September 10, 2017

যকের ধন




উৎস গুগল ইমেজেস


সিনেমার টিকিট কাটার সময় আমাদের সর্বদা প্রায়োরিটি থাকে, সাধ্যে কুলোলে, হলের শেষ সারির টিকিট কেনার।

আপনারা যে কারণে ভাবছেন, সে কারণে নয়। 

সিনেমা হলের সবথেকে পেছনের সারির টিকিট কেনার আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য, আমার সিটের পেছনে ক্রমাগত কেউ যাতে লাথি না মেরে যেতে পারে সেটা সুনিশ্চিত করা। যাতে অবশেষে আমাকে পেছন ফিরে অনুরোধ করতে না হয়,“দাদা/দিদি/ভাই/বোন, এই বেলা একটু ক্ষান্ত দিন।” যাতে তারপর একটা বিশ্রী, আড়ষ্ট অস্বস্তি মনমাথা না ছেয়ে থাকতে পারে।

আপনারা হয়তো মনে করছেন আমি একটি রগচটা সহদর্শক, পায়ের ভাঁজ খুলে এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে যেতে গিয়ে একবার আলতো খোঁচা লাগলেই খাঁড়া নিয়ে লাফিয়ে পড়ি। আফটার অল, সেই প্রবাদটা তো আছেই, সারাদিন যদি আপনার সবাইকে দেখে গা জ্বলে তাহলে দোষটা বাকিদের থেকে আপনার গায়ের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

কাজেই আমাকে যদি সব হলে, সব সিনেমার, সব শোতে কেউ না কেউ লাথি মারে, তাহলেও দোষটা সে লোকটার পায়ের থেকে বেশি আমার পিঠের হওয়ার কথা, কিন্তু আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, ঘটনাটা সেরকম নয়। আমি দাঁতে দাঁত চেপে গোটা সিনেমা জোড়া পায়ের লাথি খেয়ে চুপ করে থাকার চেষ্টা করেছি, অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছি, এমনকি আমার পিঠে লাথির শব্দ এবং কম্পনে চমকে গিয়ে অর্চিষ্মান চমকে ঘাড় ঘুরিয়েছে এমনও হয়েছে। 

এবং মেনে নিয়েছে, বা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে, যে লাথি-মারা লোকদের সঙ্গে আমার সিটের একটা অলৌকিক সমাপতন আছে।

'যকের ধন' দেখব ঠিক করা ছিল, সে নয়ডা গিয়ে হলেও, তারপর কতগুলো ঘটনা এমন ঘটল যে আমরা নিশ্চিত হলাম যে সিনেমার দেবতা আমাদের 'যকের ধন' দেখাতে চান। শুক্রবার খেয়াল করলাম নয়ডার সঙ্গে সঙ্গে সাকেতেও চলছে 'যকের ধন'। তারপর এস এম এসে ওলাঅটোর প্রোমোশন কোড এসে গেল, আর আমরা সত্তর টাকার রাস্তা (মিটারে পঞ্চাশ) চব্বিশ টাকায় পৌঁছে গেলাম।

যতটুকু টাকা বাঁচল তার পাঁচগুণ খরচ করে পপকর্নের গামলা আর কোল্ড ড্রিংকসের বালতি নিয়ে হলে ঢুকে বসলাম। চেয়ারের পিঠ হেলিয়ে দেওয়ালে ঠেকালাম, শান্তিতে মন ছেয়ে গেল। সিনেমা চলাকালীন আড়চোখে দেখলাম, অর্চিষ্মানের ওপাশে বসা ভদ্রলোকটি ক্রমাগত সামনের সিটে লাথি মেরে চলেছেন। আমার আরাম দ্বিগুণ হয়ে গেল। 

