December 31, 2017

ছবিতে ২০১৭



জানুয়ারি

বছরের এর থেকে ভালো শুরু আর হতেই পারত না। গোয়ার সেই দুপুরের আরামটা এখনও মনে করতে পারি। এই গোয়াতেই হানি লেমন জিঞ্জার ‘টি’-এর মাহাত্ম্য প্রথম অনুধাবন করি। এখন এই পোস্ট লেখার সময়েও এক গ্লাস লেমন জিঞ্জার ‘টি’ পাশে রাখা রয়েছে। 


ফেব্রুয়ারি

খিড়কি গাঁওয়ের রুস্তম’স ক্যাফে অ্যান্ড বেকারি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ওই দোকানটার শান্তি, জাফরি দিয়ে এসে পড়া রোদ আর পোহা, মনে আছে এখনও।



মার্চ 


এপ্রিল মাসে প্রায় কিছুই ঘটেনি। 

মে

ল্যান্ডোর। , ,


জুন




জুলাই

ম্যাগপাই মার্ডারস। আমার এবছরের পড়া সেরা বই।

আগস্ট


সেপ্টেম্বর



অক্টোবর আবার অকিঞ্চিৎকর।





ডিসেম্বর

একটা জিনিস শেখালো। আমার স্মরণযোগ্য অতীতে অবান্তরের কোনও পোস্টে এত ভিউজ হয়নি যা ডিসেম্বরের এই পোস্টে হয়েছে। এ মাসের বই, অনুবাদ গল্প তো ছেড়েই দিলাম, নস্ট্যালজিয়ার পোস্টেও না। দৃশ্যমানতা বাড়াতে গেলে লোককে মত প্রকাশের সুযোগ করে দিতে হয়। বিশেষ করে বিপক্ষ মত প্রকাশের। শেখা হল, কাজে লাগাতে পারব কি না সেটা সময় বলবে।

*****

অবান্তরের সব পাঠককে আমার তরফ থেকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালাম। আপনাদের দু'হাজার আঠেরো ভালো কাটুক। 



December 26, 2017

একটি ভালো সিনেমা




কোনও সিনেমার প্রথম দৃশ্যে যদি তাঁতের শাড়ি, সুতির পাঞ্জাবী, মার্বেলের মেঝে আর সে মেঝের ওপর বাবু হয়ে বসা গান গাওয়া বালক থাকে, তাও আবার যে সে গান না, একেবারে ‘সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা’, তাহলে আপনার কী মনে হয় আমি জানি না, আমার আর কোনও সন্দেহই থাকে না সিনেমাটা ভালো।  

আর এই ভালো সিনেমাটাই কি না রিলিজ করার সাত মাস পরেও আমার না-দেখা পড়ে ছিল। আরও কত মাস পড়ে থাকত কে জানে যদি না অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে (ব্যোমকেশের ভূমিকায়) দেখার জন্য ফোনে হইচই অ্যাপ ডাউনলোড  করতাম। সে অ্যাপের কল্যাণে অনির্বাণ ভট্টাচার্য ছাড়াও আরও অনেককিছু দেখা হল। 'বৌদি ডিটেকটিভ’ মার্কা হইচই অরিজিন্যাল ওয়েবসিরিজ দেখা হল, পুরোনো সিনেমার মধ্যে সাড়ে চুয়াত্তর, চিড়িয়াখানা, নতুনের মধ্যে খোঁজ, ক্ষত, খাদ ইত্যাদিও বাদ গেল না।

কিন্তু বছরের শেষে হইচই অ্যাপের কাছে যে কারণে সবথেকে বেশি কৃতজ্ঞ বোধ করছি তা এই ভালো সিনেমাটার জন্য। যার ভালো তার সবই ভালো, এমনকি নামটাও। আমার ফেভারিট তরকারি আর এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র বাচ্চা ছেলেটির নাম একই, পোস্ত। (বাই দ্য ওয়ে, বিপাশা বসুর কুকুরের নামও পোস্ত, জানতেন?) আজকাল পশ্চিমবঙ্গে বাংলা বাচ্চাদের অ্যাংলো ডাকনাম রাখার চল হয়েছে, আমার রিষড়ার এঁদো পাড়া অ্যানি, সানি-তে ছেয়ে গেছে, কিন্তু এ বাচ্চার অভিভাবকরা সে রাস্তায় হাঁটেননি, বাঙালিয়ানার হদ্দমুদ্দ করে নাম রেখেছেন পোস্ত। (আমার মন বলছে, পোস্তর বোন থাকলে তার নাম রাখা হত প্রজাপতি বিস্কুট।) পোস্ত শান্তিনিকেতনে থাকে আর কাচা পাজামাপাঞ্জাবী পরে গুরুদেবের গান গায়। পোস্তর বাড়িতে থাকেন তাঁর ঠাকুরদাঠাকুমা আর বঙ্গজীবনের অঙ্গ নিবেদিতপ্রাণ ঝি, যিনি পোস্তর সব অসভ্যতা সয়ে হাসিহাসি মুখে পোস্তর পেছনপেছন সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়ান। ঠাকুমা পোস্তর টিফিন গুছোন, পড়াশোনা দেখেন, ঠাকুরদা পোস্তকে স্কুলে দিয়ে আসেন নিয়ে আসেন আর গুরুদেবের গান শেখান। আরও কিছু ছেলেমেয়ে ঠাকুরদার কাছে গান শেখে এবং ঠাকুরদাকে ‘গুরুজী’ বলে ডাকে। দেখাদেখি পুঁচকে পোস্তও ঠাকুরদাকে ‘গুরুজী’ বলে ডাকতে শিখেছে। এটাকে জাস্ট কিউট ডাকাডাকি বলে উড়িয়ে দিলে ভুল করবনে, পোস্তর ঠাকুরদা আক্ষরিক অর্থেই পোস্তর গুরু। জীবনের যা কিছু সত্য, সুন্দর এবং শিব, সেই শিক্ষা তিনিই পোস্তকে শেখান এবং শেখাবেন। এবং তাঁর এই শিক্ষাদানের প্ল্যানে কেউ বাগড়া দিতে এলে তাঁদের তিনি ছাড়বেন না।

এমন ভালো প্ল্যানে কে-ই বা বাগড়া দিতে আসবে? প্রশ্ন করবেন দর্শক। আর জানতে পারবেন, পোস্তর এই আগাপাশতলা রাবীন্দ্রিক যাপনে একটা, থুড়ি, দুটো কাঁটা আছে। পোস্তর বাবা এবং মা। দুজনে কলকাতায় থেকে চাকরি করেন। থুড়ি, পোস্তর বাবা চাকরি করতেন, আদর্শে না পোষানোয় চাকরির মুখে লাথি মেরে আপাতত বেকার। এরকম নাকি উনি প্রায়ই করে থাকেন। গুরুজীর ছেলের কাছ থেকে আর কীই বা আশা করা যায়? পোস্তর মা চাকরি করেন। মারাত্মক লম্বা অফিস আওয়ারস, সারাদিনের শেষে বাড়ি ফিরে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া তো দূর অস্ত, শোনার পর্যন্ত সময় থাকে না। তাছাড়া চাকরিটাও খুব একটা ভদ্রমহিলাসুলভ নয়। লোকজনকে ফোন করে করে লোন-শোধের আলটিমেটাম দিতে হয়। এঁদের কলকাতা শহরে সাজানোগোছানো খেলানো বাড়ি/ফ্ল্যাট, উইকএন্ডে শান্তিনিকেতনে পোস্তকে দেখতে যান আর বাবামায়ের কাছে ‘পোস্তকে আমাদের কলকাতায় নিয়ে যেতে দিন,’ বলে পায়ে ধরাধরি করেন।

‘বাচ্চাটা ঠাকুমাদাদুর খপ্পরে পড়ল কী করে?’

ভালো সিনেমা পজ করতে হল। 

‘মানে?’

‘বলছি, বাচ্চাটা ঠাকুমাদাদুর খপ্পরে পড়ল কী করে?’ 

অর্চিষ্মানের প্রশ্নে আমি খানিকক্ষণ হাঁ করে রইলাম, তারপর অপরিশীলিত ভাষা প্রয়োগের জন্য মৃদু তিরস্কার করলাম। কিন্তু সত্যি বলতে প্রশ্নটা আমার মনেও এসেছিল। বিশেষ করে মিমি ‘আমার পোস্তর সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করে, মা’ করে যে রেটে কান্নাকাটি করছিলেন তাতে মনে না এলেই অদ্ভুত। 

সিনেমা এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে ক্রমে রহস্য ফাঁস হল।

প্রথমত, পোস্তর বাবামা, যিশুমিমি দুজনেই চাকরি করেন (সরি, করতেন। এখন মোটে একজন করেন।) দ্বিতীয়ত,  সে সময় যিশুমিমির রোজগার এখনকার থেকে কম ছিল। আর তিন নম্বরে কিস্তিমাত, পোস্ত হওয়ার সময় যিশুমিমির ফ্ল্যাট ছিল মোটে এক কামরার। 

‘তুমি দাবি কর যে কলকাতা শহরে এককামরার ফ্ল্যাটে একটা বাচ্চা বড় হবে? কোপাইয়ের ধারে বিঘে বিঘে খাঁ খাঁ লালমাটির মাঠ পড়ে থাকতে?’ আমি অর্চিষ্মানকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলাম।

অর্চিষ্মান, প্রত্যাশামতোই, বাক্যহারা।

একমাত্র মিমি দেখলাম গুরুজীর যুক্তির উত্তরে কিছু কুযুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করলেন। বললেন, ‘দাদুদিদার লাক্সারি তো সবার থাকে না, তা বলে সে সব বাচ্চা কি মানুষ হয় না? তাছাড়া আমি তো মা, আমার ছেলে কোথায় থাকবে সে বিষয়ে আমার কি কিছু বলার থাকতে পারে না? ’ হ্যানাত্যানা। বলা বাহুল্য গুরুজী কিংবা পরিচালকদ্বয়, কেউই মিমির প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। 

এই দার্ঢ্যের পরিচয় দেওয়া ছাড়াও সিনেমার পরিচালকদের আরও একটা ব্যাপারে সাধুবাদ জানাতেই হয়, একটা অসম্ভব শক্ত কাজ তাঁর করতে পেরেছেন, কোনও চরিত্রকেই একমাত্রিক করে ফেলেননি। কেউই পুরোটা খারাপ নয়, যেমন মিমি। রবীন্দ্রসংগীতের ধার ধারেন না, ছেলেকে পিৎজা কিনে দেন, ফোন করে লোন আদায়ের মতো পুরুষালি চাকরি করেন, আবার এই মিমিই বাচ্চা মেয়ের মাথায় নরম হাত চালিয়ে চুল এলোমেলো করে দেন। গুরুজী যে গুরুজী যিনি সাধারণ কথোপকথনের মধ্যে যখনতখন রবিঠাকুরের পদ্য মুখস্থ বলে উঠতে পারেন তিনিও নিষ্কলঙ্ক নন, তাঁরও ব্যাকস্টোরিতে সন্তানপালনসংক্রান্ত নানারকম গোলযোগ দেখানো হয়েছে।

একমাত্র একটি চরিত্রের ক্ষেত্রে তাঁরা হার মেনেছেন। তাঁর অনেক গুণ। তিনি আদর্শের জন্য চাকরি ছাড়েন, ধপধপে সাদা পাজামাপাঞ্জাবী পরে ছেলেকে সাইকেলে চড়িয়ে চাঁদনিরাতে বনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে গান গান। ছেলেকে মারতে গিয়েও মুঠো করে হাত নামিয়ে নেন, কেঁদে মেঝেতে লুটিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করেন। কিন্তু এত গুণ সব বিফলে যায়। পরিচালকদের শত চেষ্টাতেও যে সত্যিটা কোনওভাবেই ঢাকাঢুকি দিয়ে ওঠা যায় না, সেটা হচ্ছে…

পোস্তর বাবা মদ খান। 

*****

মা চাকরি করে। বাবা মদ খায়। এবং তার পরেও ছেলেকে নিজেদের কাছে রেখে মানুষ করার আস্পর্ধা দেখায়। 

গুরুজীর কাছে আর কীই বা রাস্তা খোলা ছিল, নাতির কাস্টডির জন্য ছেলের বিরুদ্ধে মামলা ঠোকা ছাড়া?

এর মধ্যে যিশুর কেরিয়ারের বদলে কেরিয়ারসংক্রান্ত সাবপ্লট খানিকটা এগিয়েছে। শান্তিনিকেতনে এসে যিশু এক পুরোনো চেনার সঙ্গে বন্ধুত্ব ঝালিয়েছেন, সে বন্ধুর নামটাম সিনেমায় বলা হয়েছিল কি না ভুলে গেছি, কিন্তু মদ খায় সেটা দেখানো হয়েছিল শিওর। বন্ধু যিশুকে একটা চূড়ান্ত লোভনীয় প্রস্তাব দেন। তিনি লন্ডনে গিয়ে রেস্টোর‍্যান্ট খোলার প্ল্যান করছেন, যিশুকে তিনি সে রেস্টোর‍্যান্টে চাকরি দিতে চান। 

যিশু রেস্টোর‍্যান্ট-ব্যবসার র জানেন কি না জানি না, (ধরে নেওয়া যায় জানেন না, জানা থাকলে পরিচালকেরা দর্শকদের জানাতেন নিশ্চয়) যিশুর বন্ধু জানেন কি না আমার মনে পড়ছে না। ইন ফ্যাক্ট, যিশুর বন্ধু মদ খান এ ছাড়া আর কোনও তথ্য সিনেমায় দেওয়া হয়েছিল কি না সেটাই আমার মনে পড়ছে না।

বলা বাহুল্য, যিশু লাফিয়ে পড়েন। যেন এর থেকে নিশ্ছিদ্র লাইফপ্ল্যান জগতে আর কেউ কোনওদিন কাউকে অফার করেনি। স্থির করেন মিমি এবং পোস্তকে নিয়ে লন্ডনে গিয়ে সেটল করবেন। 

মিমি যিশুর থেকেও সরেস, লন্ডনে যাওয়ার আনন্দে তিনি নিজের চাকরিটি ছেড়ে বসে থাকেন এবং শ্বশুরশাশুড়িকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করেন এই বলে যে, ‘আমি আপনাদের ছেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য চাকরি পর্যন্ত ছেড়ে দিতে পারলাম আর আপনারা নাতিকে ছাড়তে পারছেন না?’

আমার নাতি থাকলে আমিও এদের হাতে তাকে ছাড়তাম না, স্বীকার করছি। 

তবে আদালতে এই চাকরিবাকরির গোলমালটা নিয়ে কোনও কথাই ওঠে না। ওখানে যিশুমিমিকে কাৎ করতে মায়ের চাকরি আর বাবার মদই যথেষ্ট। 

আরও একটা জিনিস, বা একজন বলা উচিত, যিশুমিমিকে একা হাতে হারানোর পক্ষে যথেষ্ট ছিলেন, তিনি হচ্ছেন বিবাদীপক্ষের উকিল, সোহিনী সেনগুপ্ত।

আমি একশো দশ শতাংশ নিশ্চিত গুরুজী সোহিনীকে পয়সা খাইয়েছিলেন। না হলে নিজের গোলে ওই রেটে কেউ গোল দেয় না। পোস্তকে বাড়ি, পোস্তর বাবামাকে বাড়িওয়ালা এবং ঠাকুমাদাদুকে কেয়ারটেকার এই রকম মারাত্মক মেটাফরসহযোগে সোহিনী তাঁর সওয়াল শুরু করেন। বলেন, 'বাড়ি ঝেড়েমুছে, যত্ন করে রাখা যাদের কাজ, তারা বাড়িকে নিজেদের বলে ক্লেম করার সাহস করে কী করে?'  

