June 28, 2017

টয় ট্রেন





কালকা-সিমলা টয় ট্রেনে আমি ছোটবেলায় একবার চড়েছিলাম বাবার সঙ্গে, এবং খালি বাবার সঙ্গেই, মা যেন কাদের সঙ্গে বাসে করে পুরো রাস্তাটা গেছিলেন। এরকম অদ্ভুত ব্যবস্থা কেন হয়েছিল, আমি মা বাবা তিনজনেই এখন ভেবে মনে করতে পারছি না এবং তিনজনেই যারপরনাই অবাক হচ্ছি। আবার ওই একই ট্রেনে অর্চিষ্মান চড়েনি, কিন্তু নাকতলার মা চড়েছেন। এই সব অদ্ভুত অসাম্য দূর করার জন্য ঠিক হল টয় ট্রেনে সিমলা যাওয়া হবে। এখন, শুধু সিমলা গিয়ে আবার ফিরে আসা পড়তায় পোষায় না, তাছাড়া লোককে বলারও অসুবিধে। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, 'কী করলে?’ আর আমরা যদি বলি ‘এই তো ট্রেনে করে সিমলা গিয়ে আবার বাসে করে ফিরে এলাম’ তাহলে সবাই এমন মুখ করবে, করবেই, যেন আমাদের জন্ম বৃথা। বলবে, আহা ওই জায়গাটা গেলে না? দারুণ মিস করলে। এমন নয় যে সব কিছু দেখে এলেও লোকের মুখ বন্ধ করা সম্ভব। আমি নিশ্চিত ওয়ার্ল্ড টুর করে এলেও কেউ না কেউ থাকবে যার আমাদের ভ্রমণসূচী নিয়ে মতামত থাকবে। ওই জায়গাটায় গেলে না, বা গেলেও মোটে একদিন থাকলে, ওই মোড়টার ওই সিগন্যালটায় দাঁড়ালে না, সূর্যোদয় দেখলে, কিন্তু ওখানের তো সানসেটটাই ফেমাস ইত্যাদি।

দ্বিতীয় বিপদটা প্রথমটার থেকেও ভয়ংকর। সেটা হচ্ছে সিমলা যাওয়া। যথেষ্ট অন্যরকম লোকেরা সিমলা যায় না। টু পপুলার। সাতাশ কিলোমিটার দূরে সোঘিতে নেমে পড়ে, তবু সিমলা যায় না। আমরাও সিমলায় যাওয়ার নামে আঁতকে উঠলাম। টয় ট্রেনে চড়ছি বলে সিমলা যেতেই হচ্ছে, কিন্তু যত দ্রুত সম্ভব প্রাণ হাতে করে পালাতে হবে। পালিয়ে কোথায় কোথায় যাওয়া যেতে পারে খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত সাংলা ভ্যালি পছন্দ হল। কিন্তু অতদূরে যেতে গেলে শুধু তিনদিনের উইকএন্ড যথেষ্ট নয়। আমাদের পক্ষে যা নিতান্ত অচারিত্রিক তাই করলাম। দু’দিন ছুটি নিলাম। বুধবার রাতে বেরোব, সোমবার রাতে ফিরব। 

টয় ট্রেনের চক্করে আরও একটা জিনিস স্বভাবের বাইরে গিয়ে করতে হল। পাহাড়ের এত কাছে থাকি বলেই, পাহাড়ের জন্য আমরা দিনসাতেকের বেশি সাধারণত প্ল্যান করি না। কিন্তু টয় ট্রেনের টিকিটের ডিম্যান্ড দু’নম্বর মার্কেটের ম্যাগাজিনের স্টলে দেশ-এর ডিম্যান্ডের থেকেও বেশি। একমাস আগে বুকিং খোলার দু’ঘণ্টার মধ্যে সব সিট শেষ। কাজেই একমাস আগে টিকিট কাটতে হল। আর ট্রেনের টিকিটই যখন কাটলাম তখন হোটেলগুলোও বুক করে ফেলা হল মাসখানেক আগে থাকতেই।

পাঁচটা টয় ট্রেন যায় কালকা থেকে সিমলা। সবক’টারই ভালোমন্দ আছে, সে সব লিখে আমি ব্লগপোস্ট ভারাক্রান্ত করছি না, সে সব নিয়ে লাখ লাখ সাইটে কোটি কোটি তথ্য আছে। সবদিক ভেবেচিন্তে আমরা বাছলাম শিবালিক ডিলাক্স এক্সপ্রেস। ভোর পাঁচটা কুড়িতে কালকা থেকে ছাড়ে, সিমলা পৌঁছোয় বেলা দশটা নাগাদ। দিল্লি থেকে কালকা আমরা যাব হিমাচল প্রদেশ সরকারের অর্ডিনারি নন-এসি সিটার বাসে। ছ’ঘণ্টার জার্নি। ভলভোও নেওয়া যেত, কিন্তু ভলভোর ভাড়া মাথাপিছু প্রায় হাজার আর সরকারি অর্ডিনারি বাসের ভাড়া মাথাপিছু দু’শো একাশি। নিজেদের বোঝালাম, যদি খুব কষ্ট হয়, যদি ঝাঁকুনিতে ঘনঘন মাথা বাসের ছাদে ঠেকে, তাহলে টাকা বাঁচানোর কথা একে অপরকে মনে করিয়ে সান্ত্বনা পাব। 

কিন্তু বাসের আর একটা ফ্যাচাং আছে, যেটা আমাদের আগে খেয়াল হয়নি। বাস যায় দিল্লি থেকে সিমলা। পথে কালকা রেলস্টেশন পড়ে। রাস্তার ওপরেই পড়ে না স্টপ থেকে আরও খানিকক্ষণ যেতে হয়, সেসব আমরা কিছুই জানি না। রাত আড়াইটের সময় স্টপে নেমে রেলস্টেশন পর্যন্ত যাওয়ার কিছু পাওয়া যাবে কি না তাও না।  এ সব আমাদের মাথায় এল আই এস বি টি-তে বাসে উঠে সিট বেছে বসার পর।  কন্ডাকটরকে জিজ্ঞাসা করলেই সব রহস্যের সমাধান, কিন্তু আই এস বি টি-তে গাড়ি ছাড়ার আগে কন্ডাকটরকে চিহ্নিত করা, আর করতে পারলেও তাঁকে সুস্থমতো প্রশ্ন করতে পারা, ওয়েল, যাঁরা জানেন তাঁরা জানেন। বসে বসে দুজনে টেনশনে ঘামছি, এমন সময় জানালা দিয়ে আমি দেখলাম, খাকি ইউনিফর্ম পরা ড্রাইভারজি দরজা খুলে হেঁইও বলে নিজের সিটে ওঠার উপক্রম করছেন। কনডাক্টরের থেকেও অথেনটিক পথনির্দেশ যদি কেউ দিতে পারেন তবে ইনিই, এই ভেবে চেঁচিয়ে আমি আমাদের প্রশ্নাবলী পেশ করলাম। 

১। বাসটা কালকা স্টেশন দিয়ে যাবে কি না?
২। গেলে কত কাছ দিয়ে যাবে?
৩। যদি দূর দিয়ে যায় তাহলে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছনোর কিছু পাওয়া যাবে কি?

আমি যতক্ষণে দ্রুত আমার প্রশ্ন সারছিলাম, ততক্ষণ ড্রাইভারজি একহাত স্টিয়ারিং-এ, একহাত দরজার ফ্রেমে, এক পা চৌকাঠে রেখে আর দু’চোখ আমার দিকে রেখে ঝুলছিলেন। আমার প্রশ্নমালা শেষ হতে মুখভর্তি গুটখার পিক সামলে “হাঁ হাঁ” বলে বাসে উঠে পড়লেন। 

বাসে ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম হল, মাঝে কনুইয়ের খোঁচা মেরে অর্চিষ্মান দেখাল, সত্যি চণ্ডীগড় শহরটা ভারি সুন্দর। তারপর রাত আড়াইটে নাগাদ 'কালকা স্টেশনওয়ালে উতরো' চিৎকারে তন্দ্রা ছুটল। খচমচ করে লটবহর নিয়ে নামলাম, বাস সাঁ করে সিমলার দিকে ছুটে চলে গেল। আর আমরা আবিষ্কার করলাম, ঘুটঘুটে অন্ধকার জনপ্রাণীহীন রাস্তায় আমরা দুজন দাঁড়িয়ে আছি। রেললাইন বা স্টেশনের চিহ্নমাত্র নেই। শুধু দশ হাত দূরে একটা লাল রঙের বিন্দু একবার নিভুনিভু হচ্ছে আর একবার জ্বলে উঠছে।

বিড়িওয়ালা ভদ্রলোক এগিয়ে এসে রাস্তার ধারে পাঁচিলের ফাঁকা অংশ দেখিয়ে বললেন, 'সিধা চলে যাইয়ে।' সে পথ যে কী অন্ধকার আর কী নির্জন, কী বলব। একটাই ভরসা, এত বেশি রাতে হয়তো দুষ্কৃতীরাও ঘুমিয়ে পড়েছেন। অবশ্য আমাদের সুটকেসের চাকা কংক্রিটের রাস্তায় যে পরিমাণ ঘর্ঘর তুলেছে, ঘুম ভেঙে যাওয়া বিচিত্র নয়। 

