May 15, 2017

ল্যান্ডোর ১/৩




ভোর সাড়ে চারটেয় নন্দাদেবী এক্সপ্রেস হরিদ্বার স্টেশন ছাড়ামাত্র কত বার যে চেন টানা হল, কত লোক, কত বুড়ো কত বাচ্চা, কত আস্ত আস্ত সংসার যে আধখোলা বাক্স, কাঁধ থেকে ঝোলা গামছা, উশকোখুশকো চুল আর ঘুমভাঙা আতংকিত চোখ নিয়ে ধড়মড় করে গড়িয়ে গড়িয়ে প্ল্যাটফর্মে পড়লেন, আর পড়লেন তো পড়লেন একেবারে পুলিসের হাতে - এটা ঘটবে আঁচ করে যাঁরা হাসি হাসি মুখে ফাইনের বিলবই খুলে আগেভাগেই দাঁড়িয়ে ছিলেন - আমি আর অর্চিষ্মান লোয়ার বার্থে শুয়ে নাক পর্যন্ত চাদর টেনে সব ঘাপটি মেরে দেখলাম। অর্চিষ্মান পরে বলল, আমাদের কামরার সাইড লোয়ারে যে ভদ্রলোকটি ছিলেন, তিনি নাকি অ্যাটেনডেন্টকে টাকাও দিয়েছিলেন ঘুম ভাঙানোর জন্য, অ্যাটেনডেন্ট এসে তাঁকে ঘুম ভাঙিয়েওছিল, তারপর তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। শেষমুহূর্তে মারাত্মক হুড়োহুড়ি করে নামলেন। তাও সব নিয়ে নামতে পারেননি, পাওয়ার ব্যাংক পড়ে রইল। তা তিনি নামলেন ভালোই হল, নন্দাদেবী রাতের ট্রেন বলে মাঝের বার্থ পাকাপাকি ভাবে টাঙানোই থাকে, ঘুম ভেঙে গেলে লোয়ার বার্থে বসা অসম্ভব। আমরা উঠে এসে সাইড লোয়ারে বসলাম। একটু পরে আরেক ভদ্রলোক বেরোলেন, তিনি এত চেঁচামেচিতেও ওঠেননি, এতক্ষণে ঘুম ভেঙেছে। এখন দেরাদুনে নেমে বাসে করে হরিদ্বার ফেরা ছাড়া গতি নেই। 

সাইড লোয়ারে মুখোমুখি বসে আমরা নিজেদের মনে করলাম যে ভবিষ্যতে কখনও হরিদ্বার আসতে হলে নন্দাদেবী নৈব নৈব চ। কিন্তু দেরাদুন যদি যেতে হয়, যেমন আমরা যাচ্ছি, তাহলে নন্দাদেবীর থেকে মোক্ষম আর কিছু নেই। এগারোটা পঞ্চাশে গাড়িতে উঠে বিছানা পেতে শোও। ভোর সাড়ে পাঁচটায় দেরাদুনে নামো। ঘুম ভাঙা না ভাঙার ব্যাপার নেই, ওটাই লাস্ট স্টপ। তাছাড়া হরিদ্বারের হুড়োহুড়িতে ঘুম ভাঙবেই। 

