September 26, 2016

রানী (১/২)




মূল গল্প: The Queen of the Mystery
লেখক: Ann Cleeves

*****

হাতির দাঁতের হাতলটা বাহারি। সামান্য ঢেউ খেলানো দেহে খাঁজ কাটা, যাতে মুঠোর ভাঁজে নিখুঁত ফিট করে আর গ্রিপও শক্ত হয়। বাঁটের সঙ্গে ফলার সংযোগস্থলে দুদিকে দুটো সোনালি ডানার মতো বেরিয়ে আছে। ডানার ওপাশে চকচকে স্টিলের ফলা, প্রায় ছ’ইঞ্চি লম্বা। ডগা থেকে দু’ফোঁটা রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। যতবার ওদিকে চোখ পড়ে শিল্পীর মাত্রাবোধের প্রশংসা করি।

জানালার পাশে, এখন যেখানে আমি বেতের দোলনা চেয়ারে বসে ইউক্যালিপটাসের হাওয়া খাচ্ছি, সেখান থেকে অবশ্য রক্ত দেখা যাচ্ছে না। পুরু হ্যান্ডমেড কাগজের চিঠিটা আধখোলা হয়ে পড়ে আছে টেবিলের ওপর। ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে শুধু আইভরি রঙের বাঁটের একটা কোণা। বাঁটের মাথায় সোনালি ডানা, স্টিলের ব্লেড, রক্ত, সব আমি স্মৃতি থেকে বললাম। রক্তের ফোঁটার দু'ইঞ্চি নিচ থেকে যে বয়ানটা শুরু হয়েছে সেটারও দুয়েকটা শব্দ এদিকওদিক করে আমি পুরোটা বলে দিতে পারি। কারণ এই চিঠিটা আমি এর আগেও অগুনতিবার পেয়েছি।

সুধী,

নিখিল বঙ্গ রহস্যরোমাঞ্চ সমিতির পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই। আমাদের বহুপ্রতীক্ষিত বাৎসরিক ব্যোমকেশ সম্মান প্রদানের ঋতু আসন্ন। সপ্তবিংশতিতম ব্যোমকেশ সম্মানসন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে আগামী এতই ডিসেম্বর, অমুক হোটেলের ব্যাংকোয়েট হলে।

আমরা অত্যন্ত গর্ব ও প্রীতির সঙ্গে জানাচ্ছি যে পাঠকের বিচারে আপনার রচিত অমুক উপন্যাসটি এ বছরের সেরা রহস্য উপন্যাস বিভাগে মনোনীত হয়েছে।

এ বছরের সভা সাফল্যমণ্ডিত করতে আপনার উপস্থিতি ওঁ অংশগ্রহণ কামনা করি। বিস্তারিত কর্মসূচি এই চিঠির সঙ্গে . . . ইত্যাদি।

বয়ানের নিচে ‘মুখ্য কার্যনির্বাহক, নিখিল বঙ্গ রহস্যরোমাঞ্চ সমিতি' টাইপের ওপর প্যাঁচালো সই। সই করার সময় যে পরিমাণ রাগ কার্যনির্বাহকের হয়েছে তার তিলমাত্রও বোঝার উপায় নেই। আমার অটোগ্রাফ দেখেই কি লোকে বুঝতে পারে সেই মুহূর্তে আমি কত বিরক্ত, চিন্তিত, অন্যমনস্ক, প্রতিশোধস্পৃহায় জর্জরিত?

কেয়া চেষ্টা করেছিল যাতে আমি না যাই। নমিনেশনের লিস্ট বেরোনোর পর ফোন করেছিল।

অনুদি, তুমি এবার না আসতে চাইলে উই কমপ্লিটলি আন্ডারস্ট্যান্ড। আমরা তোমাকে খুব মিস করব, বাট উই উইল আন্ডারস্ট্যান্ড।

জানি রে। আমি বলেছিলাম। কিন্তু গেলে হয়তো আমারই ভালো লাগবে। একটা চেঞ্জ অফ প্লেস। একলা বাড়িতে সারাক্ষণ . . .

ইন দ্যাট কেস, তুমি সিক্সটিনথ না এসে সেভেন্টিনথ আসতে পার। সিক্সটিনথে তো জাস্ট ডিনার ছাড়া আর কিছু নেই।

দেখি, বলে প্রসঙ্গ বদলেছিলাম। সিক্সটিনথের ডিনারটা যে শুধু ডিনার নয় সেটা আমিও জানি, কেয়াও জানে। এটাও জানে যে বাংলাভাষার যে কোনও পেশাদার রহস্যরোমাঞ্চ লেখকের কাছে গোটা ইভেন্টটার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ওটাই। লেখক, প্রকাশক, সম্পাদক, ফিল্মপ্রযোজক, সাংবাদিক, সমালোচক, টিভি, রেডিও . . . সবাই থাকবে ওখানে। সাধারণ পাঠক ছাড়া। যারা বইগুলো পয়সা দিয়ে কিনে পড়েছে। আমরা প্রেসের লোক, আমরা প্রযোজকের অফিস থেকে বলছি এইসব বলে ফ্রি কপি আদায় করেনি।

অথচ গোটা ব্যাপারটাতে পাঠকদের ভূমিকাটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। আমার মতো পুরোনোদের মতে ব্যোমকেশের একমাত্র বিশ্বাসযোগ্যতা এখন এটাই যে গোটা ব্যাপারটা পাঠকের ভোটে হয়। এই কেয়া আর কেয়ার চ্যালাচামুণ্ডার সেটা পছন্দ নয়। কী না, সাধারণ পাঠকের ভোট আনএডুকেটেড, আনইনফর্মড। চেষ্টারটন মুখস্থ না থাকলে নাকি রহস্যগল্পের রসোদ্ধার করা যায় না। শেওড়াফুলির মেয়ের এত এলিটিজম আসে কোত্থেকে কে জানে। আমার আগে মনে হত এসব খাটুনি কমানোর ফন্দি। পুজোর সময় খবরের কাগজে, ম্যাগাজিনে, টিভিতে, রেডিওতে নমিনেশনের লিস্ট বার কর, আজকাল ওয়েবসাইটও খুলেছে, সে সব সামলাও। বছর বছর ক্যাটেগরি বাড়ানোর বেলা তো উৎসাহের অভাব নেই, উপন্যাস, ছোটগল্প, ট্রু ক্রাইম, তদন্তমূলক, ধারাবাহিক, নন-ফিকশন। তার প্রতিটি বিভাগে লাখে লাখে ভোট আসবে। শহর, গ্রাম, সারা ভারত, সারা বিশ্ব থেকে। সে সব ঝাড়োবাছো। তার থেকে পাঁচ বিশেষজ্ঞের কমিটি বসিয়ে দিলে ঝামেলা অনেক কম। তাঁরা পাঁচটা করে বই বেছে তার মধ্যে একটাকে প্রাইজ দিয়ে দেবেন। এখন সন্দেহ হয় এসব তুলে দেওয়ার পেছনে আরও একটা একটা কুমতলব থাকতে পারে। ইদানীং গোয়েন্দাগল্প নিয়ে সিনেমা বানানোর একটা ঝোঁক এসেছে। হয়তো প্রোডাকশন হাউসের সঙ্গে আঁতাত আছে। যে গল্পটা প্রোডিউসারের পছন্দ সেটাকে প্রাইজ দিতে পারলে হয়তো সিনেমার বিজ্ঞাপনে সুবিধে হবে।

ষোলোর ডিনারে এই সব হবে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবি তোলা হবে। সে ছবি কাগজে, ম্যাগাজিনে, টিভিতে, পাঠকরা দেখবে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা তাঁদের বাড়ির লোককে সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। আমার সঙ্গে আলাপ করাবেন। আমি হাসব, কথা বলব, সই দেব। আগের বছর পরিচয় হয়ে থাকলে সে কথা মনে করাতে পারলে আর কথাই নেই। যাঁদের সঙ্গে এটা করব তাঁদের অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ ওই তিন মিনিটের মনোযোগের বদলে পরের বছর  আমাকে ভোট দেবে। 

ঘর কাঁপিয়ে হাসত রঞ্জন। 

একবছর আগে তুমি কাকে দেখে হেসেছিলে সে কথা মনে রেখে লোকে তোমাকে ভোট দেবে? লোকে ভোট দেবে তোমার বই পড়ে। এমন প্লট ফাঁদবে, শেষপাতায় এমন টুইস্ট দেবে যে লোকে তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভোট দিতেই পারবে না।

