ্ডার মুখটা ছেতরে গেল।

থাকুন না তিন মাস, তারপর নিজেই ‘পাঠান পাঠান’ করে স্যারের পায়ে চার বেলা ধন্না দেবেন। সাধ করে পাগলেও থাকে না এখানে।

এবার ষণ্ডা সত্যি সত্যি চলে গেল। ফাঁকা করিডরে দুম দুম পায়ের আওয়াজটা মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন অবিরাম। তারপর দরজা বন্ধ করে জানালাটার পাশে এসে দাঁড়ালেন। বন দেখা যাচ্ছে। রোদটা কি পড়ে এসেছে একটু? এই বেলা সুইচটুইচগুলো দেখে রাখতে হবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবিরাম ঘণ্টাকয়েক আগে ফেলে আসা জীবনটার কথা ভাবতে লাগলেন। কী কী জিনিসের জন্য মন কেমন করতে পারে তাঁর? ফিরে যেতে ইচ্ছে করতে পারে? কেরানির চাকরি? কবি হওয়ার ব্যর্থ, হাস্যকর চেষ্টা? সপ্তাহে তিনদিন বরাভয়দার বাড়ির সাহিত্য-আড্ডায় দেওয়ালের টিকটিকির মতো অপ্রয়োজনীয় উপস্থিতি? মুড়োনো ধনেপাতার টব?

নিশ্চিত হলেন অবিরাম। নাঃ, ফিরতে তিনি চান না।


*****


কাল অফিস যেতে হবে, ঘুমে চোখ ঢুলে আসছে, তবু ফেসবুক খুলে বসে ছিল শুভ্র। এই ইডলিদোসার রাজত্বে তিনমাস হল চাকরি করতে এসেছে সে। অলরেডি ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি দশা। বন্ধু নেই, ভাষার অসুবিধে, খাওয়া রোচে না। কিন্তু কিছু করার নেই। পেটের দায়। একমাত্র সান্ত্বনা ফেসবুক। হাজার দেড়েক ফ্রেন্ডস আছে শুভ্রর। সকালবিকেলদুপুররাত্তির যখনই পারে তাদের সান্নিধ্যে মনের ব্যাটারি রিচার্জ করে নেয় শুভ্র।

কিন্তু আজ রিচার্জের বদলে ব্যাটারি ক্ষয়ই হচ্ছিল শুধু। কারও ওয়ালেই ইন্টারেস্টিং কিস্যু নেই। সেই রাঁধছেবাড়ছে খাচ্ছে পিটিশন সাইন করছে সেলফি তুলছে। নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসেনি একটাও, ওর পাঠানো রিকোয়েস্টগুলোও কেউ অ্যাকসেপ্ট করেনি। কেউ কারোর সঙ্গে ঝগড়াও করছে না যে সেই দেখে খানিকটা টাইমপাস করা যাবে।

কবিরা যে মাইরি নিজেদের মধ্যে এত ঝগড়া করে, নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করত না শুভ্র। এই এ ওকে চোর বলছে, ও তাকে ‘আরে ধুর ওর আবার কিছু পড়াশোনা আছে নাকি’ বলে চেটে দিচ্ছে, সে আবার এর ব্যাকরণ শুধরে দিয়ে স্মাইলি মারছে – ক্যাঁচাল আর কাকে বলে। এদিকে আবার হাফ লাইন কবিতা লিখে একে অপরকে ট্যাগানোও চাই। শুভ্রও একদিন এদের মতো হয়ে যাবে নির্ঘাত। ও এখনও ঠিক ফুল-কবি হয়ে উঠতে পারেনি, ও এখনও যাকে বলে প্রতিশ্রুতিমান। চাকরিতে ঢোকার পর থেকে খানিকটা সময় কাটাতেই উইকএন্ডে লেখালিখি শুরু করেছে শুভ্র। আফটার অল, মাধ্যমিকে বাংলার নম্বরটাই সবথেকে ভালো ছিল। বাংলায় অনার্স পড়ার সাহস হয়নি তখন, এখন তার ক্ষতিপূরণের পালা চলছে। এর মধ্যেই বেশ কয়েকটা ওয়েবজিনে লেখাপত্র ছাপা হয়েছে ওর। অনেকেই উৎসাহটুৎসাহ দিচ্ছেন। এই রেটে চললে কিছুদিনের মধ্যে একটা বইয়ের ভাবনাচিন্তা করা যেতেই পারে।