মিনিট দশেক হাঁটার পর কালকা স্টেশনের আলো চোখে এল। কালকা আমার অন্যতম প্রিয় স্টেশন। ছোট্ট, শান্ত, পরিচ্ছন্ন। ইতিউতি চাদর মুড়ি দিয়ে লোকজন ঘুমোচ্ছিলেন। আমরা একটা ফাঁকা বেঞ্চি বেছে বসলাম। চা আর ভেজ প্যাটিস খেয়ে আমি ক্যামেরার ব্যাগের ওপর মাথা রেখে গুটিসুটি হয়ে শুলাম, অর্চিষ্মান হাঁটাহুটি করে টাইমপাস করল, তারপর ভোর পাঁচটা নাগাদ আরেক কাপ গরম চা সহকারে খবর আনল যে প্ল্যাটফর্মে গাড়ি দিয়ে দিয়েছে। 

শিবালিক এক্সপ্রেসের ছাড়ার কথা পাঁচটা বেজে কুড়িতে। কিন্তু কখনওই টাইমে ছাড়ে না, কারণ কখনওই হাওড়া দিল্লি কালকা মেল টাইমে আসে না। শিবালিক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কালকার জন্য অপেক্ষা করে। ভালোই করে, কারণ প্রচুর লোক কালকা মেলে এসে টয় ট্রেন ধরেন।  আমাদের সৌভাগ্য সেদিন কালকা মেল মোটে ঘণ্টাখানেক লেট করেছিল। সোয়া ছ’টা নাগাদ কিলবিল করে লোকজন দৌড়ে দৌড়ে টয়ট্রেনের দিকে আসতে লাগল। “এদিকে”, “সুজিতদা", “পা চালিয়ে” ইত্যাদি শব্দ হাওয়ায় উড়তে লাগল। একজোড়া নারীপুরুষ, যাঁদের আমি অমাবস্যার রাতে চশমা ছাড়াও বাঙালি বলে চিনতে পারব, আমাদের জানালার বাইরের বেঞ্চে বাক্সপ্যাঁটরা বিছিয়ে বসলেন। বোধহয় অন্য কোনও ট্রেন ধরবেন। মহিলা বসেই একখানা বই খুললেন কোলের ওপর। ভয়ানক উঁকিঝুঁকি মেরে প্রচ্ছদে সমরেশ মজুমদারের নামটা দেখতে পেলাম। বইয়ের নাম দেখতে পাইনি।

গাড়ি ছেড়ে দিল। পথের বর্ণনা দেওয়া বাহুল্য। পাহাড়, কুয়াশা, পাইনের বন, সুড়ঙ্গ সব আছে। আর আছে ছবির মতো সব স্টেশন। টকসাল, গুম্মান, কোটি, মিষ্টি মিষ্টি নামের স্টেশনের চেহারাও ততোধিক মিষ্টি।  অদ্ভুত ভালো মেন্টেন্যান্স। ছবির মতো গুছোনো। 


কালকা-সিমলা রেলওয়ে চালু হয়েছিল লর্ড কার্জনের সময়, উনিশশো তিন সালে। কালকা থেকে সিমলা, মোটে ছিয়ানব্বই কিলোমিটার দূরত্বে এ ট্রেন পেরোয় একশো দু’খানা সুড়ঙ্গ, আটশোরও বেশি ব্রিজ আর চড়ে প্রায় চোদ্দশো মিটার। রাস্তা জায়গায় জায়গায় প্রায় আটচল্লিশ ডিগ্রি খাড়া। 

গোটা রাস্তায় বারোগ ষ্টেশনে একবার থামে ট্রেন। ভারি সুন্দর ষ্টেশন।

কালকা ষ্টেশনে দু’কাপ করে চা আর ভেজ প্যাটিস খেয়েছিলাম মনে আছে? ট্রেনে ব্রেকফাস্টে দিল পাউরুটি, ডিমভাজা/ ভেজ কাটলেট, জুস, চা। বারোগে ট্রেন থেকে নেমে ফোটো তোলাতুলি সেরে আমরা খেলাম আরও একটা করে ভেজ কাটলেট। তারপর কী একটা ষ্টেশনে হিসেবের বাইরে ট্রেন থামল, জানালা দিয়ে কিনলাম শশা, মশলা চানা, পপকর্ন। আর বাকি রাস্তায় সঙ্গের স্টক থেকে মোন্যাকো বিস্কুট আর নাট ক্র্যাকার। বেড়াতে গেলে পাকস্থলীর আয়তন বেড়ে যায়। এছাড়া এর আর কোনও ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। 

                                                                                                                             (চলবে)


June 20, 2017

মঙ্গলবার পর্যন্ত



উৎস গুগল ইমেজেস

কখনও কখনও পরিস্থিতি এমন হয় যে সব কিছুর মধ্যেও সময় বার করে নেওয়ার আশা থাকে। আজ হল না, কাল হবে, কাল না হলে পরশু তো হবেই। আবার কখনও কখনও অতি বড় চাষার পক্ষেও আশাবাদী হওয়া পোষায় না।  যেমন এখন। চারদিকে যা চলছে, যা চলবে আগামী সাত দিন, (লিখতে গিয়ে হাত কাঁপল, কারণ সত্যিটা হচ্ছে গোটা বছরটাই) তার মধ্যে যদি নিজের সঙ্গে আর কাউকে বলি দেওয়া যায়, সে অবান্তর।

বলি দেওয়াটা কখনও কখনও জিইয়ে রাখার থেকে কম বেদনার। আজও হল না, কালও হল না-র মধ্যে একটা অসহায়তা থাকে। সারাদিনের একমাত্র ভালোলাগার কাজ না করতে পারার কষ্ট থাকে। আর আমার মতো জন্মহিংসুটেদের ক্ষেত্রে, কই-আর-সবাই-তো-সবকিছু-পেরে-যাচ্ছে-তুড়ি-বাজিয়ে-আমি-একটা-ব্লগ-পর্যন্ত-চালাতে-পারছি-না জ্বলুনি ফাউ।

তখন 'পারলাম না'-র গ্লানিটাকে 'পারতাম কিন্তু করলাম না'-র নির্মোহ উচ্চারণে পরিণত করা ছাড়া গতি থাকে না। 'প্রাইজ কেন পেলাম না'-র কাঁদুনির থেকে যেমন 'লাথি মারি তোর প্রাইজে' বলাটা বুদ্ধিমানের। 'সামনের সাত দিন আমি লিখতে চেয়েও পারব না'-র থেকে 'আগামী সাতদিন আমার ছুটি কাজেই পায়ে ধরে সাধলেও লিখব না', ভেবে নেওয়া সোজা।

আমিও তাই ভেবে নিচ্ছি।

সামনের মঙ্গলবার পর্যন্ত অবান্তরের ছুটি। আমারও ছুটি। (শুধু অবান্তরের কাছ থেকেই, বাকি ঘানি যেমন পেষার পিষবে।) তবে পুরোটাই কালো নয়, একটা ভালোও আছে। তার প্রস্তুতির জন্যও খানিকটা সময় দরকার। ব্যাগট্যাগ গোছাতে হবে, টিকিটমিকিটের প্রিন্ট আউট নিতে হবে, ড্রাইভারজিকে ফোন করে মনে করাতে হবে, "সিমলায় আমাদের পিক আপ করতে আসবেন কিন্তু সময়মতো, ডোবাবেন না দয়া করে।"

সোজাসাপটা ছুটি নেওয়ার সিদ্ধান্তটা যে ভালো হয়েছে অলরেডি টের পাচ্ছি। অলরেডি মগজ লাফাচ্ছে ছুটির পর ফিরে আপনাদের গল্প শোনানোর আশায়। আপনারা সবাই খুব ভালো থাকবেন, যাঁদের যাঁদের জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে বৃষ্টি দেখবেন, বাকিরা তাঁদের বৃষ্টিতে লোভ দেবেন। যাঁরা যাঁরা আম খেতে পাচ্ছেন আম খাবেন, যাঁদের আম খেলেই ফোঁড়া বেরোয় তারা রিস্ক না নিয়ে লিচু খাবেন। মোট কথা, ফুর্তিতে থাকবেন, এই আমার আন্তরিক কামনা। 

আর সে ফুর্তির মাঝে কখনওসখনও যদি অবান্তরের কথা মনে পড়ে, তবে দু-ফোঁটা চোখের জলের দরকার নেই, মুহূর্তের জন্য আনমনা হলেই আমার জন্ম সার্থক।

টা টা বাই বাই, আবার যেন দেখা পাই।


June 18, 2017

22 Never Asked Questions




কাল রাত বারোটার সময় কী করছিলেন? ঘুমোচ্ছিলাম

আপনি যদি অন্য কেউ হতেন, এখন আপনি যিনি, তাঁর বন্ধু হতেন? পাগল?

