August 19, 2018

দ্য হাউস অফ সিল্ক



উৎস গুগল ইমেজেস

আমার এ বছরের গল্পের বই পড়াকে গ্রাফে ফেলল দেখা যাবে দীর্ঘ কোমাটোজ, মাঝে মাঝে প্রাণের সাড়া। কপাকপ তিন চারটে বই গিলে আবার ঝিমুনি। জাগরণের সময়টুকুতে ইন্টারেস্টিং বই যে পড়া হয় না তেমন নয়। রুথ রেন্ডেলের গল্প অবলম্বনে গল্প লিখতে গিয়ে ওঁর দু'খানা ছোটগল্প সংকলন পড়া হয়েছে। রুথ ওয়্যার বলে আমার কাছে নতুন এক লেখকের 'ইন আ ডার্ক, ডার্ক উড' নামের একটা উপন্যাস পড়লাম। অ্যান ক্লিভস-এর ভেরা স্ট্যানহোপ সিরিজ টিভিতে দেখা ছিল, শুরুর দুটো বই পড়লাম। আমার দেখা 'বইয়ের থেকে বেটার' টিভি রূপান্তরের হাতে গোনা লিস্টে আর একটা নাম যোগ হল সম্ভবতঃ। তবে আরও দু'চারটে বই না পড়ে মন্তব্য করা উচিত নয়। 

বইগুলো পড়ার পর অনেক কথা মাথায় এসেছিল, তক্ষুনি লিখে রাখা হয়নি, এখন ভুলে গেছি। কোটেশন-মোটেশনও কিছু জমিয়ে রাখা হয়নি কোথাও। এখন পোস্ট লিখতে গেলে খাটনির মধ্যে পড়তে হবে। সত্যি বলতে কি অবান্তরে পোস্ট লেখা নিয়ে আমার অত উদ্বেগ নেই, যত আছে বই পড়া নিয়ে। বছরের শুরুতে পঞ্চাশটা বই পড়ার ঢ্যাঁড়া পিটিয়েছিলাম, দিল্লি বইমেলার সৌজন্যে খানিকটা পিক-আপও নেওয়া গিয়েছিল, কিন্তু তারপরই কোমা ধরেছে। এখন যা পরিস্থিতি, একত্রিশে ডিসেম্বর পঞ্চাশের বদলে সাঁইত্রিশে গিয়ে দৌড় না শেষ হয়। 

সেটা হতে দেওয়া যায় না। কাজেই আমার এমন বই চাই যা আমি শেষ করতে পারব। অথচ যা চটি নয়। নিজের পরীক্ষায় নিজেই চিটিং করার থেকে প্যাথেটিক আর কিছু নেই। এবং অফ কোর্স, বই এমন হতে হবে, পঞ্চাশটা বই শেষ করার হাস্যকর মুলো নাকের সামনে না ঝুললেও যেটা আমি পড়তাম। পড়তে চাইতাম। আমার পড়তে ভালো লাগত। 

বইয়ের আগে লেখকের নাম মনে এল। 

অ্যান্থনি হরোউইটজ। 

বইও বেশি ভাবতে হল না। ওঁর 'দ্য হাউস অফ সিল্ক' পড়ার ইচ্ছে আমার বহুদিনের। তাছাড়া অরিজিত আশ্বাস দিয়েছেন বইখানা তাঁর ভালো লেগেছে। 

দ্য হাউস অফ সিল্ক, অ্যান্থনি হরোউইটজের লেখা প্রথম শার্লক হোমস প্যাস্টিশ। কোনান ডয়েল এস্টেটের তরফ থেকে বরাত দেওয়া অফিশিয়াল প্যাস্টিশ। দ্য হাউস অফ সিল্ক লেখার পর আর একটি সিকোয়েলও লেখা হয়েছে মরিয়ার্টি নামে। 

বইয়ের শুরুতেই দেওয়া আছে কাজেই স্পয়লার নয়। শার্লক হোমস সত্যি সত্যি মৃত। ওয়াটসন বৃদ্ধ। অতি বৃদ্ধ। নার্সিং হোম-জাতীয় কোনও এক জায়গায় আছেন। সারাদিন লেখেন। লিখলে ভালো থাকেন। 

গল্প শুরু হয়, হোমসের বেশিরভাগ গল্পই যেভাবে শুরু হয় সেভাবে। এক ভদ্রলোক এসেছেন একটি সমস্যার ব্যাপারে হোমসের কাছে সাহায্য চাইতে। রহস্যটিও এর থেকে বেশি হোমসোচিত হওয়া সম্ভব নয়। ভদ্রলোক আর্টের কারবারি। কয়েকটি পেন্টিং চুরি এবং সে চুরি-পরবর্তী মারামারি কাটাকাটির ফলে এক অ্যামেরিকান মাফিয়া তাঁর পিছু ধাওয়া করে ইংল্যান্ডে এসেছে এবং প্রাণে মারার হুমকি দিচ্ছে। শাখাপ্রশাখা বেরিয়ে কেস ক্রমে জটিলতর হয়। সে সব বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে, তাই এড়িয়ে যাচ্ছি, কিন্তু এটুকু বলাই যায়, দ্য হাউস অফ সিল্ক-এ রহস্যের অভাব নেই। প্রথম দেখায় যে রকম লাগে গল্পটা অত সরল নয়। পেঁয়াজকলির থেকে পেঁয়াজের সঙ্গেই হাউস অফ সিল্কের প্লটের সাদৃশ্য বেশি। গল্পে লেস্ট্রাড আছেন, মাইক্রফট আছেন, শার্লকের রাস্তার ছেলে বাহিনী আছে, ছোট্ট রোলে ওয়াটসনের স্ত্রী মেরি আছেন। ঘোড়ার গাড়ি আছে, আফিমের ঠেক আছে। যা কিছু বা যাঁদের অপেক্ষায় শার্লক হোমসের পাঠকরা থাকবেন, তাঁরা সকলেই আছেন। 

প্লট সম্পর্কে এর থেকে বেশি কিছু বলতে না পারার জন্য দুঃখিত। আমার গল্পটা খুবই ভালো লেগেছে। রহস্য, রহস্যের গতি, উত্থানপতন, সবই ভালো। ফোর স্টার দেওয়ার মতো ভালো।

কিন্তু দ্য হাউস অফ সিল্ক মৌলিক উপন্যাস হিসেবে কেমন সেটা জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে শার্লক হোমসের প্যাস্টিশ হিসেবে বইটা কতটা সফল সেটা।

ভাষা, ভয়েস, চরিত্র এবং পারিপার্শ্বিক বিচারে হরোউইটজের 'হাউস অফ সিল্ক' অরিজিন্যাল শার্লক হোমসের গল্পের সফল অনুকরণ বলেই আমার মত। আমার মতে শার্লক হোমসের গল্পের মুল আকর্ষণও ওইগুলোই। শার্লক হোমসের মতো একখানা যুগনির্ণায়ক চরিত্র আর লন্ডনের ছায়াছায়া অলিগলিতে খটাখট ঘোড়াগাড়ি। অরিজিন্যাল হোমসের ওয়াটসনের গল্প বলার ধরণে বিস্ময়চিহ্ন ব্যবহার করার প্রবণতা, বন্ধুর প্রতি অন্ধ গুণগ্রাহিতা, চ্যাপ্টারের শুরুতে টেমস বা কান্ট্রিসাইড নিয়ে প্যারাদুয়েক ভাষাবিস্তার, হাউস অফ সিল্কে একেবারে নির্ভুল টোকা। 

তাহলে কোন জায়গাটায় হাউস অফ সিল্ক অরিজিন্যাল শার্লক হোমসের গল্পের মতো নয়?

এক, বইয়ের আয়তনে। অরিজিন্যাল শার্লক হোমসের ছাপান্নটাই ছিল ছোটগল্প আর উপন্যাস মোটে চারটে। দ্য হাউস অফ সিল্ক, অরিজিন্যাল শার্লক হোমসের দীর্ঘতম উপন্যাস হাউন্ড অফ বাস্কারভিলস-এর থেকেও দীর্ঘ। শুরুর দিকের ঘটনাগুলো, ক্লায়েন্টের দেখা করতে আসা, ক্লায়েন্টকে দেখে বা দেখার আগেই তার সম্পর্কে হোমসের অনেককিছু বলে দেওয়া, মিসেস হাডসনের প্রবেশ ও প্রস্থান ইত্যাদি ঘটনাগুলো স্লো মোশনে ঘটছে মনে হয়। অবশ্য যতক্ষণ না আপনি ওই লয়ে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন ততক্ষণই মনে হয়, তারপর সয়ে যায়।  (আমি কিন্তু অ্যান্থনি হরোউইটজের লেখাকে স্লো মোশন বলছি না। আমি বলছি শার্লক হোমসের সাপেক্ষে ধীরগতি।) 

দ্বিতীয় তফাৎ হল রহস্যের চরিত্রে। শার্লক হোমসের গল্পে সাধারণতঃ যে ধরণের রহস্য থাকে, তার থেকে ঢের ঢের ঢের বেশি আতংকউদ্রেককারী। অরিজিন্যাল শার্লক হোমসের ক্লায়েন্টরা জানালার বাইরে 'স্যাভেজ' ইন্ডিয়ান 'মাংকি' ফেস দেখলেই স্মেলিং সল্টের বোতলের ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়তেন, দু'হাজার এগারোর পাঠকদের ও জিনিস দেখিয়ে সহানুভূতি আদায় করা কঠিন হত। কাজেই এ যুগের পাঠকরা যা যা পড়ে আঁতকে উঠতে পারেন, বেছে বেছে সেই রকম রহস্যই ফেঁদেছেন লেখক। এবং প্রাচীন চরিত্ররা তৎকালীন সময়ে দাঁড়িয়ে সে সব রহস্যের পিছু ধাওয়া করছেন একেবারে আধুনিক ভাবনাচিন্তা, সংবেদনশীলতা এবং নীতিবোধের সূত্র মেনে। অরিজিন্যাল বইয়ে চরিত্রগুলোর মধ্যে যার ছিটেফোঁটা নমুনাও দেখা যায়নি।  

আর এখানেই প্যাস্টিশের মূল টানাপোড়েন। গলির ছায়া, ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ, মিসেস হাডসনের লং স্কার্টের কুঁচির গুনতি যত বেশি আসলের কাছাকাছি তত হাততালি। কিন্তু সাজ পোশাকের আড়ালে চরিত্রগুলোর মূল্যবোধ হতে হবে একেবারে আপ টু ডেট। বেশ কিছু জায়গায় রীতিমত ক্ষমা চেয়েছেন ওয়াটসন, লেস্ট্রেডকে গালি দিয়েছিলেন বলে। শার্লক হোমসকে দিয়ে বলিয়েছেন, সত্যি আমি অনেক কাজ ভেবেচিন্তে করিনি। আরেকটু সেন্সিটিভিটি দেখানো উচিত ছিল।

চরিত্রদের গোলমেলে আচরণ সংশোধন করার দায়িত্ব প্যাস্টিশ লেখকের কি না সেটা ভাবার বিষয়। চরিত্রের অথেন্টিসিটির মধ্যে তার খারাপ দিকগুলোও তো পড়ে। না হয় থাকলই। 

যাই হোক, আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে। বইখানা একদিনে পড়ে ফেলা গেছে। সামনের ক'দিনের গল্পের বই পড়ার যে খরাটা আসতে চলেছে, আসবেই, সে নিয়ে এক্ষুনি দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে।



August 15, 2018

দাদার দোকান



এক নম্বর মার্কেটের কোণাকুণি একটা বড় গাছের তলায় - কী গাছ খেয়াল করে দেখিনি কোনওদিন, বট অশ্বত্থ পরিবারের সম্ভবতঃ - ছিল দাদার চায়ের দোকান। গাছের গায়ে চক দিয়ে কেউ লিখে দিয়েছিল, 'দ্য সিংগিং ট্রি।' চায়ের দোকানের নাম থাকাটা আনকমন। দাদার চায়ের দোকানও কমন ছিল না।  

সে দোকানে সকালে গ্রিন টি পাওয়া যেত, সন্ধেয় হট চকোলেট। সে দোকানের পেছনের পাঁচিলের গায়ের শেলফে মকাইবাড়ি চায়ের প্যাকেট সাজানো থাকত। শেলফের নিচে খবরের কাগজে ছাপা ছবি সাঁটা থাকত, বলিউডের বিখ্যাত চিত্রপরিচালক দাদার দোকানে বসে চা খাচ্ছেন। একটা ইন্ডাকশনের ওপর বড় ডেকচিতে ক্রমাগত চা ফুটত, দুধ চা, যে রকম চা রাস্তার অন্যান্য চায়ের দোকানে আপনি আশা করবেন। অন্য ইন্ডাকশনে কফির জল কিংবা দুধ বসানো থাকত। সারি দিয়ে রাখা থাকত কমার্শিয়াল বৃহদায়তন চকচকে স্টিলের ভ্যাকুয়াম ফ্লাস্ক। মসালা লেমন টি চাইলে, সারি সারি সস এবং মশলার বোতল থেকে জিরের নির্যাস, মশলা মাখানো আমলকির টুকরো, কুচোনো আদা দিয়ে দাদা মশলা লেমন টি বানিয়ে দিতেন। গরমকালে লাল টুকটুকে ফ্রিজ থেকে বরফ বার করে মিক্সিতে গুঁড়িয়ে মিশিয়ে দিলেই হয়ে যেত মসালা লেমন আইস টি। শেষদিকে অবশ্য দাদার হাতের চা খাওয়ার আমাদের কপাল হত না। বেশিরভাগ দিন সহকারী বানিয়ে দিতেন, কোনও কোনওদিন বৌদি। দাদাবৌদির মেয়ের হাতের চাও খেয়েছি আমরা।

দাদাকে আমরা ভাঙা টেবিলে চা বানাতে দেখেছি, সে চা কেটলিতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দোকানে দোকানে ডেলিভারি দিতে দেখেছি। সেই থেকে শুরু করে মসালা লেমন আইস টি। সি আর পার্কে এ ধরণের রূপকথার গল্প হাওয়ায় ওড়ে। কে কবে এসেছিলেন রান্নার ঠাকুর। কিছু ছিল না সঙ্গে। রাঁধতে পারি, আপনার কোনও অনুষ্ঠানে লোক খাওয়াতে হলে বলবেন, শুধু এই অনুরোধটুকু ছাড়া। এই করে ক্রমে কেটারিং ব্যবসা, মার্কেটে দোকান, মার্কেট লাগোয়া চার কোটির ফ্ল্যাট। আমরা শুনে শিহরিত হতাম, কিন্তু দাদার উত্থানটা আমাদের আরও ইমপ্রেসিভ লাগত। কানে শোনা আর চোখে দেখার তফাত আছে। 

আমরা দাদার দোকানে যেতাম। রোজ না কারণ দাদার দোকান থেকে আমাদের বাড়ি একটু দূরে। তবু মাঝে মাঝে ছুটির দিন, চল দাদার দোকানে চা খেয়ে আসি, বলে ধড়াচুড়ো পরে বেরোতাম। আমাদের পক্ষে এত উদ্যোগের কারণ শুধু চা, সে যত ভালোই হোক, হতে পারে না। আমরা যেতাম দাদার খদ্দেরদের দেখতে। দাদার দোকানে বিবিধ লোকের আমদানি হত। অটো চালান, অফিস থেকে ফিরছেন, চা খেতে যতটুকু সময় লাগে, তারপর চলে যাবেন, এঁদের দেখতে আমাদের উৎসাহ ছিল না। দাদার দোকানে কিছু লোক 'ঠেক' বসাতেন, আমাদের টানতেন তাঁরা। পোশাকআশাক দেখলেই বোঝা যেত তাঁরা নাটক করেন, লেখেনটেখেন, গানটান, মিছিলে হাঁটেন, কবিতা তো লেখেনই। আমরা চা নিয়ে বসে তাঁদের ডিবেট শুনতাম, রাজনীতি, খেলাধুলো, এবং আরও নানা বিষয়ে বক্তৃতা শুনতাম। কোনও কোনওদিন আমাদের চলে আসার সময় হয়ে যেত। কোনওদিন ওঁরা আগে যেতেন, কেউ কেউ যাওয়ার আগে দাদা/ বৌদি/ ভাইঝিকে 'হাগ' করে যেতেন, সেও দেখার সুযোগ হয়েছে। 

একদিন সন্ধেবেলা অর্চিষ্মান বাড়ি ফিরে, কান থেকে গান খুলতে খুলতে খুলতে, এ দিয়ে ও পায়ের গোড়ালি থেকে জুতো আলগা করতে করতে বলল, দাদার দোকান তুলে দিয়েছে, জান?

