October 18, 2020

মজাহীন পুজো



এবারের পুজোয় মজা হবে না, বলছেন কেউ কেউ। মাস্ক পুড়িয়ে কাছা উড়িয়ে আনন্দ করা যাবে না। হইহুল্লোড় নেই, দৌড়োদৌড়ি নেই, ভিড়ভাট্টা নেই। চাঁদা ওঠেনি বেশি। আলো জ্বলবে না। এ পুজো আবার পুজো নাকি?

পুজোয় আমাদের বাড়ি বেড়াতে আসার সময় তুতো ভাইবোনেরা (কেউ কেউ) হুবহু এই কথাই বলত। কোনও মানে হয়? পুজোয় সবাই কলকাতায় আসে, আর আমরা কি না মফঃস্বলে যাচ্ছি? তার থেকে বরং তোমরা এস, দেখে যাও কেমন হয় শহরের আনন্দের পুজো। তোমাদের দুঃখের পুজো উজিয়ে দেখতে যাওয়ার থেকে ঢের বেশি যুক্তিপূর্ণ হবে না কি সেটা?

তবু যাতায়াত হত দু'পক্ষেই। এখন যেমন ইচ্ছের জয় সর্বত্র, তখন তেমন কর্তব্যবোধের জমানা ছিল। অপছন্দের বা অসুবিধেজনক দূরত্বে থাকা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও নিয়ম করে যেত লোকে। দুঃখের পুজো সইতে হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও।

শহরতলির লোকদের পক্ষেও এই যাতায়াত খুব বেশি আনন্দের ছিল না। এমনিতে তো লোক-আসাসংক্রান্ত খাটনি - ডাল ভাতের বদলে ঘি ভাত, ট্যালটেলে মুসুরের বদলে ভাজা মুগ, চারাপোনার ঝোলের বদলে কচি পাঁঠার কষা, শুঁটকো চালতার চাটনির বদলে কাজুকিশমিশ পায়েস, বেডকভার বদলানো, জানালার পর্দা পাল্টানো। সবের ওপর উক্ত অতিথিদের আনন্দের পুজো ছেড়ে দুঃখের পুজো দেখতে আসার আত্মবলির মর্যাদারক্ষার্থে তটস্থ থাকা।

রিকশা থেকে নেমে মিষ্টির প্যাকেট হস্তান্তর করতে করতে অতিথিরা বলতেন, বাপরে বাপরে বাপ, ট্রেন লাইন তোরা থাকিস কী করে? কাজিন বলত, কী গো, তোমাদের পুজো হচ্ছে না নাকি এ বছর? কিছু টেরই পাচ্ছি না তো। মাইকফাইক বাজে না?

রীতিমত বাজে। এই তো সারাসকাল 'মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো' লুপে চলছিল, তারপর অঞ্জলির মন্ত্রও এ বছর থেকে মাইকে পড়েছেন ঠাকুরমশাই। আরেকটু আগে এলেই...

আরও আগে? আত্মীয়রা শিউরে উঠতেন। সেই কখন বেরিয়েছি, বাপ রে বাপ রে বাপ।

আমরা অধোবদন হতাম। সত্যি, আমাদের বাড়িটা লজ্জাজনক রকমের দূরে। তাঁদের পরিশ্রমের মর্যাদা দিতে গাড়ি (অ্যামবাসাডর) ভাড়া করে যাওয়া হত শ্রীরামপুরের পুজো দেখতে। হাজার হোক সাবডিভিশন শহর। এককালে শ্বেতাঙ্গদের উপনিবেশ ছিল। গঙ্গার ধারে সুদৃশ্য থামওয়ালা কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, কলকাতার প্রেসিডেন্সির পরে, বলা বাহুল্য, কিন্তু দেশের বাকি সব কলেজের আগে!

এ সব দেমাকে চিঁড়ে ভিজত না, উল্টে আমাদের দুরবস্থা আরও প্রকটই হত। শ্রীরামপুরের পুজোগুলোও ম্যাডক্স স্কোয়ারের সামনে শ্রাদ্ধবাড়ি।

প্রোটেক্টেড ছোটবেলার একটা সুবিধে হচ্ছে বাকিরা যে কত সুখী আর আমরা যে কত দুঃখী সেই সত্যিটার থেকেও প্রোটেকশন পাওয়া যায়। বড় হয়ে, দেখেশুনে, চোখ খোলে। একবার এক চেনা লোক তার এক চেনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলেছিল, দাঁড়া দাঁড়া, তোদের যেন কী একটা কমন ব্যাপার আছে... প্রিয় বই...উঁহু… প্রিয় সিনেমা... রাদার সত্যজিৎ দ্যান ঋত্বিক.. উঁহু তাও না...ইস পেটে আসছে মুখে আসছে না.. অ্যাই কুন্তলা, তোর বাড়ি ট্রেনলাইনে না? কোথায় যেন? দত্তপুকুর?

না না, দত্তপুকুর তো শিয়ালদা লাইন, আমার লাইন হাওড়া। রিষড়া।

ইউরেকা! তুইও রিষড়ার লোক না? অতি টিপটপ ভদ্রলোককে মিউচুয়াল ফ্রেন্ড পাকড়াও করলেন।

সে ভদ্রলোক যত বলেন, লোক আবার কী? জন্মে থেকে মোটে পঁচিশ বছর পর্যন্ত তিনি রিষড়ায় থেকেছেন, তারপরের জীবনটা এক্সক্লুসিভলি মেট্রো এবং মেগাপলিসে ঘুরে ঘুরেই কেটেছে। মুম্বাই, মিউনিখ, ম্যানহ্যাটান... তত আমাদের কমন চেনা বলে যান, চিনতিস নাকি একে অপরকে? কতদূর তোদের পাড়া? গঙ্গায় চান করতে যেতিস? ট্রেনে ডিমসেদ্ধ খেতিস?

আমার ভদ্রলোককে দেখে মায়াই হচ্ছিল। রিষড়ায় কাটানো ওঁর বিশ্রী, দুঃখী শৈশব, কৈশোর, প্রাকযৌবন বিষয়ে ততদিনে ওঁর চোখ ফুটে গেছে, তাই উনি সে দুঃখের কথা আর মনে করতে চান না।

একটু দেরিতে হলেও, আমারও মায়া কেটেছে। কী দুঃখের পুজোই না কাটিয়েছি শৈশবে। বিশেষ করে দাগ রেখে গেছে একটা দুঃখের অষ্টমী। যে দুঃখে সে বছরের অষ্টমীর জামাটারও অবদান ছিল। জামাটা মা এনে দিয়েছিলেন। বাড়ি থেকে ওই একটাই জামা হত। তবে সেজকাকু, ছোটকাকু, জেঠু, বড়, মেজ, ছোট মামা, বড়, মেজ, সেজ, ছোটমাসি মিলিয়ে আমার পুজো কালেকশন কম হত না। কোনটা কোন দিন পরা হবে সেই নিয়ে চিবুক-চুলকোতে হত। সাধারণতঃ সাদা, আকাশি, গোলাপি, কচি কলাপাতা ইত্যাদি 'লাইট' কালারের জামাগুলো (বাড়ির জামা অবধারিত এই গোত্রে পড়ত) ষষ্ঠী বা সপ্তমীতে পরা হত। আর দেখতেশুনতে হাল্লারাজার জোব্বার কাছাকাছি 'ডিপ' কালারের জামাগুলো, যেগুলো পরামাত্র গলগল ঘাম হয় আর গা কুটকুট করে, তুলে রাখা হত অষ্টমী আর নবমীর জন্য।

সে বছর কেন যেন মা আমার জন্য ওইরকম একটা গা কুটকুটে জামা কিনে এনেছিলেন। তার রং লাইট ঘিয়ে হলেও বাকি আর কিছুই লাইট নয়। চুমকিটুমকি বসানো। এদিকসেদিকে নেট, লেসের কারিকুরি।

কেন কিনে এনেছিলেন মা জামাটা ভগবান জানেন। তার আগের প্রতি বছর এবং পরের বছরগুলোতেও মা নিউ মার্কেট থেকে ছিট কাপড় কিনে এনে দেবশ্রী টেলারিং থেকে জামা বানিয়ে আনতেন। সে বছর কেন হঠাৎ শ্রীরাম আর্কেডে গিয়ে লিফটে চড়ে মহার্ঘ জামা কিনতে গিয়েছিলেন মা, রহস্য। থাকলে ফোন করে সমাধান করে নেওয়া যেত।

জামাটা যে দেখতে খুব চমৎকার ছিল তা নয়। দেবশ্রীর ক্যাটালগ দেখে বানানো ছিটকাপড়ের জামার বেশিরভাগই ওর থেকে সুদৃশ্য ছিল। পরে জেনেছি, সুন্দর দেখানোটা অনেকক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য হচ্ছে 'এক্সপেনসিভ' দেখানো। সে উদ্দেশ্য ওই জামা সফল করেছিল। আলো পিছলানো, সলমাচুমকি বসানো, হাত ছোঁয়ালে মোটা সুতির আশ্বাসের বদলে সরসরে সিনথেটিকের গা-শিরশিরানো মিলিয়ে জামাটা যে দামি সে আর বলে দিতে হচ্ছিল না। আমার ওয়ার্ডরোবে (গোদরেজ আলমারির একটা তাকের অর্ধেক) ও রকম জামা আর ছিল না।

মা নিজেও অস্বস্তিতে ভুগছিলেন। বারবার বলছিলেন, একটু বেশি খরচ হয়ে গেল, কিন্তু ভালো হয়েছে না সোনা জামাটা? তোর পছন্দ হয়েছে? সত্যি সত্যি?

আমি জোরের সঙ্গে বলেছিলাম, মচৎকার জামা হয়েছে মা। কোথায় রেডিমেড, কোথায় হাতে বানানো। তাছাড়া হাতে বানানো মুখমোছা জামাদের মধ্যে না হয় থাকল একটা চুমকি বসানো রেডিমেড জামা। আফটার অল, বৈচিত্র্যই জীবনের সম্পদ।

তখন মা আর চেপে রাখতে না পেরে জামার দামটা বলেই ফেলেছিলেন। এ-গা-রো-শো টাকা।

শিউরানিটা কতটা চাপা দিতে পেরেছিলাম কে জানে। আমি তখন ডেইলি পাঁচ পাঁচ দশটাকা রিকশাভাড়া অ্যালাউয়েন্স পাই। হাজার টাকা ব্যাপারটা থিওরিতে সম্ভব জানি, বাস্তবে বিশ্বাস করি না।

মা নিশ্চয় করতেন, তবে তাঁর অস্বস্তিটা ছিল অন্য জায়গায়। অ্যাফর্ডেবিলিটি নিয়ে নয়, নীতির প্রশ্নে। খাইখরচ, বই কেনা, বেড়াতে যাওয়া, পোশাকআশাক, রেস্টোর‍্যান্টে খাওয়া - কোন খাতে কত খরচ করা যাবে তার একটা নির্দিষ্ট হিসেব বা আইডিয়া সে আমলের মধ্যবিত্তর ছিল। আর সে হিসেবের ভিত্তি ছিল বাঙালির বর্ণপরিচয়ের অরিজিন্যাল চার অক্ষর। ব-এ হ্রস্ব ই ল-এ আ-কার দন্ত্য স-এ হ্রস্ব ই ত-এ আ-কার। ও জিনিসের পাল্লায় একবার পড়লে সন্তানের চরিত্রগঠনের ওইখানেই ইতি। পাশের বাড়ির হিংসুটে পাকা বাচ্চা লাগবে না, নিজের বাচ্চা আপসে গোল্লায় যাবে।

দামি জিনিসের আরেকটা ঝামেলা হল, সে সস্তা সংসর্গে থাকতে পারে না। একটা দামি জিনিসের জন্য অন্য দামি জিনিস লাগে। দাম দিয়ে গ্যাজেট কিনলে ভয় হয়, চিমনিহীন রান্নাঘরের তেলমশলায় দামের চমক চটল বলে। নিজের লোভের ওপর তো আর রাগ করা যায় না, সব রাগ গিয়ে পড়ে পূর্বপুরুষের রান্নার ছিরির ওপর। যা পাচ্ছে ভেজে দিচ্ছে। যেমন অস্বাস্থ্যকর, তেমন গাঁইয়া। গাদা গাদা সম্বার-ফোড়ন, চটাসপটাস, ফুট ফাট, খুকখুক, হ্যাঁচ্চোম্যাচ্চো। ভদ্র জায়গায় রাঁধার উপায় নেই, স্মোক অ্যালার্ম বাজতে শুরু করবে। হাউ এমব্যারাসিং। চিমনিটা এ মাসে হয়ে যাক, পরের মাসের টার্গেট এয়ার ফ্রায়ার। হাওয়ায় শিঙাড়া ভেজে দেবে। খেতে যেমনই হোক, রান্নাঘর নোংরা হবে না।

মোদ্দা কথা, এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে ওই ফোর ডিজিট দামের জামা পরে টিউবলাইট জ্বালানো প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো যায় না। ঝাড়লন্ঠন মিনিমাম লাগে।

আর ঝাড়লন্ঠন চাইলে কলকাতা যেতে হয়। হোলনাইট ঠাকুর দেখার সাহস বা শক্তি আমাদের কারওরই ছিল না, কাজেই ঠিক হল খেয়ে উঠে বেলা থাকতে থাকতে কলকাতা গিয়ে ঠাকুর দেখে রাত থাকতে থাকতে ফিরে এসে শান্তিতে ঘুমোনো যাবে।

বুড়োদের গল্প বলতে এত সময় লাগে কেন জানেন? গল্পের স্টক বেশি হওয়াটা যত না কারণ, তার থেকে বড় কারণ হচ্ছে একটা গল্পের পেছনে মেলা তথ্যপ্রমাণ সাপ্লাই দিতে হয়। এক কথা একশোবার ইনিয়েবিনিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা চালাতে হয়। না হলে সবই 'গুল্প'-এর মত শুনতে লাগে।

এই যেমন নবীন প্রজন্ম আমার এই গল্পটা শুনে বলবে, অষ্টমীর সন্ধেবেলা ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুর থেকে ট্রেনে চড়ে এসে গঙ্গা পেরিয়ে শহরে ঢুকে ঠাকুর দেখে রাত হওয়ার আগে বাড়ি ফিরে ঘুমোবে, ইয়ার্কি হচ্ছে?

