December 28, 2018

কর্ডলেস




দিল্লিতে যে রেটে ঠাণ্ডা পড়েছে তাতে আমরা প্রায় রুম হিটারের ওপর চড়ে বসে আছি বলা যায়। কোনদিন না গায়ে আগুনটাগুন লাগে। আগে আমাদের একটা ঊষা কোম্পানির ব্লোয়ার ছিল, গোঁ গোঁ শব্দে প্রবল বেগে গরম হাওয়া ছাড়ত। সেটার ভালো ব্যাপার ছিল যে অত্যন্ত দ্রুত অত্যন্ত বেশি গরম হত, কিন্তু খারাপ ব্যাপার ছিল যে গরম হত অতি অল্প জায়গা। যেখানে যেখানে হাওয়া পৌঁছচ্ছে শুধু সেইখানটাই গরম। যথার্থেই পোর্টেবল ব্লোয়ার। সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে না ঘুরলে উষ্ণতার আশা নেই। 

বছরদুয়েক আমাদের রুম হিটিং অবস্থার আপগ্রেড হয়েছে এবং আমরা একখানি অয়েল-ফিলড রুমহিটারের মালিক হয়েছি। সে হিটার অতি স্বাস্থ্যকর উপায়ে ঘর গরম করে অর্থাৎ কি না অনেকক্ষণ চালিয়ে রাখলেও বোঝা যায় না আদৌ গরম হচ্ছে কি না। প্রথমে হাহাকার করেছিলাম। পয়সা নষ্ট হল, কিছুই গরম হচ্ছে না।  তারপর একদিন ঘোর শীতে একমুহূর্তের জন্য দরজা খুলে পাশের ঘর থেকে খবরের কাগজ না কী একটা আনতে গেছি, হিটার থাকা না থাকায় তফাৎটা স্বমহিমায় প্রকাশিত হল। 

আমাদের নতুন বাড়ির সব ভালো কিন্তু ইনসুলেশন অকথ্য। শবাসনে শুলে বুঝতে পারি দরজার তলা দিয়ে ফুরফুরিয়ে হাওয়া ঢুকছে। বাইরের ঘরে তিনটে দরজা, দুটো জানালা এবং হিটারহীন ঘরটার টেম্পারেচার মোটামুটি মেলা গ্রাউন্ডের সমান হয়ে থাকে। অসুবিধে নেই, বাইরের ঘরে যাওয়ার আমাদের বিশেষ প্রয়োজন হয় না। খালি কারিগাছে জল দিতে যাওয়ার সময়, বারান্দায় জামাকাপড় মেলতে আর তুলতে যাওয়ার সময় আর ফোনে কথা বলার সময় ছাড়া। 

আমাদের বাড়ির ভেতরে মোবাইলের কানেকশন পাওয়া যায় না এবং সে জন্য একখানা ল্যান্ডলাইন নেওয়া হয়েছে সে খবর লিখেছি অবান্তরে। ওই ল্যান্ডলাইনখানা রয়েছে বাইরের ঘরে। কর্ডলেসও না যে এ ঘরে নিয়ে এসে কথা বলব। 

কর্ডলেস ফোন কিনিনি কেন? কিংবা শোওয়ার ঘরে ফোনের কানেকশন বসাইনি কেন? নানারকম কারণ আছে। অন্তত তখন ছিল। তারে তারে বাড়ি অলরেডি ছয়লাপ, আর তার না জোটানোর জন্য। কোনও একটা সিদ্ধান্ত যখন নেওয়া হয় তখন তার পক্ষে যুক্তির অভাব থাকে না। যে সিদ্ধান্ত যত বেশি ভুল হতে চলেছে তার পক্ষে যুক্তি তত অকাট্য হয়, এ আমি খেয়াল করে দেখেছি। না পড়ার সময় মনে হয় সি জি পি এ ধুয়ে জল তো খাওয়া যাবে না, এই যে রাত তিনটের সময় মাঠে বসে গাইছিও না, গানের সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ছি, এটাই মানুষ হওয়ার আসল শিক্ষা। প্রেম করার সময় প্রেমিকের সাজিয়ে কথা বলতে পারাটাকেই প্রেম করার পক্ষে যথেষ্ট বোধ হয়। এমনকি কর্ডলেস না কেনার পক্ষে উঠে গিয়ে ফোন না ধরার বাসনাকে চারিত্রিক দুর্বলতা এবং শিরদাঁড়ার অভাব বোধ হয়েছিল। 

