April 23, 2017

এ মাসের বই/ এপ্রিল ২০১৭/ ১



We/Yevgeny Zamyatin




উৎস গুগল ইমেজেস


জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইটি ফোর’ যাঁরা পড়েছেন আর Yevgeny Zamyatin-এর ‘উই’ যাঁরা পড়েননি, খুব সহজেই তাঁদের সঙ্গে দ্বিতীয় বইটির পরিচয় করানো যায়। দুটি বইয়ের চরিত্র, ঘটনাবলী, ক্লাইম্যাক্স অবিকল এক। 

Yevgeny Zamyatin-এর ‘উই’ লেখা হয়েছিল অরওয়েলের নাইনটিন এইটি ফোর লেখা হওয়ার পঁচিশ বছর আগে। হয়তো দৈববলে দুই লেখকের মগজে একই প্লট, একই চরিত্রেরা হাজির হয়েছিল? হয়তো জর্জ অরওয়েল ‘উই’-এর কথা জানতেনই না? এই সম্ভাবনা শূন্য, কারণ উনিশশো ছেচল্লিশে, নাইনটিন এইটি ফোর প্রকাশের তিন বছর আগে অরওয়েল ‘উই’ উপন্যাসের একটি সমালোচনা লেখেন “ট্রিবিউন” পত্রিকায়। 

‘উই’ উপন্যাসের ঘটনা ঘটছে ভবিষ্যতের কোনও একটি সময়ে। এক হাজার বছর আগে এক দীর্ঘ সংগ্রামের পৃথিবী অ্যামেরিকার অধীনতা স্বীকার করেছে, এখন গোটা পৃথিবীটাই ওয়ান স্টেট এবং সেই স্টেটটি হল অ্যামেরিকা। উইনস্টন স্মিথ-এর বদলে 'উই'-এ আমাদের বক্তা ডি- ৫০৩। মিনিস্ট্রি অফ ট্রুথ-এ ইতিহাস সংশোধনের বদলে ডি ৫০৩-এর কাজ হল স্পেসশিপ বানানো। ‘ইনটিগ্র্যাল’ নামের মহাকাশযান বানানোর প্রোজেক্টের তিনি চিফ ইঞ্জিনিয়ার। ওয়ান স্টেটে “আই” বলে কিছু নেই, সব “উই”। ওয়ান স্টেটে খিদে নেই, অভাব নেই, স্বাধীনতা নেই, সেক্স নেই। সেক্স আছে, নিয়মমাফিক সেক্স। স্টেট থেকে পিংক স্লিপে নাগরিকদের সেক্সসঙ্গী অ্যাসাইন করা হয়। ডি ৫০৩-এর একজন মোটামুটি রেগুলার সেক্সসঙ্গী আছে, ও-৯০। স্টেট নির্ধারিত নির্দিষ্ট দিনে ও-৯০, ডি ৫০৩-র ঘরে আসে। কতক্ষণ থাকবে সে সব ঠিক করা আছে, খাওয়া এবং ঘুমের সময়ের মতোই। ওই সময়টুকুর জন্য ঘরের পর্দা নামিয়ে রাখার অনুমতি আছে, বাকি সর্বক্ষণ স্বচ্ছ কাচের চার দেওয়াল খোলা রাখতে হয়, যাতে অভিভাবক (অরওয়েল-এর বিগ ব্রাদার এখানে “ওয়েল-ডুয়ার”) তাঁর প্রজাবর্গের ওপর নজর রাখতে পারেন। 

এ ব্যবস্থায় আমাদের ডি ৫০৩ খুশি। 

"this morning I was on the dock where the Integral is being built, and I saw the lathes; blindly, .with abandon, the balls of the regulators were rotating; the cranks were swinging from side to side with a glimmer; the working beam proudly swung its shoulder; and the mechanical chisels were dancing to the melody of unheard tarantellas. I suddenly perceived all the music, all the beauty, of this colossal, this mechanical ballet, illumined by light blue rays of sunshine. Then the thought came: why beautiful? Why is the dance beautiful? Answer: because it is an unfree movement. Because the deep meaning of the dance is contained in its absolute, ecstatic submission, in the ideal non-freedom." 

একদিন ও-৯০-র সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়ে ডি ৫০৩-র দেখা হয়ে যায় আই-৩০৩ নামের এক নারীর সঙ্গে। কামতৃষ্ণায় পাগল হয়ে ঘড়িবাঁধা জীবনের কক্ষপথ থেকে ছিটকে যায় ডি-৫০৩। তারপর আই-৩০৩-র হাত ধরে ডি-৫০৩-র আলাপ হয় একদল অদ্ভুত মানুষের সঙ্গে, যারা হ্যাপিনেস চায় না, স্বাধীনতা চায়। 

তারপর কী হয় জানতে গেলে আপনাকে 'উই' পড়তে হবে। সামান্য এদিকওদিক বাদ দিলে 'উই'-তেও তাই হবে যা 'নাইনটিন এইটি ফোর'-এ হয়েছিল। বা বলা উচিত, 'নাইনটিন এইটি ফোর'-এও তাই হয়েছিল যা 'উই'-তে হইয়েছিলেন Yevgeny Zamyatin। 

Yevgeny Zamyatin ছিলেন সাবেকি বলশেভিক। বলশেভিক আন্দোলনের শরিক হয়ে তিনি জেল খেটেছিলেন, অজ্ঞাতবাসে থেকেছিলেন। বিপ্লবের পর তাঁর সহযোগী বিপ্লবীরাই তাঁকে আবার জেলে পাঠিয়েছিল, বিপ্লবের পরিণতি নিয়ে ঠাট্টা করে বই লেখার জন্য। 

কিছু লোক থাকে যাদের যে কাজটা যত মানা করা হয় সে কাজটা তত বেশি করে করে, Zamyatin ছিলেন সেই গোত্রের লোক। উনিশশো সতেরোর বিপ্লবের পর ক্রমাগত তিনি পার্টির বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখছিলেন। উনিশশো তেইশ সালে 'উই' শেষ করার পর তিনি বুঝলেন এ জিনিস সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রকাশ করা অসম্ভব। তিনি পাণ্ডুলিপি পাচার করলেন অ্যামেরিকায়, যেখানে ইংরিজি ভাষায় অনুবাদ হয়ে উই বেরোলো উনিশশো চব্বিশে। পত্রপাঠ তাঁর সমস্ত লেখা তাঁর নিজের দেশে ব্যান হল, এবং তিনি কারারুদ্ধ হলেন। উনিশশো একত্রিশে বন্ধু ম্যাক্সিম গোর্কির সহায়তায়, স্তালিনের কাছে আবেদন করে তিনি দেশ ছাড়লেন এবং প্যারিসে, দারিদ্র্যের মধ্যে মারা গেলেন উনিশশো সাঁইত্রিশে। Zamyatin বিশ্বাস করতেন সাহিত্য যদি করতেই হয়, তবে সে রকমই করা উচিত যা সিস্টেমকে শান্তিতে ঘুমোতে দেবে না। "[H]armful literature is more useful than useful literature," বলে গিয়েছেন তিনি। 

অরওয়েল নিজে কোনওদিন তাঁর বিশ্বখ্যাত উপন্যাসের প্রেরণা হিসেবে ‘উই’-এর নাম করেননি। হাক্সলি-র ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’-এর বিরুদ্ধেও 'উই'-এর প্লট চুরির অভিযোগ উঠেছিল। হাক্সলি খোলাখুলি তা অস্বীকার করেন। এসবের ভিড়ে একমাত্র উজ্জ্বল উদ্ধার কার্ট ভোনেগাট। তাঁর ‘প্লেয়ার পিয়ানো’ উপন্যাসের প্রেরণার প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,I cheerfully ripped off the plot of Brave New World, whose plot had been cheerfully ripped off from Eugene Zamiatin’s We.” 



*****

Station Eleven/ Emily St. John Mandel



উৎস গুগল ইমেজেস


শুরুতে সবাই ভেবেছিল অন্যান্য এপিডেমিকের ক্ষেত্রে যেমন হয় এটাও তেমন হবে। কিছু লোক মরবে। যত লোক মরার ভয় পাবে তার থেকে অনেক কম। তারপর সব আবার আগের মতো। পৃথিবীর মেডিক্যাল ইতিহাসে জাস্ট একটা চ্যাপ্টার।  

বই যখন লেখা হয়েছে তখন ঘটনাটা যে সে রকম হয়নি বুঝতেই পারছেন। মস্কো থেকে একদল জ্বোরো যাত্রী নিয়ে প্লেন এসে নামল উত্তর অ্যামেরিকায়, হয়তো তারাই “জিরো পেশেন্ট”। হয়তো নয়। কে জানে। আমরা শুধু জানলাম শীতের বরফপড়া শান্ত সেই রাতে থিয়েটারে বসে শেক্সপিয়ারের নাটক দেখছিল জীবন চৌধুরী, তার চোখের সামনে অভিনয় করতে করতে বুক চেপে ধরে মরে গেল এক নক্ষত্র অভিনেতা, যাকে বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে প্যারামেডিক ট্রেনিং নেওয়া জীবন, নিজের জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে গেল। আর তার ঘণ্টা কয়েক পরই হাসপাতাল থেকে বন্ধুর ফোন এল। এক অদ্ভুত জ্বরে ছেয়ে যাচ্ছে সারা শহর, জীবন যেন পালিয়ে যায় শহর ছেড়ে দূরে। কোথায় পালাবে জীবন? সাত ট্রলি দরকারি জিনিস নিয়ে পঙ্গু ভাইয়ের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে খিল দিল জীবন। আর তার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গোটা পৃথিবীর “৯৯.৯%” জনসংখ্যা লুপ্ত হয়ে গেল “জর্জিয়া ফ্লু”তে।

এর পরের ঘটনা শুরু হয় সেই গ্রেট ক্লিনসিং-এর কুড়ি বছর পর, যখন পৃথিবীতে পরিত্যক্ত থার্মাল পাওয়ার ষ্টেশন আছে কিন্তু ইলেকট্রিসিটি নেই, কম্পিউটারের ডাঁই হওয়া মৃতদেহ আছে কিন্তু ইন্টারনেট নেই, ভ্যাকসিন নেই, হাসপাতাল নেই, ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই।

বলা বাহুল্য, ধর্ম আছে। ধর্মগুরুও আছেন। বালিকাবিবাহের স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি বালিকা ধরে ধরে নিজের হারেম সাজাচ্ছেন। 

আর আছে একটি ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার গ্রুপ। তারা ঘুরে ঘুরে শেক্সপিয়ারের নাটক অভিনয় করে বেড়ায়। ধীরে ধীরে আমরা বুঝতে পারি গল্পের মূল চরিত্রগুলোর সুতো সব বাঁধা আছে কুড়ি বছর আগের হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়ার সেই অভিনেতা আর্থারের সঙ্গে। তাঁর প্রথম স্ত্রী মিরান্ডা, দ্বিতীয় স্ত্রী এলিজাবেথ, পুত্র টাইলার, বন্ধু ক্লার্ক সবাই। জীবন চৌধুরীকেও আমরা দেখতে পাই পরে আরেকবার। তবে এঁরা সকলেই সেকেন্ডারি চরিত্র। 'স্টেশন ইলেভেন'-এর প্রধান চরিত্র কার্স্টেন রেমন্ড, ইয়ার জিরোতে যাঁর বয়স ছিল আট, আর মারা যাওয়ার আগে আর্থার যাকে দুটো কমিক বই উপহার দিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের নাম ‘স্টেশন ইলেভেন’। 

এমিলি সেন্ট জন ম্যান্ডেলের চতুর্থ উপন্যাস 'স্টেশন ইলেভেন'। ঘরানায় বাঁধতে গেলে একে ফেলতে হবে কল্পবিজ্ঞানের গোত্রে, আরও খুঁটিয়ে দেখলে 'পোস্ট অ্যাপোক্যালিপটিক' গোত্রে। আমি সাধারণত কল্পবিজ্ঞানে উৎসাহ কম পাই, পোস্ট অ্যাপোক্যালিপসে আরও কম। সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে কিংবা প্রেমে দাগা খেয়ে একজন মানুষ অন্য মানুষের প্রাণ নিচ্ছে, এতদূর আমার কল্পনা পৌঁছতে পারে, কিন্তু পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে, কারেন্ট নেই, কম্পিউটার নেই, লোকে তীরধনুক দিয়ে শিকার করছে, অতদূর পারে না। পড়লেই মনে হয়, যতসব গাঁজাখুরি। কিছু পোস্ট অ্যাপোক্যালিপটিক উপন্যাস আমি পড়েছি, মার্গারেট অ্যাটউডের 'হ্যান্ডমেড’স টেল', কার্ট ভনেগাটের 'ক্যাট’স ক্রেডল' ইত্যাদি, কিন্তু সংখ্যায় তারা নগণ্য। কাজেই পোস্ট অ্যাপোক্যালিপটিক উপন্যাস হিসেবে 'স্টেশন ইলেভেন'-এর ভালোমন্দ বিচার আমি করতে পারব না। এমনি গল্প হিসেবে করতে পারি, তাই করছি। 

পোস্ট অ্যাপোক্যালিপটিক ইত্যাদি হওয়া সত্ত্বেও আমার মতো অনুৎসাহী পাঠক যে সাড়ে তিনশো পাতার বই দু'দিনে শেষ করতে পেরেছে সেটাই ‘ স্টেশন ইলেভেন’-এর সাফল্যের অন্যতম প্রমাণ। ম্যান্ডেল খুবই শক্তিশালী লেখক। চরিত্রদের রক্তমাংসের করে তোলায়, ওই অদ্ভুত, অকল্পনীয় পৃথিবীকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলায় তিনি সফল। কেউ কেউ দেখলাম বলেছেন, জর্জিয়া ফ্লু এবং তৎপরবর্তী ধ্বংসলীলা বাস্তব নয়, ইলেকট্রিসিটি কেন ফেল করল, করলেও বা কেউ লাইব্রেরিতে গিয়ে বইটই পড়ে সে ফেলিওর সারিয়ে তুলতে পারল না কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার এসব অসুবিধেজনক লাগেনি। কল্পনা বাস্তবনিষ্ঠ হল না কেন তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। 

আমার খারাপ লেগেছে বইটির “কোটেবিলিটি”। এমনিই গোটা ব্যাপারটা ভয়ানক চক্ষুরুন্মীলক। এই আছি এই নেই। এই কামড়াকামড়ি করছি, রাগে ফাটছি, ঈর্ষায় জ্বলছি। এই জ্বর হয়ে মরে গেলাম। মরলে তবু একরকম, না মরলে আরও বিপদ। যত আরাম টেকেন ফর গ্র্যান্টেড নিয়েছিলাম সব হাওয়া, তখন নদীর ঘোলা জল, গাছের বিষ ফল খেয়ে, আমার থেকে শক্তিশালী মানুষদের (যারা আমার মতোই সারভাইভালের জন্য লড়ছে) হাতে মার খেয়ে, ধর্ষিত হয়ে মর, নয়তো তাদের মারতে শেখো। কাউকে না-ঘাঁটানো না-চটানো কেরানি থেকে বন্য খুনি। 

এতেও যদি জীবনের সারসত্য বোঝা না হয় তাহলে আর কীসে হবে আমি জানি না। তাঁর পাঠকরাও যে বুঝবে সে বিশ্বাসটা লেখক রাখতে পারেননি, এবং “Hell is the absence of the people you long for.” “They spend all their lives waiting for their lives to begin.” “Survival is insufficient.”(এই উদ্ধৃতিটা অবশ্য 'স্টার ট্রেকঃ ভয়েজার' থেকে ধার করা বোধহয়, আমি স্টার ট্রেক দেখিনি, কারণ হিসেবে কল্পবিজ্ঞানের প্রতি আমার উদাসীনতা দ্রষ্টব্য, সবাই বলছে তাই জেনেছি) গোছের কোটেশনে বই ছয়লাপ করে রেখেছেন। এক সমালোচক এ কারণে স্টেশন ইলেভেন-কে “সিউডো-ডীপ” বলেছেন, সেটা একটু বেশি রূঢ় হয়েছে বলে আমি মনে করি, তবে ডেপথ যে জায়গায় জায়গায় সামান্য কম হলেও চলত সে বিষয়ে আমি একমত। 

ম্যান্ডেলের আগের তিনটি বইয়ের তুলনায় 'স্টেশন ইলেভেন' নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক বেশি, বিক্রি হয়েছে প্রচুর। দুর্দান্ত কিছু একটা হতে চলেছে এ খবর বই প্রকাশের আগেই বেরিয়ে গিয়েছিল। আমি বলছি না, 'স্টেশন ইলেভেন' খারাপ বই। আমি শুধু বলছি হাইপের ঘাড়ে চড়ে 'স্টেশন ইলেভেন' অনেক দূর গেছে যতখানি হয়তো এর যাওয়ার কথা ছিল না।


April 22, 2017

And Then The Murders Began



নিজের বইকে অন্যের বই থেকে ঢের ভালো, ঢের ইন্টারেস্টিং আর ঢের বেশি বিক্রি করতে চান? এই ট্রিকটা কাজে লাগিয়ে দেখতে পারেন।


April 19, 2017

দাদুর ছবি



সোমবার যখন ছুটি নিতেই হবে তখন অত তাড়াহুড়ো দেখিয়ে, বাড়ির লোকের ঘুম মাটি করে সকালের প্লেন ধরার মানে ছিল না। আরাম করে বাড়ি থেকে খেয়েদেয়ে বিকেলে বেরিয়ে রাতে ফিরলেই হত।  

কিন্তু অবান্তরের পাঠকরা জানেন, বাড়িতে আমার বড় জোর বিশ্রাম হতে পারে, আরাম হয় না। তবে আরামই তো একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, বাড়ি গেলে আরও অনেক ভালো ভালো জিনিস হয়। দু’পক্ষের মাবাবার সঙ্গে দেখা হয়, পোস্তবাটা, বেগুনপোড়া আর এঁচোড়ের তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়া হয়, বুদ্ধি করে তাক বুঝে যেতে পারলে (যেমন আমরা গেলাম) পয়লা বৈশাখের উপহার মেলে। আর যদি এ সবের কিছুই না হয়, ঠাকুমার সঙ্গে দেখা তো আছেই। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, এখন যতটুকু দেখা হয় ততটুকুই কম। 