নাঃ। এবার শুয়ে পড়তেই হবে। স্ক্রিনের নিচে ডানদিকে একবার চোখ বোলালো শুভ্র। দু’টো বাজতে তিন। আর তিন মিনিট দেখবে, তারপর ল্যাপটপের ঝাঁপ ফেলবে। একবার মিষ্টি মেয়েটার প্রোফাইল ঘুরে এল, (রিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট কর মা, আর পেন্ডিং রাখিস না) একবার প্রাক্তন প্রেমিকার (রিলেশনশিপের বিষয়ে এখনও কিছু আপডেট নেই দেখে খুশি হল), তারপর ল্যাপটপের ডালা ধরে টানতে যাবে এমন সময় ওর চোখ আটকে গেল।

R. I. P.

দু’টোর সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও থামল শুভ্র। কে আবার ফুটে গেল? ব্যাপারটা দেখা দরকার।

একটা আবছা ছবি। নাকচোখমুখ কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। মাঝবয়সী একটা লোক সেটুকু বোঝা যাচ্ছে। কে বাবা তুমি? ছবিটার নিচে লেখা লাইনগুলোর দিকে মনোযোগ দিল শুভ্র।

Abiram Bhattacharya, eminent Bengali poet, passed away today at 2:30 PM at his house in Patuli. God rest his soul. RIP.

এমিনেন্ট বেংগলি পোয়েট? অবিরাম ভট্টাচার্য? শুভ্র হাঁ করে রইল কিছুক্ষণ। কবিতা লিখছে সে ছ’মাস, কিন্তু পড়ছে তো সেই স্কুল লাইফ থেকে। ভালো-মন্দ, খাজা-গজা, আধুনিক-অত্যাধুনিক সব রকম কবিতাই নেড়েঘেঁটে দেখেছে সে, এই অবিরাম ভট্টাচার্যের নাম তো জম্মে শোনেনি?

নোটিসটা ভালো করে পরীক্ষা করল শুভ্র। চেনা কেউ লাইক দিলে তাকে খুঁচিয়ে ব্যাপারটা জেনে নেওয়া যেত, কিন্তু কোনও লাইক পড়েনি এখনও। নতুন ট্যাব খুলে অবিরাম ভট্টাচার্য টাইপ করে এন্টার মারল শুভ্র। একগাদা ভট্টাচার্যর লিংক বেরোলো, গোটা তিনেক বিরাম ভট্টাচার্য, পাঁচের পাতায় গিয়ে শেষে একজন অবিরাম ভটচাজ, তাও সে আবার অ্যামেরিকার কোন ইউনিভার্সিটিতে রকেট সায়েন্স নিয়ে গবেষণা করে। বাংলা কবিতার ত্রিসীমানায় ঘেঁষে বলে তো মনে হয় না।

এমিনেন্ট পোয়েট, অথচ লোকটার চিহ্নমাত্র নেই কোথাও? পুরস্কারসংবর্ধনা নেই, রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা নেই, ফেসবুকে একটা অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নেই?

পোস্টটা শেয়ার করবে ঠিক করল শুভ্র। ক্লিক করতে যাবে এমন সময় কী ভেবে থমকালো ও। খটাখট টাইপ করল,

খ্যাতি, প্রতিপত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার মুখে লাথি মেরে বেঁচে থাকার মতো কলজেওয়ালা আরও একজন চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। এই দুঃসময়ে যে আপনার বড় দরকার ছিল, কবি।

শেষে একটা RIP জুড়ে দিয়ে ল্যাপটপটা এবার সত্যি সত্যি বন্ধ করল শুভ্র। মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করে, উল্টোদিক ফিরে, গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

                                                              (চলবে)

   

August 09, 2014

সাপ্তাহিকী



Tumuch Lake, British Columbia। শিল্পীঃ Shane Kalyn


Strategy on the part of the good writer of prose consists of choosing his means for stepping close to poetry but never stepping into it.
                                                           ---Friedrich Nietzsche


এ সপ্তাহের সাপ্তাহিকীর শুরুতেই কুইজ। হ্যারি পটারকে কতটা ভালো চিনি আমরা?পরীক্ষা হয়ে যাক। আমার দেখলাম পরের দিকের থেকে প্রথম দিকের গল্পগুলোর খুঁটিনাটি অনেক বেশি মনে আছে। কুইজটা খুঁজেপেতে আমাদের পাঠিয়েছেন সুতীর্থ। তাঁকে ধন্যবাদ।