নন্দাদেবীর লাস্ট স্টপ দেরাদুন হতে পারে, আমাদের লাস্ট স্টপ ল্যান্ডোর। দেরাদুন থেকে মুসৌরি একঘণ্টার রাস্তা, মুসৌরি থেকে মিনিট পনেরো গাড়ি চেপে পাহাড়ে উঠলেই ল্যান্ডোর। ল্যান্ডোর যাওয়ার আমাদের কথা ছিল না। আমরা, মূলত আমিই, ভেবেছিলাম বিনসর যাব। সেই কবে বাবামায়ের সঙ্গে বিনসরে গিয়ে, ফাঁকা মাঠে দাঁড়িয়ে চাঁদের আলোয় হিমালয়ের সারি সারি চুড়োর দিকে তাকিয়ে ভেবে রেখেছিলাম, মধুচন্দ্রিমা করতে হলে বিনসরেই করা উচিত। যাব যাব করে বিয়ে চার বছরের পুরোনো হয়ে গেল, বিনসর যাওয়া হল না। টুরিস্ট রেস্ট হাউসের বুকিং উইন্ডোতে “পেমেন্ট আনসাকসেসফুল” “পেমেন্ট আনসাকসেসফুল” দেখতে দেখতে সব ঘর ফুরিয়ে গেল। আমি বিনসর ফেরার শপথ নিয়েছিলাম ওই রেস্টহাউসের পেছনের মাঠে দাঁড়িয়েই, কাজেই অন্য কোথাও থাকার প্রশ্নই ওঠে না। অগত্যা বিনসর বাদ। ম্যাকলয়েডগঞ্জ মুখস্থ হয়ে গেছে। ভীমতাল নওকুচিয়াতাল মনে ধরছে না। শেষমেশ ল্যান্ডোরই পড়ে রইল। আমাদের চেনা লোক গিয়েছিল বছর ছয়েক আগে, তাদের ফেসবুকের ছবি দেখলাম আবার করে। ওরা যেখানে থেকেছিল, নেট খুঁজে সেই উডসাইড বাংলোর নম্বর বার করে ফোন করলাম। আছে আছে, রুম আছে! পরদিন, ন’টা পঞ্চান্ন থেকে কি বোর্ডের ওপর আঙুল উঁচিয়ে অর্চিষ্মান রেডি হয়ে রইল, সকাল দশটা বাজতে না তৎকালে নন্দাদেবীর দু’খানা লোয়ার সিট বাগিয়েও ফেলল। সেই সিটে, ঠিক সেই সিটে নয়, সেই কুপের সাইড লোয়ার সিটে বসে বসে আমরা এখন জানালা দিয়ে রাস্তাঘাট খেতখামার দেখতে দেখতে যাচ্ছি আর টের পাচ্ছি এতক্ষণে “বেড়াতে যাচ্ছি” ফিলিংটা বুকের ভেতর টইটম্বুর হয়ে উঠেছে। 

দেরাদুন থেকে মুসৌরির ভাড়া প্রিপেড ট্যাক্সিতে এগারোশো, বাসে ছাপ্পান্ন ছাপ্পান্ন একশো বারো। আমাদের কোনও তাড়া নেই, তাছাড়া লোকের বাড়িতে যাচ্ছি, সকাল সাতটায় গিয়ে কড়া নাড়া অকওয়ার্ড। আমরা আরাম করে ফুঁ দিয়ে দিয়ে এলাচ দেওয়া কড়া মিষ্টি চা খেলাম, বাসস্ট্যান্ডে (রেলস্টেশনের একেবারে লাগোয়া) মিনিট চল্লিশ বসে রইলাম, লোকজন দেখলাম, বাংলা কথা শুনে কান খাড়া করলাম তারপর টিকিট কেটে বাসে চড়লাম। একঘণ্টার মধ্যে মুসৌরির এসে গেল। মুসৌরির দু’খানা বাসস্ট্যান্ড, একটার নাম লাইব্রেরি, অন্যটা পিকচার প্যালেস। বাস নামিয়ে দিল লাইব্রেরিতে, এদিকে ল্যান্ডোরের ট্যাক্সি ছাড়ে পিকচার প্যালেস বাসস্ট্যান্ড থেকে। লাইব্রেরি থেকে পিকচার প্যালেস পুরো রাস্তা রিকশা যায় না, মাঝপথ পর্যন্ত গিয়ে নামিয়ে দিল। বাকিটুকু হেঁটে। ওই বাকিটুকুই হচ্ছে টুরিস্টদের স্বর্গরাজ্য, ওখানে রিকশামিকশা ঢোকালে যানজটের একশেষ, তাই এই নিয়ম। আসার আগে ইউটিউবে মুসৌরি ল্যান্ডোর নিয়ে “গটটা ডু” যত লিস্ট দেখেছি, সে সব দোকানপাট রেস্টোর‍্যান্ট এই রাস্তায়। সবই এখন বন্ধ। একদিক থেকে ভালোই, ফাঁকা আর পরিষ্কার ম্যাল রোড দিয়ে আমরা হেঁটে চললাম। একি, সাতসকালে ডিমভাজার গন্ধ আসছে কোথা থেকে?


