December 31, 2018

আমার দু'হাজার উনিশের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ




অবশেষে সেই ক্ষণ উপস্থিত। দুহাজার আঠেরো, যা কি না কল্পবিজ্ঞানের কোনও বছর, তার ফুরিয়ে যাওয়ার। এই সব মুহূর্তে বিশ্বাস করতেই হয়, দু’হাজার বাইশ, দু’হাজার তেইশ ইত্যাদি সাল, আর্থার সি ক্লার্ক কিংবা অদ্রীশ বর্ধনের বইয়ের পাতা ছাড়া যারা কোথাও নেই, থাকা উচিত নয়, সেগুলোরও এই রকম স্মরণসভা লেখার সময় আসবে। যে রেটে চলছে, আমিই লিখব। পাকা চুল হয়তো আরও কয়েকটা বাড়বে, সম্ভবতঃ অনুতাপও, কিন্তু এ ঘটনা ঘটবে।

বছরের এই সময়টা আমার প্রিয়। গরম লাগছে না, ঘাম হচ্ছে না। চারদিকে গত বারো মাসের বারোটি বেস্ট বই, তেরোটি বেস্ট সিনেমা, সতেরোটি বেস্ট ছবির লিস্ট। উৎসব-উৎসব ফিলিং, গিভ অ্যান্ড টেক-বিহীন। সবথেকে ভালো খোলস ছাড়ানোর, শুকনো আমি খসে যাওয়ার অনুভূতিটা। একটাই খারাপ, সামনের বছরের রেজলিউশনসংক্রান্ত স্বপ্নের পোলাওয়ে ঘি ঢালার স্বপ্ন শেষ, কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে সত্যি সত্যি সেগুলো রক্ষার্থে নামতে হবে। বিচক্ষণরা এই জন্য রেজলিউশন নেওয়ার বোকামো করেন না এবং প্রত্যাশা পূর্ণ না করার ফেলিওর থেকে নিজেকে মুক্তি দেন। তাছাড়া রেজলিউশন নেওয়া সহজ, শক্ত হচ্ছে নিজেকে বদলানো। আর যদি সেটা না পারা যায় তাহলে নতুন কিছু হওয়ার চান্স নেই। যা এতদিন হয়ে এসেছে তারই পুনরাবৃত্তি হবে। আর নিজেকে আদৌ বদলান যায় কি না সে নিয়ে তো সংশয়ের বিরাট স্কোপ রয়েছেই। যদি পুরনো কুন্তলার টাইপ হয় রেজলিউশন নেওয়ার জন্য নেওয়া এবং সেগুলো রক্ষা করতে না পারা, আর পুরনো কুন্তলা যদি পুরনো কুন্তলাই থাকে, তাহলে নতুন বছরের নতুন রেজলিউশনের পরিণতিই পুরনোই হবে।

কিন্তু যদি আমরা আমাদের টাইপের দাসই হয়ে থাকি, তাহলে রেজলিউশন নেওয়া থেকেও আমার মুক্তি নেই। কারণ আমার টাইপ রেজলিউশন নেওয়া। নেশা, পেশা এবং স্বাস্থ্য, এই তিন ক্ষেত্র জুড়ে আমার দু’হাজার উনিশের রেজলিউশন নেওয়া শেষ। অনেকে রেজলিউশনে অবিশ্বাসীরা ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার প্রেফার করেন। এমন একটা শব্দ যা তাঁদের সামনের বছরের কম্পাস হবে।  আমার আরেকটা টাইপ হচ্ছে যেটাতে বিশ্বাস করা সেটাতে খুব জোরদার বিশ্বাস করা। যাতে যাতে কাজ দেওয়া সম্ভব বা কাজ দিলেও দিতে পারে বা কারও কাজ দিয়েছে শোনা গেছে, রেজলিউশনসংক্রান্ত এমন সমস্ত টোটকা তাগা তাবিজ মাদুলি, ঝাড়ফুঁক, জাদুটোনা, বাটি-চালানোতে আমি বিশ্বাস করি। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। আমার দু’হাজার উনিশের শব্দ ‘শেষ’। এ বছর আমি বই পড়া শুরু করলে শেষ করব। লেখা শুরু করলে শেষ করব। আগের কিংবা তারও আগের বছর শুরু হয়ে যা যা আধখানা হয়ে পড়ে আছে সেগুলো শেষ করব। যা যা শুরু করিনি, যদি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিই, শেষ করব।

আপনারা যাঁরা যা টাইপই ( ‘টাইপই’ লিখতে গিয়ে ‘টাইপো’ লিখে ফেলেছিলাম, অসুবিধে নেই, আপনি টাইপো হলেও এ বার্তা আপনার জন্য প্রযোজ্য) হোন না কেন, রেজলিউশন-নেওয়া, না-নেওয়া, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, হঠকারী, বিচক্ষণ  - আপনাদের সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। দু’হাজার উনিশ খুব ভালো আর খুব আনন্দে কাটুক। যা চান তাই যেন পান। 

হ্যাপি নিউ ইয়ার। 


December 28, 2018

কর্ডলেস




দিল্লিতে যে রেটে ঠাণ্ডা পড়েছে তাতে আমরা প্রায় রুম হিটারের ওপর চড়ে বসে আছি বলা যায়। কোনদিন না গায়ে আগুনটাগুন লাগে। আগে আমাদের একটা ঊষা কোম্পানির ব্লোয়ার ছিল, গোঁ গোঁ শব্দে প্রবল বেগে গরম হাওয়া ছাড়ত। সেটার ভালো ব্যাপার ছিল যে অত্যন্ত দ্রুত অত্যন্ত বেশি গরম হত, কিন্তু খারাপ ব্যাপার ছিল যে গরম হত অতি অল্প জায়গা। যেখানে যেখানে হাওয়া পৌঁছচ্ছে শুধু সেইখানটাই গরম। যথার্থেই পোর্টেবল ব্লোয়ার। সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে না ঘুরলে উষ্ণতার আশা নেই। 

বছরদুয়েক আমাদের রুম হিটিং অবস্থার আপগ্রেড হয়েছে এবং আমরা একখানি অয়েল-ফিলড রুমহিটারের মালিক হয়েছি। সে হিটার অতি স্বাস্থ্যকর উপায়ে ঘর গরম করে অর্থাৎ কি না অনেকক্ষণ চালিয়ে রাখলেও বোঝা যায় না আদৌ গরম হচ্ছে কি না। প্রথমে হাহাকার করেছিলাম। পয়সা নষ্ট হল, কিছুই গরম হচ্ছে না।  তারপর একদিন ঘোর শীতে একমুহূর্তের জন্য দরজা খুলে পাশের ঘর থেকে খবরের কাগজ না কী একটা আনতে গেছি, হিটার থাকা না থাকায় তফাৎটা স্বমহিমায় প্রকাশিত হল। 

আমাদের নতুন বাড়ির সব ভালো কিন্তু ইনসুলেশন অকথ্য। শবাসনে শুলে বুঝতে পারি দরজার তলা দিয়ে ফুরফুরিয়ে হাওয়া ঢুকছে। বাইরের ঘরে তিনটে দরজা, দুটো জানালা এবং হিটারহীন ঘরটার টেম্পারেচার মোটামুটি মেলা গ্রাউন্ডের সমান হয়ে থাকে। অসুবিধে নেই, বাইরের ঘরে যাওয়ার আমাদের বিশেষ প্রয়োজন হয় না। খালি কারিগাছে জল দিতে যাওয়ার সময়, বারান্দায় জামাকাপড় মেলতে আর তুলতে যাওয়ার সময় আর ফোনে কথা বলার সময় ছাড়া। 

আমাদের বাড়ির ভেতরে মোবাইলের কানেকশন পাওয়া যায় না এবং সে জন্য একখানা ল্যান্ডলাইন নেওয়া হয়েছে সে খবর লিখেছি অবান্তরে। ওই ল্যান্ডলাইনখানা রয়েছে বাইরের ঘরে। কর্ডলেসও না যে এ ঘরে নিয়ে এসে কথা বলব। 

কর্ডলেস ফোন কিনিনি কেন? কিংবা শোওয়ার ঘরে ফোনের কানেকশন বসাইনি কেন? নানারকম কারণ আছে। অন্তত তখন ছিল। তারে তারে বাড়ি অলরেডি ছয়লাপ, আর তার না জোটানোর জন্য। কোনও একটা সিদ্ধান্ত যখন নেওয়া হয় তখন তার পক্ষে যুক্তির অভাব থাকে না। যে সিদ্ধান্ত যত বেশি ভুল হতে চলেছে তার পক্ষে যুক্তি তত অকাট্য হয়, এ আমি খেয়াল করে দেখেছি। না পড়ার সময় মনে হয় সি জি পি এ ধুয়ে জল তো খাওয়া যাবে না, এই যে রাত তিনটের সময় মাঠে বসে গাইছিও না, গানের সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ছি, এটাই মানুষ হওয়ার আসল শিক্ষা। প্রেম করার সময় প্রেমিকের সাজিয়ে কথা বলতে পারাটাকেই প্রেম করার পক্ষে যথেষ্ট বোধ হয়। এমনকি কর্ডলেস না কেনার পক্ষে উঠে গিয়ে ফোন না ধরার বাসনাকে চারিত্রিক দুর্বলতা এবং শিরদাঁড়ার অভাব বোধ হয়েছিল। 

সে সব মে জুন মাসে।

এখন ডিসেম্বরের শেষ এবং এখন ওই ঘরের প্রতিটি সারফেস মনে হয় বরফজলে চুবিয়ে তোলা হয়েছে। ফোনও এমন ঠাণ্ডা হয়ে থাকে যে কানে ঠেকিয়ে কথা বলা যায় না, দু’ইঞ্চি দূরে ধরে কথা বলতে হয়। সবেরই ভালোমন্দ আছে। চট করে ‘হ্যালো কেমন আছ, ভালো করে খাচ্ছটাচ্ছ তো’ বলেই ‘আচ্ছা রাখছি’ বলে ক্ষান্ত দিতে হয়। গুছিয়ে বসে পরনিন্দা পরচর্চা করার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। বাধ্য হয়ে ভারচুয়াস জীবনযাপন। 

কিন্তু ভারচুয়াস হব বললেই তো হওয়া যায় না। শুধু তো মা বাবা তিন্নি নয়, আরও নানারকম ফোন আসে। জরুরি ফোন। জলওয়ালা ফোন করেন, মুদির দোকানের ডেলিভারি নিচে এসে ওই নম্বরেই ফোন করেন, পিৎজাওয়ালারাও করেন। আজকাল যাই অর্ডার করি না কেন, স্পেশাল ইন্সট্রাকশনে লিখে দিই যে আমাদের ল্যান্ডলাইনে ফোন করতে হবে। ঠাণ্ডায় ফোন ধরতে পারছি না বলে ডমিনোজের ব্যবসা বন্ধ হতে দেওয়া যায় না। স্থির করলাম এই ছুটিতেই কর্ডলেসের ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। আমি আর অর্চিষ্মান দুজনেই চব্বিশে ডিসেম্বর, সোমবার ছুটি নিয়েছিলাম, কাজেই বড়দিনের ছুটিটা বেশ লম্বা হয়েছিল। কোথাও যে বেড়াতে যাব না তাও স্থির ছিল। ঘরে বসে একেবারে গব্য বিশ্রাম। তবে ভেবেছিলাম আমরা কর্মিষ্ঠ লোক, একটানা চারদিন কি আর শুয়ে থাকতে ভালো লাগবে? ফাঁকে ফাঁকে কিছু কাজ করে ফেলব, যেমন নেহেরু প্লেসে ঘুরে ঘুরে কর্ডলেস কেনা, ভাঙা ল্যাপটপগুলো ই-ওয়েস্টের লোকেশনে পৌঁছে দিয়ে আসা ইত্যাদি। ছুটি দু’দিন ফুরোতে টের পেলাম স্নানখাওয়া ইত্যাদি নিত্যকর্মপদ্ধতি ছাড়া আমরা বাকিটা সময় খাটে লেপের তলায় অনুভূমিক অবস্থান থেকে নড়িনি, ফোন কিনতে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। অনলাইন অর্ডার করলাম। অর্চিষ্মান বুদ্ধি খাটিয়ে আমাজন প্রাইম নিয়ে রেখেছে, পরদিনই এসে গেল। 

সেট আপ করে, লেপের তলায় পা ঢুকিয়ে, একটুকরো ফ্রুটকেক আর এককাপ ইংলিশ ব্রেকফাস্ট নিয়ে হিটারটাকে কানের সামনে নিয়ে এসে বসে, মায়ের নম্বর টিপলাম। মা তুললেন। হাঁটুর ব্যথার খবর নিয়ে, চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, তারপর? গসিপটসিপ কিছু আছে নাকি? মা জানালেন, আছে, কিন্তু দু’হাজার উনিশে তাঁর রেজলিউশন হচ্ছে সমস্ত রকম ক্ষুদ্রতামুক্ত হয়ে উন্নত জীবনযাপন করা। কাজেই গসিপ থাকলেও তিনি সে নিয়ে চর্চায় আগ্রহী নন। বরং রেজলিউশন রক্ষার্থে লাইব্রেরি থেকে যে জ্ঞানযোগের বইখানা তুলে এনেছেন, আমার যদি আর কোনও কাজের কথা না থাকে তাহলে তিনি সে বইয়ে মনোনিবেশ করবেন। এই না বলে ফোন কেটে দিলেন। অর্চিষ্মান হিটার জড়িয়ে ফ্যাচফ্যাচ হাসতে লাগল।



December 23, 2018

আমার শীত, আমাদের শীত




লোকে বলে প্রথম প্রেমের নাকি সবই স্পেশাল হয়, তাকে নাকি অন্য কোনও প্রেম দিয়ে রিপ্লেস করা যায় না,  তার প্রতি দুর্বলতা নাকি চিরকাল থেকে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার সে রকম কিছু মনে হয় না। প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় সব প্রেমই স্পেশাল, সবেরই কিছু না কিছু চিরকাল মনে থাকে। অবশ্য স্মৃতিতে ভালো নাকি মন্দের অংশটুকু বেশি হবে তা নির্ভর করে কে কাকে ছেড়েছে তার ওপর। যাই হোক, প্রেম সম্পর্কে থিওরি দেওয়ার জন্য এই পোস্টের অবতারণা নয়, বরং আমার প্রথম প্রেমিকের দেওয়া একটা থিওরির প্রাসঙ্গিকতা বিষয়েই পোস্ট। 

