August 15, 2018

দাদার দোকান



এক নম্বর মার্কেটের কোণাকুণি একটা বড় গাছের তলায় - কী গাছ খেয়াল করে দেখিনি কোনওদিন, বট অশ্বত্থ পরিবারের সম্ভবতঃ - ছিল দাদার চায়ের দোকান। গাছের গায়ে চক দিয়ে কেউ লিখে দিয়েছিল, 'দ্য সিংগিং ট্রি।' চায়ের দোকানের নাম থাকাটা আনকমন। দাদার চায়ের দোকানও কমন ছিল না।  

সে দোকানে সকালে গ্রিন টি পাওয়া যেত, সন্ধেয় হট চকোলেট। সে দোকানের পেছনের পাঁচিলের গায়ের শেলফে মকাইবাড়ি চায়ের প্যাকেট সাজানো থাকত। শেলফের নিচে খবরের কাগজে ছাপা ছবি সাঁটা থাকত, বলিউডের বিখ্যাত চিত্রপরিচালক দাদার দোকানে বসে চা খাচ্ছেন। একটা ইন্ডাকশনের ওপর বড় ডেকচিতে ক্রমাগত চা ফুটত, দুধ চা, যে রকম চা রাস্তার অন্যান্য চায়ের দোকানে আপনি আশা করবেন। অন্য ইন্ডাকশনে কফির জল কিংবা দুধ বসানো থাকত। সারি দিয়ে রাখা থাকত কমার্শিয়াল বৃহদায়তন চকচকে স্টিলের ভ্যাকুয়াম ফ্লাস্ক। মসালা লেমন টি চাইলে, সারি সারি সস এবং মশলার বোতল থেকে জিরের নির্যাস, মশলা মাখানো আমলকির টুকরো, কুচোনো আদা দিয়ে দাদা মশলা লেমন টি বানিয়ে দিতেন। গরমকালে লাল টুকটুকে ফ্রিজ থেকে বরফ বার করে মিক্সিতে গুঁড়িয়ে মিশিয়ে দিলেই হয়ে যেত মসালা লেমন আইস টি। শেষদিকে অবশ্য দাদার হাতের চা খাওয়ার আমাদের কপাল হত না। বেশিরভাগ দিন সহকারী বানিয়ে দিতেন, কোনও কোনওদিন বৌদি। দাদাবৌদির মেয়ের হাতের চাও খেয়েছি আমরা।

দাদাকে আমরা ভাঙা টেবিলে চা বানাতে দেখেছি, সে চা কেটলিতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দোকানে দোকানে ডেলিভারি দিতে দেখেছি। সেই থেকে শুরু করে মসালা লেমন আইস টি। সি আর পার্কে এ ধরণের রূপকথার গল্প হাওয়ায় ওড়ে। কে কবে এসেছিলেন রান্নার ঠাকুর। কিছু ছিল না সঙ্গে। রাঁধতে পারি, আপনার কোনও অনুষ্ঠানে লোক খাওয়াতে হলে বলবেন, শুধু এই অনুরোধটুকু ছাড়া। এই করে ক্রমে কেটারিং ব্যবসা, মার্কেটে দোকান, মার্কেট লাগোয়া চার কোটির ফ্ল্যাট। আমরা শুনে শিহরিত হতাম, কিন্তু দাদার উত্থানটা আমাদের আরও ইমপ্রেসিভ লাগত। কানে শোনা আর চোখে দেখার তফাত আছে। 

আমরা দাদার দোকানে যেতাম। রোজ না কারণ দাদার দোকান থেকে আমাদের বাড়ি একটু দূরে। তবু মাঝে মাঝে ছুটির দিন, চল দাদার দোকানে চা খেয়ে আসি, বলে ধড়াচুড়ো পরে বেরোতাম। আমাদের পক্ষে এত উদ্যোগের কারণ শুধু চা, সে যত ভালোই হোক, হতে পারে না। আমরা যেতাম দাদার খদ্দেরদের দেখতে। দাদার দোকানে বিবিধ লোকের আমদানি হত। অটো চালান, অফিস থেকে ফিরছেন, চা খেতে যতটুকু সময় লাগে, তারপর চলে যাবেন, এঁদের দেখতে আমাদের উৎসাহ ছিল না। দাদার দোকানে কিছু লোক 'ঠেক' বসাতেন, আমাদের টানতেন তাঁরা। পোশাকআশাক দেখলেই বোঝা যেত তাঁরা নাটক করেন, লেখেনটেখেন, গানটান, মিছিলে হাঁটেন, কবিতা তো লেখেনই। আমরা চা নিয়ে বসে তাঁদের ডিবেট শুনতাম, রাজনীতি, খেলাধুলো, এবং আরও নানা বিষয়ে বক্তৃতা শুনতাম। কোনও কোনওদিন আমাদের চলে আসার সময় হয়ে যেত। কোনওদিন ওঁরা আগে যেতেন, কেউ কেউ যাওয়ার আগে দাদা/ বৌদি/ ভাইঝিকে 'হাগ' করে যেতেন, সেও দেখার সুযোগ হয়েছে। 

একদিন সন্ধেবেলা অর্চিষ্মান বাড়ি ফিরে, কান থেকে গান খুলতে খুলতে খুলতে, এ দিয়ে ও পায়ের গোড়ালি থেকে জুতো আলগা করতে করতে বলল, দাদার দোকান তুলে দিয়েছে, জান?

অর্চিষ্মান কানাঘুষো খবর এনেছিল, ওই তল্লাটে থাকা দুই বন্ধু কনফার্ম করল। দাদার চায়ে নাকি ড্রাগ মেশানো হত। কেউ বলছে চায়ে মেশানো হত, কেউ বলছে আলাদা কেনাবেচা হত। মোদ্দা কথা কোনও একটা বেআইনি ব্যাপার চলছিল। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তুলে দিয়েছে। 

বলা বাহুল্য আমরা এ সব গুল বিশ্বাস করিনি। কারও পকেটে যত পৌঁছচ্ছে আর যত পৌঁছনো উচিত সে নিয়ে একটা দড়িটানাটানি উপস্থিত হয়েছে এবং দাদা সে টানাটানিতে হেরে গেছেন। 

তারপর বেশ কিছুদিন ওই জায়গাটা দিয়ে আসতে খারাপ লাগত। গাছের তলা ফাঁকা। চেয়ার নেই, মানুষ নেই, গাছের গা থেকে কাগজের সাজগুলোও খুলে নিয়ে গেছে। 

আরও কিছুদিন বাদে মনখারাপটাও রইল না। 

*****

কাল সন্ধেয় অর্চিষ্মান বাড়ি ফিরে, কান থেকে গান খুলতে খুলতে, এ পা দিয়ে ও পায়ের গোড়ালি থেকে জুতো আলগা করতে করতে বলল, ওহ, দাদা এখানে নতুন দোকান দিয়েছেন, জানো!

আমাদের বাড়ি থেকে মারাত্মক কাছে, মেলা গ্রাউন্ডের পাঁচিল ঘেঁষেই নাকি দাদার দোকান। অর্চিষ্মান আশ্বাস দিল, ওটা দাদাই। কারণ দাদা অর্চিষ্মানকে দেখে হাত নেড়েছেন। বলেছেন, এসে গেছি, আপনাদের পাড়ায়।

আমি দেখিনি, কাল পরশুর মধ্যে দেখে ফেলব নিশ্চয়, তবে অর্চিষ্মান যা বলল, আপাতত জাস্ট একটা টেবিল আর স্টোভ আর সসপ্যান। মেনুতে জাস্ট নর্মাল চা, বড়জোর লাল চা। চেয়ার নেই, গ্রিন টি নেই, দেওয়ালই নেই যে সেলিব্রিটিদের ছবি সাঁটা হবে।

খালি দাদা আছেন আর দাদার ফাইট আছে। আগেরবারের শুরুতেও যা ছিল।

August 12, 2018

তালাচাবি



এজেন্ট বলেছিলেন, 'বাড়ির সিকিউরিটি হেবি। একেবারে পিসফুল থাকতে পারবেন।' আগের বাড়িতে একতলার সিঁড়ির দরজা রাতের ছ'ঘণ্টা ছাড়া সারাদিন খোলা থাকত, লোকে দোতলায় উঠে একেবারে আমাদের ঘরের দরজায় বেল বাজাত, আমরা প্রথম সাত দিন আই হোল দিয়ে দেখে তারপর না দেখেই খুলে দিতাম। এ বাড়িতে ও সব গা এলানি চলে না, মেন গেটে কলিং বেল, মেন গেট দিয়ে ঢুকে গলি বেয়ে এসে সিঁড়ির দরজায় তালা, সে তালা পেরিয়ে দোতলায় উঠলে তবে আমাদের নাগাল পাওয়া যাবে।  