এত সব কাজের মাঝে একেকটা মুহূর্ত আসে যা নিখাদ আরামের। রবিবার দুপুরে যেমন এসেছিল। কোন একটা চ্যানেলে ‘ব্যোমকেশ পর্ব‘ দিয়েছিল, মামেয়ে দেখলাম বসে বসে। এ ব্যোমকেশ ঘোড়ায় চড়তে পারে, লাঠি খেলতে পারে, আইটেম সঙের সঙ্গে হাতে ফুলের মালা জড়িয়ে চপল চোখে তাকাতে পারে। পরের সিনেমাগুলোয় আরও কী কী পারবে ভাবতেই আমার হৃৎকম্প হচ্ছে।

তবে এসব খালি নিন্দে করার জন্য করা, মায়ের পাশে বসে যখন  টিভিতে সিনেমাটা দেখছিলাম তখন আমার শুধু ভালোই লাগছিল। পর্দা নামিয়ে ঘর ছায়া করা ছিল, মাথার ওপর ফ্যান অল্প বেগে ঘুরছিল, চোখের সামনে বাঙালি গোয়েন্দা বাংলা রহস্য সমাধান করছিল, খারাপ লাগার জায়গাই নেই। 

আরামের ষোলোকলা পূর্ণ করেছিল তেজপুর থেকে বাবার আনা বাঁশের চেয়ারটা। সাড়ে পাঁচ ফুটের নিচে হাইটওলা যে কেউ গোটা শরীরটা নিয়ে চেয়ারের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। এখন ওই চেয়ারটায় বসার জন্য বাড়িতে রীতিমত মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা হয়, অথচ আমরা এই চেয়ারের কার্যকারিতা নিয়ে কত সন্দেহই না প্রকাশ করেছিলাম। 

সন্দেহের কারণ সেই দর্শনধারিতা। বা তার অভাব। বেশিরভাগ কাজের জিনিসের মতোই চেয়ারটার চেহারা খুব একটা সুবিধের নয়। যেটা চেয়ারটার সবথেকে বড় গুণ, সেটাই ওটার সবথেকে বড় দোষ। তা হল চেয়ারটার বেঢপত্ব। তেজপুর থেকে চিরদিনের মতো ট্রান্সফার হয়ে চলে আসার সময় বাবা যখন ওই চেয়ার আর সঙ্গে মানানসই একখানা টেবিল নিয়ে হাজির হলেন, মা হতভম্ব হয়ে বলেছিলেন, "এ জিনিস কোথায় রাখব?" বাবা একটুও দমে না গিয়ে সামনের ঘরের দরজা আর তক্তপোশের মাঝখানের জায়গাটা দেখিয়ে বললেন, "কেন এইখানে দিব্যি ফিট করে যাবে।" 

গেলও। দেওয়ালে ঝুলন্ত ঘোর নীলবর্ণ মাকালীর ছবির নিচে। মাঝে মাঝে মাকালীর মাথায় গোঁজা জবাফুল চেয়ারের ওপর খসে পড়ে থাকে, আমরা বসার আগে সে ফুল ওই চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়েই মায়ের মাথায় আবার ফিট করে দিই। 

চেয়ারের বিরুদ্ধে শেষ, অক্ষম প্রতিবাদ হিসেবে মা বিড়বিড় করেছিলেন, সামনের ঘরের লুকটা একেবারে খারাপ হয়ে গেল। 

মায়ের সঙ্গে সাধারণত আমি সব বিষয়েই সহমত হই কিন্তু এটাতে না হেসে পারিনি। মা নিজেও হেসেছিলেন অবশ্য। কারণ আমাদের সামনের ঘরের লুক অলরেডি চমৎকার। কোনও বেঢপ চেয়ারের সাধ্য নেই তাকে মাটি করে। একটা তক্তপোষ, দুটো চেয়ার, প্লাস্টিকের তিন থাক টেবিলের ওপর একটা টিভি, অবশেষে ফ্ল্যাট স্ক্রিন হয়েছে এই বছরকয়েক আগে। দেওয়ালে জালি দেওয়া জানালা, গজালে ঝোলানো বেঁটে বুককেস, অসংখ্য তার, অসংখ্য ফোটো, কোনওটার সঙ্গে কোনওটার সাইজের মিল নেই। নীল মাকালীর পাশে গেরুয়া বিবেকানন্দের পাশে হাতে আঁকা রবীন্দ্রনাথ। সাঁতরাগাছি কারখানায় ইঞ্জিনের সামনে সাদাকালো গ্রুপছবি। আমার যুবক ঠাকুরদার পাশে বৃদ্ধ রামঠাকুর। গলায় কণ্ঠি, হাড় বার করা শরীরে সাদা কাপড় জড়ানো, বাবু হয়ে বসে আছেন। বাঁ হাঁটুর নিচ দিয়ে ডান পায়ের পাতা বেরিয়ে আছে। লম্বা গড়নের সঙ্গে মানিয়ে সে পায়ের পাতাও রীতিমত দীর্ঘ। বছরের বিশেষ বিশেষ সময়ে, সম্ভবত রামঠাকুরের জন্মতিথির কাছাকাছি সময়ে ওই পায়ের পাতার দৈর্ঘ্য আরও বাড়ে। ফটোর ভেতরেই। ঠাকুমার বন্ধুবান্ধবরা সকলেই দেখতে পেত। ঠাকুমাও পেতেন। আমি ঠিক শিওর হতে পারছি না বুঝে আমার দিকে এমন অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকাতেন যে আমি নার্ভাসটার্ভাস হয়ে বলতাম, "হ্যাঁ হ্যাঁ, এই তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ইঞ্চিদুয়েক বেড়েছে।"

এই ছবিটা নিয়ে একটা গল্প আছে। গত সাড়ে সাত বছরে সেটা আপনাদের বলেছি নিশ্চয়, তবু আরেকবার শুনুন। আমাদের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। দূর মানে রিয়েলি দূর। রাস্তায় তাঁকে দেখলে আমি চিনতে পারব না, তিনিও আমাকে পারবেন না। দু’দিকের ঠাকুরদার বাবারা কেমন যেন কাজিন ছিলেন, পড়শিটড়শিও হতে পারেন। যাই হোক, তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে। সেও অনেকদিন আগে। বাবাকাকার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে তখনও আমার রীতিমত ঘাড় ব্যথা করে। ভদ্রলোকও লম্বাচওড়া ছিলেন এটুকু মনে আছে, বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটাও। তাঁর স্ত্রী এদিকে মেরেকেটে পাঁচ ফুট, পঁয়তাল্লিশ কেজি। ঘোমটাঘেরা মুখে শান্ত ভালোমানুষি মাখামাখি। গাঁকগাঁক করে জেঠু সবার সঙ্গে আলাপ করছিলেন, বাবাকাকার পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিলেন। এমন সময় জেঠুর চোখে দেওয়ালের ছবিতে পড়ল। “ওই দেখ আমার কাকা…কেমন সুন্দর চেহারা ছিল দেখেছ?” ভুরু নাচিয়ে জেঠিকে উদ্দেশ্য করে বললেন তিনি। 

জেঠি তৎক্ষণাৎ ঘোমটা ভালো করে টেনে দেওয়ালের দিকে দু’পা এগিয়ে গিয়ে বুকের কাছে দু’হাত জড়ো করে মন দিয়ে নমো করলেন। গদগদ স্বরে বললেন, “আহা, কী সাধকের মতো চেহারা।” 

ঘরশুদ্ধু সবাই ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে রইল, জেঠুই প্রথম ধাতস্থ হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “উফ, ওটা কাকা কেন হতে যাবে, ওটা রামঠাকুর, কাকা পাশেরটা…”

পরে সবাই খুব হেসেছিল, এখনও হাসে। জেঠির প্রতি কোনওরকম অশ্রদ্ধা থেকে নয়, একেবারেই নির্মল হাসি। হাসির আরও বেশি কারণ হল আমার দাদুর ছবিটা। জোয়ান বয়স, পরিষ্কার কামানো দাড়ি, নিখুঁত ছাঁটা গোঁফ, কুচকুচে কালো একমাথা চুলের সামনেটা সিঙাড়ার মতো উঁচু। ফটোগ্রাফারের নির্দেশেই নিশ্চয়, দাদু সামান্য ডানদিকে বেঁকে দাঁড়িয়ে তেরছা চোখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন। 

মোট কথা, তাঁকে সাধক বলে সন্দেহ কেউ করবে না। আর যারা তাঁকে ফোটোর বাইরে চিনত তারা তো নয়ই। রেলের চাকরি নিয়ে এদেশে আসার আগে দাদু যাত্রাদলে বাঁশি বাজাতেন, ছেলেমেয়ের বাবা হওয়ার পরও সিনেমার পাতা খুঁটিয়ে পড়তেন। দাদু তাঁর চারের মধ্যে তিন ছেলের থেকে প্রায় এক ফুট করে বেঁটে ছিলেন। সে জন্যই বোধহয় মেজাজটাকে তিনি সর্বদাই টঙে বেঁধে রাখতেন। দিনে অন্তত একবার করে সবাইকে স্মরণ করাতেন, এটা তাঁর বাড়ি, তাঁর সংসার। তাঁর সংসার চালানোর সিস্টেম কারও পছন্দ না হলে সদর দরজা খোলাই আছে, বেরিয়ে গিয়ে নিজের সংসার বানিয়ে নিজের সিস্টেমে চালাও।

সেদিন লুচি খাচ্ছি বসে বসে। আমি তক্তপোশে, জামাই বলে মা অর্চিষ্মানকে সেই চেয়ারটায় বসিয়েছেন। তরকারি শেষ, হাফ লুচি বাঁচিয়ে রেখেছি, লাস্টে পায়েস দিয়ে খাব। এমন সময় অর্চিষ্মান বলল, “তোমার দাদুর ছবিটা দেখলে ঘনাদার কথা মনে পড়ে কিন্তু।”

ঘনাদা? আমার দাদু? রাগই হল একটু। মাথাটাথা খারাপ নাকি? অন্ধও দাদুকে ঘনাদার সঙ্গে গোলাবে না। 

অর্চিষ্মান বলল, "আহা, সে হয়তো সামনাসামনি অন্যরকম দেখতে ছিলেন, আমি বলছি এই ছবিটার কথা।" 

তারপর ও ধরে ধরে দেখিয়ে দিল। দাদুর খাড়া নাক, চওড়া কপাল, আর কপালের ওপর কালো চুলের সিঙাড়া। বিশেষ করে ওই সিঙাড়াটা। ঘনাদা ঘনাদা একটা ছাপ আছে বটে। মেনে নিলাম আমি।  

কে জানে হয়তো দাদুর মুখে সাধকের ভাবও থাকতে পারে, আমাদের বাসি চোখে ধরা পড়ে না।


April 13, 2017

A Table of One's Own



স্টিফেন কিং-এর ‘অন রাইটিং’-এ একটা টেবিলের কথা আছে। লন্ডনের এক ঝাঁ চকচকে হোটেলের একটি প্রকাণ্ড রাজকীয় টেবিল। সিঁড়ির মাথায় কিংবা লবিতে কোথায় যেন সেটা রাখা ছিল। এমন কোথাও যা লোকের চোখে পড়বে। (সবটাই স্মৃতি থেকে লিখছি। উঠে গিয়ে বুককেস থেকে বই পেড়ে আনতে পারি। কিন্তু আড়াইশো পাতার বইয়ে কন্ট্রোল এফ ছাড়া “টেবিল” কে খুঁজবে? কাজেই শহর মানুষ ইত্যাদি বিশেষ্য গোলমাল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মূল ভাবটার হবে না, প্রমিস।)

কিং-এরও চোখ পড়ল। হোটেলের কর্তৃপক্ষ তাঁকে গর্বিত মুখে জানালেন, এই টেবিলটা একজন লেজেন্ডারি লেখকের। হোটেলবাসের এক রাতে কিং-এর ভয়ানক লেখা পেল, উঠে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কাগজ পেন পাওয়া যাবে? বেয়ারারা দৌড়ে এনে দিল। কিং জিজ্ঞাসা করলেন এই টেবিলে বসে লেখা যাবে? ম্যানেজার দৌড়ে এসে ঘেরাটোপ সরিয়ে জায়গা করে দিল। টেবিলে বসে স্টিফেন কিং ফসফস করে লিখে ফেললেন ষোলো পাতা। লং হ্যান্ড। এমনিতে কিন্তু কিং লং হ্যান্ড লেখেন না। আমি জানি, ওঁর লেখা নিয়ে আরেকটা লেখায় আমি পড়েছি। কিং লং হ্যান্ড লিখতে পছন্দ করেন, কিন্তু মাথা যে বেগে চলে, পেন সে বেগে চলে না, সে এক ভজঘট ব্যাপার হয়। মাথার সঙ্গে পাল্লা দিতে কি-বোর্ড বেটার।

অ্যাটোনমেন্ট-এর লেখক ইয়ান ম্যাকুয়ান-এর বলছিলেন একবার, লেখার জন্য একটা টেবিল বানিয়েছেন তিনি নিজের জন্য। প্রায় বারো ফুট লম্বা। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বইয়ে ঠাসা ঘরে, বিরাট বিরাট জানালার সামনে সে টেবিল রাখা থাকে। টেবিলে থাকে শুধু একটি বৃহৎস্ক্রিন অ্যাপেল কম্পিউটার। বাকি জায়গায় বই, খাতা, নোটস। রোজ সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ ফোন, ইন্টারনেট, ইমেল বন্ধ করে এই টেবিলে এসে বসেন ম্যাকুয়ান। আইডিয়া থাক না থাক, লেখার ইচ্ছে থাক না থাক। তারপর টেবিল বুঝবে সে লেখককে দিয়ে লিখিয়ে নেবে কি না।

টেবিলের মহিমায় আমিও বিশ্বাস করি। অফিসে আমার যেটুকু কাজ হয়, আমার টেবিলের কল্যাণেই হয় বলে আমার বিশ্বাস। কত লোককে দেখি ঝটাক ঝটাক টেবিল বদল করছে, ভালো থেকে আরও ভালো, পছন্দসই থেকে আরও পছন্দসই। আমাকে বলে, অনেকদিন তো হল এই ডেস্ক, বদলাতে চাও না? আমি বলি, ভালোই তো আছে। প্রথম যখন এসেছিলাম, কী দুঃখই না হয়েছিল। সবক’টা খুঁত চোখে বাণের মতো বিঁধেছিল। ড্রয়ার আছে, কিন্তু একটু জোরে না ঠেললে পুরোটা বন্ধ হয় না। সামনের বোর্ডে কে সেলোটেপ দিয়ে কী বাণী সেঁটেছিল, টেনে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় ডেস্কের লাল রঙের খানিকটা সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। প্রথম ক’মাস যতবার চেয়ারে বসতাম, ওই চটারং চোখে পড়ত। এখন আর পড়ে না। এখন চোখে পড়ে আমার শখ করে কেনা বাহারি জলের বোতল, আমার বাড়ির ডাবর হানির বোতল বেয়ে ওঠা মানি প্ল্যান্ট, চটা রং বোর্ডে সারা বছরের ছুটির হিসেব, আর তার পাশে আমার নিজস্ব পছন্দের বাণী। 

ডান ইজ বেটার দ্যান পারফেক্ট।

*****

আমাদের বাড়িতেও আছে একখানা টেবিল। টেবিলের ওপর খবরের কাগজ, খবরের কাগজের বিল, গল্পের বই, গ্যাসের রসিদ, ওষুধের পাতা, ব্যাংকের পাসবই, খুচরো। বাল্মীকিপ্রতিভার মেক আপ নেওয়া রবীন্দ্রনাথের ছবির নিচে ওঁরই হাতের লেখায় “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য…” ছাপা পিচবোর্ড। দু'খানা (কখনও কখনও তিনটে) ল্যাপটপ।গুচ্ছের রিফিলসহ এবং রিফিলছাড়া ডটপেন পেনসিলপোরা ফ্যাবইন্ডিয়ার কাপ, যার মধ্যে নেল কাটার আর ছোট কাঁচিটাও থাকার কথা। ডান হাঁটুর পাশের ওপরের ড্রয়ারে থার্মোমিটার থেকে শুরু করে তেলের বোতলে ছ্যাঁদা করার স্ক্রু ড্রাইভারের মতো দেখতে একটা যন্ত্র, ইউনিভার্সাল অ্যাডাপটর, ব্যাটারির পাতা, আর  অদ্ভুত ভাবে একখানা স্ট্যাম্পের কালি প্যাড। আমার না, অর্চিষ্মানেরও নাকি না।  

ওই টেবিলে বসেই আমি অবান্তর লিখি।  

শুনে মনে হতে পারে আমাকে বেঁধেমেরে লেখানো হয়, তেমন নয়। ওই টেবিলে লেখার অনেকগুলো সুবিধে আছে। অর্চিষ্মান ও ঘরেই থাকে সর্বক্ষণ। এ পাশে আরেকটা ঘর আছে, কিন্তু সেটা দুয়োরানী ঘর। সে ঘরের চেয়ারে আমরা রোজকার পরার জামা ডাঁই করে রাখি। খবর না দিয়ে লোক এলে ভালো ঘরটার আবর্জনা এ ঘরে ছুঁড়ে ফেলে মাঝের পর্দা টেনে দিই। তাছাড়া এ ঘরে টেবিল নেই। লিখতে হলে লিখতে হবে খাটে বসে। আর খাটে বসে লিখতে গেলে একটু পরেই কেতরে শুয়ে পড়ার সম্ভাবনা। টেবিল থেকে নেমে গিয়েও খাটে শুয়ে পড়া যায়, কিন্তু তাতে কয়েকটা স্টেপ বেশি লাগে বলে বিবেক কামড় দেওয়ার সময়ও বেশি পায়। 

তাছাড়াও এ ঘরে লোক থাকে না বলে ঘরটা সবসময় ঠাণ্ডা মেরে থাকে কেমন। কেমন ছায়াছায়া, মনমরা, স্যাতসেঁতে। একদিক থেকে দেখতে গেলে কাজের কাজ করার জন্য এই ঘরটাই আদর্শ। তবু আমার এ ঘরে মন বসে না। 

