September 30, 2017

যতই অকওয়ার্ড হোক



একসময় বিজয়া এলে আতংক হত। দশমীর সকাল থেকে মাবাবা মনে করাতেন, কাকে কাকে ফোন করতে হবে। করতেই হবে। আমি যত বলি, এতদিন কথা নেই, দেখা নেই, হঠাৎ ফোন করে বিজয়ার প্রণাম করতে যাওয়াটা মহা অকওয়ার্ড হবে, কিছুতেই শুনবেন না। হোক অকওয়ার্ড। তবু করবে। ওঁরা খুশি হবেন। তাছাড়া খুশিঅখুশির ব্যাপারই না এটা। কর্তব্য পালনের মতো করে করবে। 

গত বছরদুয়েক থেকে নিজেই করি। অস্বীকার করব না, ফোনের রিং হওয়ার সময় একবার মাথায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে, কী বলব? তারপর ওপারের হ্যালো-র উত্তরে নিজের পরিচয় দেওয়ামাত্র সব অকওয়ার্ডনেস হাওয়া হয়ে যায়। সাজিয়েগুছিয়ে, ভেবেচিন্তে, আগুপিছু বেছে যে কথা বলতে হবে, একটা শব্দ এদিকওদিক হয়ে গেলে চাকরি জুটবে না, কিংবা ফ্রাইডে নাইটের আড্ডায় ইমেজ চুরমার, তেমন তো নয়, এ সব কথার নদী বইছে আমার জন্মের, কোনও কোনও ক্ষেত্রে আমার বাবামায়ের জন্মেরও আগে থেকে। আমার হাঁ করার শুধু অপেক্ষা। অমনি উল্টোদিক থেকে কথার তোড়। কোথায় আছিস, কেমন আছিস, কত মাইনে পাস। এ বছর কোনও প্রশ্নের ঘুঁষিতে কাৎ হলে কুছ পরোয়া নেই, আসছে বছর আবার হবে। কখনও ন্যায্য নালিশ। তোরা তো আর আসবি না, বলে কী হবে। তখন সত্যি লজ্জা পাওয়া। সত্যি চাই গো যেতে, কিন্তু সময় নেই। যতদিন নেই, ততদিন এই বিজয়ার ফোন আছে। খুব খুব বিরল কেসে, এতই বিরল যে সে কথা তোলাও ভুল তবু সত্যের খাতিরে লিখছি, মনে হয়েছে, হয়তো ওপ্রান্তের সুর সামান্য কাটা। মনে হয়েছে, হয়তো সুতো ধরে রাখার চেষ্টা বৃথা। সত্যি তো, আমার কী দায়? তখন নিজেকে মনে করানো, প্রশ্নটা দায়অদায়ের নয়, প্রশ্নটা কর্তব্যের। বছরে তো মোটে একটা দিন। 

আজ রাতে, কাল সকালে সবার নম্বর খুঁজে খুঁজে বার করে ফোন করব। কাউকে বাদ দেব না। 

আপনাদের তো দেবই না। আপনাদের সবার জন্য রইল আমার অনেক ভালোবাসা, নমস্কার, কোলাকুলি। সবাই ভীষণ আনন্দে থাকুন, যা চান তাই পান। শুভ বিজয়া। 


September 29, 2017

ঠাকুমার পুজো



এককালে আমরা অষ্টমীর রাতে ঠাকুর দেখতে বেরোতাম, একডালিয়া আর কলেজ স্কোয়্যার আর মহম্মদ আলি পার্কের মণ্ডপে ঢুকে ঠাকুর দেখে আসতাম, আর ক’বছর পরে এই সব গল্প লোকের কাছে করলে লোকে বলবে, দেখেছ, চিরকেলে বাঙাল, জমিদারি ফলাচ্ছে।

আমি জীবনে চল্লিশ মিনিটের বেশি কোনও প্যান্ডেলে লাইন দিইনি। রিষড়ার শুনশান প্যান্ডেলে তো না-ই, কলেজ স্কোয়্যার, কুমোরটুলি, বাগবাজার ইত্যাদি হেভিওয়েট পুজোতেও দিইনি। দিইনি আমি বিরাট বিপ্লবী বলে কিংবা এই সব পুঁজিবাদী আস্তিক বাগাড়ম্বরে আমার অরুচি আছে বলে নয়, দিইনি দিতে হয়নি বলেই। গেছি, প্যান্ডেলে ঢুকেছি, নমো করে বেরিয়ে এসেছি। একবার কলেজ স্কোয়্যারের পুকুরপাড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হয়েছিল মনে আছে, তাও চল্লিশ মিনিটের বেশি কিছুতেই হবে না।  

এইবার লোকে আমার এজ শেমিং করবে, পরশু অঞ্জন দত্তকে যেমন করলেন একজন। “আপনি যখন রঞ্জনা লিখেছিলেন স্যার, আমরা ইশকুলে পড়তাম, উঃ, জাস্ট ভাবা যায় না।”  বলবে, সে তো তোমাকে এককালে সোমবার সোমবার মানডে টেস্টও দিতে হয়নি, ইনস্ট্যাগ্রামে অ্যাকাউন্টও খুলতে হয়নি, হাসি বোঝাতে অল ক্যাপস-এ লোল-ও টাইপ করতে হয়নি। তুমি লোলচর্ম হয়েছে বলে তো পৃথিবী থেমে থাকবে না। মান্ধাতার, থুড়ি, তোমার আমলে লাইন ছিল না বলেই এ আমলেও প্যান্ডেলের সামনে লাইন পড়বে না এটা কেমন যুক্তি?

আমি না হয় মান্ধাতা, অর্চিষ্মানকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি হায়েস্ট কতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েছ?” অর্চিষ্মান ভেবেটেবে বলল, “পঁয়তাল্লিশ মিনিট।” 

বছরদুয়েক আগে টিভিতে দেখলাম শ্রীভূমি না কোন একটা পুজোর লাইনে একজন হাসি হাসি মুখে বলছেন, “এই তো সবে সাড়ে তিন ঘণ্টা হল।” আগের বছর নাকতলার বাবামা চতুর্থীর সন্ধ্যেবেলা বেরিয়ে জ্যামে তিনঘণ্টা দাঁড়িয়ে আধখানা ঠাকুরও না দেখে বাড়ি ফিরে এবার বুদ্ধি খাটিয়ে তৃতীয়ার দুপুরবেলা বেরিয়ে কয়েকখানা পুজোতে টিক মেরে এসেছেন।

হঠাৎ হল কী?  কলকাতার জনসংখ্যা কি চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে গেল গত ক’বছরে? 

একজন বললেন, “কলকাতার কেন হতে যাবে রামোঃ, মফস্বল থেকে পালে পালে পাবলিক আসে আজকাল শহরের ঠাকুর দেখতে, এ হচ্ছে তাদের ভিড়।”

অস্বস্তিকর নীরবতা কাটাতে একজন প্রস্তাব দিল চুসকি খেয়ে আসার। 

অনেক বেরসিক আছেন, লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখাকে ভয়ানক বেঁকা চোখে দেখেন। “কারা এরা? কী দেখে?”

আপনি যদি আশা করেন লোকে প্যান্ডেলে যায় দশ হাত, টানা চোখ, শুঁড়, কেশর, বীণা কিংবা বাবরি দেখতে, তাহলে অবাক হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি আপনাকে, ও সব কেউ দেখে না। এমনকি সবাই এক জিনিসও দেখে না। বিভিন্ন লোক বিভিন্ন জিনিস দেখে। বেশির ভাগ বড়রা অন্য বড়দের দেখে। প্যান্ডেলের গায়ে কাচের কাজ থাকলে চট করে নিজেকে দেখে নেয়। বেশিরভাগ ছোটরাই আই লেভেলে ইঁদুর, হাঁস, পেঁচা, সিংহ দেখে। অবশ্য ঢাক না বাজলে তবেই।

বাগপাড়ার পুজোয় একবার সরস্বতীকে মাখন জিনসের প্যান্ট পরানো হয়েছিল, শেয়ালদা স্টেশনের ভিড় হয়েছিল সেই প্যান্ট দেখতে। বাবামায়ের সঙ্গে বাঁশবেড়িয়ার তাঁদের এক সহকর্মীর বাড়িতে গিয়েছিলাম একবার, তাঁদের বাড়ির পুজো দেখতে। আর কে কী দেখছিল জানি না, আমি দেখছিলাম কড়িকাঠের নিচে টানা বারান্দার ওপর ইজিচেয়ারখানা। বাঁশের ঘন কাটাকুটি পিঠ আর বসার জায়গা, চকচকে কালো কাঠের গোলাপফুল খোদাই বর্ডার, হাতলটা কবজির কাছে রীতিমত চওড়া, চায়ের কাপ তো বটেই, মাস মার্কেট পেপারব্যাকও দিব্যি রাখা যাবে। আমাদের বাড়ির ফোল্ডিং কাঠামোর গায়ে ডুরিকাটা শতরঞ্চি পরানো ইজিচেয়ারের তুলনায় সে ইজিচেয়ার যেন রিকশাস্ট্যান্ডের শনিমন্দিরের তুলনায় তাজমহল। 