এই তো, লাভলি অমলেট সেন্টার, মুসৌরি ল্যান্ডোর নিয়ে টিভিতে আর ইউটিউবে যত ভিডিও দেখেছি, সবেতে এই দোকান আর দোকানের মালিককে দেখিয়েছে। বাকি ব্লগটগেও পড়েছি, এ দোকানে নাকি পিক আওয়ারে মারাত্মক ভিড় জমে, দু’ঘণ্টার আগে অমলেটের দর্শন পাওয়া যায় না। আর এখন, এই সকাল আটটার সময় মোটামুটি ফাঁকাই, ভেতরে চারটে অল্পবয়সী ছেলে বসে অমলেট সাঁটাচ্ছে। আমরা ঢুকে গেলাম। অমলেটটার মধ্যে বিশেষ মহত্ব কিছু নেই, ডিম ফেটাও, ফেটানোটা খুব মারাত্মক রকম ভালো হতে হবে যদিও। কাঁটা দিয়ে, বা কাঁটা দেখতে না পেলে চামচ দিয়েই যেমন বাটির এ দেওয়াল ও দেওয়ালে বারদুয়েক ঠুন ঠুন ঠোকা দিয়ে নিই, সেরকম গা বাঁচালে চলবে না। একটা গভীর স্টিলের মগে আগে পিছে ডাইনেবাঁয়ে ওপর নিচে অনেকক্ষণ ধরে বনবন করে হুইস্ক ঘুরবে, ডিমের সাদাহলুদ এমন মিশে যাবে, কোনওদিন যে তারা আলাদা ছিল সে কথা মনে থাকবে না, তখন বড় বড় দু’টো থালায় স্তূপীকৃত কেটে রাখা পেঁয়াজকুচি আর কাঁচালংকাকুচি মিশিয়ে আবার খানিকক্ষণ ফেটাও, তারপর বাসন্তীরঙের, যা প্রায় সাদার দিকে এগোচ্ছে, মিশ্রণখানা ঢেলে দাও আগুনে বসানো ফ্রাইং প্যানে। ঢালাই লোহার গা, ব্যবহারে ব্যবহারে, তেল চপচপে। ডিম প্যানের কোণা কোণায় ছড়িয়ে যাবে, তখন প্লাস্টিকের চামড়া ছাড়িয়ে দু’টুকরো চিজ রাখতে হবে পাশাপাশি। চিজের ওপর পাউরুটি চাপা। এর পর দু’দিক থেকে অমলেট ভাঁজ করে এনে পাউরুটির ওপর রেখে, গোটা ব্যাপারটা উল্টে বেশ করে ভাজাভাজা হবে। ফ্রাইং প্যান থেকে অমলেট সোজা পড়বে থালায়, তারপর পিৎজা কাটার দিয়ে এদিকে তিনটে টান, ওদিকে চারটে। কাটা লাইন দিয়ে গলন্ত চিজ নাক বার করবে। জিভ ছুঁলেই পুড়বে, অথচ এত ভালো খেতে যে আপনি ধীরে ধীরে খেতে পারবেন না। এই বিপদ আঁচ করে মিস্টার লাভলি কাচের ফ্রিজে ঠাণ্ডা কোল্ড ড্রিংকস সাজিয়েই রেখেছেন।

পিকচার প্যালেস থেকে আমরা ট্যাক্সি নিয়ে যাব সিস্টারস বাজার। বাজারে প্রকাশের দোকানের সামনে লোক থাকবে, সে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে উডসাইড। পিকচার প্যালেস থেকে সিস্টারস বাজার মোটে  তিন-চার কিলোমিটার, কিন্তু পুরোটাই চড়াই। ফ্যান্সি টুরিস্টদের পক্ষে ব্যাগ কাঁধে ওঠা কঠিন। কাজেই ওইটুকু রাস্তা, চারশো টাকা। 

