May 27, 2017

কেটলি ও কপোলকল্পনা



এখনও সবকিছু শান্ত, ফ্যানের ঘরঘর আর বাড়িওয়ালার পাম্পের আওয়াজ (আর আমার টাইপিং-এর খটাখট) ছাড়া চারদিক শব্দহীন। অর্চিষ্মান ঘুমোচ্ছে। আমার ভোরের কোটা দু’কাপ চা হয়ে গেছে, ও উঠলে ওর সঙ্গে আরেক কাপ খাব। মিনিটকুড়ি আবোলতাবোল আড্ডা দেব, ব্যস। তারপর একটা দক্ষযজ্ঞ বেধে যাবে।  

আজ আমাদের বাড়ি গোছানোর দিন। অনেকদিন আগেই এই দিনটা আসা উচিত ছিল। করছি করব বলে ঠেলে রেখেছি। আর ঠেলব না। সারা সপ্তাহ ধরে নিজেদের প্রস্তুত করেছি। চ্যাটবাক্সে গানের লিংক চালাচালি করার আগেপিছে মনে করিয়েছি, "মনে আছে তো? এই উইকএন্ডেই কিন্তু… "

প্রথমে হাত দেব ওয়ার্ডরোবে। টান মেরে জামাকাপড়গুলো ফেলব। অফিসে যাওয়ার দুটো জামা থাকবে, বাড়িতে পরার দুটো। বালিশ, গদি সরিয়ে খাটের গহ্বরের হাঁ খুলব। তিনটে সুটকেস, পাঁচটা লেপ, সাতটা বালিশ, সতেরোটা বিছানার চাদর। হ্যাঁচকাটানে ড্রয়ার খুলব একে একে। কান ধরে ধরে সামনে আনব ঘাপটি মেরে থাকা যত বিল, রসিদ, পুরোনো ডায়রি। দুমদুম পা ফেলে যাব রান্নাঘরে। সংসারে দুটো লোক। তাদের ছ’টা থালা, তেরোটা বাটি, পনেরোটা চায়ের কাপ। আজকের পর আর থাকবে না। নেক্সট, ফ্রিজ। ফ্রিজের দরজায় যে সব সরুমোটা সাদাকালো শিশিবোতলেরা এক্সপায়ারি ডেটের অপেক্ষায়, কিংবা ডেট পার করে হাসিহাসি মুখে বসে আছেন, তাঁদের ফেলব। ঝাঁট দেওয়ার নামে গায়ে জ্বর, অথচ বারান্দার কোণে পাঁচ রকমের ঝাঁটা জমেছে। একটা লম্বা, একটা বেঁটে, একটার মাথায় মোরগের মতো ঝুঁটি, একটার গায়ে মেঘের মতো তুলো। সব ঝেঁটিয়ে বিদেয় করব। বার সাবান শেষ কবে মেখেছি মনে নেই, এদিকে বাথরুমের আয়নাবাক্সে একটা সবুজ, একটা গোলাপি, একটা নীল সাবানকেস। সব যাবে আজ প্লাস্টিকবন্ধ হয়ে কুড়ার ভাণ্ডে।

কিংবা যাবে না। মন চাইবে। মাথা বলবে ফেলে দাও, গত চার বছর যে শাড়িটা পরোনি, সেটা নেক্সট চল্লিশেও পরবে না। গত চার বছর যে হার লকারে রয়ে গেছে, সেটা নেক্সট চল্লিশও লকারে থাকবে। মাঝখান থেকে গচ্চা যাবে কিছু লকারের ভাড়া। আর সে হার বানাতে যা গেছে তা তো গেছেই। সে দুঃখের কথা আর না মনে করাই ভালো। মাথাকে চুপ করিয়ে শাড়ি আবার ধীরে ধীরে বাক্সে নামিয়ে রাখব। হয়তো এ বাক্সের বদলে অন্য বাক্সে। তাও একটু ফাঁকা লাগছে, না গো? নিজের মনকে চোখ ঠারাতে না পেরে একে অপরের চোখ ধার নেব। আবার রসিদগুলো ভাঁজ করে রাখব গুছিয়ে ড্রয়ারে। যদি লাগে। 

আর তারপর দু’কাপ চা নিয়ে বসব দুজনে যে যার ল্যাপটপ কোলে নিয়ে। অর্চিষ্মান কী ভাববে বা আদৌ কিছু ভাববে কি না জানি না, আমার ভাবনা স্ক্রিন থেক উঠে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াবে। আলমারির পাল্লা খুলে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। বন্ধ ড্রয়ারের হাতলে হাত বোলাবে। ভাববে, যদি পারতাম। সব টান মেরে ফেলে দিতে। 

কেমন হত? ওয়ার্ডরোব খাঁ খাঁ, ড্রয়ার ঢুঁ ঢুঁ, খাট নেই, গাদাগুচ্ছের চেয়ার নেই, চোদ্দ বাই বারো ফুট ঘরে আছে শুধু কটা বুককেস, কয়েকটা বই, কয়েকটা ছবি, আর কয়েকটা গাছ। হালকা হালকা, কী হালকা। গোটা বাড়িটা যেন ভাসছে হাওয়ায়, পর্দাগুলো দুলছে। মাঝে মাঝে মেলা গ্রাউন্ডের দিক থেকে হাওয়ার একেকটা ঝাপটা আসছে, বুককেসের হালকা বইগুলো খসে পড়ছে টুপটাপ, দেওয়ালে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসা আমরা দুজন হেলে যাচ্ছি, বাঁদিকে কিংবা ডানদিকে। একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছি। ভয় লাগছে না একটুও, যেন খুব শান্ত ভদ্র একটা নাগরদোলায় চেপেছি। চারদিক নিঝুম, খালি রান্নাঘরে চায়ের কেটলির জল ফুটছে গব গব করে।

*****

বাই দ্য ওয়ে, আমাদের বর্তমান ইলেকট্রিক কেটলি অবশেষে দেহ রেখেছে। বা রাখব রাখব করছে।  দু’হাজার বারোতে যখন এ বাড়িতে নতুন এসেছিলাম, বা অর্চিষ্মান এসেছিল বলা উচিত, যখন বাড়িটা আমার স্বপ্নের মতো হালকা ছিল, এমনকি স্বপ্নের থেকেও বেশি, কারণ বই, গাছ, ছবিও ছিল না - তখন এই কেটলিটা ছিল। বছরদেড়েক পর যখন আই ব্লক থেকে আরেক দফা খাট বুককেস, টিভি নিয়ে আমি এলাম আর তারও একমাস পর কলকাতা থেকে সুটকেসভর্তি শাড়ি, শার্টপ্যান্টের পিস বেডকভার, বই, চায়ের সেট আর অস্বচ্ছ প্লাস্টিকের বাক্সভর্তি গাদা গাদা মুখে মাখার ক্রিম, পাউডার, পারফিউম নিয়ে আমরা দুজনে এলাম, তখনও ছিল। ওই যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে বসে আমরা এই কেটলি থেকেই জল ঢেলে দু’কাপ চা খেয়েছিলাম। আর সাহস পেয়েছিলাম, বন্ধ সুটকেস ডিঙিয়ে দরজায় তালা মেরে সিনেমাহলে চলে যাওয়ার। এই কেটলির ঢাকনিতে একটা চিড় আছে, আমার সিপ্রালেক্সবিহীন কোনও মুহূর্তের অবদান। ওই একই মুহূর্তে ঢাকনাটা বাকি শরীর থেকে খুলে এসেছিল। এখন কাত করে জল ঢালতে গেলে মাঝে মাঝে ঢাকনাটা খুলে কাপের ওপর পড়ে। আর লিটারখানেক ফুটন্ত জল হাতের ওপর। সাবধানে চলা যায়, চলছিও প্রায় বছরখানেক ধরে। কিন্তু অফিসে যাওয়ার আগের মুহূর্তে কিংবা ফেরার পরমুহূর্তে সাবধানতার ওপর ভরসা করা যায় না, তখন একটা কেলেংকারি ঘটতে পারে, ঘটবেই যে কোনও দিন।

এই সব ভেবেটেবে আমরা নতুন কেটলি কিনেই আনলাম। কতরকমের কেটলি পাওয়া যায় আজকাল বাজারে, লাল নীল হলুদ, কতরকমের এক্সট্রা ফিচার। কোনও রকম পরীক্ষানিরীক্ষায় যাইনি আমরা, কারণ কেটলি আমাদের কাছে ফ্যান্সি গ্যাজেট নয়, বাঁচামরা। আমরা সেই ট্রায়েড অ্যান্ড টেস্টেড ব্র্যান্ডের, কালো প্লাস্টিক আর স্টিল মেশানো বডি, খাটো তারওয়ালা, এক লিটারের মডেল কিনেছি। প্রথম যখন কাঁচি দিয়ে পিচবোর্ডের বাক্স কেটে, সেলোটেপ আর বাবলর‍্যাপ খুলে কেটলিটা বার করলাম, বুক ধড়াস করে উঠল, এতটুকু! আগেরটা কি তবে দেড় বা দু’লিটারের ছিল? নির্ঘাত। মনটা দমে গিয়েছিল নিমেষে। কেটলি হাতে  রান্নাঘরের দিকে হাঁটার পনেরো পায়ে কতকিছু মনে এল। ফেরৎ দেব? ফেরৎ দিতে গেলে কত ঝামেলা করতে হবে? নাকি যা পেয়েছি তাতেই কাজ চালিয়ে যাব? জলের সংকুলান হলে, বার বার উঠে কেটলিতে জল ভরতে হলে চা খাওয়ার ঘটা কিছু কমতে পারে, হয়তো। 

রান্নাঘরে পৌঁছে পুরোনো কেটলিটার গায়ে নতুন কেটলি লাগিয়ে দেখলাম, অবিকল এক। মাথার ওপর বসিয়ে দেখলাম, বেড় এক্স্যাক্টলি সমান। পাশাপাশি রেখে হাঁটুতে ভর দিয়ে চোখ খুব সামনে নিয়ে গিয়ে মাপলাম, জল ঢালার জন্য ঠোঁটের মতো অংশটা এক, এমনকি ঠোঁটের নিচে যে ফুটো ফুটো মতো করা আছে, সম্ভবত বাষ্প বেরোনোর জন্য, তার সংখ্যাও কাঁটায় কাঁটায় সমান সমান। 