বাইরে থেকে দেখলে সে রকমটাই মনে হয় বটে। যে লেখকদের বাজার শুধুমাত্র লেখা দিয়েই নির্ধারিত হয়। যে লোকগুলো এ কথা বিশ্বাস করে তাদের জিজ্ঞাসা করুন যে আপনাদের লাইনে, চাকরিতে, ব্যবসায়, কী দিয়ে ভালোমন্দ ঠিক হয়, বেশিরভাগই লাফিয়ে উঠে বলবে মামাকাকা দিয়ে, ধরাকরা দিয়ে, যৌবনের ছলাকলা দিয়ে। ওয়েল, লেখার লাইনটাও আর পাঁচটা লাইনের মতোই। ভালো হওয়ার সুবিধে একেবারে নেই বলব না, কিন্তু শুধু ভালো দিয়ে হয় না, আরও নানারকম কায়দাকানুন লাগে। 

আমার তো এখন মনে হয় লেখালিখির সঙ্গে অন্য পেশার তফাৎ শুধু পরিশ্রমের সঙ্গে পারিশ্রমিকের অনুপাতে। নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে সেটা পেট চালানোর মতো নয়। এমনকি নেগেটিভও হতে পারে। গোড়ার দিকে আমার যেটা ছিল। রাত জেগে গল্প লিখে কলকাতার নামি কাগজে পাঠাতাম। কম কথায় আমি তখনও সারতে পারতাম না। এই মোটা মোটা পাণ্ডুলিপি হত। বিস্তর পোস্টেজ। ফেরৎ আসত। বসে বসে সারাতাম। সারাতে গিয়ে পাণ্ডুলিপি আগের থেকে মোটা হয়ে যেত। আবার খামে পুরে স্ট্যাম্প মেরে পাঠাও। সব রঞ্জনের টাকায়। একবার ভেবেছিলাম নিজে রোজগার করব। ওদের কোঅপারেটিভের একটা স্কুল ছিল, এখনও আছে, বাগানের কম্পাউন্ডেই। সেখানে পড়ালে অন্তত পোস্টের খরচাটা উঠে আসবে। আমার ঝুলোঝুলিতে রঞ্জনই ওঁদের বলেছিল। নাম কা ওয়াস্তে ইন্টারভিউ দিয়ে আমি স্কুলে জয়েন করি। 

মাস্টার্সে জিওগ্রাফি ছিল, ক্লাস এইটে পড়াতে দিয়েছিল। সাতদিন গিয়েছিলাম। ক্লাসে দাঁড়িয়ে পর্বতের রকমফের বোঝাতাম, আর মাথার ভেতর ঘুরত পাহাড়ের ওপর কুয়াশা ঘেরা বাংলো। বাংলোর ভেতর ফার্নেস, ফার্নেসের সামনে কার্পেটের ওপর হাত পা চিতিয়ে পড়ে আছে একটি সুন্দরী সদ্য কৈশোর পেরোনো দেহ, প্রাণহীন। হ্যাঁ হ্যাঁ, আগাথা ক্রিস্টির একটা গল্পের শুরু অবিকল এই রকম। আমি নিজের গল্প বলছি না, উদাহরণ দিচ্ছি। 

আমার মুখ দেখে রঞ্জনই বলেছিল, যথেষ্ট হয়েছে। আমি বলে দেব, তোমাদের বোকা ছাত্র পড়িয়ে আমার বউয়ের মাথাব্যথা হয়েছে। আর আসতে পারবে না। গ্লানিতে মরে ছিলাম কয়েকদিন। নিজেকে অপদার্থ মনে হচ্ছিল। আমাকে চাঙ্গা করতে তখনই রঞ্জন গ্যারাজের ওপরের ঘরটা সারাতে শুরু করে। পুবের দেওয়াল কেটে ডবল জানালা, জানালার পাশে মেহগনি কাঠের চওড়া টেবিল, গদি আঁটা চওড়া চেয়ার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে লিখলেও পিঠ ব্যথা করবে না। টেবিলের ওপর ফুলদানিতে সাজানো সুষমার রোজ যত্ন করে সাজানো রডোডেনড্রনের ছটা থেকে চোখ তুললেই দেখা যাবে পাহাড়ের আবছা এবড়োখেবড়ো চুড়ো।

ওই জানালার বাইরে একদিন আমি মধুমাধবী মুখোপাধ্যায়কে প্রথম দেখি। অলৌকিকে বিশ্বাস আমার নেই, কিন্তু যা সত্যি তাকে অগ্রাহ্য করি কী করে। বসে বসে পেন কামড়াচ্ছি, কোনও আইডিয়া আসছে না, যা লিখছি ফেরত আসছে, সত্যি বলতে কি লেখাগুলো আমারও যে খুব মনের মতো হচ্ছে তা নয়। চেয়ারের গদিতে পিঠ ঠেকে গেলেই গ্লানি চড়চড়িয়ে বাড়ছে, আমার জন্য এত খরচ অথচ . . .  যখন ভাবছি সব তাকে তুলে এবার সুষমার কাছে রান্নাবান্না শিখে সংসারে মন দিই, এমন সময় একদিন রডোডেনড্রনের ঝাড় থেকে মুখ তুলে দেখলাম জানালার বাইরে ইউক্যালিপটাসের ছায়ায় মধুমাধবী মুখোপাধ্যায় দাঁড়িয়ে আছে। সোজা আমার দিকে তাকিয়ে। রক্তমাংসের মানুষের থেকেও স্পষ্ট। পরের আট মাস ওই টেবিলে আমার পাশে মধুমাধবী বসে রইল। আমি লিখলাম ‘বিষের নদী’। পাঠিয়ে দিলাম। চিঠি এল। মনোনীত। তারপরের আট মাস ধরে বাংলাভাষার সবথেকে জনপ্রিয় দৈনিকের রবিবারের পাতায় ধারাবাহিক বেরোলো ‘বিষের নদী’। 

মাত্র দেড়খানা বছর। তার ওপারে আমি বাবার পয়সায় উচ্চশিক্ষিত হয়ে বরের পয়সায় বসে খেয়ে নারীবাদের মুখে চুনকালির গ্লানিতে সিঁটিয়ে থাকা বড়লোকের আদুরে অপদার্থ বউ। আর এপারে বাংলা সাহিত্যের উদীয়মান নক্ষত্র। রয়্যালটির টাকা। বেস্টসেলার। সংবর্ধনা। ফ্যান মেল। অটোগ্রাফ। পরের বছর। নতুন বই। বেস্ট সেলার। সংবর্ধনা। ফ্যান মেল। অটোগ্রাফ। তার পরের বছর। নতুন বই। রিপিট। উদীয়মান খসে গেল। বাংলা সাহিত্যের আকাশে আমি নক্ষত্র হয়ে টিমটিম জ্বলতে লাগলাম। গত তিরিশ বছর ধরে জ্বলছি। 

ইন্টারভিউ নিতে আসা চশমা পরা চোখা ছেলেরা অবশ্য সবসময় 'রহস্য' শব্দটা গুঁজে দেয়। বাংলা ‘রহস্য’ সাহিত্যের নক্ষত্র। আমার কিছু মনে হয় না। বাংলা 'রহস্য' সাহিত্যের সবথেকে বেশি বিক্রি হওয়া লেখকও আমি। সেটার কথা অবশ্য ভুলেও মনে করাই না। ওরা সরস্বতীর পূজারী, তাহলে ঘৃণায় আমার দিকে তাকাতেও পারবে না। আমি নিজেকে সুগৃহিণী হিসেবে প্রোজেক্ট করি। সুষমার রাঁধা খাবারদাবার নিজে হাতে বেড়ে খাওয়াই। সুদৃশ্য ছাঁকনি দিয়ে রঞ্জনদের বাড়ির দেড়শো বছরের পুরোনো চায়ের সেটে সুষমার বানানো চা ঢেলে দিই। নিজে হাতে বাগান দেখাই, তকতকে করে গুছিয়ে রাখা গেস্টরুমে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জলের বোতল, তোয়ালে গুছিয়ে দিই। পনেরো দিন বাদে মেলে ম্যাগাজিন আসে, ছ'পাতার ফিচার ‘রহস্যের রানী’। অনেক প্রশংসার মধ্যে ঘরোয়া আর ডাউন টু আর্থ শব্দগুলোই বার বার ফিরে ফিরে আসে। আমি জানি ওই ছেলে সারাজীবনের মতো আমার পাঠক হয়ে গেছে, প্রত্যেক বছর ওই একটা ভোট আমার বাঁধা। 