বম্বেতে লোকে ঠাকুর দেখতে যায়, সে মুখে যাই বলুক না কেন, ফাঁকতালে রাণী মুখার্জিকে দেখতে। অনেকে অভিজিৎ ভট্টাচার্যের পুজোও দেখতে যান, কী দেখতে আমি শিওর নই। আমি এ বছর বম্বেতে ঠাকুর দেখতে গেলে অবশ্য ইরা ছাড়া কাউকে দেখতাম না। এ বছর ইরাও দেখছে পুজো। স্যাডলি, ভুলেও যাচ্ছে। না হলে জিজ্ঞাসা করা যেত, কী দেখল ও জীবনের প্রথম পুজোতে।

অগ্রদূত স্পোর্টিং-এ দুর্গার মুখ এবছর নাকি অবিকল শ্রীদেবী কাটিং বানিয়েছে, বাবামা সপ্তমীতে গিয়েছিলেন নিজের চোখে দেখতে। "সত্যি শ্রীদেবীরে সোনা", উত্তেজিত হয়ে বললেন দুজনেই।  ছবিও তুলেছেন নাকি। পাঠাননি এখনও, না হলে আপনাদের দেখাতাম।

আমরাও বেরিয়েছিলাম সপ্তমীতে, নবপল্লীর প্যান্ডেলে অঞ্জন দত্ত, তস্য সুপুত্র নীল দত্তকে দেখতে। সে অভিজ্ঞতা অবান্তরে আসছে শিগগিরই। এই নবপল্লীতেই আমি ক্যাকটাসকে দেখেছিলাম, জুন মালিয়াকে দেখেছিলাম, সম্ভবত ভূমিকেও। 

আশেপাশে সেলিব্রিটি না থাকলে আমি প্রধানত ঝাড়লণ্ঠন দেখি। আর দেখি পেডেস্ট্যাল ফ্যানটা কোনদিকে। 

আমার ঠাকুমা গত বেশ কিছু বছর ধরে সিলিং ফ্যান ছাড়া আর কিছুই দেখেন না। আমার যে তেজস্বিনী ঠাকুমার গল্প আপনাদের শুনিয়েছি, যিনি ডাকাতদের ভয় পাওয়াতে ফাঁকা ঘরে গামবুট পরে হাঁটতে হাঁটতে জোরে জোরে বলতেন, “হ্যাঁরে তপন, বন্দুকটা হাতের কাছে নামিয়ে রেখেছিস তো?” তিনি আর সেই ঠাকুমা নেই। বা বলা উচিত ঠাকুমার নশ্বর শরীরখানা আমার সত্যিকারের ঠাকুমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি। “যথেষ্ট হল, এবার ছাড়ান দাও ভাই” বলে শয্যা নিয়েছে। হাঁটাচলা তো অনেকদিনই চুকেছে, এবার গিয়ে দেখলাম কথাও প্রায় বন্ধ। ঘাড় নেড়ে সারেন। আমরা কিছুক্ষণ ঠাকুমাকে ঘিরে বসে আসর জমালাম, তারপর বাকি সবাই উঠে চলে গেল যে যার কাজে। কাঁহাতক আর মুখ বুজে বসে থাকা যায়, তাই আমি ঠাকুমার বালিশটা একটুখানি টেনে নিয়ে ঠাকুমার পাশে বডি ফেলে দিলাম। শুয়ে শুয়ে মোবাইলে ইন্টারনেট সার্ফ করতে লাগলাম, অবান্তরে পাহারা চালু রাখলাম। ঠাকুমা তাঁর রোগা হাতখানা দিয়ে আমাকে ছুঁয়ে রইলেন। 

আমাদের দুজনের দুজনকে যা বলার বলা হয়ে গেল, যা বোঝার বোঝা হয়ে গেল। 

নরম দেখে, ছাপা পাড়ের একটা নীল পাড় সাদা শাড়ি আমাদের নাম করে কিনে রেখেছিলেন মা, ষষ্ঠীর দিন সকালে ব্যায়াম,  স্নান হয়ে যাওয়ার পর সেটা জড়িয়ে ঠাকুমাকে বসিয়ে দেওয়া হল। ঠাকুমা এমনি বসতে চান না মোটে আজকাল, সেদিন বসে রইলেন। চা বিস্কুট খেলেন। খানিকক্ষণ পর গরম লাগছে কি না, শাড়ি বদলে দেওয়া হবে কি না জিজ্ঞাসা করতে ঘাড় নেড়ে জানালেন, না। একটু পরে বাবা পাশে এসে বসে জিজ্ঞাসা করলেন, "নতুন শাড়ি?" ঠাকুমার ঘাড় ওপর নিচে নড়ল। 

“কে দিয়েছে?” 

উত্তর নেই। বাবা আশাও করেননি। এ সব প্রশ্ন স্রেফ করার জন্য করা। স্বাভাবিক কথোপকথনের ভঙ্গি করার জন্য। ঠাকুমাকে বুঝিয়ে দেওয়া যে তাঁর উত্তর ফুরোলেও, আমাদের অনেক প্রশ্ন বাকি রয়ে গেছে এখনও। 

একটু বাদে ঠাকুমার গলা দিয়ে একটা ঘরঘর শব্দ বেরোলো। বাবা ঠাকুমার দিকে তাকালেন, আর বাবার চোখে চোখ রেখে ঠাকুমা স্পষ্ট গলায় বলে উঠলেন, “সোনা দিসে।”

শুনে থেকে সব ফেলে ঠাকুমাকে দেখতে চলে যেতে ইচ্ছে করছে। 


September 27, 2017

বড়ে গোলাম



     "The old fashioned cook, dressed in a clean white dhoti, brought us four gleaming silver thalis one by one.  Each had seven small silver bowls containing an assortment of dishes, all swimming in thin sauces of different hues - yoghurt white, spinach green, lentil yellow, potato brown, squash beige, beetroot red, and so on. The maestro scowled at the unfamiliar food and lowered the large and rather shapeless thumb of his right hand into each bowl in turn, hoping against hope that it would encounter a piece of meat on a bone. When the thumb met no resistance and sank clean to the bottom of each bowl, right through the thin gravies, the horrible truth dawned on him. He was trapped in a puritanical vegetarian household and there were no prospects of getting meat. That he was an honoured guest here was no consolation. 

     When the cook came in with freshly fried porous, Bade Ghulam Ali Khan could not help saying witheringly in his native Punjabi, ‘So you decided to cook every tree and every bush you could lay your hands on!’ Fortunately, the poor man could not understand a word that was being said to him. I got the general drift and was appalled at the terrible blunder that had resulted in such a glaring mismatch between guest and host. 

     I was the person in charge, so the maestro turned to me, pushing the thali roughly away. ’Such music as mine, and this food?’ he thundered in a shocked tone. ‘The truth is I can’t manage with this at all. I’m going to cook my own dinner. I’ll make a list of what I need. It’s impossible for me to sing without proper nourishment. Even when we sit down to practise at home, a big pot of good food is always at hand, and we dig into it regularly to keep up our strength. Somebody told me that every note I sing has the aroma of kababs. Do you think I can sing the way I do if I have to feed on grasses swimming in fluids of various kinds?’ 

     I was sure my father would think I had made some horrible mistake when we did not arrive even six hours after we were expected. The disciples had set off with a long shopping list that featured six broiler chickens, a kilo of khoya of solidified whole milk, a kilo of almonds, a tin of clarified butter, fifteen different spices, and a stack of tandoori rotis. A charcoal fire was lit and a portable stove set up in the open courtyard because no meat of any kind was allowed in the family kitchen. Full-scale cooking operations started at around nine with great enthusiasm and expertise and a delicious, one-dish meal was triumphantly produced within two hours. The maestro heaped vast quantities on to a china plate since the metal thalis were not available for this kind of depraved eating. Nor was any space inside the house, so the dinner took place outdoors and was all the more enjoyable for that. Three or four hearty belches announced the end of this phase of the proceedings and we finally set off for the site of the concerts." 

