November 21, 2018

শীতের স্নান



মেয়েকে বাংলা মিডিয়ামে পড়ানোর জেদ করেছিলেন মা, তার মাশুল গুনতে হয়েছিল আমাকে। রোজ রাতে সাড়ে ন'টার ইংরিজি নিউজ শুনতে হত। কে কী বলছে কিচ্ছু মাথায় ঢুকত না, গোটা সময়টা ঢুলতাম খালি ওয়েদারের খবরের আগামাথা উদ্ধার হত। ভারতবর্ষের ম্যাপের নানা জায়গায় মেঘ বৃষ্টি সূর্যের ছবি দেখে দিব্যি বোঝা যেত ব্যাকগ্রাউন্ডে ঘোষক কী বলছেন। ওয়ান টু জানতাম কাজেই  চারটি মেট্রোপলিসের তাপমাত্রাও বোঝা যেত। কলকাতারটা থেকে চার ডিগ্রি মাইনাস করে আমরা রিষড়ার তাপমাত্রা ধরে নিতাম। কিন্তু আমাদের রিয়েল উত্তেজনা ছিল দিল্লির টেম্পারেচার নিয়ে। দিল্লিতে তখন আমার বড়মামা মামী মামাতো দিদিরা থাকতেন। নভেম্বর মাস থেকে শুরু করে দিল্লির তাপমাত্রা ক্রমে পনেরো, বারো, দশ, আট হত এবং আমাদের বিস্ময় বাড়ত। এবং একদিন সেই অমোঘ দিনটি আসত যখন দিল্লির টেম্পারেচার সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁত।  

সাত! 

অথচ ওর থেকেও ঠাণ্ডা জায়গা যে পৃথিবীতে আছে জানতাম। ট্রেন থেকে বিশ্বের একশোটি আশ্চর্য তথ্য না ওই রকম নামওয়ালা চটি বই নিয়ে এসেছিলেন মা, তাতে লেখা ছিল সাইবেরিয়ার কোন গ্রামে গরমকালে তাপমাত্রা মাইনাস চল্লিশ না ওইরকম থাকে। থাকে তো থাকে। আম্বানিরা মাসে কত রোজগার করে জেনে কি আমি ইমপ্রেসড হই? আমি মুগ্ধ হই গত মাসে জয়েন করা সহকর্মীর মাইনে নেগোশিয়েশনের দক্ষতার কানাঘুষো শুনে। 

দিল্লির আবহাওয়ায় সর্দির দাপট গেছে, সিংহাসনে এখন দূষণ। একজন ভালোবাসার লোক সেদিন ফোন করে বললেন, সোনা, শুনছি নাকি দিল্লিতে দরজাজানালা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকলে কুড়িটা সিগারেট খাওয়ার সমান আর রাস্তায় বেরোলে চল্লিশটা সিগারেট খাওয়ার সমান পলিউশন? বললাম, হ্যাঁ দূষণ তো মারাত্মক। কিন্তু কুড়িখানা সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারটা মাথায় ঘুরতে লাগল। অর্চিষ্মান যে তিনমাস ধরে 'পিউরিফায়ার কিনি চল পিউরিফায়ার কিনি চল' করছে, সেটা এবার উদ্যোগ নিয়ে করে ফেলতে হবে। 

দিল্লির ঠাণ্ডা নিয়ে আমাদের উত্তেজনা স্তিমিত হলেও মায়ের হয়নি। মা রোজ বারান্দায় বসে বসে আমার ঠাণ্ডা লাগা প্রতিরোধের উপায় ভাঁজেন তারপর ফোন করে সেগুলো পয়েন্ট করে করে বলেন। মায়ের লিস্টের সবথেকে ওপরের থাকে টুপি পরার পয়েন্ট। সোনা, মাথাটাই আসল। যতই লজ্জা করুক না কেন অফিসে মাথা মুড়ি দিয়ে বসে থাকবে। উপদেশে এইরকম রাবড়ির মতো পরত একমাত্র মায়ের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। মাথা ঢাকতে বলাও হল, আবার ভ্যানিটি নিয়ে ভর্ৎসনাও হল। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ল মানবদেহের কোনখান দিয়ে ঠাণ্ডা লাগে সেটা নিয়ে নানা লোকের নানা মত। কেউ বলেন ঠাণ্ডা লাগে বুক দিয়ে, কেউ বলেন কান এবং মাথা দিয়ে, কেউ বলেন গলাটাই আসল, ওটাকে যে কোনও মূল্যে রক্ষা করতে হবে। আমার চেনা একজন 'গলা বাঁচাও কমিটি'র প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং কালীপুজো পেরোলেই গলায় ভুষি রঙের মাফলার পেঁচিয়ে ঘুরতেন। জানুয়ারি মাস এসে গেলে মাফলার ছাড়া তাঁকে দেখা যেত না। রাতে এপাশওপাশ করার পর সেই মাফলার গলায় জড়িয়ে একবার শ্বাসরোধের উপক্রম হয়েছিল, তবু শিক্ষা হয়নি। 

গলা দিয়ে কী করে ঠাণ্ডা লাগবে সেটা অবশ্য আমি শিওর নই। গলা দিয়ে ঠাণ্ডা লাগলে হাতের পাতা, পায়ের পাতা, হাঁটু ছেঁড়া জিনস পরলে হাঁটু দিয়েও সমপরিমাণ ঠাণ্ডা শরীরে ঢোকার কথা। কানের ফুটো দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঠাণ্ডা লাগার থিওরিটা বরং আমার অনেক যুক্তিযুক্ত মনে হয়। আর মাথা ঢাকলে কানের ফুটোটাও ঢাকা হবে। তা বলে আমি মাথা মুড়ি দিয়ে ঘুরি না মোটেই অফিসে। বহিরঙ্গ নিয়ে অতখানি নির্মোহ এখনও হতে পারিনি। 

সত্যি বলতে অফিসে অত ঠাণ্ডা লাগেও না। বছরের বাকি দশ মাস বরং অফিসে বসে আমি রীতিমত হাঁসফাঁস করি। কারণ আমার অফিসের বাকি সবাই সর্বক্ষণ নালিশ করে এসি নাকি মারাত্মক বাড়িয়ে রাখা হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার। আমি অনেক গুরুতর ব্যাপারেও মুখ বন্ধ রাখার পক্ষপাতী, এসির খোলাবন্ধ নিয়ে মতপ্রকাশের প্রশ্নই নেই। খালি একদিন রেগে গিয়েছিলাম। জুলাই মাস ছিল, বসের মাথা এবং ফলতঃ আমার মাথাও গরম ছিল। এসি চড়া থাকলে সুবিধেই হত। কিন্তু শীতকাতুরেরা ভীষণ চেঁচামেচি করে এসি কমিয়ে রাখলেন। আমি রাগ চেপে বাড়িতে চলে এসে অর্চিষ্মানকে সবে বলতে গেছি, 'কারা এরা? কাদের এত ঠাণ্ডা লাগে সর্বক্ষণ?' তার আগেই শুনি অর্চিষ্মান বলছে, 'আর বোলো না, অফিসে সবাই ঠাণ্ডায় কাঁপছে আর দু’জন চেঁচাচ্ছে, মরে গেলাম, এসি বাড়াও। কারা এরা?' 

আমার শীতকাল গরমের থেকে সর্বদাই বেশি পছন্দের কারণ ঠাণ্ডা লাগলে একটার ওপর আরেকটা জামা গায়ে চাপানো যায়, কিন্তু যতই গরম লাগুক একটা লিমিটের পর আর জামা খোলা যায় না। এইটাই হচ্ছে গরমের তুলনায় শীতের শ্রেষ্ঠত্বের সহজ যুক্তি। কিন্তু নম্বরের মুখ চেয়ে স্কুলের রচনায় আরও আবোলতাবোল লিখতে হত। শীত ভালো লাগে কারণ ফুলকপি পাওয়া যায়, জলবাহিত রোগ কম হয়, মেলা বসে, ডোভার লেনে ভীমসেন জোশী গান ধরেন হাবিজাবি। নম্বর বেশি পাওয়ার জন্য এর ওপর আবার কাব্য করার চেষ্টা হত। কবিত্বশক্তি কোনওকালেই ছিল না, কাজেই সেগুলোও 'কুয়াশার মধ্যে দূর থেকে ট্রেনের হর্ন' মার্কা স্টকের কাব্যই হত। 

শীতের একটাই অসুবিধে মাঝে মাঝে টের পাই, স্নান করার অসুবিধে। অ্যাকচুয়ালি স্নান করার থেকেও, স্নান যে করতে হবে সেই জানাটা বেশি অসুবিধেজনক। অর্চিষ্মানের সঙ্গে থাকতে শুরু করার পর এই বিষয়ে খানিকটা সুবিধে হয়েছে। 'তুমি আগে স্নানে যাও, তোমার হয়ে গেলে আমি ঢুকব,' এ উচ্চারণের থেকে আরামের কিছু নেই। এ দৈনিক দড়ি টানাটানিতে জয়ের আনন্দ যিনি জিতেছেন তিনিই জানেন। আমার আনন্দ আরও বেশি কারণ বাড়ি ছাড়ার আগে পর্যন্ত এ আনন্দ থেকে আমি বঞ্চিত ছিলাম। চন্দ্রবিন্দুর গানে  'তাড়াতাড়ি চানে যাও/ শুনে দেখো মা'র কথা' লাইনদুটো শোনার আগে পর্যন্ত আমার জানাই ছিল না, মায়ের কথা না শুনে দেখাটাও একটা অপশন। এখনও মাঝে মাঝেই হার মেনে আমাকেই আগে স্নানে যেতে হয়। তখন আমি প্রতিশোধ হিসেবে স্নান করে বেরিয়েই অর্চিষ্মানকে বলি, 'আহ, কী আরাম, স্নান করে নাও, দেখবে আর ঠাণ্ডা লাগবে না।' 

সাত! 

এখন তো তাও অনেক সুবিধে। গিজার চালাও, কল খোলো, গরম জল পাও। আমার বাড়ির কেউ কেউ রান্নায় গুঁড়োমশলা ব্যবহার করা এবং কৃত্রিম উপায়ে গরম হওয়া জলে স্নান করার বিরোধী ছিলেন। জলের বালতি রোদে রেখে গরম করে সেই জলে স্নান করাটাই সবথেকে স্বাস্থ্যকর, দাবি করতেন তাঁরা। রোদে গরম করা জল অনেকটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মতো। আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে রোদে রেখে জল যথেষ্ট গরম হয়েছে, তাহলে সম্ভবতঃ আপনার অসুবিধে হবে না। কিন্তু যদি আপনার মনে বিন্দুমাত্র সংশয় থেকে থাকে যে শীতের মরা রোদে জল কিছুতেই পর্যাপ্ত গরম হতে পারে না, তাহলে গায়ে ওই জল ছোঁয়ানোমাত্র শক গ্যারান্টিড। দ্বিতীয় যে উপায়টা আমাদের বাড়িতে জল গরম করার জন্য ব্যবহৃত হত সেটা হচ্ছে গ্যাসে বা স্টোভে হাঁড়ি বসিয়ে গরম করা। গ্যাসের উনুন আটকা থাকলে কেরোসিন স্টোভে গোঁগোঁ আওয়াজ তুলে জল গরম হত। তারপর সেই হাঁড়ির গলা কাপড় জড়িয়ে ধরে দৌড়ে দৌড়ে সেটা নিয়ে যাওয়া হত বাথরুম পর্যন্ত। দৌড়ে, কারণ সকাল সাড়ে আটটার সময় হেঁটে নষ্ট করার মতো টাইম মায়ের থাকত না। ওই ফুটন্ত জলের হাঁড়ি নিয়ে দৌড়তে গিয়ে মা যে কোনওদিন মুখ থুবড়ে পড়েননি, শুধু এইরকম কতগুলো উদাহরণের জন্য এখনও অ্যাগনস্টিক শব্দটার খুঁটি ছেড়ে দিতে পারছি না। 

সাত! 

তারপর আমাদের বাড়িতে একটা অত্যাশ্চর্য জিনিসের আবির্ভাব ঘটল, সেটা হচ্ছে ইমারশন হিটার। যেন আগুন আবিষ্কার হল। বিজ্ঞানের অগ্রগতি দেখে সবাই মুগ্ধ। সবার জন্য পার্সোন্যাল ইমারশন হিটার কেনা হল। বিভিন্ন সাইজের বালতির জন্য বিভিন্ন সাইজের হিটার। বিঘৎপ্রমাণ মিনি ইমারশন হিটারও যে পাওয়া যায়  জেনে সবাই চমৎকৃত হলেন। বলাবলি হল, আর দেরি নেই, এইবার রান্নাঘরে রেভলিউশন আসছে। গ্যসের খরচ মারাত্মক কমে যাবে। চা ইত্যাদি করার জন্য তো আর রান্নাঘরমুখো হওয়ারই দরকার নেই, যে যার কাপে ইমারসন হিটার ডুবিয়ে জল গরম করে নিলেই হবে। কিনে ফেলা হল গোটাচারেক। 

একটাই অসুবিধে, সুইচ না নিভিয়ে, জল যথেষ্ট গরম হল কি না দেখতে জলে হাত ডোবানো যাবে না। দিলে কারেন্ট মারতেও পারে। বিজ্ঞান যদিও আশ্বাস দিচ্ছে সে রকম কিছু ঘটার চান্স নেই, কিন্তু বিজ্ঞানে ভরসা করে পাগলে। আজ বলছে পৃথিবী চ্যাপ্টা। কাল বলবে গোল। যে কোনও দিন এসে বলবে আগের সবকিছু ঐতিহাসিক ভুল ছিল, আসলে পৃথিবী রম্বস। 

রান্নাঘরে রেভলিউশনও এল না। কারণ সবাই টের পেল চা তেষ্টা পেলে যে যার নিজের বুদবুদ থেকে বেরিয়ে ইমারশন হিটার প্লাগ ইন করে জল গরম বসানোর থেকে সোজা হচ্ছে মায়ের উদ্দেশ্যে 'একটু চা হবে নাকি' চেঁচানো। সবথেকে বড় সুবিধে, মা কারেন্ট মারবেন না। 

***** 

ইউনিভার্সিটির এক দাদা বারোমাস ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেন। বলতেন, শুরুতে একটু কষ্ট হয়, কিন্তু একবার ঠাণ্ডা জলে স্নানের অভ্যেস করে নিতে পারলে জরাব্যাধি থেকে মুক্তি, শোকতাপ থেকে মুক্তি, এমনকি ঘটনাটা শুদ্ধমনে ঘটাতে পারলে মাধ্যাকর্ষণ থেকেও নাকি মুক্তি সম্ভব। তিরিশ বছর রোজ দু'বেলা ঠাণ্ডা জলে স্নান করার পর কে যেন বাবু হয়ে বসা অবস্থায় খাট থেকে ছ’ইঞ্চি ভেসে থাকতে সক্ষম হয়েছে। 

অনেক ভেবে দেখেছি। বাবু হয়ে বাতাসে ভেসে থাকতে পারা আমার বাকেট লিস্টে সত্যিই নেই। তাছাড়া অর্চিষ্মানের কথাও ভাবা উচিত। যতই আগে স্নানে যাওয়ার যুদ্ধে আমাকে গোহারা হারাক, হঠাৎ ল্যাপটপ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে যদি দেখে আমি বাতাসে ভাসন্ত অবস্থায় ওর দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাচ্ছি, ভালো হবে না। কাজেই আমি এক্ষুনি গিজারটা ফেলে দিচ্ছি না। আপাতত গরম জলে স্নানই চলুক। ইন ফ্যাক্ট, এই পোস্টটা শেষ করতে এত দেরি হয়ে যাচ্ছে যে আজ মনে হয় না অফিস যাওয়ার আগে আদৌ স্নান করা সম্ভব হবে।


November 12, 2018

ফুচকা ও ফিকশন



ক’দিন আগে একটা সিনেমা দেখে এসেছি, তুম্বাড়। আপনারা না দেখে থাকলেও পোস্টটা পড়তে পারেন, কারণ কোনও স্পয়লার দেওয়া হচ্ছে না। সবাই বলছিল দারুণ নাকি সিনেমা। ইউটিউবের রিভিউয়ারেরা পাঁচে চার সাড়ে চার দিচ্ছিলেন, কেউ বলছিলেন এ রকম কালার কারেকশন আগে ভারতীয় সিনেমায় হয়নি। আমি কালার কারেকশন কাকে বলে জানি না, খালি জানি সিনেমাটা দেখতে চমৎকার হয়েছে। পরিচালক দর্শককে উদ্বেলিত সবুজ পাহাড়, অবিশ্রাম বৃষ্টি, লণ্ঠনের টিমটিম আলোয় আলোকিত রাতের নদী, শহরের বাজারের কোলাহলের একেবারে মাঝখানে নিয়ে গিয়ে ফেলতে পেরেছেন।

তুমবাড় হচ্ছে খুব যত্ন করে, দারুণ কায়দা করে বানানো একটা হিতোপদেশের গল্প। সমস্যাটা হচ্ছে যতই কায়দা করা হোক না কেন, হিতোপদেশের গল্প ফাইন্যালি হিতোপদেশের গল্পই থাকে। দেবতার অভিশাপ। মানুষের লোভ। লোভে পাপ। পাপে মৃত্যু। তাছাড়া দু’হাজার আঠেরোতে বসে ঝুরঝুরে ধ্যানধারণার বিন্দুমাত্র আপডেট ছাড়া একখানা নতুন গল্প ফাঁদার সিদ্ধান্তটাও কৌতূহলোদ্দীপক। কেউ বলতে পারে সিনেমা তো গল্প নয়, কাজেই গল্পটা সময়গ্রাহ্য হল নাকি চরিত্ররা একমাত্রিক হু কেয়ারস, কালার কারেকশনটাই আসল কথা। এর উত্তরে আমি স্পিচলেস। অন্ধের হাতি দর্শনের গল্পটা খাঁটি। আমাকে যত ভালো সিনেমা দেখানোই হোক না কেন আমি খালি গল্পটা দেখে, ডায়লগ শুনে বাড়ি চলে আসব এবং তার চুলচেরা বিচার করতে বসব তা সে যুক্তিযুক্ত হোক না হোক।

যদিও তুম্বাড়ের চুল চেরা এই পোষ্টের উদ্দেশ্য নয়। তুম্বাড়ের কান টানলাম শুধু ওই বক্তব্যটায় পৌঁছনোর জন্য যে একটা গল্প ভালো লাগতে গেলে তার প্লটও জমাটি হতে হয়, ক্যারেকটারও ইন্টারেস্টিং হতে লাগে। আমি ক্যারেকটারগুলো সব স্টিক ফিগারের মতো এঁকেছি কিন্তু ভাষায় কেমন বঙ্কিমি বাঁধুনি কিংবা চরিত্রদের পরত উৎকৃষ্ট রাবড়ির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে কিন্ত শেষে গিয়ে প্রতিটা সাবপ্লট দড়ি ছেঁড়া বাছুরের মতো ছত্রাকার - এ রকম হয় না।

*****

ফুচকার সঙ্গে আমার মতে এই বিষয়ের ফিকশনের মারাত্মক মিল। ফুচকারও ভিন্ন ভিন্ন উপাদান থাকে যাদের কোনও একটার খামতি অন্যটার উৎকর্ষ দিয়ে ঢাকা যায় না। আমার মতে। সবার মতে নয়। অনেকে মনে করেন ফুচকার আসল কেরামতি ফুচকাটায় অর্থাৎ খোলাটায়। সেটা যদি পাতলা, মুচমুচে, এবং মাপমতো সাইজের হয় তাহলে আলুমাখা, তেঁতুলজল, এবং ফুচকাওয়ালার অ্যাটিচিউডের ছোটখাটো খামতি অগ্রাহ্য করা যেতে পারে।

আমি, অফ কোর্স, এরকম মনে করি না। বিশেষ করে ফুচকাওয়ালার অ্যাটিচিউডের ব্যাপারটায়। অভিজ্ঞতায় দেখেছি বাকি সব পেশার মতোই ভালো ফুচকাওয়ালা হতে গেলেও ব্যক্তিগত কিছু গুণ জরুরি। পরিশ্রমের ইচ্ছে, ভালো ব্যবহার, অন্যের সুবিধেঅসুবিধের প্রতি মনোযোগ ইত্যাদি। অলস, অভব্য, আত্মসর্বস্ব ফুচকাওয়ালা ভালো ফুচকা খাওয়াচ্ছেন, জন্মে দেখিনি। ফুচকা খেয়ে খুশি হওয়ার জন্য ফুচকাওয়ালার সঙ্গে খাইয়ের একটা কানেকশন দরকার। ঠিক যেমন লেখা পড়ে আনন্দ পাওয়ার জন্য লেখকের সঙ্গে পাঠকের। যে লেখকের রাজনীতিকে অশ্রদ্ধা করি তাঁর শত অরাজনৈতিক লেখাও মন ছুঁয়ে যায় না। ঠিক তেমনি কোনও ফুচকাওয়ালাকে দেখলেই গা জ্বললে তিনি যত ভালো ফুচকাই বানান না কেন,মর্যাদা করা যায় না। সি আর পার্কে আমার মোটামুটি প্রিয় একটি ফুচকার দোকান আছে এবং সেই দোকানে দুজন ফুচকাওয়ালা আছেন। কে কবে দোকানের দায়িত্ব নেবেন সেটা সারপ্রাইজ। প্রতি শুক্রবার, কোনও কোনও সপ্তাহের মাঝখানেও ট্যাক্সি থেকে নেমে আঙুলের ওপর ভর দিয়ে, গলা বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করি দোকানে কোনজন আছেন। একজন থাকলে রাস্তা পেরিয়ে দোকানের দিকে এগোই, অন্যজন থাকলে দীর্ঘনিঃশ্বাস চেপে ঝালমুড়ি নিয়ে বাড়ি চলে যাই। যতবার অন্যথা করেছি, যতবার ফুচকার লোভে ফুচকাওয়ালার খামতি অগ্রাহ্য করতে গেছি, ততবার শিক্ষা হয়েছে। ঝাল দিতে বললে পুরো ফুচকাটা তৈরি করে ওপর থেকে লাল লংকার গুঁড়ো ছড়িয়ে থপ করে শালপাতায় ছুঁড়ে ফেলেছে। দেখেশুনে আমি সিদ্ধান্তে এসেছি ফুচকাওয়ালার সঙ্গে খাইয়ের সম্পর্ক পূর্বনির্ধারিত। হয় ক্লিক করে, নয় করে না। কমপ্রোমাইজ করতে হয়। আর ফুচকা নিয়ে আমি কমপ্রোমাইজ করি না।

তবে এটা মানি, ফুচকার কোনও একটা এলিমেন্টের যদি নৈর্ব্যক্তিক বিচার সম্ভব হয়, সেটা হচ্ছে ফুচকার খোলা। কেউই বলবেন না যে ন্যাতানো ফুচকার খোলা আমার দারুণ পছন্দ। সে দিক থেকে ফিকশনের প্লটের সঙ্গে ফুচকার খোলার তুলনা করা যায়। কেউই বলবেন না, সত্যি বলছি আমার না প্লট একটু নড়বড়ে হলেই ভালো লাগে। বরং আলুমাখা, তেঁতুলজল এ সবে আপেক্ষিকতার জায়গা আছে। যে জন্য তারা চরিত্র, ভাষা, পয়েন্ট অফ ভিউ ইত্যাদির সঙ্গে তুলনীয়। কারও ঝাল পছন্দ, কারও মিষ্টি, কারও লাইকেবল চরিত্র ভালো লাগে, কারও বদের বাসা ছাড়া মন ওঠে না। নিজস্ব নীতিবোধও অনেকসময় আনন্দগ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমার চেনা একজন পাঠক নাটকনভেলের কাল্পনিক পরকীয়াও সইতে পারেন না। আরেকজনকে চিনতাম, আশাপূর্ণা দেবীর অনুরাগী ছিলেন, তাঁর বাকি সব গল্প গোগ্রাসে গিলেছিলেন, খালি মেয়েদের চোপা সইতে পারতেন না বলে ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ অনেক বার চেষ্টা করেও শেষ করতে পারেননি।

