June 28, 2016

কুইজঃ বইটা কী?





এই কুইজটা দেখে থেকে ইচ্ছে হচ্ছিল বাংলা বই নিয়ে এরকম একটা কুইজ অবান্তরে ছাপার। অবশেষে হল। নিচে দশটা বইয়ের নাম (উপন্যাসের, প্রবন্ধ সংকলনের, ভ্রমণকাহিনির, আত্মজীবনীর) স্বরবর্ণ এবং স্পেস মুক্ত করে দেওয়া হল। আপনাদের আসল নামটা বার করতে হবে। (রচয়িতার নাম বললে এক্সট্রা হাততালি)। 

প্রশ্নপত্র সোজা হয়েছে প্রতিবারের মতোই। তবু একটা ছোট টিপ দিয়ে রাখি, শব্দগুলো জোরে জোরে উচ্চারণ করলে আসল নামটা ঝপ করে নাগালে এসে যাবে। উত্তর বেরোবে বুধবার সকাল আটটায়, ততক্ষণ কমেন্ট মডারেশন চালু থাকবে। 

অল দ্য বেস্ট। 

*****


১। দবচধরন

২। বষদসনধ 

৩। সজনহরবল 

৪। পলম 

৫। তনকড়দশ

৬। সপরবনরসর* (এই হিন্টটা আগে "সপরগছরসর" ছিল, যেটা ভুল। অসুবিধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।)

৭। জগর

৮। পথরদব

৯। ললশল

১০। শনবরনর


June 27, 2016

সম্বল



গত রবিবার সন্ধ্যেবেলা দোসা খেয়ে, এক হাতে ফ্রাইং প্যান আর অন্য হাতে বাঁধাইয়ের দোকান থেকে খবরের কাগজে মোড়া দু’খানা মধুবনী পেন্টিং (এখান থেকে কেনা) দোলাতে দোলাতে যখন বাড়ির দিকে ফিরছি, তখন আকাশ জুড়ে থালার মতো চাঁদের চারপাশে ঘন লাল মেঘের বৃত্ত দেখেই বুঝেছিলাম যে বৃষ্টি হবে।

অ্যাকচুয়ালি বুঝেছিলাম তারও আগে। ফ্রাইং প্যান কেনা আর ছবি বাঁধাতে দেওয়ার মাঝখানে যখন চশমার দোকানে ঢুকেছিলাম তখনই। যতক্ষণ হাঁটছিলাম ততক্ষণ কিছু টের পাচ্ছিলাম না। মানে স্বাভাবিক গরম লাগছিল। দরজা ঠেলে এসির ভেতর ঢুকলাম আর শরীরের সমস্ত রোমকূপ থেকে বর্ষার মতো ঘাম ঝরতে শুরু করল। আর অমনি আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। ঠিক মায়ের কথা নয়, মায়ের ব্যারোমিটারের কথা। 

মা বলেন ওঁর শরীরের মধ্যে নাকি একটা ব্যারোমিটার বসানো আছে। প্রথম কবে বলেছিলেন সেটাও মনে আছে। হাওড়া স্টেশনের সাবওয়ের টিউবলাইট জ্বালা টিমটিমে, স্যাঁতসেঁতে, ভ্যাপসা গর্তটায় সিঁড়ি দিয়ে নামছি, মা মেয়ে দুজনে পাল্লা দিয়ে ঘামছি। আমি যথারীতি রুমাল আনতে ভুলে গেছি। মা নিজের ব্যাগ থেকে একটা এক্সট্রা রুমাল বার করে আমার হাতে গুঁজে দিতে দিতে বলছেন, আজ বৃষ্টি হবে সোনা। ব্যারোমিটার বলছে। ঘোর নিম্নচাপ।  

সেই থেকে মায়ের ব্যারোমিটার বিরাজ করছে আমাদের জীবনে। আমাদের মানে আমার আর মায়ের। এ ব্যারোমিটারের পূর্বাভাস আবহাওয়া কোম্পানির মতো ভুলভাল নয়। আজ পর্যন্ত কোনওদিন এ ব্যারোমিটার ফেল করেনি। কেউ যখন বলছে না বৃষ্টি হবে, মায়ের ব্যারোমিটার একা হাতে বৃষ্টি নামিয়েছে, সবাই যখন নিশ্চিত এ বছর মা দুর্গা নৌকো চেপে আসছেন যখন বন্যা কেউ আটকাতে পারবে না, মায়ের ব্যারোমিটার ঠোঁট টিপে মাথা নেড়েছে, আকাশ থেকে একটি ফোঁটাও ঝরেনি।

যাই হোক, চশমার দোকানে ঢুকে আমি এমন ঘামতে শুরু করলাম যে অর্চিষ্মানকে পকেট থেকে রুমাল বার করে দিতে হল। ঘাম মুছতে মুছতে বললাম, নির্ঘাত বৃষ্টি হবে। ঘোর নিম্নচাপ।

তারপর সোমবার দুপুরবেলা যখন সিটের পেছনের জানালায় মেঘের ছায়া ঘনিয়ে এল, বাইরের চাতালে রাখা সিমেন্টের বড় বড় টবে পোঁতা পামগাছগুলো জোরে জোরে মাথা নাড়তে লাগল, অফিসের সবাই যে যার সিট ছেড়ে উঠে হাতের কাছের জানালার সামনে ভিড় করে দাঁড়াল আর সবার চোখের সামনে অদৃশ্য জুবিন মেহতার হাতের দুলুনিতে হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল, তখন আমার ভীষণ, ভীষণ গর্ব হল। অবশেষে মায়ের মতো একটা ব্যারোমিটারের মালিক হতে পেরে। 

গর্বের ভাবটা অবশ্য কেটে গেল একটু পরেই, তার জায়গায় এসে গেল একগাদা দুঃখ। এমন সুন্দর আকাশমাটি এক করা বৃষ্টি অথচ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখার উপায় নেই, কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে আধাখ্যাঁচড়া রিপোর্ট কটমট করে তাকিয়ে আছে। সিটে ফিরে এসে টাইপ করতে শুরু করলাম। প্রতিশোধ হিসেবে রিপোর্টে একের চার মন রাখলাম, তিনের চার মন বৃষ্টিকে দিয়ে দিলাম। সে স্ক্রিনে ছায়া ফেলা মেঘের দিকে তাকিয়ে রইল আর ভাবতে লাগল, যদি নিজেই নিজের মালিক হত তাহলে এমন একটা দিন নিয়ে কী কী করত।

১। সকালে উঠে ডিসিশন নিত, আজ রেনি ডে। অফিস ছুটি।

২। জানালা খুলে দিত হাট করে, পর্দা সরিয়ে দিত। কোণাকুণি বাড়িটার তিনতলার বারান্দা থেকে চোখ বাঁদিকে ফেরালেই এই ঘরটা সোজা দেখা যায়, কিন্তু তাতে একটুও ঘাবড়াত না। চুলোয় যাক প্রাইভেসি। তাছাড়া যে নিজের মনে থাকে তার থেকে যে চুরি করে দেখে লজ্জার অংশটা তারই বেশি। অ্যাকচুয়ালি, পুরো লজ্জাই তার।

৩। ভাবত আদা দিয়ে চা খেলে কেমন হয়। যদিও সেটা বাস্তব হত না, কারণ বাইরের প্রকৃতি বদলেছে, ভেতরেরটা তো রয়ে গেছে যে কে সেই। যখন মালাইকারি খেতে ইচ্ছে করছে তখন নারকেলের দুধ নেই, যখন আদা দিয়ে চা খাওয়ার আদর্শ পরিস্থিতি তখন আদা নেই। গত একমাস ধরে ফ্রিজের নিচে গড়াগড়ি খাওয়া আড়াই ইঞ্চি আদা ফেলে দিল এই পরশু না তরশু। 

৪। মনটা খারাপ হয়ে যেত। কেন ও এরকম? কেন ও অন্যদের মতো নয়? গুছোনো? দূরদর্শী? রান্নাঘরের জানালার ওপাশে সানসেটের তলায় পায়রাগুলো রোজ ডানা ঝাপটাঝাপটি করে। আজ পায়রাদেরও রেনি ডে। ঝাপটার শব্দ মিস করতে করতে ভাবত, এই বৃষ্টির দিনটা ও কীভাবে কাটাবে? সেলফ পিটিতে ভুগে? না সমস্ত চিন্তা চুলোয় দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে? এই আচমকা ছুটির আরাম নিংড়ে নিতে নিতে?