আমার প্রথম প্রেমিক ভালো ছাত্র ছিলেন। স্বাধীনচেতাও ছিলেন। তাঁর আর একটা ভালো ব্যাপার ছিল কাঁধ ছাপানো পনিটেল, কিন্তু সেটা এই পোস্টে প্রাসঙ্গিক নয়। প্রথম দুটো গুণ অবলম্বন করে তিনি ছোট বয়স থেকে (বা যে বয়সে বাঙালি ছেলেদের ছোট মনে করা হয়) তাঁর থেকে ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। টাকার বিনিময়ে। সোজা কথায় টিউশানি। আমার সেই প্রথম প্রেমিক আমাকে বলেছিলেন যে টিউশানি করতে করতে একটা অতি অদ্ভুত জিনিস তিনি লক্ষ করেছেন। 

‘না না, হাসিস না, এটা আমি সিরিয়াসলি খেয়াল করেছি। প্রতি বছর ছাত্ররা আগের বছরের থেকে বেশি গাধা হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ভাব একেকটা জেনারেশনে ছাত্রদের কোয়ালিটি কত ফল করে। আমার এক স্যার যে বলতেন তাঁদের আমলে ছাত্ররা আমাদের থেকে পঁচিশগুণ বেশি বুদ্ধিমান ছিল, কথাটা ভুল নয় তাহলে।’

নিজেদের আমলের অনেক কিছু নিয়েই লোকের নস্ট্যালজিয়া থাকে। ছাত্রদের বুদ্ধি তার একটা নমুনামাত্র। আমার বাবা, আমার ধারণা আরও অনেকের বাবা, নিজেদের জেনারেশনের নিয়মানুবর্তিতা এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে নস্ট্যালজিক। আমার মা দাবি করেন পাগলের কোয়ালিটি তো নিশ্চিতভাবে পড়েছে। আমার ছোটবেলায় এক পাগলের উৎপাত প্রত্যক্ষ করেছিলাম, আমাদের স্কুলের মেয়েদের যাতায়াতের পথে সে কিছু না পরে দাঁড়িয়ে থাকত। দিনসাতেক এই রকম চলার পর পাড়ার ছেলেরা তাকে উৎখাত করে। শুনে আমার মা মাথা নেড়ে বলেছিলেন তাঁদের স্কুল যাওয়ার পথে যে পাগল বসে থাকতেন তিনি ছাত্রীদের দেখলেই, ‘অ্যাই, ইশকুলে যে যাচ্ছ, অকারেন্স বানান কর দেখি?’ হেঁকে উঠতেন। ছোট মেয়েরা ভয় পেয়ে দৌড়লে মাথা নেড়ে বলতেন, ‘আমাদের আমলে কত ভালো ইংরিজি পড়ান হত। তোমরা কিস্যু শিখছ না।’

আমার ঠাকুমা বলতেন তাঁর সময়ের খাবারদাবার এখন আর নেই কারণ সবেতেই সার আর জীবাণুনাশক আর ভেজাল। সে স্বাদও নেই কারণ কাঠের আগুনও নেই। সেদিন একজন বললেন, বাংলা গদ্য আর পড়েন না, কারণ পড়ার মতো কিছু লেখা হচ্ছে না। উনি আমার আমলের কিংবা আমার থেকে বছর দুই পাঁচ পুরোন আমলেরই হবেন। তাতেই এই। আমার বাবা যে ‘দেশ’ পড়া ছেড়েছেন তা নিয়ে আর তাঁকে দুষলে চলবে না।

লোকে দাবি করে সুরে যারা গাইতে পারতেন আগেই গেয়ে চলে গেছেন। যারা তুলি ধরে সোজা টান দিতে পারতেন তাঁরাও হাওয়া। বাংলাভাষায় কথা বলার লোকও আর নেই। এই শেষের কথাটা অবশ্য আমি নিজে বিশ্বাস করি। আমিও বুড়ো হয়েছি তো। একসময় যাঁদের খুব খারাপ লাগত বলে দাবি করতাম, যেমন শিলাজিৎ, আজকাল তাঁদের প্রতি রীতিমত আত্মার টান অনুভব করি। কারণ তাঁরা আমার মাতৃভাষায় কথা বলেন। শিলাজিতের পরের প্রজন্মের সেলিব্রিটিরা আর সেই ভাষায় কথা বলেন না। তাঁরা সেই ভাষাটার একটা পরিবর্তিত রূপে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার দিতে বসে বলেন, ‘ফর রিল্যাক্সেশন, লাইক, ইউ নো, ডগিকে নিয়ে এভরি মর্নিং ওয়াকে যাই।’ তাঁদের ভাষায় আমি আমার ভাষার টুকরোটাকরা ঝিলিক দেখতে পাই কিন্তু রিল্যাক্স করে শুনতে পারি না। এদিকে সম্প্রতি টিভিতে শিলাজিৎ মনোজদের অদ্ভুত বাড়ির শুটিং-এর মজার গল্প করছিলেন, সম্পূর্ণ আমার আমলের বাংলা ভাষায়। আমি পুরোটা বুঝতে পারলাম আর আমার খুব হাসি পেল আর শিলাজিৎকে আরেকটু বেশি পছন্দ হল।

আমাদের আমলের বাংলা ভাষাটা সত্যিই আর নেই। তবে সে নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। ভাষা নদীর মতো, গত আটত্রিশ বছরে সে নদী অনেক বাঁক নিয়েছে, অনেক শাখানদী ছেড়েছে, অনেক উপনদী জুটিয়েছে, সে দিয়ে অনেক মড়া ভেসে গেছে, অনেক পরিশোধন প্রকল্পের মধ্য দিয়ে ভেসেছে এবং এসবের পর যে চেহারাটা নিয়েছে সেটার সঙ্গে আমার মাতৃভাষার, অন্তত কথ্য চেহারাটার, মিল অল্পই। 

আমাদের সময় ঘোরানো ডায়ালের ফোন ছিল এখন নেই, আমাদের সময় লোকে বিনয় কাকে বলে জানত এখন জানে না, এ সব ছাড়িয়ে অনেকে দাবি করেন জীবনের আস্ত আস্ত অংশই আজকাল হাওয়া হয়ে গেছে। ইন্টারনেটে ঘুরলে নাইনটিজ কিংবা এইটিজ দশকের প্রতিভূ হিসেবে নমিক্সটেপ, ক্যাসেট, কমপ্ল্যানের ঝাপসা বিজ্ঞাপনে শাহিদ কাপুর - আয়েষা টাকিয়ার ছবি সম্বলিত নানা লিস্ট বেরোয়। কাজ ফাঁকি মারার জন্য আমি এই সব পোস্টের কমেন্ট পড়ি মাঝে মাঝে। কমেন্টে এসে কেউ কেউ মাথা চাপড়ান নব্বইয়ের দশকের পর যারা বড় হয়েছে তারা কেউ শৈশব কাকে বলে জানবে না। কেউ কেউ আরও স্পেসিফিক হন। পঁচানব্বইয়ে যাঁদের পাঁচ বছর বয়স ছিল তারাই শেষ নিজেদের শৈশবকে শৈশব বলে দাবি করতে পারে, তার পর আর নয়। এইটিজ-এর লিস্টের নিচে এই একই দাবি। পঁচাশি সালে যাঁদের বয়স সাড়ে সাত ছিল তাঁরাই শেষ শৈশবের অধিকারী তার পর থেকে বাজারে যে সব শৈশব বেরিয়েছে সব ফেক। আমি এঁদের কাউকে আশাহত করতে চাই না কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে আপনার শৈশবে যদি দুই দুই চার মাইল হেঁটে স্কুলে যাওয়াআসা না থেকে থাকে কিংবা স্কুলের মাস্টারমশাইরা জুলপিতে ওপরদিকে টান না দিয়ে কিংবা দুই আঙুলের মধ্যে উডপেনসিল রেখে আঙুল মুচড়ে শাস্তি যদি না দিতেন তাহলে আপনাদের শৈশবটাও আদ্যন্ত ফেক। আমার ঠাকুরদা বলে গেছেন।

স্বাভাবিকভাবেই, বাকি সব হারিয়ে যাওয়া ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে লোকে যতটা উত্তেজিত হয় তার থেকে বেশি হয় শৈশব হারানো নিয়ে। এই থিমের একটা চমৎকার সিনেমা দেখলাম কিছুদিন আগে, নাম ‘হামি’। এঁরা চুরি যাওয়া শৈশব নিয়ে শুধু আফসোস না করে একজন চোরকেও খুঁজে বার করেছেন। সিসিটিভি। ‘হামি’ বানানেওয়ালাদের শৈশবে স্কুলটা স্কুলের মতো ছিল। জেলখানার মতো সেখানে করিডরে করিডরে সিসিটিভি ছিল না। আশ্চর্যজনকভাবে, পিডোফাইলও ছিল না। যেই না স্কুলে স্কুলে সিসিটিভি লাগান হয়েছে পিলপিল করে চতুর্দিক থেকে পিডোফাইল বেরোতে শুরু করেছে। এর পরেও লোকে দাবি করছে যে স্কুলে স্কুলে সিসিটিভি লাগানো হোক। ‘হামি’কর্তৃপক্ষ স্পিচলেস। 

আগেও অবান্তরে বলেছি বোধহয় যে অফিসের লিফটে কিংবা প্যান্ট্রিতে আমি আবহাওয়া এবং একমাত্র আবহাওয়া নিয়েই কথা বলতে স্বচ্ছন্দ। না হলে এ বছর কত ইনক্রিমেন্ট হয়েছে কিংবা সেম কাস্টে বিয়ে হয়েছে কি না এই সব বিষয়ের খপ্পরে পড়ার আশংকা থাকে। তাছাড়া ওয়েদার নিয়ে কথা বললে চট করে ঐকমত্যে পৌঁছনো যায়, সেটাও একটা প্লাস পয়েন্ট। গরমকালে সকলেরই গরম লাগে, বর্ষাকালে ছাতা না নিয়ে বেরোলে সকলেই ভিজে যায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে শীতকালে বিষয় হিসেবে ওয়েদার নিজের অ্যাডভান্টেজ আর রক্ষা করতে পারছে না। একজনকে সেদিন বললাম, ‘কী ঠাণ্ডা পড়েছে না?’ তিনি বললেন, ‘কই এই তো আমি হাফ সোয়েটার পরে ঘুরছি। আগের মাস পর্যন্ত ঠাণ্ডা জলে স্নান করতাম। ঠাণ্ডা পড়ত আমাদের সময়।’ 

কিছুদিন আগে আমার সামনে সামনে দু’জন সহকর্মী হাঁটছিলেন। একজন জীবনে প্রথমবার মুম্বইয়ের বাইরে পা এবং পড়বি তো পড় দিল্লির নভেম্বরে। স্বভাবতঃই তাঁর খুব ঠাণ্ডা লাগছে। যিনি তাঁর পাশে পাশে হাটছিলেন তিনি প্রথমজনের ঠাণ্ডা লাগাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বললেন, ‘আর ভাই, এ কী দেখছ, ঠাণ্ডা পড়েছিল টু থাউজ্যান্ড সেভেনটিনের জানুয়ারিতে। যে বছর আমি প্রথম দিল্লিতে এসেছিলাম।’ বাঁক ঘুরতে গিয়ে তাঁরা পেছনে ঘাপটি মেরে চলা আমাকে আবিষ্কার করে ফেললেন এবং সাক্ষী মানলেন। 'টু থাউজ্যান্ড সেভেনটিনের ডিসেম্বর দিল্লির লাস্ট লিজেন্ডারি উইন্টার কি না?’ হাতজোড় করলাম। এই সব ব্যাপারে আমার স্মৃতি অতি অকৃতজ্ঞ। আমাকে ছেড়ে দেওয়া হোক। কারওরই পক্ষ অবলম্বন করা হল না। আশা করলাম শীতসংক্রান্ত সমর্থন না পেয়ে কেউই চটবেন না।

কাগজে লিখেছে কত বছরের মধ্যে যেন পরশু দিল্লিতে কোল্ডেস্ট ডে ছিল। ভাবলাম আজ নিশ্চয় সকলেরই ঠাণ্ডা লাগবে। ভেবে প্যান্ট্রিতে দাঁড়িয়ে কফিতে চিনি গুলতে গুলতে বললাম, ‘আজ কী ঠাণ্ডা, তাই না?’ অমনি একজন বয়স্ক সহকর্মী বললেন, ‘এই একদিনের ঠাণ্ডায় কেয়া হোগা? বচপন মে তো রামলীলা দেখতে পাঠানোর সময়ও মা সোয়েটার না পরিয়ে ছাড়তেন না। কী সব শীতকাল ছিল আহা।’ আমি তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চুক চুক করলাম বটে কিন্তু আমার আরেকটা কথাও মনে পড়ে গেল। আমার মাও আমাকে কালীপুজোর পর থেকে বউটুপি না পরিয়ে রাস্তায় বের করতেন না। নিজে যদিও হাফসোয়েটারও পরতেন না। নভেম্বর মাসে আমার গায়ে লেপ চাপা দিতেন এবং নিজে কাঁথা গায়ে দিয়ে ফুরফুরে হয়ে ঘুমোতেন। হতে পারে আমার সহকর্মীদের শৈশবে সত্যিই শীত বেশি পড়ত। কিন্তু ছেলেমেয়েদের কখন সোয়েটার টুপি পরাতে হবে সেই সম্পর্কে তাঁদের আমলের মায়েদর সিদ্ধান্তের বিশ্বাসযোগ্যতা যতখানি কম ছিল, আমাদের আমলেও ততখানিই কম ছিল। ওই একটা জিনিসের এই আমলেও বিশেষ উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না। আমার মা যেমন এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর যুগেও দাবি করেন এ বছরের মতো শীত আর আগে কখনও পড়েনি আর সেই জন্যই আগের বছরগুলোতে না পরলেও এ বছর আমার অবশ্য করে বউটুপি পরা শুরু করা উচিত।


December 20, 2018

বর্ষশেষের পোস্ট



দু’হাজার আঠেরো অবশেষে বিদায় হচ্ছে। তাড়াতাড়ি হচ্ছে না। হিন্দিতে একটা চমৎকার শব্দ আছে ধোবিপিছাড়, গত বারো মাস, বাহান্নটা সপ্তাহ ধরে আমাকে সেই করে, তবে হচ্ছে। আত্মীয়বিয়োগ জাতীয় বড় বড় খারাপ ঘটনা তো ঘটেছেই, বেড়াতে যাওয়া কম হয়েছে, বই পড়া কম হয়েছে, বাইরে খাওয়া সিনেমা দেখা কম হয়েছে, বেশি হয়েছে খালি অফিসের কাজ।