আমি চমৎকৃত যে জাজ তক্ষুনি কেয়ারটেকারের নামে গোটা বাড়ি লিখে দেননি। 

যাই হোক, মামলা চলতে থাকে।  বাবাছেলের টানাপোড়েন, গুরুজী আর গুরুজীর বউয়ের টানাপোড়েন, গুরুজীর আড্ডার বুড়োদের টানাপোড়েন, যিশুমিমির টানাপোড়েন, পোস্ত আর কাজের মাসির আক্ষরিক টানাপোড়েন।

তারপর গোলেমালে পোস্তর বাবামা পোস্তকে সঙ্গে নিয়ে লন্ডন রওনা দেন। সব ভালো সিনেমার মতোই ক্লাইম্যাক্স ঘটে এয়ারপোর্টে। পোস্তর বাবামা পোস্তকে চুপ করে দাঁড়াতে বলে কী একটা কাজ করছেন, ফিরে দেখেন ছেলে হাওয়া। 

এখানে পরিচালকরা একটু কাঁচা কাজ করে ফেলেছেন বলে আমার বিশ্বাস। শিষ্যকে এত ভালোভালো জিনিস শিখিয়ে এদিকে বাবামা একজায়গায় দু’মিনিট চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে বললে যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সেটা গুরুজী শিখিয়ে উঠতে পারেননি, এটা ফাঁস করে দেওয়াটা ঠিক হয়নি।

অবশ্য মদ খাওয়া বাবা আর চাকরি করা মায়ের কথা না শোনাই ভালো। গুরুজী ঠিকই করেছেন। গুরুজী ভুল করতেই পারেন না।

তারপর মধুরেণ সমাপয়েৎ। ল্যাজ গুটিয়ে বাবামা পোস্তকে ঠাকুমাদাদূর কাছে ফেরৎ দিয়ে যান। পেটের ভেতর থেকে ভসভসিয়ে ওঠা অট্টহাস্য চেপে গুরুজী কথা দেন যে পোস্তকে সময় হলে নিজের হাতে তিনি বাবামায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসবেন। 

*****

সিনেমাটা দেখে আমি মুগ্ধ। অর্চিষ্মান মুগ্ধ। আপনারাও যাঁরা দেখেছেন মুগ্ধ হয়েছেন নিশ্চয়? যাঁরা দেখেননি তাঁরাও এই মচৎকার ভালো সিনেমাটা দেখুন আর গলা ফাটিয়ে জানতে চান, কে বলে টালিগঞ্জে সুস্থ রুচির সিনেমা বানানো হয় না?



December 24, 2017

কয়েকটা লিংক





আন্তর্জাতিক চা দিবসে বৈজয়ন্তী এই লিংকটা পাঠিয়েছিলেন। 

All writers belong to the class of non-orators,
                                                                         —Thomas Mann

ওপরের উক্তিটি যে রচনাটা থেকে নেওয়া সেটা খুব বেশি লোকের কাজে লাগবে বলে মনে হয় না, তবু রইল। অকাজের জিনিস জানতে বাধা নেই। 


আগাথা ক্রিস্টির অনুরাগীদের ডেইজি আর্মস্ট্রং নামটা চেনা লাগতে পারে। এই ডেইজি আর্মস্ট্রং-এর কিডন্যাপিং-এর ঘটনাটা নাকি আগাথা ক্রিস্টি একটি সত্যি অপহরণের ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লিখেছিলেন। 


যদি ইচ্ছে হয় নতুন বছরে এর মধ্যে কিছু কিছু পদক্ষেপ নিয়ে দেখতে পারেন।

প্লিজ, অ্যাভিড হওয়ার দরকার নেই, বইপত্রের সঙ্গে সামান্য পরিচয় আর চোখকান খোলা থাকলে এই কুইজে সবাই একশোয় একশো পাবে। 


December 23, 2017

রেজাল্ট ও রেজলিউশন





মা ফোন ছেড়ে দেওয়ার পর সেই প্রশ্নটা মনে পড়ল যেটা কাল থেকে করব করব করে করা হচ্ছে না। আবার ফোন করলাম, পরিশীলিত বাংলায় এক ভদ্রমহিলা জানালেন, মায়ের ফোন নেটওয়ার্কের বাইরে। ভাবলাম বাড়ির ফোনে ফোন করি, কিন্তু আমার প্রশ্নটা সকাল ছ’টার সময় ঝ্যাং ঝ্যাং করে সারা বাড়ি কাঁপিয়ে ল্যান্ডলাইন বাজানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল। আবার মোবাইলে ফোন করাই সাব্যস্ত করলাম। তবে এবার নম্বর ম্যানুয়ালি টাইপ করে।

কয়েকটা নম্বর আমি মাঝে মাঝেই ম্যানুয়ালি টাইপ করে ফোন করি, নম্বরগুলো মুখস্থ আছে কি না দেখে রাখার জন্য। মায়ের নম্বর, বাবার নম্বর, অর্চিষ্মানের নম্বর, রিষড়ার ল্যান্ডলাইন ইত্যাদি। এ ছাড়াও পাড়ার কিছু লোকের (বুচিদিদিদের) ল্যান্ডলাইন নম্বর আপসেই মনে থেকে গেছে, আর ছোটমামারও। তবে সেগুলো বিনা প্র্যাকটিসেই। 

যাই হোক, আমার মুখস্থবিদ্যার কথা থাক, যা বলছিলাম তাতে ফেরৎ আসি। টাইপ করার পরিশ্রম বৃথা গেল না, ইট’স রিংগিং। কিন্তু বাজছে তো বাজছেই। একমিনিটের মধ্যে ফোন থেকে কতদূরে যেতে পারেন মা? এই সব ভাবছি আর ভাবছি এই ঘটনাটাকে, মাকে ফোনে চাওয়ামাত্র না পাওয়াটাকে, সক্কালসক্কাল কতদূর মেজাজ খারাপ করার পারমিশন দেওয়া যেতে পারে, এমন সময় মা ফোন তুলে বললেন, ‘হ্যাঁ রে মা?’

আর আমিও মাকে প্রশ্নটা করে ফেললাম। 

‘সামনের বছর তোমার রেজলিউশন কী গো মা?’

চায়ের বাসনের ঠুং ঠাং ছাপিয়ে মা হা হা করে হাসলেন। বললেন, পঁয়ষট্টি পার করে তাঁর অবশেষে বুদ্ধি খুলেছে, তিনি এ বছর কোনও রেজলিউশন না নেওয়ার রেজলিউশন নিয়েছেন। বললেন, ‘পুরোনো ডায়রিগুলো খুললে যা হাসি পায় সোনা।’ প্রতি বছর কম কথা বলার রেজলিউশনগুলো নাকি মাকে ডায়রির পাতা থেকে মুখ ভেঙাতে থাকে।

আমি অবশ্য মনে মনে মায়ের এই রেজলিউশন না ফলাতে খুশিই হয়েছি। মা কম কথা বললে আমার সঙ্গে মায়ের কথাতেও কোপ পড়ত আর তাহলে আমার মোটেই ভালো লাগত না। কিন্তু সেটা মুখে বললাম না। মুখে বললাম, ‘ওহ, তাহলে রেজলিউশন নিচ্ছ না এবার?’

‘নাহ।’

আমি মাকে আইডিয়া দিতে পারতাম। কালকেই গোটা তিনেক ভিডিও দেখলাম আর গোটা পাঁচেক ব্লগপোষ্ট পড়লাম, 'ফিফটি রেজলিউশন আইডিয়াস ফর দ্য বেস্ট ইয়ার অফ ইয়োর লাইফ’ গোত্রের, মানছি সেগুলোর অধিকাংশই বোকা বোকা এবং আমার মায়ের পক্ষে প্রযোজ্য নয়, যেমন বাংজি জাম্পিং, রক ক্লাইম্বিং, পারসুইং হ্যাপিনেস হ্যানাত্যানা, কিন্তু আমার মায়ের নেওয়ার মতো রেজলিউশনেরও অভাব নেই। দু’হাজার আঠেরোয় ওজন বাড়াব, বেশি ঘুমোব, অকারণ চিন্তা (বিশেষ করে সোনাসংক্রান্ত) করব না। কিন্তু আমি দিলাম না। রেজলিউশন নেওয়া আমার মতে খাওয়াদাওয়া বইপড়ার সিদ্ধান্তের মতোই, চূড়ান্ত ব্যক্তিগত। জোরাজুরির কোনও ব্যাপারই নেই।

উল্টে আরেকটা সংশয় মনে জাগল। আমারও কি মায়ের পথ অনুসরণ করা উচিত? আমার ডায়রির পাতা থেকেও কি রোজ ব্যায়াম করার, রোজ গান প্র্যাকটিস করার রেজলিউশনগুলো দাঁত বার করে হাসছে না? 

তাছাড়া ভেবে দেখলে মায়ের মতো হতে ওঠাই আমার শেষমেশের রেজলিউশন, কিংবা ভবিতব্য। কাজেই মায়ের যেটা বুঝতে পঁয়ষট্টি লাগল সেটা আমার সাঁইত্রিশেই বুঝে ফেলার মধ্যে একটা চরম ঔদ্ধত্য এবং ওস্তাদি রয়েছে। 

অতএব আমি দু’হাজার আঠেরোতেও রেজলিউশন নেওয়ার সিদ্ধান্ত বজায় রাখলাম। 

সে সব রেজলিউশনে যাওয়ার আগে আগের বছরের রেজলিউশনগুলোর হাল একবার দেখা দরকার।

দু’হাজার সতেরোতে ‘রেগুলারিটি’কে থিম করব ঠিক করেছিলাম। সে থিম জীবনের কোনও কোনও ক্ষেত্রে কাজ দিয়েছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেয়নি। গান এবং শরীরচর্চার ক্ষেত্রে দেয়নি, পড়া এবং লেখার ক্ষেত্রে দিয়েছে। দু’হাজার সতেরোয় আমি লিখেছি বেশি, পড়েছিও বেশি। তাতে আনন্দের কিছু নেই, কারণ কাজ বেশি করা আর এফেক্টিভলি করার মধ্যে তফাৎ আছে। এ বিষয়ে নিচে বিশদে বলছি।

দু’হাজার সতেরোর আমার প্রথম রেজলিউশন ছিল সাহসী হওয়ার। খুবই ধোঁয়াধোঁয়া রেজলিউশন। নম্বর দেওয়া শক্ত। গত বছর আমাকে কোনও হানাবাড়িতে রাত কাটাতে হয়নি, কাজেই সাহসের প্রমাণ দেওয়ার সুযোগও হয়নি। তবে প্রায় হানাবাড়ির মতো ভয়ের খপ্পরে পড়েছিলাম বছরের শেষের দিকে, তখন সাহসের দরকার পড়েছিল। 

গানকে জীবনে ফেরৎ আনব ভেবেছিলাম, গান আরও দূরে চলে গেছে।

রুটি করা শিখব বলেছিলাম। সারাবছর আধখানা রুটিও করিনি।

কিন্তু সব ভালো যার শেষ ভালো। আমার দু’হাজার সতেরোর শেষতম রেজলিউশন ছিল চপস্টিকে স্বচ্ছন্দ হওয়া। বন্ধুগণ, আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে এই রেজলিউশনটা আমি শুধু রাখিইনি, আমি এখন যাকে বলে চপস্টিক-চ্যাম্পিয়ন। চপস্টিক দিয়ে খাওয়ায় আমি এখন এমন দক্ষতা অর্জন করেছি যে প্রতিবার চাউমিন (হাক্কা) খেয়ে থালা মাথার ওপর তুলে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে অর্চিষ্মানকে প্রমাণ দিতে পারি যে যে অতি ক্ষুদ্রতম চাউমিনের টুকরো এবং গাজরের কুচিও থালায় পড়ে নেই। 

বই পড়া নিয়ে দু’হাজার সতেরোর রেজলিউশন ছিল এই রকমঃ 

গুনতিঃ এ বছর ক'টা বই পড়ব খুলে বলিনি। বলেছিলাম রেজলিউশন রাখতে পারলেও বলব, না পারলেও বলব। দু’হাজার ষোলোর পঞ্চাশটা বই পড়ার চ্যালেঞ্জ জিতে আমার সাহস বেড়ে গিয়েছিল, দু’হাজার সতেরোতে আমি পঁচাত্তরটা বই পড়ার রেজলিউশন নিয়েছিলাম। যা আমি রাখতে পারিনি। আপাতত আমার বইয়ের গুনতি সাতান্ন। আরও তিনটে বই পড়া বাকি আছে, যার মধ্যে দুটো শেষ হবেই। অর্থাৎ ৫৯-৬০টা বই পড়েছি আমি দুহাজার সতেরো সালে। 

আরেকটা কথা মাথায় রাখতে হবে, এ বছর আমি বেশ কয়েকটি বই রি-রিড করেছি (ফেলুদা সমগ্র, কিরীটী সমগ্র, ফাদার ব্রাউন সমগ্র।) সেগুলো গুনতিতে ধরা হয়নি। তাছাড়াও আরও কিছু বই পড়া হয়েছে যা অনলাইন রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি। সব মেলালে গোটা পঁয়ষট্টি বই হবে। পঁচাত্তরের ফিনিশলাইন পার না করতে পারলেও ক্ষমাযোগ্য।

নন ফিকশনঃ মোট পড়া বইয়ের মধ্যে মোটে ন’খানা নন-ফিকশন। মাসে একটাও না। আমার মতে, ফেল। 

বাংলা বইঃ এ বছর আমি গোটা বারো বাংলা বই পড়েছি। মাসে একটা, আগের বছরের তুলনায় নিঃসন্দেহে উন্নতি। 

মোটা বইঃ এ বছর আমার পড়া সবথেকে মোটা বইয়ের পাতাসংখ্যা ৫৯২, সবথেকে রোগা বইয়ের পাতাসংখ্যা ৬০। গড় পাতাসংখ্যা ২৬০। কাজেই মোটা বই পড়া হয়নি ধরতে হবে। তবে রি-রিড করা বইগুলো সব মোটা মোটা, সেগুলো গুনতিতে ধরলে গড় ভদ্রস্থরকম বাড়ত কি না কে জানে। 

২০১৮-র রেজলিউশন

এবারের রেজলিউশনের লিস্ট থেকে আমি প্রতিবছরই উইশলিস্টে থাকা রেজলিউশনগুলো বাদ দিচ্ছি, তাছাড়া রুজিরুটিসংক্রান্ত কিছু রেজলিউশনও আপনাদের শুনিয়ে বোর করছি না। সেগুলোই শোনাচ্ছি যেগুলোর সঙ্গে আপনাদের সোজাসুজি সম্পর্ক আছে। অর্থাৎ লেখা এবং পড়া। 

লেখাসংক্রান্ত রেজলিউশনের কথা বলতে গেলে প্রথমেই নিল গেমনের কথা বলতে হবে। ‘লেখা নিয়ে কিছু টিপস দিন’ ধরে পড়লে নিল গেমন একটা কথা বারবার বলেন, যেটা শুনলে মনে হয় আপাতদৃষ্টিতে লেখার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই, কিন্তু এ বছর আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি গেমনের উপদেশের মাহাত্ম্য। 