প্রথম রয়্যালটির চেকটা হাতে নিয়ে আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। হাতে নিয়ে ভূতের মতো বসে ছিলাম। রঞ্জন একাই দু’জনের সমান উল্লাস করে বেড়াচ্ছিল। বলছিল, আহা অত স্তম্ভিত হওয়ার কী আছে, এ তো হওয়ারই ছিল। সেলিব্রেট করতে সেই বিকেলেই পাঁচ কিলোমিটার দূরের গেঁয়ো বাজারে গিয়েছিলাম আমরা। রয়্যালটির পয়সায় দু’জনে কফি আর স্যান্ডউইচ। 

সত্যি বলব? সেই বিস্ময় আমার এখনও কাটেনি। অন্যান্য চাকরির সঙ্গে লেখার চাকরির এটা আরেকটা তফাৎ। আপনার কি প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে মনে হয়, চাকরিটা আসলে একটা স্বপ্ন? আজকেই অফিসে পৌঁছে আবিষ্কার করবেন যে অফিসটফিস আসলে ছিল না কোনওদিন কোথাও, গোটাটাই আপনার কল্পনা? আমার হয়। তিরিশ বছর আগে টেনশন হত ছাপবে না, এখন সন্দেহ হয় বেস্টসেলার হবে না। আমার বদলে অন্য কারও গল্প নিয়ে সিনেমা বানিয়ে ফেলবে টালিগঞ্জের ঝকঝকে পরিচালক। আতংকটা আলাদা, কিন্তু তীব্রতা একইরকম। যতক্ষণ পারা যায় ভুলে থাকার চেষ্টা। কিন্তু মনে পড়বেই। তখন চারপাশটা স্লো মোশন হয়ে যাবে। হৃদপিণ্ডের চিৎকারটা ক্রমশ বাড়তে বাড়তে বাকি সব শব্দ ডুবিয়ে দেবে। বুকের ভেতর একটা টর্নেডো ক্রমশ প্রকাণ্ড হয়ে উঠবে, মনে হবে তার টানে আমার আমার সারা শরীরটা গুঁড়ো হয়ে ভুস করে মিলিয়ে যাবে এক্ষুনি।

*****

গাড়ির কাচ নামিয়ে দিলাম। মৌরির কৌটোটা নিয়ে বেরোতে ভুলে গেছি। কষ্টের সময় মুখে মৌরি দিলে আরাম হয়। আর মিনিট দশেক এগিয়ে একটা বাজার আছে। ওখানে এমনিও দাঁড়াতে হবে। অসুবিধে নেই। গাড়ি বার করতে বলেছিলাম হাতে অনেক সময় নিয়েই। তাড়াহুড়ো আর পোষায় না। বাগডোগরার কালো মসৃণ রাস্তা, বর্ষায় ভিজে চকচকে হয়ে রয়েছে। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি হু হু করে ছুটছে।

বাজারের বাইরে গাড়িটাকে পার্ক করিয়ে ড্রাইভারকে মৌরি আর দু’চারটে টুকিটাকি আনতে পাঠালাম। এখানে একসময় স্রেফ জঙ্গল ছিল। আর একটা কাঁচা রাস্তার চৌমাথা। শনিবার শনিবার দু’চারজন ঝাঁকায় করে মালপত্র নিয়ে এসে বসত। তারপর রাস্তা পাকা হল। ঝাঁকা ঠেলাগাড়ি হল। একটা, দুটো, দশটা। এখন ঠেলা ঝাঁকা দুটোই প্রায় অদৃশ্য। পাকা বাড়ির দোকান ছাড়া প্রায় নেইই। একটা মুদির দোকান, একটা জেনারেল স্টোর, একটা সেলুন আর একটা ফার্মেসি। সাদা সাইনবোর্ডে লাল অক্ষর দিয়ে বড় বড় করে লেখা, জয়গুরু ফার্মেসি। 

ফার্মেসির দরজা ঠেলে একটা ছেলে বেরিয়ে এল। ছেলে না, এখন লোক। ওর নাম বিমল। ওর বউয়ের নাম সুমনা। ওর ছেলের নাম শুভজিৎ। জানালা দিয়ে হাত বার করে নাড়লাম। বিমল হাসতে হাসতে এগিয়ে এল। 

চললেন, দিদি? অল দ্য বেস্ট। এবারও আপনিই পাচ্ছেন। কেউ আটকাতে পারবে না। আমাদের লট চলে গেছে। 

হাসলাম। ওর বাড়ির লোকের খবর নিলাম। সুমনা? শুভজিৎ? বিমলের মুখের হাসি চওড়া হল। খুব ভালো আছে দিদি, মহা দুষ্টু হয়েছে। একদম পড়াশোনা করতে চায় না। 

বিমলকে আমি চিনি প্রায় পঁচিশ বছর। এই বাজারের ভেতরেই একটা লাইব্রেরির দোতলায় স্থানীয় সাহিত্য সমিতির তরফ থেকে আমাকে একবার সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সাহিত্যিকরা সকলেই প্রবীণ পুরুষ, সকলেই প্রাবন্ধিক কিংবা কবি। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই প্রবীণ সভাপতি আমাকে জানিয়েছিলেন সাধারণত সংবর্ধনা দেওয়ার সময় নন-ফিকশন কিংবা কবিদেরই বিবেচনা করা হয়। আমি ব্যতিক্রম। এঁরা কেউই আমার লেখা পড়েননি। এঁদের বাড়ির মহিলারা পড়েছেন এবং স্বামীদের বুঝিয়েছেন যে আমি বাৎসরিক সংবর্ধনা পাওয়ার যোগ্য। তাছাড়া আমি উত্তরবঙ্গের লেখক হয়ে কলকাতা জয় করেছি সেটাও সিদ্ধান্ত সহজ করেছিল। ঘোষক ক্রমাগত আমাকে ‘দেবী’ বলে সম্ভাষণ করেছিলেন। বাঙালি ঘরের দৈনন্দিন টানাপোড়েন নিয়ে শ্রীমতী অনসূয়া দেবী জটিল রহস্যের অবতারণা করে. . . ইত্যাদি ইত্যাদি। সংবর্ধনা শেষে আমরা যখন মালা মিষ্টির প্যাকেট গাড়িতে তুলছি, তখন বিমল এসেছিল। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে রোগা রোগা হাফপ্যান্ট পরা পা,  সদ্য গোঁফের রেখা। অটোগ্রাফের খাতা আর পেন এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, আপনার লেখা আমার খুব ভালো লাগে। 

সেই বিমলের এখন বউ ছেলে নিয়ে ভরা সংসার। সেই বিমল এখন স্থানীয় মিস্ট্রি ক্লাবের হোতা। প্রতি বছর পুজোর মুখে আমার নতুন উপন্যাস বেরোলে বিমল সে বইয়ের ‘লঞ্চ’ আয়োজন করে, ‘লেখিকার সঙ্গে মুখোমুখি’ আলোচনাসভার আয়োজন করে। আমি সেখানে গিয়ে পাঠকদের প্রশ্নের উত্তর দিই। বই সই করি। প্রতি বছর ব্যোমকেশের আগে বিমল আর বিমলের সাঙ্গোপাঙ্গরা সমিতির ফান্ড থেকে আমার বই কিনে বিলোয়, ভোট জোগাড়ের জন্য বাড়ি বাড়ি ঘোরে। 

আমি শুধু প্রত্যেকবার এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ওর দোকানের সামনে থামি। ওর ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করি। ওর বউয়ের কথা, মায়ের সায়াটিকার ব্যথার কথা।

গাড়ি ছেড়ে দিল। বিমল গাড়ির সঙ্গে দৌড়ে এল দুয়েক পা। তারপর থেমে হাত নাড়তে লাগল। আমিও হাত নাড়লাম। ওর দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকলাম যতক্ষণ না গাড়ি বাঁক নেয়। 

*****

অনুদিইইইই! 