৫। উত্তর বেরিয়ে গেল ঝট করে। অফিস যাবে কি যাবে না সেই শক্ত প্রশ্নটার উত্তরটার মতোই। বৃষ্টির দিনে উত্তর খুব সহজে পাওয়া যায় দেখা যাচ্ছে। বাইরেটা যত ঘোলাটে, ঘরের ভেতরটা যত আবছা, দৃষ্টি ততই পরিষ্কার। 

৬।  চায়ের কাপ নিয়ে গ্রিলের বাইরে তাকিয়ে দেখত মোটা মোটা জলের ফোঁটার ঘা খেয়ে বাড়িওয়ালার সজনেফুলে ভরা গাছ কেমন মাথা নাড়ছে।

৭। দেখত আর মনে পড়ত একটা পেঁপে গাছের কথা। এরকম কুচি কুচি পাতা নয় সে গাছের। তার একেকটা শাখার অন্তে ছড়ানো আলপনার মতো বড় বড় পাতা, তার মিহি দেহের একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরোনোর সময় রোদের রং সবুজ হয়ে যায়। এ রকম দিনে সেই পাতা বেয়ে জলের ফোঁটা এসে নামছে জানালার শিকে। তারপর সোজা পথ বেয়ে সারি বেঁধে চলেছে। একে অপরের সঙ্গে ঠিক সমান দূরত্ব বজায় রেখে। কী নিয়মনিষ্ঠ, ছাব্বিশে জানুয়ারির প্যারেডও লজ্জা পাবে। চলতে চলতে পুষ্ট হবে, তারপর ভার সইতে না পেরে টুপ করে খসে পড়বে। দেখতে দেখতে ইচ্ছে হবেই, আঙুল দিয়ে তাদের মিছিল মাটি করে দেওয়ার। কিছুক্ষণ অনিয়ম, দোলাচল, তারপর আবার মিছিল শুরু। আগের নিয়মে। যেন জীবনের ছোট একটি ডেমো। একে অপরের পিছু পিছু অন্ধের মতো চলেছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ, অহংকার, চর্বি জমতে জমতে মুটোচ্ছি, মুটোতে মুটোতে যখন জীবনের গ্রিপ আলগা হয়ে যাবে, পড়ে মরে যাব। 

৮। বাড়ির বিভিন্ন কোণ থেকে ইনডোর প্ল্যান্টগুলোকে তুলে এনে জানালার বারান্দায় রেখে, দুহাতে তাদের পাতা জড়ো করে জানালার বাইরে বার করে দিত। বেচারারা দেখুক, কী জিনিস মিস করছে।

৯। বুককেসের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবত, কী পড়া যায়। ভাবাটা অবশ্য টাইমপাস, কারণ ও জানে এমন দিনে সঙ্গ দেওয়ার জন্য ওর বুককেসে একটাই (বা একজন লেখকেরই) বই আছে। ইন্ডিয়াফেরৎ স্মৃতিকাতর মেজরের দল, ভিকারেজে বিকেলের চায়ের আসর, ইঞ্চ-এর ট্যাক্সি সার্ভিস, লোকাল গেজেটের বিজ্ঞাপনে খুনের ঘোষণা নিয়ে আগাথা ক্রিস্টি গায়ে হালকা চাদরের মতো মুড়ে থাকতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত।

১০। মাঝখানে খেতে উঠতে হত অবশ্য। আজকের মতো অন্যরকম দিনেও রোজকার মতো খিদে পায় কেন? আর যদি পায়ই তাহলে মুখের সামনে খাবার ধরে দেওয়ার কেউ থাকে না কেন? (অ্যাকচুয়ালি থাকে না যে সেটা ভালোই, থাকলে তার উপকারের বদলে তার আদেশ মানতে হত।) কিন্তু নেই যখন সেই নিয়ে ভেবে মাথা ঘামানোর মানে হয় না। সমাধান হল গোটা ব্যাপারটা যথাসম্ভব শর্টে সারা। সসপ্যান, ফুটন্ত জল, ম্যাগি। দু’মিনিটটা বিজ্ঞাপনের ফাঁকি, আসলে রান্নাঘরে ঢোকা থেকে বেরোনো পর্যন্ত মিনিট পাঁচেক লাগে। সেটা অ্যাফোর্ডেবল। 

১১। হঠাৎ জেগে উঠে দেখত, বুকের ওপর বই ভাঁজ করে রাখা, ঘর অন্ধকার, বাইরে একটানা বৃষ্টির শব্দ। মাথা ভার, তার থেকেও বেশি মন খারাপ। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। ইস, দিনটা ফুরিয়ে গেল। দৌড়ে গিয়ে চা বসাত, ঘরের আলো জ্বালাত। এই গানটা জোরে চালাত ল্যাপটপে। 

১২। মনে পড়ত, আজ স্নান করা হল না। 

১৩। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকত। এখন আর সজনে গাছটাকে দেখা যাচ্ছে না। এখন শুধু ঘন ছায়ার মাঝে মাঝে কয়েকটা জানালার আলো। ব্যারোমিটারের কাছে খোঁজ নিত। কালও কি এমন কাটবে? উঁহু। পূর্বাভাস বলছে কাল খটখটে রোদ, সকালবেলা অফিসে পৌঁছে মেল খোলার সময় বুকের ভেতর মৃদু ভূমিকম্পের সম্ভাবনা।

১৪। ভয়ানক অবসাদ সেট করবে করবে এমন সময় সকালের প্রশ্নটা মনে পড়ে যেত। উত্তরটাও। রেনি ডে-তে দুঃখের জায়গা নেই।  গত ক'ঘণ্টাকে যত্ন করে মুড়ে বুকের ভেতর রেখে দিত ও। সামনের রৌদ্রকরোজ্বল দিনরাতের যুদ্ধক্ষেত্রে এইটুকুই তো সম্বল। 


June 25, 2016

সাপ্তাহিকী






The biggest human temptation is to settle for too little.
                                                                                 —Anonymous

প্রথমেই ভালো খবর। পৃথিবীর বেস্ট বুকওয়ার্ম আমরা।

এবার একটা খারাপ খবর। এশিয়ার প্রথম এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম ওয়ার্কিং ফোটোগ্রাফি স্টুডিও অবশেষে বন্ধ হল। আমাদের নাকের ডগাতেই। 