সিস্টারস বাজার নামটার মধ্যে কোনও রহস্য নেই। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এখানে একটা ব্রিটিশ মিলিটারি হাসপাতাল ছিল। সে হাসপাতালের নার্স অর্থাৎ সিস্টারদের সম্মানে এই নামকরণ। ও হাসপাতাল আমাদের উনিশশো সাতচল্লিশ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। যদিও উনিশশো সাতচল্লিশটল্লিশ ল্যান্ডোরের হিসেবে খোকাখুকু।  ল্যান্ডোরের ইতিহাস শুরু হয় (তার আগেও কিছু থাকলে, পথের ধারে, চার্চের সামনের ফলকে সে সব লেখা নেই, কাজেই আমি জানি না) আঠেরোশো পঁচিশ সালে। সে বছরই এখানে প্রথম পাকা ইমারত তোলেন কর্নেল ইয়ং নামের এক সাহেব। ল্যান্ডোর, অন্তত আজকের ল্যান্ডোর স্থাপনের উদ্দেশ্যই ছিল নেটিভদের ছোঁয়া বাঁচিয়ে পাহাড়ের ওপরে একটি নিভৃত নস্ট্যালজিয়া চর্চার জায়গা বানানো। এখানে তাঁরা থাকবেন, চার্চে বিয়েশাদি করবেন, ছেলেপুলেকে পড়াবেন, আহত ব্রিটিশ সৈন্যরা হাসপাতালে চিকিৎসা পাবে। ল্যান্ডোর নামটাও দেওয়া ওয়েলসের এক গ্রামের কথা মনে করে। তবে সে নাম উচ্চারণ করতে ওয়েলশ জিভ চাই। Llanddowror


সিস্টারস বাজার হচ্ছে একটা তিনমাথা মোড়। একটা রাস্তা দিয়ে আমরা এসেছি, একটা রাস্তা বাঁ দিকে বেঁকে পাহাড়ের ওপারে হাওয়া হয়ে গেছে, আর একটা রাস্তা ডানদিকে চলে গেছে নিজের মনে। ওই রাস্তাটার বাঁদিক ঘেঁষে তিনচারটে দোকান নিয়েই সিস্টারস বাজার। ওই যে ল্যান্ডোর বেকহাউস, ওখানে আমরা কালপরশু ফরাসি সরুচাকলি আর কফি আর হানি লেমন জিঞ্জার টি খাব। তার পাশের প্রকাশ স্টোর থেকে জ্যাম জেলি কিনে নিয়ে যাব দিল্লি, আর তার পাশে প্রকাশ-এরই হ্যান্ডিক্রাফটসের দোকান থেকে কিনব গাঢ় নীল রঙের সিন্ধুঘোটকের মোটিফ আর কাচ বসানো ঘর সাজানোর জিনিস, যা পর্দার রড থেকে ঝুলবে আমার নতুন টেবিলের ওপর।  

তবে এখন আমরা এসব কিছুই করব না, এখন আমরা কথা বলব প্রকাশের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শক্তপোক্ত চেহারার, ঘিয়ে শার্ট আর ওর থেকে সামান্য গাঢ় রঙের ফুলপ্যান্ট পরা ভদ্রলোকের সঙ্গে। যিনি আমাদের গাড়িটাকে দেখে সামান্য এগিয়ে এসে হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করছেন, “উডসাইড যানা হ্যায় কেয়া?”

ইনি হচ্ছেন জগদীশ ভাইসাব। উডসাইড-এর মালিক ছাড়া আর সব কিছুই। পথপ্রদর্শক, উডসাইডে বসবাসকারী প্রাণী এবং অপ্রাণিবাচক সবার, সবকিছুর দেখভালকারী, যে কোনও রকমের ট্রাবলশুটার। আমাদের ছিল একখানা ব্যাকপ্যাক আর কাঁধে ঝোলানো একটা ব্যাগ, অনেক আপত্তি সত্ত্বেও জগদীশ ভাইসাব ওই কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে আমাদের আগে আগে চলতে শুরু করলেন। 