পৃথিবীর কোনও কোনও লোককে দেখলে আমার নিজের কল্পনাকে বাস্তব রূপ পেতে দেখতে ইচ্ছে করে। কেয়া মুন্সী তাদের মধ্যে একজন। মৃতদেহের বর্ণনা দিতে গিয়ে আমি প্রায়ই কেয়ার চেহারা কল্পনা করি। গুলি খেয়ে কেয়া পড়ে আছে, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। ফ্যান থেকে কেয়া ঝুলছে, ঠোঁট থেকে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে। অথচ কেয়ার ওপর আমার এত রাগের কোনও কারণ নেই। হ্যাঁ, ও আমার বইয়ের নিন্দে করে। অফ কোর্স, আমার বইয়ের নয়। আমার বইয়ের উন্মুক্ত নিন্দে করার জায়গা এখন আর কোনও সমালোচকের নেই। কেয়া মুন্সীরও না। কিন্তু যখনই অন্য কোনও বইয়ের সমালোচনায় আমার ওপর রাগটা ফুটে বেরোয়। নিন্দে করতে গিয়ে লেখে, “কোজি, সংকীর্ণ প্রেক্ষাপটে রহস্য গল্প ফাঁদার যে ক্ষতিকারক প্রবণতা আমাদের বাংলা সাহিত্যে আছে”. . . প্রশংসা করতে গিয়ে লেখে, “সস্তা জনপ্রিয়তার লোভ কাটিয়ে যারা এখনও ঘরোয়া প্রেক্ষাপট থেকে বেরোতে পারেন না”… চাইলে আমি ব্যাপারটা বন্ধ করতে পারি। কিন্তু তাহলে খোলাখুলি যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যেটা আমার মতে বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

অনুদিইইইইইই…

কড়া এসির হাওয়া ফুঁড়ে কেয়ার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর আবার কানে এসে বিঁধল। আমার ডাকনাম কিন্তু অনু নয়। আমার মা বাবা কাকা পিসে বন্ধুবান্ধব কেউ কোনওদিন আমাকে অনু বলে ডাকেনি। রঞ্জনও প্রকাশ্যে আমার পুরো নাম ধরে ডাকত, আড়ালে আমার সত্যি ডাকনাম ধরে। কেয়া প্রথমদিন থেকেই অনুদি, প্রথম দিন থেকেই তূমি। 

ছদ্ম উত্তেজনায় আধা দৌড়ে আধা হেঁটে আয়নার মতো চকচকে কাঠের মেঝের ওপর দিয়ে হিলের খুরখুর তুলে কেয়া এগিয়ে এল। একটা টাইট হাঁটু পর্যন্ত জামা পরেছে। মিনিমাম পঁয়তাল্লিশ তো হবেই, ফিগারটা মেন্টেন করেছে ভালো। ওর পেছনে ধূমকেতুর লেজের মতো একটা ভিড়। বেশিরভাগই চেনা মুখ। অবন্তিকা সান্যাল। মৌসুমী পাল। মৌসুমীর প্রদ্যুৎ সিরিজটা আমার খারাপ লাগে না। ভিড়ের এক হাত ওপরে ভাসছে সৌরীশ সেনগুপ্তের টাক। আড়ালে লোকে বলে ও হচ্ছে বাংলা রহস্য সাহিত্যে জেন্ডার ইকুয়ালিটির টোকেন। ঐতিহাসিক ঘরানায় লেখে। গত বছর ওর গৌড়ের ওপর বেস করা উপন্যাসটা অ্যাকচুয়ালি বেশ জমাটি। এ বছর নমিনেশন আছে। 

সৌজন্যবিনিময়, আলিঙ্গন আর একে অপরের বইকে ভালো বলার পর উচ্ছ্বাস মিইয়ে এল। কেয়ার নেতৃত্বে লেখকদের ভিড় সরে গেল অন্যদিকে। রয়ে গেলেন কিছু আয়োজক। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ লেখালিখিও করেন। একজন রিটায়ারমেন্টের পর সাহিত্য ধরেছেন। গোয়েন্দাগল্প লিখছেন। আগের বছর আমাকে ওঁর প্রথম তিনটে চ্যাপ্টার পড়তে দিয়েছিলেন। গোয়েন্দার নাম মধুসূদন মাইতি। আমি দশপাতা পড়ার চেষ্টা করে ছাড়ান দিয়েছি। বলেছি, চমৎকার বাঁধুনি। তিনি জানালেন তাঁর খসড়া কমপ্লিট, এবার যদি আমি আমার প্রকাশককে . . . আমি বললাম, নিশ্চয়। তারপর তাঁর নাতির কথা জিজ্ঞাসা করলাম। প্রত্যাশামতোই, পাণ্ডুলিপি প্রকাশক উবে গেল। টানা পাঁচমিনিট রুদ্ধশ্বাস নাতিভজনার পর আমি আস্তে করে বললাম যে এবার ঘরে যাব। সকলেই বুঝদার। নিশ্চয় নিশ্চয়, এই বয়সে এতখানি জার্নি। 

প্রকাণ্ড লবির দেওয়াল ঘেঁষে সিলিং ছোঁয়া পাম গাছের বর্ডার। ইতিউতি নরম সোফাসেটি, বাহারি ঝরনা। ঠাণ্ডা সুবাসিত হাওয়ায় হালকা সন্তুরের আওয়াজ। কথোপকথনে বাধা সৃষ্টি করবে না, কিন্তু ফাঁক পড়লে সে ফাঁক ভরাট করবে। রিসেপশনের উডওয়ার্কের আড়াল থেকে নরম হলুদ আলো ছিটকোচ্ছে। ওপাশে দাঁড়ানো সারি সারি নিখুঁত মুখ। কাছে না এগিয়ে গেলে, ফুলের মতো দাঁতের হাসি দেখতে না পেলে, মিষ্টি গলার কথা শুনতে না পেলে চারপাশের সজ্জা থেকে এদের আলাদা করা অসম্ভব। 

চাবি নিয়ে পেছন ফিরতে যাব, মেয়েটি নরম গলায় ডাকল, “ম্যাম?” ফিরে দেখি ডেস্কের আড়াল থেকে মেয়েটার হাতে উঠে এসেছে মধুমাধবী সিরিজের তেইশ নম্বর উপন্যাস। মুখে এটিকেট ভঙ্গ করে ফেলার অপরাধী হাসি। এরা ভাবে অটোগ্রাফ চেয়ে এরা আমাদের বিব্রত করে। নাম জিজ্ঞাসা করলাম। মিহি গলায় মেয়েটা বলল, শ্রুতিস্মৃতা। ইদানীং ভয় হয়, কোনদিন না অটোগ্রাফ দেওয়ার আগে নামের বানান জিজ্ঞাসা করতে হয়। শ্রুতিস্মৃতাকে শুভেচ্ছা আর ভালোবাসার সঙ্গে নিজের নাম সই করে পেছন ফেরার আগেই কেয়ার শীৎকার কানে এল। 

সলেজ ধূমকেতু আবার ছুটে চলেছে দরজার দিকে। ঠাহর করার আগেই লক্ষ্যবস্তুটিকে ঘিরে ফেলেছে। আমি তাকিয়ে রইলাম। আমাকে যখন ভিড় ঘিরে ধরে তখন এ রকম দেখতে লাগে তার মানে। কিন্তু আমি তো এখানে, তাহলে ওরা ওখানে কেন? আমার পাদুটো কাঠের মেঝেতে গেঁথে রইল।

বেশ খানিকক্ষণ পর ভিড়ের পাপড়ি খুলে উন্মুক্ত হল একটি মানুষ। 

এত ছোটখাটো? পাঁচ ফুট টেনেটুনে। মোছামোছা রঙের একটা সুতির শাড়ি। হিলহীন চটি। সম্ভবত বাটার। শ্রীলেদার্সেরও হতে পারে। কাঁধ থেকে ঝুলন্ত কাপড়ের ব্যাগ। চুল টেনে পেছনে খোঁপা বাঁধা। কালো ফ্রেমের চশমার ওধার থেকে একজোড়া চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। থতমত দৃষ্টি। দোকান বাজার রেস্টোর‍্যান্টে ঢুকতে গিয়ে কিংবা সিগন্যালে দাঁড়ানো অবস্থায় গাড়ির কাচ নামিয়ে এ দৃষ্টি আমি আগে অনেক দেখেছি।  

কিন্তু এ দৃষ্টি স্পেশাল। কারণ এ দৃষ্টির আমার শত সহস্র ফ্যানের কোনও একজনের নয়, এ দৃষ্টির মালিক শর্মিষ্ঠা গুপ্ত। সাহিত্য পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন, খবরের কাগজের বইবিভাগে গত ক’মাস ধরে যার ছবি, যার প্রথম উপন্যাসের প্রশংসা আমার দিকে অহরহ চেয়ে থেকেছে। জীবনের প্রথম উপন্যাস লিখে ব্যোমকেশ রহস্য সম্মানের সেরা রহস্য ক্যাটেগরিতে মনোনয়ন যে ছাড়া আর কেউ পায়নি। আমিও না। কেয়ার সমালোচনার শিরোনাম ছিল, রহস্যের নতুন রানী? বাকিরা এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও উচ্ছ্বাসটা সকলেরই কমন। হাতে গোনা কিছু সমালোচক আরেকটু ধৈর্য ধরার পক্ষে, অন্তত দ্বিতীয় উপন্যাসটা পর্যন্ত, কিন্তু বেশিরভাগেরই মত এ ঝড় তাৎক্ষণিক নয়।  

