September 28, 2015

পনেরোটি মিথ্যে . . .




উৎস গুগল ইমেজেস


. . . যা আমি নিজেকে অহরহ বলে থাকি।

১। কালকের দিনটা আজকের দিনের থেকে লম্বা হবে। আজকের দিনটা চব্বিশ ঘণ্টার ছিল, কালকের দিনটা অন্তত ছাব্বিশ ঘণ্টার হবে। কারণ আজ আমি যে কাজগুলো সময়ের অভাবে করে উঠতে পারিনি - রেওয়াজ, ব্যায়াম এবং পড়াশুনো - সেগুলো সব আমি কাল করব।

২।  প্রতি বছর শারদীয়া আনন্দমেলা আমাকে কিনতেই হবে, কারণ শারদীয়া আনন্দমেলার সঙ্গে আমার শৈশব কোনও না কোনও ভাবে জড়িয়ে আছে।

৩। আমি দিনের পর দিন ঠাকুমাকে ফোন না করলেও ঠাকুমা ঠিকই বুঝবেন যে আসলে আমি তাঁর কথা রোজ ভাবি। তাঁর চোখের সামনে যখন ছিলাম, তখনকার মতোই, কিংবা তার থেকেও বেশি ভালোবাসি।

৪। অর্চিষ্মান আমাকে যতখানি মাতৃমুখী এবং মাতৃনির্ভর মনে করে আমি আসলে অতখানিও নই।

৫।  আমার প্রতিশোধস্পৃহা নেই।

৬। আমি এখন আমার জীবনের অন্যতম সুখের সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। অতীতের পরাজয়ের স্মৃতি আমাকে আর অবিরত ধাওয়া করে না।

৭। পরের লং উইকএন্ডে আমি বাড়ি গোছাব। বিলোনোর জন্য যে জামাকাপড়গুলো গত একবছর ধরে গুছিয়ে রাখা আছে সেগুলো যথাস্থানে পৌঁছব।  

৮। এই শেষ। পরের বার হলে সিনেমা দেখতে এসে তিনশো টাকা দিয়ে তিন মুঠো পপকর্ন আমি আর কিনব না। এ জিনিস করা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে . . .

৯। এক প্যাকেট ক্রিম ক্র্যাকার রীতিমত বৈধ ডিনার। বিশেষ করে বাড়িতে একা থাকলে।

১০। পৃথিবীতে পড়ার জন্য এত বই আছে, আর সময় এত কম। আগাথা ক্রিস্টি আর সত্যজিৎ রায়ের একশোবার পড়া বইগুলো আবার পড়ে সে দুর্মূল্য সময় আমি নষ্ট করব না।

১১। আমি যদি আমার সমস্যাগুলোকে সমস্যা বলে স্বীকার না করি তবে তারা নিজে নিজেই সমাধান হয়ে যাবে।

১২। মগজের থেকে মনের কথা শুনে চলা সবসময়েই ভালো।

১৩। স্বত্ব আর সত্ত্ব-র বানান এবং অর্থের পার্থক্য নিয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী। প্রতিবার ব্যবহার করার আগে অভিধান খুলে দেখার কোনও প্রয়োজনই বোধ করি না।

১৪। আমার সময় আছে। যদিও আর দুমাস পর আমার পঁয়ত্রিশ হবে। যদিও আমি জানি গত পঁয়ত্রিশ বছর যে গতিতে কেটেছে আগামী পঁয়ত্রিশ বছর তার থেকে পঁয়ত্রিশ গুণ দ্রুত কাটবে। তবু আমার সময় আছে। দায়িত্ব পালন করার, স্বপ্ন পূর্ণ করার। অনেক, অনেক সময় আছে।

১৫। আমি চেষ্টা করছি। আমার যতটুকু সামর্থ্য আছে, যতখানি সময় আছে, যে পরিমাণ সদিচ্ছা আছে, সবটুকু দিয়ে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।

  

September 27, 2015

ফাঁকিবাজি



শ্রীকান্ত আর ইন্দ্রনাথ-এর গল্পে ছিনাথ বহুরুপী আবির্ভূত হওয়ার ঠিক আগে সন্ধ্যেবেলায় ভাইবোনদের পড়তে বসার দৃশ্য ছিল মনে আছে? পড়ুয়াদের দলের নেতা ছিলেন মেজদা। তাঁর কড়া পাহারায় ভাইবোনদের পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়ার কোনও সুযোগ থাকত না। জল খাওয়া, বাথরুম যাওয়া ইত্যাদি পড়া ফাঁকি দেওয়ার রাস্তা আছে সে সব বন্ধ করার জন্য নানারকম অভিনব উপায় বার করেছিলেন মেজদা। এই সব কাজ করার জন্য সবাইকে আবেদনপত্র জমা দিতে হত, মেজদা সে সব পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে তবে ভাইবোনদের পড়া ছেড়ে ওঠবার অনুমতি দিতেন। এই সব করতে গিয়ে তাঁর নিজের পড়ার বেজায় ব্যাঘাত হত সন্দেহ নেই, কিন্ত তিনি সে নিয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিলেন বলে মনে হয় না। দুঃখের বিষয় হচ্ছে যাদের পড়ানোর জন্য মেজদার এত বলিদান, তাদেরও গোটা সময়টা অ্যাপ্লিকেশন লিখতে আর পাশ করাতেই চলে যেত, পড়া কতখানি হত সেটা তর্কের বিষয়।

আমার মায়েদের ছোটবেলাতেও এ ধরণের নিয়ম চালু ছিল জানতে পেরেছি। তবে অ্যাপ্লিকেশনের বদলে মায়েদের ছিল ঘুঁষি মারার ব্যবস্থা। সন্ধ্যেবেলা একসঙ্গে সবাই পড়তে বসত। জল খেতে হলে একবার মাটিতে ঘুঁষি মারা হত। বাথরুমে যেতে গেলে দুবার। কোন বাথরুমে যাওয়া হচ্ছে, ছোট না বড়, সেই অনুযায়ীও ঘুষির সংখ্যার তারতম্য হত। সেজমাসি এসবের সাক্ষী থাকতেন না বলাই বাহুল্য, কাজেই এত অনুমতির ঘটা কীসের জন্য জানতে চাইলে মা বলেছিলেন, অনুমতি না, স্রেফ একে অপরকে জানান দেওয়ার জন্যই নাকি এই ব্যবস্থা। যাতে নিজেরাই নিজেদের পড়াশোনার পারফরম্যান্সের ওপর পাহারা রাখা যায়। গণতান্ত্রিক উপায়ে।

