February 28, 2018

সিক্রেট ট্রিক



দু’নম্বর মার্কেটে চা খেতে খেতে একজন বলল, ফোন করে বলল দু’জন, অর্চিষ্মানকে গ্রুপ চ্যাটেও নাকি তিনজন বলেছে। সেদিন ওলাতে উঠে একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হোয়্যার ইজ ইয়োর ড্রপ? ওহ, সি আর পার্ক? বাই দ্য ওয়ে, আমিনিয়া খুলেছে শুনেছেন তো, গেছেন নাকি?

যাওয়া হয়নি। তবে সামনে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করেছি। আর সেকেন্ড বেষ্ট অপশন যেটা, ইন্টারনেটে রিভিউ পড়া, তাও করেছি। কেউ কেউ লিখেছেন, খেয়ে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল, ছেঁড়া ঘুড়ি রঙিন বল… কেউ লিখেছেন, জঘন্য, পাতে দেওয়া যায় না। অবশ্য গোটা জাতটার যে রকম অধঃপতন হয়েছে তাতে বিরিয়ানি পাতে দেওয়ার মতো থাকলেই অদ্ভুত হত। একজন দেখলাম লিখেছেন, বিরিয়ানি ভালো তবে কলকাতার আমিনিয়ার বিরিয়ানির মতো নয়, কিন্তু তাতে এঁদের কোনও দোষই নেই। দোষ দিল্লির জলের, যেটা কলকাতার জলের থেকে আকাশপাতাল অন্যরকম। যারা জানে না তারা মাংসের সুসিদ্ধতা, চালের দৈর্ঘ্য, আলুর সংখ্যা, ডিমের থাকা না-থাকা নিয়ে লাফায়, যারা জানে তারা জানে বিরিয়ানির বাঁচামরা এগুলোর কোনওটার ওপর নির্ভর করে না। বিরিয়ানির বাঁচামরা নির্ভর করে রান্নার জলের ওপর। জলটাই হচ্ছে বিরিয়ানির সিক্রেট ট্রিক।

*****

আমাদের চেনা একজন পায়েস রেঁধে খাইয়েছিলেন, তাঁকে যেই না ভদ্রতা করে বলা হয়েছিল, ‘বাঃ দারুণ হয়েছে,’ মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে তিনি বলেছিলেন, ‘কেন আমার পায়েস ভীষণ ভালো আর তোমাদেরটা চলনসই ভালো হয় বল দেখি? তোমাকে বলছি কারণ তুমি বাকিদের মতো বদের বাসা, যমের অরুচি নও। পায়েস রান্নার সময় এক চিমটে নুন দেবে। ব্যস, তারপর পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকবে।’

পায়ের ওপর পা তুলে? মায়ের চোখ কপালে উঠেছিল, মা তো দুধ দেন চাল দেন খানিক পর চিনিও দেন তারপর কপালে আর নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম নিয়ে নার্ভাসমুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাড়তেই থাকেন নাড়তেই থাকেন, পাছে তলা ধরে যায়। মায়ের নার্ভাসনেসের কথা শুনে পায়েসপটিয়সী মাথা পেছন দিকে হেলিয়ে হেসে বলেছিলেন, ‘ও সব নাড়াটাড়া কিছু নয়, পায়েসের সিক্রেট ট্রিক হচ্ছে নুন।’

এ রকম সিক্রেট ট্রিকের কথা আরও শুনেছি। এক চিমটে হিং-ই নাকি গোটা রান্নার ভোল পালটে দিতে পারে, কিংবা এক চুটকি কসুরি মেথি। শুধু দেওয়া নয় কখন দেওয়া হবে তার ওপরেও রান্নার ভবিতব্য নির্ভর করে নাকি। হলুদ দিলেই হল না, দেওয়ার টাইমিংটাই আসল।

ভালো রান্নার আবার কিছু অ্যাবস্ট্রাক্ট সিক্রেটও আছে। মায়ের হাতের ছোঁয়া, বউয়ের প্রেম ইত্যাদি। এ সব সিক্রেটে আমার বিশ্বাস নেই। মাতৃত্বের পরীক্ষায় ডিস্টিংশন নিয়ে পাস করা বহু মায়েদের আমি অখাদ্য রাঁধতে দেখেছি। আমি বলছি না, সে সব মায়েদের সন্তানরা নিজেরাই বলেছে। আর বউয়ের প্রেমের মিথ সম্পর্কে তো ফার্স্ট হ্যান্ড অভিজ্ঞতা আছে। অর্চিষ্মানের প্রতি আমার প্রেম দরকারের থেকে বেশি বই কম নয়, কিন্তু এত প্রেম নিয়েও রেঁধেও একবার মাংসের আলু টেনিসবলের মতো শক্ত রয়ে গিয়েছিল, কামড় বসিয়ে বেচারার দাঁত যে পড়ে যায়নি ভাগ্য।

মাকে ভালো রান্নার সিক্রেট ট্রিক জিজ্ঞাসা করতে গিয়েছিলাম, মা বললেন ট্রিক হচ্ছে কোনওমতে রান্না শেষ করে গ্যাস নিভিয়ে ফ্যান চালিয়ে ঘুমোনো। অগত্যা আমাকে নিজের ট্রিকের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়েছে। সে ট্রিক হচ্ছে যা যা দেওয়ার যথাসম্ভব ঠিকঠাক দেওয়া, দিয়ে ভগবানের নাম করা।

এইরকম পচা ট্রিকে যা হওয়ার তাই হয়। ভাজাভুজিতে রেগুলার নুন বেশি হয়, ডালে জল হয় বেশি নয় কম, আলুপোস্তর আলু গলে কাদা, ফুলকপির বিদঘুটে গন্ধ ঢাকতে গরমমশলা বেশি করে দিয়ে খেতে বসে মনে হয় এলাচদারচিনির ঝোল খাচ্ছি।

*****

মাবাবা আসবেন শুনে খুব আনন্দ হল তারপর মনে পড়ল খাটের ওপর ডাঁই জামাকাপড় ভাঁজ করতে হবে, পুরোনো খবরের কাগজ বিদায় করতে হবে, রান্নাঘর পরিষ্কার করতে হবে। সপ্তাহে সপ্তাহে যে রকম পরিষ্কারের ভঙ্গি করি সে রকম নয়, ডিপ ক্লিন। বাসনকোসন রাখার তারজালিটা ধরে যেই না ঝাঁকুনি দিয়েছি, টপ করে কী একটা পড়ল।

একটা কাঠের খুন্তি। সরু হাতল, মাথাটা বেলুনের মতো ফোলা, বিভিন্ন শেডের বাদামি স্রোতের মতো বয়ে গেছে সারা শরীর জুড়ে। ননস্টিক কড়াইয়ের সঙ্গে ফ্রি এসেছিল। এখন এর গায়ের শেডগুলো মলিন হয়ে এসেছে, বেলুনের মাথাটা জায়গায় জায়গায় ক্ষয়ে গেছে, হাতল আর মাথার সংযোগস্থলের একটা জায়গাও টোল খেয়ে গেছে, যে জায়গাটা কড়াইয়ের ধারে ঠুকে ঠুকে খুন্তিতে লেগে থাকা তরকারি কড়াইয়ে ফেরত পাঠানো হয়। মোদ্দা কথা খুবই ঝড়তিপড়তি অবস্থা। অন্যান্য ননস্টিক কড়াইয়ের সঙ্গে যেসব খুন্তিরা ফ্রি এসেছিল তাদের এই অবস্থা নয়। ইন ফ্যাক্ট, তাদের অবস্থা খুবই ভালো, কারণ সেগুলো ব্যবহারই হয় না। যত চোট যায় এই খুন্তিটার ওপর দিয়ে। কারণ এটা আমার ফেভারিট খুন্তি। আর এই খুন্তিটাকে আমি বেশ কিছুদিন ধরে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

*****

ওই খুন্তিটার ফেভারিট হওয়ার কোনও কারণ নেই। চেহারাগত কোনও বৈশিষ্ট্য তো নেইই, পুরোনো হলেও এতও পুরোনো নয় যে নস্ট্যালজিক ভ্যালু থাকবে। যেটা রান্নাঘরের সাঁড়াশিটার আছে। সাঁড়াশিটার অবশ্য অন্য ভ্যালুও আছে। সলিড লোহার, ডাকাত পড়লে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার মতো বাড়িতে ওই একটাই জিনিস আছে। এ সাঁড়াশির বয়স আমার থেকে বেশি। জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখেছি ওই সাঁড়াশি দিয়ে ভাত বসানো হচ্ছে, ডাল নামানো হচ্ছে, আমার পেটব্যথা হলে ওইটা দিয়ে চেপে ধরে থানকুনির রস ফোটানো হচ্ছে। আমার দিল্লির রান্নাঘরেও একটা সাঁড়াশি ছিল গোবিন্দপুরীর বাজার থেকে কেনা, সে এমন টাইট যে দু’হাত দিয়ে টেনে খুলে তারপর বাসন ধরতে হয়। নামিয়ে আবার দু’হাত দিয়ে টেনে বাসন থেকে ছাড়াতে হয়।

একবার বাড়ি গিয়ে কালো সাঁড়াশিটা তুলে ধরে গলায় ফিফটি পার্সেন্ট বিষাদ আর ফিফটি পার্সেন্ট বঞ্চনা ফুটিয়ে বলেছি, 'তোমাদের সাঁড়াশিটা কী ভালো, আমারটা কী বাজে,’ যা হওয়ার তাই হল, মা একেবারে অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে পড়লেন। ‘ছি ছি, আমি কি মা? নিজে ভালো সাঁড়াশি নিয়ে মৌরসিপাট্টা করে বেড়াচ্ছি আর একমাত্র মেয়ে সাঁড়াশির অভাবে কেঁদে মরছে?’ তারপর ক্রমে ক্রমে মা কল্পনা করলেন ওই খারাপ সাঁড়াশি দিয়ে ধরতে গিয়ে একদিন গরম ডালের বাটি আমার পায়ের ওপর, সাঁড়াশির মুখ মিসাইলের মতো গেঁথে গেছে আমার আঙুলের নখের পাশের নরম জায়গাটায়…. মায়ের কথা বন্ধ হয়ে গেল, রান্না অর্ধেক রেখে সাঁড়াশি মেজেধুয়ে আমার সুটকেসে পুরে কোনওমতে একটা ছেঁড়া ন্যাকড়া দিয়ে হাত পুড়িয়ে গরম হাঁড়ি ওঠানো নামানো করতে লাগলেন।