দু’হাজার আঠেরো একটি অতি জঘন্য বছর। দু’হাজার উনিশ যেন এরকম না হয় ভগবান। 

দু’হাজার আঠেরোর রেজলিউশন রিভিউ করছি না আর, কারণ এই নয় যে রেজলিউশন রক্ষা হয়নি। আমার ডায়রির প্রথম পাতায় যে রেজলিউশনগুলো (গোটা বাইশ) লিখেছিলাম আশ্চর্যজনকভাবে তার বেশিরভাগই (দুই-তৃতীয়াংশ মতো) রক্ষা হয়েছে। রিভিউ করছি না কারণ সে রেজলিউশনগুলোর অধিকাংশই ব্যক্তিগত অর্থাৎ সেগুলোর কথা অবান্তরে আগের বছর লিখিনি কাজেই সেগুলোর পূর্ণ হওয়া না হওয়ার ফিরিস্তি অবান্তরে দেওয়ার মানে হয় না। তাছাড়া বছরের মাঝখানে কিছু রেজলিউশন জড়ো হয়েছিল, সেগুলো সামলাতে গিয়ে হিসেব গোলমাল হয়েছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস নাগাদ প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার জোগাড় হয়েছিল যে কোনও কূলই রক্ষা হবে না। কপালজোরে বেশিরভাগই রক্ষা হয়েছে।

দু’হাজার আঠেরোতে বই পড়েছি আপাতত চুয়াল্লিশ। পঞ্চাশ হল না। হবেও না। পঁয়তাল্লিশ হলেও হতে পারে। মর্নিং শোজ দ্য ডে কথাটার অসারত্ব আবারও প্রমাণ হল। জানুয়ারি ফেব্রুয়ারিতে নানাবিধ বইমেলার দৌলতে গোটা কুড়ি বাংলা বই শেষ করে সেই যে ঢিলে দিলাম, টুকটাক ইতিউতি পড়তে পড়তে হঠাৎ সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ খেয়াল হল আমি ‘অন ট্র্যাক’ থেকে ‘বিহাইন্ড শেডিউল’ হয়ে পড়েছি। তখন পিক আপ নেওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু অন্যান্য কাজ, বিশেষ করে আমার বসও পিক আপ নিলেন। কাজেই পঞ্চাশের বুড়ি আমার এ বছর আর ছোঁয়া হল না। নভেম্বরে একবার শেষ চেষ্টা করেছিলাম, ওই এক মাসে ছ’টা না সাতটা বই পড়েছি, কিন্তু মরণকালে নাম করলে হরিও হাত বাড়ান না।  বই কম পড়ার আরও একটা কারণ, অজুহাত হিসেবে নয়, এমনিই বলছি কারণ কথাটা সত্যি, এ বছর আমি এমন কোনও বই পড়িনি যা আমাকে আরও বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে। ভালো বই, বই পড়ার ইচ্ছের আগুনে ধোঁয়া দেয়। এ বছর সে রকম কোনও বইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। আমার চেষ্টার অভাবে নয়। আমি আমার পড়ার গাড়ি গড়গড়িয়ে চালানোর জন্য বার বার আমার প্রিয় লেখকদের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। কোনও কোনও সময় সেটা ব্যাকফায়ার করেছে ( রবার্ট গ্যালব্রেথের লিথ্যাল হোয়াইট), কোনও কোনও সময় (অ্যান্থনি হরোউইটজের দ্য সেন্টেন্স ইজ ডেথ, আইমিয়ার ম্যাকব্রাইডের দ্য লেসার বোহেমিয়ানস) করেওনি। কিন্তু এমনও ঘটেনি যে তারা আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

দু’হাজার আঠেরোতে আমি টের পেয়েছি মিনিমাম শরীরচর্চা করা আর না করার তফাৎ আমার শরীর, আরও বেশি করে মন, এখন টের পায়। দু’হাজার আঠেরোতে নিয়মিত ভোরবেলা মাদুর পেতে কুকুর, মকর, ভুজঙ্গ আরও যা যা হওয়ার হয়েছি, দু’হাজার উনিশেও হব। দু’হাজার উনিশে বয়স আরও এক বছর বেড়ে যাবে কাজেই শরীরচর্চার গুরুত্ব বাড়বে বই কমবে না।

দু’হাজার আঠেরোতে আমি লিখেছি বেশি। আর লিখতে গিয়ে একটা জিনিস টের পেয়েছি। আরও দ্রুত লিখতে শিখতে হবে। আর প্রোজেক্ট শেষ করতে হবে। ডান ইজ বেটার দ্যান পারফেক্ট কথাটার মাহাত্ম্য আমি এ বছর যত বেশি করে বুঝেছি আগে বুঝিনি। একটা লেখার ফাইন্যাল চেহারা কখনওই লেখা শুরুর আগে মাথার মধ্যের সে লেখার চেহারাটার মতো হয় না। কাজেই সেটা গালে পুরে বসে থাকার থেকে শেষ করে বাজারে ছেড়ে দিয়ে নতুন লেখা ধরাই একমাত্র বুদ্ধির কাজ।

দু’হাজার আঠেরোতে আরও একটা জিনিসের মর্ম আমি বুঝেছি, তা হল ডেডলাইন। ডেডলাইন বিনা আমার জীবন অন্ধকার। সমস্যাটা হচ্ছে আমার এমন অনেক কাজ করতে ইচ্ছে করে, করা দরকার বলে মনে হয়, যেগুলোর জন্য কেউ আমাকে ডেডলাইন দেওয়ার নেই। নিজেকে নিজে ডেডলাইন দেওয়া যায়, কিন্তু সে সব ডেডলাইন রক্ষা না হলেও যে তত কিছু ক্ষতি হবে না এই জানাটা মগজে সদা জ্বাজ্বল্যমান থাকে। আর্থিক ক্ষতি হবে না। সময়ের ক্ষতিই বা এমন কী? আজ হল না, কাল হবে। এ মাসে হল না, নেক্সট মাসে হবে। এ বছর না হলে, সামনের বছর। একেবারে শেষের যে ‘ডেড’ লাইনটা এই সব দিন মাস বছরের শেষে অনড় অটল দাঁড়িয়ে আছে সেটার কথা মনেই থাকে না। দু’হাজার উনিশে সেটা মনে রাখার চেষ্টা করব। না মনে থাকলে বড় বড় লাল অক্ষরে 'ডেড' লিখে টেবিলের সামনে ঝুলিয়ে রাখব ঠিক করেছি।


December 15, 2018

মটর কা পানি, ন্রুসিংহ কা খাজা



বাবামায়ের প্রতি আমার কোনও অভিযোগ নেই। সন্তানকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার ওয়ান শট গেমে ওঁরা আশাতীতরকম ভালো পারফর্ম করেছেন, কিন্তু এবার পুরী গিয়ে একটা করার মতো অভিযোগ জন্মাল। আমাকে এতদিন এতবার পুরী নিয়ে গিয়েও ওঁরা আমাকে মটর কা পানি একবারও খাওয়ালেন না কেন।  


মটর কা পানি ব্যাপারটা শুনতে যতটা অদ্ভুত, দেখতেও ততটাই। স্টোভের ওপর একটা বড় চ্যাৎনা পাত্রে কতগুলো ফ্যাটফেটে মটর একগলা জলের মধ্যে ভাসছে। আপনি গিয়ে দাঁড়ালে একটা মগে ওই মটর খানিকটা, মটরের জল খানিকটা, কাঁচা লংকা, তেঁতুল জল বেশ করে ঘুঁটে, ছোট স্টিলের বাটিতে ঢেলে চামচ সহযোগে আপনাকে দেওয়া হবে। সে বাটির রক্তশূন্য চেহারা আগে কখনও না দেখে থাকলে আপনার দশটাকা এইভাবে খরচ করার সিদ্ধান্তটার প্রতি সন্দেহ জাগতে বাধ্য।

যতক্ষণ না আপনি চামচে করে ওই ফ্যাকাসে তরল তুলে চুমুক দিচ্ছেন। ধোঁয়া ওঠা গরম। চোখে জল এনে দেওয়া ঝাল। আর সে টকের কথা মনে করলে এই সি আর পার্কের বাড়িতে হিটারের গায়ে সেঁটে বসে জিভে জল এসে যাচ্ছে। ওই সর্বরোগশোকহর তরল যতক্ষণ আপনার গলা দিয়ে নামবে ততক্ষণ বসের মুখ মনে পড়বে না, গ্যারান্টি।

দুঃখের বিষয়, বাটিটা শেষ হয়ে যাবে। আশার থেকে দ্রুত। তখন আরও এক বাটি নিয়ে হাফ হাফ করে খাওয়া ছাড়া উপায় নেই। দু’নম্বর মার্কেটে যদি মটর কা পানি বসত আমি রোজ, উইদাউট ফেল, খেয়ে বাড়ি ঢুকতাম। মটর কা পানির সঙ্গে আমি আমার ফেভারিট স্ট্রিট ফুডের তুলনা করতে চাই না, কিন্তু চেনা ঘুগনির থেকে এনি ডে বেটার। অর্চিষ্মানও এ মতে হাই ফাইভ। 

আমাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে খাচ্ছিলেন আরও অনেকে। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে একজনের চেহারাটাই সবথেকে বেশি মনে আছে। হাতখানেক হাইট। অর্চিষ্মানের মুখের দিকে তাকাতে গেলে মাথা নব্বই ডিগ্রি পেছনে হেলাতে হয়। সারা দেহ দস্তানা থেকে মোজা থেকে মাংকিটুপিতে এমন আঁটোসাঁটো মোড়া যে হাতপা নাড়ানোর অবস্থাতে নেই। খালি গোল মুখ, নাক আর কাজলটানা ড্যাবা ড্যাবা চোখ দৃশ্যমান। সেই অবস্থায় তিনি অল্প অল্প হাঁ করছেন আর গার্জেন নিজের খাওয়ার ফাঁকে চামচে করে মটরের জল ওই হাঁয়ের মধ্যে পুরে দিচ্ছেন। ওই মারাত্মক ঝাল, অম্লানবদনে গিলে আবার হাঁ। মনে মনে ‘জিতে রহো বাচ্চু’ আশীর্বাদ করে পরের গন্তব্যের দিকে গেলাম। 

গন্তব্য খাজাপট্টি। মন্দিরের গায়েই গলি। পুরীর সমুদ্রের পরেই যে জিনিসটা এতদিন (এতদিন কারণ এতদিন আমি মটর কা পানি খাইনি) আমার পছন্দের ছিল তা হচ্ছে খাজা। আমি নিজে কখনও খাজা কিনেছি বলে মনে পড়ছে না। বাবামায়ের সঙ্গে যদি বা কেনার সাক্ষী থেকে থাকি সে অনেক ছোটবেলায়, কোথা থেকে কেনা হয়েছিল মনে নেই, কাকাতুয়া টাকাতুয়া হবে। এ বাদ দিলে জীবনে খাওয়া বেশির ভাগ খাজাই আমাকে জোগাড় করতে হয়নি, আত্মীয়স্বজন পাড়াপ্রতিবেশী কেউ না কেউ পুরী যেতেই থাকেন, বাড়ি বসে খাজার সাপ্লাই পেয়ে গেছি।

এবার নিজেদের উদ্যোগ নিয়ে খাজা কিনে খেতে হবে। অফিসের রিসার্চে মন বসে না কিন্তু পৃথিবীর বাকি সব কিছু নিয়েই রিসার্চ করি। খাজা নিয়েও করেছি। রিসার্চে বেরিয়েছে জগন্নাথ মন্দিরের সন্নিকটস্থ খাজাপট্টির অভ্যন্তরস্থ ন্রুসিংহ সুইটসের খাজাই পুরীর অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ খাজা।

লখনৌয়ের দস্তরখোয়ানই হোক কিংবা ভোপালের গলির বিরিয়ানির দোকান, যে কোনও আইকনিক দোকানে খেতে গেলেই ডুপ্লিকেটের অসুবিধে ফেস করেছি। একই নামে ঘাড়ের কাছে নয়তো রাস্তার উল্টোদিকে আরেকটা দোকান। চোখে দেখে কোনটা আসল বোঝার উপায় নেই। পুরীর ন্রুসিংহ সুইটসও তার অন্যথা নয়। গলির মুখ থেকেই নৃসিংহ, নরসিংহ, আসল ন্রুসিংহতে খাজাপট্টি ছয়লাপ। কিন্তু অরিজিন্যাল ন্রুসিংহ সুইটস বার করতে কোনও অসুবিধে হবে না। কারণ পৃথিবীর যত খাজা খদ্দের একটাই দোকানে ভনভন করছে। 


ন্রুসিংহ সুইটসে খাজা কিনতে গেলে আপনাকে একটা নিয়ম মনে রাখতে হবে। সময় এবং ধৈর্য অনন্ত নিয়ে যেতে হবে। ওর পর কোনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখলে চলবে না। আমরা এ নিয়ম জানতাম না, কপালগুণে মঙ্গলাজোড়ি থেকে ফেরার পথে গেছি, খাজা কিনে হোটেলে চলে যাব। আর কোনও কমিটমেন্ট নেই। দোকানের সামনে অন্তত পাঁচ সারি লোক, মাথার ওপর নোট ধরা হাত তুলে চেঁচাচ্ছেন। কেউ লাইন ভেঙে ঢুকছেন। কেউ কেউ তৃতীয় সারি থেকে ক্রমাগত নিজের অর্ডার তোতাপাখির মতো চেঁচিয়ে চলেছেন, আশু খাজাপ্রাপ্তির কোনও সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও। এর মধ্যে কেউ কেউ পেছনে দাঁড়িয়ে হাতের তেলোখানা আমার পিঠে মেলে রেখেছেন পাছে আমি শুকনো ডাঙায় ব্যালেন্স হারিয়ে ওঁর ওপর পড়ে যাই। উনিই লাস্ট সারি, এমন নয় যে ওঁকে কেউ পেছন থেকে ঠেলছে এবং উনি টাল সামলানোর জন্য আমাকে ধরে আছেন। জাস্ট আরেকটা বডি সামনে আছে তাই উনি সেটা ছুঁয়ে আছেন।  

শারীরিক স্পর্শ বিষয়ে আমাদের দেশের লোকদের এই অসীম উদাসীনতা আমাকে বিস্মিত করে। যে কোনও লাইনে দাঁড়িয়ে দেখবেন, পেছনের জন আপনার গায়ে সেঁটে দাঁড়াবেন। তাঁকে এড়ানোর জন্য এক ইঞ্চি এগিয়ে যান, পত্রপাঠ এগিয়ে এসে আবার গায়ে সেঁটে যাবেন। খালি জায়গা নষ্ট করার বদভ্যেস ভারতীয়দের নেই। অপেক্ষা করলাম, মহিলা হয়তো খেয়াল করছেন না, খেয়াল করলে হাত সরিয়ে নেবেন। পাঁচ মিনিট পর ফিরে বলতে হল, হাতটা নামান দয়া করে। এই সব করে আমি অবশেষে ক্রমে চতুর্থ, তৃতীয় লাইনে এলাম আর বুঝলাম ভিড়টার আসল কারণ কী। খদ্দেরের ভিড় নয়। খদ্দের তো আছেই। অসংখ্য। কিন্তু তাঁরা খাজা কিনে সরে এলে এই ভিড়টা হয় না। হতে পারে না। 