এইবার একটা ঘটনা ঘটল, বা কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হল বলা উচিত, যাঁরা পরবর্তীকালে আমাদের ল্যান্ডোরের গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবেন। সিস্টারস বাজারের রাস্তা থেকে প্রথম যে শাখাপথটি ডানদিকে বেঁকে গেছে, তার মোড়ে দেখি দুপেয়ে আর চারপেয়ে মেলানোমেশানো একটা ছোটো জটলা। দাঁড়িয়ে আছে চারজন, কিন্তু বোঝাই যায় একজনই প্রধান, বাকিরা নিমিত্তমাত্র। এই প্রধানজন দৈর্ঘ্যে আমার কোমরের থেকে উঁচু বই নিচু না, লম্বালম্বা পা, গাভর্তি সাদাকালো লোম আর একখানা ঝুলন্ত গোঁফ চোখেমুখে সর্বদাই একটা দুঃখের ভাব ফুটিয়ে রেখেছে। এঁর নাম আমি জানিনি,  কিন্তু দেখেই চিনেছি, ইনি জাতেগোত্রে সেন্ট বার্নার্ড। পাশেরটিও বনেদি কুকুর, কিন্তু ভাতের যেমন পায়েস, তেমনি বনেদি কুকুরেরও সেন্ট বার্নার্ড। কাজেই অন্যজন ছায়ায় ঢাকা পড়েই রইল। দু’পেয়েরা তো আমলই পেল না, পাহাড়ের দেওয়ালের বনফুলের সঙ্গে মিশে রইল। 

ওই শাখাপথ থেকে এবার শুরু হল নামা। প্রথমে খানিকটা কাঁচা পথ, তারপর বুঝলাম ঘন পাতার নিচে পাথরের ধাপ কাটা আছে। এঁকে বেঁকে পথ চলল, দুয়েকটা নিঝুম বাংলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে।  হার্থস্টোন লজের সবুজ রং করা খাটো গেট সর্বদাই আধখোলা দেখেছি, শেষদিন গেট খুলে এক মেমসাহেব বেরোলেন, রংচঙে কুর্তা সালওয়ার পরা, আমাদের দেখে হেসে হ্যালো বললেন। এই সব বাংলোগুলো পাহাড়ের আড়ালে থাকে বলে দেখা যায় না, যদিও অস্তিত্ব অনুমান করা যায় কুকুরের চিৎকার শুনে। এই হার্থস্টোনের পরের ধাপের বাংলোটা যেমন। বন্ধ গেটের ওপাশে দুটি অ্যালশেসিয়ান, লোকের টুঁ মাত্র পেলে দৌড়ে দৌড়ে আসে, পাশাপাশি গেটে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে, আকাশবাতাস ফাটিয়ে চেল্লাতে থাকে। দু’দিনে আমরা যতবার ওই পথ দিয়ে নেমেছি উঠেছি, কথা বলতে বলতে, মুখ বুজে, দুমদাম করে পা ফেলে, পা টিপে টিপে, একটি বারও মিস করেনি। এদের নিচের ধাপে আরেকটি বড় জায়গাওয়ালা বাংলো, সামনে দোলনা পোঁতা, তাদেরও আছে একটি পোষা সাদা কুকুর, কোন জাত জানি না, অ্যালশেসিয়ানদুটোর থেকে অনেক বেশি ভদ্র। প্রথমবার নেমেছিলাম তখন চেঁচিয়েছিল, তারপর যখনই বা নেমেছি বা উঠেছি, দৌড়ে এসে জালের কাছে দাঁড়িয়ে লেজ নেড়েছে।  

নামতে নামতে অবশেষে গাছের ফাঁক দিয়ে লালচে আভা দেখা গেল। জগদীশ বললেন, ওই হল উডসাইড। 