তাতে আমার পিস কিছু বাড়েনি। বেল বাজলে প্রতিবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখতে যেতে হয় কে এসেছে। কেউ কেউ আবার গলি বেয়ে সিঁড়ির দরজা পর্যন্ত আসেন না, মেন দরজায় বেল বাজিয়ে ওইখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন। তখন কাকের বাসা চুল নিয়ে, রং চটা জামা-পরা অবস্থাতেই যাও মেন গেট পর্যন্ত তদন্ত করতে। পায়ে হাওয়াই চটিও থাকে না সবসময়। 

সেদিন অবশ্য মেন গেট পর্যন্ত যেতে হল না। নিচের দরজা খুলেই সারপ্রাইজ, অর্চিষ্মান সতেরো মিনিট আগে এসে গেছে। আঙুল গলানো পলিথিনের প্যাকেটের ভেতর ঠোঙা, ঠোঙা থেকে চমৎকার অস্বাস্থ্যকর সুবাস বেরোচ্ছে। নিজের জন্য আলুর চপ, আমার জন্য বেগুনি। চায়ের সঙ্গে খেতে দারুণ মজা হবে। খাওয়ার পর আঙুলের ডগা থেকে নোনতা গুঁড়ো চাটতেও মজা। তবে সবথেকে মজা হবে খাওয়ার পর। এক গ্লাস জল খেয়ে নিলেই ব্যস। ফ্রিজ থেকে খাবার বার করা নেই, মাইক্রোওয়েভে গরম করা নেই, থালায় নিয়ে বসে চোয়াল ব্যথা করে চিবোনো নেই, বাসন মাজাও নেই। দিনের পাট ওইখানেই চুকল। খুব বাড়াবাড়ি হলে ল্যাপটপের তলা থেকে বেরিয়ে এক গ্লাস ইনো গুলতে হবে, ব্যস।

কিন্তু সেদিন অত আনন্দের মুখে বাধা পড়ল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরে ঢুকে দরজায় সাঁটা হুকে চাবি ঝোলাতে যাব, চাবি নেই। অথচ নিচে নামার সময় চাবিটা আমার হাতে ছিল, আমি জানি। 

জানি কারণ আমাদের এ বাড়ির দরজার তালা ইয়েল লক। তালাচাবির ভ্যারাইটি মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাসে ছিল না, কাজেই আমার কোনও আইডিয়া নেই ওই ব্যাপারে। কিন্তু ইয়েল লক কাকে বলে জানতাম। পৃথিবীর যত অলস গোয়েন্দাগল্প লেখক ইয়েল লককে বিখ্যাত করে দিয়ে গেছেন। ইয়েল লকওয়ালা দরজা বাইরে থেকে টেনে দিলে বন্ধ হয়ে যায় এবং চাবি ছাড়া খোলা যায় না। এ তালা বাজারে চালানোর সময় নিশ্চয় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল, হাতল ধরে টানুন, দরজা বন্ধ করুন। দরজার তালায় চাবি ঘোরানোর মূল্যবান পনেরো সেকেন্ড বাঁচান। ওই সময় বরং ক্যান্সারের ওষুধ কিংবা মঙ্গলে পৌঁছোনোর শর্টকাট আবিষ্কার করে ফেলুন। 

আর যদি চাবি ঘরের ভেতর ফেলে দরজা টেনে দেন, তালা ভাঙুন। ভুলেছেন কেন? ভুগুন এবার। আপনার মতো দায়িত্বজ্ঞানহীনের ভোগাই উচিত।

আমরা সাবধানতা অবলম্বন করেছিলাম বলা বাহুল্য। তাড়াতাড়ি কর, গ্যাসটা দেখেছ? বারান্দার দরজার ছিটকিনি তুলেছ?-র এইসব গিয়ে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়ের এক এবং অদ্বিতীয় প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছিল, 'চাবি নিয়েছ?' একজন দরজা ধরে দাঁড়াতাম, অন্যজন চাবি বার করে চোখের সামনে ঝোলাতাম। ঝুলন্ত চাবিকে দু'জোড়া চোখের ফুল ভিউতে রেখে আমরা দরজা বন্ধ করতাম।

বেশি সতর্ক হয়েছিলাম আমি। ইয়েল লকের সঙ্গে আমার মোলাকাত এই প্রথম নয়। ইয়েল লক-ঘটিত কিছু পরিস্থিতি আমার চেতনায় এমন ট্রমাটিক ছাপ ফেলেছে, পার্ট ওয়ানের রেজাল্টও ফেলেনি। নিজের বাড়ির দরজায় ইয়েল লক দেখে সে সমস্ত ট্রমা ফিরে এসেছিল। দরজার বাইরে চাবি হাতে নিয়ে ছাড়া পা রাখতাম না, ডোর স্টপার ঠেসে দরজা হাঁ করে খুলে নিচে গেলেও চাবি নিয়ে যেতাম। কারণ নিশ্চিত ছিলাম, আমি নিচে যাওয়া মাত্র কোনও রসিক ভূত হাওয়া দিয়ে দরজা ঠেলে বন্ধ করে দেবে। আমি রং চটা টি শার্ট পাজামা পরে বন্ধ ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব। 

কাজেই আমি চাবি হাতে নিয়েই নেমেছি। 

কিন্তু ওই মুহূর্তে কিছুই নিশ্চিত করে বলা যায় না, সবই ধোঁয়া ধোঁয়া লাগে। রোজ হাতে নিয়ে নামি, হয়তো আজই ভুল হয়েছে? ঘরের দরজা থেকে সিঁড়ির দরজা পর্যন্ত চাবি হারানোর সম্ভাব্য রুট তন্নতন্ন খোঁজা হল। জিনিস হারানোর একটা বাজে ব্যাপার হচ্ছে, খোঁজার জন্য পুরো বাড়িটা উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া। বাথরুমের শেলফে, বাইরের দরজার সম্পূর্ণ উল্টোদিকের বারান্দায় কারিগাছের টব, কোনও জায়গাই চাবি থাকার পক্ষে অসম্ভাব্য নয়। অফ কোর্স, আমি ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের ঢাকনা তূলে চাবি ফেলে দিইনি, কিন্তু তা বলে ওটা খোঁজা বাদ দেওয়া তো যায় না। অর্চিষ্মান ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের ঢাকনা তুলে দলামোচড়া কাগজ টান করে দেখতে দেখতে বলল, 'এই তো অমুক রিসিট এইখানে!'

চাবি?

নেই। 

আমি কেঁদে ফেলার আগের স্টেজে গিয়ে 'সরি সরি' বলতে লাগলাম, অর্চিষ্মান রিসিট ভাঁজ করে পকেটে পুরতে পুরতে বলল, 'আহা, এ তো আমার হাতেও হতে পারত।'

অবান্তরের পড়ুয়া যদি কেউ থেকে থাকেন, পার্টনারের খোঁজ করছেন বা করবেন, আপনার প্রতি আমার একটা পরামর্শ আছে। হাইট, রং, বাড়িগাড়ি, অন-সাইট ট্র্যাভেলের সুযোগ, ধর্মে মতি, ঐতিহ্যে শ্রদ্ধা, সাধুসন্ন্যাসীতে বিশ্বাস, এসবের সঙ্গে সঙ্গে পার্টনারের কাম্য গুণের চেকলিস্টে আরেকটা বিষয়ও যোগ করে রাখুন। কোনও একটা ক্ষতি হয়ে গেলে (ক্ষতির দায় যদি সত্যি সত্যি অন্যপক্ষের হয়েও থাকে) নালিশের খাঁড়া নিয়ে ঝাঁপিয়ে না পড়ার গুণ। লিস্টের বাকি সব গুণের মতো চকচকে নয়, কিন্তু মারাত্মক দরকারি।