বক্রোক্তি ব্যবহার করেন? মনে মনে সর্বক্ষণ, মুখে যথাসম্ভব কম।

কত বছর বয়সে সাইকেল চালাতে শিখেছিলেন? চার কিংবা পাঁচ। 

ক্যারাটে জানেন? না। 

শিস দিতে পারেন? না। তবে ক্যারাটে যেমন শিখতে চাই না, শিস দেওয়াটা শিখতে চাই। 

নিজের ভাষা ছাড়া আর কোন ভাষায় অনর্গল হতে চান? বাঙাল ভাষায়

কখনও ইন্ডিয়ান ফুড চেখে দেখেছেন? ইন্টারনেট থেকে প্রশ্ন টুকলে কী পরিণতি হয় সেটা দেখানোর জন্য এই প্রশ্নটা রাখলাম।

একদিনের জন্য সবার সময় থেমে গেল, খালি আপনার ছাড়া। কী করবেন? ঘুমোব।

আপনার জীবনের একটাই দিন বার বার পুনরাবৃত্তি হতে লাগল। কোন দিনটা হলে ভালো হয়? আজকের দিনটা। কারণ আজ রোববার। বৃষ্টি হওয়ার পর টেম্পারেচারও কম।

আপনার ব্যক্তিগত নরক? যেখানে আমি একলা। 

ব্যক্তিগত স্বর্গ? যেখানে আমি একলা। 

আপনার সামনে এক নতুন জগতের প্রবেশপথ খুলে গেল। সে জগৎ সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন না, গেলে ফিরতে পারবেন কি না জানেন না, দরজা কতক্ষণ খোলা থাকবে জানেন না। কী করবেন? যেখানে আছি সেখানে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকব। 

আপনার জীবনের সেরা আবিষ্কার? (ইংরিজিতে লিখেছিল ‘বেস্ট ফাইন্ড’) অর্চিষ্মান

মুদির দোকানে গেলে সর্বদা কী কেনেন? রোজ কিনি না, তবে সবথেকে ঘন ঘন কিনি ম্যাগি আর মাইক্রোওয়েভ পপকর্ন। 

কোনও কাজের মোটিভেশন বজায় রাখতে গেলে কী করা উচিত বলে মনে করেন? সে কাজটা রোজ করা। 

কোন খেলা দেখতে পছন্দ করেন? কোনও খেলাই না। যেগুলো পছন্দ করি না সেগুলো তো হয়েই গেল, যেগুলো করি সেগুলো দেখতে বসলে হারজিত নিয়ে এমন বুক ধড়ফড়ানি হয় যে তার থেকে না দেখা ভালো। 

বাড়িতে ফোন ফেলে রেখে বেরিয়ে গেলে কী ফিলিং হয়? প্রথমে প্যানিক, তারপর শান্তি। 

সবথেকে রিল্যাক্সিং কোথায় বেড়াতে গেছেন? ল্যান্ডোরের স্মৃতি টাটকা, রিল্যাক্সেশনও চরম হয়েছিল, তাই ল্যান্ডোর। 

আপনার ফোনের সবথেকে উপযোগী তিনটি অ্যাপ? ওলা, উবার, জোম্যাটো। 

লোকে সাধারণত আপনার থেকে কী সাহায্য চাইতে আসে? পথনির্দেশ।

টিভিতে কোন ধরণের অনুষ্ঠান দেখা পরিহার করেন? রিয়ালিটি শো আর সিরিয়াল। কারণ একবার দেখতে শুরু করলে আর থামতে পারব না। 


June 16, 2017

Whether a little less might not have been better



কালকের পোস্টে প্রতিভাট্রতিভা নিয়ে আলোচনা করার পর আজই ব্রেইন পিকিংস -এ এই পোস্টটা পড়লাম। ওঁদের সাইট থেকে, আর ইন্টারনেটের খাঁজখোঁজ থেকে কুড়োনোবাড়ানো ট্যালেন্ট বনাম জিনিয়াস সংক্রান্ত কয়েকটা কোটেশন এই রইল।

Talent is insignificant. I know a lot of talented ruins. Beyond talent lie all the usual words: discipline, love, luck, but most of all, endurance. —James Baldwin

Genius gives birth, talent delivers. —Jack Kerouac

The Man of Genius may at the same time be, indeed is commonly, an Artist, but the two are not to be confounded. The Man of Genius, referred to mankind, is an originator, an inspired or demonic man, who produces a perfect work in obedience to laws yet unexplored. The Artist is he who detects and applies the law from observation of the works of Genius, whether of man or nature. The Artisan is he who merely applies the rules which others have detected. There has been no man of pure Genius; as there has been none wholly destitute of Genius. —Henry David Thoreau

Talent is like the marksman who hits a target which others cannot reach; genius is like the marksman who hits a target … which others cannot even see. —Arthur Schopenhauer

The difference between talent and genius is in the direction of the current: in genius, it is from within outward; in talent from without inward. —Ralph Waldo Emerson

Genius is seldom recognized for what it is: a great capacity for hard work. --Henry Ford

(নিচের উদ্ধৃতিদুটো যদিও ট্যালেন্ট বনাম জিনিয়াস সংক্রান্ত নয়, তবু এখানে জুড়ে দিলাম। প্রথমটা, গোয়েন্দাগল্প লেখকরা যে কত বুদ্ধিমান হন তার প্রমাণ হিসেবে। দ্বিতীয়টা, মনের কথা হিসেবে।)

Mediocrity knows nothing higher than itself, but talent instantly recognizes genius.’ —Arthur Conan Doyle

Sometimes, indeed, there is such a discrepancy between the genius and his human qualities that one has to ask oneself whether a little less talent might not have been better.’ —Carl Gustav Jung


June 15, 2017

উপস্থিত



গত ক’দিনে আমার গুগল সার্চ হিস্ট্রির কয়েকটা নমুনা হল এই

Bailey’s 2017
Delhi temperature
Utpalendu Satarupa
Ministry of Petroleum and Natural Gas
Shakira bellydancing
Bijoli grill bangabhaban
Ready to use plant soil buy online india
How to find the energy to write after a work day

কেউ বলেছেন চট করে ন্যাপ নিয়ে উঠে লিখুন, কেউ বলেছেন বাড়ি ফিরে জুতো খুলতে পারেন, মোজা খুলবেন না। মোজাতেই সব মোটিভেশন। কেউ বলেছেন বাড়ি যাওয়ার পথে মাঝপথে কফি শপে থেমে লিখুন। কিন্তু লিখুন, দোহাই আপনার। আমি সেই সব পড়েটড়ে লিখতে বসেছি। জানি না, কতখানি হবে, কারণ চোখ টানছে, খাট ডাকছে, আঙুল মাঝে মাঝেই উঠে নতুন ট্যাব খুলে সার্চ করছে। হাউ টু রাইট আফটার অ্যান এইট আওয়ার ওয়ার্ক ডে? হাউ মেনি ওয়ার্ডস টু রাইট?

লোকে বলে লেখা যত ইন্টারেস্টিং, লেখার কথা তত ইন্টারেস্টিং নয়। আমি নিজে লেখার কথা পড়তে ভীষণ ভালোবাসি, কে কতক্ষণ লেখে, কখন লেখে, ঘণ্টা মেপে লেখে না শব্দ মেপে, নাকি মাপামাপি চুলোয় দিয়ে, এ সব জানতে আমার দারুণ কৌতূহল। মাইকেল ক্রিকটন নাকি সারাদিনে দশ হাজার শব্দ লিখতেন, স্টিফেন কিং দু’হাজার, আর্থার কোনান ডয়েল তিন হাজার, হেমিংওয়ে মোটে পাঁচশো শব্দ লিখতেন আর অস্কার ওয়াইল্ড নাকি সকালবেলা একটিমাত্র নিখুঁত শব্দ লিখে বিকেলবেলা সেটি কেটে দিতেন। 

বিখ্যাত লেখকদের লেখার রুটিন পড়লে একই সঙ্গে উদ্দীপনা, বিস্ময়, নিজের প্রতি ধিক্কার, এই সব নানারকম অনুভূতি হয়। গুস্তাভ ফ্লোবে-র লেখার, বা সারাদিনের, রুটিন পড়ে যেমন হিংসে হল। সকাল দশটার সময় ঘুম থেকে উঠতেন গুস্তাভ। উঠেই একটা ঘণ্টা বাজাতেন। সেই ঘণ্টা বাজলে তবে সারা বাড়ির লোক স্বাভাবিক গলায় কথা বলার সাহস পেত, তার আগে শুধু ফিসফিস। ঘণ্টা শুনে ব্যক্তিগত ভৃত্য জল নিয়ে আসত, পাইপে তামাক গুঁজে দিত, ফসফস করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গুস্তাভ খবরের কাগজ পড়তেন, চিঠির উত্তর দিতেন, মায়ের সঙ্গে গল্প করতেন। তারপর স্নান সেরে, মাথায় যত্ন করে চুল পড়া কমানোর ওষুধ লাগিয়ে ডাইনিং রুম। সেখানে খেতে খেতে আর গল্প, খাওয়া শেষে বাড়ির বাগানে, নদীর ধারে দল বেঁধে ঘোরাঘুরি। তারপর দুটো নাগাদ ফিরে এসে লিখতে বসা। এই যে সারাটা দিন নিজের হাতে, আমি আমার সময়মতো লেখার টাইম বার করে নেব, এইটা একটা মারাত্মক বিলাসিতা।

সবার অবশ্য এই বিলাসিতা লাগে না। অ্যান্থনি ট্রলপের যেমন লাগেনি। ডাকবিভাগে ডাকসাইটে চাকরি করতেন ভদ্রলোক, আর সাতষট্টি বছর বয়সে মরে যাওয়ার আগে সাতচল্লিশটা উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, চিঠিচাপাটি, সবাই যা যা লেখে, সে সবও লিখেছিলেন। অ্যান্থনি ট্রলপ অনুপ্রেরণাট্রেরণায় বিশ্বাস করতেন না। উনি বিশ্বাস করতেন লিখতে বসলে লেখা আসবে। ঠিক করে নিতেন আগামী এত দিনে আমি এতটা লিখব, তারপর সেই টার্গেটকে মাস, সপ্তাহ, দিনে ভাঙা হত। লেখার পাশাপাশি একটা ডায়রিও চলত, সেখানে টার্গেট আর ডেডলাইন দাগানো থাকত। লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না ফাঁকি পড়ছে সে সব চোখের সামনে জ্বলজ্বল করত। দিনে তিনহাজার শব্দ লিখতেন ট্রলপ। চাকরিতেও মগ্নপ্রাণ ছিলেন কাজেই অফিসে বসে চুরিচামারি করে লেখার জন্য ছোঁকছোঁক করতেন না। তিন হাজারের গোটাটাই লেখা হত অফিস যাওয়ার আগে, ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে। অর্থাৎ ঘণ্টাপ্রতি হাজার শব্দ। কিন্তু এখানে থেমে গেলে আর পাঁচজনের সঙ্গে ট্রলপের তফাৎ থাকে না। ঘড়ি সামনে রেখে পনেরো মিনিটে আড়াইশো শব্দ লিখতেন ট্রলপ। তিন ঘণ্টায় তিন হাজার শব্দ নেমে যেত, ট্রলপ উঠে পড়ে অফিস চলে যেতেন। সারাদিন চুটিয়ে কাজ করে সন্ধ্যেবেলা চুটিয়ে আড্ডা দিতেন, আর সপ্তাহে অন্তত দু’বার বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে শেয়াল শিকারে বেরোতেন। 