সে সব মে জুন মাসে।

এখন ডিসেম্বরের শেষ এবং এখন ওই ঘরের প্রতিটি সারফেস মনে হয় বরফজলে চুবিয়ে তোলা হয়েছে। ফোনও এমন ঠাণ্ডা হয়ে থাকে যে কানে ঠেকিয়ে কথা বলা যায় না, দু’ইঞ্চি দূরে ধরে কথা বলতে হয়। সবেরই ভালোমন্দ আছে। চট করে ‘হ্যালো কেমন আছ, ভালো করে খাচ্ছটাচ্ছ তো’ বলেই ‘আচ্ছা রাখছি’ বলে ক্ষান্ত দিতে হয়। গুছিয়ে বসে পরনিন্দা পরচর্চা করার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। বাধ্য হয়ে ভারচুয়াস জীবনযাপন। 

কিন্তু ভারচুয়াস হব বললেই তো হওয়া যায় না। শুধু তো মা বাবা তিন্নি নয়, আরও নানারকম ফোন আসে। জরুরি ফোন। জলওয়ালা ফোন করেন, মুদির দোকানের ডেলিভারি নিচে এসে ওই নম্বরেই ফোন করেন, পিৎজাওয়ালারাও করেন। আজকাল যাই অর্ডার করি না কেন, স্পেশাল ইন্সট্রাকশনে লিখে দিই যে আমাদের ল্যান্ডলাইনে ফোন করতে হবে। ঠাণ্ডায় ফোন ধরতে পারছি না বলে ডমিনোজের ব্যবসা বন্ধ হতে দেওয়া যায় না। স্থির করলাম এই ছুটিতেই কর্ডলেসের ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। আমি আর অর্চিষ্মান দুজনেই চব্বিশে ডিসেম্বর, সোমবার ছুটি নিয়েছিলাম, কাজেই বড়দিনের ছুটিটা বেশ লম্বা হয়েছিল। কোথাও যে বেড়াতে যাব না তাও স্থির ছিল। ঘরে বসে একেবারে গব্য বিশ্রাম। তবে ভেবেছিলাম আমরা কর্মিষ্ঠ লোক, একটানা চারদিন কি আর শুয়ে থাকতে ভালো লাগবে? ফাঁকে ফাঁকে কিছু কাজ করে ফেলব, যেমন নেহেরু প্লেসে ঘুরে ঘুরে কর্ডলেস কেনা, ভাঙা ল্যাপটপগুলো ই-ওয়েস্টের লোকেশনে পৌঁছে দিয়ে আসা ইত্যাদি। ছুটি দু’দিন ফুরোতে টের পেলাম স্নানখাওয়া ইত্যাদি নিত্যকর্মপদ্ধতি ছাড়া আমরা বাকিটা সময় খাটে লেপের তলায় অনুভূমিক অবস্থান থেকে নড়িনি, ফোন কিনতে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। অনলাইন অর্ডার করলাম। অর্চিষ্মান বুদ্ধি খাটিয়ে আমাজন প্রাইম নিয়ে রেখেছে, পরদিনই এসে গেল। 

সেট আপ করে, লেপের তলায় পা ঢুকিয়ে, একটুকরো ফ্রুটকেক আর এককাপ ইংলিশ ব্রেকফাস্ট নিয়ে হিটারটাকে কানের সামনে নিয়ে এসে বসে, মায়ের নম্বর টিপলাম। মা তুললেন। হাঁটুর ব্যথার খবর নিয়ে, চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, তারপর? গসিপটসিপ কিছু আছে নাকি? মা জানালেন, আছে, কিন্তু দু’হাজার উনিশে তাঁর রেজলিউশন হচ্ছে সমস্ত রকম ক্ষুদ্রতামুক্ত হয়ে উন্নত জীবনযাপন করা। কাজেই গসিপ থাকলেও তিনি সে নিয়ে চর্চায় আগ্রহী নন। বরং রেজলিউশন রক্ষার্থে লাইব্রেরি থেকে যে জ্ঞানযোগের বইখানা তুলে এনেছেন, আমার যদি আর কোনও কাজের কথা না থাকে তাহলে তিনি সে বইয়ে মনোনিবেশ করবেন। এই না বলে ফোন কেটে দিলেন। অর্চিষ্মান হিটার জড়িয়ে ফ্যাচফ্যাচ হাসতে লাগল।



11 comments:

  1. গসিপহীন জীবন আর আলুহীন বিরিয়ানির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। তার ওপর জ্ঞানযোগ...!
    বাঁচোয়া এটাই যে নিউ ইয়ার্স রেজলিউশনের মেয়াদ মকর সংক্রান্তি অবধি চলে। গরম পড়লেই, খবরের কাগজের ভাষায়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, আমিও সেই আশাতেই আছি, ঋজু।

      Delete
  2. Kuntala,

    Sobar agey maf cheye nichhi apnar lekha tey niyomito comment na korar jonnyo. Kintu bhabben na tate apnar ekjon pathok komechhey, ami chupi chupi ese pore chole jai, prothom diner motoi mugdho pathok hisabe ... karone okarone comment kora hoye othey na.