                                                                          ---Sheila Dhar, Raga’n Josh


September 25, 2017

জাহানারা রোশেনারা



মহাদ্বিতীয়ার দুপুর থেকে বৃষ্টি নামল। সে রকম বৃষ্টি চট করে দিল্লিতে দেখা যায় না। ঝমঝম দেখা যায়, ঝিরিঝিরি দেখা যায়, কিন্তু ঠায়লয়ে সারাদুপুর, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এইটা বিরল। তাপমাত্রা নামল তিরিশের নিচে, ডেফ কল থেকে মূলচন্দের রাস্তায় হাঁটুজল জমল, বাড়ি ফেরার রাস্তা তিরিশ মিনিট থেকে তিয়াত্তর মিনিট হয়ে গেল। বাড়ির সামনে উবার থেকে নেমেছি, বলা বাহুল্য, তক্ষুনি বৃষ্টিটা জোর হতে হবে, আমি লটবহর সামলে, বাটার জুতো প্যাচপেচিয়ে রাস্তা পেরিয়ে বাড়ির গেটের দিকে হাঁটছি, ভাবছি অর্চিষ্মানের নিশ্চয় আসতে ন’টা বাজবে, ভেবে ভেবে দুঃখী মুখ তুলেছি, অমনি চশমার কাচ বেয়ে ভরা বাদরের ধারার ফাঁক দিয়ে চেনা মুখ, চেনা গোঁফ। দরজার সামনে অর্চিষ্মান দাঁড়িয়ে হাসছে। 

শুক্রবারের রাতে বাড়িতে ঢুকে দরজার ছিটকিনি তোলা, জামাকাপড় ছাড়া, চা বসানো, এক বগলে বালিশ অন্য বগলে ল্যাপটপ নিয়ে খাটের দিকে হাঁটা, এমনকি আমাদের রোজকার জরাজীর্ণ রসিকতাগুলোর মধ্যেও যে একটা নতুন পালিশ পড়ে, সেটাকে অনেকসময় ভাষায় রূপান্তরিত করার কথা ভেবেছি আমি, এবং হাল ছেড়েছি। সে ক্ষমতা আমার জানা নেই। বা ভাষাই অক্ষম, তাও হতে পারে। আফটার অল, গোলাপের ফুটে থাকাকে শুধু গোলাপের ফুটে থাকার সঙ্গেই তুলনা করা যায়, বুঝেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

জানালা দিয়ে আসা ঊনত্রিশ ডিগ্রির ভেজা হাওয়া আর কংক্রিটের ওপর টুপটাপ জলের আওয়াজ সেই অলরেডি অনির্বচনীয় শুক্রবারের সন্ধ্যেকে অন্য মাত্রা দিল।

*****

শনিবারের সকাল, স্বাভাবিকভাবেই হল দেরিতে। কিন্তু খুব যে দেরি করব তার উপায় নেই। ঘরের জমানো কাজ শেষ করে, খেয়েদেয়ে সোয়া দু’টোর মধ্যে বেরোতে হবে, তিনটে পাঁচে শো ‘ব্যোমকেশ ও অগ্নিবাণ’-এর টিকিট কাটা আছে। পালে পালে বাংলা সিনেমা রিলিজ করেছে দিল্লিতে। ব্যোমকেশ, কাকাবাবু, প্রজাপতি বিস্কুট, ককপিট। বুকমাইশো আমার দুর্বল জায়গা ধরে ফেলেছে, ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা চললেও ক্রমাগত ‘মাছের ঝোল’-এর প্রোমো কোড পাঠাতে থাকে।

দেখতে পারলে আমরা চারটে সিনেমাই দেখতাম, কিন্তু সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। অগত্যা র‍্যাংকিং করতে হল। দুজনের র‍্যাংকিং-এরই লাস্টে ছিল ককপিট, ফার্স্টে ব্যোমকেশ।

অগ্নিবাণ এবং উপসংহার, এই দুটো গল্প মিশিয়ে তৈরি হয়েছে 'ব্যোমকেশ ও অগ্নিবাণ'। অগ্নিবাণের গল্প ওই দেশলাইয়ের গল্পটা, আর উপসংহারের গল্প হচ্ছে কোকনদ গুপ্তকে নিয়ে। গল্প নিয়ে বলার কিছু নেই, সিনেমা নিয়েও আমার বলার কিছু থাকা উচিত না। শাশ্বতকে তো ভালোই লাগে, যিশু অভ্যেস হয়ে গেছেন, ঊষসীর উপস্থিতি খুবই কম, তাতে একটা জিনিস ভালো হয়েছে, হিংস্র দাম্পত্য কলহ মাত্রা ছাড়ায়নি। ওপরচালাকিবর্জিত সংলাপ দিয়ে সিনেমা চালানোর সাহস দেখানোর জন্য অঞ্জন দত্তকে আমার বিনম্র ধন্যবাদ। 

তাছাড়া আরও একটা শক্ত কাজ তাঁকে করতে হয়েছে, গল্পের স্ত্রীচরিত্রদের পাল্টানো। ঝগড়ুটে, স্নেহহীন, শুচিবায়ুগ্রস্ত। পরম স্নেহময় স্বামীর স্নেহ যিনি স্রেফ স্বভাবদোষে পেলেন না উল্টে বিষবৎ ঘৃণা জুটল, অফ কোর্স, নিজের স্বভাবদোষেই। “অন্যান্য নারীসুলভ সদগুণের মধ্যে বাচালতাও” যার চরিত্রে ভরপুর। বইয়ের পাতায় এ সব পড়লে যে রকম ওয়ার্ম কোজি ফিলিং হয়, চোখে দেখলে হয়তো নাও হতে পারে। তাই সে সব চরিত্রে নতুন মোচড় আনতে হয়। নতুন মনস্তাত্ত্বিক ঠ্যাকনা। দুঃখের বিষয়, সে সব ঠ্যাকনাই শেষপর্যন্ত 'স্বামী সময় দেন না, তাই স্ত্রী যত গোলমাল বাধান'-তে গিয়ে ঠেকে। এর থেকে প্লেন ঝগড়ুটে নারীসুলভ নারী দেখালেও খুব বেশি অসুবিধে হত বলে মনে হয় না। শরদিন্দুর দূরদৃষ্টির প্রশংসা করতে হয়।

*****

ভাড়াবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘাড় বাড়ালে যে পুজোর প্যান্ডেল দেখা যায়, আমার মা পনেরোশো কিলোমিটার দূর থেকে ফোন করে খবর দিলেন, তারা নাকি নবমী নিশিতে মহানট অসীমকুমারের নির্দেশনায় চাণক্য পালার আয়োজন করেছে। যাত্রা আমি খুব ছোটবেলায় দেখেছি, তখনও রিষড়ার সব কারখানাগুলো ঝপাঝপ বন্ধ হয়ে যায়নি, ধুঁকছিল। আর সে সব কারখানার মাঠে মাঝেমাঝেই যাত্রাপালার আয়োজন হত। আমার বাবা প্রতিটি যাত্রা দেখতে যেতেন। সাইকেলের রডে সাঁটা ছোট্ট সিটে বসে সন্ধ্যের পালাগুলোতে আমিও গেছি মাঝে মাঝে, বাবা আর ঠাকুরদার বাঁকানো হ্যান্ডেল ছাতার সঙ্গে। সে ছাতার হাইট তখন আমার থেকে বেশি। রাত দশটা নাগাদ ঘুমন্ত আমিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বাবা আর দাদুর ছাতা আবার মাঠে ফিরে যেতেন, পালা শেষ করে বাড়ি ফিরতে কখনও মাঝরাত, কখনও শেষরাত।

ওই সময়টা এইসব যাত্রামাত্রা মা কত সুনজরে দেখতেন আমার সন্দেহ আছে, কিন্তু সময় মানুষকে বদলে দেয়, যাত্রাকে বদলে দেয়, যাত্রার প্রতি মানুষের মনকেও। এখন যাত্রা শব্দটা শুনলেই মায়ের মনে পড়ে তাঁর নিজের শৈশবের ঔরংজেব, বাবু হয়ে বসা বয়কাট ছাঁট মা ঊর্ধ্বপানে মঞ্চের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছেন, ঔরংজেবের অট্টহাস্যে মায়ের ছোট্ট শিরদাঁড়ায় বিদ্যুৎ খেলছে, আর একটা পুরোনো দুঃখ মাথাচাড়া দিচ্ছে আবার। জাহানারা রোশেনারার মতো এমন নাম থাকতে তাঁর কপালে কিনা অর্চনা?