ওপরের দুটো ঘটনা দিয়ে আমি যেটা বোঝাতে চাইছি যে কাজে ফাঁকি দেওয়ার অনেক রকম উপায় আছে। টিভি দেখে, ঘুমিয়ে, গল্পের বই পড়ে, ইউটিউব দেখেও যেমন কাজে ফাঁকি দেওয়া যায়, সেরকমইকাজ কী করে আরও ভালো করে করা যায়সেই নিয়ে মাথা খাটিয়েও করা যায়। এই রকম ফাঁকির সুবিধে হচ্ছে এতে বিবেকদংশন থাকে না. বা থাকলেও কম থাকে। নিজের মনকে চোখ ঠারানো যায়। এই সত্যিটা মেজদা ও তাঁর ভাইয়েরা জানতেন, আমার মামাবাড়ির লোকেরা জানতেন, আমার বড়বেলার এক বন্ধুও জানত।

সেই বন্ধু পড়াশোনা নিয়ে ভয়ানক সিরিয়াস ছিল। পরীক্ষা আসার চার মাস আগে ক্লাস বাংক করা বন্ধ করে দিত,  সিনেমা দেখত না, ফুচকা খেত না। পাছে শরীর খারাপ হয়ে পড়ার সময় নষ্ট হয়। পড়াশোনার প্রতি এত নিবেদিতপ্রাণ আমি আমার জীবনে আর কাউকে দেখিনি। আমরা জমা দেওয়ার আগের রাতে পুরোনো হোমওয়ার্ক খুঁজতে বেরোতাম, বন্ধুর ফোল্ডারে গত পাঁচবছরের সব হোমওয়ার্কের প্রতিটি প্রশ্ন ও সমাধান জমা করা থাকত। মাইক্রোর ফোল্ডার লাল রঙের, ম্যাক্রোর নীল, ইকোনোমেট্রিক্সের সবুজ। বন্ধুর নোটের খাতায় প্রশ্ন আর উত্তর আলাদা আলাদা কালিতে লেখা থাকত।

আশ্চর্যের ব্যাপারটা হচ্ছে এত নিষ্ঠা কিন্তু নম্বরে প্রতিফলিত হত না। হতেই হবে সে রকম কোনও কথা নেই। আমার এক বন্ধু দাবি করেছিল যারা যে সাবজেক্টকে যত বেশি ভালোবাসে বা যে সাবজেক্টটা যত ভালো বোঝে তারা সেটায় সবথেকে কম নম্বর পায়। আমি আবার এত শক্ত যুক্তি বুঝি না, আমার হিসেবে বলে বেশি পড়লে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে। কাজেই যে বন্ধু এত পড়ে সে কেন নম্বর পায় না সেটা নিয়ে আমার একটা খটকা লেগে থাকত।

খটকাটা কাটল তার রুমে একদিন পড়তে গিয়ে।

গিয়ে দেখলাম যা আশা করেছিলাম তাই। টেবিল পরিপাটি করে গোছানো। রং মিলিয়ে ফোল্ডার থরে থরে সাজানো। দেওয়ালে মোটিভেশনাল পোস্টার, টেবিলে সরস্বতীর মূর্তি। আমি বই খুলে বসলাম, সে ঘর গুছোতে লাগল।  বলল, না হলে নাকি তার পড়ায় মন বসে না। আমি পড়তে থাকলাম, সে ঘর পরিপাটি করে গুছোলো, সাজানো বইয়ের তাক আবার কেঁচে গন্ডুষ করে সাজালো, নতুন পাওয়া নোটের বান্ডিল পাঞ্চ করে ফোল্ডারে ফোল্ডারে ঢোকালো, রং মিলিয়ে মিলিয়েপোস্ট ইটসাঁটল, (পাছে খুঁজে পেতে অসুবিধে হয়) গা ধুতে গেল, গা ধুয়ে এসে সরস্বতীর সামনে ধূপ জ্বালল। শেষটা ঘরের পরিবেশ যখন কণ্বমুনির আশ্রমের মতো হয়ে উঠেছে, আর আমি যখন ব্যাগ গুছিয়ে আমার রুমের দিকে রওনা দিচ্ছি, তখন সে আমাকে বলছে, “চল, আমিও তোর সঙ্গে বেরোবো, এক কাপ কফি লাগবে, দেখলি তো সন্ধ্যেটা কোথা দিয়ে কেটে গেল, এখন রাত জাগতে হবে।

মোদ্দা কথাটা হচ্ছে ফাঁকি দেওয়ার অনেকরকম উপায় থাকতে পারে। এবং সে উপায়গুলোকে দেখে অনেকসময় ফাঁকি বলে চেনাও যায় না। আমি নিজেও এ জিনিস করে থাকি। নিচে আমার কতগুলো ফাঁকি দেওয়ার উপায়ের কথা লিখলাম, যেগুলো খালি চোখে দেখলে চট করে ধরা যাবে না যে আমি ফাঁকি দিচ্ছি। সত্যিটা কেবল জানে আমি আর আমার কাজ। আর এই জানবেন আপনারা।

১। ওয়ার্ম আপ: আমার কাজে ফাঁকি দেওয়া শুরু হয় কাজ শুরুরও আগে। অফিসে পৌঁছেই যে কাজ শুরু করে দেওয়া যায়, বা ওয়ার্ড ফাইল খুলেই টাইপ করা শুরু করা যায়, এই খবরটাই যেন আমার জানা নেই। কাজ শুরু করার আগে আমি বসি ওয়ার্ম আপ করতে। অফিসে সে ওয়ার্ম আপের দৌড় গুগল নিউজ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে, তাও  কর্তৃপক্ষের রক্তচক্ষুর কথা মনে পড়ে সে ওয়ার্ম আপে কিছুক্ষণ বাদেই ক্ষান্ত দিতে হয়, কিন্তু বাড়িতে হলে আর রক্ষা নেই। ওয়ার্ম আপ করার ছুতোয় আমি গুগল নিউজ মিনিটে মিনিটে আপডেট করে পড়েছি, বিবিসির পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ডকুমেন্টারি গোটা দেখেছি, এমনকি ক্যান্ডি ক্রাশের লাইফ শেষ না হওয়া পর্যন্ত খেলে গেছি, এমনও ঘটেছে। সারাদিন ওয়ার্ম আপ করতে করতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে রাতে ঘুমোতে চলে গেছি এ ঘটনাও বিরল নয়।   