সেটা হচ্ছে, ‘ফিনিশ থিংস।’

দু’হাজার সতেরোতে আমি প্রচুর লিখেছি, কিন্তু শেষ করিনি কিছুই। সব আধাখ্যাঁচড়া পড়ে আছে। অর্থাৎ কার্যকরিতার দিক থেকে দেখলে লিখিনি কিছুই। তবে অত নৈরাশ্যবাদী হওয়া আমার স্বভাবে নেই। আমি বিশ্বাস করি টাইপ করা শব্দ বিফলে যায় না। কিন্তু দু’হাজার আঠেরোতে আমি শুধু টাইপ করব না, আগের বছরের শুরু হওয়া প্রোজেক্টগুলো শেষ করব।  

সামনের বছরের আমার লেখাসংক্রান্ত দ্বিতীয় রেজলিউশন হচ্ছে ফিকশন সংক্রান্ত। আবার আমার চরিত্রসংক্রান্তও বটে। সেদিন একজন ইউটিউবারকে বলতে শুনলাম ইউটিউব করতে নামার পর তাঁর জীবনে যে জিনিসটার সবথেকে বেশি অভাব ঘটেছে সেটা হচ্ছে কমফর্ট। যা যা করেন সবটাই করেন নিজের কমফর্ট জোনের বাইরে গিয়ে। শুনে আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় হল। 

কারণ আমি উপলব্ধি করলাম যে জীবনে আমি যে জিনিসটাকে সবথেকে বেশি মূল্য দিই সেটা হচ্ছে কমফর্ট। যাঁর সঙ্গে কমফর্টেবল নই তাঁর সঙ্গে কথা বলি না, তাঁর দোকান থেকে জিনিস কিনি না, এমনকি সে অটোভাইসাবকে দেখলেও রাস্তা বদল করি। মানুষ ছাড়াও কাজের ক্ষেত্রেও আমার এ নীতি খাটে। যে কাজগুলো আরাম করে করা যায় না, সেগুলো না করাই আমার রীতি। অস্বস্তিদায়ক লেখা না লেখাই আমার মোটো। 

গত আট বছর ধরে অবান্তর লিখে লিখে এই ডায়রিগোত্রের লেখা আমার অভ্যেস হয়ে গেছে, এ লেখা লিখতে আমি কমফর্টেবল। 

যা বাস্তবে ঘটেনি, যা আমাকে খাতার পাতায় ঘটাতে হবে, অর্থাৎ ফিকশন, সে লিখতে গেলে আমার এখনও কান্না পায়। আমি বড়োজোর অনুবাদ করতে পারি, কারণ শত ছায়া-অবলম্বনে হলেও শুরু-মাঝ-শেষের একটা ভারা অলরেডি বাঁধা থাকে, ওটা ধরে ধরে হাঁটায় আমি কমফর্টেবল। 

দু’হাজার আঠেরোতে আমি সম্পূর্ণ বানিয়ে বানিয়ে গল্প লেখায় কমফর্টেবল হব। পাতে দেওয়ার অযোগ্য হলেও লিখব, যতক্ষণ না ওটা আমার কমফর্ট জোনের মধ্যে ঢুকে আসে।

পড়াঃ দু’হাজার আঠেরোতে আমি পঞ্চাশটা বই পড়ব। আর বাংলা বই পড়ব বারোটার থেকে বেশি।

ওহ, পড়া আর লেখা ছাড়াও আরেকটা ছোট্ট রেজলিউশন আছে আমার, সেটা হচ্ছে আমার চারপাশ ‘কিপ্‌ল-ফ্রি’ রাখার। মারাত্মক শক্ত রেজলিউশন। আমার ধারণা এটা আমার বাকি সব রেজলিউশনের থেকে বেশি শক্ত, তবে আমি অলরেডি এ বিষয়ে খানিকটা এগিয়েছি। গতকাল যখন টিফিনের পর অফিসের সবাই সিক্রেট স্যান্টা নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করছিল, আমি তখন আমার ডেস্কের হাবিজাবি কাগজ বেছে বেছে রিসাইকেল ঝুড়িতে চালান করছিলাম। কিপ্‌ল বনাম নন-কিপ্‌লের এই যুদ্ধ সারাবছর জারি রাখাই আমার রেজলিউশন।

*****

দু’হাজার আঠেরোর জন্য আপনারা কিছু রেজলিউশন নিলেন নাকি?



December 18, 2017

এ মাসের বই/ নভেম্বর ২০১৭



Do Androids Dream of Electric Sheep?/Philip K. Dick


উৎস গুগল ইমেজেস

“Kipple is useless objects, like junk mail or match folders after you use the last match or gum wrappers or yesterday's homeopape. When nobody's around, kipple reproduces itself. For instance, if you go to bed leaving any kipple around your apartment, when you wake up the next morning there's twice as much of it. It always gets more and more." [...]"There's the First Law of Kipple," [...] "'Kipple drives out nonkipple.' [...]"No one can win against kipple," he said, "except temporarily and maybe in one spot, like in my apartment I've sort of created a stasis between the pressure of kipple and nonkipple, for the time being. But eventually I'll die or go away, and then the kipple will again take over. It's a universal principle operating throughout the universe; the entire universe is moving toward a final state of total, absolute kippleization.”

'ব্লেড রানার ২০৪৯' দেখতে গিয়ে পঁয়ত্রিশ বছর আগে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা 'ব্লেড রানার'-এর কথা জানতে পারলাম, 'ব্লেড রানার' সম্পর্কে জানতে গিয়ে জানলাম ফিলিপ কে ডিক-এর দু’শো চুয়াল্লিশ পাতার উপন্যাস ‘ডু অ্যান্ড্রয়েডস ড্রিম অফ ইলেকট্রিক শিপ?’-এর কথা, যাকে ভিত্তি করে বানানো হয়েছিল অরিজিন্যাল 'ব্লেড রানার'।

‘ডু অ্যান্ড্রয়েডস ড্রিম অফ ইলেকট্রিক শিপ’-এর ঘটনা ঘটছে পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীতে। তেজস্ক্রিয়ায় গাছপালা, পশুপাখি ধ্বংস হয়ে গেছে, চারদিকে ধুলো, সে পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের চেনা পৃথিবীর কোনও মিল নেই।  যারা অ্যাফর্ড করতে পেরেছে তারা অন্য গ্রহে চলে গেছে। ইন ফ্যাক্ট, মানবসভ্যতাকে রক্ষা করার জন্য কর্তৃপক্ষ সবাইকে পৃথিবী ছাড়াতেই উৎসাহ দিয়েছেন। সেখানে আছে পরিষ্কার হাওয়া, নিজস্ব বাড়ি, গাড়ি এবং একান্ত নিজস্ব অনুকূল! অর্থাৎ অ্যান্ড্রয়েড চাকর।

তা বলে পৃথিবী একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়নি। বলা বাহুল্য, গরিব লোকেরা পালাতে পারেনি, আর পারেনি যারা তেজস্ক্রিয়তায় বেশিরকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ‘চিকেন হেড’ এ পরিণত হয়েছে। তারা আটকে গেছে এমিগ্রেশনের জন্য দরকারি আই কিউ না দেখাতে পারায়। গরিব, বোকা, ধুলোয় ভর্তি, গাছহীন, পশুপাখিহীন পৃথিবী ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঘুরে চলেছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেক আপদ, তা হল দুর্বৃত্ত অ্যান্ড্রুয়েড। যত নতুন নতুন মডেল বেরোচ্ছে তারা তত মানুষের মতো হয়ে উঠছে, কেউ কেউ আর ‘যেমন চালাও তেমন চলি’ নীতিতে বিশ্বাসী থাকতে চাইছে না। এইসব অ্যান্ড্রয়েডদের সামলানোর জন্য পুলিসফোর্সে আলাদা বিভাগ খোলা হয়েছে, তাছাড়া আরও নানারকম বাড়তি সাহায্যও দরকার হয়ে পড়েছে। যথা, বাউন্টি হান্টারস। 

গল্পের হিরো রিক ডেকার্ড এরকমই এক বাউন্টি হান্টার। ডেকার্ড দুর্বৃত্ত অ্যান্ড্রয়েডদের ‘রিটায়ার’ করে, পার রিটায়ার পয়সা পায়। ডেকার্ড সানফ্রান্সিসকো শহরে স্ত্রী আইরানের সঙ্গে থাকে। গল্প শুরু হওয়ার সময় আমরা জানতে পারি মঙ্গল থেকে ছ’জন নেক্সাস-৬ মডেলের অ্যান্ড্রয়েড পালিয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে, তাদের ধরার জন্য যাদের লাগানো হয়েছিল, একজনকে অলরেডি তারা নৃশংসভাবে খুন করেছে। পুলিসকর্তা প্যানিকড হয়ে ডেকার্ডকে খবর পাঠিয়েছেন, অবিলম্বে মিশনে বেরোতে হবে। নেক্সাস-৬ মডেল এ যাবৎ অ্যান্ড্রয়েড ম্যানুফ্যাকচারিং ইতিহাসে বেস্ট মডেল, কাজেই সবথেকে বেশি মানুষের মতো এবং প্রায় মানুষের মতোই বিপজ্জনক। এদের ‘রিটায়ার’ করানোর জন্য চাই সেরা শিকারি।

সেই শিকারি আমাদের রিক ডেকার্ড। 

গল্পের শুরুতে আমরা এও জানতে পারি, ডেকার্ড নিজের কাজ নিয়ে অতৃপ্ত, সে এই বাউন্টি হান্টারের জীবন থেকে নিষ্কৃতি চায়। তবু সে এই মিশনে নামতে রাজি হয়। কেন? শুধু কি পুলিসকর্তাকে ‘না’ বলতে না পেরে? নাকি নিজের কাজের প্রতি এখনও কোথাও কোনও মায়া বা উত্তেজনা বাকি থেকে যাওয়ায়? এসবের কোনওটাই নয়। রিক ডেকার্ডের শেষবারের মতো অ্যান্ড্রয়েডনিধনে নামার অনুপ্রেরণা হচ্ছে টাকা। ছ’জন অ্যান্ড্রয়েডকে রিটায়ার করে ডেকার্ড যা রোজগার করবে তা দিয়ে সে একটা সত্যিকারের, রক্তমাংসের পোষ্য কিনবে। এখন তার যে ইলেকট্রিক ভেড়াটা আছে, অবিকল সত্যিকারের ভেড়ার মতোই, সেটার বদলে।

কল্পবিজ্ঞান শুনলেই আমাদের মাথায় আসে উদ্ভট পোশাক, উদ্ভট অভ্যেস, উদ্ভট যন্ত্র যারা আমাদের সমকালের থেকে ভবিষ্যৎকে আলাদা করে। ফিলিপ কে ডিকের উপন্যাসেও সে রকম অনেক জিনিস আছে। হভার কার, যে গাড়ি বায়ু, জল, মাটি সবেতে চলতে পারে, অত্যাধুনিক লেজার বন্দুক। কিন্তু যে উদ্ভট যন্ত্রটিকে আমার সবথেকে ইন্টারেস্টিং লেগেছে সেটার উল্লেখ আছে বইয়ের প্রথম দৃশ্যেই। 

পেনফিল্ড মুড অর্গ্যান। 

যন্ত্রটি সরল। যন্ত্রের সঙ্গে একটি ম্যানুয়াল আছে, তাতে নানারকম মুড এবং তার করেসপন্ডিং নম্বর দেওয়া আছে। মুড অর্গ্যানে সেই নম্বর ডায়াল করলেই উক্ত মুড আপনি পেয়ে যাবেন। যেমন ধরুন, অ্যান্ড্রয়েড মারতে বেরোনোর সকালে রিক ডেকার্ড সকালবেলা যন্ত্রে সেট করল ‘Optimistic businesslike attitude’। আরেকটা কমন মুড হচ্ছে ‘the desire to watch television, no matter what is on.  মুড অর্গ্যানে শুধু যে এইসব ভালো ভালো মুডই সেট করা যায় তা নয়, নিজেকে অত্যাচারের ইচ্ছে থাকলে তার সুযোগও আছে, রিক ডেকার্ডের স্ত্রী আইরান যেমন সারাদিনের জন্য শেডিউল করে রাখছেsix hours of existential despair.’  

কিন্তু এইসব অত্যাধুনিক যন্ত্র, বন্দুক, রোবট ইত্যাদিতে ঠাসা গল্প হলে ‘ডু অ্যান্ড্রয়েডস ড্রিম অফ ইলেকট্রিক শিপ’ এত বিখ্যাত হত কি না সন্দেহ। এ উপন্যাসের মূল কথা সেই অন্যরকম পৃথিবীটার অন্যরকম যন্ত্রপাতি নয়। মূল কথা হচ্ছে সেই অন্যরকম পৃথিবীর মানুষরা। তাদের বাঁচামরা, আশানিরাশা, চাওয়াপাওয়া, ভালোমন্দ, ন্যায়নীতি, বিজ্ঞান, ধর্ম, বিনোদন। ফিলিপ কে ডিকের উপন্যাসে এই ধর্ম এবং বিনোদনের একটা সম্মুখসমর আমরা দেখতে পাই। ধর্মের দিকে রয়েছে মার্সারিজম, উইলবার মার্সার বলে একজন সে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। এ ধর্মের মূল কথা ‘এমপ্যাথি’ বা সহানুভূতি। এ ধর্মের অনুরাগীরা বিশ্বাস করে, ব্যক্তি এবং সমষ্টির প্রতি সহানুভূতি অনুভব করাতেই মোক্ষ। এখানে সহানুভূতি বলতে আমরা রোজ সকালবিকেল রাস্তার গরিব ভিখিরি বাচ্চাদের দেখে যে জিনিসটা ফিল করি সেটা নয়, এ অনুভূতি আক্ষরিক। চার্চ, মসজিদ, মন্দিরের বদলে এ ধর্মের বিশ্বাসীদের বাড়িতে বাড়িতে একখানা করে এমপ্যাথি বক্স আছে, সে বাক্সের মধ্যে ঢুকে একটা হাতল ছুঁয়ে দাঁড়ালেই ভার্চুয়াল রিয়ালিটির মাধ্যমে মানুষ অন্য মানুষের যন্ত্রণা, আনন্দ এবং যাবতীয় অনুভূতির নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়ে। একে অপরের যাবতীয় অনুভূতি নিজের শরীরে মনে অনুভব করে। এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে রয়েছেন উইলবার মার্সার স্বয়ং, তিনি একটা পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে ক্রমাগত প্রস্তরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন, এমপ্যাথি বাক্সের মধ্য দিয়ে তাঁর অনুগামীরা তাঁর সেই যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছে। যেন মার্সার নন, পাথর এসে লাগছে তাদের নিজেদের শরীরেই। আবার কোনও অনুরাগীর পোষা প্রাণী মরে যাওয়ার যন্ত্রণা, বা পোষা প্রাণী কেনার আনন্দও অনুরাগীরা এমপ্যাথি বাক্সের মধ্য দিয়ে নিজেদের শরীরে, মনে অনুভব করতে পারছে । এইসব আনন্দ, দুঃখ, যন্ত্রণা কাটাকুটি হয়ে চলেছে অবিরত। 