*****

যবে থেকে ঠাকুর দেখতে বেরোতে শুরু করেছি, বুঝেছি ঠাকুর দেখার সমান ইম্পরট্যান্ট হচ্ছে রাস্তায়, প্যান্ডেলে অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া। কোন দিন কার সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোব (ষষ্ঠীর দিন ব-দিদি, সপ্তমীতে স, অষ্টমী নবমী দশমী অবস্থা বুঝে বাবা মা আর পিসির মধ্যে বণ্টন) সেটা যেমন বাঁধা থাকত, কার সঙ্গে কী খাব সেটাও বাঁধা থাকত। এর সঙ্গে ফুচকা আর রোল, ওর সঙ্গে ফুচকা আর আইসক্রিম। কত খাব সেটাই শুধু বাঁধনছাড়া, খেতে খেতে শরীর খারাপ লাগলে থামস আপ খেয়ে ঢেঁকুর তুলে আবার খাওয়া।

সে সব দিন গেছে। সবারই গেছে সে রকম দাবি করছি না। এ বছরেই দেখেছি প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে গার্জেন বলছেন, ‘ওই দেখ দুগ্‌গাঠাকুর ওইদিকে’ আর যাকে বলা হচ্ছে সে আক্ষরিকই আমার হাঁটুর দৈর্ঘ্যের, ‘কিন্তু আইসক্রিম ওইদিকে,’ বলে গার্জেনের হাত ধরে একটা কোয়ালিটির ঠেলাগাড়ির দিকে তার ওই মারাত্মক অপ্রতুল শরীরে সমস্ত জোর প্রয়োগ করে টানছে।

কাজেই দিন গেছে শুধু আমার। খাওয়া নির্লজ্জরকম খিদে-নির্ভর হয়ে পড়েছে। ষষ্ঠীর সন্ধেবেলা রিষড়ায় টোটোপরিক্রমা সেটা আবারও প্রমাণ হল। প্রতি প্যান্ডেলের সামনেই ফুচকা, রোল, ম্যাগি, সুপ ম্যাগি, কচুরি, আলুকাবলি ইত্যাদি ছিল কিন্তু আমরা কিছুই খাচ্ছিলাম না। আমি খাচ্ছিলাম না কারণ দুপুরে ওই রকম খাওয়ার পর আমার সত্যিই পেটে জায়গা ছিল না। অর্চিষ্মানও না না করছিল, কিন্তু সেটা পেট ভরা ছিল বলে নাকি ভদ্রতা করে, জানি না। 

মাবাবার অস্বস্তি হচ্ছিল নিশ্চয়। প্রতি প্যান্ডেলের সামনে নেমে ওঁরা ক্রমাগত 'এটা খাবি?’ ‘সেটা খাবে?’ জিজ্ঞাসা করছিলেন। শেষটা যখন বললেন ‘তাহলে এককাপ চা-ই খাও নাকি প্রজাপতি বিস্কুট দিয়ে?’ তখন মনে হল এত বাড়াবাড়ি না করলেও চলবে। পঞ্চাননতলার পঁচাত্তর বছরের পুজো প্যান্ডেলের মেলায় পৌঁছে বাবা আরেকবার যেই না বললেন, ‘ফুচকা খাবি সোনা?’ রাজি হয়ে গেলাম। বাবা বললেন, ‘ওটা ফাঁকা আছে ওদিকে চল।’ 

আর আবারও প্রমাণ হল আমি কত বদলে গেছি। এক মুহূর্তের জন্য কী মনে হল জানেন? মনে হল, যেখানে ভিড় সেখানটাই কি ভালো হবে না? যাই হোক, মনের কথা মনে রাখার বুদ্ধিটুকু হয়েছিল ভাগ্যিস। বাবার পেছন পেছন ফাঁকা ফুচকার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভদ্রলোক একবার শুধু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ঝাল হবে?’ তারপর আলু মাখতে শুরু করলেন। হাতে হাতে প্লেট দিলেন, তারপর কাঁচের বাক্স থেকে ফুচকা নিয়ে ভেঙে, আলুমাখা পুরে তেঁতুলজলে ডুবিয়ে প্লেটে প্লেটে দিতে শুরু করলেন। 


এই ছবিটা ওঁর ফুচকার দোকানের নয়। ছবিটা আপনারা কেউ কেউ চিনতে পারেন। এটা একটা বিখ্যাত ফুচকার দোকানের ছবি। ভিড়ভাট্টার সঙ্গে গুণগত মানের সমানুপাতিক সম্পর্কে আপনার বিশ্বাস থাকে তাহলে আপনি চোখ বুজে এই দোকানের ফুচকায় আস্থা রাখতে পারেন। কারণ এই ফুচকার দোকান কখনওই ফাঁকা থাকে না। ইউটিউবের ফুচকা-ওয়াকে এই দোকান কভার করা হয়।

এটা দক্ষিণাপনের সামনের ফুচকার দোকান। অর্চিষ্মানের মুখে এই দোকানের ফুচকার কথা আর আলুরদমের কথা অনেক শুনেছি। চতুর্থীর রাতে এক জরুরি কাজ সেরে অন্য জরুরি কাজে যাওয়ার ফাঁকে আমার জীবনে প্রথমবার এই লিজেন্ডারি দোকানের ফুচকা এবং আলুরদম চাখার কাজটাও গোঁজা হয়েছিল। 

দোকানের সামনে তিন সারি খদ্দের অলরেডি দাঁড়িয়ে ছিলেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুচকার মেনুসম্বলিত বোর্ড পড়তে লাগলাম। দইফুচকার মহামারী লেগেছে কলকাতায়, এ দোকানে যে পাওয়া যাবে আশ্চর্য কী। তাছাড়াও আরও কত ভ্যারাইটির যে ফুচকা রাখেন ওঁরা, দু’পাঁচটা মুখস্থ করেছিলাম, ভুলে গেছি। আমাদের তাড়া ছিল, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে কোনও মহৎ অভিজ্ঞতা হয় না জানা ছিল। তাছাড়া যাঁরা আগে এসেছেন আগে ফুচকা খাবেন, সেই দুয়ে দুয়ে চার নিয়েও সংশয় জাগেনি। 

কিন্তু সকলেই আমার মতো অংকে কাঁচা নন। বা বাজিয়ে দেখার সাহস রাখেন। পঁয়ত্রিশটাকা বিল উঠলে দু’হাজারের নোট এগিয়ে চুপ করে তাকিয়ে থাকেন। সে রকম একজন খদ্দের হইহই করে এসে বললেন, ‘এই আমার গাড়ি এক্ষুনি এল বলে, আমাকে ঝপ করে এক প্লেট ফূচকা দিয়ে দাও দেখি।’ ইমপ্রেসড হলাম। ‘আমার পঁয়তাল্লিশ এসে যাবে, ঝপ করে ফুচকাটা দিয়ে দিন দেখি,’ বললে কী প্রতিক্রিয়া হবে ভেবে সূচের মতো একটু বিঁধলও। 

বিক্রেতারা জানালেন, হবে না। যা-ই আসুক না কেন, গাড়ি কিংবা হেলিকপ্টার, লাইন ভেঙে ফুচকা খাওয়া তাঁরা অ্যালাউ করবেন না। এবং তাঁদের ‘না’-এর উচ্চারণ শুনে বোঝা গেল সেটা দরাদরিতে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘হতেও পারে’, ‘কী যে করেন’, ‘পিকটাইমে এ সব করা যায় নাকি’, ‘দাঁড়ান দেখছি, যত্তসব’- ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হওয়ার চান্স নেই। এবার আগের থেকেও বেশি ইমপ্রেসড হলাম। ফুচকাওয়ালার চারিত্রিক গুণাবলীর যে পয়েন্টটা ছিল তাতে বড় একখানা রাইট বসল। অবশেষে আমাদের পালা এল। আমার পাশেই দাঁড়ালেন সেই স্মার্ট খদ্দের, তাঁর গাড়ি তখনও আসেনি। ফুচকা দেওয়া শুরু হল। মিথ্যে বলব না, স্বস্তি করে খাওয়ার পক্ষে একটু বেশিই জাম্বো। কিন্তু মুখে পড়া মাত্র ফুচকার অতি সূক্ষ্ম খোলা যেই না কুড়মুড়িয়ে চূর্ণ হল, যেই না ভাবছি, লিজেন্ড হওয়ার কারণটা অবশেষে বোঝা গেল…কিন্তু শেষপর্যন্ত বোঝা গেলও না। 

কারণ আলুমাখা আর তেঁতুলজল। দু’প্যারা আগেই আমি এগুলোর পছন্দেঅপছন্দে আপেক্ষিকতার থিওরি দিয়েছি, কাজেই আমি আমার মতই জানাতে পারি। দক্ষিণাপনের সামনের ফুচকায়, আমার মতে, ঝাল, নুন, টক, মশলাপাতি সবই মাঝারিমানের। বেশিরভাগ লোকের কী ভালো লাগবে, বা কতটুকুতে অসুবিধে হবে না সেইটা গেস করে দেওয়া। হয়তো বেশিরভাগ লোকের ভালো লাগে। কিন্তু বেশিরভাগ লোকের কথা মাথায় রেখে বানানো যে কোনও সৃষ্টিরই যা রিস্ক, হাতে গোনা কয়েকজনকে গভীরভাবে ছুঁতে না পারা,সেটা থেকেই যায়। 

দক্ষিণাপনের ফুচকা সম্পর্কে আমার কোনও নালিশ নেই, কিন্তু ‘ভালোই তো,’ ছাড়া আর কোনও প্রশংসাও নেই। ও ফুচকা সবদিক থেকে এতই মোলায়েম এবং বিনীত যে কেউ অফেন্ডেড হবেন না। ও ফুচকা কাউকে নাকের জলে চোখের জলে করতে পারবে না। যেটা ষষ্ঠীর সন্ধেবেলায় পঞ্চাননতলার ফুচকা পেরেছিল। মুখে পোরামাত্র,রামঝাল আলু আর রামটক তেঁতুলজল পঞ্চেন্দ্রিয়র ঝুঁটি ধরে মারল টান, কুলকুণ্ডলিনীর জট দিল খুলে। শরীরে এবং মগজে দুপুরের অতিভোজনজনিত শ্লথতা এক লাথি খেয়ে পিঠটান দিল। ক’প্লেট খেয়েছিলাম নেই খালি মনে আছে মুখভর্তি ফুচকা নিয়ে, চোখের কোলে টলটলে জল নিয়ে ইশারায় বলেছিলাম, চালিয়ে যান। ‘আমি কুন্তলার প্লেট থেকেই একটা নিয়ে খাব’খন’ দিয়ে শুরু করা অর্চিষ্মান দ্বিতীয় না তৃতীয় কে জানে কোন খেপ থেকে আমার আর বাবার মাঝখানে ঢুকে পড়ে নিজস্ব প্লেটের জন্য হাত বাড়িয়েছিল। খালি মা নার্ভাস মুখে কানের কাছে মুখ এনে বলছিলেন, ‘রাতে মোচার বড়া না খেলে কিন্তু…’ 



ফুচকা খাওয়ার পর দক্ষিণাপনের গেটের সামনের দোকান থেকে আলুরদমও এক প্লেট নেওয়া হয়েছিল। আজকাল একটা ধারণা জনমানসে বদ্ধমূল হয়েছে যে স্ট্রিট ফুডের গুড থেকে গ্রেট হয়ে ওঠার পথে একটাই সিঁড়ি। একটি চ্যাটচেটে, থকথকে মিষ্টি চাটনি। ফুচকাতে এর প্রকোপ অনেকদিন শুরু হয়েছে। সি আর পার্কে একজনকে ঝালমুড়িতেও সেই চাটনি মেখে খেতে দেখেছি। পুরো মুড়িটা বানানো হয়ে যাওয়ার পর ওপর থেকে মিষ্টি চাটনি ঢেলে দেওয়ার পর মোটা বেঁটে তর্জনী ঠোঙার ভেতর ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে পুরো মুড়িতে সে চাটনি মাখানোর সংগ্রাম, আমার আজীবনের দুঃস্বপ্নের স্টকে এনট্রি নিয়েছে। আমি চমৎকৃত এই দেখে যে লোকে আজকাল আলুরদমও ওই চাটনি ছড়িয়ে খাচ্ছেন। আমাদের আলুরদমের প্লেটেও যত্ন কর চাটনি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমি চাটনির ছোঁয়া যতখানি সম্ভব বাঁচিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। চাটনির নিচে লাল লাল মশলা মাখানো গোল গোল আলুগুলোকে দেখতে লাগছিল চমৎকার, তারা অতি চমৎকার সেদ্ধ হয়েছিল,কিন্তু ফুচকার যা রিভিউ এখানেরও তাই, সেটা হচ্ছে নুনঝাল সবই সবার কেমন ভালো লাগবে সেই আন্দাজ করে দেওয়া হয়েছে, এবং সেফ খেলতে গিয়ে খেলাটা মাঠে মারা গেছে।) 

***** 

এইবার আপনারা বলতে পারেন, ও সব সেফটেফ কিছু নয়, সোজা কথা হচ্ছে তুমি মফঃস্বলের তাই হিংসে করে শহুরে ফুচকা আলুরদমকে কম নম্বর দিচ্ছ। পাড়াগেঁয়ে পক্ষপাত ছাড়া এ আর কিচ্ছু না। তাছাড়া নস্ট্যালজিয়া বলেও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি? পঞ্চাননতলা তোমার অবচেতন ছেয়ে রয়েছে, যতই ভালো ফুচকা দেওয়া হোক না কেন ও জিনিস ছাড়া মন উঠবে না। ওর সঙ্গে ফুচকার ভালোমন্দের কোনও সম্পর্ক নেই, আছে শুধু সাইকোলজির। 

হতেও পারে। সাইকোলজি অতি প্যাঁচালো ব্যাপার। আমার পক্ষে কিছুতেই বুকে হাত দিয়ে বলা সম্ভব নয়, পক্ষপাতিত্ব বা স্মৃতিমেদুরতা আমার জাজমেন্ট ঘোলাটে করেনি। 

কিন্তু আবার নাও করতে পারে। কেন বলছি, কারণ ওই ফুচকা আর আলুর দম খাওয়ার পর অর্চিষ্মান ওর ছোটবেলার আরও একটা জিনিস আমাকে খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল, সেটা হচ্ছে মশলা সোডা। এটা দক্ষিণাপনের ভেতরে ঢুকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে। দোতলায় পৌঁছে আমরা উঠে এদিকওদিক তাকাচ্ছি কারণ অর্চিষ্মানের স্মৃতিতে যেখানে সোডার স্টলটা থাকার কথা ছিল সেখানে নেই। তখনই পাশের ‘টেস্টি’ নামের দোকান থেকে এক ভদ্রলোক হাঁক পাড়লেন, কী খুঁজছি জানতে চেয়ে। মশলা সোডা শুনেই বললেন, খাবেন তো? ভেতরে আসুন। দোকানটা অর্চিষ্মানের স্মৃতির থেকে সামান্য অন্যদিকে চলে গেছে। দু’গ্লাস সোডা নিলাম। 

মশলা সোডা আমি অনেক খেয়েছি। অধুনা সোডাবটলওয়াটারের মসালা থামস আপ থেকে শুরু করে যৌবনের হোস্টেলের বান্টা। জানুয়ারি মাসের রাত তিনটের সময় গঙ্গা ধাবায় গিটার-দাদার পাশে দাঁড়িয়ে চুমুক দেওয়া সেই বান্টাকে, নস্ট্যালজিয়ার দৌড়ে পৃথিবীর কোনও বান্টা, এমনকি পঞ্চাননতলারও,হারাতে পারবে না। কিন্তু স্বাদের দৌড়ে দক্ষিণাপনের টেস্টি -র মশলা সোডা সে বান্টার থেকে কোনও অংশে কম যায় না, এ আমি একশোবার জোর গলায় স্বীকার করছি। 

November 05, 2018

গত ক'দিনে যে ক'টা বিষয়ে আনন্দ পেয়েছি



১। অফিসের পুরোনো ডেস্কটপ বদলে আমাকে একটা নতুন ডেস্কটপ দেওয়া হয়েছে। এটা যে কত আনন্দের বিষয় আর কত জন্মের পুণ্যের ফল সেই নিয়ে গোটা একটা পোস্ট লেখা যায়। কিন্তু আমি লিখছি না। এমনকি ঘটনাটাকে আমি আমার নিকট অতীতের আনন্দের ঘটনাবলীর মধ্যে গুনছিও না। মানুষের চরিত্র ওইরকমই, চাওয়ার জিনিস পাওয়া হয়ে গেলেই সব মজা মাটি। 

আনন্দের ব্যাপারটা ঘটল যখন আমি আমার নতুন কম্পিউটারে প্রথমবার অবান্তরের ঠিকানা টাইপ করলাম। লালসাদা পাতা খুলল। কম্পিউটার বিনীত ভঙ্গিতে জানতে চাইল, সাইটটাকে ট্রান্সলেট করে দেব কি? বললাম, নোপ, নেভার ট্রান্সলেট অবান্তর। অ্যাকচুয়ালি, নেভার ট্রান্সলেট বেংগলি, কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, নেভার ট্রান্সলেট অবান্তর। 

এই যে দাপটের সঙ্গে আমি নতুন কম্পিউটারের সঙ্গে অবান্তরকে পরিচয় করিয়ে দিলাম, আর বুঝিয়ে দিলাম যে আর যার সঙ্গেই চলুক, তোমার কোনও কেরামতি এর সঙ্গে চলবে না, এতে আমার ভয়ানক আনন্দ হল। 

২। আমি ধরেই নিয়েছিলাম দশটা পাঁচটা কেরানি জীবনের সবথেকে বড় আনন্দ হচ্ছে পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা, ব্যাংকে কাজ, গাছে জল দেওয়া - কিছু একটা কারণ দেখিয়ে ঝুপ করে ডুব দেওয়ার সুবিধে। আর যেহেতু বেশি ঘন ঘন এটা করা যায় না, ধৈর্য ধরে সোনার ডিম পাড়া হাঁসের সামনে সাধনায় বসে থাকতে হয়, যখন অবশেষে ডিম যখন সত্যি সত্যি হাতে আসে তখন আনন্দের অবধি থাকে না। 

গত কয়েকমাসে বিবিধ কারণে হাঁসের পেট কেটে বেশ কয়েকটা ডিম বার করে নিতে হয়েছে. কাজেই এখন দাঁতে দাঁত চেপে অফিস যেতে হবে। সপ্তাহে পাঁচ দিন, মাসে বাইশ দিন। ছুটির লিস্টেও বেশি বাকি নেই। এক দিওয়ালি, গুরু নানক আর বড়দিন ছাড়া হক্কের ছুটিও নেই আর। 

যদি না বস ছুটি নেন। রিসেন্টলি আমি উপলব্ধি করেছি বস ছুটি নিলে অফিসটা অন্যরকম লাগে। নিজেকে চেনা যায় না। চলাফেরা অন্যরকম। মাথা উঁচু। শিরদাঁড়া টান। দিনের মধ্যে পাঁচশোবার ঘাড় ঘুরিয়ে আশপাশ পেছন পরীক্ষা করা নেই, মেলবক্সে বন্ধ খাম দেখলে ধড়ফড়ানি নেই। নিজের বাড়ন্ত ছুটি খরচ হওয়া নেই। 

বসের ছুটি, আমার ক্রমশঃ বিশ্বাস জন্মাচ্ছে, নিজের ছুটি নেওয়ার থেকেও চমৎকার ব্যাপার। 

৩। কদিন আগে এক সহকর্মী অফিস ছেড়ে চলে গেলেন। যাওয়ার দিন আমি এদিক থেকে যাচ্ছি, উনি ওদিক থেকে হাতে কাগজের পাহাড় নিয়ে আসাছেন রিসাইকেল ঢিপির দিকে। কত কথা বলা যেত। অভিনন্দন, কবে যাচ্ছ, ওখানে তো এখন ভীষণ ঠাণ্ডা সোয়েটার কিনেছ তো, থাকার জায়গা ঠিক হয়ে গেছে কি না, বড়দিনে দেশে ফিরবে কি না, ফিরলে এস কিন্তু দেখা করতে। এ সব কিছুই না জিজ্ঞাসা করে আমি বললাম, চলে যে যাচ্ছ, তোমার ডেস্কের গাছগুলোর কী হবে? 