সাঁইত্রিশ হতে চলল, এখন মন না বসলে আর বসিয়ে কাজ নেই ভেবেচিন্তে আমি এ ঘরের জন্য একটা টেবিলচেয়ারের অর্ডার দিয়েই ফেললাম। শান্তি এসেছিলেন রবিবার সকালবেলা মাপ নিতে। উনি দেওয়ালের গায়ে ফিতে ঠেকাচ্ছেন আর আমি বলছি, “কমান কমান। আরও ছোট করুন। এ টেবিলে থাকবে খালি আমার ল্যাপটপ আর ছোট ডায়রিখানা। ব্যস।” শান্তি বললেন, “ফাইলটাইল? ফোল্ডারটোল্ডার?” আমি বললাম, “কিচ্ছু না, কিচ্ছু না। ইচ্ছে হলেও যাতে না রাখতে পারি এমন করে বানান।” নিচে একখান ড্রয়ার? বিলকুল না। ড্রয়ার এমনিতেই দরকারের বেশি হয়ে গেছে বাড়িতে। শান্তি শেষমেশ বললেন, “একখান জলের বোতল রাখারও জায়গা না হলে কিন্তু প্র্যাকটিকাল হবে না দিদি…” আমি ভেবে দেখলাম জলের বোতল জরুরি, জলের বোতল না হলেও চায়ের কাপ তো রাখতেই হবে। ঠিক আছে, জলের বোতল অ্যালাউ করা যেতে পারে। কিন্তু তার বেশি কিচ্ছুটি নয়। শান্তি মাপ নিয়ে চলে গেলেন। আপাতত উনি গেছেন কলকাতা, মেয়েকে নিয়ে ফিরবেন সামনের সপ্তাহে। আমার ইমপ্র্যাকটিক্যাল টেবিল তৈরি হয়ে চলে আসবে তার পরের সপ্তাহেই।

আমার টেবিল। 

শব্দদুটো সেই থেকে বুকের ভেতর বার বার ধাক্কা মারছে আর একটা অসামান্য ফুর্তি ছেয়ে ফেলছে আমার সারা শরীরমনমাথা। অপরাধবোধ হল। লোকে যে বলে একসন্তানরা স্বার্থপর হয়, কথাটা ভুল নয় তবে। অর্চিষ্মান কানে ইয়ারফোন গুঁজে স্ক্রিনের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে ছিল, গিয়ে একদিকের কান থেকে ফোনটা সরিয়ে বললাম, “তুমি গিয়ে মাঝে মাঝে বোসো ওই টেবিলে, কেমন?” অর্চিষ্মান চোখ ঘুরিয়ে বলল, “বোঝা গেছে।”

*****

যে পোস্টের শুরু কিং-এর টেবিলের গল্প দিয়ে, তাকে কুন্তলার টেবিলের গল্প দিয়ে শেষ করা ভালো দেখায় না। লন্ডনের সেই দামি হোটেলের সংরক্ষিত নক্ষত্রের ছোঁয়া লাগা টেবিলে এক রাত লিখে এমন মোহিত হয়ে গেলেন কিং যে স্থির করলেন তাঁরও ও রকম একখানা টেবিল চাই। সে টেবিলে শুধু কিং লিখবেন। সংসারের আর কোনও কাজে তাকে ময়লা করা হবে না। বাড়ি ফিরেই টেবিলের অর্ডার দেওয়া হল। মহার্ঘ কাঠের, বিস্তীর্ণ টেবিল। যখনতখন লোকে যাতায়াত করে না এমন একখানা ঘর বেছে তাকে স্থাপন করা হল। তার দিকে তাকিয়ে, তার গা থেকে বিচ্ছুরিত মেহগনি আভা দেখে কিং-এর গা ছমছম করতে লাগল। সাহস সঞ্চয় করে টেবিলে বসলেন স্টিফেন কিং। মসৃণ টেবিলটপ তাঁর সামনে ম্যানিকিওরড মাঠের মতো বিস্তৃত হয়ে রইল। কম্পিউটার এল, খাতা এল, বই এল, কি-বোর্ডের ওপর আঙুল উদ্যত হল। লেখা এল না। 

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কিং আবার নিজের পুরোনো টেবিলে ফিরে গেছেন, যেটা বাড়ির মাঝখানের একটা ঘরের কোণায় রাখা। এদিকে একটা এক্সট্রা বই গুঁজতে গেলে ওদিকের একটা বই মাটিতে পড়ে যায়। সে ঘরের মধ্য দিয়ে সকলেই চলাচল করে, চেঁচিয়ে একে অপরকে ডাকে। কিং অত্যন্ত বিরক্ত হন, কিন্তু লেখা মহানন্দে স্রোতের মতো বইতে থাকে।

আমারও যদি এরকম হয়? একলা ঘরে একলা টেবিলে বসে লেখার বদলে যদি হাঁ করে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে টিকটিকির চলাচল দেখতে হয়? সম্ভাবনাটা আমার মাথায় আসেনি তা নয়। সমাধানও এসেছে। যদি ও ঘরে বসে লেখা না বেরোয় তাহলে টেবিলসুদ্ধু আমি আবার এ ঘরে হাজির হব। ওই জন্যই অত ছোট করে বানাতে বলেছি। যাতে আমি আর আমার টেবিল ফিট করে যাই।


April 10, 2017

পাড়াপড়শি



কোথায় থাক-র উত্তরের একটা চেনা প্রত্যুত্তর আছে। সেটা হচ্ছে আমি যেখানে থাকি তার আশেপাশের প্রশ্নকর্তার চেনা কেউ একজন থাকে, তাঁকে আমি চিনি কি না। “আশপাশ”-এর পরিধি জায়গা ভেদে বদলে যায়। নাকতলার আশপাশ ৮বি থেকে টালিগঞ্জ। রিষড়ার ক্ষেত্রে সেটা হয়ে যায় লিলুয়া থেকে তারকেশ্বর। 

"ভদ্রেশ্বরে আমার পিসতুতো মামি থাকেন, চেনেন?"  

"আচ্ছা, শ্রীরামপুরে মামাতো পিসি?" 

কাঁহাতক আর লোককে হতাশ করা যায়। আমি পাড়ার নাম শুনে খানিকক্ষণ কপাল কুঁচকে থাকি, উনিশশো নিরানব্বইয়ে একবার গেছিলাম বটে ওই পাড়ায়। "কী রকম দেখতে বলুন তো আপনার পিসি? রসগোল্লার মতো মুখ, বাতাসার মতো টিপ?"  

"বাতাসা টিপ মিলে গেছে, মুখটা খালি রসগোল্লার বদলে লর্ড চমচম। মনে পড়ছে?"

আমি সেকেন্ডখানেক সময় নিয়ে চোখ বিস্ফারিত করি, "হ্যাঁ হ্যাঁ, পড়ছে পড়ছে। তিন নম্বর বাসে করে যেতেন আসতেন তো? ওঁকে তো দেখেছি কতবার।" 

খুশি হয়ে সামনের লোক চলে যান। আজ রাতে নির্ঘাত পিসির বাড়ি ফোন যাবে। "তোমাদের ওদিকের একজন, রিষড়ায় থাকে, মাশরুমের মতো নাক আর ছাগলের মতো চোখ। চেন নাকি?"

একমাত্র সি আর পার্কের ক্ষেত্রে দেখেছি পরিধিটা সি আর পার্কেই সীমাবদ্ধ থাকে। কেউ আমাকে কখনও সি আর পার্কে থাকি শুনে ময়ূরবিহারের বাঙালি কিংবা গাজিয়াবাদের বাঙালিকে চিনি কিনা জানতে চাননি। তবে ডি ব্লকে থাকি অথচ সি কিংবা ই ব্লকের লোককে চিনি না শুনলে অনেকেই আহত হয়। আমি তড়িঘড়ি বলি, "আসলে আমরা ভাড়া থাকি তো, বছর বছর পাড়া বদলে যায়, তাই কাউকে চেনা হয়ে ওঠে না।"

না চেনা নিয়ে আমার আফসোসই আছে। এক জায়গায় থাকলে, এক বাজারে বাজার করলে, এক ফুচকাওয়ালার থেকে ফুচকা খেলে, এক রসরাজ থেকে মিষ্টি কিনলে একে অপরকে চেনাই উচিত, অন্তত আমার তাই মত। অর্চিষ্মান শহুরে লোক, ওর এ সব না চেনায় কোনও অপরাধবোধ নেই। অত চেনাচিনির কী আছে। পাশ দিয়ে গেলে ফোন চেক করার ভঙ্গি করবে, নেহাত চোখে চোখ পড়ে গেলে কাষ্ঠ হাসবে, ব্যস। 

রিষড়ার বাড়িতে একদিন সকালে ছাদে দাঁড়িয়ে আমগাহের মুকুল পরীক্ষা করার সময় সামনের বাড়ির একজনকে উল্টোদিকের বাড়িকে উদ্দেশ্য করে “আজ বিছানা কে তুলল, কর্তা না গিন্নি?” চেঁচাতে শুনে অর্চিষ্মান যত অবাক হয়েছিল, তত আর কিছুতে নয়।

কিন্তু পরিস্থতি সামান্য হলেও বদলাচ্ছে। এক পাড়ায় প্রায় সাড়ে তিন বছর কাটানোর পর আমি আমার প্রতিবেশীদের অল্প অল্প চিনতে শুরু করেছি। বেশিরভাগেরই সঙ্গে আলাপ চৌখিক, কারও কারও সঙ্গে কিঞ্চিৎ বেশি। এঁদের একজন থাকেন মোড়ের মাথার, যেখানে পাশাপাশি দাঁড়ানো একটা তুলো গাছ আর একটা ছাতিম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক বিকেল হলেই মোটা ছুঁচে বিঁধিয়ে রজনীগন্ধার মালা গাঁথেন, চারতলা বাড়িটার দোতলায়। বারান্দায় একগাদা টব আর গাছ আর একটা হেলানো চেয়ার, চেয়ারের ওপর ছড়ানো একগাদা পেপারটেপার খেয়াল করেছিলাম আমি আগেই, একদিন দু’হাতে ভারি বোঝা নিয়ে ফিরছি, এমন সময় ওপর থেকে ঘোঁক করে একটা শব্দ এল। সংক্ষিপ্ত এবং গম্ভীর। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি ঘৃতকুমারীর ঝাড়ের ফাঁক থেকে উঁকি মারছে একটি প্রাজ্ঞ মুখ। বাদামি রঙের ছোটখাটো শরীরের আগায় গোল মুণ্ডুতে গোলতর চোখ, ভুরু সর্বক্ষণ কোঁচকানো, ঠোঁটে সর্বদা বিরক্তি। আমি মুখ তুলে, মুখ নামিয়ে, এদিকওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, "আমাকে কিছু বলছেন দাদা?" আরেকবার ঘোঁক শব্দ হল। এবার বিরক্তির মাত্রাটা বেশি। "আশেপাশে আর কী কেউ আছে, যে তাকে ডাকব? আর দেখে কি মনে হচ্ছে আমি অকারণে ডাকাডাকি করার লোক?" 

মোটেই নয়। পাগ আমাকে তারপরেও অনেকবার ডেকেছে। একদিন ঝালমুড়ি খেতে খেতে আসছিলাম, বারান্দা থেকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, "কী খাচ্ছিস?" নিরামিষ মুড়ি তাও আবার ঠেসে লংকা দেওয়া শুনে ছ্যাৎরানো মুখ আরও ছেতরে চলে গেল বারান্দার ওদিকে।

প্রতিবেশী বটে, কিন্তু পাগকে আমি রীতিমতো সমীহ করে চলি। আমি নিশ্চিত পাগ গ্রাফিক নভেল ছাড়া আর কিছু পড়েন না, তাও শুধু ইংরিজিতে হলেই।

স্যার জেমস-এর সঙ্গে আমার দেখা হয় সাধারণত সফল-এর দোকানে। আমি ঝুড়ি নিয়ে আলুপটল টমেটো কুড়োই। মা বলেন গোল টমেটো পোড়াতে ভালো। গোল টমেটো আজকাল আর পাওয়া যায় না, সব শক্ত, ছুঁচোলো। আমি টমেটো টিপে টিপে পরীক্ষা করি, স্যার জেমসের বকলস লাগোয়া পার্কের রেলিং-এ বাঁধা থাকেন। আমি মাঝেমাঝে আই কন্ট্যাক্টের চেষ্টা করেছি, বিশেষ সুবিধে হয়নি। একদিন ঘাড় ঘোরাতে গিয়ে চোখে চোখ পড়েই গেল আর তখন এক বিরাট হাই তুলে নিজের ধারালো দাঁত বিকশিত করেই মুখ ফিরিয়ে স্যার জেমস আবার নিজের কাজে মন দিলেন। কাজ বলতে পাশ দিয়ে একটা নেড়ি যাচ্ছিল তাকে দেখে একবার ঘ্যাঁক করে নিজের আপত্তি জানান দেওয়া। 

এত দেমাক কীসের, সত্যি বলছি, ভেবে পেতাম না। তারপর রহস্য উদ্ঘাটন হল। যিনি স্যার জেমসকে পার্কের রেলিং-এ বেঁধে সফল-এ ঢোকেন তাঁকে দেখে। তিনি কুমড়ো/সিতাফলকে পাম্পকিন বলেন, ঢ্যাঁড়স/ভিন্ডিকে বিন্ডি, গোবি গোওবি হয়ে যায় অসতর্ক হলেই। বুঝলাম স্যার জেমস বহুদিন বিদেশে থেকে ফিরেছেন। আমার মতো নেটিভের সঙ্গে মেশার উৎসাহ নেই। মনের দুঃখ খানিকটা কমল। স্যার জেমস নামটাও তখনই স্থির করলাম। 

দেমাক অবশ্য যে কেবল বিদেশে গেলেই হতে হবে তেমন নয়। বা স্যার জেমসের মতো দশাসই হলেই নয়। দেমাকের ক্ষেত্রে সাইজ ডাজ নট ম্যাটার। আমাদের বাড়ির পেছনের গলিতে একজন প্রতিবেশী থাকেন, দেমাকে যিনি স্যার জেমসের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন, অথচ সাইজের দিক থেকে স্যার জেমসের দশ ভাগের এক ভাগ। ইন ফ্যাক্ট, দূর থেকে তিনি যখন তাঁর মানুষের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে আসেন অনেক সময় তাঁকে দেখাই যায় না, খালি মনে হয় মাটির ওপর কুচকুচে কালো রঙের একটা কম্পমান বল চলেছে। কাছে এলে বলটার নিচে চারটে পা দেখা যায় আর একেবারে ঘাড়ের কাছে এলে স্পষ্ট হয় বলের সামনে একটা গোল মুখ, ঝুপো লোমের মধ্যে থেকে গোল গোল কাচের গুলির মতো একজোড়া চোখ। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এঁর দেমাক চেহারার। ধরাকে সরা এবং আমাকে মাছি জ্ঞান করেন।

আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। সকাল বিকেল আমাদের গলি পেরিয়ে আসেন যান। কেউ কেউ খেয়ে খেয়ে এত মোটা হয়েছেন যে জানুয়ারির শীতেও এক হাত লম্বা জিভ বার না করে হাঁটতে পারেন না। কেউ ভয়ানক ফিট, সঙ্গের মানুষকে ছুটিয়ে সারা করেন। কেউ বুড়োবুড়ির বাড়িতে থাকেন, বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার লোক নেই, সারা বিকেল গ্রিলের দরজায় নাক ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আশপাশের বাড়ির প্রতিবেশীরা বেড়াতে বেরোলে কথোপকথন চালান। বা চালানোর চেষ্টা করেন। কারণ যাদের সঙ্গে ইনি কথা বলেন তারা বেশিরভাগ সময়েই উত্তর দেয় না, ল্যাজ নাড়তে নাড়তে নাক আকাশে তুলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়। এঁর সব কথা যে বুঝি তা নয়, তবে শুনে মনে হয় কথাগুলো বিশেষ মোলায়েম নয়। সারাদিন বন্দী থেকে থেকে বেচারার মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। 

আরও অনেকে আছেন, যারা রাস্তায় কিংবা বাজারে থাকেন, মনুষ্যসঙ্গের ধার ধারেন না। বাজারের ঠিক মাঝখানটায় কাত হয়ে শুয়ে থাকেন চার পা যতখানি সম্ভব ছড়িয়ে, বাকিরা কোথা দিয়ে হাঁটবে সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র কনসিডার না করেই। আমি মাঝে মাঝে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, ভাবি, ঘুমন্ত যখন অভদ্রতা হবে না নিশ্চয়। কাছে যাওয়া মাত্র ভুল ভাঙে। লোক গেলে পা সরাচ্ছেন না, কিন্তু চোখ খুলে রেখেছেন অল্প করে। আমি যে ওঁকে দেখছি, সেটা উনিও দেখে রাখছেন।

পাড়াপড়শির খবরাখবর না রাখাজনিত যে গ্লানিটা আমার ছিল সেটা খুব ধীরে হলেও কাটতে শুরু করেছে। সি আর পার্কে আপনার  চেনাজানা দুপেয়ে কেউ যদি থেকে থাকেন তাহলে খুব সম্ভবত আমি তাঁকে চিনি না, কিন্তু সেই দু’পেয়ের চারপেয়ে যদি কোনও সঙ্গী থাকে তাহলে খুব সম্ভব আমি সেই চারপেয়েকে চিনি।


April 06, 2017

আদা লজেন্স



মাবাবা গিয়েছিলেন বাদামি বিজাপুর সেকেন্দ্রাবাদ। রুটে কোনও মতেই দিল্লি পড়ে না, তবু ফেরার পথে দিল্লি হয়ে গেলেন। শনিবার ভোরে বেংগালুরু রাজধানী নিজামুদ্দিনে ঢুকল, বাড়ি এসে দুপুরবেলা যাওয়া হল বিহার ভবন। আর বাকি সময় আড্ডা, বিশ্রাম, উপহার…প্রদানের বদলে কেবল আদান। নতুন জামাকাপড়, অফিস যাওয়ার ব্যাগ। সেকেন্দ্রাবাদ ষ্টেশনে আঙুর কেনা হয়েছিল। মিষ্টি বেরোতে নিজেরা না খেয়ে বাকিটুকু প্যাক করে এনেছেন, দিল্লিতে মিষ্টি আঙুর পাওয়ায় যায় না যায়। মায়ের ব্যাগে আর একটা প্যাকেটের ভেতর সাদা সাদা গুঁড়ো গুঁড়ো কী সব। ময়দা। আরেকটা ছোট পলিথিন মোড়া বেকিং পাউডারের বাক্স আর ভ্যানিলার শিশি। আর একটা প্রেশার কুকারের সেপারেটর। একমাত্র মাখন, ডিম, চিনি আর প্রেশার কুকারটা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে এসেছেন মা। ওহ, আর উলের কাঁটা। চল্লিশ মিনিট পর বিঁধিয়ে দেখা হবে কেক হয়েছে কি না। খুব ইচ্ছে ছিল কেকের ছবি তুলে রাখি অবান্তরের জন্য। তারপর মনে হল ওর থেকে সুদর্শন কেক আপনারা সবাই দেখেছেন। রেস্টোর‍্যান্টে দোকানে ফুড ব্লগে ওর থেকে ঢের বেশি দ্রষ্টব্য কেকের নমুনা অহরহ দেখা যায়। যদি কিছু রাখতেই হত তবে সে হল কেকের স্বাদ আর বাবা মা অর্চিষ্মানের সঙ্গে বসে সে কেক খাওয়ার ফিলিংটা। কিন্তু সে সব ফিলিং তুলে রাখার জন্য কোনও যন্ত্র বেরোয়নি।