অর্চিষ্মান কানাঘুষো খবর এনেছিল, ওই তল্লাটে থাকা দুই বন্ধু কনফার্ম করল। দাদার চায়ে নাকি ড্রাগ মেশানো হত। কেউ বলছে চায়ে মেশানো হত, কেউ বলছে আলাদা কেনাবেচা হত। মোদ্দা কথা কোনও একটা বেআইনি ব্যাপার চলছিল। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তুলে দিয়েছে। 

বলা বাহুল্য আমরা এ সব গুল বিশ্বাস করিনি। কারও পকেটে যত পৌঁছচ্ছে আর যত পৌঁছনো উচিত সে নিয়ে একটা দড়িটানাটানি উপস্থিত হয়েছে এবং দাদা সে টানাটানিতে হেরে গেছেন। 

তারপর বেশ কিছুদিন ওই জায়গাটা দিয়ে আসতে খারাপ লাগত। গাছের তলা ফাঁকা। চেয়ার নেই, মানুষ নেই, গাছের গা থেকে কাগজের সাজগুলোও খুলে নিয়ে গেছে। 

আরও কিছুদিন বাদে মনখারাপটাও রইল না। 

*****

কাল সন্ধেয় অর্চিষ্মান বাড়ি ফিরে, কান থেকে গান খুলতে খুলতে, এ পা দিয়ে ও পায়ের গোড়ালি থেকে জুতো আলগা করতে করতে বলল, ওহ, দাদা এখানে নতুন দোকান দিয়েছেন, জানো!

আমাদের বাড়ি থেকে মারাত্মক কাছে, মেলা গ্রাউন্ডের পাঁচিল ঘেঁষেই নাকি দাদার দোকান। অর্চিষ্মান আশ্বাস দিল, ওটা দাদাই। কারণ দাদা অর্চিষ্মানকে দেখে হাত নেড়েছেন। বলেছেন, এসে গেছি, আপনাদের পাড়ায়।

আমি দেখিনি, কাল পরশুর মধ্যে দেখে ফেলব নিশ্চয়, তবে অর্চিষ্মান যা বলল, আপাতত জাস্ট একটা টেবিল আর স্টোভ আর সসপ্যান। মেনুতে জাস্ট নর্মাল চা, বড়জোর লাল চা। চেয়ার নেই, গ্রিন টি নেই, দেওয়ালই নেই যে সেলিব্রিটিদের ছবি সাঁটা হবে।

খালি দাদা আছেন আর দাদার ফাইট আছে। আগেরবারের শুরুতেও যা ছিল।

August 12, 2018

তালাচাবি



এজেন্ট বলেছিলেন, 'বাড়ির সিকিউরিটি হেবি। একেবারে পিসফুল থাকতে পারবেন।' আগের বাড়িতে একতলার সিঁড়ির দরজা রাতের ছ'ঘণ্টা ছাড়া সারাদিন খোলা থাকত, লোকে দোতলায় উঠে একেবারে আমাদের ঘরের দরজায় বেল বাজাত, আমরা প্রথম সাত দিন আই হোল দিয়ে দেখে তারপর না দেখেই খুলে দিতাম। এ বাড়িতে ও সব গা এলানি চলে না, মেন গেটে কলিং বেল, মেন গেট দিয়ে ঢুকে গলি বেয়ে এসে সিঁড়ির দরজায় তালা, সে তালা পেরিয়ে দোতলায় উঠলে তবে আমাদের নাগাল পাওয়া যাবে।  

তাতে আমার পিস কিছু বাড়েনি। বেল বাজলে প্রতিবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখতে যেতে হয় কে এসেছে। কেউ কেউ আবার গলি বেয়ে সিঁড়ির দরজা পর্যন্ত আসেন না, মেন দরজায় বেল বাজিয়ে ওইখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন। তখন কাকের বাসা চুল নিয়ে, রং চটা জামা-পরা অবস্থাতেই যাও মেন গেট পর্যন্ত তদন্ত করতে। পায়ে হাওয়াই চটিও থাকে না সবসময়। 

সেদিন অবশ্য মেন গেট পর্যন্ত যেতে হল না। নিচের দরজা খুলেই সারপ্রাইজ, অর্চিষ্মান সতেরো মিনিট আগে এসে গেছে। আঙুল গলানো পলিথিনের প্যাকেটের ভেতর ঠোঙা, ঠোঙা থেকে চমৎকার অস্বাস্থ্যকর সুবাস বেরোচ্ছে। নিজের জন্য আলুর চপ, আমার জন্য বেগুনি। চায়ের সঙ্গে খেতে দারুণ মজা হবে। খাওয়ার পর আঙুলের ডগা থেকে নোনতা গুঁড়ো চাটতেও মজা। তবে সবথেকে মজা হবে খাওয়ার পর। এক গ্লাস জল খেয়ে নিলেই ব্যস। ফ্রিজ থেকে খাবার বার করা নেই, মাইক্রোওয়েভে গরম করা নেই, থালায় নিয়ে বসে চোয়াল ব্যথা করে চিবোনো নেই, বাসন মাজাও নেই। দিনের পাট ওইখানেই চুকল। খুব বাড়াবাড়ি হলে ল্যাপটপের তলা থেকে বেরিয়ে এক গ্লাস ইনো গুলতে হবে, ব্যস।

কিন্তু সেদিন অত আনন্দের মুখে বাধা পড়ল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরে ঢুকে দরজায় সাঁটা হুকে চাবি ঝোলাতে যাব, চাবি নেই। অথচ নিচে নামার সময় চাবিটা আমার হাতে ছিল, আমি জানি। 

জানি কারণ আমাদের এ বাড়ির দরজার তালা ইয়েল লক। তালাচাবির ভ্যারাইটি মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাসে ছিল না, কাজেই আমার কোনও আইডিয়া নেই ওই ব্যাপারে। কিন্তু ইয়েল লক কাকে বলে জানতাম। পৃথিবীর যত অলস গোয়েন্দাগল্প লেখক ইয়েল লককে বিখ্যাত করে দিয়ে গেছেন। ইয়েল লকওয়ালা দরজা বাইরে থেকে টেনে দিলে বন্ধ হয়ে যায় এবং চাবি ছাড়া খোলা যায় না। এ তালা বাজারে চালানোর সময় নিশ্চয় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল, হাতল ধরে টানুন, দরজা বন্ধ করুন। দরজার তালায় চাবি ঘোরানোর মূল্যবান পনেরো সেকেন্ড বাঁচান। ওই সময় বরং ক্যান্সারের ওষুধ কিংবা মঙ্গলে পৌঁছোনোর শর্টকাট আবিষ্কার করে ফেলুন। 

আর যদি চাবি ঘরের ভেতর ফেলে দরজা টেনে দেন, তালা ভাঙুন। ভুলেছেন কেন? ভুগুন এবার। আপনার মতো দায়িত্বজ্ঞানহীনের ভোগাই উচিত।

আমরা সাবধানতা অবলম্বন করেছিলাম বলা বাহুল্য। তাড়াতাড়ি কর, গ্যাসটা দেখেছ? বারান্দার দরজার ছিটকিনি তুলেছ?-র এইসব গিয়ে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়ের এক এবং অদ্বিতীয় প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছিল, 'চাবি নিয়েছ?' একজন দরজা ধরে দাঁড়াতাম, অন্যজন চাবি বার করে চোখের সামনে ঝোলাতাম। ঝুলন্ত চাবিকে দু'জোড়া চোখের ফুল ভিউতে রেখে আমরা দরজা বন্ধ করতাম।

বেশি সতর্ক হয়েছিলাম আমি। ইয়েল লকের সঙ্গে আমার মোলাকাত এই প্রথম নয়। ইয়েল লক-ঘটিত কিছু পরিস্থিতি আমার চেতনায় এমন ট্রমাটিক ছাপ ফেলেছে, পার্ট ওয়ানের রেজাল্টও ফেলেনি। নিজের বাড়ির দরজায় ইয়েল লক দেখে সে সমস্ত ট্রমা ফিরে এসেছিল। দরজার বাইরে চাবি হাতে নিয়ে ছাড়া পা রাখতাম না, ডোর স্টপার ঠেসে দরজা হাঁ করে খুলে নিচে গেলেও চাবি নিয়ে যেতাম। কারণ নিশ্চিত ছিলাম, আমি নিচে যাওয়া মাত্র কোনও রসিক ভূত হাওয়া দিয়ে দরজা ঠেলে বন্ধ করে দেবে। আমি রং চটা টি শার্ট পাজামা পরে বন্ধ ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব। 

কাজেই আমি চাবি হাতে নিয়েই নেমেছি। 

কিন্তু ওই মুহূর্তে কিছুই নিশ্চিত করে বলা যায় না, সবই ধোঁয়া ধোঁয়া লাগে। রোজ হাতে নিয়ে নামি, হয়তো আজই ভুল হয়েছে? ঘরের দরজা থেকে সিঁড়ির দরজা পর্যন্ত চাবি হারানোর সম্ভাব্য রুট তন্নতন্ন খোঁজা হল। জিনিস হারানোর একটা বাজে ব্যাপার হচ্ছে, খোঁজার জন্য পুরো বাড়িটা উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া। বাথরুমের শেলফে, বাইরের দরজার সম্পূর্ণ উল্টোদিকের বারান্দায় কারিগাছের টব, কোনও জায়গাই চাবি থাকার পক্ষে অসম্ভাব্য নয়। অফ কোর্স, আমি ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের ঢাকনা তূলে চাবি ফেলে দিইনি, কিন্তু তা বলে ওটা খোঁজা বাদ দেওয়া তো যায় না। অর্চিষ্মান ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের ঢাকনা তুলে দলামোচড়া কাগজ টান করে দেখতে দেখতে বলল, 'এই তো অমুক রিসিট এইখানে!'

চাবি?

নেই। 

আমি কেঁদে ফেলার আগের স্টেজে গিয়ে 'সরি সরি' বলতে লাগলাম, অর্চিষ্মান রিসিট ভাঁজ করে পকেটে পুরতে পুরতে বলল, 'আহা, এ তো আমার হাতেও হতে পারত।'

অবান্তরের পড়ুয়া যদি কেউ থেকে থাকেন, পার্টনারের খোঁজ করছেন বা করবেন, আপনার প্রতি আমার একটা পরামর্শ আছে। হাইট, রং, বাড়িগাড়ি, অন-সাইট ট্র্যাভেলের সুযোগ, ধর্মে মতি, ঐতিহ্যে শ্রদ্ধা, সাধুসন্ন্যাসীতে বিশ্বাস, এসবের সঙ্গে সঙ্গে পার্টনারের কাম্য গুণের চেকলিস্টে আরেকটা বিষয়ও যোগ করে রাখুন। কোনও একটা ক্ষতি হয়ে গেলে (ক্ষতির দায় যদি সত্যি সত্যি অন্যপক্ষের হয়েও থাকে) নালিশের খাঁড়া নিয়ে ঝাঁপিয়ে না পড়ার গুণ। লিস্টের বাকি সব গুণের মতো চকচকে নয়, কিন্তু মারাত্মক দরকারি।

গোটা বাড়ি খোঁজা হয়ে যাওয়ার পর হাল ছাড়তে হল। 'কোথায় যাবে?' 'পাখা লাগিয়ে উড়ে তো যাবে না?' অস্থির আর্তনাদেরা 'যা হওয়ার হয়ে গেছে।' 'আর ভেবে লাভ নেই' ইত্যাদি শ্রান্ত উপলব্ধিতে পর্যবসিত হল। সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার খোঁজায় ক্ষান্ত দিয়ে ডুপ্লিকেট চাবি বার করার সময় হয়েছে।

অফ কোর্স, আমাদের ডুপ্লিকেট চাবির ব্যবস্থা ছিল। এ চাবি ঘরের ভেতর ফেলে বেরোতে আমার যে তিনমাসের বেশি লাগবে না এটা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধির দরকার নেই। আর এই রকম গোলমেলে তালাওয়ালা বাড়ির একটাই চাবি থাকলে অর্চিষ্মানের রাতে ঘুম হবে না। আমরা নিজেরাই ডুপ্লিকেট করাতাম, কিন্তু আবিষ্কার হল অলরেডি একটা ডুপ্লিকেট আছে। আমাদের মতোই কোনও অগোছালো ভাড়াটে করিয়ে রেখেছিল নিশ্চয়। ডুপ্লিকেটটা আসলটার সঙ্গে একই গোছায় রাখা। যদি গোছা ভেতরে রেখে বেরিয়ে যাই, ও জিনিস কোনও কাজেই লাগবে না। তাই আমরা ডুপ্লিকেট চাবিটা বাড়ির বাইরে কোথাও রাখার ব্যবস্থা করার কথা ভেবেছিলাম। বাড়ির বাইরে আমাদের একমাত্র আশ্রয় হচ্ছে অফিস। আমার অফিস অপেক্ষাকৃত কাছে তাই ডুপ্লিকেট চাবি আমার অফিসেই রাখার স্থির হয়েছিল। আমার ডেস্কে একটা ডাবর হানির বোতল, যেটায় আগে মানি প্ল্যান্ট থাকত, দেহ রাখার পর খালি পড়ে ছিল, তার মধ্যে সে চাবি পুরে বোতলের মুখ বেশ করে এঁটে বন্ধ করা আছে।

এখন সে চাবি উদ্ধার করার সময় এসেছে। সপ্তাহে পাঁচ দিন বাধ্য হয়ে অফিস যাই। এ সপ্তাহে ছ'বার যাওয়া হবে। ষষ্ঠবার সেধে যাব। রাত আটটার সময়। 

বেরোনোর আগে চা খাওয়া যাক। মুখ তেতো, মন ভার, নিজের অপদার্থতায় তখনও নিজের ওপর রেগে গুম। পলিথিন থেকে বেগুনির ঠোঙা বার করে এলোমেলো ভাঁজ খুলছি, ভাঁজ থেকে থালার ওপর ঠুন করে পড়ল চাবির গোছা।

সিঁড়ির নিচে দরজা খুলে পলিথিনের ব্যাগ আঙুলান্তর করার সময় আঙুল খসে চাবি বেগুনির পলিথিনের ভেতর পড়ে গেছে। নিঃশব্দে। 

ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু অত সুস্বাদু বেগুনি আর কখনও, কোথাও খেয়েছি কিনা মনে পড়ছে না।


August 09, 2018

মায়ের স্বপ্ন



সারাজীবনে কতগুলো স্বপ্ন দেখা হল আর সে সব স্বপ্নের কতগুলোকে বাস্তবে রূপান্তরিত করা সম্ভব হল সেটা আমার মতে জীবনের সফলতা-বিফলতা মাপার অন্যতম মাপকাঠি হতে পারে। স্বপ্ন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মতো চেনা হতে পারে বা চাঁদে যাওয়ার মতো অচেনা। নেশাকে পেশা করে বাঁচার মতো সাহসী কিংবা কোনও বিশেষ মানুষকে বিয়ে করার মতো আনইন্টারেস্টিং। যা খুশি, যেমন খুশি স্বপ্ন হতে পারে। স্বপ্নের ভালোমন্দ এখানে বিচার্য নয়। বিচার্য হচ্ছে স্বপ্নের স্ট্রাইক রেট।  

সে রেট দিয়ে বিচার করলে আমার মায়ের জীবন আগাগোড়া ফেলিওর। 

ব্যর্থতার প্রথম কারণ মায়ের স্বপ্নের চরিত্র। মা এমন সব স্বপ্নই দেখেন যেগুলো সত্যি হওয়া অসম্ভব। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাবলীল ইংরিজি কথোপকথন। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ডুয়েট। দেশবিদেশের স্টেজে রবিশঙ্করের সঙ্গে সেতার।

মায়ের স্বপ্ন ব্যর্থ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, বেশিরভাগ লোকের বেশিরভাগ স্বপ্ন ব্যর্থ হওয়ার কারণের থেকে আলাদা নয়। যথেষ্ট সিরিয়াসলি স্বপ্নটার পেছনে না পড়ে থাকা। এই গোত্রে পড়বে মায়ের নিজে গাড়ি চালিয়ে দূরে দূরে বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্নটা। একেবারেই নাগালের ভেতরের স্বপ্ন। আরেকটু দম লাগালেই, দম লাগাতেও হত না, খালি স্বপ্নটার কথা মাথায় রেখে জীবনের শেপটা একটু টিপেটুপে এদিকওদিক করে নিলেই মা এই স্বপ্নটাতে পাস করে যেতেন।  