২। টু ডু লিস্ট: লিস্ট বানিয়ে কাজ করা যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটা অন্যতম উপায় সেটার অনেক প্রমাণ আছে। পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা অনেকেই লিস্ট বানিয়ে কাজ করতেন। বিলিতি ব্যক্তিত্বরা তো করতেনই, আমাদের বিধানচন্দ্র রায়ও নাকি করতেন। ডাক্তারি, রাজনীতি মিলিয়ে সারাদিনে বিধানচন্দ্রের নাওয়াখাওয়ারও সময় মিলত না। অথচ সেই বিধানচন্দ্র নাকি দিনের শুরুতে, যখন বাকি সবাই নাকে দড়ি দিয়ে ছুটবে বলে প্রস্তুত হচ্ছে, আধঘন্টা চুপ করে বসে থাকতেন। একদিন তাঁর এক ঘনিষ্ঠ লোক আর না থাকতে পেরে বলেই ফেললেন, যে এই সময়টা এভাবে নষ্ট করা কি ডাক্তারবাবুর উচিত হচ্ছে? তখন ডাক্তারবাবু মিষ্টি হেসে বললেন যে ওই আধঘন্টা বাজে খরচ নয় মোটেই। ওই সময়টা তিনি সারাদিনে কী কী কাজ করবেন সেটা মাথার ভেতর ছকে নেন, অর্থাৎ মাথার ভেতর তাঁর সেদিনের টু ডু লিস্ট লেখেন। সেই আধঘণ্টা সময় যদি তিনি এই কাজের পেছনে না খরচ করেন তাহলে তাঁর গোটা দিনই মাটি।

কিন্তু টু ডু লিস্ট বানিয়ে কী করে গোটা দিন মাটি করা যায় সেটা শেখার জন্য আমার কাছে আসতে হবে। লিস্টের যত কাজ বাকি পড়ে থাকে, আমার লিস্ট বানানোর উৎসাহ তত পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক এমনকি বার্ষিক টু ডু লিস্টও বানিয়ে দেখেছি আমি - কোনওটাই কাজে লাগেনি, বা আমি কাজে লাগাতে পারিনি। সাধারণ টু ডু লিস্ট বানিয়েছি, বিষয়ভিত্তিক লিস্ট বানিয়েছি (অর্থাৎ কি না একদিনে অবান্তরের কাজের লিস্ট, অফিসের কাজের লিস্ট, ব্যক্তিগত কাজের লিস্ট), সময়ভিত্তিক লিস্ট (সকালের, দুপুরের, বিকেলের), সব লিস্টেরই কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

এমন নয় যে আমি নিজের এই স্বভাবে লজ্জিত নই। টু ডু লিস্টের কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য, টু ডু লিস্টের সম্মান রাখার জন্য  এমনও হয়েছে যে আমি একটা কোনও কাজ করে তারপর সেটা টু ডু লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করেছি। যাতে অন্তত কোনও একটা আইটেমের পাশে টিক চিহ্ন দিতে পারি। তারপর দেখা গেছে কেবল চা খাওয়া, চুল আঁচড়ানো আরটু ডু লিস্ট বানানোর পাশে টিক দেওয়া গেছে, সেই লিস্টের বাকি সব আইটেম যেমন ছিল তেমনি পড়ে আছে।

৩। মোটিভেশন সংগ্রহ: আমার আরেকটি ফাঁকি দেওয়ার উপায় হচ্ছে কাজ করার মোটিভেশন সংগ্রহ করা। এর মধ্যে বিখ্যাত (এবং কর্মিষ্ঠ) লোকেদের টু ডু লিস্ট সংগ্রহকরণ , দৈনিক রুটিন পর্যবেক্ষণ, উৎপাদনশীলতা সংক্রান্ত ওয়াল পেপার সাঁটন ইত্যাদি পড়ে। এসব করতে আমি যত মোটিভেটেড অনুভব করি কাজ করার বেলা যদি তার পাঁচ শতাংশও করতাম, আজ আমার জীবনটার চেহারা অন্যরকম হত।

দুঃখের বিষয়টা হচ্ছে যে আমি খেয়াল করে দেখেছি, এই সব শক্ত শক্ত ইনজিরি কথা, মোটিভেশন, ডেডিকেশন, ইন্সপিরেশন - যখন আমি জানতাম না, তখন আমার এগুলোর একটারও অভাব ছিল না। যত দিন যাচ্ছে ততই শব্দগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠছে আর মানেগুলো হয়ে পড়ছে দুর্বল।

আমার নিজের জীবনে তো এই বদলটা দেখছিই, কিন্তু এটাও কি হতে পারে যে মোটিভেশন শিকারের অভ্যেস প্রজন্মের সঙ্গে সঙ্গেও বাড়ছে?  আমার আগের প্রজন্মের একজন কর্মী লোককে আমি কাছ থেকে দেখেছি, তিনি আমার মা। ঘরের বা বাইরের - যে কোনওরকমের কাজের অভাব হলে মায়ের হাত পা কাঁপতে শুরু করে, টেনশন হয়, এ আমার নিজের চোখে দেখা। মাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে তিনি মোটিভেশনের অভাব হলে কী করে থাকেন। তাতে মা এমন অদ্ভূত চোখে আমার দিকে তাকালেন যেন ডিকশনারির বাইরে ওই শব্দটা তিনি কোনওদিনও শোনেননি।

৪। অর্গানাইজেশন: ওপরে আমার যে বন্ধুর কথা বলেছিলাম, তার ফোল্ডারেরা এখন আমার ফোল্ডারদের দেখে লজ্জা পাবে। তফাৎ হচ্ছে শুধু তার ফোল্ডারেরা ছিল রক্তমাংসের, আমার ফোল্ডারেরা বৈদ্যুতিন। অফিস ও বাড়ির কমপিউটারে, ড্রপবক্স ও গুগল ড্রাইভে, যেখানে পেরেছি আমি ফোল্ডার বানিয়ে রেখেছি। কাজের ফোল্ডার, অকাজের ফোল্ডার। একই জিনিস চার জায়গায় চারটে ফোল্ডারে সেভ করা আছে। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে, দরকারের সময় একটাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু কি ফোল্ডার, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রয়েছে বুকমার্কিং। যা পাচ্ছি, বুকমার্ক করে রাখছি। আর এসব রাখতে গিয়ে কাজের সময় কোথা দিয়ে পালাচ্ছে চোখে দেখা যাচ্ছে না। সমস্যাটা কোন পর্যায়ে গেছে সেটা বোঝানোর জন্য আপনাদের দুখানা স্ক্রিনশট দেখাই দাঁড়ান।