রবিবারের রাজধানী ধরে মাবাবা চলে গেলেন রিষড়া, আমরা চলে এলাম বাড়ি। সোমবার নতুন জামা পরে অফিস বেরোতে গিয়ে খেয়াল করলাম টেবিলের ওপর একটা হলুদ রঙের হজমোলার শিশি। হজমোলার শিশি মানেই যে তাতে হজমোলা থাকতে হবে তার কোনও মানে নেই। তাছাড়া বছর সাতাশ আগে হজমোলার অধিক কনসাম্পশনজনিত (এক ঘণ্টায় এক শিশি) দুর্ঘটনার পর থেকে আমাকে হজমোলাসংক্রান্ত কোনও উৎসাহ দেননি তাঁরা। নিজে হাতে কিনে দিয়ে যাবেন এ সম্ভাবনা নেই। বরং চিরতার কাঠি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তুলে কানের কাছে নিয়ে ঝাঁকালাম। কী রকম ঝরঝর শব্দ হল। ডেফিনিটলি চিরতা নয়। প্যাঁচ খুলেই চোখে পড়ল। আমার চেনা, প্রিয় জিনিস। নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকলাম। চেনা, প্রিয় গন্ধ। মুখে দিলাম। কুড়কুড় করে দাঁতের চাপে ভাজা জোয়ান গুঁড়িয়ে গেল। জিভের ওপর ছড়িয়ে গেল, ঝাঁজালো, নোনতা স্বাদ। চেনা, প্রিয় স্বাদ। 

আমি অর্চিষ্মানকে বললাম, এটা মা ট্রেন থেকে কিনেছে। অর্চিষ্মান যদি বলত, আহা, দোকান থেকেও তো কিনতে পারেন, তাহলে আমি বলতাম, উঁহু। ট্রেনের জোয়ানের একটা অন্য স্বাদ আছে। যেটা দোকানবাজারের সাধারণ জোয়ানে পাওয়া যায় না। 

হতে পারে পুরোটাই মানসিক। যুক্তি দিয়ে এ তফাৎ ব্যাখ্যা করা মুশকিল। কিন্তু তা বলে মিথ্যে নয়। এই যে সপ্তাহে অন্তত চারদিন দু’নম্বর মার্কেট থেকে ঝালমুড়ি কিনে খাই, মাঝে মাঝে বোর হয়ে গেলে ছুটির দিনে কালীবাড়ির দিকে একজন মুড়িওয়ালা বসেন, হেঁটে হেঁটে তাঁর কাছেও যাই। তাঁর মুড়ি শুধু সুস্বাদুই নয়, পনেরো টাকায় যে ওই পরিমাণ মুড়ি কেউ দিতে পারেন সেটা আমি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। এক এক লপ্তে প্রায় পাঁচ ছয় কাস্টমারের মুড়ি একবারে মাখা হয়। প্রায় ছ’ফুট লম্বা, স্বাস্থ্যবান চেহারার বিক্রেতার সমস্ত মনোযোগ দিতে হয় ওই পরিমাণ মুড়ি হাতা দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মাখার জন্য। সে এক দেখার মতো ব্যাপার। একটু সন্ধ্যের দিকে ওই এক ঠোঙা খেয়ে একটু এগিয়ে এসে রাজুদার এক বড় গ্লাস লেমন মসালা টি খেয়ে নিলে সে রাতের মতো রাঁধাবাড়া থেকে মুক্তি। 

এ সব কোনও মুড়িই লোকাল ট্রেনের মুড়ির সমকক্ষ নয়। মোটা কাপড়ের দড়ি দিয়ে গলা থেকে ঝোলানো যন্ত্র, মাঝখানে মুড়ির টিনের চারপাশে ফুলের মতো ফুটে থাকা আলুসেদ্ধ, পেঁয়াজ, কাবলি ছোলা ইত্যাদির বাটি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বিক্রেতাদের মুড়ির ম্যাচ আমি আর কোথাও পাইনি। এই যে বাড়িতে মাঝে মাঝে অংকুরিত ছোলা, লেবুলংকা বিটনুন দিয়ে মাখি, সে কি ট্রেনের ছোলামাখার মতো খেতে হয়? লেডিজ কামরার ওই প্রান্তে ছোলাওয়ালা উঠলে এ প্রান্তে টের পাওয়া যেত, কাঁচা পেঁয়াজের এমনই বদগন্ধ। গোড়ায় নাকে রুমাল চেপে বসে থাকতাম, তারপর একদিন আশেপাশের সবাইকে খেতে দেখে আর থাকা গেল না। ডু নট নক ইট টিল ইউ ট্রাই ইট। এ কথার সত্যতা আমি এই ছোলামাখার ক্ষেত্রে যতটা বুঝেছি তত আর কিছুতে নয়। কেটে রাখা কাঁচা পেঁয়াজের ওই বিকট গন্ধ, ছোলা এবং আরও নানা উপাদানে একেবারে চাপা পড়ে যায়, সব মিলিয়ে এমন একটা জিভে জল আনা, বিকেলের খিদের পক্ষে পারফেক্ট ব্যাপার হয় যে ভাবা যায় না। 

বাড়িতেও তো মা কত হাঙ্গামা করে শনিবার দুপুরে না ঘুমিয়ে পরিষ্কার হাতে কচি শশার খোসা ছাড়িয়ে দু’প্রান্ত কেটে, ঘষে ঘষে সাদা ফেনা ছাড়িয়ে, চার ফালি করে কেটে পরিষ্কার প্লেটে টাটা সল্ট সহকারে ঘরে ঘরে পরিবেশন করতেন, সেগুলো দেড়খানা খেয়ে মুখ ফেরাতাম, ওদিকে ট্রেনের শশা, কবেকার খোসা ছাড়িয়ে রাখা, কপালের ঘাম ঝেড়ে সেই হাতেই সেকেন্ডে একটা করে কেটে মাঝখান থেকে দুই ফালি করে মশলা (মশলার কৌটোর মুখে শশার রস আর মশলা পুরু হয়ে জমে উঠেছে) ছড়িয়ে কাগজে মুড়ে দিতেন বিক্রেতা। নিউজপ্রিন্টের কালি নাকি ভয়ানক শক্তিশালী, জানালার কাচের পুরোনো দাগও নিমেষে তুলে ফেলতে পারে। আরও একটা উপকারের কথা জানে না লোকে, ভেজা শশার গায়ে জড়ালে স্বাদ বাড়ে বহুগুণ। 

শীত পড়লেই বাজারে আলুপটলের পাশে আমলকীর ঝুড়ি বসত, আর সে ঝুড়ি থেকে আমলকীরা বাজারের ব্যাগ বাহিত হয়ে চলে আসত আমাদের বাড়িতে। আমলকী নাকি দেবতাদের ভোগ্য, খেলে চুলের ডগা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সর্বত্র উপকার। মা আমলকী নিয়ে আমার পেছন পেছন দৌড়তেন। ওই কষ কষ স্বাদ আমার জঘন্য লাগত। আমলকী আমার একমাত্র একরকম ভাবেই মুখে রুচত, সেটা হচ্ছে গাদাগাদা ঝালনুনে চুবিয়ে খটখটে শুকিয়ে সমস্ত খাদ্যগুণ তাড়িয়ে তাকে মুখশুদ্ধির শিশিবন্দী অবস্থায়। মা লোভ দেখানোর জন্য বললেন, কাঁচা আমলকী খেয়ে জল খেলে নাকি একটা ম্যাজিক হয়। আমি বোকার মতো বিশ্বাস করে জলের গ্লাসে চুমুক দিলাম। ম্যা গো! সাধ করে এরকম মিষ্টি জল কেন কেউ খেতে চাইবে?! ক’বছর পর ট্রেনে আমলকী উঠল। কাঁচা, ঝিরিঝিরি করে কাটা, ছোট ছোট জিপলক প্যাকেটে পোরা। মায়ের মুখ মনে পড়ল। কিনে খেলাম। বাড়ির আমলকীর থেকে একশো গুণ বেটার খেতে। 

তবে আমি ট্রেনে এসব স্বাস্থ্যকর খাবার খেতাম না। আমি খেতাম ঝালমুড়ি আর বাদাম চাক। আর সল্টেড বাদাম। আমার মা ভালোবাসতেন চিনি মাখানো মিষ্টি বাদাম। কোনওদিন মায়ের কথা না শুনে বাড়ি থেকে বেরোলে, সল্টেডের বদলে মিষ্টি বাদাম খেতাম। একরকমের প্রায়শ্চিত্তের চেষ্টা আরকি। লজেন্সটজেন্সও খেতাম, তবে কম। খেলেও মিঠুনের মায়ের থেকে কিনে কখনও নয়। মিঠুনের মা ছিলেন রোগাপাতলা, টকটকে সিঁদুর পরা সিঁথির দু’পাশ দিয়ে তেলচকচকে ঢেউ খেলানো চুল কানের পেছন দিয়ে নেমে গেছে। মিঠুনের মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল মিঠুন, যাকে মিঠুনের মা হোস্টেলে দিয়ে এসেছেন। এসব কথা মিঠুনের মা-ই ডেকে ডেকে বলতেন। মিঠুনের মায়ের লজেন্স বিক্রি করার ধরণ ছিল একেবারে ইউনিক। কামরার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উনি সকলের সঙ্গে আলাপ করতেন। কাউকে বৌদি, কাউকে দিদিমণি, কাউকে ঠাকুমা বলে ডাকতেন। অবিবাহিত মেয়েদের বলতেন, “আমার লজেন নিলে তোমার শাহরুখ খানের মতো বর হবে, না নিলে…” ওয়েল, কার মতো হবে সেটা আমি আর এখানে বলছি না। মোদ্দা কথা হচ্ছে মিঠুনের মা কামরায় এলে হাসি, মশকরা, ঠাট্টার একটা ঢেউ উঠত। বেশিরভাগ লোকই সেই ঢেউয়ে মহানন্দে ভাসত আর আমার মতো কিছু বেরসিক, চট-মশকরাতে যারা অভ্যস্ত নয়, উল্টে আতংকিত, গম্ভীর হয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকত। তাতে অবশ্য বিপদ বাড়ত বই কমত না। মিঠুনের মা তাঁদের ধরে ধরে “এই গম্ভীর দিদিকে দেখে আমার কী ভয় লাগছে, বাবারে” বলে ইয়ার্কি চালিয়ে যেত, এবং কামরাশুদ্ধু সবাই ফিকফিক করে হাসত। বলাই বাহুল্য, মিঠুনের মায়ের প্রতি আমি প্রসন্ন ছিলাম না। একদিন সে অপ্রসন্নতা মায়ের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়াতে মা সান্ত্বনা দিলেন। “তুই ওর চেষ্টার কথাটা ভেবে দেখ সোনা, লজেন্স বিক্রি করার জন্য কত বেশি পরিশ্রম করছে বাকিদের থেকে। “

নিজের দৃষ্টিটাকে একটু ঠিক করে নিয়ে দেখলাম, সত্যি। সকলেই তো বয়াম কিংবা ঝোলা ব্যাগ নিয়ে ঘুরে ঘুরে লজেন্স বিক্রি করে। মিঠুনের মা গলা ফাটিয়ে চেঁচায়, প্রতিটি সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত কথোপকথন করে। অন্যদের থেকে মিঠুনের মায়ের জনপ্রিয়তা বেশি, কিন্তু বিক্রি ততটাও কি বেশি, পরিশ্রম যতটা? ট্রেন থেকে “ধুর কেউ কিনছে না, তোমাদের সবার রান্নায় বেশি নুন পড়বে আজ” মুখ ঝামটা দিয়ে একদিন বেলুড়ে নেমে গেল মিঠুনের মা। জানালা দিয়ে দেখলাম, স্টেশনের গাছের নিচের বেদীতে বসল গিয়ে। ক্লান্তিতে ভাঙা মুখ, চিন্তাক্লিষ্ট দৃষ্টি। কোথায় সেই নাটুকে, ব্যক্তিগত সীমার তোয়াক্কা না করা মিঠুনের মা। ওই মুহূর্তে মিঠুনের মাকে দেখতে লাগছিল আর পাঁচজন হকারের মতোই, যার লজেন্স বিক্রি হচ্ছে না আশামতো। 

তারপর একদিন মিঠুনের মায়ের থেকে লজেন্স কিনলাম এক প্যাকেট। “প্রথমবার নিচ্ছ, পাঁচ প্যাকেট নাও না গো দিদি”-র উত্তরে কাষ্ঠ হেসে একটাই নিলাম। টাকা নিয়ে মিঠুনের মা তিনজনকে ডিঙিয়ে আমার ঘাড়ের কাছে এসে ভয়ানক সিরিয়াস মুখে বলল, “আমি বলছি দিদি, দেখো, তোমার বর তোমার ঠিক মনের মতন হবে।"

আমাদের সৌরভ স্টোরসের সামনের কাউন্টারের গোটাটাই ট্রেনের খাবারে ভর্তি। আদা লজেন্স, কমলা লজেন্স, বাদাম চাক, শুকনো আমলকী, লালনীল মৌরি। অর্চিষ্মান টপাটপ কিনে খায়। আমাকে বলে, “খাও খাও।” আমি বেশিরভাগ সময়েই খাই না, আদা লজেন্সের প্যাকেট কেনা হলে একটা হয়তো মুখে দিই। ভালোই, তবে আদা লজেন্সের মতো খেতে নয়। অর্চিষ্মান বলে, “আদা লজেন্স এরকমই খেতে হয়। তোমার যত…”

হয়তো আমারই যত। হয়তো আদা লজেন্স এরকমই খেতে হয়।  শুধু সৌরভ স্টোরসেরই তো নয়, এক নম্বর মার্কেটের সঞ্জীব স্টোরস, অফিসের কাছের মুদি দোকানের আদা লজেন্স সবই তো ট্রাই করে দেখেছি। সবকটাই অবিকল এক রকম খেতে। কিন্তু কোনওটাই পাঁচটা চল্লিশের তারকেশ্বরের, মিঠুনের মায়ের ঝোলাব্যাগের আদা লজেনের মতো খেতে নয়, সেটা আমি ওকে কী করে বোঝাব।


April 02, 2017

বুবুনের মা




মূল গল্পঃ Why Herbert Killed His Mother
লেখকঃ Winifred Holtby


*****

বুবুনের মা’কে আমরা প্রথমে বুবুনের মা বলে চিনতাম না। শুধু আমরা না, কেউই চিনত না। আমরা মালবিকা বউদি বলে চিনতাম, বুবুনের দিদিমা দাদাই মিলি বলে চিনতেন, বুবুনের ঠাকুমা ঠাকুরদা, ছোটকা, রাঙাপিসি কেউ বড়বৌমা, কেউ বড়বৌদি ইত্যাদি নামে চিনতেন, বুবুনের বাবা প্রকাশ্যে মালবিকা এবং আড়ালে সোনা বলে চিনতেন, আর স্কুলের বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে বুবুনের মা যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেননি, তারা মালবিকা, মালু, মালা ইত্যাদি নামে চিনত। 

এ সবই বুবুন হওয়ার আগে। 

আমাদের ইদানীং সন্দেহ হয়, একমাত্র বুবুনের মা-ই হয়তো নিজেকে বুবুনের মা বলে চিনতেন, গোড়া থেকেই। অন্য সব নামগুলোর আড়ালে তিনি তাঁর আসল পরিচয়টা লুকিয়ে রেখেছিলেন। না হলে মাতৃসদনের দোতলার জানালার ধারের বেডে বুবুনকে পরিষ্কারটরিশকার করে শুইয়ে রেখে যাওয়ার (বুবুনের মায়ের নির্দেশ ছিল, রক্ত, শ্লেষ্মা মাখামাখি অবস্থায় কেউ যেন বুবুনকে না দেখে) মুহূর্ত থেকে মালবিকা, মিলি, মালা এবং আরও যাবতীয় পরিচয় ঝেড়ে ফেলে, বুবুনের মা নিজেকে ‘বুবুনের মা’ হিসেবে যেভাবে পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত করলেন, তা অসম্ভব। 

বুবুনের মা নিজে কবে থেকে জানলেন? আমরা জিজ্ঞাসা করিনি। কৌতূহলের অভাবে নয়, চক্ষুলজার খাতিরে। বুবুনের বাবার স্পার্ম ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গিয়ে ভ্যাজাইনা, সারভিক্স পেরিয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবে দাঁড়িয়ে ঘন ঘন ঘড়ি দেখতে থাকা বুবুনের মায়ের ডিম্বাণুর সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার মুহূর্ত থেকেই কি? এ সব ভ্যাজাইনা, ফ্যালোপিয়ান, সেক্সটেক্সে অবশ্য বুবুনের মা বিশ্বাস করতেন না। ঈশ্বরের দান কোন নোংরা পথে এসেছে সেটা অবান্তর, এসেছে যে সেটাই সব।  

প্রথমদিকে বুবুনের মায়ের স্বাস্থ্যে নানারকম জটিলতা দেখা দিয়েছিল। ডাক্তারদিদিমণি পরীক্ষা করে ওষুধ দিলেন। বললেন আয়রন কম আছে, ঠেসে রাজমা খান। রেললাইনের ওপারের মারওয়াড়ি পাড়ার দোকান থেকে রাজমা কিনে আনলেন কাকু, বুবুনের মায়ের পিসশাশুড়ি তারকেশ্বরের মাথার পচা ফুলের পাপড়ি মাদুলির ভেতর ঢুকিয়ে হাতে বেঁধে দিয়ে গেলেন। বুবুনের মা মুখে কিছু বললেন না, কিন্তু মনে মনে জানলেন এসবে আসলে কিছু হয় না। আসল হচ্ছে মায়ের মন। আর সেই মন তাঁকে বলেছিল যে বুবুনের কোনও ক্ষতি হবে না। 