খুঁজে পাওয়া খুন্তিটা হাতে ধরে কেমন একটা অনুভূতি হল। যেন খুন্তি নয়, আমার হাতের স্বাভাবিক এক্সটেনশন। রান্না শুরু করার আগে যেমন হয়, কী জানি কেমন হবে ধুকপুকুনি, সব নিমেষে হাওয়া। গুনগুন গাইতে গাইতে উচ্ছে কাটলাম, সুদর্শন চক্রের মতো ঘুরে ঘুরে তাঁরা কড়াইয়ে ভাজা হলেন। পেঁয়াজটমেটো সম্বার দিয়ে সিম্পল মুসুরডাল রাঁধলাম। বেশি করে কাঁচালংকা দিয়ে আলুপোস্ত আর কড়াইশুঁটি দেওয়া ডুমো ডুমো আলুফুলকপির ঝোল হল। বাড়িতে মাশরুম খাওয়া হয় না, এদিকে মা আমিষ ছেড়েছেন আর ভেজিটারিয়ান ডায়েটে মাশরুম নিয়মিত থাকা দরকার নেটে পড়েছি,  কাজেই মাশরুম কাসুন্দিও হল। মারাত্মক সোজা রান্না। তেল, রসুন, মাশরুম, কাসুন্দি, নুন, কাঁচালংকা। ব্যস, রান্না শেষ। তারপর মনে পড়ল, সেদিন শনিবার। আমার এবং বাবার ফেভারিট বেগুনপোড়া করা যেতে পারে। আমি ছোটবেলা থেকেই বেগুন, বিশেষ করে বেগুনপোড়া-প্রেমী ছিলাম, আমার রোজই বেগুনপোড়া খেতে ইচ্ছে করত। একবার ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেন বেগুন, টমেটো ইত্যাদি খালি শনিমঙ্গলবারই পোড়ানো হয়, অন্যদিনে পোড়ানো হয় না? ঠাকুমা পাটায় চন্দন ঘষতে ঘষতে বলেছিলেন, শনিমঙ্গল ছাড়া অন্যদিন বেগুনটমেটো পোড়ানো নাকি ইকুইভ্যালেন্ট টু বাড়ির লোককে পোড়ানো। আমি কথা বাড়াইনি কিন্তু বিশ্বাসও করিনি। ইয়ার্কি নাকি? কিন্তু বাবামা হয়তো বিশ্বাস করেন। কাজেই বেগুন পুড়িয়ে ধনেপাতা টমেটো পেঁয়াজ দিয়ে ভর্তা বানানো হল।

সব হল ওই ফিরে পাওয়া খুন্তি দিয়েই। তারপর খুন্তি ভালো করে ধুয়ে মেজে, তেলে পাঁচফোড়ন শুকনোলংকা ছেড়ে ওই খুন্তি দিয়েই নেড়েচেড়ে টমেটো খেজুর আমসত্ত্বের চাটনি বানিয়ে, লাস্টে অল্প তেঁতুলের রস দিয়ে নামিয়ে নিলাম।

দুজনেই বললেন, ‘আহা কী ভালো রেঁধেছিস সোনা। ভাতটা কী ঝরঝরে হয়েছে। আর এরকম ডাল পেলে তরকারি লাগেই না।’ মা বললেন, ‘ফুলকপি রাঁধা মারাত্মক শক্ত ব্যাপার, সেটা যে এইরকম রাঁধতে পারে…’ বাবা বললেন, ‘বাড়ির বেগুনপোড়াটা এই রকম হয় না কেন বল দেখি?...”

আমি খুশিতে গদগদ হলাম কিন্তু মাবাবা তো বলবেনই। অর্চিষ্মান মাবাবার সামনে বেশি কিছু বলবে না বুঝে নিজেই জিজ্ঞাসা করলাম। তখন ও আস্তে করে বলল, ’ভালো হয়েছে।’ তারপর মনে পড়ল অর্চিষ্মান টেনিসবলের মতো আলু খেয়েও চুপ করে ছিল, কাজেই ওর কথাকেও বিশ্বাস করা যায় না।

বিশ্বাস করা যায় শুধু নিজের জিভকে। ডাল দিয়ে ভাত মেখে মুখে পুরলাম। নাঃ, ডালের ঘনত্ব মাপমতো, ফুলকপির বদগন্ধও নেই, আলু সুসিদ্ধ হয়েছে। নুনঝালমিষ্টিরাও ত্যাঁদড়ামো করেনি কেউ, সুসভ্য আচরণ করেছে।

*****

সিক্রেট খুন্তিটাকে চোখে চোখে রাখছি আজকাল। আর হাতছাড়া হতে দিচ্ছি না।


February 26, 2018

আমার জীবনে কিছু না হওয়ার আসল কারণ



উৎস গুগল ইমেজেস


গত দশদিনে এক সন্ধ্যেয় বাজারের দু’দিকের দুই ফুচকাওয়ালার ফুচকা (আড়াই মিনিটের তফাতে) + আলুকাবলি (একদিকের, থ্যাংক গড) খেয়ে এমন পেটব্যথা, বুকজ্বলুনি, গা-গোলানি হয়েছিল যে রাতে ডিনার তো দূর অস্ত,পরের চব্বিশঘণ্টা কিছু গলা দিয়ে নামবে কিনা সন্দেহ হচ্ছিল। পরদিন ভোর চারটেয় অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম ভাঙল। চোখ খোলারও আগে টের পেলাম ক্ষিদের অসহ্য কামড় । পেটের থেকে নির্লজ্জ এ জগতে আর কিছু আছে কি?

আরেকদিন ওলা ভাইসাবের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হল। আমি ওঁকে 'এক’ রেটিং দিলাম। উচিত শিক্ষা দেওয়ার গর্বে মাথা উঁচু করে সফল-এ ঢুকে হলুদ ঝুড়িতে সবুজ করলা পুরছি, মনে পড়ল যা চেঁচিয়েছি তাতে একের বেশি রেটিং আমার কপালেও জুটবে না। মেজাজটাই গেল খারাপ হয়ে।

আরেকদিন অর্চিষ্মানের বন্ধু ‘অ’ এসেছিল। সেই অনারে ফ্রিজের আলুকপি ফেলে রেখে আমরা ‘মা তারা’য় গেছিলাম। আলু দিয়ে পাঁঠার ঝোল, ভাত, রুটি, আলুপোস্ত, আলুভাজা, থামস আপ আর টমেটো শশা গাজর লেবু কাঁচালংকার স্যালাড খাওয়া হল। লংকাগুলো তো ঝাল ছিলই, তার থেকেও ঝাল ছিল বাংলার আধুনিক সংস্কৃতির ধারকবাহকদের নিয়ে আমাদের নিন্দেমন্দ।

উইকএন্ডে মা বাবা এসেছিলেন। তাঁরা চলে গেছেন, রেখে গেছেন নতুন জামা, গল্পের বই, গত পঁচিশ বছর ধরে পারফেকশনের চূড়ায় নিয়ে যাওয়া প্রেশার কুকারে বানানো পৃথিবীর সুস্বাদুতম ভ্যানিলা কেক, বাড়ির গাছের নারকেলের নাড়ু, মশাট থেকে আনা খেজুরের খাঁটি রসের গুড়ের পায়েস, রাজধানীতে পাওয়া (এবং নিজেরা না খেয়ে বাঁচিয়ে রাখা) লেমনেড টেট্রাপ্যাক, চটপটা ডালমুট। আর রেখে গেছেন অনেকদিন পর চোখে দেখার আরাম আর কানে শোনার ভালো ভালো গল্প। সে সব গল্প মনে থাকতে থাকতে আপনাদের শোনানোর ইচ্ছে আছে।

*****

ওপরের কোনওটাই কি গত দশদিনে অবান্তরে পোস্ট না ছাপার উপযুক্ত অজুহাত বলে বোধ হচ্ছে আপনাদের?

আমারও হচ্ছে না। কোনও সুস্থ মানুষেরই হওয়া সম্ভব নয়। 

গত দশদিন অবান্তর ফাঁকা থাকার আসল এবং একমাত্র কারণ হচ্ছে অ্যাকিউট ফাঁকিবাজিটাইটিস। যার জন্য আমার এ জীবনে কিস্যু হয়নি, হবেও না। সে আমি মেনে নিয়েছি, কিন্তু অবান্তরও যে হবে না এইটা এখনও মেনে নিতে পারছি না। তাই এই চূড়ান্ত ফাঁকিবাজির পোস্ট পাবলিশ করে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার একটা চেষ্টা করলাম। কালপরশু পদস্থ পোস্ট আসছে, প্রমিস। 


February 16, 2018

নিউটনের পাপ






ষোলোশো বাষট্টি সালে, টিনএজার আইজ্যাক নিউটন ডায়রিতে তাঁর পাপের লিস্ট বানিয়েছিলেন। কয়েকটা নমুনা নিচে দেওয়া হল, পুরো লিস্ট পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

Putting a pin in John Keys hat on Thy day to pick him. 

Wishing death and hoping it to some. 

Striking many. 

Having uncleane thoughts words and actions and dreamese. 

Punching my sister. 

Robbing my mothers box of plums and sugar. 

Beating Arthur Storer.


কৃতজ্ঞতাস্বীকার


February 15, 2018

শেষ দিন




মেয়ের সঙ্গে সবাই ক্যাশটাকা সোনাদানা খাটবিছানা ফ্রিজ মাইক্রোওয়েভ শ্বশুরবাড়ি পাঠায়, দ্বিতীয় সংগ্রাম সিংহের শ্বশুরমশাই পাঠিয়েছিলেন মেয়ের আটচল্লিশ জন সখী। তাঁদের থাকার জন্য রংবেরঙের ফুল লতাপাতা, মার্বেলের হাতিঘোড়া আর ফোয়ারা দিয়ে সাজিয়ে রাণা বানিয়ে দিয়েছিলেন নয়নাভিরাম সহেলিয়োঁ কি বাড়ি। 


সেই বাড়ি আমরা দেখতে এসেছি সক্কাল সক্কাল। আরেকটু পরে এলেও হত, আনন্দ ভবনের প্রায় ফুটবল মাঠের সাইজের খাটে লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমটাও এসেছিল দিব্যি। কিন্তু সেই খাটের মাথার কাছে জানালা, জানালার ওপারে মোটা মোটা গাছ আর সেই গাছের ডালে অজস্র পাখি সূর্য উঠতে না উঠতে চেঁচামেচি লাগাল। সে যে কী চেঁচামেচি যে নিজে কানে না শুনেছে জানে না।

অ্যালার্মের স্নুজ টেপা যায়, পাখিদের গলা টেপা যায় না। কাজেই উঠতে হল। উঠে কমপ্লিমেন্টারি চা ব্রেকফাস্ট খেয়ে আমরা গেলাম সহেলিয়োঁ কা বাড়ি দেখতে।

মরুভূমির দেশ বলেই বোধহয়, ফোয়ারা এদের কাছে সৌন্দর্যায়নের একটা বিশাল অঙ্গ। লেকের মাঝে ফোয়ারা, প্রাসাদের মাঝে ফোয়ারা, যেদিকে তাকাও সেদিকে ফোয়ারা। তবে ফোয়ারার চরম বাড়াবাড়ি দেখলাম সহেলিয়োঁ কা বাড়িতে। ফোয়ারায় ফোয়ারায় ছয়লাপ, পিছল! সাবধান! সতর্কতামূলক নোটিস লাগাতে হয়েছে মোড়ে মোড়ে, তবু ফোয়ারারা জল ছিটিয়েই চলেছে।