আমি চেষ্টা করেছিলাম, এই গত পরশুই, সময় মেপে শব্দ লেখার। ট্রলপের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার আমার সাহস হয়নি, আমি ভেবেছিলাম আমার পক্ষে আধঘণ্টায় আড়াইশোই যথেষ্ট হবে। ওই আধঘণ্টাতেই এফ এম এ এমন ভালো ভালো গান বাজালো যে আমাকে টাইপ করা থামিয়ে সে গান শুনতে হল। আড়াইশো শব্দ যখন শেষ করলাম তখন ঘড়ি এক ঘণ্টা দশ মিনিট পার করে ফেলেছে। 

অবশ্য সবাই ট্রলপের মেথডে বিশ্বাস করেন না। ট্রলপের বহুপ্রসবের অভ্যেসকে অনেক ক্রিটিকই সন্দেহের চোখে দেখতেন (যেমন আমরা বছর বছর শারদীয়ার লেখকদের করি), মৃত্যুর পর ট্রলপের আত্মজীবনী ছাপা হল। তখন এই পনেরো মিনিটে আড়াইশো শব্দটব্দের ব্যাপার সবার গোচরে এল। অবশেষে সন্দেহের নিরসন। এতদিনে স্পষ্ট হল লোকটা এত খারাপ লিখত কী করে। এ কি লেখক না মেশিন?

তবে এই ক্রিটিকরা সংখ্যায় কম। শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিশ্রম করার ক্ষমতা এসবকে লোকে অনায়াস দক্ষতা/ স্বতঃস্ফূর্ততার থেকে মূল্য দেয় বেশি। আমিও এই দলেই পড়ি। এই সব লেখালিখির রুটিন, শব্দসংখ্যা পড়তে পড়তে সেটাই লক্ষ করছিলাম। মাইকেল ক্রিকটনের থেকে হেমিংওয়ের লেখা আমি পছন্দ করি বেশি, কিন্তু হেমিংওয়ে যে দিনে মোটে পাঁচশো শব্দ লিখতেন দিনে আর ক্রিকটন যে দশ হাজার এইটা আমাকে থমকে দিল। জন্মগত প্রতিভায় লোকে অত ইম্প্রেসড হয় না, গাঁতিয়ে খেটে প্রতিভার খামতিকে অতিক্রম করাতে যত হয়। আর প্রতিভা যদি কেউ অপচয় করে, তাহলে তো রক্ষা নেই। প্রতিভাবানদের, বিশেষ করে সে যদি নিজের ভাষার, নিজের ধর্মের, নিজের মামারবাড়ির পাড়ার (যে যেটাকে বেশি গুরুত্ব দেয়) প্রতিভার প্রতি মানুষের একটা স্বাভাবিক অধিকারবোধ থাকে। কীভাবে খরচ করলে সে প্রতিভার সদ্ব্যবহার হবে, সে সম্পর্কেও একটা নির্দিষ্ট মতামত থাকে। প্রতিভাবানের প্রতিভা খরচ করার ধরণ যদি সে মতের সঙ্গে না মেলে তাহলেই জাজমেন্টের বন্যা। ঋত্বিক ঘটক কেন মদ খেলেন, পিকাসো কেন নারীসঙ্গ করলেন, অরুন্ধতী রায় কেন রাজনীতি করতে গিয়ে কুড়ি বছরে মোটে দু’খানা উপন্যাস নামালেন, সমরেশ বসু কেন দু’খানা সংসার করলেন, সবাই কেন রবীন্দ্রনাথের (বায়োপিক দেখে আসার পর শচিন তেন্ডুলকরের নামও জোড়া হচ্ছে) মতো ঠুলিবাঁধা ঘোড়া হলেন না, এই নিয়ে গাধাদের চিন্তার শেষ নেই। আমারও না। আজ সকালেই ভাবছিলাম, হেমিংওয়ে যদি অত মাছ না ধরে আর দৈনিক আরও পাঁচশো শব্দ বেশি লিখতেন, কত ভালোই না হত।

আমার মতো যারা অফিসে ফাঁকি মারে, বাড়িতে ফাঁকি মারে, স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে ফাঁকি মারতে মারতে এসেছে, তারা পরিশ্রম আর নিষ্ঠার নামে এত উদ্বাহু কেন, এটা আমার কাছে একটা রহস্য। পরিশ্রমের বিকল্প নেই, এ কথা সবার জীবনের/শিল্পের ব্রত নাও হতে পারে, এটা মেনে নিতে এত কষ্ট কীসের? কোথা থেকে আমাদের এই দৃঢ় প্রত্যয় যে প্রতিভা না থাকাটা দৈবের হাতে, কিন্তু পরিশ্রম না করাটা সম্পূর্ণ নিজদায়িত্ব? তাহলে নিজেরা করলাম না কেন? অস্কার ওয়াইল্ডের মতো ‘পারফেক্ট ওয়ার্ড’ লেখার ক্ষমতা আমার নেই এটা মেনে নিতে আমার কোনও অসুবিধেই হয়নি, কিন্তু ট্রলপের মতো পনেরো মিনিটে আড়াইশো শব্দ লেখারও যে নেই, এটা হাতে কলমে পরীক্ষা করে না দেখলে অবিশ্বাস যাচ্ছিল না। রেজাল্ট দেখেও শান্তি নেই। মনে মনে ভাবছি আজ পারিনি, কাল পারব নিশ্চয়। পরিশ্রমও যে চাইলেই করা যায় না, সেটার প্রতিভাও যে নিয়ে জন্মাতে হয় এটা আমার এখনও মাথায় ঢোকেনি। আর কবে ঢুকবে জানি না।


June 08, 2017

সাতচল্লিশ



শাটার সিনেমাটা দেখেছেন? অরিজিন্যাল থাই কিংবা অ্যামেরিক্যান রিমেক? যারা দেখেননি এবং দেখতে চান এবং স্পয়লারে আপত্তি আছে, তাঁরা এইবেলা চোখ বন্ধ করুন। নেক্সট অনুচ্ছেদ থেকে পড়তে চাইলে পড়তে পারেন। যারা এখনও চোখ খুলে আছেন, তাঁদের জন্য আরেকবার গল্পটা বলি বা মনে করিয়ে দিই। একটি ফোটোগ্রাফার ছেলের জীবনে নানারকম গোলযোগ ঘটতে শুরু করে। তার তোলা ছবিতে নানারকম ভূতুড়ে আলো দেখতে পাওয়া যায়, অন্ধকার রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় সামনে রাস্তায় রহস্যময় নারী লিফট চায়। এ সবই হরেদরে হরর ছবিতে থাকে, এ নিয়ে উত্তেজনার কিছু নেই। ইন্টারেস্টিং হচ্ছে অন্যান্য ভৌতিক উপসর্গগুলো। ছেলেটির কাঁধে ক্রমাগত ব্যথা হয়, ছেলেটির কাঁধ ক্রমশ ঝুঁকে যায়। ওজন মেশিনে উঠলে যা নম্বর দেখায় ওইরকম রোগাপ্যাংলা ছেলের অত ওজন হতেই পারে না। ছবির শেষে জানা যায় অতীতে ছেলেটি একটি পাপকাজ করেছিল, সে পাপের ভূত আক্ষরিক অর্থেই ছেলেটির কাঁধে চেপে বসে আছে, আর সেই ভারে ছেলেটি ক্রমশ বেঁকে যাচ্ছে। 

গত ক’দিন আমার অবস্থাটা হয়েছে অনেকটা সেইরকম। আমার বয়স বাড়ছে সেকেন্ড মিনিট ঘণ্টা মেপে যেমন বাড়ে, কিন্তু আমার কাঁধের বয়স যেন বাড়ছে একেক লাফে দশ বছর। অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু আমি টের পাচ্ছি কাঁধদুটো ধনুকের মতো বেঁকে গেছে, মাঝে মাঝে যখন সোজা করছি, টনটনিয়ে উঠছে। সবসময় মাথা ভার, মুখ হাঁড়ি। চেনা লোক দেখলে বুক ধড়ফড়, এই বুঝি কথা বলতে হয়। 

তিনটে কারণে এটা  হতে পারে।

এক, পুরোনো আর রোজ রোজ নতুন নতুন জমা পাপের ভার
দুই, বাইরের গরম আর ভেতরের এসির দ্রুত পট পরিবর্তন। 
তিন, গোটাটাই মানসিক।

আমার নিজের ধারণা তিনটে কারণের মিশ্রণে গোলমালটা ঘটেছে। মিশ্রণের অনুপাতটা তেত্রিশ, তেত্রিশ, তেত্রিশ নাকি চল্লিশ চল্লিশ কুড়ি নাকি নব্বই পাঁচ পাঁচ, সেটা আমি জানি না। 