ওই মুহূর্তের আগে আমার সহকর্মীর ডেস্কের গাছগুলো সম্পর্কে আমি আধখানা ব্রেনকোষও খরচ করিনি। যাতায়াতের পথে ডেস্কের ওপর দিয়ে দুটো সবুজ পাতার ডগা নজরে পড়েছিল। কিন্তু সেও চোখের কোণা দিয়ে। নজর করে দেখা নয়। অথচ ওই মুহূর্তে আমার সব ছেড়ে গাছের কথা মনে পড়ল। 

গাছ ছাড়াও আরও অনেক কিছু দিয়ে লোকে ডেস্ক সাজায় আমাদের অফিসে। জি-টোয়েনটি কান্ট্রির লিস্ট, ভারতের 'লেবার ল’ বিবর্তনের ইনফোগ্রাফিক, উর্দু শায়েরি, ইংরিজি কোটেশন, বছরভরের ছুটির তালিকা, সেমিনার থেকে পাওয়া নিজের নাম ছাপা বকলস - চোখ থাকলে সব দিয়েই ডেস্ক সাজানো যায়, সাজাতেও দেখেছি। তবে সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছিল এক ইন্টার্ন, তার নাকি সমুদ্র ভালো লাগে। ডেস্কের দেওয়াল, সি পি ইউ, কী বোর্ডের শরীর এবং প্রতিটি কি, এমনকি স্টেপলার এবং পেন হোল্ডার পর্যন্ত সে শনিরবি বসে বসে বিভিন্ন শেডের নীল কাগজে মুড়ে দিয়েছিল। সামারের শেষে সে চলে গেলে, সে সব নীল কাগজ খুঁটে খুঁটে তুলতে তুলতে ভারপ্রাপ্ত লোকজন যে কত বিড়বিড় করেছিল ইয়ত্তা নেই। 

আমার ডেস্কে কিছুই নেই, একটি কাগজে লেখা একটি সেন্টেন্স ছাড়া। সেটা আমি অনেক কায়দা করে পারতপক্ষে লোকের দৃষ্টির আড়ালে এবং সতত নিজের দৃষ্টির সম্মুখে রাখার চেষ্টা করেছি। সামান্য পাঁচ অক্ষরের বাক্য। কিন্তু আমার মতে সব কথার শেষ কথা। Done is better than perfect. সর্বদা যে কাজে লাগাতে পারি তেমন নয়, কিন্তু আগের থেকে বেশি পারি। 

সেদিন বিকেলেই আন্টিজির দোকান থেকে চা খেয়ে, প্যান্ট্রি থেকে জল খেয়ে ফিরে দেখি আমার ডেস্কে একটা সুন্দর কাঁচের বোতলের মধ্যে দুটো লম্বা সবুজ শাখা। সম্ভবতঃ এগুলোকে লাকি ব্যাম্বু বলে। আমার মাথার পেছনের জানালা দিয়ে আসা আলোয় এখন তারা ঝলমল করে। দুটো শাখাতেই নতুন পাতাও গজিয়েছে। 

৪। চুল কাটার দরকার হয়ে পড়েছিল। মাকে জিজ্ঞাসা করলে বলবেন দরকার পড়েছিল অনেকদিন আগেই, কিন্তু মায়ের কথায় এখন নতুন করে কান দেওয়ার মানে হয় না। ভাবছিলাম যাব যাব কিন্তু যাওয়া হচ্ছিল না। সময়ই হচ্ছিল না। সময় হওয়া না হওয়ার ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত। এই যে সাতদিন একা একা থাকলাম, অফিসফেরতা বাজারে গিয়ে আলুপেঁয়াজ কেনার সময়ই পেলাম না। অথচ বাজার পর্যন্ত যাচ্ছিলাম, ঝালমুড়ি প্যাক করানোরও সময় পাচ্ছিলাম। প্যাক করাতে করাতে যেই না মনে পড়ছিল যে কাবার্ডের ভেতর হলুদ রঙের ম্যাগির প্যাকেট দেখেছি সকালে, অমনি দু’পা এগিয়ে আলুপটল বেগুন মেথিশাক কেনার টাইমে মারাত্মক টান পড়ে যাচ্ছিল। কোনওমতে ঝালমুড়ি ব্যাগে পুরে দৌড়ে বাড়ি। তারপর ফাদার ব্রাউন সিরিজ অটো প্লে-তে চালিয়ে মুড়ি খাওয়া। পার্লারে গিয়ে চুল কাটার থেকে এক কোটিগুণ আরামের ব্যাপার। 

পার্লারে যেতে আমার ভালো লাগে না। এক, প্রচণ্ড দাম। আমার দরকার চুলের তলাটা ধরে ক্যাঁচ করে কেটে দেওয়া। সেটা আমার মা একসময় বিনাপয়সায় করে দিতেন। পার্লারের প্রফেশনালরা ওটা করতে পাঁচশো নেবেন। তারপর মাথার চারপাশে গরম হাওয়ার কালবৈশাখী তুলবেন, প্রতিটি চুল ভাজা ভাজা হয়ে ফুলে উঠবে। নেক্সট কয়েকঘণ্টা পাঁচ দুইয়ের আমি পাঁচ চারের হয়ে ঘুরে বেড়াব। এদিকে আশি না একশো কুড়ি টাকায় অর্চিষ্মানের চুল গোঁফ দাড়ি সব মেরামত হয়ে যায়। আর মেরামতির পর ওকে ঠিক ওর মতোই দেখতে লাগে। জিজ্ঞাসা করেছিলাম বিট্টু আমার চুল কেটে দেবে কি না। কোনও কায়দা তো নেই, জাস্ট ছোট করা। আমি শিওর অর্চিষ্মানের চুল কাটতে ওর থেকে বেশি স্কিল খরচ হয়। অর্চিষ্মান বোধহয় ওর চুল কাটার ‘মি-টাইমে’ আমার উৎপাত চায় না, মাথা নেড়ে বলল, বিট্টু এ কাজ করবে না। না না জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই, আমি জানি করবে না। তারপর একদিন শুনলাম বিট্টুও নাকি চুল কাটা হয়ে যাওয়ার পর ওকে ফেশিয়াল করানোর জন্য ঝুলোঝুলি করেছে। আর ও প্রসঙ্গ তুলিনি। 

আর তাছাড়া অন্য গোলমাল তো আছেই। চুল কাটতে কাটতে ক্রমাগত প্রস্তাব আসতে থাকবে। ভুরু ঠিক করে দেওয়ার, ব্রণর দাগ ঠিক করে দেওয়ার, স্কিন ঠিক করে দেওয়ার। আমি তো কী বলব ভেবে পাই না। সকালেই তো দাঁত মাজার সময় আয়নায় নিজেকে দেখলাম, কই কিছু ভুল তো চোখে পড়ল না। কিন্তু ওঁরা প্রফেশনাল, ওঁদের কথার ওপর আমার কথা বলা সাজে না। 

যাই হোক, চুলটা না কাটলে আর সত্যিই চলছিল না। ঝালমুড়ি, ফাদার ব্রাউন বাদ দিয়ে বুকে পাথর চাপিয়ে পার্লারে গেলাম। গোটা সময়টা আশ্চর্যজনক নির্বিঘ্নে কাটল। কেউই কিছু ঠিক করার কথা বললেন না। আমার ধারণা যে বয়স পর্যন্ত সংশোধনের আশা থাকলেও থাকতে পারে সেটা আমি পেরিয়ে গেছি। দাম দেওয়ার সময় নিরাসক্ত মহিলা শুধু জানতে চাইলেন, চুলে রং করান না? বললাম, না। মহিলা বললেন, ভেরি গুড ডিসিশন। গোয়িং গ্রে-টাই লেটেস্ট ট্রেন্ড। 

ট্রেন্ড যতদিন থাকে আনন্দে আছি। চলে গেলে আবার নতুন আনন্দের বিষয় খুঁজতে বেরোতে হবে। কিন্তু সে যখন যাবে তখন দেখা যাবে।


ভাবছি বাঁধিয়ে চোখের সামনে ঝুলিয়ে রাখব

November 01, 2018

তোত্তো-চান





বই আমি পড়ি বেশি বটে, কিন্তু বই বাছে ভালো অর্চিষ্মান। দোকানে, মেলায় অচেনা বইয়ের ঢিপি ঘাঁটতে ঘাঁটতে টপ করে একখানা ইন্টারেস্টিং বই তুলে আনে। আমি অন দ্য স্পট বাছাবাছিতে নেই। ধৈর্য নেই। ভরসাও না। যদি খারাপ বেরোয়? আমি একশোখানা রিভিউ পড়ে, দেখে, শুনে বই কেনা টাইপ। অর্চিষ্মান ঘুরেফিরে নেড়েচেড়ে কিনে ফেলা টাইপ। ওই রকম আলগোছেও কী করে অত ভালো বই খুঁজে পায়, যে বইগুলোর সামনে দিয়ে আমি দু’মিনিট আগে হেঁটে এসেছি, সেটা একটা রহস্য। 

আমার থেকে চশমার পাওয়ার অতখানি কম বলে বোধহয়। অবশ্য খানিকটা চরিত্রেরও ব্যাপার আছে। যে কোনও দোকানে, বইয়ের তো বটেই, ঢুকলেই আমার প্যালপিটেশন হয়। কিছু না কিনে বেরোব কীভাবে ভেবে ঘাম ছোটে। যত দ্রুত চোখ বুলিয়ে বেরোনো যায়। কোনও কোনও কর্তৃপক্ষ তাকান না। তাতেও ভয় লাগে এই ভেবে যে তাঁরা নির্ঘাত ভাবছেন, জানতাম, কিনবে না। কোনও কোনও প্রো-অ্যাকটিভ বিক্রেতা হাতে বই তুলে দেন। দেখুন না, এটা দারুণ হয়েছে। সেটা আরও অস্বস্তিকর। অর্চিষ্মান বলে, অত ঘাবড়ানোর কী আছে, বলবে নেব না। জোর করলে আবার বলবে। না দাদা, আজ নেব না। হয়ে গেল। ও নিজে তাই করে। বিনয়ে বিন্দুমাত্র টান পড়ে না, হেসে হেসে বলে, না দাদা, সত্যিই লাগবে না। এ রকম হয়েছে যে দুজনে বইমেলার কুখ্যাত গলি পেরোচ্ছি, আমি হেড ডাউন করে জোরে জোরে পা ফেলে, অর্চিষ্মান দুলকি চালে। অমনি ডাই করা বইয়ের পেছন থেকে একখানা হাত বেরিয়ে অর্চিষ্মানের শার্ট টেনে ধরেছে। এ রকম কিছু ঘটতে পারে জানতাম, স্পিড বাড়িয়ে দৌড়ে গলি পেরিয়ে গেছি। অনেকক্ষণ পরে সাহস জোগাড় করে উঁকি মেরে দেখি অর্চিষ্মান যথারীতি দুলকি চালে আসছে। হাতে একটা বই। তবে কি অসাধ্যসাধন হল? আরেকটু কাছে আসতে দেখি বইটা বেশ মোটা, আরও এগোতে মলাট-ভর্তি কালীঠাকুর। অনেকক্ষণ দড়ি টানাটানির পর নাকি ভদ্রলোক হাল ছেড়ে বলেছেন, কিছুই নেবেন না যখন এইটা নিন। ফ্রি সুভেনির।

মোদ্দা কথা অর্চিষ্মান দোকানে গিয়ে আমার মতো তটস্থ হয়ে থাকে না, কাজেই ধীরেসুস্থে দেখেশুনে ভালো বই বার করতে পারে। আমিও পারি, ক্বচিৎকদাচিৎ। এই যেমন পুজোর আগ দিয়ে এক নম্বর মার্কেটের কাছে চিত্তরঞ্জন ভবনে বইমেলা বসেছিল। গিয়েছিলাম। ভয়ে ভয়ে দুয়েকটা বই নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। একটা বইয়ের নাম ‘সাংঘাতিক সাসপেন্স’। ট্যাগলাইন নয়, বইয়ের নামই ‘সাংঘাতিক সাসপেন্স’। নিচে অদ্রীশ বর্ধনের নাম। ওঁরই লেখা গল্প নাকি ওঁর সম্পাদনা করা মনে পড়ছে না। অর্চিষ্মানকে ডেকে দেখালাম। ও স্বীকার করল যে নাম দিতে হলে বইয়ের এইরকম নামই দেওয়া উচিত। কিন্তু গল্পগুলো বইয়ের নামের মতো ভালো হবে কি না সেটা সম্পর্কে শিওর হতে পারছিলাম না। তাছাড়া বইটা খুব মোটা ছিল আর দামও আমরা যত টাকার বই কিনব স্থির করে মেলায় গিয়েছিলাম তার থেকে বেশি ছিল। তাই আর কেনা হল না। আমি দোকানি ভদ্রলোকের দিকে পেছন ফিরে অল্প অল্প হাত বোলাচ্ছি বইটার মলাটে এমন সময় অর্চিষ্মান একটা পাতলা বই তাকের কোণা থেকে নামিয়ে এনে বলল, এটা নিলে কেমন হয়?

বইটার নাম হল তোত্তো-চান। আমি বইটার নাম আগে কখনও শুনিনি। একটা জাপানি বইয়ের বাংলা অনুবাদ। অনুবাদক মৌসুমী ভৌমিক। আমি ভেবেছিলাম ইনি নিশ্চয় অন্য কোনও মৌসুমী ভৌমিক হবেন কিন্তু না, ইনিই তিনি।

আমি চিনতাম না, কিন্তু তোত্তো-চান বিশ্বসাহিত্যের চেনা বই। আসল বইয়ের নাম আরেকটু বড়, গোটা নামটার অনুবাদ হচ্ছে ‘তোত্তো চানঃ জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটা’। লিখেছিলেন তেৎসুকো কুরোয়ানাগি, জাপানের জনপ্রিয় দূরদর্শন ব্যক্তিত্ব এবং সমাজসেবী। উনিশশো ঊনআশি থেকে আশি পর্যন্ত তোত্তো-চান জাপানের একটি সাময়িকীতে ধারাবাহিক হিসেবে বেরোত। একাশি সালে বই ছেপে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ কপি বিক্রি হতে থাকে। উনিশশো চুরাশি সালে আমেরিকায় প্রকাশিত হয় ডরোথি ব্রিটনের তোত্তো-চান-এর ইংরিজি অনুবাদ। তারপর পৃথিবীর অসংখ্য ভাষায়, ভারতবর্ষেও একাধিক ভাষায় অনুবাদ হয়েছে তোত্তো-চান। অনেক দেশে তোত্তো-চান স্কুলের পাঠ্যপুস্তক। 

জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকার সঙ্গে শাস্তি পাওয়ার একটা সম্পর্ক আছে। তোত্তো-চান একটি ছোট্ট মেয়ে। দুষ্টু মেয়ে। স্কুলে সে খালি ঝামেলা করে, ক্লাসে মন দেয় না, বিঘ্ন ঘটায়। তাকে কেবলই জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে পাঠান শিক্ষকরা। অবশেষে এমন এক দিন আসে যখন স্কুল থেকে তোত্তো-চানকে বিদায় দেওয়া হয়। তখন তোত্তো-চানের মা তাকে নিয়ে যান একটা নতুন স্কুলে, স্কুলের নাম তোমোই গাকুয়েন। প্রথম যে জিনিসটা তোত্তো-চানকে চমকে দেয় সেটা হচ্ছে স্কুলবাড়িটা। ক্লাসগুলো বসে পুরোনো রেলগাড়ির কামরার মধ্যে। হেডমাস্টারমশাইয়ের ঘরে ঢুকে আরও বিস্ময়। মাস্টারমশাই ওকে বলেন ওর যা বলার আছে বলতে। যা ইচ্ছে বলতে। অবাক হয়ে যায় তোত্তো-চান। আগের স্কুলে ওকে কেবলই মুখ বন্ধ করতে বলা হত, আর এখানে কি না কথা বলতে বলা হচ্ছে? যত খুশি? সে স্কুলের আরও অনেক অবাক-করা নিয়ম ছিল। স্কুলে কখন কোন বিষয় পড়া হবে সে সব ঠিক করত ছাত্ররাই। টিফিন খাবার সময়ও ভীষণ মজা। হেডমাস্টারমশাই আর তাঁর স্ত্রী তদারকি করতেন। সকালবেলা পড়া হয়ে গেলে দুপুরবেলা নদীর তীর ধরে হাঁটতে যাওয়া হত। চাষবাস শেখা হত। তোমোই গাকুয়েনে তোত্তো-চানের এমন অনেক সহপাঠী ছিল যারা অন্য স্কুলে হয়তো ওর সহপাঠী হতেই পারত না। একজন বন্ধুর পায়ে ছিল পোলিও। তাকে তোত্তো-চান কেমন করে ঠেলে গাছে তুলেছিল সে বর্ণনা পড়লে আপনার শ্বাস রুদ্ধ হবে, চোখে জল আসবে। আরেকজন সহপাঠী ছিল তোত্তো-চানের থেকে বয়সে অনেক বড় কিন্তু হাইটে সমান সমান। সবথেকে বড় কথা তোত্তো-চানের তো তখনও আরও অনেক লম্বা হওয়া বাকি ছিল, কিন্তু ওর বন্ধু আর কখনও লম্বা হত না। 

তোত্তো-চান বইয়ের অসাধারণ ছবিগুলোর শিল্পী চিহিরো ইবাসাকি। ইবাসাকি কিন্তু বইটার জন্য ছবিগুলো আঁকেননি। তোত্তো-চান ছেপে বেরিয়েছে উনিশশো একাশিতে আর ইবাসাকি দেহ রেখেছেন উনিশশো চুয়াত্তরে। তেৎসুকো কুরোয়ানাগি চিহিরো ইবাসাকির গুণমুগ্ধ ছিলেন। পেনসিলের দু’চারটি টানে ছোট ছেলেমেয়েদের ভাবভঙ্গি, দৌড়নো, বসে থাকা, মনখারাপ কেমন ফুটিয়ে তুলতে ইবাসাকি তা দেখে অবাক হতেন। তাই তিনি চিহিরো ইবাসাকির ছবির মিউজিয়ামে গেলেন এবং তাঁর পরিবারের লোকেদের সম্মতি নিয়ে কয়েকটা ছবি বেছে নিয়ে এলেন তোত্তো-চান বইয়ের জন্য। একলা মেয়ে, গাছের তলায় দৌড়ে আসা ছেলেমেয়ের দল এমন সব ছবি ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে অলৌকিক ভাবে খাপ খেয়ে গেল। 

রেলগাড়ির কামরার ভেতর সেই তোমোই গাকুয়েন স্কুলে কাটানো তোত্তো-চানের কয়েকটা বছরের গল্প নিয়ে এই বই। আসলে কিন্তু এটা একেবারেই গল্প নয়। তেৎসুকো কুরোয়ানাগির কথায়, “এই বইয়ের একটি ঘটনাও আমি আমার খেয়ালখুশি মতন বানিয়ে লিখিনি।" তোমোই গাকুয়েন বলে সত্যি একটা স্কুল ছিল। সত্যিই সেই স্কুলটা বসত রেলগাড়ির পুরোনো কামরার ভেতর। পুরোনো স্কুল থেকে দুষ্টুমি করার জন্য সত্যি সত্যি বার করে দেওয়ার পর তেৎসুকো কুরোয়ানাগির মা সত্যি সত্যি সে স্কুলে তাঁকে ভরতি করতে নিয়ে গিয়েছিলেন, আর তোমোই গাকুয়েনের মতো স্কুল যার মাথা থেকে বেরিয়েছিল, হেডমাস্টারমশাই, তিনিও ছিলেন পৃথিবীর মাটিতে হেঁটেচলে বেড়ানো রক্তমাংসের একজন সত্যি মানুষ। সোসেকু কোবায়াশী। কোবায়াশী ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ। দেশবিদেশ ঘুরে তিনি যত ভালো ভালো আইডিয়া জোগাড় করেছিলেন সেগুলো সব তাঁর নিজের স্কুলে প্রবর্তন করেছিলেন।

বইয়ের বেশিরভাগটাই জুড়ে তোমো গাকুয়েন স্কুলের কথা থাকলেও তোত্তো-চানের বাড়ির গল্প আছে, মাবাবার সঙ্গে মেলায় গিয়ে মুরগির ছানা কেনার গল্প আছে, বাড়িতে খেলার সঙ্গী কুকুর রকির গল্প আছে। আর আছে ঘনিয়ে আসা যুদ্ধের কথা। বড়দের কাছে সে যুদ্ধের খবর আসে রেডিও, কাগজ বেয়ে, আর ছোট্ট তোত্তো-চান দেখে স্কুলে যাতায়াতের পথের ভেন্ডিং মেশিনটা, যেটায় টাকা গুঁজে দিলেই চকোলেট পড়ত টপ করে, সেটা একসময় খালি হতে হতে পুরো ফাঁকা হয়ে গেল। চকোলেট ভরতে আর এল না কেউ।

বোমা পড়ে তোমোই গাকুয়েন ধ্বংস হয়ে যায় উনিশশো পঁয়তাল্লিশে। কোবায়াশী তোমোই গাকুয়েন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন উনিশশো সাঁইত্রিশে। জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি নেহি। ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কোবায়াশী নাকি বলেছিলেন, পরের স্কুলটা কেমন হবে? তিনি মারা গিয়েছিলেন উনিশশো তেষট্টিতে। কিন্তু আরেকটা তোমোই গাকুয়েন কোনওদিন তৈরি হয়নি। 

ছোটবেলার স্কুল একটা অন্যরকম ব্যাপার। সে যতই সাধারণ হোক। আমাদের জীবনের একটি অসাধারণ অংশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বলেই বোধহয়। কিন্তু সে স্কুল যদি তোমোই গাকুয়েনের মতো অসাধারণ হয়, আর তেৎসুকো কুরোয়ানাগির মতো কেউ অসাধারণ ভাষায় সেই স্কুলের গল্প লেখেন?

আমি জাপানি ভাষা জানি না। মৌসুমী ভৌমিকও নাকি জানেন না। তিনিও তোত্তো-চান অনুবাদ করেছেন ডরোথি ব্রিটনের ইংরিজি অনুবাদ থেকেই। না করে থাকতে পারেননি। মৌসুমী ভৌমিক আরও যদি অনুবাদ করেন, পড়তে রাজি আছি। স্পোর্টসের দিনের আনন্দ, স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে টিফিন খাওয়ার সুখ, স্কুলের মেঝেতেই কাল্পনিক ক্যাম্পে তাঁবু খাটিয়ে ঘুমোতে যাওয়ার উত্তেজনা - যদি ভুলে গিয়ে থাকেন, তোত্তো-চান একবার পড়ে নিন। সব মনে পড়ে যাবে। 


October 28, 2018

কথোপকথন



ক্যায়সে ইংলিশ বোলতে হ্যায় ইয়ে লোগ। 

অভিযোগটা মিস করে যেতে পারতাম। কারণ সমস্ত মনোযোগ ন্যস্ত ছিল দুহাতে ধরা পাসপোর্টে। কাজটা যতটা কঠিন হবে ভেবেছিলাম তার থেকেও কঠিন। জানালার সিট চেয়ে এমারজেনসির এক্সিটের জানালার সিট পেয়েছি। ওটা অনেকের কাছেই কভেটেড কারণ পা ছড়ানো যায়, সামনের সিট অসভ্যের মতো নাকের ওপর পড়ে না। মুশকিল একটাই, ওই সিটে বসলে পায়ের সামনে তো বটেই, কোলেও কোনও রকম হ্যান্ড লাগেজ রাখা বারণ। সব তুলে দিতে হবে ওভারহেড বিনে। ব্যাগ, মানিব্যাগ, পাসপোর্ট সব। 

প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আমার এ বারের বনযাত্রার থিম পাসপোর্ট না হারানো। ব্যাগ তুলে দিয়েছি, কিন্তু পাসপোর্ট দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বসে আছি। নেক্সট আটঘণ্টা এই ভাবেই বসে থাকব। এদিকে প্লেন ছেড়েছে রাত আড়াইটেয়। যখনতখন ঘুমিয়ে পড়তে পারি এবং হাতের গ্রিপ খুলে পাসপোর্ট পড়ে যেতে পারে। কাজেই ওই মুহূর্তে অন্য কোনও দিকে মন দেওয়ার প্রশ্নই নেই। 

আমি সাধারণত পারিপার্শ্বিকের দিকে দরকারের বেশিই নজর দিই। সামনের লোকের অর্ধেক কথা মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে অথচ তিনটে টেবিল পেরিয়ে চতুর্থ টেবিলের কে কার বাবা কে শ্বশুর, ফার্স্ট ডেট চলছে নাকি ব্রেক আপ হবে হবে, কে তারকভস্কি দেখে কে তারানতিনো সে সব আমি ক্যাচ করে ফেলেছি - এ রকম অনেক বার ঘটেছে।  

এই রকম কমপালসিভ লোক-দেখিয়ে হওয়া সত্ত্বেও ওই মুহূর্তে আমি আমার আশেপাশের লোকজনের দিকে দেখিনি। দেখিনি মানে কি একেবারেই দেখিনি? আমার যে রকম দেখা স্বভাব তার তুলনায় কম দেখেছি, কিন্তু যাঁরা একেবারেই দেখেন না তাঁদের তুলনায় বেশি দেখেছি। ভদ্রমহিলার চেহারা কেজো। পোশাকআশাকে ফ্যাশনের থেকে ফাংশানের ওপর জোর বেশি। ছোট চুল, সালওয়ার কামিজ। আর দেখেছি, দেখিনি কারণ ও জিনিস দেখা যায় না, কিন্তু টের পাওয়া যায় অব্যর্থ - আত্মবিশ্বাসের অভাব। মহিলা টিকিট হাতে নিয়ে ঠিক রো-তে ঠিক সিটের সামনে এসে সবাইকে জিজ্ঞাসা করছিলেন যে ঠিক জায়গায় এসেছেন কি না। আমাকেও করেছিলেন, পাসপোর্ট থেকে চোখ না সরিয়ে হুঁহাঁ-তে সেরেছি। কিছুক্ষণ বাদে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট এসে মহিলাকে বলেছেন যে ওঁর হাতব্যাগ ওপরে রাখতে হবে। মহিলা নির্বাক। অ্যাটেনডেন্ট জিজ্ঞাসা করছেন, ডু ইউ স্পিক ইংলিশ ডু ইউ স্পিক ইংলিশ, মহিলা হ্যাঁ না-ও বলতে পারছেন না, জাস্ট তাকিয়ে আছেন। সেই একবার পাসপোর্টের সাধনা ভঙ্গ করতে হয়েছিল। ভদ্রমহিলা উঠে গিয়ে ব্যাগ রেখে এসেছেন। এবং আমি আবার আমার সাধনায় ফিরে গেছি। 

এমন সময় ওপরের মন্তব্য। স্বগতোক্তির মতো শোনালেও যেটা আসলে বলা হয়েছে আমাকেই উদ্দেশ্য করে। সাড়া না দেওয়া অভদ্রতা। সেকেন্ড তিনেক খরচ করে কনটেক্সটটা বুঝলাম। পেছনের সিটে একদল জার্মান যাত্রী বসে আছেন। অ্যাটেনডেন্টদের ডেকে ডেকে জল চা কফি চাইছেন। খালি বিশেষ্য পদ আর থ্যাংক ইউ, প্লিজ, এক্সকিউজ মি। টি, প্লিজ। ওয়াটার, থ্যাংক ইউ। 

পাসপোর্ট থেকে চোখ সরিয়ে মহিলার দিকে তাকালাম। 

মহিলা আবার বললেন, ক্যায়সে ইংলিশ বোলতে হ্যায় শুনা হ্যায়? 