গোটা বাড়ি খোঁজা হয়ে যাওয়ার পর হাল ছাড়তে হল। 'কোথায় যাবে?' 'পাখা লাগিয়ে উড়ে তো যাবে না?' অস্থির আর্তনাদেরা 'যা হওয়ার হয়ে গেছে।' 'আর ভেবে লাভ নেই' ইত্যাদি শ্রান্ত উপলব্ধিতে পর্যবসিত হল। সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার খোঁজায় ক্ষান্ত দিয়ে ডুপ্লিকেট চাবি বার করার সময় হয়েছে।

অফ কোর্স, আমাদের ডুপ্লিকেট চাবির ব্যবস্থা ছিল। এ চাবি ঘরের ভেতর ফেলে বেরোতে আমার যে তিনমাসের বেশি লাগবে না এটা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধির দরকার নেই। আর এই রকম গোলমেলে তালাওয়ালা বাড়ির একটাই চাবি থাকলে অর্চিষ্মানের রাতে ঘুম হবে না। আমরা নিজেরাই ডুপ্লিকেট করাতাম, কিন্তু আবিষ্কার হল অলরেডি একটা ডুপ্লিকেট আছে। আমাদের মতোই কোনও অগোছালো ভাড়াটে করিয়ে রেখেছিল নিশ্চয়। ডুপ্লিকেটটা আসলটার সঙ্গে একই গোছায় রাখা। যদি গোছা ভেতরে রেখে বেরিয়ে যাই, ও জিনিস কোনও কাজেই লাগবে না। তাই আমরা ডুপ্লিকেট চাবিটা বাড়ির বাইরে কোথাও রাখার ব্যবস্থা করার কথা ভেবেছিলাম। বাড়ির বাইরে আমাদের একমাত্র আশ্রয় হচ্ছে অফিস। আমার অফিস অপেক্ষাকৃত কাছে তাই ডুপ্লিকেট চাবি আমার অফিসেই রাখার স্থির হয়েছিল। আমার ডেস্কে একটা ডাবর হানির বোতল, যেটায় আগে মানি প্ল্যান্ট থাকত, দেহ রাখার পর খালি পড়ে ছিল, তার মধ্যে সে চাবি পুরে বোতলের মুখ বেশ করে এঁটে বন্ধ করা আছে।

এখন সে চাবি উদ্ধার করার সময় এসেছে। সপ্তাহে পাঁচ দিন বাধ্য হয়ে অফিস যাই। এ সপ্তাহে ছ'বার যাওয়া হবে। ষষ্ঠবার সেধে যাব। রাত আটটার সময়। 

বেরোনোর আগে চা খাওয়া যাক। মুখ তেতো, মন ভার, নিজের অপদার্থতায় তখনও নিজের ওপর রেগে গুম। পলিথিন থেকে বেগুনির ঠোঙা বার করে এলোমেলো ভাঁজ খুলছি, ভাঁজ থেকে থালার ওপর ঠুন করে পড়ল চাবির গোছা।

সিঁড়ির নিচে দরজা খুলে পলিথিনের ব্যাগ আঙুলান্তর করার সময় আঙুল খসে চাবি বেগুনির পলিথিনের ভেতর পড়ে গেছে। নিঃশব্দে। 

ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু অত সুস্বাদু বেগুনি আর কখনও, কোথাও খেয়েছি কিনা মনে পড়ছে না।


August 09, 2018

মায়ের স্বপ্ন



সারাজীবনে কতগুলো স্বপ্ন দেখা হল আর সে সব স্বপ্নের কতগুলোকে বাস্তবে রূপান্তরিত করা সম্ভব হল সেটা আমার মতে জীবনের সফলতা-বিফলতা মাপার অন্যতম মাপকাঠি হতে পারে। স্বপ্ন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মতো চেনা হতে পারে বা চাঁদে যাওয়ার মতো অচেনা। নেশাকে পেশা করে বাঁচার মতো সাহসী কিংবা কোনও বিশেষ মানুষকে বিয়ে করার মতো আনইন্টারেস্টিং। যা খুশি, যেমন খুশি স্বপ্ন হতে পারে। স্বপ্নের ভালোমন্দ এখানে বিচার্য নয়। বিচার্য হচ্ছে স্বপ্নের স্ট্রাইক রেট।  

সে রেট দিয়ে বিচার করলে আমার মায়ের জীবন আগাগোড়া ফেলিওর। 

ব্যর্থতার প্রথম কারণ মায়ের স্বপ্নের চরিত্র। মা এমন সব স্বপ্নই দেখেন যেগুলো সত্যি হওয়া অসম্ভব। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাবলীল ইংরিজি কথোপকথন। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ডুয়েট। দেশবিদেশের স্টেজে রবিশঙ্করের সঙ্গে সেতার।

মায়ের স্বপ্ন ব্যর্থ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, বেশিরভাগ লোকের বেশিরভাগ স্বপ্ন ব্যর্থ হওয়ার কারণের থেকে আলাদা নয়। যথেষ্ট সিরিয়াসলি স্বপ্নটার পেছনে না পড়ে থাকা। এই গোত্রে পড়বে মায়ের নিজে গাড়ি চালিয়ে দূরে দূরে বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্নটা। একেবারেই নাগালের ভেতরের স্বপ্ন। আরেকটু দম লাগালেই, দম লাগাতেও হত না, খালি স্বপ্নটার কথা মাথায় রেখে জীবনের শেপটা একটু টিপেটুপে এদিকওদিক করে নিলেই মা এই স্বপ্নটাতে পাস করে যেতেন।  

অবশ্য স্বপ্নে পাসফেলের ব্যাপারে অত চট করে করে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো শক্ত। কারণ স্বপ্ন সাদাকালো নয়। ইন ফ্যাক্ট, স্বপ্নের কোনও রং থাকে না নাকি। যে ইতিহাস পরীক্ষার দিন ভূগোল পড়ে হলে পৌঁছনোর স্বপ্ন দেখছে সে আসলে কীসের ভয় পাচ্ছে, ইতিহাসের? নাকি প্রস্তুতিহীনতার? অনাহূত সারপ্রাইজের? যে ঘামতে ঘামতে মাঝরাতে উঠে বসছে, পরীক্ষা ঘাড়ের কাছে, সবার অংকের সিলেবাস শেষ একা তার ছাড়া, তার প্যানিকটা কি অংকে? নাকি বাকিদের সঙ্গে রেসে হেরে যাওয়ার আতংকটাই আসল? মায়ের গাড়ি চালিয়ে বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্নটা সম্ভবতঃ গাড়ির নয়, বেড়াতে যাওয়ারও না। স্বপ্নটার নির্যাস হয়তো নিজের জীবনের চালকের আসনে নিজে বসাটা। সেদিক থেকে দেখলে মা অনেকটাই সফল। 

কিন্তু আমি এইসব স্বপ্নবিচারে বিশ্বাসী নই। কিছু কিছু ব্যাপার (বেশিরভাগ) ফেসভ্যালুতে নেওয়াই কার্যকরী বলে আমি মনে করি। কাজেই আমি ধরে নিচ্ছি গাড়ি চালিয়ে লং ড্রাইভে যাওয়ার স্বপ্নে মা ফেল।

মায়ের তৃতীয় ব্লান্ডার, স্বপ্নের দায় অপাত্রে অর্পণ করা। মা নিজেকে নিয়ে যতদিন স্বপ্ন দেখছিলেন, ততদিন তবু একরকম ছিল। তাতে ওঁর সাধ মেটেনি, ছাগলের ক্ষুরে পেনসিল বেঁধে তাকে সিঁড়িভাঙা সরল কষাতে গেছেন। (বাক্যটা শেষ করামাত্র বিবেকে একটা অস্বস্তি টের পেলাম আর অমনি বারান্দার গ্রিলের বাইরে একটা ছাগলের মুখ ভেসে উঠল। আমার নাম শুনলাম যেন? আমি তাড়াতাড়ি বললাম, এখানে ছাগল বলতে আমি তোমাকে মিন করিনি, আমার চেনা একজনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছি। ছাগল বলল, অত প্রতীক দিতে হবে না। সোজা কথা সোজাভাবে লেখ। তাতে যদি লেখা উতরোয়। গভীর বিরক্তিসূচক 'হুঃ' বলে আবক্ষ ছাগল মিলিয়ে গেল।)