Belgian endive is shaped like a torpedo and grows to about six inches in length. It has tender white leaves with either yellow or red-colored leaf edges. The leaves offer a soft texture and delicate crunch with a pleasantly bitter flavor. While Belgian endive is commonly used raw in recipes it is also versatile in cooked preparations. Roast whole or halved endive with olive oil until softened and serve as a side dish with grated cheese. Grill endive halves and add to cooked grains or serve atop pizza. Add chopped or halved to tarts, quiche, soups, stews and stir-fries.  The bitter flavor of Belgian endive pairs well with onion, pear, apple, cranberries, herbs such as basil and thyme, walnuts, pecans, butter, cream based sauces, olive oil, bacon lardons, prosciutto, lamb, poultry and gorgonzola, manchengo, blue and feta cheeses. 
ওপরের প্যারাগ্রাফটা বেলজিয়াম এনডাইভ-এর বর্ণনা। আবার কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনাও বটে। অন্তত এঁরা সেরকমই দাবি করছেন। আপনার সঙ্গে কোন তরিতরকারির মিল আছে জানতে হলে ক্লিক করুন। 

ডেজার্টে আঠেরো স্কুপ আইসক্রিম? ফিদেল ক্যাস্ত্রোর বাঁয়ে হাথ কা খেল।

এতদিনে আমার নির্বান্ধব হওয়ার কারণটা বোঝা গেল। 

ভলটেয়ারের মতো কপাল হলে বন্ধু জুটতেও পারে। ভলটেয়ারের অন্যান্য নানারকম গুণের কথা তো শুনেছেন, তাঁর বিষয়বুদ্ধি সম্পর্কে জানতে হলে ক্লিক করুন। 

মনের মতো চাকরি পাচ্ছেন না? সুমুখ মেহতাকে দিয়ে সিভি লিখিয়ে দেখুন। 

এই খবরটা আগে সাপ্তাহিকীতে ছেপেছি কি না মনে পড়ছে না। খবরটা এমনই সাংঘাতিক যে দ্বিতীয়বার ছাপলেও ক্ষতি নেই। পৃথিবীর আকাশে চাঁদমামার একাধিপত্য শেষ।

এই “are writing” অংশটুকু বোধগম্য হচ্ছে না আমার। Women were always, always writing the best crime novels. 

সামনের লোকটার রাসায়নিক সংকেত উদ্ধার করতে চান? হ্যান্ডশেক করুন। চান না? বুকের কাছে হাত জড়ো করে ক্ষান্ত দিন। 


ফোন, ল্যাপটপ, টিভি ইত্যাদির স্ক্রিন থেকে যে নীল আলো বিচ্ছুরিত হয় তা আমাদের মগজের মেলাটোনিন প্রবাহকে বিঘ্নিত করে যার ফলে আমাদের ঘুম আসতে দেরি হয়। কাজেই আমাদের উচিত ঘুমোনোর অন্তত দু’ঘণ্টা আগে থেকে সবরকম স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা।

এ সপ্তাহের গান। এ শুনেও যদি বৃষ্টি না নামে তা হলে কিছু বলার নেই। 


June 21, 2016

What Literary Character is Your Mental Twin?




Honorable and empathetic, your mental twin is the legendary Atticus Finch. A noble soul whose experiences in life have shaped you into the morally-balanced person you are today, few others share your genuine passion for equality and justice. Whether it's in everyday life or in terms of overarching societal change, you cannot help but feel connected and driven to changing what is not "right". Above all else, you are a rare combination - someone who is as forgiving as they are morally inflexible. After all, you know more than most that there is no truth in justice unless a person has attempted to walk in another's shoes. Only then can one truly understand another's plight.

*****

আমি সম্মানিত, শিহরিত, উত্তেজিত। আপনার মানসিক যমজ বিশ্বসাহিত্যের কোন তারকা?


June 20, 2016

ডিয়ার পার্ক, হজ খাস




পুঁজিবাদে নিমজ্জিত হয়ে বাস করি, এদিকে পয়সার ওপর অবিশ্বাসের ভাবটাও কাটতে চায় না। অল গুড থিংস আর ফ্রি- র মতো উদ্ভট এবং মিথ্যে কোটেশনের ফাঁদ থেকে বেরোতে পারি না কিছুতেই। মাল্টিপ্লেক্সে যাই, এসি রেস্টোর‍্যান্টে গাঁকগাঁক করে খাই, ইন্দ্রিয়সুখ হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবার এ অনুতাপও খোঁচা মারে যে পয়সা দিয়ে না কিনে আর যেন আনন্দ করতেই ভুলে গেছি। অনুতাপটার একটা ছোট অংশ পয়সা খরচ নিয়ে, কিন্তু বেশিরভাগটা আমাদের বিনোদনের রকম নিয়ে। আর আমাদের বিনোদনের রকম তো শেষমেশ আমাদের সম্পর্কেই অনেক কিছু বলে, তাই না?

অথচ দিল্লিতে বিনাপয়সার বিনোদনের অভাব নেই। গুচ্ছ গুচ্ছ প্রদর্শনী, খোলা বাতাসে নাটক থিয়েটার, দূতাবাসে বা ভাষা শেখার স্কুলে বিদেশী সিনেমার স্ক্রিনিং, দেশী সিনেমার ফেস্টিভ্যাল, প্যান্ডেল বেঁধে ধ্রুপদী সংগীতের আসর - সব কিছুই হয় পুরোদমে। কিন্তু সে সব জায়গায় আমরা যাই না। ছবির কিছুই বুঝি না, ছবির প্রদর্শনী কী দেখতে যাব? নাটকগুলো এত রাতে শুরু হয়, বাড়ি ফিরব কী করে? আর ফিরলেও পরদিন অফিস যেতে লেট হয়ে যায় যদি? বছরে একবার ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ঢুঁ মারি আর ক্ল্যাসিক্যাল ফাংশানে গিয়ে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে মাঝপথে উঠে চলে আসি (অর্থাৎ কিনা হাফবার)।

বলেছিলাম, সমস্যাটা বিনোদনের সাপ্লাইয়ের নয়, সমস্যাটা আমাদের ডিম্যান্ডের। বা আরেকটু কড়া করে বললে, আমাদের রুচির।

গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে কি না বলুন? তাই আমি ঠিক করলাম ব্যাপারটার সংশোধনের সময় এসে গেছে। ক’সপ্তাহ আগের এক রবিবার ভোর ভোর উঠে অটো ডেকে আমরা চলে গেলাম হজ খাসের ডিয়ার পার্কে।

বিনাপয়সার বিনোদন খুঁজতে বসে প্রথমেই আমার মনে পড়েছিল দিল্লি শহরের লাখ লাখ সরকারি পার্কের কথা। পার্কে বেড়াতে যাওয়ার সুবিধেটা হচ্ছে গাছপালার কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করা যায়, কিন্তু অসুবিধেও কিছু আছে। প্রথম চিন্তা প্রেম। আমি প্রেমের ঝাণ্ডা-ওড়ানো স্লোগান-দেওয়া সমর্থক কিন্তু প্রত্যেকটা ঝোপের আড়াল থেকে যদি প্রেম উঁকি মারতে থাকে তাহলে অস্বস্তি বোধ না করার মতো স্মার্টও নই। সেই বাবদে বেশ কয়েকটা পার্ক বাদ পড়ে গেল। কটা পার্কের নাম সব লিস্টে আসছিল, সেটা আবার অর্চিষ্মানের অফিস যাওয়ার পথে পড়ে। ওখানে গেলে কেমন হয় জিজ্ঞাসা করাতে অর্চিষ্মান বলল না না ওখানে ভয়ানক প্রেমের প্রতাপ। আমি বললাম, আহা সে তো পার্ক মাত্রেই থাকবে। তখন অর্চিষ্মান খুব গম্ভীর মুখ করে, “তুমি বুঝতে পারছ না, ওখানের প্রেমের টাইপটা একটু ডেয়ারিং” বলে চোখ গোলগোল করে মিনিংফুল নীরবতা অবলম্বন করল, আর আমি ক্ষান্ত দিলাম। তারপর চোখে পড়ল হজ খাসের ডিয়ার পার্কের নাম। বাড়ির কাছে। তাছাড়া পার্কে হরিং আছে যখন ধরে নেওয়া যায় শিশুরাও থাকবে। আর শিশুদের সামনে ডেয়ারিং প্রেম করার সাহস প্রেমিকপ্রেমিকারা দেখাতে পারবেন না। কাজেই ফাইন্যাল।