সখীদের বাড়ি দেখে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। উদয়পুরে অনেক কিছু দেখার আছে, মহারাণা প্রতাপ মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, কর্ণী মাতার মন্দির (আনন্দ ভবনের জানালা থেকে রাতের বেলা সেই মন্দির পর্যন্ত রোপওয়ের আলো দেখেছি), জগদীশ মন্দির, একলিঙ্গ মন্দির, খানিক দূরে হলদিঘাটি - কিন্তু আমরা এসব কিছুই দেখব না। আমরা দেখব শুধু উদয়পুরের বিখ্যাত সিটি প্যালেস। তবে তার আগে চেক আউট করব। চেক আউট করে লাগেজ রিসেপশনে রেখে যাব।

হোটেলের লাঞ্চ শুরু হয় দুপুর একটায়। আর লাঞ্চের টাইমিংসংক্রান্ত কড়াকড়ির কথা জেনেছিলাম কাল দুপুরেই। কিন্তু রেস্টোর‍্যান্টের ভারপ্রাপ্ত ভাইসাব আমাদের জানালেন, আমরা খেয়েই বেরোতে পারি। আমাদের কথাবার্তা শুনে তিনি জেনেছেন যে আমরা কী খেতে ভালোবাসি, ডালরুটি সবজি, বারোটার মধ্যে সে সব রেডি করে দিতে তাঁর কোনও অসুবিধেই হবে না।

*****


রাণা সঙ্গের যে ছেলেকে বাঁচাতে ধাত্রীপান্না নিজের ছেলেকে শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সেই উদয়সিংহই (দ্বিতীয়) পত্তন করেছিলেন এই উদয়পুরের। প্রভূত মারামারি কাটাকাটির মধ্যে তাঁর জন্ম এবং ছোটবেলা কেটেছিল বলেই বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, চারদিক খোলা পাহাড়ের ওপর অবস্থিত চিতোরে মুঘল আক্রমণ যে রেটে বাড়ছে, তাতে মেওয়ারসূর্য অস্ত যেতে বেশিদিন লাগবে না যদি না রাজধানী নিরাপদতর কোনও জায়গায় সরিয়ে নেওয়া যায়।

জল জঙ্গল পাহাড় দিয়ে ঘেরা পিচোলা দিঘির পারের থেকে নিরাপদ আর কীই বা হতে পারে? জায়গাটা একেবারে আলটপকা পছন্দ ছিল না, কারণ এখান থেকে উনিশ কিলোমিটার দূরে নাগডা শহরেই ষষ্ঠ শতাব্দীতে পত্তন হয়েছিল মেওয়ার শাসনের। অষ্টম শতাব্দীতে রাজধানী চলে যায় চিতোরগড়ে। সেখান থেকে আটশো বছর রাজত্ব চালানোর পর সূর্যবংশী শিশোদিয়া রাজপুত সাম্রাজ্যের রাজধানী উদয়সিংহ (দ্বিতীয়)র হাত ধরে ফেরত আসে উদয়পুরে।

সব ভালো গল্পেই রাজা থাকেন, শিকার থাকে আর শিকার করতে গিয়ে বনে দেখা হয়ে যাওয়া সন্ন্যাসী থাকে। এ গল্পেও আছে। জঙ্গলে শিকার করে বেড়ানোর সময় উদয়সিংহ সন্ন্যাসীর দেখা পেলেন। তিনি রাণাকে আশীর্বাদ করে জানালেন রাজধানী স্থাপনের নিমিত্তে এই স্থান অতি উপযোগী। পনেরোশো ঊনষাটে রাজধানী স্থাপন হল। প্রথমে ছিল একটি ছোট চত্বর, চত্বরে রাজা বসতেন, চারপাশের ছোট ছোট ঘরে রাজ্যচালনার কাজ চলত। 


সেই ছোট চত্বরই রাই আঙ্গন, যেখান দিয়ে কানে অডিও গাইড গুঁজে আমি হেঁটে চলেছি। 


পরের চারশো বছর ধরে ছিয়াত্তর প্রজন্মের রাণারা রাই অঙ্গনের সঙ্গে জুড়ে জুড়ে উদয়পুর সিটি প্যালেসকে আজকের চেহারায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। এই এক প্রাসাদে নাকি আলাদা আলাদা এগারোখানা প্রাসাদ আছে। তাতে একটু খাপছাড়া লুক যেমন হয়েছে, প্রাসাদের নির্মাণশৈলীতে যেমন রাজপুত, মুঘল, অ্যাংলো বিভিন্ন স্থাপত্যের মিশেল ঘটেছে, তেমনি আয়তনেও প্রাসাদ হয়ে উঠেছে প্রকাণ্ড। আটশো ফুট চওড়া, একশো ফুট উচ্চতা। আর সে প্রাসাদে কত যে মহল, বড়ি মহল, মানিক মহল, জেনানা মহল; কত যে চৌক, অমর বিলাস, ভীম বিলাস, কৃষ্ণা বিলাস ইয়ত্তা নেই। সে সব মহল, চৌক ভর্তি করে এই প্রাচীন রাজবংশের সম্পদ, ছবি, দলিলদস্তাবেজ, পালকি, পোশাক, অস্ত্র, রান্নাবাটির হাতাখুন্তির মিউজিয়াম বসানো হয়েছে। চিন এবং পর্তুগিজদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ হিসেবে সাদানীল টাইলসে আঁকা ছবি আছে, মিনিয়েচার পেন্টিং আছে, পাথর খোদাই করে বানানো নাকচোখমুখ ভাঙা প্রাচীন দেবদেবীর মূর্তি আছে। মার্বেলের অতি নিপুণ শিল্পকর্ম আছে। তরবারি, চোগাচাপকান, পালকি, রথ, হাওদা, সিংহাসন আছে।

কিন্তু সবথেকে ভালো জিনিস যা আছে তা হল গল্প।

রাণা ভীম সিং-এর মেয়ে কৃষ্ণা ছিলেন মারাত্মক রূপসী। সময়মতো কৃষ্ণার সম্বন্ধ পাঠানো হল আশেপাশের রাজ্যের রাজপুত্রদের কাছে। ভুলক্রমে জয়পুর আর যোধপুর, দুই রাজ্যের রাজপুত্রের কাছেই জামাই হওয়ার নেমন্তন্ন গেল। তাঁরা যখন বরযাত্রীসহ দুদিক থেকে উদয়পুরের দু’দিকে এসে উপস্থিত হলেন তখন ভুলটা ধরা পড়ল। ভীম সিং কাকে ‘না’ করবেন স্থির করে উঠতে পারলেন না। রাজপুত্রদের ইগো ভয়ানক, পান থেকে চুন খসলেই যুদ্ধ ঘোষণা হবে। 


এই ত্রিশঙ্কু অবস্থার সমাধান কী হল বলে আপনার মনে হয়?

কৃষ্ণার বিয়ে নিয়েই যখন সমস্যা তখন তাকেই যে সমাধানের দায়িত্ব নিতে হবে তাতে কুযুক্তির কিছু নেই। ভীম সিং মেয়েকে গিয়ে বললেন, ‘মা, তুই বিষ খেয়ে আমাকে এই ঝামেলা থেকে উদ্ধার কর।’ কৃষ্ণাকে ভীম সিং ভালো মানুষ করেছিলেন। সে এক কথায় রাজি হয়ে গেল। বলল, ‘বিষ খাওয়ার আগে শুধু আমাকে ভগবানের নাম করে নিতে দাও।’ এই না বলে কৃষ্ণা ভগবানের নাম নিয়ে হাসিমুখে বিষ খেল। এবং মরল না। আবার বিষ দেওয়া হল। আবারও কৃষ্ণা মরল না। তৃতীয়বার বিষ দেওয়ার পরেও যখন কিছু হল না, তখন সবাই বলল ওই যে কৃষ্ণা বিষ খাওয়ার আগে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিল, সে জন্য যত গোলমাল বাধছে। এরও সমাধান সোজা, বিষের ডোজ বাড়িয়ে প্রার্থনার ডোজের থেকে বেশি করে দিলেই হবে। আগের বার কৃষ্ণা ভগবানের কাছে কীসের প্রার্থনা করেছিল জানা নেই (সম্ভবত নিজের প্রাণের), এইবার হাল ছেড়ে বাবার মঙ্গলপ্রার্থনা করে বিষ খেল। এবং আর উঠল না।

ভীম সিং চোখ মুছে মেয়ের নামে বিলাসমহল বানিয়ে দিলেন। সেই মহলই হচ্ছে কৃষ্ণা বিলাস। এখন মিনিয়েচার পেন্টিং-এর সংগ্রহশালা।


সিটি প্যালেসের ছাদের ওপর অমরবিলাস। ফোয়ারা, গাছ, পাখির ডাক মিলিয়ে চার ধারের থামওয়ালা বারান্দাঘেরা এই মরুদ্যানটি যে কী শান্তির, কী সুন্দর, কী আরামদায়ক, বলে বোঝানো যায় না। অডিও গাইড বললেন, এখানে বিশ্রাম নিতে চাইলে নিন। গান শুনতে চাইলে তারও ব্যবস্থা আছে। ন’শো এক টিপলে মর্নিং রাগা বাজবে, ন’শো দুই টিপলে ইভনিং রাগা।

নাকতলার মা বন্ধুদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ গিয়েছিলেন, রোদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে হাজারদুয়ারি দেখছিলেন, জীবন্ত ইতিহাস  বলেটলে সবাই শিহরিত হচ্ছিলেন, এমন সময় মা শুনলেন একজন বয়স্ক মহিলা প্রাসাদের বারান্দায় বসে পড়ে রাগত স্বরে বলছেন, ‘এই যা কইর‍্যা থুইছে, দেখনের আর শ্যাষ নাই।’ 



হাঁটতে হাঁটতে দেখতে দেখতে আমাদেরও অবস্থা হয়েছিল খানিকটা সেই রকম। কিন্তু পয়েন্টে পয়েন্টে উর্দিপরা সান্ত্রী দাঁড়িয়ে আছেন, ফাঁকি দিলেই বকছেন। শেষে একটা সিলভার রুম না কী বাকি ছিল, আমরা ‘যথেষ্ট হয়েছে’ বলে পাশ কাটিয়ে পালানোর উদ্যোগ করতেই চোখ পাকিয়ে আঙুল তুলে বললেন, ‘যান গিয়ে দেখে আসুন বলছি।’ তখন দেখতেই হল রুপোর থালাবাটি রথ সিংহাসন। আর একটা বিয়ের গোটা মণ্ডপ। মণ্ডপের তোরণ, চাঁদোয়া, যজ্ঞস্থল, ঘট, ঘটের ওপর আম্রপল্লব সব খাঁটি রুপো দিয়ে বানানো।