কিন্তু মায়ের সবথেকে বড় ভুল, পোস্টের গোড়াতে যেটা লিখলাম, সফল স্বপ্ন আর টোটাল স্বপ্নের অনুপাতের সহজ হিসেবটা মাথায় না রাখা। অনুপাত ভদ্রস্থ রাখতে গেলে স্বপ্ন কম দেখুন, হরের হুড়হুড়িয়ে বাড়া প্রতিরোধ করুন, তাহলেই লবের পেছনে অত পরিশ্রম না করলেও চলবে। কেউ কেউ দ্বিমত রাখতে পারেন। বলতে পারেন বেশি স্বপ্ন দেখার সুবিধে হচ্ছে একটা না একটা তো সফল হবেই। এঁরাই বলেন, পরীক্ষায় তো বস, ফেল করলে ফেল করবি। অ্যাপ্লাই তো কর, কেউ না কেউ তো ডাকবেই। পত্রিকায় লেখা পাঠাতে থাক, ছাপলে ছাপবে, না ছাপলে ছাপবে না। প্রোপোজ তো করে দেখ, রাজি হলে ভালো না হলে হল না। 

এঁরা বিশ্বাস করেন, হারাজেতায় ক্ষতি নেই, পার্টিসিপেশনটাই আসল। 

হারলে আমার কনফিডেন্স যে গুঁতোটা খাবে, সে ব্যাপারে এঁদের কোনও মাথাব্যথা নেই। এঁরা জানেন না, প্রতিটি হার, প্রতিটি প্রত্যাখ্যান আমার ইগো কত গভীর ফালাফালা করে যাবে, সে হাঁ সারাজীবনেও বুজবে না। এঁরা বোঝেন না, আমার অলরেডি তলানি-ছোঁয়া কনফিডেন্স আমাকে সামলে চলতে হবে, যত্রতত্র খরচ করে ফেললে চলবে না। লাভ চাই না, ক্ষতি যথাসম্ভব কম রাখাই আমার জীবনের লক্ষ্য। বি এম ডবলু চেয়ে হিরো সাইকেল পেলাম, তাতে আমি নেই। তার থেকে হিরো সাইকেলই চাইব আমি সকালবিকেল।

মায়ের সঙ্গে এ ব্যাপারেও আমার উল্টো। অগুনতি ব্যর্থ স্বপ্নের বোঝা সারাজীবন ধরে বইতে কষ্ট হল কি না সেটা আমি মাকে জিজ্ঞাসা করেছি। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলতে না পেরে কষ্ট হয়েছিল? তোমার সব স্বপ্নে কচাকচ কাঁচি চালিয়ে দিয়েছি বলে আমার ওপর রাগ হয়? মা হাসেন। বলেন, ভুলেই গেছিলাম, তুই বললি বলে মনে পড়ল। ওই রকম বিশ্রী স্বপ্ন, পূর্ণ হয়নি বেঁচে গেছি। 

হতে পারে আমাকে বাড়াবাড়িরকম ভালোবাসেন বলে মা দুঃখ চেপে রাখেন। কিন্তু আমার সেটা মনে হয় না। রাগ দুঃখ মনে পুষে বসে থাকার ব্যাপারেও মায়ের সঙ্গে আমার মিল নেই। মা স্বপ্ন দেখেন, বেশিরভাগই ব্যর্থ হয়, মা আবার তেড়েফুঁড়ে নতুন স্বপ্ন দেখেন। আমার মা প্যাথোলজিক্যাল স্বপ্ন-দেখিয়ে। এই বয়সে এসে এ রোগ সারা মুশকিল। সারুক আমি চাইও না। মা জেগে আছেন অথবা ঘুমোচ্ছেন অথচ স্বপ্ন দেখছেন না, এটা হলেই মাকে চেনা কষ্টের হবে। 

তাই কাল সকালে মা যখন বললেন পরশু রাতে তিনি একটা স্বপ্ন দেখেছেন, আমি চায়ে চুমুক দিয়ে হেলান দিয়ে বসে বললাম, বল শুনি কী স্বপ্ন।

স্বপ্নে নাকি মা লাইব্রেরি থেকে মোটা মোটা তিনটে বই হাতে নিয়ে সবে বেরিয়েছেন। মায়ের স্বপ্নের এমন আটপৌরে শুরু দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, কিন্তু প্রকাশ করিনি। দেখা যাক কোথাকার স্বপ্ন কোথায় দাঁড়ায়। সবে তো শুরু।

মায়ের স্বপ্নে বৃষ্টি নামল। সে কী বৃষ্টি রে সোনা, চারদিক ধোঁয়া, কিছু দেখা যাচ্ছে না। মা বই হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছেন বাড়ি ফিরবেন কী করে। এমন সময় একটা বাস এসে থামল।  

লাইব্রেরি থেকে আমাদের বাড়ির পথে আধঘণ্টা বাদে বাদে একটা করে টোটো যায়। কিন্তু এটা বাস্তব নয়, এটা মায়ের স্বপ্ন। মা বাসে চড়লেন। বাসে আর কেউ নেই। কন্ডাকটরও নেই? মায়ের মনে নেই। যাত্রী যে মা একা সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, ড্রাইভার কন্ডাকটর কেউ আছে কি না মা খেয়াল করেননি।

জল জমে রাস্তা পুকুর, হেলেদুলে বাস চলল। বাইরে বৃষ্টি আরও ঝেঁপে এল, ক্রমে চাকা জলে ডুবে গেল। চাকা পেরিয়ে জানালার নিচ ছোঁয় ছোঁয়। মায়ের স্বপ্নের বাস থামছে না, চলছে তো চলছেই।

কোন লাইব্রেরিতে গিয়েছিলে, মা? জয়কৃষ্ণ? নাকি আরও দূরের? চিড়িয়াখানার পাশেরটা?

আরে না, আমাদের পাঠাগার। কিন্তু রাস্তাটা ফুরোচ্ছিলই না। স্বপ্নের রাস্তা বলে বোধহয়।

তারপর একসময় জল জানালা ছাপিয়ে ঢুকে পড়ল বাসের ভেতর। মা বুঝলেন আর উপায় নেই। বইগুলো ফেলে দুই হাত ওপরে তুলে বাঁচার চেষ্টা করলেন। 

আর অমনি যেন কে তাঁকে দু'হাত ধরে টেনে নিল। বাসের জানালা গলে রোগা মা বেরিয়ে এলেন, তারপর ভেসে ভেসে ওপরদিকে উঠতে লাগলেন। 

সত্যি সত্যি উড়ছিলাম রে সোনা। একসময় মেঘটেঘ ছাড়িয়ে চলে গেলাম। তখন আর বৃষ্টি নেই। ঝকঝকে রোদ, নীল আকাশ, ঠাণ্ডা হাওয়া, নির্ভার আমি উড়ছি। 

কখন দেখলে মা স্বপ্নটা?

ওই তো একবার ঘুম ভেঙে দেখেছিলাম তিনটে সাতচল্লিশ, তারপর পাঁচটার সময় উড়তে উড়তেই ঘুম ভাঙল।  

ভোরের স্বপ্ন। সত্যি হওয়ার কোনও চান্স নেই, বলা বাহুল্য। 

***** 

তারপর টাইপ করতে করতে, ওলায় যেতে যেতে, রুটি ঢ্যাঁড়সভাজা খেতে খেতে দৃশ্যটা দেখছি। আমার ক্ষীণতনু মা, উড়ছেন। কাদামাখা পৃথিবীর নাড়ি কেটে, মেঘ ছাড়িয়ে, নীল আকাশে ভাসছেন। শিরদাঁড়ার ব্যথা, পেনশনে টি ডি এস, বারবার খারাপ হওয়া মোবাইলেরা, না বলে কামাই করা মাসিপিসিরা মাটিতে দাঁড়িয়ে দু'হাত তুলে বলছে, ওগো যেয়ো না, আমাদের সঙ্গে নাও, মা উড়ে উড়ে, সবার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছেন।

হলই বা স্বপ্নে। হল তো?

ভাবছি, মায়ের থেকে স্বপ্ন দেখার বিদ্যেটা শিখে নিই। নাকি বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে?