উডসাইড আড়াইশো বছরের পুরোনো বাড়ি। অফ কোর্স, আসল বাড়ির ওপর অনেক কেরামতি হয়েছে, কিন্তু ভিত আড়াইশো বছরের। ল্যান্ডোরের একটা ভয়ানক ভালো নিয়ম হচ্ছে যে নতুন বাড়ি বানানো যাবে না। যা আছে তাই সারিয়েবাড়িয়ে কাজ চালাতে হবে। আমাদের বর্তমান মালিক মিসেস ভাট্টি বাড়ি কিনেছিলেন উনিশশো বিরাশিতে। তিনি ও তাঁর স্বামী মিস্টার ভাট্টি তখন দিল্লিতে ব্যস্ত প্রফেশনাল। তবু তাঁরা ল্যান্ডোরে বাড়ি কিনলেন কারণ ছুটিতে পাহাড়ে এসে থাকার স্বপ্ন ছিল অনেকদিনের, আর তাঁরা যে সোসাইটিতে ঘুরতেনফিরতেন সেখানকার সকলেই কেনে। রিটায়ারমেন্টের পর ভাট্টিরা এ বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করলেন, চারপাশে মারাত্মক ইলাসট্রিয়াস সব পড়শি। (উডসাইডের লাগোয়া বাংলোতে আপাতত থাকেন শান্তম শেঠ ও তাঁর স্ত্রী গীতা শেঠ, সদ্যপ্রয়াত লীলা শেঠের ছেলে ছেলের বউ। বলা বাহুল্য, এঁরা বিক্রম শেঠের ভাই ও ভাইয়ের বউও বটে। একদিন সকালবেলা জ্যামটোস্ট খাওয়ার সময় মিসেস শেঠ এলেন পড়শির খোঁজখবর নিতে, আমাদের সঙ্গে হাই হ্যালো করলেন আর আমি তার পরের মিনিট পাঁচেক ভোম্বল হয়ে রইলাম। বিক্রম শেঠের বৌদির এত কাছে দাঁড়িয়েছি!)

বছর তিনেক আগে মিস্টার ভাট্টি মারা যাওয়ার পর থেকে বাড়িভর্তি পেন্টিং, বই আর মারকাটারি সব আসবাবপত্র নিয়ে মিসেস ভাট্টি উডসাইডে একা থাকেন। মাঝে মাঝে লোকমুখে খবর পেয়ে টুরিস্টপার্টি আসে আমাদের মতো, আর তাঁর সবসময়ের খেয়াল রাখার জন্য আছেন স্বামীস্ত্রী, জগদীশ আর বীণা। বীণাজীর হাতের রান্না একবার খেলে আর ভোলার সাধ্য নেই। আরও একজন মিসেস ভাট্টির কাছে থাকে, আমাদের ল্যান্ডোরের গল্পে তার অন্যতম মেন রোল, মুখবন্ধে শুধু তার ছবি দেখিয়ে মিনিমাম প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো দিয়ে রাখি। 


এ হচ্ছে বরফি। সিনেমার হিরোর নাম টুকে নয়, গায়ের রং-এর জন্য তো নয়ই, এ বরফি এর বরফির মতো মিষ্টি স্বভাবের জন্য। বরফির বয়স দুই, উডসাইডের ত্রিসীমানার মধ্যে দিয়ে একটি অচেনা প্রজাপতিও গেলে বরফি চেঁচিয়ে অস্থির হয়, বরফি চান করতে ভালোবাসে না।  