এই পরিস্থিতিগুলোতে আমি এতবার পড়েছি যে লিংকটা না দিয়ে পারলাম না।


পৃথিবীতে এই একটি ফুডগ্রুপের খাবার থাকলেই আমার দিব্যি চলে যেত।

"Anyone we could marry would, of course, be a little wrong for us." এত বড় সত্যি কথাটা দিয়ে যে লেখা শুরু হয়, সেটা পুরোটা না পড়লে কি চলে?

লোকে ফুলদানিতে ফুল সাজায়, এই ভদ্রলোক সাজান মহাকাশে।

যাঁরা একটানা বেশি পড়তে পারেন না তাঁদের সমস্যা এতদিনে ঘুচল। এবার টুইটারে ছোটগল্প লেখা হচ্ছে। প্রতি পর্বে একশো চল্লিশ শব্দ, দু’শো আশি পর্বে গল্প শেষ। এরপরও যদি লোকের পড়ার অভ্যেস তৈরি নাহয় তবে আর কীসে হবে আমি জানি না।



আপনি গুগলকে দিয়ে এতদিন আকাশপাতাল খোঁজাচ্ছিলেন, এবার গুগল আপনার শরীরের ভেতর আঁতিপাঁতি খুঁজবে।

কিশোরকুমারের গাওয়া সব গানই আমার প্রিয়, এই গানটা একটু বেশি প্রিয়। আপনাদের?


August 07, 2014

The Shortest Route



গঙ্গা পেরোতে হবে শুনেই সতর্ক, ট্রেন ধরতে হবে শুনে ভিরমি। হাওড়া স্টেশন তো নয়, যেন নন্দাদেবীর বেসক্যাম্পে যেতে বলা হয়েছে। এরপরেই কোমরে দড়ি বেঁধে, তুষারকুঠার হাতে নিয়ে অগস্ত্যযাত্রা। বেরোতে গিয়েও থমকে গিয়ে, ফিরে এসে মায়ের পা ছুঁয়ে কিংবা পার্টনারের গালে চুমু খেয়ে কানে কানে ‘আই লাভ ইউ’ বলে যাওয়া। যদি আর দেখা না হয়, অন্তত এই মুহূর্তটুকু রইল সারাজীবন আঁকড়ে থাকার জন্য।

এইবার শুরু হবে প্রশ্ন।

কতক্ষণ বাদে বাদে ট্রেন ছাড়ে? ডিমসেদ্ধ বিক্রি হয় শুনেছিলাম, লাল শালু মোড়া ঝুড়িতে করে? আর শশা পাওয়া যায় কি? ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে?

প্রথম প্রশ্নটার উত্তর, অনেক। অফিস(ফেরতা)টাইমে প্রায় বাসের মতোই ঘনঘন। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর, উঁহু। শশা চাইলে পাওয়া যেতে পারে, ডিমসেদ্ধ মুশকিল। তবে এত কিছু খাওয়ার দরকার কি? মোটে আধঘণ্টার তো রাস্তা। অনেকে অবশ্য টানা আধঘণ্টা মুখ না চালিয়ে থাকতে পারে না, আপনি যদি তাদের মতো হন তবে আপনার পক্ষে বাদামভাজা তাক করাটাই উচিত হবে। নোনতা, মিষ্টি, গুড়মাখানো চাক। আপনার যেমন রুচি। কপাল যদি খুব ভালো হয় গাঁটের পয়সাও খরচ করতে হবে না, কোনও স্থানীয় এম পি–র সঙ্গে ট্রেনে দেখা হয়ে গেল হয়তো। এ সব দিকের লোক পার্লামেন্টেই যাক আর যেখানেই যাক, মফস্বলী দেওয়াথোওয়ার অভ্যেসটা গায়ে লেগে থাকে। বলা যায় না, হয়তো গোটা কামরার লোককে বাদামভাজা কিনে খাওয়াল। বানিয়ে বলছি না, সত্যি সত্যি হয়েছে এ’রকম।