আর এর ঠিক উল্টোদিকে আছে বাস্টার ফ্রেন্ডলির টোয়েন্টি ফোর সেভেনের রুদ্ধশ্বাস টক শো। সেলেব্রিটিদের অবিরাম সাক্ষাৎকার চলে এই শোতে, তারা কারা, কী কারণে সেলেব্রিটি সে সব স্পষ্ট নয়, কিন্তু তাদের জীবন, অভিজ্ঞতা, হাসি, কান্না, গিলছে সবাই বসে বসে চব্বিশঘণ্টা। বিনোদন ছাড়াও বাস্টার ফ্রেন্ডলির শোয়ের আরেকটা মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে মার্সারিজম তথা উইলবার মার্সারকে ভণ্ড প্রমাণ করা। ক্রমাগত ‘তদন্তমূলক সাংবাদিকতা’ চালিয়ে বাস্টার ফ্রেন্ডলি উইলবার মার্সার সম্পর্কে নানা খতরনাক সত্য উদ্ঘাটন করতে থাকে। 

একদিক থেকে দেখলে, মার্সারিজম আর বাস্টার ফ্রেন্ডলি টক শোয়ের তফাৎটা সাদাকালোর। মার্সারিজম যেখানে একে অপরের সঙ্গে সংযোগের কথা বলে, বাস্টার সেখানে ওয়ান-ওয়ে এন্টারটেনমেন্ট। মার্সারিজমে একা ঘরে বসে এমপ্যাথি বক্সের মধ্য দিয়ে অনেকের সঙ্গে এক হওয়া যায়, আর বাস্টার ফ্রেন্ডলির টক শো শুনতে শুনতে মানুষ একাকীত্ব অনুভব করতে পারে না। মার্সারিজম সংবেদনশীলতাকে ক্রমাগত শান দিতে দিতে চূড়ান্ত পর্যায় নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার পাশের মানুষের অনুভূতির সশরীরে অনুভব করতে পারে, আর বাস্টার ফ্রেন্ডলি ক্রমাগত শব্দ, দৃশ্য, রঙের হুল্লোড়ে আমাদের ইন্দ্রিয় ভোঁতা করতে থাকে।

কিন্তু আমার মতে (ওয়েল, যারা যারা এই বই পড়েছেন তাঁদের সবার মতেই), এই সব খুঁটিনাটি ‘ডু অ্যান্ড্রয়েডস ড্রিম অফ ইলেকট্রিক শিপ?’-এর মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্নটা হচ্ছে মানুষ কীসে মানুষ হয়? আর অ্যান্ড্রয়েড কীসে মনুষ্যেতর থেকে যায়? আর মানুষ আর অমানুষকে আলাদাই বা চেনা যায় কী করে?

অ্যান্ড্রয়েডরা, বিশেষ করে নেক্সাস-৬ মডেলের অ্যান্ড্রয়েডরা এত বেশি মানুষের মতো, যে মারার আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে হয় যে তারা মানুষ না অ্যান্ড্রয়েড। সে জন্য নানারকম পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু স্টেট অফ দ্য আর্ট যে পরীক্ষাটিতে রিক ডেকার্ড ব্যক্তিগতভাবে ভরসা করে তা Voigt-Kampff test. এই টেস্টের অংশ হিসেবে প্রশ্নকর্তা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা অ্যান্ড্রয়েডকে কয়েকটি নৈতিক এবং দার্শনিক প্রশ্ন করেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নয়, উত্তর দেওয়ার সময় উত্তরদাতার সূক্ষ্মতম শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখে তার মনুষ্যত্ব কিংবা মনুষ্যত্বের অভাব নির্ধারণ করা হয়। 

একটা প্রশ্নের নমুনা এই রইলঃ 

"Now consider this. You're reading a novel written in the old days before the war. The characters are visiting Fisherman's Wharf in San Francisco. They become hungry and enter a seafood restaurant. One of them orders lobster, and the chef drops the lobster into the tub of boiling water while the characters watch."

যাঁরা রেড লবস্টার-এ গিয়ে অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে সবথেকে মোটা আর লাল লবস্টার বেছে সেটা শেফকে রান্না করতে দিয়েছেন, এই পরীক্ষায় তাঁরা একজনও মানুষ বলে গণ্য হবেন না।

Voigt-Kampff test-এর অধিকাংশ, প্রায় সব প্রশ্নই অন্য প্রাণের প্রতি প্রাণের সাড়া বা এমপ্যাথি মাপার। সেটার কারণ সম্ভবত ওই সময়কার পৃথিবীতে প্রাণ এত বিরল, সাপ্লাই ডিম্যান্ডের নিয়ম মেনেই তা প্রায় হীরের মতো দামি হয়ে উঠেছে। জ্যান্ত পশু বা পাখি পুষতে পারা সামাজিক প্রতিষ্ঠার সংকেতে পরিণত হয়েছে। 

বলা বাহুল্য, এই পরীক্ষা ফুলপ্রুফ নয়। প্রথমত এতে 'এমপ্যাথি' কেই মনুষ্যত্বের একমাত্র মাপকাঠি বলে ধরা হয়েছে, যেটা তর্কসাপেক্ষ। তাছাড়াও কেন একজন মানুষ এমপ্যাথেটিক আর অন্যজন নয়, সেটার নানারকম কারণ থাকতে পারে। হয়তো বিকাশগত বাধা একটা কারণ। তাছাড়া যদি ধরেও নেওয়া হয় যে এমপ্যাথিই মনুষ্যত্বের শেষ কথা, তখনও আরও অনেকগুলো প্রশ্ন উদয় হয়। কার প্রতি এমপ্যাথি? মার্সারিজম অনুযায়ী অন্য মানুষের প্রতি, Voigt-Kampff test-এর প্রশ্নপত্র অনুযায়ী জীবজন্তুর প্রতি। মেশিনের প্রতি এমপ্যাথি কেন নয়? অ্যান্ড্রয়েডদের প্রতি কেন নয়? 

তাছাড়াও মানুষ-অ্যান্ড্রয়েড চেনায় পরীক্ষাটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন জাগে। একটি দৃশ্যে রিক ডেকার্ডকে স্বয়ং ওই টেস্টে বসতে হয়, এবং সন্দেহ জাগে সে নিজে মানুষ না অ্যান্ড্রয়েড। 

এই সব দাঁতভাঙা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে রিক ডেকার্ডের অ্যান্ড্রয়েড-শিকার চলতে থাকে। ক্রমাগত আবিষ্কার হতে থাকে যে অ্যান্ড্রয়েডরা মানুষের সমাজের কত গভীরে ঢুকে পড়েছে, রিক ডেকার্ড যাদের সঙ্গে উঠেছে বসেছে অ্যান্ড্রয়েড মেরেছে, বোন ম্যারো পরীক্ষায় বেরোচ্ছে তারাও আসলে অ্যান্ড্রয়েড ছিল। হভার কারে চড়ে, লেজার গানে চেপে যুদ্ধ চলতে থাকে। তবে এই সব অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের পাশাপাশি আরও একটা মারাত্মক ওল্ডস্কুল, চিরচেনা অস্ত্রের বহুলব্যবহার হতে থাকে এই কল্পবিজ্ঞানের পৃথিবীতে। কী বলুন দেখি?

নারীশরীর। 

এই পৃথিবীতে এবং পৃথিবীর সৌরজগতের অন্যান্য উপনিবেশেও নারীশরীরের চাহিদা গগনচুম্বী। রক্তমাংস এবং অ্যান্ড্রয়েড, দুই ভ্যারাইটিরই। পৃথিবীর বাইরে অন্যান্য গ্রহে রক্তমাংসের নারীর সঙ্গে অ্যান্ড্রয়েড নারী শরীরের বাজার চলছে রমরম করে, এ বাজারকে কর্তৃপক্ষ বেআইনি ঘোষণা করেছেন, কিন্তু পুরুষের কাছে নারীশরীরের চাহিদাই নাকি আদিমতম এবং অনতিক্রম্য, কাজেই সে আইনকে সবাই কাঁচকলা দেখাচ্ছে। এমনকি অ্যান্ড্রয়েডরাও বুদ্ধি খাটিয়ে তাদের আর্মিতে কিছু নিখুঁত শরীরওয়ালা নারীমডেল রেখেছে, যাদের কাজই হচ্ছে বাউন্টি হান্টারদের প্রলুব্ধ করে অ্যান্ড্রয়েডনিধন মিশন থেকে তাদের বিচ্যুত করা। বলা বাহুল্য, লেজার গানের থেকে এই স্ট্র্যাটেজি কোনও অংশে কম কাজ দিচ্ছে না।   

মানুষ মঙ্গলে পৌঁছে গেলেও যে কিছু জিনিস অবিকল একরকম থেকে যাবে, এটা আশ্বাসের।

*****

A Kiss Before Dying/ Ira Levin


উৎস গুগল ইমেজেস

এ মাসের গোড়ায় একজন বুকব্লগারের মুখে একটি বিখ্যাত গোয়েন্দা উপন্যাসের নাম শুনলাম। আইরা লেভিন-এর লেখা ‘আ কিস বিফোর ডাইং’। বইটা সম্পর্কে উৎসাহ সম্বন্ধ আরও বাড়ল যখন জানলাম ‘বাজিগর’ সিনেমাটি এই বইয়ের ওপর ভিত্তি করে বানানো হয়েছে। পড়ে বুঝলাম বাজিগর বইটি থেকে অনেকটাই আলাদা, তারপর জানলাম 'আ কিস বিফোর ডাইং' নিয়ে হলিউডে খানদুয়েক সিনেমা বানানো হয়েছে, বাজিগর তাদের একটার কপি। আমি সে সব সিনেমা দেখিনি, কাজেই সত্যিমিথ্যে বলতে পারব না। 

বলার দরকারও নেই, কারণ আজ আমাদের আলোচ্য 'আ কিস বিফোর ডাইং'-ভিত্তিক সিনেমা নয়, 'আ কিস বিফোর ডাইং' গল্পটি স্বয়ং। গল্পটি শুরু হয় এক চরিত্রের সীমিত প্রথম পুরুষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। সে তার বর্তমান প্রেমিকাকে খুনের প্ল্যান করছে। বইয়ের গোড়ার কয়েকটি পাতায় তার ব্যাকগ্রাউন্ড এবং ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য আমরা জানতে পারি। জানতে পারি সে নার্সিসিস্টিক এবং সাইকোপ্যাথ। ন্যায়অন্যায়ের ধারণাটা আর পাঁচজন লোকের থেকে তার আলাদা। বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করে সুখে জীবন কাটানোর যে প্ল্যানটি সে ফেঁদেছে, সেটা ভেস্তে যাওয়া আটকানোর জন্য সে যা খুশি করতে পারে, হ্যাঁ, মার্ডার পর্যন্ত। ডরোথিকে খুনের তার পুঙ্খানুপুঙ্খ প্ল্যান করা দেখে আমরা ইমপ্রেসড হই। এবং ওই ক’পাতায় লেখক আমাদের চরিত্রটির সঙ্গে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে সক্ষম হন যে সে প্ল্যানে বিন্দুমাত্র গোলযোগের সম্ভাবনা জাগলে আমাদের প্যালপিটেশন হয়। 

এটা করা মারাত্মক রকম শক্ত, কারণ লেখক আমাদের চরিত্রটির নামটাই বলেননি।

অর্থাৎ এর পর যখন সাসপেক্টদের মিছিল শুরু হবে, তখন খুনের মোটিভ, অপরচুনিটি, মোডাস অপারেন্ডি সব জানা থাকা সত্ত্বেও আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হবে না যে খুনি কে।

ব্রিলিয়ান্ট, তাই না?

আরও ব্রিলিয়ান্ট লাগবে যদি মনে রাখেন যে 'আ কিস বিফোর ডাইং' আইরা লেভিনের প্রথম উপন্যাস। তেইশ বছর বয়সে লেখা।

তেইশ। 

আমার মতে 'আ কিস বিফোর ডাইং'-এর সেরা অংশ হচ্ছে ওই শুরুর অংশটুকু, যখন আমরা অজ্ঞাতনামা ‘হি’-র মাথার ভেতর ঘুরছি। টানটান, নির্মেদ, টেনশনে ভরপুর। দুঃখের বিষয়, গোটা বইটা ওরকম নয়।

ডরোথি খুন হওয়ার পর ডরোথির দিদি এলেন বোনের হত্যারহস্য সমাধানে নামে। আর তখন থেকে গল্পের বাঁধুনিও ঢিলে হতে থাকে। খুনির নামটা আমরা জেনে যাই গল্পের মাঝামাঝি, তারপর থেকে শেষ পর্যন্ত খালি সুতো গোটানোর অপেক্ষা। এবং মাঝেমাঝেই সে অপেক্ষা দীর্ঘ লেগেছে আমার।

স্টিফেন কিং যদিও আইরা লেভিনকে ‘সুইস ওয়াচমেকার অফ সাসপেন্স নভেলস’ খেতাব দিয়েছেন, সেটার প্রমাণ আমি এই বইতে খুব একটা পাইনি। রহস্য টিকিয়ে রাখার জন্য কিছু চরিত্রকে অবিশ্বাস্যরকম নির্বোধ বানিয়ে রাখা ইত্যাদি গোঁজামিলও লেভিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যবহার করেছেন।

তবে মনে রাখতে হবে এটা তাঁর প্রথম উপন্যাস। প্রথম উপন্যাস হিসেবে 'আ কিস বিফোর ডাইং'-এ প্রভূত প্রতিশ্রুতি ছিল। পরে এই আইরা লেভিন ‘রোজমেরি’স বেবি’ লিখবেন। 

জয় অর্জুন সিং-এর সাবধানবাণী পড়ে আমি বইটা পড়ার আগে বেশি রিভিউটিভিউ পড়তে যাইনি, আপনারাও যাবেন না, কারণ কিছু কিছু জায়গায় খুনির নাম দিয়ে রিভিউ শুরু করা হয়েছে। স্পয়লার নিয়ে সেনসিটিভ হলে বিপদে পড়ে যাবেন।

*****

The Poisoned Chocolates Case/Anthony Berkeley 


উৎস গুগল ইমেজেস

বিবিসি রেডিওর একটা সুবিধে হচ্ছে, প্রচুর নতুন নতুন গোয়েন্দা গল্প এবং সিরিজের সন্ধান পাওয়া যায়। নাটক হিসেবে গল্প শোনার একটা সুবিধে হচ্ছে, ব্যাপারটা আমার পোষাবে কি না, সেটা সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা করা সোজা হয়। অভিজ্ঞ অভিনেতা  অভিনয় বা পাঠ শুনেও যদি কোনও গল্প সম্পর্কে আমার উৎসাহ না জাগে, তবে পড়ে ভালো লাগা মুশকিল। সম্প্রতি গোয়েন্দাগল্পের স্বর্ণযুগের বিখ্যাত লেখক অ্যান্থনি বার্কলের 'দ্য পয়জনড চকোলেটস কেস' উপন্যাসটির নাট্যাভিনয় শোনার সুযোগ হল। শুনে এত ভালো লাগল যে আমি উপন্যাসটা বই হিসেবে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

এখানে আরও একটা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলা যায়, যে বই পড়া আর শোনার মধ্যে তফাৎ কী? বা আদৌ কিছু আছে নাকি। আমি এ বছর একটা গোটা বই (কমেডিয়ান মাইকেল ম্যাকিনটায়ারের আত্মজীবনী) অডিওবুকে শুনেছি। সেটাকে এ বছরের পড়া বইয়ের গুনতিতে ধরেওছি। কিন্তু এখনও আমার পড়ার প্রতি পক্ষপাতিত্ব যায়নি, পড়লে পাতা উল্টে পেছনে যাওয়ার সুযোগ থাকে। বা বইয়ের পাতায় আঙুল গুঁজে রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে নেওয়া যায়। রেডিওতে শুনে 'দ্য পয়জনড চকোলেটস কেস'-এর চরিত্র, প্লট, রহস্য এবং সমাধান সবই জানা হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আমি বইটা পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, কারণ আমার মনে হল এমন জমাটি একটা গল্প বই হিসেবে না পড়লে মাটি।