মিসেস ভাট্টি, ঘনিষ্ঠতার মাত্রা এবং বয়স বুঝে যাঁকে আপনি জারিনা আপা বা জারিনা খালা বলে ডাকতে পারেন, জীবন শুরু করেছিলেন লখনৌয়ের এক রীতিরেওয়াজওয়ালা পরিবার থেকে, যেখানে তাঁকে বোরখা পরতে হত। পরিবারের ট্র্যাডিশন বুঝে বিয়েও হয়েছিল উনিশ না পেরোতেই। সেখান থেকে তিনি লন্ডনে পি এইচ ডি পর্যন্ত গেছেন, দেশীবিদেশী সংস্থায় চাকরি করেছেন, ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়েছেন, পেপার পাবলিশ করেছেন, বই লিখেছেন। এই বিরাশি বছর বয়সে এখনও একখানা এইচ পি ল্যাপটপে নিজের কাজ করেন, দেশের রাজনীতি, সমাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখেন এবং নাদাল-জোকোভিচ ম্যাচ হলে ডাইনিং টেবিলের বদলে সোফায় বসেই ডিনার সারেন। আশ্চর্য শক্ত মন এবং শরীর। আমরা যখন পৌঁছলাম, তখন বীণাজি ছিলেন না, মিসেস ভাট্টি নিজে চা করে নিয়ে এলেন আমাদের জন্য। বারান্দায় বসে গল্প করতে করতে চা বিস্কুট খেলাম। বরফি বসে মালকিনকে পাহারা দিল, পাছে আমরা কিছু বেগড়বাঁই করি। তারপর ঘর দেখিয়ে দিলেন মিসেস ভাট্টি, দোতলায় উঠে ডানদিকের দরজা। চাবিতালার কোনও পাট নেই, উনি এ বাড়ির “ফিক্সড ডিপোজিট”। তাছাড়া বরফিকে ভুললে চলবে না। 

ঘরে ঢুকে দেখি মাঝবরাবর একটা লম্বা লাইন থেকে দু’পাশে নিখুঁত সামঞ্জস্যে কাঠের পাটায় হেলান দিয়ে ছাদ নেমে গেছে ঢালু হয়ে দু’দিকে। ডানদিকের দেওয়ালে বড় জানালার কাচের বাইরে বাড়ির গা বেড় দেওয়া লম্বাটে বারান্দা। নিচে দেরাদুন উপত্যকার ভিউ দেখতে বারান্দায় বেরোনোর দরকার যাতে না পড়ে সে জন্য জানালার পাশে গদিওয়ালা তক্তপোষ। বাঁশের কফি টেবিল ঘিরে তিনখানা বেঁটে  ইজিচেয়ার। দেওয়ালে প্রকাণ্ড কাঠের ওয়ার্ডরোব। এদিকে তাকালে ডিজাইন করা ছত্রীআঁটা খাট। খাটের দু’পাশে সিম্পল কিন্তু সুন্দর হাতলওয়ালা বেডসাইড টেবিলের ওপর কাঠের শরীরের ওপর আইভরি রঙের শেডপরানো ল্যাম্প। একটা মোটা গদিআঁটা আরামচেয়ার। খাটের ওপাশের দেওয়ালে আমার বুকপর্যন্ত উচ্চতার গুরুগম্ভীর চেস্ট, চেস্টের এপাশে কালো কাঠের খোলামেলা বুককেস। বুককেসের ওপরের তাকে একটি বাচ্চার ছবির (সম্ভবত মিসেস ভাট্টির পুতি) দু’পাশে লম্বা সেকেলে কাচের ঢাকা মোমবাতিদানি। নিচের তাকে কয়েকটা বই, যে রেখেছে তার সঙ্গে আমার পড়ার রুচি মেলে। বুককেসের ডানপাশে একটা মস্ত টেবিল চেয়ার। টেবিলে একটা শুকনো গাছের শুকনো সরু ডালের বেড়ার ভেতর কাপড়ের ঢাকনা দেওয়া ল্যাম্প। আর এই টেবিলের সামনে ওপাশের দেওয়ালের মতো আরেকটা বড় জানালা কাটা।

(পয়সা থাকলে ফার্নিচারগুলো সব কিনে ফেলতাম রে তোপসে।)

জানালার ওপারে বারান্দা। জগদীশ ভাইসাব বলে দিয়েছেন, ঘরে না থাকলে বারান্দায় যাওয়ার দরজা বন্ধ রাখতে। মাঝে মাঝে নাকি বাঁদর এসে উৎপাত করে। আমরা জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখলাম আশেপাশে বাঁদর দেখা যাচ্ছে কি না, যাচ্ছে না দেখে দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম। 