রেল কোম্পানির বইতে লিখে রেখেছে কুড়ি মিনিট, কিন্তু আসলে পৌঁছতে লাগে তিরিশ। হাওড়া থেকে ঘটাং ঘটাং করে রেললাইনের জট ছাড়িয়ে লিলুয়া পৌঁছতেই দশ মিনিট কাবার, বাকি রাস্তা পক্ষীরাজের মতো উড়ে কুড়ি মিনিটে।

উঁহু, গুড নয়। ভিড়ের কথাটা মাথায় রাখতে হবে। সাড়ে পাঁচটা থেকে সাড়ে আটটার ভিড় নিয়ে কালজয়ী উপন্যাস লেখা যায়। কেন যে কেউ লেখে না কে জানে। তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। সমস্যা যখন আছে তখন সমাধান থাকবে না এমনটা তো হতে পারে না। কয়েকটা টিপ্‌স্‌ দিয়ে রাখছি। কাজে লাগবে। নিজেকে ভিড়ের ঠিক মাঝখানটায় প্লেস করবেন। মানিব্যাগ হাত দিয়ে চেপে ধরে সামনের লোকের ওপর বডি ছেড়ে দেবেন। পেছনের লোক ঠেলে তুলে দেবে। একবার সেট হয়ে গেলে ব্যস। অনেকটা মুড়ির বয়ামের মতো ব্যাপার। যতক্ষণ ঝাঁকানো হচ্ছে ততক্ষণই যা কষ্ট। তারপর সেট হয়ে গেলেই হয়ে গেল।

এবার তিরিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকুন। কী? সিট? হাহা, না পাবেন না। হুম্‌, তা একরকম শিওরই বলতে পারেন। আপনার দ্বারা হবে না। সিট পেতে গেলে প্রথমেই দরকার ‘সিট আমি পাবই, কোনও ব্যাটার সাধ্য নেই রোখে’ কনফিডেনস্‌। কারশেড থেকে আসা ফাঁকা ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়নো, রানিং-এ ওঠা, শিশুবৃদ্ধ নির্বিচারে কনুই চালানো – ও সব তারপর আপসে আসবে। একদিনে হবে না। তবে বেশিদিনও লাগবে না। এক সপ্তাহ, ম্যাক্সিমাম। যারা ট্রেনলাইনে জন্মায় তাদের অবশ্য জন্মগত প্রতিভা থাকে। বাচ্চা জন্মানোর ছ’দিনের দিন বিধাতা এসে কী করেন বলে আপনার ধারণা? জন্মের অক্ষাংশদ্রাঘিমাংশ বুঝে প্রতিভার প্যাকেজ বিতরণ করে যান। দিল্লিতে থাকলে গালি দেওয়ার প্রতিভা, প্যারিসে থাকলে তিনশো পঁয়ষট্টি দিন তিনশো ছেষট্টি রকম করে গলায় স্কার্ফ পেঁচানোর প্রতিভা, ট্রেনলাইনের আশেপাশে জন্মালে অফিসটাইমে সিট জোগাড়ের প্রতিভা। এবার সে প্রতিভায় শান দেওয়া শিশুর আর তার বাবামায়ের ব্যাপার। আপনার সঙ্গে সিট নিয়ে যাদের কমপিটিশন তারা এ জিনিস গত পঁচিশ বছর ধরে প্র্যাকটিস করছে। সেই যখন জামাইষষ্ঠীতে মায়ের কোলে চেপে কপালের টিপের ওপর পাউডার মেখে মামাবাড়ি যেত তখন থেকে। দু’ইঞ্চি ব্যাসের রুপোর চুড়ি টাইট হয়ে বসা টার্কির টেংরির মতো মোটা মোটা হাত দিয়ে সামনের লোককে এন্তার কিল মেরেছে চুল টেনেছে। আজ এ সিট পাবে না তো কি আপনি পাবেন?