দেরিটা হচ্ছে টেস্ট করতে গিয়ে। আধঘণ্টা চেঁচিয়ে গলা ভেঙে, ঠেলেঠুলে অবশেষে লাইনের সামনে এসেছেন। হতেই পারে না, টেস্ট করে খাজা খারাপ লাগলে না কিনে ফিরে যাবেন। তবু টেস্ট করার জন্য আকুতি। কেউ কেউ আবার টেস্ট করার কথা ভুলে গিয়েছিলেন। পাঁচ কেজি খাজা প্যাক করিয়ে পেছন ফিরেই মনে পড়ে গেছে, ফ্রিতে আধখানা খাজা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।  সঙ্গে সঙ্গে টার্ন অ্যারাউন্ড। ভাইয়াআআআ থোড়া টেস্ট করা দোওও। ভয়ানক ব্যস্ত কর্মচারীরা যতক্ষণ না সে আকুতিতে সাড়া দিয়ে খচাৎ করে একখানা খাজা ভেঙে ওঁর দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন ততক্ষণ এ হাতে পাঁচকেজি খাজার প্যাকেট নিয়ে ও হাত বাড়িয়ে থাকবেন। চমকের আরও বাকি ছিল। কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন পেছন থেকে একটি শীর্ণ হাত এগিয়ে এসে বলল,  ভাই একটা খাজা দাও না, টেস্ট করব। আমি ভাবছি উনি কি আশা করছেন আমি সামনের ঝুড়িতে রাখা খাজা তুলে ওঁকে পাস করব? কারণ আমি সেটা করব না। তারপর বুঝলাম উনি গোটা খাজা এমনকি আধখানা খাজাও চাইছেন না, উনি চাইছেন দাঁড়িপাল্লার কোণে যে গুঁড়ো খাজা পড়ে আছে সেগুলো। সিরিয়াসলি চাইছেন। আমি একটা চাকলা মতো তুলে দিলাম।হাত আবার এগিয়ে এল, আরেকটু দাও ভাই, ওঁকেও একটু টেস্ট করাব। এবার আর চাকলাও ছিল না। বললেন, গুঁড়োই দাও, ওতেই চলবে। 

দেখেশুনে আমার সন্দেহ হচ্ছে ন্রুসিংহ সুইটসের খাজাতে, বিশেষ করে টেস্ট করা খাজাতে কোনও দৈবীশক্তি থাকলেও থাকতে পারে। আমরা টেস্ট করিনি তাই বলতে পারব না। তবে কিনে আনা খাজাগুলো, সত্যিই এতদিন যে নন-ন্রুসিংহ খাজা খেয়েছি তাদের থেকে অনেক ভালো। অল্প মিষ্টি, কুড়কুড়ে, রসালো। মচৎকার।

ওই গলিতে মালাই কা পুরি (বেসিক্যালি মোষের দুধের ঘন সর চিনি ছড়িয়ে ভাঁজ করে কলাপাতায় পরিবেশিত) নামের একটি চমৎকার জিনিস পাওয়া যায়, কিন্তু আমরা যেতে যেতে সেটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। শুধু সর কাপে করে বিক্রি হচ্ছিল, কিন্তু আমরা খেলাম না। এ ছাড়াও ছেনা জিল্লি (ছানার জিলিপি তবে ছোট সাইজের আর প্যাঁচটা অনেক টাইট), চমচম, সিংহের মাথার মতো রসগোল্লা জাতীয় সুখাদ্যে ভর্তি। আমরা গলি পরিদর্শন করে এলাম কিন্তু খেলাম না কিছুই। মটর কা পানি খেয়ে মুখটা বেশ ঝালটক হয়ে ছিল সেটা মিষ্টি দিয়ে মাটি করতে মন চাইল না। তাছাড়া সেদিনই বি এন আর এ শেষ রাত, আর রেলওয়ে হোটেলের রান্না সত্যিই ভালো, হোটেলেই খাওয়া যাবে’খন।

পুরীতে আর খালি একটা সকাল বাকি। আরও কয়েকটা দ্রষ্টব্য বাকি রয়ে গিয়েছিল, দেখতে হলে হয় সেগুলো দেখতে হয় নয় সমুদ্রের সঙ্গে শেষ দেখা সারা যায়। আমরা কোনটা বাছলাম তাতে কোনও সারপ্রাইজ নেই। বি এন আর -এ কলকাতা থেকে আসা ট্রেনের সময়ের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সকাল আটটায় চেক আউট। ব্রেকফাস্ট করে ব্যাগ ক্লোক রুমে রেখে চললাম সমুদ্রের দিকে। প্রথমে ভেবেছিলাম আধঘণ্টা মতো থাকব। সেদিন পা ভেজানোর লোভটুকুও করা যাবে না, কারণ ওই জামায় আমাকে বাড়ি পর্যন্ত আসতে হবে আর অর্চিষ্মানকে উঠতে হবে ভুবনেশ্বরের গেস্টহাউসে। কাজেই আধঘণ্টার বেশি থেকে করবই বা কী। কিন্তু তারপর রবিবারের সকালের স্নানার্থীতে তট ভরে উঠল আর আমরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারলাম। নিজেরা স্নান করার থেকে কোনও অংশে কম রোমহর্ষক নয় অন্যদের স্নান করতে দেখা। আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে এক নুলিয়া ভদ্রলোকের ছাউনির নিচে চেয়ার প্রতি বিশটাকা ভাড়া দিয়ে আরও আধঘণ্টা বসলাম। একজন ভারায় মিষ্টির ডেকচি নিয়ে যাচ্ছিলেন, শালপাতায় করে চমচম খাওয়া হল। ছবি তুলব ভেবেছিলাম কিন্তু এতই ভালো খেতে যে খাওয়ার আগে ফোন তাক করতে করতেই চমচম ফিনিশ।




*****

এবারের বেড়ানোর শেষটা একটু বেশি দুঃখের। আমার জন্য দুঃখের কারণ আমাকে একা একা বাড়ি ফিরতে হবে আর অর্চিষ্মানের জন্য দুঃখের কারণ ওকে এখন আরও দুদিন কনফারেন্সে হেসে হেসে কথা বলতে হবে। কাজেই আমাদের ইচ্ছে ছিল ভুবনেশ্বরে ফিরেও আরেকটু সময় একসঙ্গে কাটানো। মন্দিরটন্দির দেখার সময় থাকবে না, তবে অন্য একটা কাজ তো থাকেই। যে কাজটা কখনও ফুরোয় না। সকালে খেলেও দুপুরে খেতে হয়ে। দুপুরে খেলেও রাতে না খেলে চলে না।

হোয়্যার টু  ইট ইন ভুবনেশ্বর সার্চ দিতে অনেক জায়গার নাম বেরিয়েছিল তারপর যাওয়ার পথে প্লেনে অর্চিষ্মানের সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল যাঁর বাড়ি ভুবনেশ্বরে। আমরা তাঁকে যেই না  জিজ্ঞাসা করেছি, আচ্ছা কোথায় খাওয়া যায় বলুন তো, উনি বললেন, এটার উত্তর আমি জানি, আমার বাড়িতে। ভারি সজ্জন লোক, আমাদের অনেক করে বলছিলেন, কিন্তু আমরা ‘না না এবার সময় নেই পরের বার প্রমিস’ অনুনয়বিনয় করাতে বললেন, ওডিশা হোটেল। 

নামজাদা খাওয়ার জায়গার লিস্টে সবেতেই এই নামটা আগে আমরা দেখেছি। ওডিশা হোটেলের দুটো দোকান, মেনটা চন্দ্রশেখরপুরের ইনফো সিটিতে, শাখাটি শহীদ নগরে । প্রথম রাতে এসে ভুবনেশ্বরের যে হোটেলে উঠেছিলাম সেটাও শহীদ নগরেই। হোটেলে ঢুকেছিলাম রাত দশটা পাঁচে আর দোকান খোলা ছিল সাড়ে দশটা পর্যন্ত। গুগল ম্যাপ দেখাচ্ছিল ছশো মিটারের রাস্তা। অন্ধকারে না দৌড়ে যতখানি জোরে হাঁটা যায় হেঁটে চললাম দোকানের দিকে। তখন স্বাভাবিক ভাবেই কোনও খাইয়ে নেই। বৃহস্পতিবার আবার ওই শাখাটিতে কেবল নিরামিষ পাওয়া যায়। আমরা রুটি তরকারি, ভেজ থালি ইত্যাদি নিয়েছিলাম। আমার আবার সবেতে পাকামো। মেনুতে যে নামটা চেনা যাচ্ছে না, নিজেকে অ্যাডভেঞ্চারাস প্রমাণ করতে সেইটিই অর্ডার করা চাই। একটা পদ সে ক্রাইটেরিয়া পূর্ণ করেছে মনে হল আর অমনি আমি বলে বসলাম চুঁই বেসর খাব। কোঁকড়াচুলো ছেলেটি হেসে ঘাড় নেড়ে চলে গেল। আমার কেমন সন্দেহ হওয়াতে গুগল করে দেখি হে ভগবান আমি সজনে ডাঁটার ঝোল অর্ডার করেছি। হাঁকডাক করে অর্ডার বদলালাম, বললাম অ্যাডভেঞ্চার মাথায় থাকুক, আপনি রাই (সর্ষে) মাশরুমই আনুন ভাই।


অর্চিষ্মান আবার কোথায় পড়েছে যে ওডিশা হোটেলে ভুবনেশ্বরের বেস্ট মাটন ঝোল পাওয়া যায়। কাজেই আমরা ফেরার দিনও ওডিশা হোটেলেই লাঞ্চ খাব স্থির করলাম। এবার আর ব্রাঞ্চে নয়, চন্দ্রশেখরপুরের ইনফোসিটির মেন দোকানে। আমার জন্য আলুকপির ঝোল, ডাল আর অর্চিষ্মানের জন্য পাঁঠার মাংস, ভাত নেওয়া হল। আলুকপির ঝোল যত ভালো সম্ভব ওঁরা তত ভালোই রান্না করেছিলেন। পাঁঠার ঝোল সম্পর্কে অর্চিষ্মানও একই মতামত দিল। কিন্তু যে জিনিসটা খেয়ে আমরা দুজনেই উচ্ছ্বসিত হলাম সেটা হচ্ছে মিক্সড ভাজা। কুমড়োফুল ভাজা, উচ্ছে ভাজা, শাক ভাজা, বরবটি ভাজা - সে একেবারে চমৎকার ব্যাপার। এক প্লেট খেয়ে আরেক প্লেট অর্ডার করা হল। ডেজার্টে গুলাবজামুন আর ক্ষীর নিলাম। ক্ষীরখানা একেবারে ফাসক্লাস। 



ওডিশা হোটেলের সবই ভালো, খালি ধাঁই কিরি কিরিটা একটু বেশির দিকে। মানে ক্ষীর আর বিল একই সঙ্গে এসে যাচ্ছে টাইপের। অথচ এমন নয় যে আমাদের টেবিলে বসবে বলে কেউ অপেক্ষা করছেন। আসলে ব্যস্ত দোকান বলেই বোধহয় ওটা অভ্যেস হয়ে গেছে, যখন ব্যস্ততার দরকার নেই তখনও সিস্টেম বিদ্যুৎবেগে কাজ করে।

একসঙ্গে থাকাটা আরও একটুখানি টেনে লম্বা করার জন্য গুগলম্যাপে নিকটবর্তী কফির দোকান সার্চ করে বারিসতা বেরোল, সেখানে গিয়ে ক্যাপুচিনো আর হানি জিঞ্জার টি নিয়ে আধঘণ্টা বসলাম। আর সত্যিই সময় নেই। ওলা ডেকে এয়ারপোর্ট। কাঁচের দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা অর্চিষ্মানকে টাটা করে ইন্ডিগোর কাউন্টারের দিকে হাঁটা লাগালাম আর আমাদের বেড়ানো সত্যি সত্যি ফুরিয়ে গেল।



December 12, 2018

সমুদ্রস্নানের সাত রকম




১। এঁরা সবার আগে বিচে আসবেন। সুইমসুট, সানগ্লাস, তোয়ালে, শতরঞ্জি, ছাতা, জুতো পাহারা দেওয়ার লোক -  সমুদ্রস্নানের সমস্ত প্রয়োজনীয় গিয়ার ঘাড়েবগলে করে। এর পর শতরঞ্জি পেতে ছাতা মেলে কিংবা নুলিয়াদের ছাউনি ভাড়া করে আরাম করবেন কিংবা স্রেফ সানগ্লাস আর শতরঞ্জির ভরসায় ডেয়ারডেভিল নেমে পড়বেন ট্যানের সাধনায়। কেউ মালিশওয়ালা ডেকে মাল্টিটাস্কিং-এ নিমগ্ন হবেন। এঁদের সন্তানসন্ততিরা প্যাস্টেল রঙের ছোট্ট বালতি বেলচা নিয়ে বালিতে শিল্পকর্ম ফাঁদবে। এঁদের আশপাশ দিয়ে কোটি কোটি লোক সমুদ্রে নেমে, স্নান করে, উঠে বাড়ি চলে যাবে। এঁদের জলে নামার ওয়ার্ম আপ ফুরোবে না। আদৌ জলে নামা হবে কি? আমি জানি না। আমি যতক্ষণ আশেপাশে থেকেছি নামতে দেখিনি কোনওবার, আমি চলে আসার পরে নেমে থাকলে আমার জানার কথা নয়।

আমার সন্দেহ হচ্ছে ইনি ওয়ার্ম আপ ক্যাটেগরিতেই পড়বেন, নিশ্চিত হতে পারছি না বলে আলাদা লিখছি। এঁকে প্রথম দেখা যাবে ডান কিংবা বাঁ দিকে, বহুদূরে, একটি কালো বিন্দু হিসেবে। বাড়তে বাড়তে সেটি অবশেষে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের আকার ধারণ করবে। দৃষ্টি নিচু বা সামনে, সমুদ্রের দিকে কদাচ নয়। কাঁধের তোয়ালে তাঁর স্নানের ইচ্ছের সাক্ষ্য দিচ্ছে, কিন্তু যে রকম ফোকাস এবং গতির সঙ্গে হাঁটছেন, চট করে থামবেন বা জলে নামবেন মনে হচ্ছে না। ক্রমে তিনি আপনাকে পার হয়ে করে দূরে চলে যেতে যেতে আবার বিন্দু হয়ে যাবেন। কোথা থেকে আসছেন? শংকরপুর হতে পারে, কোথায় যাচ্ছেন? কন্যাকুমারিকা হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। 