উদয়সিংহ নিরাপদ রাজধানী বানাতে চেয়েছিলেন। কাজেই স্রেফ জল জঙ্গল পাহাড়ের ওপর ভরসা করেননি। শহরের চারপাশে পাঁচিল তুলে গেট বসিয়েছিলেন। সে সব গেটের  নাম বড়া পোল, হাথি পোল ইত্যাদি। কিন্তু আমার মতে সবথেকে সুন্দর পোল হচ্ছে তিনটি চূড়াওয়ালা ত্রিপোলিয়া পোল। 


ঢুকেছিলাম হাথি পোল দিয়ে, বেরোলাম ত্রিপোলিয়া গেট দিয়ে। এ জায়গা আমাদের চেনা,  একটু এগোলেই জগদীশ টেম্পল, আরও এগোলে গ্রিক কফির দোকান উদয় আর্ট ক্যাফে, বাঁদিকে বেঁকলে গনগৌর ঘাট, আর ঘাটের মুখে ডানহাতে এডেলওয়াইস নামের পুরোনো জার্মান ক্যাফে। পা ব্যথার ছুতো করে আমরা সেখানে বসে লেমন টি আর টা হিসেবে স্যান্ডউইচ খেলাম। 

ব্যস, বেড়ানো ফুরোল। বাকি রইল শুধু আনন্দ ভবনের রিসেপশন থেকে লটবহর কালেক্ট করে উবার ডেকে সিটি সেন্ট্রাল স্টেশন পৌঁছনো। রাজস্থানের ট্র্যাক রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রেখে মেওয়ার সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস টাইমে ছাড়ল, সোমবার সকালে হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে টাইমে পৌঁছল, বাড়ি ফিরে চা খেয়ে, স্নান করে, উবার ডেকে আমরা টাইমে অফিসে ঢুকে গেলাম।

*****

সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে আনপ্যাক করার সময় দেখি লাল ব্যাগটার গায়ে খড়ি দিয়ে একশো তেরো লেখা। চেক আউটের পর হোটেলে জমা রেখে প্যালেস দেখতে গিয়েছিলাম, তখনই সম্ভবত কেউ চেনার সুবিধের জন্য আমাদের ঘরের নম্বর লিখে রেখেছেন। মুছতে গিয়েও মুছলাম না। থাক, যতদিন থাকে। 

                                                                                                                               (শেষ)

মাউন্ট আবু - উদয়পুর ভ্রমণঃ প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম ও শেষ পর্ব


February 12, 2018

ঘুমর ঘুমর ঘুমর ঘুমর




ফতে সাগর লেকের ধারের উঁচু টিলার ওপর রাজকীয় গেস্ট হাউস হিসেবে তৈরি হয়েছিল, একসময় রাজারাজড়া আর ব্রিটিশ বড়সাহেবদের আপ্যায়ন করা হত, মেওয়ার রাজ্যের প্রধানমন্ত্রীও নাকি আনন্দ ভবনে থেকেছেন কিছুদিন। স্বাধীনতার পর এ বাড়ি হয়ে যায় সরকারি হোটেল। গত বছর অন্য কিছু সরকারি হেরিটেজ হোটেলের সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ ভবনের প্রাইভেটাইজেশনের কথাও উঠেছিল। এই সব হেরিটেজ হোটেল সংরক্ষণের দায়িত্ব সরকারের কিনা, নাকি এসব হাতি না পুষে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করাই সরকারের প্রায়োরিটি হওয়া উচিত সে সব আলোচনার জন্য চ্যানেলে চ্যানেলে প্যানেল বসবে’খন, আমি শুধু জানি প্রাইভেটাইজেশন হলে আমরা আনন্দ ভবনে থাকতে পারতাম না, সরকারি হোটেল বলে পারছি।

মাউন্ট আবু থেকে সোয়া ন’টার বাসে (যেটা কাঁটায় কাঁটায় সোয়া ন’টাতেই ছেড়েছে) উদয়পুর এসে পৌঁছেছি দেড়টা নাগাদ। এই ফেব্রুয়ারির শুরুতে যে রকম রোদের তেজ, মে জুন মাসে কী হবে ভগবানই জানেন। বাসস্ট্যান্ড থেকে অটো নিয়ে আনন্দ ভবন। রিসেপশন থেকে বলে দেওয়া হল, এখন লাঞ্চ মিলবে না, মিনিমাম একঘণ্টা আগে নাকি অর্ডার দিতে হয়, আর দু’টোয় লাঞ্চটাইম শেষ। তাতে আমরা একটু দমেই গেলাম, মাউন্ট আবুর আর টি ডি সি তে কেমন প’নে তিনটেতেও বিনা বাক্যব্যয়ে লাঞ্চ খাইয়েছিলেন ওঁরা সেটা মনে পড়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই, কিন্তু তারপর একজন সুটবুট পরা মানুষ কোথা থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘কী খাবেন?’ আমরা তাড়াতাড়ি বললাম ‘সির্ফ ডাল রোটি কাফি হ্যায়, চাওল ভি নহি চাহিয়ে।’

স্বর্গীয় ডালরুটি খেয়ে আধঘণ্টা গড়িয়ে, দুই বাড়িতে ফোন করে আনন্দ ভবনের লম্বা লম্বা বারান্দা, বারান্দা থেকে ফতে সাগর লেকের ভিউর যথাসম্ভব বর্ণনা দিয়ে আমরা বেরোলাম। যা বোঝা যাচ্ছে, এই রোদে বেশি দেখাদেখি করা যাবে না। তাতে অসুবিধে নেই, রিসার্চে জেনেছি শহরে উদয় আর্ট ক্যাফে বলে একটা গ্রিক কফির দোকান আছে। রিভিউতে একজন লিখেছেন, দু’বছর ভারতে থাকা এবং অক্লান্ত খোঁজার পর তিনি সিদ্ধান্তে এসেছেন উদয়পুরের ঘিঞ্জি গলির ভেতরের এই দোকানেই ভারতবর্ষের সেরা কফি পাওয়া যায়। 

কফির ভালোমন্দে আমাদের কিছু এসে যায় না, কিন্তু আরাম করে বসার জন্য কফিশপের থেকে বেটার জায়গা পাওয়া শক্ত। 

আগেই বলেছি, আনন্দ ভবন ফতে সাগর লেকের ধারে আর উদয় আর্ট ক্যাফে হচ্ছে লেক পিচোলার কাছে জগদীশ টেম্পল রোডে। কিলোমিটার দুয়েক দূর আর রোদও আছে, তবু হেঁটেই গেলাম। কারণ হেঁটে ছাড়া শহর দেখে মজা নেই, আর উদয়পুর দেখার মতোই শহর। দুপাশে বোগেনভিলিয়া ছাওয়া চওড়া পরিষ্কার রাস্তাও যেমন আছে, ইউরিন্যালের গন্ধওয়ালা সরু গলিও আছে, ঘোড়া আছে, ষাঁড় আছে, হিপি আছে, টুরিস্ট আছে। ছোট ওয়াকিং ব্রিজ বেয়ে লেকের একটা লেজুড় ক্রস করে আমরা এসে পড়লাম সিটি প্যালেসের দিকে। প্যালেস অবশ্য আমরা আজ দেখব না, আরাম করে সময় নিয়ে দেখব আগামীকাল। আজ খালি কফি খাওয়া আর নৌকোবিহার। 

ক্রমে রাস্তা সরু হয়ে এল, চতুর্দিকে আর্টের দোকান, কফি শপ এবং হিপির সংখ্যা বিপজ্জনক রকম বৃদ্ধি পেল। হাঁটছি তো হাঁটছিই। আমার আবার ধৈর্য থাকা আর ফুরোনোর মধ্যে ট্রানজিশনটা অবিশ্বাস্য দ্রুত। হাঁটছি হয়তো আধঘণ্টা ধরে, কিন্তু হঠাৎ মনে হবে, ওরে বাবা আর পারছি না। পারছি না মানে আর হাঁটলে মরেটরেও যেতে পারি। মনের ভাব সবে সেরকম হয়েছে, এমন সময় বাঁয়ে বেঁকেই উদয় আর্ট ক্যাফে বেরিয়ে পড়ল। 

এই হচ্ছে সেই বিখ্যাত গ্রিক কফি, আমার পক্ষে একটু বেশিই কড়া। তাই আমি নিয়েছিলাম আইস ক্যাপুচিনো। কফি খেতে খেতে আমরা আবোলতাবোল বিষয় নিয়ে আড্ডা মারলাম, দোকানের অন্যান্য খদ্দেরদের আড়চোখে দেখে জাজমেন্ট পাস করলাম, মোদ্দা কথা সময় দারুণ ভালো কাটল। এত ভালো কাটল যে কফি শেষ হওয়ার পর দুটো হানি লেমন জিঞ্জার চা-ও নেওয়া হল। ততক্ষণে রোদ্দুরও মিইয়ে এল বেশ খানিকটা। বিল মিটিয়ে ক্যামেরার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।


উদয় আর্ট ক্যাফে থেকে মিনিট তিনেক হাঁটলেই লেক পিচোলার ধারে গনগৌর ঘাট। গন হচ্ছেন শিব আর গৌর হচ্ছেন গৌরী, এই দুজনের দাম্পত্য উদযাপন করা গনগৌর উৎসব রাজস্থানের প্রিয় উৎসব। হোলির পরদিন থেকে শুরু হয়ে পরের দু’সপ্তাহ ধরে উৎসব চলে, শেষদিন পালকি, রথ, গরুর গাড়ি সহযোগে মিছিল শহর পরিক্রমা করে এই ঘাটে এসে থামে, হর গৌরীর মূর্তি লেকে ভাসান দিয়ে উৎসব সাঙ্গ হয়।

সেসব জগঝম্পের মধ্যে যে এসে পড়িনি, সে জন্য কপালকে ধন্যবাদ দিয়ে ঘাটের সিঁড়িতে এসে বসলাম। বসাটা খুব যে শান্তিপূর্ণ হচ্ছিল তা নয়। ঘাটের চাতালে নানারকম গোলযোগ হচ্ছিল, পায়রাগুলো শান্তিতে খাচ্ছিল, সেই সব পায়রাদের উড়িয়ে সেই উড়ন্ত পায়রার ঝাঁকের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেলফি নেওয়ার জন্য কিছু লোক আপ্রাণ পরিশ্রম করছিলেন, প্রথমে হাসি পাচ্ছিল, তারপর গা জ্বলছিল, তারপর ‘যা হচ্ছে হোক’ বলে গোটা ব্যাপারটা থেকে মন তুলে নিলাম যখন, তখন চোখে পড়ল সামনের জলে পড়ন্ত সূর্যের রশ্মি আর কানে এল দিশি সারেঙ্গীর আওয়াজ। 