হ্যাঁ, সে তো বটেই। দুঃখ পেয়ে লাভ নেই। গীতার মূল শিক্ষাটা মনে রাখবেন, ট্রেনে চড়বে কিন্তু সিটের আশা করবে না। তাহলেই সব পিসফুল।

উঠে পড়েছেন অথচ ট্রেন ছাড়ছে না? টাইম হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও? টাইম গুলি মারুন। জানালার বাইরে তাকান, অবশ্য যদি সে পরিস্থিতি থাকে। আরে না না থাকবে, শান্ত হোন . . . সিট পাননি তো কী হয়েছে, জানালার একেবারে ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে ফুরফুরে হাওয়া খেতে খেতে যেতে পারবেন। হ্যাঁ হ্যাঁ, এই মা সরস্বতীর পা ছুঁয়ে প্রমিস।

হ্যাঁ, যা বলছিলাম। জানালার বাইরে জনস্রোতের দিকে তাকান। যতক্ষণ দেখবেন সে স্রোত হেলেদুলে চলেছে ততক্ষণ ট্রেন ছাড়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। যেই দেখবেন লোকজন ছুটতে শুরু করেছে বুঝবেন আর দেরি নেই।

ছুটছে কেন? কোনও কোনও সময় টেকনিক্যাল কারণ থাকে ছোটার। ধরুন যদি আপনি পুরুষ হন আর ধরুন যদি ট্রেন ছাড়ার সময়ে যদি আপনার হাতের কাছে লেডিস কামরা পড়ে যায়। তখন প্রাণপণে দৌড়ে সে কামরাটা পেরিয়ে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। তবে বেশিরভাগ সময়ে অত জটিল কারণ থাকে না। লোকে এমনিই শখ করে দৌড়য়। সেই যে চিরকালীন মরীচিকা – আরেকটু এগিয়ে যেতে পারলেই বোধহয় বেটার লাইফ, ফাঁকা সিটওয়ালা কম্পার্টমেন্ট – সেই ব্যাপার আরকি।

আর কি, এবার স্টেশন আসবে, ট্রেন থামবে, নেমে পড়বেন। কায়দা একই। সামনের ভিড়ের ওপর ভর করে পেছনের ভিড়ের ঠেলায় গন্তব্যে পৌঁছনো। তবে এবার দু’একটা বাড়তি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। সবথেকে জরুরি বিষয়টা হচ্ছে, ভিড় দেখে ঘাবড়ে গিয়ে নিজের স্টেশন আসার তিনটে স্টেশন আগে থেকে দরজার সামনে গিয়ে গুঁতো খাবেন না। কোনও আত্মসম্মানওয়ালা ডেলিপ্যাসেঞ্জার ও জিনিস করে না। ওটা করলেই সবাই বুঝে যাবে আপনি আনাড়ির চরম। কোন্নগর ছাড়ার পর ধীরেসুস্থে সিট ছেড়ে . . . আই মিন, প্যাসেজ থেকে বেরোবেন। খুব টেনশন হলে সামনের লোককে জিজ্ঞাসা করবেন তিনি নামবেন কি না, নয়তো নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের দুঃখদুর্দশার কথা ভাববেন। একটুও টেনশন করবেন না, ট্রেন আপনাকে না নামিয়ে যাবে না।

নেমেছেন? বলেছিলাম। না না, এখন দম নিতে দাঁড়ালে চলবে না। চলুন চলুন। ভিড়ের সঙ্গে স্পিড মিলিয়ে হাঁটুন। ও দিকে আবার কী দেখছেন? এ কী, মুখ এত বড় হাঁ করেছেন কেন? ওহ্‌, না না, এটা বাজার নয়, প্ল্যাটফর্মই। সে যতই জোরকদমে আলুপটল মাশরুম চিচিঙ্গা বিক্রি হোক না কেন। হ্যাঁ হ্যাঁ ইলিশ মাছও আছে। সে কী, এখন মাছ কিনতে দাঁড়াবেন নাকি? আপনি দেখছি আমার মায়ের মতো। বাজার দেখলে বাজার করার কথা মনে পড়ে। গোটা রাস্তা মনে ছিল না, হঠাৎ ফলের ঝুড়ির দিকে তাকিয়ে ‘কাল স্যালাডের জন্য শশা লাগত যে রে সোনা!’ শশার পর টমেটো, টমেটোর পর কাঁচালংকা। এই করতে করতে যখন শেষমেশ প্ল্যাটফর্ম থেকে নামলাম ততক্ষণে স্ট্যান্ড খালি করে সব রিকশা চলে গেছে, আমরা হাতে ফাটোফাটো বাজারের প্লাস্টিক নিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছি।

হ্যাঁ, রিকশা চাইলে ইলিশ ছেড়ে এখন চলুন। গুড। ওরে বাবা, অত জোরে না হাঁটলেও চলবে। থাকবে রিকশা।