    Kintu aaj hotath ekta somossya tey pore mone holo, sob theke authentic uttor apnar thekei pabo. Tai birokto korchhi.

    Gotokaal ekjoner sathey addar majhe katha othey Narayan Sanyal er kanta series niye. Kanta series er besh kichu golper plot o namkoron hubuhu Agatha Christie er novel theke neoa. Amar bondhu bolechhen, kono boi e narayan sannyal ta swikar koren ni.
    Ami Kanta series er boi e Koifiyot e dekhechhi uni ta swikar korechhen, kintu individual boi gulor khetre ki ta bola chhilo? eta i amar proshno. Khub boka boka, oproyojoniyo proshno, kintu kichhutei mene nite parchhhi na priyo lekhok swamporke erokom opobad.

    Boddo beyara abdar - manchhi, kintu apni jodi kichhu janen, please bolben?
    Birokto korar jonnyo khub dukkhito.

    Ar hya, apnar lekha niye kichhu bolbo na ... somoy er sathey sathey bhishon sukho pathyo hoye uthechhey.
    Bhalo thakben.

    -- Atmodip

    ReplyDelete
    Replies
    1. আত্মদীপ, খুবই ইন্টারেস্টিং কমেন্ট। এবং বেশ অনুপ্রেরণাদায়ীও বটে। আমি একটু আগেই বসে বসে ভাবছিলাম দু'হাজার উনিশে কোন কোন গোয়েন্দাকে রি-রিড করতে হবে। আপনার কমেন্ট পড়ে লিস্টে পি কে বাসু, বার এট ল-র নামটা ঢুকিয়ে নিলাম।

      আপনার বন্ধু সম্ভবত: ঠিক। ইন্ডিভিজুয়াল বইয়ের ক্ষেত্রে নারায়ণ সান্যাল অনুপ্রেরণার কথা স্বীকার করেননি। সোনার কাঁটা বইয়ের শুরুতে একটা কৈফিয়ত আছে, কিন্তু সেটা ক্রিস্টির নামকরণ সংক্রান্ত নয় (হওয়ার কারণও নেই; সোনার কাঁটা-র কাছাকাছি নামের কোনও গল্প ক্রিস্টি লেখেননি। কৈফিয়তটা মূলত: পি কে বাসু চরিত্রের পেছনে স্ট্যানলি গার্ডনারের উকিল-গোয়েন্দা পেরি মেসনের উপস্থিতি সংক্রান্ত।) এই কৈফিয়ত অন্য গল্পগুলোর ক্ষেত্রে পুনরুল্লিখিত হয়েছে মনে হয় না।

      কিন্তু মোটের ওপর তাঁর গোয়েন্দাকাহিনীর পেছনে যে প্রভূত লেখকের অবদান আছে সেটা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন নারায়ণ সান্যাল। পি কে বাসু সিরিজের নামে তো ক্রিস্টির গল্পের প্রভাব আছেই (যেমন, অ আ ক খুনের কাঁটা বোঝাই যাচ্ছে এ বি সি মার্ডার থেকে নেওয়া হয়েছে, সারমেয় গেণ্ডুকের কাঁটা-নামের পেছনে ডাম্ব উইটনেস-এর ছায়া জ্বলজ্বল) নাম ছাড়াও এ গল্পগুলোর প্লটও প্রায় কাঁটায় কাঁটায় (!) এক। পরে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছে রইল।

      টেলিপ্যাথি কাকে বলে, এই পেরি মেসনের টেলিভিশন রূপান্তর, যেটাতে নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন রিচার্ড বার আর যেটা উনিশশো সাতান্ন থেকে ছেষট্টি পর্যন্ত সি বি এস-এ প্রসারিত হয়েছিল, সেটা গত ক'দিন ধরে ইউটিউবে গোগ্রাসে গিলছি।

      Delete
    2. :(

      এই উত্তরটা আশা করি নি একদম । তবে আপনার বিশদ আলোচনার অপেক্ষায় রইলাম।

      অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

      Delete
  3. Haha.. gyanjoge puro bowled hoye gecho..

    ReplyDelete
  4. হাহাহা , দারুন দিয়েছেন এটা উনি । জ্ঞানযোগ তো মুষ্টিযোগ হয়ে আছড়ে পড়েছে ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. এটা ভালো বলেছ, প্রদীপ্ত, মুষ্টিযোগই বটে।

      Delete
  5. কুন্তলার মা আর কয়েকদিন পরেই সেলিব্রিটি হবেন (দুএক দিন আগে ফেসবুকে একজনের পাতায় এখান থেকে একটা লেখার খন্ডাংশ দেখলুম) - কিন্তু এই লেখাটার উপসংহার এযাবৎ কালের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিল | উনি দীর্ঘজীবী হোন |

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, থ্যাংক ইউ, অনিরুদ্ধ।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.