এই ছবিটায় আমাকে যদিও তেমন রূপসী লাগছে না, এ ছবি তুলতে গিয়ে ক্যামেরাম্যান প্রায় জলে পড়ে যাচ্ছিলেন তাই তাঁর কমিটমেন্টের মর্যাদা দিতে অবান্তরে ছাপলাম।

এই গনগৌর ঘাটের গায়েই সপ্তদশ শতাব্দীতে মেওয়ার রাজবংশের প্রধানমন্ত্রী অমরচাঁদ বানিয়েছিলেন বাগোর কি হাভেলি। হাভেলির একশো আটত্রিশটি ঘর, অসংখ্য বারান্দা, করিডর জুড়ে এখন মিউজিয়াম বসানো হয়েছে। টাইম ম্যানেজমেন্টের ভুলে সে মিউজিয়াম আমাদের দেখা হয়নি, আপনারা গেলে অবশ্য করে যাবেন। তবে মিউজিয়াম ছাড়াও এই বাগোর কি হাভেলি-তে আরও একটা রোমহর্ষক ব্যাপার হয়, সেটা হচ্ছে প্রতি সন্ধ্যেয় সাতটা থেকে আটটার মধ্যে নামের রাজস্থানি লোকনৃত্যের অনুষ্ঠান ‘ধরোহর’। মিউজিয়াম হল না, অন্তত হাভেলির বারান্দায় বসে নাচ দেখার ইচ্ছে আমাদের খুবই, কিন্তু আবার বোটিং না করলেও চলবে না। 

গনগৌর ঘাট থেকে বোটিং-এর ঘাট অটোতে নেবে একশো টাকা। নো দরাদরি অ্যালাউড। দূরত্বের পক্ষে একশো টাকা ভাড়াটা অত্যন্ত বেশি, কিন্তু হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়, সময়ও নেই। সূর্য ডোবে ডোবে। বোটিং সেরে আবার অটো নিয়েই ফিরতে হবে এই গনগৌরে, নাচ দেখার জন্য। 

বেড়াতে এসেছি কাজেই এসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই বলে আমরা অটোতে চড়ে চলে গেলাম লেক পিচোলা বোটিং পয়েন্টে। আয়তন বিশাল (প্রায় সাত বর্গ কিলোমিটার) বলেই বোধহয় নক্কি লেকের মতো প্যাডেল বা দাঁড় টানা বোট দেখলাম না। লেক পিচোলায় খালি চলে ভটভটি বোট। ছোট বড় সব রকমই আছে। আপনি কুড়ি জনের সঙ্গেও বোটে উঠতে পারেন, আবার বেশি টাকা দিয়ে ছোট প্রাইভেট ভটভটিও (উইথ চালক) ভাড়া নিতে পারেন।


লেক পিচোলায় সূর্যাস্তকালীন নৌকাবিহার নাকি জীবনের সেরা কয়েকটি রোম্যান্টিক ‘টু ডু’র মধ্যে পড়ে। সে রোম্যান্সের মর্যাদা দিতে হলে হয়তো আমাদের প্রাইভেট বোটই নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তারা সবাই অলরেডি বুক হয়ে লেকে নেমে পড়েছে, খালি বড় বোটই বাঁধা আছে ফেরিতে। আরও আঠেরোজন সহযাত্রীর সঙ্গে নৌকাবিহার করে যতটুকু রোম্যান্স হবে তাই দিয়েই চালিয়ে নেব’খন স্থির করে আমরা বোটে উঠে পড়লাম।

সূর্যাস্ত তো ভালোই, সমান ভালো হচ্ছে সেই লেকের দুপাশের এবং মধ্যের প্রাসাদ-অট্টালিকার শরীরের ওপর সূর্যাস্তের আলোর প্রলেপ। 

এই বাড়িতে নাকি পপস্টার কেটি পেরি বিয়ে করেছিলেন। 

বোট থেকে নেমে অটো নিয়ে আমরা গনগৌর ঘাটে বাগোর কি হাভেলিতে ফিরে এলাম। ‘ধরোহর’ দেখার জন্য অলরেডি লাইন পড়ে গেছে। নিজেদের আর ক্যামেরার টিকিট কেটে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় পৌঁছলাম এবং চোখ কপালে উঠে গেল। 

গিজগিজ করছে লোক। দোতলার চাতালটা একটা অ্যাম্ফিথিয়েটার, তার সিঁড়িতে পাতা গদিআঁটা বেঞ্চি তো টইটম্বুরই তাছাড়াও দুপাশের ব্যালকনি, ঝরোখা, রেলিং সর্বত্র থেকে মানুষ ঝুলছে। এই বাজারেও মূল অ্যাম্ফিথিয়েটারের মূল বসার জায়গায় দুটো বসার জায়গা খালি দেখে আমাদের সন্দেহ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তখন ফাঁকা জায়গা দেখে উত্তেজনার চোটে লাফিয়ে গিয়ে বসেছি, আর বসামাত্র ফাঁকা সিটের রহস্য উন্মোচন হয়েছে। নাকের ডগায় একখানি আম না জাম গাছের প্রকাণ্ড কাণ্ড, ‘আমিও নাচ দেখব’ বলে গ্যাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে রকম উদ্যোগী হলে আবার সিট শিকারে বেরোনো যেত, কিন্তু অর্চিষ্মান আর আমার আবার এই ব্যাপারে মারাত্মক মিল। চালিয়ে দেওয়া গেলে আমরা সর্বদা চালিয়েই নিই। অসুবিধে কিছু হয়নি, মাঝেমাঝে একটু এদিকওদিক গলা বাড়াতে হচ্ছিল, কিন্তু নাচগান পুতুলখেলা সবই স্পষ্ট দেখা গেছে।

বিশ্বের পূর্বপশ্চিম উত্তরদক্ষিণ থেকে দর্শক এসেছেন, তাঁদের হাতে গাইডবুক, মুখে হাসি আর ভাঙাচোরা না-মা-স-ঠে। দুয়েকজন আমাদের চত্বরেই বসেছিলেন আর গাছের কাণ্ডে তাঁদের দৃষ্টি প্রতিহত হচ্ছিল। আমাদের আশেপাশে দুচারজন, আমাদেরই দেশের লোক, ভিড় বাসট্রেনে চড়ে চড়ে সিট আবিষ্কারে যাঁদের দক্ষতা শিকারী বাজের পর্যায়ে পৌঁছেছে তাঁরা খুঁজে খুঁজে ভালো সিট বার করে নিজেরা না গিয়ে বিদেশী বন্ধুদের সেই সব ভালো সিটে পাঠাতে লাগলেন।

কিতনে দূর সে আয়ে হ্যায়, সোচো। দে শুড সি।

বুকের মধ্যে কেমন একটা ফিলিং হল। 

এই ফিলিংটা আরও অনেকবার হল সেই সন্ধ্যেয়। মাথায় আগুন নেওয়া নাচ দেখে, মহিষাসুরমর্দিনী নাচ দেখে মাথায় দশখানা মাটির হাঁড়ি নিয়ে স্টেজ ঘিরে শিল্পীর পাঁই পাঁই দৌড় দেখে সেই সব বিদেশী বন্ধুরা যখন চোখ কপালে তুলছিলেন, দুই হাত মাথার ওপর তুলে তালি দিচ্ছিলেন, হুপ হাপ শব্দ করে (নির্ঘাত অ্যামেরিকান) উৎসাহব্যঞ্জক উল্লাস প্রকাশ করছিলেন, আমার বারবার সেই ফিলিংটা হচ্ছিল। 

সিনেমাহলে সিনেমা শুরুর আগে জনগণমন বাজার সময় উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হওয়ার সময় যেটা এককুচিও হয় না। 
*****

ডালরুটি খেতে চমৎকার, কিন্তু তা বলে বেড়াতে গিয়ে সর্বদাই ডালরুটি খেলে কেমন না? তাই আমরা ঠিক করলাম উদয়পুরের শেষ রাতে বাইরে খাব। উদয়পুরে খাবার জায়গার অভাব নেই, খাবার জায়গার রেকোমেন্ডেশনেরও অভাব নেই। কোনও দোকানের খাবার অথেনটিক, কোনও দোকানের ভিউ অতুলনীয়, কোনও দোকানে নাকি অ্যান্থনি বোর্দে খেয়েছিলেন। শেষটা ভিউই জিতল, আর আমরা গেলাম আম্বরাই রেস্টোর‍্যান্টে ডিনার করতে। 

সতেরোশো চৌত্রিশ থেকে সতেরোশো বাহান্নর মধ্যে মহারাণা দ্বিতীয় জগৎ সিং-এর আমলে বানানো আমেট হাভেলি হয়ে গেছে হোটেল আমেট হাভেলি, আর সেই হোটেলের রেস্টোর‍্যান্টই হচ্ছে আম্বরাই। লেকের ধারের বিস্তৃত ব্যালকনিতে সারি সারি টেবিল। কোনওটা একটু জলের একেবারে ধারে, কোনওটা তার দু’রো পেছনে। যেখানেই বসুন না কেন লেকের ওপারে আলোকজ্জ্বল সিটি প্যালেসের ভিউ গ্যারান্টিড। যথারীতি, টেবিল পাওয়ার অপেক্ষা করতে হল। আমাদের সঙ্গে আরও কিছু লোক অপেক্ষা করছিলেন, মাপমতো টেবিল খালি হয়ে যাওয়ায় তাঁরা সকলেই জায়গা পেয়ে গেলেন, (খেয়াল করলাম, কোনওটাই জলের একেবারে ধারের রয়ের টেবিল নয়,) কেবল আমরাই হাঁদার মতো বসে রইলাম। 

অবশেষে ডাক এল। সুটবুট পরা এক ভদ্রলোকের পিছু পিছু টেবিলের সারির মধ্যে দিয়ে আমরা এঁকেবেঁকে চললাম, চললাম…চললাম… কোথায় আন্দাজ করতে পারছেন নিশ্চয়?

একেবারে জলের ধারের একটা টেবিলে! 

জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের হেরোরাই শুধু এইসব তুচ্ছ জয়ের তৃপ্তির মর্ম বুঝতে পারবেন।  

খুব খাওয়া হল। মকটেল থেকে শুরু করে স্টার্টার থেকে মেনকোর্স। এত খাওয়া হল যে ডেজার্টের আর জায়গা রইল না। সুবেশ, সুভদ্র একজন বয়স্ক ভদ্রলোক আমাদের খাওয়াদাওয়ার দেখাশোনা করছিলেন। বলছিলেন, কোনও তাড়াহুড়ো নেই, ‘ভিউ দেখতে রহিয়ে অর খাতে রহিয়ে।’ আম্বরাইয়ের খাবার অতি ভালো, অতি সুস্বাদু। আমাদের আর আশপাশের টেবিলের মোমবাতির যতটুকু-না-হলে-নয় আলোয়, ঝলমলে প্রাসাদের আলো আর সেই আলোর প্রতিবিম্ব ভেঙেচুরে দেওয়া ঢেউয়ের অতি মৃদু ছলাৎ ছলাৎ শব্দে সে স্বাদ কোটিগুণ হয়ে উঠল। 

আশ্বাস পেয়ে আমরা এত ধীরেসুস্থে আরাম করে খেলাম যে ভাইসাবকে এসে খাটো হয়ে যাওয়া মোমের ওপর নতুন মোম বসিয়ে দিয়ে যেতে হল। ক্রমে রাত গভীর হল, হাওয়া ঠাণ্ডা হল, ফেরার অটো পাওয়া যাবে কি না চিন্তা গুঁড়ি মেরে মাথায় ঢুকল। 

প্রাসাদের দীপাবলীর দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখলাম। কী উজ্জ্বল। চোখ সরে এসে থামল টেবিলের উল্টোদিকে। সেখানে বসে থাকা লোকটার চশমার আড়ালের দু’চোখের উজ্জ্বলতা? এককোটি প্রাসাদেরও সাধ্য নেই পাল্লা দেয়।

‘ওঠা যাক, নাকি?’

‘ওঠা যাক।’

                                                                                                                         (চলবে) 

মাউন্ট আবু - উদয়পুর ভ্রমণঃ প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম ও শেষ পর্ব

February 10, 2018

নক্কি লেক + সানসেট পয়েন্ট




পায়ের নখ দিয়ে খোঁড়া হয়েছিল বলে লেকের নাম নক্কি সে নিয়ে কোনও মতভেদ নেই, কিন্তু নখ দিয়ে একটা গোটা লেক কেন খোঁড়া হয়েছিল সে নিয়ে আছে। কেউ বলে, দানবের হাত থেকে পালানোর জন্য দেবতারা নখ দিয়ে লেক খুঁড়ে তার নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন, কেউ বলে রসিয়া বালম নামে একজন লোক রাজার মেয়ে বিয়ে করার জন্য খেপে উঠতে রাজা শর্ত দিয়েছিলেন যে নখ দিয়ে এক রাতের মধ্যে লেক বানিয়ে দিলে তবেই রাজকন্যা মিলবে না হলে নয়, আবার একজায়গায় লিখেছে দেখলাম নখ দিয়ে সত্যি সত্যি লেক খুঁড়ে ফেলছে দেখে জাল মুরগির আওয়াজ শুনিয়ে তাড়াতাড়ি সময়ের আগেই ভোর করিয়ে দেওয়া হয়েছিল ইত্যাদি।

মোদ্দা কথা, নখ দিয়ে নক্কি লেক খোঁড়া হয়েছিল আর দিলওয়ারা মন্দির দেখে আমরা সে লেক দেখতে যাব। জিপে বসেই সিদ্ধান্ত ফাইন্যাল হল আর ভাইসাব আমাদের বাংলা কথা পরিষ্কার ধরে ফেলে বললেন উনি আমাদের নিয়ে যেতে পারেন। এঁদের বাংলা বুঝে ফেলা মোটেই অস্বাভাবিক নয়, কারণ হোটেলের ভাইসাব জানিয়েছেন পুজোর পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যত টুরিস্ট মাউন্ট আবুতে আসে তার নাইনটি পারসেন্ট বাঙালি। 


নক্কি লেকের চারদিকে চা, বুড়ির চুল, আইসক্রিম, হস্তশিল্পের জমজমাট বাজার। লেকের মধ্যেও বিনোদনের বিবিধ ব্যবস্থা। একদিকে জলের ওপর দুটো প্রকাণ্ড ড্রাম ভাসছে, আইডিয়াটা হচ্ছে ওই ড্রামের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হলে আপনি হ্যামস্টার মতো দৌড়বেন আর ড্রাম জলের ওপর ঘুরবে। কিন্তু আপনি হ্যামস্টার নন, কাজেই দৌড়তে গিয়ে বার বার পড়ে যাবেন, ড্রাম ঘুরবে না, বাইরে থেকে লম্বা লগি দিয়ে ঠেলা মারতে হবে। উল্লসিত হাসির শব্দ শুনে মনে হচ্ছিল ভেতরে মারাত্মক আমোদ হচ্ছে, বাইরে থেকে দেখে বিশেষ সুবিধের লাগল না। অন্যদিকে গেলাম।  


অন্যদিকে বোটিং-এর ব্যবস্থা। এক রকম বোট দেখতে সত্যিকারের নৌকোর মতো, যে নৌকোয় দাঁড় বাইবার লোক কর্তৃপক্ষ প্রোভাইড করেন, দ্বিতীয়রকম হচ্ছে প্যাডেল বোট। ‘পাটুলির ঝিলে মাবাবাদিদির সঙ্গে কত প্যাডেল বোটিং করেছি,’ অর্চিষ্মানের চোখ নস্ট্যালজিয়ায় চকচক করে উঠল। আমার দিকে ঘাড় ঘুরতে দেখেই আমি বলে উঠলাম, ‘না, রিষড়ার গঙ্গায় প্যাডেল বোটিং-এর কোনও ব্যবস্থা ছিল না, অন্তত আমার ছোটবেলায় ছিল না, এখনের কথা জানি না। তবে বেথুন থেকে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে নলবনে প্যাডেল বোটিং করেছি। কাজেই আমাকে একেবারে নভিস ঠাউরানোর কোনও কারণ নেই।’ 

বোটিং-এর ব্যাপার আমরা আত্মনেপদী হওয়াই স্থির করলাম। লাল টুকটুকে একটা প্যাডেল বোট আমাদের ভাগ্যে উঠল। বোটের হালের সঙ্গে সংসারের হালের তুলনা করে নিজেদের বোকা রসিকতায় নিজেরাই চমৎকৃত হয়ে নক্কির বুকে ভেসে পড়লাম।


বেশিরভাগ সময় যখন জলের ধারে দাঁড়িয়ে অন্যদের বোটিং করতে দেখি, মনে হয় এতে এত মজা পাওয়ার কী আছে? কারা এরা? বয়স কত? সেই আমিই যখন বোটে চড়লাম, পাহাড়জঙ্গল ঘেরা বিস্তীর্ণ শান্ত জলরাশি, সূর্যের আলোপড়া ঝিকমিকে কুচিকুচি ঢেউ, হাত বাড়িয়ে জল ছুঁলে আঙুলের ডগা শিরশির করে, তুলে পাশের জনের গায়ে ছেটানো যায়, এমন উত্তেজনা হল যে প্রস্তাব দিলাম রাজস্থানের সব লেকে, শুধু রাজস্থানের কেন, ভারতবর্ষের সব লেকে বোটিং করার রেকর্ড বানালে কেমন হয়?

অর্চিষ্মান বলল, 'ওরে বাবা কুন্তলা, কাল উদয়পুরে লেক পিচোলায় বোটিং করব এইটা শুধু ঠিক করা থাক, গোটা ভারতবর্ষ নিয়ে পরে ভাবা যাবে। 

বোটিং সেরে লাক্কি চা-এর দোকান থেকে দু’কাপ চা নিয়ে লেকের ধারের পাঁচিলের পাশে বসলাম। উল্টোদিকের বেঞ্চে দুজন বসে ছিলেন। একজন স্বাভাবিকের থেকে লম্বা, একজন স্বাভাবিক। (লম্বাজনকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলবেন, ‘স্বাভাবিক কোথায় বেঁটে তো,’ কিন্তু সে মতামতে কান দেওয়ার দরকার নেই।) শান্তশিষ্ট মুখ। হাতে চায়ের কাপ। কথা বলছেন না, কিন্তু সেটা ঝগড়া হয়েছে বলে মনে হয় না। বরং মনে হয় পাশাপাশি চুপ করে বসে থাকার মতো কমফর্ট লেভেলে সম্পর্কটাকে নিয়ে যেতে পেরেছেন বলে। একজনের চা শেষ হয়ে গেল। আরেকজন ফুঁ দিয়ে দিয়ে খেতে লাগলেন। ক্রমে তাঁরটাও শেষ হয়ে গেল। যিনি চা শেষ করে বসে ছিলেন, তিনি অন্যের খালি কাপটা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এদিকওদিক তাকাতে লাগলেন। ওই তো, ডাস্টবিন। খালি কাপদুটো গিয়ে কাপদুটো ডাস্টবিনে ফেলে জনেই উঠে হেঁটে হেঁটে চলে গেলেন। 

বছরকয়েক পরে আমি আর অর্চিষ্মান এই দুজন হয়ে গেলে আমার আপত্তি নেই।

*****

একটু পরে আমরাও কাপ ডাস্টবিনে ফেলে উঠে পড়লাম। ছ’টা বাজবে প্রায়। পশ্চিমের আকাশ গেরুয়া। নক্কি লেক থেকে দু’কিলোমিটার দূরে সানসেট পয়েন্ট। আমাদের যাওয়ার প্ল্যান নেই, বাহনও নেই।

হোটেলে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে? তাও নেই।

ক্লান্তি এক অদ্ভুত জিনিস। অফিসের সিটে বসে সারাদিন কান খুঁচিয়ে বাড়ি ফিরলেও মনে হয় ‘মাগো তুলে নাও আর তো পারি না,’ কখন নাকেমুখে গুঁজে বিছানায় সেঁধোবো তর সয় না। আর সেদিন ভোর চারটেয় টুথব্রাশ ব্যাগে পুরে বেরিয়েছি, একঘণ্টা প্লেন, চার ঘণ্টা বাস (তাও নন-এসি) ঠেঙিয়ে, দুটি ডালরুটি নাকে গুঁজে ঘুরে ঘুরে মন্দির দেখে আধঘণ্টা প্যাডল ঘুরিয়ে অনভ্যস্ত ঊরু টনটন, অথচ ক্লান্তির ক নেই শরীরের এক বিন্দুতেও। মনমগজ চনমন করছে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এত এনার্জি কীভাবে খরচ করা যায় ভাবছি, এমন সময় কানে এল, ‘সানসেট পয়েন্ট, সানসেট পয়েন্ট।’ এক ভদ্রলোক একখানা লজঝড়ে জিপের পাশে দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছেন। অর্চিষ্মান বলল, ‘সেকি, এখনও সানসেট হয়নি নাকি?’ আমি বললাম,’না, ছ’টা চব্বিশে হবে।’ স্মার্টফোন এসে এই একটা সুবিধে হয়েছে। সূর্যোদয়, সূর্যাস্তের সময়, নিম্নচাপের মাত্রা, আর্দ্রতার পরিমাপ, ইত্যাদি অবান্তর ইনফরমেশন হাতের মুঠোয় রাখা যায়। 

শেয়ারে গেলে মাথাপ্রতি দশ টাকা, ফুল বুকিং একশো। আমরা আদৌ যেতে চাই কি না সেটাই শিওর নই, শেয়ারেই যাব স্থির করলাম।