সকাল সাতটা পনেরো থেকে কুড়ির মধ্যে আমরা পার্কের সামনে অটো থেকে নামলাম আর আমাদের মাথা ঘুরে গেল। স্বাস্থ্যোদ্ধারকারীর দল, হরিণদেখিয়ের দল, ব্যাডমিন্টন খেলুড়ের দল, সেলফি শিকারীর দলে প্রায় মেলা বসে গেছে। হজ খাস ভিলেজের গেটের সামনের ছোট্ট সবজিবাজারের গা ঘেঁষে বসা ঠেলাগাড়ির ওপর গবগব করে চা ফুটছে, তার ধোঁয়ার ওপাশে শুকনো ঝিঙে আর ফ্যাকাশে টমেটো নিয়ে বসা রোগা ভদ্রলোকের মুখের আউটলাইন ক্রমাগত কেঁপে উঠছে, উনুনের সামনে ফুলের মতো ফুটে রয়েছে ধপধপে সাদা ডিমের সারি, প্লাস্টিকের ভেতর থেকে উঁকি মারছে স্থানীয় বেকারির মোটা মোটা ফাঁপা পাউরুটি। এমন কি একখানা আইসক্রিমের গাড়িও গন্ধে গন্ধে হাজির, তার বিক্রিবাটাও হচ্ছে দিব্যি।

আমরা হচ্ছি গিয়ে ভ্রমণপিপাসু, রিয়েল ডিল, আর অন্যরা হচ্ছে গিয়ে কলকলে টুরিস্ট, এরকম অন্যায্য ভাবভঙ্গি আমাদের আছে। আর সেটা আছে বলেই ডিয়ার পার্কের গেটের চেহারা দেখে আমাদের আশাহত হওয়ার খুবই চান্স ছিল, কিন্তু হল না। কারণ ততক্ষণে কানে এসে পৌঁছেছে গগনবিদারী ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ। এ শব্দ আমি চিনি। জে এন ইউ-র জঙ্গলে মাঝরাত্তিরে এ ডাকের কম্পিটিশন হয়। এ ডাকের ডাকিয়ের মুড়োয় ঝুঁটি, ল্যাজে পেখম আর গলায় এমন অদ্ভুত রং যে তাকে ডিফাইন করার জন্য একটা আস্ত শব্দ জুড়তে হয়েছে অভিধানে।


ডাক লক্ষ্য করে জোরে পা চাললাম। ঘটনাস্থলে পৌঁছে চক্ষুস্থির। কম্পিটিশন হচ্ছে বটে, কিন্তু ডাকের নয়, পেখম মেলার। এদিকে একজন ট্যাঁ করে ডেকে নিজের পেখম মেলেছে, তো ওদিক থেকে তার দ্বিগুণ জোরে ট্যাঁ করে উঠে আরও একজোড়া ময়ূর পেখম মেলেছে। তাই দেখে আমাদের কাছাকাছি যে প্রতিযোগী সে মনমরা হয়ে পেখম নামিয়ে নিয়েছে। তাড়াহুড়ো করে বার করতে গিয়ে ক্যামেরার ফিতে, ব্যাগের ফিতে জড়িয়েমড়িয়ে একাকার। ভাগ্যিস বুদ্ধি করে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ব্যাটারি আর এস ডি কার্ড যথাস্থানে ভরে নিয়ে এসেছিলাম, না হলে আরও সময় নষ্ট হত। অবশেষে যখন ক্যামেরা বেরোল, ততক্ষণে ময়ূর পেখম গোটাতে শুরু করে দিয়েছে।

ছবি তোলা সেরে আবার হাঁটা শুরু করতে যাব দেখি কয়েকজন বেঁটেখাটো মানুষ জালের দেওয়ালের বরফিতে ছোট ছোট আঙুল ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবামার তাড়ার উত্তরে বলছে, পাঁচ মিনট অওর, মাম্মা, প্লিইইইজ।


কী দেখছে ওরা? পেখম তো নেমে গেছে অনেকক্ষণ। তবু হাঁ করে ময়ূরটার দিকে তাকিয়ে আছে কেন? কিছু ইন্টারেস্টিং ছবি মিস করে যাচ্ছি কি না দেখতে আবার একবার জালের ধারে ফিরে এলাম। বাচ্চাগুলোর দৃষ্টি লক্ষ্য করে ময়ূরটার দিকে তাকালাম। খোলা অবস্থাতে পেখম সুন্দর সকলেই জানে। বন্ধ অবস্থাতেও যে পেখম এত সুন্দর, আবার নতুন করে মনে পড়ল। শুধু পেখমই তো নয়, গলার রংটাও। পিসির একটা ময়ূরকণ্ঠী রঙের শাড়ি ছিল, ডান হাত থেকে বাঁ হাতে নিলে তার রং বদলে যেত। শাড়িতে যে এমন কাণ্ড হবে সেটা মেনে নিতে কোনও অসুবিধে হয়নি। আফটার অল, মেশিনে বানানো। তা বলে জ্যান্ত প্রাণীর গলায় অমন কেরামতি? প্রতিবার দাম্ভিক ঘাড় ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে গলায় নীলের চকচকে শেডের মেলা? শত শত কালো গভীর চোখ আঁকা পেখমটা যেন একটা বিরাট বাহারি ঝালর, দিল্লির ধুলো ঝাঁট দিতে দিতে চলেছে।


ছোটদের তো ক্যামেরা নেই, তাই ওরা এখনও চোখ দিয়ে দেখে। আমরা দেখি গাছের মাথায় পাতার জঙ্গল, ওরা দেখে ফেলে পাতার আড়াল থেকে একটা প্রাইভেসি-প্রিয় ময়ূরের ঝুলন্ত ল্যাজের ডগা। হরিণের শিং দেখে, সদ্য শেখা ওয়ান টু থ্রি-র বিদ্যা প্রয়োগ করে ওরা হরিণের শিং গোনে, জালের ভেতর হাত গলিয়ে মিহি সোনালি লোমে ঢাকা, নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে কাঁপতে থাকা শরীরে হাত বোলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। তাদের স্নেহ থেকে আমাদের দিশি কুকুরেরাও বাদ পড়ে না। পড়া উচিতও নয়। পার্কের মালিকানা যদি কারও হাতে থেকে থাকে তবে সে হরিণও নয়, ময়ূরও নয়, সে আমাদের নেড়ি। তার শিং-ও নেই, পেখমও নেই, কিন্তু আত্মবিশ্বাস সব খামতি পূরণ করে দিয়েছে।