৫। রিসার্চ: পেটের দায়ে করতে করতে এখন এই ব্যাপারটা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমন ঢুকে গেছে যে গবেষণা ছাড়া এখন কোনও কাজ করার ক্ষমতা হারিয়েছি। অভ্যেসটা কাজের ক্ষেত্রে হয়তো কাজে লেগেছে, কিন্তু বাকি সব কাজ মাটি করেছে। যে কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে আমি যে পরিমাণ সময় সে জায়গাটা সম্পর্কে রিসার্চ করে নষ্ট করি সে সময়ে আরও তিনটে বেড়ানো প্ল্যান করে ফেলা যায়। একটা জুতোর ক্যাবিনেট কিনতে গিয়ে আমি গোটা বাড়ির ফার্নিচার কেনার গবেষণা করে ফেলি। তবে এই গবেষণা সব থেকে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে অবান্তরের পোস্ট লেখার সময়। বোনাস কুইজের কথাই ধরুন। কোনও একটা প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে লাগসই একটা গল্পের লাইন মনে পড়ে যায় (নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই সেটা ফেলুদার কোনও গল্পের হয়) কিন্তু অবিকল সেই লাইনটা তো মনে পড়ে না, কাজেই তখন গল্পটা খুঁজে বার করে লাইনটা খুঁজে বার করতে হয়। আর একবার গল্প খুঁজে পেলে সেই গল্পটা তো পুরোটা না পড়ে ছাড়া যায় না, কাজেই। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই খোঁজাখুঁজির তবু একটা মানে থাকে। যেমন আগের অনুবাদটা করার সময় রাঁচি শহরের কাছাকাছি অঞ্চলের আদিবাসী মহিলাদের নাম খোঁজার গবেষণাটা কাজের ছিল, কিন্তু ওই অঞ্চলের চার্চের ওয়েবসাইটে ঢুকে ঢুকে সেখানকার আধিকারিকদের ঠিকুজিকুষ্ঠি জানাটা নিতান্তই অকাজের। এই পোস্টটা লেখার সময়ও আমি গবেষণার বাতিককে সংযত রাখতে পারিনি। টু ডু লিস্ট সংক্রান্ত কোটেশন খুঁজতে গিয়ে আমি ঝাড়া দেড়টি মিনিট নষ্ট করেছি। দেড় মিনিট শুনতে হয়তো সামান্য মনে হচ্ছে, কিন্তু তিনতিনটে দিন টানা ছুটির পর, টু ডু লিস্টের নব্বই শতাংশ কাজ বাকি থেকে যাওয়ার পর, এবং অবান্তরের পরবর্তী পোস্ট রেডি না থাকার পরিস্থিতিতে রবিবার সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় দেড় মিনিটের মূল্য প্রায় দেড় দিনের সমান।

আপনি কী কী অভিনব উপায়ে কাজে ফাঁকি দেন?


September 26, 2015

সাপ্তাহিকী




শিল্পীঃ বিল ওয়াটারসন



I think we judge talent wrong. What do we see as talent? I think I have made the same mistake myself. We judge talent by people's ability to strike a cricket ball. The sweetness, the timing. That's the only thing we see as talent. Things like determination, courage, discipline, temperament, these are also talent.
                                                             ---Rahul Dravid

শুরু করার আগে ভেবেছিলাম গোল্লা পাব, শেষে গিয়ে দেখি এগারোটার মধ্যে নটাই ঠিক হয়েছে।
টাকাকড়ি গয়নাগাঁটির বদলে রুটির ব্যাংক। লিংক পাঠিয়েছে চুপকথা।

বাঁদর যদি আপনার ক্যামেরা দিয়ে সেলফি তোলে, তবে সে সেলফির স্বত্ত্ব কার, বাঁদরের না আপনার?


বেশ কিছুদিন ধরে বড়লোক দেশেফ্রম স্ক্র্যাচখাবারদাবারের হুজুগ চলছে। এই ভদ্রলোক সত্যি সত্যিফ্রম স্ক্র্যাচস্যান্ডউইচ বানিয়েছেন। নিজে সবজি ফলিয়ে, গরুর দুধ দুইয়ে চিজ বানিয়ে, সমুদ্রের জল থেকে লবণ নিষ্কাশন করে। সে স্যান্ডউইচের দাম কত পড়েছে বলে আপনার ধারণা?

সেলফি স্টিকের থেকেও বিরক্তিউৎপাদক কিছু আছে কি? এই যে, সেলফিস্পুন

বিহাইন্ড এভরি হিরো, দেয়ার ইজ ওয়ান সাইডকিক। 

অন্যের দৈনিক রুটিনের কথা জানতে ভালো লাগে? তাহলে এই লিংকে ক্লিক করে দেখতে পারেন।

অণুগল্প, কিন্তু সামান্য অন্যরকম অণুগল্প। অক্সফোর্ড অভিধানের নমুনা বাক্য জড়ো করে লেখা অণুগল্প।


বলছে বিগিনারদের ফোটো তোলার জন্য কমপ্লিট গাইড। 

সারা পৃথিবীতে এই সুরটা দিনে ১৮০ কোটি বার শোনা হয়, অর্থাৎ সেকেন্ডে কুড়ি হাজার বার। আমি আপনি আরেকবার শুনলে ক্ষতি নেই।

আমাদের বাড়িতেও এই রহস্যজনক ব্যাপারটা ঘটে। আপনার বাড়িতে?