August 05, 2018

'বিদায় ব্যোমকেশ' হলে গিয়ে দেখার সাতটি কারণ



উৎস গুগল ইমেজেস

***স্পয়লার আছে ***

১। গল্প নয়। গল্পের জন্য দেখতে পারেন। যদি বুঝতে পারেন। আমি বুঝিনি বলে আপনাকে রেকমেন্ড করতে পারছি না। ব্যোমকেশ (আবীর) ভয়ানক বুড়ো হয়েছেন। সত্যবতী (সোহিনী) আর অজিত (রাহুল) মরে ভূত হয়েছেন। ব্যোমকেশের ছেলে অভিমন্যু বক্সী (জয়), যাকে আমরা খোকা বলে চিনি, ডি সি কলকাতা পুলিশ, দু'বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যান। একেবারে উধাও। পুত্রবধূ অনসূয়া (বিদীপ্তা) অফিস যান-আসেন, নাতি সাত্যকি (আবীর) ফিজিক্সে আলো নিয়ে গবেষণা করে। সাত্যকির বান্ধবী অবন্তিকা (সোহিনী) বড়লোক প্রোমোটার বাবার (অরিন্দম শীল) মেয়ে। 

এর মধ্যে একদিন অভিমন্যু বক্সী টপটপ রক্ত ঝরা ছুরি হাতে এসে নোনাপুকুর থানায় আত্মসমর্পণ করেন। বলেন উনি একটা খুন করেছেন। লাশ কোথায় পাওয়া যাবে সে হদিসও দেন। বাধ্য হয়েই তাঁকে লক আপে ঢোকাতে হয়। তাঁকে সাহায্য করতে চান তাঁর কর্মজীবনের সহকর্মী ও বন্ধু ডি সি কৃষ্ণেন্দু মালো (রূপঙ্কর বাগচী), কিন্তু অভিমন্যু কিছুতেই বলবেন না উনি কেন উধাও হয়েছিলেন, কেন খুন করেছেন, কেন ফিরে এলেন। ক্রমে আরও একটা লাশ আবিষ্কার হয় এবং রকমসকম দেখে মনে হয় এই খুনটাও অভিমন্যু করেছেন। ব্যোমকেশ ঘরে বসে বসে, সাত্যকি গার্লফ্রেন্ডের বাবার এস ইউ ভি চালিয়ে তদন্ত চালায়। দু'চারজনের ওপর সন্দেহ জড়ো হয়। কেউ কেউ রাতে চুপিচুপি গাড়ি নিয়ে বেরোয়। 

গল্পটা আমি বুঝতে পারিনি কারণ সিনেমায় রহস্য সমাধানের থেকে বেশি জরুরি ব্যাপার হচ্ছে বাবা-ছেলে, দাদু-নাতি, স্বামী-স্ত্রী, শ্বশুর-পুত্রবধূ, মা-ছেলের সম্পর্কের প্যাঁচাল। সে প্যাঁচাল বিল্ড আপ করতে গিয়ে ফার্স্ট হাফে অভিমন্যু বক্সীর আত্মসমর্পণ ছাড়া আর বিশেষ কিছুই দেখানোর সুযোগ হয়নি। সেকেন্ড হাফে একটু নড়াচড়া শুরু হল, কিন্তু কে যে কাকে কেন খুন করল, হঠাৎ উধাও হলই বা কেন (কারণ বলা আছে, কিন্তু আমি কনভিন্সড নই ওই কারণে কেউ গা ঢাকা দিতে পারে,) আর বেছে বেছে ঠিক ওই সময়েই ফিরেই বা এল কেন, আমি সত্যি বলছি বুঝতে পারিনি। এত গোলমাল কেন হচ্ছে, সেটা বোঝানোর প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় সেকেন্ড হাফেরও বেশ কিছুটা কেটে যাওয়ার পর। একটা ফাইল। তার পেছনে সবাই মিলে পড়েছে। সে নাকি মারাত্মক ফাইল। এখন বার বার মারাত্মক ফাইল মারাত্মক ফাইল বললে বিশ্বাস করে নিতে হয় মারাত্মক, কিন্তু মারাত্মকতার মাত্রা সম্পর্কে সংশয় থেকে যায়। কী এমন হয়েছিল যার জন্য এত খুনোখুনি? গোলমালে সন্দেহভাজনদের ভূমিকাও এর ওর মুখে দুয়েকলাইন বলা, চোখে দেখিয়ে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা নেই।

সম্ভবতঃ গোটা ব্যাপারটা আমার বোঝার পক্ষে বেশি সূক্ষ্মতার সঙ্গে দেখানো হয়েছে। মুশকিলটা হচ্ছে সিনেমাটার বাকি অনেক জায়গা আবার বেশ বানান করে, আন্ডারলাইন টেনে দেওয়া আছে। ব্যোমকেশের অসহায়তা বোঝানোর জন্য সত্যবতী আর অজিতের ভুতকে এনে, "আমি হেরে গেলাম," "আমি বুড়ো হয়ে গেলাম," উচ্চারণ করিয়ে বোঝানো হয়েছে। নিষ্ঠুরতা বোঝানোর জন্য লাল গোলাপে আগুন ধরিয়ে দেওয়াটেওয়াতেও কোনওরকম ধোঁয়াশা নেই। খালি রহস্যের ক্লু ইত্যাদির ব্যাপারে দর্শকের বুদ্ধির ওপর প্রত্যাশা রাখা আমার মতে অন্যায়।

২। আবীরের দুই অবতার দেখতে যেতে পারেন। প্রথম অবতার বুড়ো ব্যোমকেশ, দ্বিতীয় অবতার সুয়াভ সাত্যকি। বুড়ো ব্যোমকেশ নখদন্তহীন বাঘ হয়েছেন, সেলিব্রিটি স্টেটাস রয়ে গেছে, কিন্তু গায়ে জোর নেই। একলা ঘরে বসে সত্যবতীর জন্য ঝুমকোলতার চারার গায়ে হাত বোলান আর মাটি কুঁদে পাখি, সত্যবতী আর অজিতের মূর্তি বানান। ছাদে গিয়ে গোলাপের বাগান করেন।

সুয়াভ সাত্যকি আলো নিয়ে রিসার্চ করেন। দাদু, বাবা, মা - সকলের ওপর অভিমান। অবন্তিকারূপী সোহিনীর সঙ্গে প্রেম। আবীরের প্রতি সম্পূর্ণ পক্ষপাত নিয়েই বলছি, তাঁর চরিত্রটি খুব অদ্ভুত সময়ে অদ্ভুত আচরণ করে। বাবা দু'বছর পর ফিরে এসে জেলে। দাদু  বাবাকে ছাড়ানোর বদলে এমন সব ক্লু খুঁজে বার করছে যে বাবা ছাড়া পাওয়ার বদলে আরও প্যাঁচে পড়ছেন। সেই সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাদুর মতো শাল জড়িয়ে, চশমা পরে, গালে কাটা দাগ এঁকে দাদু দাদু সাজাটা ব্যাখ্যার অতীত। 

৩। সোহিনী আর সোহিনীর দুই অবতারকেও দেখতে যেতে পারেন। যদি ক্ল্যাসিক বেঙ্গলি বিউটি পছন্দ করেন, হোমস্টাইল শাড়ি পরা, সদ্য স্নান থেকে ওঠা কুঞ্চিত কেশদাম, নিচু স্বরে কথা কয়, মুখে সর্বদা 'এই জায়গাটা একটু বুঝিয়ে দাও না' ভাব নিয়ে ঘোরে, পাকাচুল ছেলেকে 'আমার খোকা' বলে ডাকে, তাহলে 'সত্যবতী' অবতার আপনার জন্য পারফেক্ট। একবার শুধু 'আমার খোকা'র সঙ্গে সঙ্গে 'আমার ব্যোমকেশ'ও বললেন শুনলাম। তাঁর বানানো চরিত্র নিয়ে সিনেমাওয়ালাদের টানাটানি এবং ইন্টারপ্রিটেশনের রকমারিত্ব দেখলে দেখলে শরদিন্দু কী করতেন সে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে শুনেছি কাউকে কাউকে, সত্যবতী ব্যোমকেশের নাম মুখে আনছে শুনলে শরদিন্দু কী করতেন সেটা নিয়ে অ্যাকচুয়ালি আমার বেশি চিন্তা হচ্ছিল। 