একটুও ইয়ার্কি না। অন গড ফাদার মাদার। এখন যেমন গায়ে তেল মেখে তৃতীয়ার দুপুররাতে না বেরোলে আধখানা ঠাকুরও দেখা যায় না, জ্যামে দাঁড়িয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে প্যান্ডেলের আলোর আভাস পেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়, আমাদের আমলে সে রকম ছিল না। আমরা অষ্টমীর দিন খেয়ে উঠে, চল চল সন্ধে নামলে ভিড় হয়ে যাবে, তাড়া দিতে দিতে জানালা বন্ধ করতাম, (আশ্বিন মাসের সন্ধেবেলা জানালা খোলা রাখলে যা মশা ঢুকবে, বাড়ি ফিরে আর ঘুমোতে হবে না। পুজোর দিনে মশারাও সপরিবারে বেরোবেন, গায়ে হাতে পায়ে দুই আঙুলের ফাঁকে, যেখানে চাপড় মারা তো দূরের কথা ভরপেট রক্ত খেয়ে উড়ে যাওয়ার পর আরাম করে চুলকোনোও যায় না, পাত পেড়ে ভোজে বসবেন),  ট্রেনে চড়ে শহরে গিয়ে, সারা সন্ধে ঠাকুর দেখে, গোড়ালির ওপরের নরম চামড়ায় জুতোর সেলাইয়ের জ্বলুনি সয়ে, রাতের ট্রেনে ঘামতে ঘামতে, হাই তুলতে তুলতে বাড়ি ফিরতাম। সিট পাওয়ার প্রশ্নই নেই, পা খুলে আসছে। টেনশন হচ্ছে যদি রিকশাস্ট্যান্ড ফাঁকা হয়ে যায় তাহলে আবার স্টেশন থেকে হেঁটে বাড়ি যেতে হবে (হত, প্রত্যেক বছর) আর নিজেদের মন্দবুদ্ধিকে শাপশাপান্ত করছি। কলেজ স্কোয়ারের ওই চিমসেমুখো ঠাকুর দেখার লাইনে ফালতু সময় নষ্ট হল। না হলে আরও দুটো প্যান্ডেল ঘোরা হয়ে যেত।

খেয়ে উঠতে না উঠতে নীল আকাশের সাদা মেঘ কুচকুচেবর্ণ ধারণ করে পৃথিবীর ওপর ফেটে পড়ল। বেলা চারটে নাগাদ কলকাতার উচ্চাশা ছেঁটে শ্রীরামপুরে নামিয়ে আনা হল। সন্ধে ছ'টার সময় বৃষ্টি যখন ধরল ততক্ষণে রিষড়ার চৌহদ্দির বাইরে বেরোনোর আশা অতি বড় অপ্টিমিস্টেও করবে না।

রিষড়াই সই। ধরাচুড়ো পরে বেরিয়ে হাফ মাইল পর পর চল্লিশওয়াটের বাল্ব জ্বলা ল্যাম্পপোস্টখচিত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে প্রথম প্যান্ডেলটার পাঁচশো মিটারের মধ্যে পৌঁছেছি, আবার নামল।

ক্যাটস অ্যান্ড ডগস বৃষ্টি। দৌড়ে একটা বন্ধ দোকানের ঝাঁপের নিচে পৌঁছতে পৌঁছতে নতুন জামা গায়ে সেঁটে গেল, কপাল বেয়ে জলের ধারা চশমার ওপর দিয়ে বইল। সঙ্গে হাওয়া। মাঝ-অক্টোবরের রাতে, অল্প অল্প কাঁপতে কাঁপতে, ভিজতে ভিজতে আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম, ঝড়ের দাপটে দু'হাত দূরের ল্যাম্পপোস্টের বাল্ব দপদপিয়ে নিভে গেল।

দোকানের চালের অপ্রতুল আশ্রয়ে আরও দুজন লোক ছিলেন, মনে আছে। তাঁরা অবশ্য পুজো দেখতে বেরোননি। একজনের হাতে পুরোনো রঙের ডিব্বায় আঠা, অন্যহাতে ব্রাশ, অন্যজনের হাতে গোল্লা পাকানো পোস্টারের তাড়া। বৃষ্টি নামার আগে পর্যন্ত তাঁরা এদিকসেদিক পোস্টার সেঁটে বেড়াচ্ছিলেন। কীসের পোস্টার দেখতে পাইনি, তবে মোটামুটি গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় কাস্তে হাতুড়ি তারার। তখন ও সব দিকে অন্য কেউ বিশেষ ছিল না।

বললাম না, গুল্পের মতো শুনতে লাগে।

মিনিট পঞ্চাশ পর হাওয়া কমল। বৃষ্টি ধরার আশায় ছাই দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। অষ্টমীর রাত, খাঁ খাঁ রাস্তা, জলের ছাড়া আর শব্দ নেই কোথাও।

বাড়ি পৌঁছে মা গরম জল বসালেন, বৃষ্টির জল ধুয়ে ফেলতে হবে যাতে ঠাণ্ডা না লাগে। তারপর চা/কফি/গরম দুধ, ডিনারের পর্ব সেরে, মা সেই ভিজে জামা ইস্তিরি করতে বসলেন। সুতির জামা হলে নিংড়ে দুবার ঝাপটা মারলেই ঝামেলা মিটত। দামি জামার সঙ্গে ও সব হেলাছেদ্দা চলবে না।

ভেবেছিলাম আপনাদের মধ্যে যদি কেউ থেকে থাকেন, মজাহীন পুজো নিয়ে আফসোস করছেন, তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এই অষ্টমীর সন্ধেটার কথা লিখব। অনেকসময় লোকের দুঃখ দেখলে নিজের কষ্ট কম ঠেকে। লেখার পর বুঝছি তিন দশকেরও বেশি যত অষ্টমীর রাত মিলেমিশে একাকার, শুধু ওই মজাহীন অষ্টমীর রাতখানা জ্বলজ্বলে থেকে গেছে। জ্বলজ্বলেই, দগদগে নয়। রাতটার কথা মনে এসেছিল বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজতে মাজতে। চশমা ছিল, কাজেই অজান্তে ফুটে ওঠা হাসিটা কল্পনা করছি না।

বলা যায় না, আপনার এ বছরের পুজোটাও আমার সেই বছরের পুজোটার মতো হবে হয়তো। মজাহীন, কিন্তু মেমোরেবল। বছর কুড়ি বাদে সব মজা বাষ্প হয়ে উড়ে গেলে হয়তো দেখবেন পড়ে আছে এই মেমোরিটাই।


October 11, 2020

স্যার পোয়্যারো!

 

উৎস গুগল ইমেজেস


আত্মপ্রকাশের শতবর্ষে এর থেকে ভালো কিছু এরক্যুল পোয়্যারোর জীবনে ঘটতে পারত কি? আগাথা ক্রিস্টির প্রথম উপন্যাস প্রকাশ এবং পোয়্যারোর একশোতে পা রাখার পোস্ট প্রায় রেডি, কিন্তু এই খবরটা উদযাপনের তর সইল না।

ডেভিড সুশে পঞ্চাশ বছর ধরে নাটক, টিভি, সিনেমায় অভিনয় করছেন, বহু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন, এমনকি ইন্সপেক্টর জ্যাপ পর্যন্ত সেজেছেন। ওঁকে যখন লোকে জিজ্ঞাসা করেছে, এতদিনের সব অভিনয়ের অভিজ্ঞতা সব যখন পোয়্যারোর সমুদ্রে ডুবে মরল, সবাই যে শুধু আপনাকে বাতিকগ্রস্ত বেলজিয়ান ডিটেকটিভ বলেই চিনে রাখল, তাতে রাগ হয় না? অবিচার মনে হয় না?

ডেভিড সুশের যত ইন্টারভিউ দেখেছি, পড়েছি, শুনেছি, প্রশ্নটা অবধারিত এসেছে এবং সুশে অবধারিত হাসিমুখে বলেছেন, সেটা হওয়াই তো স্বাভাবিক। দুঃখ পাব কেন বালাই ষাট, এ তো পরম পাওয়া। 

বইয়ের পোয়্যারোর থেকে টিভির পোয়্যারো এককোটি গুণ ভদ্র, নম্র, বিনয়ী ভালোমানুষ। তাই টিভির পোয়্যারোকে আমার এককোটি গুণ ভালো লাগে। সে-ই পোয়্যারো যখন নাইটহুড পেলেন, দৌড়ে সবাইকে খবরটা দিতে ইচ্ছে হল।

অভিনন্দন, স্যার পোয়্যারো!


October 09, 2020

অফসিজন রেজলিউশন



নিজেকে পছন্দ করার আমার যে দেড়খানা কারণ, তার মধ্যে গোটা কারণটা হল যে আমি এমন একজন লোক যার সময়ের টানাটানি হয় না। কখনও হয়নি। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকের আগে সাড়ে ন'টায় ঘুমোতে গেছি, পরীক্ষা শুরুর আগের দিন মায়ের সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়েছি, তেমন ঠাণ্ডা পড়লে নাওয়া ভুললেও খাওয়ার সময় ঠিক বার করে নিয়েছি।

আমার গর্বের সেই জায়গা টলতে বসেছে। আমারও সময়ের অভাব ঘটেছে। দিনটা চব্বিশ ঘণ্টার না হয়ে আটচল্লিশ ঘণ্টার কেন হচ্ছে না সেই নালিশটা করছি না জাস্ট এই জন্য কারণ আমি অলমোস্ট নিশ্চিত বাড়তি চব্বিশ ঘণ্টাও কাজের পেছনে বা কাজ-করছি-না নখকামড়ানির পেছনেই খরচ হয়ে যাবে। আরাম কিছুই হবে না। ওই নরকভোগের জন্য চব্বিশ ঘণ্টা এনাফ।

সময় নেই মানে কী? রাতে কি ঝাড়া সাত ঘণ্টা ঘুমোচ্ছি না? দিনে তিনবার ভরপেট, সাতবার কিছুমিছু খাচ্ছি না? ইউটিউবে হাতে বানানো উনুনে, কাঠের জ্বালে অথেনটিক বিরিয়ানি রাঁধা দেখছি না?

আমার দৈনিক টু ডু লিস্ট কি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির টু ডু লিস্টের মতো দেখতে হয়ে গেছে?

অফ কোর্স, না।

কিছুই বাদ পড়েনি, সবই চলছে, চলার ধরণ খালি পালটে গেছে। আগে যেমন বুক বাজিয়ে আড়াইঘণ্টা একটানা ক্যান্ডি ক্রাশ খেলা যেত, এখন একচোখ স্ক্রিনের ঈশানকোণের ঘড়িতে রেখে চট করে একদান খেলে নিতে হয়। মিডসামার মার্ডারসের পঁচিশবার দেখা এক ঘণ্টা তেত্রিশ মিনিটের এপিসোড ছাব্বিশতম বার চালানোর আগে স্পিড বাড়িয়ে সাড়ে ছেচল্লিশ মিনিটের করে নিতে হয়।.বিবেকের চোখে চোখ ফেলা এড়িয়ে বলতে হয়, ওর মধ্যে ডিনারটাও সেরে নেব, আলাদা সময় নষ্ট করব না, এই ল্যাপটপ ছুঁয়ে বলছি।

বাদ যে পড়েছে, সে অবান্তর। মনে পড়ে না গত দশ বছরে, পনেরোদিনের বেশি না পোস্ট না ছেপে থেকেছি কি না। আগামীকাল শেষ পোস্ট ছাপার পনেরোদিন হবে, তাই আজ জরুরি কাজ লেখা ফেলেও পোস্ট লিখছি। এ রেকর্ড ব্রেক না করলেও চলবে।

করলেই বা কী? লোকে সিগারেট ছেড়ে দেয়, প্রেম ছেড়ে দেয়, কত কত বছরের প্রিয় মানুষকে চিরকালের মতো ছেড়ে দেয়। ছাড়লেই ছাড়া। ধরে থেকেই বা কী হাতিঘোড়া হচ্ছে। সেদিন একজন আমার মুখের ওপরই প্রশংসা করে বললেন, ধন্যি আপনার অধ্যবসায়, বছরের পর বছর ধরে ব্লগটা যে ভাবে মেন্টেন করেছেন উইদাউট এনি ভিজিবল সাকসেস, খুব কম লোকেই পারত।

এ জিনিস হামেশাই ঘটে আমার সঙ্গে; দেখতেশুনতে প্রশংসার মতোই লাগে, কিন্তু মন খুলে খুশি হতে পারি না। একবার পোয়্যারো হেস্টিংসকে খুব তোল্লাই দিয়ে বলেছিল, "আমাদের এক্ষুনি একজনকে দরকার যাকে দেখলেই বোকা মনে হয়, তুমি সে রোলে অপরিহার্য, মনামি হেস্টিংস।" আমার দশা ওই হেস্টিংসের মতো। "আমাগো সোনার রং কালো অইলে অইব কি, মন এক্কেরে দুধের মতো সাদা" থেকে শুরু করে অবান্তরে "অনেকদিন পর/অবশেষে/ফাইন্যালি একটা ভালো লেখা পেলাম" পার হয়ে শেষমেশ "উইদাউট ভিজিবল সাকসেস।"

থতমত অবস্থা কাটিয়ে স্থির করলাম ওঁর বক্তব্যের একটা অংশের সঙ্গে আমি একমত। "যেমনই হোক, কিছু একটা হচ্ছে" আশ্বাস না থাকলে কোনও কাজ চালিয়ে যাওয়া শক্ত। কিন্তু উইদাউট ভিজিবল সাকসেস অবান্তর চালিয়ে নিয়ে যাওয়া-সংক্রান্ত প্রশংসা করার অংশটার সঙ্গে প্রাণ পণ করেও একমত হতে পারলাম না। ভাবার চেষ্টা করলাম, আমি সত্যিই মারাত্মক অন্যরকম, বিনা রিটার্নে অবান্তরের মাটি কামড়ে পড়ে আছি, পারলাম না।<

সত্যিটা হচ্ছে আমার কখনওই অবান্তরকে আনসাকসেসফুল মনে হয়নি। আমার বাকি জীবনের ছিরি নিয়ে সবার সন্দেহ আর করুণা দুই-ই বাড়বে জেনেও স্বীকার করছি - অবান্তর আমার জীবনের অন্যতম সাকসেস স্টোরি।

উইদাউট ভিজিবল সাকসেস অবান্তর কামড়ে পড়ে আছি কেন-র থেকে ঢের বেশি রহস্যজনক প্রশ্ন বরং এতদিন পড়ে থাকার পরেও পরেও "লেখা" সোজা হয় না কেন। কে যেন গল্প বলেছিল, "সুনীলদা, প্লিজ..." শোনার কুড়ি মিনিটের মধ্যে দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় লিখে, এডিট করে, হাতে ধরিয়ে, টা টা করে অফিস থেকে বেরিয়ে যেতে পারতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সুনীলদা নই কাজেই কুড়ি মিনিটের উচ্চাশা যদি ছেড়েও দিই, পনেরোশো শব্দে মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য কুড়ি ঘণ্টা অন্ততঃ যথেষ্ট হওয়া উচিত?