September 20, 2015

রুস্তম'স




আধচিনিতে আমি আগেও অনেকবার গেছি, কিন্তু মাদার্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুলটা ঠিক পেরোলেই একটা যে প্রায় দুমানুষ উঁচু সবুজ রঙের হাসি হাসি মুখের ডাইনোসরের মূর্তি আছে সেটা খেয়াল করিনি। রুস্তমস -এ কাল দুপুরে খেতে গিয়ে এই ভালো জিনিসটা আবিষ্কার করা হয়ে গেল।

আমরা দোকান বেশি রিপিট করার সুযোগ পাই না, কিন্তু কুইজিন রিপিট করি অহরহ। অর্চিষ্মান আর আমার, দুজনেরই পার্সি খাবার পছন্দের। খান মার্কেটের সোডাবটলওপেনারওয়ালা, দরিয়াগঞ্জের পার্সি অঞ্জুমান সেরে আমরা কাল গিয়েছিলাম আধচিনির রুস্তমস-এ।

প্রাণ হাতে নিয়ে রাস্তা পেরিয়ে রুস্তমস-এর দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁদিকে সিঁড়ি। সিঁড়ির গায়ে পুরোনো ধাঁচের কল্কা করা লোহার রেলিং, দেওয়ালের গায়ে সাদাকালো প্রিন্টে পুরোনো পার্সি জীবনের ছবি। দোতলায় বসার জায়গাখানাও সুন্দর করে সাজানো। দেওয়ালে সাদাকালো ছবি, কাঠের পালিশ করা চেয়ারটেবিল, একটা জমকালো কাঠের আলমারি। লোক বেশি বসার জায়গা নেই। গোটা পাঁচেক টেবিল। রিজার্ভেশন নেওয়া হয় না। অনলাইনে পড়েছিলাম আগেভাগে না গেলে নাকি দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আমরা অবশ্য গিয়ে দেখলাম মোটে দুজন বসে খাচ্ছেন। তবে আমাদের খাওয়া চলাকালীন, ঘড়িতে দুটো বাজার সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে দোকান ভর্তি হয়ে গেল।

বসার সঙ্গে সঙ্গেই এল ফাউ সাবুদানার পাঁপড়। অর্চিষ্মান অর্ডার করল টুকটুকে লাল রঙের রাস্‌পবেরি সোডা, আমি নিলাম হলুদসবুজ জিঞ্জার ফিজ। রাস্‌পবেরি সোডাটা অবিকল কাফ সিরাপের মতো খেতে, আমার জিঞ্জার ফিজটাও বিশেষ সুবিধের ছিল না। তবে আমি সর্বত্র সল্টি লাইম সোডা অর্ডার করি, জিঞ্জার ফিজ আগে কখনও খাইনি বা খেলেও একদুবার খেয়েছি, তার স্বাদ আমার মনে নেই। হতে পারে ব্যাপারটা ওরকমই খেতে হয়।

যাই হোক, সোডা আর ফিজে চুমুক দিতে দিতে আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করছিলাম, কাজেই স্বাদটাদ নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর সময় ছিল না। ডাইনোসরের যত মূর্তি, খেলনা আমি দেখেছি, সবেরই রং সবুজ। অথচ জুরাসিক পার্ক ইত্যাদি সিনেমা দেখে আমার ধারণা যে তারা মোটেই সবুজ ছিল না, বরং মেটে মেটে, ভুষো ভুষো রঙের ছিল। অর্চিষ্মান, ‘গুগল থাকিতে মুখে কেন কথা বল?’ ভঙ্গি করে ফোনের ব্রাউজারে টাইপ করল, ‘ডাইনোসর + গ্রিন + হোয়াইসে রহস্যটা রহস্যই থাকল তবে ডাইনোসর নিয়ে নানারকম তথ্য জানা হয়ে গেল। ডাইনোসরের কংকালমংকাল তো এদিকসেদিক ঢের পাওয়া গেছে, কিন্তু একজায়গায় নাকি এক বেচারা ডাইনোসর পাথরের ওপর থেবড়ে বসে জিরোনোর সময় ফসিল হয়ে গিয়েছিল, কাজেই ডাইনোসরের তশরিফের একখানা চমৎকার ফসিলও এখন বিজ্ঞানীদের কব্জায়।


এইসব হতে হতেই এসে গেল আমাদের ফার্স্ট কোর্স। কিমা প্যাটিস। টেবিলে রাখার সঙ্গে সঙ্গে যা খুশবু ছেড়েছিল সে আর বলার নয়। নাম প্যাটিস বটে, কিন্তু কিমার পুরের চারপাশের আস্তরটা ময়দা বা বেসনের বদলে মিহি আলুসেদ্ধর। আর সবটুকুর ওপর একটা ভীষণ পাতলা কুড়মুড়ে বর্ম। মুখে পুরলে একসঙ্গে তিনরকম টেক্সচারের বিস্ফোরণ। মা খেলে বলতেন “মচৎকার!” তবে বড্ড বড়। পুরোটা না খেয়ে ছাড়াও যায় না, আর খেলে মোটামুটি পেটের অর্ধেক ভরে যায়।


এরপর আমরা খেলাম কলমি নো পুলাও। কলমি অর্থে চিংড়ি। পুলাও অর্থে পুলাও। লম্বা লম্বা সুগন্ধী হলদে চালের ভাতের মধ্যে সুপুষ্ট, সরস চিংড়ি। এর সঙ্গে সংগত করার জন্য আমরা 'কাজু নি মুরগি' (কাজুবাদামবাটা দেওয়া মুরগি) নিতে পারতাম, কিংবা 'ভাটিয়া নু গোশ' (আলু দেওয়া ঝালঝাল পাঁঠার মাংসের ঝোল), কিন্তু আমাদের চোখ টানল একখানা ডিমের পদ।


'বিড়া পর এডু'। 'বিড়া' হচ্ছে গিয়ে ঢ্যাঁড়শ, আর 'এডু' হল ডিম। ঢ্যাঁড়শ কুচি কুচি করে কেটে, ভালো করে পেঁয়াজ মশলাটশলা দিয়ে কষিয়ে রান্না করে একটা ওভেনপ্রুফ বাটিতে পুরে তার ওপর দুখানা ডিম কুসুম আস্ত রেখে ফটাফট ভেঙে ওভেনে ঢুকিয়ে দিযে মিনিট দশেক অপেক্ষা করলেই ডিমের সাদা অংশ জমাট বেঁধে যাবে, কিন্তু কুসুম থাকবে নিটোল, টলটলে। ব্যস, হয়ে গেল 'বিড়া পর এডু'। এবার এই বিড়ার জায়গায় যা চাই বসিয়ে নিতে পারেন। ফরাসিরা তাদেরOeuf en Cocotte’  (বাটির মধ্যে ডিম)-এ মাশরুম হ্যানাত্যানা দেয়, (ইন ফ্যাক্ট আমি নিজেও বাড়িতে এ জিনিস আলু আর হ্যাম দিয়ে বানিয়েছি, ছবি তোলার আগেই বাটি ফর্সা হয়ে গিয়েছিল, কাজেই প্রমাণ দিতে পারলাম না) কিন্তু বানানোর পদ্ধতি এক ও অবিকল। রুস্তমস-এর মেনুতে ‘কান্দা পাপেতা পর এডু’-ও ছিল, অর্থাৎ কিনা হলুদ পেঁয়াজ দিয়ে রাঁধা আলুর ওপর ডিম, কিন্তু অর্চিষ্মানের ঢ্যাঁড়শপ্রীতির কথা মনে রেখে আমরা ‘বিড়া পর এডু’ই অর্ডার করলাম।