২। ওয়ার্ম আপ দলের একশো আশি ডিগ্রিতে আছেন ইনি। পায়ের তলায় বালি শুরু হওয়া মাত্র দুই হাত মাথার ওপর তুলে দৌড়তে শুরু করবেন, সমুদ্রে ঝাঁপানোর আগে পর্যন্ত থামবেন না। এঁর উল্লাসজনিত চিৎকার এঁর সমুদ্রস্নানের আনন্দ সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ রাখবে না। কিন্তু ইনি স্বার্থপরের মতো একা আনন্দ করতে চান না। সঙ্গীরা, যাঁরা নিজের মতো করে স্নান করছেন বা করছেন না, তাঁদের নিজের আনন্দের ভাগ দেওয়ার জন্য ইনি উৎকণ্ঠিত। কোনও সঙ্গী সমুদ্রস্নানে অনুৎসাহী হলে  এঁর অন্নপ্রাশনের ভাত হজম হবে না। জলকেলি ছেড়ে উঠে এসে সঙ্গীর হাত ধরে টানতে শুরু করবেন। সঙ্গী বিপদ বুঝে ত্রাহি চেঁচাবেন। চিৎকারে এফেক্ট উল্টো হবে, এঁর পরোপকারের স্পৃহা লকলকিয়ে উঠবে, সঙ্গীকে জলে চুবনোর প্রতিজ্ঞা দৃঢ় হবে। বালির ওপর দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে তিনি সঙ্গীকে সমুদ্রের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকবেন। কনটেক্সট ছাড়া দৃশ্যে ঢুকে পড়লে পুলিসকে ফোন করা কিংবা নিকটবর্তী চ্যালাকাঠ তুলে নিয়ে এঁর মাথায় বসিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে অস্বাভাবিক নয়। 

৩। ভিড়ে দাঁড়িয়ে বালিঘোলা ঢেউয়ের গুঁতোয় হাঁচোড়পাঁচোড় স্নানে ইনি নেই, গোলযোগ ছাড়িয়ে দূরে চলে যাবেন, তারপর ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে ভাসতে বাকিদের আনাড়িপনার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসবেন।

৪। এঁরা হারার আগেই হেরে বসে থাকবেন। ঢেউয়ের গুঁতোয় পড়ে গিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে করতেই পরের আরও বড় ঢেউটার আঘাতে পুনরায় পর্যুদস্ত হওয়াতেই যে সমুদ্রস্নানের আসল মজা, এই মতে এঁরা বিশ্বাসী নন। হারবই যখন ফাইট দিয়ে কী হবে ভেবে নিয়ে এঁরা বিচের ওপর হাত পা এলিয়ে বসে বা শুয়ে থাকবেন। ঢেউ সরে গেলেও উঠে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাবেন না। কী হবে উঠে, আবার তো শুইয়েই দিয়ে যাবে।

আমার ঠাকুমা এই ক্যাটেগরির স্নানার্থী ছিলেন। আমি একবার ঠাকুমার দেখাদিখি গড়াগড়ি স্টাইলে সমুদ্রস্নানের অ্যাটেম্পট নিয়েছিলাম। জঘন্য আইডিয়া। সারা গায়ে বালি কিচকিচ। বারদুয়েক গড়াগড়ি খেয়ে উঠে পড়ে নালিশ করাতে ঠাকুমা বলেছিলেন, এই সেম বালি মহাপ্রভু গায়ে মেখেছিলেন। কাজেই কিচকিচানি নন-ইস্যু। 

৫। এঁদের শুধু স্নান করলে হবে না, স্নানের মুহূর্তটিকে অমর করে রাখতে হবে। যারা অ্যাথলেটিক নন তাঁরা হাঁটু ভাঁজ করে জলে এক হাত ছুঁইয়ে, অন্য হাতে ভি দেখিয়ে ক্ষান্ত দেবেন। অ্যাথলেটিকরা নিজস্ব ক্ষমতা অনুসারে ঢেউয়ের মাথার ওপর দিয়ে লাফিয়ে, কাউকে ঘাড়ে নিয়ে/ কারও ঘাড়ে উঠে, কার্টহুইল করতে করতে সমুদ্রে নামার ছবি তোলাবেন।

সকলেরই ঠিক সেই মুহূর্তের ছবি চাই যে মুহূর্তে সফেন ঢেউ তাঁকে ঘিরে উচ্ছ্বল। সমস্যাটা হচ্ছে মুহূর্তটা আগে থেকে গেস করা অসম্ভব। কখনও ঢেউ মাধ্যমিকে সাতখানা লেটার বাগিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে টায়টায়, এদিকে ইনি শুকনো বালিতে ছাদের সমান লাফিয়ে আহাম্মক। আবার কখনও কখনও লাস্ট মোমেন্টে পিক আপ নিয়ে ঢেউ ভিক্টরি সাইন ডুবিয়ে তাঁকে চুবিয়ে চলে যাচ্ছে, সেই মুহূর্তে একগলা নোনাজল গেলা মুখ আর যাই হোক ফোটোজেনিক থাকছে না। একটাই বাঁচোয়া, ডিজিট্যাল জমানা, মেমোরি মেকিং মনোমত না হওয়া পর্যন্ত ক্লিক করে যাওয়া যাবে। ততক্ষণ সমুদ্রতট শোয়া, বসা, শূন্যে ত্রিভঙ্গ অবস্থা থেকে ‘এবার!’ ‘এবার!’ ‘এবার!’ কলরবে মুখরিত হয়ে থাকবে, এই যা।

৬। এঁরা পেটের-ভেতরটা-কেমন-করে-বলেই-তো-জায়েন্ট-হুইল-চড়ি, মুখ-চুলকোয়-বলেই-তো-বেগুন-খাই মোটো নিয়ে জীবনের মধ্য দিয়ে চলেন। মাথার দু’হাত ওপর থেকে ঢেউ যখন প্রচণ্ড বেগে নেমে আসছে গিলে খাবে বলে, মাথা ফাঁকা, চোখ বোজা, শ্বাস রুদ্ধ, ভেসে যাওয়ার অত কাছাকাছি আর আসা হবে না কখনও, ওই মুহূর্তের ওপারে কী আছে জানা নেই, সেই মুহূর্তটাই এঁদের মতে পুরীর বেস্ট মুহূর্ত। 

ইন ফ্যাক্ট, সেই মুহূর্তটাই পুরী। 

আর সেই মুহূর্তের মুখোমুখি হওয়ার একটাই স্ট্র্যাটেজি এঁদের জানা আছে। ঢেউয়ের উচ্চতা এবং শক্তি এবং নিজের নাস্তানাবুদ হওয়ার মাত্রা বুঝে ভিন্ন স্কেলে, ভিন্ন পিচে গলা ছাড়া। চেঁচানোটা এঁদের কোপিং মেকানিজম।

৭। এঁরা নাকেমুখে জল ঢুকতে ঢুকতেও, আছাড় খেতে খেতেও লোকলজ্জায় মরবেন। বলবেন, ওরে বাবা কুন্তলা অত চেঁচিয়ো না, ওই যে ওরা তাকাচ্ছে। 



December 06, 2018

রঘুরাজপুর আর মঙ্গলাজোড়ি




মঙ্গলাজোড়ি যাওয়া ফাইন্যাল অবশেষে হল শুক্রবার সন্ধেবেলা স্বর্গদ্বারে বসে লেবু চা খেতে খেতে। শনিবার কোথাও একটা যাব সেটা জানতাম কিন্তু যাওয়ার জায়গাটা নিয়ে সংশয় ছিল। কোনারক দুজনেরই দেখা, দুজনেরই নন্দনকাননে অনাগ্রহ। নাকতলার বাবা মঙ্গলাজোড়ির খবর দিয়েছিলেন। চিলিকা হ্রদের উত্তরপ্রান্তের ছোট্ট গ্রাম। সাইবেরিয়া মংগোলিয়া এই সব জায়গায় এখন ঠাণ্ডাটা একটু বেশি তাই পাখিরা উড়ে উড়ে এসে জড়ো হয় মংগলাজোড়ির বিরাট জলাজমি। নলঘাসের বনের অলিগলি বেয়ে মঙ্গলাজোড়ির মিষ্টি জল চিলকার নোনতা জলের সঙ্গে মিশেছে সে ভুলভুলাইয়া নেটিভ, পরিযায়ী মিলিয়ে এই ক'মাস, নভেম্বর থেকে মার্চ, প্রায় নাকি তিন লাখ পাখির আখড়া। গত কয়েকবছরে কিছু বদমেজাজি পায়রা ছাড়া আর বিশেষ কোনও রকম পাখির সঙ্গে ওঠাবসা নেই, আমি তাও অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে ফিঙেটিঙে চিনতে পারি, অর্চিষ্মানের কাক পায়রা শালিক চড়ুই পার হলে সব পাখিই ডাইনোসরের বংশধর। কাজেই মঙ্গলাজোড়ি যদি যাই একটা নতুন জায়গায় যাওয়া হবে ভেবেই যাব। পুরীতে সারাদিন থেকেই বা কী করব। 

যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা আছে। মঙ্গলাজোড়িতে বেস্ট পাখি দেখার সময় ভোর নয়তো সন্ধে। পুরী থেকে মংগলাজোড়ি গাড়িতে লাগে দু'ঘণ্টা কাজেই ভোর আউট অফ কোশ্চেন। সূর্যোদয় দেখব বলে দুদিন পিক আপ নিয়ে দুদিনই ফেল করছি, রাত দুটোয় পাখি দেখতে বেরোনর উদ্যম আমাদের থেকে আশা করা বৃথা। কাজেই বিকেলের স্লট টার্গেট করতে হবে। 

তাহলে সকালে কী করব?

রঘুরাজপুর যাওয়া যায়। পথেই পড়বে। সেখানে পট্টচিত্র শিল্পীদের গ্রাম আছে, তাঁদের স্টুডিও দেখে, শিল্পসৃষ্টির প্রক্রিয়া ফার্স্ট হ্যান্ড পর্যবেক্ষণ করে মংগলাজোড়ির রাস্তা ধরা যায়।

আমি একেবারেই উৎসাহী ছিলাম না। কারণ এই নয় যে পট্টচিত্র সম্পর্কে আমার উৎসাহ নেই। চোখের সামনে শিল্পীদের শিল্পসৃষ্টি করতে দেখার অভিজ্ঞতাটাও যে অন্যরকম তাও জানি। কিন্তু এও জানি যে ওই দেখাটা আসল ব্যাপার নয়। আসল ব্যাপার শুরু হবে ওসব ঝামেলা ফুরোলে। বেচা এবং কেনা। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে খবর আছে, কেনানোর ঝুলোঝুলি লিজেন্ডারি। আমি বেচাকেনার বিরুদ্ধে নই। শিল্প যে ফাইন্যালি প্রোডাক্ট ইত্যাদি নিয়েও আমার সন্দেহ নেই কিন্তু মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, আমার সত্যিই পট্টচিত্র কেনার ইচ্ছে নেই। কারণ এক, দরকার নেই, দুই, যেগুলো পছন্দ হবে সেগুলো কেনার সাধ্য আমাদের নেই, তিন, চক্ষুলজ্জার খাতিরে যেগুলো কিনে আনব সেগুলো পড়ে পড়ে ধুলো খাওয়া ছাড়া আর কোনও উপকারে লাগবে না। তার ওপর গোটা ব্যাপারটায় ফোড়ন হবে অপরাধবোধ। একজন শিল্পী এমন সুন্দর জিনিস নিজে হাতে বানিয়েছেন, সেগুলো ঝেড়েবেছে, না দাদা পোষাচ্ছে না বুঝলেন, বলে উঠে আসার পরিস্থিতিতে আমি নিজেকে ফেলতে চাই না। সাধ করে তো না-ই।

তবু  মঙ্গলজোড়ি  ফাইন্যাল হল যখন রঘুরাজপুর যাওয়াও ফাইন্যাল হল। চন্দনপুরের মোড় থেকে গাড়ি ঢুকল ডানদিকে। রাস্তা ঝপ করে সরু হয়ে গেল। মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পর পথ আবার দু’ফালি, ডানদিকে রঘুরাজপুর নামের নিচে তীরচিহ্ন। গাড়ি নাকবরাবর চলেছে। ব্যাপার কী? লক্ষণ বললেন, চিত্র দেখবেন তো, আমি যেখানে যাচ্ছি সেখানে চলুন, রঘুরাজপুরের থেকে ঢের ভালো করে দেখিয়ে দেবে সবকিছু। কী আর বলব। যেচে যন্ত্রে গলা দিয়েছি। নিয়ে চলুন যেখানে মন চায়।

গাড়ি একটা গলির মধ্যে ঢুকল। একটা সাদা রং করা ছোট বাড়ি থেকে একজন রোগা ভদ্রলোক এসে নমস্কার করে আমাদের নিয়ে গেলেন সিঁড়ি দিয়ে দোতলার ঘরে। খালি ঘরের মাঝখানে মাদুর পাতা, একদিকে বসার বেঞ্চ, বাকি ঘর জুড়ে ভাঁজ করা তালপাতা, গোল পাকানো কাগজ ভর্তি। ঘরের লাগোয়া রোদ আসা বারান্দায় বসে তিনজন মেয়ে ডেস্কের ওপর তালপাতা রেখে তার ওপর কারিকুরি করছিলেন,  পট্টচিত্রের কাজ শিখছেন। বারান্দার বাইরে একখানা মন্দির উঠেছে গা ঘেঁষে। 



এই হচ্ছে তালপাতা। নিম হলুদের জলে চুবিয়ে শুকোনো হয়েছে পোকাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। চিত্র তৈরির প্রথম ধাপ হচ্ছে একরকমের ছুঁচলো লোহার পেনসিলের আঁচড়ে পাতায় ডিজাইন আঁকা। নমুনা হিসেবে ভদ্রলোক একটা পাখি আঁকলেন। আঁকলেন মানে তিন চারটে টান দিলেন। আমাদের হাতে দিয়ে বললেন, ঝট করে কিছু মাথায় এল না, তাই খুব সাধারণ একটা পক্ষী আঁকলাম আরকি।  আমাকে তিন সেকেন্ডে একখানা পাখি আঁকতে দিলে যা কাণ্ড হত আর বললাম না। 


তারপর উনি একটা বোতল থেকে কাজলের কালি গাছের আঠা মেশানো একটা তরল কাপড়ে ঢেলে পাখিটার ওপর ঘষঘষ ঘসলেন।