অবশ্য স্বপ্নে পাসফেলের ব্যাপারে অত চট করে করে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো শক্ত। কারণ স্বপ্ন সাদাকালো নয়। ইন ফ্যাক্ট, স্বপ্নের কোনও রং থাকে না নাকি। যে ইতিহাস পরীক্ষার দিন ভূগোল পড়ে হলে পৌঁছনোর স্বপ্ন দেখছে সে আসলে কীসের ভয় পাচ্ছে, ইতিহাসের? নাকি প্রস্তুতিহীনতার? অনাহূত সারপ্রাইজের? যে ঘামতে ঘামতে মাঝরাতে উঠে বসছে, পরীক্ষা ঘাড়ের কাছে, সবার অংকের সিলেবাস শেষ একা তার ছাড়া, তার প্যানিকটা কি অংকে? নাকি বাকিদের সঙ্গে রেসে হেরে যাওয়ার আতংকটাই আসল? মায়ের গাড়ি চালিয়ে বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্নটা সম্ভবতঃ গাড়ির নয়, বেড়াতে যাওয়ারও না। স্বপ্নটার নির্যাস হয়তো নিজের জীবনের চালকের আসনে নিজে বসাটা। সেদিক থেকে দেখলে মা অনেকটাই সফল। 

কিন্তু আমি এইসব স্বপ্নবিচারে বিশ্বাসী নই। কিছু কিছু ব্যাপার (বেশিরভাগ) ফেসভ্যালুতে নেওয়াই কার্যকরী বলে আমি মনে করি। কাজেই আমি ধরে নিচ্ছি গাড়ি চালিয়ে লং ড্রাইভে যাওয়ার স্বপ্নে মা ফেল।

মায়ের তৃতীয় ব্লান্ডার, স্বপ্নের দায় অপাত্রে অর্পণ করা। মা নিজেকে নিয়ে যতদিন স্বপ্ন দেখছিলেন, ততদিন তবু একরকম ছিল। তাতে ওঁর সাধ মেটেনি, ছাগলের ক্ষুরে পেনসিল বেঁধে তাকে সিঁড়িভাঙা সরল কষাতে গেছেন। (বাক্যটা শেষ করামাত্র বিবেকে একটা অস্বস্তি টের পেলাম আর অমনি বারান্দার গ্রিলের বাইরে একটা ছাগলের মুখ ভেসে উঠল। আমার নাম শুনলাম যেন? আমি তাড়াতাড়ি বললাম, এখানে ছাগল বলতে আমি তোমাকে মিন করিনি, আমার চেনা একজনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছি। ছাগল বলল, অত প্রতীক দিতে হবে না। সোজা কথা সোজাভাবে লেখ। তাতে যদি লেখা উতরোয়। গভীর বিরক্তিসূচক 'হুঃ' বলে আবক্ষ ছাগল মিলিয়ে গেল।)

কিন্তু মায়ের সবথেকে বড় ভুল, পোস্টের গোড়াতে যেটা লিখলাম, সফল স্বপ্ন আর টোটাল স্বপ্নের অনুপাতের সহজ হিসেবটা মাথায় না রাখা। অনুপাত ভদ্রস্থ রাখতে গেলে স্বপ্ন কম দেখুন, হরের হুড়হুড়িয়ে বাড়া প্রতিরোধ করুন, তাহলেই লবের পেছনে অত পরিশ্রম না করলেও চলবে। কেউ কেউ দ্বিমত রাখতে পারেন। বলতে পারেন বেশি স্বপ্ন দেখার সুবিধে হচ্ছে একটা না একটা তো সফল হবেই। এঁরাই বলেন, পরীক্ষায় তো বস, ফেল করলে ফেল করবি। অ্যাপ্লাই তো কর, কেউ না কেউ তো ডাকবেই। পত্রিকায় লেখা পাঠাতে থাক, ছাপলে ছাপবে, না ছাপলে ছাপবে না। প্রোপোজ তো করে দেখ, রাজি হলে ভালো না হলে হল না। 

এঁরা বিশ্বাস করেন, হারাজেতায় ক্ষতি নেই, পার্টিসিপেশনটাই আসল। 

হারলে আমার কনফিডেন্স যে গুঁতোটা খাবে, সে ব্যাপারে এঁদের কোনও মাথাব্যথা নেই। এঁরা জানেন না, প্রতিটি হার, প্রতিটি প্রত্যাখ্যান আমার ইগো কত গভীর ফালাফালা করে যাবে, সে হাঁ সারাজীবনেও বুজবে না। এঁরা বোঝেন না, আমার অলরেডি তলানি-ছোঁয়া কনফিডেন্স আমাকে সামলে চলতে হবে, যত্রতত্র খরচ করে ফেললে চলবে না। লাভ চাই না, ক্ষতি যথাসম্ভব কম রাখাই আমার জীবনের লক্ষ্য। বি এম ডবলু চেয়ে হিরো সাইকেল পেলাম, তাতে আমি নেই। তার থেকে হিরো সাইকেলই চাইব আমি সকালবিকেল।

মায়ের সঙ্গে এ ব্যাপারেও আমার উল্টো। অগুনতি ব্যর্থ স্বপ্নের বোঝা সারাজীবন ধরে বইতে কষ্ট হল কি না সেটা আমি মাকে জিজ্ঞাসা করেছি। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলতে না পেরে কষ্ট হয়েছিল? তোমার সব স্বপ্নে কচাকচ কাঁচি চালিয়ে দিয়েছি বলে আমার ওপর রাগ হয়? মা হাসেন। বলেন, ভুলেই গেছিলাম, তুই বললি বলে মনে পড়ল। ওই রকম বিশ্রী স্বপ্ন, পূর্ণ হয়নি বেঁচে গেছি। 

হতে পারে আমাকে বাড়াবাড়িরকম ভালোবাসেন বলে মা দুঃখ চেপে রাখেন। কিন্তু আমার সেটা মনে হয় না। রাগ দুঃখ মনে পুষে বসে থাকার ব্যাপারেও মায়ের সঙ্গে আমার মিল নেই। মা স্বপ্ন দেখেন, বেশিরভাগই ব্যর্থ হয়, মা আবার তেড়েফুঁড়ে নতুন স্বপ্ন দেখেন। আমার মা প্যাথোলজিক্যাল স্বপ্ন-দেখিয়ে। এই বয়সে এসে এ রোগ সারা মুশকিল। সারুক আমি চাইও না। মা জেগে আছেন অথবা ঘুমোচ্ছেন অথচ স্বপ্ন দেখছেন না, এটা হলেই মাকে চেনা কষ্টের হবে। 

তাই কাল সকালে মা যখন বললেন পরশু রাতে তিনি একটা স্বপ্ন দেখেছেন, আমি চায়ে চুমুক দিয়ে হেলান দিয়ে বসে বললাম, বল শুনি কী স্বপ্ন।

স্বপ্নে নাকি মা লাইব্রেরি থেকে মোটা মোটা তিনটে বই হাতে নিয়ে সবে বেরিয়েছেন। মায়ের স্বপ্নের এমন আটপৌরে শুরু দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, কিন্তু প্রকাশ করিনি। দেখা যাক কোথাকার স্বপ্ন কোথায় দাঁড়ায়। সবে তো শুরু।

মায়ের স্বপ্নে বৃষ্টি নামল। সে কী বৃষ্টি রে সোনা, চারদিক ধোঁয়া, কিছু দেখা যাচ্ছে না। মা বই হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছেন বাড়ি ফিরবেন কী করে। এমন সময় একটা বাস এসে থামল।  

লাইব্রেরি থেকে আমাদের বাড়ির পথে আধঘণ্টা বাদে বাদে একটা করে টোটো যায়। কিন্তু এটা বাস্তব নয়, এটা মায়ের স্বপ্ন। মা বাসে চড়লেন। বাসে আর কেউ নেই। কন্ডাকটরও নেই? মায়ের মনে নেই। যাত্রী যে মা একা সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, ড্রাইভার কন্ডাকটর কেউ আছে কি না মা খেয়াল করেননি।

জল জমে রাস্তা পুকুর, হেলেদুলে বাস চলল। বাইরে বৃষ্টি আরও ঝেঁপে এল, ক্রমে চাকা জলে ডুবে গেল। চাকা পেরিয়ে জানালার নিচ ছোঁয় ছোঁয়। মায়ের স্বপ্নের বাস থামছে না, চলছে তো চলছেই।

কোন লাইব্রেরিতে গিয়েছিলে, মা? জয়কৃষ্ণ? নাকি আরও দূরের? চিড়িয়াখানার পাশেরটা?

আরে না, আমাদের পাঠাগার। কিন্তু রাস্তাটা ফুরোচ্ছিলই না। স্বপ্নের রাস্তা বলে বোধহয়।

তারপর একসময় জল জানালা ছাপিয়ে ঢুকে পড়ল বাসের ভেতর। মা বুঝলেন আর উপায় নেই। বইগুলো ফেলে দুই হাত ওপরে তুলে বাঁচার চেষ্টা করলেন। 

আর অমনি যেন কে তাঁকে দু'হাত ধরে টেনে নিল। বাসের জানালা গলে রোগা মা বেরিয়ে এলেন, তারপর ভেসে ভেসে ওপরদিকে উঠতে লাগলেন। 

সত্যি সত্যি উড়ছিলাম রে সোনা। একসময় মেঘটেঘ ছাড়িয়ে চলে গেলাম। তখন আর বৃষ্টি নেই। ঝকঝকে রোদ, নীল আকাশ, ঠাণ্ডা হাওয়া, নির্ভার আমি উড়ছি। 

কখন দেখলে মা স্বপ্নটা?

ওই তো একবার ঘুম ভেঙে দেখেছিলাম তিনটে সাতচল্লিশ, তারপর পাঁচটার সময় উড়তে উড়তেই ঘুম ভাঙল।  

ভোরের স্বপ্ন। সত্যি হওয়ার কোনও চান্স নেই, বলা বাহুল্য। 

***** 

তারপর টাইপ করতে করতে, ওলায় যেতে যেতে, রুটি ঢ্যাঁড়সভাজা খেতে খেতে দৃশ্যটা দেখছি। আমার ক্ষীণতনু মা, উড়ছেন। কাদামাখা পৃথিবীর নাড়ি কেটে, মেঘ ছাড়িয়ে, নীল আকাশে ভাসছেন। শিরদাঁড়ার ব্যথা, পেনশনে টি ডি এস, বারবার খারাপ হওয়া মোবাইলেরা, না বলে কামাই করা মাসিপিসিরা মাটিতে দাঁড়িয়ে দু'হাত তুলে বলছে, ওগো যেয়ো না, আমাদের সঙ্গে নাও, মা উড়ে উড়ে, সবার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছেন।

হলই বা স্বপ্নে। হল তো?

ভাবছি, মায়ের থেকে স্বপ্ন দেখার বিদ্যেটা শিখে নিই। নাকি বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে?



August 05, 2018

'বিদায় ব্যোমকেশ' হলে গিয়ে দেখার সাতটি কারণ



উৎস গুগল ইমেজেস

***স্পয়লার আছে ***

১। গল্প নয়। গল্পের জন্য দেখতে পারেন। যদি বুঝতে পারেন। আমি বুঝিনি বলে আপনাকে রেকমেন্ড করতে পারছি না। ব্যোমকেশ (আবীর) ভয়ানক বুড়ো হয়েছেন। সত্যবতী (সোহিনী) আর অজিত (রাহুল) মরে ভূত হয়েছেন। ব্যোমকেশের ছেলে অভিমন্যু বক্সী (জয়), যাকে আমরা খোকা বলে চিনি, ডি সি কলকাতা পুলিশ, দু'বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যান। একেবারে উধাও। পুত্রবধূ অনসূয়া (বিদীপ্তা) অফিস যান-আসেন, নাতি সাত্যকি (আবীর) ফিজিক্সে আলো নিয়ে গবেষণা করে। সাত্যকির বান্ধবী অবন্তিকা (সোহিনী) বড়লোক প্রোমোটার বাবার (অরিন্দম শীল) মেয়ে। 

এর মধ্যে একদিন অভিমন্যু বক্সী টপটপ রক্ত ঝরা ছুরি হাতে এসে নোনাপুকুর থানায় আত্মসমর্পণ করেন। বলেন উনি একটা খুন করেছেন। লাশ কোথায় পাওয়া যাবে সে হদিসও দেন। বাধ্য হয়েই তাঁকে লক আপে ঢোকাতে হয়। তাঁকে সাহায্য করতে চান তাঁর কর্মজীবনের সহকর্মী ও বন্ধু ডি সি কৃষ্ণেন্দু মালো (রূপঙ্কর বাগচী), কিন্তু অভিমন্যু কিছুতেই বলবেন না উনি কেন উধাও হয়েছিলেন, কেন খুন করেছেন, কেন ফিরে এলেন। ক্রমে আরও একটা লাশ আবিষ্কার হয় এবং রকমসকম দেখে মনে হয় এই খুনটাও অভিমন্যু করেছেন। ব্যোমকেশ ঘরে বসে বসে, সাত্যকি গার্লফ্রেন্ডের বাবার এস ইউ ভি চালিয়ে তদন্ত চালায়। দু'চারজনের ওপর সন্দেহ জড়ো হয়। কেউ কেউ রাতে চুপিচুপি গাড়ি নিয়ে বেরোয়। 

গল্পটা আমি বুঝতে পারিনি কারণ সিনেমায় রহস্য সমাধানের থেকে বেশি জরুরি ব্যাপার হচ্ছে বাবা-ছেলে, দাদু-নাতি, স্বামী-স্ত্রী, শ্বশুর-পুত্রবধূ, মা-ছেলের সম্পর্কের প্যাঁচাল। সে প্যাঁচাল বিল্ড আপ করতে গিয়ে ফার্স্ট হাফে অভিমন্যু বক্সীর আত্মসমর্পণ ছাড়া আর বিশেষ কিছুই দেখানোর সুযোগ হয়নি। সেকেন্ড হাফে একটু নড়াচড়া শুরু হল, কিন্তু কে যে কাকে কেন খুন করল, হঠাৎ উধাও হলই বা কেন (কারণ বলা আছে, কিন্তু আমি কনভিন্সড নই ওই কারণে কেউ গা ঢাকা দিতে পারে,) আর বেছে বেছে ঠিক ওই সময়েই ফিরেই বা এল কেন, আমি সত্যি বলছি বুঝতে পারিনি। এত গোলমাল কেন হচ্ছে, সেটা বোঝানোর প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় সেকেন্ড হাফেরও বেশ কিছুটা কেটে যাওয়ার পর। একটা ফাইল। তার পেছনে সবাই মিলে পড়েছে। সে নাকি মারাত্মক ফাইল। এখন বার বার মারাত্মক ফাইল মারাত্মক ফাইল বললে বিশ্বাস করে নিতে হয় মারাত্মক, কিন্তু মারাত্মকতার মাত্রা সম্পর্কে সংশয় থেকে যায়। কী এমন হয়েছিল যার জন্য এত খুনোখুনি? গোলমালে সন্দেহভাজনদের ভূমিকাও এর ওর মুখে দুয়েকলাইন বলা, চোখে দেখিয়ে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা নেই।

সম্ভবতঃ গোটা ব্যাপারটা আমার বোঝার পক্ষে বেশি সূক্ষ্মতার সঙ্গে দেখানো হয়েছে। মুশকিলটা হচ্ছে সিনেমাটার বাকি অনেক জায়গা আবার বেশ বানান করে, আন্ডারলাইন টেনে দেওয়া আছে। ব্যোমকেশের অসহায়তা বোঝানোর জন্য সত্যবতী আর অজিতের ভুতকে এনে, "আমি হেরে গেলাম," "আমি বুড়ো হয়ে গেলাম," উচ্চারণ করিয়ে বোঝানো হয়েছে। নিষ্ঠুরতা বোঝানোর জন্য লাল গোলাপে আগুন ধরিয়ে দেওয়াটেওয়াতেও কোনওরকম ধোঁয়াশা নেই। খালি রহস্যের ক্লু ইত্যাদির ব্যাপারে দর্শকের বুদ্ধির ওপর প্রত্যাশা রাখা আমার মতে অন্যায়।

২। আবীরের দুই অবতার দেখতে যেতে পারেন। প্রথম অবতার বুড়ো ব্যোমকেশ, দ্বিতীয় অবতার সুয়াভ সাত্যকি। বুড়ো ব্যোমকেশ নখদন্তহীন বাঘ হয়েছেন, সেলিব্রিটি স্টেটাস রয়ে গেছে, কিন্তু গায়ে জোর নেই। একলা ঘরে বসে সত্যবতীর জন্য ঝুমকোলতার চারার গায়ে হাত বোলান আর মাটি কুঁদে পাখি, সত্যবতী আর অজিতের মূর্তি বানান। ছাদে গিয়ে গোলাপের বাগান করেন।