রবিবারে আমাদের তাপমাত্রা ছিল সাতচল্লিশ। সোমবার ছেচল্লিশ। এমনিতে তো গতকাল, আজ, আগামীকালের সমস্ত ফারাক ইস্তিরি হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তার মধ্যে এটা একটা খবর।  খবরটা দিতে মাকে ফোন করলাম। শুরুতে যেমন করতে হয়, কী করছ, কেমন আছ ইত্যাদি, সেসব ভদ্রতা করছি, মা বললেন, “কেমন আর থাকতে পারে মানুষ, সাঁইতিরিশে?” আমি সাতচল্লিশের বাণ মারলে মায়ের সাইতিরিশ অক্কা পেত, কিন্তু আমি চুপ করে রইলাম। একে তো গরম নিয়ে গর্ব করা বংশপরিচয় নিয়ে গর্ব করার থেকেও হাস্যকর। দুই, আমার সাতচল্লিশের কষ্ট মায়ের সাঁইত্রিশের কষ্টের থেকে বেশি এবং মহান এটা নির্ধারণ করার কোনও উপায় আমার কাছে নেই। তিন, নিজেকে মনে করালাম, আমি ঘামছি না, মা ঘামছেন। 

গরমে গোটা শনিরবি বাড়িতে বসে থাকতে হল। বসে বসে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাস মুখস্থ করে ফেললাম।  মোটামুটি যা বুঝলাম সাতচল্লিশের দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই, আর সামনের সপ্তাহে, চোদ্দই জুন নাগাদ ধুঁয়াধার বর্ষণের সম্ভাবনা। আরও একটা কাজ হল, এ বছরের নন-ককেশিয়ান গোয়েন্দা জোগাড়ের সিলেবাসের একটা ধাপ পেরোনো গেল। জাপানি লেখক Keigo Higashino-র ইন্সপেক্টর কাগা। তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত এ মাসের বইতে বলব। 

আর যে কাজটা হয়েই থাকে, টিভি দেখা, সেটাও হল দেদার। তবে এই শনিরবি টিভি দেখার পাশাপাশি টিভি দেখাসংক্রান্ত একটা সত্য উদ্ঘাটন করলাম, যেটা হচ্ছে, আমরা টিভিতে অনুষ্ঠান দেখার বদলে চ্যানেল দেখি। এর কারণ আমাদের রিমোট, বা রিমোটের অনুপস্থিতি। বেশিরভাগ সময় আমাদের রিমোট খুঁজে পাওয়া যায় না। যদি বা পাওয়া যায়, সেটা সর্বদা আমাদের থেকে হাত দশেক দূরে অবস্থান করে। এই হাতে করে খাটে নিয়ে এসে বসলাম, এই দেখি ঘরের ও প্রান্তে বুককেসের ওপরে তিনি অবস্থান করছেন। এটা কী করে হয় আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না। রীতিমত ভৌতিক। রিষড়ার বাড়িতে এ ধরণের ঘটনা খুব ঘটত। ফাঁকা ঘরে ফ্যান ঘুরছে, কেউ দেখছে না টিভি চলছে, জানালা এঁটে বন্ধ করা হয়নি, ছাদের কাপড় তুলে এনে দরজা দেওয়া হয়নি। কে করেছে? “আমি না”, “আমিও না”, “আমি তো না-ই”।  তখন ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই যে বাড়িতে আমরা ছাড়াও অন্য কেউ আছেন নির্ঘাত, তিনিই দোষী। অচেনা অশরীরীর কথা ভাবলে ভয় লাগে, তাই আমরা ধরে নিতাম,  ঠাকুরদা করেছেন। কাঁহাতক আর সামনের ঘরের দেওয়ালের ফোটোর ভেতর হাসি হাসি মুখে বসে থাকা যায়, তাই দাদু নেমে এসে এসব নষ্টামো করে বেড়াচ্ছেন।

দিল্লির ভাড়াবাড়িতেও এরকম কেউ আছেন নিশ্চয়। আমরা আসার পর, বাড়িওয়ালা এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই পর পর সজ্ঞানে স্বর্গলাভ করেছেন। তাঁরা হতে পারেন, বা আমরা আসার আগে এই ঘরে কেউ স্বর্গলাভ করেছিলেন, তাও হতে পারে। যিনিই থাকুন না কেন, তাঁর যত রসিকতা রিমোটখানাকে নিয়ে। আমাদের তাতে আপত্তি নেই। রসিকতা যদি রিমোটের বদলে গ্যাসের নব বা জলের কল নিয়ে হত, তাহলে কেলেংকারি। তার থেকে রিমোট ভালো। 

রিমোট খুঁজে না পাওয়া গেলে তো হয়েই গেল, নাগালের বাইরে থাকলেও একই ব্যাপার। ধরুন আপনি সব কাজ সেরে, গ্যাস, কল পরীক্ষা করে, গাছে জল দিয়ে, বাসন মেজে, ও ঘরের লাইট ফ্যান নিভিয়ে, জলের বোতলে জল ভরে এসে খাটে উঠে আবিষ্কার করলেন রিমোট আনা হয়নি। তখন কি আবার নেমে রিমোট আনতে যাবেন? গেলে আমার সঙ্গে আপনার মিল নেই। অর্চিষ্মানের সঙ্গেও নেই। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার আর অর্চিষ্মানের ভয়ানক মিল। আমরা তখন টিভিতে যে চ্যানেল খোলা আছে সেটাই দেখতে থাকি। যা-ই দেখানো হচ্ছে তাতেই আমাদের দিব্যি চলে যায়। এই করে করে একসময় আমাদের কেবলই ফক্স লাইফ দেখা হত, সকালে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া, দুপুরে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া, রাতে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া।  এই করে করে নাপতোল দেখেছি। (দেখে দেখে এমন নেশা হয়েছে এখন মাঝে মাঝে খাট থেকে উঠে রিমোট খুঁজে এনে চ্যানেল বদলে নাপতোল দেখি। কিন্তু সে এখনকার কথা, শুরুটা হয়েছিল রিমোট হারানো দিয়েই।) এ সপ্তাহের চ্যানেল ছিল জি সিনেমা বাংলা। টানা দু’দিন জি সিনেমা বাংলা দেখে চ্যানেল দেখে আমি যে সিদ্ধান্তে এসেছি, সেগুলো নিম্নলিখিতঃ

১। বাংলা সিনেমার নামে সবথেকে বেশি ব্যবহৃত শব্দ ‘অত্যাচার’। অন্যায় অত্যাচার। বিধাতার অত্যাচার। শাশুড়ির অত্যাচার। দ্বিতীয় ব্যবহৃত শব্দ ‘প্রতিবাদ’। শুধু ‘প্রতিবাদ’। অন্যায়ের প্রতিবাদ। বৌমার প্রতিবাদ।

২। দেভকে গালি দিয়ে লাভ নেই, বাংলা সিনেমার অভিনেতাদের বেশিরভাগই স্পষ্ট উচ্চারণে বাংলা বলতে পারেন না, কোনওদিনই পারতেন না। রঞ্জিত মল্লিক, শতাব্দী রায় এঁদের মধ্যে কয়েকজন। ইন ফ্যাক্ট, দেখেশুনে আমার ধারণা জন্মেছে, বাংলা সিনেমায় সফল হওয়ার অন্যতম শর্ত বাজে উচ্চারণ। 

৩। উত্তমপন্থীরা যা-ই বলুন না কেন, যত চোখে ঠুলি পরে থাকতে চান না কেন, সোজা কথাটা হচ্ছে, বাংলা ইন্ডাস্ট্রির জন্য প্রসেনজিৎ যা করেছেন, করে চলেছেন এবং করবেনও, সেরকম আর কেউ করেননি। হ্যাঁ, মিথে পরিণত তিনি নাও হতে পারেন (অবশ্য মৃত্যুর পর কী হবে না হবে বলা যায় না। যদিও আমি চাই প্রসেনজিৎ অমর হোন এবং বাংলা সিনেমার রাজার মুকুট পরে সিংহাসনে চড়ে থাকুন) কিন্তু ফ্যাক্ট ইজ ফ্যাক্ট। ব্যাগি জামা থেকে চুলের ছাঁট থেকে শুরু করে আমি, আমার, আমাকে জাতীয় সমস্ত শব্দকে ‘আ-আ-মি”, “আ-আ-মার”, “আ-আ-মাকে” উচ্চারণ পর্যন্ত, বাংলা সিনেমার প্রত্যেকটি ট্রেন্ডের পথিকৃৎ আমাদের প্রসেনজিৎ। জি বাংলা সিনেমা সে কথা জানে এবং সারা দিনে অন্তত তিনটে করে তাঁর ছবি দেখায়। কানাঘুষো শুনি, কারা নাকি প্রসেনজিৎকে ইন্ডাস্ট্রিতে নবজীবন দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে। যাঁরা এ গুজব ছড়ান তাঁদের আমি সবিনয়ে বলতে চাই, জি বাংলা সিনেমা দেখুন, প্রসেনজিৎকে ফিরিয়ে আনার দরকার ছিল না, কারণ তিনি যাননি কোথাও, এখানেই ছিলেন। 

৪। কোনও ছেলের কোনও মেয়ের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার উপায়ঃ মেয়েটিকে ধর্ষণ করা
কোনও মেয়ের কোনও ছেলের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার উপায়ঃ ছেলেটির নামে ধর্ষণের মিথ্যে অভিযোগ আনা
কোনও মেয়ের কোনও ছেলেকে ইমপ্রেস করার উপায়ঃ ছেলেটি তাকে ধর্ষণ করা সত্ত্বেও, “আমি তোমাকে ভালোবাসি কাজেই পুলিসে দিচ্ছি না” বলে গলায় আঁচল দিয়ে ছেলেটিকে প্রণাম করে কাঁদতে কাঁদতে দড়ি কিনতে বাজারে যাওয়া।
কোনও ছেলের কোনও মেয়েকে ইমপ্রেস করার উপায়ঃ মেয়েটিকে অন্য ছেলেদের হাত থেকে ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচানো। 