আপনি যদি অতটা প্রাচীনপন্থী না হয়ে থাকেন, একটু অন্যরকম নায়িকা যদি আপনার পছন্দ হয়ে থাকে, পাড়াপ্রতিবেশী কী বলবে তোয়াক্কা না করে মাঝরাতে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে সিনেমার ডায়লগ বলে দেখানোর মত অন্যরকম, বড়লোকের মেয়ে কিন্তু টাকাপয়সার কেয়ার করে না টাইপ অন্যরকম, সেজে থাকে কিন্তু আবার সাজের দুয়েকটা এলিমেন্ট দেখে (ওভারসাইজড চশমা) বোঝা যায় যে বহিরঙ্গের সুপারফিশিয়ালিটিতে মন নেই, তাহলে সাত্যকির গার্লফ্রেন্ড অবন্তিকা, যাকে সবাই তুন্না না কী একটা নামে ডাকে, সেই অবতার আপনার জন্য পারফেক্ট হবে।

খ, ছ, ভ, হ, ঝ - এইসব কঠিং বর্ণের উচ্চারণ সোহিনীর দুই অবতারের একজনের পক্ষেও অসম্ভব।*** তবে তিনি তো আর আবৃত্তি করতে আসেননি, অভিনয় করতে এসেছেন। হু কেয়ারস। 

৪। অজিত আর সত্যবতীর ভুত দেখতেও যেতে পারেন। দুজনেই ভরা যৌবনে ভুত হয়েছেন। ব্যোমকেশের আশেপাশে সর্বদা ঘোরেন। ক্লু-ট্‌লুর আভাস দেন। সিনেমার শেষে ব্যোমকেশের সত্যবতীর ভুতকেই চায়ের জল বসানোর অনুরোধ জানানোটা আমার বেশ রিয়েলিস্টিক লেগেছে।

৫। বাঙালির সংস্কৃতিমনস্কতা নিয়ে গর্ব করতে হলেও এই সিনেমাটা দেখতে যাওয়া জরুরি। এটা অবশ্য এই সিনেমার একচেটিয়া নয়। অজিতের ভুত, ব্যোমকেশ, সাত্যকি সকলেই যখনতখন কবিতার লাইন মুখস্থ বলে। লক আপে নাটকের সংলাপ, চেজ সিকোয়েন্সে সুকুমার রায় পর্যন্ত ঠিক ছিল কিন্তু ক্লাইম্যাক্সে সবাই সবার মাথায় বন্দুক ধরে থাকা অবস্থায় গলা কাঁপিয়ে নাটকের সংলাপ বাঙালি ছাড়া আর কেউ বলতে পারে কি না আমি শিওর নই। 

৬। ক্লাইম্যাক্সের জন্যও বিদায় ব্যোমকেশ দেখা উচিত। অ্যাকচুয়ালি ক্লাইম্যাক্স না দেখলে বাকিটা দেখার কোনও মানে হয় না, কারণ পুরো গল্পটা ক্লাইম্যাক্সেই বলা হয়েছে। হতে পারে আপনি এতক্ষণে ধৈর্য হারিয়েছেন, গল্পের খুঁটিনাটি জানার আগ্রহ আর বোধ করছেন না, তবু দেখুন। কারণ শ্রী সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। ওঁকে কাজল, লিপস্টিক পরিয়ে হাতে বন্দুক ধরিয়ে খুনখারাপি করতে পাঠানোর পেছনে চরিত্রের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনকে মেনস্ট্রিমে জায়গা দেওয়ার সদিচ্ছার থেকে ওঁর ওই চেহারা দেখিয়ে দর্শককে এক্সট্রা কণ্টকিত করার বদিচ্ছেটাই বেশি বলে আমার সন্দেহ। ক্লাইম্যাক্সে সুজয় খালি নাচতে বাকি রাখেন, 'কুমীর জলকে নেমেছি' সুর করে গাইতে থাকেন, খনখন করে হাসেন। সে হাসি সংক্রামক।  

৭। এ কারণগুলোর একটাও যদি যথেষ্ট মনে না হয়, তবু আপনার সিনেমাটা দেখতে যাওয়া উচিত। বাংলা সিনেমার কিছু হচ্ছে না বলে চেঁচাবেন, আর এদিকে হলে গিয়ে দেখে টাকা খরচ করে বাংলা সিনেমার পৃষ্ঠপোষকতা করবেন না, এ মহাপাপ করবেন না।

***আমাকে একজন জানিয়েছেন যে সোহিনী সম্ভবতঃ উচ্চারণগুলো ভালোই পারেন, বড়লোকের আদুরে মেয়ের ভূমিকায় আধো আধো গলায় কথা বলার নির্দেশ ছিল বলে ওইভাবে বলেছেন।


August 02, 2018

প্রমীলার প্রতিশোধ








গোয়েন্দা উপন্যাস পড়লে যত আরাম হয়, গোয়েন্দা ছোটগল্প পড়লে তত আরাম হয় না কেন এ নিয়ে আমি ভেবেছি। অ-গোয়েন্দা সাহিত্যে আমার আরামের প্যাটার্ন ঠিক উল্টো বলে আরও বেশি করে ভেবেছি।

একটা কারণ হতে পারে ছোট গোয়েন্দাগল্পে প্লট খেলানোর জায়গা কম বলে। তিন পাতা অন্তর নতুন ক্লু, সাড়ে সাত পাতা পার হয়ে রেড হেরিং, মাঝপথ পার হয়ে খানিক দূর এগিয়ে দু'নম্বর খুন (আপনি যাকে খুনী ভেবে পাঁচটাকার মাঞ্চ বাজি ধরেছেন সে) ইত্যাদির অবসর ছোটগল্পে নেই। কাজেই এ সবের মজাও নেই। বড়র তুলনায় ছোট গোয়েন্দাগল্পের দ্বিতীয় ডিসঅ্যাডভান্টেজ - চরিত্রের ভিড়, পারিপার্শ্বিকের বর্ণনা, সাবপ্লট ইত্যাদি দিয়ে মূল প্লটের খুঁত ঢাকার সুযোগহীনতা। এ সব ঠ্যাকনা সরিয়ে নিলে বেশিরভাগ গোয়েন্দাগল্পই বিপদে পড়বে। ক্রিস্টি যে ক্রিস্টি, তাঁর লেখা ছোটগল্প পড়েও মনে হবে, এ ভারি গোঁজামিল হল।

প্লটিং-এ পারঙ্গম লেখকেরা উপন্যাসে মাত করেন (ক্রিস্টি) আর চরিত্রচিত্রণ, পারিপার্শ্বিক সৃষ্টিতে দক্ষরা ছোটগল্পে ভেলকি দেখান বেশি (কোনান ডয়েল) - এ আমার অবজার্ভেশন।

রুথ রেন্ডেল আমার মতে দ্বিতীয় গোত্রের লেখক। স্ট্যান্ড অ্যালোন এবং সিরিজ মিলিয়ে, স্বনামে (ইন্সপেক্টর ওয়েক্সফোর্ড সিরিজ) ও বেনামে (বারবারা ভাইন ছিল তাঁর ছদ্মনাম) রেন্ডেল প্রায় পঁয়ষট্টিখানা গোয়েন্দা উপন্যাস লিখেছিলেন। পঁয়ষট্টিটা পড়িনি, সম্ভবতঃ পড়বও না, কারণ রুথ রেন্ডেলের উপন্যাস আমার অত ভালোও লাগে না। তাঁর লেখা 'দ্য সেন্ট জিটা সোসাইটি'- উপন্যাসের অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছেও আমি কোনও ক্রাইমের দেখা পাইনি  বা ক্রাইম ঘটে থাকলেও তার সমাধানে কোনও রকম প্রচেষ্টা, তাপউত্তাপ চোখে পড়েনি। কেবলই চরিত্রচিত্রণ চলছে।

যেখানে ধাঁধা লিখতে হচ্ছে না; ক্লূ, রেড হেরিং, মোটিভ, অপরচুনিটির খেলা খেলার দায় যেখানে নেই, রুথ রেন্ডেল ঝলসান সেখানে। অর্থাৎ ছোটগল্পে। অপরাধের প্রতি গভীর কৌতূহলী মন নিয়ে অপরাধের ঘটনাকে ঘিরে থাকা চরিত্রদের দেখেন নিজে গভীরভাবে, আমাদের দেখান। রুথ রেন্ডেলের ছোটগল্প দশের বেশি সংকলনে জড়ো করা আছে। আমার টু রিড লিস্টে দশটাই আছে। কারণ যা পড়েছি প্রায় সবই ভালো লেগেছে। আর সে সব গল্পের মধ্যেও ভালো লেগেছে 'দ্য উইংক'। আঠাশশো শব্দের মধ্যে অতখানি ভয়াবহতা, অতখানি উদাসীনতার (উদাসীন বলেই এফেক্টিভ হয়তো) সঙ্গে এঁকে দেওয়া, অবিশ্বাস্য। 'দ্য উইংক'-এর ছায়া অবলম্বনে লেখা আমার ছোটগল্প 'প্রমীলার প্রতিশোধ' বেরিয়েছে এ বারের চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছেড়ে যাওয়া মেল ট্রেনের গল্পের কামরায়। লিংক নিচে রইল।



July 26, 2018

ডালমুট কিনতে গিয়ে



চাল আটা দুধ দই সর্ষের তেল সার্ফ এক্সেলে টিক মারা হয়ে যাওয়ার পর বললাম, "এবার একটা জেমস, একটা পটেটো চিপস আর ঝাল দেখে একটা ডালমুটের প্যাকেট দিন দেখি।"

দোকানের নতুন ছেলেটি ফ্যালফেলিয়ে রইল। 

"ডালমুট . . . কী জিনিস?"