সুয়াভ সাত্যকি আলো নিয়ে রিসার্চ করেন। দাদু, বাবা, মা - সকলের ওপর অভিমান। অবন্তিকারূপী সোহিনীর সঙ্গে প্রেম। আবীরের প্রতি সম্পূর্ণ পক্ষপাত নিয়েই বলছি, তাঁর চরিত্রটি খুব অদ্ভুত সময়ে অদ্ভুত আচরণ করে। বাবা দু'বছর পর ফিরে এসে জেলে। দাদু  বাবাকে ছাড়ানোর বদলে এমন সব ক্লু খুঁজে বার করছে যে বাবা ছাড়া পাওয়ার বদলে আরও প্যাঁচে পড়ছেন। সেই সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাদুর মতো শাল জড়িয়ে, চশমা পরে, গালে কাটা দাগ এঁকে দাদু দাদু সাজাটা ব্যাখ্যার অতীত। 

৩। সোহিনী আর সোহিনীর দুই অবতারকেও দেখতে যেতে পারেন। যদি ক্ল্যাসিক বেঙ্গলি বিউটি পছন্দ করেন, হোমস্টাইল শাড়ি পরা, সদ্য স্নান থেকে ওঠা কুঞ্চিত কেশদাম, নিচু স্বরে কথা কয়, মুখে সর্বদা 'এই জায়গাটা একটু বুঝিয়ে দাও না' ভাব নিয়ে ঘোরে, পাকাচুল ছেলেকে 'আমার খোকা' বলে ডাকে, তাহলে 'সত্যবতী' অবতার আপনার জন্য পারফেক্ট। একবার শুধু 'আমার খোকা'র সঙ্গে সঙ্গে 'আমার ব্যোমকেশ'ও বললেন শুনলাম। তাঁর বানানো চরিত্র নিয়ে সিনেমাওয়ালাদের টানাটানি এবং ইন্টারপ্রিটেশনের রকমারিত্ব দেখলে দেখলে শরদিন্দু কী করতেন সে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে শুনেছি কাউকে কাউকে, সত্যবতী ব্যোমকেশের নাম মুখে আনছে শুনলে শরদিন্দু কী করতেন সেটা নিয়ে অ্যাকচুয়ালি আমার বেশি চিন্তা হচ্ছিল। 

আপনি যদি অতটা প্রাচীনপন্থী না হয়ে থাকেন, একটু অন্যরকম নায়িকা যদি আপনার পছন্দ হয়ে থাকে, পাড়াপ্রতিবেশী কী বলবে তোয়াক্কা না করে মাঝরাতে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে সিনেমার ডায়লগ বলে দেখানোর মত অন্যরকম, বড়লোকের মেয়ে কিন্তু টাকাপয়সার কেয়ার করে না টাইপ অন্যরকম, সেজে থাকে কিন্তু আবার সাজের দুয়েকটা এলিমেন্ট দেখে (ওভারসাইজড চশমা) বোঝা যায় যে বহিরঙ্গের সুপারফিশিয়ালিটিতে মন নেই, তাহলে সাত্যকির গার্লফ্রেন্ড অবন্তিকা, যাকে সবাই তুন্না না কী একটা নামে ডাকে, সেই অবতার আপনার জন্য পারফেক্ট হবে।

খ, ছ, ভ, হ, ঝ - এইসব কঠিং বর্ণের উচ্চারণ সোহিনীর দুই অবতারের একজনের পক্ষেও অসম্ভব।*** তবে তিনি তো আর আবৃত্তি করতে আসেননি, অভিনয় করতে এসেছেন। হু কেয়ারস। 

৪। অজিত আর সত্যবতীর ভুত দেখতেও যেতে পারেন। দুজনেই ভরা যৌবনে ভুত হয়েছেন। ব্যোমকেশের আশেপাশে সর্বদা ঘোরেন। ক্লু-ট্‌লুর আভাস দেন। সিনেমার শেষে ব্যোমকেশের সত্যবতীর ভুতকেই চায়ের জল বসানোর অনুরোধ জানানোটা আমার বেশ রিয়েলিস্টিক লেগেছে।

৫। বাঙালির সংস্কৃতিমনস্কতা নিয়ে গর্ব করতে হলেও এই সিনেমাটা দেখতে যাওয়া জরুরি। এটা অবশ্য এই সিনেমার একচেটিয়া নয়। অজিতের ভুত, ব্যোমকেশ, সাত্যকি সকলেই যখনতখন কবিতার লাইন মুখস্থ বলে। লক আপে নাটকের সংলাপ, চেজ সিকোয়েন্সে সুকুমার রায় পর্যন্ত ঠিক ছিল কিন্তু ক্লাইম্যাক্সে সবাই সবার মাথায় বন্দুক ধরে থাকা অবস্থায় গলা কাঁপিয়ে নাটকের সংলাপ বাঙালি ছাড়া আর কেউ বলতে পারে কি না আমি শিওর নই। 

৬। ক্লাইম্যাক্সের জন্যও বিদায় ব্যোমকেশ দেখা উচিত। অ্যাকচুয়ালি ক্লাইম্যাক্স না দেখলে বাকিটা দেখার কোনও মানে হয় না, কারণ পুরো গল্পটা ক্লাইম্যাক্সেই বলা হয়েছে। হতে পারে আপনি এতক্ষণে ধৈর্য হারিয়েছেন, গল্পের খুঁটিনাটি জানার আগ্রহ আর বোধ করছেন না, তবু দেখুন। কারণ শ্রী সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। ওঁকে কাজল, লিপস্টিক পরিয়ে হাতে বন্দুক ধরিয়ে খুনখারাপি করতে পাঠানোর পেছনে চরিত্রের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনকে মেনস্ট্রিমে জায়গা দেওয়ার সদিচ্ছার থেকে ওঁর ওই চেহারা দেখিয়ে দর্শককে এক্সট্রা কণ্টকিত করার বদিচ্ছেটাই বেশি বলে আমার সন্দেহ। ক্লাইম্যাক্সে সুজয় খালি নাচতে বাকি রাখেন, 'কুমীর জলকে নেমেছি' সুর করে গাইতে থাকেন, খনখন করে হাসেন। সে হাসি সংক্রামক।  

৭। এ কারণগুলোর একটাও যদি যথেষ্ট মনে না হয়, তবু আপনার সিনেমাটা দেখতে যাওয়া উচিত। বাংলা সিনেমার কিছু হচ্ছে না বলে চেঁচাবেন, আর এদিকে হলে গিয়ে দেখে টাকা খরচ করে বাংলা সিনেমার পৃষ্ঠপোষকতা করবেন না, এ মহাপাপ করবেন না।

***আমাকে একজন জানিয়েছেন যে সোহিনী সম্ভবতঃ উচ্চারণগুলো ভালোই পারেন, বড়লোকের আদুরে মেয়ের ভূমিকায় আধো আধো গলায় কথা বলার নির্দেশ ছিল বলে ওইভাবে বলেছেন।


August 02, 2018

প্রমীলার প্রতিশোধ








গোয়েন্দা উপন্যাস পড়লে যত আরাম হয়, গোয়েন্দা ছোটগল্প পড়লে তত আরাম হয় না কেন এ নিয়ে আমি ভেবেছি। অ-গোয়েন্দা সাহিত্যে আমার আরামের প্যাটার্ন ঠিক উল্টো বলে আরও বেশি করে ভেবেছি।

একটা কারণ হতে পারে ছোট গোয়েন্দাগল্পে প্লট খেলানোর জায়গা কম বলে। তিন পাতা অন্তর নতুন ক্লু, সাড়ে সাত পাতা পার হয়ে রেড হেরিং, মাঝপথ পার হয়ে খানিক দূর এগিয়ে দু'নম্বর খুন (আপনি যাকে খুনী ভেবে পাঁচটাকার মাঞ্চ বাজি ধরেছেন সে) ইত্যাদির অবসর ছোটগল্পে নেই। কাজেই এ সবের মজাও নেই। বড়র তুলনায় ছোট গোয়েন্দাগল্পের দ্বিতীয় ডিসঅ্যাডভান্টেজ - চরিত্রের ভিড়, পারিপার্শ্বিকের বর্ণনা, সাবপ্লট ইত্যাদি দিয়ে মূল প্লটের খুঁত ঢাকার সুযোগহীনতা। এ সব ঠ্যাকনা সরিয়ে নিলে বেশিরভাগ গোয়েন্দাগল্পই বিপদে পড়বে। ক্রিস্টি যে ক্রিস্টি, তাঁর লেখা ছোটগল্প পড়েও মনে হবে, এ ভারি গোঁজামিল হল।

প্লটিং-এ পারঙ্গম লেখকেরা উপন্যাসে মাত করেন (ক্রিস্টি) আর চরিত্রচিত্রণ, পারিপার্শ্বিক সৃষ্টিতে দক্ষরা ছোটগল্পে ভেলকি দেখান বেশি (কোনান ডয়েল) - এ আমার অবজার্ভেশন।

রুথ রেন্ডেল আমার মতে দ্বিতীয় গোত্রের লেখক। স্ট্যান্ড অ্যালোন এবং সিরিজ মিলিয়ে, স্বনামে (ইন্সপেক্টর ওয়েক্সফোর্ড সিরিজ) ও বেনামে (বারবারা ভাইন ছিল তাঁর ছদ্মনাম) রেন্ডেল প্রায় পঁয়ষট্টিখানা গোয়েন্দা উপন্যাস লিখেছিলেন। পঁয়ষট্টিটা পড়িনি, সম্ভবতঃ পড়বও না, কারণ রুথ রেন্ডেলের উপন্যাস আমার অত ভালোও লাগে না। তাঁর লেখা 'দ্য সেন্ট জিটা সোসাইটি'- উপন্যাসের অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছেও আমি কোনও ক্রাইমের দেখা পাইনি  বা ক্রাইম ঘটে থাকলেও তার সমাধানে কোনও রকম প্রচেষ্টা, তাপউত্তাপ চোখে পড়েনি। কেবলই চরিত্রচিত্রণ চলছে।

যেখানে ধাঁধা লিখতে হচ্ছে না; ক্লূ, রেড হেরিং, মোটিভ, অপরচুনিটির খেলা খেলার দায় যেখানে নেই, রুথ রেন্ডেল ঝলসান সেখানে। অর্থাৎ ছোটগল্পে। অপরাধের প্রতি গভীর কৌতূহলী মন নিয়ে অপরাধের ঘটনাকে ঘিরে থাকা চরিত্রদের দেখেন নিজে গভীরভাবে, আমাদের দেখান। রুথ রেন্ডেলের ছোটগল্প দশের বেশি সংকলনে জড়ো করা আছে। আমার টু রিড লিস্টে দশটাই আছে। কারণ যা পড়েছি প্রায় সবই ভালো লেগেছে। আর সে সব গল্পের মধ্যেও ভালো লেগেছে 'দ্য উইংক'। আঠাশশো শব্দের মধ্যে অতখানি ভয়াবহতা, অতখানি উদাসীনতার (উদাসীন বলেই এফেক্টিভ হয়তো) সঙ্গে এঁকে দেওয়া, অবিশ্বাস্য। 'দ্য উইংক'-এর ছায়া অবলম্বনে লেখা আমার ছোটগল্প 'প্রমীলার প্রতিশোধ' বেরিয়েছে এ বারের চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছেড়ে যাওয়া মেল ট্রেনের গল্পের কামরায়। লিংক নিচে রইল।



July 26, 2018

ডালমুট কিনতে গিয়ে



চাল আটা দুধ দই সর্ষের তেল সার্ফ এক্সেলে টিক মারা হয়ে যাওয়ার পর বললাম, "এবার একটা জেমস, একটা পটেটো চিপস আর ঝাল দেখে একটা ডালমুটের প্যাকেট দিন দেখি।"

দোকানের নতুন ছেলেটি ফ্যালফেলিয়ে রইল। 

"ডালমুট . . . কী জিনিস?"

সামনে আয়না না থাকা সত্ত্বেও ওই মুহূর্তে আমার মুখটা কেমন দেখাচ্ছিল কল্পনা করতে অসুবিধে হয়নি। লিনিয়ার অ্যালজেব্রার ক্লাসে প্রথম যখন ডিটারমিনেন্টস কষতে শিখেছিলাম, এই কোণা ওই কোণা গুণফল থেকে ওই কোণা এই কোণার গুণফল বিয়োগ করার নিয়মটা জেনেছিলাম, এক সহপাঠী হাত তুলে জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন এই পার্টিকুলার প্যাটার্নই হতে হবে, কেন এই কোণা ওই কোণার বদলে ওই কোণা এই কোণা হবে না?

আমার মুখটা সেই মুহূর্তে বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দিদিমণির মুখটার মতো দেখাচ্ছিল। এই প্রশ্নটা যে কেউ করতে পারে এটা যেমন উনি কস্মিনকালেও ভেবে দেখেননি তেমনি "সংজ্ঞাসহ ডালমুটের বৈশিষ্ট্য যাহা জান লিখ", জীবনে চলার পথে এ প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা সত্যি সত্যিই আমার আনসিন ছিল। 

আমতা আমতা করে শুরু করলাম, "ডালমুট . . . ছোটো ছোটো গোল গোল . . . হলদেটে . . ." 

"ওহ, মুগডাল?''

"না না মুগডাল বলিনি . . . '

'আহা মুগডাল মানে যে মুগডাল এই গরমে লাউ দিয়ে রেঁধে খেলে স্বাস্থ্য ভালো হয়, সে মুগডালের কথা যে আপনি বলেননি, বলতে পারেন না, সে আমি বুঝে গেছি। আপনি এই মুগডালের কথা বলছেন তো?' বলে হলদিরামের মুগডালভাজার বেগুনি-বাসন্তী প্যাকেট তুলে থলিতে পোরার উপক্রম করল। 

ভাগ্যিস তক্ষুনি পাশের গুদামঘর থেকে আরেকজন কর্মচারী ডালমুটের প্যাকেট এনে অর্চিষ্মানের হাতে ধরালেন। অকুস্থল ত্যাগ করা বাসনায় তাড়াতাড়ি ব্যাগ হাতড়ে টাকা বার করছি, হাতে ধরা ডালমুটের প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে থাকা অর্চিষ্মানের মুখটা চোখে পড়ল।

***** 

বাড়ি ফিরে, বাজার গুছিয়ে, চা বানিয়ে, ডালমুটের সিংহভাগ বয়ামে ঢুকিয়ে বাকিটুকু প্লেটে নিয়ে এসে টিভির সামনে এসে বসলাম। চায়ে চুমুক দিয়ে একমুঠো ডালমুট মুখে পুরে বললাম, "বাই দ্য ওয়ে, তুমি এতদিন কোন জিনিসটাকে ডালমুট বলে জানতে?"