আমরা খাটের ওপর এবং রিমোট টিভির কাছে থাকার জন্য শনিরবি তিন তিন করে ছ’খানা বাংলা সিনেমা দেখা হল, তার মধ্যে ‘চৌধুরী পরিবার’ দু’বার। অসামান্য ছবি। আপনারা দেখার চান্স পেলে ছাড়বেন না। যেমন বিনোদনধর্মী, তেমন শিক্ষামূলক। স্বামীকে দিয়ে স্ত্রীকে শিক্ষা দেওয়া, চরিত্রবান ভাইকে দিয়ে মাতাল দাদাকে শিক্ষা দেওয়া, প্রেমিক দিয়ে বেচাল প্রেমিককে শিক্ষা দেওয়া, জামাইকে দিয়ে শাশুড়িকে শিক্ষা দেওয়া, স্কুলকলেজের চালকলাবাঁধা সিলেবাসের ফাঁক দিয়ে যতরকম শিক্ষা আমাদের হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে, অথচ এখন জীবনে চলার পথে প্রতিপদে সে সব শিক্ষার অভাব অনুভব করছি, সে সব আছে চৌধুরী পরিবার-এ। 

আপনার যদি এ সব শিক্ষায় রুচি না থাকে, আপনি যদি গতে বাঁধা, পুঁথিপড়া শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার জন্যও চৌধুরী পরিবার দেখা আবশ্যক। বা জি সিনেমা বাংলা-র অন্য সিনেমা। মাধ্যমিকে বাংলার নম্বর নিয়ে আমার গর্বের শেষ ছিল না, এদিকে হঠাৎ বড়লোক হওয়া বোঝাতে এতদিন সেই “আঙুল ফুলে কলাগাছ”/ “ধরাকে সরা”/ “সাপের পাঁচ পা” “দুইদিনের যুগী…” ইত্যাদি জরাজীর্ণ প্রবাদের চর্বিতচর্বণ চালাতাম। চৌধুরী পরিবার-এ জীবনে প্রথমবার শুনলাম এক চরিত্র আরেক চরিত্রকে তিরস্কার করছেন, “লম্বা লম্বা সিগারেট খেয়ে তুমি আজকাল বিড়ির স্বাদ ভুলে গেছ।”

এর থেকে উদ্ভাবনী এবং যথাযথ উক্তি আপনি অদূর, সুদূর, কোনও অতীতেই আর শুনেছেন কি? ভবিষ্যতেও শুনবেন না। গ্যারান্টি। শেখার পর থেকে গত তিনদিনে আমি ডায়লগটা অর্চিষ্মানের ওপর বারসাতেক প্রয়োগ করেছি, প্রত্যেকবারই অর্চিষ্মান দাবি করেছে যে নিশানা কানঘেঁষে গেছে। কিন্তু আমি তাতে দমছি না। 


June 04, 2017

পাঁচিল



মূল গল্পঃ The Railings
লেখকঃ Ronald Frame

*****

ছেলেটার ঘরের জানালা দিয়ে পাঁচিলটা দেখা যেত। প্রায় দু’মানুষ উঁচু, তার ওপর একহাত লম্বা কাঁটাতারের বেড়া। ঐকিক নিয়মের অংক কষতে কষতে, ইতিহাসের সনতারিখ মুখস্থ করতে করতে, কম্পাসের কাঁটা পাতার মাঝখানে বিঁধিয়ে বৃত্ত আঁকতে আঁকতে মনঃসংযোগ হারিয়ে মুখ তুলে তাকালেই ছেলেটা পাঁচিলটা দেখতে পেত। রান্নাঘরের জানালা, চিলেকোঠার জাফরি,  ঠাকুরঘরের ঘুলঘুলি থেকেও দেখা যেত পাঁচিলটা। অটল প্রহরীর মতো বাড়ি ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। রক্ষা করছে। 

রক্ষা করার মতো কিছু নাকি ছিল একসময়। কোথায় ছিল সে নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলে তিনতলার বড়ঘরের সিন্দুকটায়, এখন যার দরজা খুললেই ন্যাপথলিনের দমবন্ধ গন্ধের ঝাপট, আর যার গায়ে সাঁটা আয়নাটার সামনে হিসেব করে দাঁড়াতে পারলে কপালের ঠিক মাঝখানটায় তৃতীয়নয়নের মতো কমলা রঙের ছোপ, তার ভেতর নাকি ছিল সাত রাজার হিংসে করার মতো ষড়ৈশ্বর্য। কেউ বলে, ছিল চিলেকোঠায়, যার প্রতিটি ঘুলঘুলিতে এখন পায়রার বাসা, বুকবুক আওয়াজে কান পাতা যায় না। আবার কেউ বলে এসবের কোথাও না, ছিল আসলে পাঁচিলের ধারের ওই মরা জামরুল গাছের গোড়ায়। কালিচোষা তুলোট কাগজে সংকেত লেখা ছিল, কারা যেন খুঁজে পেয়ে খুঁড়ে নিয়ে চলে গেছে। 

মোট কথা, এখন আর পাহারা দেওয়ার মতো কিছু নেই। তবু পাঁচিল আছে, তারকাঁটাসহ। কী পাহারা দিচ্ছে কে জানে। সম্ভবত আব্রু। ষড়ৈশ্বর্য গেছে, রেখে গেছে আব্রু। আব্রু সবার থাকে না। যাদের থাকে তাদের তা যত্নে রক্ষা করতে হয়। পাঁচিলের বাইরে মাঝে মাঝে বেরোতেই হয়, না বেরোলে চলে না, তখন দেখেছে ছেলেটা, সত্যি, সবার বাড়িতে পাঁচিল নেই। বেশিরভাগেরই  রাস্তার সঙ্গে ঘর মিশে গেছে, কোনও পাঁচিল নেই, কাঁটাতারও না। থাকার দরকারও নেই। ওদের কোনওদিন ষড়ৈশ্বর্য ছিল না, আব্রুও না।

এই বেআব্রু লোকগুলোকে পাঁচিলের ভেতরের লোকজন পছন্দ করত না। ছেলেটা জন্মে থেকে দেখছে এই বেআব্রু লোকগুলো। জামরুল গাছের নিচে পোঁতা সোনার মোহরের মতো সে স্বর্গেরও শুধু  গল্পই শুনেছে ছেলেটা, যখন এরা ছিল না। পদে পদে আব্রু খোয়াবার ভয়ও ছিল না। তারপর একদিন রেলস্টেশন আর স্টিমারঘাট আর তারকাঁটাহীন মাঠঘাট পেরিয়ে পিলপিল করে এসে ঢুকল এরা, যেখানে পারল খুঁটি পুঁতে বসে পড়ল। এ বাড়ির আব্রুও যেত, যদি না পাঁচিলটা থাকত।

পাঁচিলটা কিন্তু রইল না আর বেশিদিন। সরলের সিঁড়ি ভেঙে ততদিনে ত্রিকোণমিতিতে কিশোর, খবর এল, পাকা রাস্তা যাবে। ওই বেআবরু বাড়িগুলোর বারান্দার ওপর দিয়ে, আর এই পাঁচিলের ওপর দিয়েও। ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে সবাইকে। পাঁচিলের এপারের লোকগুলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সরকারি আদেশ বুঝিয়ে কাগজের তাড়া গুছিয়ে উঠে পড়ার আগে সে দৃষ্টির অর্থ উদ্ধার করতে না পেরে ঘেমো শার্ট, কেঠো চোয়াল জিজ্ঞাসা করল, “কিছু বলবেন?”

কী বলবে? বললেই বা কী বুঝবে এসব লোকেরা, আব্রু যাদের ছিলই না কোনওদিন? ক্ষতিপূরণ তো জমির, পাঁচিল গেলে আব্রু যে চিরকালের মতো উদোম হয়ে যাবে, সে ক্ষতি পূরণ করবে কে? কী দিয়ে?

কিশোর দাঁড়িয়ে ছিল পড়ার ঘরের জানালায় যখন গাঁইতি, হাতুড়ি নিয়ে ওরা এল। পাঁচিলের গোড়ায় বাড়ি পড়ল, ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই। পাঁচিল প্রথমে অটল রইল। মনে হতে লাগল, লড়াই নিতান্ত একপেশে। ওদের লোহার হাতুড়ি শাবল যেন শোলার খেলনা। তারপর ক্রমে পাঁচিল টলতে শুরু করল, প্রতিটি আঘাত যেন একেকটা আর্তনাদ, বাড়ি কেঁপে কেঁপে উঠল, সারাবেলার যুদ্ধের পর শেষ আব্রুটুকু উজাড় করে দিয়ে পাঁচিল ঝুরঝুর করে ধসে গেল।

পাঁচিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল ছেলেটা। কিশোরেরই বয়সী কিন্তু ওর থেকে অনেক বেশি সুঠাম আর শক্তিশালী। হাতের গাঁইতিটা নিশ্চয় ভীষণ ভারি, অথচ ছেলেটার হাতে ঘাসের মতো পোষ মানা। ছেলেটার ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনও আবরণ নেই। কালো চামড়ার নিচে পেশির ঢেউ। গাঁইতি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দু’হাত কোমরের দু’পাশে রেখে সম্রাটের মতো দাঁড়াল ছেলেটা। সারা গা চকচক করছিল ঘামে, কপালের ওপর পড়া চুল ধুলোয় ধূসর। পাঁচিলের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে ছেলেটা হাসছিল। ধপধপে দাঁত। ঝকঝকে হাসি। 