সবার রিভিউতে পড়লাম, হেমেন রায়ের মূল গল্প থেকে সিনেমার গল্প বেশ খানিকটা আলাদা। বইয়ের গল্প আমি সম্পূর্ণ ভুলে গেছি, কাজেই কোথায় কোথায় আলাদা বলতে পারব না, সিনেমার গল্পটাই বলি আপনাদের। বিমল প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক,কুমার তার বন্ধু, অ্যাড এজেন্সিতে কাজ করে। (অ্যাড এজেন্সিতে কাজ করানোর একটা সুবিধে হচ্ছে পৃষ্ঠপোষকদের প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট। যেমন ধরা যাক, কুমার যদি চ্যাম্পিয়ন ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপনের প্রোজেক্টে কাজ করে, তাহলে ল্যাপটপ স্ক্রিন থেকে 'চ্যাম্পিয়ন'-এর বিজ্ঞাপন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকায় অস্বাভাবিক কিছুই নেই।)  

যাই হোক, বাড়ির পুরোনো ঘর থেকে কুমারের বড় ঠাকুরদা বীরেন্দ্র রায়ের বাক্স উদ্ধার হয়, ভেতর থেকে বেরোয় একখানা মড়ার মাথার খুলি। খুলির ওপর নানারকম অদ্ভুত সংখ্যাটংখ্যা লেখা। নির্ঘাত গুপ্তধনের সঙ্কেত। এদিকে ভারতীয় জাদুঘরের অ্যাসিস্ট্যান্ট কিউরেটর হিরণ্ময়কে (কৌশিক সেন) তলব করেন করালী (সব্যসাচী চক্রবর্তী)। করালীর কাছেও রয়েছে একখানা উচেন লিপিতে লেখা কাগজ। এইবার ভালো লোক দুষ্টু লোক সবাই মিলে গুপ্তধন ধাওয়া করে। দ্বিতীয়ার্ধ্বে শর্মিষ্ঠা ( প্রিয়াঙ্কা সরকার), শম্ভু গোম্পা (সমিধ মুখার্জি) ইত্যাদি চরিত্ররা আসে। প্রিয়াঙ্কা সরকারের চরিত্রটা একটু জোর করেই ঢোকানো হয়েছে মনে হয়, তবে সেটা ভালোই হয়েছে, একেবারে মেয়েশূন্য গল্প ভালো দেখাত না।

আড়াইঘণ্টার সিনেমার প্রথমার্ধটা আমার খারাপ লাগেনি, যদিও অ্যাডভেঞ্চার মিস করছিলাম। যকের ধন-এর গল্প ভুলে গেছি বটে, কিন্তু তাতে অ্যাডভেঞ্চার যে ভরপুর ছিল, সেটা ভুলিনি। ফার্স্ট হাফে গল্প কলকাতাতেই ঘোরে, যদিও পটপরিবর্তনের জন্য গুচ্ছ পুরোনো বাড়ির ছাদ, ভারতীয় জাদুঘরের রাজকীয় বারান্দা, প্রেসিডেন্সির ঐতিহ্যশালী সিঁড়ির ব্যবহার করেছেন পরিচালক। সেগুলো সব গল্পের প্রয়োজনেই হয়েছে, কাজেই কিছু বলার নেই, কিন্তু মাঝে একবার বিমল আর কুমার গঙ্গাবক্ষে লঞ্চের ওপর আলোচনারত ছিলেন, সেটার কোনও কারণ আমি খুঁজে পাইনি। (যদি না “এক নাগাড়ে স্টুডিওর বদ্ধ পরিবেশে শুটিং চিত্র তারকাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর” এই আপ্তবাক্যটি পরিচালক মাথায় রেখে এ সিদ্ধান্ত নেন। সম্ভাবনাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কেন পরে স্পষ্ট হবে।)

অ্যাডভেঞ্চার ভরপুর আছে সেকেন্ড হাফে। আর সেই সব অ্যাডভেঞ্চার সামলাতে গিয়ে সিনেমাটা একটু নড়বড়ে হয়ে গেছে মনে হয়েছে আমার। ক্লাইম্যাক্সে রাতের বেলা ঘন বনের ভেতর গোলাগুলি চলছে, কাজেই আলোর অনুপস্থিতি প্রত্যাশিত, কিন্তু সেটা একই সঙ্গে কী-থেকে-কী-হয়ে-গেল গোছের একটা ফিলিং জাগায়। 