দ্বিতীয় যে কারণের জন্য আমি 'দ্য পয়জনড চকোলেটস কেস' বই হিসেবে সিদ্ধান্ত নিলাম, সেটা হচ্ছে গোয়েন্দাসাহিত্যের ইতিহাসে 'দ্য পয়জনড চকোলেটস কেস' একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। গল্প বলার সঙ্গে সঙ্গে বার্কলে এই উপন্যাসের মাধ্যমে স্বর্ণযুগের গোয়েন্দাগল্পের ক্রিটিক্যাল অ্যানালিসিস করেছেন, যে অ্যানালিসিসের রেজাল্ট সমসাময়িক গোয়েন্দালেখকদের পক্ষে স্বস্তিজনক নাও হতে পারে।

সে সব অস্বস্তিকর প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে গল্পের প্লট সম্পর্কে বলা যাক। অ্যান্থনি বার্কলের রজার শেরিংহ্যাম সিরিজ বেশ নামকরা, যদিও আমার পড়ার সুযোগ হয়নি। রজার শেরিংহ্যাম নিজে গোয়েন্দাগল্পের লেখক এবং দরকার পড়লে স্বয়ং গোয়েন্দার ভূমিকায় নামেন। রজার শেরিংহ্যাম লন্ডনে ‘ক্রাইম সার্কল’ নামের এক প্রেস্টিজিয়াস ক্লাব পত্তন করেছেন। (ইন্টারেস্টিং ট্রিভিয়াঃ দ্য পয়জনড চকোলেটস কেস প্রকাশিত হয় উনিশশো ঊনত্রিশে, আর পরের বছরই বার্কলে, সে সময়কার বিখ্যাত রহস্য ঔপন্যাসিকদের সঙ্গে মিলে বিখ্যাত ‘ডিটেকশন ক্লাব’ পত্তন করেন। ক্লাবের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন চেস্টারটন।) 'ক্রাইম সার্কল'-এর সদস্যসংখ্যা হাতে গোনা, কারণ ক্লাবে নাম লেখাতে গেলে রহস্যসমাধানের প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে ঢুকতে হয়। গল্প শুরু হওয়ার সময় আমরা দেখি ক্লাবের ছ’জন সদস্য উপস্থিত। ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রেসিডেন্ট ঔপন্যাসিক এবং গোয়েন্দা রজার শেরিংহ্যাম, বিখ্যাত বড়লোক ব্যারিস্টার স্যার চার্লস ওয়াইল্ডম্যান, অ্যালিস ড্যামারস নামের একজন ইন্টেলেকচুয়াল, ‘হাই ব্রাও’ ঔপন্যাসিক (বার্কলে হেল্পফুল হয়ে ‘হাই ব্রাও’ লেখকের সংজ্ঞা দিয়ে দিয়েছেনঃ যে সব লেখকের উপন্যাসে প্লট থাকে না), নাট্যকার মেবল ফিল্ডার-ফ্লেমিং, পটবয়লার এবং মাসমার্কেট গোয়েন্দাগল্প লেখক মর্টন হ্যারোগেট ব্র্যাডলি এবং অ্যামব্রোস চিটারউইক। এই শেষজন এই নক্ষত্রসভার একমাত্র সাধারণ মেম্বার, জনগণেশের প্রতিনিধি। কিন্তু প্রবেশিকা পরীক্ষায় রেকর্ড নম্বর পেয়ে ক্লাবে ঢুকেছেন।

গল্প যখন শুরু হচ্ছে, তখন এই ছ’জন ছাড়াও আরেকজন ক্লাবে উপস্থিত আছেন, তিনি হচ্ছেন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের পুলিসকর্তা ইন্সপেক্টর মোরেসবি। তাঁর উপস্থিতির কারণ অচিরেই প্রেসিডেন্ট শেরিংহ্যাম পরিষ্কার করেন। ইদানীং লন্ডনের অভিজাত মহলে একটি হত্যারহস্য নিয়ে তোলপাড় হয়েছে, সেটা হচ্ছে মিসেস বেন্ডিক্সের হত্যারহস্য। ঘটনা ঘটেছে এইরকমঃ রেনবো ক্লাব নামের লন্ডনের এক অভিজাত ক্লাবের সদস্য স্যার ইউস্টাস পেনেফাদার, রোজকার মতো বেলা সাড়ে দশটার সময় ক্লাবে এসে দেখেন এক চকোলেট কোম্পানি তাঁকে সৌজন্যমূলক একবাক্স চকোলেট পাঠিয়েছে। এইসব আধুনিক মার্কেটিং পদ্ধতির ঘোরতর বিরোধী স্যার পেনেফাদার তৎক্ষণাৎ বাক্সটি তাঁর সহমেম্বার গ্রাহাম বেন্ডিক্সকে চালান করেন। বেন্ডিক্স আবার এদিকে তাঁর স্ত্রী জোয়ান বেন্ডিক্সের সঙ্গে কী একটা বাজি ধরে হেরেছেন, শর্তস্বরূপ একবাক্স চকোলেট তাঁর জোয়ানের জন্য কেনার কথা। স্যার পেনেফাদারের দেওয়া চকোলেট তিনি বাড়ি নিয়ে যান। সেই চকোলেট খেয়ে জোয়ান মারা যান, তদন্তে বেরোয় চকোলেটে বিষ মেশানো ছিল।

রজার শেরিংহ্যাম ক্রাইম সার্কলের সবাইকে জানান, যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড বহু চেষ্টা করেও খুনিকে ধরতে না পেরে অবশেষে হাত তুলে দিয়েছে, এবং তিনি ইন্সপেক্টর মোরেসবিকে প্রস্তাব দিয়েছেন যে থিওরেটিক্যাল রহস্য রহস্য খেলা অনেক হয়েছে, এবার ক্রাইম সার্কলের শখ হয়েছে সত্যিকারের রহস্য সমাধানে নিজেদের ক্ষমতা চেখে দেখার, কাজেই এই মিসেস বেন্ডিক্স হত্যারহস্যের তাঁরা সমাধান করতে চান।

স্থির হয় প্রতি সদস্য নিজের মতো করে ঘটনাটির তদন্ত করবেন, এবং একসপ্তাহ পরে শুক্রবার সন্ধ্যেয় সে তদন্তের ফলাফল ক্লাবের সবাইকে জানাবেন। তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ফলাফল ঠিক না ভুল।

চোর ডাকাত পুলিস বাবু খেলার মতো করে চিরকুট বেছে তদন্তকারীদের ক্রম স্থির হয়। প্রথম সপ্তাহে স্যার ওয়াইল্ডহ্যাম, তারপর যথাক্রমে মেবল ফিল্ডার ফ্লেমিং, তারপর মর্টন হ্যারোগেট ব্র্যাডলি, তারপর রজার শেরিংহ্যাম, তারপর অ্যালিস ড্যামারস, সবশেষে অ্যামব্রোস চিটারউইক।

তদন্ত শুরু হয়, ছ’জন ছ’সপ্তাহ ধরে তাঁদের তদন্ত এবং ফলাফলের কথা ফলাও করে সবাইকে বলেন। বলা বাহুল্য, বাকিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্যদের তদন্তের ভুল ধরেন। অবশেষে একটা সমাধান বেরোয়, এবং সবাই মেনে নিতে বাধ্য হন, যে এটাই ঠিক। 

আর এই গোটা প্রসেসটার মধ্য দিয়ে অ্যান্থনি বার্কলে গোল্ডেন এজ মিস্ট্রি রাইটিং-এর নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ করেন। আর সেখানেই পয়জনড চকোলেটস কেস সমসাময়িক গোয়েন্দাগল্পের থেকে আলাদা হয়ে ওঠে।

প্রথম তফাৎ হচ্ছে, রজার শেরিংহ্যামের সিরিজের পাঁচ নম্বর উপন্যাস হলেও এ গল্পে রজার শেরিংহ্যামের ভূমিকা বাকি তদন্তকারীদের থেকে একটুও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গোল্ডেন এজের গোয়েন্দাগল্পের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রহস্য কিংবা সমাধানের থেকেও ‘গোয়েন্দা’ বা গল্পের হিরোর প্রতি ফোকাস। গোয়েন্দার বদলে 'দ্য পয়জনড চকোলেটস কেস'-এর সম্পূর্ণ ফোকাস তদন্তপ্রক্রিয়ার ওপর। ছ’জন গোয়েন্দার রহস্যসমাধানের মধ্য দিয়ে অ্যান্থনি বার্কলে বিবিধ তদন্তপদ্ধতির আলোচনা করেন। ইন্ডাকটিভ বা বটম আপ অ্যাপ্রোচ, অর্থাৎ যেখানে অলরেডি জানা তথ্য এবং বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে, সেই বিশ্বাসের পক্ষে বা বিপক্ষে উদাহরণ জোগাড় করে করে সমাধানে পৌঁছোনো হয়। ডিডাকটিভ বা টপ ডাউন অ্যাপ্রোচ, ঘটে যাওয়া ঘটনাকে তথ্য, যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে সমাধানে পৌঁছোনো। কেউ আবার ফরেনসিক ছাড়া আর কিছুকে মানেন না, কারও কাছে সাইকোলজিই শেষ কথা।

(এই লিংকে ডিডাকশন বনাম ইনডাকশন পদ্ধতি নিয়ে, উদাহরণ দিয়ে (তাও আবার শার্লক হোমসের) বেশ ভালো করে প্রাঞ্জল করে বোঝানো হয়েছে, ইচ্ছে করলে দেখতে পারেন।)

গতে বাঁধা গোয়েন্দাগল্পের সঙ্গে দ্বিতীয় তফাৎটা আমার মতে 'পয়জনড চকোলেটস কেস'-এর সবথেকে বড় অবদান। সেটা হচ্ছে এইটা পয়েন্ট আউট করা যে রহস্যসমাধানের প্রক্রিয়া এবং সমাধান কী অসম্ভব রকম ব্যক্তিগত। এই যে ছ’জন শখের গোয়েন্দা ছ’টা সলিউশনে পৌঁছোলেন, সেই সলিউশনগুলো সম্পূর্ণরকম তাঁদের ব্যক্তিত্ব, দর্শন এবং অভিজ্ঞতাসাপেক্ষ। এ যেন ঠিক অন্ধের হাতি দেখার মতো ব্যাপার। কেউ লেজ দেখছে, কেউ পা, কিন্তু সকলেই হাতিই দেখছে আবার কেউই হাতি দেখছে না। সকলেই যে যার বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতা খাটিয়ে ছ’টা সলিউশনে পৌঁছেছেন, ছ’টাই কনভিন্সিং আবার একইসঙ্গে অন্য আরেক গোয়েন্দার দৃষ্টি থেকে দেখলে ছিদ্রে ভরপুর।

তৃতীয়ত, ক্রাইম সার্কেলের সদস্যদের মধ্যে লেখকদের সংখ্যাধিক্যটা আপনার চোখ এড়ায়নি নিশ্চয়। তার মধ্যে দুজন আবার গোয়েন্দাগল্প লেখক। এটার একটা কারণ হচ্ছে অ্যান্থনি বার্কলে এটাও প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে গোয়েন্দাগল্প আর কিছুই নয়, পাঠক এবং লেখকের বুদ্ধির লড়াই। এবং লেখকের পাঠককে বোকা বানাতে সক্ষম হওয়ার পরীক্ষা। গোয়েন্দাগল্পের সফল লেখক মর্টন হ্যারোগেট ব্র্যাডলি বলছেন, 

"Artistic proof is, like artistic anything else, simply a matter of selection. If you know what to put in and what to leave out you can prove anything you like, quite conclusively. I do it in every book I write."

পয়জনড চকোলেটস কেসের চতুর্থ প্রতিপাদ্য হচ্ছে যে সবের পরে কিন্তু সবার ওপরে সত্য আবিষ্কার আর প্রমাণের মধ্যে একটা পরিখা থেকে যায়। সে পরিখার ব্যাপারে আর বিশদে বললে স্পয়লার দেওয়া হয়ে যাবে, কাজেই বলছি না।

উপন্যাসে বলা আছে, গোয়েন্দাগল্পে লেখক সর্বশক্তিমান, কাজেই অ্যান্থনি বার্কলের পক্ষপাতও এ উপন্যাসে পরিস্ফুট হয়েছে। নিজের সৃষ্ট গোয়েন্দা বলেই হয়তো শেরিংহ্যামের প্রতি দুর্বলতা রয়ে গেছে তাঁর। বাকি পাঁচজনের তদন্তপ্রক্রিয়া আমরা পুরোটাই তাঁদের জবানিতে জানতে পারি, কিন্তু শেরিংহ্যামের তদন্তটা নিজেদের চোখে দেখি। শেরিংহ্যাম কোথায় কোথায় যাচ্ছেন, কাদের সঙ্গে কথা বলছেন সে সব বিস্তারে লেখা আছে। ইন ফ্যাক্ট, ওই অংশটুকুই ধ্রুপদী গোল্ডেন এজ গোয়েন্দাগল্পের মতো পড়তে লাগে।

গোয়েন্দাগল্পের থিওরি প্র্যাকটিক্যাল নিয়ে উৎসাহ থাকলে অ্যান্থনি বার্কলের 'দ্য পয়জনড চকোলেটস কেস' অবশ্যপাঠ্য, এটুকু বলতে পারি।

পুনশ্চঃ এই রিভিউ লেখার সময় দ্য পয়জনড চকোলেটস কেস সম্পর্কে আরও কে কী বলেছেন খুঁজতে গিয়ে একটা তথ্য পেলাম। (বাই দ্য ওয়ে, পয়জনড চকোলেটস নিয়ে রীতিমত রিসার্চ পেপার লেখা হয়েছে। নেটে আছে, উৎসাহ থাকলে খুঁজে পড়তে পারেন।) পরবর্তী কালে। সম্ভাব্য আরও দুখানা তদন্তপদ্ধতি এবং সমাধান পয়েন্ট আউট করে, পয়জনড চকোলেটস কেস উপন্যাসে দুটো বাড়তি চ্যাপ্টার যোগ করেছিলেন দুজন লেখক। উনিশশো ঊনআশিতে ক্রিশ্চিনা ব্র্যান্ড এবং মার্টিন এডওয়ার্ডস (কবে জানি না)। আমি এঁদের চ্যাপ্টারদুটো পড়িনি, সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলব।


December 15, 2017

বিশ্ব চা দিবসে


অবান্তরের সকল চাপ্রেমী কমরেডদের আমার প্রীতি, শুভেচ্ছা, ভালোবাসা জানালাম। নিজে ঘন ঘন চা খান, অন্যদেরও খাওয়ান। 

December 14, 2017

৩৭



আমার ঠাকুরদা কংগ্রেসকে ভোট দিতেন এবং বিশ্বাস করতেন নোয়ার নৌকায় যদি মানুষের স্পেসিমেন হিসেবে কাউকে কখনও চাপানোর দরকার পড়ে, তাহলে সেটা ইন্দিরা গান্ধী ছাড়া অন্য কারও হওয়া উচিত না। কেউ খুব দেমাক নিয়ে চললে তিনি জানতে চাইতেন (হোপফুলি উক্ত ব্যক্তির আড়ালে, তবে কিছুই বলা যায় না), ‘নিজেকে কী মনে করে, ইন্দিরা গান্ধী?’ চেনাশোনার মধ্যে কারও জন্মদিন পালন হচ্ছে শুনলে মন্তব্য করতেন, ‘ইন্দিরা গান্ধী নাকি যে জন্মে উদ্ধার করে দিয়েছে?’