করে ভুল কিছু করিনি, দিব্যি খেতে। আমার ব্যাপারটাতে আরেকটু ঝালনুন হলে খারাপ লাগত না, কিন্তু অর্চিষ্মান যে রকম চেঁছেপুছে মাথা নেড়ে নেড়ে খাচ্ছিল, আমি আর সে মত প্রকাশ করলাম না।

পার্সিরা কাচুম্বরের খুব ভক্ত। সব খাবারের সঙ্গেই ফ্রি পাওয়া যায়। সেই কাচুম্বরের টাকনা দিয়ে চিংড়ির পোলাও আর ডিমঢ্যাঁড়শ দিয়ে আমাদের দিব্যি লাঞ্চ হল। কিমা প্যাটিসের ষড়যন্ত্রে পোলাওয়ের সবটুকু শেষ করতে পারিনি, কিন্তু চিংড়িগুলো তুলে তুলে খেয়ে নিয়েছিলাম। অর্চিষ্মান ঢ্যাঁড়শের বাটি প্রায় মেরে এনেছিল, কিন্তু শেষটা গিয়ে ছাড়ান দিল। তাছাড়া একটা ডেজার্টের জায়গাও তো রাখতে হবে?

 ক্যারামেল কাস্টার্ড। যেমন ভালো খেতে হওয়ার কথা, তেমনই ভালো খেতে।

এদের বিল দেওয়ার কায়দাটা অভিনব।

দিল্লিতে এই সময়টায় বৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাস ছিল, কিন্তু মেঘ ডাকা ছাড়া আর কিছুই হল না। সে নিয়ে আমি রাগ প্রকাশ করাতে অফিসের একজন বললেন, “ইধারউধার হো রহা হ্যায়।” শুনে আমার মাথা আরও গরম হয়ে গেল। আমার ঠাকুমাকেও এ জিনিস করতে দেখেছি। প্রচণ্ড গরমে কুলকুল করে ঘামছি, কালোকালো মেঘ সব হুসহুস করে নাকের সামনে আকাশ দিয়ে উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে, ঠাকুমা খুব চোখটোখ ঘুরিয়ে বলতেন, “কোথাও জোর হইতাসে।” যেন সেটাই যথেষ্ট সান্ত্বনার। রুস্তম’স-এর এসি থেকে বেরিয়ে গরমটা আরও বেশি মনে হতে লাগল। কী ভাগ্য একটা অটো পাওয়া গেল তৎক্ষণাৎ এবং আরও বড় ভাগ্য যে ভাইসাব কথা না বলে মিটার চালু করলেন। অত ভরাপেটে দরাদরি করতে হলেই হয়েছিল। ফোকর দিয়ে গলা বাড়িয়েই রেখেছিলাম, দেখলাম, ওই ঝলসানো রোদে, আপাদমস্তক ধুলোপরিবৃত হয়ে সবুজ রঙের ডাইনোসর তার ছোট ছোট দু’হাত আকাশের দিকে তুলে আকর্ণ হেসে চলেছে। ওর এই হাসি দেখার জন্যই ঘনঘন এপাড়ায় আসতে হবে মনে হচ্ছে।

September 19, 2015

সাপ্তাহিকী







It is common knowledge that there are two kinds of scholar these days: the stationary and the peripatetic. The stationaries pursue their studies in the traditional way, while their restless colleagues participate in every sort of international seminar and symposium imaginable. The scholar of this second type may be readily identified: in his lapel he wears a card bearing his, name rank and home university, in his pocket sticks a flight schedule of arrivals and departures, and the buckle on his belt - as well as the snaps on his briefcase - are plastic, never metal, so as not to trigger unnecessarily the alarms of the airport scannars that search boarding passengers for weapons.

                                 ---Stanislaw Lem, The Futurological Congress


He whose name shall not be pronounced correctly.

ইতিহাসটা টেকনোলজির, না পকেটের?

Home Naledi. Homo Sapiens দের পূর্বপুরুষ?

প্রস্তরযুগ এসে গেছে। বাকিগুলোও কি আসবে তার মানে?



কারও বাড়ি গেলে কী নিয়ে যাওয়া হবে সেটা একটা মাথাব্যথার বিষয়। আজকাল কেউ মিষ্টি খেতে চায় না, ফলের মারাত্মক দাম। এই গিফটটার কথা ভেবে দেখবেন নাকি?


আমার বাড়িতে একজন থাকে যে  কিনা হোস্টেলে থাকতে কুঁড়েমির কম্পিটিশনে ফার্স্ট হয়েছিল। যদিও এখন আর তাকে কুঁড়ে বলা যাবে না, সে এখন বাড়ির এবং বাইরের অনেক কাজ করে।



September 16, 2015

September 15, 2015

আমার রোল মডেলের একশো পঁচিশতম জন্মদিনে



উৎস গুগল ইমেজেস


(নিচের লিস্টের ভেতরে ভেতরে ক্লু-এর মতো চারটে বোনাস কুইজ গুঁজে দেওয়া আছে। আগাথাপ্রেমীরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।)

১। আগাথা ক্রিস্টি (15 September 1890 – 12 January 1976) বেঁচেছিলেন ছিয়াশি বছর, লিখেছিলেন বাহাত্তরটি উপন্যাস (ছেষট্টিটি রহস্য, ছ’টি রোম্যান্স), চোদ্দটি ছোটগল্প সংকলন, ছ’টি ননফিকশন। টিভি ও রেডিওর জন্য নিজের সাতটি লেখার নিজে হাতে অনুরূপ করেছিলেন, ষোলটি লেখার নাট্যরূপ দিয়েছিলেন। ক্রিস্টি নিজেই নিজের বর্ণনা দিয়েছিলেন, “a sausage machine, a perfect sausage machine.” বছরে নিয়ম করে দুটো নভেল বেরোত তাঁর, একটা ঠিক ক্রিসমাসের আগে আগে, প্রকাশকরা সেটা বিক্রি করতেন ‘Christie for Christmas’ নাম দিয়ে। অথচ তাঁর জামাই অ্যান্থনি হিকস বলেছেন, “you never saw her writing.”