সিনেমাটায় ভালো জিনিস আছে অনেক, দেখলে উত্তরবঙ্গে বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে। সব্যসাচীকে তো আমি পছন্দই করি, বেশ কিছুদিন ধরে দুষ্টু লোকের ভূমিকায় দেখার পর কৌশিক সেনকে হীরুদার চরিত্রে বেশ পছন্দ হয়েছে আমার। বাংলা সিনেমার হিরো হয়েও যে এত স্পষ্ট উচ্চারণে বাংলা বলেন, সেটার জন্য পরমব্রতর একটা জোর হাততালি প্রাপ্য।  

তাছাড়া বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সুকুমার রায় এবং আবোলতাবোলের অবদান নিয়ে আপনার মনে যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহ থেকে থাকে, তাহলে বিমলকে আড়াইঘণ্টা স্ক্রিনে দেখার পর আর থাকবে না। বাংলা সিনেমায় সত্যজিৎ এবং সোনার কেল্লার অবদানের গুরুত্ব নিয়েও। গড়পারের রায়চৌধুরীদের নিয়ে বিমল অবসেসড। কথায় কথায় আবোলতাবোল আবৃত্তি করে, ফেলুদার ডায়লগ বলে। এতবার বলে যে সন্দেহ হয় অবসেশনটা বিমলের, নাকি পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের, হাতের মুঠোয় একটা চরিত্র পেয়ে তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারেননি? 

লাস্ট সিনে স্পষ্ট হয়ে যায় সিকোয়েল আসছে। বলাই বাহুল্য, দেখব। 


8 comments:

  1. bah bah. ami kotodin bangla cinema dekhi na. oh ar yeti obhijan er poster dekhlam. tomar post e comment korar pordin e. hatibagan diye auto kore jete jete. jodio kakababu r ami temon akta fan noi kintu ei cinema ta amio dekhte chai.

    ReplyDelete
    Replies
    1. এবার ট্রেলারটাও দেখে ফেল কুহেলি, ইউটিউবে পাবে। সত্যি কথা বলতে আমিও কাকাবাবুর ফ্যান নই, কিন্তু আমি বাংলা সিনেমা কোনওটাই ছাড়ি না, কারণ বাংলা সিনেমার নিন্দে করে যত সুখ, অন্য কোনও ভাষার সিনেমার নিন্দে করে তা নেই। এটা সিরিয়াসলি বললাম।

      Delete
  2. bah. dekhte hobe tow. by the way parle "sahaj pather goppo" dekho. delhi PVR eo release hoyechey shunlam.

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ, রিলিজ করেছে তো শম্পা। দেখব তাহলে। রেকো দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

      Delete
  3. baah.. daarun review.. aamaar aar giye dekha holo na.. dekhi yeti obhijaan ta dekha hoi na ki..

    bhalo thakben

    Indrani

    ReplyDelete
    Replies
    1. গিয়ে দেখতে আমারও সবসময় ভালো লাগে না, ইন্দ্রাণী। ঝামেলা মনে হয়। কিন্তু বাংলা সিনেমা রিলিজ করলে চেষ্টা করি। বড় পর্দায় লোকজন বাংলায় কথা বলছে, নাচছে, গাইছে, সিগারেট ফুঁকছে, দেখার মজাই আলাদা।

      Delete
  4. সিনেমাটার বেশ কিছু খামতি আমাকে কষ্ট দিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হল পার্শ্ব-চরিত্রদের যাচ্ছেতাই উপস্থিতি ('অভিনয়'-এর মতো কঠিন কাজ তাঁদের কাছ থেকে প্রত্যাশিতই নয়), ডিউলি সাপোর্টেড বাই যাচ্ছেতাই সিনেমাটোগ্রাফি, এবং পরিচালকের তরফে পরমের আপাত নির্ভার অভিনয়ের ওপর নানা ম্যানারিজম আরোপ করার চেষ্টা। কিন্তু তা সত্বেও আমি সিনেমাটা বেশ উপভোগ করেছি,এবং সিকুয়েল এলেই দেখব।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ, আমারও অখাদ্য মনে হয়নি, ঋজু। এই বাজারে সেটাই অনেক।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.