 তারপর এমনি প্লেন জল দিয়ে পরিষ্কার করে মুছে দিতেই হয়ে গেল পট্টচিত্রের পাখি। সত্যিই ম্যাজিকের মতো।

এরপর যা হওয়ার তাই হল। উনি আমাদের ওঁর এবং ওঁর ছাত্রছাত্রীদের হাতে বানানো চমৎকার চিত্র দেখালেন, তালপাতার ওপর সে সব টানের সূক্ষ্মতা আমি কল্পনা করতে পারি না, আপনাদের ব্যাখ্যা করে বোঝানো তো ছেড়েই দিলাম। দশাবতার, রাসলীলা, গণেশ। ওইটুকুটুকু ছবির জায়গায় জায়গায় আবার ফ্ল্যাপের মতো করা, এপাশে ওপাশে আলাদা ছবি। দেশী সিল্কের ওপর আঁকা রঙিন ছবি, তার জৌলুস বিশ্বাস হয় না। মস্ত মস্ত কার্টন টেনে টেনে এনে ছবির পর ছবি বার করে আমাদের দেখাতে লাগলেন। এত সুন্দর সে সব ছবি, দেখলে কিনে ফেলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু যা ভেবেছিলাম তাই। এমনি এমনি তো চুল পাকেনি। যেটা চোখে লাগছে, সেটাই সাধ্যের বাইরে। বার বার বললাম, দেখাবেন না দাদা, আমরা সত্যিই পারব না। মিনিট চল্লিশ পর ওঁর বিশ্বাস হল। ভদ্রলোক অসম্ভব ভদ্র। বিরক্ত লাগছিল নিশ্চয়, তবু ব্যবহার একই রকম শান্ত রেখে পাশের ঘর থেকে আরেকটা বাক্স এনে বললেন, এইগুলো দেখুন তবে। নারকেলের খোলার গায়ে ঝলমলে রং দিয়ে আঁকা জগন্নাথের মুখ। দাম শুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে দু'খানা তুলে প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছি এমন সময় ঝুমুর ঝুমুর। ওপরতলা থেকে নামছে দুই আড়াই হাত লম্বা বালিকা, ঝলমলে শাড়ি,  চোখে কাজল, হাতে আলতার সূর্য, তেল চুকচুকে বয়েজ কাট চুলে ফুলের মুকুট। সেজেগুজে কনফিডেন্স তাদের তুঙ্গে, তাড়াতাড়ি সাইড দিলাম। অর্চিষ্মান গত বেশ কিছুদিন ওডিশায় ঘোরাঘুরি করছে, বলল, গোটিপুয়া নাচ হবে বুঝি? পাশের ঘরে অনেকক্ষণ ধরে বিদেশী গলা পাচ্ছিলাম, তাঁদের জন্য পারফরমেন্সের ব্যবস্থা হয়েছে। অর্চিষ্মানও নাকি সে নাচ দেখেছে। দেখার মতো নাকি ব্যাপার। সে অবশ্য শিল্পীদের দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছিল।

গাড়িতে ওঠার পর লক্ষ্মণ বললেন, আবার রঘুরাজপুর যাবেন নাকি? আমরা বললাম, না ভাই আজকের মতো নেগোশিয়েশনের কোটা শেষ, আপনি বরং এবার সোজা মঙ্গলাজোড়িই চলুন। লক্ষণ বললেন, সেই ভালো, দেরিও হয়ে যাবে। চন্দনপুরের মোড়ে এসে ডানদিকে বাঁক নিয়ে ঘুরল আমাদের গাড়ি। 

নিরাকারপুর, শ্রীমুকুন্দপুর এই রকম চমৎকার চমৎকার সব নামের জায়গা পেরিয়ে গাড়ি চলল। একটা একটা বড় লোকালয় আসে, আর আমরা জানালা দিয়ে যতখানি সম্ভব জায়গাটা দেখে নেওয়ার চেষ্টা করি। এই জায়গাগুলোয় কখনও বেড়াতে আসা হবে না, কাজেই এই সুযোগ। এখানে নৃত্যগীত অ্যাকাডেমির বেশ প্রচলন আছে দেখলাম। আর দেখলাম মানুষ, গরু, ফুচকার গাড়ি, চায়ের দোকান, শাকসবজির বাজার। সে সব বাঁধাকপি বেগুনের সতেজতা দেখলে সি আর পার্কের কপি বেগুন লজ্জা পাবে। বসতির মাঝে মাঝে দীর্ঘ রাস্তা জুড়ে দুদিকে নিচু ক্ষেত, জলে ভর্তি। নাকি সব জুলাই মাসের বন্যার জল, এখনও নামেনি। বারদুয়েক চা খেয়ে চিপস কিনে মঙ্গলজোড়ি পৌঁছলাম বেলা আড়াইটে নাগাদ।


মংগলাজোড়ি ইকো রিসর্ট। পাখি-উৎসাহীরা এখানে এসে থাকতে পারেন। বেসিক ব্যবস্থা, কিন্তু পরিচ্ছন্ন। ছাউনি ঢাকা ওই গোল জায়গাটায় জনাপাঁচেক লোককে খেতে দেখে মনে পড়ল দুপুরের খাওয়া নিয়ে ভাবা হয়নি। অর্চিষ্মান আমার কানে কানে, জিজ্ঞাসা কর না আমাদের তিনজনকে খেতে দেবে কি না, বলেই দৌড়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল।

আমি মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়ে আমাকেও বাথরুমটা দেখাবেন আর ইয়ে তিনজনের লাঞ্চ পাওয়া যাবে কি? 

মহিলা জিভ কাটলেন। এই মহিলার সঙ্গে গতকাল রাত থেকেই ফোনে কথা হচ্ছে। যা বুঝলাম, উনি রিসর্টের ফোনও ধরেন, প্যাকেজের খবরও দেন, রান্নাঘরেরও তদারকি করেন, টাকাপয়সারও হিসেব রাখেন। বললেন, পাওয়া তো যায়, কিন্তু আগে থেকে বলতে হয়। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ঠিক আছে ঠিক আছে, আমরা পাখিটাখি দেখে এসে না হয়... মহিলা বললেন, আসতে ছ'টা বেজে যাবে। দাঁড়ান দেখছি। আমি কাঁচুমাচু হয়ে পেতে রাখা টেবিল চেয়ারে বসলাম। অর্চিষ্মান এসে বলল, ব্যবস্থা করে ফেলেছ? বাঃ।

খাবার এল। ভাত, ডাল, আলু ফুলকপির তরকারি আর বেগুনভাজা।  দইয়ের সঙ্গে শশা, গাজর, পেঁয়াজ। প্রত্যেকটি জিনিসই যা বোঝা গেল আরও চাইলে পাওয়া যেত। আমরা চাইনি। কারণ আমাদের হয়েও বেশি হয়েছিল।

ওডিশা আর আসামের খাবারের সম্পর্কে আমরা একটা আলোচনা মাঝে মাঝেই করি। বিশেষ করে যখন এ দুটি রাজ্যের খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়। আলোচনার বিষয় হল যে এই রাজ্যদুটোর খাবারের প্রতি অবিচার করতে আমরা বাধ্য। কারণ এ জায়গাদুটোর খাবার বড্ড বেশি আমাদের খাবারের মতো। মানে মাছের ঝোল আর মুগের ডাল আর কলমি শাক নিয়ে কত উচ্ছ্বসিত হওয়া সম্ভব, সে যতই ভালো রান্না হোক না কেন? গত আটত্রিশ বছরে যে আটত্রিশ কোটি বার আমি মাছের ঝোল, ডাল, তরকারি খেয়েছি বাড়ির পিঁড়ি কিংবা টেবিলে বসে, কখনও না কখনও তো এর থেকে ভালো রান্না হয়েইছিল। সরসোঁ দা সাগ খেয়ে বরং আমার পক্ষে অভিভূত হওয়া সহজ। আলুনি কিংবা নুনপোড়া না হলেই হোক না কেন হাড়িপ্পা বলে লাফিয়ে উঠব।

আমরা যতক্ষণ খেলাম গাছের ডালে একটা কাক আর মাটিতে একটা বেড়াল বসে পাহারা দিল। ছাউনির নিচে পাখিড়ুদের খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল, বসে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন, একজন লাগলেন, আর ভাই আমি কলকাতায় থাকি না, আমার আবার স্ট্যাটাস, হ্যাঃ।

সেদিন দুপুরের খাওয়া সম্পর্কে একটাই বলতে পারি, আমাদের খাওয়া আটত্রিশ কোটি ডাল ভাত তরকারির মধ্যে মনে করে রাখার মতো  ডালভাত তরকারি খাইয়েছিল মঙ্গলাজোড়ি ইকো রিসর্ট। খাওয়া সেরে টাকাপয়সা মিটিয়ে গাড়ি চড়ে চলে গেলাম বার্ড ওয়াচিং টাওয়ারে, যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন অশোক। অনেকগুলো দাঁড়-বাওয়া নৌকো সারি দিয়ে দাঁড় করানো ছিল, একটার দাঁড় বেয়ে একজন কাছে নিয়ে এলেন। আমি, অর্চিষ্মান আর অশোক চড়ে বসলাম। আমাদের একটা বাইনোকুলার দেওয়া হল। 


মঙ্গলাজোড়ির ইতিহাস রোমহর্ষক। একসময় এই গ্রামের লোকজন পরিযায়ী পাখি শিকার করে খেতেন। । বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে এখন ভক্ষক টু রক্ষক হয়েছেন। পাখি চেনার চোখের এঁদের তৈরি হয়েছিল এক কারণে, এখন অন্য কারণে কাজে লাগছে। অশোকের ট্রেনিং হয়েছে সে রকম একজন ওস্তাদ শিকারীর হাতে। একদিনে একটা পাখি, এই ছিল তাঁর পাখি চেনানোর পদ্ধতি। 

নানারকম পাখি দেখা হল। পার্পল মুরহেন, কমন মুরহেন, হুইস্কারড টার্ন, উড স্যান্ডপাইপার, নর্দার্ন পিনটেইল, গ্রেহেড আর রেড ওয়াটল ল্যাপউইং, রাডি শেলডাক যা নাকি আমাদের পুরাণের চখাচখী, সর্বদা জোড়ায় জোড়ায় থাকে। যারা পরিযায়ী পাখি নিয়ে চর্চা করেন তাঁরা বলতে পারবেন আমরা বেশি পাখি দেখেছি না কম দেখেছি নাকি এই রকমই দেখা যায়। আমার সবথেকে চমক লাগছিল পাখিগুলো যখন হঠাৎ উড়ান নিচ্ছিল, আর অমনি একরঙা পাখির ডানায় ম্যাজিকের অন্য রং, সাদা ডানার মাঝখান দিয়ে হঠাৎ চওড়া বাদামী রঙের পোঁচ, কারও একই রঙের ভিন্ন ভিন্ন শেডসারি সারি, শাড়ির কুঁচির মতো। 

কিন্তু সত্যি বলব? এই একটি পাখিও না দেখতে পেলে আমার মঙ্গলাজোড়ি একই রকম ভালো লাগত। দাঁড়ের ঠেলায় নলঘাসের বনের গলিতে ভেসে পড়ার প্রথম মুহূর্ত থেকেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম. শান্ত জায়গায় তো অনেক গেছি। পাহাড় শান্ত, ভোরবেলা আমার বাড়িও শান্তই, কিন্তু এ আমি আগেও খেয়াল করে দেখেছি, জলের একটা আলাদা শান্তি আছে। স্থির জলের। মাইথন, মুকুটমণিপুর, এমনকি আমাদের পাড়ার পুকুরঘাটটারও শান্তিকেও আর কোনও শান্তির সঙ্গে যাকে গুলোন চলে না। সব কষ্ট শুষে নেওয়া, মুছে নেওয়া শান্তি।

অথচ একেবারে শান্তও তো ছিল না জায়গাটা। চখাচখী তো ভয়ানক চেঁচামেচি লাগিয়েছিলই, মোষগুলোও হেঁড়েগলায় ডেকে উঠছিল মাঝে মাঝেই। দাঁড়ের ঘায়ে জল জলের গায়ে লাট খাচ্ছিল। আমরা মঙ্গলাজোড়িতে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম দিনের ব্যস্ততম সময়ে। পাখিদের, মোষদের তখন বাড়ি ফেরার সময়। মোষগুলোকে না হয় জড়ো করার জন্য লোক আছে, কিন্তু পাখিরা বাড়ি ফেরার সময় হলে নিজেরাই হেঁকে ডেকে সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়। খালি চোখেই বোঝা যাচ্ছিল, অশোকের জোরাজুরিতে চোখে বাইনোকুলার ঠেকিয়ে দেখলাম একটা বিরাট জায়গা পাখিতে পাখিতে কিলবিল করছে। পাখিদের সাড়ে ছ'টার হাওড়া স্টেশন। একে একে উড়ছে আকাশে। 


এমনকি যারা উড়তে পারে না, ডাকতে পারে না, দূর থেকে দেখলে ধ্যানস্থ মনে হয়, তারাও কাছে গেলে বোঝা যায় জেগে রয়েছে দিব্যি। জলের দু'ইঞ্চি নিচ দিয়ে শিকড়ের স্তূপ, গুল্ম, শ্যাওলা, জড়াজড়ি করে ভেসে চলেছে সংসার নিয়ে। অশোকের নির্দেশে নৌকোর ছুঁচোল নাক ঢুকে যাচ্ছে কচুরিপানার বনে, খসখস আপত্তির তুলে জায়গা দিচ্ছে নারাজ কচুরিপানার জঙ্গল। 

জল যখন চারদিক থেকে যখন ঘিরে ধরে, অনভ্যস্ত চোখের দিক গুলিয়ে যায়। কোনদিক থেকে এসেছিলাম, কোথায় যাচ্ছি সব একশা। উঁচু হয়ে থাকা লাল মাটির রাস্তাটা অনেকক্ষণ চোখে চোখে রেখেছিলাম। কখন হারিয়ে গেছে খেয়ালই করিনি। ঘণ্টাদুয়েক পর উঁচু নলঘাসের পাঁচিল সরে যেতেই দেখি নৌকো দাঁড়িয়ে আছে ফেরির একেবারে সামনে। 

December 01, 2018

পুরী



রেলের খাবারের যা ছিরি হয়েছে আজকাল, রেলওয়ে হোটেলের খাওয়া যে সে স্ট্যান্ডার্ডের হবে না সে রকম একটা আন্দাজ ছিল। পুরীবাসের আড়াই দিনে সেটা বুঝেছি, কিন্তু নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম হোটেলে পৌঁছনোর আধঘণ্টার মধ্যে ভেজ পকোড়া আর চা খেয়েই। 