পরের আটচল্লিশ ঘণ্টা এই বারান্দায় আরও অনেকবার আসব। ভোরে আসব, যখন পাখির ডাকে কান ঝালাপালা, দুপুরে, যখন বারান্দার মার্বেলমেঝে এক অর্ধেক রোদ ঝলমল অন্য অর্ধেক ছায়া, আবার সন্ধ্যে নামার মুখে, যখন পাখির বদলে ঝিঁঝিঁদের বাজার গরম, বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না, গা শিরশির করবে। যখনই আসি না কেন, ঘন, সোঁদা একটা গন্ধে বারান্দা ছেয়ে থাকবে সর্বক্ষণ। প্রথমে চিনতে পারব না, তারপর বুঝে নেব। ওটা হল গাছেদের গন্ধ। জঙ্গলের গন্ধ।


                                                                                                                            (চলবে)

26 comments:

  1. Replies
    1. ল্যান্ডোর দেখে, এমনকি ল্যান্ডোরের কথা মনে করেও আমাদের মুখ থেকে এই শব্দটাই বেরোচ্ছে, অস্মিতা।

      Delete
  2. bah bah - ki sundar- tinni

    ReplyDelete
    Replies
    1. তা সুন্দর বটে, তিন্নি।

      Delete
  3. Notun jaayegar gondho paaaaauuun!! Baki goppo r opekkhaye roilam. :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, এই মন্তব্যটা দারুণ, শর্মিলা।

      Delete
  4. asadharon! baki ta chotjoldi chhapo please.- Bratati.

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, ব্রততী।

      Delete
  5. আহা কি ভালো! ইচ্ছে করছে আপনাদের ছবির এলবামটা কেড়ে এনে এক নিঃশ্বাসে দেখে ফেলি ! যাই পড়ছি মনে হচ্ছে ছবি কেন নেই :(

    ReplyDelete
    Replies
    1. ছবি বেশি তুলিনি, অন্বেষা। একে তো তখন জায়গাটা নিশ্চিন্তে ভালো করে দেখা যায় না, তারপর আবার বাড়ি এসে ঝাড়তেবাছতে হয়। ডবল ঝামেলা।

      Delete
  6. Mongolbaar sokale ei Dillir gorome purte purte eta porei udbuddho hoye Landour er ticket kete fellam.

    Ki daroon lekha! :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. কী মজাআআআআ!!!!!!!! ল্যান্ডোর যাচ্ছ!!!! এই বেড়ানোর গল্প কিন্তু চাই-ই চাই, বিম্ববতী।

      Delete
  7. tomar beranor lekha porlei sei jaygata jete icche kore :) - PB

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, প্রদীপ্ত, এটা ভালো কমপ্লিমেন্ট। তবে ল্যান্ডোর যাওয়ার মতোই জায়গা। একটু বেশি ছুটি ম্যানেজ করতে পারলে এই সাইডটা ঘুরে যেও।

      Delete
  8. amar pochonder series suru abar.. dimbhaja ta kore khete icche hocche.. taratari next ta lekho..

    ReplyDelete
    Replies
    1. লিখছি, ঊর্মি। সম্ভবত কাল বেরোবে।

      Delete
  9. Landour.. er bakita prar jonye bose roilam. Binsar jabar ichha amadero , dekha jak hoi kina...

    ReplyDelete
    Replies
    1. হইয়ে ফেলুন, ইচ্ছাডানা। বিনসর বিফলে যাবে না।

      Delete
  10. অসাধারন। ইচ্ছে হচ্ছে গিয়ে কদিন কাটিয়ে আসি। পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম!!!!

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, ধন্যবাদ।

      Delete
  11. Ki aram ei goromer me dhye dudin paharer kole katano....tar opor emon shanto jaigai

    ReplyDelete
    Replies
    1. যা বলেছেন, সুস্মিতা। দিল্লি এখন চিড়বিড় করে ফুটছে।

      Delete
  12. Ki darun...
    ..Landor onek din dhore amar list e. Tomar lekha pore ichche ta aro beer gelo

    ReplyDelete
    Replies
    1. এবার ইচ্ছেপূরণ করে ফেলো, প্রিয়াঙ্কা।

      Delete
  13. Replies
    1. সময় পেলে ল্যান্ডোর ঘুরে যান, সায়ন।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.