জানালার পাশে সেদিন থেকে ঘনঘন এসে দাঁড়াত কিশোর। ছেলেটা কোদাল দিয়ে ভাঙা ইটের টুকরোগুলো তুলত ঝুড়িতে, মাথায় চাপিয়ে ফেলে দিয়ে আসত অদূরে দাঁড়ানো টেম্পোয়। মাথা ঝাঁকিয়ে, সারা শরীর কাঁপিয়ে হাহা করে হাসত ছেলেটা, বাগান পেরিয়ে, পাইপ বেয়ে, কার্নিশে পা রেখে সে দুরন্ত হাসি জানালা টপকে ঢুকে যেত কিশোরের কানে। শেষ ঝুড়ি পাঁচিলের ইট যেদিন উঠে গেল টেম্পোয়, সেদিন কিশোর সারাদিন দাঁড়িয়ে রইল জানালার দিকে, বার বার গুঁড়ো গুঁড়ো কী সব ঢুকে যাচ্ছিল ওর চোখে, চোখ জ্বালা করছিল। ছেলেটা পাঁচিলের শেষ টুকু ঝুড়িতে নিয়ে টেম্পোতে তুলে দিয়ে এল। চেঁচিয়ে বলল, “আসছি।” তারপর রাস্তা তৈরি করার জন্য এনে রাখা নতুন ইটের পাঁজার ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে শার্ট নিয়ে পরতে পরতে, এই প্রথমবার, পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল জানালার দিকে। কিশোরের ইচ্ছে হল দৌড়ে পালায়, কিন্তু ছেলেটার বড় বড় চোখদুটো যেন বঁড়শি, বিঁধে গেছে ওর বুকের ভেতর। টেম্পো স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে ওদিকে, দৌড়ে চলে যেতে যেতে আরেকবার পেছন ফিরে তাকাল ছেলেটা। 

***** 

বাড়ির লোক ছবি এনে দিলেন। ভাবলেশহীন চোখ বোলাল যুবক। ছবি থেকে একটি মেয়ে, সমান ভাবলেশহীন চোখে ওর চোখে চোখ ফেলে রইল। চোখ দেখে যুবকের সন্দেহ হয়েছিল, অন্যেরা সে সন্দেহ নিরসন করল। মেয়েটাও একটা উঁচু পাঁচিলের ওপারে বড় হয়েছে। রাজযোটক, বলল সবাই।

ছবির মিছিল চলছিল বছরকয়েক ধরেই, যুবক এড়িয়ে যাচ্ছিল। প্রথম প্রথম এই এড়িয়ে যাওয়াটাকে প্রশংসার চোখে দেখত সবাই। বলত, জানা ছিল আগেই, ও অন্যদের থেকে আলাদা। কিন্তু বারবার এড়াতে এড়াতে কারও কারও মনে প্রশংসার ভেতর একটা সন্দেহ কাঁটার মতো জেগে উঠছে, টের পাচ্ছিল যুবক। তবে কি যেটা আড়ালেআবডালে সন্দেহ করা হয়েছে তা-ই? ও কি সত্যি আলাদা অন্যদের থেকে? ওর তাকানো, ওর দাঁতে নখ কাটার অভ্যেস, ‘স’ উচ্চারণ করার সময় ওর ঠোঁটের একটা বিশেষ ভঙ্গিতে বেঁকে যাওয়া, অবিকল ওর পিসতুতো বোনের মতো, যার সঙ্গে ছোটবেলায় পুতুল খেলে ওর বেশিরভাগ সময় কেটেছে?  যুবক সতর্ক হল। আর দেরি করা উচিত হবে না।

সেন্টের গন্ধ আর চেলির খসখস আর ডেকোরেটরের ফ্যানের ঝড়ের মতো গরম হাওয়ার ঘূর্ণির মধ্যে বসিয়ে এক বৈশাখের গোধূলিতে যুবকের হাতের ওপর সেই ভাবলেশহীন মেয়েটির হাত, যার নাম, যুবক জেনেছে, জবা, স্থাপন করে দেওয়া হল। জবার আংটির কানা বিঁধছিল যুবকটির হাতে। গরমে, ভয়ে, ঘেমে যাচ্ছিল যুবকের হাতের তালু, ইচ্ছে করছিল এক্ষুনি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে এই সব দড়িদড়া খুলে দৌড়তে, কিন্তু বাস্তবে যুবক কাঠের মতো বসে রইল কল্কা আঁকা পিঁড়িতে, আর পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দুজনের দুটি হাত, বেশ করে বেঁধে দিলেন। 

পরদিন সকালে, কিংবা সন্ধ্যেয়, যুবকটি ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল ততক্ষণে, একদল শ্যালিকা হাসিতে গড়িয়ে পড়তে পড়তে, বয়স্কা আত্মীয়াদের ঠোঁটচাপা চোখটেপা প্রশ্রয়ে এগিয়ে এসে যুবকটির হাতে গুঁজে দিল পাঁচটি ফলের বীজ। বলল, এই নাও, ভালো করে বুনে দিও জমিতে। আবার হাসি। যুবকের গরম হয়ে যাওয়া কানের পর্দায় খনখন করে সে হাসি বাজল। 

যথাসময়ে বীজ থেকে ফল হল। এ বাজারে কেউ পাঁচটা ফল আশা করে না, একটির পরই সবাই শান্ত হল। তাছাড়া ভাগ্যদেবী মুখ তুলে চাইলেন, প্রথম দানেই ছেলে উঠল, দ্বিতীয় সন্তানের প্রত্যাশা বা জোরাজুরি কেউ করল না। দায়িত্ব সেরে, সকলের চোখের আড়ালে দাম্পত্যবিছানা থেকে নিজের বালিশখানা নিয়ে সরে পড়ল লোকটা। 

*****

উড়ো ফোনের খবরে, শহরের এক ঘিঞ্জি গলির এক ঝুরঝুরে বাড়ির সারি সারি ঘরের একটার দরজা লাথি মেরে ভেঙে বুড়োটার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলল পুলিস। বুড়োটার নিচে চাপা পড়ে ছিল একটা অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক। যে অফিসার রেডের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, ঠিক ওই বয়সী তাঁর একটা ছেলে আছে বাড়িতে। ছেলের সামনে উচ্চারণ করার কথা কল্পনাও করতে পারেন না, এরকম একটা অশ্রাব্য গালি দিয়ে অফিসার তাঁর পালিশ করা বুট বিঁধিয়ে দিলেন বুড়োটার পাঁজরে। তাঁর লোকেরা কাতরাতে থাকা বুড়োটাকে কলার ধরে টানতে টানতে নিয়ে জালঘেরা ভ্যানে তুলে দিল।

সবাই অবশ্য এই অফিসারের মতো হয় না, কারও কারও মনে দয়ামায়া থাকে। যেমন বিচারের পর বুড়ো যে জেলে এল সেখানকার ভারপ্রাপ্ত অফিসার। কলেজে তাঁর পাসে সাইকোলজি ছিল। শান্ত, নিরীহ, ভীতু বুড়োটাকে দেখে তাঁর দয়া হল। ক্রিমিন্যাল টাইপ নয়। বুড়োটা যখন বাগানে কাজ করত, তখন তিনি মাঝে মাঝে বুড়োটার কাছে যেতেন। বুড়োটা ভয় পেয়ে দ্বিগুণ জোরে মাটি কোপাতে লাগত, তিনি অভয় দিতেন। বুড়োটার সঙ্গে গল্প করতেন। বলতেন, এই যে এইসব অপরাধ, যে অপরাধে বুড়োটা ধরা পড়েছে, সেগুলোর দায় আসলে দোষীদের নয়। এর বীজ পোঁতা হয় অনেক শুরুতে, অনেক গভীরে। বুকের মধ্যে রুদ্ধ কামনার ফেনা জমতে জমতে একদিন ফেটে বেরোয়। আমাদের দেশে তো সচেতনতা নেই, বলতে বলতে তাঁর মুখে আফসোসের ছায়া ঘনাত, না হলে কাউনসেলিং-এ সব সারে। বুড়োটাকে উৎসাহ দিতেন অফিসার। বলতেন, এখনও সময় আছে, শুধু মন খুলে দিতে হবে। চেতন অবচেতনের মাঝের পাঁচিল ভেঙে দিতে হবে।

মনস্তত্ত্বের ক্লাস শেষ করে অফিসার ফিরে গেলে বুড়োটা হাতের খুরপি রেখে জিরোত। জেলের বাগানের কোণে একটা জামরুল গাছ, তার ছায়ায় বসে গামছা নেড়ে ঘাম শুকোত। চোখ লেগে আসত কখনও কখনও। আধোঘুমে বুড়োটা স্বপ্ন দেখত কাঁটাতারের বেড়াওয়ালা একটা উঁচু পাঁচিলের। জীবন্ত। স্বপ্নে পাঁচিলটা ক্রমশ উঁচু হতে থাকত, উঁচু আরও উঁচু, আরও উঁচু। ঘাড় ব্যথা হয়ে যেত বুড়োর, তবু মাথা দেখতে পেত না। পাঁচিলের ওধারে একটা ঘামচপচপে কালো ছেলে, একলা একটা শাবল নিয়ে পাঁচিলটার গায়ে শুধু অক্লান্ত বাড়ি মেরে চলত, ঠাঁই, ঠাঁই, ঠাঁই… 



June 02, 2017

গত সাত বছরে



কাল চিরাগ দিল্লির সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আমি সেই কাজটা করলাম, যেটা দু’হাজার নয়ের সেপ্টেম্বর মাস থেকে এই দুহাজার ষোলোর মে মাস পর্যন্ত, গত সাত বছরে কখনও করিনি। 

বললাম, “একটা পোস্টের আইডিয়া দাও না গো।”