আমি? আমি ধৈর্য ধরার পক্ষে। গত তিরিশ বছর ধরে এ রকম নতুন রাজা নতুন রানীর দেখা আমি কম পাইনি। এখন ভাবলে হাসি পায়, কিন্তু বছর দশেক আগে কেয়া মুন্সী নিজে এই খেতাবের দাবিদার ছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরণের জনপ্রিয়তাটা একই হাতের লেখা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে পাঠকের স্বাদবদলের স্বাভাবিক চাহিদা। আর কিচ্ছু না। দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তাটা একটা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। যেটার সঙ্গে ভালো লেখার কোনও সম্পর্ক নেই। অবিশ্বাস্যরকম বেশি লোক ভালো লেখে। সত্যি বলতে কি আমার তিরিশ বছরের কেরিয়ারে খারাপ লেখা আমি প্রায় দেখিইনি। কাজেই ভালো লেখে কথাটার আমার কাছে কোনও মানে নেই। আমি কৌতূহলী জানতে এ মেয়ের আমাকে সিংহাসনচ্যুত করার ক্ষমতা আছে কি না। আমার সমান বই বিক্রির ক্ষমতা আছে কি না। টানা তিরিশ বছর ধরে বাংলাভাষার সেরা রহস্যলেখকের মুকুট পরে থাকার ক্ষমতা আছে কি না। 

শর্মিষ্ঠা গুপ্ত এখনও আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের ঘোরটা কেটে গেছে। এখন ওর আর কোনও সন্দেহ নেই যে আমিই আমি। মেয়েটা আমার দিকে হাঁটতে শুরু করল। 

সতর্ক হলাম। নার্ভাসনেসটা প্রকাশ হতে দেওয়া যাবে না।  

আমি আপনার খুব বড় ভক্ত। বুকের কাছে হাত জড়ো করে বলল মেয়েটা।

হেসে নমস্কার ফিরিয়ে দিলাম। 

মধুমাধবী আমার পৃথিবীর সবথেকে প্রিয় গোয়েন্দা। 

মেয়েটার বয়স এত কম ছবিতে বুঝিনি। নিঃসন্দেহে তিরিশের ওপারে। যদিও সামনের একগাছি চুল পেকেছে, আর জামাকাপড়ও পরেছে মাসিপিসির মতো।

আমি বিশ্বাস করি, ও রকম চরিত্র বিশ্বসাহিত্যে আর একটিও লেখা হয়নি।

এটাও শোনা, তবে কম। অন্তত যারা বলেছে তারা কেউই নিজেরা লেখে না। এ শর্মিষ্ঠা গুপ্ত তো? 

প্রাথমিক আবেগের ভাবটা কেটে গিয়ে মেয়েটা এখন অনেকটা সংযত।

আমার নাম শর্মিষ্ঠা। শর্মিষ্ঠা গুপ্ত।

আমি ভুরুতে বিস্ময় ফোটালাম। 

ওহ্‌হ্‌হ্‌, তুমি। তোমার কথা তো শুনেছি। 

নতুন, সাড়া ফেলা লেখকদের প্রতি এটা আমার স্ট্যান্ডার্ড উত্তর। তাদের বই পড়া সত্ত্বেও আমি কখনও বলি না যে ওহ, তোমার বই তো পড়েছি। তোমার কথা শুনেছি-র দুটো মানে হতে পারে, যে যার আত্মবিশ্বাস অনুযায়ী বেছে নেবে। এক, তোমার সম্পর্কে আমি এখনও সিদ্ধান্তে পৌঁছইনি। অথবা, আরও খারাপ, তোমাকে পড়ে দেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি না। শর্মিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ নিয়মের ব্যত্যয় করার কোনও কারণ নেই। তাছাড়া শর্মিষ্ঠা গুপ্তর বই আমি সত্যিই পড়িনি, প্রকাশকের পাঠানো কপি বাড়িতে পৌঁছোনো সত্ত্বেও। কাজেই মিথ্যাচারের পাপ হল না। কিন্তু সত্যিটাও বলা হল না। সেটা বলতে গেলে বলতে হত তোমার বই পড়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পড়িনি। কারণ তিরিশ বছরে এই প্রথম কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীর বই পড়ে দেখতে সাহসে টান পড়েছে আমার।

মেয়েটা অপ্রতিভ হল। চোখ নামাল। ইতস্তত ভঙ্গি। নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। এবার নিজের বইয়ের কথা তুলবে। বলবে, আমার বইটা পড়েছেন দিদি? কেমন লেগেছে? সেরকম স্মার্ট হলে বলতে পারে, ভুলভ্রান্তি হলে শুধরে দেবেন, আপনাদের কাছ থেকেই তো শিখব।

শান্ত দুটো চোখ আবার উঠে এল আমার চোখে। 

আপনি আমার রোল মডেল ছিলেন। এখনও আছেন। আমি সবসময় আপনার মতো হতে চেয়েছি।

নিরাবরণ হাসি হাসল শর্মিষ্ঠা গুপ্ত। 


*****
                                                                                                                                   (চলবে)

September 20, 2016

মরশুমি ভালো-খারাপ




১। আমাদের বাড়িওয়ালার গাছে শিউলিফুল এসেছে। ভোরবেলা, এমনকি অফিস বেরোনোর সময়েও দরজার আশেপাশের চার পা সুবাসিত হয়ে থাকে। ভালোবাসি। 

২। ফুলগুলো আর ক’দিন বাদে গাছ থেকে ঝরে মাটিতে পড়বে এবং লোকজন নির্বিচারে সেগুলো পদদলিত করে যাতায়াত করবে। ভালোবাসি না। লোকজনের দোষ নেই। এড়ানো শক্ত। কিন্তু কেউ এড়ানোর চেষ্টাও করে না সেটাও ঠিক।

৩। মেলাগ্রাউন্ড জুড়ে প্যান্ডেল। মাঠ ছিঁড়েখুঁড়ে বাঁশ, ত্রিপল, রঙিন কাপড়, লোহার কাঠামো। একটুও ভালোবাসি না। ভোরবেলা ফাঁকা মাঠে কুকুরগুলো ছোটাছুটি করে খেলত। একটা সাদা, একটা কালো, একটা সাদাকালো। এখন ছোটার জায়গা নেই, তাছাড়া কর্মযজ্ঞ দেখে বেচারারা ঘাবড়েও গেছে। চুপচাপ বসে থাকে ছড়িয়েছিটিয়ে। 

৪।  ওই একই কারণে আমার শরীরচর্চা রুটিনে (রেডিওতে বিজ্ঞাপন সহ সাত থেকে দশটা গানের (এনার্জি আর ঘড়ি বুঝে) সমান হাঁটা, তারপর দুটো গানের সমান দোলনা চড়া) রীতিমত বিঘ্ন ঘটেছে। দোলনা ঘিরে প্যান্ডেলশিল্পীদের অস্থায়ী কুটির বানানো হয়েছে। এখন দোলনায় আমার বদলে তাঁদের গামছা দোলে। ভালো তো লাগেই না, রীতিমত দুঃখ হয়। 

৫। কেনাকাটি। ভালোবাসি না। দেওয়াদেওয়ি। একটুও ভালোবাসি না। ছোটবেলায় নতুন জামা পেতে ভালো লাগত। কিন্তু ছোটবেলায় তো খালি পুজোতেই জামা হত। বড়জোর পয়লা বৈশাখে একপিস সুতির হাতকাটা ফ্রক। এখন যখন ইচ্ছেমতো, যখনতখন জামা কিনে আনছি তখন পুজোর জামার মহিমা কিছু বাকি নেই। এখন শুধু অভ্যেস। আর ভদ্রতা। আর অপচয়। শুধু টাকার নয়। কোনও পক্ষের আলমারিতেই তো আর জায়গা নেই। 

৬। শালিমারের বিজ্ঞাপন। যেটায় চন্দ্রিল আছেন। কমলা রঙের পাঞ্জাবি পরে দু’হাত অঞ্জলির ভঙ্গিতে তুলে ধরছেন, রূপমের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন। কাশফুল আর ঢাকের থেকে ওই বিজ্ঞাপনটা আমার কাছে অনেক বেশি পুজোর বার্তাবাহী। খুবই ভালোবাসি। 