উঁহু, ওদিকে তাকাবেন না। জানি টেবিল পাতা আছে, জানি টেবিলের ওপর ক্যারামের গুটির মতো গোল গোল কী সব ঘুরছে, জানি যারা ঘোরাচ্ছে তাদের চোখেমুখে চোরচোর ভাব। টেবিলটা ফোল্ডিং। পুলিশ আসছে বুঝলেই যাতে গুটিয়ে নিয়ে বগলে করে পালাতে পারে। হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক পালাতে পারবে। জুয়াচোর আর পুলিশে কখনও দেখা হওয়ার নিয়ম নেই জানেন না? হয় পুলিশ ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে আসবে, নয়তো এঁরা দারুণ জোরে দৌড়বেন।

প্ল্যাটফর্ম শেষ, এবার কোন দিকে? আচ্ছা আপনি বলুন দেখি। আপনি এতক্ষণ আমাকে প্রশ্ন করছেন, এবার আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। এই যে দুটো রাস্তা দেখছেন, একটা বুক ফুলিয়ে আলোঝলমল ভিড়ভিড়াক্কার বাজারের মধ্য দিয়ে গটগটিয়ে চলে গেছে আর অন্যটি ব্যাপারস্যাপার দেখে টুক করে বাঁয়ে বেঁকে বুড়ো অশ্বত্থগাছটার তলার অন্ধকার দিয়ে সটকেছে।

কোনটা আমার রাস্তা হতে পারে বলে আপনার মনে হয়? আহা, গেসই করুন না।

জানতাম পারবেন। ঠিক ধরেছেন, ওই আনস্মার্ট মেনিমুখো রাস্তাটাই আমার রাস্তা। চলুন, এবার রিকশা . . . বিজয়কাকু? কেমন আছ? আমি ভালো। আরে বেশিদিন না, এই পরশুই চলে যাব। পুজোয়? জানি না গো আসা হবে কি না, ইচ্ছে তো আছে।

চলুন চলুন, উঠে পড়ুন। সে কী, আপনি রোজ যে বাসে আসাযাওয়া করেন তার কনডাক্টরের নাম জানেন না? অবশ্য শহরের ব্যাপারস্যাপার আলাদা। সত্যি বলতে কি আমারও ফার্স্ট নেম বেসিসে চেনা রিকশাকাকুর সংখ্যা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এখন যারা জোয়ান, তারা আমাকে চেনে না, আমিও তাদের চিনি না।

নাঃ, মনখারাপ করছি না। সময়ের নিয়ম, কে খণ্ডাবে। ওটা? ওটা শনিমন্দির। ভাগ্যিস শনিবার নয়, নয়তো দেখতেন ভিড় কাকে বলে। রাস্তা জ্যাম হয়ে যেত। এর পর আসবে হনুমান মন্দির, এর চাতালে প্রতি সন্ধ্যেয় ঢোলকরতাল নিয়ে হনুমানচালিসা গান হয়। এখন হচ্ছে না কেন কে জানে। হয়তো শেষ হয়ে গেছে। কিংবা টিভিতে ভালো সিনেমা দিয়েছে। জানেন, এই সাইকেলের দোকানটায় আমি সাইকেল রাখতাম রোজ স্কুলে যাওয়ার আগে। ঝুপড়ি? কোন ঝুপড়ি? ওহ্‌, যেটার সামনে ভিড় করে লোক দাঁড়িয়ে আছে? আহা ঝুপড়ি কোথায়, দিব্যি বোর্ডে বড় বড় করে ‘মালা রুটি সেন্টার’ লিখে রেখেছে তো। জানেন এটা যখন খুলেছিল, ওই যে ভদ্রলোক রুটি সেঁকছেন গোমড়ামুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, তিনি এই এইটুকু ছিলেন। সিরিয়াসলি। এঁরা তিন ভাই। একজন আমার থেকে একটু বড় ছিল, একজন ঠিক আমার সমান, আর ছোটজন এই ইনি। মাবাবাকে দেখছি না, রিটায়ার করেছেন বোধহয়। ছেলেরাই দেখছে এখন ব্যবসা। শুরুতে এটা সত্যিসত্যিই একটা রোগা ঝুপড়ি ছিল। একটা উনুন, একটা বেলুনচাকি, একটা চিমটে, একজোড়া রোগা বাবামা, তিনটে লিকপিকে বাচ্চা। যখন ওদের একটাও রুটি বিক্রি হত না, তখনও মালার মধ্যে একটা ব্যাপার ছিল। তকতকে পরিষ্কার দোকানঘরের সামনে উনুনে আঁচ দিয়ে, আটা মেখে বসে ধৈর্য ধরে বসে থাকত পাঁচটা লোক। তারপর একদিন সন্ধ্যেবেলা অফিসফেরৎ এক ভদ্রমহিলা থামলেন। তাঁর দেখাদিখি আরেক জনের সাহস হল। তারপর আরেকজন। তারপর আরেকজন। মাসখানেক পর প্রথম রিকশার বদলে একটা সাইকেল এসে থামল। বারোটা রুটি প্যাক করে দাও তো, বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে বলেছে। ব্যস। মালার ব্যবসা পাখনা লাগিয়ে সেই যে উড়ল আর কখনও পড়তে দেখিনি তাকে। তারপর তো ভেতরে বসে খাওয়ার জায়গাও হল। মাঝে মাঝে গানের স্কুল থেকে ফেরার পথে আমার আর মায়ের খুব ইচ্ছে হত রিকশা থামিয়ে একদিন বসে গরমগরম রুটি তরকারি খেয়ে যাই, কিন্তু রাস্তায় সর্বক্ষণ পাড়ার লোকের এত ভিড় থাকত যে মায়ের সাহস হয়নি। দেখলে সবাই নিশ্চয় ভাবত বৌদির মাথাটা গেছে।