অথচ পুরোনো কেটলিটার পাশে নতুনটাকে কী খেলনাসুলভ দেখাচ্ছে। যেন চাসুড়ের রান্নাঘরে নয়, কোনও শখের চাপ্রেমীর ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখার জন্য বানানো। অথচ এত মাপামাপির পর সন্দেহের কোনও জায়গাই নেই যে দুজনে আসলে এক ও অবিকল। তবে? খানিকক্ষণ ভেবে অবশেষে এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে আসলে ব্যবহার এবং উপযোগিতা, জিনিসকে (মানুষকেও হয়তো) একটা আলাদা মহত্ব দেয়। এই কেটলিতেও যখন জল ভরব, সুইচ অন করব, রক্তচক্ষু জ্বেলে কেটলি গরম হতে শুরু করবে, শোঁ শোঁ শব্দ ক্রমে টগবগটগবগ, একদল বন্য ঘোড়া যেন কেটলি ফাটিয়ে বেরোনোর উপক্রম করবে, তাদের ক্ষুরের ধুলো আর নিঃশ্বাসের আগুনের আঁচ বেরোবে কেটলির গা দিয়ে, থরথর করে কাঁপবে কেটলি, আর তারপর তা থেকে আমরা যে যার কাপে ঢেলে নেব সঞ্জীবনীসুধা, তখন এই চকচকে খেলনাসুলভ কেটলিকেও ততখানিই প্রকাণ্ড আর মহান আর সর্বশক্তিমান দেখাবে, যেমন আমাদের সংসারের প্রথম কেটলিকে দেখাত এতদিন। 


May 23, 2017

টাফিদের আড্ডায়



সে মেধা নেই, সে নোবেল নেই, সে সি পি এম নেই, এমনকি সে আড্ডাও নেই। নেই নেই আর্তনাদ ছাড়া আর কিছু নেই বাঙালির। আড্ডার না থাকাটা সবথেকে বড় আফসোস। নোবেল, জ্ঞানপীঠ, ম্যাগসেসে, পলিটব্যুরোর সদস্যপদ, বসের পিঠচাপড়ানি, ফর্সা + রবীন্দ্রসংগীত জানা বউ, অ্যামেরিকার স্কলারশিপ, বাঙালি যতটুকু যা পেয়েছে, সব নাকি আড্ডা মেরেই পেয়েছে। অমর্ত্য সেন শান্তিনিকেতনের মাঠে আড্ডা দিতেন, তবে না অক্সফোর্ড কেম্ব্রিজ হার্ভার্ড, শান্তিদেব ঘোষ আর সুচিত্রা মিত্র কালোদার দোকানে বসে আড্ডা দিতেন, তবে না গলায় অমন দাপট। ছ’নম্বর প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটের আড্ডার দৌলতেই না যত আনন্দ, রবীন্দ্র, সাহিত্য অ্যাকাডেমি, জ্ঞানপীঠ। 

তবে একেবারে কি নেই? আছে এদিকসেদিক ঘাপটি মেরে। আমাদের বাড়ির সামনেই একটা আছে। বিশুদ্ধ বাঙালি আড্ডা। ওই যে মোড়ের মাথায় বাড়ির (যার নেমপ্লেটে সারিসারি নাম আর প্রতিটি নামের পাশে নামের থেকেও বেশি জায়গা জুড়ে ‘আই আই টি’ লেখা), তার সামনের কংক্রিটের ঢালু হওয়া অংশটুকুতে আর রাস্তার ওপারে জমে ওঠা বালির পাহাড়ে ভাগ ভাগ হয়ে আড্ডা বসে। কখনও কখনও আড্ডা তর্কের আকার নেয়, তার চিৎকার পাঁচশো মিটার দূরের আমার এই ভাড়াবাড়ির দোতলাতেও পৌঁছোয়। মাঝে মাঝে খুব কৌতূহল হয় গিয়ে দেখি। কিন্তু সে আড্ডায় আমার প্রবেশাধিকার নেই।

টাফির আছে। টাফি আমাকে মোটামুটি নেকনজরে দেখে, ওর থেকে মাঝে মাঝে আড্ডার খবরাখবর পাই। রাজনীতির খবর বেশি দেয়টেয় না, বলে, “তুমি ওসব বুঝবে না।” সামাজিক ইস্যু হলে মুড ভালো থাকলে, গরম কম থাকলে, মাঝেসাঝে বলে। 

গত সপ্তাহে দুদিন হঠাৎ মেঘলা হল (এ সপ্তাহে ছেচল্লিশ ছোঁবে, তারই আগাম সান্ত্বনা সম্ভবত), বৃষ্টির ছাঁট পাওয়ার আশায় জানালা খুলে রেখেছিলাম, চেঁচামেচি শুনতে পেলাম স্পষ্ট। খানিকক্ষণ পর জানালা দিয়ে লাফ মেরে ঢুকে, খাটে উঠে, সারা গা ভালো করে ঝাঁকিয়ে আমার বেডকভার ভিজিয়ে, আমার চায়ের কাপ থেকে চুকচুক করে খানিকটা চা খেয়ে মুখব্যাদান করে (ভদ্রলোকের মতো দুধচিনি দেওয়া চা খাও না কেন বল দেখি?) আরাম করে বসে টাফি বলল, “আড্ডা খুব জমেছিল আজ।” আমি বললাম, “শুনে তো তাই মনে হল। কী নিয়ে লেগেছিল?”

টাফি ততক্ষণে পকেট থেকে ফোন বার করেছে। দু’চারবার ওপরনিচে স্ক্রোল করে, দুচারজনের পোস্টে লাইক আর লাভসাইন মেরে, মুচকি হাসতে হাসতে নিজের স্টেটাস আপডেট দিল। যদিও ভদ্রতাবিরোধী, তবু উঁকি মেরে দেখলাম টাফি লিখেছে, #চিলিংউইডচা। টাফির প্রোফাইল পিকচারটা আমারই তোলা। আমারই বারান্দায়, আমারই কারিগাছের টবে হেলান দিয়ে, কালো সানগ্লাস পরে, জিভ বার করে, থাবা উঁচিয়ে রক সাইন দেখিয়ে টাফি দাঁড়িয়ে আছে। 

অবশেষে ফোন নামিয়ে রেখে টাফি বলল, “হ্যাঁ, কী বলছিলে?”

“তর্কটা কী নিয়ে লেগেছিল?”

“বাংলা।”

আমি ভুরু কোঁচকালাম। নিজের ফোন তুলে একবার ক্যালেন্ডার চেক করতে যাচ্ছি, টাফি হাই তুলে বলল, “না না, এটা ফেব্রুয়ারি মাসও নয়, আজ একুশ তারিখও নয়।” বলে চিত হয়ে চার পা আকাশে তুলে শুলো।  

আমি ইশারা বুঝে ওর নরম সাদা পেটটা চুলকোতে লাগলাম। টাফি লাল জিভটা অল্প বার করে, চোখ বুজল।

আমি বললাম, “তবে?”

টাফি বলল, “গ্লোবাল ওয়ার্মিং চলছে জান না? সিজন ব্যাপারটাই উঠে গেছে। বর্ষাকালে বৃষ্টি হচ্ছে না, ডিসেম্বরে শীত পড়ছে না, বাংলা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে ফেব্রুয়ারির কী দরকার।”

তা বটে। 

আমার মুখ দেখে টাফির দয়া হল বোধহয়। দু’কথায় আমাকে ধরতাই দিয়ে দিল। এবার থেকে রাজ্যের সব স্কুলে বাংলা পড়া আবশ্যিক। 

নাঃ, তর্ক লাগার মতোই বিষয় বটে। আমি বললাম, “শুনি শুনি, কারা সমর্থন করল, আর কারা বলল চলবে না?”

টাফি থাবা দিয়ে পেটের একটা অংশ নির্দেশ করে বলল, “এ কি তোমাদের শহরতলি ইশকুলের বিতর্কসভা পেয়েছ, যে দিদিমণি বলে দিলেন সভার মত হল এই, বাংলা বাধ্যতামূলক, এবার একদল তেলচিটে বিনুনি বাঁধা মেয়ে কোমরে আঁচল কষে সভার পক্ষে বলবে, আরেকদল তেলচিটে বিনুনি বাঁধা মেয়ে বিপক্ষে? এখন ওসব পক্ষে বিপক্ষে হয় না। এখন মতামতের স্পেকট্রাম। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে থেকে শুরু করে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তার মাঝে কত অ্যাংগেলে ঘোরে, কত স্পিড, ঘোরা ভালো না খারাপ, ডানদিকে ঘোরে না বাঁদিকে, ক্লকওয়াইজ ঘোরে না অ্যান্টিক্লকওয়াইজ ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ে বিবিধ লোকে মত প্রকাশ করে।” 

তেলচিটে বিনুনির খোঁচাটা আমার ভালো লাগল না। আমি হাত সরিয়ে নিয়ে বললাম, “ওহ, তা তোমার শহুরে পরিশীলিত বন্ধুরা কে কী বলল শুনি?”

টাফিও বুঝেছিল, খোঁচাটা একটু বেশি ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। গা ঘেঁষে, আমার গালটা একবার চেটে দিয়ে গল্প শুরু করল। 

“শুরুতে যে চিৎকারটা শুনেছ সেটা মোস্ট প্রব্যাবলি লাল্টুবিল্টুর দলের। তখনও বেশি লোক জমেনি। ওরাই লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে শার্ট উড়িয়ে উল্লাস করছিল। না না, বাংলার জন্য নয়। বাঙালির জন্যও নয়। রাজ্যে, মেনলি কলকাতায় থাকা মেড়ো আর খোট্টাগুলো যে কেস খাবে, এইটাই এই দলের উল্লাসের মূল কারণ।"

"তারপর গুটিগুটি আরও অনেকে এসে জড়ো হল। এরা লাল্টুবিল্টুর থেকে আরেকটু বুঝদার।” 

আমি বললাম, “কী রকম?”