৭।  পুরী থেকে বাবার এনে দেওয়া কটকিটা অবশেষে যে পরার সুযোগ আসতে চলেছে এইটা ভালোবাসি।

৮। কিন্তু তার আগে যে ব্লাউজ বানাতে ছুটতে হবে (যদি অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে না দিয়ে থাকে) সেটা একটুও ভালোবাসি না। 

৯। অর্চিষ্মানের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোব, আইসক্রিম আর কালা খাট্টা চুসকি খাব ভাবতেই ভালো লাগে। 

১০। আমাদের সঙ্গে আরও এক কোটি লোক ঠাকুর দেখতে বেরোবে আর আইসক্রিম কালা খাট্টা চুসকি খাবে আর তাদের আঙুল, কনুই, চিবুক গড়িয়ে গাঢ় বেগুনি তরল মাটিতে পড়বে, কিংবা এক হাতে আইসক্রিম সামলে অন্য হাতে ফোন তাক করে সেলফি তুলতে গিয়ে এ হাত কাত হয়ে আইসক্রিম খসে মাটিতে পড়বে, তার ওপর এক কোটি জোড়া জুতোর ধুলো, ভাবতেই কান্না পায়।

১১। স্মল টকের অসম্ভব সহজ হয়ে যাওয়াটা ভালোবাসি। লিফটে, রেস্টরুমে, ক্যান্টিনে চেনা আধচেনা লোকের সঙ্গে অস্বস্তিকর নীরবতা হাওয়া। দেখা হলেই হিন্দি ইংরিজি বাংলায়, “ঘর নেহি যাওগে?” ট্যাক্সিতে উঠে ডেসটিনেশন সি আর পার্ক দেওয়া মাত্র, “রাস্তা কব সে বন্ধ হো রহা হ্যায়, ম্যাডাম?” 

১২।  কিন্তু এই মরশুমের যে জিনিসটা সবথেকে, সবথেকে ভালোবাসছি সেটা হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতিতে আসা জোয়ার। টিভি দেখাটা মারাত্মক ইন্টারেস্টিং হয়ে গেছে। বিনোদনের মুখ চেয়ে কলকাতা সি আই ডি-র পাঁচবার দেখা এপিসোডগুলো ছ’বার করে দেখার যন্ত্রণা নেই। কাল পাওলি দামের সাতদিনের লুক দেখলাম। নতুন নতুন সিনেমার ট্রেলার। কলার তোলা ট্রেঞ্চ কোট থেকে সিক্সপ্যাক-এদিকে-গালফোলা হিরোর বুকখোলা রোম্যান্স থেকে শহরের তলার শহরের গুন্দাগর্দি। ইন্ডাস্ট্রির সেরা অভিনেতাদের জীবনের সেরা অভিনয়। দেখলে পিলে চমকে যায়। গায়ে কাঁটা দেয় গানের কথা। ভেঙেচুরে গেছে ঘরবাড়ি/চাপা দিয়ে চলে গেছে লরি/ উচ্ছে করলা গাড়িগাড়ি/ আমি রেঁধে খাব তরকারি। তারকাদের ইন্টারভিউ। এত বিখ্যাত অথচ আমার আপনার মতোই। রেগুলার গাই। অবসর টাইমে ডগদের নিয়ে ওয়াকে যান। সিঙ্গাপুরে শুটিং-এ গিয়ে ফান হ্যাভ করেন। ইয়াহ্‌। লাইক ক্রেজি। শুনতে শুনতে নস্ট্যালজিয়ার ঢেউ মগজে আছাড় খায়। মাবাবার ঘাড়ে চেপে দায়দায়িত্বহীন জীবনযাপনের সোনালি দিনগুলো , শ দিয়ে শকুন কাঁদে গরুর শোকে আর ভি ফর ভালচার যখন একইসঙ্গে চলছিল। তখন মুহূর্তের ব্রেনওয়েভে ভাষার ব্যারিকেড ভেঙেচুরে ‘ভালচার কাঁদে কাউ-র শোকে’। এ বাংলাভাষায় আমার কপিরাইট থাকবে না? 



September 17, 2016

সাপ্তাহিকী




খবরাখবর


আত্মবিশ্বাসের খারাপ ব্যাপার হচ্ছে জিনিসটা কখনওই মাপমতো থাকে না। কম হলে তবু একরকম। বেশি হলে ভয়াবহ। এবং হাস্যকর।

কে বলতে পারে এখন শরীরচর্চা ইন্ডাস্ট্রি টাকা খাওয়াচ্ছে না? কিংবা অরগ্যানিক ইন্ডাস্ট্রি?

শরীরচর্চার কথা বলতে মনে পড়ল। অক্ষয়কুমার ঊনপঞ্চাশ হলেন। যিনি না থাকলে আমার মতে হিন্দি সিনেমায় সুপুরুষ নায়কের কোটাটা খালি পড়ে থাকত। তাঁর স্বাস্থ্যের রহস্য আর্লি টু বেড আর্লি টু রাইজ। এবং জিমে না যাওয়া।

সঞ্চয়প্রতিভা নয়, ঔদার্যও নয়, গোটা গল্পটার সবথেকে অবিশ্বাস্য ব্যাপার আমার মতে এত টাকা জমিয়েও লোকটা টাকার গরম লুকিয়ে রাখল কী করে সেটা।


ভিডিও

ধ্যানের বৈজ্ঞানিক উপকারিতা প্রমাণ হলে অনেকেই ব্যাপারটা চেখে দেখতে চাইবে।

লিস্ট

অ্যাংজাইটি বলতে আমি যা বুঝি তার মধ্যে এগুলোর অনেকগুলোই পড়ে না। তবু চোখ বোলাতে মন্দ কী।

ট্রেনলাইনে যারা বড় হয়েছে তাদের সবার হয়েছেই হয়েছে L’appel du vide বাংলাদেশের প্রতি আমার কোনও Kaukokaipuu নেই। আমি মারাত্মক মাত্রার Malu-তে ভুগি। ইদানীং সর্বক্ষণ Torschlusspanik হচ্ছে।

কুইজ/খেলা

আমি পূর্ণচ্ছেদে বিশ্বাসী। সম্পর্কের, কথোপকথনের, সমস্যার। দেখে ভালো লাগল যে এরা আমার চরিত্রকে দাঁড়ির সঙ্গেই তুলনা করেছে।

মিস মার্পল তাঁর কেরিয়ারে ক’কাপ চা খেয়েছিলেন সেটা বলতে না পারলেও ক’টা খুন সমাধান করেছিলেন সেটা পারা উচিত ছিল। নিজেকে নিয়ে চূড়ান্ত হতাশ।


September 15, 2016

বিহার নিবাস, দ্য পটবেলি





লালু ভালো নীতিশ খারাপ। মৈথিলী ভাষায় অইখন মানে এখানে তইখন মানে সেখানে। ভোজপুরী ফিল্মি গানের ভাষা এমন যে ফ্যামিলিকা সাথ বইঠকে শোনা যায় না। অথচ সেই গান শুনে শুনে মৈথিলী যুবসম্প্রদায় গোল্লায় যাচ্ছে। এ সব খবর আমরা পেলাম ঈদের দুপুরে বাড়ি থেকে বিহার নিবাস যেতে যেতে। 

ট্যাক্সিতে উঠেই যেই না বললাম বিহার নিবাস যানা হ্যায়, ভদ্রলোক এক গাল হেসে জি পি এস বন্ধ করে দিলেন। ট্যাক্সিচালকরা দু’প্রকার। একদল জি পি এস-এর দেখানো রাস্তার এক ইঞ্চি এদিকওদিক দিয়ে যেতে রাজি হন না। আর একদল জি পি এস-এর সাহায্য নেওয়াকে কাপুরুষতা মনে করেন। প্রথমে ভেবেছিলাম এই ভদ্রলোক দ্বিতীয় দলের। তারপর অন্য কারণটা বেরোলো। নার্ভাস হয়ে আমরা কিন্তু রাস্তা চিনি না বলাতে আশ্বাসের হাত তুলে বললেন, আপনা হি স্টেট হ্যায়, ভবন তো পাতা হি হোনা চাহিয়ে।

কৌটিল্য মার্গের বিহার ভবন ওঁর পাতা ছিল ঠিকই কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ক্যান্টিনটা তেনজিং নোরগে মার্গের বিহার নিবাসে। দুটোর মধ্যে দূরত্ব মোটে পাঁচ মিনিট।