September 23, 2017

কয়েকটা লিংক




শিল্পীঃ নিয়াজউদ্দিন



ধরা যাক মাটি খুঁড়ে একটা কবর বেরোলো। কবরের মধ্যে একটা কঙ্কাল। সঙ্গে তরবারি, কুঠার, বর্শা, বর্মভেদকারী ধারালো তীর, ছুরি ও ঢাল। আবার দু’খানি অশ্ব। হোমরাচোমরা কোনও সমরাধিপতির কঙ্কাল হবে। আরও বেরোলো কঙ্কালের কোলের ওপর রাখা একরকমের দান দেওয়া খেলার বোর্ড, যা দেখে ধরে নেওয়া যায় (এবং হলও) এই বীর যোদ্ধা যুদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতেন। সুইডেনের এমন একটা অংশে কবরটা বেরোলো যেখানে ভাইকিংদের বাড়বাড়ন্ত ছিল, কাজেই ইনি যে ভাইকিং যোদ্ধা ছিলেন সেটা ধরে নিতেও কোনও বাধা নেই। এই শক্তিধর, সম্মাননীয়, উচ্চপদস্থ বীর ভাইকিং যোদ্ধা পুরুষ না নারী? আঠেরোশো আশির দশকের শেষ দিকে আবিষ্কার হওয়ার পর এই প্রশ্নটা ওঠেনি কারণ উত্তরটা সবাই ধরেই নিয়েছিল। দেড়শো বছর পর সেই ধরে নেওয়াটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। 

বাজি থেকে বই। যদিও আর্টিকলটার তথ্যনিষ্ঠতা নিয়ে আমার সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। হেমিংওয়ের বিখ্যাত ‘বেবি শু’ সংক্রান্ত বিখ্যাত পরমাণু-গল্পটি হেমিংওয়ের লেখা কি না সে নিয়ে দ্বন্দ্ব যায়নি।






September 21, 2017

আমি দোষ স্বীকার করছি, ধর্মাবতার



ইউটিউবের অরিজিন্যাল ট্যাগের সঙ্গে আরও কয়েকটা দোষত্রুটি জুড়ে এই রইল আমার বই এবং বইপড়া সংক্রান্ত অপরাধের  ফিরিস্তি। 

যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য ছাড়া মিথ্যা বলিব না। 

১। উপহার পাওয়া বই কখনও অন্যকে উপহার দিয়েছেন?
না। যদিও প্রথম প্রশ্নেই কেমন হাই গ্রাউন্ড নেওয়া গেল, তবু এও স্বীকার করে রাখি, আমার কাছে যদি শীর্ষেন্দুর দশটা উপন্যাস দু’কপি উপহার থাকে, তাহলে আমি বিনা দ্বিধায় একখানা কাউকে উপহার হিসেবে গছাতে পারি। শীর্ষেন্দুর জায়গায় কামু, কাফকা, রোম্যা রোল্যাঁ হলেও পারি। না পারার কোনও কারণই খুঁজে পাচ্ছি না। 

২। কোনও বই না পড়েই পড়েছি বলেছেন?
এইটা এক কথায় বলতে যাওয়া মুশকিল। আমার বিশ্বাস প্রশ্নকর্তা আসলে জানতে চেয়েছেন স্রেফ জাতে ওঠার জন্য, “হ্যাঁ হ্যাঁ আমার তো দস্তয়েভস্কি মুখস্থ” বলেছি কি না। যতদূর মনে পড়ছে, বলিনি। তবে অনেক সময় এমন হয়েছে ধরুন কেউ, গজেন্দ্রকুমার মিত্র-র ওই গল্পটা পড়েছিস? বলে একটা গল্পের নাম বলল। নামটা আমি চিনতে পারলাম না। কিন্তু গজেন্দ্রকুমার মিত্র-র ছাপা হওয়া সব গল্পই যেহেতু আমি পড়েছি, তাই আমি সাদা মনে ঘাড় নেড়ে বলে দিলাম, “হ্যাঁ, পড়েছি।” আরও একটা বেটার রেসপন্স হতে পারত, “কোন গল্পটা বল তো?… ও আচ্ছা, আচ্ছা, হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, পড়েছি…” বলা, কিন্তু ঠিক সময়ে ঠিক প্রতিক্রিয়া মনে পড়লে আজ আমি যেখানে আছি সেখানে থাকতাম না, যা করছি তা করে দিনগত পাপক্ষয় করতাম না। 

৩। চ্যাপ্টার বাদ দিয়ে দিয়ে পড়েই পড়েছি বলেছেন? 
চ্যাপ্টার হয়তো নয়, তবে প্যারাগ্রাফ তো নিশ্চয় বাদ দিয়েছি, হরদম দিই। এবং তাতে মোটেই লজ্জা পাই না। শক্ত বইয়ের প্যারা বাদ দেওয়ার কথা বলছি না, শক্ত বই পড়ার বয়স আমার চলে গেছে। এখন যা সহজে মাথায় ঢোকে শুধু তাই পড়ি। সে সব সহজ বইয়ের অংশও হরদম বাদ দিই। এবং মনে করি, ওই অংশগুলো লেখকের, বা লেখক না হলেও এডিটরের আগেই বাদ দেওয়া উচিত ছিল।

My most important piece of advice to all you would-be writers: When you write, try to leave out all the parts readers skip. 
                                                                                                         - Elmore Leonard

এই রকম প্যারা লাফিয়ে, পাতা ঝাঁপিয়ে বইকে ‘পড়া বই’এর মধ্যে গুনি কি না? কী সাংঘাতিক, গুনব না কেন? তা হলে তো 'লর্ড অফ দ্য রিংস'-কেও না পড়া বইয়ের মধ্যে গুনতে হয়। কিংবা The Truth About the Harry Quebert Affair'- কেও। আমি এগুলোকে ‘পড়া’ বইয়ের মধ্যেই গুনি, এবং ‘পয়সা দিলেও আরেকবার পড়ব না’র মধ্যেও। 

৩। ধার নিয়ে কোনও বই ফেরত না দিয়েছেন?
না। অন প্রিন্সিপল, বই ধার নিই না। 

৪। কাউকে বই ধার দিতে অস্বীকার করেছেন? মুখের ওপর? আপনি কি মানুষ না পাষণ্ড? পারলেন কী করে?
প্রথমে মুখে বলতে চাইনি, হিন্ট দিয়েছি। কিন্তু একটা জিনিস আমি এই সাঁইত্রিশ বছরে বুঝেছি, লোকে কোয়ান্টাম মেকানিকস বুঝে ফেলে, হিন্ট বোঝে না। কাজেই বলতে হয়েছে। কারণ বই ধার দিয়ে ফেরত না পেলে তাকে মুখে বলে, ফোন করে, ইমেল করে, হোয়াটসঅ্যাপ ডাউনলোড করে দিবারাত্র পিং করে, তার বাড়িতে গিয়ে তার বুককেস হাঁটকে বই উদ্ধার করে নিয়ে আসতে হত, তারপর সম্পর্ক ছেদ করতে হত। সেটা আরও বেশি অভদ্রতা হত না?

৫। সিরিজ এলোমেলো করে পড়েছেন?
আমি যে রকম সিরিজ বেশি পড়েছি, ফেলুদা, ব্যোমকেশ, মিস মার্পল, পোয়্যারো, সেগুলো এলোমেলো করে পড়লে কিছু যায় আসে না। যেসব সিরিজে পারম্পর্য ম্যাটার করে, যেমন হ্যারি পটার, সেগুলো সিরিজ ধরেই পড়েছি। 

৬। কাউকে কোনও বইয়ের স্পয়লার দিয়ে দিয়েছেন?
মনে তো পড়ছে না, তবে একেবারে যে দিইনি, এ কথা তামাতুলসী ছুঁয়ে বলতে পারব না। কারণ আমি স্পয়লারের মর্ম বুঝি না। একটা এক লাইনের/ এক পাতা/দশ পাতার তথ্য বলে দেওয়ার জন্য বাকি গোটা পাঁচশো পাতার বই পড়া যে কারও মাটি হবে এটা বিশ্বাস করতে আমার অসুবিধে হয়। তবে আপনার যদি স্পয়লারে আপত্তি থাকে তাহলে ইচ্ছে করে সেটা মাটি করব না, নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি খারাপ, অতটাও খারাপ নই। 

৭। বইয়ের পাতা মুড়েছেন?
এরা আমাকে কী মনে করেছে, কালাপাহাড়?