নিজে ব্লগ খুলে, নিজেই সবাইকে হেঁকেডেকে নিজের জন্মদিন মনে করাচ্ছি জানলে দাদু কী বলতেন আমি কল্পনা করতে চাই না। 

আমি সত্যি ভেবেছিলাম চোদ্দই ডিসেম্বরের নিয়মরক্ষা পোস্টটা এবার এড়িয়ে যাব। কী নিজেই নিজের জন্মদিন পালন করা, তাছাড়া বয়সটাও তো বলার মতো কিছু না। সাঁইত্রিশ। এত আনরোম্যান্টিক, এত বোরিং, এত তুচ্ছ, তাৎপর্যহীন বয়স মানুষের জীবনে আর দুটো খুঁজলে পাওয়া যাবে না বলে আমার বিশ্বাস। কোনও সাঁইত্রিশ বছর বয়সী রকস্টারের কথা শুনেছেন? সাঁইত্রিশ পূর্ণ করে কেউ বোধি প্রাপ্ত হয়েছে জানা আছে? কোনও সরকারি চাকরির সময়সীমা সাঁইত্রিশ হতে দেখেছেন? কোনও সাহিত্য/ কলা/গণিত/বিজ্ঞানের প্রাইজ সাঁইত্রিশ বছরের কম বা সাঁইত্রিশ বেশি বয়সের লোকেদের দেওয়া হয় শুনেছেন? সাঁইত্রিশ বছর বয়সে কেউ মিলিওনেয়ার হয়েছে কিংবা ম্যারাথন দৌড়েছে শুনলে ইমপ্রেসড হয়েছেন? 

বলার দরকার নেই, উত্তরটা আমি অলরেডি জানি। 

সাঁইত্রিশের মতো এত বিবর্ণ, নিস্তেজ বয়স জীবনে কমই আসে। চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট এমনকি সত্তরেরও গ্ল্যামার আছে। সেদিনই ডাক্তারখানায় বসে একটা লুচিভাজা পত্রিকা দেখছিলাম, ‘সেক্সি অ্যাট সেভেন্টি’ বা ওই গোছেরই হেডিং-এর নিচ থেকে মহার্ঘ শাড়ি পরে হেমা মালিনী আর শোভা দে উল্লসিত ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। সত্তর বছর বয়সে পৌঁছে শোভা দে জীবনে প্রথম নিজের পিঠে অদৃশ্য দুটি ডানার অস্তিত্ব টের পেয়েছেন, যা দিয়ে তিনি দুনিয়া চুলোয় দিয়ে নতুন থেকে নতুনতর সম্ভাবনার দিগন্তের দিকে উড়ে যেতে পারেন। 

আমি গ্যারান্টি দিতে পারি, সাঁইত্রিশ বছর পূর্ণ করার মুহূর্তে দুখানা ডানা তো দূর অস্ত, শোভা দে-র মাথায় একটি চুলও এক্সট্রা গজায়নি। 

এইসব ভেবেটেবে আমি স্থির করেছিলাম সাঁইত্রিশ নিয়ে আর বেশি গোল করব না, চুপচাপ দিনটা কাটিয়ে দেব। যদি কেউ ভুলেই যায়, তাকে মনে করাব না। আর সত্যিই তো, আমি তো ইন্দিরা গান্ধী নই, আমার জন্মদিন ঘটা করে উদযাপনের তো কিছু নেই।

ভোরবেলা টাইপ করার বদলে বসে বসে এই সব ভাবছি, সবুজ শেডের আড়াল থেকে হলুদ এল ই ডি-র আলো সামনের গোলাপি দেওয়ালে কাটা নখের মতো পড়েছে এমন সময় অন্য যুক্তি মাথায় এল। দাদু হলে বলতেন কুযুক্তি, কিন্তু আমি অত সহজে উড়িয়ে দিতে রাজি নই। আমি ইন্দিরা গান্ধী নই বলেই কি আমার জন্মদিন আমার নিজেরই পালন করার দায়িত্ব বেশি হয় না? ম্যাডাম গান্ধীর বেঁচে থাকা উদযাপনের জন্য দেশের বিদেশের, পার্টির, বিরোধী পার্টির লোকেরা এক পায়ে খাড়া থাকতেন, নিজের জন্মদিন ভুলে যাওয়া, বা উপেক্ষা করার বিলাসিতা তাঁকে মানাত। 

আমাকে মানায় না। কারণ আমি ইন্দিরা গান্ধী নই। আমার মতো লোকের এ পৃথিবীতে সাঁইত্রিশটা বছর বেঁচেবর্তে থাকার যদি কোনও মানে বার করতে হয় তাহলে আমাকেই করতে হবে।  

উবারে বসে, ভাইসাবকে জানালার কাচটা তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে, যে জিনিসগুলো হাতে নিয়ে দৌড়ে বেরিয়েছিলাম, চাবি, ফোন, কমলালেবু যথাস্থানে ঢুকিয়ে, মোজা পরে, ব্যাগ হাঁটকে সবুজ টিউব খুঁজে, বোরোলিন ঠোঁটে ঘষে সিটে হেলান দিয়ে বসে অর্চিষ্মানের দিকে তাকালাম। ও-ও ততক্ষণে সুস্থির হয়ে বসেছে, (অবশ্য ও অস্থির হয় না কখনওই), বসে ফোনে আঙুল বোলাচ্ছে।  আমি ডানহাতে বাঁ কবজি ছুঁয়ে, যেন ঘড়ির ডেট ঠিক করতে হবে এমন ভঙ্গিতে আলতো প্রশ্ন করলাম, ‘আজ কত তারিখ গো?’

‘তেরোই ডিসেম্‌ম্… ‘ বলতে বলতে অর্চিষ্মানের ঘাড় ফোন থেকে আমার দিকে ঘুরে গেল, এলানো শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল, চোখ গোল গোল করে আমার হাত ধরে অর্চিষ্মান বলতে লাগল, ‘আগের উইকএন্ড পর্যন্ত মনে ছিল বিশ্বাস কর, আজই ভুলে গেছি। কী বাঁচান বাঁচালে, থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ…’

আমি বললাম, ‘প্রথমত, ভুলে গেলেও কিছু না, আর দ্বিতীয়ত, আমি মোটেই মনে করাইনি, আমি এমনিই ডেট জিজ্ঞাসা করছিলাম। ইন ফ্যাক্ট, আমার নিজেরই মনে ছিল না, তুমি এত কথা বললে বলে মনে পড়ল।’ 

অর্চিষ্মান মুচকি হাসল, সে হাসির মানে আমি জানতে চাই না।


December 10, 2017

মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস




অর্চিষ্মান একবার বলার চেষ্টা করেছিল, রিভিউ ভালো নয় কিন্তু। কিন্তু ও-ও জানত, 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' সিনেমা হয়ে বেরিয়েছে যখন আমি দেখব। ক্রিটিকে, দর্শকে কী বলল তোয়াক্কা না করেই। শনিবার সাড়ে বারোটার শোয়ের টিকিটের দাম মোটামুটি ভদ্রলোকের মতো দেখে আমরা রওনা দিলাম। টিকিট অনলাইন কাটা যেত, কিন্তু সে ক্ষেত্রে ‘কনভেনিয়েন্স ফি’ বলে একটা জিনিস হয়, সেটা আমার চরম অসুবিধেজনক লাগে। তাছাড়া আমার ভরসা ছিল, ফুকরে রিটার্নস রিলিজ করেছে, থরঃ রাগনারোক চলছে, এই বাজারে বেশি লোক পোয়্যারো নিয়ে উৎসাহী হবে না। ভরসা বিফলে যায়নি,হলে গিয়ে টিকিট পেতে কোনও অসুবিধেই হয়নি। 

প্রায় আধঘণ্টা ধরে ট্রেলার আর অ্যাড চলার পর মার্গসংগীতের ছোঁয়া লাগানো জনগণমন বাজিয়ে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি করে সিনেমা শুরু হল। পবিত্র শহর জেরুজালেমে একটি রহস্যের সাফল্যের সঙ্গে সমাধা করে (বইয়ের সমস্যাটির সঙ্গে সিনেমার সমস্যাটির মিল নেই) পোয়্যারো লন্ডনে ফিরছেন, ইচ্ছে ফেরার আগে ইস্তানবুলে ক’টা দিন বিশ্রাম নিয়ে যান। কিন্তু খবর আসে, আরেকটি রহস্য সমাধানের জন্য পোয়্যারোকে অবিলম্বে লন্ডনে ফিরতে হবে। ট্রেন কোম্পানির কর্তা মঁসিয়র বুকের ভাইপোর (ইনিও মঁসিওর বুক, যদিও বইয়ে এই ভূমিকায় সিনিয়র মঁসিয়র বুকই ছিলেন) সহৃদয়তায় টইটম্বুর ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের ক্যালে কোচে পোয়্যারোর একটি সিটের বন্দোবস্ত হয়। যাত্রার শুরুতেই স্যামুয়েল র‍্যাচেট নামের একজন অ্যামেরিকান বড়লোক পোয়্যারোকে নিজের ‘বডিগার্ড’ হিসেবে নিযুক্ত করতে চান, বলেন কেউ বা কারা তাকে হুমকি চিঠি পাঠিয়ে খুন করতে চাইছে। পোয়্যারো ‘না’ করে দেন। সেই রাতেই র‍্যাচেট নৃশংসভাবে খুন হন, আর তুষারঝড়ে ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস আটকা পড়ে যায়। মঁসিওর বুকের ভাইপো পোয়্যারোর হাতে পায়ে পড়ে খুনিকে ধরে দেওয়ার অনুরোধ করেন, না হলে কোম্পানির বড়বাবু হিসেবে তাঁর একেবারে নাককাটা যাবে।

'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' আগাথা ক্রিস্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখা, প্লটের অভিনবত্বের জন্য তো বটেই, কিন্তু সে অভিনবত্ব তো ক্রিস্টির সব বইতেই কমন। মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' স্পেশাল এই জন্য যে এই বইতেই ঠিক আর ভুল, ন্যায় এবং অন্যায়, শাস্তি এবং ক্ষমার মাঝামাঝির ধোঁয়াটে জায়গাটা হারক্যুল পোয়্যারোর কাছে প্রথম প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়। টিভি সিনেমার পরিচালক প্রযোজকদের কাছে এই গল্প তাই চিরকালই লোভনীয়। সিনেমার পর্দায় উনিশশো চুয়াত্তরে সিডনি লুমের পরিচালনায় 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস'-এ পোয়্যারোর ভূমিকায় ছিলেন অ্যালবার্ট ফিনি। এই ছবিতেই একটি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ইনগ্রিড বার্গম্যান সেরা সহঅভিনেত্রীর অস্কার জিতেছিলেন। টিভির পর্দায় দুহাজার দশ সালে ডেভিড সুশে ছাড়াও 'মার্ডার ইন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস'-এ পোয়্যারোর ভূমিকায় নেমেছিলেন আলফ্রেড মলিনা, দুহাজার এক সালে।

দু'হাজার সতেরোর 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' পরিচালনা করেছেন কেনেথ ব্রানা, পোয়্যারোর ভূমিকাতেও তিনিই অভিনয়ও করেছেন। র‍্যাচেটের ভূমিকায় জনি ডেপ, গ্রেটা অলসন (যে ভূমিকায় অভিনয় করে ইংগমার বার্গম্যান অস্কার পেয়েছিলেন) চরিত্রের নাম বদলে হয়ে গেছে পিলার এস্ত্রাভাদোস (এই চরিত্রের নাম নেওয়া হয়েছে 'হারক্যুল পোয়্যারো’স ক্রিসমাস' বই থেকে), অভিনয় করেছেন পেনেলোপি ক্রুজ, প্রিন্সেস দ্রাগোমিরফের ভূমিকায় আছেন ডেম জুডি ডেঞ্চ। দু’চারটে চরিত্র এবং তাদের ভূমিকা অদলবদল করা হয়েছে। কর্নেল আরবাথনট আর ডাক্তার মিলিয়ে তৈরি হয়েছেন ডাক্তার আরবাথনট, গল্পে ডাক্তারের ভূমিকাও বদলেছে। এ ছাড়া গল্পের কাঠামো তেমন কিছু বদলায়নি।

বদলেছে গল্পের ফোকাস। 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস'-এ থিম (ন্যায়অন্যায় ঠিকবেঠিকের সংজ্ঞায়ন) জরুরি, কিন্তু ক্রিস্টির বাকি সব গল্পের মতোই প্লট আরও জরুরি। ব্রানার 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' প্লট প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মেনেছে, বইয়ের প্রতিটি ক্লু, রেড হেরিং আছে সিনেমাতেও, কিন্তু সেগুলোকে যথেষ্ট খেলিয়ে ব্যবহার করা হয়নি, তাদের পেছনে যথেষ্ট সময় খরচ করা হয়নি। সম্ভবত এই ভেবে যে এত চেনা গল্পে কী হবে, কেন হবে, কী করে হবে এসব সবাই জানে, কাজেই সে সবের গভীরে না গেলেও চলবে। তার থেকে বরং পোয়্যারোর দোলাচল, অন্যান্য চরিত্রদের অন্তর্লীন টানাপোড়েনে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। কথাটা সত্যি, কিন্তু আরও সত্যি কথাটা হচ্ছে, ওই ক্লুয়ের লেজ ধরে ধরে, রেড হেরিংয়ের পিছু নিয়ে পথ ভুল করে আবার ঠিক পথে ফিরে আসার খেলাটা বাদ দিলে গোয়েন্দাগল্পের পনেরো আনা মজা মাটি।

সামান্য বদল এসেছে পোয়্যারোর চরিত্রেও। আগাথা ক্রিস্টির পোয়্যারো দৌড়োদৌড়ি তো দূরে থাক, জুতোর পালিশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বাড়ি থেকে বেরোন না, গুলিগোলা মারাত্মক অপছন্দ করেন। সেই পোয়্যারো বিপজ্জনক ব্রিজ বেয়ে অপরাধীকে ধাওয়া করছেন, হাতে গুলি খেয়ে টসকাচ্ছেন না। বিশ্বাস করা শক্ত। তবে এসব বদলে আমার আপত্তি নেই। এর থেকে ঢের আপত্তিজনক ব্যাখ্যা এর আগে হয়েছে (পিটার উস্তিনভ, অ্যালবার্ট ফিনি, আলফ্রেড মলিনা) যেখানে পোয়্যারো রীতিমত ভাঁড়ে রূপান্তরিত হয়েছেন। সে সব দেখে রাগ হয়েছিল খুব, কিন্তু ক্রমে বুঝেছি এইরকম আইকনিক চরিত্রের বিভিন্ন ব্যাখ্যা হবেই। না হলেই অদ্ভুত হত। 

আমার 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' ভালো লেগেছে । বরফঢাকা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ট্রেন যাওয়ার দৃশ্য ভালো লেগেছে, অভিনয় ভালো লেগেছে, মূল গল্পের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকার সিদ্ধান্ত ভালো লেগেছে। তবে ভালো যে লাগবে জানাই ছিল।