বিহার নিবাসের ক্যান্টিনকে অবশ্য ক্যান্টিন বলা উচিত নয়। কারণ সেটা একটা বাহারি দোকান। শাহপুর জাট ভিলেজে পটবেলি রুফটপ ক্যাফের ধুন্ধুমার ব্যবসা দেখে বিহার ভবন/নিবাসের কর্তারাই পটবেলি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন বিহার নিবাসে তাঁদের দোকান খুলতে। সিদ্ধান্ত যে ভুল হয়নি তা মঙ্গলবারের (অবশ্য ছুটির মঙ্গলবার) দুপুরের হাউসফুল দিয়েই পরিষ্কার। 

শাহপুর জাটের চারতলা বাইতে যাঁদের হাঁটু কাঁপে, কিংবা হিপস্টারদের যাঁরা ভয় পান তাঁদের পক্ষে বিহার নিবাসের পটবেলি আদর্শ। ঝলমলে, অতিথিবৎসল আবহাওয়া। কাউন্টারে যিনি বসেছিলেন আর যিনি ঘুরে ঘুরে তদারকি করছিলেন, দু’জনকেই শাহপুর জাটের ক্যাফেতে দেখেছি।

পটবেলির মেনুতে স্টার্টারের নামগুলো পড়লেই অর্ডার করতে ইচ্ছে করে। আলু লালু চপ, কিমা গোলি, পোঠিয়া মছলি ফ্রাই। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে জানি, ওগুলো খেলে আর কিছু খাওয়া যায় না। তাই সোজা মেন কোর্স। আমার জন্য চিকেন তিখা ইস্টু, অর্চিষ্মানের জন্য খড়া মসালা মাটন। প্রথমটা ভাত আর দ্বিতীয়টা পরোটার সঙ্গে আসে। আর গলা ভেজানোর জন্য নেওয়া হল সল্টি অ্যান্ড স্পাইসি লস্যি। 


খড়া মসালা মানে গোটা মশলা। এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি, জিরে, ধনে, গোলমরিচ, জয়িত্রী, জায়ফল - কেউ কেউ গন্ধের জন্য মৌরিও দেন - তেলে ফোড়ন (গোটা কিংবা মোটা করে গুঁড়িয়ে) দিয়ে মাংস রান্না করাই হচ্ছে খড়া মসালা মাটনের মোদ্দা রেসিপি। এত তরিবত করে রাঁধলে তো রান্না খারাপ হওয়ার কোনও কারণ নেই, খড়া মসালা মাটন প্রত্যাশিতভাবেই ভালো। কিন্তু আমাকে রুদ্ধবাক করল চিকেন তিখা স্টু। গাজর আর আলুর টুকরো দিয়ে রান্না ঝাল ঝাল, টক টক মুরগির পাতলা ঝোল। জিভে ছোঁয়ানোমাত্র মাথা থেকে পা পর্যন্ত যত ঘুমন্ত কোষ, ঝিমন্ত রন্ধ্র ঝাঁকুনি খেয়ে বাপ বাপ বলে উঠে দাঁড়ায়, দু’হাত তুলে গলা খুলে “জিয়া হো বিহার কে লালা” রাঁধুনিবন্দন শুরু করে। 


বাইরে ছাতার তলায় লিট্টি উৎপাদনশালা। খোলা আগুনের ওপর লোহার জালির ওপর বড় সাইজের সবেদার মতো সারি সারি লিট্টি। হাতের তেলো দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চারপাশ সমান করে সেঁকা চলছে। 

কাচের দেওয়াল ভেদ করে এমন মিষ্টি আলো আসছিল যে আমরা ভাবলাম আরেকটু বসা যাক। সঙ্গ দিতে এল পাইনঅ্যাপেল আপসাইড ডাউন কেক উইথ আইসক্রিম। অথেনটিক না হতে পারে, চমৎকার। আনারসের চোখওয়ালা টুকরো ঢাকা নরম মসৃণ স্পঞ্জকেক। পাইনঅ্যাপেলের উপস্থিতি প্রমাণের তাগিদে কোনও রকম সেন্টের ব্যবহার করা হয়নি। আমার মতো গন্ধবিচারীদের পক্ষে রক্ষে। 


শেষে ভালো খাওয়া উদযাপন করতে এক কেটলি চা। আদালবঙ্গএলাচ দিয়ে বেশ করে ফোটানো।

দিল্লিবাসী হলে আর স্টেট ক্যান্টিনে খাওয়ার আগ্রহ থাকলে বিহার নিবাসের দ্য পটবেলি-কে লিস্টের ওপরদিকে রাখুন। আর যাঁরা দিল্লিতে কিংবা বিহারে থাকেন না তাঁরা শিগগিরি বাড়ির কাছে বিহারী দোকান খুঁজে খেতে যান।




September 13, 2016

আমার জীবনের কুড়িটি জ্বলন্ত সমস্যা



১। তেষ্টা মেটার আগেই চা ফুরিয়ে যাওয়া। প্রত্যেকবার।

২। চায়ের দুধ, চিনি, নুন, বয়ামে কখনওই প্যাকেটের পুরোটার জায়গা না হওয়া। বাকিটুকু গার্ডার পেঁচিয়ে রাখতে বাধ্য হওয়া। চোখের সামনে রাখলে দৃশ্যদূষণ, আড়ালে রাখলে বিস্মৃতি। 

৩। ওষুধ ফুরোনোর আগেই অসুখ সেরে যাওয়া। তারপর সারাবাড়ি ওষুধের গোরস্থান।

৪। বাড়িতে প্লাগ পয়েন্টের থেকে গ্যাজেট বেশি থাকা।

৫। অর্চিষ্মান আর আমার ফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদির চার্জ সর্বদা, সর্বদা, একসঙ্গে ফুরোনো। এবং তখন ওপরের সমস্যাটা প্রকটতর হয়ে ওঠা।

৬। আশু দরকারি কাজটা ছাড়া পৃথিবীর সব কাজ করতে ইচ্ছে করা। 

৭।  পড়তে শুরু করা বইটা ছাড়া পৃথিবীর অন্য সব বই পড়তে ইচ্ছে করা। 

৮। সব খাবার গরম হয়ে যাওয়ার পর সিনেমা বেছে বাফারিং-এ দেওয়ার কথা মনে পড়া। তখন হয় সিনেমা বাছতে গিয়ে খাবার ঠাণ্ডা কর, নয় সিনেমা চালাতে চালাতে খাওয়া শেষ।

৯। বাঁধানো ছবির তুলনায় দেওয়ালে পেরেক কম পড়া। নিজেরা মারার এলেম নেই। আর পেরেক মারার জন্য এখনও লোক ভাড়া পাওয়া যায় না। হাঁ করে বসে থাকা কখন বড় কিছু খারাপ হবে - কলিং বেল, গিজার - তখন ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে পেরেক পুঁতিয়ে নেওয়ার জন্য। 

১০। ইলেকট্রিশিয়ান আসা থেকে চলে যাওয়া পর্যন্ত দুজনের মাথা থেকে পেরেকের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ বেরিয়ে যাওয়া।   

১১। মুদির দোকানে হোম ডেলিভারির অর্ডার দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ চেয়ে থাকা। 

১২। অর্ডার দেওয়ার পাঁচ মিনিট পর ফোন করে একটা ভুলে যাওয়া আইটেম জুড়ে দেওয়ার কথা বললে শোনা, “দিদি, এক্ষুনি আপনার মালটা বেরিয়ে গেল।” 

১৩। ঠিক সে সব ক্ষেত্রেই নুন দিয়েছি কি না ভুলে যাওয়া, যে সব ক্ষেত্রে চেখে দেখা সম্ভব নয়। মাংস ম্যারিনেট করতে দিয়ে, ডিম ফেটানোর পর।

১৪। রিল্যাক্সেশন পুরো হওয়ার আগেই ভিডিও গেমের লাইফ ফুরিয়ে যাওয়া।

১৫। দিন ফুরিয়ে গেলেও ইউটিউবে দেখার মতো ভিডিও না ফুরোনো। 

১৬। সুবিধেজনক দিকে পড়ার সমান সুযোগ থাকলেও জিনিসপত্রের সর্বদা খাটের সেদিকে পড়া যেদিকে হাত ঢোকানোর জায়গা নেই। 

১৭। একটা হারানোর পর অনেক খুঁজে না পেয়ে শেষমেশ অন্যটা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার চব্বিশঘণ্টার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া দুলটা বেরিয়ে পড়া। 

১৮। ইন্টারনেটে যাদের দেখলে ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যায়, তাদের খবরই সবথেকে বেশি নিতে ইচ্ছে করা।

১৯। উল্টোদিক থেকে চেনা লোক আসতে দেখলে তার উপস্থিতি অ্যাকনলেজ করা মোক্ষম মুহূর্তটা চিহ্নিত করতে না পারা। সবসময়েই টু আর্লি, নয়তো টু লেট।

২০। অনেক ভেবেও কুড়ি নম্বর অসুবিধেটা মনে করতে না পারা। এবং এটা জানা যে পাবলিশ করার কুড়ি সেকেন্ডের মধ্যে আমার জীবনের জ্বলন্ততম সমস্যাটা মনে পড়বে যেটা এই লিস্টে অনুপস্থিত।  



September 10, 2016

সাপ্তাহিকী



Intelligence is really a kind of taste: taste in ideas. 
                                                                                             ---Susan Sontag


Mother's genes go directly to the cerebral cortex, those of the father to the limbic system. 