৮। কোনও বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বীকার করতে অস্বীকার করেছেন? ইমেজ রক্ষার্থে?
এটা ডেফিনিটলি করিনি। এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারলাম, কারণ আমি বাজে বই পড়তে দারুণ ভালোবাসি। মনে করি সবার নিয়ম করে তিনটে ভালো বই পড়ার পর একটা করে বাজে বই পড়া দরকার।

১০। লেখক দিয়ে বইয়ের বিচার করেছেন?
এই রে, এইবার এরা আমার দুর্বল জায়গায় টর্চ ফেলেছে। আমি সত্যি সত্যিই লেখক দিয়ে বইয়ের বিচার করতে চাই না, শিল্প আর শিল্পী যে আলাদা এইসব তত্ত্ব আমি জানি এবং মনেপ্রাণে মানিও, কিন্তু মানা আর হাতে কলমে প্র্যাকটিস করার মধ্যে যে সাঁকো, সেটা এখনও পেরোতে পারিনি। ধরুন একজন লেখকের একটা উপন্যাস পড়ে দারুণ লাগল, সবাইকে বললাম পড়ুন পড়ুন/ পড়/ পড়িস। তারপর একজায়গায় সেই লেখক মহাশয়ের প্রায় দু’হাজার শব্দের আর একটা লেখা পড়লাম, প্রথম লেখাটা নিয়ে। দ্বিতীয় লেখাটার প্রথমার্ধে উক্ত লেখাটি কী ভাবে লেখক হিসেবে তাঁকে অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছে তাঁর বিবরণ, দ্বিতীয়ার্ধ রণহুংকার। উপন্যাসটি লিখে কেমন তিনি তাঁর শত্রুদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন, যে সব শালার তাঁর খ্যাতি দেখে চোখ টাটাচ্ছিল, তাঁর লেখা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যাঁরা চাদর মুড়ি দিয়ে এসে ইলেকট্রিকের লাইন কেটে দিয়ে যাচ্ছিল, তাঁদের থোঁতা মুখ কেমন ভোঁতা করে দিয়েছেন তার আখ্যান।

এই দ্বিতীয় লেখাটা পড়ার পর থেকে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে, লেখকের প্রথম লেখাটা আমি আর কাউকে রেকমেন্ড করতে পারছি না। করতে গেলেই অদৃশ্য দুটো হাত গলা টিপে ধরছে, জিভ অসাড়, স্মৃতি ঝাপসা। 

এর সমাধান একটাই, লেখকের ব্যক্তিগত জীবন বা মতামত থেকে শতহস্ত দূরে থাকা। এই হাটে হাঁড়ি মিডিয়ার জগতে যা ভয়ানক শক্ত। চোখ বন্ধ করে থাকতে চাইলেও উপায় নেই। এই কালকেই রোয়াল্ড ডাল সম্পর্কে কী সব জেনে ফেললাম। তবু চোখ বন্ধ করে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। 

১১।  বই দিয়ে পাঠক বিচার করেছেন? 

এই বিচারটা ওপরেরটা থেকেও বেশি অন্যায়, এবং সত্যি সত্যি দুঃখ এবং লজ্জার সঙ্গে স্বীকার করছি, এটাও আমি করি। আত্মপক্ষ সমর্থনে একটাই কথা বলতে পারি এইসব ছুঁৎমার্গ আচারবিচার নিজের মনেই (আর অর্চিষ্মানের কানে) রাখি, ফ্রিডম অফ স্পিচ ফলিয়ে, “এরা কারা, বস?” চেঁচিয়ে আত্মগর্ব অনুভব করি না। কারণ আমি জানি এটা অন্যায় আর এইসব বিচারে আমিও কোথাও দাঁড়াব না, ফুৎকারে উড়ে যাব। কাজেই এই অন্যায়টা আমি অজ্ঞাতে নয়, জ্ঞাতসারেই করি, এবং সর্বদা চেষ্টায় থাকি না করার।

এতে কি দোষ খানিকটা স্খালন হয়, নাকি আমি সত্যি সত্যিই কালাপাহাড়?

September 20, 2017

নিল গেমন'স ফার্স্ট ল + টগবগ উৎসব সংখ্যা ১৪২৪




“Picking up your first copy of a book you wrote, if there’s one typo, it will be on the page that your new book falls open to the first time you pick it up.” 
                                                                                   – Neil Gaiman’s First Law


আমার মতে বড় কথা টাইপোর চোখে পড়া নয়। টাইপোর থেকে যাওয়াটা। শুধু টাইপো হলে তবু একরকম। আরও কত কিছু যে থেকে যায়, চোখে পড়ে। কত ত্রুটি, কত গোঁজামিল। অনেককে বলতে শুনেছি নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখা নাকি নিজের সন্তানকে প্রথমবার দেখার মতো। সন্তানকে দেখে যদি কারও প্রথমেই, ‘ইস নাকটা কী বোঁচা’, ‘মাগো মাথায় কেন টাক’ ইত্যাদি মনে না হয় তাহলে তাঁর সঙ্গে আমার বিশেষ মিল নেই। 

আমাদের বঙ্কিমও বলেছিলেন, তিন মাস পরে নিজের লেখা পড়লে নাকি তাঁর ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। ধরে নিচ্ছি, সে যুগেও টেবিল ছেড়ে প্রকাশকের টেবিল ঘুরে বই হয়ে আসতে একটা লেখার তিন মাস বা তার বেশিই লেগে যেত, কাজেই বঙ্কিমের উক্তিটাকে নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখার প্রতিক্রিয়া হিসেবেও ধরে নেওয়া যেতে পারে।

বঙ্কিম, গেমন-এরই এই, তাহলে তিনমাস পর আমার লেখার অবস্থা কী হয় ভাবুন।

নড়বড়ে গাঁথুনি, নিড়বিড়ে ভাষা, পর পর দুটো সেন্টেন্সে একই শব্দ ব্যবহার, সব বইয়ের পাতা থেকে গুলতির মতো ছিটকে ছিটকে চোখে বেঁধে। অথচ গল্পটা পাঠানোর আগে দুশোতমবার যখন চোখ বোলাচ্ছিলাম (আর একটিবারও বোলালে বমি করে ফেলতাম নিশ্চিত), এগুলো চোখে পড়েনি।

নিল গেমন আরও একটা কথা বলেছিলেন, দশ মিনিট গুগল সার্চ করে পেলাম না, প্যারাফ্রেজ করে বলছি। বলেছিলেন, তাঁর লেখক জীবনের সারাৎসার হচ্ছে  - লেখা, ছাপতে দেওয়া, ছাপা হওয়ার পর পড়ে শিউরে ওঠা এবং পত্রপাঠ পরের লেখাটা লিখতে বসা। আবার ছাপা, আবার শিহরণ, আবার লেখা, আবার ছাপা, আবার শিহরণ…

কিশোর সাহিত্য পত্রিকা টগবগ-এর উৎসব সংখ্যা ১৪২৪-এর একটা ভালো উদ্যোগ ছিল, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের গল্পের অনুবাদ প্রকাশ। আমার দায়িত্ব ছিল কাশ্মীরী গল্প অনুবাদ করার। গল্পের লেখক এম কে রায়না ভারি ভদ্রলোক, ওঁর একটা গল্প ইংরিজি করাই ছিল, নিজেই করে রেখেছিলেন, আমি সেটা ইংরিজি থেকে বাংলা করলাম। বলাই বাহুল্য, নিজের সামান্য ফোড়ন দিতেও ছাড়লাম না। সেই গল্পটার খানিকটা তুলে দিয়েছে দেখলাম রোহণ বিজ্ঞাপন হিসেবে। পড়ে আমার শিহরণ হল। তা সত্ত্বেও, সেটাই নিচে দিচ্ছি।

টগবগ উৎসব সংখ্যা ১৪২৪ কাগজের কিনতে হলে চলে যান এইখানে

ই-বুক কিনতে হলে এইখানে 

কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চাখতে হলে, এইখানে


*****

এম কে রায়না-র ‘দ্য লাস্ট গেম’ ছোট গল্প অবলম্বনে আমার অনুবাদ ‘শেষ খেলা’র উদ্ধৃতাংশ


আবার কাজে নামল লালজী। মায়ের চোখ বাঁচিয়ে রান্নাঘরের জ্বালানি কাঠকুটো হাঁটকে একটা বেশ চওড়া চ্যালা কাঠের তক্তা জোগাড় করে নিয়ে গেল রাজুভাইয়ার কাছে। নিজের গুমটির ভেতর, কানে পেনসিল গুঁজে তখন রাজুভাইয়া খুব মন দিয়ে শিরীষ কাগজ দিয়ে ঘষে ঘষে একটা কাঠের লম্বা পাটাতনকে মসৃণ করছিল। হাতের কাঠটা দিয়ে লালজী সব বুঝিয়ে দিল রাজুভাইয়াকে। পরদিন স্কুলের পরে সবাই মিলে গিয়ে দেখল রাজুভাইয়া সেই চ্যালাকাঠটাকে কেটে ছেঁটে, হাতলটাতল বসিয়ে, পালিশ-টালিশ করে দিব্যি একটা ব্যাট বানিয়ে রেখেছে। সবাই খুব খুশি হল ব্যাট দেখে, কিন্তু আসল ভয়ের কাজটাই এখনও বাকি। খুচরো পয়সাগুলো হাতে মুঠো করে লালজী জিজ্ঞাসা করল, “কত দাম ব্যাটের?” রাজুভাইয়া একবার ওদের মুখের দিকে, একবার লালজীর মুঠোর দিকে তাকাল।

“কত এনেছ?”