যথাক্রমে পান্থনিবাস এবং পুরী হোটেল দিয়েই পুরীতে থাকার জায়গার খোঁজ শুরু হয়েছিল, প্রত্যাশিতভাবেই পাওয়া যায়নি। তারপর ভিক্টোরিয়া ক্লাব, হোটেল হলিডেজ আরও যা যা সমুদ্রমুখী হোটেল আছে সবেতেই মাথা ঠুকে ব্যর্থ হয়েছি। দুঃখের কথা জানাতে নাকতলার বাবা বললেন ওঁর একজন পরিচিত রিসেন্টলি বি এন আর পুরীতে থেকে এসেছেন এবং উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। 

অর্চিষ্মান শুনেই বি এন আর-এ ফোন করল এবং ওঁরা বললেন, চলে আসুন, ঘর আছে। সেই খবরটাই আমাকে ফোন করে দেওয়ার চেষ্টা করছিল অর্চিষ্মান, পাজি পাজেরোটা ওভারটেক করে যে কনভারসেশনটা মাটি করে।

আমরা প্রথমটা দোনোমোনোই করেছিলাম। কারণ বি এন আর আমাদের বাজেটের বাইরে। তারপর অনেকগুলো যুক্তি মাথায় এল। এক, বোঝাই যাচ্ছে পুরীতে এখন ইলিইলি কিলিকিলি ভিড়। এই বাজারে ঘর পাওয়া গেলেও স্বর্গদ্বারের কাছাকাছি থাকাটা খুব একটা বুদ্ধিমানের হবে না। ও তল্লাটে ঘর অবশ্য পাওয়া যাচ্ছেও না। একটি দুটি হোটেল তাদের ‘মহারাজা সুইট’ খালি আছে আশ্বাস দিয়েছে কিন্তু এই পিক সিজনে দাম আর ঘরের নামের ভারসাম্য কতখানি রক্ষা হচ্ছে আমাদের সন্দেহ আছে। মহারাজা সুইট আসলে হয়তো দেখব গিয়ে সেনাপতিপুত্রের কামরা। টাকাও যাবে, আফসোসও রাখার জায়গা থাকবে না।

আর একটা অপশনও আছে। পুরীও পালাচ্ছে না, আমরাও পালাচ্ছি না, ভিড়টা একটু কমলে না হয় …

পালাচ্ছি না কেন রহস্য, কারণ পালানো আমাদের দরকার। ভীষণ ভীষণ ভীষণ দরকার। কাজেই এই শেষের অপশনটা বাতিল করলাম। চলেই যাই, ফিরে এসে ক’দিন বাইরে কম খাব না হয়। ভালোই করেছি গিয়ে। বি এন আর আমাদের খুবই ভালো লেগেছে। ওঁদের ঘরগুলোর সব রেলওয়ে ক্যারেজে আর স্টেশনের নামে নাম। আমাদের ঘরটা ছিল বারোঘ স্টেশনের নামে। সিমলা কালকা লাইনের সেই ভীষণ সুন্দর বারোঘ। যেখানে টয় ট্রেন থেকে নেমে আমরা ছবি তুলেছিলাম, ভেজ কাটলেট আর চিপস খেয়েছিলাম।

বি এন আর-এর মাইনাস পয়েন্ট একটাই, হোটেলটা সমুদ্রতটে নয়। দূরেও নয়, সমুদ্র আর হোটেলের মাঝখানে জাস্ট এক রো বাড়িঘর। পাঁচ মিনিট হাঁটলেই সে সব পেরিয়ে বিচে পৌঁছনো যায়। সে বিচ অপূর্ব শান্ত, ফাঁকা এবং স্বর্গদ্বারের তুলনায় স্বর্গের মতো পরিষ্কার। 

বারোঘের চমৎকার বিছানা দেখেই ভিট্রুভিয়ান ম্যান হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল, ইচ্ছে দমন করলাম। একটা গোটা সন্ধে মাটি করা যাবে না। চা আর ভেজ পকোড়া সাঁটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

আমার সমুদ্রের থেকে পাহাড় বেশি ভালো লাগে কিন্তু সমুদ্রের একটা অ্যাডভান্টেজ স্বীকার করতে হবে। পাহাড়ের রঙ্গরসটা একটু কম। (অবশ্য লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে ওটাও পাহাড়ের প্লাস পয়েন্ট) হঠাৎ বাঁক ঘুরলে আর পাহাড় চুড়োয় বরফটরফশুদ্ধু সারপ্রাইজ! বলে ঘাড়ে এসে পড়ল এরকম হয় না। সমতল দিয়ে যেতে যেতে প্রথমে ছোটখাটো টিলা দিয়ে শুরু হয়ে ক্রমশঃ উঁচু হতে হতে যতক্ষণে মনের মতো পাহাড়ের সামনে গিয়ে পৌঁছচ্ছি ততক্ষণে পাহাড় দেখার প্রস্তুতি সারা হয়ে গেছে।

সমুদ্রের আবার ও সব ছলাকলা প্রচুর। সমুদ্র আপনাকে দেখা দেওয়ার আগে নানারকম টিজার দেবে। সংকেতের সাহায্যে নিজের অস্তিত্বের জানান দেবে। যে রাস্তাটা অলমোস্ট সমকোণে এসে ডানদিকে মোড় নেয় স্বর্গদ্বারের দিকে, সেই রাস্তাটা দিয়ে রিকশা করে আসতে আসতে আপনি সমুদ্র দেখার আগে আকাশ দেখবেন। স্বাভাবিক আকাশের মতো নয়, মাটির কাছাকাছি ঝুঁকে এসেছে। দেখে আপনি বুঝবেন সমুদ্রের আর দেরি নেই।

এখন আকাশ দেখে সমুদ্র আঁচ করার উপায় নেই। অনেকখানি পুবদিকে এসে গেছি, সাড়ে পাঁচটাতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। এবারের টিজার, আকাশের বদলে গর্জন। আমরা হোটেলের সিকিউরিটি ভাইসাবের দেখানো রাস্তায় চলেছি। ঠিকই চলেছি, কারণ গর্জন ক্রমে বাড়ছে। অবশেষে সব আড়াল সরে গেল। পায়ের তলায় কংক্রিট ফুরিয়ে বালি, সামনে অন্ধকারের সীমাপরিসীমা নেই। সেই অসীম অন্ধকারে একটা দুটো সাদা রেখা উল্কার মতো ফুটে মিলিয়ে যাচ্ছে। 

কিছু কিছু সিচুয়েশনে পড়লে মনে একটা প্রশ্ন জাগে। ঠিক সময়ে প্রশ্নটা মাথায় এলে সিচুয়েশনগুলোতে পড়তেই হত না। যেমন প্লেন ধুপধাপ এয়ার পকেটে পড়ার সময়। চড়ার আগে কখনও মনে হয় না যে আমার আকাশে ওড়ার কথা নয়। অটো কিংবা উবারপুলে পৃথিবীর মাটিতে চলেফিরে বেড়ানোর কথা। তা সত্ত্বেও যেচে কেন উড়তে গেলাম?

অন্ধকার সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে আবার সেই প্রশ্নটাই মনে এল। যে অন্ধকারটার সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি, যেটা ক্ষণে ক্ষণে আমাকে দেখে দাঁত খিঁচোচ্ছে, গোটা পৃথিবীর ওটা তিনভাগ, আর বাকি একভাগের কত শতাংশ জমি তিন্নির দেওয়া বাহারি চটিশোভিত আমার পা দু’খানা অধিকার করে রেখেছে - দুটোর তুলনা আমার কল্পনায় কুলোচ্ছে না, কিন্তু বইয়ে পড়েছি কাজেই আন্দাজ করতে পারি। হঠাৎ ভর সন্ধেয় যেচে এর গায়ে এসে পড়ার তো কোনও কারণ ছিল না। দু’নম্বর মার্কেট থেকে ঝালমুড়ি আর মোমো প্যাক করিয়ে ঘরে ঢুকে পরিপাটি ছিটকিনি তুলে দিলেই হত, রোজ যেমন দিই।

অর্চিষ্মান আমার থেকে সাহসী, তাই ভয় স্বীকার করতে পারে। বলল, ভয় লাগছে না? ঘাড় নাড়ছি আর বাঁ চোখের কোণ দিয়ে দেখছি অনেক দূরে বালুতট ফুঁড়ে একটা ল্যাম্পপোস্ট উঠছে। উঠছে তো উঠছেই। বাকি সব ল্যাম্পপোস্টের মাথা ছাড়িয়ে প্রায় আকাশে ঠেকে গেছে যখন বুঝলাম ওটা কার্তিকপূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের আলোয় অন্ধকারটা সামান্য ফিকে হল আর দেখলাম ঢেউয়ের গায়ে আমার আর অর্চিষ্মানের ছায়া দুলছে। 

ভয় চলে গেল অনেকটা। হাত পা ঘাড়ের খিল খুলে গিয়ে আবার বেশ নাড়াতেচাড়াতে পারলাম, শ্বাস নিয়মিত হল, বুকের কাঁপুনিও কমল অনেকটা। এই যে বালির রেলিং আছে হাতখানেক উঁচু হয়ে, যার নিচে এসে বাঁদর ঢেউগুলো হাল ছেড়ে ফিরে যাচ্ছে, সেগুলোর এধারে থাকলেই অনেকটা সেফ, বল?

একটু হাঁটা যাক নাকি? যাক যাক। এদিককার বিচটা দিনে হয়তো রূপসী (সত্যিই) কিন্তু রাতের বেলা একটু বেশি ফাঁকা ফাঁকা। ইতিউতি ছায়ার পুঁটলির কোনটা যে বালির স্তূপ কোনটা যে প্রেমিকপ্রেমিকা জগন্নাথই জানেন। দু’কিলোমিটার দূরে স্বর্গদ্বারের আবছা আলো লক্ষ করে হাঁটতে শুরু করলাম। মাঝপথে ছোট নালা মতো পড়ল, সমুদ্রের ঢেউ এসে জমছে, বিকট গন্ধ, চটি হাতে নিয়ে সেই নালা পেরোলাম। 

একটু দূর যেতেই ঢেউয়ের মাথায় কী সব চিকচিক। অমনি কেতাবি বিদ্যে জাহির করলাম, নির্ঘাত ফসফরাস।

যথারীতি ভুল। তাছাড়া ফসফরাস হলে যেখানেসেখানে জ্বলত, এ চিকচিকানি একেবারে সরলরেখা ধরে চলেছে লম্বালম্বি। ওগুলো আসলে জালের দড়ির গিঁট। তিনজন লোক একটা জাল টেনে সমুদ্র থেকে তোলার চেষ্টা করছে। চেষ্টা না বলে যুদ্ধ বলাই উচিত। পারের কাছে ঢেউয়ের গতি দুদিকেই, আসার আর ফেরার। কায়দাটা হচ্ছে আসার সময় ঢেউয়ের আনুকূল্যে হই হই করে যতখানি সম্ভব জালটাকে তুলে আনা, তারপর যখন ঢেউ ফিরছে এবং সঙ্গে সঙ্গে জালও তখন হেঁইও বলে বালিতে গোড়ালি গেঁথে শরীর যতখানি সম্ভব পেছনে হেলিয়ে জাল টেনে রাখা। তাতেও জাল খানিকটা চলেই যাবে, কারণ ওদিকে তিনভাগ আর এদিকে একভাগের শতাংশের যে হিসেবটা একটু আগে দিলাম, সেটা। খালি এইটুকু চেষ্টা যতখানি উদ্ধার করে আনা হয়েছিল তার থেকে যেন কম খোয়া যায়। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সমুদ্র না সমুদ্রের সঙ্গে এই অসম সংগ্রাম কোনটা বেশি ফ্যাসিনেটিং ভাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু প্র্যাকটিস নেই তাই বেশি ভাবলে ব্রেন ব্যথা করে। ভাবা থামিয়ে যেদিকে যাচ্ছিলাম সেদিকেই রওনা দেওয়া গেল।

স্বর্গদ্বার। কিলবিল করছে ভিড়। ভালোই হয়েছে এখানে ঘর না পেয়ে। পেলে চব্বিশ ঘণ্টা এরই মধ্যে থাকতে হত। তার থেকে ঘণ্টাখানেক বসে ভিড়ের আনন্দ উপভোগ করে নিরিবিলি পাড়ায় গিয়ে ঘুমব। বিচ থেকে উঠে এসে, চটি ঝেড়েঝুড়ে যথাসম্ভব বালিমুক্ত করে রাস্তার ধারের রেলিং-এ গিয়ে সমুদ্রের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসলাম। 

মিথ্যে বলব না, প্রথমটা কেবলই কে বিস্কুট খেয়ে প্যাকেট অম্লানবদনে বিচে ফেলছে, পপকর্নের প্লাস্টিক ফুটপাথে কারণ ছ’ইঞ্চি অক্ষরে ইউজ মি লেখা বিন তাঁর বাঁ দিকে আর পপকর্নের প্যাকেট ডান হাতে, পুরী হোটেলের বারান্দায় কারা হাফপ্যান্ট পরে ঠ্যাং নাচাতে নাচাতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে, ওই লোকগুলো বসেছে বলেই আমি বসতে পারছি না - এই সবই মনে আসছিল। তারপর নিজেকে বললাম, সোনা, বি পজিটিভ। অমনি দেখলাম ঝলমলে জামা পরে বালকবালিকা হাতে বেলুন নিয়ে চলেছে। গম্ভীর মুখে সামনে দিয়ে যাচ্ছেন একজোড়া দম্পতি। একজন অন্যজনকে পরামর্শ দিচ্ছেন, ‘অমুকদাকে বলবে আমরা খেতে যাচ্ছি, তারপর ওদের ব্যাপার।’ দল বেঁধে পুরী যাওয়ার প্ল্যান করার সময় কমরেডারি উথলে উঠছিল, এখন ছায়া দেখলেও গা জ্বলছে। সবাই ঝালমুড়ির তিনকোণা ঠোঙা হাতে নিয়ে আসছে ওইদিক থেকে। একটু দূরে ডেকচি নিয়ে একজন বসেছেন, কেউ সামনে গিয়ে দাঁড়ালে ডেকচি থেকে ধোঁয়া ওঠা সেদ্ধ ভুট্টা চিমটে দিয়ে তুলে কাগজের প্লেটে রেখে মশলা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আমার বিন্দুমাত্র খিদে নেই, কিন্তু সবাই খাচ্ছে সেটাই কি খাওয়ার যথেষ্ট ভালো কারণ নয়? তারপর ভাবলাম নাঃ, লোভে পাপ, পাপে ইনো। তার থেকে লেবু চা খাওয়া যাক বরং। 

অর্চিষ্মান বলল, এসে ভালোই হয়েছে বল? 