গরম চায়ে বিষম খেয়ে, কেশেটেশে, সামলে নিয়ে অর্চিষ্মান সেই কথাটা বলল যেটা সপ্তাহের এমাথায় ওমাথায় ও আমাকে বলে থাকে। মুখ দেখে নাকি আমার ঘোড়েলপনার তল পাওয়া যায় না।

বললাম, "আমার ঘোড়েলপনার থেকে এই মুহূর্তে তোমার ডালমুট চেনা না চেনার বিষয়টা ইম্পরট্যান্ট।"  

চানাচুরের ভেতর লম্বা লম্বা কাঠির মতো যে জিনিসগুলো থাকে অর্চিষ্মান নাকি এতদিন ওগুলোকেই নাকি ডালমুট ভাবত।

"হরি হরি, যেগুলোকে আমরা কাঠিভাজা বলি আর এরা গাঠিয়া বলে?" যত হাসি পেয়েছিল তার তিনগুণ হাসলাম এপাশওপাশ গড়াগড়ি খেয়ে।

'তোমার সঙ্গে বাজে রসিকতা করার সময় নেই আমার' ভঙ্গিতে কানে হেডফোন লাগিয়ে অর্চিষ্মান স্ক্রিনের দিকে মুখ ফেরাল। আমি হাসি থামিয়ে বাটিতে লেগে থাকা ডালমুটের গুঁড়ো তর্জনীর ডগা দিয়ে চেপে চেপে মুখে ট্রান্সফার করতে থাকলাম। ডালমুট চেনে না বলে অর্চিষ্মানকে ঠাট্টা করলাম বটে, অজ্ঞানতায় আমি নিজেও কিছু কম যাই না। সয়াবিন যে গোল গোল ছোট ছোট বড়ির আকারে গাছের ডালে ঝুলে থাকে না, ইউনিভার্সিটিতে উঠে এ তথ্য জেনে মাথা তাজ্ঝিমমাজ্ঝিম হয়ে গিয়েছিল। সাবুকে ট্যাপিওকা বলে আবার লালচে ট্যাবাটোবা আলুর মতো দেখতে জিনিসটাকেও ট্যাপিওকা বলে এবং এটা যে জাস্ট কোইনসিডেন্স হতে পারে না, মাথাতেই আসেনি। আমি ভেবেছিলাম সাবুদানা পেঁপে জাতীয় কিছু ফলের বীজটিজ হবে, ফল কাটলে ঝুরঝুর করে বেরিয়ে কাটিং বোর্ড পেরিয়ে দৌড় দেয়। দৌড়ে এমন সব জায়গায় গিয়ে ঘাপটি মারে, ক্যাবিনেটের পেছনে আর দেওয়ালের ফোঁকরে, পাঁচ বছর পর বাড়ি বদলের আগে যে সব জায়গায় হাত পৌঁছনোর চান্স নেই। 

এই সব ভেবেটেবে মনে হল অবান্তরে ভুল জানা নিয়ে পোস্ট লিখলে কেমন হয়। এই ধরণের পোস্ট সম্ভবতঃ আগেও লিখেছি। ন'বছর ব্লগ চালানোর অসুবিধে এটাই, ভাবনার গভীরতা ও বৈচিত্র্য না থাকলে বিষয় রিপিট হতে বাধ্য।

ভুল জানার বদলে ভুল ধরা নিয়েও পোস্ট লেখা যেতে পারে। কারণ দুটো জিনিসের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধরিয়ে না দিলে আমরা যে ভুল জানি তা আমাদের পক্ষে জানা অসম্ভব হত। নিজের ভুল নিজে ধরা, প্রিন্ট আউট না নিয়ে টাইপো খুঁজে বার করার মতোই কঠিন। আমি যেমন চিরদিন কৃচ্ছ্রসাধন কথাটা 'কৃচ্ছসাধন' উচ্চারণ করেছি এবং বানানটাও ওটাই লিখেছি। অথচ ঠিক বানানটা তো আমি বইয়ের পাতায় ছাপার অক্ষরে কবে থেকে দেখছি। বার বার দেখছি। যতদিন না এই অবান্তরেই একজন শুধরে দিলেন, নিজে থেকে নিজের ভুল শুধরোতে পারিনি। এ রকম আরেকটা বানান হল শূন্য। পড়ছি শূন্য, লিখছি শূণ্য। যেদিন ভুলটা ঠিক হল, মনে পড়ল ছাপার অক্ষরে তো এটাই লেখা দেখে এসেছি চিরকাল, এই বানানটাই তো 'নরম্যাল' দেখতে। সেই থেকে 'শূণ্য'র দিকে তাকাতে পারি না, এমন অস্বস্তি। অথচ এতদিন অম্লানবদনে লিখে গেছি। এই ভুলটা কে ধরে দিয়েছিলেন মনে পড়ছে না। কেউ ধরে দিয়েছিলেন তো বটেই, নিজে ধরলে খুবই অদ্ভুত হবে। 

সব ভুল যে ধরিয়ে দিলেই ঠিক করে নিতে পারব তেমন অবশ্য কথা দিতে পারছি না। সেলুন বলে যে কোনও বস্তু ভূভারতে নেই, ওটা যে অশিক্ষিত বাঙালির জিভের অক্ষমতা এটা কিছুদিন হল জেনেছি। কথাটা হবে স্যালোঁ। 

তা বলে আমি কি এখন থেকে রবিবার দুপুরে দরজা খুলে, "বাবা তো বাড়ি নেই, বাবা তো স্যালোঁ গেছেন," বলব? বলব না। বড়জোর সেলুন এড়িয়ে 'চুল কাটার দোকান' পর্যন্ত নামতে পারি, ব্যস। 

রিসেন্টলি জানলাম কথাটা ওয়াকিবহাল নয়, ওয়াকিফ্‌হাল। ওয়াকিবহাল লিখি না লিখি, ওয়াকিফ্‌হাল যে চট করে লিখছি না, গ্যারান্টি। ওয়াকিবহাল লিখলে সবাই বুঝবে কী বলতে চেয়েছি, কেউ কেউ পেছনে হাসবে। অসুবিধে নেই। সামনে হাসলে একটু অসুবিধে হবে, কিন্তু কী আর করা, চুপ করে থাকব। এদিকে ওয়াকিফ্‌হাল লিখলে কেউ কেউ পিঠ চাপড়াতে আসতে পারেন। "আমি ছাড়াও এই শব্দটা কেউ ঠিক জানে দেখে মানবসভ্যতার প্রতি বিশ্বাস ফিরে এল।" আমিও হয়তো উত্তেজিত হয়ে, "যা বলেছেন" কিংবা "একমত" গোছের রিপ্লাই দিয়ে বসলাম। তার থেকে অবগত-টবগত দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া নিরাপদ। 

গ্রীষ্মবর্ষার মতো ভুল ধরাধরির সিজন থাকে। কোনও একটা সাম্প্রদায়িক গোলমাল বাধলে সবাই মনুস্মৃতি আর কোরান খুলে বসে কোটেশন তুলে তুলে ভুল ধরতে নামে। ‘বেন হুর’ সিনেমাটা রিলিজ করার সময় একধাক্কায় অনেকের ভুল ঠিক হয়ে ‘বেন হার’ হয়ে গিয়েছিল। 'ডেঙ্গু' সিজন এলে যেমন জানা যায় ওটা 'ডেঙ্গি' হবে। 'ব্রাজিল' যে 'ব্রেজিল' আর 'আর্জেন্টিনা' যে 'আর্খেন্তিনা', গত একমাস ধরে এই ভুলদুটো সবাই সবাইকে খুব ধরাচ্ছে দেখলাম।

কেউ ভুল ধরলে রাগ হয়, কিন্তু হওয়া উচিত নয়। কারণ ভুল ধরিয়ে দেওয়ার ব্যামোটা একটা ব্যামোই। বা নিজেদের ঠিক জানাটা না জানিয়ে থাকতে না পারার। এই জানানোর বেগ যখন আসে, যাঁদের আসে তাঁরা জানেন, সংবরণ করা অসাধ্য। আমি নিজে এ ব্যামোতে ভুগেছি। আমার দোষ নয়, হেরিডিটির দোষ। আমাদের বাড়িতে কেউ কখনও পুরুতমশাই মন্ত্র বলার পর মন্ত্র বলে না। পুরুতমশাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি করতে থাকে। 'আমাদের যে পুরুতমশাইয়ের শুনে শুনে মন্ত্র বলার দরকার নেই,  আমরা যে মন্ত্রগুলো অলরেডি জানি,’ এইটা না প্রমাণ করতে পারলে কী হবে দেখার সুযোগ আমার হয়নি, মারাত্মক কিছু হবে যে সন্দেহ নেই। তার ওপর গোটা ব্যাপারটাই হয় চেঁচিয়ে। কারণ 'আমরা ঠিক উচ্চারণে মন্ত্রোচ্চারণ করতে পারি, নিচুস্বরে তালেগোলে ভুল উচ্চারণে সমোসকৃত সারি না,' সেটা বোঝানোরও মহাদায় আছে। বসন্তপঞ্চমীর পুণ্য প্রভাতে আমাদের ঠাকুরঘর থেকে হেঁড়েমিহি গলায় যখন 'জয় জয় দেবি চরাচরসারে' কোরাস ভেসে আসে সে একটা শোনার মতো ব্যাপার হয়।

ঠাকুমা বলতেন, 'বংশের ধারা বাইগুন চারা।' আমার স্বভাবেও সে বেগুনচারা লকলক করে বাড়ছিল। বছরকয়েক আগে একটি দুর্ঘটনায় সে বৃদ্ধি প্রতিহত হয়েছে। আড্ডায় বসে পনেরো মিনিট ধরে একজন পি এইচ ডি-রত বাঙালি ছাত্রের মুখে 'মদ্য' শুনতে শুনতে আমি বলে ফেলেছিলাম, "কথাটা মদ্য নয়, মদ্যপ।" বলামাত্র ঘর জুড়ে, “এইও কুন্তলার সামনে কেউ ভুল বাংলা বলতে পারবে না, কারণ কুন্তলা বাংলা নিয়ে সেনসিটিভ,” ইত্যাদি ঠাট্টার হররা উঠেছিল।

ওই ঘটনাটা আমার ভুল ধরানোর কেরিয়ারে একটা জলবিভাজিকা। সেই থেকে আমি চেষ্টা করি মায়ের ছাড়া আর কারও ভুল না ধরতে। অর্চিষ্মানের ভুল মাঝে মাঝে ধরে ফেলি (ডালমুটের কেসটাই যেমন) কিন্তু আমি সচেতন, ক্রমাগত ছিদ্রান্বেষিত হতে হতে তেতে গিয়ে ও যদি কোনওদিন "তবে রে," বলে আমার ভুল ধরাতে শুরু করে তা হলে আমাদের এই দু'কামরার ভাড়াবাড়ি আর বাসযোগ্য থাকবে না। 

অন্যের ভুল না ধরার চেষ্টায় সফল হয়েছি বলব না কারণ মুখে থামালেও মাথার মধ্যে ভুল ধরা এখনও চলেছে। তবে সে ভুল ধরা নিতান্ত নির্বিষ। আপনি মদ্য বলুন বা ওয়াকিফ্‌হাল, ওতে যে কিছু এসে যায় না সে আমি রন্ধ্রে রন্ধ্রে জানি। সবাই জানে। কেউ কেউ ব্যতিক্রম থাকেন। একজন দাবি করেছিলেন, এনিওয়ের বদলে এনিওয়েজ বলে এমন কোনও লোকের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, বাস্তবে বা সোশ্যাল মিডিয়ায়, তিনি অ্যাকসেপ্ট করেন না। তালেগোলে অ্যাকসেপ্টেড হয়ে গেলে ভুল চোখে পড়ামাত্র ক্যান্সেল করেন। তবে ইনি ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ লোকই আমার মতো। 'ব্রেজিলের বদলে ব্রাজিল বলে অতএব ওর হলুদসবুজ জার্সি কেড়ে নিয়ে কানচাপাটি মেরে পাঁচবছর ফুটবল খেলা দেখা নিষিদ্ধ করে দাও,' এই রকম দাবি বেশিরভাগ লোকেই করবেন না। গত মাস জুড়ে যারা ভুল ঠিক করার সামাজিক কর্তব্য সারছিলেন, তাঁরাও না।

*****

পোস্টটা লিখতে লিখতে মনে হল, যেটুকু ডালমুট শিশির তলায় বাকি আছে সেটুকুর জন্য এই নিয়মটা চালু করলে কেমন হয়? গতসপ্তাহের আগে ডালমুট চিনত না তারা ওই ডালমুট ছুঁতে পারবে না। যারা জানত, বয়ামের ডালমুটে খালি তাদেরই অধিকার। আপনাদের মতামত জানাবেন দয়া করে।




July 24, 2018

৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মে বর্ষা





আমাকে হাড়ে হাড়ে চেনা সত্ত্বেও সাতদিনের নোটিসে আমার থেকে হাজার শব্দের লেখা আদায়ের ঝুঁকি কেন নিলেন সেটা সোমেন বলতে পারবেন, সাতদিনের নোটিসে হাজার শব্দের লেখা দেব প্রমিস করার স্পর্ধা আমি কেন দেখালাম সেটা আমি বলতে পারি।

কারণ এক, নিজেকে আমার এখনও চিনতে বাকি। 

দুই, আমাকে লেখাটা লিখতে বলা হয়েছিল বর্ষাসংক্রান্ত আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা/উপলব্ধি/ভাবনা/কল্পনা নিয়ে। আজকাল যাকে বলে মুক্তগদ্য। আমরা যাকে বলতাম রচনা।

সাতদিনের মধ্যে হাজার শব্দের বর্ষার রচনা যদি লিখে উঠতে না পারি তাহলে সে লজ্জা আমার। সে লজ্জা আমার বাংলার দিদিভাইদেরও যারা বছরের পর বছর হাফইয়ার্লি আর অ্যানুয়ালের খাতায় 'একটি বর্ষার সকাল/বিকেল/দুপুর/রাতদুপুর' রচনায় আমার আবেগমথিত আর বিশেষণখচিত বাংলার খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। একটিবারও বলেননি, 'কুন্তলা, অনেক তো হল, এবার একটু অন্য রচনায় হাত পাকাও যেটা খানিকটা প্রিপেয়ার করে হলে আসতে হয়।'

বললে আমি খুবই বিপদে পড়তাম। ভারতের ম্যাঙ্গানিজ আর মাইকা উৎপাদক রাজ্যের নাম মুখস্থ করতেই আমার জিভ বেরিয়ে যেত, এর ওপর বিজ্ঞান কেন আশীর্বাদ-এর পক্ষে পাঁচটা পয়েন্ট আর অভিশাপ-এর পক্ষে আরও পাঁচটা পয়েন্ট মনে রাখতে হলেই হয়েছিল। 

কাজেই বুক বেঁধে আমি বর্ষার রচনা লিখতে বসলাম। সময়সীমা ফুরনোর সাঁইত্রিশ মিনিট পর সোমেনকে পাঠিয়েও দিলাম।

দু'পার বাংলার আরও একত্রিশজন লেখকের লেখা নিয়ে তৈরি চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের বর্ষা সংখ্যা 'বদরিয়া ঘেরি আয়ি'তে আমার সেই বর্ষার রচনাটি বেরিয়েছে। এই রইল লিংক। 



July 21, 2018

আপনি যদি সি আই ডি-র ভিলেন হন



১। দুষ্কর্ম করতে যাওয়ার আগে ফলস দাড়ি লাগিয়ে নিন। বা অলরেডি থাকলে, কামিয়ে নিন। দাড়ি থাকা না-থাকার ওপর দয়ার হাতের চড়থাপ্পড় খাওয়া (আপনি মহিলা হলে সেই এপিসোডে উপস্থিত মহিলা অফিসারের) না-খাওয়া নির্ভর করবে না, কিন্তু সি আই ডি টিমের সবথেকে খতরনাক সদস্যের চোখে ধুলো দিলেও দিতে পারেন। 

না, দয়া সি আই ডি টিমের সবথেকে খতরনাক সদস্য নয়। দড়াম দড়াম দরজা ভাঙা ছাড়া আর কোনও কাজের নয় দয়া। আমার ফেভারিট অফিসার অভিজিৎও নয়। ফ্রেডরিক তো আছে খালি কমেডি করতে। এ সি পি প্রদ্যুমন্‌ও "কুছ তো গড়বড় হ্যায়" জাতীয় কিছু জরাজীর্ণ ম্যানারিজম ছাড়া মোটের ওপর আলংকারিক। ডক্টর সালুংখের যত কেরামতি ল্যাবে, তিনি আপনার পিছু ধাওয়া করতে বেরোবেন না। টিমের নারীসদস্যদের সম্পর্কে আপনাকে সতর্ক করতে পারলাম না বলে দুঃখিত। তাতে ক্ষতি নেই কিছু কারণ তাঁরা নির্বিষ। 

যার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আপনাকে দাড়িসংক্রান্ত পরামর্শটা দিলাম, একদিক থেকে দেখলে তিনি সি আই ডি টিমের সদস্যই নন। তিনি পাঞ্জাবীপরিহিত, চশমাশোভিত নিরীহ একজন আর্টিস্ট। ডাক পাওয়া মাত্র ঝোলা, ঝোলার ভেতর খাতা পেন্সিল নিয়ে হাজির হবেন আর প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ শুনে আপনার এমন ছবি এঁকে দেবেন, ক্যানভাসকে মনে হবে আপনার বাথরুমের আয়না। কাজেই সতর্ক হোন। অপারেশনে নামার আগে নিজের আসল চেহারা লুকোন। দাড়ি যোগ অথবা বিয়োগ করুন। 

২। চেক করে নিন আপনার পোশাকআশাক লটবহরের মধ্যে কোনও ইউনিক জিনিস আছে কি না। আপনি এমন জুতো পরে নেই যা বৃহন্‌মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের আওতায় একমাত্র একটি দোকানেই কিনতে পাওয়া যায়। এমন হাতুড়ি কারও মাথায় মারছেন না যেটা একটি কামারশালার একজন ওস্তাদ কামারই বানাতে পারেন। এমন ইনজেকশন ফোটাতে যাচ্ছেন না যা শহরের একটিমাত্র কেমিস্টের দোকানে ছ'মাস আগে থেকে অর্ডার না দিলে পাওয়া যায় না। আপনি যে রকম আনাড়ি, ফোটাতে গিয়ে অর্ধেক সূচ ভিকটিমের শরীরের ভেতর রয়ে যাবে। মনে রাখবেন এখানে প্রতিপক্ষ আপনার লোকাল থানার ঘুষ খাওয়া পুলিশ নয়, সি আই ডি। ওই ভগ্নাংশের লেজ ধরে গোটা সিরিঞ্জের সোর্স খুঁজে বার করতে তাঁদের পনেরো মিনিটের বেশি লাগবে না। কারণ সি আই ডি-র অফিসাররা আর কিছু পারুন না পারুন, দোকানে দোকানে গিয়ে জেরা করতে সিদ্ধহস্ত। দোকানের সংখ্যা যত বাড়বে আপনার ধরা পড়ার সম্ভাবনা তত কমবে। কাজেই পাড়ার ওষুধের দোকান থেকে পাঁচটাকা পিস ডিজপোজেবল সিরিঞ্জ কিনে ব্যবহার করুন। বাটার জুতো পরে ব্যাংকডাকাতি করতে যান। জিমি চু বিয়েবাড়ির জন্য তোলা থাক। 