“চার টাকা।” মুঠো খুলে খুচরোগুলো দেখাল লালজী। রাজুভাইয়া আশ্চর্য হয়ে গেল। ব্যাটের মজুরিও তো চার টাকাই! ভীষণ খুশি হয়ে ব্যাট নিয়ে ফিরতে যাবে এমন সময় পিছু ডাকলেন রাজুভাইয়া। “ব্যাট লাগবে, বল লাগবে না?” নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করল ওরা। কাগজ গোল্লা পাকিয়ে গার্ডার পেঁচিয়ে রেডি করা আছে। রাজুভাইয়া উঠে গিয়ে দোকানের ভেতর থেকে একটা কাঠের বল বার করে দিল ওদের হাতে। বলল, “নতুন পলিসি চালু হয়েছে দোকানে, ব্যাট কিনলে বল ফ্রি।”

বসন্ত ততদিনে পুরোদস্তুর জেঁকে বসেছে মনিয়ারে। তুঁতগাছের সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে মুকুলের আভাস। হাওয়ায় কামড় উধাও। সবাই বলল, “শুভকাজে আর দেরি কেন, ম্যাচের দিন স্থির করে শত্রুপক্ষকে নেমন্তন্ন করা হোক, পিচের ধুলোয় ব্যাটাদের নাকগুলো ঘষে দেওয়া যাক।” এই ব্যবস্থায় সবথেকে বেশি যার উৎসাহ থাকবে ভেবেছিল সবাই, সেই লালজীই তেমন গা করল না। বলল, “ম্যাচ পরে হবে, তার আগে আমাদের খানিকটা প্র্যাকটিস করা দরকার।”

পরের রবিবার ভালো করে জলখাবার খেয়ে লালজী, রফিক, কুন্দন, রঘু, কবীর আর রামজী ব্যাট, বল আর তুঁতগাছের চারটে ডাল নিয়ে চলল পাড়ার বাইরের সেই কাঁটাতার ঘেরা মাঠের দিকে। ওদের সুপার সিক্স টিমের খবর এর মধ্যে চাউর হয়েছে, ওদের স্কুলেরই ছোট ক্লাসে পড়া ডজনখানেক উৎসাহী দর্শকও জুটল। মাঠের ধারে লাইন দিয়ে বসল তারা। ব্যাটিং অর্ডার স্থির করার রাস্তা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। চিরকুটে এক, দুই নম্বর লিখে ভাঁজ করে দুই হাতের আঁজলায় নিয়ে দাঁড়াল রামজী। চিরকুট তুলে নিল বাকি পাঁচজন। দেখা গেল লালজীর চিরকুটে বড় বড় করে লেখা আছে ‘এক’।

প্রথম বল করবে কুন্দন। নতুন বল নিয়ে কুন্দন হেঁটে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল উলটোদিকে। নতুন ব্যাট নিয়ে লালজী গিয়ে দাঁড়াল তিনটে তুঁতডালের সামনে। শেষবারের মতো ব্যাট ঠুকে পিচের গতিপ্রকৃতি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল লালজী। চোখ চালিয়ে দেখে নিল বিরোধীপক্ষের ফিল্ডারদের অবস্থান। দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে অল্প ঝুঁকে খুনে দৃষ্টি নিয়ে লালজীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে রঘু, রফিক, কবীর, রামজী। কে বলবে এতদিনের বন্ধু? চোখে খুনে দৃষ্টি, এক চুল ভুল করলে ‘আউট’ বলে চেঁচিয়ে উঠবে সবাই।

বুকের মধ্যে অল্প একটু কাঁপন ধরল কি লালজীর? কুন্দনকে চেঁচিয়ে বলল ও, প্রথম বলটা নেট প্র্যাকটিসের জন্য, ফলাফল যাই হোক না কেন হিসেবে ধরা হবে না। ক্যাপ্টেনের কথা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা কারোর নেই। কুন্দন মনে মনে সবুজ খাতার পড়া ঝালিয়ে নিল। স্পিন না পেস না গুগলি? অনেক ভেবে-টেবে অল্প ছুটে এসে একটা স্পিন বল দিল কুন্দন। লালজী ডিফেন্সের ভঙ্গিতে ব্যাট তুলল, চ্যালাকাঠের ব্যাটে ঠকাস করে ঠোকা খেয়ে বল চলে গেল কুন্দনের দিকে। চটাপট হাততালি দিয়ে উঠল মাঠের চারপাশের দর্শকরা। রান হল না কোনও।

দ্বিতীয় বল। কুন্দন এবার দৌড় শুরু করেছে খানিকটা দূর থেকে। প্র্যাকটিস বল সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে ব্যাটসম্যানের আত্মবিশ্বাসও তুঙ্গে, বল কাছে আসার তর সইল না, এগিয়ে গিয়ে ব্যাট চালাল লালজী।

আবার ‘ঠকাস’ করে শব্দ। কিন্তু ব্যাটে তো বল লাগেনি! অথচ একটা চিৎকার উঠেছে চারদিকে, কান ফাটানো হাততালি, নিজের নিজের জায়গা ছেড়ে ফিল্ডাররা ছুটেছে কুন্দনের দিকে, সবাই মিলে জড়াজড়ি করে এখন একটাই পিণ্ড হয়ে গেছে। সবাই একদিকে, লালজী একদিকে। পেছনে ফিরে তাকাল লালজী। যা দেখল বিশ্বাস হল না তার। তিনটে ডালের মাঝেরটা মাটি থেকে উপড়ে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে, তখনও অল্প অল্প গড়াচ্ছে বিশ্বাসঘাতক বলখানা।



*****

গল্পের সঙ্গতে চমৎকার ছবিটি এঁকেছেন অরিজিৎ ঘোষ। 



September 19, 2017

এখন-তখন




যা যা বদলেছে
যা যা একই আছে


আগে মহালয়ায় সবাই যে যার নিজের বাড়িতে রেডিও শুনত এখন মাইক লাগিয়ে পাড়ার সবাইকে শোনায়।

তখনও রেডিওর মহালয়া বেস্ট ছিল, এখনও বেস্ট


আগে এই দিনটা এলে মনে হত, এবার সত্যিই পুজো এসে গেছে এখন সেটা খুঁটিপুজোর দিন মনে হয়


তখনও টিভির মহালয়া বেশি এন্টারটেনিং ছিল, এখনও তাই আছে কারণ, ব্রহ্মার দাড়ি তিরিশ বছর ধরে সমান হাস্যকর


আগে চারপাশে সকলেই মহালয়া খায় না মাথায় দেয় জানত। "আজ তুমলোগ কেয়া করতে হো?” গোছের অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হত না। উত্তরটা সোজা, কিন্তু প্রশ্নকর্তার রিঅ্যাকশন গোলমেলে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


তখনও রেডিও শুনে আর টিভি দেখে মহালয়া উদযাপন করতাম, এখনও করি।


আগে মহালয়া আসতে আসতে জামাজুতো কেনা হয়ে যেত। কারণ তখন বাবামা দায়িত্ব নিতেন। জীবনের ওপর কন্ট্রোল তাঁদের আমাদের থেকে বেশি ছিল।
তখনও মহালয়ার দিন পড়ায় মন বসত না, আজও কাজে মন বসছে না। ফাঁকি দিয়ে বাজে পোস্ট ছাপছি।