জিপের ভেতরে বসে দেখছি বাইরের ছায়া ঘন হয়ে আসছে, ঘড়িতে ছ’টা পাঁচ, ভদ্রলোকের সানসেট পয়েন্ট সানসেট পয়েন্ট চিৎকার শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু কেউ আসছে না। যাদের দেখার তারা অলরেডি পয়েন্টে চলে গেছে নির্ঘাত। হঠাৎ জিপ দুলে উঠল। প্যাসেঞ্জার নয়, ড্রাইভার। ‘পঞ্চাশ টাকা দিয়ে দেবেন, আমি জিপ ছাড়ছি। নহি তো কুছ নহি দেখনে কো মিলেগা।'

নক্কি লেক থেকে দু’কিলোমিটার মতো দূরে সানসেট পয়েন্ট, তার এক কিলোমিটার গাড়ি করে যাওয়া যায়, পরের এক কিলোমিটার হয় ঘোড়া, নয় ঠেলা-ওয়াগন নয় পদব্রজ। জিপ থেকে নামামাত্র চারদিক থেকে ওয়াগন, ঘোড়ার মালিকরা ছুটে এলেন। ঘোড়াটোড়ায় আমাদের দুজনেরই ভয়। আর ওয়াগনে বসব, হাতপাখার হ্যান্ডেলের সাইজের বারো বছরের ছেলে ঠেলবে, ওয়েল, ততখানি লুব্জুগুব্জু হতে এখনও দেরি আছে। আমরা মাথা নাড়তে নাড়তে চললাম, ঘোড়াওয়ালারা পেছন পেছন আসতে থাকলেন, সে ঘোড়ার ক্ষুরের খটখট আওয়াজে উপকার হল, আমরা ভয়ে দ্রুত পা চালালাম আর সানসেট পয়েন্টে পৌঁছে গেলাম ছ’টা সাড়ে তেইশেই।


সূর্য আসলে কত দ্রুত চলে (বা পৃথিবী আসলে কত জোরে ঘোরে) টের পাওয়া যায় সূর্য ওঠা আর ডোবার সময়টায়। গেল গেল করতে করতেই গন। 

ওঠার সময় দৌড়তে দৌড়তে চোখের কোণ দিয়ে দেখেছিলাম দুপাশে ভুট্টা (একেকটা ভুট্টা দিল্লির আড়াইখানা ভুট্টার সময়), আনারদানা, মশলানুন মাখানো শশার ঝুড়ির ভিড়। কিন্তু মনে রেখেছিলাম মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে, সামনের কাঁচের বাক্সে সোনালি ফুলকো গোলগোল, আর আড়ালে হলেও সেদ্ধ আলু, সেদ্ধ মটর, তেঁতুলজল আর চটপটা মশলা আশেপাশে আছেই আছে।

রাংতার প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে গেলাম। অর্চিষ্মানও ফুচকা/গোলগাপ্পা/পানিপুরি পছন্দ করে, কিন্তু 'খাবে?' জিজ্ঞাসা করলেই দশের মধ্যে ন’বার প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় দুদিকে মাথা নাড়ে। তারপর হয়তো আমার প্লেট থেকে তুলে একটা দুটো খায়। পরে একদিন যৌবনের খাওয়াদাওয়া নিয়ে রোমন্থনের সময় বলেছিল, বড় হওয়ার সময় প্রতিটি ফুচকাওয়ালাকে ঘিরে এত মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকত যে তাদের মধ্যে গিয়ে ফুচকা খাওয়ার কথা কল্পনা করলেও প্যালপিটেশন। ওই করে করে খাওয়ার অভ্যেসটা গড়ে ওঠেনি। 

গোলগাপ্পা পয়েন্ট থেকে হোটেল শিখর এক দশমিক নয় কিলোমিটার। হাঁটবে তো? হাঁটব হাঁটব। একটা হাত পকেটে পুরে আরেকটা হাত অন্যের হাতে গলিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তা বেশিরভাগটাই নেমে গেছে নিচের দিকে। একসময় হাঁটার পথ গাড়ির পথের থেকে আলাদা হয়ে গেল, তখন কেবল দূর থেকে একটাদুটো হর্ন, আর মাথার ওপর গাছের পাতা গলে চাঁদের আলো। বাসস্ট্যান্ড এসে গেল। কাল সকালে উদয়পুর যাওয়ার বাসের খোঁজ নিয়ে, মোড়ের কিরানা দোকান থেকে থামস আপ আর ফটাফট কিনে হোটেলের পথে হাঁটা দিলাম। পেট্রোল পাম্পের পাশের রাস্তা বেয়ে উঠছি যখন, কোন বাড়িতে যেন রেডিওতে রাজস্থানি গান বাজছিল।

                                                                                                      (চলবে)


মাউন্ট আবু - উদয়পুর ভ্রমণঃ প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম ও শেষ পর্ব

February 08, 2018

আদারওয়াইজ



মহর্ষি বশিষ্ঠের ফেভারিট গরু নন্দিনী একবার খাদে পড়ে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টাতেও নন্দিনীকে উদ্ধার করতে না পেরে বশিষ্ঠ শিবের সাহায্য চাইলেন। শিব পাঠালেন সরস্বতীকে। মা সরস্বতী স্রোতস্বিনী হয়ে খাদ ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন, নন্দিনী সাঁতরে পারে উঠল। কাজ সেরে পল্লু ঝেড়ে মা সরস্বতী বাড়ি চলে গেলেন, খাদ আবার হাঁহাঁ করতে লাগল। নন্দিনী ভারি লক্ষ্মী মেয়ে ছিল, তার কালো চোখ আর লম্বা লেজ ছিল, কিন্তু বুদ্ধি কতখানি ছিল সে নিয়ে বশিষ্ঠ সন্দিগ্ধ ছিলেন। তিনি বললেন, রিস্ক নিয়ে লাভ নেই, এ খাদ চিরকালের মতো ভরিয়ে দেওয়া হোক। অর্বুদ নামে এক ভয়ানক শক্তিশালী সাপ তখন সে জঙ্গলে বাস করতেন। বিষ্ণুর আদেশে তিনি পাক খেয়ে খেয়ে খাদ ভরিয়ে দিলেন। খাদ তো ভরলই, উপচে পড়ে অর্বুদপর্বতের সৃষ্টি করল। সেদিনের সেই অর্বুদ পর্বতই আজকের মাউন্ট আবু।

মাউন্ট আবুতে হিন্দু পুরাণের তেত্রিশ কোটি দেবদেবী হয় বাস করেছেন, নয় কখনও না কখনও ভিজিট করেছেন। তেত্রিশ না হলেও কয়েক কোটি হোটেল যে মাউন্ট আবুতে আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সিজনে এ জায়গার চেহারা ভাবতেও গায়ে কাঁটা দেয়। আমরা থাকব আর টি ডি সি-র হোটেল শিখর-এ। রাস্তা চেনা খুব সোজা। বাসস্ট্যান্ডে ঢোকার ঠিক তিন মিনিট আগে ডানহাতে পেট্রোল পাম্প, তার গা বেয়ে একখানা রাস্তা ‘আমি চললাম ভাই, তোমাদের সঙ্গে আর আমার পোষাচ্ছে না’ ভঙ্গিতে ঊর্ধ্বপানে হাঁটা দিয়েছে, সেটা ধরে উঠে গেলেই হোটেল শিখর। জিভ বার করে হাঁপাতে হাঁপাতে হোটেলে পৌঁছে দেখি, মহার্ঘ কটেজ, যেগুলো আমরা বুক করতে গিয়েও করিনি মোটে তো এক রাত থাকব ভেবে, সেগুলো আরও টঙে। ভাগ্যিস।  

একে ঘোর সিজন নয়, তায় শুক্রবার। ভাইসাব বললেন, ‘একতলাতেও খালি আছে ঘর, দোতলাতেও আছে। দোতলাতেই যান বরং, ভিউ বেটার মিলেগা।’ 


এই হচ্ছে হোটেলের ঘরের বারান্দা থেকে সকাল সন্ধ্যের ভিউ। ভালো না? 

দুটো বাজতে যাচ্ছিল, সকালের দু’চামচ পোহা কবে হজম হয়ে গেছে। টিভি চালিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে পাঞ্জাবী পপের বিটের তালে তাল মিলিয়ে দ্রুত মুখচোখে জল দিয়ে জামা বদলে গেলাম ডাইনিং হলে। আর তখনই আমাদের অন্যান্য বেড়ানোর সঙ্গে এবারের বেড়ানোর দুটো প্রধান তফাতের প্রথমটা প্রকট হল। 

যত জায়গাতেই বেড়াতে গেছি, বেশিরভাগ জায়গাতেই এমন সময় পৌঁছেছি যখন চায়ের সঙ্গে টা খাওয়া আদর্শ সময়। সরকারি হোটেলের স্ন্যাক্স মেনুতে স্যান্ডউইচ হ্যানাত্যানার সঙ্গে ভেজিটেবল পকোড়া থাকেই। আমরা মেনু খুলে দেখার প্রয়োজনও বোধ করি না, ভেজিটেবল পকোড়া অর্ডার দিয়ে দিই। এক সময় এমনটা হয়েছিল যে আমি ভেবেছিলাম গিনেস বুকে তো সবথেকে বেশি বার্গার খাওয়ার, সবথেকে লম্বা স্যান্ডউইচ খাওয়ার, কতরকম রেকর্ড থাকে, ভারতবর্ষের সব সরকারি অ্যাকোমোডেশনের ভেজিটেবল পকোড়া খাওয়ার রেকর্ডের আইডিয়াটা কেমন?