৩। তাছাড়া ওই সব দোকানে কিছু কর্মচারী থাকবেন যিনি পরশু সকালে কী খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন মনে করতে পারবেন না কিন্তু ছ'মাস আগে আপনি কী রঙের জামা পরে ছুরি কিনতে এসেছিলেন অব্যর্থ বলে দেবেন। ছুরি পছন্দ করা আর টাকা দেওয়ার মাঝখানে আপনার যে একটা ফোন এসেছিল আর আপনি যে উল্টোদিকের লোকটার সঙ্গে খুনের প্ল্যান ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন সেটাও উনি শুনেছেন এবং ভার্বাটিম বলতে পারবেন। আপনার কোমরের জন্মদাগের অবিকল বর্ণনা দিতে পারবেন যা শুনে সি আই ডি-র বিপজ্জনক সদস্যটি আপনার ছবি এঁকে দেবেন। যা দেখে আপনাকে ধরতে সি আই ডি-র পাঁচ মিনিটের বেশি লাগবে না। 

অতএব এক, ক্রাইমসংক্রান্ত যে কোনও কাজে যাওয়ার সময় নকল দাড়িগোঁফ লাগান। দুই, ফোনে চিলচিৎকার করে কথা বলার অভ্যেসটা পাল্টান।

৪। ক্রাইম সিনের সর্বত্র ডি এন এ ছড়িয়ে আসবেন না। কাউকে গুলি করে মারলেন আর আপনার মাথার দু'গাছি চুল তাঁর মুঠোর মধ্যে রয়ে গেল, এমন যেন না হয়।  আগেও বলেছি, এ আপনার লোকাল থানা না। এটা সি আই ডি। এঁদের নিজস্ব ফরেনসিক ল্যাবরেটরি আছে, সে ল্যাবে ডক্টর সালুংখে আর তাঁর স্যাঙাৎ ডক্টর তরিকা আছেন, আর আছে কোটি কোটি টেস্ট টিউব। ডক্টর সালুংখে সে রকম একটা টিউব থেকে লাল রঙের রহস্যময় তরল অন্য টিউবে ঢালতেই সেটা নীল রঙের হয়ে যাবে, সারা ল্যাব ধোঁয়ায় ধোঁয়াক্কার। ধোঁয়া কেটে গেলে আপনার বাড়ির ঠিকানা আর ডি এন ম্যাচ চোখের সামনে জ্বলজ্বল করবে।

৫। আপনি দুষ্কর্ম সাধন করার পর কোনও একজন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন র‍্যান্ডম নাগরিক এ সি পি প্রদ্যুমনের মোবাইলে ফোন করে খবর দেবেন। এর পর শুরু হবে পিছু ধাওয়া। ক্বচিৎকদাচিৎ রেলস্টেশন, ভিড় রাস্তায় চেজ সিকোয়েন্স হবে। বছরের নির্দিষ্ট সময় এপিসোড সম্প্রচার হলে গরবা বা ডান্ডিয়া ডান্স পার্টিও হতে পারে। তবে ডান্স ক্লাব বা পাবের পসিবিলিটি সবথেকে হাই। আপনি হয় ও সব গোলমেলে জায়গায় যাওয়া বন্ধ করুন নয় চোখকান খোলা রাখুন। প্রথমে খেয়াল করুন, কাউকে দেখেই ফলস দাড়ি পরে ঘুরছে মনে হচ্ছে কি না। আপনি ওভারকনফিডেন্ট হয়ে দাড়ি না লাগিয়ে বা না কামিয়ে ব্যাংকডাকাতি করে এসেছেন বলে সি আই ডি অফিসাররাও তাই করবেন না। লক্ষ করুন, রেলস্টেশনে কেউ অতি অভিনয় করে নিজেকে কুলি প্রমাণ করার চেষ্টা করছে কি না, পাবে কোনও মহিলা নাচতে নাচতে সন্দেহজনক রকম গায়ে পড়ছেন কি না। ওঁরা সি আই ডি। (আপনি নারী হলে পুরুষ সি আই ডি-রা গায়ে পড়বেন।) বারটেন্ডারের দিকে তাকান, গ্লাস মুছতে মুছতে ক্রমাগত একা একা ঠোঁট নেড়ে চলেছেন? গ্যারান্টি সি আই ডি। সি আই ডি-কে চেনার একটা সুবিধে হচ্ছে, ওঁরা সবে মিলি করি কাজে বিশ্বাসী, সকলেই একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকবেন কিংবা একই ফ্লোরে, সম্ভবতঃ একে অপরের সঙ্গেই নাচবেন। কথা বলতে বলতে বারটেন্ডার কানে হাতে ছোঁয়ালেন? চট করে চোখ বুলিয়ে নিন, নৃত্যরত মহিলা এবং বাকি ফলস দাড়িরাও ওই মুহূর্তে কানে হাত দিয়েছেন কি না। দিলে বুঝবেন কানে লাগানো আছে সিক্রেট ফোন। এঁরা সবাই সি আই ডি।

৬। বন্ধু কম রাখুন। ও বালাই না রাখলেই বেস্ট, নিতান্ত একাকীত্বে ভুগলে বড়জোর দুয়েকজন বুদ্ধিমান বন্ধু রাখলেও রাখতে পারেন। এটা জীবনের জেনারেল টিপস হিসেবে মানুন। ক্রাইম করে সি আই ডি-র হাত থেকে বাঁচার উচ্চাশা পোষণ করলে মহামন্ত্র করে বুকে ঝোলান। চায়ের দোকানে, গ্যারেজে, বিস্কুটের গুঁড়োর মতো বন্ধু ছড়িয়ে রেখে আসবেন না যাতে স্রেফ তাদের কলার চেপে ধরে ন'টায় শুরু করে সি আই ডি ন'টা আটান্নয় আপনার কাছে পৌঁছে যেতে পারে। 

৭। সি আই ডি হয় আপনার কাজের জায়গায় পৌছবে নয় সোজা বাড়িতে। কাজের জায়গা হলে আপনি বেছে বেছে সেইদিন কামাই করতে পারেন। তাতে সুবিধে হবে না। তাহলে বাকিদের পরীক্ষা করার আগেই সি আই ডি নিশ্চিত হয়ে যাবে যে আপনিই খুনি/পকেটমার/ডাকাত। আর কোনও প্রমাণ লাগবে না, আপনার অনুপস্থিতিই আপনার দুষ্কর্মের সাক্ষ্য দেবে। 

যদি সাহস দেখিয়ে অফিসে আসেন তাহলে নিম্নলিখিত ঘটনাপরম্পরার জন্য তৈরি থাকুন। আপনাদের সবাইকে লাইন দিয়ে দাঁড় করানো হবে এবং একধার থেকে সি আই ডি অফিসারেরা সবার হাতের তেলো পরীক্ষা করতে শুরু করবেন। অকুস্থলে নাকি ভোটারদের আঙুলে ছাপ মারার জন্য এক টিন রঙের বাক্স রাখা ছিল, আপাতত সেটা ঢাকনা খোলা অবস্থায় মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে। এ থেকে দুটো ব্যাপারে শিক্ষা নিন। এক, অকুস্থলে রঙের টিন ডাই করা দেখলে তাতে শখ করে হাত ডুবিয়ে আসবেন না, দুই, এ ধরণের শখের কেস হিস্ট্রি থেকে থাকলে গ্লাভস পরুন। না থাকলেও পরা অভ্যেস করুন।

৮। সত্যি বলছি, পরিস্থিতি যদি এই পর্যায়ে এসে পৌঁছয় তাহলে আপনার বাঁচার পথ বন্ধ বললেই চলে। শুরুতে দাড়ির ব্যাপারটা খেয়াল রাখা উচিত ছিল। যাকগে যা হওয়ার হয়েছে, একটাই অনুরোধ, যদি এ রকম পর্যায় আসেই তাহলে দয়া করে দিকবিদিকশূন্য হয়ে দৌড়তে শুরু করবেন না। কোনও লাভ হবে না। দয়া আপনার থেকে জোরে দৌড়োয়। 

*****

এখন আর টিপস দিয়ে লাভ নেই, তবু ধরা পড়ার পর কী কী হতে পারে জানা থাকলে শক কম লাগতে পারে তাই বলছি। 

আপনি একটা চড় খাবেন। পুরুষ হলে সম্ভবতঃ দয়ার হাতে, নারী হলে সেই এপিসোডে যে মহিলা অফিসার ডিউটিতে আছেন তাঁর হাতে। এই চড় পৃথিবীর আর কোনও চড়ের মতো নয়। চড় না বলে একে টেলিপোর্টার বলাই ভালো। চড় শুরু হতে পারে পৃথিবীর (ওয়েল, বৃহন্‌মুম্বাই মিউনিসিপ্যালিটি কর্পোরেশনের) যে কোনও জায়গায় কিন্তু শেষ হবে সি আই ডি-র অফিসে। আপনি একটি চেয়ারে বসে থাকবেন, চড়ের ইমপ্যাক্টে আপনার মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে একটা টেবিলের ওপর আর আপনাকে ঘিরে পা ফাঁক করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে সি আই ডি-র গোটা টিম।

আপনি খেয়াল করেছেন কি না জানি না, এখনও পর্যন্ত যা যা হয়েছে, তার মধ্যে কোথাও প্রমাণের ব্যাপার নেই। হ্যাঁ সাক্ষীরা আপনাকে দেখেছে, খতরনাক শিল্পী আপনার ছবি এঁকেছেন, স্মৃতিধর দোকানদার আপনার জামার রং চিনেছেন। তাতে কী প্রমাণ হয়? সাক্ষীর চোখ খারাপ, খতরনাক শিল্পীর আর ওই স্মৃতিধর দোকানদারের আপনার প্রতি ক্ষার ছিল। 'আপনি লাস্টে দৌড়োলেন কেন?' কেউ জানতে চাইলে বলবেন সকালে এক্সারসাইজ হয়নি তাই দৌড়েছেন, একটা কাজের কথা মনে পড়ে গেছিল তাই দৌড়েছেন। 

দৌড়নো মানুষের জন্মগত অধিকার তাই দৌড়েছেন। 

এ সি পি প্রদ্যুমন্‌ প্রতি এপিসোডের শেষে নিজেই আগ বাড়িয়ে ফাঁসির নিদান দিলে কী হবে, দেশে আইনআদালত বলে একটা ব্যাপার আছে। যেখানে আপনি গ্লাভস না পরা সত্ত্বেও, গোঁফদাড়ির ব্যাপারে চরম অমনোযোগিতা দেখানো সত্ত্বেও, সি আই ডি-র সব সাক্ষ্যপ্রমাণ বা যাকে ওঁরা সাক্ষ্যপ্রমাণ বলে দাবি করবেন, ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে কোনও জজ দেড়বার ভাববেন না। পাসমার্কস পেয়ে পাস করা উকিলের কেস জিতে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসতে পাঁচের জায়গায় ছ'মিনিট লাগবে না।

যদি না আপনি চড় খেয়ে গলগলিয়ে সব স্বীকার করতে শুরু না করেন। আপনার মোটিভ অপরচুনিটি আরও হ্যানাত্যানা যা সব সি আই ডি-র খুঁজে বার করা উচিত ছিল কিন্তু করতে গিয়ে আপাদমস্তক ব্যর্থ হয়েছেন, সে সব গল্প প্লেটে সাজিয়ে সি আই ডি-র হাতে তুলে না দেন।

যদি নিতান্তই দেন, দয়া করে, আমাদের মুখ চেয়ে অন্তত ইন্টারেস্টিং গল্প বলবেন। কে কবে আপনার মায়ের গলা টিপেছিল, কার বাবা আপনার বাবার বিজনেস লাটে তুলেছিল, কে আপনার বিজ্ঞানী বাবার রুলটানা খাতা থেকে পরমাণুবোমার পাঁচপাতা ফর্মুলা ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেই থেকে আপনার বাবা রকিং চেয়ারে বসে বিড়বিড় বকেন আর রুলটানা খাতা দেখলেই কুচিকুচি করে হাওয়ায় ওড়ান - এই সব বস্তাপচা প্রতিশোধের গল্প বলবেন না প্লিজ। এগুলো দেখে দেখে শুনে শুনে চোখকান হেজে গেছে।

*****

(বা আপনার যদি ওই গল্পগুলোই বলার ইচ্ছে করে তো ওগুলোই বলবেন। কারও তোয়াক্কা করবেন না। আপনি যতই মাথামুণ্ডুহীন গল্প বলুন না কেন, যত বোকামোই করুন না কেন, আমার এত খেটেখুটে লেখা উপদেশামৃত এককান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেককান দিয়ে বার করুন না কেন, একটা কথা আমি আপনাকে দিতে পারি, আপনার গল্পটা যে এপিসোডে দেখাবে সেটা আমি দেখব। সম্ভবতঃ দেখে ফেলেছি। আবার দেখালে আবারও দেখব। বাড়িতে থাকলে তো বাড়ির টিভিতেই দেখব, বাড়ির বদলে আসমুদ্রহিমাচল যেখানেই থাকি, সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়ে তিনপোঁচ ট্যানড হয়ে, 'আর কোনওদিন চড়ব না' কান মুলতে মুলতে পাহাড় থেকে নেমে, ঘন জঙ্গলে বাঘ দেখতে গিয়ে বাঁদরের চাঁটি খেয়ে ঘরে ফিরে সরকারি গেস্টহাউসের বিংশ শতাব্দীতে কেনা টিভির কোনও চ্যানেলে যদি সি আই ডি চলে, দেখব। কেউ আটকাতে পারবে না।)


July 16, 2018

অসম্ভব



বছর ঘুরে ইনটার্ন-ঋতু ফিরেছে, অফিস অলরেডি কানায় কানায় ছিল, ফাটো ফাটো হয়েছে। কনফারেন্স রুমের দরজা খুললে ইনটার্ন উপচে পড়ছে, প্যাসেজ দিয়ে হাঁটার সময় তাদের ল্যাপটপের প্রসারিত তারে ঠোক্কর খাচ্ছি সকালবিকেল। 

খারাপ লাগে না। এমনিতে তো সাড়ে আটটা-পাঁচটা জ্যান্ত মড়া হয়ে ঘোরা, ঘণ্টায় একবার করে প্যান্ট্রি ভিজিট। গরম জলে লেমন টি ব্যাগ ডোবাতে ডোবাতে প্রোজেক্ট আর সাবমিশন আর সেমিনারের চর্বিতচর্বণ। সে জায়গায় যৌবনের দূতেরা রংচঙে মাছের মতো ঝাঁক বেঁধে অফিসের মধ্যে দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে, লাফিয়েঝাঁপিয়ে কাজ করছে, শেষ করে এনে জিজ্ঞাসা করছে, "এবার কী করব?" 

ইচ্ছে হয় শিখিয়ে দিই, "কাজ শেষ হয়ে গেছে বলতে নেই, ঘাপটি মেরে থাকো যতক্ষণ না বস ডেকে পাঠায়।" শেখাই না। আমার ওস্তাদি করার দরকার নেই, এ সব বেসিক শিক্ষা সময় শিখিয়ে দেবে।

এরা জোরে কথা বলে, আস্তে হাসতে পারে না। এদের হেডফোনের ওপারের ঢিকচিক ঢিকচিক গোটা অফিস শুনতে পায়। সেদিন আমার এক সহকর্মী "বচা লো ভাইয়া" বলে অ্যাডমিনের কাছে গিয়ে হত্যে দিয়ে পড়েছে। তার পাশের ঘরে চারজন ইনটার্ন বসেছে এবং ক্রমাগত উচ্চঃস্বরে কথা বলছে, হেসে গড়াচ্ছে। সহকর্মী দেওয়ালে টকটক টোকা দিয়ে আপত্তি প্রকাশ করাতে প্রত্যুত্তরে টোকা এসেছে। খিলখিল হাসি সহযোগে। 

আমি অফিসে কানে ইয়ারফোন গুঁজে রাখি। কিছু না চললেও। প্রাইভেট আলাপচারিতার জন্য আমি অ্যাভেলেবল নই বোঝানোও হয়, লোকজনের প্রাইভেট আলাপচারিতায় আড়িও পাতা যায়। আসাযাওয়ার পথে ইনটার্নদের কথা শুনি। এটা শেষ করে ওটা, এখান পুরোনো হলে ওখান। প্ল্যানিং-এ প্ল্যানিং-এ জীবন ছয়লাপ। ভাবি, এত কষে আঁটোসাঁটো প্ল্যান কোরো না বাছা, হাওয়াবাতাস চলার খানিকটা জায়গা রাখো। আহূত অনাহূত সারপ্রাইজদের আসাযাওয়ার ব্যাকডোর খোলা রাখো।

অফ কোর্স, মুখে বলি না। গম্ভীর মুখে চায়ের কাপে টি ব্যাগ ডিপ ডিপ ডোবাই। নিজের বাকি জীবনটার জন্য যে প্ল্যানটা ছকেছি সেটাতে আরেকটু ঢিলে দিতে হবে, ডিসিশন নিই।

সেদিন প্যান্ট্রিতে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে দিনের পাঁচ নম্বর চা-টা বানাচ্ছি, এমন সময় আর্তনাদ। 

নাইনটি ওয়ান?! ইউ আর নাইনটি ওয়ান বর্ন? 