September 17, 2017

ঘরের কাজঃ কান্না-পাওয়া থেকে না-করতে-পারলে-মন-খারাপ ক্রমানুসারে



অনেক সময় হয় না, একটা লোককে অনেক দিন চোখের চেনা হওয়ার পর সে লোকটার সঙ্গে পরিচয়, ক্রমে এতখানি ঘনিষ্ঠতাও হয়, যে ওই চোখে চোখে চেনার সময় লোকটা আপনার সম্পর্কে কী ধারণা করেছিল সেটা সে আপনার কাছে স্বীকারও করে? আমার যে ক’জনের সঙ্গে এ রকম হয়েছে, তারা মূলত তিনটে বিষয় আমার কাছে স্বীকার করেছে, যেগুলো তারা আমার সম্পর্কে ভেবেছিল। 

প্রথম দর্শনেই নাকি তারা ধরে ফেলেছিল, আমি বাঙালি। দু’দিন দেখে নিশ্চিত হয়েছিল, আমি বদমেজাজী, রাগী বাঙালি। ধমকাতেও হবে না, ভুরু কুঁচকে তাকালেই গরু দুধের বদলে দই দিতে শুরু করবে। আরও কিছুদিন আমাকে অবজার্ভ করে তাদের মনে হয়েছিল আমার কোনও কাজ নেই। দুশ্চিন্তা নেই, দায়িত্ব নেই, কর্তব্য নেই। জোয়াল ঠেলছি না, যেন আতর মেখে হুঁকো টানতে টানতে চলেছি জীবনের মধ্যে দিয়ে। তারা অবশ্য ওপরের উপমাটা ব্যবহার করেনি, কারণ তারা হুঁকো জানে না, হুকা বার জানে। (একটা জিনিস জেনে আমি চমকে গেছি। হুকা বারের হুঁকোতে নাকি তামাকটামাক থাকে না, স্রেফ গন্ধওয়ালা ধোঁয়া! সেটাই লোকে গুচ্ছ পয়সা খরচ করে গুড়ুক গুড়ুক টানতে থাকে! ) তারা আমার এই ভঙ্গি বর্ণনা করার সময় বলেছিলেন, “মুংফলি খাতে খাতে, গানা গাতে গাতে।”

এই তৃতীয় অবজার্ভেশনটা স্বীকার করার সময় লোকে খুব লজ্জা লজ্জা মুখ করে। আমাকে দেখে যে দামি এবং ভারী মনে হয় না, মনে হয় না আমার ডায়রিতে জায়গা পাওয়ার জন্য মিটিং এবং টেলিকনরা গুঁতোগুঁতি করছে, এটা মনে করিয়ে দিলে পাছে আমি অফেন্স নিই।

আশ্বস্ত করি। অফেন্স মোটেই নিইনি, নিলে ভণ্ডামি হবে। কারণ সত্যিই দায়িত্বকর্তব্য আমার অভিধানের প্রিয়তম শব্দ নয়, আজ কী কী কাজ না করে ফেলে রাখা যেতে পারে, রোজ ভোরে চোখ খোলারও আগে আমার সে চিন্তা শুরু হয়। অফিসের কাজ করি পেটের দায়ে, বাড়ির কাজ করি লোকলজ্জায়।

মুখে বলি বটে, কিন্তু মনে মনে মনখারাপও হয়। কেন ভগবান আমাকে এরকম ফাঁকিবাজ করে বানালেন। এক ঠোঙা মুংফলি কিনে অফিসের দিকে হাঁটতে থাকি, কিন্তু গানা আসে না গলায়। আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকি, সব কাজ একটা লোকের কী করে খারাপ লাগতে পারে, দুয়েকটা নিশ্চয় বেরোবে যেগুলো করতে ভালো লাগে? অন্তত, কম খারাপ? অফিস বরাবরের মতোই হতাশ করে। জল খাওয়া আর আন্টিজির দোকানে যাওয়া ছাড়া আর পাতে দেওয়ার মতো কাজ খুঁজে পাই না। 

বুক বেঁধে বাড়ির দিকে তাকাই। একমনে ভাবতে ভাবতে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখা যায়। আছে আছে, কাজ আছে! যেগুলো করতে আমার কান্না পায় না, এমনকি রীতিমত ভালোও লাগে।

আমার কান্না পাওয়া থেকে ভালো লাগার ক্রম অনুযায়ী কয়েকটা সাংসারিক কাজের একটা লিস্ট এই রইল। আপনাদের সঙ্গে কী মিলল, কী মিলল না জানতে কৌতূহলী রইলাম। 

ইস্তিরি করাঃ অ্যাকচুয়ালি, ইস্তিরি করাকে এই লিস্টে রাখা ইস্তিরি করা-কে অপমান, কারণ লিস্টের বাকি কাজগুলোর প্রতি আমার খারাপ লাগাদের যোগ করে, যোগফলের বর্গফল বার করলেও সে খারাপ লাগা ইস্তিরি করার খারাপ লাগাকে ছুঁতে পারবে না। তাই আমি একে অফিশিয়াল লিস্টের বাইরে রাখলাম।

কেন এত খারাপ লাগে সেটা বুঝিয়ে বলা মুশকিল, একটা হতে পারে, আমি বিষয়টাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করি। পরিষ্কার জামা, ছেঁড়াফাটা নয়, সেটা আবার টানটান হতে হবে কে বলল? তার ওপর যখন রোহিত বাল কলসি থেকে বার করা জামা প্যান্ট পরে রাজদ্বার থেকে ম্যাগাজিন কভার দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন? সে বেলা? 

“ওটা লিনেন।” ইস্তিরি-পুলিস চোখ বন্ধ করে মাথা নেড়ে বলেন। 

সামনের জন্মের আগে আমার গোটা ওয়ার্ডরোব লিনেন-এ বদল করার আগে কোনও সম্ভাবনা দেখছি না, কাজেই এ যমযন্ত্রণা আপাতত চলবে। (কারও কারও আবার শুধু জামা ইস্তিরি করে কুলোয় না, মাথার চুলও রোজ ইস্তিরি না করে তাঁরা প্রকাশ্যে পা রাখেন না। সাষ্টাঙ্গ প্রণাম ছাড়া তাঁদের আমার আর কিছু বলার নেই।)

৭। ফ্রিজ পরিষ্কারঃ যেদিন যেদিন ঘুম থেকে উঠে মনে হয়, বাঃ, মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছে, ডেডলাইন নেই, আফসোস নেই, দিগন্তে অপরাধবোধের ছায়া পর্যন্ত নেই, মোটামুটি নব্বই শতাংশ নিশ্চিত হয়ে বলা যায় সেইদিনই, ঠিক সেইদিনই আমার ফ্রিজ পরিষ্কার করার দিন। 

একটা গোটা দিনকে মাটি করার ক্ষমতা, আমার অফিসের কিছু কিছু লোকের আছে, আর আছে আমার ফ্রিজের। ফ্রিজ না বলে অন্ধকূপ বলাই ভালো। কিংবা ‘হাউস অফ লিভস’ গল্পের সেই ভৌতিক করিডোরের মতো। বহিরঙ্গের সঙ্গে অন্দরের কোনও সম্পর্ক নেই। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, এইটুকু, অবশ্য দু’জনের সংসারে আর কত বড়ই বা লাগে। আমরা তাঁদের আশ্বস্ত করি, যত ছোট দেখতে লাগছে জিনিসটা আসলে তত ছোট নয়। আড়াল আবডাল থেকে কত কিছু যে বেরোয়, কল বেরোনো ছোলা, হারিয়ে যাওয়া টিফিনবাক্সের ভেতর একটুকরো পাতিলেবু। আধবাটি চাউমিন, দু’ চামচ মুগের ডাল। শুধু আয়তনই যে ডিসেপটিভ তা নয়, আমার ধারণা ফ্রিজটার একটা অলৌকিক শক্তি আছে, খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার। 

পরিণাম, ধরে ধরে খাবার ফেলা, এবং নিজের প্রিভিলেজের এই রকম নির্লজ্জ অপব্যবহারে শিউরে শিউরে ওঠা।

৬। ধুলো ঝাড়া/ ঝাঁট দেওয়াঃ ধুলো ঝাড়তে আমার ভালো লাগে না, তারও পেছনে অপরাধবোধ। প্রতিটি জিনিস হাতে তুলে মুছতে গিয়ে মনে পড়ে, কী আবোলতাবোল জঞ্জালে বাড়ি ভর্তি করে রেখেছি। বসের বকুনি খেয়ে অনলাইনে ‘কিপ কাম অ্যান্ড ড্রিংক টি’ কিনেছিলাম। দীপাবলীতে অফিস থেকে কুৎসিত মোমবাতি দিয়েছিল, এখনও জুতোর কেসের ওপর অধিষ্ঠান করছে। ধুলো ঝাড়ার আরেকটা খারাপ ব্যাপার হচ্ছে সিদ্ধান্ত নেওয়া। রাখব না ফেলব। 