মায়ের মন ছাড়া আরও একটা ব্যাপারে বুবুনের মা গোড়া থেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, তা হল নাড়ির টান। যা সম্ভাবনার প্রথম মুহূর্ত থেকে মা ও সন্তানের মধ্যে যোগস্থাপনা করে। বুবুনের মা সে টান দিবারাত্র অনুভব করতেন। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর ছাদে গিয়ে নিজের বাড়ন্ত পেটের ওপর হাত রেখে বুবুনের মা সে নাড়ির সাহায্যে বুবুনের সঙ্গে কথোপকথন করতেন। সারাদিন কী কী হল, আজ তিনি কী কী রান্না করেছেন, রান্নাগুলো কেমন হয়েছিল, ঠিকে ঝি এসেছিল কি না, শাশুড়ি এবং ননদের সঙ্গে তাঁর কী কী ঝগড়া হয়েছে, সে সব ঝগড়ায় তাঁর যুক্তির অকাট্যতা, বুবুনের বাবা আরেকটু চালাক হলে যে চাকরিতে উন্নতি করতে পারতেন এই সব। 

কিন্তু বুবুনের সঙ্গে এসব কথা বলতে বুবুনের মায়ের ভালো লাগত না। বলতেন, আর কারও সঙ্গে এ সব বলা যায় না বলে। বুবুনের মায়ের কাছে কথোপকথনের সেরা অংশ ছিল বুবুনের ভাবী জীবন নিয়ে প্ল্যানিং। বুবুন বড় হয়ে কী হবে। ডাক্তার, নাকি ইঞ্জিনিয়ার? পেটে হাত রেখে বুবুনের মা অপেক্ষা করে থাকতেন, বুবুন কোনটায় সাড়া দেয়। প্রথমদিকে বুবুন চুপ করে থাকত। তবে কি ছেলে অন্য কিছু হতে চায়? পাশের বাড়ির মিতালির বরের মতো পেটরোগা প্রফেসর? বুবুনের মায়ের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গিয়েছিল। মাথা ঘুরে উঠেছিল। নেহাত পড়ে গেলে বুবুনের ক্ষতি হতে পারে ভেবে তিনি তাড়াতাড়ি অ্যান্টেনার থামটা ধরে নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন। এরপর রাতের পর রাত ধরে শুরু হল বোঝানো। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার উপযোগিতা আর প্রফেসর হওয়ার অপকারিতা। বুবুনের মায়ের বাপের বাড়ির দিকে সকলেই হয় ডাক্তার নয় ইঞ্জিনিয়ার, তাঁদের কত বড় বাড়ি, গাড়ি, বিদেশভ্রমণ। আর উল্টোদিকে মিতালির বর। তাও যদি কলকাতার কলেজ হত। বনগাঁ লাইনের কোন ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরের কলেজে পড়াতে যায়, ছাত্ররা সব চাষাভুষো। দোতলা তুলেই দম বেরিয়ে গেছে, প্লাস্টার করার পয়সা হয়নি। অথচ দেমাকের অন্ত নেই। মোটা কালো চশমার আড়াল থেকে এমন করে তাকায় আর খাবলা খাবলা দাড়ির আড়াল থেকে এমন করে হাসে যেন একা ও-ই মানুষ, বাকিরা সব পোকা।

বোঝাতে বোঝাতে বুবুনের মায়ের যখন সব যুক্তি শেষ, গলায় প্রায় রক্ত উঠে গেছে, যখন তিনি ভাবতে শুরু করেছেন, তাহলে কি বুবুন জেদী আর ঠ্যাঁটা? নাকি আরও সাংঘাতিক, নাড়ির টান বলে আসলে কিছু নেই? তখন এক রাতে পেটের ভেতর থেকে একটা মৃদু নড়াচড়া ভেসে এল। দিয়েছে দিয়েছে, ছেলে সাড়া দিয়েছে! উত্তেজনায় বুবুনের মায়ের গলা প্রায় বন্ধ হয়ে এল, তিনি পেট চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন,  

ডাক্তার না ইঞ্জিনিয়ার?

বুবুন পেটের ভেতর নড়ে উঠল। বুবুনের মা বুঝতে পারলেন না। মায়ের মন, তবু ছেলের লাথির সংকেত উদ্ধার করতে পারছে না? গ্লানি গ্রাস করল বুবুনের মাকে। তারপর তিনি বুঝলেন, তাঁর প্রশ্নটা করায় ভুল হয়েছে। তিনি আরেকবার শুরু করলেন, 

ডাক্তার?

সব চুপচাপ। দূরে একটা রাতজাগা পাখি ট্যাঁ করে উঠে থেমে গেল।  

ইঞ্জিনিয়ার?

তিন সেকেন্ড সব চুপচাপ। বুবুনের মায়ের হৃদপিণ্ডের ধড়াম, ধড়াম, ধড়াম দামামার আড়ালে অবশেষে প্রায় অস্ফুট একটি ছোট লাথি এসে ঠেকল বুবুনের মায়ের স্ফীত পেটের দেওয়ালে। 

ফাঁকা অন্ধকার ছাদে একা একা দাঁড়িয়ে আনন্দে কাঁদতে লাগলেন বুবুনের মা। তাঁর ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে।

*****

ছেলের কেরিয়ার সেটল হয়ে যাওয়ার পর অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন বুবুনের মা। তাঁর গর্ভাবস্থাজনিত শারীরিক সমস্যা কমে এল। ডাক্তারদিদিমণি বললেন, রাজমায় কাজ দিয়েছে। পিসিশাশুড়ি বললেন, বাবা তারকনাথের জয়। বুবুনের মা মুচকি হাসলেন। তিনি আবার বুবুনের বাবার সঙ্গে হেসে কথা বলতে শুরু করলেন, রান্না করতে করতে গুনগুন করতে লাগলেন। একদিন দুপুরে খেয়েদেয়ে উঠে টিভি খুলে দেখলেন, তাঁর প্রিয় নায়িকার সিনেমা চলছে। সিনেমায় নায়কনায়িকার প্রেম হল। তারপর একই গানে বিয়ে এবং গর্ভসঞ্চার হল। বুবুনের মা আগেও অনেকবার দেখেছেন সিনেমাটা, কিন্তু এবার তিনি অনেক বেশি করে রিলেট করতে পারলেন। সুখবরটা পাওয়ার পর নায়িকা তাঁর খাটের সামনে নায়কের একটি প্রায় মানুষপ্রমাণ প্রতিকৃতি সাঁটলেন। যাতে সর্বক্ষণ, চলতেফিরতে, ঘুমোতে যাওয়ার আগে, ঘুম থেকে চোখ খুলেই সেই ছবির দিকে তাকাতে পারেন। (এই খানে বুবুনের মা নায়িকার সঙ্গে নিজের আরও একটি মিল দেখে রোমাঞ্চিত হলেন, দুজনের কারও মনেই সন্দেহ ছিল না যে তাঁদের ছেলেই হবে)। এ সব হাঙ্গামার উদ্দেশ্য যাতে ছেলে ছবির মানুষটির মতো দেখতে হয় তা সুনিশ্চিত করা। 

এরপর অবশ্য বুবুনের মা একটা সমস্যার সম্মুখীন হলেন যেটা নায়িকাকে হতে হয়নি। নায়িকার হাতের কাছে সুদর্শন নায়ক ছিলেন, বুবুনের মাকে টাঙাতে হলে টাঙাতে হবে বুবুনের বাবার ছবি, আর তাহলে বুবুন হয়ে যাবে পাঁচ ফুট পাঁচ, মোটা, কালো, ঝুপোগোঁফওয়ালা, টাকমাথা, খয়েরজর্দার ছোপলাগা এবড়োখেবড়ো দাঁতওয়ালা একটা লোক।

অনেক ভেবে বুবুনের মা তাঁর ঘরের দেওয়ালে একটি ফুটফুটে ফর্সা, গোল গোল গালওয়ালা, নীল কাচের গুলির মতো চোখওয়ালা, পাখির ডানার মতো পলকওয়ালা একটি শিশুর ছবি সাঁটলেন। 

মায়ের মন এবারেও কাজ করল। আমরা খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম বুবুনের মায়ের খাটের পাশে রেলিং দেওয়া ছোট্ট কটে শুয়ে হাতপা নাড়ছে ফুটফুটে ফর্সা, গাবলুগুবলু, মোটাসোটা, মাথাভর্তি কুচকুচে কালো চুলওয়ালা একটা জ্যান্ত পুতুল। নীল চোখ আর সোনালি চুল হল না দেখে বুবুনের মা একটু হতাশ হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর বাপের বাড়ির দিকে কারওরই চোখের মণি নীল কিংবা চুলের রং সোনালি নয়, বিশেষ করে যারা ডাক্তারইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। সে কথা মনে করে নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন। 

দুঃখের বিষয়, সান্ত্বনার প্রয়োজন দিনের পর দিন ক্রমেই বেড়ে চলল। যখন বুবুন যখনতখন কাঁদত, যখনতখন বিছানা ভেজাত, রাতে ঘুমোতে দিত না। বুবুনের মাকে এ বিষয়ে অনেকে সাবধান করেছিলেন, বিশেষ করে তাঁর বন্ধুরা, যাঁরা কিছুদিন আগেই মা হয়েছেন। বুবুনের মা হাসিমুখে শুনেছিলেন এবং ধরে নিয়েছিলেন এসব মা হিসেবে তাঁর বন্ধুদের অক্ষমতার প্রমাণ। তিনি বুবুনকে এমন যত্নে রাখবেন যে সে কাঁদবে না। এমন ডিসিপ্লিনে প্রথম থেকেই বেঁধে ফেলবেন যে সে যখন ঘুমোনোর তখন ঘুমোবে, যখন খেলার তখন খেলবে, যখন বাথরুম পাবে ঝুনঝুনি নাড়িয়ে জানান দেবে। ইন ফ্যাক্ট, ছাদে দাঁড়িয়ে এ মর্মে বুবুনের সঙ্গে তাঁর রীতিমত চুক্তিও হয়েছিল, কিন্তু দেখা গেল বুবুন সে চুক্তির ধার ধারছে না। যখন ইচ্ছে হচ্ছে কাঁদছে, যখন ইচ্ছে ঘুমোচ্ছে, এবং যখন ইচ্ছে যেখানে ইচ্ছে বাথরুম করছে। বুবুনের মা লড়াকু মহিলা, তিনি শ্রেষ্ঠ মায়ের কমপিটিশনে তাঁর বাকি বন্ধুদের থেকে এগিয়ে থাকার মরণপণ করলেন, কিন্তু অচিরেই তাঁর আড়াই মাসের ছেলে তাঁকে হার মানাল। শেষে একদিন সেই ভয়ংকর ঘটনা ঘটল যেটা তিনি কল্পনাও করেননি। ন্যাপি পাল্টে দুধ খাইয়ে অতি সাধনায় ঘুম পাড়ানোর দু’মিনিটের মধ্যে বুবুন কাঁদতে শুরু করল, এবং বুবুনের মা পেছন ফিরে ঘুমের ভান করে শুয়ে রইলেন। যতক্ষণ না বুবুনের বাবা উঠে ছেলেকে দেখতে গেলেন। 

বুবুনের মা ঝুমঝুমি হাতে তুলে দিয়ে ছেলেকে ভোলানোর চেষ্টা করলেন, হাত থেকে কেড়ে নিয়ে শাসনের চেষ্টা করলেন, বুবুন সকালবিকেলরাতদুপুর একাকার করে, দেড় বিঘৎ হাঁ করে চেঁচাতে থাকল। কেঁদে কেঁদে বুবুনের ওজন কমে গেল, মাথার চুল সব ঝরে গেল। বুবুনের মা বুবুনের কট চিলেকোঠায় বদলি করলেন, পাড়াপ্রতিবেশী দেখতে এলে বললেন, ছেলে ঘুমোচ্ছে। ক’মাস আগের ছাদের শান্তির সন্ধ্যেগুলো এখন স্বপ্ন মনে হতে লাগল। পাড়ার লোকেরা কেউ কেউ বুবুনকে ছিঁচকাঁদুনে বলল, কেউ রুগ্ন। কেউ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বলল, পিসশাশুড়ি, প্রত্যাশিত ভাবেই, তারকেশ্বর যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। বুবুনের মা সব করলেন। বুবুনের কান্না থামল না। 

এমন সময় একদিন টিভিতে বুবুনের মা 'হ্যাপিমমি' ব্র্যান্ডের বেবিফুডের বিজ্ঞাপন দেখলেন। এক সুন্দরী মডেল, আঠেরো বছর হয়েছে কিনা সন্দেহ, একটি গোল, ফর্সা, নীল চোখের বাচ্চাকে চামচে করে বেবিফুড খাওয়াচ্ছে। মা এবং বাচ্চা দুজনের মুখেই হাসি আর ধরছে না। বুবুনের মায়ের বুক মুচড়ে উঠল। ঠিক এমনই তো তিনি কল্পনা করেছিলেন। মায়ের মন কি তবে ভুল বলেছিল? নাড়ির টান তবে কি এতই দুর্বল?

চোখের জল মুছে বুবুনের মা বুবুনের বাবাকে ফোন করলেন। ফেরার পথে হ্যাপিমমি ব্র্যান্ডের বেবিফুড আনতে বলে দিলেন। রাতে মা-ছেলের ঝলমলে মুখের ছবিছাপা নীল রঙের প্যাকেট খুলে বেবিফুড বুবুনকে খাওয়ানো হল। সেদিন রাতে দু’ঘণ্টার বদলে বুবুন আড়াই ঘণ্টা অন্তর অন্তর কাঁদল। পরের রাতে তিন ঘণ্টা পরপর। বুবুনের মা হ্যাপিমমির ডোজ বাড়ালেন। ঠিক তিনদিন হ্যাপিমমি ডায়েটে থাকার পর, তৃতীয় রাতে বুবুন একবারও কাঁদল না।

ডাক্তারদিদিমণি বললেন, ওষুধে কাজ দিয়েছে তার মানে। পিসিশাশুড়ি কী বললেন সেটা আর বলার দরকার নেই। বুবুনের মা মুচকি হাসলেন। মাসতিনেক পর বুবুনের মা রাতে শুতে যাওয়ার আগে বুবুনের বাবাকে বললেন, হ্যাপিমমি বেবিফুড কোম্পানির আরেকটি প্রোডাক্ট আছে, ‘প্রাউডমমি’ প্র্যাম, সেটা তাঁর দরকার। তারপর একদিন বিকেলে হ্যাপিমমি বেবিফুড খাইয়ে, বুবুনকে নতুন জামা, নতুন মোজা, নতুন টুপি পরিয়ে, প্রাউডমমি প্র্যামে চড়িয়ে বুবুনের মা পাড়ায় বেরোলেন।

এত সুন্দর বাচ্চা, সত্যি বলছি, আমাদের পাড়ায় আগে কেউ কখনও দেখেনি। ফুটফুটে, নাদুসনুদুস, চকচকে চোখ, কুচকুচে চুল। রাস্তার লোক থেমে বুবুনের মাকে এমন সুন্দর নিখুঁত বাচ্চার জন্ম দেওয়ার জন্য অভিনন্দন জানাতে লাগল। বাড়ি বাড়ি থেকে প্রতিবেশীরা বেরিয়ে এসে বুবুনকে কোলে নেওয়ার জন্য, বুবুনের গাল টেপার জন্য মারামারি করতে লাগল। বুবুন কিন্তু একটুও কাঁদল না, ফোকলা মুখে খিলখিলিয়ে হেসে হাতপা নেড়ে খেলা করতে লাগল। 

সেদিন সান্ধ্যভ্রমণ সেরে বাড়ি ফিরে এসে বুবুনকে হ্যাপিমমি খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে বুবুনের মা কাগজ পেন নিয়ে বসলেন। হ্যাপি মমি এবং প্রাউড মমির মূল কোম্পানি ‘মমি’জ ওয়ার্ল্ড’কে একটা চিঠি লিখলেন। তাঁদের কোম্পানির প্রোডাক্ট যে বুবুনের মা আর বুবুনের জীবন বদলে দিয়েছে, সে বাবদে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে। 

*****

চিঠিটা পড়লেন মমি’জ ওয়ার্ল্ড-এর চিঠিচাপাটি বিভাগের একমাত্র কর্মচারী ছোটেলাল সাহু। তিনি গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে, মমি’জ ওয়ার্ল্ড-পত্তনের সময় থেকে এর এই বিভাগে চাকরি করছেন। মেন অফিস বিল্ডিং-এর পেছনদিকে একটা ঘুপচি ঘরে ছোটেলালের অফিস। রোজ কাঁটায় কাঁটায় সকাল ন’টায় তিনি আসেন, আর সন্ধ্যে ছ’টায় ঘরে তালা লাগিয়ে বেরোন। হাতে একটা প্লাস্টিকের বাজারের ব্যাগ থাকে। ছোটেলালের মতো ব্যাগটাও টেকসই। গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে।

পঁয়ত্রিশ বছর ধরে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, কচ্ছ থেকে কিবিথু পর্যন্ত ভূখণ্ডের প্রায় প্রতিটি জেলা, প্রতিটি শহর, প্রতিটি গ্রাম থেকে আসা চিঠি পড়েছেন ছোটেলাল। যে সব জায়গার নাম কোনও ম্যাপে লেখা থাকে না, কোনও খবরে বা রেডিওর গানের অনুরোধের আসরে যে সব গ্রামের নাম কেউ কখনও শোনেনি, যে সব গ্রামের কোনও মেয়ে ধর্ষণ হয়নি কিংবা কুস্তিতে পদক জেতেনি, সে সব অদ্ভুত অলৌকিক সব জায়গার ঠিকানা লেখা চিঠি পড়েছেন ছোটেলাল। কোথায় শিশুরা হ্যাপি মমি খেয়ে পোলিও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে, কোথায় হ্যাপিমমির প্যাকেট খোলামাত্র জ্যান্ত ধেড়ে ইঁদুর লাফ দিয়ে বেরিয়ে প্যাকেটখোলকের গলা টিপে ধরেছে, কোথায় হ্যাপি মমি বাটিতে ঢেলে দুধের সঙ্গে গুলতে শুরু করা মাত্র ফুটে উঠেছে সাঁইবাবার মুখ। 