ছোটরা নিজেরাও অবশ্য দেখার মতোই জিনিস। এটা আমি তাদের প্রতি কোনওরকম তাচ্ছিল্য বা অনুগ্রাহক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলছি না। কিন্তু যে কোনও পরিস্থিতিতেই যে তারা বড়দের থেকে সপ্রতিভ, বুদ্ধিমান এবং আকর্ষণীয়, সেই সত্যিটা আবারও হৃদয়ঙ্গম করে বলছি। আমরা এবং বাবামায়েরাও যেটা প্রায়ই ভুলে যাই। সে প্রমাণ ডিয়ার পার্কে অহরহ পাচ্ছিলাম। বাবামা ঘর্মাক্ত দেহে ছুটতে বেরিয়েছেন, সঙ্গে তাঁদের পুত্র বা কন্যা। বাড়িতে একা রাখার অসুবিধে বলে ট্যাঁকে করে নিয়ে এসেছেন। ঘুষ হিসেবে গেটের মুখ থেকে কুরকুরে কিনে দেওয়া হয়েছে। তারা সেগুলো বুকে আঁকড়ে ধরে বিরসবদনে বাবামায়ের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে। এমন সময় বাবার মাথায় কী ভূত চাপল, কিংবা ভূত নয়, ছেলেমেয়ের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যেই তিনি প্রস্তাব দিলেন, চলো, রেস করতে হ্যায়। ছেলেমেয়ের মুখে নিমেষে হাসি। কুড়কুড়ের প্যাকেট পতাকার মতো মাথার ওপরে নাড়াতে নাড়াতে তারা ছুট লাগাল, দেখতে দেখতে আড়াই ফুটের পলকা শরীর বাঁক পেরিয়ে অদৃশ্য, এদিকে তাড়া করে দু’পা যেতে না যেতেই বাবামায়ের জিভ বেরিয়ে ভুঁড়ি ছুঁয়ে ফেলার দশা।

আরেকটু দূরে দেখি একটা বুড়ো বটগাছের গা বেয়ে ঝুরি নেমেছে মোটা মোটা, সেই ধরে একজন ছোট দোল খাচ্ছে। হাঁটু ভেঙে বুকের কাছে নিয়ে এসেছে যাতে গ্রিপ শক্ত থাকে আর অদ্ভুত কায়দায় নিজের ছোট শরীরটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে স্থবির ঝুরিতে গতি আনার চেষ্টা করছে। পাশে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন, মাথার ওপর তোলা দুই হাতের পাঞ্জা একটা ঝুরি জড়িয়ে আছে। মুখে নার্ভাস হাসি। পাশে দুলন্ত সন্তান চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছে, দু’পা মাটি থেকে তুলে ফেলার। বাবার মুখের নার্ভাস হাসি দেখে বোঝা যাচ্ছে যে ইচ্ছে আছে খুবই, কিন্তু ভরসা করতে পারছেন না। ওই প্রাচীন প্রকাণ্ড বট যদি তাঁর মতো নশ্বর মানুষের ভার না বইতে পারে? ভরসাও নেই, মাটিকে লাথি মেরে ওড়ার সাহসও না।


দিল্লিতে ঘুরব অথচ পুরোনো ভাঙাচোরা বাড়ি চোখে পড়বে না তা কি হয়?


এটা একটা মসজিদ। বোর্ডে নাম সন ইতিহাস লেখা ছিল, এখন মনে পড়ছে না।


হজ খাসের ডিয়ার পার্ক একটা বায়োডাইভার্সিটি পার্কও বটে। গোলাপের বাগান, আরও নানারকম লক্ষ লক্ষ বিরল সুলভ গাছ গুল্ম বৃক্ষের সংগ্রহ আছে এখানে। আমাদের মতো গাছ না চেনা লোকেদের জন্য তাদের গায়ে যত্ন করে হিন্দি, ইংরিজি, ল্যাটিনে নামধাম লেখা। তবে এত এক্সোটিক গাছের মধ্যেও আমার সবথেকে ভালো লাগে বটগাছ। যত বুড়ো তত ভালো। আশেপাশের যত আন্দোলন আর কোলাহল সব নিজের শরীরের গোলকধাঁধার মধ্যে শুষে নেওয়ার অদ্ভুত প্রতিভা থাকে বটের। তার তলায় এসে বসলে মনে হয় একটা শব্দ নিরোধক বুদবুদের মধ্যে ঢুকে পড়লাম যেন।


হাঁটতে হাঁটতে একটা সৎসঙ্গের আসর পেরোতেই চোখের সামনে এই দৃশ্য উন্মোচিত হল।


সব গুড থিংস ফ্রি কি না জানি না, কিন্তু বিস্তর ভেরি গুড থিংসের গায়ে যে এখনও প্রাইস ট্যাগ লাগেনি, হজ খাসের ডিয়ার পার্ক তার প্রমাণ। তাছাড়া পার্কের লোকেশনও দারুণ। পার্ক থেকে বেরিয়ে তিন মিনিট হেঁটে গিয়ে কাঁচালংকা দেওয়া চা খাওয়া যায়। ডিয়ার পার্কে তো আবার যাবই, দিল্লির অন্যান্য সরকারি বাগানগুলোও সময় করে ঘুরে ফেলতে হবে।

বুড়োদের ভিড়ে নতুন প্রজন্মকে চোখে পড়ছে কি?

     

June 18, 2016

সাপ্তাহিকী







Touch comes before sight, before speech. It is the first language and the last, and it always tells the truth.
                                                        —Margaret Atwood, The Blind Assassin


স্বস্তি মিত্র। বেঁচে থাকতে এঁর নাম জানতাম না।

এই লিংকটা দেখে প্রথমেই যেটা চোখে লাগল সেটা হচ্ছে মনীষীদের ছবির বদলে মডেলের ব্যবহার। তারপর আসল বক্তব্যের দিকে নজর গেল। সেটাও অতি সরলীকৃত মনে হল। অবশ্য সেটাই প্রত্যাশিত। এদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই সমস্ত মহামানবদের সারাজীবনের সাধনার মূল সুরটিকে একটি প্রশ্নে প্রকাশ করা। সে প্রশ্ন আর কত জটিল হবে। আরেকটা জিনিসও খেয়াল করছিলাম, এবং করে খুশিই হচ্ছিলাম, যে মহামানবদের লিস্টে এঁরা শুধু ককেশিয়ানদের জায়গা দিয়ে হাত ঝাড়েননি, বাকি পৃথিবীটার দিকেও চোখ মেলে তাকানোর পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু তারপর স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎ আমার একজন ভীষণ চেনা লোকের ছবি/মডেল বেরিয়ে পড়ল আর আমার সব যুক্তিবুদ্ধি এমন গুলিয়ে গেল…  কর্তৃপক্ষের কাছে আমার অনুরোধ, সব কালা আদমিই একরকম দেখতে হন না। দয়া করে এবার থেকে মডেলের বদলে ছবি ব্যবহার করলে বাধিত হব। 