ধুলো ঝাড়ার পরে আসে ঝাঁট দেওয়ার পালা। ধুলো ঝাড়ার থেকে কম বিরক্তিকর, তবে ফ্যান বন্ধ করতে হয়, সেটা আরামদায়ক নয়। আবার কিছু বেয়াদপ ঝুল থাকে, শুয়ে পড়ে খাটের তলা থেকে বার করে আনার পর তারা আবার উড়ে উড়ে খাটের তলায় সেঁধোতে থাকে, আমার নাকের ডগা দিয়ে, সেটাও আত্মবিশ্বাসের পক্ষে ক্ষতিকারক।

৫। কাপড় কাচাঃ কাপড় কাচায় এ ধরণের মানসিক চাপ নেই। পরিশ্রম আছে বিস্তর। কাচার পর তোয়ালে নিংড়ে জল বার করেছেন যাঁরা, জানেন। কাপড় কাচার যে ব্যাপারটা আমাকে ভাবায় সেটা হচ্ছে কাজটার, বা কাজটার নামের অন্তর্লীন অসততা। 

কাপড় কাচা আসলে কাপড় কাচা নয়। কাপড় কাচা হল জামা বাছা, ভেজানো, কাচা, মেলা। মনে করে ক্লিপ লাগানো। না হলে অফিস থেকে এসে দেখা কাল ঝাঁট দেব বলে ফেলে রাখা বারান্দার মেঝেতে তারা গড়াগড়ি খাওয়ারত অবস্থায় আবিষ্কার করা। শুকোলে মনে করে তোলা। না তুললে, বৃষ্টি গ্যারান্টি। এবং আমার একটিমাত্র জিনস ভিজে গোবর। 


৪। বাজার করাঃ কাপড় কাচার মতো এই শেষ হয়েও হইল না শেষ দোষটা বাজার করারও আছে। স্রেফ ওই তোয়ালে চেপা, ক্লিপ দেওয়ার অংশটা নেই বলে কান ঘেঁষে বাজার করা জিতে গেল। বাজার করা কখনওই শেষ হয় না। চাল আনলে আটা ফুরোয়, লাইজল আনলে মনে পড়ে ওডোনিলও আনতে হত। আলু কিনে পোস্ত ভুলে যাই, পোস্ত কিনলে পাঁপড়, পাঁপড় পাঁপড় জপতে জপতে বাজারে গিয়ে যদি বা মনে করে তাকে ব্যাগে পুরি, রবিবার বিকেলে চা বানিয়ে আবিষ্কার হয় পপকর্ন নেই। 

একটা ছিল না?! বাজার যাওয়ার আগে দেখলাম যে! 

মাথায় হাত দিয়ে বসি। এখন কী খাব আমরা? 

শেলফের ওপর থেকে পাঁপড়গুলো চোখ পিটপিট করে।

আমার দুঃখ দ্বিগুণ হয়। পাঁপড়? মাগো, পাঁপড় মানুষে খায়?

তবু বাজার করা আমার লিস্টের এত নিচের দিকে কেন? ধড়াচূড়া পরে বাইরে বেরোতে হওয়া সত্ত্বেও এবং মানুষের সঙ্গে কথোপকথন চালাতে হওয়া সত্ত্বেও? কারণ বাজার করার এতগুলো খারাপ দিক আছে বলেই আমি প্রতিবার বাজার করতে গিয়ে দু’প্লেট করে ফুচকা খাই। 

এবং বাজার করা ভালো লাগা কাজের লিস্টে হইহই করে ওপরে উঠে আসে। 

৩। রান্না করাঃ রান্না করতে আমার খারাপ লাগে না। মাঝে মাঝে সিম করে এসে টিভি দেখা যায়, ভালো হলে ভালো, খারাপ হলেও অসুবিধে নেই, নিজের হাতের রান্না খেতে কারওরই খারাপ লাগে না, আর অর্চিষ্মান ভালোখারাপ যেমনই হোক না কেন, মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করে। খারাপ লাগার বিশেষ কিছুই নেই।

তবু যে এক নম্বরে জায়গা পেল নাতার কারণ হচ্ছে রান্না রোজ করতে হয়, চট করে শেষ হয়ে যায়, তখন আবার রান্না করতে বসতে হয়। বিশেষ করে ভালো খেতে হলে তো অসুবিধেজনক রকম তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। (তখন আমাদের অলৌকিক ফ্রিজ কোনও কম্মে লাগেন না।) 

২। গাছে জল দেওয়াঃ গাছে জল দেওয়া যে আমার লিস্টের এক নম্বর ভালো লাগা কাজ নয় সেটা দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেছি। একটু ভাবতেই অবশ্য কারণটা বেরিয়ে পড়ল। 

ভালো লাগার কারণ তো বুঝিয়ে বলার কিছু নেই। জল দিলে গাছ সাড়া দেয়। ছোট ছোট পাতা বার করে মাথা নাড়ে। পা উঁচু করে জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি মারে। 

ঠিক উল্টো ব্যাপারটা হয় ফেলে রেখে বেড়াতে চলে গেলে। নিজেরা হেসে খেলে বেড়িয়ে ফিরে আসি, দেখি গাছ নেতিয়ে পড়েছে। জল না পেয়ে আধমরা। এবং সবথেকে খারাপ দিকটা হচ্ছে, ওকে না খেতে দিয়ে মেরে ফেলার জন্য গাছের আমার প্রতি কোনও অভিযোগ নেই। চুপ করে মরে যাবে। এবং তাৎক্ষণিক হলেও, ওর মৃত্যুর তুলনায় হাস্যকররকম অকিঞ্চিৎকর হলেও, আমাকেও খানিকটা মেরে যাবে।

অতএব? বাকি কী রইল? আমি মনে মনে জানতাম এর জেতার একটা জোর সম্ভাবনা রয়েছে, সে সম্ভাবনা নিশ্চয়তায় রূপান্তরিত হয়েছে।

১। বাসন মাজাঃ বাসন মাজার কোনও খারাপ দিক, এই মুহূর্তে আমি খুঁজে পাচ্ছি না। একজায়গায় দাঁড়িয়ে করা যায়, কারও সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকট করতে হয় না, লেবুগন্ধের প্রিল দিয়ে কবজি একবার আলতো করে ঘোরাতে না ঘোরাতেই চকচকে। (একমাত্র রাইস কুকারটা মাজতে একটু অসুবিধে হয়, সাইজে বেঢপ বলে বেসিনের সাইডে লেগে ঘটর ঘটর আওয়াজ করে।) 

আর যদি পাজামার পকেট থাকে, আর মোবাইলটা যদি সেই পকেটে ফেলে রাখা যায়, আর কোন চ্যানেলে যদি এই গানটা দেয়, তাহলে বাসন মাজা রীতিমত লোভনীয় টাইমপাস। এমন অনেক সময় হয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যে সাতটায় টেলিকনফারেন্সে, একটাই কথা পাঁচটা লোকের মুখে পাঁচশো রকম ভাবে শোনার পর, আমার রান্নাঘরের বাসন মাজার ছোট্ট কোণটার কথা মনে পড়ে বুক মুচড়ে উঠেছে। 

আরও একটা কারণ আছে বাসন মাজতে ভালো লাগার। অর্চিষ্মান বেসিনের দিকে এগোলেই “না না, এগুলো আমি ম্যানেজ করে নেব, তুমি বরং ইস্তিরির দিকটা দেখো গিয়ে” বলে ঝাঁপিয়ে গিয়ে পড়ার। যে কারণটা আমি আগে কাউকে বলিনি, এই আপনাদের বলছি। আগাথা ক্রিস্টি নামের একজন খুব বুদ্ধিমান আর সফল লেখক বলেছিলেন, তাঁর বেস্ট আইডিয়াগুলো তিনি সব পেয়েছেন বাসন মাজতে মাজতে। 

দুঃখের বিষয়, আমার সঙ্গে সে রকম কিছু ঘটেনি এখনও। তবু আমি হাল ছাড়ছি না। এখনও অনেক বাসন মাজার আছে, আজ না হোক কাল না হোক, একদিন না একদিন আইডিয়াকে এসে ধরা দিতেই হবে। যতদিন না আসছে,ততদিন আমার ভালো লাগা কাজের লিস্টে বাসন মাজার সিংহাসন কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.