মাসছয়েক আগে জয়েন করা আমাদের টিমের নবীনতম ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ইনটার্ন রুদ্ধশ্বাস। মুখ হাঁ, চোখ বিস্ফারিত। ওর এক হাতের মধ্যে দাঁড়িয়ে উনিশশো একানব্বই সালে জন্মানো একটা রক্তমাংসের মানুষ চা খাচ্ছে। যেন একটা টি-রেক্স ছোটো ছোটো হাত তুলে দুদিকের গাড়ি থামিয়ে নেহরু প্লেসের সিগন্যাল পেরোচ্ছে। এও কি সম্ভব? 

একবার ভাবলাম, আমার জন্মসালটা বোমার মতো ফাটাই। কী রিঅ্যাকশন হয় দেখি। নিজেকে মনে করালাম, বাচ্চাদের ভয় দেখিয়ে আনন্দ পায় সাইকোপ্যাথরা। সবুজ বিনে টি ব্যাগ টিপ করে ফেলে সিটে ফিরে এলাম। 

*****

গরমের ছুটি শেষ। ক্লাস শুরু হবে। ধীরে ধীরে ইনটার্নরা বিদায় নিচ্ছে। এবং কেউ কেউ দাবি জানিয়েছে আমি যেহেতু সবার আগে অফিসে আসি, ওদের বস/ সুপারভাইজার/ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষেরটেবিলে গিয়ে আমি যদি বিদায়কালীন গিফটগুলো রেখে আসতে পারি তবে খুব ভালো হয়। এমন সময়েই যেন রাখি যখন টেবিলে ম্যাম/স্যার থাকবেন না, ওকে? আর যদি থাকেন তবে যেন আমি কোনও একটা এক্সকিউজ দেখি চলে আসি, ওকে? প্লিজ? প্রমিস?

আপাতত সকালবেলা অফিসে এসে সহকর্মীদের ডেস্কে সলমাচুমকিখচিত র‍্যাপার মোড়া গিফট রাখছি, আবেগমথিত বিদায়বাণী লেখা পোস্ট-ইট সাঁটছি আর ভাবছি, সামনের বছর যারা আসবে তারা যারা এ বছর যারা চলে গেল তাদের থেকেও বেশি ছেলেমানুষ হবে। 

এও কি সম্ভব?


July 12, 2018

কিকিরা



প্রথম দু’খণ্ড তেড়েফুঁড়ে শেষ করে তৃতীয় খণ্ড শুরু করতে যাব, ভূমিকায় চোখ আটকাল।  

বিমল কর লিখছেন, "গোয়েন্দা গল্প বলতে যা বোঝায়, কিকিরার গল্প তা নয়। অপরাধমূলক কাহিনী বলা যায়। খুনোখুনি বন্দুক পিস্তল রক্তপাত - এইসব ভয়ংকর ব্যাপার কিকিরার গল্পে নেই; যেটুকু আছে তা আড়ালে, এবং অতি সামান্য। এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিকিরাসারকে যাদের ভালো লাগে, এই লেখাগুলি তাদের তৃপ্ত করলে খুশি হব।"

কেলেংকারি। কিঙ্কর কিশোর রায় বা কিকিরা-কে নিয়ে অবান্তরে পোস্ট লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন একজন কিছুদিন আগে। কিকিরা পড়েছি সেই ছোটবেলায়, তাও বছরে একবার পূজাবার্ষিকীতে। মেন চরিত্রদের নাম মনে আছে, দুয়েকটা গল্প পড়া শুরুর পর প্লটও হয়তো ছায়াছায়া মনে আসবে, ব্যস। তাছাড়া তখনকার পড়া, চোখের সামনে ছাপার অক্ষর আছে তাই পড়া। আগামাথা বুঝে, তুল্যমূল্য বিচার করে পড়া নয়। কাজেই কিকিরা নিয়ে আমার মহার্ঘ মতামত দেওয়ার আগে আরেকবার পড়া আবশ্যিক। 

আর সেই পড়তে গিয়ে এই সর্বনাশ। যেখানে লেখক নিজেই বলে দিচ্ছেন যে কিকিরার গল্প গোয়েন্দা গল্প নয়, সেখানে গোয়েন্দা গল্পের মাপকাঠিতে কিকিরাকে মাপা অবিচার নয় কি? 

এ দ্বন্দ্বের দুটো সমাধান হয়, এক, লেখকের কথা মেনে নিয়ে মাপজোক থেকে কিকিরাকে মুক্তি দেওয়া, দুই, লেখককে অগ্রাহ্য করে যা করতে নেমেছিলাম, সেটা করা। লেখার পর সে লেখাতে কোন লেবেল সাঁটা হবে সেটা কে বলবে, লেখক না পাঠক, এ নিয়েও তর্ক হতে পারে। 

এ ছাড়াও একটা ব্যাপার আছে। কিকিরার কাহিনী পড়তে পড়তে মাথার ভেতর পোস্ট ভাঁজতে শুরু করেছিলাম, যা যা লিখব ভেবেছিলাম বেশিরভাগই প্রশংসাসূচক। এইবার যদি কিকিরাকে নন-গোয়েন্দা ধরে নিতে হয়, তাহলে সেই সব প্রশংসাকেও বাতিল করতে হয়।

তা আমি করছি না। বইয়ের ভূমিকায় লেখকের এবং গল্পের স্বয়ং কিকিরার বারংবার ডিসক্লেমার, "আমরা তো ওই ক্লাসের নয়। মানে গোয়েন্দা ক্লাসের। আমরা হলাম, কী বলব - কী বলা যায় - ফেউ ক্লাসের।"  "আমি গোয়েন্দা নই - ম্যাজিশিয়ান।" অগ্রাহ্য করে আমি কিকিরার গল্পদের সম্পর্কে আমার মতামত জানাতে বসলাম। হ্যাঁ, গোয়েন্দা গল্প হিসেবেই। 

*****

কিন্তু তার আগে কয়েকটা কথা বলা দরকার। 

গোয়েন্দা গল্প পাশে এসে বসতে চাইলে সাহিত্যের বাকি ঘরানারা যে নাকে রুমাল চাপা দেয় তার কারণ সবাই জানে। ডেভিড সুশে, যিনি পোয়্যারোরূপে জগৎজয় করেছেন, বলেছেন যে তাঁকে ছোটবেলায় গোয়েন্দা গল্পটল্প পড়ার অনুমতি দেওয়া হত না। বরং এমন জিনিস পড়তে উদ্বুদ্ধ করা হত, যা পাঠক হিসেবে তাঁকে "চ্যালেঞ্জ" করবে। তাঁর ভাবনা এবং রুচি তৈরি করবে। পাঠকের রুচিটুচি নিয়ে গোয়েন্দাগল্পের কোনও দায়িত্ব নেই, অজানাকে জানানো, নিজেকে চেনানো ইত্যাদিতেও গোয়েন্দা গল্প উদাসীন। ট্রেন, বাস, প্লেনের অপেক্ষা করার সময় সে শুধুমাত্র আপনার বোরডমের সঙ্গী হওয়ার প্রমিসটুকুই করে, ব্যস।  

বাংলা গোয়েন্দা গল্পের বিরুদ্ধে এ সবের ওপরে আরও একটা বিষয়ে অভিযোগ থাকে। যেটাকে আমি বলি 'ঝাড়া', আমার থেকে বেটার বাংলা জানা লোকেরা বলেন "কুম্ভীলকবৃত্তি"। বাংলা গোয়েন্দাসাহিত্যের বেশিরভাগ গল্পউপন্যাসের রহস্য সমাধানের প্রক্রিয়া, গোয়েন্দার চরিত্র, গোয়েন্দার সঙ্গে স্যাটেলাইটের ডায়নামিক্স, - একটা বিশেষ ধারার বিলিতি গোয়েন্দাগল্পের অনুকরণে। ফর্মুলেইক। আমার তাতে অসুবিধে হয় না, আমি নিজে ফর্মুলা গল্প পড়তেই ভালোবাসি এবং বেশিরভাগ ফর্মুলাভাঙা গল্প পড়েই হতাশের হদ্দ হই। 

বাংলা ভাষার গোয়েন্দা গল্পের লেখকরা ফর্মুলা পর্যন্ত গিয়ে থামলেও একটা কথা ছিল, তা তাঁরা থামেননি। আনাড়ি ডেবিউট্যান্ট নন, রীতিমত প্রতিষ্ঠিত লেখক, বিলিতি গল্প প্লটকে প্লট নামিয়ে দিয়েছেন। এবং নিজের গল্পের মুড়োপেটিল্যাজা কোত্থাও উৎস স্বীকার করেননি। কেন স্বীকার করেননি সেটা অ্যাকচুয়ালি কেন চুরি করেছেন তার থেকে আমার কাছে বেশি রহস্যজনক। 'অমুক গল্পের অনুপ্রেরণায়', 'তমুক গল্পের ছায়াবলম্বনে' লিখে দিলেই হত। গরিমা তো কমতই না, বরং বাড়ত। যতবার দেখি, ‘শুভ মহরৎ’-এর শুরুতে যেই না পর্দায় ফুটে ওঠে, "...সেই সব মিস মার্পলদের...' তাতে মনে প্রসন্ন ভাবই জাগে মনে, অজান্তেই একটা পক্ষপাত তৈরি হয়। 

কিকিরা তিন খণ্ড পড়ে মন ভালো হয়ে গেল এই দেখে বাংলা গোয়েন্দারা যে সব স্টক গোয়েন্দার ছাঁচে ঢেলে তৈরি হন, কিকিরা সেই ছাঁচের নন। অন্তত আমার পড়া কোনও দেশিবিলিতি গোয়েন্দার সঙ্গে আমি কিকিরার মিল খুঁজে পাইনি। 

কিকিরা সিরিজের প্রথম গল্প 'কাপালিকেরা এখনও আছে' শুরু হয় তারাপদকে দিয়ে। তারাপদ বেকার, বটুকবাবুর মেসে থাকে, টাকাপয়সার মারাত্মক টানাটানি। এমন সময় একটা চিঠি আসে যেখানে লেখা আছে তারাপদর একজন মিস্টিরিয়াস পিসে তাঁর বিপুল সম্পত্তি তারাপদকে দিয়ে যেতে চান। তারাপদ আর তারাপদর বেস্ট ফ্রেন্ড চন্দন ট্রেনে চেপে রওনা দেয়। আনরিজার্ভড বগি, মারাত্মক ভিড়। হাত পা যথাসম্ভব ছড়িয়ে না বসলে নিজের জায়গা বাঁচানো যায় না।

"এমন সময় এক অদ্ভুত ধরনের ভদ্রলোক এসে কামরায় উঠলেন। টিয়াপাখির মতন নাক, তোবড়ানো গাল, গর্তে বসা চোখ। চেহারাটি রোগাসোগা, গায়ে সেই আদ্যিকালের অলেস্টার, মাথায় কাশ্মীরি টুপি ডান হাতে একটা সুটকেস ঝুলছে, বাঁ হাতে খয়েরি বালাপোশ। ভদ্রলোক এতই রোগা যে গায়ে অলেস্টার চাপিয়েও তাঁকে মোটা দেখাচ্ছে না। গলায় মোটা মাফলার জড়ানো।" 

তারাপদ, তারাপদর জীবনের সমস্যা, তারাপদর বন্ধু আর ট্রেনের ভিড়ে এইভাবে কিকিরা প্রথম পাঠকের সামনে আসেন। নিতান্ত নিরীহ মুখে, 'একটু সাইড দেবেন দাদা'' ভঙ্গিতে। ক্রমে, অতি ধীরে তাঁর একটা ছবি ফুটে ওঠে। বছর পঞ্চাশ বয়স, শহরের সস্তা পাড়ায় ঘুপচি ফ্ল্যাটে সহায়ক বগলাকে নিয়ে বাস।

"মানুষটির সঙ্গে এই ঘরটির অদ্ভুত মিল। বিচিত্র ছাঁটের, আর বেয়াড়া রং-চং-অলা এক আলখাল্লা-পরা কিকিরাকে বাড়িতে যেমনটি দেখায় এই ঘরটিও সেইরকম অদ্ভুত দর্শন। এ-ঘরে কী নেই? কিকিরার সিংহাসন-মার্কা চেয়ার ছাড়াও যত্রতত্র বিচিত্র সব জিনিস ছড়ানো। পুরনো দেওয়ালঘড়ি, চিনে মাটির জার, বড়-বড় পুতুল, কালো ভুতুড়ে আলখাল্লা, চোঙাঅলা সেকেলে গ্রামোফোন, ম্যাজিকওয়ালার আই বল, ফিতে জড়ানো ধনুক, পাদরিসাহেবের টুপি, ম্যাজিক ছাতা আর তলোয়ার, পায়রা-ওড়ানো বাক্স, টিনের চোঙ - কোনটা নয়! তার সঙ্গে এক-দু'মাস অন্তর জমানো ম্যাজিক-মশাল, গাঁজার কলকে, বাহারি মোমদান - এ-সব তো জমেই যাচ্ছে দিনের পর দিন।"

“ব্যাকগ্রাউন্ড" দিয়ে কিকিরাকে মাপতে গেলে অসুবিধে হবে, কারণ সেটা নন-এক্সিস্টেন্ট। কিকিরার বাবা স্বাধীনতাসংগ্রামী ছিলেন নাকি আদর্শবাদী মাস্টারমশাই, মায়ের দিকে কেউ জমিদার ছিল কি না, এই সব কোনও তথ্য বিমল কর পাঠকের কাছে ফাঁস করেননি। বরং কিকিরা সারাজীবনে নিজ উদ্যোগে কী কী করেছেন সে জানতে চান, ইন্টারেস্টিং উত্তর পাবেন। ম্যাজিশিয়ান ছিলেন, হাতে চোট পেয়ে তাঁর পেশাদার ম্যাজিশিয়ান হওয়ার স্বপ্ন কেঁচে যায়। এখন কিকিরা ম্যাজিকের বই লিখবেন ভাবেন, ছোকরা ম্যাজিশিয়ানদের টিপস দেন, তাদের ম্যাজিকের যন্ত্রের নকশা করে দেন,সঙ্গে করে নিয়ে যান চেনা মিস্ত্রির দোকানে। রহস্য সমাধানে হাতযশের কথা জেনে চেনাপরিচিতরা কেউ কেউ কিকিরার দিকে দুয়েকটা রহস্য চালান করেন, তার সমাধান করেও হাতে কিছু আসে। 

কত আসবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কিকিরা হেসে বলেন, কে জানে কত দেবে, যা ইচ্ছে তাই দেবে। 

তা বলে কিকিরা একেবারে কাছাখোলাও নন। ব্যাংকে তাঁর সামান্য কিছু টাকা আছে, সেটা শেষ হয়ে গেলে যে পেটে টান পড়বে সেটা কিকিরা জানেন এবং জেনে তাঁর মন খারাপও হয়। 'তদন্ত করে মন না ভরলে টাকা দিয়ে কী হবে' এই ধরণের গ্র্যান্ড কথাবার্তা কিকিরা বলেন না, কারণ, এক, টাকার মর্ম তিনি জানেন, দুই, গ্র্যান্ড কথা বলার চরিত্রই নয় কিকিরার। পোশাকআশাক রংচঙে হলেও কিকিরা আদতে মারাত্মক মাটির মানুষ, জেরার সময় (যদি সেটাকে আদৌ জেরা বলা যায়) অভদ্রতা হবে ভয়ে অনেক জরুরি প্রশ্ন করার আগেও থমকান, অনেকসময় কারও সঙ্গে প্রথমবার কথা বলেই নিশ্চিত হয়ে যান, লোকটা ভালো, এ দুষ্কৃতী হতেই পারে না। 

কিকিরার এক্সট্রাকারিকুলার গুণ প্রচুর। রামপ্রসাদ থেকে নিধুবাবু গাইতে পারেন, মাথা থেকে বার করে নানারকম রান্না করেন। কিসমিসের পকৌড়া, মুলতানি আলুর দম। 