না হেসে যতখানি হাসার ভঙ্গি করা যায় করলাম। তাতেই গড়গড়িয়ে বেরিয়ে এল। 

মহিলার বাবা কাকা দাদা সবাই প্রফেসর। হোমরাচোমরা ব্যাপার। আমার পেশা জানতে চাইলেন। ভয়ে ভয়ে বললাম। ভাবছি খারাপ ইংরিজি বলার সঙ্গে এসবের সম্পর্ক কী, তখনই মহিলা বললেন উনি নিজে স্কুলে পড়ান। ফ্যামিলির সবার মতো ওঁরও পি এইচ ডি আছে। মুখের আলো অল্প ডিম করে জুড়ে দিলেন, হিন্দিতে।  

কুয়াশাটা অল্প কাটল কি? 

মহিলা বললেন, এমন শিক্ষিত বাড়ি, কিন্তু বাড়িতে কথাবার্তা, পড়াশোনা, লেখাজোখা সবই হিন্দিতে। উনি ইংরিজি জানেন না তা নয়, পড়তে পারেন, বুঝতে পারেন, দিব্যি লিখতেও পারেন। খালি মুখে বলতে গেলে হ্যাজ বিন, হ্যাভ বিন গুলিয়ে একাকার। আর এরা দেখুন ইজ, আর পর্যন্ত উড়িয়ে দিয়েছে এবং বিন্দুমাত্র লজ্জা পাচ্ছে না। 

বড় করে শ্বাস নিলাম। নিজেকে সংযত রাখা জরুরি। না হলে ব্রেক কষা মুশকিল হবে। একবার শুরু করলে থামতে পারব না। বলে ফেলব, আমি জানি আপনি ইংরিজি জানেন। পড়তে পারেন, বুঝতে পারেন, লিখতে পারেন। কিন্তু বলতে গেলে জিভ জ্যাম, হার্ট ঢেঁকি। ওদের সে রকম হয় না কারণ ওরা কনফিডেন্ট। তার অনেকটাই বিনা পরিশ্রমে পাওয়া। সুবিধেজনক গায়ের রং, সুবিধেজনক গোলার্ধে জন্ম। তার ওপর ওরা ইংরিজি বলাকে জীবনের মোক্ষ মনে করে না। আমাদের অনেক সুবিধে অলরেডি কম তার ওপর ইংরিজির জুজু। আমাদের সিনেমার ভাঁড়েরা ভুল ইংরিজি বলে। সন্তানকে বাংলা মিডিয়ামে দিলে শুভানুধ্যায়ীরা বলে যায় এর থেকে হাত পা বেঁধে জলে ফেলে দিলেই পারতে। ইংরিজি বলতে পারা আমাদের তূণের ব্রহ্মাস্ত্র, যা ছুঁড়ে আমরা সব প্রতিকূলতাকে জয় করতে পারি। আর সেই ব্রহ্মাস্ত্র বিনে শত কবচকুণ্ডল নিয়েও আমাদের কর্ণের কপাল, পি এইচ ডি বাগিয়েও আমরা নিরক্ষর সমতুল। 

অফ কোর্স, এ সব বলব না। কারণ আমি নিজেকে পাগল প্রমাণ করতে চাই না। এ সব বললে ভদ্রমহিলা সান্ত্বনা তো পাবেনই না, উলটে ভয় পেয়ে যাবেন। হয়তো অ্যাটেনডেন্টকে ডেকে বলবেন সিটটা চেঞ্জ করে দিতে। বলার সময় ইংরিজি ঠিক হল কি না কেয়ার করবেন না কারণ প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ ভুল ইংরিজি বলার হেনস্থাকে অবশেষে অতিক্রম করে যাবে। 

সেটা অ্যাকচুয়ালি খারাপ হবে না। 

কিন্তু আমার মানইজ্জতের পক্ষে ভালো হবে না। গোটা প্রলাপটা গিলে নিয়ে শুধু বললাম, ইংরিজি বলাটা স্রেফ কনফিডেন্সের ব্যাপার। না ঘাবড়ে বলে যাবেন। বোঝানো নিয়ে তো কথা। 

নতুন কথা নয়। উনিও জানেন নিশ্চিত। কিন্তু জানলেও সোজা নয় এতদিনের ভয় কাটানো। অনেকবার, বারবার, শুনতে শুনতে, মনে পড়তে পড়তে আজন্ম জমানো হীনম্মন্যতার পাহাড় যদি এতটুকুও টোল খায়, সেও অনেক। 

***** 

যে রেটে চোখে চোখে রেখেছিলাম, নিজে হারিয়ে গেলেও পাসপোর্ট হারাত না। তা বলেই যে যাত্রা স্বস্তির হয়েছিল তেমন নয়। ব্রেন সে ব্যাপারে কলকাঠি নেড়েছে। বার বার জিজ্ঞাসা করছে, পাসপোর্ট তো হাতেই আছে কিন্তু বাড়ির চাবি? সেটা কোথায় রেখেছ? রেখেছ কি আদৌ? চোখের সামনে তো দেখছি না। হারালে নাকি আবার? তুমি...সিরিয়াসলি। 

আমি ফিরে আসার আগে অর্চিষ্মান বেরিয়ে যাবে, ফিরবে মিনিমাম দশ দিন পার করে। কাজেই বাড়ির চাবি সঙ্গে থাকাটা ক্রুশিয়াল। 

ট্রেন স্টেশনে নেমে পাসপোর্ট আর ঘরের চাবি পরীক্ষা করে ফাঁকা বেঞ্চ দেখে বসলাম। 'তেরো ডিগ্রি অ্যান্ড লাইট ড্রিজল' ওয়েবসাইটের স্ক্রিনে যতখানি নিরীহ পড়তে লাগে বাস্তবে ততটা নয়। ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে দেজা ভু হল। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ফ্রাংকফুর্ট এয়ারপোর্টের লাগোয়া রেলস্টেশনের মেঘলা স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমি আগেও কেঁপেছি। কাঁপার বিকল্প হচ্ছে দরকার অনুপাতে জামাকাপড় প্যাক করে সুটকেস চেক ইন করা। ঝলমলে এয়ারপোর্টে কোটি কোটি লোকের সঙ্গে কনভেয়ার বেল্টের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা আর যতবার একেকটা করে সুটকেস মুখ বাড়ায় মনে করা, এইটা... না এইটাও আমার না...সর্বনাশ ওই লোকটা তুলে নিল যে, ওটাই কি আমার? দৌড়ে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করব? সিনক্রিয়েট হবে…তাছাড়া যদি আমার না হয়? আর ততক্ষণে যদি আমারটা এসে চলে যায়?… সবার সুটকেস চলে এল…আমার পাশে যে মহিলা ট্রলি নিয়ে আমাকে গুঁতোচ্ছেন, একে একে পাঁচটা সুটকেস তুলে নিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলেন…একটা ক্লান্ত সুটকেস ঘুরছে সেই শুরু থেকে, হয়তো মায়ের দেওয়া ছোট্ট লাল সুটকেসটাও অন্য কোনও বেল্টে ঘুরছে গোঁত্তা খেয়ে খেয়ে… 

তার থেকে বরং মেঘলা, স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আরও অনেকবার কাঁপব। 

ট্রেন এসে গেল। সুটকেস লাগেজের র‍্যাকে রেখে ব্যাকপ্যাক নিয়ে সিটের খোঁজে এগোলাম। সিট আগেভাগে বুক করা যায়। আমি করি না। কারণ এ সব দেশে মানুষের তুলনায় সিট বেশি। কোনওদিন কাউকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখিনি। জানালার ওপর সরু ফিতের মতো স্ট্রিপে দাগানো কোন কোন সিট অলরেডি বুকড। নন-দাগী একখানা সিট দেখে বসলাম। মাঝরাস্তায় একবার ট্রেন বদল নিয়ে ঘণ্টা দেড়-দুইয়ের রাস্তা। এই সময়টায় অনেক কিছু করা যায়। যে কাজে যাচ্ছি সেটা ঝালানো যায়। অবান্তরের পোস্ট ভাঁজা যায়, ছোটগল্পের আউটলাইন করা যায়। রাস্তার দুপাশের দৃশ্যগুলো চেনা। তবু তাকিয়ে রইলাম। শহরের কাছাকাছি অঞ্চলে রেললাইনের ঘাড়ের ওপর বাড়ি, ছোট ছোট জানালায় সাদা লেসের পর্দা। কোনও জানালায় ইনডোর প্ল্যান্ট, কোনও জানালার শিক থেকে ঝুলছে সসপ্যান, হাতাখুন্তি, কোনও জানালার পাশে মিনিম্যালিস্ট টেবিলল্যাম্প। রাতে এই ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়াশোনা করে কেউ একাগ্র হয়ে। দৃশ্যটা কল্পনা করে আমার পড়তে বসতে ইচ্ছে করে হঠাৎ। শহর ছাড়ালে গাছপালা জঙ্গল। জঙ্গলের মাঝে মাঝে তিনকোণা ছাদ, জানালায় ফুলওয়ালা বাড়ি। বিস্তৃত মাঠ। 

ডু ইউ থিংক দিজ আর ফার্মল্যান্ডস? 

সহযাত্রীর নাম জিজ্ঞাসা করা হয়নি। মালয়েশিয়ার মেয়ে। ফ্রাংকফুর্টের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমি যখন কাঁপছিলাম এ তখন মাথায় টুপি, হাতে দস্তানা গলাচ্ছিল। কোলের ওপর রাখা ঠোঙা থেকে অল্প মাথা বার করা প্রেটজেলের ওপর ফোন তাক করে ছবি তুলছিল। পিঠে ব্যাকপ্যাক, হাতে প্রায় নিজের সমান সাইজের একটা হলুদ সুটকেস। বেড়াতে এসেছে। ওরও নাকি বনে যাওয়ারই কথা ছিল, গন্তব্য বদলে যাচ্ছে কোবলেনজ। আর কোথায় কোথায় যাবে জিজ্ঞাসা করতেই ডিফেন্সিভ হয়ে গেছে। হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বেশি সময়ে কম ঘুরছ কি না, কম সময়ে বেশি ঘুরছ কি না, আসল জিনিসটাই বাদ দিয়েছ কি না, লোক্যাল কুইজিন টেস্ট করেছ কি না, করলেও কোন দোকানে করেছ - বেড়ানো নিয়ে লোকে যা জাজ করে, বই পড়া নিয়েও তত করে কি না সন্দেহ।  

মেয়েটি জানাল যে ও তাড়াহুড়ো করে ঘুরতে বেড়াতে ভালোবাসে না। আশ্বাস দিলাম আমিও বাসি না। প্রসঙ্গ ঘোরালাম। জিজ্ঞাসা করলাম, প্রেটজেল খেতে ভালোবাস? 

মেয়ে একেবারে লাফিয়ে উঠল। বলল, কী দাঁতভাঙা খাবার রে বাবা। ওর কোন এক জার্মান ফ্রেন্ড নাকি মালয়েশিয়ান খাবার খেয়ে দুয়ো দিয়েছে এই বলে যে তোমাদের খাবার তো চিবোতেই হয় না। ও নাকি প্রেটজেলের ছবি তুলে ওই বন্ধুকেই পাঠাচ্ছিল এই লিখে যে তোমাদের খাবার চিবোতে দাঁত ভেঙে যায়। জার্মান খাবারের নিন্দে করে খানিক বন্ডিং হল। বললাম আমার যদিও প্রেটজেল মচৎকার লাগে। একটা নিয়ে বসলে টাইমপাস হয় আর খাওয়ার পর অনেকক্ষণের জন্য নিশ্চিন্তও থাকা যায়, কিন্তু আমার চেনাশোনা অনেকেই প্রেটজেল দু’চক্ষে দেখতে পারে না। বললাম, মালয়েশিয়ার খাবার আমার খুব ভালো লাগে। মালয়েশিয়ার খাবারদাবারের ব্যাপারে যেটুকু জানা ছিল, যথাক্রমে পেনাং কারি এবং রোটি চানাই, সে দুটোর নাম করে দাবিটা জোরালো করার চেষ্টা করলাম। 

ভাবলাম এবার নিশ্চয় ভারতীয় খাবারের কথা উঠবে। মিষ্টি দই, রসগোল্লার প্রত্যাশা করাটা বাড়াবাড়ি, সম্ভবতঃ বাটার চিকেন সম্পর্কে জানতে চাইবে। বাটার চিকেন সম্পর্কে কী কী ভালো কথা বলা যায় মনে মনে পয়েন্ট করার চেষ্টা করছি এমন সময় মেয়েটা আমাকে জিজ্ঞাসা করল, 

ডু ইউ ফিল সেফ ইন ইন্ডিয়ান রোডস? 

ওর কোন বন্ধু নাকি শ্রীলংকা ঘুরে গেছে, ইন্ডিয়া আসার জন্য মহা এক্সাইটেড। কিন্তু বন্ধুর স্বামী ভয়ে কাঁটা। সে বলেছে একা একা ইন্ডিয়া আসার কোনও দরকার নেই, যবে তার অফিস ছুটি পাওয়া যাবে তবে দুজনে মিলে আসা যাবে ইত্যাদি। 

ইংরিজি বলা নিয়ে কেউ কিছু বলতে এলে উত্তর আমার তৈরি আছে, কিন্তু একাধিকবার এই প্রশ্নটার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও এর উত্তর আমার তৈরি করা নেই। অ্যাঁ, মানে, ইয়ে এইসব করতে করতেই কোবলেনজ এসে গেল। ঢাউস হলুদ সুটকেস নিয়ে নেমে গেল মেয়েটা। যাওয়ার আগে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেল। বন আসতে তখনও খানিকটা পথ বাকি। আমি ফের জানালা দিয়ে দৃশ্যাবলী দেখায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।


October 21, 2018

এখানে ওখানে



আমাকে একটা রেললাইন দিন। লাগোয়া একটা প্ল্যাটফর্ম। কালীপাহাড়ির মতো ভালো দেখতে প্ল্যাটফর্ম হওয়ার দরকার নেই। কদাকারও হলেও চলবে। তার ওপর দাপুটে, বদমেজাজি। কালীপাহাড়ির তিনখানা প্ল্যাটফর্ম পাশাপাশি জুড়লে তার একটা হয়। সে রকম ষোল বা ওই রকমই হাস্যকর গুনতির অনেকগুলো প্ল্যাটফর্ম পাশাপাশি রাখুন। গিজগিজ ভিড়। দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে, উবু হয়ে, হেলান দিয়ে, দৌড়ে। ভিড়ের মাথায়, মাথার তলায়, কোলে, কাঁখে, গোড়ালির ফাঁকে লটবহর। মগজের সুইচ অফ সে ভিড়ের। অন্তরীক্ষ থেকে যান্ত্রিক গলা আর বোর্ডে লাল দপদপে আলো তাদের চালনা করছে। পাঠাচ্ছে এদিকসেদিক। কুকুরবেড়াল শুয়োর হনুমান, পাখিরাও আছে। গ্রাসাচ্ছাদনের ধান্দায় ঘুরছে ভিড়ের আড়ালে আবডালে। 

গরম নেই। কিন্তু তাপ আছে। এতগুলো লোকের কোঁচকানো ভুরু, মাল বওয়ার ক্লান্তি, অপেক্ষার শ্রান্তি এবং ভালোয় ভালোয় গন্তব্যে পৌঁছনো হয় কি না হয় টেনশনের আঁচ, আবহাওয়ায় আনমিসটেকেবল।  

গোটা দৃশ্যের একটি ছোট অংশে এইবার নড়াচড়া শুরু হল। না না, নড়াচড়া তো ছিলই শুরু থেকে, সেই সর্বব্যাপী এবং সর্বগ্রাসী চাঞ্চল্যের ওপর বাড়তি চাঞ্চল্য। প্রথমে চাঞ্চল্যের কারণ বোঝা যাবে না। তারপর ভিড়ের মাথার ওপর তার মাথা দেখা যাবে। ধাতব, শীতল, কঠিন। ধীরগতি ও ভয়াল। রুদ্ধশ্বাস ভিড় আলপিনের মতো এগোবে চুম্বকের দিকে। 

আপনি আমার প্রতিকূলতা বাড়াতে চান? বাড়ান। হাতে ভি আই পি সুটকেস ধরান। গলা থেকে ঝোলান চার হাতি বস্ত্রখণ্ড। একসময় একে বশে রাখার উপায় আমার জানা ছিল। ভি-এর মতো ভাঁজ করে কাঁধের জামার সঙ্গে ক্লিপ দিয়ে গুঁজে রাখতাম। সোনালি গায়ে খাঁজকাটা ডিজাইনের ক্লিপদুটো আমার কলকাতার কলেজের বন্ধুরা ক্লাসের ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। আর ইউ ম্যাড? সে সব মফস্বলী ম্যাডনেস আমার ঘুচে গেছে। ক্লিপ তো নেইই, শখ করে দাম দিয়ে ফুরফুরে ওড়না কেনা হয়েছে, সে নিজের উপযোগিতা প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টায় গলা আঁকড়ে ঝুলছে, এখানে লটকাচ্ছে, ওখানে ফাঁসছে। সিনে সহযাত্রী আমদানি করুন, আমার দশ কেজির নীল ভি আই পি-র বদলে তাঁর হাতে পঁয়ত্রিশ কেজির লাল অ্যামেরিক্যান টুরিস্টার তুলে দিন। যা দিয়ে উনি আমার ভি আই পি-কে গুঁতিয়ে লাইন ভেঙে আগে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। সংসার সমরাঙ্গনে আমার সহযোদ্ধার মনোবল ভেঙে দিন। এই অসম লড়াইয়ে আমাকে সাহায্য করার বদলে সে ক্রমাগত আমাকে নিরুৎসাহ করার চেষ্টা করুক। কী করছ? পড়ে যাবে, ছেড়ে দাও, যে আগে যেতে চাও যেতে দাও, হকের লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসো, হার মানো।  

এতেও মন ভরছে না আপনার? আপনি ট্রেনটাও থামাতে চান না? অল্প চালু রাখতে চান? রাখুন। ইন ফ্যাক্ট, আমি সেটাই প্রেফার করব। কারণ ওইটা শেষমেশ আমার প্রতিযোগিতাদের ছিটকে দেবে। অ্যামেরিক্যান টুরিস্টার রানিং ট্রেন সামলাতে পারবে না। আমি হেঁইও বলে আমার বাক্স সিঁড়ি টপকে ট্রেনের মেঝেতে তুলে দেব, হ্যান্ডেল ধরে নিজেকে চাগিয়ে নেব সিঁড়িতে, ওড়নাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেব, সঙ্গে আসতে হলে এস, যেতে চাইলে, ফ্র্যাংকলি, আই ডোন্ট কেয়ার। অমনি সে সুড়সুড় করে এর সুটকেসের হাতল, ওর চটির তলা থেকে নিজেকে মুক্ত করে আমার গলায় লটকে যাবে অদৃশ্য ক্লিপের তলায়। এইবার খালি বগিতে ঢুকে সিট নম্বর খুঁজে সিটের নিচের খাঁ খাঁ অভ্যন্তরে ভি আই পি সেট করে দিয়ে জানালার পাশে আরাম করে বসা আর অপেক্ষা করা কখন যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে দেওয়া সহযোদ্ধা এসে পাশের খালি জায়গাটায় বসবে। বসে মাথা নেড়ে বলবে, কোনও দরকার ছিল? 

***** 

আপনি আমাকে একটা রাস্তায় নামান। বড় রাস্তা। বড় শহরের রাস্তা। যে শহরে কয়েকদিন ধরে স্পেশাল কিছু একটা ঘটছে। ঘটবে আরও ক’দিন। সে সব শহরের সে সব রাস্তাতে এমনি সময়েই অনেক আলো থাকে, স্পেশাল ক’দিনে তার ওপর স্পেশাল আলো। এত আলোতেও চারদিক যতখানি আলোকিত হলে ইম্প্রেসড হওয়া যেত, ততখানি হচ্ছে না। সাধারণ আলোতে কেন কাজ দিচ্ছে না সেই রহস্যটা কনট্রাক্টর আর ভারপ্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ লোকেরা বলতে পারবেন, স্পেশাল আলোতে কেন হচ্ছে না সেটা আমি বলতে পারি। আগেও খেয়াল করেছি, এ সব আলো খালি ঝলকায় ফ্রকের চুমকিতে, গগলসের সবুজ ডাঁটিতে, প্রেমিকপ্রেমিকার চোখের তারায়। শহরের রাস্তার মতো বোরিং ব্যাপার আলোকিত করার দায় নেই এর।  

যাই হোক, সেই ঝলমলে আলোর নিচে আবছা অন্ধকারে আমি দাঁড়িয়ে আছি। পাশে আমার সহযোদ্ধাও আছে। আগের যুদ্ধে যে আমাকে ফেলে পিঠটান দিয়েছিল। কেন দাঁড়িয়ে আছি, কেন এই ক’দিন রাস্তায় বেরোনোর পরিণতি হাড়ে হাড়ে জানা সত্ত্বেও বাড়িতে বসে পুজোবার্ষিকী পড়ছি না, কিংবা কেন জানালা বন্ধ করে লাইট নিভিয়ে ফ্যান পাঁচে চালিয়ে বেডকভার গায়ে চাপা দিয়ে ঘুমোচ্ছি না এ সব প্রশ্ন করবেন না।  

আমাদের আশেপাশে আরও অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছেন। মিনিটে মিনিটে আরও লোকেরা এসে জড়ো হচ্ছেন। বোঝা গেল ওখানে এ রকম ভিড় এমনিতেই থাকে, কিন্তু দফায় দফায় সে ভিড় পাতলা করে দেওয়ার উপায়ও থাকে। এখন স্পেশাল সময়ে সে সব উপায় অন্তর্হিত হয়েছে। বাড়ি যাওয়ার আরেকটা উপায় আছে অবশ্য। ফোনে চার্জও আছে, ডেটাও আনলিমিটেড। তবু ওলা উবার ডাকছি না কেন? কারণ চতুর্থীর রাতে অনেক প্যান্ডেলের প্রতিমার হাতে অস্ত্র না উঠলেও ওলাউবার দশ হাতে খাঁড়া, বল্লম, চক্র, গদা নিয়ে নেমে পড়েছে। বনবন ঘোরাচ্ছে এলোপাথাড়ি যেদিকে পারে। ঢাকুরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে গাঙ্গুলিবাগান, তাও পুল, বলে নাকি দুটো সিট মাত্র দুশোটাকায় পাওয়া যাচ্ছে, নিতে হলে নিন না হলে আর পনেরো মিনিট পরে সাড়ে তিনশো হয়ে যাবে। হোক গে, বলে ফোন অন্ধকার করে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলাম। সহযোদ্ধাকে সবে বলতে গেছি, চক্ষুলজ্জা বলে জিনিসটাই চলে গেছে বুঝলে? অমনি দেখি সহযোদ্ধার দৃষ্টি চলে গেছে আমার মাথার ওপর দিয়ে পেছনদিকে, চোখ বিস্ফারিত, হাঁ মুখে ওই অন্ধকারেও অনির্বচনীয় আলো, যেন সব জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর মিলে গেল এক্ষুনি।  

পঁয়তাল্লিশ!  

কোথায় যেন শুনেছিলাম বেয়াল্লিশ... বলতে না বলতে ভিড়ের শরীরে আসন্ন যুদ্ধের আভাস। যত না বেগ তার থেকে জোরে ল্যাগব্যাগ করতে করতে আসছে একটা টিনের বাস, বাসের গা থেকে ঝুলছেন সবুজ গেঞ্জি পরা একজন লোক। গলা সপ্তমে তুলে চেঁচাচ্ছেন, কী চেঁচাচ্ছেন কিছু বোঝা যাচ্ছে না, এইটুকু খালি স্পষ্ট যে এঁর মতো পাওয়ারফুল লোক এই মুহূর্তে এ শহরে বেশি কেউ নেই। 

কবজিতে টান, চিন্তাসূত্র পটাং, ঘাড় ঘুরিয়ে আমার নিড়বিড়ে সহযোদ্ধার খোলস ছিঁড়ে আবির্ভাব হয়েছে এক নতুন মানুষ, দৈর্ঘ্য প্রস্থে অবিকল আগের জন কিন্তু চোখেমুখে এমন জ্বলজ্বলে প্রত্যয়, গত আট বছরের চেনায় দেখেছি কি না মনে করতে পারছি না।  

ছুটতে পারবে? 