বুককেসসজ্জা দিয়ে চরিত্র বিচার? দেখা যাক আমার সম্পর্কে এরা কী বলেঃ

The Genre Coordinator: Fantasy, romance, literary, YA, they all have their place—grouped together. You’re a logical, organized thinker. Books of the same feather flock together, right? Thematically speaking, you’ve got your things together. Your choices have rational decisions behind them, and you’re all about easily accessing what you want. When you approach a problem, your initial thought is to examine and absorb information, and then solve the issue. Your motto? It’s what’s inside that counts.
শেষ বাক্য বোল্ড আমি করেছি। কারণ বাকি সব চরিত্র বিশ্লেষণ যদি মিথ্যেও হয়, ওই লাইনটা ডাহা সত্যি। ঘরানা অনুযায়ী বই সাজানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি বই অনুভূমিক ভাবেও রেখে থাকি। এরা সেটার জন্য একটা আলাদা ক্যাটেগরি করেছে দেখলাম।
Sideways Stacker: The great thing about you is that you observe the world from a unique perspective. Why should books be straight up and down when it’s easier to read the spines horizontally? Logical and different. Plus, it gives your shelves some pizazz. You adapt this attitude to everything you do. Embrace the fact that you were the weird kid growing up, because it means you have an awesome future ahead. The weird ones always end up in first place. Stay quirky forever, Sideways Stacker.
এটা একেবারেই হয়নি, আমি কোনওকালেই উইয়ার্ড কিড ছিলাম না, কোয়ার্কি বিশেষণটাও আমার ওপর বাজে খরচ। আমি একেবারেই চোখে ঠুলি বেঁধে ছোটা (খোঁড়ানো বলাই উচিত) গাধা।

রণথম্বোরে যখন সাফারি করতে গিয়ে বাঘ দেখেছিলাম তখন যদি এরকম হত? মাগো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অনেক অভিনব উপায়ে সংকেত আদানপ্রদান হত শুনেছি, কিন্তু তা বলে এই উপায়ে?

গল্প যখন লেখা হয় তখন লেখকদের মাথায় একটা নাম থাকে, আর সে গল্প যখন আমাদের হাতে এসে পৌঁছয় তখন তা হয়ে যায় অন্য নামের। এরকম কয়েকটা গল্পের প্রথম নাম আপনাদের বলছি, দেখুন তো পরের নামগুলো চিনতে পারেন কি না। Trimalchio on West Egg, পারলেন? পারলেন না? অবশ্য এটা একটু শক্ত। আচ্ছা এইটা বলুন। Four and a Half Years of Struggle Against Lies, Stupidity and Cowardice. এটাও চিনতে পারছেন না? হুম্‌ম্‌। আচ্ছা এইটা নিশ্চয় পারবেন। Atticus. পেরেছেন তো? আগেই বলেছিলাম। 

মাটি খুঁড়ে লোকে গুপ্তধন পায়, ডাইনোসরের ফসিল হয়ে যাওয়া চোয়াল, ম্যামথের দাঁত, অমর হওয়ার উচ্চাশায় পুঁতে রাখা নাটক নভেল প্রেমের কবিতা পায়। তা বলে এই জিনিস?

টাকা জেরক্স করার চেষ্টা করে দেখেছেন কখনও? পারবেন না। কেন পারবেন না জানতে হলে ক্লিক করুন। 


এতদিন কিছুকিছু লেখককে দেখে অবাক হতাম। ধারাবাহিক উপন্যাসের একেকটা পর্ব লিখছেন আর ছাপিয়ে দিচ্ছেন, নিজেই নিজেকে ভালো বলছেন, অন্যের লেখার তেড়ে নিন্দে করছেন। দেখতাম আর জাজ করতাম। আর করব না। সে সব লেখকরা এরকম আচরণ করেন, থামবেন না, চালিয়ে যান। আপনাদের মধ্যে জেমস জয়েস হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। 

এ সপ্তাহের গান। একটা বড় খেয়ালের শুধু দ্রুত অংশটুকু। সাধারণত এরকম কাটাকুটির আমি পক্ষপাতী নই, তবু এই ভিডিওটার লিংক দিলাম। গান শুনতে শ্রোতার যত মজা লাগে, গান গাইতে গাইয়ের তার থেকে কত বেশি মজা লাগে এই ভিডিওটা সেটার জলজ্যান্ত প্রমাণ।  


June 17, 2016

শাসন



বাবার নাকে একটা আড়াআড়ি কালশিটের মতো দাগ আছে যেটা দেখলে মনে হয় ক্লাস এইট থেকে চশমা পরার ফল। কিন্তু বাবা যখন চশমা পরে থাকেন তখন বোঝা যায় যে চশমার সঙ্গে ও দাগের কোনও সম্পর্ক নেই।

ওটা আমার ঠাকুমার এককালের প্রবল প্রতাপের চিহ্ন। আবার ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করলে ঠাকুমা বিনয়ের সঙ্গে নিজের প্রতাপের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাবেন। বলবেন, ওটাকে বাবা ছোটবেলায় কী রকম বাঁদর ছিলেন সেটার প্রমাণ হিসেবেই দেখা উচিত। কোনও একটি মতদ্বৈতের পরিস্থিতিতে ঠাকুমা বাবার গালে একটি প্রকাণ্ড চড় বসান এবং বাবার মুণ্ডু ঘুরে গিয়ে জানালার শিকে ধাক্কা খায়। সেই থেকে ও দাগ নাকের ওপর বিরাজ করছে। 

ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হচ্ছে, দাগের উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঠাকুমা এবং বাবা দুজনের মুখেই এমন নরম আলো ফোটে যেন তাঁরা কোনও হিংস্র ঘটনার স্মৃতিচারণ করছেন না, যেন পুরীর সমুদ্রতটে বসে জীবনে প্রথমবার ঢেউ গোনার কথা মনে করছেন। দাগটা যেন কোনও ক্ষত নয়, দুজনের জীবনেরই একটা সুখের সময়ে স্মৃতি। যখন ঠাকুমার অথরিটি সংসারে সর্বময় ছিল, আর আমার বাবার জীবনের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নাকে ব্যান্ডেজ বাঁধতে গিয়ে খেলতে যেতে দেরি হয়ে যাওয়া।

কিন্তু শুধু নস্ট্যালজিয়া নয়, ওই আলোর মধ্যে আরও একটা অনুভূতি লুকিয়ে আছে। ঠাকুমার ক্ষেত্রে সেটা গর্বের। মারসি, তবে না মানুষ হইসে? বাবার কাছে সেটা কৃতজ্ঞতার। ভাগ্যিস শাসন করেছিলে, তাই তো করে খাচ্ছি। দুজনেই যখন বিকেলবেলা বারান্দায় বসে থাকেন (এখন ঠাকুমা আর বসার অবস্থায় নেই, ক’বছর আগেও ছিলেন, এটা তখনকারই কথা) আর নিজেদের বিস্তৃত পরিবারের অপেক্ষাকৃত কম সৌভাগ্যজনক শাখাপ্রশাখার কথা আলোচনা করেন, যাদের উত্তরসূরিরা ততটাও দাঁড়াতে পারেনি, তখন দুজনেই একমত হন, শাসনের অভাবই তাঁদের ব্যর্থতার একমাত্র কারণ। দুজনের মৃদুগলার আলোচনা ডুবিয়ে দিয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে চিৎকার করতে করতে ছেলেরা হুশ করে সাইকেল চালিয়ে চলে যায়, চমকে উঠে দুজনেই চুপ করে যান, অপ্রসন্ন মাথা নাড়েন, খানিকটা অননুমোদনে, খানিকটা খেদে। এদের বাড়িতে যদি নাক-ফাটানো মা থাকত।