ভালো মানে? না এলে জয়জগন্নাথ পাপ দিতেন। 

লেবু চা-টা দারুণ ভালো তাই না? আরেক কাপ খাবে? 

বাঁধনছাড়া বাঁচার সাহস যে আমাদের নেই প্রমাণ হয়ে গেছে অনেকদিন। কিন্তু পর পর দু’কাপ লেবু চা খাওয়ার আছে। দুজনে দুই দুই চার কাপ লেবু চা নিয়ে বসলাম, সামনে দিয়ে কলরব করে জনতা, অটো, ট্যাক্সি চলাচল করতে লাগল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে সিদ্ধান্ত নিলাম, এই মুহূর্তটাকে জীবনের মনে রাখা মুহূর্তের হল অফ ফেম-এ জায়গা দেওয়া যেতে পারে।

                                                                                                                  (চলবে)




November 28, 2018

ভুবনেশ্বর




দিল্লির বাইরে বেরোনর পর প্রথম যেটা চমকে দেয় সেটা হচ্ছে বাকি দেশটার লোকজন কী ভদ্র এবং বিনীত। ভদ্র মানুষজন ছাড়াও ভুবনেশ্বরের আরও অনেক গুণ আছে। ভুবনেশ্বর শুনেছি আধা-প্ল্যানড শহর। রাস্তাঘাট দেখলে সেটা বোঝা যায়। রীতিমত পরিষ্কার। তাছাড়া পুরুষ হকি বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে তাই মোড়ে মোড়ে ব্যানার সেঁটে শহরটা আরও সেজেগুজে রেডি। আর ভালো শহরের ওলাউবার পরিষেবা। যে সময়টুকু ভুবনেশ্বরে ছিলাম ওলাউবারের অটো ট্যাক্সিই ব্যবহার করেছি। হায়েস্ট অপেক্ষা করতে হয়েছে পাঁচ মিনিট। একজন খালি ওলা মানিতে যেতে অসম্মত হয়েছিলেন, তাঁকে ক্যাশে পেমেন্ট করেছি। ব্যস।

অফিস সেরে ভুবনেশ্বর পৌঁছতে হয়ে গিয়েছিল রাত দশটা পাঁচ। হোটেলে ব্যাগ রেখেই দৌড়েছিলাম ডিনার খেতে, সে গল্প পরে বলব। খেয়েদেয়েই ঘুম, কারণ সকাল থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ঘোরাঘুরি শুরু করতে হবে। পরদিন দুপুর পর্যন্ত ভুবনেশ্বরে থাকার মেয়াদ। তার মধ্যে যা দেখার দেখে ফেলতে হবে, যা খাওয়ার খেয়ে ফেলতে হবে। হোটেলে ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি ছিল, কিন্তু সে সব খেয়ে পেট ভরানো চলবে না। ইউটিউব দেখে, ব্লগ পড়ে কয়েকটা খাওয়ার জায়গা বাছা আছে, সব হয়ত যাওয়া অসম্ভব কিন্তু কয়েকটায় যেতেই হবে। বিশেষ করে রবি মৌসা-র দোকানে।


রবি মৌসার দোকান এখন আর মৌসার নয়। বিখ্যাত হওয়ার পর মৌসা নিজেকে ভাইয়া বলে চালিয়েছেন। দোকানে দেখলাম ওঁকে, সত্যিই মৌসা বলাটা বাড়াবাড়ি। ইন্টারনেটের ম্যাপে, উবার কিংবা গুগল ম্যাপে সার্চ দিলে রবি ভাইয়া'স কিচেন বলে যেটা আসে ওটাই মৌসার দোকান। অটোপ্সি রোডের ওপর ঝুপড়ি। গ্রাঞ্জ কুইজিনের ঠাকুরদাদা। অটো নিয়ে পৌঁছলাম সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ। ফুটন্ত তেলের কটাহে গবগব করে জিনিসপত্র ভাজা হচ্ছে। এই দোকানের লিজেন্ড হচ্ছে রবি মৌসা, থুড়ি, ভাইয়া গরম তেলে হাত ডুবিয়ে চপ বা বড়া ছাড়তে পারেন। ভিডিও দেখেছি, দাবি ফাঁপা নয়। কিন্তু স্যাডলি সে অভিনব কেরামতি আমরা চাক্ষুষ করতে পারিনি। কারণ ভাইয়া সম্ভবত: অসুস্থ। তিনি দোকানের ভেতর দুই পায়ে চন্দনের মতো কী সব লেপে, নয়তো পতলা মোজার মতো পরে সামনের চেয়ারে ছড়িয়ে বসে ছিলেন।


আমরা সবকিছুই স্যাম্পল নিলাম। ইডলি,ভাজা  ইডলি, ঘুগনি আর ওই গোলটা হচ্ছে আলুর বড়া বা চপ।  

চপের প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ল। আমার গল্প নয়, অর্চিষ্মানের গল্প। হোস্টেলের ওডিশাবাসী বন্ধু মহা উত্তেজিত হয়ে আড্ডায় এসে বলল, কাছেই একটা দোকান খুলেছে, ওডিশার স্পেশাল খাবার পাওয়া যায়। চল খেয়ে আসি। চল, চল বলে সবাই মিলে হই হই করে যাওয়া হল। অর্চিষ্মান এই জায়গাটায় পৌঁছে অর্থপূর্ণ পজ দেয়।  বলে, বলতো কীসের দোকান?

কীসের?

চপের।

ওড়িয়ারা কিছু তেলেভাজা খেতে পারে। আমি সি আর পার্কের বাঙালিদের রাত আটটার সময় চপ খেতে দেখে শিহরিত হই, ওড়িয়ারা ব্রেকফাস্টে আলুর চপ খায়। অবশ্য এই ক্লাসের আলুর চপ হলে খাওয়াই যায়। ওই রকম পাতলা মোড়ক আমি কোনও চপের খাইনি।

অর্চিষ্মান বলল ওর সব থেকে ভালো লেগেছে ভাজা ইডলি, আমি ভোট দিলাম আলুর চপকে। সবই সাময়িক, কারণ আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে এমন একটা জিনিস আমরা খাব যা আমাদের সব ভোটাভুটি বানচাল করে দেবে।দোকানের একদিকে বড় বড় এলুমিনিয়ামের ডেকচিতে রসের পুকুরে রসগোল্লা চমচম ভাসছিল। ও সবে উৎসাহ ছিল না। ফিরে আসতে গিয়েও ভাবলাম একবার জিজ্ঞাসা করেই দেখা যাক।

ছেনা পোড়া হ্যায়, ভাইসাব?


আস্ক অ্যান্ড ইউ শ্যাল রিসিভ।

চলে এল আমার আর অর্চিষ্মানের অভিজ্ঞতায় শ্রেষ্ঠ ছানা পোড়া। এমন মসৃণ, এমন নরম, এমন সুস্বাদু, সর্বাঙ্গসুন্দর ছানা পোড়া আমরা কখনও খাইনি।
*****

ভুবনেশ্বরে আরও অনেককিছু আছে নিশ্চয় দেখার, মিউজিয়াম,পার্ক, কিন্তু ভুবনেশ্বর সবথেকে বিখ্যাত যে সব দ্রষ্টব্যের জন্য, মন্দির, আমরা সেগুলোই ঘুরে দেখব ঠিক করলাম। প্রথম গন্তব্য সব মন্দিরের মধ্যে বিখ্যাততম লিঙ্গরাজ। মন্দিরের দিকে এগোতে এগোতেই টের পেলাম কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। ভিড় বাড়ছে। দুপাশে পুজোর জিনিসপত্র নিয়ে হাঁক পাড়ছেন বিক্রেতারা। বোঝা যাচ্ছে বেশিরভাগই অস্থায়ী। মন্দিরের সামনে পৌঁছে আমরা হতভম্ব। পাণ্ডা গিজগিজ করছে, গেটের সামনে লাইন একেবেঁকে কোথায় অদৃশ্য হয়েছে কে জানে। ওই লাইনে দাঁড়িয়ে মন্দিরে ঢোকার প্রশ্নই নেই। তাছাড়া আমাদের উদ্দেশ্য মন্দিরের শোভা অবলোকন, এই পরিস্থিতিতে সেটা জাস্ট অসম্ভব। ছাড়ান দিলাম। আফসোস হল, শুনেছি অনেক বড় জায়গা নিয়ে খেলানো মন্দির, চমৎকার দেখতে।

পরে অটো ভাইসাবের কাছে জেনেছিলাম, গোটা কার্তিক মাসই ওডিশাতে পুজোপার্বণের মাস, পারা চড়তে চড়তে পূর্ণিমায় তুঙ্গে ওঠে। আর হবি তো হ' সেদিনই পূর্ণিমা। এই দিনেই নাকি পুজো করে নদীতে বাণিজ্যতরীর যাত্রা শুরু হত। পারাদ্বীপ এবং গোপালপুর বন্দরে নাকি এই কার্তিকপূর্ণিমার গুরুত্ব সাংঘাতিক। রাস্তার দুপাশে কলার খোলায় প্রদীপ নিয়ে প্রচুর বিক্রেতা বসেছিলেন, মনে পড়ল।


লিঙ্গরাজের পাশেই একটা বন্ধ মন্দির। অনেক ছোট, পুজো হয় না বলে ভিড় নেই। ওখানে ঢুকে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটান গেল। লিঙ্গরাজ দেখা হল না, আফসোস রয়ে গেল। পরের বার মনে করে কার্তিক পূর্ণিমা বাদ দিয়ে আসতে হবে।


রাজারানি মন্দিরে এমনিতেও যেতাম, তাছাড়া ও মন্দিরে পুজো হয় না, বাড়তি সুবিধে। রাজারানি শব্দটা এসেছে রাজারানিয়া থেকে, যে নামের পাথর দিয়ে মন্দির তৈরি হয়েছিল। মন্দিরচত্বর চমৎকার মেন্টেন করা। ঘাস, ফোয়ারা। চাতালে যেদিকে ছায়া পড়েছে সেখানে রোমান্টিক ফোটোশুট চলছিল। আমরা মন্দিরের চারদিক ঘুরে এসে ভদ্রস্থ দূরত্বের গাছের ছায়ার একখানা বেঞ্চে বসে সেই দেখলাম খানিকক্ষণ। বাগানে স্প্রিংকলারের চারদিকে রাজহাঁস-হাঁসিদের উত্তেজনাও দেখার মতো। তারপর একজন এসে ওই স্প্রিংকলারটা বন্ধ করে দেওয়াতে তারা মারাত্মক গজগজ করতে করতে হেলেদুলে পাশের স্প্রিংকলারের দিকে গেল। নিরাপদ দূরত্বে ছিলাম, দৌড়ে এসে ঠুকরে দিতে পারবে না আশ্বাস ছিল, কাজেই প্রাণ খুলে হাসলাম।


কোন যক্ষীর মাথা কেটে নিয়ে গিয়েছিল চট্টরাজের লোক জানি না, আমি তাই এমনিই দুই মাথাওয়ালা যক্ষীর ছবি তুলে এনেছি।


লাস্ট স্টপ, মুক্তেশ্বর। মুক্তেশ্বরেও কার্তিকপূর্ণিমার ভিড় আছে তবে লিঙ্গেশ্বরের তুলনায় কিছুই না।


মুক্তেশ্বর আর পরশুরামেশ্বর একেবারে গায়ে গায়ে।  পরশুরামেশ্বরের মন্দির আরও ফাঁকা তাই আরও সুন্দর। রাস্তার লাগোয়া মন্দির। দেখা শেষ করে উবার ডেকে মন্দিরের পাঁচিলে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছি, আমি রাস্তার দিকে পিঠ করে, অর্চিষ্মান সাইড করে। হঠাৎ রাস্তার দিকে মুখ ঘুরিয়েই অর্চিষ্মান কেমন থতমত খেয়ে গেল তারপর হাসল। বললাম কী হল কী হল,  অর্চিষ্মান বলল, একটা বাচ্চা মেয়ে যাচ্ছিল রাস্তা দিয়ে, একটু হলেই তোমার মাথায় চাঁটি মারার উদ্যোগ নিয়েছিল, আমার চোখে চোখ পড়ে যাওয়ায় হাত নামিয়ে নিল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। ফুট দুয়েক দৈর্ঘ্য, বছর সাতেক বয়স, লাল রঙের ঘাগরা এবং ব্লাউজ, গলায় লাল পুঁতির মালা, ন্যাড়া না হয়ে যতখানি ছোট করে চুল কাটা যায় সে রকম হেয়ারস্টাইলে লাল হেয়ারব্যান্ড। এক হাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত গার্জেনের হাতে। আমরা ওর দিকে দেখছি দেখে মিচকি মিচকি হেসে মাথা নিচু করে লাল জুতো দিয়ে ধুলো ছিটকোচ্ছে।



কোনও জায়গায় যাওয়ার আগে হোমওয়ার্ক যে কী জরুরি জিনিস খণ্ডগিরি উদয়গিরি দেখতে গিয়ে আবারও রিয়েলাইজ করলাম। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের গুহা সব, জৈন সাধুদের খোদাই করা, তার গায়ে ব্রাহ্মীতে লেখা শ্লোক, সিংহ, হাতি, ফুল ফল পাতা, মারাত্মক ঐতিহাসিক তাৎপর্যময় ব্যাপার, অথচ আমরা এমনি পার্কে বেড়ানোর মতো করে ঘুরে এলাম।



লাঞ্চ? দুজনেই মাথা নাড়লাম। আলুর চপ এখনও খেল দেখাচ্ছে। খণ্ডগিরি উদয়গিরির এন্ট্রিগেটের সামনে সারি দিয়ে ফুচকা বসেছে, সেই খাওয়া যাক বরং এক প্লেট করে। তারপর একখানা ডাব, হাফ হাফ।

ভুবনেশ্বরেরর পালা শেষ। এবার সেই জায়গাটাতে যাব, যেখানে যাওয়ার আমাদের আসল আকুতি। কীভাবে যাব এখনও শিওর নই। ওলাউবার তেরোশ-র আশেপাশে হিসেব দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের সন্দেহ যে এর থেকে ঢের সস্তায় ব্যাপারটা সারা সম্ভব। চেক আউটের সময় ভদ্রলোক কনফার্ম করলেন। অটো নিয়ে চলে যান মাস্টার ক্যান্টিনের বাসস্ট্যান্ডে, সরকারি লাল বাস চলছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়, চকাচক এসি, পৌঁছে দেবে দেড় ঘণ্টার ভেতর। ভাড়া? মোটে একশো টংকা। খুশি হয়ে বাসে চড়লাম। শহর পড়ে রইল পেছনে। দু'দিকে খালি মাঠে উঁচু উঁচু কাশেরা দুলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর সূর্য লাল হয়ে উঠল তাদের মাথায়।  

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.