অবান্তর প্রশ্ন, কারণ আমি অলরেডি ছুটছি। সহযোদ্ধা আমার কবজি ধরে ছুট লাগিয়েছেন এবং আমাকে ছুটতে বাধ্য করছেন। আমাদের আগে পরে আরও কোটি কোটি লোক ছুটছে। কোনও একটা সামনের বিন্দু লক্ষ করে যেখানে পরমপ্রতাপশালী সারথি তাঁর বাস থামাতেও পারেন আবার নাও পারেন।  

একবার বলার চেষ্টা করলাম, পরের পঁয়তাল্লিশের জন্য অপেক্ষা… 

পঁয়তাল্লিশ মিনিটেও আসবে কি না গ্যারান্টি নেই। সহযোদ্ধা স্পিড বাড়ালেন। 

বাস থামল। কিছু লোক প্রচণ্ড বেগে দৌড়ে, পেছন থেকে রীতিমত কমপ্লেক্স দিয়ে ওভারটেক করে এসে দরজার সামনে ব্রেক কষেছেন। ও দাদা উঠবেন না তো এই মারাত্মক স্প্রিন্ট টানলেন কেন?  

ঝুলব বলে। ফুরফুরে পাঞ্জাবী পরেছি, ইস্তিরি মাটি করি আরকি। ভেতরে যেতে হয় আপনি যান, আপনার আঁচল সেফটিপিন থেকে আলাদা হয়ে ছিঁড়েকুটে যাক, আমার পাঞ্জাবী যেন না টসকায়।  

ওই প্রস্থের দরজা দিয়ে ওই বেগে অত লোক একসঙ্গে ঢোকা, স্পেশাল দিন বলেই সম্ভব। বাসের ভেতর পা দেওয়ার মুহূর্তে সবুজ গেঞ্জির প্রচণ্ড থাবড়ায় বাস ছেড়ে দিল, রামধাক্কায় আমার কবজি থেকে সহযোদ্ধার হাত খসে গেল এবং জনতার স্রোত আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল বাসের প্রায় ল্যাজের দিকে। আমার ডান পা বাসের মেঝেতে, বাঁ হাঁটু অল্প মণিপুরি নাচের ভঙ্গিতে ঝুলন্ত ও বঙ্কিম। ডান হাত দিয়ে প্রাণপণে নিজের পার্সের মুখ চাপা দিয়ে রেখেছি এবং বাঁ হাত সেঁটে গেছে সামনের মহিলার পার্সের গায়ে। 

সহযোদ্ধা বাসে উঠেছেন সেটুকু জানি, কিন্তু আশেপাশে নেই। ভিড়ের মধ্যে আপাতত আমি একা। তাতে চিন্তার কিছু নেই। একা এসেছি, একা যাব। ঢাকুরিয়া থেকে গাঙ্গুলিবাগানের রাস্তাটুকু একা পেরোতে আর কী।  

সমস্যাটা হচ্ছে, আমি গাঙ্গুলিবাগান ভালো করে চিনি না। অন্য সময় বাঁ ফুটে সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার দেখলে বুঝি এসে গেছি, এখন কোথায় সত্যনারায়ণ, আমার দৃষ্টি জুড়ে সামনের মহিলার খোঁপা, নাকটা কোনওমতে সাইড করে অক্সিজেন কার্বন ডাই অক্সাইডের রাস্তা খোলা রেখেছি। মাঝে মাঝে সবুজ গেঞ্জির সেলিমপুর, সুলেখা মোড়, বাঘা যতীন চেঁচিয়ে চলেছেন তাও কাজে দিচ্ছে না কারণ সে সব স্টপের পরম্পরা আমার মুখস্থ নেই। গাঙ্গুলিবাগান নামতে হলে কখন রেডি হতে হবে, কখন ঠেলতে শুরু করতে হবে এ সব ব্যাপারে আমি ক্লু লেস। 

আমার সহযোদ্ধা অবশ্য নন। হেঁটে, রিকশায়, বাসে, অটোতে যতরকম ভাবে একটা রাস্তা পার হওয়ার যায়, এই শহরের এই রাস্তাটুকু তিনি সবরকম ভাবে পার হয়েছেন। হাঁক দিয়ে আমাকে অবগত রাখা তাঁর পক্ষে জলভাত। কিন্তু তিনি আজকে নিজের স্বাভাবিক জাড্য নস্যাৎ করে ওই স্পিডে দৌড়ে আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছেন, আজকেই আবার টইটম্বুর বাসে আমাকে ডেকে ডেকে লোকেট করে নিজেকে লোকচক্ষুর যথাসম্ভব আড়ালে রাখার সাধনায় বিঘ্ন ঘটাতে রাজি হবেন কি? স্পেশাল দিনেও একজনের কাছ থেকে এতগুলো সারপ্রাইজ আশা করা অন্যায়। হয়তো চুপচাপ বাস থেকে নেমে যাবেন এবং ফোন করে জানানোর চেষ্টা করবেন যে এইবার আমাকেও নেমে পড়তে হবে। ডানহাতের আঙুল বুলিয়ে পার্সের ভেতর ফোনটাকে অনুভব করলাম। বার করার তিলমাত্র সম্ভাবনা নেই।  

তক্ষুনি মির‍্যাকল ঘটে গেল। বাঘা যতীন না কী একটা আসতেই হুড়হুড় করে বাসের অর্ধেক লোক নেমে গেল। তার পরেও যা রইল নেহাত কম নয় কিন্তু আমি প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব খাটিয়ে তিনচারটে দরকারি স্টেপ নিয়ে নিলাম। সামনের মহিলার পার্স থেকে হাত সরিয়ে নিলাম, বাঁ পাটা নামিয়ে বাসের মেঝেতে স্থাপিত করলাম এবং শরীর ঘুরিয়ে নিলাম সেইদিকে যে দিকে আমার সহযোদ্ধা থাকলেও থাকতে পারেন। 

আন্দাজ অব্যর্থ। ঘোরামাত্র চোখে চোখে পড়ে গেল। কিছুক্ষণ আমরা ওইভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপর সহযোদ্ধা দরজার দিকে তাকিয়ে ভ্রুভঙ্গি করা মাত্র শরীরে যত শক্তি ছিল জড়ো করে সামনের লোককে ঠেলে (পেছনের লোকদেরও কৃতিত্ব দিতে হবে, তাঁদের ঠেলুনি ছাড়া এ অসাধ্য সাধন হত না।) পেছনের দরজা দিয়ে নেমে পড়লাম। 

সহযোদ্ধার হাত বাড়ানোই ছিল। চুলের ক্লিপ খুলে কানের কাছে ঝুলছিল, এক হাত দিয়ে সেটাকে সামলাতে সামলাতে অন্য হাত বাড়িয়ে তাঁর হাত ধরলাম। তিনি মাথা নেড়ে জিজ্ঞাসা করলেন, খুব কষ্ট হয়নি তো?



October 07, 2018

Lethal White, Cormoran Strike #4






(স্পয়লার থাকতে পারে।)

জে কে রোলিং বলেছেন, লিথ্যাল হোয়াইট লিখতে তাঁর ভয়ানক পরিশ্রম হয়েছে। কিন্তু বইটা লিখে তিনি আনন্দও পেয়েছেন খুব।

রবার্ট গ্যালব্রেথ ছদ্মনামে লেখা জে কে রোলিং-এর করমোরান স্ট্রাইক সিরিজের চতুর্থ বই লিথ্যাল হোয়াইট। আমি লিখতে যাচ্ছিলাম যে হ্যারি পটারের মতো এই সিরিজেও জে কে রোলিং ক্রমশ মোটা থেকে মোটাতর বই লিখছেন, তারপর গুডরিডস ঘেঁটে দেখলাম যে আগের তিনটে বই-ই সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশো পাতার মধ্যে ছিল। এইবারেই একলাফে ছশো ছাপ্পান্ন।

ছশো ছাপ্পান্ন পাতার একটাই ডিটেকটিভ গল্প আগে খুব বেশি কিংবা আদৌ পড়েছি কিনা মনে পড়ছিল না, কিন্তু সবেরই প্রথমবার আছে। পড়তে শুরু করলাম এবং বুঝলাম লিথ্যাল হোয়াইট আসলে দুটো বই। একটা রোম্যান্স, অন্যটা ডিটেকটিভ। পাঠকদের বোঝার সুবিধের জন্য পার্ট ওয়ান পার্ট টু আলাদা করেও দেওয়া আছে, ছোটখাটো ব্যতিক্রম বাদ দিলে পার্ট ওয়ানের অধিকাংশ জুড়ে রয়েছে রবিন করমোরানের রোম্যান্স আর দ্বিতীয়ার্ধে রয়েছে রহস্য গল্পটি।

এর আগের বইগুলোতেও স্ট্রাইক আর রবিনের ব্যক্তিগত জীবন ফোকাসে ছিল, তবে চারশো শব্দের মধ্যে আরেকটা রহস্য ফেঁদে তার জট ছাড়ানোর ঝামেলা ছিল বলে অল্প কথায় সারতে হয়েছিল। লিথ্যাল হোয়াইটে অত সংযম করেননি লেখক, শ'তিনেক পাতা হিরো হিরোইনকে বিনা শর্তে ছেড়ে দিয়েছেন।

করমোরান স্ট্রাইক আর রবিনে এলাকটের প্রেমের গল্পটার প্রতি আমার সমালোচনা প্রধানতঃ এই যে গল্পটা বোরিং। গত তিনটে বই ধরে আমরা দুজনের দুজনের প্রতি দুর্বলতার কথা জেনে আসছি। দুজনে ক্রমাগত একে অন্যের কথা ভাবছে এবং দেখা হবে মনে পড়লে ফাঁকা ঘরে বসে হেসে ফেলছে, অতি ঘোর সংকটের মুহূর্তে নিজেদের রোম্যান্টিক পার্টনার কিংবা বরবউকে ফোন না করে একে অপরের নম্বর টিপছে এবং তার পরেও ভাবছে, আমি কি তার মানে ওর প্রেমে পড়েছি? এটা অবশ্য এক্সক্লুসিভলি রবিনের ভাবনা। ওপরের প্রতিটি আচরণ তিন পাতা অন্তর অন্তর রিপিট করার পরও করমোরান স্ট্রাইকের মাথায় এ ধরণের কোনও সন্দেহের উদয় হচ্ছে না।)

যে কোনও সার্থক গল্পেই প্রধান উপাদান নায়কনায়িকার উদ্দেশ্য সফল হওয়ার পথে বাধাবিপত্তি। করমোরান রবিনের রোম্যান্সে অন্যতম প্রধান বাধা হচ্ছে রবিনের গত তিন বইয়ের বাগদত্ত এবং এই বইয়ে স্বামী ম্যাথিউ। অর্ডার দিয়ে বানানো। ড্রেকো ম্যালফয়েরও ফ্যান ক্লাব আছে শুনেছি, ম্যাথিউর চরিত্রের একটা ভালো দিকও যদি কেউ বার করতে পারেন তাহলে তাঁর চোখকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখার প্রস্তাব রইল আমার।

তাছাড়া করমোরান স্ট্রাইকের প্রেমিকারা তো আছেই। স্ট্রাইক কনভেনশনালি খারাপ দেখতে হলেও মেয়েদের কাছে তার আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য। এবং সে সব মেয়েরা হচ্ছে গিয়ে লন্ডনের উচ্চকোটি পার্টির প্রাণ। মডেল, সোশ্যালাইট। করমোরান স্ট্রাইক কমিটমেন্টে বিশ্বাস না করলেও মেয়েদের আকুতিতে মাঝে মাঝে সাড়া দিয়েই ফেলেন (পার বই অন্তত একবার) এবং তাঁর 'নো স্ট্রিংস' স্ট্যান্ডে অনড় থাকেন। বলাই বাহুল্য, মেয়েরা সেটা পারে না। তারা মুখে বলে 'নো স্ট্রিং' এদিকে মনে ইচ্ছে খেলিয়ে সংসার পাতার। তারপর যা হওয়ার তাই হয়, ব্রেক আপ এবং স্ট্রাইকের নিতান্ত মানসিক চাপ।

অন্য মেয়েদের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক হলেও করমোরান আসলে মনে মনে রবিনের ফ্যান। গল্পের নব্বই শতাংশ পুরুষ চরিত্ররাই অবশ্য রবিনের ফ্যান কারণ রবিন টেক্সটবই থেকে উঠে আসা সুন্দরী। যদিও সোনালি চুল, সরু কোমর ইত্যাদি জরাজীর্ণ কারণে নয়, স্ট্রাইক রবিনকে পছন্দ করে রবিন অন্য মেয়েদের মতো নয় বলে। রবিন দারুণ গাড়ি চালায়, বারো ঘণ্টায় বাইশটা সিগারেট খেলেও মুখে বড়া দিয়ে থাকে, বলে না হাতির মতো মুটোচ্ছ একটু কম খাও, এমন কী বনজঙ্গল হাঁটকাতে গিয়ে খোঁড়া পা নিয়ে স্ট্রাইক হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেও রবিন অন্য মেয়েদের মতো আহা বলে ছুটে আসে না, প্রশংসনীয় অ-নারীসুলভ উদাসীনতায় গাছের ডাল এগিয়ে দেয়।

তবে রবিন করমোরানের প্রেমের পথে প্রধান ভিলেন হচ্ছে করমোরান স্ট্রাইকের প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ড শার্লট। ম্যাথিউর জন্য একপিস বিশেষণটা খরচ করে ফেলে এখন আফসোস করছি, কারণ শার্লট ম্যাথিউর থেকেও সরেস। অ্যাকচুয়ালি, শার্লটের শয়তানির মধ্যে একটা দৈবী ব্যাপার আছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বোম ফেটে পা উড়ে যাওয়ার থেকেও শার্লটের সঙ্গে কাটানো ষোল বছরের ট্রমা বেশি করমোরানের। তবু শার্লটকে স্ট্রাইক এড়াতে পারে না। হাড়ে হাড়ে চেনা সত্ত্বেও যেই না ঝকমকে গাউন পরে সেজেগুজে শার্লট সামনে এসে দাঁড়ায়, স্ট্রাইক আবার শার্লটের জালে জড়িয়ে পড়তে থাকে। ঘুমের ভেতর দুঃস্বপ্নে শার্লট স্ট্রাইকের মগজের ভুলভুলাইয়ায় ঘুরে ঘুরে ব্ল্যাক ম্যাজিক করে সমস্ত গোপন দরজা উন্মুক্ত করতে থাকে।

চারটে গল্প লাগল বুঝতে, কিন্তু অবশেষে আমি বুঝতে পেরেছি, শার্লট হচ্ছে স্ট্রাইক সিরিজের ‘ইউ নো হু’। শার্লটের হরক্রাক্স কটা কোথায় লুকোনো আছে আমি জানি না, তবে সিরিজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শার্লট থাকছে সেটুকু জানি।

পার্ট ওয়ানের বেশির ভাগ রবিন করমোরানের ব্যক্তিগত জীবন চর্চার মাঝে মাঝে রোলিং পার্ট টু-র গোয়েন্দা গল্পটার ভিত্তিস্থাপন করে রাখেন। সিরিজের তৃতীয় গল্প কেরিয়ার অফ ইভিল-এ কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারকে ধরে দেওয়ার পর করমোরান স্ট্রাইক এখন সেলিব্রিটি গোয়েন্দা। রাস্তাঘাটে লোকজন অটোগ্রাফ টটোগ্রাফ নেয়। দেখা হলে মেয়েদের গাল গোলাপি হয়, পুরুষেরা হিংসে করে। এর মধ্যে একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষ, বিলি, স্ট্রাইকের অফিসে এসে জানায় যে কুড়ি বছর আগে সে একটি বাচ্চাকে খুন হতে দেখেছে। স্ট্রাইক তার কথা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারে না এবং অল্পস্বল্প খোঁজাখুঁজি শুরু করে। ঠিক এই সময় আরেকজন ক্লায়েন্ট আসেন স্ট্রাইকের কাছে। যে সে ক্লায়েন্ট নন, একেবারে সংস্কৃতি মন্ত্রী। তিনি ব্ল্যাকমেলড হচ্ছেন এবং মন্ত্রীর বিশ্বাস তাঁকে ব্ল্যাকমেল করছেন ক্রীড়ামন্ত্রী এবং ক্রীড়ামন্ত্রীর স্বামী। সংস্কৃতিমন্ত্রী কিছুতেই ভাঙতে চান না কেন তিনি ব্ল্যাকমেলড হচ্ছেন, তাঁর শুধু দাবি ক্রীড়ামন্ত্রী এবং তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে এই ব্ল্যাকমেলের প্রমাণ জোগাড় করে দিতে হবে।

স্ট্রাইক কেস নেয় এবং অচিরেই বুঝতে পারে যে অসুস্থ লোকটির বাচ্চা খুন হতে দেখার অভিযোগের সঙ্গে এই কেস একেবারে সম্পর্করহিত নয়। তদন্ত শুরু হওয়ার অব্যবহিত পরে সংস্কৃতিমন্ত্রী খুন হয়ে যান। মন্ত্রীর মেয়ে স্ট্রাইকের পুরোনো চেনা। (তারও যথারীতি স্ট্রাইকের প্রতি মনকেমন।) সে স্ট্রাইককে অনুরোধ করে বাবার খুনের সমাধান করে দিতে। মন্ত্রীর খুন আর বিলির কুড়ি বছর আগে দেখা বাচ্চা-খুনের তদন্ত পাশাপাশি চলতে থাকে।

লিথ্যাল হোয়াইট-এর গোয়েন্দা-অর্ধের ব্যাপারে আমার মত হচ্ছে যে গল্পটা অ্যাকচুয়ালি খারাপ না। প্রচুর চরিত্র, অগুন্তি সাবপ্লট। লিথ্যাল হোয়াইট লিখতে জে কে রোলিং-এর এত পরিশ্রম কেন হল বোঝা শক্ত নয়। ঘোড়া, ছবি, হোমিওপ্যাথি, ল্যাটিন কবিতা - সব নিয়ে ঘোরতর রিসার্চ করতে হয়েছে। চরিত্ররা শুধু অগুন্তি নয়, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডও বিবিধ। মন্ত্রীসান্ত্রীর পারিবারিক ড্রামা থেকে অতিবাম রাজনীতির প্রাঙ্গণ থেকে পার্লামেন্ট হাউসের অলিগলি। কুড়ি বছরের তফাতে দুটো রহস্যকে জড়াতে প্যাঁচও প্রচুর খেলিয়েছেন রোলিং। কিন্তু যখনই গল্প দানা বাঁধতে শুরু করেছে তখনই রবিন করমোরানের ব্যক্তিগত জীবন এসে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছে। হয় রবিন ম্যাথিউর ঝগড়া হচ্ছে, নয় করমোরানের গার্লফ্রেন্ড কমিটমেন্ট দাবি করে বসছে, আর এ সবের স্টক ফুরোলেই সর্বনাশ! ও কে রাস্তা পেরোচ্ছে! শার্লট নাকি?!

ধাঁধাটার বিষয়ে বলতে হলে বলি, দু’এক জায়গায় বোঝা যায় যে যে গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন চেপে যাওয়া হল যেমন সংস্কৃতিমন্ত্রী কেন ব্ল্যাকমেলড হচ্ছিলেন সে খবরটা। মন্ত্রী নিজে তো বলেনইনি, তাঁর মৃত্যুর পর যেচে করমোরান স্ট্রাইককে তদন্ত করতে ডেকে আনার পরেও বাড়ির লোকেরা কিছুতেই ব্ল্যাকমেলের কারণ ভাঙলেন না। সেটা জানা গেল বইয়ের একেবারে লাস্টে পৌঁছে। আর জানা মাত্র হুড়মুড়িয়ে রহস্য সমাধান হয়ে গেল। তবে এগুলো তুচ্ছ অসন্তোষ। বলার জন্য বলা।

লিথ্যাল হোয়াইট-এর ব্যাপারে রোলিং-এর সঙ্গে আমার একটা জায়গায় মিলেছে, আমারও লিথ্যাল হোয়াইট পড়তে ভয়ানক পরিশ্রম হয়েছে। আনন্দের অংশটুকু মেলাতে পারলে ভালো লাগত, স্যাডলি, পারলাম না।



October 02, 2018

বিচার






আজ থেকে প্রায় একশো সাড়ে সতেরো বছর আগে, উনিশশো সালের ডিসেম্বর মাসের এক তারিখ। হাড়কাঁপানো শীতের রাত। নিশ্চিন্তে ঘুমোতে গেলেন আইওয়ার মেডোরা শহরের সমৃদ্ধ চাষী জন হোস্যাক। দু’তারিখ সকালে উঠে বাড়ির লোক দেখলে রাতে কেউ এসে ঘুমন্ত জন হোসাকের মাথা কুঠারের দুটি নিপুণ আঘাতে থেঁতলে দিয়ে গেছে। ঘটনার চারদিন পরে খুনের দায়ে এমন একজনকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ যে হোস্যাক পরিবারের আত্মীয় বন্ধু প্রতিবেশী, গোটা মেডোরা স্তম্ভিত হয়ে গেল। ক্রমে জন হোসাক হত্যারহস্যের স্ক্যান্ডাল হইহই করে দেশময় ছড়িয়ে পড়ে। শুধু খুনই নয়, ওই খুনপরবর্তী মামলার অংশটুকুও সমান রোমহর্ষক। একটা নমুনা দিলেই আপনারা বুঝতে পারবেন, একসময় জন হোস্যাক হত্যা মামলায় বিবাদীপক্ষের মূল অস্ত্র ছিল বাড়ির কুকুর ‘শেপ’। রাত ন’টা থেকে দশটার মধ্যে শেপ চেঁচিয়েছিল কি না, কতখানি চেঁচিয়েছিল, তারপর সারা রাত আর টুঁ শব্দ করেনি কেন, এই নিয়ে দিনের পর দিন লড়ে গিয়েছিলেন দুই পক্ষের উকিলরা। দেশের সব কাগজ ফলাও করে মামলার গতিপ্রকৃতি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছেপেছিল।

এই সব যখন হচ্ছিল তখন সুস্যান গ্লাসপেল নামে একজন 'ডে মইন ডেইলি নিউজ' পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন। তাঁকে যেতে হয়েছিল কাগজের পক্ষ থেকে হোস্যাক মামলা কভার করতে। সতেরো বছর পরে, হোসাক মামলাকে আশ্রয় করে সুস্যান লিখেছিলেন একটি একাঙ্ক নাটিকা, নাম দিয়েছিলেন ‘ট্রিফলস’। তুচ্ছ ব্যাপারস্যাপার। পরের বছর ‘ট্রিফলস’ আট হাজারেরও বেশি শব্দের একটি ছোটগল্প রূপে আবির্ভূত হল, সুস্যান গ্ল্যাসপেল তার নাম দিলেন ‘আ জুরি অফ হার পিয়ারস’।

গত একশো বছর ধরে সুস্যান গ্ল্যাসপেলের ‘আ জুরি অফ হার পিয়ারস’ আর ট্রিফলস নেই। পঞ্চাশের দশকে অ্যালফ্রেড হিচকক তাঁর ‘অ্যালফ্রেড হিচকক প্রেসেন্টস’ ধারাবাহিকের একটা এপিসোড বানিয়েছিলেন গ্ল্যাসপেলের গল্প নিয়ে। উনিশশো আশিতে এই গল্প নিয়ে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের সিনেমাও বানানো হয়। এ ছাড়াও ফেমিনিস্ট সাহিত্য একশো এক-এর যে কোনও সিলেবাসে 'ট্রিফলস' বা 'আ জুরি অফ হার পিয়ারস'-এর জায়গা বাঁধা।

আমি যবে থেকে ছায়া অবলম্বনে গল্প লেখা শুরু করেছি, তবে থেকে সুস্যান গ্লাসপেলের ‘আ জুরি অফ হার পিয়ারস’ আমার চেতনার সামনে জ্বলজ্বল করছে। তবু আমি যে কখনও এই গল্পটার বাংলায়ন বা রূপান্তর যাই বলুন, করার চেষ্টা করিনি সেটা একটা রহস্য। রহস্য আরও ঘনঘোর কারণ সুস্যান গ্লাসপেলের ‘আ জুরি অফ হার পিয়ারস’ এমন দুটো খোপে টিক মারে যা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং আনন্দের।

এক, মেন রোলে মেয়েরা, দুই, প্লটের কেন্দ্রে খুনখারাপি।

এবারের চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের মেল ট্রেনের গল্পের কামরায় সুস্যান গ্ল্যাসপেলের ‘আ জুরি অফ হার পিয়ারস’ গল্পের ছায়া অবলম্বনে লেখা আমার গল্প ‘বিচার’-এর লিংক এই রইল।


September 30, 2018

September 28, 2018

যেটা বলার



জীবনে দুটো জিনিসের না থাকা নিয়ে আমার গর্ব ছিল।

এক, দাঁতে পোকা।

দুই, সময়ের অভাব।

যবে থেকে স্মৃতি তৈরি হয়েছে, সময়ের অভাব আমার কখনও হয়েছে বলে মনে পড়েনি। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকের আগে যখন সবার সময় বাড়ন্ত তখনও আমি বিকেলবেলা ছাদে উঠে পেয়ারাগাছের ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে গুনগুনাচ্ছি। প্রতিবেশীরা পর্যন্ত আতংকিত হতেন। সোনা তো খুব একটা বেশি পড়ছে না মনে হচ্ছে! 