December 09, 2017

কয়েকটা লিংক ও চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের হুইলার্স স্টল






The best things in life happen to you when you’re alone. 
                                                                         —Agnes Martin


দ্য অরিজিন্যাল গন গার্ল। 

গত বছরে শেখা ৫২টি তথ্যের এই তালিকাটি ইন্টারেস্টিং। ভারতসংক্রান্ত যে তথ্যটি লেখক জেনেছেন সেটা হল,
  1. Unscrupulous mobile phone recharging stations in Uttar Pradesh, India, are selling the phone numbers of female customers to male customers, who use them to harass the women. Numbers cost from Rs 50 (60p) to Rs 500 (£6) depending on how attractive the victim is. [Snigdha Poonam]

এই সোজা কথাটা মনে রাখা শক্ত। দ্য আদার সাইড ইজ নট ডাম্ব।


গাছ পোঁতা হয়েছে, একশো বছর পরে তাদের কেটে কাগজ হবে, সেই দিয়ে বই হবে। হতে পারে অভিনব ব্যাপার, তবে আমার খবরটা শুনে মনখারাপ হল, এ যেন বলির আগে পাঁঠাকে কাঁঠালপাতা খাওয়ানো। 

ডাইনোসরের প্রতি আমার ভালোবাসা আছে (মুখোমুখি আমি পড়তে চাই না যদিও,) তাই যখন জানলাম এমন উড়ুক্কু প্রাণীর খোঁজ পাওয়া গেছে যাদের খাদ্য ছিল শিশু ডাইনোসর, আমার মোটেই ভালো লাগল না।

এই লিংকটা খুললে আপনারাও ডাইনোসরকে ভালো না বেসে পারবেন না।


এই পাঠপ্রতিক্রিয়াগুলো আগেও পড়েছেন অবান্তরে, কিন্তু আমার এবছরের প্রিয় তিনটি বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া বেরিয়েছে এ মাসের চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের হুইলার্স স্টলে। 

December 07, 2017

গত সপ্তাহে



আমি তৈরি হয়েই গিয়েছিলাম। গেট খুলতে খুলতে বারান্দাটা দেখব, যে বারান্দায় বসে বসে ঠাকুমা মশা মারতেন, দু’পাশের বাগান দেখব, ঠাকুমার লাগানো, যত্ন করা গাছে ভরা বারান্দা পেরিয়ে সদর ঘর দেখব, ঘরের তক্তপোশে আমি আর ঠাকুমা শুয়ে থাকতাম পাশপাশি, বাঁয়ে বেঁকে অযৌক্তিক বারান্দাটা পেরিয়ে আলনা দেখব আর আলনার পাশে পর্দা সরিয়ে ঠাকুমার ঘর দেখব। এ ঘরের বিছানায় গত পাঁচ বছর ধরে ঠাকুমা শুয়ে ছিলেন। শুয়ে শুয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও অনেকক্ষণ তাঁর কাছে না গেলে আমাকে ‘সোনা সোনা’ বলে ডেকেছেন। ওই ঘরের জানালার শিকের মধ্য দিয়ে বিশ্বের খবর নিয়েছেন এবং দিয়েছেন। 

আমি তৈরি ছিলাম এসব দেখলেই আমার চোখে জল আসবে।

যেটার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না (যদিও থাকা উচিত ছিল) সেটা হচ্ছে ওই বাড়িতে এখন অন্তত দশজন লোক বাড়তি থাকবেন। আরও জনা দশেক রোজ আসাযাওয়া করবেন। ঠাকুমার খাট দেওয়ালের দিকে ঠেলে দিয়ে মেঝেতে ঢালাও বিছানা পাতা হবে। তেরোদিনের জন্য যাঁদের খাটে শোওয়া বারণ হয়ে গেছে তাঁরা তো মাটিতে শোবেনই, যাদের বারণ নয় তারাও কমরেডারি দেখিয়ে বেতো হাঁটু নিয়ে এই ডিসেম্বরের শীতে মেঝেতে শয্যা পাতবেন। আতপচালের ফেনাভাত আর সাবুমাখার মহোৎসব চলবে। (শেষদিন সেজকাকু বলেছেন, ‘এই শেষ, আর লাইফে সাবু মুখে তুলব না, বাপ রে বাপ রে বাপ।’ )

যেটার জন্য আমার তৈরি থাকা উচিত ছিল সেটা হচ্ছে বাড়ি গেলে শোক করার মতো ফুরসৎই থাকবে না আমার।

ভালোই হয়েছে না থেকে। আমার তো শখের শোক, আমার বাবামার না হলে বড্ড কষ্ট হত।

*****

আমার শোকের অনুপস্থিতির জন্য দায়ী আরও একটা ফ্যাক্টরের কথা আমি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম, সেটা হচ্ছে দুজন মানুষের উপস্থিতি। তাদের ছবি আগের পোস্টেও দেখিয়েছি আপনাদের, আবার দেখাচ্ছি। 


মাঝের জন্য হচ্ছেন মনা। আর ডানের জন্য টুনা। এ দুজন যথাক্রমে আমার জেঠতুতো দিদি এবং বোন। তিনে মিলে আমরা মনাসোনাটুনা। মনাদিদি ভীষণ ভালো গল্প করতে পারে, তেতোচচ্চড়ি খাইয়ে মাংস ভুলিয়ে দিতে পারে, একবার চোখ বড় করে তাকিয়ে অতি বাঁদর বাচ্চাকে শান্ত করতে পারে, কিন্তু আস্তে হাসতে পারে না। 

টুনার জীবনের সবথেকে বড় আফসোস, ওর আশেপাশে সবার চশমা আছে, খালি টুনার নেই। ছোটবেলায় বাবামায়ের সঙ্গে দুয়েকবার ডাক্তারখানায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, বড় বয়সে টুনা মরিয়া হয়ে নিজেই ডাক্তারখানায় গেছে এবং চোখে আবছা দেখার কাল্পনিক কমপ্লেন করেছে। বলেছে, ‘ভালো করে দেখুন না ডাক্তারবাবু, যদি খুঁজেটুজে একটুখানি পাওয়ার পাওয়া যায়।’ ডাক্তার বলেছেন, ‘অসম্ভব। এত স্বাস্থ্যবান চোখ আমি লাইফে কমই দেখেছি।’ এখন টুনার একমাত্র আশা বুড়ো হওয়া। তবে যদি চশমা পাওয়া যায়।

মনাটুনা এসে পড়ার পর আমার শোকের যেটুকু সম্ভাবনা ছিল তাও আর রইল না। নেমন্তন্ন বাড়িতে গল্প করার মতো জিনিসের অভাব থাকে না। ব্যান্ডের গান থেকে শুরু করে ফিল্মের হিরোহিরোইন পর্যন্ত আমাদের পছন্দঅপছন্দ মোটামুটি একইরকম, আত্মীয়স্বজনের ক্ষেত্রেও বিশেষ অমিল নেই। অর্থাৎ যাকে পছন্দ তাকে তিনজনেরই পছন্দ, যাকে দেখলে গা জ্বলে তাকে দেখলে তিনজনেরই গা জ্বলে। গায়ের দোষ নেই, কিছু কিছু লোকের স্বভাবই ওই রকম। কাকে কী জিজ্ঞাসা করলে বিব্রত হতে পারে বুঝে নিয়ে তাকে ঠিক সেই প্রশ্নটা করে। আমাদের তিনজনকেই সেরকম প্রশ্ন করার পর আমরা প্রতিশোধ নেওয়া ঠিক করলাম। গাজ্বলার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যাকে দেখলে গা জ্বলে, তার সবকিছু দেখলেই গা জ্বলে, এমনকি বেগুনভাজা খাওয়ার রকম দেখলেও। 

প্রথমে যখন হাসির হররা ওঠে সবাই আঁতকে ওঠে। শ্রাদ্ধবাড়িতে এত জোরে হাসতে নেই, নিমন্ত্রিতরা কী বলবে? আর মনাদিদির হাসি তো তিনটে বাড়ির পরের লোকেরাও শুনতে পাচ্ছে। মাজেঠি রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে মুখ চেপে ধরার চেষ্টা করেন। তারপর আশেপাশের ঘরে যারা ভয়ানক গম্ভীর মুখ করে বসে ছিল তারা গুটি গুটি আমাদের ঘরে এসে ভিড় জমায়। গোল বড় হয়, খাটে তিলধারণের জায়গা থাকে না, সবাই ঝুলি ঝেড়ে মজার গল্প বার করে। সবাই জোরে জোরে হাসে।

সন্ধ্যেবেলা বাইরের লোকেরা চলে গেলে, ঠাকুমার ঘরে বড়দের আড্ডা বসে। আমরা এ ঘর থেকে শুনতে পাই মা বহুদিন বাদে গান গাইছেন। পিসিরা গলা মিলিয়েছে।

*****

অনুষ্ঠানবাড়ির অন্যতম কঠিন ব্যাপার হচ্ছে লোক চেনা। একতুতো, দুইতুতো, তিনতুতো কাকা জেঠু, পিসে, কারও কারও মুখ মনে আছে, কাউকে কোনওদিন দেখেছি কি না সন্দেহ। আমার তিনতুতো ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে জীবনে দু’বার, নাম ভুলে গেছি। কান খাড়া করে ঘুরছি, যদি কেউ নাম ধরে ডাকে, শুনে নেব। কেউ ডাকল না, তখন দায়িত্বজ্ঞানহীন ননদের মতো স্বীকার করতেই হল, ‘তোমার নামটা বল না, ভুলে গেছি।’

পাড়ার লোকদের আমি একসময় সবাইকে চিনতাম, এখন সেখানেও হয়েছে মুশকিল, বুড়োদের চিনতে পারছি, জোয়ানদের পারছি না। পারব কী করে? এদের আমি দেখেছি কাউকে হামা দিতে, কাউকে হাতে হাওয়াই চটি পরে দৌড়তে। তারা এখন সব বরবউ সহযোগে উপস্থিত হয়েছে। আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে, ‘চিনতে পারছ? বল তো আমি কে?’ 

অত ভিড়ের বাড়িতে অবশ্য সবাইকে না চিনলেও পার পেয়ে যাওয়া যায়। ‘ভালো করে খাবেন, লজ্জা করবেন না, যা লাগে চেয়ে নেবেন’ বলতে গেলে নামধাম না জানলেও চলে। বা সদ্য কেউ বাড়িতে ঢুকলে, ‘আসতে বেশি কষ্ট হয়নি তো’ ইত্যাদি বলতেও ট্যাক্স লাগে না। কিন্তু মা এই করতে গিয়েই বিপদে পড়েছেন, একটা ফর্সা গম্ভীর মতো ছেলেকে যেই না জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘আপনাদের আসতে কতক্ষণ লাগল?’ সে ছেলে একগাল হেসে বলেছে, ‘দেড় মিনিট, জেঠিমা।’ তারপর বেরোলো সে বুম্বা, আমাদের তিনটে বাড়ি পরের বণিকদের বাড়ির ছেলে।

তবে লোক চেনার থেকেও শক্ত কাজ হচ্ছে চা করা। আমার মতে অনুষ্ঠানবাড়ির সবথেকে শক্ত কাজ। আজকাল আবার সবার প্যাকনা, কেউ দুধ দিয়ে খায়, কেউ না দিয়ে, কেউ আধকাপ খাবে, কেউ দুই-তৃতীয়াংশের একচুমুক বেশি খেলেই পেট ফেটে মরে যাবে। আর ওয়ার্স্ট যারা তারা জিজ্ঞাসা করতে বলবে, ‘আমার কোনও ঝামেলা নাই, যা দিবা দাও।’ তারপর লিকার চা দেখে বলবেন, ‘ইস, কালাকালা চা খাই না।’ দুধ দেওয়া চা নিয়ে এলে চুমুক দিয়ে মুখব্যাদান করে বলবে, ‘চিনি ছাড়া কর নাই? না করলে অসুবিধা নাই। এই দিয়া কাম চালায়া নিমু।’ 

‘তাই নিন বরং,’ বলার মতো স্মার্ট আমার মা বা জেঠি কেউই নন, কাজেই তৃতীয়বার চা আসে।

এর ওপর যদি চায়ের কাপ ধুতে হয় তাহলেই হয়েছে। মৎস্যমুখী/নিয়মভঙ্গের দিন সকালে আবিষ্কার করা হল কাগজের কাপ শেষ, একজনকে দিয়ে আনানো হয়েছিল, সে ভয়ানক ছোট কাপ নিয়ে এসেছে, তাতে লোককে চা দিলে একেবারে নাককাটা। মা আমাকে একপাশে ডেকে চুপি চুপি বললেন, ‘বাজারে গিয়ে কাপ এনে দে সোনা।’ আমি বললাম, ‘অফ কোর্স।’ তারপর কুটকুটে সবুজ রঙের বমকাই পরে সকাল সাড়ে ন’টার সময় টোটো চেপে গেলাম কাপ কিনতে। 

ভাগ্যিস গেলাম। ওই সময়ের রিষড়া স্টেশন দেখিনি আমি বহু বহু বছর। একই রকম গোলমেলে, তবে লোক আরও বেশি। দোকানের মাথার বোর্ড আরও চকচকে। অনেক চেনা দোকান নেই। কোনওটা ভেঙে তিনখানা দোকান হয়েছে। যে দোকানগুলোকে আমার ছোটবেলায় প্রকাণ্ড মনে হত, যত দিন যাচ্ছে তত তারা চিলতে থেকে চিলতেতর প্রতিভাত হচ্ছে। দোকানের ভেতরের শিশিবয়ামের ওপাশে বসে থাকা মুখ বেশিরভাগই বদলে গেছে, তবে কাউকে কাউকে এখনও চেনা যায়। 

আমার বন্ধুর বাবার দশকর্মা ভাণ্ডার থেকে কাপ কিনলাম। কাকু চিনতে পেরেছেন আমাকে। 

*****

দুঃখ হল বাড়িটা যখন ফাঁকা হয়ে গেল। সবাই চলে গেলে, একজনের না থাকা প্রকট হয়ে ওঠে। মাবাবা প্ল্যান করেন, ‘তুমি সামনের দিকে শোবে, আমি পেছন দিকে শোব, তাহলে বাড়ির দুদিকেই নজর রাখা যাবে।’ আমার খাটের সঙ্গে মিশে যাওয়া ঠাকুমা যে বাড়ি পাহারা দেওয়ার কাজে লাগছিলেন এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে? চলে যাওয়ার আগে গৌরীপিসি খেতে বসে গ্রাস তুলতে পারে না। মামি মরে গেলে কি মামাবাড়ি ফুরিয়ে যায়? তপাকাকুর গাড়িতে উঠে পড়ে মনে হয়, এইবার সত্যি সত্যি সব ফুরোলো। ঠাকুমার ঘরের জানালাটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলি, ‘চললাম, ঠাকুমা। টা টা।’ 