হয় না। একেকটা পোস্ট লিখে শেষ করতে অনন্ত সময় লাগে। আমি অতীব পারফেকশনিস্ট বলে নয়। প্যারাগ্রাফের সৌকর্ষ বাড়ানোর পেছনে পরিশ্রম করার থেকে প্যারাগ্রাফটাই উড়িয়ে দেওয়া আমার কাছে বেশিরভাগ সময়েই প্রেফারেবল। এই ঢিলেমোর জন্য দায়ী আমার নিজেকে খারাপ লাগার হাজার কারণের একটা। হিসেব কষে দেখেছি একটা দু'ঘণ্টার কাজের জন্য আমার তিরিশ মিনিট ওয়ার্মিং আপ, মাঝে পঁয়তাল্লিশ মিনিট টিফিন, শেষে ঘণ্টা তিনেকের উদযাপন লাগে। এই মুহূর্তে ওই পরিমাণ সময় খরচ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। যেটুকু ফাঁক পাই পরিশ্রম করতে ইচ্ছে করে না। ডবল স্পিডে এক এপিসোড মিডসমার মার্ডারস দেখে নিতে মন চায়।

পরিস্থিতির আশু পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ একসময় যে রেটে অবান্তরের পাতা ভরত, অদূর ভবিষ্যতে সে রেটে আর ভরবে না।

খালি সারাদিনের আবোলতাবোল হাবিজাবি ব্যস্ততার মধ্যে মন যেমন অবান্তরে পড়ে থাকত, তেমনই পড়ে থাকবে। খারাপ লিখলেও লিখব, ভালো লিখলেও লিখব। সময় থাকলেও লিখব, সময় না থাকলেও লিখব। কম লিখব, রেগুলার লিখব। এক তাৎপর্যপূর্ণ বছরের তাৎপর্যহীন এক বৃহস্পতিবারের সন্ধেবেলায় এই আমি আমাকে কথা দিলাম।


September 25, 2020

পরাপরি বিষয়ে



স আমাদের নিচের তলার সহভাড়াটে। চাকরিসুবাদে কাশ্মীরের গুলিগোলার মধ্যে স-এর নিত্য যাতায়াত। আমি, বলা বাহুল্য, ইমপ্রেসড। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বেলাতে আমাদের বন্ধু না পড়লেও শত্রু কমন পড়েছে, কাজেই ভাব হতে দেরি হয়নি।

মোদ্দা কথা, স-এর সামনে পড়লে আমি নিজের বেস্ট ফুট ফরওয়ার্ডের চেষ্টায় থাকি। হাসি না পেলেও হাসি, খবর নেওয়ার দরকার না থাকলেও নিই, বাথরুম চেপে দাঁড়িয়ে দেশের-দশের আলোচনা শুনতে শুনতে ঠিক ঠিক জায়গায় মাথা নাড়ি। অন্ততঃ নাড়ার চেষ্টা করি। ভুলভ্রান্তি হয় না বলব না, তবে চেষ্টার অভাবে নয়।

সেই স-এর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। অথচ দেখা হওয়ার কথা ছিল না। সাড়ে ন’টা বাজতে যাচ্ছিল, কী খাব কী খাব গবেষণায় সন্ধে থেকে যত সময় বইয়েছিলাম তাতে বিরিয়ানি রেঁধে খেয়ে ফেলা যেত। কিন্তু জেদ চেপে গেছিল, অর্ডার করেই খাব। বিশ্বশুদ্ধু কুইজিন পার হয়ে কাঠি রোলে এসে ডুবে মরলাম। আমি খাব মাশরুম রোল, অর্চিষ্মান চিকেন না কীসের রোল অর্ডার করেছে। বাড়িওয়ালার সঙ্গে সারা বিকেল বসে ইলেকট্রিক বিলের হিসেব কষে এসেছে, লজ্জার মাথা খেয়ে ওকে আবার খাবার আনতে বলা যায় না। অগত্যা আমিই গেছি। ডেলিভারি ভাইসাবের দেখা নেই, আমার নার্ভাসনেস ক্রমশ চড়ছে। যদিও ম্যাপে ওঁর বাইক তিন মিনিট দূরে দেখাতেই গেটে এসে দাঁড়িয়ে আছি, তবু হয়তো মিস হয়ে গেছে। ফিরে এসে বকবেন। ভুল করে অন্য গলিতে ঢুকে পড়েছেন তাও হতে পারে, ঘুরেঘারে ঠিক গলিতে এসে, এ রকম ভুল হয়ে যাওয়া গলিতে ডেলিভারি দেওয়া হেবি ঝামেলার, আপনারা তো অর্ডার দিয়েই খালাস, বলেও বকতে পারেন।

অল্প অল্প ঘামছি আর গলা বাড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছি এমন সময় পেছন থেকে স বলে উঠল, ডিনারের অপেক্ষায় বুঝি?

চমকে উঠেছিলাম। সামনে মেলা গ্রাউন্ডের অশ্বত্থ, কাপাস, ডাইনে বাঁয়ে বাড়িওয়ালার আম আর প্রতিবেশীর ঘোড়ানিমের ছায়ায় গেটের কাছটা ঝুপসি হয়ে থাকে। তার মধ্যে বেড়ালটা এমন নিঃশব্দে হাঁটাচলা করে যে ভয় লাগে কোনদিন না অজান্তে গায়ে পা দিয়ে ফেলে নিজের আর বেড়ালের - দু’পক্ষেরই হার্টফেল ঘটাই। স্কুলে অবশ্য পড়েছিলাম বেড়ালরা অন্ধকারে দেখতে পায়, কাজেই আমি না দেখতে পেলেও ও আমাকে দেখতে পাবে এবং দুজনেরই প্রাণ বাঁচাবে, সেই ভরসায় থাকি।

প্রতিবেশী বারান্দার সাদা আলো গাছের পাতার ফাঁকটাক দিয়ে যেটুকু এসে পড়েছিল, বাঁচিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। কারণ হচ্ছে সেই মুহূর্তে আমি রাস্তায় বেরোনোর উপযোগী পোশাক পরে ছিলাম না। নিম্নাঙ্গে নীল পাজামা সেটের নীল প্যান্ট, ঊর্ধ্বাঙ্গে হলুদ পাজামা সেটের হলুদ শার্ট পরে, হলদে-সবুজ ওরাং ওটাং হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রোলের অপেক্ষা করছিলাম।

এমন সময় স-এর উৎসাহব্যঞ্জক কুশলপ্রশ্ন।

প্রশ্নের ল্যাজা থেকে উৎসাহ উবে যাচ্ছে টের পেয়েছিলাম পেছন ফিরতে ফিরতেই, পেছন ফিরে আবছা আলোয় ঘটনাটা দেখলাম স-এর মুখেচোখেও। উৎসাহ থেকে ক্রমে আতংকে অবতরণ। শেষটা হেঁ হেঁ ভঙ্গিতে চোখে চোখ ফেলা প্রাণপণ এড়িয়ে গেটের বাইরে পার্ক করা বাইকে চড়ে স অন্তর্হিত হল।

হলটা কী? একটা ঘোরতর সন্দেহ উঁকি মারল। এই যে হলুদ শার্টটা, এটার বয়স মান্ধাতার কাছাকাছি। বছরের পর বছর পরতে পরতে, ধুতে ধুতে, ন্যাতাতে ন্যাতাতে, জায়গায় জায়গায় অল্প অল্প ফাঁসতে ফাঁসতে অবশেষে কাল রাতে স্রেফ পাশ ফিরতে গিয়ে শরীরের চাপে ফ্যাঁআআআস আওয়াজ করে একটি প্রকাণ্ড ছ্যাঁদার জন্ম হয়েছে। একটু আধটু নয়, রীতিমত লম্বাচওড়া। সকালে উঠে জামা ছেড়ে রেখেছি, সন্ধে নামতে আবার সেই জামাই পরে ফেলেছি। পিঠের প্রকাণ্ড গর্তের কথা ভুলে মেরে দিয়ে।

কল্পনা করলাম, আমার জামায় বিঘৎখানেক ফোঁকর; ফোঁকর দিয়ে আমার বিঘৎখানেক পিঠ, অন্তর্বাসের ফিতেটিতেশুদ্ধু নির্লজ্জের মতো ড্যাবডেবিয়ে আছে।

ঠাকুমা বারান্দায় বসে মশা মারতে মারতে রাস্তা দিয়ে যাওয়া মেয়েদের পোশাক নিয়ে কমেন্ট পাস করতেন। রাস্তা দিয়ে যাওয়া বেশির ভাগ মানুষকে নিয়েই ঠাকুমা কমেন্ট পাস করতেন অবশ্য। কে যাচ্ছে, তার দেশ কোথায়, তার বংশে চোদ্দপুরুষে কারও বরিশালের সঙ্গে কোনও মেলামেশা ছিল কি না, তার বাড়িতে বছর দশেক আগে কী যেন একটা স্ক্যান্ডাল ঘটেছিল। বাকিদের ক্ষেত্রে যদি বা ক্বচিৎকদাচিৎ গাফিলতি ঘটত, মশা মারতে মনোযোগ টলে যাওয়া ইত্যাদি, কোনও মেয়ে অসুবিধেজনক পোশাক পরে বাড়ির সামনে দিয়ে পাস করলে ঠাকুমা উইদাউট ফেল লক্ষ করতেন এবং মতামত প্রকাশ করতেন। (বলা বাহুল্য, মেয়েটির কান বাঁচিয়ে। ঠাকুমা আর যাই হোন বোকা ছিলেন না। তাঁর সেলফ-প্রিজার্ভেশন বোধ আজীবন টনটনে ছিল।) ঠাকুমা সবথেকে কুপিত হতেন জিনসপরা মেয়ে দেখলে। আমি জিনস পরা শুরু করার পরও কোপ কমেনি। শুধু কারণটা বদলে গেছিল। আমাগো সোনা জিনস পরে বলে কি বিশ্বশুদ্ধু মেয়ে জিনস পরে ঘুরবে? এটা কি মগের মুলুক?

একটা কথা এ বেলা পরিষ্কার করে রাখি। আমার ঠাকুমা ও রকম ছিলেন বলে আমি দাবি করছি না সবার ঠাকুমাই এ রকম হবেন। এই অবান্তরেই অনেক বছর আগে ঠাকুমার বৈধব্যপালনের গল্প ফেঁদে আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে আমার ঠাকুমা যখন প্রাণপণ বৈধব্য পালন করছিলেন তখন বাংলাদেশের বেশিরভাগ সমসাময়িক বিধবাই প্রেমসে মুরগির ঠ্যাং চিবোচ্ছিলেন। যাঁরা লজ্জা পাচ্ছিলেন তাঁদের বাড়ির লোকেরা,  “এসব বাজে নিয়ম মানলে আমার মরা মুখ দেখবে,” অনুযোগ সহযোগে কোর্মাকালিয়ার বাটি মুখের কাছে ধরছিলেন। কাজেই আমার ঠাকুমা অকথ্য সেকেলে ছিলেন, আমাদের বাড়ি চরম ব্যাকওয়ার্ড ছিল, আর আমাদের পাড়া আর সোশ্যাল সার্কেলটা ছিল আস্ত একটা ডিসটোপিয়া। সে ডিসটোপিয়ায় কে কী পরবে-র থেকেও জরুরি ছিল কে কতখানি পরবে-র প্রশ্নটা।

উইদাউট ফেল, বেশি পোশাক পরা কম পোশাক পরার থেকে বেটার মনে করা হত।

আমি কিন্তু বেশি আব্রুর কথা বলছি না, বেশি কাপড়ওয়ালা পোশাক বলছি। না হলে ভদ্র পোশাকের বাজারে শাড়ির দর অত তেজী হওয়ার কোনও কারণ নেই। বারো হাত কাপড়ের একটা পোশাক সাড়ে তিন হাত একটা শরীর আগাপাশতলা ঢাকা দিতে ওইরকম ব্যর্থ হয় কেন সেটা পৃথিবীর টপ তিনটে রহস্যের মধ্যে পড়বে। আব্রুর কম্পিটিশনে সালওয়ার কামিজ কোলবালিশের খোলকে ফেল ফেলবে যে কোনও দিন, অথচ শাড়ির তুলনায় সালওয়ার কামিজকে স্ক্যান্ডালাস ধরা হত। ম্যাক্সি, নাইটি, কাফতান - গ্লোরিফায়েড কোলবালিশের খোল ছাড়া আমি যাদের আর কিছু ভাবতে নারাজ, সেগুলোর কথা তো ছেড়েই দিলাম।

আমাদের বাড়ির মহিলারা যে শাড়ি ছাড়া কিছু পরেন না, এটা বেশ জাঁকের ব্যাপার ছিল। অসুখের খবর পেয়ে ভদ্রতা-ভিজিটে এসে কেউ যদি পরামর্শ দিতেন, শায়া ব্লাউজ শাড়ির ঝঞ্ঝাট আর কেন মাসিমা, এবার নাইটি ধরুন, ঠাকুমা জ্বলজ্বলে মুখে বলতেন, আমার ছেলেরা ও সব পছন্দ করে না।

বলা বাহুল্য, ঠাকুমার ছেলেদের আমি কখনও ‘এটা কেন পরেছ, ওটা কেন পরোনি’ বলে বেড়াতে শুনিনি। হতে পারে ঠাকুমা মিথ্যেই তাঁদের নিন্দে করছিলেন। আবার এও হতে পারে ঠাকুমা জানতেন, পরছেন না বলেই শুনতে হচ্ছে না। কিছু বাচ্চা থাকে শুনেছি, যারা নিজে নিজেই প্রতি সন্ধেয় বই খুলে বসে যায়, পড়তে বস বলে চোখ রাঙাতে হয় না - অনেকটা সেইরকম আরকি। না বসলে কী হত সেটা ভেবে দেখার। বাবা একবার অফিস থেকে টেবিলটেনিস টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে লাল কলার দেওয়া একটা সাদা টি শার্ট উপহার পেয়েছিলেন। লাল-সাদা তখন থেকেই আমার প্রিয় কম্বিনেশন; ফস করে বলে উঠেছিলাম, আমি একদিন পরব জামাটা?