হ্যাঁ, স্টেশন ছেড়ে এগিয়ে এলে আর তেমন আলো নেই এই রাস্তাটায়। ভালো তো। আকাশের তারাগুলো কত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দেখুন। দূরে ওই যে তিনটে ছায়াছায়া তালগাছ, একটুও না বেঁকে সোজা উঠে গেছে, দেখতে পাচ্ছেন? মা বলেছিলেন, ‘দেখেছিস সোনা, ঠিক যেন ভূতের স্কেল।’ তারপর থেকে সোজা ঠ্যাংঠেঙে তালগাছ দেখলেই আমি তাকে ভূতের স্কেল ছাড়া কিছু ভাবতে পারিনি।

এই তো, চলেই এসেছি প্রায়। অধৈর্য হচ্ছেন কেন। এবার বাঁয়ে বেকব, তারপর ডায়ে, তারপর আবার বাঁয়ে, আবার ডায়ে, আবার বাঁয়ে বেঁকে সোজা নাকবরাবর। আর অন্ধকার পাবেন না রাস্তায়। এবার রাস্তাঘাট সব পাড়ার মধ্য দিয়ে। এই রাস্তার বেশিরভাগ বাড়ির লোককে আমি চিনি। নাম জানি না, অফ কোর্স, কিন্তু মুখ চিনি। এই যে মোড়টা . . . সামলে. . . হ্যান্ডেলটা শক্ত করে ধরে বসুন, এই জায়গাটা একটু উঁচুনিচু আছে। এই মোড়টা দিয়ে একবার আমি আর বুচিদিদি সাইকেল নিয়ে যাচ্ছিলাম আর উল্টোদিক থেকে দুটো লোক আরেকটা সাইকেল চেপে আসছিল। আমার তখনও হাত স্টেডি হয়নি। আমি সাইকেলটাকে আসতে দেখে কেমন ভেবলে গিয়ে হাতটাত কাঁপিয়ে ফেললাম, ওদিকের লোকদুটো সংঘর্ষ এড়াতে ‘আরে আরে এ কী এ কী!’ বলে খচমচিয়ে সাইকেল থেকে নেমে পড়ল। আমি তো একমুহূর্ত না থেমে অকুস্থল থেকে যত দ্রুত সম্ভব পালানোর চেষ্টা করছি, বুচিদিদিও আমার পেছন পেছনই আসছে, এদিকে ওই লোকগুলো সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে, ‘চালাতে পারে না, এদিকে রাস্তায় বেরোনো চাই’ এইসব তড়পে চলেছে। আমি বুচিদিদিকে সবে বলছি, ‘বুচিদিদি, পালাও পালাও’, এমন সময় বুচিদিদি মোটা গলায়, ‘তুই থাম তো’ বলে সাইকেল থেকে নেমে পড়ে পেছন ফিরে যেই না চেঁচিয়ে উঠেছে, ‘আপনারা যখন এতই ভালো চালাতে পারেন তখন কাটিয়ে গেলেই পারতেন দাদা’ অমনি লোকদুটো সুড়সুড় করে সাইকেলে উঠে পড়ে চম্পট। বুচিদিদি থমথমে মুখে সিট ঝেড়ে আবার সাইকেলে উঠতে উঠতে বলছে, ‘কিছু বলা হয় না বলে বেশি পেয়ে বসেছে’, এই ছবিটা এখনও আমার চোখে লেগে রয়েছে।