*****

জি টি রোডে অবরোধ হয়েছিল। ভেতর দিয়ে অনেক ঘুরে আসতে হল। ভেতরের গলি এমনিতেই সরু, তার মধ্যে দুদিকে সবজি, ফলের ঠেলাগাড়ি, দোকানের সামনে হেলান দেওয়া বাইক, দুদিক থেকে আসা এস ইউ ভি। এইসব সময় বোঝা যায়, মফস্বলের অধিকাংশ লোকই স্বভাবগত ভাবে ট্রাফিক পুলিস। বাড়ির ছাদ থেকে, বারান্দা থেকে কত যে ডাইনে কাটাও, বাঁয়ে কাটাও,’ শোনা গেল। এমনকি রাস্তার পাশের দশফুট বাই দশফুট খুপরির সামনে হামা দেওয়া খোকাখুকু পর্যন্ত কাজলটানা চোখ পাকিয়ে ‘কাতাও কাতাও’ করছে। কপাল ভালো জ্যাম ছাড়ল আর আমরা অবরোধের লোকেশন পার করে জি টি রোডে এসে পড়লাম। তখনই দেখলাম মেরুনসবুজ আর লালহলুদ পতাকায় মোড়া টেম্পো আর প্রাইভেট গাড়িগুলোকে। ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের ম্যাচ আছে যুবভারতীতে। নিজের নিজের দলকে সমর্থন করার জন্য গাড়ি ভাড়া করে, ঠাসাঠাসি হয়ে চলেছে দুই দলের সমর্থকেরা। মাইকে চিৎকার করতে করতে, স্লোগান দিতে দিতে,  মুখে এবং হস্তমুদ্রায় যৌন নিগ্রহের আস্ফালন করতে করতে বাংলার যুবসমাজ মহান ঐতিহ্যরক্ষায় চলেছে।

*****

প্লেনে আমার পাশে যে বসেছিল সে আকারে মানুষের বাচ্চার মতোই, প্রকারে ল্যাজকাটা বাঁদর। দুরন্ত বাচ্চাদের আমি ভয় পাই এবং পারতপক্ষে ঘাঁটাই না। মুখ গম্ভীর করে প্রাণপণে ভগবানকে ডাকি যেন তারাও আমাকে না ঘাঁটায়। এর সঙ্গেও সারা রাস্তা আমি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারের কোনও চেষ্টা করিনি। নিজের কাজ করেছি, সামনের সপ্তাহের টু ডু লিস্ট বানিয়েছি, গো এয়ারের মেনু মুখস্থ করেছি, আর ফ্লাইট ম্যাগাজিন দেখে পরের বেড়াতে যাওয়ার আইডিয়া সংগ্রহ করেছি। 

শেষটা যখন ল্যান্ডিং হচ্ছে তখন শুরু হল চিৎকার। ‘মাম্মি মেরে কান মে দর্দ হো রহা হ্যায়! পাপা মেরে কান মে দর্দ হো রহা হ্যায়!’ মাম্মি পাপা যথাসম্ভব চেষ্টা করলেন তার কানের দর্দ থামাতে, একখানা কোক কেনা হয়েছিল কিছুক্ষণ আগে সেই খেতে দিলেন, নাকমুখ বন্ধ করে বসতে বললেন, কর্তৃপক্ষকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন লজেন্সটফি কিছু পাওয়া যাবে কি না, তাতে সে কানের ব্যথা ভুলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ম্যাংগো বাইট!’ ম্যাংগো বাইট পাওয়া গেল না।

তখন সে হাল ছেড়ে চুপ করল। মিনিটখানেক পর কোমরের কাছে একটা খোঁচা খেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি জন্য ছোট একখানা মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

‘আপকে কান মে ভি দর্দ হো রহা হ্যায়, আন্টি?’

আমি মাথা নেড়ে বললাম, না।

সে মায়ের দিকে ফিরে করুণ গলায় বলল, ‘কিসিকে কান মে দর্দ নহি হো রহা হ্যায়, সির্ফ মেরে কান মে কিঁউ হো রহা হ্যায়?’

আর আমি মাটিতে মিশে গেলাম। ছি ছি ছি। কী ক্ষতি হত আমার যদি বলতাম, আমি কানের ব্যাথায় মরে যাচ্ছি? সত্যভাষণের রোগ কি অবশেষে আমাকে ধরে ফেলল? এইসব ভেবে ভেবে মরমে মরছি, এমন সময় প্লেন ল্যান্ড করল। কানের ব্যথাও কমল সম্ভবত কারণ সে আমাকে দ্বিতীয় প্রশ্নটা করল। 

‘আপ দিল্লি মে রহতে হো?’

আমার উত্তর শুনে চোখ কপালে তুলে বলল, ‘ম্যায় ভি দিল্লি মে রহতা হুঁ।’ যেন এরকম আশ্চর্য সমাপতন ওর বছরপাঁচেকের জীবনে আগে ঘটেনি।

আমি প্রায়শ্চিত্তের জন্য মুখিয়ে ছিলাম, হাত তুলে বললাম, ‘ফির হো যায়ে এক হাই ফাইভ?’ 

চটাস করে হাই ফাইভ এসে পড়ল আমার হাতে।


December 03, 2017

এখনতখন



ঘণ্টাখানেক হল ঘরে ঢুকেছি। সবাইকে ফোন করে নিশ্চিন্ত করে, হাতপা ধুয়ে, জামা ছেড়ে, টিভি চালিয়ে, কেটলিতে জল বসানো হয়ে গেছে। অবান্তরে চারখানা পোস্ট লেখার মতো কথা জমেছে গত চারদিনে। সে সব কথা, মনে হওয়া, মনে পড়া, মাথার ভেতর জট পাকিয়ে, বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে রয়েছে এখন। তাদের ঝেড়েবেছে বাক্যে প্যারাগ্রাফে সাজাতে সময় লাগবে, হয়তো সাজানো হবেও না। তাই আপাতত চট করে এই কয়েকটা ছবি দেখিয়ে নিই আপনাদের। আপনারা সবাই ভালো আছেন আশা করি। শিগগিরই আগের ছন্দে দেখা হচ্ছে।











November 26, 2017

দ্য অয়েন্টমেন্ট



২০শে নভেম্বর, ২০১৭ র সকাল সাতটা তিন মিনিটে ঠাকুমা মারা গেলেন। আমি ঠাকুমার কাছে ছিলাম না। এমন দূরত্বেও ছিলাম না যে চট করে চলে আসতে পারি। কাজেই আমাকে বাবামা খবরটা তৎক্ষণাৎ জানাননি। পাছে আমার বিপদ হয়। পাছে আমি অতদূরে একলা ভেঙে পড়ি। আমি খবর পেয়েছি বাড়ি ঢুকে, অর্চিষ্মানের মুখে, সব চুকেবুকে যাওয়ার পর। 

মৃত্যুর সময় ঠাকুমার কাছে আমার বাবা ছিলেন, মা ছিলেন, আর বিজলিদি ছিল। গত কয়েকবছরে আমার ঠাকুমার সবথেকে কাছের তিনজন মানুষ। ঠাকুমা বিছানাবন্দী ছিলেন অনেক বছর। শেষদিকে সাড়া কমে এসেছিল, ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, ‘মাল্টিঅর্গ্যান ফেলিওর’ শুরু হয়েছে। অতিকষ্টে দুয়েকটা কথা বলতেন, কিন্তু চেতনা টনটনে ছিল, যেটুকু বলতেন নিখুঁত বলতেন। ছোটদাদু দিদা দেখতে এসেছিলেন, প্রথমটা চিনতে পারেননি। দৃষ্টিশক্তি ধীর হয়ে এসেছিল। ঠাকুমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়াতে পেরেছিলেন। স্মৃতি অদ্ভুতভাবে কাজ করে। জ্যান্ত লোককে চিনতে পারছেন না, অথচ কবে মরে যাওয়া তাঁর ছোটমাসির নাম জিজ্ঞাসা করাতে মুহূর্তের মধ্যে বলে উঠেছিলেন, ‘কুট্টিমাসি’। ছোটদাদু কম মৃত্যু দেখেননি তাঁর জীবনে। বলে গিয়েছিলেন বাবাকে, এখন আর বেড়াতে যেয়ো না কোথাও। 

সপ্তাহখানেক ধরে ঠাকুমার খারাপ শরীর আরও খারাপ হয়েছিল। কী একটা ইনফেকশন হয়েছিল, গালের কাছটা ফুলে গিয়ে ধুম জ্বর এসেছিল। ডাক্তারবাবু বদলে বদলে ওষুধ দিচ্ছিলেন, তাতে কাজও দিচ্ছিল। গালের ফোলাটা কমল, জ্বর নামল। সবাই ভাবল আবার সামলে নিলেন ঠাকুমা। গত প্রায় দশ বছর ধরে এই রকম সব ঝড় সামলে নিচ্ছেন ঠাকুমা। স্ট্রোক, মাথার অপারেশন, হ্যানাত্যানা। উনিশ তারিখেও একটা নতুন ওষুধ লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু, সন্ধ্যেবেলায় হাঁটতে বেরিয়ে ওষুধটা কিনে এনেছিলেন বাবামা, খাওয়ানোও হয়েছিল।

কুড়ি তারিখ সকালে মা এসে ঠাকুমার লেপ সরিয়ে শীতের জামা পরাতে গিয়ে দেখেছিলেন, কী রোগা হয়ে গেছেন ঠাকুমা। শরীরটা শুধু একটা খাঁচা। রোজই দেখছেন, কিন্তু সেদিন মায়ের নতুন করে দুঃখ হয়েছিল। মনে হয়েছিল, ঠাকুমার কত কষ্ট হচ্ছে। বিজলিদি ঠাকুমাকে দাঁত মাজিয়ে, চুল আঁচড়িয়ে দেওয়ার পর চা খেতে বসা হত সবাই মিলে। এই পর্যন্ত অন্যদিনের মতোই চলছিল, বিজলিদি ঠাকুমার দেখভাল করছিল, মা রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় ব্যতিক্রম ঘটল। বিজলিদি ডাকল, ‘বৌদি, শিগগিরি আসুন।’ মা ছাঁকনি ফেলে ঠাকুমার ঘরের পর্দা তুলে একঝলক দেখে বাবাকে দৌড়ে গিয়ে বললেন, ‘শিগগির এসো।’ বাবা এসে বসলেন ঠাকুমার পাশে। ঠাকুমার শ্বাস তখন গভীর এবং ধীর। বিজলিদির মাথা বরফের মতো ঠাণ্ডা, ঠাকুমার খাটের পাশের টেবিলে রাখা জলের ঘটি এনে দিল বাবার হাতে। বাবা এক চামচ জল দিলেন ঠাকুমার মুখে। জল ঠোঁটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল। মা ঠাকুমার মাথা তুলে ধরলেন, কিন্তু ততক্ষণে আরেকটা কথা মায়ের মনে পড়ে গেছে। ঠাকুরের আসনে দু’টো গঙ্গাজলের দুটো পাত্র রাখা আছে আমাদের। একটায় রিষড়ার গঙ্গার জল, অন্যটায় হরিদ্বারের। হরিদ্বারের গঙ্গার জল আনার পর সেই দিয়েই খুব পুজোটুজো হচ্ছিল, যতদিন না ঠাকুমা বললেন, রিষড়ার গঙ্গার জলেই ঠাকুর তুষ্ট হবেন এখন, হরিদ্বারের গঙ্গার জল বরং বাঁচিয়ে রাখ আমার জন্য। তখন ঠাট্টা বলেই ধরেছিল সবাই, কিন্তু ওই মুহূর্তে সবই ভয়ানক সিরিয়াস। ঠাকুমার মাথার নিচে শাল গুঁজে দিয়ে মা দৌড়লেন ঠাকুরের আসন থেকে ঠাকুরকে বঞ্চিত করে ঠাকুমার জন্য তুলে রাখা সেই জল আনতে। একেক চামচ সেই জল বাবা, মা, বিজলিদির হাত থেকে বিনা প্রতিবাদে ঢকঢক করে গিলে নিলেন ঠাকুমা, আর তাঁর চোখের পাতা দুটো স্লো মোশনে বুজে এল। যেন ভীষণ ঘুম পেয়েছে।

ডাক্তারবাবু এলেন। তেত্রিশ বছর আগে আমার ঠাকুরদা মারা যাওয়ার  সময় এই ডাক্তারবাবু সবে পাশ করে পাড়ায় চেম্বার খুলে বসেছিলেন, ঠাকুরদা বন্ধুবান্ধবের কাছে সুখ্যাতি শুনেছিলেন, খুব শখ ছিল তরুণ ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে তবে মরবেন। ঠাকুরদার সাধ মিটেছিল। সেই আমাদের বাড়িতে ডাক্তারবাবুর যাতায়াত শুরু। তেত্রিশ বছর পর, সেই ডাক্তারবাবু, এখন যাঁর চুলে পাক, চোখে চশমা, আমার ঠাকুমার ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিলেন। 

আত্মীয়স্বজন এল, তারও আগে এল পাড়ার লোক। ঠাকুমা যাঁদের সঙ্গে বসে বারান্দায় গল্পের আসর বসিয়েছেন, রাত তিনটে থেকে জেগে থেকে নিজের বাড়ির সঙ্গে যেচে যাঁদের বাড়ির ফুলগাছ পাহারা দিয়েছেন, সবাই। জেঠু, জেঠি, রত্মাকাকিমা, অমিতকাকু, শ্যামলকাকু, রাজুদা, টুকাইদা, বুচিদিদি, বুবুন। হরিবোল বলে ঠাকুমার খাট গাড়িতে তুলে দিল সবাই। আমার বাবাকাকাজেঠু তো গেলেনই, পাড়ার সবাই যারা একে অপরের বাড়ির শ্মশানবন্ধু হয়ে এসেছে বছরের পর বছর, তারাও সঙ্গে গেল। 

*****

শোক সর্বদাই স্বার্থপর। ঠাকুমার জন্য আমার যত না শোক, ঠাকুমা চলে যাওয়ার পরের আমার জন্য আমার শোক তার থেকে অনেক বেশি। মোটে একটাই জীবন বাঁচছি, কাজেই বেঁচে থাকায় আমি এক্সপার্ট নই। বেঁচে থাকতে গেলে কী কী লাগে আমি জানি না। টাকা লাগে, জামাকাপড় লাগে, প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি, এবং প্রশংসা লাগে। কার কতটা করে লাগবে তারও তারতম্য আছে, কোনও বাঁধাধরা নিয়ম নেই।

তবে যা বুঝেছি, বাঁচতে গেলে ভালোবাসার লোক লাগেই। এমন লোক যারা আমাকে ভালোবাসবে। কোনও প্রশ্ন না করে ভালোবাসবে। আমি যেমন ঠিক তেমন করে আমাকে ভালোবাসবে। আর সে রকম ভালোবাসা কেমন হয়, কাকে বলে তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন আমার ঠাকুমা। 

জীবন থেকে হঠাৎ অতখানি ভালোবাসা উধাও হওয়ার ক্ষতি হিসেব করছি আমি এখন বসে বসে। শেষবার গিয়ে ঠাকুমার গালে গাল, ঠাকুমার আঙুলে আঙুল জড়ানোর ছোঁয়াটা মনে করার চেষ্টা করছি। অপেক্ষা করছি, কখন সময় এই ক্ষতি পূরণ না করলেও, অন্তত ভুলিয়ে দেবে।

ডেথ ইজ নট দ্য ফ্লাই ইন দ্য অয়েন্টমেন্ট। ইট ইজ দ্য অয়েন্টমেন্ট। পড়লাম ক’দিন আগেই। ক’দিনের জীবন কাটিয়ে আমার ঠাকুমা সেই মৃত্যুময় জগতে ফিরে গেছেন। আমিও যাব একদিন। যদিও আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ঠাকুমা ততদিন বসে থাকবেন, তা ধরে নেওয়ার মতো নিষ্পাপ বিশ্বাস আমার আর নেই। শুধু গত সাঁইত্রিশ বছরের ঠাকুমাকে কাছে পাওয়াটুকু রইল। থাকবেও।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.