দাঁতে পোকা না থাকাটা ভালো হয়েছে, কিন্তু সময়ের অভাব একটু থাকলেই ভালো হত মনে হচ্ছিল ক'দিন ধরে। গয়ংগচ্ছ চালটা আরেকটু শুধরোতো। কারণ আজ হাতে সময় অনন্ত বলে লং রানে তো নয়, আরেকটু তাড়াহুড়ো করলে হয়তো কাজ বেশি হত। অন্যের কাছে আমার সময় বাহুল্য ব্যাখ্যা করা চিরকালই শক্ত ছিল, নিজের কাছেও শক্ত ঠেকছিল ইদানিং। ইউটিউব দেখছি কখন, ক্যান্ডি ক্রাশ খেলছি কখন, সময় তো সেই চব্বিশ ঘণ্টা, আখেরের কাজের সময় কেড়ে কি? এমনকি গল্পের বই পড়ারও সময় পাচ্ছি না?

অবশেষে আক্ষেপ ঘোচানোর সুযোগ পেয়েছি। দু'হাজার আঠেরোর দ্বিতীয়ার্ধ আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে। অফিসে আগে যাওয়া, পরে ফেরা, শনিরবিবারে কাজ করা - কর্মবীর হতে গেলে যে যে খোপে টিক মারতে হয় সবেতে মেরে ফেলেছি। এমনকি একদিন দুঃস্বপ্নে আবক্ষ বস পর্যন্ত ভেসে ভেসে এসেছিলেন। হাসিমুখে শুধু ঠোঁটদুটো নড়ে নড়ে বলছিল, আজকের মধ্যে হয়ে যাবে তো? আজকের মধ্যে হয়ে যাবে তো?

শুধু বসের দোষ দেওয়া যাবে না অবশ্য। যেচে কিছু জাঁতাকলে পা গলিয়েছি, পেশা এবং নেশা দুই ক্ষেত্রেই। সময়ভিক্ষার বাটি নিয়ে দরজায় দরজায় দাঁড়াতে দাঁড়াতে এমন অবস্থা হয়েছে মাঝরাতে ঘুম থেকে ঠেলে তুললেও গড়গড় করে ডেডলাইন বাড়ানোর আবেদন বলতে শুরু করব। বাংলা এবং ইংরিজি দুই ভাষাতেই।

খারাপ সময়ের মধ্যে আনন্দও আছে। নাকতলার বাবামা এসেছিলেন। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম এখানেসেখানে যাব, কিছুই হয়নি, বাড়িতেই থেকেছি। তিলকমামার বাড়ি গিয়ে গল্প করেছি, সুমিতামামির হাতের অবিশ্বাস্য ভালো খবর অবিশ্বাস্য পরিমাণে খেয়েছি। ফুর্তিতে থাকলে পাকস্থলীর আয়তন বৃদ্ধি পায় সম্ভবত। কারণ ওই রকম খেয়ে এসে পরদিন আমরা গিয়েছিলাম রাজস্থালীতে। লংকার আচার থেকে মুগ ডালের হালুয়া পর্যন্ত কিচ্ছু বাদ দিইনি। ও জিনিস বাদ দেওয়া যায় না।

সময়ের অভাবের সমস্যাটা হচ্ছে অভাব নিয়েও কিছু কিছু কাজ করেই যেতে হয়। দাঁত মাজতেই হয়, রোজ সকালে স্নানে যেতেও। ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা খেতেও উঠতেই হয়। সেখানেও সময় বাঁচানো যায় না। এ সব নিত্য আপদের মধ্যে আবার হইহই করে চন্দ্রিল ভট্টাচার্য সেকেন্ড ইনিংসে নেমেছেন, যা ডিবেট করছেন তাই ভাইরাল। সময়ের অভাবে বাকিদের বক্তব্যগুলো শুনছি না, খালি চন্দ্রিলেরটুকু শুনে ট্যাব বন্ধ করছি। চন্দ্রিল বলবেন, আমি শুনব না, এ তো হতে পারে না। কাজেই শুনতে হচ্ছে।

সময় কাড়তে হয়েছে যাদের থেকে তাদের মধ্যে পড়েছে বেচারা অবান্তর। সপ্তাহে তিনটে পোস্ট লেখার আমার বছরের শুরুর অ্যাম্বিশন দশদিনে একটায় এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এমনও নয় যে ব্যাপারটা এক-দু'সপ্তাহের, ঘাপটি মেরে চালিয়ে দেওয়া যাবে। সামনের ক'মাস, অন্তত দু'হাজার আঠেরোর শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনও আশা নেই। হতে পারে দু'হাজার উনিশে পৌঁছে আমি আবার ছন্দ ফিরে পাব কিংবা এই ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে যাব।

আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি টাইম ম্যানেজমেন্টে আরেকটু ভালো হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সফল হব কি না জানি না। হতে পারে এই পোস্টটা পাবলিশ করামাত্র আমার কোলে টপ করে এক্সট্রা তিনটে ঘণ্টা এসে পড়ল, আর আমি সেই তিনটে ঘন্টার সার্থক সদ্ব্যবহার করে নিয়মিত অবান্তরে পোস্ট লিখতে শুরু করলাম। তাহলে এই এত কৈফিয়তের কোনও মানেই থাকবে না, তবু আমি দিয়ে রাখলাম।



September 23, 2018

সাজাব যতনেঃ স্পেশাল শারদ এপিসোড




নমস্কার। সুপ্রভাত। কেমন আছেন? বাতাসে কিন্তু আমেজ এসে গেছে, দেখেছেন তো? শহরের বাইরে গেলে কাশফুলটুল দেখে হয়তো বোঝা যেত, আমাদের বাড়ির সামনে একটা শিউলি গাছ ছিল, কিছুদিন আগে কেটে ফেলায় এখন আর সেটা দেখেও বোঝার জো নেই। কিন্তু যাদের গাছ নেই, তাদেরও টিভি আছে। আর টিভিতে হইহই করে পুজো এসে গেছে। কলকাতার বচ্চন পরিবারের অ্যাডগুলো দেখেছেন? সকলে মিলে কেমন হেসে হেসে উপহার দিচ্ছে একে অপরকে? জামা, জুতো, গ্যাজেটস? নারকেল তেল? অ্যাডে কাজ দিয়েছে আশা করি? নিজের আর আপনজনদের তেলা মাথায় আরও তেল দেওয়ার জন্য, ভরা আলমারি আরও ভরার জন্য শপিং সেরে ফেলেছেন?

যতই শপিং করুন না কেন, জামাকাপড় যতই নতুন নতুন পরুন না কেন, সত্যি কথাটা হচ্ছে, লোকে দেখবে আপনার মুখ। আপনার ত্বক। আপনার গালের চমক, চুলের বাহার। কাজেই অত সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় গয়নাগাঁটির সদ্ব্যবহার করার আগে নিজেকে সুন্দর করে তুলতে হবে।  আর সেই সুন্দরের সাধনায় সিদ্ধিলাভ করানোর ফুলপ্রুফ টিপস নিয়ে, পুজোর পাঁচ, থুড়ি, পনেরোদিন কী সাজবেন, কীভাবে সাজবেন, নানান খবর নিয়ে আজকেরসাজাব যতনের স্পেশাল শারদ এপিসোডে এসে গেছি আপনাদের সঞ্চালিকা সুরূপা আর আমাদের সঙ্গে আছেন, আপনাদের সবার চেনা, সবার ফেভারিট, কলকাতার বিখ্যাত বিউটি বিশেষজ্ঞ, শাইন অ্যান্ড গ্লো ব্র্যান্ডের সি ই ও রূপসী ম্যাম। ওয়েলকাম ম্যাম।

ম্যামঃ থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ। আমারও ভীষণ ভালো লাগছে আবার সাজাব যতনে-তে আসতে পেরে। একটা গুড নিউজ দিয়ে শুরু করতে চাইব, শাইন অ্যান্ড গ্লো কিন্তু এখন মেক ওভার নিয়ে সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো হয়ে গেছে।

ওহ, নতুন নাম রেখেছেন বুঝি দিদি, থুড়ি, ম্যাম?

হ্যাঁ ভাই। শাইন অ্যান্ড গ্লো-এর এতদিন অ্যাপ্রোচ ছিল সায়েন্টিফিক, এই বার পুজোয় আমরা আমাদের ব্র্যান্ড রি-লঞ্চ করেছি, এখন আমাদের শ্যাম্পু লোশন ক্রিমে, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন, নাইট্রোজেনের সঙ্গে সঙ্গে থাকবে অশ্বগন্ধার রস, ঘৃতকুমারীর এসেন্স, কাঁচা হলুদের নির্যাস, পেঁয়াজের ঝাঁজ, রসুনের সুবাস। আমরা আসলে চাইছি বেদ আর বিজ্ঞানটাকে পাঞ্চ করতে। আমাদের ট্যাগলাইনও ওটাই। বেদেও আছি বিজ্ঞানেও আছি।

শুনেই তো গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ম্যাম।

শুধু শুনেই? আমাদের দশ হাজার বছরের পরম্পরায় বিউটি বিষয়ক এমন সব ফিলজফিক্যাল থট আছে; আমাদের কবিতা, গানে, সাহিত্যে বিউটি নিয়ে এমন চর্চা, রান্নাঘরে বিউটিফুল বানানোর এমন সব উপাদান, এক্সপ্লোর করতে শুরু করলে তোমার মাথা ঝিমঝিম করবে।

দশ হাজার? টিভির অ্যাডে যে বলল পাঁচ হাজারি পরম্পরা?

কে বলল?

শাহরুখ... নাকি সলমান… না না মনে পড়েছে, অক্ষয়কুমার অক্ষয়কুমার। হ্যাঁ ম্যাম, অক্ষয়কুমার।

ওহ ওই হিরোটা? ওটা হচ্ছে একটা ডাম্ব অ্যাকটর। ওর কোনও সিনেমা আমি পাইরেটেড কপি ছাড়া দেখি না, কোনও মেসেজই থাকে না। উইকিটুইকি দেখে উগরে দিয়েছে দেখো গে। থিংকিং অ্যাকটর আমির খান বললে তবু বিশ্বাস করতাম, অক্ষয়কুমার বলেছে যখন তখন তো স্যাঙ্গুইন পাঁচ হাজার নয়। তুমিই বল না, এতদিনের সনাতনী ব্যাপারস্যাপার, মোটে পাঁচহাজারের হতে পারে?

আমি ঠিক বলতে পারব না ম্যাম, আমার আবার চিরকালই ইতিহাসে পাঁতিহাস।

আচ্ছা দশ যদি নাও হয়, সাড়ে সাত হাজার তো হবেই। আর কমাতে বোলো না প্লিজ, পুজোর প্রোমোশনের বউনি, এর নিচে নামতে পারব না।

সে পাঁচ দশ সাড়ে সাত যাই হোক, শাইন অ্যান্ড গ্লো এখন নবরূপে সনাতনী, সেটাই রোমহর্ষক ব্যাপার। অভিনন্দন জানবেন ম্যাম।

থ্যাংক ইউ সো মাচ। এই রি-ব্র্যান্ডিং নিয়ে যা পরিশ্রম গেল। ব্যাকব্রেকিং। উঃ।

খাটনি তো হবেই। সাড়ে সাত হাজার বছরের খনি খোঁড়া...

বেশিরভাগটাই আমাকে দেখতে হয়েছে, তবে আমার টিমও দারুণ খেটেছে। রাদার খাটিয়ে নিয়েছি। অফিস চলাকালীন পার হেড পাঁচটে স্টেটাস দেওয়ার আপার লিমিট করে দিয়েছিলাম আর মোটে তিনটে সেলফি।

কী বলছেন ম্যাম!

ওইরকম ঘাড় ধরে কাজ করিয়েছিলাম বলেই না হল? সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো-র নতুন ব্র্যান্ড নতুন লুকে, নতুন দামে বাজারে এসে গেছে, বিশ্বকর্মা পুজোর আগেই।

দেখছেন তো দিদিরা বোনেরা মাসিরা পিসিরা, আপনাদের গাল ঝকঝকে, চুল চকচকে করার জন্য রূপসীম্যাম আর ম্যামের টিম কেমন পরিশ্রম করেছেন? আপনারা দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে আসুন, ম্যামের থেকে টিপস নিন, ম্যামের প্রোডাক্ট কিনুন, মাখুন, সুন্দরী হয়ে উঠুন। তার আগে আমাদের সাজাব যতনে-র স্টুডিওতে ফোন করুন, নম্বর হচ্ছে... ওহ, ফোন এসে গেছে অলরেডি, ম্যামের সঙ্গে কথা বলার জন্য সকলেই উদগ্রীব।

হ্যালো, সাজাব যতনের প্রথম কলার হওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অভিনন্দন এবং স্বাগত। কে বলছেন?

হ্যালো হ্যালো, শুনতে পাচ্ছেন?  

হ্যাঁ পাচ্ছি। বলুন।

রুপুদিদিকে একটু দিন না।

ম্যাম এখানেই আছেন, আপনি বলে যান, শুনতে পাবেন।

হ্যালো রুপুদিদি?

বলছি। আপনি কে বলছেন?

দিদি আমি বনশ্রী বলছি বেহালা থেকে। অজন্তা সিনেমায় নেমে রাস্তা পার হয়ে যে সরকারি আবাসনটা আছে সেটার পাশ দিয়ে দশ মিনিট হাঁটলে, অটো পেলে...  

আপনি কি ম্যামকে হাউজ কল দেবেন?

হাউজ কল?

তাহলে বাড়ির লোকেশন ছেড়ে সমস্যায় আসুন।

সমস্যাটা হচ্ছে দিদি, আমার মুখের গ্লো কমে যাচ্ছে। মেয়েটাকে উঠিয়ে আয়নার ওপরের টিউবলাইটটা মোছানোর পরও ম্যাড়মেড়ে। চুলটাও আগের মতো ফুরফুরে হচ্ছে না। বাঁচান দিদি।

ব্যস, এই? ওর জন্য তো আমাদের..

জানি জানি দিদি, গ্লো ফেস আর শাইন হেয়ার, আমি তো কিনে এনে রেগুলার মাখছি। এক মাস হল।

তাহলে তো হয়েই গেল। সমস্যা কীসের?

ইয়ে, বাড়ির ভেতরে তো গ্লো ভালোই হচ্ছে, কিন্তু বাইরে বেরোলেই দিদি গরমে সব গলে গলে পড়ছে। অজন্তা পর্যন্ত আসতে না আসতেই সব ক্রিম রুমালে। মুখে যদি ক্রিম না-ই থাকল তাহলে গ্লো কী করে থাকবে ম্যাম? ঘাম বন্ধ করার কোনও ক্রিমটিম, পাউডারটাউডার যদি বলে দেন...

সে বলব না হয় কিন্তু সবার আগে ইম্পরট্যান্ট একটা প্রশ্ন অ্যাড্রেস করা দরকার। তুমি রোদে হাঁটছিলেই বা কেন?

আর বলবেন না দিদি। অটো পাওয়াই যায় না। পেলেও অটোওয়ালার পাশের পাশের সিটে বসতে হয়, হাঁটার থেকেও বেশি পরিশ্রম। আরও বেশি ঘাম।

হোয়াই অটো? স্মার্ট ফোন নেই? ওলা ডাকবে, উবার ডাকবে, কাঁচ বন্ধ করে বসে থাকবে। বলবে এসি বাড়িয়ে দিন। রোদে খবরদার বেরোবে না। ইউ ভি রে জানো? স্কিনে লাগলে কী মারাত্মক সব ব্যাপার ঘটতে পারে জানো? বাই দ্য ওয়েআমাদের সনাতনী সব প্রোডাক্টে আমরা এস ইউ ভি আগের থেকে বাড়িয়েছি।

সঞ্চালিকা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচালেন। ক্যামেরা সামনে রাখা টেবিলে ফোকাস করল। বেগুনি রঙের ছোট বড় বোতল, টিউব, জার ঠাসাঠাসি।

যাই হোক, তুমি এখন আমাদের নিউ অ্যান্ড ইম্প্রুভড সনাতনী গ্লো ফেস ব্রাইটেনার আর সনাতনী শাইন হেয়ার ভলিউমিনাইজারটা কিনে ব্যবহার করা শুরু কর, ফেসের ফরমুলাটায় আমরা ঘৃতকুমারীর নির্যাস আর হেয়ারেরটায় পেঁয়াজের রস অ্যাড করে বাজারে ছেড়েছি। দুটোরই দাম আগের দামের দেড়গুণ, কাজ কগুণ সে আর নিজে মুখে বলছি না, নিজেই টের পাবে।

বাঁচালেন দিদি। বলছি ওতে মুখের অয়েলি ভাবটাও যাবে তো?

অয়েলি! আমাদের প্রোডাক্ট তো ফ্রম দ্য বিগিনিং কমপ্লিটলি অয়েল ফ্রি। তুমি কী বলছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। রেগুলারলি ইউজ করছ নাকি একবার মেখেই এই হল না সেই হল না বলে নালিশ করতে লেগেছ?

এই আপনাকে ছুঁয়ে বলছি দিদি, গত তিন মাস তিন বেলা করে মেখেছি, একদিন তো অফিসে বেরোনোর আগে লেট হয়ে যাচ্ছিল বলে চান বাদ দিয়েছি, তবু গ্লো না মেখে বাড়ির বাইরে পা রাখিনি।

প্রসিডিওর ফলো করছ? শুধু ধাঁই ধাঁই করে প্রোডাক্ট মাখলেই তো হবে না, তার আগে ফেসটাকে প্রিপেয়ার করতে হবে। নানারকম স্টেপ আছে। ক্লিনিং, ময়েশ্চারাইজিং অ্যান্ড টোনিং অ্যান্ড…

স---ব করি দিদি…

সব স্টেপে আমাদের ব্র্যান্ড ইউজ করতে হবে, প্রেপিং-এ যা তা সস্তা ব্র্যান্ডের জিনিস মেখে স্কিন মাটি করলে তারপর শাইন অ্যান্ড গ্লো কিছু করতে পারবে না।

আপনার শাইন অ্যান্ড গ্লো ছাড়া আর কোনও কসমেটিকস ব্র্যান্ড আমার বাড়ির চৌকাঠ পেরোয় না দিদি। রোজ আমি শাইন অ্যান্ড গ্লো ফেস ওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে, শাইন অ্যান্ড গ্লো ময়েশ্চারাইজার সারা মুখে  থুপে থুপে লাগিয়ে...

হোয়াট!

সঞ্চালিকাঃ কী হল ম্যাম?

থুপে থুপে লাগাচ্ছে! আমাদের ব্যাক ব্রেক করা করে টেস্ট টিউব আর গ্লাভস পরে বানানো সিক্রেট ফর্মুলায় বানানো প্রোডাক্ট তুমি থুপে থুপে লাগাচ্ছ কী রকম? আমি তো পইপই করে বলে দিয়েছি, কী ভাবে কী করতে হবে।

সাজাব যতনে-তে তো ডেমোও দিয়েছেন ম্যাম, দেখোনি?

তাছাড়া প্যাকেটের গায়েও তো লেখা আছে। ওয়েট ওয়েট, তুমি ঠিক কী লাগাচ্ছ বল তো? গ্লো-ই লাগাচ্ছ তো?

হ্যাঁ দিদি, ওই যে আপনাদের সামনে রাখা আছে অবিকল ওই বেগুনি বাক্স।

বাক্সের গায়ে আমার হাসি হাসি হলোগ্রাম ফেস ছিল?

সেটা তো ঠিক খেয়াল করিনি দিদি।

সঞ্চালিকাঃ কী সর্বনাশ, জাল শাইন অ্যান্ড গ্লো?

কিছুই বলা যায় না। কালচারটাই তো ঝাড়ার। সাড়ে সাত হাজার বছর ধরে একে অন্যের আইডিয়া ঝেড়ে যাচ্ছে। শোনো আমি আবার বলে দিচ্ছি। এক নম্বর, তুমি ইমিডিয়েটলি শাইন অ্যান্ড গ্লো-র জায়গায় সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো-তে আপগ্রেড কর। ফেস ওয়াশ থেকে ফিনিশিং টাচ পাউডার পর্যন্ত, এভরিথিং। ওই সব থোপাথুপি অ্যাবসলিউটলি বন্ধ কর। উল্টো এফেক্ট হবে। ভালো করে শুনে নাও কী করতে হবে।

ঘুম থেকে উঠে ফেসটা সনাতনী অ্যালোভেরা গ্লো ফেস ওয়াশ দিয়ে ওয়াশ করে, হ্যাঁ ওয়াশ করবে। ধোবে না। স্যাঁতসেঁতে ছ্যাতলা পড়া বাথরুমে প্লাস্টিকের বালতি থেকে প্লাস্টিকের মগ দিয়ে জল তুলেও লোকে মুখ ধোয়। আর ওয়াশ হচ্ছে টিভিতে যেমন দেখায়, দুই হাতে জল তুলে মুখে ছেটাবে। জলের ফোঁটা ইউনিফর্মলি মুখের চারপাশে ঝর্নার মতো ঝরবে। বুঝেছ? তারপর খবরদার গামছা দিয়ে ফেস ঘষবে না, ফেসে কত সূক্ষ্ম কার্টিলেজ থাকে জান? একবার ড্যামেজ হলেই হয়েছে। না না বেহালার সের দরের তোয়ালের সঙ্গে গামছার এসেনশিয়ালি কোনও ফারাক নেই। টার্কিশ টাওয়েল তো অ্যাফর্ড করতে পারবে না, এয়ার ড্রাই করে নিয়ো বরং। ফ্যান পাঁচে চালিয়ে ঠিক নিচে মুখ ফ্যানের দিকে তুলে দাঁড়িয়ে থাকবে, যতক্ষণ না শুকোয়। তারপর সনাতনী গ্লো ময়েশ্চারাইজার রিং ফিংগারের টিপে অল্প একটু নিয়ে সারা মুখে প্যাট করে করে... কী করে?

সঞ্চালিকাঃ প্যাট করে করে...

ম্যামঃ ওকে বলতে দাও…

কলারঃ প্যাট করে করে...

সঞ্চালিকাঃ ম্যাম- আপনি কী ভালো টিচার...