২। সারাদিন ঘরের দরজা বন্ধ করে না লিখলেও, সত্যিটা হচ্ছে আগাথা ক্রিস্টির লেখক মগজ সর্বদা খাটত। যাঁকেই দেখতেন, তিনিই তাঁর পরের গল্পের খুনি কিংবা ভিকটিম হতে পারতেন, যেখানেই যেতেন, দোকান বাজার কফিশপ, সেটাই তাঁর ক্রাইমের পটভূমি হতে পারত, যা-ই শুনতেন সেটাই মাথার ভেতর নতুন প্লটের বীজ বুনতে পারত। এই বীজ বোনায় সাহায্য করত আগাথার নোটবুক। আগাথা ক্রিস্টির হাতে লেখা প্রায় একশোরও বেশি নোটবুক ছিল, যেগুলোর মধ্যে রক্ষা পেয়েছে মোটে তিয়াত্তরটা। তাঁর নোটবুক সম্পর্কে ক্রিস্টি বলে গেছেন, I usually have about half a dozen (notebooks) on hand and I used to make notes in them of ideas that struck me, or about some poison or drug, or a clever little bit of swindling that I had read about in the paper”.

বোনাস কুইজ একঃ আগাথা ক্রিস্টির নোটবুক থেকে পাওয়া গেছে নিচের লাইনক’টি। আপনাদের বলতে হবে এই লাইনগুলো কোন বইয়ের আইডিয়া?

'“West Indian book – Miss M? Poirot . . . B & E apparently devoted – actually B and G (Georgina) had affair for years . . . old ‘frog’ Major knows – has seen him before – he is killed”

২। আইডিয়া থেকে গল্পে পৌঁছনোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটা ঘটত মাথার ভেতর। I think the real work is done in thinking out the development of your story, worrying about it until it comes right. That may take quite a while . . . All that remains is to try to find the time to write that thing.” এই ভাবনাটা চলত সারাদিন ধরে। বাড়ির কাজ সারতে সারতে, অতিথিসৎকার করতে করতে, ছুটি কাটাতে কাটাতে। একবার অ্যামেরিকায় বেড়াতে গিয়ে তাঁর এক বন্ধুদম্পতির বাড়িতে কিছুদিন ছিলেন আগাথা। বড়লোক দম্পতির বাড়িতে সুইমিং পুল ছিল আর ছিল পুলের পাশে পাম গাছে ছাওয়া রাস্তা। একদিন বন্ধু দেখলেন বিকেলবেলা আগাথা সেই পামবীথি ধরে জোরে জোরে হাঁটাহাঁটি করছেন। বন্ধু তাঁর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন, কিন্তু আগাথা কেমন যেন আনমনা হয়ে রইলেন, বিশেষ সাড়া দিলেন না। বন্ধুও আর ঘাঁটালেন না। পরের বছর আগাথা ক্রিস্টির নতুন নভেল বেরোল। সুইমিং পুলের পাশে হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে ডক্টর জন ক্রিস্টোর রক্তাক্ত দেহ। পুলের চারদিকে জঙ্গলে ঢাকা চারচারটি (অনেকদিন আগে পড়েছি, গুনতি ভুল হতে পারে।) জঙ্গলে ছাওয়া পথ। কোন পথ ধরে এসেছে খুনি?

বোনাস কুইজ দুই: রাস্তা নয়, খুনিও নয়, গল্পের নাম ধরতে হবে আপনাদের।

৩। আগাথা ক্রিস্টি নিজে অবশ্য দাবি করেছিলেন যে অন্য কোথাও নয়, বাথটবে শুয়ে শুয়ে, আপেল চিবোতে চিবোতে প্লট ভাবতেই তাঁর সবথেকে ভালোলাগে। “Nowadays they don’t build baths like that. I’ve rather given up the practice.”

বোনাস কুইজ তিন: আগাথা ক্রিস্টির কোন চরিত্র আপেল খেতে বাড়াবাড়ি রকম ভালোবাসতেন? (হিন্টঃ ইনি গোয়েন্দা নন। কিন্তু হারক্যুল পোয়্যারোকে বেশ কিছু গোয়েন্দাগিরিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।)

৪। ওপরের চরিত্রের মতো, আরও অনেক চরিত্র আগাথা ক্রিস্টি নিজের ছায়ায় তৈরি করেছিলেন। তিনি নিজে বলেছিলেন যে মিস মার্পল আসলে তাঁর সৎ-ঠাকুমার চরিত্রের আদলে তৈরি। কিন্তু রিচার্ড অ্যাটেনবরো, যিনি কেরিয়ারের শুরুর দিকে আগাথা ক্রিস্টির বিখ্যাত ‘মাউসট্র্যাপ’ নাটকের ওয়েস্ট এন্ড প্রোডাকশনে অভিনয় করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার মত মেলে বেশি। যে মার্পলের মধ্যে আগাথা নিজেও ছিলেন অনেকটা। সস্ত্রীক তাঁর সঙ্গে যখন আগাথা ক্রিস্টির আলাপ হয় ততদিনে ক্রিস্টি রহস্যলেখক হিসেবে বিখ্যাত। সেলিব্রিটিদের সম্পর্কে সবারই মনে মনে একটা ছবি থাকে, অ্যাটেনবরোরও ছিল। ক্রিস্টিকে দেখে তিনি হাঁ হয়ে গেলেন। “I don’t think I will ever forget the first time we met Agatha Christie. And that’s not just a figure of speech. To begin with, she is just about the last person in the world you’d ever think of in connection with crime or violence or anything blood curdling or dramatic. She is the calmest, gentlest, most charming and matter of fact character you can imagine. And the thought of hers probably the best selling thriller writer of the days is frankly incredible. . . I must say we were taken absolutely by surprise when we met this very sweet and delightful person. She was so kind and friendly, rather like the embodiment of everything one expects from the perfect aunt.”