“এরা প্রমাণ ছাড়া তর্ক করে না। মুশকিল হল, বেশিরভাগেরই প্রমাণ স্বয়ং নিজে। নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতা দিয়ে জগতের উচিতঅনুচিত ভালোমন্দ প্রমাণ হবে। যেমন ধরো ওই মোড়ের বাড়ির কালোটা।”

আমি বললাম, “কালো কোথায়, কানের কাছে একটু সাদা ছোপ আছে তো।”

টাফি নাক দিয়ে ভুক করে একটা শব্দ করল (অনেকটা আমাদের ধুস-এর মতো শুনতে), “আমার মতো সর্বাঙ্গ ধপধপে সাদা তো নয়, ওদের আমি কালোই বলি।”

টাফির বর্ণবিদ্বেষ আমার পছন্দ নয়, কিন্তু এখন ওসব পয়েন্ট আউট করতে গেলে গল্প মাটি হয়, কাজেই কিছু বললাম না। 

বললাম, “কী বলল, কালোটা?”

“খুব চোখটোখ ঘুরিয়ে বলল, ‘কই আমি তো আজীবন ইংরিজি মিডিয়ামের ডাস্টবিনের আশেপাশে ঘুরেছি, আমার চোদ্দ পুরুষের কেউ কখনও বাংলা মিডিয়ামের দারোয়ানের লাঠির বাড়ি খাওয়া তো দুরে থাক, ছায়া পর্যন্ত পাড়ায়নি। তা বলে কি আমরা বাংলা বলতে শিখিনি?’ এই বলে বালির পাহাড়ে উঠে বুক চিতিয়ে ‘এসেছে শরৎ হিমের পরশ’ গোটাটা আবৃত্তি করে শুনিয়ে দিল।

“এই ভর জ্যৈষ্ঠ মাসে?”

“বিউটিপার্লারের দোতলার টমিটাপেন্সও কালোটাকে সাপোর্ট করল।” 

আমি বললাম, “এরা আবার কারা?” 

টাফি বলল, “কেন তুমি যখন অফিসে যাও পাশাপাশি গলায় বকলস বেঁধে দুজন বেরোয় দেখোনি? সোনালি ঝুপো ঝুপো লোম…”

“ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝেছি। তা এঁরা কি গোয়েন্দাটোয়েন্দা নাকি?”

টাফি তেরিয়া হয়ে বলল, “তোমাকেও তাই বলেছে বুঝি? !@#৳ মিথ্যেবাদী কোথাকার!”

আমি কানে আঙুল দিয়ে বললাম, “না না, ওঁরা কিছু বলেননি, আমি এমনিই আন্দাজ করলাম।”

টাফি বলল, “আরে ওরা সবাইকে বলে বেড়ায় ওরা নাকি সিক্রেট সার্ভিসে ছিল, আপাতত রিটায়ার্ড। যত সব গুলতাপ্পি। জন্মে থেকে দেখছি সকালবিকেল একনম্বর পর্যন্ত জিভ বার করে হাঁপাতে হাঁপাতে যায়, আর হাঁপাতে হাঁপাতে ফেরে। বাকি সময় বারান্দায় বসে ঝিমোয়। সিক্রেট সার্ভিস না হাতি।”

আমি বললাম, “ওদের গোটা তিনেক ছানা আছে না? গলায় ওয়াটার বটল ঝুলিয়ে বাড়ির সামনে স্কুলবাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে? ভীষণ মজার।” 

“মজার?” টাফি চোখ কপালে তুলল। “একেকটা একেক পিস। দু’নম্বরের শনিমন্দিরের মেঝেতে পুঁতলে একনম্বরের কালীমন্দিরের মেঝে ফুঁড়ে বেরোবে। আমাকে দেখলেই ‘টাফি, তোর গোদা পায়ে লাথি’ ছড়া কাটে আর মুখ ভেংচায়।”

আমি হাসি চেপে বললাম, “কী বলল টমিটাপেন্স?”

“টমি বলল, ‘আমরাও তো ছেলেপুলেকে ইংরিজি ইশকুলে দিয়েছি, না হয় এখন রাইমস ছাড়া আর কিছু দাঁতে কাটছে না, তা বলে কি আমার ছেলেমেয়ে বাংলা শিখবে না? এই যে আমি প্রতিবছর বইমেলা গিয়ে চুন চুন কে বাংলা সাহিত্যের মণিমুক্তো কুড়িয়ে আনছি, যত্ন করে জমাচ্ছি বুকশেলফে, সুকুমার রায় টু সতীনাথ ভাদুড়ী, রাইমসের চাপ একটু কমলে কি বাচ্চারা সেগুলো পড়বে না?’

টাপেন্স বলল, ‘আর তাছাড়া নাচের ইশকুলে তো এই বছরেও ঋতুরঙ্গ করেছে আর ড্রামা স্কুলে অবাক জলপান। আবার কত চাই? যত্ত সব।’”

আমি বললাম, “তা বটে।” 

টাফির গল্পের মুড এসে গিয়েছিল। “এই সব হতে হতে মাছের বাজারের দিক থেকে বাদামি দুটো নেড়ি এসে হাজির। একটা বেশ নাদুসনুদুস, অন্যটার অর্ধেক লোম উঠে গেছে। ওটা বেশি কথা বলে না, চুপচাপ থাকে। নাদুসনুদুসটাকে দেখেছ বোধহয়, পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ, পনেরোই আগস্টে প্রভাতফেরি লিড করে। গলায় সুর নেই বিশেষ, দরদ দিয়ে মেকআপ দেয়।”

মাথা নাড়লাম। দেখেছি। বা শুনেছি বলা ভালো। 

“নাদুসনুদুস খুব দৌড়ে এসে, জিভ বার করে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘বন্ধুগণ ব্রেকিং নিউজ, এখন থেকে বাংলা বাধ্যতামূলক।’

শুনে সবাই হাই তুলে, তুড়ি বাজিয়ে, পাশ ফিরে শুল। নাদুসনুদুস বলল, ‘ওহ, সেই নিয়েই কথা হচ্ছে বুঝি? দারুণ হয়েছে, এতদিনে একটা কাজের মতো কাজ হয়েছে, জয়ব্বাংলা।’ 

টাপেন্স মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘আমাদের ছেলেপুলেরা তো আর মাছের বাজারে চুরি করে লাইফ কাটাবে না। আমাদের ছেলেপুলে রেসপেক্টেবল অফিসে রেসপেক্টেবল চাকরি করবে। তাদের ইংরিজি শেখা মাস্ট।’

টাপেন্স যদিও কথাটা আকাশের দিকে নাক তুলে বলেছিল, সকলেই বুঝেছে কাকে উদ্দেশ্য করে বলা। নাদুসনুদুস তেরিয়া হয়ে বলল, ‘বাংলা পড়লে ইংরিজি শেখা যায় না কে বলল? আমার ঠাকুরদা বাংলা পড়ে রায়চৌধুরী খেতাব পেয়েছিলেন, আমার মাসতুতো দাদার পিসতুতো বোন বাংলা ইশকুলে পড়ে বিলেতে পি এইচ ডি করছে, আমিও তো ইতিহাস ভূগোল অংক ইংরিজি সব বাংলাতেই পড়েছি, তা বলে কি ইংরিজি বলতে পারি না? এ বি সি ডি ই এফ জি এইচ, ক্যাট ব্যাট ম্যাট ফাক শিট। কে বলে বাংলা পড়লে ইংরিজি শেখা যায় না?’

“স্যার জেমস এর মধ্যে কখন সফল-এর সামনে থেকে গুটি গুটি এসে আড্ডায় যোগ দিয়েছে কেউ খেয়ালই করেনি। স্যার জেমসকে চেনো তো?” 

চিনি। সারাজীবন বিলেতে কাটিয়ে এ পাড়ায় নতুন এসেছেন। সাহেবি চেহারা, সাহেবি হাবভাব। সুট প্যান্ট বোলার হ্যাট পরে ঘোরেন। ইংরিজি ছাড়া কথা বলেন না, 'সিট'-এর বদলে ‘বোসো’ বললে দাঁড়িয়ে থাকেন। 

“ঠিক ধরেছ। ওটাই। স্যার জেমস থাবা মুখের কাছে এনে গলা খাঁকারি দিল। টমিটাপেন্স উঠে দাঁড়িয়ে বাও করল, নাদুসনুদুস মুখ বেঁকিয়ে ঘাড়টা অন্যদিকে ঘোরালো, কিন্তু কানদুটো খাড়া করে রইল। 

সব উশখুশ থামলে গলা খাঁকারি দিয়ে হ্যাটপরা মাথাটা যথাসম্ভব উঁচু করে উদাত্ত কণ্ঠে স্যার জেমস বলল, “ফ্রেন্ডস, রোমানস, কান্ট্রিমেন। আমি বয়সে বুড়ো কিন্তু হাবেভাবে নবীন। আমার সমসাময়িকরা যখন ধর্মগ্রন্থ বগলে বাণপ্রস্থে গেছে তখন আমি বালখিল্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্মার্টফোনে টাইপ করা শিখেছি। আমার এ বিষয়ে কিছু বলার আছে।’

“আমি অমনি কচুগাছের আড়াল থেকে বলেছি, ‘সে আপনার কোন বিষয়ে কিছু না বলার থাকে দাদু?’” টাফি ফ্যাচফ্যাচ করে হাসছে।

আমি বললাম, “তুমি কোনদিন মারধোর খাবে। স্যার জেমস রাগলেন না?”

টাফি বলল, “রাগবে না আবার। রেগেকেঁপে একশা। একেবারে ছাদের সমান লাফ দিয়ে উঠে বলছে, ‘কে কে কে? কে বলল এসব, সবক’টাকে কান ধরে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বার করে দেব।’”

“তারপর?”