সঙ্গের পকোড়া-খাইয়ে এক সেকেন্ডও না ভেবে বলেছিলেন, ‘অতি ছেঁদো।’ অগত্যা।  

ওঁরা যত্ন করে লাঞ্চ মেনু দিয়েছিলেন কিন্তু আমরা বললাম, ‘যা হয় দিন, আমরা মোটে এক রাত থাকছি কি না, এক্ষুনি শহর দেখতে বেরোতে হবে।’ তাতে ভাইসাব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ডাল রোটি সবজি?’ আমরা বললাম, ‘বঢিয়া।’ 

ডাল এল, সঙ্গে হাতরুটি আর মিক্সড ভেজ।  

তখন না হয় খিদের মুখ ইত্যাদি অজুহাত দেওয়া যেত, কিন্তু তারপরেও তো আরও তিনচারবেলা খেয়েছি, কাজেই কথা দিতে পারি পুরো মাহাত্ম্য খিদের নয়। রাজস্থানের লোকেরা কিছু ভালো ডাল রাঁধতে পারে, আর পারে রুটি বানাতে। ডালরুটি তো আগেও খেয়েছি, পরেও খাব অনেক জায়গায়, কিন্তু ওই পাঁচবেলায় খাওয়া ডালরুটির অতীতের সব ডালরুটির স্মৃতি ফিকে করে দিয়েছে। পেঁয়াজ রসুন টমেটো ফোড়নের সহজসরল ডাল, অতি কায়দার ডালেরও কান মুলে দেবে। তাজা তরিতরিকারি দিয়ে গরম গরম রাঁধা সবজিও খারাপ হওয়ার কোনও কারণই নেই। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে ও রকম ডাল আর ওই কোয়ালিটির রুটি পেলে সবজির থাকা না থাকা ম্যাটার করে না। আর রুটি। আহা। নিখুঁত গোল আর পাতলা আর ফুলকো তো বটেই, বেস্ট হচ্ছে রুটির গায়ে ছোট ছোট বাদামি ফোসকার ফাঁদে আটকে থাকা ধোঁয়ার ফিকে গন্ধটা। ডালে চুবিয়ে মুখে পুরলেই প্রাণের ভেতর রাবণহাতার বুক-মোচড়ানো সুর বাজতে শুরু করে। 

*****

অন্যান্য বেড়ানোর সঙ্গে এবারের বেড়ানোর দ্বিতীয় তফাৎটা হচ্ছে জায়গা নির্বাচনে। আমরা সাধারণত ফাঁকা ফাঁকা জায়গায় যেতে পছন্দ করি, যেখানে চাইলেও করার কিছু থাকে না। খালি খাও আর ঘুমোও আর ইচ্ছে করলে হাঁটো। সে তুলনায় মাউন্ট আবু (এবং উদয়পুরও) টুরিস্টদের স্বর্গরাজ্য। কাজেই পয়েন্টের অভাব নেই। সেভেন পয়েন্টস, নাইন পয়েন্টস, হানিমুন পয়েন্ট, সুইসাইড পয়েন্ট, সানরাইজ পয়েন্ট, সানসেট পয়েন্ট। প্রথমত, এই সব পয়েন্টগুলোর অর্ধেক জাস্ট ভাঁওতা হয়। দ্বিতীয়ত, অনেকটা সময় বাঁধা পড়ে যায়। আমাদের আবার আগাপাশতলা টুরিস্ট হওয়া সত্ত্বেও নন-টুরিস্ট হাবভাব আছে ষোলোআনা। পাইনের ছায়ায় পাহাড়ি পথ ধরে যদি নিজেদের ইচ্ছেমতো হাঁটতেই না পারলাম তাহলে আর পাহাড়ে গিয়ে লাভ কী? 

তাই আমরা ঠিক করলাম, নিজেরা আলাদা আলাদা করে যা দেখার দেখব, যা ইচ্ছে না হবে দেখব না। মাউন্ট আবুর দিলওয়ারা টেম্পল শৈল্পিক ঔৎকর্ষে জগৎখ্যাত। আর কিচ্ছু না দেখলেও দিলওয়ারা দেখতেই হবে। পেট্রোল পাম্পের কাছে একটা জিপ দাঁড়িয়ে ছিল। বললাম, আমাদের একটু দিলওয়ারা ছেড়ে দেবেন? ভাইসাব রাজি হয়ে গেলেন। 

একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে বানানো পাঁচটি জৈন মন্দিরের সমাহার এই দিলওয়ারা টেম্পলস। ১০৩১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ প্রথম মন্দির বানিয়েছিলেন সোলাংকি বংশের রাজা প্রথম ভীমদেবের মন্ত্রী বিমল শাহ। প্রথম যখন তিনি মন্দির বানানোর প্রস্তাব নিয়ে গেলেন, স্থানীয় ব্রাহ্মণ মোড়লরা বলল, ‘এখানে অম্বামাতার পুজো হয়, তোমার বিধর্মী মন্দির হবে কী রকম?’ বিমল শাহ রাজনীতি করে খেতেন, পুরোহিতদের থেকে তাঁর বুদ্ধি বেশি বই কম ছিল না। তাই মাতা অম্বা তাঁকে স্বপ্ন দিলেন। বললেন, অমুক গাছের তলা খুঁড়ে যদি তমুক মূর্তি পাস তাহলে তুই এখানে মন্দির স্থাপনা করতে পারিস, এই আমি পারমিশন দিলাম। গাছের তলা খুঁড়ে মূর্তি বেরোলো, শুরু হল দিলওয়ারা টেম্পলের। ওই অঞ্চলে মার্বেল পাওয়া যেত না, দূরদূরান্ত থেকে মার্বেল এনে মন্দির বানানো হল। কেউ বলে মার্বেল আনা হত মকরানা খনি থেকে, যে খনি থেকে তাজমহলের মার্বেল তোলা হয়েছিল। হাতিদের পিঠে চড়িয়ে মার্বেল আনা হত বলে মন্দির গড়ার পেছনে হাতিদের অবদানের কথা মাথায় রেখে এক মন্দিরের চাতালে সারি সারি হাতির মূর্তিও আছে। বিমল শাহের বানানো এই প্রথম মন্দির উৎসর্গ করা হল জৈন তীর্থঙ্কর আদিনাথকে। এছাড়াও নেমিনাথ, পার্শ্বনাথ এবং মহাবীরের উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত মন্দিরও আছে। পাঁচটি মন্দিরের কোনটা কখন কে কর্তৃক কার উদ্দেশ্যে বানানো হয়েছিল সে সব লিখতে গেলে মহা বোরিং হবে (সবথেকে বড় কথা সাইটে সাইটে ঘুরে সে সব তথ্য আমার নিজেরই সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে), কাজেই সে রাস্তায় যাচ্ছি না। তার থেকে বরং কয়েকটা গল্প আপনাদের শোনাই। 

বিমল শাহের মন্দির প্রতিষ্ঠার দুশো বছর পর, ১২৩০ সাল নাগাদ ওই জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন দুই ভাই, বস্তুপাল আর তেজপাল। সঙ্গে ছিল দুই ভাইয়ের দুই স্ত্রী অনুপমা আর ললিতা আর প্রচুর ধনরত্ন। ডাকাতের ভয়ে তাঁরা সে সব জঙ্গলে গাছের তলায় লুকিয়ে রাখলেন আর আদিনাথের ভজনপূজন করে মন্দিরের চাতালেই নিদ্রা গেলেন। তাঁদের ভক্তিতে দেবতা খুশি হলেন। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দুই ভাই ভাইয়ের বউ নিজেদের সম্পত্তি মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করতে গিয়ে দেখেন, যা রেখে গিয়েছিলেন তা তো আছেই, বাড়তি আরও ঘড়া ঘড়া মোহরও আছে। বস্তুপাল আর তেজপাল স্থির করলেন দেবতার দেওয়া দান দেবতার কাজেই লাগাবেন। আবার মার্বেল এনে মন্দির তৈরি হল। ন’টি সমান ভাগে ভাগ করে নবচৌকি ছাঁদের সিলিং হল, মাঝের খোপ থেকে ঝুলল মার্বেলের বানানো কারুকার্যময় ঝাড়লন্ঠন, সে লন্ঠন ঘিরে বসলেন তিনশো ষাটজন জৈন সাধু, সবশেষে গূঢ় মন্দিরে স্থাপিত হলেন বাইশতম তীর্থঙ্কর নেমিনাথ। 

ললিতা আর অনুপমা চুপ করে বসে কাণ্ড দেখছিলেন আর ভাবছিলেন, এই মন্দিরে তো বস্তুপাল তেজপালের নামই অমর হয়ে থাকবে, আমাদের তো কেউ মনে রাখবে না। তাঁরা স্থির করলেন, তাঁরাও মন্দির বানাবেন। অত বড় না হোক, অন্তত নেমিনাথের মন্দিরের দ্বারের দুপাশে দুটি মিনি-মন্দিরও যদি বানানো যায় তাই যথেষ্ট। কিন্তু মন্দির বানাতে টাকা চাই। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাঁদের ছিল না, বাপের বাড়ি যেতে হল টাকা চাইতে। বানানো শুরু হল জেঠানি-দেবরানির মন্দির।

তারপর কী হল বলে আপনার ধারণা? বাংলা হিন্দি যে কোনও সিরিয়ালের যে কোনও এপিসোডের দেড় মিনিট যদি দেখে থাকেন, উত্তর দিতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। দুই জায়ে চুলোচুলি শুরু হল। 'ওর মন্দিরটা আমারটার থেকে বেশি ভালো হয়ে যাচ্ছে' নাকে কেঁদে তাঁরা একে অপরের মন্দির বারবার ভেঙে দিতে লাগলেন। যদিও তাঁদের টাকা নয়, অপচয় দেখে দুই স্বামী বিরক্ত হলেন, কারিগরদের আদেশ দিলেন দুই গিন্নির মন্দির অবিকল একরকম করে বানাতে। কারিগররা ভাবল, সত্যি মন্দির তো বানানো হয়েই গেছে, এই খেলাখেলা মন্দিরে আমরাই বা আমাদের ইনপুট দিতে ছাড়ি কেন, ভেবে দেবরানি যেহেতু বয়সে এবং সম্পর্কে ছোট, তাঁর মন্দিরে একটা হাতি কম বানিয়ে দিল।

দিলওয়ারা মন্দিরের কারুকার্য সত্যি চমৎকার। বৈদেহীদের নিখুঁত প্রত্যঙ্গবিভঙ্গ থেকে শুরু করে, হাতের নখ, ফোটা পদ্মের পাপড়ি, সূর্যমুখীর পাপড়ির ভাঁজের কারুকার্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মন্দির বানাতে অসামান্য পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করা হয়েছিল। সারাদিন মার্বেল কাটার পর যে গুঁড়ো জড়ো হত তার সমপরিমাণ সোনারুপো নাকি কারিগরদের পারিশ্রমিক দেওয়া হত। 


ক্যামেরা, ফোন কিছু নিয়েই মন্দিরে ঢোকা যায় না বলে ছবি তুলতে পারিনি। ইন্টারনেটে অনেক ছবি আছে, ইচ্ছে হলে দেখে নিতে পারেন। ইন ফ্যাক্ট, আপনি যদি মহিলা হন আর দিলওয়ারা টেম্পল দেখতে যাওয়ার সময় আপনার যদি ঋতু চলে তাহলে আপনাকে যা দেখার সব নেটেই দেখতে হবে। কারণ মন্দিরে ঢোকার মুখে যেখানে ক্যামেরা জুতো ইত্যাদি নিয়ে ঢোকার নিষেধাজ্ঞা টাঙানো আছে, সেখানেই রক্তাক্ষরে ইংরিজি এবং হিন্দিতে বড় বড় করে লেখা আছে, ঋতু চলাকালীন মহিলাদের মন্দিরে প্রবেশ স্ট্রিকটলি নিষেধ। 

“আদারওয়াইজ মে সাফার।”

                                                                                                                       (চলবে)

মাউন্ট আবু - উদয়পুর ভ্রমণঃ প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম ও শেষ পর্ব

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.