৫। কিন্তু আগাথা ক্রিস্টি একেবারে নিরীহ নিড়বিড়ে পিসিমা ছিলেন না। (তাঁর সৃষ্ট পিসিরাও অবশ্য কেউ নিরীহ নিড়বিড়ে নন।) উনিশশো বাইশ সালে প্রথম স্বামী আর্চির সঙ্গে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছিলেন আগাথা। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, হনলুলু, কানাডা। মা ক্লারাকে সেসব জায়গা থেকে লম্বা লম্বা চিঠি লিখেছিলেন তিনি। তাঁর দৌহিত্র ম্যাথিউ প্রিচার্ড ‘The Grand Tour: Around The World With The Queen Of Mystery’ নামে সে সব চিঠির একটি সংকলন বার করেছেন। আগাথার অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল ওরিয়েন্টাল এক্সপ্রেসে চেপে বাগদাদে যাওয়া। আর্চির সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর, আগাথা একাই গিয়েছিলেন সেই স্বপ্ন পূরণ করতে। পরে ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্ড্রু ইমস আগাথার সেই যাত্রাপথ অনুসরণ করেছিলেন। সে বৃত্তান্ত ইমস লিখে রেখে গেছেন ‘8:55 to Baghdad’ নামের বইতে।

৬। যাঁরা গোয়েন্দাগল্পকে হেলাছেদ্দার চোখে দেখেন তাঁদের চোখ খোলার জন্য এই নিচের ঘটনাটা যথেষ্ট হওয়া দরকার। একটি শিশু বহুদিন ধরে একটি অজ্ঞাত রোগে কষ্ট পাচ্ছিল। ডাক্তারবদ্যিরা কেউ রোগ চিহ্নিত করতে না পেরে একে একে জবাব দিচ্ছিলেন। কেবল একজন নার্স ছাড়া। তাঁর হঠাৎ অনেকদিন আগে পড়া একটা বইয়ের কথা মনে পড়ল। 'The Pale Horse'। লেখক আগাথা ক্রিস্টি। নার্স ডাক্তারকে ধরেকরে শিশুটির শরীরে থালিয়ামের মাত্রা পরীক্ষা করালেন। স্বাভাবিকের থেকে দশ গুণ বেশি। জানা গেল বাড়ির আশেপাশে নিয়মিত থালিয়ামওয়ালা কীটনাশক ব্যবহার হয়। ওষুধ পড়ল। শিশুটি অচিরেই সুস্থ হয়ে উঠল।

৭। হারক্যুল পোয়্যারো পৃথিবীর একমাত্র গোয়েন্দা নিউ ইয়র্ক টাইমস যাঁর অবিচুয়্যারি ছেপেছিল।

উৎস গুগল ইমেজেস

৬। খুব সম্ভবত হারক্যুল পোয়্যারো পৃথিবীর একমাত্র গোয়েন্দা যাঁর নিজের এবং যাঁর সৃষ্টিকর্তা দুজনের নামেই একটি করে প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে।

বোনাস কুইজ চার: হারক্যুল পোয়্যারোর নামে গোলাপের নামকরণ করার ঘটনাটা কোন গল্পে ঘটেছিল?

৭। অবান্তরের জন্য এই লিস্টটা বানাতে গিয়ে অনেক কিছু জানা হয়ে গেল। কিন্তু সবথেকে ভালো লাগল যে কথাটা জেনে সেটা লাস্টের জন্য তুলে রেখেছি। আমাকে যাঁরা অসুবিধেজনকরকম কাছ থেকে চেনেন (বেসিক্যালি দু’জন, দু’জনের নামই ‘অ’ দিয়ে শুরু) তাঁরা আমার চরিত্রের একটা ব্যাপার সম্পর্কে জানেন। আমার যদি কাউকে ভালোলাগে তাহলে তাঁর সবটুকুই ভালো লাগতে হবে। তাঁর কোনও দোষ থাকা চলবে না, কথায়বার্তায়, চলায়ফেরায় কোনও রকম বিচ্যুতি কখনও ঘটা চলবে না। বা ঘটলেও, সেটা আমার চোখে পড়া চলবে না। খানিকটা মনুষ্যসুলভ দুর্বলতা যদি বেরিয়েই পড়ে, ব্যস, আমার অনুরাগের বেলুন ফটাস করে ফেটে যাবে।

আগাথা ক্রিস্টির আমি ফ্যান। প্রশ্ন-প্রশ্ন খেলায় সেলিব্রিটি সংক্রান্ত যত প্রশ্ন হয় তাদের সবগুলোতেই আমার উত্তর হয় আগাথা ক্রিস্টি। আমার রোল মডেল আগাথা ক্রিস্টি, যে কাউকে ডিনারে ডাকার অপশন থাকলে আমি আগাথা ক্রিস্টিকে ডাকতে চাই, পৃথিবীর যে কোনও জায়গায় যে কোনও সময়ে জন্মানোর অনুমতি পেলে আমি সেন্ট মেরি মিডে বয়স্ক স্পিনস্টার হিসেবে জন্মাতে চাই।

আমার এ হেন ক্রিস্টিপ্রীতিতে এতদিন একটা ছোট, প্রায় অদৃশ্য কাঁটা বিঁধে ছিল। কাঁটা নয়, একটা কোটেশন। ওই কথাটা যে আগাথা ক্রিস্টি বলেছেন সেটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারতাম না। আবার ভাবতাম, মানুষ তো কতরকম পরিস্থিতিতে কত কথা বলে। আমিও বলেছি। আমি রাষ্ট্রে বিশ্বাস করি না, আমি অমিতাভ বচ্চনে বিশ্বাস করি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমি তো আমি, আগাথা তো . . . তিনি কী করে বললেন, "An archaeologist is the best husband a woman can have because the older she gets the more interested he becomes in her.?

আজ জানতে পারলাম আগাথা এমন কথা কোনওদিনও বলেননি। লোকে ওঁর মুখে বসিয়েছে। যেহেতু আগাথা একজন প্রত্নতত্ত্ববিদকে বিয়ে করেছিলেন, সেহেতু লোকে মনে করেছে এ রকমের অদ্ভুত কথা আগাথা ক্রিস্টি বলতেই পারেন। আমি যে ‘লোক’-এর ফ্যান কেন নই, সেটা আশা করি আর বুঝিয়ে বলতে হবে না।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.