কিন্তু বুবুনের মায়ের চিঠিটা তিনি বুঝতে পারলেন না। একবার, দু’বার, তিনবার পড়লেন। উল্টেপাল্টে দেখলেন। ভারতবর্ষের একটি মফস্বল শহরের একজন মা এবং একটি শিশু, হ্যাপিমমি এবং প্রাউডমমি ব্যবহার করে উপকার পেয়েছে, না শুধু উপকার নয়, মাইনাস সতেরোর ঘোলাটে চশমার খুব কাছে পোস্টকার্ডটা নিয়ে এসে আবার একবার পড়ে দেখলেন, “জীবন বদলে দিয়েছে।” 

অবশেষে ছোটেলাল চিঠিখানা নিয়ে ওপরমহলে যাওয়া সাব্যস্ত করলেন। পঁয়ত্রিশ বছরে ছোটেলাল তিন বারের বেশি মেন অফিসে যাননি। অফিসের দারওয়ান, যে তিনমাস হল ডিউটি জয়েন করেছে সে ছোটেলালের কোঁচকানো জামা আর ঝোঁকা কাঁধ দেখে হাঁকিয়েই দিচ্ছিল প্রায়, এমন সময় অফিসের বড়বাবু, যিনি প্রায় বারো বছর আছেন, সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। ছোটেলালের আনা চিঠি দেখে বড়বাবুর ভুরু কোঁচকালো। তারপর চিঠি দেখলেন সুপারিন্টেনডেন্ট, তারপর ম্যানেজার, তারপর হেড ম্যানেজার, তারপর আরও কত কত লোকের কাছে চিঠি গেল আমরা জানি না। কারণ মমি’জ ওয়ার্ল্ডের হায়ারার্কি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বেশি নেই। 

*****

আমরা শুধু জানলাম একদিন দুপুর-বিকেলের দিকে দুজন সুটবুট পরা লোক এল পাড়ায়। একজনের কাঁধে একটা ঢাউস ব্যাগ, ব্যাগের গায়ে লেখা ‘মমি’জ ওয়ার্ল্ড’। মিসেস মালবিকা সেনের বাড়িটা কোথায়? মালবিকা নামটা ততদিনে লোকে বিস্মৃত হয়েছে, মাসছয়েকের বাচ্চা আছে শুনেটুনে মনে হল বুবুনের মা হলেও হতে পারেন। পথনির্দেশ নিয়ে লোকদুটো চলে গেল বুবুনদের বাড়ির দিকে, আমরা গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে জটলা করতে লাগলাম। 

আধঘণ্টা পর লোকদুটো আবার রাস্তায় বেরিয়ে এল। সঙ্গে প্বুবুনের মা, প্রায় বিয়েবাড়ির সাজে সজ্জিত, আর ‘প্রাউড মমি’তে শোয়া বুবুন। লোকদুটোর একজনের কাঁধে এখন একটা লম্বা নল লাগানো ক্যামেরা। প্র্যাম-ঠেলারত অবস্থায় তাঁরা বুবুনের মা ও বুবুনের ছবি নিলেন। বসে, দাঁড়িয়ে, রাস্তায় শুয়ে পড়ে, ভটচাজদের পাঁচিলে চড়ে। 

পরের মাসে শহরের প্রায় সবক’টি জনপ্রিয় কাগজে, ম্যাগাজিনে বুবুনের মা আর বুবুনের পাতাজোড়া ছবি বেরোলো। বুবুনের মায়ের মাথার ওপর একটা নীল রঙের মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, মেঘের ভেতর উদ্ধৃতি চিহ্ন দিয়ে লেখা, “মমি’জ ওয়ার্ল্ড আমার বুবুনের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যের একমাত্র সিক্রেট।”

*****

আমাদের অনেকেরই জীবনের একমাত্র সেলেব্রিটি-সংসর্গ ঘটেছিল ওই সময়টাতেই, যখন বুবুন আর বুবুনের মা মমি’জ ওয়ার্ল্ডের মডেল হয়ে আমাদের ছোট্ট মফস্বলের নিউজস্ট্যান্ডের মলাট দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। মমি’জ ওয়ার্ল্ডের কন্ট্র্যাক্ট শেষ হতে না হতে বুবুনের জন্য আরও মডেলিং-এর অফার আসতে লাগল। বাচ্চাদের জামাকাপড়ের, জুতোর, চুষিকাঠির, লালাপোষের। লোকে আমাদের পক্ষপাতদুষ্ট বলতে পারে, কিন্তু সত্যি তখন দেশের কোনও শিশু মডেলই বুবুনের থেকে মিষ্টি ছিল না। বুবুনের মা অবশ্য মডেলিং-এর অফার পেলেন না, অফারগুলো ছিল শুধু বুবুনের জন্যই, কিন্তু বুবুনের মা কখনওই ছেলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাননি। নিজে নেপথ্যে থেকে বুবুনকে লাইমলাইটে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য। 

বছরখানেকের মধ্যেই তিনি তাঁর লক্ষ্যপূরণ করে ফেললেন। লাইমলাইটে ভাসতে লাগল বুবুন। মডেলিং-এর পর বুবুনের মা বুবুনকে বেবি কম্পিটিশনে নাম দেওয়ালেন। প্রথমে ভদ্রকালী ‘আমরা সবাই’ সংঘের বেস্ট বেবি কম্পিটিশন জিতল বুবুন। তারপর জেলা সদর এবং নিখিল বঙ্গ পেরিয়ে সারা ভারত বেবি কম্পিটিশন। যেটা হবে নাগপুরে। কম্পিটিশনের তিনমাস আগে থেকে প্রিপারেশন চলল। সকাল আটটার আগে আর সন্ধ্যে ছ’টার পর বুবুনকে নিয়ে বুবুনের মা হাঁটতে বেরোতেন, যাতে রোদ লেগে বুবুনের সানট্যান না নয়, অথচ ভিটামিন ডি এবং খোলা হাওয়ার সাপ্লাই যথেষ্ট থাকে। কম্পিটিশনের তিন দিন আগে গাড়ি চেপে বুবুনের বাবামা বুবুনকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন, বাড়ি পাহারা দিতে রেখে গেলেন পিসশাশুড়িকে। গাড়িতে ওঠার আগের মুহূর্তে পিসশাশুড়ি বুবুনের মায়ের মাথায় জয়তিলক কেটে দুগ্‌গা দুগ্‌গা বলে দিলেন।

কম্পিটিশন টিভিতে সম্প্রচারিত হল। টাইমিং ভালো ছিল, শনিবার সন্ধ্যে ছ’টা। আমরা মুড়িমাখার বাটি হাতে নিয়ে বসে, বাংলা সিনেমার বদলে বুবুনের কম্পিটিশন দেখলাম। বেবিদের ওজন, দৈর্ঘ্য, চোখ ও চামড়ার ঔজ্জ্বল্য ইত্যাদি পরীক্ষার পর বেবির মায়েদের পরীক্ষা হল। বেবির শারীরিক, মানসিক, বৌদ্ধিক সমস্ত বিকাশসংক্রান্ত কুইজে বুবুনের মা হান্ড্রেড পার সেন্ট স্কোর করলেন। নিতাইজেঠু উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “পারবেই তো, ‘শিশুর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ বইখানা তো লাইব্রেরি থেকেই নিয়ে গিয়েছিল বুবুনের মা।” এই বলে তিনি পাড়ায় পাঠাগারের উপযোগিতা বলে একখানা বক্তৃতা শুরু করতে যাচ্ছিলেন, আমরা তাঁকে থামিয়ে দিলাম কারণ তখন লাস্ট রাউন্ড শুরু হতে চলেছে। মায়েরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছেন। বিচারকরা জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের প্ল্যান কী। আমরা অনেকেই বুবুনের ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানতাম, বুবুনের মা-ই জানিয়েছিলেন। লাইনের অন্তে বুবুনের মায়ের পালা এল। স্ক্রিন জুড়ে এখন বুবুনের মায়ের মুখ। ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রশ্ন শোনা গেল, “আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?” 

বুবুনের মা চুপ করে রইলেন। আমরা উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। কারও কারও আঙুলের নখ ছিটকে উঠে দাঁত ছুঁল। টেনশন সহ্য করতে না পেরে লাস্ট মোমেন্টে বুবুনের মায়ের কি নার্ভ ফেল করল? আমরা কেউ কেউ চিৎকার করে উঠলাম, “ইঞ্জিনিয়ার! ইঞ্জিনিয়ার!” যেন আমাদের গলা টিভি স্ক্রিনের ওপাশে পৌঁছে বুবুনের মাকে সাহায্য করবে।

ধীরে, অতি ধীরে, বুবুনের মায়ের মুখে একটা আলো ফুটে উঠল। মঞ্চের আলো নয়, তার থেকে অন্যরকম, ভেতরের আলো। একটা কিছু যে ঘটতে চলেছে সেটা ক্যামেরাম্যান ও টের পেয়েছিলেন নির্ঘাত, রক্তের গন্ধ পাওয়া বাঘের দৃষ্টির মতো তিনি শিকারের ওপর নিশ্চল হলেন। পুরোনো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট অস্কার টিভির নন এল সি ডি ঝাপসা পর্দাতেও আমরা স্পষ্ট দেখতে পেলাম বুবুনের মায়ের কাজলটানা চোখের কোণায় একটা কী যেন চকচক করে উঠছে। জলের ফোঁটাটা ক্রমে বড় হল, কিন্তু চোখের কোণা ছেড়ে পড়ল না। বুবুনের মায়ের ঠোঁট নড়ে উঠল। ক্যামেরা জুম ইন করল, আমরা টিভি সেটের দিকে ঝুঁকে পড়লাম। প্রায় অস্ফুট আর আবেগে বুজে আসা গলায় বুবুনের মা বললেন, “আমার বুবুন মানুষের মতো মানুষ হবে।”

টিভি স্ক্রিনে যেন একটা বিস্ফোরণ হল। অন্য মায়েরা চারদিকে ছিটকে পড়লেন, জাজেরা যে যার চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন, মঞ্চের আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল, মডেলরা চারদিক থেকে মুহুর্মুহু শঙ্খ এবং হুলুধ্বনি করতে লাগলেন। একজন মডেল এসে বুবুনকে বুবুনের মায়ের কোলে চড়িয়ে দিয়ে গেল। প্রতিযোগিতার স্পনসর রনসন অ্যান্ড রনসন বেবি প্রোডাক্টসের কান্ট্রি হেড এসে বুবুনের মায়ের হাতে তুলে দিলেন যশোদাগোপালের মূর্তি, সলিড সোনার। বুবুনের মাথায় সোনার মুকুট পরিয়ে দেওয়া হল, বুবুনের মায়ের মাথাও ফাঁকা রইল না। বেস্ট বেবি, বেস্ট মমি। 

*****

মুকুট মাথায়, গালে গাল ঠেকানো বুবুনের মা আর বুবুনের হাসিমুখের ওই ছবিটা বুবুনদের বসার ঘরে টাঙানো ছিল আরও বেশ কয়েক বছর। বুবুনের মায়ের জীবনের চরম সার্থকতার মুহূর্তের ছবি। 

ওই মুহূর্তটা আরও একটা কারণেও ইম্পরট্যান্ট, কারণ তার পর থেকেই একটু একটু করে সব বদলে যেতে লাগল। সবথেকে অসুবিধেজনক যেটা হল, বুবুন বড় হয়ে গেল। প্রাণীজগতের একটা অদ্ভুত নিয়মের কথা বুবুনের মায়ের খেয়াল হয়নি, সেটা হচ্ছে বয়সের সঙ্গে কিউটনেসের ব্যাস্তানুপাতিক সম্পর্ক। বুবুনের মা অ্যামেরিকার বড় বড় ল্যাবে চিঠি লিখলেন, সকলেই তাঁকে উত্তরে জানালেন যে অনেক গবেষণার পর অবশেষে বিজ্ঞানীরা এর প্রতিষেধক বার করার চেষ্টায় ক্ষান্ত দিয়েছেন।  

বুবুনের মা দমলেন না। চেহারায় না হলেও তাঁর বুবুন অন্য সব দিকে সেরা হবে। 

এইবার কিন্তু বুবুনের মা সমস্যায় পড়লেন। কারণ দেখা গেল বুবুন কিছুতেই সেরা নয়। তলানিও নয়। একেবারে মাঝখানে। বাংলা, ইংরিজি, অংক, ভূগোল, জীবনবিজ্ঞান, তবলা বাজানো, সাবান বানানো, লং জাম্প, টাগ অফ ওয়ার, সবেতেই বুবুন একেবারে অটল মধ্যপন্থী। বুবুনের মা বুবুনকে নিয়ে প্রাইভেট টিউটরের কাছে ছুটে ছুটে হন্যে হয়ে গেলেন, বিজ্ঞাপন দেখে দেখে ব্রাহ্মীর জুস খাইয়ে খাইয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলেন, বুবুন কিছুতেই মাঝখান থেকে নড়ল না। 

বুন যখন সেরা হতে অস্বীকার করল, তখন বুবুনের মা স্থির করলেন তিনি ছেলেকে সেরা বানাতে না পারলেও সেরাদের সান্নিধ্যে রাখবেন। বুবুন স্কুল কামাই হলে পরদিন তিনি গিয়ে কেবল ফার্স্ট বয়ের খাতা থেকেই আগের দিনের পড়া টুকতেন। ফার্স্ট বয়ের পাশে না বসলে বুবুনের গায়ে নানারকম অজানা ফুসকুড়ি দেখা দেয় এ অভিযোগ লিখিতভাবে দায়ের করলেন। বুবুনের ক্লাসটিচার অভিযোগ পড়ে খানিকক্ষণ হাঁ করে থাকলেন, কিন্তু তিনি প্রবীণ শিক্ষক, প্রায় চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি জানতেন কোন গার্জেনকে ঘাঁটাতে নেই। বুবুনের বসার জায়গা ফার্স্ট বয়ের পাশে বাঁধা হয়ে গেল। 

এই সব যখন হচ্ছিল তখন বুবুনের জীবনে একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। রবিকাকুর রিকশায় চেপে বুবুন স্কুলে যেত, আর যেত মৃত্যুঞ্জয় বলে একটি ছেলে। বুবুন স্বভাবতই শান্ত আর লাজুক ছিল, মৃত্যুঞ্জয়ও। গোড়াতে কেউই কারও সঙ্গে কথা বলত না বিশেষ। মাসখানেক কাটার পর ধীরে ধীরে আড় ভেঙে দুজনে দুজনের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। এবং আবিষ্কার করে আশ্চর্য হয়ে গেল যে নিজেদের মধ্যে কত মিল। দুজনেই ক্রিকেট ভালোবাসে, দুজনেই অংকের মাস্টারমশাইকে যমের মতো ভয় পায়, দুজনেই মাছের কাঁটা ম্যানেজ করতে পারে না। দ্রুত বুবুন আর মৃত্যুঞ্জয়ের বন্ধুত্ব গাঢ় হল। 

একদিন জানালা দিয়ে বুবুনের মা দেখলেন, রিকশা থেকে নেমে বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে বুবুন অনেকক্ষণ মৃত্যুঞ্জয়কে টা টা করছে। মৃত্যুঞ্জয়ও রিকশার পেছনের পর্দা তুলে টা টা করছে। 

ক’দিন বাদেই অ্যানুয়াল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলো। রেজাল্ট নিয়ে একে একে সবাই বেরোল ক্লাস থেকে। বুবুন আর মৃত্যুঞ্জয়ও বেরোলো পাশাপাশি। বুবুনের মা বুবুনের রেজাল্ট খুলে পরীক্ষা করলেন। তারপর মৃত্যুঞ্জয়ের রেজাল্ট। বাংলা, অংক সবেতেই মৃত্যুঞ্জয় বুবুনের প্রায় সমান সমান, হঠাৎ একজায়গায় এসে বুবুনের মায়ের আঙুল থমকে গেল। ইংরিজিতে ছেলেটা কুড়ি পেয়েছে! কুড়ি! বুবুনের মায়ের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তিনি বুবুনের কবজি চেপে ধরে বাড়ি ফিরে এলেন। পরদিন থেকে বুবুনের যাওয়ার জন্য অন্য রিকশা স্থির হল। আর বুবুনের মা বুবুনকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলেন যে মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে সে আর মিশবে না।

*****

স্কুলের স্যারেরা বলেছিলেন, কমার্স শুভজিতের জন্য বেটার ফিট, কিন্তু বুবুনের মা সায়েন্স ছাড়া আর কোনও ফর্মই তুললেন না। উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট বুবুনের খারাপ হল। জয়েন্টের কহতব্য নয়। বুবুনের মা দাঁতের ফাঁক দিয়ে থেমে থেমে উচ্চারণ করলেন, "আমার . . . ছেলে . . . ইঞ্জিনিয়ার . . . হবে।" বুবুনের বাবা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে বুবুনকে প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি করে দিয়ে এলেন। 

আর সেখানেই বুবুনের দেখা হয়ে গেল সংহিতার সঙ্গে। মিডিয়া টাইকুন অরবিন্দ ঘোষালের একমাত্র সন্তান সংহিতা ঘোষাল। দামি গাড়ি থেকে নেমে, দামি জুতোয় খটখট আওয়াজ তুলে যখন হাঁটত সংহিতা, সবাই পথ ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়াত। খালি অতি সাহসী কয়েকজন, যাদের মধ্যে একজন অজাতশত্রু সমাদ্দার, 'সমাদ্দার সর্ষের তেল' সাম্রাজ্যের সেএকমাত্র ওয়ারিস, নিয়মিত জিমে গিয়ে টি শার্টের হাতা ফুলিয়েছে, সংহিতার পাশে পাশে হাঁটার সাহস দেখাত। 