কিকিরা অন্যের ইংরিজি নিয়ে হাসেন না কারণ এক, উনি যে জগতে চলাফেরা করেন সেখানে কেউ ইংরিজি বলে না, দুই, কিকিরার নিজের ইংরিজিও তথৈবচ। তিনি চন্দনকে স্যান্ডেলউড বলে ডাকেন, নাক ডাকার ইংরিজি করেন নোজ কলিং, তাঁকে যে হ্যান্ড বার্নিং করে খেতে হয় সে নিয়ে আফসোস করেন। কিকিরার ইংরিজি নিয়ে তারাপদ চন্দন, কিকিরা নিজেও হাসেন। সে হাসিতে কোনও পক্ষের তাচ্ছিল্য বা কুণ্ঠা জড়িয়ে নেই। কিকিরা কুকুর ভয় পান, এবং চন্দন তারাপদ সেই নিয়ে হাসলে বলেন, গোয়েন্দারা সাহসী হয়, আমি ম্যাজিশিয়ান। 

গোয়েন্দাসুলভ ঘুঘুপনার ছিটেফোঁটা নেই কিকিরার। বিপন্ন লোকজনের প্রতি তাঁর মায়া প্রায় কর্তব্যবোধের পর্যায়ে। তারাপদকে ঘোর বিপদ থেকে বাঁচাতেই তিনি যেচে আলাপ করেন, তাছাড়াও পরের বিভিন্ন গল্পে ক্রমাগত কিকিরার এমন সব ক্লায়েন্ট আসতে থাকে, ঠিক ক্লায়েন্টও না, আসন্ন বা ঘটমান কোনও বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচানোর যাদের ক্ষমতা নেই। যারা ভীতু, অসহায়। কিকিরা তাদের সহায়।  

কিকিরার গল্পের রহস্যসমাধানে কিকিরাই প্রধান, তারাপদ আর চন্দন একেবারেই ফেউ, কিন্তু এই তিনজনের মধ্যে একটা নির্মল বন্ধুত্বের সম্পর্ক আছে। তারাপদ আর চন্দনের প্রতি কিকিরার আছে স্নেহ, আর কিকিরার প্রতি আছে ওই দুজনের শ্রদ্ধা এবং দায়িত্ববোধ। চন্দন ডাক্তার কিকিরার স্বাস্থ্যে অবহেলা নিয়ে সর্বদাই চিন্তিত। এমন যদি পরিস্থিতির উদয় হয় যে কিকিরাকে দিয়ে কেউ কাজ করিয়ে নিচ্ছে কিন্তু টাকা দিচ্ছে না, তাহলে দুই বন্ধুই বিচলিত হয়ে পড়ে এবং উক্ত পার্টিকে গিয়ে শাসিয়ে আসার প্ল্যান ভাঁজে। তিনজনের সম্পর্কের আরও একটা ভালো ব্যাপার হচ্ছে তারাপদ চন্দনের কিকিরার প্রতি মুগ্ধতার অনুপস্থিতি। এটা সম্ভবত থার্ড পার্সনে গল্প বলার সিদ্ধান্তের ফল। (বিমল কর মাঝে মাঝে হেড হপিং করেননি যে তা নয়, হঠাৎ হঠাৎ এক প্যারা কিকিরা কী ভাবছেন বা উল্টোদিকের লোকটার কেমন নার্ভাস লাগছে, লোকটার মাথার ভেতর থেকে তার পাঁচ লাইন বর্ণনা, কিন্তু সেগুলো ওই এক দু'প্যারাই। মোটের ওপর গল্পগুলো থার্ড পার্সনে লেখা।) যেহেতু তারাপদ বা চন্দন গল্প বলছে না তাই কিকিরা যে কত মহান, কত বুদ্ধিমান, কত জ্ঞানী - কোনও ভক্ত বা অনুরাগীর চোখ দিয়ে পাঠককে দেখতে হয়নি। যা দেখাতে হয়েছে সবই কিকিরার কাজ আর আচরণের মাধ্যমে দেখাতে হয়েছে। 

আমার মতে বাকি সব বাঙালি বিখ্যাত গোয়েন্দাদের সঙ্গে কিকিরার সর্বপ্রধান অমিল হচ্ছে তাঁর 'সার্কল'। কিকিরার চষা-বসা "পঞ্চাশ রকমের ব্যবসা”ওয়ালা লোকজনের সঙ্গে। কেউ দাঁতের মাজন বিক্রি করে, কেউ চুলের কলপ, কেউ খুচরো ম্যাজিশিয়ান, কারও ফলের দোকান। বারোয়ারি বাথরুমওয়ালা খুপরি ঘরের পাড়ায় তারা থাকে। কিকিরার চেনাপরিচিত বা ক্লায়েন্টকুলের মধ্যে দু'চার ঘর জমিদার যে খুঁজলে পাওয়া যাবে না তেমন নয়, কিন্তু তাদেরও ঝড়তিপড়তি দশা, খাটপালঙ্ক বেচে দিন গুজরান হয়। কিকিরা নিজে কলকাতাতে থাকেন কিন্তু সে কলকাতা ঐতিহ্যহীন, নন-ফোটোজেনিক, নস্ট্যালজিয়া-রহিত। ক্যাথলিক দক্ষিণী, অ্যাংলো, হাফ চাইনিজ, কবে কোথা থেকে কলকাতায় এসেছিল এখন পদবীতে শুধু অ-বাঙালিত্বের ছাপ লেগে আছে, সে সব মানুষেরা থাকে কলকাতার সে সব পাঁচমেশালি পাড়ায়। কিকিরা তাদের মাঝখানে থাকেন, তাদের সঙ্গে ওঠেনবসেন। 

*****

কিন্তু হায়, এই মহামিলনের মাঠে নারীর জায়গা হয়নি । তিন খণ্ডের আঠেরোটি গল্পে মহিলাদের পার্টিসিপেশন নিম্নরূপ।

কোনও এক চরিত্রের পূর্ণিমা নামে বোনের এক লাইন রূপের প্রশংসা।
মায়াদি নামের নার্সের ভাইকে বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য চন্দনের কাছে দু'লাইনের তদবির।
বছর পাঁচেকের বাচ্চা মেয়ে ফুটফুটি, যে গল্পে আসে এবং কিকিরার হাত থেকে চকোলেট নিয়ে দৌড়ে পালায়।
মুদিদোকানে ধারে জিনিস কিনতে এসে খেদানি খাওয়া গরিব বাচ্চা মেয়ে। 

ও হ্যাঁ, আরেকটা গল্পে রহস্য সমাধান করতে দীঘা বা কাছাকাছির সমুদ্রতটে যেতে হয়েছিল, বিচে ঘুরতে ঘুরতে কিকিরারা দেখেছিলেন উল্টোদিক থেকে "একটা ছেলে তার বউ আর মেয়েকে নিয়ে" হেঁটে হেঁটে আসছে।

ব্যস। নিজের হাতে তৈরি করা বর্ণময় বিচিত্র এই পৃথিবীতে আর কোনও মহিলার স্যাম্পল বিমল কর দেখে উঠতে পারেননি যিনি তাঁর গল্পের প্লট বা থিম বা আরও যা সব মেসেজটেসেজ, তাতে কণামাত্র অবদান রাখতে পারেন। 

'বাংলা গোয়েন্দাসাহিত্যে নারী' শীর্ষক সেমিনার হলে ফার্স্টসেকেন্ড বয়রা যে রেটে গোল খেতে শুরু করবেন, তাতে আন্ডারডগ কিকিরাকে এই নিয়ে বেগ দেওয়ার মানে হয় না। বরং "তখন ওই রকমই হত" বলে মুভ অন করে যাওয়াই ভালো।

*****

কিকিরার রহস্যসমাধান পদ্ধতিতে প্রত্যাশিতভাবেই ম্যাজিক রয়েছে। গোড়ার দিকের বেশ কিছু রহস্যের সমাধানে কিকিরার ম্যাজিশিয়ান হওয়ার অভিজ্ঞতা ক্রুশিয়াল হয়ে দাঁড়ায়। সবসময় রহস্য উন্মোচনের জন্যও নয়, অনেকসময় উল্টোদিকের লোকটাকে খানিকটা ব্যাকফুটে ফেলে দেওয়ার জন্য বা জাস্ট রসিকতা করার জন্যও কিকিরা ছোটখাট হাতসাফাই করেন। 

যা নেই তা হল ক্লু, রেড হেরিং, এইসব। কিকিরার মেথড নিয়ে আলোচনাও রয়েছে গল্পের ভেতর।

"জঙ্গুলে যুদ্ধ করার টেকনিক আলাদা।…চন্দন বলল, " ঝোপে লাঠি মারতে হয়।"
"মানে?"
"মানে ঝোপেঝাড়ে লাঠি মেরে যাও, যদি সাপের মাথায় লাগে। এই যেমন আপনি?"
"আমি? আমি কি বাপু ঝোপেঝাড়ে লাঠি মেরে যাচ্ছি?"
"যাচ্ছেন বইকি! আপনার রঘুপতি, ওই আগুনের খেলা, একটা লোক খুন হওয়া - এঁর কোনোটারই কোনো সুতো আপনি ধরতে পারছেন না - জানেনও না, বৃথাই ঝোপেঝাড়েলাঠি ঠুকে যাচ্ছেন?"
কিকিরা বললেন, "দেখো স্যান্ডেল উড, গল্পের গোয়েন্দারা বড় - বড় লাফ মারতে পারে, তাদের প্র্যাকটিস আছে! আমি গোয়েন্দা নই - ম্যাজিশিয়ান। আমি হাত সাফাই করি, ভেলকি দেখাই।"

রহস্য সমাধানের জন্য কিকিরার অস্ত্র একটাই, যে কোনও লোকের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা। কিকিরা যাকে পান তার সঙ্গেই আলাপ জমান, টুক করে ম্যাজিক দেখিয়ে মন জয় করেন। কিকিরার কথা বলার ভঙ্গি এতই অগোয়েন্দাসুলভ, নন-থ্রেটনিং, যে অনেক সময় দুষ্কৃতীরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই দোষ স্বীকার করে ফেলে। তাতে গোয়েন্দাগল্পের অন্যতম যে আরাম, নিজে মাথা খাটিয়ে ধাঁধা সমাধান করার (বা আমার মতো অলস পাঠকের ক্ষেত্রে নিজের মাথা অফ করে অন্য কাউকে ধাঁধা সমাধান করতে দেখার), সেটা পাওয়া যায় না। তাছাড়া কিকিরার গল্পে রোমহর্ষণের ভাগটাও একটু কমের দিকে। মারামারিকাটাকাটি এড়ানোর চেষ্টা করেছেন বলেই হয়তো গল্পে খুব বেশি দুষ্টু লোক দেখাতে পারেননি বিমল কর। বড়জোর সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ। বংশের একজন হারিয়ে গিয়েছিল বা মরে গিয়েছিল বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, সে ফিরে এসে সম্পত্তির জন্য ঝামেলা পাকাচ্ছে। লোকাল গুণ্ডা শাসাচ্ছে ইত্যাদি।

যথেষ্ট রোমহর্ষক নয় এমন রহস্য নিয়েও অনেক দূর যাওয়া যায় না তেমন নয়, কিন্তু যাওয়ার পথে আরও একটি কাঁটা ফুটিয়ে রেখেছেন বিমল কর। এমন এলানোছড়ানো গল্প বলা, চট করে মনে করতে পারছি না শেষ কবে পড়েছি। যে তথ্যগুলো পাঠকের জানা জরুরি সেগুলো দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে তথ্যগুলো পাঠকের কোনও কাজে লাগবে না, বা না বলে দিলেও সবাই বুঝে নিতে পারবে সেগুলোও যত্ন করে, ধরে ধরে লিখে গেছেন। 

যেমন, 
দুই বন্ধু ছাতা নিয়ে বেরিয়েছে, তাই তৃতীয় জন ছাতা নিয়ে বেরোয়নি। 
তারাপদ আর চন্দন টর্চ নিয়ে বেরিয়েছে তাই কিকিরা আর টর্চ নেননি।
বগলা চন্দন আর তারাপদকে সিঙাড়া পরিবেশন করল। কিকিরাকেও বাদ দিল না। 

(তিনটে উদাহরণই সত্যি সত্যি বইতে আছে, আমি বানাচ্ছি না।)

কিকিরার গল্পকে আর যে ডুবিয়েছে সে হল ডায়লগ। বিমল কর খুবই রিয়েলিস্টিক ডায়লগ লিখতেন। তিনি নিজে সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন বলেই আমার বিশ্বাস, না হলে কেউ অত সংলাপ লেখে না। আড্ডা আমি আপনি সবাই মেরেছি, কাজেই রিয়েলিস্টিক আড্ডা কেমন হয় সেটা ব্যাখ্যা করে বলার দরকার নেই। কিকিরা তারাপদ এবং চন্দন ক্রমাগত আড্ডা মারে, ঠাট্টা ইয়ার্কি স্মৃতি রোমন্থন, কবে কোন চেনা লোক কী মজার কথা বলেছিল সেই সব ঠাসাঠাসি আড্ডা। অত হাসিঠাট্টা এবং রিয়েলিস্টিক কথোপকথনের মধ্যে ক্লু ইত্যাদি সূক্ষ্ম ব্যাপার তো ভুলেই যান, গল্পের মূল সুতোর খোঁজ রাখাও শক্ত হয়ে পড়ে। 

এই অন্তহীন কথোপকথন পড়তে পড়তে আপনার কী হয় আমি জানি না, আমার চোখ পিছলে যায়। সড়াৎ করে যেখানে গিয়ে থামে সেখানে হঠাৎ একটা নাম। মোহিত। সেরেছে, মোহিত আবার কে? মূল চরিত্র কারও নাম মোহিত বলে তো মনে পড়ছে না। ছাপা বইয়ে কন্ট্রোল এফ কবে যে আবিষ্কার হবে। তখন আবার পাতা উলটে পাঁচপাতা পেছনে, এই তো মোহিত। কিকিরাকে যিনি রহস্য সমাধানের বরাত দিয়েছিলেন তাঁর ভায়রাভাই। মোহিত ডাক্তার। অমুক হাসপাতালে প্র্যাকটিস করে।

আচ্ছা। গল্পে মোহিতের অবদান? 

কিছুই না। কথাপ্রসঙ্গে বলা। লোকে যেমন বলে। 

আমাদের অফিসে অনেকসময় সেমিনারের অডিওভিডিও রেকর্ডিং করে শান্তি হয় না, পাছে দামি বিশেষজ্ঞের দামি কথা একটাও হারিয়ে যায়, গোটা ব্যাপারটার ট্রানস্ক্রিপশন করা হয়। অক্ষর বাই অক্ষর রিপ্রোডাকশন। 'আম’, ‘উম’, ‘ইয়ে’, ‘মানে’, ‘অর্থাৎ কি না’, ‘বোঝাই যাচ্ছে’ কিচ্ছু বাদ না দিয়ে।

কিকিরার গল্প পড়তে গিয়ে সময় সময় আমার ট্রান্সক্রিপশন পড়ার ফিলিং হচ্ছিল। ওই অন্তহীন কথোপকথনের মধ্যে থেকে কাজের কথা ছেঁকে তুলে আনতে গেলে গোয়েন্দা লাগাতে হবে এবং সেটা কিকিরার মতো ঝোপঝাড়ে লাঠি মারা গোয়েন্দা হলে চলবে না। ফরমুলেইক, মেথডিক্যাল গোয়েন্দা চাই। 

*****

বিমল কর লিখে গেছেন, কিকিরাসারকে যাদের ভালো লাগে গল্পগুলো তাদের ভালো লাগলেই তিনি খুশি হবেন। আমার কিকিরাসারকে ভালো লেগেছে। তালেগোলে গোয়েন্দাগিরিতে নেমে পড়া বর্ণময় বোহেমিয়ান, একই সঙ্গে শান্ত, অনুচ্চকিত, সহজ কিকিরাসারকে আমার মন থেকে ভালো লেগেছে। বাংলা গোয়েন্দাসাহিত্যের তারকাখচিত বাজারে অরিজিন্যালিটি দিয়ে কিকিরা নিজের জায়গা করে নিয়েছেন, সে জায়গা থাকবেও অনেকদিন। অন্তত থাকুক আমার তাই প্রার্থনা। 


July 06, 2018

বুড়ো হওয়ার সহজ টোটকা



Make your interests gradually wider and more impersonal, until bit by bit the walls of the ego recede, and your life becomes increasingly merged in the universal life. An individual human existence should be like a river — small at first, narrowly contained within its banks, and rushing passionately past rocks and over waterfalls. Gradually the river grows wider, the banks recede, the waters flow more quietly, and in the end, without any visible break, they become merged in the sea, and painlessly lose their individual being.
                                                                                                  
                                                                                                     ---Bertrand Russell


কৃতজ্ঞতা স্বীকার



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.