বাবা সত্যিই অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু এটা তো ছেলেদের জামা।

আরেকটা ব্যাপার খোলসা করে নিই। নিজের জামাকাপড় নিয়েও বাবার অগুনতি বাধানিষেধ। বাবা জিনস পরেন না, কলারহীন টি-শার্ট পরেন না, হাতকাটা স্যান্ডো পরেন না। ঘোরতম দুঃস্বপ্নেও কোনওদিন নিজেকে হাফপ্যান্ট-পরা অবস্থায় আবিষ্কার করেননি, গ্যারান্টি। তবে কেন করেননি জিজ্ঞাসা করলে, 'আমার মা/বউ/মেয়ে/দিদিমা/পিসিমা/কাকু/জেঠামশাই/পিসেমশাই পছন্দ করেন না বলে,' এই উত্তরটাও যে বাবা দেবেন না সেটাও গ্যারান্টি। ডবল গ্যারান্টি।

আমাদের ডিসটোপিয়ান পাড়ায় জিনস তখনও দূরঅস্ত কিন্তু সালওয়ার কামিজ জোরকদমে চালু হয়ে গেছে। ঝিণ্টি মিন্টি মৌটুসি মামণিরা সকাল বিকেল সালওয়ারকামিজ পরে হেঁটে, সাইকেল চড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পাড়ায় ওইরকম একজন জেঠি থাকা সত্ত্বেও সেটা কী করে সম্ভব হল ভাববার বিষয়।

জেঠির অনেক গুণ ছিল। তাঁর একা হাতে বারোজনের রান্নাবান্না সামলানো, দুর্গতকে সেবা, পড়শির বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া দেখে সকলেই টুপি খুলত। তার ওপর জেঠি ট্রেকিং করতেন। একটু ভুল হল, ট্রেক করতেন জেঠু। করতেন মানে নেশার মতো করতেন। বছরে দু’বার তো মিনিমাম। গোটা এলাকায় তখন একমাত্র ওই বাড়িতে ট্র্যাভেল ম্যাগাজিন আসত। একমাত্র ওই বাড়িতেই হট শট ছাড়া অন্য কোনও ব্র্যান্ডের ক্যামেরা ছিল। জটিল, গামবাট ক্যামেরা। সে ক্যামেরায় তুলে আনা নীল আকাশের গায়ে বরফটুপি পর্বত, সবুজ প্রান্তর আর টলটলে দিঘির ছবি আমরা দল বেঁধে দেখতে যেতাম। ছোটো ছোট সাদা বর্ডারওয়ালা নেগেটিভেরা লাইন দিয়ে প্রোজেক্টর মেশিনের আলোর সামনে এসে থামত আর খাটের ছত্রীর ফাঁকে নীলরং দেওয়ালের চৌখুপিতে সে সব ছবির প্রমাণসাইজ সংস্করণ ফুটে উঠত।

জেঠির নিশ্চয় ট্রেকিং ভালো লাগত, না হলে আর প্রত্যেকবার সঙ্গে যেতেন কেন। আর সে তো শুধু যাওয়া নয়। অভিযান। সুটকেসে চারটে জামা পুরলাম আর রাত পেরোলেই পুরী কিংবা সিমলা নয়তো রাজস্থান পৌঁছে গেলাম -এ বেড়ানো সে বেড়ানো নয়। মানুষপ্রমাণ রুকস্যাকের ভেতর আস্ত তাঁবু, বালিশ তোশক, লেপকম্বল। আমাদের বেড়াতে যাওয়ার বেডিং বলতে তখন ট্রেনের সেকেন্ড ক্লাসের কেঠো বার্থে পাতার চাদর আর ডাকব্যাকের হাওয়াভরা বালিশ, যাতে রাখামাত্র মুণ্ডু পিংপং বল। ট্রেনে শোওয়ার সময় হলে, “আমি বালিশ ফোলাবোওওও” বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাড়িশুদ্ধু লোকের বালিশ ফুলিয়ে দিতাম আর জুলজুল চোখে প্রতিবেশী ভ্রমণার্থীদের বালিশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। যদি কেউ নিজের বালিশটা ফুলিয়ে দেওয়ার অফার দেয়। কী ভাগ্যিস, কেউ দেয়নি কোনওদিন। এখন অবাক লাগে, একবারও মাথায় আসেনি এমন চমৎকার কাজটা করার জন্য আমি ছাড়া আর কেউ মাথা কুটে মরছে না কেন। যে আমাকে আমার ইচ্ছে মতো প্রায় কিছুই করতে অ্যালাউ করা হয় না, সেই আমার বালিশ ফুলিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবে সকলেই “হ্যাঁ হ্যাঁ, সোনা চাইছে যখন ওকেই দেওয়া হোক,” একবাক্যে রাজি হয়ে উঠছে কেন। ফুলিয়ে ফুলিয়ে বালিশের ভেতর পোরা পাউডার গলায় গিয়ে খকখক কাশি, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ, আর আমি বিশ্বের সুখীতম মানুষ হতে পারার আনন্দে জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে পা দোলাচ্ছি। মা বলছেন, সোনা ঠাণ্ডা লাগবে, টুপি পরে নাও শিগগিরি।

জেঠুদের ট্রেকিং অভিযানের আরও সঙ্গী ছিল, যাঁদের সঙ্গেও আমার বিভিন্ন সময় ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে মোলাকাত হয়েছে। সকলেই জেঠির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তখনই জেনেছিলাম রুকস্যাকের ভেতর বিছানাকম্বলের সঙ্গে একটা ছোট মতো স্টোভ, একটা মাঝারি মাপের প্রেশার কুকার, অল্প চাল, অল্প ডাল, গোটা কতক আলু, পেঁয়াজও থাকত। দীঘা থেকে দ্বারভাঙ্গা থেকে মণিমহেশ, যেখানেই ওঁরা যান না কেন, বাইরের বিশ্রী খাবার মুখে তুলতে হত না, জেঠি টুক করে ভাতেভাত নামিয়ে নিতেন। চারদিকে শোঁশোঁ হাওয়া বইছে আর হিমালয়ের নাম-না-জানা প্রান্তরে তাঁবুর ভেতর বাড়ির ওম জাগানো জেঠির হাতের ভাতেভাত, সকলে উচ্ছ্বসিত হয়ে গলা মেলাত, এ অভিজ্ঞতা যার না হয়েছে সে ঠকেছে।

এই সমস্ত গুণপনা ছাপিয়ে জেঠির যে অতুল কীর্তিখানা পাড়ায় পাড়ায় রাষ্ট্র হয়েছিল সেটা হচ্ছে এই যে, ওই সব দুর্গম পর্বতশৃঙ্গ জেঠি শাড়ি পরে জয় করেছিলেন। শাড়ি পরে উঠেছিলেন, নেমেছিলেন, তাঁবু খাটিয়েছিলেন, ভাতেভাত রেঁধেছিলেন। আর হাতেনাতে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন চলাফেরা, সাইকেল চালানো, ট্রেনেবাসে যাতায়াতে অসুবিধের ছুতো দিয়ে যারা শাড়ি পরতে চায় না, তারা মিথ্যুক দি গ্রেট।

বুদ্ধিমানরা অবশ্য অসুবিধেটসুবিধের ঘোলাজল এড়িয়ে যেতেন। বলতেন, আহা ও সব কিছু না, আসলে শাড়ির মতো ভালো বাঙালি মেয়েদের আর কিছুতেই দেখায় না বলেই পরার কথা তোলা আরকি। সাহেবরা জানো শাড়িপরা মহিলা দেখে কত খুশি হয়? আমরাই দেশের পোশাক বলে হেলাছেদ্দা করি। তাছাড়া কী এলিগ্যান্ট পোশাক, ইন্দিরা গান্ধীকে দেখোনি? তাছাড়া এতদিনের একটা ট্র্যাডিশন। ছেড়ে দেওয়া কি ভালো দেখায়?

এই রকম একটা কথোপকথনের এইরকম একটা পয়েন্টে এসে আমি একবার, একবারই, একটা কেলেংকারি ঘটিয়েছিলাম। তখন সবে মাসছয়েক হল বাড়িছাড়া। বাঁধা গরু ছাড়া পেলে যা হয়, ওই ছ'মাসেই আমার শিক্ষাদীক্ষা লাটে উঠেছিল। কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় ভুলে মেরেছিলাম।

বলে বসেছিলাম (ভার্বাটিম নয়, প্যারাফ্রেজ), কিন্তু ছেলেরা তো কবে থেকেই ধুতিপাঞ্জাবী গঙ্গায় ভাসিয়ে প্যান্টশার্ট পরছে। সেও তো চমৎকার পোশাক। আর ট্র্যাডিশনালও বটে। কই তখন তো কেউ উচ্চবাচ্য করেনি?

সেদিন একটা দামি শিক্ষা হয়েছিল আমার। প্রতিবাদ করার জায়গা নিজের বাড়িটা নয়। ওটার জন্য রাস্তা আছে। প্রতিবাদ করতে হলে ওখানে নেমে মিছিল দাও গে। প্যান্ডেলের পুরুতমশাইয়ের বাড়িয়ে ধরা চরণামৃতর বাটির মুখে পড়ে মুচকি হেসে “আমি এ সবে বিশ্বাস করি না” ঘোষণা করে যত নাস্তিকতা ফলাতে চাও ফলাও, বাড়ির সত্যনারায়ণের সিন্নি আর ভোগের খিচুড়ির প্রতি মাখোমাখো নস্ট্যালজিয়া তুলে রাখো। তাছাড়া প্রতিবাদ করবেই বা কেন ? আমাদের বাড়িগুলো তো সব একেকখানা রেনেসাঁসের আখড়া। আমাদের বাড়িতে মেয়েদের নিক্তি মেপে ছেলেদের সমান করে বড় করা হয়েছে। মায়ের ওপর যত জুলুম ভালোবেসে করা হয়েছে (আমাকে একজন এও বুঝিয়ে ছেড়েছিল, মাকে যে বাড়ির সবার থেকে বেশি কাজ করতে দেওয়া হয় সেটা আসলে মায়েদেরই মুখ চেয়ে। খেটে মরার স্বাধীনতাটুকু না দিলেই নাকি মায়েরা অফেন্ডেড হবেন।) আমাদের জাত মিলিয়ে বিয়ে খোঁজার সঙ্গে জাতিবিদ্বেষের কোনও সম্পর্ক নেই, ওটা স্রেফ কমপ্যাটিবিলিটি ইত্যাদি ভালো ভালো বিজ্ঞানসম্মত যুক্তির মুখ চেয়ে। আমাদের বাড়িতে পাঁচ আঙুলে দশটা আংটি পরার সঙ্গে কুসংস্কারের সম্পর্ক আছে রটায় কোন দুর্জনে? আমরা কি জানি না সি টি ভি এন-এ যে সব শ্রীগুরু শ্রীমাতারা ল্যাপটপ খুলে কুষ্ঠি বিচার করতে বসেছেন সব টপ টু বটম বুজরুক? আমরা পরি নিতান্তই ব্যক্তিগত কারণে।

আমাদের সেই সব ব্যক্তিগত বাড়িগুলোতে ছেলে আই আই টি-তে চান্স পেল কি না, বাবার প্রোমোশন হল কি না, বাড়ির বাচ্চা রসুনজয়ন্তীতে ন্যাড়া মাথায় মালা পেঁচিয়ে অংশগ্রহণ করল কি না ইত্যাদির পাশাপাশি ফ্যামিলির মানইজ্জতের একটা বিরাট কমপোনেন্ট ছিল ফ্যামিলির মহিলাদের পোশাকআশাক। আমার এক খুড়তুতো দিদির জিনস পরার আবদার শুনে কাকুর মুখ রক্তশূন্য হয়ে গিয়েছিল। সেকেন্ড তিরিশ পর সামলে নিয়ে কাকু হাতজোড় করেছিলেন। আর তো বেশিদিন বাঁচব না, যতদিন বাঁচছি, সমাজের কাছে মাথা উঁচু করে বাঁচতে দে। ফস করে জাজ করে বসবেন না, কাকু আজীবন সংস্কৃতিমনস্ক ছিলেন, পাড়ায়, জেলায়, মায় মহকুমা লেভেলেও নাটকথিয়েটার করে এসেছেন, সেই থেকেই সম্ভবতঃ তাঁর কথাবার্তার ধরণটা সামান্য নাটুকে হয়ে গিয়েছিল।

অনেকদিন পর সোশ্যাল মিডিয়ায় আড়ি পাততে গিয়ে দেখি জয়সলমিরের বালির ওপর উটের গলার দড়ি ধরে ভীষণ হাসিমুখে দিদি দাঁড়িয়ে। “ও মা, উটটা কী কিউট,” কমেন্ট করতে গিয়েও জোর সামলে নিয়েছিলাম। মনে পড়ে গিয়েছিল, আমি এখানে নেই।

প্রতিক্রিয়া প্রকাশের লোভ সংবরণ করে ছবিটা দেখেছিলাম। দিদির হাস্যোজ্বল মুখ। দিদির পাশে দাঁড়ানো কাকুর মুখেও অনাবিল হাসি। মানহানির গ্লানিমাত্র নেই।

জানতাম এটাই হবে। সংস্কৃতিমনস্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাকু ভীষণ নরম মনেরও ছিলেন। (নরম-মন আর সংস্কৃতিমনস্কতার হাই কোরিলেশন অবশ্য প্রত্যাশিত।) কাজেই, জিনস পরার নিষেধে অনড় থাকতে পারেননি। নিজেই দোকানে গিয়ে কিনে দিয়েছেন। এবং হাওড়া স্টেশন পার হয়ে গেলে সে জিনস পরার ঢালাও অনুমতি দিয়েছেন। তারপর মরুভূমিতে জিনসের ফুলপ্যান্ট, বরফচুড়ো পাহাড়ের পাদদেশে ফুরফুরে ম্যাক্সিড্রেস, নানাবিধ শখমেটানো পোশাকে দিদি এবং দিদির পাশে কাকুর বহু হাসিমুখ ছবি দেখেছি।

যাই হোক, স প্রাণ হাতে করে হাওয়া হয়ে গেল, আমি আমার ব্লান্ডার উপলব্ধি করে আধমরা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ম্যাপের ডিরেকশনের সম্পূর্ণ উল্টোদিক থেকে বাইক গুমগুমিয়ে জোম্যাটো ভাইসাব উপস্থিত হলেন। রোলের প্যাকেট হস্তান্তর হল। থ্যাংক ইউ ভাইসাব, ওয়েলকাম ম্যাম বলাকওয়া হল। ভাইসাব লাল ব্যাগের জিপ বন্ধ করতে লাগলেন। রোলের বাক্স হাতে গেটের এপারে ছায়ার ভেতর আমি স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম। জোম্যাটো ভাইসাব দুয়েকবার আড়চোখে আমার স্থাণুমূর্তির দিকে তাকালেন। ভয় পেলেন কি না কে জানে। পেলেও আমি নিরুপায়। পেছন ফিরছি না প্রাণ থাকতে।

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই মায়ের কথা মনে পড়ল।

অনেক বলেকয়ে একদিন রিষড়ার বাড়িতে জোম্যাটো থেকে খাবার অর্ডার করতে রাজি করিয়েছিলাম। অ্যাপট্যাপ ডাউনলোড করতে করতে পাছে শুভ কাজে দেরি হয়, আমার ফোন থেকেই দোসা আর মেদু বড়া বাড়ির ঠিকানায় অর্ডার করেছিলাম। এইবার অর্ডার অ্যাকসেপ্টেড হয়েছে, এইবার ডেলিভারি পার্সন দোকানের দিকে এগোচ্ছে, এইবার দোকানে পৌঁছেছে - ফোনে ফোনে রুদ্ধশ্বাস ধারাবিবরণী চলছিল। মারাত্মক উত্তেজনা।