ও-কারের শেষটুকু ঠোঁট ছাড়ার আগেই সম্বিত ফিরল। এটা আমি কী করলাম! অবান্তরের সবথেকে অপরিহার্য নিয়মটাই ভেঙে ফেললাম? গত সাত বছরের শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্ত পেরোতে পেরোতে একটিই সত্যকে আমি ধ্রুব রাখতে চেয়েছি। অবান্তরকে ‘টিমওয়ার্ক ফ্রি’ জোন রাখতে চেয়েছি। অফিসে, সংসারে, উবারপুলে, টিমওয়ার্ক যত বুকের ওপর চড়ে গলা টিপে ধরেছে তত আমি প্রাণ পণ করেছি অবান্তরকে রাহুমুক্ত রাখার। অবান্তর আমার ছাগল, তাকে আড়ে কাটব না বহরে কাটব শুধু আমার এক্তিয়ার। আমার একার ক্ষমতায় যতটুকু কুলোবে, যেমন কুলোবে, অবান্তর ততটুকুই, তেমনই চলবে। 

কিন্তু সত্যি সত্যি কি টিমওয়ার্ক ছাড়া কিছু দাঁড়ায়? পোস্ট আর কমেন্টের যুগলবন্দী ছাড়া ব্লগ কী? তাহলে আর ইন্টারনেটে কেন, ডায়রি কিনে মনের কথা লিখলেও হয়। অ্যাকচুয়ালি তাও হয় না, আমার কোটি কোটি ডায়রির সবগুলোই কোনও না কোনও সময় কারও না কারও হাতে পড়েছে। বেস্ট হয় মনের কথা মনেই রেখে দিতে পারলে। 

অবান্তরের পাঠকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমি অনেককে জানি যারা আমার পোস্ট না পড়ে বা পড়ার পরে দ্বিগুণ উৎসাহে কমেন্ট পড়েন। কিন্তু কমেন্ট আর পোস্টের মাঝখানে ‘পাবলিশ’ নামের একটি নিশ্ছিদ্র দেওয়াল থাকে, তার ওপারে পাঠক আমার গুণগান করুন, গালি দিন, সাপের বদলে ব্যাঙ বেরোতে দেখে হতাশ হন, সে তাঁদের অভিরুচি, অধিকার। তার ওপর আমার হাত নেই। ঠিক যেমন কারও হাত নেই পাবলিশ হওয়ার আগে অবান্তরে কী ঘটছে তার ওপর।

পাঠকের না, অর্চিষ্মানের না, মায়েরও না।

আর সেই আমি কি না আইডিয়া ধার চাইছি?

অনেক খুঁজে একটাই সান্ত্বনা বেরোলো, যে ধারটা অন্তত অর্চিষ্মানের কাছে চেয়েছি। আমি নিজেকে বুঝিয়ে রেখেছি, অর্চিষ্মানের সঙ্গে করা গসিপগুলো গসিপ নয়। আপাদমস্তক ইনকারেক্ট ভাবনা, যেগুলো নিজের মায়ের কাছে বলার সাহস আমার হবে না এবং আমার মা আমাকে বললেও আমি তাঁকে ঘোরতর জাজ করব, সেগুলো অর্চিষ্মানের কাছে উন্মুক্ত করা, সামহাউ, ক্ষমাযোগ্য। অর্চিষ্মানের উদ্দেশ্যে বলা কথা আসলে আমার মনে মনে ভাবারই সামান্য এক্সটেনশন। 

কিন্তু এসব সান্ত্বনা, সান্ত্বনাই। সত্যিটা হল, আমি আমার সাতবছর আগলানো দুর্গের মুখ খুলে দিয়েছি, এবার তেড়ে বন্যার জল ঢুকলে আমি ছাড়া দোষারোপ করার কেউ নেই।

দ্রুত ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামতে হল। আর এতে সাহায্য করল আমার আর অর্চিষ্মানের দুজনেরই চরিত্র, যা সম্পূর্ণ বিপরীত কিন্তু এই সব মুহূর্তে পারফেক্ট পরিপূরক। 

অর্চিষ্মানের যে ব্যাপারটা সাহায্য করল, সেটা হল ওর উত্তর দেওয়ার আগে ভাবার স্বভাব। আমি যেমন প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই “ওহ, এটা তো আমি জানি” বলে লাফিয়ে উত্তর দিতে শুরু করি, ও ঠিক তার উল্টো। প্রশ্নটা শোনে, ভাবে, তারপর উত্তর দেয়। এতে উত্তরের কোয়ালিটি তো ভালো হয়ই, তাছাড়া আমার মতো প্রশ্নকর্তার পক্ষেও, যিনি সাতপাঁচ না ভেবে প্রশ্ন করেছেন, ভালো হয়, কারণ তিনি কথা ঘোরানোর সুযোগ পান। 

আর আমার না ভেবে কথা বলার ক্ষমতাটাও কাজে লেগে গেল। সিগন্যাল যতক্ষণে সবুজ হল ততক্ষণে আমি অবান্তর থেকে ওয়েদার হয়ে শনিরবি কী কী ‘ফান থিংস’ করা যেতে পারে, কথোপকথন সেখানে নিয়ে গেছি। দুজনে মোবাইল খুলে ‘ডেলহিইভেন্টস ডট কম’ পরীক্ষা করছি, আমার মাথার মধ্যে একটা গলা বলে চলেছে, "মাগো, কী বাঁচাই না বাঁচলাম।" 

*****

বলা বাহুল্য, অর্চিষ্মানের সাজেস্ট করা বিষয় নিয়ে অবান্তর লিখলে কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হত না। কথাটা সেটা নয়। কথাটা হচ্ছে, সাত বছর ব্লগ লেখার পরও এমন মুহূর্ত আসে, যে পরের পোস্ট কী নিয়ে লিখব সেটা ভেবে পাওয়া যায় না। এমন নয় যে মুহূর্তগুলো ক্বচিৎকদাচিৎ আসে। ঘনঘন আসে। সপ্তাহের শুরুতে, মাঝে, শেষে আসে। প্রতিটি পোস্ট ছাপা হওয়ার পরেই আসে। 

এসে দু’হাত বুকের সামনে আড়াআড়ি ভাঁজ করে, ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকায়। বলে, "এটা তো নেমে গেল, এরপর? আর ভাণ্ডারে কিছু আছে? নাকি দোকান বন্ধ করার সময় এসে গেছে?"

কখনও সামান্য চিন্তা হয়। সত্যি, কী নিয়ে লিখব? এই যে বুদ্ধিমান পায়রাটা আমার নাকের সামনে দিয়ে উড়ে চলে গেল, নিজের জীবন সহজসরল রেখেছে, ব্লগ খুলে ঝঞ্ঝাট বাড়ায়নি, একে নিয়ে লিখব? এই যে লিফট-এ চেপে উঠছি, লিফট নিয়ে লিখব? কখনও পুরোদস্তুর প্যানিক সেট ইন করে। পাগলের মতো স্মৃতি হাতড়াই, লিফটে বলার মতো কিছু ঘটেছিল কি? কখনও কি কোনও টল ডার্ক হ্যান্ডসামের সঙ্গে বন্দী হয়ে পড়েছিলাম, বা লিফটে চড়ে জীবনের কোনও সারসত্য উপলব্ধি হয়েছিল? নাথিং। লিফটে বলার মতো একটাই ঘটনা ঘটে আমার সকালবিকেল, সেটা হচ্ছে দূর থেকে অফিসের চেনা লোক লিফটে উঠছে দেখলে হয় স্পিড কমাতে হয়, নয় গতিপথ বদলাতে। আর সে সব কিছুই করার সুযোগ না থাকলে দাঁত বার করে বলতে হয়, ডাক্তারের আদেশ। তারপর লিফটের বদলে ভাঙো পাঁচতলা সিঁড়ি। 

বোরিং লোকের ব্লগ লেখার এটাই সমস্যা। নিজেকে রসদ করে ব্লগ চালাতে গেলে আমি আজ সকালে ঘুম থেকে উঠলাম, খেলাম, অফিসে এলাম, এসে বসের ধাতানি খেয়ে মুখ হাঁড়ি করলাম, দিনের পর দিন এই চর্বিতচর্বণ করে যেতে হয়। তাতে অসুবিধে কিছু নেই, এরকম ব্লগ অনেকেই লেখেন এবং আমার পড়তেও দিব্যি লাগে। তবে আমার ধারণা ক্রমাগত এসব লিখতে লিখতে আমি নিজেই বোর হয়ে যাব। বেশিদিন এইসব লেখা যায় না, ঠিক যে কারণে বেশিদিন ডায়রি লেখা যায় না। 

তখন হয় আইডিয়ার অপেক্ষা করতে হয়, নয় ইমপ্রোভাইজ করতে হয়। কুইজ, কোটেশন, সাপ্তাহিকী হ্যানাত্যানা। এসব হাজার শব্দের ট্র্যাডিশনাল পোস্টের বিকল্প নয়, পাঠককে এসব দিয়ে বোকা বানানো যায় না। তবু মনে হয় ফাঁকা জায়গা তো খানিকটা ভরল। এই ভরাতে ভরাতেই হয়তো পরের আইডিয়াটা মাথায় আসবে।

আসেও। গত সাত বছরে কখনও হতাশ করেনি। সেগুলো আইডিয়া হিসেবে কেমন তার বিচার আমি করছি না, আমার পক্ষে করা সম্ভবও নয়। হাজার শব্দ লিখে যাওয়ার মতো কিছু একটা হলেই আমার মতে যথেষ্ট। তবু গোটা মন মানে না। লেখার সময় অর্ধেক মন ছি ছি করে, বোরের হদ্দ হয়, হাই তোলে। বলে "তুলে নাও মা, এ যমযন্ত্রণা জন্মের মতো ঘোচাও।" অন্য অর্ধেক বলে "ঘাবড়াও মৎ, লিখতে থাকো।" আমি সদাসর্বদা এই দ্বিতীয় মনটার কথা শুনি। যেমন আজ শুনলাম।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.