“তারপর আবার কী। সবাই হাতেপায়ে ধরে ঠাণ্ডা করল। ছেড়ে দিন দাদা, ইগনোর করুন, হেটারদের পাত্তা দেবেন না, আমাদের কথা ভেবে বক্তৃতা চালিয়ে যান। দুয়েকজন বলল, ‘ফেক প্রোফাইল, রিপোর্ট করে এলুম।’ অমনি একযোগে রোল উঠল, ‘রিপোর্টেড, রিপোর্টেড।’” 

“আবার গলা খাঁকরানি, আবার ফ্রেন্ডস অ্যান্ড রোমানস আর হ্যানাত্যানা শেষ করে স্যার জেমস আসল কথায় এল। এই কথাগুলোও নতুন কিছু নয়, সকলেই শুনেছে আগে। 'আপনারা সকলেই জানেন, যাঁরা জানেন না তাঁদের অবগতির জন্য জানাই, আমি আজীবন বিলেতে কাটিয়েছি। এখন এই আই আই টি মোড়ে আপনাদের নেতৃত্ব দিচ্ছি বলে ভাববেন না আমি আপনাদের লোক। আমি মনেপ্রাণে বিলিতি। এখনও আমার ফ্যামিলি বিলেতে থাকে, আমার নাতিরা তো ওখানেই জন্মেছে। ভাবুন একবার। বিলিতি নাতি। কই তারা তো বাংলা পড়ছে না। তা বলে কি তারা বছর বছর পুজো ফাংশানে “যদি কুমড়োপটাশ নাচে” আবৃত্তি করছে না? এনকোর পাচ্ছে না? তবে আমার নাতিরা, বিলেতে জন্মেছে বলেই বোধহয়, দারুণ শার্প। আপনাদের নাতি হলে কে জানে কী করত। ইন ফ্যাক্ট, তাদের এই পারফরম্যান্সের ভিডিও আমার বাড়িতে তুলে রাখা আছে, আমি প্রস্তাব করছি,’ নাদুসনুদুসের দিকে তাকিয়ে স্যার জেমস বলল, ‘সমিতির আগামী মিটিং-এ সেটা দেখানোর ব্যবস্থা হোক। বাংলা না পড়লে বাংলা সাহিত্যে দিকপাল হওয়া যায় না, এ সর্বৈব অপপ্রচার। আমার বিলিতি নাতিরা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।’

টমিটাপেন্সের বিচ্ছুগুলো ইশকুল থেকে ফিরে বাড়ি না গিয়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল, তাদের একটার গলা থেকে ওয়াটার বটল খুলে নিয়ে চুমুক দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিল স্যার জেমস।

‘আমি যেটা বলতে চাই, আপনাদের কারও ছেলেমেয়ে নাতিপুতি যখন আমার নাতিদের সমকক্ষ হতে পারবে না, কী পড়ানো হবে না হবে, বাংলা না ইংরিজি না হিব্রু, সেটা, পার্ডন মাই অনেস্টি,’ থাবা তুলে আবার গলা খাঁকরালো স্যার জেমস, ‘ইমমেটেরিয়াল, ইররেলেভ্যান্ট। ইশকুলে না পাঠালেও কিছু আসবে যাবে না। আর যদি পাঠাতেই হয়, তাহলে আমার মতে, আমার বিলিতি নাতিদের বিলিতি স্কুলের মহান ঐতিহ্য অনুসরণ করে বাংলা বাধ্যতামূলক করার বদলে, বাংলা ব্যান করা সরকারের পবিত্র কর্তব্য। আমি এসব বিবেচনা করে বাংলা ব্যান করার পিটিশন লিখেই এনেছি, আপনারা যদি ঝামেলা না করে পিটিশনে থাবাছাপ দিয়ে দেন, তাহলেই ল্যাঠা চুকে যায়।’ এই না বলে স্যার জেমস পকেট থেকে একটা পাকানো কাগজ বার করে গলা খাঁকারি দিয়ে পড়তে শুরু করল।

‘হার ম্যাজেস্টি দ্য কুইন…’

এমন সময় সবার চোখ ঘুরে গেল। নাদুসনুদুসের চ্যালা, মার্কেটের লোম ওঠা ঘেয়ো কাঁপতে কাঁপতে স্যার জেমস-এর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক থাবা তুলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে, ‘কোথায় ছাপ দিতে হবে স্যার? আমার মধ্যে পোটেনশিয়াল ছিল, বিশ্বাস করুন স্যার, কেরানি বাবামা কিপটেমো করে বাংলা স্কুলে পাঠিয়েছিল বলে আজ এই দশা।’ ঘেয়োকে দেখে স্যার জেমস রিফ্লেক্সে নাক চাপা দিয়েছিল, এখন আহ্লাদিত হয়ে ‘এখানে এখানে’ বলে পিটিশন নিয়ে এগিয়ে গেল।

সবাই কেমন থতমত খেয়ে গিয়েছিল, প্রথম সম্বিত ফিরল নাদুসনুদুসের। ‘আরে আরে কর কী কর কী’ বলে সে দৌড়ে এল, একটা গোলমাল বাধে দেখে খুশি হয়ে লাল্টুবিল্টুর দল হইহই করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওদিক থেকে টমিটাপেন্স, টমিটাপেন্সের খোকাখুকুর নাচের ক্লাসের, আবৃত্তি ক্লাসের টিচাররা, তাইকোন্ডু ক্লাসের টিচাররা ধেয়ে এল।

“কারা কোন দলের হয়ে লড়ছিল?” আমার কৌতূহল তুঙ্গে।

“কে জানে।” টাফি মুখ ছেতরালো। “অত হট্টগোলে বোঝা যায় নাকি। যদ্দূর মনে পড়ছে নাচগানআবৃত্তির টিচাররা বাংলার ফরে লড়ছিল, আর তাইকোন্ডুর টিচাররা সেভাবে কারও পক্ষ নিচ্ছিল না, যারাই মার খাচ্ছিল, তাদের হয়ে লড়ছিল। ঘেয়োর হয়ে দু’তিনজন খুব ঘুঁষি চালাচ্ছিল দেখলাম।”

শুনে আমার কীরকম রক্ত গরম হয়ে উঠল। বললাম, “তুমি কোথায় ছিলে?”

“আমি আবার কোথায় থাকব, আমি কচুঝোপে বসে চেঁচালাম খানিকক্ষণ, তারপর ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলাম, হেবি মশা। মারামারি তখন তুঙ্গে, চারদিক থেকে ‘ইংরিজি গোল্লায় যাক, বাংলা গোল্লায় যাক, মেড়ো গোল্লায় যাক, খোট্টা গোল্লায় যাক, বাঙালি গোল্লায় যাক’ স্লোগান উঠেছে, আমার কথা কারও মনেই নেই। আমি হাতপা চালালাম এদিকওদিক। যাকে সামনে পেলাম চড়চাপাটি দিলাম, কানটান মুললাম। ঝগড়ার ঝোঁক একটু কমে আসছে দেখলেই, একেকবার একেকজনের কানের কাছে গিয়ে বলছিলাম, ‘ধোর মশাই, আপনি কিসু zানেন না।’ তাতে কাজ দিচ্ছিল খুব।” 

টাফি হাসির চোটে দুবার গড়াগড়ি খেল খাটের ওপর। 

“তারপর সব মহা বোরিং লাগতে লাগল, বৃষ্টিও নেমে গেল, আমি ভাবলাম যাই, তোমার খবর নিয়ে আসি।” 

বৃষ্টি থেমে গিয়ে একটা অসামান্য হলুদ আলো ফুটেছে জানালার বাইরে, সেদিকে তাকিয়ে দুজনে বসে রইলাম।

কিছুক্ষণ পর একটা প্রশ্ন মনে এল। “এ ব্যাপারে তোমার কী মত?”

টাফির ভুরু কোঁচকাল, “কোন ব্যাপারে?”

“বাংলা বাধ্যতামূলক করা উচিত নাকি উচিত না?”

অনেক পেট চুলকোনোর পর, কানে হাত বোলানোর পর, রাতে কলকাতা বিরিয়ানি হাউসের মাংসের টুকরো খাওয়াব কথা দেওয়ার পর, টাফি অবশেষে নিজের মতটা বলতে রাজি হল। কিন্তু একটা শর্তে। 

"কী?"

"তোমার ওই ব্লগে লিখবে না, খবরদার।"

লিখব না। কথা দিলাম। টাফি সবে আমার কানে ফিসফিস করে নিজের মতটা বলেছে, অমনি মোড়ের মাথা থেকে আবার চিৎকার শুরু হল। 

টাফির কান অমনি খাড়া। “ওই ওই, আরেকটা ডিসকোর্স শুরু হয়েছে।”  

আমি বললাম, “কী নিয়ে?” টাফি বলল, “সে ঘটনাস্থলে না গিয়ে কী করে বুঝব। আমিষ-নিরামিষ হতে পারে, বাংলা-হিন্দি হতে পারে, আস্তিক-নাস্তিক হতে পারে, সাদাপোস্ত-হলুদপোস্ত হতে পারে, সিরাজ-আরসালান হতে পারে। যাই হোক না কেন, আমি ছাড়া জমবে না। তেমন কিছু হলে খবর দেব, বারান্দার দরজাটা খুলে রেখো।”

এক লাফে বারান্দা পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল টাফি। 



May 19, 2017

ল্যান্ডোর ৩/৩




পাহাড়ে গেলে প্রশ্নটা অবধারিত ওঠে। এখানে থেকে যেতে পারবে? এই গুটিকয়েক মানুষ আর অনেক গাছের মধ্যে? ঝিঁঝিঁর ডাক আর প্রজাপতির মধ্যে? আপনি যদি বলেন, থাকা না থাকার ডিসিশন তো ওভাবে নেওয়া যায় না, চাকরি পেতে হবে, তাছাড়া বাড়ির লোক কে কোথায় থাকবে, তারা সঙ্গে থাকতে চাইবে কি না, ছেলেমেয়েদের স্কুল কী হবে, বাবামা কী বলবেন, পাড়াপড়শি কী বলবে, তাহলে উত্তরটা বাস্তবধর্মী এবং বোরিং হবে।

বেড়াতে গিয়ে বোরিং উত্তরের কোনও জায়গা নেই। উত্তর দিতে হবে স্পষ্ট হ্যাঁ কিংবা না-তে। 

আমি সবসময় বলি, পারব। চারদিকে ঝিঁঝিঁ ডাকবে, ঝুপঝুপ বৃষ্টি পড়বে যখনতখন, আমি বারান্দায় বসে চা খাব, বরফি দৌড়ে দৌড়ে প্রজাপতি তাড়াবে, না পারার কী আছে? অর্চিষ্মান সবসময় বলে, না বাবা, আমি পারব না। একদিন ভালো লাগবে, দু’দিন ভালো লাগবে, তিনদিনের দিন ঠিক দু’নম্বর মার্কেটের এগরোলের জন্য মন হু হু করবে। 

আপনি পারবেন, নিরিবিলি পাহাড়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে?