আমার বাবা-ঠাকুমার শাসনসংক্রান্ত আরও একটা থিওরি হচ্ছে, মোর ইজ বেটার। শুধু শাসনই নয়, শাসন করার লোকও যত বেশি হয় তত ভালো। ঠাকুরদার বেশ কিছু বন্ধুর হাতে বাবাদের শাসন করার অধিকার দেওয়া ছিল। তাঁরা ইচ্ছে করলেই বা দরকার বুঝলেই ঠাকুরদা ঠাকুমার পাঁচ ছেলেমেয়ের কান মুলতে পারতেন। এ ব্যাপারে বাংলা ভাষার এক বিখ্যাত সাহিত্যিকের সঙ্গে তাঁদের মত মেলে। সে সাহিত্যিকের ছোটবেলার স্মৃতিচারণে পড়েছি, তিনি একদিন ভরদুপুরে পাশের পাড়ায় এক বন্ধুর বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে বন্ধুর নাম ধরে উচ্চস্বরে ডাকাডাকি করছিলেন। এমন সময় বন্ধুর পাশের বাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে তাঁর কান মুলে/ চড় মেরে তাঁকে বকে বলেছিলেন যে ভরদুপুরবেলা এ রকম চিৎকার করাটা ভয়ানক অসভ্যতা। সাহিত্যিক খুবই নস্ট্যালজিয়ার সঙ্গে সে ঘটনাটি স্মরণ করেছিলেন। তাঁর লেখায় এ আফসোস স্পষ্ট ছিল যে যত দিন যাচ্ছে তত এ ধরণের ঘটনা বিরল হয়ে যাচ্ছে। আজকাল রাস্তাঘাটে ছেলেমেয়েদের প্রচণ্ড অসভ্যতা করতে দেখলেও বড়রা কিছু বলে না, চোখ উল্টে বসে থাকে। শেখার জায়গা আমাদের ক্রমে কমে আসছে।

বাবাদের স্কুলের মাস্টারমশাইদের গল্প শুনে ছোটবেলায় আমার ঘাড়ের চুল খাড়া হয়ে যেত। তাঁরা কোনওরকম দুষ্কর্ম দেখলে ছাত্রের জুলপির চুল ধরে ওপরদিকে হ্যাঁচকা টান দিতেন, মাঝখানে পেনসিল রেখে দুই আঙুল পেঁচিয়ে দিতেন।  তাঁদের সবাই খুব সম্মান করত। বাবামারা ছেলেপুলেদের তাঁদের কাছে সারাদিনের জন্য গচ্ছিত রেখে শান্তিতে থাকতেন।

দুঁদে শাসকদের প্রতি সম্মানের এই ব্যাপারটা আমি পরেও খেয়াল করেছি। তখন বাবাদের যুগ শেষ। আমি বড় হচ্ছি। পেয়ারা গাছ পাড়ায় দ্রুত কমে আসছে কাজেই পেয়ারা গাছের ডাল ভেঙে ছেলেমেয়ে ঠ্যাঙানোর গল্প ক্রমে লিজেন্ডে পরিণত হচ্ছে। সেই সময়ে আমাদের পাড়ায় একঘর নতুন ভাড়াটে এল। রাজু, রাজুর বাবা, রাজুর মা। রাজুর বয়স দশ, কালো গোল মুখের ওপর খাড়া খাড়া চুল দেখলে স্ট্যাটিক খাওয়া সজারুর কথা মনে পড়ে, দাদারা কেউ বলে দোদোমা, কেউ বলে ধানি পটকা। পড়াশোনা খেলাধুলো কোনওদিকেই রাজুর প্রতিভার কোনও ছাপ দেখা যেত না। রাজুর জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল কারও কথা না শোনা।

তবু পাড়ার কারওরই, বিশেষ করে চল্লিশের বেশি বয়স যাদের, সন্দেহ ছিল না যে রাজু বড় হয়ে একজন সফল মানুষ হবে। তার কারণ, রাজুর মা। রাজু সারাদিন দুষ্টুমি করত। রাজুর মা সারাদিন রাজুকে শাসন করতেন। চিৎকার করে। অবশ্য ভালো কাজ লুকিয়েচুরিয়ে করবেনই বা কেন। অনেক সময় সে শাসনের নমুনা চোখেও দেখতে পেতাম। রাজু বিদ্যুৎবেগে বাড়ি থেকে ছুটে বেরোচ্ছে আর বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে রাজুর বাবার একখানা এগারো নম্বর সাদানীল হাওয়াই চটি উড়ে আসছে। সঙ্গে রাজুর মায়ের চিৎকার। জুতো কখনওই লক্ষ্যভেদ করতে পারত না। খানিকক্ষণ পর রাজুর মা হেলেদুলে বেরিয়ে এসে রাস্তা থেকে চটি উদ্ধার করে নিয়ে যেতেন। আশেপাশের বাড়ির প্রতিবেশীদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করতেন। তাঁর মুখে মিনিটকয়েক আগের ক্রোধের চিহ্নমাত্র থাকত না। আমরা ভাবতাম এত শাসন, কাজে তো লাগে না দেখি। কিন্তু বড়রা বলতেন, ভেতরে ভেতরে কাজ ঠিকই দিচ্ছে, বড় হয়ে রাজু একজন গ্রেট ম্যান হবে।

সময়সমাজ ভেদে শাসনের উপায়, তীব্রতা ভিন্ন হয়, তার থেকেও ভিন্ন হয় মানুষভেদে। বাবাদের একই সময়ে বড় হওয়া সত্ত্বেও আমার মা মামা মাসিরা একেবারেই মারধোর খাননি। অথচ তাঁরা কিছু কম নৃসিংহঅবতার ছিলেন না। তাছাড়া তাঁরা সংখ্যায় বাবাদের থেকে বেশি ছিলেন। বাবারা পাঁচ, মায়েরা আট। আটজনই একসঙ্গে বড় হচ্ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু তাতে আমার দিদিমাদাদুর কিছু সুরাহা হয়নি। যারা বড়  হয়ে গেছে, তাঁদের ছেলেমেয়েরা এসে দলে ভিড়েছিল। তাদের খেলা, মারামারি, আক্রমণ, ডিফেন্স, কান্না, হাসি—সব মিলিয়ে কী পরিমাণ শব্দব্রহ্ম সৃষ্টি হত সেটা আমি আমার প্রৌঢ় মাসিমামাদের ডাইনিং টেবিলের চারদিকে বসে কুশলবিনিময়ের ডেসিবেল দেখেই আন্দাজ করতে পারি।

অথচ কেউ কিছু বলত না। দাদুর বলার সময় ছিল না, দিদিমা ভয়ানক শান্ত ছিলেন। পরিস্থিতি নিতান্ত খারাপ হলে রান্নাঘর থেকে মাঝে মাঝে “আহি, আহি” বলে হাঁক দিতেন। তাতে কোনও কাজ দিত না। কারণ ছেলেমেয়েরা জানত যে রান্নাঘর ছেড়ে মায়ের আসার সময় নেই। হুমকিই সার। দিদিমার আরেকটা বকুনি খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। ছেলেমেয়েদের দুষ্টুমি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলতেন, “জ্যান স্বরাজ পাইসে” (জ্যান-এর বানান অন্ত্যস্থ য হবে, কিন্তু টাইপ করা যাচ্ছে না। দুঃখিত।) দিদিমা যখন বড় হচ্ছিলেন তখন স্বরাজ পাওয়াকে একজন মানুষের আনন্দের, বাঁধনহীনতার, স্বাধীনতার চূড়ান্ত মনে করা হত। সমসাময়িক সমাজের স্বপ্ন, ইচ্ছে, আশা কেমন বকুনির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সেই রিসার্চে এই গল্পটা কাজে লাগতে পারে।