সামনে আয়না না থাকা সত্ত্বেও ওই মুহূর্তে আমার মুখটা কেমন দেখাচ্ছিল কল্পনা করতে অসুবিধে হয়নি। লিনিয়ার অ্যালজেব্রার ক্লাসে প্রথম যখন ডিটারমিনেন্টস কষতে শিখেছিলাম, এই কোণা ওই কোণা গুণফল থেকে ওই কোণা এই কোণার গুণফল বিয়োগ করার নিয়মটা জেনেছিলাম, এক সহপাঠী হাত তুলে জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন এই পার্টিকুলার প্যাটার্নই হতে হবে, কেন এই কোণা ওই কোণার বদলে ওই কোণা এই কোণা হবে না?

আমার মুখটা সেই মুহূর্তে বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দিদিমণির মুখটার মতো দেখাচ্ছিল। এই প্রশ্নটা যে কেউ করতে পারে এটা যেমন উনি কস্মিনকালেও ভেবে দেখেননি তেমনি "সংজ্ঞাসহ ডালমুটের বৈশিষ্ট্য যাহা জান লিখ", জীবনে চলার পথে এ প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা সত্যি সত্যিই আমার আনসিন ছিল। 

আমতা আমতা করে শুরু করলাম, "ডালমুট . . . ছোটো ছোটো গোল গোল . . . হলদেটে . . ." 

"ওহ, মুগডাল?''

"না না মুগডাল বলিনি . . . '

'আহা মুগডাল মানে যে মুগডাল এই গরমে লাউ দিয়ে রেঁধে খেলে স্বাস্থ্য ভালো হয়, সে মুগডালের কথা যে আপনি বলেননি, বলতে পারেন না, সে আমি বুঝে গেছি। আপনি এই মুগডালের কথা বলছেন তো?' বলে হলদিরামের মুগডালভাজার বেগুনি-বাসন্তী প্যাকেট তুলে থলিতে পোরার উপক্রম করল। 

ভাগ্যিস তক্ষুনি পাশের গুদামঘর থেকে আরেকজন কর্মচারী ডালমুটের প্যাকেট এনে অর্চিষ্মানের হাতে ধরালেন। অকুস্থল ত্যাগ করা বাসনায় তাড়াতাড়ি ব্যাগ হাতড়ে টাকা বার করছি, হাতে ধরা ডালমুটের প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে থাকা অর্চিষ্মানের মুখটা চোখে পড়ল।

***** 

বাড়ি ফিরে, বাজার গুছিয়ে, চা বানিয়ে, ডালমুটের সিংহভাগ বয়ামে ঢুকিয়ে বাকিটুকু প্লেটে নিয়ে এসে টিভির সামনে এসে বসলাম। চায়ে চুমুক দিয়ে একমুঠো ডালমুট মুখে পুরে বললাম, "বাই দ্য ওয়ে, তুমি এতদিন কোন জিনিসটাকে ডালমুট বলে জানতে?"

গরম চায়ে বিষম খেয়ে, কেশেটেশে, সামলে নিয়ে অর্চিষ্মান সেই কথাটা বলল যেটা সপ্তাহের এমাথায় ওমাথায় ও আমাকে বলে থাকে। মুখ দেখে নাকি আমার ঘোড়েলপনার তল পাওয়া যায় না।

বললাম, "আমার ঘোড়েলপনার থেকে এই মুহূর্তে তোমার ডালমুট চেনা না চেনার বিষয়টা ইম্পরট্যান্ট।"  

চানাচুরের ভেতর লম্বা লম্বা কাঠির মতো যে জিনিসগুলো থাকে অর্চিষ্মান নাকি এতদিন ওগুলোকেই নাকি ডালমুট ভাবত।

"হরি হরি, যেগুলোকে আমরা কাঠিভাজা বলি আর এরা গাঠিয়া বলে?" যত হাসি পেয়েছিল তার তিনগুণ হাসলাম এপাশওপাশ গড়াগড়ি খেয়ে।

'তোমার সঙ্গে বাজে রসিকতা করার সময় নেই আমার' ভঙ্গিতে কানে হেডফোন লাগিয়ে অর্চিষ্মান স্ক্রিনের দিকে মুখ ফেরাল। আমি হাসি থামিয়ে বাটিতে লেগে থাকা ডালমুটের গুঁড়ো তর্জনীর ডগা দিয়ে চেপে চেপে মুখে ট্রান্সফার করতে থাকলাম। ডালমুট চেনে না বলে অর্চিষ্মানকে ঠাট্টা করলাম বটে, অজ্ঞানতায় আমি নিজেও কিছু কম যাই না। সয়াবিন যে গোল গোল ছোট ছোট বড়ির আকারে গাছের ডালে ঝুলে থাকে না, ইউনিভার্সিটিতে উঠে এ তথ্য জেনে মাথা তাজ্ঝিমমাজ্ঝিম হয়ে গিয়েছিল। সাবুকে ট্যাপিওকা বলে আবার লালচে ট্যাবাটোবা আলুর মতো দেখতে জিনিসটাকেও ট্যাপিওকা বলে এবং এটা যে জাস্ট কোইনসিডেন্স হতে পারে না, মাথাতেই আসেনি। আমি ভেবেছিলাম সাবুদানা পেঁপে জাতীয় কিছু ফলের বীজটিজ হবে, ফল কাটলে ঝুরঝুর করে বেরিয়ে কাটিং বোর্ড পেরিয়ে দৌড় দেয়। দৌড়ে এমন সব জায়গায় গিয়ে ঘাপটি মারে, ক্যাবিনেটের পেছনে আর দেওয়ালের ফোঁকরে, পাঁচ বছর পর বাড়ি বদলের আগে যে সব জায়গায় হাত পৌঁছনোর চান্স নেই। 

এই সব ভেবেটেবে মনে হল অবান্তরে ভুল জানা নিয়ে পোস্ট লিখলে কেমন হয়। এই ধরণের পোস্ট সম্ভবতঃ আগেও লিখেছি। ন'বছর ব্লগ চালানোর অসুবিধে এটাই, ভাবনার গভীরতা ও বৈচিত্র্য না থাকলে বিষয় রিপিট হতে বাধ্য।

ভুল জানার বদলে ভুল ধরা নিয়েও পোস্ট লেখা যেতে পারে। কারণ দুটো জিনিসের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধরিয়ে না দিলে আমরা যে ভুল জানি তা আমাদের পক্ষে জানা অসম্ভব হত। নিজের ভুল নিজে ধরা, প্রিন্ট আউট না নিয়ে টাইপো খুঁজে বার করার মতোই কঠিন। আমি যেমন চিরদিন কৃচ্ছ্রসাধন কথাটা 'কৃচ্ছসাধন' উচ্চারণ করেছি এবং বানানটাও ওটাই লিখেছি। অথচ ঠিক বানানটা তো আমি বইয়ের পাতায় ছাপার অক্ষরে কবে থেকে দেখছি। বার বার দেখছি। যতদিন না এই অবান্তরেই একজন শুধরে দিলেন, নিজে থেকে নিজের ভুল শুধরোতে পারিনি। এ রকম আরেকটা বানান হল শূন্য। পড়ছি শূন্য, লিখছি শূণ্য। যেদিন ভুলটা ঠিক হল, মনে পড়ল ছাপার অক্ষরে তো এটাই লেখা দেখে এসেছি চিরকাল, এই বানানটাই তো 'নরম্যাল' দেখতে। সেই থেকে 'শূণ্য'র দিকে তাকাতে পারি না, এমন অস্বস্তি। অথচ এতদিন অম্লানবদনে লিখে গেছি। এই ভুলটা কে ধরে দিয়েছিলেন মনে পড়ছে না। কেউ ধরে দিয়েছিলেন তো বটেই, নিজে ধরলে খুবই অদ্ভুত হবে। 