ল্যান্ডোরের লোকেরা শহরের কথা বললে বুঝে নিতে হবে, মুসৌরির কথা হচ্ছে। মুসৌরি থেকে ল্যান্ডোর ওঠা যত কষ্টের, ল্যান্ডোর থেকে মুসৌরি নাম ততই সোজা। নাকবরাবর নেমে যাও। অন্তত মিসেস ভাট্টি তাই বললেন।  উডসাইড থেকে নিচে নামার একটা রাস্তা আছে। পথটা সরু আর জঙ্গলে ঢাকা, তাই চোখে পড়েনি বোধহয়। চা, টোস্ট, প্রকাশের জ্যাম, আর মিসেস ভাট্টির আত্মীয়ের বানানো চিজ দিয়ে প্রাতরাশ সেরে আমরা বেরোলাম। 

বেশ খানিকটা নেমে এসেছি, এমন সময় ওপরে জঙ্গলে কীরকম সব শব্দ হতে লাগল। খসখস, ফোঁস ফোঁস, সাঁই সাঁই।  আমরা ঘাড় ঘুরিয়ে ওপরে তাকালাম। ঘন জঙ্গলের আড়ালে কিছু দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু একটা আলোড়ন বোঝা যাচ্ছে। আলোড়নটা ক্রমে বাড়ছে।  খচমচ, ফোঁস ফোঁস এখন রীতিমত জোরে। পাতার ফাঁক দিয়ে দিয়ে কালো রঙের একটা কী যেন দ্রুত সরছে। 

তারপর একটা গাছের আড়াল থেকে বস্তুটি দৃশ্যমান হল। কালো মুখের হাঁয়ের ভেতর সাদা দাঁতের সারি, লকলকে লাল রঙের জিভ। বাদামি চোখ বিস্ফারিত। ছুটন্ত চার পা যেন মাটি ছুঁচ্ছে না। আমরা হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আশেপাশে কেউ নেই। অনেক নিচে দুটো লোক বসে রাস্তা সারাচ্ছে দেখেছিলাম ওপর থেকে, এখন তাদের সাড়াও পাচ্ছি না। বরফি এত রাগল কেন? মিসেস ভাট্টি ছাতা অফার করেছিলেন, সেটাও তো আমরা আনিনি।  

বরফি শেষ মোড়টা ঘুরেছে। চোখ বন্ধ করার মুহূর্তে দেখতে পেলাম বরফি একটা প্রকাণ্ড লাফ দিয়েছে আমার দিকে।

হাতে একটা ভেজা ভেজা কী ঠেকল। বরফির নাক। চোখ খুলে বরফির চোখে চোখ ফেললাম। সেই বিস্ফারিত দৃষ্টি এখন নরম। বরং খানিকটা নালিশপূর্ণ। কেন আমাকে না নিয়ে নামলে? ওকে ওকে, নো প্রবলেম, ভুল যখন করেই ফেলেছ তখন সরি না বললেও চলবে। চল, আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বরফি ল্যাজ নাড়তে নাড়তে সামনে সামনে চলল। ওর বয়স মোটে দুই হলে কী হবে, আমার বয়স যে সাড়ে ছত্রিশ সে খেয়াল আছে, কাজেই দশ পা এগিয়ে এগিয়ে দাঁড়াচ্ছে। মাটি শুঁকছে। কান খাড়া করে কী সব শুনছে। উডস্টক স্কুলের মোড়ে এসে আমরা বড় রাস্তায় পড়লাম। বরফির কাজ শেষ। বরফি ওখানেই ঘোরাঘুরি করতে লাগল। আমরা হাঁটা শুরু করলাম। । খুব এলিয়ে হেঁটেও পাহাড়, ঘিঞ্জি ল্যান্ডোর বাজার পেরিয়ে মুসৌরি পৌঁছতে মিনিট পঁয়তাল্লিশের বেশি লাগল না।

মূসৌরিতেও আমাদের যথারীতি কিছু করার নেই। এদিকওদিক উদ্দেশ্যহীন ঘোরা। ম্যালরোড ধরে হাঁটাহাঁটি। আজ শনিবার, তাই গতকালের থেকে ভিড়টা বেশি। লাভলির দোকানে অমলেটপ্রার্থীর ভিড় কালকের প্রায় তিনগুণ। হাঁটতে হাঁটতে রোপওয়ের জায়গাটায় পৌঁছোলাম। রোপওয়ে আছে, আমরাও আছি, সময়ও আছে, কাজেই রোপওয়ে চড়া হল। রোপওয়ে যায় ম্যাল রোড থেকে গান হিলের চুড়ো। ম্যাল রোড থেকে চারশো ফুট উঁচুতে এই গান হিল মুসৌরির অন্যতম উঁচু পিক, যেখান থেকে হিমালয় দেখা যায়। প্রাচীনত্বের গৌরব আছে এই রোপওয়ের, কিন্তু যাত্রাপথটি বিশেষ সুন্দর নয়। পুরোটাই শহরের ওপর দিয়ে। কিছু কিছু জায়গায় তো একেবারে ঘাড়ের ওপর দিয়ে। হোটেলের বারান্দায় ঝাঁট পড়ছে সকাল সকাল, রোপওয়ের জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখছি কালো জলের মধ্যে ভাসছে গুটখার প্যাকেট। 

গান হিলের ওপরটাও একেবারে হট্টমেলা। বন্দুক ছুঁড়ে বেলুন ফাটানো, ঘোড়ারূপী সিটওয়ালা ঘূর্ণি। দু’পা শান্তিতে হাঁটার উপায় নেই,  ইয়ারিং চাহিয়ে? ফোটো চাহিয়ে? অমুক চাহিয়ে? তমুক চাহিয়ে? এক জায়গায় আবার লিখে রেখেছে, ফেসবুক ফোটো পয়েন্ট।

মুসৌরিতে আমাদের একেবারে কোনও কর্মসূচি ছিল না বললে ভুল হবে, একটা কাজ ছিল, সেটা হল খাওয়া। বেশ কয়েকটা দোকান পছন্দ করে রেখেছিলাম, তার মধ্যে লাভলি অমলেট সেন্টার অলরেডি টিক মারা হয়ে গেছে, বাকি লিস্টের প্রথমেই কালসাং।

কালসাং এ তল্লাটের বিখ্যাত দোকান, চেনও বলা যেতে পারে, কারণ দেরাদুনেও আছে কালসাং। রংচঙে দোকান, ম্যাল রোডের একেবারে মোড়ের মাথায়। দোতলায় বসলে ভিউ চমৎকার। শনিবার দুপুরে কালসাং-এ ঠাসাঠাসি ভিড়। একতলায় জায়গা নেই, আমাদের উঠতে হল দোতলায়। 


কালসাং-এ বসে থাকতে দিব্যি লাগছিল। শনিবার হাফছুটি হয়েছে, ম্যাল রোড জুড়ে ইউনিফর্ম পরা স্কুলের ছেলেমেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেভেন্টারসের মিল্কশেক খাচ্ছে, কেভেন্টারস থেকে বোধহয় বেলুনও দিচ্ছিল, সবার হাতে কাঠির ডগায় বাঁধা সাদাকালো বেলুন। একদল এসেছে কালসাং-এও। অর্ডার দিয়েছে তিব্বতি রুটি টিংমো। নরম সাদা ময়দার বলে ফুলে ওঠা টায়ারের মতো বেড়। আর সঙ্গে কী একটা তরকারি/মাংস। আর কোল্ড ড্রিংকস। 

টিংমো দেখলাম আরও অনেকেই নিয়েছেন। আমাদের দুজনের কারওরই জিনিসটা বিশেষ পছন্দ নয়, তাই আমরা অন্য জিনিস নিলাম। 


মাটন মোমো। 


আর পালং শাক দিয়ে পদ্মের ডাঁটা ভাজা। মচৎকার খেতে। অবশ্য এত তেলচপচপে করে ভাজলে সবকিছুই ভালো লাগবে বোধহয়। (মুলো ছাড়া।) 

কালসাং-এর ভিউর মাঝামাঝির নিচের দিকে একটা বইয়ের স্ট্যান্ড দেখছেন? ওটা হচ্ছে কেম্ব্রিজ বুকস্টোর। এই দোকানেই রাস্কিন বন্ড শনিবার বিকেলে বিকেলে দেখা দেন, যাতে লোকজন ঠাণ্ডা থাকে, তাঁর বাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া না করে। এত ছোট দোকানে এত বই চট করে দেখিনি আমি। দুই দেওয়ালে বই, মেঝেতে বই, মাথার ওপর বই। চিলতে দোকানের মাঝবরাবর আরেকটা শেলফ উপচে বই। দু’দিকে যে গলির সৃষ্টি হয়েছে তাতে গড়পড়তা অ্যামেরিকান ঢুকতে পারবে না। বেশিরভাগই দেখলাম, ইয়ং অ্যাডাল্ট। অর্থাৎ স্কুলের পড়ুয়াদের টার্গেট করা। আমরা থাকতে থাকতেই স্কুলের বাচ্চারা এসে বইখাতা পেনসিল কিনল। 


দু’নম্বর যে দোকানটায় আমরা খেলাম সেটা হল ক্যাফে বাই দ্য ওয়ে। এদিকেরটা আদালেবুমধু চা। এই চায়ের একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, কোনও কোনও জায়গায় এতে চা দেয়, আবার কোনও কোনও জায়গায় দেয় না। অর্থাৎ, নামে হানি লেমন জিঞ্জার টি হলেও, আসলে গরম জলে আদালেবুমধু। গোয়াতে এই দ্বিতীয় রকমেরটা খেয়েছিলাম, ল্যান্ডোর বেকহাউসও। ক্যাফে বাই  দ্য ওয়ে-তে দেখলাম চা দিয়েছে। অর্চিষ্মান খাচ্ছে গ্রিন অ্যাপেল সোডা। 