আমাদের বুবুনও সংহিতাকে দেখেছিল, কারণ সংহিতাকে না দেখে কে-ই বা থাকতে পারে। কিন্তু সুন্দরী মেয়ে দেখলেই প্রেমে পড়ে যেতে হবে এ যুক্তিতে বুবুনের মন চলত না। কাজেই সংহিতা রইল সংহিতার মতো। বুবুন বুবুনের মতো। মাঝে মাঝে কথাবার্তা হত। ক্লাসমেটদের যেমন হয়। একবার মুকুটমণিপুরে পিকনিকে গিয়ে অন্তাক্ষরীতে বুবুন গান গাইল। গানটা অ্যাকচুয়ালি বুবুন মাঝারির থেকে ভালো গাইত, কিন্তু গান-গাওয়া ছেলে বুবুনের মায়ের দুচক্ষের বিষ বলে তিনি সে দিকে ছেলেকে উৎসাহ দেননি। সংহিতা জোরে জোরে হাততালি দিল। অজাতশত্রু ভুরু কোঁচকালো, কিন্তু সংহিতা যখন কনুইয়ের খোঁচা মেরে জিজ্ঞাসা করল, “ভালো না?” তখন তাড়াতাড়ি, “অস্‌স্‌সাম্‌” বলে নিজেও চটাপট হাততালি দিল। তারপর মাঝে মাঝে সংহিতা আশেপাশে কেউ না থাকলে বুবুনের কাছে এসে নোটটোট চাইত। ক্রিকেট, ফুটবল, যে সব বিষয়ে সংহিতার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই, কিন্তু বুবুনের থাকলেও থাকতে পারে, সে সব বিষয়ে কথা বলত।

কোর্সের শেষে ক্যাম্পাসিং হল। যে যার চাকরি নিয়ে চলে গেল দেশের এদিকসেদিক। আমাদের বুবুনের ডাক পড়ল পুনেতে। বুবুনের মা আত্মীয়দের সবাইকে ফোন করে খবর দিলেন। পাড়ার কেউও বাদ পড়ল না। সংহিতা গেল না কোথাও। ইঞ্জিনিয়ারিং ওর ভালোই লাগে না। অরবিন্দ ঘোষাল কাগজের অফিসে মেয়েকে ঢুকিয়ে নিলেন। ছিটকে যাওয়ার আগে একদিন সব বন্ধু মিলে কলেজে খাওয়াদাওয়া হইহল্লা হল। সংহিতা সেদিন বুবুনের সঙ্গে একটা কথাও বলতে পারল না। ফেরার পথে সারারাস্তা গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকল। বাবামা কাকাপিসির ঠাকুমাঠাকুরদার হাজার সাধাসাধিতেও দাঁতে কুটোটি না কেটে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। পরদিন সকালে বিছানা তুলতে গিয়ে সংহিতাদের বাড়ির বহুদিনের পুরোনো মাসি, সংহিতাকে যিনি কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন, দেখলেন, বালিশে গাঢ় হয়ে জমেছে নোনা জলের দাগ, তুলো তখনও স্যাঁতসেঁতে। 

বছরখানেকের প্রবেশন শেষ হলে বুবুনের চাকরি পাকা হল। বুবুন বাড়িতে খবর দিল। বুবুনের মা পৃথিবীসুদ্ধু সবাইকে খবর দিলেন। গত এক বছরে বুবুন আর সংহিতার ইমেল চালাচালি হত মাঝে মাঝেই। খবরটা পেয়ে সংহিতা অকারণেই বাবার গলা জড়িয়ে চুমু খেল, গাড়ি থামিয়ে রাস্তার কুকুরগুলোকে এক্সট্রা খাবার দিল, এক্সট্রা আদর করল। অফিসে পৌঁছ মেলে লিখল, “কই দেখি তোর কোয়ার্টারের ছবি?” বুবুন ফিরতি মেলে ছবি পাঠালো। দু’কামরার ছোট্ট কোয়ার্টার। রান্নাঘরটা একটু বেশিই ছোট। কিন্তু ব্যালকনি আছে একটা। সেখানে দাঁড়ালে দূরে দিগন্তে দেখা যায় বেতাল পাহাড়ের চুড়ো। 

পাকাপাকি যোগ দেওয়ার আগে বুবুন বাড়ি ফিরল। বুবুন সংহিতার দেখা হল শপিং মলে। বুবুন অনেকটা রোগা হয়ে গেছে এক বছরে, আর মুখে ফুটেছে আত্মবিশ্বাসের আলো। হাসিঠাট্টা, খাওয়াদাওয়ার পর বুবুন সংহিতাকে তুলে দিতে গেল পার্কিং লটে। যেতে যেতে বুবুন হাতপা নেড়ে অনেক কথা বলছিল, সংহিতা কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছিল না। ওর কান ভোঁ ভোঁ করছিল, বুক ধড়াস ধড়াস করছিল, কপাল আর ঠোঁটের ওপর ঘাম জমছিল, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিল। সংহিতার এস ইউ ভি-র সামনে এসে দাঁড়াল যখন ওরা, তখন বুবুনের কথার স্রোত থামল। আর ও নজর করল যে সংহিতাকে রীতিমত অসুস্থ দেখাচ্ছে। বুবুন সংহিতার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করল, “কী রে? কী হয়েছে তোর?”

সংহিতা বড় করে একটা শ্বাস নিল, তারপর ওই পার্কিং লটের ধুলোভরা মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে বুবুনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “উইল ইউ ম্যারি মি?”

*****

বুবুনের বাবা উল্লসিত হলেন। বুবুনের মা থমকে গেলেন। ছেলের বিয়ের ব্যাপারটা কোনও দূর ভবিষ্যতে ছায়ার মতো ছিল, সেটা হঠাৎ বাস্তব হয়ে ওঠার ধাক্কা তাঁকে টলিয়ে দিল। পাকা কথা বলতে বুবুনের বাবামা গেলেন সংহিতাদের বাড়ি। বাড়ি, গাড়ি, দাপট দেখে বুবুনের বাবার আনন্দ আরও বাড়ল, আরও চুপসে গেলেন বুবুনের মা। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে হিল খটখটিয়ে নেমে সংহিতা যখন সামনে এসে দাঁড়াল, বুবুনের মায়ের গলা শুকিয়ে গেল। একবার তিনি ভেবেছিলেন তাঁকে জিজ্ঞাসা করে ডিসিশন নেওয়া হয়নি বলে ব্যাপারটায় ভেটো দেবেন কি না, কিন্তু এক বছরের দূরত্ব বুবুনের সঙ্গে তাঁর নাড়ির টানকে সামান্য হলেও দুর্বল করে দিয়েছিল। তিনি চুপ করে রইলেন।

অরিন্দম ঘোষালের কাগজে, সাহিত্য ম্যাগাজিনে, টিভি চ্যানেলে সংহিতার বিয়ের খবর ফলাও করে ছাপা হল। ঘোষাল মিডিয়ার মহিলা ম্যাগাজিন সংহিতার সংগীত থেকে বিদাই পর্যন্ত পাঁচদিনের বিয়ের নির্ঘণ্ট ছাপা হল এবং ওই পাঁচদিন সংহিতা যে পাঁচজন ডিজাইনারের পোশাক পরবে তাঁদের ঠিকুজিকুষ্ঠি এবং সাক্ষাৎকারও। বিরোধী খবরের কাগজ ইকনমিস্ট লাগিয়ে বিয়ের আনুমানিক খরচ এস্টিমেট করিয়ে ঘোষাল মিডিয়ার কালো টাকা ইনভেস্টিগেট করার জন্য মামলা ঠুকল। লিটল ম্যাগাজিনেরা এই নির্লজ্জ পয়সার আস্ফালনকে ধিক্কার জানাল, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষালের নামে ছড়া কেটে, হ য ব র ল-র প্যারাগ্রাফ পালটে প্যারডি লেখা হল। 

কিন্তু সব মামলা, সব ধিক্কার, সব আস্ফালনের পরে সকলেই যে প্রশ্নটা করল, এই শুভজিৎ কে? যে উড়ে এসে ঘোষালসাম্রাজ্যের সিংহাসনে জুড়ে বসল? স্ট্রাগলিং অভিনেতা? ব্যর্থ মডেল? অনূর্ধ্ব তেরোয় বাংলার প্রতিনিধিত্ব করা ক্রিকেটার? বাংলা ব্যান্ডের গ্রুপি?

সকলেই নিজের নিজের সার্কেলে খোঁজ নিল, কেউ কোনও উত্তর পেল না। সবাই মেনে নিতে বাধ্য হল, অরবিন্দ ঘোষালের একমাত্র মেয়ে একজন নোবডিকে বিয়ে করছে। 

*****

সত্যিটা মেনে নিয়ে সবাই যখন চুপ করে গেছে, আন্দোলন, বিক্ষোভ থিতিয়ে এসেছে অনেকটা, তখন বাংলা ভাষার মোটামুটি চেনা খবরের কাগজগুলোর প্রায় প্রত্যেকটার অফিসেই একটা বেশ বড়সড়, পেটমোটা খাম এসে হাজির হল। খাম খুলে বেরোলো গাদা গাদা পেপার কাটিং আর বিভিন্ন কাপ, মেডেলের ছবি, সার্টিফিকেটের জেরক্স। সঙ্গে একটি অস্বাক্ষরিত চিঠি। অতি বিনয়ী ভাষায় কেউ একজন মাননীয় সম্পাদককে জানিয়েছেন, শ্রী অরবিন্দ ঘোষালের একমাত্র কন্যা কল্যাণীয়া সংহিতা ঘোষালের ভাবী স্বামী কল্যাণীয় শুভজিৎ নোবডি নন, তিনি এককালের ভারতসেরা বেবি বুবুন। 

*****

সংহিতার ফোনটা নিয়ে চেনা আধচেনা সাতাত্তরটা ফোন রিসিভ করে, শেষপর্যন্ত ফোনটা সুইচড অফ করে, মুখ যথাসম্ভব আড়াল করে নিউজস্ট্যান্ড থেকে সেদিনকার কয়েকটা কাগজ ঝটপট তুলে নিয়ে বুবুন যখন বাড়িতে ঢুকল তখন ভেতরের ঘর থেকে তারস্বরে টিভির আওয়াজ ভেসে আসছে। দৃঢ় ‘স’ উচ্চারণসহ ঘোষক আজকের ব্রেকিং নিউজ পরিবেশন করছেন। “অরবিন্দ ঘোষালের জামাইয়ের আসল পরিচয় ফাঁস হয়েছে। ঘটনাস্থলে আছেন আমাদের প্রতিনিধি তাপস, হ্যালো হ্যালো, তাপস? শুনতে পাচ্ছ? হ্যাঁ আমিও পাচ্ছি। আমাদের দর্শকরা জানতে চান ভারতসেরা বেবি বুবুন তাঁদের বাড়ির জামাই হতে চলেছেন শুনে ঘোষাল পরিবারের কী প্রতিক্রিয়া?”

তাপস ভেসে উঠলেন স্ক্রিনে। অরবিন্দ ঘোষালের বাংলোর বন্ধ গেটের সামনে শ’দেড়েক লোক ধাক্কাধাক্কি করছে। কারও ঘাড়ে ক্যামেরা, কারও হাতে মাইক। মাথার ওপর গদার মতো নেমে আসা অন্য এক চ্যানেলের বুম পরম দক্ষতায় কাটিয়ে তাপস বললেন, “হ্যালো হ্যালো, অনামিকা, হ্যাঁ, হ্যালো হ্যালো… আমরা কিন্তু এখন আছি অরবিন্দ ঘোষালের বাড়ির ঠিক সামনেই…হ্যালো……হ্যাঁ…এখানে কিন্তু উত্তেজনা রুদ্ধশ্বাস আকার ধারণ করেছে। তবে ঘোষাল পরিবারের কারও সঙ্গেই কিন্তু এখনও পর্যন্ত যোগাযোগ করা যায়নি। না, আমাদের রাইভ্যাল চ্যানেলও কিন্তু…(আবার ধেয়ে আসা বুম নিখুঁত ফুটওয়ার্কে এড়িয়ে)… ব্যর্থ হয়েছে। তবে আমরা কিন্তু একজন ঘোষাল পরিবারের খুব গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে কিন্তু আমাদের মধ্যে পেয়েছি…” হাত বাড়িয়ে একজন সিকিউরিটি গার্ডকে স্ক্রিনের ভেতর টেনে আনলেন তাপস। “ইনি কিন্তু গত তিন মাস ধরে ঘোষালবাড়ির গেটে ডিউটি দিচ্ছেন। ইনি এখন আমাদের জানাবেন বেবি বুবুনের পরিচয় ফাঁস হওয়ার পর ঘোষালবাড়ির কার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে…”

স্ক্রিনে আবার স্টুডিওর ছবি ফুটে উঠল। এখন অনামিকা আর অনামিকার ল্যাপটপের সঙ্গে ইন সেটে আরও চারজন। সকলেই সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে বাংলার মাথা। কানের হেডফোন অ্যাডজাস্ট করে নিয়ে অনামিকা বললেন, “হ্যালো হ্যালো তাপস, তুমি ওঁর সঙ্গে কথা চালিয়ে যাও, আমরা এখানে বিশেষজ্ঞদের থেকে জেনে নিই, বেবি বুবুনের আত্মপ্রকাশের কী প্রভাব পড়তে পারে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সমাজ ও রাজনীতিতে…”

বুবুন ঢুকে দেখল সারা ঘর, মেঝে, খাটে, চেয়ারে টেবিলে পেপার কাটিং, সার্টিফিকেট, মেডেল, বেবি বুবুনের ছবি ছত্রাকার। তার মাঝখান যশোদাগোপালের সোনার মূর্তি আঁকড়ে বুবুনের মা বসে আছেন। তাঁর মাথায় বেস্ট মমি মুকুট। টিভির দিকে তাকিয়ে তিনি একই সঙ্গে হাসছেন এবং কাঁদছেন। 

বুবুনকে দেখে আলো হয়ে উঠল বুবুনের মায়ের মুখ। “বুবুন, বুবুন, তুই আর নোবডি নোস বুবুন। এখন সবাই জানে তুই ভারতসেরা বেবি বুবুন। আমি ভারতসেরা মা। কে ওই অরবিন্দ ঘোষাল আর তার মেয়ে?” বুবুনের মায়ের মুখ থেকে মাতৃত্বের আলো মুহূর্তের জন্য মুছে গিয়ে ক্রোধ ফণা তুলল।

“তুই আমার কাছে আবার ফিরে আয় বুবুন, মায়ের কাছে। বাকি সব সম্পর্ক দুদিনের বুবুন, একমাত্র অমর হল নাড়ির টান। বুবুন…বুবুন…” বলতে বলতে দুই হাত প্রসারিত করে বুবুনের দিকে দৌড়ে এলেন বুবুনের মা। 

আত্মরক্ষার জন্য বুবুন হাত বাড়ালো। বাড়ানো হাতটা গিয়ে ঠেকল যশোদাগোপালের মূর্তিতে। মূর্তিটা বুবুনের মায়ের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে একবার মাথার ওপর তুলেই নামিয়ে আনল নিচে বুবুন। ছিটকে গেল সোনার মুকুট। গোপালের সোনার থাবা আর কপালের সংঘাতে ছিটকে বেরোলো রক্ত। বিস্ফারিত চোখে মাত্র একবার “বু…বু…ন” বলে মাটিতে পড়ে গেলেন বুবুনের মা। বেস্ট মমি মুকুটটা মেঝের যেখানে পড়েছিল, মাথাটা ঠিক তার নিচে সেট হয়ে গেল। 

*****

পুলিশ এল। স্থানীয় থানার নতুন ফার্স্ট অফিসার, ইন্সপেক্টর দত্ত। বুবুন থম মেরে মায়ের মৃতদেহের পাশে বসে ছিল, মুখ তুলেও দেখল না। দেখলে হয়তো চিনতে পারত, এ সেই মৃত্যুঞ্জয়। বুবুনের রিকশার বন্ধু। সেকেন্ড অফিসার সান্যাল সারা বাড়ি ঘুরে এসে মৃত্যুঞ্জয় দত্তের কানে কানে বললেন, “ওপেন অ্যান্ড শাট কেস, স্যার।”

সেই রেজাল্টের ঘটনাটা মৃত্যুঞ্জয়কে গভীর আঘাত করেছিল। জীবনে প্রথমবার বন্ধু হারানোর শোক সবাইকেই যেমন করে। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ইংরিজিটা শিখেই ছাড়বেন। ইংরিজি শেখার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি প্রথমেই বাংলাটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেন আর চেষ্টায় কী না হয়। এখন একমাত্র বউয়ের রান্নায় নুন কম হলে মৃত্যুঞ্জয় বাংলায় মুখব্যাদান করেন, বাকি সব জায়গায় ওনলি ইংলিশ। 

তিনি গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, “লেটস শাট ইট দেন।”

বুবুনের হাত থেকে আস্তে করে রক্তে মাখামাখি মূর্তিটা বার করে সান্যালের বাড়িয়ে ধরা এভিডেন্স বস্তায় ফেলে দিলেন মৃত্যুঞ্জয় দত্ত। এই এভিডেন্স বস্তা স্পেশাল “শাট কেস”-এর জন্য। এর ঠিকানা থানার পেছনের ডোবা।

বুবুনের গম্ভীর কিন্তু শান্ত মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বুকপকেট থেকে ভাঁজ করা কালো সানগ্লাসটা, যেটা ‘দাবাং’ দেখার পর তাঁর বউ শ্রীরামপুরের শপিং মল থেকে কিনে এনে দিয়েছে, পরে বাইরে বেরিয়ে এলেন মৃত্যুঞ্জয়। হাবিলদার লাঠি উঁচিয়ে রাস্তা খালি করে রেখেছিল। জিপের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মৃত্যুঞ্জয় দত্ত ভাবলেন, এতদিন যে সময় লাগল, সেটাই আশ্চর্যের। কিন্তু চার বছর আট মাস কেরিয়ারে তিনি এত আশ্চর্যের জিনিস দেখেছেন যে এই ঘটনাটা তাঁকে বেশি আশ্চর্য করল না। মোড়ের ঠিক মাথায় “কী হয় দেখাই যাক না” ভঙ্গিতে লাস্ট মোমেন্ট পর্যন্ত বসে থাকা একটা সাহসী নেড়িকে হর্ন দিয়ে তাড়িয়ে (এবং উত্তরে “ঘ্যাঁক” প্রতিবাদ পেয়ে) জিপ পাড়া ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটা মৃত্যুঞ্জয় দত্তর মাথা থেকে বেরিয়ে গেল।