সব ভুল যে ধরিয়ে দিলেই ঠিক করে নিতে পারব তেমন অবশ্য কথা দিতে পারছি না। সেলুন বলে যে কোনও বস্তু ভূভারতে নেই, ওটা যে অশিক্ষিত বাঙালির জিভের অক্ষমতা এটা কিছুদিন হল জেনেছি। কথাটা হবে স্যালোঁ। 

তা বলে আমি কি এখন থেকে রবিবার দুপুরে দরজা খুলে, "বাবা তো বাড়ি নেই, বাবা তো স্যালোঁ গেছেন," বলব? বলব না। বড়জোর সেলুন এড়িয়ে 'চুল কাটার দোকান' পর্যন্ত নামতে পারি, ব্যস। 

রিসেন্টলি জানলাম কথাটা ওয়াকিবহাল নয়, ওয়াকিফ্‌হাল। ওয়াকিবহাল লিখি না লিখি, ওয়াকিফ্‌হাল যে চট করে লিখছি না, গ্যারান্টি। ওয়াকিবহাল লিখলে সবাই বুঝবে কী বলতে চেয়েছি, কেউ কেউ পেছনে হাসবে। অসুবিধে নেই। সামনে হাসলে একটু অসুবিধে হবে, কিন্তু কী আর করা, চুপ করে থাকব। এদিকে ওয়াকিফ্‌হাল লিখলে কেউ কেউ পিঠ চাপড়াতে আসতে পারেন। "আমি ছাড়াও এই শব্দটা কেউ ঠিক জানে দেখে মানবসভ্যতার প্রতি বিশ্বাস ফিরে এল।" আমিও হয়তো উত্তেজিত হয়ে, "যা বলেছেন" কিংবা "একমত" গোছের রিপ্লাই দিয়ে বসলাম। তার থেকে অবগত-টবগত দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া নিরাপদ। 

গ্রীষ্মবর্ষার মতো ভুল ধরাধরির সিজন থাকে। কোনও একটা সাম্প্রদায়িক গোলমাল বাধলে সবাই মনুস্মৃতি আর কোরান খুলে বসে কোটেশন তুলে তুলে ভুল ধরতে নামে। ‘বেন হুর’ সিনেমাটা রিলিজ করার সময় একধাক্কায় অনেকের ভুল ঠিক হয়ে ‘বেন হার’ হয়ে গিয়েছিল। 'ডেঙ্গু' সিজন এলে যেমন জানা যায় ওটা 'ডেঙ্গি' হবে। 'ব্রাজিল' যে 'ব্রেজিল' আর 'আর্জেন্টিনা' যে 'আর্খেন্তিনা', গত একমাস ধরে এই ভুলদুটো সবাই সবাইকে খুব ধরাচ্ছে দেখলাম।

কেউ ভুল ধরলে রাগ হয়, কিন্তু হওয়া উচিত নয়। কারণ ভুল ধরিয়ে দেওয়ার ব্যামোটা একটা ব্যামোই। বা নিজেদের ঠিক জানাটা না জানিয়ে থাকতে না পারার। এই জানানোর বেগ যখন আসে, যাঁদের আসে তাঁরা জানেন, সংবরণ করা অসাধ্য। আমি নিজে এ ব্যামোতে ভুগেছি। আমার দোষ নয়, হেরিডিটির দোষ। আমাদের বাড়িতে কেউ কখনও পুরুতমশাই মন্ত্র বলার পর মন্ত্র বলে না। পুরুতমশাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি করতে থাকে। 'আমাদের যে পুরুতমশাইয়ের শুনে শুনে মন্ত্র বলার দরকার নেই,  আমরা যে মন্ত্রগুলো অলরেডি জানি,’ এইটা না প্রমাণ করতে পারলে কী হবে দেখার সুযোগ আমার হয়নি, মারাত্মক কিছু হবে যে সন্দেহ নেই। তার ওপর গোটা ব্যাপারটাই হয় চেঁচিয়ে। কারণ 'আমরা ঠিক উচ্চারণে মন্ত্রোচ্চারণ করতে পারি, নিচুস্বরে তালেগোলে ভুল উচ্চারণে সমোসকৃত সারি না,' সেটা বোঝানোরও মহাদায় আছে। বসন্তপঞ্চমীর পুণ্য প্রভাতে আমাদের ঠাকুরঘর থেকে হেঁড়েমিহি গলায় যখন 'জয় জয় দেবি চরাচরসারে' কোরাস ভেসে আসে সে একটা শোনার মতো ব্যাপার হয়।

ঠাকুমা বলতেন, 'বংশের ধারা বাইগুন চারা।' আমার স্বভাবেও সে বেগুনচারা লকলক করে বাড়ছিল। বছরকয়েক আগে একটি দুর্ঘটনায় সে বৃদ্ধি প্রতিহত হয়েছে। আড্ডায় বসে পনেরো মিনিট ধরে একজন পি এইচ ডি-রত বাঙালি ছাত্রের মুখে 'মদ্য' শুনতে শুনতে আমি বলে ফেলেছিলাম, "কথাটা মদ্য নয়, মদ্যপ।" বলামাত্র ঘর জুড়ে, “এইও কুন্তলার সামনে কেউ ভুল বাংলা বলতে পারবে না, কারণ কুন্তলা বাংলা নিয়ে সেনসিটিভ,” ইত্যাদি ঠাট্টার হররা উঠেছিল।

ওই ঘটনাটা আমার ভুল ধরানোর কেরিয়ারে একটা জলবিভাজিকা। সেই থেকে আমি চেষ্টা করি মায়ের ছাড়া আর কারও ভুল না ধরতে। অর্চিষ্মানের ভুল মাঝে মাঝে ধরে ফেলি (ডালমুটের কেসটাই যেমন) কিন্তু আমি সচেতন, ক্রমাগত ছিদ্রান্বেষিত হতে হতে তেতে গিয়ে ও যদি কোনওদিন "তবে রে," বলে আমার ভুল ধরাতে শুরু করে তা হলে আমাদের এই দু'কামরার ভাড়াবাড়ি আর বাসযোগ্য থাকবে না। 

অন্যের ভুল না ধরার চেষ্টায় সফল হয়েছি বলব না কারণ মুখে থামালেও মাথার মধ্যে ভুল ধরা এখনও চলেছে। তবে সে ভুল ধরা নিতান্ত নির্বিষ। আপনি মদ্য বলুন বা ওয়াকিফ্‌হাল, ওতে যে কিছু এসে যায় না সে আমি রন্ধ্রে রন্ধ্রে জানি। সবাই জানে। কেউ কেউ ব্যতিক্রম থাকেন। একজন দাবি করেছিলেন, এনিওয়ের বদলে এনিওয়েজ বলে এমন কোনও লোকের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, বাস্তবে বা সোশ্যাল মিডিয়ায়, তিনি অ্যাকসেপ্ট করেন না। তালেগোলে অ্যাকসেপ্টেড হয়ে গেলে ভুল চোখে পড়ামাত্র ক্যান্সেল করেন। তবে ইনি ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ লোকই আমার মতো। 'ব্রেজিলের বদলে ব্রাজিল বলে অতএব ওর হলুদসবুজ জার্সি কেড়ে নিয়ে কানচাপাটি মেরে পাঁচবছর ফুটবল খেলা দেখা নিষিদ্ধ করে দাও,' এই রকম দাবি বেশিরভাগ লোকেই করবেন না। গত মাস জুড়ে যারা ভুল ঠিক করার সামাজিক কর্তব্য সারছিলেন, তাঁরাও না।

*****

পোস্টটা লিখতে লিখতে মনে হল, যেটুকু ডালমুট শিশির তলায় বাকি আছে সেটুকুর জন্য এই নিয়মটা চালু করলে কেমন হয়? গতসপ্তাহের আগে ডালমুট চিনত না তারা ওই ডালমুট ছুঁতে পারবে না। যারা জানত, বয়ামের ডালমুটে খালি তাদেরই অধিকার। আপনাদের মতামত জানাবেন দয়া করে।




 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.