এই দোকানে আমরা পরদিন সকালেও বাস ধরার আগে (আর অ্যাভোমিন খাওয়ার পরে) পিৎজা দিয়ে ব্রাঞ্চ সারব। এত ভালো পিৎজা আমি কমই খেয়েছি। 

গাড়ি ধরে ল্যান্ডোর ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। কালই আমাদের ফিরে যাওয়া। ট্রেনের টিকিট নেই। বাসে যেতে হবে মুসৌরি থেকে দেরাদুন, আবার দেরাদুন থেকে দিল্লি। সারাদিন লেগে যাবে। ল্যান্ডোর ছেড়ে যেতে হবে সকাল সকাল। বেড়ানো এখানেই শেষ।

মনখারাপটাকে বাড়তে দিলাম না। সিস্টারস বাজারে নেমে প্রথমেই এক শিশি গুজবেরি জ্যাম, এক শিশি স্ট্রবেরি, এক শিশি পিনাট বাটার কিনলাম। সবগুলো আমরা খাব না। এক শিশি পাবেন বাড়িওয়ালা। আমরা না থাকাকালীন আমাদের গাছে জল দেওয়ার বদান্যতার বিনিময়ে।

তারপর হাঁটতে শুরু করলাম। চারদুকানের উল্টোদিকে। এদিকটায় আসিনি আগে। এখন পিক সিজন। মুসৌরি থিকথিক করছে দেখে এলাম, অথচ এখানে টানা কুড়ি মিনিট হাঁটার পরও একটিও মানুষের দেখা না পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।  অবশেষে উল্টোদিক থেকে এক মহিলাকে আসতে দেখা গেল। নীল সালওয়ার কামিজ, ঘোমটার মতো করে দেওয়া ওড়না। হাতে একটা বিরাট বস্তা কাপড়ের ব্যাগ। মহিলা ঠিক সুবিধে করতে পারছেন না ব্যাগটা নিয়ে, কারণ ভেতরে ভারি কিছু আছে, এবং বেঢপ কিছু। এদিক ওদিক থেকে ফুলে ফেঁপে রয়েছে। মহিলা ব্যাগ এ হাত ও হাত করছেন। একবার ঝোলাচ্ছেন, একবার বুকে জড়াচ্ছেন। ততক্ষণে দুপক্ষই একে অপরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। মহিলার চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমাদের পেরিয়ে যাওয়ার ঠিক মুখে মহিলা থামলেন। রেলিং-এর ওপর ব্যাগ রেখে বেশ করে হ্যান্ডেলদুটোয় গিঁট বাঁধলেন। তারপর চাগিয়ে একেবারে মাথায়। এক হাত দিয়ে ব্যাগ সামলে ধরে আমাদের ক্রস করে গেলেন মহিলা। দশবারো পা গিয়ে আমি পেছনে তাকিয়ে দেখলাম। ব্যাগ মাথায় সেট করে গেছে। এখন মহিলার দু’হাতই ফ্রি। আমার নিজের কথা মনে পড়ল। দু’নম্বর মার্কেটের সামনে সন্ধ্যেবেলা যখন নামি, এক কাঁধে ব্যাগ, পিঠে ল্যাপটপ। বাজার করার থাকলে তার সঙ্গে আরেকটা ব্যাগ জোড়ে। বাঁধাকপি নয়তো লাউ, গোটা আষ্টেক টমেটো গড়াগড়ি খাচ্ছে তলায়। এক আঁটি পালং শাক। দু’প্যাকেট কাউ মিল্ক।  কোনওটার সঙ্গে কোনওটার আকৃতিপ্রকৃতিতে কোনও মিল নেই। কেউ কারও সঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে না। কাজেই ব্যাগটার আকারের কোনও ছিরিছাঁদ হয়নি। আমি ব্যাগটাকে বুকের কাছে জাপটে ধরে চলেছি। এক, হাতে ঝোলালে বেশি ভারি লাগে, দুই, ভয় লাগে যদি হ্যান্ডেল ছিঁড়ে মাটিতে আলুপটল গড়াগড়ি যায়। অসুবিধেজনক যত না, হিউমিলিয়েটিং তার থেকে বেশি। দামি কুকুরগুলো আবার ঠিক ওই সময় বকলস পরে সান্ধ্যভ্রমণে বেরোয়। যদি এই মহিলার মতো স্মার্ট হতাম, বেশ মাথায় নিয়ে চলা যেত।

দামি কুকুরের কথা ভাবতে ভাবতেই একটা দামি বাড়ি এসে গেল। প্রকাণ্ড বাংলো, গেট, গেটে ট্রেসপাসারস উইল বি প্রসিকিউটেড লিখে রক্ষা হয়নি, আবার একজন সিকিউরিটি গার্ড দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। পরে জগদীশ ভাইসাবের কাছ থেকে কনফার্ম করেছিলাম ওটাই শিল্পপতি সঞ্জয় নারং-এর বাড়ি। এটা নাকি উনি ওঁর জিগরি দোস্ত তেন্ডুলকরের জন্য কিনে রেখেছেন। ঘটনাটা সত্যি হলে তেলা মাথায় তেলের এর থেকে বিকট উদাহরণ আর হয় না। যাই হোক, আমরা সিকিউরিটি ভাইয়ের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে রাস্তাটা পার হয়ে এলাম। ভাইসাব কিছু বললেন না, বলার দরকারও ছিল না, কারণ ততক্ষণে চিৎকার শুরু হয়েছে। চিৎকারের উৎসমুখে ঘাড় উঁচিয়ে দেখি, তিনতলার ছাদ থেকে একটা কুকুর আমাদের উদ্দেশ্য করে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, আর তার পাশে চুপটি করে আমাদের চোখে চোখ ফেলে দাঁড়িয়ে আছেন সেই প্রথমদিনের দেখা সেন্ট বার্নার্ড। টুঁ শব্দটি না করে।  

আমরা নিচ থেকে ওপরের পরিস্থিতি আন্দাজ করতে চেষ্টা করলাম। সেন্ট বার্নার্ড বলছেন, এ কী, এ সব গরিবগুর্বো আমার বাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটছে কোন সাহসে। ভালো করে পাহারা দিচ্ছিস না নাকি। পাশের কুকুরটা ভয়ে ঘেমে গেছে, না দাদা, আমি ভালো করেই পাহারা দিয়েছিলাম, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি এক্ষুনি তাড়িয়ে দিচ্ছি।

পরদিন সকালে জগদীশ ভাইসাব আর বরফি মিলে আমাদের আবার স্কুলের সামনে বড় রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে গেলেন। ওঁর এক বন্ধুর গাড়ি আছে, তিনি আমাদের নিয়ে যাবেন মুসৌরির পিকচার প্যালেস বাসস্ট্যান্ড। যেখান থেকে আমরা দেরাদুনের বাস ধরব। গাড়িতে ওঠার আগে একবার বরফির ভেজা নাকটায় হাত বুলিয়ে আসব ভেবেছিলাম, কিন্তু সে ততক্ষণে মহা উত্তেজিত কে জানে কোন অদৃশ্য চোরের পেছনে দৌড়েছে। 

May 17, 2017

ল্যান্ডোর ২/৩



পাহাড়ে, বিশেষ করে ল্যান্ডোরের মতো নিরিবিলি পাহাড়ে আমার আসতে ইচ্ছে করে দুতিনটে কারণে প্রথমত, দৃশ্যপট পরিবর্তন যা রোজ দেখি, তার থেকে অন্য দেখা আমার মুখ, তোমার মুখ, বসের মুখের বদলে গাঢ় পাহাড়, ফ্যাকাসে পাহাড়, নীল পাহাড়, সবুজ পাহাড় দুদিকে হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা থাকা পাইনের বন, লাল ছাদের সারি রোদচিকচিক মাকড়সার জাল হলুদ প্রজাপতি

দ্বিতীয় কারণ, গন্ধ বাড়িতে মোটামুটি একটা গন্ধহীন অবস্থার মধ্যে দিনরাত কাটাই বলা যেতে পারে সকালবেলা একবার ওলাক্যাবের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় কুড়া সংগ্রহের গাড়ি থেকে রাতভর জমে, ফুলে, ভেপসে ওঠা ডাল, মাছের কাঁটা, তরমুজের খোসার গন্ধবিকেলে একবার বাজারের মেছো গন্ধ। আর কিছু সিজনাল গন্ধ। জানুয়ারি মাসের রেজলিউশন সিজনে প্রায়ই অফিসের এ ডেস্ক ও ডেস্ক থেকে কাঁচা পেঁয়াজ দেওয়া স্যালাডের গন্ধ আসে। আর কখনও কখনও, অটোয় বসে থাকা অবস্থায় ছাতিমের ঘ্রাণ ব্যস।

পাহাড়ে এলে গন্ধের ভ্যারাইটি যে খুব বাড়ে তেমন নয়, মূলত গাছের গন্ধ। সেটা বর্ণনা করা খুব শক্ত ঠাণ্ডা, সবুজ রঙের গন্ধ। ল্যান্ডোরে পাইনি, অন্য অনেক পাহাড়ে অনেকসময় কাঠের উনুনের গন্ধ পেয়েছি। ল্যান্ডোরে প্রকাশের দোকানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে টাটকা পাউরুটির গন্ধের ঝাপট নাকে লেগেছে

তিন নম্বর কারণটা আমার পাহাড় ভালোবাসার সবথেকে বড় কারণ। শব্দ। বা শব্দহীনতা। বাড়িতে চোখ বন্ধ করলে দৃশ্য আটকানো যায়, নাক টিপে ধরলে গন্ধ তাড়ানো যায়, কিন্তু শব্দের হাত থেকে রেহাই নেই লোকজন চেঁচাচ্ছে, হর্ন দিচ্ছে, কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছে, মাইক বাজিয়ে টেবিলটেনিস প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করছে। আমিও কালপ্রিট, এ সব যখন কিছু হচ্ছে না, তখন নিজেই কানে গান গুঁজে রাখি।  সংগীতপ্রিয়তার হদ্দমুদ্দ মা বলেন, গান আরেকটু কম শুনে নিজে গাইলে হয় না সোনা? মা সারাদিন অনেক কথা বলেন, সব শুনতে গেলে বিপদ। সে কথা থাক পাহাড়ের শব্দের কথা হচ্ছিল, সে কথাই হোক

বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে এসে পাতা জানালার সামনে পাতা ইজিচেয়ারে বসলাম এমনি পিঠ সোজা করে বসলে দুয়েকটা পাইন গাছটাছ দেখা যায়, কিন্তু শরীর ছেড়ে মাথা পেছনদিকে হেলিয়ে দিলে আর কিচ্ছু দেখা যায় না, খালি নীল রঙের একটা চৌকো, তার মাঝে সাদা ছোপ ছোপ মেঘ আর কানের মধ্যে একটা বোঁ বোঁ শব্দ। ক্রমাগত ঘরঘর ঘুরে চলা ব্রেনের বোধহয়। তারপর খানিকক্ষণ পর ধীরে, নিচু পায়ে অন্য শব্দরা ঢুকতে শুরু করে নিচে একবার বরফি চেঁচালো কি? অনেক দূরে খট খট করে একটা শব্দ হচ্ছে একটানা কাঠ কাটছে কেউ। একতলায় মিসেস ভাট্টি হাঁটছেন কাঠের মেঝে মচমচ করছে

আমাদের কিছু প্ল্যান করা নেই। মুসৌরি যেতেও পারি, নাও যেতে পারিএখন জুতো গলিয়ে বেরোতেও পারি, আবার কিছু না করে সামনের নীল চৌকোর দিকে তাকিয়ে বসেও থাকতে পারি বই মুখে করে। 

তবু বেরোলাম।  কারণ খিদে পেয়েছেউডসাইডে দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা সাধারণত রাখেন না মিসেস ভাট্টি। ঠিকই করেন, কারণ বেশিরভাগ লোকেই সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে ডিনার হবে বাড়িতেই, বীণাজি রাঁধবেন, ভাত রুটি ডাল তরকারি মাংস, যার যেমন রুচিআমরা বেরোচ্ছি শুনে মিসেস ভাট্টি দুপুরের খাওয়ার জায়গা বলে দিলেন। আমরা কিছু রিসার্চ করেই এসেছি, তবে আমরা ঘেঁটেছি সেকেন্ডারি ডেটা, আর মিসেস ভাট্টি করেছেন প্রাইমারি ফিল্ড সার্ভে  ল্যান্ডোরে খাওয়ার তিন ধাপের ব্যবস্থা একেবারে সস্তায় সারতে হলে আছে চারদুকান চারদুকান হচ্ছে ল্যান্ডোরের বিখ্যাত মোড়, যেখানে, একটা না, দুটো না, পাঁচটা না, দশটা না, চারটে দোকান আছে ম্যাগি, চা ইত্যাদি পাওয়া যায়দেড়েকের মধ্যে দুজনের খাওয়া হয়ে যাবে দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে ক্যাফে আইভি, ল্যান্ডোর বেকহাউস ইত্যাদি। দুজনের হাজারখানেক পড়বে আর ফ্যান্সি খেতে গেলে যেতে হবে এমিলি রকেবি ম্যানর বলে এখানে একটা হোটেল আছে, তাদের দোকান মাসে এক শনিবার মিসেস ভাট্টি তাঁর বন্ধুর সঙ্গে ডেটে যান ল্যান্ডোরের কোনও এক ক্যাফেতে ক্যাফে আইভি-তেও গিয়েছিলেন, ঢালাও রেকোমেন্ডেশন দিলেন

রাস্তাও বলে দিলেন মিসেস ভাট্টিই এখন নাহয় তিনি ঘরবৈঠা, একসময় তো পাহাড় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। ল্যান্ডোরের রাস্তাঘাট সোজা নিয়মে চলে সোজা চলতে চলতে পাহাড়ের দেওয়ালে গিয়ে ধাক্কা খায়, তখন বাধ্য হয়েই তাকে দুভাগ হতে হয় হয় বাঁদিকের রাস্তা নিতে হবে, নয়তো ডানদিকের সে রাস্তা গিয়ে আবার কোথাও গোঁত্তা খেয়ে দুভাগ হবে, তখন আবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে ডাইনে যাব না বাঁয়ে সিদ্ধান্ত ভুল হলেও চিন্তা নেই, যতক্ষণ না পাহাড় থেকে একেবারে নেমে পড়ছেন ততক্ষণ আপনি সেফউডসাইড থেকে পাহাড় বেয়ে সিস্টারস বাজারে উঠে প্রথম দুমাথা থেকে বাঁদিক বেঁকে সোজা গিয়ে কেলগ চার্চ সেখানে থেকে আবার বাঁয়ের রাস্তা ধরে সোজা গেলেই চারদুকান।

হাঁটতে শুরু করলাম। এত পরিষ্কার একটা জায়গা হয় কী করে? পথের পাশে একটিও শিখরের প্যাকেট নেই, একটাও প্লাস্টিকের বোতল নেই দশ হাত অন্তর অন্তর পরিষ্কার চিহ্ন দেওয়া ডাস্টবিন, সবাই কষ্ট করে সেখানেই সব আবর্জনা ফেলেছে নাকি?

ল্যান্ডোর একেবারে অকাজের জায়গা নয়। একটা ল্যাংগোয়েজ স্কুল আছে এখানে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই বিদেশী, কারণ হয় ওঁদের সাহস বেশি, কিংবা ওঁদের দেশে নিরাপত্তা বেশি। তাই কুড়িপঁচিশ বছর বয়সের ছেলেমেয়েরা আইটি-তে ঢোকার লাইন না দিয়ে এক বছরের ব্রেক নিয়ে হিন্দির মতো একটা ভাষা শিখতে ভারতবর্ষের মতো একটা দেশে পড়ে থাকতে পারে দুদিনে এঁদের অনেকের সঙ্গেই দেখা হল রেস্টোর‍্যান্টে কোণের টেবিলে বসে মন দিয়ে পড়াশোনা করছেন, ছোট চৌকো কার্ডের একদিকে শব্দ, অন্যদিকে শব্দের মানে লিখছেন একপাশে ম্যাকবুক, অন্যপাশে ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটবুক অফ হিন্দি (বা ওইরকম নামওয়ালা কোনও বই) খোলা রাস্তাঘাটে চলতেফিরতেও ছাত্রদের সঙ্গে দেখা হচ্ছিল এদিক থেকে একজন হিপি মেম চলেছেন, ওদিক থেকে আসছেন আরেকজন হিপি সাহেব। গায়ে ঢোলা  কুর্তাপাজামামাথায় ঝুঁটি, পায়ে কিটোস, কাঁধে রুকস্যাক, বোতলে জল। ইনি বললেন আপ য়িঁহাপে কিতনে মহিনে সে রহ্‌ রহে হো?” অন্যজন চারটে আঙুল তুলেছেন কিন্তু কনফিডেন্সের অভাবে ভুগছেন। খানিকক্ষণ আঙুলের দিকে তাকিয়ে থেকে বলছেন, “তিন?” এদিকের মেম মাথা নাড়ছেন। সাহেব কনফিউজড এবং নার্ভাস ওহ ইয়াহ, চার মহিনেমেমসাহেবের মুখে হাসি ফুটেছে সাহেব জিজ্ঞাসা করছেন, “অ্যান্ড আপ?” মেম গর্বিত মুখে বলছেন, “আঠ মহিনেসাহেব বিস্ময়ে এবং অ্যাপ্রিশিয়েশনে নুয়ে পড়ছেন ওয়াওএতক্ষণে দুজনেরই ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে, (আমার বিশ্বাস, হিন্দির স্টকও শেষ) দুজনে গড়গড়িয়ে ইংরিজি বলতে শুরু করেছেন। কী বলছেন আর শোনা হয়নি।


এই হচ্ছে কেলগ চার্চ


ওই ঘিঞ্জি শহরটা হচ্ছে মুসৌরি

আর এই যে চমৎকার স্বর্গের মতো পথটা ধরে আমরা হাঁটব, এটা হচ্ছে ল্যান্ডোরএই রাস্তা ধরে সোজা গেলে চারদুকান


এই হল চারদুকান ল্যান্ডোরের অন্যতম পুরোনো বসতি ওটা ল্যান্ডোরের প্রথম পোস্ট অফিস। বেজায় পুরোনো।


চারদুকানের গায়ে সেন্ট পলস চার্চ এই চার্চে জিম করবেটেরউঁহু, জিম করবেটের নয়জিম করবেটের মাবাবার বিয়ে হয়েছিল


চারদুকানের উল্টোদিকে এই হচ্ছে ক্যাফে আইভি

যদ্দূর মনে পড়ছে আমরা খেয়েছিলাম স্যান্ডউইচ আর ইজিপশিয়ান স্ক্র্যাম্বলড এগ আর টোস্ট আর সোডা লাইম। সবক’টা খাবারই চমৎকার খেতে। কিন্তু সবথেকে ভালো ব্যাপারটা হচ্ছে খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলুভাজা।

ক্যাফে আইভি থেকে বেরিয়ে চারদুকানকে পেছনে রেখে নাকবরাবর চললে এসে যাবে নিউ লাল টিব্বা ওল্ড লাল টিব্বা কোথায় আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না, বলতে পারব না এই নিউ লাল টিব্বা হচ্ছে একটি টুরিস্ট পয়েন্ট, এবং আমার মতে বাতিলযোগ্য যদিও আমরা বাতিল করিনি, কারণ আমাদের আর কিছু করার ছিল না। একটা কোল্ডড্রিংকসের দোকানের ছাদে পাঁচটা প্লাস্টিকের চেয়ার আর একটা দূরবীন দুজনের কুড়ি কুড়ি চল্লিশ টাকার টিকিট কাটলে সেই দূরবীন দিয়ে আপনাকে দূরের পাহাড়ের একটা সাদা রঙের মন্দির, দিখ রহা হ্যায়? বহোৎ আচ্ছা। এবার দূরবীন বাঁদিকে ঘোরানসাদা বাড়ি দেখতে পাচ্ছেন? বহোৎ আচ্ছা। ওগুলো হচ্ছে ব্রিটিশদের বাংলো। ডানদিকে ঘোরানডানদিকে কী দেখিয়েছিল আমি অলরেডি ভুলে গেছি