"ডেলিভারড" মেসেজ পাওয়ার একটা ভদ্রস্থ সময় গ্যাপ দিয়ে বাড়িতে ফোন করেছিলাম। কেমন খেলে বাবা, জীবনের প্রথম জোম্যাটো? বাবা বললেন, দারুণ, দারুণ সোনা। রোজ না হলেও, দু’চারমাসে একবার করে অর্ডার করা যেতেই পারে, বল? ফোন করার আগে ভেবে রেখেছিলাম বলব যে ভালো লাগলে মাসে দু’চারবার করে অর্ডার করে খেতেই পারো, চেপে গেলাম। বললাম, মাকে দাও দেখি, কেমন লাগল শুনি।

বাবা জানালেন, মা শাড়ি ছাড়তে গেছেন, ধরতে হবে একটু।

মনটা খচ করে উঠল। দোসা খেয়ে শাড়ি ছাড়তে যাওয়ার ব্যাপারটা তো সুবিধের শোনাচ্ছে না। ছোঁয়াছুয়ি ছাড়াপরার খেলাটা মাকে খেলতে দেখিনি তো আগে। আগে দেখিনি বলেই যে পরে দেখব না তেমন না অবশ্য। রিটায়ারমেন্টের পরের বয়সটা গোলমেলে, এ সময় মাবাবাদের চোখে চোখে রাখতে হয়। সহসা কর্মহীনতাজনিত মানসিক বিচলনের সম্ভাবনা তো থাকেই, তাছাড়া বদসঙ্গের আতংক এ সময় তুঙ্গে থাকে। মা একবার শ্রীরামপুর প্ল্যাটফর্মে কোন এক সৎসঙ্গ আশ্রমের আশ্রমিকের সঙ্গে ‘কী গরম, ট্রেন কী লেট’ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গল্প করেছিলেন। গল্পে গল্পে আশ্রমিক মায়ের ফোন নম্বর নিয়ে, ডেইলি একবার করে ফোন করে মাকে আশ্রমে ঢোকার উস্কানি দিতেন। একদিন দেখে যান, দিদি, দেখবেন কী ভালো লাগবে। সুস্থরুচির মানুষেরা জড়ো হয়ে একটু ধার্মিক বইটই পড়ি, জীবনের মানেটানে নিয়ে আলোচনাটালোচনা হয়।

মা প্রথম দিন গল্পটা ফোনে বলে খুব হেসেছিলেন। বলেছিলেন, সোনা, তুই কি পাগল হলি? এখন আমি গুরু বাগাতে বেরোব? সাতদিনের দিন বললেন, আরে রোজ ফোন করছে, কী বলি বলত? ভাবছি একদিন ভদ্রতা করে ঘুরে আসি। চোদ্দদিনের মাথায় আশ্রমিক বাড়িতে হাজির।

একবর্ণ বাড়িয়ে বলছি না, ওই ক’দিন আমি ভালো করে ঘুমোতে পারিনি। হয়তো আমারই ভুল। আমার স্বাধীন মা সৎসঙ্গ করতে চাইলে আমার কিচ্ছু বলার থাকতে পারে না। আশ্রমের কীর্তনপার্টির চাঁদা, গুরুপূর্ণিমায় গুরু/গুরুমাকে তসরের ধুতিশাড়ি, আশ্রমের রান্নাঘরে ফ্রিজ মাইক্রোওয়েভ - এ সবও মা নিজের পেনশন থেকে আরামসে সামলে দিতে পারবেন, আমার মুখাপেক্ষী হবেন না। কাজেই সেসব দিক থেকেও মায়ের স্বাধীন সিদ্ধান্তে বাগড়া দেওয়ার কোনও অধিকারই আমার নেই।

অন্য কারও মায়ের আশ্রম জয়েন করা নিয়ে আমার মত একশোবার চাইলে আমি একশোএক বার এই মত দিতাম। কিন্তু এটা অন্য কারও মা নয়, আমার মা। আমার মা যেমন অন্যের মেয়ে চিত্রহার দেখলে কিছুই বলতেন না, আমি দেখতে বসলে কান ধরে তুলে আনতেন, অবিকল সেই লজিকে আমি আমার মাকে সৎসঙ্গ করতে অ্যালাউ করতাম না। দরকার হলে ভরা সেশনের মাঝখানে দুপদাপিয়ে ঢুকে মাকে তুলে আনতাম।

মাথায় তখন আর দোসাটোসা কাজ করছিল না, কিন্তু মনে পড়ল অফিসের লিডারশিপ না কী একটা ট্রেনিং-এ শিখিয়েছিল, তেতো কথা বলতে হলে সর্বদা দুটো মিষ্টি কথার মাঝে পুরে বলতে।

দোসা কেমন খেলে মা? ভালো ছিল? ঠাণ্ডা হয়ে গেছিল কি আসতে আসতে?

মা বললেন, একটুও না। বাইকে করে সাঁ করে এসে গেছে তো। কী ভালো সার্ভিস রে সোনা। দোসাটা ন্যাতায় পর্যন্ত নি। তোরা আজ ডিনারে দোসা অর্ডার করবি নাকি? বেশি করে বড়া অর্ডার করিস কিন্তু। যদি অ্যালাউ করিস আজকের অর্ডারটা না হয় আমরা…

মা, প্লিজ থামো। তুমি দোসা খেয়ে উঠে শাড়ি ছাড়ছ নাকি আজকাল?

মা বললেন, আরে ও রকম খড়মড়ে ইস্তিরি করা তাঁতের শাড়ি পরে কতক্ষণ থাকব? তাই ছেড়ে ফেললাম। যা গরম…

আমি বললাম, খড়মড়ে শাড়ি? খড়মড়ে শাড়ি পরে ছিলেই বা কেন এই গরমে? ন্যাতা শাড়িগুলো গেল কই?

কোথায় আবার যাবে? ন্যাতা একখানা শাড়িই পরে বসেছিলাম তো। যা গরম…

তাহলে ছাড়লে কেন?

বাঃ, লোকটা ডেলিভারি দিতে এল না? তাও তো লাস্ট মোমেন্ট পর্যন্ত বসে ছিলাম। তুই যখন বললি যে বাইক সুভাষনগরের মোড়ে তখন দৌড়ে শাড়ি ছাড়তে গেলাম। ডেলিভারি দিয়ে চলে যাওয়ার পর আবার ন্যাতা শাড়ি পরে নেব ভেবেছিলাম কিন্তু তোর বাবা বলল, দোসা গরম থাকতে থাকতে খেয়ে নাও, তাই খেয়ে উঠে ছাড়তে গেছিলাম। যা গরম রে সোনা, কাল নির্ঘাত বৃষ্টি হবে, ঘেমে জল হয়ে গেছি…

ভাইসাব চলে গেলেন। আমি অবশেষে পেছন ফিরে হাঁটা লাগালাম। গেট থেকে দোতলার সিঁড়ি বেশি দূর নয়, একশো মিটার। কিন্তু তার মধ্যেই একশোটা লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। হওয়ার কোনও কারণ নেই, আমি যে দেখা হওয়া এড়াতে চাইছি সেটা মাটি করার জন্যই হবে। তিনতলা থেকে প্রসেনজিতরা হুড়মুড়িয়ে নামবে, একতলা থেকে কেউ দুমদুমিয়ে উঠবে। কাকিমার ওষুধের ডেলিভারি, স’দের মুদির ডেলিভারি — এরাই বা বাদ থাকবে কেন, এরাও সবাই আসবে এখনই। এসে দেখবে আমি পিঠফাটা জামা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

দরজায় পৌঁছে গেলাম। কেউ এলো না। নিজের কপাল দেখে নিজেই মুগ্ধ। কুষ্ঠিতে লিখেছিল বটে চল্লিশ নাগাদ শনির দশা কাটার একটা চান্স আছে। ফুরফুরে মনে দরজা ঠেলে ঢুকতে যাব, এমন সময় খড়মড় খচখচ। চমকে পেছন ফিরতেই সবুজ চোখে চোখ। কুচকুচে হুমদো বেড়ালটা। এমনি সময় সর্বদা চোরের মতো ধাবমান থাকে, এখন থাবা গুছিয়ে স্থির বসে আছে। শিরদাঁড়া টানটান। বসে বসে কোথায় কী ঘটছে, কে কী করছে, বলছে, পরছে —নজর রাখছে সব।

বেড়ালটা নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। মুখমণ্ডল জুড়ে হতাশা, ভর্ৎসনা লেপালেপি। অবশেষে দুদিকে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ল্যাজ দুলিয়ে পাঁচিল পেরিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল বেড়াল। গম্ভীর গলায় শুধু বলে গেল, ম্যাও।


September 13, 2020

গেছে যে দিন



টুইটারে একজন ছবি তুলেছেন, দিল্লির সব আইকনিক জায়গার ছবি। পার্ক, অফিস, মাঠ, রেস্টোর‍্যান্ট, সিনেমা হল, মাঠ, মসজিদের সিঁড়ি, মন্দিরের চুড়ো, চায়ের ঝুপড়ি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছোলে ভাটুরে খাওয়ার উঁচু টেবিল।

সবাই ভাবে, অন্ততঃ একসময় ভাবত, আমরা হচ্ছি টো টো কোম্পানি। শুক্রবার সন্ধেয় ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে হাওয়াই চটি হাতে গলিয়ে সেই যে ছুট লাগাই, রবিবার রাতের আগে বাড়িমুখো হই না। নিজের এই চরিত্রবিশ্লেষণে অর্চিষ্মান মনের ভাব কী হত কে জানে, আমি নিতান্ত অপ্রসন্ন হতাম। আমার চিরদিনের শখ লোকে জানবে আমি অন্তর্মুখী টাইপস। মনুষ্যসংসর্গ এড়িয়ে চলি। অফিস থেকে ফিরে গম্ভীর মুখে যখন প্রবন্ধসংকলন খুলে বসি, আশেপাশের লোকজন ফিসফিস করে কথা বলে আর টিপটিপ পায়ে হাঁটে।

অর্চিষ্মান বলল, দেখো তো চিনতে পারো নাকি জায়গাগুলো।

আইকনিক জায়গা চেনার প্রসঙ্গ আসছে কোত্থেকে যদি জানতে চান, আসছে কারণ ছবিগুলো তোলা হয়েছে লকডাউনে। আর এটা অস্বীকার করার কোনও জায়গাই নেই যে ভারতবর্ষের যাবতীয় ভাস্কর্য, স্থাপত্য, মন্দিরমসজিদ, ভাটুরার থেকে একশো গুণ বেশি আইকনিক হচ্ছে ঠাসাঠাসি গাদাগাদি ভিড়। এ রকম আমার সঙ্গে তো হামেশা ঘটে। খাঁ খাঁ মাঠের ছবি দেখে ভাবি এটা আবার কোথায়, তারপর চোখ পড়ে মাঠের মধ্যিখানে একখানা ঢ্যাঙা স্তম্ভ, ও হরি এ যে কুতুব মিনার। কী ফাঁকা, চিনতেই পারিনি।

ভিড়হীনতার অস্বস্তিটা কাটিয়ে উঠে দেখা গেল ছবির লিস্টের নব্বই শতাংশ জায়গায় আমরা গেছি। একাধিক বার গেছি। খটখটে রোদে, ঝিমঝিমে বৃষ্টিতে, কনকনে শীতে - জায়গাগুলোতে আমাদের ছবি ফোনে আর মনে জ্বলজ্বল করছে।

রেস্টোর‍্যান্টের টেবিলগুলো পর্যন্ত চেনা গেল। জাফরি দেওয়ালঘেঁষা আমাদের ফেভারিট টেবিল না ওটা? পালং শাকের চাট, গোভিন্দ গট্টা কারি আর মসালা সোডা নিয়ে কতবার মুখোমুখি বসেছি বল তো?

যে জায়গাগুলোয় যাইনি, সেগুলোও চিনতে পারলাম। ওই বইয়ের দোকানটায় যাব যাব বলছিলাম কতবার। তুমি প্রত্যেকবার হাবিজাবি এক্সকিউজ দিয়ে ঠেকাচ্ছিলে। দেখলে তো কী হল? এখন কবে সব নিষেধ উঠবে, কবে দোকান খুলবে...

মুখ হাঁড়ি করে বসে রইলাম দুজনে। যদি দোকান না-ই খোলে আর? রোদে পুড়ে, বৃষ্টি ভিজে, প্রবন্ধপাঠ ফাঁকি দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় টো টো করা সকাল দুপুর বিকেল সন্ধেগুলো আর না আসে? বাকি জীবনটা টু বি এইচ কে-র বদ্ধ ঘরে বসে জীবন কাটানোই কপালে থাকে?

বাকি জীবনের কথা জানি না, সেদিন আমার ঘরে বসে রইলে চলত না। অর্চিষ্মান এমনিতে আমার বেরোনোতে মোটেই সঙ্গ দিতে আসে না। ওর মত হচ্ছে যদি বেরোতেই হয় একজন বেরোক, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাট লিস্ট অন্যজন থাকবে। ঘুরেঘারে বাড়ি ফিরলে দরজা খুলে লাফ মেরে দশ হাত দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। জুতোর বাক্সের ওপর রাখা স্যানিটাইজারের বালতিপ্রমাণ শিশিটার দিকে ভুরু নাচায় আর আঙুল দিয়ে বাথরুমের দিকে দেখায়। শিগগিরি স্নান করে এসো। ভাবছি ওকে একবার জেরক্সের দোকানের ভাইসাবের কাছে পাঠাব। যিনি মাস্কটাস্কের বালাই রাখেননি আর আমার গ্লাভসের ওপর খুচরো পয়সা ঢেলে দিতে দিতে বলছিলেন, ম্যাডাম ইতনা মৎ ডরিয়ে। যিতনা ডরেঙ্গে উতনা হোনে কা চান্স বঢ়েগা।

অর্চিষ্মান বলল, বাঃ, তবে আর কী। ভাইসাবের কথা মতো চলে প্রাণটা খোয়াও।

আমাদের যৌবনের উপবনের মনকেমন ছবি দেখে ওর মগজেও রাসায়নিক ক্রিয়াবিক্রিয়া ঘটল বোধহয়, বলে উঠল, ধুউউস, চল তো তোমার কোথায় কোথায় যাওয়ার আছে আজ, আমিও যাই।

দেখবি তো দেখ, ব্যাংক আর পোস্টাপিস আর ওষুধের দোকানের বদলে আমার সেদিন যাওয়ার ছিল মার্কেটিং - এ। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দোকানে পিড়িং পিড়িং সুরবাহারের ব্যাকগ্রাউন্ডে ঘুরে ঘুরে দুয়েকটা জরুরি পোশাকআশাক কিনব আর পছন্দ হলে গোটা দুয়েক কফি কাপ - তেমনটাই ছিল প্ল্যান। যতদূর মনে পড়ে আগের রাতে অর্চিষ্মানকে প্ল্যানের কথা বলেওছিলাম, তখন কানে ইয়ারফোন গুঁজে ল্যাপটপের দিকে হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে ছিল, সাড়াশব্দ পাইনি।

যথোপযুক্ত প্রোটেকশন দিয়ে বেরোলাম। যেই না বেরোলাম, আমাদের এতদিন পর একসঙ্গে দেখেই সম্ভবতঃ, ঠা ঠা রোদ মেঘের আড়ালে অদৃশ্য হল, মাথার চুল অল্প অল্প উড়িয়ে, সারা শরীর ঠাণ্ডা করে হাওয়া বইল। অটো চড়ে আমরা গেলাম এখান থেকে ওখান, ওখান থেকে সেখান। ভাইসাব জোরে রেডিও ছাড়লেন। অগর তুম সাথ হো, সব গম ফিসল যায়ে...