বুচিদিদির বয়স? তখন? মেরেকেটে চোদ্দ। আমার থেকে মোটে চারবছরের বড় বুচিদিদি, কিন্তু সাহস অন্তত চারকোটিগুণ বেশি। চিরদিনই।

এই তো এসে গেছি এবার। এটা তনুশ্রী আইচের বাড়ি, আমার সঙ্গে কেজিতে পড়ত, ওটা তুলতুলিদি’দের, এটা অমিত কাকুদের, এটা মাখনদাদুর, এটা টুকাইদার, এটা বুচিদিদিদের আর ওওইটা অবশেষে আমাদের বাড়ি। অ্যাঁ? কলাগাছ? বাবা আপনার তো দারুণ চোখ। এই অন্ধকারেও দেখে ফেলেছেন। মা ফোনে বলছিলেন খুব কাঁদি ধরেছে নাকি। তবে ও দিকে নজর দেবেন না, বাগানের পেছনের জানালায় বসে একজন নির্ঘাত সে কাঁদির দিকে তাকিয়ে ঠায় পাহারা দিচ্ছেন, আপনি হাত ছোঁয়াতে গেলেই চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবেন।

যাই হোক, বাড়ির কথা জানতে চাননি আপনি। রুট জানতে চেয়েছিলেন। বলে দিলাম। এই সেই রুট। কী বলছেন? যথেষ্ট শর্ট নয়? আরে লং-শর্ট তো আপেক্ষিক। তাছাড়া মোটে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগেছে পৌঁছতে, আর কত কম চাই আপনার? যাই হোক, আমার আর আপনাকে দেওয়ার মতো সময় নেই। আপনার পছন্দ হলে আমার রুটের কথা আপনার সমীক্ষা রিপোর্টে লিখবেন, না হলে লিখবেন না। আপনার হিসেবে শর্টেস্ট হোক না হোক, এটাই আমার শিওরেস্ট রুট টু হ্যাপিনেস।


August 04, 2014

অ্যানাটমি অফ বেংগলি সংগস





ধ্রুপদাঙ্গ
0:00

1:59:58



অ্যা . . . অ্যা . . .অ্যা . .
গলা খাঁকরানি
অ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা (দ্রুতলয়ে পাখোয়াজ সহযোগে)



রবীন্দ্রসংগীত (প্রাক ২০০১)
0:00

3:00



বেহালা
কান্না (দাঁতকপাটি সহযোগে)
বেহালা



রবীন্দ্রসংগীত (উত্তর ২০০১)
0:00




25:26






সরোদ
আবৃত্তি
কান্না
আবৃত্তি
কান্না
সরোদ



বাংলা ব্যান্ডের গান
0:00

5:27



গিটার, একতারা, হারমোনিয়াম, তবলা, ডুগডুগি, গাল
পরাণ, ভাল্লাগেনা, খাইসে, তুই কেন আমাকে বুঝলি না, কেন আমাকে কেউ বুঝল না মাগোওওও 
গিটার, একতারা, হারমোনিয়াম, তবলা, ডুগডুগি, গাল



বাংলা সিনেমার গান (অধুনা)
0:00

3:00



স্যাক্সোফোন
জানেমন, জানেজিগর, জওয়ানি, ঝক্কাস, বিন্দাস, পুচ্‌ইয়োরহ্যান্ডসআপ
লেটস্‌স্‌স্‌ পাআআআর্ডিইইইই


শিলাজিৎ
0:00                                                                                           4:20

মুয়াহাহাহা ইল্লিল্লিল্লিল্লি বিল্লিল্লিল্লিল্লি হ্যাঃহ্যাঃহ্যাঃ হোঃহোঃহোঃ খ্যাঁকখ্যাঁকখ্যাঁক ঘোঁয়্যাকঘোঁয়্যাকঘোঁয়্যাক ওয়্যাকথুঃ





 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.