ম্যামঃ ইয়েস, প্যাট করে করে লাগিয়ে নেবে। তারপর আমাদের সনাতনী গ্লো আই রি-কনস্ট্রাক্টিং ক্রিম, রিং ফিংগারের টিপে নিয়ে…

সঞ্চালিকাঃ প্যাট করে করে, বলুন বলুন, আমার সঙ্গে রিপিট করুন।

কলারঃ প্যাট করে করে..

ম্যামঃ লাগিয়ে নেবে। এর পর সনাতনী সেরাম, বাম আরও যা যা আছে, সব সিকোয়েন্স ফলো করে মাখবে। মনে না রাখতে পারলে আমাদের প্যাকেটের ভেতর প্রোভাইড করা লিফলেট দেখে দেখে করবে। আধখানা স্টেপও বাদ দেবে না। আমার হলোগ্রাম ফেস সাঁটা প্যাকেজ ছাড়া কিনবে না। অ্যান্ড অফ কোর্স, রোদে বেরোবে না, অটো চড়বে না, এসি ছাড়া দশ মিনিটের বেশি কোথাও বসবে না।

সঞ্চালিকাঃ এগুলো তো ম্যাম কমনসেন্স।

কমনসেন্সই সবথেকে আনকমন তো। এগুলো যে বলে দিতে হয় আগে জানতাম না, যত দিন যাচ্ছে শিখছি। বেসিক ব্যাপারগুলোই আমাদের দেশের মেয়েরা জানে না। হার্টব্রেকিং।

সঞ্চালিকাঃ আমরা এবার পরের ফোনে যাব, কিন্তু তার আগে একটা জিনিস জানতে ইচ্ছে করছে, ওই আই-রিকনস্ট্রাক্টিং ক্রিমটা কী ম্যাম? পুরোনো চোখ ভেঙেচুরে নতুন করে চোখ বানাবেন ম্যাম? ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।

পুরোনো চোখ তো নতুন হবেই, দৃষ্টি পর্যন্ত বদলে ফেলবে। বিউটিফুল ফ্রম উইদিন। না হলে শুধু বাইরে থেকে লোশন লাগিয়ে কী হবে? সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো একেবারে ভেতর থেকে বদলে দেবে। দৃষ্টি এমন বদলে যাবে যে পিতৃমাতৃদত্ত চেহারা আর সহ্য হবে না। আয়নার সামনে দাঁড়ালেই মনে হবে, মাগো আমি কী কুচ্ছিত, মাগো আমার চোখটা কেন কুতকুতে, মাগো, ভুরুটা এ রকম শেপলেস কেন, মাগো এই থোবড়া নিয়ে রাস্তায় বেরোব কী করে।

সে তো ভয়ানক প্যাথেটিক হবে ম্যাম।

প্যাথেটিক হওয়ানোই তো আমাদের উদ্দেশ্য। হোমিওপ্যাথিতে শোনোনি, বাড়িয়ে তারপর কমায়? আমাদের সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লোয়ের অ্যাপ্রোচও এক্স্যাক্টলি ওটাই। আত্মবিশ্বাস যত তলানিতে ঠেকবে, তত মোটিভেশন বাড়বে। সনাতনী গ্লো কেনার, তিনবেলা রিলিজিয়াসলি মাখার। এমন কী শুরুতে অনেকসময় এও হতে পারে যে সনাতনী গ্লো-তেও কাজ দিল না...

সেটাও বুঝি ইচ্ছে করে করা ম্যাম? যাতে আত্মবিশ্বাস আরও চুরমার হয়…

আর মোটিভেশন আরও কিক ইন করে...আরও কেনার, আরও মাখার...অ্যান্ড দেন, মে বি, কে বলতে পারে, অবশেষে শাইন এল। গ্লো এল। আপনি ফাইন্যালি শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হয়ে গেলেন।  

উঃ, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ম্যাম। ঠিক যেন জেমস বন্ডের সিনেমা।

কিন্তু প্যাকেটে যা যা যেমন করে লেখা আছে, সব ইন্সট্রাকশন মেনে ইউজ করতে হবে।

সে তো বটেই, প্যাটের বদলে থুপবেন তারপর ম্যামের, ইয়ে, শাইন অ্যান্ড গ্লো-র পিণ্ডি চটকাবেন, সে কী করে হবে।

এক্স্যাক্টলি। ব্র্যান্ড রি-লঞ্চ করার পর, প্যাকেজিং-এর ডিজাইন বদলে আমরা আরও কিছু ইম্পরট্যান্ট ইন্সট্রাকশন অ্যাড করেছি। কিছু অফারটফারও চালু হল বলে। আমাদের ওয়েবসাইট থেকে মিনিমাম দেড় হাজার টাকার প্রোডাক্ট অর্ডার করলে পাঁচটাকা মূল্যের প্লাস্টিক রুদ্রাক্ষ ফ্রি দেওয়া হবে। রোজ সকালে প্রোডাক্ট ফেসে বা হেয়ারে যেখানে দরকার মেখে যতক্ষণ না শুকোয় জপতে হবে। বিশুদ্ধ বৈদিকমতে জপতে পারলে ডবল গ্লো।

চমৎকার। কিন্তু দিদি এবার আমরা আরেকটা কলে যাব। হ্যালো কে আছেন?

হ্যালো হ্যালো?

হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি, বলুন, আপনার নাম, বয়স আর লোকেশন?

হ্যালো হ্যালো?

হ্যাঁ বলুন। নাম বয়স লোকেশন।

এটা কি মোদের গরব মোদের আশা চ্যানেলের সাজাব যতনে স্টুডিও?

ঠিক ধরেছেন।

একটু রূপসী ম্যামকে দিন না।

হ্যাঁ আমি শুনতে পাচ্ছি আপনি বলুন।

ম্যাম? ইইইইইই, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না আমি লাইন পেয়েছি, ম্যাম, ইইইইইইইই আমার কতদিনের ড্রিম...কান্ট বিলিভ ইট।

আমাদের চ্যানেলের পলিসি হচ্ছে পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে কাজের কথা শুরু না হলে কেটে নেক্সট ফোনে চলে যাওয়া। আপনার কাউন্টডাউন এখন তেরো সেকেন্ড, চোদ্দ সেকেন্ড…

পিম্পল, পিম্পল...কাটবেন না প্লিজ, ওহ মাই গড…আমার লাইফের ফার্স্ট পিম্পল উঠেছে ম্যাম, চিবুকের বাঁদিকে, লাইফের ফার্স্ট পিম্পল...

ম্যামঃ লাইফের ফার্স্ট? ওয়াও।

সঞ্চালিকাঃ জীবনের প্রথম ব্রণ? গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, উঃ। প্রথম প্রেমের মতোই প্রথম ব্রণর একটা রোমাঞ্চ আছে কিন্তু, না ম্যাম? সেই থরথর ভাব, সেই টনটন ব্যথা...

আর কত মেমোরিজ, পহলা পিম্পল, পহলা নশা, পহলা খুমার।

ম্যাম সুর ধরলেন, সঞ্চালিকা গলা মেলালেন। ক্যামেরা দুজনের চোখ বন্ধ, সামান্য উত্তোলিত মুখের ওপর প্যান করে গেল।

(গান থামিয়ে) ম্যামঃ শুনেছ গানটা?

কলারঃ আমি তো তখন জন্মাইনি ম্যাম, আমার মা নাইনটিস ওল্ডিস বলে একটা অ্যালবাম চালায় মাঝে মাঝে, সেটাতে শুনেছি। একটু স্লো, তার ওপর  লিরিক্সে  তেনু, সাড্ডি, চঙ্গা এইসব ওয়ার্ডস নেই তো, মিনিং-ও ভালো বুঝতে পারি না।

অ। যাই হোক, এবার পিম্পলের ব্যাপারে বল। কবে হল, কী হল, কী বৃত্তান্ত একেবারে গোড়া থেকে গুছিয়ে বল।

এই তো পরশু, ম্যাম। আর্লি মর্নিং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি চিবুকের বাঁ দিকে একটা... আমি তো ডেভাস্টেটেড।  অ্যাডের অ্যাডোলেসেন্টদের কী সুন্দর সাপোর্ট সিস্টেম থাকে, বন্ধুটন্ধু, দিদিটিদি, বলেটলে দেয়। আমি তো সিংগল চাইল্ড।  মাকেই জিজ্ঞাসা করলামতোমার যখন প্রথম ব্রণ হয়েছিল কী করেছিলে মা’, মা বলল...

ম্যাম + সঞ্চালিকাঃ কী বলল? কী বলল?

বলল, মা নাকি প্যাট করে গেলে দিয়েছিল।

ম্যামঃ ওহ মাই গড...

সঞ্চালিকাঃ মাগো…

ম্যামঃ শোনো...তোমার নামটা কী  যেন?

সঞ্চালিকাঃ হ্যাঁ হ্যাঁ, তালেগোলে নামটাই জানা হয়নি।

দিপান্‌ভিতা, ম্যাম।

কী?

দিপান...ভিতা।

সঞ্চালিকাঃ নামটা চেনা চেনা লাগছে না ম্যাম? কোথায় যেন শুনেছি?

ম্যামঃ হ্যাঁ, দিপানভিতা, শোনো তুমি একেবারে ঠিক জায়গায় এসেছ, তোমার দিদি নেই তো কী হয়েছে, শাইন অ্যান্ড গ্লো, আমি, আমার পুরো টিম…

সঞ্চালিকাঃ আমিও আমিও...

ম্যামঃ আমরা সবাই তোমার সাপোর্ট সিস্টেম হব। তোমার ফার্স্ট পিম্পলকে সেলিব্রেট করব, প্রফেশনাল কেয়ার প্রোভাইড করব। কত বয়স তোমার?

এই তো পনেরোতে পড়ব ম্যাম।

থ্যাংক গড। তুমি ঠিক সময়ে এসেছ। অ্যাকচুয়ালি বারোতে এলে ঠিক হত, কিন্তু তিন বছর লেট ইজ স্টিল ম্যানেজেবল। এখন থেকেই যদি রেজিমেন্টেড ওয়েতে স্কিনের টেক কেয়ার করা শুরু কর, লং রানে মারাত্মক ফল পাবে। গত বছর থেকে আমরা সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো-র একটাক্যাচ দেম ইয়ংলাইন শুরু করেছি...

সঞ্চালিকাঃ ওটা এর জন্য বেশ মানানসই হবে না ম্যাম? ইয়ংও আবার ক্যাচ কট কট হওয়ার জন্য বেশ উদগ্রীবও।

ওটা বারো থেকে পনেরোর এজ গ্রুপকে টার্গেট করে বানানো হয়েছে। ওখানে সনাতনী পিম্পল প্যাকেজ পেয়ে যাবে। প্যাকেটের ভেতরে সব লেখা আছে দেখে দেখ ইউজ করবে। তাছাড়াও তোমাকে আমার ভারি ভালো লেগেছে কি না, তাই আমি ফ্রিতে কিছু স্কিন ভালো রাখার টিপস দিয়ে দিচ্ছি, মন দিয়ে শোনো।  ফুচকা রোল আলুকাবলি আরও যা যা সব তোমার বয়সী মেয়েরা খায়, অ্যাট এনি কস্ট অ্যাভয়েড করবে কারণ এক, তুমি অন্য মেয়েদের মতো নও, দুই, গ্লোয়িং স্কিন নিডস গ্রেট স্যাক্রিফাইসেস। খালি জল আর ফলের ওপর থাকতে পারলেই ভালো। অন্য  মেয়েদের মতো মুটোবে না, দারুণ কনফিডেন্স পাবে। আর যা-ই কর না কেন, রোদকে প্লেগের মতো পরিহার করবে। বাড়ি থেকে বেরোতে হলে গাড়ি ব্যবহার করবে, না পারলে সারা মুখ কাপড়ে বেঁধে বেরোবে। চোখ দুটো খোলা রাখলেও রাখতে পারো, তবে আমি বলব গগলস পরে নিতে। সান থেকে প্রোটেকশন তো আছেই, তাছাড়া এই রকম আনপ্রিপেয়ারড  ফেস নিয়ে পৃথিবীকে ফেস করার জন্য এখনই তুমি রেডি নও।

ওকে ম্যাম। ইইইইই, আই অ্যাম সো এক্সাইটেড।

সঞ্চালিকাঃ আমরাও দিপানভিতা-......দিপান... ভিতা... দিপান.....এই তোমার নাম দীপান্বিতা নাকি? হ্যালো হ্যালো, কেটে গেছে। ওহ, আরেকটা কল এসেও গেছে। হ্যালো কে আছেন লাইনে? সাজাব যতনে-তে আপনাকে স্বাগত জানাই।

হ্যালো, আমি শ্রীরামপুর থেকে মৌমিতা বলছি।

হ্যাঁ মৌমিতা বলুন।

আমার চুল পেকে যাচ্ছে।

সঞ্চালিকাঃ যাক, আমি ভাবছিলাম আজ খালি ফেস নিয়েই কথাবার্তা হবে। সাজাব যতনে-র আজকের এপিসোডের প্রথম হেয়ার কলার হওয়ার জন্য আপনাকে অভিনন্দন মৌমিতা।

ম্যামঃ পেকে যাচ্ছে? হুম, আপনার হেয়ার সম্পর্কে আরেকটু ডিটেলস দিন।

কলারঃ এই তো পিঠের মাঝখান পর্যন্ত পৌঁছোয়, কালো রঙের...  

সঞ্চালিকাঃ যা কিনা দ্রুত সাদা হওয়ার দিকে এগোচ্ছে।

ম্যামঃ আহা, টেক্সচার বলুন, খরখরে না ফিনফিনে, ভারি না হালকা, স্ট্রেট না ওয়েভি...এই রকম স্কেচি ডিটেলস ফোনে শুনে ডায়াগনসিস এত ডিফিকাল্ট হয়ে যায়। শুনুন আপনাকে ক্লিনিকে আসতে হবে। আমরা চুলের এক্সরে, এম আর আই করাব, লেজার গান ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চুলের জাত গোত্র ধর্ম সব বার করে ফেলব। তারপর ট্রিটমেন্ট শুরু হবে। যতদিন সেটা না হচ্ছে আপনি নিউ অ্যান্ড ইমপ্রুভড শাইন অ্যান্ড গ্লো হেয়ার সেরামটা রেগুলারলি ব্যবহার করুন। ওটায় অ্যালোভেরা অ্যান্ড অ্যাকটিভেটেড চারকোল ঠেসে দিয়েছি। আর আমার ক্লিনিকে ফোন করে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিন। অ্যাসাপ।

সঞ্চালিকাঃ ফোন নম্বর দেখুন স্ক্রিনের নিচে ভেসে ভেসে যাচ্ছে।

কলারঃ ওককে ম্যাম, থ্যাংক ইউ ম্যাম।

ম্যামঃ ব্যস শুধু হেয়ার? আর কিছু সমস্যা নেই? স্কিন, পিম্পল...  

সঞ্চালিকাঃ সেও কি সম্ভব?

ম্যামঃ রেগুলারলি ট্রিটমেন্ট করান? ফেশিয়াল? ব্লিচিং? এনি কাইন্ড অফ প্যাম্পারিং?

কলারঃ না, মানে ও সব তো...

বয়স কত?

এই অক্টোবরে সাতাশ পূর্ণ করে আঠাশে পড়ব।

আঠাশ! কী সাংঘাতিক! তুমি আঠাশেও বসে বসে ঘুমোচ্ছ? মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি শোননি?

সঞ্চালিকাঃ এইটা ঠাকুমাও বলত।

ম্যামঃ মেয়েরা কুড়িতে বুড়ি হয়, পঁচিশ থেকে মেয়েদের মুখের চামড়া ঢিলে হতে শুরু করে, মুখে বিশ্রী দাগ বেরোয়, ঠোঁট ঝুলতে শুরু করে, হাতপায়ের চামড়া কোঁচকায়। আর তুমি আঠাশ বছর বয়সে নিজের আঢাকা আকাচা মুখ, পাকা চুল নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছ? দেশে আইনআদালত নেই নাকি?

সঞ্চালিকা শিউরে ওঠার ভঙ্গি করলেন।

সনাতনী গ্লো ফ্লো ছাড়ো, এই স্টেজে এক্সটারনাল অ্যাপ্লিকেশন আর কাজ দেবে না, তোমার এখন সনাতনী বোটক্স দরকার। আমাদের সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো রিপেয়ারিং প্যাকেজ আছে, ইঞ্জেকশন দিয়ে ঠোঁটে গাঁদাল পাতার রস ঢুকিয়ে দেব, ভৃঙ্গরাজের সঙ্গে ভিটামিন সি পাঞ্চ করে মাথায় মাখিয়ে দেব, গন্ধে আশেপাশে লোক ঘেঁষতে পাবে না, প্রাইভেসির হদ্দমুদ্দ। কিন্তু তোমাকে ইমিডিয়েটলি শাইন অ্যান্ড গ্লো আই সি ইউ তে আসতে হবে। দয়া করে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে এসো না। ওই লেভেলের স্ট্রেস ফেসের ডেলিকেট স্কিন হ্যান্ডল করতে পারে না। ওলা উবার নেবে। নিতান্ত দৈন্যদশা হলে পুল বা শেয়ার নিতে পার।

সঞ্চালিকাঃ হ্যালো মৌমিতা, হ্যালো? লাইনে আছেন? আহা রে, ভয়ে গলা একেবারে বসে গেছে, শুনুন আপনি ঘাবড়াবেন না, আমাদের ম্যাম টাফ লাভে বিশ্বাস করেন। আপনি সময় করে একদিন ম্যামের ক্লিনিকে চলে আসুন। না না, শ্রীরামপুর থেকে ওলা নেওয়ার দরকার নেই, আসলে ম্যামের ভূগোলটা একটু… এদিকে হেদো ওদিকে পাটুলি পেরোলে শ্রীরামপুরও যা সাসকাচুয়ানও তাই। শুনুন, টা নাগাদ একটা শ্রীরামপুর লোকাল আছে না? সেটায় আসবেন, আগেভাগে উঠলে জানালার ধারের সিট পেয়ে যাবেন, স্ট্রেস হবে না বেশি। ওকে? ভয় পাবেন না। টাটা, বাই বাই আবার যেন দেখা পাই।

দিদি, পরের কলে যাওয়ার আগে ওই যে সনাতনী রিপেয়ারিং প্যাকেজ না কী বললেন, সেটা সম্পর্কে আরেকটু খোলসা করুন না প্লিজ-

হ্যাঁ, সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো রিপেয়ারিং প্যাকেজ। গত বছর থেকেই আছে। না রেখে আর থাকতে পারলাম না। আমাদের এডুকেশন সিস্টেমটা এত ফ্লড। চালকলা বাঁধা শিক্ষাই শুধু হয়েছে, কোনও কাজের কাজ হয়নি। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক জয়েন্ট স্পোকেন ইংলিশ নিয়ে পাগলা হয়ে যাচ্ছে সব। আরে বাবা খানাখন্দ ছোপছাপওয়ালা মুখ নিয়ে বাংলায় লেটার তো ভুলেই যাও, হড়হড় করে ইংরিজি বললেও চিঁড়ে ভিজবে না। সালোকসংশ্লেষ গিলিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর অথচ আমাদের বডির বৃহত্তম অর্গ্যান যে স্কিন সেটার টেক কেয়ার কী করে করতে হবে সে ব্যাপারে স্পিকটি নট। থিওরির তো এই অবস্থা, প্র্যাকটিক্যালও তথৈবচ। শহরের বাইরে গেলে সমস্যাটা ভয়াবহ ম্যাগনিচিউডে। বিঘে বিঘে জমির ওপর স্কুল বানিয়েছে, খাঁ খাঁ মাঠ, ঝাঁ ঝাঁ রোদ, সেই মাঠে বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা দৌড়চ্ছে। হা হা করে হাসছে। কেউ কিছু বলার নেই। অত ভায়োলেন্টলি হাসাহাসির ফলে চোখের নিচের স্কিনে টান পড়ছে, কুঁচকে যাচ্ছে। ওই জায়গার স্কিন কী ডেলিকেট তোমাকে কী বলব, ও জিনিস আর সারবে? আমি অনেস্ট তাই বলছি, সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো-ও সারাতে পারবে না। সাম ড্যামেজেস আর পার্মানেন্ট।

ইস, জোরে হাসতে কত করে মানা করেছিল ঠাকুমা । তখন এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বার করেছি।

ঠাকুমাদিদিমার কথা না শুনে শুনেই তো পরিস্থিতি এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। সাড়ে সাত হাজার বছরের ঐতিহ্য, তার একটা মুল্য নেই? এই যে এত হেয়ারের প্রবলেম মেয়েদের আজকাল, এও তো ট্র্যাডিশন ভাঙার শাস্তি।

কী বলছেন ম্যাম?

আচ্ছা তোমার ঠাকুমার ছবি আছে বাড়িতে?

হ্যাঁ ম্যাম, সাদা চুল,ফোকলা দাঁত, আমার দিদির মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে হাসছে।

আহা যৌবন বয়সের।

একটা ছিল বোধহয় বাবার কাছে, ভীষণ খারাপ কোয়ালিটি। হলদে মার্কা, ঠাকুমা উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে। মাথায় ঘোমটা।

অ্যায়, অ্যায়। তোমার ঠাকুমার চুল কবে পেকেছে?

তা তো মনে নেই ম্যাম, আমি তো অনেকদিনই দেখছি।

আঠাশ বছরে পেকেছিল কি?

মনে হয় না।

আলবাৎ পাকেনি। কোনও ঠাকুমাদিদিমার চুল আঠাশ বছরে পাকেনি। ভূভারতে কেউ দেখাতে পারবে না। কেন বল তো?

খাবারে ভেজাল ছিল না বলে নাকি ম্যাম? আমি ক্লাস ফাইভে অংকে ফেল করেছিলাম সবাই মারতে এসেছিল। একা ঠাকুমা বলেছিল আমার কোনও দোষ নেই, এত ভেজাল দেওয়া খাবার খেয়ে পাশ করলেই আশ্চর্য হত।

উফ্‌, সেটা কমপ্লিটলি ডিফারেন্ট ইস্যু। মেয়েদের চুল পাকার এপিডেমিকের পার্শিয়াল এক্সপ্ল্যানেশন খাবারে ভেজাল হতে পারে, পুরোটা কী করে হবে।

তাহলে কী ম্যাম?

ভাবো ভাবো, তোমার ঠাকুমার ছবিতেই ক্লু আছে, এটাও বলে দিচ্ছি।

উঃ, ক্লু, ডিটেকটিভ গল্প আমার ফেভারিট ম্যাম। ঠাকুমার ছবি, ঠাকুমার ছবি… সাদাকালো...আয়তাকার…

ওরে বাবা, ছবিটা না ছবিটাতে ঠাকুমার কথা ভাবো।

ঠাকুমা... ঠাকুমা... উঁচু কপাল, খাড়া নাক, উদাস চোখ, তবে ওটা বোধহয় ফটোগ্রাফারের ইন্সট্রাকশন...আচ্ছা আচ্ছা ভাবছি... গলায় চেন, মাথায় ঘোমটা...

স্টপ!

গলার চেন?

উঁহু।

মাথায় ঘোমটা?

হেয়ারের সব থেকে বড় এনিমি কী জানো? থাক আমিই বলছি, সান। আর সেই সান থেকে ঘোমটা সাড়ে সাত হাজার বছর ধরে মেয়েদের কী লেভেলে প্রোটেকশন দিয়েছে জানো?

তার মানে ম্যাম, বলছেন সনাতনী ঘোমটায় ফেরত গেলেই...

আমি কিছুই বলছি না ভাই, হার্ড এভিডেন্স যা বলার বলছে।

ম্যাম, প্রোডিউসার হাত নাড়ছেন, এই লাইনে আর এগোতে বারণ করছেন বোধহয়। আবার কখন তেনারা বল্লম নিয়ে এসে পড়বেন...

কেনারা?

ভরদুপুরে তেনাদের নাম নিতে নেই, ম্যাম। ডেঞ্জারাস ব্যাপার।

কী বলছ কী? কারা?