বাজার সারা হলে অর্চিষ্মান বলল, শোনো না, আমার না অনে-এ-এ-এ-কদিনের শখ ধরে ওই কায়দার মুদির, থুড়ি গ্রোসারি শপটায় যাই। যাবে? অসুবিধে হবে না তো?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে গল্প জমা দেওয়ার ডেডলাইন আগের রাতেই পেরিয়েছে, এখনও কম করে পাঁচঘণ্টার কাজ বাকি।

আর যারই অসুবিধে হোক আমার হবে না গ্যারান্টি।

বন্দুক থার্মোমিটারে জ্বর মাপিয়ে শপে ঢুকলাম। যে তাকই দেখি, তাক লেগে যায়। একদম বাঁদিকে ক্লাসিক মেয়োনিজ, তার পাশেরটা গারলিক মেশানো মেয়োনিজ, তার পাশেরটা অনিয়ন মেয়ো, তার পাশেরটা অনিয়ন গারলিক, তার পাশেরটা চিলি গারলিক, তার পাশেরটা অনিয়ন চিলি - অন্ততঃ বারোখানা মেয়োনিজের শিশি পাশাপাশি রাখা। এক মহিলা এসে ছ'টা তুলে নিয়ে গেলেন। শিশির উল্টোদিকে, যেদিকটায় আমরা বেশি মনোযোগ দিচ্ছিলাম কারণ ওখানে এম আর পি লেখা থাকে, দৃকপাত করলেন না। যে কনফিডেন্সে সৌরভ স্টোরসে অর্চিষ্মান অরবিট আর টিকট্যাক আর ফটাফট তোলে, আমি ঝাল চানাচুর আর কাকাজি চিপসের ফ্যামিলি প্যাক কুড়োই, বলি, এই এগুলো এগুলো, আর হ্যাঁ, এগুলোও দিয়ে দিন না - অবিকল সেই কনফিডেন্স।

শুধু তো মেয়োনিজ নয়, হারিসা, পেরি পেরি, তাহিনি, তাজিকি আরও কতরকম। এ সব সৌরভ স্টোরসে দেখলে অবাক হতাম হয়তো, কিন্তু এখানে না দেখলেই অবাক হতে হত। থমকালাম তাকের প্রান্তে এসে, যেখানে একটা শিশির গায়ে লেখা আছে পাকা পেয়ারার পেস্ট। এটা আগেও দেখেছি। অচেনা জিনিসের থেকে চেনা জিনিসকে অচেনা অবতারে দেখলে মাথা ঘোরে বেশি। আমাদের ছোটবেলায় জনগণের গড় ওজন মিনিমাম পাঁচ কেজি কম ছিল আর টিভিতে চ্যানেলে চ্যানেলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় রাঁধাবাড়ার অনুষ্ঠান হত না। চোদ্দপুরুষ নাম শোনেনি এমন সব উপকরণ দিয়ে, চকচকে হাতাখুন্তি নেড়ে, ঝকঝকে উনুনে, ধপধপে উর্দি পরে বাবাজেঠুর মতো দেখতে লোকজন রান্না করতেন। সে সব অনুষ্ঠানে "আংকল, লাবড়ার রেসিপি আপলোড করুন না প্লিইইজ" বলে হামলে পড়ার সাহসই পেত না পাবলিক। মনে আছে এক এপিসোডে জিগস কালরা বেগুন গোলগোল করে কেটে, দুধে ভিজিয়ে, তেলে ভেজে, দইয়ে ডুবিয়ে, মধু ছিটিয়ে পরিবেশন করেছিলেন। রুটি বেগুনভাজা খেতে খেতে দেখেছিলাম বলে সম্ভবতঃ শকটা বেশি লেগেছিল, এখনও ভুলিনি।

একেবারে খালি হাতে দোকান থেকে বেরিয়ে আসা ভালো দেখায় না, অল্প অল্প মনখারাপও হয়, তাই একটা প্লাম ওয়ালনাট আর একটা চকোলেট কেক কেনা হল। আবহাওয়া তখনও দেখার মতো মনোরম। অর্চিষ্মান বলল, চল হাঁটি। হাঁটবে?

ডেডলাইনটা মগজে একবার উঁকি দিয়ে গেল। হোয়াই নট?

ফুটপাথের রেলিং-এর ওপারে একটি বিস্তৃত বনভূমি। বৃক্ষ থেকে গুল্ম থেকে ঘাস। সবুজ জমির মধ্য দিয়ে পায়ে চলা পথ। দুএকটা কাঠের বেঞ্চি।

এই পার্কটায় আমরা কোনওদিন আসিনি, না?

আসিনি, কিন্তু সকালবিকেল দেখেছি। আকাশের মেট্রো রাজপথের দিকে আঙুল দেখলাম। অর্চিষ্মানের মুখচোখ বদলে গেল। ও-ও-ও, এটা সেই পার্কটা! মেট্রো থেকে যেটা রোজ দেখতাম?

ওই পার্কটাই বটে। তখন প্রি-ওলা/উবার জমানা। বাড়ি টু নেহরু প্লেস অটোভাড়া চল্লিশ থেকে তিরিশে নামানোর ব্যর্থ স্ট্রাগল দিয়ে দিন শুরু হত। ফেরার সময় অর্চিষ্মান রাজীব চক থেকে উঠত, আমি জহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম থেকে। আন্দাজমতো টাইম তাক করে যে যার অফিস থেকে বেরোতাম। প্ল্যানটা হচ্ছে জে এল এন-এ ট্রেন ঢোকার সময় অর্চিষ্মান দরজার যথাসম্ভব কাছে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারবে, আমি প্ল্যাটফর্ম থেকে যতখানি পারি গলা বাড়িয়ে এদিক ওদিক দেখব। অর্চিষ্মানকে দেখতে পেলে আমি মেট্রোতে উঠব, অর্চিষ্মান আমাকে দেখতে না পেলে নেমে পড়বে।

পরিণতি, আর যাই হোক, বোরিং হত না। মেট্রো ঢুকছে, একেকটা দরজা সাঁই সাঁই করে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, একটা লোককে দেখলাম অনেকটা অর্চিষ্মানের মতোই দেখতে…ওই তো! ভিড়ের ওপর অর্চিষ্মানের মাথা! দরজাটা অনেক এগিয়ে গেছে, পেছন পেছন দৌড়নো সম্ভব না। আপাতত সামনের দরজাটায় উঠে পড়ব, ট্রেন বেয়ে অর্চিষ্মানের কামরায় পৌঁছনো যাবে। অর্চিষ্মান আমাকে দেখেছে কি না অবশ্য জানি না। হয়তো আমি এ দরজা দিয়ে উঠলাম, ও ওই দরজা দিয়ে নেমে পড়ল। পড়লে পড়বে, চান্স নেওয়া ছাড়া গতি নেই।

সব সময় এত রোমহর্ষক ব্যাপার হত না অবশ্য। কখনও কখনও ফাঁকা কামরায় গেটের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো অর্চিষ্মানের চোখে চোখ পড়ে যেত। আবার এমনও হত কেউ কাউকে দেখতে পাইনি, ট্রেন থেমেছে, ভিড় পাতলা হয়েছে, দরজা বন্ধ হওয়ার টিং টিং বেজে গেছে, এমন সময়... প্ল্যাটফর্মের ওই প্রান্তে অর্চিষ্মান না? ও-ও ওই মুহূর্তে আমাকে আবিষ্কার করেছে আর আমরা উসেইন বোল্টের স্পিডে গিয়ে দুদিক থেকে ধেয়ে আসা মেট্রোর দরজা এড়িয়ে ট্রেনে উঠে পড়ছি।

এবং দুজনেই দিনগুলোর কথা সম্পূর্ণ ভুলে মেরে দিয়েছি। ভুলে মেরেছি মানে কি আর ভুলে মেরেছি? এই যে মনে পড়া মাত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ ছবির মতো সব ঝেঁকে এল মাথার ভেতর, ভুলিনি যে তা তো বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু সোম-শুক্র ন'টা পাঁচটা ভাত ডালের নিচে কখন ওই দিনগুলো তলিয়ে গেছে চিরদিনের মতো, খেয়ালই করিনি।

তাই শোকপালনও করিনি।

মা ছিল, মা নেই; স্কুল লাইফ ছিল, স্কুল লাইফ নেই; মাথার চুল একসময় কালো ছিল, এখন নেই --এই সব গুরুত্বপূর্ণ থাকা না থাকার ফাঁক গলে কত দিনরাত, কত থাকা না-থাকা পালিয়ে গেছে।

চোখ তুলে তাকাইনি কারণ ওই চলে যাওয়ার শূন্যতাটা নতুন কিছু এসে ভরিয়ে দিয়েছে। মেট্রোর খেলা ফুরোতে না ফুরোতেই ওলা উবারের নতুন খেলা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রথম যেদিন মেসেজ এল "পুলিং উইথ অর্চিষ্মান", ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই অর্চিষ্মান বলে উঠল, এইই, তোমার আমার সেম পুল! আর ওর ফোনের স্ক্রিনে পষ্ট দেখলাম লেখা আছে "পুলিং উইথ কুন্তলা"। ব্যস, সেদিন থেকে আরেকটা খেলা শুরু হয়ে গেল। রান্নাঘরে টিফিনবাক্সের ঢাকনা বন্ধ করতে করতে, বারান্দায় তোয়ালে মেলতে মেলতে কো-অরডিনেশনের খেলা। সেকেন্ডের কাঁটা মিলিয়ে পুল বুক করার কো-অর্ডিনেশন, যাতে সেম পুল নিশ্চিত করা যায়। (যায় না, বলা বাহুল্য, তবু খেলতে তো বাধা নেই)। আর যদি না-ই যায় তাহলে অন্ততঃ এইটুকু নিশ্চিত করা যাক যে প্রাণ গেলেও বাড়ি থেকে বেরোনোর রেসে সেকেন্ড (ওয়েল, লাস্ট) হওয়া চলবে না। দেখ না দেখ, পেছন ফিরে টুক করে উবার বুক করে দেওয়া এবং আমারই ট্রিক আমার ওপর প্রয়োগ করে অন্য কেউ আমার আগে বুক করে ফেলছে কি না চোখে চোখে রাখা। অফিস দেরি হলেও এই সব খেলাধুলোর সময়ে টান পড়েনি কখনও।

সে খেলাও শেষ। অন্ততঃ ২০২০তে শুরু হওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আমার অফিসের লোকেশন বদলে গেছে, এক পুলে জায়গা পাওয়ার আর চান্সই নেই। আগে বেরোনোর কম্পিটিশনে জিততে হলে বাড়ি থেকে বেরোতে হবে তো আগে?

অর্থাৎ কি না ওই জীবনটা, ওই জীবনের যাবতীয় খেলাধুলো হারজিত সঙ্গে নিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে। হয়তো কোনও একদিন পূর্বাভাস ছাড়া লাফিয়ে পড়ে চমকে দেবে। চিনতে পারছ? নীল মাস্কের আড়ালে হাসতে হাসতে, গ্লাভস পরা আঙুলে আঙুল জড়িয়ে স্বর্গীয় দুপুরের হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে দুটো লোক, ওরা কারা? কী সাংঘাতিক, আমরা নাকি?! মেট্রো স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাঁদার মতো এদিকওদিক দেখছে একজন, ওটা আমি? ছুটন্ত মেট্রোর দরজার ওপারে রোগা লম্বা ইয়ারফোন গোঁজা যে ছেলেটার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ছেলেটা মুচকি হাসল, ওটাই অর্চিষ্মান? চিনতে চিনতেই স্টেশন ছেড়ে মেট্রো হাওয়া। একবিন্দু পড়ে নেই কোথাও। কাল আসবে না আবার? ঠিক এই সময় এসে যদি দাঁড়াই? কী করে আসবে, ওই টাইমটেবিল তামাদি হয়ে গেছে কবেই।

বুক হু হু করে। চলে গেছে বলে যত না, তার থেকে ঢের বেশি ওদের চলে যাওয়াগুলো টের পাইনি বলে। আর কোনওদিন আসবে না জেনেও, "এসো কিন্তু" বলে টাটা করে দিইনি বলে।

ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাত পা এলিয়ে বিছানার ওপর পড়তে যাব, অর্চিষ্মানের "দেখে, দেখে!" আর্তনাদে হৃদপিণ্ড মুখে চলে এল। দেখি খাট জুড়ে পেপার, পেপারের ওপর চায়ের কাপ, প্লেট, প্লেটের ওপর প্লাম ওয়ালনাট। উদ্যত ছুরি হাতে মহা বিরক্ত মুখে, ভুরুটুরু কুঁচকে অর্চিষ্মান তাকিয়ে আছে। 

সকালদুপুর মেট্রো উবার -- যারা যাওয়ার তো চলেই গেছে, তাদের নিয়ে কাঁদুনি গাইতে বসে যদি চা ঠাণ্ডা হয়ে যায় খুব খারাপ হবে। তাছাড়া অর্চিষ্মান যে বেগে প্লাম-ওয়ালনাটে ছুরি চালাচ্ছে আর গপাগপ কেক মুখে পুরছে, ইমিডিয়েটলি লাফিয়ে না পড়লে হক্কের অর্ধেক তো ছেড়েই দিলাম, গুঁড়ো ছাড়া কিছু জুটবে না। সেটাও বাকি সব চলেটলে যাওয়ার থেকে কিছু কম ট্র্যাজিক হবে না। 

তাই সেদিন আর এ বিষয়ে কথা বাড়াইনি। তবে কথাগুলো তো মাথার ভেতর ঘুরছিলই, এই অবান্তরে লিখে রাখলাম।


September 07, 2020

রোল মডেল







কে কার গল্প বলার অধিকারী সেটা একটা ভেবে দেখার মতো প্রশ্ন। এবং বেশিরভাগ ভাবনা-উসকানো প্রশ্নের মতোই এ প্রশ্নের এককথার উত্তর নেই। একটা বিরাট রেঞ্জ আছে, নর্থ পোল টু সাউথ পোল। ওই পোলে যিনি বসে আছেন তিনি বলবেন, যার যার নিজের গল্প বলেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। একজনের শুধু সেই বাস্তবকেই গল্প করে বলারই অধিকার আছে যে বাস্তবের মধ্য দিয়ে সে নিজে গেছে। অন্যের বাস্তব নিয়ে গল্প ফাঁদতে যাওয়া পরের ধনে পোদ্দারি করতে যাওয়া ছাড়া আর কিছু না।