পৃথিবীর প্রথম চুটকি হল খ্রিস্টপূর্ব উনিশশো শতকের একটি সুমেরিয়ান প্রবাদ। 

জাপানে বোমাপতনের পরে ভিয়েতনামের যুদ্ধে রাস্তায় ছুটতে থাকা ছোট মেয়েটির ছবি ফেসবুকের সংজ্ঞায় ফুল ফ্রন্টাল নুডিটি-র উদাহরণ। কাজেই বাতিল।
  
চারচারটে জন্তুকে আমরা জিরাফ নামের ছাতার তলায় গুঁজে রেখেছি। (নিউ ইয়র্ক টাইমস)

উনিশশো চুয়াত্তর সালে টুইন টাওয়ার তৈরি হওয়ার খবরটা দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারে বসে পেয়েছিলেন ইনি। তখনই ঠিক করেন এক টাওয়ারের ছাদ থেকে অন্য টাওয়ারের ছাদ পর্যন্ত হাঁটবেন। প্রস্তুতির আট মাসে দড়িতে হাঁটা মোটে একবার প্র্যাকটিস করেছিলেন তিনি। তাঁর মূল মাথাব্যথা ছিল হাঁটার পার্টটা নয়, গার্ডের চোখ এড়িয়ে ছাদ টু ছাদ তার লাগানোর পার্টটা। কারণ ঘটনাটা ঘটানোর জন্য তাঁর অনুমতি ছিল না। কাজেই নিচে সেফটি নেটও ছিল না। 
“On the last step, as I gave myself up to the police, it started to rain. They were very angry. It took them an entire afternoon to process and get rid of me. They were rough, but some asked for my autograph."

জেতার টোটকা? উঁহু, এক্সেলেন্স নয়। ইকুয়ালিটি। 

 ছবির পেছনে জল ছিটকানোর ব্যাকগ্রাউন্ড বানাতে চাইলে। 




আমার বাবামার জন্মবছরের বেস্টসেলার বই দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই, আমার জন্মবছরের বেস্টসেলার দ্য বোর্ন আইডেন্টিটি, অর্চিষ্মানের জন্মবছরের বেস্টসেলার সিক্রেটস। আপনার?



September 08, 2016

সাত



গোড়ায় অসুখবিসুখের প্রসঙ্গে সাত বছর সময়টা জরুরি ছিল। বলা হত এ পৃথিবীতে এমন কিছু রোগ আছে, শরীরের এবং মনের, যা সারতে লাগে সাত বছর। তারপর বিশেষজ্ঞরা বার করলেন মানুষের সম্পর্কেও সাত বছর সময়টা জরুরি। সম্পর্ক মানে মূলত রোম্যান্টিক সম্পর্ক, জোগাড় করা থেকে টিকিয়ে রাখা, সবকিছুতেই যাদের পেছনে কাঠখড় পোড়াতে হয়। জন্মলগ্নে মুফতে পাওয়া সম্পর্ক, বিজয়ায় একটা ফোন করলেই পরের বছরের জন্য যাদের থাকা নিশ্চিত, তারা নয়। বিশেষজ্ঞরা বললেন এই সব কঠিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাত বছর সময়টা ক্রুশিয়াল। শুরুতে হালকা ইরিটেশন, লাল হওয়া, ফুসকুড়ি। পত্রপাঠ ব্যবস্থা না নিলে একেবারে বিচ্ছেদে গড়ানো অসম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা কিছু বললে অবশ্য একটা সান্ত্বনা থাকে। যে আরেকদল বিশেষজ্ঞ ঠিক উল্টো কথাটা প্রমাণ করে দেবেন। এ ব্যাপারেও তাই হল। অন্যরা বললেন যে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা তো নেই, বরং সাত বছর যদি কোনও সম্পর্ক টিকে যায় তাহলে বরং নিশ্চিত হওয়া যায় বাকি জীবনটাও সেটা টিকবে। সাত বছর একসঙ্গে থাকা মানে পালানোর রাস্তা সব একে একে বন্ধ হয়েছে, একে অপরকে হাড়েমজ্জায় অভ্যেস হয়ে গেছে, বাকিটুকু জাস্ট নিয়ম করে টেনে দিলেই হল। 

কোন তত্ত্বটা যে ঠিক সেটা তো জানিই না, কোনটা যে বেশি ভয়ের সেটাও নিশ্চিত নই। 

যেমন আজ রাত পোহালে আমার অবান্তর লিখে চলার সাত বছর পূর্ণ হবে, এ খবরটা উদযাপনের না বুক চাপড়ানির, সেটা আমার গুলিয়ে যাচ্ছে। 

জন্মের বাইরে পাওয়া আমার কোনও সম্পর্ক, রোম্যান্টিক বা ননরোম্যান্টিক, সাত বছর টেকেনি। (এখন যে রোম্যান্টিক সম্পর্কটায় আছি সেটা অ্যাকচুয়ালি সাত ছুঁতে চলেছে, মাগো...) কেউ আমাকে তাড়িয়েছে, কাউকে আমি কাটিয়েছি। কোনওটা সম্পর্কের পেডেস্ট্যাল থেকে হড়কাতে হড়কাতে এখন পরিচয়ের ক্ষীণ সুতোয় ঝুলছে। আর কোনওটার দিকে আঙুল তুলে যারা বলছে, কই এইগুলো তো বেশ জং ধরা মনে হচ্ছে, তাদের আমি রহস্য করে উত্তর দিচ্ছি, তবেই বুঝুন। 

অবান্তরের সঙ্গে সম্পর্কটা সাত বছর কী করে টিকল সেটা একটা রহস্য। সে রহস্যের চাবি আমি নই। হতেই পারি না। তাহলে আমার অন্যান্য সম্পর্কেও এর ছাপ পড়ত। 

দায়ী নির্ঘাত অন্য পক্ষ। অর্থাৎ, অবান্তর।

কিন্তু অবান্তর কি সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে পারে? শেষপর্যন্ত তো সে স্ল্যাশ, কোলন, হাইফেন আর ডট দিয়ে লেখা একটা নাম। থাকে ল্যাপটপে, খায় ইন্টারনেট। সে সাত বছর ধরে এইরকম একটা মিনিংফুল রিলেশনশিপ পুষছে এটা আমি অনেক চেষ্টা করেও মেনে নিতে পারলাম না।

তখন আমার নজর পড়ল অবান্তরের ওপারের ছায়াটার দিকে। আপনার ছায়া। আপনাদের ছায়া। যার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ আলাপ নেই, অথচ সারাদিনের সমস্ত সশরীরী কথোপকথন, দেওয়ানেওয়াকে ম্লান করে যে ছায়া আমাকে ঘিরে থাকে, যে ছায়া রসিক ও সংবেদনশীল, বুদ্ধিমান ও বিনীত, আত্মবিশ্বাসী ও শিখতে রাজি, বলার থেকে শুনতে খুশি, যে ছায়ার মেজাজ নরম, শিরদাঁড়া শক্ত, চোখ চকচকে, হাসি পরিষ্কার, আর যে ছায়া ভেতর থেকে ভালো।

আমার ঠিক যেমনটি পছন্দ, আপনারা ঠিক তেমনই। আপনাদের জন্যই সাত বছর ধরে অবান্তরে ফিরে ফিরে আসছি, আপনারা আমাকে না ছাড়লে আরও অন্তত সাত বছর আসব। আমার জীবনের অন্যতম পারফেক্ট সম্পর্কে সাত বছর ধরে আমাকে থাকতে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনেক ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা রইল। এই সাড়ে চারশো শব্দের মধ্য দিয়ে যতটুকু প্রকাশ করতে পারলাম তার থেকে অন্তত সাড়ে চারশো কোটি গুণ। 



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.