*****

‘শুভজিৎ ওয়েডস সংহিতা’, হলুদের ছোপ দেওয়া প্রজাপতির ডিজাইন আঁকা হালফ্যাশনের কার্ড আমাদের বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছোলো ক’দিন পরই। “মা মারা যাওয়ার ছ’মাসও হয়নি, চোখের চামড়া বলে কি কিছু নেই এদের?” বলাবলি করতে করতে পাড়া ঝেঁটিয়ে আমরা নেমন্তন্ন খেতে গেলাম। স্টেশন রোডে তিনতলা বারোয়ারি বিয়েবাড়ি “মঙ্গলদীপ”-এর গা বেয়ে শতশত হলুদ উজ্জ্বল টুনির মালা আর গেটে পুলিশ। (সংহিতার কোন মামা নাকি এম পি, খবরটা তাহলে সত্যি?) এম পি মামা এসে পড়লে পাছে খাওয়ার জায়গায় কারফিউ জারি হয়, তাই আগে খাওয়া সারা হল। এক দেওয়ালে চাউমিন, আরেক দেওয়ালে পিৎজা, আরেক দেওয়ালে কুলচা। ইয়ংস্টারেরা চুটিয়ে খেল, যে সব বুড়োবুড়িরা নকল দাঁত দিয়ে কুলচা চিবোতে পারল না, তারা ভুখা পেটে কোণের চেয়ারে বসে নরম ময়দার লুচি আর ছোলার ডাল দিয়ে মাখা কালোজিরে চালের ভাতের কথা ভেবে হাহুতাশ করল। 

দোতলার সিংহাসনে রানীর মতো বসে ছিল সংহিতা, আর ডিজাইনার ধুতির কোঁচা হাতে ধরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের বুবুন। ভিড় ঠেলে কোনওমতে সামনে গিয়ে সংহিতার হাতে বেডকভার আর 'শীর্ষেন্দুর দশটি উপন্যাস' গুঁজে আমরা চলে এলাম। বাইরে বেরোনোমাত্র আলো আর চিৎকার আর সুগন্ধী দমবন্ধ বাতাসের জায়গায় শেষ অঘ্রাণের হাওয়া জাপটে ধরে আরাম দিল। রিকশাস্ট্যান্ড ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে, আমরা হেঁটেই ফিরলাম। 

ফিরতে ফিরতে ছবির মতো বিয়েবাড়ির দৃশ্য মাথার ভেতর ভেসে ভেসে যাচ্ছিল সবারই। বুবুনের বাবার হাসি, সংহিতার রং বুলিয়ে উঁচু করা গালের হাড়ের অহংকার। কিন্তু সব ছাপিয়ে আমাদের বারবার মনে পড়ছিল বুবুনের মুখ। সারা ঘরের আলো হাসি রং কোলাহল সিলিং-এর পলকাটা ঝাড়লন্ঠনে প্রতিফলিত হয়ে যেন জড়ো হয়েছিল বুবুনের মুখে। 

নাঃ, কোনও সন্দেহই নেই, বুবুন আমাদের দেখা বেস্ট বর।

রেললাইনের পাশের হনুমানমন্দিরের গা বেয়ে ওঠা অশ্বত্থগাছটার পাতা সরসরিয়ে উঠল। লোকে বলবে হাওয়া, কিন্তু আমরা স্পষ্ট শুনলাম কে যেন বলছে, “জানি জানি জানি…”


March 28, 2017

উঠতে বসতে



লটারি জাতীয় ব্যাপারে আমার কপাল কখনওই ভালো হয় না। ছোটবেলায় একবার সেজকাকুর হয়ে বঙ্গলক্ষ্মী না কীসের একটা টিকিট পছন্দ করেছিলাম, লাগেনি। অফিসে বছর বছর দেওয়ালিতে তাম্বোলা নামের এক বিভীষিকা হয়, লোকজন ডাইনেবাঁয়ে কফি মাগ থেকে ক্যাডবেরি জেতে, আমি গোল্লা পাই। ডি ডি এ ফ্ল্যাটের লটারিতেও নাম লিখিয়েছিলাম বছরকয়েক আগে, যথারীতি নাম ওঠেনি। 

একমাত্র একটি ব্যাপারে আমার কপাল আশ্চর্যরকম খোলে, সেটা হচ্ছে হোটেলের ঘর। বেড়াতে গেলে কপালের ভাগ কম, যেমন ভাড়া দেব, তেমনই ঘর পাব। কিন্তু কাজে গেলে ঘর অন্যে বুক করে রাখে, দরজা খুলে ঢোকার আগে আঁচ করা অসম্ভব কপালে কী নাচছে। লটারিই হল একরকম। সে সব লটারিতে আমার কপাল বেশিরভাগ সময়েই অত্যন্ত ভালো। 

যেমন ধরুন, যেবার সারিস্কা গিয়েছিলাম অফিসের সঙ্গে। এক রাজবাড়ি-কাম-হোটেলে থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। কেউ রাজার ঘর পেল, কেউ রানীর ঘর। সবাই ছোটাছুটি করে সে সব ঘর দেখতে গেল। আমাদের অ্যাডমিন হাত তুলে দিয়ে বললেন, আমি বাবা কিছু করিনি, যার যেমন কপাল তেমন পেয়েছ। আমি যে ঘরটা পেলাম সেটা খুব সম্ভবত সেনাপতির। যথেষ্ট আরামদায়ক, কিন্তু মেঝে ফুঁড়ে ফোয়ারা বেরোয়নি। ঘরপ্রতি দু’জন করে থাকবে। আমার ঘরে আমার সঙ্গে কে থাকবে জানা ছিল না। আমার অফিসে কোনও বন্ধু নেই, শত্রুও না, যে আসবে তাকেই মাথা পেতে নেব ভঙ্গি করে বসে রইলাম। কেউ আসে না, আসে না, শেষ পর্যন্ত এলই না। রাজারানীর খাটে লোকজন দু’জন করে শুয়ে রাত কাটালো, আমি সেনাপতির খাটে একা স্টার ফিশ হয়ে শুয়ে খুব হাসলাম।

আরেকবার ট্রেনিং দিতে নিয়ে গিয়েছিল জঙ্গলের মধ্যে, আশেপাশে কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ একখানা আখাম্বা হোটেল। খেলানো বাগান, বাগানে ভাঙা পরী, করিডরের দেওয়ালে সারি দিয়ে টাঙানো চিনামাটির প্লেটে আঁকা সাহেবমেম, কোণে কোণে রাখা অ্যান্টিক সিন্দুকে জাফরি দিয়ে আসা রোদের কাটাকুটি। ওখানে আমরা থাকব তিনরাত্তির। কে কোন ঘরে থাকবে ঠিক করা নেই। একে একে রিসেপশন থেকে চাবি নিয়ে চলে যাও। আমিও গিয়ে ঘরে ব্যাগপত্র রেখে খুশি খুশি মুখে ডাইনিং রুমে এসেছি, দেখি সবার মুখ হাঁড়ি। সব বাহার নাকি বাইরেই, ঘর কহতব্য নয়। কারও ঘরে জানালা খোলে না, কারও বন্ধ হয় না,  কারও কারও বাথরুম এত ছোট, যে বেসিনটা বেসিক্যালি শোবার ঘরে। কারও এসি কাজ করছে না,আর ইন্টারনেট তো কারওরই নেই। সবাই ভয়ানক রেগে গিয়ে আমার দিকে তাকাল। হাউ’জ ইয়োরস? আমি একবার ভাবলাম বলব নাকি যে আমার অ্যাকচুয়ালি ইজ নয়, আর। একটা বসার ঘর, একটা শোওয়ার, বাথরুমে একখানা ছোটমতো টাবও আছে। শোওয়ার ঘরের জানালা বাইরে বাগানের ভাঙা পরী পেরিয়ে দিগন্তজোড়া জঙ্গলের মাথায় সূর্যাস্তের আকাশ। আর বসার ঘরে সোফা, যার ওপর আধশোয়া হয়ে এতক্ষণ অর্চিষ্মানের সঙ্গে স্কাইপ করছিলাম, তাই নামতে একটু লেট হয়ে গেল।

মনে আছে জল খাওয়ার ছুতোয় মুখে লেগে থাকা হাসিটুকু গিলে ফেলে গম্ভীর মুখে বলেছিলাম, কী আর বলব। 

বেজিং-এও আমার কপাল যথারীতি ভালোই ছিল। বেজিং-এ অবশ্য কারও কপালই খারাপ ছিল না। সব ঘরই ভালো, কেবল কোণের ঘরগুলো, যার একটা আমি পেয়েছিলাম, সেটা একটু বেশি ভালো। 

তবু সে ঘরে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল। প্রথম কথা তো নিজের বাড়িতে ব্যবস্থাপত্র যতই খারাপ হোক না কেন আরাম ঢের বেশি হয়, তাছাড়া অর্চিষ্মান থাকে। কিন্তু এ সব তো সব হোটেলের ক্ষেত্রেই সত্যি। বেজিং-এর হোটেলবাসের বাড়তি প্রাণান্তকরতাটুকু হচ্ছে ইন্টারনেটের অভাব। ইন্টারনেট আছে, তার স্পিডও সাংঘাতিক। কিন্তু দেখব কী? গুগল নেই, ইউটিউব নেই, এমনকি অবান্তরও নেই। 

সেই দু’হাজার নয়ের সেপ্টেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত এমন বেশ কয়েকবার হয়েছে যে আমি টানা সাতদিন লিখিনি। কিন্তু এমন একবারও হয়নি যে আমি টানা সাতদিন অবান্তরের মুখ না দেখে থেকেছি। ব্যাপারটা যে কতখানি অদ্ভুত সেটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়, তাই আমি চেষ্টাও করছি না। 

কাজ শেষ হল যখন তখন আমার সহ্যশক্তি শেষ সীমায়। এয়ারপোর্টে পৌঁছে সঙ্গীরা গেল ডিউটি ফ্রি শপিং করতে, আমি নির্দিষ্ট গেটের কাছে বসলাম। অবান্তর তখনও দেখা যাবে না, কিন্তু নেক্সট বেস্ট যেটা, অবান্তরের জন্য পোস্ট লেখা, সেটা করা যাবে। সিটে বসে ল্যাপটপ খুলে নিষিদ্ধ নগরীর গল্প টাইপ করতে শুরু করেছি, এমন সময় ঘটনাটা ঘটল। 

ঘটনাটাকে ঘটনা বলে তখন তো আর চিনতে পারিনি, তখন দেখলাম একজন রোগাপাতলা ভদ্রলোক, এয়ারপোর্টের কর্মচারীর উর্দি গায়ে, বাঁ হাতে একতাড়া কাগজ, ডানহাতে একখানা পেন, এসে আমার পাশের ফাঁকা সিটে বসলেন। খানিকক্ষণ পর আমার চশমার ফ্রেমের কোণায় একটা মোবাইল ফোনের স্ক্রিন উঁকি মারল। ফোনটা ধরে একখানা ফর্সা কবজি। আমি মুখ তুললাম। ভদ্রলোক হাসিহাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভুরু নাচিয়ে স্ক্রিনের দিকে দেখালেন। 

ওই স্ক্রিনটা আমি গত ক’দিনে দেখেছি বেশ কয়েকবার। বেসিক্যালি, ট্রানস্লেশন অ্যাপ। তুমি তোমার ভাষায় একটা কিছু টাইপ করলে সেটা অন্য ভাষায় অনুবাদ হয়ে যাবে। আপাতত যে ভাষাটা স্ক্রিন থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে সেটা ইংরিজি। ভদ্রলোক আমার সুবিধের জন্য অডিও চালু করে দিলেন, এবার ফোন থেকে এক ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর যান্ত্রিক গলা আমাকে জিজ্ঞাসা করতে লাগল, ক্যান ইউ টিচ মি হাউ টু ডু ইট?

টিচ? হোয়াট? 

ভদ্রলোক কোলের কাগজের তাড়ার ওপর ফোন নামিয়ে রেখে দু’হাত সামনে শূন্যে বাড়িয়ে ধরে দশ আঙুল নাড়ালেন কয়েকবার। চোখ বুজে। 

মূকাভিনয় আর দু’চারটে ইংরিজি শব্দ মিলিয়ে যা বুঝলাম, ভদ্রলোক আমার টাইপিং-এর স্পিড,  তাও আবার কি-বোর্ডের দিকে না তাকিয়ে, দেখে এমন অভিভূত হয়েছেন যে আমার থেকে এ বিদ্যেটি শিখতে চান।

প্রথমেই একটা পুরোনো দুঃখ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমার মুখের মধ্যেই এমন একটা কিছু আছে যে লোকে যেচে এসে আমাকে নিয়ে ঠাট্টামশকরা করে যায়। এ আমি বারবার দেখেছি। দুঃখটা খানিকটা কমলে দু’নম্বর চিন্তাটা হল। আমি ভদ্রলোকের মুখের দিকে ভালো করে তাকালাম, মাথা খারাপ তো মনে হচ্ছে না। চাকরিবাকরি করে খাচ্ছেন যখন। তিন নম্বর সম্ভাবনাটাই সবথেকে ভয়ের। ল্যাপটপ ব্যাগটা পায়ের সামনে রাখা ছিল। আমি যথাসম্ভব গোপনে পা-টা সামান্য এগিয়ে ব্যাগটাকে নিজের দিকে টেনে আনার চেষ্টা করলাম, বিশেষ সুবিধে হল না। 

তারপর কাঁচা বয়সের এক বন্ধুর শিক্ষা মনে পড়ল, যা হচ্ছে সব ফেস ভ্যালুতে নিতে শেখ। ভদ্রলোক বন্ধুত্বপূর্ণ, তাই আমার সঙ্গে আলাপ করছেন। আমিও হেসে প্রতি- আলাপ করলাম। এ কথা সে কথা হল, ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আর ইউ দ্য বস্‌? 

আমি কান্নাটাকে হাসির চেহারা দিয়ে সত্যিটা স্বীকার করলাম। বললাম, বস তো দূর অস্ত, আমি হচ্ছি গিয়ে সারভেন্টস্য সারভেন্ট। ভদ্রলোক জোরে জোরে মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করতে লাগলেন। এত জোরে যে টাইপ করে সে বস না হয়ে যায় না। এমন সময় পেছন থেকে আরেকটি গলা কানে এল। 

ইউ আর রাইট, দিজ পিপল আর দ্য বসেস ইন ইন্ডিয়া নাউ।

আমাদের অদ্ভুত কথোপকথন যে আরও লোকজনের কানে গেছে সেটা বুঝিনি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম দু-তিনটে সিট ওপাশে দু’চারজন লোক বসে আছে, আমাদের দেশের, তাদের মধ্যে একজন হাসিমুখে আমার চোখে চোখ ফেলে তাকিয়ে আছেন। এর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ভদ্রলোকের কাজের ডাক এসে গেল, তিনি মাথা খুব করে ঝাঁকিয়ে আমাকে টা টা করে চলে গেলেন। আমি আবার টাইপ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ততক্ষণে সুতো ছিঁড়ে গেছে। নিষিদ্ধ নগরীর গল্পেরা ব্যাকস্টেজে, সামনের স্টেজে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আরও দুটো শব্দ। 

দিজ পিপল। 

আমাকে কোন পিপলদের সঙ্গে এক গোত্রে বসাচ্ছেন উনি ভাবার চেষ্টা করলাম। চশমা-পরা পিপল? নাক থ্যাবড়া পিপল? চুল পাকা পিপল?  কোনওটাই জুৎসই লাগল না। চশমা পরা, নাক থ্যাবড়া বসে দেশ ছেয়ে গেছে এ কথা সত্যি, কিন্তু সেটা ওঁকে কোনও ভাবে বিচলিত করতে পারে মনে হল না।

আরও এক রকমের ‘পিপল’-এর মধ্যে আমি পড়ি বটে। মেয়েদের মধ্যে। মেয়েরাই যে আজকাল চতুর্দিকে বস হয়ে উঠছে, এই ব্যাপারটাই ওঁকে রসিকতা করতে বাধ্য করেছে ধরে নিলাম আমি। 

দু’তিনটে অনুভূতি একসঙ্গে মারামারি করছিল জায়গা নেওয়ার জন্য। রাগ, অপমান, মনখারাপ। কোনওটাই আমার রুগ্ন মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে সুবিধেজনক নয়।  

আরেকবার লোকটার দিকে তাকালাম। এখন লোকটা অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। ওই বয়সের বেশিরভাগ ভারতীয় পুরুষকে যেমন দেখতে হয়। মাঝারি ভুঁড়ি, মাঝারি টাক। আপাদমস্তক মাঝারি চেহারা। বলার মতো কোনও প্রিভিলেজ চুঁইয়ে পড়ছে না (বিদেশী এয়ারপোর্টে বসে থাকার অবভিয়াস প্রিভিলেজটা ছাড়া)। 

অথচ জন্মসূত্রে এ আরেকটা প্রিভিলেজ পেয়েছিল। পুরুষ হয়ে জন্মানোর প্রিভিলেজ। কোনও পরিশ্রম, কোনও স্ট্রাগল করতে হয়নি, জাস্ট একটি প্লেজেন্ট অ্যাকসিডেন্ট। ব্যস। এখন ক্ষেত্রবিশেষে সে প্রিভিলেজ মুঠো গলে পালিয়ে যাচ্ছে যখনতখন। আর সেই সঙ্গে রাগ বাড়ছে। কমছে প্রকাশের সুযোগ। এখন জোকসের মুখোস পরিয়ে রাগগুলো বার করে দেওয়া ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই, মাঝারি লোকেদের কাছে। 

ব্যাপারটা খুবই বেদনার, অ্যাকচুয়ালি। 

রাগের বদলে করুণাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত বলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। সান্ত্বনা দেওয়ার কথাও মাথায় এসেছিল একবার, কিন্তু ততক্ষণে বোর্ডিং-এর লাইন দেওয়ার নির্দেশ এসে গেছে।


March 24, 2017

বেওয়ারিস বাংলা



“আজকাল বাঙ্গালী ভাষা আমাদের মত মূর্ত্তিমান কবিদলের অনেকেরই উপজীব্য হয়েচে, বেওয়ারিস লুচীর ময়দা বা তইরি কাদা পেলে যেমন নিষ্কর্ম্মা ছেলেমাত্রেই একটা না একটা পুতুল তইরি করে খ্যালা করে, তেম্‌নি বেওয়ারিস বাঙ্গালী ভাষাতে অনেকে যা মনে যায় কচ্চেন; যদি এর কেও ওয়ারিশান থাক্‌তো, তা হলে ইস্কুলবয় ও আমাদের মত গাধাদের দ্বারা নাস্তা নাবুদ হতে পেতো না -  তা হলে হয় ত এত দিন কত গ্রন্থকার ফাঁশী জেতেন, কেউ বা কয়েদ থাকতেন; …”
                                                                                                   
                                                                                                 — হুতোম প্যাঁচার নকশা



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.