এই পোলের লোক অমনি লাফিয়ে পড়ে বলবেন, যাব্বাবা, এ যুক্তিতে তো রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টার লেখা উচিত হয়নি, দৈর্ঘ্য প্রস্থ কোনওদিক থেকেই তো ভদ্রলোকের সঙ্গে বালিকা রতনের কোনও মিল পাওয়া যায় না। আর শরৎচন্দ্রের মহেশ-এর জীবনচরিত লেখা নিয়েও তাহলে প্রতিবাদ করতে হয়। এগুলো যদি ছাড় দেওয়া যায়, ত্রৈলোক্যনাথের লুল্লুভূতের গল্প? সে তো সব অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনের তুঙ্গ অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন। এ যুক্তিতে তো স্রেফ আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা ছাড়া সাহিত্যে আর কোনও রকমের ঘরানাই থাকা উচিত না।

বলা বাহুল্য, এর উত্তরে নেহাৎ ত্যাঁদড় না হলে কেউ বলে না, উচিত তো না-ই। বলে, আহা তা বলা হচ্ছে না। বলতে চাওয়া হচ্ছে যে কোনও জনগোষ্ঠী যদি একটি বিশেষ বঞ্চনা বা অত্যাচারের সিস্টেম্যাটিক্যালি ভুক্তভোগী হয়ে থাকে, তাহলে সে ভোগান্তির হাতে কলমে অভিজ্ঞতা না থাকলে সে বিষয়ে শিল্পসৃষ্টি না করতে বসাই ভালো। অর্থাৎ কি না একজন সাদার বর্ণবিদ্বেষের জাঁতাকলে পিষ্ট কালো মানুষদের কষ্ট কল্পনা করতে না যাওয়াই ভালো, ঔপনিবেশিকদের দলের লেখকের পরাধীন জাতির লাঞ্ছনা সাজিয়েগুছিয়ে না লেখাই ভালো, আজীবন উঁচুজাত হওয়ার যাবতীয় সুযোগসুবিধে চেটেপুটে ভোগ করে একজন নিচুজাতের মানুষের বঞ্চনা, লাঞ্ছনা কল্পনা করার মতো প্রতিভা আমার আছে আত্মবিশ্বাসে ভুগে, তাঁদের গল্প বলার দায়িত্ব ঘাড়ে না নেওয়াই ভালো।

অবশ্য আমি এমন অনেককে চিনি, যারা শোষক শোষিতের এই সপাট ভাগাভাগি এত সহজে মেনে নিতে রাজি নন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ দিয়ে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। জীবনে প্রথম হোস্টেল। নিজের ঘর তখনও অ্যালট হয়নি। আর একজনের ঘরে থাকব। মাতৃভাষায় রুমমেটের সঙ্গে কথোপকথন চালাতে পারার আশ্বাস দিয়ে যাবতীয় আশংকা চাপাচুপি দিয়ে রেখেছি। সেই প্রথমবার তাঁর সঙ্গে দেখা, তাঁর ঘরে ঢোকা। মহিলা ইস্ত্রি করছিলেন। অভ্যর্থনা জানিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করলেন। বললাম। যা বুঝলাম, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি আমার নামের মুড়োটুকুই জানতেন, ল্যাজাটা সেই সবে গোচর হল।

তাঁর ঠোঁটে গভীর সাংকেতিক হাসি ফুটল।

বললেন, কনগ্র্যাচুলেশনস।

তখন আমি এখনকার থেকেও এক কোটি গুণ বেশি বোকা ছিলাম কাজেই এই আলটপকা অভিনন্দনের মানে বুঝিনি। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। স্রেফ উচ্চবর্ণ বাড়িতে জন্মানোর অপরাধে, এক্সট্রা পরিশ্রম, এক্সট্রা স্ট্রাগল করে, সংরক্ষণের কাঁটাছড়ানো রাস্তায় রক্তাক্ত পায়ে হেঁটে, সব ব্যাটার যাবতীয় ষড়যন্ত্রের মুখে নুড়ো জ্বেলে আমি যে আমার পূর্বপুরুষের হক্কের জমিদারিতে ফের ঝাণ্ডা গাড়তে পেরেছি, সেই অসামান্য অ্যাচিভমেন্ট বাবদেই অভিনন্দন।

এবারের চার নম্বরের গল্পটা লিখতে লিখতে মনে হচ্ছিল, এই সব দিক থেকে ভাবলে হয়তো আমার এই গল্পটা লেখা অনুচিত। আকারেপ্রকারে আমি আর আমার গল্পের হিরো একটাই গোদা বাক্সে পড়ি বটে; সেও মেয়ে আমিও মেয়ে, কিন্তু দুজনের সমস্ত মিলের ওইখানেই ইতি। গল্পের খাতিরে তাকে যে যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তার কণামাত্র আমাকে ফেস করতে হয়নি। হলে কী হত কল্পনা করতেও চাই না।

আমার সন্দেহ, উঁহু, বিশ্বাস -- আমার জন্য না হলেও এই গল্পের যাত্রা বহু মানুষের জীবনে জলভাত। অনিবার্য। সিস্টেম্যাটিক।

দোটানায় ভুগতে ভুগতেই তবু চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর জন্য লিখে ফেলেছি রোল মডেল নামের একখানা গল্প। এই রইল লিংক।



August 26, 2020

রাত অকেলি হ্যায়



উৎস গুগল ইমেজেস


প্রশংসা

১। আজকাল নামজাদা সেলিব্রিটির প্রতি আনুগত্য জাহির করতে ভয় লাগে। কোথায় কী গুল খিলিয়ে রেখেছেন। বা এখন না খেলালেও পরে খেলাবেন। তখন কিছু লোক, তুমি তো একসময় খুব মাথায় তুলতে, বলে মুখ বেঁকাবে। শিল্পের থেকে শিল্পীকে আলাদা রাখার থিওরি ফলিয়ে যে শত্রুপক্ষের থোঁতা মুখ ভোঁতা করব সে জমানাও গেছে। এখন রোলিং-এর ট্রান্সফোবিক মন্তব্যের প্রতিবাদে প্রগতিশীলদের দলে দলে বুকশেলফ থেকে হ্যারি পটারের বক্সসেট বিদায় করার জমানা। এখন সবার মত হচ্ছে শিল্পীকে বাদ দিয়ে শিল্প হয় না। শিল্পীর ধ্যানধারণা, বিশ্বাসঅবিশ্বাস -- মগজ এবং আঙুল চুঁইয়ে শিল্পের মধ্যে ঢোকে; যে শিল্পকে তোল্লাই দেওয়া মানে শিল্পীর যাবতীয় ভালোমানুষি এবং বাঁদরামোকে প্রশ্রয় দেওয়া।

ওঁর অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের দোষগুণ, ভালোমন্দ কিছুই জানি না ধরে নিয়ে স্বীকার এবং ঘোষণা করছি - এই মুহূর্ত এবং গত বেশ কয়েকবছর, নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকি আমার ফেএএএএভারিট অভিনেতা। চড় খাওয়া গুণ্ডা থেকে শুরু করে চড় মারা পুলিস থেকে শুরু করে পিডোফাইল মাস্টারমশাই থেকে শুরু করে সাকসেসফুল মাফিয়া ডনের অপদার্থ ছেলে -- যে রূপেই উনি পর্দায় আবির্ভূত হন না কেন, সমান শিহরণ জাগে।

রাত অকেলি হ্যায়-তেও জেগেছে। রাত অকেলি হ্যায়-তে নওয়াজুদ্দিন সেজেছেন পুলিস অফিসার। নাম জটিল যাদব। গোড়াতে যতীন রাখা হয়েছিল, তালেগোলে জটিল হয়ে গেছে। মায়ের সঙ্গে একলাটি থাকেন, সততার সঙ্গে চাকরি করেন, কোনওরকম চরিত্রদৌর্বল্যে ভোগেন না।

অভিনয় তো ভালোই করেন, এ ছাড়াও ধুদ্ধুড়ি হয়েও না হওয়া একটা সত্য সিদ্দিকিসাহেব বারবার প্রমাণ করেন। সেক্স অ্যাপিলের কোনও দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, মেলানিন হয় না। ওর জন্য গুলি ফুলিয়ে, ঠোঁট ফাঁপিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকাতেও হয় না। ও জিনিস যার থাকে তার থাকে, যার থাকে না তার শত চেষ্টাতেও গজানোর আশা থাকে না।

সিনেমায় আরও অনেকেই আছেন, চেনা মুখ। হিরোইন সেজেছেন রাধিকা আপ্তে। তিতলি নামের একটি হাত পা পেটের ভেতর সেঁধানো হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম, অভিনয় করেছিলেন শিবানী রঘুবংশী, এখানে ছোট কিন্তু জরুরি একটি রোলে আছেন। আরেকজন পছন্দের অভিনেতা তিগমাংশু ধুলিয়া করেছেন গোলমেলে পুলিস বসের পার্ট। শ্বেতা ত্রিপাঠী, যিনি নওয়াজুদ্দিনের সঙ্গে হারামখোর নামের আরেকটি বুক কাঁপানো সিনেমা-য় অভিনয় করেছিলেন, তিনিও আছেন। ইলা অরুণ নেমেছেন জটিল যাদবের মায়ের রোলে।

আরেকজন আছেন, আদিত্য শ্রীবাস্তব। যিনি 'ওরে বাবা সেধে এত ডিপ্রেসিং সিনেমা কেন দেখতে বসেছি' গোত্রের আমার তিনটি প্রিয় সিনেমা -  গুলাল, ব্ল্যাক ফ্রাইডে এবং পাঁচ-এ অভিনয় করেছিলেন। আরও নিশ্চয় অনেক ভালো ভালো সিনেমায় ভালো ভালো অভিনয় করেছেন এবং করবেন। কিন্তু আমার কাছে তিনি আজীবন, আমরণ সিনিয়র ইন্সপেক্টর অভিজিৎ হয়েই থাকবেন। ওঁকে খারাপ লাগা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, লাগার মতো কিছু করেনওনি।

২। আজকাল ওয়েবসিরিজ/সিনেমা দেখতে বসার একটা ফাউ বিনোদন হচ্ছে, দেখে উঠে বল-তো-গল্পটা-কোথা-থেকে-ইন্সপায়ার্ড-ইন্সপায়ার্ড খেলা। দেখেশুনে যা বুঝলাম, রাত অকেলি হ্যায় সে বাবদে একটা বিরাট রেঞ্জ কভার করেছে। শেক্সপিয়ার থেকে শরদিন্দু। এই অসামান্য কীর্তি রা-অ-হ্যা কী করে স্থাপন করল কীভাবে সেটা বলতে গেলে আগে গল্পটা বলতে হবে।

বিয়ের রাতে বর খুন হয়েছেন। বর্ষীয়ান বর। স্ত্রী গত হয়েছেন পাঁচবছর আগে। সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারও ডেড। একটা গোলমাল আছে বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু বরের পরিবার বনেদি এবং পয়সাওয়ালা, ভোটেটোটে দাঁড়ান, কাজেই পুলিস বিশেষ গা করছে না। দুর্ঘটনার পাঁচ বছর বাদে বর আবার বিয়ে করছেন (বর টাইপ করতে গেলেই অভ্র বারংবার বর্বর সাজেস্ট করছে। এই সিনেমার ক্ষেত্রে সেটা এত অ্যাপ্রোপ্রিয়েট যে কী বলব)। একটা ব্যাপারে বরমশাইয়ের বদান্যতার তারিফ করতে হবে, দ্বিতীয় বিয়ে করার সময় গৃহকর্মনিপুণা সুলক্ষণা অনাঘ্রাতা বালিকা বেছে আনার বদলে তিনি তাঁর মেয়ের বয়সী দীর্ঘদিনের রক্ষিতা রাধাকে বিয়ে করার বিপ্লব ঘটিয়েছেন। বলা বাহুল্য, তাঁর বিয়ের সিদ্ধান্তে অনেকেই চটেছে। বিশেষ করে অপদার্থ জামাই, শ্বশুরমশাই মরলেই সম্পত্তির অধিকারী হওয়ার অপেক্ষায় যিনি থাবা কচলাচ্ছিলেন। তাছাড়াও আছেন বরের মৃত দাদার পরিবার, বৌদি, ভাইপো, ভাইঝি। এঁরাও আশায় আশায় ছিলেন যে কিছু ছিটেফোঁটা পাওয়া যেতে পারে। কাকার এত বয়সে বিয়ে বসাটা তাঁদেরও মনঃপূত হওয়ার কোনও কারণ নেই।

সেই বর খুন। বাড়ির সবাই, বিশেষ করে অপদার্থ জামাইটি লাফিয়ে পড়ে নতুন বউয়ের ওপর খুনের আঙুল তোলে। এক ঢিলে যদি দুই পাখি বিদেয় করা যায়। তদন্ত করতে আসেন ইন্সপেক্টর জটিল যাদব।

শেক্সপিয়ার যা পড়েছি সবই অনূদিত এবং অ্যাব্রিজড, তবু গল্পের ধাঁচ জানা আছে বলে আর গাদাগুচ্ছের রিটেলিং দেখা আছে বলে বুঝেছি, কাকাভাইপোর টানাপোড়েন, মায়ের অন্ধ পুত্রস্নেহ ইত্যাদি সম্পর্কের প্যাঁচ, বিশেষ করে কমন দালানে একজোট হয়ে তাঁদের ঝামেলা পাকানো দেখলে শেক্সপিয়ার থেকে টোকা মনে হওয়া অবিশ্বাস্য নয়। তারপর বাড়িতে একজন সন্দেহজনক চরিত্রের ফেম ফ্যাটালের আবির্ভাব আর বাড়ির একাধিক পুরুষের তাঁর প্রতি কেমন কেমনের ব্যাপারটা -- ক্ল্যাসিক শরদিন্দু।

কিন্তু আমি বলব, এর সঙ্গে ওর সঙ্গেও মিল থাকা সত্ত্বেও, আসলে রাত অকেলি হ্যায় কিছু থেকেই টোকা নয়। রাত অকেলি-র গল্পটা কতগুলো বহুব্যবহৃত ট্রোপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যে ট্রোপগুলো আগেও বহু গল্প ব্যবহার করেছে। দু'টো ট্রোপের উদাহরণ তো আগেই দিলাম, নিচে আরও কয়েকটা দিচ্ছি।

১। প্রথম খুনের যে সাক্ষী থাকবে, সেকেন্ড খুনটা সে হবে।

২। বাড়ির সকলেরই খুন করার মোটিভ আছে।

৩। সবার মিথ্যে বলার স্বার্থ আছে। কারও অ্যালিবাই দাঁড়াচ্ছে না।

৪। বদের বাসা রাজনীতিবিদের সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিস অধিকর্তার আঁতাত চলছে।

৫। সৎ পুলিস অফিসারকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না ইত্যাদি প্রভৃতি।

প্রশংসার ক্যাটেগরিতে ট্রোপের প্রতি আনুগত্যের কথা বেখাপ্পা লাগতে পারে। কিন্তু ট্রোপ ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারলে গল্প বলা আপসে অনেক টান টান হয়ে যায়। প্রথম ট্রোপটার কথাই ধরুন। খুনের সাক্ষী খুন। মান্ধাতার আমল থেকে গোয়েন্দাগল্পে চলে আসছে বলে অনেকে নাক কোঁচকাতে পারেন। কিন্তু একটা গল্পে একাধিক খুন ঠেসে দিতে হলে (যা কি না আমার মতে ভালো রহস্যগল্পের অবিসংবাদিত শর্ত) এর থেকে যুক্তিযুক্ত কারণ কি কেউ দেখাতে পেরেছে?