জানেন না? ফ-এ এ-কার, ম-এ হস্‌সি, ন-এ হসসি…

ও মাই গড, দ্যাট এফ ওয়ার্ড। আরে ছাড়ো তো, ওদের আবার ভয় পাওয়ার কী আছে? সমান হতে চাস তো ক্যান্সারের ওষুধ বার করে দেখা, তা না যত কোপ ঘোমটা আর বাপভাইয়ের সম্পত্তির ওপর। শেমফুল। আসুক না কার আসার, দেখিয়ে দেব। সাজাব যতনের দর্শকদের বলছি, প্লিজ, প্লিইইজ অত জোরে হাসবেন না। অল্প করে ঠোঁট ছেতরান। পার্সোন্যালিটিও মেন্টেন হবে, চোখের ঠোঁটের চামড়াও কুঁচকোবে না।

আসলে ওটা না অনেকের হাতে থাকে না, ম্যাম।  অনেকে না হাসি পেলে চাপতে পারে না। আমারও ওই রোগটা আছে। হাসি পেলে একেবারে বত্রিশ পাটি বার করে পেট চেপে গড়াগড়ি হাসি। মুচকি হাসিতে সারব যে তা হবে না।

চেষ্টা করবে। সনাতনী একটা টোটকা আছে হাসি কন্ট্রোল করার। ডান নাক চেপে বাঁ নাক দিয়ে শ্বাস ছাড়বে, আবার বাঁ নাক চেপে ডান নাক দিয়ে শ্বাস ছাড়বে। ওটা পাঁচবার করতে না করতেই হাসির ঠাকুরদা বাপ বাপ বলে পালাবে। অন্যের তোমাকে দেখে হাসি পেতে পারে, তোমার পাবে না। গ্যারান্টি। তাছাড়া দাঁতেরও যা ছিরি। প্লিজ নন-হোয়াইটেনড দাঁত দেখিয়ে হাসবেন না। ডাক্তারদের কাছে নিয়মিত গিয়ে দাঁত সাদা করে আসুন। তবে দাঁতের ডাক্তাররা আজকাল ভিজিট বাড়িয়েছেন...

ওরে বাবা ম্যাম, গত বছর আমার রুট ক্যানাল হয়েছিল, দাঁতের ব্যথা ভুলিয়ে দিয়েছিল পকেটের ব্যথা। পুজোয় একটা শাড়ি কম কিনতে হল। এবার বাইরে কম খেয়েছি, একটা বেশি কিনে মেক আপ করে নেব।

এত কৃচ্ছ্রসাধনের আর দরকার নেই। পকেটকে কষ্ট না দিয়ে দাঁত ঝকঝকে করার উপায় আমরা আমাদের ল্যাবে রিসার্চ করে বার করেছি। (ম্যাম হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে বেগুনী টিউব তুলে নিলেন) এই যে আছে, সনাতনী দন্তরুচি শাইন অ্যান্ড গ্লো টুথপেস্ট। নুন আছে, কয়লা আছে, আরও যা যা উপকরণ বেদে লেখা ছিল সব ঠেসে দিয়েছি। সাতদিন মাজুন, দাঁত একেবারে ঝকঝক করবে।

ঠাকুমা বলতেন আমলকি নাকি দাঁতের পক্ষে ভালো, সনাতনী পেস্টে আমলকি রেখেছেন ম্যাম?

অফ কোর্স, রেখেছি। তবে আমলকি নয়, আমলা। প্যাকেজিং-এর রিয়েল এস্টেট আজকাল হেবি চড়া। যেখানে তিন অক্ষরেই সারা যায়, চার অক্ষর কেন ভাই? কম কথায় সারা বাঙালির ধাতে নেই। বাংলা ইজ দ্য মোস্ট ইনএফিশিয়েন্ট ল্যাংগোয়েজ। ইনএফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ইউজলেস।

এইটা একদম ঠিক বলেছেন ম্যাম। আমারও কোনও ইউজে লাগেনি। উল্টে বাঁশ। আমি দাঁতনমাজি বালিকা বিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট বলে আমাকে সামনে ল্যাপটপ নিয়ে বসতে দেয়নি, জানেন? সেই কবে থেকে অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে রেখেছি। এদিকে যারা সেন্ট আর মেরি থেকে বেরিয়েছে, সবার সামনে ল্যাপটপ, গায়ে জ্বলজ্বলে লালসাদা  টুথপেস্টের অ্যাড সাঁটা। আমাকে ল্যাপটপ দিলে আমি আমারটায় সনাতনী মাজনের বেগুনি অ্যাড সাঁটার অ্যাপ্লাই করব, ম্যাম। প্রমিস।

থ্যাংক ইউ সো মাচ।

আচ্ছা ম্যাম, এই রিপেয়ারিং প্যাকেজে আপনারা লোমটোম তোলেন? গোঁফ চাঁছেন? নারীকে নির্লোম করে দেন?

অফ কোর্স। লোম থাকলে অর্ধেক নারীত্ব মাটি।

তাছাড়া হাতে লোম না থাকলে শুনেছি ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেটের গ্রিপও ভালো হয়। একটা হেয়ার রিমুভাল ক্রিমের অ্যাডে দেখলাম দীপিকা পাড়ুকোনকে, কী জোরে মারল, বাপস....

এই তো তোমরা অ্যাড দেখে বোকা বনে যাও। দীপিকা পাড়ুকোন ব্যাডমিন্টন ভালো খেলবে না তো কি তুমি খেলবে? ওদের দেখানো উচিত অর্ডিনারি নারীদের, এই ধরো তোমার মতো যারা, তাদের হাত স্মুদ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রং হচ্ছে কি না।

হচ্ছে নাকি ম্যাম?

দেখো চামড়ার কোয়ালিটি আর বিয়ের বাজারে মেয়ের দামের কোরিলেশন তো অলরেডি এস্ট্যাবলিশড। বাকি বিষয়গুলোতে এখনও সে রকম নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না তবে রিসার্চ চলছে। বিউটি অ্যান্ড কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রির জায়েন্ট প্লেয়ারদের আর এন ডি ডিপার্টমেন্টরা কোমর বেঁধে নেমেছে। ডেটা কালেকশন হচ্ছে, গ্লোবাল ডেটা, বিগ ডেটা

গায়ে কাঁটা দিচ্ছে...

সেই ডেটা নিয়ে কোটি কোটি ইকনমিস্ট, স্ট্যাটিসটিশিয়ান দিবারাত্র অংক কষছে, ভেরিয়াস টপিকসে, মেয়েদের হাতের লোমের সঙ্গে র‍্যাকেটের গ্রিপের, মেয়েদের চুলের ঘনত্বের সঙ্গে ইভটিজিং-এর প্রতিবাদ দেখানোর সাহসের এটসেটরা এটসেটরা। আমরা তো ছোট আউটফিট, আমরাও আমাদের মতো করে চেষ্টা করছি। স্মল স্কেলে ডেটা কালেকশন চলছে। আমার বোনপো মাস্টার্স করছে ইকনমিক্সে, ওর সামার ভেকেশন চলছে, এখন ও বসে বসে ল্যাপটপে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলছে, বলেছে ডেটা এসে গেলেই রিগ্রেশান রান করে রেজাল্ট বার করে দেবে। মেনলি দুটো রিসার্চ কোশ্চেন রেখেছি। এক, চুলের শাইনের সঙ্গে অফিসকাছারিতে অপমানিত হওয়ার সম্পর্ক; দুই, ফেসের গ্লোর সঙ্গে জয়েন্ট ক্র্যাক করার কোরিলেশন। আমার গাট ফিলিং বলছে, ওই সেকেন্ড রেজাল্টটা বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেক্যাচ দেম ইয়ং’-লাইনের সেলসের পালে হাওয়া লাগবে।

লাগবে কি ম্যাম, লেগে গেছে ধরে নিন।

বলছ? থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ। রিপেয়ারিং প্যাকেজের তিনটে অপশন রয়েছে, ডিলাক্স, এক্সিকিউটিভ, প্রিমিয়াম প্যাকেজ।

তিনটের তফাৎ কী যদি বলে দেন।

দেখো ডিলাক্সটা আমি দেখি না। শাইন অ্যান্ড গ্লো অ্যাকাডেমির আনপেড ইন্টার্নরা দেখে। ডিলাক্স প্যাম্পারিং প্যাকেজ অপট্ করলে আমরা একটা মুচলেকা সই করিয়ে নিই যে পরিণামের দায়িত্ব শাইন অ্যান্ড গ্লো কর্তৃপক্ষের নহে। ইনটার্নরা ফেশিয়াল করতে গিয়ে চোখের মণি ম্যাসাজ করে দিল নাকি গরম ওয়্যাক্স ফেলে অর্ধেক ভুরু উড়িয়ে দিল, সে সব দায় আমরা নেব না। আপনি সজ্ঞানে সবথেকে চিপ অপশনটা বাছলে এ সব হতেই পারে। এক্সিকিউটিভটা শাইন অ্যান্ড গ্লো-র ছেলেমেয়েরাই দেখে। তবে ইয়াং ব্লাড তো, মজা করার লোভ সামলাতে পারে না। মাঝে মাঝেই হাসতে হাসতে এসে আমাকে বলে, দিয়েছি দুটো ভুরু দুরকম করে। প্রিমিয়ামের পয়সা না বার করার মজা বুঝুক এইবার।

আর প্রিমিয়ামটা ম্যাম?

সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো প্রিমিয়াম রিপেয়ারিং অ্যান্ড প্যাম্পারিং প্যাকেজ, ইটস দ্য স্টাফ ড্রিমস আর মেড অফ। এখানে শাইন অ্যান্ড গ্লো-র বাছাই করা শিল্পীরা আপনার মাথার চুলের ডগা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত বিউটিফাই করবে, প্যাম্পার করবে। আপনি সুন্দরী তো হয়ে উঠবেনই, আপনার স্ট্রেস গলে পড়বে, যতক্ষণ আপনি আমাদের স্টুডিওতে থাকবেন, বেশিক্ষণ না, পুরো প্রসিডিওরটায় ঘণ্টা বারো সময় লাগবে, ততক্ষণ জীবনের কোনও ক্লেদ আপনাকে ছুঁতে পারবে না, বসের মুখে মনে পড়বে না। চুল আপনি যেমন চান তার থেকেও ফুরফুরে হয়ে উঠবে, স্কিন যতটুকু চান তার থেকেও বেশি গ্লোয়িং। প্রতিবেশী, বস, বর, বয়ফ্রেন্ড যে দেখবে চমকে যাবে।

উঃ দারুণ হবে বলুন দিদি...আচ্ছা এই প্যাকেজগুলো করতে গেলে কত খসবে যদি...অ্যাঁ... আরেকটা ফোন এসে গেছে? নেওয়া যাক। হ্যালো?

কলারঃ শুনুন, আমি অনেকক্ষণ থেকে আপনাদের অনুষ্ঠান শুনছি, কিন্তু এক্ষুনি একটা কথা আপনারা বললেন যেটার প্রতিবাদ করতে আমাকে ফোন করতেই হল।

ওরে বাবা ম্যাম, দেখেছেন ফ-জুজু এসে গেছে। কেন ও সব ঘোমটার উপকারিতাটুপকারিতা বলতে গেলেন ম্যাম, প্রোডিউসার আবার আমার ল্যাপটপ ঝুলিয়ে দেবে। ধুস।

ম্যামঃ আহা শোনাই যাক না, কী বিষয়ে প্রতিবাদ। বলুন ভাই।

আপনি যে এই বললেন না যে আপনাদের প্রিমিয়াম প্যাকেজটা ইউজ করলে বর বয়ফ্রেন্ড অফিসের লোক পাড়ার লোক সব চমকে যাবে। আমি অ্যাকচুয়ালি ভাবছিলাম প্যাকেজটা নেব, কিন্তু আমি তো কাউকে চমকাতে চাই না।

সঞ্চালিকাঃ সেকি কাউকে চমকাতে চান না অথচ নিজের ত্বক চমকাতে চান?

মানে চমকালে চমকাতে পারে, কেউ যদি চমকাতেই চায় তাহলে আমি তো বাধা দিতে পারি না, আমি আবার ব্যক্তিস্বাধীনতার পূজারী।

আপনি খুবই অন্যরকম কিন্তু। এই রকম আমি আগে শুনিনি, আপনি শুনেছেন ম্যাম?

আমি এই করে চুল লাল বেগুনী নীল সবুজ করেছি হে, স-অ-অ-ব আমার দেখাশোনা আছে। দাঁড়ান আমি বলছি, আপনি আর্টিস্ট, মেক আপ আপনার ক্রেয়ন বাক্স, মেক আপ ব্রাশ আপনার তুলি, মুখ আপনার ক্যানভাস। রোজ সকালের সাজগোজ আপনার ক্রিয়েটিভ আউটলেট। তাই তো?

কলারঃ কী কাণ্ড, আপনি তো এ যুগের নস্ত্রাদামুস...

সঞ্চালিকাঃ খনাও হতে পারেন। আসলে কী বলুন তো, কবি তো বলেই গেছেন, মুখই মনের আয়না। আর আমাদের ম্যাম সারাদিন মুখ নিয়েই চর্চা করেন, শত  শত মুখ...
  
ম্যামঃ বিভিন্ন শেপের, শেডের...

হ্যাঁ শেপের শেডের মুখ, নাড়েন চাড়েন ঘাঁটেন। কাজেই কার মনে কী চলছে সেটা যে ম্যাম ধরে ফেলবেন তাতে অবাক হওয়ার কিচ্ছু নেই।

ম্যামঃ  যাই হোক আপনি আর্টিস্ট যখন জানেন নিশ্চয়, ছেঁড়া ফাটা ছোপ লাগা ক্যানভাসে ভালো আর্ট হয় না। কাজেই ক্যানভাসটাকে টানটান আর চকচকে রাখতে হবে। আমাদের সনাতনীর গ্লো ময়েশ্চারাইজার আর গ্লো সেরাম, গ্লো ফেস ওয়াশ আরও যা যা বলে মুখে রক্ত তুললাম এতক্ষণ সব নিয়মিত ইউজ করুন। আমাদের একটা সনাতনী প্যালেট বার করেছি, এক্সাইটিং সব কালারস, আর্টের বেগ আসলে সেগুলো যেখানে যা ইচ্ছে যেমন খুশি মিশিয়ে লাগিয়ে নিন। তবে আমার একটা পরামর্শ আছে, অ্যাপ্লিকেশনে খুব একটা অরিজিন্যালিটি দেখাতে যাবেন না। এ ক্যানভাসে সালভাদর দালি না হতে যাওয়াই বেস্ট। আর্টিস্টিক আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, চারপাশের ক্রিয়েটিভরা যা করছেন, চোখ বুজে তাই করে যান।

কলারঃ সে তো বটেই, আগে তো রুল শিখতে হবে, তবে তো ব্রেক।

সঞ্চালিকাঃ উঃ কী বললেন। আগে রুল শেখা, তারপর ব্রেক। ভালো বলেছে না ম্যাম?

শুধু বললেই তো হবে না, কাজে করতে হবে।

তা ঠিক। জ্ঞানপাপী থাকে অনেকে। ঠাকুমা বলত আমারও নাকি ওই টেন্ডেন্সি আছে। যাই হোক, এবার আমরা আমাদের প্রোগ্রামের শেষের দিকে চলে এসেছি, আর একটাই ফোন নেওয়া যাবে। ম্যামের কাছে আরও কোনও প্রশ্ন বাকি থাকলে স্ক্রিনের নিচে ভেসে ভেসে যাওয়া নম্বরে ফোন করুন, মেল করুন, প্যাকেজ কিনুন, সুন্দরী হোন কিংবা আর্ট প্র্যাক্টিস করুন, আপনার যেমন অভিরুচি।

হ্যালো হ্যালো, কে আছেন। সাজাব যতনে-র আজকের এপিসোডের শেষতম কলার হওয়ার জন্য আপনাকে অভিনন্দন। বলুন আপনার কী প্রবলেম হচ্ছে? স্কিন ম্যাড়ম্যাড়ে নাকি হেয়ার ফল?

কলারঃ প্রবলেম আমার হয়নি, তোর ম্যামের হবে এবার।

এ কী, আপনার গলায় কেমন বেসুর বাজছে… হে ভগবান আপনি ফ-জুজু নাকি? দেখুন ওই ঘোমটার ব্যাপারটা কিন্তু আমি বলিনি, হ্যাঁ হ্যাঁ প্রোডিউসার হাত নেড়ে বলতে বলছেন উনিও বলেননি, আমাদের প্রোগ্রামের গেস্টরা কে কী বলল সে রাগ আমাদের ওপর ঝাড়বেন না প্লিজ…

তোর ম্যামকে ফোনটা দে…

দিচ্ছি দিচ্ছি... তবে আপনার ভাষাটা যদি একটু পরিশীলিত করেন...এটা তো ব্রাভো টিভি নয় ভাই, আমাদের চ্যানেলের নামমোদের গরব মোদের আশা’...

ফোনটা দিবি নাকি…

দিচ্ছি দিচ্ছি, বাবাগো…

ম্যামঃ হ্যাঁ দাও তো, দেখি এত তড়পানি কীসের। হ্যালো বলুন ভাই আপনার কী কী গ্রিভ্যান্সেস।

গ্রিভ্যান্সেস মানে? এই সাজাব যতনে-তেই তিন মাস আগে এসে খুব জাঁক করে বলেছিলেন, সপ্তাহে তিনদিন মাখলে নাকি মুখ এমন চকচক করবে ফোন থেকে টর্চ অ্যাপ ডিলিট করে দিলেও চলবে?

দেয়নি বুঝি?

দেড়শো টাকায় দেড় চামচ পাউডার, তিন বাক্স কিনে ফুরিয়ে ফেললাম, তারপর মাসতুতো দিদির বিয়েতে গিয়ে সবাই মামাতো বোনের স্কিনের গ্লো নিয়েই সবাই উদবাহু। আমার দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠছে, এ কী চেহারা, কিছু করাচ্ছিসটরাচ্ছিস না কেন? ওই চলল গোটা বিয়েবাড়ি।

ম্যামঃ ভুলভাল মেখেছিলেন নিশ্চয়

সঞ্চালিকাঃ প্যাট করে করে লাগিয়েছিলেন? না থুপেই দায় সেরেছিলেন?

আরে রাখুন আপনার প্যাট। আর কী যেন চুল গজানোর মলম? মাখতে গিয়ে আমার চার আঙুল কপাল পাঁচ আঙুল হয়ে গেছে, সারা মাথা গুঁড়ি গুঁড়ি, তিন দিন বাদে ফুলে উঠে ফেটে গিয়ে পুঁজ...শেষটা ডাক্তার ডেকে, গোটা মাথা কামিয়ে এখন ব্যান্ডেজ বেঁধে বসে আছি, চুল উঠবে কি না গ্যারান্টি দিচ্ছে না ডাক্তার। আমি উকিলের চিঠি পাঠাচ্ছি তৈরি থাকুন।

সঞ্চালিকাঃ সেকী কাকে চিঠি পাঠাচ্ছেন? আমাদের পাঠাবেন না দয়া করে, স্ক্রিনের  নিচে ম্যামের ঠিকানা ভেসে ভেসে যাচ্ছে সেখানেই বরং...

ম্যামঃ পাঠাতে বল উকিলের চিঠি, আমিও দেখে নেব। কী না কী মেখে শেষে আমার ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে...

কলারঃ আমি সব বোতল সব রসিদ রেখে দিয়েছি, আমি একা নই, আমাদের পাড়ায় আরও দুটো কেস আছে, একজনের শাইন অ্যান্ড গ্লো মেখে সারা মুখে পাঁচড়া উঠেছে, আরেকজনের এক্স্যাক্টলি আমার কেস, ন্যাড়া মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে ঘুরছে। আমরা দুজনে গোটা মিউনিসিপ্যালিটি, মহকুমা, জেলা ঘুরে ঘুরে সই সংগ্রহ করছি, শাইন অ্যান্ড গ্লো মেখে খোসপাঁচড়ায় ছেয়ে যাওয়া, ভুরু  উঠে যাওয়া কেস হুড়হুড় করে বাড়ছে, দরকার হলে নিখিল বঙ্গ অ্যান্টি শাইন অ্যান্ড গ্লো সই সংগ্রহ ক্যাম্প খুলব, তবু ছাড়ব না। সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো-র সবাইকে আমি জেলের লপ্সি না খাইয়ে থামব না। আর এই যে আপনারা, যত সব ভুঁইফোঁড় চ্যানেল খুলে বসে চোরচোট্টা চিটিংবাজদের জায়গা দিচ্ছেন, তারাও বাদ পড়বেন না, তৈরি থাকুন, এই আমি বলে রাখলাম।

সঞ্চালিকাঃ মাগো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে, বাপিদা কী করছ, লাইনটা কাটো শিগগিরি... উঃ, বুকটা কী জোরে ধড়ফড় করছে।

ম্যামঃ আরে যান যান বসান ক্যাম্প, করান সই, দেখব কার ঘাড়ে কটা মাথা। আমার জামাইবাবু হাই কোর্টে আছেন। দেখ গে, বংশের সবার টাক, সে এক্সপেক্ট করে কী করে যে একমাস শাইন অ্যান্ড গ্লো মেখে কেশবতী কুন্তলা হবে? এ কী ম্যাজিক নাকি? সাতদিনে আলকাতরা থেকে দুধে আলতা? আমারও কপাল যেমন। এই সব খেন্তিপেঁচিদের সুন্দরী করে তুলতে তুলতে লাইফ হেল হয়ে গেল, কেরিয়ারে একটা গায়ত্রী দেবী পেলাম না, না হলে দেখিয়ে দিতাম, সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লো কী খেল দেখাতে পারে...

শান্ত হন ম্যাম, এত রাগলে আমার ভয় লাগছে,  ও বাপিদা জল আনতে বল না... ঠাকুমা বলত জল খেলে রাগ কমে, খান ম্যাম এই জলটা আস্তে করে চুমুক দিয়ে দিয়ে খেয়ে নিন।

জানো এই সব নেমকহারামদের জন্য আমি দিনরাত এক করে খাটি, আমার ফেভারিট সিরিয়াল একেকদিন মিস হয়ে যায়, আর তার প্রতিদানে...

ম্যাম কাঁদবেন না প্লিজ  কে কোথাকার হেটার কী বলল তাতে কেউ এভাবে কাঁদে? এত কষ্ট পেলে চলে? আমি বলছি আপনাকে ম্যাম, এ বছর সনাতনী শাইন অ্যান্ড গ্লোয়ের যা বিক্রি হবে কসমেটিকসের ইতিহাসে কখনও কোনও ক্রিমের তত হয়নি। মিলিয়ে নেবেন, ম্যাম। ঠাকুমা বলতেন, ভালোর খারাপ হয় না, হতে পারে না। ষাট ষাট...ইস কেঁদে কেঁদে একেবারে হেঁচকি উঠে গেছে গো, ষাট ষাট...

আমাদের প্রোগ্রাম শেষ করার সময় এসে গেছে। দেখুন দেখি শেষে কেমন সব তিতকুটে হয়ে গেল। যাই হোক। ম্যামও কী রকম কেঁদেটেদে... ম্যামের মন ভালো করার জন্য আপনারা ম্যামের ক্রিম, লোশন, দাঁতের মাজন দলে দলে কিনুন, মাখুন। সুন্দরী হবেন কি না হবেন সে সব পরের ব্যাপার। চেষ্টা তো করতে হবে। আপনার হাতে শুধু চেষ্টা করাটাই আছে। করে যান। আমার ঠাকুমা বলতেন, মা ফলেষু কদাচন। গ্লোয়ের আশা না করে মেখে যান। গ্লো আসার হলে আসবে, না আসলে ধরে নেবেন কপালে ছিল না। আপনারা সবাই আমার আসন্ন উৎসবের প্রীতি শুভেচ্ছা ভালোবাসা নেবেন। আজকের মতো আসি? টা টা।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.