আমি যখন বড় হচ্ছিলাম তখন শাসনপদ্ধতি বাবাদের সময়ের থেকে অনেক বদলে গেছে। মারধোর কমে এসেছে, কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি একেবারে। তবে আমি চারপাশে যা যা দেখেছি, তাও গল্প করার জন্য যথেষ্ট।

আমাদের স্কুলে নিয়মিত মান্থলি টেস্ট হত। এখনকার ডেইলি টেস্টের বাজারে আমাদের জীবন কেকওয়াক মনে হলেও পঁচিশ বছর আগে সেটা যথেষ্ট কড়াকড়ির পর্যায়ে পড়ত। মান্থলি টেস্টের নম্বরের গড় করে সেটা হাফইয়ার্লি আর অ্যানুয়াল পরীক্ষায় যোগ কার ব্যবস্থা ছিল মনে হয়, কাজেই মাবাবারা সেটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। এ রকম এক মান্থলি পরীক্ষার খাতা বেরিয়েছিল সে দিন। ছুটির পর কারও কারও মা আসতেন নিতে। সেরকম একজন মা ঝাঁপিয়ে পড়ে খাতা দেখতে চাইলেন। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে খাতা বার করে দিল। মায়ের নম্বর পছন্দ হল না। তিনি বললেন, “ছি ছি ছি। এই দ্যাখ, তোর জন্য সন্দেশ এনেছিলাম, কিন্তু দেব না।" এই না বলে ক্লাস ফাইভে পড়া সন্তানের চোখের সামনে বাক্স খুলে কপকপ করে চারটে কাঁচাগোল্লা খেয়ে ফেললেন।

ট্রেনে এরকম আরেকজন মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি তাঁর পাশে বসা আরেকজন মায়ের সঙ্গে আলাপ করতে করতে যাচ্ছিলেন। ছেলেমেয়েরা যে কিছুই খেতে চায় না সে নিয়ে কথা হচ্ছিল। অন্য মা অনুযোগ করছিলেন যে ছেলে কিছুই খেতে চায় না। মানে চায়, কিন্তু সব খারাপ জিনিস। ডিমসেদ্ধ কপাকপ খেয়ে ফেলে কিন্তু হরলিক্সের গ্লাস যেমন কে তেমন পড়ে থাকে। সেই শুনে আমাদের মা বললেন, "আমি তো না খেলে একবার জিজ্ঞাসা করি, 'খাবি?' দুবার জিজ্ঞাসা করি, 'খাবি?' তারপর আর কথা না বাড়িয়ে নিজেই গ্লাস তুলে ঢক ঢক করে খেয়ে নিই।”

(এখানে খালি মায়েদের শাসন করার কথাই লিখছি। এই বাজারে, যেখানে টিভি খুললেই পরিষ্কার হয়ে যায় বাচ্চার সর্দি লাগা প্রতিরোধ করা থেকে শুরু করে দৌড়ে এরোপ্লেনকে হারাতে পারা থেকে শুরু করে ভাঙা পা নিয়ে সাঁতার কাটা শুরু করে নিজের জুতো গরিব বন্ধুকে দিয়ে দেওয়ার মহত্ব শেখানো সবই মায়েদের সাফল্য অথবা ব্যর্থতা, সেখানে কেবলমাত্র মায়েদের শাসনপদ্ধতি নিয়ে কথা বলাটা রিস্কি। লজ্জা পেয়ে আমি বাবাদের শাসনপদ্ধতি নিয়ে ভাবতে বসলাম। কিল চড় ঘুষি আর অত পরিশ্রম করার ইচ্ছে না থাকলে “কিস্যু হবে না” ভবিষ্যদ্বাণী ছাড়া আর কোনও ইন্টারেস্টিং উদাহরণ মনে পড়ল না। কাজেই আমি নিরুপায়। আপনাদের যদি বাবাদের শাসনের কোনও ইন্টারেস্টিং উদাহরণ জানা থাকে তাহলে মন্তব্যে এসে লিখতে পারেন।)

তবে স্কুলের শাসন বাবাদের সময়েও অদ্ভুত ছিল, আমাদের সময়েও ছিল। কিছু সাইকোপ্যাথ তখনও সেধে বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটানোর পেশা বেছে নিতেন, আমাদের সময়েও নিতেন। জোড়া স্কেল ক্লাস থ্রি-র বাচ্চার পিঠে ভেঙে ফেলতে দেখেছি আমি নিজে চোখে। আরেকজনকে দেখেছি, ক্লাসে খাতা না আনার বা ওই গোত্রের কোনও অপরাধের জন্য একটি বাচ্চা মেয়ের জামা খুলে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। এবং খুলতে শুরু করে দিয়েছেন। ক্লাসশুদ্ধু আতংকিত বন্ধুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেয়েটি ঠকঠক করে কাঁপছে।

আমি নিজে বেশি মারধোর খাইনি। মা শান্ত ছিলেন, আমি মায়ের থেকেও শান্ত ছিলাম। আমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালেই আমার হয়ে যেত। তবু চড়থাপ্পড় খেয়েছি কয়েকখানা। দুঃখের বিষয় সেগুলোর বেশিরভাগই অন্যের ভাগের। রাগ হলে যাদের ওপর রাগ হয়েছে তাদের ধরে মারা যায় না, তাই মা আমাকে ধরে মারতেন। তবে সে মার মাঝারি গোছের চড়ের সীমা ছাড়ায়নি কখনও। আমার এইরকম বোরিং শাসনের জীবনে একটা ঘটনা মনে রাখার মতো। তখন আমি খুবই ছোট। পাতিহাঁস আঁকা টেপফ্রক পরে ঘুরি। সেই সময় একদিন সন্ধ্যেবেলা ইংরিজি কোনও বানান উপর্যুপরি ভুল করার অপরাধে মা আমাকে বাগানে বার করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা যত এলেবেলে শুনতে লাগছে ততটাও নয়, কারণ তখনও আমাদের নতুন ঘর হয়নি, বাগান জুড়ে আম কাঁঠাল নিম পেয়ারা কুল নারকেলের ছড়াছড়ি। তারা সব ভূতের মতো হাতপা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। আর এখন কেন যেন মনে হয় সে রাতে চাঁদের আলোও ছিল না।

আমার ভয় করছিল খুবই, কিন্তু ভয়ের থেকেও চমকে গেছিলাম বেশি। তাই কাঁদিটাদিনি। মিনিটখানেক পরেই মা দরজা খুলে আমাকে তুলে আনলেন। অনেক অনেক দিন পর বকাঝকা নিয়ে গল্প করার সময় আমি মাকে বাগানের এপিসোডটার কথা মনে করাতে মা জিভ কেটে কান ধরেছিলেন। ঘটনাটা মা-ও ভুলতে পারেননি। কারণ নিজের আচরণ তাঁকেও অবাক করেছিল। তারপর মা আমাকে বললেন এ সবই হচ্ছে অবচেতনের খেলা। মায়ের যখন পাতিহাঁস আঁকা টেপফ্রক পরার বয়স ছিল তখন নাকি মানুষের দেহে ক’টা হাড় থাকে বলতে না পারায় সেজমাসি মাকে বাড়ির বাইরে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। ভাগ্যিস দাদু তখন বাজার করে ফিরছিলেন তাই মায়ের অপমান দীর্ঘ হয়নি। সেই থেকে মায়ের অবচেতনে ছিল যে শাসনের তূণে 'বাইরে বার করে দেওয়া’ অস্ত্রটা থাকা জরুরি। সে অস্ত্র জীবনে একবারের জন্য হলেও প্রয়োগ না করে মায়ের মুক্তি ছিল না।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.