রাত অকেলি হ্যায় আমার মতে গোয়েন্দাগল্পের ট্রোপগুলো প্রশংসনীয় মুনশিয়ানার সঙ্গে ব্যবহার করেছে।

৩। তিননম্বর প্রশংসাটা 'নুন-আরেকটু-বেশি-হলেই-রান্নাটা-খারাপ-হয়ে-যেত গোত্রের। ছোট শহরের সামাজিক রাজনৈতিক চালচিত্র, মূল্যবোধ, অবক্ষয়, গুড কপ ব্যাড কপ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদিতে টইটম্বুর প্রেক্ষাপট দেখে আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম, এই রে, এইবার সোশ্যাল কমেন্টারি শুরু হল বলে। হলে, ফ্র্যাংকলি, আমি উঠে পড়তাম। পড়িনি যে তার একমাত্র কারণ হচ্ছে ও সবের মধ্যেও গল্পের রহস্য, খুন এবং খুন কে করেছে, কে করতে পারে, সেটাই সর্বদা প্রাধান্য পেয়েছে। বাদবাকি সবই ঘটেছে ওই সুতোর আশেপাশে।

নিন্দে

১। অ্যাদ্দিনে এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে গল্পের প্রধান প্লট যা-ই হোক না কেন, সাবপ্লট হবে প্রেম। এবার এটাও পরিষ্কার হয়ে যাওয়া দরকার যে প্রেমটা কাদের কাদের মধ্যে হতে পারে সেটা নিয়ে আরেকটু মাথা খাটানোর দরকার আছে।

এমন জুটির মধ্যে যদি আপনি প্রেমভালোবাসার উন্মেষ ঘটান যাদের একজন পরীক্ষা দেবে আরেকজন নম্বর দেবে, একজন অ্যাপ্রাইজাল জমা দেবে আরেকজন অ্যাপ্রাইজালে কমেন্ট লিখবে, একজন খুন করবে আরেকজন তদন্ত করবে -- তাহলে আমার মতো ছোটমনেরা ভুরু কোঁচকাবে। কোঁচকাবেই।

নির্ঘাত এ কিছু আদায় করার জন্য প্রেম করছে। নির্ঘাত ও একে ফাঁদে পেয়ে প্রেম করছে।

জটিল যাদব যদি বাড়ির বৃদ্ধা ঠাকুমার প্রেমে পড়তেন, যিনি সাস্পেক্ট নন এবং কুলাঙ্গার নাতিনাতনি বাপকাকাকে খুন করে জেলেই যাক বা ফাঁসি, যাঁর কিস্যু যার এসে যায় না, আমি বিন্দুমাত্র বিচলিত হতাম না। উল্টে এমন চমৎকার জুড়ির প্রতি বুকভরা শুভেচ্ছা জানাতাম।

হ্যাঁ, গল্পে স্টেক থাকত না। প্রধান সাসপেক্টের প্রতি তদন্তকারীর প্রেমের যে এক্সট্রা টানাপোড়েন, ঠাকুমার সঙ্গে প্রেম সেটা জোগাতে পারত না। কারণ সেখানে স্বার্থের সংঘাত নেই। আর জমাটি সংঘাত না থাকলে গপ্পও নেই।

সে সংঘাত এখানেও যে খুব দেখানো হয়েছে তেমন নয়। বাহ্যিক সংঘাত একরকম দেখানো হয়েছে কারণ জটিল যাদবের চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়েছে, কিন্তু অন্তর্লীন সংঘাতের খাতা শূন্য।

জটিল যাদব প্রেমে পড়েছেন অন্যতম প্রধান সন্দেহভাজনের, যার খুন করার ঝুড়ি ঝুড়ি মোটিভ এবং অপরচুনিটি আছে। এবং মুখ থুবড়ে পড়েছেন। তিনি ধরে নিয়েছেন মহিলা খুন করতেই পারেন না। এই ধরে নেওয়ার পেছনে গাট ফিলিং ছাড়া আর কোনও যুক্তি খাড়া করার পরিশ্রম করা হয়নি।

প্রেমে পড়ে জটিল সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিকতা হারিয়েছেন। সহকর্মী যখন রাধাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছেন, (সহকর্মীটিও নৈর্ব্যক্তিক নন; তিনি আবার ধরেই নিয়েছেন রাধাই খুনী এবং রাধাকে যা নয় তাই সম্বোধনে ভূষিত করছেন) জটিল যাদব তাঁকে প্রকাশ্য দিবালোকে বাইক থেকে নামিয়ে চড়থাপ্পড় মারছেন।

যে পুলিস অফিসারকে ঘটনার আগের সিনে বসের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে দেখা যায়নি, তিনি সাসপেন্ড হয়ে, ক্রাইম সিনে ঢুকে, বাড়িশুদ্ধু লোককে মেরে পাট করে, রাধাকে বাইকের পেছনে চাপিয়ে শহর ছেড়ে, মাঝরাতে রাধার চেনা বাড়িতে গিয়ে উঠে, সকালবেলা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে রাধার দু'গাল চেপে ধরে চুম্বনোদ্যত হচ্ছেন এবং পরের সিনে রাধা তাঁকে মিথ্যে বলেছে আবিষ্কার করে দেওয়ালে ঠেসে ধরে থাবড়া কষাচ্ছেন।

অর্চিষ্মান তর্ক করল যে এইসব মূলত জটিল যাদবের চরিত্রের আর্ক বোঝানোর জন্য করা হয়েছে। যে লোকটা সিনেমার শুরুতে মহিলাদের জামাকাপড়, চালচলন নিয়ে ভয়াবহ সেকেলে এবং আপত্তিজনক মন্তব্য করছে, সেই কি না দশ মিনিট যেতে না যেতে সমাজের চোখে পতিত একজন নারীর হয়ে চাকরি লাটে তুলে, প্রাণের মায়া ত্যাগ করে লড়ে যাচ্ছে। এর থেকে মারাত্মক আর্ক আর কী হতে পারত? আর কনফ্লিক্টের মতোই, চরিত্রের, বিশেষ করে প্রধান চরিত্রের আর্ক, ভালো গল্পের গোড়ার শর্ত।

যদি ধরে নিই যে আর্ক দেখানোই উদ্দেশ্য হয়, তবে তা যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য কি? পুলিসের চাকরির মতো একটা চাকরি করে জটিল যাদবের যে চক্ষুরুন্মীলন ঘটেনি, আবেদনময়ী সাসপেক্টের সামনে পড়ে এক নিমেষে তা ঘটে গেল?

ঘটতেও পারে। যদি ঘটে তার থেকে ভালো কিছু হয় না। তবে আমার কাছে আর্কটা সমস্যা নয়। আমার সংশয়টা অন্য জায়গায়। কয়েকটা উদাহরণ দিলে যেটা বোঝাতে সুবিধে হবে।

সম্প্রতি একটি ধারাবাহিক গোয়েন্দা উপন্যাস পড়লাম। গল্পের হিরো একজন তরুণ আই পি এস অফিসার। শুরু থেকে বিভিন্ন চরিত্রের মুখে অফিসারের মেধা, বিচক্ষণতা, রহস্য সমাধানে পটুতার গুণগান শুনে শুনে কান ঝালাপালা। অতঃপর গল্পে অফিসারের দপ্তরে এক মহিলা একটি রহস্য নিয়ে এলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "আসতে পারি?" অফিসার চোখ তুলে তাকালেন এবং থমকে গেলেন। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। তিনি বুঝতে পারলেন, এতদিন ধরে এই মানুষটিরই তাঁর অপেক্ষা ছিল। তাঁর কান গরম হল, গলা খসখসে, জিভ খটখটে। অনেককক্ষণ পর তিনি আবিষ্কার করলেন মহিলা কখন যেন সামনের চেয়ারে বসে কী সব কথা বলে চলেছেন, একবর্ণও তাঁর কানে ঢোকেনি। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে যথাসম্ভব সামলে নিয়ে পরিস্থিতি ম্যানেজ দিলেন।

এইবার কল্পনা করুন আপনি ওই সুন্দরী মহিলা। মারাত্মক বিপদে পড়েছেন। ছুটে গেছেন পুলিসের কাছে সাহায্য চাইবেন বলে। আপনি আপনার সমস্যার কথা বলছেন, এদিকে উল্টোদিকে বসা পুলিস কিছুই শোনার অবস্থায় নেই। তিনি ঘামছেন। কান গরম। এক পা অন্য পায়ের ওপর তুলছেন। আবার ওই পায়ের ওপর এই পা। উশখুশ করছেন। গলা ঝাড়ছেন। আপনার কথা একবর্ণ তাঁর মগজে ঢুকছে না।

আপনি এঁকে ভালো পুলিস অফিসার বলবেন? আমি হলে বলতাম না। মেধা চাই না, পটুতা চাই না, মগজাস্ত্র, ইনটুইশন কিচ্ছু চাই না। নিজের মন ও শরীরের ওপর বেটার সংযমওয়ালা কাউকে দে ভাই। যিনি আমার মাপজোকের থেকে আমার সমস্যাকে বেশি সিরিয়াসলি নেবেন এবং নিজের ডিউটি যথাযথ পালন করবেন।

এবার অনামী রহস্য ধারাবাহিকের বদলে একটি বিশ্ববন্দিত সায়েন্স ফিকশন। বিজ্ঞান, ফিলজফি, পুরাণ, ইতিহাস, বিপ্লবের অসামান্য ককটেল। জনর সাহিত্যের ফুরফুরে বদনামের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া সিরিয়াস সাইফাই। সমস্ত প্রধান ভাষায় অনূদিত, পুরস্কৃত। সেই গল্পে এক বিজ্ঞানী গেছেন আরেক বিজ্ঞানীর সঙ্গে বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলতে। প্রথম জন পুরুষ, দ্বিতীয় জন মহিলা। আমার অক্ষরে অক্ষরে মনে নেই, দেখে দেখে টোকার ধৈর্যও নেই, কিন্তু মহিলা বিজ্ঞানীকে পুরুষ বিজ্ঞানীর প্রথম দেখার ফিলিংটা পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে আছে। মহিলা সাদা ফুলের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর লাবণ্যময়ী মুখে রোদছায়া খেলা করছে। হিরো বিজ্ঞানী চলচ্ছক্তিহীন হয়ে তাকিয়ে আছেন। এমন নারীও আছে পৃথিবীতে? ব্যস, সেই মুহূর্ত থেকে মহিলা আর সহকর্মী নন, বিজ্ঞানী নন, তাঁর রোল হচ্ছে হিরোর কামনার ধনের। এর পর তিনি যাই বুদ্ধির কথা বলবেন না কেন, হিরোর অনুরাগ চড়চড়িয়ে বাড়বে। ওয়াও, বিউটি উইথ ব্রেনস!

দুটো কারণে আমি বইগুলোর নাম করলাম না। এক, কারও চক্ষুশূল হওয়ার আমার অভিপ্রায় নয়। দ্বিতীয়ত, অবিকল এই রোগে ভোগা আরও দু'কোটি বইকে ছেড়ে এই দুই বইকে নিয়েই পড়লাম কেন, সেটার সদুত্তর দিতে পারব না বলে।

আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, এই সব হিরোরা বিজ্ঞানীও নন, পুলিসও নন, শিল্পী, খেলোয়াড়, রাজনীতিবিদ কিচ্ছু নন। আমাদের অধিকাংশ হিরোই আসলে তেরো বছরের হরমোনতাড়িত বালক।

এত কথা এই জন্য পাড়লাম সেটা হচ্ছে জটিল যাদবের চরিত্রের এই দুর্বলতাটাকে দুর্বলতা হিসেবে উপস্থাপন করলেই আমার বেশি ভালো লাগত। হিরোর মধ্যে সততা, নিয়মানুবর্তিতা, নির্ভীকতা ইত্যাদি দেবতাসুলভ পরিমাণে ঠেসে দিয়ে, যৌন আবেদনের শামুকে পা কাটানোর সিদ্ধান্তটা আমার চিরকালের রহস্য লাগে। ঘুষের মুখে পড়লে ঘুঁষিয়ে ঘুষদাতার দাঁত ভেঙে যাকে নিজের সততার প্রমাণ দিতে হয়, মুখের আদল আর ত্বকের মেলানিন মনের মতো হলে তিনি কাণ্ডজ্ঞান হারানোর লাইসেন্স পান কেন?

২। রা-অ-হ্যা যেমন ট্রোপ সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করে, তেমনি তা ক্লিশেতে পরিপূর্ণ। চরিত্রের ক্লিশে তো আছেই। পুলিসের মা বিয়ে দিতে চান। পুলিস বিয়ে করতে চান না। হিরোইন নারীশক্তির প্রতিভূ। দৃশ্যের ক্লিশেও ভূরি ভূরি। শেষ দৃশ্যে পাবলিক পরিবহনের টার্মিনাসে নায়কনায়িকার মিলন। জোয়া আখতারের সিনেমা হলে লুক্সেমবার্গের এয়ারপোর্টে হত, এখানে ছাপরা এক্সপ্রেসের ভিড় কামরায় হয়েছে। ওই মারাত্মক ভিড় কামরাতেও হিরোইন জানালার সিট পেয়েছেন ইত্যাদি।

ওয়েল, আমার ক্ষমতায় যা কুলিয়েছে, রাত অকেলি হ্যায়-এর ততখানি বিচার এখানে রইল। সিনেমা তৈরিতে আর যা যা লাগে -- আলো, শব্দ, সম্পাদনা, কালার কারেকশন, বুম হোল্ডিং-এর ইন-ডেপথ পর্যালোচনার জন্য বিশেষজ্ঞরা তো রইলেনই। আমার বিচারের সঙ্গে আপনাদের বিচার মিলল কি না জানাবেন। না মিললেও। 


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.