টিব্বা থেকে নেমে এসে রাস্তা দুভাগ হলক্রমাগত বাঁদিকে বেঁকতে বিরক্ত লাগছিল, তাই এবার ডানদিকের রাস্তাটা নিলাম। এই রাস্তা সোজা ফিরে গেছে কেলগ চার্চ। চমৎকার রাস্তা। সামান্য ঢালু, চলতে কষ্ট নেই, বাঁদিকে নেমে গেছে পাহাড়, ডানদিকে উঠে গেছে পাহাড়, তার গায়ে মাঝে মাঝে কয়েকখানা বাড়ি। আর একটা কবরখানা রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন পাথর হয়ে যাওয়া সাহেবমেমেরা লাজবন্তী ম্যাকআর্থার, লাভিং ওয়াইফ অফ জর্জ ম্যাকআর্থার আমরা লাজবন্তীর মুখোমুখি বসলাম রাস্তার ধারের কংক্রিট রেলিং-এর ওপর চারপাশে গমগম করছে ঝিঁঝিঁর ডাক। মাঝে মাঝে একটাদুটো পাখি আর কুকুরের ডাক আরও মাঝে মাঝে একটাদুটো বাইক ভটভটিয়ে যাচ্ছে যখন অন্য শব্দরা গাছের আড়ালে লুকোচ্ছে, ভটভটানি মোড় ঘুরলেই আবার এসে বসছে রাস্তা জুড়ে

এই কবরখানার ডানদিকে নয়তো বাঁদিকে, কোনদিকে ভুলে গেছি, একটা বাড়ি আছে বাড়ি ল্যান্ডোরে আছে যথেষ্টই, গাছের থেকে সংখ্যায় অনেক কম বলে চোখে পড়ে নাভারতের যত সেলিব্রিটি আছেন, সবাই একেকখানা করে সে সব বাড়ি কিনে রেখেছেন। বিশাল ভরদ্বাজ থেকে সঞ্জয় নারং। অন্য বেশিরভাগ বাড়িরই রং সাদা বা হলুদ বা ওই গোছের, জঙ্গলের মধ্যে জেগে থাকে।

এই বাড়িটা তাদের থেকে আলাদা রাস্তা থেকে কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে বাড়ি পর্যন্ত। বাড়িটার রং কেমন শ্যাওলা শ্যাওলা, চারপাশের গাছ জঙ্গল পাহাড়ের সঙ্গে একাকার। একবার ভাবলাম একটা ছবি তুলি। তারপর সাহস হল না। এমনই ব্যক্তিত্বপূর্ণ বাড়ি। তাছাড়া অত সুন্দর বাড়িকে কি ছবিতে ধরা সম্ভব? পাহাড়ের গায়ে ফলকে বাড়ির নামটা পড়ে রাখলাম।

অনেক পর, সম্ভবত দেরাদুন থেকে দিল্লির বাসে বসে অর্চিষ্মান ফোন থেকে মুখ তুলে বলল, "ওই বাড়িটা কার বলত?"

অকারণ, তবু নামটা শুনে গর্ব হল। মনে হল, এ তো হতেই হত। বাড়ির মালিকের নাম আমি বলছি না, দুটো হিন্ট দিচ্ছি। এক, উনি আমার (এবং আরও অনেক বাঙালির) অন্যতম প্রিয় চরিত্রের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। আর, এঁর এই বাড়িটার গেটেই নাকি একটা বোর্ডে লেখা ছিল (যদিও আমরা দেখিনি, হয়তো সরিয়ে ফেলেছেন) “বিওয়্যার, র‍্যাবিড থেসপিয়ান”। বলুন দেখি কার বাড়ি?

সিস্টারস বাজারে ফিরে মনে পড়ল ল্যান্ডোর বেকহাউসে ব্রেকফাস্ট করব ভেবে রেখেছিলাম দিল্লিতে থাকতেই ব্রেকফাস্ট তো হয়ইনি, লাঞ্চও অন্যজায়গায় সেরে নিয়েছি তাতে অসুবিধে নেইআমাদের মতো প্রিভিলেজড লোকজনের খাওয়ার তো খিদের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক নেই। ইচ্ছে হলেই যখনতখন খেতে বসতে পারি। অনেকক্ষণ হাঁটাও হয়েছে। তাছাড়া এখন যদি বাড়ি ঢুকে যাই তাহলে আবার পাহাড় ঠেঙিয়ে উঠে আসার ইচ্ছে থাকবে না কাজেই ঘোরাঘুরি আরেকটু দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য আমরা বেকহাউসে ঢুকে পড়লাম

আর পড়ামাত্র ল্যান্ডোরের একমাত্র নিন্দে করার জিনিসটা হাতে চলে এল দোষটা বেকহাউসের নয় দোষটা বেকহাউসের লোকেশনের সিস্টারস বাজারের একেবারে মোড়ের মাথায়, টুরিস্টের ভিড় লেগেই থাকে আমিও টুরিস্ট, আমিও ইরিটেটিং, কিন্তু এই টুরিস্টরা আমার থেকেও ইরিটেটিং অবশ্য লিখতে গিয়ে একটা কথা মনে হচ্ছে, এঁরা সবাই ঘুরছিলেন দল বেঁধে, একটা এস ইউ ভি-তে মিনিমাম ছ- সাত জন সে জন্যই বোধহয় অত কথা বলতে হচ্ছিল আর অত চেঁচিয়ে তার মধ্যে বেকহাউস কর্তৃপক্ষ দোকান সাজিয়েছেন ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম আর হোয়াটসঅ্যাপে দেখানোর মতো করে। সবথেকে কেলেংকারি করেছেন একখানা রাজকীয় আর্মচেয়ার রেখে, তাতে বসে ছবি তোলার জন্য আক্ষরিক লাইন পড়েছে আর কেউই তো শুধু বসছেন না, বসে, ঠ্যাং তুলে, জিভ বার করে, টুপি ঘুরিয়ে, কাঁচকলা দেখিয়ে একাকার করছেন বেকহাউসের পেছনদিকে একটা চৌখুপি মতো আছে, জানালা দিয়ে পাহাড় দেখা যায় সে জায়গাটা মোটামুটি ল্যাংগোয়েজ স্কুলের ছাত্রদের একচেটিয়া একটু পরে তাঁদের দুজন উঠে গেলে আমরা তাঁদের টেবিলে উঠে গেলাম এখান থেকেও কলরব কানে আসছে, চোখে অ্যাট লিস্ট দেখতে হচ্ছে না আমরা বসলাম, আর আমাদের খেপআর আদা লেবু মধু চা এসে গেল



দোকান থেকে বেরিয়ে বুঝলাম জানালা দিয়ে যেটাকে পাইনের ছায়া ভেবেছিলাম সেটা আসলে মেঘ বাড়ির ছাদে, বনের মাথায় ঘন হয়ে জমেছে দিল্লি থেকে বয়ে আনা ছাতা রয়ে গেছে ব্যাগের ভেতরেই জোরে হাঁটা লাগালাম উতরাই বেয়ে নামতে নামতে, অ্যালশেসিয়ানের প্রতিবাদ ছাপিয়ে মেঘের ডাক প্রবল হয়ে উঠল শেষরক্ষা হল না, শেষ বাঁকটা পেরোতে পেরোতে বৃষ্টি নেমে গেল উডসাইডের অল্প ফাঁক গ্রিল গেট তাক করে ছুটছি, গ্রিল পেরিয়ে গেছে, এবার বাগানে পাতা একেকটা লাল পাথরে একেক পা ফেলে ছুটছি, চশমার কাচ বেয়ে জলের ধারা নেমেছে। ওদিকে বারান্দা থেকে বরফি চেঁচাচ্ছে, জোরে, আরও জোরে বসার ঘরের সোফায় একগাদা খাতা পেনসিল বই স্ক্র্যাবলবোর্ড আর জুসের গ্লাস নিয়ে মিসেস ভাট্টি বসে ছিলেন, আমাদের দেখে অবাক হয়ে বললেন, "ছাতা নিয়ে বেরোওনি? পাহাড়ে বেড়ানোর এক নম্বর রুলটাই তো ভেঙেছো।"

আমরা আর লজ্জার মাথা খেয়ে বললাম না যে, আমাদের প্রকৃতিটাই রেবেলিয়াসদিনে একটা করে রুল না ভাঙলে ভাত হজম হয় না

এরপর দুটো কাজ করা যেত এক, মিসেস ভাট্টির বুককেস থেকে বই কিংবা নিজেদের ব্যাগ থেকে কিন্ডল বার করে ইজিচেয়ারে বসে টেবিলে পা তুলে, কিংবা ডিভানে উপুড় হয়ে, হাঁটু থেকে পা সিলিংপানে ভাঁজ করে, জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে, খোলা দরজা দিয়ে আসা ভেজা পাহাড়ের গন্ধ শুঁকতে বই পড়া যেত নয় তো মিসেস ভাট্টির নরম গদির ওপর নরম লেপ গায়ে দিয়ে ভোঁসভোঁস করে ঘুমোনো যেত আমরা করব ভেবে রেখেছিলাম একটা, কাজে হয়ে গেল অন্যটা

চোখ খুলে দেখি ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার জানালার বাইরেও আলো নেই, শুধু একটা ঘন নীলচে আভা সুইচবোর্ডটা মনে হয়ে দেখেছিলাম ঘরের অন্য প্রান্তে, জানালার পাশে হাই তুলতে তুলতে, অচেনা মেঝেতে পা ঘষটে ঘষটে সেদিকে চললাম সুইচবোর্ড পর্যন্ত পৌঁছোনোর আগেই থামতে হল। কারণ জানালার দিকে চোখ পড়েছে। দেরাদুন ঝলমল করছে


                                                                                                                         (চলবে)
ল্যান্ডোর ১/৩
ল্যান্ডোর ২/৩

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.